
সূচিপত্র
প্রস্তাবনা- যাতায়াত ব্যবস্থা
জাহানারপার থেকে বরপেটা যাতায়াত
মথাউরির পরিবর্তনের ইতিহাস
কাদং হয়ে বরপেটা যাতায়াত
সাওঁরাচরা অঞ্চলের উন্নয়নে খান পরিযালের ভূমিকা
আমার জীবনের প্রথম বাস ভ্রমণ
পূর্বের বরপেটার কিছু কথা
পূর্বের বরপেটার কিছু কার্যলয়ের অবস্থান
পূর্বের আমোদ-প্রমোদের মাধ্যম
বাঘবর অঞ্চলে নাটক, গীতিনাট্য ও পুতুলনাচ
আগে ছেলে-মেয়েরা কীভাবে লিখা-পড়া শিখত
হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষা: তখন ও এখন
ষাট ও সত্তরের দশকের বঙ্গীয়মূলের মুসলমান সমাজ: একটি তুলনামূলক বিবরণ
উপসংহার
প্রস্তাবনা-যাতায়াত ব্যবস্থা
আমার জন্ম ১৯৫১ সালের ১২ নভেম্বর। জন্ম বাঘবর অঞ্চলের আলীগাঁয়ে আমাদের নানা ধনাই হাজির বাড়িতে। আমি প্রাথমিক ও এম. ই স্কুল পর্যন্ত লিখা-পড়াও শিখেছি আলীগাঁয়ে নানাদের বাড়িতে থেকে। আমাদের বাড়ি ছিলো বাঘবরের পশ্চিম দিকে অবস্থিত জাহানারপারে। ১৯৮০ সালে আমাদের বাড়ি ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পড়ে নদের বুকে বিলীন হয়ে গিয়েছিলো। তারপর অনেকদিন আমাদের গ্রাম ব্রহ্মপুত্র নদের গর্ভে ছিলো। কয়েক বছর আগে চর উঠেছে। আমরা খুবই দুর্ভাগা। আমাদের জন্মস্থান, ছেলেবেলা যেসব জায়গা দিয়ে চলাফেরা করেছি সেসব জায়গা এখন নদীর গর্ভে। ছোটবেলা যাদের সাথে খেলা-ধুলা করে বড় হয়েছি, বলতে গেলে তাদের কারও সাথে এখন যোগাযোগ নেই। তাদের কে কে বেঁচে আছে এবং কে কে মৃত্যুবরণ করেছে, দুই একজনের বাইরে অধিক সংখ্যকের বিষয়েই বর্তমান আমি কিছুই জানি না। ছোটবেলা যারা আমাকে কোলে-পিঠে নিয়ে বড় করেছিলেন, যাদের সাথে খেলা-ধুলা করে বড় হয়েছি তাদের কে কখন মৃত্যুবরণ করেছে মোবাইলের প্রচলন হওয়ার আগে পর্যন্ত সেই বিষয়ে কোনো খবর পাওয়া সম্ভব ছিল না।
অবশ্যে মোবাইলের প্রচলন হওয়ার পর থেকে একটু দেরিতে হলেও এখন সেইসব মৃত্যুর খবর পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এই সেদিন মৃত্যু হলো ওয়াজুদ্দিন তাওইর ছেলে মহির উদ্দিনের। মহির উদ্দিনের ডাক নাম ছিলো মহু। বয়েসে আমার চেয়ে ছয় সাত বছরের ছোট ছিলো। নদী ভাঙনের পরে কৃষ্ণাই জমি কিনে সেখানে বাড়ি করেছিলো। মহির উদ্দিন আমাদের ছোট ভাই হোসেন আলীর চাচাতো সমুন্দি।সেই সুবাদে সে সম্পর্কে আমার বিয়াই ছিলো এবং আমার সাথে তার ভালই সদ্ভাব ছিলো। নদী ভাঙনের পরে আমি এখন বরপেটার যতিগাঁয়ে বাড়ি করেছি। যতিগাঁয় মহির উদ্দিনেরও আত্মীয় আছে। তাই যতিগাঁয় আত্মীয়দের বাড়ি এলে সে আমার সাথে দেখা না করে যেত না। তার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম ফেসবুকের সুবাদে। খবরটা শুনে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম।
মহির উদ্দিনের এক ছেলে, তিন মেয়ে। ছেলের জন্মের সাথে আমার এক স্মৃতি জড়িত আছে। আশির দশকের শেষের দিকের কথা হবে। সঠিক তারিখ অবশ্যে মনে নেই। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের পরে আমাদের আলিগাঁও প্রথামিক বিদ্যালয় গৃহটা মহির উদ্দিনদের বাড়ির পাশেই স্থাপন করা হয়েছিলো। বিদ্যালয় গৃহটা ছিলো গো-হালটের দক্ষিণ পাশে এবং মহির উদ্দিনদের বাড়ি ছিলো গো-হালটের উত্তর পাশে। বিদ্যালয় গৃহ এবং তাদের বাড়ির মধ্যে অনুমান বিশ পঁচিশ হাতের ব্যবধান ছিলো।
সেদিন আমি স্কুলেই ছিলাম। মহির উদ্দিনদের বাড়ি থেকে মেয়েলি কণ্ঠের চিৎকারের পাশাপাশি অনেক মেয়েলোকের কোলাহলের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। কিসের কোলাহল শুনার জন্য কৌতূহলী হয়ে তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে এলাম। মহির উদ্দিন বাড়ির উঠোনেই দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি তাকে কোলাহলের কারণ জিজ্ঞাসা করলাম- বিয়াই, কি হয়েছে? অনেক সময় ধরে চিৎকার কোলাহলের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ব্যাপার কি?
তখন মহির উদ্দিন বললো- আপনার বিয়ানের সন্তান হবে। সেই রাত থেকেই বিষ উঠেছে। সন্তান খালাস হচ্ছেনা। তাই খুব দুঃশ্চিন্তায় আছি। কি করব, কোনো উপায় ভেবে পাচ্ছিনা। প্রায় তিন চার জন চাওনি মিলেও সন্তান খালাস করাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
তখনও হাস্পতালে সন্তান প্রসবের প্রচলন হয়নি আমাদের গ্রামাঞ্চলে। গ্রাম্য ধাইরাই তখন সন্তান প্রসব করাতেন গ্রামাঞ্চলে। সেই ধাইদের চাওনি বলা হতো। তিন চারজন চাওনি মিলেও যখন সন্তান খালাস করাতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন বলতে গেলে মহা বিপদ। এরকম অবস্থায় অনেক প্রসূতি তখন মারাও যেত গ্রামাঞ্চলে। আমি কোনো ডাক্তার বা কবিরাজ নই। সাধারণ স্কুল শিক্ষক। সন্তান প্রসবের বিষয়ে আমার তেমন কোনো অভিজ্ঞতাও নেই। কিন্তু আমাদের সমাজে ইংরেজিতে একটা কথা প্রচলন আছে, অল ই্ডিয়ানচ আর ডক্টর। সকল ভারতীয়ই ডাক্তার। কেউ কারো কোনো রোগব্যধির কথা শুনলে সে কিছু একটা বিধান দিবেই। আমিও সমাজের একজন। তাই আমিও এর ব্যতিক্রম নই। তাই বিপদের কথা শুনে আমার একটা আয়াতের কথা মনে পড়ে গেল। কোরানের আয়াত। কোন বিপদ আপদের সময় আয়াতটি পড়লে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়া যায়, এমনই প্রবাদ প্রচলন ছিলো এই আয়াতটি সম্পর্কে। আয়াতটি হজরত ইব্রাহীম(আঃ)এর সাথে সম্পর্কিত ছিলো। হজরত ইব্রাহীম(আঃ)কে নমরূদ যখন আগুনে নিক্ষেপ করেছিলো, তখন এই আয়াতটি পড়ে তিনি আগুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। কিছুদিন আগেই আমি কোন এক উৎস থেকে আয়াতটি শিখেছিলাম। তাই আমি ভাবলাম- দেখি সেই আয়াতটা প্রয়োগ করে, যদি কাজে লাগে! কাজ হলে ভালো, না হলেও তো কোনো ক্ষতি নেই।
এভাবে ভেবে আমি বললাম- বিয়াই, কাচের গ্লাসে করে এক গ্লাস জল নিয়ে আসুন।
মহির উদ্দিন কোন রকম প্রশ্ন না করে জল এনে দিলো। আমি আয়াতটা পড়ে জলে ফুঁ দিয়ে বললাম- যান, জলটুকু বিয়ানকে খাইয়ে দিনগে’।
মহির উদ্দিন তৎক্ষণাৎ গিয়ে জল খাইয়ে দিলো। জল খাওয়ানোর একটু পরেই একটি ছেলে সন্তান ভূমিষ্ট হলো। সাথেই সাথেই মহির উদ্দিন এসে আমাকে খবরটা দিলো। তাদের বিশ্বাস আমার জলপড়া খেয়েই সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মহির উদ্দিনের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল ছিলো।
আমি সেকালর কথা বলতে গিয়ে একালরো কিছু কথা বলে ফেললাম। তারজন্য আমি পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সেকালের কথা বলতে গেলে প্রথমে সেকালের যাতায়ত ব্যবস্থা, লোকের সামাজিক অবস্থান ও জীবন ধারণ সম্পর্কে বলতে হয়। প্রথমে আমি তখনকার দিনের রাস্তাঘাটের কথা বলি। আমাদের গ্রাম নিয়েই প্রথমে শুরু করি।আমাদের গ্রাম নিতান্ত অনুন্নত এলেকায় ছিলো এবং আমার ছেলেবলার যাতায়তও একটা সীমিত পরিসরের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো। আমাদের বাড়ি থেকে আলীগাঁও নানাদের বাড়ি, নানাদের বাড়ি থেকে গরলা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসা, এটাই ছিলো আমার তখনকার পৃথিবী।
আমাদের বাড়ি থেকে কীভাবে আলীগাঁও নানাদের বাড়ি যেতাম সে সম্পর্কে বলি। ছোটবেলা আমি নানাদের বাড়ি বিশেষভাবে আমার দাদীর সাথে যেতাম। মার সাথে যেতাম যদিও সেটা এখন আমার মনে নেই। আমাদের পারার সামনে দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে দুই রশি দক্ষিণে পূর্ব-পশ্চিম দিকে প্রসারিত একটি গোহালট ছিলো এবং আমাদের পারার বাড়িগুলির সামনে দিয়ে ছিলো অন্য একটি হাঁটা-পথ। আমরা গোহালট দিয়ে খুব একটা যাতায়ত করতাম না। বাড়ির সামনের হাঁটা পথ দিয়েই যাতায়ত করতাম অধিকাংশ সময়।
আমাদের বাড়ি থেকে এক মাইল পূর্ব দিকে ছিলো বাঘবর পাহাড়। বাঘবর পাহাড়ের তিন চার কিলোমিটার পূর্ব দিকে অবস্থিত আলিগাঁয় নানাদের বাড়ি ছিলো। পশ্চিম দিকে সেউরারভিঠা নামক একটি গ্রাম ছিলো। সেউরারভিঠার পশ্চিমে ছিলো বেকাী নদী। সেউরারভিঠার সাথে আমাদের তেমন সম্পর্ক ছিল না। তাই আমরা পূর্ব দিকেই যাতায়াত করতাম বেশি। পশ্চিম দিকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যাতাযাত করা হতোনা। পূর্ব দিকে আসার সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ির সামনের হাঁটাপথ দিয়ে পণ্ডিত তাউর বাড়ি পর্যন্ত এসে সেখান থেকে গোহালটে উঠে বাঘবর পাহারের মাঝ বরাবর লক্ষ্য করে সোজা বাঘবরের পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত গোহালটে উঠতাম। গোহালটটি বাঘবর থেকে উত্তর দিকে অবস্থিত মরাভাজের দিকে প্রসারিত ছিলো। সেই গোহালট ধরে দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত বাঘবর থানায় আসতাম। তারপর বাঘবর থানার সামনে দিয়ে এসে মন্দিয়া দিঘীরপাম হয়ে বাঘবর পর্ষন্ত প্রসারিত পিডব্লিউডি রাস্তায় উঠতাম।
বাঘবর থেকে সুতির পার পর্যন্ত আসতে পিডব্লিউডিতে দুই জায়গায় দুটি কুম ছিলো। খরার মরশুমে সেই কুম দুটি পাশ কাটিয়ে হেঁটে আসতাম এবং বর্যার মরশুমে কুম দুটি পার হওয়ার জন্য নৌকার ব্যবস্থা ছিলো। নৌকায় পয়সা নিত না। সরকারী নৌকা থাকত। তারপর পিডব্লিউডি ধরে আলীগাঁয়ের নায়েব আলী নানার বাড়ি পর্যন্ত আসতাম। সেখান থেকে আলিরপাম বাজারের দিকে প্রসারিত একটি গোহালট ছিলো। সেই গোহালট দিয়ে কিছুদূর এলে একটি খাল পেতাম। আমরা আলিরপাম বাজারের দিকে না গিয়ে সেই খাল পার হয়ে হাঁটা পথ ধরে ছয়সাত রশি এলেই নানাদের বাড়ি পেতাম। নানাদের বাড়ির দক্ষিণ পশ্চিম কোনায় মসজিদগৃহ ছিলো। হাঁটাপথটা মসজিদ গৃহের উত্তর পাশে দিয়ে এসে নানাদের বাইর বাড়ির ওপর দিয়ে দক্ষিণ পূর্ব দিকে কিছুদূর এসে বিদ্যালয়গৃহের সাথে মিলিত হতো। বিদ্যালয়গৃহের সন্মুখে একটি খেলার মাঠ ছিলো। খেলার মাঠের দক্ষিণ পাশ দিয়ে পূর্ব-পশ্চিম দিকে প্রসারিত একটি গোহালট ছিলো। উত্তর অঞ্চল অর্থাৎ সুতির পার, বরলি, পালার পাম প্রভৃতি গ্রামের ছাত্ররা ৩৭১ নম্বর আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসার জন্য এবং অন্যান্য লোকেরা আলীরপাম হাটে যাওয়ার জন্য এই হাঁটা-পথটাই ব্যবহার করত। বর্ষার মরসুমেও খালটা প্রায়ই হেঁটে পার হওয়া যেত। তবে প্রবল বন্যা হলে তখন একটু পশ্চিম দিকে অবস্থিত তমছের ভাইদের বাড়ি বরাবর কাপড় বাঁচিয়ে খালটা হেঁটে পার হওয়া যেত।
পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সবলোক আলীরপাম হাটে যাওয়ার জন্য আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের দক্ষিণ দিক দিয়ে পূর্ব-পশ্চিম দিকে প্রসারিত রাস্তা অর্থাৎ গো-হালট ব্যবহার করত। আমরা নানাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশ দিয়ে গিয়ে সেই গোহালটে উঠে পূর্বদিকে প্রায় এক মাইল যাওয়ার পর একটি মাথাউরি পেতাম। মাথাউরিটি লখিমপুর জেলার পূর্বের ধেমাজি মহকুমার শিসিকলঘর-টেকেলিফুটা থেকে বাঘবরের প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত দলাগাঁও পর্যন্ত প্রসারিত ছিলো। সেই মাথাউরি দিয়ে পঞ্চাশ ষাট মিটার যাওয়ার পর মাথাউরি থেকে নেমে হাঁটাপথে প্রায় আধা মাইল যাওয়ার পর আলীরপাম বাজার পেতাম। আলীরপামে দৈনিক বাজারের পাশাপাশি শুক্রবারে সপ্তাহিক হাট বসত। ব্রহ্মপুত্র নদ বাজার থেকে অনুমান এক কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ছিলো। বাজারের পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত একটি সুতি ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত প্রসারিত ছিলো। আলিরপাম বাজারে অনেক হিন্দু ব্যবসায়ীর বিভিন্ন দোকান ছিলো। সেই দোকনীদের মাঝে নিত্যানন্দ সাহা, গৌড় সাহা, তারাপদ সাহা, সূর্য সাহা, নারায়ন বসাক, মুস্তি বেপারি প্রভৃতিরা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলো। বাজারে রাখাল সূত্রধর নামক একজন হাতুড়ে ডাক্তার ছিলেন। হাতুড়ে হলেও তখন তাঁর খুবই নাম-ডাক ছিলো। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি রাখাল ডাক্তার নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ছেলে জগদীশ সূত্রধর আমার সমসায়িক ছিলো।
তখন বরপেটা থেকে মন্দিয়া, দিঘীরপাম হয়ে বাঘবর পর্যন্ত প্রসারিত পিডব্লিউডি রাস্তার বাইরে বরপেটার দক্ষিণ অঞ্চলে কোন রাস্তা ছিল না। অবশ্যে গো-হালট ও হাঁটা-পথ ছিলো অনেক। তখন সেই পিডব্লিউডি রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে দিঘীরপাম হয়ে বরপেটা বা মন্দিয়া যাতায়াত করতে হতো। কারণ তখন গাড়ী-মটরতো দূরের কথা সাইকেল পর্যন্ত ছিল না আমাদের অঞ্চলে। তখন আলিগাঁও অঞ্চলে মাত্র তিনটা সাইকেল ছিলো। একটা আলীগাঁয়ের আমাদের নানা ধনাই হাজীর, একটা দানেশ মুন্সীদের এবং একটা সারগাঁয়ের মাগন বেপারীর। শুনেছি, মাগন বেপারীর সাইকেলটা বোলে এখনও আছে।এটা ষাঠের দশকের প্রথম ভাগের কথা। গড়ল-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় অধ্যয়ন কালে আমি কয়েকবার আলিগাঁও থেকে সেই পিডব্লিউডি রাস্তা গিয়ে দিঘীরপাম হয়ে পায়ে হেঁটে মন্দিয়া এবং বরপেটায় গিয়েছি। মন্দিয়া থেকেও খেয়ায় ভেলেঙ্গী নদী পার হয়ে আবার হেঁটেই বরপেটা যেতে হতো। অবশ্যে কোন কোন সময় ভেলেঙ্গী নদীর ওপারে বাস দাঁড়িয়ে থাকতো। বাস থাকলে তখন বাসেও যাওয়া যেতো। বাসের ভাড়া তখন দুরকম ছিলো। সামনের সিটের জন্য পঞ্চাশ পয়সা এবং পেছনের সিটের ভাড়া ছিলো চল্লিশ পয়সা। সামনের দিকে তক্তা দিয়ে প্রস্থ বরাবর বেরা দিয়ে বাসটাকে দুইভাগে ভাগ করা ছিলো। সামনের দিকে প্রস্থ বরাবর বেঞ্চের মতো করে আসন পাতা ছিলো এবং পেছনের দিকে লম্বালম্বি তক্তা দিয়ে বেঞ্চ পাতা ছিল। শেষের পর্যায়ে কোনো কোনো বাসে নারকেলের ছোবড়ার আঁশ ও প্লাস্টিক দিয়ে গদি তৈরি করে কাঠের পাটাতনের ওপর পেতে দেওয়া হতো।
মন্দিয়া থেকে বরপেটাগামী বাসের তেমন কোন নিশ্চয়তা ছিল না। তাই অনেকে খেয়ায় ভেলেঙ্গী নদী পার হয়ে বাস না থাকলে বাসের জন্য অপেক্ষা না করে হেঁটেই বরপেটা যেতো। পরবর্তীতে আমি নিজেও ভেলেঙ্গী নদী পার হয়ে পায়েহেঁটে অনেকদিন বরপেটা এসেছি। ১৯৭১ সালে ম্যাট্রিক পাশ করার পর আমাকে সাইকেল কিনে দিয়েছিলো। সাইকেল কেনার পর অবশ্যে আমি সাইকেল নিয়ে মন্দিয়া-বরপেটা যাতায়াত করেছি। বলা বাহুল্য হলেও বলছি। আমাকে তখন ৭০ টাকা দিয়ে রবার সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। সাইলকেলটা গোয়ালপারা থেকে আমাদের উত্তর পাড়ার তাউই সোবাহান বেপারি কিনে এনেছিলেন। সোবাহান বেপারীর ছেলে গোলাপ হোসেন আমার দোস্ত ছিলো। সেই সুবাদে সোবাহান বেপারি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মাত্র সোবাহান বেপারিই নয়, আমি লেখা-পড়া শিখছি বলে তখন অনেকেই আমাকে স্নেহ করতেন। যদি বলা হয়, তখন পাড়ার ছেলেদেরকে অনেকেই নিজেদের ছেলে-মেয়ের মতোই আদর যত্ন করতেন, তাহলে মনে হয় বাড়িয়ে বলা হবে না। এখন সেসব কথা ভাবাই যায় না।
জাহানারপার থেকে বরপেটা যাতায়াত
গড়লার স্লুইচ গেট থেকে আলিগাঁও পাথার, আলিগাঁও, পালারপাম, সুতিরপার হয়ে বাঘবর পর্যন্ত নির্মিত মাথাউরিটি ১৯৬৪ সালে পুনরায় নদীভাঙনের কবলে পড়ে। তখন গড়াল-চাচরা এম. ই. মাদ্রাসার পূর্বদিকে অবস্থিত পুরোনো মাথাউরিটির সঙ্গে সংযোগ করে চাচরা, মানিকপুর, শিলুশি ও পালারপামের মধ্য দিয়ে সুতিরপার পর্যন্ত একটি নতুন মাথাউরি নির্মাণ করা হয় এবং সুতিরপারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত বাঘবর পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত পুরোনো মাথাউরিটির সঙ্গে সেটিকে যুক্ত করা হয়।
এই নতুন মাথাউরিটি নির্মাণের পর দীঘিরপার হয়ে আমাদের বরপেটায় যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। তখন জাহানারপার থেকে বরপেটায় আসতে হলে বাঘবর থানার কাছ থেকে মাথাউরিতে উঠে মাথাউরি দিয়ে সুতিরপার, শিলুশি গ্রাম হয়ে হেঁটে মানিকপুর আসতে হতো। মানিকপুর থেকে আবার কলিমুদ্দিনের খেয়ায় একটি ছোট খাল পার হয়ে মন্দিয়া থেকে শিলুশি পর্যন্ত বিস্তৃত পিডব্লিউডি সড়কে উঠতে হতো। সেখান থেকে সত্রকনরা হয়ে মন্দিয়ায় এসে তারপর বরপেটায় আসতে হতো।
শিলুশি ও সুতিরপারের মধ্য দিয়ে নির্মিত মাথাউরিটি ১৯৮০ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পড়ার পর মানিকপুর গ্রামের উত্তরদিকে অবস্থিত পুরোনো মাথাউরিটির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে শিলুশি ও বরলি গ্রামের মধ্য দিয়ে বাঘবর পাহাড় পর্যন্ত আবার নতুন করে মাথাউরি নির্মাণ করা হয়।
তখন জাহানারপার থেকে বরপেটায় যেতে হলে শুষ্ক মৌসুমে বাঘবর থানার সামনের রাস্তা দিয়ে এসে নতুন নির্মিত মাথাউরিতে উঠতে হতো। এরপর সত্রকনরা হয়ে মন্দিয়ায় এসে বরপেটা আসতে হতো। কিছুদিন পর নতুন নির্মিত মাথাটিও নদীভাঙনের আশঙ্কার মুখে পড়ে। তখন বরলি থেকে আবার বাঘবর পাহাড়ের উত্তর দিকে অবস্থিত বাঘবরের আরিমত্ত থান এবং বাঘবর হাইস্কুল পর্যন্ত নতুন করে মাথাউরি নির্মাণ করা হয়।
এই নতুন মাথাউরি নির্মাণের পর জাহানারপার থেকে বরপেটায় আসতে হলে বাঘবর পাহাড়ের উত্তর দিক দিয়ে এসে বাঘবর হাইস্কুল পর্যন্ত নির্মিত মাথাউরিতে উঠতে হতো। সেখান থেকে হেঁটে সত্রকনরা হয়ে মন্দিয়ায় আসতে হতো। এরপর মন্দিয়ায় খেয়া নৌকায় ভেলেঙ্গি নদী পার হয়ে পিডব্লিউডি সড়কে উঠতে হতো। বাস পাওয়া গেলে বাসে করে, আর বাস না থাকলে হেঁটেই বরপেটায় আসতে হতো। অন্যদিকে, বর্ষাকালে অনেক সময় নৌকায় করে কাদং পর্যন্ত এসে, কাদং থেকে বাসে করে বরপেটায় আসতে হতো।
**মথাউরির পরিবর্তনের ইতিহাস**

ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পড়ার কারণে বামুন ডংরার পশ্চিম দিকে পুরনো মথাউরির সঙ্গে সংযোগ করে বেশ কয়েকবার নতুন করে মথাউরি নির্মাণ করতে হয়েছে। লখিমপুর থেকে বাঘবরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত দলাগাঁও পর্যন্ত বিস্তৃত মথাউরিটি প্রথম ১৯৬১ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পড়ে। ফলে গড়লার স্লুইস গেট বাজারের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত পুরনো মথাউরির সঙ্গে সংযোগ করে আলীগাঁও পাথার, আলীগাঁও, পালারপাম, সুঁতিরপার প্রভৃতি গ্রামের মধ্য দিয়ে বাঘবর পর্যন্ত নতুন করে মথাউরি নির্মাণ করা হয়।
গড়লার স্লুইস গেট থেকে আলীগাঁও পাথার, আলীগাঁও, পালারপাম, সুঁতিরপার এবং বাঘবর পর্যন্ত নির্মিত মথাউরিটিও ১৯৬৪ সালে আবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে। ফলে গড়াল-চাচরা এম, ই, মাদ্রাসার পূর্ব দিকে অবস্থিত পুরনো মথাউরির সঙ্গে সংযোগ করে চাচরা, মানিকপুর, শিলুশি ও পালারপামের মধ্য দিয়ে সুঁতিরপার পর্যন্ত নতুন করে মাথাউরি নির্মাণ করা হয় এবং সুঁতিরপারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত বাঘবর পর্যন্ত প্রসারিত পুরনো মথাউরির সঙ্গে সেটিকে যুক্ত করা হয়।
কিন্তু এই মথাউরিটিও ১৯৮০ সালে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের কবলে পড়ে। এরপর মানিকপুর গ্রামের উত্তর দিকে অবস্থিত পুরনো মথাউরির সঙ্গে সংযোগ করে শিলুশি ও বরলি গ্রামের মধ্য দিয়ে বাঘবর পাহাড় পর্যন্ত আবার নতুন করে মথাউরি র্নির্মাণ করা হয়। কিছুদিন পর নতুন করে নির্মিত মথাউরিটিও ভাঙনের হুমকির মুখে পড়ায় বরলি থেকে বাঘবর পাহাড়ের উত্তর দিকে অবস্থিত বাঘবরের আরিমত্ত থান এবং বাঘবর হাইস্কুল পর্যন্ত নতুন করে মথাউরি নির্মাণ করা হয়।
সেই একই বছর চাচরা ও দীঘিরপাম অঞ্চলও ব্রহ্মপুত্রের নদীভাঙনের কবলে পড়ে। ফলে বামুণদংরা হাইস্কুলের পশ্চিম দিকে অবস্থিত পুরনো মথাউরির সঙ্গে সংযোগ করে দীঘিরপাম ও চাচরার মধ্য দিয়ে নতুন করে মথাউরি নির্মাণ করে মানিকপুরের পুরনো মথাউরির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এরপর চাচরা ও মানিকপুরের উত্তর অংশ আবার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের কবলে পড়ে। ফলে চাচরা ও মানিকপুরে অবস্থিত মথাউরির একটি বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে দীঘিরপামের পুরনো মথাউরির সঙ্গে সংযোগ করে চাচরার মধ্য দিয়ে মাথাউরিটি সম্প্রসারিত করে সত্র কনরা বাজারের পশ্চিম দিক দিয়ে বরলি গ্রামের মধ্য দিয়ে সম্প্রসারিত করে বাঘবর হাইস্কুল পর্যন্ত মথাউরিটি পুনরায় নির্মাণ করা হয়। সেই মথাউরিটি এখনও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে যদিও বরলির পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত মথাউরিটি এখন একেবারে নদীর পাড়ে পড়েছে। কখন কী ঘটে, তা কেউ বলতে পারে না। ব্রহ্মপুত্রের নদীভাঙনের স্বভাবই এমন- কখন কোন অঞ্চল, কোন রাস্তা বা মাথাউরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
কাদং হয়ে বরপেটা যাতায়াত
কাদং হয়ে বরপেটা যেতে হলে প্রথমে হেঁটে মরাভাজ এবং মরাভাজ থেকে গয়নার নৌকায় করে কাদং এবং কাদং থেকে বাসে চড়ে বরপেটা আসতে হতো। বাস নিয়মিত ছিল না। তাই কখনও কখনও পায়ে হেঁটেও জনীয়া হয়ে বরপেটা যেতে হতো।
গয়নার নৌকার কথাই যখন উঠেছে তাহলে একটি গল্প বলি। তখন সাওঁরাচরা গ্রামের বাদল খানের খুবই নাম-ডাক ছিলো। তিনি কোথাও গেলে তাঁর সাথে কমেও দশ-বারজন লোক থাকত। সাওঁরারচরা গ্রামটা বেঁকি নদীর উত্তর পারে অবস্থিত। সাওঁরাচরা থেকে বরপেটা আসতে হলে বালিকুরি হয়ে কলগাছিয়া পর্যন্ত সাইকেলে এসে তারপর কালগাছিয়া থেকে বাসে বরপেটা আসতে হতো। নইলে করারকুরে বেকী নদী পার হয়ে সাইকেলে অথবা বাসগাড়ি থাকলে বাসে করে বরপেটা আসতে হতো। কারণ করারকুর থেকে বরপেটা পর্যন্ত তখন বাসগাড়ি যাতাযাত করত। অবশ্যে বাস নিযমীয়া ছিল না। তাই বাদল খান সাহাব অনেক সময় গয়নার নৌকায় চড়েও বরপেটা আসতেন। একদিন আমি কাদং আসার জন্য মরাভাজের খেয়াঘাটে বসে গয়নার নৌকার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় একটি নৌকা এসে ঘাটে ভিড়ল। নৌকায় চড়ে দেখি বাদল খান সাহেব বসে আছেন নৌকায়। আমরা সবাই সেই নৌকায় চড়ে কাদং এলাম। কাদং আসার পর বাদল খান বললেন- কাউকে নৌকার ভাড়া দিতে হবেনা। নৌকার ভাড়া আমি দিব। এভাবে বলেই তিনি বললেন- বাস নাই। তাই সবাই চায়ের দোকানে গিয়ে চা খান। কাউকে চায়ের পয়সা এবং যারা যারা বরপেটা যাবেন তাঁদের বাস ভাড়াও দিতে হবেনা। সত্যি সত্যি সবাই চা খেলাম। সেদিন চায়ের পয়সা এবং বাস ভাড়া বাদল খানই দিয়েছিলেন। শুধু সেদিনই নয়।শুনেছি, তিনি গয়নার নৌকায় কাদং এলে সবসময়ই এরকম করতেন।সালটা মনে হয় ১৯৭৭ ছিলো। বাদল খান শ্যামবর্ণ ছিলেন এবং দেখতে সুপুরুষ ছিলেন।
বাদল খান সাহেব মনে হয়, টুকটাক কবিরাজইও জানতেন। কথাটা বুঝিয়ে বলি। আমার গলায় মাছের কাঁটা আটকে ছিলো। তাই আমি খুসখুস করে কাশছিলাম। খান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন- কি হয়েছে, এভাবে কাশছেন কেন?
আমি বললাম- গলায় মাছের কাঁটা আটকেছে। নামতেছেনা।
উনি তখনই কিছু বললেন না। কিছু সময় পরে বললেন- দেখেনতো কাঁটা আছে কিনা?
আমি দেখলাম গলায় কাঁটা নেই। আমি বললাম- কাঁটা কই গেলো?
তখন বাদল খান সাহেব বললেন- আমি ঝেড়ে দিয়েছি, তাই কাঁটা নেমে গেছে।
বাদল খানের কথাই যখন উঠেছে তখন আরেক দিনের একটি গল্প বলি। সালটা মনে হয় ২০১১ হবে। বারটা সেদিন রবিবার ছিলো।সেদিন সকাল অনুমান সাতটায় বাদল খানের সুযোগ্য সন্তান সাদুল্যা খান স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বললেন- আবুল সাব, কোথায় আছেন?
সাদুল্যা খান তখন মনে হয় বঙ্গাইগাঁয়ের সহকারী আইএস ছিলেন এবং বরপেটা জেলার সর্বশিক্ষার সহকারী জেলা সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন।সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো। আমি ২০০৮ সালে আমার দিগ্বিজয়ী বাবর নামক একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস প্রকাশ করেছিলাম। উপন্যাসটির ‘দিগ্বিজয়ী বাবর’ নামে একটি টোকা তিনি লিখে দিয়েছিলেন। সেই সুবাদে আমার সাথে তাঁর ভালই পরিচয় ছিলো বলতে হয়।
ফোন রিসিভ করে আমি বললাম- বলুন স্যার, এত সকালে কীজন্য ফোন করলেন?
সাদুল্যা সাহেব বললেন- যাব এক জায়গায়। আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছি।
আমি বললাম- কোথায়?
আসেন। সাদুল্যা স্যার বললেন- গেলেই জানতে পারবেন। আমাদের বাড়ি পর্যন্ত সাইকেল নিয়ে আসেন। এখান থেকে আমরা চার চাকা নিয়ে যাব।
সেদিন সাদুল্যা স্যার আমাকে তাঁদের সাওঁরাচরার বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন।
সেদিন বাদল খান সাহেব বাড়িতে ছিলেন এবং তিনি নিজ হাতে আমাদের খাদ্য পরিবেশন করেছিলেন।
শুধু সাওঁরাচরা অঞ্চলেই নয়, পশ্চিম বরপেটা অঞ্চলের উন্নয়নে বাদল খান সাহাবের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিলো। এই বিষয়ে বরপেটার বউমা জুমিতরা দাস ‘সাওঁরাচরা অঞ্চলের উন্নয়নে খান পরিয়ালের ভূমিকা’ শীর্যক বাদল খান সাহাবের কর্মজীবনের ওপরে সম্প্রতি বার্তা নামক আলোচনীতে ২০১৭ অসমিয়ায় একটি তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধটি বাংলায় অনুবাদ করে এখানে সন্নিবিষ্ট করা হলো-
সাওঁরাচরা অঞ্চলের উন্নয়নে খান পরিযালের ভূমিকা
লেখিকা-জুমিতরা দাস
বাংলা অনুবাদ-আবুল হোসেইন
বরপেটা শহর-সংলগ্ন গণককুছি গ্রামের মাননীয় রামতন দাস ডাঙরীয়ার বাড়ির বউ হয়ে আসার পর থেকেই লক্ষ্য করতাম, কুর্তা-পায়জামা পরিহিত, নেতার মতো দেখতে এক মুসলমান ভদ্রলোক এই বাড়িতে প্রায়ই আসা-যাওয়া করতেন। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হিসেবে প্রথম দিকে তাঁর ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় আমি কিছুটা সংকোচ বোধ করতাম। কিন্তু পরে তাঁর পরিচয় ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরে শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে গেল। তিনি ছিলেন আমার শ্বশুরের একান্ত বন্ধু, মাননীয় বাদল খান সাহাব।
সরকারি দায়িত্বের কারণে আমার শ্বশুর রামতন দাস ডাঙরীয়াকে দীর্ঘদিন বাদল খান সাহেবের বাড়িতে অবস্থান করতে হয়েছিল। সেই সূত্রেই তাঁদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কৌতূহলবশত এই মানুষটির সম্পর্কে জানাতে আমি শ্বশুরমশাইকে অনুরোধ করেছিলাম। তিনিও সময়-সুযোগ বুঝে বাদল খান সাহাব এবং তাঁর পরিবারের কথা অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে আমাকে বলতেন। শ্বশুরমশাইয়ের মুখে শোনা সেই গল্পের নায়কের মতো মানুষটি এবং তাঁর পরিবারের বিষয়ে দু-চারটি কথা লিখে রাখার লোভ আমি সামলাতে পারিনি।
আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী বরপেটা শহরের পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত সাঁওরাচরা গ্রামের অতীতের কথা স্মরণ করতে গেলে এই অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তি মহঃ বাদল খান সাহাবের কথা অনিবার্যভাবেই উঠে আসে।
বাদল খান সাহাবের পিতা মরহুম মফিজ খান সাহাব ১৯৪৬ সালে এই গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। খান সাহাবের পিতামহ ছাবেদ খান ছিলেন অবিভক্ত বঙ্গদেশের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নিলজা গ্রামের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। ছাবেদ খানের জ্যেষ্ঠ পুত্র জনাব খান বঙ্গদেশের স্থানীয় জমিদার চানমিয়া সাহাবের কাছারিতে চিরস্তাদার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একবার কোনো একটি বিষয় নিয়ে জমিদারের পেয়াদার সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় তাঁকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়।
কিছুদিন পর জনাব খান তাঁর আরও তিন ভাই— মফিজ খান, বুদ্ধ খান ও কুরপান খানের সঙ্গে মিলিত হয়ে অসমের তেজপুর শহরে অবস্থিত মিলিটারি ক্যাম্পে হাঁস-মুরগি সরবরাহের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তাঁরা এই লাভজনক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সে সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘূর্ণাবর্তে পড়ে তাঁদের সেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা অসমের উর্বর মাটিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহের সিদ্ধান্ত নেন। ইতিমধ্যে তাঁদের কিছু নিকটাত্মীয় কলগাছিয়ার নিকটবর্তী বালাইপাথার গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সূত্রে ১৯৩৯ সালে তাঁরা বঙ্গদেশের নিজ গ্রাম থেকে নৌকাযোগে উজান বেয়ে অসমে এসে ওই গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে জমি কিনে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানে তাঁদের জন্য জমি পর্যাপ্ত ছিল না। তাই ১৯৪৬ সালে চার ভাই একসঙ্গে সাঁওরাচরা গ্রামে এসে কুজরত মুন্সী নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে চল্লিশ বিঘা জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন।
সেই সময় সাঁওরাচরা গ্রামের পুরোনো বাসিন্দাদের মধ্যে ছিলেন পাশান আকন্দ, আশকর আলী মণ্ডল, ছন্দ আলী, ছৈয়দ আলী আকন্দ, বদর আলী, তালেব শেখ, ছাদেক আলী (পশ্চিমপাড়া), মাণিক দেওয়ানী, রেফাজ শেখ, আবদুশ বশিদ মৌলভী, মাতাব খাঁ, কুরান শেখ, সাদেক আলী, মাতাব মুন্সী (পূর্বপাড়া), জুরান আলী দেওয়ানী, আবদুস ছোবাহান, আবদুর রহমান, ইজ্জত আলী মুন্সী, দারোগালী, শরিয়তুল্লা মুন্সী, ছত্তর খাঁ, গান্ধু হাজী (দক্ষিণপাড়া) প্রমুখ। তখন সাঁওরাচরা গ্রামটি আজকের মতো বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত ছিল না, যদিও কয়েকটি সুবা বা পাড়া হিসেবে এলাকাগুলো পরিচিত ছিল।
নতুন করে এসে বসতি স্থাপনকারী মফিজ খান সাহাব ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তি। তাঁর প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের কারণে ১৯৫০ সালে প্রথমবারের মতো তাঁকে সাঁওরাচরা গ্রামের সরকারি গ্রামপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
ততদিন পর্যন্ত এই গ্রামে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। তবে স্থানীয় মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি-দুটি মক্তব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে আরবি শিক্ষার প্রচলন ছিল।
১৯৫২ সালে গ্রামপ্রধান মফিজ খানের নেতৃত্বে গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত জুব্বার আলী সাহাবের পাড়ায় একটি প্রাইমারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময় এই অঞ্চলে শিক্ষকতা করার মতো উপযুক্ত লোক না থাকায় বেতবাড়ির বাসিন্দা চেরাগ আলী সাহাবকে বিদ্যালয়টির শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে সেই বিদ্যালয়টি ৮৬২ নম্বর সাঁওরাচরা নিম্ন বুনিয়াদি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে।
গ্রামে ক্রমশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদাও বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৫৯ সালে গ্রামপ্রধান সাহাবের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে আরও একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীকালে এই বিদ্যালয়টি ৯৩৩ নম্বর সাঁওরাচরা মাঝরগাঁও বুনিয়াদি বিদ্যালয় নামে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সে সময় সাঁওরাচরা আজকের মতো গ্রাম, রিজার্ভ ও পাথারে বিভক্ত ছিল না। ১৯৬২ সালে মফিজ খান গ্রামপ্রধানের পরামর্শে দক্ষিণ পাড়ার জুরান আলী সাহাবের নেতৃত্বে আরও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে সেটি ১০৯৫ নম্বর সাঁওরাচরা জনপ্ৰিয় প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গ্রামপ্রধান সাহাব স্থানীয় মুরব্বিদের সহযোগিতায় অন্যান্য যেসব প্রতিষ্ঠানগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে সাঁওরাচরা মধ্যপাড়া মসজিদ (১৯৫৫), সাঁওরাচরা মাঝরগাঁও ঈদগাহ (১৯৫৯) এবং সাঁওরাচরা বাজার (১৯৬২) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মফিজ খান সাহাবের শিক্ষার প্রসারের প্রতি প্রবল আগ্রহ শুধু নিজের গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সে সময় পশ্চিম বরপেটা অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তিনি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কাদং হাইস্কুলের তিনি ম্যানেজিং কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এছাড়া, ১৯৬২ সালে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত রামপুর জনকল্যাণ এম.ই. মাদ্রাসার তিনি প্রতিষ্ঠাপক সভাপতি ছিলেন।
এছাড়াও তিনি বাঘবর থানার অন্তর্গত এই অঞ্চলের জন্য গঠিত ভি.ডি.পি. (Village Defence Party) দলের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। সে সময় বাঘবর থানা-ভিত্তিক একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ওজন নিক্ষেপ (Weight Throw) খেলায় তিনি প্রথম পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।
সামাজিক কাজকর্মে ঘোরাঘুরি করার সময় দ্রুত চলাচলের জন্য তিনি ঘোড়া ব্যবহার করতেন। অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তৎকালীন বিধায়ক অ্যাডভোকেট আব্দুর রৌফ, ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ, বরপেটা মুন্সিফ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অধরবাবু প্রমুখে গণ্যমান্য ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। ১৯৫৭ সালে ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ মহোদয় তাঁর বাড়িতে অবস্থান করে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন।
সে সময় এই গ্রামে প্রচলিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি জেহাদ ঘোষণা করে অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসেছিলেন। ফলে একদল দুষ্কৃতকারীর কাছে তিনি চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত এই শত্রুতা চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং ১৯৬৪ সালের ভরাবর্ষার সময় এক মেঘাচ্ছন্ন বিকেলে(জুলাই মাসের ২৫ তারিখে) ভি.ডি.পি. দলের সম্পাদক হিসেবে বাঘবর থানায় দায়িত্ব পালন করে নৌকাযোগে বাড়ি ফেরার পথে একদল দুষ্কৃতকারী ছলনার আশ্রয় নিয়ে তাঁকে অপহরণ করে এবং নির্মমভাবে হত্যা করে।
বাদল খান সাহেবের সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান
মরহুম মফিজ খান গাঁওবুঢ়ার মেজো পুত্র বাদল খান সাহেবের তখন বয়স মাত্র ত্রিশ বছর। শোকাহত পুত্র হিসেবে পিতার নির্মম হত্যার সংবাদ শুনে তিনি প্রথমে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই, একজন পুত্র হিসেবে পিতৃহত্যার এই নির্মম ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। পরের পৰ্যায়ে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাদল খান সাহাবও বৃহত্তর বরপেটা অঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৬৪ সালে সাওঁরাচরা রিজার্ভে আরও একটি এল.পি. স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এই বিদ্যালয়টি ১৩০৪ নং সাঁওরাচরা রিজার্ভ প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে।
১৯৬৪-৬৫ সালে তিনি বালিকুড়ি এম.ই. মাদ্রাসা পরিচালনা সমিতির দাতা সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদার কথা বিবেচনা করে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে সাওঁরাচরা গ্রামের মরা বেঁকীর উত্তর ও দক্ষিণ পাড়ে যথাক্রমে ১৬৫৭ নং এবং ১৭৫৭ নং সাঁওরাচরা গাঁও ও পাথার প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেই সময় বৃহত্তর এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। ফলে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে বাধ্য হতো। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে স্থানীয় মুরব্বিদের সহযোগিতায় ১৯৭৭ সালে তিনি তাঁর পিতার নামে মফিজ খান এম.ই. মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর ঠিক পরের বছর একই স্থানে একটি হাইস্কুলও প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৯৪ সালে এই হাইস্কুলটি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।
নারীশিক্ষার প্রতিও বাদল খান সাহাব বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সাওঁরাচরা মাঝারগাঁওয়ে একটি বালিকা এম.ই. মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও বৃহত্তর এই অঞ্চলের অন্তর্গত শোলমারী গ্রামে ১৯৭৯ সালে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা পরবর্তীকালে উচ্চতর মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। ২০০০ সালে জনতা বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয় বেঁকী ভ্যালি কনিষ্ঠ মহাবিদ্যালয়।
বেঁকী ভ্যালি কনিষ্ঠ মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাপক সভাপতি, লাংলা বি.বি. মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা সমিতির কার্যকরী সদস্য, বামুনটারি আতাউর রহমান কলেজ অব এডুকেশনের পরিচালনা সমিতির প্রতিষ্ঠাপক কার্যকরী সদস্য এবং চান্দমামা হাইস্কুল ও খাতারটারি খারেজিয়া মাদ্রাসা পরিচালনা সমিতির সভাপতি হিসেবে কার্যনির্বাহ করার পাশাপাশি তিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি কলগাছিয়ার নবজ্যোতি মহাবিদ্যালয়েরও গভার্নিং বডির কার্যকরি সদস্য ছিলেন।
উল্লিখিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৃহত্তর এই অঞ্চলের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর বেকার সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেও তাঁর উদ্যোগ ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলার পুলিশ সুপার জীবেশ্বর হাজরিকা তাঁর সুপারিশের ভিত্তিতে বিশজনেরও বেশি পুলিশ কনস্টেবলকে চাকরিতে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
বাদল খান সাহেবের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন
বাদল খান সাহেবের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পিতার মৃত্যুর আগেই, অর্থাৎ ১৯৬২ সালে তিনি সাওঁরাচরা গ্রাম পঞ্চায়তের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই পদে তিনি ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পরপর দুটি কার্যকাল সম্পন্ন করেছিলেন। সে সময় পঞ্চায়ত সভাপতির কার্যকাল তিন বছরের ছিল।
পরের বছর তিনি পুনর্গঠিত চিকণী গ্রাম পঞ্চায়তের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনর্গঠিত বৃহৎ দক্ষিণ তিতাপানী গাঁও পঞ্চায়তের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি এই পঞ্চায়ত থেকেই কাউন্সিলর (আঞ্চলিক পঞ্চায়তের সদস্য) হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে তিনি দক্ষিণ তিতাপানী সমবায় সমিতিরও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৯৭ সালে তিনি আবার পুনর্গঠিত চিকলী গাঁও পঞ্চায়তের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ২০০২ সালে বরপেটা জেলা পরিষদের বরভিটা জেলা পরিষদ সমষ্টি থেকে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি জনিয়া বিধানসভা সমষ্টির বিধায়ক পদে দুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন যদিও সফল হতে পারেননি।
এছাড়াও তিনি জনিয়া সমষ্টির প্রাক্তন বিধায়ক এবং তৎকালীন অসমের কৃষিমন্ত্রী আতাউর রহমান সাহেবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সেই সূত্রে তৎকালীন অসমের রাজস্বমন্ত্রী মহেন্দ্র মোহন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। এই সুসম্পর্কের কারণে ১৯৬৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে গোবিন্দপুর রিজার্ভের অন্তর্গত সত্ৰকণরায় ৫২৪টি ভূমিহীন পরিবারকে জমি আবন্টন দেওয়া হয়েছিল।
সেই সময় সেখানে নৱনুৰ এল.পি. স্কুল, দুটি মসজিদ এবং একটি কবরস্থান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া অসম আন্দোলনের প্রাক্কালে গোবিন্দপুর রিজার্ভে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের সময় তাঁর তৎপরতার ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাপক ধন-জনের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
এই অঞ্চলের রাস্তাঘাটের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাদল খান সাহেবের অবদান অপরিসীম। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই ১৯৬৯ সালে সরকারি উদ্যোগে কাদং–হাতছাড়া রাস্তা নির্মিত হয়। এছাড়াও সাওঁরাচরা (বরইতলী) বাজার থেকে বেঁকী নদীর ঘাট, রামপুর বাজার থেকে সাওঁরাচরা বাজার পর্যন্ত রাস্তা(মাঝের কাঠের সেতু পর্যন্ত), সাওঁরাচরা বাজার থেকে খাতারটারি মাদ্রাসা, সাওঁরাচরা বাজার থেকে বালিকুড়ি এন.সি. পর্যন্ত(মরা বেঁকীর পাড় বরাবর)রাস্তা, সাওঁরাচড়া–শান্তি বাজার এবং সংযোগকারী কাঠের সেতু প্রভৃতি তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়েছিল।
এই অঞ্চলের জমি জরিপের কাজেও তিনি পরোক্ষভাবে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই কাজে নিযুক্ত মণ্ডল কানুনগো অমূল্য দাস (পাটবাউসী) এবং রামরতন মণ্ডল দীর্ঘকাল তাঁর বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। বরপেটার সু-সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ করুণা দত্ত মহাশয়ও কর্মসূত্রে এই অঞ্চলে এসে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবনে যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রী ডাঃ ভূমিধর বর্মন, জেহেরুল ইসলাম, অকণ রাভা, ওয়াজেদ আলী চৌধুরী, শুকুর আলী, অসম লোকসেবা আয়োগের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডাঃ তারাপ্রসাদ দাস, লোকসেবা আয়োগের সদস্য এম. মোজাম্মেল হুসেইন, বিধায়ক আব্দুছ ছোবাহান, এ. এফ. গোলাম উসমানি, আব্দুল খালেক, চন্দন কুমার সরকার, সাংসদ ইসমাইল হোসেইন–১, ইসমাইল হুসেইন–২, আঞ্চলিক সভাপতি কাদের বাবু, মোছলেম উদ্দিন, মাষ্টার, কলগাছিয়ার সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম হোতা কদ্দুছ দেওয়ানী, মোজাফর আলী ভূঞা, ঈমান মাষ্টার, বরপেটার বিশিষ্ট ব্যক্তি ঘনকান্ত দাস, নারায়ণ তালুকদার প্রমুখ ব্যক্তিত্বের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিলো।
তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বর্ণময় জনজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সরকারিভাবেও বিভিন্ন সম্মানজনক পদে মনোনীত করা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ২০০৪ সালে বরপেটা জেলা সংখ্যালঘু উন্নয়ন নিগমের (মাইনরিটি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) উপসভাপতি এবং ২০০২ সালে কলগাছিয়া শিশুকল্যাণ প্রকল্পের(আই.সি.ডি.এস.)বাছাই কমিটির সদস্য পদে তাঁকে মনোনীত করা হয়েছিলো। তিনি বরপেটা জেলা কংগ্রেস কমিটির উপসভাপতি পদেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বর্তমানে বাদল খান সাহেবের বয়স আশি বছর পেরিয়ে গেলেও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তরুণের মতোই সক্রিয় ছিলেন। তাঁর একক প্রচেষ্টায় সাওঁরাচরা গ্রামে ‘শান্তি বাজার’ নামে একটি দৈনিক বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বহু মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
২০১৭ সালের ১৯ ফেব্ৰুৱারী সমবার রাত আনুমানিক ৯ টায় এশ্বার নামাজ বাদ নিজ বাসগৃহে তিনি আকস্মিকভাবে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৪ বছর |তাঁর মৃত্যু পশ্চিম বরপেটা অঞ্চলের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মৃত্যুর সময় তিনি এক ছোট ভাই, চার বোন, দুইজন সহধৰ্মিনী, আঠজন পুত্ৰ সন্তান, তিন জন কন্যা সন্তানসহ ২৮ জন নাতি/নাতিনী ইহ সংসারে রেখে যান। ইন্তেকালের পর তাঁর রূহের মাগফিরাতের জন্য সমাজ বাসী, গ্রামবাসী, অঞ্চলবাসী এবং গুণমুদ্ধ হাজার হাজার জনসাধারণ একত্রিতভাবে নিজেদের গাঁটের টাকা খরচ করে ৩/৪ স্থানে ৭ দিনের এবং ৪০ দিনের দোয়া মেহফিল আয়োজন করেছিলেন। এই ঘটনা তাঁর জনপ্রিয়তার কথা প্রমাণ করে।
(লেখিকা বরপেটার শংকর-মাধব মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক)
আমার জীবনের প্রথম বাস ভ্রমণ

১৯৬৩ সাল। আমি তখন আলীগায় নানাদের বাড়িতে থেকে ৩৭১ নম্বর আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২য় শ্রেণিতে অধ্যয়ন করি। আমি গরমের বন্ধে বাড়িতে ছিলাম। আমাদের বাবা এবং আমার উকিল মেয়ের জামাই হায়েত আলী ফেঙুয়া যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাবা আমাকেও সঙ্গে নেওয়ার কথা বললেন। আমি এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। আমরা কোনো এক শনিবারে কোনো এক নৌকায় চড়ে প্রথমে কাদং আসি। কাদং থেকে পরে মহম্মদপুরে আমাদের দুখী জেঠাদের বাড়ি যাই। দুখী জেঠা বাবার ফুফাত ভাই ছিলেন। দুখী জেঠা বাবার চেয়ে বয়সে অনেকটা বড় ছিলেন।
আমরা কাদং বাজার থেকে সন্ধ্যার সময় দুখী জেঠাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। সেদিন রাতে আমরা দুখী জেঠাদের বাড়িতেই ছিলাম। জেঠাদের বাড়ির সামনে টাপাজুলি নামক প্রাইমারি বিদ্যালয় ছিলো। দুখী জেঠার বাবা ইলিমুদ্দিন দেওয়ানী তখনকার অন্যান্য গণ্যমান্য লোকদের সহযোগিতায় কী জন্য জানিনা টাপাজুলি গ্রাম থেকে বিদ্যালয়টা মহম্মদপুর গ্রামে স্থানান্তর করেছিলেন।স্খান পরিবর্তন করলেও বিদ্যালয়ের নামটা টাপাজুলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই রয়ে গিয়েছিলো। সেই সুবাদে অনেকে জেঠাদের বাড়ি টাপাজুলি গ্রামে বলেও উল্লেখ করতেন। বিদ্যালয়টি এখনও আছে, তবে যাদের প্রচেষ্টায় বিদ্যালয় গৃহটি স্থানান্তর করা হয়েছিলো, তাঁদের কেউ এখন বেঁচে নেই।
যা হোক, পরের দিন সকালে আমি বিদ্যালয় গৃহের কাছে গেলাম। বিদ্যালয়ের সন্মুখে খেলার জন্য একটি ছোট মাঠ ছিলো। মাঠটা চোরকাঁটা বনে পরিপূর্ণ ছিলো। চোরকাঁটা বনকে স্থানীয় ভাষায় আমরা নিলাজী বন বলি। দুখী জেঠার ছোট ছেলের নাম কফিল উদ্দিন। তিনি বয়সে আমার চেয়ে তিন-চার বছরের বড় ছিলেন।আমি লুঙি পিন্ধে ছিলাম। কফিল ভাই মজা করে বললেন- যা, মাঠে একটু দৌড়ে আয়। নিলাজি বনের ছোট ছোট ফুলগুলোযে কাপড়ের মাঝে কাঁটার মতো আটকে ধরে সে বিষয় আমার সামান্য জ্ঞান ছিলো যদিও তার কতটা ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে ততটা জ্ঞান ছিল না। কারণ আমাদের বাড়ি ছিলো নিচু জলাশয় অঞ্চলে। তাই আমাদের জমিগুলো বছরের প্রায় পাঁচ ছয় মাস জলের তলে ডুবে থাকত। সেজন্য আমাদের অঞ্চলে নিলাজি বন জন্মাত না। আমি সাত আঠ বছর বয়স থেকে আলীগায় নানাদের বাড়িতে থেকে লিখা-পড়া শিখতাম। আলীগাঁও অঞ্চল অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় ছিলো। আলীগাঁয়েও নিলাজি বন জন্মাত। তবে খুবই কম। নিলাজি বন কাপড়ে আটকে ধরে বলে কিছুটা জ্ঞান আমার ছিলো। তাই আমি কাপড় গুটিয়ে মাঠে নামলাম। তখন কফিল ভাই মজা করার জন্য বললেন- কাপড় গুটিয়ে যাচ্ছিস কেন। কাপড় ছেড়ে যা। কফিল ভাইর কথা মতো আমি নিলাজি বনে পরিপূর্ণ মাঠে কাপড় ছেড়ে ইচ্ছেমতো দৌড়াদৌড়ি করলাম।ফলে আমার লুঙিতে ইচ্ছেমতো নিলাজি বন আটকে ধরল। অনেক সময় দৌড়াদৌড়ির পর যখন আমি বাড়ি এলাম তখন বড়দের সবাই বললেন- তুই একি করছিস! লুঙির দেখি বারটা বাজিয়ে এনেছিস। এখন এগুলি ছাড়াতে গেলে একবেলা লাগবে।
জেঠি বললেন- এগুলো যে কাপড়ে গেঁথে ধরে তুমি জাননা নাকি?
আমি মাথা নিচু করে বললাম- জানি।
যদি জানই, তাহলে এভাবে কাপড় ছেড়ে নিলাজি বনে গিয়েছিলে কেন?
কফিল ভাই বললেন তাই কাপড় ছেড়ে গিয়েছিলাম।
বলাবাহুল্য আমি এই কথা বলার পর কফিল ভাইকে সবাই কমবেশি গালাগাল দিতে লাগলেন এবং জেঠি অনেক সময় ধরে কাঁচি দিয়ে চেঁচে সেই নিলাজি বন ছাড়িয়েছিলেন।
সেদিন রাতেও আমরা জেঠাদের বাড়িতেই ছিলাম। পরেরদিন আমরা হেঁটে বাংলিপাড়া কফিল উদ্দিন তাওইদের বাড়ি এসেছিলাম। কফিল উদ্দিন বাবার ছোটবেলার দোস্ত ছিলেন এবং উভয়ের সেই দোস্ত আজীবন অটুট ছিল। বলা বাহুল্য এখানকার মতো তখন ই-রিক্সা থাকাতো দূরের কথা সাইকেলও তেমন ছিল না। খুব ধনীদের দুই চার জন তখন সাইকেল ব্যবহার করতেন। অন্যরা সবাই হেঁটেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করতেন।
আমার জন্ম ১৯৫১ সালের ১২ নভেম্বর। সেই সুবাদে তখন আমার বয়েস ছিল বার তের বছরের মতো। মহম্মদপুর থেকে বাংলিপাড়ার দূরত্ব অনুমান চার পাঁচ কিলোমিটার হবে। জানিনা কীজন্য এই চার পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে যাওয়ার জন্য আমার ঠেং বিষ শুরু হয়েছিলো এবং বিষের চোটে শরীরে জ্বর উঠে গিয়েছিলো। জ্বরের চোটে আমি গরমের দিনেও একটি চাদর গায় দিয়ে শোয়ে পড়েছিলাম। শোয়ার পর আমার ঘুম ধরেছিল এবং একেবারে সন্ধ্যা বাতি ধরানোর আগে আগে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলাম। কিন্তু আমি ভাবলাম সন্ধ্যে নয়, সকাল হয়েছে। আর মনে মনে ভাবলাম, কী রকম বাড়িতে এসেছি, আমি জাগ্রত হই নাই বলে কী এরাঁও আমাকে ডেকে জাগিয়ে ভাত খেতে দিতে পারেন নাই। না খেয়েই রাত কাটিয়ে দিলাম। একথা মনে মনে ভাবতেছি, এমন সময় আমাদের মাউই ঘরে সন্ধ্যা বাতি ধরালেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম, সকাল নয়, সন্ধ্যে হয়েছে।তখন আমি মনে মনে খুবই লজ্জিত হলাম। ভাগ্যিস, আমি কথাটা প্রকাশ করি নাই, প্রকাশ করলে তখন আমার মুখ দেখানোর উপায় থাকত না।
যা হোক, পরের দিন অনুমান দশটার সময় তাউইর সাথে আমরা বাংলিপাড়া থেকে হেঁটে বরপেটা এলাম। কোনো সড়ক ছিল না। পায়েহাঁটা রাস্তা ছিল। তাউইদের বাড়ি থেকে বেরিয়েই প্রথমে ছোট একটি খাল পার হলাম। খালটা তাউইদের বাড়ির পেছনেই ছিলো। বর্ষা মাস। তাই খালে প্রচুর জল ছিলো। তবে খালটা পার হওয়ার জন্য বাঁশের সাঁকো ছিলো। সাঁকো দিয়ে খালটা পার হয়ে হাঁটা পথে কিছুদূর আসার পর আরেকটা খাল পেলাম। সেই খালেও বাঁশের সাঁকো ছিলো। সেই খাল পার হয়ে শনকুছি রিজার্ভের মাঝ বরাবর হেঁটে এসে চাউলখোয়া নদী পেলাম। খেয়া দিয়ে চাউলখোয়া নদী পার হয়ে সরাসরি বর্তমান বরপেটার যেখানে মাছ বাজার সেখানে এলাম। মাছ বাজারের পাশেই একটি বট গাছ ছিল। সেখানেই ছিলো বাস আস্থান। বাস আস্থানে দুই তিনটা বাস দাঁড়িয়ে ছিলো। নাক থাকা বাস।সেখান থেকে একটি বাসে চড়ে আমরা চারজন ধুমারকুর হয়ে চাপারবড়ি নেমেছিলাম। চাপারবড়ি থেকে ফেঙুয়া আধা মাইলের মতো দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। সেখান থেকে হেঁটে ফেঙুয়ায় অবস্থিত সাধু মিয়াদের বাড়ি গিয়ে উঠেছিলাম বেলা অনুমান দুইটার দিকে। সাধু মিয়াদের বাড়িতে আমরা তিন চার দিন ছিলাম। খুবই আদরযত্নে তাঁরা রেখেছিলেন আমাদের। গরমের দিন ছিলো, তাই সন্ধ্যের সময় উঠোনে বিছানা করে বড়রা গল্পগুজব করতেন। গরমের জন্য তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পাখা ঘূরাতেন আর আমরা ছেলেপিলেরা তাঁদের পাশে শোয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।
সাধু মিয়াদের সাথে আমাদের কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিলনা। এক সময় সাধু মিয়ারা আমাদের জাহানারপাড়েই ছিলেন। তাঁরা আমাদের পড়শি ছিলেন। সেজন্য আমাদের পরিযালের সাথে তাঁদের খুবই সুসম্পর্ক ছিলো। ১৯৫৯ সালে তাঁরা আমাদের নিকট জমি বিক্রী করে ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলেন। সেই জমি বিক্রী দলিল এখনও সংরক্ষিত আছে আমাদের কাছে। সাধু মিয়ার তিন ভাই ছিলেন। আলিমুদ্দিন, সাধু মিয়া এবং নায়েব আলি। সাধু মিয়াদের কেউ এখন বেঁচে নেই। সবাই ২০০০ সালের পূর্বেই সবাই এন্তেকাল করেছেন।
১৯৫৯ সালে সাধু মিয়া যখন আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিলেন তখন তাঁর একটি কন্যা সন্তান এবং একটি ছেলে সন্তান ছিলো। কন্যা সন্তানের নাম ছিলো উজালা খাতুন আর ছেলে সন্তানের নাম ছিলো সামেজ উদ্দিন। নায়েব আলীর তখন একটি কন্যা সন্তান ছিলো। নাম ছিলো আউসী খাতুন। উজালা বয়সে আমার চেয়ে কিছুটা বড় ছিলো আর আউসী আমার সমবয়সী ছিলো। সামেজ উদ্দিন আমার চেয়ে কিছুটা ছোট ছিলো। ১৯৫৯ সালে আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে আসার সময় উজালার বয়েস অনুমান ১১ বছর, আউসীর ৯ বছর এবং সামেজ উদ্দিনের ৭ বছর ছিলো। আমি ২০১৯ সালে তাঁদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তখন সামেজ উদ্দিন এবং উজালা খাতুনের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো। আউসীর অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে গেছ। তাই তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়নি। উজালা খাতুনের বিয়ে হয়ে গেলেও সে সেদিন যেকোনো কারণে বাপের বাড়িতেই ছিলো। তাই ভাগ্যবশত তার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিলো। তবে উজালা খাতুন বা সামেজ উদ্দিন কেউই আমাকে চিনতে পারেনি। চিনা সম্ভবো ছিল না। তাদের সঙ্গে আমার শেষবারের মতো দেখা হয়েছিলো ১৯৬৩ সালের জুন মাসের শেষের দিকে তাদের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার সময়। তাই ছাপন্ন সাতান্ন বছর পরে হঠাৎ কাউকেদেখলে চিনা সম্ভবো নয়। বলতে গেলে, আমিও তাঁদের চিনতে পারিনি। শুধু নামটুকু মনে ছিল এই যা। উজালা তো বলতে গেলে প্রায় বুড়ী হয়ে গেছে। সামেজ উদ্দিনের অবস্থাও প্রায় একই রকম। তবে উজালা স্বীকার বলেছিলো, হ্যাঁ, তাঁর আবছা আবছা মনে পড়ছে, তবে সঠিক মনে করতে পারছেনা। অনেক দিনের কথাতো!
সামেজ উদ্দিনের কিছুই মনে নেই। তবে সে বলেছিলো- নামটা যেন শুনা শুনা লাগছে।
উঠোনটা আগের মতো অক্ষত অবস্থায় নাথকলেও মূল অংশ প্রায় আগের মতোই আছে। তবে ঘর-দুয়ারগুলো আগের মতো নেই।অনেক পরিবর্তন হয়েছে।উঠোনটা দেখে আমি নষ্টালজিক হয়ে উঠেছিলাম। উঠোনের যে জায়গাটায় বিছানা করেছিল এবং যেখানে শোয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম, মোটামুটি সেই জায়গাটা আন্দাজ করে সেখানে দাঁড়িয়ে শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চলে এসেছিলাম। তবে বলতে গেলে, সুখজনক কিংবা দুখজনক প্রায় সব স্মৃতিই মধুর হয়।.
পূর্বের বরপেটার কিছু কথা
বাসের কথা দিয়েই যখন বরপেটার কথা শুরু করেছি তখন পূর্বে বরপেটার কোন কোন জায়গায় বাস আস্থান ছিলো সেই বিষয়ে কিছু কথা বলি। আগেই বলেছি, বর্তমান যেখানে বরপেটা শহরের মুখ্য বাজার অবস্থিত সেখানে বরপেটা শহরের প্রথম বাস আস্থান ছিলো। তারপর বরপেটা মটর শ্রমিক সন্থার বর্তমানের সাধারণ সম্পাদক অপূর্ব কুমার দাসের মুখে শোনামতে, বর্তমান যেখানে বরপেটা জেলা সাহিত্য সভা ভবন, ছহিদ ভবন এবং মটর শ্রমিক সন্থার অফিস অবস্থিত বাজারের নিকট থেকে সেখানে ১৯৬৮ সালে বাস আস্থান স্থানান্তর করা হয়েছিলো। এই বাস আস্থানে বিশ্বকর্মা পূজোর দিন বাসের মালিক সংন্থা ও মটর শ্রমিক সন্থার তরফ থেকে বিশ্বকর্মা পূজোর দিন নাটক মঞ্চস্থ করাতেন। আমি নিজেই কয়েকবার নাটক উপভোগ করেছি এই বাস আস্থানে। জেলা পুথিভড়াল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্বে বর্তমানের সাহিত্য সভা ভবন মহকুমা পুথিভড়াল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। এই মহকুমা পুথিভড়াল অসমের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী স্বর্গীয় মহেন্দ্র মোহন চৌধুরি ১৯৭০ সালে উদ্বোধন করেছিলেন। আমি সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।
বাস আস্থানের উত্তর পাশেই একেবারে রাস্তার ধারে লাশ কাটা ঘর ছিলো। নব্বৈর দশকে লাশকাটা ঘরটা বরপেটা শহরের মেটুয়াকুছির উত্তর পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত বাঘবর বিধান সভা সমষ্টির প্রাক্তন এম, এল, এ জালাল উদ্দিন সাহেবের বাড়ির পশ্চিম প্রান্তে একেবারে চাউলখোয়া নদীর পাড়ে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমান যেখানে শ্মশানের চুল্লি স্থাপন করা হয়েছে তার বিপরীত দিকে। এই নব্বৈর দশকের শেষের দশকে বর্তমান যেখানে সিন্ডিকেট ব্যাংক ও বরপেটা এথেলিটিক ক্লাবের বিল্ডিং অবস্থিত সেখানে কিছুদিনের জন্য বরপেটা বাঘবর রোডের বাস আস্থান স্থানান্তর করা হয়েছিলো। অবশ্যেই অল্প কয়েক দিনের জন্য। অনুমান ১৯৮৪ সালে বরপেটা শহরের মুখ্য বাস আস্থান গান্ধীনগরে স্থানান্তর করা হয়েছে। আমি ১৯৮৫ সালে এই বাস আস্থান থেকে কয়াকুছি পর্যন্ত বাস ভ্রমণ করেছিলাম। তাই কথাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে।
সত্তর আশীর দশকের বরপেটার কিছু রাস্তা এবং সরকারি অফিসের কথা বলি।আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়েছিলাম ১৯৭১ সালে। বরপেটার মাধব চৌধুরি কলেজে এডমিশন নিয়ে প্রথম অবস্থায় ভেরাগাঁয়ের আমাদের মামা রায়চান আলীর বাড়ি থেকে কিছুদিন কলেজে যাতায়াত করেছিলাম। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষাও মামাদের বাড়ি থেকেই হেঁটে এসে বরপেটা বিদ্যাপীঠ হাইস্কুলে দিয়েছিলাম। বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল এখন উচ্চতর মাধ্যমিকে উন্নীত হয়েছে। আমি যে রোমটায় বসে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, সেই রোমটা এখনও বহাল তবিয়তে আছে। রোমটাতে মনে হয়, এক সময় শিক্ষকদের কমন রোমও ছিলো। ২০০৪ সালে আমাদের ছেলে ছোলেমান কবীর বরপেটা বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলো। আমি তার পড়া-শুনার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য একদিন স্কুলে গিয়েছিলাম।তখন বরপেটা বিদ্যাপীঠ হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক তথা আসামের স্বনামধন্য সাহিত্যিক অক্ষয়মিশ্র স্যারকে সেই রোমে বসে থাকতে দেখেছিলাম।
মামাদের বাড়ি থেকে কলেজে আসার সময় ভেরাগাঁও থেকে হেঁটে বর্তমান বরপেটার যেখানে এল,আই, চি অফিস রয়েছে সেখান থেকে কোনাচা হাঁটাপথে কলেজে আসতাম। তখন বর্তমানের এল,আই,চি অফিসের পূব পাশে বরপেটা-জনীয়া রাস্তার গাঁ ঘেঁষে দুই তিনটা বাড়ি এবং এল, আই, চি অফিসের পশ্চিম পাশে ঢুলীদের কয়েকটা বাড়ি ছিলো। বর্তমানের এল,আই,চি অফিস থেকে কলেজ পর্যন্ত কোনো বাড়িঘর ছিলনা। খোলা মাঠ ছিল এবং মাঠে বেনা বন ছিলো। বেনা বনের মাঝে মাঝে সরু হাঁটা পথ ছিলো।সেই হাঁটা পথ দিয়েই আ্রমরা কলেজে যাতায়াত করতাম। কলেজের সামনের রাস্তার দক্ষিণ পাশে বর্তমান অনেক বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট হযেছে, তখন কলেজের সামনে একেবারে ফাঁকা ছিলো। কলেজের পূব পাশে বর্তমান যেখানে জেলা গ্রন্থাালয় এবং অডিটরিয়াম রয়েছে, সেখানে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত হরিজন কলোনি ছিলো। ১৯৭১ সালে মাত্র দুই তিনটা পরিয়াল ছিলো সেখানে। আমরা কলেজে আসার সময় পরিয়ালগুলিকে প্রত্যক্ষ করেছি। কিছুদিন পরে অবশ্যে পরিয়াল কয়টি বর্তমান যেখানে হরিজন কলোনি রয়েছে সেখানে উঠে গিয়েছিলো।
তখন কলেজের পশ্চিমাঞ্চলে খুব একটা বাড়ি-ঘর ছিল না। সঠিক তারিখ বলতে পারব না, মনে হয়, ১৯৭২ সালে মাধব চৌধুরি কলেজর পশ্চিম দিকে অবস্থিত গান্ধীনগরে জনসাধারণকে আধা বিঘা করে ভূমি আবন্টন দিযেছিল। এই ভূমি আবন্টন দেওয়ার পর থেকে পর্যায়ক্রমে এই অঞ্চলে বাড়ি-ঘর নির্মাণ শুরু হয়। বর্তমান এই অঞ্চলে প্রচুর বাড়ি-ঘর হযেছে। বলতে গেলে, এখন পাও ফেলার জায়গা নেই এরকম অনেক বাড়ি-ঘর হয়েছে এই অঞ্চলে।আমার মনে হয়, বাঘবর বিধান সভা সমষ্টির প্রাক্তন বিধায়ক জালাল উদ্দিন সাহেবই গান্ধীনগরের উত্তর-পশ্চিম কোনায় প্রথম বাড়ি করেছিলেন। জালাল উদ্দিন সাহেব যখন বাড়ি নির্মাণ করেন, তখন তাঁর বাড়ির চারপাশ বেনা বনে পরিপূর্ণ ছিলো এবং দিনের বেলাও শেয়ালের ডাক শোনা যেতো। অবশ্যে জালাল উদ্দিন সাহেব বাড়ির দক্ষিণ পাশ দিয়ে অন্য কেউ কেউ বাড়ি করতে পারে, তবে সেটা আমার জানা নেই।
বর্তমান যেখানে ব্যক্তিগত খণ্ডের ব্রকলিন মিসন স্কুল রয়েছে সেখানে ছাত্রদের জন্য মেস বাড়ি ছিল। আমাদের দক্ষিণ অঞ্চলের অনেক ছাত্র সেই মেসে থেকে মাধব চৌধুরি কলেজে অধ্যয়ন করত। আমিও ১৯৭৪ সালে সেই মেসে গেষ্ট হিসেবে একদিন রাত্রিযাপন করেছিলাম। মেসটিতে এক বৃদ্ধ দম্পতি থাকতেন। বৃদ্ধলোকটি ইন্দ্রপুরী সিনেমা হলের অপারেটর ছিলেন।
বর্তমান যেখানে সঞ্জীবনী হাস্পাতল রয়েছে, সেখানে এক সময় মূল রাস্তা থেকে অনেকটা ভেতরে তিন চারটা সাধারণ পাকা গৃহ ছিলো। সেখানে কলেজের প্রফেসররাঁ ভাড়া থাকতেন। প্রফেসরদের মাঝে সেখানে ভাড়া ছিলেন গণেশ ঠাকুরীয়া, এবট শ্রীবাস্তব এবং হরি সিং। গণেশ ঠাকুরীয়া ফিজিক্সের, এবট স্যার ইংরাজির এবং হরি সিং জুল’জির প্রফেসর ছিলেন। ফিজিক্সের প্রফেসর গণেশ ঠাকুরীয়া স্যারের নিকটে আমরা কয়েকজন ছাত্র টিউশন পডতাম। টিউশন পড়ুয়া সেই ছাত্রদের মধ্যে সুতির পারের আব্দুর রেজ্জাক, সাওঁরারচরার আকবর খান, শিতুলির শেরমান আলি এবং ছাপরার অদুদ ভাইর কথা আমার মনে আছে।
আমি কোনো এক কারণে একদিন কাদং গিয়েছিলাম। বিকেল বেলা সাইকেল নিয়ে কাদং থেকে বরপেটা ফিরে আসার পথে আমি অদুদ ভাইদের বাড়িতে উঠেছিলাম। অদুদ ভাইদের বাড়ি জনীয়া-বরপেটা রাস্তার উত্তর পাশে রাস্তার গা ঘেঁসে ছিলো। সেবার অদুদভাইদের বাড়িতে প্রচুর পাতা কবি হয়েছিলো। সময়টা মনে হয় চৈত্র মাসের শেষের দিকে ছিলো। পাতাকবির খুব একটা সমাদর ছিল না তখন।অদুদ ভাইদের উঠানে পাতাকবির দম দেখে আমি বলেছিলাম- এত পাতাকবি তুলেছে! বিক্রী করতে নিবে নাকি?
বিক্রী করার জন্যই তুলেছে মনে হয়। এভাবে বলেই অদুদ ভাই বলেছিলো- চল, এক কাজ করি, ঠাকুরীয়া স্যারের জন্য কয়েকটা কবি নিয়ে যাই।
আমি বললাম- মন্দ হবেনা। আজ টিউশন ক্লাসের সময় দিলেই হবে।
সিদ্ধান্ত মতেই আমরা ছাপরা থেকে কবি নিয়ে এসে গণেশ স্যারকে দিয়েছিলাম। কথাটা অদুদ ভাইরও মনে আছে। তাঁর সাথে ফোনে কথা বলে আমি কথাটা নিশ্চিত হয়েছি। হয়তো বলা বাহুল্য হবে, তবু বলি, জনীয়া থেকে বরপেটা আসা রাস্তার উত্তর পাশে তখন কোনো পাকা গৃহ ছিল না একমাত্র অদুদ ভাইদের গৃহের বাইরে। রাস্তার দক্ষিণ পাশে রুস্তম হাজি সাহেবের বাড়িতে বনের বেড়ায় সিমেন্ট, বালি, চূণ নীল দিয়ে লেপা বাড়ির উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম ভিটায় তিনটি সুন্দর গৃহ ছিল। পূবের ভিটায় টিনের চাল ও টিনের বেড়ার একটি গৃহ ছিলো। তখন জন বসতি কম ছিলো ও বাড়িগুলিও ফাঁক ফাঁক অর্থাৎ পাতল পাতল ছিলো। তাই ব্যতিক্রমী বাড়িগুলি সাধারণত মানুষের চোখে পড়ত। তখন আমাদের বংগীয় মূলের মুসলমানদের প্রায় সবার বাড়িতে ছনের গৃহ ছিলো এবং এসব ছনের গৃহের বেড়া সাধারণত পাটখড়ি অথবা কাশবনের ছিলো। যাদের টিনপাতের গৃহ থাকত তাঁদের ধনী মানুয বলে বিবেচনা করা হত। তবে টিনপাতের গৃহে প্রায় সবারই পাটখড়ির বেড়া থাকত। তাই একটি কথা প্রচলিত ছিলো, টিনের ঘরে পাটখড়ির বেড়া, ঐটাই হলো শ্বেখপাড়া।
তখন বাড়িঘর কীরকম পাতল পাতল ছিলো, সেই বিষয়ে একটু বলি। ১৯৬৭ সালের কথা। আমি রূপাকুছির আব্দুল ভাইদের বাড়িতে থেকে আমি কাদং হাইস্কুলে অধ্যয়ন করতাম। আব্দুল ভাই আমাদের খালাত বোনের জামাই ছিলেন। আব্দুল ভাইদের বাড়িতে লজিং থাকার আগে কযেকদিন আমি রূপাকুছির মুস্তি মিয়ার বাড়িতে লজিং ছিলাম। একদিন রাতে প্রস্রাব করা জন্য আমি দশটা এগারটার সময় বাইরে বের হয়েছি, এমন সময় একটি তীব্র আলো এসে আমার শরীর পড়লো। আমি ভয়ে দৌড়ে ঘরের ভেতরে এলাম। পরের দিন খবর নিয়ে সেই আলোর উৎস জানতে পারলাম। সেই আলোর উৎস ছিলো রিজে্ন্ট সার্কাস।সে বছর বরপেটায় রিজেন্ট সার্কাস এসেছিলো। সেই রিজেন্ট সার্কাসে টর্স লাইটের মতো একটি মস্তবড় লাইট ছিলো। সেই লাইটের আকার প্রায় একটা ঢাকের ঢোলের মতো ছিলো। সেই লাইট থেকে তীব্র আলো বের হতো। সেই আলো শুনেছি, ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝে অবস্থিত সুখোয়ারঝার চর পর্যন্ত পৌঁছে যেত।বরপেটা থেকে সুকোয়ারঝার চরের দূরত্ব কমেও ২৫ কিলোমিটার হবে। আর রূপাকুছির দূরত্বতো বরপেটা থেকে মাত্র পাঁচ ছয় কিলোমিটার ছিলো। আর তখন বাড়িঘর-গাছগাছড়াও কম ছিল। তাই তখন বাধাহীনভাবে আলো অনেক পর্যন্ত যেতে পারত।
তখন ঘরবাড়ি কতটা বিরল ও ছড়ানো-ছিটানো ছিল, তার আরেকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
তখন আমরা রূপাকুছি বা কাদং থেকে বরপেটায় আসার জন্য দুটি পথ ব্যবহার করতাম—একটি ছিল জনিয়া-জাহোরপাম হয়ে, আর অন্যটি পথ ছিল গাগলমারি-ভেরাগাঁও হয়ে। তখন করাকুর থেকে বরপেটা পর্যন্ত বাস চলাচল করত। কিন্তু বাস ছিল অত্যন্ত অনিয়মিত। তাই বেশির ভাগ সময় আমাদের যাদের সাইকেল ছিল না, তারা গাগলমারি-ভেরাগাঁওয়ের পথ ধরে হেঁটেই বরপেটায় যাতায়াত করতাম। যাদের সাইকেল ছিল, তাদের জন্য অবশ্য বিষয়টি আলাদা ছিল। তারা দুই পথেই যাতায়াত করত। বাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে আমরাও জনিয়া-জাহোরপাম হয়ে বরপেটায় আসতাম।
করাকুর থেকে বরপেটা পর্যন্ত বাস কতটা অনিয়মিত ছিল, সে সম্পর্কে একটি দিনের ঘটনা বলা যাক। ঘটনাটি ১৯৭০ সালের। সে বছর বরপেটায় আন্তঃজেলা ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমরা রূপাকুছি থেকে হেঁটে গিয়েই বেশ কয়েকটি খেলা উপভোগ করেছিলাম। সেবার ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল নগাঁও জেলা ও মণিপুরের মধ্যে। আমাদের হেঁটেই খেলা দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেউ একজন বলল, খেলা দেখার জন্য জনিয়া থেকে বাস দেওয়া হবে। তাই গাগলমারি হয়ে হেঁটে যাওয়ার পরিবর্তে আমরা জনিয়ায় এসে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু বাস আর এল না। ফলে আমাদের খেলাও দেখা হলো না।
রূপাকুছি থেকে বরপেটায় আসার জন্যও দুটি পথ ছিল। একটি পথ ছিল—রূপাকুছি মসজিদগৃহের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত চাউলখোয়া নদী পার হয়ে গজিয়া-কাদং পর্যন্ত বিস্তৃত পিডব্লিউডি সড়ক ধরে গাগলমারি হয়ে এবং অন্য পথটি ছিল রূপাকুছি থেকে চাউলখোয়া নদীর পাড় ধরে পূর্বদিকে এসে তমেজ উদ্দিন গাঁওবুড়ার বাড়ির কাছে খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে।
প্রথম পথটি— গজিয়া-কাদং পিডব্লিউডি সড়ক ধরে গাগলমারি পর্যন্ত আসার পর, গজিয়া-কাদং সড়কের ধারে, রাস্তার উত্তর পাশে গাগলমারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পাওয়া যেত। বিদ্যালয়টির পূর্ব দিকে একটি মাথাউরি ছিল। মাথাউরিটি ভেরাগাঁয়ের মধ্য দিয়ে এসে বরপেটা-জনীয়া পিডব্লিউডি রাস্তায় মিলিত হয়েছিল। সেই মাথাউরির পথ ধরে এসে বরপেটা-জনিয়া রোড দিয়ে বরপেটায় আসা যেত।
দ্বিতীয় পথটি— তমেজ উদ্দিন গাঁওবুড়ার বাড়ির কাছে নৌকায় খেয়া পার হয়ে বন্দে আলী দেওয়ানী ও রাসু দেওয়ানীদের বাড়ির সামনে দিয়ে পূর্বদিকে এগিয়ে এসে আবার চাউলখোয়া নদীর কাছে পৌঁছানো যেত। (চাউলখোয়া নদীটি এতটাই আঁকাবাঁকা ছিল যে, কোনো একটি বাড়ির সামনে থেকে নদীর পাড় ধরে এগিয়ে গেলে কিছুটা পথ ঘূরে-ফিরে আসার পর আবার সেই বাড়িটির পেছন দিকেও আসা যেত। অর্থাৎ একটি নদীই বাড়ির সন্মুখ দিকে এবং পেছন দিকেও ছিলো। এমনই বাঁকা ছিলো চাউলখোয়া নদী।) সেই চাউলখোয়া নদীর পাড় ধরে কিছুটা দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেলে গাগলমারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পাওয়া যেত। বিদ্যালয়টির পূর্ব দিকে অবস্থিত মাথাউরির পথ ধরে আগের মতোই বরপেটা-জনিয়া রোডে উঠে বরপেটায় আসা যেত।
বরপেটা আসার সময় গাগলমারিতে পৌঁছালেই আমরা বরপেটা ডাকঘরের টেলিগ্রাম টাওয়ারটি দেখতে পেতাম। এখন সেই টাওয়ারটি দেখা তো দূরের কথা, সেই টাওয়ারের চেয়েও উঁচু ১২ মিটার উচ্চতার মোবাইল টাওয়ারও এখন দেখা যায় না।আমার ধারণা, টেলিগ্রাম টাওয়ারটির উচ্চতা সম্ভবত দশ মিটারের বেশি ছিল না। ঘরবাড়ি, গাছপালা ইত্যাদি তখন এতটাই কম ছিল যে, গাগলমারী থেকেই বরপেটা ডাকঘরের টেলিগ্রাম টাওয়ারটি স্পষ্ট দেখা যেত। কিন্তু এখন বরপেটায় এলেও টাওয়ারটি চোখে পড়ে না।
ঘরবাড়ি, গাছপালা ইত্যাদি বিরল ও ছড়ানো-ছিটানো থাকার জন্যই গাগলমারি থেকে বরপেটা ডাকঘরের টেলিগ্রাম টাওয়ারটি তখন স্পষ্টভাবে দেখা যেত।
পূর্বের বরপেটার কিছু কার্যলয়ের অবস্থান
বরপেটার ট্রেজারি (কোষাগার) অফিসটি সত্তর-আশির দশকে বর্তমানে যেখানে জজকোর্ট রয়েছে, সেই স্থানে ছিল। তখন স্টেট ব্যাংকটি ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয়ের পূর্বদিকে অবস্থিত একটি দোতলা ভবনে ছিল। ভবনটি এখনও আছে, যদিও পরে অনেক সংস্কার করা হয়েছে। পরবর্তীকালে স্টেট ব্যাংকটি চাউলখোয়া নদীর উত্তর পারে বর্তমানে যে স্থানে রয়েছে, সেখানে স্থানান্তরিত করা হয় এবং ট্রেজারি অফিসটি স্টেট ব্যাংকের পুরোনো ভবনে স্থানান্তর করা হয়। স্টেট ব্যাংকটি এখনও সেই স্থানেই রয়েছে। তবে ট্রেজারি অফিসের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ করে আনুমানিক ২০১৩-১৪ সালে সেটিকে নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ষাটের দশকে বরপেটায় প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসের দিন থানার সামনে চাউলখোয়া নদীতে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হতো। জীবনে প্রথমবার ১৯৬৬ সালে আমি একাই আলীগাঁও থেকে বরপেটায় এসে সেই নৌকা বাইচ উপভোগ করেছিলাম। তবে সেই নৌকা বাইচের স্মৃতি আমার কাছে খুব একটা সুখকর ছিল না। কথাটা একটু ব্যাখ্যা করে বলা যাক-
ছোটবেলায় আমি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে কখনও কখনও ঘরের দরজা খুলে ঘুমের ঘোরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতাম। সেই কারণে নাড়ার ভিটার সুফি সাধক আব্দুল হামিদ সাহেব আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার চিকিৎসা করেছিলেন। তিনি প্রায় আধা গজ লম্বা এক টুকরো কাপড় আমার গলায় বেঁধে দিয়েছিলেন। কাপড়ের টুকরোটি আমি প্রায় ছয় মাস গলায় বেঁধে রেখেছিলাম। রোগ থেকে মুক্তি পেলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে হাজোর মসজিদে বাতাসা নিবেদন করার কথা ছিল কাপড়ের ঠুকরো বেঁধে দেওঁয়ার সময়।
আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর মাঘী পূর্ণিমার আগে আগে একদিন বাবা এসে বললেন— “এবার মাঘী পূর্ণিমায় তোকে নিয়ে হাজো যাব। হাজোর মসজিদে গিয়ে বাতাসা দিতে হবে।”
কথাটা শুনে আমি খুব আনন্দিত হলাম। কিন্তু দৌল পূর্ণিমায় আবির খেলার অজুহাত দেখিয়ে বাবা সেবার আমাকে হাজো নিয়ে গেলেন না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমি কিছুটা হতাশ হলাম। আমাকে হতাশ হতে দেখে তখন সিরাজ মামা বললেন— “মন খারাপ করো না। এবার স্বাধীনতা দিবসে তোমাকে বরপেটায় নিয়ে যাব। স্বাধীনতা দিবসের দিন বরপেটায় নৌকা বাইচ হয়। তখন নৌকা বাইচের পাশাপাশি আরও অনেক কিছু দেখতে পারবে।”
শুধু বরপেটাতেই নয়, তখন সারা দেশেই মহাসমারোহে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হতো। দেশ তখন মাত্র কয়েক বছর আগে স্বাধীন হয়েছে। ফলে স্বাধীনতা দিবসের দিন সবাই আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠত। আমরা ছাত্রছাত্রীরা স্বাধীনতা দিবসের দিন সকাল ন’টায় হাতে হাতে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে শিক্ষকদের নেতৃত্বে শোভাযাত্রা বের করতাম। “জওহরলাল নেহরু কি জিন্দাবাদ”, “মহাত্মা গান্ধী কি জয়”, “ভারত মাতা কি জয়”, “ঘরে ঘরে যঁতর ঘুরে”, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” প্রভৃতি স্লোগান দিতে দিতে শোভাযাত্রা করে আমরা ছাত্রছাত্রীরা আলীরপাম বাজারে এসে সমবেত হতাম। বাজারে প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করা হতো। ছেলেদের দৌড়, হাই জাম্প, লং জাম্প, মেয়েদের মিউজিক্যাল চেয়ার, চামুচে মার্বেল নিয়ে দৌড়, বিস্কুট খাওয়া ইত্যাদি নানাবিধ খেলা অনুষ্ঠিত হতো।
সেই কারণেই সিরাজ মামা যখন আমাকে বরপেটায় নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন, তখন হাজোর কথা ভুলে গিয়ে আমি বরপেটা যাওয়ার আনন্দে মেতে উঠলাম। পাঠ্যপুস্তক ইত্যাদি রাখার জন্য আমার কোনো ট্রাঙ্ক ছিল না। তাই বরপেটায় গেলে একটি ট্রাঙ্ক কিনব বলে ঠিক করলাম এবং অল্প অল্প করে টাকা জমাতে শুরু করলাম। স্বাধীনতা দিবসের দুদিন আগে জামাকাপড় ধুয়ে ইস্ত্রি করার জন্য বালিশের নিচে রেখে দিলাম।
স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন আমি মামাকে জিজ্ঞেস করলাম— “মামা, কাল কখন যাবে?”
সিরাজ মামা বললেন— “কোথায়?”
আমি বললাম— “বরপেটায়। আপনিই তো বলেছিলেন, স্বাধীনতা দিবসের দিন আমাকে বরপেটায় নিয়ে যাবেন!”
সিরাজ মামা বললেন— “ও, সেই কথা? এবার আমার যাওয়া সম্ভব হবে না। আমার কিছু জরুরি কাজ আছে। আগামী বছর নিয়ে যাব। এবার তোমাদের স্কুলেই খেলাধুলা হবে। তুমি খেলবে না?”
আমি কিছু বললাম না। মামা যে আমাকে বরপেটায় নিয়ে যাবেন না, তাঁর কথাতেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল। তাই মনে মনে সেখান থেকে সরে এসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম— যেভাবেই হোক, কাল আমি একাই বরপেটায় যাব।
স্বাধীনতা দিবসের দিন কাউকে কিছু না জানিয়ে আমি একাই হেঁটে বরপেটার উদ্দেশে রওনা হলাম। গড়লা, দীঘিরপাম হয়ে মন্দিয়ায় এসে পৌঁছলাম। আশা করেছিলাম, মন্দিয়া থেকে বাসে উঠব। কিন্তু কোনো বাস পেলাম না। একজন লোক বললেন, গয়নার নৌকায় বরপেটায় যাওয়া যায়। গয়নার নৌকা কোথায় পাওয়া যাবে, সেটাও তিনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন।
লোকটির কথামতো গিয়ে দেখলাম, ভেলেঙ্গী নদীতে অনেক নৌকা দাঁড়িয়ে আছে। সেখান থেকে একটি নৌকায় উঠে বরপেটার উদ্দেশে রওনা হলাম। অবশ্য ঠিক বরপেটায় নয়, ভাড়ার নৌকাটি আমাদের বরপেটা থেকে প্রায় দেড়-দুই কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ভকতপাড়ায় নামিয়ে দিল। সেখান থেকে অন্য লোকজনের সঙ্গে পায়ে হেঁটে পিচঢালা রাস্তা ধরে বরপেটার বড়বাজারে এলাম এবং এক দোকান থেকে আমার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত ট্রাঙ্কটি কিনলাম। কত দিয়ে কিনেছিলাম মনে নেই। তারপর একটি দোকানে এসে খোরমা দিয়ে চা খেয়ে নৌকা বাইচ দেখতে এলাম।
থানার সামনে চাউলখোয়া নদীতে তখন নৌকা বাইচ চলছিল। আমরা টিনের নৌকার বাইচ দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু সেদিন চাউলখোয়ায় যে নৌকাগুলোর বাইচ হচ্ছিল, সেগুলো ছিল কাঠের ডোঙা নৌকা। অবশ্য নৌকাগুলো ছিল অত্যন্ত লম্বা এবং রঙচঙে। নদীর দুই তীর মানুষে পরিপূর্ণ ছিল। ভিড়ের চাপে চলাচলের পথ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। আমাকে ভিড় ঠেলে এগোতে হচ্ছিল।
কিন্তু তখন আমার নৌকা বাইচ দেখার মতো মন বা মানসিকতা কোনোটাই ছিল না। কীভাবে বাড়ি ফিরব, সেই চিন্তাই আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। আমি রাস্তাঘাট ভালোভাবে চিনতাম না। পথ ভুল হয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কাও মনে ক্রিয়া করছিল। তাই নৌকা বাইচ না দেখেই যে পথ দিয়ে এসেছিলাম, ঠিক সেই পথ ধরেই গয়নার নৌকা থেকে যেখানে নেমেছিলাম, সেখানে ফিরে এলাম।
সেখানে কয়েকটি নৌকা দাঁড়িয়ে ছিল। তার মধ্যে একটি নৌকায় চড়ে আমি আবার মন্দিয়ায় ফিরে এলাম। তখন সূর্য ডোবার আর বেশি সময় বাকি ছিল না। দৌড়ে গেলেও বাড়ি পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। কিন্তু আমার পক্ষে রাতে একা হেঁটে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই কী করব, কী করব না—এই চিন্তায় যখন দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তখন হঠাৎ হোসেন মামা আমাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে বললেন— “আরে, আবুল তুমি? তুমি কোথা থেকে এলে? কার সঙ্গে এসেছ?”
হোসেন মামা ছিলেন আমাদের মামাদের পিসির ছেলে। তাঁর বাড়ি আগমন্দিয়ায়। তিনি কাপড়ের ব্যবসায়ী রহিমুদ্দিন মামার ছোট ভাই ছিলেন। সেই রহিমুদ্দিন মামার, যার ঘোড়া আনতে গিয়ে আমার পিঠের চামড়া ছড়ে গিয়েছিল।
আমি উত্তরে বললাম— “আমি একাই এসেছি। বরপেটায় গিয়েছিলাম।”
আমার কথা শুনে হোসেন মামা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি বললেন— “একা এসেছ মানে! বাড়িতে বলে এসেছ?”
আমি বললাম— “না, বলে আসিনি।”
— “বলে আসনি মানে! এখন কী করবে? চল, আমাদের বাড়ি। কাল সকালে আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।”
হোসেন মামার সঙ্গে আমি তাঁদের বাড়িতে এলাম। সেখানে সেই রাতটা কাটানোর পর পরদিন সকালে হোসেন মামা আমাকে সঙ্গে নিয়ে আলীগাঁয় এলেন। না বললেও চলে, সেদিন বাড়ির সবার কাছ থেকেই আমাকে অনেক বকাঝকা শুনতে হয়েছিল।
এবার আসি নৌকা বাইচের কথায়। আমাদের বাঙালি-মূলের মুসলমান লোকেরা সাধারণত টিনের তৈরি নৌকা বাইচ দিতেন। কিন্তু বরপেটার স্থানীয় অসমীয়া লোকেরা কাঠের ডোঙা নৌকা দিয়ে নৌকা বাইচ দিতেন। সেই কাঠের ডোঙা নৌকার বাইচ দেখতেও প্রচুর মানুষের সমাগম হতো।
বর্তমানে বরপেটায় সেই নৌকা বাইচ আর অনুষ্ঠিত হয় না। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে শোনা কথা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে নৌকা বাইচ চলাকালে কোনো একটি বিষয় নিয়ে বাইচাদের মধ্যে মারামারি হয়েছিল। সেই মারামারির পর থেকেই নাকি নৌকা বাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে—সম্প্রতি আমার এক বন্ধুর মুখে এমন কথাই শুনেছি। বিষয়টি কতটা সত্য, সে সম্পর্কে আমার সেই বন্ধু হয়তো আরও ভালোভাবে বলতে পারবেন। নৌকা বাইচ বন্ধ হওয়ার অন্য কারণও থাকতে পারে। কারণ বর্তমানে নৌকা বাইচ আয়োজন করার মতো পর্যাপ্ত পানি চাউলখোয়া নদীতে নেই। পানির অপ্রতুলতাও নৌকা বাইচ বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
বরপেটার কাছারি গৃহগুলি চাউলখোয়া নদীর দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। আগে কাছারির পাশে চাউলখোয়া নদীর ওপর একটি কাঠের সেতু ছিল। বর্তমানে সেই কাঠের সেতুর জায়গায় পাকা সেতু নির্মিত হয়েছে। ২০২৪ সালে জজকোর্টটি চাউলখোয়া নদীর উত্তর পারে আইন মহাবিদ্যালয়ের পশ্চিম প্রান্তে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পূর্বে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা আধিকারিকের কার্যালয় এবং জেলা পরিবহণ বিভাগের কার্যালয় বরপেটার বিভিন্ন স্থানে ভাড়াবাড়িতে পরিচালিত হতো। বর্তমানে এই দুটি কার্যালয়ের জন্য বর্তমান জজকোর্টের পশ্চিম প্রান্তে চাউলখোয়া নদীর তীরে নিজস্ব ভবন নির্মাণ করে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। অবশ্যে জজকোর্টের আগেই এই দুটি কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়েছিলো।
বরপেটা-হাউলি সংযোগকারী সড়কে চাউলখোয়া নদীর ওপর যে পুরোনো লোহার সেতুটি ছিল, তার পরিবর্তে বর্তমানে সেখানে পাকা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।
বরপেটার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ইত্যাদির কথা লিখতে গেলে অনেক কথা লিখতে হবে। কিন্তু তার বিশেষ প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ রাস্তাঘাট প্রায় সর্বত্রই উন্নত হয়েছে। যেসব জায়গায় আগে খেয়া নৌকায় কিংবা সাঁতরে নদী পার হতে হতো, সেসব জায়গায় বর্তমানে কংক্রিটের সেতু নির্মিত হয়েছে। যেসব জায়গায় মানুষ আগে খড়ের ঘরে বাস করত, সেসব এলাকার বহু বাড়ি এখন পাকা বাড়িতে পরিণত হয়েছে। যেসব জায়গায় আগে গোহালট বা ক্ষেতের আলই ছিল একমাত্র যাতায়াতের ব্যবস্থা, সেসব জায়গায় এখন প্রশস্ত পাকা রাস্তা নির্মিত হয়েছে।
আমাদের জাহানারপারের বাড়িটি একসময় অত্যন্ত অনুন্নত এলাকায় অবস্থিত ছিল। বরপেটায় আসতে হলে এক সপ্তাহ আগে থেকেই চিন্তাভাবনা করতে হতো। তখন বরপেটায় এসে যদি দুপুর দুটো বেজে যেত, তখন হয় হোটেলে আশ্রয় নিতে হতো, নয়তো কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে রাতের জন্য অতিথি হতে হতো।
আমাদের বাঘবরের কথাই বা শুধু বলি কেন। আমি বর্তমান যে যতিগাঁয় বসবাস করছি, এই যতিগাঁয়ের রাস্তাঘাটের অবস্থাও তখন খুবই শোচনীয় ছিল। আমি নদী ভাঙনের ফলে ১৯৯৮ সালে যতিগাঁয় উঠে এসেছি।যতিগাঁও বরপেটার একেবারে কাছে অবস্থিত একটি গ্রাম। শহরতলি গাঁও। মাধব চৌধুরি কলেজ আমাদের যতিগাঁও থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যতিগাঁয়ই এখন বরপেটা মেডিক্যাল কলেজ এণ্ড হাস্পতাল স্থাপিত হয়েছে। বরপেটা মেডিক্যাল কলেজের নাম আগে ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ মেডিক্যাল কলেজ এণ্ড হসপিটাল ছিলো। ২০২৬ সালের অসম বিধান সভা নির্বাচেনর আগে আগে সরকার মেডিক্যাল কলেজের নাম পরিবর্তন করে বরপেটা মেডিক্যাল কলেজ রেখেছে।
আমি যখন যতিগায় প্রথম বাড়ি করি তখন যতিগাঁয় না ছিল রাস্তা, না ছিল ঘাট। যতিগাঁও এবং ভেরাগাঁয়ের অনেকেই তখন বরপেটা গিয়ে রিক্সা, ঠেলা চালাত। গরিব বাড়ির বৌঝিরা বরপেটা গিয়ে অসমিয়া মহাজনদের বাড়িতে, চায়ের দোকানে কাজ করত। রাস্তা ছিলনা। গো-হালট ছিলো। সেটাও আবার সরজমিনের থেকে অনেকটা নিচু। খরাদিনে যেমন তেমন চলে যেত, কিন্তু বর্যামাসে রাস্তায় এক কোমর পানী জমে থাকত। তখন সবাই গামছা পরে বরপেটা যেত এবং বেলা তিনটা চারটার মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসতে হতো। আমি নিজেও এভাবেই যাতায়াত করেছি। এখন রাস্তা হয়েছে, অবশ্যে তেমন উন্নত নয়, তবু সারারাত গাড়ি মটর চলে। গ্রামে তিন চার তালা বিশিষ্ট বিল্ডিং হয়েছে। অনেকে বাডি় ভাড়ার ব্যবসাও শুরু করেছে। ২০০৯ সালে আগে বিজুলির ব্যবস্থা ছিল না। এখন বাড়ি বাড়ি এচি চলে। শীতের দিনে গিজার (Geyser) দিয়ে পানি গরম করে গোসল করে। কারেন্টে ভাত রান্ধে।
এখন বাঘবর এলেকার লোক রাত দশটা অবধি বরপেটায় আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। এখন আমাদের বাড়িতে বাঘবর অঞ্চলের কোনো লোক এলে রাত দশটা বাজলেও বাড়ি চলে যায়। আগে যতটা সাইকেল ছিল না, এখন তার চেয়ে বেশি মটর সাইকেল হয়েছে। যেখানে আল পথ ছিলো সেখানে চওড়া পাকা রাস্তা হয়েছে। রাস্তার সাথে সাথে বাড়ি বাড়ি বিজুলির ব্যবস্থা হযেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে। উন্নয়নের পূর্ব শর্ত যে যোগাযোগ ব্যবস্থা এ কথায় হয়তো কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়।
আমরা যেমন পেয়েছি তেমনই আবার হারিয়েছিও অনেক। যেমন এখন লোকের ঘড়ী নাই। মোবাইলেই ঘড়ী। টর্চ লাইট নাই। মোবাইলেই লাইট। সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। মোইবালেই সিনেমা দেখতে পারা যায়। আগে ভালো বই এলে মারিমারি করে সিনেমার টিকেট কাটতে হতো। এখন ঘরে শোয়ে শোয়ে সিনেমা দেখা যায়। এখন প্রভাতে ঢেকুচ ঢেকুচ ঢেকীর শব্দ শোনা যায় না। কারণ এখন ঢেকী নাই, মরিচ বাটার পাটা নাই। আগে সিজারিন করে সন্তান হওয়ার কথা শুনিনি। এখন সিজারিন ছাড়া সন্তান প্রসব হয় না। ঢেকী এবং মরিচ বাটার পাটা নাই বলেই এখন সিজারিন করতে হয় বলে বিশ্বাস। আগে চাষ-বাসের জন্য গরু পোষতে হতো।অবস্থাপন্ন গৃহস্থদের রাখাল রাখতে হত হালচাষ করা জন্য এবং গরু পোষার জন্য। শীতের দিনে প্রভাতে কৃষকের হাক-ডাক শোনা যেত। শীতের মাঝে হাল বাওয়ার জন্য পায়ের আঙুলের কর ফেটে যেত। এখন গরু পোষতে হয় না, হালও বাইতে হয় না। কারণ এখন ট্রেক্টর আছে। মৈ দিতে হয় না, ট্রেক্টরেই মৈ দিয়ে দেয়। গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ীর স্থান নিয়েছে ট্রেক্টর। এখন গরু দিয়ে ধান মাড়ানোর প্রয়োজন হয় না। ধান মাড়ানোর জন্য ধান মাড়াই-এর মেশিন(থ্রেশার (Thresher)) আছে।
এখন চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ মাসে দলবদ্ধ দুয়া গান শোনা যায় না। কারণ এখন দলবদ্ধভাবে ক্ষেত নিড়ানোর প্রয়োজনই হয়না, কারণ ঘাস মারার ওষুধ আছে।
একটা গল্প বলি। গল্পটা কতদূর সত্যি জানিনা। গল্পটা শুনেছিলাম অনেক দিন আগে। একবার বোলে পরীক্ষায় ধানখেতের বিষয়ে একটা রচনা এসেছিলো। তখন কোনোদিন গ্রামের মুখ দেখেনি এমন একজন ছাত্র বোলে লিখেছিলো- ধান গাছ বটগাছের সমান বড় হয়। ধানগাছের অনেক ডালপালা আছে।এরকমই কিছু কথা লিখেছিলো আর কি। আমার মনে হয়, এক সময় আমাদের ছেলে-মেয়েরা লাঙল, জোয়াল, ঢেকী কি জিনিস চিনবে না। তাদের জাদুঘরে নিয়ে গিয়ে এগুলি দেখাতে হবে।
পূর্বের আমোদ-প্রমোদের মাধ্যম
পূর্বে আমোদ-প্রমোদের তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না। আজকালকার মতো ঘরে ঘরে টি,ভি ছিল না, বলতে গেলে ষাঠ সত্তরের দশকে আমরা টিভির নামই শোনিনি। রেডিও অবশ্যে ছিল, তবে খুবই কম। দুই এক বাড়িতে। আলিগাঁয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একমাত্র আলিরপাম বাজারের নিত্যান্দ সাহা এবং সূর্য সাহার বাসায় রেডিও ছিলো। বড় রেডিও। কাঠের বাক্সের। তাঁরা রেডিও দোকান ঘরের গদিতে রাখতেন।সন্ধ্যের সময় দোকান ঘরের সামনে চট বিছিয়ে দিতেন, সেই চটে বসে আমরা কোনো কোনো দিন সন্ধ্যের সময় খবর শোনতাম। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের সময় আমরা নিত্যানন্দ সাহার দোকানের সামনে চটে বসে প্রায় নিয়মিতভাবে যুদ্ধের খবর শোনতাম। আমি তখন নানা ধনাই হাজির বাড়িতে থেকে আলিগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতাম। বাজারটা নানাদের বাড়ি থেকে অনুমান পোয়া কিলোমিটার দূরে ছিলো। একটু দূর হলেও আমি প্রায় নিয়মিতভাবেই রেডিওর খবর শোনতে বাজারে যেতাম।
জলিল হাজি সাহেবের বাড়িতে অবশ্যে একটা পোর্টএবল রেড়িও ছিলো। তবে রেডিওটা বাড়ির ভেতরে রাখতেন বলে আমরা কেউ সেই রেড়িও শোনতে যেতাম না। এদিকে রেডিওর চাউন্ডো কম ছিল। তাই শোনে তেমন মজা পেতাম না। অবশ্যে আমি সেই রেডিওতে মাঝেমধ্যে বরদলুই ট্রফির খেলার ধারাবিবরণী শোনতাম। জলিল হাজি সাহাবের বাড়ির সামনে একটা কমিউনিটি হল ছিলো। জলিল হাজি সাহেবের বড় ছেলে বাবর আলী মাঝেমধ্যে বিকেল বেলা সেই কমিউনিটি হলে বসে রেড়িও শোনতেন। সেই সুযোগে আমি মাঝে-মধ্যে খেলার ধারাবিবরণী শোনতাম আর কি! স্কুল বন্ধ থাকলে সুযোগ পেলে মাঝেমধ্যে সকাল বেলা গীতিমালিকা অনুষ্ঠানো শোনতাম সেই রেডিওতে।
তখন ষাঠের দশকের প্রথম ভাগে আমোদ-প্রমোদের আর একটি মাধ্যম ছিলো কলের গান(গ্রামোফোন)। অবশ্যে কলের গান সব অঞ্চলে ছিল না। খুব সৌখিন দুই একজনে রাখতেন কলের গান। ফেঙুয়ায় মধু ও যদু নামে দুই ভাই ছিলেন। আমি জানা মতে, তাঁদের বাড়িতে কলের গান ছিলো। যদু-মধুদের বাড়ি ফেঙুয়ার সাধু মিয়াদের বাড়ির নিকটে ছিলো। সাধু মিয়ার খাতিরেই একবার মধু তাঁর কলের গান নিয়ে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন আমি প্রথম দেখেছিলাম কলের গান। তখন বড় বড় ডিস্কে গান রেকর্ড করা থাকতো।
ডিস্কটি গ্রামোফোনের গোলাকার একটি প্লেটের ওপর স্থাপন করা হতো। মূলত শেলাক (Shellac) নামের এক ধরনের প্রাকৃতিক রেজিন, সঙ্গে তুলা, কাঠের গুড়ি, কালি ইত্যাদি মিশিয়ে ডিস্ক তৈরি করা হতো। পরবর্তী সময়ে — ভিনাইল (Vinyl/PVC) ব্যবহার শুরু হয়। ভিনাইলের ডিস্ক তুলনামূলকভাবে নমনীয়, হালকা এবং কম ভঙ্গুর। প্লেটটির নিচে থাকা মোটর বা স্প্রিং চালিত যন্ত্রই প্লেটটিকে নির্দিষ্ট গতিতে ঘোরাত। ডিস্কের ওপর ছোট ছোট খাঁজ (grooves) থাকে। এই খাঁজগুলোর মধ্যে শব্দের কম্পনের আকার সংরক্ষিত থাকে। সুঁই (পিনকাঁটা)(needle/stylus) খাঁজের ওপর বসিয়ে দিলে ডিস্ক ঘোরার সময় সুঁইটি খাঁজের ওঠানামা অনুসরণ করে। ফলে কম্পনের সৃষ্টি হয়। সেই কম্পন ডায়াফ্রাম–এ পৌঁছায় এবং ডায়াফ্রামটি বাতাসে কম্পন সৃষ্টি করে। পুরোনো গ্রামোফোনে সেই কম্পনের শব্দ শিঙার আকৃতির হর্ন (horn)-এর মাধ্যমে জোরালো হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসত। তখন আব্বাস উদ্দিনের লোকগীতিই বেশি বাজানো হতো কলের গানে।
পঞ্চাশের দশকে দিল্লীতে প্রথম টিভি এসেছিলো যদিও আমরা টিভির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম নব্বৈর দশকের শেযের দিকে। তখন ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য আমরা দলবেঁধে মন্দিয়া আসতাম।১৯৮৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইন্যাল খেলা আমরা মন্দিয়াতে উপভোগ করেছিলাম। পরবর্তী পর্যায়ে সত্র কনরার ইমান আলী মাস্টার এবং রাণিরপামের ইজ্জত আলী মাস্টারের ছেলে ময়নাল হক(মনু মেকার) টিভি কিনেছিলো। ইমান আলী মাস্টার টিভি কারেন্টে চালাতেন এবং মনু মেকার টিভি ব্যাটারি দিয়ে চালাতেন। মুন মেকারের টিভিত আমি বাবরি মছজিদ ধ্বংসের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলাম। তখন অনেকরই টিভি কেনার ইচ্ছা ছিল যদিও কারেন্ট না থাকার জন্য অনেকে টিভি কিনে চালাতে পারত না।
তখন শীতের দিনে আমোদ-প্রমোদের প্রধান আকর্ষণ ছিলো গীতিনাট্য এবং নাটক। শিক্ষিতরা নাটক মঞ্চস্থ করতেন এবং কিছু শিক্ষিত এবং অশিক্ষিতরা মিলে গীতিনাট্য মঞ্চস্থ করতেন। আমরা নিজেরাও নাটক মঞ্চস্থ করেছি। নাটক বিশেষভাবে মঞ্চস্থ করা হতো স্কুল বা ক্লাবের অধিবেশনে এবং গীতিনাট্য নতুন হাট বসালে বা বিয়ে বাড়িতে বিশেষভাবে মঞ্চস্থ করা হতো। তখন আমাদের বাঘবর অঞ্চলে কয়েকটা নাটক, গীতিনাট্য এবং পুতুল নাচের দল ছিলো। সেই সম্পৰ্কে একটি প্ৰতিবেদন নিন্মে দেওয়া হলো-
বাঘবর অঞ্চলে নাটক, গীতিনাট্য ও পুতুলনাচ-
একসময় বাঘবর অঞ্চল—অর্থাৎ আলীগাঁও, সারগাঁও, পালারপাম, মানিকপুর সাতমুখী, মরাবাজ, জাহানারপাড়, বাঘবর প্রভৃতি এলাকায়—অনেক ভালো ভালো অভিনেতা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন অত্যন্ত উচ্চমানের অভিনেতা। তাঁরা সুযোগ-সুবিধা পেলে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও সুনাম অর্জন করতে পারতেন বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। এই অভিনেতাদের মধ্যে প্রথমেই নাম নিতে হয় আলীগাঁয়ের ফয়জল হকের। আলীগাঁও অঞ্চলে ফয়জল হক ‘হক সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর অভিনয় প্রতিভা ছিল অত্যন্ত উঁচুমানের। তাঁর নাট্য নির্দেশনাও উচ্চমানের ছিলো। আমি নিজেই তাঁর নির্দেশনায় নাটকে অভিনয় করেছি।
ষাটের দশকে আলীগাঁও অঞ্চলের আলীরপাম বাজারে একটি শখের নাট্যদল ছিল। সেই নাট্যদলে তারাপদ সাহা, নারায়ণ বসাক, রাধাবল্লভ সাহা, বিশ্বনাথ সাহা, ফজল বৈরাগী, পরেশ সাহা, কানাইলাল সাহা, গুণীন্দ্র সাহা (টেনু সাহা), হরিপদ সাহা, পতিতপাবন কর্মকার, মোহনলাল বাকালি প্রমুখ সুনামের সঙ্গে অভিনয় করতেন। কানাইলাল সাহা ও গুণীন্দ্র সাহা নারী চরিত্রে অভিনয় করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তখন।
যাঠের দশকের প্রথম দিকে আলীরপাম বাজার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের কবলে পড়ায় বাজারটি আলীগাঁও-এ স্থানান্তর করা হয়। তখন উপরোক্ত অভিনেতাদের সঙ্গে সন্ধ্যারাণী সাহা, টগরী বসাক, বাসনা সাহা, মালতী শীল, অঞ্জলি সাহা প্রমুখ মেয়েরাও বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। পালারপামের অখিল সূত্রধর, নারায়ণ ঘোষ এবং মানিকপুরের আজাহার আলী, ইদ্রিস আলী, সামছুল হক প্রমুখ অভিনেতারা বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করে সুনাম অর্জন করেছিলেন। মানিকপুরের আমজাদ আলী এবং বাঘবরের হোসেন আলীও গীতিনাট্যে অভিনয় করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
বর্তমানে পালারপামের আলিমুদ্দিন একটি পুতুলনাচের দল পরিচালনা করেন। এই পুতুলনাচের দলে হোসেন আলী, মোবারক দর্জি, আলিমুদ্দিন, কলিমুদ্দিন, হাকিম আলী, রমজান আলী, ছত্তর আলী, অঞ্জলি প্রমুখ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সুনামের সঙ্গে অভিনয় করে চলেছেন। ২০২৬ সালের ছয় আগস্ট লোকশিল্পী হোসেন আলী মৃত্যুবরণ করেছে।তার মৃত্যু পুতুল নাচের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পুরোনো আলীরপাম বাজারে একটি শখের নাট্যদল ছিল। সেই নাট্যদল ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’, ‘রক্ত তर्पণ’, ‘রাজা দেবিদাস’ প্রভৃতি নাটকসহ বিভিন্ন নাটক মঞ্চস্থ করত। এসব নাটকে তারাপদ সাহা, নারায়ণ বসাক, রাধাবল্লভ সাহা, বিশ্বনাথ সাহা, ফজল বৈরাগী, পরেশ সাহা, কানাইলাল সাহা, গুণীন্দ্র সাহা (টেনু সাহা), হরিপদ সাহা, পতিতপাবন কর্মকার, মোহনলাল বাকালি প্রমুখ অভিনেতারা সুনামের সঙ্গে অভিনয় করতেন।
ব্রহ্মপুত্রের নদীভাঙনের ফলে আলীরপাম বাজার আলীগাঁও-এ স্থানান্তরিত হওয়ার পরও বিশ্বনাথ সাহা, রাধাবল্লভ সাহা, খোকা বাকালি, মোহনলাল বাকালি এবং মেয়েদের মধ্যে সন্ধ্যারাণী সাহা, টগরী বসাক, বাসনা সাহা, মালতী শীল, অঞ্জলি সাহা প্রমুখ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করেছেন।
ষাটের দশকে আলীগাঁও-এ ‘রজনী প্রভাত’ নামে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই পাঠাগারের উদ্যোগে তৎকালীন আলীগাঁও-এর ছাত্রদের পাশাপাশি মানিকপুরের ছাত্ররাও মিলিত হয়ে ‘রজনী প্রভাত’ নাট্যদল নামে একটি নাট্যদল পরিচালনা করতেন। এই নাট্যদলের মাধ্যমে ‘বন্দির ছেলে’, ‘রক্ত তर्पণ’ প্রভৃতি নাটক মঞ্চস্থ করা হতো। এসব নাটকে আজাহার আলী, সিরাজুল হক, ফয়জল হক, করিম মেকার, মহির উদ্দিন, রজব আলী, আক্কাছ গাঁওবুড়া, পালহাজীর এলহাম খান মাস্টার প্রমুখ অভিনেতারা সুনামের সঙ্গে অভিনয় করেছেন।
এ ছাড়াও আর বহু অভিনেতা ও কলাকুশলী ছিলেন, কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সেই সময় আলীগাঁও অঞ্চলে দুজন গ্রামসেবক ছিলেন। তাঁরাও বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করতেন; কিন্তু তাঁদের নামও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী পর্যায়েও আলীগাঁও অঞ্চলে বহু প্রতিভাবান অভিনেতা ছিলেন। তাঁরা প্রথম পর্যায়ে ‘মিলন অপেরা’ নামে একটি শখের নাট্যদল গঠন করে বিভিন্ন স্থানে ‘সোহরাব-রুস্তম’, ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’, ‘অশ্রু নদীর তীরে’সহ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। এসব নাটকে ফয়জল হক, অখিল সূত্রধর, নারায়ণ ঘোষ, বাহারুল ইসলাম, সামচুল হক, গোপাল সাহা, ইদ্রিস আলী, বাবুল বসাক, গোপাল বসাক, নিরঞ্জন বসাক, বাদল সাহা, নারায়ণ সাহা(নারু), মণীন্দ্র সরকার, বাসের আলী, আফাজ উদ্দিন প্রমুখ অভিনেতারা সুনামের সঙ্গে অভিনয় করেছেন।
এই নাটকগুলিতে নুরুল ইসলাম মাস্টার ‘প্রম্পট মাস্টার’ হিসেবে সহযোগিতা করতেন। নুরুল ইসলাম একসময় নাটকে নারী চরিত্রেও অভিনয় করতেন।
পরবর্তী পর্যায়ে ‘নিউ মিলন যুবক সংঘ অ্যান্ড লাইব্রেরি’ নামে একটি ক্লাব গঠন করা হয়। সেই ক্লাবের উদ্যোগে ‘সোরাব-রুস্তম’, ‘বাঙালীর শেষ নামাজ’, ‘দেবিদাস’, ‘সোনার সংসার’, ‘নিমাই সন্ন্যাস’, ‘দোজখের জল্লাদ’ প্রভৃতি নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। এসব নাটকে ফয়জল হক, নারায়ণ ঘোষ, মোবারক দর্জি, আবুল হুসেইন মাস্টার, গোপাল সাহা, বাহারুল ইসলাম, বাবুল বসাক, রজব আলী, ইন্নছ দর্জি, মন্টু সরকার প্রমুখ অভিনেতারা অভিনয় করেছেন।
আলীগাঁও বাজার নদীভাঙনের কবলে পড়ায় বাজারটি উত্তর দিকে শিলুচি গ্রামে স্থানান্তর করা হয়। সেই বাজারে ‘মানুষ কেন কাঁদে’ নাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়েছিলো। ওই নাটকে ফয়জল হক, আবুল হুসেইন মাস্টার, মোবারক আলী দর্জি, গোপাল সাহা, বাহারুল ইসলাম, মোছলেম উদ্দিন, সিরাজুল হক, লাল মিঞা প্রমুখ অভিনেতারা অভিনয় করেছেন।
আলীগাঁও অঞ্চলে একটি গীতিনাট্যের দলও ছিল। সেই দল ‘রহিম-রূপভান’, ‘সাগর ভাসা’, ‘কমলার বনবাস’, ‘ভাওয়াল সন্ন্যাস’, ‘অভয়-দুলাল’, ‘অরুণ-শান্তি’ প্রভৃতি গীতিনাট্য মঞ্চস্থ করত। এসব গীতিনাট্যে মোবারক দর্জি, গোপাল সাহা, জাকির হুসেইন (জোনাব আলী), বাহারুল ইসলাম, হোসেন আলী, হামেদ আলী, আব্দুর রহমান, রজব আলী, সামচুল হক, হালিম আলী, জমির আলী, ওহাব আলী, বিজয়চন্দ্র দাস প্রমুখ অভিনেতারা সুনামের সঙ্গে অভিনয় করতেন।
গীতিনাট্যের দলের পরিচালক ছিলেন আমির আলী। ‘প্রম্পট মাস্টার’ ছিলেন আব্দুল লতিফ। লালচান ও নীলচান আলী ঢোল-খোল সংগত করতেন।
ষাঠের দশকে সারগাঁও-এ একটি গীতিনাট্য দল ছিল। দলটি পরিচালনা করতেন মাজু ব্যাপারী। তাঁরা ‘রাজুবালা’ নামে একটি গীতিনাট্য মঞ্চস্থ করতেন। ‘রাজুবালা’ গীতিনাট্যে মহম্মদ আলী সরকার অভিনয় করতেন। এই গীতিনাট্যে অভিনয় করা অন্যান্য অভিনেতা ও কলাকুশলীদের তথ্য আমার পক্ষে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মানিকপুরে ‘নবরত্ন যাত্রাদল’ নামে একটি গীতিনাট্যের দল ছিল। তাঁরা ‘কাজলরেখা’, ‘ইসমাইলের কোরবানি’, ‘দুঃখের দরিয়া’, ‘সাগর ভাসা’, ‘কমলার বনবাস’, ‘অরুণ-শান্তি’, ‘রহিম-রূপভান’, ‘ভাই-ভাবীর ভালোবাসা’, ‘অভয়-দুলাল’, ‘আলোমতি প্রেমকুমার’, ‘সূর্যের কিরণ’, ‘শহীদ কারবালা’ প্রভৃতি নাটক মঞ্চস্থ করতেন।
উক্ত নাটকগুলিতে ইমান আলী, জব্বর খান, আমজাদ আলী আহমেদ, সামচুল হক, ওহাব আলী আহমেদ, নুরুল ইসলাম খান, হায়দর আলী, জালাল মোল্লা, হাকিম আলী, একাব্বর আলী, জাহাঙ্গীর আলী আহমেদ, আয়নাল হক, রাজীব আহমেদ, হাবিল উদ্দিন, আমির আলী, হানিফ আলী, সিরাজ আলী (শিরু), রহিম উদ্দিন, কদম আলী, আলী হুসেইন, আকবর আলী, অহেদ আলী, মহর আলী প্রমুখ অভিনেতারা অভিনয় করতেন।
উক্ত যাত্রাদলের পরিচালক ছিলেন জসিমুদ্দিন খান। বাদ্যযন্ত্র ও অন্যান্য কলাকুশলীদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল বারেক, নাসির উদ্দিন খান, আব্দুস সামাদ, মহর আলী (১), মহর আলী (২), মোকছেদ আলী, মজিবর রহমান এবং রমজান আলী আহমেদ। নাটকের নির্দেশনায় ছিলেন ফজল হক(হক সাব), আমজাদ আলী আহমেদ ও সামচুল হক।
ষাট ও সত্তরের দশকে আলীগাঁও বাজারে ‘কৃষ্ণলীলা’ নামে একটি গীতিনাট্যের দল ছিল। তাঁরা ‘শুক-শারী’, ‘নিমাই সন্ন্যাস’ প্রভৃতি গীতিনাট্য মঞ্চস্থ করতেন। এসব গীতিনাট্যে প্রফুল্ল শীল, রাধেশ্যাম সরকার, গুণীন্দ্র সাহা, মাখন সাহা (মন্টু সাহা), আরতি সাহা, কাননবালা সাহা, ছবিরাণী সাহা, আদুরি শীল প্রমুখ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সুনামের সঙ্গে অভিনয় করতেন।
কৃষ্ণলীলায় খোল সংগত করতেন হীরু শীল, বাসুদেব সাহা ও খোকা বাকালি। ‘প্রম্পট মাস্টার’ ছিলেন নিবারণ ফৌজদার।তারাপদ সাহার বাবা।
বাঘবরের বালাজানেও একটি শখের নাট্যদল ছিল। সেই নাট্যদল ‘গরিবের মেয়ে’, ‘বিদায় সালাম’, ‘কোহিনূর’, ‘নিহত গোলাম’, ‘সোরাব-রুস্তম’, ‘আলমগীর’, ‘পানিপথ’ প্রভৃতি নাটক মঞ্চস্থ করত। এসব নাটকে বিল্লাল হোসেইন মাস্টার, আবুল হুসেইন মাস্টার, ময়ছের আলী মাস্টার, আমজাদ হুসেইন, আব্দুল হালিম মাস্টার, ইউসুফ আলী সেক্রেটারি, আব্বাস দর্জি, ময়নুল হক, সাইফুল ইসলাম, আতাউল্লাহ, সুরত আলী, ভক্ত পাল, বিষ্ণু দে, আতোয়ার রহমান, কদ্দুস আলী, ওয়ারেছ আলি মাস্টার, চান মিয়া, নৈমুদ্দিন প্রমুখ অভিনেতারা অভিনয় করতেন। আরও অনেকে অভিনয় করতেন যদিও বর্তমানে তাঁদের নাম উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বাঘবরেও একটি গীতিনাট্যের দল ছিল। সেই দল ‘রহিম-রূপভান’, ‘অভয়-দুলাল’, ‘অরুণ-শান্তি’, ‘ভাওয়াল সন্ন্যাস’ প্রভৃতি গীতিনাট্য সফলভাবে কয়েক বছর ধরে মঞ্চস্থ করেছেন। এসব গীতিনাট্যে হোসেন আলী, জেলহক আলী, বিশ্বকেতু, সোহরাব আলী, সামাদ আলী, আবু বক্কর সিদ্দিক, ফয়জল হক (নারী চরিত্রে), মজিবর রহমান (নারী চরিত্রে), বাহেজ উদ্দিন, আমজাদ আলী প্রমুখ অভিনেতারা অভিনয় করেছেন। এই গীতিনাট্য দলের পরিচালক ছিলেন দিদার আলী। লোকে স্ফূর্তি করে তাঁকে দিদার পাগলা বলতেন।
ষাঠের দশকে প্রথম দশকে বাঘবরের জাহানারপাড়ে একটি গীতিনাট্যের দল ছিল। তাঁরা ‘অভয়-দুলাল’, ‘ভাওয়াল সন্ন্যাস’ প্রভৃতি গীতিনাট্য অভিনয় করতেন। এসব গীতিনাট্যে নিয়েত আলী, নালু মিয়া, ওয়াজুদ্দিন, ফজল হক প্রমুখ অভিনেতারা অভিনয় করেতেন।
বরপেটা শহরের অতি নিকটবর্তী ভেরাগাঁও-রাঙাপানিতেও সম্প্রতি পর্যন্ত একটি গীতিনাট্যের দল সক্রিয় ছিল। তাঁরা ‘কমলার বনবাস’, ‘নিজাম খুনী’, ‘রহিম-রূপভান’, ‘আলোমতি প্রেমকুমার’, ‘সাগর ভাসা’, ‘নূরজাহান মালা’ প্রভৃতি গীতিনাট্য সফলভাবে মঞ্চস্থ করেছেন।
এসব গীতিনাট্যে জালিম উদ্দিন, মজিবর রহমান (নারী চরিত্রে), শহিদুল ইসলাম, মদন আলী, হামিদ আলী, তজু মিয়া, ওমর আলী, ছাদেক আলী, এসাক আলী, ওমর আলী(২), ফজল আলী, কোরবান আলী, রশিদ আলী, জাকির হোসেইন, ইউসুব আলী, মানিক আলী, আফছের আলী প্রমুখ অভিনেতারা অভিনয় করতেন।
আলীগাঁও অঞ্চলের শিলোচি গ্রামে ‘মিলনজ্যোতি পুতুল থিয়েটার’ নামে একটি পুতুলনাচ থিয়েটার দল এখনও সক্রিয় রয়েছে। এই পুতুলনাচের দল ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’, ‘কবরের ফুল’, ‘রহিম-রূপভান’, ‘সতী বেহুলা’, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ প্রভৃতি গীতিনাট্য মঞ্চস্থ করে চলেছে। এই পুতুলনাচের দলে হোসেন আলী (বাঘবর), মোবারক দর্জি, আলিমুদ্দিন, কলিমুদ্দিন, হাকিম আলী, রমজান আলী, ছত্তর আলী, অঞ্জলি প্রমুখ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এখনও অভিনয় করে চলেছেন।
‘মিলনজ্যোতি পুতুলনাচ থিয়েটার’ নামে মেধিরটারীতেও আরেকটি পুতুলনাচের থিয়েটার দল সক্রিয় রয়েছে। এই থিয়েটার দল ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’, ‘কবরের ফুল’, ‘রহিম-রূপভান’, ‘সতী বেহুলা’ প্রভৃতি গীতিনাট্য অভিনয় করে। এই দলে হোসেন আলী (বাঘবর), আক্কাছ আলী, কদ্দুস আলী, ছিদ্দিক আলী, রমজান আলী, ছবুর উদ্দিন, অঞ্জলি প্রমুখ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অভিনয় করেন।
যতটুকু তথ্য আমি উদ্ধার করতে পেরেছি, আপাতত সেই তথ্যই এই প্রতিবেদনে সন্নিবেশ করা হলো। প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত বিভ্রাট পাঠকের নজরে পড়লে, সহৃদয় পাঠক তা দেখিয়ে দিলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। এখানেই ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এই সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনের সমাপ্তি টানছি।
গীতিনাট্য ও নাটকের পাশাপাশি কবিগানেরও প্রচলন ছিল ষাট, সত্তর, আশির দশকে গ্রাম্যাঞ্চলে। কবিগান হাটে-বাজারে এবং উৎসবপার্বণে অনুষ্ঠিত হতো। ছনপুরার মাছিম সরকার এবং মাছিম সরকারের পোষ্যপুত্র ও শিষ্য সামচুল হক প্রখ্যাত কবিয়াল ছিলেন। কান্দাপারার মোকশেদ আলী এবং বাঘবরের জাহানারপাড়ের সুনীল সরকারো কবিয়াল হিসেবে সুখ্যাতি অৰ্জন করেছিলেন। বাঘবর অঞ্চলে বিশেষভাবে দীর্ঘকাল অধিক জনপ্রিয় ছিলেন নৃপেন সরকার। তিনি অন্ধ ছিলেন। সেজন্য তিনি কানা বয়াতি নামে পরিচিত ছিলেন।
অন্য এক পরম্পরা ছিলো আমাদের গ্রাম্যাঞ্চলে। আমোদ প্রমোদের কোনো মাধ্যম না থাকার জন্য সন্ধ্যেবেলা ভাত খাওয়ার পরে অনেকেই পাড়া বেড়াতেন এবং গল্পগুজব করে সময় পার করতেন।এর ফলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হতো।
আগে ছেলে-মেয়েরা কীভাবে লিখা-পড়া শিখত
আমাদের দিনে মানে পূর্বে এখনকার মতো যেখানে সেখানে স্কুল কলেজ ছিল না। চার পাঁচটা গ্রাম মিলে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো। কোনো কোনো অঞ্চলে একটা বিদ্যালয়ও ছিল না। আমি দেখেছি খুব বিদ্যুৎসাহী অনেক ছেলেরা ভিন্ন গ্রামে লজিং থেকে লিখা-পড়া শিখেছে। উদাহরণ স্বরূপে বলতে পারি, বাঘবর অঞ্চলের ৩৭১ নম্বর আলিগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা। আলিগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোয়ামারির হানিফ আলী, চান্দু মিয়া ও কালু মিয়া লজিং থেকে পড়া-শুনা করত। হানিফ আলি ও কালু মিয়া লজিং থাকতেন আমাদের নানা ধনাই হাজির বাড়ি এবং চান্দু মিয়া লজিং থাকত ঘুতু দেওয়ানীর বাড়ি। আমি নিজেও নানাদের বাড়িতে লজিং থেকে লিখা-পড়া শিখেছি। আমাদের জাহানারপাড় গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় দেউলদি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল যদিও বর্ষায় যাতায়াতের অসুবিধার জন্য আমি নানাদের বাড়ি থেকেই লিখা-পড়া করতাম। কারণ আমাদের গ্রাম বর্ষার চার পাঁচ মাস প্রায় জলের তলায় ডুবে থাকত। একথা অনেক জায়গায় বলা হয়েছে। তাই পুনরাবৃত্তির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
এখন স্কুল স্থাপন করেন শিক্ষকরা। কিন্তু পূর্বে স্কুল স্থাপন করতেন অঞ্চলের জনসাধারণ। আলিগাঁও বিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব গণ্যমান্য লোক জড়িত ছিলেন। বিদ্যালয়টি ১৯৩৯ সালে স্থাপিত হয়েছিলো। বিদ্যালয়টি স্থাপনের ক্ষেত্রে ধনাই হাজি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন যদিও তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন পাকু বেপারী, কয়েদ আলী ফকির, পোচাই দেওয়ানী, বাজু মল্লিক, জহুর উদ্দিন, নজর দেওয়ানী, বসির খান, নিজাম খান(সর্ব সাং আলিগাঁও)বিনোদ দেওয়ানী, মোকছেদ আলী, আশরফ আলী, মাজম গাঁওবুঢ়া, ইমারত খান, সমশের বয়াতী, ঘুতু দেওয়ানী(আলীৰ পাম) জলিল হাজী, মানিক দেওয়ানী, আরিফ মুন্সী, নায়েব আলী মুল্ল্যা, ফিকির দেওয়ানী, আলম খান, কালু খান, ফালু দেওয়ানী, নালু দেওয়ানী এবং মেছের আলী (আলিগাওঁ পাথার) প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য বর্তমান এতগুলি লোকের সহযোগিতার কথা কল্পনাই করা যায় না। এখন একটি বিদ্যালয় স্থাপন ভাতের সাথে জল খাওয়ার মত হয়েছে। এখন ইচ্ছে করলেই দুই চারজনে মিলে এক দুইদিনের ভেতরে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করতে পারে। আলিগাঁও অঞ্চলে আলিগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে মনে হয় স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত অন্য কোনো বিদ্যালয় ছিল না। তখন একমাত্র বাঘবর-এ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো যদিও এম, ই স্কুল ছিল না। কুরির দশকের প্রথম দশক থেকে বংগীয়মূলের মুছলমান অধ্যূষিত অঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন শুরু হয়েছিলো যদিও এম,ই ও হাইস্কুল অনেক পরে স্থাপিত হয়েছে। আমি যতদূর জানি, পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্দ্ধ থেকে এম,ই ও হাইস্কুল স্থাপন শুরু হয়েছে।কারণ বরপেটা অঞ্চলের প্রায় সবগুলি এম,ই ও হাইস্কুল ১৯৫৫ সালের পরে স্থাপন হওয়া দেখা যায়।একমাত্র কাদং মাইনর স্কুল ১৯৪৫ সালে স্থাপিত হয়েছিলো।
এম,ই ও হাইস্কুলের অভাবের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় উত্তীর্ণ হওয়ার পর অনেকেই লিখা-পড়া ছেড়ে দিতেন। বরপেটা সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৮৭১ সালে স্থাপিত হয়েছিলো। তাই ধনী ঘরের বিদ্যুৎসাহী এক দুইজন ছাত্র বরপেটার সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতেন। ১৯৪৫ সালে কাদং মাইনর স্কুল স্থাপন হওয়ার পর উচ্চপ্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নবজাগরণ সৃষ্টি হয় এবং মাইনর স্কুলের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর অনেকে দেউরিকুছি, ডঙরকুছি, দত্তকুছি, করেরতল,বরপাল্লী, ভেরাগাঁও প্রভৃতি গ্রামে লজিং থেকে বরপেটার সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতেন। আমাদের মামা জুলহাস আলি কাদং থেকে কাদং মাইনর স্কুলের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বরপেটার সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতেন বলে নানা-নানীর মুখে শুনেছি।
তখন অনেকরই স্কুল প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছা ছিল যদিও শিক্ষকের অভাবের জন্য সেই প্রচেষ্টায় সফল হতে পারেন নি। আমি নিজে দেখেছি, আলিগাঁয় একটি এম, ই স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু শিক্ষকের অভাবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
বলতে গেলে, কাদং মাইনর স্কুল স্থাপনের পর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের বরপেটা অঞ্চলের পূর্ববংগীয় মূলের মুছলমানের শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিলো। ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তারাবারি, কাদং, বামুন দংরা, মন্দিয়া, জনীয়া, গুনিয়ালগুরি, বালাগাঁও, ময়নবরি, হাউলির ঢাকালীয়াপারা প্রভৃতি অঞ্চলে প্রথমে এম,ই স্কুল ও পরে পর্যায়ক্রমে এম, ই স্কুলগুলোর সাথে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। গড়লা, বাঘবর, কয়াকুছি, বাগোদী, বালিকুরি, কলগাছিয়ার কৃষ্ণকান্ত পাঠক প্রভৃতি হাইস্কুল ষাঠের দশকের প্রথমার্দ্ধে স্থাপিত হয়েছে।
এই সময়ে ১৯৬০ সালে গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাছা স্থাপিত হয়েছিল। আমি নিজেই গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় নানাদের বাড়িতে থেকে হেঁটে গিয়ে অধ্যয়ন করেছি। আলিগাঁও থেকে গড়লার দূরত্ব কমেও চার পাঁচ কিলোমিটার ছিলো, আমি সেই চার পাঁচ কিলোমিটার হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করতাম। বর্ষার দিনে কোনো কোনো সময় গামছা পিন্ধে খাল সাঁতরেও স্কুলে গিয়েছি।
তখনকার দিনে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত আলিগাঁও অঞ্চলের ছাত্র সিরাজুল হক, তমছের আলী, ফয়জল হক, মহির উদ্দিন,এলাহি বক্স, ছিদ্দিক আলী, সামসুল হক প্রভৃতিরা লজিং থেকে বামুন দংরা, কাদং, ভেল্লা, তারাবারি প্রভৃতি হাইস্কুলে অধ্যয়ন করতেন। বাঘবরের দলাগাঁয়ের আফসার আলী লজিং থেকে বামুন দংরা হাইস্কুলে অধ্যয়ন করতেন। এদের পরবর্তী পর্যায়ে আমি নিজেও কাদঙের রূপাকুছি লজিং থেকে কাদং হাইস্কুলে অধ্যয়ন করেছি। আমার মতো নগাঁও অঞ্চলের হেলচা পামের সাদেক আলী, শমসের আলী, সাহেব আলী, কায়েম উদ্দিন, বাঘমারা চরের আয়নাল হক, তাজ উদ্দিন, বাঘবর অঞ্চলের ইউসুফ আলী, আব্দুল বারেক, মোক্তার আলী, আসান উদ্দিন, মরাবাজের নৈমুদ্দিন, আব্দুর রসিদ,সাহেদ আলী, আব্দুল কাদের প্রভৃতিরা কাদং, রূপাকুছি, মহম্মদপুর, রসুলপুর, কান্দাপারা প্রভৃতি অঞ্চলে লজিং থেকে কাদং হাইস্কুলে অধ্যয়ন করতেন। আমাদের আগের পর্যায়ে গোয়ালপারার জীবন আলি শেখ,আমির হোসেইন,বছির উদ্দিন প্রভৃতিরা কাদং অঞ্চলে লজিং থেকে কাদং মাইনর স্কুলে অধ্যয়ন করতেন। আর অনেকে অন্যান্য অঞ্চল থেকে এসে কাদং মাইনর স্কুল এবং হাইস্কুলে অধ্যয়ন করতেন যদিও তথ্যের অভাবে সেসব নাম লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হল না। বলতে গেলে লজিং সংস্কৃতিয়ে বংগীয়মূলের মুছলমান ছাত্র-ছাত্রীদের লিখা-পড়ার গতি ত্বরান্বিত করেছিল।
তখন বরপেটা মহকুমায় উচ্চশিক্ষার একমাত্র অনুষ্ঠান ছিলো মাধব চৌধুরি মহাবিদ্যালয়। তাই মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর দুই চারজন ছাত্র মাধব চৌধুরি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতেন এবং বেশির ভাগই লিখা-পড়া সমাপ্ত করে নিজ নিজ অঞ্চলে প্রাথমিক ও মাজলীয়া বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষা প্রসারের জন্য আত্মনিয়োগ করতেন। কলেজে পড়ুয়া ছাত্রদের প্রায় সবাই করেরতল, বরপাল্লী, ভেরাগাঁও, দনাকুছি, দত্তকুছি, দেউরিকুছি, জাহোরপাম প্রভৃতি অঞ্চলে লজিং থেকে অধ্যয়ন অব্যাহত রাখতেন। দুই চারজনে আবার ধুবুরির বি, এন কলেজেও অধ্যয়ন করতেন। তখন লজিং রাখারও প্রতিযোগিতা হতো। অবস্থাপন্ন গৃহস্থের প্রায় সবাই লজিং রাখার জন্য আগ্রহী ছিলেন। কোনো কোনো গৃহস্থ দুই তিনজন করেও লজিং রাখতেন। তখনকার সেই সময়ের মানুষের মনোভাবের কথা এখন কল্পনা করাও যায়না।বলা বাহুল্য, এই কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররাই স্নাতক ডিগ্রী আহরণ করে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার ক্ষেত্রে জাগরণ সৃষ্টি করতেন। এই রকম শিক্ষকের কথা বলতে গেলে আমি জানার মধ্যে জনীয়া হাইস্কুলের আব্দুল হালিম, কাদঙ হাইস্কুলের মণির উদ্দিন আহমেদ, মন্দিয়া হাইস্কুলের আব্দুল হামিদ খান, বামুন দংরার মণির উদ্দিন আহমেদ গড়লা এস, কে হাইস্কুলের হাসান আলী প্রভৃতি শিক্ষকদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আমাদের সময়ে শিক্ষকদের আমরা সকলের ঊর্ধ্বে স্থান দিতাম। তাঁদের আদেশ-উপদেশ বেদবাক্যের মতোই পালন করার জন্য চেষ্টা করতাম। শিক্ষকদের পরেই আমরা শ্রদ্ধা করতাম আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ছাত্রদের। আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে বলে আমরা পার্যমানে তাঁদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতাম।
সেই সময়ে সাইকেলের ব্যবহার খুবই কম ছিল। তখন ধনীদের দুই চারজনে সাইকেল ব্যবহার করতেন। তাই আমরা প্রায় তিন-চার কিলোমিটার রাস্তা হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করতাম। অবশ্য শিক্ষকদের অধিকাংশই সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করতেন। একমাত্র প্রধান শিক্ষক মণির উদ্দিন আহমেদ এবং আব্দুল মান্নান স্যার হেঁটে স্কুলে আসা-যাওয়া করতেন। ছাত্রদের মাঝে গরেমারীর মিজানুর রহমান এবং গাগলমারীর আতোৱার রহমান সাইকেল নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতেন। দুজনেই র্যালি কোম্পানির সাইকেল চালাতেন।
আজ-কালকার মতো তখন লং প্যান্টের প্রচলনও ছিল না। এমনকি বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষকেরাও পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে স্কুলে আসতেন।অবশ্য দু-একজন শিক্ষক মাঝে মাঝে লংপ্যান্ট পরতেন। সেই সময়ে আমাদের কাদং হাইস্কুলে লংপ্যান্ট পরা শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন তারিক হোসেইন, আব্দুল হক এবং আবুল কাশেম স্যার। আমরা ছাত্ররা পায়জামা ও চাইনীচ শার্ট পরতাম, আর মেয়েরা সাধারণত শাড়ি পরত। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়েরা ফ্রক পরত। আজ-কালকার মতো সোয়েটার বা জুতো পরার কথা আমরা তখন কল্পনাই করতে পারতাম না। সাধারণত আমরা হাওয়াই চপ্পল ব্যবহার করতাম। তবে সেটিও স্কুলে যাওয়ার জন্য নয়, টাউন শহরে যাওয়ার জন্য। কারণ চপ্পল পরে স্কুলে যাওয়াকে আমরা তখন অপরাধ বলে মনে করতাম। বাড়িতে আমরা খড়ম ব্যবহার করতাম। এখনকার মতো জোতা লংপ্যান্ট পরে স্কুলে যাওয়ার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না।
তখন ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা খুবই কম ছিল। আমাদের বংগমূলীয় মুসলমান অধ্যূষিত অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খুব কম সংখ্যক বিদ্যালয়ে তখন একশর ওপরে ছাত্র-ছাত্রী ছিলো। আমি দেখা কোনো বিদ্যালয়ে দুইজনের বেশি শিক্ষক ছিল না তখন। আমাদের দিনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটা শ্রেণি ছিলো। ক-মান, খ-মান, প্রথম মান, দ্বিতীয় মান এবং তৃতীয় মান। ছাত্রের তুলনায় ছাত্রীর সংখ্যা খুব নগন্য ছিলো। আমি ১৯৬০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। আমাদের শ্রেণিতে আমরা মাত্র ষোল সতেরজন মতো ছাত্র ছিলাম। সেখানে ছাত্রী সংখ্যা ছিলো মাত্র তিনজন। রমজান দেওয়ানীর মেয়ে তারাবানু, জয়নাল আব্দিনের মেয়ে সামর্ত বানু(আমার মামাত বোন) এবং আমাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজর আলি স্যারের মেয়ে সাজেদা খাতুন। আমি ১৯৬৪ সালে গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলাম। আমাদের শ্রেণিতে তেত্রিশ জন ছাত্রের মাঝে একজনও ছাত্রী ছিল না। অবশ্যে পরের বছর ১৯৬৫ সালে চতুর্থ শ্রেণিতে চারজন ছাত্রী ভর্তি হয়েছিলো। তাঁদের মাঝে ছিল চাচরার লালবানু, উম্মে কুলচুম, কাহিবারীর জরুনা খাতুন এবং আলীগাঁও-এর সামর্ত বানু। লালবানু ম্যাট্রিক পরীক্ষায় গড়লা এস, কে হাইস্কুল থেকে আরবীতে প্রথম লেটার মার্ক পেয়েছিলো। সে পরবর্তীতে প্রাইমারী বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কার্যনির্বাহ করে অবসর গ্রহণের পর মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর ছেলে রেজাউল হামিদ একজন নামকরা সাইকোলজিস্ট। জরুনা খাতুনের বিয়ে হয়েছিলো গড়লা এস, কে হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক ইদ্রিস আলির সাথে। ইদ্রিস আলি স্যারের বাড়ি কয়াকুছি। উম্মে কুলচুমের বিয়ে হয়েছিলো মাণিকপুরের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ওমর আলি দেওয়ানীর ছেলে আমির আলির সাথে। সামর্ত বানুর অকাল মৃত্যু হয়েছে।
আমি ১৯৬৭ কাদং হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আমাদের শ্রেণিতে ছাত্রী ছিলো মাত্র দুজন। নূরজাহান এবং লক্ষী ঘোষ। অষ্টম শ্রেণিতে প্রামোশন পাওয়ার পরে নূরজাহানের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো মন্দিয়া হাইস্কুলের কেরাণির সাথে। একমাত্র লক্ষী ঘোষ আমাদের সাথে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলো। সেবছর আমরা কাদং হাইস্কুল থেকে ২১ জন ছাত্র-ছাত্রী ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম এবং উত্তীর্ণ হয়েছিলাম মাত্র ১৬ জন। সম্ভবত সেবার লক্ষী ঘোষ উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষা: তখন ও এখন
বর্তমানের হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষার পরীক্ষাৰ্থীর সংখ্যা এবং ফলাফলের দিকে তাকালে একটি নস্টালজিক ভাবনা মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে তোলে। আমি ১৯৭১ সাল এবং ২০১৭ সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষার এক তুলনামূলক বিশ্লেষণ দিতে চাচ্ছি। ১৯৭১ ও ২০১৭ সাল বেছে নেওয়ার কারণ হলো, আমি ১৯৭১ সালের হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষার একজন পরীক্ষার্থী ছিলাম। সেই বছরই টিহু হাইস্কুলের খগেন শর্মা প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। আর এবার, ৪৬ বছর পর, পুনরায় টিহু থেকেই পার্থপ্রতীম ভূঞা প্রথম স্থান অধিকার করেছেন।
পার্থক্যটি হলো—তখন খগেন শর্মা একটি সরকারি বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে এই গৌরব অর্জন করেছিলেন; অন্যদিকে, ২০১৭ সালে পার্থপ্রতীম ভূঞা টিহুর জাতীয় বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
খগেন শর্মা তখন ৮০০ নম্বরের মধ্যে ৬৯৬ নম্বর, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশ নম্বর লাভ করেছিলেন। আজকের নম্বরের মানদণ্ডে বিচার করলে, এই নম্বর পেলে এখন খগেন শর্মা ডিস্টিংশনও লাভ করতে পারতেন না। অন্যদিকে, ২০১৭ সালে পার্থপ্রতীম ভূঞা ৬০০ নম্বরের মধ্যে ৫৮৯ নম্বর, অর্থাৎ ৯৮.১৭ শতাংশ নম্বর লাভ করেছিলেন। এই ৪৬ বছরের ব্যবধানে শতকরা নম্বরের পার্থক্য ১১.১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, আগের তুলনায় শতকরা নম্বর ১১.১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে মোট ৬০০ নম্বরের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। কিন্তু তখন মোট ৮০০ নম্বরের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হতো। এর পাশাপাশি, ইচ্ছুক পরীক্ষার্থীরা অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে ঐচ্ছিক গণিত অথবা বিজ্ঞান বিষয়ে ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারতো। অতি মেধাবী এবং ভালো ছাত্রছাত্রীরাই সাধারণত এই অতিরিক্ত বিষয়ের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতেন। সেই অতিরিক্ত বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর থেকে ৭০ নম্বর বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৩০ নম্বর মূল নম্বরের সঙ্গে যোগ করা হতো। এই অতিরিক্ত নম্বর ছাত্রছাত্রীদের মোট নম্বরের শতকরা হার বৃদ্ধি করতে সাহায্য করত।
আমার যতদূর মনে আছে—স্মৃতি যদি আমাকে প্রতারণা না করে থাকে— খগেন শর্মা আটটি বিষয়ের মধ্যে ছয়টি বিষয়ে লেটার মার্ক পেয়েছিলেন। সম্ভবত ইংরেজি ও অসমীয়া—এই দুটি বিষয়ে তিনি লেটার মার্ক পাননি। কিন্তু বর্তমানে এমন কোনো বিষয় নেই, যেখানে লেটার মার্ক পাওয়ার সুযোগ নেই। অসমীয়া ও ইংরেজি বিষয়েও এখন অনেক ছাত্রছাত্রী লেটার মার্ক লাভ করে।
২০১৭ সালের পরীক্ষায় প্রথম দশটি স্থানাধিকারীর তালিকায় ২৯ জন ছাত্রছাত্রীর নাম ছিল। অথচ খগেন শর্মার সময়ে প্রথম দশটি স্থানাধিকারীর তালিকায় মাত্র দশজন ছাত্রছাত্রীর নাম ছিল। ২০১৭ সালের পরীক্ষায় দশম স্থান অধিকার করা ছাত্রছাত্রীরাও ৯৬.৬৭ শতাংশ নম্বর লাভ করেছিলেন। অর্থাৎ, খগেন শর্মা যদি ২০১৭ সালে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতেন, তাহলে প্রথম স্থান অধিকার করা তো দূরের কথা, স্থানাধিকারীদের তালিকাতেও তাঁর নাম থাকত না।
কিন্তু সত্যিই কি খগেন শর্মা আজকের স্থানাধিকারী ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় দুর্বল ছাত্র ছিলেন? মোটেই নয়।
কারণ, তখনকার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সেই সময় অধিকাংশ শিক্ষকই ছিলেন অপ্রশিক্ষিত। তখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়া বহু লোকও শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশায় যুক্ত হতেন। তদুপরি, বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামোও আজকের তুলনায় অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল।
আজকের মতো তখন বস্তুনিষ্ঠ প্রশ্ন ছিল না; প্রশ্নগুলি মূলত বর্ণনামূলক ছিল। ষোলো নম্বরের একটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে কমপক্ষে দুই পৃষ্ঠা লিখতে হতো। বর্তমানে অনেক প্রশ্নের উত্তরে একটি বা দুটি বাক্য লিখলেই এক বা দুই নম্বর পাওয়া যায়। কিন্তু তখন কোনো প্রশ্নের উত্তরের জন্য এভাবে এক বা দুই নম্বর নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো না।
অনেক বিষয়ে তখন ১৬ নম্বর করে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হতো। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল ২০ নম্বরের। সেই ২০ নম্বরের প্রশ্নটিতে পাঁচ নম্বর করে চারটি উপ-প্রশ্নের উত্তর লিখতে হতো। সেটিই ছিল একমাত্র সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন। সেই সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর লিখতেও কমপক্ষে আধা পৃষ্ঠা লিখতে হতো। এই পাঁচ নম্বরের কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর লিখতে এক পৃষ্ঠারও বেশি লেগে যেত।
ফলে একজন অতি উত্তম মেধাবী ছাত্র তখন ১৬ নম্বরের প্রশ্নের উত্তরে ১৩ বা ১৪ নম্বর আহরণ করতে সক্ষম হতো। উত্তম ছাত্ররা ১৬-এর মধ্যে ১০ থেকে ১২ নম্বর পেত। আর মাঝারি মানের ছাত্রছাত্রীরা পাঁচ থেকে আট নম্বরের মধ্যে পেত। তাই গণিত ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর আহরণ প্রায় অসম্ভব ছিল।
তখন আরও একটি বড় অসুবিধা ছিল। এখন মোট ৬০০ নম্বরের পরীক্ষা দিলেই হয়, কিন্তু তখন মোট ৮০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হতো। অতি উত্তম ও উত্তম ছাত্র-ছাত্রীদের আবার ৯০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হতো।
তদুপরি, বর্তমান একটি শিক্ষাবর্ষে যে পাঠ্যক্রম পড়ানো হয়, সাধারণত সেখান থেকেই পরীক্ষার প্রশ্ন আসে। কিন্তু তখন প্রায় চার বছরের পাঠ্যক্রম থেকে প্রশ্ন করা হতো। এসব কারণে বহু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীও ভালো নম্বর আহরণ করা থেকে বঞ্চিত হতো।
এখন তিনটি বিষয়ে ২০ নম্বর করে ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বরের ব্যবস্থা রয়েছে। তখন এই সুবিধা ছিল না। এখন বানান ভুল হলেও সাধারণত নম্বর কাটা হয় না; তখন বানান ভুল হলে নম্বর কাটা হতো। এমনকি প্রশ্নের নম্বর ভুল লিখলেও বর্তমান নম্বর দেওয়া হয়, কিন্তু তখন প্রশ্ন নম্বর ভুল হলে নম্বর দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
২০১৭ সালে হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৩,৭২,৭৪০ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছিলো ১,৭৮,৬৫৬ জন, অর্থাৎ উত্তীর্ণের হার ছিলো ৪৭.৯৪ শতাংশ।
খগেন শর্মা যে বছর পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, অর্থাৎ ১৯৭১ সালে, মোট পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র ৭৮,০০৭ জন। এর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র ২২,৭৩৩ জন এবং প্রাইভেট পরীক্ষার্থী ছিল ৫৫,২৭৪ জন। অর্থাৎ নিয়মিত পরীর্ক্ষার্থীর চেয়ে প্রাইভেট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি ছিলো। নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণের হার ছিল ৫৮.২৫ শতাংশ এবং প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণের হার ছিল মাত্র ২৩.৪১ শতাংশ। তখন প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের কারণে সামগ্রিক উত্তীর্ণের হার অনেক সময়ই নিম্নগামী হতো।
অসম মাধ্যমিক শিক্ষা আইন, ১৯৬১-এর অধীনে ১৯৬২ সালের ২৯ জানুয়ারি তৎকালীন ডি.পি.আই. এস.সি. রাজখোয়াকে চেয়ারম্যান এবং বিদ্যালয়সমূহের পরিদর্শক মহম্মদ এন. ইসলামকে সম্পাদক হিসাবে মনোনীত করে অসম মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠন করা হয়েছিলো। ১৯৬২ সালের ১৪ মার্চ থেকে অসম মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষা পরিচালনা করে আসছে।
প্রথম পর্যায়ে পর্ষদকে বিপুলসংখ্যক প্রাইভেট পরীক্ষার্থীর দায়িত্ব বহন করতে হতো। তদুপরি, আজকের মতো তখন উন্নত পরিকাঠামোর সুবিধা ছিল না। অন্যদিকে, প্রতি বছর নিয়মিত পরীক্ষার্থীর তুলনায় প্রাইভেট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলছিল। ফলে পর্ষদ সন্তোষজনক ফলাফল প্রদর্শন করতে অনেক সময় ব্যর্থ হতো।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, আজকের মতো তখন মার্কশিটের বিসংগতি, প্রশ্নপত্রের ত্রুটি কিংবা অন্যান্য পরীক্ষাব্যবস্থাজনিত সমস্যা দেখা দিত না।
১৯৬৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে নিয়মিত ও প্রাইভেট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং তাঁদের উত্তীর্ণের হার কেমন ছিল, তা নিচের পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়।
| বছর | নিয়মিত পরীক্ষার্থী | প্রাইভেট পরীক্ষার্থী | নিয়মিত উত্তীর্ণ | উত্তীর্ণের হার | প্রাইভেট উত্তীর্ণ | উত্তীর্ণের হার | বহিষ্কৃত |
| ১৯৬৪ | ২২,৪৩৬ | ১৫,২৫২ | ১০,০৮২ | ৪০.৫% | ৩,৩৩৬ | ২২.৩% | ৯৮ |
| ১৯৬৫ | ২৪,০০৮ | ১৯,১১৫ | ১০,৩৫০ | ৪৩.১% | ৪,২৯৭ | ২২.৫% | ৯৮ |
| ১৯৬৬ | ২৪,২৫৮ | ২৪,১৮৯ | ১১,৮৫২ | ৪৮.৮৫% | ৬,৪২১ | ২৬.৫৪% | ১১১ |
| ১৯৬৭ | ২৪,৪১০ | ৩২,০১৬ | ১০,৪১০ | ৪২.৫% | ৪,৮৬৬ | ১৫.২% | ১১৩ |
| ১৯৬৮ | ২০,৯২০ | ৪৩,২৬৩ | ৮,৬২৬ | ৪১.৩% | ৯,৬৫৬ | ১৪.৪% | ৮৯ |
| ১৯৬৯ | ১৮,৯৩১ | ৫১,৫৮০ | ৯,৯৯২ | ৫২.৬% | ১০,০০০ | ১৯.৩% | ১৫৪ |
| ১৯৭০ | ২১,০৬৮ | ৫৫,২৭৪ | ১০,৪১০ | ৪৯.৪৩% | ৯,৭৬৮ | ১৭.২% | ১৪ |
| ১৯৭১ | ২২,৭৩৩ | ৫৫,২৭৪ | ১৩,২৪০ | ৫৮.২৫% | ১৪,৩২০ | ২৩.৪১% | ১২ |
| ১৯৭২ | ২৪,৯৯৫ | ৫৮,৫৭০ | ১৫,৬৫০ | ৬২.৬% | ১৪,৭৭০ | ২৫.২% | ২২ |
| ১৯৭৩ | ২৮,৬৬৩ | ৫৩,৫৬০ | ১৭,২০০ | ৬০% | ১১,৫৭০ | ২১.৬% | ১৩০ |
ওপরের তালিকা থেকে দেখা যায়, নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণের হার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছিল। অন্যদিকে, প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণের হার মাঝেমধ্যে ওঠানামা করলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় একই পর্যায়ে রয়ে গিয়েছিল।
তখন উত্তীর্ণের হার কম থাকার অন্যতম কারণ ছিল দুর্বল পরিকাঠামো। কারণ, তখন শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল অত্যন্ত কম। একটি তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে শিক্ষা খাতে বাজেটের পরিমাণ ছিল ৭৬ লাখ টাকা; ১৯৬৯-৭০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ কোটি টাকা এবং ১৯৭৯-৮০ সালে ৭৪.৪৮ কোটি টাকা।
ফলে বিদ্যালয়গুলোর পরিকাঠামো এবং শিক্ষকদের মাসিক পারিশ্রমিক ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও তখন পরীক্ষাব্যবস্থা ছিল পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ। উত্তীর্ণের হারও মোটামুটি প্রশংসনীয় ছিল বলা যায়।
এডমিট কার্ডের বিসংগতি, মার্কশিটের ত্রুটি, প্রশ্নপত্রের ভুল—এসবের কথা তখন শুনেছি বলে মনে পড়ে না। নকলের প্রচলনও তখন প্রায় ছিল না বললেই চলে। ওপরের তালিকায় বহিষ্কৃত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দেখলেই বিষয়টি কিছুটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও নকলের প্রবণতা এমনভাবে বেড়েছে যে, শেষ মুহূর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হয়েছে। এমনকি তিনটি বিষয়ে ‘গ্রেস’ নম্বর দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের উত্তীর্ণের হার বাড়ানোর মতো লজ্জাজনক পদক্ষেপও নিতে হয়েছে।
সরকারি এবং বেসরকারি ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ্য করলে খুবই একটা দুঃখজনক প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। সরকারি বিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিদ্যালয়ের ফলাফল অনেক বেশি উন্নত। সেজন্য অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দ্বারা পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে বর্তমান সরকারি বিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মাথা নত করতে হচ্ছে। আমাদের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক কথা।
শিক্ষা বিভাগ যদি এই পরিস্থিতি থেকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে উদ্ধার করতে না পারে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে অভিভাবকদের সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি যে মোহভঙ্গ হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বর্তমানে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে পরীক্ষার্থীর অবতীর্ণ ও উত্তীর্ণের পরিসংখ্যান ছিলো নিন্মরূপ-
২০১৭–২০২৬: HSLC পৰীক্ষার ফলাফল
| বছর | অৱতীৰ্ণ পরীক্ষাৰ্থী | উত্তীৰ্ণ পরীক্ষাৰ্থী | উত্তীৰ্ণর হার |
| ২০১৭ | ৩,৭২,৬৪০ | ১,৭৮,৬৫৬ | ৪৭.৯% |
| ২০১৮ | ৩,৩৭,৫৭০ | ১,৮৯,১৯১ | ৫৬.০% |
| ২০১৯ | ৩,৩৬,২০৩ | ২,০২,৫০৮ | ৬০.২% |
| ২০২০ | ৩,৪২,২২৪ | ২,২১,৭৫৬ | ৬৪.৮% |
| ২০২১ | ৪,২৬,৫৫৩ | ৩,৯৭,১৩২ | ৯৩.১% |
| ২০২২ | ৪,০৫,৫৮২ | ২,২৯,১৩১ | ৫৬.৪% |
| ২০২৩ | ৪,১৫,৩২৩ | ৩,০১,৮৭৯ | ৭২.৬% |
| ২০২৪ | ৪,১৯,০৭৮ | ৩,১৭,২৪২ | ৭৫.৭% |
| ২০২৫ | ৪,২২,৭৩৭ | ২,৭৯,৩৭৬ | ৬৩.৯৮% |
| ২০২৬ | ৪,২৯,২৪৯ | ২,৮১,৭০১ | ৬৫.৬২% |
এই সংখ্যাগুলির ভেতরে ২০২৬ সালের তথ্য Assam State School Education Board (Division-I)-এর Results Gazette– থেকে সরাসরি নেওয়া হয়েছে। সেই সরকারি গেজেটে ২০১৭–২০২৬ সালের সমগ্ৰ দশকের ফলাফল একসাথে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৬ সালে মুঠ ৪,২৯,২৪৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অবতীৰ্ণ হয়েছিল এবং তার মাঝে ২,৮১,৭০১ জন পরীক্ষার্থী উত্তীৰ্ণ হয়েছে। এর মাঝে প্ৰথম বিভাগে ৮৫,১৮৯ জন, দ্বিতীয় বিভাগে ১,৫০,১৬৭ জন এবং তৃতীয় বিভাগে ৪৬,৩৪৫ জন উত্তীৰ্ণ হয়েছে। বর্তমান ম্যাট্রিক পরীক্ষায় যতজন ছাত্র-ছাত্রী প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়, পূর্বে ততজন ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষায় অবতীর্ণই হতোনা।
উত্তীর্ণের হার আগের তুলনায় বর্তমান যে খুব একটা বেশি উন্নত হয়েছে তা বলা যায় না। তবে শতকরা প্রাপ্ত নম্বরের সংখ্যা, ডিস্টিংশন, স্টার মার্ক এবং প্রথম শ্রেণি প্রাপ্তের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছ এ কথা স্বীকার করতেই হবে। শিক্ষার গুণগত মান আগের তুলনায় যে খুব একটা বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে তাও বলা যায় না। বিদ্যালয়ের পূর্বের পরিকাঠামো এবং বর্তমানের পরিকাঠামোর তুলনায় হিসেব করতে গেলে কিছুই উন্নত হয়নি বলা যায়। আগে পরীক্ষার ফলাফল প্রাত্যহিক বাতরি কাকতে প্রকাশ করা হতো।বর্তমান পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য পরীক্ষার ফলাফল পুস্তিকা(বুকলেট) আকারে প্রকাশ করা হয়।…………….
ষাট ও সত্তরের দশকের বঙ্গীয়মূলের মুসলমান
সমাজ: একটি তুলনামূলক বিবরণ
ষাট ও সত্তরের দশক ছিল গ্রামীণ ও মফস্বলি বাংলাভাষী মুসলমান সমাজের জন্য এক বিশেষ সময়। তখনকার সমাজব্যবস্থা আজকের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ছিল না। মানুষের জীবনযাত্রা ছিল অপেক্ষাকৃত সরল, পারিবারিক বন্ধন ছিল দৃঢ় এবং প্রতিবেশী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক সম্পর্কের মূল্য ছিল যথেষ্ট গভীর।
পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্ক
সেই সময়ের মুসলমান সমাজে যৌথ পরিবার বেশ প্রচলিত ছিল। একই বাড়িতে বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, দাদা-দাদি কিংবা অন্যান্য আত্মীয় একসঙ্গে বসবাস করতেন। পরিবারের প্রবীণ ব্যক্তির মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। পিতা ছিলেন পরিবারের প্রধান এবং তাঁর সিদ্ধান্ত সাধারণত পরিবারের অন্য সদস্যরা মেনে চলতেন।
বড় ভাই-বোনদের প্রতিও ছোটদের যথেষ্ট সম্মান ছিল। পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে অন্য সদস্যরা দায়িত্ব ভাগ করে নিতেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক কেবল রক্তের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল সামাজিক কর্তব্যের অংশ।
বর্তমানে যৌথ পরিবারের পরিবর্তে অনেক বেশি একক পরিবার দেখা যায়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, শহরমুখী জীবন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রসারের ফলে পরিবারের সদস্যরা ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ফলে পারিবারিক স্বাধীনতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আগের দিনের মতো প্রতিদিনের ঘনিষ্ঠতা অনেক ক্ষেত্রে কমেছে।
প্রতিবেশী সম্পর্ক
ষাট-সত্তরের দশকে পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কারও বাড়িতে বিয়ে হলে প্রতিবেশীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে যোগ দিতেন। কারও মৃত্যু হলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবেশীরা শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াতেন। ঘর তৈরি, ধান কাটা, ফসল তোলা, বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগ—এসব ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল স্বাভাবিক সামাজিক রীতি।
একটি পাড়াকে অনেকটা বৃহত্তর পরিবারের মতো মনে করা হতো। কারও বাড়িতে রান্না না হলে পাশের বাড়ির খাবার পৌঁছে যেত; কারও সন্তান অসুস্থ হলে প্রতিবেশীরা খোঁজ নিতেন। পারার অন্যের ছেলে-মেয়েদের পারা প্রতিবেশিরা নিজেদের ছেলে-মেয়ের মতো খেয়াল রাখতেন। আগে ফাল্গুন মাস থেকে জৈষ্ঠ মাসে খুবই ঝড়ঝঞ্জা হতো। ঝড়ঝঞ্জা হয়ে যাওয়ার পর ডেকে ডেকে প্রতিবেশীর খোঁজ-থবর নিতেন। বিপদ-আপদে প্রতিবেশিরা সহায়ের জন্য দৌড়ে আসতেন। সামাজিক নিরাপত্তার একটি বড় অংশই তখন তৈরি হতো এই পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহায়তার মাধ্যমে। আগে বিনোদনের কোনো সামগ্রী মানে রেডিও টেলিভিশন ছিলনা, তাই সন্ধ্যেয় খাওয়া-দাওয়ার পর একজন আরেকজনের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। গল্প-গুজব করতেন। এর ফলে পারিবারিক সৌহৃদ্য বৃদ্ধি পেত।
আজকাল যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিবেশী সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে গেছে। একই বাড়ি বা একই পাড়ায় বসবাস করেও অনেক মানুষ একে অপরের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব কম জানেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু প্রত্যক্ষ মানবিক যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে।
বিবাহ ও সামাজিক অনুষ্ঠান
তখন বিয়ে ছিল শুধু দুটি মানুষের সম্পর্ক নয়; দুটি পরিবারের এবং অনেক সময় দুটি আত্মীয়গোষ্ঠীর মিলন। বিয়ের সিদ্ধান্তে পরিবারের প্রবীণদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পাত্র-পাত্রীর পছন্দের ক্ষেত্রে পরিবারের সামাজিক অবস্থান, চরিত্র, বংশপরিচয় ও পারিবারিক অবস্থানও বিবেচনা করা হতো।
বিয়ের অনুষ্ঠান সাধারণত ছিল অপেক্ষাকৃত সাদামাটা। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরাই বিয়ের অধিকাংশ আয়োজন সামলাতেন। রান্নাবান্না থেকে অতিথি আপ্যায়ন—সবকিছুতেই সমাজের অংশগ্রহণ থাকত। আজকের মতো বিপুল ব্যয়, আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা কিংবা আনুষ্ঠানিকতার চাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বলা চলে ছিলই না। একেবারে সাদামাটা ছিলো বিয়ের অনুষ্ঠান। মুসলমানের মাঝে সিন্দূরের ব্যবহার নেই, কিন্তু কোনো কোনো অঞ্চলে সিন্দূর ছাড়া বিয়ে হতোনা। অবশ্যে বর্তমান এই প্রথা একেবারে বিলুপ্ত হয়েছে। নতুন জামাইর সাথে পরিচয় হওয়ার এক পরম্পরা প্রচলিত ছিলো। পারার ছেলেরা দলবেঁধে জামাই দেখতে আসতো। হাঁহি-তামসা স্ফূর্তির মাধ্যমে জামাই-এর সাথে ভাব বিনিময় করে পরিচয় হতো। একই ভাবে পারার মহিলা, বৌঝিরা দলবেঁধে নতুন বউ দেখতে আসতো। নতুন বৌয়ের সাথে ভাব বিনিময় করত।
তবে সেই সময়ের ব্যবস্থার সবকিছু ইতিবাচক ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হতো না এবং অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও ছিল অধিক। শিক্ষার প্রসার ও নারীর সামাজিক অবস্থানের উন্নতির ফলে এই পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে সম্প্রতি।
নারীর অবস্থান
ষাট-সত্তরের দশকের গ্রামীণ বঙ্গীয়মূলের মুসলমান পরিবারে নারীর প্রধান দায়িত্ব ছিল সংসার পরিচালনা, সন্তান প্রতিপালন এবং পরিবারের দেখাশোনা করা। অনেক নারী কৃষিকাজ, পশুপালন, ঘরের কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কাজেও যুক্ত ছিলেন, যদিও সেই শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হতো না।
মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। অনেক পরিবারে ছেলেদের পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, নারীদের তেমন দেওয়া হতো না। সেজন্য কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল।
বর্তমানে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বহুগুণ বেড়েছে। নারীরা শিক্ষকতা, চিকিৎসা, প্রশাসন, ব্যবসা, রাজনীতি, সাংবাদিকতা এবং বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। ফলে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও নারীর ভূমিকা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।
শিক্ষা
সেই সময় শিক্ষার সুযোগ আজকের তুলনায় সীমিত ছিল। গ্রামের অনেক পরিবারে মাধ্যমিক স্তরের পর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। অর্থাভাব, দূরত্ব এবং সামাজিক মানসিকতা ছিল এর অন্যতম কারণ ছিল। এদিকে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষানুষ্ঠানের সংখ্যা কম ছিল।
তবু শিক্ষাকে সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হতো। একজন শিক্ষিত ব্যক্তি পরিবার ও সমাজে বিশেষ মর্যাদা পেতেন। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতিও ছাত্রছাত্রীদের গভীর শ্রদ্ধা ছিল।
বর্তমানে বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কারণে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রও অনেক প্রসারিত হয়েছে। তবে এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা, পরীক্ষার চাপ এবং শিক্ষাকে চাকরির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করার প্রবণতাও বেড়েছে।
ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন
মসজিদ শুধু নামাজের স্থান ছিল না; সামাজিক যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জুমার নামাজ, ঈদ, রমজান, মিলাদ, ধর্মীয় আলোচনা ইত্যাদি উপলক্ষে মানুষ একত্রিত হতেন। ধর্মীয় উৎসব ছিল সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতাৰ মাধ্যম। মাঝে মাঝে ধর্মসভা অনুষ্ঠিত করে মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা করা হতো।
ঈদের সময় নতুন পোশাক, সেমাই-পিঠা, আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া এবং ছোটদের সালামি দেওয়া ছিল আনন্দের অংশ। সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন।
আজও ধর্মীয় উৎসবের গুরুত্ব অটুট রয়েছে, কিন্তু উৎসবের ধরন বদলেছে। যোগাযোগ ও পরিবহন সহজ হওয়ায় দূরের আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা সহজ হয়েছে; পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভেচ্ছা বিনিময়ের নতুন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
পোশাক ও জীবনযাত্রা
ষাট-সত্তরের দশকে পুরুষদের মধ্যে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ধুতি বা সাধারণ পায়জামা-পাঞ্জাবি, তিন পকেটের শার্টের ব্যবহার প্রচলিত ছিলো। নারীরা শাড়ি পরতেন এবং পোশাকে সরলতা ছিলো। উৎসবের পোশাক সাধারণত বিশেষ যত্নে সংরক্ষণ করা হতো। নারীরা বাড়িতে বলতে গেলে ব্লাউজ ব্যবহার করতেনই না। কোনো আত্মীয় বাড়ি বা অনুষ্ঠানে গেলে তখন ব্লাউজ পরতেন।ছোট ছোট মেয়েরা এক ধরণের হাফপ্যান্ট পরত।কোনো কোনো অঞ্চলে গাগরা পরত। এখনকার মতো তখন চাদর বা সোয়েটার পরতেন না গরিব ঘরের নারীরা। শীতের দিনে পিন্ধনের কাপড় ভাঁজ করে চাদরের মতো করে শীত নিবারণের জন্য পরতেন।পুরুষদের কেউ কেউ চাদর ব্যবহার করতেন, কেউ কেউ আবার লুঙি ভাজ করে পরতেন শীত নিবারণের জন্য।
গয়নার মধ্যে ছিলো তারাখুঁটি, কোমরের বিছা, পায়েল, সিঁথিপাটি, গলার রূপার হার, কানের দুল, নাকের তারা বা এছ প্রভৃতি। বিছাগুলি দুই তিন ভরি ওজনের থাকত। নাকের তারা বা এছ-এর বাইরে সবই রূপার তৈরি থাকত। গলার সোনার হারের প্রচলন ছিলইনা বলা যায় তখন।
গৃহস্থালির জীবনও ছিল অনেক বেশি শ্রমনির্ভর। রান্না হতো কাঠ, খড় বা অন্যান্য জ্বালানি দিয়ে; অনেক বাড়িতে পানির জন্য কূপ, পুকুর বা দূরের উৎসের ওপর নির্ভর করতে হতো। ধান বানার জন্য ছিলো ঢেকি এবং মরিচ, মসলা বাটার জন্য ছিলো পাটা পুতা। বিদ্যুৎ ও আধুনিক গৃহস্থালির যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা খুবই পরিশ্রমসাপেক্ষ ছিলো।
বর্তমানে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ফ্রিজ, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ভোগবাদী মানসিকতা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
জীবিকা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
সেই সময় বঙ্গীয়মূলের মুসলমান সমাজের বড় অংশই কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, মৎস্য শিকার, দিনমজুরি বা বিভিন্ন স্থানীয় পেশার ওপর নির্ভরশীল ছিল। অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে রাখাল থাকত। তখন রাখালের মায়না ছিলো মাসিক পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকার মধ্যে। কামলার দিন মজুরি ছিল ১.৫০ টাকা থেকে ২.৫০ টাকা। এখন সেসব কথা ভাবলেও অবাক লাগে।
কৃষক পরিবারে ফসল ভালো হলে গোটা পরিবারের মুখে হাসি ফুটত; ফসল নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ত পুরো সামাজিক জীবনে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের পাশে আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা অনেক সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন।
বর্তমানে কৃষির পাশাপাশি চাকরি, ব্যবসা, পরিবহন, নির্মাণ, বিদেশে কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন আধুনিক পেশা অর্থনীতির অংশ হয়েছে। অর্থনৈতিক সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত আর্থিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে।
সামাজিক শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ
সেই সময় সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, অতিথির প্রতি সম্মান, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব এবং সামাজিক রীতিনীতির প্রতি প্রবল আনুগত্য ছিলো। কারও আচরণ সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হলে পরিবার ও সমাজের প্রবীণরা তাকে শাসন করতেন বা পরামর্শ দিতেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি সেই আদেশ বা পরামর্শ নির্বিবাদে মেনে নিতেন। এই ব্যবস্থার ফলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী ছিল। তবে এর নেতিবাচক দিকও ছিল—ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত ছিল এবং প্রচলিত সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে তখন কথা বলা সহজ ছিল না।
আজ ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তিগত পছন্দ ও মানবাধিকারের ধারণা অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এর ফলে পারিবারিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল হয়েছে। পুরোনো দিনের সামাজিক সংহতির জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা প্রচলন হয়েছে।
যোগাযোগ ও বিনোদন
ষাট-সত্তরের দশকে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত ছিল। চিঠি, পোস্টকার্ড, ডাকঘর অথবা সরাসরি সাক্ষাৎই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কারও মৃত্যু হলে শারীরিকভাবে তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করেই মৃত্যুর খবর জানানো সম্ভব হতো। ফলে দূরের আত্মীয়রা মৃত্যুর সংবাদ অনেক দেরিতে পেতেন। কখনও কখনও এক-দুই মাস পরেও তাঁরা সেই খবর পেতেন। রেডিও ছিল তখনকার অন্যতম প্রধান বিনোদন ও সংবাদমাধ্যম। গ্রামের কোনও একটি বাড়িতে রেডিও থাকলে আশপাশের বহু মানুষ সেখানে একত্রিত হয়ে খবর, গান কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন।
আজ মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হয়েছে, কিন্তু মানুষের মুখোমুখি বসে গল্প করার সংস্কৃতি অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
সামগ্রিক তুলনা
ষাট-সত্তরের দশকের বঙ্গীয়মূলের মুসলমান সমাজ ছিল সম্পর্কনির্ভর সমাজ; বর্তমান সমাজ ক্রমশ প্রযুক্তি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজে পরিণত হয়েছে। তখন মানুষের আর্থিক সামর্থ্য কম হলেও পারস্পরিক নির্ভরতা ছিল বেশি। এখন আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুযোগ অনেক বেশি, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বেড়েছে।
তখন একটি পরিবারের সুখে-দুঃখে পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতেন। আজ একই দায়িত্ব অনেক সময় প্রতিষ্ঠান, বাজার, পেশাদার সেবা বা ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
তবে অতীতকে কেবল আদর্শ এবং বর্তমানকে কেবল অবক্ষয় হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। অতীতের সমাজে যেমন আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও পারিবারিক বন্ধন ছিল, তেমনি ছিল শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, নারীর অসম অধিকার, অল্প বয়সে বিয়ে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ঘাটতি। বর্তমান সমাজে যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিস্তার ঘটেছে, তেমনি কোথাও কোথাও আবার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক দূরত্বও বেড়েছে।
উপসংহার
ষাট ও সত্তরের দশকের বঙ্গীয়মূলের মুসলমান সমাজকে স্মরণ করলে তাই শুধু পুরোনো দিনের নস্টালজিয়া নয়, একটি পরিবর্তনশীল সমাজের ইতিহাসও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখনকার সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক—আত্মীয়তা, প্রতিবেশিত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। আধুনিক সমাজ আমাদের শিক্ষা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও বৃহত্তর সুযোগ এনে দিয়েছে, কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।
হয়তো অতীতের সরলতা হুবহু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়; কিন্তু অতীতের মানবিকতা ও সামাজিক বন্ধনের সঙ্গে বর্তমানের শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নারী-পুরুষের সমতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সমন্বয় ঘটানো নিশ্চয় সম্ভব। তাহলেই পরিবর্তনের মধ্যেও একটি মানবিক ও সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
