
শহীদ কারবালা (যাত্ৰাপালা)
আগকথা
৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর এবং হিজরি মহরম মাসের ১০ তারিখে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে একটি মর্মন্তুদ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো। এই ঘটনাটি ইসলামী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, বিশেষ করে শিয়া মুসলমানদের জন্য, কারণ এটি নবী মুহাম্মদ(সাঃ)এর নাতি হুসাইন ইবনে আলীর শাহাদাতকে চিহ্নিত করে। যুদ্ধটি উমাইয়া খলিফা প্রথম ইয়াজিদের সেনাবাহিনী এবং হুসাইনের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি ছোট দলের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। এই ঘটনার প্রভাব ধর্মীয় রীতিনীতি এবং বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে চলেছে।
কারবালার এই ঘটনার আধারে মীর মোশারফ হোসেইন রচিত বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসটি বাঙলা ভাষী মুসলমানের মাঝে বহুল প্রচলিত একটি গ্রন্থ। এই গ্রন্থর আধারে রচিত শহীদ কারবালা যাত্রাপালা মুসলমান সমাজে খুবই সমাদৃত যাত্রাপালা। ছেলেবেলা অর্থাৎ প্রায় ষাট পঁয়ষষ্টি বছর পূর্বে থেকে এই শহীদ কারবালা যাত্রাপালার সাথে আমি পরিচিত। তখন এই যাত্রাপালার প্রকৃত নাম কি ছিলো জানিনা। তবে পূর্বে এই যাত্রাপালার প্রচলিত নাম ছিলো ইমাম যাত্রা বা দাস্তান-এ-কারবালা। পরবর্তীতে শহীদ কারবালা অথবা মহরম পর্ব নামেও কোনো কোনো জায়গায় যাত্রাপালাটির নামকরণ করা হয়েছে। প্রচলিত শহীদ কারবালা যাত্রাপালার আধারে মূল ঘটনা পরিবর্তন না করে শুধু ভাষার ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন করে শহীদ কারবালা যাত্রাপালাটি আমি সম্পাদনা করে মহরম পর্ব পর্যন্ত প্রকাশ করলাম। লোকের সমাদর পেলে পরর্বতীতে উদ্ধার পর্ব যাত্রাপালাটিও সম্পদনা করে প্রকাশ করার চেষ্টা করব। মূল হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিটি জনীয়ার ছবুর উদ্দিন-এর কাছ থেকে আমি সংগ্রহ করেছি। সেজন্য তাঁর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ রইলাম। যাত্রাপালাটি লোকের সমাদর পেলে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে। সম্পাদিত যাত্রাপালাটিতে রয়ে যাওয়া ভুলত্রুটির জন্য আমি পাঠকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। যাত্রাপালাটি সদাশয় যাত্রাপ্রেমীরা মঞ্চস্থ করলে আমি কৃতার্থ হব।
বিনত- আবুল হুছেইন,
সাং-যতিগাওঁ-
পোঃ- জাহোরপাম, বরপেটা, আসাম।
মোবাইল নং- ৭০০২১-১২০১২
(বিঃদ্রঃ- শহীদ কারবালা যাত্রাপালাটি ঐতিহাসিক ঘটনা চিহ্নিত করে না।)
* * *
প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য
-মদিনার পথ-
(শিকারী বেশে এজিদ ও অলিদের প্রবেশ ও শিকার সন্ধান করতে করতে প্রস্থান)
(কিছু পরে কলসী কাঁখে জয়নবের প্রবেশ। জয়নব ওজু করার পর গোসল সমাপ্ত করে কলসী ভরে প্রস্থান ও সঙ্গে সঙ্গে এজিদ ও অলিদের প্রবেশ।)
এজিদ-কত বন জংঘল তন্ন তন্ন করে সন্ধান করলাম, কিন্তু কোথাও একটি শিকারের সন্ধান পেলাম না। এখন আমরা কোথায় এসেছি বলতে পার, সেনাপতি অলিদ?
অলিদ-এখন আমরা মদিনায় আছি, শাহজাদা। (জয়নবকে দেখিয়া)ঐ দেখুন, শাহজাদা!
এজিদ- (জয়নবকে দেখে)একি! মূর্তিমতি উষা যেন দিল দেখা উদয় আঁচলে, চন্দন চর্চিত ভালে রক্ত পতাম্ভরে, ললিত ঝংকার তুলি চরণ মঞ্জিরে, কে, কে ঐ সদ্যস্নাতা লাবণ্যময়ী রমণী? দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেল। বলতে পার সেনাপতি কে ঐ রমণী?
অলিদ- না, আমি জানিনা ঐ রমনীর সন্ধান।
এজিদ- বলতে পার রমণীটি যে বাড়িতে প্রবেশ করল ঐ বাড়িটি কার?
অলিদ- ঐ বাড়ীর মালিক আব্দুল জব্বার, শাহজাদা।
এজিদ- আব্দুল জব্বার- আব্দুল জাব্বার! যাও সেনাপতি, খবর কর ঐ রমণী কার ঘরণী। কি নাম তার, যেমুন করেই হোক অংকশায়িনী করব আমার।
অলিদ- জাহাঁপনা যদি বাধা প্রদান করেন তো, কী করবেন আপনি?
এজিদ– বৃদ্ধ পিতা মাবিয়াকে বন্দী করে নিক্ষেপ করে কারাগারে লভিব সিংহাসন। তারপর, তারপর ছলেবলে কৌশলে ধ্যানের প্রতিমারে করব দামেস্কের পাটরাণী।
অলিদ- একি বলছেন, শাহজাদা! আপনার পিতাকে বন্দী করবেন?
এজিদ- তুমি একটি মূর্খ, যাও ত্বরা, সন্ধান কর রমনীর।
অলিদ-যথা আজ্ঞা, শাহজাদা। (প্রস্থান)
এজিদ- নয়নে লেগেছে ধাঁধাঁ, আহা মরি মরি, কি সুন্দর রূপ, দেখি নাই কভু। যেন স্বর্গের হুরী। কীভাবে পাব আমি ঐ ধ্যানের প্রতিমা!দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেল। যাই দেখি সেনাপতি কি সংবাদ সংগ্রহ করল।(প্রস্থানোদ্যত)
অলিদের প্রবেশ
এজিদ- কি সংবাদ, সেনাপতি?
অলিদ- শাহজাদা, যে রমণীকে দেখে আপনি পাগল হয়েছেন, তিনি আব্দুল জব্বারের স্ত্রী জয়নব ।
এজিদ- জয়নব-জয়নব-জয়নব!
অলিদ- এখন চলুন শাহজাদা।
এজিদ- তবে তাই চল। জয়নব-জয়নব-জয়নব!
(উভযের প্ৰস্থান)
* * *
প্রথম অঙ্ক দ্বিতীয় দৃশ্য
-রং মহল-
(এজিদ, মারোয়ান ও অলিদের প্রবেশ)
এজিদ- শোন মন্ত্রী, শোন সেনাপতি। কৌশলে আমি আমার কার্য সিদ্ধির পথে অনেক দূর এগিয়েছি। গতকাল আব্দুল জব্বারের নিকট আমার ভগ্নীকে বিবাহ দিব বলে পত্র লিখে পাঠিয়েছিলুম। আমার ভগ্নীকে বিবাহ করার আশায় আব্দুল জব্বার তাঁর স্ত্রী জয়নবকে তালাক দিয়েছে। কিন্তু শেষে সে আমার ভগ্নীকে পেল না। শেষে কি হলো শোনবে?
অলিদ- কি হলো শাহজাদা?
এজিদ- আব্দুল জব্বার এখন পাগল হয়ে গেছে। হাঃ- হাঃ-হাঃ-
মারোয়ান- এত বুদ্ধি আপনার, শাহজাদা?
অলিদ-আব্দুল জব্বার কিছুই বলল না,শাহজাদা?
এজিদ– বলবার সুযোগই সে পায়নি । ঐ শোন- হাঃ হাঃ হাঃ-
নেপথ্যে আব্দুল জব্বারের গীত-
ধ্যানের প্রতিমা দিয়েছি ভাসিয়ে
অগাধ সিন্ধু নীরে-২
এখনও যে তার বাজে রাগিণী
আমার হিয়ার তিমিরে ।-২
আমি ধ্যানের প্রতিমা দিয়েছি ভাসিয়ে
অগাধ সিন্ধু নীরে।
এজিদ- ঐ শোন, আব্দুল জব্বার পাগলের ন্যায় গান গেয়ে বন জংঘলে ঘূরে বেরাচ্ছে ।
আব্দুল জব্বার পূর্ব গীতাংশ-
আমি ভুলিবারে চাই
পারিনা ভুলিতে
ঝরে শুধু আঁখিবারি
আর কি তোমায়, পাব ফিরিয়ে
আমার হৃদয় রাণীরে।। (গীত অন্ত)
মারোয়ান- শাহজাদা, আপনার বুদ্ধির প্রশংসা না পারছি না।
এজিদ- যাও মন্ত্রীবর, পিতাকে বলে এক সপ্তাহের মধ্যে আমার মনস্কামনা পূর্ণ করবে। কার্য সিদ্ধি করতে পারলে আমি তোমাদের যথেচ্ছ পুরস্কারে পুরস্কৃত করব।
মারোয়ন- আমি চেষ্টার ত্রুটি করব না, শাহজাদা। এখন চলুন শাহজাদা, আমরা বিশ্রামাগারে চলে যাই। শাহজাদার জয় হোক- শাহজাদার জয় হোক।
(সকলের প্রস্থান)
* * *
প্রথম অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য
মাবিয়ার প্রাসাদ
(মাবিয়া ও উকিলের প্রবেশ)
উকিল- আমাকে কেন তলব করেছেন, জাহাঁপনা?
মাবিয়া– শোন উকিল সাহেব! তুমি এখনই মদিনায় জয়নব আলয়ে যাত্রা কর। মদিনায় গিয়ে শাহজাদা এজিদের শুভবিবাহ বার্তা বিবি জয়নবকে জানাও।এবং যেকোনো প্রকারেই হোক তাঁকে রাজি করিয়ে শাহজাদার মনস্কামনা পূর্ণ কর। কার্য শেষে তুমি পাঁচশত স্বর্ণমূদ্রা বকশিশ পাবে।
উকিল- আমি অবশ্যেই শাহজাদা এজিদের মনস্কামনা পূর্ণ করব, জাহাঁপনা।
মাবিয়া- শোনে সুখী হলাম, উকিল সাহেব। শোনে সুখী হলাম।
উকিল- তবে এখন আমি যাই, যাত্রার আয়োজন করিগে’। বন্দেগী জাহাঁপনা। (প্রস্থান)
মাবিয়া- যাক, এখন আমি নিশ্চিন্ত হলাম। শাহজাদার বিবাহ কার্য সম্পন্ন করতে পারলে আমি অত্যন্ত সুখী হব।
(প্রস্থান)
* * *
প্রথম অঙ্ক চতুর্থ দৃশ্য
মদিনার পথ
(উকিলের প্রবেশ)
উকিল- একশ, দুশ, তিনশ, চারশ, পাঁচশত স্বর্ণমূদ্রা বকশিশ দেবে শাহজাদা এজিদ । বাপরে বাপ, পাঁচশত স্বর্ণমূদ্রা। কাজ হাসিল করতে পারলেই পাঁচশত স্বর্ণমূদ্রা পুরস্কার পাব। আমি ঘটক। বিবাহের উকালতি করাই আমার কাজ। কিন্তু কোনোদিন শুনি নাই একটি বিবাহ কার্যে পাঁচশথ স্বর্ণমূদ্রা বকিশশ দেয। আমি এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ ফতে করে পাঁচশত স্বর্ণমূদ্রা একটি একটি করে গোনে পকেটস্থ করব। হাঃ হাঃ হাঃ
(শিকারী বেশে আক্কাসের প্রবেশ)
আক্কাস- জ্বনাব। এতো প্রফুল্লচিত্তে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
উকিল- আমার কথা কি অজানা আছে, জ্বনাব। আমার ব্যবসা পূর্বেও যা ছিলো, এখনও তাই আছে।
আক্কাস- তাহলে জ্বনাব, আপনি শুভ কাজের জন্য যাচ্ছেন?
উকিল- হ্যাঁ, শুভ কাজের জন্যই যাচ্ছি।
আক্কাস- কি সেই শুভ কাজ?
উকিল- আমি যাচ্ছি শাহজাদা এজিদের শুভ বিবাহের পয়গাম নিয়ে জয়নব আলয়ে। শাহজাদা এজিদ জয়নবের জন্য একেবারে পাগল হয়ে গেছেন। আমি এখন যাই। রাস্তায় অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখনও আমাকে অনেক দূর যেতে হবে।
আক্কাস- দাঁড়ান জ্বনাব। আমার একটি কথা শুনুন।
উকিল- আচ্ছা, কী বলবেন শীঘ্র করে বলুন।
আক্কাস- যদি কৃপা করে আমার পয়গামও বিবি জয়নবের নিকট পেশ করেন, তাহলে আমি খুবই বাধিত হব।
উকিল- অবশ্যে, অবশ্যেই আমি আপনার পয়গামের কথাও বিবি জয়নবের নিকট পেশ করব।
আক্কাস- শোনে সুখী হলাম, জ্বনাব- শোনে সুখী হলাম। আচ্ছা এখন আমি যাই, পরে আপনার সঙ্গে দেখা হবে-
(প্রস্থান)
উকিল- আচ্ছা যান। এতো দেখছি, এক ঢিলে দু’টি পাখী মারার মতো কথা। হ্যাঁ, ঢিল আমি দু’টিই দিব, তবে যে ঢিলে পাখী মরে আর কি! পার্বত্য পথে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের তলায় একেবারে ফোস্কা পড়ে গেছে। এখন এই শিলাতলে বসে একটু জিরিয়ে নিই। তারপর আবার যাত্রা শুরু করব। (বসতে উদ্যত)
(শিকারী বেশে হাসানের প্রবেশ)
হাসান-(উকিলকে দেখে) উকিল সাহেব, অনেক দিন পর আপনাকে দেখে পরম আনন্দিত হলাম। আপনি এতো সেজেগোজে কোথায় যাচ্ছেন, জ্বনাব?
উকিল- হুজুর মেহেরবান। সে কথা আর কি বলব! আমি শাহজাদা এজিদের বিয়ের পয়গাম নিয়ে জয়নব আলয়ে যাচ্ছি।
হাসান- তাহলে আমারও একটি কথা শুনুন।
উকিল– শীঘ্র করে বলুন, কি বলবেন। পথে আসতে অনেক বিলম্ব হয়েছে। তাই যা বলবার শীঘ্র করে বলে ফেলুন।
হাসান- এতো ব্যস্ত কেন? কোথায় এতো বিলম্ব হলো, জ্বনাব?
উকিল- পথে আসতে ধনকুবের আক্কাস ভাইয়ের সাথে দেখা। কথা-বার্তার পর তিনিও তাঁর শুভ বিবাহের পয়গাম বিবি জয়নবের নিকট পেশ করতে বললেন। বর্তমান আমি উভয়ের শুভ বিবাহের পয়গাম নিয়ে জয়নব আলয়ে যাচ্ছি। আপনার যদি কোনো কথা বলবার থাকে, তাহলে শীঘ্র বলে ফেলুন।
হাসান- বলবার মতো তেমন কিছু নেই। প্রথমত মাবিয়া পুত্র এজিদ, দ্বিতীয়ত ধন কুবের আক্কাস, উভয়ের পয়গাম নিয়ে জয়নব আলয়ে যাচ্ছেন। দয়া করে যদি এই গরীবের কথাটাও বিবি জয়নবের নিকট পেশ করেন, তাহলে আমি বাধিত হব। বিবি জয়নব যাকে স্বামীত্বে বরণ করবেন, করুক, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আশা করি আমার কথাটা বিবি জয়নবের নিকট পেশ করতে ভুলে যাবেন না। আমি এখন আসি, জ্বনাব –
(প্রস্থান)
উকিল- অবশ্যে, অবশ্যে আমি আপনার শুভ সংবাদও বিবি জয়নবকে বলব, হজরত। তবে এখন আমি কি করি? একটি পয়গাম নিয়ে আসতে তিন তিনটি পয়গাম পেলাম। এখন কার পয়গাম আগে পেশ করব! অবশ্যে আক্কাসের পয়গামটা না দিলেও হবে। কিন্তু বাকী দুটি পয়গাম দিতেই হবে। না দিলে উপায় নেই। যদি ইমামের পয়গাম পেশ না করে এজিদের পয়গাম পেশ করি, তাহলে পরকালে জাহান্নামী হতে হবে। আর যদি এজিদের পয়গাম পেশ না করে ইমামের পয়গাম পেশ না করি তাহলে বাদশাহ আমার সবংশ ধ্বংস করবে। এবং সঙ্গে পাঁচশত স্বর্ণ মূদ্রা হতেও বঞ্চিত হতে হবে। হে পরম দয়ালু খোদা, তুমি যা ভালো বুঝ তাই করাও প্রভু- তাই করাও। শাহজাদা এজিদের কাজ সম্পন্ন করতে পারলে পাঁচশত স্বর্ণ মূদ্রা বকশিশ পাব। কিন্তু ইমাম সাহেব আমাকে কাণাকড়িও দিবেন না। যাই দেখি, কি করা যায়! তিনজনের পয়গামই আমি পেশ করব। বিবি জয়নব যাকে গ্রহণ করে করবেন। তাতে নিশ্চয় কারও আপত্তি থাকবে না।
(প্রস্থান)
* * *
প্রথম অঙ্ক পঞ্চম দৃশ্য
জয়নব আলয়
(রাত্রি প্রভাত। জয়নব নিদ্রিত অবস্থায়। স্বপ্ন দেখে জাগ্রত হইয়া)
জয়নব- হায়রে হতভাগ্য জীবন আামার। উঃ!খোদা। একি তোমার বিচার খোদা! হায়রে দুষ্ট এজিদ, তুই ছলনা করে আমার স্বামীকে লোভ দেখায়ে এবং কু-পরামর্শ দিয়ে আমাকে লাভ করার আশায় যতই ফন্দি করিস না কেন, তুই যা ভেবেছিস তা কখনও হবে না- কখনও না।
(আপন মনে কথা বলতে বলতে উকিলের প্রবেশ)
উকিল- ওগো জয়নব বিবি! আমি দামেস্কের শাহজাদা এজিদের বিবাহের পয়গাম নিয়ে আপনার নিকট এসেছি। দামেস্কের বাদশাহ মাবিয়া পুত্র শাহজাদা এজিদ আপনাকে নিকাহ করার উদ্দেশ্যে আমাকে উকিল নিযুক্ত করে পাঠিয়েছেন। আপনি শাহজাদা এজিদের প্রস্তাবে রাজি হওয়া উচিত। কারণ তাঁকে স্বামীত্বে বরণ করলে আপনি বেগম হতে পারবেন বিবি সাহেবান- বেগম হতে পারবেন।
জয়নব-আপনার সব কথাই অবগত হলাম। দেখুন বড় বড় বাদশাহগণ বড়ই আত্যাচারী। সাদ্দাদ, নমরূদ, কারূন ও ফেরাউন এরা মানুষের কত অন্যায় অত্যাচার করেছেন। তা সকলই আপনার জানা আছে। তাঁরা স্বয়ং খোদাই দাবী করতেও কুণ্ঠিত হোননি।তাঁদের অবস্থা কি হয়েছিলো তাতো আপনি জানেন!আমি এই দুনীয়ার বাদশাহের বেগম হতে চাই না, উকিল সাহেব।
উকিল-আপনার কথা শোনে আমি ধন্য হলাম। দ্বিতীয় প্রণয়প্রার্থী হলো, ধন কুবের আক্কাস। তিনি খুবই রূপবান ও ধনবান। তাঁকে স্বামীত্বে বরণ করলে আপনি দুনীয়ার সব রকম সুখে সুখী হতে পারবেন। তবে বিবি সাহেবান, আপনি শাহজাদা এজিদের প্রস্তাবে রাজি হলেই উত্তম হবে।
জয়নব- উকিল সাহেব, আমি এই দুনীয়ার সুখ শান্তি চাইনা। এই দুনীয়ার রূপ যৌবন, ধনরত্ন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। যে ধনে আমি রোজ কিয়ামতে ভীষণ সংকটে উদ্ধার হতে পারব, আমি সেই মহামূল্য ধনের জন্য ব্যস্ত। দুষ্ট এজিদের কথা বারবার আমার সন্মুখে প্রকাশ করবেন না। যে দাসীপুত্র পাপিষ্ঠ ছলনা করে আমার স্বামীকে কু-পরামর্শ এবং লোভ দেখাইয়ে আমাকে পরিত্যাগ করাইয়াছে, সে কথা মনে উদয় হলে আমার প্রাণ ব্যথায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। সেই দুষ্ট পাপিষ্ঠের প্রতি আমি রাজ্যলোভে, ধনলোভে কখনও রাজি হব না- আমার জীবন থাকতে না। উকিল সাহেব, আপনি এখন আসতে পারেন।
উকিল-(স্বগত) এখন দেখছি আমার দুনীয়ার সব আশা ভরসা পণ্ড হয়ে গেল।আমি যে ডালই ধরি সেই ডালই ভেঙ্গে পরে। বিবি সাহেবান কোনোমতেই এজিদের পয়গাম গ্রহণ করবেন না।এখন দেখি ইমাম হাসানের প্রস্তাব গ্রহণ করেন কি-না! পরকালের সম্বলও তো কিছু চাই।(প্রকাশ্যে) বিবি সাহেবান, ভব সাগরের কাণ্ডারী হজরত ইমাম হাসানও আপনার প্রণয়প্রার্থী। আপনি তাহলে হজরত ইমাম হাসানের প্রস্তাবে রাজি হোন।
জয়নব-(চমকিয়া উঠে) উকিল সাহেব, এমন সৌভাগ্য কি আমার হবে! হজরত ইমাম সাহেব কি এই দুঃখিনীর ওপড় সদয় হবেন? যে ইমাম সাহেব দিন দুনীয়ার সর্দার, যার নানা দিনের পয়গম্বর, ভব পারের কাণ্ডারী। যার উম্মতগণ গোনাহ হতে উদ্ধার হয়ে বেহেস্তে গমন করবেন, সেই মহাত্মা হাসান কি আমায় দাসীরূপে গ্রহণ করবেন? এ কথা যে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, উকিল সাহেব।
উকিল- অবিশ্বাস করবার কিছুই নাই, বিবি সাহেবান- অবিশ্বাস করবার কিছুই নাই। এ কথা মিথ্যা বা প্রবঞ্চনা নয়। যদি দয়া করে আপনি-
জয়নব- উকিল সাহেব, আমার জীবন যৌবন সকলই ইমাম হাসান সাহেবের নিকট সমর্পণ করলাম। আমি তাঁর নামে কোরবানী হতেও প্রস্তুত, উকিল সাহেব- আমি তাঁর নামে কোরবানী হতেও প্রস্তুত।
আহা কি মধুর কথা আজ শুনিলাম কর্ণে!
দাসী করিবে মোরে ইমাম হাসানে
কতদিনে খোদা তায়ালা হবে দয়াবান
কোন পূণ্যফলে স্বামী হইবে হাসান
ইহা আমার প্রাণে না হয় বিশ্বাস
তন্দ্ৰার ঘোরে যেন কেহ বলে যায়
তাহাই ধারণা এখন হলো আমার
জয়নব হবে বিবি ইমাম শাহার।।
উকিল- বিবি সাহেবান, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমি আজই ইমাম সাহেবকে আনতে মদিনায় যাব।
জয়নব- তাহলে এখন আমি আসি উকিল সাহেব।
(প্রস্থান)
উকিল- সতী রমনী জয়নব এ ভূবনে
ধর্ম পরায়ণা সতী ধর্ম সদা মনে
না চাহিল হতে সে পাট মহারাণী
না চাহিল ধন মান ধন্যা সে রমণী।
এ নব বয়সে বিবি খোদাকে চিনিল
দুনীয়ার সুখ ভোগ সকলই ত্যাগিল।
ভীষণ সংকটে বিবি উদ্ধারের আশায়
পতি ভজিবারে চাহে ইমাম শাহায়
ধন্য ধন্য জয়নব বিবি ধন্য এ সংসারে
তোমার ধর্মের যশ রহিবে সংসারে।।
(প্রস্থান)
* * *
প্রথম অঙ্ক ষষ্ঠ দৃশ্য
-হাসান আলয়-
(হাসানের প্রবেশ)
হাসান- একি! হঠাৎ আমার মাতৃ অভিশাপের কথা মনে পড়ল কেন? আমার মন বলছে, আজ হতে আমার মাতৃ অভিশাপ ফলবতী হওয়ার দিন শুরু হলো।
উকিল- বন্দেগী হজরত।
হাসান- কে, ও উকিল সাহেব। বলুন, খবর কি?
উকিল- খবর ভালো, হজরত।
হাসান- কি রকম ভালো? জয়নব বিবি কি আমার পয়গাম গ্রহণ করেছেন?
উকিল- শুধু গ্রহণই করেন নি। আমি দিন তারিখ সবই একেবারে ঠিক করে এসেছি। আপনি শুধু আমার সাথে জয়নব আলয়ে যেতে হবে। আমি কয়েকদিনের মধ্যে আপনাদের বিবাহ কার্য সমাধা করব। জয়নব বিবি আপনার পথ চেয়ে বসে আছেন।
হাসান- উত্তম। তাহলে চলুন উকিল সাহেব, আজই আমরা বিবাহের আয়োজন করিগে’।
(উভয়ের প্রস্থান)
* * *
প্রথম দৃশ্য সপ্তম দৃশ্য
বিবাহ বাসর
(জয়নবের প্রবেশ)
জয়নব- যত দিন যায়, ততই আশা তৃষ্ণা বৃদ্ধি হয়, কিন্তু হায়, কতদিনে আশা পূর্ণ হবে মোর। দিবস রজনী অন্তরে ধ্বনিত হয়, ইমাম পত্নী হবে জয়নব। মিথ্যা- মিথ্যা- মিথ্য! সবই মিথ্যা কল্প কাহিনী। মিথ্যা সেই উকিলের বাণী।ইমাম সেবায় নিযুক্ত নাহি হবে জয়নব কখনও। বিবাহিতা স্বামী যার না হলো আপন, সেই নারীর জীবনের স্বার্থকতাই বা কি! তাঁকে ভূঞ্জিতে হয় চিরদিন সংসারের অশেষ যন্ত্রণা।
(হাসান ও উকিলের প্রবেশ)
উকিল- আপনার আর যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে না, বিবি সাহেবান।আমি আপনার মাশুক হজরত ইমাম হাসানকে নিয়ে এসেছি। এখন আপনারা শুভবিবাহ কার্য সমাধা করুন। আসুন ইমাম সাহেব(হাসানের হাতে জয়নবের হাত সমর্পণ করে)বলুন, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
হাসান- বিসমিল্লাহি রহমানির রাহিম।
উকিল- (জয়নবের উদ্দেশ্যে) আপনিও বলুন বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
জয়নব- বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
উকিল– আজ হতে আপনারা স্বামী-স্ত্রী। শুভবিবাহ সম্পন্ন হলো। এখন আমার কর্তব্য কর্ম শেষ হলো। আমি এখন দামেস্কে যাত্রা করব। শাহজাদা এজিদ আমার আগমন অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে রয়েছেন। তাঁকে খবরটা দিতে হবে।
(প্রস্থান)
জয়নব– আজ হতে আমার মনের আশা পূর্ণ হলো। প্রিয়তম আমাকে আপনার দাসী হিসাবে গ্রহণ করুন। (জয়নব ইমাম সাহেবকে সালাম করল)
হাসান-(জয়নবকে তোলে ধরে) দাসী নয় প্রিয়া, আজহতে তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী। আর আমি তোমার অন্তরের-
জয়নব- আপনি আমার অন্তরের প্রদীপ।
গীতকণ্ঠে বিবেকের প্রবেশ
বিবেক-
নারী গণ্ডগোলের মূল-২
জয়নবেরে নিকাহ করে-২
চোখে দেখবি সরষের ফুল
নারী গণ্ডগোলের মূল।।
মাতৃ অভিশাপ ফলবে তোমার-২
মাতার হয়েছিলো ভুল।
শহীদে জহরে মরণ-২
হাসান হোসেনের লিখন
ফোরাতের পানী বন্ধ হবে-২
জয়নব হবে মূল
গণ্ডগোলের মূল।
নারী গণ্ডগোলের মূল।।
হাসান- (রাগান্বিত ভাবে) যাও- যাও, ইহা নহে বাতুলের আগার, শুনিতে চাহিনা তব উন্মাদের প্রলাপ। মাতার ইচ্ছা নয় যে ধ্বংস হোক পুত্রের জীবন প্রদীপ। তবু, তবু কেন সন্মুখে দেখতেছি ভীষণ সঙ্কট। দুর্দান্ত দুশমনের সহিত বাজিব মহারণ। হাসান ও হোসেন পুত্র তব হইবে মৃত্যুর কারণ। এসো, এসো প্রিয়ে, অদৃষ্টের লিখন মোর না হবে খণ্ডন।
(জয়নবের হাতে ধরে প্রস্থান)
* * *
প্ৰথম অঙ্ক অষ্টম দৃশ্য
এজিদের প্রাসাদ
(চিন্তামগ্ন এজিদের প্রবেশ)
এজিদ- জয়নব! জয়নব!! জয়নব!!! যেদিকে নিহারি সেদিকেই জয়নব। জয়নব বিহীন মম ওষ্ঠগত প্রাণ। আমি লালায়িত জয়নবের তরে, আমি চাই শুধু জয়নব। ঐ-ঐতো মোর প্রাণ প্রিয়া জয়নব। (ধরতে উদ্যত) কেন, কেন প্রিয়ে, ধরা নাহি দাও মোরে? বসাব তোমায় আমার হৃদয় সিংহাসনে। ঐ, ঐতো মোর প্রাণ প্রিয়া জয়নব। (ধরতে উদ্যত) এসো, এসো প্রিয়ে, অভিমান নাহি কর আর, তাপিত প্রাণ মোর শীতল কর স্পর্শে তোমার। আমি যে তোমার- শুধুই তোমার।
(উকিলের প্রবেশ)
এজিদ- শীঘ্র এসো প্রিয়ে, আমার দগ্ধ প্রাণ শীতল কর। কি, ধরা নাহি দিবে মোরে, তাহলে জোর করে করায়ত্ব করিব তোমারে– (উকিলকে জড়াইয়া ধরল। উকিল পালাতে চেষ্টা করতে লাগিল) হাঃ- হাঃ-হাঃ, আর কোথায় পালাবে? শোন, শোন প্রিয়ে, আমার একটি কথা শোন। আমার তাপিত প্রাণ শীতল কর প্রিয়ে।
উকিল- আমি জয়নব নই, শাহজাদা। আমি, আমি উকিল। আমায় ছেড়ে দিন, শাহজাদা।
এজিদ- না না. ছাড়িব না, কভূ, বল, বল প্রিয়ে, তুমি আমার হবে?
উকিল- দোহাই শাহজাদা, আমি আপনার প্রিয় নই, শাহজাদা। আমি উকিল।
এজিদ- এ্যাঁ, একি, উকিল সাহেব!(উকিলকে ছেড়ে দিয়ে) আমার প্রাণপ্রিয়ে জয়নবকে নিয়ে এসেছেন তো? নিরুত্তর কেন? বলুন, আমার প্রাণ প্রিয়ে জয়নবকে নিয়ে এসেছেন তো?
উকিল- কি বলব, শাহজাদা। বলতে আমার কষ্ট হচ্ছে। জয়নব বিবি আপনার পয়গাম প্রত্যাখান করেছেন। আপনার পয়গাম পাওয়া মাত্র তিনি বললেন, এজিদ ঠগ, এজিদ প্রবঞ্চক, প্রবঞ্চক এজিদকে আমি বিবাহ করব না।
এজিদ- কি, কি বললে! তার এতো সাহস!
উকিল- জয়নব বিবি ইমাম হাসানকে স্বামীত্বে বরণ করেছেন।
এজিদ- কি, এতো দুঃসাহস সেই ভিক্ষুক পুত্র হাসানের! আমাকে অবজ্ঞা? আমি এই অহমিকার পূর্ণ প্রতিশোধ নেব। আমি দেখিয়ে দেব এজিদকে অবজ্ঞা করার ফল। দোষ শুধু হাসানের নয় উকিল সাহেব, দোষ তোমারও আছে।
উকিল-( কম্পিত স্বরে) না না, শাহজাদা। আমার কোনো দোষ নেই। আমি সম্পুর্ণ নির্দোষ।
এজিদ- তোমার দোষ নেই? এই কে আছিস? (অলিদের প্রবেশ) বন্দী কর- বন্দী কর এই বৃদ্ধ উকিলকে। (উকিলকে বন্দী করিল) নিয়ে যাও এই বিশ্বাসঘাতককে অন্ধকার কারাগারে।
উকিল- ইয়া আল্লাহ, একি করলেন, শাহজাদা? আমাকে বন্দী করে কোনো ফল হবে না। ভালোও হবে না।
এজিদ- ভালো-মন্দ বিবেচনা করব আমি, তুমি নয়। নিয়ে যাও, এই বৃদ্ধকে অন্ধকার কারাগৃহে। এই উকিলই হবে আমার প্রতিহিংসা যজ্ঞের প্রথম আহুতি। হ্যাঁ, শোন, ঐ সঙ্গে পিতাকে দরবারে ডেকে পাঠাবে। আমি ডেকে পাঠিয়েছি বলবে।
উকিল- আমি- আমি গরীব, শাহজাদা। আমার মাথার কোনো মূল্য নেই। আমাকে হত্যা করেও আপনার কোনো লাভ হবে না। আমাকে ছেড়ে দিন, শাহজাদা।
এজিদ- হ্যাঁ, ছেড়ে দিব। হাঃ-হাঃ-হাঃ। কারাগারে নিয়েই তোমাকে ছেড়ে দিব।
অলিদ- ভাবছ কি? নিঃশব্দে চলে এসো আমার সঙ্গে। অন্ধকার কারাগারে বসে সুখের স্বপ্ন কল্পনা করবে এস। (উকিলকে লইয়া অলিদ প্রস্থান)
এজিদ- এখন দেখি পিতা কি বলে। তারপর- তারপর জ্বালাব প্রলয়ের অগ্নিশিখা। দেখাব এজিদ কত ভীষণ- কত ভয়ঙ্কর।
অলিদের পুনঃ প্রবেশ
অলিদ- শাহজাদা, জাহাঁপনা আপনাকে দরবারে তলব করেছেন। চলুন শাহজাদা।
এজিদ- আচ্ছা চলুন। (এজিদ ও অলিদ প্রস্থান)
মাবিয়া ও পরে এজিদের প্রবেশ
মাবিয়া- আমায় ডেকেছিলে পুত্র?
এজিদ- (অবনত মস্তকে) জ্বী হ্যাঁ, পিতা।
মাবিয়া- কেন?
এজিদ- সে কথা বলতে আমার জিব্বা আড়ষ্ট হয়ে আসছে পিতা। আমি জয়নবকে পাবার জন্য কত কিছু করলাম।আব্দুল জব্বারকে প্রতাড়ণা করে তালাক লইলাম।তবু আমার সেই মানস প্রতিমা, হৃদয়ের রাণী জয়নবকে জেনেশুনে হজরত আলীর প্রথম পুত্র ইমাম হাসান নিকাহ করেছে। ইমাম হাসানের এই অহমিকা আমি কোনোদিন সহ্য করব না পিতা।
মাবিয়া- ইমাম হাসান জয়নবকে নিকাহ করেছেন! এ নিয়ে আফসোস করনা পুত্র। জয়নব বিবির ভাগ্য ভাল। সেজন্য ইমাম হাসান তাঁকে নিকাহ করেছেন। আমি তোমাকে কয়েকটি কথা বলব, মনযোগের সহিত শ্রবণ কর। নবীজির বংশধর ইমাম হাসান ও হোসেনের সাথে কোনোদিন বিবাদ কর না। সালামী, নজর ও কর সময়মতে পরিশোধ করতে অবহেলা করনা।
এজিদ- কী বলেলন, পিতা? আমি শাহজাদা এজিদ সেই ভিক্ষুক পুত্রদ্বয়কে সালাম করব? না- না, এ অসম্ভব- এ অসহ্য পিতা। আপনি আমাকে অন্য আদেশ করুন, পিতা। ইমাম হাসান ও হোসেনকে সালাম আমি করতে পারব না। শুধু তাই নয়, তাঁদের আমি ক্ষমাও করতে পারব না। আপনার এ আদেশ পালনে আমি বাধ্য নই, পিতা।
মাবিয়া- কি বললে, ইমাম হাসান ও হোসেনকে তুমি সালাম করবে না?
এজিদ- না করব না। আমার জীবন থাকতে না। আমার কথা শুনে রাখুন পিতা, যে নবীজির আওলাদদেরকে আপনি খাস বান্দা বলে মনে করেন, আমি তাঁদের নরাধম পাষণ্ড বলে মনে করি। আমি আপনার চরণ স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করলাম, যে পর্যন্ত ইমাম ভাতৃদ্বয়েক হত্যা করে ইমাম হাসান ও হেসেনর সমস্ত বিবিগণকে বেঁধে দামেস্কে আনতে না পারব, সে পর্যন্ত আমার সুখ নেই- আমার শান্তি নেই।
মাবিয়া- কি বললে? (এজিদকে পদাঘাত) দূর হও, আমার সন্মুখ হতে। তোমার মত পাষণ্ড পুত্রের আমি মুখদর্শন করতে চাই না। তোমার মতো পুত্রের মুখ দর্শন করা জ্ঞানী লোকের জন্য মহাপাপ।বামন হয়ে আকাশের চাঁদ ধরতে চাও। এ দূরাশা তোমার কোনোদিন পূর্ণ হবেনা। কোথায় আসাদ-
(আসাদের প্রবেশ)
আসাদ-(কুর্ণিশ করে) বন্দেগী জাহাঁপনা।
মাবিয়া- (এজিদকে) আমার সন্মুখ হতে দূর হও কমবক্ত। কোনোদিন মিলবেনা তোমার এই দামেস্কের তক্ততাজ। পূর্বপুরুষ যারা জ্ঞানীগুণী ছিলেন, নবীজির থিদমত হেতু তাঁদের মিলল এই তক্ততাজ। আসাদ, তুমি ত্বরিত মদিনা গমন কর। ইমাম হাসানকে ডেকে আন। এই তক্ততাজ আমি তাঁদের হাতে অর্পণ করব। যতদূর সম্ভব, তুমি সত্বর মদিনা গমন কর। (প্রস্তান)
এজিদ- দাঁড়াও আসাদ।(আসাদের পথরোধ করে দাঁড়িয়ে)এই কে আছিস-
(অলিদ ও মারোয়ানের প্রবেশ)
এজিদ- বন্দী কর পিতার এই আজ্ঞাবাহী নফরকে (অলিদ আসাদকে বন্দী করিল) নিয়ে যাও একে এখন অন্ধকার কারাগারে।
অলিদ- চল ব্যাটা, কারাগারে।
(আসাদকে লইয়া অলিদ ও মারোয়ান প্রস্থান)
এজিদ-এইবার দেখা যাবে, কেমন করে এই তক্ততাজ অর্পণ কর ইমাম হাসানেরে। আমি আজ প্রেমের দায়ে, রূপের নেশায়, পিতা-পুত্রের সম্বন্ধটাও ভোলে গেলাম। তবু-তবু আমি চাই সেই জয়নব। জয়নব-জয়নব-জয়নব-
(প্রস্থান)
* * *
দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য
এজিদ দরবার
(এজিদ, মারোয়ান, অলিদ ও সভাসদগণের প্রবেশ)
এজিদ- মন্ত্রী মারোয়ান। এখন উপায়? পিতার মৃত্যুতে আমার মেরুদণ্ডটা একেবারে ভেঙ্গে গেছে, মন্ত্রীবর। আমার আশা-ভরসা সকলই ভস্মে পরিণত হলো। আমার আশা ছিলো কি, আর হলো কি!
মারোয়ান- শাহজাদা, আপনি বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করুন। আমি আপনার আশা পূরণ করার জন্য মরণ পণ চেষ্টা করব, শাহজাদা। আপনি এখন এই সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ছেড়ে আজকের এই শুভক্ষণে রাজ সিংহাসনে আরোহণ করুন। সভাসদগণ, আপনারা সকলেই শাহজাদা রাজ সিংহাসনে আরোহণ করার শুভক্ষণে আনন্দ উৎসবে রাজদরবার মুখর করে তুলুন।
(অলিদ এজিদকে সিংহাসনে আরোহণ করাল এবং মারোয়ান এজিদের মাথায় রাজমুকুট পরাইয়া দিলো।)
মারোয়ান- জয় জাহাঁপনা এজিদের জয়-
সকলে- জয়
অলিদ- জয় দামেস্ক অধিপতির জয়।
সকলে- জয়।
(গীতকণ্ঠে বিবেকের প্রবেশ)
বিবেক-(গীত) আজ হতে তোদের
এজিদ হলো রাজা-২
সু-প্রভাতে শুভ দিনে-২
আনন্দে ব্যাকুল রাজা
এজিদ হলো রাজা।
আজ হতে তোদের
এজিদ হলো রাজা
ঢাক, ঢোল, ঘণ্টা
শংখের ধ্বনি
বাজিতেছে শারী শারী-২
ঘরে ঘরে বাজে কাশী-২
আনন্দ জগত জোরা
এজিদ হলো রাজা।
আজ হতে তোদের
এজিদ হলো রাজা ।।
(গীতান্তে বিবেক প্রস্থান)
মারোয়ান- হ্যাঁ-হ্যাঁ, আজ হতে আমাদের এজিদ মহারাজ হলো।
এজিদ- মন্ত্রী মারোয়ান, আজকের এই শুভদিনে একজন নৰ্তকী ডেকে এনে নাচ-গানে রাজদরবার মুখর করে তোলো।
মারোয়ান- কোথায় নর্তকী! (নর্তকীর প্রবেশ) শোন নর্তকী, আজ এই শুভক্ষণে তুমি নাচে গানে জাহাঁপনাকে আনন্দ প্রদান কর।
(নর্তকী নাচ-গান অন্তে প্রস্থান)
এজিদ- মন্ত্রী মারোয়ান, সত্যই কি আমি দামেস্ক অধিপতি হয়ে রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছি?
মারোয়ান- শুধু দামেস্ক নয়, আজ হতে আপনি মক্কা ও মদিনারও ভাবী শাসক।
এজিদ- তাহলে আজ হতে আমি তোমাদেরকে যা আদেশ করব, তোমরা সকলেই তা পূরণ করবে?
মারোয়ান- নিশ্চয়ই করব, জাহাঁপনা। আপনার আদেশ আমাদের শিরোধার্য।
এজিদ- তাহলে বর্তমান আমার প্রথম লক্ষ্য জয়নব। যেকোনো প্রকারেই হোক জয়নবকে আমার চাই। যে পর্যন্ত আমি জয়নবকে লাভ করতে না পারব, সে পর্যন্ত রাজ ঐশ্বর্য কিছুই আমার প্রিয় নয়।
মারোয়ান- জয়নব বিবির জন্য আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, জাহাঁপনা। ইমাম হাসান আপনার মানস প্রতিমা জয়নবকে নিকাহ করে কিছুতেই সুখী হতে পারবে না। চলুন, জাহাঁপনা, আমরা মন্ত্রণা কক্ষে দিয়ে একখানা পত্র লিখে ইমাম হাসানের নিকট প্রেরণ করিগে’।
এজিদ-উত্তম। আমি আজ নিজ হাতে পত্র লিখব। পত্র পাঠান্তে যেন ইমাম হাসান হোসেনের মন প্রাণ আতঙ্কে শিহরিত হয়ে উঠে। আমি আজ রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম, যেভাবে পারি হাসান ও হোসেনের বংশ নাশ করাই হবে আমার প্রথম কাজ। ইমাম ভ্রাতৃদ্বয় যদি প্রাণ ভয়ে বন-জংঘলে, পাহাড়-পর্বতে, সাগর সলিলের অতল জলাধিতলে লুক্কায়িত হয়, তবুও তাঁরা এজিদের কোপানল হতে রক্ষা পাবে না। পূর্বের ভানু যদি পশ্চিম দিকে উদিত হয়, তবুও আমার এই প্রতিজ্ঞা অচল অটল থাকবে। ইমাম বংশ ধ্বংস করাই হবে আমার জীবনের প্রথম লক্ষ্য।
মারোয়ান- এখন চলুন জাহাঁপনা। আমরা এখন ইমাম হাসানের নিকট পত্র লিখিগে’।
এজিদ- উত্তম। তবেই চল।
(উভয়ের প্রস্থান)
* * *
দ্বিতীয় অঙ্ক দ্বিতীয় দৃশ্য
হাসান দরবার
(হাসান, আব্দুর রহমান ও পরে পত্রহস্তে এজিদের কাসেদের প্রবেশ।)
কাসেদ- বন্দেগী খোদাবন্দ।
হাসান- বন্দেগী। কে তুমি? কোথা হতে এসেছ?
কাসেদ- আমি দামেস্কের বাদশাহ এজিদের কাসেদ। আমি জাহাঁপনা এজিদের পত্র নিয়ে এসেছি। এই নিন জাহাঁপনার পত্র।
হাসান- এজিদ পত্র লিখেছে?(পত্র গ্রহণ)। কাসেদ, হজরত মাবিয়ার সংবাদ কি?
কাসেদ- তিনি এন্তেকাল করেছেন খোদাবন্দ।
হাসান- এন্তেকাল করেছেন! হজরত মাবিয়া এন্তেকাল করেছেন?
কাসেদ- হ্যাঁ খোদাবন্দ, হজরত মাবিয়া এন্তেকাল করেছেন।
সকলে মিলে– ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন।
হাসান- মন্ত্রী আব্দুর রহমান, আপনি পত্রখানা পাঠ করুন।দেখি কি লিখেছে পত্রে।
আব্দুর রহমান-(পত্রপাঠ) ইমাম হাসান ও হোসেন।তোমরা কি আজ পর্যন্ত অবগত হউনি যে, মহারাজাধিরাজ এজিদ দামেস্কের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে সমস্ত আরবের শাসনদণ্ড হাতে নিয়েছেন। আজ পর্যন্ত তোমরা দুই ভ্রাতা আমার নিকট বায়েত গ্রহণ করে গলায় তরবারি বেঁধে সালামী, কর ও নজরাণা আদি দাখিল না করার কারণ কি? পত্র পাঠমাত্র তোমরা দুই ভ্রাতা গলায় তরবারি বেঁধে সালামী, কর ও নজরাণাসহ দামেস্ক নগরে এসে নতজানু হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা না করলে তোমাদের কিছুতেই নিস্তার নেই।–ইতি, দামেস্ক অধিপতি জাহাঁপনা এজিদ।
হাসান-একি কথা! এজিদ কমবক্ত, পাষণ্ড গোলাম পুত্র গোলাম। সে মুনিব বংশের প্রতি বিন্দুমাত্র ভয় প্রদর্শন করলো না। দাসীপুত্রের অহমিকা দেখে আমার শরীর জ্বলেপোরে যাচ্ছে। এজিদ কমবক্ত লেখিল লেখন, বিচারিয়া দেখুন যত বন্ধুগণ। নানা আমার নূরনবী বাপ আলী শাহা, দাসীপুত্র হারামজাদ জানেনা কি তাহা? সেই দুষ্ট হারামজাদ লেখিল লেখন, গোলাম পুত্র সালাম চাহে মনিব সকাশে। এমন অপমান সহ্য নাহি করা যায়, মনে কয় পয়জারেতে ভেজি যমালয়।
আব্দুর রহমান- দাসীপুত্র এজিদ কমবক্ত। যার মুখ দর্শনে জ্ঞানীলোকের মহাপাপ হয়, সেই দুষ্ট দাসীপুত্রকে সালাম করব আমরা? ছিঃ-ছিঃ, কি ঘৃণার কথা! যে পাষণ্ড খরিদা দাসীর গর্ভে জন্মেছিলো, যার পিতা আমাদের চির দাস ছিলো, সেই গোলাম পুত্র গোলাম এজিদের শাসনাধীনে থাকব আমরা? বাহঃ! কি চমৎকার দূরাশা! না-না, আমরা কখনও পাষণ্ড এজিদের অধীনে থাকব না। আমি আজ হতে করলাম পণ, আমার দেহে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত গোলাম পুত্র গোলামের অধীনে আমরা থাকব না।এবং তার বশ্যতাও স্বীকার করব না। এতে জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হব না।
হাসান- কাসেদ, অতি শীঘ্র এই স্থান হতে প্রস্থান কর। ভবিষ্যতে এরূপ ঘৃণিত প্রস্তাব নিয়ে মক্কা ও মদিনায় প্রবেশ কর না। গরীব কাসেদ বলে আজ তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।
কাসেদ- খোদাবন্দ আমার পত্রের উত্তর?
হাসান-(ক্রোধে) এই দিচ্ছি তোমার পত্রের উত্তর।(পত্র ছিন্ন করে) যাও, তোমার বাদশাহকে বলবে, যদি তার বেঁচে থাকার ইচ্ছা আছে, যদি বাদশাহী করার ইচ্ছা আছে, তাহলে অবিলম্বে সে এসে যেন আমার পদচুম্বন পূর্বক ক্ষমা প্রার্থনা করে। ইহা যদি না করে সেই পাপী অধম, বাদশাহী দূরের কথা তার বাঁচিবেনা জীবন।দাসীপুত্র হারামজাদ এজিদ মাতাল, পয়জার মেরে তাঁর উড়াইব ছাল।
(কম্পিত অবস্থায় কাসেদ প্রস্থান)
আব্দুর রহমান- চলুন ইমাম সাহেব। এখন আমরা বিশ্রামাগারে চলে যাই। দেখা যাক, কোথাকার পানী কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়!
(প্রস্থান)
* * *
দ্বিতীয় অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য
–এজিদ দরবার–
(এজিদ, মারোয়ান, অলিদ ও সৈন্যগণের প্রবেশ)
এজিদ-সৈন্যগণ, তোমাদের যে কেউ হাসান ও হোসেনের শির কেটে এনে আমার রাজদরবারে হাজির করতে পারবে তাকে আমি মেসের ও ইরাণের বাদশাহী দান করব। হাসান আমায় দাসীপুত্র বলে অনেক নিন্দাবাদ করেছে। আমার প্রেরিত কাসেদকে অপমান করে রাজদরবার থেকে বাহির করে দিয়েছে। আঃ- কি অপমান! এ অপমান কী সহ্য করা যায়? না- না, কিছুতেই সহ্য করা যায় না। সেনাপতি অলিদ-
অলিদ- আদেশ করুন জাহাঁপনা।
এজিদ- তুমি অবিলম্বে লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে মদিনা অভিমুখে গমন কর। তারপর মদিনায় গিয়ে হাসান ও হোসেনের শির কেটে এনে আমার সন্মুখে হাজির করবে। এ যদি করতে না পার তোমাকে আমি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করব।
গীতকণ্ঠে পাগলের প্রবেশ
পাগল- (গীত)
ওরে হারাখোর
দাসীর গর্ভে জন্ম নিয়ে-২
এই অহঙ্কার তোর।
ওরে হারামখোর।।
যখন তুই মদিনায় ছিলি
মদিনা ছেড়ে দামেস্কে এলি
দামেস্কে এসে বাদশাহী পেলি-২
সেজন্য তোর এতো জোর।
ওরে হারামখোর।।
দাসীর গর্ভে জন্ম নিয়ে-২
এই অহঙ্কার তোর।
ওরে হারামখোর।।
হানিফ যেদিন আসবে দেশে
পরবিরে তুই ঘোর বিপাকে
মনে মনে ভেবে দেখ তুই-২
এই অহঙ্কার যাবে দূর।।
ওরে হারামখোর।।
দাসীর গর্ভে জন্ম নিয়ে-২
এই অহঙ্কার তোর
ওরে হারমখোর।।
(গীতান্তে পাগলের প্রস্থান)
এজিদ- যাও-যাও, বনের পাগল। শুনিতে চাহিনা তব পাগলের প্রলাপ। আবার হানিফা আসবে? হাঃ-হাঃ-হাঃ- শত সহস্র হানিফাকেও এজিদ ভয় করে না। সেনাপতি অলিদ-
অলিদ–(অভিবাদন করে)আদেশ করুন, জাহাঁপনা।
এজিদ– অভিবাদন নয়, অভিবাদন নয়- আমি আগে কাজ চাই। আগে আমার আদেশ পালন কর। অভিবাদন পরে করলেও হবে।
অলিদ- জাহাঁপনার আদেশ শিরোধার্য। সৈন্যগণ, তোমরা সকলে রণসাজে সজ্জিত হও। উড়াও নিশান, বাজাও ডঙ্কা, এখনই যাত্রা করব আমরা মদিনা। মদিনায় গিয়ে হাসান ও হোসেনের শির কেটে এনে জাহাঁপনার সন্মুখে হাজির করতে হবে। হাসান ও হোসেনের পরিজন জয়নব, কদভানু এবং সহর ভানুকে বেঁধে আনতে হবে। এ কার্য যদি সম্পাদন করতে না পারি, সেনাপতি অলিদ নাম আমি বৃথাই ধরি। হাঃ—হাঃ-হাঃ- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়, জাহাঁপনা এজিদের জয়-
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে অলিদ ও সৈন্যগণের প্রস্থান।)
এজিদ- মন্ত্রী মারোয়ান-
মারোয়ান- আদেশ করুন, জাহাঁপনা।
এজিদ- হাসান আমার কেমন শত্রু দেখেছ? আমার মন বলছে, আজই আমি মদিনায় গিয়ে হাসানের প্রতিহিংসার চরম শাস্তি বিধান করে জয়নবকে নিয়ে এসে আমার অন্তরের জলন্ত অগ্নি নির্বাপিত করি।
মারোয়ান- আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, জাহাঁপনা, ধৈর্য ধারণ করুন। সেনাপতি অলিদের কোনো খবর না লইয়া আমরা মদিনায় যাত্রা করব না। এখন চলুন আমরা বিশ্রামাগারে চলে যাই।
এজিদ- উত্তম। তবে তাই চল।
(উভয়ের প্রস্থান)
* * *
দ্বিতীয় অঙ্ক চতুর্থ দৃশ্য
– ইমাম শিবির-
( হাসান ও পরে অলিদের প্রবেশ)
অলিদ- তুমি আমাদের জাহাঁপনা এজিদের হুকুম কেন অমান্য করলে? তোমার এখন কিছুতেই নিস্তার নেই। ভালো চাওতো এখনও সময় আছে, তোমরা দুই ভ্রাতৃ দাঁতে তৃণ তুলে, গলায় তরবারি বেঁধে সালামী, নজর ও করসহ জাহাঁপনার নিকট গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তারপর মক্কা ও মদিনার সিংহাসনে বসে রাজত্ব কর। ইহা না করলেতোমাদর কিছুতেই নিস্তার নাই।
হাসান- কি বললে? কমবক্ত অলিদ। ময়ূরকে কি কোনোদিন চিল ও কাককে সালাম করতে দেখেছিস? নবীর বংশ কি কোনোদিন গোলাম বংশকে সালাম করে? পাপাত্মা অলিদ!এজিদ কমক্তের যদি বাঁচবার এবং দামেস্ক শাসন করবার সাদ থাকে, তাহলে অবিলম্বে এসে আমার পদ চুম্বন করে যেন ক্ষমা প্রার্থনা করে। তা নাহলে সে কিছুতেই রক্ষা পাবে না।
অলিদ- সাবধানে রসনা সঞ্চালন কর। নছেৎএখনই তোমার জীবন প্রদীপ নির্বাপিত করে দিব। আমার হাতে এখানা কি, দেখেছ? (অলিদ তরবারি দেখাইল)।
হাসান- কমবক্ত পাপিষ্ঠ দূরাচার অলিদ! তুই ষড়যন্ত্র করে আমার সাথে যুদ্ধ করতে এসেছিস? যার পিতা শেরে আলী আকাশ জমিন ধরে করতাল বাজাতে পারে, তাঁর পুত্রকে দেখাতে এসেছিস শক্তির গরিমা। তোমার দর্প নিমিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বাজাইব বিজয় ভেরী, বীরদর্পে রাজত্ব করিব এই মদিনাপুরী।
অলিদ- তোমার দর্প দেখে অলিদ কখনও ভীত হবে না। এখনও সময় আছে বাঁচবার যদি সাদ আছে, সালাম কর গিয়ে নতুন বদশাহেরে আমার।
হাসান-পাপাত্মা অলিদ। তোর আর নিস্তার নেই। গোর্জ মেরে মস্তক তোর করব চূর্ণ বিচূর্ণ। (গোর্জ দেখাইল)
(সহসা ওহাবের প্রবেশ)
ওহাব- ক্ষ্যান্ত হোন খোদাবন্দ। এই হতভাগা জীবিত থাকতে আপনাকে অস্ত্র ধারণ করতে হবে না। পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যে, আমরা রাসুলের উম্মত বেঁচে থাকতে পয়গম্বর রাসুলের রওজা আক্রমণ করতে পারে।
হাসান- উত্তম! অদ্যাকার যুদ্ধের ভার আমি তোমার ওপর ন্যস্ত করলাম। পরম দয়ালু খোদা তায়ালার নামে ভরসা রেখে যুদ্ধে অগ্রসর হও। এই নাও তরবারি। (তরবারি প্রদান করিলেন)
ওহাব- পেয়েছি-পেয়েছি। এইবার প্রভুর আদেশ পেয়েছি।পাপাত্মা অলিদ!সিংহের সহিত শৃগালের আস্ফালন। মশক হয়ে হস্তীরে জব্দ। এখনও বলছি জীবনে যদি বাঁচবার সাদ থাকে, তাহলে এরূপ ঘৃণিত প্রস্তাব নিয়ে কখনও মক্কা ও মদিনায় প্রবেশ কর না। নছেৎ-
অলিদ- নছেৎ, কি করবে?
ওহাব- মূর্খ নছেতের অর্থ বুঝলেনা। নছেতের অর্থ প্রাণবধ।তোর প্রাণ বধ করে শৃগালের উদরস্ত করাব।
অলিদ- উত্তম। তবে তাই হোক। রণক্ষেত্রেই পরীক্ষা হোক কে কার প্রাণবধ করতে পারে।
(উভয়ের যুদ্ধ অলিদ বন্দী)
ওহাব- (অলিদকে ধরিয়া) আদেশ করুন ইমাম সাহেব, আদেশ করুন। এই মুহূর্তে এই পাপিষ্ঠের জীবন লীলা শেষ করে দিই।
(দ্রুত হাসানের প্রবেশ)
হাসান- ক্ষ্যান্ত হও বীর, ক্ষ্যান্ত হও।
অলিদ-(অবনত হয়ে) আমায় ক্ষমা করুন ইমাম সাহেব- আমায় ক্ষমা করুন।
হাসান- ওহাব, একে ছেড়ে দাও। শাস্ত্রে বলে ক্ষমাহি পরম ধর্ম।
ওহাব- শত্রুকে হাতের মুঠোয় পেয়েও ছেডে় দিতে বলেন, খোদাবন্দ?
হাসান- হ্যাঁ, বললাম। কারণ শত্রু হলেও সে ক্ষমাপ্রার্থী।
ওহাব- যা পাপী। শুধু প্রভুর আদেশ রক্ষার্থে তোকে ছেড়ে দিলাম।(অলিদকে ছেড়ে দিলো)
অলিদ- আমার অপরাধ মার্জনা করুন, ইমাম সাহেব।আমি আপনার পদ স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করে বলছি, জীবনে আর কোনোদিন অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হব না।আজ হতে আপনি নিশ্চিন্তে মক্কা ও মদিনায় রাজত্ব করুন।
হাসান- যাও অলিদ, তোমার প্রথম ভুল আমি ক্ষমা করলুম। জীবনে আর কখনও এরূপ ঘৃণিত ও অ্ন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়োনা। চলো ওহাব, এখন আমরা শিবিরে চলে যাই। (প্রস্থান)
ওহাব- অলিদ, দেখলেতো আমার প্রভুর দয়া! শোন, তোমাকে যদি আবার আমি এই মদিনার বুকে ধরতে পারি, তাহলে সেদিন তোমাকে আমি জীবন্তে কবর দিব, বুঝলে? (প্রস্থানোদ্যত আবার ফিরে এসে) হাঃ-হাঃ-হাঃ- অলিদ তুমি বোলে এজিদের প্রধান সেনাপতি। বাহঃ- এরূপ ক্ষুদ্র শক্তি যার বাহুতে সে হয়েছে আবার প্রধান সেনাপতি!ছিঃ-ছিঃ, ভীরু, কাপুরুষ,এই সামান্য শক্তি নিয়ে আবার মদিনায় প্রবেশ করলে তোমার আর নিস্তার নেই। সেদিন তোমাকে আমি কিছুতেই ক্ষমা করব না। সেদিন আমি কারও অনুরোধও শুনব না। এই কথা মনে থাকে যেন।
(প্রস্থান)
অলিদ- আজ আমি ইমামের দয়ার জন্য কোনোমতে বেঁচে গেলাম। এখন কি করি? কোন উপায় অবলম্বন করি? সন্মুখ যুদ্ধে ইমাম হাসানকে পরাস্ত করা অসম্ভব। এখন শিবিরে গিয়ে জাহাঁপনার নিকট পত্র লিখে সমস্ত ঘটনা জানাতে হবে। তারপর আমি এ অপমানের প্রতিশোধ কড়ায় গণ্ডায় পরিশোধ না করে দামেস্কে ফিরব না। আমি চাই- চাই শুধু প্রতিশোধ- প্রতিশোধ- হাঃ-হাঃ-হাঃ-
(প্রস্থান)
* * *
দ্বিতীয় অঙ্ক পঞ্চম দৃশ্য
-এজিদ দরবার-
(পত্র হস্তে এজিদ ও মারোয়ানের প্রবেশ)
এজিদ- (এজিদ পত্র বাহির করে) মন্ত্রী মারোয়ান! দেখতো পত্রখানা কে কোথা হতে পাঠিয়েছে। পত্রখানা পাঠ কর। (মারোয়ানের হস্তে পত্র প্রদান )
মারোয়ান– জাহাঁপনা, অলিদ মদিনা শিবির হতে পত্র প্রেরণ করেছে। (পত্র পাঠ) জাহাঁপনা, ইমাম হাসান ও হোসেনকে সম্মুখ যুদ্ধে পরাস্ত করা অসম্ভব। এরা হজরত আলি বরাবর যোদ্ধা। ইমাম হাসান ও হোসেনকে যুদ্ধে পরাস্ত করে জয়লাভ করতে হলে অন্যপ্রকার কৌশলের বিশেষ প্রয়োজন হবে।যদি আপনার অন্য কোনো কৌশল জানা থাকে তাহলে তা অতিশীঘ্র লেখিয়া জানাইতে অনুরোধ জানালাম। -ইতি! আপনার অনুগত সেনাপতি অলিদ।
এজিদ- প্রধান মন্ত্রী মারোয়ান! হাসান ও হোসেন আমার কেমন শত্রু দেখেছ? বিবি জয়নবকে নিকাহ করব বলে কত কাণ্ডইনা করলাম। কিন্তু আমার সেই প্রেয়সী বিবি জয়নবকে জেনেশুনে ইমাম হাসান নিজে বিবাহ করল। এবং আরও কত ঘৃণিত কটু বাক্যবাণে আমার অন্তরে ব্যাথা দিয়েছে তা মুখে বলা যায় না। যেভাবেই হোক আমি হাসান হোসেনকে প্রাণে বধ করব। তা না হলে আমার শান্তি নেই- আমার স্বস্তি নেই।
মাঝোয়ান- এতো বিচলিত হবেন না, জাহাঁপনা! আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। হাসানকে ছলেবলে কৌশলে বধ করে জয়নব বিবিকে আপনার অঙ্কশায়িনী করব। আমি অদ্য রজনীতে স্বপ্নযোগে জানতে পেরেছি যে, হাসানের মৃত্যু অন্য কোনো প্রকারে হবে না। তার মৃত্যু হবে-
এজিদ— বল-বল, মন্ত্রী মারোয়ান, তার মৃত্যু কি প্রকারে হবে? শীঘ্র করে খোলে বল।
মারোয়ান— হাসানকে বধ করতে হলে যেকোনো প্রকারে তাঁকে বিষপান করাতে হবে। তাছাড়া অন্য কোনো প্রকারে ইমাম হাসানের মৃত্যু হবে না।
এজিদ— মন্ত্রী মারোয়ান। তাহলে এখন উপায়? কে করাবে বিষ পান?
মারোয়ান— এর জন্য আপনি চিন্তা করবেন না, জাহাঁপনা। কি প্রকারে ইমাম হাসানকে বিষপানে বধ করতে হবে, সে সন্ধান আমি আগেই করেছি, জাহাঁপনা। যে প্রকারেই হোক আপনার পরম শত্রু হাসানের জীবন লীলা শেষ করে আপনার ‘মনবাসনা আমি পূর্ণ করব। আমি আজ রজনীতেই পত্রযোগে অলিদকে হাসান বধের উপায় অবগত করব।
এজিদ— মন্ত্রী মারোয়ান! আমার এ কাৰ্য ফতে করতে যত অর্থের প্রয়োজন হবে তা নিশ্চিন্তে রাজকোষ থেকে খরছ করবে। এরজন্য আমার রাজভাঙার উন্মুক্ত থাকবে। আরও মনে রেখো, তোমরা যে কেউ আমার চিরশত্রু ইমাম হাসানকে হত্যা করতে পারবে তাকে আমি লক্ষাধিক স্বর্ণমুদ্রা বকশিশ দেব। মন্ত্রী মাঝোয়ান! এখন যাও। কাল বিলম্ব না করে হাসান বধ কাৰ্য সমাপন করে যতদূর সম্ভব শীঘ্র আমাকে শুভ সংবাদ দেবে। (প্রস্থান)
মারোয়ান- এর জন্য আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, জাহাঁপনা। মূর্খ হাসান! তোমার আর রক্ষা নাই।। তোমাকে হত্যা করার জন্য যে পথের সন্ধান আমি পেয়েছি, সেখান থেকে তুমি রক্ষা পাবেনা- কোনোমতেই না। (প্রস্থান)
* * *
দ্বিতীয় অঙ্ক ষষ্ঠ দৃশ্য
-অলিদ শিবির-
( সৈন্যসহ অলিদ এবং মারোয়ানের প্রবেশ। পরে পত্ৰ হস্তে কাসেদের প্রবেশ)
কাসেদ- বন্দেগী মহামান্য সেনাপতি সাহেব।
অলিদ– কি সংবাদ কাসেদ?
কাসেদ— মন্ত্রী মারোয়ান আপনাকে একখানা পত্র পাঠিয়েছেন। এই নিন সেই পএ। (পত্র প্রদান)
অলিদ—(অলিদ পত্র পাঠ।) সেনাপতি অলিদ, ইমাম হাসানের সঙ্গে সন্মুখ সমরে জয়লাভ করা অসম্ভব। কারণ সে আলি বরাবর মহাযোদ্ধা। সেজন্যই তাঁকে বধ করতে হলে কৌশল অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ তাঁকে জহর প্রয়োগে বধ করতে হবে। তুমি নগর হতে একজন সু-চতুরা কুটনি তালাশ করে তাকে অসংখ্য টাকা পয়সার লোভ দেখায়ে বশীভূত করে জহর প্রয়োগে হাসানকে হত্যা করবে। ইহাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত। – ইতি প্রধান মন্বী মারোয়ান।
অলিদ— এইবার উপযুক্ত উপায় সন্ধান পেয়েছি। কাসেদ, তুমি যাও, এখনই এই নগর হতে একজন কুটনি তালাশ করে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও।
কাসেদ-আমি এখনই কুটনির তালাশে যাচ্ছি, সেনাপিত সাহেব। (প্রস্থান)
অলিদ– হাসান! এইবার তোমার নিস্তার নেই। সৈন্যগণ, তোমরা এখন শিবিরে গিয়ে বিশ্রাম করগে’। সময় হলে আমি তোমাদের ডেকে পাঠাব। (সৈন্যগণ প্রস্থান) হাঃ-হাঃ-হাঃ- আমি চাই শুধু প্রতিশোধ– হ্যাঁ, শুধুই প্রতিশোধ।হাঃ-হাঃ-হাঃ-
( মায়মুনা কুটনির প্রবেশ)
ময়মুনা— আমায় কেন তলব করেছেন সেনাপতি সাহেব?
অলিদ- বিশেষ প্রয়োজন আছে বলেই তোমাকে আমি ডেকে পাঠিয়েছি।
ময়মুনা- বেশ বলুন, কি সেই আপনার বিশেষ প্রয়োজন?
অলিদ- নিশ্চয়ই বলব। কিন্তু-
ময়মুনা- আবার কিন্তু কি?
অলিদ- কিপ্ত কিছুই নয়, তবে সন্দেহ অনেক।
মায়মুনা- আমার নিকট কথা বলতে কোনো সন্দেহ করতে হবেনা, সেনাপতি সাহেব। আমার নাম মায়মুনা কুটনি। এই দুনীয়ার যত কু-কার্য আছে তা একমাত্র আমার দ্বারাই করা সম্ভব। এখন আপনার কি কার্য করতে হবে, তা বিনাদ্বিধাই বলে ফেলুন।
অলিদ- তাহলে শোন মায়মুনা, যদি তুমি বিষপ্রয়োগে ইমাম হাসানকে বধ করতে পার, তাহলে তোমাকে আমি পাঁচশত স্বর্ণমূদ্রা পারিতোষিক দেব। আর যখন যা চাইবে তাই পাবে। পারবে- পারবেতো বিষপ্রয়োগে হাসানকে বধ করতে?
মায়মুনা- অবশ্যেই পারব। এই সামান্য কাজের জন্য এতো ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? আমার নাম মায়মুনা। কি করতে না পারি? আমি ইচ্ছে করলে চাঁদ-সূৰ্যকে বশীভূত করে আপনার চরণে এনে দিতে পারি। সমস্ত জগতকে ছলনা করে ভুলিয়ে দিতে পারি। ইমাম সাহেবকে বিষপানে হত্যা করাতো আমার জন্য তুচ্ছ কথা। এর জন্য আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। এই আমি এখনি, ইমাম সাহেবকে বধ করতে চললাম। আচ্ছা সেনাপতি সাহেব, অগ্রিম কিছু দেবেন কি?
অলিদ- এই নাও মায়মুনা, আজ তোমাকে তিনশত স্বর্ণমোহর অগ্রিম দিলুম।বাকী দুইশত মোহর কার্য শেষে পাবে। বল, তুমি সন্মত?
মায়মুনা— নিশ্চয়ই সন্মত। (স্বর্ণের মোহর গোনতে লাগল)1
আলিদ- যাক, আমি এখন নিশ্চিন্ত হলুম। যাও, মায়মুনা অতি শীঘ্র কাজ ফতে করে ফেল। কিন্তু মায়মুনা! কাৰ্যে ত্রুটি করলে এই সু-তীক্ষ্ণ তরবারি তোমার বক্ষে বিদ্ধ করব। (তরবারি কোষমুক্ত করে আবার কোষবদ্ধ করল) আমি এখন যাই। হাঃ-হাঃ-হাঃ- হাসান! এইবার তোমার রক্ষা নাই-(অলিদ প্রস্থান)1
মায়মুনা– আমি আজই ইমাম হাসানকে হধ করার পথ তৈয়ার করব। হায় হায়। এতোদিন কেবল সোনার মোহরের নামই শুনেছি।কিন্তু স্ব-চক্ষে দেখিনি। এই প্রথম সোনার মোহর দেখলাম এবং তিনশত মোহর হাতাহাতিও পেলাম। আর চাইকি! কাজ হাঁসিল করতে পারলে আরও দুইশত সোনার মোহর পাব। আমি এখনই কদভানু কুটিরে যাব।যদি একবার কদভানুকে ছলনায় বশীভূত করতে পারি, তাহলে আমার আর কোনো চিন্তা থাকবে না। (প্রস্থান)
* * *
দ্বিতীয় অংক সপ্তম দৃশ্য
–কদভানুর কুটির:-
(কদভানু, সুমতি দাসী ও পরে কাঁদতে কাঁদতে মায়মুনার প্রবেশ।)
মায়মুনা-তুমি না সেদিন আমার কথা অবিশ্বাস করেছিলে। আজ আব্দুর রহমান সাহেবের বাড়িতে ইমাম সাহেবের সাদি হচ্ছে। এখন আমার কথা সত্যমিথ্যা প্রমাণ করো।যদি আমার কথা মিথ্যে হয়, তাহলে তুমি আমাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিও।
কদভানু- সুমতি দাসী, তুমি অতি সত্বর আব্দুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে জেনে এসো কিসের বাজনা বাজতেছে এবং কিসের এতো ধুমধাম হচ্ছে।যদি ঐখানে ইমাম সাহেবের বিবাহ কার্য অনুষ্ঠিত না হয়, তাহলে আমি মায়মুনার নাককান কেটে তাড়িয়ে দিবে।
সুমতি দাসী- আমি এখুনি সত্য মিথ্যা যাচাই করে আসব, মালকিন সাহেবান। (প্রস্থান)
মায়মুনা-আমার কথা কোনোদিনই মিথ্যে হবেনা। মিথ্যে কথা আমি বলতেই জানিনা।
কদভানু- সত্যমিথ্যা প্রমাণ একটু পরেই হয়ে যাবে।
(সুমতি দাসীর প্রবেশ)
কদভানু-কি সংবাদ সুমতি?
সুমতি-কথা সত্যি মালকিন। ইমাম সাহেব, আব্দুর রহমানের কন্যাকে বিবাহ করতেছে।
কদভানু- সেকি কথা! ইমাম সাহেব না শিকারে গেছে। তাহলে এই কি তাঁর শিকার! সুমতি, তুমি কি অন্দর মহলে প্রবেশ করে স্বচক্ষে দেখে এসেছ?
সুমতি— না, আমি অন্দর মহলে প্রবেশ করতে পারিনি। আমি প্রবেশ করতে চেয়েছিলুম, কিন্তু প্রহরীরা আমাকে প্রবেশ করতে দেয়নি। প্রহরীরা বলল, অন্দর মহলে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইমাম সাহেবের নিষেধ আছে।
কদভানু- মায়মুনা! তাহলে এখন আমি কি করি? ইমাম সাহেব তাহলে সত্যি আমার প্রেম বন্ধন ছিন্ন করে আব্দুর রহমানের রূপসী কন্যাকে সাদী করতেছে? হয়তো তিনি আর আমার দিকে এখন ফিরেও তাকাবে না! এখন উপায় কি মায়মুনা? সুমতি তুমি এখন আন্দর মহলে চলে যাও। (সুমতি প্রস্থান)
মায়মুনা- মায়মুনা বেঁচে থাকতে তোমার কোনো চিন্তা নেই। আমি ইচ্ছে করলে চন্দ্র সূর্যকে পর্যন্ত তোমার বশে এনে দিতে পারি। এতো সামান্য একজন মানুষ। তাঁকে তোমার বশে এনে দেওয়াটা আমার জন্য কি বড় কথা! আমার নিকট এমন এক কেরামতি ওষুধ আছে, তা একবার সেবন করাতে পারলে, তিনি আব্দুর রহমানের কন্যা অথবা জয়নবের দিকে ফিরেও তাকাবেন না।
কদভানু– তাহলে সত্যিই কি তোমার নিকট কেরামতি ওষুধ আছে?
মায়মুনা- কেন থাকবে না। নিশ্চয় আছে।
কদভানু- আমাকে দিতে পারবে?
মায়মুনা- নিশ্চয় দিতে পারব। কিন্তু…
কদভানু- আবার কিসের কিন্তু? টাকা পয়সা লাগবে?
মায়মুনা– টাকা পয়সা আমি নিই না।
কদভানু- তাহলে, কি চাও?
ময়মুনা- আমি কিছুই চাইনা। যদি তুমি আমায় বিশ্বাস করো-
কদভানু-বিশ্বাস করি বলেইতো তোমার নিকট আমার অন্তরের কথা খুলে বলছি। দয়া করে আমাকে ওষুধ প্রদান করে সুখী করো।
মায়মুনা- এই এক্ষুনি আমি তোমায় ওষুধ দিচ্ছি। তবে, কয়েকটি কথা বলব শোন, এই ওষুধ তৈরি করে সরবতের সাথে খুব সাবধানে খাওয়াতে হবে। সরবত তৈরি করতে যেন সরবতে আঙুল প্রবেশ না করে। এবং ওষুধ অন্য কাউকে দেখিওনা। খুব, সাবধানে রেখো। ( মায়মুনা ওষুধ প্রদান করল ও কদভাनू তা গ্রহণ করলেন)
গীতকন্ঠে বিবেক প্রবেশ-
বিবেক- (গীত)
কদভানু তোরে করি মানা
ওষুধ নিওনা।
ওষুধের মধ্যে সন্দেহ আছে-
তুমি জান না। ঐ
মায়মুনারো দাগাবাজি,
আগে না বুঝিতে পারবি
সে ছল করে জগত
ভুলাইতে পারে-২
তুমি জান না।
ওষুধ নিও না।।
কদভানু তোরে করি মানা
ওষুধ নিও না।
(গীতান্তে বিবেক প্রস্থান)
ময়মুনা– দূর হ— দূর হ, বনের পাগল- পথের কাঙাল।
কদভানু- ময়মুনা, ওই পাগল কি যেন বলে গেলো? ওর কথা কি সত্য হবে?
মায়মুনা- মা কদভানু, ওর কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ও হয়েছে বনের পাগল, পথের কাঙাল। খেতে না পেয়ে পেটের দায়ে যা ইচ্ছা তাই বলে থাকে। ওর কথায় কি বিশ্বাস করতে আছে? ওর কথা যে বিশ্বাস করে, সেও পাগল ব্যতীত অন্য কিছূই নয়। এখন তুমি অন্দর মহলে গিয়ে তোমার কাৰ্য করগে’। আমি এখন বাড়ি চললাম। (প্রস্থান)
কদভানু— আচ্ছা যাও, আমিও এখন অন্দর মহলে গিয়ে সরবত তৈরি করে রেখে দিইগে’। হয়তো স্বামী এখুনি গৃহে ফিরবে। (কদভানু প্রস্থান)
(শিকারী বেশে হাসানের প্রবেশ)
হাসান- আজ অন্দর মহল এতো নীরব নিস্তব্ধ কেন? কদভানু- কদভানু তুমি অতি শীঘ্র আমার জন্য এক পিয়ালা সরবত নিয়ে এসো। দারুন রৌদের তাপে পিপাসায় আমার কন্ঠনালী একেবারে শুষ্ক হয়ে গেছে। এক পিয়ালা সরবৎ দানে আমার পিপাসা নিবারণ করো, প্রিয়ে ।
(সরবতের পিয়ালা হাতে কদভানুর প্রবেশ)।
কদভানু- প্রাণবল্লভ চির সখা। আপনি আমার জীবনের জীবন। আপনি গৃহে ফিরে আসবেন বলে আমি আপনার জন্য আগেই সরবৎ তৈরি করে রেখেছি। এই নিন, সরবত পান করে আপনার শুষ্ক প্রাণ শীতল করুন। (সরবৎ প্রদান)
হাসান- দাও,- সরবত দাও। পিপাসায় আমার কন্ঠনালী একেবারে শুষ্ক হয়ে গেছে। এই সরবৎ পানে আমার পিপাসা নিবারণ করি প্রিয়ে। (সরবত পান)
(গীতকণ্ঠে বিবেক প্রবেশ)
বিবেক— (গীত)
আজ হতে তোর, ভবের লীলা শেষ।
না জানিয়ে, অসময়ে
বিষ করলি পেটে প্রবেশ।
ভবের লীলা শেষ।।
ফাতেমারো রূপের কথা
বললি কেন আলীর সেথা
সেজন্যেই তো তোদের মাতা-২
দিছে অভিশাপ
ভবের লীলা শেষ।
আজ হতে তোর
ভবের লীলা শেষ।।
(গীতান্তে বিবেক প্রস্থান)
হাসান- হায়, হায়, একি আশচৰ্য! সরবতের স্বাদ আজ এমন লাগছে কেন, কদভানু? আমার অন্তরটা এমনি ভাবে জ্বলে উঠলো কেন, কদভানু? জ্বলে গেল – পোরে গেল, আমার গলা জ্বলে গেল, কভানু। বুকটা আমার জ্বলে গেল কদভানু। আমার সর্বাংগ জ্বলে গেল। সরবতে তুমি কি মিশ্রণ করে আমাকে খাওরালে, কদভানু?
কদভানু- আমি আপনাকে সরবতই দিয়েছি স্বামী।
হাসান— সরবৎ নয়, সরবৎ নয় কদভানু। এযে হলাহল বিষ।
কদভানু— বিষ- একি বলছেন স্বামী। আপনার কথা শ্রবণে আমার কলিজা বিদির্ণ হয়ে যাচ্ছে। এরূপ কথা আজ কেন বলছেন স্বামী?
হাসান— ওঃ– কি ভীষণ, কি তীব্র জ্বালা। জ্বলে গেল, পোরে গেলো, কদভানু। তোমাকে আমি অগাধ বিশ্বাস করার এই কি ফল, কদভানু! ওঃ- বুঝেছি এতোদিনে আমার জীবন কাল পূর্ণ হয়েছে। হায়-হায়, আমি যেন ঘুমের ঘোরে শুনলাম, আজ হতে তোর ভবের লীলা শেষ। আজই মাতৃ অভিশাপ ফলবে। হায়- হায়, সত্যি কি আমি আজ বিষ পান করেছি? প্রাণাধিক প্রিয়, বল- বল প্রিয়ে, এ সরবত তুমি নিজ হাতে তৈরি করেছ, না অন্য কারো দ্বারা তৈরি করিয়েছ?
কদভানু- প্রাণ বল্লভ, চির সখা, আপনি আজ এমন কথা বলছেন কেন? অন্য কাউকে দিয়ে আমি সরবত তৈরি করাইনি- আমি নিজ হাতে সরবত তৈরি করেছি।
হাসান-ওঃ- বুঝেছি, কদভানু, আজ আমি সবই বুঝেছি। আজ আমার জীবনকাল পূর্ণ হয়েছে।নানা নূরনবী বলেছিলেন, জহর পানে আমার মৃত্যু হবে।ওঃ- কদভানু তাই তুমি আজ, কোনো এক শত্রুর চক্রান্তে সরবতের সাথে আমাকে আজ বিষপান করালে। এ দোষ তোমার নয়, কদভানু। এযে বিধির বিধান! ওঃ- এসময়ে আমার জীবনের জীবন হোসেন ভ্রাতা কোথায় রইল? ভাই হোসেন, আমার এই অন্তিম সময়ে তোমায় আমি একটি বার দেখতে পেলুম না। ওঃ- কদভানু, তুমি অতি শীঘ্র আমার জীবনের জীবন বৎস কাশেমকে ডাক।
কদভানু- কাশেম-কাশেম, তুমি অতি শীঘ্র চলে এসো, পুত্র। তুমি এসে তোমার পিতার দগ্ধপ্রাণ শীতল কর, পুত্র।
(নেপথ্যে কাশেমের মা-মা কণ্ঠস্বর-
(কাশেমের দ্রুত প্রবেশ )
কাশেম- মা-মা, আজ এতো আকুল কণ্ঠে আমায় ডাকছেন কেন, মা? একি! আব্বা, আপনার চান বদন মুখ আজ এতো কালো বর্ণ ধারণ করেছে কেন? আপনার কি হয়েছে, একবার খোলে বলুন, আব্বাজান?
হাসান- বৎস, কাশেম। আমার পেটে বিষ প্রবেশ করেছে।
কাশেম- আব্বাজান- একি বলছেন আপনি! আপনার পেটে বিষ প্রবেশ করেছে? শীঘ্র বলুন আব্বাজান, কে এমন জাহান্নামী যে, আপনাকে বিষ পান করিয়েছে?শীঘ্র খোলে বলুন, আমি এখনি তার মুণ্ডপাত করে প্রতিশোধ নেব।
হাসান– ক্রোধ সম্বরণ কর, বৎস! এখন প্রতিশোধ গ্রহণ করার সময় নয়। এখন তুমি অতি শীঘ্র তোমার কাকাজানকে ডেকে নিয়ে এসো।
কাশেম- ঠিক আছে। আমি এখনি কাকাজানকে ডেকে নিয়ে আসব। কাকা- কাকাজান-
(কাশেম দৌড়িয়ে প্রস্থান।)
হাসান- ওঃ- প্রাণাধিক প্রিয়ে। আমায় ধর। আমাকে শোইয়ে দাও। ওঃ- বড় জ্বালা। আমিযে আর স্থির থাকতে পারছিনা। আমায় চিরদিনের জন্য বিশ্রাম করাও, প্রিয়ে।
(কদভানু হাসানকে ধরিয়া শোয়াইলেন।)
কদভালু— একি বলছেন স্বামী! সত্যিই কি আপনি আজ চির বিদায় নিবেন! আপনার এদৃশ্য দেখে যে আমার কলিজা বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে, স্বামী।
হাসান- না গিয়ে যে আর থাকতে পারছি না, কদভানু।
কদভানু- স্বামী, আপনি আমায় অভিশাপ দিন, স্বামী।
হাসান- তোমাকে আমি অভিশাপ দিব না কদভানু। এতে তোমার কোনো দোষ নেই। এযে বিবিধ নির্বন্ধ। খোদা তায়ালার হুকুম ছাড়া মানুষ কোনো কর্ম করতে পারে না, কদভানু।
(হোসেনকে লইয়া কাশেমের প্রবেশ)
কাশেম— কাকা– কাকাজান, ঐ দেখুন আব্বাজান বিষের যন্ত্রনায় কেমন অচেতন হয়ে পরে রয়েছে। আব্বা― আব্বাজান। (হাসানের বক্ষে আছাড় খেয়ে পড়ল)
হোসেন- সত্যিতো দাদার চাঁদ বদন মুখ আজ কালোবর্ণ ধারণ করেছে। দাদা -দাদা, সত্যিই কি আপনি আজ এই দুনীয়ায় আমাদের একা ফেলে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন? বলুন দাদা, আপনার কি হয়েছে? একটিবার কথা বলে আমার দগ্ধ প্রাণ শীতল করুন, দাদা। (হাসানকে জড়াইয়া ধরিল)
হাসান– হোসেন, তুমি এসেছ ভাই?
হোসেন– হ্যাঁ, আমি এসেছি দাদা। বলুন দাদা, আপনার এ অৱস্থা কে করেছে? কে আপনাকে বিষ পান করিয়েছে? আপনার এ অবস্থা দেখে আমি যে আর স্থির থকতে পারছিনা দাদা।
হাসান- ভাই হোসেন, এখন অধীর হয়োনা। তোমার আমার সকলেরই একদিন মৃত্যুর পিয়ালা চাকতে হবে। কেউ এই দুনীয়ার বুকে চিরদিন থাকত পারবে না। আমার অন্তিম সময়ে তুমি যদি অধৈর্য হয়ে পড়ো তাহলে আমার প্রাণবায়ু বাহির হতে বিলম্ব হবে এবং তখন আমি খুবই যন্ত্রণা পাব, ভাই। অন্তিম সময়ে সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করা সকল মানুষেরই কর্তব্য ভাই।
হোসেন— হায় খোদা, তোমার মনেকি এই ছিল খোদা! কোন অপরাধে আমার ডাইিন হাতখানা ভেঙ্গে ফেললে প্রভু। হে- দয়াময়, বিপদভঞ্জন খোদা, তুমি না বিপদভঞ্জন নাম ধারণ করেছ? আমাকে তুমি এই মহাবিপদ হতে রক্ষা করলে না কেন খোদা। হায়-হায়, আমি যে এখন স্বর্ণপুরী মদিনা অন্ধকারময় দেখছি। দাদা- দাদা, বলুন দাদা, কে আপনাকে বিষ দিয়েছে? আমি এখনি সেই জাহান্নামীর শির কেটে এনে সমুচিত শাস্তি প্রদান করব।
হাসান- প্রাণপ্রিয় ভ্রাতা হোসেন, ক্রোধ সম্বরণ কর। এ আমার বিধির বিধান। বিধির বিধান কখনও খণ্ডন হয় না, ভাই। আমাকে আজ যে ব্যক্তি বিষ পান করিয়েছে, সে দোষী নয়। শত্রুর চক্রান্তে পরে প্রাণাধিক কদভানু আমাকে সরবতের সাথে বিষপান করিয়েছে।ভাই হোসন, কদাচ তোমরা কদভানুর প্রতি শত্রুতাভাব পোষণ কর না। নানা নূরনবী হজরত মহম্মদ (সাঃ) জীবিত কালে বলেছিলেন, জহরপানে আমার মৃত্যু হবে। নানা নূরনবীর বাক্য কখনও মিথ্যা হবে না। আজ হতে তোমাদের সঙ্গে এই আমার শেষ দেখা। এসো, এসো ভাই হোসেন, এসো বৎস কাশেম। তোমরা সকলেই আমায় ধর, আমাকে উঠিয়ে বসাও। (ধরিয়া বসাইল) এসো ভাই হোসেন, এসো বৎস কাশেম, তোমাদের দুইজনকে আমার জীবনের শেষ সন্ধিক্ষণে একবার শেষবারের মতো বক্ষে ধারণ করি। ভাই হোসেন, তোমাকে আমি কয়েকটি কথা বলব। তুমি মনযোগের সহিত শ্রবণ কর। তুমি মদিনা ছেড়ে অন্য কোথাও যেওনা, ভাই। শত্রু মিত্র সকলের সঙ্গে মিলাপীতির সহিত থাকবে। কারও সাথে কলহ এবং বিবাদ করিও না। বৎস কাশেমকে নিজ পুত্রজ্ঞানে স্নেহ করো। তোমার কন্যা সখিনার সঙ্গে কাশেমের শুভবিবাহ সমাধা করো। বৎস কাশেম-
কাশেম- বলুন পিতা-
হাসান- তুমি কখনও তোমার কাকাজানের আদেশ অমান্য করো না।তোমাদের সকলকে আর একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, তোমরা সকলেই তা মনে রেখো। আমাদের চিরশত্রু দামেস্কের বাদশাহ এজিদের সাথে যুদ্ধ করো না। আমার জীবনকাল ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে আসছে। আমি আর বসে থাকতে পারছিনা। তোমরা সদা সর্বদা পরম দয়ালু খোদা তায়লার ওপর ভরসা ও বিশ্বাস রাখবে। তিনি যখন যেভাবে চালিত করবে, তোমরা সেই ভাবেই চলবে। আরও একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি- তোমরা সকলেই বিবিগণের মান-সন্মান বজায় রেখে দুনিয়ার কাজ করবে। বিপদে আপদে সর্বদাই খোদা প্রেমে বিভোর থাকবে। তোমরা এখন আমায় শয়ন করাও। (ধীরে ধীরে শয়ন করাইল) আমার বিয়োগ বেদনায় অস্থির হয়ে কখনও খোদা তায়ালার নাম স্মরণ করতে ভুলে যেও না। ইহাই আমার শেষ উপদেশ। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন।
সকলে- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন।
হোসেন- হে পরম দয়ালু খোদা। তোমার মনে কি এই ছিলো প্রভু? আমার জীবনের জীবন দাদাকে তুমি কেড়ে নিলে? হায়-হায়, সত্যিই তো কোরানের বাণী মিথ্যা নয়। কোরানে আছে, মরণ কালে কেউ কারও সঙ্গী হবে না। হায়-হায়, আজ তাই ঘটল। প্রাণাধিক ভ্রাতা আমাদের রেখে তিনি একা চলে গেলেন। খোদার মহিমা বুঝবার শক্তি কারও নেই।
কদভানু- হে নিদারুন বিধি! এই দুখিনীর প্রতি তুমিও বাম হলে প্রভু। হায় খোদা, তোমার হুকুম ভিন্ন, দুনীয়ার কোনো কাজই হতে পারে না। এই বয়েসে তুমি আমাকে বিধবা সাজালে, খোদা। হায়-হায় আমি মায়মুনার চক্রান্তে পরে নিজ হাতে স্বামী হত্যা করলাম। আজ হতে এই দুনীয়ায় আমার নাম থাকবে স্বামী হত্যাকারিণী বলে। হে খোদা, তুমি আমায় মৃত্যু দাও খোদা, তুমি আমায় মৃত্যু দাও।
(আব্দুর রহমানের প্রবেশ)
আব্দুর রহমান- একি! স্বর্ণপুরী মদিনা আজ হঠাৎ কেঁপে উঠলো কেন? আকাশ কাঁপছে, পাতাল কাঁপছে, সমস্ত জগত কাঁপছে কেন? আজ মদিনাপুরী অন্ধকার, নিরানন্দময় দেখা যাচ্ছে কেন? ঐ যেন জীবজন্তু, পশুপক্ষী সব কেঁদে উঠলো। যেদিকে দৃষ্টিপাত করছি, সেই দিকেই শুধু ক্রন্দনের রোল শুনতে পাচ্ছি। অন্দর মহল আজ অন্ধকারময় কেন?(ভালোভাবে কান পেতে শোনে) একি! অন্দর মহলে যেন ক্রন্দনের রোল শুনতে পাচ্ছি। ঐযে কে যেন হায় হোসেন, হায় হোসেন বলে কাঁদতেছে। (অগ্রসর হয়ে) একি হোসেন, তুমি কাঁদছো কেন? কি হয়েছে, এখানে এভাবে শায়িত কে?
হোসেন- প্রাণ প্রিয় ভ্রাতা, চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছেন, মন্ত্রীবর।
আব্দুর রহমান- একি বলছ তুমি, মহাত্মা হাসান নেই?
হোসেন– নেই মন্ত্রীবর।
আব্দুর রহমান- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন। উঃ- হাসান তুমি চলে গেলে ভাই? মৃত্যুর পূর্বে তোমার মুখের একটি কথাও আমি শুনতে পেলাম না, ভাই। হে প্রভু তোমার মহিমা বুঝবার শক্তি আমার নেই। মহাত্মা হোসেন, এ সময়ে মৃত্যু শোক প্রকাশের সময় নয়। হাসানের মৃতদেহ সমাধিস্থ করা আমাদের বিশেষ প্রয়োজন। শীঘ্র আপনারা সকলে মোবারক রওজায় চলুন। সকলেই হাসেনের মৃতদেহ ধরুন। (সকলেই ধরিল) । এখন চলুন হাসানের মৃতদেহ রওজা মোবারকে নিয়ে যাই। বলুন, আল্লাহু আকবর-
সকলে- আল্লাহু আকবর।
(হাসানের মৃতদেহ লইয়া ধীরে ধীরে সকলের প্রস্থান)
* * *
দ্বিতীয় অঙ্ক অষ্টম দৃশ্য
– রওজা মোবারক-
((হাসানের মৃতদেহ লইয়া হোসেন, আঃ রহমান, কাশেম, ওহাব ও অন্যান্যর প্রবেশ)
আব্দুর রহমান– বন্ধুগণ! আপনারা শীঘ্র ইমাম সাহেবের দাপন কাৰ্য সমাধা করে ফেলুন। দাপন কার্য বিলম্বে অসুবিধা হতে পারে।
( সৈন্য সহ অলিদের প্রবেশ )
অলিদ- (বাধা দিয়া) শোন আরবীয়গণ, তোমরা এখনি এই স্থান হতে চলে খাও। আমরা এখানে কোনো মুর্দা দাপন করতে দিব না। আমার আদেশ লঙ্ঘন করলে তোমদের কঠোর শাস্তির সন্মুখীন হতে হবে।
হোসেন- কমবক্ত অলিদ। আমাকে একা দেখে তোর এতো অহঙ্কার। তুই জানিস না যার পিতা হজরত শেরে আলী(কঃ)। যে আসমান জমি ধরে করতাল বাজাতে, আজ তুই তাঁর পুত্রের সাথে রণ করতে এসেছিস? শৃগাল হয়ে সিংহের সাথে যুদ্ধ, মশক হয়ে হস্তীকে জব্দ। পাপাত্মা অলিদ! এখনো বলছি তুই এস্থান হতে চলে যা। নচেৎ-
আলিদ- নচেৎ কি করবে?
হোসেন- তোকে হত্যা করে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হাসানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব।
অলিদ- সাবধানে রসনা সঞ্চালন কর, বাচাল। এই দেখেছ আমার হাতে এখানা কি? (তরবারি দেখাইল) আমি এখনি তোমার শিরচ্ছেদ করব।
হোসেন– মন্ত্রীবর, আব্দুর রহমান! তুমি ত্বরা এসে সমশের ধর- আমি গোর্জ ধরছি।গোর্জে মেরে দুষ্ট হারামজাদ আলিদের মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তারপর দাদার দাপন কার্য সমাপন করব। আয়- আয় পাপিষ্ট পাপাত্মা, আজ এই সমাধিক্ষেত্রে তোর দর্প চূর্ণ করব।
অলিদ- সাবধান- ( তরবারি দ্বারা বাধা প্রদান)
আব্দুর রহমান- ক্রোধ সম্বরণ করুন, ইমাম সাহেব (বাধা দিলেন)
গীতকণ্ঠে বিবেক প্রবেশ
বিবেক—(গীত)-
হোসেন তোরে করি মানা
বিবাদ করোনা। ২
মৃত্যু কালে তোদের ভ্রাতা- ২
করেছে মানা, বিবাদ করো না।
হাসানের গোর দিবি যেথা
খোদা রহম করবে সেথা।
তুমি জান না।
বিবাদ করো না।
এসময়ে বিবাদ করা-২
তোমার জন্য সাজে না,
বিবাদ করো না
হোসেন তোরে করি মানা-
বিবাদ করো ना।
(গীতান্তে বিবেক প্রস্থান)
আব্দুর রহমান- ভ্রাতা হোসেন, আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। এ সময়ে বিবাদ করা সম্ভব নয়। যে অলিদের জীবন এক মুষ্ঠির আঘাতে উড়ে যেতে পারে তার উপড়ে কি সমশের চালাতে হবে? হাসানের গোরা দিব যথা খোদা তায়ালার রহম নাজেল হবে সেথা। এর জন্য চিন্তা কি? আপনারা সকলেই ইমাম সাহেরের মৃতদেহ নিয়ে অগ্রসর হোন। আপনারা সকলেই পরম দয়ালু খোদা তায়ালার নাম স্মরণ করুন। বলুন আল্লাহ-আকবর-
সকলে— আল্লাহ আকবার-
(হাসানের মৃতদেহ লইয়া প্রস্থান)
অনিদ- যাও- যাও, এমনি ভাবেই তোমাদের সকলকে একটি একটি করে হত্যা করে জাহাঁপনা এজিদের মনোস্কামনা পূর্ণ করব। সৈন্যগণ, আর চিন্তা কি! কৌশলে হাসান বধ কার্য সমাধা করেছি। এখন হোসেনকেও হত্যা করতে হবে। সৈন্যগণ, এখন তোমরা শিবিরে গিয়ে বিশ্রাম করগে’। বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ— জয়।
অলিদ— জয় দামেস্কধিপতির জয়-
সৈন্যগণ— জয়
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে অলিদ ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
অলিদ—কৌশলে জহর প্রয়োগে হাসানের প্রাণনাশ করলাম। এখন হোসেনকে কীভাবে হত্যা করব তাই ভাবছি। মহা চিন্তার বিষয়। এদের সঙ্গে সন্মুখ সমরে জয়লাভ করা অসম্ভব। কৌশলে যদি হোসেন বধ কাৰ্য সমাধা করতে না পারি তাহলে আমাদের বিপদ অনিবার্য। এখন কি করি? যদি হোসেনকে কৌশলে হত্যা করতে পারি তাহলে জাহাঁপনা এজিদের দরবারে নিশ্চয় আমার যশ ও কীর্তি বৃদ্ধি হবে। (চিন্তা করে) হ্যাঁ― উপায় পেয়েছি, কৌশলে কার্য সামাধা করতে হবে। আমি এখন হোসেনের নির্জন কক্ষে প্রবেশ করে জাহাঁপনা এজিদের নামে কুৎসা রটনা করব। হোসেনের নিকট আত্মসমর্পণ করে তাঁর মৃত্যু কোথায়, কি প্ৰকারে হবে এই বিষয়ে সন্ধান লইয়া জাহাঁপনা এজিদ সমীপে প্রেরণ করতে হবে। যাই দেখি, কৌশলে হোসেন বধকাৰ্য সমাধা করতে পারি কি-না। আর চিন্তা কি! এখনই আমি উড়ে চলে হোসেনের নির্জন কক্ষে। হাঃ-হাঃ-হাঃ (প্রস্থান)
* * *
তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য
হোসেনের নিজন কক্ষঃ-
( হোসেন একা সিংহাসনে উপবেশন করে আপন মনে বলতেছে।)
হোসেন- হে মহান করুণাময় খোদা! তোমার মহান করুণার পার নাই খোদা। তুমি কাউকে ফকির সাজাও আবার কাউকে সাজাও রাজা। আমাকে কেন তুমি, রাজা সাজালে প্রভু! আমাকে তুমি কেন রাজা সাজালে! আমাকে রাজা সাজানোর অর্খ কি? শুধু কি শত্রুর সমুখীন হওরার জন্যই? যদি তাই না হবে, তাহলে দামেস্কের বাদশাহ এজিদ আমার পরম শত্রু রূপে অন্যায় অতাচার করবে কেন? আমিতো তাঁর কোনো অন্যায় করিনি। আমি এখন একা। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন, তিনিও পরম শত্রু এজিদের কু-চক্রান্তে বিষপান করে চলে গেলেন। তোমার মহিমা বুঝবার শক্তি আমার নেই, খোদা- বুঝবার শক্তি আমার নেই।
(নত শিরে অলিদের প্রবেশ।)
অলিদ- হজরত ইমাম সাহেব, আমার বন্দেগী গ্রহণ করুন।
হোসেন-এখন তুমি কোন অভিপ্রায়ে এখানে অলিদ? তুমি আমার পরম শত্রু এজিদের প্রধান সেনাপতি। এখানে আসতে কি করে সাহস হলো তোমার?
অলিদ- না এসে থাকতে পারলুম না, ইমাম সাহেব।
হোসেন= কেন?
অলিদ- দেখুন ইমাম সাহেব, জাহাঁপনা এজিদ আপনাকে হত্যা করার জন্য কতই না অভিসন্ধি করতেছে। আপনি আমায় বিশ্বাস করুন, আমি জীবনে আর কোনোদিন আপনার বিরুদ্ধাচারণ করব না। কারণ আপনি হচ্ছেন দিনদুনীয়ার মালিক, ভবপারের কাণ্ডারী, হজরত রাসুলের বংশধর। সেজন্যই আমি আপনার অনুগত হয়ে থাকতে চাই। আমি দেখতে চাই, কেমনে দুরাচার এজিদ আপনাকে হত্যা করে।
হোসেন- অলিদ, দুষ্ট এজিদ গোলাম পুত্র হয়ে মনিব বংশের প্রতি অন্যায় অত্যাচার করতেছে। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ইসাম হাসানকে চক্রান্ত করে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে। আমাকে হত্যা করার জন্য কত ফন্দি ফিকির করতেছে। সেই ফন্দি ফিকিরের সীমা সংখ্যা নাই। কিন্ত দুষ্ট এজিদ আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে যতই অভিসন্ধি করুক না কেন, সে আমাকে কখনও হত্যা করতে পারবে না। আমার নানাজী নুরনবী হজরত মহম্মদ মোস্তফা (সাঃ) জীবিত অবস্থায় বলে গেছেন, আমার মৃত্যু কারবালা প্রান্তর ভিন্ন অন্য কোথাও হবে না। দুষ্ট এজিদের শত চেষ্টা অলীক কল্পনা ব্যতীত অন্য কিছুই নয়। (হোসেন দ্রুত প্রস্থান)
অলিদ- (হোসেনের গমন পথের দিকে লক্ষ্য করে) পেয়েছি – পেয়েছি, হোসেনের মৃত্যুর রহস্যের সন্ধান পেয়েছি। আর তোমার রক্ষা নাই হোসেন। তুমি কাকে বিশ্বাস করেছ! তুমি যাকে বিশ্বাস করে তোমার মৃত্যু রহস্য প্রকাশ করেছ, সে কে জান? সে তোমার মিত্র নয়- সে তোমার পরম শত্রু। আমাকে বিশ্বাস করা আর কাল সর্পকে বিশ্বাস করা একই কথা। তুমি তা ভাবতেই পারনি হোসেন। তোমাকে কারবালা প্রান্তরে নিয়ে গিয়ে যদি হত্যা করতে পারি, তাহলে আমি জাহাঁপনা এজিদের প্রিয়ভাজন হয়ে ভবিষ্যতে রাজাধিরাজ হতে পারব। আর চাই কি, হাসানকে যেমন কৌশলে হত্যা করেছি, তোমাকেও আমি তেমনই কৌশলে হত্যা কবর। এখনি আমি শিবিরে গিয়ে পত্র লিখে জাহাঁপনা এজিদকে সমস্ত কথা জানাব। জাহাঁপনা, আপনি আর কোনো চিন্তা করবেন না। আমি আপনার নির্দ্ধারিত সব কাজ একে একে ফতে করে ফেলব- ফতে করে ফেলব। হাঃ- হাঃ- হাঃ
(অলিদ অট্টহাসি হাসতে হাসতে দ্রুত প্রস্থান।
* * *
তৃতীয় অঙ্ক দ্ধিতীয় দৃশ্য
(এজিদের আনন্দ মহল)
(এজিদ ও পত্রহস্তে মারোয়ানের প্রবেশ)
এজিদ— অনেকদিন অতিবাহিত হয়, আজ পর্যন্ত সেনাপতি অলিদের কোনো সংবাদ পাচ্ছিনা। এর কারণ কি মন্ত্রীবর?
মারোয়ান– কোনো চিন্তা করবেন না জাহাঁপনা। এই দেখুন মহামতি অলিদ মদিনা হতে পত্র প্রেরণ করেছে।
এজিদ- অলিদ পত্র প্রেরণ করেছে? উত্তম! মন্ত্রীবর, আপনি অতিসত্বর পত্রখানা পাঠ করুন, শুনি কি লিখেছে সে পত্রে।
(মারোয়ান পত্রপাঠ)
মারোয়ান- (পত্রপাঠ) জাহাঁপনা, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি মায়মুনা কুটনি সহযোগে কৌশলে ইমাম হাসানকে হত্যা করেছি।
এজিদ- উত্তম হয়েছে। এর জন্য সে পুরস্কার পাবে। তারপর, তারপর কি লিখেছে পত্রে?
মারোয়ান- নবীজির রওজায় হাসানকে সমাধিস্থ করতে দিইনি।
এজিদ– কেন দেবে। সে উচিত বিচার করেছে।
মারোয়ান– হোসেনের প্রাণ বিনাশেরও সন্ধান পেয়েছি। কিন্ত তাঁর মৃত্যু মদিনায় হবে না।
এজিদ— মদিনায় হবে না! তাহলে কোথায়, কি উপাযে তাঁর মৃত্যু হবে?
মারোয়ান— কারবালা ভিন্ন অন্য কোথাও তাঁর হবে না। এ সংবাদ আমি গুপ্তভাবে কৌশলে সংগ্রহ করেছি। এখন আপনি এর উপায় বের করুন, জাহাঁপনা। ইতি- আপনার অনুগত– সেনাপতি অলিদ
এজিদ-মন্ত্রী মাবোয়ান।
মারোয়ান— আদেশ করুন জাঁহাপনা।
এজিদ- আদেশ নয়, আদেশ নয়, আনন্দ কর। আনন্দ উৎসবের আয়োজন কর। যে হাসান জেনে-শুনে আমার পেয়সী বিবি জয়নবকে নিকাহ করেছিলে সেই পরম শত্রু কামাতুর হাসানের মৃত্যু হয়েছে। উত্তম হয়েছে। এইবার হোসেনকেও হত্যা করতে হবে। কিন্তু কি ভাবে, কীভাবে হোসেনকে দাস্ত কারবালায় নিয়ে হত্যা করব তাই ভাবছি।
মারোয়ান- ভাববার কিছুই নেই জাহাঁপনা। এর জন্য আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু আনন্দ উল্লাসে কয়েকটি- দিন অতিবাহিত করুন। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমি আপনার চিবশত্রু হোসেনের জীবন নাশ করব। কৌশলে হীরক চূর্ণ জহর দ্বারা হাসানের জীবন সংহার করা হয়েছে, এখন হোসেনকে দাস্ত কারবালায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করতে কতক্ষণ! আপনি মাত্র নর্তকীদের নিয়ে নাচগানে মাতোরাবা হয়ে থাকুন। কোথায় নর্তকী। শীঘ্র চলে এসে। (নর্তকীর প্রবেশ) তোমরা নাচে গানে রাজসভা আনন্দে মুখর করে তুলো। আজ আমাদের মহা আনন্দের দিন। সমস্ত সাম্রাজ্য ব্যাপী আনন্দ উৎসব পালন করতে হবে।
(নর্তকী নাচগান করতে লাগল ও এজিদ, মারোয়ান বাহঃ, বাহঃ, দিতে লাগিল)
(নাচগানান্তে নর্তকী প্রস্থান)
এজিদ- মন্ত্রী মারোয়ান! এরকম আনন্দ আমার বিশেষ ভালো লাগছে না। যে পৰ্যন্ত হোসেনকে হত্যা করে নিঃষ্কণ্টক হয়ে জয়নব রত্ন লাভ করতে না পারব সে পৰ্যন্ত আমার সুখ নাই- শান্তি নাই।
মারেয়ান- জাহাঁপনা, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনার শত্রু হোসেনকে কি প্রকারে কারবালায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করব সে সিদ্ধান্তও আমি নিয়ে ফেলেছি। আমি জানি কুফাধিপতি আবদুল্লাহ জিয়াদের ‘সঙ্গে হোসেনের খুবই বন্ধুত্ব। জিয়াদের কথায় হোসেন উঠবস করে। এখন আবদুল্লাহ জিয়াদকে ধন-রত্ন এবং টাকা-পয়সা দিয়ে বশীভূত করে কৌশলে হোসেনকে কারবালায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করতে হবে। ইহা ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ে হোসেন বধ কাৰ্য সমাধা করা সম্ভব নয়।
এজিদ— কুফাধিপতিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদ কি ধন-রত্ন, টাকা পয়সায় বশীভূত হবে?
মারোয়ান— নিশ্চয়ই হবে। আমি জানি আব্দুল্লাহ জিয়াদ সদা পরের ধনে ধনী হবার চেষ্টায় থাকে।
এজিদ- বেশ, আব্দুলাহ জিয়াদকে রাজি করার জন্য বর্তমান পাঁচ লক্ষ্য টাকা পাঠাও। এর জন্য যত টাকার প্রয়োজন হবে তলব মাত্রই আমি দিতে প্রস্তুত। তার জন্য আমার রাজকোষ উন্মুক্ত রইল। আর চিন্তা কি, আমার চিরশত্রু ইমাম হাসান হোসেনকে এবং তাঁদের বংশধরগণকে হতা করে জয়নব লাভ করাই এখন আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। মন্ত্রী মারোয়ান, হোসেন বধ কাৰ্য সমাধা করার ভার তোমার ওপর আমি ন্যস্ত করলাম। (এজিদ প্রস্থান)
মারোয়ান- এর জন্য আপনি চিন্তা করবেন না, জাহাঁপনা। হোসেন বধ কার্য সমাধা করার দায়িত্ব আমি নিজেই বহন করব। আজই আমি আব্দুল্লাহ জিয়াদের নিকট নিজ হস্তে পত্র লেখে নগদ পাঁচশ টাকাসহ পত্রখানা প্রেরণ করব। যাই এখন আমি আমার কাৰ্য সিদ্ধির জন্য প্রবৃত্ত হৈগে’।হাঃ-হাঃ-হাঃ- (প্রস্থান)
* * *
তৃতীয় অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য
:কুফা শহর:-
জেয়াদ আলয়-
(পত্র হাতে আদুল্লাহ জিয়াদের প্রবেশ)
জিয়াদ— জাহাঁপনা, এজিদ বার বার আমার নিকট পত্র লিখে আমার সহায় প্রার্থনা করতেছে। এবং সাথে নগদ পাঁচ লক্ষ টাকাও পাঠিয়েছে। আর যখন যা চাইব তখনই তা তলব মাত্র দিতেও প্রস্তুত। এখন কি করি? হোসেন আমার বাল্য জীবনের বন্ধু। বন্ধুকে হত্যা করা মহাপাপের কথা। শুধু তাই নয়। ইহ জগতে আমার নাম থাকবে বিশ্বাসঘাতক বন্ধু হত্যাকাষী আব্দুল্লাহ জিয়াদ বলে। এখন আমি কোন পথ অবলম্বন করি? একদিকে মহাপাপ, অন্যদিকে বিপুল ধনসম্পদ, টাকা পয়সা। কথাটা খুবই ভাববার বিষয়! হ্যাঁ পেয়েছি, আমি জাহাঁপনা এজিদের আদেশ অনুসারে কাৰ্য করার জন্যই সিদ্ধান্ত নিলাম। হোসেনকে হত্যা করে আমি মহাধনী হব। জাহাঁপনা এজিদ আমার জন্য তাঁর ধন ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে রেখেছে, সুযোগ যখন পেয়েছি, এই সুযোগ আর হাতছাড়া করব না। আমি এখনই গুপ্ত কক্ষে গিয়ে বন্ধুবর হোসেনের নিকট একখানা পত্র লিখব। পত্রখানা পেলেই যেন হোসেন কালবিলম্ব না করে কারবালা অভিমুখে চলে আসে। হাঃ-হাঃ-হাঃ- একবার হোসেন আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে কারবালায় এলেই হলো। হাঃ-হাঃ-হাঃ- আর কি চাই! এখন আমি মন্ত্রণাকক্ষে গিয়ে পত্র লিখিগে’। হাঃ-হাঃ-হাঃ-
(প্রস্থান)
* * *
তৃতীয় অংক চতুর্থ দৃশ্য
-:ইমাম বাটিঃ
(হোসেন, আব্দুর রহমান, মোসলেম ও মদিনা বাসীগণ)
হোসেন— বন্ধু বান্ধব, মুরব্বীগণ! আপনারা সকলে স্ব-চোখেই দেখলেন, দাদা আমাদের এই নিষ্ঠুর মরুময় জগতের বুকে একা রেখে স্বর্গীয় সুখ অনুভবের জন্য চির বিদায় নিলেন। আমাকে দিয়ে গেলেন শুধু চিন্তার পাহাড়। তবে, মৃত্যুর জন্য আমি কোনো চিন্তা করি না। কারণ জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য। আমি ভাবছি পরকালের কথা। ইহ জগতের সুখ-ভোগ চিরস্থায়ী নয়। আমি আপনাদের অযোগ্য নায়ক মাত্র। দাদার মৃত্যুতে আমার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেছে। এ অবস্থায় আমি কি আপনাদের মতো সুযোগ্য বিশ্বস্ত অমাত্যগণের ওপর নির্ভর করতে পারিনা?
সকলে- নিশ্চয়ই পারেন, জ্বনাব।
হোসেন– তাহলে শুনুন বন্ধুগণ। আমার দুর্বিষহ জীবনের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আমি প্রতিমুহূর্তেই মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। এ অস্থায়ী জগতে আর যে কটা দিন বেঁচে থাকি, সেই কটাদিন আমি নির্জনে বসে খোদার প্রেমে মশগুল হয়ে থাকতে চাই।
আব্দুর রহমান- খোদাতায়ালা আপনাকে দীঘজীবী করুন।
হোসেন- কিন্তু দীর্ঘজীবী আমার কাম্য নয়, মন্ত্রীবর।
(পত্রহাতে জিয়াদের দূতের প্রবেশ।)
দূত:- বন্দেগী খোদাবন্দ। এই নিন কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদ আপনার জন্য পত্র প্রেরণ করেছেন।( হোসেনকে পত্র প্রদান)
হোসেন- পত্র! বন্ধুবর আবদুল্লাহ জিয়াদ পত্র প্রেরণ করেছেন! বন্ধুবর আবদ্ুল্লাহ জিয়েদর কুশলতো!
দূত- হ্যাঁ তিনি কুশলেই আছেন, খোদাবন্দ।
হোসেন- বন্ধুবর আব্দুল্লাহ জিয়াদের কুশল সংবাদ শোনে খুশি হলাম। যাও দূত! তুমি আজকে আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করে বিশ্রাম কর গিয়ে।
দূত– বন্দেগী খোদাবন্দ। ( অভিবাদন করে দূত প্রস্থান।)
হোসেন- (পত্রপাঠ) হে সৈয়দকুল চূড়ামণি হজরত আলী করমুল্লাহুর যোগ্যপুত্র হজরত ইমাম হোসেন। বর্তমান মাবিয়ার পুত্ৰ এজিদ দামেস্কের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে কু-প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে সর্বদা শরাবের নেশায় মত্ত। সে ধর্ম বিরোধী ও অত্যাচারী। তাঁর অত্যাচারে আমাদের কুফা বাসীগণ অসহ্য হয়ে উঠেছে। আপনাকে ব্যতীত আমরা এজিদকে কখনও খলিফা বলে স্বীকার করব না। আমি নাম মাত্র কুফার শাসক। আপনি অতিশীঘ্র এসে কুফার সিংহাসনে আরোহণ করে আমাদের মনবাসনা পূর্ণ করুন। আমাদের শানিত তরবারি কোষমুক্ত রইল। আপনার জন্য শত্রুর রক্তে বসুন্ধরা প্লাবিত করতে আমরা পশ্চাৎপদ হব না। এটাই বর্তমান কুফাবাসীদের দৃঢ় সংকল্প। এই বিষয়ে কুফাবাসীদের বিন্দুমাত্র কপটতা নাই। খোদা তায়লার মহাগ্রন্থ আল কোরাণ শ্বরীফ স্পর্শ করে বলতেছি, আপনার সঙ্গে যদি আমরা চাতুরি বা প্রবঞ্চনা করি তাহলে যেন আমরা সর্বশক্তিমান খোদা-তায়ালার গজবে পরি, এবং পরকালে নরকবাসী হই। আপনি যদি আমাদের কথায় অবিশ্বাস করে কুফা সহরে না আসেন তবে আপনার ওপর আমাদের চিরকাল দাবি থাকবে। অতএব অতিশীঘ্র আপনি কুফায় চলে আসুন। আমি আপনার আগমন প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে রইলাম। -ইতি আপনার আশ্রিত, কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদ ।
হোসেন—(পত্রপাঠ শেষে) বন্ধুগণ! বন্ধুবর আব্দুল্লাহ জিয়াদের পত্ৰপাঠে আমি পরম সন্তুষ্ট লাভ করলাম। আমি কিছুতেই আর মদিনায় থাকব না। আমি পিতার পূর্ব রাজধানী কুফা সহরে গিয়ে বাস করব। কুফাধিপতি জিয়াদ তার রাজ্য, ধন-ঐশ্বর্য, সৈন্য-সামন্ত, সমস্তই আমার নামে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আপনারা আমাকে বিদায় দিন। বেঁচে থাকলে সময় মতো আবার আপনাদের সাথে সাক্ষাৎ হবে।
আব্দুর রহমান- হজরত! আব্দুল্লাহ জিয়াদ আপনার নিকট পত্র প্রেরণ করার উদ্দেশ্য কিছুই বুঝতেছি না। এতে আমার সন্দেহ হইতেছে। আমি আপনাকে অনুরোধ করে বলছি, আপনি মদিনা ছেড়ে কোথাও যাবেন না। কুফাবাসীগণের কথা আপনি কখনও বিশ্বাস করবেন না। তাঁদের মুখে মধু, কিন্তু অন্তরে হলাহল বিষ। আপনি নিশ্চিন্তে এখানেই বাস করুন। আমাদের দেহে প্রাণ থাকতে শত্রুগণ আপনার কেশাগ্র স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারবে না।
মদিনাবাসীগণ— (সমবেত কণ্ঠে) হজরত! আপনি এখানে নিশ্চিন্তে বাস করুন। আমরা আপনার চরণ সেবা করে নিজেদের ধন্য করব।
হোসেন- আমি জানি, আপনারা আমাকে ভক্তি ও সন্মান করেন। কিন্তু আর কতকাল এখানে নিশ্চেষ্টভাবে বসে থাকব। স্থানান্তরে যেতে দোষ কি? কুফায় যেতে তো কোনোরূপ দোষ দেখতেছিনা? আমার মৃত্যু যদি সেখানে লেখা থাকে, তাহলে শত সহস্র বাধা সত্ত্বেও সেখানে যেতেই হবে।
আব্দুর রহমান- সে কথা অবশ্যেই যথার্থ। কিন্তু অগ্রে কুফাধিপতি আব্দুল জিয়াদের অভিসন্ধি এবং প্রজাগণের মনোভাব না জেনে আমরা আপনাকে মদিনা থেকে কুফায় যেতে দিব না। আপনি এখান থেকে একজন বিশ্বস্ত লোক কুফায় পাঠিয়ে দিন। সে কুফায় গিয়ে আব্দুল্লাহ জিয়াদের অভিসন্ধি ও প্রজাগণের মনোভাব জ্ঞাত হয়ে পত্র লেখবে। সেই পত্র না পাওয়া পর্যন্ত আপনাকে আমরা কোথাও যেতে দিব না।
হোসেন- আপনার মত মুরব্বীর কথা অমান্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে, কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদের মনোভাব জানবার জন্য কাকে পাঠাব তাই ভাবছি।
মোসলেম- হজরত! যদি কৃপা করে এই অধীনকে পাঠাতেন তাহলে পরমানন্দে আমি কুফায় গিয়ে কুফাধিপতির অভিসন্ধি জেনে আসতে পারতাম।এখন হজরতের ইচ্ছা।
হোসেন- ভ্রাতা মোসলেম! আমি আপনাকে কুফায় যাবার জন্য নিযুক্ত করলাম। আপনি আজই কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করুন।
মোসলেম- আপনার আদেশ আমার শিরোধার্য্য। আমি আজই কুফা অভিমুখে যাত্রা করব। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমি কুফায় গিয়ে যদি শুভ সংবাদ পাই তাহলে পত্র লেখে আপনাকে সংবাদ জানাব।নচেৎ, এই যাত্রাই হবে আমার শেষ যাত্রা। আমি আপনার কার্যে জীবন উৎসর্গ করতেও পশ্চাদপদ হব না।
হোসেন- ভ্রাতা মোসলেম! তোমাকে আমি খোদার নামে সমর্পণ করলাম। তুমি কুফায় গিয়ে যদি জীবিত থাক, তাহলে নিশ্চয়ই আবার দেখা হবে। আর যদি কুফাবসীর কু-প্রবঞ্চনায় জীবন দান কর, তাহলে পরকালে খোদার দরবারে তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে। এখন খোদা তায়ালার নাম স্মরণ করে যাত্রার আয়োজন কর গিয়ে।
মোসলেম- হে খোদা! পরোরার দেগার, তুমি আমায় কুশলে কুফা নগরে পৌঁছে দিও, মেহেরবান। আশীর্বাদ করুন হজরত! আমি যেন কুফায় গিয়ে আপনাকে মঙ্গল সংবাদ দিতে পারি। (হোসেনের পদচুম্বন করে মোসলেম প্রস্থান)
হোসেন- যাও ভাই। হঠাৎ আমার মন ভ্রাতা মোসলেমের জন্য কেঁদে উঠলো কেন? আমার মন বলছে, ভ্রাতা মোসলেমের সঙ্গে আর আমার সাক্ষাৎ হবে না।
আব্দুর রহমান- এখন চিন্তা করে কোনো ফল হবে না, হজরত!বিধির বিধান খণ্ডন করার শক্তি কারও নেই। চলুন, এখন আমরা বিশ্রামাগারে চলে যাই।
হোসেন- হে খোদা, তুমিই মঙ্গল কর্তা। তুমি সকলের মঙ্গল করো খোদা, সকলের মঙ্গল করো।
(ধীরে ধীরে সকলের প্রস্থান)
* * *
তৃতীয় অঙ্ক পঞ্চম দৃশ্য
-মোসলেম বাটি-
(পুত্রদ্ধয় সহ মোসলেমের প্রবেশ )
মোসলেম- শুন পুত্রগণ! আমি এক মহৎ দায়িত্ব নিয়ে আজই কুফা অভিমুখে যাত্রা করব। আমার অবর্তমানে তোমরা দুটি ভাই তোমাদের মাতার আদেশ মেনে চলবে।
মহম্মদ- পিতা! আপনি কিজন্য কুফা শহরে যাবেন? আমাদের খুলে বলুন পিতা।
মোসলেম- তোমরা এখনও বালক! তোমরা সেই উদ্দেশ্যের কথা শুনে কোনো ফল হবে না, পুত্রদ্বয়। বড় হলে তখন সবই বুঝতে পারবে। এখন তোমরা গৃহে চলে যাও।
ইব্রাহীম- আমি আপনার সঙ্গে যাব, পিতা ।
মহম্মদ- তাহলে আমিও যাব পিতা।
মোসলেম- পুত্রগণ! তোমাদের এতো দূরদেশে যাওয়া সম্ভব হবে না। পাহাড় পৰ্ব্বত, নদনদী, মরুপ্রান্তর অতিক্রম করে যাওয়া তোমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তোমরা তোমাদের মাতার নিকট চলে যাও। আমার অবিহনে তোমাদের মাতাকে কে শান্ত্বনা দেবে, পুত্র?
মহম্মদ- আপনি যদি যেতে পারেন তাহলে আমরা কেন যেতে পারব না,পিতা ?
মোসলেম-গমন পথে যদি বিঘ্ন ঘটে, তখন তোমাদেরকে কে রক্ষা করবে?
ইব্রাহীম — খোদা তায়ালা রক্ষা করবে, পিতা।
মহম্মদ- পিতা! আপনি যদি শত শহস্র বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে হজরত ইমাম হোসেন সাহেবের নামে জীবন উৎসর্গ করতে কুফা সহরে যেতে পারেন, তাহলে আমরা কেন পারব না, পিতা? ইমাম হোসেন সাহেবের নামে অম্লান বদনে জীবন দিতে আমরাও প্রস্তুত আছি পিতা।
মোসলেম— তোমাদের মাতাকে একা রেখে তোমরাও আমার সঙ্গে যেতে চাও, পুত্রদ্বয়?
মহম্মদ- মরণ কালে যদি কেউ কারও সঙ্গে না যায়, তাহলে আজ আমরা মাকে ফেলে চলে যাব তাতে কি ক্ষতি হবে, পিতা?
ইব্রাহীম- মরণের পরপারে আমরা আবার মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করব,পিতা।
মোসলেম- ধন্য- ধন্য পুত্রগণ! এই নব বয়েসে তোমাদের প্রভুভক্তি দেখে আমিও ধন্য। চন্দ্রসূর্যকে সাক্ষী রেখে এখনই আমরা কুফা অভিমুখে যাত্রা করব। বল, পুত্রগণ নারায়ে তাকবীর ।
পুত্রদ্বয়- আল্লাহু আকবার-
মোসলেম- নারায়ে তাকবীর-
পুত্রদ্বয়- আল্লাহু আকবার।
মোসলেম- নারায়ে তাকবীর।
পুত্রদ্বয়- আল্লাহ আকবার-
(আল্লাহ আকবার ধ্বনি দিতে দিতে দুই পুত্রসহ মোসলেম প্রস্থানোদ্যত)
সহসা গীতকণ্ঠে বিবেকের প্রবেশ।
বিবেক-(বাধা দিয়া)
যেও না-যেও না-যেও না-
কুফায় যেও না।
মোসলেম তোমায় করি মানা
কুফায় যেও না।
কুফায় গেলে মৃত্যু হবে
কুফায় গেলে মৃত্যু হবে
তুমি জাননা
কোথায় যেও না।।
মোসলেম তোমায় করি মানা
কুফায় যেওনা।
জিয়াদ রাজার দাগাবাজি,
আগে না বুঝিতে পারবি।
তোর সোনার বরণ দুটি পুত্র
ফিরে পাবি না।
কুফায় যেওনা।
মোসলেম তোমায় করি মানা
কুফায় যেও না।।
(গীতান্ত বিবেক প্রস্থান)
মোসলেম- বিধির লেখন কদাচ খন্ডন হবে না। বল পুত্রগণ নারায়ে তাকবীর।
পুত্রগণ- আল্লাহ আকবার ।
মোসলেম- নারায়ে তাকরীর ।
পুত্রদ্বয়- আল্লাহু আকবার।
(সকলের প্রস্থান।)
* * *
তৃতীয় অঙ্ক ষষ্ঠ দৃশ্য
-জেয়াদ দরবার-
(আব্দুল্লাহ জিয়াদ ও সভাসদগণের প্রবেশ)
জিয়াদ- সভাসদগণ! ‘আপনারা খুবই সতর্ক থাকবেন। কারণ কখন যে বন্ধুবর হোসেন আসেন তা ঠিক নেই। তাঁর আগমন বার্তা পাওয়া মাত্র আপনারা সকলেই গিয়ে তাঁকে সাদরে সম্ভাষণ পূর্ব্বক এনে রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করবেন। তিনি এলেই আমি সিংহাসনের গুরুভার থেকে রক্ষা পেতে পারি।
(দূতের প্রবেশ)
দূত- বন্দেগী জাহাঁপনা।
জিয়াদ– কি সংবাদ দূত ?
দূত- মদিনাবাসীগণ এসে গেছে।
জিয়াদ- মদিনাবাসীগণ এসেছেন! সভাসদগণ, আপনারা সকলেই হোসেন সাহেবকে সাদরে সম্ভাষণ পূর্বক এগিয়ে নিয়ে আসুন। সকলে বলুন নারায়ে তাকবীর-
সকলে– আল্লাহু আকবার
জিয়াদ- নারায়ে তাকবীর-
সকলে- আল্লাহু আকবার ।
( জিয়াদ ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
জিয়াদ– হাঃ হাঃ হাঃ, এইবার কিস্তিমাত। আর চিন্তা কি! এখনই আমি সকল কণ্টকের অবসান করব। ঐতো হোসেন সাহেবকে নিয়ে আসছে।
( পুত্রদ্বয়সহ মোসলেম ও সভাসদগণের প্রবেশ)
মোসলেম– নারায়ে তাকবীর।
সকলে- আল্লাহু আকবার।
মোসলেম– নারায়ে তাকবীর।
সকলে- আল্লাহু আকবার।
জিয়াদ-আমার বন্দেগী গ্রহণ করুন, হজরত। । আপনি এসেছেন? কিন্তু বন্ধুবর হোসেন সাহেব কোথায়?
মোসলেম- তিনি আসেন নি, জ্বনাব। হয়তো কয়েকদিন পরেই তিনি স্ব-পরিয়ালে চলে আসবেন। প্রভু হোসেন আমাকে তাঁর প্রতিনিধি স্বরূপ প্রেরণ করেছেন।
জিয়াদ- শোনে খুশি হলাম।আপনি এখন আসন গ্রহণ করুন, জ্বনাব। সভাসদগণ! আপনারা আজ থেকে হজরত হোসেনের পরিবর্তে মোসলেম সাহেবকেই প্রভু বলে মান্য করবেন। তিনি আজ থেকে আমাদের ইমাম। আমার ওপর যে গুরুভার ছিলো সেই গুরুভার হতে আমি রক্ষা পেতে চাই। এই সম্বন্ধে আমি আপনাদের মতামত জানতে চাই।
সভাসদগণ– মার হাবা! মার হাবা!!
জিয়াদ– উত্তম! সভাসদগণ, আমি আজ হতে আমি মুক্ত। এই রাজ্য পূর্ব্বে যাদের ছিলো, আমি আজ আবার তাদের হস্তেই অর্পণ করলাম। হজরত মোসলেম ভ্রাতা, আপনি আজ থেকে আমাদের প্রভু। আমি নিজ হস্তে আপনাকে রাজমুকুট পড়িয়ে দিচ্ছি। আপনারা সকলেই বলুন- জয় হজরত মোসলেমের জয়।
সকলে- জয়-
জিয়াদ- জয় হজরত ইমাম হোসেনের জয়।
সকলে- জয়-
(জিয়াদ মোসলেমের শিরে রাজমুকুট পড়িয়ে দিলেন)
মোসলেম- আমি আপনাদের অসীম অনুগ্রহ এবং প্রভুভক্তি দেখে অত্যন্ত সুখী হলাম। আমি আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
জিয়াদ- হজরত! আপনি নিশ্চিতে শাসনকার্য পরিচালনা করুন। আপনি আমাদের প্রতি যখন যা আদেশ করবেন আমরা সকলেই তা অম্লান বদনে পালন করব। হজরত ইমাম হোসেন এলে আমরা তাঁর নিকট বায়েত গ্রহণ করে দাসের মত তাঁর সেবায় নিযুক্ত থাকব। এখন আমরা নিজ নিজ আলয়ে প্রত্যাগমন করতে চাই।
মোসলেম– আচ্ছা, আপনারা এখন যেতে পারেন।
জিয়াদ- সভাপদণ! বলুন নারায়ে তকরীর।
সকলে— আল্লাহু আকবার।
জিয়াদ- নারায়ে তকবীর।
সকলে- আল্লাহু আকবার।
( জেয়াদ ও সভাসদগণ প্রস্থান)
মোসলেম– সত্যি আমি আজ কুফাবাসী এবং আদুল্লাহ জিয়াদের প্রভুভক্তি দেখে মুগ্ধ। এরা নিশ্চয়ই হজরত হোসেনের এতি অটল ভক্তি ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে। আব্দুল্লাহ জিয়াদ স্ব-হস্তে আমার মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিয়েছে। এদের প্রতি এখন আমাদের সন্দেহ করার কি আছে! আমি এখন অন্তপুরে গিয়ে হজরত ইমাম সাহেবকে এখানে আসার জন্য পত্র লেখব। তিনি এখানে এসে নিশ্চয়ই প্রভুত্ব বিস্তার করে সুখ-শান্তিতে দিন অতিবাহিত করতে পারবেন। হে খোদা! তোমার মহিমা বুঝবার শক্তি কারও নেই। তুমি যা ভালো বিবেচনা করো তাই করো প্রভু- তাই করো। (প্রস্থান)
(আব্দুলাহ জিয়াদ পুনঃপ্রবেশ)
জিয়াদ- হাঃ-হাঃ- হাঃ, এইবার প্রথমে মোসলেম। তারপর হোসেন। আর চিন্তা কি! মোসলেম এখন আমাদের হাতের মুঠোয় আবদ্ধ। মোসলেম ‘আমার হাত থেকে আর রক্ষা পাবে না। আগামী কল্য হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে মোসলেমকে ঘেরাও করে হত্যা করব। এখন যাই, একখানা পত্র লেখে জাহাঁপনা এজিদকে শুভ সংবাদটা জানাই গিয়ে। জাহাঁপনা, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি একে একে সব কাজ ফতে করে ফেলব- সব কাজ ফতে করে ফেলব। হাঃ-হাঃ-হাঃ- (প্রস্থান)
* * *
তৃতীয় অঙ্ক সপ্তম দৃশ্য
-হোসেন আলয়-
( পত্র হস্তে হোসেন, আঃ রহমান ও ওহাবের প্রবেশ।)
হোসেন- বন্ধুগণ, শুভাকংখীগণ! এই দেখুন, ভ্রাতা মোসলেন স্ব-হস্তে পত্র লিখে প্রেরণ করেছন।
আব্দুর রহমান- পত্রখানা পাঠ করুন, হজরত।
হোসেন-(পত্রপাঠ) হজরত ইমাম সাহেব, কুফাবাসীগণ অত্যন্ত ধার্ম্মিক এবং সহজ-সরল। এঁদের অন্তরে প্রতাড়ণার ভাবনার লেশমাত্র নাই। আমার কর্তৃত্বাধীন হয়ে এঁরা নিয়মিত ভাবে উপাসনা করতেছে, এবং চল্লিশ সহস্রেরও অধিক পুরুষ আমার হস্তে বায়েত গ্রহণ করেছে। ইসলামের এই প্রকার উন্নতি এবং পাঞ্জাতনের প্রতি তাঁদের প্রগাঢ় ভক্তি দেখে আমি অতান্ত সন্তুষ্ট হয়েছি। কুফাবাসীগণ আপনার পথপানে চেয়ে রয়েছে। অতএব আপনি কালবিলম্ব না করে কুফায় এসে শাসনকার্য পরিচালনা করুন। ইতি। আপনার চির আশ্রিত মোসলেম।
হোসেন- বন্ধুগণ! আর চিন্তা কি- আর ভাবনা কি! আবদুল্লাহ জিয়াদ এবং কুফাবাসীদের প্রতি আমাদের যে সন্দেহ ছিলো, এখন মোসলেমের পত্র পেয়ে সকল সন্দেহ দূরীভূত হলো। এতে আপনাদের মতামত কি?
আব্দুর রহমান- আমাদেরও আর কোনো সন্দেহ নেই, হজরত।
হোসেন-তাহলে চলুন, আজই আমরা কুফা অভিমুখে যাত্রা করি।
আব্দুর রহমান– তবে তাই চলুন, হজরত। ( সকলের প্রস্থান )
* * *
তৃতীয় অংক অষ্টম দৃশ্য
-এজিদ দরবার-
(এজিদ, পত্রহস্তে মারোয়ান, অলিদ, শিমার ও সৈন্যগণের প্রবেশ।)
এজিদ- আজ অনেক দিন অতিবাহিত হলো, কিন্তু কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদের কোনো সংবাদ পাচ্ছিনা কেন? এর কারণ কি, মন্ত্রী মারোয়ান?
মারোয়ান- কোনো চিন্তা করবেন না জাহাঁপনা । এই দেখুন, কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদ পত্র প্রেরণ করেছেন।
এজিদ- আব্দুল্লাহ জিয়াদ পত্র প্রেরণ করেছেন? উত্তম! পত্রখানা পাঠ করে আমাকে শুনাও তো, মন্ত্রীবর।
মারোয়ান- পেত্রপাঠ) জাহাঁপনা! ইমাম হোসেন মদিনা থেকে এগার মঞ্জিল রাস্তা অতিক্রম করে তারপর রাস্তা ভুলে কারবালা অভিমুখে যাত্রা করেছে। বীরবর মোসলেম আমার চক্রান্তে কুফা নগরে আবদ্ধ রয়েছে। অচিরেই মোসলেমের জীবন নাটকের যবনিকা পরবে। হোসেনকে বাধা না দিয়ে কারবালা প্রান্তরে নিতে পারলে আমাদের জয় অনিবার্য। এখন কি প্রকারে হোসেনকে কারবালায় নিবেন সেই উপায় চিন্তা করুন। ইতি। আপনার হিতাকাংঙ্খী- আব্দুল্লাহ জিয়াদ-
‘ এজিদ- শোন অলিদ! তুমি আমাদের প্রধান সেনাপতি। আজই তুমি শিমার, ওমর এবং নামী নামী যোদ্ধা নিয়ে গিয়ে হোসেনের ভ্রাতা মোসলেমেকে হত্যা করে ফোরাৎ তীরে গিয়ে ফোরাত নদী অবরোধ করবে। তোমরা খুব সাবধানে সতর্কতার সঙ্গে আজ্ঞাবাহী সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। কারণ তারা সবাই শেরে খোদা আলী বরাবর যোদ্ধা। তাঁদের যুদ্ধ কৌশল পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। সর্বপ্রথম তাঁদের সঙ্গে সন্মুখ সমরে অগ্রসর না হইয়া কৌশলে জয় লাভের চেষ্টা করবে। প্রথমে তাঁদের আহারাদি বন্ধ করবে। কোনো দিক হতেই যেন তাঁদের জন্য খাদ্যদ্রব্য এবং কোনো প্রকারের সাহায্য পৌঁছাতে নাপারে। ফোরাৎ নদী হতে যেন তারা এক বিন্দু পানিও আহরণ করতে না পারে এবং সেজন্য তোমরা খুব সাবধানে ফোরাৎ কূলের পহরায় নিয়োজিত থাকবে। হোসেনের চক্রান্তে বশীভূত হইয়া যাতে এক বিন্দু পানিও তাঁদের দান করা না হয় তার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক থাকবে। পানি অবিহনে হোসেন পরিজনবর্গ এবং শিশু সন্তানগণ পানি পানি বলে আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে মরলেও এক বিন্দু পানি দান করবে না। হোসেন বংশীয় কেউ যদি ফোরাৎ তীর হতে পানি সংগ্রহ করে পান করতে পারে তাহলে শত চেষ্টা করেও তোমরা যুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব হবেনা। তোমরা যে কেউ হোসেন বধ কার্য সমাধা করে তার খণ্ডিত শির আমার সামনে হাজির করতে পারবে তাকে আমি মেসের শহর ও ইরাণের বাদশাহী দান করব। এবং ঐ সংগে নগদ পাঁচ লক্ষ টাকাও উপহার দেব। অবিলম্বে কার্য সমাধা করে আমাকে সংবাদ দিবে। (প্রস্থান)
মারোয়ান- সেনাপতি অলিদ! সৈনগণকে যুদ্ধে যাত্রার আদেশ দাও। স্বয়ং আজ আমিও তোমাদের সাথে যাব সেই কারবালা প্রান্তরে। আমি দেখব, ইমাম হোসেন কত বড় যুদ্ধ কৌশলী বীর। তাঁর শত কৌশল ছিন্ন করে হোসেন বধ কাৰ্য সমাপ্ত না করে আমি দামেস্কে প্রত্যাবর্তন করব না।
অলিদ— জাহাঁপনার আদেশ আমার শিরোধার্য। আর তোমার রক্ষা নাই হোসেন। তোমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ইমাম হাসানকে কৌশলে বিষপানে হত্যা করেছি- এখন তোমাকে কৌশলে কারবালা প্রান্তরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে জাহাঁপনা এজিদ দরবারে আমি যশ ও কীর্তি স্থাপন করব। এই হত্যাকাণ্ডের কথা যেন প্রলয়কাল পর্যন্ত লোকে ভুলতে নাপারে। বিষাদ সিন্ধুর প্রতিটি পৃষ্ঠায় এই হত্যাকাণ্ডের কাহিনী অক্ষুণ্ণ থাকে। সৈন্যগণ, উড়ে চলো উল্কাবেগে সেই কারবালা প্রান্তরে। সাজো সমর সাজে, বাজাও ডঙ্কা, উড়াও নিশান। বল জয়, জাহাঁপনা এজিদের-
সকলে-জয়-
অলিদ- জয়, দামেস্কধিপতির-
সকলে- জয়।
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান)
* * *
তৃতীয় অঙ্ক নবম দৃশ্য
-সমর ক্ষেত্র-
আব্দুল্লা জিয়াদ ও দুই পুত্রসহ মোসলেমের প্রবেশ।
জিয়াদ— ভ্রাতা মোসলেম, ঐ-দেখুন রঙীন পাতাকা উড়িয়ে আমাদের চিরশত্রু এজিদের সৈনগণ কুফা অভিমুখে আসতেছে। আপনার এখন যা ভালো বিবেচনা হয়, তাই করুন। এখন আর রাজকাৰ্য নিয়ে বসে থাকা উচিত নয়। আপনি শীঘ্র যুদ্ধ ঘোষণা করুন। নছেৎ আমাদের বিপদ অনিবার্য। আমি আপনাকে রাজ্যদান করার কথা শুনেই জাহাঁপনা এজিদ আমার প্রতি ক্রোধিত হয়ে আমাকে ধরে নিতে সৈন্য প্রেরণ করেছেন। শীঘ্র এর প্রতিরোধের জন্য আদেশ করুন।
মোসলেম– ভ্রাতা আব্দুল্লাহ জেয়াদ! চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নাই। এসময়ে আমি নিজেই চলে যাব সমর ক্ষেত্রে। এজিদ সৈন্য যদি সত্যিই আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাহলে আমিও এজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আপনি শুধু আমাকে সহায় করবেন। এটাই আমার শেষ অনুরোধ। চলো পুত্রগণ! পরম দয়ালু খোদা তায়ালার নাম ভরসা করে যুদ্ধে চলো। বল পুত্রগণ, নারায়ে তাকবীর।
পুত্রদ্বয়- আল্লাহু আকবর
মোসলেম- নারায়ে তাকবীর।
পুত্রদ্বয়- আল্লাহু আকবর।
(দুইপুত্রসহ মোসলেম প্রস্থান।)
জিয়াদ- হুঃ, আমি করব মোসলেমকে সহায়। মোসলেম! তুমি এখনো আমার চক্রান্ত বুঝতে পারনি, মূর্খ। এই এক চক্রান্তেই কিস্তিমাত হবে। তোমাকে আমি এমনি ভাবে সহায় করব যেন এই জগত তা কখনও ভুলতে না পারে। আর চাই কি, এমনি ভাবেই আমার উদ্দেশ্য সাফল্যমণ্ডিত করে আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। এই কে আছিস-
(দুইজন দারোয়ানের প্রবেশ)
দারায়ান— আদেশ করুন, জাহাঁপনা।
জিয়াদ- যাও, মুখ্য ফটকদ্বার বন্ধ করে দাও। আমরা মোসলেমকে সহায় করব না। মোসলেম যেন আর প্রাসাদে প্রবেশ করতে না পারে। এজিদের সৈন্যগণ যেন মোসলেমকে ঐ যুদ্ধক্ষেত্রে ঘিরে ধরে হত্যা করতে পারে।
(দারোয়ানগণ মুখ্য ফটক বন্ধ করল।)
মোসলেম-(ফটকের বাহির থেকে)একি, ফটকদ্বার বন্ধ করল কেন? দ্বারী দ্বার খোল।
জিয়াদ- হাঃ-হাঃ-হাঃ- তুমি মরে পচে গেলেও আর ফটকদ্বার উন্মুক্ত করা হবে না, মোসলেম- ফটকদ্বার উন্মুক্ত করা হবে না। (জিয়াদ দ্রুত প্রস্থান)
(মোসলেম প্রবেশ)
মোসলেম- বাহঃ, এতো ষড়যন্ত্র। পুত্রগণ, আব্দুলাহ জিয়াদকে আর আমার বুঝতে বাকী নেই। ঐ দেখ, আব্দুল্লাহ জিয়াদ আমাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে কীভাবে ফটকদ্বার বন্ধ করে দিলে। এখন দেখছি, এই আসন্ন বিপদে আমাদের জীবন দিতে হবে। তোমরা এখন খোদার নাম স্মরণ করে সন্মুখ সমরে অগ্রসর হও, পুত্রগণ। বল, নারায়ে তাকবীর-
পুত্রদ্বয়- আল্লাহু আকবর
মোসলেম– নারায়ে তাকবীর
পুত্রদ্বয়- আল্লাহু আকবর—
মোসলেম- মানি না- মানি না তোদের ফকটদ্বার।(মোসলেম লাথি মেরে ফটকদ্বার ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করলেন) রে পাষণ্ড বিশ্বাসঘাতক সৈন্যগণ। আয়- আয়, কে আগে আক্রমণ করবি আয়।
সৈন্যসহ অলিদ ও শিমারের প্রবেশ
শিমার- মোসলেম! এখন তুমি তোমার পরমেশ্বরের নাম স্মরণ কর। মনে কর, সন্মুখে তোমার যমদূত।
মোসলেম- চুপ কর কমবক্ত। এজিদের বেতনভোগী সৈন্য। হস্তে অস্ত্র থাকতে মুখে কথা বলতে লজ্জা করে না তোর?
অলিদ- সৈন্যগণ। চতুর্দিক হতে মোসলেমকে আক্রমণ কর।মোসলেম যেন কোনোমতেই পালাতে না পারে। চালাও যুদ্ধ-
মোসলেম- আমি তোদের ভয়ে পালাব? এ তোদের অলীক কল্পনা। তবে ধর অস্ত্র।
(উভয় পক্ষে তমুল যুদ্ধ এবং যুদ্ধ করিতে করতে সকলেই প্রস্থান)
ক্লান্ত শরীরে মোসলেম প্রবেশ ।
মোসলেম– হে পরম দয়ালু খোদা! তোমার মনে কি এই ছিলো প্রভু? কুফায় বুঝি আমার জীবন দিতে হবে। হায়-হায়, আমি কি মহাভুল করেছি। আমাকে মহাপাপী হতে হলো। কেন আমি আদুল্লাহ জিয়াদের অভিসন্ধি ভালোভাবে পরীক্ষা না করে প্রভু হোসেনের নিকট পত্র লিখলাম। হায়-হায়, আমি নিজে মৃত্যুমুখে পতিত হলাম এবং প্রভু হোসেনকেও মৃত্যুর জন্য আহ্বান জানালাম। ওঃ- আমি কি মহাভুল করেছি। হে প্রিয় ভাই, হজব্রত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হে আচ্ছালামের প্রিয় নয়নমণি! আমার জন্য বড়ই পরিতাপের বিষয় এই যে, কুফাবাসীদের ও আব্দুল্লাহ জিয়াদের অভিসন্ধি ভালোরূপ না জানিয়া আপনাকে আমি এখানে আসতে পত্র লিখলাম। হায়-হায়, এস্থানে এমন একজন ব্যক্তি নাই যে, এই দুঃসংবাদ ইমাম সাহেবের নিকট পৌঁছে দিবে। হায়-হায়, কুফাবাসীগণ! তোমরা এতই বিশ্বাসঘাতক লম্পট? তোমরা না খোদার কালাম পড়ে আমার হাতে বায়েত গ্রহণ করেছ? তোমরা খোদার কালাম পর্যন্ত অবজ্ঞা করতে কুণ্ঠিত হলে না। হায়-হায়, তোমরা এতই বিশ্বাস ঘাতক হৃদয়হীন? হায় আব্দুল্লাহ জিয়াদ! তুমি পাষাণ্ড এজিদের কু-প্রবৃত্তিতে বশীভূত হয়ে ইহকাল ও পরকালের আশা ত্যাগ করতে কুণ্ঠিত হলে না । হায়রে পাপী, তোর মত মহাপাপী যেন আর জগতে সৃষ্টি না হয়।
(সৈন্য সহ অলিদ ও শিমারের প্রবেশ।)
অলিদ- সৈন্যগণ! ঐ দেখ মোসলেম পাগলের মতো পদচালনা করতেছে। এই সুযোগে তাঁকে চতুর্দিক হতে এক সংগে আক্রমণ কর।
মোসলেম– তবেরে দুরাচার কাফের সৈন্যগণ! আমার মৃত্যুই যথন তোদের কাম্য, তখন আর বিলম্ব করছিস কেন? শীঘ্র যুদ্ধ দে।
শিমার— সৈন্যগণ! আক্রমণ কর। সবাই ঘিরে ধরে মোসলেমকে হত্যা কর।
(যুদ্ধ করিতে করিতে উভয় পক্ষ প্রস্থান করিল এবং পরে ভগ্ন তরবারি হস্তে মোসলেম ও পরে অলিদ ও শিমারের প্রবেশ)
শিমার–মোসলেম, এখন তোমার রক্ষা নেই। তুমি বোলে আরবের শ্রেষ্ঠ বীর! তোমার বীরত্ব এখন কোথায় গেল?
মোসলেম- আমার তরবারিখানা যখন ভেঙ্গে গেছে, তখন সাথে সাথে আমার বল বিক্রমও শেষ হয়েছে। তোমারা বীর। তোমারা যদি বীরের মর্যদা রাখতে চাও, তাহলে আমাকে একখানা তরবারি দাও।
(তরবারি হস্তে আব্দুল্লাহ জিয়াদের প্রবেশ।)
জিয়াদ- মোসলেম! এখনো তোমার যুদ্ধের স্বাদ মিটেনি? এখনো আবার তরবারি ভিক্ষে চাইছ?
মোসলেম– হ্যাঁ- ভাই! আমাকে একখানা তরবারি ভিক্ষে দাও।
জিয়াদ– উত্তম! এই দিচ্ছি তোমাকে তরবারি। (অস্ত্রাঘাত)। পেয়েছ? পেয়েছ তরবারি?হাঃ-হাঃ-হাঃ
মোসলেম- ওঃ- বিশ্বাস ঘাতক আব্দুল্লাহ জিয়াদ! তোর হৃদয় এতো পাষাণ?
জিয়াদ– হাঃ-হাঃ-হাঃ- যত পারো আমাকে অপবাদ দাও- অভিশাপ দাও। তবু আমি চাই লক্ষ টাকা- হাঃ-হাঃ-হাঃ- লক্ষ টাকা।
মোসলেম- উঃ- খোদা! তুমি হজরত হোসেনকে রক্ষা করো, খোদা। উঃ- আমি আর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা।আমার পরপারের ডাক এসেছে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুল্লাহ– (টলিতে টলিতে প্রস্থান)
জিয়াদ— সৈন্যগণ! বল জয়, জাহাঁপনা এজিদের জয়।
সকলে- জয়
জিয়াদ— জয় দামেস্কাধিপতির জয়।
সকলে- জয়
জিয়াদ- সেনাপতি অলিদ ও শিমার। এখন আর চিন্তা কি। মোসলেমকে এখন-হত্যা করা হলো। এরপর হোসেনকে হত্যা করতে হবে।
অলিদ— নিশ্চয় করতে হবে। হোসেনকে বধ করাই এখন আমাদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য।
জেয়াদ- যদি তাই হয়, তাহলে তোমরা এখন সবাই কারবালা প্রান্তরে গিয়ে অগ্রে ফোরাৎকূল অবরোধ কর। কারবালা প্রান্তরে তোমরা খুব সাবধানে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। হ্যাঁ শোন, তোমাদের সকলকেই জানিয়ে দিচ্ছি যে, মোসলেমের পুত্র দুটিকে ধরে আমার সন্মুখে এনে দিতে পারবে তাকে আমি এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেব। এখন যাও, আর বিলম্ব করোনা। জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সকলে- জয়
জিয়াদ- বল, জয় দামেস্কধিনতির-
সকলে- জয়-
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান।)
(মোসলেমের পুত্রদ্বয় নিঃশব্দে দৌড়িয়া প্রবেশ ও ছুটাছটি করতে করতে আবার প্রস্থান।)
* * *
তৃতীয় অংক দশম দৃশ্য
:কুফার পথঃ
-রাত্রি দ্বিপ্রহর-
(মোসলেম পুত্রদ্বয়কে লইয়া কাজির প্রবেশ।)
কাজি- তোমাদের দু’জনকে আমি অনেক দূর এগিয়ে দিলুম। ঐ যে কাফেলা দেখা যাচ্ছে, তাঁরাই মদিনার যাত্রী। মদিনায় যাবে। আর কিছুদুর গেলেই তোমরা ঐ দলে মিশে যেতে পারবে। এখন তোমরা শীঘ্র গিয়ে ঐ দলের সাথে মিশে যাও।
মহম্মদ- কাজি সাহেব! আমাদের আবাজান কোথায়? তিনি কখন চলে গেছেন? আর যে ফিরলেন না। এর কারণ কি কাজী সাহেব?
কাজি- সে কথা আর কি বলব। বলতে গেলে আমার প্রাণ বিদরিয়া যায়। তোমরা শীঘ্র চলে যাও পুত্রগণ। তোমাদের পিতার কথা তোমরা পরে জানতে পারবে।(কাজির ক্রন্দন)
ইব্রাহীম-একি কাজি সাহেব! আব্বাজানের কথা বলতে গিয়ে আপনি কেঁদে ফেললেন কেন? বলুন, বলুন কাজি সাহেব, আব্বাজানের কি হয়েছে?
কাজি- পুত্রদ্বয়, তোমাদের আব্বাজানকে গতকাল কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদ চক্রান্ত করে হত্যা করেছে।
পুত্রদ্বয়- উঃ- আবাজান- আব্বাজান। কোঁদিতে লাগিল) হায়- হায়, এখন আমরা কেথায় যাই। কি করি? কোথায় গিয়ে পালাই?
কাজি:- কেঁদনা পুত্রগণ! এখন কাঁদলে আর কোনো ফল হবে না। জিয়াদ, তোমাদের আব্বাকে হত্যা করেছে এবং ধরতে পারলে তোমাদেরও হত্যা করবে। তাই যতদূর সম্ভব তোমরা এখান থেকে নিঃশব্দে পালিয়ে যাও।
মহম্মদ- পালাব কেন কাজি সাহের? আপনি কি আমাদের আশ্রয় দিবেন না?
কাজি:- না পালালে তোমাদেরকে আমি রক্ষা করতে পারব না, পুত্রগণ। আর আমি তোমাদেরকে আশ্রয়ও দিতে পারব না। আব্দুল্লাহ জিয়াদ ঘোষণা করেছে, যে কেউ তোমাদেরকে ধরে দিতে পারবে তাকে লক্ষ টাকা পুরস্কার দেবে। আরও ঘোষণা করেছে, যে তোমাদেরকে আশ্রয় দিবে তাকেও নাকি হত্যা করবে। আমি তোমাদেরকে যেটুকু সহায় করলাম, একথাও যদি আব্দুল্লাহ জিয়াদ জানতে পারে, তাহলে আমাকেও ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করবে। তোমরা এখন শীঘ্র এখান থেকে পালিয়ে যাও।
মহম্মদ- আপনি যে আমাদেরকে রক্ষা করলেন, তারজন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
কাজি- ধন্যবাদ দেবার সময় পরেও পাবে। এখন তোমরা যতদূর সম্ভব শীঘ্র দৌড়ে চলে যাও। (প্রস্থান)
মহম্মদ- চলো ভাই, শীঘ্র দৌড়ে চলো।
ইব্রাহীম- দাদা– (কাঁদতে লাগল)
মহম্মদ- কাঁদিসনে ভাই! এখন কাঁদলে আর কোনো ফল হবে না। শীঘ্র দৌড়ে চলো।
ইব্রাহীম- দৌড়ে কেন যাব, দাদা?
মহম্মদ- দৌড়ে না গেলে আব্দুল্লাহ জিয়াদের লোকে আমাদেরকে হত্যা করবে ভাই।
ইব্রাহীম- হত্যার জন্য এতো ভয় পাচ্ছ কেন দাদা? আবাজান যে পথে গেছে আমরাও সেই পথে যেতে ভয় কি দাদা?
মহম্মদ- মৃত্যুর জন্য আমি ভয় পাচ্ছিনা ভাই। আমরা দুটি ভাই দৌড়ে গিয়ে যদি প্রভু হোসেনকে কুফায় আসতে বারণ করতে পারি তাহলে দুষ্ট কাফেরগণ প্রভু হোসেনকে হত্যা করতে পারবে না। নতুবা প্রভু হোসেনকেও আব্দুল্লাহ জিয়াদ হত্যা করবে।
ইব্রাহীম– একথা যদি সত্য হয়, তাহলে শীঘ্র দৌড়ে চলো, দাদা।
মহম্মদ— তবেই চলো ভাই।
( উভয়ে দৌড়াইয়া প্রস্থান ও দৌড়াইয়া পুনঃ প্রবেশ।)
মহম্মদ- দৌড়ে চলো ভাই। দৌড়ে চলো। রাত্রি প্রায় শেয় হয়ে এলো। আমরা প্রায় মদিনায় এসে পরেছি।
ইব্রাহীম:– আমার যে আর পা চলছে না, দাদা।
মহম্মদ- আর কিছু দূর চলো ভাই। এরপর না হয় আর কিছু দূর আমি কাঁধে করে নিয়ে যাব।
ইব্রাহীম- আচ্ছা চলো দাদা।
উভয়ে দৌড়িয়ে প্রস্থান ও পুনঃ দৌড়িয়ে প্রবেশ।
মহম্মদ- দৌড়ে চলো ভাই।
ইব্রাহীম- আমি আর পারব না দাদা। আমার সর্বশরীর অবশ হয়ে আসছে। পায়ের তলায় ফুসকা পরে গেছে। এখন খানিক বিশ্রাম করে নিই। তারপর আবার পথ চলব।। কিন্তু, একি দাদা?
মহম্মদ- কি ভাই?
ইব্রাহীম- কাজি সাহেব আমাদেরকে যেখান থেকে বিদায় দিয়েছিলেন এযে সেই স্থান দাদা!
মহম্মদ– সত্যই তো ভাই। আমাদের সারা রাত্রির পরিশ্রম বিফলে গেলো।ঐতো পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। আমাদের রাত্রির সব পরিশ্রম বিফলে গেলো। ঐতো পূর্ব আকাশ ফরসা হয়ে উঠেছে। সূৰ্যের কিরণছটা ঝলমল করেছে। প্রাণের ভয়ে সমস্ত রজনী চলিলাম। হায়- হায়, সারা রাত্রির পরিশ্রম বিফলে গেলো। বড় আশা করেছিলাম আমরা দুটি ভাই প্রভু হোসেনকে কারবালা প্রান্তরে আসার পথে বাধা দিয়ে কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদের দূরভসন্ধির কথা প্রকাশ করব। কিন্তু তা বলা সম্ভব হল না। হায়-হায়, আমাদের মনের অভিলাষ পূর্ণ হলো না। তার পূর্বেই আব্বাজান যে পথে চল গেছে আমাদেরও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে।
ইব্রাইীম- দাদা, আমাদের ভাগ্যে কি ইহাই লেখা ছিলো। আমাদের এ দুর্দশা দেখে কুফাবাসীদের কারও অন্তরে কি দয়া সঞ্চার হবে না।
মহম্মদ- নারে ভাই! কুফাবাসীগণ মানুষ নয়। সবাই বিশ্বাসঘাতক।
ইব্রাইীম— দাদা!
মহম্মদ- কি ভাই?
ইব্রাইীম- আমার বড় ভয় হচ্ছে দাদা।
মহম্মদ- খোদার নাম স্মরণ কর ভাই। ঐযে নদীর তীরে একটি বাগান দেখা যাচ্ছে, চল, ঐ বাগানে গিয়ে আমরা দুটি ভাই সারাদিন লুকিয়ে থাকব। যখনই আবার সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে তখনই আমরা দুটি ভাই আবার পথ চলব। এইতো আমরা বাগানে এসে পড়েছি। এখন আমরা শীঘ্র লুকিয়ে পড়ি। (উভয়ে লুকাইল)
(উন্মাদের ন্যায় হারেশের প্রবেশ)
হারেশ- আমি বড়ই হতভগা, হায়রে হতভাগ্য জীবন আমার। আমার জীবন বোধহয় এমনি ভাবে দুখেকষ্টে কেটে যাবে। তা-নাহলে জাহাঁপনা আব্দুল্লাহ জিয়াদের আদেশে মোসলেমের পুত্র দুটিকে খুঁজছি– আর খুঁজছি, দিবা-রাত্রি অবসর নাই। খাওরা নাই, পরা নাই, কেবল খুঁজছি আর খুঁজছি। হায়রে রত্ন! কাকে ধরা দেবে? যে পাবে তাকে আর পায় কে, এক মুহূর্তেই লক্ষ টাকার মালিক হয়ে যাবে। আর আমি, – আমি শুধু খুঁজেই মরব। দেখি, আরও একটু খুঁজে দেখি। যদি ভাগ্যে মিলে, জীবিত আর ধরে নিব না। শুধু মাথা নিয়েই হাজির করব জাহাঁপনা জেয়াদ সমীপে। হাঃহাঃ হাঃ- আমি চাই শুধু মোসলেম পুত্রদ্বয়ের মাথা। যাই আবার সন্ধান করিগে’।যদি মিলে তাহলেই লক্ষ টাকা। হাঃ-হাঃ-হাঃ- লক্ষ টাকা- (দ্রুত প্রস্থান)
(কলসী কাঁখে হারেশের স্ত্রীর প্রবেশ)
হারেশ স্ত্রী- আজ তিন দিন গত হয়ে যায়। স্বামী মোর গৃহে ফিরল না। শুনেছি, জাহাঁপনা জিয়াদ নাকি ঘোষণা করেছে, যে হজরত মোসলেমের পুত্র দুটিকে ধরে দিতে পারবে তাকে লক্ষ টাকা পুরস্কার দিবে। হে ঈশ্বর, তুমি সেই পিতৃহীন বালক দুটিকে রক্ষা করো প্রভু- রক্ষা করো। ‘আমার স্বামী লক্ষ টাকার লোভে এই মহাপাপের কাজে লিপ্ত হয়েছে। যেন তাঁর মনস্কামনা পূর্ণ না হয় প্রভু- পূর্ণ না হয়। না, আমি বিলম্ব করছি কেন। যাই, জল ভরে শীঘ্র গৃহে চলে যাই। (জল ভরতে অগ্রসর হলো এবং জলের মধ্য দুটি বালকের প্রতিচ্ছবি দেখে চমকে উঠে)- কি আশচৰ্য! কি সুন্দর দুটি বালক যেন জ্বলের মধ্যে ছল-ছল নেত্রে চেয়ে রয়েছে। ঐযে একটি গাছের গহব্বর দেখা যাচ্ছে, ঐখানেই নিশ্চয় বালক দুটি লুকিয়ে রয়েছে। (অগ্রসর হয়ে) কেরে তোরা বালকদ্বয়? আমায় দেখে এখানে লুকিয়ে রয়েছিস? উঠ-উঠ, বালকগণ। কোনো ভয় নাই। আমি যে নারী- আমিযে মা!
পুত্ৰদ্বয়: মা-মা,(নিকটে এসে) তুমি আমাদের আশ্রয় দাও মা।
হারেশ স্ত্রী– কে তোমরা বালক? কেন এখানে লুকিয়ে রয়েছ?
বালকদ্বয়– আমরা হজরত মোসলেমের পুত্র। আব্বাজানের সঙ্গে আমরা দুটি ভাই মদিনা থেকে এখানে এসেছিলাম।
হারেশ স্ত্রী- তোমাদের আব্বাজানের কি হলো?
বালকদ্বয়- আমাদের আব্বাজানকে বিশ্বাসঘাতক আব্দুল্লাহ জিয়াদ চক্রান্ত করে হত্যা করেছে, মা।
হারেশ স্ত্রী:- উঃ- কি নিঠুর এই আব্দুল্লাহ জিয়াদ। (কাঁদিয়া ফেলিল)
বালকদ্বয়- সে আমাদিগকে ধরে নিয়ে হত্যা করবে মা? তুমি কি আমাদেরকে আশ্রয় দিতে পারবে, মা?
হারেশ স্ত্রী- তা হয়তো পারব। তবে-
বালকদ্বয়- তবে কি মা? তুমি আমাদেরকে আশ্রয় দাও, মা। আমাদেরকে আশ্রয় দিলে খোদার দরবারে তুমিও আশ্রয় পাবে, মা।
ইব্রাহীমঃ– আমাদের বড়ই ভয় হচ্ছে, মা। (কাঁদতে লাগল)
হারেশ স্ত্রী– কেঁদনা পুত্রগণ। তোমাদের কান্না অন্য কেউ শুনতে পেলে এখনি তোমাদের ধরে নিয়ে যাবে। তোমরা এখন আমার সঙ্গে নিঃশব্দে চলে এসো।
পুত্রদ্বয়- মা– মা, তুমি যে করুণাময়ী মা। তোমাকে আমাদের শত শত ধন্যবাদ।
হারেশ স্ত্রী:- হ্যাঁ, আমি তোমাদের করুণাময়ী মা। ধন্যবাদ দেবার সময় পরেও পাবে। এখন তোমরা নিঃশব্দে আমার সঙ্গে চলে এসো, পুত্রদ্বয়।
(পুত্রদ্বয়কে নিয়ে হারেশ স্ত্রী প্রস্থান)
* * *
তৃতীয় অংক একাদশ দৃশ্য
-হাবেশের গৃহ-
(হারেশের নিজ পুত্রদ্বয়সহ হারেশের স্ত্রীর প্রবেশ।)
হারেশ স্ত্রী- শোন পুত্রগণ। তোমাদের কাছে আমার একটি অনুরোধ। আমার একটি অনুরোধ তোমাদের পালন করতে হবে। বল, তোমরা পারবে?
পুত্রদ্বয়- কেন পারব না মা। বল মা, তোমার কি অনুরোধ পালন করতে হবে?
হারেশ স্ত্রী- আবার বল পুত্রগণ! আমি যা আদেশ করব তোমরা তা বর্ণে বর্ণে পালন করবে?
পুত্রদ্বয়- তুমি যা আদেশ করবে আমরা তা বর্ণে বর্ণে পালন করব!
হারেশ স্ত্রী— যদি বলি জীবন দিতে হবে?
পুত্রদ্বয়- আমরা জীবন দিতেও প্রস্তুত।
হারেশ স্ত্রী- তাহলে আমার পদ স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা কর, আমি যা বলব, তোমরা দুটি ভাই তাই পালন করবে।
পুত্রদ্বয়- এই আমরা তোমার পদ স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করলাম, তুমি যা আদেশ করবে আমরা দুটি ভাই তা আখরে আখরে পালন করব এবং তোমার আদেশ পালনে আমরা জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হব না, মা।
হারেশ স্ত্রী- এইবার আমি নিশ্চিন্ত। শোন পুত্রগণ, তোমরা মহাবীর হজরত মোসলেমের কথা হয়তো ভুলনি!
প্রথম পুত্র- না ভুলিনি। এমন বীর পুরুষের কথা কি ভুলতে পারি, মা। একে বৃদ্ধ বয়েস, তার উপরে ঘোরতর যুদ্ধ। তবু তাঁর মুখে আল্লাহ আল্লাহ নাম। তিনিই মহামানব, মহাবীর, মহাধার্মিক মোসলেম। এমন লোকের কথাকি ভুলতে পারি মা।
হারেশ স্ত্রী- শুনে সুখী হলাম পুত্রগণ! শুনে সুখী হলাম। ইসলামের সেই ধর্মবীরের নাম তোমাদের মুখে শুনে আমি বড়ই আনদিত। সেই মহাবীর মোগলেমের দুটি সন্তান এখনও জীবিত। তাহাদেরকে ধরে দেবার জন্য আদুল্লাহ জিয়াদ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। যে ব্যক্তি সেই দুটি বালককে ধরে দিতে পারবে সেই পাবে লক্ষ টাকা। সেই অসহায়, নিরাশ্রয় বালক দুটি যদি তোমাদের হাতে ধরা পরে তাহলে তোমরা কি করবে?
দ্বিতীয় পুত্র—তাদের রক্ষা করার জন্য আমরা জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হব না।
হারেশ স্ত্রী- ধন্য হলাম পুত্রগণ- আমি তোমাদের কথা শ্রবণ করে আমি ধন্য হলাম। আমার স্তনের দুগ্ধ আমি কালসর্পকে খাওয়াইনি। আচ্ছা পুত্রগণ, সেই দুটি অনাথ বালক এখন তোমাদের গৃহে অতিথি।
পুত্রদ্বয়- আমাদের অতিথি!
হারেশ স্ত্রী- হ্যাঁ, আমাদের গৃহে অতিথি?
প্রথম পুত্র- তাঁদেরকে কোথায় রেখেছ, মা? তাঁদের শীঘ্র নিয়ে এসো। লোকে দেখলে তাঁদের রক্ষা করা সম্ভব হবে না। শীঘ্র তাঁদের নিয়ে এসো।
হারেশ স্ত্রী:- ক্ষনেক অপেক্ষা কর পুত্রগণ! আমি এখুনি তাঁদেরকে নিয়ে আসব। (দ্রুত প্রস্থান।)
২য় পুত্র— দাদা-
১মঃ- কি ভাই?
২য় পুত্র— আমাদের বড়ই সৌভাগ্য তাই না দাদা?
১ম পুত্র- সৌভাগ্য এখনও হয়নি ভাই। ঐ দুটি বালককে যখন আমরা মদিনায় তাঁদের মায়ের নিকট পৌঁছে দিয়ে আসতে পারব তখন আমাদের সৌভাগ্য হবে। এখনও আমাদের অনেক কিছু করবার বাকী রয়েছে।
২য় পুত্ৰ- করবার আর কিছূই নেই দাদা! এই কার্যে যদি বিঘ্ন ঘটে, তাহলে আমরা দুটি ভাই হাসিসুখে জীবন দিয়ে স্বর্গে চলে যাব।
প্রথম পুত্র- আচ্ছা ভাই, তাই হবে।
(মোসলেম পুত্রদ্বয়কে লইয়া পুন: হারেশ স্ত্রীর প্রবেশ।)
হারেশ স্ত্রী: এই যে পুত্রগণ! সেই দুটি অনাথ বালক। মনে কর বালক দুটি তোমাদের সহোদর ভাই।
হা:পুত্রদ্ধয়ঃ- এসো ভ্রাতাগণ! তোমাদের আর এখন কোনো ভয় নেই। (দুইজনে দুইজনকে টানিয়া নিকটে আনিল)
মোসলেম পুত্রদ্বয়- ভাই- আমাদের রক্ষা করো, ভাই। (কাঁদিয়া ফেলল)
হাঃপুত্রদ্বয়– কেঁদনা ভ্রাতাগণ। তোমাদের আর কোনো ভয় নেই।
(নেপথ্যে হারেশ বলতে লাগল।)
হারেশ:- কে আছ, দ্ধার খোল- বলছি, শীঘ্র করে দ্বার খোল।
হারেশ স্ত্রী- ঐতো স্বামী মোর গৃহে এসেছে। তোমরা এখন শীঘ্র পালাও।
১মহারেশ পুত্র- একি বলছ মা! বাবার ভয়ে আমরা পালাব?
হারেশ স্ত্রী- আমার মন বলছে, না পালালে তোমরা এই বালক দুটিকে রক্ষা করতে পারবে না ।তোমরা এখন নিঃশব্দে এখান থেকে পালাও।
হারেশঃ((নেপথ্যে))- খোল, দ্বার খোল বলছি-
হারেশ স্ত্রী:- একি পুত্রগণ! এখনো তোমরা এখানে দাঁড়িয়ে রইলে? শীঘ্র পালাও। তোমাদের বাবা চলে গেলে তোমরা এসে বালকদ্বয়কে নিয়ে পথে বের হবে।
হারেশ পুত্রদ্বয়- এই আমরা যাচ্ছি মা। তুমি বালকদ্বয়কে শীঘ্র লুকিয়ে ফেল। বাবা এসে পড়লে এদের রক্ষা করা সম্ভব হবে না। (দ্রুত প্রস্থান)
হারেশ স্ত্রী- স্বামী বাড়ি এসে পরেছে। তাই তোমাদের এখন বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। শোন বালক! তোমরা নিঃশব্দে এখানে শুয়ে ঘুমাও। এইতো আমি বিছনা করে দিচ্ছি। আমার ছেলে দুটি তোমাদের পহরায় থাকবে। তোমারা চিন্তা কর না। স্বামী ঘুমিয়ে পড়লেই তোমাদের দামেস্ক পার করে দিয়ে আসবে। আমি এখন দ্বার খোলে দিয়ে স্বামীকে খাবার দিবার ব্যবস্থা করিগে’।
পুত্রদ্বয়- মা- মা।
হারেশ স্ত্রী– তোমরা এখন শোয়ে পড়। আমি তোমাদের ওপর কাপড় ঢাকা দিয়ে দিচ্ছি।
(পুত্রগণ শোয়ে পড়ল এবং হারেশ স্ত্রী তাঁদের ওপর কাপড় ঢাকা দিলেন।)
হারেশ স্ত্রী- আসছি স্বামী। একটু ধৈর্য ধর। এই আমি এক্ষুনি দ্বার খোলে দিচ্ছি। (ধীরে ধীরে প্রস্থান করল।)
(কিছুক্ষণ পর নিদ্রাহতে জেগে দুই ভাই কথা বলতে লাগল।)
মহম্মদ- উঠ-উঠ ভাই ইব্রাহীম। আর ঘুমাইও না।
ইব্রাহীম- এতো আকুল কণ্ঠে আমায় কেন ডাকতেছ, দাদা? একি তুমি কাঁদছ?
মহম্মদ- না কেঁদে যে আর স্থির থাকতে পারছিনা ভাই। এই দুঃখময় সংসার হইতে সুখময় স্বর্গে যাবার জন্য প্রস্তুত হও, ভাই। আমি বড়ই দুঃখের স্বপ্ন দেখেছি ভাই।
ইব্রাহীম:- তুমি এমন কি স্বপ্ন দেখলে দাদা? শীঘ্র তোমার স্বপ্নের কাহিনী আমার নিকট খোলে বল, দাদা।
মহম্মদ- আচ্ছা, তবেই শোন। আমি যেন স্বপ্নে দেখলাম স্বর্গের দ্বার উন্মুক্ত। স্বর্গীয় সৌরভে সমগ্র দুনীয়া আমোদিত। স্বর্গীয় উদ্যানে নবী(সাঃ), হজরত আলি (করমুল্লাহ), খাতুনে জান্নাতে হজরত ফাতেমা(রাঃ) এবং হজরত ইমাম হাসান(রাঃ) ভ্রমণ করতেছে। আমাদের পিতা হজরত মোসলেম তাঁদের সাথে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হজরত নবী( সাঃ) আব্বাজানকে সম্বোধন করে বললেন- মোসলেম তুমি একাই চলে এলে? তোমার স্নেহের পুত্র দুইটিকে তোমার সঙ্গে আনলে না কেন? আব্বাজান তখন করযোরে বিনীত ভাবে বললেন—হুজুর। তাঁরা শীঘ্রই এসে আপনার খেদমতে উপস্থিত হবে।
ইব্রাহীমঃ- দাদা, আমিও ঐরূপ স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নের বিবরণ কি সত্য হবে দাদা?
মহম্মদঃ- এ স্বপ্ন মিথ্যা হবে না ভাই। আমরা যেমন রাত্রি প্রভাত কালে আব্বাজানের সঙ্গে কুফায় এসেছিলাম; তেমনি ঠিক আবার স্বৰ্গে গিয়ে আব্বাজানের সাথে মিলিত হব। আর কারও বিরহ যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে না। আঃ-কি সুখের স্বপ্ন! কি আনন্দের স্বপ্ন! এই অশান্তিময় জগত হতে মুক্তিলাভ করে আমরা শান্তিময় জগতে গমন করব।
মহম্মদ- ভাই ইব্রাহীম!
ইব্রাহীমঃ- বল দাদা।
মহম্মদঃ- আবার শুয়ে শোয়ে পড় ভাই।
ইব্রাহীমঃ- তুমিও শোয়ে পর, তুমিও ঘুমাও দাদা।
(উভয়ে গায়ে কাপড় ঢাকা দিয়া শোয়ে পড়ল।)
( সন্ধানী দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে করতে হারেশ প্রবেশ)
হাবেশঃ কার, কার কণ্ঠস্বর।জন প্রাণীহীন নির্জন এই কক্ষ। তবে কে কোথায় কথা বললে? (কান পেতে নিরীক্ষণ) না- না, কোথাও কোনো শব্দ নেই।তবে এই ক্রন্দেনর রোল কোথা থেকে ভেসে এলো। কিন্তু এখন কারও সাড়াশব্দ শুনতে পাচ্ছিনা। তবে এই নির্জন কক্ষে কথা বলল কে? কার কণ্ঠস্বর আমার কর্ণে প্রবেশ করলো? কিন্তু আমি খোঁজে পাচ্ছিনা কেন? তবে এই নির্জন কক্ষে কথা বললো কে? আমি কি ভুল শুনলাম! তবে কি আমি লক্ষ টাকার মালিক হতে পারব না? না- না আমি বিচলিত না হয়ে আরও খুঁজে দেখব। (সবদিক নিরীক্ষণ করে)- পেয়েছি- পেয়েছি। নিশ্চয় এখান থেকেই শব্দ ভেসে আসছে। (কাপড় সরাইয়া মোসলেম পুত্রদ্বয়কে দেখে) হাঃ-হাঃ-হাঃ-হায়রে হতভাগ্য জীবন আমার। এমনি ভাবে যে মোসলেমের পুত্রদুটি আমাকে ধরা দেবে তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। থাক- থাক, এমনি ভাবেই ঘুমিয়ে থাক। আগে আমি তরবারিটা নিয়ে আসি। তারপর এক আঘাতেই আমি লক্ষ টাকার মালিক হয়ে যাব। আমি চাই শুধু লক্ষ টাকা- হ্যাঁ, লক্ষ টাকা। হাঃ-হাঃ-হাঃ- (হারেশ প্রস্থান)
(দৌড়িয়ে হাবেশ স্ত্রীর প্রবেশ)
হারেশ স্ত্রী- সর্বনাশ― সর্বনাশ হয়েছে! এখন আমি কেমনে এই বালক দুটিকে রক্ষা করি। হায়-হায়, স্বামী এসে এই বালক দুটিকে দেখে গেল। উঠ– উঠ পুত্রগণ! আমার সঙ্গে শীঘ্র চলো এসো। তোমাদের এক্ষুনি এখান থেকে পালাতে হবে।
পুত্রদ্বয়- মা- মা, আমরা কেন পালাব, মা?
হারেশ স্ত্রী:- না পালালে যে তোমাদেরকে আমি রক্ষা করতে পারব না, বাবা। শীঘ্র আমার সঙ্গে চলো এসো।(পালানোদ্যত)
(সহসা তরবারি হস্তে হারেশের প্রবেশ)
হারেশ- (বাধা দিয়া) আর পালাতে হবেনা শয়তানী, আমি এসে পরেছি।
হারেশ স্ত্রী- স্বামী, তুমি এই অসহায় অনাথ বালক দুটিকে রক্ষা কর।
হারেশঃ– না-না, আমি এদের রক্ষা করব না, তবে হত্যা করব।
হারেশ স্ত্রী- একি বলছেন স্বামী! এরা পিতৃহীন অসহায় বালক। এদের দেখে কার না অন্তরে দয়া উদ্রেক হয়! তুমি এদের রক্ষা করো, স্বামী। অসহায়কে রক্ষা করা মানুষের ধর্ম, স্বামী।
হারেশ:- ধর্ম— ধর্ম-ধর্ম, রসাতলে যাক ধর্ম।এ সংসারে বেঁচে থাকতে হলে টাকাই হলো বড় ধর্ম। টাকা না থাকলে কোথাও সন্মান পাওয়া যায় না। দুঃখে কষ্টে জীবন যাপন করতে হয়, জানিস শয়তানী!
হারেশ স্ত্রী:- দুঃখে কষ্টে জীবন যাপন করাও যে ভালো স্বামী। পাপ টাকায় পরকালে উদ্ধার পাওয়া যাবে না। বরং নরকের পথ উজ্বল হয়ে উঠবে, স্বামী। তুমি তো জানো, হজরত মোসলেমের পুত্র দুটিকে ধরে দিলে আব্দুল্লাহ জিয়াদ তাঁদেরকে হত্যা করবে। তাহলে কি তুমি এই সোনার চাঁদ বালক দুটিকে হত্যার জন্য দায়ী হবে না? পরকালে রোজ কিয়ামতে অকুলের কাণ্ডারী হজরত নবী (সাঃ) এর সামনে তখন কেমনে দাঁড়াবে? হায় —হায়, যে কথা স্মরণ করলে বুক ফেটে যায়, সর্বশরীর ভয়ে কেঁপে উঠে, তাহলে মানুষ এমন কাজ কেমনে করে? অর্থলোভে অনর্থ ঘটবে। মহাপাপের ভাগীও হবে। অর্থলোভে এই অনাথ বালক দুটিকে হত্যা করে তোমার হাত দুখানা কলংকিত করোনা। আমাদের অর্থের প্রয়োজন নেই। তুমি যদি চিরজীবন বসে খেতে চাও, তাহলে আমি দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা মেগে তোমাকে খাওয়াব। তবু তোমাকে আমি এমন পাপকার্য্ করতে দেব না।
হারেশ:- রাখ শয়তানী তোর সাধু উপদেশ। এই সমস্ত সাধু উপদেশ আমি অনেক শুনেছি। যে ব্যক্তি মেয়ে মানুষের কথা শুনে সে এই জগতে কাপুরুষ ব্যতীত অন্য কিছুই নয়। একালে যার সুখ নাই, পরকালেও তার সুখ হয় না, জানিস শয়তানী। দে– দে, ছেলে দুটিকে আমার হাতে তুলে দে। আমি এদেরকে হত্যা করে লক্ষ টাকা লাভ করব।
হারেশ স্ত্রী: ওগো স্বামী; তুমি আমার স্বামী। আমি তোমার সহধর্মিনী-স্ত্রী। তুমি দয়া করে এই বালক দুটিকে রক্ষা করো।তোমার নিকট আমি এই বালক দুটির জীবন ভিক্ষা চাই। তুমি এই অনাথ বালক দুটিকে রক্ষা করো।
হারেশ:- হবে না। এই বালক দুটিকে মরতেই হবে।
হারেশ স্ত্রী:- কেন মরতে হবে? জেনে রাখ, আমি এই বালক দুটিকে স্বেচ্ছায় তোমার হাতে তোলে দিব না।
হারেশ- কি তুই বালক দুটিকে স্বেচ্ছায় আমার হাতে তুলেদিবি না?
হারেশ স্ত্রী- না, আমি দেব না। দেব না- দেব না-দেব না।
হারেশ:- বেশ, আমি জোর করেই ছিনিয়ে নেব এই বালক দুটিকে। দেখি কে এদের কে রক্ষা করে। (পুত্র দুটিকে ধরে টানতে লাগল।)দে দে, পুত্র দুটিকে আমার হাতে তুলে দে।
(এমন সময় তরবারি হাতে হারেশ পুত্রদ্বয়ের প্রবেশ )
হারেশ পুত্রদ্বয়- সাবধান পিতা। আমরা দুটি ভাই জীবিত থাকতে এই বালক দুটির কেশাগ্র পর্যন্ত আপনি স্পর্শ করতে পারবেন না।
হারেশ- কি, পুত্র হয়ে পিতার কার্যে বাধা দিবে?
প্রথম পুত্র– হ্যাঁ পিতা, তুমি যদি অর্থলোভে মহাপাপ কার্যে লিপ্ত হতে পারো; তাহলে আমরা কি আদর্শ মাতৃগর্ভে জন্ম ধারণ করে তা প্রতিবোধ করতে পারব না? শুধু তাই নয়, এমন পাপিষ্ঠ পিতার বক্ষের ওপর বসে হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হব না।
হারেশ:- পুত্রদ্বয়। আমি পরের ছেলের মাথা কাটব তাতে তোদের ক্ষতি কি?
২য় পুত্র- আমাদের সম্মুখে পরের ছেলের মাথা কাটবে, এতে কি আমাদের পাপ হবে না? এখনো বলছি পিতা, যদি পরকালের মঙ্গল চাও, তাহলে দুটি বালক দুটিকে রক্ষা করো।
হারেশঃ– হবে না,— হবে না রক্ষা। আমার সম্মুখ হতে সরে যাও, নছেৎ আমি তোদেরকেও হত্যা করব।
১ম পুত্র- চলে যাব? না পিতা, বিনা যুদ্ধে এই বালক দুটিকে তোমার হাতে তুলে দিব না।
হারেশ– বাঃ রে বাঃ! আশা ছিলো কি আর হলো কি। আমার কার্য্যে এতো বাধা কেন! না- না, আমি আর কারো বাধা মানব না। দে– দে, ছেলে দুটিকে ভালোয় ভালোয় আমার হতে তুলে দে। তোদের জন্য আমি লক্ষ টাকা থেকে বঞ্চিত হতে পারব না। আয়– আয় অবাধ্য পুত্রদ্বয়, অগ্রে তোদের যুদ্ধের পিপাসা মিটিয়ে তারপর এই দুটি বালককে হস্তগত করব। হাঃ-হাঃ-হাঃ- (যুদ্ধে জন্য অগ্ৰসর)
পুত্রদ্বয়- তবেই তাই হোক, ধর অস্ত্র। আজ পিতাপুত্রের রক্তে বসুন্ধরা রঞ্জিত হবে। মা-মাগো, আমরা এই যুদ্ধে জীবন দিলেও তুমি এই বালক দুটিকে রক্ষা করো।
হারেশ— আর রক্ষা করতে হবে না। অস্ত্র ধর।
(যুদ্ধ ও যুদ্ধ করতে করতে প্রস্থান।)
মহম্মদ ও ইব্রাহীম- মা, মাগো, তুমি আমাদের রক্ষা করো।(হারেশ স্ত্রীকে জড়াইয়া ধরল)
হারেশ স্ত্রী- কেঁদ না বালকগণ! তোমরা নিঃশব্দে আমার সঙ্গে চলে এসো।
(মোসলেম পুত্রদ্বয়কে লইয়া হারেশ স্ত্রী প্রস্থানোদ্যত এমন সময় অবস্থায় রক্তাক্ত শরীরে উম্মাদের ন্যায় হারেশের প্রবেশ ।)
হারেশ- বালক দুটিকে আর নিয়ে যেতে হবে না শয়তানী। আমি এসে পরেছি। আমি এদেরকে হত্যা করে লক্ষ টাকা লাভ করব।
হারেশ স্ত্রী- কি আমি বেঁচে থাকতে আমার সন্মুখে এই অনাথ বালক দুটিকে হত্যা করবে? আমি তা কখনও হতে দেব না-
হারেশ:- তবেরে অবাধ্য নারী। আমি এখনো বলছি, আমার কাৰ্যে বাধা দিসনে। আমি আজ স্নেহ, মায়া, মমতা সবই বিসর্জন দিয়েছি, জানিস শয়তানী?
হারেশ স্ত্রী- জানি- জানি স্বামী! তবু আমি এই রত্ন দুটিকে তোমার হস্তে তুলে দেব না- কখনও না!
হারেশ- কি দেবে না? অবাধ্যতার শাস্তি কি তা তুই জানিস? তোরই কথায় আমার পালিত পুত্র ও ঔরষজাত সন্তান আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিলো। এই দেখ—– দেখ শয়তানী। ( রক্তাক্ত হাত দুখানি দেখাইল।) আমি আজ পুত্র রক্তে স্নান করে এসেছি। তবু আমার চাই লক্ষ টাকা। হাঃ-হাঃ-হাঃ
হারেশ স্ত্রী- উঃ-রাক্ষস স্বামী! তুমি পিতা হয়ে পুত্র হত্যা করেছ? তবু তোমার রক্ত পিপাসা মিটল না। ওগো স্বামী, আমি বিনয় করি, তোমার চরণ ধরি তবু তুমি ক্ষান্ত হও। ভেবে দেখ, যা করেছ, তারা আর ফিরবে না। একবার চেয়ে দেখ, তোমার পুত্রদ্বয় রক্তাক্ত কলেবরে তোমার দিকে চেয়ে রয়েছে। আমি এখনও তোমাকে বলছি, তুমি দয়া করে এই অনাথ বালক দুটির প্রতি দয়া কর।
হারেশ- দয়া-দয়া-দয়া! আমার এখন দয়া করবার অবসর নেই। আমার চাই লক্ষ টাকা। দে- দে, ছেলে দুটিকে আমার হাতে তোলে দে।
হারেশ স্ত্রী- আমি বেঁচে থাকতে, আমার দেহে প্রাণ থাকতে, আমার সন্মুখে কখনও এই বালক দুটিকে হত্যা করতে দিব না। আগে আমাকে হত্যা কর, তারপর যা ভালো বিবেচনা হয় তাই করো।
হারেশ- কি দিবে না? তাহলে দেথ শয়তানী তোর অবাধ্যতার শাস্তি। (তারবারি দ্বারা স্ত্রীর বক্ষভেদ করল)
হারেশ স্ত্রীঃ- উঃ! বালকগণ! আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারলুম না। তোমরা আমাকে ক্ষমা করো – ক্ষমা করো। (জমিনে ঢলে পরল)
ইব্রাহীম ও মহম্মদ- মা, মাগো। (হারেশ স্ত্রীর বক্ষে আছাড় খেয়ে পড়ল।) তুমিও চলে গেলে? এখন আমাদেরকে কে রক্ষা করবে মা? তুমি কথা বল মা। তুমি একটিবার সাড়া দাও, মা।
হারেশ- আয় – আয়, আর কেউই তোদের ডাকে সাড়া দিবেনা। নিঃশব্দে আমার সঙ্গে চলে আয়। আমি তোদের কে হত্যা করে লক্ষ টাকা লাভ করব।
মহম্মদ- তাহলে তুমি আমায় আগে হত্যা কর।
ইব্রাহীম- না-না, আমায় আগে হত্যা কর।
হারেশ: কাউকে আগ-পাছে হত্যা করব না। আমি তোদের দুইজনকে এক সঙ্গে হত্যা করব।
ইব্রাহীম- (গান) আমাকে মেরোনা হারেশ গো।
ও-হারেশ ধরি দুই চরণে গো
‘আমাকে মেরনা হারেশ গো।
আমাকে, মারিলে হারেশ
ও- হারেশ কাঁদবে আমার মায়ে গো।
আমাকে মেরনা হারেশ গো।
পিতা মরিল কোফা সহর
ও- হারেশ আমরা দুই ভাই অনাথ গো।
আমাকে মেরনা হারেশ গো।
খোদায় যদি বেহেস্তে নেয় গো
ও- হারেশ তোমায় নিব আগে গো।
আমাকে মের না হারেশ গো।
আমাকে মেরোনা হারেশ গো
ও হারেশ ধরি তোমার পায়ে গো।
আমাকে মের না হারেশশ গো। (গীত অন্ত)
মহম্মদ ও ইব্রাহীম– হারেশ! তুমি আমাদেরকে হত্যা না করে মদিনায় পৌঁছিয়ে দাও।
হারেশ:- মদিনায় পৌঁছিয়ে দেব। হাঃ-হাঃ-হা:- আমি তোমাদেরকে মদিনায় পৌছিয়ে দেব। তার আগে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও বালকগণ।
মহম্মদ ও ইব্রাহীমঃ-(গান)
কেঁদে ‘আকুল, হবে গো আমার মা দুখিনী-২
আকুল হইবে মায়ে গো
ও-হারেশ গলে লইবে ছুরি গো
আমার মা দুখিনী।
কেঁদে আকুল হবে গো,
আমার মা দুঃখিনী
আমাকে মারিলে হারেশ গো
ও- হারেশ কাঁদবে আমার মায়ে গো
আমার মা দুঃখিনী।
কেঁদে আকুল হবে গো—
আমার মা দুঃখিনী।
আমরা বিনে আমার মায়ের গো
আর তো কেহ নাই গো
আমার মা দুঃখিনী।
কেঁদে আকুল হবে গো,
আমার মা দুঃখিণী।
খোদায় যদি বেহেস্তে নেয় গো
ও-হারেশ তোমায় নিব আগে গো
আমার মা দুঃখিনী।
কেঁদে আকুল হবে গো,
আমার মা দুখিনী। (গীত অন্ত)
ইব্রাহীম— বাবা হারেশ! তুমি আমাদের প্রতি একটু দয়া কর। আমাদের বংশের প্রতি কৃপাদৃষ্টি কর। আমাদের প্রতি দয়া করলে শেষে তুমি স্বৰ্গলাভ করতে পারবে।
হারেশ- স্বর্গ— স্বর্গ-স্বর্গ! স্বৰ্গ অনেক দূরে বালক। চাইনা আমি স্বর্গ- চাইনা আমি মানুষের শুভেচ্ছা। আমি চাই শুধু লক্ষ টাকা-হাঃ- হাঃ-হাঃ- আয়– আয় নিঃশব্দে চলে আয় আমার সঙ্গে।
(পুত্রদ্বয়কে টানিয়া লইয়া হারেশ প্রস্থান।)
* * *
চতুর্থ অঙ্ক প্রথম দৃশ্য
– জেয়াদ রাজ দরবার-
আব্দুল্লাহ জিয়াদের প্রবেশ।
জিয়াদঃ- কয়েকদিন অতিবাহিত হয়, ঘোষণা করা হয়েছে যে, মোসলেমের পুত্র দুটিকে যে ধরে দিতে পারবে, তাকে লক্ষ টাকা পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই বালক দুটিকে কেউই ধরে এনে আমার রাজদরবারে হাজির করতে পারলে না। এর কারণ কি? তবে কি, মোসলেমের পুত্র দুটিকে কেউ মদিনায় পৌঁছে দিয়েছে, না পালিয়ে মদিনা চলে গেছে! আমার জন্য এটা খুবই চিন্তার বিষয়। তবে কি আমার অভিলাষ পূর্ণ হবে না!
(মোসলেমের পুত্রদ্বয়ের ছিন্নমুণ্ড নিয়ে অট্টহাসি হাসতে হাসতে হারেশ প্রবেশ)
জিয়াদঃ— কে,– কে তুমি? কোন অভিপ্রায়ে উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে রাজদবারে প্রবেশ করলে? বল, কে তুমি?
হারেশ- হাঃ-হাঃ-হাঃ- এই দেখুন জাহাঁপনা। (ছিন্নমুণ্ড দেখাইল।) লক্ষ টাকা, হাঃ-হাঃ-হাঃ-আমি চাই শুধু লক্ষ টাকা।
জিয়াদ- এ তুমি করেছ কি? বিশ্বাসঘাতক, পাষণ্ড- শয়তান। বল-বল শয়তান এই ছিন্ন শির দুটি কার?
হারেশ- জাহাঁপনা! এই ছিন্ন শির দুটি হজরত মোসলেমের দুই পুত্ৰের। আমি আপনার আদেশ পালন করেছি, জাহাঁপনা। আমাকে এখন লক্ষ টাকা দিয়ে বিদায় করুন।
জিয়াপঃ-নিষ্ঠুব, বেইমান, হারামজাদ। কোন প্রাণে তুমি এই সোনার চাঁদ বালক দুটিকে হত্যা করেছ? আমি কি মোসলেমের দুই পুত্রের ছিন্নমুণ্ড আনতে আদেশ করেছিলুম- না জীবন্ত ধরে আনতে আদেশ করেছিলুম?
হারেশ- জাহাঁপনা! ছিন্নমুণ্ডইতো আপনার কাম্য। জীবন্ত ধরে এনে দিলেওতো আপনি এই বালক দুটিকে হত্যাই করতেন। তাই আমি বড় কষ্ট করে এই দুটি ছিন্নমস্তক আপনার দরবারে হাজির করেছি। এখন আমার প্ৰাপ্য টাকা দিয়ে আমাকে আপনি বিদায় করুন, জাহাঁপনা।
জিয়াদ- সে বিচার আমি করতাম। বিচারে হয়তো আমি তাদের মুক্তিই দিতুম। বল- বল শয়তান, তুই কার আদেশে এমন সুন্দর বালক দুটিকে হত্যা করেছিস?
হারেশ- জাহাঁপনা! হত্যা না করে উপায় ছিল না। এই বালক দুটিকে হস্তগত করতে গিয়ে আমি আরও তিনটি জীবন নাশ করেছি। কারণ তারা এই বালক দুটিকে ধরে আনতে বাধা দিয়েছিলো। তাই নিরুপায় হয়ে জাহাঁপনার আদেশ পালনার্থে আমি তাদেরকে আগে হত্যা করেছি। তারপর এই বালক দুটিকে হত্যা করে ছিন্নমুণ্ড দুটি আপনার দরবারে হাজির করেছি। এখন আপনি আমার প্ৰাপ্য টাকা দিয়ে আমাকে বিদায় করুন, জাহাঁপনা। টাকা নিয়ে আমি আনন্দ করতে করতে গৃহে চলে যাই।
জিয়াদ- হ্যাঁ- লক্ষ টাকা তুমি পাবে। তবে তোমাকে ক্ষনেক অপেক্ষা করতে হবে। লক্ষ টাকা দিয়ে তোমাকে আমি চির বিদায় দিব। তার আগে বলতো লোভী, এই বালক দুটিকে হস্তগত করতে গেলে কে কে তোর বিরোধিতা করেছিলো?
হারেশ- আমার একটি পালিত পুত্র আর একটি ঔরষজাত সন্তান। আর অন্য একজন আমারই স্ত্রী।
জিয়াদঃ- নিষ্ঠুর— বেইমান-কুলাঙ্গার-পাষণ্ড।
হারেশ- জাহাঁপনা! শীঘ্র আমার পাপ্য টাকা দিয়ে আমাকে বিদায় করুন।
জিয়াদ— হুঁ― তোমাকে আমি এখনই বিদায় করব। তোমাকে বিদায় না করলে খোদার দরবারে যে আমাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে। তোমার মত নিষ্ঠুর, নরপিচাশ, অর্থলোভী, কুলাঙ্গারকে উপযুক্ত পুরস্কার দিয়েই বিদায় দিতে হবে। তুমি এতবড় অর্থলোভী পিচাশ যে, টাকার লোভে নিজের স্ত্রী পুত্রকেও হত্যা করতে কুণ্ঠিত হওনি। যে ব্যক্তি টাকার লোভে নিজের বংশ নিজেই ধ্বংস করতে পারে তার মুখ দর্শন করাও মহাপাপ। তুমি আমার বিনা আদেশে পাঁচটি জীবন নাশ করেছ। এইবার আমি তোমার টাকার পিপাসা মিটিয়ে দিব।
হারেশ- দিন জাহাঁপনা! আমার প্রাপ্য টাকা দিয়ে আমাকে বিদায় করুন। মহানন্দে গৃহে চলে যাই।
জিয়াদ- চুপ কর নরপিচাশ। এই কে আছিস।
(ঘাতকের প্রবেশ।)
ঘাতক:- আদেশ করুন, জাহাঁপনা।
জিয়াদ- শৃংঙ্খলিত কর এই অর্থলোভী নিষ্ঠুর পাষণ্ডকে।
ঘাতক- জাহাঁপনার আদেশ শিরোধাৰ্য। (হারেশকে বন্দী করল।)
জিয়াদ- এই অর্থলোভী নরপশু টাকার লোভে সব কিছুই করতে পারে। একে ফোরাৎতীরে নিয়ে যাও। যেখানে এই পাষণ্ড নিজ পুত্র ও নিজ স্ত্রীকে হত্যা করেছে সেই স্থানে একে অর্দ্ধপ্রোথিত করে পাথর মেরে হত্যা করবে এবং এর শরীর শৃগাল কুকুরের উদরস্থ করাবে। এই বেইমানের মৃত্যু সংবাদ শুনে যেন দুনিয়ার কেউ এমন পাপকার্যে লিপ্ত হতে সাহস না করে। যাও,নিয়ে যাও আমার সন্মুখ হতে এই পাষণ্ডকে। (জিয়াদ প্রস্থান।
ঘাতক- আয়– আয় শয়তান। ফোরাৎতীরে নিয়ে গিয়ে এখনই তোর জীবন লীলার অবসান করব।
হারেশ- ঠিক হয়েছে। জাহাঁপনা উচিত বিচারই করেছে। আমি স্ত্রীর রক্তে স্নান করেছি ও পুত্রের রক্তে বসুন্ধরা সিক্ত করেছি, আমার শাস্তি এমনি হওয়াই উচিত। চলো, ঘাতক আমাকে ফোরাৎতীরে নিয়ে চলো।
ঘাতক- আয় – আয় বেইমান।
(হারেশকে টানিয়া লইয়া ঘাতকের প্রস্থান।)
* * *
চতুর্থ অঙ্ক দ্বিতীয় দৃশ্য
কুফা অভিমুখে যাত্রা-
কারবালা প্ৰান্তর-
(হোসেন, আব্দুর রহমান, ওহাব, কাশেম, আলি আকবর, জয়নাল আব্দীন, কদভানু, জয়নব, সখিনা ও অন্যান্য আত্মীয় বন্ধুবান্ধব সহ প্রবেশ করে পদচালনা করতে লাগল। হঠাৎ একটি করুণ সুর বেজে উঠল এবং সকলেই তা উৎকর্ণ হইয়া শুনতে লাগল।)
গীতকন্ঠে পথিকের প্রবেশ।
পথিক গীত-
মদিনা ছাড়িয়া হোসেন
এলো কারবালায়।-২
কারবালাতে নাইরে পানি
উঠলো হাহাকার।-২
আজগুবি এক শব্দ উঠলো
শব্দে বলছে হায়রে হায়।-২
মদিনা ছাড়িয়া হোসেন
এলো কারবালায়।
হোসেনেরো ঘোঁড়ার পদ
জমিনে দাবায়।-২
বৃক্ষ হতে টাটকা রক্ত
পরে জমি ভেসে যায়।
কুফার রাস্তা ভুলে গিয়ে
এলো কারবালায়া।-২
ভাই বেরাদর আত্মীয় স্বজন
সব হারাইবে কারবালায়।-২
মহরমের এক তারিখে
এলো কারবালায়।
মাতামহের ভবিষ্যত বাণী
ফলবে তোমার কারবালায়।
আকাশ কাঁদছে পাতাল কাঁপছে
কাঁদছে ফতেমায়
ফতেমার ক্রন্দন শুনে
আল্লায় বলছে হায়বে হায়।
ফেরেস্তা কাঁন্দিয়া বলছে
পরোয়ার দেগার।
তোমার খেলা তুমি খেলো
জীরের বুঝা হলো দায়।
মদিনা ছাড়িয়া হোসেন
এলো কারবালায়।
(গীতান্তে পথিক প্রস্থান।)
হোসেন- বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়গণ, তোমরা সকলেই পরম দয়ালু খোদা তায়ালার নাম স্মরণ কর। তাপস বলে গেল, মদিনা ছাড়িয়া হোসেন এলো কারবালায়। একি! সত্যিইতো আমার ঘোঁড়ার পদ জমিনে ডাবিয়েছে। তাহলে এই বুঝি সেই কারবালা! হায়-হায়, নানা নূরনবী হরজত মোস্তফা(সাঃ) জীবন কালে এই কারবালার কথাই বলেছিলেন। উঠলো হাঁহাকার। মুরব্বীগণ, বিবিগণ, বন্ধুগণ, তোমরা- আর অগ্রসর হইওনা। তোমরা এখানেই শিবির নির্মাণ কর।
ওহাব- হজরত ইমাম সাহেব! আমরা শিবির নির্মাণের জন্য যে বৃক্ষেই কুঠারাঘাত করছি সেই বৃক্ষ হতেই রক্ত নির্গত হচ্ছে, এর কারণ কি হজরত?
হোসেন- ইহা পরম দয়ালু খোদা তায়লার ইংগিত ভিন্ন অন্য কিছুই নয়। যে ভুমিতে রক্ত ভিন্ন অন্য কিছূই দেখা যায় না, সেই স্থানেই আমার মৃত্যু অবধারিত। এই সেই ভূমি। এই স্থানেই আমাদের সকলেরই পবিত্র খোদার নামে জীবন উৎসর্গ করতে হবে। এই স্থানেই শত্রু হস্তে আমার মস্তক বিছিন্ন হয়ে দামেস্কধিপতি এজিদের রাজদরারে প্রেরিত হবে। এখন চলো আমরা শিবির নির্মাণ করে শত্রুদের গতিরিধি পরীক্ষা করিগে’। (সকলের প্রস্থান)।
* * *
চতুর্থ অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য
-ফোরাত তীর –
– অলিদ শিবির-
(মারোয়ান, অলিদ, শিমার ও সৈনগণের প্রবেশ।)
মারোয়ান- সৈন্যগণ, তোমরা খুব সাবধানে ফোরাতীর অববোধ করবে। ঐযে শিবির দেখা যাচ্ছে, ঐ শিবিরই আমাদের চির শত্রু হোসেনের শিবির। ঐ শিবির হতে কোনো লোক যেন ফোরাৎ নদী থেকে এক ফোটা পানিও নিতে না পারে। আমাদের সৈনদের মধ্য যদি কেউ হোসেনের বাক চাতুর্যে ভুলে তাকে সহায় করে এবং জাহাঁপনা এজিদের আদেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে হত্যা করে ক্ষুধার্ত কুকুরের উদরস্ত করা হবে। যখন হোসেন ও তাঁর আত্মীয়স্বজন, শিশুসন্তানগণ পানি বিহনে কাতর হয়ে হায়-হুতাশ করবে, তখন তোমরা চতুর্দিক হতে তীর বর্ষণ করে তাঁদের একটি একটি করে পশুর মত হত্যা করবে। ঐ- হোসেন শিবির হতে পানি নিতে আসতেছে। শীঘ্র ফোরাত তীর অবরোধ কর। আমি এখন আমার কাৰ্যে চললাম। (প্রস্থান)
অলিদ- সৈন্যগণ, প্রস্তুত হও। শীঘ্র অগ্রসর হও। বল, জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়–
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির
সৈন্যগণ- জয়-
অলিদ- সৈন্যগণ তোমরা সকলেই ফোরাতের চতুর্দিক অবরোধ করে বন-জংঘলে নিজ নিজ স্থানে লুকিয়ে পর। ঐ দেখ, কে যেন ফোরাতের দিকে আসতেছে।
(সকলেই ফোরাৎতীর অবরোধ করে জংঘলের মাঝে লুকাইল)
(সহসা ওহাবের প্রবেশ)
ওহাব- কে তোমরা? আমাকে লক্ষ্য করে চেয়ে রয়েছে কেন? আমি অন্য কেউ নই। আমি হজরত হোসেনের দাস। পানি নিতে এসেছি।
অলিদ- সাবধান! তুমি যেই হওনা কেন। পানির দিকে আর এক পদও অগ্রসর হইওনা।
ওহাব- আমি বহু পথ অতিক্রম করে এসেছি। পানি পিপাসায় আমি বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমাকে কেন পানি নিতে দেবে না ভাই? আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি।
অলিদ- অন্যায় করেছ কি করনি সেকথা বিবেচনা করব পরে। এখন এক বিন্দু পানিও তোমাকে দেওয়া হবে না।
ওহাব- ভাই! তোমরা মুসলমান হয়ে কি মুসলমানের প্রতি দয়া করবে না? পানি দানে আমার তাপিত প্রাণ শীতল কর, ভাই। তাহলে পরকালে কাওছারের পানি পান করতে পারবে।
অলিদ- যাও- যাও, তোমার উপদেশে ভুলে তোমাকে আমরা পানি দিতে পারব না। জাহাঁপনা এজিদের নিষেধ আছে। এখনো বলছি, যদি জীবনের মায়া থাকে, তাহলে নিঃশব্দে এখান থেকে চলে যাও। নছেৎ-
ওহাব- নছেৎ, কি করবে?
অলিদ- তোমাদেরকে একটি একটি করে হত্যা করব।
ওহাব- কেন ভাই! আমরাতো তোমাদের কাছে কোনো অপরাধ করিনি। তাহলে বিনা অপরাধে আমাদের কেন হত্যা করবে?
অলিদ- হোসেন বংশের কাউকে আমরা এক বিন্দু পানি ফোরাত তীর হতে নিতে দিব না। জাহাঁপনা এজিদের আদেশ অমান্য করলে তোমার শিরশ্ছেদ অনিবার্য- বুঝলে!
ওহাব- তোমরা এতো নিষ্ঠুর! এই আসন্ন বিপদে এক বিন্দু পানিও আমাকে দিলে না। তোমাদের নিকট অনুরোধ করেও কোনো ফল হল না। তাহলে আমি এখন শিবিরে চলে যাই। কথাটা হজরত হোসেনের কর্ণগোচর করিগে’। (প্রস্থান)
অলিদ- সৈন্যগণ, বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ— জয়।
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়-
অলিদ- সৈন্যগণ! দেখেছ? হোসেনের দাসের কি বিনয়ী ভাব। তোমরা কখনও কেউ ওদের বিনয়ীভাবে মত্ত হইও না। খুব সাবধানে ফোরাত তীর পাহারা দেবে। বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়-
অলিদ- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈনগণ— জয়-
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান।)
* * *
চতুর্থ অঙ্ক চতুর্থ দৃশ্য
-হোসেন শিবির-
(হোসেনের প্রবেশ)
হোসেন- খোদা! তুমি সর্বশক্তিমান, মহান। তোমার মহিমা বুঝবার শক্তি আমাদের নেই, খোদা। তুমি কাউকে হাঁসাও, আবার কাউকে কাঁদাও।এইতো তোমার খেলা, খোদা- এইতো তোমার খেলা-
ওহাবের প্রবেশ
ওহাব- হজরত ইমাম সাহেব! আমি ফোরাত তীর হতে পানি আনতে পারলুম না, খোদাবন্দ।
হোসেন- কেন, কি হয়েছে?
ওহাব- আমি ফোরাৎ তীরে গিয়ে উপস্থিত হওরার সঙ্গে সঙ্গে এজিদ সৈন্যগণ চতুর্দিক হতে এসে আমার প্রতি লক্ষ্য করে বলতে লাগল, তুমি যে কেউই হওনা কেন, ফোরাত তীর হতে একবিন্দু পানিও নিতে পারবে না। আরও বলেছে, তাঁদের আদেশ অমান্য করলে জাহাঁপনা এজিদের আদেশে আমাদের শিরশ্ছেদ করা হবে। তাই আমি বিফল হয়ে ফিরে এসেছি, হজরত। এখন এর উপায় করুন, হজরত।
হোসেন- উপায় আর কি করব। পরম দয়ালু খোদা তায়ালার অপার মহিমা বুঝা দায়। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাদের কিছুই করার উপায় নেই।
ওহাব- হজরত, মোসলেম সাহেব কি এ সংবাদ পায়নি?
হোসেন- আমিও তাই ভাবছি। আমাদের শিবিরে পাতাকা উড্ডীন দেখে এজিদ সৈনগণ চিনতে পেরেছে। অথচ হজরত মোসলেম সাহেব আমাদের কোনো সংবাদ নিতেছেনা। এর কারণ আমি কিছুই বুঝতে পারতেছিনা।
(দ্রুতবেগে একজন জনৈক পথিকের প্রবেশ।)
পথিক– আপনারা কে? আমি কি এই পথে মদিনা যেতে পারব?
হোসেন- কে তুমি? মদিনা কেন যাবে?
পথিক- আমি হজরত মোসলেমের একজন শিষ্য। আমি কুফানগর হতে মদিনায় হোসেন সাহেবের নিকট যাইতেছি।
হোসেন- বল- বল ভাই! কি হেতু তুমি হোসেন সাহেবের নিকট যাবে?
পথিক- সেকথা বলবার এখন অবসর নেই। আমায় যেতে দিন। বিলম্ব হলে হয়তো কোনো বিপদ হতে পারে। অন্য কেউ দেখলে আমার উদ্দেশ্য বিফলও হতে পারে।
হোসেন– এতো ব্যস্ত কেন, ভাই? তোমার কথা শ্রবণে আমার শরীর ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে আসছে। বল ভাই, কেন তুমি হোসেন সাহেবের নিকট যাবে?
পথিক- কেন আমায় বাধা দিচ্ছেন? বিশেষ বিলম্বে হজরত হোসেন সাহেবের অমঙ্গল ঘটতে পারে।
হোসেন- তুমি যার জন্য মদিনায় যাইতেছ সে তোমার সন্মুখে উপস্থিত। বল ভাই! কি সংবাদ তুমি বহন করে নিয়ে এসেছ?
পথিক- সেকি কথা! আপনি এখানে কেন? শীঘ্র ফিরে যান পবিত্র মদিনা সহরে।না হলে আপনার নিশ্চিত বিপদ ঘটবে। জাহাঁপনা এজিদের আজ্ঞায় কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জিয়াদের চক্রান্তে হজরত মোসলেমকে এজিদ সৈন্য নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
হোসেন- উঃ – মোসলেম ভ্রাতাকে হত্যা করেছে? (মুর্ছাগতপ্রায়)
ওহাব- বিহ্বল হবেন না, হজরত। আপনিই তো বলেছেন, খোদা তায়লার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কার্য্যই হতে পারে না। বল পথিক, তোমার আরও কি কিছু বলবার আছে?
হোসেন- বল- বল পথিক, আরও যদি কোনো কিছু বলবার আছে, তাহলে শীঘ্র খোলে বল।
পথিক- আপনাকেও হত্যা করার জন্য জিয়াদ ও এজিদ সৈন্য অনেক প্ৰকার ষড়যন্ত্র করতেছে। অসংখ্য সৈন্য দামেস্ক হতে এসে ফোরাত তীর অবরোধ করেছে। কারবালার চতুর্দিকেই এজিদ সৈন্যগণ ঘিরে রয়েছে। এখন আপনার যা ভালো বিবেচনা হয়, তাই করুন, হজরত। আমি এখন আবার কুফায় চললাম। (প্রস্থান)
হোসেন- ভ্রাতা ওহাব, তুমি শিবিরে চল যাও। হয়তো তুমি পানি নিয়ে আসবে বলে সবাই পথপানে চেয়ে রয়েছে।
ওহাব- কিন্তু আমি শিবিরে গিয়ে কি বলব, হজরত? শিবিরে গিয়ে যে, লবার মতো কিছুই নাই। (প্রস্থান)
হোসেন- হায়- হায়, এখন আমি কি করি! মহাত্মা মোসলেমের মৃত্যু সংবাদও আমায় শুনতে হলো! তিনি আমার জন্য দূর্দান্ত কুফাবাসীদের হস্তে জীবন উৎসর্গ করেছে। ভাই মোসলেম, তুমি চলে গিয়েছ পবিত্র স্বর্গধামে। আর আমার আশা কি। দুদিন পরে আমিও তোমার সঙ্গী স্বরূপ আসতেছি, ভ্রাতা। (প্রস্থানোদ্যত ।)
(শিশুসন্তান ক্রোড়ে লইয়া সহর ভানুর প্রবেশ।)
সহর ভানু- ওগো প্রাণবল্লভ- প্রাণ সখা। পানি পিপাসায় আমার স্তনের দুগ্ধ পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। দুগ্ধপোষ্য শিশু স্তনে দুগ্ধ না পেয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমি আপনার পা ধরে বিনয় করছি, যে প্রকারেই হউক, এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে একবিন্দু পানি দানে জীবন রক্ষা করুন, হজরত।
হোসেন- প্রাণাধিক সহর ভানু! দুষ্ট কাফেরগণ পানির উৎস ফোরাৎ তীর অবরোধ করে রেখেছে। তারা কি আমাকে পানি দিবে? আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।
সহর ভানু- ওরা কেন পানি দেবে না, স্বামী? হয়তো আমরা কোনো অন্যায় করতে পারি। সেজন্য আমাদের পানী না-ও দিতে পারে। কিন্তু এই দুগ্ধপোষ্য শিশু তো কোনো অন্যায় করেনি, স্বামী। যে ফোরাতের পানি পশুপক্ষীরা অবাধে ভক্ষণ করতে পারে, সেই পানি আমরা কেন পাব না, স্বামী?
হোসেন:- তুমি সে কথা যথার্থ বলেছ। আচ্ছা, সহর ভানু, দাও, আমার জীবনের জীবন দুগ্ধপোষ্য শিশু আসগরকে আমার কোলে দাও। আমি ওকে নিয়ে ফোরাতের-শীতল পানি পান করিয়ে নিয়ে আসিগে’।
সহর ভানু– (শিশুটিকে হোসেনের ক্রোড়ে তুলে দিলেন। হোসেন সন্তানটি বুকে চেপে ধরে ধীরে ধীরে প্রস্থান করলেন এবং ঐ সঙ্গে সহর ভানু ও প্রস্থান করলেন।)
* * *
চতুর্থ অঙ্ক পঞ্চম দৃশ্য
– ফোরাত তীর-
( জয়ধ্বনি দিতে দিতে অলিদ, শিমার ও সৈনগণের প্রবেশ।)
অলিদ-জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়-
অলিদ- সৈন্যগণ, খুব সাবধানে ফোরাত তীর অবরোধ কর। ঐতো হোসেন পানির জন্য আসতেছে। ওর মিষ্ট কথায় ভুলে একবিন্দু পানি যদি কেউ দান করে তাকে আমি জাহাঁপনার আদেশে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করর। যাও, ফোরাতকূল অবরোধ করগে’।
(শিশু সন্তান ভ্রুোড়ে হোসেনের প্রবেশ।)
হোসেন- এজিদ সৈন্যগণ। তোমাদের মাঝে যদি কেউ মুসলমান থেকে থাক, তাহলে একবিন্দু পানি দান করে এই দুগ্ধপোষ্য শিশুর জীবন রক্ষা কর।
অলিদ- হোসেন! জীবনে যদি আর দুই চারদিন বাঁচবার আশা থাকে, তাহলে তুমি শিবিরে ফিরে যাও। একবিন্দু পানিও তোমাকে আমরা দেব না।
হোসেন- কেন পানি দেবে না? আমি যদি অপরাধ করেছি, আমাকে পানি না দিতে পার। কিন্তু আমার ক্রোড়ে যে শিশু সন্তান দেখতেছ ওকে কেন পানি দিবে না? ওতো তোমাদের কোনো অন্যায় করেনি, ভাই!
অলিদ:- সেকথা বিবেচনা করব পরে, এখন নয়। এখন শুধু জেনে রাখ তোমাকে এবং তোমার বংশের একটি প্রাণীকেও আমরা একবিন্দু পানি দিতে পারব না। কারণ জাহাঁপনা এজিদের নিষেধ আছে।
হোসেন:- সেনাপতি অলিদ! তুমি একটি বার এই শিশু সন্তানের প্রতি লক্ষ্য কর। চেয়ে দেখ ভাই, কোলের শিশু পানি পিপাসায় কিরূপ ভাবে ছটফট করতেছে।
অলিদঃ- তোমার ঐ সমস্ত অভিনয়ে আমরা ভুলব না। জীবনে যদি বেঁচে থাকতে চাও, আর যদি ফোরাত নদীর পানি নিতে চাও, তাহলে এজিদকে প্রভু বলে মান্য কর এবং তাঁকে সালাম জানাও। অন্যথা তোমার শত অনুরোধেও আমরা তোমাকে পানি দিব না।
হোসেন:– ওরে কমবক্ত পাষণ্ড, এজিদের বেতনভোগী দাস। হজরত নবীর বংশধরকে কি কখনও গোলাম পুত্র গোলামকে সালাম করতে দেখেছিস? ওরে দুষ্ট পাপিষ্ট! তোরা কখনও কেয়ামতের ভীষণ সঙ্কট হতে রক্ষা পাবি না। পাপিষ্ট সৈন্যগণ, এখনও সময় আছে; যদি পানি দানে এই শিশু সন্তানের জীবন রক্ষা করিস, তাহলে কেয়ামতের ভীষন সঙ্কটে তোদের উদ্ধার করে পরে আমি বেহেস্তে গমন করব।
অলিদ- হোসেন! এখনও তুমি এস্থান ত্যাগ করলেনা! শিমার-
শিমার— আদেশ করুন সেনাপতি।
অলিদঃ- এখনও আদেশের অপেক্ষা করতেছ। সুতীক্ষ্ণ তীর বর্ষণ করে তুমি হোসেনের দুগ্ধপোষ্য শিশুটির পানি পিপাপা মিটিয়ে দাও।
শিমার:- আপনার আদেশ শিরোধাৰ্য।
(শিমার তীর নিক্ষেপ করল এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুটির বক্ষ ভেদ করল।)
শিমার- পেয়েছ, এখন পেয়েছ উপযুক্ত পানি?
হোসেনঃ- ওঃ এ তুমি কি করলে পাষণ্ড? ওরে পাষাণ হৃদয় সৈনিক, এই শিশু সন্তানটিকে হত্যা করে তোদের কি লাভ হল! শিশুর পরিবর্তে আমাকে কেন হত্যা করলে না, পাষণ্ড? দুগ্ধপোষ্য শিশু, শরাঘাতে কীরূপ ভাবে ছটফট করতেছে। হে খোদা! এ দৃশ্য দেখেও আমাকে অটল হয়ে থাকতে হলো। হায় হায়, আমার হৃদয় যেভাবে কঠিন করেছ, তেমনিভাবে প্রিয়তমা সহর জানুর অন্তরটিও কঠিন করে দিও, খোদা। ওরে কঠিন হৃদয় পাপিষ্ঠ এজিদের বেতনভোগী সৈন্যগণ! তোরা জেনে রাখিস, আজ যেমনভাবে তোদের শরাঘাতে শিশু সন্তনাটি আমার ভ্রুোড়ে ছটফট করতেছে, একদিন হয়তো খোদার দরবারে গিয়ে তোদেরও এমনিভাবে ছটফট করতে হবে।
শিমার- হোসেন! এখনও এস্থান ত্যাগ করলে না? শীঘ্র এস্থান ত্যাগ কর, না হলে আমি তোমাকেও এই শর নিক্ষেপ করে হত্যা কবর।
হোসেন:- এই আমি যাচ্ছি। তোমরা সব কিছুই করতে পারবে। না,— এখন তোমাদেরকে আমি কিছুই বলব না। যাই, শিবিরে গিয়ে সহর ভানুকে শিশুটি দিই গিয়ে। সহর ভানু- সহর ভানু। (প্রস্থান)
অলিদ- জয় ঝাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়-
শিমার- ঠিক হয়েছে। এমনি নির্মম ভাবে হোসেন বংশ ধ্বংস করতে হবে। হোসেন শিবির হতে যে কেউ পানির জন্য ফোরাত তীরে আসবে, তোমরা ঠিক এমনি ভাবেই তাদের একটি একটি করে হত্যা করবে। আমার আদেশ অমান্য করলে কাউকে আমি রেহাই দেব না। বল- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ– জয়
অলিদ- জয় দমাস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়-
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান।)
* * *
চতুর্থ অঙ্ক- ষষ্ঠ দৃশ্য
– হোসেন শিবির-
(সহর ভানুর প্রবেশ)
সহর ভানুঃ– অনেক সময় হয়, স্বামী মোর গেছে ফোরাতকূলে পানির সন্ধানে। তবে এখনও ফিরছে না কেন? কি হলো!
নেপথ্যে হোসেন– সহর ভানু, সহর ভানু-
সহর ভানু- ঐ যে, স্বামী মোর ফোরাতকূল হতে ফিরে এসে, সহর ভানু- সহর ভানু বলে আমাকে ডাকতেছে।
হোসেন: সহর ভানু- সহর ভানু।
(হোসেনের প্রবেশ।)
হোসেন-সহর ভানু।
সহর ভানু- স্বামী, আপনি এসেছেন, স্বামী?
হোসেন- প্রাণাধিক সহর ভানু- ধর, তোমার জীবনের জীবন শিশুটিকে চির জন্মের মতো পানি পিপাসা নিবৃত্তি করে নিয়ে এনেছি। ধর, ক্রোড়ে তুলে নাও। (মৃত শিশু সম্ভানটি সহর ভানুর ভ্রুোড়ে দিলেন।)
সহর ভানু- একি স্বামী! এর শরীর রক্ত মাখা কেন? কি হয়েছে? কই ওতো সাড়া দিচ্ছে না। আপনার চোখে জল কেন, স্বামী? বলুন- বলুন, স্বামী কি হয়েছে আলী আসগরের?
হোসেন- বলবার সাহস পাচ্ছিনা, সহর ভানু। আমি বলবার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। বলতে গেলে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। ভালোরূপে চেয়ে দেখে, সহর ভানু। তোমার স্নেহের দুলাল আজ তুমি প্রাণ ভরে দেখে নাও।
(সহর ভানু শিশুটির আবৃত কাপড় ঘুচাইয়া।)
সহর ভানু- একি! উঃ- স্বামী! একি, আলী আসগর সাড়া দিচ্ছে না কেন? (মূর্ছিতা)
হোসেন:- আফসোস কর না, সহর ভানু। আর কেঁদ না। মন শক্ত কর।
সহর ভানু- ও: খোদা! তোমার মনে কি এই ছিলো, খোদা। কারবালায় এনে শত্রুর হাতে আমার দুগ্ধপোষ্য শিশুর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করলে, খোদা। পাষাণ হৃদয় শত্রুগণ! এই শিশু সন্তানের শরীরে লৌহ তীর নিক্ষেপ করতে তোদের অন্তরে একটুও দয়ার সঞ্চার হলো না? হস্ত দুখানি কাঁপল না? ওরে বৎস, জীবনের জীরন, একটিবার আমাকে মা বলে ডাক, বাছা- একটি বার আমায় মা বলে ডাক। তোর শোকে ওরে পুত্র, আমি তেজিব জীন!
হোসেন:- ধৈর্য ধারণ কর সহর ভানু। কাঁদলে কোনো ফল হবে না। খোদা তায়ালার লিখন কারও খণ্ডাবার সাধ্য নেই। তিনিই একমাত্র শুদ্ধ বিচার কৰ্তা।
সহর ভানু- এযে তাঁর পক্ষপাতিত্ব বিচার স্বামী।
হোসেন:- একথা বল না, সহর ভানু। তিনি যা করেন, তা সকলের মঙ্গলের জন্যই করে থাকেন। এপর আমাদের কি ঘটবে তাই এখন চিন্তা কর। চল, এখন শিবিরে গিয়ে শিশু সন্তানের দাপন কার্য সমাধা করিগে’।
সহর ভানু– খোদা, তুমি আমার অন্তর পাষাণে পরিণত কর, খোদা- আমার অন্তর পাষাণে পরিণত কর। (মৃত সন্তান লইয়া সহর ভানু প্রস্থান।)
হোসেন:- খোদা! তুমি আর কতদিন আমায় এমনিভাবে কাঁদাবে, খোদা। আমাকে যদি চিরদিন কাঁদতেই হবে, তাহলে কাঁদবার শক্তি দাও খোদা- কাঁদবার শক্তি দাও।
(আব্দুর রহমান ও ওহাবের প্রবেশ)
আব্দুর রহমান– হজরত! আমাদের বন্দেগী গ্রহণ করুন। আপনি কাঁদছেন হজরত? কি হয়েছে আপনার, যার জন্য আপনি বিহ্বল হয়ে কাঁদছেন? ঐদিকে পানি পানি বলে শিবিরে হাহাকার রোল উঠছে। পানি পিপাসায় আর্তকন্ঠে চিৎকার করছে। আপনি এখন এর উপায় করুন, হজরত।
হোসেন- পানির জন্য হাহাকার করলে আমি কি করব, বন্ধুগণ! আমাদের পিপাসা নিবৃতির জন্য খোদা তায়ালা কারবালা প্রান্তরে ফোরাতের পানি বরাদ্দ করেনি, বন্ধুগণ। যদি তাই হত তাহলে শত্রু শরাঘাতে আমার ক্রোড়ে শিশু সন্তানের জীবন লীলা অবসান হত না। এতো তোমরা স্বচক্ষেইতো প্রত্যক্ষ করলে।
আব্দুর রহমানঃ- এ দৃশ্য দেখে শিবিরে বসে থাকলে কি চলবে হজরত! আমাদের ভাগ্যে যা লেখা আছে, তা নিশ্চয়ই হবে। তাই বলে হাতপা গুটিয়ে শিবিরে বসে থাকলে কি চলবে হজরত? আপনি আদেশ করুন হজরত, স্বয়ং আমি যাব পানি আনতে ঐ রাক্ষসী ফোরাৎতীরে।যুদ্ধ করে হলেও আমরা ফোরাতকূল উদ্ধার করব।
হোসেনঃ- না বন্ধুগণ! তোমাদেরকে আমি যুদ্ধে পাঠাতে পারব না। এই আসন্ন বিপদকালে তোমাদের যুদ্ধে পাঠিয়ে আমি একা শিবিরে বসে থাকতে পারব না।
ওহাব:- হজরত আপনি এতো ভাবছেন কেন? আমরা কাপুরুষের ন্যায় শিবিরে বসে থাকলেওতো দুদিন পরে পানি পিপাসায় হায়-হুতাস করে প্রাণ ত্যাগ করতেই হবে।
হোসেন:- তাই বলে আমি তোমাদেরকে রণে পাঠাতে পারব না।
আব্দুর রহমান- হজরত! একি বলছেন আপনি! যে পাপিষ্ঠ সৈন্যগণ, শিশু সন্তানের জীবন পৰ্যন্ত নাশ করতে পারে, আপনার বংশের প্রতি এতবড় অন্যায় আচরণ করতে পারে, মুসলমান হয়ে ভবপারের কাণ্ডারী নবী(সাঃ)এর পবিত্র ইসলাম ধর্মের প্রতি যারা অবাধে অন্যায় অতাচারে লিপ্ত থেকে ফোরাত নদীর কূল অববোধ করতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে এখনও বাধা প্রদান করছেন কেন, হজরত? এগুলি স্বচক্ষে দেখে আমরা সহ্য করতে পারব না। আপনি হাসিমুখে আদেশ করুন, হজরত, আমরা হয় শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে ফোরাৎকূল উদ্ধার করব, নছেৎ সন্মুখ সমরে বীরত্ব প্রদর্শন করে প্রাণ বিসর্জন দিব।
ওহাব:- হজরত! যে পৰ্যন্ত আপনার পরম শত্রু এজিদের সৈন্যগণকে হত্যা করে ফোরাৎকূল উদ্ধার করতে না পারব, সে পৰ্যন্ত আমরা আর শিবিরে ফিরব না।
হোসেন:- সমস্যা- আমাকে বড় সমস্যায় ফেলে দিলে বন্ধুগণ!
আব্দুর রহমান:- এর জন্য ভাবছেন কেন, হজরত। জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য। ঐ দেখুন, শত্রু সৈন্যগণ আমাদেরকে লক্ষ্য করে পাগলা কুত্তার মতো কীভাবে জিব্বা মেলে চেয়ে রয়েছে।
হোসেন:- আচ্ছা তাহলে যাও। পরম দয়ালু খোদার নাম ভরসা করে রণে চলে যাও। আমি তোমাদেরকে খোদার নামে সমর্পণ করলাম। যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারলে অবশ্যে আবার দেখা হবে। আর যদি যুদ্ধে তোমাদের জীবন দিতে হয়, তাহলে বেহেস্তে নবীজির দরবারে তোমাদের সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ হবে। বন্ধুগণ! আমি তোমাদেরকে আরও একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, শত্রুর আঘাতে অসহ্য হইয়া কখনও তাঁদের প্রতি অভিশাপ দিওনা। হাঁসিমুখে সন্মুখ সমরে প্রাণ বিসর্জন দিবে। যাও, খোদার নাম স্মরণ করে যাত্রা কর। আমি এখন আসি। (হোসেন প্রস্থান।)
ওহাব:- পেয়েছি, প্রভুর আদেশ পেয়েছি। চলুন, বন্ধগণ আমরা আজ হাসিমুখে সন্মুখ সমরে প্রাণ দিতে চলে যাই।
আব্দুর রহমান- নারায়ে তকবীর।
ওহাব-আল্লাহু আকবার ।
আব্দুর রহমান– নারায়ে তকবীর।
ওহাব- আল্লাহু আকবার।
আব্দুর রহমান- নারায়ে তকবীর।
ওহাব:- আল্লাহু আকবার৷
(আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান।)
* * *
চতুর্থ অঙ্ক সপ্তম দৃশ্য
-রণতুমি:-
(সৈন্যগণসহ অলিদ, শিমার ও মারোয়ানে প্রবেশ।)
অলিদ- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণঃ– জয়
(দ্রুত বেগে রণসাজে ওহাবের প্রবেশ।)
ওহাব:- বন্ধ কর- বন্ধ কর তোদের জয়ধ্বনি। মত্ত মাতংগ আজ যমরূপে তোদের সন্মুখে দণ্ডায়মান। মহাপাপী এজিদের সৈন্যগণ, আজ তোদের নিস্তার নেই। শক্তি থাকে তো যুদ্ধে অগ্রসর হ। নছেৎ, ফোরাৎকূল ছেড়ে পালিয়ে যা।
অলিদ- যুবক, এতো স্পর্দ্ধা তোর! জাহাঁপনা এজিদের সৈন্য আমরা। আমাদের জয় অনিবার্য। আজ তোদের নিস্তার নেই।
ওহাব- কাফের সৈন্যগণ, যেদিন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে মহা সংকট দেখা দিবে, মহান বিচার কর্তা যেদিন জীব মাত্রেরই পাপ পূণ্যের বিচার করবে। বল, বল কাফেরের দল তখন তোরা সেই মহান বিচারকের সন্মুখে কি উত্তর দিবি?
অলিদ:- সৈন্যগণ, এখনো কি চেয়ে দেখছ? হত্যাকর- হত্যা কর, এই বাচালকে। ওর বাচালতা আমার অসহ্য। চতুর্দিক হতে আক্রমণ কর।
ওহাব- তবে ধর অস্ত্র। আয়-আয় তোদের যুদ্ধের সাদ মিটিয়ে দিই।
(উভয়ে যুদ্ধ করতে লাগল এবং এজিদ সৈন্য পলায়ন করল।)
ওহাব- সব শেষ। উঃ-এক বিন্দু পানি বিহনে আমার প্রাণ ওষ্ঠগত। আর যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। যাই দেখি ইমাম সাহেব একবিন্দু পানি দানে আমার পিপাসা নিবৃত্ত করতে পারে কিনা। পানি-পানি- (প্রস্থান)
হোসেনের প্রবেশ
হোসেন- রণস্থল এতো নীরব কেন? তবে কি ওহাব শত্রুভয়ে রণস্থল হতে পালিয়ে গেছে- না প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে? এজিদ সৈন্যদের দেখছি না কেন?
রণক্লান্ত শরীরে ওহাবের প্রবেশ।
ওহাব- আমি এখনো জীবিত আছি হজরত। শত্রুসৈন্য আমার ভয়ে সমরক্ষেত্র হতে পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমি পানি পিপাসায় বড়ই কান্ত হয়ে পরেছি, আমার শরীর দুর্ব্বল হয়ে আসছে। পিপাসায় আমার ছাতি ফেটে যাচ্ছে হজরত! এসময়ে যদি একবিন্দু পানি দানে আমার পানি পিপাসা নিবারণ করতেন, তাহলে হাজার হাজার শত্রুসৈন্য সংহার করে ফোরাতকূল উদ্ধার করা আমার জন্য কঠিন হতো না হজরত।
হোসেন– ভ্রাতা ওহাব! আমার নিকট পানি চেয়ে আমাকে লজ্জা দিচ্ছ কেন? আমার নিকট কতটুকু পানি আছে তাতো তুমি জানো। যাও ভাই ওহাব, শুষ্ককন্ঠে হাজার হাজার শত্রুসৈন্য সংহার করে প্রাণ বিসর্জন দাওগে’। পর জন্মে বেহেস্তে গমনপূর্বক কাওছারের সুমিষ্ট সুশীতল পানি পান করতে পারবে।যাও ভাই, রণক্ষেত্রে চলে যাও। (প্রস্থান)
ওহাব- পেয়েছি- পেয়েছি, প্রভুর আদেশ পেয়েছি। এইবার আমি উপযুক্ত পানী পেয়েছি। আমার এই জগতের পানি পিপাসা মিটেছে। আর আমার পানি পিপাসা নাই। পাপিষ্ট এজিদ সৈন্যগণ, আর বিলম্ব করছিস কেন? শীঘ্র রণক্ষেত্রে চলে আয়। আয়- আয় কাফেরের দল।
(জয়ধ্বনি করতে করতে অলিদ ও শিমারের প্রবেশ)
অলিদ– জয়, জাহাঁপনা এজিদের-
শিমার– জয়-
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির-
শিমার- জয়
ওহাব- বন্ধ কর, বন্ধ কর তোদের জয়ধ্বনি। আর জয়ধ্বনি দিতে হবে না পাপিষ্ঠগণ। শক্তি থাকে তো অস্ত্র ধর, না হলে ফোরাত কূল ছেড়ে দিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যা।
অলিদ– মুখ সামলে কথা বল বাচাল। আমরা পালাব রণক্ষেত্র ছেড়ে! সৈন্যগণ বিলম্ব কেন, আক্রমণ কর এই বাচালকে।
ওহাব– তবে আয় তোদের যুদ্ধের সাদ মিটিয়ে দিই।
উভয়ের যুদ্ধ ও যুদ্ধ ক্ষ্যান্ত দিয়া ওহাব বলতে লাগলো
ওহাব- খোদা, আর যে স্থির থাকতে পারছিনা। বীরবর, এসময়ে আমায় একবিন্দু পানি দান কর। পিপাসায় আমার অণ্ঠকণ্ঠ শুকিয়ে গেছে। পানি দান করে তোমরা বীরের মর্যদা রক্ষা করো।
শিমার- পানি! এখনো পানির আশা? এই অস্ত্রে তোর পানির পিপাসা মিটিয়ে দিব। (তরবারি প্রদর্শন)
ওহাব- উঃ- খোদা, তোমরা এতো নিষ্ঠুর? আমার মৃত্যু আসন্ন। এই আসন্ন মৃত্যুর সময় তোমরা একবিন্দু পানী দান করলে না। পরকালে নিশ্চয়ই তোমাদের এর জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে।
অলিদ- যুবক, রণক্ষেত্রে হাতে অস্ত্র থাকতে যে মুখে কথা বলে সে কাপুরুষ ব্যাতীত কিছুই নয়।
ওহাব-তবে ধর অস্ত্র।
( উভয় পক্ষের যুদ্ধ। ওহাবের তরবারি ভেঙে মাটিতে পরে গেলো)
ওহাব- সৈন্যগণ। তোমরা বীর। এ সময়ে তোমরা আমাকে একখানা অস্ত্র দান করে বীরের মর্যদা রক্ষা করো।
শিমার- এই তোমায় অস্ত্র দান করছি। (অস্ত্রাঘাত) কেমন পেয়েছ অস্ত্র? হাঃ-হাঃ-হাঃ-
ওহাব- উঃ-হজরত আর আপনার সঙ্গে দেখা হলো না। আমি আর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহ মোহাম্মাদুর রাসুলল্লাহ। (টলিতে টলিতে প্রস্থান)
অলিদ- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ– জয়–
অলিদ– জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়-
(তরবারি হাতে আব্দুর রহমানের প্রবেশ)
আব্দুর রহমান- আর জনধ্বনি দিতে হবে না। আমি এসে পড়েছি। এইবার আর তোদের নিস্তার নেই! এইবার শিশু সন্তান হত্যা এবং ওহাব হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করব। শক্তি থাকে তো যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হ।
অলিদ- আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়েই আছি। তুমি একজন বৃদ্ধ। যুদ্ধ করে অনর্থক কেন প্রাণ বিসর্জন দিবে। এ বয়েসে যে কটা দিন বেঁচে থাক, শিবিরে গিয়ে সৃষ্টিকর্তার নাম জপ কর গিয়ে।
আব্দুর রহমান- তোমায় আমাকে উপদেশ দিতে হবে না। শক্তি থাকে তো বৃদ্ধের অস্ত্রাঘাত সহ্য কর।
অলিদঃ– সৈন্যগণ, চালাও যুদ্ধ। হত্যা কর। এই বৃদ্ধকে।
(যুদ্ধ চলিল, বৃদ্ধ আব্দুর রহমান ক্রমশ: দুর্বল হইয়া পরল এবং যুদ্ধে ক্ষ্যান্ত দিয়া।)
আব্দুর রহমান- ওঃ খোদা! আর পারলুম না ফোরাৎকুল উদ্ধার করতে। আমায় মৃত্যু দাও খোদা! আমায় মৃত্যু দাও। পানি পিপাসায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। ভ্রাতা হোসেন! তোমার সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হলো না। মৃত্যুর পর রোজ কেয়ামতে যেন তোমার মুখ দর্শন করতে পারি। লা ইলাহা ইল্লাহ আল্লাহ মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। (টলিতে টলিতে প্রস্থান)
অলিদঃ- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগনঃ– জয়
অলিদঃ– জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ— জয়
অলিদ– সৈন্যগণ! আর চিন্তা নেই! আর আমাদের প্রতিপক্ষ যোদ্ধা কেউই নেই। আমরা এমনি ভাবেই হোসেন বংশ ধ্বংস করে শেষে হোসেনকেও হত্যা করব। হোসেন রণক্ষেত্রে এসে মিষ্টবাক্যে এবং নানান প্রলোভনে তোমাদের মন ভুলাতে চেষ্টা করতে পারে! কিন্তু সেই প্রলোভনে ভুললে হোসেনকে হত্যা করে লক্ষ টাকা পুরস্কার লাভ করা সম্ভব হবে না। এবং তোমরাও আমার অস্ত্রাঘাত হতে রক্ষা পাবে না। তোমরা এখন সকলেই ফোরাৎতীর অবরোধ কর। যদি কেউ এই ফোরাত তীরে পানি আহরণ করতে আসে তাহলে তাকে তীর নিক্ষেপ করে হত্যা করবে। বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ– জয়-
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান।)
কাশেম- হাহাকার!হাহাকার!! হাহাকার!!! ধূলা ধূসরিত গগন, নিম্নে মৃত্তিকা, উর্ধে সু-উজ্জ্বল নীল আকাশ। এর মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে বীভৎস রোদন। (করুণ সুর বেজে উঠল) ঐ-ঐ সেই ক্রন্দনের রোল। সাড়া জগত কাঁদতেছে, আকাশ কাঁদতেছে, বাতাস কাঁদতেছে, মৃত্তিকায়, পশুপক্ষী, বৃক্ষ-লতা সবাই করুণ সুরে ক্রন্দন করতেছে-
(নেপথ্যে এজিদসৈন্যের মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি হতে লাগলে )
(এজিদ সৈন্য- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়)
কাশেম- আবার– আবার সেই শত্ৰুসৈন্যের জয়ধ্বনি। আরে অমিত বীর, বীরের তনয়। কেন আমি এখনও কাপুরুষের ন্যায় শিবিরে বসে আছি। কেন আমি শিশুসন্তানের নির্মম হত্যার প্রতিশোধ নিতে ভুলে গেছি? না-না, আমি আর শিবিরে বসে থাকব না।
( নেপথ্যে করুণ সুর বেজে উঠল।)
কাশেম- আবার – আবার সেই ক্রন্দনধ্বনি? দাঁড়া-দাঁড়া- আমি চিরতরে স্তব্ধ করে দিব তোদের বৃথা আস্ফালন।
(নেপথ্যে এজিদের জয়ধ্বনি।
কাশেম-আবার- আবার সেই জয়ধ্বনি! ওরে নির্মম পাষণ্ড সৈন্যগণ, আর কতদিন এমনি ভাবে জয়ধ্বনি দিবি? না-না, তোদের জয়ধ্বনি আর সহ্য হচ্ছে না। আমি এখনই উল্কাবেগে চলে যাব তোদের জয়ধ্বনি বন্ধ করতে।
(নেপথ্যে করুণ সুর বেজে উঠল)
কাশেম- আবার- আবার সেই বৃথাভরা ক্রন্দনধ্বনি! হায়রে কত বৃথা অন্তরে তোর। আমার এই ক্ষুদ্র বক্ষে যে দুঃখ চাপা দিয়ে রেখেছি তার শতাংশের এক অংশও বোধহয তোর নেই। তবু আমি নীরবে শিবিরে বসে আছি। না – না, আর আমি বসে থাকব না। এখনি আমি উড়ে চলে যাব যুদ্ধক্ষেত্রে। দাঁড়া- দাঁড়া পাষণ্ড এজিদ সৈন্য, আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি, আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি।
(দ্রুত বেগে প্রস্থান।)
* * *
পঞ্চম অংক দ্বিতীয় দৃশ্য
হোসেনের কক্ষ
(হোসেনের প্রবেশ।)
হোসেন- কত আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, শিশুসন্তান পর্যন্তও হারাইলাম। তবু ফোরাত কুল উদ্ধার করে পরিজনের পানি পিপাসা নিবারণ করতে পারলুম না। কারবালা প্রান্তর রক্তস্রোতে রঞ্জিত হয়ে ফোরাত নদী প্রবল বেগে প্রবাহিত হইতেছে; তবু ফোরাৎতীর শত্রু হস্ত হইতে উদ্ধার করতে পারলুম না। আমিই বা কেন এই জগতে জীবিত রয়েছি। এই জগতে আমার থেকে লাভ কি! না না, আমি আর ইহ জগতে বেঁচে থাকিব না। আমি শত্রুর সাথে মোকাবিলা করতে আজই কারবালা প্রান্তরে যাব।(প্রস্থানোদ্যত )
(দ্রুতবেগে কাশেমের প্রবেশ)
কাশেম- আপনার চির অনুগত অজ্ঞাবহ দাস কাশেম জীবিত থাকতে আপনি কেন রণক্ষেত্রে যাবেন, কাকাজান?
হোসেন- প্রাণাধিক কাশেম, তুমি পিতৃহীন যুবক। তুমি তোমার মায়ের একমাত্র নয়নমণি। আমাদের বংশের একমাত্র স্নেহের দুলাল। অমূল্য রত্ন। আমি তোমাকে কোন মুখে প্রাণে রণক্ষেত্রে পাঠাব। না-না, এ আমি পারব না, বৎস।
কাশেম-একি বলছেন, কাকাজান। শত্রুর ভয়ে ‘আমাকে রণে যেতে দেবেন না। আপনি এজিদের সৈনগণকে মহাভয়ংকর বলে জ্ঞান করছেন। আপনি আমাকে একটিবার আদেশ করুন কাকাজান- আমি ঐ সকল সৈন্যদের পথের ক্ষুদ্র পিপিলিকা জ্ঞানে হত্যা করে ফোরাতকুল উদ্ধার করে আসব। এই হেন বিপদকালে আমি যদি শত্রুভয়ে শিবিরে বসে থাকি তাহলে এই জগতে আমাকে লোকে কাপুরুষ ব্যতীত অন্য কিছু বলবে না। এবং আব্বাজান ও আপনার নামে লোকে কলঙ্ক রটনা করবে, কাকাজান। আমি এই অবস্থায় শিবিরে বসে থাকতে পাবর না। আদেশ করুন কাকাজান, আমি এক্ষুণি যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যাব।
হোসেন:- প্রাণাধিক কাশেম! তুমি ইমাম বংশের সর্বপ্রধান ইমাম হাসানের একমাত্র অমূল্যনিধি। তুমিই আমাদের মাথার মণি। আমার মৃত্যুর পর তুমিই হবে মক্কা ও মদিনার বাদশাহ। বর্তমান যে মুকুট আমার মাথায় শোভা পাচ্ছে, দুদিন পরে এই মুকুট তোমার মাথায় শোভা পাবে। না-না, তোমাকে ‘আমি রণক্ষেত্রে পাঠাইতে পারব না, বৎস। তুমি শীঘ্র শিবিরে চলে যাও। স্বয়ং আমি আজ যাব যুদ্ধক্ষেত্রে।
কাশেম:- আপনি যাই বলুন, কাকাজান! এই হতভাগা কাশেম জীবিত থাকতে এবং আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে আপনাকে আমি রণে যেতে দেব না। আদেশ করুন কাকাজান। আমি স্বয়ং যাব যুদ্ধক্ষেত্রে।
হোসেন:- কাশেম! তুমি যদি একান্তই রণে যাবে তাহলে আমি যে তোমার পিতার নিকট একটি প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ আছি, আমাকে তুমি সেই প্রতিজ্ঞা হতে মুক্ত করে রণে চলে যাও, বৎস।
কাশেম- বলুন কাকাজান! আপনি আব্বাজানের নিকট কি প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ? আমি এখনি আপনাকে সেই প্রতিজ্ঞা হতে মুক্ত করে যুদ্ধে চলে যাব।
হোসেন:- রণে যাবার পূর্বে তোমাকে বিবাহ করতে হবে।
কাশেম- একি বলছেন কাকাজান! এরকম ঘোর বিপদকালে আমাকে বিবাহ করতে হবে! তা আসি পারব না, কাকাজান।
হোসেন: তোমাকে বিবাহ করতেই হবে কাশেম। ইহা আমার মনে গড়া কথা নয়। এ হলো তোমার পিতৃর আদেশ। পিতৃর আদেশ তোমাকে পালন করতেই হবে।
কাশেম- পিতৃর আদেশ!এতো দেখছি মহাবিপদ, এখন আমি কি করি! (নেপথ্যে এজিদের জয়ধ্বনি।) আমাকে ক্ষমা করুন, কাকাজান। ঐ শুনুন কাকাজান, শত্রুগণ কীভাবে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। যে পর্যন্ত আমি ঐ জয়ধ্বনি রোধ করতে না পারব, শত্রু সংহার করে, ফোরাৎকূল উদ্ধার করতে না পারব, যে পর্যন্ত পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে না পারব, যে পৰ্যন্ত পিতৃ আদেশ পালন করতে না পারব, সে পর্যন্ত আমি বিবাহ করতে পারব না। আশীর্ব্বাদ করুন কাকাজান, আমি যেন শত্রুসৈন্য নিধন করে সমুচিত প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারি।
হোসেন:- ক্ষনেক অপেক্ষা কর কাশেম। ঐতো তোমার মাতা আসতেছে। তুমি আগে তোমার মায়ের নিকট হতে বিদায় গ্রহণ কর, তারপর আমি তোমাকে হসিমুখে বিদায় দিব।
কাশেম- মা- মা, তুমি আশীর্বাদ কর মা, ‘আমি যেন শত্রুসৈন্য নিধন করে ফোরাতকূল উদ্ধার করতে পারি।
(দ্রুত কদভানুর প্রবেশ।)
কদভানু– কাশেম, এতো আকুল কণ্ঠে আমায় ডাকছ কেন, পুত্র? তুমি এতো ব্যস্ত কেন? তুমি কোথায় যাবে, পুত্র?
কাশেম- আমি যুদ্ধে যাব মা। আমাকে তুমি আশীর্বাদ কর, মা। আমি যেন যুদ্ধে জয়লাভ করে ফোরাৎকূল উদ্ধার করতে পারি। আমায় বিদায় দাও মা।
কদভানু- কাশেম। আমার একটি কথা শোন, পুত্র।
কাশেম:- কি কথা মা? শীঘ্র করে খোলে বল। ঐ দেখ, মা? শত্রুসৈন্য আমায় লক্ষ্য করে কীভাবে চেয়ে রয়েছে। আমি আর স্থির থাকতে পারছি না, মা। শীঘ্র আমায় বিদায় দাও মা।
কদভানু- কাশেম! তোমাকে রণে যেতে হবে সে কথা আমি জানি। তাই আমি তোমাকে বাধা দিব না। তবে তোমার কাকাজানের আদেশ অমান্য করে যুদ্ধে গমন করা তোমার জন্য উচিত হবে না।
কাশেম- মা, কাকাজানের আদেশ এই আসণ্ন বিপদকালে আমি কেমনে পালন করব মা?
কদভানু- তবু তোমাকে কাকার আদেশ পলন করতেই হবে, পুত্র।
কাশেম- মা-মা, কর আশীর্বাদ, কর বিয়ের আয়োজন। কাকাজানের আদেশ পালন করেই আমি যুদ্ধক্ষেত্রে যাব। যে নীচাত্মা পামরগণে করেছে হত্যা মোর আত্মীয় স্বজনে, সেই নীচাত্মা পামরগণের বিদরিয়া বক্ষ, তপ্তরক্তে পূর্ণ করব অঞ্জলি আমার। মা- মা, আর আমায় বাধা দিওনা মা। কাকাজান! করুন বিয়ের আয়োজন, আগে আপনাদেরকে অঙ্গীকার মুক্ত করে, তারপর চলে যাব আমি যুদ্ধক্ষেত্রে।
হোসেন- ক্ষনেক অপেক্ষা কর বৎস। আমি সখিনাকে নিয়ে আসি। আমি এই যাব, আর এই আসব। (প্রস্থান)
কাশেম- ও: খেদা! আমার ললাটে কি ইহাই লেখা ছিলো, খোদা। সমর প্রাঙ্গণে আমায় বিবাহ করতে হলো!
কদভানু- ইহা যে বিধির লিখন, পুত্র। বিধির লিখন কেউ খণ্ডাতে পারে না। ঐ-তো তোমার কাকাজান আসছে।
(বিবাহ সাজে সু-সজ্জিতা সখিনাকে লইয়া হোসেনের প্রবেশ।)
হোসেন:- বৎস কাশেম! তোমার পিতৃ আদেশ পালন হেতু আমাদের স্নেহের দুলালী সখিনাকে তোমার হাতে সমর্পণ করলাম। তুমি সখিনাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করে তোমার পিতৃঋণ হতে আমায় মুক্ত করে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যাও, বৎস। ধর, সখিনার হস্তে ধর। প্রাণাধিক সখিনা, তুমিও কাশেমের হস্তে ধর। আজ হতে তোমাকে আমি কাশেমের হস্তে সমর্পণ করলাম। ইহ কাল ও পরকালে যেন তোমরা সুখী হতে পার।
কাশেম-আব্বাজান, এখন তো আপনি আমার পিতৃঋণ হতে মুক্ত।
হোসেন- হ্যাঁ পুত্র, আমি তোমার পিতৃ ঋণ হতে মুক্ত।
কাশেম- তাহলে আশীর্বাদ করুন, আমি রণক্ষেত্রে চলে যাই।
হোসেন- আমি তোমাকে মুক্তকণ্ঠে আশীর্বাদ করছি, তুমি যেন শত্রু নিধন করে ফোরাতকূল উদ্ধার করতে পার। তুমি যদি সন্মুখ সমরে জয়লাভ করতে পার, তাহলে নিশ্চয়ই আবার দেথা হবে। আর যদি সমরক্ষেত্রে মৃত্যু হয়, তাহলে বেহেস্তে তোমার পিতার নিকট পৌঁছোতে পারবে। (প্রস্থান)
কাশেম– মা!
কদভানু- কাশেম!
কাশেম- মা- আশীর্বাদ কর আমি যেন সমরে জয়লাভ করে ফোরাত কূল উদ্ধার করতে পারি।
কদভানু- বৎস কাশেম।ক্ষনেক অপেক্ষা কর। এই অবসরে আমি আমার মনের বাসনা পূর্ণ করে নিই।
(কাশেম ও সখিনাকে এক সাথে বসাইয়া করুন দৃষ্টিতে তাকাইয়া বলতে লাগলো)
কদভানু- হে খোদা! আমার কাশেম ও সখিনাকে তোমার নিকট সমর্পণ করলাম। আমি স্বযত্নে কাশেমকে আমার স্তনের দুগ্ধ পান করিয়েছি, আজ থেকে সেই দুগ্ধের দাবি আমি ছাড়লাম। আমার কাশেম যদি সন্মুখ সমরে প্রাণ বিসর্জন দেয়, তাহলে পরজন্মে যেন এইরকম যুগল মিলনরূপে দেখা মিলে। (ধীরে ধীরে কদভানু প্রস্থান)
কাশেম: সখিনা-
সখিনাঃ- স্বামী!
কাশেম:- প্রিয়ে, প্রণয় পরিচয়ের ভিক্ষারী আমরা নই। খোদা, আমাদের জন্য আজ এই নতুন সম্পর্কের সৃষ্টি করলেন। তুমি বীর কন্যা- বীর জায়া। এ সময়ে তুমি মৌন হয়ে থাকা আমার জন্য খুবই দুঃখের কারণ, প্রিয়ে। পবিত্র প্রণয়তো পূর্বহতেই ছিল, এখন আজ আবার আমরা নতুন করে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলাম। আর আশা কি? এ অস্থায়ী জগতে আরও কি সুখ আছে?
সখিনাঃ– প্রাণনাথ, চিরসখা; তুমি আমায় প্রবোধ দিতে পারিবে না। তবে বলে রাখি, যেস্থানে শত্রুর নাম নাই, ভয় নাই, কোলাহল নাই, কারবালা প্রান্তর নাই, ফোরাৎ জলের পিপাসা পর্যন্ত যেখানে নাই, সেই স্থানে যেন তোমাকে আমি পাই।
কাশেম- নিশ্চয় পাবে প্রাণ প্রেয়সী সখিনা! এখন তুমি আমায় হাসি মুখে বিদায় দাও, আমি রণে চল যাই।
সখিনা- প্রাণেশ্বর। একি কথা বলছ তুমি? তোমার কথা শ্রবণে কলিজা বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। প্রাণনাথ চিরসখা! আগে এই দুখিনীকে নিজ হস্তে শ্বহীদ করে তারপর তুমি রণে চলে যাও।তোমার অবিহনে আমায় কে সান্ত্বনা দিবে? কে করবে আদর সোহাগ? আমি তোমার চরণ ধরে মিনতি করছি, আমায় একাকিনী রেখে কদাচ তুমি রণে যেতে পারবে না।
কাশেম- প্রাণাধিক সখিনা। নবীজির আওলাদ কখনও প্রেয়সীর মহব্বতে দেওয়ানা হয়ে ধর্মযুদ্ধ ত্যাগ করতে পারে না। আমায় তুমি হাসিমুখে বিদায় দাও সখিনা। যদি আমি যুদ্ধে জয়লাভ করে ফিরে আসতে পারি তাহলে আবার আমাদের মিলন হবে। আর যদি সন্মুখ সমরে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে যেন পরজন্মে রোজ কেয়ামতের দিন মিলিত হইয়া একসাথে বেহেস্তে গমন করতে পারি।
সখিনা- প্রাণেশ্বর!
কাশেম- প্রিয়ে, অধীরা হয়ো না। ধৈর্য ধারণ করো।
সখিনা- তোমাকে আমি খোদার নিকট সমর্পণ করলাম। তুমি রণে গমন কর। আমাদের প্রথম মিলন রজনীর সমাগমে অস্তমিত সূর্যের মিলন ভাব দেখে প্রফুল্ল হওয়া সখিনার ভাগ্যে নাই। যাও প্রাণনাথ, খোদা তোমার মঙ্গল করবে। তুমি নিজ বাহুবলে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে ফিরে এসো, প্রাণনাথ। (কাশেমকে ধরে) না- না স্বামী, আমি একি ভুল বকিতেছি, তোমাকে আমি রণে পাঠিয়ে কেমনে একাকিনী শিবিরে থাকব?
কাশেম-একি বলছ সখিনা। তুমি না এখনি আমায় হাঁসিমুখে বিদায় দিলে। আবার কেন বাধা দিচ্ছ?
সখিনা:- কি করি স্বামী! জানিনা নারীর হৃদয় এতো কোমল কেন। তোমার বিদায় দৃশ্য দেখে আমার হৃদয় ভেঙ্গে যাছে, প্রাণনাথ। আমার প্রাণে যে ধৈর্য মানছে না, স্বামী। কোনো দিনই শুনিনি যে, যেদিনই বিবাহ সেই দিনই আবার বিচ্ছেদ। আমার মতো কপাল পোরা জনম দুঃখিনী এই জগতে আর কে আছে, স্বামী? (কেঁদে ফেললো)
কাশেম- প্রাণ প্রেয়সী সখিনা! তুমি কেঁদনা প্রিয়া। তোমার ক্রন্দনে আমার হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছে। সর্বশরীর অবশ হয়ে আসছে। তুমি ধৈর্য ধারণ কর প্রিয়ে, খোদাতায়লার নাম স্মরণ কর, তিনি সূক্ষ্ম বিচারকর্তা।নিশ্চয়ই তিনি আমাদের ক্ষেত্রে সুবিচার করবেন।
সখিনাঃ- এযে পক্ষপাতিত্ব বিচার স্বামী।
কাশেম: এমন কথা বল না সখিনা। তিনি যে নিরেপক্ষ বিচারক। পরম দয়ালু খোদা তায়ালার মহিমা বুঝবার শক্তি কারও নেই। তিনি কতজনকে কাঁদাইতেছে আবার কতজনকে হাসাইতেছে।তাঁর মহিমা বুঝা দায়। তুমি কেঁদনা সখিনা। তুমি আমায় বিদায় দাও। আমি হাসিমুখে রণে চলে যাই। বিদায় সখিনা বিদায়। (প্রস্থানোদ্যত)
সখিনাঃ স্বামী-
(সখিনা কাশেমকে জড়িয়ে ধরল।)
কাশেম- সখিনা! কেন আমায় বাধা দিলে প্রিয়ে? আবার কেন আমায় মায়াজালে বন্দী করলে। তোমার মায়াজালে বন্দী হয়ে আমি ধর্মযুদ্ধ ত্যাগ করতে পারব না সখিনা। ঐ-চেয়ে দেখ সখিনা, শত্রু সৈন্য আমায় লক্ষ্য করে বিদ্রূপ করছে। তারা কীরূপ কুকুরের মত লেলিহান জিব্বা বের করে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে। তাদের দমন করা কি আমার কর্তব্য নয়। বিদায় সখিনা- বি-দা-য়- (প্রস্থান)
সখিনাঃ- স্বামী-স্বামী! (কাশেমের গমন পথের দিকে তাকাইয়া) ও: চলে গেল। আমায় একাকিনী ফেলে চলে গেল। যাও, আমিও তোমার গমন পথে চলে যাব। স্বামী– স্বামী। (প্রস্থান)
* * *
পঞ্চম অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য
রণভুমি-
( রণসাজে কাশেমের প্রবেশ।)
কাশেম- পাপাত্মা কাফেরের দল। যদি যুদ্ধের সাদ থেকে থাকে, যৌবনে যদি কারও অমূল্য জীবন বিসর্জন দিতে সাদ থাকে, তাহলে বিলম্ব কেন হাসান তনয় কাশেমের সন্মুখে এসে যুদ্ধ দাও।
জয়ধ্বনি দিতে দিতে অলিদ, শিমার, মারোয়ান ও সৈনগনের প্রবেশ।
অলিদ— জয়, জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ– জয়-
কাশেম- বন্ধ কর- বন্ধ কর তোদের জয়ধ্বনি। শক্তি থাকে তো অস্ত্র ধর। নতুবা ফোরত কূল ছেড়ে পালিয়ে যা।
অলিদ- বাক-চাতুর্যের নাহি প্রয়োজন। শক্তি থাকে তো অস্ত্র ধর।
কাশেম- তবে রে তাই হোক বিধর্মী কাফেরের দল।
(যুদ্ধ করতে করতে উভয় দলের প্রস্থান ও পরে জয়ধ্বনি করতে করতে অলিদ, মারোয়ান, শিমার ও সৈন্যগণের পুনঃ প্রবেশ)
আলিদ- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়-
অলিদ-জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়
মারোয়ান:- সৈন্যগণ, খুব সাবধানে অস্ত্র পরিচালনা করবে। আজকের যুদ্ধে কে উপস্থিত হয়েছে জান কি? এ অন্য কেউ নয়। এ হয়েছে হাসান নন্দন কাশেম। সে আলী বরাবর যোদ্ধা। স্বচক্ষেইতো দেখলে কি তাঁর রণ কৌশল। সে একাই আমাদের হাজার হাজার সৈন্য নিধন করেছে। খুব সাবধানে অস্ত্র চালনা ও তীর বর্ষণ করবে। ঐ চেয়ে দেখ, সেই সিংহ কীরূপ ধারণ করে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। তোমরা সকলেই বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়-
(প্রলয় বিক্রমে কাশেমের প্রবেশ)
কাশেম- বন্ধ কর- বন্ধ কর তোদের জয়ধ্বনি। শক্তি থাকে তো যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হ। নতুবা ফোরাৎকূল ছেড়ে দিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যা।
(মারোয়ান ব্যতীত সকলের প্রস্থান।)
মারোয়ান: তোমাকে দেখে আমরা পালাব না। তুমি একা আর আমরা হাজার হাজার সৈন্য। তোমাকে আমরা চতুর্দিক হতে ঘেরাও করে ফেলেছি। এখন তোমার আর নিস্তার নেই। আচ্ছা বলতো যুবক, তুমি কে?
কাশেম-যুদ্ধ ক্ষেত্র আবার পরিচয়ের দরকার কি?
মারোয়ানঃ- পরিচয় না পেলে আমি যুদ্ধে অগ্রসর হব না।
কাশেমঃ– শোন তবে আমার পরিচয়। আমি ইমাম হাসান নন্দন কাশেম। বলতো কাফের তুই কে?
মারোয়ান- রনক্ষেত্রে হাসি-তামসা এবং পরিচয়ের দরকার কি? আমি এখনই তোমার শিরশ্ছেদ করব।
কাশেমঃ শিরশ্ছেদ আমার নয়, শিরশ্ছেদ করব তোমার। এখনি তোমার শির ধুলায় গড়াগড়ি যাবে।
মারোয়ান- আমার শির ধুলায় গড়াগড়ি যাবে? সৈন্যগণ, শীঘ্র আক্রমণ কর এই অর্বাচীনকে। হত্যা কর। শিরশ্ছেদ কর। (পিছনে তাকাইয়া) একি সৈন্যগণ কোথায়! (মারোয়ান ভয়ে কাঁপতে লাগল।) কোথায় সৈন্যগণ! কই, আমার সৈন্যগণ কোথায় চলে গেল? এতো দেখছি মহাবিপদ।
কাশেম-কোথায় তোমার সৈন্যগণ? কেন, সৈন্যগণ তোমার আদেশ পালন করলে না? তুমি এখন তোমার ইষ্ট দেবতার নাম স্মরণ কর। বল, তোমার পরিচয় কি?
মারোয়ান:- আমার পরিচয় দিয়ে তুমি কি করবে? আমি আমার পরিচয় বলব না।
কাশেম– কেন বলবে না?
মারোয়ান- আমার পরিচয় পেলে তুমি ভয়ে পালিয়ে যাবে।
কাশেম- ভয় কাকে বলে আমি জানিনা। বল-বল, কাফের তোর পরিচয়?
মারোয়ান:- আমার পরিচয় শুনতে যদি তোমার এতই সাদ, তাহলে শোন আমার পরিচয়। আমি হয়েছি দামেস্কধিপতি শাহেনশাহ রাজাধিরাজ এজিদের প্রধান মন্ত্রী। নাম মারোয়ান।
কাশেম- তুই সেই মারোয়ান? (লাফ দিয়ে এসে মারোয়ানের গর্দান ধরল) মারোয়ানের বাচ্চা, এখন কোথায় পালাবি? কেন সাত সমুদ্র, তের নদী পার হয়ে এসেছিলি আমাদের এই পবিত্র আরব দেশে! লোটা, ঘটি, বাটি যাদের সাথী, তারা ধরেছে তরবারি। এই দেখ, এখনই তোর যুদ্ধের সাদ মিটিয়ে দিচ্ছি। (পদাঘাত)
মারোয়ান- ছেড়ে দাও, বাপ। আর পদাঘাত কর না। পদাঘাত করলে আমি মরে যাব।
কাশেম- হুঃ- ছেড়ে দেবো। আমি তোকে পদাঘাত করেই মেরে ফেলব।
মারোয়ান- ছেড়ে দাও বাবা। তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। তুমি মহাবীর। এমনিভাবে তুমি আমাকে মেরে তোমার বীর নামের কলঙ্ক করো না! তোমার রীরের মৰ্যদা নষ্ট করোনা। আমি তোমার পায়ে ধরে বলছি, আমি এজীবনে আর তোমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করব না। আমায় ক্ষমা কর, যুবক। তোমার বীরের মর্যদা রক্ষা করো।
কাশেম-হাঃ-হাঃ-হাঃ- তাহলে যুদ্ধের সাদ মিটেছে? থাক তবে মারোয়ারির বাচ্চা। এমনি ভাবে এখানে পড়ে থাক। (পদাঘাত করে প্রস্থান।)
মারোয়ান- (মারোয়ান আস্তে আস্তে উঠে বলতে লাগিল) না -না, এখানে আর কেউ নেই। বাপরে, বাপ। কি সাংঘাতিক রে বাবা! এতো দেখছি জীবন মরণ সমস্যা। আমি ভাবছিলাম ও একজন সামান্য যুবক। কিন্তু ওতো সামান্য যুবক নয়, এযে মহাবীর। আচ্ছা আবার দেখা হলে তখন বুঝিয়ে দেব- আমিও মারোয়ারির বাচ্চা। আমি দেখাব আমার লোটার ভেতর বুদ্ধি আছে কি-না। আমারই অনুগত সৈন্যগণ আমাকে একা রেখে পালিয়ে গেছে।নিরখহারাম সৈন্যগণ। এর প্রতিশোধ আমি কড়ায় গণ্ডায় আদায় না করে আমি ছাড়ব না। কোথায় সৈন্যগণ, শীঘ্র এখানে চলে এসো। নতুবা কারও নিস্তার নেই।
(সৈন্যসহ অলিদ ও শিমারের প্রবেশ)
অলিদ-মন্ত্রীবর!হাসান নন্দন কাশেমের সংগে যুদ্ধে জয়লাভ ‘অসম্ভব। এখন উপায় কি?
মারোয়ান- হুঃ- যুদ্ধে জয়লাভ অসম্ভব বলেইতো লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে সমর ক্ষেত্রে এসে সামান্য একজন যুবকের ভয়ে ভেড়ারপালের মতো সবাই পালিয়ে গিয়েছিলে।নিমখ হারাম সৈন্যগণ। এখন একথা বলতে লজ্জা করছে না? একখা জাহাঁপনার কর্ণে প্রবেশ মাত্র তোমাদের যে কি দশা হবে সে কথা কি স্মরণ আছে? যদি জাহাঁপনা এজিদের হস্তে প্রাণ দিতে না চাও, তাহলে বিপুল বিক্রমে অস্ত্র ধারণ কর।কাশেম এখন পানি পিপাসায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় যদি ফোরাত কূল থেকে পানি পান করতে পারে, তাহলে আমাদের পরাজয় অনিবার্য। তোমরা এখন ঐ বনের মধ্যে লুকিয়ে থাক। কাশেম যখন ফোরাতকূলে উপস্থিত হয়ে পানি পান করতে নদীতে নামবে, তখন তোমরা বনের আড়াল থেকে তীর বর্ষণ করে কাশেমের জীবন নাশ করবে। খুব কৌশলে এবং খুব সাবধানে তীর নিক্ষেপ করবে। যাও, শীঘ্র বনের মাঝে লুকিয়ে পড়। ঐ-যে, কে যেন এই দিকে আসতেছে। কাশেমের সাথে সন্মুখ সমরে আমরা কেউ রক্ষা পাব না। যাও, বনের মাঝে লুকিয়ে পড়। যাও, শীঘ্র লুকিয়ে পড়। (দ্রুত প্রস্থান)
(সকলেই বনের মধ্য লুকাইল। ক্লান্ত শরীরে কাশেমের প্রবেশ।)
কাশেম-(চতুর্দিক নিরীক্ষণ করে) কই, কোথাওতো কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা। তাহলে এখন আর চিন্তা কি! এখন ফোরাত কূল উন্মুক্ত। বিলম্ব না করে ফোরাৎকূল হতে পানি নিয়ে শিবিরে চলে যাই। হায়রে ফোরাতকূল, তুই এতই নিষ্ঠুর যে, তোর পানি জগতের কত পশুপক্ষীরা অবাধে পান করছে, অথচ আমরা মানুষ হয়ে তোর পানি পান করতে পারছি না। আজ তুই মুক্ত হয়েছিস। আজ আমি উদর পূরে পানি পান করে পিপাসা নিবারণ করব।(আঁজলা ভরে পানি নিয়ে) হায়রে পানি! তোর নাম জীবন।আমি তোকে আজ প্রাণ ভরে পান করব। (কাশেম পানি পান করতে উদ্যত হলে, এমন সময় আড়াল থেকে তীর এসে তার পৃষ্ঠে বিদ্ধ হয়। তখন পানি ফেলে দিয়ে) আ!কোথাওতো কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা।তাহলে তীর নিক্ষেপ করল কে? তীর এসে আমার গলদেশে বিদ্ধ হয়েছে। উঃ- আর যে বিষের জ্বালা সহ্য হচ্ছে না। হায়রে নিষ্ঠুর ফোরাত! সত্যিই তোর পানি আমাদের ভাগ্যে নেই। হে তপন! তুমি রক্তরাঙা হয়ে পশ্চিম গগনে হেলে পড়েছ। আর ক্ষনেক অপেক্ষা কর, যুদ্ধ গমন কালে আমি সখিনার সঙ্গে একটি প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ আছি। আমি তাঁকে বলে এসেছি যে, শত্রুসৈন্য নিপাত করে আমি এখনই ফিরে যাব। উঃ- আর যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা। সখিনা হয়তো আমার জন্য পথ পানে চেয়ে রয়েছে। সখিনা আর চেয়ে থাকতে হবেনা, আমি অবিলম্বে তোমার নিকট ছুটে আসছি। সখিনা-সখিনা- (দ্রুত দৌড়ে প্রস্থান)
(দ্রুত মারোয়ানের প্রবেশ)
মারোয়ান- সৈন্যগণ, শীঘ্র বনের মাঝ থেকে বেরিয়ে এসো। আর আমাদের ভয় নেই। (সৈন্যগণ বনের মাঝ থেকে বাহির হয়ে সৈন্যগণের প্রবেশ।) ঐ দেখ কাশেম কীভাবে শিবিরাভিমুখে ছুটে যাচ্ছে। তোমরা সকলেই বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়-
মারেয়ান- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ-জয়
মারোয়ান- সৈন্যগণ! এখন তোমরা সকলেই নিশ্চিন্তে মনে শিবিরে চলে যাও। কাল প্রত্যুষে হোসেনের গতিবিধি লক্ষ্য করে আবার আমাদের যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে হবে। তোমরা সকলেই বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়-
মারোয়ান- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ— জয়
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান।)
* * *
পঞ্চম অংক চতুর্থ দৃশ্য
-ইমাম শিবির – সখিনার কুটির-
(সখিনার প্রবেশ)
সখিনা- স্বামী মোর প্রভাতে গিয়েছে রণে, এখনো ফিরে এলোনা কেন! একি! হঠাৎ দিবাস্বপ্নযোগে একি দেখলাম আমি। হায়-হায়, এ স্বপ্ন কাহিনী দেখে যে, আমি আর স্থির থাকতে পারছি না। কে যেন ঐ ফোরাৎকুলে হায় হায় বলে আর্তনাদ করতেছে। হতভাগা কুকিলও তো ঐ বৃক্ষডালে বসে বিনয় করে করুণ সুরে কুহু কুহু রবে আর্তনাদ করতেছে। ওরে বনের কুকিল, তোর ঐ করুণ আর্তনাদে আমার হৃদয়ের ধৈর্য্যের বাঁধন ছিন্ন হয়ে গেল। ওরে কুকিল, তোর নিকট এই মিনতি আমার, করুণ সুরে ডাকিসনে আর-
(সখিনার গান।)
কুকিল ডাকিস নারে আর,
আজ আমার দুঃখেরই বাহার
অসময় নিদানের কালে,
কে আছে আমার??
শুয়েছিলাম নিরলে,
একি দেখলাম স্বপনে।
নিভেছিল মনের আগুন,
দিলি কেন জ্বালিয়ে।
বন্ধু মুক্তা মানিক হার,
গলে পরলাম না একবার।
থাকতে যার নাইগো পতি,
পোরা কপাল তার।
পতি গিয়েছে রণে,
ফিরে আসবে কখনে।
পতি ছাড়া একাকিনী,
থাকি কেমনে??
আমার দুঃখে জনম যায়
সুখের ভরা ডুবে যায়,
দুঃখে দুঃখে জনম গেল,
সুখ পাব কোথায়??
আমার বিধির হলো ভুল,
আমার কানে কর্ণফুল।
আর এক দুঃখ পড়লো মনে
মাথায় কাঞ্চা চুল।।
(গীত অন্ত)
সখিনা- হে খোদা, পাক পরোয়ার দেগার। আমি কি অপরাধ করেছি যে বিবাহের বাসর থেকেই স্বামী মোর রণে চলে গেল, রবি ডুবু ডুবু, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, এখনও স্বামী ফিরে এলোনা কেন? তবে কি, স্বামী মোর কাফেরের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে?
(গীত কন্ঠে বিবেকের প্রবেশ।)
বিবেক-(গীত)
জনম দুঃখিনী সখিনা,
হোসনে দুঃখে কাতরা
হোসনে দুঃখে কাতরা।
তোমার স্বামী, আসিবে ফিরে,
দুঃখে তাহার জীবন ভরা
হোসনে দুঃখে কাতরা।
হোসনে দুঃখে কাতরা।
অধীরা হইওনা মাগো,
কেঁদনা জননী।
তুমি সতী শিরোমনি,
আরব জননী।
এ দুঃখ রজনী পোহাবে আবার!
তোমার তরী থাকিবে ভরা
হোসনে দুঃখে কাতরা,
হোসনে দুঃখে কাতরা।
যেদিন হইতে মা তুই,, মদিনা ছাড়িলি,
কারবালায় এসে মা তুই, শিবির পাতিলি।
ও তোর বাসর সজ্জা, বাসী হয়ে রবে।
বিধরা হবি মা তুই মহরম চাঁদে,
হোসনে দুঃখে কাতরা।। (গীত অন্ত। বিবেক প্রস্থান)
সখিনা- কে যেন কি বলে গেল। দিবস রজনী চলে গেল। দিনমণি অস্ত গেলো, এখনওতো স্বামী ফিরে এলো না। স্বামী মোর বিদায় কালে বলে গিয়েছে, শত্রু সংহার করে এখনই ফিরে আসবে। কৈ, কোথায় ফিরে এলো? ওগো স্বামী, তুমি ফিরে এসো। আমার কোনো আশা নেই- কামনা নেই। ইহ জগতে স্বামী সুখ আমার ভাগ্যে নেই। তুমি মাত্র একটিবার আমায় দেখে যাও।
(নেপথ্যে আকুল কন্ঠে কাশেমের সখিনা সখিনা ডাক।)
ঐযে, কে যেন আমায় আকুল কন্ঠে সখিনা- সখিনা বলে ডাকতেছে। (সহসা রক্তাক্ত শরীরে কাশেমের প্রবেশ) স্বামী! তুমি এসেছ স্বামী? শীঘ্র এসো। এই দুঃখিনীর তাপিত প্রাণ শীতল কর।
কাশেম– সখিনা, এই দেখ প্রেয়সী। আমি আজ কি সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে এসেছি।
সখিনা- (কোশেমকে ধরিয়া) স্বামী! স্বামী!! আজ তোমার এ বেশ কেন, স্বামী?
কাশেমঃ প্রাণ প্রেয়সী সখিনা! বিবাহের সময় উপযুক্ত পরিচ্ছেদে আমি তোমাকে বিবাহ করতে পারিনি বলেই আমি আজ আমার দেহ নির্গত শোণিত ধারে শুভ্র বসন লোহিত বর্ণে রঞ্জিত করে তোমায় দেখতে যুদ্ধক্ষেত্র হতে শত্রুসৈন্য ভেদ করে ছুটে এসেছি। ওঃ সখিনা, আমি যে আর স্থির থাকতে পারছি না। আমার সম্পূর্ণ শরীর লোহিত বর্ণে রঞ্জিত হয়েছে। বড় যন্ত্রণা, বড় পিপাসা সখিনা। পানি পিপাসায় আমি আর স্থির থাকতে পারছি না। আমায় একবিন্দু পানি দাও, সখিনা।
সখিনা- একি বলছ স্বামী! এ মরুপ্রান্তরে আমি পানি কোথায় পাব? পানি দেবার শক্তি কি আমার আছে স্বামী।
কাশেম:- সত্যিতো তুমি পানি কোথায় পাবে। পানি পাবার ভাগ্যতো আমাদের নেই, সখিনা। ও: সখিনা, আমি আর স্থির থাকতে পারছি না। আমায় ধর সখিনা, আমায় জমিনে শোইয়ে দাও। তোমার পুষ্পহার কাশেম, আজই তোমার গলে শোভা বর্দ্ধন করেছিল এবং আজই আবার চিরবিদায় নিতেছে। আমায় বিদায় দাও সখিনা- আমায় বিদায় দাও।
সখিনা: একি বলছ স্বামী! সত্যই কি তুমি আমায় এই জগতে একা রেখে চলে যাবে?
কাশেম- না গিয়ে যে আর থাকতে পারছিনা, সখিনা। ঐ- দেখ, কি সুন্দর আলো।
সখিনা- কোথায় আলো? আমিতো কোথাও আলো দেখতেছিনা। তুমি ভুল দেখেছ, স্বামী।
কাশেম- ভুল নয় সখিনা। ঐ চেয়ে দেখ, আব্বাজান স্বর্গের দ্বারে পানির পিয়ালা হাতে নিয়ে আমায় লক্ষ্য করে ডাকতেছে, কাশেম! তুমি কেন জগতের পানির জন্য অপেক্ষা করতেছ। শীঘ্র চলে এস। তোমার জন্য বেহেস্তের সু-শীতল পানি আমি প্রস্তুত করে রেখেছি। তুমি আমায় বিদায় দাও, সখিনা।
সখিনা- হায় খোদা! ইহাই কি আমার ভাগ্যে লেখা ছিলো, খোদা। তুমি আজই গড়লে আবার আজই ভেঙ্গে ফেললে। ওগো স্বামী, আমি তোমায় বিদায় দিলুম। কিন্তু পরকালে রোজ হাসরে যেন তোমাকে আমি আবার ফিরে পাই।
কাশেমঃ হায়- হায়! এসময়ে আমি আমার মাতার মুখ দর্শন করতে পারলুম না। সখিনা, আমায় ক্ষমা করো। আমি তোমার ঋণ পরিশোধ করতে পারলুম না। লা-ইলাহা ইল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। (মৃত্যু)।
সখিনাঃ- স্বামী – স্বামী! তুমি আর একটিবার তোমার সখিনার সাহানা বেশ চেয়ে দেখ। এখনো আমি সেই বিবাহ বেশেই রয়েছি। আমার কেশগুচ্ছ যে ভাবে দেখেছিলে এখনও সেই ভাবেই রয়েছে। একটি কেশও স্থানভ্রষ্ট হয়নি। তুমি যে বেশে ইহজগতে আমাকে ছেড়ে গেলে, আমি ঠিক সেই বেশেই থাকব। আমি জগতে বেঁচে থাকা পর্যন্ত তোমার দেহ নির্গত রক্তবিন্দু মুক্তিকায় মিশে যেতে দেব না। যে সূর্য্যদেব সখিনার বিবাহ দেখেছিলো, সেই সূর্য্যদেবই আবার সখিনার বৈধব্য দশা দেখতে দেখতে অদৃশ্য হলো। আমার কপালে কি এই লেখা ছিলো, খোদা।
সখিনার গান ।
আমার এই ছিলো কপালে গো,
দারুন বিধির লেখা-২
কালো রাত্ৰি না পুহাইতে,
মরলো প্রাণের পতিগো
দারুন বিধির লেখা।
আমার এইছিলো কপালে গো,
দারুন বিধির লেখা।
অসময় নিদানের কালে,
কে দেখিবে মোরে গো
দারুন বিধির লেখা।
আমার এইছিলো- কপালে গো,
দারুন বিধির লেখা।
শশুড় মরল জহর খেয়ে,
পতি মরল রণে গো
দারুন বিধির লেখা।
আমার এই ছিল কপালে গো,
দারুন বিধির লেখা।
জনম দুখিনী কাঙ্গালিনী,
বানাইলো মোরে গো
দারুন বিধির লেখা।
আমার এই ছিল কপালে গো,
দারুন বিধির লেখা।।
(গীত অন্ত।)
সখিনাঃ- আব্বাজান- আব্বাজান। এ সময়ে তুমি কোথায় রইলে আব্বাজান। একটি বার তুমি সখিনার দুর্দশা দেখে যাও। (কাঁদিতে লাগিল)
সহসা হোসেনের প্রবেশ।
হোসেন:- কাশেম! কাশেম!! বৎস কাশেম।
সখিনা- তোমাদের কাশেম আর সাড়া দেবে না আব্বাজান।ঐ- চেয়ে দেখ, স্বামী মোর কি সুন্দর সাজে সজিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
হোসেন:- সত্যিই তো, কাশেম– কাশেম! তুমি আমায় ছেড়ে চলে গেলে, বৎস।
সখিনা:- আব্বা-আব্বাজান (পুনঃ কাঁদতে লাগল)
হোসেন:- কাঁদিস নে মা। কাঁদলে আর কোনো ফল হবে না। উঠ বাবা কাশেম, তুমি উঠে দাঁড়াও। তোমার তরবারি হস্তে তুলে নাও বাবা। ঐ চেয়ে বাবা তোমার প্রিয় অশ্ব তোমাকে লক্ষ্য করে ছলছল নেত্রে তোমার দিকে চেয়ে রয়েছে। প্রাণাধিক বীরেন্দ্র কাশেম, আর একটিবার অস্ত্র ধর, বৎস। হে খোদা! তুমি আমার ডাহিন বাম দুটি হস্ত ভেঙ্গে ফেললে খোদা। আমার বৎস কাশেম, আর কি সাড়া দেবেনা?
সখিনা- আব্বাজান! তুমি একি অলীক কল্পনা করছ! সে জন্মের মত চির বিদায় নিয়ে চলে গেছে। আমাকে বিধবা সাজিয়ে সে বেহেস্তে চলে গেছে, আব্বাজান।
হোসেন- সত্যিই তো আমি অলীক কল্পনা করতেছি। যে একবার চলে যায়, হাজার ডাকলেও তো সে আর ফিরে আসে না। কার মায়ায় ও সাড়া দেবে। দাদা! তুমি না কাশেমকে আমার হস্তে সমর্পণ করেছিলে, আমি কাশেমকে রক্ষা করতে পারলুম না, দাদা। কাশেম যাও,- দাদাকে গিয়ে বলো ক্ষনেক পরে আমিও আসতেছি। ভাবীজান, তুমি দেখে যাও তোমার কাশেম কিরূপ রক্তরঞ্জিত বেশ ধারণ করে বেহেস্তে চলে গেছে।
সহসা কদভানুর প্রবেশ।
কদভানু- কাশেম, কাশেম! আমার কাশেম সন্মুখ সমরে জয়লাভ করে ফিরে এসেছে। সখিনা, একি ইমাম সাহেব! আপনারা সকলেই অশ্রু বর্ষণ করছেন কেন? সখিনার চন্দ্রবদন মুখ এতো মলিন কেন! কি হয়েছে সখিনা? কাশেম এসেছে, কোথায় কাশেম?
সখিনা- এসেছে আম্মাজান! ঐ দেখুন কি সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে আপনার কাশেম ধরায় নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে।
কদভানু— সত্যিই তো— একি বৎস কাশেম! তুমি ধরায় পড়ে রয়েছ কেন? কি হয়েছে তোমার? (কাশেমকে জড়ায়ে ধরলেন।) উঠ বাবা, কথা বল। বল বাবা, তোমার কি হয়েছে! একটি বার খুলে বল বাবা। একি তোমার শরীর রক্তে বঞ্জিত কেন?
হোসেন: ভাবীজান, তোমার কাশেম আর কথা বলবে না। তোমার কাশেম শত্রুর শরাঘাতে লৌহিত্য বসন পরিধান করে বেহেস্তে চলে ‘গেছে।
কদভানু– ও: খোদা! সত্যি তুমি আমায় পুত্রের কাঙাল সাজালে খোদা। বাবা কাশেম, তুমি একটিবার আমাকে মা বলে ডাক। হায়-হায় খোদা! আমি কেমন করে পুত্রশোক যন্ত্রণা সহ্য করব!
হোসেন-সহ্য করতেই হবে ভাবীজান। খাঁচার পাখী, খাঁচা ছেড়ে উড়ে গেছে। এখন কাঁদলে আর পাখী ফিরে আসবেনা। খোদাকে ডাক, খোদার নাম ব্যতীত এখন আর আমাদের কেউ সাথী নেই।
কদভানু- হায় খোদা: আমার বুকের ধন কেড়ে নিয়ে তুমি আমায় পাগলীনি সাজালে! না, আর কাঁদব না। হে খোদা! তোমার নিকট আমার এই প্রার্থনা যে, আমার মৃত্যুর পর পরকালে যেন কাশেমের মুখের ‘মা’ ডাক আমি শুনতে পাই। হায় খোদা! তুমি আমাকে কেন বাঁচিয়ে রেখেছ, খোদা। তুমি আমাকে মৃত্যু দাও- মৃত্যু দাও।
সখিনা- মৃত্যুর জন্য ভাবছেন কেন আম্মাজান, আাজ না হয় কাল হয়তো আমাদের সবাইকে এমনিভাবে মরতে হবে।
হোসেন:- সখিনা! ভাবীজান !! তোমরা আর নয়নবারি মৃত্তিকায় ফেল না। তোমাদের নয়নবারি দেখে ক্ৰমশ: আমার শরীর দুর্বল হয়ে আসছে। তোমরা আর কেঁদনা। তোমাদের ক্রন্দনে পরম দয়ালু খোদা তায়ালা আমাদের প্রতি অসন্তষ্ট হতে পারে। তোমরা কাশেমকে ধর। একে এখান থেকে নবী(সাঃ)এর রওজা মোবারকে নিয়ে যাই।
(কাশেমের মৃতদেহ নিয়ে সকলের প্রস্থান)
* * *
পঞ্চম অঙ্ক পঞ্চম দৃশ্য
আলি আকববের শিবির
(আলি আকবরের প্রবেশ।)
আলি আকবর- হাহাকার! হাহাকার!! হাহাকার !!! ধূলায় দোসর আবৃত গগন, নিন্মে মৃত্তিকা, উর্দ্ধে সুউচ্চ নীল আকাশ। তার মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে বীভৎস করুণ রোধন। (করুণ সুব বেজে উঠল) ঐ সেই ক্রন্দেনর বোল। সমগ্র জগত কাঁদছে, আকাশ কাঁদছে, পাতাল কাঁদছে, মৃত্তিকায় পশুপক্ষী, বৃক্ষলতা সবই করুণ কান্নার রোল তুলছে। (নেপথ্যে এজিদ সৈন্যের জয়ধ্বনি-জয় জাহাঁপনা এজিদের) আবার-আবার সেই শত্রুগণের জয়ধ্বনি! আরে অমিত বীরের তনয়। তবে কেন এখনও আমি কাপুরুষের ন্যায় শিবিরে বসে আছি? কেন আমি শিশুসন্তানের নির্মম হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে ভুলে গেছি! না-না, আর আমি শিবিরে বসে থাকব না। (করুণ সুর বেজে উঠল) আবার- আবার সেই ক্রন্দন ধ্বনি। দাঁডা-দাঁড়া কাফেরগণ, আজ ঘুচাইব তোদের রণের আকিঞ্চন- (নেপথ্যে এজিদের জয়ধ্বনি) আবার – আবার সেই জয়ধ্বনি। ওরে নির্মম পাষণ্ড শত্রুদল আর কতদিন এমনিভাবে জয়ধ্বনি দিবে। না-না, আর আমি ওদের জয়ধ্বনি সহ্য করব না। এখনি আমি উল্কা বেগে ছুটে যাব ওদের জয়ধ্বনি স্তব্ধ করতে। (করুণ সুর বেজে উঠল) আবার– আবার সেই ক্রন্দন ধ্বনি। হায়রে কত ব্যথা তোর অন্তরে। আমার ক্ষুদ্র বক্ষে যে দুঃখ চাঁপা দিয়ে রেখেছি তার শতাংশের এক শতাংশও তোদের অন্তরে নেই। তবু আমি নীরবে শিবিরে বসে আছি। না-না, আমি আর বসে থাকব না। আমি এখনি উড়ে চলে যাব সেই সমর প্রাঙ্গণে। দাঁড়া- দাঁড়া শত্রুগণ, আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি। (প্রস্থানোদ্যত)
দ্রুত হোসেনের প্রবেশ।
হোসেন-(আকবরকে বাধা দিয়ে)- কোথায় যাবে বৎস, আলি আকবর?
আলি আকবর- যুদ্ধে যাব, আব্বাজান। শত্রু সৈন্যের জয়ধ্বনি আমার কর্ণে শেলের মতো আঘাত হানছে, আব্বাজন- শেলের মতো আঘাত হানছে। তাই আমি ঐ শত্রু সৈন্যের জয়ধ্বনি চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে যুদ্ধক্ষেত্রে যাব, আব্বাজান।
হোসেন- তুমি একি বলছ আলি আকবর। তুমি যাবে যুদ্ধক্ষেত্রে?
আলি আকবরঃ– কেন যাব না, আব্বাজান! দাদার মৃত্যুর প্ৰতিশোধ, শিশু আলী আসগরের বর্বরোচিত হত্যার প্রতিশোধ, আত্মীয় স্বজনের নিৰ্মম হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা কি আমার কর্তব্য নয়, আব্বাজান?
হোসেন:- কর্তব্য হলেও আমি তোমাকে যুদ্ধে যেতে দেব না, পুত্র। তোমার অবিহনে তোমার মাতা কেমন করে একাকিনী শিবিরে থাকবে। তুমি শিবিরে থেকে তোমার মাতাকে সান্ত্বনা দাও। আমি নিজেই আজ চলে যাব যুদ্ধক্ষেত্রে।
আলী আকবর-একি বলছেন আব্বাজান! আমি জীবিত থাকতে আপনি যাবেন যুদ্ধক্ষেত্রে! না, তা কখনই হতে পারে না। আব্বাজান, আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত আপনাকে রণে পাঠিয়ে আমি শিবিরে বসে থাকতে পারব না আব্বাজান। আপনি আমাকে হাসি মুখে বিদায় দিন, আবাবাজান। রণে গিয়ে য়েন আমি ভ্রাতৃ, আত্মীয়স্বজন হত্যার পরিশোধ গ্রহণ করতে পারি।
হোসেন– তুমি আমাকে বড় সমস্যায় ফেললে বৎস আলী আকবর। আমি আশা করছিলাম, আমার অবিহনে তোমার শিরে আমার মাথার রাজমুকুট শোভা পাবে। কিন্তু আমার সেই আশা পূরণ হলোনা। কি করব! ধর্মযুদ্ধে বাধা দেওয়া আমার কর্তব্য নয়। আচ্ছা পুত্র, তোমাকে আমি খোদাতায়লার দরবারে সমর্পণ করলাম। তুমি খোদার নাম ভরসা করে যুদ্ধে চলে যাও। খুব সাবধানে শত্রুসৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। যাও পুত্র, বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে। (প্রস্থান)
আলী আকবর- পেয়েছি— পেয়েছি, আব্বাজানের আদেশ পেয়েছি। আর তোদের রক্ষা নাই জানিও কাফেরগণ। আমি চাই- চাই শুধু প্রতিশোধ- হাঃ-হাঃ-হাঃ- (প্রস্থান।)
* * *
পঞ্চম অঙ্ক ষষ্ঠ দৃশ্য
(ফোরাত তীর)
(জয়ধনি দিতে দিতে সৈন্যসহ অলিদ মারোয়ান ও শিমারের প্রবেশ।)
অলিদ:- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়
অলিদ- সৈন্যগণ খুব সাবধান। আজ রণক্ষেত্রে কে আসবে বলা মস্কিল। ঐ চেয়ে দেখ, আজ যেন পশ্চিম গগণে সূর্যদেব উদিত হচ্ছে।
শিমার- সত্যিই তো সেনাপতি ও তো মানুষ নয়, নিশ্চয়ই কোনো ফেরেস্তা রণক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছেন। বাহঃ, কি সুন্দর স্বর্গীয় রূপ! ওর শরীরে আমরা কেমনে অস্ত্রাঘাত করব, বলতে পারেন মন্ত্রীবর?
মারোয়ান- সৈন্যগণ। তোমাদের মনোবৃত্তি নিতান্তই ঘৃণণীয়। রণক্ষেত্রে কারও রূপের প্রশংসা করার দরকার নেই। শীঘ্র রণবাদ্য বাজাও। বল,-জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ– জয়-
মারোয়ান:- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়-
(দ্রুতঃ আলি আকবরের প্রবেশ)
আলি আকবর- আর জয়ধ্বনি দিতে হবে না কাফেরের দল। শক্তি থাকে তো যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হ।
অলিদঃ- অর্বাচীন বালক! তুমি একজন সামান্য বালক। তোমার এতো অহংকার, এতো সাহস। তোমার যদি জীবনের মায়া থাকে, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে তোমার মাতৃকুলে চলে যাও। নতুবা এখনই তোমার জীবন প্রদীপ চিরদিনের মত নিভে যাবে। যদি ভালো চাও, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে শিবিরে চলে যাও।
আলি আকবর- ভালোমন্দ বিবেচনা তোমার করতে হবে না। জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার ভয় আমার নেই। শক্তি থাকে তো যুদ্ধে অগ্রসর হও,’ নতুবা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে ভেড়ার পালের ন্যায় ফোরাতকূল ছেড়ে পালিয়ে যাও।
মারোয়ান- কি, আমরা পালাব? সৈনগন! আক্রমণ কর এবং হত্যা কর এই অর্বাচীনকে।
আলি আকবর-হ্যাঁ কর হত্যা, আমি হত্যার জন্য প্রস্তুত হয়েই আছি।
(যুদ্ধ এবং যুদ্ধ করতে করতে সকলের প্রস্থান ও পরে ক্লান্ত শরীরে আলি আকবরের পুনঃ প্রবেশ)
আলি আকবর:- সবশেষ! সবশেষ! কাফেরগণ এই শক্তি নিয়ে সমরক্ষেত্রে এসেছিলে? কই –কোথায় লুকিয়েছিস? শীঘ্র বাহির হ। আজ তোদের কারও নিস্তার নেই। (চতুর্দিক নিরীক্ষণ করে।) নাই– নাই, কেউ নেই বাধা দিবার জন্য। ও: খোদা! পানি পিপাসায় আমার কন্ঠনালী শুকিয়ে গেছে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। এসময়ে যদি একবিন্দু পানি পান করতে পারতাম, তাহলে শত্রুগণকে হত্যা করে ফোরাৎকূল উদ্ধার করতে পারতাম। কিন্তু কি করব! ফোরাতের পানি আমাদের ভাগ্যে নেই। ও:-খোদা! তোমার এই চক্রান্ত ছিল খোদা। না— না, তোমাকে দোষারূপ করছি কেন। সকল দোষ আমাদের অদৃষ্টের। না, আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা। পানি পিপাসায় আমার সর্বশরীর ক্রমান্বয়ে অবশ হয়ে আসছে। যাই, আব্বার কাছে চলে যাই। আব্বাজান যদি আমাকে একবিন্দু পানি দিতে পারে, তাহলে শত্রুসৈন্য কেউই আজ রেহাই পাবে না। যাই শীঘ্র চলে যাই- আব্বাজান- আব্বাজান- (দ্রুতঃ প্রস্থান।)
* * *
পঞ্চম অঙ্ক সপ্তম দৃশ্য
-হোসেন শিবির-
(হোসেনের প্রবেশ)
হোসেন- পরম দয়ালু খোদা! আমায় তুমি কারবালা প্রান্তরে এনে আত্মীয় স্বজন, ভাই বেরাদর সব শেষ করেও তোমার মনোবাসনা পূর্ণ হলো না, খোদা। তুমি না বাঞ্ছাকল্পতরু। হে খোদা! আমি যদি তোমার নিকট কোনো অপরাধ করে থাকি, তাহলে সেই অপরাধ মার্জনা কর, খোদা।
নেপথ্যে আলি আকবর- আব্বা- আব্বাজান-
হোসেন- একি, এযে আলি আকববের কণ্ঠস্বর। তবে কি বৎস আলি আকবর যুদ্ধ জয় করে ফিরে এসেছে?
(ক্লান্ত শরীরে আলি আকবরের প্রবেশ।)
আলি আকবর-আব্বাজান! আমায় একবিন্দু পানি দাও, আব্বাজান। পানি পিপাসায় আমার ছাতি ফেটে যাচ্ছে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা। (হোসেনকে জড়ায়ে ধরল )।আব্বাজান! ওঃ খোদা! আমায় শক্তি দাও খোদা- আমায় শক্তি দাও।
হোসেন- বৎস, আলি আকবর! আজ মহরমের নয়টি দিবস অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে, নয়নাশ্রু ব্যতীত আজ পর্যন্ত একবিন্দু পানির দেখা মেলেনি। সেই নয়নাশ্রুও এখন শুষ্ক হয়ে গেছে। এই মরুপ্রান্তরে পানি কোথায় পাব বৎস? ওঃ খোদা! তুমি আমায় এ দৃশ্য সহ্য করবার শক্তি দাও খোদা— শক্তি দাও। আমি বেঁচে থাকতে আমার ঔরসজাত সন্তান পানি বিহনে ছটফট করছে। এ দৃশ্য দেখেও আমাকে নীরবে থাকতে হচ্ছে। উঠ, উঠ বৎস! খোদার নাম স্মরণ কর।
আলি আকবরঃ- ওঃ খোদা! তুমি আমায় মৃত্যু দাও খোদা! আমায় মৃত্যু দাও। আব্বাজান, শীঘ্র আমাকে পানি দাও।
(নেপথ্যে এজিদ সৈন্যের জয়ধ্বনি)
হোসেন- একমাত্র আমার জিবায় একটু পানি রয়েছে, বৎস। এতে যদি তোমার পানি পিপাসা নিবারণ হয়, তাহলে আমি ধন্য হব। বৎস আলি আকবর, তুমি আর ইহজগতের পানির আশা করোনা। খোদা তায়ালার ইচ্ছা হলে বেহেস্তে গমনপূর্বক তুমি স্বর্গীয় সু-শীতল কাওছাবের পানি পান করতে পারবে। এস, এস পুত্র। আমার জিব্বা লেহন করে তোমার পানি পিপাসা নিবারণ কর।
(আলী আকবর হোসেনের জিবা লেহন করলো)
হোসেন- যাও পুত্র! তুমি যুদ্ধে চলে যাও। আমি আশির্বাদ করি তুমি যেন সন্মুখ সমরে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করে বেহেস্তে চলে যেতে পার। (হোসেন প্রস্থান।)
আলি আকবর- তাই হবে আব্বাজান। আপনার জিবা লেহন করে আমার প্ৰাণ শীতল হয়েছে। আর কি চাই। এখনি আমি চলে যাব যুদ্ধক্ষেত্রে। আমি চাই শুধু প্রতিশোধ- প্রতিশোধ- (দ্রুত প্রস্থান।)
* * *
পঞ্চম অংক অষ্টম দৃশ্য
-ফোরাৎতীর:- –রণভূমি-
(সৈন্যসহ অলিদ, মারোয়ান ও শিমাবের প্রবেশ।)
অলিদ- জয় জাহাঁপনা এজিদের
সৈন্যগণ- জয়
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির
সৈন্যগণ- জয়
অলিদ- মন্ত্রীবর, এখন উপায়?
মারোয়ান- কেন, কি হয়েছে?
অলিদ- এখন পর্যন্ত আমাদের অনেক সৈন্য নিধন হয়েছে। ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে হোসেন বধ করতে এসেছিলুম, এখন আছে মাত্র পাঁচশত সৈন্য। এখন এই অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে হোসেন বধ করা অসম্ভব।এখন শীঘ্র এর উপায় বের করুন।
মারোয়ান:- সৈন্যের জন্য তোমাদের কোনো চিন্তা করতে হবে না। অদ্য রজনীতে আরও ত্রিশ হাজার সৈন্য এসে উপস্থিত হবে। আমাদের আর কোনো চিন্তা নেই। বাজাও ডঙ্কা- উড়াও যুদ্ধের নিশান। বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়
মারোয়ানঃ- জয় দামেস্কধিপতির
সৈন্যগণ- জয়
(দ্রুত: আলি আকবরের প্রবেশ।)
আলি আকবর- আবার, আবার সেই জয়ধ্বনি। আজ আমি তোদের জয়ধ্বনি চিরতরে স্তব্ধ করে দিব।
মারোয়ান- সৈন্যগণ! একসঙ্গে আক্রমণ করে এই অর্বাচীনকে।
আলি আকবর-তবেই ধর অস্ত্র-
(তুমুল যুদ্ধ ও আলি আকবর ক্রমশ: দুর্বল হয়ে পড়ল।)
আলি আকবর- সৈন্যগণ তোমরা বীর। পানি দানে তোমরা আমার পিপাসা নিবারণ করে বীবের মর্যদা রক্ষা কর।
শিমার- পানি? পানি দিব তোমাকে? এই দিচ্ছি পানী। (আলি আকবরকে অস্ত্রাঘাত করল।)
আলি আকবর- আঃ- রাক্ষসগণ! তোমরা আমাকে অল্স্ত্রাঘাত করলে? ও: খোদা! আমায় মৃত্যু দাও, খোদা। আমায় মৃত্যু দাও। ওঃ, এই অন্তিম সময়ে পিতৃ-মাতৃর দর্শন পেলুম না। যাই, যতশীঘ্র সম্ভব আমি শিবিরে চলে যাই। লা ইলাহা ইল্লালাহ মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। (টলিতে টলিতে প্রস্থান।)
অলিদ- জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণঃ- জয়।
অলিদ- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ— জয়।
অলিদ– জয় শাহেনশাহ এজিদের-
সৈন্যগণ-জয়।
(জয়ধ্বনি দিতে দিতে সকলের প্রস্থান।)
* * *
ষষ্ঠ অংক প্রথম দৃশ্য
-হোসেন শিবিবঃ
-জয়নাল আবদিনের প্রবেশ-
জয়নাল- হাহাকার! হাহাকার!! হাহাকার!!! ধূলায় ধূসর আবৃত গগন, নিম্নে মৃত্তিকা উর্দ্ধে সুউজ্বল নীল আকাশ, এর মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে বীভৎস করুণ রোধন। (করুণ সুর বেজে উঠল) ঐ-ঐ আবার সেই ক্রন্দেনর রোল, দাঁড়া, দাঁড়া শত্রুদল। গুচাইব আজ তোদের দর্প অহংকার।(করুণ সুর বেজে উঠল) আবার, – আবার সেই ক্রন্দন ধ্বনি। কত বৃথা অন্তরে তোর, আমার ক্ষুদ্র বক্ষে যে দুঃখ চাঁপা দিয়ে রেখেছি তার শতাংশের এক শতা্ংশ দুঃখও তোর অন্তরে নেই। তবু তুই কাঁদছিস। আমি আর তোকে কাঁদতে দেব না। আমি আজই তোর দুঃখ নিবারণ করব। তবু যদি কাঁদিস, আমি তোর কণ্ঠ চিরতরে বোধ করে দিব।(করুণ সুর বাজিল) আবার—আবার সেই ক্রন্দনধ্বনি। দাঁড়া- দাঁড়া শত্রুগণ, আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি। (প্রস্থানোদ্যত)
সহসা হোসেনের প্রবেশ
হোসেন:- (জয়নালকে ধরে) বৎস জয়নাল আব্দিন! প্রস্তুত হয়ে কোথায় যাবে বৎস? বল পুত্র, বল কোথায় যাবে? আমার নিকট শীঘ্র খোলে বল। আমাদের ছেড়ে তুমি একা একা কোথায় যাবে?
জয়নাল- কেন আমায় বাধা দিলে আব্বাজান!আমি চলেছি রণক্ষেত্রে। ঐ- ঐ দেখুন আব্বাজান, শত্রু সৈন্যগণ আমাদের বংশ ধ্বংস করে কীরূপ আনন্দ উৎসব করতেছে। ওদের দমন করা কি আমার কর্তব্য নয়, আব্বাজান! ভাইবন্ধু, আত্মীয়স্বজন যদি কারবালা প্রান্তরে শত্রুসৈন্য নিধন করে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে, তাহলে আমি কেন পারব না, আব্বাজান?
হোসেন- বৎস জয়নাল! তুমিও আমাদের মায়া মমতা ত্যাগ করে চলে যাবে, বৎস?
জয়নাল- না গিয়ে যে আর শিবিরে বসে থাকতে পারছিনা, আব্বাজান। ভাইবন্ধু, আত্মীয়স্বজন, সবাই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। শত্রুসেনা যুদ্ধে পরাস্ত করে কেউ ফোরাৎকুল উদ্ধার করতে পারেনি। তাই আমার অন্তরে বড় জ্বালা, আব্বাজান। আমি যে পর্যন্ত ঐ পাপিষ্ঠ সৈন্যগণকে হত্যা করে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করতে না পারব, ফোরাত কূল উদ্ধার করে পানির ঘাট উদ্ধার করতে না পারব, সে পর্যন্ত আমি শিবিরে ফিরব না, আব্বাজান। আমাকে এখন বিদায় দিন, আব্বাজান। বিদায় আব্বাজান-বিদায়-
(প্রস্থানোদ্যত এবং হোসেন বাধা দিয়া)
হোসেন:- বৎস জয়নাল! তোমার কথায় আমার বুকখানা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাচ্ছে পুত্র- চৌচির হয়ে যাচ্ছে। (কাঁদতে লাগলো)
জয়নালঃ- একি! আব্বাজান, তুমি কাঁদছ কেন? তোমার নয়ন বারি ধারা কেন ঝড়ে পরছে। তুমি আর কেঁদনা।
(গীত)
কেদনা বাবা তুমি, – আমি যাব যুদ্ধ করতে-২
পানি বিহনে সবে, – সকলি মরিয়া গেছে। ২
সকলি হারিয়ে আমি, – একা কেন রব ঘরে-২
মারিয়া কাফেরের লস্কর, – উদ্ধারিব ফোরাতের জল-২
কেদনা বাবা তুমি, – আমি যাব যুদ্ধ করতে।
-সহসা সহর ভানুর প্রবেশ-
সহর ভানু— কে, কে এমন করুণ সুরে রোদন করতেছে। এতো দেখছি পুত্র জয়নাল আবদিনের কণ্ঠশ্বর। একি জয়নাল, তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কি হয়েছে, পুত্র? তুমি আমায় খোলে বল বৎস।
জয়নাল:-ঐ-দেখ মা, আব্বাজান কিরূপ রোদন করতেছে। তাই আমি আব্বাজানকে সান্ত্বনা দিবার জন্য একটি গীত গেয়েছি, মা।
সহর ভানু- একি স্বামী আপনি কাঁদছেন? আপনার নয়নবারি ঝরছে কেন, স্বামী! আপনার ক্রন্দনে আমার কলিজা বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কেন আপনি কাঁদছেন? একটিবার খোলে বলুন, স্বামী।
হোসেন- প্রাণাধিক সহর ভানু। আমি না কেঁদে যে থাকতে পারছিনা। বৎস জয়নাল আব্দিনকে তোমার বুকে রেখে আজ আমি যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু জয়নাল আমার আগেই রণে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। তাই আমি না কেঁদে থাকতে পারছি না, সহর ভানু।
সহর ভানু- সেকি কথা! তুমি রণে যাবে?, না-না বাবা জয়নাল, তুমি রণে যেয়োনা, বাবা। তোমাকে রণে পাঠিয়ে আমি কেমনে একাকিনী শিবিরে থাকব, বাবা!
জয়নালঃ- রণে নাগিয়ে যে থাকতে পারছিনা, মা। ঐ-চেয়ে দেখ মা, শত্রুসৈন্য আমাকে লক্ষ্য করে কুত্তার মত লেলিহান জিব্বা মেলে কীভাবে চেয়ে রয়েছে। তাদের দমন করা কি আমার কর্তব্য নয়, মা? তুমি আমায় হাঁসিমুখে বিদায় দাও মা, আমি রণে চলে যাই।
সহর ভানু- বৎস জয়নাল, তোমাকে প্রবোধ দেবার মতো ক্ষমতা আমার নাই, পুত্র। তবে তুমি এইটুকু মনে রেখ যে, আমার চারটি পুত্র একে একে হারালুম, তোমায় কোলে নিয়ে সে সমস্ত শোক তাপ ভুলে আছি। তুমি একান্তই যদি রণে চলে যাবে, তাহলে আগে আমাকে হত্যা করে তারপর তুমি রণে চলে যাও, পুত্র।
জয়নাল:-একি বলছ মা! ঐ চেয়ে দেখ, শত্রুসৈন্য যুদ্ধ নিশান উড়িয়ে দিয়েছে।যুদ্ধের জন্য আমাকে আহ্বান জানাচ্ছে।এখন আমি ব্যতীত আর কে রণে যাবে, মা?
হোসেন:-কথা যথার্থ। কিন্তু অদ্যকার রণে আমিই যাব বৎস।
জয়নাল- সেকি কথা আব্বাজান! হতভাগা জয়নাল আব্দিন বেঁচে থাকতে আপনি যাবেন যুদ্ধক্ষেত্রে? আব্বাজান একি বলছেন শুনেছ, মা!
সহর ভানু- শুনেছি পুত্র। ওগো স্বামী! সত্যিই কি আপনি যুদ্ধে যাবেন? আপনার কথা শ্রবণে আমার কলিজা বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আমার সারা জীবনের শোক-তাপ-যন্ত্রণা আপনার চন্দ্রবদন মুখ দর্শন করে মুখ বুজে সহ্য করে এসেছি। আজ যদি আপনি সত্যিই যুদ্ধে চলে যান, তাহলে আমাদেরকে কে রক্ষা করবে, স্বামী?
হোসেন- সে জন্য কোনো চিন্তা করোনা সহর ভানু। রক্ষাকর্তা তো আমি নই। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই তোমাদেরকে রক্ষা করবেন। আমি মাত্র উপলক্ষ্য ছিলাম। এখন সে দায়িত্ব আমি খোদার হাতে সমর্পণ করলাম। বৎস জয়নাল-
জয়নাল- আব্বাজান- (হোসেনকে জড়িয়ে ধরল)।
হোসেনঃ— ব্যস্ত হয়োনা বৎস জয়নাল আব্দিন। এ কথা মনে রেখ যে, খোদার হুকুম ভিন্ন দুনিয়ার কোনো কাজই হতে পারে না। আমি তোমাকে কয়েকটি কথা বলব, তুমি মনযোগের সাথে শ্রবণ কর। আমি যুদ্ধে যাওয়ার পর তুমি কিন্তু কখনও যুদ্ধে যেওনা। তোমার মাতৃর আদেশ তুমি কখনও লঙ্ঘন কর না। সদা খোদার ওপর নির্ভর ও বিশ্বাস রেখে চলবে। বৎস জয়নাল- পিয়তমা সহর ভানু! আমি যুদ্ধে শত্রুহস্তে শহীদ হলেও তোমরা কোনো আফসোস করোনা। শত্রুর প্রতি প্রতিশোধ নিতে যেওনা এবং নির্জনে বসে খোদা প্রেমে সদা মগ্ন থাকবে। প্রাণাধিক পুত্র, তুমিই বর্তমান ইমাম বংশের একমাত্র উজ্জ্বল মণি। তোমা হতেই ইমাম বংশ প্রলয়কাল পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। মতামহের প্রচারিত পবিত্র ইসলাম ধর্ম তোমার দ্বারা অক্ষুণ্ণ থাকবে। যখন তুমি শত্রুর হাত থেকে মুক্তিলাভ করে মদিনা পৌঁছোবে, তখন পবিত্র রওজা শরীফে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, ইয়া রাসুল্লাহ তোমার ইমাম হোসেনকে দামেস্করাজ এজিদের আদেশে দুরন্ত কুফাবাসী পিপাসায় পীড়িত রেখে নির্মভাবে হত্যা করে শহীদ করেছে।
সহর ভানু- স্বামী- স্বামী- (জড়াইয়া ধরলেন)
জয়নাল- আব্বাজান- আব্বাজান– (জড়াইয়া ধরলো)
হোসেন- অধীরা হয়োনা সহর ভানু। আমার কথা শ্রবণ করে জীবিত কাল পৰ্যন্ত স্মরণ রাখতে ভুলনা। বৎস জয়নাল, আরও বলবে, আপনার বংশধর পাঞ্জাতন বলে শত্রুগণ সম্মান করেনি। পরকালের শাস্তির ভয়ে ভীত হয়নি। আপনি যাকে আদর করে স্বন্ধে নিতেন, যে কন্ঠে, যে মুখে স্নেহভরে বার বার চুম্বন করতেন, সেই কণ্ঠদেশ বর্ষাঘাতে বিদ্ধপূর্বক তররারি আঘাতে ছেদন ও অশ্বের পদতলে দলিত মথিত করে আনন্দ উল্লাস করেছে। যে ইমাম হোসেনকে হজরত জিব্রাইল (আঃ) স্বর্গীয় ফল ভক্ষণ করাতেন, সেই হোসেনকে অনাহারে রেখে নৃশংসভাবে তাঁর প্রাণ বধ করেছে। আরও বলবে দামেস্করাজ এজিদ হজরত ইমামকে তাঁর হাতে বায়েত গ্রহণ করতে বলেছিলো। এজিদ হস্তে বায়েত গ্রহণ করলে আপনার পবিত্র নামে কলঙ্ক হবে বলে তিনি বায়েত গ্রহণ করেন নি। তিনি আপনার নামের ও ধর্মের সন্মান রক্ষার জন্য শত্রুর হাতে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। এ সমস্ত কথা পবিত্র রওজা শরীফে পৌঁছোতে ভুল না। বিদায় বৎস জয়নাল আবদিন, বিদায় সহর ভানু- বিদায়- (প্রস্থানোদ্যত)|
জয়নাল- আব্বাজান- আব্বাজান-
সহর ভানু- স্বামী- স্বামী- (দুজনে হোসেনকে জড়াইয়া ধরিল)
হোসেন- বৎস জয়নাল আব্দিন, প্রাণধিক সহর ভানু! তোমরা আর আমায় মায়াজালে আবদ্ধ করোনা। আমার জীবনকাল পূর্ণ হয়ে আসছে। বৎস জয়নাল আব্দিন- এসো পুত্র (জয়নালকে বুকে জড়াইয়া ধরে) বাছা! আয় বাছা-
জন্মের মতো তোকে বুকে ধরি,
আর বুকে জড়িয়ে ধরতে পারি কি না পারি।
চাঁদমুধে চুমা দিয়ে আমি চলে যাই
দুনীয়ার বুকে বাছা তুমি বিনে নাই।
যদি কাফেরগণে মারে আমায় রণে
যেওনা বাছা তুমি কাফেরের রণে।
আমার কারণে বাছা না ভেব দিলেতে
ফির বুকে নিব বাছা রোজ কিয়ামতে।
না ভাবিও বাছা কখন আমার কারণে
খোদায় ভাবিয়া বাছা থাকিও ভূবনে।
বিদায়-বিদায় বাছা জয়নাম আব্দিন
বিদায়-বিদায় প্রাণাধিক সহর ভানু।
যাবার পূর্বে বলে যাচ্ছি, সহর ভানু, বৎস জয়নাল আব্দিনকে কদাচ রণে যেতে দিও না। বি-দা-য় (হোসেন প্রস্থান)
সহর ভানু- স্বামী- স্বামী।
জয়নাল- মা-মা- আব্বাজান সত্যি যুদ্ধে চলে গেলো। আব্বাজান আবার কবে আসবেন, মা?
সহর ভানু- তিনি আর আসবেন না বাছা- তিনি আর আসবেন না। চলে গেলে, আমায় একা ফেলে চলে গেলে ওগো স্বামী।( কাঁদিতে লাগিল)
জয়নাল- তবে আর কাঁদছ কেন, মা? কাঁদলেতো আর কোনো লাভ হবেনা। এখন খোদাকে ডাক মা- খোদাকে ডাক-
সহর ভানু– তুমিও ডাক, পুত্র।
জয়নাল- তবেই ডাকছি, মা-
(গীত)
খোদা-খোদা, এইতো তোমার খেলা-২
ও তোমার খেলা তুমি খেলো
জীবের লাগাও গোলা
এইতো তোমার খেলা।।
রাজায় সাজাও কাঙ্গাল বেশে,
ফকির সাজাও রাজা।
ও বিষাদ সিন্ধু নীরে-২
তরী ডুবেছিলো এই বেলা
এইতো তোমার খেলাT
খোদা, খোদা এইতো তোমার খেলা।
কাউকে হাঁসাও, কাউকে কাঁদাও,
কাউকে ভাসাও সাগরেতে।- ২
ও-একূল ভেঙ্গে ও-কূল গড়ো-২
জীবের লাগাও গোলা
এইতো তোমার খেলা-২
খোদা- খোদা এইতো তোমার খেলা।।
(গীত অন্ত )
সহর ভানু- পুত্র! এ গান তোমায় কে শিখিয়ছে, পুত্র। তোমার গান শুনে আমার মনটা শান্ত হলো, পুত্র। আবার গাও- আবার গাও পুত্র, তোমার গান আবার আমার শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে।
জয়নাল- এখন গান গাওয়ার সময় নেই মা। ঐ চেয়ে দেখ, সূর্যদেব পশ্চিম গগনে হেলে পড়েছে। এখন জহুরের নামাজ প়ড়তে হবে।গান তোমাকে পরে শুনাব, মা। এখন চলো আমরা জহুরের নামাজ পড়তে যাই।
সহর ভানু- আচ্ছা চলো। হে খোদা! তুমিই মেহেরবান!! তুমিই মেহেরবান!!!
(উভয়ের প্রস্থান)
* * *
ষষ্ঠ অংক দ্বিতীয় দৃশ্য
-ফোরাত নদীর তীর-
রণভূমি
(সৈন্যসহ অলিদ, মারোয়ান, শিমার ও আব্দুল্লাহ জিয়াদের প্রবেশ।)
মারোয়ান- সৈন্যগণ! তোমরা খুব সাবধানে অদ্যকার যুদ্ধ পরিচালনা করবে। কারণ অদ্যকার যুদ্ধে আববের সর্বশেষ্ঠ বীর হজরত আলী করমুল্লাহের কনিষ্ঠ পুত্র মহাবীর হজরত ইমাম হোসেন আসবেন। তিনি শুধু যুদ্ধাই নয় মায়াবীও বটে! তিনি যুদ্ধে এসে নানান ছলনা করতে পারে। তেমরা কেউ তাঁর ছলনায় ভুলে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করোনা। এখন হোসেন একা। তাঁকে হত্যা করতে আমাদের বিশেষ অসুবিধা হবে না। হোসেনকে হত্যা করে তাঁর মস্তক দামেস্ক নগরে জাহাঁপনা এজিদের সমীপে পৌঁছোতে পারলে নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা স্বর্ণমূদ্রা বকশিস পাবে এবং সমগ্র জগতে আমাদের বীরত্ব কাহিনী প্রকাশ পাবে। হোসেন যুদ্ধে আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই তোমরা তাঁকে চতুর্দ্দিক থেকে আক্রমণ করবে এবং যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পানি চাইলে তোমরা কেউ পানি দিবেনা। হোসেনের ভয়ে যদি কেউ সমরক্ষেত্র হতে পালিয়ে যাও, তাহলে জেনে রেখ, তার মৃত্যু অনিবার্য্য। এখন সকলেই বল, জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ– জয়
মারোয়ান- জয় দাস্কোধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়
(রণসাজে সজ্জিত হয়ে হোসেনের প্রবেশ।)
হোসেনঃ― আর জয়ধ্বনি দিতে হবেনা। আমি এসে পরেছি।
মারোয়ান-তুমি এসে পরেছ বলে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে হতে ভয়ে পালাব কেমন?
হোসেন— আমি তোমাদের পালাতে বলিনি, এজিদ পক্ষ অবলম্বনকারী সৈন্যগণ! বল দেখি আমি কে? আমি কোন বংশে জন্মগ্রহণ করেছি? তোমরা এখনও আমাকে চিনতে পারনি। তোমরা যার মহা বচন পড়ে মুসলমান হয়েছ, আমি সেই দোজাহানের নবী হজরত মহম্মদ (সাঃ)এর বংশ সম্ভূত, যিনি শরিয়ত ও মারফতের পরম গুরু। তোমরা কি জান না, হজরত আলী করমুল্লাহ আমার পিতা? তোমরা কি জান না, হজরত হামজা যিনি শহীদের বাদশাহ তিনি আমার পিতার চাচাজান ছিলেন? তবে কীজন্য তোমরা আমাকে বধ করতে অগ্রসর হচ্ছ? তোমরা একবার ভেবে দেখ, তোমরা যে নরীজির উম্মত- সেই নবীজির শিরের পাগুরি আমার শিরে শোভা পাচ্ছে। পিতা হজরত আলীর জুলফিক্কার তরবারি আমার হাত শোভাবর্ধন করছেন। আজ তোমাদের নরীজির জুব্বা পাগুরি সকলই আমার অঙ্গে শোভা পাচ্ছেন। তোমরা আমাকে পশুর ন্যায় অববোধ করে রেখেছ। যে ফোরাৎ নদীর পানি বনের পশু-পক্ষী অবাধে পান করতেছে, সেই ফোরাতের পানি আমাদের বংশধরকে পান করতে না দিয়ে তোমরা মাতামহের উম্মত হতে বঞ্ছিত হচ্ছ। আর কত বলব! এখন আমি জীবনের মায়া- মমতা সবই ত্যাগ করেছি। ক্ষনেক পরেই তোমরা তোমাদের মনস্কামনা পুর্ণ করতে পারবে। তোমরা এখন ভেবে দেখ, আমি অল্প সময় খোদা তায়ালার নামে আরাধনা করে আসি। (প্রস্থান।
মারোয়ান- সৈন্যগণ! শুনলে তো? হোসেন কীরূপ ছলনা আরম্ভ করেছে। ওর কথায় তোমরা কর্ণপাত করোনা। হোসেন রণে উপস্থিত হওয়া মাত্র তোমরা চতুর্দিক হতে এক সঙ্গে আক্রমণ করে তাঁকে হত্যা করবে। রাজাজ্ঞা পালন না করলে তোমাদের সকলেরই চরম শাস্তি ভোগ করতে হবে। ঐতো হোসেন এলো বলে। তোমরা সকলেই বল জয় জাহাঁপনা এজিদের-
সৈন্যগণ- জয়
মারোয়ান- জয় দামেস্কধিপতির-
সৈন্যগণ- জয়
(রণসাজে সু-সজ্জিত হোসেনের প্রবেশ।)
হোসেলঃ- চুপকর– বিশ্বাসঘতক মেষের দল। আর বিলম্ব করছিস কেন। এইবার ক্ষুধার্ত সিংহের প্রতাপ স্ব-চোক্ষে প্রত্যক্ষ কর।
অলিদ- হোসেন, তুমি কোন সাহসে রণক্ষেত্রে উপস্থিত হলে? ত্রয়োদশ সহস্র সৈন্যের সঙ্গে তুমি একা কতক্ষণ যুদ্ধ করবে?
হোসেন- ধর্মদ্রোহী অলিদ! আমি ইচ্ছা করে যুদ্ধে এসেছি। অন্যায় যুদ্ধে তোমরা আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও শিশুসন্তানদের হত্যা করেছ। আমিতো তোমাদের অভিশাপ করিনি এবং করবও না। বীর তনয় আমি। বীরের ন্যায় সমরক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিব। তোমরা আমায় অন্যায়ভাবে হত্যা করতে পারবে, কিন্তু আমার জীবনকাল পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তোমরা আমার উপর যতই অস্ত্র নিক্ষেপ কর না কেন, তা সকলই ব্যর্থ হবে। আমি তোমাদের কয়েকটি কথা বলে যাচ্ছি। তোমরা আমাদের বংশের প্রতি যত প্রকার অন্যায় অতাচার করতেছ, তা আমি নির্বিবাদে সহ্য করে এসেছি। আমি তোমাদের প্রতি ক্রোদ্ধ হয়ে তোমাদের প্রতি অস্ত্রাঘাত করিনি। আমি যদি নদীর দিকে লক্ষ্য করে আর্তনাদ করি তাহলে নদী শুকিয়ে যাবে এবং বিশ্বের বুকে ভূমিকম্প সৃষ্টি হবে। ক্রোদ্ধ নজরে আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করলে অগ্নিবর্ষণ হবে। তোমাদের প্রতি রোষদৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তোমরা ভস্মীভূত হয়ে যাবে। কিন্তু বিশ্বপতি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে আমি মৌনতা অবলম্বন করে আসছি। অকারণে ধন ঐশ্বর্যের মোহে ধর্মের মর্যদা নষ্ট করে তোমরা আমার প্রতি অস্ত্রাঘাত করতে হস্ত উত্তোলন করোনা। বৃথা কেন পাপাচারে লিপ্ত হয়ে ইহকাল পরকাল হারিয়ে নরকের ভীষণ শাস্তিভোগ করবে! আমি তোমাদের সর্বপ্রকার অত্যাচার সহ্য করলাম। কিন্তু পরিণামে তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত তোমাদের ভোগ করতেই হবে।
মারোয়ান- সৈন্যগণ, এঁর মিষ্ট ভাষণে ভোলে তোমরা জাহাঁপনা এজিদের আদেশ ভুলে যেওনা। আক্রমণ কর। হত্যা কর। হোসেনের কোনো কথাই আমরা শুনব না। ওর কথা তোমরা বিশ্বাস করোনা।
হোসেন- তোমরা আমার কথা বিশ্বাস কর বা না কর, আমার কর্তব্য আমি পালন করেছি। অত্যাচারী দাম্ভিক সৈন্যগণ, যে পরম দয়ালু দয়াময় খোদাতায়ালা হজরত আদম(আঃ) এর প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর মহাকষ্ট নিবারণ করেছিলেন। হজরত নুহুকে মহা বন্যা হতে রক্ষা করেছিলেন। হজবত ইউসুফ (আঃ) কে কূপ হতে উদ্ধার করে মিসরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। ইরাহীম (আঃ) এর জন্য অগ্নিকে ফুলের শয্যায় পরিণত করেছিলেন। হজরত মুসা(আঃ)কে ফেরাউনের হাত হতে রক্ষার জন্য নীলসমুদ্রে পানির সেতু নির্মাণ করেছিলেন। দয়াময়ের নিকট আমি যদি যুদ্ধজয়ের প্রার্থনা করি, তা কি বিফল হবে? না, অবশ্যেই হবে না। তবে আমার দ্বারা তখন মাতামহের ভবিষ্যত বাণী লঙঘন করা হবে। তাই আমি আমাকে ভবিতব্যের উপর ছেড়ে দিয়েছি। মহান খোদার যা খুশি তাই করবেন। পাপী উম্মতের পাপ আমার দ্বারা মার্জনা করবেন। আমি খোদাতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য ও ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য জগতবীসাকে দেখাবার জন্য হজরত ইসমাইল(আঃ)এর ন্যায় তোমাদের তরবারির নিচে মাথা রাখতে সঙ্কুচিত হব না। এখন তোমাদের যদি যুদ্ধ করবার প্রবল ইচ্ছা থাকে তাহলে বিলম্ব না করে অস্ত্রাঘাতে বীরত্ব প্রদর্শন কর।
অলিদ-মন্ত্রী মারোয়ান, আমরা মহাত্মা হোসেন সাহেবের বিরুদ্ধে আর অস্ত্রধারণ করব না।
(অলিদ ও পরে একে একে সকল সৈন্য মারোয়ানের সন্মুখে তরবারি রেখে দিলো)
মারোয়ান–(ক্রাধান্বিতভাবে) সৈন্যগণ, রাজাজ্ঞা অবমানার শাস্তি কি জান? তোমরা সামান্য ভিক্ষুকের কথা বিশ্বাস করে কেন জীবন দিতে যাবে? তাতে তোমাদের লাভ কি হবে? এখনও সময় আছে। অস্ত্ৰ ধর, হোসেনকে হত্যা কর। নছেৎ, তোমাদের করো জীবন রক্ষা হবে না।
শিমার- (অস্ত্র তুলে নিয়ে)সৈনাগণ! শীঘ্র অস্ত্র তুলে নাও। নতুবা আমার এই অস্ত্র থেকে তোমাদের কাহারও জীবন রক্ষা হবেনা। অস্ত্র ধর| চালাও যুদ্ধ।
অলিদ– সৈন্যগণ? ভাবছ কি? সবাই অস্ত্র তুলে নাও। (সকলেই অস্ত্র তুলে নিলো।)
অলিদ- হোসেন, এবার আর তোমার রক্ষা নাই। আজ আমরা দানব সেজে তোমাকে হত্যা করে জাহাঁপনা এজিদ দরবার হতে লক্ষ টাকা পুরস্কার নিব। চাইনা স্বৰ্গ, চাইনা মর্ত, চাই শুধু টাকা! টাকা!! ধর তরবারি। হাঃ-হাঃ-হা:-
(উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ চলিতে লাগিল এবং হোসেন কোনো প্রত্যুত্তর না করে ভরবারি চালাইতে লাগিল ও এজিদের সৈন্য হোসেনের বিক্রম দেখে পালাইতে লাগিল।)
হোসেনঃ- সবশেষ! সবশেষ!! সবশেষ!!! আর বাধা দেবার মতো শত্রুসৈন্য কেউ নেই। এখন ফোরাতীর উন্মুক্ত। আর চিন্তা কি? উঃ- বর পিপাসা। আমি আজ ফোরাতকূলে গিয়ে উদর পূরে পানি পান করে আমার পিপাসা নিবারণ করব। প্রস্থান-
* * *
ষষ্ঠ অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য
-ফোরাৎকূল-
(সৈন্যসহ অলিদ, মারোয়ান, শিমার ও আবদুল্লাহ জিয়াদের প্রবেশ।)
মারোয়ান- সৈন্যগণ। তোমরা সকলেই এখন ফোরাত তীর অরবোধ কর। সন্মুখ সমরে অস্ত্র প্রয়োগ করে হোসেনকে বধ অসম্ভব। হোসেন এখন পানি পিপাসায় ক্লান্ত হয়ে পরেছে। সে এখন নিশ্চয় ফোরাৎকূলে পানি পান করতে নামবে। হোসেন যদি পানি পান করতে পারে তাহলে যুদ্ধ জয় পরের কথা; আমাদের জীবন রক্ষা করা অসম্ভর হয়ে দাঁড়াবে।
অলিদ- তাহলে এখন উপায় ?
মারোয়ান– উপায় নিশ্চয়ই আছে। তোমরা এখন সকলেই এই নিবিড় অরণ্য মাঝে লুকিয়ে থাক। যখন হোসেন এসে ফোরাৎকূলে পানি পান করতে নামবে, তখন তোমরা আড়াল থেকে তীর বর্ষণ করে তাঁর পানি পান পণ্ড করে দিবে। এছাড়া ‘অন্য কোনো উপায় নেই।
অলিদ- সেন্যগণ! আর বিলম্ব করোনা। ঐ দেখ, হোসেন কীভাবে ফোরাতকূলের দিকে ছুটে আসছে। শীঘ্র পালাও।
(সকলেই বনের মাঝে লুকাইল।)
(ক্লান্ত শরীরে হোসেনের প্রবেশ।)
হোসেন: হায় খোদা! সত্যিই কি আজ ফোরাতকূল শত্রুমুক্ত করে দিলে খোদা। আর কেন আমি পানি পিসাসায় অধীর হয়ে যন্ত্রণা ভোগ করতেছি। আজ আমি উদরপূরে পানি পান করে আমার পিপাসা নিবারণ করব।
(হোসেন পোষাক-পরিচ্ছদ খুলে পানিতে নামলেন এবং মারোয়ান তা লক্ষ্য করে মৃদুস্বরে আপন সৈনদের প্রতি বলতে লাগল।)
মারোয়ান- সৈন্যগণ! শীঘ্র বনের মাঝ থেকে বাহির হও। ঐ- দেখ, হোসেন এখন পানি পিপাসায় ক্লান্ত হয়ে তার অঙ্গের পোশাক পরিচ্ছদ খোলে পানি পান করতে ফোরাৎকূলে নেমেছে। তোমরা সকলেই এখন তাঁর প্রতি বিশষভাবে লক্ষ্য রাখবে। যখনই হোসেন পানি হস্ত নিয়ে পানি পান করতে উদ্যত হবে, তখনই তোমরা আড়াল থেকে তীর নিক্ষেপ করে পানিপান পণ্ড করে দিবে। নতুবা, আমাদের বিপদ অনিবাৰ্য। এই এখনই আমাদের সুবর্ণ সুযোগ। তোমরা শীঘ্র প্রস্তুত হওঁ।
(হোসেন পানিতে নেমে বলতে লাগল।)
হোসেন- হায়রে পানি! এতদিন পর আজ আমি ফোরাতের পানি পান করার সুযোগ পেয়েছি। হায় খোদা! তোমার মহিমা অপার।এখন আমি পানি পান না করে কোথাও যাব না। হায়রে পানি! এখন আমি পানি পান করে তাপিত প্রাণ শীতল করব। (পানি হাতে তুলে পান করতে উদ্যত) হায়-হায়, আমি কোন প্রাণে তোকে ভক্ষণ করি! আমার কত আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব পানি বিহনে জীবন ত্যাগ করেছে। তাদের জীবনের চেয়ে কি আমার জীবনের মূল্য এতই বেশি! না-না, আমি তোকে ভক্ষণ করাতো দূরের কথা, স্পর্শও করব না। (হোসেন পানি ফেলে দিল ।তখনই চতুর্দিক হতে তীর বর্ষণ হতে লাগল এবং একটি তীর এসে হোসেনের অংগে বিদ্ধ হল। তখন হোসেন স্বকাতরে বলতে লাগল। ওঃ-খোদা! কোথা হতে যেন তীর এসে আমার শরীরে বিদ্ধ হলো। কোথাওতো কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা। ওবে দুরাত্মা সৈন্যগণ! তোরা আড়াল থেকে কেন আমাকে তীর নিক্ষেপ করছিস? শক্তি থাকেতো আমার সমুখে এসে উপনিত হ। ভয় করছিস কেন? এখন আমার সময় পূর্ণ হয়ে আসছে। ওঃ– তোরা এতো নিষ্ঠুর যে, আমার অন্তিম সময়ে আমাকে একবিন্দু পানিও পান করতে দিলিনা। তবে আমি আর ভাবছি কেন। দুনীয়ার পানি আর আমার ভাগ্যে নেই।
দৈববাণী-হোসেন! সত্যি তোমার ভাগ্যে দুনীয়ার পানি নেই। তুমি দুনীয়ার পানির জন্য অপেক্ষা করছ কেন। শীঘ্র বেহেস্তে চলে এস। তোমার জন্য বেহেস্তের সু-শীতল পানি নিয়ে আমরা অপেক্ষা করতেছি। তুমি বিলম্ব না করে অতিশীঘ্র চলে এসো। (হোসেন টলিতে টলিতে জমিতে পরে গেল।)
শিমার- মন্ত্রী মারোয়ান, হোসেন এখন ধরাশায়ী। যাও, তুমি হোসেনের মস্তক ছেদন কর এবং লক্ষ টাকার মালিক হওঁ।
মারোয়ান:–শিমার, হোসেনের মস্তক ছেদন করা দূরের কথা, আমি হোসেনের নিকটেই যেতে পারব না।
শিমার- বাহ:- এত সাহস তোমার। এরকম সাহস নিয়ে আবার কারবালায় যুদ্ধ করতে এসেছ! অলিদ, তুমিই হোসেনের মস্তক ছেদন কর এবং তুমিই লক্ষ টাকা পুরস্কার লাভ কর।
অলিদ- নবীর বংশের ওপড় আমি যে, অন্যায় অত্যাচার এবং নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে পাপকার্য করেছি- তাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। এখন আমি আর হোসেনের মস্তক ছেদন করে লক্ষপতি হতে চাইনা। আমি এ কার্য করতে পারব না।
শিমার- বাহঃ- কি চমৎকার! সবাই হোসেনকে ভয় করছ! কেউই হোসেনের মস্তক ছেদন করতে পারবে না। কিন্তু আমি শিমার বাহাদুর! দুনীয়ার কাউকে আমি ভয় করিনা। এই দেখ, আমি নিজেই হোসেনের মস্তক ছেদন করব।
(শিমার লাফ দিয়ে এসে হোসেনের বক্ষের ওপর উপবেশন করে হোসেনের গলায় বার বার খঞ্জর চালাতে লাগল এবং হোসেন তা সহ্য করতে না পেরে বলতে লাগল।)
হোসেন- আহঃ-কে তুই পামর আমার বক্ষের ওপর উপবেশন করলি? ওরে আর যে আমার সহ্য হচ্ছেনা। আহঃ-ওরে আমার বক্ষের ওপর থেকে একটু নেমে বস। আমাকে একটি বার নিশ্বাস ফেলতে দে।
শিমার- না- না, তোমার মস্তক ছেদন না করে আমি তোমার বক্ষের ওপর থেকে নামব না এবং তোমার কোনো কথাও শুনব না।
হোসেন– ওরে পাষণ্ড নরাধম! তাহলে তুই তোর বক্ষের বস্ত্র খোলে আমাকে দেখা। আমি দেখব তুই আমাকে হত্যা করতে পারবি কি না।
শিমার- বক্ষ খোলে দেখালে কি হবে?
হোসেন:- সত্যিই যদি তুই আমার হত্যাকারী হয়ে থাকিস, তাহলে আমি তোকে কথা দিচ্ছি, মরণের পরপারে যদি খোদা তায়ালা আমাকে বেহেস্তে স্থান দেন তো, তাহলে তোকে অগ্রে বেহেস্তে না দিয়ে আমি বেহস্তে প্রবেশ করব না।
(শিমার নিজের বক্ষের বস্ত্র খোলে দেখাল।)
শিমার– এই দেখ, আমি আমার বুকের বস্ত্র খোলে তোমাকে দেখালাম। তুমি মনে রেখ হোসেন, আমার নাম মহাবীর শিমার বাহাদুর।
হোসেনঃ— শিমার, নবীজির বাক্য কখনও মিথ্যা হবে না। শিমার তোর হস্তেই আমার মৃত্যু অনিবার্য। শিমার তোর এই খঞ্জর দিয়ে শত সহস্রবার চেষ্টা করলেও আমার মস্তক ছেদন করতে পারবি না। আমার কোমরে যে খঞ্জর রয়েছে, সেই খঞ্জর দ্বারা আমার মস্তক তুমি ছেদন কর।
(শিমার হোসেনের কোমর হতে খঞ্জর বাহির করে)
শিমার- হাঃ- হাঃ- হাঃ, তবে আমি তাই করব। তোর খঞ্জর দিয়েই তোর মস্তক ছেদন করব। তবু আমি চাই লক্ষ টাকা– লক্ষ টাকা- (হোসেনের খঞ্জর দ্বারা শিমার হোসেনের মস্তক ছেদন করল) লক্ষ টাকা- লক্ষ টাকা, হাঃহাঃহাঃ-
(হোসেনের খণ্ডিত শির নিয়ে শিমার দৌড়িয়ে প্রস্থান)
(হোসেনের মৃত দেহের ওপর আঁর কাপড় পড়ল।)
(মহরম পর্ব সমাপ্ত)
