ভারতের দুর্গ(Fort of India)

সূচিপত্র

লাল কেল্লা

আগ্রা দুর্গ

জয়পুর (আমের) দুর্গ

গোলকুণ্ডা দুর্গ

ফতেপুর সিক্রি দুর্গ

জয়সালমের দুর্গ

বেকাল দুৰ্গ

বেঙ্গালুরু দুর্গ

ভেল্লোর দুৰ্গ

ফোর্ট উইলিয়াম

বারাবতী দুর্গ

রায়গড় দুর্গ

সলিমগড় দুর্গ

রন্থাম্ভোর দুর্গদৌলতাবাদ দুর্গ

ভারতের দুর্গ                                               

নিবেদন

    ভারতে অসংখ্য দুর্গ রয়েছে। দুর্গগুলি দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, স্থাপত্য দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। বিভিন্ন রাজবংশ এবং সাম্রাজ্য দ্বারা নির্মিত এই দুর্গগুলি দেশের গৌরবময় অতীত এবং বিভিন্ন নির্মাণশৈলী প্রদর্শন করে।

ভারতের কিছু বিখ্যাত দুর্গ:-

    ১. লাল কেল্লা (লাল কিল্লা): দিল্লিতে অবস্থিত, এই দুর্গটি ১৬৪৮ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহান দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং এটি একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।

    ২. আগ্রা দুর্গ:- উত্তর প্রদেশের আগ্রায় অবস্থিত এই দুর্গটি ১৫৬৫ সালে মুঘল সম্রাট আকবর দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং এটি তার অত্যাশ্চর্য স্থাপত্য এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যের জন্য পরিচিত।

    ৩. গোলকুন্ডা দুর্গ: তেলেঙ্গানার হায়দ্রাবাদে অবস্থিত, এই দুর্গটি ১১ শতকে নির্মিত হয়েছিল এবং এর চিত্তাকর্ষক স্থাপত্য এবং শহরের অত্যাশ্চর্য দৃশ্যের জন্য পরিচিত।

    ৪. মেহরানগড় দুর্গ: রাজস্থানের যোধপুরে অবস্থিত, এই দুর্গটি ১৫ শতকে নির্মিত হয়েছিল এবং এর মনোমুগ্ধকর কাঠামো এবং শহরের অত্যাশ্চর্য দৃশ্যের জন্য পরিচিত।

    ৫. গোয়ালিয়র দুর্গ: মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে অবস্থিত, এই দুর্গটির ৮ম শতাব্দীর একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে এবং এটি তার অত্যাশ্চর্য স্থাপত্য এবং সুন্দর মন্দিরের জন্য পরিচিত।

    স্থাপত্যের তাৎপর্য:- ভারতীয় দুর্গগুলি তাদের অত্যাশ্চর্য স্থাপত্যের জন্য পরিচিত, যা বিভিন্ন শৈলী এবং সংস্কৃতির প্রভাবকে প্রতিফলিত করে। লাল দুর্গের মুঘল স্থাপত্য থেকে মেহরানগড় দুর্গের রাজপুত স্থাপত্য পর্যন্ত, প্রতিটি দুর্গের নিজস্ব অনন্য শৈলী এবং আকর্ষণ রয়েছে।

    ঐতিহাসিক তাৎপর্য:– ভারতীয় দুর্গগুলি কেবল স্থাপত্যের বিস্ময় নয় বরং ঐতিহাসিক গুরুত্বও বহন করে। এগুলি সামরিক দুর্গ, রাজকীয় বাসস্থান এবং প্রশাসনের কেন্দ্র হিসাবে নির্মিত হয়েছিল এবং দেশের ইতিহাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

            পর্যটন: ভারতীয় দুর্গগুলি একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণ এবং সারা বিশ্ব থেকে দর্শনার্থীরা দুর্গগুলির স্থাপত্য, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য দর্শন করতে আসেন। ভারতীয় দুর্গগুলি দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, স্থাপত্য দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রমাণ বহন করে। ইতিহাস, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতিতে আগ্রহী যে কারও জন্য এগুলি অবশ্যই পরিদর্শনের জন্য আকর্ষণীয় স্থান।

    উকিপেডিয়ার সহায় নিয়ে দুর্গগুলির বিষয়ে লেখা হয়েছে। তথ্যবিভ্রাটের জন্য আমি পাঠকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। পাঠক ভুলত্রুটিগুলি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পরবর্তীতে সেগুলি শুদ্ধ করার চেষ্টা করব। ভুলত্রুটিগুলি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য পাঠকের কাছে আমার বিনম্র অনুরোধ রইল। *

লাল কেল্লা

    লাল কেল্লা, যা লাল কিলা নামেও পরিচিত । ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মুঘল দুর্গ। যা পূর্বে মুঘল সম্রাটদের প্রাথমিক বাসস্থান হিসেবে কাজ করত। ১৬৩৯ সালের ১২ মে সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত এই দুর্গটি আগ্রা থেকে দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের পর নির্মিত হয়েছিল। মূলত লাল এবং সাদা রঙে সজ্জিত, দুর্গটির নকশাটি তাজমহলের স্থপতি ওস্তাদ আহমেদ লাহোরির নামে নাম করণ করা হয়েছিল। লাল কেল্লা শাহজাহানের রাজত্বকালে নির্মিত উচ্চতর মুঘল স্থাপত্যের প্রতীক। দূর্গটিতে পারস্যের প্রাসাদের প্রভাব এবং আদিবাসী ভারতীয় স্থাপত্যের উপাদানের মিশ্রণ ঘটেছে।

                ১৭৩৯ সালে নাদির শাহের আক্রমণের সময় দুর্গটি লুণ্ঠিত হয় এবং এর শিল্পকর্ম এবং রত্নপাথর ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের পর, ব্রিটিশরা এর অনেক মার্বেল কাঠামো ভেঙে ফেলে, যদিও প্রতিরক্ষামূলক দেয়ালগুলি মূলত অক্ষত ছিল। দুর্গটি পরে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

    ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু লাল কেল্লার প্রধান প্রবেশদ্বার লাহোরি গেটের উপরে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। তারপর থেকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে প্রধান ফটকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় তেরঙ্গা উত্তোলন করে থাকেন এবং এর প্রাচীর থেকে জাতীয়ভাবে সম্প্রচারিত ভাষণ প্রদান করেন এবং উক্ত ভাষণ জাতীয়ভাবে সম্প্রচার করা হয়।

    লাল কেল্লা ২০০৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য এর স্বীকৃতি পেয়েছে।

    ব্যুৎপত্তি লাল কেল্লা নামটি হিন্দুস্তানি লাল বেলেপাথরের দেয়াল থেকে উদ্ভূত। লাল শব্দটি হিন্দি থেকে এসেছে, যার অর্থ “লাল”, অন্যদিকে কিলা শব্দটি আরবি থেকে এসেছে, যার অর্থ “দুর্গ”। মূলত দুর্গটি “ধন্য দুর্গ” (কিলা-ই-মুবারক) নামে পরিচিত, লাল কেল্লাটি রাজপরিবারের বাসস্থান হিসেবে কাজ করত। আগ্রা দুর্গও লাল কিলা নামে পরিচিত।

        ইতিহাস- সম্রাট শাহজাহান তাঁর রাজধানী আগ্রা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্তের পর ১৬৩৯ সালের ১২ মে লাল কেল্লা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মূলত সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় রঙ লাল এবং সাদা দিয়ে দূর্গটি নির্মিত। তাজমহলের কাজের জন্য বিখ্যাত স্থপতি ওস্তাদ আহমেদ লাহোরি লাল কেল্লার নকশাটি এঁকেছিলেন। দুর্গটি যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত এবং  যা একসময় বেশিরভাগ দেয়ালের চারপাশের পরিখায় জল সরবরাহ করত। দূর্গটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ১৬৩৮ সালেৰ ১৩ মে তারিখে পবিত্র ইসলামিক মহররম মাসে। শাহজাহানের তত্ত্বাবধানে  দূর্গটি নির্মাণের কাজ ১৬৪৮ সালের ৬ এপ্রিল সম্পন্ন হয়। অন্যান্য মুঘল দুর্গের বিপরীতে  লাল কেল্লার সীমানা দেয়ালগুলি পুরানো সলিমগড় দুর্গের মতো সৌষম্যহীন।দুর্গ-প্রাসাদটি পূর্বে শাহজাহানাবাদের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করত, যা এখন পুরাতন দিল্লি নামে পরিচিত। শাহজাহানের উত্তরসূরী সম্রাট আওরঙ্গজেব লাল কেল্লার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সম্রাটের ব্যক্তিগত কক্ষের সাথে মোতি মসজিদ (মুক্তা মসজিদ) যুক্ত করেন। প্রাসাদে আরও সহজে যাতায়াতের জন্য তিনি প্রধান ফটকের সামনে দুটি চক্রাকার বারবিকান(সুরক্ষিত প্রবেশদ্বার) নির্মাণ করেন।

    সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল রাজবংশের প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামোর পতন ঘটে। যার ফলে ১৮ শতকে প্রাসাদের অবক্ষয় ঘটে। ১৭১২ সালে  জাহান্দার শাহকে মুঘল সম্রাটের মুকুট প্রদান করা হয়। শাসন শুরু করার এক বছরের মধ্যেই জাহান্দার শাহকে হত্যা করা হয় এবং ফররুখশিয়ার তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। প্রায় ২০০,০০০ সৈন্যের যথেষ্ট শক্তিশালী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও ১৭৩৯ সালে  পারস্য সম্রাট নাদির শাহ  মুঘল সেনাবাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। বিজয়ের পর  নাদির শাহ লাল কেল্লা লুণ্ঠন করেন, এর ধনসম্পদ হস্তগত করেন। লুন্ঠনকৃত সামগ্রীর মধ্যে কিংবদন্তি ময়ূর সিংহাসনও ছিল। তিন মাস পর নাদির শাহ পারস্যে ফিরে যান এবং শহরটিকে তার পূর্বের শাসকের শাসনে রেখে যান। মুহাম্মদ শাহের রাজত্বকালে মুঘল সাম্রাজ্য মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। মুঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার ফলে মুঘলরা দিল্লির নামধারী শাসক হয়ে ওঠেন। ১৭৫২ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির মাধ্যম মারাঠারা দিল্লির সিংহাসনের রক্ষক হিসেবে মনোনীত হয়। ১৭৫৮ সালে সিরহিন্দে আফগানদের উপর মারাঠাদের বিজয় এবং এরপর পানিপথে তাঁদের পরাজয়ের ফলে তাঁরা আহমদ শাহ দুররানির সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পরে।

    ১৭৬০ সালে  মারাঠারা আহমদ শাহ দুররানির সেনাবাহিনীর কাছ থেকে দিল্লি রক্ষার জন্য তহবিল সংগ্রহের কারণে দিওয়ান-ই-খাসের রূপালী সিলিং খুলে গলিয়ে ফেলে। ১৭৬১ সালে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠারা হেরে যাওয়ার পর  আহমেদ শাহ দুররানি দিল্লি আক্রমণ করেন। দশ বছর পর  নির্বাসিত সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নির্দেশে মারাঠারা রোহিলা আফগানদের কাছ থেকে দিল্লি পুনরুদ্ধার করে এবং মারাঠা সেনাবাহিনীর সেনাপতি মহাদাজি শিন্দে দ্বিতীয় শাহ আলমকে সিংহাসনে পুনর্বহাল করেন।

    ১৭৬৪ সালে  ভরতপুরের জাট শাসক মহারাজা জওহর সিং দিল্লি আক্রমণ করেন এবং অবশেষে ১৭৬৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির লাল কেল্লা দখল করেন। দুই দিন পর মুঘলদের কাছ থেকে কর আদায়ের পর জাটরা লাল কেল্লা থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়।

    ১৭৮৩ সালে জাসা সিং আহলুওয়ালিয়া, জাসা সিং রামগড়িয়া এবং বাঘেল সিং ধালিওয়ালের নেতৃত্বে শিখ মিশলরা দিল্লি এবং লাল কেল্লা জয় করে। ৪০,০০০ সৈন্য নিয়ে গঠিত একটি সন্মিলিত বাহিনী নিয়ে তাঁরা আওধ থেকে যোধপুর পর্যন্ত এক বিস্তৃত এলাকা লুট করে। আলোচনার পর শিখ বাহিনী দিল্লি থেকে প্রত্যাহার করতে এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে পুনর্বহাল করতে সম্মত হয়। তাদের পশ্চাদপসরণের শর্ত হিসেবে, জাটরা দিল্লিতে সাতটি শিখ গুরুদ্বার নির্মাণের শর্ত দেয়, যার মধ্যে চাঁদনী চকের গুরুদ্বার সিস গঞ্জ সাহেবও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

                ১৭৮৮ সালে  নাজিব খানের নাতি রোহিল্লা এবং জাবেতা খানের পুত্র গোলাম কাদের (যিনি শিখ ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন) দিল্লি লুট করেন এবং মুঘল রাজপরিবারের মহিলা সদস্যদের হত্যা করেন। তারা সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকেও বন্দী করেন। মহাদাজি শিন্দে এই বিষয়টি অবগত হয়ে তাঁর সেনা পাঠিয়ে দেন। সেনারা দিল্লীতে এসে শাহ আলমকে মুক্ত করেন এবং গোলাম কাদেরকে খুঁজতে শুরু করেন। কাদের রোহিলখণ্ডের ঘোষগড়ে লুকিয়ে ছিলেন। তাঁকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করে শিরশ্ছেদ করা হয়। এর ফলে, ১৮০৩ সাল পর্যন্ত লাল কেল্লায় মারাঠা পতাকা ঝুলানোর অনুমতি দেওয়া হয়।

    দ্বিতীয় অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী দিল্লির যুদ্ধে দৌলত রাও সিন্ধিয়ার নেতৃত্বের মারাঠা সৈন্যদের পরাজিত করে; এই ঘটনা দিল্লির উপর মারাঠা নিয়ন্ত্রণ এবং লাল কেল্লার উপর তাদের কর্তৃত্বের অবসান ঘটায়।যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল অঞ্চলের প্রশাসন দখল করে এবং লাল কেল্লায় একজন বাসস্থান স্থাপন করে। শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠেন। যে বিদ্রোহে শাহজাহানাবাদের বাসিন্দারা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

    মুঘল শক্তির কেন্দ্র এবং প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সত্ত্বেও  ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সময় লাল কেল্লা কোনও সংঘর্ষের স্থান ছিল না। বিদ্রোহ দমনের পর দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ১৭ সেপ্টেম্বর দুর্গ ত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর একজন ব্রিটিশ বন্দী হিসেবে লাল কেল্লায় ফিরিয়ে আনা হয়। ১৮৫৮ সালে তার বিচার হয় এবং সেই বছরের ৭ অক্টোবর এ তাকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়।বিদ্রোহের সমাপ্তির পর ব্রিটিশরা লাল কেল্লা ধ্বংস করার নির্দেশ প্রদান করে। ফলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়। দুর্গের প্রায় ৮০% কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়,  যার মধ্যে দুর্গের নদীমুখী সম্মুখভাগ বরাবর মণ্ডপগুলিকে সংযুক্তকারী পাথরের পর্দাও ছিল। সমস্ত আসবাবপত্র হয় অপসারণ করা হয় বা ধ্বংস করা হয়; হারেম অ্যাপার্টমেন্ট, চাকরদের আবাসন এবং বাগান ভেঙে ফেলা হয়। শুধুমাত্র দূর্গের পূর্ব দিকের মার্বেল ভবনগুলি সম্পূর্ণ ধ্বংস থেকে রক্ষা পায়, যদিও ধ্বংসের সময় সেগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল এবং টাওয়ারগুলি তুলনামূলকভাবে অক্ষত থাকলেও, অভ্যন্তরীণ কাঠামোর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।

    ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী লর্ড কার্জন লাল কেল্লার সংস্কারের প্রচেষ্টা শুরু করেন। সংস্কারের মধ্যে ছিল এর দেয়াল পুনর্নির্মাণ এবং আধুনিক জল ব্যবস্থা সহ বাগানগুলির পুনরুজ্জীবন দান ।

    ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নেহেরু লাল কেল্লায় ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করেন।

    ১৭৪৭ সালে নাদির শাহের আক্রমণের সময় এবং ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের পরে লাল কেল্লায় সংরক্ষিত বেশিরভাগ রত্ন এবং শিল্পকর্ম লুট করা হয়েছিল। অবশেষে এগুলি ব্যক্তিগত সংগ্রহকারীদের বা ব্রিটিশ জাদুঘর, ব্রিটিশ লাইব্রেরি এবং ভিক্টোরিয়া এবং অ্যালবার্ট জাদুঘরের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ  শাহ জাহানের জেড ওয়াইন কাপ এবং দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের মুকুট, উভয়ই লুট হয়ে গিয়েছিলো এবং সেগুলি  বর্তমানে লন্ডনে রয়েছে। ভারত সরকার সেগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য করা অনুরোধ ব্রিটিশ সরকার এখনও পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।

    ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ এবং রানী মেরির দিল্লি দরবার পরিদর্শন করেছিলেন। তাদের সফরের পূর্বে কিছু ভবন সংস্কার করা হয়েছিল। লাল কেল্লা প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরটি ড্রাম হাউস থেকে মমতাজ মহলে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

    আইএনএ বিচার,  যা লাল কেল্লা বিচার নামেও পরিচিত। ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার কোর্ট-মার্শাল করা হয়েছিলো। প্রথম বিচারটি ১৯৪৫ সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে লাল কেল্লায় পরিচালিত হয়েছিল।

    ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু লাল কেল্লার লাহোর গেটের উপরে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

    ভারতের স্বাধীনতার পর  লাল কেল্লার খুব কম পরিবর্তন ঘটে এবং সামরিক স্থানটি সেনানিবাস হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। লাল কেল্লার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ২০০৩ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল ।পরে দূর্গটির পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের কাছে হস্তান্তর করা হয়।২০০৯ সালে দুর্গটিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ব্যাপক সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (CCMP) ঘোষণা করা হয়।

    সাম্প্রতিক বছরগুলিতে  লাল কেল্লা কমপ্লেক্সে বেশ কয়েকটি নতুন জাদুঘর এবং গ্যালারি যুক্ত করা হয়েছে। ২০১৯ সালে উদ্বোধন করা হয়েছে। এই জাদুঘরগুলি চারটি ঔপনিবেশিক যুগের ব্যারাকে অবস্থিত। ব্যারাক বি১ ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য নিবেদিত, ব্যারাক বি২ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের স্মরণে এবং ব্যারাক বি৩ সুভাষ চন্দ্র বসু এবং ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী আন্দোলনের উপর আলোকপাত করে। ব্যারাক বি৪ ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ এবং দিল্লি আর্ট গ্যালারির মধ্যে একটি সহযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠান, যা ভারতীয় শিল্পকলা প্রদর্শন করে। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী জাদুঘর, মমতাজ মহল জাদুঘর এবং নওবত খানা জাদুঘর সহ পূর্ববর্তী জাদুঘরগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রদর্শনীগুলি এই নব-স্থাপিত জাদুঘরে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

    লাল কেল্লায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে নির্মিত বেশ কয়েকটি হলুদ মাটির রঙিন মৃৎশিল্প সংস্কৃতির নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে।

    লাল কেল্লা দিল্লির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এবং প্রতি বছর হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে আসেন। এটি জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ একটি স্মৃতিস্তম্ভ; প্রতি বছর ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে, প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং এর প্রাচীর থেকে একটি ভাষণ প্রদান করেন, যা দেশব্যাপী সম্প্রচারিত হয়। ভারতীয় রুপির ৫০০ নোটের পিছনেও দুর্গটি দেখা যায়।

    লাল কেল্লার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগুলি বিভিন্ন সংরক্ষণের অবস্থায় রয়েছে। যদিও কিছু কাঠামো তুলনামূলকভাবে অক্ষত রয়েছে, তাদের মূল সাজসজ্জা উপাদানগুলি ধরে রেখেছে, অন্যগুলি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, লুটেরাদের দ্বারা মার্বেল খচিত ফুলের নকশাগুলি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একসময় বিস্তৃত জলের বৈশিষ্ট্যগুলি এখন শুকিয়ে গেছে। চা ঘরটি, যদিও তার ঐতিহাসিক রূপে সংরক্ষিত নয়, একটি কার্যকর রেস্তোরাঁ হিসেবে কাজ করে। মসজিদ এবং হাম্মাম (পাবলিক স্নানাগার) দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ, যা কেবল কাঁচের জানালা বা মার্বেলের জালির কাজ দিয়েই দেখতে পাওয়া যায়। কমপ্লেক্সের ভেতরের হাঁটার পথগুলি ক্রমশ খারাপ যাচ্ছে এবং প্রবেশপথে এবং প্রাঙ্গণের ভিতরে উভয় স্থানেই পাবলিক টয়লেট দেখা যায়। লাহোরি গেটটি প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে,  যে রাস্তাটি গয়না এবং কারুশিল্পের দোকানসহ একটি শপিং এলাকায় নিয়ে যায়। কমপ্লেক্সে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর এবং একটি ভারতীয় যুদ্ধ-স্মারক জাদুঘরের পাশাপাশি “রক্তের চিত্র” এর একটি জাদুঘরও রয়েছে, যা বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় শহীদদের গল্প বর্ণনা করে।

    ২০০০ সালের সন্ত্রাসী হামলা- ২০০০ সালের ২২ ডিসেম্বর লাল কেল্লায় একটি সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছিলো, যা ছয়জন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্যরা পরিচালনা করেছিলো। সংবাদমাধ্যমে আক্রমণটি ভারত-পাকিস্তান শান্তি আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিলো। এই আক্রমণের ফলে দুইজন সেনা এবং একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলো।

    নিরাপত্তা- ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে লাল কেল্লার চারপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দিল্লি পুলিশ এবং অর্দ্ধসামরিক বাহিনী দুর্গের আশেপাশের এলাকাগুলিতে সতর্কতামূলক অবস্থান গ্রহণ করে। অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষীদের শার্পশুটাররা উঁচু ভবনগুলিতে কৌশলগতভাবে মোতায়েন থাকে।উদযাপনের সময় দুর্গের চারপাশের আকাশসীমা একটি নো-ফ্লাই জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং কোনো আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলি আশেপাশে নির্দ্ধারিত থাকে।

    তত্বাবধান বিতর্ক- ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে  ডালমিয়া গ্রুপ ভারত সরকারের “ঐতিহ্য গ্রহণ” প্রকল্পের অধীনে লাল কেল্লাকে রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়ন এবং পরিচালনার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করে, যার জন্য পাঁচ বছরের জন্য ২৫ কোটি মূল্যের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক লাল কেল্লা দত্তক নেওয়ার ফলে তীব্র সমালোচনা এবং ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়, যা জনসাধারণ, ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলির মাঝে সমালোচনার জন্ম দেয়। ২০১৮ সালের মে মাসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কেন্দ্রীয় প্রত্নতত্ত্ব উপদেষ্টা বোর্ড বা বিশেষজ্ঞদের অন্য কোনও স্বীকৃত সংস্থা দ্বারা “নিরপেক্ষ পর্যালোচনা” না করা পর্যন্ত চুক্তিটি স্থগিত করার দাবি জানায়।

    ২০২১ সালের প্রজাতন্ত্র দিবস ভারতীয় কৃষকদের প্রতিবাদ- ২০২১ সালের ২৬ জানুয়ারী প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতীয় কৃষকদের প্রতিবাদের সময়  প্রতিবাদী কৃষকদের একটি দল দুর্গ ভেঙে ফেলে  এর প্রাচীর থেকে ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন করে এবং দুর্গের গম্বুজগুলিতে আরোহণ করে। একজন কৃষককে দুর্গের সামনে একটি পতাকার খুঁটিতে আরোহণ করতে এবং নিশান সাহেবের স্তম্ভে পতাকা উত্তোলন করতে দেখা গেছে। বিক্ষোভকারী এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে দুর্গের সাথে থাকা জিনিসপত্রের ক্ষতি হয়। পুলিশের ঘোষণার পর দুর্গটি খালি করা হয়।

    স্থাপত্য- লাহোর গেটের ঠিক ওপারে অবস্থিত ব্যারেল-ভল্টেড কাঠামোটি একটি বাজার হিসেবে কাজ করত এবং মূলত দুর্গের মধ্যে বসবাসকারী উচ্চপদস্থ মুঘল মহিলাদের চাহিদা পূরণের জন্য নির্মিত হয়েছিল।

    বিশ্ব ঐতিহ্য সম্মেলন লাল কেল্লাকে “মুঘল সৃজনশীলতার শীর্ষ” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুর্গটি স্থানীয় ঐতিহ্যের সাথে ইসলামী প্রাসাদ কাঠামোর সংমিশ্রণ ঘটেছে, যার ফলে “পারস্য এবং তৈমুরীয় স্থাপত্য” এর সংমিশ্রণ হয়েছে। দুর্গটি ভারতীয় উপমহাদেশ ব্যাপী পরবর্তী ভবন এবং উদ্যানগুলি নির্মাণের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।

    লাল কেল্লা ২৫৪.৬৭ একর (১০৩.০৬ হেক্টর) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং ২.৪১ কিলোমিটার (১.৫০ মাইল)এলেকা প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত। এই দেয়ালগুলি, নদীর দিকে ১৮ মিটার (৫৯ ফুট) এবং শহরের দিকে দিকে ৩৩ মিটার (১০৮ ফুট) পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট। দুর্গটি অষ্টভুজাকার।  উত্তর-দক্ষিণ অক্ষ পূর্ব-পশ্চিম অক্ষের চেয়ে দীর্ঘ। মার্বেল, ফুলের সাজসজ্জা এবং দুর্গের দ্বৈত গম্বুজগুলি মুঘল স্থাপত্যের উদাহরণ।

    দূর্গটি উচ্চমানের অলংকরণ প্রদর্শন করে এবং কোহিনূর হীরাটি আসবাবপত্রের অংশ ছিল বলে জানা যায়। লাল কেল্লার শিল্পকর্মে পারস্য, ইউরোপীয় এবং ভারতীয় শৈল্পিক ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটেছে, যা একটি স্বতন্ত্র শাহজাহানী শৈলীতে পরিণত হয়েছে। লাল কেল্লা ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য কমপ্লেক্স, যা একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বৈচিত্র্যময় শৈল্পিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে। এমনকি ১৯১৩ সালে জাতীয় গুরুত্বের স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে এটির সংরক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য প্রচেষ্টা করা হয়েছিল।

    লাহোরি এবং দিল্লি গেটগুলি জনসাধারণ ব্যবহার করত এবং খিজরাবাদ গেটটি সম্রাটের জন্য সংরক্ষিত ছিল। লাহোরি গেটটি লাল কেল্লার প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে এবং প্রবেশদ্বারটি ছাত্তা চক(মীনা বাজার)পর্যন্ত প্রসারিত। এটি একটি গম্বুজযুক্ত শপিং এলাকা, যা প্রায়শই আচ্ছাদিত(কভারড) বাজার নামে পরিচিত।

    প্রধান স্থাপনা- লাল কেল্লার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য টিকে থাকা স্থাপনাগুলির মধ্যে রয়েছে এর দেয়াল এবং দূর্গের প্রধান গড়, প্রধান ফটক, দর্শকদের হল এবং পূর্ব নদীর তীরে অবস্থিত রাজকীয় আবাসস্থল।

    লাহোরি গেট- লাল কেল্লার প্রধান প্রবেশদ্বার লাহোরি গেট। লাহোর শহরের দিকে এর অবস্থান থেকে লাহোরি গেটটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৪৭ সাল থেকে প্রতিটি ভারতীয় স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লার লাহোরি গেটে  জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লার প্রাচীর থেকে একটি ভাষণ প্রদান করেন।

        দিল্লি গেট- দিল্লি গেটটি লাল কেল্লার দক্ষিণ দিকে জনসাধারণের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে এবং লাহোরি গেটের সাথে একই রকম বিন্যাস এবং আকৃতি বিশিষ্ট। গেটের পাশে দুটি পূর্ণাঙ্গ পাথরের হাতি একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান করছে।

    ছত্তা চক- লাহোরি গেট সংলগ্ন ছাত্তা চক (বা মীনা বাজার) যেখানে মুঘল আমলে রাজপরিবারের জন্য রেশমের গয়না এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রি করা হত। এই বাজারটি আগে বাজার-ই-মুসাক্কাফ বা ছাত্তা-বাজার (উভয়টির অর্থ “ছাদযুক্ত বাজার”) নামে পরিচিত ছিল।এর দক্ষিণ প্রান্তে দিল্লি গেট অবস্থিত।

    নওবত খানা- দরবারের পূর্ব দেয়ালে বর্তমানে বিচ্ছিন্ন নওবত খানা, যা নক্কার খানা (ড্রাম হাউস) নামেও পরিচিত। লাল কেল্লার মধ্যে প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে সঙ্গীত পরিবেশিত হত এবং এই পরিবেশনার সময় রাজপরিবারের সদস্যরা ছাড়া সকলকে নেমে আসতে হত। পরবর্তী মুঘল সম্রাট জাহান্দার শাহ (১৭১২-১৭১৩) এবং ফারুখসিয়ার (১৭১৩-১৭১৯) এখানেই খুন হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ভারতীয় যুদ্ধ স্মারক জাদুঘরটি দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত।ছত্তা চকের খিলানযুক্ত তোরণটির পরিমাপ ৫৪০ ফুট বাই ৩৬০ ফুট (১৬০ মি × ১১০ মি)। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর লাল কেল্লার পাশের তোরণ এবং কেন্দ্রীয় ট্যাঙ্কটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

                দিওয়ান-ই-আম  নক্করখানা যে অভ্যন্তরীণ প্রধান প্রাঙ্গণে নিয়ে যেত তা ছিল ৫৪০ ফুট (১৬০ মিটার) প্রশস্ত এবং ৪২০ ফুট (১৩০ মিটার) গভীর। নক্করখানা সুরক্ষিত গ্যালারি দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এর থেকে দূরে দিওয়ান-ই-আম  জনসাধারণের জন্য তৈরি করেছিলেন।এই স্থানটি সাধারণ মানুষের দ্বারা উত্থাপিত সরকারী বিষয়গুলি তদারকি করার জন্য ব্যবহৃত হত, যার মধ্যে কর, উত্তরাধিকার বিরোধ এবং ওয়াকাফ (অর্থ প্রদান) সম্পর্কিত আইনি বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

     হলের স্তম্ভ এবং খোদাই করা খিলানগুলি সূক্ষ্ম কারুকার্য প্রদর্শন করে এবং হলটি মূলত সাদা চুনাম স্টুকো(চুনাম হল এক ধরণের প্লাস্টার যা মূলত চুন (ক্যালসিয়াম অক্সাইড) এবং বালি দিয়ে তৈরি, কখনও কখনও সিন্ডার বা পিউমিসের মতো অন্যান্য উপকরণ দিয়েও তৈরি করা হয়।) দিয়ে সজ্জিত ছিল।অনুষ্ঠানস্থলের পিছনে  একটি উঁচু স্থানে সম্রাট মার্বেল বারান্দা (ঝাড়োখা) থেকে দর্শকদের স্বাগত জানাতেন। দিওয়ান-ই-আম রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্যও ব্যবহৃত হত।

     মুমতাজ মহল- প্রাসাদের দক্ষিণতম দুটি মণ্ডপ হল জেনানা(মহিলাদের আবাসস্থল)ছিলো, যার মধ্যে রয়েছে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী আরজুমন্দ বানু বেগম (মুমতাজ মহল) এর জন্য নির্মিত মমতাজ মহল এবং বৃহত্তর রঙ মহলটি রাজকীয় মহিলাদের জন্য একটি নির্দ্ধারিত ছিলো। মমতাজ মহলে লালকেল্লায় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে।

    রঙ মহল- রঙ মহল, যার অর্থ “রঙের প্রাসাদ”, সম্রাটের স্ত্রী এবং উপপত্নীদের বাসস্থান হিসেবে কাজ করত রঙ মহল। এর নামকরণ করা হয়েছে এর প্রাণবন্ত চিত্রকর্ম এবং জটিল সাজসজ্জা থেকে, যার মধ্যে রয়েছে আয়নার মোজাইক(ছোট ছোট রঙিন পাথর, কাচের টুকরো ইত্যাদি একসাথে রেখে তৈরি করা একটি ছবি বা প্যাটার্ন।)।এর কেন্দ্রে একটি মার্বেল পুল রয়েছে, যা নাহর-ই-বিহিস্ত (“স্বর্গের নদী”) দ্বারা সজ্জিত।

    খাস মহল- খাস মহল ছিল সম্রাটের বাসস্থান। নাহর-ই-বেহেস্ত দ্বারা এটি শীতল করা হত। এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে মুথাম্মন বুর্জ(মুথাম্মন বুর্জ, যা মুসাম্মন বুর্জ বা শাহ বুর্জ নামেও পরিচিত), , আগ্রা দুর্গের মধ্যে অবস্থিত একটি বিশিষ্ট অষ্টভুজাকার টাওয়ার। যেখানে সম্রাট তাঁর উপস্থিতির জন্য নদীর তীরে অপেক্ষারত দর্শকদের সামনে উপস্থিত হতেন। এই ধরনের রীতিনীতি তৎকালীন বেশিরভাগ রাজার মধ্যে প্রচলিত ছিল, যা তৎকালীন রাজদরবারের প্রচলিত রীতিনীতি এবং ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে।

    দিওয়ান-ই-খাস- দিওয়ান-ই-খাস বা সম্রাটের ব্যক্তিগত দর্শকদের হল।  এটি অভিজাত ব্যক্তি এবং রাজপরিবারের সদস্যদের সরকারী বিষয় এবং অনুরোধের সমাধানের জন্য নির্দ্ধারিত একটি স্থান। দিওয়ান-ই-আমের উত্তর দিকে অবস্থিত একটি গেট প্রাসাদের সবচেয়ে ভেতরের প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার প্রদান করত, যা জালাউ খানা(জালাউ খানা হল ভারতের পাতিয়ালার কিলা মুবারক কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত একটি দ্বিতল ভবন।) নামে পরিচিত।  সেই সাথে দিওয়ান-ই-খাসেও প্রবেশাধিকার প্রদান করত। এটি সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি এবং মূল্যবান পাথর দিয়ে সজ্জিত। এক সময়ের রূপালী ছাদটি কাঠ দিয়ে পুনর সজ্জিত করা হয়েছে। ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার ১৭ শতকে এখানে রত্নখচিত ময়ূর সিংহাসন প্রত্যক্ষ করার কথা বর্ণনা করেছেন। হলের উভয় প্রান্তে দুটি বাইরের খিলানের উপরে  পারস্য কবি আমির খসরুর একটি শিলালিপি রয়েছে:-

যদি স্বর্গ পৃথিবীর উপর থাকতে পারে,

এটিই সেটা, এটিই সেটা, এটিই সেটা।

    হাম্মাম- হাম্মাম ছিল রাজকীয় স্নানাগার, যেখানে সাদা মার্বেল নকশার মেঝেসহ তিনটি গম্বুজ বিশিষ্ট কক্ষ ছিল। এটি করিডোর দ্বারা পৃথক এবং গম্বুজ দ্বারা মুকুটযুক্ত তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে গঠিত। অ্যাপার্টমেন্টগুলি রঙিন কাচের স্কাইলাইট দ্বারা আলোকিত। বর্তমান প্রবেশপথের পাশে দুটি কক্ষ রাজকীয় শিশুদের স্নানের স্থান হিসাবে কাজ করত বলে মনে করা হয়। পূর্ব দিকের অ্যাপার্টমেন্টে  তিনটি ঝর্ণা বেসিন ছিল, মূলত সেগুলি ড্রেসিং রুম হিসাবে ব্যবহৃত হত। প্রতিটি কক্ষে একটি করে কেন্দ্রীয় ঝর্ণা ছিল এবং একটিতে দেয়ালে লাগানো একটি মার্বেল জলাধার ছিল। কিংবদন্তি অনুসারে, একসময় কল থেকে সুগন্ধি গোলাপজল প্রবাহিত হত। পশ্চিম দিকের অ্যাপার্টমেন্টটি গরম বা বাষ্পীয় স্নানের জন্য মনোনীত ছিল, এর পশ্চিম দেয়ালে গরম করার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছিল।

    বাওলি- বাওলি (ধাপ(সিড়ি)-কূপ) ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের পর ব্রিটিশদের দ্বারা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরও লাল কেল্লার অভ্যন্তরে যে কয়েকটি স্থাপনা টিকে ছিল, তার মধ্যে বাওলি (ধাপ-কূপ) অন্যতম। এর কক্ষগুলিকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং ১৯৪৫-৪৬ সালের লাল কেল্লার বিচারের সময় আইএনএ অফিসার জেনারেল শাহ নওয়াজ খান, কর্নেল প্রেম কুমার সেহগল এবং কর্নেল গুরবকশ সিং ধিলনকে এখানে রাখা হয়েছিল। লাল কেল্লার বাওলিটি স্বতন্ত্রভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যেখানে দুটি সিঁড়ি রয়েছে যা কূপে নেমে আসে।

    মতি মসজিদ- মতি মসজিদ( মুক্তা মসজিদ)হাম্মামের পশ্চিমে দিকে অবস্থিত। মতি মসজিদ( মুক্তা মসজিদ)লাল কেল্লার পরবর্তী সংযোজন । মসজিদটি ১৬৫৯ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত উপাসনালয় হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। এই ছোট  তিন গম্বুজ বিশিষ্ট কাঠামোটি সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি এবং এতে একটি তিন-খিলানযুক্ত পর্দা রয়েছে যা উঠোনের দিকে উন্মুক্ত।

    হীরা মহল- হীরা মহল লাল কেল্লার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি প্যাভিলিয়ন(যেখানে পোশাক পরিবর্তন এবং বিশ্রাম নিতে পারে।)। এটি দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয়েছিল এবং এটি হায়াত বক্স উদ্যানের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় বা তার কিছু পরে এটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। শাহী বুর্জ ছিল সম্রাটের প্রধান অধ্যয়নস্থল; এর নামের অর্থ “সম্রাটের টাওয়ার” এবং এর উপরে মূলত একজন ছত্রী(ছত্রী হলো “স্তম্ভের উপর স্থাপিত একটি গম্বুজবিশিষ্ট কিয়স্ক(রাস্তার পাশের খুব ছোট দোকান বা স্টল যেখানে খবরের কাগজ, মিষ্টি, সিগারেট ইত্যাদি বিক্রি হয়।)।ছিল। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, টাওয়ারটি পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। এর সামনে সম্রাট আওরঙ্গজেব কর্তৃক সংযোজিত একটি মার্বেল প্যাভিলিয়ন রয়েছে।

    হায়াত বখশ বাগ- হায়াত বখশ বাগ (‘জীবনদানকারী উদ্যান’) কমপ্লেক্সে(সংযুক্ত কয়েকটি ভবন।)র উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত। লাল কেল্লার মধ্যে খালের প্রতিটি প্রান্তে একটি সাদা মার্বেল প্যাভিলিয়ন রয়েছে, যার নামকরণ করা হয়েছে সাওয়ান এবং ভাদোঁ প্যাভিলিয়ন, হিন্দু মাসের সাওয়ান এবং ভাদোনের নামানুসারে। জলাধারের কেন্দ্রে জাফর মহল অবস্থিত, যা ১৮৪২ সালের দিকে বাহাদুর শাহ জাফর কর্তৃক যুক্ত করা একটি লাল বেলেপাথরের কাঠামো। এটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। উদ্যানগুলি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে।এই কাঠামোগুলির বাইরে,  উত্তর দিকে একটি রাস্তা সলিমগড় দুর্গের সাথে সংযোগকারী একটি খিলানযুক্ত সেতুর দিকে প্রসারিত।

    রাজপুত্রদের আবাসস্থল- রাজপুত্রদের আবাসস্থল হায়াত বখশ বাগ এবং শাহী বুর্জের উত্তরে অবস্থিত, যা মুঘল রাজপরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করতেন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ বাহিনী এই এলাকার বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস করে দিয়েছিলো, এবং একটি প্রাসাদকে সৈন্যদের জন্য একটি চা-ঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছিলো।*

আগ্রা দুর্গ

        আগ্রা দুর্গ (কিলা আগ্রা) হল আগ্রা শহরের একটি ঐতিহাসিক মুঘল দুর্গ। দূর্গটি আগ্রার লাল দুর্গ নামেও পরিচিত। ১৫৩০ সালে এই দুর্গে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের রাজ্যাভিষেক হয়েছিলো। পরে ১৫৬৫ সালে মুঘল সম্রাট আকবর এটি সংস্কার করেন এবং বর্তমানের কাঠামোটি ১৫৭৩ সালে সম্পন্ন হয়েছিলো। রাজধানী আগ্রা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করার আগে পর্যন্ত অর্থাৎ ১৬৩৮ সাল পর্যন্ত এটি মুঘল রাজবংশের শাসকদের প্রধান বাসস্থান ছিলো। দূর্গটি “লাল-কিলা” বা “কিলা-ই-আকবরী” নামেও পরিচিত ছিল।ব্রিটিশদের দ্বারা দূর্গটি দখলের আগে  শেষ ভারতীয় শাসক মারাঠারা এটি দখল করেছিলেন। মুঘল শাসনামলে এর গুরুত্বের কারণে আগ্রা দুর্গটি ১৯৮৩ সালে  ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। দূর্গটি  তাজমহল থেকে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার (১.৬ মাইল)উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।শাহজাহান এটি সংস্কার করেছিলেন।

    আগ্রার বাকি অংশের মতো গজনীর মাহমুদ ভারত আক্রমণের পূর্বে আগ্রা দুর্গের ইতিহাস অস্পষ্ট। তবে, ১৫ শতকে  চৌহান রাজপুতরা এটি দখল করেছিলেন। এর পরপরই, সিকান্দার খান লোদী (১৪৮৭-১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ) দিল্লি থেকে তার রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তরিত করে আগ্রার পূর্ববর্তী দুর্গে কয়েকটি ভবন নির্মাণ করার পর আগ্রা রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। পানিপথের প্রথম যুদ্ধের (১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ) পর, মুঘলরা দুর্গটি দখল করে এবং সেখান থেকে শাসন করে। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে দূর্গটিতে হুমায়ুনের রাজ্যাভিষেক করা হয়েছিলো। আকবরের রাজত্বকালে (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ) দুর্গটি বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছিলো। পরবর্তীতে  এই দুর্গটি ১৩ বছর ধরে ভরতপুরের জাটদের অধীনে ছিল।

    ইতিহাস- ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধের পর, বাবর ইব্রাহিম লোদির প্রাসাদে দুর্গে অবস্থান করেছিলেন। পরে তিনি সেখানে একটি বাওলি (সিঁড়ি) নির্মাণ করেন। ১৫৩০ সালে তার উত্তরসূরী হুমায়ুনকে দুর্গে রাজ্যাভিষেক করা হয়। ১৫৪০ সালে শের শাহ সুরির হাতে বিলগ্রামে হুমায়ূন পরাজিত হোন। ১৫৫৫ সাল পর্যন্ত দুর্গটি সুরীদের অধীনে ছিল।  পরে হুমায়ুন এটি পুনরুদ্ধার করেন এবং ১৫৫৬ সালে মৃত্যু পর্যন্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আদিল শাহ সুরির সেনাপতি হেমু ১৫৫৬ দূর্গটি পুনৰ দখল করেন এবং আকবর দূর্গটিকে আবার পুনরুদ্ধার করেন।

    দিওয়ান-ই-আম- দূর্গটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে, আকবর এটিকে তাঁর রাজধানী করেন এবং ১৫৫৮ সালে আগ্রায় পৌঁছান। আকবরের ঐতিহাসবিদ আবুল ফজল লিপিবদ্ধ করেছেন, যে দূর্গটি ‘বাদলগড়’ নামে পরিচিত ছিলো এবং এটি একটি ইটের দুর্গ ছিলো। দূর্গটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় ছিল এবং আকবর রাজস্থানের ধৌলপুর জেলার বারাউলি এলাকা থেকে লাল বেলেপাথর এনে দূর্গটি পুনর্নির্মাণ করিয়েছিলেন। স্থপতিরা ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং অভ্যন্তরীন ভাগ ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এবং বাইরের পৃষ্ঠ বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। প্রায় ৪,০০০ কর্মী আট বছর ধরে প্রতিদিন এটিতে কাজ করেছিলেন এবং  ১৫৭৩ সালে এটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছিলো।

    আকবরের নাতি শাহজাহানের রাজত্বকালে এই স্থানটি বর্তমান অবস্থা লাভ করেছিলো। শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর দাদার বিপরীতে শাহজাহান সাদা মার্বেল দিয়ে ভবন তৈরি করতেন। শাহজাহান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে, তাঁর পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে আওরঙ্গজেব জয়ী হন। আওরঙ্গজেব তাঁর পিতাকে আগ্রা দুর্গে গৃহবন্দী করে রাখেন।

    দুর্গটি ১৩ বছর ধরে ভরতপুরের জাঠ শাসকদের অধীনে ছিল। দুর্গটিতে তাঁরা ‘রতন সিং কি হাভেলি’ নির্মাণ করেছিলেন। ১৮ শতকের গোড়ার দিকে মারাঠারা দুর্গটি আক্রমণ করে দখল করে নেয়। এরপর দূর্গটি মারাঠা এবং তাঁদের শত্রুদের মধ্যে বহুবার হাত বদল হয়। ১৭৬১ সালে আহমদ শাহ আবদালি কর্তৃক পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের ভয়াবহ পরাজয়ের পর  পরবর্তী আড়াই দশক ধরে মারাঠারা এই অঞ্চলের বাইরে ছিল। অবশেষে ১৭৮৫ সালে মহাদজি শিন্ডে দুর্গটি দখল করেন। ১৮০৩ সালে দ্বিতীয় অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধের সময় মারাঠারা দূর্গটি ব্রিটিশদের দখলে যায়।১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের সময় এই দুর্গটি একটি যুদ্ধের স্থান ছিল, যার ফলে ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হয় এবং ভারতে ব্রিটেনের সরাসরি শাসন শুরু হয়।

    আগ্রা দুর্গে বারুদ বিস্ফোরণ- ১৮৭১ সালের ৩০ নভেম্বরে দুর্গের ভেতরে অবস্থিত একটি কার্তুজ কারখানায় বিস্ফোরণে ছত্রিশ জন নিহত হয়েছিলো।

    বিন্যাস- ৩৮০,০০০ বর্গমিটার (৯৪ একর) আয়তনের এই দুর্গটি অর্ধবৃত্তাকার, এর সীমানা যমুনা নদীর সমান্তরালে অবস্থিত এবং এর দেয়ালগুলি সত্তর ফুট উঁচু। দ্বৈত প্রাচীরের মাঝে মাঝে বিশাল বৃত্তাকার বুরুজ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কামান স্থাপনের জন্য বিন্ধা, আক্রমণকারীদের উপর পাথর বা জ্বলন্ত জিনিস নিক্ষেপের সুবিধা। এর চার পাশে চারটি দরজা ছিল।এর খিজরি দরজা নদীর দিকে খোলা ছিলো। দুর্গের দুটি দরজা উল্লেখযোগ্য: “দিল্লি গেট” এবং “লাহোর গেট”। লাহোর গেটটি অমর সিং রাঠোরের নামে তাই এটি “অমর সিং গেট” নামেও পরিচিত।

    দুর্গের পশ্চিম দিকে শহরের দিকে মুখ করে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভ দিল্লি গেটটি চারটি দরজার মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং আকবরের সময়ের একটি শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হিসাবে বিবেচিত হয়। এটি ১৫৬৮ সালের দিকে নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য এবং রাজার আনুষ্ঠানিক ফটক হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। এটি সাদা মার্বেলের জটিল খিলানযুক্ত কাজ দিয়ে সজ্জিত। পরিখা পার হয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে ফটকে পৌঁছানোর জন্য একটি কাঠের ড্রব্রিজ(একটি সেতু  বিশেষ করে দুর্গের পরিখার উপর নির্মাণ করা হয়, যেটি এক প্রান্তে ঝুলানো থাকে যাতে এটিকে উঁচু করা যায় যাতে মানুষ পারাপারের অনুমতি ছাড়াই চলাচল করতে পারে বা এর নিচ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে না পারে।) ব্যবহার করা হতো; ভিতরে  হাতি পোল (“হাতির গেট”) নামে একটি অভ্যন্তরীণ প্রবেশপথ ছিলো- যা দুটি প্রাণবন্ত পাথরের হাতি এবং তাদের আরোহী দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। অবরোধের সময়  আক্রমণকারীরা দুর্গের ফটকগুলিকে ভেঙে ফেলার জন্য হাতি ব্যবহার করত। তবে সোজা দৌড়ের গতিরোধ করে এই বিন্যাস দ্বারা এটি প্রতিরোধ করা হতো।

    দুর্গের উত্তর অংশটি এখনও ভারতীয় সামরিক বাহিনী (বিশেষ করে প্যারাসুট ব্রিগেড) দ্বারা ব্যবহৃত হয়, তাই জনসাধারণ দিল্লি গেট ব্যবহার করতে পারে না। পর্যটকরা অমর সিং গেট দিয়ে প্রবেশ করেন।

    স্থাপত্য ইতিহাসের দিক থেকে এই স্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবুল ফজল লিপিবদ্ধ করেছেন যে, বাংলা ও গুজরাটের নকশা অনুযায়ী এই দুর্গে পাঁচশোটি ভবন নির্মিত হয়েছিল। এর মধ্যে বাদশাহ শাহজাহান কিছু ভবন ভেঙে সাদা মার্বেল প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন। বাকি বেশিরভাগ ভবন ১৮০৩ থেকে ১৮৬২ সালের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ সৈন্যরা ব্যারাক তৈরির জন্য ধ্বংস করে দিয়েছিলো। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নদীর দিকে মুখ করে অবস্থিত প্রায় ত্রিশটি মুঘল ভবন এখনও টিকে আছে, যেমন দিল্লি গেট এবং আকবর গেট এবং একটি প্রাসাদ-“বাঙালি মহল”।

    আকবর দরওয়াজা (আকবর গেট) শাহজাহান কর্তৃক অমর সিং গেট নামে নামকরণ করা হয়েছিল। গেটটি দিল্লি গেটের নকশার অনুরূপ। দুটি ভবনই লাল বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত।বাঙালি মহল লাল বেলেপাথর দিয়ে তৈরি এবং বর্তমানে এটি আকবরী মহল এবং জাহাঙ্গীরী মহল নামে বিভক্ত।

    জাহাঙ্গীরের হাউজ (ট্যাঙ্ক)- জাহাঙ্গীরের হাউজ ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ নির্মিত। এই হাউজ (ট্যাঙ্ক) স্নানের জন্য ব্যবহৃত হত। হাউজটি ৫ ফুট উঁচু, ৮ ফুট ব্যাস এবং ২৫ ফুট পরিধি বিশিষ্ট। এর বাইরের দিকে ফারসি ভাষায় লিখা একটি শিলালিপি রয়েছে যেখানে এটিকে হাউজ-ই-জাহাঙ্গীর বলা হয়েছে। এটি প্রথমবার আকবরের প্রাসাদের উঠোনের কাছে আবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৮৪৩ সালে এটিকে দিওয়ান-ই-আমের সামনে স্থাপন করা হয়েছিল। ১৮৬২ সালে এটিকে জনসাধারণের বাগানে (কোম্পানি বাগ) স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো এবং সেখানে এটির অনেক ক্ষতি হয়েছিলো। পরে স্যার জন মার্শাল এটিকে আগ্রা দুর্গে ফিরিয়ে এনে সেখানে স্থাপন করেন। এই হাউজের কারণে প্রাসাদটি জাহাঙ্গীরী মহল নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে যদিও এটি আকবরের বাঙালি মহলের অংশ।

    শাহজাহানী মহল- শাহজাহানী মহল ১৬২৮-৩৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। মহলটি সাদা মার্বেল নির্মিত খাস মহল এবং লাল পাথরের জাহাঙ্গীরী মহলের মাঝখানে অবস্থিত। মহলটি দুটি ভিন্ন যুগে নির্মিত দুটি আবাসিক কমপ্লেক্সের মাঝখানে অবস্থিত। লাল পাথরের ভবনকে মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর রুচি অনুসারে রূপান্তর করার প্রথম প্রচেষ্টা এবং এটি ছিল আগ্রা দূর্গে নির্মিত শাহজাহানের প্রাচীনতম প্রাসাদ। মহলটিতে একটি বিশাল হল,  পাশের কক্ষ এবং নদীর তীরে একটি অষ্টভুজাকার টাওয়ার রয়েছে। ইট এবং লাল পাথর দিয়ে সাদা স্টুকো প্লাস্টার দিয়ে পুনর্নির্মিত করা হয়েছিল এবং ফুলের নকশায় রঙিনভাবে রঙ করা হয়েছিল। পুরো প্রাসাদটি একসময় সাদা মার্বেলের মতো সাদা ঝলমলে ছিল।

    গজনীন গেট (১০৩০ খ্রিস্টাব্দ):- গজনীন গেটটি মূলত গজনীতে মাহমুদ গজনবীর সমাধির অন্তর্গত ছিল। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশরা সেখান থেকে এটি আগ্রায় এনেছিল। গভর্নর জেনারেল লর্ড এলেনবরো ঐতিহাসিক ঘোষণায় দাবি করেছিলেন যে এগুলি সোমনাথের চন্দন কাঠের দরজা যা মাহমুদ ১০২৫ সালে গজনীতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই দাবিটি মিথ্যা। কেবল ভারতীয় জনগণের সদিচ্ছা অর্জনের জন্য এই দাবি করা হয়েছিল। গেটটি আসলে গজনীর স্থানীয় দেওদার কাঠ দিয়ে তৈরি, চন্দন কাঠ দিয়ে নয়। অলংকরণের ধরণেও প্রাচীন গুজরাটি কাঠের কাজের সাথে কোনও মিল নেই। উপরের অংশে খোদাই করা একটি আরবি শিলালিপিও রয়েছে। এতে মাহমুদের উপাধি সহ নাম উল্লেখ রয়েছে। স্যার জন মার্শাল এখানে একটি নোটিশ বোর্ড স্থাপন করেছিলেন, যা এই গেট সম্পর্কে পুরো ঘটনা বর্ণনা করে। এটি ১৬.৫ ফুট উঁচু এবং ১৩.৫ ফুট প্রশস্ত এবং এর ওজন প্রায় আধা টন। এটি জ্যামিতিক, ষড়ভুজাকার এবং অষ্টভুজাকার প্যানেল দিয়ে তৈরি। যেগুলো একটির সাহায্যে অন্যটির ফ্রেমের মধ্যে রিভেট(রিভেট হলো একটি স্থায়ী যান্ত্রিক বন্ধনী) ছাড়াই স্থির করা হয়েছে। এটি সোমনাথে পুনরুদ্ধারের ধারণাটি শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করা হয়েছিল। তারপর থেকে এটি একটি কক্ষে সংরক্ষিত আছে।

        জাহাঙ্গীরের বিচার শৃঙ্খল (আনুমানিক ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ):- এই স্থানেই মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘বিচার শৃঙ্খল’ (জাঞ্জির-ই-আদল) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতিকথায় লিপিবদ্ধ করেছেন যে, সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি প্রথম যে আদেশ দিয়েছিলেন, তা হল, বিচার পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা ন্যায় প্রদানে বিলম্ব করলে বা ভণ্ডামি করলে ক্ষতিগ্রস্তরা এই শৃঙ্খলের কাছে এসে এটিকে নাড়া দিয়ে সেই শব্দে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। শৃঙ্খলটি খাঁটি সোনার তৈরি ছিল। শৃহ্খলটি ৮০ ফুট লম্বা ছিল এবং ৬০টি ঘণ্টা বাঁধা ছিল। এর ওজন ছিল ১ কুইন্টাল। এক প্রান্ত শাহ-বুর্জ(টাওয়ার)এর দুর্গের সাথে এবং অন্য প্রান্ত নদীর তীরে একটি পাথরের খুঁটিতে আটকানো ছিল। এটি কোনও পৌরাণিক কাহিনী নয়। উইলিয়াম হকিন্সের মতো সমসাময়িক বিদেশী ভ্রমণকারীরা ব্যক্তিগতভাবে এটি দেখেছিলেন। ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি একটি চিত্রকর্মেও এটি চিত্রিত হয়েছে। এটি ছিল জনগণের অভিযোগের প্রতিকারের একটি উপায়, যারা সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি, কোনও পারিশ্রমিক, ভয় বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য যেতে পারত। জাতি বা ধর্মের বা দরিদ্র ও ধনী ব্যক্তির মধ্যে কোনও পার্থক্য ছিল না। জাহাঙ্গীরের বিচার ব্যবস্থা ‘আদল-ই-জাহাঙ্গীর’ ভারতীয় ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে রযেছে।

    মুথাম্মন বুর্জ (শাহ-বুর্জ) এবং ঝরোখা (১৬৩২-১৬৪০ খ্রিস্টাব্দ):- এই প্রাসাদটি পূর্বমুখী। নদীর তীরে আগ্রা দুর্গের উপরে অবস্থিত। এটি মূলত বাদশাহ আকবর লাল পাথর দিয়ে তৈরি করেছিলেন। এটি ঝরোখা দর্শনের জন্য এবং প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সময় সূর্য দর্শনের জন্য ব্যবহার করতেন। জাহাঙ্গীর এটি ঝরোখা হিসাবেও ব্যবহার করতেন। তিনি এর দক্ষিণ দিকে তাঁর ‘আদল-ই-জাঞ্জির’ (ন্যায়বিচারের শৃঙ্খল)ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর অষ্টভুজাকার নকশার কারণে, এটিকে ‘মুথাম্মন বুর্জ’ বলা হত। পারস্যের ঐতিহাসিক এবং বিদেশী ভ্রমণকারীদের দ্বারা এটিকে ‘শাহ-বুর্জ’ (সাম্রাজ্য বা রাজার টাওয়ার) হিসাবেও উল্লেখ করা হয়েছে। ১৬৩২-১৬৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে শাহজাহান সাদা মার্বেল দিয়ে এটি পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। তিনি এটি ঝরোখা দর্শনের জন্যও ব্যবহার করতেন, যা ‘দরবার’-এর মতোই একটি অপরিহার্য মুঘল প্রতিষ্ঠান ছিল। এই প্রাসাদের পশ্চিম দিকে শাহ-নাসিন (অ্যালকোভ) সহ একটি প্রশস্ত দালান রয়েছে। এই দালানটি একটি উঠোনে খোলা হয়েছে যার উত্তর দিকে একটি জালি পর্দা দ্বারা বেষ্টিত প্রক্ষিপ্ত একটি চবুতরা রয়েছে, এর পশ্চিম প্রান্তে শীশ মহলের দিকে যাওয়ার জন্য কয়েকটি কক্ষ রয়েছে; এবং দক্ষিণ দিকে একটি স্তম্ভ (দালান)রয়েছে, যার সাথে একটি কক্ষ সংযুক্ত রয়েছে। সুতরাং, এটি সম্পূর্ণরূপে সাদা মার্বেল দিয়ে নির্মিত একটি বৃহৎ কমপ্লেক্স। এর একঘেয়েমি ভাঙার জন্য দেয়ালে গভীর কুলুঙ্গি রয়েছে। এটি শাহজাহানের সবচেয়ে অলঙ্কৃত ভবনগুলির মধ্যে একটি। এই প্রাসাদটি সরাসরি দিওয়ান-ই-খাস, শীশ মহল, খাস মহল এবং অন্যান্য প্রাসাদের সাথে সংযুক্ত। এখান থেকেই মুঘল সম্রাট সমগ্র দেশ শাসন করতেন। এই বুর্জটি তাজমহলের পূর্ণ এবং মহিমান্বিত দৃশ্য উপস্থাপন করে এবং শাহজাহান এই কমপ্লেক্সে তার কারাবাসের আট বছর (১৬৫৮-১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ) কাটিয়েছিলেন এবং বলা হয় যে তিনি এখানেই মারা যান। তার মৃতদেহ নৌকায় করে তাজমহলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে সমাহিত করা হয়েছিল।

    শীশ মহল (১৬৩১-৪০ খ্রিস্টাব্দ):- মুঘল সম্রাট শাহজাহান গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদের অংশ হিসেবে এটি নির্মাণ করেছিলেন। এর সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল, এর দেয়াল এবং ছাদে করা কাচের মোজাইক কাজ। এই কাচের টুকরোগুলিতে উচ্চমানের আয়না রয়েছে যা আধা-অন্ধকার অভ্যন্তরে হাজারো উপায়ে চকচকে এবং ঝিকিমিকি করে। কাচগুলো সিরিয়ার হালেব থেকে আমদানি করা হয়েছিল। শাহজাহান লাহোর এবং দিল্লিতেও কাচের প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন।

    জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে- ২০০৪ সালে আগ্রা দুর্গ স্থাপত্যের জন্য আগা খান পুরষ্কার জিতেছে। ইন্ডিয়ান পোস্টাল বিভাগ এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের লেখা শার্লক হোমস রহস্য “দ্য সাইন অফ দ্য ফোর”-এ আগ্রা দুর্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মিশরীয় পপ তারকা হিশাম আব্বাসের একটি জনপ্রিয় গান হাবিবি দাহ-এর মিউজিক ভিডিওতে আগ্রা দুর্গটি প্রদর্শিত হয়েছিল। ১৬৬৬ সালে জয় সিং প্রথমের সাথে “পুরন্দরের চুক্তি (১৬৬৫)” অনুসারে শিবাজি দিওয়ান-ই-খাসে আওরঙ্গজেবের সাথে দেখা করার জন্য আগ্রায় এসেছিলেন। তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্ন পদমর্যাদার লোকদের পিছনে রাখা হয়েছিল। অপমানিত হয়ে তিনি রাজকীয় দর্শকদের পাশ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন এবং ফলে ১৬৬৬ সালের ১২ মে তাঁকে জয় সিং-এর আবাসস্থলে আটকে রাখা হয়েছিলো।*

মেহরানগড় দুর্গ

    মেহরানগড় দুর্গ ভারতের রাজস্থানের যোধপুরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক দুর্গ। মেহরানগড় দুর্গটি ভাকুরচিরিয়া পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। দুর্গটি পার্শ্ববর্তী সমভূমি থেকে প্রায় ১২২ মিটার (৪০০ ফুট) উপরে অবস্থিত এবং ১,২০০ একর (৪৮৬ হেক্টর)ভূমির উপর বিস্তৃত। দুর্গটি ১৪৫৯ সালের দিকে রাঠোর বংশের রাজপুত শাসক রাও যোধা দ্বারা নির্মিত হয়েছিল, যদিও বিদ্যমান কাঠামোর বেশিরভাগই ১৭ শতকে তাঁর উত্তরসূরিদের দ্বারা নির্মিত। দুর্গটিতে সাতটি দরজা রয়েছে। দরজাগুলির মধ্যে রয়েছে প্রধান প্রবেশদ্বার জয় পোল (যার অর্থ ‘বিজয় দ্বার’)।দরজাটি মহারাজা মান সিং ১৮০৬ সালে জয়পুর এবং বিকানের সেনাবাহিনীর উপর বিজয় সাব্যস্ত করার স্মরণে নির্মাণ করেছিলেন। ফতেহ পোল (অর্থাৎ ‘বিজয় দ্বার’), মুঘলদের উপর মহারাজা অজিত সিংহের বিজয়ের স্মরণে নির্মিত হয়েছিলো। ইংরেজ লেখক, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রুডইয়ার্ড কিপলিং দুর্গটিকে “একটি প্রাসাদ যা সম্ভবত টাইটান(মেহরানগড় দুর্গের টাইটানস”বাক্যাংশটি রুডইয়ার্ড কিপলিং দ্বারা দুর্গের মহিমার একটি রূপক বর্ণনা।)দের দ্বারা নির্মিত এবং সকালের সূর্য দ্বারা রঙ করা হয়েছিল” বলে বর্ণনা করেছেন।

    দুর্গটির সীমানার মধ্যে জটিল খোদাই এবং বিস্তৃত উঠোনের জন্য পরিচিত বেশ কয়েকটি প্রাসাদ রয়েছে এবং  চামুণ্ডা মাতাজির মন্দির, পাশাপাশি একটি জাদুঘর রয়েছে। নীচের শহরটিতে যাওয়ার জন্য একটি আঁকাবাঁকা রাস্তা রয়েছে। জয়পুরের আক্রমণকারী সেনাবাহিনীর দ্বারা ছোড়া কামানের গোলাগুলির প্রভাবের ছাপ এখনও দ্বিতীয় ফটকে বিদ্যমান। দুর্গের উত্তর-পূর্বে কিরাত সিং সোধার ছত্রী রয়েছে। কিরাত সিং মেহরানগড়কে রক্ষা করতে গিয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছিলেন।

দুর্গটিতে অনুষ্ঠিত কিছু উল্লেখযোগ্য উৎসবের মধ্যে রয়েছে ওয়ার্ল্ড সেক্রেড স্পিরিট ফেস্টিভ্যাল এবং রাজস্থান আন্তর্জাতিক লোক উৎসব।

    উৎপত্তি- মেহরানগড়ের উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ ‘মিহির’ (অর্থাৎ সূর্য) এবং ‘গড়’ (অর্থাৎ দুর্গ) থেকে উদ্ভূত। দুর্গটির নামকরণ করা হয়েছিল মিহিরগড়, যার অর্থ ‘সূর্যের দুর্গ’।

    ইতিহাস- রাঠোর বংশের প্রধান রাও যোধা  ভারতে যোধপুরের উৎপত্তির কৃতিত্ব পান। তিনি ১৪৫৯ সালে মারওয়ারের রাজধানী হিসেবে যোধপুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মান্দোর ছিল মারওয়ারের পূর্ববর্তী রাজধানী। রাও যোধা ছিলেন রণমলের ২৪ পুত্রের একজন এবং পঞ্চদশ রাঠোর শাসক। সিংহাসনে আরোহণের এক বছর পর রাও  যোধা তাঁর রাজধানী যোধপুরের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ এক হাজার বছরের পুরনো মান্দোর দুর্গ তখন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রদানকারী বলে বিবেচিত হত না। রাও নারা (রাও সামরার পুত্র)এর বিশ্বস্ত সহায়তায়  মেওয়ার বাহিনী মান্দোরে পরাজিত হয়েছিলো। ফলে রাও যোধা রাও নারাকে দেওয়ান উপাধি প্রদান করেছিলেন এবং রাও নারার সহায়তায় ১৪৫৯ সালের ১২ মে মান্দোরের ৯ কিলোমিটার (৫.৬ মাইল) দক্ষিণে একটি পাথুরে পাহাড়ে দুর্গের ভিত্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই পাহাড়টি ভাকুরচিরিয়া নামে পরিচিত ছিল। কিংবদন্তি অনুসারে, দুর্গটি নির্মাণের জন্য তাঁকে পাহাড়ের একমাত্র মানব বাসিন্দা,  পাখিদের দেবতা, চেরিয়া নাথজি নামক এক সন্ন্যাসীকে স্থানান্তর করতে হয়েছিল। স্থানীয় জনগণ চেরিয়া নাথজির অনুসারী ছিলেন এবং তাই সন্ন্যাসী এই অঞ্চলে প্রভাবশালী ছিলেন। স্থানান্তরের জন্য তাঁকে অনুরোধ করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই প্রত্যাখানের ঘটনা বহুবার ঘটেছিল। ফলে রাও যোধা চরম পদক্ষেপ নেন এবং দেশনোকের আরেকজন শক্তিশালী সাধক করণী মাতা(শ্রী করণী মাতা ছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীর একজন হিন্দু ঋষি এবং চরণ বর্ণের একজন মহিলা সাধুযাকে দেবী দুর্গার অবতার বলে বিশ্বাস করা হয়)র সাহায্য চান। করণী মাতা একজন হিন্দু যোদ্ধা ঋষি ছিলেন। রাজার অনুরোধে, তিনি এসে চেরিয়া নাথজিকে অবিলম্বে স্থানত্যাগ করতে বলেন। করণী মাতার উচ্চতর শক্তি দেখে চেরিয়া নাথজি তৎক্ষণাৎ সেই স্থান ত্যাগ করে চলে যান এবং যোধা! তোমার দুর্গে কখনও জলের অভাব ঘুচবেনা! বলে রাও যোধাকে অভিশাপ দেন। রাও যোধা দুর্গে একটি বাড়ি এবং একটি মন্দির নির্মাণ করে দিয়ে সন্ন্যাসীকে শান্ত করতে সক্ষম হন। করণী মাতা মেহরানগড় দুর্গের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। বিকানের এবং যোধপুর উভয়ের দুর্গের ভিত্তিপ্রস্তরও শ্রী করণী মাতা স্থাপন করেছিলেন। রাজস্থানের অন্যান্য সমস্ত রাজপুত দুর্গগুলি কোনও না কোনও কারণে সংশ্লিষ্ট বংশগুলি দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। যোধপুর এবং বিকানেরের রাঠোরদের দুর্গগুলি আজও তাঁদের কাছে রয়েছে। স্থানীয় জনগণ এই ঘটনাটিকে একটি অলৌকিক ঘটনা বলে মনে করে এবং শ্রী করণী মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। রাও যোধা দুই চরণ যুদ্ধবাজকে মাথানিয়া এবং চোপাসনি গ্রামও দান করেছিলেন।

    দুর্গের স্থান যাতে শুভ হয় তা নিশ্চিত করার জন্য, রাও যোধা “রাজা রাম মেঘওয়াল” নামে মেঘওয়াল বর্ণের একজন ব্যক্তিকে দুর্গটিতে কবর দিয়েছিলেন। তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর সেবা প্রদান করেছিলেন, কারণ সেই সময়ে এই কাজ শুভ বলে বিবেচিত হত। “রাজা রাম মেঘওয়াল” কে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে তার পরিবারের প্রতিদানে রাঠোররা তাদের দেখাশোনা করবে। তার পরিবারকে জমি দেওয়া হয়েছিল এবং আজও রাজা রাম মেঘওয়ালের বংশধররা সুর সাগরের কাছে রাজবাগে বাস করে।

    দুর্গটি মূলত ১৪৫৯ সালে যদিও যোধপুরের প্রতিষ্ঠাতা রাও যোধা দ্বারা নির্মিত হয়েছিল, তবে বর্তমানে যে দুর্গটি দাঁড়িয়ে আছে তার বেশিরভাগই মহারাজা যশবন্ত সিং (১৬৩৮-৭৮) এর আমলের। দুর্গটি শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি উঁচু পাহাড়ের উপরে অবস্থিত এবং ৫ কিলোমিটার (৩.১ মাইল) বিস্তৃত। দুর্গটির দেয়াল ৩৬ মিটার (১১৮ ফুট) পর্যন্ত উঁচু এবং ২১ মিটার (৬৯ ফুট) প্রশস্ত।  রাজস্থানের সবচেয়ে সুন্দর এবং ঐতিহাসিক প্রাসাদগুলি দুর্গের মধ্যে অবস্থিত। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি খান্ডওয়ালিয়া সম্প্রদায়ের কাছে বড় পাথর ভাঙার জ্ঞান ছিল এবং তাঁরা অন্যদের সাথে মিলে এই দুর্গটি তৈরি করা হয়েছিল।

    সাতটি দরজার একটি সিরিজ দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করা যায়। সবচেয়ে বিখ্যাত দরজাগুলি হল:-

    জয় পোল– ১৮০৬ সালে জয়পুর এবং বিকানেরের সাথে যুদ্ধে তাঁর বিজয় উদযাপনের জন্য মহারাজা মান সিং দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।

    ফতেহ পোল; ১৭০৭ সালে মুঘলদের উপর বিজয় উদযাপনের জন্য নির্মিত।

    গোপাল পোল- এটি ফতেহ পোলের পরে দ্বিতীয় পোল।

    দেধ কাংড়া পোল- পোলটি এখনও কামানের গোলাবর্ষণের চিহ্ন বহন করে।

    অমৃত পোল– দেধ কাংড়া পোল এবং লোহা পোলের মাঝখানে অবস্থিত।

    লোহা পোল- যা দুর্গ কমপ্লেক্সের মূল অংশে প্রবেশের শেষ প্রবেশদ্বার। ঠিক বাম দিকে রানী এবং কিছু রাজকন্যাদের হাতের ছাপ (সতী চিহ্ন) রয়েছে, যারা তাঁদের স্বামীর মৃত্যুর পর বছরের পর বছর ধরে সতীদাহ করেছিলেন।

    সূরজ পোল- ভিতরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার যা প্রাসাদ কমপ্লেক্স এবং দৌলত খানা চৌকে প্রবেশাধিকার প্রদান করে।

    দুর্গের ভিতরে বেশ কয়েকটি চকচকে কারুকার্য এবং সজ্জিত প্রাসাদ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, মতি মহল (মুক্তার প্রাসাদ), ফুল মহল (ফুলের প্রাসাদ), শীষা মহল (আয়না প্রাসাদ), সিলেহ খানা এবং দৌলত খানা। জাদুঘরে পালকি, হাওদা, রাজকীয় দোলনা, বাদ্যযন্ত্র, পোশাক এবং আসবাবপত্রের সংগ্রহ রয়েছে। দুর্গের প্রাচীরে পুরানো কামান (বিখ্যাত কিলকিলা সহ) সংরক্ষিত ছিল এবং দুর্গ থেকে শহরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।

    মেহরানগড় জাদুঘরের গ্যালারি– হাওদাহ ছিল এক ধরণের দুই-বগি বিশিষ্ট কাঠের আসন (বেশিরভাগই সোনা ও রূপার এমবসড চাদর দিয়ে ঢাকা), যা হাতির পিঠে লাগানো হত। সামনের বগিটি  পায়ের জায়গা এবং একটি উঁচু প্রতিরক্ষামূলক ধাতব চাদর সহ, রাজা বা রাজপরিবারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, এবং পিছনের ছোট বগিটি একজন নির্ভরযোগ্য দেহরক্ষীর জন্য নির্দ্ধারিত ছিলো,যেজন ফ্লাই-হুইস্ক অ্যাটেনডেন্টের ছদ্মবেশে থাকত।

    পালকি- বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত অভিজাত মহিলাদের ভ্রমণ এবং প্রদক্ষিণের জন্য পালকি ছিল একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। বিশেষ অনুষ্ঠানে অভিজাত পুরুষ এবং রাজপরিবারের সদস্যরাও পালকি ব্যবহার করতেন।

    দৌলত খানা মেহরানগড় জাদুঘরের ধনসম্পদ এই গ্যালারিটিতে ভারতীয় ইতিহাসের মুঘল আমলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বোত্তমভাবে সংরক্ষিত সূক্ষ্ম ও প্রয়োগ শিল্পের সংগ্রহ রয়েছে। সেই সময়ে যোধপুরের রাঠোর শাসকরা মুঘল সম্রাটদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এখানে সম্রাট আকবরের ধ্বংসাবশেষও রয়েছে।

    অস্ত্রাগার- এই গ্যালারিতে যোধপুরের প্রতিটি যুগের বিরল বর্মের সংগ্রহ প্রদর্শিত হয়। জেড, রূপা, গণ্ডারের শিং, হাতির দাঁতের তৈরি তরবারির স্তম্ভ, রুবি, পান্না ও মুক্তো দিয়ে খচিত ঢাল এবং পিপায় সোনা ও রূপার কাজ করা বন্দুক প্রদর্শন করা হয়। গ্যালারিতে অনেক সম্রাটের ব্যক্তিগত তরবারিও প্রদর্শিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে রাও যোধার ৩ কেজিরও বেশি ওজনের তরবারি। আকবরের তরবারি এবং তৈমুরের তরবারির মতো অসাধারণ ঐতিহাসিক নিদর্শনও রয়েছে।

    চিত্রকর্ম- এই গ্যালারিটিতে মারোয়ার-যোধপুরের রঙ প্রদর্শিত হয়, যা মারোয়ার চিত্রকলার সর্বোত্তম উদাহরণ।

    পাগড়ি গ্যালারি- মেহরানগড় জাদুঘরের পাগড়ি গ্যালারি রাজস্থানে একসময় প্রচলিত বিভিন্ন ধরণের পাগড়ি সংরক্ষণ, নথিভুক্তকরণ এবং প্রদর্শনের চেষ্টা করে; প্রতিটি সম্প্রদায়, অঞ্চল এবং উৎসবের নিজস্ব পাগড়ি ছিল।

    শাহী লাল ডেরা- শাহী লাল ডেরা বা রাজকীয় লাল তাঁবু দুর্গের রাজকীয় সংগ্রহের একটি অংশ।

    মেহরানগড় দুর্গের অভ্যন্তরভাগ– চামুণ্ডা মাতাজি ছিলেন রাও যোধার প্রিয় দেবী, তিনি ১৪৬০ সালে পুরাতন রাজধানী মান্দোর থেকে চামুণ্ডা মাতাজির মূর্তি এনে মেহরানগড়ে স্থাপন করেছিলেন। মা চামুণ্ডা ছিলেন মান্দোরের প্রতিহার শাসকদের কুল দেবী। চামুণ্ডা মাতাজি এখনও মহারাজা এবং রাজপরিবারের ইষ্ট দেবী বা দত্তক দেবী এবং যোধপুরের বেশিরভাগ নাগরিকও তাঁর পূজা করেন। দশেরা উদযাপনের সময় মেহরানগড়ে যথেষ্ট ভিড় জমে।

    রাও যোধা ডেজার্ট রক পার্ক- রাও যোধা ডেজার্ট রক পার্ক মেহরানগড় দুর্গ সংলগ্ন ৭২ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত। পার্কটিতে পরিবেশগতভাবে পুনরুদ্ধার করা মরুভূমি এবং শুষ্ক ভূমির গাছপালা রয়েছে। দুর্গ সংলগ্ন এবং নীচে একটি বৃহৎ  পাথুরে অঞ্চলের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার করার জন্য ২০০৬ সালে পার্কটি তৈরি করা হয়েছিল এবং ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জনসাধারণের জন্য পার্কটি উন্মুক্ত করা হয়েছিল। পার্কের ভেতরে এবং আশেপাশের এলাকায় রাইওলাইটের মতো স্বতন্ত্র আগ্নেয়গিরির শিলা গঠন রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঢালাই করা টাফ এবং ব্রেসিয়া, বেলেপাথরের গঠন। পার্কটিতে ইন্টারপ্রিটেশন গ্যালারি সহ একটি ভিজিটর সেন্টার, একটি স্থানীয় উদ্ভিদ নার্সারি, ছোট দোকান এবং ক্যাফে রয়েছে।

    ২০০৮ সালের পদদলিত– ৩০ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে মেহরানগড় দুর্গের ভিতরে চামুণ্ডা দেবী মন্দিরে যথেষ্ট ভিরের জন্য মানব পদপিষ্টের ঘটনা ঘটেছিলো, যেখানে ২২৪ জন নিহত এবং ৪০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছিলো।

    সংস্কৃতি

    মেহরানগড় দুর্গের রাতের দৃশ্য- এই দুর্গের প্রবেশপথে লোকসঙ্গীত পরিবেশনকারী সঙ্গীতজ্ঞরা রয়েছেন এবং এখানে জাদুঘর, রেস্তোরাঁ, প্রদর্শনী এবং কারুশিল্পের বাজার রয়েছে। এই দুর্গটি ডিজনির ১৯৯৪ সালের লাইভ-অ্যাকশন চলচ্চিত্র দ্য জঙ্গল বুক এবং ২০১২ সালের দ্য ডার্ক নাইট রাইজেসের চিত্রগ্রহণ করা হয়েছিলো। দ্য ডার্ক নাইট রাইজেসের মূল চিত্রগ্রহণ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালের ৬ মে। ইমরান হাশমি অভিনীত আওয়ারাপানেরও এখানে শুটিং করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে, এই দুর্গটি ইসরায়েলি সুরকার শাই বেন তজুর, ইংরেজ সুরকার এবং রেডিওহেড গিটারিস্ট জনি গ্রিনউড এবং রেডিওহেড প্রযোজক নাইজেল গডরিচ সহ সঙ্গীতজ্ঞদের একটি সহযোগী অ্যালবাম রেকর্ড করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। রেকর্ডিংটি আমেরিকান পরিচালক পল থমাস অ্যান্ডারসনের জুনুন নামে একটি তথ্যচিত্রের বিষয়ে ছিল। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে, বলিউড ছবি থাগস অফ হিন্দুস্তানের জন্য চলচ্চিত্রের দলগুলি দুর্গটিকে তাদের শুটিংয়ের জন্য ব্যবহার করেছিল। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন তাঁর অফিসিয়াল ব্লগে সেখানকার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একটি পোস্ট রেখেছিলেন। *

জয়পুর (আমের) দুর্গ

        আমের দুর্গ বা আম্বর দুর্গ ভারতের রাজস্থানের আমেরে অবস্থিত। আমের হল ৪ বর্গকিলোমিটার (১.৫ বর্গমাইল) আয়তনের একটি শহর। শহরটি রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর থেকে ১১ কিলোমিটার (৬.৮ মাইল) দূরে অবস্থিত। পাহাড়ের উপরে অবস্থিত দূর্গটি  জয়পুরের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।আমের দুর্গ তার শৈল্পিক শৈলীর উপাদানের জন্য পরিচিত। এর বিশাল প্রাচীর, দরজা এবং পাথরের তৈরি পথের সিরিজ সহ, দুর্গটি মাওতা হ্রদকে উপেক্ষা করে, যদিও মাওতা হ্রদ আমের প্রাসাদের জলের প্রধান উৎস।

    আমের প্রাসাদ রাজপুত স্থাপত্যের একটি সুন্দর উদাহরণ। এর কিছু ভবন এবং কাজের উপর মুঘল স্থাপত্যের প্রভাব পরেছে। লাল বেলেপাথর এবং মার্বেল দিয়ে নির্মিত, আকর্ষণীয়, বিলাসবহুল প্রাসাদটি চারটি স্তরে নির্মিত, প্রতিটি স্তরে একটি করে উঠোন রয়েছে। এটি দিওয়ান-ই-আম, বা “জনসাধারণের দর্শকদের হল”, দিওয়ান-ই-খাস, বা “ব্যক্তিগত অভিজাত দর্শকদের হল”, শীষ মহল (আয়না প্রাসাদ), বা জয় মন্দির এবং সুখ নিবাস নিয়ে গঠিত যেখানে প্রাসাদের অভ্যন্তরে জলধারার উপর দিয়ে প্রবাহিত বাতাসের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শীতল জলবায়ু তৈরি করা হয়। অতএব, আমের দুর্গটি আমের প্রাসাদ নামেও পরিচিত।প্রাসাদটি রাজপুত মহারাজা এবং তাঁদের পরিবারের বাসস্থান ছিল। দুর্গের গণেশ গেটের কাছে প্রাসাদের প্রবেশপথে, চৈতন্য সম্প্রদায়ের দেবী শীলা দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি মন্দির রয়েছে, যা রাজা মান সিংহকে ১৬০৪ সালে বাংলার যশোরের রাজাকে পরাজিত করার সময় দেওয়া হয়েছিল। (যশোর এখন বাংলাদেশে অবস্থিত)। রাজা মান সিংহের ১২ জন রানী ছিল। তাই তিনি  প্রতিটি রানীর জন্য একটি করে ১২ টি কক্ষ নিৰ্মাণ করেছিলেন। প্রতিটি কক্ষে রাজার ঘরের সাথে সংযুক্ত একটি সিঁড়ি ছিল, তবে রানীরা উপরে যেতে পারতেন না। রাজা জয় সিংহের মাত্র একজন রানী ছিলেন তাই তিনি তিনটি পুরনো রানীর ঘরের সমান একটি কক্ষ তৈরি করেছিলেন।

    জয়গড় দুর্গের সাথে এই প্রাসাদটি আরাবল্লি পাহাড়ের চিল কা টিলা (ঈগলদের পাহাড়) এর ঠিক উপরে অবস্থিত। প্রাসাদ এবং জয়গড় দুর্গকে একটি জটিল হিসাবে বিবেচনা করা হয়, কারণ দুটি দূৰ্গ একটি ভূগর্ভস্থ পথ দ্বারা সংযুক্ত। যুদ্ধের সময় রাজপরিবারের সদস্যরা এবং আমের দুর্গের অন্যান্য সদস্যদের আরও সন্দেহজনক জয়গড় দুর্গে স্থানান্তরিত করার জন্য এই পথটি একটি পালানোর পথ হিসাবে তৈরি করা হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট জানিয়েছেন যে, আমের প্রাসাদে বার্ষিক পর্যটক ভ্রমণ প্রতিদিন ৫০০০ দর্শনার্থী আসেন, ২০০৭ সালে ১.৪ মিলিয়ন দর্শনার্থী এসেছিলো। ২০১৩ সালে কম্বোডিয়ার নমপেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৩৭তম অধিবেশনে, রাজস্থানের পাঁচটি দুর্গের সাথে আমের দুর্গকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।দূৰ্গগুলি রাজস্থানের পার্বত্য দুর্গের অংশ।

    ব্যুৎপত্তি- চিল কা টিলার উপরে নির্মিত অম্বিকেশ্বর মন্দির থেকে আমের বা আম্বর নামটি এসেছে। অম্বিকাশ্বর হল দেবতা শিবের স্থানীয় নাম। তবে, স্থানীয় লোককাহিনী অনুসারে দুর্গটির নামকরণ করা হয়েছে অম্বা, মাতা দুর্গার নামানুসারে।

    ভূগোল- আমের প্রাসাদটি রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার (৬.৮ মাইল) দূরে আমের শহরের কাছে মাওতা হ্রদের পাশে জঙ্গলে ঘেরা একটি পাহাড়ি ঢালে অবস্থিত। প্রাসাদটি দিল্লির জাতীয় মহাসড়ক ১১ সি-এর কাছে অবস্থিত।দুর্গের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত একটি সরু ৪-ডব্লিউডি রাস্তা উঠে গেছে, যা সুরজ পোল (সূর্যদ্বার) নামে পরিচিত। এখন পর্যটকদের জন্য হাতিতে চড়ার পরিবর্তে জিপে করে দুর্গে যাওয়া অনেক বেশি সুবিধে বলে মনে করা হয়।

    প্রাথমিক ইতিহাস- অম্বর ছিল একটি মীনা(মীনা হল উত্তর ও পশ্চিম ভারতের একটি উপজাতি যা কখনও কখনও ভিল সম্প্রদায়ের একটি উপ-গোষ্ঠী হিসাবে বিবেচিত হয়।) রাজ্য, যা একটি সুসাওয়াত(ভারতের ঐতিহাসিক মীনা বংশ।) বংশ দ্বারা শাসিত ছিল। কাকিল দেও সুসাওয়াতদের পরাজিত করার পর তিনি খোহের পরে আম্বরকে ধুন্ধারের রাজধানী করেন। কাকিল দেও ছিলেন দুলহেরাইয়ের পুত্র।

    প্রাথমিক যুগে, জয়পুর রাজ্যটি আম্বর বা ধুন্ধর নামে পরিচিত ছিল এবং পাঁচটি ভিন্ন উপজাতির মীনা প্রধানদের দ্বারা শাসিত ছিল। তারা দেওতির বরগুর্জর রাজপুত রাজার আধিপত্যের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে কচ্ছওয়া রাজপুত্র দুলহা রায় মীনাদের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করেন এবং দেওলির বরগুর্জরদেরও পরাজিত করেন এবং ধুন্ধরকে সম্পূর্ণরূপে কচ্ছওয়া শাসনের অধীনে নিয়ে নেন।

    আম্বর দুর্গটি মূলত রাজা মান সিংহ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। জয় সিং প্রথম ১৬০০ সালের গোড়ার দিকে এটি সম্প্রসারিত করেন। পরবর্তী ১৫০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে শাসকরা উন্নতি ও সংযোজন করেছেন। ১৭২৭ সালে সওয়াই জয় সিং দ্বিতীয়ের সময়ে কচোয়ারা তাদের রাজধানী জয়পুরে স্থানান্তরিত করেন।

    মধ্যযুগে, আমের ধুন্দর (ধুন্ধর, যা জয়পুর অঞ্চল নামেও পরিচিত, পশ্চিম ভারতের রাজস্থান রাজ্যের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল। এর মধ্যে জয়পুর, জামওয়ারমগহড়, আলওয়ার, … জেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।)নামে পরিচিত ছিল এবং একাদশ শতাব্দী থেকে (১০৩৭ থেকে ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দ)পর্যন্ত অর্থাৎ আমের থেকে জয়পুরে রাজধানী স্থানান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত কচোয়ারা শাসন করেছিলেন। আমেরের ইতিহাস এই শাসকদের সাথে অবিস্মরণীয়ভাবে জড়িত কারণ তারা আমেরে তাঁদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

    আমের দুর্গের জেনানা প্রাঙ্গণ- প্রাসাদটি ছয়টি পৃথক কিন্তু প্রধান অংশে বিভক্ত, যার প্রতিটির নিজস্ব প্রবেশদ্বার এবং প্রাঙ্গণ রয়েছে। প্রধান প্রবেশদ্বারটি সুরজ পোল (সূর্যদ্বার) দিয়ে প্রাঙ্গণে নিয়ে যায়। এটি সেই স্থান যেখানে সেনাবাহিনী যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তাঁদের প্রদান করা যুদ্ধের উপহার নিয়ে বিজয় কুচকাওয়াজ করত। রাজপরিবারের মহিলারাও জালযুক্ত জানালা দিয়ে সেই বিজয় কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করত। এই গেটটি বিশষভাবে তৈরি করা হয়েছিল এবং প্রাসাদের প্রধান প্রবেশদ্বার হওয়ায় এতে প্রহরী সরবরাহ করা হতো। সূর্যদ্বারটি উদীয়মান সূর্যের দিকে মুখ করে ছিল, তাই সুরজ পোল এই নামকরণ করা হয়েছিলো। রাজকীয় অশ্বারোহী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই গেট দিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করতেন।

    জালেব চক- জালেব চক একটি আরবি শব্দ যার অর্থ সৈন্যদের একত্রিত হওয়ার স্থান। এটি আমের প্রাসাদের চারটি উঠোনের মধ্যে একটি, যা সাওয়াই জয় সিংহের রাজত্বকালে (১৬৯৩-১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত হয়েছিল। মহারাজার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা এখানে সেনা কমান্ডার বা ফৌজ বকশির নেতৃত্বে কুচকাওয়াজ করতেন। মহারাজা স্বয়ং রক্ষীদের দল পরিদর্শন করতেন। উঠোনের পাশে ছিল ঘোড়ার আস্তাবল, যার উপরের স্তরের কক্ষগুলিতে রক্ষীরা বাস করত।

    গণেশ পোলের প্রবেশপথ- জলেবি চক থেকে একটি চিত্তাকর্ষক সিঁড়ি মূল প্রাসাদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। এখানে, সিঁড়ির সিঁড়ির ডানদিকে প্রবেশপথে শিলা দেবী মন্দির রয়েছে যেখানে রাজপুত মহারাজারা পূজা করতেন, ষোড়শ শতাব্দীতে মহারাজা মানসিংহ থেকে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত, যখন রাজপরিবারের দ্বারা প্রচলিত পশু বলিদানের রীতি (মহিষ বলিদান) বন্ধ হয়ে যায়।

    গণেশ পোল বা গণেশ গেট, হিন্দু দেবতা গণেশের নামে নামকরণ করা হয়েছে, যা জীবনের সমস্ত বাধা দূর করে বলে বিশ্বাস করা হয়। এটি মহারাজাদের ব্যক্তিগত প্রাসাদে প্রবেশের পথ। এটি একটি তিন-স্তরের কাঠামো যার অনেক ফ্রেস্কো(প্লাস্টার সম্পূর্ণ শুকিয়ে না যাওয়া অবস্থার দেয়াল, ছাদ ইত্যাদির উপর আঁকা একটি চিত্রকর্ম এবং রঙ করার পদ্ধতি) রয়েছে, যা মির্জা রাজা জয় সিং (১৬২১-১৬২৭) এর আদেশে নির্মিত হয়েছিল। এই গেটের উপরে সুহাগ মন্দির রয়েছে যেখানে রাজপরিবারের মহিলারা জালিযুক্ত মার্বেল জানালা দিয়ে দিওয়ান-ই-আমে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন।

    প্রথম চত্বর- জালেবি চকের ডান পাশে, শীলা দেবী মন্দির নামে একটি ছোট কিন্তু মার্জিত মন্দির রয়েছে(শীলা দেবী ছিলেন কালী বা দুর্গার অবতার)। মন্দিরে প্রবেশের পথটি রূপালী রঙে মোড়ানো একটি ডাবুল দরজা দিয়ে আটকানো, যার উপর একটি উঁচু পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। গর্ভগৃহের ভিতরে প্রধান দেবী দু’টি রূপালী সিংহ দ্বারা বেষ্টিত। মহারাজা মান সিংহ বাংলার যশোরের রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য শীলা দেবীর মন্দিরে কালীর কাছে আশীর্বাদ চেয়েছিলেন। কিংবদন্তি অনুসারে দেবী স্বপ্নে রাজাকে সমুদ্রের তলদেশ থেকে তাঁর মূর্তিটি তুলে এনে এখানে স্থাপন ও পূজা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৬০৪ সালে বাংলার যশোরের রাজার যুদ্ধে জয়লাভের পর রাজা সমুদ্র থেকে মূর্তিটি তুলে মন্দিরে স্থাপন করেছিলেন এবং একটি একক পাথরের ফলক দিয়ে খোদাই করে নির্মাণ করার ফলে এর নাম রেখেছিলেন শীলা দেবী। মন্দিরের প্রবেশপথে  গণেশের একটি খোদাইও(হিন্দু দেবতা গণেশের ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি) রয়েছে, যা প্রবালের একটি টুকরো দিয়ে তৈরি।

    শীলা দেবী স্থাপনের আরেকটি কাহিনী হল, যশোরের রাজাকে পরাজিত করার পর রাজা মান সিংকে একটি কালো পাথরের শিলা উপহার দিয়েছিলেন, যা মহাভারতের মহাকাব্যের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয় যেখানে কংস এই পাথরের উপর কৃষ্ণের বড় ভাইবোনদের হত্যা করেছিলেন। এই উপহারের বিনিময়ে মান সিং তার জয়ী রাজ্য বাংলার রাজাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর এই পাথরটি দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি খোদাই করতে ব্যবহৃত হয়েছিলো, যিনি অসুর রাজা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন এবং দুর্গার মন্দিরে শীলা দেবী হিসেবে স্থাপন করেছিলেন।তখন থেকে জয়পুরের রাজপুত পরিবারের বংশ দেবী হিসেবে শীলা দেবীকে পূজা করতেন। তবে, তাদের পারিবারিক দেবতা রামগড়ের জাম্ব মাতা হিসেবেই থেকে গেছেন।

    এই মন্দিরের সাথে সম্পর্কিত আরেকটি প্রথা হল, নবরাত্রির উৎসবের দিনগুলিতে পশু বলিদানের ধর্মীয় রীতি (বছরে দুবার পালিত নয় দিনের উৎসব)প্রচলিত ছিলো। উৎসবের অষ্টম দিনে মন্দিরের সামনে একটি মহিষ এবং ছাগল বলি দেওয়ার প্রথা ছিল, যা রাজপরিবারের উপস্থিতিতে এবং ভক্তদের বিশাল সমাবেশের উপস্থিতিতে সংঘটিত করা হত। ১৯৭৫ সাল থেকে আইন অনুসারে এই প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, এরপর থেকে জয়পুরের প্রাসাদ প্রাঙ্গণে বলিদান অনুষ্ঠিত হয়, কেবল একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান হিসেবে যেখানে কেবল রাজপরিবারের নিকটাত্মীয়রা অনুষ্ঠানটি উপভওগ করতে পারে। তবে, এখন মন্দির প্রাঙ্গণে পশু বলিদান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং দেবীর উদ্দেশ্যে কেবল নিরামিষ ধরণের নৈবেদ্য প্রদান করা হয়।

    দ্বিতীয় চত্বর(উঠোন)- প্রথম স্তরের চত্বরের মূল সিঁড়ির উপরে অবস্থিত দ্বিতীয় উঠোনে দিওয়ান-ই-আম বা জনসাধারণের দর্শকদের জন্য হল রয়েছে। স্তম্ভের দ্বি-সারি দিয়ে নির্মিত, দিওয়ান-ই-আম হল একটি উঁচু প্ল্যাটফর্ম যার ২৭টি স্তম্ভ রয়েছে, যার প্রতিটিতে হাতির আকৃতির রয়েছে, যার উপরে গ্যালারি রয়েছে। নাম থেকেই বোঝা যায়, রাজা জনসাধারণের কাছ থেকে আবেদন শুনতে এবং গ্রহণ করার জন্য এখানে দর্শকদের একত্রিত করতেন।

    তৃতীয় চত্বর(উঠোন)- তৃতীয় চত্বরে মহারাজা, তাঁর পরিবার এবং পরিচারকদের ব্যক্তিগত কক্ষ অবস্থিত ছিল। এই উঠোনটিতে গণেশ পোল বা গণেশ গেট দিয়ে প্রবেশ করা যায়। গেটটি মোজাইক এবং ভাস্কর্য দ্বারা সজ্জিত। উঠোনে দুটি ভবন রয়েছে। একটি মুঘল উদ্যানের ধাঁচে সাজানো এবং একটি বাগান দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। প্রবেশদ্বারের বাম দিকের ভবনটিকে জয় মন্দির বলা হয়, যা কাচের খোদাই করা প্যানেল এবং বহু-আয়নাযুক্ত সিলিং দিয়ে অলঙ্কৃত। আয়নাগুলি উত্তল আকৃতির এবং রঙিন ফয়েল(ধাতুর পাতলা পাত) এবং রঙ দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে যা ব্যবহারের সময় মোমবাতির আলোয় উজ্জ্বলভাবে জ্বলজ্বল করত। শীষমহল (আয়না প্রাসাদ) নামে পরিচিত, আয়না মোজাইক এবং রঙিন কাচ ছিল “ঝিকিমিকি মোমবাতির আলোয় ঝলমলে রত্ন বাক্স”। শীষ মহলটি রাজা মান সিং ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মাণ করেছিলেন এবং ১৭২৭ সালে সম্পন্ন হযেছিলো।তবে, ১৯৭০-৮০ সময়কালে এই কাজের বেশিরভাগই অবনতি হতে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তারপর থেকে এটি পুনরুদ্ধার এবং সংস্কারের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। হলের চারপাশের দেয়ালে খোদাই করা মার্বেল রিলিফ প্যানেল(এক ধরণের শিল্পকর্ম যেখানে সমতল পটভূমি থেকে ভাস্কর্যযুক্ত চিত্র বা নকশা প্রজেক্ট করা হয়) রয়েছে। হল থেকে মাওতা হ্রদের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

    জয় মন্দিরের উপরে রয়েছে জস মন্দির, যেখানে ফুলের কাচের খোদাই এবং আলাবাস্টার রিলিফ ওয়ার্ক সহ ব্যক্তিগত দর্শকদের জন্য একটি হলঘর রয়েছে।

    উঠোনে দেখা অন্য ভবনটি জয় মন্দিরের বিপরীতে অবস্থিত এবং এটি সুখ নিবাস বা সুখ মহল (আনন্দের হল) নামে পরিচিত। এই হলঘরে চন্দন কাঠের দরজা দিয়ে প্রবেশ করা যায়। দেয়ালগুলি মার্বেল খোদাইয়ের কাজ দিয়ে সজ্জিত এবং “চিনি খানা”(“চিনামাটির ঘর) নামক কুলুঙ্গি রয়েছে। একটি পাইপযুক্ত একটি খোলা নালা দিয়ে জল প্রবাহিত হয়। জল এই ভবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, ফলে পরিবেশকে শীতল রাখে। ঠিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মতো। এই নালা থেকে বাগানে জল প্রবাহিত হয়।

                জাদুর ফুল এখানকার একটি বিশেষ আকর্ষণ হল, আয়না প্রাসাদের চারপাশের একটি স্তম্ভের গোড়ায় খোদাই করা “জাদুর ফুল”। সেখানে দুটি উড়ন্ত প্রজাপতির চিত্র রয়েছে; ফুলটিতে সাতটি অনন্য নকশা রয়েছে যার মধ্যে রয়েছে একটি মাছের লেজ, পদ্ম, ফণাযুক্ত কোবরা, হাতির শুঁড়, সিংহের লেজ, ভুট্টার খোঁপা এবং বিচ্ছু,, এগুলির প্রতিটি হাত দিয়ে আংশিকভাবে লুকিয়ে রাখার একটি বিশেষ উপায়ে দৃশ্যমান।

    বাগান- পূর্বে জয় মন্দির এবং পশ্চিমে সুখ নিবাসের মাঝখানে অবস্থিত একটি বাগান। বাগানটি  তৃতীয় উঠোনের উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর নির্মিত। মির্জা রাজা জয় সিং (১৬২৩-৬৮) দ্বারা নির্মিত হয়েছিল বাগানটি। এটি চাহার বাগ(চারবাগ, যা চাহার বাগ নামেও পরিচিত, পারস্য এবং ইন্দো-পার্সিয়ান চতুর্ভুজাকার বাগান বিন্যাস, যা সাধারণত পথ বা জলপ্রবাহ দ্বারা চারটি ছোট অংশে বিভক্ত, যা কুরআনের দ্বারা বর্ণিত স্বর্গের উদ্যানের দ্বারা অনুপ্রাণিত।) বা মুঘল উদ্যানের আদলে তৈরি। এটি একটি ষড়ভুজাকার নকশায় তৈরি একটি ডুবন্ত বিছানা(একটি ডুবে যাওয়া বিছানা, যা ডিপ্রেশন গার্ডেন নামেও পরিচিত।)য় অবস্থিত। এটি একটি তারকা আকৃতির পুলের চারপাশে মার্বেল দিয়ে রেখাযুক্ত সরু নালা দিয়ে বিছানো হয়েছে যার মাঝখানে একটি ঝর্ণা রয়েছে। বাগানের জন্য জল সুখ নিবাস থেকে আসা নালা এবং জয় মন্দিরের ছাদ থেকে উৎপন্ন “চিনি খানা কুলুঙ্গি” নামক নালা থেকে ক্যাসকেডের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়।

    ত্রিপোলিয়া গেট- ত্রিপোলিয়া গেট বলতে তিনটি দরজা বোঝায়। এটি পশ্চিম দিক থেকে প্রাসাদে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি তিন দিকে খোলা, একটি জালেব চক, অন্যটি মান সিং প্রাসাদ এবং তৃতীয়টি দক্ষিণে জেনানা দেওরহি(জেনানা দেওরহি, যা “রাণীর প্রাসাদ” নামেও পরিচিত)তে প্রবেশের জন্য।

    সিংহ গেট- সিংহ গেট বা প্রধান গেট  একসময় একটি সুরক্ষিত গেট ছিল। সিংহ গেট প্রাসাদ প্রাঙ্গণের ব্যক্তিগত কক্ষ পর্যন্ত প্রসারিত ছিলো এবং শক্তি নির্দেশ করার জন্য এটিকে ‘সিংহ গেট’  নামে ডাকা হত। গেটটি সাওয়াই জয় সিংহের রাজত্বকালে (১৬৯৯-১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত। এটি ফ্রেস্কো(প্লাস্টার সম্পূর্ণ শুকিয়ে না যাওয়া অবস্থায় দেয়াল, ছাদ ইত্যাদির উপর আঁকা একটি চিত্রকর্ম; এইভাবে রঙ করার পদ্ধতি) দিয়ে আচ্ছাদিত; এর সারিবদ্ধতা আঁকাবাঁকা, সম্ভবত অনুপ্রবেশকারীদের আক্রমণ করার জন্য নিরাপত্তার কারণে তৈরি করা হয়েছিলো।

    চতুর্থ চত্বর (উঠোন)- চতুর্থ উঠোন হল জেনানা (রাজপরিবারের মহিলারা, যার মধ্যে উপপত্নী বা উপপত্নীরাও অন্তর্ভুক্ত) থাকতেন। এই উঠোনে অনেকগুলি থাকার ঘর রয়েছে যেখানে রানীরা থাকতেন এবং রাজা যখন তাঁর পছন্দমতো রাণীর সাথে দেখা করতেন, তখন তিনি জানতেন না যে, তিনি কোন রাণীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন, কারণ সমস্ত কক্ষ একটি সাধারণ করিডোরে খোলা ছিল।

    মান সিংহ প্রসাদ- এই প্রাঙ্গণের দক্ষিণে অবস্থিত মান সিং প্রথমের প্রাসাদ অবস্থিত ছিলো। প্রাসাদটি দুর্গের প্রাচীনতম অংশ। প্রাসাদটি নির্মাণে ২৫ বছর সময় লেগেছিল এবং ১৫৯৯ সালে রাজা মান সিং প্রথমের (১৫৮৯-১৬১৪) রাজত্বকালে এটি সম্পন্ন হয়েছিল। এটিই ছিলো মূল প্রাসাদ। প্রাসাদের কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণে স্তম্ভযুক্ত বারদারি(যাকে কখনও কখনও বারাদারিও বলা হয়। ভবন বা মণ্ডপ যার বারোটি দরজা বা খোলা অংশ রয়েছে) বা মণ্ডপ রয়েছে।  ফ্রেস্কো এবং রঙিন টাইলস মাটি দিয়ে উপরের তলার কক্ষগুলিকে সাজিয়েছে। এই মণ্ডপটি (যা গোপনীয়তার জন্য পর্দাযুক্ত ছিল) মহারাণীদের (রাজপরিবারের রানীদের) মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহার করা হত। এই মণ্ডপের সমস্ত দিক খোলা বারান্দা সহ বেশ কয়েকটি ছোট কক্ষের সাথে সংযুক্ত।এই প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ আমের শহর পর্যন্ত প্রসারিত।  আমের একটি ঐতিহ্যবাহী শহর যেখানে অনেক মন্দির, প্রাসাদসমৃদ্ধ বাড়ি এবং মসজিদ রয়েছে। রানী মা এবং রাজার পত্নীরা জানানি দেওরহিতে প্রাসাদের এই অংশে থাকতেন, যেখানে তাদের মহিলা পরিচারিকারাও থাকতেন। রাণী মায়েরা আমের শহরে মন্দির নির্মাণে গভীর আগ্রহী ছিলেন।

    সংরক্ষণ- রাজস্থানের ছয়টি দুর্গ, যথা আম্বর দুর্গ, চিত্তোর দুর্গ, গাগ্রন দুর্গ, জয়সলমের দুর্গ, কুম্ভলগড় এবং রণথাম্বোর দুর্গকে  ২০১৩ সালের জুন মাসে নমপেনে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৩৭তম সভায় ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলিকে ধারাবাহিকভাবে সাংস্কৃতিক সম্পত্তি এবং রাজপুত সামরিক পাহাড়ি স্থাপত্যের উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

    আমের শহর, যা আমের প্রাসাদের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং একটি ঐতিহ্যবাহী শহর যার অর্থনীতি পর্যটকদের আগমনের উপর নির্ভরশীল (পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন ৪,০০০ থেকে ৫,০০০)পর্যটকের আগমন হয়। এই শহরটি ৪ বর্গকিলোমিটার (১.৫ বর্গ মাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এতে আঠারোটি মন্দির, তিনটি জৈন মন্দির এবং তিনটি মসজিদ রয়েছে। এটিকে বিশ্ব স্মৃতিস্তম্ভ তহবিল (WMF) বিশ্বের ১০০টি বিপন্ন স্থানের মধ্যে একটি হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছে। এটিকে  সংরক্ষণের জন্য তহবিল রবার্ট উইলসন চ্যালেঞ্জ গ্রান্ট(রবার্ট উইলসন চ্যালেঞ্জ গ্রান্ট হল একটি জনহিতকর উদ্যোগ, যার মধ্যে প্রায়শই একটি মিলিত অনুদান অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা নির্দিষ্ট সংস্থাগুলিতে বর্ধিত অনুদানকে উৎসাহিত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।) দ্বারা সরবরাহ করা হয়। ২০০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দুর্গের ভেতরে প্রায় ৮৭ টি হাতি বাস করত, কিন্তু বেশ কিছু হাতি অপুষ্টিতে ভুগছিল বলে জানা গেছে।

    আমের ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ADMA) কর্তৃক ৪০ কোটি টাকা (US$৮.৮৮ মিলিয়ন) ব্যয়ে আমের প্রাসাদের সংরক্ষণের জন্য কাজ করা হয়েছে। তবে, প্রাচীন স্থাপনাগুলির ঐতিহাসিকতা এবং স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগুলি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপযুক্ততা নিয়ে এই সংস্কার কাজগুলি তীব্র বিতর্ক এবং সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকটি সমস্যা উত্থাপিত হয়েছে তা হল স্থানটির বাণিজ্যিকীকরণ।

    আমের দুর্গে একটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় একটি চলচ্চিত্র ইউনিট ৫০০ বছরের পুরনো একটি ছাউনি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, চাঁদ মহলের পুরাতন চুনাপাথরের ছাদ ভেঙে দিয়েছে, সেট মেরামতের জন্য গর্ত খুঁড়েছে এবং জালেব চকে প্রচুর পরিমাণে বালি ছড়িয়ে দিয়েছে যা রাজস্থান স্মৃতিস্তম্ভ, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং প্রাচীন আইন (১৯৬১) এর সম্পূর্ণ অবজ্ঞা এবং লঙ্ঘন। রাজস্থান হাইকোর্টের জয়পুর বেঞ্চ হস্তক্ষেপ করে চলচ্চিত্রের শুটিং বন্ধ করে দিয়েছে। এই ধরনের ঐতিহাসিক সুরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভগুলি এখন আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।

    হাতির নির্যাতনে উদ্বেগ- হাতির নির্যাতন এবং তাদের পাচারের বিষয়ে বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং হাতিদের উপর চড়ার মাধ্যমে আম্বের প্রাসাদ কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার অমানবিক অনুশীলনকে অনেকে অমানবিক বলে মনে করে। সংস্থা PETA এবং কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এই গুরুতর বিষয়টি তুলে ধরেছে। হাতি গাঁও (হাতির গ্রাম) বন্দী প্রাণী নিয়ন্ত্রণ লঙ্ঘন করে বলে জানা গেছে। PETA-(প্রাণীদের নীতিগত চিকিৎসার জন্য মানুষ)এর একটি দল যন্ত্রণাদায়ক কাঁটাযুক্ত শিকল দিয়ে বাঁধা হাতি, অন্ধ, অসুস্থ এবং আহত হাতিদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং বিকৃত দাঁত এবং কানযুক্ত হাতিদের খুঁজে পেয়েছে। ২০১৭ সালে নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক একটি ট্যুর অপারেটর ঘোষণা করেছিল যে, তাঁরা আম্বের ফোর্ট ভ্রমণের জন্য হাতির পরিবর্তে জিপ ব্যবহার করার কথা ঘোষণা করেছিলো।*

গোলকুণ্ডা দুর্গ

    গোলকুন্ডা হল ভারতের তেলেঙ্গানার হায়দ্রাবাদের পশ্চিম উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি সুরক্ষিত দুর্গ এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর। এই দুর্গটি মূলত কাকাতীয় শাসক প্রতাপরুদ্র কর্তৃক ১১ শতকে মাটির দেয়াল দিয়ে নির্মিত হয়েছিল।বাহমনি সুলতান মোহাম্মদ শাহ প্রথমের রাজত্বকালে  প্রথম বাহমনি-বিজয়নগর যুদ্ধের সময় মুসুনুরি নায়কদের কাছ থেকে বাহমনি রাজাদের হাতে এটি হস্তান্তর করা হয়েছিল। সুলতান মাহমুদ শাহের মৃত্যুর পর  বাহমণি সুলতানাত ভেঙে যায় এবং বাহমনি রাজাদের দ্বারা হায়দ্রাবাদের গভর্নর সুলতান কুলি শহরটিকে সুরক্ষিত করেন এবং গোলকুন্ডাকে গোলকুণ্ডা সুলতানাতের রাজধানী করেন। হীরার খনি, বিশেষ করে কোল্লুর খনির আশেপাশে অবস্থিতির কারণে  গোলকুন্ডা গোলকুন্ডা হীরা নামে পরিচিত বৃহৎ হীরার বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। গোলকুন্ডা দুর্গ বর্তমানে পরিত্যক্ত এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হযেছে। ২০১৪ সালে ইউনেস্কো এই কমপ্লেক্সটিকে “অস্থায়ী তালিকায়” বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই অঞ্চলের অন্যান্য দুর্গগুলির সাথে  দাক্ষিণাত্য সুলতানতের স্মৃতিস্তম্ভ এবং গোলকুণ্ডা দুর্গ নামে (যদিও সেখানে বেশ কয়েকটি ভিন্ন সুলতানি ছিল) বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অন্তর্ভূক্ত করেছে।

                ইতিহাস- গোলকুন্ডা দুর্গের উৎপত্তি ১১ শতকে। এটি মূলত কাকাতীয় সাম্রাজ্যের প্রতাপরুদ্র কর্তৃক নির্মিত একটি মাটির ছোট দুর্গ ছিল।গোলকুন্ডা নামটি তেলুগু গোল্লাকোঁদ থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। গোল্লাকোঁদের অর্থ “রাখালের পাহাড়”। এটাও মনে করা হয় যে, কাকাতীয় শাসক গণপতিদেব ১১৯৯-১২৬২ সালে তাঁদের রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল রক্ষার জন্য একটি পাথরের পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ফাঁড়ি(চৌকি)নির্মাণ করেছিলেন।ফাঁড়িটি পরেগোলকুন্ডা দুর্গ নামে পরিচিত হয়েছিলো। ১৫১৮ সালে কুতুব শাহী সাম্রাজ্যের শাসক সুলতান কুলি দুর্গটিকে একটি সুরক্ষিত দুর্গে রূপান্তরিত করেন এবং শহরটিকে গোলকুন্ডা সুলতানির রাজধানী ঘোষণা করেন।

     ওয়ারাঙ্গলের রাজা সনদের মাধ্যমে দুর্গটি বাহমনি রাজার কাছে হস্তান্তর করার পর বাহমনি সুলতানি আমলে গোলকুন্ডা ধীরে ধীরে খ্যাতি লাভ করে। বাহমনিদের দ্বারা গোলকুন্ডায় গভর্নর হিসেবে প্রেরিত সুলতান কুলি কুতুব-উল-মুলক (শাসনকাল ১৪৮৭-১৫৪৩) ১৫০১ সালের দিকে গোলকুণ্ডাকে তার শাসনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়কালে বাহমনি শাসন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সুলতান কুলি (কুলি কুতুব শাহের আমল) ১৫১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গোলকুন্ডায় কুতুব শাহী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ৬২ বছর ধরে  প্রথম তিনজন কুতুব শাহী সুলতান মাটির দুর্গটি বর্তমান কাঠামোতে সম্প্রসারিত করেছিলেন। এটি মাটির একটি বিশাল দুর্গ, যা প্রায় ৫ কিমি (৩.১ মাইল) পরিধিতে বিস্তৃত ছিল। ১৫৯০ সাল পর্যন্ত এটি কুতুব শাহী রাজবংশের রাজধানী ছিল। পরে রাজধানী হায়দ্রাবাদে স্থানান্তরিত হয়েছিলো। কুতুব শাহীরা দুর্গটি সম্প্রসারণ করেন এবং ৭ কিমি (৪.৩ মাইল)পরিধির বহিঃপ্রাচীর দিয়ে শহরটিকে ঘিরে ফেল ফেলেছিল।

     সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে গোলকোন্ডায় একটি শক্তিশালী তুলা-বয়ন শিল্প বিদ্যমান ছিল। দেশীয় ব্যবহার এবং রপ্তানি করার জন্য প্রচুর পরিমাণে তুলা উৎপাদিত হত। মসলিন এবং ক্যালিকো দিয়ে তৈরি উচ্চমানের সরল বা প্যাটার্নযুক্ত কাপড় উৎপাদিত হত গোলকুণ্ডায়। এখানে সাদা বা বাদামী রঙের, ব্লিচ(রাসায়নিক ব্যবহার করে অথবা রোদে রেখে সাদা বা হালকা রঙের কিছু তৈরি করা) করা বা রঞ্জিত বিভিন্ন ধরণের সাদা কাপড় পাওয়া যেত। এই কাপড় পারস্য এবং ইউরোপীয় দেশগুলিতে রপ্তানি করা হত। প্যাটার্নযুক্ত কাপড় তৈরি হত প্রিন্ট দিয়ে যা নীল রঙের জন্য নীল, লাল রঙের জন্য চা-মূল ব্যবহার করে দেশীয়ভাবে তৈরি হত। প্যাটার্নযুক্ত কাপড় মূলত জাভা, সুমাত্রা এবং অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলিতে রপ্তানি করা হত। আট মাস ধরে অবরোধের ফলে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতে দুর্গটি অবশেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন।ফলে কুতুব শাহী রাজত্বের অবসান ঘটে এবং শেষ গোলকুন্ডা রাজা আবুল হাসান তানা শাহকে বন্দী করেন।

    হীরা- গোলকুন্ডা দুর্গে একটি ভল্ট ছিল যেখানে বিখ্যাত কোহ-ই-নূর এবং হোপ হীরা(হোপ ডায়মন্ড হল একটি বৃহৎ, বিখ্যাত নীল হীরা) একসময় অন্যান্য হীরার সাথে সংরক্ষণ করা হত।

    গোলকুন্ডা গুন্টুর জেলার কোল্লুর, কৃষ্ণা জেলার পারিতালা এবং আতকুরের কাছে পাওয়া হীরার জন্য বিখ্যাত এবং কাকাতিয়া রাজত্বকালে শহরে কাটা হত। সেই সময়ে ভারতে বিশ্বের একমাত্র হীরার খনি ছিল। গোলকুন্ডা ছিল হীরা ব্যবসার বাজার শহর  এবং সেখানে বিক্রি হওয়া রত্নগুলি বেশ কয়েকটি খনি থেকে আহরিত হয়ে আসত। মাটির দেয়ালের মধ্যে অবস্থিত দুর্গ-শহরটি হীরা ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল।

    গোলকুণ্ডা নামটি একটি সাধারণ অর্থ গ্রহণ করেছে এবং এটি প্রচুর সম্পদের সাথে যুক্ত হয়েছে। কিছু রত্নবিদ অত্যন্ত বিরল টাইপ হীরা বোঝাতে IIa শ্রেণীবিভাগ ব্যবহার করেন। IIaএকপ্রকার স্ফটিক যার মধ্যে মূলত নাইট্রোজেনের অমেধ্য নেই এবং তাই বর্ণহীন; জেমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অফ আমেরিকা (GIA) দ্বারা চিহ্নিত অনেক টাইপ IIa হীরা, গোলকুন্ডা অঞ্চল এবং এর আশেপাশের খনি থেকে এসেছে।

    অনেক বিখ্যাত হীরা গোলকোন্ডার খনি থেকে খনন করা হয়েছে বলে মনে করা হয়, যেমন:

দারিয়া-ই-নূর

হোপ ডায়মন্ড

কোহ-ই-নূর

উইটেলসবাখ-গ্রাফ ডায়মন্ড

নূর-উল-আইন

প্রিন্সি ডায়মন্ড

রিজেন্ট ডায়মন্ড

    ১৮৮০-এর দশকের মধ্যে, “গোলকন্ডা” শব্দটি ইংরেজি ভাষাভাষীরা যে কোনও বিশেষ সমৃদ্ধ খনি এবং পরে যে কোনও মহান সম্পদের উৎস বোঝাতে সাধারণভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

    রেনেসাঁ এবং প্রাথমিক আধুনিক যুগে, “গোলকন্ডা” নামটি একটি কিংবদন্তি আভা(এক স্বতন্ত্র গুণ। যা কাউকে বা কিছুকে ঘিরে থাকে বা তার থেকে আসে বলে মনে হয়) অর্জন করে এবং বিশাল সম্পদের সমার্থক হয়ে ওঠে। খনিগুলি হায়দ্রাবাদ রাজ্যের কুতুব শাহীদের জন্য সম্পদ বয়ে আনে, যারা ১৬৮৭ সাল পর্যন্ত গোলকুন্ডা শাসন করেছিলেন, তারপর হায়দ্রাবাদের নিজামের কাছে, যারা ১৭২৪ সালে মুঘল সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। পরে হায়দ্রাবাদকে ভারতের সাথে সামিল করা হয়। গোলকুন্ডা অবরোধের ঘটনা ঘটেছিলো ১৬৮৭ সালের জানুয়ারিতে, যখন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব তার বাহিনীকে গোলকুন্ডা দুর্গে (যা তার সময়ের হীরার রাজধানী নামেও পরিচিত) কুতুব শাহী রাজবংশকে অবরোধ করার জন্য নেতৃত্ব দেন। তখন গোলকুন্ডার শাসক ছিলেন সুপ্রতিষ্ঠিত আবুল হাসান কুতুব শাহ।

    স্থাপত্য- প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ কর্তৃক গোলকুণ্ডা দূর্গকে প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং ধ্বংসাবশেষ আইনের অধীনে প্রস্তুত করা সরকারী “স্মৃতিস্তম্ভের তালিকা”-তে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ধনভাণ্ডার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। গোলকুন্ডা দূর্গটি চারটি স্বতন্ত্র দুর্গ নিয়ে গঠিত। যার ১০ কিমি (৬.২ মাইল) দীর্ঘ বহিঃপ্রাচীর, ৮৭টি অর্ধবৃত্তাকার বুরুজ (কিছু কিছু এখনও কামান দিয়ে সজ্জিত), আটটি প্রবেশপথ এবং চারটি ড্রব্রিজ(ড্রব্রিজ হল এক ধরণের চলমান সেতু যা সাধারণত জলপথের উপর দিয়ে চলাচলের অনুমতি বা সীমাবদ্ধ করার জন্য উঁচু করণ, নামানো বা ঝুলানো যেতে পারে।) রয়েছে, যার ভিতরে বেশ কয়েকটি রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্ট(প্রাসাদ) এবং মন্দির, মসজিদ, আস্তাবল ইত্যাদি রয়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্নটি হল “ফতেহ দরওয়াজা” (বিজয় দ্বার, যা আওরঙ্গজেবের বিজয়ী সেনাবাহিনী এই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করা বলে পরিচিত)দিয়ে প্রবেশ করা সবচেয়ে বাইরের ঘের, যা দক্ষিণ-পূর্ব কোণের কাছে বিশাল লোহার কাঁটা দিয়ে খোদাই করা হয়েছে(যাতে হাতিদের আঘাত না করা যায়)। ফতেহ দরওয়াজাতে একটি শব্দগত প্রভাব অনুভব করা যায়। যেমুন  প্রবেশপথের গম্বুজের নীচে একটি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে হাততালি বাজালে হাততালির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সর্বোচ্চ স্থান “বালা হিসার” মণ্ডপে স্পষ্টভাবে শোনা যায়। আক্রমণের ক্ষেত্রে এটি একটি সতর্কতা হিসেবে কাজ করত।

    “বালা হিসার” গেটটি পূর্ব দিকে অবস্থিত দুর্গের প্রধান প্রবেশদ্বার। এর সীমানায় স্ক্রোলের সারি দ্বারা বেষ্টিত একটি সূক্ষ্ম খিলান রয়েছে। স্প্যান্ড্রেলগুলিতে(স্থাপত্যে, স্প্যান্ড্রেল হল একটি মোটামুটি ত্রিভুজাকার স্থান, যা প্রায়শই খিলানের বক্ররেখার মধ্যে বা একটি খিলান এবং চারপাশের আয়তক্ষেত্রাকার ফ্রেমের মধ্যে পাওয়া যায়।) ইয়ালি(ইয়ালিদের সিংহ, বাঘ বা হাতির চেয়েও শক্তিশালী বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সজ্জিত গোলাকার(সজ্জিত গোলাকার হল বৃত্তাকার আলংকারিক উপাদান যা প্রায়শই স্থাপত্য এবং নকশায় ব্যবহৃত হয়।) রয়েছে। দরজার উপরের অংশে ময়ূর রয়েছে, যার লেজগুলি একটি অলঙ্কৃত খিলানযুক্ত কুলুঙ্গির পাশে অবস্থিত। নীচের গ্রানাইট ব্লক লিন্টেলটিতে একটি চাকতির পাশে ইয়ালি খোদাই করা হয়েছে। ময়ূর এবং সিংহের নকশা হিন্দু স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

    ইব্রাহিমের মসজিদ এবং রাজার প্রাসাদের পাশে অবস্থিত জগদম্বা মন্দির, প্রতি বছর বোনালু(বোনালু হল একটি হিন্দু উৎসব, যা মূলত ভারতের তেলঙ্গানায় পালিত হয়, যা দেবী মহাকালীর পূজার জন্য নিবেদিত) উৎসবের সময় লক্ষ লক্ষ হিন্দু ভক্তদের সমাবেশ ঘটে।জগদম্বা মন্দিরটি প্রায় ৯০০ থেকে ১,০০০ বছর পুরনো, যা কাকাতীয় আমলের আদিকাল থেকে তৈরি।গোলকুন্ডা দুর্গের আশেপাশে একটি মহাকালী মন্দির অবস্থিত।

    দুর্গটিতে কুতুব শাহী রাজাদের সমাধিও রয়েছে। এই সমাধিগুলি ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে এবং এটি গোলকুন্ডার বাইরের প্রাচীর থেকে প্রায় ১ কিমি (০.৬২ মাইল) উত্তরে অবস্থিত। এগুলি বাগান এবং অসংখ্য খোদাই করা পাথর দ্বারা বেষ্টিত।

    গোলকুন্ডার বাইরের দিকে দুটি পৃথক মণ্ডপ রয়ছে। “কাল মন্দির” দুর্গের মধ্যেই অবস্থিত। গোলকুন্ডা দুর্গের উপরে অবস্থিত রাজার দরবার (রাজার দরবার) থেকে মন্দিরটি দেখা যায়।

    দুর্গের অভ্যন্তরে প্রাপ্ত অন্যান্য ভবনগুলি হল:- হাবশী কামান (আবিশিয়ান খিলান), আশলা খানা, তারামতি মসজিদ, রামদাস বন্দীখানা, উটের আস্তাবল, ব্যক্তিগত চেম্বার (সাধারণত গোপনীয়তা, নির্জনতাকে বোঝায়।), মর্তুয়ারি স্নান(মর্চুয়ারি স্নান, যা রাজকীয় মর্চুয়ারি স্নান নামেও পরিচিত, এটি একটি কাঠামো যা বিশেষভাবে একজন মৃত ব্যক্তির দেহের আনুষ্ঠানিক ধৌতকরণের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, বিশেষ করে রাজকীয় বা অভিজাত ব্যক্তিদের জন্য।), নাগিনা বাগ, রামসাসের কোঠা, দরবার হল, আম্বরখানা(“আম্বরখানা” বলতে শস্যভাণ্ডার বোঝায়, বিশেষ করে ঐতিহাসিক দুর্গগুলির মধ্যে পাওয়া শস্যভাণ্ডার।)ইত্যাদি।

    গোলকুণ্ডার শাসক রাজবংশ- কাকাতিয়া রাজবংশমুসুনুরী নায়কগণবাহমানি সুলতানকুতুব শাহী রাজবংশ,মুঘল সাম্রাজ্য এবং আসফ জাহি রাজবংশ।

    নয়া কিলা (নতুন দুর্গ)- নয়া কিলা হল গোলকুন্ডা দুর্গের একটি সম্প্রসারিত অংশ যা জমির মালিক কৃষক এবং শহরের বিভিন্ন এনজিওর প্রতিরোধ সত্ত্বেও হায়দ্রাবাদ গল্ফ ক্লাবে রূপান্তরিত হয়েছিল। নতুন দুর্গের প্রাচীর শুরু হয় অনেক টাওয়ার সহ আবাসিক এলাকা এবং হাতিয়ান কা ঝাড় (“হাতির আকারের গাছ”)- একটি বিশাল পরিধিসহ একটি প্রাচীন বাওবাব(অ্যাডানসোনিয়া হল মাঝারি থেকে বড় পর্ণমোচী গাছের একটি প্রজাতি যা বাওবাব নামে পরিচিত। অ্যাডানসোনিয়ার আটটি প্রজাতি আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং মাদাগাস্কারের স্থানীয়) গাছ। এতে একটি যুদ্ধ মসজিদও রয়েছে। গল্ফ কোর্সের কারণে এই স্থানগুলিতে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত।

    কুতুব শাহী সমাধিসৌধ- কুতুব শাহী সুলতানদের সমাধিসৌধগুলি গোলকুন্ডার বাইরের প্রাচীর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এই স্থাপনাগুলি সুন্দরভাবে খোদাই করা পাথরের কাজ দিয়ে তৈরি এবং ল্যান্ডস্কেপযুক্ত বাগান দ্বারা বেষ্টিত। এগুলি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং প্রচুর দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। এটি হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে একটি।

    গোলকুন্ডা আর্টিলারি সেন্টারভারতীয় সেনাবাহিনী- গোলকুন্ডা আর্টিলারি সেন্টার, হায়দ্রাবাদে ১৯৫তম গানার্স ডে উদযাপন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১।গোলকুন্ডা আর্টিলারি সেন্টার, হায়দ্রাবাদ, ১৫ আগস্ট ১৯৬২ সালে আর্টিলারি রেজিমেন্টের দ্বিতীয় রিক্রুট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গোলকুন্ডা আর্টিলারি সেন্টার গোলকুন্ডা দুর্গের আশেপাশে অবস্থিত। গোলকুন্ডা সেন্টারে তিনটি প্রশিক্ষণ রেজিমেন্ট রয়েছে এবং বর্তমানে একসাথে ২৯০০ রিক্রুটকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

    ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য- গোলকুন্ডা দুর্গ এবং হায়দ্রাবাদের অন্যান্য কুতুব শাহী রাজবংশের স্মৃতিস্তম্ভ (চারমিনার এবং কুতুব শাহী সমাধি) ২০১০ সালে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধিদল ইউনেস্কোর কাছে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে বিবেচনার জন্য জমা দিয়েছিলো। বর্তমানে এগুলি ভারতের “অস্থায়ী তালিকায়”(অস্থায়ী তালিকা হল আইটেমগুলির একটি প্রাথমিক বা অস্থায়ী তালিকা, যা প্রায়শই পরিবর্তন বা আপডেট সাপেক্ষে।) অন্তর্ভুক্ত।

    জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে গোলকুণ্ডা- অ্যালাইন,  রেইন ডি গোলকোন্ডে (১৭৬০), স্ট্যানিসলাস ডি বাউফলার্সের গল্প, অ্যালাইন, রেইন ডি গোলকোন্ডে (১৭৬৬), পিয়েরে-আলেকজান্দ্রে মনসিগনির অপেরা, অ্যালাইন, রেইন ডি গোলকোন্ডে (১৮০৩), হেনরি-মন্টান বার্টনের অপেরা, অ্যালাইন, রেইন ডি গোলকোন্ডে (১৮০৪), ফ্রাঁসোয়া-অ্যাড্রিয়েন বোয়েলডিউর অপেরা, অ্যালাইন, রেইন ডি গোলকোন্ডা (১৮২৮), গায়েতানো ডোনিজেত্তির অপেরা, লেটিশিয়া এলিজাবেথ ল্যান্ডনের লেখা “দ্য টম্বস অফ দ্য কিংস অফ গোলকোন্ডা” কবিতাটি ১৮৩৮ সালে ফিশারের ড্রয়িং রুম স্ক্র্যাপ বুকে প্রকাশিত হয়েছিল।

    গোলকোন্ডার নামকরণ করা স্থান- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের একটি শহরের নামকরণ করা হয়েছে গোলকোন্ডার নামকরণ।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডার একটি শহরের নামকরণ করা হয়েছে গোলকোন্ডার নামকরণ।

    ত্রিনিদাদের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত একটি গ্রাম ১৯ শতকে একটি সমৃদ্ধ জমির নাম গোলকুণ্ডা নামে নামকরণ করেছিল, যা একসময় আখের জমি ছিল। বর্তমানে, বেশিরভাগ পূর্ব ভারতীয় চুক্তিবদ্ধ ভৃত্যদের বংশধররা গোলকোন্ডা গ্রামটিতে বসবাস করে।*

ফতেপুর সিক্রি দুর্গ

        ফতেপুর সিক্রি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রা জেলার একটি শহর। আগ্রা জেলার সদর দপ্তর আগ্রা তহশীল থেকে ৩৫.৭ কিলোমিটার (২২.২ মাইল) দূরে অবস্থিত। নিজেই ১৫৭১ সালে সম্রাট আকবর কর্তৃক ফতেপুর সিক্রিকে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৫৭১ থেকে ১৫৮৫ সাল পর্যন্ত ফতেপুর সিক্রী আকবরের সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিলো। আকবর পাঞ্জাবে এক অভিযানের কারণে এটিকে পরিত্যাগ করেন এবং পরে ১৬১০ সালে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হয়।

    শহরের নামকরণ সিক্রি নামক গ্রাম থেকে হয়েছে। কারণ পূর্বে এই স্থানটির নাম সিক্রি ছিলো। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI)বিভাগের খননকার্য থেকে জানা যায় যে আকবর তার রাজধানী তৈরির আগে এখানে লোকের আবাসস্থল, মন্দির এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। আকবর রাজধানী স্থাপনের পূর্বে এই অঞ্চলটিতে সুঙ্গাদের বাসস্থান ছিল। অঞ্চলটি তখন সংস্কৃত গোত্রের কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ৭ম থেকে ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত অর্থাৎ খানওয়ার যুদ্ধ (১৫২৭) পর্যন্ত এটি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো।

    শেখ সেলিম চিশতির খানকাহ এই স্থানে আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীর ১৫৬৯ সালে সিক্রি গ্রামে আকবরের প্রিয় স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন এবং জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয় জন্মদিনের পর আকবর এখানে একটি প্রাচীর ঘেরা শহর এবং রাজপ্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেন। ১৫৭৩ সালে আকবরের গুজরাট অভিযান ও বিজয়ের পর শহরটি ফতেহপুর সিক্রি, “বিজয়ের শহর” নামে পরিচিত হয়।

    ১৮০৩ সালে আগ্রা দখল করার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করে এবং ১৮৫০ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রটি বহাল ছিল। ১৮১৫ সালে  হেস্টিংসের মার্কেস(একজন অ্যাংলো-আইরিশ রাজনীতিবিদ এবং সামরিক কর্মকর্তা যিনি ১৮১৩ থেকে ১৮২৩ সাল পর্যন্ত ভারতের গভর্নর-জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।) সিক্রিতে স্মৃতিস্তম্ভ মেরামতের নির্দেশ দেন।

    মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এর অসামান্য স্থাপত্যের কারণে ফতেহপুর সিক্রি ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা লাভ করেছে।

                ইতিহাস- প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, রঙিন ধূসর মৃৎপাত্রের যুগ থেকেই এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদ সৈয়দ আলী নাদিম রেজাভির মতে, এই অঞ্চলটি শুঙ্গ শাসনামলে এবং তারপর কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণদের অধীনে সমৃদ্ধি লাভ করে। যারা ৭ম থেকে ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত খানওয়ার যুদ্ধ (১৫২৭) পর্যন্ত এই অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন এবং কখনই একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি দিল্লি সুলতানাতের অধীনে আসে এবং খিলজি রাজবংশের সময়কালে এই স্থানে অনেক মসজিদ নির্মিত হয় এবং অঞ্চলটি আকারে বৃদ্ধি পায়।

    ১৯৯৯-২০০০ সালে চাবেলি টিলায় ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ(ASI,  Archaeological Survey of India) কর্তৃক খননের উপর ভিত্তি করে, আগ্রার প্রবীণ সাংবাদিক ভানু প্রতাপ সিং বলেন যে, প্রাচীন জিনিসপত্র, মূর্তি এবং কাঠামো সবই ১,০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে হারিয়ে যাওয়া “সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় স্থান” নির্দেশ করে।”খননকাজে প্রচুর পরিমাণে জৈন মূর্তি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রয়েছে তারিখসহ একটি মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর। জৈন সম্প্রদায়ের সিনিয়র নেতা স্বরূপ চন্দ্র জৈন বলেন- মূর্তিগুলি ভগবান আদিনাথ, ভগবান ঋষভ নাথ, ভগবান মহাবীর এবং জৈন যক্ষিণীদের হাজার বছরের পুরনো মূর্তি। ইতিহাসবিদ সুগম আনন্দ বলেছেন যে, আকবরের রাজধানী হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠার আগেও এখানে বসতি, মন্দির এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র থাকার প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেছেন যে, একটি পাহাড়ের উপর খোলা জায়গাটি আকবর তার রাজধানী তৈরির জন্য ব্যবহার করেছিলেন।

    আকবর রাজধানী হিসেবে স্থানটি বরাদ্দ করার আগেই, তার পূর্বসূরী বাবর এবং হুমায়ুন ফতেহপুর সিক্রির নগর বিন্যাস ও পুনর্গঠনের জন্য অনেক কিছু করেছিলেন। ইতালির বারির পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যান্ডস্কেপ স্থাপত্যের অধ্যাপক এবং ইসলামী স্থাপত্যের পণ্ডিত আত্তিলিও পেত্রুসিওলি উল্লেখ করেছেন যে “বাবর এবং তার উত্তরসূরীরা” “আগ্রার কোলাহল এবং বিভ্রান্তি থেকে দূরে সরে যেতে এবং যমুনার মুক্ত বাম তীরে নৌকা এবং স্থলপথ উভয়ের সাথে সংযুক্ত উদ্যানের একটি নিরবচ্ছিন্ন ক্রম তৈরি করতে চেয়েছিলেন।” শহরের বুলন্দ দরওয়াজা ছিল এমনই একটি স্মৃতিস্তম্ভ  যা ৪৬ মিটার (১৫০ ফুট) উচ্চতা বিশিষ্ট এবং এখন দেশের সবচেয়ে স্বীকৃত মুঘল স্মৃতিস্তম্ভগুলির মধ্যে একটি।

    জায়গাটি বাবরের খুব পছন্দের ছিল, যিনি এর নাম দিয়েছিলেন শুকরি (ধন্যবাদ)। কারণ এর বিশাল হ্রদটি মুঘল সেনাবাহিনী ব্যবহার করত।অ্যানেট বেভারিজ তার বাবরনামার অনুবাদে উল্লেখ করেছেন যে, বাবর “সিকরি” শব্দটিকে “শুকরি” বলতে নির্দেশ করেছেন। তার স্মৃতিকথা অনুসারে, বাবর রানা সাংঘাকে পরাজিত করার পর এখানে “বিজয়ের উদ্যান” নামে একটি বাগান তৈরি করেছিলেন। গুলবদন বেগমের হুমায়ুন-নামা বর্ণনা করে যে, বাগানে তিনি একটি অষ্টভুজাকার মণ্ডপ তৈরি করেছিলেন। মণ্ডপটি তিনি বিশ্রাম এবং লেখার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। নিকটবর্তী হ্রদের কেন্দ্রে তিনি একটি বিশাল মঞ্চ তৈরি করেছিলেন। হিরণ মিনা(একটি বিশাল, জীর্ণ এবং উঁচু ইটের তৈরি চার তলা বিশিষ্ট টাওয়ার)র থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে একটি পাথরের স্তম্ভের গোড়ায় একটি বাওলি(বাওলি, যা স্টেপওয়েল নামেও পরিচিত, এক ধরণের জলাধার যা জলস্তরে নেমে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে তৈরি।) রয়েছে। সম্ভবত এটিই ছিল তার বিজয়ের স্মরণে একটি সুপরিচিত শিলালিপির মূল স্থান।

    ১৫৬৯ সাল পর্যন্ত আকবর উত্তরাধিকারহীন ছিলেন। ১৫৬৯ সালে সিক্রি গ্রামে আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীর সিক্রিতে  জন্মগ্রহণ করেন। সুফি সাধক সেলিম চিস্তি জাহাঙ্গীরের জন্মের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ফলে তাঁর সম্মানে আকবর সিক্রিতে একটি ধর্মীয় প্রাঙ্গণ নির্মাণ শুরু করেছিলেন। জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয় জন্মদিনের পর আকবর একটি প্রাচীর ঘেরা শহর এবং রাজপ্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেছিলেন।

    সিক্রি শহরটি ১৫৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সিক্রি গ্রামের নামানুসারে শহরটির নামকরণ করা হয়েছিল। গুজরাটে সফল অভিযানের সম্মানে বুলন্দ দরওয়াজা নির্মিত হয়েছিল, তখন শহরটি ফতেপুর সিক্রি- “বিজয়ের শহর” নামে পরিচিতি লাভ করেছিলো। ১৫৮৫ সালে আকবর পাঞ্জাবে একটি অভিযানে যাওয়ার সময় শহরটি পরিত্যাগ করেন এবং পরে ১৬১০ সালের মধ্যে এটি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হয়। জল সরবরাহের অসুবিধা জন্যা শহরটি পরিত্যক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যদিও শহর সম্বন্ধে আকবরের আগ্রহ হ্রাসের কারণও শহরটি পরিত্যক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। কারণ এটি কেবলমাত্র তাঁর ইচ্ছায় নির্মিত হয়েছিল। রাল্ফ ফিচ এটিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, “আগ্রা এবং ফতেপুর সিক্রি দুটি খুব বড় শহর। শহর দুটি লন্ডনের চেয়ে অনেক বড় এবং খুব জনবহুল ছিলো। আগ্রা এবং ফতেপুরের মধ্যে দূরত্ব ছিলো ১২ মাইল (কোস) এবং সমস্ত পথ খাদ্য এবং অন্যান্য জিনিসের একটি বাজার ছিলো এবং অনেক লোকের সমাগম ছিলো।

    ১৬০১ সালে আকবর শহরটি পরিত্যাগ করার পর তিনি মাত্র একবারের জন্য এখানে এসেছিলেন। আকবরের মৃত্যুর ৪-৫ বছর পর উইলিয়াম ফিঞ্চ শহরটি পরিদর্শন করে বলেন, ” শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত । একটি পতিত মরুভূমির মতো পড়ে আছে।” ১৬১৬ থেকে ১৬২৪ সাল পর্যন্ত বুবোনিক প্লেগে(বুবোনিক প্লেগ হল একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস দ্বারা সৃষ্ট, যা মূলত সংক্রামিত মাছিদের কামড়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।)র মহামারীর সময়, জাহাঙ্গীর ১৬১৯ সালে এখানে তিন মাস অবস্থান করেছিলেন। মুহাম্মদ শাহও কিছু সময়ের জন্য এখানে অবস্থান করেছিলেন এবং মেরামতের কাজ আবার শুরু করেছিলেন। তবে, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে, ভবনগুলির অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।

    ১৮০৩ সালের অক্টোবরে দৌলত রাও সিন্ধিয়ার ব্যাটালিয়নগুলিকে তাড়া করার সময়  জেরার্ড লেক শহরে সবচেয়ে ভারী জিনিসপত্র এবং অবরোধ বন্দুক রেখে যান। ১৮০৩ সালে আগ্রা দখল করার পর  ব্রিটিশরা এখানে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করে এবং কেন্দ্রটি ১৮৫০ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। ১৮১৫ সালে ওয়ারেন  হেস্টিংসের শাসন কালে সিক্রি এবং সিকান্দ্রার স্মৃতিস্তম্ভগুলির মেরামতের নির্দেশ দেন। ১৮৬৫ থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত শহরটি একটি পৌরসভা ছিল এবং পরে এটিকে একটি বিজ্ঞপ্তিকৃত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯০১ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল ৭,১৪৭ জন।

    জনসংখ্যার তথ্য- ২০১১ সালের ভারতীয় আদমশুমারি অনুসারে, ফতেহপুর সিক্রির মোট জনসংখ্যা ছিল ৩২,৯০৫ জন, যার মধ্যে ১৭,৩৯২ জন পুরুষ এবং ১৫,৫১৩ জন মহিলা ছিলো। ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুর জনসংখ্যা ছিল ৫,১৩৯ জন। ফতেহপুর সিক্রিতে মোট সাক্ষরতার সংখ্যা ছিল ১৭,২৩৬ জন, যা জনসংখ্যার ৫২.৪%, যার মধ্যে পুরুষ সাক্ষরতার হার ৬০.৪% এবং মহিলা সাক্ষরতার হার ৪৩.৪% ছিলো। ফতেহপুর সিক্রির ৭+ জনসংখ্যার কার্যকর সাক্ষরতার হার ছিল ৬২.১%, যার মধ্যে পুরুষ সাক্ষরতার হার ৭১.৬% এবং মহিলা সাক্ষরতার হার ৫১.৪%। তফসিলি জাতি এবং উপজাতির জনসংখ্যা যথাক্রমে ৪,১১০ এবং ১ জন। ২০১১ সালে ফতেহপুর সিক্রিতে ৪,৯৩৬টি পরিবার ছিল।

    ভাষা- ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, ৯৮.৮১% মানুষ হিন্দি ভাষাভাষী এবং ১.০৪% ব্রজভাষাভাষী ছিলো।

    প্রশাসন-ফতেহপুর সিক্রি আগ্রা জেলার পনেরটি ব্লক সদর দপ্তরের মধ্যে একটি। এর অধীনে ৫২টি গ্রাম পঞ্চায়েত (গ্রাম পঞ্চায়েত) রয়েছে।

    ফতেহপুর সিক্রি, ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ, লোকসভার একটি নির্বাচনী এলাকা এবং আরও পাঁচটি বিধানসভা (আইনসভা) বিভাগ নিয়ে গঠিত: আগ্রা গ্রামীণ, ফতেহপুর সিক্রি, খেরাগড়, ফতেহবাদ, বাহ।

    স্থাপত্য- ১৯১৭ সালে ফতেহপুর সিক্রি শহরের সাধারণ পরিকল্পনা অনুসারে ফতেহপুর সিক্রি ৩ কিলোমিটার (১.৯ মাইল) দৈর্ঘ্য এবং ১ কিলোমিটার (০.৬২ মাইল) প্রস্থের একটি পাথুরে পাহাড়ের উপর অবস্থিত প্রাসাদ শহর এবং প্রাসাদ শহরটি তিন দিকে ৬ কিলোমিটার (৩.৭ মাইল) প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত এবং এক দিকে একটি হ্রদ দ্বারা বেষ্টিত। শহরটি সাধারণত ৪০ মিটার উঁচু শৈলশিরায় অবস্থিত এবং মোটামুটি একটি রম্বসের আকৃতিবিশিষ্ট। স্থল কাঠামোর সাধারণ বিন্যাস, বিশেষ করে “উদ্যান, পরিষেবা এবং সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে বিচার করলে শহরটি মূলত এর অভিজাত বাসিন্দাদের অবসর এবং বিলাসিতা প্রদানের জন্য নির্মিত হয়েছিল।

    ফতেহপুর সিক্রির রাজবংশীয় স্থাপত্য তৈমুরীয় রূপ এবং শৈলীর আদলে তৈরি করা হয়েছিল। শহরটি বিশাল এবং বিশেষ করে লাল বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। ফতেহপুর সিক্রির প্রাসাদের স্থাপত্য শব্দভাণ্ডার এবং সাজসজ্জায় গুজরাটি প্রভাবও দেখা যায়। শহরের স্থাপত্য তৎকালীন ভারতে জনপ্রিয় হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধরণের ঘরোয়া স্থাপত্যকে প্রতিফলিত করে।     

    ৫ মাইল (৮.০ কিমি) দীর্ঘ দুর্গ প্রাচীর বরাবর ৯ গেট দিয়ে দূৰ্গটিতে প্রবেশ করা যায়। গেট কযটি হলো- দিল্লি গেট, লাল গেট, আগ্রা গেট এবং বীরবলের গেট, চন্দনপাল গেট, গোয়ালিয়র গেট, তেহরা গেট, চোর গেট এবং আজমেরী গেট। প্রাসাদে রানী মরিয়ম-উজ-জামানির গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ এবং শীতকালীন প্রাসাদ রয়েছে যা সাধারণত যোধা বাই প্ৰাসাদ নামে পরিচিত।

    এই শহরের ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ উভয় গুরুত্বপূর্ণ ভবন হল:

    বুলন্দ দরওয়াজা: ফতেহপুর সিক্রির বুলন্দ দরওয়াজাটি জমায়েত মসজিদের দক্ষিণ দেয়ালে অবস্থিত।  মাটি থেকে ৫৪ মিটার (১৭৭ ফুট) উঁচু। আকবরের সফল গুজরাট অভিযানের স্মরণে মসজিদটি নির্মাণের প্রায় পাঁচ বছর পর ১৫৭৬-১৫৭৭ সালে বিজয়ের খিলান হিসেবে এই দরজাটি উন্মুক্ত করা হয়েছিল। খিলানপথে দুটি শিলালিপি রয়েছে, যার একটিতে লেখা আছে: “মরিয়মের পুত্র ঈসা বলেছেন: পৃথিবী একটি সেতু, এটি অতিক্রম করো, কিন্তু এর উপর কোন ঘর তৈরি করো না। যে এক ঘন্টার আশা করে সে অনন্তকালের আশা করতে পারে। পৃথিবী কেবল এক ঘন্টা টিকে থাকে। প্রার্থনায় সময় কাটাও, কারণ বাকিটা অদৃশ্য”।

                কেন্দ্রীয় বারান্দায় তিনটি খিলানযুক্ত(ইট বা পাথরের অৰ্ধ গোলাকার গাঁথনি) প্রবেশপথ রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি, কেন্দ্রে অবস্থিত, যা স্থানীয়ভাবে ঘোড়ার নালের দরজা নামে পরিচিত। বুলন্দ দরওয়াজার বিশাল সিঁড়ির বাইরে বাম দিকে একটি গভীর কূপ রয়েছে।

    জামে মসজিদ: এটি একটি জামে মসজিদ যার অর্থ সমবেত মসজিদ এবং সম্ভবত এটি কমপ্লেক্সে নির্মিত প্রথম ভবনগুলির মধ্যে একটি, কারণ এর শিলালিপিতে ৯৭৯ হিজরি (১৫৭১-৭২ খ্রিস্টাব্দ) এর নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়েছিলো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর পরে বুলন্দ দরওয়াজায় একটি বিশাল প্রবেশপথ যুক্ত করা হয়েছিলো। এটি ভারতীয় মসজিদের আদলে নির্মিত হয়েছিল, একটি কেন্দ্রীয় উঠোনের চারপাশে ইওয়ান(“ইওয়ান” এর দুটি স্বতন্ত্র অর্থ রয়েছে। স্থাপত্যে, এটি একটি বৃহৎ, খিলানযুক্ত হল বা স্থানকে বোঝায়, যা প্রায়শই একপাশে খোলা থাকে, যা পার্থিয়ান এবং ইসলামী স্থাপত্যে পাওয়া যায়। ওয়েলশ এবং কর্নিশে, ইওয়ান একটি নাম, যা ইফানের সাথে সম্পর্কিত এবং ল্যাটিন জোহানেস থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ “ঈশ্বর করুণাময়” বা “ঈশ্বর করুণাময়”।) ছিল। মসজিদটিতে তিনটি মিহরাব রয়েছে। বৃহৎ কেন্দ্রীয় মিহরাবটি একটি গম্বুজ দ্বারা আবৃত, এটি জ্যামিতিক নকশায় সাদা মার্বেল খিলান দিয়ে সজ্জিত।

    সেলিম চিশতির সমাধি: জামা মসজিদের আঙিনা এর মধ্যে সুফি সাধক সেলিম চিশতির (১৪৭৮-১৫৭২) সাদা মার্বেল পাথরে আবৃত একটি সমাধি রয়েছে। একতলা বিশিষ্ট ভবনটি একটি কেন্দ্রীয় বর্গাকার কক্ষের চারপাশে নির্মিত, যার মধ্যে মুক্তার মোজাইক দিয়ে খোদাই করা একটি অলঙ্কৃত কাঠের ছাউনির নীচে সাধকের সমাধি রয়েছে। এর চারপাশে প্রদক্ষিণের জন্য একটি আচ্ছাদিত পথ রয়েছে, খোদাই করা জালি, জটিল জ্যামিতিক নকশা সহ পাথরের ছিদ্রযুক্ত পর্দা এবং দক্ষিণে একটি প্রবেশপথ রয়েছে। সমাধিটি ১৫ শতকের গোড়ার দিকে গুজরাট সুলতানি আমলের পূর্ববর্তী সমাধি দ্বারা প্রভাবিত। সমাধির অন্যান্য আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল সাদা মার্বেল সর্পিল বন্ধনী, যা প্যারাপেটে(ছাদ, সেতু বা অন্যান্য উঁচু কাঠামোর ধারে একটি নিচু প্রাচীর যা মানুষকে পড়ে যাওয়া থেকে বাধা দেয়।)র চারপাশে ঢালু ছাদকে সমর্থন করে।

    সমাধির বাম পার্শ্বে পূর্ব দিকে, শেখ বদরুদ্দিন চিশতীর পুত্র এবং শেখ সেলিম চিশতীর পৌত্র ইসলাম খান প্রথমের একটি লাল বেলেপাথরের সমাধি রয়েছে, যিনি জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে মুঘল সেনাবাহিনীতে একজন সেনাপতি হয়েছিলেন। সমাধির শীর্ষে একটি গম্বুজ এবং ছত্রিশটি ছোট গম্বুজ বিশিষ্ট ছাদ রয়েছে এবং এতে বেশ কয়েকটি কবর রয়েছে, যার মধ্যে কিছু নামহীন, সমস্তই শেখ সেলিম চিশতীর পুরুষ বংশধর।

    দিওয়ান-ই-আম:- দিওয়ান-ই-আম বা জনসাধারণের দর্শকদের হল(ভবন)।  এমন ভবন অনেক শহরেই দেখা যায়। যেখানে শাসকবর্গ সাধারণ জনগণের সাথে দেখা করতেন। এটি একটি বিশাল খোলা জায়গার সামনে অবস্থিত একটি মণ্ডপের মতো আয়তাকার কাঠামো। দিওয়ান-ই-আমের দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং তুর্কি সুলতানার বাড়ির পাশে তুর্কি স্নানাগার রয়েছে।

    দিওয়ান-ই-খাস:– দিওয়ান-ই-খাস বা ব্যক্তিগত দর্শকদের হল। এটি সমতল বর্গাকার ভবন যার ছাদে চারটি ছত্রী রয়েছে। তবে ভবনটি তার কেন্দ্রীয় স্তম্ভের জন্য বিখ্যাত। ভবনটির একটি বর্গাকার ভিত্তি এবং একটি অষ্টভুজাকার খাদ রয়েছে। উভয়ই জ্যামিতিক এবং ফুলের নকশার ব্যান্ড দিয়ে খোদাই করা হয়েছে। প্রথম তলায় ভবনের প্রতিটি কোণের সাথে চারটি পাথরের হাঁটা পথ দ্বারা সংযুক্ত। এখানেই আকবর বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের সাথে তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করতেন এবং ব্যক্তিগত দর্শকদের সাথে আলোচনা করতেন।

    ইবাদতখানা: ইবাদত খানা(উপাসনা ঘর) ১৫৭৫ সালে মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক নির্মিত একটি সভা ঘর, যেখানে আকবর একটি নতুন সিক্রেটিস্টিক(সমন্বিত বিশ্বাস, সমন্বিত বিশ্বাস বলতে বিভিন্ন  এবং প্রায়শই বিপরীতধর্মী, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনুশীলনের সংমিশ্রণ বা মিশ্রণকে একটি নতুন, ঐক্যবদ্ধ ব্যবস্থায় বোঝায়।) বিশ্বাস, দীন-ই-ইলাহির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

    অনুপ তালাও: অনুপ তালাও রাজা অনুপ সিং সিকারওয়ার দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। একটি চারটি সেতু সহ একটি শোভাময় পুল। রাজকীয় ছিটমহলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভবন এটিকে ঘিরে রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে খোয়াবগাহ (স্বপ্নের ঘর) আকবরের বাসভবন, পঞ্চমহল, একটি পাঁচতলা প্রাসাদ, দিওয়ান-ই-খাস (ব্যক্তিগত দর্শকদের হল), আঁখ মিচৌলি এবং পচিসি দরবারের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে জ্যোতিষীর আসন।

    যোধা বাই মহল: আকবরের প্রিয় এবং প্রধান রাজপুত স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানী সাধারণত যোধা বাই নামে পরিচিত। তাঁর প্রাসাদটিতে রাজপুত প্রভাব বিদ্যমান এবং এটি একটি উঠোনের চারপাশে নির্মিত। গোপনীয়তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছিলো। এখানে একটি হিন্দু মন্দির এবং একটি তুলসী মঠও রয়েছে যা মরিয়ম-উজ-জামানী পূজার জন্য ব্যবহার করতেন। এই প্রাসাদটি আকবরের খোয়াবগাহের সাথে অভ্যন্তরীণভাবে সংযুক্ত ছিল।

    নওবত খানা: নওবত খানা নওকার খানা নামেও পরিচিত। যার অর্থ ঢোল ঘর।  যেখানে ঢোল বাজিয়ে সম্রাটের আগমন বার্তা ঘোষণা করা হতো। এটি হাতি পোল গেট বা হাতি গেটের সামনে অবস্থিত, যা কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্রবেশপথ  ছিলো এবং রাজকীয় প্রবেশদ্বার হিসাবে জানা যেতো।

    পচিসি কোর্ট: একটি বর্গক্ষেত্র যা একটি বৃহৎ বোর্ড গেম হিসেবে চিহ্নিত।  আধুনিক কালের লুডো খেলার টুকরো হিসেবে ব্যবহার করত। যদিও অনেক ঐতিহাসবিদ এটিকে ১৭ শতকে নির্মিত বলে মনে করেন।

    পঞ্চমহল: একটি পাঁচতলা বিশিষ্ট প্রাসাদীয় কাঠামো, যার স্তরগুলি ধীরে ধীরে আকারে হ্রাস পাচ্ছে। শেষ স্তরটি একটি একক বৃহৎ গম্বুজ বিশিষ্ট ছত্রী। মূলত ছিদ্র করা পাথরের পর্দাগুলি সম্মুখভাগের দিকে মুখ করে ছিল। পর্দাগুলি সম্ভবত দরবারের মহিলাদের জন্য নির্মিত হয়েছিল। মেঝেগুলি প্রতিটি স্তরে জটিলভাবে খোদাই করা স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত, মোট ১৭৬টি স্তম্ভ।

    বীরবলের বাড়ি: আকবরের প্রিয় মন্ত্রীর বাড়ি, যিনি একজন হিন্দু ছিলেন। ভবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল অনুভূমিক ঢালু সানশেড বা ছাজ্জা(একটি সানশেড, যা চাজ্জা নামেও পরিচিত, হল একটি জানালা বা দরজার উপরে একটি প্রক্ষিপ্ত স্থাপত্য উপাদান যা ছায়া এবং বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।)এবং তাদের সমর্থনকারী বন্ধনী।

    হিরণ মিনার: হিরণ মিনার বা হাতির টাওয়ার, একটি বৃত্তাকার টাওয়ার যা হাতির দাঁতের আকারের পাথর দিয়ে আবৃত। ঐতিহ্যগতভাবে এটি সম্রাট আকবরের প্রিয় হাতির স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

    অন্যান্য ভবনের মধ্যে ছিল, টাকসাল (টাকশাল), দফতর খানা (রেকর্ড অফিস), কারখানা (রাজকীয় কর্মশালা), খাজানা (কোষাখানা), হাম্মাম (তুর্কি স্নান), দারোগার কোয়ার্টার, আস্তাবল, কাফেলা, হাকিমের কোয়ার্টার ইত্যাদি।

    পরিবহন- ফতেহপুর সিক্রি আগ্রা থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার (২৩ মাইল) দূরে অবস্থিত।নিকটতম বিমানবন্দর হল আগ্রা বিমানবন্দর। খেরিয়া বিমানবন্দর নামেও পরিচিত বিমান বন্দরটি। বিমান বন্দরটি  ফতেহপুর সিক্রি থেকে ৪০ কিলোমিটার (২৫ মাইল) দূরে অবস্থিত। নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হল, ফতেহপুর সিক্রি রেলওয়ে স্টেশন। শহরের কেন্দ্র থেকে রেলওয়ে স্টেশনটি প্রায় ১ কিলোমিটার (০.৬২ মাইল) দূরে অবস্থিত। ফতেহপুর সিক্রি আগ্রা এবং পার্শ্ববর্তী কেন্দ্রগুলির সাথে সড়কপথে সংযুক্ত। যেখানে পর্যটন বাস এবং ট্যাক্সি ছাড়াও Uttar Pradesh State Road Transport Corporation নিয়মিত বাস পরিষেবা পরিচালনা করে।

    জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ফতেপুর সিক্রি– সালমান রুশদির উপন্যাস “দ্য এনচ্যান্ট্রেস অফ ফ্লোরেন্স” আংশিকভাবে ১৬ শতকের ফতেপুর সিক্রির উপর ভিত্তি করে রচনা করা।

    চলচ্চিত্রে- ১৯৯৭ সালের হিন্দি ছবি “পারদেশ”-এর হিট গান “দো দিল মিল রাহে হ্যায়”, যেখানে শাহরুখ খান এবং মহিমা চৌধুরী অভিনীত চলচিত্রটি  এই শহরেই শুটিং করা হয়েছিল।*

জয়সালমের দুর্গ

    জয়সলমের দুর্গ ভারতের রাজস্থান রাজ্যের জয়সলমের শহরে অবস্থিত। এটি বিশ্বের খুব কম “জীবন্ত দুর্গ”(“জীবন্ত দুর্গ” বলতে কেবল ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ বা পর্যটন আকর্ষণের পরিবর্তে, এমন দুর্গগুলিকে বোঝায় যেখানে মানুষ বসবাস করে।)গুলির মধ্যে একটি। কারণ পুরাতন শহরের জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ এখনও দুর্গের মধ্যেই বাস করে। দূর্গটির ইতিহাস ৮৬০ বছরের। জয়সলমেরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য দুর্গের দেয়ালের বাইরে প্রথম  ১৭ শতকে বসতি স্থাপন করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

    জয়সলমের দুর্গ রাজস্থানের দ্বিতীয় প্রাচীনতম দুর্গ।১১৫৬ খ্রিস্টাব্দে রাওয়াল (শাসক) জয়সল দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিলো। জয়সলমের নাম থেকে এটির নামকরণ করা হয়েছে। দূর্গটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথের(প্রাচীন সিল্ক রোড সহ) সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে ছিল।

    দুর্গের বিশাল হলুদ বেলেপাথরের দেয়াল দিনের বেলায় ধূসর সিংহের মতো রঙ ধারণ করে।  সূর্যাস্তের সাথে সাথে রং মধু-সোনালী(মধুর সোনার সংজ্ঞা হলো মাঝারি হলুদ রঙ যার লাল আভা আছে)তে মিশে যায়। এই কারণে এটি স্বর্ণ দুর্গ, সোনার কুইলা বা সোনার দুর্গ নামেও পরিচিত।বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের একই নামের বিখ্যাত বাংলা চলচ্চিত্রের সোনার কেল্লা (সোনার কেল্লার জন্য বাংলা) নামটি পরে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছিল। দুর্গটি ত্রিকূট পাহাড়ের উপর বিশাল থর মরুভূমির বালুকাময় বিস্তৃতির মাঝে অবস্থিত। তাই দূর্গটি ত্রিকূটগড় নামেও পরিচিত।দূর্গটি আজ শহরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত।

    ২০১৩ সালে কম্বোডিয়ার নমপেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৩৭তম অধিবেশনে, রাজস্থানের পাঁচটি দুর্গের সাথে জয়সলমের দুর্গকে রাজস্থানের পার্বত্য দুর্গগুলির গ্রুপের অধীনে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

    ইতিহাস- কিংবদন্তি অনুসারে  ১১৫৬ খ্রিস্টাব্দে ভাটি রাজপুত(ভাটি (যাকে ভাট্টি নামেও ডাকা হত, ভাটি রাজপুত একটি রাজপুত বংশ। ভাটি বংশ ঐতিহাসিকভাবে বর্তমান ভারত ও পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি শহর শাসন করেছিল, যাদের চূড়ান্ত রাজধানী এবং রাজ্য ছিল ভারতের জয়সলমের)রাওয়াল জয়সাল এই দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন।গল্প অনুসারে, এটি প্রথমে লোধ্রুবাতে নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিলো, কিন্তু জয়সাল অসন্তুষ্ট হওয়ার জন্য জয়সালমের শহর প্রতিষ্ঠা করে একটিকে নতুন রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

    ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে রাওয়াল জৈত সিং প্রথম দিল্লি সালতানাতের আলাউদ্দিন খিলজির দীর্ঘ অবরোধের মুখোমুখি হন এবং আলাউদ্দিন খিলজি ভাটিদের ধন-সম্পদ কাফেলার উপর আক্রমণের কারণে জৈত সিং উত্তেজিত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। অবরোধের শেষে  নিশ্চিত পরাজয়ের মুখোমুখি হয়ে, ভাটি রাজপুত মহিলারা ‘জওহর’ ব্রত পালন করেন এবং মূলরাজের নেতৃত্বে পুরুষ যোদ্ধারা সুলতানের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেন। আলাউদ্দিন খিলজির সফল অবরোধের কয়েক বছর পর  দুর্গটি দিল্লি সালতানাতের অধীনে গিয়েছিলো। অবশেষে কিছু বেঁচে থাকা ভাটিদের দ্বারা পুনরায় দখল করা হয়েছিল।

    রাওয়াল লুনাকরণের রাজত্বকালে ( প্রায় ১৫৩০-১৫৫১ খ্রিস্টাব্দে) একজন আফগান সেনাপতি আমির আলী দুর্গটি আক্রমণ করেছিলেন। যখন রাওয়ালের মনে হয়েছিল যে তিনি একটি পরাজিত যুদ্ধে হতে চলেছেন, তখন তিনি তাঁর মহিলাদের হত্যা করেছিলেন। কারণ তখন জওহরের ব্যবস্থা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল না। তবে দুঃখজনকভাবে, কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পরপরই তাঁকে সহায় করার জন্য অতিরিক্ত সেনা এসে পৌঁছায় এবং জয়সলমেরের সেনাবাহিনী দুর্গ রক্ষা করতে সমর্থ হয়।

    ১৫৪১ খ্রিস্টাব্দে  রাওয়াল লুনাকরণও মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, যখন সম্রাট হুমায়ুন আজমির যাওয়ার পথে দূর্গটি আক্রমণ করেছিলেন। মুঘলরা ১৭৬২ সাল পর্যন্ত দুর্গটি নিয়ন্ত্রণ রেখেছিলেন। ১৭৬২ সালে মহারাওয়াল মূলরাজ দুর্গটি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন।

    ১৮১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং মূলরাজের মধ্যে চুক্তির ফলে মূলরাজ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হন এবং ১৮২০ সালে মূলরাজের মৃত্যুর পর, তার নাতি গজ সিং উত্তরাধিকারসূত্রে দুর্গের নিয়ন্ত্রণ পান।

    ব্রিটিশ শাসনের আগমনের সাথে সাথে সামুদ্রিক বাণিজ্যের উত্থান তথা বোম্বাই বন্দরের উত্থানের ফলে জয়সলমের ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক পতনের দিকে পরিচালিত হয়। স্বাধীনতা এবং ভারত বিভাগের পর  প্রাচীন বাণিজ্য পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শহরটি স্থায়ীভাবে তাঁর পূর্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে সরে যায়। তা সত্ত্বেও, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের সময় জয়সলমেরের কৌশলগত গুরুত্ব প্রমাণিত হয়েছিল।

    যদিও জয়সলমের শহরটি এখন আর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর বা প্রধান সামরিক চৌকি হিসেবে কাজ করে না, তবুও শহরটি একটি প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে রাজস্ব অর্জন করতে সক্ষম। প্রাথমিকভাবে  জয়সলমেরের সমগ্র জনসংখ্যা দুর্গের মধ্যেই বাস করত এবং আজও পুরাতন দুর্গটিতে প্রায় ৪,০০০ লোকের বসবাস করে, যারা মূলত ব্রাহ্মণ এবং রাজপুত সম্প্রদায়ের বংশধর। এই দুটি সম্প্রদায় একসময় দুর্গের এক সময়ের ভাটি শাসকদের কর্মী হিসেবে কাজ করত। তখনই তাঁরা শ্রমিকদের পাহাড়ের চূড়ায় এবং দুর্গের দেয়ালের মধ্যে বসবাসের অধিকার দিয়েছিল। এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শহরের অনেক বাসিন্দা ধীরে ধীরে ত্রিকুট পাহাড়ের পাদদেশে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে শহরের জনসংখ্যা মূলত দুর্গের পুরানো দেয়ালের বাইরে এবং নীচের সংলগ্ন উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

    স্থাপত্য- দুর্গটি ১,৫০০ ফুট (৪৬০ মিটার) লম্বা এবং ৭৫০ ফুট (২৩০ মিটার) প্রশস্ত। এবং দূর্গটি একটি পাহাড়ের উপর নির্মিত এবং আশেপাশের গ্রামাঞ্চল থেকে ২৫০ ফুট (৭৬ মিটার) উচ্চতার উপরে উঠে গেছে। দুর্গের ভিত্তির উপর ১৫ ফুট (৪.৬ মিটার) উঁচু একটি প্রাচীর রয়েছে। দুর্গের উপরের বুরুজ বা টাওয়ারগুলি একটি প্রতিরক্ষামূলক অভ্যন্তরীণ-প্রাচীর পরিধি তৈরি করেছে, যা প্রায় ২.৫ মাইল (৪.০ কিমি) লম্বা। দুর্গটিতে এখন ৯৯টি বুরুজ রয়েছে, যার মধ্যে ৯২টি ১৬৩৩-৪৭ সালের মধ্যে নির্মিত বা উল্লেখযোগ্যভাবে পুনর্নির্মিত হয়েছিল। দুর্গটিতে শহরের পাশ থেকে চারটি সুরক্ষিত প্রবেশদ্বার বা ফটকও রয়েছে, যার মধ্যে একটি একসময় কামান দ্বারা সুরক্ষিত ছিল।দুর্গের দেয়াল এবং মাঠের অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে:-

    দুর্গে দর্শনার্থীদের প্রবেশপথের সাথে চারটি বিশাল প্রবেশপথ রয়েছে, যা দুর্গে প্রবেশের মূল পথের সাথে যুক্ত।

    রাজমহল প্রাসাদ জয়সলমেরের মহারাওয়ালের প্রাক্তন বাসস্থান।

    বা রি হাভেলি ৪৫০ বছরের পুরনো এই হাভেলি (ঐতিহ্যবাহী, অলঙ্কৃতভাবে সজ্জিত বাসস্থান), যা একসময় মহারাজাকে পরামর্শদানকারী ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের বাসস্থান ছিল। এখন এর বিভিন্ন স্তরে আকর্ষণীয় জাদুঘর রয়েছে। রান্না থেকে শুরু করে পোশাক পর্যন্ত দুর্গ জীবনের সকল দিকের নিদর্শন প্রদর্শন করা হচ্ছে।

    জৈন মন্দির: জয়সলমের দুর্গের অভ্যন্তরে  ১২-১৬ শতকে হলুদ বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত ৭টি জৈন মন্দির রয়েছে। মের্তার আসকরণ চোপড়া সম্ভাবনাথকে উৎসর্গীকৃত একটি বিশাল মন্দির তৈরি করেছিলেন। মন্দিরে অনেক পুরানো ধর্মগ্রন্থসহ ৬০০ টিরও বেশি মূর্তি রয়েছে।চোপড়া পঞ্চজী দুর্গের ভিতরে অষ্টপদ মন্দির তৈরি করেছিলেন। জয়সলমেরের লক্ষ্মীনাথ মন্দির লক্ষ্মী ও বিষ্ণুর পূজার জন্য নিবেদিত।

    অসংখ্য বণিক হাভেলি- উত্তর ভারতের রাজস্থানী শহর ও শহরগুলিতে ধনী বণিকদের দ্বারা নির্মিত এই বিশাল বাড়িগুলি প্রায়শই বেলেপাথরের দ্বারা নির্মিত। কিছু হাভেলি শত শত বছরের পুরনো। জয়সলমেরে হলুদ বেলেপাথরের অনেক সুসজ্জিত হাভেলি রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে অনেক মেঝে এবং অসংখ্য কক্ষ রয়েছে, যেখানে সজ্জিত জানালা, খিলান, দরজা এবং বারান্দা রয়েছে। কিছু হাভেলি আজ জাদুঘর কিন্তু জয়সলমেরের বেশিরভাগ হাভেলিতে এখনও সেই পরিবারগুলি বাস করে, যারা এগুলি তৈরি করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাস হাভেলি যা ১৫ শতকে নির্মিত। হাভেলিগুলি এখনও মূল নির্মাতাদের বংশধরদের দখলে রয়েছে। আরেকটি উদাহরণ হল, শ্রীনাথ প্রাসাদ যেখানে একসময় জয়সলমেরের প্রধানমন্ত্রী বসবাস করতেন। কিছু কিছু কাঠের দরজা এবং ছাদগুলি শত শত বছরের পুরানো। এগুলি কাঠের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

    নাথমাল হাভেলি- নাথমাল হাভেলি জয়সলমের দুর্গের একটি প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ। হলুদ বেলে পাথর দিয়ে তৈরি। হাভেলিটি সূর্যের নীচে সোনার মতো জ্বলজ্বল করে। জয়সলমেরের দরবারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাথমালের নামে হাভেলির নামকরণ করা হয়েছে। হাভেলিটি লুলু এবং হাতি দুই ভাই একই সাথে পর্যায়ক্রমে হাভেলিটি তৈরি করেছিলেন। এই কারণে  ভবনটির বিভিন্ন অংশের কোনও মিল নেই। তবুও এটি শিল্পের এক চমৎকার নিদর্শন এবং অলঙ্কৃত স্থাপত্য। স্থপতিরা ভবনের ভিত্তিপ্রস্তরে হাতির উপর একজন রাজপুতানা যোদ্ধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ভবনটি বৈশিষ্ট্যগতভাবে উভয় পাশে দুটি হাতির দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। ভবনটিতে ইসলামী এবং রাজপুতানা শৈলীর মিশ্রণ হয়েছে।

    দুর্গটিতে ঘুটনালি নামে একটি অভিনব নিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে যা দুর্গের চার দিকেই বৃষ্টির জল সহজেই নিষ্কাশন করে। বছরের পর বছর ধরে, এলোমেলো নির্মাণ কার্যক্রম এবং নতুন রাস্তা নির্মাণ এর জন্য দূর্গটির পরিসর ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

    সংস্কৃতি- এই দুর্গে ইতালীয়, ফরাসি এবং স্থানীয় খাবারসহ অসংখ্য খাবারের দোকান রয়েছে। বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় দুর্গের উপর ভিত্তি করে একটি গোয়েন্দা উপন্যাস সোনার কেল্লা (সোনার কেল্লা) লিখেছিলেন এবং পরে তিনি এটি এখানে চিত্রায়িত করেছিলেন। ছবিটি একটি ক্লাসিক হয়ে ওঠে এবং বাংলা এবং বিশ্বজুড়ে বিপুল সংখ্যক পর্যটক প্রতি বছর দুর্গটি পরিদর্শন করতে আসে, সত্যজিত রায় ছবিতে যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন তা উপভোগ করার জন্য। ২০১৩ সালের জুন মাসে নমপেনে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৩৭তম সভায় রাজস্থানের ছয়টি দুর্গ, যথা আম্বর দুর্গ, চিত্তোর দুর্গ, গাগ্রন দুর্গ, জয়সলমের দুর্গ, কুম্ভলগড় এবং রণথম্বোর দুর্গ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলিকে ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক সম্পত্তি এবং রাজপুত সামরিক পাহাড়ি স্থাপত্যের উদাহরণ হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে।

    পুনরুদ্ধার- ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপের ফলে জয়সলমীর দুর্গ আজ বহুমুখী হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। দূর্গের উপর জলের স্রোতে চাপ, অপর্যাপ্ত নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, পরিত্যক্ত বাড়িঘর এবং ত্রিকুট পাহাড়ের চারপাশে ভূমিকম্পের ঘটনা দুর্গটিকে উদ্বেগজনকভাবে প্রভাবিত করছে। জয়সলমের দুর্গটি একটি দুর্বল পাললিক শিলার পাদদেশের উপর নির্মিত হয়েছে। ফলে এর ভিত্তিগুলিকে বিশেষভাবে জলস্রোতের ঝুঁকিতে ফেলেছে। বছরের পর বছর ধরে এর ফলে দুর্গের উল্লেখযোগ্য অংশ যেমন রাণীর প্রাসাদ বা রাণী কা মহল এবং বাইরের সীমানা প্রাচীরের কিছু অংশ এবং নীচের পিচিং দেয়াল(পিচিং ওয়াল” বলতে ঢাল বা বাঁধ বরাবর পাথর বা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি কাঠামো নির্মাণের অনুশীলনকে বোঝায় যাতে ক্ষয় থেকে দেয়ালকে রক্ষা করা যায় এবং স্থিতিশীলতা প্রদান করা যায়।)ভেঙে পড়েছে।

    বিশ্ব স্মৃতি তহবিল- ১৯৯৬ সালের বিশ্ব স্মৃতি তহবিল ওয়াচ-এ এবং আবার ১৯৯৮ ও ২০০০ সালের প্রতিবেদনে দুর্গটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। কারণ এর বাসিন্দাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রতি বছর পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কারণে এটি হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। দুর্গটি রাজস্থানের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। প্রতি বছর পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ পর্যটক এখানে আসেন। ফলস্বরূপ  এটি বাণিজ্যিক কার্যকলাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে মানব ও যানবাহন চলাচল উভয় ক্ষেত্রেই অসাধারণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

    বিশ্ব স্মৃতি তহবিল এবং যুক্তরাজ্য ভিত্তিক দাতব্য সংস্থা জয়সলমের ইন জেওপার্ডি দ্বারা প্রধান সংস্কার কাজ করা হয়েছে। Indian National Trust for Art and Cultural Heritage(INTACH-)এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান এস.কে. মিশ্রের মতে, আমেরিকান এক্সপ্রেস জয়সলমের দুর্গ সংরক্ষণের জন্য ১ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ প্রদান করেছে।নাগরিক সুযোগ-সুবিধার জন্য দায়বদ্ধ বিভিন্ন সরকারি বিভাগ, স্থানীয় পৌরসভা এবং দুর্গের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দায়ী প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপের অভাব এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে আছে।*

 বেকাল দুৰ্গ

    বেকাল দুর্গ ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে কেলাডির শিবাপ্পা নায়ক কর্তৃক নির্মিত একটি মধ্যযুগীয় দুর্গ। এটি ৪০ একর (১৬০,০০০ বর্গমিটার) জুড়ে বিস্তৃত কেরালার বৃহত্তম দুর্গ। বেকাল দুর্গ সমুদ্র সৈকত, কেরালার একটি জনপ্রিয় সৈকত।

    দুর্গটি সমুদ্র থেকে উঠে এসেছে বলে ধারণা হয়। এর বাইরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জলের সংস্পর্শে রয়েছে। বেকাল দুর্গ কোনও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না এবং এতে কোনও প্রাসাদ বা প্রাসাদ অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

    দূর্গটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল জলাশয়, ম্যাগাজিন এবং টিপু সুলতান কর্তৃক নির্মিত একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে যাওয়ার সিঁড়িগুলি।দুর্গের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে উপকূলরেখা এবং কানহাঙ্গাড়, পল্লিক্কারা, বেকাল, মাভল, কোট্টিকুলাম এবং উদুমা শহরগুলির দৃশ্য উপভোগ করা যায়। দুর্গের আঁকাবাঁকা প্রবেশপথ এবং আশেপাশের পরিখাগুলি এর প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের দিক নির্দেশনা করে। বাইরের দেয়ালের ছিদ্রগুলি নৌ আক্রমণ থেকে দূর্গকে কার্যকরভাবে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। উপরের ছিদ্রগুলি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে লক্ষ্য করার জন্য তৈরি। নীচের ছিদ্রগুলি নিকটতম শত্রুকে আঘাত করার জন্য তৈরি। সবচেয়ে নীচের ছিদ্রগুলি দুর্গের নিকটতম শত্রুদেরকে আক্রমণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিলো। এর শক্ত কাঠামো ডাচদের দ্বারা নির্মিত কান্নুরের থালাসেরি দুর্গ এবং সেন্ট অ্যাঞ্জেলো দুর্গের মতো।

    ইতিহাস- পেরুমাল যুগে বেকাল মহোদয়পুরমের অংশ ছিল। মহোদয়পুরম ছিল নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে ভারতের কেরালার একটি শক্তিশালী রাজ্য চেরা রাজবংশের প্রাচীন রাজধানী শহর। মহোদয়পুরম পেরুমালদের পতনের পর  দ্বাদশ শতাব্দীতে বেকাল মুশিকা বা কোলাথিরি বা চিরক্কল রাজপরিবারের সার্বভৌমত্বের অধীনে এসেছিলো। কোলাথিরিদের অধীনে বেকালের সামুদ্রিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং মালাবার একটি অপরিহার্য বন্দর শহরে পরিণত হয়।

    ১৫৬৫ সালে তালিকোটার যুদ্ধের পর  কেলাদি নায়ক (ইক্কেরি নায়ক) সহ সামন্ত সর্দাররা এই অঞ্চলে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বেকাল প্রথমে আধিপত্য বিস্তারের কেন্দ্র হিসেবে এবং পরে এটি মালাবারকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা কাজ করে। এই বন্দর শহরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব পরবর্তীতে নায়কদের বেকালে দুর্গ নির্মাণের জন্য প্ররোচিত করে। হিরিয়া ভেঙ্কটাপ্পা নায়ক দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে শিবাপ্পা নায়ক এটির নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেন। কাসারগোদের নিকটে চন্দ্রগিরি দুর্গও এই সময়ে নির্মিত হয়েছিল।

    মহীশূরের শাসক হায়দার আলী এই অঞ্চল দখলের পর কোলাথিরি এবং নায়কদের মধ্যে সংঘর্ষের অবসান ঘটে এবং বেকাল মহীশূর রাজাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

    টিপু সুলতান যখন মালাবার দখলের জন্য সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তখন বেকাল দূর্গ তাঁর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ছিল। বেকাল দুর্গে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে প্রাপ্ত মুদ্রা এবং নিদর্শনগুলি মহীশূর সুলতানদের শক্তিশালী উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধের সময় টিপু সুলতানের মৃত্যুর ফলে মহীশূরীয়দের এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটে এবং দুর্গটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সময়ে বোম্বে প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত দক্ষিণ কানাড়া জেলার বেকাল তালুকের সদর দপ্তর ছিল হোসদুর্গ(পুঠিয়াকোট্টা ((যার অর্থ ‘নতুন দুর্গ’))হোসদুর্গ দুর্গ নামেও পরিচিত, এটি কেরালার কাসারগোড জেলার অন্তর্গত কানহানগড়ের একটি দুর্গ।)। ফলে বেকাল দূর্গ এবং এর বন্দরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব হ্রাস পায়।

    পর্যটন- ১৯৯২ সালে ভারত বেকাল দুর্গকে একটি বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এর প্রচারের জন্য তিন বছর পর বেকাল পর্যটন উন্নয়ন কর্পোরেশন গঠন করেছে। বোম্বে চলচ্চিত্রের ‘উইরে’ (তামিল) গীতে এবং মালায়ালাম চলচ্চিত্র মধুরানোম্বারাকাট্টুর ‘দ্বাদশিয়িল’ গীতে দুর্গটি প্রদর্শন করা হয়েছে।

    পরিবহন- স্থানীয় রাস্তাগুলি উত্তরে ম্যাঙ্গালোর এবং দক্ষিণে ক্যালিকটের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হল বেকাল ফোর্ট রেলওয়ে স্টেশন, কানহানগড় রেলওয়ে স্টেশন এবং ম্যাঙ্গালোর-পালাক্কাড় লাইনে কোটিকুলাম রেলওয়ে স্টেশন।

    বেকাল থেকে নিকটতম আন্তর্জাতিক ম্যাঙ্গালোর বিমানবন্দরের দূরত্ব  ৭১ কিমি,  কান্নুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দূরত্ব  ১০১ কিমি এবং কালিকট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দূরত্ব  ১৯৫ কিমি।*

বেঙ্গালুরু দুর্গ  

    ১৫৩৭ সালে বেঙ্গালুরু দুর্গটি মাটি দিয়ে তৈয়ার করা হয়েছিল। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের একজন আধিপত্যবাদী এবং বেঙ্গালুরুর প্রতিষ্ঠাতা কেম্পে গৌড়া- প্রথম এই দুর্গের নির্মাতা ছিলেন। রাজা হায়দার আলী ১৭৬১ সালে মাটির দুর্গটি পাথরের দুর্গে প্রতিস্থাপন করেন এবং ১৮ শতকের শেষের দিকে তাঁর পুত্র টিপু সুলতান এটিকে আরও উন্নত করেন। ১৭৯১ সালে ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সময় দূর্গটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, এটি এখনও ১৮ শতকের সামরিক দুর্গের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ১৭৯১ সালের ২১ মার্চ লর্ড কর্নওয়ালিসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী তৃতীয় মহীশূর যুদ্ধের (১৭৯০-১৭৯২) সময় বেঙ্গালুরু অবরোধ করে দুর্গটি দখল করে। সেই সময়ে দুর্গটি টিপু সুলতানের একটি শক্ত ঘাঁটি ছিল। সম্প্রতি  কৃষ্ণরাজেন্দ্র রোডে দুর্গের দিল্লি গেট এবং দুটি প্রধান দুর্গের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। ব্রিটিশরা দুর্গের প্রাচীর ভেঙেছিল, একটি মার্বেল ফলক সেই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পুরাতন দুর্গ এলাকায় রাজা টিপু সুলতানের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ এবং তাঁর অস্ত্রাগারও রয়েছে। ২০১০ সালে মণিদীপা সাহু রচিত “রিডল অফ দ্য সেভেন্থ স্টোন” উপন্যাস এই দুর্গটি গুপ্তধন অনুসন্ধানের পরিবেশ তৈরি করেছিল।

    ইতিহাস– ১৫৩৭ সালে  বিজয়নগর সাম্রাজ্যের একজন প্রধান কেম্পে গৌড়া প্রথম একটি মাটির দুর্গ তৈরি করেছিলেন এবং এর চারপাশের এলাকাকে বেঙ্গালুরু পিট(বেঙ্গালুরু পিট হল বেঙ্গালুরু শহরের একটি এলাকা যা ১৫৩৭ সালে কেম্পেগৌড়া প্রথম (আনুমানিক ১৫১০-১৫৭০) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে মূল দিকে রাস্তাগুলি তৈরি করা হয়েছিল এবং প্রতিটি রাস্তার শেষে প্রবেশদ্বার ছিল।) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যাকে আধুনিক বেঙ্গালুরুর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হত।

    বেঙ্গালুরু বা বেঙ্গালুরু পিটের নির্মাতা কেম্পে গৌড়া প্রথম এর মূর্তি  বেঙ্গালুরু কর্পোরেশন অফিসের বিপরীত দিকে অবস্থিত। শৈশব থেকেই নেতৃত্বের অসাধারণ গুণাবলী প্রদর্শনকারী কেম্পে গৌড়া প্রথমের একটি নতুন শহর গড়ে তোলার মহৎ অভিপ্রায় ছিল। হাম্পিতে তাঁর ভ্রমণের সময় এই অভিপ্রায় আরও তীব্রতর হয়ে ওঠেছিলো । তখনকার বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু পিট এখন ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবাহী বিজয়নগর শহর। তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অটল ছিলেন এবং সাম্রাজ্যের শাসক রাজা অচুতরায়ার কাছ থেকে নিজের জন্য একটি নতুন শহর নির্মাণের অনুমতি নিয়েছিলেন। রাজা রাজা অচুতরায়ার কেম্পে গৌড়াকে একটি নতুন শহর নির্মাণের উদ্যোগের খরচ মেটাতে ১২টি হোবলি (রাজস্ব উপবিভাগ) উপহার দিয়েছিলেন, যার বার্ষিক আয় ছিলো ৩০,০০০ বরাহ (স্বর্ণমুদ্রা)।

    কেম্পে গৌড়া রাজা আচুতারায়ার এর সমর্থন পেয়ে তার পৈতৃক ভূমি ইয়েলহাঙ্কা থেকে তাঁর নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য চলে আসেন। দুর্গ এবং বেঙ্গালুরু পিটের জন্য স্থান নির্বাচন প্রক্রিয়ার একটি সংস্করণ হল যে,  তাঁর উপদেষ্টা গিদ্দে গৌড়ার সাথে একটি শিকার অভিযানের সময়, কেম্পে গৌড়া ইয়েলহাঙ্কার পশ্চিম দিকে গিয়েছিলেন এবং ইয়েলহাঙ্কা থেকে প্রায় ১০ মাইল (১৬ কিমি) দূরে হেসরঘাট্টার কাছে শিবসমুদ্র নামক একটি গ্রামে পৌঁছেছিলেন। সেখানে একটি গাছের নীচে শান্ত পরিবেশে  তিনি একটি দুর্গ, একটি সেনানিবাস, ট্যাঙ্ক (জল জলাধার) এবং সকল পেশার মানুষের জন্য মন্দিরসহ একটি উপযুক্ত রাজধানী শহর নির্মাণের কল্পনা করেছিলেন। এটাও বলা হয় যে, একটি খরগোশের দ্বারা শিকারী কুকুরকে তাড়িয়ে দেওয়ার একটি অস্বাভাবিক ঘটনার লক্ষণ হিসেবে এই স্থানটি নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়েছিল। দেবী লক্ষ্মীর (হিন্দু সম্পদের দেবী) স্বপ্ন, যা সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তার রাজধানীর স্থান সম্পর্কে তার সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করেছিলো। অতএব, ১৫৩৭ সালের এক শুভ দিনে, তিনি দোদ্দাপেট এবং চিক্কাপেটের সংযোগস্থলে, বর্তমানের অ্যাভিনিউ রোড এবং পুরাতন তালুক কাচেরি রোড(ওটিসি) এর সংযোগস্থলে  চার দিকে চার জোড়া সজ্জিত সাদা ষাঁড় দিয়ে জমি চাষ করে একটি যুগান্তকারী অনুষ্ঠান এবং উৎসব পরিচালনা করেছিলেন।

    এরপর, কেম্পে গৌড়া একটি মাটির দুর্গ (বর্তমানে শহরের পশ্চিম অংশে) নির্মাণ করেন, যার চারপাশে পরিখা এবং নয়টি বড় দরজা ছিল। মাটির দুর্গের ভবনটিও কিংবদন্তিতে পরিপূর্ণ। দুর্গ নির্মাণের সময় বলা হত যে, অশুভ আত্মাদের প্রভাবে দক্ষিণ দরজাটি তৈরি হওয়ার সাথে সাথেই ভেঙে পড়বে। ফলে অশুভ আত্মাদের তাড়ানোর জন্য মানুষের বলিদান প্রয়োজন হবে। কিন্তু কেম্পে গৌড়া মানব বলিদান করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে। তখন তাঁর পুত্রবধূ লক্ষ্মী শ্বশুরের দুর্দশা বুঝতে পেরে রাতের আড়ালে দক্ষিণ দরজায় নিজের তরবারি আঘাতে আত্মহত্যা করেন। ফলে পরবর্তীকালে  কোনও দুর্ঘটনা ছাড়াই দুর্গটি সম্পন্ন হয়। লক্ষ্মীর স্মৃতিতে কেম্পে গৌড়া কোরামঙ্গলায় পুত্রবধূর নামে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। এইভাবে কেম্পে গৌড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় এবং বেঙ্গালুরু পিট মাটির দুর্গের চারপাশে দূর্গ বিকশিত হয়ে বেঙ্গালুরু দুর্গ নামে পরিচিত লাভ করে।

                ১৬৩৭-৩৮ সালে, কেম্পে গৌড়ার শাসনামলে বেঙ্গালুরু দুর্গ খুবই সমৃদ্ধ ছিল।বিজাপুর সুলতানাতের সেনাপতি রুস্তম ই জামান (রান্দৌলা খান) বেঙ্গালুরু দুর্গ এবং শহর দখল করতে চেয়েছিলেন। তবে, ৩০,০০০ শক্তিশালী অশ্বারোহী সৈন্য দ্বারা দুর্গটি ঘিরে ফেলার পর কস্তুরী রাঙ্গা নায়ক রুস্তম ই জামানকে দুর্গ আক্রমণ না করার জন্য রাজি করান। কেম্পে গৌড়া নায়ককে সৈন্য প্রত্যাহার করতে সক্ষম হন। রন্দৌলা খান  নায়কের সাথে দেখা করেন এবং বিজাপুর শাসকদের অধীনে তাঁকে পুরষ্কার এবং স্বীকৃতি প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। শীঘ্রই কেম্পে গৌড়া তাঁর সমস্ত সম্পদসহ এবং কোনও যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেন। এরপর রুস্তম ই জামান দুর্গটি দখল করেন এবং শাহজির হাতে এর ব্যবস্থাপনা হস্তান্তর করেন, যার মধ্যে তিনি সম্প্রতি জয় করা অন্যান্য অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত ছিলো। যেখানে বেঙ্গালুরুকে সদর দপ্তর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

     ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চিক্কাদেব রায় ওদিয়ারের শাসনামলে এই মাটির দুর্গটি সম্প্রসারণ করা হয়। ১৭৬১ সালে  হায়দার আলী এটি সংস্কার করেন এবং পাথর দিয়ে দূর্গটিকে সুরক্ষিত করেন। হায়দার আলীর পুত্র টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় দুর্গের একটি অংশ ব্রিটিশদের বোমাবর্ষণ দ্বারা দূর্গটি ক্ষতিগ্স্ত হয়। টিপু সুলতান পরে দুর্গটি মেরামত করেন। দুর্গের ভেতরে, ভগবান গণপতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি মন্দির রয়েছে।

     ১৭৯১ সালের মার্চ মাসে লর্ড কর্নওয়ালিসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী তৃতীয় মহীশূর যুদ্ধের সময় বেঙ্গালুরু দুর্গ অবরোধ করে। কমান্ড্যান্ট বাহাদুর খানের নেতৃত্বে মহীশূর সেনাবাহিনীর কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে ২০০০ জনেরও বেশি মহীশূর সৈন্য নিহত হয়। ২১শে মার্চ ব্রিটিশরা দিল্লি গেটের কাছে দেয়াল ভেঙে দূর্গটি দখল করে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ মার্ক উইল্কসের ভাষায়, “প্রতিরোধ সর্বত্র সম্মানজনক ছিল।”

    দুর্গের কাঠামো- মাদ্রাজের মতো বেঙ্গালুরুতেও একটি দুর্গ ছিল, যার বাইরে একটি পেত্তা(“পেটাহ”মানে “দরজা” বা “খোলা”) বা সুরক্ষিত শহর ছিল। এই বিন্যাসটি ভারতের প্রায় সমস্ত শহর বা জনবসতির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল।  পেত্তা দখলের ঝুঁকিতে পড়লে দুর্গটি বেশিরভাগ বাসিন্দার জন্য আশ্রয়স্থল প্রদান করত। বেঙ্গালুরু দুর্গের পরিধি ছিল প্রায় এক মাইল এবং এটি শক্ত পাথরের তৈরি ছিল। দূর্গটি প্রশস্ত পরিখা দ্বারা বেষ্টিত ছিল এবং প্রাচীর বরাবর নির্দিষ্ট ব্যবধানে ২৬টি টাওয়ার ছিল। এর উত্তরে পেত্তা অবস্থিত ছিল, যার পরিধি কয়েক মাইল ছিলো এবং সুরক্ষিত প্রাচীর, কাঁটা এবং ক্যাকটাস দিয়ে তৈরি গভীর বেল্ট এবং একটি ছোট পরিখা দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। মোটকথা, বেঙ্গালুরু দূর্গকে আক্রমণ করার জন্য অনুকূল ছিল না।

    সম্প্রতি দুর্গের কেবল দিল্লি গেট অবশিষ্ট রয়েছে, বাকি অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। দূর্গটি মূলত প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা ছিল। দিল্লি গেট থেকে বর্তমান KIMS ক্যাম্পাস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। বেঙ্গালুরু দুর্গের মধ্যে ছিল বর্তমান ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল, কোটে ভেঙ্কটরমণ স্বামী মন্দির, টিপু সুলতানের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ, মাক্কালা কুটা পার্ক, বেঙ্গালুরু মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস, ফোর্ট হাই স্কুল, ফোর্ট চার্চ, মিন্টো চক্ষু হাসপাতাল এবং বর্তমান KIMS হাসপাতাল।

    ফোর্ট চার্চ- ব্যাঙ্গালোরের ফোর্ট চার্চটি বেঙ্গালুরু দুর্গের মধ্যেই অবস্থিত ছিল। বাণী বিলাস হাসপাতাল নির্মাণের জন্য গির্জাটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। মহীশূর সরকার চামরাজপেটে একটি নতুন গির্জা নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ করে এবং এটি বর্তমান সেন্ট লুক’স চার্চ নামে পরিচিত।প্রাথমিক রেকর্ড অনুসারে এই গির্জাটিকে ড্রামার’স চ্যাপেল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গির্জাটি টিপু সুলতানের পতনের পর ব্রিটিশ সৈন্যরা নির্মাণ করেছিল। বেঙ্গালুরুতে ফোর্ট চার্চ প্রথম প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা স্থাপন  করা হয়েছিল।

    ফোর্ট কবরস্থান- ফোর্ট কবরস্থানে বেঙ্গালুরু অবরোধের সময় নিহত অফিসারদের সমাহিত করা হয়েছিল। কবরস্থানটি রবার্ট বাউয়ার, লন্ডন দ্বারা  ১৭৯৪ সালে প্রকাশিত রবার্ট হোমের বই “সিলেক্ট ভিউস ইন মাইসোর, দ্য কান্ট্রি অফ টিপু সুলতান”, এ চিত্রিত করা হয়েছিলো। হোমের চিত্রকর্মে ক্যাপ্টেন জেমস স্মিথ, জেমস উইলিয়ামসন, জন শিপার, নাথানিয়েল ডস এবং জেরেমিয়া ডেলানি, লেফটেন্যান্ট কোনান এবং লেফটেন্যান্ট-কর্নেল গ্র্যাটনের কবর দেখানো হয়েছে। ১৮৯৫ সালে লিপিবদ্ধ করা হিসাবে  কবরস্থানটি ফোর্ট চার্চের ঠিক বাইরে অবস্থিত ছিল এবং গির্জাটি এই কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দায়ী ছিল। কবরস্থানে সাইপ্রেস গাছ, গোলাপের গুল্ম এবং ফুল ছিল। মহীশূর সরকার কবরস্থানের জন্য একটি প্রাচীর এবং গেট তৈরি করেছিল।

    যাইহোক, ১৯১২ সালে রেভারেন্ড ফ্রাঙ্ক পেনি যখন তাঁর বই “দ্য চার্চ ইন মাদ্রাজ: খণ্ড II”-এ কবরস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন, তবে তখন  কবরস্থানটি অবশিষ্ট ছিল না। ১৭৯১ সালে বেঙ্গালুরু দুর্গের যুদ্ধে নিহতদের রেকর্ড মহীশূর সরকার কর্তৃক সেনোটাফ (সেনোটাফ হল একটি খালি কবর, সমাধি বা স্মৃতিস্তম্ভ যা এমন কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্মানে নির্মিত হয় যাদের দেহাবশেষ অন্য কোথাও রয়েছে বা হারিয়ে গেছে।)সমাধিসৌধে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ফলস্বরূপ  ১৯৬৪ সালের ২৮ অক্টোবর সমাধিসৌধটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে।

    ফোর্ট স্কুল- ফোর্ট চার্চ ১৯ শতকের শেষের দিক থেকে ফোর্ট স্কুল পরিচালনা করত। ফোর্ট চার্চই আসবাবপত্র, অধ্যয়নের মানচিত্র এবং পরিচালিত হিসাব সরবরাহ করত এবং ফোর্ট চার্চ স্কুল কমিটি দ্বারা এগুলি তত্ত্বাবধান করা হত। ডায়োসেসান ম্যাগাজিন রেকর্ড করে যে, ১৮৯৩ সাল থেকে  ১৯০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর  পর্যন্ত মিস রোজারিও প্রধান মিশ্ট্রেস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফোর্ট স্কুলের বর্তমান এবং পুরাতন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্কুল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, ফোর্ট চার্চের লে ট্রাস্টি জে ডব্লিউ হার্ডি, পুরস্কার বিতরণ করেছিলেন ই এ হিল, স্কুল পরিদর্শক এবং রেভারেন্ড জি এইচ ল্যাম্ব। ডায়োসেসান ম্যাগাজিন এর রেকর্ড  অনুসারে ১৯১১ সালে অনুষ্ঠানটির প্রধান মিস্ট্রেস ছিলেন মিস পেজ।

    চামরাজপেটে এখনও একটি ফোর্ট স্কুল রয়েছে, যার ভবনটি ১৯০৭ সাল তৈরি। একসময় ইংলিশ ভার্নাকুলার স্কুল নামে পরিচিত, ফোর্ট স্কুলটি বেঙ্গালুরু মেডিকেল কলেজের বিপরীতে এবং টিপু সুলতানের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদের কাছে অবস্থিত। স্কুল ভবনটি ১৯০৭ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং এর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী এইচ এস ডোরেস্বামী, ক্রিকেটার জি আর বিশ্বনাথ, রাজনীতিবিদ ভি এস কৃষ্ণ আইয়ার,  মহীশূরের মহারাজা জয়চামরাজেন্দ্র ওয়াদিয়ার, কর্ণাটকের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কেঙ্গাল হনুমানথাইয়া এবং আমলা নরসিমহা রাও। সম্ভাব্য সংস্কারের জন্য ভবনটি Indian National Trust for Art and Cultural Heritage.( INTACH) দ্বারা অধ্যয়ন করা হচ্ছে। ফোর্ট স্কুলটি বেঙ্গালুরু পিট এলাকার প্রাচীনতম উচ্চ বিদ্যালয়। বর্তমানে স্কুলটিতে ইংরেজি মাধ্যমের ১৮৬ জন এবং কন্নড় মাধ্যমের ৮১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ইংরেজি মাধ্যমের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তামিল এবং তেলেগু পরিবারের, যারা ইংরেজি ভাষা মাতৃভাষা এবং তৃতীয় ভাষা হিসেবে কন্নড় বিষয়ে অধ্যয়ন করে।

    বর্তমান অবস্থা- বর্তমান কেবল দিল্লি গেট দুটি দুর্গের অবশিষ্টাংশ রয়েছে। ১৭৯১ সালে দুর্গটি দখল করার পর  ব্রিটিশরা এটি ভেঙে ফেলা শুরু করেছিলো এবং এই প্রক্রিয়া ১৯৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। রাস্তা তৈরির জন্য প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়েছিল, অন্যদিকে অস্ত্রাগার, ব্যারাক এবং অন্যান্য পুরাতন ভবনগুলি দ্রুত কলেজ, স্কুল, বাস স্ট্যান্ড এবং হাসপাতাল তৈরির জন্য ব্যবহার করা করে হয়েছে। ২০১২ সালের নভেম্বরে বেঙ্গালুরু মেট্রো নির্মাণস্থলের শ্রমিকরা টিপু সুলতানের সময়কার কামানের গোলাসহ দুটি বিশাল লোহার কামান আবিষ্কার করেছেন।

    জেমস হান্টারের স্কেচ- জেমস হান্টার রয়েল আর্টিলারিতে একজন লেফটেন্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি একজন সামরিক চিত্রশিল্পী ছিলেন এবং তার স্কেচগুলিতে সামরিক ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দিক চিত্রিত করা হয়েছিল। হান্টার ব্রিটিশ ভারত সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন এবং টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

    হান্টার দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন ভূদৃশ্যের স্কেচ তৈরি করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে বেঙ্গালুরু, মহীশূর, হোসুর, কাঞ্চিপুরম, মাদ্রাজ, আর্কট, শ্রীপেরুম্বুদুর ইত্যাদি। এই চিত্রকর্মগুলি ১৮০২ থেকে ১৮০৫ সালের মধ্যে লন্ডনের এডওয়ার্ড ওর্মে কর্তৃক প্রকাশিত ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ অ্যান্টিয়েন্ট অ্যান্ড মডার্ন ইন্ডিয়া এম্বেলব্ডেড উইথ কালারড এনগ্রেভিং’  এবং ১৮০৪ সালে এডওয়ার্ড ওর্মে কর্তৃক প্রকাশিত ‘পিকচারস্ক সিনারি ইন দ্য কিংডম অফ মাইসোর’ বইয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

    হান্টার ১৭৯২ সালে ভারতে মারা গিয়েছেন। তাঁর বেঙ্গালুরু দুর্গের কিছু চিত্রকর্ম রয়েছে।*

ভেল্লোর দুৰ্গ

    ভেলোর দুর্গ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ভেলোর শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ১৬ শতকের একটি বিশাল দুর্গ। এটি বিজয়নগর সম্রাটদের দ্বারা নির্মাণ কৰা হযেছিলো। দুর্গটি একসময় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের আরবিদু রাজবংশের রাজকীয় রাজধানী ছিল। দুর্গটি তার বিশাল প্রাচীর, প্রশস্ত পরিখা এবং মজবুত গাঁথুনির জন্য বিখ্যাত।

    দুর্গটির মালিকানা বিজয়নগরের সম্রাটদের কাছ থেকে, বিজাপুরের সুলতান, মারাঠা, কর্ণাটকী নবাব এবং অবশেষে ব্রিটিশদের কাছে চলে গিয়েছিলো। ভারত স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত দুর্গটি ব্রিটিশদের অধীনে ছিলো। বর্তমান দূর্গটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ভারত সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের কাছে। ব্রিটিশ শাসনামলে, টিপু সুলতানের পরিবার এবং শ্রীলঙ্কার শেষ রাজা  শ্রী বিক্রম রাজসিংহকে দুর্গে বন্দী হিসেবে রাখা হয়েছিল। দূর্গটি শ্রীরঙ্গ রায়ের বিজয়নগর রাজপরিবারের গণহত্যারও সাক্ষী। এই দুর্গে রয়েছে জলকান্তেশ্বর হিন্দু মন্দির, খ্রিস্টান সেন্ট জনস গির্জা এবং একটি মুসলিম মসজিদ, যার মধ্যে জলকান্তেশ্বর মন্দিরটি তার অসাধারণ শিল্প কাজের জন্য বিখ্যাত। ১৮০৬ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম উল্লেখযোগ্য সামরিক বিদ্রোহ এই দুর্গেই সংঘটিত হয়েছিলো। বিদ্রোহটি ভেলোর বিদ্রোহ নামে জনাজাত। দেশী-বিদেশী উভয় দর্শনার্থীর জন্য তামিলনাড়ুর সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলির মধ্যে ভেলোর দুর্গ একটি।

    ১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সম্রাট সদাশিব রায়ের অধীনস্থ সর্দার চিন্না বোম্মি রেড্ডি এবং থিম্মা রেড্ডি নায়ক দ্বারা ভেলোর দুর্গ নির্মিত হয়েছিল। তালিকোটার যুদ্ধের পর বিজয়নগরের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর চন্দ্রগিরিকে চতুর্থ রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর দুর্গটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছিলো। ১৭ শতকে রায় উপাধিধারী আরবিদু রাজবংশ এই দুর্গে বাস করতেন এবং ১৬২০-এর দশকে টপ্পুরের যুদ্ধে এটিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। রায় পরিবারের দুটি উপদলের মধ্যে রায় উপাধি দাবি নিয়ে এই বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। প্রতিটি উপদলের মধ্যে তাঁদের নিজ নিজ অধস্তনরা ছিল: তাঞ্জোরের নায়ক, জিঞ্জি এবং মাদুরাই তাঁদের স্বার্থ অনুসারে পক্ষ গ্রহণ করেছিল।

    রায়দের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী তুর্কি-পার্সিয়ান বিজাপুর সুলতানদের সাথে এবং মাদুরাইয়ের নায়ক এবং জিঞ্জিতে তাঁদের অধস্তনদের সাথে বার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি না পাঠানোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছিল। ১৬৪০-এর দশকে  শ্রীরঙ্গ রায় তৃতীয়ের রাজত্বকালে, দুর্গটি বিজাপুর সেনাবাহিনী দ্বারা সংক্ষিপ্তভাবে দখল করা হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঞ্জোরের নায়কদের সহায়তায় দূর্গটি পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল।

    ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শ্রীরঙ্গ রায়ের রাজত্বকালে, রাজপরিবারের মধ্যে একটি অভ্যুত্থান ঘটে এবং রাজপরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলি শাসক সম্রাট শ্রীরঙ্গ রায় এবং তাঁর রাজপরিবারকে হত্যা করে এবং  সম্রাটের ছোট ছেলে রাম দেব রায়ের সাথে সম্রাটের সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী দুর্গ থেকে পাচার হয়ে যায়। এই ঘটনাগুলির ফলে ১৬১৬ সালে টপ্পুরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।  দক্ষিণ ভারতীয় যুদ্ধগুলির মধ্যে যুদ্ধটি শতাব্দীর বৃহত্তম যুদ্ধগুলির একটি।

    ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফ্রান্সিস ডে ভেলোর-চন্দ্রগিরি অঞ্চলের নায়কদের কাছ থেকে করমণ্ডল উপকূলে ব্যবসা করার জন্য একটি ছোট জমি অধিগ্রহণ করেন যা বর্তমান চেন্নাইতে অবস্থিত।

    বিজাপুরের অধীনে (১৬৫৬-১৬৭৮)- ১৬৫০-এর দশকে, শ্রীরঙ্গ মহীশূর এবং তাঞ্জোর নায়কদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে এবং জিঞ্জি এবং মাদুরাই আক্রমণ করার জন্য দক্ষিণ অভিমুখে অগ্রসর হয়। তাঁর প্রথম যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল জিঞ্জি দুর্গ দখল করা, কিন্তু মাদুরাইয়ের থিরুমালাই নায়ক শ্রীরঙ্গের মনোযোগ অন্যদিকে আকর্ষণ করার জন্য উত্তর দিক থেকে ভেলোর আক্রমণ করার জন্য অনুরোধ করে। তখন বিজাপুরের সুলতান তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং ভেলোর দুর্গ দখল করেন। পরবর্তীতে মাদুরাই-বিজাপুর উভয় সেনাবাহিনীই জিঞ্জিতে একত্রিত হয় এবং ভেলোর-তাঞ্জোর বাহিনীকে পরাজিত করে। এক সংঘর্ষের পর  উভয় দুর্গই বিজাপুরের সুলতানের হাতে চলে যায়। এই ঘটনার ২০ বছরের মধ্যে  মারাঠারা বিজাপুর সুলতানদের কাছ থেকে দুর্গটি দখল করে নেয়।

    মারাঠাদের অধীনে (১৬৭৮-১৭০৭) ১৬৭৬ সালে  মহান মারাঠা রাজা শিবাজির অধীনে মাওলারা দক্ষিণে তাঞ্জোর দেশের দিকে অগ্রসর হন। কারণ তাঞ্জোর সম্প্রতি মাদুরাইয়ের চোক্কানাথ নায়ক দ্বারা আক্রমণ এবং দখল করা হয়েছিল। একই বছর  শিবাজি মহারাজের ভাই একোজি তাঞ্জোরের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন, কিন্তু জিঞ্জি এবং ভেলোরে অবস্থিত তাঁর নিকটতম প্রতিবেশী মাদুরাই এবং বিজাপুর সুলতানদের দ্বারা হুমকির মুখে পড়েন। শিবাজি মহারাজের সেনাবাহিনী প্রথমে জিঞ্জি দুর্গ দখল করে, কিন্তু ভেলোর আক্রমণের দায়িত্ব তার সহকারীর উপর ছেড়ে দিয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে চলে যান, কারণ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব তার অঞ্চলগুলিতে আক্রমণ করেছিলেন। ১৬৭৮ সালে, দীর্ঘ চৌদ্দ মাস অবরোধের পর, দুর্গটি মারাঠাদের হাতে চলে যায়। শিবাজির প্রতিনিধি দুর্গগুলিকে শক্তিশালী করেন এবং আপেক্ষিক শান্তিতে অঞ্চলটির শাসন কার্য পরিচালনা করেন।

    মুঘলদের অধীনে (১৭০৭-১৭৬০) ১৭০৭ সালে, যে বছর আওরঙ্গজেবের মৃত্যু হয়, দাউদ খানের নেতৃত্বে দিল্লি সেনাবাহিনী মারাঠাদের পরাজিত করে ভেলোর দুর্গ দখল করে। দিল্লির সিংহাসনের জন্য সংগ্রামের সুযোগ দাক্ষিণাত্যের মুসলিম গভর্নরদের স্বাধীনতা ঘোষণা করার সুযোগ এনে দেয়। ১৭১০ সালে সাদাত উল্লাহ খানের নেতৃত্বে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত আর্কটের নবাবও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৭৩৩ সালে সাদাত উল্লাহ খানের উত্তরসূরি দোস্ত আলী তাঁর এক জামাতাকে দুর্গটি উপহার দেন।

    ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে (১৭৯৯-১৯৪৭) মাদুরাই নায়কদের পতন এবং মাদ্রাজ উপকূলে ব্রিটিশদের উত্থানের সাথে সাথে নবাব এবং তাঁর জামাতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নবাবকে ব্রিটিশরা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিদারদের ফরাসিরা সমর্থন করে; যার ফলে কর্ণাটক যুদ্ধ শুরু হয়। ব্রিটিশরা তুলনামূলকভাবে অনায়াসে ভেলোর দুর্গ দখল করে এবং ভারতের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত দুর্গটিকে তাঁদের একটি প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে।

    ১৭৮০ সালে  দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধের সময় হায়দার আলী দুর্গটি অবরোধ করেন, কিন্তু অবরোধ তুলে নেওয়ার আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ গ্যারিসন দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দূর্গটি নিজেদের দখলে রাখে।

    ভেলোর বিদ্রোহ (১৮০৬) এই দুর্গটি ছিল ভেলোর সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো।বিদ্রোহটি জনপ্রিয়ভাবে ভেলোর বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ১৮০৬ সালে ভেলোর দুর্গটি ব্রিটিশরা মাদ্রাজ সেনাবাহিনীর দুটি পদাতিক রেজিমেন্ট এবং একটি ইংরেজ রেজিমেন্টের চারটি কোম্পানি মোতায়েন করার জন্য ব্যবহার করেছিল। মাদ্রাজ সেনাবাহিনীর ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ মাদ্রাজ সিপাহীদের পাগড়ি প্রতিস্থাপনের জন্য একটি নতুন গোলাকার টুপি নির্ধারণ করেছিলেন, সেই সাথে পাগড়ি, এবং দাড়ি অপসারণের আদেশ অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই পদক্ষেপগুলি কেবল কুচকাওয়াজে মাদ্রাজ সৈন্যদের চেহারা উন্নত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল কিন্তু সিপাহীরা এগুলিকে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে আক্রমণাত্মক হস্তক্ষেপ বলে মনে করেছিল। টুপিতে গরুর চামড়া দিয়ে তৈরি একটি চামড়ার ককেড(অফিসের ব্যাজ হিসেবে অথবা লিভারির অংশ হিসেবে টুপিতে পরা একটি গোলাপ বা ফিতার গিঁট।) থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।

    ১৮০৬ সালের ১০ জুলাই, সূর্যোদয়ের আগে, দুর্গে অবস্থানরত ভারতীয় সিপাহিরা সেখানকার ইউরোপীয় ব্যারাকে আক্রমণ করে এবং ভোরের দিকে প্রায় ১৫ জন অফিসার এবং ১০০ জন ব্রিটিশ সৈন্যকে হত্যা করে এবং তাঁদের ঘরবাড়ি লুটপাট করে। বিদ্রোহী সৈন্যদের মধ্যে কেউ কেউ টিপু সুলতানের পুত্রদেরও তাঁদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। খবরটি দ্রুত আর্কটের অশ্বারোহী সেনানিবাসের কমান্ডার কর্নেলের কাছে পৌঁছায়, যিনি নয় ঘন্টার মধ্যে ব্রিটিশ ও ভারতীয় অশ্বারোহীদের বেশ কয়েকটি স্কোয়াড্রন এবং  ঘোড়ার কামানসহ দুর্গে পৌঁছে যান। ৮০০-এরও বেশি বিদ্রোহীরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সাথে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। দুপুরের মধ্যে বিদ্রোহ দমন করা হয়। এই ঘটনার পর ব্রিটিশরা তদন্ত আদালত গঠন করে, যারা টিপু সুলতানের পরিবারকে ভেলোর থেকে সুদূর কলকাতায় স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

     ভেলোর বিদ্রোহের খবর ব্রিটেনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এবং মাদ্রাজ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক স্যার জন ক্র্যাডক উভয়কেই প্রত্যাহার করা হয়। ভেলোর বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতে সংঘটিত প্রথম উল্লেখযোগ্য সামরিক বিদ্রোহ, যদিও ১৮৫৭ সালের বাংলা বিদ্রোহের দ্বারা এটি মূলত ছায়াচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে।

    স্থাপত্য- উল্লেখিত আছে যে “ভেলোরের মতো দুর্গ পৃথিবীর বুকে আর কোথাও নেই। এর একটি গভীর জলপূর্ণ খাদ (পরিখা) ছিল। পরিখাটিতে একসময় ১০,০০০ টি কুমির ঝাঁকে ঝাঁকে এই দুর্ভেদ্য দুর্গে অনুপ্রবেশকারীদের ধরে ফেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকত। এর দ্বিগুণ পুরু দেয়াল রয়েছে, যার বুরুজগুলি অনিয়মিতভাবে বেরিয়ে আসছে, যেখানে দুটি গাড়ি পাশাপাশি চালানো যেতে পারে”। দুর্গটি আর্কট এবং চিত্তুর জেলার নিকটবর্তী খনি থেকে আহরণ করা গ্রানাইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এটি ১৩৩ একর (০.৫৪ কিমি২) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং একটি ভাঙা পর্বতশ্রেণীর মধ্যে ২২০ মিটার (৭২০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত। দুর্গটি একটি পরিখা দ্বারা বেষ্টিত। পরিখাটি আক্রমণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা লাইন হিসাবে ব্যবহার করা হত। ধারণা করা হয় যে, প্রায় ১২ কিমি (৭.৫ মাইল) দূরে ভিরিঞ্জিপুরমে যাওয়ার জন্য দূর্গটিতে একটি পালানোর সুড়ঙ্গ অন্তর্ভুক্ত ছিল। শত্রুর আক্রমণের সময় সুড়ঙ্গটি রাজা এবং অন্যান্য রাজপরিবার ব্যবহার করতে পারত। তবে, পরবর্তীতে এএসআই-এর গবেষকরা এই ধারণাটি বিতর্কিত বলে ধারণা করেন। কারণ এই ধরণের কোনও পথের অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই দুর্গটিকে দক্ষিণ ভারতের সামরিক স্থাপত্যের সেরা উদাহরণ হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং দূর্গটি তার বিশাল প্রাচীর, প্রশস্ত পরিখা এবং শক্তিশালী গাঁথুনির জন্য পরিচিত।

    দুর্গটিতে একটি মন্দির, একটি মসজিদ, একটি গির্জা এবং আরও অনেক ভবন রয়েছে। ভবনগুলি বর্তমানে সরকারি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে রয়েছে তামিলনাড়ুর প্রাচীনতম পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। জলগণ্ডীশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত জলগণ্ডীশ্বর মন্দির (দেবতার আসল নাম ছিল “জোয়ারকান্দিশ্বর”) তার ভাস্কর্যের জন্য বিখ্যাত এবং সেই সময়ের অত্যন্ত দক্ষ কারিগরদের সূক্ষ্ম কারুশিল্পের প্রমাণ বহন করে। মন্দিরে প্রবেশপথের বাম দিকের বারান্দায় অবস্থিত ভাস্কর্যটি শিল্প ও স্থাপত্যের অনুরাগীদের দ্বারা প্রশংসিত একটি মাস্টারপিস। মন্দিরটি দীর্ঘকাল কোনও দেবতা ছাড়াই ছিল এবং এটি অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহৃত হত। অবশ্যে বেশ কয়েক বছর আগে ভগবান শিবের একটি মূর্তি দিয়ে মন্দিরটি পবিত্র করা হয়েছে।

    দুর্গের ভেতরের মসজিদটি শেষ আর্কট নবাবের আমলে নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে  ভেলোরে বসবাসকারী কয়েক হাজার মানুষের প্রতিবাদ সত্ত্বেও দুর্গের ভেতরের মসজিদে মুসলমানদের নামাজ পড়ার অনুমতি প্রদান করা হয়নি। ভেলোরের বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন যে, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ(ASI) মসজিদে মুসলমানদের নামাজ পড়ার অনুমতি প্রদান না করে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে।  পক্ষান্তরে হিন্দু এবং খ্রিস্টানদের যথাক্রমে মন্দির এবং গির্জায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। তবে, কেউ কেউ মুসলমানদের দাবি অস্বীকার করেন, কারণ ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে, প্রয়াত আব্দুল সামাদসহ মুসলমানরা জলগণ্ডীশ্বর মন্দির পুনরায় খোলার সমর্থনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, মুসলমানরা দুর্গের কাঠামোর ভিতরে উপাসনা করতে চান না। স্থানীয় জামাত নেতৃত্বও এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য ক্ষুদ্র রাজনৈতিক সংগঠনগুলিকে দোষারোপ করেছিলেন।

    দুর্গের ভেতরের গির্জাটি ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে (রবার্ট ক্লাইভ, ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানি দ্বারা) নির্মিত হয়েছিল। মুথু মণ্ডপম হল শ্রীলঙ্কার শেষ শাসক শ্রী বিক্রম রাজসিংহের সমাধিফলকের চারপাশে নির্মিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ।

    সেন্ট জনস গির্জা– ভেলোর দুর্গের অভ্যন্তরে অবস্থিত সেন্ট জন’স গির্জা, ১৮৪৬ সালে মাদ্রাজ সরকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক ঘাটির অফিসার এবং সৈনিকদের জন্য স্থাপিত হয়েছিল। গির্জাটির নামকরণ করা হয়েছে সেন্ট জন দ্য ইভাঞ্জেলিস্টের নামে। তবে, গির্জাটি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র(পবিত্রতা, এমন একটি কাজ যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বা জিনিসকে ধর্মনিরপেক্ষ বা অপবিত্র ব্যবহার থেকে আলাদা করা হয় এবং প্রার্থনা, আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে পবিত্রের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়,) করা হয়নি এবং তাই আনুষ্ঠানিকভাবে সেন্ট জন’স গির্জা নামে নামকরণ করা হয়নি। সেন্ট জন’স গির্জা হল ভেলোর ডায়োসিসে(এমন একটি এলাকা যেখানে বেশ কয়েকটি গির্জা রয়েছে, যার জন্য একজন বিশপ থাকেন)র প্রাচীনতম স্থায়ী গির্জা।

    রাজকীয় বন্দী- ভেলোর দুর্গ বেশ কয়েকজন রাজকীয় বন্দীকে আশ্রয় দিয়েছে। ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তনমের পতন এবং টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর, তাঁর পরিবার(যার মধ্যে তাঁর পুত্র, কন্যা, স্ত্রী এবং মা অর্থাৎ হায়দার আলীর স্ত্রী) দুর্গে আটক ছিলেন। ১৮০৬ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর, ব্রিটিশরা টিপুর পুত্র এবং কন্যাদের কলকাতায় স্থানান্তরিত করেছিলো। হায়দার আলীর বিধবা স্ত্রী বকশি বেগম (মৃত্যু ১৮০৬) এবং টিপুর স্ত্রী ও পুত্র পাদশাহ বেগমের সমাধি (যারা ১৮৩৪ সালের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন), দুর্গের পূর্ব দিকে এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত।

    ভেলোর দুর্গ শ্রীলঙ্কার শেষ শাসক রাজা শ্রী বিক্রম রাজসিংহের (১৭৯৮-১৮১৫) চূড়ান্ত বাসস্থান হয়ে ওঠেছিলো। রাজা এবং তাঁর পরিবারকে অন্যান্য পরিবারসহ ১৭ বছর ধরে এই দুর্গে যুদ্ধবন্দী হিসেবে রাখা হয়েছিল। দুর্গের মাঝে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শেষ রায় রাজাদের সাথে তাঁর সমাধি পাওয়া যায়।

    সংস্কৃতি- ভেলোর দুর্গটি ভেলোর শহরের কেন্দ্রস্থলে পুরাতন বাস স্ট্যান্ডের বিপরীতে অবস্থিত। ভেলোর চেন্নাই-বেঙ্গালুরু মহাসড়কে অবস্থিত এবং চেন্নাই থেকে ১২০ কিমি (৭৫ মাইল) এবং বেঙ্গালুরু থেকে ২১০ কিমি (১৩০ মাইল) দূরে অবস্থিত। নিকটতম রেল স্টেশন হল ভেলোর-কাটপাডি জংশন ।জংশনটিতে সমস্ত দ্রুতগামী ট্রেন থামে। নিকটতম বিমানবন্দর হল ভেলোর বিমানবন্দর, তিরুপতি বিমানবন্দর, চেন্নাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ১৯৮১ সালে ভারতের ডাক ও টেলিগ্রাফ বিভাগ দুর্গটির স্মরণে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিলো এবং ২০০৬ সালের জুলাই মাসে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ভেলোর সিপাহী বিদ্রোহের ২০০তম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিলেন। ১৬ শতকের এই দুর্গটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং বর্তমানে এটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। সরকারি জাদুঘর হল তামিলনাড়ু সরকারের জাদুঘর বিভাগ দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা একটি বহুমুখী জাদুঘর। এর ভান্ডারে নৃবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, ভূতত্ত্ব, মুদ্রাবিদ্যা, প্রাক-ইতিহাস এবং প্রাণিবিদ্যার মতো বিষয়গুলির সাথে সম্পর্কিত প্রাচীন এবং বর্তমান সময়ের নিদর্শনগুলি রয়েছে। উত্তর আর্কোট জেলার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি গ্যালারিতে মনোমুগ্ধকরভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। এই জাদুঘরটি ছুটির দিনগুলি ছাড়া সকল দিন সকাল ৯.০০ টা থেকে দুপুর ১২.৩০ টা এবং দুপুর ২.০০ টা থেকে বিকেল ৫.০০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং প্রবেশ মূল্য মাত্র ৫ টাকা।*

ফোর্ট উইলিয়াম

    ফোর্ট উইলিয়াম, আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয় দুর্গ,  কলকাতার হেস্টিংস (হেস্টিংস হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা জেলার মধ্য দক্ষিণ কলকাতার একটি এলাকা।)এ অবস্থিত একটি দুর্গ। এটি ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রাথমিক বছরগুলিতে নির্মিত হয়েছিল। দুর্গটি গঙ্গা নদীর প্রধান শাখানদী হুগলি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। বোম্বে (মুম্বাই) এবং মাদ্রাজ (চেন্নাই) ছাড়াও কলকাতার সবচেয়ে স্থায়ী ব্রিটিশ-যুগীয় সামরিক দুর্গগুলির মধ্যে একটি। দুর্গটি সত্তর হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। দুর্গটির নামকরণ করা হয়েছিল রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের নামে।দুর্গের সামনের ময়দানটি  দেশের বৃহত্তম পার্ক। আজ দুর্গটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্ব কমান্ডের সদর দপ্তর।

    ইতিহাস- দুটি ফোর্ট উইলিয়ামস রয়েছে। মূল দুর্গটি ১৬৯৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক স্যার জন গোল্ডসবারোর নির্দেশে নির্মিত হয়েছিল এবং এটি সম্পূর্ণ হতে এক দশক সময় লেগেছিল। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এই দুর্গটি নির্মাণের অনুমতি প্রদান করেছিলেন। স্যার চার্লস আয়ার হুগলি নদীর তীরে দক্ষিণ-পূর্ব ঘাঁটি এবং সংলগ্ন দেয়াল সহ নির্মাণ শুরু করেছিলেন। ১৭০০ সালে ভাইচরয় উইলিয়ামের নামে এর নামকরণ করা হয়েছিলো। আয়ারের উত্তরসূরী জন বিয়ার্ড ১৭০১ সালে উত্তর-পূর্ব ঘাঁটিটি যুক্ত করেন এবং ১৭০২ সালে দুর্গের কেন্দ্রে সরকারি ভবন নির্মাণ শুরু করেন। নির্মাণ কাজ ১৭০৬ সালে শেষ হয়।১৭৫৬ সালে, বাংলার নবাব সিরাজ উদ দৌলা দুর্গটি আক্রমণ করে অস্থায়ীভাবে শহরটি জয় করেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে আলীনগর রাখেন। এর ফলে ব্রিটিশরা ময়দানে একটি নতুন দুর্গ নির্মাণ করে। পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) পর ১৭৫৮ সালে রবার্ট ক্লাইভ দুর্গটি পুনর্নির্মাণ শুরু করেন; প্রায় দুই মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে ১৭৮১ সালে দুর্গটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। দুর্গের চারপাশের এলাকা পরিষ্কার করা হয় এবং অঞ্চলটি “কলকাতার ফুসফুস” হয়ে ওঠে। এটি উত্তর-দক্ষিণ দিকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং প্রায় ১ কিলোমিটার প্রশস্ত। ১৭৭৫ সালে ভারতীয় সমরাস্ত্র কারখানার সদর দপ্তর ফোর্ট উইলিয়ামে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

    সম্প্রতি  ফোর্ট উইলিয়াম ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পত্তি। পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সদর দপ্তর সেখানে অবস্থিত। দুর্গটিতে ১০,০০০ সেনা সদস্য থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। সেনাবাহিনী এটিকে কঠোরভাবে পাহারা দেয় এবং বেসামরিকদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ।

    ফোর্ট উইলিয়ামের বেশিরভাগ অংশ অপরিবর্তিত রয়েছে, তবে সেন্ট পিটার্স চার্চ, যা কলকাতার ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য একটি ধর্মযাজক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত, এখন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সদর দপ্তরের সৈন্যদের জন্য একটি গ্রন্থাগার। জমির একটি বড় অংশ ঘোষ এবং পালদের পরিবারের বাসস্থান।

    দুর্গের প্রবেশপথে একটি যুদ্ধ স্মারক তৈরি করা হয়েছে এবং দুর্গটিতে একটি জাদুঘরও রয়েছে যেখানে ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের নিদর্শন, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত নিদর্শনগুলি রয়েছে।

    ২০২৫ সালে মহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গ উপকূলে অবস্থিত প্রাচীনতম দুর্গের সম্মানে দুর্গটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় বিজয় দুর্গ। বাংলায় মারাঠা আক্রমণের কারণে বাঙালিদের সংবেদনশীলতা লক্ষ্য করে টাইমস অফ ইন্ডিয়া এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে। পত্রিকাটি পরামর্শ দেয় যে, এই নামকরণের ফলে মোদী সরকারের ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী ক্ষতি হতে পারে।ইন্ডিয়ান ম্যাসোনিক লজ হল ফ্রিম্যাসনসের একটি স্থানীয় শাখা বা শাখা, যা ভারতে দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী একটি ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন।

    কাঠামো- দুর্গটি ইট এবং মর্টার(মর্টার হল নির্মাণে ব্যবহৃত একটি বাঁধাই পেস্ট, যা সাধারণত সিমেন্ট, বালি এবং জলের মিশ্রণ এবং কখনও কখনও চুনের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি করা হয়।) দিয়ে তৈরি।দুর্গটি ৫ বর্গকিলোমিটার (১.৯ বর্গ মাইল) আয়তনের একটি অনিয়মিত অষ্টভুজের আকারে তৈরি। এর পাঁচটি দিক ভূমিমুখী(জমির দিকে মুথ বা উপকূল থেকে দূরে থাকা।) এবং তিনটি দিক হুগলি নদীর দিকে। নকশাটি একটি তারা দুর্গের মতো, যা কামানের ছোঁড়া কঠিন গুলির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য উপযুক্ত। দুর্গটি ঘিরে ৯ মিটার (৩০ ফুট) গভীর এবং ১৫ মিটার (৪৯ ফুট) প্রশস্ত একটি শুকনো পরিখা রয়েছে। দুর্গটিতে ছয়টি দরজা রয়েছে: চৌরঙ্গী, পলাশী, কলকাতা, ওয়াটার গেট, সেন্ট জর্জেস এবং ট্রেজারি গেট। কেরালার থালাসেরির মতো জায়গায় একই রকম দুর্গ রয়েছে।*

                                                    বারাবতী দুর্গ

    বারাবতী দুর্গ ৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার কটকে সোমবংশী (কেশরী) রাজবংশের মারাকত কেশরী কর্তৃক নির্মিত একটি দুর্গ। দুর্গের ধ্বংসাবশেষ পরিখা, দরজা এবং নয়তলা বিশিষ্ট প্রাসাদের মাটির ঢিবি এখনও অবশিষ্ট রয়েছে।

    অবস্থান- এই মধ্যযুগীয় দুর্গটি কটকের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৮ কিমি দূরে ২০°২৯′১.৩২″ উত্তর ৮৫°৫২′৩.৩৬″ পূর্ব অক্ষাংশে অবস্থিত।দুর্গটির  উত্তরে মহানদী নদী এবং দক্ষিণে মহানদীর শাখানদী  কাঠজোড়ি দ্বারা গঠিত ব-দ্বীপের মুখে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪.৬২ মিটার উপরে অবস্থিত।

    ইতিহাস- ৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে সোমবংশী বংশের শাসক মহারাজা মার্কট কেশরী কটককে রক্ষা করার জন্য একটি বারাবতী গ্রামে পাথরের বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন।বাঁধটি নির্মাণের পর গ্রামটি বারাবতী কটক নামে পরিচিত হয়েছিল।

    বরাবতী দুর্গ নির্মাণের তারিখ সম্পর্কে পণ্ডিতদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাসগ্রন্থ মাদলপাঞ্জিতে নিম্নরূপ একটি আকর্ষণীয় গল্প বর্ণিত আছে-

    পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজা তৃতীয় অনঙ্গভীম দেব তাঁর রাজধানী চৌদ্বারে (১২১১-১২৩৮ খ্রিস্টাব্দ) বাস করতেন। একদিন  রাজা মহানদী পার হয়ে দক্ষিণ দিকে বেড়াতে গিয়েছিলেন। এখানে তিনি লক্ষ্য করেন যে, কো-দণ্ড উপ-বিভাগের অন্তর্গত বারাবতী গ্রামে  দেবতা বিশ্বেশ্বরের নিকটে  একটি বগলা একটি বাজপাখির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দৃশ্যটি দেখে রাজা খুব অবাক হয়ে এক শুভ দিনে  তিনি সেখানে দুর্গ নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করেন। তখন এই গ্রামের নামকরণ হয় বারাবতী কটক। এরপর তিনি চৌদ্বার ত্যাগ করে কটকে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন।

    ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে শহরটি বাংলার কররানি(কররানী রাজবংশ ছিল বাংলা শাসনকারী শেষ স্বাধীন আফগান রাজবংশ, যা ১৫৬৪ থেকে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। রাজবংশটি তাজ খান কররানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত)দের হাতে চলে যায়, তারপর ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সাম্রাজ্যের হাতে এবং তারপর ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে মারাঠা সাম্রাজ্যের হাতে চলে যায়।১৮০৩ সালে কটক অবশিষ্ট ওড়িশার সাথে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ১৯১৯ সালে বাংলা-নাগপুর রেলপথ কটককে মাদ্রাজ (চেন্নাই) এবং কলকাতা (কলকাতা) এর সাথে সংযুক্ত করে। ১৯৩৬ সালে কটককে নবগঠিত ওড়িশা রাজ্যের রাজধানী করা হয়। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত কটক ওড়িষ্যার রাজধানী ছিল। পরে রাজধানী ভুবনেশ্বরে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৮৯ সালে কটক শহরটি তার অস্তিত্বের এক হাজার বছর পূর্ণ করে।

    মুসলিম এবং মারাঠাদের শাসনামলে  এটি ওড়িশার রাজধানী ছিল। ১৮০৩ সালের অক্টোবরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বারাবতী দুর্গ দখল করে এবং দেশের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত শাসককে এখানে বন্দী করে রাখার জন্য এটি একটি কারাগারে পরিণত হয়। ১৮০০ সালে কুজঙ্গার রাজা, ১৮১৮ সালে সুরগজার রাজা এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের এই দুর্গে কঠোরভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। এছাড়াও  ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে দুর্গটি ধ্বংস করার জন্য ভাঙচুর করা হয়েছিল।

    স্থাপত্য- দুর্গটি বর্গাকারে নির্মিত। এটি ১০২ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। দুর্গটির চারদিক, উত্তর ও পশ্চিম দিকে ১০ মিটার প্রস্থ এবং পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে ২০ মিটার প্রস্থের একটি পাথরের পাকা পরিখা দিয়ে ঘেরা। প্রবেশপথ ছাড়া পুরো দুর্গের প্রাচীর অনুপস্থিত। ১৯১৫ সাল থেকে  জাতীয় গুরুত্বের বিবেচনায়  ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কর্তৃক স্থানটিকে একটি সুরক্ষিত স্থান হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।

    দুর্গের কেন্দ্রে, পশ্চিম দিকে একটি ট্যাঙ্কসহ একটি উঁচু ঢিবি ছিল। এটি ১৫/১৬ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এখন স্থানটি ব্যাপকভাবে দখলের কবলে রয়েছে। ঢিবির পূর্ব দিকে শাহী মসজিদ এবং পুকুরের পশ্চিমে হযরত আলী বুখারীর মাজার অবস্থিত। ১৯৮৯ সালে ঐতিহাসিক দুর্গের সাংস্কৃতিক দিগন্ত নির্ণয়ের জন্য ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কর্তৃপক্ষ খননকাজ চালায় এবং খননকাজ কাজ এখনও চলছে। ১৯৮৯ সালের ১ ডিসেম্বর ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কর্তৃপক্ষ খননকালে খোন্দালাইট পাথর দিয়ে নির্মিত একটি বর্গাকার প্রাসাদের প্রমাণ পেয়েছে। প্রাসাদটি বালি এবং চুনের মিশ্রণ দিয়ে সাবধানে প্রস্তুত করা হয়েছিল। কাঠামোর পূর্ব দিকে খনন করা পরিখা থেকে ল্যাটেরাইট(লালচে কাদামাটি, শুকিয়ে গেলে শক্ত এবং কখনও কখনও নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হয়।) ব্লক দিয়ে তৈরি ৩২টি স্তম্ভ পাওয়া গেছে। স্তম্ভগুলি মোটামুটি বর্গাকার কিন্তু আকারে ভিন্ন ভিন্ন।

    ঢিবির উত্তর-পূর্ব কোণে একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। ঢিবির পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে খননকাজ চালিয়ে ল্যাটেরাইট ব্লক দিয়ে তৈরি একটি দুর্গ প্রাচীরের অস্তিত্ব     শহরের পশ্চিম অংশে মহানদীর ডান তীরে পুরাতন বারাবতী দুর্গের ধ্বংসাবশেষ অবস্থিত। দুর্গের অবশিষ্টাংশগুলি হল, একটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার এবং নয় তলা বিশিষ্ট প্রাসাদের মাটির ঢিবি। প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ থেকে জানা যায় যে দুর্গটি প্রায় আয়তাকার কাঠামোর ছিল, যার আয়তন ১০২ একর (০.৪১ বর্গকিলোমিটার) এরও বেশি ছিল এবং চারদিকে ল্যাটেরাইট এবং বেলেপাথরের দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত ছিল। ঢিবির পশ্চিমে একটি পুকুর রয়েছে। ঢিবির উত্তর-পূর্ব কোণে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। মন্দিরটি ল্যাটেরাইট ব্লকের ভিত্তির উপর সাদা বেলেপাথর দিয়ে তৈরি ছিল। এখন পর্যন্ত প্রায় চারশোটি ছাঁচনির্মাণের টুকরো এবং কিছু বিকৃত ভাস্কর্য উদ্ধার করা হয়েছে। গঙ্গা যুগের এই মন্দিরে ভগবান জগন্নাথের একটি পাথরের মূর্তি রয়েছে। ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের গভর্নর নবাব মুর্শিদকুলি খান কর্তৃক নির্মিত একটি মসজিদ এখনও বিদ্যমান।

    প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন- ১৯৮৯ সালে খননের সময়, দুর্গের কেন্দ্রীয় ঢিবি এলাকায় একটি প্রাসাদ, একটি প্যাভিলিয়ন এবং রোডোলাইট(রোডোলাইট হল বিভিন্ন ধরণের গারনেট, বিশেষ করে পাইরোপ এবং অ্যালমান্ডিন খনিজের মিশ্রণ।) দিয়ে তৈরি ব্লকের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। দক্ষিণাঞ্চলে নিয়মিত বিরতিতে চারটি সারিতে সারিবদ্ধ আঠারোটি বিশাল স্তম্ভের ভিত্তি উন্মোচিত হয়েছে।

    সুরক্ষিত দুর্গের সাংস্কৃতিক কালক্রম নিরূপনের জন্য ২০০৭ সালে স্থানটির খননও করা হয়েছিল। এই খননগুলিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন আবিষ্কারের মধ্যে ছিল- একটি উপবিষ্ট দেবী, সিংহ-মাথা, প্রদীপের টুকরো, পাথরের বল এবং পাত্রের টুকরো, গুলতি বল, পোড়ামাটির তৈরি পশুর মূর্তির টুকরো এবং লোহার তৈরি একটি লেখনী। মৃৎশিল্পের আবিষ্কারে মধ্যে ছিল, স্টোরেজ জার, স্পুটেড পাত্র, ল্যাম্প, নক করা ঢাকনা, ক্ষুদ্র পাত্র, থালা এবং বাটি, হুক্কার শেষ অংশ এবং চীনা চীনামাটির টুকরো প্রভৃতি।

    ১৬ বছরের ব্যবধানের পর, ২০২৩ সালে ওড়িশা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির মধ্যে সংযোগ খুঁজে বের করার জন্য খনন পুনরায় শুরু করা হয়েছিল।*

রায়গড় দুর্গ

    ভারতের মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলায় মাহাদ শহরে অবস্থিত রায়গড় হলো একটি পাহাড়ি দুর্গ। এটি দাক্ষিণাত্য মালভূমির অন্যতম শক্তিশালী দুর্গ এবং ঐতিহাসিকভাবে এটিকে রাইরি বা রাইরি দুর্গ নামে অভিহিত করা হত।

    মারাঠা শাসক ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ, তার প্রধান প্রকৌশলী হিরোজি ইন্দুলকরের সাথে, রায়গড় সহ বিভিন্ন ভবন এবং কাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করেছিলেন। ১৬৭৪ সালে, কোঙ্কণের মারাঠা রাজ্যের রাজা হওয়ার পর, শিবাজি মহারাজ রায়গড়কে তার হিন্দবী স্বরাজের রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

    সহ্যাদ্রি পর্বতমালার মধ্যে এর ভিত্তি থেকে ৮২০ মিটার (২,৭০০ ফুট) এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৩৫৬ মিটার (৪,৪৪৯ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত।  দুর্গ থেকে আশেপাশের এলাকার দৃশ্য চোখে পরে। দুর্গটিতে প্রায় ১,৫৫০ জন লোক বাস করত, যাদের গড়ে ৫ জন করে পরিবার ছিল। দুর্গে প্রবেশ করতে প্রায় ১,৭৩৭টি সিঁড়ি বেয়ে ওপড়ে উঠতে হয়। বিকল্পভাবে, বর্তমান দর্শনার্থীরা রায়গড় রোপওয়ে বেছে নিতে পারেন।এটি একটি আকাশযান ট্রামওয়ে, যা মাত্র চার মিনিটের মধ্যে ৭৫০ মিটার (২,৪৬০ ফুট) দৈর্ঘ্যে বিস্তৃত এবং মাটি থেকে ৪০০ মিটার (১,৩০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত দুর্গে পৌঁছে যেতে সাহায্য করে।

    প্রধান বৈশিষ্ট্য- দুর্গের প্রধান প্রাসাদটি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, যার মধ্যে কেবল ভিত্তিস্তম্ভগুলিই বর্তমান অবশিষ্ট রয়েছে। মূল দুর্গের ধ্বংসাবশেষে রানীর আবাসস্থল এবং ছয়টি কক্ষ রয়েছে।  প্রতিটি কক্ষের নিজস্ব বিশ্রামাগার রয়েছে। কক্ষগুলিতে কোনও জানালা নেই। এছাড়াও, প্রাসাদের সামনে তিনটি ওয়াচ টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, যার মধ্যে কেবল দুটি অবশিষ্ট রয়েছে, কারণ তৃতীয়টি বোমাবর্ষণের সময় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দুর্গটি গঙ্গা সাগর হ্রদ নামে পরিচিত একটি কৃত্রিম রয়েছে।

    “মহা দরজা” (বিশাল দরজা) হলো দুর্গে প্রবেশের একমাত্র প্রধান পথ। পূর্বে দরজাটি সূর্যাস্তের সময় বন্ধ ছিল। মহা দরজার উভয় পাশে দুটি বিশাল বুরুজ রয়েছে যা প্রায় ২০-২১ মিটার (৬৫-৭০ ফুট) উচ্চতাবিশিষ্ট। দুর্গের শীর্ষটি এই দরজার উপরে ১৮০ মিটার (৬০০ ফুট) উপরে অবস্থিত।

    রায়গড় দুর্গের ভেতরে অবস্থিত রাজার দরবারে  মূল সিংহাসনের একটি প্রতিরূপ রয়েছে। সিংহাসনটি পূর্ব দিকে নাগরখানা দরওয়াজা নামক প্রধান দরজার দিকে মুখ করে রয়েছে। এখানেই ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের রাজভিষেক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দরজাটি শব্দগতভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে দরজা থেকে সিংহাসনে পৌঁছানোর শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। দক্ষিণ দিকে মেনা দরওয়াজা নামে একটি গৌণ প্রবেশদ্বার ছিল। দরজাটি দুর্গের রাজকীয় মহিলাদের জন্য ব্যক্তিগত প্রবেশদ্বার ছিল। প্রবেশ পথটি রানীর আবাসস্থল পর্যন্ত প্রসারিত ছিলো। রাজা স্বয়ং উত্তর দিকে অবস্থিত পালখি দরওয়াজা ব্যবহার করতেন। পালখি দরওজার ডানদিকে তিনটি অন্ধকার এবং গভীর কক্ষের সারি রয়েছে। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে, এগুলি দুর্গের শস্যভাণ্ডার ছিল।

                দুর্গ থেকে  তকমাক টোক নামক মৃত্যুদণ্ডের স্থানটি দেখা যায়। সেখান থেকে দণ্ডিত বন্দীদের মৃত্যুদণ্ডের জন্য ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হত। এই এলাকাটি বর্তমান বেড়া দিয়ে ঘেরা।

    জগদীশ্বর মন্দিরের দিকে যাওয়ার মূল বাজার অ্যাভিনিউয়ের ধ্বংসাবশেষের সামনে শিবাজির একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। জগদীশ্বর মন্দিরে প্রবেশের প্রথম ধাপ হল ৩২টি মার্বেল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা।যার প্রথম ধাপে সর্দার হিরোজি ইন্দুলকরের নাম, তাঁর সমাধি এবং তাঁর কুকুর ওয়াঘ্যার সমাধি খোদাই করা আছে। হিরোজি ইন্দুলকর মারাঠা সম্রাট শিবাজির অধীনে ১৭ শতকের একজন স্থপতি ছিলেন।পাচাদ গ্রামের পাদদেশে শিবাজির মা রাজমাতা জিজাবাইয়ের সমাধি অবস্থিত। দুর্গের অতিরিক্ত আকর্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে, খুবলাধা বুরুজ, নানে দরজা এবং হাট্টি তালাভ (হাতির হ্রদ)। হেনরি অক্সিন্ডেন ১৬৭৪ সালের ১৩ মে থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত দুর্গে ছিলেন এবং তিনি উদ্ধৃত করেছেন- “আমরা সূর্যাস্তের কাছাকাছি সেই শক্তিশালী পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছেছিলাম, যা প্রকৃতির দ্বারা সৃষ্ট শিল্পের চেয়েও বেশি সুন্দর ছিলো। দুর্গটি দুটি সরু দরজা, একটি শক্তিশালী উঁচু প্রাচীর এবং তার সাথে বুরুজ দিয়ে সুরক্ষিত ছিলো। পাহাড়ের বাকি সমস্ত অংশ সরাসরি খাড়া ছিলো, ফলে দুর্ভেদ্য ছিলো। পাহাড়ে রাজার দরবারের মতো অনেক শক্তিশালী ভবন এবং অন্যান্য রাজ্যমন্ত্রীদের জন্য প্রায় ৩০০ জনের বাড়ি রয়েছে।পাহাড়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ মাইল। সেখানে কোনও মনোরম গাছ বা কোনও ধরণের শস্য জন্মায় না। আমাদের বাড়ি দুর্গ থেকে প্রায় এক মাইল দূরে ছিল, যেখানে আমরা খুব একটা সন্তুষ্ট না হয়ে অবসর সময় যাপন করছিলাম।”

    হিরকানি বুরুজ- দুর্গটিতে “হিরকানি বুরুজ” (হিরকানি ঘাঁটি) নামে একটি ঐতিহাসিক বুরুজ রয়েছে যা একটি বিশাল খাড়া পাহাড়ের উপরে নির্মিত। কিংবদন্তি অনুসারে, “পাশের একটি গ্রামের হিরকানি নামে একজন দুধওয়ালা দুর্গে বসবাসকারী লোকদের কাছে দুধ বিক্রি করতে এসেছিলেন। সূর্যাস্তের সময় দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় তিনি দুর্গের ভিতরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। দুর্গ থেকে শিশুপুত্রের কান্না শুনে, উদ্বিগ্ন মা ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে সাহসের সাথে তার ছোট্ট সন্তানের ভালোবাসার জন্য অন্ধকারে খাড়া পাহাড় বেয়ে নেমে আসেন। পরে তিনি শিবাজির সামনে এই অসাধারণ কৃতিত্বের কথা বর্ণনা করেন। সাহসিকতার জন্য শিবাজি তাঁকে পুরস্কৃত করেন। এটি দুর্গের সুরক্ষার জন্য একটি সম্ভাব্য ফাঁক ছিল। সেজন্য শিবাজি পাহাড়ের উপরে একটি বুরুজ তৈরি করেন এবং দুধওয়ালার নামে এর নামকরণ করেন হিরকানি বুরুজ।

    ঘটনা- ছত্রপতি শিবাজির পোষা কুকুরের মূর্তিটি ২০১২ সালের জুলাই মাসে সংভাজি ব্রিগেডের সদস্যরা প্রতিবাদ করে সরিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু শিবাজি রায়গড় স্মারক সমিতি, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, ভাস্কর রামভাউ পারখি এবং জেলা প্রশাসন কর্তৃক কুকুরের মূর্তিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল।

    রোপওয়ে- “রায়গড় রোপওয়ে” হল একটি রোপওয়ে যা দুর্গে যাত্রী পরিবহনের ব্যবহৃত হয়। রোপওয়ের আগে রায়গড় দুর্গে ওঠার জন্য একমাত্র হাঁটা পথ ছিল এবং হেঁটে ওপড়ে উঠতে এক ঘন্টা সময় লাগত। রোপওয়ে এই স্থানটিকে যাতায়াতের তুলনামূলকভাবে অধিক সহজতর করে তুলেছে। রায়গড় রোপওয়ে প্রকল্পটি অলাভজনক প্রচেষ্টা, যা ভারতে এই ধরণের একমাত্র প্রকল্প। এই সুবিধাটি শ্রী শিবাজি রায়গড় স্মারক মণ্ডল, (SSRSM) পুনের মালিকানাধীন। নির্মাণ কাজ ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে শুরু হয়ে ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে সম্পন্ন হয়। প্রকল্পটি উদ্বোধন করেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সরসঙ্ঘচালক অধ্যাপক রাজেন্দ্র সিং। আরোহণ ৪২০ মিটার এবং দড়ির দৈর্ঘ্য ৭৬০ মিটার। মোটর ক্ষমতা ৫২.২২ কিলোওয়াট এবং প্রতিটি কেবিনের ওজন ১০০ কেজি।

    রোপওয়ে জাদুঘর- রোপওয়ে প্রকল্পটিতে একটি জাদুঘর রয়েছে যা বাবাসাহেব পুরন্দরে এবং নিনাদ বেদেকর দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।

    জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে- ‘দ্য সিক্রেট অফ দ্য শিলেদারস’ ওয়েব সিরিজের অনেক দৃশ্য রায়গড় দুর্গে শুটিং করা হয়েছিল।২০২৫ সালের হিন্দি ছবি ‘ছাওয়া’-এর কিছু দৃশ্য রায়গড়ের লোকেশনে শুটিং করা হয়েছিল।*

সলিমগড় দুর্গ

    সলিমগড় দুর্গ (যা সেলিমের দুর্গ নামেও পরিচিত) ১৫৪৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত একটি দ্বীপে শের শাহ সুরির পুত্র সেলিম শাহ সুরি দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। দুর্গটি এমন এক সময়ে নির্মিত হয়েছিল যখন মুঘল সাম্রাজ্য সাময়িকভাবে উৎখাত হয়েছিল। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে শের শাহ সুরি মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে দিল্লিতে সুর সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুরি রাজবংশের শাসন ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। হুমায়ুন ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে সুরি রাজবংশের শেষ শাসক সিকান্দার সুরিকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন।

    মুঘল আমলে, বিশেষ করে পরবর্তী বছরগুলিতে, সলিমগড় দুর্গ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লাল দুর্গ এবং শাহজাহানবাদ শহর নির্মাণের সময় সম্রাট শাহজাহানসহ বেশ কয়েকজন মুঘল শাসক- যিনি ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহানবাদ শহরের নির্মাণ কার্য সম্পন্ন করেছিলেন। বলা হয় যে, দিল্লি পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযান শুরু করার আগে হুমায়ুন তিন দিন সেখানে তাঁবু গেড়ে ছিলেন।

    মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব পরে দুর্গটিকে কারাগারে রূপান্তরিত করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশরা দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এই রীতি অব্যাহত রেখেছিল। সলিমগড় দুর্গ এখন লাল কেল্লা কমপ্লেক্সের অংশ। ২০০৭ সালে এই কমপ্লেক্সটিকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ(ASI) এর সংরক্ষণের জন্য সুপরিকল্পিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।

    দুর্গ নির্মাণের জন্য নির্বাচিত স্থানটি দিল্লির সমভূমিতে অবস্থিত ছিলো । যার উচ্চতা ৮০-১১০ ফুট (২৪-৩৪ মিটার) এর মধ্যে ছিল। একদিকে যমুনা নদী এবং অন্যদিকে আরাবল্লী পর্বতমালার উত্তরের ঢাল দ্বারা বেষ্টিত ছিলো। দুর্গস্থলে উন্মুক্ত শিলাস্তর, উত্তর-পূর্ব দিকের শৈলশিরার সান্নিধ্য এবং জামা মসজিদের সাথে সারিবদ্ধতাসহ এই ভূ-প্রকৃতিকে যমুনার ক্ষয় থেকে রক্ষা করার জন্য আদর্শ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিলো। তদুপরি, একদিকে নদী এবং অন্যদিকে পাহাড়ি শৈলের সংমিশ্রণ এটিকে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক বাধা প্রদান করে। ফলে যেকোনো আক্রমণকারী বাহিনীকে নদীর গতিপথ অনুসরণ করতে বাধ্য করে। এই কৌশলগত সুবিধাগুলি বিবেচনা করে, ১৫৪৬ সালে সলিমগড় দুর্গ নির্মিত হয়েছিলো।

    সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের পর  হুমায়ুন সলিমগড় দুর্গের নাম পরিবর্তন করে নুরঘর রেখেছিলেন। কারণ শের শাহ সুরি- সুর সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং দুর্গটি নির্মাণকারী সেলিম শাহ সুরির পিতা ছিলেন। ফলস্বরূপ, হুমায়ুন আদেশ দেন যে, দুর্গের আসল নাম যেন তার দরবারে ব্যবহার করা না হয়।

    ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহ, যে বিদ্রোহকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে দমন করা হয়েছিল, এই দুর্গে উল্লেখযোগ্য কার্যকলাপ শুরু করেছিলো। শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে হুমায়ুনের সমাধিতে বন্দী করা হয়েছিল। বিদ্রোহের সময় সলিমগড় দুর্গ যুদ্ধকালীন অভিযানের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ব্রিটিশ দৃষ্টিকোণ থেকে, বিদ্রোহী সৈন্যদের সাথে বাহাদুর শাহ জাফরের সহযোগিতা স্পষ্ট ছিল। বলা হয় যে, তিনি এই দুর্গ থেকে সৈন্য পরিচালনা করেছিলেন এবং ১৮৫৭ সালের আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের গোড়ার দিকে যুদ্ধ কৌশল নিয়ে আলোচনা করার জন্য এখানে সভা আহ্বান করেছিলেন। তিনি দুর্গের প্রাচীর থেকে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কামানের গোলাবর্ষণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন বলে জানা গেছে।

    একবার  সেনা কর্মকর্তারা তাদের বেতন চেয়ে অনুরোধ করলে, তিনি তার মুকুটের রত্ন বন্ধক রাখার এবং এমনকি এই উদ্দেশ্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করার প্রস্তাব দিয়ে একটি প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি করেছিলেন। কর্মকর্তারা সম্রাটের আন্তরিকতার উপর আস্থা রেখে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরবর্তীকালে  ঘোষণা জারি করা হয়েছিল যে, সম্রাট ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করবেন এবং সকল বর্ণ ও ধর্মের মানুষকে প্রতিরোধে যোগদানের আহ্বান জানাবেন।

    ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে, ব্রিটিশ সৈন্যরা দুর্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সেই সময়, বাহাদুর শাহের বিশ্বস্ত সহযোগী, বখত খান তাকে পিছু হটতে এবং খোলা গ্রাম্য অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে, সম্রাট পালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি তার বাহিনীকে সরে যাওয়ার অনুমতি দিলেও, তিনি নিজেই হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ চতুর্থ পদাতিক বাহিনী অবশেষে একটি একক প্রবেশপথ দিয়ে সলিমগড় দুর্গে প্রবেশ করে। পাঞ্জাব চতুর্থ পদাতিক রেজিমেন্ট এর আগে লাহোর গেট দিয়ে লাল দুর্গে প্রবেশ করেছিল।

    বিদ্রোহ দমনের পর  ব্রিটিশরা প্রথমে সলিমগড় দুর্গকে একটি সামরিক শিবির হিসেবে ব্যবহার করেছিলো। ১৯৪৫ সাল থেকে, ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর (আইএনএ) বন্দীদের রাখার জন্যও এটিকে একটি কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো।

    বিন্যাস- সলিমগড় দুর্গের ত্রিভুজাকার বিন্যাস রয়েছে। দুর্গের পুরু দেয়ালগুলি ধ্বংসস্তূপের পাথর(ধ্বংসস্তূপের গাঁথনি হল এক ধরণের পাথরের কাজ যা দেয়াল এবং অন্যান্য কাঠামো তৈরিতে মোটামুটি আকৃতির, অনিয়মিত পাথর ব্যবহার করা হয়।) দিয়ে তৈরি। দুর্গটিতে বৃত্তাকার বুরুজ রয়েছে এবং নির্মাণের পর থেকে একাধিক মেরামত ও পুনরুদ্ধারের ধাপ অতিক্রম করা হয়েছে।

    একটি খিলান সেতু(খিলান সেতু হল এমন একটি সেতু যা একটি বাঁকা খিলান কাঠামো যা নিজস্ব ওজন এবং বহনকারী যেকোনো যানবাহন বা বোঝার ওজন বহন করে।) দুর্গটিকে এর উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত লাল দুর্গের সাথে সংযুক্ত করেছে। এই সেতুটি বাহাদুর শাহ জাফরের রাজত্বকালে নির্মিত হয়েছিল এবং এই স্থানে অবস্থিত গেটটি বাহাদুর শাহ গেট নামে পরিচিত। গেটটি মূলত ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি, যেখানে লাল বেলেপাথরের ব্যবহারও ছিল।

    ব্রিটিশ শাসনামলে, পূর্ববর্তী একটি সেতু ভেঙে ফেলে এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে একটি রেললাইন স্থাপন করা হয়েছিল। এই নির্মাণটি লাল দুর্গ থেকে সলিমগড় দুর্গকে বিভক্ত করেছিল এবং পরবর্তীকালে এই কার্য অসংবেদনশীল এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ক্ষতিকারক বলে বিবেচিত হয়েছিল। বলতে গেলে রেললাইনটি দুর্গটিকে কার্যকরভাবে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল।

    কারাগার হিসেবে ব্যবহার– আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে, সলিমগড় দুর্গকে সর্বপ্রথম কারাগারে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। আওরঙ্গজেব তাঁর ভাই মুরাদ বক্সকে এই দুর্গে বন্দী করে রেখেছিলেন।– মুরাদ বক্স তাঁদের বড় ভাই দারা শিকোহের বিরুদ্ধে সংঘাতে আওরঙ্গজেবকে সমর্থন করেছিলেন। মদ্যপানের পর ঘুমন্ত অবস্থায় মথুরায় মুরাদ বক্সকে বন্দী করা হয়েছিল বলে জানা যায়। “ইসলামের মৌলিক নীতি ত্যাগ করার জন্য”তাঁকে বন্দি করা হয়েছিলো বলে কারাবাসের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিলো। পরে তাঁকে গোয়ালিয়রে স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো।

    এছাড়াও বলা হয়, যে আওরঙ্গজেব তাঁর বড় মেয়ে জেবুন্নিসাকে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ২১ বছর ধরে সলিমগড় দুর্গে বন্দী করে রেখেছিলেন। জেবুন্নিসা কবিতা এবং সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। এদিকে আওরঙ্গজেব গোঁড়া এবং কঠোরভাবে ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন। এই আদর্শগত মতানৈক্যর জন্যই জেবুন্নিসাকে আটক রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়। সম্রাটের অনুগ্রহ হারিয়ে ফেলা তাঁর ভাই মুহাম্মদ আকবরের প্রতি তাঁর সহানুভূতিও তাঁর কারাবাসে অবদান রেখেছিল বলেও মনে করা হয়।

    ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের পর, ব্রিটিশরা শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে হুমায়ুনের সমাধিতে বন্দী করার পর এই দুর্গে কিছু সময়ের জন্য আটক করে রেখেছিলেন। পরে তাকে বার্মার রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়েছিলো। রাজনৈতিক বন্দীদের আটক করার জন্য এটি ব্যবহারের কারণে, দুর্গটিকে প্রায়শই ইংল্যান্ডের টাওয়ার অফ লন্ডনের সাথে তুলনা করা হয়, যেখানে অনেক রাজ্ বন্দীকে বন্দী করে রাখা হত এবং কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হত বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত।

    ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের আগে  সলিমগড় দুর্গ আবার কারাগার হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিলো। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত, ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর (আইএনএ) বন্দীদের এখানে রাখা হয়েছিলো। কারাগারে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের স্বীকৃতিস্বরূপ, দুর্গটির নামকরণ করা হয়েছে স্বাধীনতা সেনানী স্মারক (মুক্তিযোদ্ধাদের) স্মৃতিস্তম্ভ।

    দুর্গের সাথে সম্পর্কিত বেশ কিছু কিংবদন্তিও রয়েছে, বিশেষ করে অলৌকিক কার্যকলাপ সম্পর্কিত। সেই সুপরিচিত গল্পগুলির মধ্যে একটি হল, জেবুন্নিসার আত্মা, কালো পোশাক পরিধান করে,  চাঁদনী রাতে এখানে কবিতা আবৃতি করতেন। আরেকটি গল্পে, এই এলাকায় কান্নাকাটির শব্দ এবং আর্তনাদ শোনা যায় বলে বিশ্বাস করা হয়। এগুলি আইএনএ সৈন্যদের শব্দ, যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল এবং বন্দী অবস্থায় মারা গিয়েছিল। এই আখ্যানগুলি ভারতের ইতিহাসে মুঘল এবং ব্রিটিশ যুগের মধ্যে দুর্গের প্রতীকী সংযোগে অবদান রেখেছে।

    দুর্গ সংরক্ষণ ব্যবস্থা- ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সলিমগড় দুর্গটি ধারাবাহিকভাবে সামরিক বাহিনীর দখলে ছিল। প্রাথমিকভাবে, এটি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাঁরা দুর্গটিতে আর্টিলারি ইউনিট স্থাপন করেছিল এবং দুর্গটিকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভের পর  দুর্গটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। বছরের পর বছর ধরে  ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) সহ আরও বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থাও এর রক্ষণাবেক্ষণের সাথে জড়িত ছিল।

    ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সলিমগড় দুর্গটি ধারাবাহিকভাবে সামরিক বাহিনীর দখলে ছিল। প্রাথমিকভাবে, এটি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, যারা আর্টিলারি ইউনিট স্থাপন করেছিল এবং দুর্গটিকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভের পর, দুর্গটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। বছরের পর বছর ধরে, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) সহ আরও বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থাও এর রক্ষণাবেক্ষণে জড়িত ছিল।

    এই ওভারল্যাপিং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ASI-এর জন্য অসুবিধা তৈরি করেছিল, বিশেষ করে যখন তারা ১৯৯২ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় দুর্গের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করার জন্য ইউনেস্কোর কাছে গিয়েছিলো। সম্পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অভাবের কারণে  ASI-কে তার আবেদন প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। পরিস্থিতি সলিমগড় দুর্গ, লাল দুর্গ এবং লাল দুর্গ কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভগুলির কার্যকর সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল।

    এএসআই আদালতে একটি হলফনামা দাখিল করে বলেছে: “যতক্ষণ না দুর্গের এই অংশগুলি সম্পূর্ণরূপে খালি করে এএসআই-এর কাছে হস্তান্তর করা না হয় এবং ইতিমধ্যেই যে ক্ষতি হয়েছে তার যথাযথ মূল্যায়ন না করা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত দুর্গ রক্ষণাবেক্ষণ করা অসম্ভব।” এএসআই আরও বলেছে যে, ভারত সরকারের পর্যটন মন্ত্রণালয়, পূর্ণ দায়িত্ব হস্তান্তর এবং পুনরুদ্ধারের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরে  বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদার জন্য ইউনেস্কোর কাছে পুনরায় আবেদন করবে।

    ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে, ভারতীয় সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এএসআই-এর কাছে দুর্গটি হস্তান্তর করে এবং পরবর্তীতে  ২০০৬ সালে  এএসআই বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্তির জন্য একটি নতুন প্রস্তাব জমা দেয়। বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি ২০০৭ সালের ২৩ থেকে ২৭ জুন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে অনুষ্ঠিত তার অধিবেশনে ভারত সরকারের অনুরোধ অনুমোদন করে। পরে ASI কর্তৃক জারি করা একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে:

    বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্তির পর ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে  ASI স্থানটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের বিশদ মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করে একটি খসড়া সমন্বিত সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (CCMP) প্রস্তুত করেছিলো। এই পরিকল্পনায় পূর্বে দুর্গের মধ্যে পরিচালিত বিভিন্ন বিভাগ এবং সংস্থার ভূমিকা এবং দায়িত্বগুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি লাল কেল্লাকে সলিমগড় দুর্গের সাথে সংযুক্ত ঐতিহাসিক সেতুটি পুনরুদ্ধারেরও প্রস্তাব করেছিল, যা মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের মধ্যে একটি সংযোগ হিসাবে এর প্রতীকী মূল্যকে স্বীকৃতি দেয়।

    CCMP-এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এবং এর প্রস্তাবগুলির অগ্রাধিকার নির্ধারণের অপেক্ষায়  ASI বেশ কয়েকটি পুনরুদ্ধার কাজ শুরু করে। এর মধ্যে লাল কেল্লায় ২৭.৫ মিলিয়ন (প্রায় 0.55 মিলিয়ন মার্কিন ডলার) আনুমানিক ব্যয়ে এবং সলিমগড় দুর্গে ৮ মিলিয়ন (প্রায় 160,000 মার্কিন ডলার) ব্যয়ে সংরক্ষণের প্রচেষ্টা অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার লক্ষ্য ছিল ২০১০ কমনওয়েলথ গেমসের আগে কাজগুলি সম্পন্ন করা।

    জাদুঘর- লাল কেল্লা কমপ্লেক্সের সলিমগড় দুর্গ প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত স্বাধীন সংগ্রাম জাদুঘর (স্বাধীনতা সংগ্রামের জাদুঘর) জনসাধারণের জন্য ২রা অক্টোবর ১৯৯৫ তারিখে উন্মুক্ত করা হয়েছে। এই স্থানটি ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর (আইএনএ) সদস্যদের জন্য কারাগার হিসেবে ব্যবহার করত বলে এই স্থানটি স্বাধীন সংগ্রাম জাদুঘর হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। জানা গেছে, অনেক আইএনএ বন্দী দুর্গের জেল প্রাঙ্গণেই মারা গিয়েছিলেন।

    জাদুঘরের অবস্থানের প্রাথমিক শনাক্তকরণ কর্নেল গুরবকশ সিং ধিলনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছিল। কর্নেল গুরবকশ সিং ধিলন ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশরা যেখানে রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য আইএনএ বিচার পরিচালনা করেছিল সেই এলাকাটি শনাক্ত করেছিলেন। তবে, জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর  কর্নেল ধিলন পরে স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, বিচারের আসল স্থানটি বিদ্যমান জাদুঘর সংলগ্ন একটি ভিন্ন ভবনে ছিল।

    ২০০৭ সালে, ভারতের স্বাধীনতার ৬০তম বছর উপলক্ষে, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (এএসআই) জাদুঘরটিকে এই নতুন চিহ্নিত স্থানে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। উন্নত জাদুঘরে নতুন গ্যালারির জন্য আরও নথি, বিদ্যমান কাঠামোর জন্য আরও ভালো আলোর প্যানেলিং অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

    এই উপলক্ষে, মহাত্মা গান্ধীর উপর একটি নতুন বিভাগ খোলারও প্রস্তাব করা হয়েছিল, যেখানে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং লবণ সত্যাগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

    প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পর, সলিমগড় দুর্গের প্রাঙ্গণ এবং জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্য, ASI লাল কেল্লার প্রবেশপথে পর্যটক গাইড চালু করেছে, যাতে দর্শনার্থীরা সহজে সলিমগড় দুর্গে যেতে পারেন। দুর্গটি পূর্বে লাল কেল্লার তুলনায় তুলনামূলকভাবে অজানা ছিল। লাল কেল্লার গেট থেকে জাদুঘর পর্যন্ত দীর্ঘ হাঁটা পথের জন্য আগে সলিমগড় দুর্গ দর্শনে জনসাধারণকে আগ্রহকে নিরুৎসাহিত করেছিল। উন্নত সাইনবোর্ড এবং নির্দেশিত ট্যুরে গাইডের মাধ্যমে এই অসুবিধা বর্তমান মোকাবেলা করা হচ্ছে।

    প্রাথমিক বছরগুলিতে, সলিমগড় দুর্গে কেবল নৌকা যোগে যাতায়াত করা যেত। লাল কেল্লা এবং সলিমগড় দুর্গের মধ্যে সংযোগকারী একটি সেতু শাহজাহানের পিতা সম্রাট জাহাঙ্গীর নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। এই মূল সেতুটির স্থানে পরে একটি রেল সেতু প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিল। বর্তমানে  একটি খিলানযুক্ত ওভারব্রিজ উত্তর-পূর্ব প্রান্ত থেকে সলিমগড় দুর্গকে লাল কেল্লার সাথে সংযুক্ত করেছে। এই খিলানযুক্ত ওভারব্রিজ থেকে সলিমগড় দুর্গ, লাল কেল্লা, যমুনা নদী এবং আশেপাশের অঞ্চলের দুর্দান্ত দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

    তবে, কমপ্লেক্সের চারপাশের ধমনী রাস্তাগুলিতে ভারী যানবাহনের ক্রমাগত চলাচল এবং কাছাকাছি অবস্থিত যমুনা নদীর স্টিলের সেতুর উপর দিয়ে ক্রমাগত যানবাহন চলাচলের কারণে এই অঞ্চলটি প্রায়শই কোলাহলপূর্ণ থাকে। পূর্ব ভারত রেলপথটি সলিমগড় দুর্গের মধ্য দিয়ে দিল্লি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছিল। রেলপথটি দুর্গ কাঠামোর কিছু অংশের উপর দিয়ে গিয়েছিল এবং পরে রাজপুতানা রেলপথের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য রেলপথটি সম্প্রসারিত করা হয়েছিল।*

 রন্থাম্ভোর দুর্গ

    রন্থাম্ভোর দুর্গটি ভারতের রাজস্থানের সোয়াই মাধোপুর জেলার সোয়াই মাধোপুর শহরের কাছে রন্থাম্ভোর জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অবস্থিত। ভারতের স্বাধীনতার সময় পর্যন্ত এই উদ্যানটি জয়পুরের মহারাজাদের শিকারের ক্ষেত্র ছিল। এটি একটি শক্তিশালী দুর্গ যা রাজস্থানের ঐতিহাসিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। দুর্গটি রন্থাম্ভোর জাতীয় উদ্যানের চারপাশের মনোরম দৃশ্য প্রদান করে এবং বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ।

    পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মহারাজা জয়ন্ত যাদব রন্থাম্ভোর দুর্গের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরী রাজারা দুর্গ নির্মাণে অবদান রেখেছিলেন। সেই সময়ে রন্থাম্ভোর দুর্গকে এর কৌশলগত উন্নয়ন এবং নকশার কারণে দুর্ভেদ্য বলে মনে করা হত। অনেক শাসকের রন্থাম্ভোর দুর্গ দখলের আগ্রহ প্রকাশ করার অনেক কারণের মধ্যে এটি একটি কারণ ছিলো। পরবর্তীকালে  দুর্গটি দিল্লির মুসলিম শাসকদের দ্বারা দখল করা হয় এবং পরে হাদা (হাদা রাজবংশ, যা হাদোতি নামেও পরিচিত  ছিল, চৌহান রাজপুতদের একটি শাখা, যারা ভারতের রাজস্থানের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে শাসন করতেন।) এবং মেওয়ারসহ আরও বেশ কয়েকটি রাজবংশ দ্বারা দুর্গটি দখল করা হয়েছিলো। দিল্লি সুলতানাত অল্প সময়ের জন্য দুর্গটি দখল করেছিলো। পরবর্তীতে  এটি মারওয়ার এবং মুঘলদের নিয়ন্ত্রণে এসেছিলো।

    দুর্গটি পার্শ্ববর্তী সমভূমি থেকে ৭০০ ফুট উপরে একটি কৌশলগত অবস্থানে ছিল। ২০১৩ সালে কম্বোডিয়ার নমপেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৩৭তম অধিবেশনে, রাজস্থানের ৫টি দুর্গের সাথে রন্থাম্ভোর দুর্গকে রাজস্থানের পাহাড়ি দুর্গগুলির অধীনে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

        ইতিহাস- দুর্গটি পঞ্চম শতাব্দীতে মহারাজা জয়ন্ত যাদব দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে পৃথ্বীরাজ চৌহান কর্তৃক তাঁদের বহিষ্কার না করা পর্যন্ত দুর্গটির উপরে তাঁদের শাসন করেছিল।

    চৌহান ক্ষত্রিয়দের অধীনে- দুর্গটির পূর্বের নাম ছিল রণস্তম্ভপুর (সংস্কৃত: Raṇa-sthaṃba-pura, “যুদ্ধক্ষেত্রের শহর)। দ্বাদশ শতাব্দীতে চাহামান (চৌহান) রাজবংশের প্রথম শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহানের রাজত্বকালে এটি জৈন ধর্মের সাথে যুক্ত ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে বসবাসকারী সিদ্ধসেনাসুরি এই স্থানটিকে পবিত্র জৈন তীর্থের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। মুঘল আমলে, দুর্গে মল্লিনাথের একটি মন্দির নির্মিত হয়েছিল। ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় পৃথ্বীরাজ (পৃথ্বীরাজ চৌহান) এর পরাজয়ের পর, দুর্গটি ঘোরের মুসলিম ঘোরি শাসক মুহাম্মদ ঘোরির নিয়ন্ত্রণে এসেছিলো।

    ১২২৬ সালে দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিশ রন্থাম্ভোর দুর্গ দখল করেন, কিন্তু ১২৩৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর চৌহানরা এটি পুনরায় দখল করেন। ভবিষ্যৎ সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবনের নেতৃত্বে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদের সেনাবাহিনী ১২৪৮ এবং ১২৫৩ সালে দুর্গটি অবরোধ করে দখল করতে ব্যর্থ হয়, কিন্তু ১২৫৯ সালে জয়ত্রসিংহ চৌহানের কাছ থেকে গিয়াস উদ্দিন বলবন দুর্গটি দখল করে। শক্তি দেব ১২৮৩ সালে জয়ত্রসিংহের স্থলাভিষিক্ত হন এবং রন্থাথম্ভোর দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন। সুলতান জালাল উদ্দিন ফিরুজ খিলজি ১২৯০-৯১ সালে দুর্গটি অবরোধ করেন, কিন্তু তিনি দুর্গটি দখল করতে ব্যর্থ হন। ১২৯৯ সালে  আলাউদ্দিন খিলজির বিদ্রোহী সেনাপতি মুহাম্মদ শাহকে হাম্মীরদেব আশ্রয় দেন এবং তাঁকে সুলতানের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ১৩০১ সালে আলাউদ্দিন খিলজি দুর্গটি অবরোধ করে হাম্মীরদেবকে পরাজয় করে দুর্গটি দখল করেন।

    মেওয়ারের অধীনে- মেওয়ারের বিভিন্ন রাজা দুর্গটি দখল করেছিলেন। রন্থাম্ভোর দুর্গটি রানা হামির সিং (১৩২৬-১৩৬৪), রানা কুম্ভ (১৪৩৩-১৪৬৮) এবং রানা সাঙ্গা (১৫০৮-১৫২৮) এর সরাসরি শাসনাধীন ছিল।

    হাদাসদের অধীনে- রানা উদয় সিং প্রথমের রাজত্বকালে (১৪৬৮-১৪৭৩) দুর্গটি বুন্দির হাদা রাজপুতদের হাতে চলে যায়। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ ১৫৩২ থেকে ১৫৩৫ সাল পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দুর্গটি দখল করেন। মুঘল সম্রাট আকবর রন্থাম্ভোর অবরোধের সময় (১৫৬৮) হাদাসদের কাছ থেকে দুর্গটি দখল করেন।

    জয়পুরের অধীনে- সপ্তদশ শতাব্দীতে দুর্গটি জয়পুরের কচওয়াহা মহারাজাদের অধীনে চলে যায় এবং ভারতের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এটি জয়পুর রাজ্যের অধীনে ছিল। দুর্গের আশেপাশের অঞ্চল জয়পুরের মহারাজাদের জন্য একটি শিকারভূমিতে পরিণত হয়েছিল। জয়পুর রাজ্য ১৯৪৯ সালে ভারতে যোগদান করে এবং ১৯৫০ সালে রাজস্থান রাজ্যের অংশ হয়ে ওঠে।

    মন্দির- রন্থাম্ভোর দুর্গের ভেতরে দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লাল করাউলি পাথর(লাল কারাউলি পাথর বেলেপাথর নামেও পরিচিত, এটি মূলত ভারতের রাজস্থানের কারাউলি জেলায় পাওয়া যায়।) দিয়ে নির্মিত গণেশ (ত্রিনেত্র গণেশ), শিব এবং রামলালাজির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত তিনটি হিন্দু মন্দির রয়েছে। গণেশ মন্দিরটি বিশেষভাবে বিখ্যাত এবং প্রতি বুধবার হাজার হাজার দর্শনার্থী দর্শনের জন্য আসেন। এছাড়াও এখানে ভগবান সুমতিনাথ (৫ম জৈন তীর্থঙ্কর) এবং ভগবান সম্ভাবনাথের একটি জৈন মন্দির রয়েছে।

    কাছাকাছি আকর্ষণ- নিচে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ আকর্ষণ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়, কারণ এই প্রকল্প বাঘ সুরক্ষিত এলাকার অধীনে পড়ে। এটি কেবল বন্যপ্রাণী সাফারির জন্য অনুমোদিত এবং বুক করা যানবাহন(জিপ সাফারি, ক্যান্টার সাফারি এবং হাতি সাফারি সহ বিভিন্ন পার্ক এবং অভিজ্ঞতার জন্য বন্যপ্রাণী সাফারি বুক করা যেতে পারে।) থেকে দর্শন করা যায়।

জলের প্রবেশদ্বার-

কাচিদা উপত্যকা

সুরওয়াল লেক

সিতলা মাতা

পিকনিক স্পট

মালিক তালাও

বন্য জীবন

বকুলা

লাকর্দা ও অনন্তপুরা

রাজবাগ তালাও

রন্থাম্ভোর জাতীয় উদ্যান

ঐতিহাসিক স্থান

যোগী মহল

পদম তালাও

রাজ বাগ ধ্বংসাবশেষ

রন্থাম্ভোর দুর্গ

রন্থাম্ভোর স্কুল অফ আর্ট

গণেশ মন্দির

জৈন মন্দির।*

 

দৌলতাবাদ দুর্গ

    দৌলতাবাদ দুর্গ, মূলত দেওগিরি দুর্গ, ভারতের মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজি নগরের নিকটে দৌলতাবাদ গ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক সুরক্ষিত দুর্গ। এটি যাদবদের রাজধানী (৯ম শতাব্দী- ১৪শ শতাব্দী)  কিছু সময়ের জন্য দিল্লি সালতানাতের রাজধানী (১৩২৭-১৩৩৪) এবং পরে আহমেদনগর সালতানাতের (১৪৯৯-১৬৩৬) একটি গৌণ রাজধানী ছিল।

    ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে, দেবগিরি বর্তমান সম্ভাজিনগরের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমি শহর হিসেবে গড়ে উঠে। পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের দিকে যাওয়া কাফেলার পথ বরাবর শহরটি অবস্থিত ছিলো। শহরের ঐতিহাসিক ত্রিভুজাকার দুর্গটি প্রাথমিকভাবে ১১৮৭ সালের দিকে প্রথম যাদব রাজা  ভিল্লাম পঞ্চম দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।১৩০৮ সালে শহরটি দিল্লি সালতানাতের আলাউদ্দিন খিলজি দ্বারা অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। আলাউদ্দিন খিলজি উত্তর ভারতের কিছু অংশ শাসন করেছিল। ১৩২৭ সালে  দিল্লি সালতানাতের মুহাম্মদ বিন তুঘলক দেবগিরির নাম পরিবর্তন করে দৌলতাবাদ রাখেন এবং তার রাজকীয় রাজধানী দিল্লি থেকে দেবগিরি শহরে স্থানান্তরিত করেন। যার ফলে দিল্লির জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে দৌলতাবাদে স্থানান্তরিত হয়। যাইহোক, মুহাম্মদ বিন তুঘলক ১৩৩৪ সালে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং দিল্লি সালতানাতের রাজধানী দিল্লিতে ফিরিয়ে আনেন।

    ১৪৯৯ সালে, দেবগিরি, যার নাম ইতিমধ্যেই দৌলতাবাদ করা হয়েছিল, আহমেদনগর সালতানাতের অংশ হয়ে ওঠেছিলো।  আহমেদনগর সালতানাত এটিকে তাঁদের গৌণ রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করতেন। ১৬১০ সালে  দৌলতাবাদ দুর্গের কাছে, নতুন শহর সম্ভাজিনগর গড়ে উঠে। অঞ্চলটির নাম তখন খাদকি ছিল। সম্ভাজিনগর আহমেদনগর সালতানাতের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইথিওপীয় সামরিক নেতা মালিক আম্বর দ্বারা। মালিক আম্বরকে দাস হিসেবে ভারতে আনা হয়েছিল। কিন্তু তিনি পরে আহমেদনগর সালতানাতের একজন জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেছিলেন। দৌলতাবাদ দুর্গের বর্তমান দুর্গগুলির বেশিরভাগই আহমেদনগর সালতানাতের অধীনে নির্মিত হয়েছিল।

                শহরের এলাকাটি দেবগিরির পাহাড়ি দুর্গ (কখনও কখনও ল্যাটিন ভাষায় দেওগিরি)হিসেবে পরিচিত। দুর্গটি প্রায় ২০০ মিটার উঁচু একটি শঙ্কুযুক্ত পাহাড়ের উপর অবস্থিত। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য পাহাড়ের নিচের ঢালের বেশিরভাগ অংশ যাদব রাজবংশের শাসকরা কেটে ৫০ মিটার উল্লম্ব কোণ করে রেখেছিলেন।। চূড়ায় পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হল একটি সরু সেতু, যেখানে দুজনের বেশি লোকের চলাচলের সুবিধা নেই। পাথরের মধ্যে খনন করা একটি দীর্ঘ গ্যালারি রয়েছে, যার বেশিরভাগ অংশই খুব ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে।

    মাঝখানে প্রবেশ গ্যালারিটিতে খাড়া সিঁড়ি রয়েছে, যার শীর্ষটি একটি ঝাঁঝরি দিয়ে আচ্ছাদিত ছিলো, যুদ্ধের সময় উপরের সৈন্য দ্বারা সেখানে জ্বলন্ত বিশাল আগুনের চুলা তৈরি করার উদ্দেশ্যে ঝাঁঝরটি নির্মিত হয়েছিলো। দুর্গের চূড়ায় আশেপাশের গ্রামাঞ্চলের দিকে মুখ করে থাকা বিশাল পুরানো কামানের নমুনা রয়েছে। এছাড়াও মাঝখানে, শত্রুদের বিভ্রান্ত করার জন্য একটি গুহার প্রবেশপথ রয়েছে।

    দৌলতাবাদ ছত্রপতি সম্ভাজিনগর থেকে ১৬ কিমি উত্তর-পশ্চিমে জেলা সদর দপ্তর এবং ইলোরা গুহাগুলির মাঝখানে অবস্থিত।মূল বিস্তৃত রাজধানী শহরটি এখন বেশিরভাগই জনবসতিহীন এবং একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে।

    ইতিহাস- শহরটি কমপক্ষে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে দখল করা হয়েছিল এবং এখন এখানে অজন্তা ও ইলোরার মন্দিরের মতো হিন্দু ও জৈন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। ৩২ নম্বর গুহায় জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি খোদাই করে কুলুঙ্গির একটি সিরিজ রয়েছে।

    কথিত আছে যে, শহরটি আনুমানিক ১১৮৭ সালে ভিল্লাম পঞ্চম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভিল্লাম পঞ্চম একজন যাদব রাজপুত্র ছিলেন যিনি চালুক্যদের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে পশ্চিমে যাদব রাজবংশের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যাদব রাজা রামচন্দ্রের শাসনামলে দিল্লি সালতানাতের আলাউদ্দিন খিলজি ১২৯৬ সালে দেবগিরি আক্রমণ করেন এবং যাদবদের মোটা অঙ্কের কর দিতে বাধ্য করেন। পরবর্তীতে কর প্রদান বন্ধ করলে ১৩০৮ সালে আলাউদ্দিন খিলজি দেবগিরিতে দ্বিতীয় অভিযান পাঠান এবং রামচন্দ্রকে তার অধীনস্থ সামন্ত হতে বাধ্য করান।

    ১৩২৮ সালে, দিল্লি সালতানাতের মুহাম্মদ বিন তুঘলক তাঁর রাজ্যের রাজধানী দেবগিরিতে স্থানান্তরিত করেন এবং এর নামকরণ করেন দৌলতাবাদ। ১৩২৭ সালে সুলতান দৌলতাবাদ (দেবগিরি) কে তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। কিছু পণ্ডিতের মতে,  রাজধানী স্থানান্তরের পেছনের ধারণাটি যুক্তিসঙ্গত ছিল, কারণ এটি রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল এবং ভৌগোলিকভাবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত আক্রমণ থেকে রাজধানীকে সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রশস্ত ছিলো।

    তুঘলক দৌলতাবাদ দুর্গ  অঞ্চলটি শুষ্ক অবস্থায় পেয়েছিলেন। ফলে তাঁর রাজধানী স্থানান্তরের কৌশলটি মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই তিনি দিল্লিতে ফিরে এসেছিলেন এবং “পাগল রাজা” উপাধি অর্জন করেছিলেন।

    দৌলতাবাদ দুর্গের সময়কালের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বাহমানি সুলতান হাসান গাঙ্গু বাহমানি, যিনি আলাউদ্দিন বাহমান শাহ (শাসনকাল ৩ আগস্ট ১৩৪৭-১১ ফেব্রুয়ারি ১৩৫৮) নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি চাঁদ মিনার নির্মাণ করেছিলেন।

    হাসান গাঙ্গু দিল্লির কুতুব মিনারের প্রতিরূপ হিসেবে চাঁদ মিনার নির্মাণ করেছিলেন। চাঁদ মিনার বা চাঁদের মিনার হল ভারতের দৌলতাবাদে অবস্থিত একটি মধ্যযুগীয় মিনার। এই মিনারটি মহারাষ্ট্র রাজ্যে দৌলতাবাদ দুর্গ কমপ্লেক্সের কাছে অবস্থিত। চাঁদ মিনারটি দিল্লির কুতুব মিনারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং এটি থেকে অনুপ্রাণিত।তিনি মিনারটি নির্মাণের জন্য ইরানি স্থপতিদের নিযুক্ত করেছিলেন, যারা রঙ করার জন্য ল্যাপিস লাজুলি(ল্যাপিস লাজুলি হল একটি গাঢ় নীল মূল্যবান রূপান্তরিত শিলা যা এর প্রাণবন্ত রঙের জন্য মূল্যবান এবং গয়না, অলঙ্কার এবং রঙ্গক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।) এবং লাল গেরুয়া ব্যবহার করেছিলেন। বর্তমানে আত্মহত্যার ঘটনার কারণে মিনারটি পর্যটকদের জন্য নিষিদ্ধ। কারণ সেখানে একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ভারতীয় পর্যটন ওয়েবসাইটগুলির মতে, ২১০ ফুট উঁচু এই মিনারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং একসময় দুর্গ কমপ্লেক্সের মধ্যে একটি জনপ্রিয় আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল। চাঁদ মিনারকে দক্ষিণ ভারতে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের সেরা নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি ৬৩ মিটার উঁচু এবং ৪ তলা বিশিষ্ট এবং ২৪টি কক্ষে বিভক্ত। মিনারের গোড়ায় একটি ছোট মসজিদ বা প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে, যা পারস্য নীল টাইলস দিয়ে ঢাকা আবৃত। মিনারের উচ্চতা দৌলতাবাদ দুর্গের প্রতিটি কোণ থেকে এটিকে দৃশ্যমান করে।

    দুর্গের আরও ভেতরে অবস্থিত চিনি মহলটি নিজাম শাহী রাজবংশের সময়কালের বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীতে, মুঘলরা এটিকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, এখানে হায়দ্রাবাদের গোলকুন্ডা সালতানাতের আবুল হাসান কুতুব শাহকে বন্দী করা হয়েছিল।

    বেশিরভাগ দুর্গ বাহমনী এবং আহমেদনগর সালতানাতের নিজাম শাহদের অধীনে নির্মিত হয়েছিল। ১৬৩২ সালে শাহজাহানের অধীনস্থ দাক্ষিণাত্যের মুঘল গভর্নর দুর্গটি দখল করে নিজাম শাহী রাজপুত্রকে বন্দী করেছিলেন। ১৭৬০ সালে মারাঠারা দুর্গটি দখল করেছিলেন।

    কিংবদন্তি- হিন্দু পুরাণ মতে,  ভগবান শিব এই অঞ্চলের চারপাশের পাহাড়ে অবস্থান করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই দুর্গটি মূলত দেবগিরি নামে পরিচিত ছিল, যার আক্ষরিক অর্থ “দেবতার পাহাড়”।

    গঠন- দৌলতাবাদ একটি সুরক্ষিত শহর যা ১০০০ বছরের নির্মাণ ইতিহাস রয়েছে। শহরটি দাক্ষিণাত্যের শাসকদের ধারাবাহিক তত্ত্বাবধানে ছিল। এটিকে তিনটি স্বতন্ত্র অঞ্চলে ভাগ করা যেতে পারে:

    বালাকোট, শঙ্কুযুক্ত পাহাড়ের উপরে অবস্থিত সবচেয়ে ভেতরের দুর্গ;  

    কটক, মধ্যবর্তী দুর্গ  এবং

    আম্বারকোট  সবচেয়ে বাইরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর যা ঐতিহাসিক শহরের বেশিরভাগ অংশকে ঘিরে রেখেছে।

    বালাকোট- শঙ্কু আকৃতির দেওগিরি পাহাড়ের উপর অবস্থিত পাথরের দুর্গের নাম বালাকোট। তুঘলকরা এই নামকরণ করেছিলেন। যাদবরা পাহাড়ের ঢালগুলিকে উল্লম্বভাবে ভেঙে, ৫০ মিটার উঁচু করে এই দুর্গ নির্মাণ শুরু করেছিলেন এবং পাহাড়ের পাদদেশে একটি গভীর পরিখা খনন করেছিলেন। বালাকোটে বেশ কয়েকটি প্রাসাদসম ভবন রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ভবনটি হলো নিজাম শাহী রাজবংশের সময়কার চিনি মহল। এটি কোনও নির্দিষ্ট নির্মাতার সাথে সম্পর্কিত বলে কোনও প্রমাণ নেই। এটি সম্ভবত রাজবংশের প্রাথমিক দিনগুলিতে নির্মিত হয়েছিলো এবং এর সম্মুখভাগে নীল/সাদা টাইলস লাগানো। প্রাসাদটি ভেঙে পড়া অবস্থায় রয়েছে এবং বর্তমানে এটি একটি দীর্ঘ হল হিসেবে টিকে আছে। প্রাসাদটির একপাশে একটি প্রবেশপথ রয়েছে। প্রাসাদটি অতীতে সম্ভবত বড় ছিলো, কিন্তু মুঘলরা এটিকে ধ্বংস করে কারাগারে রূপান্তরিত করেছিল।

    বালাকোটের উত্তর প্রান্তের নীচে মুঘল সম্রাট শাহ জাহানের একটি পরিত্যক্ত প্রাসাদ ভবন রয়েছে, যা ১৬৩৩ সালে মুঘলরা দুর্গ দখল করার পর নির্মিত হয়েছিল। এতে দুটি বৃহৎ আদালত, পশ্চিমে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন এবং একটি হাম্মাম রয়েছে। বালাকোটের চূড়ার নীচে শাহ জাহানের আরেকটি মণ্ডপ পাওয়া যায়। বালাকোটে ১৫ শতকের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজকীয় বাসভবনও রয়েছে। ভবনটি বাহমনি রাজবংশের প্রাথমিক যুগে নির্মিত হয়েছিল।

    কটক- কটক হল দৌলতাবাদে অবস্থিত একটি বৃত্তাকার  মধ্যবর্তী দুর্গ। এটি তুঘলক সেনাপতিরা বালাকোটের সম্প্রসারণ হিসাবে তৈরি করেছিলেন।এর উত্তর ও পূর্ব প্রান্ত দেবগিরি পাহাড়ের পাদদেশ সংলগ্ন। প্রতিরক্ষা প্রাচীরটি একটি বিশাল দ্বি-প্রাচীর, যার মধ্যে বুরুজ এবং পরিখা রয়েছে। প্রাচীরের পূর্ব প্রবেশপথের ঠিক বাইরে অবস্থিত একটি মুঘল যুগের হাম্মাম।কটকের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হল, দৌলতাবাদের বৃহৎ জামে মসজিদ। মসজিদটি ১৩১৮ সালে নির্মিত। অল্প দূরে চাঁদ মিনার। দুর্গের মহাকোট নামক একটি অংশে একটি ব্যতিক্রমী উঁচু মিনার অবস্থিত। মিনারটি ১৪৪৬ সালে আলাউদ্দিন বাহমনী দৌলতাবাদ দখলের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছিলো। এর ভিত্তিটি একটি ছোট কাঠামো দ্বারা আবৃত, যার মধ্যে একটি মসজিদ রয়েছে।

    আম্বারকোট- আম্বারকোট হল দৌলতাবাদ দুর্গের সবচেয়ে বাইরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর। এই প্রাচীর ঐতিহাসিক শহরের বেশিরভাগ অংশকে ঘিরে রেখেছে। এটি সাধারণত নিজাম শাহীদের মন্ত্রী মালিক আম্বরের নামে তৈরি বলে ধারণা করা হয়, তবে সম্ভবত তুঘলকরা এটি তৈয়ার করেছিলেন। এটি উপবৃত্তাকার এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। কটকের মতো, আম্বারকোট প্রাচীরটি দুটি প্রতিরক্ষা প্রাচীর নিয়ে গঠিত। পণ্ডিত পুষ্কর সোহোনি উল্লেখ করেছেন যে, আম্বারকোটের দেয়ালের চারপাশে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে, যা এখনও তদন্ত করা হয়নি।

    সড়ক পরিবহন- দৌলতাবাদ ঔরঙ্গাবাদের উপকণ্ঠে অবস্থিত এবং ঔরঙ্গাবাদ-ইলোরা সড়কে (জাতীয় মহাসড়ক ২০০৩) অবস্থিত। ঔরঙ্গাবাদ সড়কপথে সুসংযুক্ত এবং দেবগিরি থেকে ২০ কিমি দূরে অবস্থিত।

    রেল পরিবহন- দৌলতাবাদ রেলওয়ে স্টেশনটি দক্ষিণ মধ্য রেলওয়ের মানমাদ-পূর্ণা এবং দক্ষিণ মধ্য রেলওয়ের নান্দেদ বিভাগের মুদখেদ-মানমাদ অংশে অবস্থিত। ২০০৫ সালের আগে পর্যন্ত, এটি হায়দ্রাবাদ বিভাগের একটি অংশ ছিল। ঔরঙ্গাবাদ দৌলতাবাদের নিকটের একটি প্রধান স্টেশন। দেবগিরি এক্সপ্রেস নিয়মিতভাবে মুম্বাই এবং হায়দ্রাবাদের সেকেন্দ্রাবাদের মধ্যে ছত্রপতি সম্ভাজি নগর হয়ে চলাচল করে।*

সমাপ্ত

Scroll to Top