
আমার ছেলেবেলা
শৈশব কাল- আমাদের গ্রামের প্রকৃত নাম ছিল জাহানাপার। কিন্তু বাইরের লোকে দেউলদি বলে জানত। পূব দেউলদি। আমাদের গ্রামটা বেকি নদীর অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। আমাদের গ্রামটা ছিল বেকি নদীর পূব পাড়ে। তাই নাম হয়েছিল পূব দেউলদি। বেকি নদীর পশ্চিম পাড়ে আর একটা গ্রাম ছিল। সেই গ্রামের নাম ছিল পশ্চিম দেউলদি। গ্রামের নাম পূর্বে পূব বালিকুরিও ছিল। পরে পূব দেউলদি এবং পূব দেউলদির পরে জাহানার পার হয়েছে। ১৯৫৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরে স্বাধীনতার পর সরকার প্রথম জমি জরিপ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখনই পর্যায়ক্রমে অনেক নতুন গ্রাম সৃষ্টি করা হয়। লাট মণ্ডলেরা তখন নতুন গ্রামগুলির নাম বিশেষ পরিবেশ এবং বিশেষত্বের ওপড় নির্ভর করে নিজের সুবিধা মতো রাখে। জাহানারপারের কাছেই জাহানা বিল। তাই সম্ভবতঃ আমাদের নতুন গ্রামের নাম জাহানারপার রাখা হয়েছিল। জাহানা বিলের পারে অবস্থিত গ্রামটার নাম রাখা হয়েছিল জাহানার ঘোলা। নতুন নামগুলি অনেকে এখনও জানেনা। তাই বাইরের লোকেরাঁ সমগ্র অঞ্চলটাকে পূব দেউলদি নামেই জানে।

জাহানারপার একটি হতদরিদ্র গ্রাম। গ্রামের মানুষগুলো কৃষিজীবী। অশিক্ষিত। বাইরের বিশ্বের সাথে পরিচয় নাই বললেই চলে। গ্রামের তিনদিকে জল। উত্তর দিকে বেকি নদী। দক্ষিণে জাহানা বিল। জাহানা বিল মাছের জন্য খুবই বিখ্যাত ছিল। ইজারদাররা ডাকে নিয়ে মাছ ধরত। জাহানা বিলের দক্ষিণে রামাপারা, দলাগাঁও পারি দিয়ে গেলে ব্রহ্মপুত্র নদ। ব্রহ্মপুত্র নদীকে লোকে ব্রহ্মার পুত্র বলে জানে। তাই ব্রহ্মপুত্রকে নদী না বলে নদ বলে। জাহানারপার থেকে জাহানা বিল এক মাইল দুরে অবস্থিত। জাহানা বিল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ প্রায় মাইল দু’য়েক হবে। উত্তর দিকে বেকি নদী এক মাইল দূরে। গ্রামের পূর্বদিকে বাঘবর পাহাড়। গ্রামথেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে। গ্রামের পশ্চিম দিকে বেকি, জাহানা বিল এবং ব্রহ্মপুত্র নদের সংগম স্থল। জাহানার পারের চার দিকে কয়েকটা গ্রাম আছে। দক্ষিণ দিকে জাহানার ঘোলা।
জাহানা বিলের পারে। উত্তর দিকে রৌমারী এবং বালাজান গ্রাম। জাহানারপার, জাহানার ঘোলা, রৌমারী, বালাজান, মরাভাজ, বাঘবর প্রভৃতি গ্রামগুলি নিন্ম জলাভূমি এবং বেকি নদীর অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত। তাই বৎসরের কয়েক মাস জলের তলে থাকে। প্রায় পাঁচ মাস। জ্যৈষ্ঠের শেষ দিক থেকে কার্তিকের আগ পর্যন্ত। তখন গ্রামের বাড়ীগুলি কচুরি পানার মত ভাসে। হাঁসেরা সাঁতার কাটে মনের আনন্দে। হ্যাজাক লাইট দিয়ে মাছ ধরে জল কমে গেলে। রাতের বেলা হ্যাজাক লাইটগুলি শারী শারী জোনাকি পোকার মতন চলাফেরা করে। হ্যাজাকের সংখ্যা বেশি হলে ফুলের মালার মত দেখা যায়। গ্রামের বৃদ্ধ বণিতা, জী-বৌয়েরা সেই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য উপভোগ করত প্রাণ ভরে। আমাদের কাকা ভেলু মিঞাও হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে মাছ ধরত। আলীগাঁয়ের এলাহি বক্সেরও হ্যাজাক দিয়ে মাছ ধরার নেশা ছিল। এলাহি বক্স কাকীর মামাত ভাই। সে মাজে-মধ্যে আমাদের বাড়ীতে গিয়ে কাকার সাথে মাছ ধরতে যেত। একদিন তারা অনেক মাছ ধরেছিল। বলতে পারেন নৌকার খোল ভর্তি।
`আমাদের বাবা হ্যাজাক দিয়ে মাছ ধরতেন না।তিনি মাছ ধরতেন দোয়াড়ি দিয়ে। কাকা মাজে-মধ্যে দাঁওন দিয়েও মাছ ধরতেন। দাঁওন দুই প্রকারের ছিল। একটাকে বলত উড়া দাঁওন এবং আরেকটাকে বলত ডুবা দাঁওন। উড়া দাঁওন পানীর ওপরে রশি টানিয়ে রশিতে বরশী বেধে বরশীর মুখে মাছ গেঁথে দিত এবং ডুবা দাঁওনে রশির সাথে বরশী বেধে বরশির মুখে কেঁচু বা মাছ গেঁথে পানীর তলে ডুবিয়ে দিত। উড়া দাঁওনে বোয়াল মাছই বেশি ধরত। ডুবা দাঁওনে নানা রকম মাছ ধরত। পানী কম থাকলে আমিও বাড়ীর কাছে উড়া এবং ডুবা দুই ধরণের দাঁওনই দিতাম। এই কাজে আমার দাদী বাহারজান নেছা আমাকে সাহায্য করতেন। আমাদের বাড়ীর সামনে এবং পেছনে দুটি ডোবা ছিল। সেখানে চুঙা পেতেও মাছ ধরতাম। সন্ধ্যে বেলা চুঙা পানীতে ডুবিয়ে রেখে আসতাম এবং সকাল বেলা সেই চুঙা তুলে আনতাম। চুঙা ভর্তি হয়ে মাছ থাকত। বিশেষ করে জিওল মাছ।
আমাদের পাড়ার বাড়ীগুলি ফাঁক ফাঁক ছিল। ছামের মাথায় মাথায়। প্রায় বিশ পঁচিশটা পরিয়াল বাস করত আমাদের পাড়ায়। একটি বাড়ী থেকে আরেকটা বাড়ীর তফাৎ কমেও দেড় দুইশত হাত। বর্ষার মরশুমে একটা বাড়ী থেকে আরেকটি বাড়ীতে যেতে হলে কলাগাছের ভেলা অথবা নৌকার সহায় নিতে হত।
আমাদের অঞ্চলে আমন ধান তেমন হত না। তাই বর্ষার মরশুমে জল থই থই করত। কখনও কখনও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আমাদের গ্রামে তুফান উঠত। তখন বড় বড় ঢেউ উঠত। তখন ছোট নৌকা অথবা ভেলা নিয়ে এ বাড়ি ও বাড়িতে যাওয়া সম্ভব হত না। বড় নৌকা করে যেত হতো। ধরুন, কেউ ভেলা অথবা ছোট নৌকা নিয়ে এক বাড়ি বেড়াতে গেছে, হঠাৎ তুফান উঠল। তখন তাকে সেই বাড়িতেই থেকে যেত হত তুফান না কমা পর্যন্ত। আমার কাকার ভায়রার নাম ছিল আসরুদ্দিন। তিনি কাঠ মিস্ত্রী ছিলেন। তাঁর কাজ খুব পরিপাটি ছিল; কিন্তু খুব ধীরে ধীরে কাজ করত। তাই তাঁকে লোকে ‘টিপা’ মিস্ত্রী বলত। তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। একবার তিনি আমাদের বাড়িতে কলাগাছের ভেলা নিয়ে বেড়াতে এসেছিলেন। এমন সময় তুফান উঠেছিল। তখন সে বাধ্য হয়ে আমাদের বাড়িতে চার দিন থেকে তারপর বাড়ি গিয়েছিলেন। এমনই ছিল সেই তুফানের তাণ্ডব।

আমাদের একটি বড় নৌকা ছিল। পঁচিশ হাত। পরে ভেঙে তেত্রিশ হাত বানিয়ে ছিল। চার পাঁচটা গ্রামের মধ্যে সম্ভবতঃ আমাদের নৌকাটাই বড় ছিল। বর্ষার মরশুমে আমাদের অঞ্চলের লোক দলগোমা হাটে যেত। দলগোমা হাট ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত। তাই ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে দলগোমা হাটে যেতে হত। তখন ব্রহ্মপুত্র নদ নব্য ছিল না। প্রচণ্ড স্রোত ছিল। জাহাজ চলত। তাই ছোট নৌকা নিয়ে কেউ দলগোমা হাটে যেত না। আমাদের নৌকাটাই যখন একমাত্র বড় নৌকা, তাই তিন চারটা পাড়ার লোক আমাদের নৌকায় চড়ে দলগোমা হাটে যেত। সকাল বেলা হাটে যাওয়ার সময় তাঁরা ছোট নৌকা অথবা ভেলায় করে এসে আমাদের নৌকায় চড়ে হাটে যেতেন; কিন্তু অসুবিধা হত হাট থেকে ফিরে বাড়ি যাওয়ার সময়। তখন বাবা ও কাকা আমাদের নৌকায় করে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসতে হতো। আমাদের নৌকার বাদামের রং নীল ছিল।
‘নাইয়ারে নীল বাদাম উড়াইয়া, কোন দেশে যাও বাইয়া।’ এই আর কি! লক্ষ্য করেছি, তখন সোমবার দিন পশ্চিম দিক থেকে প্রায়ই বাতাস বইত। মৌসুমি বাতাস। তাই নীল বাদাম উড়িয়ে হাট থেকে আসত আমাদের নৌকা। নৌকা নিয়ে দলগোমা হাটে গেলে আমারা নৌকার অপেক্ষায় বাড়ির ঘাটের পাড়ে বসে থাকতাম এবং অধীর আগ্রহে লক্ষ্য করতাম কখন নীল বাদাম উড়িয়ে আমাদের নৌকাটা আসে! নীল বাদাম দেখলেই বুঝতে পারতাম ঔ আমাদের নৌকা আসছে। নৌকায় বাদাম উড়িয়ে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যেত, কিন্তু আমাদের ঘাটে ভিড়াত না। কারণ অন্য লোকদের তাঁদের বাড়ি পৌঁছানোর জন্য আমাদের বাড়ি পেছনে ফেলে চলে যেত। আমরা তখন আশাহত হতাম। দলগোমা হাট আম, কাঁঠাল, বাঁশের জন্য বিখ্যাত ছিল। খুবই আশা করে বসে থাকতাম দলগোমা থেকে বাবা আম, কাঁঠাল নিয়ে আসবে। মজা করে খাব। কিন্তু সে আশা আমাদের সব সময় সফল হতো না। কোনো কোনোদিন আমরা ঘুমিয়ে পড়ার পর বাবা ও কাকা নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। এরকম ঘটনা প্রায়শঃই ঘটত।
আমাদের গ্রাম থেকে দেড় মাইল দূরে ছিলো বরপেটা জেলার একমাত্র পাহাড় বাঘবর পাহাড়। বাঘবর পাহাড়ের পাদদেশে বাঘবর থানা। ১৯৫৭ সালে স্থাপিত। বিষ্ণুরাম মেধি গৃহমন্ত্রী থকা কালীন থানাটা স্থাপন করেছিলেন। আমি নিজে থানার ঘরগুলো বানাতে দেখেছি, মা অথবা দাদীর সাথে মামাদের বাড়ী যাওয়ার সময়।
বাঘবর রবিবার এবং বুধবারে হাট বসত। সেই হাট থেকেই অঞ্চলের লোকেরা সপ্তাহের বাজার করে আনত হাটবারে। যখন নতুন হাট বসে তখন সেখানে হাটবারে মাজে-মধ্যেই যাত্রাগান হত। একবার কাদঙের রূপাকুছির যাত্রাদল সেখানে যাত্রাপালা অভিনয় করেছিল। আমাদের মামা আবু বাক্কার সেই যাত্রাদলে হারমনিয়াম বাজাতেন। আবু বাক্কার মামা মামাদের জেঠাত ভাই। তার কাছে বসে আমি সেদিন যাত্রাপালা উপভোগ করেছিলাম। সেখানে কেরামত নামের একজন লোক ‘আমার প্রাণের হুক্কারে তোর নাম কে রেখেছে হুক্কা’ শীর্ষক একটি গীত গেয়ে কৌতুক অভিনয় করেছিলেন। সে দৃশ্য এখনও আমার মনে দাগ কেটে আছে।
প্রথমে বুধবারে হাট বসত পাহাড়ের পাদদেশে। থানার কাছে। সেখানে থানার পুলিসরা মাঝে-মধ্যে তরু-তরকারি কিনে পয়সা দিত না। তাই একদিন সেই পয়সা নিয়ে গণ্ডগোল হয় এবং থানার নিকট থেকে হাট স্থানান্তর করে পূর্বদিকে কিছুদূরে মাথাউরির দক্ষিণ পাশে বসায়। তখন কেশব চৌধুরী, উপেন পাটোয়ারী এবং রামেশ্বর গাঁওবুড়ারাঁ বাঘবরের প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন।
আমাদের গ্রামের প্রধান ফসল ছিলো চিনাধান এবং রবিশস্য। গম, সরিষা, মাসকালাই, মটর কালাই, ধইনা, তিল, তিসি প্রভৃতি রবি শস্যের মধ্যে প্রধান ছিলো। ধান অৱশ্যে বপন করত; কিন্তু একটু আগ মরশুমে বর্ষা হলেই সেই ধান জলে তলিয়ে যেত। তাই কৃষকেরা ধানের থেকে রবিশস্যের ওপড়েই অধিক নির্ভরশীল ছিল। যাদের মাটি-বৃত্তি কম ছিলো, তারা বর্ষার মরশুমে অন্য গ্রামে গিয়ে কামলা বেচত। আর যাদের অবস্থা অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ছিল তারা বাড়িতেই থাকত এবং ছেলে-পিলে নিয়ে হই হুল্লোড় করে দিন কাটাত। আমাদের পাড়াটা কারিকর পাড়া নামে পরিচিত ছিল। কারণ পাড়াটায় কারিকর সম্প্রদায়ের লোক বাস করত। দুই চারটি বাড়ীতে কাপড় বুনত, বিশেষ করে বর্ষার মরশুমে– কৃষিকর্ম না থাকলে। কেতা (খেতা)জাল, গামছা প্রভৃতি। সে জন্যে তাঁতের খট্ খট্ শব্দও শুনা যেত সেই হই-হুল্লোড়ের মধ্যে। আমাদের বাবাও বর্ষার মরশুমে কাপড় বুনত। এম, ই স্কুলে পড়া অবস্থায় গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি গেলে আমিও কাপড় বুনতাম বাবা বাড়ী নাথাকলে। খুবই ভাল লাগত কাপড় বুনে।
আমাদের বাবা মিঠু মিঞা অপেক্ষাকৃত একটু স্বচ্ছল গৃহস্থ ছিল। আসলে তার উপাধি ছিল মিঠু মল্লিক। এনআরসির সময় মিঠু মল্লিকের জায়গায় মিঠু মিঞা লেখে নিয়েছিল। বিদ্যা-বুদ্ধি তেমন ছিল না বলে সরকারি খাতায় নাম পড়ায় তিনি সেটাই মেনে নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে মিঠু মিয়া নামেই পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁরা দুই ভাই ছিলেন। বোন ছিল না। ভায়ের নাম ভেলু মিঞা অর্থাৎ ভেলু মল্লিক। মিঠু মিঞার বয়স যখন বার বৎসর তখন তাঁদের বাবা বুদ্ধু মল্লিক গাছ কাটতে গিয়ে গাছের তলে পড়ে অকালে মারা গিয়েছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি বিধবা মাতৃ বাহারজান নেসা এবং ভ্রাতৃ ভেলু মিঞার সাথে আসাম এসেছিলেন কুরির দশকের প্রথমভাগে। তাঁরা প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিলেন কাদং অঞ্চলের টাপাজুলি গ্রামের দুরসম্পর্কের ফুফাত ভগ্নীপতি ইলিম উদ্দিনের বাড়ীতে। সেখান থেকে চল্লিশের দশকের শেষভাগে উঠে এসেছিলেন জাহানারপার গ্রামে।
বিধবা মাতৃর দুই সন্তান কি যাদুবলে বাঘবর পাহাড়ের পূর্বদিকে অবস্থিত আলীগাঁও গ্রামের দুইটি বিখ্যাত ও ধনী পরিয়াল ধনাই হাজী এবং পাক্কু বেপারীর পরিয়ালের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন সে কথা এখনও আমার কাছে স্বপ্নের মতো ধারণা হয়। দুই ভ্রাতৃ কর্মে বিশ্বাসী ছিল এবং বিহংগম দৃষ্টিতে তাদের চরিত্রে কোন খুঁত ছিল না। এই দুটি গুণের বলেই হয়তো তাঁরা এই দুইটি পরিয়ালের সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুই ভ্রাতৃর মধ্যে খুবই মিলা-প্রীতি ছিল। কোনো ঝগড়া-ফ্যাসাদ ছিল না। বলতে গেলে, রাম এবং লক্ষ্মণের মত সদ্ভাব ছিল এবং তাঁরা মায়ের খুবই ভক্ত ছিলেন। মায়ের আদেশকে তাঁরা বেদবাক্য মনে করতেন।
আমাদের বাড়ী নিম্ন জলাশয় অঞ্চলে অবস্থিত ছিল যদিও অনেক গাছ-গাছড়া ছিল আমাদের বাড়ীতে। আম, জাম, বরই, কাঁঠাল প্রভৃতি গাছ। আমাদের উত্তর পাড়ায় বগুড়াদের বাস ছিল। তাঁরা পূর্ববংগের বগুড়া জেলা থেকে উঠে এসেছিল বলে তাঁদের পাড়াটাকে আমরা বগুড়া পাড়া বলতাম। তাঁরা গাছ-গাছড়ার তেমন কদর জানতেন না। তাই তাঁদের বাড়ীতে তেমন গাছ-গাছড়া ছিল না। বরইর দিন এলে ছেলে- পিলেরতো কথাই নাই, বড়রাও এসে আমাদের বরই গাছের তলায় ভির করে থাকত।
বগুড়াদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, খাওয়া-দাওয়া আমাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তাঁরা প্রায় সবাই ব্যবসা করতেন। বিশেষ করে বর্ষার মরশুমে। হাটে হাটে গিয়ে হাটের রাস্তার মাথায় মাথায় চট বিছিয়ে তাঁরা সরিষা, কলাই, তিসি, কালোজিরা, গম প্রভৃতি কিনতেন এবং হাটেই বড় বেপারীর নিকটে বিক্রী করে দিতেন। পাট পাঁইট করতে তাঁরা খুব ওস্তাদ ছিলেন। কম দামের পাট কিনে এমনভাবে পাঁইট করতেন যে, দেখতে একেবারে ‘টপ’ পাটের মতো লাগত। তাঁরা তরকারিতে হলফা সঁচ ব্যবহার করতেন। গরুর মাংসের সাথে ব্যবহার করতেন চালের গুড়া। বগুড়া পাড়ার কিছু কিছু লোক আমাদের বাড়িতে কামলা বেচতেন।দুই চারজন লোক ব্যবসায়িক সূত্রেও আমাদের সাথে সম্পর্ক রেখে চলতেন।গম, সরিষা, মাসকালাই, মটর কালাই, ধইনা, তিল, তিসি প্রভৃতি কিনার জন্য আর কি। তাঁদের দুই একজন আমাদের সাথে ইষ্টি(কুটুম)ও করেছিলেন। তেমনই একজন ছিলেন সুলতান আলি। ধান, পাট খেত নিড়ানোর সময় সুলতান আলী আমাদের বাড়ীতে বলতে গেলে প্রায় নাগাড়বান্দা কামলা বেচতেন। তাঁর মেয়ের জামাইর নাম এবং আমার নাম একই ছিল।আবুল। আবুল হুছেইন। তাই আমাকে তিনি জামাই বলে ডাকতেন। একদিন কার বিয়েতে জানিনা, আমাকে দাওয়াত করেছিল। আমি একা গিয়ে ছিলাম সেই দাওয়াত খেতে। আমাকে খুব আদর-সাদর করে একটি ঘরে বসতে দিয়েছিল। সে ঘরে নাচ-গান চলছিল। বৌ-ঝিরা আঁচল উড়িয়ে উড়িয়ে ঘুরে ঘুরে নাচছিল এবং গীত গাইছিল। বিয়াগীত। আমি তখন সম্ভবতঃ প্রথম মানে পড়ি।(সালটা মনে হয় ১৯৫৯ সাল ছিলো।)তাই আমি ছোট ছিলাম। ছোট বলে আমাকে দেখে কেউ লজ্জাবোধ করছিল না। তাদের নাচগানের দাপটে ঘরে কাদা উঠে গিয়েছিল।
আমাকে বসতে দিয়েছিল একেবারে দরজার পাশে। যথা সময়ে খাদ্য পরিবেশন করল। শেমাই। শেমাইর রং দেখে বুঝার উপায় ছিল না সেটা শেমাই বলে।হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে তবে বুজতে পারলাম সেটা শেমাই। আঁখের গুড়ের শেমাই। দেখতে কালো মতো। শেমাইতো নয়, চালের গুড়া দলা পাঁকিয়ে কিছু একটা করেছে আর কি! দুধ ব্যবহার করেছে বলে মনে হল না। করলেও যৎসামন্যই করেছে। তাই রঙটা কালো হয়েছে। আগেই বলেছি, বগুড়া লোকগুলো রান্নাবান্নায় একটু দুর্বল ছিল। বগুড়া পাড়ায় ইয়াকুব মুন্সি নামের একজন লোক ছিলেন। ক্ষীর রান্না সম্পর্কে তাঁকে নিয়ে একটি প্রবাদ প্ৰচলিত আছে। তিনি নাকি একদিন হাট থেকে এক পোয়া গুড় এবং আধা সের দুধ এনে তার স্ত্রীকে ক্ষীররান্না করতে দিয়েছিলেন।
একবার ক্ষীরের খবর নিতে এসে মুন্সি সাহেব তাঁর স্ত্ৰীকে জিজ্ঞেস করলেন- কি গো গিন্নী, রান্না হোল?
স্ত্রী বলল- এই হবেই আর কি।
গুড় কোথায় রেখেছ? সবটুকুই দিয়েছ না-কি?
হ্যাঁ, সবটুকুই দিয়েছি।
সবটুকুই ক্ষীরে দিয়েছ মানে? আড়াই সের চাল এবং আধা সের দুধ! তার মধ্যে এক পোয়া গুড় এমনিতে ঢেলে দিয়েছ। একটু রাখা-রাখি করণ লাগে না নাকি?
এমনই ছিল তাদের ক্ষীর।
আমি নখ দিয়ে শেমাই একটু চেখে দেখলাম। একটা বিশ্রী স্বাদ ছিল সেই শেমাইয়ের। আমার বমি আসার উপক্রম হল। কোনো মতে বমি চেপে ঘর থেকে বেড়িয়েই দিলাম দৌড়। এক দৌড়ে এসে বাড়ি পেলাম।
এই কথাগুলো আমি বগুড়াদের ছোট করার জন্য লেখিনি। সেই সময়ের বগুড়াদের অবস্থা তুলে ধরার জন্য লিখেছি। এখন তাঁদের রান্নাবান্না অনেক পরিবর্তন হয়েছে।ঠিক আমাদেরই মতো। কথা-বার্তা, রান্নাবান্না এবং আচার-আচরণেও এখন তাঁরা অন্যান্য বাংলাভাষী মূলের মুসলিমদের মতোই হয়েছে বলতে গেলে।
আমাদের পাড়ার লোকগুলো সারা বর্ষাই জলের মধ্যে বাস করত, অথচ তাঁদের খাবার জলের ব্যবস্থা ছিল না।বর্ষাকালে বর্ষার জল খেত এবং খরা মরশুমে মাটিতে কুয়া খুঁড়ে জল তুলত। জলের অভাব দূর করার জন্য আমাদের নানা ধনাই হাজি আমাদের বাড়ীতে ইদারা গেঁথে দিয়েছিলেন।মনে হয় ১৯৫৭ সাল হবে। আলীগাঁয়ের বিনোদ মুন্সী সেই ইদারা গেঁথে ছিলেন। তাঁর সাথে কে সহয়োগিতা করেছিলো কথাটা আমার এখন মনে নেই। তখনও আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করিনি। স্কুলে যাওয়ার আগেই সংযোগবশতঃ সেই ইদারা গাঁথার সময় আমি পঞ্চাশ পর্যন্ত সংখ্যা গোনা শিখেছিলাম। আমাদের বাবা ও চাচারা দুই ভাই ছিলেন। তাঁদের চাচাত ভাই ছিলেন চারজন। ইশ্বা, মোসলেম উদ্দিন, আব্দুল হাকিম এবং আব্দুল কাদের।উনারা বালাজান গ্রামে বাস করতেন। আমাদের গ্রাম থেকে তিন চার কিলোমিটার উত্তর দিকে ছিলো বালাজান গ্রাম। আমাদের বাড়ীর পশ্চিম পাশেই ছিলো গো-হালট।ইদারাটা সেই গো-হালটের পাশেই গেঁথেছিল। তখনও ইদারা গাঁথার কাজ শেষ হয়নি। তাই সেদিন ইদারা গাঁথার কাজ চলছিল।
বাবা, কাকা এবং আমি সেদিন ইদারা গাঁথার কাজ দেখতে ইদারার কাছেই ছিলাম। এমন সময় ইশ্বা কাকা সেই গো-হালট দিয়ে তামুকের চারা নিয়ে দলাগাঁও হাটে যাচ্ছিলেন। ইশ্বা কাকা বাবার চেয়ে বয়সে ছোট ছিলেন। ইশ্বা কাকাকে দেখে বাবা বললেন- ইশ্বা, তুই? কোথায় যাচ্ছিস?
ইশ্বা কাকা কাছে এসে বললেন- কয়েকটা তামুকের চারা নিয়ে হাটে যাচ্ছি।
বাবা তামুক, বিড়ি খেতেন না। কাকা তামুক এবং বিড়ি খেতেন। তাই তামুকের চারার কথা শুনে কাকা বললেন- তামুকের চারা নাকি? আমাদের তামুকের চারা রাখতে হবে।
ইশ্বা কাকা বললেন- দর্কার থাকলে রেখে দাও। ভাল জাতের তামুক।
ইশ্বা কাকা টুকরিতে করে তামুক নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি মাথা থেকে টুকরিটা নামিয়ে বললেন- কয়টা দিব?
বাবা বললেন- পঞ্চাশটা দাও।
ইশ্বা কাকা ঈষৎ উচ্চস্বরে গোনে পঞ্চাশটা তামুকের চারা দিলেন। আমি সেই চারা গোনা দেখে পঞ্চাশ পর্যন্ত সংখ্যা গোনা শিখলাম।অবশ্যে আমি আগেই বিশ পর্যন্ত গোনতে শিখেছিলাম।সেদিন পঞ্চাশ পৰ্যন্ত গোনা শেখা হয়েছিলো।
দেউলদি নিন্ম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ মাস
আমাদের বাবা মিঠু মিয়া তখন দুই সন্তানের পিতৃ। আমি এবং হোসেন আলী। পরে আমরা পাঁচ ভাই এবং দুই বোন হয়েছিলাম। ভাইদের নাম- হোসেন আলী, জহুরুল হক, সামচুল হক এবং ওমর ফারুক কিবরিয়া। বোনদের নাম হল- খোদেজা খাতুন এবং জেলেকা খাতুন।জহুরুল হক ১৯৮৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর অকালে মারা গেছে। মেলেরিয়া জ্বর হয়ে। কাকা ভেলু মিঞা বিয়ে করেছিলেন যদিও তখনও তাঁর কোন সন্তান-সন্ততি হয়নি।
আমার বয়েস তখন সাত এবং হোসেন আলীর সাড়ে চার বৎসর। দলাগাঁও গ্রামে তখন শনিবার দিন হাট বসত। সাপ্তাহিক বাজার। দলাগাঁও গ্রামের বিখ্যাত পরিয়াল রবি মোল্লাহর বাড়ীর কাছেই বসত সেই হাট। শনিবারের হাট নামে পরিচিত ছিল সেই হাট। একদিন বাবা শনিবারের হাট থেকে এসে আমার হাতে নবপাঠ নামের একটি বই দিয়ে বললেন- নে, তোর জন্য আনলাম। তোদের সিরাজ মামা হাটে এসেছিল। সেই কিনে দিয়েছে। তোকে স্কুলে যেতে বলছে। সোমবার থেকে বইরার সাথে স্কুলে যাবি। আমি বইরাকে বলে দিব, সে তোকে স্কুলে নিয়ে যাবে।
বইরা মানে আমাদের দূর সম্পর্কীয় জেঠার ছেলে। আসল নাম আব্দুল বারেক। বারেক ভাইর জন্ম বর্ষার মরশুমে হয়েছিল। সে বৎসর প্রবল বন্যা হয়েছিল। বন্যার জলে বাড়ী-ভিটা ডুবে গিয়েছিল। প্রবল বন্যাকে স্থানীয় ভাষায় বইরান বলত। তাই বইরানের মধ্যে জন্ম হয়েছিল বলে তাকে সবাই বইরা বলে ডাকত।
আমার জন্যে বই এনেছে। হোসেন আলীর জন্য আনে নি, তাই হোসেন আলী অভিমান করে বলল- আমার জন্যে বই আন নাই?
বাবা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- তুমি এখনও ছোট। তাই স্কুলে যেতে পারবে না। বড় হলে এনে দিব। এই ভাবে সান্ত্বনা দিয়েই বাবা ধামা থেকে কাপড় বের করে হোসেন আলীর হাতে দিয়ে বললেন- তোমার জন্য এই প্যান্ট এনেছি। পরে দেখতো, মাপে হয় কিনা?
সে যুগে এখনকার মতো ব্যাগের প্রচলন ছিল না। বেতের তৈয়ারি ধামার প্রচলন ছিল। ধামায় করেই হাট থেকে জিনিসপত্র আনা নিয়া করতো।
হোসেন আলী কাপড় দেখে খুশী। সে প্যান্ট নিয়ে দৌড়ে চলে গেল দাদীকে দেখানোর জন্যে।
আমি বললাম- আমার জন্য কাপড় আন নাই? আমি কি পিন্ধে স্কুলে যাব?
বাবা ধামা থেকে আর এক জোড়া সার্ট-প্যান্ট বের করে দিয়ে বললেন- তোর জন্যেও এনেছি। এই সার্ট-প্যান্ট পিন্ধে স্কুলে যাবি। এখনই হোসেনকে দেখাবি না। ঘরের ভিতরে গিয়ে পিন্ধে দেখ মাপে হয় কিনা। পিন্ধেই খুলে রাখবি। হোসেন আলী দেখলে আবার গাল ফুলাবে।
স্কুলতো অনেক দূরে। আমি বললাম- যদি বারেক ভাই স্কুলে না যায়, সেদিন আমি একা একা কেমনে যাব? স্কুল কামাই করলে স্যার মারবে না?
আমি মিথ্যা বলিনি। স্কুলটা সত্যিই অনেক দুরে। আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় এক মাইল হবে। আমাদের দক্ষিণ পাড়ায় ফজু গাঁওবুড়াদের বাড়ীর কাছে। দেউলদি নিন্ম প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষক আব্দুল বারেক। বাড়ী পালহাজীর কাছে খোকনবাড়ি গ্রামে।(এই আব্দুল বারেক স্যারের সাথে আমি পরবর্তী সময়ে এক স্কুলে শিক্ষকতা করেছি।) বাড়ী থেকে সাইকেল নিয়ে আসা-যাওয়া করেন। বর্ষার মরশুমে ফজু গাঁওবুড়ার বাড়ি লজিং থাকেন। স্যারের সাথে আমাদের বাবার পরিচয় আছে। বাবার কাছ থেকে মাঝে-মধ্যে গামছা কিনেন। বাবা বর্ষার মরশুমে কাজ না থাকলে গামছা, কেতা জাল, চেলেং বুনতেন। সেগুলো তিনি বাঘবর এবং দলাগাঁয়ের হাটে গিয়ে বিক্রী করতেন।
বাবা বললেন- বইরা না গেলে সেদিন না গেলেই হল। মাষ্টার মশায়ের সাথে আমার পরিচয় আছে। আমার কাছ থেকে গামছা কিনে। আমি বলে দিলে কিছুই বলবেন না।
সিদ্ধান্ত মতেই সোমবার দিন বারেক ভায়ের সাথে স্কুলে গেলাম। স্যারের কাছে গিয়ে বারেক ভাই আমার নাম ভর্তি করে দিল। নাম ভর্তি করতে কোনো বেগ পেতে হল না। কারণ সে সময় ছাত্রের সংখ্যা খুবই কম ছিল। সে জন্য ছাত্রের সমাদর ছিল।
স্কুলে তখন আমি সহপাঠী হিসাবে পেলাম আকাল উদ্দিন, নওসাদ, আব্দুল হালিম, হাতেম আলী প্রভৃতিকে। ওপড়ের ক্লাসে ছিল ফাজিল উদ্দিন, ইউসুফ আলী, আব্দুল বারেক এবং মোখতার আলী। আরও অনেকে ছিল যদিও তাদের নাম এখন মনে নেই। পরবর্তী জীবনে ফাজিল উদ্দিন ফরেষ্ট বিভাগে, ইউসুফ আলী পঞ্চায়েত সেক্রেটারি হিসেবে চাকরি করে অবসর নিয়েছে। আব্দুল বারেক, মোখতার আলী এবং আকাল উদ্দিন শিক্ষকতা করেছে। এরা সবাই এখন অবসর নিয়েছে।ইউসুফ সেক্রেটারী 2021 সালের 26 জানুয়ারি মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন। খুবই অমায়িক প্রকৃতির লোক ছিলেন ইউসুফ সেক্রেটারী।
নিয়মিতভাবে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে লাগলাম। আমাদের পাড়া থেকে বারেক ভাই এবং আমি স্কুলে যাই। ছয় সাত মাস স্কুলে যাওয়ার পরে একদিন স্কুল থেকে বাড়ী আসার সময় হোঁচট খেয়ে আমার ডান পায়ের মধ্যমা আঙুলের নখ উঠে গেল। রক্তে ভেসে গেল সমস্ত নখ। বাড়ী আসার পর নখের অবস্থা দেখে আমাদের মা আয়শা খাতুন জিজ্ঞেস করলেন- কি হল? পায়ে এত রক্ত কেন?
আমি বললাম- বাড়ী আসার সময় রাস্তায় হোঁচট খেয়েছি। তাই নখ উঠে গেছে।
মা ভালো করে নখটা ধুয়ে নেকড়া বেধে দিয়ে বললেন- তোকে আর এত দূরের স্কুলে যেতে হবে না। মামাদের বাড়ী গিয়ে সেখানের স্কুলেই পড়বি। মামাদের বাড়ীর সাথেই স্কুল। তখন আর হাঁটতে হবে না। সামর্থ ভানুর সাথে পড়তে পারবি। সেও শুনেছি স্কুলে যায়। তোর মামাদের বাড়ী জাইগীর থেকে কত জায়গার লোক এসে পড়ে। তুইও পড়বি।
কথাটা শুনে আমি খুবই খুশী হলাম। আলীগাঁয়ের সাথে আমার শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িত হয়ে আছে। আমাদের দু’টি বাড়ী ছিল। একটি জাহানারপারে এবং আর একটি আলীগাঁয়ে। আমরা ছোটবেলা আলীগাঁয়েই থাকতাম। দাদী এবং চাচীকে নিয়ে কাকা থাকতেন জাহানারপারে। আমার ছোট ভাই হোসেন আলীর জন্ম আলীগাঁয়েই। হোসেন আলীর নামটাও আমিই রেখেছিলাম। হোসেন আলীর জন্মের দিন আমার বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুল কেটেছিল। পুরাণা ভাঙা ডোলের চাক কাটতে গিয়ে। সে কাটা দাগ এখনো বামহাতের কনিষ্ঠ আঙুলে বিদ্যমান। তখন আমার বয়েস তিন অথবা সাড়ে তিন বৎসর। বাবা-মার মুখে শুনা মতে আমার জন্ম ১৯৫১ সালের ১২ ই নভেম্বর। সোমবার। বাংলা বৎসরের কাতি মাসের শেষের দিকে। ১৯৫১ সালে আসামে এনআরসি হয়েছিল। মা’র মুখে শুনা মতে এনআরসি লিখে যাওয়ার এক মাস পরে আমার জন্ম হয়েছিল। আমার মামাত বোন সামর্থ ভানু আমার থেকে এক বৎসরের বড়। তার নাম এনআরসিতে উঠেছে। এনআরসিতে তার বয়েস এক বৎসর।
আলীগাঁয় আমাদের বাড়ীর পূব পাশে মজিবর রহমানদের বাড়ী ছিল। বলতে গেলে লাগোয়া বাড়ি।আলীগাঁও গ্রামটা বাম অঞ্চলে অবস্থিত ছিলো যদিও আমাদের বাড়ী অপেক্ষাকৃত একটু নিম্ন অঞ্চলে অবস্থিত ছিলো। তাই উঁচা ভিটা বেঁধে মজিবরদের এবং আমাদের বাড়ী বানাতে হযেছিলো। দু’টি উঁচা ভিটা বাঁধতে যেটুকু ফাঁক হয়েছিলো, সেটুকুই ফাঁকই ছিলো আমাদের দুই বাড়ীর মাঝখানে।মজিবরের বাবা মতিয়ার রহমানের সাথে আমাদের বাবার খুবই আন্তরিকতা ছিল। সেই আন্তরিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য হোসেন আলীর সাথে মজিবরের দোস্ত পাতিয়ে দিয়েছিল। সেই দোস্ত এখনও অটুট আছে। আমার দোস্ত পাতিয়েছিল আলীগাঁয়েরই তহের আলীর ছেলে আব্দুল আজিজের সাথে। আমাদের দোস্তির সম্পর্কটা তেমন ঘনিষ্ট না থাকলেও পরস্পরে পরস্পরকে দোস্ত বলে ডাকতাম এবং উভয় বাড়ির সকল সদস্যরাই সেই সম্পর্কটায় গুরুত্ব দিত। আমি পরে আরও তিন জনের সাথে দোস্ত পেতেছি। আমার ইচ্ছায় নয়, লোকের ইচ্ছায়। কাদঙের রূপাকুছির সবুর উদ্দিনের সাথে বারেক ভাই এবং মাণিকপুরের ইদ্রিস আলীর সাথে ইসমাইল হোসেন ভাই দোস্ত পাতিয়ে দিয়েছিল আমার ছাত্র জীবনে। আমাদের বগুড়া পাড়ার সোবাহান বেপারীর ছেলে গোলাপ হোসেনের সাথে দোস্ত পাতিয়ে দিয়েছিল আমাদের বাবা নিজে। বসতি অনেক পাতলা এবং লোকজন কম ছিল বলে বেগানা লোকের সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ানোর জন্য তখন এ ধরণের সম্পর্ক করার পরম্পরা ছিলো। উকিল শশুড়, ধর্মপিতা, ধর্মভাই প্রভৃতি সম্পর্ক তখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। গোলাপ হোসেনের বাবা সোবাহান বেপারীর সাথে বাবার সুসম্পর্ক ছিল। সোবাহান বেপারী রবিশস্যের বেপার করতেন। সরিষা, ধইনা, কালাইর বেপার। আমাদের বাড়ির রবিশস্য সোবাহান বেপারীর কাছেই বিক্রী করতেন। সেই সূত্রেই বাবার সাথে সোবাহান বেপারীর সুসম্পর্ক ছিল। সেই সুসম্পর্ক পরবর্তী জীবনে অটুট রাখার জন্যই গোলাপ হোসেনের সাথে বাবা দোস্ত পাতিয়ে দিয়েছিল।
আমার জন্ম আলীগাঁয় মামাদের বাড়ীতে। তখন এখনকার মতো ডাক্তারের সুবিধা ছিল না। গ্রামাঞ্চলে তখন কোনো পাসের ডাক্তারও ছিল না। কোনো ফার্মাসিতে থেকে কিংবা কোনো ডাক্তারের কাছে কাজ শিখে কোনো কোনো স্বল্প শিক্ষিত লোকেরা তখন গ্রামাঞ্চলে ডাক্তারী করতেন। তাঁদের তখন অনেকে হাতুড়ে ডাক্তার বলত। গ্রামাঞ্চলে তখন কোনো হাসপাতালও ছিল না। তাই হাসপাতলে কোনো সন্তান জন্ম হত না। বাড়ীতেই জন্ম হত ধাইয়ের তত্ত্বাবধানে। ধাইদের স্থানীয় ভাষায় চাওনি বলা হত। আমার জন্ম হয়েছিল সুর্যোদয়ের কিছু আগে। তখন ছেলে সন্তান জন্ম হলে আজান দেওয়ার নিয়ম প্রচলিত ছিল। তাই আমি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নানা ধনাই হাজী আজান দিয়েছিলেন। একথা নানী আমাকে পরে বলেছে।
নানা তখন হজ্ব করে এসেছিলেন। পরে জেনেছি, নানা প্রথমবার ১৯৩৯ সালে হজ্বে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বার গিয়েছিলেন আমার জন্মের তিন বৎসর পরে। তাই নানাদের বাড়ীটা হাজী বাড়ী নামে পরিচিত ছিল। নানাদের বাড়ীতেই মসজিদ ছিল। আমাদের নানা ধনীলোক ছিলেন। ধনীলোক বলতে কোটিপতি অথবা লাখপতি ছিলেন না। তাই ধনী না বলে, বলতে পারেন স্বচ্ছল ছিলেন। এক’শ বিঘার ওপরে জমি ছিল নানাদের।
রাখাল-চাকর দিয়ে চাষ-আবাদ করাতেন। তাই চাকর-বাকর, কামলা দিয়ে বাড়ীটা সব সময় সরগরম হয়ে থাকত।
মা কোন দিন আমাকে নিয়ে মামাদের বড়ীতে যাবে, সেটা জানার জন্য বললাম-মা, কোন দিন যাবে?
দেখি কোন দিন যেতে পারি। মা বললেন- তোর বাপের অনুমতি নিতে হবে তো। আমি বললে তো আর হবে না। তোর বাপের কাছে আগে কথাটা বলি। তিনি অনুমতি দিলেই চলে যাব। আমারও অনেক দিন যাওয়া হয়নি।
সন্ধ্যে বেলা ভাত খাওয়ার সময় আমি মাকে ইংগিতে বললাম- মা, কথাটা বাবাকে বলেছ?
মা বললেন- তোর এত তারাতারি কেন? বলবই তো। আজ নয়। ধীরে-সুস্থিরে সময় বুজে বলব।
না, এখনি বল। আমি জেদ ধরে বসলাম।
বাবা কথার হদিস না পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কি কথা?
মা বললেন- ও আজ স্কুল থেকে বাড়ী আসার সময় পায়ে হোঁচট খাওয়ায় ডান পায়ের মধ্যমা আঙুলের নখ উঠে গেছে। তাই বলেছি, তোকে আর হেঁটে স্কুলে যেতে হবে না। মামাদের বাড়ী থেকে পড়বি। তাই কোন দিন মামাদের বাড়ী নিয়ে যাব, বলতে বলছে।
বাবা উৎফুল্লিত হয়ে বললেন- তাহলে তো ভালই হয়। তাদের বাড়ীতেই স্কুল। দু’জন জাইগীরো আছে। হানিফ এবং কালু। ওদের বাড়ী রামাপাড়ার মোয়ামারি।(হানিফ আলী পরে গুয়াহাটির আজাদ হোটেলের মালিক হয়েছিল। এখন এন্তকাল করেছে। কালু মিঞার খবর বর্তমান আমার জানা নাই। হয়তো বেচে আছে এখনো।) ও কি পড়ছে আমরা কিছুই খবর নিতে পারি না। প্রয়োজনে কোনো পড়াও বলে দিতে পারি না। মামাদের বাড়ীতে থেকে পড়লে তাদের কাছে ও পড়াও শিখে নিতে পারবে। তুমি ভালো কথাই মনে করেছ। এখানে উন্নার(খরা) মরশুমে স্কুলে যেতে অসুবিধা না হলেও বর্ষায় স্কুলে যেতে খুবই অসুবিধা হবে। নাও ছাড়া স্কুলে যাওয়া সম্ভব হবে না। বারেক বলতে গেলে বর্ষার মরশুমে প্রায়ই স্কুল যায়ই না।ঠিক আছে, সময় করে ওকে নিয়ে একদিন আলীগাঁও যাও।আলীগায় থেকেই ও পড়বে।
এ ভাবে বাবা সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন আলীগাঁয় থেকে পড়ার জন্য।
আলীগাঁয়ের দিনগুলো
দুই দিন পর মার সাথে আলীগাঁও এলাম। পরের দিন হানিফ মামা এবং কালু মামার সাথে স্কুলে গেলাম। হানিফ আলী এবং কালু মিঞা একটু বেশি বয়েসে স্কুলে নাম ভর্তি করিয়েছিল। ওরা দুইজনই মামাদের ভাই বলে ডাকত। সেই সুবাদেই আমি ওদেরকে মামা বলে ডাকতাম।
আমি দেউলদি স্কুলে ছয় সাত মাস পড়েছিলাম এবং বর্ণ কয়টি পড়তে এবং লিখতে শিখেছিলাম। তখন প্রাইমারী স্কুলে ছয়টি শ্রেণী ছিল। ছোট ক-মান, বড় ক-মান, খ-মান, প্রথম মান, দ্বিতীয় মান এবং তৃতীয় মান। আগে থেকেই বর্ণ পরিচয় এবং লেখার অভ্যাস থাকার দরুন হেড স্যার ফজর আলী সাহেব আমাকে ক-মানে ভর্তি করে নিলেন। তখন স্কুলের হেড মাষ্টার ছিলেন ফজর আলী এবং সহকারি শিক্ষক ছিলেন হোসেন আলী স্যার। উভয়েই টি, টি পাস শিক্ষক ছিলেন।বিদ্যালয়ের নাম ছিলো 371 নম্বর আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৩৯ সালে স্থাপিত।পরবৰ্তীতে আমি এই বিদ্যালয়ে অনেক বছর শিক্ষকতা করেছি।
আমার নুতন জীবন শুরু হল। কালু মিঞা আমার থেকে বয়েসে অনেক বড় ছিল যদিও সেও বড় ক-মানে পড়ত। আমার মামাত বোন সামর্থ ভানুও পড়ত বড় ক-মানে। খুবই আনন্দের সাথে আমি লেখা-পড়ায় মনোনিবেশ করলাম।
তিন চার দিন স্কুলে খুব আনন্দের সাথেই যাওয়া আসা করলাম। একদিন স্কুল থেকে এসে বাড়ী এসে মাকে খুঁজছি, কিন্তু মাকে দেখছি না। এঘর, ওঘর করে সব ঘর খোঁজে দেখার পর আমার সন্দেহ হল, মা আমাকে রেখে বাড়ী চলে যায়নি তো! কথাটা ভাবার সাথে সাথে আমার মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে উঠল। এমনিতে স্কুল থেকে এসে ভাত খেযে পড়তে বসি, না হলে স্কুলের মাঠে খেলতে যাই। মাকে না দেখে সেদিন কিছুই ভাল লাগছিল না।সাড়াটা বাড়ী শূন্য শূন্য লাগছিলো এবং বুক ফেটে যাওয়ার উপক্ৰম হযেছিলো।
আমার অবস্থা দেখে নানী আমার নিকটে এসে বললেন- কাকে খুঁজছিস?
আমি মুখে কিছু না বলে ফ্যাল ফ্যাল করে নানীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
অ’ বুজেছি, মাকে খুঁজছিস? নানী বললেন- তোর মা বাড়ি চলে গেছে। আয় ভাত খাবি। তোর মামী ভাত বেড়ে বসে আছে। তোকে কোথাও না দেখে খুঁজতে খুঁজতে আমি এখানে এসেছি।
আমি কিছু না বলে আমাদের বাড়ি আসার রাস্তার মুখে এসে দাঁড়ালাম। রাস্তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। সেদিন আমার কেমন লাগছিল এখন সে কথা লেখে বুজানো সম্ভব নয়। মা’র আঁচল একজন সন্তানের জন্য কত প্রয়োজন সেদিন আমি সেই কথা উপলব্দি করতে পেরেছিলাম। যাই হোক, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছিলাম এবং লেখা-পড়ায় আগের মতোই মনোযোগ দিয়েছিলাম।
প্রথম বৎসরের বাৎসরিক পরীক্ষায় আমার রোল নম্বর আট হয়েছিল।১৯৬১ সাল। এক হয়েছিল আলী হোসেনের এবং দুই হয়েছিল কালু মিঞার। খ-মান থেকে প্রথম শ্ৰেণীতে উঠার সময় আমার রোল নম্বর হযেছিলো তিন। আলী হোসেনের এক এবং কালু মিঞার দুই। দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠার সময় আমার রোল নম্বর হলো দুই এবং আলী হোসেনের এক। কালু মিঞার তিন। দ্বিতীয় শ্ৰেণী থেকে তৃতীয শ্ৰেণীতে উঠার সময় আমার রোল নম্বর এক এবং আলী হোসেনের তিন হয়েছিলো।দ্বিতীয় শ্ৰেণীতে উঠার পর কালু মিঞা বাৎসরিক পরীক্ষা না দিয়েই পড়া ছেড়ে দিয়ে বাড়ী চলে গিয়েছিলো। তাই সাকাযেত হোসেনের রোল নম্বর দুই হয়েছিলো। আলী হোসেনের রোল নম্বর তিন হওয়ার কারণও ছিলো।(আলী হোসেন আমার থেকে বয়সে অনেকটা বড় ছিলো। প্ৰায় সাত আট বছরের মতো।প্ৰকাশ থাকে যে, তখন আট নয় বছরের আগে আমাদের গ্ৰাম্যাঞ্চলে দু-চারজনের বাদে কেউ স্কুলে যেতই না।)১৯৬৩ সালে আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর বাৎসরিক পরীক্ষার আগের দিন একটি ঘটনা ঘটেছিলো। সেদিন সন্ধ্যের সময় আলী হোসেন আমাদের স্কু্লে প্ৰশ্নপত্ৰ চুরি করতে এসেছিলো। স্কুলটা ছিলো মামাদের বাড়ী সংলগ্ন। প্ৰশ্নপত্ৰ থাকতো স্কুলের টেবিলে। মামা সিরাজুল হক যে গৃহে থাকতন, সেই গৃহটা ছিলো একেবারে স্কুলের সাথে লাগোয়া। যে ভাবেই হোক, সম্ভবত টেবিলের তালা ভাঙার শব্দ শুনে, মামা কথাটা টের পেয়ে গিয়েছিলেন এবং আলী হোসেনকে হাতেলোটে ধরে ফেলেছিলেন। তবে ছেলে মানুষ ভেবে তাকে শাসিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
পরের দিন হেড মাস্টার ফজর আলী স্যার স্কুলে এসে স্কুলের টেবিলের তালা ভাঙা দেখে সংয়োগবশতঃ সিরাজ মামাকেই ডেকে পাঠান। হেড স্যারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সিরাজ মামা স্কুলে এসে রাতের ঘটনা খোলে বলেন। তখন বাৎসরিক পরীক্ষা চলছিলো। তাই আলী হোসেনও সেদিন পরীক্ষা দিতে স্কুলে এসেছিলো।
হেড স্যার ফজর আলী সাহেব আলী হোসেনকে কাছে ডেকে এনে শাসন করে ছেড়ে দিয়েছিলন। এর কারণও অবশ্যে ছিলো। আসলে সেদিন প্ৰশ্নপত্ৰ স্কুলে ছিলই না। প্ৰশ্নপত্ৰ ছিলো হেড মাস্টার সাহেবের বাড়ীতে। আলী হোসেনও ছিলো নিত্যান্তই সহজ সরল। লেখা-পড়ায়ও ভালো ছিলো। স্কুলে প্ৰশ্নপত্ৰ চুরি করতে আসাটা ছিলো তার নিত্যান্তই ছেলে মানুষই। তাই হয়তো স্যারেরা তেমন কঠোর পদক্ষেপ নেন নি। আমি ভাবি, প্ৰশ্নপত্ৰ চুরি করতে এসে ধরা পরার জন্য আলী হোসেন মানসিকভাবে যে আঘাত পেয়েছিলো, তার জন্যই সম্ভবতঃ তার রোল নম্বর তিন হয়েছিলো। আলী হোসেন সম্পৰ্কে আমি পরে কোন খোঁজ খবর রাখিনি। কারণ আমি তৃতীয় শ্রেণীতে না পড়েই হেড মাস্টার ফজর আলী সাহেবর পরামর্শ অনুসারে সরাসরি চতুর্থ শ্রেণীতে গড়লা এম, ই মাদ্ৰাসায় ভর্তি হয়েছিলাম। আলী হোসেন তৃতীয় শ্রেণীতেই রয়ে গিয়েছিলো। আলী হোসেনের ছেলে আকবর আলী বলা মতে, আলী হোসেন ১৯৮৩ সালে মারা গেছে।
স্কুলে তখন ছেলেদের মাঝে আলী হোসেন এবং কালু মিঞার বাইরেও আমার সহপাঠী ছিল চান্দু মিঞা, আলী হোসেন, বলান খান, সাকায়েত হোসেন, আব্দুল আলী (আব্দুল পরবর্তীতে ফরেষ্টার হয়েছিল। এখন মৃত্যু বরণ করেছে।) আলী মিঞা, জমির হোসেন, নুর হোসেন. আবুল কাশেম, চান্দু মিঞা(এই চান্দু ছিল হানিফ মামার ছোট ভাই। ঘুতু দেওয়নীর বাড়ীতে জাইগীর থাকত। ঘুতু দেওয়ানীর ছেলে আকবরের সাথে আমার মামাত ভাই আব্দুর রহমানের দোস্ত পাতিয়েছিল। দোস্ত পাতার সময় ঘোঁড়ার বগি এনেছিল। সেদিন প্রথম ঘোঁড়ার বগি দেখেছিলাম এবং প্রথম বগিতে উঠার সুযোগ পেয়েছিলাম।)। ছেলেদের মাঝে আরও দুই চারজন ছিলো যদিও এখন তাদের নাম মনে করা সম্ভব হচ্ছেনা। মেয়েদের মাঝে সহপাঠী ছিলো তারা ভানু, সাজেদা খাতুন এবং সামর্থ ভানু। আব্দুলকে স্কুলের সবাই বাইশ কোটি পালোয়ান, নুর হোসেনকে বকাসুর এবং আবুল কাশেমকে তেইশ কোটি পালোয়ান বলে ডাকত। স্কুলে তখন নুরুল ইসলাম নামের একজন ছাত্র ছিল।সে আমার সম্পর্কীয় মামা লাগত। তার মাথায় জট ছিল। সে আমার থেকে দুই ক্লাস ওপরে পড়ত। মাথায় জট ছিল বলে তাকে সবাই জইটা বলে ডাকত। পরবর্তী পর্যায়ে সে বি, এ পাস করেছিল এবং আলীগাঁও এম, ই স্কুলে শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছিলো। নুরুল ইসলামই সম্ভবতঃ আলীগাঁও নিন্ম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতক ছিলো।সে ২০২১ সালের ২ রা আগস্ট মারা গেছে।
মামাদের বাড়ী থেকে এক মাইল পূবে আলীরপাম বাজার ছিল। সেই বাজার থেকে পরেশ চট্টি নামের একটি ছেলে আমাদের স্কুলে পড়তে আসত। সে আমার থেকে ওপরের ক্লাসে পড়ত। তার কথা বিশেষ কারণে আমার মনে আছে। আলীরপাম বাজারের পশ্চিম প্রান্তে দয়ালচাঁদ গোস্বামীর আশ্রম ছিল। সেই আশ্রমে ঝুলন পূর্ণিমার সময় নাটক করত। এক বৎসর দাতাকর্ণ নাটকে পরেশ চট্টি রোহিতাশ্বের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। দাতা কর্ণের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তারাপদ ফৌজদার। ওরফে তারাপদ সাহা। আমি সেই নাটক উপভোগ করেছিলাম।
আশ্রমের পশ্চিম প্রান্তে একটি প্রাইমারি স্কুল ছিল। সেখানে পালহাজির এলহাম খান শিক্ষকতা করতেন। সেই স্কুলের মাঠে আমি খ-মানে পড়ার বৎসর সার্কাস দল এসেছিল। আমি মামাদের সাথে সেই সার্কাস উপভোগ করেছিলাম। সেখানে জ্যান্ত মানুষ কবর দিয়েছিল এবং আধা ঘণ্টা কবরের ভেতর রাখার পর কবর থেকে জ্যান্ত তুলে এনেছিল। সেই সার্কাসে দুটি মেয়ে একটি গীত পরিবেশন করেছিল- ‘ফাগুন হাওয়ায় ডাক দিয়েছে, আগুন জ্বলে মনে, ঘরে রেখে ডাগর বধূ, বাইরে কেন ঢাল মধু।’ এই গীতটি তখন থেকেই আমার মনে আছে।
সাজেদা আমাদের প্রধান শিক্ষক ফজর আলী মাষ্টারের মেয়ে। চান্দুকে আমি তাউই বলে ডাকতাম। কারণ আমি ওর বোনের বিয়েতে উকিল হয়েছিলাম। উকিল হওয়ার সময় আমি খুবই ছোট ছিলাম। বাবার কোলে চড়ে বিয়ে বাড়ি গিয়েছিলাম। তখনও আমার বোঝার বা বলার বয়েস হয়নি। তাই যা বলার বাবাই বলেছিলেন। আমি বাবার কোলে বসে শুধু তামাশা দেখেছিলাম। সেদিন দুধ ভাত খাওয়ার সময় আমার নাক দিয়ে দুধ ঢুকেছিলো এবং আমার কাপড়-চোপড় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমরা সাধারণতঃ খাড়া কানার থালায় খেতাম। সেদিন আমাদের চিতনা থালায় খেতে দিয়েছিল। তাই চিতনা থালায় খাওয়ার অভ্যেস না থাকার দরুন দুধ চুমুক দিতে গিয়ে নাকে ঢোকে উক্ত ঘটনা ঘটেছিল।
আমার স্কুলের বন্ধুদের তালিকায় চান্দুর স্থান সবার ওপড়ে ছিল। আমরা এক সাথে খেলা-ধুলা করতাম। দলগত খেলায় আমরা দুজন দুই দলের নেতৃত্ব দিতাম। আমি দৌড়ে প্রায়শঃই আগে থাকতাম। তাই ছাউচি, ঘোল্লা খেলায় আমার খুবই সমাদর ছিল। প্রত্যেকেই আমার দলে থাকতে চাইত। লবণদারি খেলায় চান্দুর সমাদর আমার চেয়ে বেশি ছিল। কারণ লবণদারি খেলায় দৌড়ের চেয়ে বুদ্ধির প্রয়োজন বেশি হত। বুদ্ধির খেলায় চান্দু সব সময় আগে থাকত। চান্দু এক বাপের এক ছেলে ছিল। তাই বাড়িতে ওর খুবই আদর ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে আদরই ওকে নষ্ট করেছিল। লেখাপড়ায় ভাল ছিল যদিও আদরের জন্যই সে বেশিদূর এগোতে পারেনি। প্রাইমারি পাস করার পর ওর আর লেখাপড়া হয়নি। পড়া ছেড়ে দিয়ে দুষ্টুমি করে ঘুরে বেড়াত। এর গাছের আমটা, ওর গাছের শশাটা শখের চুরি করত। অবশ্যে পড়া বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনও কম দায়ি ছিল না। শুধু চান্দুরই নয়, আরও অনেকের জীবনে বিভীষিকা হয়ে এসেছিল ব্রহ্মপুত্র নদ। সে সব কথা পরবর্তী পর্যায়ে লেখার চেষ্টা করব। চান্দুর বুদ্ধাংক খুবই উচ্চ পর্যায়ের ছিল। প্রাইমারি পাস করলেও পরবর্তী সময়ে দেখেছি ও বংকিম চট্টোপাধ্যায়ে উপন্যাস নিজে বুঝে পড়তে পারত এবং অন্যকেও বুঝিয়ে দিতে পারত।
আমরা পড়াশুনার বাইরেও অবসর সময়ে বিভিন্ন খেলা-ধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। তার মধ্যে আমাদের প্রিয় খেলা ছিল মার্বল এবং লাটিম খেলা। আলিরপাম বাজারে সেকান্দার কর্মকারের সাইকেল মেরামতের দোকান ছিল। সাইকেল মেরামতের পাশাপাশি তিনি কর্মকারের কাজও করতেন। সেকান্দার কর্মকারের লম্বা লম্বা চুলদাড়ি ছিলো এবং বয়েস মনে হয় ষাঠের কাছাকাছি ছিলো। কর্মকার হিসাবে তাঁর খুবই নাম-ডাক ছিল। শুনেছি, তিনি নাকি বাঁশ দিয়ে সাইকেল তৈয়ার করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।তিনি কাঁচি, দা, কাটারি, ছুরি, খন্তা, কুড়াইল, লাঙলের ফাল, সুরকি, হানা, কোঁচের ফলা প্রভৃতি তৈয়ার করতেন। কাঠের কাজেও তাঁর ভালো হাত ছিল।তিনি লাটিম তৈয়ার করতেন। লাটিমগুলি দেখতে খুবই সুন্দর হতো। সেখান থেকে লাটিম কিনে এনে আমরা খেলা করতাম। সেকান্দার কৰ্মকারের দোকানে ফুলচান মিয়া সাইকেল মেরামতের কাজ করতো। ফুলচান মিঞা আমার থেকে বয়সে চার পাঁচ বছরের বড় ছিলো।তার কাছে পরবৰ্তী জীবনেও আমরা সাইকেল মেরামত করাতাম। সেকান্দার কৰ্মকারের ছেলেপিলে কয়জন ছিলো জানি না। তবে এক ছেলের বিষয়ে জানতাম। তার নাম ছিলো মেহের আলী। মেহের আলীও সাইকেল মেরামত করতো।ফুলচান মিঞার থেকে সে বয়সে বড় ছিলো। লাটিম খেলায় চান্দু ওস্তাদ ছিল।
আলীগাঁয় জিগীর মুন্সী নামের একজন লোক ছিল। আমাদের মামা জয়নাল আবদীন তাঁর বোন বিয়ে করেছিলেন। সেই সুবাদে তিনি আমার মামা হতেন। তিনি বর্ষার মরশুমে পাটের বেপার করতেন। বিভিন্ন হাট থেকে পাট কিনে নৌকায় করে ধুবুরী নিয়ে গিয়ে বিক্রী করতেন। ধুবুরী থেকে তিনি একটি কেরমবোর্ড কিনে এনেছিলেন। মনে হয়, সালটা ১৯৬১ ছিল। তখন আমি খ-মানে পড়ি। সেটাই ছিল আলীগাঁও অঞ্চলের প্রথম কেরমবোর্ড।
আলীগাঁও অঞ্চলে তখন কিছু কিছু শিক্ষার আলো পড়তে শুরু করেছে। মামাদের বাড়ির পূব দিকে দুটি বাড়ি পরেই জলিল হাজি সাহেবের বাড়ি ছিল। জলিল হাজির ছেলে বাবর আলী এবং আব্দুল আজিজ কিছু লেখা-পড়া শিখেছিলেন। তাঁরা আলীগাঁও অঞ্চলের অন্যান্য যুবকদের সাথে মিলে তাঁদের বাড়ীর সামনে একটি কমিউনিটি হল স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের মত আরও দুই চারজন স্বল্প শিক্ষিত যুবক ছিল আলীগাঁও অঞ্চলে। তাঁরাই সাধারণতঃ কেরম খেলতেন। বাবর আলী(এই বাবর আলী জলিল হাজির ছেলে নয়। আমার খালাত বোনের জামাই।) এবং মোসলেম উদ্দিনের নাম আমার মনে আছে। মোসলেম উদ্দিন জিগীর মুন্সীর মেয়ের জামাই ছিলেন। তিনি আলীগাঁও বাজারে দর্জি কাজ করতেন। আমরা মোসলেম উদ্দিনের কাছ থেকে হাফপেণ্ট বানিয়ে পরতাম।মোসলেম উদ্দিনের বাড়ী ছিলো গোবিন্দপুর। তখন আমরা গোবিন্দপুরকে কৈমারি বলে জানতাম। মোসলেম উদ্দিন পরে, মোসলেম প্রেসিডেণ্ট নামে জনাজাত হয়েছিলেন। আমাদের মামা সিরাজুল হক, ফজল হক, এবং অন্যান্যদের মধ্যে তমছের আলী, এলাহি বক্স, সিদ্দিকুর রহমান, আব্দুল হালিম এরাঁও কেরম খেলতেন।(আব্দুল হালিম পরে প্রাইমারির শিক্ষক হযেছিলেন। শুনেছি, তাঁর এক ছেলে কৃষি বিজ্ঞানী)তাঁরা তখন ছাত্র।
আলীগাঁও অঞ্চলে তখন কোনো এম. ই স্কুল ছিল না। তাই সবাই কাদং, দংরা, তারাবাড়ি, ভেল্লা প্রভৃতি স্কুলে জাইগীর থেকে পড়া-শুনা করতেন। তাই গরমের বন্ধে বাড়ী এলে তাঁরা কেরম খেলতেন। আমরা ছোটরা সেই খেলা খুব আগ্রহ সহকারে দেখতাম। লোক কম হলে তাঁরা আমাদের খেলার সুযোগ দিতেন। কেরম টেবিলের ওপড়ে রেখে খেলতেন। আমরা এতটাই ছোট ছিলাম য়ে, কেরাম টেবিলের ওপড়ে রাখলে আমরা ভালোভাবে নাগাল পেতাম না। তাই আমাদের পায়ের তলায় টোল দিয়ে দাঁড়িয়ে খেলতে হত। বিশেষ করে চান্দু, জিন্নত আলী এবং আমি কেরম খেলার সুযোগ পেতাম। জিগির মুন্সীর ভাইপো ছিল জিন্নত আলী। তাই বড়দের সাথে কেরম খেলার সময় সে সব সময় অগ্রাধিকার পেত। বড়রা কেউ না থাকলে তার সুবাদে আমরা ছোটরাও কেরম খেলার সুযোগ পেতাম। সুযোগ পেলে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে কেরম খেলা নিয়ে মেতে থাকতাম। অবশ্যে তার জন্যে গালা-গালও শুনতে হত বড়দের কাছ থেকে।পরবর্তী পর্যায়ে চান্দু কেরম খেলায় খুবই ওস্তাদ হয়ে উঠেছিল। সে বড়দের সাথে পাল্লা দিয়ে কেরম খেলত। জিন্নত আলী লেখা-পড়ার চেয়ে কেরম খেলায়ই বেশি ভাল ছিল।
আমাদের ছাত্রদের মধ্যে কিছুদিন বকপাখি পোষার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। বকেরা বাঁশেবনে বাসা বেধে ডিম দিয়ে ছানা তুলত। মামাদের বাড়ীতে বাঁশবন ছিল না। পূব পাড়ার ঘুতু দেওয়ানীদের পাড়ায় বাঁশবন ছিল। সেখানে বকেরা বাঁশের আগায় বাসা বানিয়ে ছানা তুলত। বাঁশ বেয়ে আগায় উঠে সেই ছানা ধরে আনতে হত। চান্দু, আমার মামাত ভাই আব্দুর রহমান এবং আমি একদিন বকের ছানা আনতে গিয়েছিলাম। একটি বাড়ির পেছনে অনেক বাঁশবন। কোনো কোনো বাঁশের আগায় বকের বাসা। চান্দু প্রথমে উঠে গিয়ে একটি বাসা থেকে একটি বাচ্চা ধরে আনল।
আমি বললাম- মাত্র একটি বাচ্চা ধরে আনলেন! আমাদের জন্য আনলেন না কেন? বাচ্চা কি একটাই ছিলো?
চান্দু বলল- না কয়েকটাই ছিলো। তবে বাচ্চাগুলো খুবই ছোট ছোট। সেগুলো লালন করা যাবে না। তাই আনলাম না। ঠিক আছে। পাশেই আর একটি বাসা আছে। সেখানেও বাচ্চা আছে। একটু জিরিয়ে নিয়ে ধরে এনে দিচ্ছি। বাঁশে অনেক কমচি। উঠতে খুব কষ্ট হয়। বাঁশের কমচিতে জড়িয়ে ধরে। চান্দু নিজের শরীর দেখিয়ে বললো- এই দেখেন, কমচির আঁচড় লেগে কয় জায়গায় চামড়া ছড়ে গেছে।
আমি বললাম- ঠিক আছে, আপনি জিরিয়ে নিন। আমি চেষ্টা করে দেখি উঠতে পারি কিনা! বলেই আমি একটি বাঁশ বেয়ে উঠতে লাগলাম। চান্দু মিথ্যা বলেনি। বাঁশের কমচিতে আটকে ধরে। সেগুলো পাস কাটিয়ে নানারূপ কসরৎ করে উঠতে হয়। আমি বকের বাসার একেবারে কাছা-কাছি উঠে গেলাম। বাসায় যে বাচ্চা আছে, না দেখেই বুঝা যাচ্ছে। বাচ্চারা কেচর- মেচর শব্দ করছে। আমি উৎসাহিত হয়ে উঠলাম। বাসার কাছা-কাছি গিয়ে একটু তলে থেকেই বাচ্চা ধরতে হাত বাড়িয়ে দিলাম। অমনি একটা দাঁড়াশ সাপ সোঁ সোঁ শব্দ করে আমার গা বেয়ে নেমে গেল। ভয়ে আমার শরীর থর থর করে কাঁপতে লাগল। কে কার বাচ্চা ধরে! আমি কাঁপতে কাঁপতে বাঁশ থেকে নেমে এলাম। আমার আর বাঁশবনে উঠার সাহস হল না। পরে চান্দু অন্য একটি বাঁশবন থেকে আমাদের জন্য দুটি বাচ্চা ধরে এনে দিয়েছিল। সেই বাচ্চাটা আদর করে পোষে বড় করেছিলাম। বাচ্চা ছেড়ে দিলেও ‘আয় আয়’ বলে ডাকলে কাঁধে এসে বসত। মানুষে বলে, বনের পাখি কখনও চিরদিন খাঁচায় পূরে রাখা যায় না। বাচ্চাটা বড় হওয়ার পর একদিন ছেড়ে দিয়ে স্কুলে গেছি। স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি বাচ্চাটা নেই। অনেক খোঁজা-খুঁজির পরেও আর বাচ্চাটা পেলাম না। হয়তো উড়ে গিয়েছিল, নয় তো কেউ ধরে খেয়ে ফেলেছিল।
আমার প্রথম উপন্যাস পাঠ
আমি যখন খ-মানে পড়ি তখন একটি ঘটনা ঘটেছিল। আলীগাঁও অঞ্চলের শিক্ষিত যুবকেরা আলীগাঁয় ‘রজনী প্রভাত’ নামে একটি লাইব্রেরী স্থাপন করেছিল। লাইব্রেরীটার কার্যালয় ছিলো মামাদের বাড়িতে। লাইব্রেরীতে দু’টি আলমারি ভর্তি পুস্তক ছিল। আমাদের মামা সিরাজুল হক এবং ফজল হকের লাইব্রেরী স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রচুর অবদান ছিল। আরও যারা লাইব্রেরী স্থাপনের সাথে যুক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে আলীগাঁর এলাহি বক্স, সিদ্দিকুর রহমান, তমছের আলী, মহির উদ্দিন, মানিক পুরের আজাহার আলী, আব্দুল করিম, আক্কাস আলী, আলমস আলী, চাচরার রজব আলী এবং দলাগাঁর আফসার আলীর নাম উল্লেখযোগ্য। রজব আলী এবং আফসার আলী মেট্রিক পাসের পরেই তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্থানে চলে গিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। শুনেছি রজব আলী নাকি সেখানে সেনা বাহিনীতে চাকরি করতেন এবং মেজর পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। আফসার আলীও উচ্চ পদে চাকরি করে অবসর নিয়েছেন। আফসার আলী দশ বার বছর আগে বাংলাদেশ থেকে আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে আসাম এসেছিলেন এবং একদিন আমার সাথে দেখা করতে আমাদের বাড়ীও এসেছিলেন। সম্ভবত আমার চেয়ে দশ বার বছরের বড় হবেন তিনি। তিনি বলা মতে, আমার বিষয়ে ছোটবেলার অনেক কথাই মনে আছে তাঁর।যাই হোক, লাইব্ৰেরীর সাথে যারা যুক্ত ছিলেন তাঁদের বেশির ভাগই ছাত্র ছিলেন। এরা বিভিন্ন জায়গায় জাইগীর থেকে পড়া-শুনা করতেন। গরমের বন্ধের সময় যখন সবাই বাড়ী আসতেন, তখন মামাদের বাড়ি সরগরম হয়ে থাকত। তখন সবাই লাইব্রেরীর পুস্তক পড়ত এবং কীভাবে গ্রামের উন্নতি করা যায় সে নিয়ে চিন্তাভাবনা করত।আফসার আলীর বাড়ী দলাগাঁ হলেও বন্ধের দিনগুলি মামাদের বাড়ীতেই কাটিয়ে দিতেন। আলীগাঁও থেকে দলাগাঁ চার পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে ছিলো।
বৎসরের অন্যান্য সময়ে অন্যান্যরা লাইব্রেরী থেকে কিতাপ নিয়ে পড়তেন। তাঁদের মধ্যে বাবর আলী(আমার খালাতো বোনের জামাই)র কথা আমার বিশেষভাবে মনে আছে। মামারা যখন বাড়ি থাকতেন তখন লাইব্রেরীর চাবি মামাদের কাছেই থাকত। মামারা বাড়ি না থাকলে লাইব্ররীর চাবি হানিফ মামার কাছে থাকত। একদিন বাবর আলী পুস্তক ফেরত দিতে এসে দেখে হানিফ মামা বাড়ি নেই। তখন কার কাছে পুস্তক জমা দেয়! আমাকে দেখে তিনি বললেন- হানিফ আলীকে দেখছি না! সে কোথায় গেছে?
আমি বললাম- বাজারে যেতে পারে, বসুন।
বাবর আলী বললেন- না, বসতে পারব না। কাজের তাড়া আছে। দেরি করলে অসুবিধা হবে। তিনি ভ্রূ কুঁচকে ভেবে বললেন- এক কাজ করি। তোমার কাছেই পুস্তক দুটি দিয়ে যাই। হানিফ এলে তাকে দিও। দিতে পারবে না?
আমি বললাম- পারব। পারব না কেন?
বাবর আলী আমার হাতে পুস্তক দু’টি দিয়ে বললেন- এই নাও। সাবধানে রেখ।পুস্তক যাতে না ছিঁড়ে।
আমি পুস্তক দুটি হাতে নিয়ে বললাম- না, ছিঁড়বে না। আমার পুস্তক রাখার জায়গায় রেখে দিব।
আমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে বাবর আলী পুস্তক দু’টি রেখে চলে গেলেন। আমি পুস্তক দু’টি নিয়ে আমার পড়ার জায়গায় এলাম। পুস্তক দু’টির মধ্যে একটি ছিল হিতেশ ডেকার ভাড়াঘর। অন্যটির নাম মনে নেই এখন। সম্ভবতঃ আনোয়ারা ছিল। কারণ তখন বাংলা পুস্তকের মাঝে আনোয়ারা এবং মনোয়ারা খুবই জনপ্রিয় ছিলো। শিক্ষিত অথবা অৰ্দ্ধ শিক্ষিত লোকের বিয়েতে পুস্তক দু’টি প্রায় সবাই উপহার দিত।আমি পড়ি অসমিয়া মাধ্যমে, তাই আমি ভাড়াঘর উপন্যাসের পাতা উল্টাতে লাগলাম। তখন সবে আমি খ-মানে উঠেছি। যুক্তাক্ষরের জ্ঞান তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তাই আমি বর্ণ জোঁটিয়ে জোঁটিয়ে পড়তে লাগলাম। ভালোভাবে বুঝতে না পারলেও পড়ে ভালো লাগল। লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া শুরু করে দিলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া মানে, যদি বড়রা বাহিরা পুস্তক পড়তে দেখে তাহলে রাগ করবে! তাই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া আর কি। বর্ণ জোঁটিয়ে জোঁটিয়ে পুস্তকটা শেষ করতে আমার মনে হয় সাত আটদিন লেগেছিল। এর পর থেকে সুযোগ পেলেই আমি লাইব্রেরী থেকে পুস্তক নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। পুস্তক পড়াটা শেষে প্রায় নেশার মত হয়ে গিয়েছিল। সুযোগ পেলেই পড়তাম। অৱশ্যে সুযোগ খুব কমই হতো। বড়দের ভয়, তার ওপড়ে ছিল স্কুলের পড়ার তাড়া। আমাদের দুজন শিক্ষকই পড়ার ক্ষেত্রে খুব কড়া ছিলেন। পড়া মুখস্থ না হলে বেত দিয়ে দস্তরমতো পিটাতেন। হোসেন আলী স্যার এক অভিনব পদ্ধতিতে শাস্তি দিতেন। জুলফিতে ধরে পেন্সিল দিয়ে মাথায় টোকা মারতেন। তখন খুবই কষ্ট হত। তাই পড়ার সুযোগ থাকলেও সব সময় পড়া সম্ভব হতো না।
পাঠ্য পুস্তকের বাইরে অন্য পুস্তক পড়ার কথাই যখন উঠেছে তখন নাটকের কিতাব পড়ার কথাটাও এই ফাঁকে বলে রাখি। মামারা বাৎসরিক পরীক্ষা শেষে বাড়ীতে এলে নাটক করতেন। লাইব্রেরীর সাথে যারা যারা যুক্ত ছিলেন তারাই নাটকে অভিনয় করতেন। সবগুলি নাটকের নাম এখন মনে নেই যদিও বন্দির ছেলে, রক্ত তর্পণ, রঘুবীর নাটক নামক তিনটি নাটকের নাম আমার মনে আছে। নাটকগুলি কলকাতা থেকে পার্সেল করে আনতেন। সেই নাটকগুলি আমি লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। সেখান থেকে নাটকের প্রতিও আমার আগ্রহ জন্মেছিল। কিতাপ পড়া সম্পর্কে আরও অনেক কাহিনী আছে। সেগুলি আমার লেখা ‘ফিরে দেখা’ নামক আত্মকথনে সন্নিবিষ্ট করার আশা রইল।

জীবনের প্রথম স্টীমার (জাহাজ) দর্শন
আগেই বলেছি মামাদের বাড়ি থেকে আলীরপাম বাজার প্রায় এক মাইল দূরে ছিল। প্ৰত্যেক শুক্রবারে সেখানে সপ্তাহিক হাট বসত।অনেক লোকের সমাগম হত সেই হাটে। আমরা স্কুল শেষে প্রত্যেক শুক্রবারে হাটে যেতাম। আগেই বলেছি, চান্দুর সাথে আমার আন্তরিকতা ছিল। চান্দু হাটে গিয়ে মমবাতি কিনত এবং সেগুলি পান দোকানীর কাছে বিক্রী করত। দু’আনা দিয়ে তিন’টি মমবাতি কিনত এবং সেগুলি একেকটা এক আনা দরে বিক্রী করত। তাই এক আনা লাভ থাকত। সেই পয়সা দিয়ে সে চাহ কিনে খেতো। আমাকেও মাঝে-মধ্যে চাহ খাওয়াতো। আমার পয়সা উপার্জনের তেমন তাড়া ছিল না। কারণ আমার বড় মামা জয়নাল আব্দিন হাটে কাপড়ের দোকান করতেন। দোকোনে গেলেই দু-চার আনা করে এটা ওটা কিনে খাওয়ার জন্য দিতেন। নিজে কামাই করে খাওয়ার স্বাদই আলাদা। তাই আমিও মাঝে-মধ্যে চান্দুর সেই ব্যবসার অংশীদার হতাম। কোনো কোনোদিন আমার পয়সা মারাও যেত।
আগাবেলা মমবাতি দিতাম এবং হাট ভাঙার আগে আগে পয়সা আনতাম। হাটে অনেক পান দোকান ছিল। কোনো কোনো দোকানীর বেচা-কিনা হয়ে গেলে সেই দোকানি দোকান-পাট সামলে চলে যেত। তখন দোকানের ক্রম ভেঙে যেত। তাই কাকে কাকে মমবাতি দিয়েছি কোনো কোনো দিন মনে করতে পারতাম না। তাই কোনো কোনো দিন চালান গায়েব হয়ে যেত। সে যাই হউক, আমি সেদিন হাটে একটু দেরিতে গিয়েছিলাম। চান্দুর খোঁজ নিয়ে দেখি সে পান দোকান দিয়ে ঘুরা-ঘূরি করতেছে।
আমি তার কাছে গিয়ে বললাম- তাউই, আজ কয়টি দোকানে দিয়েছেন?
চান্দু বলল- আজ দেওয়া হয় নি। নদী দেখতে গিয়েছিলাম। এইমাত্র এলাম। দেরি হয়ে গেছে। তাই খোঁজ নিতে এসেছি কেউ মমবাতি নেয় কিনা।
আমি বললাম- নদী দেখতে গিয়েছিলেন? কেন?
চান্দু বলল- ব্ৰহ্মপুত্ৰতে খুব ধার পড়েছে। জাহাজ (ষ্টীমার) উজাতে পারছে না। তাই জাহাজ দেখতে গিয়েছিলাম।
স্টীমারের কথা শুনে আমি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলাম। দূর থেকে স্টীমারের হর্ণের শব্দ শুনেছি যদিও স্টীমার তখনও স্বচক্ষে দেখা হয়নি। ব্রহ্মপুত্র নদে তখন ছোট ছোট জাহাজ চলত। বড় লঞ্চের থেকে কিছুটা বড়।তবে খুবই কম। সপ্তাহে বা মাসে দু একটা করে।তাই আমি কোনোদিন সেই জাহাজের ভাগে পরিনি। সেজন্য আমি স্বচক্ষে স্টীমার দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাম।স্টীমারকে তখন লোকে পানী(পাইনা)জাহাজ বলত।হর্ণের শব্দ বরপেটা পর্যন্ত শুনা যেত। কোনো কোনো স্টীমারের দুই দিকে ফ্ল্যাট বাঁধা থাকত।
আমি বললাম-চলেন তাহলে, আমিও জাহাজ দেখব।
এইমাত্র দেখে এলাম। এক্ষুনি আবার……চান্দু আমতা আমতা করতে লাগল।
জানেনই তো আমি আসব। একা একা গেলেন কেন? আমি বললাম- আমি এখন একা যেতে পারব না। আপনাকেও যেতে হবে আমার সাথে।
চান্দুর সাথে আমার আন্তরিকতাটা খুবই প্রগাঢ় ছিলো।তাই সে আমার আবদার ফেলতে না পেরে ভ্রূ কুঁচকে ভেবে বলল- ঠিক আছে। তিনটি দোকানে মমবাতি নিবে। মমবাতি তিনটি দিয়ে তার পরে যাব।
চান্দু মমবাতি কিনে এনে দোকানে দিল। ইতিমধ্যে আমার মামাত ভাই আব্দুর রহমান এবং চান্দুর চাচাত ভাই আলী হোসেন সেখানে এসে জুটেছিল। তাই আমরা চারজন নদীতে জাহাজ দেখতে গেলাম।
চান্দু মিথ্যা বলেনি। সত্যিই জাহাজ উজাতে পারছেনা। নদী তখন এখনকার মতো এতো প্রশস্ত ছিল না। এপাড় থেকে ওপাড় আধা মাইলের মতো হবে। দু’টি জাহাজ। একটি নদীর দক্ষিণ পাড়ে লঙর ফেলে রয়েছে এবং অন্য জাহাজটি উত্তর পাড় দিয়ে উজানোর চেষ্টা করতেছে। নদীতে প্রচণ্ড স্রোত। স্বাভাবিক না। অস্বাভাবিক। ঘটনাটা সম্ভবতঃ ১৯৬১ সালের। আমি তখন খ-মানে পড়ি। সময়টা সম্ভবতঃ বাংলা বৈশাখ মাসের শেষ দিকে ছিল।
সেখানে ব্রহ্মপুত্র নদের একটি সুঁতি ছিল। সুঁতিটায় বাইদাজনি ঢালা এসে পড়েছিল। হয়তো কোনো এক সময়ে নদী ভেঙে গিয়ে উত্তর দিকে অনেক দূর পর্যন্ত মানে গড়লার কাছা-কাছি গিয়ে পৌঁছেছিলো। আবার চড়া ফেলে নদী দক্ষিণ দিকে চলে এসেছে। কথাতে আছে, নদী মরলেও তার রেখ থাকে। তাই নদী দক্ষিণ দিকে চলে এলেও তার রেখা রয়ে গেছে। সুঁতিটা দেখতে খালের মতো। খরার মরশুমে অনেক জায়গায় জল থাকে না। বর্ষার মরশুমে জলে ভরে ফুলে-ফেঁপে উঠে এবং ভীষণ স্রোত পড়ে। সেবার একটু আগ মরশুমেই নদীতে জোয়ার এসেছিল এবং খুবই স্রোত পড়েছিল। আঙুল দিলে ছিঁড়ে যাবে এমনই ছিল সেই স্রোতের বেগ। ষ্টীমার এগিয়ে আসে ঠিকই; কিন্তু সুঁতির মুখে এলেই আর এগোতে পারে না, পিছিয়ে যায়। এভাবে কয়েকবার চেষ্টা করার পরেও যখন এগোতে পারল না, তখন ষ্টীমারটা নদের দক্ষিণ পাড়ে গিয়ে দ্বিতীয় স্টীমারটা থেকে একটু দূরে লঙর ফেলল। আমরা কিছুক্ষণ নদীর তামাশা দেখে সেদিনকার মতো বাজারে ফিরে এলাম।
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন শুরু

মামাদের বাড়ী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ এক মাইল দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। কাছে কোনো জলের ব্যবস্থা না থাকার দরুন সবাই নিজের নিজের গরুগুলিকে ব্রহ্মপুত্রতে গা ধোয়াতে নিত মাঝেমধ্যে। মামাদের বাড়ীতে সুনাউল্লাহ নামের একজন রাখাল ছিল। আমরা নদীর স্রোত দেখে আসার দুদিন পরে সে গরুর গা ধোয়াতে নদীতে গিয়েছিল। সে এসে নানা ধনাই হাজিকে বলল- তাউই, নদীতে খুব ধার পড়েছে। নদীর পারের মাটিতে ভাঙন ধরছে। ভয়ে গরু নদীতে নামাতে পারিনি।
নানা বললেন- তাই নাকি? তাহলেতো সমস্যা হবে। তারাবারি, রৌমারী, চেনিমারি প্রভৃতি অঞ্চলের অনেক জনবসতি ইতিমধ্যে নদী ভাঙনের ফলে নদীর জলে তলিয়ে গেছে। কিছুদিন আগে তারাবারির মারোয়ারীরা এসে আলীর পাম বাজার দেখে গেছে। তাঁদের আলীরপাম বাজার পসন্দও হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা আসার কথা। নদীতে ভাঙন শুরু হলে তাঁদের আর আসা হবে না। আমাদের ঘরবাড়ী, জমাজমি নিয়েও টানা-টানি পরে যাবে।
আমি নানার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। নদী ভঙনের কথা শুনে আমি দৌড়ে গিয়ে চান্দুকে খবরটা দিলাম- তাউই, নদীতে বোলে ভাঙন শুরু হয়েছে। দেখতে পারলে ভালো হত। যাবেন নাকি?
চান্দু বেলার দিকে চেয়ে বলল- অনেক বেলা আছে। যাওয়া যায়। আপনিও যাবেন নাকি?
আমি বললাম- যাব বলেই তো খবর দিতে এসেছি।
চলুন তাহলে। চান্দু বলল- রহমানও যাবে নাকি?
আমি বললাম- যেতে পারে। আপনি একটু দাঁড়ান। আমি ডেকে নিয়ে আসি।
আমি রহমানকে ডাকতে এলাম। রহমানকে নিয়ে ফিরে আসার সময় দেখা হল সামেজুদ্দিনের সাথে। সামেজুদ্দিন রহমানের মামাত ভাই।রহমানের চেয়ে বয়সে ছোট।
সামেজুদ্দিন বলল-কোথায় যাচ্ছ?
রহমান বলল- নদীর ভাঙন দেখতে যাব।
সামেজুদ্দিন বলল- আমিও যাব তোমাদের সাথে।
আমি বললাম- চান্দুও যাবে আমাদের সাথে। ভালই হল, চারজন একসাথে যেতে পারব।
চান্দুর কথা শুনে সামেজুদ্দিন দমে গেল। বলল- চান্দু গেলে আমি যাব না। ও খুব দুষ্টু। সেদিন আমার সাথে কি ব্যবহারটা করল তোমাদের মনে নেই?
আছে, থাকবে না কেন? আমি বললাম- সেটাতো ছিল একটা খেলা।
এমন খেলা খেলতে হয় নাকি? সামেজুদ্দিন বলল- আমি সেদিন হাত দিয়ে ভাত খেতে পারি নি। ঘেন্না করছিল। চামুচ দিয়ে ভাত খেয়েছি।
খেলার কথাই যখন উঠেছে, তাহলে কথাটা একটু বুঝিয়ে বলি।সেদিন আমরা চোর পুলিস খেলছিলাম। চান্দু- চোর, আলি হোসেন- গেরস্ত, গাজিবর(গাজিবর সোভাহান দেওয়ানীর ছেলে। সোভাহান দেওয়ানীকে সবাই ‘মানে’ দেওয়ানী বলত। কারণ সোভাহান দেওয়ানীর একটি মুদ্রাদোষ ছিল। তিনি কথা বলার সময় ‘মানে মানে’ করতেন।) দারোগা, সামেজুদ্দিন- পুলিস এবং আমি হাকিম। আব্দুর রহমান, জিন্নত আলী এবং অন্য দুই তিনজন দর্শক ছিল। তাদের নাম এখন মনে নেই।
খেলাটার আইডিয়া ছিলো চান্দুর। চোর পুলিশ খেলা। খেলাটা ছিল এই রকম- গেরস্ত আলি হোসেন কলাপাতা কেটে এনে বিছানা করে শুয়ে নাক ডাকাতে লাগল। চোররূপী চান্দু চোর সেজে এসে সিঁদ কাটার ভান করে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। আলি হোসেন শিতানে একটি লুঙি রেখে শুয়েছিল। চান্দু লুঙিটা নিয়ে পালিয়ে গেল।
কে একজন মুরগের ডাক ডেকে ভোর হওয়ার ইংগিত দিল। আলি হোসেন ঘুম থেকে উঠে দেখে তার লুঙিটা শিতানে নেই। সে এসে থানায় অভিযোগ দিল।
থানার দারোগার অভিনয় করা গাজিবর বলল- কে চুরি করেছে বলে তোমার সন্দেহ হয় ?
আলি হোসেন বলল- আমাদের এই এলাকায় চান্দুর বাহিরে অন্য চোর নেই। চান্দুই চুরি করেছে, স্যার।
চান্দু চুরি করে মাল লুকিয়ে রেখে গম ক্ষেতে শুয়েছিল। দারোগারূপী গাজিবর সামেজুদ্দিনকে নিয়ে চোর ধরতে এসে চান্দুকে গম ক্ষেত থেকে ধরে বলল- বল বেটা, মাল কোথায় রেখেছিস?
চান্দু আসলে জাত বদমাস ছিল। সে গম ক্ষেতের এক জায়গায় গর্ত করে হেগে মাটি চাপা দিয়ে রেখেছিল। সে সেই জায়গায় দেখিয়ে বলল- মাল এখানে রেখেছি, স্যার।
দারোগারূপী গাজিবর পুলিসরূপী সামেজুদ্দিনকে হুকুম দিল- যাও, মাল বের কর।
মাল বের করার জন্য সামেজুদ্দিন মাটিতে দুহাতের আঙুল ঢুকিয়ে দিল। তখন তার আঙুলে গু লেগে ধরল। গু দেখে সামেজুদ্দিন ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল। বলা বাহুল্য, সামেজুদ্দিনের অবস্থা দেখে আমরা সবাই দৌড়ে পালালাম। হাকিম হয়ে আমাকে আর বিচার করতে হল না।
ঘেন্না করারই কথা। আমি সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললাম- চান্দু তাউই সেদিন কাজটা ভালো করেনি। আমার মনে হয়, সে আর ওরকম কাজ করবে না। যদি করে, আমরাও ওর সাথে আর খেলব না। চল।
সামেজুদ্দিন দৃঢ় কণ্ঠে বলল- না, চান্দু গেলে আমি যাব না।
রহমান বলল- চল্, আজ যদি বদমাসী করে, তাহলে দাদার কাছে নালিশ দিব। দাদা ধমক মেরে ওকে সোজা করে দিবে।
রহমান মিথ্যা বলেনি। দাদা মানে ধনাই হাজির ধমকের দাম ছিল। ধনাই হাজির ধমক খেয়ে পাগলও সোজা হয়ে যেত। আলিগাঁয় ফজা নামের একজন পাগল ছিল। যাকে বলে বদ্ধ পাগল। ঘোড়ার লাদ মিষ্টির মতো মজা করে খেত এবং অন্যকে সেই লাদ দেখিয়ে বলত- ‘খেয়ে দ্যাখ, কি মিষ্টি।’ এর বাড়ির লাঙল ওর বাড়ি নিয়ে গিয়ে রেখে দিত। এক গেরস্তের গরু গোয়াইল থেকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে রাত দুপুরে অন্যের ক্ষেতে হাল জোড়ত। এর গাছের লাউটা চুরি করে ওর বাড়িতে রেখে দিত। এ রকম নটখট কাজ করত আর কি! অবশ্যে বদ্ধ পাগল হলেও সে এমনিতে মানুষের কোনো অন্যায় করত না।
ফজা পাগলা রাতে ঘুমোতো না। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াত আর এ রকম নটখটে কাজ করত। ধনাই হাজির বাড়ির সাথে সংলগ্ন মসজিদ গৃহ ছিল। একদিন রাতে ফজা পাগলা সেই মসজিদে ঢোকে যতগুলি মমবাতি ছিল, সব মমবাতি জ্বালিয়ে ছিল এবং সেই মমবাতির আগুনে মসজিদের জায়নামাজ পুড়ে গিয়েছিল। ধনাই হাজি ফজরের নামাজ পড়তে গিয়ে দেখে সবগুলি মমবাতি জ্বলতেছে এবং আগুন লেগে জায়নামাজ পুড়তেছে। তাঁর বুঝতে অসুবিধা হল না যে, কাজটা কে করেছে। সকাল বেলা রাখাল পাঠিয়ে ফজা পাগলাকে ধরে এনে ধমকে দিয়েছিল এবং সেই ধমক খেয়ে সে মোটা-মুটি ভাল হয়ে গিয়েছিল। এমনই ব্যক্তিত্ব ছিল ধনাই হাজির। ধনাই হাজিকে কেউ ভয় অবশ্যে করত না, তবে সমীহ করে চলত সবাই।
সামেজুদ্দিনও জানত ধনাই হাজির এই ব্যক্তিত্বের কথা। তাই ধনাই হাজির কাছে নালিশ দেওয়ার কথা শুনে শেষ পর্যন্ত সে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেল।
চান্দুকে নিয়ে আমরা আলিরপাম বাজার হয়ে নদীর পাড়ে এলাম।
নদীর পাড়ে এসে দেখি অনেক লোক জড়ো হয়ে নদী ভাঙনের দৃশ্য উপভোগ করছে। নদীর জল কালান্তক যমের মতো গর্জন করছে। সেই দৃশ্য ছিল অতিশয় ভয়ঙ্কর। চোখে না দেখলে সেই দৃশ্য বর্ণনা করে বুঝানো সম্ভব নয়। আধা বিঘা, পোয়া বিঘা জমি নিয়ে মাটিতে ফাটল ধরছে। চর্ চর্ শব্দ হচ্ছে এবং এক সময় সেই মাটি ঝপাং করে নদীর জলে লুটিয়ে পড়ছে এবং প্রচণ্ড গর্জন করে জল সেই মাটি নিজের পেটে সামাল দিচ্ছে। মাটির সাথে কলাগাছ এবং অন্যান্য ছোট-বড় গাছ-গাছড়া, ঘাস-বন নদীর জলে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যেন ক্ষুধাতুর অজগড় সেই গাছ-বন-তৃণ গিলে ফেলছে। কলাগাছের গোড়ার মাটি ধুয়ে যাওয়ার পর ফোঁস্ করে জলের ওপড়ে ভেসে উঠছে এবং জলের স্রোতের টানে নৃত্য করতে করতে ভাটির দিকে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই অদৃশ্য হয়ে পড়ছে। কাক, চিলেরা জলের বুক থেকে পোকা, মাকড়সা, উইচিরিঙা প্রভৃতি থাবা মেরে ধরে মজা করে খাচ্ছে। ছোট-বড় ছেলে-মেয়েরা সেই দৃশ্য প্রাণ ভরে উপভোগ করছে। স্রোতের টানে অনেক কাঠখরি ভেসে আসছে। দুই একজন সাহসী ছেলে সেই ভাঙনের মধ্যেও সাঁতরে গিয়ে সেই কাঠখরি ধরে আনছে।
আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে একটু পশ্চিম দিকে একটা বাড়ি। বাড়িটা নদীর ভাঙনের মুখে পরছে। ঘরগুলো স্থানান্তর করেছে। সেই বাড়ির কাছে কিছু লোক জটলা করে দাঁড়িয়ে ছিল।
চান্দু বলল- চলেন তাউই, ওখানে কি হচ্ছে দেখে আসি।
বাক্যব্যয় না করে আমরা সেখানে এলাম। এসে দেখি একটি কবরকে কেন্দ্র করে জটলা বেঁধেছে। দুই তিন মাস আগে একজন লোকের মৃত্যু হয়েছে। তারই কবর। কবরটার আধা অংশ নিয়ে ফাঁটল ধরেছে। তাই সবাই প্রত্যক্ষ করছে। আমরাও সেখানে দাঁড়ালাম। একটু পরেই কবরের আধা অংশ নদীতে নেমে গেল। লাশটা নেমে গেল না। লাশটার আধা অংশ বের হয়ে ঝুলতে লাগল নদীর কাছাড়ে। কাফনের কাপড়ের মধ্যে লাশটা তখনও অক্ষত ছিল। লাশটা দেখা যাচ্ছিল না। কাফনের কাপড়ে ঈষৎ শেওলা জমেছিল। আমার আর দেখার সাহস হল না।
আমি চান্দুকে বললাম- তাউই, চলেন। আমি আর দেখতে পারব না।
রহমান আমার কথা সমর্থন করে বলল- আমার বমি পাচ্ছে। মাথা ঘুরাচ্ছে। তারাতারি চল।
সামেজুদ্দিন বলল- আমারও বমি পাচ্ছে।
চান্দুর অবশ্যে আসার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু আমাদের তাগিদে সে আসতে বাধ্য হল। সেদিন রাত্রে আমার ঘুম হল না। লাশটার সেই দৃশ্য বার বার চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগল।
সে বৎসরই নদী ভেঙে এসে আলীরপাম বাজার পেল। বাজারে অনেক হিন্দু ব্যবসায়ী লোক ছিল। তাঁরা সেখান থেকে উঠে এসে একটু উত্তর দিকে বাজার বসাল। সেখানে একটি বড় শিমুল গাছ ছিল। তাই সেই বাজারের নাম হল শিমুল তলা বাজার। কিছুদিন পরে সেখানেও ভাঙন শুরু হল। সেখান থেকে বাজার উঠে এসে এক মাইল উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত আলম খানের বাড়ীর কাছে বাজার বসল।আলম খানের বাড়ীর কাছে বলে সেই বাজারের নাম হল আলম তলা বাজার। আলমতলা বাজার থেকে আধা মাইলের মতো ঈষৎ উত্তরপূর্ব দিকে মানিকপুর বাজার অবস্থিত ছিল। দুই তিন ঘর ব্যবসায়ী লোক সেখানেও চলে গেল।
সে সময় নুতন বাজার বসালে যাত্রা এবং কবিগান আয়োজন করা হত। কবিগান দিনের বেলা এবং যাত্রাগান রাত্রিবেলা অনুষ্ঠিত হত। একদিন কৃষ্ণলীলা যাত্ৰানুষ্ঠান দিনের বেলাতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই যাত্রাপালায় রাধেশ্যাম বিশ্বাস কৃষ্ণ এবং প্রফুল্ল শীল রাধার অভিনয় করেছিল। রাধেশ্যাম এবং প্রফুল্ল উভয়ে আলীগাঁও প্রাইমারী স্কুলের ছাত্র ছিল। তখন হিন্দু এবং মুসলমানের পার্থক্য আমরা বুঝতাম না। সবাই মিলে-মিশে থাকতাম। রাধেশ্যামের গানের গলা ভালো ছিলো। পরবৰ্তীতে সে কবিগান পালায় হারমোনিয়াম বাজাত এবং দোহারি করত।
আমাদের স্কুলের একটি ঘটনার জন্য রাধেশ্যাম বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। তখনকার দিনে আমোদ-প্রমোদের তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আমোদ-প্ৰমোদের মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্ৰকারের খেলাধূলা এবং যাত্ৰাগান। কিশোর ও যুবকেরা ফুটবল, হাডুডু, গোল্লা, ছাওচি, লবণদারি, কড়ি মুচড়ানি, কাছি টানা, মার্বল, লাটিম খেলত এবং বড়রা মাঝেমধ্যে লাঠিবাড়ি খেলত।লাঠিবাড়িকে তখন সর্দার বাড়িও বলা হত। লাঠিবাড়ি খেলায় রূপা, হাইছা এবং হালু মিঞার খুব নাম-ডাক ছিল। এরা তিনজন দেখতে পালোয়ানের মত ছিল। মাজায় কাপড় পেচিয়ে যখন মাঠে নামত, তখন প্রকৃত লাঠিয়ালের মত মনে হত। লাঠি খেলার আগে ডাক ভাঙতে হত। রূপচান ডাক ভাঙায় ওস্তাদ ছিল।
মাঝে-মধ্যে আলীরপাম প্রাইমারি স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলা হত। একদিন আমি ফুটবল খেলা দেখেছিলাম। সেদিন আলীরপাম বাজারের বিশ্বনাথ সাহা।(ডাক নাম বিশা খলিফা), রাধ্যেশ্বাম সাহা, মানিকপুরের আজাহার আলী, আক্কাস আলী, আব্দুল করিম, আলীগাঁয়ের ফজল হক, সিরাজুল হক, এলাহি বক্স, এলহাম খান সেই ফুটবল খেলায় অংশ গ্রহণ করেছিল। আরও অনেকে ছিল যদিও তাদের নাম এখন আমার মনে নেই। খেলাটা খুবই উচ্চমানের ছিল। বিশা খলিফা এক সময় তদানীন্তন পূর্বপাকিস্থানের মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের প্লেয়ার ছিল।
একদিন ছুটির পরে হেড মাষ্টার ফজর আলী সাহেব বললেন- দেখি কে কেমন কুস্তী(স্থানীয় ভাষায় কুস্তীকে পাছাড় খেলা বলা হত) লড়তে পারিস। আয়, কে কে কুস্তী লড়বি।
সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল কুস্তী লড়াই। ছোট বড় সবাই কুস্তী লড়তে শুরু করে দিল। ছোটরা খানিক লড়েই বড়দের লড়াই উপভোগ করতে লাগল এবং কালু মিঞার সাথে সবাই কুস্তীতে পরাজিত হতে লাগল।
হেড মাষ্টার সাহেব বললেন- কালুকে হারাতে পারে এমন কেউ আছে কি?
রাধেশ্যাম কুস্তী না লড়ে মনে মনে দাঁড়াইয়া ছিল। সে সার্টটা খোলে বলল- আমি লড়ব কালুর সাথে।
হেড মাষ্টার বললেন- পারবি তো! সবাই কিন্তু পরাজয় হচ্ছে।
রাধেশ্যাম বলল- সবাই যখন পরাজিত হচ্ছে, আমি হলে আর তেমন কি ক্ষতি হবে! লড়ে দেখি, পারি কিনা!
হেড মাষ্টার সাহেব বললেন- লড়ো তাহলে।
কালু মিঞা এবং রাধেশ্যামের কুস্তী লড়াই শুরু হল। দুজনই প্রায় সমান সমান। কেউ কাউকে মাটিতে ফেলতে পারছে না। রাধেশ্যাম বিশ্বাস হঠাৎ কালুর পায়ে নিজের পা দিয়ে পেঁচ দিয়ে কালুকে মাটিতে ফেলে দিল। সাথে সাথে করতালি আরম্ভ হল। কিন্তু কালু উঠতে পারছে না। সে বাম হাতটা ধরে দুই পা মেলে বসে রইল।
কি হল? উঠছিস্ না কেন? হেড মাষ্টার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
কালু বলল- আমার হাতটা মনে হয় ভেঙে গেছে।
হেড মাষ্টার উঠে গিয়ে বাম হাতটা ধরে একটু নাড়াচাড়া করে বললেন- সত্যিইতো ভেঙে গেছে।
কালুকে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসা হল। সাথে সাথেই বাচ্চা মুরগি মেরে থেঁতু করে হাতের ভাঙা অংশে লাগিয়ে বাঁশের কাঠি এবং কাপড় পেঁচিয়ে ঝাঁপ বেঁধে দেওয়া হল।কালু মিঞার সেই ভাঙা হাত ঠিক হতে প্রায় তিন মাস লেগেছিল। সেদিন থেকেই রাধেশ্যাম হিরো হয়ে উঠেছিল।
আলীগাওঁ বাজার আলম তলায় থাকাকালীন বাজারের সাথে জড়িত আমার দু’টি ঘটনার কথা মনে আছে। একদিন নানী আমার হাতে একটি এক টাকার মুদ্রা দিয়ে বললেন- যা, বাজার থেকে দুই সের গুড় নিয়ে আয়। যাবি, আর আসবি। খুচরা পয়সা সাবধানে আনিস। হারায় না যেন।
আলম তলা বাজার মামাদের বাড়ী থেকে আধা মাইল দূরে উত্তর-পূৰ্ব দিকে অবস্থিত ছিলো।গুড় আনার জন্য পয়সা কুঁচে গুজে দিলাম দৌড়। এক দৌড়ে এসে নিত্যানন্দ সাহার দোকান পেলাম। দুই সের গুড় নিয়ে টাকাটা দিলাম। নিত্যানন্দ সাহা টাকা ক্যাসবাক্সে রেখে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এদিকে খুচরা ফেরতের জন্য আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিতানন্দ সাহা বললেন- বাড়ী যাবি না? দাঁড়িয়ে আছিস যে?
আমি আমতা আমতা করে বললাম- খুচরা পয়সা?
নিত্যানন্দ সাহা বললেন- এক টাকাই হয়েছে। গুড়ের দাম বেড়েছে। আট আনা সের।
আগে পঁয়ত্রিশ পয়সা করে ছিল। সেদিন থেকে পঞ্চাশ পয়সা হল। সালটা ছিল ১৯৬২। মাত্র আট আনা সের গুড়! এখন ভাবলে অবাক লাগে।
১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। বোমা ফেলতে পারে, এই ভয়ে সাবধানতাবশতঃ আমাদের স্কুলের পেছনে জেড আকারের কয়েকটা গর্ত খুঁড়িয়েছিলেন মাস্টার মশায়রাঁ।গর্তগুলো আমরা ছাত্ররাই খুঁড়েছিলাম মাস্টার মশায়দের নির্দেশ মতো। বোমা ফেলার মতো ঘটনা ঘটলে সেই গর্তে কেমন করে লুকোতে হবে স্যারেরা আমাদের সেই বিষযে ট্রেনিং দিয়েছিলেন। তখন সবার বাড়িতে রেডিও ছিল না। আলীগাঁও অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র আজিজ সরকারদের বাড়িতে পোর্টএবল রেডিও ছিল। সেখানে আমি একদিন বরদলুই ট্রফির ধারা বিবরণী এবং একদিন গীতিমালিকা অনুষ্ঠান শুনেছিলাম। গীতিমালিকা আধুনিক গীতের অনুষ্ঠান ছিলো। গীতিমালিকা সকাল সাড়ে সাত ঘটিকায় অনুষ্ঠিত হতো এবং সংবাদ পরিবেশন করা হতো সন্ধ্যে সাড়ে সাত ঘটিকায়। সেই ধারা বিবরণী এবং গীত শুনার কথা আমার এখনও মনে আছে। আলীরপাম বাজারে নিত্যানন্দ সাহা এবং সূর্য সাহার দোকানে কাঠের বাক্সের বড় আকারের রেডিও ছিল। রেড়িওগুলি পোর্টএবল ছিল না। মানে ইচ্ছে করলেই যেখানে সেখানে স্থানান্তর করা যেত না। এক জাযগায় স্থাযীভাবে বসিযে রাখা হতো। অনেকে সন্ধ্যেবেলা সেখানে যুদ্ধের খবর শুনতে যেতো। দোকানের সামনে চট বিছিয়ে দিত।সবাই সেখানে বসে যুদ্ধের খবর শুনত। আমিও দুই তিন দিন সন্ধ্যেবেলা খবর শুনতে গিয়েছিলাম এবং চটে বসে যুদ্ধের খবর শুনেছিলাম।
সেই যুদ্ধের বৎসরই বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আগেই বলা হয়েছে, আমাদের নানা ধনাই হাজী আলীগাঁও অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন।নির্বাচনের সময় তাজুদ্দিন উকিল, ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ, রেণুকা বরকটকী প্রভৃতি রাজনৈতিক নেতারা নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা করতে নানার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আমি একদিন সবার সাথে ফখরুদ্দিন সাহেবের সাথে করমর্দন করেছিলাম। খুবই তুলতুলে নরম ছিল ফখরুদ্দিন সাহেবের হাত।
তখন বৈশাখ জৈষ্ঠ মাসে প্রায় সবাই ঘুড়ি উড়াত। চং, চিলা, পত্তিংগা প্রভৃতি। চঙের মাথায় বেত মিহি করে বেঁধে দিত। কুম্ কুম্ শব্দ করে ডাকত সেই বেত। তখন খেত নিড়ানোর সময়। খেতে খেতে কামলারা ক্ষেত নিড়াত এবং ধূয়া গান গাইত। তার সাথে যোগ হত সেই চঙের বেতের ডাক! একেবারে সরগরম হয়ে উঠত পরিবেশ।
আমরা ছোটরা পত্তিংগা এবং চিলা উড়াতাম। মাঝে মাঝে চং বানানোর চেষ্টাও করতাম এবং দুই একটা বানাতামও, তবে সেই চং উড়ত না। কিছু সময় দৌড়া-দৌড়ি করে ভেঙে-মুচরে ফেলে দিয়ে বাড়ী চলে আসতাম। একদিন অবশ্যে আমি বানানো একটি চং উড়েছিল। সেদিন সেকি আনন্দ! ছোট ছোট ছেলেদের কাছে আমি হিরো বনে গিয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু আমার সেই হিরোগিরি স্থায়ী হয়নি। তারপরে অনেক চং বানিয়েছি, কিন্তু একটি চঙও আর উড়ে নি। তাই পত্তিংগা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হত। কোন কোনদিন দিনে দুই তিনটি করেও পত্তিংগা বানাতম। কারণ কাগজের অভাব ছিল না। মামারা বৎসরের শেষে খাতার কাগজ বাড়িতে এনে রেখে দিতেন। সেই কাগজগুলিই পত্তিংগা বানানোর কাজে ব্যবহার করতাম। তখনকার দিনে বই-পত্রের মলাটের জন্য বাঁশ তাও(এক প্রকার কাগজ) ব্যবহার করত। পরে সেই বাঁশতাও দিয়েও পত্তিংগা বানাতাম। একটি পত্তিংগা বানাতে আধা তাও বাঁশ তাও ব্যবহার করতাম। আধা তাওযের সেই পত্তিংগা নিয়ে একদিন একটি ঘটনা ঘটেছিলো।
আলীগাঁও অঞ্চলের জমি ধান-পাটের জন্যে খুবই উপযোগি ছিল। এক কোমরের ওপড়ে জল হত না। প্রচুর পাট এবং আমন ধান হত। তাই কৃষকদের সহায় করার জন্য আলীগাঁও প্রাইমারি স্কুলের পশ্চিম পাশে গ্রামসেবকদের থাকার জন্যে একটি আবাসগৃহ নির্মাণ করেছিল। সেই আবাসগৃহ নির্মাণের সময় ঘটেছিলো ঘটনাটা। সেদিন আমি আধা তাও বাঁশতাও দিয়ে পত্তিংগা বানিয়ে উড়াচ্ছিলাম। আব্দুর রহমানও ছিলো আমার সাথে। কিছু সময় ঘুড়ীটা উড়ানোর পর ঘুড়ীর ডোরের কাঠিতে পাটকেল চাপা দিয়ে অন্য কিছু একটা খেলা খেলছিলাম। কি খেলছিলাম তা এখন মনে নেই। হঠাৎ ঝাপটা বাতাস এসে পাটকেল চাপা থেকে কাঠিটা সরে গিয়ে ঘুড়ীটা ওপরে উঠতে লাগল। বাতাস পূর্বদিক থেকে বইছিল। ঘুড়ীটা পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি আকাশের দিকে উঠতে লাগল। আমি ঘুড়ীর পেছন পেছন দৌড়োতে লাগলাম।
তখনকার দিনে আনারস মার্কা সূতার খুবই নাম-ডাক ছিল। চিকণ মিহি এবং খুব শক্ত ছিল সেই সূতা। এক গাড়ী সূতা কিনে এনে আমি আর রহমান ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। আমার সুতাটুকু আমি একটা বাঁশের কাঠিতে পেঁচিয়ে নিয়েছিলাম।বলা বাহুল্য, আমি সেই সূতা দিয়েই সেদিন ঘুড়ীটা উড়াচ্ছিলাম। ঘুড়ী ওপড়ের দিকে উঠছে আর কাঠি থেকে সূতা খসে সূতার কাঠিটা নিচের দিকে নেমে আসছে। এই ধরি, এই ধরি করে ঘুড়ির পেছনে ছুটতে লাগলাম। রহমান কিছুদূর আমার সাথে দৌঁড়ে এসেছিল যদিও কিছুদুর আসার পর সে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি ডাকলাম যদিও সে আর অগ্রসর হল না।আমি একাই ছুটতে লাগলাম ঘুড়ীর পেছনে। ছুটতে ছুটতে দলাগাঁয়ের মাথাউরির মাথা পর্যন্ত গেলাম।(বহরি আলীরপাম হয়ে আসা মাথাউরিটা দলাগাঁয় এসে শেষ হয়েছিল। মাথাউরির মাথা থেকে একটু পুব দিকেই মাথাউরির উত্তর পাশে তখন দলাগাঁয়ের শনিবারের হাট বসত। আমি মাঝে-মধ্যে দলাগাঁয়ের সেই হাটে যেতাম। তাই রাস্তা-ঘাট আমার চেনা ছিল।) কিন্তু ঘুড়ীটা ধরতে পারলাম না। বেলার দিকে চেয়ে দেখি বেলা বেশি নেই। একটু পরেই বেলাটা ডুববে। ডিমের কুসুমের মতো লাল হয়ে উঠেছে বেলা। বেলার অবস্থা দেখে আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে উঠলাম। তাই আর এগোতে সাহস হল না। হতাশ হয়ে ঘুড়ীর দিকে চেয়ে রইলাম। ঘুড়ীটা একটু একটু করে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। ঘুড়িটা এক সময় মেঘের আড়াল হয়ে আমার দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। বিফল মনোরথ হয়ে সেখান থেকে বাড়ী ফিরে এলাম। বাড়ী ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, সেদিন নানীর গালাগাল শুনতে হয়েছিল।
আরও একদিন নানীর গালাগাল শুনতে হয়েছিল। আগ মন্দিয়ায় মামাদের তিন জন খালাত ভাই ছিলেন। রহিমুদ্দিন, মজু মিঞা এবং হোসেন আলী। রহিমুদ্দিন মামা কাপড়ের দোকানী ছিলেন। তিনি হাটে হাটে কাপড় বিক্রী করতেন। শুক্রবারে আলিরপামের এবং শনিবারে দলাগাঁয়ের হাটে। সারগাঁয়ে মাথাউরির দক্ষিণ পাশে আরও একটি হাট বসত।সেই হাটের নাম ছিল খাগ্রাহাটি। মঙ্গলবারে বসত সেই হাট। হাটে তেমন লোকজনের সমাগম হত না। তাই রহিমুদ্দিন মামা নিয়মিত সেই হাটে দোকান করতেন না। উৎসব পার্বণে মানে দুই ঈদের মরশুমে তিনি সেই হাটে দোকান করতেন।হাট তিনটি রহিমুদ্দিন মামাদের বাড়ী থেকে অনেকটা দূরে ছিলো।তাই তিনি শুক্রবারের হাটে কেনা-বেচা করে রাত্রে মামাদের বাড়ীতে থেকে পরের দিন দলাগাঁয়ের হাটে গিয়ে কেনা-বেচা করতেন। কারণ দলাগাঁয়ের হাট বসত শনিবারে। খাগ্রাহাটিতে দোকান করলে, খরার মরশুমে বাড়ী থেকে এসে দোকান করে সেদিনই বাড়ী চলে যেতন এবং বর্ষার মরশুমে দোকান করে মামাদের বাড়ীতে থেকে পরের দিন বাড়ী চলে যেতেন।তাঁর একটি ঘোঁড়া ছিল। ঘোঁড়ার পিঠে দু’দিকে দুটি কাপড়ের গাঁঠ ঝুলিয়ে দিয়ে নিজেও ঘোঁড়ার পিঠে চড়ে হাটে আসা-যাওয়া করতেন।
একদিন রহিমুদ্দিন মামার ঘোঁড়াটা দড়া খোলে পালিয়ে গেল। এদিক সেদিক খোঁজে না পেয়ে তিনি আমায় ডেকে বললেন- আবুল, ঘোঁড়াটা দড়া খোলে পালিয়ে গেছে। এদিক সেদিক অনেক খোঁজলাম, কোথাও পেলাম না। দেখত, ঘোঁড়াটা কোথায় আছে। লাগামটা নিয়ে যাও। পেলে লাগাম লাগিয়ে নিয়ে আসবে। আমার হাটের বেলা হয়ে এল। এখন গোসল করব। ঘোঁড়া খোঁজতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। সাবধান, ঘোঁড়ার পেছনে যাবে না কিন্তু, লাথি মারবে। ঘোঁড়ার পেছনে গেলে যে লাথি মারে এই অভিজ্ঞতা আমার অনেক পরে একদিন হয়েছিলো। সে কথা পরে বলতেছি।
এমনিতে ছাই, তাতে আবার বাতাস। লাগামটা নিয়ে দিলাম ছোট। আমি জানি, ঘোঁড়াটা কোথায় থাকতে পারে। নানাদের বাড়ী থেকে আধা পোয়া মাইল উত্তর দিকে একটি খাল ছিল। খালটা বর্ষার দিনে বন্যার জল পেয়ে ফুলেফেঁপে উঠত এবং খরার মরশুমে পানী শুকিয়ে মাঠের মতো হয়ে থাকত। ফলে খরার মরশুমে সেখানে প্রচুর ঘাস গজাত। তাই ঘোঁড়াটা সেখানে থাকতে পারে ভেবে আমি লাগামটা নিযে ঘোঁড়া খোঁজতে খালের দিকে দিলাম ছোট। অনুমান করা মতেই আমি খালে এসে ঘোঁড়াটা পেলাম।
ঘোঁড়াটা শান্ত স্বভাবের ছিল। আমার সাথে ঘোঁড়াটার চেনা পরিচযও ছিলো।কারণ আমি মাঝেমধ্যে ঘোঁড়াটাকে আদর করে শখের দানাপানি খাওয়াতাম। তাই আমি অনায়াসেই ঘোঁড়ার মুখে লাগামটা লাগালাম। লাগাম লাগিয়ে ঘোঁড়ার পিঠে উঠতে গেলাম। ঘোঁড়াটা আমার চেয়ে অনেকটা উঁচা ছিল, তাই লাফিয়ে পিঠে উঠা সম্ভব হল না। আমি সুবিধাজনক উঁচা জায়গা খোঁজতে লাগলাম যাতে সেখানে দাঁড়িয়ে ঘোঁড়ার পিঠে উঠতে পারি!
কিন্তু আশে-পাশে তেমন কোনো সুবিধাজনক উঁচা জায়গা পেলাম না। এদিকে ঘোঁড়ার পিঠে না উঠলেও নয়! তাই আমি ঘোঁড়া নিয়ে নায়েব আলী নানার বাড়ির দিকে এলাম। নায়েব আলী নানার বাড়ি খাল থেকে একটু দূরেই অবস্থিত। নায়েব আলী, আমাদের নানার থেকে বয়সে ছোট। নানার খালাত ভাই। তাই আমি নানা বলে ডাকতাম।তিনি কথা একটু জোরে জোরে বলতেন। তাই সবাই তাঁকে গলগইলা নায়েব আলী বলত।
দিনের বেলা গরু বাঁধার জন্য নায়েব আলী নানাদের বাইর বাড়ি একটি গোয়াল ঘর ছিল। স্থানীয় ভাষায় সেই গোয়াল ঘরকে আওলা ঘর বলত। সেই আওলা ঘরে বেড়া ছিল না। আমি ঘোঁড়াটা নিয়ে ঘরের ভেতর ঢোকে গেলাম। সেখানে গরুকে দানা-পানি খাওয়ানোর জন্য একটি বাঁশের তৈরি খাঁচা ছিল। খাঁচাটার ওপরে উঠে আমি ঘোঁড়ার পিঠে চেপে বসলাম। কিন্তু ঘোঁড়াটা ঘর থেকে বেরোনোর সময় লাগল ল্যাঠা। আমি ঘোঁড়টা নিয়ে ঘরটার দীঘে দীঘে ভেতরে ঢোকে ছিলাম। কিন্তু আমি পিঠে উঠার পর ঘোঁড়াটা ঘরটার প্রস্তে প্রস্তে বেড়োতে লাগল। আমি চেষ্টা করেও ঘোড়াটা ফেরাতে সক্ষম হলাম না। ঘরটা নিচু ছিল। তাই বেড়োনোর সময় রুয়ার কানার আঁচড় লেগে আমার পিঠের চামড়া ছড়ে গেল। আমার শরীরে গেঞ্জি ছিলো। রক্তে ভিজে গেল সেই গেঞ্জি। ঘোঁড়াটা নিয়ে বাড়ি আসার পর নানী আমার পিঠ দেখে বকাবকি করতে লাগলেন এবং ভাল করে ধুয়ে গেন্দাফুল গাছের পাতা পিসে আমার পিঠে লাগিয়ে দিলেন। সেই ঘাঁ শুকাতে প্রায় এক মাস লেগেছিলো।
এখন বলি ঘোঁড়ার পেছনে গেলে যে লাথি মারে সেই অভিজ্ঞতার কথা। ঘটনাটা ঘটেছিল নানাদের বাড়ি ভাঙনের কবলে পড়ার কিছুদিন পরে। তখন আলীরপাম বাজার আলম তলা থেকে আলীগাঁও উঠে এসেছে। আলীগাঁও বাজারে খোকা বাকালি নামের একজন লোক ছিল। তিনি তামাকের ব্যবসা করতেন। তাঁরা দু’ভাই ছিলেন। খোকা বাকালির বড় ভায়ের নাম ছিল মোহন বাকালি। মোহন বাকালি ভালো অভিনেতা ছিলেন এবং খোকা বাকালি ঢোল বাজানোতে ওস্তাদ ছিলেন। খোকা বাকালি কথা বলার সময় একটু তোতলাতেন। তিনি ঘোঁড়াকে ‘ঘোডা’ বলতেন। তিনি একটি ঘোঁড়া পোষতেন। ছোট আকারের ঘোঁড়া। দেখতে প্রায় গাধার মতো ছিলো। তিনি ঘোঁড়াটা প্রায়ই আলগা দিয়ে রাখতেন। তাই লোকের ক্ষেতের শস্য খেয়ে অন্যায় করত। মামাদের বাড়ির পেছনে ধান ক্ষেত ছিল। তখন ধান প্রায় পেকেছে। একদিন বিকেল বেলা ঘোঁড়াটা সেই ধানক্ষেতে এসে ধান খাচ্ছিল। রহমান এবং আমি ঘোঁড়া তাঁড়াতে গেলাম। হঠাৎ আমার মনে কুবুদ্ধি উদয় হল। আমি জানি, সুযোগ পেলেই অঞ্চলের দুষ্ট ছেলেরা ঘোঁড়াটা ধরে ইচ্ছামত দৌঁড়ায়। ধরতে পারলে আমিও ঘোঁড়াটা দৌড়াব। এভাবে মনে মনে ভেবে. ঘোঁড়াটার মুখে লাগাম লাগানোর জন্য একগাছা দড়ি নিয়ে এলাম।

ঘোঁড়াটা অতি সহজেই ধরে ফেললাম। দড়িটা লাগামের মত করে ঘোঁড়ার মুখে গুঁজে দিলাম। লাগাম লাগানোর পর আমি ঘোঁড়ার পিঠে উঠার জন্য লাফাতে লাগলাম। কিন্তু উঠতে পারছি না। দানেশ মুন্সীদের এক জোড়া মহিষ ছিল। দানেশ মুন্সি আমার কাকার শশুড়। আমার সম্পর্কীয় নানা। সেই মহিষের পিঠে আমি একদিন উঠেছিলাম। মহিষের লেজ ধরে পেছনের ঠেং বেয়ে। কথাটা মনে পড়াতে, আমি ঘোঁড়ার পেছনের ঠেং বেয়ে উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম। রহমানের হাতে ঘোঁড়ার লাগামটা দিয়ে আমি ঘোঁড়ার পেছনে গেলাম। পেছনে গিয়ে লেজ ধরার চেষ্টা করছি মাত্র, অমনি ঘোঁড়াটা মারল লাথি। লাথি লাগল আমার ডান ঊরুর মাঝে। লাথি খেয়ে কেঁকিয়ে উঠে ঊরু ধরে আমি বসে পড়লাম। আমার অবস্থা দেখে রহমান ঘোঁড়াটা ছেড়ে দিয়ে আমার কাছে এলো এবং সেই সুযোগে ঘোঁড়াটা পালিয়ে গেল। একটু হলেই লাথিটা আমার অণ্ডকোষের মাঝে লাগত। তখন কি হত এখন বলা মুস্কিল! এভাবেই সেদিন আমার ঘোঁড়ায় উঠার আশা মাটি হয়েছিল।রহমানের মুখ থেকে ঘটনাটা শুনার পর নানী আমাকে সেদিন ইচ্ছেমতো বকেছিলেন।
নদী ইতিমধ্যে ভেঙে অনেক দূর এসেছে। স্কুল থেকে নদী দেখা যায়। নদীর অবস্থা খুবই ভয়াবহ। প্রত্যেক বৎসর কিছু কিছু করে নদী এগিয়ে আসছে মামাদের বাড়ীর দিকে। মামাদের বাড়ি থেকে নদীটা তখনও অনেকটা দূরে। অনেকটা বললে ভুল হবে, কিছুটা দূরে। মামাদের বাড়ি থেকে নদীটা দেখা যায়। সে সময়কার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। বাড়ি নদীর পাড়ে পড়াতে অনেকে ঘর-দুয়ার স্থানান্তর করে অন্যত্র উঠে গিয়েছিল। তাই নদীর পাড়ে অনেক শূন্য ভিটা পড়ে ছিল। একদিন নদীর পাড়ে বেড়াতে গিয়ে দেখি আমাদের সহপাঠি ছেদুদের ভিটায় একটি আম গাছে অনেক আম লেগে আছে। আম তখনও পাকেনি। কাঁচা। চান্দু এবং রহমান আমার সাথে ছিল।
গাছে আম দেখে চান্দু বলল- তাউই, চলেন আম খাই গিয়ে।
আমি বললাম- লোকের আম গাছ। দেখলে মারবেনা তো! গাছে উঠবে কে?
গাছে আমি উঠব। চান্দু বলল- আমি গাছের ওপড় থেকে ফেলে দেওয়া আম, আপনারা শুধু গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে কুড়োবেন এবং কাউকে আসতে দেখলে আমাকে বলবেন। আমি গাছ থেকে নেমে দৌড়ে পালাব।
সিদ্ধান্ত মতোই চান্দু গাছে উঠল এবং টপাটপ আম ছিঁড়ে নিচে ফেলতে লাগলো। আমরা লুঙ্গি গুচিয়ে কোঁচ মতো করে নিচে থেকে সেই আম কুড়িয়ে লুঙ্গির কোঁচে ভরতে লাগলাম।
ছেদুদের বাড়ি স্থানান্তর করে আমাদের স্কুলের পাশেই নির্মাণ করেছিল। ওদের বাড়ি থেকে ভিটাটা দেখা যায়। ছেদুর বোন ডলি বাড়ির বাইরে কিছু একটা করছিল। আমরা তার নজরে পড়ে গেলাম। সে বাড়ির ভেতরে গিয়ে বড়দের কথাটা বলাতে ছেদুর বাবা বাইরে বেড়িয়ে এসে আমাদের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দৌড়ে আসতে লাগলো। তিনি দৌড়ে আসতে আসতে গাছ থেকে খানিকটা দূরে থাকতে হেঁকে বললেন- কে? কে, গাছের আম পাড়ে? র, আসতেছি। আজ দেখাব মজা।
আমরা আম কুড়ানোয় এত ব্যস্ত ছিলাম যে, আগে আমরা ছেদুর বাবাকে লক্ষ্য করিনি। তাঁর হাঁক শুনে আমরা তাঁর দিকে ফিরে তাকালাম। দেখলাম, তিনি একেবারে গাছের কাছাকাছি এসে পড়েছে। তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। চান্দুকে ডেকে বলার মতো সময় তখন আমাদের ছিল না। চাচা যার যার জান বাঁচা। এই নীতি অনুসরণ করেই আমরা চান্দুকে কিছু না বলেই কোঁচ থেকে আম ফেলে দিলাম দৌড়। চান্দু গাছের ওপড়েই থেকে গেল। আমরা এক দৌড়ে এসে আবুল কালামদের বাড়ি পেলাম। পেছন দিকে এক বারের জন্যও ফিরে তাকালাম না। চান্দুর অবস্থা জানার জন্যও না। আবুল কালাম আমাদের সম্পর্কীয় খালাত ভাই। ওদের বাড়ি ছেদুদের ভিটা থেকে পশ্চিম দিকে অনেকটা দূরে ছিল। সেদিন ছেদুর বাবার ভয়ে সারাটা বেলা আবুল কালামের সাথে খেলে তাদের বাড়ীতেই কাটিয়ে দিলাম। চান্দুর কি হল, সে কথা কিছুই জানতে পারলাম না। সন্ধ্যের আগে আগে বাড়ী ফিরলাম।
ভয়ে ভয়ে বাড়ি এসে পৌঁছোলাম। ভাবছিলাম, ছেদুর বাবা নিশ্চয় নানার কাছে নালিশ দিয়েছে এবং বাড়ি ফিরলেই নানা বকাবকি করবে। কিন্তু কেউ কিছু বলল না। অর্থাৎ ছেদুর বাবা নালিশ দেয়নি।
নানী আমাদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন-সেই সকালে ভাত খেয়ে বেড়িয়ে গেছিস। এখন বাড়ী ফেরার সময় হলো।আমরা চিন্তা করে করে শুকিয়ে গেছি। কোথায় গেল আস্ত ছেলে দুটি! বল, কোথায় ছিলি সারাদিন?
আমি কৈফিয়তের সুরে বললাম- আবুল কালামদের বাড়ি গিয়েছিলাম। খালা আসতে দিল না। বলল, ভাত খেয়ে যাবি। তাই ভাত খেতে দেরি হয়ে গেছে।
কথাটা মিথ্যে বলিনি। দুপুরের খাওয়া দাওয়া সত্যিই আবুল কালামদের বাড়ীতেই করেছিলাম।
যা, হাত-মুখ ধোয়ে পড়তে বস। নানী ধমকের সুরে বললেন।
রহমান হাত-মুখ ধোয়ে পড়তে বসল আর আমি চান্দুদের বাড়ি গেলাম চান্দুর অবস্থা জানার জন্য। চান্দুদের বাড়ি নানাদের বাড়ির পূব পাশের প্রথম বাড়িটাই ছিল।
চান্দু আমাকে দেখেই অভিযোগ করে বলল- তাউই, এ রকম কাজ করলেন? আমাকে না বলেই দৌঁড়ে পালিয়ে গেলেন?
আমি ক্ষমা খোঁজার ভঙ্গীতে বললাম- ভুল হয়ে গেছে, তাউই।মাফ করবেন। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম! তাই বলার সুযোগ পাই নি। বলেন তো, ছেদুর বাবা আপনাকে ধরে ফেলেছিল না-কি? তিনি আপনাকে মারধোর করেছে না-কি?
না, ধরতে পারেনি। চান্দু বলল- ছেদুর বাবা গাছের প্রায় কাছাকাছি আসার পর আমি তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে ছিলাম। আমি গাছ থেকে নামতে নামতে সে একেবারে গাছের নিচ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলো। উপায় না পেয়ে আমি তাঁর শরীর লক্ষ্য করে মুতে দিলাম। মুত শরীরে পড়ার ভয়ে সে পিছিয়ে গেল। সেই ফাঁকে আমি গাছ থেকে নেমে দিলাম দৌড়। ধরতে পারবে না বলেই হয়তো সে আর আমার পেছনে দৌড়ে আসেনি।
ছেদুর বাবা আপনাকে চিনতে পারে নি তো? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
না, পারেনি। চান্দু বলল- গেঞ্জি খোলে মুখটা ঢেকে নিয়েছিলাম। চিনতে পারলে কখন নালিশ দিত এবং নালিশ দিলে এতক্ষণে পিঠে চেলাকাঠের কোব পড়ত।
যাক, আপনার বুদ্ধির জন্যই এবারের জন্য বেঁচে গেলাম। এ ভাবে প্রশংসা করেই আমি বললাম- এ রকম কাজ আর করব না। আপনিও করবেন না।
চান্দু কিছু বলল না। মনে মনে রইলো। অর্থাৎ সে সুযোগ পেলে করবে!
বিদ্যালয় গৃহ স্থানান্তর
১৯৬২ সাল। আমি তখন প্রথম শ্রেণীতে পড়ি। নদী ভেঙে একেবারে নানাদের বাড়ীর কাছা-কাছি এল।নানাদের বাড়ির পূর্ব পাশে একটু দক্ষিণ দিকে বিদ্যালয় গৃহটা ছিল। বিদ্যালয়ের সামনেই সরকারি হালট। নদী এসে হালট পেল। ছেদুদের ভিটাটা অনেক আগেই নদীতে তলিয়ে গেছে। এখন নানাদের বাড়ি স্থানান্তরের পালা।
ধনাই হাজি ধর্মভীরু লোক। দুই বার হজ্ব করে এসেছে। তাই অনেক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের সাথে তাঁর চিনা-পরিচয়। নদী ভাঙন বন্ধের জন্য রাজস্থানের আজমীড়ের উর্দুভাষী মৌলানা এনে একেবারে নদীর পাড়ে বিদ্যালয়ের মাঠে ধর্মসভা অনুষ্ঠিত করলেন। মৌলানা সাহেব ধর্মপ্রাণ লোক। তাঁর দোয়ায় যদি ভাঙন বন্ধ হয়, এই আশায় আর কি! সেই সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। সেদিন বহুলোক সেই মৌলানার কাছে মুরিদ গ্রহণ করেছিলেন। সবাই একসাথে মৌলানা সাহেবের হাত ধরা সম্ভব নয় বলে একটি লম্বা সাইজের কাপড় ধরে সবাই বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। আমিও ধরেছিলাম সেই কাপড়। সভা শেষে মৌলানা সাহেব নদী ভাঙন বন্ধের জন্য মোনাজাত করেছিলেন।
মৌলনা সাহেব কামেল লোক বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর জন্য আলাদা করে অস্থায়ী পায়খানার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রবাদ ছিল যে, তিনি পায়খানা করলে সেই মল পায়খানায় থাকে না। মল গায়েব হয়ে যায়। কথাটা স্বচক্ষে দেখার জন্য চান্দু এবং আমি একদিন মৌলনা সাহেব পায়খানা করে আসার পর পায়খানায় গিয়ে দেখেছিলাম। আমরা কিন্তু মল দেখেছিলাম। গায়েব হয়ে যায়নি! মৌলনা সাহেবের মল যে গায়েব হয়ে যায়, এই কথাটা যে নেহাতই প্রবাদ ছিল, কোনো সত্যতা ছিল না, চান্দু এবং আমি তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলাম।
মৌলনা সাহেবের দোয়ায় নদী ভাঙন বন্ধ হল না। নদী ভেঙে হালট পার হয়ে এল। তখন ধুবড়ির জলেশ্বর থেকে আব্দুর রহমান নামের একজন মৌলনা নানাদের বাড়ি এলেন। তিনিও কামেল লোক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এমনও প্রবাদ ছিল যে, তিনি খোয়াজ খিজিরের সাথে কথা বলতে পারেন!
মৌলনা সাহেব আসার পর একদিন আলোচনা প্রসঙ্গে নানা বললেন- নদীর অবস্থা খুবই সংগীন। নদী ফেরানোর জন্য আপনার কাছে কোনো বিধান আছে কি?
আব্দুর রহমান সাহেব বললেন- বিধান অবশ্যেই আছে। তবে আগে কিছু বলতে পারব না। আগে নদীটা দেখতে হবে। নদী দেখার পর তবে বলতে পারব, নদী ভাঙন বন্ধ হবে কি হবে না! ঠিক আছে, আজ রাত্রেই আমি নদীর পাড়ে যাব, তারপর ফিরে এসে বলব, নদী ফিরবে, কি ফিরবে না।
আব্দুর রহমান সাহেব সেদিন রাত্রে নদীর গতিবিধি নিরীক্ষণ করে এসে নানাকে বললেন- নদীর অবস্থা খুবই ভয়ংকর। কথা মানতেই চায় না। খোয়াজ খিজির খুব ক্ষেপে আছে। (খোয়াজ খিজির জলের মালিক। খোয়াজ খিজিরের নির্দেশেই নদী ভাঙে বলে মানুষের মাঝে একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে।) মানুষের ধর্ম-কর্মে মতি নেই। অন্যায়-অবিচারে দেশ ভরে গেছে। তাই খোয়াজ খিজির খুব রাগ করলেন আমার সাথে। তবে অনেক পীড়াপীডির পর একটু আশা দিয়েছে। নদী ফিরবে। তবে একটি কাজ করতে হবে।
নানা সাগ্রহে বললেন- কি কাজ করতে হবে? বলুন, আমরা করার চেষ্টা করব।
মৌলনা সাহেব বললেন- আল্লাহর নাম সোয়া লক্ষবার কাগজে লেখে সেই কাগজ নদী এবং মাছ থাকা বিল, বাঁওড়ে ছিটিয়ে দিতে হবে। পরে আজমীড় গিয়ে সিন্নি করতে হবে।
তিন চারদিন পর মৌলবী, মুন্সী ডেকে এনে আল্লাহর নাম লেখার কাজ শুরু হয়ে গেল। যখন এই লেখার কাজ চলছিল, তখন গরমের বন্ধ ছিল। এমনিতে আমি গরমের বন্ধের মধ্যে বাড়ী যেতাম। সেবার বাড়ী গেলাম না। কি হয় দেখার জন্য নানাদের বাড়ীতেই রয়ে গেলাম। চার পাঁচদিনের মধ্যে আল্লাহর নাম লেখা শেষ হল এবং সেই কাগজ নদী, বিল, বাঁওড়ে ছিটিয়ে দেওয়া হল। তারপর চাঁদা তোলে টাকা দিয়ে মৌলনা সাহেবকে পাঠানো হল আজমীড়ে সিন্নি করার জন্যে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। নদী আগের মতোই ভেঙে চলল।
ব্রহ্মপুত্র নদ কেন ভাঙে এই সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত আছে। ১৯৫৭ সালে ‘Out plan for flood control in Assam’ এর মারফতে ভারত সরকার বান নিয়ন্ত্রণর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করছিল। যোজনা অনুসারে ভারত সরকার ব্রহ্মপুত্র বোর্ড কর্তৃক ইটালি, হংকং প্রভৃতি দেশের আর্হিতে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে কিছু সংখ্যক মাথাউরি নির্মাণ করছিল। আজ অবদি সেই মাথাউরিগুলোর অনেক অংশ জায়গায় জায়গায় রয়েছে এবং সেই মাথাউরিগুলো মেরামতের নামে সরকার বছর বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে চলেছে। এদিকে অপরিকল্পিতভাবে(পর্যাপ্ত কালভার্ট, দলঙের ব্যবস্থা না করে) রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য নদীর জল চলাচলের জায়গা একমাত্ৰ নদীর মাঝে সীমিত হয়ে পড়েছ। ফলস্বরূপ, ব্রহ্মপুত্রের উপনদীগুলোর স্রোতের বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্রোত-এ বয়ে আনা তলানি পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর তলদেশ ওপড়ে উঠে এসেছে। নদীর তলদেশ ওপড়ে উঠে আসার ফলে নদীর জল ধারণের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে উদ্বৃত জল নদীর পাড়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। জলের এই অতিরিক্ত চাপের ফলেই নদীতে ভাঙনের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। ভাঙন কি ভাবে সংঘটিত হয়? নদীর পাড় সাধারণতঃ উলম্বভাবে ৯০ ডিগ্রী কোণ করে থাকে। নদীর তলানি পড়ে নদীর তলদেশ ওপড় দিকে উঠে এলে প্রবল জলের স্রোতে পাড়ের নিন্মাংশে ভূ-পৃষ্ঠের সমান্তরাল ভাবে গর্তের সৃষ্টি করে। ফলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সেই ভূমিভাগ নদীর তলদেশে বসে যায়। আসলে এরকমই হল নদী ভাঙনের রহস্য। বলা বাহুল্য, এখানে খোয়াজ খিজিরের কোনো হাত নেই।
সে যাই হোক, গরমের বন্ধের পরই নদী ভেঙে এসে বিদ্যালয় গৃহ পেল। নানাদের বাড়ী স্কুল ঘরের উত্তর দিকে ছিল। নদী ভেঙে আসছিল দক্ষিণ দিক থেকে। তাই বিদ্যালয় গৃহটা আগে স্থানান্তর করা হল। নানাদের বাড়ী থেকে আধা পোয়া মাইল উত্তরে একটি খাল ছিল। বিদ্যালয় গৃহটা অস্থায়ীভাবে সেই খালের উত্তর পারে টিনের ছাপ্পড় বেঁধে পুনরায় স্থাপন করা হলো। সেখানে আমরা ক্লাস করতে লাগলাম। সেখান থেকে একটু দূরেই আমাদের খালু সুলতান মিয়ার বাড়ি। তাঁর বাড়ির সামনে একটি পরিত্যক্ত ছনের ঘর ছিল। টিনের ছাপ্পড়ে কিছুদিন ক্লাস করার পর আমাদের ক্লাস সেই ঘরে স্থানান্তর করা হলো। ঠিক তখনই আমাদের হোসেন আলী স্যার বেসিক ট্রেনিংঙে গেলেন। তাঁর পরিবর্তে বেতবারীর আলতাব হোসেন আমাদের স্কুলে জইন করলেন। আলতাব হোসেন স্যারের সাথে আমি ‘বিপরীত’ শব্দের অর্থ নিয়ে অযথা তর্ক করেছিলাম। আসলে আলতাব হোসেন স্যার শুদ্ধ ছিল। ভুলটা আমারই ছিল। সে জন্যে এখনও আমি অপরাধ বোধ করি। আলতাব স্যার সম্ভবতঃ আমাদের স্কুলে ছয় মাস ছিলেন।
ইতিমধ্যে নানাদের বাড়ীও ভাঙনের কবলে পড়ল। পুরানা বাড়ী থেকে কিছু উত্তর পশ্চিমে মাথাউরির কাছে নানাদের জমি ছিল। নানাদের বাড়ী সেখানে মাথাউরির উত্তর পাশে স্থানান্তর করা হল এবং কিছুদিন পরে বিদ্যালয় গৃহটাও সেখানে স্থানান্তর করা হল।
আলীগাঁও বাজারের পত্তন
নানাদের বাড়ি ভাঙার এক বছর পর অৰ্থাৎ ১৯৬৩ সালে আলমতলা বাজার ভাঙনের কবলে পরে। বাজারের সব লোক তখন নানাদের বাড়ির সামনে অবস্থিত মাথাউরিতে আশ্ৰয় গ্ৰহণ করে। সঠিক হিসেব মনে নেই, তবে মনে হয়, ছোট বড় ব্যবসায়ী মিলে ছত্রিশ সাঁইত্রিশ ঘর লোক ছিলো তখন আলীগাঁও বাজারে। গেলামালের দোকানী, কাপড়ের দোকানী, ধোবা, নাপিত, চায়ের দোকানী প্রভৃতি নানান ব্যবসায়ের সাথে জড়িত ছিলো লোকগুলো। বাজারের ব্যৱসায়ীদের মাঝে একজন ছিলেন গুনীন্দ্র রায়। তাঁরা দুই ভাই ছিলেন। অপর জনের নাম ছিল রথীন্দ্র রায়। গুনীন্দ্র রায় নানাদের বাড়ির কাছেই একটু পুব দিকে মাথাউরিতে আশ্রয় গ্ৰহণ করেছিলেন। লোকমুখে শুনা মতে, তাঁরা জমিদার বংশের লোক ছিলেন। গুনীন্দ্র রায়ের পরিবার মিনতি রায় ভালো গায়িকা ছিলেন। একদিন সন্ধ্যেরেলা তাঁদের বাড়ি থেকে গানের সুর ভেসে আসছিল। হারমনিয়াম বাজিয়ে কে যেন সুরেলা কণ্ঠে গান গাইতেছে। গান শুনে তাঁদের বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। গান গাইছিলেন ঘরের ভেতরে। খিড়কি দিয়ে ফুকচি দিয়ে দেখলাম, মিনতি রায় হারমনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেছেন। গানটার স্থায়ী ছিল-‘আমার সাদ না মিটিল, আশা না পূরিল, সকলই ফুরিয়ে যায়, মা।’ গীতটা এখনও কানে বাজে। মিনতি রায় গোয়ালপাড়ার দুধনৈয়ের মনমোহন সাহার দুহিতা। আলীগাঁও বাজার ভাঙনের কবলে পড়ার পর গুনীন্দ্ৰ রায় এবং রথীন্দ্র রায় বরপেটা রোড উঠে গেছেন।রথীন্দ্র রায় বরপেটা রোডে সবজির ব্যবসা করতেন। দুঃখের বিষয়, তিনি সবজি বাজারে সবজির দোকানে কর্মরত অবস্থায় ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে উগ্রপন্থীর গুলিতে মারা গেছেন। রথীন্দ্র রায়ের স্ত্রীর নাম অঞ্জলি রায়। তাঁদের দুই ছেলে। রসরাজ রায় এবং গৌরচান রায়। তাঁরা এখন বড় ব্যবসায়ী। গুনীন্দ্র রায় এবং মিনতি রায় এখনও জীবিত। গুণীন্দ্র রায়ের এক ছেলের নাম গোপাল রায়।সে বৰ্তমান বরপেটা রোডের বাসিন্দা। সে ব্যবসার সাথে জড়িত।
ভজনলাল বসাক ধান-চালের ব্যবসায় করতেন। বাজার থেকে ধান কিনে এনে সিদ্ধ-শুকনা করে চাল বানিয়ে বিক্রী করতেন। তখন ধানমিলের ব্যবস্থা ছিল না। ঢেকিতে বাড়া বেনে চাল বাড় করত। তাই তাঁর বাড়িতে সব সময় ঢেকির খটর খটর শব্দ হত। আমরা এই পট্টিকে মজা করে বাড়ানি পট্টি বলতাম। আর যারা বাড়া বানত তাঁদের বলতাম বাড়ানি। ১৯৯২ সালে আলীগাঁও বাজার ভাঙনের কবলে পড়ার পর ভজনলাল বসাক হাউলি উঠে এসেছিলেন। ভজনলাল বসাক কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর ছেলেরা এখন হাউলির ঠাকুর বাজারের বাসিন্দা। তাঁরা এখন বড় ব্যবসায়ী। সুপারির ব্যবসার সাথে জড়িত।
আলীগাঁয়ের পঞ্চায়েত অফিস ভজনলাল বসাকের বাড়ির পশ্চিম পাশে মামাদের জমিতে স্থাপন করা হয়েছিলো। তখন পঞ্চায়েত অফিসের সেক্রেটারি ছিলেন আব্দুল হামিদ সাহেব। তিনি পঞ্চায়েতের সেক্রেটারির পাশাপাশি ডাক্তারীও করতেন। তাই তিনি হামিদ সেক্রেটারির চেয়ে, হামিদ ডাক্তার হিসেবেই বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।পঞ্চায়েত অফিসে মস্ত বড় একটা শালকাঠের টেবিল ছিল। টেবিলের ওপরে হালকা সবুজ রঙের একটি চাদর বিছানো ছিল। আমরা বাজারে যাওয়া-আসা করার সময় হামিদ ডাক্তারকে সেই টেবিলের পেছনে বসে থাকতে দেখতাম। খুবই অমায়িক এবং গুরুগম্ভীর স্বভাবের লোক ছিলেন হামিদ ডাক্তার সাহেব। আমাদের আলীগাঁও অঞ্চলে হয়তো হামিদ ডাক্তার সাহেবই প্রথম কলগেট দিয়ে প্লাস্টিকের ব্রাশ ব্যবহার করে দাঁত ব্রাশ করতেন। তখন আমাদের অঞ্চলে সবাই পোরামাটি, ছাই অথবা খেজুর গাছের ডাল দিয়ে দাঁত মাজন করতেন। একমাত্ৰ তিনিই কলগেট এবং প্লাস্টিকের ব্ৰাশ ব্য়বহার করতেন । কারণবশতঃ খুব সকালে বাজারে গেলে কোন কোনদিন তাঁকে প্লাস্টিকের ব্রাশ দিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে দেখতাম।
১৯৬৪ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে আব্দুর রশিদ আলীগাঁও পঞ্চায়েতের সভাপতি হোন। পরবর্তি পর্যায়ে আব্দুর রশিদ সাহেব‘রসুলদি পেসিডেণ্ট’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন সমগ্র অঞ্চলে। রসুলদি প্রেসিডেন্ট বললে সবাই তাঁকে চিনত। তিনি সভাপতি হওয়ার কিছুদিন পর হামিদ ডাক্তারের পরিবর্তে আমাদের মামা সিরাজুল হক সেক্রেটারি পদে অভিষিক্ত হোন। হামিদ ডাক্তারকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছিল সে কথা আমার জানা নেই। হয়তো, তার শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব ছিল। আব্দুর রশিদ প্রেসিডেন্ট হওয়ার বৎসরই তোতা ডাক্তার নামের একজন লোক ভেদলির কালু খানকে গুলি করে হত্যা করে। খবরটা সে সময় খুবই সোরগোল ফেলেছিল সমগ্র বরপেটা অঞ্চলে।
১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে প্ৰথম শ্ৰেণীর বাৎসরিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেই পরীক্ষায় আলী হোসেন প্রথম এবং আমি দ্বিতীয় হই। সাকায়েত হোসেন সম্ভবতঃ তৃতীয় হয়েছিল। আমাদের অধ্যয়ন চলতে থাকে। মামাদের বাড়ী স্থানান্তর করলেও ভিটাটা তখনও নদীর পেটে যায় নি। কারণ খরার দিন আসার জন্য তখন নদী ভাঙন বন্ধ হয়েছিলো। তবে একেবারে নদীর পাড়ে শূন্য পড়েছিল। সমস্ত গাছ-গাছড়া কেটে এনেছিল যদিও মসজিদ ঘরের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত খেজুর গাছ এবং উত্তর পাশে অবস্থিত বরই গাছটা তখনও অক্ষত ছিল। এই বরই গাছের সাথে আমার একটি স্মৃতি জড়িত আছে। বরই গাছটা মসজিদের উত্তর পাশে ভিটার ওপড়ে ছিল। বরই গাছের তল দিয়ে লোকজন আসা-যাওয়ার জন্য হাঁটা পথ ছিল। একদিন আমি সেই গাছে উঠে ডাল ধরে ঝাঁকি দিয়ে বরই পাড়ছিলাম। নিচে থেকে সেই বরই কুড়োচ্ছিল আমার মামাত ভাই আব্দুর রহমান। একবার একটি মরা ডালে ধরে ঝাঁকি দেওয়ার সময় হঠাৎ ডালটা ভেঙে আমি গাছ থেকে পড়ে গেলাম। আমি মাটিতে সটান পা ছড়িযে বসে পড়েছিলাম। ফলে বুকে আঘাত পাওযার দরুন আমার দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না।মুখ দিয়ে কথা বেড়োচ্ছে না। তাই আমি হাত দিয়ে রহমানকে ইশ্বারা করে কাউকে ডাকতে বললাম।রহমান বয়সে আমার থেকে তিন বছরের ছোট। তাই সে আমার ইশ্বারা বুঝতে পারছিল না। আমার অবস্থা দেখে সে স্তব্ধ হয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। এদিকে আমার জীবন যায় আর কি! আমার অবস্থা দেখে কিংকর্তব্য বিমূঢ় এক সময় রহমান হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। তার ক্রন্দন শুনে বাড়ীর ভেতর থেকে বড়রা বেড়িয়ে এসে আমার বুকে-পিঠে হাত দিয়ে মালিশ করতে লাগলো। কিছুক্ষণ মালিশ করার পর ফাঁৎ করে আমার দম ফিরে এলো।অর্থাৎ আমি বেঁচে গেলাম। সেদিন রহমান যদি ক্রন্দন না করত তাহলে হয়ত আজ আমি এই ঘটনা লিখতে পাড়তাম না!
গাছ থেকে পড়ার পরেও আমরা শূন্য ভিটায় যেতাম বরই এবং খেজুর গাছের অগ্রমূলের শাঁস খাওয়ার জন্য। আমরা খেজুর গাছ কেটে ভেতর থেকে শাঁস বের করে খেতাম। খেতে খুবই মিষ্টি লাগত। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে বর্ষায় ভিটাটা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছিলো এবং আমাদের ছোটবেলার সমস্ত স্মৃতি চিরদিনের জন্য মুছে গিয়েছিলো।
জমি-জমা হারিয়ে মামাদের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। তাই মামারা পড়া-শুনা বাদ দিয়ে বাড়ীতে আসে। ছোট মামা ফয়জল হক গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকতেন। গান-বাজনা মানে গীতিনাট্য, নাটক নিয়ে। পরে অভিনেতা হিসাবে তাঁর খুবই নাম-ডাক হয়েছিল। তাঁকে সবাই হকসাব বলে ডাকত। মাজু মামা সিরাজুল হক আৰ্থিক দৈন্যতা দূর করার জন্য এটা ওটা কাজ করার চেষ্টা করতেন। পূর্বে ধর্মপুর পোষ্ট অফিসের পোষ্ট মাষ্টার ছিলেন আছুরুদ্দিন সরকার। আছুরুদ্দিন সরকারের পরিবর্তে সিরাজুল হক পোষ্ট মাষ্টারের পদে অভিষিক্ত হোন এবং পোষ্ট অফিস নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। মামা বাড়ীতে না থাকলে আমিও দুই একদিন চিঠি বিলি করতাম। চিঠিগুলি কোথায় রাখে একদিন মামা আমাকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন থেকে মামা বাড়ী না থাকলে আমি চিঠি বিলি করতাম। বিনয় মণ্ডল এবং নবদ্বীপ মণ্ডল তখন নতুন করে পূৰ্ব পাকিস্তান থেকে আসাম এসেছিলেন। অবশ্যে তাঁদের বাবা বাবুলাল মণ্ডল ও দাদা শরত মণ্ডল আগেই আসাম এসেছিলেন। বিনয় মণ্ডল এবং নবদ্বীপ মণ্ডল পাকিস্থানে তাঁদের কাকার বাসায় থেকে লেখা-পড়া করতেন। তাঁরা সেখানে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছিলেন। তাই তাঁদের আসতে একটু দেরি হয়েছিল। তাঁরা এ দেশে আসার পরে মাঝেমধ্যে তাঁদের কাকা পাকিস্থান থেকে চিঠি পাঠাতেন। সেই চিঠির মধ্যে টাকা থাকত। বেশি নয়- একটি করে দশ টাকার নোট।তখনকার দশ টাকা এখনকার হাজার টাকার কম হবে না। চিঠি তাঁদের হাতে দিলেই তাঁরা চিঠি খোলে দেখতেন। তখন চিঠির ভেতর থেকে টাকা বের হত। একদিন মামা বাড়ী ছিল না। নবদ্বীপ মণ্ডল চিঠির খোঁজ নিতে এসেছিলেন। আমি নির্দিষ্ট ব্যাগ থেকে চিঠি বার করে নবদ্বীপ মণ্ডলের হাতে দেওয়ার পর তিনি সেই চিঠি খোলে আমার সামনেই টাকা বের করেছিলেন। নবদ্বীপ মণ্ডল গড়লা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছিল। বি,এ পাস করার পর তিনি কিছুদিন বাঘবর হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেছিলেন। তারপর স্কুল এস,আই এবং পরে বরপেটা সদরের ডি আই হয়ে অবসর নেওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি নবদ্বীপ মণ্ডলকে মামা বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।
এই সময়েই আমি সাইকেল চালাতে শিখেছিলাম। তখন আলীগাঁও অঞ্চলে মাত্র তিনটি সাইকেল ছিল। একটা দানেশ মুন্সীর, একটা সারগাঁয়ের মাগন বেপারির আর একটা ছিল মামাদের। সাইকেলের জন্য ওৎ পেতে থাকতাম। কখন মামারা সাইকেল নিয়ে এসে বাড়ীতে রাখে! সুযোগ পেলেই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম। তখনকার দিনে নতুন হাট বসলে কবিগান এবং যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হত। আলীগাঁও বাজারে শীতের দিনে মাঝে-মধ্যেই যাত্রাগান অনুষ্ঠিত হত। আমাদের পাঁচজন মামা ছিল। মোসলেম উদ্দিন, জয়নাল আব্দিন, জুলহাস উদ্দিন, সিরাজুল হক এবং ফজল হক। মোসেলম উদ্দিন এবং জুলহাস উদ্দিন আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের আমি দেখি নি। শুনেছি, জুলহাস উদ্দিন বরপেটার গবর্ণমেণ্ট হায়ার সেকেণ্ডারিতে পড়া-শুনা করতেন। লেখা-পড়ায় তিনি খুবই ভাল ছিলেন। ভাল ফলাফলের জন্য স্কুল কৰ্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনি দুবার শালের চাদর পুরস্কার পেয়েছিলেন। বড় মামা জয়নাল আব্দিন নিজে যাত্রাগান শুনতেন না এবং অন্যদের যাত্রাগান শুনাও পসন্দ করতেন না। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা যাত্রাগান শুনতে পারতাম না। বাজারে যাত্রাগান অনুষ্ঠিত হলে মামা ঘরের বাইরে চিয়ার পেতে বসে থাকতেন।
১৯৬৩ সালের শেষের দিকের কথা।আমি তখন দ্বিতীয় শ্ৰেণীতে পড়ি। একদিন ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণ পারে অবস্থিত দলগোমা থেকে আলীগাঁও বাজারে একটি যাত্রা দল এসেছিল। যাত্রাপালার নাম ছিল রহিম-রূপভান। মামাদের দোতালা ঘর ছিল।(তখন গ্রামাঞ্চলে এখনকার মতো দুই তিন তালা অট্টালিকা তো দূরের কথা ইঁটের তৈয়ারি একতালা ঘরেরই ব্যবস্থা ছিল না। তখন অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল লোকেরা বিশ-পঁচিশ ফুট লম্বা কাঠের খুঁটি দিয়ে দোতালা ঘর নির্মাণ করতেন এবং কাঠের তক্তা দিয়ে পাটাতন করে দোতালা তৈয়ার করতেন। দোতালা ঘরে টিন দিয়ে বেড়া দিতেন।) সামর্ত্য ভানু,(আমাদের মামাত বোন। আমার চেয়ে এক বছরের বড় ছিলো।) রহমান এবং আমি দোতালায় শুইতাম। নানা-নানী শুইত নিচের তলায়। নানা ১৯৬৫ সালে ডিসেম্বর মাসে এবং নানী ১৯৮৮ সালে জুন মাসে মারা গেছেন।নানী মারা যাওয়ার সময় প্রবল বন্যা এবং ব্রহ্মপুত্র নদের প্রচণ্ড ভাঙনের তাণ্ডব অব্যাহত ছিলো।
রহমান এবং আমি বুদ্ধি করলাম, যে ভাবেই হোক, আজ যাত্রা দেখতেই হবে! দোতালায় কয়েকটা খিড়কি ছিল। খিড়কির শিকগুলো ছিল কাঠের তৈরি। রহমান এবং আমি দিনের বেলা একটা খিড়কির একটা শিক অনেক চেষ্টার পর খোলে ফেললাম। তাতে অনেকটা ফাঁক হল। আমি সেই ফাঁক দিয়ে গলে অনায়াসে বারান্দায় গেলাম। কেউ দেখে ফেলতে পারে এই ভয়ে তৎক্ষণাৎ আবার ভেতরে চলে এলাম। রহমানও একবার সেই ফাঁক দিয়ে বারান্দায় গেল। সে যেতে পারবে কিনা দেখার জন্য।
রহমান ভেতরে এসে বলল- আজ কেউ আমাদের ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু আমরা বারান্দা থেকে নামব কেমনে?
আমি বললাম- সে উপায় আমি চিন্তা করেই রেখেছি। সন্ধ্যেবেলা একটা মৈ এনে বারান্দায় পেতে রাখব। সেই মৈ দিয়ে নেমে যাব।
রহমান সন্দেহ প্রকাশ করে বলল- কেউ যদি মৈটা দেখে ফেলে?
আমি রহমানকে আশ্বস্ত করলাম- রাত্রে শোবার যাবার আগে গোয়াইল ঘর থেকে মৈ এনে রেখে দিব। কেউ দেখবে না।
সামর্ত যদি বলে দেয়? রহমান বলল।
রহমান এবং আমি কেউ সামর্তকে আপা বলে ডাকতাম না। নাম ধরে ডাকতাম।
সামর্তকে পটাতে হবে। আমি বললাম- মেয়ে মানুষ, পটে যাবে।
কিন্তু তাকে পটাতে হল না। সেদিন সন্ধ্যেবেলা খাওয়া-দাওয়ার পর আমি ও রহমান খুব উচ্চস্বরে সোরগোল করে পড়তে লাগলাম। আমাদের চিৎকারে অতিষ্ঠ হয়ে সামর্ত নানীর কাছে গিয়ে শোল। আমাদের মুখে বিজয়ের হাঁসি। আমি মুতার ছুতা করে বাইরে এসে গোয়াইল ঘর থেকে মৈ এনে বারান্দার চালের সাথে সুবিধাজনক স্থানে স্থাপন করে এলাম।
রাস্তা দিয়ে অনেক লোক যাত্রা শুনতে যাচ্ছে। তাদের সোরগোল শুনা যাচ্ছে। আমরা আরও জোরে জোরে পড়তে লাগলাম।
মামা ডেকে বললেন- এখন শোয়ে পড়। আর পড়তে হবে না। এত চেঁচামেচি করে কেউ পড়ে?
মেঘ না চাইতেই জল। আমরা নিজেরাও শোয়ার কথাই ভাবছিলাম। তাই মামা শোয়ার কথা বলার সাথে সাথে আমরা শোয়ে পড়লাম। পড়া নিয়ে থাকলে তো আর যাত্রা শুনতে যাওয়া যাবে না!
বাজার থেকে সোরগোলের শব্দ ভেসে এসে আমাদের কাণে পড়তে লাগল। সেই শব্দের সাথে সাথে আমাদের বুক ধরফর করতে লাগল। আমরা বিছানায় শোয়ে রইলাম ঠিকই, তবে মন গিয়ে রইল বাজারে।
রহমান অধৈর্য হয়ে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে- চলো যাই। যাত্রা শুরু হয়ে যাবে।
র’, একটু পরে যাব। আমি বললাম- মামা হয়তো এখনও জেগে আছে! বাইরে চিয়ার পেতে বসেও থাকতে পারে!
বাজার থেকে ঢোল এবং হারমনিয়ামের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। তার মানে, একটু পরেই যাত্রা শুরু হবে!
যাত্রাপালায় তিনটি কনসার্ট দেওয়ার পর যাত্রা শুরু হয়। আমি বললাম- চল তাহলে। কনসার্ট দিচ্ছে। তিনটি কনসার্ট শেষ হলেই যাত্রা শুরু হবে।
বাজার মামাদের বাড়ী থেকে একটু দূরেই। দুই তিন মিনিটের পথ। পূর্ব পরিকল্পনা মতো আমরা মৈ বেয়ে নেমে বাজারে এলাম। আমরা বাজারে আসার একটু পরেই যাত্রাপালা শুরু হল। এক জায়গায় চুপটি মেরে বসে আমরা যাত্রাপালা দেখলাম। পালা শেষ হওয়ার পর বাড়ি ফিরে এসে দেখি মামা চিয়ার পেতে বারান্দায় বসে রয়েছেন। ঘরে ঢোকতে গেলেই তাঁর চোখে পড়ে যাব এই ভয়ে আমরা বাড়ির ভেতর ঢুকলাম না। বাড়ির বাইরে ধানখড়ের কাতি ছিল। আমরা দুইজন সেই কাতির মাঝে গর্তের মতো করে সেখানে শোয়ে পড়লাম। রাত জেগেছি। তাই কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। দুপুরে জেগে উঠে বাড়ীতে অনেক লোকের সমাগমের শব্দ শুনতে পেলাম।
নানী বলছেন-ওরা এভাবে কোথায় যাবে? নদীর পারে-টারে কোথাও আছে হয়তো!
বড় মামা বললেন- কোথাও খোঁজার বাকি রাখিনি। বাজার, নদীর পাড়, বাহাদুরদের বাড়ি সব জায়গায় খোঁজেছি। কোথাও নেই। এই ভাবে বলেই তিনি বললেন- হোসেনদের বাড়ীতে যেতে পারে, সেখানে লোক পাঠাতে হবে।
নানী বললেন- আমার মনে হয় সেখানে যায়নি। আবুল তো সেদিন বাড়ী থেকে এসেছে। তবু বলছ যখন কাউকে পাঠিয়ে দাও।
বড় মামা বললেন- দেখি কাকে পাঠাতে পারি। মাদারিকে নদীর পাড়ে পাঠিয়েছি। সে এলে, তাকেই পঠাতে হবে।
মাদারি সে বৎসর মামাদের বাড়িতে রাখাল ছিল। আমার দুর সম্পর্কীয় মামা। সে রসিক প্রকৃতির লোক ছিল। মানুষকে হাসাতে পারত। আমাকে খুব স্নেহ করত।
বড় মামা মাদারির খোঁজে বেড়িয়ে পড়ল। খেরের ভেতর থেকেই আমি কথাটা টের পেলাম।
ইতিমধ্যে রহমানও জেগে উঠেছিল। সে বলল- আমার ক্ষিদে পেয়েছে। চল, এখন বেরিয়ে পড়ি।
আমি রহমানের মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরে বললাম- এখন বেরুলে মারবে।
রহমান বলল- আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে।
আমি বললাম- ঘুমিয়ে পড়। ঘুম এলেই ক্ষিদে চলে যাবে।
পেটে ক্ষিদে, চোখে ঘুম। ঘুমের কাছে ক্ষিদে পরাজিত হল। রহমান আবার ঘুমিয়ে পড়ল। একটু পরে আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত জাগা ঘুম। এক ঘুমে সন্ধ্যে হয়ে গেল।
খড়ের কাতি রাস্তার ধারে ছিল। সন্ধ্যের সময় নানী খড়ের কাতির কাছে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন- অভাগারা কোথায় আছিস? বাড়িতে আয়। কেউ তোদের কিচ্ছু বলবে না।
আমাদের বড় মামা দুই বিয়ে করেছিলেন। প্রথম বিয়ে করেছিলেন জিগির মুন্সির বোন রহমজানকে। তাঁর পক্ষে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে ছিল। ছেলের নাম আব্দুর রহমান এবং মেয়ের নাম সামর্ত ভানু। ছোট মামীর বাবার বাড়ি ছিল শিতুলি। মামীর বিয়ের আগেই বাবা মারা গিয়েছিলো বলে তাঁর বাবার নাম জানি না। মামীর কাকার নাম ছিল ছালাম মুন্সি। মামীর দুই ভাই ছিলো। তাঁদের নাম ছিলো আবুলি এবং আব্দুর রেজ্জাক। মামীর নাম ছিল সালেহা খাতুন। ছোট মামী দেখতে হৃষ্টপুষ্ট এবং খাটো ছিল। খুবই নম্র স্বভাবের ছিলেন। কিছু লেখা-পড়াও জানতেন। কোরাণ শ্বরিফ পড়তে পারতেন। এম, ই স্কুলে উঠার পরে আমি মামীর কাছ থেকে এক বেলায় আরবি বর্ণমালা শিখেছিলাম। মামি রুটি ভাজছিল। আমি আখার ধারে বসে বর্ণগুলি মুখস্থ করেছিলাম। শুধু আরবি হরফই নয়, সেহেরির এবং এফতারের দোয়ার পাশাপাশি অনেকগুলি সুরা মামির মুখে শুনে শুনে মুখস্থ করেছিলাম।
সেই ছোট মামী নানীর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মামী বললেন- রাত্রে গান শুনেনি তো! ভাগ্নের যে রকম গান শুনার নেশা। মামার জন্য শুনতে পারে না। তাই লুকিয়ে গান শুনে এসে হয়তো কোথাও ঘুমিয়ে রয়েছ।
কোথায় ঘুমিয়ে থাকবে? নানী বললেন- সারাদিন না খেয়ে ঘুমোবে না-কি?
রাত জাগা ঘুম। ছোট মামী বললেন- ক্ষিদায় চিনে না সুদা, ঘুমে চিনে না বিছানা। থাকলে থাকতেও পারে!
মামীর কথা শুনে আমি একটু অবাক হলাম। মামী যাদু-মন্ত্র জানে নাকি? না হলে কেমনে বললেন আমরা কোথাও শোয়ে রয়েছি!
আমি এমনটা ভাবতেছি। এমন সময় রহমানের কাশি পেল। সে বলল- আমার কাশি পেয়েছে।
আমি রহমানের মুখ চেপে ধরে বললাম- কাশবি না। নানী এবং মামী খড়ের কাতির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। কাশলে আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে যাবে।
রহমান কাশি চেপে রাখতে পারল না। সে কেশে ফেলল।
মামীর কানেই প্রথমে গেল সেই কাশির শব্দ। মামী বললেন- খড়ের কাতি থেকে যেন কাশির শব্দ শুনতে পেলাম। এভাবে বলেই মামী আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। নানীও এলেন মামীর সাথে।
নানী বললেন- তোরা যদি এখানে কোথাও আছিস, বেরিয়ে আয়। কেউ তোদের কিচ্ছু বলবে না।
নানীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে রহমান আগে বেরিয়ে এল। তার পেছন পেছন আমিও।
আমাদের পেয়ে সবাই খুশি হল। কেউ কিচ্ছু বলল না। বড় মামা প্রথমে কিছু রাগা-রাগির ভাব করেছিলেন। নানী কিচ্ছু বলতে দিলেন না- কেউ রাগারাগি করবে না। ছেলে মানুষ হঠাৎ ভুল করে ফেলেছে। রাগা-রাগি করলে কি ভুল শুধরে যাবে?
মামা বললেন- তোমাদের আশকারা পেয়েই ওরা একদিন গাছে উঠবে।
নানী বললেন- আমি ওদের বলে দিব। আর কোনোদিন এরকম কাজ করবে না। এভাবে বলেই নানী আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন- চল, এরকম কাজ আর করবি না। সারাদিনতো না খেয়ে আছিস। হাত-মুখও তো ধোয়া হয়নি ! যা, হাত-মুখ ধুয়ে আয়, আমি ভাত বেড়ে দিচ্ছি।
সেদিনের সেই অস্বস্তিকর ঘটনা নানীর অপত্য স্নেহের ছোঁয়ায় এভাবেই ইতি পড়েছিল।
গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় তিন বৎসর
১৯৬৩ সাল। দ্বিতীয় শ্রেণীর বাৎসরিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। যথাসময়ে রেজাল্ট বের হলো। আমি সেবার পরীক্ষায় প্রথম হলাম।আলী হোসেইন দ্বিতীয় এবং সাকায়েত হোসেইন তৃতীয় হলো। আলী হোসেইন কেন প্ৰথম থেকে দ্বিতীয হলো সে কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। তবে হ্যাঁ, সেবার আমার পরীক্ষাও ভালো হয়েছিলো। সেবার মোট চারশ পঞ্চাশ নম্বরের পরীক্ষা হয়েছিলো। চারশ পঞ্চাশ নম্বরের মধ্যে আমি চারশ চৌয়াল্লিশ নম্বর পেয়েছিলাম।তাই মনে হয়, দুর্ঘটনাটা না ঘটলেও আমিই প্রথম হতাম।
আমার নম্বর দেখে হেড মাষ্টার ফজর আলী স্যার একদিন মাজু মামা মানে সিরাজুল হক মামাকে ডেকে নিয়ে বললেন- আবুলকে এবার ডাবল প্রমোশন দেওয়ার কথা ভাবছি। তুমি কি বল?
মামা বললেন- তা কি করে সম্ভব! কোনো অসুবিধে হবে না তো?
না, কোনো অসুবিধে হবে না। ফজর আলী স্যার বললেন- ও পারবে। রিজাল্ট ভাল করেছে। তাই বলছি। একটা বৎসর নষ্ট করে লাভ নেই। ওকে এম, ই স্কুলে ভর্তি করে দাও। আমি সার্টিফিকেট দিয়ে দিব।
গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্ৰাসায় তিন বছর

গড়লা হাইস্কুল
১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে আমি মোসলেম উদ্দিন মামার সাথে গড়লা এসে গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। মোসলেম উদ্দিনের সাথে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না। তাঁদের বাড়ী মামাদের বাড়ীর কাছেই ছিলো এবং তিনি মামাদের ভাই বলে ডাকতেন, তাই আমি তাঁকে মামা বলে ডাকতাম। তিনি বয়সেও আমার থেকে অনেক বড় ছিলেন। প্ৰায় মামাদের সম বয়সী। মোসলেম উদ্দিন তখন গড়লা এস, কে হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়তেন। গড়লা-চাছরা এম, ই মাদ্রাসা ও এস, কে হাইস্কুল একটা চৌহদ্দির ভেতরে ছিল।
গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় ভর্তির হওয়ার পর আমার নতুন জীবন শুরু হলো। এক নতুন পরিবেশে প্রবেশ করলাম। কুয়ার বেং এসে যেন সাগরে পড়লাম। কোনোদিন না দেখা নতুন সহপাঠী পেলাম। বন্ধু পেলাম। নতুন স্যারদের পেলাম।
আমি মামাদের বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। মামাদের বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব অনুমান তিন বা সাড়ে তিন মাইলের মতো ছিলো। তখন কিলোমিটারের হিসাবে কেউ দূরত্ব নির্ণয় করত না, তাই মাইলের হিসেবেই বললাম। মোসলেম মামা এবং আমি প্রত্যেক দিন উক্ত দূরত্ব খালি পায়ে হেঁটে আসা-যাওয়া করতাম। কারণ তখনকার দিনে এখনকার মত সাইকেল ছিল না। আঙুলে গোনা দুই চারজন স্বচ্ছল লোকেরা তখন সাইকেল ব্যবহার করতেন। মোসলেম মামার একটি ব্যাগ ছিল। আমার পাঠ্যপুস্তক প্রায়শঃই মোসলেম মামা নিজের ব্যাগে ভরে নিতেন। আমি খালি হাতে তাঁর পেছনে পেছনে হেঁটে যেতাম।
মোসলেম মামা সকাল সাড়ে সাতটা বাজতে মামাদের বাড়ি আসতেন। তিনি আসার পরে আমি কাপড়-চোপড় পরিধান করে তাঁর সাথে স্কুলে রওনা হতাম। তখন আলীগাঁও বাজার থেকে গড়লা যাওয়ার জন্য বহরি থেকে বাঘবর পর্যন্ত যাওয়া মাথাউরিটাই ছিল একমাত্র রাস্তা। আমরা আলিগাঁও পাথার পর্যন্ত আসার পর আমাদের সাথে মিলিত হত জামাল উদ্দিন। মানে জামাল ভাই।জামাল ভাইদের বাড়ি মাথাউরির দক্ষিণ পাশে ছিল। সে মনে হয়, কাপড়-চোপড় পরিধান করে স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করত এবং আমাদের দেখলেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসে আমাদের সাথে মিলিত হতো। জামাল ভাই আমার থেকে এক শ্রেণী ওপড়ে পড়ত। কোনো কোনোদিন সারগাঁয়ের কোরবান আলি এবং তাজিম উদ্দিনের সাথেও দেখা হতো। তাঁরা আমার চেযে ওপড়ের শ্রেণীতে পড়তেন। আমি বয়েসে তাঁদের থেকে ছোট ছিলাম বলে আমি তাঁদের ভাই বলে ডাকতাম এবং তাঁরা আমাকে নাম ধরে ডাকতেন। ছোট বলে সবাই আমাকে খুব স্নেহও করতেন। তাঁদের সেই স্নেহের ঋণ আমি কোনোদিন পরিশোধ করতে পারব না। তাজিম উদ্দিন পরে এম, স্কুলের শিক্ষক হয়েছিলেন। অবসর গ্ৰহণের পর কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।কোরবান আলী ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনিও অনেকদিন আগে মারা গেছেন। জামাল উদ্দিন এম, ই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এখন অবসর নিয়েছে। তিনি এখনও জীবিত।
তখনও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের তাণ্ডব অব্যাহত ছিল। ইতিমধ্যে আলীরপাম, আলীগাঁও, সারগাঁও, গড়লা সুঁতি প্রভৃতি গ্রাম নদীর বুকে তলিয়ে গিয়েছিলো। পুরানা মাথাউরি ভাঙার পরে মাণিকপুর গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে নতুন মাথাউরি নির্মাণ করেছিল। আমরা সেই মাথাউরি দিয়েই আসা-যাওয়া করতাম। করিম মেকারদের বাড়ি মাণিকপুরে প্রায় মাথাউরির সাথেই উত্তর পাশে ছিল। একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় দেখি নদী ভেঙে এসে করিম মেকারদের বাড়ির সামনের মাথাউরি স্পর্শ করেছে। মাথাউরির দক্ষিণ পাশের কিছু অংশ ইতিমধ্যে ধ্বসে নদীতে পড়েছে। ভাঙন প্রতিরোধের জন্য লোহার মোটা মোটা তাঁর দিয়ে বেঁধে নদীতে বড় বড় গাছ ফেলতেছে। মাথাউরির চান্দি তখনও অক্ষত ছিল। আমরা সেই দৃশ্য কিছু সময় প্রত্যক্ষ করে মাথাউরির ওপড় দিয়েই স্কুলে গেলাম।
স্কুল থেকে ফিরে আসার সময় দেখলাম, মাথাউরির চান্দি ভেঙে নদীতে পড়েছে। উত্তর পাশের ঢালের কিছু অংশ মাত্র অবশিষ্ট রয়েছে। আমরা ঢাল দিয়ে বাড়ী চলে এলাম।
পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় দেখলাম, মাথাউরি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে নদীতে তলিয়ে গেছে এবং আসা-যাওয়ার জন্য নদীর পাড় বরাবর একটি উপপথ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা সেই উপপথ দিয়ে স্কুলে গেলাম।
এর মধ্যে যান্মাসিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হল এবং গ্রীষ্মের বন্ধ পড়ল। গ্রীষ্মের বন্ধের মধ্যে, পূবে গড়লা স্কুলের পশ্চিম দিকে অবস্থিত গড়লার শ্লুইস গেট বাজার থেকে পশ্চিমে আলীগাঁও বাজার পর্যন্ত মাথাউরির এক বৃহৎ অংশ নদীর বুকে তলিয়ে গেল।গ্ৰীষ্মের বন্ধ শেষ হওয়ার পর আবার স্কুল খুলল। কিন্তু আমাদের স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য রাস্তা নেই। নদীর পাড়ে পাড়ে যে উপপথ সৃষ্টি হয়েছিল বন্যার ফলে সেই রাস্তাও জলের তলায়। ইতিমধ্যে মোসলেম মামাও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন।(কারণ তখন ১৯৩৮ সালের পরে পাকিস্থান থেকে উঠে আসা প্রজা বাচনি চলছিল ও মোসেলম মামাদের পরিয়াল সেই‘কুইট ইণ্ডিয়া’ কেসে পড়েছিল। সেই কেসে হেরে পরের বৎসর মোসলেম মামারা পরিয়ালসহ পাকিস্থান চলে গিয়েছিল। শুনেছি, মোসলেম মামা পাকিস্তানে স্কুল এস, আই(পরিদৰ্শক) হয়েছিলেন। এসব শুনা কথা। কতদূর সত্য তা বলতে পারব না।) স্কুলে আসা-যাওয়ায় অসুবিধার জন্য কোরাবান আলী এবং তাজিম উদ্দিনও লজিং বাড়ী চলে গেলো।জামাল ভাইদের বাড়ীও ভাঙনের কবলে পড়াতে অন্যত্র উঠে গিয়েছিলো। ফলে আমি একা হয়ে পড়লাম। রাস্তা নেই, ঘাট নেই, আমার জন্য একা একা স্কুলে যাওয়া অসুবিধা হয়ে পড়ল। আমার অনুভব তখন কিরকম ছিলো এখন ভাষায় প্ৰকাশ সম্ভব নয়।কারণ আমার বয়েস তখনকার অন্যান্য ছাত্রের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম ছিল। ফলে এক বুক জল ভেঙে একা একা স্কুলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
কয়েকদিন স্কুলে যেতে পারলাম না। এর মধ্যে আলীগাঁও থেকে শ্লুইস গেট বাজার পর্যন্ত যাওয়া-আসা করার জন্য সরকারের তরফ থেকে লঞ্চ দিল। প্রথমদিন খুব খুশি হয়ে লঞ্চে চড়ে স্কুলে গেলাম। হাটার দর্কার হয় না। অল্প সময়েই স্কুলে যাওয়া যায়। তিন চারদিন যাওয়া-আসা করার পর সেই খুশি আর রইল না। একদিন স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে লঞ্চ-ঘাটে গিয়ে দেখি লঞ্চ বন্ধ। নষ্ট হয়েছে। মেরামত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু মেরামত হচ্ছে না। এরই মধ্যে স্কুলের সময় পার হয়ে গেল। ফলে বিফল মনোরথ হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। পরের দিন স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখি লঞ্চ নেই। কে একজন বলল, লঞ্চ মেরামত করার জন্য কোথাও নিয়ে গেছে। সেই যে লঞ্চ গেল মেরামত হয়ে আর ফিরে এল না।
ইতিমধ্যে জল কিছু হ্রাস পেল। তবুও জায়গায় জায়গায় এক বুক জল এবং দুই জায়গায় দু’টি খাল। খাল সাঁতরে পার হওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। গামছা পিন্ধে এক বুক জল ভেঙে, খাল সাঁতরে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে লাগলাম। তখনই আমার দেখা হলো, মণিন্দ্র বিশ্বাস, মণিন্দ্রের দাদা নিমাই বিশ্বাস, অনিল বিশ্বাস, নবদ্বীপ মণ্ডল এবং বিনয় মণ্ডলদের সাথে।বিনয় মণ্ডল, নবদ্বীপ মণ্ডলের দাদা। নিমাই বিশ্বাস,নবদ্বীপ মণ্ডল ও বিনয় মণ্ডল আমার চেয়ে দুই শ্রেণি ওপরে পড়ত। মণিন্দ্র এবং অনিল বিশ্বাস আমাদের ক্লাসেই পড়ত। মণিন্দ্রদের বাড়ি বাজারের উত্তর দিকে ছিল এবং তারা আগে ভেতরের কোনো একটি রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করত। তখন আমরা যেতাম মাথাউরি দিয়ে। তাই রাস্তায় তাদের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হতো না। মাথাউরি ভাঙার পর আমরা মানে আমি সেই ভেতরের রাস্তা দিয়ে যাওয়া-আসা করতে লাগলাম। ফলে তাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমার স্কুলে যাওয়া-আসা সমস্যা বলতে গেলে সমাধান হল। নবদ্বীপ মণ্ডল বরপেটা সদরের ডি আই হয়ে অবসর নিয়ে কয়েক বছর আগে মৃত্যু বরণ করেছে। নদী ভাঙনের ফলে বাকী তিনজনের মধ্যে নিমাই বিশ্বাস এবং মণিন্দ্র বিশ্বাস দরং জেলার কালিখোলায় উঠে গিয়েছিল। অনিল বিশ্বাস গোসাঁই গাঁর দিকে কোথাও উঠে গিয়েছিল। এখন তাদের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। জানতে পারলে খুবই ভাল লাগত।
এক সময় জল শুকাল। কিন্তু খাল দু’টিতে জল রয়েই গেল। কখনও নাও, কখনও ভেলা দিয়ে সেই খাল পার হতাম। কখনও কখনও আবার গামছা পিন্ধে খাল পার হতাম নাও বা ভেলা না থাকলে। জল যখন একেবারে কমে গেল তখন অন্যান্যরা কাপড় বাঁচিয়ে সেই খাল পার হতো, কিন্তু ছোট থাকার দরুন আমি কাপড় বাঁচিয়ে খাল পার হতে পারতাম না। গামছা পিন্ধেই খাল পার হতে হতো। কোনো কোনোদিন নবদ্বীপ মণ্ডল এবং নিমাই বিশ্বাস কাঁধে তুলে আমাকে খাল পার করে দিত। সেই ঋণ আমি কেমনে শোধ করব?
সে যাই হোক, খরা মরশুম এল। জল শুকাল। নিয়মিতভাবে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে লাগলাম। এরই মধ্যে বাৎসরিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা মোটা-মুটি ভালই দিলাম। ফলাফল ঘোষণার দিন এলো। দুরু দুরু বুক নিয়ে ফলাফল জানতে গেলাম। দুরু দুরু বুক নিয়ে যাওয়ার কারণও ছিলো। আমি যে তৃতীয় শ্রেণীতে অধ্যয়ন না করেই চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম!তাই আমি একটু হীনতায় ভোগতাম।আমার মনে সব সময় একটা দুর্বলতা ক্রিয়া করত যে, আমি আমাদের ক্লাসের অ্ন্যান্যদর চেয়ে কম বুঝি। কারণ আমি তাদের চেয়ে একটা শ্ৰেণী কম পড়েছি! তবে পাস করব, এটা জানতাম, কিন্তু পজিশ্বন থাকবে কি, থাকবে না এটা নিয়ে সন্দেহ ছিল। এদিকে শুভাকাংক্ষীদের প্রত্যাশা ছিল পজিশ্বন পাব বলে। শুভাকাংক্ষীদের প্রত্যাশা পূরণ হবে কি হবে না, এই নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল।
কি হবে, কি হবে এ রকম একটি অস্থির মন নিয়ে স্কুলের মাঠে বসে আছি। অপেক্ষার অন্ত পড়ল। স্যারেরা ফলাফলের তালিকা স্কুলের দেয়ালে আঠা লাগিয়ে ঝুলিয়ে দিলেন। ছাত্রেরা দল বেঁধে গিয়ে ফলাফল দেখার জন্য ভিড় করে দাঁড়াল। ছাত্রেরা বলার কারণ আছে। কারণ তখন স্কুলে একজনও ছাত্রী ছিল না। স্কুলটা স্থাপন হয়েছিল ১৯৬২ সালে এবং ১৯৬৫ সালে চতুর্থ শ্রেণীতে লালভানু, সামর্ত ভানু, রাবিয়া, উম্মে কুলচুম এবং জরিণা প্রথম নাম ভর্তি করেছিল। সামর্ত আমার মামাত বোন ছিল। স্কুলে যাওয়া-আসার অসুবিধার জন্য কয়েকদিন পরেই সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। পড়া ছেড়ে দেওয়ার কিছুদিন পরে কাদঙের রূপাকুছির বিলায়েত হোসেনের সাথে তাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। বিলাত হোসেন পেশায় দর্জি ছিল। আগেই বলেছি, সামর্ত ১৯৬৮ সালে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মারা গেছে।
ঠেলা-ঠেলি আরম্ভ হল। কার আগে কে দেখবে এই আর কি! কেউ কেউ ফলাফল দেখে উৎফুল্লিত এবং কেউ কেউ ব্যাজার হয়ে বাড়ি ফিরতে লাগল। আমি তেমনই দুরু দুরু বুক নিয়ে বসে আছি স্কুলের মাঠে। মনে দুর্বার ইচ্ছা থাকা সত্বেও ফলাফল দেখার জন্য যেতে সাহস সঞ্চয় করতে পারছি না।
এমন সময় জামাল ভাই এসে বলল- রিজাল্ট দেখলে না-কি?
আমি বললাম- না, দেখি নাই।
জামাল বলল- তুমি ফার্স্ট হয়েছ।
কথাটা আমার বিশ্বাস হলো না। ঠাট্টা করা বলে ভাবলাম। আমি কথাটা বিশ্বাস করিনি বলে জামাল ভাই বুঝতে পারল। সে আমার হাতে ধরে টেনে নিয়ে গেল ফলাফল ঝুলিয়ে রাখা সেই দেওয়ালের দিকে। তখনও কিছু কিছু ছাত্র ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়ালের পাশে। জামাল ভাই আঙুল দিয়ে সেই ফলাফলের তালিকা দেখাল। দেখলাম, আমার রোল নম্বর সাতাইশের তলায় লাল কালি দিয়ে রোমান সংখ্যার এক লেখা আছে। আমাদের শ্রেণীতে সম্ভবতঃ চৌত্রিশ জন ছাত্র ছিলাম এবং আমার রোল নম্বর সাতাইশ ছিল। দ্বিতীয় হয়েছে আব্দুল হালিম এবং তৃতীয় হয়েছে আব্দুল জব্বার। আব্দুল হালিম পরবর্তীতে গড়লা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে অভিষিক্ত হয়েছিল এবং অবসর গ্রহণের পর মৃত্যু বরণ করেছে। আব্দুল জব্বারকে আমরা ‘ইলেভেন’ বলে ডাকতাম। কারণ চতুর্থ শ্রেণীতে নাম ভর্তির সময় তার রোল নম্বর এঘার হয়েছিল। নাম হাজিরার সময় আমরা কেউ ‘প্রেজেণ্ট স্যার’ এবং কেউ কেউ আবার ইয়েস স্যার’ বলে সাঁড়া দিতাম। কিন্তু জব্বার ইলেভেন স্যার’ বলে সাঁড়া দিত। সেখান থেকেই ছাত্রেরা সবাই তাকে ইলেভেন বলে ডাকত। আমাদের ক্লাসের আব্দুল আজিজ এবং কালাম বিবাহিত ছিল। তারা বয়েসেও আমাদের চেয়ে অনেক বড় ছিল।
এর পরেও গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় আরও দুটি বৎসর অধ্যয়ন করেছিলাম। বাকি দুটি বৎসরও আমাদের তিনজনের রোল নম্বর অপরিবর্তিত ছিল। আমাদের শ্রেণীতে অধ্যয়ন করা আরও কয়েকজন সহপাঠীর কথা এখনও আমার মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে বাবর আলী, জোয়াহের আলী, আয়াত আলী, আবুল খায়ের, আবুল কাশেম, ছামাদ আলী, হালিম আলী, সৈয়দ আলী এবং আলী হক অন্যতম ছিল।
বাকী দুটি বৎসর নানান অসুবিধার মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে পাড়ে অবস্থিত উপপথ দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতাম। বন্যার মরশুমে জল এবং খরার মরশুমে ফাল্গুন চৈত্র মাসে বালু-ঝটিকার তাণ্ডব। বালুগুলো চোখে-মুখে কাঁটার মত বিদ্ধ হতো। ফলে স্কুলে যাতায়াত করতে খুবই অসুবিধা হতো। বালু-ঝটিকা শুরু হলে চোখ-মুখ রুমাল দিয়ে বেঁধে যেতে হতো। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার বৎসর প্রবল বন্যা হওয়াতে কিছু দিন সহাপাঠী আবুল খায়েরদের বাড়ীতে জাইগীর ছিলাম। আবুল খায়েরের আব্বা হোসেন আলী স্যার আমার প্রাইমারির শিক্ষক ছিলেন। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তখন বংগীয় মূলের মুসলমান সমাজে শিক্ষার ক্ষেত্রে নবজাগরণ শুরু হয়েছিল মাত্র। জায়গায় জায়গায় স্কুল স্থাপনের ধুম উঠেছিল। গড়লার আগে কাদং, মন্দিয়া, দংরা, ঢাকালিয়া পাড়া, বালাগাঁও, ময়েনবরি, তারাবাড়ি, পেড়াধরা প্রভৃতি অঞ্চলে স্কুল স্থাপন হয়েছিল এবং জাইগীর প্রথার জরিয়তে শিক্ষা বিস্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। এই প্রচেষ্টায় যে যেভাবে পারতন অংশ গ্রহণ করতেন। গড়লা-চাচরা-কাহিবাড়ির লোকও এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলেন না। তাঁরা দূরের ছাত্রদের জাইগীর রেখে শিক্ষা প্রসারের জন্য সহযোগ করতেন। জাইগীর রাখার কথা বললে চলনসই গেরস্তেদের কেউ মানা করতেন না। দুই তিনজন করেও জায়গীর রাখত স্বচ্ছল গেরস্তরা। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় আমি কিছুদিন মাণিকপুরের মোজাফর আলীর বাড়ীতে লজিং ছিলাম। মোজাফরকে আমি মামা বলে ডাকতাম। তিনি এবং তাঁর ভাই আলী হোসেন আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মোজাফর মামাদের বাড়ী আমার ওপড় শ্রেণীতে অধ্যয়নরত ইসমাইল হোসেন মানে ইসমাইল ভাইদের বাড়ীর পুব পাশে লাগোয়া বাড়ী ছিল। ইসমাইল ভাই ও তাঁর পরিয়ালের সবাই আমাকে স্নেহ করতেন। ইসমাইল ভাই আমাকে ইদ্রিস আলীর সাথে দোস্ত পাতিয়ে দিয়েছিল। সেই সম্বন্ধ এখনও অটুট আছে যদিও তেমন নিবিড় নেই। মানুষ কথায় বলে, চোখের আড়াল হলে, মনেরও আড়াল হয়। কথাটা ঠিক তেমনই আর কি! শুনেছি, ইদ্রিস আলী এখন সুফি সাধক হয়েছে এবং তাঁর অনেক মুরিদানও হয়েছে।
সহপাঠী বন্ধুদের বাইরেও মনে পরে স্যারদের কথা। স্যারদের মধ্যে কোব্বাদ আলী স্যার চতুর্থ শ্রেণীতে আমাদের ইংরাজি শিখাতেন। তাঁকে সবাই পণ্ডিত বলত। শিক্ষক হিসাবে খুবই ভাল ছিলেন তিনি। প্রশাসনের ক্ষেত্রে তিনি খুবই কঠোর ছিলেন। ছাত্ররা তাঁকে যমের মতো ভয় করত। কোব্বাদ আলী স্যার ইংরাজির বাইরেও অসমিয়া এবং অংক শেখাতেন। আব্বাস আলী স্যার পঞ্চম শ্রেণীতে ইংরাজি শেখাতেন। তিনি হেড মাষ্টার ছিলেন এবং খুবই অমায়িক ও গহীন প্রকৃতির লোক ছিলেন। বর্তমানেও তিনি জীবিত এবং পক্ষাঘাত হয়ে শয্যাগত। ষষ্ঠ শ্রেণীতে আমাদের অংক শেখাতনে হালিম স্যার। অংক বিষয়ে তাঁর খুবই বুৎপত্তি ছিলো এবং তিনি স্নেহশীল ব্যক্তি ছিলেন।
আমাদের স্কুলে দু’জন মৌলবী ছিলেন। একজনের নাম নুরুল ইসলাম এবং অন্যজনের নাম আব্দুল আলি। আমরা ছাত্ররা মৌলবীদের ‘হুজুর’ বলে সম্বোধন করতাম। নুরুল ইসলাম হুজুরের শরীরের রং ফরসা এবং আব্দুল হুজুরের শরীরের রং ঈষৎ শ্যামলা ছিল। তাই মৌলবী দু’জনকে পৃথকভাবে চিনাক্ত করার জন্য আমরা নুরুল ইসলাম হুজুরকে ‘ধলা মৌলবী’ এবং আব্দুল হুজুরকে ‘কালা মৌলবী’ বলে নামকরণ করেছিলাম। নুরুল ইসলাম হুজুর কিছু তরল প্রকৃতির এবং আব্দুল হুজুর গম্ভীর প্রকৃতির লোক ছিলেন। আব্দুল হুজুর প্রকৃতে হাইস্কুলের মৌলবী ছিলেন এবং তিনি আমাদের উর্দু শেখাতেন। তিনি আমাদের কোরানের সুরাও মুখস্থ করাতেন। তখন মুখস্থ করা সুরাগুলিই বর্তমান আমার ধর্মীয় জীবনের পাথেয় হয়ে আছে।
প্রাইমারিতে থাকতে আমরা ঈগলের পাখি দিয়ে লিখতাম। কালির দোয়াত নিয়ে স্কুলে যেতাম। তাই এমন কোনো ছাত্র ছিল না, যার কাপড়ে কালির দাগের চিহ্ন ছিল না। এম, ই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে কলম দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। কিন্তু আব্দুল হুজুর আমাদের কলম ব্যবহার করতে দিতেন না- আরবি হরফগুলি খাগরির কলম দিয়ে লেখাতেন। ইতিমধ্যে আমরা কলম দিয়ে লেখায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং অত দূরের স্কুলে কালির দোয়াত নিয়ে যাওয়াটাও অসুবিধে ছিল। তবুও আমাদের খাগরির কলম নিয়ে স্কুলে যেতে হতো একমাত্র আব্দুল হুজুরের জন্য। কিন্তু সহপাঠী সৈয়দ আলী আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলো। সে এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলো। কলমের নিপের আগা ভেঙে শিলনোড়ায় ঘষে ঘষে এক ধরণের নতুন নিপ তৈয়ার করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলো সে। যার লেখা অবিকল খাগরির কলমের সাথে মিলত। পরবর্তীতে আমরা সেই নতুন উদ্ভাবিত কলম দিয়ে লিখে খাগরির কলমের লেখা বলে হুজুরকে বোকা বানিয়েছিলাম। হুজুর এই কথা কখনও টের পায়নি। টের পেলে অবশ্যেই পিঠে সপাৎ সপাৎ বেতের কোপ পড়ত।
আব্দুল হুজুরের সাথে একদিন আমি তর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম। ছেলেবেলা থেকেই আমি অন্যায় সহ্য করতে পাড়তাম না। অন্যায় দেখলে মাথা গরম হয়ে উঠত। ঘটনাটা পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময়কার। বাৎসরিক পরীক্ষা চলছে। আব্দুল হুজুর আমাদের গার্ড দিচ্ছেন। হঠাৎ আব্দুল হুজুর আমাদের সহরাঠী বাবর আলীর পাশে গিয়ে বললেন- বাবর আলী, খাতাটা আড়াল করে লিখ্। আবুল তোকে দেখে লিখছে।
বাবর আলী আমার ঠিক পেছনে বসেছিল। কথাটা আমার কানে গেল। আসলে আমি বাবর আলীর খাতা দেখে লেখা তো দূরের কথা, আমি তার দিকে কখনও ফিরেই তাকাইনি!
তাই আমি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে উঠলাম- আপনি অন্যায় কথা বললেন কেন, হুজুর? বাবর আলী আমার পেছনে। আমি কেমনে ওর খাতা দেখে লেখলাম? না, বাবর আলীই আমার খাতা দেখে লিখছে?
কথা বিষম দেখে আব্দুল হুজুর আমার কাছে এসে পিঠ চাপড়ে বললেন- না, আমি এমনই ঠাট্টা করছিলাম।
আমি বললাম- না হুজুর, আপনি এরকম অন্যায় ঠাট্টা করা ঠিক হয়নি।
আব্দুল হুজুর মুখ ভার করে বললেন- আমার ভুল হয়েছে। কিছু মনে করিস না।
সেদিন এভাবে প্রতিবাদ করাটা ঠিক হয়েছিল, না হয়নি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।
এখনও অন্যায় দেখলে মাথা গরম হয়। তার জন্য অনেক সময় লোকের অপ্রিয়ভাজনও হতে হয়। তাই এখন তেমন প্রতিবাদ করি না। তবে অন্যায় দেখলে কষ্ট হয়। বর্তমান আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ঘৃণ ধরেছে। মানুষ ভোগবাদী মানসিকতার শিকার হয়েছে।সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কারও দিকে ফিরে তাকানোর সময় নেই। স্বার্থ ছাড়া কেউ কিছু করে না। সবাই প্রচারের জন্য ব্যস্ত। পাঁচ কেজি চাল দান করেও ফটো উঠে লোক দেখানোর জন্য ফেসবুকে আপলোড দেয়। রবীন্দ্র নাথ একটি কবিতায় লিখেছিলেন- ‘লোভে লোভে ভরেছে ধরা, স্বার্থে স্বার্থে ঘটেছে সংঘর্ষ, ভদ্রবেশি পংকিলতা উঠিয়াছে জেগে পংক শয্যা হতে।’ বর্তমান যে সিষ্টেমে সমাজ ব্যবস্থা চলছে, এভাবে চললে মানুষ কখনও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না। এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু কে করবে? আমার মনে হয়, একা কেউ করতে পারবে না। সবাই সচেতন হতে হবে। সচেতন করবে কে? আমাদের সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে- ছেলে মাকে বলছে- “মা, আমার হাগা এলে ডেকে দিও। তখন মা বলছেন- বাবা, আমাকে ডেকে দিতে হবে না, তোমার হাগায়ই তোমাকে চেতাইবনে।’ কেউ ডেকে জাগাতে গেলে মনে হয় কেউ এখন জাগবে না। নিজে নিজে একদিন জাগবে। তবে হ্যাঁ, তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
আগেই বলেছি এম, ই মাদ্রাসার সাথে একটা চৌহদ্দিতে গড়লা এস, কে, হাইস্কুল ছিল। হাইস্কুলের শিক্ষকরাও মাঝে মাঝে আমাদের পড়াতেন। হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আব্দুর রহমান। পরে তিনি বরপেটা কোর্টে উকালতি করতেন এবং এখন এন্তেকাল করেছেন। সহকারি শিক্ষক হিসেবে ছিলেন খন্দকার নূর আহমেদ। (তিনিও পরে বরপেটা কোর্টের উকিল হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পরে বরপেটা আইন মহাবিদ্যালয়ের প্রবক্তা হয়েছিলেন। এখন এন্তেকাল করেছে।) আরও ছিলেন খোয়াজ স্যার। আব্দুর রহমান স্যার মাঝে মাঝে আমাদের ইংরাজি শেখাতেন। তিনি শেখানো ইংরাজি বাক্য গাঁথনির জ্ঞানই পরে আমাদের ইংরাজি শেখার পাথেয় হয়েছিল। খোয়াজ স্যার একদিন ডিমের কুসুমের সাথে তুলনা করে পৃথিবীর আকৃতির জ্ঞান দিয়েছিলেন। সেদিনের সেই পাঠ এতোই রসাল এবং মনোগ্রাহি ছিল যে পরবর্তি জীবনেও তা ভুলতে পারিনি।
একজন নমস্য ব্যক্তির নাম না লিখলে মস্ত অন্যায় হবে। তিনি ছিলেন স্কুলের মেনেজিং কমিটির সেক্রেটারি স্বর্গীয় জোনাব আলী মাষ্টার সাহেব। তাঁকে আমি কোনোদিন শিক্ষকতা করতে দেখিনি। আমি শুনা মতে, তিনি নাকি বিদ্যালয় স্থাপনের সময় কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। সেজন্যেই তিনি শিক্ষকতা না করলেও পরবর্তী পর্যায়ে তাঁকে সবাই মাষ্টার সাহেব বলে সম্বোধন করতেন। লোকটি খুবই জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান এবং স্নেহপ্রবণ ছিলেন। তাঁকে দেখলেই ভক্তি ভাব উদয় হতো। একদিন আমরা স্কুলের ছাত্রেরা তাঁর বাড়িতে খেত নিড়ানোর নিঅড়া(মাগনা কামলা)দিয়েছিলাম। খাসির মাংস দিয়ে আমাদের পেট পুরে খাইয়েছিলেন।
আমাদের স্কুলে প্রত্যেক বৎসর নবীজির জন্মদিনে ফাতেহা-ই-দোয়াজ দাহোম উদ্যাপন করা হতো এবং সভা শেষে পায়েস পরিবেশন করা হতো। সেই পায়েস খুবই সুস্বাদু হতো। সেই পায়েস এবং একদিন ব্রহ্মপুত্র নদের চরে বনভোজ(চড়ুইভাতি) খেতে গিয়ে পাকা কুমড়া দিয়ে রন্ধন করা খাসির মাংসের স্বাদ মনে হয় এখনও আমার জিভায় লেগে রয়েছে।
আমাদের স্কুলে প্রত্যেক বছর বাৎসরিক অনুষ্ঠান(ফাংশন)অনুষ্ঠিত হতো। ফাংশনে গজল (তখন মাদ্রাসায় বাদ্য বাজানো এবং গান পরিবেশন নিষেধ ছিল) এবং একাংকিকা নাটক পরিবেশন করা হতো। এক বৎসরের দু’টি একাংকিকা নাটকের দৃশ্য আজও আমার মানস পটে সজীব হয়ে আছে। নাটক দু’টি ছিল ‘মই এমেল হ’মেই’ এবং শ্বেক্সপিয়েরের ‘ মার্সেন্ট অফ ভেনিস’। ‘মই এমেল হ’মেই’ নাটকে তালেবর রহমানের এম, এল, এর চরিত্রে করা অভিনয় এবং ‘মার্সেণ্ট অফ ভেনিস’ নাটকে আব্দুল মোতালেবের শ্বাইলকের চরিত্রে করা অভিনয় খুবই জীবন্ত ছিল। সেই অভিনয়ের কথা এখনও আমার মনে দাগ কেটে আছে। তালেবর রহমান দাবালীয়া পারা হাইস্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষক পদে কর্মরত ছিলেন এবং এখন অবসর নিয়েছেন। আব্দুল মোতালেব বাঘমারা চর এম, ই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন এবং এখন অবসর নিয়েছেন। তাঁরা আমার চেয়ে দুই ক্লাস ওপড়ে পড়তেন।
আমাদের স্কুলের ছাত্রেরা খেলা-ধুলায় পারদৰ্শী ছিল। বিশেষ করে আমাদের স্কুলের ফুটবল টিম খুবই ভালো ছিল। অন্য স্কুলের সাথে প্রতিযোগিতামূলক খেলা খেলত। একবার আমাদের ফুটবল টিম দংরা হাইস্কুল টিমের সাথে খেলতে দংরা গিয়েছিল। আমাদের টিমকে উৎসাহিত করার জন্য আমরা আমাদের টিমের সাথে দংরা গিয়েছিলাম। সেদিন আমাদের টিম এক গোলে জয়ী হয়েছিল।আমাদের স্কুলের সন্মুখে একটি ভালো খেলার মাঠ ছিলো। সেখানে প্ৰতিয়োগিতামূক ফুটবল খেলা হতো। একবার রামাপারা স্কুল টিমের সাথে খেলতে গিয়ে আমাদের স্কুল টিমের মনির উদ্দিনের পা ভেঙেছিলো। রামাপাড়া টিমের হয়ে সেদিন দেলোয়ার হোসেন নামক একজন খেলোযাড় খেলেছিলো। দেলোয়ার হোসেন উচ্চ পর্যায়ের খেলোযাড় ছিলো। তাঁর সাথে ড্রিবলিং করতে গিয়েই মনে হয় মনির উদ্দিনের পা’টা ভেঙেছিলো। মনির উদ্দিনকে পরে লাটমণ্ডল হিসেবে কৰ্মরত দেখেছি। তাঁকে দেখেলেই আমার সেই পা ভাঙার কথা মনে পড়তো।
আমাদের স্কুলের মাঠে একবার সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছিল। সালটা মনে হয় ১৯৬৫ ছিল। সিনেমার নাম মনে নেই, তবে সেখানে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ এবং হুমায়ুন রোগশয্যায় শায়িত থাকার দৃশ্য ছিল। সম্রাট বাবর হুমানয়ূনের রোগশয্যার চার দিকে প্রদক্ষিণ করে পুত্রের রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করা দৃশ্যটা আজও আমার মনে সজীব হয়ে আছে। সেই দৃশ্যই আমাকে ‘দিগ্বিজয়ী বাবর’ নামক উপন্যাস লেখার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম সিনেমা দর্শন।
তখন ছাত্রেরা বিশ্রামের সময় ইংরাজি ওয়ার্ড মিনিং খেলত। আমি বিশেষ করে আব্দুল হালিম এবং জব্বারের সাথে ওয়ার্ড মিনিং খেলতাম। ওয়ার্ড মিনিং খেলা থেকে আমার ইংরাজি শব্দের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ এবং বানান অনেক শুদ্ধ হয়েছিল। ওয়ার্ড মিনিং খেলার লোক না পেলে আমরা আমাদের সহপাঠী আবুল কাশেমদের বাড়ির সামনে অবস্থিত আমগাছের তলায় গিয়ে আড্ডা দিতাম। আমাদের বিদ্যালয় গৃহটা মন্দিয়া থেকে দিঘীরপার হয়ে বাঘবর অভিমুখে যাওয়া পি ডব্লিউ ডি রাস্তার দক্ষিণ পাশে ছিল এবং কাশেমদের বাড়ি ছিল স্কুল থেকে একশ গজ পশ্চিম দিকে রাস্তার উত্তর পাশে। ওপড় শ্রেণীর ছাত্ররাও সেখানে গিয়ে আড্ডা দিত এবং বিড়ি টানত।তাঁরা নিজেরা বিড়ি টানার পাশাপাশি, তলের ক্লাসের ছাত্রদেরও বিড়ি টানার জন্য উৎসাহিত করত। তাঁদের বিড়ি টানা কথাটা যাতে আমরা স্যারদের বলে না দিই, তার জন্যই হয়তো তাঁরা সতর্কতাবশতঃ এই পন্থা অবলম্বন করত।
শিক্ষকদের আমরা ভগবানের মতো শ্রদ্ধা করতাম। শিক্ষকদের চেয়ে জ্ঞানী এবং শ্রদ্ধার ব্যক্তি অন্য কেউ থাকতে পারে বলে আমরা কল্পনাই করতে পারতাম না। ওপড় শ্রেণীর ছাত্রদেরও আমরা ভয় এবং শ্রদ্ধা করতাম। পারাপক্ষে আমরা ওপড় শ্রেণীর ক্লাস রুমে ঢুকতাম না। বিশেষ দর্কার না হলে আমরা শিক্ষকদের কমনরোমেও যেতাম না। লংপেণ্ট পরিধান করাতো দূরের কথা লংপেণ্টের নামই তখন শুনি নি আমরা। পায়জামা এবং তল পকেট ছাড়া চাইনীজ সার্ট পরিধান করে আমরা স্কুলে যেতাম। হাইস্কুলের কেউ কেউ ঢোলা পায়জামা পড়ত। সেই পায়জামাগুলো মেয়েরা পরিধান করা ঘাগরার মত দেখাত। পাঞ্জাব আলী নামক একজন ছাত্র ছিল। তার পায়জামাই সম্ভবতঃ সব চেয়ে বেশি ঢোলা ছিল।
শীত-বর্ষা সব ঋতুতে আমরা খালি পায়ে স্কুলে যেতাম। চপ্পল পায়ে দিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা তখন আমরা কল্পনাই করতে পারতাম না। অবশ্যে তখন গ্রাম্যাঞ্চলে চপ্পলের প্রচলন হচ্ছিলও না। খরমের ব্যবহার ছিল গ্রামাঞ্চলে। আমরাও খরম ব্যবহার করতাম বাড়িতে। তখন এখনকার মত সোয়েটার অথবা জেকেটের প্রচলনও ছিল না। শীতের দিনে আমরা শরীরে চাদর পেঁচিয়ে খালি পায়ে স্কুলে যেতাম। কখনও কখনও আবার শুধু সার্ট পরিধান করে শীতে কাঁপতে কাঁপতে স্কুলে যেতাম। বেশি শীত পড়লে দাঁতে দাঁত লেগে যেত।
আনন্দ স্ফূৰ্তির সাথেই স্কুলে যাতায়াত করছিলাম মণিন্দ্রদের সাথে। কিন্তু এর মাঝে ওরা দরঙের কালিখোলা চলে গেল সপরিয়ালে। এদিকে উত্তর দিকে মাথাউরি নির্মাণ হওয়াতে নবদ্বীপ মণ্ডলরাও সেই মথাউরি দিয়ে যাতায়াত করতে লাগল। আবার আমি একা হয়ে পড়লাম। ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠার পরে মতিলাল বসাকের ছেলে গোপাল বসাক চতুর্থ শ্রেণীতে নাম ভর্তি করল। গোপালকে পেয়ে আমি খুবই খুশি হলাম। তার সাথে কিছুদিন যাতায়াত করলাম। কিন্তু কিছুদিন এক সাথে যাতায়াতের পর সেও পড়া ছেড়ে দিল। তাই আবার আমি একা হয়ে গেলাম।
শীতের দিনে সকালবেলা বেশি কুয়াশা পড়লে রাস্তা-ঘাটে তেমন লোকজন থাকত না। তখন একা একা স্কুলে যেতে ভয় করত। নদীর পাড় দিয়ে যাতায়াত করতাম। নদী থেকে যেন কুয়াশা ভলকে উঠে আসত।একদিন তো রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন স্কুলে যাইতেছি, হঠাৎ গাঢ় অ্ন্ধকার হয়ে কুয়াশা পড়তে লাগল। ধীরে ধীরে কেমন যেন চারদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। আমার থেকে তিন চার হাত সন্মুখের রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। দিনের বেলাতেই যেন রাতের অন্ধকার। আমি বুঝতে পারছিনা কেন এমন হচ্ছে। সেদিন সকাল বেলা ঝরঝরে রোদ ছিল। তাই খালি গায় যাচ্ছিলাম। শীতে কাঁপতে লাগলাম। যাই হোক, শীতে কাঁপতে কাঁপতে স্কুলে গিয়ে দেখি ছাত্র তেমন আসে নি। দু-চারজন যারা এসেছে, তারা আগুন জ্বেলে আগুন পোহাচ্ছে। তখন জানতে পারলাম, সূর্য গ্রহণ লেগেছে। সেদিন দশটার পরে সেই গ্রহণ ছুটেছিল। ফলে স্কুলের ক্লাস শুরু হতে দেরি হয়েছিল।
১৯৬৬ সাল।আমি তখন ষষ্ঠ শ্ৰেণীর ছাত্ৰ। একদিন আমি স্কুল থেকে বাড়ী আসার সময় প্রচণ্ড ঘূর্ণিবায়ু (বাঁওকুড়ানির)র কবলে পড়েছিলাম। নদী ভেঙে মাণিকপুরের আক্কাস গাঁওবুড়াদের বাড়ি অবধি বেঁকে আসার পরে চড়া ফেলে নদী দক্ষিণ দিকে চলে গিয়েছিল। তাই নদীর পাড় বরাবর একটা সুঁতির মতো সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সুঁতিতে বৎসরের প্রায় বার মাসই জল থাকত। তবে হ্যাঁ, আলীগাঁয়ের দিকে খরা মরশুমে জল প্রায় শুকিয়ে যেত। মানে অল্প একটু আধটু জল থাকত। হেঁটে এপার ওপার হওয়া যেত। মাণিকপুরের দিকে জল শুকাত না। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি আসার সময় দেখি কে একজন আক্কাস গাওঁবুড়াদের বাড়ির সামনে দিয়ে সেই সুঁতি হেঁটে পার হচ্ছে। দেখতে অনেক জল বলে ধারণা হলেও আসলে জলও খুব বেশি নয়। পশ্চিম দিকে সুঁতির মুখ আগেই শুকিয়ে গিয়েছিল। কথাটা আমার জানা আছে। চড়ের মাঝ বরাবর হেঁটে আসলে রাস্তা অনেক কম হবে। তাই আমি চড় বরাবর হেঁটে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে লোকটির পেছনে পেছনে হেঁটে সুঁতি পার হলাম। সেদিন থেকে চড়ের মাঝ দিয়ে যাওয়া-আসা করতে লাগলাম। দুই তিন দিন চড়ের মাঝ দিয়ে যাতায়াত করার পর একদিন স্কুল থেকে আসার সময় চড়ের মাঝ বরাবর আসার পর বাঁওকুড়ানিতে ধরল। আকাশ ছোঁয়া বাঁওকুড়ানি।তৃণকুটার মতো চড়ে আমি একা। বালু ঝটিকার তাণ্ডবে আমার চোখ অন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। তাই সেদিন আমি খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। শীঘ্র যাবি তো ঘূরে যা। এই নীতি অনুসরণ করেই পরে আমি ঘুরা পথেই নদীর পাড়ে পাড়েই যাতায়াত করতাম।
বজ্র বৃষ্টি হলেও স্কুলে যেতে ভয় পেতাম। ঘন ঘন বজ্র পড়লে সেদিন আমার স্কুলে যাওয়াই হতো না। কারণ বজ্রের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার মনে ভয় সঞ্চারিত হয়েছিল। অবশ্যে সঙ্গী থাকলে বিশেষ তেমন ভয় করতাম না। কথাটা তাহলে খোলেই বলি। তখনও মামাদের বাড়ি নদীর ভাঙনের কবলে পড়েনি। মামাদের দোতালা ঘর ছিল। একদিন রহমান, সামর্ত এবং আমি দোতালার খিড়কির পাশে বসে কিছু একটা খেলছিলাম। সেদিন আকাশে কালো কালো মেঘ জমেছিল। বিজুলি চমকাচ্ছিল। কিন্তু তখনও বৃষ্টি পড়ছিল না। হঠাৎ বজ্র নিনাদ হলো। আমরা খিড়কির পাশেই বসেছিলাম। আগুনের গোলা যেন আমাদের শরীরে খেলা করতে লাগল। যার দিকে তাকাই তার শরীরেই আগুন ঢেউ খেলছে। মামাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে বাড়ি সংলগ্ন একটি পুকুর ছিল। সেই পুকুরের দক্ষিণ পাশে একটি গরু গুছড় দেয়া(বাঁধা) ছিল। সে দিকে তাকাতেই দেখলাম, গরুটা লাফিয়ে ওপড়ের দিকে উঠে সাথে সাথে চিত হয়ে ধপাস করে জমিতে পড়ে গেল। তখন ছিটা ছিটা বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেছে। তাই তখন কেউ গরুটা দেখতে এল না। একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল। তখন লোকজন গরুটা দেখতে এলো। আমরাও গেলাম তাদের সাথে। গিয়ে দেখি আস্ত গরুটা মরে পড়ে আছে। সবাই বলাবলি করল, গরুটা বজ্র পড়ে মরেছে। সেদিন থেকে বজ্রের প্রতি আমার মনে এমনই ভয় ঢুকেছিল যে, বিজুলি চমকালেই আমি আড়ষ্ট হয়ে পড়তাম।
বজ্ৰ পতন হলে আমি কেমন ভয় পেতাম, সে সম্পর্কে একদিনের একটি ঘটনা বলি। নানাদের বাড়ি থেকে পোয়া মাইল দূরে একটি খাল ছিল।বজ্র পতনের তিন চার দিন পরে আমি একা সেই খালের পাড়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বিজুলি চমকাল। আমি ভয়ে দিলাম দৌড়। আমি মনে করলাম, বজ্র বুঝি আমার মাথার ওপড়েই পড়েছে। কারণ আমার মাথাটা ভারি ভারি লাগছিল। বাড়িতে আসার পর আমি মাথায় হাত দিয়ে দেখি, আমার মাথায় লুঙি বাঁধা। লুঙির ভারকেই সেদিন ভয়ে আমি বজ্র পতন হয়েছে বলে ধরে নিয়েছিলাম। বজ্রের প্রতি সেই ভয় এখনও আমার মনে বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে।বিজুলি চমকালে এখনও আমি একা একা বাইরে যেতে ভয় পাই।
বৎসর শেষে ষষ্ঠ শ্রেণীর বাৎসরিক পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি এলাম। একদিন বাবাকে বললাম- বাবা, আমি আর পড়ব না।
বাবা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন- পড়বি না মানে? কি হয়েছে?
আমি বললাম- বর্ষার মরশুমে স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। একা একা স্কুলে যেতে ভালো লাগে না। তাই যাব না।
পরের দিন বাবা আলীগাঁও এল আমাকে নিয়ে।
সিরাজ মামা তখন পোষ্ট মাষ্টার। তাই বাড়িতেই থাকতেন। আমরা মামাকে বাড়িতেই পেলাম।
বাবা বললেন- ও তো গড়লা স্কুলে পড়তে চাইছে না। যাতায়াতের অসুবিধা। একা একা যেতে হয়। তেমন ভাল লজিঙও পাওয়া যায় না।
মামা বললেন- হাইস্কুলটাও নতুন। ওকে হাউলি হাইস্কুলে ভর্তি করে দেব। কাদণ্ডের আব্দুলের মারোয়ারিদের সাথে সম্পর্ক ভালো। মারোয়ারির বাসায় রেখে পড়াব।
বাবা বললেন- ‘তুমি যা ভালো বুঝ, সেটাই কর। আমি আর কি বলব!’ আমি পাশেই ছিলাম। মামাকে এইভাবে বলে বাবা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- কি, হাউলি ভর্তি করে দিলে পড়তে পারবি তো?
হাউলির কথা শুনে আমি খুশিই হয়েছিলাম। তাই বললাম- পারব।
শেষে হাউলি হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরে এলাম।
কয়েদকদিন পরেই রেজাল্ট বেরোল। ভালোভাবেই পাস করলাম। আমার মনে আছে, সেবার আঠশ নম্বরের মধ্যে আমি ছয়শ পনের নম্বর পেয়েছিলাম। বুরঞ্জীতে পেয়েছিলাম ঊনেনব্বৈ।
একদিন বাবার সাথে গিয়ে স্কুল থেকে ট্রেন্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে এলাম। বাবা সেদিন হেড মাষ্টার আব্বাস আলী স্যারকে লুঙি এবং অন্যান্য স্যারদের একটি করে গেঞ্জি দিয়েছিলেন।
সহপাঠীদের সহায়-সহযোগিতা এবং স্যারদের স্নেহ-ভালোবাসার মাঝে আমি গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় তিনটি বৎসর কাটিয়ে ছিলাম। শুধু যাতায়াতের অসুবিধার জন্য ষষ্ঠ শ্রেণীর শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি বদলি হয়ে কাদং হাইস্কুলে নাম ভর্তি করেছিলাম। (অৱশ্যে হাউলি হাইস্কুলেই ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। সেখানে কেন ভর্তি হলাম না সে কথা পরে বলব।) হালিম বদলি হয়ে জনীয়া হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল। দু’টি স্কুল পাশা-পাশি থাকার জন্য হালিমের সাথে আমার আগের সেই বন্দুত্ব অটুট ছিল। নানান ঘাত-সংঘাতের মধ্য দিয়ে এসে এসে অনেক বন্ধু-বান্ধব এবং হিতাকাংক্ষী পেয়েছি; কিন্তু পাঁচ ছয় দশক আগের সেই বন্ধু-বান্ধব এবং স্যারদের কথা কখনও ভুলতে পারিনি। এখনও মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে আছে সেই সমস্ত স্মৃতি।
হাউলি হাইস্কুলে নাম ভর্তি
সিরাজুল হক মামার পরামর্শ মতে হাউলি হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো। তাই একদিন ছোট মামা, মানে ফয়জল হক মামার সাথে হাউলি রওনা হলাম। সেদিন ছিল বুধবার। হাউলির হাটের দিন। আসার কথা ছিল সিরাজ মামা। কিন্তু ফয়জল মামা বললেন- আমিই নিয়ে যাই ওকে। আব্দুলের সাথে আগেই আমি যোগাযোগ করেছি। মারোয়ারির বাসায় থেকে পড়তে পারবে। নাম ভর্তির সাথে সাথে ওর থাকার ব্যবস্থাও করে আসব।
আব্দুল মানে আব্দুল বেপারি। বাড়ি রূপাকুছি। কালু বেপারির ছেলে। বড় মাপের বেপারি। পাটের ব্যবসা করে। সেই সুবাদেই মারোয়ারির সাথে খাতির।
আমি ফয়জল মামার সাথে হেঁটে মন্দিয়া আসলাম। আলীগাঁও থেকে মন্দিয়া তখন ছয় সাত মাইল রাস্তা হেঁটেই আসতে হতো। গাড়ি-মটরতো দূরের কথা তখন সাইকেলই তেমন ছিল না। মন্দিয়া থেকে বরপেটা অবধি মটর চলত। তবুও নিয়মিত চলত না। কোনো দিন চললে, কোনোদিন আবার চলত না। তাই অনেকে মটরের আশায় বসে না থেকে হেঁটেই বরপেটা যাতাযাত করতো। আমি বাবাকে দিনে হেঁটে বরপেটা এসে সূতা নিয়ে আবার দিনেই বাড়ি ফিরে যেতে দেখেছি।
মন্দিয়া এসে দেখি একটি মটর(বাস) যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। মামার সাথে প্রবল উৎসাহ নিয়ে মটরে উঠে বসলাম। এর আগে আমি মাত্র একদিন মটরে উঠেছি। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় বাবার সাথে ছাপারবড়ি অঞ্চলের ফেঙুয়া গিয়েছিলাম সাধু মামাদের বাড়ি। তাই যাওয়ার দিন এবং সেখান থেকে আসার দিন মটরে উঠেছিলাম। সাধু মামাদের সাথে আমাদের রক্তের সম্পর্ক ছিল না যদিও আমাদের সাথে খুবই আন্তরিকতা ছিলো সাধু মামাদের। এক সময় সাধু মামাদের বাড়ি আমাদের জাহানারপারেই ছিল। আমাদের পাশাপাশি বাড়ি। বাবার সাথে সাধু মামার খুবই আন্তরিকতা ছিল। তাই আমরা তাঁকে মামা বলে ডাকতাম। সাধু মামারা ১৯৬০ সালে সেই জমি বিক্রী করে ফেঙুয়ায় চলে গিয়েছিলো। তাঁদের জমি ও ভিটা বাবাই রেখে দিয়েছিল।সেই জমি বিক্রীর ঘরামি দলিল এখনও আছে আমাদের বাড়ীতে।
আরও একদিন মটর দেখেছিলাম ঠিকই, কিন্তু মটরে উঠার সৌভাগ্য হয়নি। কথাটা একটু বুঝিয়ে বলি। আমি ছোট বেলা ঘুমের মাঝে স্বপন দেখে দরজা খোলে ঘুমের ঘোরেই ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতাম। সেজন্য নাড়ার ভিটার সুফি সাধক(পীর সাহেব) আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় আমার চিকিৎসা করেছিলেন। তিনি আধা গজের মত কাপড় আমার গলায় বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই কাপড় আমি ছমাস নাগাদ গলায় বেঁধে রেখেছিলাম। রোগ থেকে মুক্তি পেলে আমাকে নিয়ে গিয়ে হাজোর মসজিদে বাতাসা দেওয়ার কথা ছিল। আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠার পর একদিন বাবা এসে বললেন- এবার মাঘী পূর্ণিমায় তোকে নিয়ে হাজো যাব।
কথাটা শুনে আমি খুবই খুশি হলাম। কিন্তু দৌল পূর্ণিমার আবিরের অজুহাত দেখিযে বাবা সে যাত্রা আমাকে হাজো নিয়ে যায়নি। সেজন্য আমি মন বেজার করাতে সিরাজ মামা আমাকে বলেছিলেন- মন খারাপ করো না। এবার স্বাধীনতা দিবসে তোমাকে বরপেটা নিয়ে যাব। স্বাধীনতার দিন বরপেটা নৌকা বাইচ হয়। তখন নৌকা বাইচ দেখতে পারবে।
শুধু বরপেটাতেই নয়। তখন দেশের সর্বত্র মহাসমারোহে স্বাধীনতা দিবস পালিত হতো। তখন সবে মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেজন্যে স্বাধীনতা দিবসে সবাই আমোদ-স্ফূর্তি করত। আমরা ছাত্ররা স্বাধীনতা দিবসে সকাল নয়টা বাজায় হাতে হাতে প্লেকার্ড নিয়ে- ভারত মাতা কী-জয়। মহাত্মা গান্ধী কি- জয়। জওহরলাল নেহরু কি- জিন্দাবাদ। ইনক্লাব- জিন্দাবাদ, ঘরে ঘরে- যঁতর ঘুরে প্রভৃতি শ্লোগান দিয়ে শোভাযাত্ৰা করে আলীরপাম বাজারে গিয়ে সমবেত হতাম। সেখানে প্রতিযোগিতামূলক নানান খেলা-ধুলা হতো। ছেলেদের দৌড়, হাই জাম্প, লং জাম্প, মেয়েদের ম্যাজিক চেয়ার, চামুচে মাৰ্বল নিয়ে দৌড় প্রভৃতি খেলা।
সেজন্য বরপেটা নিয়ে যাওয়ার কথা বলাতে আমি আশ্বস্ত হয়ে হাজোর কথা ভুলে বরপেটা যাওয়ার আনন্দে মেতে উঠেছিলাম। পাঠ্যপুস্তক রাখার জন্য আমার ট্রাঙ্ক ছিল না। তাই বরপেটা গেলে ট্রাঙ্ক কিনব বলে কিছু কিছু টাকা জমাতে লাগলাম। স্বাধীনতা দিবসের দুদিন আগে কাপড় ধুয়ে ইস্ত্রির জন্য বালিশের তলায় রেখে দিলাম। স্বাধীনতার আগের দিন মামাকে জিজ্ঞাসা করলাম- কাল কখন যাবে?
সিরাজ মামা বললেন- কোথায়?
বরপেটা। আমি বললাম- সেই যে বলেছিলে, স্বাধীনতার দিন বরপেটা নিয়ে যাবে?
অ’ সেই কথা? সিরাজ মামা বললেন- সেই কথা মনে রেখেছ এখনও? এবার যাওয়া সম্ভব হবে না। আমার জরুরি কাজ আছে। সামনের বৎসর যাব। এবার তোমাদের স্কুলে খেলা-ধুলা হবে। স্কুলে খেলা-ধুলা করবে না?
আমি কিছুই বললাম না। মামা যে আমাকে বরপেটা নিয়ে যাবে না, মামার কথায় সে কথা স্পষ্ট হয়ে গেল। তাই মনে মনে সেখান থেকে চলে এলাম এবং আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, যে ভাবেই হোক, আমি একাই বরপেটা যাব।
স্বাধীনতার দিন কাউকে না বলে আমি একাই হেঁটে বরপেটা রওনা হলাম। এসে এসে মন্দিয়া পেলাম। আশা ছিল বাসে উঠব। কিন্তু বাস নেই। একজন বলল, গয়নার নৌকায় যেতে পারব। কোথায় নৌকা পাওয়া যাবে তাও বলে দিল। তার কথা মত এসে দেখি অনেকগুলো নৌকা দাঁড়িয়ে আছে ভেলেঙী নদীতে। সেখান থেকে নৌকায় চড়ে বরপেটা এলাম। বরপেটা এসে আমার ঈস্পিত ট্রাঙ্কটা কিনলাম। তারপর নৌকা বাইচ দেখতে গেলাম। থানার সামনে চাউলখোয়া নদীতে নৌকা বাইচ হচ্ছে। আমরা টিনের নৌকা বাইচ দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু যেগুলো নৌকার বাইচ হচ্ছে সবগুলি নৌকা কাঠ দিযে নিৰ্মিত। তবে খুবই লম্বা লম্বা। নদীর পাড়ে লোকে লোকারণ্য।ভিড় ঠেলে এগোতে হয়। কিন্তু তখন আমার নৌকা বাইচ দেখার মন মানসিকতা কিছুই ছিল না। কেমনে বাড়ি ফিরে যাব সেই চিন্তায় আমাকে অস্থির করে তুলল। রাস্তা-ঘাট তেমন চিনি না। রাস্তাঘাট ভোলে যেতে পারি এই দুর্বলতায়ও আমার মনে ক্রিয়া করছিলো। তাই নৌকা বাইচ না দেখেই, যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলাম, সেই রাস্তা ধরে যে জায়গায় গয়নার নৌকা থেকে নামিয়ে দিয়েছিল সেখানে এলাম। সেখান থেকে একটি নৌকায় চড়ে আবার মন্দিয়া এলাম। তখন বেলা বেশি নেই। জোরে জোরে হেঁটে গেলেও বাড়ি যেতে রাত হয়ে যাবে। কি করব, কি করব ভাবছি। এমন সময় হঠাৎ হোসেন মামা আমাকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন- আরে, তুমি? তুমি কোথা থেকে এলে?
হোসেন মামা মামাদের খালাত ভাই। আগমন্দিয়া বাড়ি। কাপড়ের বেপারি রহিমুদ্দিন মামার ছোট ভাই। যার ঘোঁড়া আনতে গিয়ে আমার পিঠের চামড়া ছড়ে গিয়েছিল।
আমি বললাম- কেউ আসে নি। আমি একাই এসেছি। বরপেটা গিয়েছিলাম।
হোসেন মামা যেন আকাশ থেকে পড়লেন- একা এসেছ? মানে ? বাড়িতে বলে এসেছ?
আমি বললাম- না। বলে আসি নি।
বলে আসনি মানে!এখন কি করবে? চল, আমাদের বাড়ি। কাল সকালে আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।
হোসেন মামার সাথে তাঁদের বাড়ি এলাম। সেখানে রাত কাটানোর পর পরের দিন হোসেন মামা আমাকে নিয়ে আলীগাঁও এলেন। বলা বাহুল্য, সেদিন সবার গালাগাল শুনতে হয়েছিল।
যা হোক, বাস ছাড়ল। বরপেটা এসে বাস থেকে নেমে হাউলির বাস ধরে হাউলি এলাম। হাউলি এসে আব্দুল বেপারির সাথে সাক্ষাৎ হলো। আব্দুল বেপারি আমাদের মারোয়ারির গদিতে নিয়ে গেল। সেখানে মারোয়ারির সাথে কথা হল। কিন্তু একটি কথা শুনে আমার মন খারাব হয়ে গেল। মারোয়ারি পাটের গোদামে থাকার কথা বললেন। পাটের গোদামে থাকার কথা শুনে আমি হাউলি পড়ব না বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। কিন্তু কথাটা আমি তখন প্রকাশ করলাম না।
সেদিন রাতে হাউলিতেই থেকে গেলাম এবং রাতে হাউলির কালী মন্দিরের সন্মুখে কলকাতার যাত্রা দেখলাম।(কালী মন্দিরটা এখনও আছে, তবে মনে হয় এখন যাত্রাভিনয় হয় না। অবশ্যে আমি সেখান দিয়ে গেলে তেরচা চোখে হলেও জায়গাটা লক্ষ্য করে যাই।)নাটকের নাম ‘নাচ মহল’। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর ঘটনা নিয়ে লিখা। আগে যাত্রাগান অনেক দেখেছি। কলকাতার যাত্রা প্রথম দেখলাম। যাত্রা দেখে খুবই ভাল লাগল। সিরাজ মামার পরিবর্তে ফয়জল মামা আমাকে হাউলি নিয়ে আসার রহস্যেরও সন্ধান পেলাম। আসলে ফয়জল মামা যাত্ৰা পাগল ছিলেন। যাত্ৰার কথা শুনলে দড়ি ছিঁড়ে নদী সাঁতরে যাত্রা দেখতে যেতেন।তিনি ভালো অভিনেতাও ছিলেন। নাটক, গীতিনাট্যে অভিনয় করতেন। যাই হোক, যাত্রা দেখে মারোয়ারির গোদামে গিয়ে ঘুমালাম। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হল। ঘুম থেকে উঠে দেখি তখন প্রায় ন’টা বেজে গেছে।
হাতমুখ ধুয়ে একটি চায়ের দোকানে এসে আমরা পরটা দিয়ে চা খেলাম। যে কোনো কারণে আব্দুল বেপারি আমাদের সাথে স্কুলে এলেন না। তিনি মারোয়ারির সাথে দেখা করতে চলে গেলেন।দশটায় মামা একাই আমাকে নিয়ে হাউলি হাইস্কুলে এসে আমার নাম ভর্তি করে দিলেন। নাম ভৰ্তি করতে বেগ পেতে হয়নি। কারণ আমি মার্কশিট সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। মার্কশিট দেখে হেড স্যার সানন্দেই আমার নাম ভর্তি করে নিয়েছিলেন।
পরে হাউলি থেকে আব্দুল বেপারির সাথে বরপেটা হয়ে কাদং এলাম।
কাদং আসার পর আমি মামাকে বললাম- মামা, আমি হাউলিতে পড়ব না। কাদং হাইস্কুলেই ভর্তি করে দাও।
মামা বললেন- হাউলিতে পড়বে না মানে? সেখানে ভর্তি করে দিয়ে এলাম যে!
আমি বললাম- সেখানে গোদামে থাকতে হবে। আমি গোদামে থাকতে পারব না। আমাকে কাদং হাইস্কুলেই ভর্তি করে দাও।
ঠিক আছে। আগে বাড়ি চল। মামা বললেন- পরে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেব।
আব্দুল বেপারির নিকট থেকে বিদায় নিয়ে মামা আমাকে নিয়ে রূপাকুছির বাকর মামাদের বাড়ীর দিকে রাওয়ানা হলো।
কাদং হাইস্কুলে নামভর্তি ও কাদঙের পুষুরার মেলা

কাদং হাইস্কুল
মামার সাথে বাকর মামাদের বাড়ি এলাম। বাকর মামার প্রকৃত নাম আবু বাক্কার ছিদ্দিক। ডাক নাম বাকর। মামাদের জেঠাত ভাই। রূপা মাতব্বরের বড় ছেলে।
রাতে আমার নাম ভর্তি সম্পর্কে বাকর মামার সাথে আলোচনা হল। বাকর মামা বললেন- কাদং স্কুলেই ভর্তি করে দে। আমরাও খোঁজ-খবর রাখতে পারব।
পরের দিন সকাল বেলা খাওয়া-দাওয়া করে মামার সাথে কাদং হাইস্কুলে এলাম। বাকর মামাও এল আমাদের সাথে। সপ্তম শ্রেণীতে ১৯৬৭ সালের জানুয়ারী মাসের প্ৰথম সপ্তাহে নাম ভর্তি করলাম। স্কুলের তদানীন্তন কেরাণি তাইজুদ্দিন স্যার সাদরেই নাম ভর্তি করে নিলেন। কারণ তাইজুদ্দিন স্যারের সাথে ফয়জল মামার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। ফয়জল মামাও এক সময় কাদং হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন এবং হাইস্কুলের প্রথম ‘ব্যাটচে’র মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। অবশ্যে তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেন নি। সেই ‘ব্যাটচে’র অন্য দু’জন পরীক্ষার্থী ছিলেন হাফিজুর রহমান(কাদং) ও সাদেক আলী(টাপাজুলি)। হাফিজুর রহমান উত্তীৰ্ণ হয়েছিলেন যদিও সাদেক আলী উত্তীৰ্ণ হতে পারেন নি।
তাইজুদ্দিন স্যার কেরাণি হলেও আমরা ছাত্ররা তাঁকে স্যার বলেই সম্বোধন করতাম। তাইজুদ্দিন স্যার পাঠ্যপুস্তকের একটি তালিকা দিলেন। সেই তালিকা নিয়ে আবার বাকর মামাদের বাড়ি এলাম। রাতে মটর শাক এবং জিওল মাছ দিয়ে রন্ধন করা তরকারি খেয়ে খুবই তৃপ্তি পেলাম। সে স্বাদ যেন এখনও মুখে লেগে আছে। মামীর রান্নায় খুব নামডাক ছিল। রূপাকুছি মামাদের আত্মীয় ছিল। ফয়জল হক মামা আমাকে সেই সব আত্মীয়দের বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাঁদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সবাই খুব আদর-আপ্যায়ন করল। আমরা তিন দিন রূপাকুছি ছিলাম। তিন দিন পর বাড়ি ফিরে এলাম।
পাঠ্যপুস্তক সংগ্রহ করে পুষ মাসের পুষূরার দিন কাদং এলাম আমাদের জেঠাত ভাই আব্দুল বারেকের সাথে। আব্দুল বারেক তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। হাসমত আলী(এম, কম)এর সহপাঠী। পুযূরার দিন আসার দুটি কারণ ছিল। একটি ছিল কাদঙের মেলার আকর্ষণ এবং অপরটি ছিল পুষুরার পরেই স্কুলের ক্লাস শুরু হবে। তখন কাদঙের মেলার খুব নাম-ডাক ছিল। দূর-দূরান্তর থেকেও অনেক লোক আসত কাদঙের মেলা দেখতে। মেলার দিন হয়তো কাদং, রূপাকুছি, কান্দাপারা, টাপাজুলি প্রভৃতি গ্রামের এমন কোন বাড়ি থাকত না, যে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের সমাগম হতো না। প্রত্যেক বাড়িতে পিঠা বানাত। বিশেষ করে ভাপা পিঠা। তিন চার দিন কাদঙের সর্বত্র উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করত।

মেলায় ষাঁড় লড়াই, লাঠিবাড়ি, হা-ডু-ডু এবং ঘোঁড়া দৌড় প্রতিযোগিতা হতো। মেলা ছাড়াও কাদঙে প্রতিযোগিতামূলক হাডুডু খেলা অনুষ্ঠিত হতো। একদিনের খেলার কথা আমার মনে আছে। সালটা সম্ভবত ১৯৬৯ ছিল। সেদিন কাদঙের হা-ডু-ডু দল এবং হাউলির মহিষ বাথানের হা-ডু-ডু দলের মাঝে খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মহিষ বাথানের কদ্দুস খুবই নামডাকের প্লেয়ার। খুবই হৃষ্টপুষ্ট এবং পালোয়ানের মতো। কেউ তাঁকে ধরে রাখতে পারে না। কাদঙের হয়ে সেদিন খেলেছিল ফজল হক, ইন্তাজ আলী, সরবত আলী, রিয়াজুদ্দিন প্রভৃতিরা। রিয়াজুদ্দিন ধরায় এবং বাকীরা দমে(ডাকে) ওস্তাদ ছিল। সরবত আলী আমাদের সহপাঠী ছিল। সরবত আলী হাডুডু খেলার খুব ভালো প্লেযার ছিল। সে দম (ডাক) দিলে প্রায়ই বিপক্ষের প্লেয়ার ছুঁয়ে আসত। বিপক্ষের প্লেয়ার তাঁকে ধরার সাথে সাথে সে জাম্প করে নিজের কোর্টে এসে পড়ত। কিন্তু কদ্দুসের জন্য কাদঙের দল হারার উপক্রম হল। তখন সরবত এক অভিনব পদ্ধতিতে কদ্দুসকে কাবু করে ফেলল। কদ্দুস দুই ঠেং ফাঁক করে দাঁড়িয়ে দম দিত। দুই তিন জনে ধরলেও সে কাঁতরাতে কাঁতরাতে ধীরে ধীরে পিছিয়ে নিজের কোর্টে এসে পৌঁছোত। আগেই বলেছি, সরবত আলী জাম্প করায় ওস্তাদ ছিল। একবার কদ্দুস ডাক দিতে এসেছে। সরবত আলী হঠাৎ জাম্প করে এসে কদ্দুসের দুই ঠেঙের মাজ বরাবর ঢোকে গিয়ে দুই ঠেং চেপে ধরল। সরবত আলী প্রায় একাই রেখে দিল কদ্দুসকে। কদ্দুসের গোমর ফাঁক হয়ে গেল। সেদিন কদ্দুস যে কয়বারই দম দিয়েছিল, সেই কয়বারই সরবত তাকে ধরে রেখেছিল। পরে কদ্দুস আর ডাক দিতেই এল না। সেদিন কাদঙের দল জয়ী হয়েছিল। প্রেমজনিত কারণে সরবত আলী ম্যাট্রিক পাস করার পর আত্মহত্যা করেছিল।
কাদঙের মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল ইমাম যাত্রা গান। ইমাম যাত্রার জায়গায় তখন অনেকে বলতো ইমান যাত্রা। এখন এই যাত্রা পালার নাম হয়েছে শ্বহিদ কারবালা। তখন ইমাম যাত্রা গান শুনাটা অনেকে পুণ্যের কাজ মনে করত। সেজন্য যুবক থেকে বৃদ্ধ সবাই যাত্রা শুনার জন্য ভিড় করত। মাঝখানে ষ্টেজ থাকত এবং চার দিকে গোল হয়ে কয়েক হাজার দর্শক বসত। তখন ষ্টেজে এখনকার মতো মাইকের ব্যবহার ছিল না। অভিনেতারা জোরে জোরে বচন গাইত। হ্যাজাক লাইট ব্যবহার করত আলোর জন্য। দর্শকরা খুবই নম্রভাবে ভক্তি সহকারে বসে সেই অভিনয় উপভোগ করত।
তখন ইমাম যাত্রার মুখ্য অভিনেতা ছিলেন- মোন্তাজ আলী মাষ্টার (ইয়াজিদ), শুকুর আলী ওরফে শুকরা সোলজার (হাসান), বান্দু পীরসাহাব(হোসেন), নেদু মিঞা(কাশেম), হাবেজুদ্দিন(সীমার)।স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করতেন দিলবর আলী। দিলবরের ডাক নাম ছিল ডিঙর। প্রমোটার মাষ্টার ছিলেন আজগর আলী মাস্টার। তিনি প্রকৃততে শিক্ষক ছিলেন না যদিও একমাত্র যাত্রাদলে প্রমোট করার জন্যই তিনি মাষ্টার হিসাবে পরিচিত ছিলেন। মাঝে মাঝে রূপাকুছির আসান আলীও প্রমোট করতেন। আসান আলী আমাদের খালাত বোনের জামাই। জীবনে অনেক নামী-দামী অভিনেতার অভিনয় দেখেছি, কিন্তু নেদু মিঞার মতো এতো মধুর কণ্ঠস্বর কারও শুনিনি। নেদু মিঞার কণ্ঠস্বর এমনই মধুর ছিল যে, সে কণ্ঠস্বর কখনও ভুলতে পারিনি।
নেদু মিঞাকে নিয়ে একদিনের একটি ঘটনা বলি। তখন রূপাকুছির একটি গীতি নাট্য দল ছিল। তারা অভয়-দুলাল পালা অভিনয় করত। সেই দলে আব্দুল আলী (ধনপতি রাজা), জহিলা (অধর্ম), নবি মিঞা (অভয়), হরিদাস শীল (দুলাল) এবং নেদু মিঞা ধর্মের চরিত্রে অভিনয় করতেন। স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করত- কদম আলী এবং সুরত আলী। আলীগাঁয়ের জইনুদ্দিনের মেয়ে সোণাভানুর বিয়ে হয়েছিল রূপাকুছির রহিমুদ্দিনের ছেলে আব্দুল বারেকের সাথে। সেই বিয়েতে জয়নুদ্দিনের বাড়িতে অভয়-দুলাল যাত্রাপালা অভিনীত হয়েছিল। আমি তখনও স্কুলে ভর্তি হইনি। এমনি মামাদের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম এবং গান শুনতে গিয়েছিলাম। বাকর মামা সেই দলে হারমনিয়াম বাজাতেন। বাকর মামা আমাকে দেখে আদর করে তাঁর পাশে বসিয়েছিল।
আমার খুবই উৎসাহ। এর আগেও আমি বাঘবর বাজারে অভয়-দুলাল যাত্রাপালা উপভোগ করেছিলাম বাকর মামার পাশে বসে। তখনও বাকর মামা হারমনিয়াম বাজাতেন। আমার উৎসাহের কারণ ছিল দু’টো। এক, কেরামত আলির ‘অ’ আমার প্রাণের হোক্কারে’ গানের সাথে কৌতুক অভিনয় এবং নেদু মিঞার মন জুড়ানো প্রাণবন্ত অভিনয়। যাত্রা আরম্ভ হল। সবই ঠিকই আছে। কিন্তু নেদু মিঞা রূপী ধর্মকে দেখছি না। নেদু মিঞার জায়গায় অন্য একজন ধর্মের চরিত্রে অভিনয় করছে। নেদু মিঞাকে না দেখে আমার ভালো লাগছিল না। সেই ধর্ম কেন আসছে না? কিন্তু কাউকে মুখ খোলে কথাটা বলতে পারছি না।অভিনয় চলছে। বলতে গেলে ‘পিনড্রপ সাইলেন্ট’। আমার মতো হয়তো অনেকে মনে মনে নেদু মিঞার অভিনয় দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিল। হঠাৎ হৈ হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। একজন হঠাৎ বলে উঠল- ‘আগের ধর্মকে লাগে। এই ধর্মের অভিনয় আমরা দেখব না।’
তার সাথে সবাই সুর মেলাল- ‘হ্যাঁ, আগের ধর্মকে লাগে।’ সবাই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ধনপতি রূপী আব্দুল ষ্টেজে এসে বললেন- নেদু মিঞার অসুখ। সে আসতে পারে নি। আপনাদের এই ধর্মের অভিনয়ই দেখতে হবে।’
কে শুনে কার কথা! সবাই বলতে লাগল- কি হয়েছে, সেটা আমরা জানি না। আগের ধর্মকে আনেন। তারপর আমরা গান শুনব। আগের ধর্ম না আসা পর্যন্ত আমরা গান শুনব না। গান বন্ধ রাখেন।
এভাবে চলল, চেঁচামেচি, হট্টগোল। অনেকে অনেক রকমে দৰ্শকদের শান্ত করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো, কিন্তু কেউ কারও কথা শুনছে না।
নেদু মিঞার সাথে কোনো কথায় মতানৈক্য হয়ে হয়তো সেদিন তাঁকে দলের সাথে আনেনি। দলের সাথে না আনলেও নেদু মিঞা নিজে থেকেই দলের অগোচরে দলের সাথে এসেছিলেন। শীতের দিন। তিনি মাথায় পাগুড়ি বেঁধে দর্শকের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একজন তাকে চিনে ফেলেছিল। সে বলে উঠল- আপনারা মিথ্যা কথা বলছেন। আগের ধর্ম এসেছে। একটু আগেই আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
আব্দুলের বড় ভাই নায়েব আলী ছিল দলের ম্যানেজার। তিনি ষ্টেজে এসে নেদু মিঞাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-নেদু, তুমি যদি সত্যিই এসে থাক, তাহলে আমার সাথে দেখা কর। দেখতেই তো পাচ্ছ দর্শকের অবস্থা। তুমি আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার কর।
নেদু মিঞা পায়জামা এবং সাদা সার্ট পড়ে গিয়েছিলেন। নায়েব আলী ষ্টেজ থেকে নেমে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি সার্টের ওপড়ে ক্রস বেল্ট লাগিয়ে ষ্টেজে এলেন। সাথে সাথে ষ্টেজে পিনড্রপ সাইলেন্ট বিরাজ করতে লাগল।
এই উদাহরণ থেকে আপনারা নিশ্চয় নেদু মিঞার জনপ্রিয়তার কথাটা অনুমান করতে পারছেন! কিন্তু এই সব প্রতিভা বর্তমান বিস্মৃতির গর্ভে হারাতে বসেছে। নেদু মিঞার মতো আরও অনেক প্রতিভা ছিল আমাদের মাঝে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের যুবকেরা তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।
কাদং অঞ্চলে তখন প্রকৃতার্থেই সাংস্কৃতিক পরিবেশ বিরাজ করত। ইমাম যাত্রা একমাত্র কাদঙের পুষূরার মেলার সময় অভিনীত হতো যদিও রূপাকুছির অভয়-দুলাল দল বিভিন্ন জায়গায় অভিনয় করে সুনাম অর্জন করেছিল।
কাদং হাইস্কুলের বার্ষিক অধিবেশনে প্রত্যেক বৎসর নাটক অভিনীত হত।বিভিন্ন বাংলা নাটক। বেশির ভাগই ঐতাহাসিক নাটক। সেই নাটকে আবুল কাশেম স্যার, ইউসুফ আলী(সেক্রেটারী), কফিল উদ্দিন, বরুণ মিত্র প্রভৃতিরা অনবদ্য অভিনয় করতেন।প্রোমোট মাস্টার থাকতেন সামেজ উদ্দিন স্যার।
পুষূরার দিন বারেক ভাইর সাথে কাদং এসে সেদিন বারেক ভাইর লজিং বাড়িতে উঠেছিলাম। বারেক ভাই লজিং ছিল রূপাকুছির সৈয়দ আলীর বাড়িতে। (সৈয়দ আলীর একমাত্র ছেলে সবুর উদ্দিনের সাথে পরবর্তিতে বারেক ভাইর উদ্যোগেই আমি দোস্ত পেতেছিলাম। এখন খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ নেই যদিও কয়েকদিন আগে পর্যন্ত সম্বন্ধটা অটুট ছিলো। তবে তিনি চলিত বছরের অর্থাৎ ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট শনিবারে স্ট্রোক করে এন্তেকাল করেছেন।)
তখন দূরের ছাত্রদের জন্য লজিঙের ব্যবস্থা ছিল। কাদং অঞ্চলের অনেকে তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে দূরের ছাত্রদের লজিং রাখতেন। পূব দেউলদি, পশ্চিম দেউলদি, মরাভাজ, আলীগাঁও, বাঘমারা চর, হেলচা প্রভৃতি অঞ্চলের অনেক ছাত্র তখন লজিং থেকে কাদং হাইস্কুলে লেখা-পড়া করত। এই লজিং ব্যবস্থায়ই তখনকার বংগীয়মূলের মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলের ছাত্রদের শিক্ষা গ্রহণের রাস্তা প্রশস্ত করেছিল। এই লজিং ব্যবস্থা না থাকলে হয়তো মুসলমানরা এখনও শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে থাকত। কাদং অঞ্চলের সেই মানুষগুলোর ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা মনে হলে সেই অখ্যাত-বিখ্যাত লোকদের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথাটা নত হয়ে যায়। তাঁদের কাছে আমরা সত্যিই ঋণী। যে ঋণ হয়তো কোনোদিন পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। পিতৃ-ভ্রাতৃসম যারা ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব অতি নিষ্ঠা সহকারে গ্রহণ করেছিলেন এবং যে সকল মা-বোনেরা ছাত্রদের রান্না-বান্না করে খাওয়াতেন তাঁদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম, ভক্তি, ভালোবাসা ছাড়া দেবার মতো আর কিছুই নেই।
তখন লজিং থেকে কাদং হাইস্কুলে অধ্যয়ন করা ছাত্রদের মাঝে ছিল- সাদেক আলী, শমসের আলী, সাহেব আলী, কায়েমুদ্দিন (হেলচা), তাজ উদ্দিন (বাঘমারা চর), আয়নাল হক (সোণতলি), ইউসুফ আলী, আব্দুল বারেক, মোক্তার আলী, আসান আলী এবং আমি (বাঘবর), নৈমুদ্দিন, সাহেদ আলী, আব্দুল কাদের, আব্দুর রশিদ(মরাভাজ)নিরঞ্জন বিশ্বাস (পশ্চিম দেউলদি)। জিন্নত আলী (আলীগাঁও) (আমার ছেলেবেলার কেরম খেলার সাথী)।অন্যান্য অঞ্চলের আরও অনেকে ছিল যদিও এখন তাদের নাম মনে করা সম্ভব হচ্ছে না। তার জন্য আমি খুবই দুঃখিত।
আমাদের বাড়ি থেকে বাকর মামাদের বাড়িতে থেকেই আমি পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু বারেক ভাই একদিন বাবাকে বলল- আমি আবুলের জন্য লজিং ঠিক করেই রেখেছি। একেবারে আমার লজিং বাড়ির কাছেই। আমার কাছে থাকলে এক সাথে স্কুলে যাতায়াত করতে পারব। স্কুল বন্ধ দিলে বাড়িতে আসতেও এক সাথে আসা-যাওয়া করতে পারব। গোবিন্দপুর রিজার্ভ দিয়ে ও একা যাতায়াত করা সম্ভব হবে না।
বারেক ভাই কথাটা মিথ্যে বলেনি। তখন গোবিন্দপুর রিজার্ভ দিয়ে যাতায়াত করাটা খুবই কষ্টসাধ্য এবং বিপদ সংকুল ছিল। নল খাগড়ি, বেনাবনে ভরা ছিল রিজার্ভ। বনের মাঝে মাঝে পায়ে হাঁটা পথ। রিজার্ভে গরু-মহিষের বাথান ছিল। মহিষগুলো রিজার্ভে চড়ে বেড়াত। মহিষের সামনে পড়লে আক্রমণের ভয় ছিল। আমরা কোনোদিন রিজার্ভের মাঝ দিয়ে একা যেতাম না। দুই তিনজন এক সাথে দল বেঁধে যেতাম। এমনও দিন আসত, আমরা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি তখন হঠাৎ মহিষ সামনে পড়ল। মহিষেরা রাস্তা আগলিয়ে ঘাঁস খাচ্ছে। আমরা রাস্তার মাঝে প্রাণটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মহিষেরা চলে না যাওয়া পর্যন্ত তখন সেখানেই দাঁড়িয়েই থাকতে হতো। মহিষগুলো চলে গেলে তবে আমরা যেতে পারতাম। বারেক ভাই, ইউসুফ আলী, মোখতার আলী, আসান উদ্দিন এবং আমি প্রায়ই এক সাথে যাতায়াত করতাম
রূপাকুছির জাইগীর বাড়ি
বারেক ভাইর যুক্তি মেনেই বাবা আমাকে বারেক ভাইর সাথে পাঠিয়েছিলেন। দুই দিন বারেক ভাইর লজিং বাড়িতে থেকে মেলার আনন্দ উপভোগ করার পরে বারেক ভাই একদিন সকাল বেলা আমাকে নিয়ে সেই লজিং বাড়িতে গেল। গৃহস্থের নাম জালালুদ্দিন।ডাক নাম জালু। দেওয়ানী টাইপের লোক। খুব হৃদয়বান। নিরংহকারী। সবাই জালালুদ্দিনের জায়গায় জালু নামে সম্বোধন করত। জালু বললে সবাই তাঁকে চিনতে পারত।
জালু কাকা বাড়িতে ছিলেন। আমাদের আদর সাদর করে বসতে দিলেন।
বারেক ভাই আমাকে দেখিয়ে বলল- এর কথাই বলেছিলাম। আমার কাকার ছেলে। বাবার নাম মিঠু মিঞা। আলীরপামের ধনাই হাজির নাতি।
ধনাই হাজির মেয়ের ঘরের নাতি নাকি? এভাবে বলেই জালু কাকা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- তোমার বাবার সাথে আমার পরিচয় আছে। তোমার নানা তো ধনীলোক। আগে আমাদের এখানেই ছিলেন। পরে আলীরপাম উঠে গেছেন।(আলীগাঁওকে বাইরের লোকেরা আলীরপাম হিসেবে জানত। যেমন আমাদের জাহানারপারকে জানত পূব দেউলদি হিসেবে।)এখান থেকেই প্ৰথমবার হজ্বে গিয়েছিলেন।
বারেক ভাই বলল- তাহলে কাল থেকেই থাকবে, না কি বলেন?
তোমাকে কথা দিয়েছি। কথা তো রাখতেই হবে। জালু কাকা বললেন- কিন্তু একটু অসুবিধা হলো। চান মিঞা এসেছে। সে বোলে ভাল হয়ে গেছে। আবার পড়বে। কিন্তু তার কথা-বার্তা শুনে তো ভাল হয়েছে বলে আমার মনে হয় না! তবে দুই বৎসর যাবত সে আমাদের এখানে আছে। এখন না-ও বলতে পারিনা!
চান মিঞা আমাদের বাঘবরেরই ছেলে। আমাদের পাশের গ্রাম শেঁউরার পারে বাড়ি। আমাদের বাড়ি থেকে একটু পশ্চিমে। তার সাথে আমার চিনা-পরিচয় আছে। বাবা-মা নেই।এতিম।দাদী আছে। দাদীই লালন-পালন করেছেন। চান মিঞার দাদী কবিরাজী চিকিৎসা করেন। বয়োবৃদ্ধ মহিলা। মাথায় জটা আছে। ছোটবেলা আমার প্ৰস্ৰাবজনিত রোগ হযেছিলো। প্ৰস্ৰাব করার সময় জ্বালাপোড়া করত। সেই রোগের চিকিৎসার জন্য দাদী আমাকে দু’দিন তাঁদের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। চান মিঞার মাথার গণ্ডগোল হয়েছে বলে আমি তখনই শুনেছিলাম।
বারেক ভাই বলল- চান মিঞা যদি থাকে, তাহলে তাকেই রাখেন। আমি একে অন্যত্র রাখার ব্যবস্থা করব। আরও দুই তিন জনে লজিং রাখবে বলেছে।
জালু কাকা বললেন- ধনাই হাজির নাতি আমার বাড়ি লজিং থাকতে এসে থাকতে পারবে না, এটা কখনও হয় না। প্রয়োজন হলে আমি দুজনকেই রাখব। এভাবে বলেই তিনি একজনকে ডেকে বললেন- হাবেজুদ্দিন, যাও তো তোমার মুক্তি কাকাকে ডেকে নিয়ে এস।
হাবেজুদ্দিন জাহানারপারেরই লোক। যদু জেঠার ছেলে। সে জালু কাকার বাড়িতে চাকর থাকে। আমার চেয়ে বয়সে এক দেড় বছররে বড়। ছোট বেলা এক সাথে খেলা-ধূলা করতাম।আমি তাকে হাবু ভাই বলে সম্বোধন করতাম।
হাবু ভাই মুক্তি কাকাকে ডেকে আনল।
মুক্তি মিঞা জালু কাকার সতালো ভাই। তিনি এসে বললেন- আমাকে ডেকেছ কেন?
তোকে লজিং রাখতে হবে। জালু কাকা আমার পরিচয় দিয়ে বললেন-আলীগাঁয়ের ধনাই হাজির নাতি। আমিই রাখব ভেবেছিলাম। চান মিঞা আবার এসেছে। তাই একটু অসুবিধা হচ্ছে। তুই কিছুদিন রাখ। পরে কিছু একটা ব্যবস্থা করব।
মুক্তি কাকা বললেন- আমার তো তেমন আলাদা ঘর নেই। কোথায় থাকতে দিব?
জালু কাকা বললেন- মা, যে ঘরে থাকে সেই ঘরের মাঝ বরাবর বেড়া দে। আমাদের পাট খড়ি আছে। ছোপ থেকে বাঁশ কেটে নিয়ে আজই বেড়াটা দিয়ে দে। কাল থেকেই এ তোদের বাড়ি থাকবে।
ঠিক আছে। মুক্তি কাকা বললেন- আমিও অনেকদিন ধরে জাইগীর রাখার কথা ভাবতেছি। তবে থাকার অসুবিধার জন্য সাহস পাচ্ছিছিলাম না। ভালোই হল।হুড়মুড় যাত্রা যা করে বিধাতা। আজই আমি বেড়াটা দিয়ে দিব।
পরের দিন মুক্তি কাকার বাড়িতে এলাম। মুক্তি কাকার মাতৃ আছে।বয়োবৃদ্ধ।ষাটের ওপড়ে বয়েস। মুক্তি কাকার দুই ছেলে। দোয়াত আলি এবং চান মিঞা। সবাই ছোট ছোট। কেউ স্কুলে যায় না। মুক্তি কাকার মা তাদের নিয়ে একটি আলাদা ঘরে থাকেন। পরের দিন গিয়ে দেখি জালু কাকার কথা মতো মুক্তি কাকা ঘরের মাঝ বরাবর বেড়া দিয়ে আমার জন্য রুম বানিয়ে রেখেছেন। তক্তা দিয়ে খাটিয়া বানিয়ে রেখেছেন শোবার জন্য।মুক্তি কাকার বাড়িতে তিন মাস থাকার পর চান মিঞার পাগলামি বেড়ে গেল। সে আবার বাড়ি চলে গেল। আমাকে আবার জালু কাকার বাড়িতে থাকতে দিল।
জালু কাকার বাড়িতে আমি সাত মাস ছিলাম। জালু কাকার তিন ছেলে এবং এক মেয়ে ছিল। ছেলের নাম ক্রমে আজগর আলী, ইমান আলী এবং আব্দুল আলী। মেয়ের নাম বেসর। আসল নাম কি জানিনা। জানার চেষ্টাও করি নি কোনোদিন। আজগর তখন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ত। ইমান আলী ওরফে ইনু এবং আব্দুলও স্কুলে যেতো। কিন্তু ওরা বিড়ি টানত। তাদের পাল্লায় পড়ে আমিও বিড়ি টানতে শিখেছিলাম।তবে তেমন না। দুই এক টান দিতাম আর কি!
সেই বৎসর বরপেটায় রেজেন্ট সার্কাস এসেছিল। সেই সার্কাসে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন লাইট ছিল। সেই লাইটের আলো রূপাকুছি পর্যন্ত আসত। পরে শুনেছি বাঘবর পর্যন্তও যেতো সেই লাইটের আলো। আমি একদিন রাতে বাইরে বেরিয়ে সেই লাইটের আলো দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পরের দিন শুনতে পেলাম, সেটা বরপেটায় আসা সার্কাসের আলো। সেদিনই আমরা মানে আব্দুল হাকিম, দরবেশ, তাজুদ্দিন এবং আমি সেই সার্কাস দেখতে গিয়েছিলাম। সেই সার্কাস দেখার পর থেকে আমাদের সিনেমা এবং থিয়েটার দেখার নেশা গড়ে উঠেছিল। আমরা ছয় সাত মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে বরপেটা এসে মাসে দুই তিন দিন করে সিনেমা দেখতাম। তখন বরপেটায় মাত্র একটি সিনেমা হল ছিল। ইন্দ্রপুরী। মেটিনি শ্বো ছিল না। সন্ধ্যেয় এবং রাতে দু’টো শ্বো দেখানো হতো।
এক দিনের একটি গল্প বলি। জালু কাকার বাড়িতে থাকাকালীন একদিন কাকী মানে জালু কাকার স্ত্রী ছেলে-মেয়ে সবাইকে নিয়ে মরাভাজ কুটুম্ব বাড়ি গিয়েছিলেন। বাড়িতে শুধু আমরা দু’জন ছিলাম। জালু কাকা এবং আমি। কাকী সকালে ভাত রেধে রেখে গিয়েছিলেন। সেই ভাত খেয়ে আমি স্কুলে গেলাম। বর্ষার মরসুম। গরমের দিন। স্কুল থেকে এসে দেখি জালু কাকা সেই ভাতে পানী দিয়ে রেখেছেন। রাতে দু’জনে সেই পান্তা ভাত খেলাম। দু’জনে খাওয়ার পরও অনেক ভাত রয়ে গেল। সকাল বেলা আবার সেই পান্তা খেয়ে স্কুলে গেলাম। স্কুল থেকে এসে দেখি জালু কাকা পুঠি মাছের তরকারী করে রেখেছেন। তিনি চৌকায় ভাত বসিয়ে দিয়ে বললেন- তুমি জ্বাল দাও। ভাত হলে তুমি খেয়ে নিও। আমি জনীয়া যাব। দর্কার আছে।
ভাত হলো। ভাত নামিয়ে একটি থালায় ভাত বেড়ে খেতে বসলাম। তখন খিদেয় আমার নাড়ি-ভুঁড়ি হজম হওয়ার যো হয়েছে। পাতিল থেকে চামুচ দিয়ে ভাত বেড়ে নিচ্ছি আর খাচ্ছি। জালু কাকার কথা মতো সেদিন দেড় সের চালের ভাত রেধেছিলেন। পোয়া খানেক চালের ভাত বাদে প্রায় সব ভাতই সেদিন আমি খেয়ে ফেলেছিলাম। আমি এমনই রাক্ষস হয়েছিলাম সেদিন!কথাটা মনে হলে এখনও আমি অবাক হয়ে যাই। এত ভাত আমি কেমনে খেয়েছিলাম সেদিন!
তখন স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষাগুলো নভেম্বরের শেষের দিক থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতো এবং ডিসেম্বরের ৩১ তারিখের ভেতরে রিজাল্ট ঘোষণা করতেন। ১৯৬৭ সালের সপ্তম শ্ৰেণীর বাৎসরিক পরীক্ষা দেওয়ার পর আমি ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাড়ি গেলাম। সেবার আমাদের স্কুলের রিজাল্ট ঘোষণা করেছিলেন ডিসেম্বরের ২৯ তারিখ শুক্রবারে। ২৯ তারিখে বাড়ি থেকে স্কুলে এসে রিজাল্ট দেখে জাইগীর বাড়ি এসে দেখি চান মিঞা আবার লজিং বাড়ি এসেছে। আমি তখনই বারেক ভাইকে কথাটা বলার জন্য বারেক ভাইর লজিং বাড়ি গেলাম। বারেক ভাই বাড়িতে ছিল না। মসজিদের সন্মুখে ছিলো।কারণ বিকেল বেলা আমরা ছাত্ররা প্রায় সবাই অন্যান্য কিছু যুবকের সাথে মসজিদের সন্মুখে আড্ডা দিতাম। আমি মসজিদের সন্মুখে গিয়ে বারেক ভাইর সাথে দেখা করে কথাটা বললাম- ভাই, চান মিঞা আবার এসেছে। এখন কি করব। দু’জন একই বাড়িতে লজিং থাকাটা কি ঠিক হবে?
বারেক ভাই বলল-চান মিঞা পরশু দিন এসেছে। আমার সাথে কাল দেখাও হয়েছিলো। চান মিঞা বললো, সে বোলে আবার পড়বে। পড়ে সেটা ভালো কথা। তবে লজিং বাড়ি থেকে কিছু না বললেও দু’জন একই বাড়িতে থাকাটা মোটেই ঠিক হবে না। দু’চার দিন থাক। দেখি কি ব্যবস্থা করতে পারি!
এমন সময় দেখা হল আমার খালত বোনের জামাই আব্দুল ভাইর সাথে। আব্দুল ভাইর ভালো নাম আব্দুল আলিম। অভয়-দুলাল গীতিনাট্যের ধনপতি রাজা। অঞ্চলের বিখ্যাত লোক। সবাই আব্দুল ভাইকে জানে। তাই আমিও আব্দুল ভাইকে আগে থেকেই জানতাম। বোনের জামাই বলেও জানতাম। আমি আব্দুল ভাইকে ভাই বলে ডাকতাম। দুলাভাই বলতাম না।
বারেক ভাই আব্দুল ভাইকে কথাটা বলল। আব্দুল ভাই বললেন- আমরা থাকতে আবুল কেন জালুর বাড়িতে রাখতে গেছে! ও তো আমাদের পর নয়। আমি ওর খালাত বোনের জামাই। এভাবে বলেই আব্দুল ভাই আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- কাল থেকে আমাদের বাড়িতে থাকবি। পারলে আজই যাবি।
পরের দিন থেকে আব্দুল ভাইর বাড়িতে থাকতে লাগলাম। আমার খালাত বোন আমাকে খুবই স্নেহ সহকারেই গ্রহণ করলেন। তাদের এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ের নাম আনোয়ারা ও ছেলের নাম হোসেন আলী। মেয়ে বড়। বয়স চার বৎসর। ছেলে ছোট। দু’ বৎসর। আমি আব্দুল ভাইদের বাড়ি ক্লাস এইটের বৎসর গিয়েছিলাম। সে বৎসর কলেরার খুব প্রকোপ বেড়েছিল। সাল টা ছিল ১৯৬৮। অনেক লোক মৃত্যু বরণ করে ছিল সেই কলেরায়। আমার মামাত বোন জিন্নতমালার বিয়ে হয়েছিল মরাভাজের হায়েত আলীর সাথে। সেই কলেরায় সাত দিনের মধ্যে জিন্নতমালা বুবুর পাঁচটি সন্তানের মৃত্যু হয়েছিল। সন্তানদের শোকে বুবুর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। প্রলাপ বকতেন। পাগলের মত আচরণ করতেন। হাসেন আলীও সে বৎসরের কলেরায় মারা গিয়েছিল।
একদিন রাতে শুয়ে আছি। হঠাৎ বমির শব্দ শুনতে পেলাম। উঠে গিয়ে দেখি হোসেন আলী বমি করছে।
আব্দুল ভাই আমাকে দেখে বললেন- হোসেনের কলেরা হয়েছে। তুই মতি ডাক্তারের বাড়ি যা। ঔষধ নিয়ে আয়।
মতি ডাক্তারের বাড়ি উত্তর পাড়ায়। বাঙালি হিন্দু। হোমিওপেথি ডাক্তার। দুই পাড়ার মাঝে মস্ত বড় একটি চক। সেই চক পাড়ি দিয়ে যেতে হবে!
আগের দিন রাতে আব্দুল ভাইর বড় ভাই কয়েদ আলীর স্ত্রী কলেরায় মারা গেছে। তাঁর কবর দিয়েছিল বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটু দূরে নদীর পাড়ে। সেদিন সন্ধ্যেয় সেই কবর থেকে লাশ বের করে শিয়ালেরা খাচ্ছিল। আমি বড় একটি বাঁশ নিয়ে সেই শিয়াল তাড়াতে গিয়েছিলাম। কিন্তু শিয়ালই আমাকে তাড়া করে খেদিয়ে দিয়েছিল। কয়েদ আলীর বাড়ি, পাশেই। আমি কয়েদ আলীর বাড়িতেও গিয়েছিলাম কথাটা বলার জন্য। তখন এমনই ভয়াবহ পরিবেশ বিরাজ করছিল যে বেলা ডুবার আগেই লোকজন ঘরের ভেতর ঢোকে পড়ত। রাস্তাঘাটে কোনো লোকজন থাকত না। তাই কেউ আমার কথায় গুরুত্ব দেয় নি।
কয়েদ আলী বললেন- খেতে দাও। এখন কি করব? পার যদি তুমি তাড়াও। না পারলে বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়।
মনটা ভালো লাগছিল না যদিও বাড়ি ফিরে এসে শুয়ে পড়ছিলাম। শিয়ালরা লাশ খাওয়ার শব্দ আমি ঘরের ভেতর থেকেই টের পাচ্ছিলাম।
সন্ধ্যেবেলার সে সব কথা মনে পড়াতে আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম। আব্দুল ভাই আমার আমতা আমতার কারণ বুঝতে পেড়ে বললেন- যা, একা যেতে ভয় পেলে হালিমকে নিয়ে যা।
হালিম আব্দুল ভাইর দূর সম্পর্কীয় ভায়ের ছেলে। হালিমদের বাড়ি আব্দুল ভাইদের বাড়ি থেকে সাত আঠ বাড়ি পশ্চিমে রাস্তার ধারে। আব্দুল ভাইদের বাড়িও রাস্তার ধারেই ছিল। বাড়ির সামনে নদী ছিল। সচারাচর হালিম আমার সাথেই শোইত। কলেরার প্রকোপ বাড়ার পর থেকে বাড়িতে শোয়। হালিমের কথা বলাতে আমি একটু সাহস পেলাম। দু’জন হলে স্বচ্ছন্দ্যে যেতে পারব। আগ-পাছ না ভেবে দিলাম দৌড় হালিমদের বাড়ি উদ্দেশ্য করে। এক দৌড়ে এসে হালিমদের বাড়ি পেলাম। ঘরে কুপির আলো জ্বলছিল। হালিম আমার থেকে বয়সে একটু বড়। আমি তাকে ভাই বলে ডাকতাম।
আমি হালিমকে ডাকতে লাগলাম- হালিম ভাই, উঠ। মতি ডাক্তারের বাড়ি যেতে হবে। হোসেনের কলেরা হয়েছে।
হালিম সাড়া দিল না। কয়েক বার ডাকার পর সাড়া দিলেন হালিমের মাতৃ- হালিম ঘুমিয়ে আছে। এখন যেতে পারবে না।
আমি বললাম- হোসেনের অসুখ। রাতে ডাক্তার না দেখালে অসুবিধে হতে পারে।
তুমি একা পারলে যাও, আর না পারলে বাড়ি যাও। হালিমকে যেতে দেব না। হালিমের মা বললেন ।
অনেক পীড়া-পীড়ির পরেও হালিম উঠল না। শেষে নিরুপায় হয়ে এক আঁটি খড়ি এনে আগুন জ্বালিয়ে এক দৌড়ে এসে মতি ডাক্তারের বাড়ি পেলাম। ডাক্তারকে ডেকে তোলে বললাম- আব্দুল ভাইর ছেলের কলেরা হয়েছে। আপনাকে যেতে বলছে।
ডাক্তার ঔষধ দিয়ে বললেন- যাও, এখনই খাইয়ে দাও গিয়ে।
আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছে। আমি বললাম- আপনিও চলুন আমার সাথে।
না, আমি এত রাতে যাব না। কাল সকালে যাব। মতি ডাক্তার বললেন।
আমি ভেবেছিলাম, যাওয়ার সময় একা গেলেও আসার সময় ডাক্তারের সাথে আসব। ডাক্তার যখন আসবে না বললেন তখন আমি হতাশ হলাম। কিন্তু উপায় নাই। আবার এক আঁটি খড়ি জ্বালিয়ে দিলাম দৌড়। সেবার চক কোনাচা সিধা পাড়ি দিলাম। এক দৌড়ে এসে বাড়ি পেলাম।
ওষুধ নিয়ে আসার পর হোসেনকে ঔষধ খাইয়ে দিল।
ওষুধ খাওয়ানোর পর আমি বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। শোয়ার একটু পরেই আমার পেট ভুটভুট করতে লাগল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাহলে আমারও কি কলেরা হল? আমার টেবিলে চিড়া এবং চেনি ছিল। বাড়ি থেকে আসার সময় মা প্রত্যেক বারই মুড়ি, চিঁড়া কিছু একটা দিয়ে দিতেন। মাঝে মধ্যে ঘিও দিতেন? বাড়ির ঘি। নিজে হাতে বানানো। সে ঘি না খেয়ে মাথায় নিতাম। ঘি খেলে যদি মাথা ভালো হয়, মাথায় দিলেও মাথা ভালো হবে এই ভেবে আর কি। আমি মুঠ মুঠ চিঁড়া এবং চেনি মুখে দিয়ে চিবুতে লাগলাম। একটু পরেই পেটের ভুটভুট বন্ধ হয়ে গেল। তার মানে আমার কলেরা হয়নি! অজীর্ণতা জনিত কারণে এমনিতেই ভুটভুট করছিল আর কি!
মতি ডাক্তারের ওষুধ খাওয়ানোর পরেও হোসেনের অসুখ ভাল হল না। পরের দিন সকালে আবার পাঠালেন জনীয়ার ডিগাম্বর ডাক্তারের বাড়ি। সাইকেল নিয়ে ডাক্তারের বাড়ি এসে দেখি ডাক্তার বাড়ি নেই। ডাক্তারের অপেক্ষায় বসে রইলাম। দেড় দুই ঘণ্টা বসার পর ডাক্তার এলেন। সৌম্যদর্শন। লম্বা চওড়া। শরীরের রং কাঁচা হলুদের মতো। দেখলে ভক্তি জন্মে।ডাক্তারের কাছে অসুখের কথা বললাম।,তিনি তখনই আমার সাথে সাইকেল নিয়ে রওয়ানা হলেন। বাড়ির কাছাকাছি এসেছি। তখনই ক্রন্দনের শব্দ শুনতে পেলাম। ডাক্তার বললেন- গিয়ে আর লাভ হবে না। রোগী মারা গেছে। আমি আর গিয়ে কি করব? তুমি যাও। আমি চলে যাই।
কথাটা শুনে আমার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। হোসেনকে আমি কোলে-পিঠে নিয়েছি। তাই হয়তো কলিজাটা ছ্যাৎ করে উঠেছিল। আমি বললাম- চলুন। এত দূর এসেছেন। আব্দুল ভাইর সাথে দেখা করে যাবেন।
ডাক্তার আব্দুল ভাইকে চিনতেন। তাই ডাক্তার কথা না বাড়িয়ে আমার সাথে বাড়িতে এলেন এবং আব্দুল ভাইকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে গেলেন।
হোসেনের জানাজা অনুমান তিনটা নাগাদ সম্পন্ন হল। রাতে আরম্ভ হল আর এক বিড়ম্বনা। মুসলিম রীতি মতে, যে গৃহে কেউ মারা যায়, সে গৃহ রাতে শূন্য রাখতে নেই। হোসেন মারা যাওয়াতে আব্দুল ভাই এবং আমার খালাত বোন নমিসা বেগম মানসিকভাবে এতোই ভেঙে পড়েছিল, যে তাঁরা কেউ সে ঘরে থাকতে রাজি হলেন না। শেষে আমাদের মাউই মমিরজান বেগম মানে আব্দুল ভাইর মা এসে আমায় বললেন- আজ মাইয়াতের গৃহ শূন্য রাখা যাবে না। ওরা কেউ শুতে রাজি হচ্ছে না। ভয় করছে। তুমিই শুতে হবে।
আমারও ভয় করছিল, কিন্তু উপায় নেই। মাউইর কথা মতো আমি মাইয়েতের গৃহে শুয়ে পড়লাম, কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। তখন খুব কম অঞ্চলেই কবরস্থানের ব্যবস্থা ছিল। তাই কেউ মারা গেলে বাড়িতেই কবর দিত। হোসেনকে কবর দিয়েছিল আমি যে গৃহে শুয়েছিলাম তার চান্দশায়। আমি যে খানে শুয়েছিলাম সেখান থেকে দুই হাত দূরেই কবর। আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। আমার ধারণা হল, এভাবে থাকলে আমি দম আঁটকে মারা যাব। তাই সন্তর্পণে ঘর থেকে বেরিয়ে এক দৌড়ে কয়েদ আলী ভাইর বাড়ি এসে রাখালদের মাঝখানে শুয়ে পড়লাম এবং ভোরে সেখান থেকে উঠে গিয়ে আবার মাইয়েতের গৃহে শোয়ে রইলাম। এই ভাবেই আমি তিনটি রাত সেই মাইয়াতের গৃহ পহরা দিয়েছিলাম। আব্দুল ভাই লম্বায় ছফুটের কম ছিলেন না। দৈহিক শক্তিতেও খুবই বলবান ছিলেন। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন আর আমাকে কিনা সেই গৃহে শোতে হয়েছিল! সে কথা ভাবলে, এখনও শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে! তবে এতে আব্দুল ভাইর কোনো দোষ ছিল না। কারণ তিনি তখন মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত ছিলেন যে, তিনি বুঝতেই পারেন নি কাজটা ঠিক হয়নি।
আব্দুল ভাইদের বাড়িতে আমি তিন বৎসর ছিলাম। এই তিন বৎসরে তাঁদের অনেক স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি। আব্দুল ভাই নিজে বাজার করতেন না। আমিই বাজার করতাম। কোনো দিন টাকা-পয়সার হিসাব চাইতেন না। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুবই সৌখীন ছিলেন আব্দুল ভাই। মাছের মরশুমে দুটি জালা ভর্তি করে কই, মাগুর মাছ কিনে এনে রাখতেন। মস্ত বড় ছিল সেই জালা। এখন আর সে রকম জালা দেখা যায় না। পূর্বে সে রকম জালায় মুড়ি রাখতেন।মচ মচা থাকত সেই মুড়ি।জালাগুলো ভেতরে ঘি মেখে বানাতেন।ঠিক এখনকার ফ্ৰিজের মতো ঠাণ্ডা থাকত সেই জালাগুলোর ভেতরে।
অন্যান্য গৃহস্থের মতো আব্দুল ভাইদের বাড়িতেও মুরগি পোষতেন। তবে অন্যান্য গৃহস্থের মতো বিক্রীর জন্য নয়, খাওয়ার জন্য। সেই পোষা মুরগির ডিম ও মাংস খেতেন। বাড়িতে খাওয়ার উপযুক্ত মুরগি না থাকলে কাদঙের শনিবারের হাট থেকে মুরগি কিনে আনতে হতো খাওয়ার জন্য। আমাদের মাউই রান্না-বান্নায় খুবই পটু ছিলেন। তাঁর হাতের রান্না খুবই সুস্বাদু হতো। দেখেছি, তাঁর হাতের মরিচ বাটা খেতেও লোক আসত। এমনই সুস্বাদু করে তিনি মরিচ বাটতেন। আমাদের বোনও রান্না-বান্নায় মন্দ ছিলেন না। ভালোই রাঁধতেন।
আব্দুল ভাই ভালো অভিনেতা ছিলেন। তিনি নিজে অভিনয় করার পাশাপাশি আশেপাশে কোথাও যাত্ৰাগান বা নাটক হলে প্রায়ই শুনতে যেতেন। তখন সঙ্গী সাথী না পেলে ভগ্নীপতি হিসাবে তিনি আমাকেও মাঝে মধ্যে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। একবার তাঁর সাথে নাটক শুনে তো বিপদেই পড়েছিলাম। মন্দিয়াতে তখন কলকাতার যাত্রাদল আসত। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। ১৯৬৯ সাল। একদিন আব্দুল ভাই সন্ধ্যে বেলা বললেন- নাটক দেখবি? কলকাতার দল। ঘোষ কোম্পানী। খুবই ভালো দল। শুনতে চাস তো আমার সাথে যেতে পারবি।
এমনিতে ছাই, তাতে আবার বাতাস। চুরি করে যাত্রাগান শুনার কথা আগেই একবার বলেছি, কথাটা নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে। জালু কাকার বাড়িতে থাকাকালীন দরবেশের পাল্লায় পড়ে সিনেমা, থিয়েটার দেখার অভ্যেসও গড়ে উঠেছিল। মামার সাথে একবার হাউলিতে কলকাতার যাত্রাদলের নাটকও দেখেছিলাম। খুবই ভালো লেগেছিল সেই নাটক দেখে। তাই কলকাতার দলের নাটকের কথা শুনে খুবই খুশি হলাম এবং কোনো দ্বিধা না করে এক কথায় আমি রাজি হয়ে গেলাম। আব্দুল ভাই, আসান আলী (আসান আলীও আমার ভগ্নিপতি ছিলেন। খালাত বোনের জামাই।) এবং আমি পায়ে হেঁটে মন্দিয়া এলাম। সেদিন ছিল সোমবার।নাটকটির নাম ছিল গৃহলক্ষ্মী। তখন এখনকার মতো চেয়ারের ব্যবস্থা ছিল না। সাধারণ যাত্ৰাগান হলে তখন মাটিতে খানখড় বিছিয়ে দিত এবং টিকেট কেটে যাত্রা দেখলে মাটিতে বিচালি বিছিয়ে ওপড়ে ফরাশ(কাৰ্পেট) বিছিয়ে দিতো। সেদিন ফরাশে বসে নাটক দেখে খুবই রোমাঞ্চিত হলাম। নাটক দেখে পায়ে হেঁটে বাড়ি আসতে আসতে বেলা সাতটা বেজে গেল।আব্দুল ভাই এসেই শোয়ে পড়লেন।স্কুলে যেতে পারব না বলে আমি শোইলাম না। গোসল করে, খাওয়া-দাওয়া সেরে সময় মতো স্কুলে গেলাম।
বিকেলে স্কুল থেকে এসে খাওয়া-দাওয়া সেরে সন্ধ্যেয় আবার মন্দিয়া রওয়ানা হলাম। নাটক দেখলাম। সকালে বাড়ি এসে স্কুলে গেলাম। এভাবেই না ঘুমিয়ে চারদিন নাটক দেখলাম।
পাঁচ দিনের মাথায় বিকেল বেলা স্কুল থেকে আসার পর আব্দুল ভাই বললেন- আজ দু’টি নাটক দেখাবে এক টিকটে। যা, ভাত খেয়ে রেডি হয়ে নে।
চোখে ঘুম। শরীর ঢুলছে। তবুও নাটক দেখতে গেলাম। নাটক শুরু হল। ঘুমে চোখ মেলতে পারছি না। কার নাটক কে দেখে! মাঝে মাঝেই ঘুমিয়ে পড়ছি।
আমার অবস্থা দেখে আব্দুল ভাই এক টোপলা মোয়া কিনে এনে দিয়ে বললেন- মোয়া চাবা। ঘুম চলে যাবে।
টোপলা খুলে মোয়া মুখে দিলাম। মোয়াও চাবাতে পারছি না। মোয়া মুখে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ছি। ঘুমিয়ে পড়তে দেখলেই আব্দুল ভাই ধাক্কা দিচ্ছেন। ধাক্কা খেয়ে আবার জেগে উঠছি। এভাবেই খুব কষ্ট করে সেদিন নাটক দেখলাম। সকাল বেলা মদ খাওয়া মানুষের মত ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি এলাম। আব্দুল ভাই বাড়ি এসেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমালে স্কুলে যেতে পারব না বলে আমি ঘুমালাম না। ন’টা বাজায় স্কুলে গেলাম। দ্বিতীয় পিরিয়ডের পরেই বেঞ্চে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। (কারণ দ্বিতীয় পিরিয়ড ছিলো কাশেম স্যারের। কাশেম স্যার কঠোর প্রকৃতির শিক্ষক ছিলেন। তিনি লঘূ দোষে গুরু শাস্তি দিতে কুণ্ঠিত হতেন না। সেই ভয়েই আমি দ্বিতীয় পিরিয়ড পর্যন্ত জেগে ছিলাম।)সেদিন ঘুমিয়েই স্কুলের সময় কাটিয়ে দিলাম। স্কুলের ছাত্র কিংবা মাস্টর মশায়রা কেউ আমাকে ডেকে জাগায় নি। স্কুল ছুটির পরেও না। ছুটির পরেও আমাকে ঘুমিয়ে রেখেই সবাই চলে গিয়েছিল। স্কুল ছুটি হয়েছে। আমি ঘুমিয়ে রয়েছি! স্কুলের চৌকিদার পেস্কার আলী ডেকে তোলে সেদিন আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমার অবস্থা এমন হয়ে ছিল যে প্রায় এক মাস পর্যন্ত রাতে পড়তে পারি নি। সন্ধ্যেয় ভাত খেয়ে শোইলেই ঘুমিয়ে পড়তাম।
রূপাকুছির কদ্দুস ভাইদের বাড়ির পাশেই মসজিদ ছিল। (আব্দুল কদ্দুস কাদং হাইস্কুলের প্রথম স্নাতক।) আমরা স্কুলের ছাত্ররা স্কুল ছুটির পরে সেখানে সমবেত হয়ে লবণদারি, লাঠিটানা, হাডুডু প্রভৃতি খেলা খেলতাম এবং গল্প-গুজব করতাম। এক দিন একটি লোক এসে বলল- কামলা পাওয়া যায় না। ক্ষেতে আগাছা জন্মে ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তোমরা ছাত্ররা ছুটির দিনে আমাদের নিড়ানি কাজ করে দিতে পারবে না?
একজন বলে উঠল- পারব। তবে, টাকা দিতে হবে।
লোকটি বলল- নিশ্চয় দেব। কাল তো রোববার। তাহলে কাল থেকেই শুরু করে দাও।
সাত আঠ জন মিলে সেবার বন্ধের দিনে অনেক দিন ক্ষেত নিড়ানি কাজ করেছিলাম। টাকাও দিত এবং ভালো মতো খেতেও দিত। আমি আর এক দিন আব্দুল ভাইর বড় ভাই নায়েব আলীর ধান কেটে দিয়েছিলাম। বর্ষার দিন। আষাঢ় মাস।হো হো করে জল বাড়ছে। অনেকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে। কামলা পাওয়া যাচ্ছে না। নায়েব আলী ভাই এসে বললেন- চল, আমার ধান কেটে দিবে। ধান তলিয়ে যাচ্ছে।
নায়েব আলী, আব্দুল ভাইর বড় ভাই ছিলেন। তাই আমি দ্বিধা না করে ক্ষেতে গিয়ে ধান কেটে দিয়েছিলাম। মাজা জলে নেমে ছিলাম। গলা জল থেকে উঠে এসেছিলাম। সন্ধ্যেয় বাড়ি এসে দেখি রুটি এবং মাংসের ব্যবস্থা করেছে। সেদিন খুব খিদে পেয়েছিলো। তাই পেট পূরে খেয়েছিলাম সেই মাংস রুটি। ধান কাটা বাবদ আমাকে টাকাও দিয়েছিলেন। আমি নিতে চাইনি। জোর করেই দিয়ে ছিলেন টাকা। কত টাকা দিয়েছিলেন এখন সঠিক মনে নেই। তবে মনে হয়, সাত টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে ফুল তোলা ছিটের কাপড়ের সার্ট বানিয়ে ছিলাম। সে সার্ট নিয়েও আমি অস্বস্তিতে পড়ে ছিলাম। আমি তখন সবুর উদ্দিনের সাথে দোস্ত পেতেছি। তাঁদের বাড়িতে এক রাতে চুরি হল। আমার সার্টটা সেদিন তাঁদের বাড়িতে ছিল। চোর সব কাপড়-চোপড় নিয়ে গেছে, শুধু আমার সার্টটা রেখে গেছে। পরে জানতে পেরেছিলাম দোস্তদের বাড়িতে কে চুরি করেছিলো। আমারই একজন সম্পর্কীয় খালাত ভাই চোর ছিল। সেই সেদিন চুরি করেছিল দোস্তদের বাড়িতে। ফুল ছাপ সার্ট। প্রায় সবাই চিনত সাৰ্টটা। সেই চোর ভাইও চিনত। অনেকদিন পরে আমি একদিন চুরির বিষয়ে সেই চোর ভাইকে জিজ্ঞাস করায় সে বলেছিল, আমার সার্ট বলে চিনতে পেড়ে সেদিন সে সার্টটা নেয়নি। তার কথা শুনে হাসব, না কাঁদব সেদিন আমি বুঝতে পারিনি। অবশ্যে তখন আমি কথাটা কাউকে বলিনি।বললে অনৰ্থক ঝামেলা হতে পারে এই ভয়ে আর কি!আজ জীবনের গল্প লিখতে বসে মুখ ফসকে কথাটা বলেই ফেললাম। অনুরোধ, কেউ যেন দোষ ধরবেন না।
১৯৬৮ সালে আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল। একদিন সকাল বেলা দরবেশ এবং তাইজুদ্দিন সাইকেল নিয়ে আমার জাইগীর বাড়ি এসে রাস্তা থেকে আমাকে ডাক দিল। আমি ঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে দেখি দরবেশ এবং তাইজুদ্দিন সাইকেল নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি যে ঘরে থাকতাম, সেই ঘরটা একেবারে রাস্তার ধারে ছিলো। তাইজুদ্দিন আমার ভগ্নিপতি আসান উদ্দিনের বাড়িতে লজিং থাকত। বাড়ি বাঘমারা চরে।(তাইজুদ্দিন পরবৰ্তীতে প্রাইমারীর শিক্ষক হয়েছিলো। অবসরের পূৰ্বেই সে অনেকদিন আগে মৃত্যুবরণ করেছে।দরবেশ আলীও অনেকদিন পূৰ্বে মারা গেছে।)
তাইজুদ্দিন বলল- আমরা ইলিশ মাছ আনতে আলীরপাম যাচ্ছি। রাস্তা চিনি না। তুই তো আলীরপামের বিষয়ে সব জানিস।কোন দিক দিয়ে গেলে ভালো হবে? ইলিশ কোথায় পাব?
আমি তাদের রাস্তার কথা বলতেছি। এমন সময় আব্দুল ভাই বাড়ির ভেতর থেকে বাইরে বেড়িয়ে এসে বললেন- তোরা কোথায় যাচ্ছিস?
আলীরপাম যাচ্ছি ইলিশ মাছ আনতে। দরবেশ বলল।
ইলিশ মাছের কথা শুনে আব্দুল ভাই বললেন- টাকা নিয়ে যা। আমাদের জন্যও দু’টো আনিস।
দরবেশ বলল- আমাদের অনেক মাছ আনতে হবে। রাস্তাও তেমন চিনি না। আবুলকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন।
আব্দুল ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- যাবি?
আমি বললাম- সাইকেল হলে যেতে পারি।
ঠিক আছে। আব্দুল ভাই বললেন- তাহলে সাইকেল নিয়েই যা।
আমি ভাত খেয়ে বেড়োতে বেড়োতে আরও দুই তিনজন এল ইলিশ মাছের অর্ডার নিয়ে।
তিনজন আলীরপাম রওনা হলাম। আমি জানতাম, ইলিশ মাছ কোথায় পাওয়া যায়। সিধা সেখানে চলে এলাম। শ্লুইস গেট বাজারের কাছেই সেবার ভাটা পড়েছিল। ভাটায় গিয়ে আমরা ইলিশ মাছের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। অনেক নৌকা জাল দিয়ে ভাটা দিচ্ছে, কিন্তু ইলিশ মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র চার পাঁচ টা মাছ পেলাম। আমাদের অন্ততঃ দশটি মাছ দর্কার।
একজন জেলে বলল- আজ তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। কাল সকালে এলে পাবে। সকালে এসো।
অগত্যা উপায় না পেয়ে আমরা সন্ধ্যেয় মামাদের বাড়ি এলাম। মামাদের বাড়িতে রাত কাটিয়ে সকাল বেলা পান্তা খেয়ে আবার ভাটায় এলাম। কিন্তু ভাটায় ইলিশ মাছ নেই। জোয়ার ভাটা পড়েছে। তাই ইলিশ মাছ তেমন আসছে না। জেলেরা মাছ ধরা বাদ দিয়ে বসে বসে বিড়ি টানছে। মাত্র পাঁচটা ইলিশ পেলাম।
দরবেশ প্রস্তাব দিল-পাঁচটা ইলিশ দিয়ে আমরা কি করবো? আমাদের দর্কার কমপক্ষে দশটা মাছ। চল, এই পাঁচটা ইলিশ নিয়ে ইষ্টি(কুটুম্ব) বাড়ি যাই। কাল সকালে আবার আসব।
তাইজুদ্দিন বলল- কোথাকার ইষ্টি বাড়ি যাবি?
ছাপারবড়ি। সেখানে আমাদের খালাদের বাড়ি। দরবেশ বলল- আজ রাতে খালাদের বাড়ি থেকে কাল সকালে আবার আসব।
আলীরপাম থেকে ছাপারবড়ি কত দূর সে সম্বন্ধে আমাদের মোটেই ধারণা নেই। তাই আমরা রাজি হয়ে গেলাম এবং ছাপারবড়ি অভিমুখে রওয়ানা হলাম। মন্দিয়া এসে খুরমা দিয়ে চাহ খেলাম। তারপর আবার ছাপারবড়ি অভিমুখে যাত্রা। বরপেটা পার হয়ে সুন্দরিদিয়া পেলাম।
সুন্দরিদিয়া পাওয়ার পর আমার কিছু কিছু অস্থির লাগতে লাগল। সুন্দরিদিয়া পার হয়ে আসার পর আমার অস্থিরতা অনেক বেড়ে গেল। আমি সাইকেলে বসে থাকতে পারছি না। ধারে কাছে কোনও বাড়িঘরও নেই। আমি সাইকেল থেকে নেমে সাইকেল ঠেলে ঠেলে আসতে লাগলাম। কিছু দূর আসার পর আমার অবস্থা এমন হলো যে, আমি সাইকেলও ঠেলতে পারছি না। দরবেশ আমাকে তার সাইকেলে বসিয়ে ঠেলে আনতে লাগল।
তাইজুদ্দিন তার নিজের এবং আমার, দুটো সাইকেল ঠেলে আনতে লাগল।
আমার সেদিন যেরকম অবস্থা হয়েছিল, এখনকার দিন হলে প্রথমেই সাপের বাতাস লাগা বলে সন্দেহ করা হতো; কিন্তু তখনও সাপের বাতাসের তেমন প্রচলন হয় নি। তাই কেউ সাপের বাতাস লাগা বলে সন্দেহ করে নি। সাপের বাতাস প্রথম দেখেছিলাম আমাদের স্কুলেই।
সেদিন প্রার্থনার ক্লাস চলছিল। প্রার্থনার মাঝেই হঠাৎ মোকদম আলী ঢলে পড়ল। মোকদম তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ত। দরবেশের জেঠাত ভাই। স্কুলে হুলস্থূল লেগে গেল। ওঝা ডেকে আনা হল। ওঝা এসে হাত চালান দিয়ে ঝাড়ার পর সেই বিষ নেমেছিল। সেই প্রথম সাপের বাতাস দেখেছিলাম। এই ঘটনাটা ঘটেছিল আমার ঘটনাটা ঘটার অনেক দিন পরে। ১৯৬৯ সালে। আমি তখন নবম শ্রেণীতে পড়ি। আমার ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৬৮ সালে। জৈষ্ঠ মাসে। আমি তখন অষ্টম শ্ৰেণীতে পড়ি।
কিছু দূর আসার পর আমি বললাম- আমার সম্ভবতঃ খিদে পেয়েছে। কিছু একটা খেতে পারলেই ঠিক হয়ে যাব। লক্ষ্য কর, যদি কোন দোকান পাওয়া যায়! বিস্কুট কিনে খাব।
ধারে-কাছে কোন দোকান পাওয়া গেল না। তখন পাওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ তখন আজকালের মত জায়গায় জায়গায় দোকান ছিল না। দোকান ছিল একমাত্র বাজার শহরে।
কিছুদূর আসার পর একটি পাড়া দেখতে পেলাম। পাড়াটা ছিলো রাস্তার পশ্চিম ধারে। পাড়াটা নিন্মভূমি অঞ্চলে অবস্থিত। বাড়িগুলো ফাঁক ফাঁক। পাড়ার প্ৰথম বাড়িটা রাস্তা থেকে খানিকটা দুরে। দরবেশ বলল- চল, এই বাড়িতে গিয়ে দেখি কিছু পাওয়া যায় কিনা!
পাড়াটা ছিল সুন্দরিদিয়া থেকে কিছুটা উত্তর দিকে অবস্থিত এখনকার কংক্ৰীট সেতু পার হয়ে।তখন সেখানে কংক্রীট সেতু ছিল না। কাঠের পুল ছিলো। সেই পুলের খানিকটা উত্তর দিকে এখন বাজার বসেছে। কেওঁটপারা বাজার। তখন সেখানে কিছুই ছিল না।রাস্তাটাও এখনকার মতো পাকা ছিল না। পাথর নুড়ি বিছানো কাঁচা রাস্তা ছিলো।
আমার অবস্থা তখন খুবই শোচনীয়। দাঁড়াতে পারছি না। বসে হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তা থেকে নিচে নামলাম। দরবেশ আমাকে ধরে সেই বাড়িতে গেল। বাড়িটা নিন্মভূমিতে অবস্থিত। তাই ভিটে বেঁধে বাড়ি করেছে। মূল ভূমি থেকে আট দশ ফুট উঁচা সেই ভিটা।
আমার তখন হাঁটার শক্তি নেই। আমি হামাগুড়ি দিয়ে সেই ভিটেয় উঠলাম। বাড়িতে চারটি ঘর। পূব পাশে ছোট্ট বসার ঘর। সে ঘরে দুজন বৃদ্ধলোক বসে হুঁকা টানছিল। ঘরের ভেতর একটি ছোট্ট বেঞ্চ পাতা ছিল। আমি গিয়ে সেই বেঞ্চে সটান শোয়ে পড়লাম।
লোক দু’টির একজন আমার আচরণ দেখে হতচকিত হয়ে বললেন- কি হয়েছে? ছেলেটা এমন করছে কেন?
দরবশে বলল- মনে হয় খিদে পেয়েছে। আপনাদের খাওয়ার কিছু থাকলে খেতে দিন।
লোকটি বললেন- বাড়ির সবাই ইষ্টি বাড়ি গেছে। সকালে রান্না করে ভাত রেখে গিয়েছিল। আমি একটু আগেই খেয়েছি। তোমাদের দেখে তো ছাত্রের মতো মনে হচ্ছে! তিনি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- চল, পাশের বাড়ি। দেখি কিছু পাওয়া যায় কি-না!
পাশের বাড়ি গেলাম। বাড়িটা আগের বাড়ির মতো অতটা উঁচা নয়। বাড়িতে গিয়েই দেখি বারান্দায় খেজুর পাতার একটি পাটি গোল করে গুছানো আছে। আমি পাটি বিছিয়ে শোয়ে পড়লাম।
দু’জন মেয়ে মানুষ ঢেঁকিতে ধান ভানছিল। একজন একটু বয়স্কা এবং অন্যজন কিশোরী। বয়স্কা সম্ভবতঃ কিশোরীর মা। মনে হল, কিশোরীর বিয়ে হয়নি। তখন ছোট্ট বয়সেই আমাদের মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হতো। এখনও সেই প্রথাই প্রচলিত আছে। বলতে পারেন, এই বাল্যবিবাহের জন্যই মুসলিম সমাজ পিছিয়ে রয়েছে।
বৃদ্ধ লোকটি বয়স্কা মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ছেলেটার খিদে পেয়েছে। তোমাদের খাবার থাকলে কিছু দাও।
মহিলাটি বললেন- ভাত নেই। ছাতু আছে। তবুও গুড় নেই।
কথাটা আমিও শুনলাম। বললাম- কিছু লাগবে না। গুড় ছাড়াই দিন।
ছাতু এনে দিল। আমি জল দিয়ে ভিজিয়ে রাক্ষসের মতো সেই ছাতু গিলতে লাগলাম। কিছুক্ষণ খাওয়ার পর কিশোরীটি বলল- মা, শুঁটকি মাছের তরকারি আছে। দাও না। সুদা খাচ্ছে। মনে হয়, খুব খিদে পেয়েছে।
পুরুল দিয়ে রান্না করা শুঁটকি মাছের তরকারি এনে দিল এবং সাথে আরও এক বাটি ছাতু দিল। ছাতু খেয়ে আমার শরীর অবশ হয়ে পড়ল। তবে, তখন আমি খানিকটা সুস্থতা অনুভব করতে লাগলাম। আমার তখন লজ্জা করতে লাগল। এমন রাক্ষসের মতো খেলাম! কি ভাবল এরাঁ! কিছুক্ষণ শোয়ে থেকে মহিলাদের কাছ থেকে বিদায় নিযে রাস্তায় এলাম। রাস্তায় তাইজুদ্দিন এবং দরবেশ আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সাইকেলে চেপে ছাপারবড়ি দরবেশের খালাদের বড়ি গেলাম। সেখানে রাত কাটিয়ে পরদিন আলীরপাম গিয়ে মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। সেদিন আমাদের প্রয়োজন মত মাছ পেয়েছিলাম।
সেদিন থেকে কেউ ছাতু খেতে বললে, আমি কোনদিন ‘না’ করি না। কারণ ছাতুই একদিন আমার জীবন বাঁচিয়ে ছিল। বাড়িটা এখনও আছে। বরপেটা থেকে সুন্দরিদিয়া হয়ে কয়াকুছির দিকে গেলে প্রথম সেতুটা পার হয়ে প্রথম বাড়িটা। সেদিকে গেলে বাড়িটার দিকে এখনও তাকিয়ে থাকি। বাড়িটায় যাওয়ার ইচ্ছাও জাগে। কিন্তু কোন দিন যাওয়া হয়নি। কেউ চিনবে না, এই ভেবে। সেই লোকগুলোর দু’জন আমার চেয়ে বয়েসে অনেকটা বড় ছিল। সেই বযস্ক লোক দু’জন হয়তো এখন আর বেঁচে নেই। তবে, মেযেটি বেঁচে থাকলে, থাকতেও পারে। কারণ সে প্ৰায় আমার সমবয়সী ছিলো।
লাল মিঞাদের বাড়ি জাইগীর
আমি ১৯৭০ সালে ক্লাস টেনের বছর তিন মাস কাদণ্ডের লাল মিঞাদের বাড়িতেও জাইগীর (লজিং) ছিলাম। সেবার প্রবল বন্যা হয়েছিল। রাস্তা-ঘাট জলে ডুবে গেছে। তিন চার দিন স্কুলে যেতে পারি নি।
একদিন কারও নৌকায় উঠে শনিবারের হাটে গেলাম। আমাদের স্কুলের হেড মাষ্টার মণির উদ্দিন স্যার আমাকে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি স্কুলে আস না কেন?
আমি বললাম- রাস্তা জলে তলিয়ে গেছে। তাই আসতে পারি নি।
হেড স্যার বললেন- ফাইন্যালের বৎসর এভাবে স্কুলে ক্ষতি করলে অসুবিধে হবে। তুমি কালই বই-পত্র নিয়ে এস। আমি কয়েক দিনের জন্য তোমার লজিঙের ব্যবস্থা করে দিব।
তখনই সেখানে এলেন লাল মিঞা। লাল মিঞাকে আমি চিনি। স্কুলে যাওয়া আসা করার সময় মাঝেমধ্যে দেখা হয়। আমার থেকে বয়েসে পাঁচ ছয় বৎসরের বড় হবে।
হেড স্যার লাল মিঞাকে জিজ্ঞেস করলেন- তোদের বাংলা ঘরে কেউ থাকে না-কি?
না, কেউ থাকে না। লাল মিঞা বললেন- কেন বলছেন?
আমাকে দেখিয়ে হেড স্যার বললেন- একে কিছুদিন তোদের বাড়িতে লজিং রাখতে হবে। এই ধর, পানী না শুকানো পর্যন্ত। রাখতে পারবি না?
আমার কোন অসুবিধে নেই। লাল মিঞা বললেন- দাদী বা কি বলে! দাদীর কাছে শুনে রাখা না রাখার কথা বলতে পারব।
হেড স্যার তখনও বিয়ে-সাদি করেন নি। তাই তিনি লাল মিঞাদের বাড়ির পাশেই হিমু বেপারির বাড়িতে লজিং থাকতেন। তিনি বললেন- তোকে কিছু বলতে হবে না। যা বলার আমিই বলব। এভাবে বলেই তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- কালই বই-পত্র নিয়ে এস। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
হেড স্যারের কথা মতোই আমি পরের দিন বই-পত্র নিয়ে লাল মিঞা ভাইদের বাড়ি এলাম। তাঁরা আমাকে সাদরেই গ্রহণ করলেন।
সেদিন থেকে লাল মিঞা ভাইদের বাড়িতে থাকতে লাগলাম। লাল মিঞা ভাইদের ছোট পরিবার। লাল মিঞা নিজে, তাঁর স্ত্রী, দাদী এবং ছোট একটি কোলের শিশু ছেলে। লাল মিঞা ভাইর পরিবার এবং তিনি নিজে আমার খুউব খেয়াল রাখতেন। আমি পড়তে বসলে লাল মিঞা ভাই চুপচাপ আমার পাশে বসে থাকতেন।
লাল মিঞা ভাইদের পূবের বাড়িতে হেলচা পামের শমসের আলী লজিং থাকত। শমসের আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম।আমাদের থেকে একটু দূরে লজিং থাকত সোণতলির আয়নাল হক। আয়নাল হক আমাদের চেয়ে এক ক্লাস নিচে পড়ত।লাল মিঞা ভাইদের বাড়ি জনীয়া কাদং রাস্তার পাশে ছিল। কাদং বাজারও ছিল একেবারে কাছে।দুই তিন মিনিটের রাস্তা। বিকেল বেলা স্কুল থেকে এসে আমরা রাস্তায় গিয়ে আড্ডা দিতাম।
শমসেরের লজিং বাড়িতে প্রায়ই ফকিরের বৈঠক বসত। ঢোল খোল বাজিয়ে গান করত।একদিন আমি শমসেরকে জিজ্ঞাসা করলাম- মাঝে মাঝেই তোমাদের বাড়িতে ঢোল-খোল বাজিয়ে গান করে কে?
শমসের বলল- অমুকের বউকে ভূতে ধরেছে। তাই ভূত তাড়াতে বৈঠক দেয়। আজও দিবে।
আমি বললাম- আমরা গেলে অসুবিধে হবে না-কি?
না, কি অসুবিধে হবে। শমসের বলল- গেলে খিচুরি খেতে পারবে।
আয়নালকে বললাম- চলো, আজ আমরা বৈঠকে যাব।
আয়নাল রাজি হয়ে গেল। সন্ধ্যেয় খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা বৈঠকে গেলাম।
ফকিরের নাম খেদিনা। টাপাজুলির লোক। সে আসন সাজিয়ে বসে রয়েছ। আমাদের দেখে আদর-সাদর করেই বসতে দিল।
সেখানে দেখলাম হেলচার কায়েমুদ্দিনও রয়েছে। আরও কয়েক জন ছাত্র ছিল। তাদের নাম এখন আমার মনে নেই। আমরা যে বৈঠকে যাব, সম্ভবতঃ কথাটা শমসের আলী প্রচার করে দিয়েছিলো। তাই হয়তো ছাত্ৰগুলোও বৈঠকে এসেছিলো।
ঢোল-খোল বাজিয়ে গান-বাজনা চলছে। কিছুক্ষণ পরে খেদিনা ‘ভার’ ( ভার এলে শরীর এবং মাথা জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে শরীর সঞ্চালন করা হয়।)এল। আমরাও বাজনার তালে তালে দোলতে লাগলাম। আমি সম্ভবতঃ একটু বেশি দোলে ছিলাম। কে একজন বলল- আবুলও ভার এল না-কি?
আমাকে ভার আসার মতো দেখা যাচ্ছে না-কি! তাহলে ভারই আসি। এভাবে মনে মনে ভেবেই আমি আরও জোরে জোরে আন্দোলিত করতে লাগলাম।
কায়েমুদ্দিন বলল- মনে হয়, সত্যিই ভার এসেছে।
কায়েমুদ্দিনের কথা শুনার সাথে সাথে ভার এলে কি ধরণের আচরণ করতে হয় সেই বিষয়ে ভাবতে লাগলাম। একবার বড় মামা জয়নাল আবদিনের পেটে বিষ হয়েছিল। তখন আমি খ-মানে পড়ি। আলীগাঁয় মোহন ফকির নামের একজন ফকির ছিল। সে ভার এসে রোগীর চিকিৎসা করত। মামার অসুখের জন্য মোহন ফকির মামাদের বাড়িতে বৈঠক বসিয়ে ছিল এবং ভার এসে মামার চিকিৎসা করেছিল। আমিও উপস্থিত ছিলাম সেই বৈঠকে। তাই মোহন ফকির তখন ভার এসে যে রকম আচরণ করছিল সে কথা আমার মনে ছিল। আমিও সেই রকম আচরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যত দূর সম্ভব সর্বশরীর জোরে জোরে আন্দোলিত করতে লাগলাম এবং বললাম- আন তেল। দে মাথায়।
কে একজন তেল এনে আমার মাথায় মৃদুভাবে চাপড়ে চাপড়ে দিত লাগল। আমি বললাম- এ ভাবে তেল দিলে হবে না। জোরে চাপড়ে চাপড়ে দে। আমার কথা শুনে জোরে জোরেই চাপড়ে চাপড়ে দিতে লাগল। যত জোরে চাপড়ে দিচ্ছে, আমি যেন ততই আরাম অনুভব করছি- ব্যথা পাচ্ছি না। আমি ভাবলাম, তেল মাথায় দিয়ে যত জোরেই চাপড়ানো হউক না কেন সম্ভবতঃ ব্যথা পাওয়া যায় না। তাই আমি ব্যথা পাচ্ছিনা। কথাটা বুঝতে পেড়েই বললাম- কি তেল মাখিস, আরও জোরে জোরে চাপড় মার।
আমার মাথায় চাপড়াতে চাপড়াতে সবাই ঘেমে গেল। তবুও আমি বলছি আরও জোরে জোরে চাপড় মার।
এতো জোরে জোরে চাপড়াচ্ছে তবু ব্যথা পাচ্ছি না। তাই সবার বিশ্বাস হয়ে গেল যে, আমি সত্যিই ভার এসেছি।
কে একজন আমার পেছনে বসেছিল। আমি সত্যিই ভার এসেছি কিনা, পরীক্ষা করার জন্য সে আমার পায়ের বৃদ্ধ আঙুল বেঁকে দিল। খুব ব্যথা পেলাম। এমনিতে হলে কেঁকিয়ে উঠতাম। ভার এসেছি এখন কেঁকানো চলবে না। তাই আমি বললাম- আমার কিছুই হবে না। ব্যথা পাবে তোদের গাছায়। আমার কথা শুনে সে আমার আঙুল ছেড়ে দিলো।
আমি শরীর ঝাঁকুনি দিতে দিতে বললাম- খেদিনা, তুই চিকিৎসা করিস, না খিচুরি খেতে আসিস?
আমার চোট-পাট দেখে খেদিনা তার ঝাঁকুনি বন্ধ করে বলল- সাহেব, আসছেন যখন আপনিই চিকিৎসাটা করুন। খুব শক্ত জিনিষ। আমি কথা মানাতে পারছি না।
আমি বললাম- ঠিক আছে। আমিই চিকিৎসা করব। তাহলে আন, রোগী আন।
রোগীনী এসে আমাকে ভক্তি দিল। আমি রোগিনীর পিঠে জোরে চাপড় মেরে বললাম- উঠ।
রোগিনী উঠে বসল।
আমি বললাম- খুব শক্ত জিনিষ কামাই করেছিস! (বাড়িটা চাউলখোয়া নদীর পাড়ে ছিল। তখন দু-চারজন লোকের বাইরে প্রায় সবাই নদীতে গোসল করত এবং নদীর জল খেতো। আমি জানি, নদীর জলই যখন পান করে, তখন সন্ধ্যে বেলা মাসে দু-চারদিন হলেও নদীর ঘাটে যায়।) তাই আমি বললাম- এক দিন সন্ধ্যে বেলা নদীর ঘাটে গিয়েছিলি? সত্যি কথা বলবি কিন্তু।
রোগিনী বলল- হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।
আমার দাম বাড়ানোর জন্য আমি বললাম- খুব শক্ত জিনিষ। আমার কথা মানবে না। আমি চলে যাই। খেদিনা, আমাকে ছেড়ে দে।
সবাই তখন জোর দিয়ে বলল- না, সাহেব। আপনি এসেছেন যখন আপনিই চিকিৎসা করতে হবে। রোগীনি খুব কষ্টে আছে।
আমি বললাম- খুব কষ্ট হবে। আচ্ছা, তোরা যখন ছাড়বি না, তখন কি আর করা যায়! কিন্তু ভোগ দিতে হবে। ভোগ ছাড়া যাবে না। খুবই শক্ত জিনিষ।
খেদিনা বলল- কি ভোগ দিতে হবে, সাহেব?
মনে গড়া কয়েক পদ জিনিষের কথা বললাম- দুধ, কলা এবং মিষ্টি ভোগ দিতে হবে এবং সোয়া পর বেলায় চালে উঠে আ-ধারালো কাঁচি দিয়ে ধারানি(জল প্রবাহিত করা) দিতে হবে। এ কাজগুলো খেদিনা করবে। আর আজ বাইচাদের মুরগ দিয়ে খিচুরি রেঁধে খাওয়াতে হবে। (খিচুরির কথা বলার সময় ভাবলাম, বাইচাদের আর ঠকাব কেন! ওদরেও পেট পূজা হয়ে যাক। খিচুরি রাধলে ওরা তো আর একা খাবে না, আমাকেও দিবে!)
খেদিনা বলল- আচ্ছা সাহেব,আপনার বিধান মতোই কাজ করব।
সব বিধান মেনে নেওয়ার পর আমি বললাম- খেদিনা আমাকে এখন ছেড়ে দে।গাছায় কষ্ট পাচ্ছে।
খেদিনা জল এনে আমার শরীরে ছিটিয়ে দিল। আমি শরীর ঝাঁকুনি বন্ধ করে ঢলে পড়লাম। খিচুরি রাঁধল। খেয়ে বাড়ি এলাম।
সেই ভারের পর্ব সেভাবেই শেষ হয়েছিল। তবে, রোগ সেরেছিলো। কথায় বলে না, বিশ্বাসে মিলিবে হরি, তর্কে বহুদূর!
কিছু দিন পরেই জল শুকাল। তখনও আব্দুল ভাইদের বাড়ি যাওয়া হয়নি। এর মাঝে একদিন আব্দুল ভাইর সাথে কাদং বাজারে দেখা হল। তিনি বললেন- আমাদের ভুলে গেলি না-কি? জল তো কখন শুকিয়েছে। বাড়ি যাবি না?
আসলে কিছুদিন পরেই টেষ্ট পরীক্ষা হবে। ইতিমধ্যে পরীক্ষার রুটিনও দিয়েছিল। তাই টেষ্ট পরীক্ষাটা আমি লাল মিঞা ভাইদের বাড়ি থেকেই দেব বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ লাল মিঞাদের বাড়ি থেকে স্কুল অনেকটা কাছে। দুই তিন মিনিটের পথ।
আমি বললাম- কয়েক দিন পরেই টেষ্ট পরীক্ষা হবে। টেষ্ট পরীক্ষাটা এখান থেকেই দেব, ভেবেছি। টেষ্ট পরীক্ষা দিয়েই তোমাদের বাড়ি যাব।
আব্দুল ভাই বললেন- ঠিক আছে। পরীক্ষা দিয়েই যাস তাহলে।
লাল মিঞা ভাইদের বাড়ি থেকেই টেষ্ট পরীক্ষা দিলাম। টেষ্টের পরে আর ক্লাস হবে না। তাই বাড়ি গেলাম। আব্দুল ভাইদের বাড়ি যাওয়া হল না। বাড়ি থেকে এসেই আব্দুল ভাইদের বাড়ি যাব, ভাবলাম।
কাদং হাইস্কুলে চার বৎসর
এতক্ষণ বললাম লজিং বাড়ির কথা। এখন বলি স্কুলের কথা। কাদং হাইস্কুলে আমি সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম এবং আমাদের শ্রেণীতে সম্ভবত ৩২ জন ছাত্র-ছাত্রী ছিল। আমার রোল নম্বর ছিল ২৯। তখন বংগীয় মূলের মুসলিম সমাজে ছেলেদের ক্ষেত্রে শিক্ষার নবজাগরণ সৃষ্টি হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে তখনও জাগরণ সৃষ্টি হয়নি। সমাজের মুখিয়াল শ্রেণীর দু-চারজন লোকেরা তখন নিজেদের কন্যা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতেন। আমাদের শ্রেণীতে ছাত্রী ছিল মাত্র দু’জন। নুরজাহান এবং লক্ষ্মী ঘোষ।নূরজাহানের বাবার নাম ছিলো লালচান গাঁওবুড়া এবং বাড়ি ছিলো বেঁকি নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত রসুলপুর গ্রামে। লক্ষ্মী ঘোষের বাবার নাম ছিলো ক্ষিতীশ পাগলা এবং বাড়ী ছিলো কাদং বাজারে। সম্ভবতঃ নবম শ্রেণী পাস করার পরে নূরজাহানের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল মন্দিয়া হাইস্কুলের কেরাণির সাথে। লক্ষ্মী ঘোষ আমাদের সাথে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল। তবে পাস করেছিল কি, করছিল না এখন মনে নেই।
আমাদের ক্লাসে ছাত্রের মধ্যে ছিল- শ্বেরমান আলী, দরবেশ আলী, আব্দুল জব্বার, মতিয়ার রহমান, হাসেন আলী, ইন্নছ আলী, আবুল হোসেন(মিতা), মোখতার আলী, মোকশেদ আলী, খোরশেদ আলী, মিজানুর রহমান,আব্দুস সোভাহান, আব্দুল কদ্দুস, নিরঞ্জন বিশ্বাস, তারিণী দাস প্রভৃতিরা । শ্রেণীতে প্রথম ছিল শ্বেরমান আলী, দ্বিতীয় দরবেশ আলী এবং তৃতীয় আব্দুল জব্বার। নিরঞ্জন এবং আমি অন্য স্কুল থেকে বদলি হয়ে এসেছিলাম। তাই আমাদের কোনো পজিশ্বন থাকার কথা নয়।নিরঞ্জন বিশ্বাস পশ্চিম দেউলদির কোন এক এম, ভি স্কুল থেকে বদলি হয়ে এসেছিলো।লজিং থাকত বাজারের হরিপদ ঘোষের বাড়িতে।তারিণী দাসদের বাড়ি ছিলো জনীয়া।
নতুন পরিবেশে প্রথমাবস্থায় আমি খুবই অস্বস্তি অনুভব করতাম। কারও সাথে পরিচয় নেই। স্যারদেরও কেউ আমাকে চেনেন না। এদিকে লজিং বাড়িতেও তেমন মন বসাতে পারছি না। আমি স্কুলে থাকলেও আমার মন পড়ে থাকত বাড়ি, আলীগাঁও এবং গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায়। তাই স্কুলে স্যারেরা কি পড়াচ্ছেন সেদিকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারতাম না। একমাত্র হাফিজুর রহমান স্যারের ক্লাসে কিছু গুরুত্ব দিতাম। কারণ হাফিজুর স্যারের কণ্ঠস্বর খুবই সাবলীল ছিল। কথাও ছিলো মিষ্টি। ছাত্রদের সাথেও সৌহৃদ্যপূর্ণ ব্যবহার করতেন। তাই আমি প্রথম থেকেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। তিনি পাঠগুলো এতই রসাল এবং সাবলীলভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে বাড়িতে এসে পড়ার বিশেষ প্রয়োজনই হতো না। আমাদের গণিত শেখাতেন শুকলাল কর্মকার স্যার। ইংরাজির প্রথম পেপার শেখাতেন আব্দুল লতিফ স্যার এবং দ্বিতীয় পেপার শেখাতেন আব্দুল হক স্যার। আব্দুল লতিফ স্যার আমাদের জাহানারপারেরই লোক ছিল এবং পরে বরপেটা সদরে উকালতি করে এখন মৃত্যু বরণ করেছেন। আব্দুল হক স্যার খুব সহজ-সরল ইংরাজি বলতেন। বুঝতে অসুবিধা হতো না। সে যাই হোক, কোনোমতে বৎসরটা পার করলাম। বাৎসরিক পরীক্ষা দিলাম। সেবার শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পাস করল নিরঞ্জন, দ্বিতীয় হল শ্বেরমান এবং তৃতীয় হল আব্দুল জব্বার। আমার রোল নম্বর হল ছয়। এক আনলাকি নম্বর। অশুভ সংখ্যা।
অষ্টম শ্রেণীতে উঠার পর লজিং বাড়ি বদল করলাম। লেখা-পড়ায় পূর্ণোদ্যমে মনোযোগ দিলাম। সেই বৎসরই তারেক হোসেন স্যার অংকের শিক্ষক হিসাবে স্কুলে যোগদান করলেন। তিনি আমাদের অংক শেখাতেন, আব্দুল মান্নান স্যার শেখাতেন বুরঞ্জী। মান্নান স্যার উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারি ছিলেন। তখন বুরঞ্জী দু’টি ভাগে ভাগ করে পড়ানো হত। ভারত বুরঞ্জী এবং ইংল্যাণ্ড বুরঞ্জী। মান্নান স্যারের ইংল্যাণ্ড বুরঞ্জী বলতে গেলে প্রায় মুখস্থ ছিল। কারণ তিনি বই খোলে পাঠ বের করে বই উল্টিয়ে টেবিলর ওপড় রেখে সাবলীলভাবে মুখস্থ আমাদের বুরঞ্জী বুঝাতেন। ইংরাজি শেখাতেন আব্দুল হক স্যার। মাঝেমধ্যে মনির উদ্দিন স্যারও আমাদের ইংরাজি শেখতেন আব্দুল হক স্যার অনুপস্থিত থাকলে। আব্দুল হক স্যারের সহজ-সরল ইংরাজি আমাদের ইংরাজির প্রতি খুবই আকর্ষণ করত। ফলে আমার ইংরাজির প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পেতে লাগল। আমাদের ভূগোল শেখাতেন আসান উদ্দিন স্যার। অসমিয়া শেখাতেন ধীরেন্দ্র নাথ দাস স্যার। তখন অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত হিন্দী শেখানো হতো। আমাদের হিন্দী শেখাতেন জয়নাল আব্দিন স্যার এবং এরাবিক শেখাতেন গোমাফুল বাড়ির সুরত জামাল হুজুর।
যন্মাষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। তখন যন্মাষিক পরীক্ষার পেপার মূল্যায়নের পরে ছাত্রদের দিয়ে দিতেন। আমি আঠটা বিষয়ের মধ্যে পাঁচটায় ‘হায়েষ্ট’ নম্বর পেলাম। ফলে শ্রেণীর সব ছাত্র-ছাত্রীরা আমার প্রতি আকর্ষিত হল। শিক্ষকরাও আমাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন। ফলে আমার শ্রেণীতে মন বসতে লাগল। পূর্বের অস্বস্তি ভাব দূর হল। লেখা-পড়ায় পূর্বের ছন্দ ফিরে এল। বাৎসরিক পরীক্ষা অনষ্ঠিত হলো। দুই নম্বরের জন্য আমি প্রথম হতে পারলাম না। আমি দ্বিতীয় হলাম এবং নিরঞ্জনই প্রথম হলো। আব্দুল জব্বার হলো তৃতীয়।
নবম শ্রেণীতে আমাদের ইংরাজি শেখাতেন আবুল কাশেম স্যার। তাঁর ইংরাজির ওপড়ে খুবই দখল ছিল। কিন্তু তিনি কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করতেন। সেজন্য অনেকের বুঝতে অসুবিধা হতো। তিনি আমাদের দ্বিতীয় পিরিয়ডে ইংরাজি শেখাতেন। আগের দিনে কাতি মাসে কলেরার প্রকোপ বৃদ্ধি পেত। কে মরে, কে বাঁচে কিছু ঠিক ছিল না। সেজন্যে কাতি মাস পার হলে সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলত। ভাবত, হয়তো আরও একটা বৎসর বাঁচতে পারব। আমাদের কাছেও কাশেম স্যারের পিরিয়ড কাতি মাসের মতই ছিল। স্যারের পিরিয়ড পার হলে আমরাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতাম।
কাশেম স্যারের পিরিয়ডের এক দিনের একটি ঘটনা বলি। সেদিন কাশেম স্যার শ্রেণী কোঠায় প্রবেশ করেই গুরু-গম্ভীর কণ্ঠে একটি ট্রেনসেলেশন জিজ্ঞাসা করলেন- ‘গরিবকে ভিক্ষা দেওয়া হয়।’ প্রশ্নটা প্রথমে কাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন এখন মনে নেই। প্রথম বেঞ্চের কেউ ট্রেন্সেলেশনটা বলতে পারল না। এমন কি নিরঞ্জন এবং শ্বেরমানও না। শ্বেরমান ইংরাজিতে ভালো ছিল। তার ইংরাজি ডিকশ্বনারি মুখস্থ ছিল বলে আমাদের মাঝে এক বদ্ধমূল ধারণা ছিল। তার প্রমাণও আমারা পেয়েছিলাম। আমরা লেইজার পিরিয়ডে মাঝেমধ্যে ওয়ার্ড মিনিং খেলতাম। সেখানে শ্বেরমানের পাল্লাই সব সময় ভারি থাকত।
এবার এলেন দ্বিতীয় বেঞ্চে। শ্রেণীকোঠা নীরব-নিস্তব্ধ। একেবারে ‘পিনড্রপ সাইলেণ্ট’। সেদিন সম্ভবতঃ আমি দ্বিতীয় বেঞ্চে মোখতার এবং ইন্নসের মাঝখানে বসে ছিলাম।(এই দু’জনের একজনও বর্তমান জীবিত নেই।) প্রথমে মোখতারকে প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করলেন। মোখতার মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল। আমার পালা পড়ল। আমার অবস্থা তখন কাহিল। ঘেমে গেছি। কোনো মতে উঠে দাঁড়ালাম। ট্রেনসেলেশনটা আমারও জানা ছিল না। তবে হ্যাঁ, ভিক্ষা শব্দের ইংরাজি আমার জানা ছিল। তাই মরণে শরণ দিয়ে বললাম- Alms are given to the Poor.’ট্রনচেলেশ্বনটা হল কি হল না, বলতে পারব না। কাশেম স্যার গুরু-গম্ভীর কণ্ঠে আমাকে বসতে বলল- ‘বস’।
আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। সেদিন থেকেই হয়তোবা আমি কাশেম স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম।
ক্লাস নাইনের বৎসর আমি একটি কাণ্ড করে ফেলেছিলাম। তার জন্যে হেড স্যার এবং আমি উভয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিলাম। স্কুল আওয়ার’ সাত পিরিয়ডে শেষ হয়। আমাদের স্কুলের চৌকিদার পেস্কার আলি প্রতিটি পিরিয়ড শেষে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে বেল বাজাত। যে কয়টা ক্লাস শেষ হত, বেলে সেই কয়টা টোকা দিত- ঢং ঢং……। সেদিন ষষ্ঠ পিরিয়ডের বেল বাজিয়ে সে হাতুড়িটা হাতে নিয়ে বেলের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। বেল বাজানোর পর কোন কোন ক্লাসে শিক্ষক গিয়েছেন, আবার কোন কোন ক্লাসে শিক্ষক যাননি। যাইতেছেন। আমাদের ক্লাসে তখনও শিক্ষক আসেন নি। আমি শিক্ষক আসার অপেক্ষায় শ্রেণী কোঠার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পেস্কারকে বেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি এগিয়ে গিয়ে তার কাছ থেকে হাতুড়িটা হাতে নিয়ে বললাম- পেস্কার ভাই, তুমি কেমনে বেল বাজাও? আমি বাজাতে পারব না?
পেস্কার আলী বলল- পারবে না কেন? বাজানো তো সোজা। এরকম ঢং ঢং করে বাজালেই হল। পেস্কার আলী হাতুড়িটা বেলের কাছে নিয়ে বাজানোর মুদ্রাটা করে দেখাল।
বিষম কালে হত বুদ্ধি। আমারও তাই হল। আমি কাল বিলম্ব না করে বেল বাজাতে লাগলাম। ঘন ঘন টোকা। ঢং ঢং ঢং! স্কুল ছুটির টোকা।
স্কুল ছুটি হয়েছে বলে শিক্ষকরা শ্রেণী কোঠা থেকে বেড়িয়ে এলেন। সাথে সাথে ছাত্ররাও বেড়িয়ে এল হইহুল্লোড় করে। আমি হতভম্ব! কি করলাম আমি? স্কুল ছুটি দিয়ে দিলাম নাকি? এখন কি হবে? এবার পিঠে বেতের সপাৎ সপাৎ কোপ পড়বে নিশ্চয়!
হেড স্যারের কমন রোমের সাথেই ছিল স্কুলের বেলটা। বেলের ঢং ঢং ছুটির শব্দ শুনে হেড স্যার বেড়িয়ে এলেন হন্তদন্ত হয়ে- কে, কে ছুটি দিল?
পেস্কার আলি আমাকে দেখিয়ে দিল। হেড স্যার কালবিলম্ব না করে সোজা এসে আমার কানে ধরলেন। কানে ধরলেন তো ধরলেনই। কিছুই বলছেন না। কিছুক্ষণ মৌন হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বললেন- বাপু, কি করলে তুমি? এমন কাজ আর করবে না। এভাবে বলেই আমার কাণ ছেড়ে দিয়ে পেস্কারকে বললেন- যাও। বল, স্কুল ছুটি হয়নি।
পেস্কার আলি ছাত্রদের ডেকে ডেকে বলতে লাগল- স্কুল ছুটি হয়নি। সবাই ক্লাসে যাও।
যারা স্কুলের বাউণ্ডারি(চৌহদ্দি)র ভেতরে ছিল তারা আবার ক্লাসে গেল আর যারা বাউণ্ডারির বাইরে গিয়েছিল তাদের দুই একজন ফিরে এল যদিও অনেকে ফিরে এল না।
তারপর থেকে স্কুলের বেলের পাশ দিয়ে যেতেও আমি সাতবার ভাবতাম।
আমাদের অসমিয়া শেখাতেন ধীরেন্দ্র নাথ দাস স্যার। অসমিয়ায় তাঁর খুবই দখল ছিল। মূল পাঠের সাথে সংগতি রেখে তিনি অনেক পৌরাণিক আখ্যান-উপখ্যান সাবলীলভাবে বলতেন। সেগুলো শুনে শুনে আমাদের পৌরাণিক আখ্যান-উপখ্যান সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছিল। অসমিয়া ভাষার প্রতি আগে থেকেই আমার কিছু আগ্রহ ছিল। আগেই বলেছি খ-শ্রেণীতে পড়ার সময় আমি হিতেশ ডেকার ভাড়াঘর উপন্যাস পড়েছিলাম। তখন থেকেই কোনো পুস্তক পেলেই আমি সাড়া রাত জেগে পড়তাম। আমাদের স্কুলে একটি লাইব্রেরি ছিল। অনেক পুস্তক ছিল সেই লাইব্রেরিতে। অসমিয়া বাংলা, ইংরাজি ভাষার পুস্তক। প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস প্রভৃতি। ধীরেন স্যারের সান্নিধ্যে এসে আমার বাহিরা পুস্তক পড়ার আগ্রহ অনেক গুণে বেড়ে গিয়েছিলো এবং আমি আমাদের স্কুল লাইব্রেরির বলতে গেলে প্রায় সব পুস্তকই পড়ে শেষ করেছিলাম। স্কুল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান ছিল সামেজ উদ্দিন স্যার। তিনিও আমাদের পুস্তক পড়তে উৎসাহিত করতেন। লাইব্রেরির গল্প উপন্যাস পড়ে আমি নিজেও গল্প কবিতা লেখার জন্য চেষ্টা করতাম। তখন বরপেটায় থিয়েটার এলে আমারা ছাত্ররা প্রায়ই দল বেঁধে গিয়ে সেই থিয়েটার উপভোগ করতাম।একবার বরপেটার সরকারী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সুরদেবী থিয়েটার দল নাটক প্রদর্শন করেছিলো।মূল নাটকের আগে তাঁরা একটি গীতি নাটিকা প্ৰদৰ্শন করেছিলন।সেই গীতি নাটিকায় ঘোষক খুব সাবলীল ও মধুর ভাষায় নাটিকার বিষয়বস্তুটুকু বর্ণনা করেছিলেন। সেই বৰ্ণনা শুনে আমি ভাষার মাধুৰ্যের প্রতি সচেতন হয়েছিলাম এবং আমি যতদূর সম্ভব ভাষা সাবলীলভাবে লিখার চেষ্টা করতাম।
পুস্তকের প্রতি থাকা আগ্রহের জন্যই হয়তো ১৯৬৯ সালে ছাত্ররা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমাকে ছাত্র একতা সভার আলোচনী সম্পাদক হিসেবে নিৰ্বাচিত করেছিলো।
সেবার আলোচনী বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক স্যার ছিলেন ধীরেন স্যার। আমি সম্পাদক থাকাকালীন ধীরেন স্যার বিদ্যালয়ের মুখপত্র হিসাবে একটি আলোচনী প্রকাশের চেষ্টা করেছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে গল্প কবিতাও সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু নানান অসুবিধার জন্য আমি সম্পাদক থাকাকালীন সেই আলোচনী প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। পরের বৎসর অর্থাৎ ১৯৭০ সালে তদানীন্তন আলোচনী সম্পাদক চান মিঞা সম্পাদক থাকাকালীন সেই আলোচনী প্রকাশ করা হয়েছিলো। আলোচনীর নাম ছিল ‘সাধনা’। সেখানে আমার ‘কুলি’ শীর্ষক একটি কবিতা এবং ‘আমার গল্প লেখার কাহিনী’ শীর্ষক একটি গল্প প্রকাশ হয়েছিলো। আমি সম্পাদক থাকাকালীন প্রচেষ্টা হাতে নেওয়ার জন্যই হয়তো ধীরেন স্যার আমার দু’টি লেখা প্রকাশ করেছিলেন। সেই দু’টিই ছিল আমার ছাপা অক্ষরে প্রথম গল্প ও কবিতা। পরে অসমের বিভিন্ন খবর কাগজে আমার অনেক প্রবন্ধ ও গল্প প্রকাশ হয়েছে এবং আমি আমেজও অনুভব করেছি, কিন্তু সেই প্রথম কবিতা এবং গল্প প্রকাশের আমেজ সত্যিই ভিন্ন ছিল!
ধীরেন স্যারের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর সাথে আমার সুসম্পর্ক ছিল। আমার প্রথম গল্পপুথি ‘এটি অভিশাপর মৃত্যু’ ২০০২ সালে অসম সাহিত্য সভার দ্বিতীয় মধ্যকালীন কলগাছিয়া অধিবেশনে প্রকাশ হয়েছিলো। গ্ৰন্থটি প্রকাশের আগে তিনি গল্পগুলো দেখে নানান পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি চিরদিন তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব। ধীরেন স্যারের মত শিক্ষকের সান্নিধ্যে না পেলে হয়তো আমার সাহিত্য জগতের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হতো না।
দশম শ্রেণীতে আমি প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। নিরঞ্জন হয়েছিল দ্বিতীয়। আব্দুল জব্বার তৃতীয়। লক্ষ্য করার মতো বিষয় যে, আব্দুল জব্বারকে কেউ তৃতীয় স্থান থেকে সড়াতে পারেনি। সপ্তম শ্রেণী থেকে সে দশম শ্রেণী পর্যন্ত তৃতীয় স্থান অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছিল। আব্দুল জব্বারের সাথে যেন আমার নাড়ির সম্পর্ক ছিল। ম্যাট্রিকে আমার রোল নম্বর ছিল ৪৩৫ এবং জব্বারের রোল নম্বর ছিল ৪৩৬। আমরা দু’জনে পরবর্তী জীবনে শিক্ষকতা করেছি। একটা এপইন্টমেন্ট লেটার (নিয়োগপত্র)-এই আমাদের দু’জনের নাম ছিল। দু’জনে রঙিয়া নিন্ম বুনিয়াদি বেসিক সেন্টারে একই বৎসর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। তখনও একটা এপইণ্টমেণ্ট লেটার-এই আমাদের দু’জনের নাম ছিল।
কথায় আছে, যার শেষ ভাল, তার সব ভাল। তবে আমার শেষ ভাল হয়নি।১৯৭১ সালে আমরা ২২ জন ছাত্ৰ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে ছিলাম। তার মধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে ছিলাম ১৬ জন। সেই পরীক্ষায় ৪৮৩ নম্বর পেয়ে নিরঞ্জন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিল এবং আমি ৪৭৬ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। মাত্র চার নম্বরের জন্য আমি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হতে না পারাটা আমার জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল। আসলে আমি একটু চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম এবং প্রায়ই প্রশ্ন নম্বর ভুল করতাম। এই প্রশ্ন নম্বর ভুলই হয়তো আমার প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার কলেজ জীবনও সুখের হয়নি।নিরঞ্জন কাদং হাইস্কুলের প্ৰথম প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস ছাত্র।
আমাদের সময়ে আমরা শিক্ষাগুরুদের ভগবানের পরেই স্থান দিতাম। তাঁদের আদেশ আমরা বেদবাক্য মনে করতাম। শিক্ষাগুরুদের পরেই আমরা জ্যেষ্ঠ ছাত্রদের স্থান দিতাম। তখনকার দিনে খুব কম লোকেই সাইকেল ব্যবহার করত। স্বচ্ছল লোকের দুই-চারজনে সাইকেল ব্যবহার করত। তাই আমরা দুই মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে যাওয়া-আসা করতাম। আজকালের মত তখন লংপেন্টের ব্যবহার ছিল না। এমন কি শিক্ষকরাও লংপেণ্ট ব্যবহার করতেন না। পায়জামা-পাঞ্জাবী ব্যবহার করতেন। মাঝে-মধ্যে ধীরেন স্যার, তারেক স্যার, আবুল কাশেম স্যার, আব্দুল হক স্যার এবং আব্দুস সাত্তার স্যার লংপেণ্ট পড়ে স্কুলে আসতেন। আব্দুস সাত্তার স্যার আমাদের গণিত এবং জ্যামিতি শেখাতেন। হেড মাষ্টার মণির উদ্দিন স্যারকে কোনো দিন লংপেণ্ট পড়তে দেখিনি। আমরা ছাত্ররা পায়জামা এবং চাইনিস সার্ট পড়ে স্কুলে যেতাম। মুসলিম ছাত্রীরা সাধারণ শাড়ী পড়ত এবং হিন্দু ছাত্রীরা ফ্রক পড়ে স্কুলে যেতো। আজকালের মত সোয়েটার এবং জোতার কথা আমরা কল্পনাই করতে পারতাম না। আমরা সাধারণতঃ হাওয়াই চপ্পল ব্যবহার করতাম, তাও স্কুলের জন্য নয়, শহরে যাওয়ার সময় ব্যবহার করার জন্য। হাওয়াই চপ্পল পড়ে স্কুলে যাওয়াটা আমরা অপরাধ মনে করতাম। বাড়িতে আমরা খরম ব্যবহার করতাম।
আমাদের স্কুলে মাঝেমধ্যে বিশেষ করে শনিবার দিন তর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। অষ্টম শ্রেণীতে প্রমোশন পাওয়ার পরে আমি প্রথম তর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে ছিলাম। প্রথম দিনের সেই অভিজ্ঞতার কথা এখনও আমার মনে দাগ কেটে আছে।
সেদিন তর্কের বিষয় ছিল- ‘বুদ্ধি এবং শক্তি’। আমি শক্তির স্বপক্ষে তর্কে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। স্কুলের প্রায়গুলো ছাত্র-ছাত্রী সেদিন সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল। প্রতিযোগিতা কে সঞ্চালনা করেছিলেন এখন সঠিক মনে নেই। স্যারেরা একজন একজন করে প্রতিযোগীর নাম ধরে ডাকছেন এবং নাম ডাকা প্রতিযোগী যুক্তি প্রদর্শন করছে। আমি দুরুদুরু বুক নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন আমার ডাক পড়বে। এক সময় আমার ডাক পড়ল। আমার বুকের স্পন্দন বেড়ে গেল। কম্পিত পদে আমি নির্দ্ধারিত জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বুকটা ঢপঢপ করতে লাগল। আমার মনে হল, সেই ঢপঢপ শব্দ যেন অনেক যোজন দূর থেকে শুনা যাবে। আমি যেন শূন্যে ভেসে আছি এমন ধারণা হল। আমার সামনে যেন কেউ নেই। আমি একা দাঁড়িয়ে আছি হলঘরে। ভাগ্য ভালো ছিল– আমি বিষয় বস্তু রচনার মত লেখে মুখস্থ করে গিয়েছিলাম। সাপের মন্ত্রের মত সেই রচনা গেয়ে গেলাম। এক সময় বেল বাজল। আমার যুক্তি প্রদর্শন শেষ হল। আমি আমার জায়গায় এসে বসলাম। সেদিন আমি সম্ভবতঃ তৃতীয় স্থান পেয়েছিলাম।
তারপর থেকে শনিবার এলেই তর্ক প্রতিযোগিতা হবে। হবে না এই বিষয়ে স্যারদের জিজ্ঞাসা করতাম। সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমি ১৯৬৯ সালের বার্ষিক অধিবেশনের তর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথমস্থান অধিকার করেছিলাম। তর্কের বিষয় ছিল ‘সিনেমার উপকারিতা এবং অপকারিতা।’ আমি উপকারিতার স্বপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেছিলাম। সেদিন মুখ্য অতিথির আসন অলংকৃত করেছিলেন মাধব চৌধুরী মহাবিদ্যালয়ের প্রবক্তা ইব্রাহিম আলী স্যার। তিনি আন্তঃকলেজ তর্ক প্রতিযোগিতায় একবার প্রথম হয়েছিলেন। তিনি একবার রাজ্যিক শিক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। এখন তিনি বরপেটা বার এছোচিয়েশ্বনের উকিল। তিনি পুরস্কার বিতরণ করেছিলেন। তিনি আমার হাতে পুরস্কার প্রদানের সময় বলেছিলেন- ‘তুমি সিনেমার উপকারিতা সম্পর্কে অনেক যুক্তিই প্রদর্শন করেছ। তাই বলে বেশি বেশি সিনেমা দেখ না য়েন। কিছু কিছু ভালোর মাঝে কিছু খারাপও প্রচ্ছন্ন থাকে।’ বক্তব্য হয়তো হুবহু এমন ছিল না, কিন্তু ভাবধারা ঠিক এ রকমই ছিল।
দশম শ্রেণীতে উঠার পর আমাদের ইংরেজি এবং ভূগোল পড়াতেন মণির উদ্দিন স্যার। অংক পড়াতেন আব্দুছ ছাত্তার স্যার। অসমিয়া পড়াতেন ধীরেন স্যার।
নবেম্বর মাসে আমাদের টেষ্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হল। আগেই বলেছি, টেষ্ট পরীক্ষা আমি লাল মিঞা ভাইদের বাড়ি থেকেই দিয়েছিলাম। টেষ্টের পর বাড়ি গেলাম। বাড়িতে কিছুদিন থাকার পর রেজাল্ট দেখতে এলাম। আমি প্রথম হয়ে প্রথম বিভাগেই উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। নিরঞ্জন দ্বিতীয় হয়েছিল। সে প্রথম বিভাগ পেয়েছিল কি না এখন মনে নেই।
রিজাল্ট দেখার পর সেদিন রাতটা আমি আব্দুল ভাইর বাড়িতেই কাটিয়েছিলাম। পরের দিন ভেড়ার পাম এলাম রায়চান মামাদের বাড়িতে। রায়চান মামাকে আগেই বলা ছিল তাঁদের বাড়িতে লজিং থাকব বলে। তাই তিনি আমার জন্য রোম ঠিক করে রেখেছিলেন। রোম দেখে সেদিনই আবার আব্দুল ভাইদের বাড়ি এলাম। রাত আব্দুল ভাইদের বাড়িতেই কাটালাম। সকাল বেলা লাল মিঞা ভাইদের বাড়ি এলাম। তাঁদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে বই-পত্র নিয়ে সেদিনই আবার রায়চান মামাদের বাড়িতে এলাম। আমাদের পরীক্ষা মার্সের ২৯ তারিখ থেকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষার দু’দিন আগে বরপেটা গিয়ে খবর পেলাম, পূর্ব পাকিস্থানে(বর্তমান বাংলাদেশ) যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তাই ২৯ তারিখে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এপ্রিলের ১৯ তারিখ থেকে। ভেড়াগাঁও থেকে আমরা কয়েকজনে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। তারা সবাই আমার মতো লজিং ছিল। সবার নাম এখন মনে নেই। বাবর আলীর নাম মনে আছে। বাবর আলী গড়লা-চাচরা এম, ই মাদ্রাসায় পড়ার সময় আমার সহপাঠী ছিল। আমরা হেঁটে হেঁটে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলাম।
পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি গেলাম। কয়েক দিন বাড়িতে থেকে আলীরপাম মামাদের বাড়ি এলাম।
আমি ১৯৭১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম। সে বৎসর সারা আসামে মুঠ পরীক্ষার্থী ছিল ৭৮০০৭ জন। তার মাঝে নিয়মীয়া পরীক্ষার্থী ছিল ২২,৭৩৩ এবং প্রাইভেট পরীক্ষার্থী ৫৫, ২৭৪ জন। নিয়মীয়া পরীক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হয়েছিল ৫৮.২৫ শতাংশ এবং প্রাইভেট পরীক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হয়েছিল ২৩.৪১ শতাংশ। এক্সপেল হয়েছিল ১২ জন। প্রথম ষ্ট্যাণ্ড করে ছিল টিহু হাইস্কুলের খগেন শর্মা। তিনি আসামের ডিজিপি হয়ে অবসর নেওয়ার পরে মৃতুবরণ করেছেন। তখন আমরা কামরূপ জেলার বাসিন্দা ছিলাম। মহকুমা ছিল তিনটা- গুয়াহাটী, নলবারী এবং বরপেটা। আমরা বরপেটা মহুকুমা থেকে সে বৎসর কতজন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম সঠিক তথ্য জানা নেই, অনুমান ২২০০ জন অবতীর্ণ হয়েছিলাম। প্রথম বিভাগ পেয়েছিল ২১ জনে।
আলীরপাম বাজারে তখন ফয়জল মামা একটি গুমটির দোকান দিয়েছিলেন। তেল, মরিচ, সাবান, বিড়ি, সিগারেট বিক্রী করতেন। পরীক্ষা দিয়ে মামাদের বাড়ি যাওয়ার পর আমি রাতে সেই দোকানে থাকতাম।
তখন আমার ছেলেবেলার সঙ্গী চান্দু অনেক বদলে গেছে। সে বিয়ে করেছে। আমি তার সাথে মিশতে চাইলেও সে আমাকে বেশি গুরুত্ব দিতো না। তাই তখন আমার সংগী হলো আলী হোসেন। আলী হোসেন আব্দুল হামিদ ডাক্তারের ছেলে। সে তার বাবার সঙ্গে থেকে ঔষধ বিক্রী করত এবং সাইকেল মেরামত করত। সে রাতে তাঁদের দোকানে ঘুমাত। আমি ঘুমাইতাম মামার দোকানে। তার সাথে থেকে বিড়ি খাওয়া শিখলাম। বাজারে বিকেল বেলা ‘মেরিজ’ খেলা হতো। কেউ কেউ ব্রিজ খেলত। আমি কিছু কিছু মেরিজ (তাসখেলা)খেলা খেলতে শুরু করলাম। প্রথম প্রথম কোনো প্লেয়ার না থাকলে খেলার সুযোগ পেতাম। কয়েক দিন খেলার পরে ভালোভাবেই শিখে ফেললাম। খেলাটা নেশার মত হয়ে গেল। খেলা খেলতে না পাড়লে ভাল লাগত না। তাই নিয়মিত ভাবেই খেলতাম।
কোনো কোনোদিন আমি প্রাইমারিতে অধ্যয়ন করা আলী গাঁও স্কুলে যেতাম। তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন ওমর আলী স্যার। তিনি ভেল্লার রাধাকুছির লোক ছিলেন। স্কুলে অনেক ছাত্র ছিল। কিন্তু শিক্ষক ছিলেন তিনি একা। তাই স্কুলে গেলে আমাকে ক্লাস নিতে বলতেন। আমি ক্লাস নিতাম। ছাত্ররাও আমাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করত। যেদিন স্কুলে যেতাম সেদিন সময়টা ভালো ভাবেই কেটে যেতো। সন্ধ্যে বেলা বাজারে ছানা সাহা, নিতাই সাহা এবং সূর্য সাহার দোকানে রেডিওতে আমরা পূর্ব পাকিস্থানের যুদ্ধের খবর শুনতাম। শ্বেখ মজিবুরের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনে আমরা সবাই অভিভূত হতাম।একদিন আলীগাঁও বাজারে রাতে মাণিকপুরের যশু খাঁর যাত্রাদলের আলোমতি গীতিনাট্য অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেদিন অনুমান রাত এগারটায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেডিওতে বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। সেই বক্তৃতা শুনার জন্য গানের মঞ্চের সমস্ত দৰ্শক গানের মঞ্চ ছেড়ে নিতাই সাহার দোকানে গিয়ে ভিড় করেছিলো।আমরা সর্বদায় বাঙ্গালীদের বিজয় কামনা করতাম।
আমাদের পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছিলো ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের এগারো তারিখে। তখন রেজাল্ট খবর কাগজে প্রকাশ করত। আমি এবং সিরাজ মামা রেজাল্ট দেখতে বরপেটা এলাম। সেদিন সম্ভবতঃ আমরা মন্দিয়াতে বাস না পেয়ে হেঁটে হেঁটে বরপেটা এসেছিলাম। তাই বেলা হয়ে গিয়েছিল। ভকতপাড়ার লক্ষ্মীনাথ বেজবড়ুয়া লাইব্রেরীতে রেজাল্ট দেখলাম। দ্বিতীয় বিভাগ। রেজাল্ট দেখে আমার মন খারাপ হল। মামারও একই অবস্থা। সেদিন রাতে আমরা বরপেটার কালু খানের হোটেলে রাত কাটালাম। সেদিন খুবই গরম পড়েছিল। তাই আমরা ডাইনিং হলে তিন চারটে বেঞ্চ একত্রিত করে ফেনের নিচে মামা ভাগ্নে এক সাথে শোয়েছিলাম। পরদিন বাড়ির দিকে রওনা হলাম। কাদং যাব ভেবেছিলাম। রেজাল্টের অবস্থা দেখে কাদং যাওয়া হল না।
আমি বরপেটার মাধব চৌধুরী মহাবিদ্যালয়ে প্রাক্ বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণীতে বিজ্ঞান শাখায় নাম ভর্তি করেছিলাম। কলেজ শিক্ষা আমি সমাপ্ত করতে পারি নি। কলেজ শিক্ষা সমাপ্ত না করেই সাংসারিক এবং চাকরি জীবনে প্রবেশ করি। পরবর্তীতে সে বিষয়ে লেখার আশা রইল।
সমাপ্ত

বাঘবর পাহাড়
