
সমাপ্তি নয়— নতুন পথচলা শুরু
(একটি সামাজিক–প্রেমের উপন্যাস)
প্রথম অধ্যায় : অভাবের ঘর
অসমের এক প্রত্যন্ত গ্রাম। গ্রামের নাম চরাইমারি। গ্রামের নামটি মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু প্রকৃতির বুকের মধ্যে অবস্থিত গ্রামের সৌন্দর্যের অভাব ছিল না। গ্রামের পূর্বদিকে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, পশ্চিমে একটি সরু নদী, উত্তরে ঘন বাঁশঝাড় আর দক্ষিণে ছিল মাটির রাস্তা ধরে কয়েক মাইল দূরের সাপ্তাহিক হাট। বর্ষাকালে নদীর জল ফুলে ফেঁপে উঠত, মাঠের শস্য, আলগুলো ডুবে যেত, আর কাঁচা রাস্তায় হাঁটুসমান কাদা জমত। শীতের সকালে ঘাসের ডগায় শিশির জমে থাকত মুক্তোর মতো। সন্ধ্যা নামলে দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, আর গ্রামের ঘরগুলোতে একে একে জ্বলে উঠত কেরোসিনের কুপি।
সেই গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে, একটি পুরোনো বাঁশবনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট একটি মাটির ঘর। ঘরের কাশবনের দেয়াল মাটি দিয়ে লেপা, ছাউনি শুকনো খড়ের। সামনের উঠোনে একটি নিমগাছ, পাশে ভাঙা বেড়া, আর পেছনে সামান্য জমি—সেখানে বর্ষাকালে শাকসবজি ফলানোর চেষ্টা করেন রহিমের বাবা।
এই ঘরেই জন্মেছিল রহিম।
রহিমের বাবা আবদুল মজিদ পেশায় একজন কৃষক। পেশায় কৃষক হলেও তাঁর তেমন জমি ছিলনা। ভিটে-বাড়ি সমেত মাত্র বিঘা চারেক জমি ছিল তাঁর। সেই জমিগুলোও ছিলো নিচু, যার অর্ধেক বর্ষায় জলের নিচে চলে যেত। বাকি জমিতে ধান ফলালেও পরিবারের সারা বছরের খাবার জুটত না। ফসল ঘরে তোলার আগেই কখনো বন্যা, কখনো পোকামাকড়, কখনো ঋণের বোঝা সেই সামান্য আয়টুকু গ্রাস করত।
ধানের মৌসুম শেষ হলে মজিদ অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতেন। কখনো বাঁশ কাটতেন, কখনো মাটি কাটতেন, কখনো দূরের হাট থেকে ধানের বস্তা মাথায় করে বয়ে আনতেন। সারাদিন পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেন ক্লান্ত শরীরে, হাতে সামান্য কয়েকটি টাকা নিয়ে।
রহিমের মা আমেনার জীবনও ছিল সংগ্রামে ভরা। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তিনি ঘুম থেকে উঠতেন। উঠোন ঝাড়ু দেওয়া, রান্নার জন্য চাল ধোয়া, স্বামীর খাবার তৈরি করা, তারপর অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যাওয়া—এই ছিল তাঁর প্রতিদিনের জীবন। ধান ভানা, বাসন মাজা, গোয়াল পরিষ্কার করা কিংবা ধান কাটার মৌসুমে মাঠে ধান কাটার কাজ করা— যখন যে কাজ পেতেন সেই কাজই করতেন তিনি। কোনো কাজকেই তিনি ছোট করে দেখতেন না।
তাঁর নিজের জন্য আলাদা কোনো চাওয়া ছিল না। বহুদিন ধরে তিনি একটি নতুন শাড়ি কেনার ইচ্ছা মনে পুষে রেখেছিলেন। কিন্তু ছেলের বই কেনার দরকার হলে সেই ইচ্ছা চাপা পড়ত। কখনো চাল ফুরিয়ে গেলে, কখনো বাবার ওষুধের প্রয়োজন হলে, নিজের সামান্য সঞ্চয়টুকুও তিনি সংসারের জন্য খরচ করে ফেলতেন।
রহিম তখন ছোট। কিন্তু অভাবের সংসারে বড় হওয়া শিশুরা বয়সের আগেই অনেক কিছু বুঝতে শেখে। সে জানত, মা নিজের থালায় কম ভাত বাড়ে, যাতে ছেলের পাতে একটু বেশি দেওয়া যায়। সে জানত, বাবা বাজার থেকে ফিরে ক্লান্তিতে বিছানায় শুয়ে পড়লেও পরদিন ভোরে আবার কাজে যাবেন। সে আরও জানত, তাদের ঘরের কোনো জিনিস নষ্ট হলে সেটি ফেলে দিয়ে নতুন জিনিস কেনার সামর্থ্য নেই। তাই ব্যবহারের অনুপযোগী জিনিসও ব্যবহারের উপযোগী করে চালাতে হয় জোড়া-তালি দিয়ে।
তবু রহিমের মনে দুঃখের চেয়ে স্বপ্নই ছিল বেশি।
ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি তার অদ্ভুত টান ছিলো। অন্য ছেলেরা যখন বিকেলে নদীর ধারে খেলতে যেত, রহিম কখনো তাদের সঙ্গে খেলতে যেতনা। সে বাড়ির ঘরের কোণে বসে পুরোনো বইয়ের পাতা উল্টাত।বাজার থেকে মরিচ কিনে বেঁধে আনা কাগজ ফেলে না দিয়ে মনযোগ গিয়ে পড়ত সে। কোনো বইয়ের মলাট ছিঁড়ে গেলে সে কাগজ দিয়ে সেই ছিঁড়া মলাট জুড়ে রাখত। খাতার পাতা শেষ হয়ে গেলে ফাঁকা জায়গাগুলোতে ছোট ছোট অক্ষরে লিখে নিত নতুন পাঠ।কারণ সে জানত, তাদের অভাবের সংসার। খাতা কিনতে গেলে হয়তো তার মাকে একবেলা উপোষ থাকতে হবে।
স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক একদিন তার বাবাকে ডেকে বললেন- মজিদ ভাই, তোমার ছেলেটার মাথা খুব ভালো। পড়াশোনায়ও খুব আগ্রহ। কষ্ট হলেও ওকে পড়াশোনা করিও। সুযোগ পেলে ও অনেক দূর যেতে পারবে।
মজিদ কথাগুলো শুনে গর্ব অনুভব করছিলেন। কিন্তু সেই গর্বের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বুকের মধ্যে একরাশ দুশ্চিন্তাও জমেছিল। পড়াশোনা করানোর খরচ তিনি কোথা থেকে জোগাড় করবেন? সাড়ে তিন পাকির মতো আবাদী জমি। তারও অর্ধেকটা বর্ষায় জলের নিচে থাকে। জমির ধান থেকে দুবেলা পেট ভরে খাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে, তাই তাঁকে লোকের জমিতে কাজ করতে হয়। লোকের ভার বইতে হয়। কখনও কখনও মাটিও কাটতে হয়। সেখানে ছেলের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা কি বিলাসিতা নয়?
সেদিন রাতে ভাত খাওয়ার পর মজিদ দীর্ঘক্ষণ উঠোনে বসে ছিলেন। আকাশে আধখানা চাঁদ। বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে বাতাস এসে তাঁর মুখে লাগছিল।
আমেনা এসে পাশে বসে বললেন- এত মগ্ন হয়ে কী ভাবছ একলা একলা উঠোনে বসে?
মজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন-কষ্ট হলেও মাস্টার সাহেব রহিমকে পড়াতে বলেছেন। ছেলেটা নাকি পড়াশোনায় খুব ভালো।
মজিদের কথা শুনে আমেনার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি অনুভব করলেন, বুকটাও যেন অনেকটা ফুলে উঠেছে। তিনি নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করে সাধারণ গলায় বললেন- সে তো ভালো কথা। ছেলে পড়াশোনায় ভালো। একথা যখন মাস্টার সাহেব বলেছেন, তখন নিশ্চয়ই ভালো। এতে চিন্তার কী আছে?
বলছ চিন্তার কিছু নেই।পড়াশোনা তো আর এমনই এমনই হয়না। পড়াশোনা করতে খরচ লাগে। তা খরচটা দেব কোথা থেকে? এদিকে আমাদের গ্রাম থেকে হাইস্কুলটা তো অনেক দূরে। প্রাইমারী পাস করলেই এম, ই। এম, ই পাস করলেই তো ওকে হাইস্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে।
আমেনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীর গলায় বললেন- গরিবের ঘরে জন্মেছে বলে ছেলেটার কী স্বপ্ন থাকতে নেই? আল্লাহ যদি ওকে মেধা দিয়ে থাকেন, আমরা কি শুধু অভাবের কথা ভেবে তার সেই মেধা নষ্ট করব?
মজিদ স্ত্রীর দিকে তাকালেন। আমেনার চোখে ক্লান্তি ও সামান্য হতাশা ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তির গভীরে ছিল অদ্ভুত দৃঢ়তা।
কিন্তু খরচের কথাও তো ভাবতে হবে। মজিদ অসুবিধার কথা জনালেন- নুন আনতে পান্তা ফুরোয় আমাদের। এদিকে এম, ই পাস করলেই তো ওকে হাইস্কুলে ভর্তি হতে হবে। হাইস্কুলও তো অনেক দূরে। তিন চার মাইল তো হবেই। তাই সব সময় বাড়ি থেকে যাওয়া সম্ভব হবে না। কোথাও লজিং থাকতে হবে। কে লজিং রাখবে গরিবের ছেলেকে!
আগে পাসটাতো দিক। আমেনা বললেন-পাস করার পর তখন দেখা যাবে। আমার মন বলছে ফল ভালো হলে তখন লজিং বাড়ির অভাব হবে না। ফল ভালো হলে তখন অনেকেই লজিং রাখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করবে। শুনেছি, গোবিন্দপুরের কোনও কোনও গৃহস্থ বোলে দুই তিনটা করেও লজিং রাখে।
তুমি ভুল শোননি। মজিদ বললেন- তা অবশ্যে রাখে।
তাহলে এতো চিন্তা করছেন কেন? রহিমের জন্য লজিঙের ব্যবস্থা নিশ্চয় হবে।
মজিদ আর কোনো কথা বললেন না। সেদিনকার আলোচনা সেখানেই শেষ হলে।
পরের দিন থেকে রহিমের পড়াশোনার জন্য নতুন সংগ্রাম শুরু হলো। পুরোনো বই সংগ্রহ করা হলো, স্কুলের শিক্ষকদের কাছে সাহায্য চাওয়া হলো, আর সংসারের খরচ থেকে সামান্য সামান্য টাকা বাঁচিয়ে রাখা হতে লাগল। আমেনা নিজের প্রয়োজন আরও কমিয়ে দিলেন। কখনো দুপুরে শুধু লবণ ভাত খেয়েই তিনি কাজে বেরিয়ে যেতে লাগলেন।
রহিম অবশ্যে এসব কথা জানত না। কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হতো, এই মানুষটির কাছে সে ঋণী। এমন ঋণ, যা কোনোদিন টাকা দিয়ে শোধ করা যাবে না।
রহিম একদিন স্কুল থেকে ফিরে সে দেখল, মা উঠোনে বসে পুরোনো একটি শাড়ি সেলাই করছেন। শাড়িটির জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। রহিম মায়ের পাশে বসে বলল- মা, তোমার একটা নতুন শাড়ি দরকার। এবার ঈদের আগে কিনতে হবে।
আমেনা কিছু বললেন না। শুধু হাসলেন।
মার হাসি দেখে রহিম বললো- হাসো আর যাই কর, এবার ঈদে তোমাকে নতুন শাড়ি কিনতেই হবে।
আমার শাড়ি এখনও চলে যাবে। তুই বরং ভালো করে পড়াশোনা কর।
কিন্তু তোমার শাড়িটা তো অনেক পুরোনো।
পুরোনো হলেই কি সব ফেলে দিতে হয়, বাবা?
রহিম উত্তর দিতে পারল না। কী উত্তর দিবে সে! সে তো আর রোজগার করতে পারে না। যখন রোজগার করতে শিখবে তখন মাকে সে ছেঁড়া শাড়ী পরতে দিবে না।
আমেনা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন- মানুষের জীবনে কাপড়ের চেয়েও বড় জিনিস আছে। তুই যদি লেখাপড়া শিখে ভালো মানুষ হতে পারিস, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ হবে। সেই আনন্দের কাছে শাড়ী তো তুচ্ছ কথা।
সেদিন অবশ্যে রহিম মায়ের কথার গভীর অর্থ বুঝতে পারেনি। কিন্তু কথাগুলো তাকে ভাবিয়ে তুলেছিলো।
বছরের পর বছর কাটতে লাগলো। সময় তার নিজস্ব গতিতে এগোতে লাগল। আশা করামতেই রহিম এম,ই স্কুলের শেষ পরীক্ষায় ভালো ফল করল।
শিক্ষকেরাও তাকে ভালোবাসতেন। কোনো ছাত্র অঙ্ক বুঝতে না পারলে রহিমকে ডেকে তার পাশে বসিয়ে দিতেন। তখন সে ধৈর্য ধরে সেই ছাত্রটিকে অঙ্ক বুঝিয়ে দিতেন। নিজের পড়া শেষ করার পর অন্যের পড়ায় সাহায্য করতে তার ভালো লাগত।
এম, ই স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার কয়েকদিন আগে প্রধান শিক্ষক তাকে রাস্তায় পেয়ে বললেন- তোমার রিজাল্ট অনেক ভালো হয়েছে। ভালোভাবে পড়াশোনা করলে তুমি অনেক দূর যেতে পারবে। তা তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?
রহিম এক মুহূর্তও দেরি করল না। বললো- স্যার, আমি শিক্ষক হতে চাই।
শিক্ষক প্রশ্ন করলেন-কেন? শিক্ষক হতে চাও কেন? শিক্ষকের চেয়েও তো অনেক বড় বড় চাকরি রয়েছে।
আমি চাই, আমাদের গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনা করুক। শুধু টাকার অভাবে আমাদের গ্রামের কাউকে যেন স্কুল ছেড়ে দিতে নাহয়।
প্রধান শিক্ষক তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন- তাহলে তোমাকে অনেক দূর যেতে হবে, রহিম। শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না, সেই স্বপ্নের জন্য পরিশ্রমও করতে হবে। চাওয়া যত বড় হবে, পরিশ্রমো তত বড় করতে হবে।
রহিম মাথা নাড়ল। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক আলো জ্বলজ্বল করে উঠল।
কিন্তু তার সামনে যে পথ, তা মোটেই সহজ ছিল না। এখন তাকে হাইস্কুলে ভর্তি হতে হবে।। সেখানে যাওয়ার খরচ, বইপত্র, পোশাক, থাকার ব্যবস্থা—সবই ছিল তার জন্য এক একটি বড় বাধা।
এম, ই স্কুলের শেষ পরীক্ষার পরে রহিম তার গ্রামেরই এক ছাত্রের কাজ থেকে হাইস্কুলের একটি ইংরেজির বই যোগার করেছিল। সেই রাতেই রহিম ঘরের এক কোণে সেই বইটি নিয়ে বসেছিলো। কেরোসিনের কুপির আলো বারবার বাতাসে কেঁপে উঠছিল। বাইরে বাঁশবনে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মা রান্নাঘরের কাজ শেষ করে এসে দেখলেন, ছেলেটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছে।
তিনি কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তাঁর মনে হলো, এই ছোট্ট ঘরের মধ্যে বসে থাকা ছেলেটির স্বপ্ন হয়তো একদিন এই গ্রামের সীমানা পেরিয়ে যাবে। হয়তো একদিন সে এমন একটি পৃথিবী দেখবে, যেখানে তাকে আর দারিদ্র্যের কাছে মাথা নত করতে হবে না।
আমেনা নিঃশব্দে কাছে এসে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
রহিম মুখ তুলে তাকাল। বললো- কী হয়েছে, মা?
কিছু না, এমনি। পড়।
কুপির কালি দড়িতে ঝুলানো জামার ওপড়ে পরছিল। আমেনা একটি ছেঁড়া কাপড় দিয়ে জমাটা ঢেকে দিয়ে বললেন-কুপির কালি পরে জামাটা ময়লা হচ্ছিল। ঢেকে দিলাম। এখন আর ময়লা হবেনা। ঘরের চালেও অনেক কালি জমেছে। একদিন সময় করে ঝেড়ে দিতে হবে।
রহিম বললো- চূড়ার মতো করে একটি বাঁশের চাক বানিয়ে চাকটায় কাপড় পেঁচিয়ে চিমনির মতো করে কুপির ওপড়ে ঝুলিয়ে দিতে হবে। তখন কালি কিছুটা হলেও কম পরবে। বেশির ভাগ কালি কুপির ওপর ঝুলানো কাপড়ের চিমনির ওপরে পরবে।
একদিন সময় বুঝে করে নিস। এভাবে বলে আমেনা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে প্রার্থনা করলেন—ছেলেটির স্বপ্ন যেন কোনোদিন ভেঙে না যায়।
বাঁশবনের ওপারে তখন রাত আরও গভীর উঠেছে। কিন্তু রহিমের ছোট্ট ঘরে কুপির আলো তখনও টিমটিম করে জ্বলছে।সেই আলোর সাথে সাথে ডানা বাঁধছে রহিমের আগামি দিনের স্বপ্ন।
দ্বিতীয় অধ্যায়
চরাইমারি গ্রামের মানুষের কাছে উচ্চবিদ্যালয় ছিল এক দূরের পৃথিবী। গ্রামের এম, ই স্কুলের পড়া শেষ করার পর অধিকাংশ ছেলেই বাবার সঙ্গে মাঠে কাজে নামত। কেউ গরু চরাত, কেউ ধান কাটত, কেউ বাজারে ছোটখাটো কাজ করত। মেয়েদের মধ্যে খুব কম জনই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেত। পরিবারের অভাব, দূরের পথ এবং সামাজিক রীতিনীতির কারণে অনেকের পড়াশোনা অল্প বয়সেই থেমে যেত। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্বপ্নও থেমে যেত।
রহিমের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
একদিন সন্ধ্যায় আবদুল মজিদ মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে উঠোনে বসে পায়ের কাদা ধুইছিলেন। সারাদিন অন্যের জমিতে উবু হয়ে কাজ করার ফলে তাঁর কোমর ব্যথা করছিল। আমেনা তখন চুলার পাশে বসে ভাত রান্না করছিলেন।
মজিদ বললেন- রহিমের পরীক্ষার ফল খুব ভালো হয়েছে। এখন তাকে হাইস্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে। কাল পরীক্ষার রিজাল্ট দিবে। রহিমকে স্কুলে যেতে বলেছে।আজ বাড়ি ফেরার সময় মাস্টার সাহেবের সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। তিনি বলে দিয়েছেন আমাকে কথাটা।
আমেনা চুলা থেকে মুখ তুলে তাকালেন।
-তা স্কুলে রিজাল্ট ঘোষণার আগেই মাস্টার মশায় তোমাকে বলে দিলেন রিজাল্টের কথা।
দিলেন। মাস্টার মশায় খুব খুশি রিজাল্ট দেখে। বললেন,স্কুল সৃষ্টির পর এই প্রথম এতো ভাল রিজাল্ট হয়েছে। এখন রহিমকে হাইস্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে।
তা হলে দাও ভর্তি করে।
মজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন- ভর্তির টাকা, বই, খাতা, পোশাক—সব মিলিয়ে বেশ কিছু টাকা লাগবে। তার ওপর স্কুলটা দূরে। প্রতিদিন যাতায়াত করাও সহজ হবে না।
আমেনা আঁচল দিয়ে হাত মুছে স্বামীর পাশে এসে বললেন-কত টাকা লাগবে?
মজিদ একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক বললেন।
সেই অঙ্কটি শুনে আমেনার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তাঁদের ঘরে তখন চাল কেনার টাকাও ঠিকমতো ছিল না। ধান উঠতে এখনও কয়েক মাস বাকি। মহাজনের কাছে আগের ঋণও শোধ হয়নি।তাই অঙ্কটা শুনে আমেনার মাথায় চক্কর মারল।
কিন্তু তিনি নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করলেন না।
-কোনো ব্যবস্থাতো করতেই হবে, তিনি বললেন।
সেই রাতেই আমেনা ঘরের পুরোনো কাঠের বাক্সটি খুললেন। বাক্সে ছিল কয়েকটি পুরোনো কাপড়, বিয়ের সময় পাওয়া একটি ছোট্ট রুপোর দুলের জোড়া, আর কাপড়ে মোড়ানো কিছু খুচরো পয়সা। ওই দুল দুটি ছাড়া নিজের বলতে আর কিছুই ছিল না তাঁর।
তিনি দুল দুটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কত যে অভাবের দিন কেটেছে! সেই সময়ও তিনি দুল দুটি বিক্রি করেননি। ভেবেছিলেন, জীবনের কোনো কঠিন দিনে হয়তো কাজে লাগবে।
আজ সেই দিন এসে গেছে।
পরের দিন রহিম স্কুল থেকে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল। সে বললো-মা, আজ রিজাল্ট দিয়েছে। আমি পাস করেছি। খুব ভালোভাবেই পাস করেছি। মাস্টার সাহেব বলেছেন, এবার আমাকে হাইস্কুলে ভর্তি হতে হবে।”
আমেনা তার মুখের দিকে তাকালেন।
তুই পড়তে চাস?
খুব চাই, মা।
তাহলে তুই নিশ্চয় পড়বি।
রহিম ইতস্তত করে বলল- কিন্তু টাকা?
আমেনা ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর উঠে গিয়ে মাচা থেকে বাক্সটা বের করে এনে ছেলের সামনে রাখলেন। বাক্সটা অনেকদিন বের করা হয়নি। তাই অনেকটা ময়লা জমে ছিলো। সেদিন রাতে বের করেছিলেন যদিও তখন ঝাড়া হয়নি। বাক্সটা ঝেড়ে সাফ করে খুলে তিনি দুটি দুল বের করলেন। তারপর দুল দুটি রহিমের দিকে বাড়িয়ে বললেন- ধর, এই দুল দুটি বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রী করে দে।
রহিম অবাক বিস্ময়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো- তারপর?
বিক্রি করে যে টাকা পাবি সেই টাকা দিয়ে স্কুলে ভর্তি হবি।
রহিম যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।বললো-না, মা! এগুলো তোমার। আমি কী করে নেব?
আমেনা ছেলের হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিলেন। বললেন-মায়ের জিনিস সন্তানের কাজে লাগবে না তো কার কাজে লাগবে?
“কিন্তু তুমি এগুলো বিয়ের সময় পেয়েছিলে—
হ্যাঁ বিয়ের সময় পেয়েছিলাম। আমাদের বিয়ের চার বছর পর আসামে এনআরসি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। বিয়ের সময় আমার বয়েস ছিলো সতের বছর। আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর পর তোর জন্ম। শুধু এক মাসের জন্য এনআরসিতে তোর নাম উঠেনি। তখন রূপার দাম ১ টাকা ভরি ছিলো। দুল দুটি পাঁচ আনির। দুল দুটি বানাতে তখন খরচ পরেছিলো ছয় আনা। তখন ছয় আনা মানে অনেক টাকা। দশ পনের টাকা হলে তখন আমাদের এলাকায় এক পাকি জমি কেনা যেত।
তাহলে তো দুলটা তোমার খুব শখের?
তাবলে কী হলো? এখন তোর দর্কার। জিনিস দুটো সৎ কাজে লাগবে- অসৎ কাজে তো নয়!। মায়ের কথা তোকে ভাবতে হবে না। এখন আমার এই দুলের প্রয়োজন নেই। দুল পরার বয়েসও নেই আমার। বাক্সে পরে থাকার চেয়ে এখন তোর পড়ার কাজে লাগবে।এটা দুলজোড়ার সৌভাগ্যই বলতে পারিস।
রহিমের চোখ ভিজে উঠল। সে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল- আমি একদিন তোমাকে অনেক ভালো রাখব, মা। আমি বড় হলে তোমাকে কোনোদিন অন্যের বাড়িতে কাজ করতে দেব না।
আমেনা মৃদু হেসে বললেন- আমার জন্য বড় কিছু করার দরকার নেই। তুই শুধু মানুষ হবি। মানুষ হয়ে মানুষের কষ্ট বুঝতে পারলেই আমি ধন্য হব।
রহিম দুল দুটি নিয়ে বাজারে এল। দোকানদার দাম বলার সময় সে বুঝতে পারল, মায়ের গয়নার মূল্য বাজারের হিসাবে খুব বেশি নয়। কিন্তু সেই সামান্য টাকার মধ্যে লুকিয়ে আছে তাঁর কত বছরের স্মৃতি, কত ত্যাগ আর কত প্রত্যাশা!
টাকা নিয়ে পরের দিনই সে গোবিন্দপুর গিয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হলো।
ভর্তির পর প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার সময় সকালে আকাশটা মেঘলা ছিলো। আমেনা ভোরে উঠে ছেলের জন্য ভাত রান্না করলেন। আলু ভৰ্তা ভাত। পুরোনো কাপড় ধুয়ে শুকিয়ে বালিশের তলে রেখে দিয়েছিলেন; ছেলেকে সেই কাপড় বের করে দিয়ে আমেনা বললেন- বালিশের তলে রেখে দিয়েছিলাম। ইস্ত্রির মতো হয়ে আছে। মন্দ হবেনা।
রহিম মায়ের দেওয়া কাপড় দেখে বললো- খুব সুন্দর হয়েছে, মা। একেবারে নতুনের মতো দেখা যাচ্ছে।
রহিম কাপড় পরে নিলেন। তার পায়ে নতুন জুতো ছিল না। আর তখন গ্রামের ছাত্রদের জুতা পরার নিয়মও ছিলনা। ছাত্রদের সবাই তখন খালী পায়েই স্কুলে যেতেন। তাই সেও খালি পায়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় এসে রহিম একবার পেছনে তাকাল। আমেনা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সাবধানে যাস, বাবা- আমেনা ডেকে বললেন।
মেঠো পথ। রহিম মাথা নেড়ে মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল।
রাস্তার দুপাশে তখন ধানক্ষেত। দূরে সাদা বকের দল খাদ্যের সন্ধানে জমিতে নেমেছে। বৃষ্টির জল পেয়ে বেরিয়ে আসা পোকা-মাকড় খাচ্ছে বকের দল।মাঠটা যেন সাদা চাদরে ঢেকে রয়েছে এমনটাই অনুমান হলো রহিমের।
বর্ষার আগের বাতাসে মাটির ছোডা গন্ধ। রহিম বুক ভরে শ্বাস টেনে হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে সে মনে মনে ভাবলো, এই পথ একদিন তাকে কোথায় নিয়ে যাবে?
তার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। শুধু তার মনে একটি দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো—যত কষ্টই হোক, সে পড়াশোনা ছাড়বে না। সে পড়বে। সে এগিয়ে যাবে। পিতা-মাতার মুখে সে হাসি ফোটাবে। গ্রামের মানুষের মুখ সে উজ্জ্বল করবে।
সে স্কুলে পৌঁছে দেখল, অন্য ছাত্রদের অনেকের গায়ে পরিষ্কার পোশাক, পায়ে জুতো, হাতে নতুন ব্যাগ, নতুন বই। নিজের পুরোনো ব্যাগটির দিকে তাকিয়ে তার একটু সংকোচবোধ হলো। কিন্তু ক্লাস শুরু হওয়ার পর তার সেই সংকোচ আর রইল না।
শিক্ষক তার নাম জিজ্ঞেস করলেন।
রহিম দাঁড়িয়ে উত্তর- রহিম, স্যার।
কোথা থেকে এসেছ?
চরাইমারি থেকে, স্যার।
চরাইমারি!সেতো অনেক দূর। কমেও পাঁচছয় মাইল হবে। এত দূর থেকে প্রতিদিন আসবে?
জি, স্যার।
শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন- মন দিয়ে পড়াশোনা করো। তোমার মধ্যে সম্ভাবনা আছে। তোমাদের হেড স্যার, আমার বিশেষ বন্ধু, তিনি আমায় বলেছেন তোমার। মন দিয়ে পড়াশোনা করলে অনেক দূর যেতে পারবে।
প্রথম দিনের ক্লাস। ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে পরিচয় পর্ব সেড়ে নিলো। অবশ্যে রহিমের সাথে কেউ তেমন ভাব বিনিময় করল না। হয়তো তার কাপড়ের অবস্থা দেখেই কেউ তেমন উৎসাহবোধ করল না তার সাথে পরিচয় হতে। রহিমও যেচে গিয়ে কারও সাথে পরিচয় হতে ভরসা পেল না।যদি কেউ তাকে পাত্তা না দেয়, তখন খুব খারাব লাগবে তার। তার থেকে একা থাকাই ভালো। রবীন্দ্র নাথের ভাষায়- যদি তোর ডাক শোনে কেউ না আসে, তবে একলা চলোরে-একলা চল, একলা চল, একলা চলোরে-
অবশ্যে তার পাশে বসা ছেলেটা তার সাথে ভাব বিনিময় করলো।ছেলেটির পোশাক-আশাকও তার মতোই পুরোনো। অবশ্যে পায়জামা নতুন। ছেলেটা খুবই নম্র ও ভদ্র। খুব কম কথা বলে। বাড়ি কোথায়, বাড়িতে কে কে আছে। এরকমই ছোট ছোট প্রশ্ন করলো সে রহিমকে। রহিম যথাযথ উত্তর দিলো তার প্রশ্নের। রহিমও তাকে অনুরূপ কয়েকটি প্রশ্ন করলো। ছেলেটিও তার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলো। রহিম বুঝতে পারলো। ছেলেটিও তার মতোই গরিব ঘরের। তার প্রাইমারির সহপাঠি মতিনও ভর্তি হয়েছিলো তার সাথে একই ক্লাসে। তারা তিনজনই সেদিন বসেছিলো একই বেঞ্চে। মতিনর বাড়ির অবস্থাও তেমন ভালো নয়। তবে তাদের থেকে কিছুটা স্বচ্ছল।
তাদের শ্রেণিতে শুধুমাত্র একটি মেয়ে ছিলো। মেয়েটি ছিলো সেই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাশালী ব্যক্তিত্ব হাজি করিম সাহেবের। মেয়েটি অবশ্যে খুবই লাজুক প্রকৃতির এবং বোরখা পড়া ছিল। মেয়েটি কারো সাথে কথা বলল না। কথা বলার সুযোগও ছিল না মেয়েটির। সে শিক্ষকদের সাথে ক্লাসে ঢোকে এবং শিক্ষকরা বেরিয়ে যাওয়ার আগেই সে ক্লাস থেকে বেড়িয়ে যায়। তাই তার সাথে কারো আলাপ করা কোনো সুযোগ ছিল না। অবশ্যে শ্রেণি শিক্ষক রহিমকে প্রশংসা করা সময় মেয়েটি তার দিকে কয়েক মুহূর্তের জন্য অপলক নয়নে চেয়ে ছিল। সেই চাওয়ার মধ্যে আকর্ষণ ছিল. না বিকর্ষণ ছিল তা বুঝার উপায় ছিল না।
বিদ্যালয়ের ছাত্রদের চালচলন দেখে অবশেযে রহিম ভাবলো, প্রাচুর্য দিয়ে নয়, তাকে মেধা দিয়ে সবার মন জয় করতে হবে। এভাবে মনকে সান্ত্বনা দিয়ে সে সেদিনের ক্লাস শেষ করল।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় রহিমের পা ব্যাথায় টনটন করছিল। তবু তার মনে আনন্দ। সে জানত, আজ সে শুধু একটি স্কুলে ভর্তি হয়নি; সে নিজের স্বপ্নের পথে প্রথম বড় পা ফেলেছে। পথ অবশ্যেই পিচ্ছিল হবে, তবু তাকে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ জীবনে চলার পথে বাধা-বিপত্তি আসবেই, সেগুলি সে সাবধানে অতিক্রম করে যেতে হবে। যতই বাধা আসুক না কেন, দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তাকে সেই বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হবে।
বাড়ি ফিরে সে মাকে সব কথা খোলে বলল। আমেনা ছেলের মুখে আনন্দ দেখে নিজের ক্লান্তি ভুলে গেলেন।
শিক্ষকেরা কেমন?
ভালো, মা। একজন স্যার বলেছেন, আমি ভালো করতে পারব। তিনি আমাদের হেড স্যারের বন্ধু।
আমেনা হাসলেন।
তাহলে তাঁর কথাটা মনে রাখিস। তবে ভালো ফল করলেই হবে না, সেই সাথে ভালো মানুষও হতে হবে।”
রহিম মাথা নাড়ল। বলল- আমি চেষ্টার ত্রুটি করব না, মা। তবে আমার চেষ্টার সাথে তোমাদের আশীর্বাদো দর্কার হবে, মা।
আমেনা ছেলের মাথায় হাত ফিরিয়ে বললেন- আমাদের আশীর্বাদ সব সময় তোমার সাথে থাকবে, বাবা। তবে গুরুজনের প্রতি সব সময় অটল ভক্ত রেখে চলবে। শিক্ষকদের কথার অবাধ্য কোনোদিন হয়োনা।
সেই রাত থেকে তার জীবনে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। ভোরে উঠে বাড়ির ছোটখাটো কাজে বাবাকে সাহায্য করা, তারপর স্কুলের জন্য বেরিয়ে পড়া। দুপুরে স্কুলের বিরতিতে বাড়ি থেকে আনা খাবার খাওয়া। বিকেলে ফিরে আবার পড়াশোনা করা। বিদ্যুৎ না থাকায় কেরোসিনের কুপির আলোয় রাত জেগে পড়া।
মাঝে মাঝে তার বন্ধুরা মাঠে খেলতে ডাকত। রহিমও খেলতে চাইত, কিন্তু বই খুললেই তার মনে পড়ত মায়ের রুপোর দুলের কথা। সেই স্মৃতি তাকে আবার পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনত- তাকে পড়তে বসতে বাধ্য করত।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে তার বন্ধু মতিন বলল- তুই এত পড়িস কেন? একটু আরাম কর। জীবনটা কি শুধু বইয়ের জন্য?
রহিম হাসল। সে বলল- আমাদের মতো গরিবের জন্য বইই তো সবচেয়ে বড় ভরসা। গরিবের জন্য আরামতো শুধু বিলাসিতা।
তবু শরীর ফিট রাখার জন্য খেলাধূলারও তো প্রয়োজন আছে।
এই যে দৈনিক বার মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে যাওয়াআসা করছি, এটাই আমাদের শরীর ফিট রাখার জন্য যথেষ্ট নয় কি!
মতিন কথাটা শুনে চুপ করে গেল। সে জানত, রহিমের কথার মধ্যে কোনো অহংকার নেই। আছে বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য।
কয়েক মাস কেটে গেল। ষাণ্মাসিক পরীক্ষা দিল। পরীক্ষার পর একমাস গরমের বন্ধ। গরমের বন্ধের পর শিক্ষকরা পরীক্ষার পেপারগুলো ফেরত দিলেন। রহিম সব কয়টা বিষয়েই হায়েষ্ট নম্বর পেলো। প্রধান শিক্ষক তাকে সামনে ডেকে প্রশংসা করলেন। সহপাঠীরা হাততালি দিল।
বাড়ি ফেরার পথে রহিমের মনে হচ্ছিল, সে সুখবরটা মাকে জানানোর জন্য ছটফট করতে লাগলো।
বাড়িতে পৌঁছে সে দেখল, তার মা উঠোনে ধান শুকাচ্ছেন। রহিম দূর থেকেই চিৎকার করে বলল- মা, আমি সব কয়টি বিষয়েই হায়েষ্ট নম্বর পেয়েছি।
আমেনা হাতের কাজ ফেলে ছেলের কাছে ছুটে এলেন।
সত্যি বলছিস?
হ্যাঁ, মা! পরীক্ষার পেপারগুলো ফেরত দিয়েছেন। এই দ্যাখ। এই বলে রহিম পেপারগুলি মায়ের সামনে মেলে ধরলেন।
তার মা লেখাপড়া না জানলেও নম্বর চিনতেন। তিনি নিজ চোখে নম্বরগুলো দেখে খুশী হলেন।
তিনি ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন। তাঁর চোখে জল এসে গেল।
বললেন-আল্লাহ তোকে ভালো রাখুন, বাবা।
রহিম মায়ের কাঁধে মুখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, পৃথিবীতে এমন কিছু আনন্দ আছে, যা কোনো পুরস্কার বা টাকার অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না।
কিন্তু তার সামনে তখনও দীর্ঘ পথ। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করতে হবে, তারপর কলেজে যেতে হবে। আর সেই পথের প্রতিটি ধাপে অপেক্ষা করছে নতুন খরচ, নতুন বাধা।
রহিম জানত না, তার জীবনের সেই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে তাকে একদিন এমন একটি বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে, যেখানে সে পাবে নতুন পৃথিবীর পরিচয়—আর এমন এক ভালোবাসা, যা তার জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দেবে।
সেই বাড়িটি ছিল গ্রামের সবচেয়ে বিত্তশালী মানুষ হাজি করিম সাহেবের।
আর সেই বাড়িতেই থাকত সায়রা। এই সায়রাই ছিল রহিমের ক্লাসমেট।
তৃতীয় অধ্যায়
চরাইমারি গ্রামের বাজার থেকে প্রায় পাঁচ ছয় মাইল দূরে ছিল গোবিন্দপুরের উচ্চবিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়টির চারদিকে খোলা মাঠ, পেছনে পুকুর, সামনে একটি পুরোনো বটগাছ। স্কুলের টিনের চাল বর্ষাকালে বৃষ্টির শব্দে মুখর হয়ে উঠত। ছাত্ররা খুব হর্ষোচ্ছ্বাস হয়ে উপভোগ করত সেই ঝমঝম শব্দ। শীতের সকালে কুয়াশা সরতে দেরি হলে ছাত্ররা মাঠে দাঁড়িয়ে রোদ ওঠার জন্য অপেক্ষা করত। মেয়েরা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলেদের দুষ্টুমি উপভোগ করত।
রহিমের বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব অনেক বেশি ছিলো। প্রতিদিন এতটা পথ হেঁটে যাওয়া, ক্লাস শেষে আবার ফিরে আসা, তারপর বাড়ির কাজে সাহায্য করা—সব মিলিয়ে তার পড়াশোনা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। বর্ষাকালে রাস্তা ডুবে গেলে স্কুলে পৌঁছানো আরও দুরূহ হয়ে পড়ত। কখনো হাঁটুসমান কাদা পেরোতে হতো, কখনো ভাঙা সাঁকোর ওপর দিয়ে সাবধানে নদীর ছোট শাখাটি পার হতে হতো।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে স্কুলে পৌঁছাতে গিয়ে রহিমের বইখাতা ভিজে গেল। ক্লাসে বসে সে বইয়ের পাতা শুকানোর চেষ্টা করছিল। শিক্ষক বিষয়টি লক্ষ্য করলেন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন- রহিম, স্কুল থেকে তোমার বাড়ি কত দূরে?
-প্রায় পাঁচ ছয় মাইল হবে, স্যার।
-এতটা পথ প্রতিদিন যাতায়াত করো?
-জি।
-কীভাবে? হেঁটে?
-জি স্যার, হেঁটে।
-এভাবে কতদিন পারবে? তোমার তো খুব কষ্ট হয় দেখছি।
রহিম মাথা নিচু করল। বলল- কষ্ট হলেও উপায় নেই, স্যার।
-সাইকেল নিয়ে আসাযাওয়া করলেই তো পার।
আমরা খুব গরিব। নুন আনতে পান্তা ফুরায় এই অবস্থা আমাদের। সাইকেল কিনব কোথা থেকে?
শিক্ষক মশায় কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন- তোমার থাকার একটা ব্যবস্থা করা দরকার। তোমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে সেটা খুবই দুঃখের বিষয় হবে।
সেই শিক্ষকই ছিলেন রহিমের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সহায়। তিনি জানতেন, ছেলেটির মেধা আছে, পরিশ্রম করার ক্ষমতা আছে; শুধু দরকার একটু সুযোগ।
কয়েক দিন পর শিক্ষক রহিমকে কমন রূমে ডেকে নিয়ে বললেন- তোমার জন্য একটা ব্যবস্থা হতে পারে। গ্রামের হাজি করিম সাহেবের বাড়িতে ফাই-ফরমাশ শোনার জন্য লোকের প্রয়োজন। তুমি চাইলে, সেখানে তোমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হতে পারে। তখন তুমি স্বচ্ছন্দে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে।
রহিমের মনে একসঙ্গে আনন্দ ও সংকোচ দেখা দিল।
-আমি কি পারব, স্যার?
-কেন পারবে না? কাজ তেমন কিছু নয়। শুধু ফাই-ফরমাশ শোনতে হবে। কেন, তোমার পরিশ্রম করতে আপত্তি আছে?
-না, স্যার। মোটেই আপত্তি নেই। বাড়িতে আমার সব রকম কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। হালচাষ থেকে শুরু করে সব রকম কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আমার।
-না না, হালচাষ করতে হবেনা। শুধু ফাই-ফরমাশ শোনলেই হবে। তাহলে আমি কথা বলে দেখি। হাজি সাহেব দরিয়াদিল লোক। এ ব্যাপারে তিনি তোমাকে নিশ্চয় সহায় করবেন।
হাজি করিম সাহেব ছিলেন গ্রামের একজন প্রভাবশালী ও স্বচ্ছল গৃহস্থ। তাঁর বাড়ি গ্রামের অন্য বাড়িগুলোর চেয়ে আলাদা ছিল। টিনের দোতালা ঘর, বড় উঠোন, আলাদা রান্নাঘর, ধানের গোলা, গোয়ালঘর, পুকুর—সব মিলিয়ে বাড়িটি একটি ছোটখাটো জমিদার বাড়ির মতো ছিল। রাখাল-চাকর দিয়ে বাড়িটি সব সময় সরগরম হয়ে থাকত।
তিনি যদিও জমিদার ছিলেন না, তবু গ্রামের মানুষ তাঁকে সম্মান ও সমীহ করে চলত। বাজারে তাঁর ধানের ব্যবসা ছিল, কয়েক শ বিঘা জমি ছিল, আর গ্রামের নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর মতামতের যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল।
শিক্ষক একদিন বিকেলে রহিমকে সঙ্গে নিয়ে সেই বাড়িতে গেলেন।
বাড়ির সামনে লোহার বড় গেট। গেট পেরিয়ে উঠোনে ঢোকতেই রহিমের চোখে পড়ল, একপাশে কয়েকটি গরু বাঁধা, অন্যদিকে বারান্দায় ধানের বস্তা সাজানো। বাড়ির লোকজন নিজেদের কাজে ব্যস্ত। কেউ উঠোনে ধান ঝাড়ছে, কেউ রান্নাঘরে কাজ করছে, কেউ বাজার থেকে আনা জিনিসপত্র গোছাচ্ছে।
করিম হাজি সাহেব বারান্দায় বসে ছিলেন। তাঁর পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। শিক্ষককে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মাস্টার সাহেব সালাম জানালেন।
হাজি সাহেব সালামের উত্তর দিয়ে বললেন- আসুন, মাস্টার সাহেব। কী খবর? কী মনে করে এলেন?
শিক্ষক রহিমের দিকে ইশারা করে বললেন- এই ছেলেটির জন্য এসেছি। সেদিন আপনাকে এই ছেলেটির কথাই বলেছিলাম। খুবই মেধাবী ছেলে। এম, ই পাস করে আমাদের স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে।নবম শ্রেণির ষাণ্মাসিক পরীক্ষায় তাদের শ্রেণিতে সে প্রতিটি বিষয়ে হায়েষ্ট নম্বর পেয়েছিল এবং এইবার বার্ষিক পরীক্ষায় সে ক্লাসে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। স্কুল থেকে এদের বাড়ি প্রায় পাঁচ ছয় মাইল দূরে। চরাইমারি। গত বছর সে দৈনিক হেঁটেই আসা-যাওয়া করেছে। এইবার ক্লাস নাইনে প্রমোশন পেয়েছে। সেজন্য লেখাপড়ার চাপ অনেকটা বেড়েছে। ফলে এতদূর থেকে আসা-যাওয়া করলে লেখা-পড়ার অনেক ক্ষতি হবে। তাই আপনার বাড়িতে যদি থাকার ব্যবস্থা হয়, তাহলে ছেলেটার খুব উপকার হবে।
করিম সাহেব রহিমের দিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-তোমার নাম কী বাপু?
রহিম করিম সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল- রহিম, চাচা।
কোন ক্লাসে পড়ো?
নবম শ্রেণিতে।এইবার প্রমোশন পেয়েছি।
ছেলেটা পড়াশোনায় কেমন? শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন করিম সাহেব।
শিক্ষক মশায় উত্তর দিলেন- আগেই তো বলেছি। পড়াশোনায় খুব ভালো। সুষোগ পেলে আরও ভাল করতে পারবে।
করিম সাহেবের মুখে সামান্য সন্তুষ্টির হাসি ফুটল। বললেন- ভালো কথা। তবে আমাদের বাড়িতে থাকলে কিছু ফাই-ফরমাশ শোনতে হবে। ভোরে উঠে নামাজ পড়তে হবে। প্রয়োজনে বাজার থেকে জিনিস কিনে আনতে হবে। পুকুর থেকে মাছও ধরতে হবে প্রয়োজন হলে। বিনিময়ে থাকা-খাওয়া পাবে। স্কুলে যাওয়ার সময়ও দেওয়া হবে।পড়ার সময় কেউ ডিষ্টার্ব করবে না। যদি করে আমাকে বলবে।
রহিম মাথা নাড়ল। বলল- জি চাচা। আমি সব কাজ করব। শুধু পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে চাই।
করিম সাহেব বললেন- সেটা তোমার ওপর নির্ভর করবে। তবে কাজ ফেলে শুধু বই নিয়ে বসে থাকলে চলবে না।
শিক্ষক কথাটি শুনে একটু অস্বস্তি বোধ করলেও কিছু বললেন না। তিনি জানতেন, দরিদ্র পরিবারের একটি ছেলের জন্য এই সুযোগটুকুও অনেক বড়।
সেদিনই রহিমের থাকার ব্যবস্থা হলো।
বাড়ির পেছনের দিকে একটি ছোট একটি ঘর ছিল। ঘরটিতে পুরোনো খাট, একটি কাঠের টেবিল আর একটি চেয়ার রাখা ছিলো। ঘরের পেছনে বাঁশঝার ছিলো। বাঁশঝারের পাশ দিয়ে একটি ব্যস্ত রাস্তা দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিক বরাবর চলে গেছে। ঘরের জানালা দিয়ে সেই রাস্তা এবং বাঁশঝাড়ের একাংশ দেখা যায়। রহিমের কাছে ঘরটি ছিল প্রায় রাজপ্রাসাদের মতো। নিজের বাড়িতে সে মাটির মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুমাত; এখানে তার জন্য আলাদা খাট রয়েছে, বই রাখার টেবিল রয়েছে। কাপড় রাখার জন্য ছোট একটা আলনাও রয়েছে ঘরটিতে। বাড়িতে সে কুপির আলোতে পড়ত। রহিম দেখল, এক কোণে একটি হারিকেনও রয়েছে। কুপিটা সে আনেনি। হারিকেন কেনার জন্য টাকা এনেছে। পাঁচ টাকা। তিন কুরি আন্ডার মূল্য। যাহোক হারিকেনটা পেয়ে ভালই হলো। পাঁচ টাকা দিয়ে সে তার দর্কারী বইখাতা কিনতে পারবে।
রাতে খাবার খেতে বসে রহিম কিছুটা সংকোচবোধ করল। বাড়ির অন্য লোকেরা আলাদা জায়গায় বসে খাচ্ছিলেন, আর রহিমকে খাবার দেওয়া হলো রান্নাঘরের পাশে রাখালদের সাথে। তবু সে কিছু মনে করল না। তার কাছে খাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণঁ না, তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
খাওয়া শেষে সে নিজের ঘরে ফিরে বই খুলল। কিন্তু নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ, অচেনা মানুষের উপস্থিতি— সব মিলিয়ে তার মন বসছিল না। মনটা কেমন যেন হাহাকার করছিল। বাড়ি থেকে এই প্রথম তার একা কোনো অপরিচিত জায়গায় রাত্রিযাপন। সে বই সামনে নিয়ে বসে পড়ার চেষ্টা করল যদিও বইয়ে মন বাসাতে পারছিল না। বারে বারে তার বাড়ির কথা মনে পড়ছিলো। তার মা এখন কী করছেন। নিশ্চয়ই তার কথা ভাবছেন। ছোট ভাই আমিনও নিশ্চয় তার মাকে তার কথা জিজ্ঞেস করে করে ব্যতিব্যস্ত করছে। তার বয়েস এখন সতের। এই সতের বছরে সে কয়েকবার নানাদের বাড়ি গিয়েছে। তার বাইরে কোথাও সে একা রাত কাটায় নি। এই প্রথম সে বাড়ি থেকে অপর কোনো লোকের বাড়িতে রাত কাটানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রাইমারিতে পড়া পর্যন্ত সে মা-বাবার সাথে এক বিছানায় শোয়েছে। হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর ঘরের এক পাশে পাথালি বরাবর কাশাবনের বেড়া দিয়ে তার জন্য আলাদা ছোট একটি রূম বানিয়ে দিয়েছিলো। সেখানে সে একা থাকত।একা থাকলেও কোনোদিন তার মনে কোনোরূপ ভয় সঞ্চার হয়নি। কারণ গৃহ একটাই ছিলো।শুধু একটি কাশবনের বেড়ার ব্যবধান ছিলো দুই রূমের মাঝখানে। কিন্তু আজ তাকে একাই থাকতে হবে আস্ত একটি গৃহে। তাই তার মনে একটু ভয়ভাবো ক্রিয়া করছিল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
রহিম, তুমি কি শোয়ে পরেছ?
রহিম দরজার দিকে তাকাল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একটি মেয়ে। খোলা মুখ, পরনে সাধারণ তাঁতের মোটা শাড়ি, হাতে কয়েকটি বই। মুখে কৌতূহল, চোখে এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস।
রহিম উঠে দাঁড়াল।
বলল-জি।
মেয়েটি বলল- আমাকে চিনতে পারনি। আমি সায়রা। এই বাড়ির মেয়ে। তোমার ক্লাসমেট।
রহিম একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল- জি, মুখতো কখনও দেখিনি। সব সময় বোরখা পড়ে থাকে ক্লাসে। তাই চিনতে পারিনি। তবে কণ্ঠস্বর শোনে ধরতে পেরেছি তুমি সায়রা।
সায়রা হেসে ফেলল। সেই হাতের বই কয়টি টেবিলের ওপর রেখে বলল-
-আমার মুখ আগে থেকেই দেখার কৌতূহল ছিল নাকি তোমার?
-না।মানে হ্যাঁ। শুধু আমারই নয়, সবারই কৌতূহল আছে তোমাকে দেখার। বোরখা পড়ার জন্য কারো তোমার মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে তোমার কণ্ঠস্বর আমি চিনি। আমারে মনে হয়,শুধু আমিই না, সবাই আপনার কণ্ঠস্বর চেনে।
-আমাকে আর আপনি বলার দরকার নেই। আমি তোমার চেয়ে নিশ্চয় বড় বড় নই।আমার বয়েস এখন ষোল্ল চলছে। আর কয়েকমাস পরেই সতের পরবে।
-আমার ইতিমধ্যে সতের পরেছে। মাত্র এক মাসের জন্য এনআরসিতে আমার নাম উঠেনি।
আমারও উঠেনি। মা একদিন বলেছিল আলোচনা প্রসঙ্গে। তাই জেনেছি।
রহিম কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
সায়রা ঘরের ভেতরে তাকিয়ে বলল- তুমি বাহিরা বই পড়ো নাকি? এই ধরো, উপন্যাস, গল্পের বই, ইতিহাস…
-জি। পেলে পড়ি।
কোন বিষয় বেশি ভালো লাগে তোমার?
সবই ভালো লাগে। তবে বাংলা আর ইতিহাস একটু বেশি ভাল লাগে।
সায়রা আগ্রহী হয়ে উঠল।
-আমারও বাংলা সাহিত্য পড়তে ভালো লাগে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েছ?
-কিছু কিছু পড়েছি।
-শরৎচন্দ্রের উপন্যাস?
-তাঁরও কিছু গল্প পড়েছি।
সায়রা অবাক হয়ে বলল- “বাহ! তাহলে তুমি তো বেশ ভালো পড়াশোনা করেছ!
রহিম মৃদু হেসে বলল- পড়াশোনা ছাড়া আমি তেমন আর কিছুই জানিনা। খেলা-ধূলা আমার খুবই পছন্দ। তবে পড়াশোনা ক্ষতি হবে বলে খেলার ভরসা পাইনা। গল্প-উপন্যাস পড়তে আমার খুব ভালো লাগে।তবে তেমন পড়ার সযোগ পাইনি। স্কুলের লাইব্রেরী থেকে দুই একটা বই নিয়ে পড়েছি। তবে খুবই ভয়ে ভয়ে, স্কুলের পড়া ক্ষতি হবে বলে। এদিকে বই কেনার টাকাও নেই আমাদের।তাই ইচ্ছে থাকলেও বই কেনা হয় না।
কথাটি শুনে সায়রার মুখের হাসি একটু ম্লান হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, ছেলেটির কথার মধ্যে এমন একটি সত্য লুকিয়ে আছে, যা সে নিজের জীবনে কখনো অনুভব করেনি।
তার কাছে বই কেনা ছিল সহজ ব্যাপার। নতুন বইয়ের প্রয়োজন হলে বাবা বাজার থেকে এনে দিতেন। স্কুলে যাওয়ার জন্য পোশাক, খাতা, কলম—কোনো কিছু নিয়েই তাকে ভাবতে হয় না। অথচ রহিমের সেই সুযোগ নেই।
সায়রা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল- তুমি পড়ো। আমি আর বিরক্ত করব না।
দরজা থেকে চলে যাওয়ার আগে সয়রা আবার ফিরে তাকাল।
কোনো বইয়ের দরকার হলে আমাকে বলবে। বাবার আলমারিতে অনেক বই আছে।
রহিম অবাক হয়ে বলল- সত্যি?
হ্যাঁ। তোমার কাছে আমি মিথ্যা বলতে যাব কেন! অনেক বই। মনে হয়, তুমি দুই চার সব বই পড়ে সেই বই শেষ করতে পারবে না। আমাদের গ্রামে রজনী প্রভাত নামক একটি লাইব্রেরী আছে। গ্রামের ছেলেরা মিলে করেছে। সেই লাইব্রেরীতেও অনেক বই আছে। তুমি চাইলে সেখান থেকেও বই এনে পড়তে পারবে।
সায়রা হাসতে হাসতে চলে গেল।
রহিম আবার বই খুলল। কিন্তু এবার তার মন অন্যরকম। সে ভাবতে লাগল, এই বাড়িতে আমার জন্য হয়তো শুধু থাকার জায়গা নয়, বইয়ের একটি নতুন জগতের দরজাও খুলে যেতে পারে।
রাত গভীর হলো। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লো। রহিম কেরোসিনের হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে লাগল। জানালার বাইরে বাঁশপাতা বাতাসে নড়ছিল। দূরে কোথাও শিয়াল ডেকে উঠল।শিয়ালের ডাক শোনে রহিমের মনে ভয় সঞ্চার হলো। তবে সেই ভয় সে ঝেড়ে ফেলে দিলো এই ভেবে যে, এতো প্রকৃতির স্বাভাবিক ঘটনা এতে আমার ভয় পাবার কি আছে!শেয়াল ডাকবে, পেঁচা হুঁ-হুঁ-হুঁউউ করে ডাকবে, ঝিঁ ঝিঁ পোকারা ঝিঁ ঝিঁ করে ডাকবে। রাত জাগা পাখিরা প্রহরে প্রহের ডেকে উঠবে। ঘরের ভেতর আরশোলা টিক টিক করবে, এগুলি তো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম এগুলো শোনে আবার ভয় পাওয়ার কি আছে!
রহিম জানত না, এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল একদিন তার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যাবে। এখানে সে যেমন নিজের স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করবে, তেমনি এমন এক অনুভূতির মুখোমুখি হবে, যার জন্য সে কোনোদিন প্রস্তুত ছিল না।
বাড়ির অন্য প্রান্তে নিজের ঘরে বসে সায়রাও বই খুলেছিল। কিন্তু তার চোখ বারবার জানালার বাইরে চলে যাচ্ছিল।
নতুন ছেলেটির কথাগুলো তার মনে ঘুরছিল—পড়াশোনা ছাড়া আর অন্য তেমন কিছুর প্রতি আগ্রহ নেই তার।
কেন জানি না, কথাটি তার মনে গভীর রেখা টেনে দিয়েছিল।
সেই রাতেই, সবার অজান্তে, দুটি আলাদা পৃথিবীর মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতুর প্রথম কাঠটি বসানো হয়ে গেল।
সেতুটির একদিকে ছিল দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর অদম্য স্বপ্ন।
অন্যদিকে ছিল স্বচ্ছলতা, সামাজিক মর্যাদা আর অজানা ভবিষ্যৎ।
এই সেতুর দুই পারে দাঁড়িয়ে ছিল দুটি বাড়ি। একটা গোবিন্দপুরে এবং অন্যটি চরাইমারি গ্রামে।
গোবিন্দপুর গ্রামের সায়রাদের বাড়ির পেছনে, স্বমহিমায় নীরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল বাঁশবন—যে বাঁশবন একদিন তাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে থাকবে।
চতুর্থ অধ্যায়
বিকেলের রোদ তখন বাঁশবনের মাথায় এসে হেলে পড়েছে। ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছে। তাতে ধানগাছের মাথাগুলো ছন্দ তোলে নাচছে।নজরুলের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়-আমার শ্যামলা বরণ বাংলা মায়ের, রূপ দেখে যা আয়রে আয়। দূরে কোথাও গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টা বাজছে। গ্রামের মাটির পথ ধরে কয়েকটি ছেলে বই হাতে বাড়ি ফিরছে। তাদের মধ্যে চরাইমারি গ্রামের রহিমও ছিল।
রহিমের পরনে ধুয়ে ধুয়ে রং উঠে যাওয়া একটি রংচটা শার্ট। কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ। ব্যাগের ভিতরে দু-একটি পাঠ্যবই, একটি ছেঁড়া খাতা আর মায়ের হাতে সযত্নে সেলাই করা ছোট্ট কাপড়ের থলি। সেই থলিতে রাখা কয়েকটি পয়সা। সেই পয়সা কয়টি তার ভবিষ্যতের পুঁজি। বিপদের সম্বল। মায়ের দেওয়া পয়সা কয়টি সে সযত্নে রক্ষা করে চলছে ভবিষ্যতে কাজ আসবে বলে।
হাজি করিম সাহেবের বাড়ির ভেতর ঢোকার সময় রহিম একবার জানালার দিকে তাকাল। জানালার পাশে বসে সায়রা বই পড়ছিল। তার সামনে খোলা বই, পাশে একটি নীল মলাটের খাতা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই সায়রার চোখে পড়ল রহিমকে।
—রহিম, একটু দাঁড়াও!
ডাক শোনে রহিম থমকে দাঁড়াল। এমন করে কেউ তাকে ডাকলে সে এখনও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সেই ডাক যদি আসে গ্রামের সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারের বাড়ি থেকে।
সায়রা জানালার কাছ থেকে সরে এসে বারান্দায় দাঁড়াল।
—তুমি কি আজ স্কুলে বাংলা কবিতার বইটা নিয়ে গিয়েছিলে?
—হ্যাঁ। কিন্তু ফেরার সময় বইটা মাস্টারমশাইয়ের টেবিলে রেখে এসেছি।
—তুমি কবিতা পড়তে ভালোবাসো?
রহিম একটু হাসল।
—ভালোবাসি। তবে সব কবিতা বুঝতে পারি না। কিছু কবিতা পড়লে মনে হয়, কবি যেন আমার মনের কথাই লিখেছেন।
সায়রা আগ্রহ নিয়ে বলল,
—কোন কবির লেখা কবিতা তোমার বেশি ভালো লাগে?
—রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা। আর নজরুলের কবিতা পড়লে মনে হয়, মানুষ গরিব হতে পারে, কিন্তু তার বুকের ভিতরের সাহসটাকে কেউ গরিব করে দিতে পারে না।
সায়রা কথাটা শুনে চুপ করে রইল। সে আগে অনেকের মুখে কবিতার আলোচনা শুনেছে, কিন্তু রহিমের কথায় অন্য রকম একটা সত্য ছিল। তার কথায় বইয়ের ভাষা কম, জীবনের অভিজ্ঞতা বেশি ছিলো।
সায়রা বলল,
—আমার কাছে একটা কবিতার বই আছে। তুমি চাইলে পড়তে পারো।
রহিম সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। বই ধার নেওয়া তার কাছে আনন্দের, কিন্তু অন্যের জিনিসের প্রতি তার দুর্বলতা আছে। কারণ অন্যের জিনিসের আলাদা এক প্রবল দায়িত্ববোধ থাকে।
—বইটা যদি তোমার খুব দরকারি হয়?
—বই পড়ার জন্যই তো। শুধু আলমারিতে রেখে দেওয়ার জন্য তো নয়।
কথাটা শুনে রহিমের মুখে হাসি ফুটল।
সায়রা ঘরের ভিতর থেকে একটি বই নিয়ে এল। বইটির মলাটে সময়ের ছাপ পড়েছে, সেজন্য বইটি সযত্নে রাখা ছিলো তার আলমারীর ভেতরে। সে বইটি রহিমের হাতে দিয়ে বলল,
- বইটা যতদূর সম্ভব তারাতারি পড়ে শেষ করবে। আর যেসব কবিতা ভালো লাগবে, সেগুলোর নাম খাতায় লিখে রেখো। বইটি অনেক পুরনো। তাই সযত্নে রাখবে।নইলে পাতা ছিঁড়ে যেতে পারে।
রহিম বইটি দুহাতে গ্রহণ করল।
—নিশ্চয়, আমি যত্ন করে রাখব বইটি।
—শুধু যত্ন করে রাখলে হবে না। পড়েও দেখতে হবে।
সায়রা হেসে উঠল।রহিমও হাসল। তাদের দুজনের মধ্যে এই প্রথম এমনভাবে কথোপকথন হলো, যেখানে একজন ধনী পরিবারের মেয়ে আর অন্যজন দরিদ্র ঘরের ছেলে নয়— তারা দুজনেই বই পাগল দুটি মানুষ।
রহিম বলল- আজ স্কুলে যাওনি কেন?
-বড্ড মাথা ব্যাথা করছিল, তাই যাইনি। এমনিতে বসে বসে খারাপ লাগছিল। তাই আলমারীতে খুঁজতে গিয়ে এই কবিতার বইটি পেয়েছি।
-খারাপের মধ্যেও ভাল কিছু নিহিত থাকে।
-যেমন?
রহিম বলল- যেমন আজ স্কুলে না যাওয়ার জন্য এই কবিতার বইটি পেলে।
অবশ্যে। স্কুলে গেলে এই কবিতার বইটি সত্যিই পেতাম না। আচ্ছা, এখম কাজের কথায় আসি।
-কাজের কথা! কি কাজের কথা?
আজ স্কুলে কি কি পড়িয়েছে?
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি বলব।আমার ঘরে এস, তখন বলে দিব।
আচ্ছা, তোমার ঘরে গিয়েই জেনে নিব।
রহিম নিজের ঘরে চলে এল। ঘরে এসেই সে কবিতার বইটি খুলে বসল।
এক সপ্তাহ পরের কথা। রহিমের অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয় নি। দুদিন স্কুল বন্ধ ছিলো। তাই সেদিন সন্ধ্যায় রহিম খুশী মন নিয়ে বাডি় এল। তখন তার ব্যাগে নিজের পুরোনো বইয়ের পাশে একটি নতুন বই ছিলো। বইটে নতুন। কবিতার বই। আগের বইটা ফেরত দেওয়ার পর আজ বাড়ি আসার সময় সায়রা এই বইটি তাকে দিয়েছে।
সায়রা বইটি দেওয়ার সময় বলেছে- বইটি একেবারে নতুন। কাল আমাদের মামা শহর থেকে পাঠিয়ে দিয়েছে। বইটি আমি পড়েনি। শুধু ভূমিকা দেখেছি। ভাবছি, তোমাকেই আগে পড়তে দেব।
তাই রহিম খুশী হয়ে বইটি খুলে বসল।
তার মুখমণ্ডল থেকে হাসির রেখা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আমিনা রূমের ভেতর প্রবেশ করল। তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল-
—কী রে, আজ এত খুশি দেখাচ্ছে কিয় তোক?
রহিম বইটি মায়ের সামনে রেখে বলল-
—মা, আমি আজ একটা নতুন পৃথিবী হাতে পেয়েছি।
কীসের নতুন পৃথিবী? হেঁয়ালি রেখে আসল কথা কি তাই বল।
রহিম মাকে বইটি দেখিয়ে বলল- এটাই আমার নতুন পৃথিবী। মানে নতুন বই।স্কুলের লাইব্রেরী থেকে এনেছি। একেবারে নতুন বই। লাইব্রেরী থেকে আমিই প্রথম এনেছি বইটি।
তুই বই এত ভালোবাসিস?
বইতো ভালবাসার জিনিসিই মা। বই পড়লে অনেক নতুন কথা জানা যায়। তুমি যে সব সময় আমায় মানুষ হতে বল। মানুষ হওয়ার মন্ত্র এই বইয়ের মাঝে পাওয়া যায়।বই মানুষের পরম বন্ধু। একজন রক্তমাংসের বন্ধু প্রতারণা করতে পারে, কিন্তু একটা বই মানুষকে কখনও প্রতারণা করেন। সঠিক পথ দেখায়।বই পড়লে মানুষের মনের পরিধি বিস্তৃত হয়।
আমেনা বইয়ের অক্ষর পড়তে পারত না। তবু তিনি বইটির মলাটে হাত বুলিয়ে দিল। একেবারে নতুন। আনকোরা।
মাকে বইয়ে হাত বুলানো দেখে রহিম খুব খুশী হলো।
রাতের খাবার খেয়ে রহিম কেরোসিনের বাতি জ্বালাল। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। বাঁশপাতার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকছে ঘরে। সে বই খুলে পড়তে শুরু করল।
প্রথম কবিতাটি পড়ে তার মনে হলো, পৃথিবীতে এমন কিছু কথা আছে, যেগুলো মুখে বলা যায় না, কিন্তু কবিতার মধ্যে তারা নিঃশব্দে বেঁচে থাকে।
সেই রাতেই সায়রার দেওয়া বইয়ের পাতার মধ্যে রহিম নিজের জীবনের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করল।
আর সায়রা নিজের ঘরে বসে ভাবছিল, ছেলেটির চোখে এত স্বপ্ন আসে কোথা থেকে?
বাইরে বাঁশবন অন্ধকারে ডুবে ছিল। অথচ সেই অন্ধকারের দুই পাশে দুটি মনের জানালা যেন অদৃশ্য এক আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠেছিল।
পঞ্চম অধ্যায়
গোবিন্দপুর গ্রামটি ছোট হলেও তার ভিতরে যেন অনেকগুলো পৃথিবী বাস করত। একই মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের জীবনযাত্রা এক ছিল না। কারও উঠোনে ধানের গোলা, গোয়ালে গরু, ঘরে টিনের চাল; আবার কারও ঘরে ভাঙা বেড়া, মাটির চুলা আর বর্ষার রাতে চালের ফুটো দিয়ে পড়া জল।
হাজি করিমের বাড়ি ছিল গ্রামের অন্যতম বড় বাড়ি। বাড়ির সামনে প্রশস্ত উঠোন, পাশে সুপারি ও নারকেলগাছ, পেছনে রাস্তার ধারে বাঁশঝাড়। উঠোনে ধান শুকানো হতো, গোয়ালে গরু বাঁধা থাকত। বাড়ির লোকজনের কথাবার্তায় একটা স্বাভাবিক কর্তৃত্ব ছিল।
অন্যদিকে রহিমদের গ্রামটি ছিলো নদীর পারের গ্রাম। অন্যান্য গ্রামের তুলনায় অনেকটা নিচু। বর্ষা এলেই গ্রামটা জলের তলে ডুবে যেত। বছরের প্রায় চার পাঁচ মাস জলে ডুবে থাকত গ্রামটা। তাই ধানের আবাদ খুব কমই হত। প্রায় বছর বছর ধান পাকার আগেই জলের তলে তলিয়ে যেত ধানক্ষেত। সেজন্য ধানের আবাদ খুব একটা করত না কেউ। গম, ধান, চিনাধানের ওপরে নির্ভর করত সবাই। তাই গ্রামের লোকগুলো তেমন অবস্থাপন্ন ছিল না।রাস্তাঘাটও তেমন ছিলনা। গোহালট এবং আলপথই ছিলো গ্রামের মানুষদের যাতাযাতের মাধ্যম।
রহিমদের ঘরটি ছিল গ্রামের শেষ প্রান্তে। বর্ষায় উঠোনে কাদা জমত, শীতকালে ভোরের কুয়াশা ঘরের ভিতর পর্যন্ত ঢুকে পড়ত কাশবনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে। তার মা আমেনা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন, কখনও ধান ভানতেন, কখনও ক্ষেতের কাজে যেতেন। অভাব ছিল তাদের সংসারের নিত্যসঙ্গী।
তবু রহিমদের বাড়িতে একটি জিনিসের অভাব ছিল না— সেটা ছিল স্বপ্ন। তবে স্বপ্ন পূরণের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন সেই অর্থ ছিল না তাদের। সংঘর্ষ করে চলতে হত তাদের।
এদিকে সায়রাদের অবস্থা ছিল রহিমদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের অর্থের অভাব ছিল না।সায়রা স্কুলে ভালো ফলাফল করত। তার বই কেনার জন্য বাবার অনুমতি নিতে হতো না। নতুন খাতা, কলম, পোশাক—সবই ছিল তার নাগালের মধ্যে। কিন্তু রহিমের একটি নতুন বই কেনার জন্য কয়েক দিনের শ্রমের টাকা জমিয়ে রাখতে হত।
একদিন স্কুল ছুটির পর সায়রা দেখল, রহিম স্কুলের বারান্দায় বসে একটি পুরোনো খাতার পাতা সেলাই করছে।
—তোমার খাতা ছিঁড়ে গেছে? সায়রা বলল।
—হ্যাঁ, অনেক দিন আগে ছিঁড়ে গেছে। ভাবছি, আর কয়েকটা পাতা কিনে এর সাথে জুড়ে দিব।
—নতুন খাতা কিনতে পারছ না?
রহিম একটু সংকোচের সঙ্গে বলল-
—খাতা কিনতে পারব। কিন্তু এই মাসে মায়ে বাবার ওষুধ কিনতে হবে। দুটো একসঙ্গে হয়তো সম্ভব হবে না।
সায়রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার নিজের আলমারিতে অর্ধেক ব্যবহৃত কয়েকটি খাতা পড়ে আছে। যেগুলো কোনোদিন ব্যবহার করা হবে না। অথচ রহিম পুরনো খাতার সঙ্গে কয়েকটি নতুন পাতা জুড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে। রহিমরা কি এতই গরিব!
সায়রা একটু সংকোচের সাথে বলল— আমার কাছে কিছু খাতা পড়ে রয়েছে। তুমি কিছু মনে না করলে, সেখান থেকে দুটো খাতা তোমাকে দিতে পারব।
রহিম মাথা নাড়ল—দিলে তো ভালই হয়। আমি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে নতুন খাতা কিনতে পারব না। তাই দিলে আমার উপকারই হবে। আমাদের অভাবের সংসার। আমাদের গ্রামটা খুবই নিচু জায়গায় অবস্থিত। বর্ষা এলেই জলের তলায় ডুবে যায় গ্রামটা। তাই ফসল ভালো হয় না। সেজন্য অভাব লেগেই থাকে প্রতিনিয়ত। কিন্তু একটা কথা বলি তোমাকে?
—কী কথা?
—আমি গরিব বলে দয়া করে দিও না কিন্তু। যদি তোমার মনে হয়, আমার পড়াশোনায় সাহায্য করা দরকার, তাহলে বন্ধু হিসেবে দিতে পার।
সায়রা কথাটার অর্থ বুঝতে পেরে মৃদু হেসে বলল—ঠিক আছে। দয়া করে নয়, বন্ধু হিসেবেই দিব। আমারও তোমাকে একটা কথা বলার আছে।
কি কথা?
তুমি আমাকে বন্ধু হিসেবেই ভাববে সব সময়। আমাদের বাড়িতে আছ বলেই যেন কোনোদিন ভেব না, তুমি আমাদের অনুগ্রহীত।
-না, তা অবশ্যে ভাবি না। তবে এটা তো অস্বীকার করা যায় না, যে আমি তোমাদের অনুগ্রহের ওপরই বর্তে আছি।
-না আজ থেকে তুমি তাও ভাববে না। আমাকে সব সময় তুমি বন্ধু ভাববে। কোনো জিনিসের প্রয়োজন হলে নিসংকোচে আমাকে বলতে পারবে।
পরদিন সায়রা দুটি খাতা নিয়ে এল। নতুন খাতা। আগে ফেলে রাখা পুরনো খাতা দেওয়ার কথা ভাবছিলো। পরে মত পাল্টে নতুন খাতাই নিয়ে এসেছে। একটি খাতার প্রথম পাতায় লিখে দিল, “জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বাড়ে।”
রহিম সেই বাক্যটি অনেকক্ষণ ধরে দেখল।হাতের লেখাও চমৎকার। গোট গোট মুক্তোর মতো লেখা।
সেদিন থেকে তাদের মধ্যে বইয়ের আদান-প্রদান শুরু হলো। সায়রা বই দিত, রহিম পড়ে ফিরিয়ে দিত। কখনও বইয়ের ভিতরে ছোট্ট কাগজে লিখে রাখত নিজের প্রশ্ন, কখনও কোনো কবিতার পাশে লিখে দিত নিজের মন্তব্য।
এই আদান-প্রদানের মধ্যে কোনো মূল্যবান উপহারের চাকচিক্য ছিল না। ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস এবং বন্ধুত্বের দাবি।
তবে গ্রামের সমাজে তাদের অবস্থান এক ছিল না। সায়রা ছিল হাজি করিমের মেয়ে; রহিম ছিল অভাবী আমেনার সন্তান। সমাজের চোখে তাদের দূরত্ব ছিল অনেক। আকাশ ও পাতালের মত তফাৎ।
কিন্তু বইয়ের পাতায় সেই দূরত্ব মাপার কোনো মাপকাঠি ছিল না।
সায়রা যখন কোনো গল্প পড়ে দুঃখ পেত, তখন রহিম সেই গল্পের অন্য অর্থ খুঁজে দিত। রহিম যখন কোনো কঠিন বিষয় বুঝতে পারত না, তখন সায়রা তা সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিত। কখনও দুজনের মত মিলত না, কিন্তু তা নিয়ে বন্ধুত্বে কোনো প্রভাব পরত না। কখনও দীর্ঘ আলোচনা চলত দুজনের মধ্যে। নানা বিষয় নিয়ে। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি কোনোটা বাদ পরত না তাদের আলোচনার মধ্যে।
তাদের বন্ধুত্বের ভিত গড়ে উঠছিল ধীরে ধীরে— কোনো ঘোষণা ছাড়া, কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়া।
শুধু একটি বিষয় তারা বুঝতে শুরু করেছিল: পৃথিবীতে মানুষকে চিনতে হলে তার বাড়ির আকার নয়, তার মনের আকার দেখতে হয়।
ষষ্ঠ অধ্যায়
সেদিন শুক্রবারের বিকেলে নামাজ শেষে মানুষ গ্রামের মসজিদ থেকে ফিরছিল। কারও হাতে বাজারের থলি, কারও কাঁধে গামছা। গ্রামের পথে ধুলো উড়ছিল লোকের সমাগমের ফলে। দূরে ধানক্ষেতে কয়েকজন কৃষক বিকেলের শেষ কাজ গুটিয়ে নিচ্ছিল।
রহিম সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে নিজের ঘরে একাই বসেছিল। সে অপেক্ষা করিছিল সায়রার জন্য।সায়রা তাকে একটি বই দেওয়ার কথা ছিল সেদিন। কিন্তু সায়রার আসতে দেরি দেখে সে ঘর থেকে বেড়িয়ে ঘরের পেছনের বাঁশঝাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ পর সায়রা এল। তার হাতে দুটি বই।
সায়রা অভিযোগ করে বলল- আমি তোমাকে ঘরের ভেতর খুঁজছি আর তুমি এসে দাঁড়িয়ে আছো বাঁশঝারের কাছে।
আমি তোমার জন্য গৃহের ভেতরেই অপেক্ষা করছিলাম। তোমার আসতে দেরি দেখে এখানে এসে দাঁডিয়েছি। জানতো, অপেক্ষার সময় বিরক্তিকর হয়।
আর বলনা, সময় মতোই আসতে চেয়েছিলাম। কিছুক্ষণ আগে পশ্চিম পাড়ার খালা এসেছিলো। তার সাথে কথা বলতে দেরি হয়ে গেছে। খালা আমাদের বাড়ি এসেছে, তাঁর সঙ্গে কথা না বললে কি ভালো দেখাত বলো।
তা অবশ্যে ঠিক। তবে আজ একটার বদলে দুটি বই কেন? রহিম জিজ্ঞেস করল।
—একটা আনার কথাই ভাবছিলাম।হঠাৎ করে পুরনো একটা বই থাক থেকে বের হয়ে এলো। তাই ভাবলাম, দুটোই নিয়ে যাই। টেবিলের ওপর পরে থাকলে তো বই আর ভাত-মাছ চাইবে না। একটা পড়া শেষ হলে আরেকটা পড়তে পারবে। তাই দুটোই নিয়ে এলাম।
রহিম বই দুটি হাতে নিয়ে নাম পড়ল। একটি গল্পের বই, অন্যটি ইতিহাসের।
—ইতিহাস কেন দিলে?
—আমাদের গ্রামের মানুষ আগে কোথায় ছিলো আর এখানে কখন এসেছে, কীভাবে এখানে এসে বসতি গড়েছে, তুমি তো সেদিন বলেছিলে, এসব কথা জানতে ইচ্ছে করে তোমার।
রহিমের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল—তুমি তাহলে সেদিনের কথা মনে রেখেছ?
—এসব কথা কি ভুলা যায়?
এভাবে বলেই সায়রা অন্যদিকে তাকাল। রহিমও কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল।
তাদের কথাবার্তার মধ্যে তখন আর শুধু পড়াশোনার আলোচনা ছিল না। তাদের অজান্তেই তাদের কথার মধ্যে অনেক ছোট ছোট কথা জায়গা করে নিয়েছিল। যে কথার হয়তো তেমন গুরুত্ব ছিল না, তবু তারা মনে গেঁথে রাখত সেই সব কথা। কথা প্রসঙ্গে সেগুলো মনে করিয়ে দিয়ে একে অপরকে তাক লাগিয়ে দিত। এত ছোট কথাও মনে রেখেছ, এই রকম আর কি!
রহিম বই দুটি নিজের বগলে চেপে ধরে বলল—আমি পড়ে তোমাকে বলব, ইতিহাসের কোন কথাটা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।
—আর গল্পের বই?
—সেটাও বলব।কোন গল্পটা আমার বেশি ভালো লেগেছে।
—সব বইয়েরই আলোচনা করবে?
—তুমি শুনতে চাইলে নিশ্চয় করব।
সায়রা হেসে বলল—আমি অবশ্যেই শুনতে চাইব।
বাঁশপাতার ফাঁক দিয়ে তখন শেষ বিকেলের আলো এসে দুজনের মুখে পড়ছিল।তাদের সামনে কোনো বেঞ্চ ছিল না, কোনো শ্রেণিকক্ষ ছিল না। ছিলনা কোনো সহপাঠিও। তবু তাদের মনে হচ্ছিল তারা যেন এক অদৃশ্য পাঠশালায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।যেখানে দাড়িয়ে তারা একে ওপরের মন পড়ার চেষ্টা করছে।
সেদিন আলোচনার মাঝে রহিম একটি কথা বলল, যা সায়রার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
রহিম বললো— জানো, আমাদের বাড়িতে বই রাখার আলমারি নেই। মা একটা পুরোনো বাক্সে আমার বইগুলো রাখেন। বৃষ্টি হলে সেই বাক্সটা ঘরের উঁচু জায়গায় তুলে রাখতে হয়, বৃষ্টির জল পরে ভিজে যাওয়ার ভয়ে। কখনও ভাবি, একদিন আমার নিজের একটা পাঠাগার হবে। সেই ঘরে অনেক বই থাকবে। যারা বই কিনতে পারে না, তারাও সেখানে এসে সেই বই পড়তে পারবে।
সায়রা সেদিন অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়েছিলো এবং বলেছিলো—তাহলে তুমি শুধু নিজের জন্যই ভাবোনা, অন্যের জন্যও ভাবো?
—অবশ্যেই অন্যের জন্যও ভাবি। যাদের সামর্থ কম, তারা কল্পনা করেই নিজের মনকে সান্ত্বনা দেন বেশি। তবে আমার সেই ভাবনায় যথেষ্ট আন্তরিকতা রয়েছে। আমি চেষ্টা করব, টাকার অভাবে যারা বই কিনে পড়তে পারে না, তারা যেন আমার কেনা বইগুলো পড়ে রস্বাদন করতে পারে।
সায়রা বুঝল, রহিমের স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির স্বপ্ন নয়। সে এমন একটি পৃথিবী গড়তে চায়, যে পৃথিবীতে একে অপরের সহায় হয়ে একটি আলাদা মানুষের সমাজ গড়ে উঠবে।
সায়রা বলল—তার মানে তুমি ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চাও?
রহিম মৃদু হাসল।
—হ্যাঁ হতে চাই। কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে অনেকটা পথ পেরোতে হয়, তাতো তুমি জানো।
—পথ লম্বা হলে বেশি হাঁটতে হয়। যার নতুন কিছু করার ইচ্ছে থাকে সে দীর্ঘ পথ দেখে থেমে থাকেনা। বরং দ্বিগুণ উৎসাহে পথ চলতে থাকে। কারণ পথ যতই দীর্ঘ হোক না কেন, সব পথেরই একদিন শেষ আছে।
রহিম সেদিন প্রথম বুঝল, সায়রা শুধু তার বইয়ের সঙ্গী নয়। সে তার স্বপ্নকেও গুরুত্ব দেয়। তার ভালমন্দ নিয়েও সে ভাবে।
অন্যদিকে সায়রার নিজের জীবনেও অনেক অপ্রকাশিত প্রশ্ন ছিল। বাবার বাড়িতে অভাব নেই, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার খুবই সীমিত। সে কী পড়বে, কোথায় পড়বে, কোথায় যাবে, কাকে বিয়ে করবে— এসব বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকার শুধু তার বাবার।এসব ক্ষেত্রে তার নিজের বলতে কোনো অধিকার নেই।
রহিমের ক্ষেত্রে এর উলটো। রহিমের অভাব ছিল অর্থের। সায়রার অভাব ছিল স্বাধীনতার।
তাদের কষ্টের ধরন আলাদা, কিন্তু তারমধ্যেও কোথাও যেন একটি মিল ছিল।
সেই দিন বাঁশবনের আড়াল থেকে একটি পাখি কর্কশ শব্দে ডেকে উঠল। রহিম বোঝতে না পারলেও সায়রা বোঝতে পারল ওটা ময়ূরের ডাক। কারণ ময়ূর সে ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছে। ময়ূর পেখম ধরলে দেখতে খুবই সুন্দর লাগে। তবে তার ডাক এতো কর্কশ কেন? সায়রা নিজেকে প্রশ্ন করল। অবশ্যে সব জিনিসেরই দুটো দিক থাকে। ভাল এবং মন্দ। ভাল এবং মন্দের সমষ্টিই এই পৃথিবী। মন্দ আছে বলেই তো ভালর এতো কদর। যেমন ধনী এবং গরিব। যেমন রহিম এবং সে নিজে।রহিম বেড়ে উঠছে অভাবের মাঝে এবং সায়রা বেড়ে উঠছে প্রাচুর্যের মাঝে। এই পৃথক দুই সামাজিক জগতের মাঝখানে সেদিন গড়ে ওঠল এক মানসিক সেতু। সেই দিন থেকে বাঁশবন তাদের কাছে শুধু গাছপালার সমষ্টি রইল না। বাঁশবন সাক্ষী হয়ে রইল তাদের মানসিক সেতুবন্ধনের।
সপ্তম অধ্যায়
আষাঢ় মাসের শুরুতেই গোবিন্দপুরে বৃষ্টি নামল। প্রথমে গুঁড়িগুঁড়ি, তারপর একটানা মুষলধারে বৃষ্টি। মাটির রাস্তা কাদায় ভরে গেল। পুকুরে জল উপচে উঠল। বাঁশঝাড়ের মাথা বাতাসে ঝুঁকে পড়ল।
স্কুলে যাওয়ার পথটি ছিল ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে। বৃষ্টি হলে সেই পথ পিচ্ছিল হয়ে যেত। অনেক ছাত্র স্কুলে আসত না এই পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া রাস্তার ভয়ে। রহিম তবু স্কুলে যেত। তার কাছে পড়াশোনার জন্য প্রতিটি দিনই ছিল মূল্যবান। স্কুল ক্ষতি করতে তার মন সায় দিত না।
সেদিন সায়রা স্কুলে আসেনি। হয়তো রাস্তা পিচ্ছিল হওয়ার জন্য। সকালে কিন্তু সে বলেছিল, বৃষ্টি থাকলেও সে স্কুলে আসবে। তারা একই বাড়িতে থাকলেও দুজন কোনোদিন একসাথে স্কুলে আসা-যাওয়া করে না। একসাথে স্কুলে আসা-যাওয়া করলে লোকে কুৎসা রটাতে পারে এই ভয়ে। এদিকে করিম সাহেবেরও বারণ আছে একসাথে স্কুলে আসা-যাওয়া করায়। স্কুলেও তারা একে অপর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে। স্কুলে আসার সময় তারা বাড়ি থেকে প্রায় দশ মিনিট আগপাছ হয়ে বেরোয়। স্কুল থেকে যাওয়ার সময়ও সেই রকমই আগপাছ হয়ে যায়। সেদিন স্কুলে পৌঁছনোর পর প্রচুর বৃষ্টি নামল। একটানা বৃষ্টি। বৃষ্টির জন্য ক্লাস করাই দুরূহ হয়ে পড়ল। টিনের চাল। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের জন্য বলতে গেলে কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।তাই স্যারেরা তেমন ক্লাস নিতে পারছিল না। দুপুরের দিকে বৃষ্টি একটু কমলে রহিম বাড়ি ফিরে এলো।
বাড়িতে এসে দেখল, উঠোনের এক পাশে জল জমে আছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সায়রা দূরের পথের দিকে তাকিয়ে ছিলো।
—আজ স্কুলে গেলে না কেন? রহিম জিজ্ঞেস করল।
—আমি যেতে চেয়ছিলাম। রাস্তা খারাপ বলে বাবা যেতে দেননি।
—আজ অঙ্কের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পড়ানো হয়েছে।
সায়রা চিন্তিত হলো।
—তুমি অঙ্কগুলো বুঝেছ?
—হ্যাঁ বুঝেছি। তুমি চাইলে বুঝিয়ে দিতে পারব।
সায়রা একটু ইতস্তত করে বলল—এখানে দাঁড়িয়েই?
রহিম চারদিকে তাকাল। বলল- এখানে বুঝানো ঠিক হবে না। আমি ঘরে গিয়ে কাপড় খুলি তারপর এসো। তখন বুঝিয়ে দিবো।
রহিম দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। সে ঘরের ভেতর প্রবেশ করার পরই আবার ঝমঝমিয়া বৃষ্টি নামল। একটু পরেই সায়রা ছাতা নিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে রহিম অঙ্ক বোঝাতে শুরু করল। সায়রা রহিমের কথা মন দিয়ে শুনছিল। কখনও প্রশ্ন করছিল, কখনও খাতায় লিখছিল। জানলা দিয়ে বৃষ্টির ফোটা ঘরের ভেতর ছিটকে আসছিল। সেজন্য রহিম উঠে গিয়ে জানলা বন্ধ করে দিলো।
কিছুক্ষণ পর সায়রার মা এসে তাদের দেখলেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন— কী হচ্ছে এখানে এই বৃষ্টির মধ্যে?
সায়রা উত্তর দিল—আজ বৃষ্টির জন্য আমার স্কুলে যাওয়া হয়নি। তাই রহিমের কাছ থেকে আজকের অঙ্কগুলি বুঝে নিচ্ছি, মা।
মা কিছুক্ষণ খাতার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন—পড়াশোনা করো। তবে অঙ্কটা বুঝা হলে চলে এসো। বৃষ্টির অবস্থা খুব একটা ভাল না। মনে হয়, আবার বৃষ্টি নামবে।
সায়রার মায়ের কণ্ঠে কোনো বিরক্তি ছিল না, কিন্তু সামাজিক দূরত্বের একটি অদৃশ্য রেখা কাজ করছিল।
বৃষ্টি থামতে থামতে বিকেল হয়ে গেল।
বিকেলে সায়রা তাকে একটি বই দিল।
—এটা তোমার জন্য।
—কী বই?
—বিজ্ঞানের বই। তোমার বইটা পুরোনো হয়ে গেছে বলেছিলে সেদিন, তাই দিলাম।
রহিম বইটি হাতে নিয়ে বলল,
—ভালই হলো। আমার বইটার কয়েকটা পাতাও ছিঁড়ে গেছে।
—সেজন্যই তো দিলাম।
এই ছোট্ট কথাটির মধ্যে যে মমতা ছিল, সেটি রহিমের কাছে বইটির চেয়েও অনেক মূল্যবান মনে হলো।
সায়রা চলে যাওয়ার পর রহিম বইটি খুলল। বইয়ের প্রথম পাতায় সায়রা নিজের নাম লিখার পরিবর্তে শুধু একটি বাক্য লিখে রেখেছিলো-
প্রশ্ন করতে শেখো, তাহলেই পৃথিবীকে চিনতে পারবে।
রহিম দীর্ঘক্ষণ সেই বাক্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, মেঘের ওপারে কোথাও একটি নতুন সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে তারজন্য।
অষ্টম অধ্যায়
একদিন রহিমের বাবা আব্দুল মজিদ হঠাৎ মারা গেলেন। আগে থেকেই তাঁর পেটের বিষ ছিলো। নানা ওঝা কবিরাজ দেখিয়েছিলেন যদিও বিষ ভাল হচ্ছিলনা। অবশেষে ধার-দেনা করে তাঁকে একবার শহরের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। ডাক্তার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর অপারেশনের কথা বলেছিলো। কিন্তু আব্দুল মাজিদ অপারেশন করাতে রাজি হচ্ছিলেন না। টাকার কথাও ছিল, আবার কাটা-ছেঁড়ার কথাও ছিল। কাটা-ছেঁড়ার চেয়ে টাকাটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন তারজন্য! যার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, কোথায় পাবে সে অপারেশনের জন্য এক গাদা টাকা। এরকম দুঃশ্চিন্তার মধ্যে একদিন একজন তাঁকে ছোডা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে প্রথমে ভেবেছিল কাপড় ধোয়া ছোডা। কাপড় ধোয়া ছোডা কি খাওয়া যায়? সে প্রশ্ন করেছিল লোকটিকে। তখন লোকটি বলেছিল, না, কাপড় ধোয়া ছোডা না। খাওয়া ছোডা। এক প্রকার ছোডা আছে সেই ছোডা খাওয়া যায়। ছোডা খেলে বিষ সাথে সাথেই উপশম হয়। আমি প্রায় চার বছর ধরে খাচ্ছি সেই ছোডা।এই ছোডা গরিবের জন্য মহৌষধ।
সেদিন থেকে আব্দুল মজিদ ছোডা খাওয়া শুরু করেছিল। ছোডা খাওয়া শুরু করার পর পেটের বিষ সারল না যদিও বিষ উঠলে ছোডা খেলে মুহূর্তের মধ্যে বিষ উপশম হতো। প্রায দুই বছর চলছিলো এই ছোডা খাওযা পর্ব। ফলে পেটে ঘাঁ হয়ে মাসখানেক আগে তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন পরপারে।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে রহিম কষ্ট হলেও বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়াআসা করছে।
সেদিন ছিল শনিবার। রহিম সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীরে খাবার খেয়ে পড়তে বসল। এখন সে কয়েকদিন ধরে কবিতার পরিবর্তে ইতিহাসের বইয়ের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কখনও কখনও সে মাকে ইতিহাসের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করে। মাঝে মাঝে সে মাকে জিজ্ঞেস করে, তাঁদের পূর্বপুরুষদের জীবন কেমন ছিল, তাঁদের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিলো, অবসর সময় কীভাবে কাটাত, এভাবে সে গ্রামের পুরোনো মানুষদের বিষয়ে নানান কথা জানতে চাইত।
আমিনা অবাক হতেন। বলতেন—এত প্রশ্ন করিস কেন রে তুই?
রহিম বলত—সবকিছু জানতে ইচ্ছে করে, মা। প্রশ্ন না করলে, না জানা কথা জানব কীভাবে? অনেক সময় নিজের মনে প্রশ্ন উদয়, সেই প্রশ্নের উত্তর নিজে খুঁজে না পেলে তখন অন্যের কাছ থেকে জেনে নিতে হয়। তোমরা বয়েসে আমাদের চেয়ে অনেক বড়। তোমরা যা দেখেছ, আমরা তা দেখিনি। তাই তোমাদের নিকট থেকই তো সেগুলো জেনে নিতে হবে।
এক রাতে আমিনা ছেলের পাশে বসে বললেন—তোর বাবা বেঁচে থাকলে তোকে দেখে খুব খুশি হতেন। তাঁরাও ইচ্ছে ছিল, তুই অনেক দূর পড়াশোনা শিখবি।
রহিম মায়ের হাত ধরে বলল— আমি পড়ব, মা। যত কষ্টই হোক। আমি তোমার কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করব। তোমার কষ্ট দেখলে আমার খুব কষ্ট হয় মা।আমি বাবার স্বপ্ন পূরণ করব, মা। বাবার জন্য আমার খুব কষ্ট হয় মা। যত কষ্টই হোক আমি পড়ব।
আমিনা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কষ্টকে ভয় পাস না, বাবা। কষ্ট করলেই তবে কেষ্ট মিলে। মানুষের উপকার করার কথা যেন কোনোদিন ভুলে যাস না। বড় মানুষ হওয়া মানে শুধু বড় চাকরি করা নয়।বড় মানুষ হরওয়া মানে মনকে বড় করা। গরিবের দুঃখ অনুভব করা। অপরকে ভালবাসতে পারলেই তো জীবন সার্থক হয়।
রহিম মায়ের কথাগুলো খুব গুরুত্ব সহকারে শুনল এবং কথাগুলো তার মনে দাগ কেটে বসল।
পরদিন স্কুলে এসে সে কথাগুলো সায়রাকে বলল।
—আমার মা বলেন, মানুষের উপকার করতে না পারলে বড় হওয়ার সার্থকতা নেই।বড় হতে হলে আগে মনকে বড় করতে হয়।
সায়রা বলল—তোমার মা খুব সুন্দর কথা বলেছেন। আসা করি, তাঁর কথা তুমি চিরদিন মনে রাখবে। পরের জন্য যে ভাবতে পারে সেই তো জগতে বড় মনের মানুষ।
রহিম বলল— তিনি পড়তে জানেন না। কিন্তু তিনি অনেক ভালো ভালো কথা জানেন। এসব কথা তিনি পাঠ্য বই থেকে শিখেননি। জীবনের পাঠশালা থেকে শিখেছেন।
সায়রা নীরব হয়ে গেল। তার নিজের বাড়িতে শিক্ষিত মানুষ অনেক, কিন্তু কখনও কখনও তাদের কথায় অহংকার থাকে। রহিমের মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, অথচ তাঁর কথায় গভীর মানবিকতা রয়েছে।
সেদিন সায়রা বাড়ি ফিরে মায়ের পাশে বসে দীর্ঘক্ষণ গল্প করল। সে প্রথমবার নিজের মাকে জিজ্ঞেস করল, ছোটবেলায় তাঁর কী স্বপ্ন ছিল।
মা মৃদু হেসে বললেন—আমাদের সময় মেয়েদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ কোথায় ছিল,বাবা? মেয়েরা তো তখন বাপ-মা-ভাইয়ের হাতের পুতুল ছিলো। তাঁরা যেভাবে চালাতেন সেভাবেই চলতে হতো মেয়েদের।শুধু মেয়েরাই নয়, সব নারীরাই পুরুষের হাতের পুতুল ছিল। আর এখনকার মতো এতো জানার সুযোগও ছিল না তখন আমাদের।মেয়েদর জন্য স্কুলে যাওয়া নিষেধ ছিলো। বাড়িতেই কায়দা পড়ানো হতো। শেষে পড়ানো হতো কোরআন। কোরআনের একটা শব্দেরও অর্থ বোঝা যেত না।সবচেয়ে দুঃখের বিষয় ছিল, বিয়ের পর কোনো মেয়েরই কোরআন পড়ার সুযোগ ছিল না। কোরআনগুলো চাঙে তুলে রাখতে হতো।আমি নিজেই কোরআন পড়া শিখেছিলাম, কিন্তু বিয়ের কোরআনের এক পৃষ্ঠাও কোনোদিন পড়ে দেখিনি।
সায়রা বুঝল, তার মায়েরও অনেক স্বপ্ন ছিল, যে স্বপ্নের কথা প্রকাশ করারও ক্ষমতা ছিলনা তাঁদের। তাই স্বপ্নগুলো নিজের মধ্যেই গুজরে-গুমরে মরে যেত।
রহিমের মায়ের মতো সায়রার মা-ও অনেক কিছু ত্যাগ করেছেন, শুধু তাঁর ত্যাগের ভাষা আলাদা ছিল। রহিমের মায়ের বলতে গেলে কোনো স্বপ্নই ছিল না। তিনি যা দেখেছেন, যা বুঝিয়েছেন সেটাকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছেন এবং যা কিছু শিখেছেন তা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন। কিন্তু তার মা কাছ থেকেই সব কিছু দেখেছেন, কিন্তু সেগুলি ছুঁয়ে দেখার স্বাধীনতা ছিল না তাঁর।
এভাবেই রহিমের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে সায়রা নিজের চারপাশের মানুষদের নতুন করে চিনতে শিখল।
বন্ধুত্ব মানুষকে শুধু অন্যের কাছে নিয়ে যায় না; নিজের ভিতরের নতুন দরজাও খুলে দেয়। ভাবের আদান-প্রদানের ফলে মনের দিগন্ত প্রসারিত হয়।
নবম অধ্যায়
ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন স্কুলে উৎসবের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হলো। ছাত্রছাত্রীরা কেউ আনন্দে চিৎকার করছে, কেউ আবার ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন।
প্রধান শিক্ষক ফল ঘোষণা করলেন। রহিম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। সব কটা বিষয়েই সে হায়েষ্ট নম্বর পেয়েছে। সায়রা শ্রেণিতে তৃতীয় হয়েছে। সেও ভাল নম্বর পেয়েছে। তবে রহিমের তুলনায় সে অনেক কম নম্বর পেয়েছে।
এক মুহূর্তের জন্য রহিম যেন বিশ্বাস করতে পারল না কথাটা। প্রধান শিক্ষকের ঘোষণার পর সহপাঠীদের অনেকে তাকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাল। রহিম মাথা নিচু করে মূক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সায়রা তার কাছে এসে বলল—আমি জানতাম, তুমি শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হবে।
রহিম মৃদু হাসল।
—তুমি না থাকলে হয়তো এত ভালো ফলাফল করতে পারতাম না।
—আমি কী করেছি?
—বই দিয়েছ, বুঝিয়েছ, সাহস দিয়েছ।
সায়রা বলল-
—হ্যাঁ, স্বীকার করছি, তোমাকে আমি বই দিয়ে সহায় করেছি। কিন্তু পরীক্ষা তো তুমি দিয়েছ। পরিশ্রমও তুমি করেছ।এর মধ্যে আমার কোনো অবদান আছে বলে আমি মনে করি না।আমার ছিল তাই দিয়েছি। তোমার থাকলে তুমিও হয়তো আমাকে দিতে।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক রহিমকে ডেকে বললেন—তোমার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আছে। সুযোগ পেলে তুমি অনেক দূর যেতে পারবে। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। ম্যাট্রিকে ভাল ফল করতে হবে।কোনো সহায় লাগলে তুমি দ্বিধাহীনভাবে আমায় বলো, আমি যতদূর পারি তোমাকে সহায় করব।
কথাগুলো রহিমের মনে আশার আলো জ্বালাল। কিন্তু বাড়ি ফিরে যখন সে মাকে ফলের কথা জানাল, তখন আনন্দের সঙ্গে একটি কঠিন প্রশ্নও সামনে এসে দাঁড়াল।
নতুন বই কিনতে হবে। নতুন জামা কাপড়ও বানাতে হবে। এতো টাকা আসবে কোথা থেকে?
আমিনা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তুই এগিয়ে চল। টাকার চিন্তা তোকে করতে হবেনা, টাকার চিন্তা করব আমি।তুই টাকার চিন্তা করে পড়ার ক্ষতি করিস না।
রহিম জানত, মায়ের হাতে টাকা নেই। তবু সে মাকে নিরাশ করতে পারল না। বলল-আচ্ছা তোমার কথাই মানলাম। এখন থেকে টাকার চিন্তা তুমি করবে আর পড়ার চিন্তা আমি করব।
এদিকে সায়রা ভাবলো, রহিমের সামর্থ কম। তাকে বই দিয়ে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু এবার শুধু বই দিলেই হবে না। সম্ভব হলে টাকা দিয়েও সহায় করতে হবে।কিন্তু তারও তো সামর্থ সীমিত। দশটা টাকার দর্কার হলেও বাবাব কাছে হাত পাততে হয়।
তাই সায়রা বাবার সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল।
হাজি করিম সাহেব প্রথমে কিছু বললেন না। তিনি রহিমকে মেধাবী ছেলে হিসেবে জানতেন। এই কথাও জানতেন যে, ছেলেটির পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ। কাজের প্রতিও অবহেলা নেই ছেলেটার।তাঁর বাড়িতে থাকার সময় কখনও দায়িত্বে অবহেলা করেনি ছেলেটা।
কিন্তু ছেলেটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সাহায্যের কথা উঠতেই তিনি বললেন—রহিম পড়াশোনায় ভালো, একথা শুধু আমি কেন সবাই স্বীকার করবে।। তবে মা, সব মানুষের জন্য সব পথ খোলা থাকে না।
সায়রা প্রতিবাদ করল না। শুধু বলল— পথ বন্ধ থাকলে কেউ না কেউ বিকল্প পথের সন্ধান করে দিতে পারে, বাবা।
হাজি করিম সাহেব মেয়ের দিকে তাকালেন। তাঁর মনে হলো, সায়রা এখন আগের মতো নেই।তার কথাবার্তা ও চালচলন যেন অনেকটা বদলে গেছে। তবে তিনি তখনও বুঝতে পারেননি, রহিমের পড়াশোনার প্রতি সায়রার এই আগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের মনের মধ্যে রহিমের প্রতি অন্য একটি সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে।
আর সেই সম্পর্কই একদিন করিম সাহেবকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক মর্যদার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।
দশম অধ্যায়
শরৎ এসে গেছে। আকাশ নীল, মেঘ সাদা। ধানক্ষেতে শিষ বেরিয়েছে। বিকেলে গ্রামের ছেলেরা পুকুরে সাঁতার কাটে, মেয়েরা কলসি নিয়ে জল আনতে যায়। বাড়ি বাড়ি ধান কাটার প্রস্তুতি চলছে।
সেদিন রহিম স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাঁশবনের নিচে এসে দাঁড়াল। বাঁশবনই তাদের দেখা-সাক্ষাৎ করার স্থান। সায়রা জানে, স্কুল থেকে যাওয়ার পথে রহিম বাঁশবনের নিচে এসে দাঁড়াবে। স্কুলেই এ বিষয়ে কথা হয়েছে সায়রার সাথে। সায়রা তাকে একটি বই দিবে। তাই সায়রাকে সময় দেওয়ার জন্য রহিম স্কুল ছুটির পর গণিতের স্যারের সঙ্গে একটা অঙ্ক নিয়ে আলোচনা করে স্কুল থেকে একটু দেরি করে ফিরেছে।
রহিমকে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না। একটু পরেই সায়রা বাঁশবনের ধারে এলো। কারণ সে স্কুল থেকে এসে কাপড় বদলিয়ে বইটি হাতে নিয়ে রাস্তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। রহিমকে দেখেই সে বইটি হাতে নিয়ে চলে এসেছে।
সায়রা বইটি ফেরত দিতে এসেছিল। গল্পের বই।বইটি রহিমই দিয়েছিল সায়রাকে। সায়রা বইটি রহিমের হাতে দিল। বইয়ের ভিতরে একটি ছোট্ট কাগজ রাখা ছিল। রহিম বইটি হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা ওলটাতেই কাগজটি তার চোখে পড়ল।
কাগজে লেখা ছিল— কিছু মানুষকে প্রতিদিন দেখা হয়, অথচ তাদের চেনা যায় না। আবার কাউকে অল্প সময়ে দেখে ফেললেও চেনা হয়ে যায়, মনে হয়, যেন বহু দিনের পরিচয়।”
রহিম কাগজটি পড়ে সায়রার দিকে তাকাল।
—এটা তোমার লেখা?
সায়রা একটু লজ্জা পেয়ে বলল— একটা গল্প পড়ে মনে হলো, কথাটা সত্যি।
—কোন গল্প?
—গল্পের নাম মনে নেই। কিন্তু কথাটা মনে আছে।
রহিম কাগজটি ভাঁজ করে আবার বইয়ের মধ্যে রেখে দিল।
—কথাটা আমারও মনে ধরেছে। মনে হয় কথাটার মাঝে লজিক আছে।
সেদিন তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই অনেকক্ষণ কথা বলল। স্কুলের পড়াশোনা, নিজেদের ভবিষ্যৎ, গ্রামের মানুষের জীবন— সব বিষয় নিয়ে।
সায়রা বলল,
—আমাদের গ্রামে এত ছেলেমেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেয় কেন?
রহিম উত্তর দিল—কারণ তাদের বাড়িতে বই কেনার আগে চাল কিনতে হয়। স্কুলে যাওয়ার আগে মাঠে কাজ করতে হয়। অসুখ হলে পড়াশোনা বন্ধ থাকে। অনেকের কাছে শিক্ষা এখনও দূরের জিনিস। বিলাসিতা।
—তাহলে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে কীভাবে?
—স্কুল বাড়াতে হবে, গরিব ছেলেদের সাহায্য করতে হবে। গ্রামের মানুষকে বোঝাতে হবে, পড়াশোনা শুধু ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য নয়। গরিবদেরও অধিকার আছে পড়াশোনা করার। খাদ্য-বস্ত্রের মতো পড়াশোনাও মানুষের মৌলিক অধিকার।
সায়রা বলল—পড়াশোনা করতে হলে তো স্কুল-কলেজ লাগবে? কলেজর ব্যবস্থা কে করবে? তুমি করবে?
—হ্যাঁ, করতে চাই। তবে শুধু ইচ্ছা থাকলেই তো হয় না।আমাদের এখনও অনেক জিনিসের অভাব রয়েছে। শিক্ষক কোথায় পাবে। হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার মতো শিক্ষকই নেই আমাদের অঞ্চলে, কলেজ শিক্ষক কোথায় পাবে?
—ইচ্ছা থাকলে সময়ে সবকিছুই সম্ভব হয়। তবে শুধু ইচ্ছা থাকলেই হবে না। ইচ্ছার সঙ্গে কাজও যোগ করতে হয়।
রহিম হাসল।
—এই কথাটা তোমার খুব প্রিয়, তাই না?
—হ্যাঁ। কারণ অনেক মানুষ শুধু স্বপ্ন দেখে, কিন্তু কাজ শুরু করে না।
বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে বিকেলের রোদ পড়ছিল সায়রার মুখে। সায়রার চুলে বাতাসে উড়ছিল। রহিমের মনে হলো, এই বিকেলটি যেন তার জীবনের অন্য সব বিকেলের চেয়ে আলাদা।
তবু সে নিজের অনুভূতির নাম দিতে পারল না।
সায়রাও পারল না।
বন্ধুত্ব কখন ভালোবাসার দিকে এগিয়ে যায়, তার কোনো নির্দিষ্ট কাল-ক্ষণ থাকে না। কখনও একটি কথা, কখনও একটু অপেক্ষা, কখনও বইয়ের পাতায় লেখা একটি বাক্য— নীরবে ভালোবাসার ভিত রচনা করে।
সেদিন তাদের কেউই এ নিয়ে ভাবেনি। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে দুজনেই একবার করে পিছন ফিরে তাকিয়েছিল।
বাঁশবন সেদিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অথচ তার চার পাশ ঘিরে একটি নতুন গল্প তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু যাদের ঘিরে গল্প তৈরি হচ্ছিল, তারা নিজেরাও জানত না সেই গল্পের শেষ কোথায়!
একাদশ অধ্যায়
শীতের আগে গ্রামে একটি বড় সামাজিক অনুষ্ঠান হলো গোবিন্দপুর গ্রামে। গ্রামের মানুষ মিলিত হয়ে মাঠ পরিষ্কার করল, বাঁশের মাচা তৈরি হলো, রাতের অনুষ্ঠানে আলো জ্বালানোর জন্য হ্যাজাক লাইট জোগাড় করা হলো। কারও বাড়ি থেকে চাল এল, কারও কাছ থেকে এল সবজি, কেউ শ্রম দিল, কেউ দিল অর্থ।
হাজি করিম সাহেব এই আয়োজনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর অবদান নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
রহিমও সেই অনুষ্ঠানের কাজে সাহায্য করছিল। সে বাঁশ কেটে মাচা তৈরিতে হাত লাগাল, ছোটদের বসার জায়গা করে দিল। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গ্রামের বৃদ্ধদের কাছ থেকে পুরোনো দিনের গল্প শুনছিল।
সায়রা গ্রামের অন্য মেয়েদের সঙ্গে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। সে দূর থেকে লক্ষ্য করল, রহিম এক বৃদ্ধের হাত ধরে তাঁকে বসার জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।
কাজের শেষে তাদের দেখা হলো।
সায়রা বলল— তুমি তো আজ সারাদিন কাজ করেছ।
—সবাই কাজ করছে। আমি একা তো করেনি!
—তুমি সব সময় নিজের কাজের বাইরেও অন্যের কাজ করো কেন?
রহিম কিছুক্ষণ ভেবে বলল—কারও কষ্ট দেখলে মনে হয়, একটু সাহায্য করতে পারলে ভালো হতো।
দেখলাম তুমি এক বৃদ্ধের সাথে নিবিড় হয়ে গল্প করছ। কী গল্প করলে দুজনে?
তুমি কোথা থেকে দেখলে?
দূর থেকেই দেখেছি।
পঞ্চাশ বছর আগের গ্রামের অবস্থা কেমন ছিল এই বিষয়ে জানলাম বৃদ্ধের কাছ থেকে।
কেমন ছিল পঞ্চাশ বছর আগে।
রাস্তা-ঘাট বলতে কিছুই ছিল না। মানুষ আল পথ দিয়ে চলাফেরা করত। কুঁয়া ছিল না। খড়াদিনে মাটি খুঁড়ে জল বের করে খেতে হতো সবাইকে। বর্ষায় বন্যার জল খেত। যার জন্য বছর বছর কলেরা বসন্তে অনেক লোক মারা যেত। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাস এলে বসন্তের প্রকোপ এবং কাতি মাস এলে কলেরার প্রকোপ বাড়ত। কলেরায় কোনও কোনও গ্রাম একেবারে সাফা হয়ে যেত। কাতি মাস গেলে মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচত এই ভেবে যে তারা আরও একটা বছর বাঁচতে পারবে। বৃদ্ধের নিজেরই এগার দিনের মধ্যে পাঁচজন ছেলেমেয়ে কলেরায় মরা গিয়েছিল।ছেলেমেয়েদের শোকে বৃদ্ধের স্ত্রী উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। একমাত্র অপরিষ্কার জল ব্যবহারের জন্য তখন চর্মরোগ লেগেই থাকত। ছোট বড় সবারই তখন চর্মরোগ হত।
সায়রা মুগ্ধ হয়ে রহিমের কথা শুনছিল। রহিম কথা শেষ করে তার দিকে তাকাল। সে বলল-কোনও কোনও জায়গায় এরকম অবস্থা এখনও রয়েছে।
কোনও কোনও জায়গায় থাকবে কেন, আমাদের গ্রামেই এখনও এরকম অবস্থা রয়েছে।
বৃদ্ধার কথা আমি মার মুখে শোনেছি। সায়রা বলল- সেই বৃদ্ধা এখনও জীবিত। চল একদিন বৃদ্ধার সাথে দেখা করে আসি।
চল, ভালই লাগবে বৃদ্ধার সাথে দেখা করলে। যদি বৃদ্ধের সাথে কথা বলতে চাও, এখনই বলতে পারবে।
না, আজ আর শুনব না। আরেকদিন শুনব। একন বেলা পরে এসেছে। তোমাকেও তো অনেক দূর যেতে হবে।
আজ তেমন অসুবিধা হবেনা। রহিম বলল-আজ মতিনের সাথে সাইকেলে এসেছি।
মতিন কি সাইকেল কিনেছে?
সাইকেলটা মতিনের নিজেরই, তবে মতিন নিজে কিনেনি। তার শশুড় বাড়ি থেকে দিয়েছে।
শশুড় বাড়ি থেকে দিয়েছে মানে? মজিদ কি বিয়ে করেছে?
হ্যাঁ করেছে। তবে তার নিজের ইচ্ছায় নয়, তার দাদির ইচ্ছায়। দাদির বোলে নাতবৌয়ের মুখ দেখার ইচ্ছা।
রহিমের পড়াশোনা?
ও তো বলতেছে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। দেখি শেষ পর্যন্ত কি হয়!
এমন সময় মজিদ সাইকেল নিয়ে সেখানে এসে হাজির হলো। সে রহিমকে উদ্দেশ্য করে বলল- চল,যাওয়া যাক। বেলা বেশি নেই।পথের অবস্থাও তেমন ভালো নয়। আন্ধার হওয়ার
আগে আগে বাডি় পৌঁছাতে হবে।
রহিম এবং মজিদ চলে গেলো। সায়রা তাদের পথের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সেও বাড়ির দিকে রাওনা হলো।
অনুষ্ঠানের রাতে গ্রামের মানুষ একসঙ্গে বসে গান শুনল, গল্প করল। ধনী-গরিব সবাই একই মাঠে উপস্থিত ছিল, যদিও তাদের বসার জায়গা ও সামাজিক অবস্থান এক ছিল না।
এক সময় একজন শিক্ষক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখলেন। তিনি বললেন, গ্রামের উন্নতির জন্য শিক্ষিত তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।
রহিম মন দিয়ে শুনছিল তাঁর বক্তব্য।
অনুষ্ঠান শেষে সায়রা তাকে বলল— স্যারের আজকের কথাগুলো স্বপ্নের মতোই লাগল। তুমি দেখলাম খুব মনযোগ দিয়ে শুনলে স্যারের বক্তব্য।
হ্যাঁ, শুনলাম। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন স্যার। শিক্ষা প্রসারের জন্য তরুণদেরই আগভাগ নিতে হবে। বলতে পার স্যার আমার মনের কথাই বলেছেন।
সায়রা বলল— তোমারও কিছু বলা উচিত ছিলো আজকের অনুষ্ঠানে। আমি তো ভাবছিলাম তুমি নিশ্চয় কিছু বলবে।
রহিম উত্তর দিল—সুযোগ পেলে নিশ্চয় বলতাম। আজ বলতে পারিনি ঠিকই, সুযোগ পেলে পরে কোনোদিন নিশ্চয় বলব।
সেই রাতের আকাশে তারা ঝলমল করছিল। সেদিন একেবারে শেষ রাতে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল। গ্রামের মানুষ হই হই করে ঘরে ফিরছিল অনুষ্ঠান শেষে। সায়রার খুব ইচ্ছে করছিল রহিমের পাশে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করার। কিন্তু উপায় ছিল না, তাদের সমাজে নারী-পুরুষের সামাজিক ব্যবধান এখনও বিদ্যমান। পুরুষ এবং মহিলার জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারিত করা ছিল। তাই দুজন একই অনুষ্ঠানে দুদিকে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছিল। বাড়ি ফেরার সময় সায়রা হাত ইশারায় রহিমকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে তার বাড়ির বৌঝিদের সাথে বাড়ি ফিরে এসেছিল।
দ্বাদশ অধ্যায়: সন্দেহের শুরু
মানুষের স্বভাবের পরিবর্তন কখনও কখনও প্রথমে চোখে পড়ে না। কিন্তু পরিবারের মানুষ নিজের পরিবারের সদস্যদের ছোট ছোট পরিবর্তন বুঝতে পারে।
সায়রা এখন প্রায়ই বইয়ের কথা বলে। পড়াশোনার অজুহাতে দীর্ঘক্ষণ জানালার পাশে বসে থাকে। রহিমের নাম তার কথায় বারবার আসে।
একদিন হাজি করিম মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন—রহিম ছেলেটা তোমার খুব বন্ধু হয়েছে দেখছি?
সায়রা একটু থেমে বলল—ও ভালো ছাত্র। তাই পড়াশোনা নিয়ে মাঝেমধ্যে ওর সাথে আলোচনা করি।কিছু না বুঝলে ওর সাথে আলোচনা করে বুঝার চেষ্টা করি।
—পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করার জন্য স্কুল আছে, শিক্ষক আছেন। সব কথা বাড়ির বাইরের লোকের সাথে বলার দরকার কী?
সায়রা বুঝল, বাবার প্রশ্নের মধ্যে শুধু কৌতূহল নেই। আছে সন্দেহ। সমাজে প্রচলিত নারী-পুরুষের মানসিক ব্যবধান।
সে শান্তভাবে বলল—ও ভাল ছাত্র। ওর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখি, বাবা। যা শিক্ষকদের কাছ থেকে শেখা যায় না।
হাজি করিম কঠিন মুখে বললেন —শেখার জন্য ভালো পরিবেশ দরকার। মানুষের সঙ্গে বুঝে-শুনে মিশতে হয়। সবার সাথে মিশলে সমাজ তা মেনে নেয় না। আশা করি, তোমাকে আমি অল্পতেই অনেক কিছু বুঝাতে পেরেছি।
সায়রা আর কিছু বলল না।
কিন্তু সেদিন থেকে বাড়ির পরিবেশ বদলাতে শুরু করল। তার বাইরে যাওয়ার সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠল। বই ধার দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি উঠল।
একদিন রহিম বই ফেরত দিতে এলে বাড়ির একজন কাজের লোক তাকে বলল, হাজি সাহেব এখন বাড়িতে নেই। পরে আসতে হবে।
তবু রহিম বইটি ফেরত দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বুঝল, তাকে ভিতরে যেতে দেওয়া হবে না।
সে বইটি কাজের লোকের হাতে দিয়ে ফিরে এল।
সায়রা জানালার আড়াল থেকে সব দেখেছিল। তার মনে কষ্ট হলো। কিন্তু সে বুঝতে পারল, বাবার সঙ্গে সরাসরি বিরোধ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এই ভেবে সে জানালার আড়ালেই চুপচাপ বসে রইল।
সন্ধ্যায় সায়রা নিজের খাতায় লিখল—মানুষের মধ্যে দূরত্ব সব সময় রাস্তা দিয়ে তৈরি হয় না। কখনও দূরত্ব তৈরি হয় সন্দেহ দিয়ে, কখনও ভয়ের দ্বারা।
সেই দিন থেকে তাদের বন্ধুত্বের পথ আর আগের মতো সহজ রইল না।
তবু রহিম তার বইপড়া বন্ধ করল না। স্কুলের লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে সে বইপড়া চালিয়ে গেল। এদিকে সায়রাও বই পড়া ছাড়ল না। সেও আগের চেয়েও বেশি উদ্যমে বই পড়া চালিয়ে গেল।
তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ কমে গেল ঠিকই, কিন্তু বোঝাপড়া কমল না।
ত্রয়োদশ অধ্যায়
শীতের এক সকালে আমেনার শরীর খারাপ হলো। প্রথমে সামান্য জ্বর মনে হলেও পরে জ্বর বাড়তে লাগল। রহিম গ্রামের চিকিৎসককে ডেকে আনল। চিকিৎসক কিছু ওষুধ দিল, কিন্তু আমিনার দুর্বলতা কমল না। জ্বরো ছাড়ল না। ফলে আমেনা খুবই দুর্বল হয়ে পড়ল।
মায়ের দেখা-শোনার জন্য রহিম স্কুলে যাওয়া বন্ধ করল। মায়ের পাশে বসে জলপটি দেওয়া, জল খাওয়ানো, সময় মতো ওষুধ খাওয়ানো ইত্যাদি কাজ রহিমকেই করতো হতো। রাতে মায়ের ঘুম ভেঙে গেলে সেও জেগে মায়ের পাশে বসে থাকত ফাই-ফরমাশ শোনার জন্য।
অভাবের সংসারে অসুখ মানে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, অর্থনৈতিক সংকটও। ওষুধ কেনার জন্য রহিমকে কয়েকটি পুরনো বইখাতা বিক্রি করার কথা ভাবতে হলো।
যে বইগুলো সে বহু যত্নে জমিয়েছিল, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে তার বুক হাহাকার করে উঠল। বইগুলো সে খুবই কষ্ট করে কিনেছিলো তার খরচের পয়সা বাঁচিয়ে।
একদিন সায়রা খবর পেল, রহিমের মা অসুস্থ। সে মাকে জানিয়ে কিছু ফল ও ওষুধ পাঠাতে চাইল। কিন্তু হাজি করিম সাহেব কথাটা টের পেয়ে বললেন —রহিমের মায়ের অসুখ হয়েছে এটা অবশ্যেই উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা, আমরা তাঁকে সাহায্য করতেই পারি। কিন্তু তাই বলে তুমি নিজে সেখানে যাওয়ার দরকার নেই। ওষুধ কিনে পাঠিয়ে দাও।
সায়রা বলল— ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে আমি রহিমের মায়ের খোঁজ নিতে চাই। আমি যাব আর আসব। কাজের কোনো লোককে আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।
—ওষুধ পাঠানো আর খোঁজ নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। রহিমের মা আমাদের কোনো আত্মীয় নয়। তাই লোকে আমাদের দুই কথা শোনাতে পারে। এই জন্য বলছি আর কি! কি ওষুধ লাগবে একটা লিষ্ট করে দাও, আমি ফার্মাসি থেকে কিনে এনে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিব।
সায়রার বলার ইচ্ছে হয়েছিলো, রহিম অনেকদিন আমাদের বাড়িতে ছিল, তাই তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া আমি জরুরি বলে মনে করি। কিন্তু বলল না। যুক্তি তর্ক করতে গেলে ওষুধ পাঠানোও বন্ধ করে দিতে পারে। এই আশঙ্কা করে সায়রা চুপ করে রইল।
সে বলল- আমি ইতিমধ্যে ফার্মাসি থেকে ওষুধ আনিয়েছি। এখন ওষুধ আনার প্রয়োজন হবে না।
তাহলে ওষুধগুলো কাইকে দিয়ে পাঠিয়ে দাও। তোমার যাওয়ার দর্কার নেই। সমাজে আমাদের একটা ইজ্জত আছে। সেই ইজ্জত ক্ষুণ্ণ করা উচিত হবে না।
সায়রা সেদিনই বিকেলে একজন বিশ্বাসী কাজের লোকের সাহায্যে ওষুধগুলো পাঠিয়ে দিল।
রহিম ওষুধ পেয়ে বুঝল, কে পাঠিয়েছে। সে একটি ছোট্ট চিরকুট লিখল— তোমার সাহায্য আমার মায়ের জন্য খুব প্রয়োজনীয় ছিল। কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে আমি চাই, যেন একদিন নিজের পরিশ্রমের টাকায় মায়ের চিকিৎসা করাতে পারি।
সায়রা চিরকুটটি পড়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
কারণ রহিমের আত্মসম্মান তাকে স্পর্শ করেছিল। সে সাহায্য প্রত্যাখ্যান করেনি, কিন্তু তার আত্মসন্মানবোধটাও যে প্রবল একথাও সে লুকায়নি।
কয়েক দিন পর আমেনার জ্বর কমল। তিনি ছেলের হাত ধরে বললেন— তুই তোর সকল কাজ-কর্ম ফেলে আমার জন্য এত কষ্ট করছিস কেন?
রহিম অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল— কারণ তুমি আমার মা। মায়ের সেবার মাধ্যমে সন্তানের জান্নাত লাভ হয় বলে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে।
আমিনা মৃদু হাসলেন। বললেন—একদিন তুই অনেক বড় হবি। তখন যেন তোর দরজায় কেউ সাহায্য চাইতে এসে খালী হাতে ফিরে না যায়।
রহিম মায়ের হাত নিজের কপালে ছুঁইয়ে নিল। বলল- তোমার এই কথা আমি সর্বদা মনে রখার চেষ্টা করব, মা। তোমার এই কথা আমি মাতৃ আদেশ বলে চিরদিন মনে রাখব।
সে মুখে এভাবে বলল এবং সেই মুহূর্তে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যত বাধাই আসুক না কেন, সে পড়াশোনায় কোনোদিন গাফিলতি করবেনা। তার সর্বস্ব দিয়ে সে পড়াশোনা অব্যাহত রাখবে। কারণ গরিবের স্বপ্ন পূরণের একমাত্র মাধ্যম হলো পড়াশোনা। ধনীর জন্য পড়াশোনা অলংকার হলেও গরিবের জন্য সম্পদ।
কারণ তার স্বপ্ন শুধু তার একার ছিল না। সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মায়ের আশা, গ্রামের দরিদ্র ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ এবং সায়রার তার প্রতি থাকা বিশ্বাস।
এদিকে সায়রা পিতার শাসনের পর থেকে রহিমের সাথে আগের মতো খোলা-খুলিভাবে মেলা-মেশা বন্ধ করে দিলো। কারণ ক্ষমতাশালী লোকেরা অনেক সময় নিজদের জেদের বশবর্তী হয়ে অন্যের ক্ষতি করতে কুণ্ঠিত হয় না। যাতে রহিমের কোনো ক্ষতি না হয়, এর জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিলো সায়রা। তবে সে বই ও চিঠির মাধ্যমে পূর্বের মতোই ভাবের আদান-প্রদান অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিলো।
চতুর্দশ অধ্যায়
আমিনার অসুখ সেরে ওঠার পর রহিম আবার স্কুলে যেতে শুরু করল। কিন্তু তার আগের মতো সায়রার সঙ্গে দেখা হতো না। স্কুলে তাদের কথা সীমিত থাকত, আর বাড়ির আশপাশে দেখা হলে সমাজের অপবাদের ভয়ে দুজনেই সতর্ক থাকত।এদিকে হাজি করিম সাহেবের ভয়ও কম ছিল না।
সায়রা একদিন তার ইতিহাসের বইয়ের ভিতরে ছোট্ট একটি চিঠি রেখে দিল। বইটি রহিমকে ফেরত দেওয়ার ছিল।
সায়রা চিঠিতে লিখেছিল—
“রহিম,
যত বাধাই আসুক তুমি পড়াশোনা ছেড়ে দিওনা। তোমার স্বপ্নের কথা আমি মনে রেখেছি। তুমি একদিন বলেছিলে, তুমি শিক্ষক হবে— আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে, তুমি তোমার ঈস্পিত লক্ষ্যে নিশ্চিতভাবে পৌঁছাতে পারবে। মানুষ অনেক সময় নিজের জীবনকে অন্যের নিয়মে বাঁধতে চায়। আসলে মনকে সৎ রেখে নিজের স্বপ্নের পেছনে নিজের মতো করে চলাই উচিত। লোকের দেখানো পথে চললে রাস্তা সুগম হয় ঠিকই, তবে অনেক সময় পথভ্রষ্ট হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। এই পৃথিবীতে যারা আঁচড় রেখে যেতে চায়, তারা নিজের মতো করে পথ চলতেই পছন্দ করে। অবশ্যে এই পৃথিবীকে কিছু জানাতে হলে, নিজেও অন্যের কাছ থেকে কিছু জানার চেষ্টা করতে হবে। পৃথিবীকে জানার একমাত্র উপায়ই হলো বই ও অন্যের সঙ্গে আলোচনা। বই ভাবতে শেখায় ও আলোচনা ভাল-মন্দ বিবেচনা করতে শেখায়।
আমি যা কিছু শিখেছি, তার অর্ধেক শিখেছি বই থেকে আর অর্ধেক শিখেছি তোমার সাথে আলোচনার মাধ্যমে।ভাবের আদান-প্রদান করলে অনেক নাজানা কথা শেখার সুযোগ হয়।
ভালো থেকো।
—সায়রা
চিঠিটি পড়ে রহিম অনেকক্ষণ বসে রইল। তার মনে হলো, সায়রা যেন দূর থেকে তাকে সাহস দিতে এসব কথা লিখেছে।
রহিম উত্তরে লিখল—
“সায়রা,
তোমার কথা আমার মনে থাকবে। আমি চেষ্টা করব যেন কোনো বাধার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে না হয়। তুমি আমাকে যে বইগুলো দিয়েছ, সেগুলো আমি শুধু পড়ার জন্য পড়িনি, জীবনের চলার পথে প্রয়োগ করারও চেষ্টা করে চলেছি।
আমাদের জীবনের পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু জ্ঞান ও মানবিকতার পথ আলাদা নয়।
—রহিম
চিঠি দুটির মধ্যে প্রেমের কোনো সরাসরি ঘোষণা ছিল না। তবু তাদের অনুভূতি আগের চেয়ে অনেক গভীর হয়ে উঠেছিল।
কখনও কখনও মানুষ মুখে যে কথা বলতে পারে না, তা কাগজের কয়েকটি লাইনে প্রকাশ করতে পারে। রহিম ও সায়রার মাঝে সরাসরি যোগাযোগ নাথাকলেও চিঠির মাধ্যমে তারা গোপনে ভাবের আদান-প্রদান চালিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু সেই চিঠির আদান-প্রদান বেশিদিন গোপন থাকল না। একদিন সায়রার বাবা লাইব্রেরীতে একটি বই খুঁজেত গিয়ে নাপেয়ে সায়রার নিকট থাকতে পারে ভেবে সায়রার বইয়ের মাঝে সেই বইটি খুঁজতে ছিলেন। কারণ তিনি জানেন সায়রা নিয়মিতভাবে লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে পড়ে। তিনি ভাবা মতেই বইটি সায়রার বইয়ের মাঝেই ছিল এবং সেই বইয়ের মাঝে রহিমের ছোট্ট একটি চিঠি ছিল।
অনধিকার বলে তিনি পুরো চিঠিটা পড়লেন না। কিন্তু কৌতূহলবশত যতটুকু পড়লেন, তাতেই তাঁর পূর্বের সন্দেহ আরও দৃঢ় হলো।
সেদিন রাতে তিনি মেয়েকে ডেকে বললেন— আমি তোমার পড়াশোনার ব্যবস্থা অন্য জায়গায় করার কথা ভাবছি। আমি দুই একদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কথাটা তোমাকে জানাব।
সায়রা কোনো প্রশ্ন করল না। সে বুঝল, ঝড় আসছে। সেই ঝড়ের বেগ কতদূর প্রবল হবে তা আগেই অনুমান করা সম্ভব নয়। তবে এটুকু অবশ্যেই অনুভব করা যায়, ঝড়ের গতি খুব একটা কম হবে না।
পঞ্চদশ অধ্যায়
হাজি করিম সাহেবের কাছে সামাজিক মর্যাদা ছিল জীবনের অন্যতম প্রধান সম্পদ। গ্রামের মানুষ তাঁকে সম্মান করত, তাঁর পরামর্শ নিত, তাঁর বাড়িতে নানা কাজে আসত। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবারের সম্মান রক্ষা করা একজন পিতার অবশ্য কর্তব্য। কারণ পরিবারের কাছে সন্মান নাথাকলে সমাজের কাছ থেকে সন্মান আশা করা যায়না।
তাঁর চোখে রহিম মেধাবী হতে পারে, সৎ হতে পারে, কিন্তু সামাজিক অবস্থানের বিচারে সে সায়রার সমকক্ষ নয়।
এক সন্ধ্যায় তিনি মেয়েকে নিজের ঘরে ডেকে এনে বললেন— সেদিন যে তোমাকে অন্যত্র রেখে পড়ানোর কথা বলেছিলাম, এ বিষয়ে আমি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছি। তোমাকে শহরের স্কুলে পড়ানোর কথা ভাবছি। তোমাকে আর গ্রামের স্কুলে পড়তে হবে না। এবার থেকে তুমি তোমাদের মামাদেরর বাড়িতে থেকে শহরের স্কুলে পড়বে। এ বিষয়ে তোমার মামার সাথে আমি কথা বলেছি।
বাবার কথা শুনো সায়রা স্তব্ধ হয়ে গেল। বলল— আর তো মাত্র কয়েক মাস বাকি ম্যাট্রিক পরীক্ষার। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর এমনিতেই তো শহরে গিয়ে কলেজে পড়তে হবে। ম্যাট্রিক পাশের পরে গেলে হবে না, বাবা? এখনি যেতে হবে?
—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
—কয়েক দিন পরেই তো আমার ষাণ্মাসিক পরীক্ষা!
—সেখানে গিয়েও পরীক্ষা দিতে পারবে। তোমার মামা ভর্তির জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করে ফেলেছেন।প্রয়োজন হলে টিউশনির ব্যবস্থাও করে দিব। সেখানে গেলে তোমার লেখা-পড়াও ভালো হবে। সবগুলো শিক্ষক প্রশিক্ষিত ও হাইলি কোয়ালিফাইড।
সায়রা বুঝল, এটি শুধু তার উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থার জন্য নয়। তাকে রহিমের কাছ
থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এসব করা হচ্ছে।
সে সাহস করে বলল—রহিম কোনো খারাপ ছেলে নয়, বাবা। সে পড়াশোনায় ভালো, পরিশ্রম করে, সবাইকে সম্মান করে।তার কাছ থেকে আমি পড়াশোনা সম্বন্ধে অনেক সহায় পাই।
হাজি করিম সাহেবের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। বলেলন- তুমি রহিমের প্রসংগ এখানে টেনে আনলে কেন? আমি যা করছি, তোমার ভালর জন্যই বলছি। আর হ্যাঁ, রহিমের প্রসংগই যখন তুলেছ, তখন শুন, আমি রহিমের চরিত্র নিয়ে কথা বলছি না। রহিম মেধাবী আমি জানি। আমি বলছি, সমাজে প্রত্যেকের একটা অবস্থান আছে।
—মানুষের অবস্থান কি জন্ম দিয়ে নির্ধারিত হয়, বাবা? নাকি কাজ দিয়ে?
প্রশ্নটি শুনে হাজি করিম রেগে গেলেন— বেশি বই পড়লে মানুষ সব সময় বাস্তবতা বোঝে না। পুথিগত বিদ্যা এবং বাস্তবতা থেকে আহরণ করা জ্ঞানের মধ্যে অনেক তফাৎ।
সায়রা কিছু বলল না। তার চোখে জল এসে গিয়েছিল, কিন্তু সে কাঁদল না। সে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাবার কাছ থেকে নিজের ঘরে চলে এল।
রাতে নিজের ঘরে বসে সে আলমারি খুলল। রহিমের কাছ থেকে পাওয়া বইগুলো সে আলাদা করে রাখল। বইয়ের পাতায় পাতায় ছিল তাদের আলোচনার স্মৃতি, ছোট ছোট মন্তব্য, নানান প্রশ্নের উত্তর।
সে একটি বইয়ের ভিতরে লিখল—দূরত্ব যদি তৈরি হয়, তা নিয়ে আক্ষেপ করোনা, কায়িক দূরত্ব মানুষকে কায়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে, কিন্তু মন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে না। দূরত্বের ওপারেও মানুষ অপেক্ষা করতে পারে।
পরদিন সে রহিমকে খবর পাঠাল যে তাকে শহরে পাঠানো হচ্ছে।
রহিম খবর শুনে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। করিম সাহেব কেন হঠাৎ এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে, একথাও সে উপলব্ধি করতে পারল।
তার সামনে পরীক্ষা, বাড়ির অভাব, মায়ের দায়িত্ব। সায়রাকে কাছে ধরে রাখার মতো তার সামাজিক ক্ষমতা ছিল না।
তবু সে মনে মনে বলল, আমি নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলব, যাতে একদিন আমার পরিচয় শুধু অভাবী ঘরের ছেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। হাজি করিম সাহেবদের মতো মানুযরাও তাকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়।
ষোড়শ অধ্যায়
সায়রার শহরে চলে যাওয়ার দিন ভোর থেকেই হাজি করিম সাহেবের বাড়িতে ব্যস্ততা। একটি গরুর গাড়িতে মালপত্র তোলা হচ্ছে। সায়রার মা বারবার জিনিসপত্র পরীক্ষা করছেন। পথের জন্য খাবার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।যাতে মেয়ে পথে যেতে ক্ষিদায় কষ্ট না পায়।
সায়রা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো গ্রামটিকে দেখছিল। ধানক্ষেত, পুকুর, মাটির রাস্তা, বাঁশবন—সবই যেন আগের মতো আছে। অথচ তার নিজের জীবন বদলে যাচ্ছে।
সে জানত, রহিম হয়তো তাকে বিদায় জানাতে আসবে না। তবু তার চোখ বারবার পথের দিকে চলে যাচ্ছিল।কারণ মন এমন জিনিষ যাকে ইচ্ছে করে বেঁধে রাখা যায় না। মন নিজের গতিতে নিজের খেয়াল খুশি মতে চলে। সাধারণ মানুষ মনকে আয়ত্বে রাখতে পারেনা। মনকে যারা আয়ত্বে রাখতে পারে তাঁরাই বিশ্ব জয় করতে পারে।
রহিম কোনো অসাধারণ মানুয় নয়, সাধারণ মানুষ। সেজন্য সে মনকে বাঁধতে না পেরে শুধু মাত্র একটিবার চোখের দেখা দেখার জন্য বাড়ি থেকে স্কুলের নাম করে বেড়িয়ে এসে স্কুলে না গিয়ে সায়রাদের বাড়ির পেছনের বাঁশবনের নিচে দাঁড়িয়ে রইল। বাঁশবনের পাশ দিয়েই শহরে যাওয়ার রাস্তা। সে গরুর গাড়িটি এগিয়ে আসতে দেখল।
সায়রা তাকে দেখতে পেল। গাড়ি থামানো হলো না। শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখাচোখি হলো। একটু দূরেই সায়রার মার সাথে কয়েকজন কাজের লোক দাঁড়িয়ে ছিল।
সেজন্য তাদের মধ্যে কোনো কথা হল না।
গাড়িটা পর্দা দিয়ে ডাকা ছিল। সায়রা জানালার পর্দা সরিয়ে হাত নাড়ল। রহিম শুধু মাথা নত করল।মুখে কিছুই বলল না।
গাড়িটি বাঁশবনের পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে একটি বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রহিম অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল বাঁশবনের নিচে। তারপর ধীরে ধীরে স্কুলের দিকে রাওনা হলো। কারণ তখনও স্কুলের সময় পেরিয়া যায়নি।
সেদিন রাতে রহিম সায়রার দেওয়া একটি বই খুলল। প্রথম পাতায় লেখা ছিল—জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বাড়ে। সে কয়েকবার পড়ল বাক্যটি। জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বরং বাঢ়ে।যেরকম আগুন থেকে আগুন নিলে যেকরম কমেনা, ঠিক সেই রকম।
রহিম বইটি বুকে চেপে ধরল। তার চোখে জল এসে গিয়েছিল, খুব সে কষ্ট করে সেই জল সম্বরণ করল।
ছেলের ভাবান্তর আমেনার চোখে ধরা পড়ল। তিনি ছেলের কাছে এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—কী হয়েছে, বাবা?
রহিম মৃদু কণ্ঠে বলল— কিছু কাছের মানুষ দূরে চলে গেলে তাদের কথা বেশি বেশি মনে পড়ে, মা।
আমিনা সব বুঝলেন না, কিন্তু ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন—যা হারিয়ে যায়, তার জন্য মন খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে জীবনের পথ থামিয়ে রাখতে নেই।
রহিম চোখ মুছে আবার বই খুলল।
সেদিন থেকে তার পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত হলো এক নীরব অপেক্ষা।
সপ্তদশ অধ্যায়
শহরের জীবন সায়রার কাছে নতুন ছিল। সেখানে পাকা রাস্তা, বড় বড় বাড়ি, দোকানপাট, স্কুলের বিশাল ভবন। গ্রামের তুলনায় পড়াশোনার সুযোগ অনেক বেশি।
কিন্তু নতুন পরিবেশের মধ্যে সে নিজেকে একা অনুভব করত। মামার বাড়িতে সবাই তাকে ভালোবাসত, তবু গোবিন্দপুরের সেই পরিচিত পুকুর, বাঁশবন, মাটির রাস্তা—এসবের অভাব সে প্রতিদিন অনুভব করত।
স্কুলের ষাণ্মাসিক পরীক্ষায় সে ভালো ফল করল। ফলে শিক্ষকেরা তার প্রশংসা করলেন। কিন্তু তবু বইয়ের পাতায় কোনো কবিতা পড়লে তার রহিমের কথা মনে পড়ত।
সে ভাবত, রহিম এখন কী করছে? তার পরীক্ষা কেমন হয়েছে? আমেনা খালার শরীর ভালো আছে তো?
সায়রা মাঝে মাঝে চিঠি লিখতে বসত। কিন্তু চিঠি পাঠানোর সাহস পেত না। চিঠিটা বাবার হাতে পড়লে তখন কী হবে? নিশ্চয় বাবা রহিমের প্রতি রুষ্ট হবে। হয়তো তাকে ডেকে এনে শাসিয়ে দিবে। মামাদের কাছে তার প্রতিও কড়া নির্দেশ পাঠাবে। তখন মামারা তার প্রতি কড়া নজর রাখবে। সে কি করছে, কি না করছে সেদিকে নজরদারি করবে। তখন সে খুবই অস্বস্তিবোধ করবে।
অন্যদিকে রহিম নিজের জীবনের কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছিল। সকালে পড়াশোনা, সন্ধ্যায় বাড়ি গিয়ে সংসারের কাজ-কর্ম দেখাশোনা করা। সম্ভব হলে মায়ের সংসারের কাজে সাহায্য কর, রাতে কেরোসিনের আলোয় বই নিয়ে বসা।
মাঝে মাঝে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসত। তবু সে নিজেকে বলত, আর এক পৃষ্ঠা, আর একটি অঙ্ক।
তার বন্ধু মতিন একদিন বলল— তুই এত কষ্ট করিস কেন? পড়াশোনা করছিস ভালো কথা। তাই বলে পড়াশোনার নামে শরীরকে এত কষ্ট দিচ্ছিস কেন! আর পড়াশোনা করলেই কি সবাই চাকরি পায়?
রহিম বলল—সবাই চাকরি পায় না, ঠিক। একমাত্র চাকরিই পড়াশোনার উদ্দেশ্য নয়। পড়াশোনা করলে পৃথিবীকে বোঝার ক্ষমতা বাড়ে। নিজের ভবিষ্যৎটা জানার জন্যও পড়াশোনার প্রয়োজন আছে।
মতিন হেসে বলল-
—তোর মাথায় সব সময় বই ঘোরে।
রহিমও হাসল। মনে মনে বলল, সত্যিই বই ঘূরে।
কিন্তু সে জানত, বই তার কাছে শুধু পরীক্ষায় পাশ করার উপায় নয়। বই তাকে এমন এক পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে, যেখানে মানুষ জন্মের পরিচয়ের বাইরে গিয়েও নিজের মূল্য তৈরি করতে পারে।
সে সায়রাকে ভুলে যায়নি। তবে সে নিজের জীবনের দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ায়নি।
তার কাছে অপেক্ষার অর্থ ছিল নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয়; নিজেকে ভবিষ্যেতর জন্য প্রস্তুত করা।
অষ্টাদশ অধ্যায়
সময় এগিয়ে চলল। রহিমের সামনে ম্যাট্রিক পরীক্ষার প্রস্তুতি। সে প্রবল ধাউতি নিয়ে অধ্যয়নের প্রতি মনোনিবেশ করল। তার মাথায় সব সময় ঘূরপাক খেত ধনীর জন্য শিক্ষা অলংকার এবং গরিবের জন্য শিক্ষা সম্পদ। অধ্যবসায় ছাড়া সম্পদ আহরণ করা যায় না।
গ্রামের স্কুলের শিক্ষক তাকে কয়েকটি পুরোনো বই দিলেন। প্রধান শিক্ষক বললেন—তোমার মতো ছাত্রকে সুযোগ দেওয়া দরকার। তুমি ভালো ফল করলে অন্যরাও উৎসাহিত হবে। আমাদের অনেক প্রত্যাশা আছে তোমার ওপরে। আসা করি তুমি আমাদের নিরাশ করবে না।
রহিম সেই কথাকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করল। বলল- আমি আপনাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব, স্যার।
ফর্ম পূরণের আগে আগে আমেনা নিজের একটি পুরোনো গয়না বিক্রি করলেন। সেই টাকা দিয়ে ছেলের ফর্ম পূরণ ও যাতায়াতের খরচের ব্যবস্থা হলো।
গয়না বিক্রীর কথা জানতে পেরে রহিম মায়ের কাছে ছুটে এল।
—মা, তুমি আবার গয়না বিক্রী করলে কেন?
আমিনা শান্তভাবে বললেন—শরীরে গয়না থাকলে আমার কী লাভ হবে? আমি বিধবা মানুষ। বিধবার গয়না পরা মানায় না।তুই পড়াশোনা করে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিস, সেটাই হবে আমার অলংকার।
রহিম মায়ের পায়ে মাথা রাখল।
পরীক্ষার আগে আগে সে শহরের নিকটে অবস্থিত বেতবারী গ্রামের একটি বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করল। বাড়ির গৃহস্থের নাম মহর আলী। খুবই সহৃদয় লোক। রহিমদের বাড়ির অবস্থা জানার পর কোনো আপত্তি করলেন না তিনি। এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন লজিং রাখার জন্য। শহর থেকে তিন মাইল দূরে বাড়িটা। মহর আলী খুব আগ্রহ সহকারেই পরীক্ষার কয়দিনের জন্য তাঁকে আশ্রয় দিলেন। পরীক্ষার দুদিন আগে রহিম ভোরে সেই জাইগীর বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এল। কুয়াশায় ঢাকা রাস্তা, ধানক্ষেতের ওপর শিশির, দূরে পাখির ডাক। তার ব্যাগে কয়েকটা কাপড়, খাতা-কলম-বই প্রবেশপত্র।
সেই গ্রামে আরও কয়েকজন ছাত্র জাইগীর ছিল। সবাই দূর-দূরান্ত গ্রাম থেকে এসেছে। তার মতই গরিব সবাই। তবে পড়াশোনার আগ্রহ সবার মধ্যেই প্রবল। তারা হেঁটেই শহরে গিয়ে পরীক্ষা দিবে। শহরের চারটা স্কুলে পরীক্ষা কেন্দ্র। তারা পরীক্ষার আগের দিন শহরে গিয়ে নিজেদের পরীক্ষা কেন্দ্র এবং ছিটগুলি দেখে এল। তাদের তিনজনের ছিট একই স্কুলে পরেছিল। দুজনের ছিট পরেছিল একই রূমে। সায়রার ছিট তাদের নিজেদর স্কুলেই পরেছিল। তবে সায়রাদের স্কুল তাদের স্কুল থেকে অনেকটা দূরে। তাই সায়রার সাথে দেখা করা সম্ভব হল না।
পরীক্ষার দিন হলের সামনে অনেক ছাত্রছাত্রীর ভির। সবাই নিজ নিজ হলের সামনে ভির করে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ হলের সামনে দাঁড়িয়েই শেষবারে মতো বইয়ে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। বেল পরার সাথে সাথে সবাই হলের ভেতর প্রবেশ করে বইগুলো সামনের টেবিলে রেখে যার যার জায়গায় গিয়ে বসল। সবার সাথে রহিমও হলের ভেতর প্রবেশ করে নিজের জায়গায় গিয়ে বসল।এক স্যার এসে পেপার দিয়ে গেলেন।
ফাইন্যাল বেল পড়ল। এক স্যার এসে প্রশ্নপত্র দিয়ে গেল। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে রহিমের বুকের ভিতর ধুকপুকুনি শুরু হলো। কিন্তু প্রথম কয়েকটা প্রশ্ন পড়েই সে উৎসাহিত হয়ে উঠল। বিষয়গুলো তার ভালোভাবে আয়ত্বে আছে।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সে লজিং বাড়ি ফিরল। তার লজিং মাস্টার মহর আলী বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রহিমকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন-
—রহিম, পরীক্ষা কেমন হয়েছে তোমার?
—ভালো হয়েছে, চাচা। সব কয়টি প্রশ্ন কমন পরেছিল। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।
তার সবকয়টি পরীক্ষাই ভালো হলো। পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফেরার পর আমেনা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন- পরীক্ষা কেমন দিলে?
আল্লাহর রহমতে ভালই দিয়েছি, মা। এখন আল্লাহর ইচ্ছা।
পরের দিন রহিম স্কুলে গিয়ে স্যারদের সাথে দেখা করল। পরীক্ষা ভালভাবে দেওয়ার কথা শুনে স্যারেরাও তাকে উৎসাহিত করলেন।
কয়েক মাস পর ফল প্রকাশ হলো। রহিম ভালোভাবে ভালো নম্বর নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলো। দুটি বিষয়ে তার লেটার মার্কও আছে। অঙ্ক এবং এরাবিকে। তার রেজাল্ট দেখে সবাই তার প্রশংসা করল।
সায়রার রেজাল্টও ভালো হয়েছে। তবে সে আট নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ পায়নি। সে পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতেই ছিল। পরীক্ষার রিজাল্ট ঘোষণার দুদিন আগে সে শহরে মামাদের বাড়ি এসেছিলো। কয়েকটা দৈনিক খবরের কাগজে বেরিয়েছিল পরীক্ষার ফল। তার মামা পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা একটি দৈনিক কাগজ এনে দিল তাকে। খবরের কাগজে সে তার রোল নম্বর দেখে খুশি হলো। তবে প্রথম বিভাগ না পাওয়ার জন্য সে মনে মনে কিছু আহত হল। কিন্তু রহিমের রোল নম্বর প্রথম বিভাগে দেখে সে খুশী হলো। সে মনে মনে বলল, আমি প্রথম বিভাগ পাইনি তাতে কি হয়েছে, আল্লাহ রহিমের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেছেন এতেই আমি খুশী।
কিন্তু রহিমের আনন্দের মধ্যেই সমস্যা দেখা দিলে। মফস্বলে কলেজ নেই। কলেজ আছে জেলার সদরে। শহরে থেকে পড়তে গেলে অনেক খরচ। নামভর্তি, থাকার খরচ, খাবারের খরচ, বই কেনার খরচ। এর সাথে আছে আরও অন্যান্য খরচ।
সে একদিন সার্টিফিকেট আনতে স্কুলে গেল। প্রধান শিক্ষক তাকে বলল- তুমি প্রথম বিভাগ পেয়েছ। তাই তুমি মেরিট স্কলারশিপ পাবে। সায়রাও মাত্র আট নম্বেরর জন্য প্রথম বিভাগ পায়নি। সেও তোমার মতই মেরিট স্কলারশিপ পাবে। স্যার এর সাথে আরও বললেন, মনে হয় সায়রা আমাদের স্কুল থেকে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হলে সেও প্রথম বিভাগই পেত। পরীক্ষার আগে আগে স্থান পরিবর্তন করার জন্য তার পড়ার ক্ষতি হয়েছে। বেশি ভাল করতে গিয়ে অবশেষে খারাপ হল তার।
রহিমও জানে কথাটা। সায়রা এখানে থাকলে সেও প্রথম বিভাগেই উত্তীর্ণ হতে পারত।
রহিম স্যারকে সমর্থন করে বলল- আমারও তাই মনে হয় স্যার, সায়রা আমাদের স্কুল থেকে পরীক্ষা দিলে সেও প্রথম বিভাগেই উত্তীর্ণ হতো। এভাবে বলেই রহিম বলল- বৃত্তির টাকার জন্য আবেদন করতে হবে নাকি স্যার।
না, আবেদন করতে হবেনা। সরকার প্রত্যেক বছর প্রথম বিভাগ এবং দ্বিতীয় বিভাগপ্রাপ্ত ছাত্রদের এককালীন একটা স্কলারশিপ দেন।
রহিমের বৃত্তি পাওয়ার কথা শোনে সবাই উৎসাহিত হলো।
সেদিন তাদের চরাইমারির ছোট্ট ঘরে যেন উৎসব নেমে এল। আমিনা প্রতিবেশীদের মিষ্টি খাওয়াতে না পারলেও নিজের হাতে নারকেলের লাড়ু বানিয়ে খাওয়ালেন।
রহিম মাকে বলল—আমার জন্য তোমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়, তাই না মা্!
আমিনা হেসে বললেন—আমার কষ্টের হিসাব রাখিস না। তুই মানুষ হতে পারলে আমি সব কষ্ট ভুলে যাব।
রহিম জানত, তার সামনে এখনও অনেক পথ। কিন্তু এবার সেই পথে হাঁটার জন্য তার হাতে সামান্য হলেও কিছু উপায় হবে। এর মধ্যে হঠাৎ ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় সে যে বাড়িতে লজিং থেকে পরীক্ষা দিয়েছিল সেই বাড়ির কথা মনে পড়ল।
-মা কাল আমি বেতবারী মহর আলী চাচার বাড়ি যাব। তিনি যদি আমাকে লজিং রাখলেন তাহলে আমার খুব উপকার হবে। আর তাকে পরীক্ষার ফলাফের খবরটা জানানোও তো দর্কার। তিনি নিশ্চয় পরীক্ষার ফল জানার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন।
ঠিক আছে, কাল তাহলে যা। পরীক্ষার ফলের খবর জানিয়ে লজিঙের কথাটা দ্যাখ। শুনেছি তিনি খুব ভালো লোক। যদি তোর প্রতি সদয় হোন, তাহলে আমাদের অনেক উপকার হবে।আজকাল তো অনেকেই লজিং রাখেন শুনেছি।
সিদ্ধান্তমতেই রহিম পরের দিন বেতবারী মহর আলীর বাড়ি এল। মহর আলী পরীক্ষার ফলাফল জানার পর খুবই খুশী হলেন। তিনি বললেন- এখন কি করবে? কলেজে পড়বে, না চাকরির ধান্দা করবে?
রহিম বলল- না চাচা, এখনই চাকরির ধান্দা করব না। কলেজে পড়ার ইচ্ছা আছে।
তোমার বাড়ির অবস্থা তেমন ভাল না, তাই বলছিলাম আর কি। মহর আলী বললেন- কলেজে পড়তে গেলে তো অনেক খরচের ব্যাপার।
আপনি যদি আমাকে সহায় করেন, তাহলে আমার কলেজে পড়া সম্ভব হবে, চাচা।
সহায়! কি সহায়?
আপনি তো জানেনই আমাদের বাড়ির অবস্থা। শহরে থেকে পড়তে গেলে মায়ের খুব কষ্ট হবে। তাই যদি আপনি….
হেঁয়ালি রেখে বল, কি বলতে চাও?
আপনাদের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হলে খুব ভাল হতো।
মহর আলী আপত্তি করলেন না। বললেন- সেটা তো খুবই ভাল কথা হবে। তোমাকে লজিং রাখতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু দৈনিক তিন চার মাইল হেঁটে আসা-যাওয়া করতে পারবে তো?
অসুবিধা হলেও পারতে হবে। কথায় আছে না, কষ্ট করলে তবে কেষ্ট মিলে।
তাহলে কবে থেকে থাকতে চাও?
এই ধরেন, কলেজে ভর্তি, বইপত্র কেনা….পনের দিন পর থেকে থাকতে হবে।
অসুবিধা হবে না। থাকতে পারবে। ইতিমধ্যে তোমার থাকার রূমটা আমি ঠিক করে ফেলতে পারব।
ঊনবিংশ অধ্যায়
কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে রহিম সায়রাকে একটি চিঠি লিখল। সে জানত না চিঠিটা তার হাতে পৌঁছাবে কি, পৌঁছাবে না। তবু লিখল।
“সায়রা,
অনেক দিন তোমার সঙ্গে কথা হয়নি। আশা করি তুমি ভালো আছ। আমি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছি তা তুমি নিশ্চয় জেনেছ। ভাল ফলাফলের জন্য উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পাব। তোমার ফলাফলো ভালো হয়েছে। মাত্র আট নম্বরের জন্য তুমি প্রথম বিভাগ পাওনি। তুমিও বৃত্তি পাবে একথা আমাদের স্কুলের স্যারেরা বলেছেন। খুব শিগগিরই আমি আমাদের শহরের কলেজে ভর্তি হব।
তুমি আমাকে যে বইগুলো দিয়েছিলে, সেগুলো এখনও আছে আমার কাছে। মাঝে মাঝে পুরোনো পাতায় তোমার লেখা প্রশ্নগুলো দেখি। কখনও কখনও মনে হয়, তুমি আমার পাশে বসে আলোচনা করছ।
আমাদের গ্রাম বদলায়নি। ধানক্ষেত আছে, পুকুর আছে, বাঁশবন আছে। শুধু তোমার অনুপস্থিতিতে আমার বিকেল অন্য রকম হয়ে গেছে। আমি তোমাদের গ্রামে গেলে সেই বাঁশবনের নিচে দাঁড়াই। তখন তোমার অনুপস্থিতিটা খুব পীড়া দেয় আমাকে। তোমার কথা মনে পড়লে কেন জানিনা, আমার অন্তরটা হাহাকার করে উঠে। আমি খবর করেছি, পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর তুমি বাড়ি আসনি। আমি তোমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তোমার জানালাটার দিকে লক্ষ্য করি। জালানাটা ঠিকই আছে, শুধু তুমি নাই জানালার পাশে।
তুমি কোন কলেজে ভর্তি হবে? আমাদের শহরের কলেজে, না অন্যত্র কোথাও? আমাকে জানাইও। আমি শিক্ষক হতে চাই। সেই স্বপ্ন এখনও আমার আছে। আমি শহরের কলেজে ভর্তি হলেও বেতবারীর মহর আলী চাচার বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাব। আমরা একই কলেজে ভর্তি হতে পারলে খুবই ভাল হতো।
ভালো থেকো। চিঠিটা পেলে তোমার কুশল খবর জানিও।
—রহিম
চিঠিটা রহিম গ্রামের এক পরিচিত লোকের হাতে দিল, যিনি মাঝেমধ্যে শহরে যেতেন। সপ্তাহ দুয়েক পর চিঠিটা সায়রার কাছে পৌঁছাল।
চিঠি পড়ে সায়রা অনেকক্ষণ নীরব হয়ে বসে রইল। তার চোখে আনন্দের জল।
রহিম কলেজে ভর্তি হবে। সে নিজের পথ তৈরি করতে চলেছে। দারিদ্রতাকে সে তার পড়াশোনার পথে অন্তরায় হতে দেয়নি। এই কথা জেনে সায়রা গর্ব অনুভব করল।
সে উত্তর লিখল—
“রহিম,
তুমি কলেজে ভর্তি হওয়ার খবর পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। তোমার পরীক্ষার ফলাফলের খবর আমি আগেই পেয়েছিলাম খবরের কাগজে। আমি জানতাম, তুমি পারবে। তোমার অধ্যবসায় তোমাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।
আমার দেওয়া বইগুলি তুমি যত্ন করে রেখো। বইগুলি আমাকে আর ফেরত দিতে হবে না। মনে কর, সেগুলো এখন তোমারই।
আমিও পড়াশোনা চালিয়ে যাব। কিন্তু কোন কলেজে ভর্তি হব সে কথা এখনও আমি জানিনা। জানই তো আমাদের সমাজে মেয়েদের স্বাধীনতা বলতে কিছুই নেই। পিতা-মাতার মর্জির ওপরই নির্ভর করে আমাদের দেশের মেয়েদের ভবিষ্যত। আমার ইচ্ছে ছিল, আমাদের শহরের কলেজে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু শুনতেছি, আমাকে শিলঙের কোনো এক কলেজে ভর্তি করে দিবে। এই সিদ্ধান্তের মূলে কি আছে তা তুমিও জানো, আমিও জানি। কিন্তু মনে রেখ পানি কেটে কখনও আলাদা করা যায় না। আমি যেখানেই থাকি না কেন, তোমার কথা মনে রাখব। আমি শিলঙে কোন কলেজে ভর্তি হব তা ভর্তি হওয়ার পর তোমাকে জানাব।
তুমি ভালো থেকো।
—সায়রা
চিঠি পাওয়ার পর রহিম বুঝল, তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলেও বন্ধুত্বের ভিত এখনও ভেঙে যায়নি।
তবে চিঠির ভাষা ছিল সংযত। কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, আমাদের সমাজে নারী স্বাধীনতা যে সীমিত এ নিয়ে খুবই সংযত ভাষায় খুব প্রকাশ করেছে সায়রা।
চিঠির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তাদের সম্পর্কের মধ্যে এখন এমন এক গভীরতা তৈরি হয়েছে, যা শুধু কাছে থাকার ওপর নির্ভরশীল নয়। দূরে থেকে সেই সম্পর্কের গভীরতা অনুভব করা সম্ভব।
দুজনেই জানত, তাদের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদের একার হাতে নেই। তবু তারা নিজেদের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। তাদের স্বপ্নকে তারা বাস্তবে রূপ দেওয়ারও চেষ্টা করে যাবে প্রতিনবিয়ত।
সেই বিশ্বাসই নীরব সাক্ষী হয়ে রইল তাদের সম্পর্কের।
বিংশ অধ্যায়
রহিম শহরের কলেজে ভর্তি হলো। আগের সিদ্ধান্ত মতেই সে বেতবারীর মহর আলীর বাড়ি থেকে হেঁটে কলেজে আসা-যাওয়া করতে লাগল। গোয়ালপারার একটি ছেলে তার পাশের অন্য একটি বাড়িতে লজিং ছিল। তারা দুজনে একসাথে কলেজে আসা-যাওয়া করতে লাগল। সেখানে তাদের জীবন সহজ ছিল না। দৈনিক তিন চার মাইল হেঁটে আসা-যাওয়া করার ফলে কলেজ থেকে ফেরার পর খুবই পরিশ্রান্ত হয়ে পরত তারা।
এদিকে বই কেনার তাড়া ছিল। অনেকের কাছে নতুন বই কেনা সহজ ছিল। কিন্তু তার কাছে বই কেনা সহজ ছিল না। তার টাকা ছিল না। সে তার মায়ের ছাগল বেচা ত্রিশ টাকা নিয়ে লজিং বাড়ি এসেছিল। সেই টাকা দিয়ে বই-খাতা কেনার পর তার হাতে অবশিষ্ট ছিল মাত্র দশ টাকা। তারপরও কয়েকটা বই কেনার ছিল। সেই বই কয়টি তাদের শহরে ছিল না। গুয়াহাটি থেকে আনতে হবে বলে দোকানী জানিয়েছিল। সে ভেবেছিল বৃত্তির টাকা পেলেই বই কয়টি কিনবে। কিন্তু একদিন কেরানীর কাছে খবর নিয়ে জানতে পারল টাকা কয়টি পেতে কিছু দিন দেরি হবে। কেরানী তাকে একটি ফর্ম দিল। সে ফর্ম পূরণ করে কেরানীর নিকট জমা দিয়ে এল।বই নাথাকার জন্য কলেজ ছুটির পর সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলেজের লাইব্রেরিতে বসে থাকত। গোয়ালপারার সেই ছেলেটিরও তার মতই অবস্থা ছিল। সেজন্য সেও তার সাথে লাইব্রেরীতে বসে থাকত।
তার সহপাঠীরা প্রথমে তার গ্রাম্য উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি করত। কিন্তু পরীক্ষায় তার ভাল ফলাফল দেখে ধীরে ধীরে তারা তাকে সম্মান করতে শুরু করল। গোয়ালপারার ছেলেটিও পড়াশোনায় ভাল ছিল। তার উচ্চারণেও সামান্য গ্রাম্য টান ছিল। তাকে নিয়েও অনেকে হাসিঠাট্টা করত। কিন্তু সে এই সব হাসিঠাট্টায় মোটেই গুরুত্ব দিত না। তাই কয়েকিদন পরেই সব ঠিক হয়ে গেল।
রহিমও বুঝতে শিখল, শহর আর গ্রামের মধ্যে শুধু সুযোগের পার্থক্য নেই; মানসিকতারও পার্থক্য আছে। শহরে অনেক কিছু সহজলভ্য, কিন্তু মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রবল। তবে কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সবাই নিজা নিজা কাজ নিয়ে ব্যস্ত। শহরের মানুষ একজন অন্যজনকে চেনেনা। গ্রামের মতো পরচর্চা পরনিন্দার বালাই নেই শহরে। গ্রামের মানুষ একে অন্যকে চেনে, শহরের মানুষ কেউ কাউকে চেনেনা। চিনলেও কথা বলার সময় নেই। গ্রামের সামাজিক রীতির বন্ধনও শক্ত, কিন্তু শহরের সামাজিক বন্ধন শিথিল।
প্রথম প্রথম কলেজে ভর্তি হয়ে সে মেয়েদের ভীড়ের মধ্য সায়রাকে খুঁজত। কিন্তু পরে সে খবর পেল যে, সায়রা এই শহরে ভর্তি হয়নি। সে ভর্তি হয়েছে শিলঙের কোনো একটি কলেজ।
মাসখানেক পর রহিম বৃত্তির টাকা পেল। টাকা পেয়েই সে তার প্রয়োজনীয় বইগুলো কিনে ফেলল।
শহরে এসেও সে নিজের গ্রামের কথা ভুলল না। মায়ের নিকট সে নিয়মিত চিঠি লিখত। ছুটিতে বাড়ি গেলে গ্রামের ছোটদের খোঁজখবর নিত। প্রয়োজনে সে তাদের নানা রকম পরামর্শ দিত। তাদের পুরোনো বই সংগ্রহ করতে এবং শিক্ষককে প্রশ্ন করার অভ্যেস গড়ে তুলতে বলত। কারণ নতুন কিছু শিখতে হলে প্রশ্ন করতে হবে। প্রশ্ন জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়।
বিয়ের পর মতিন পড়া ছেড়ে দিয়েছে। সে এখন এক ছেলের বাপ। তাই একদিন মতিন কাজের সন্ধানে শহরে এসে রহিমের সঙ্গে দেখা করল।
মতিন বলল—তুই তো সত্যিই অনেক দূর চলে এসেছিস।
রহিম হাসল। বলল—অনেকদূর এসেছি ঠিক, কিন্তু গ্রামের কথা আমি ভুলিনি।
মতিন বলল—গ্রামের ছেলেদের জন্য তুই কি করার কথা ভাবছিস?
রহিম উত্তর দিল— কি আর ভাবব। আমি নিজেই তো একজন ছাত্র। আগে নিজেকে তৈরি করে নিই। তারপর গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য এমন কিছু করতে চাই, যাতে তারা শুধু টাকার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে না দেয়। আর হ্যাঁ, সে একটু ঠাট্টার সুরে বলল- তোর মতো বিশ বছরেই ছেলের বাপ হয়ে যেন তাদের শহরে কাজের সন্ধানে আসতে নাহয়।
মতিন বলল- আমি এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। কেন যে তখন দাদির কথায় কান দিলাম! তবে আমার মতো অল্প বয়সে বিয়ে করে কেউ যেন পস্তাতে না হয়, এই বিষযে আমি আমাদের পাড়ার ছেলেদের বুঝিয়ে বলব।
তাই করিস। তোর ভুল অন্যের জন্য শিক্ষা হোক আমিও তাই চাই।
এদিকে সায়রাও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল।
সায়রা শিলঙ গিয়ে অনেক বদলে গেছে।শিলঙের মেয়েদের স্বাধীনতা দেখে সে নিজেও স্বাধীনভাবে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন সে নিজের জীবনের বিষয়ে প্রশ্ন করতে শিখেছে। সে এখন শুধু পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে চলা মেয়ে নয়। সে অনেক কিছু জানতে চায়, তার মতামতের মূল্য আদায় করতে চায়।
একবার পূজোর ছুটিতে বাড়ি আসার পর তার মা বলল- তোমাকে আর শিলং যেতে হবে না। ভাল সম্বন্ধ এসেছে। তোমার বাবা তোমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। পাত্র ভাল। হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে। সম্ভান্ত পরিবার। ছেলের বাবা তোমার বাবার ছোটবেলার বন্ধু।
কথাটা শুনে সায়রা মাকে কিছুই বলল না। সে তখনি তোমার বাবা নিকট এসে বলল- বাবা,আমি আরও পড়তে চাই। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।
হাজি করিম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন— পাত্র ভালো। তাই ভাবছি।
শুনেছি ছেলে হাইস্কুলের শিক্ষক। আমিও শিক্ষক হতে চাই। শিক্ষক হওয়ার আগে আমি বিয়ে করব না।
মেয়ের দৃঢ় মনোভাব দেখে করিম সাহেব মনে মনে আহত হলেন যদিও তিনি ধীরেসুস্থিরে বললেন- ঠিক আছে পড়াশোনা করতে চাইলে করো। তবে জীবনের সব সিদ্ধান্ত যেন তুমি নিজে নিয়োনা। যা করবে বুঝেসুঝে করো।
সায়রা জানত, তার বাবার মন পুরোপুরি বদলায়নি। তবু এই সামান্য সম্মতি তার কাছে একটি দরজা খুলে যাওয়ার মতো ছিল।
একবিংশ অধ্যায়
সত্তরের দশক এগিয়ে চলেছে। গোবিন্দপুরে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। কিছু নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে, আগের গো-হালট রাস্তায় পরিণত হয়েছে। মাটির রাস্তার কয়েকটি অংশ মেরামত করা হয়েছে। বাজারে নতুন দোকান হয়েছে। স্কুলে ছাত্রসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু এখনও অনেক ছেলে-মেয়ে দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে।
আমেনা এখন আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তবু ছেলের চিঠি পেলে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রহিমের ছোট ভাই আমিন এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। রহিমের মতো সেও পড়াশোনায় ভাল। সে এখন মাকে অনেক কাজে সহায় করে। সেই তাগিদা দিয়ে দুটি ছাগল আধি নিয়েছিল। তাদের পাড়ারই এক সম্পর্কীয় খালার কাছ থেকে। জাত ভাল। বছরে চারবার বিয়ান দেয়। আধি আনার পর ছাগলটা দুই বার বিয়ান দিয়েছে। প্রতিবারে তিনটি করে বাচ্ছা হয়েছে। আমিন তিনটা বাচ্ছা সমেত ছাগলটা খালাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। এখন আমিনের নিজেরই তিনটে ছাগল। সেই ছাগলের একটা কয়েকদিন আগে বিয়ান দিয়েছে। দুটি বাচ্ছা হয়েছে। তাই আমেনার এখন সময় খুব কম। দুর্বল শরীর নিয়ে ছেলের সাথে ছাগল পাঁচটি দেখাশোনা করেন। তবু রহিম ছুটিতে বাড়ি এলে তিনি তার জন্য পছন্দের খাবার রান্না করতে ভোলেন না।
একবার রহিম গ্রামের স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলল। সে প্রস্তাব দিল, পুরোনো বই সংগ্রহ করে একটি ছোট পাঠাগার তৈরি করা যায় কি না।
প্রধান শিক্ষক বইপ্রিয় লোক। তিনি বললেন—এটা তো খুবই ভাল কথা হবে। কিন্তু বই কোথায় পাবে?
রহিম বলল —আমি শহরের পরিচিতদের কাছ থেকে পুরোনো বই সংগ্রহ করব। গ্রামের লোকজনও যদি কিছু সাহায্য করেন, তাহলে পাঠাগারটা করা সম্ভব হবে। পাঠাগারটা হলে গ্রামের ছেলেদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ জন্মাবে। যাদের বই কেনার সামর্থ্য নাই তারাও বই পড়ার সুযোগ পাবে পাঠাগারটা স্থাপন হলে।
-আমি তোমাদের সাথে থাকব। একদিন একটা মিটিং ডাক। মিটিং ডেকে সবার সমর্থন নিয়ে পাঠাগারটা স্থাপন করলে তখন সবারই নজর থাকবে পাঠাগারটার প্রতি। জানই তো দশের নৌকা শুকনা দিয়েও চলে। এদিকে কমিটিটাও করা যাবে সেই মিটিঙে।
একদিন রবিবারে গ্রামের যুবক ছেলে এবং কিছু বয়োবৃদ্ধ লোক ডেকে একটি মিটিং করল। মিটিঙে সবাই পাঠাগারটা স্থাপনর পক্ষে মত পোষণ করল। একজন নিজের বাঙলা ঘরটা পাঠাগার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য অনুমতি দিলে। সভাপতি নির্বাচন করল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহাশয়কে। লাইব্রেরীয়ান হিসেবে নির্বাচিত করা হলো মতিনকে। সে স্বেচ্ছায় নিল দায়িত্বটা। পাঠাগারের নামকরণ করা হলো প্রত্যুষ। মানে উষাকাল। নামটা রহিমই প্রস্তাব করল। সবারই মনোমত হলো নামটা।
বাঙলা ঘরটা অনেক বড় ছিল। গ্রামের কয়েকজন যুবক মিলে ঘরটার মাঝ বরাবর তর্জার বেড়া দিয়ে একটি কোঠা তৈয়ার করল। প্রধান শিক্ষক নিজে একটা আলমারি দিলেন বই রাখার জন্য। পরের দিন সকলে বই সংগ্রহের জন্য বের হলো। প্রথমে দশটি বই, তারপর বিশটি, পরে আরও বই জমল। সপ্তাহর ভিতরে প্রায় একশটা বই জমে গেল পাঠাগারের জন্য।
একটি খাতায় কার কার নিকট থেকে বই ধার নেওয়া হলো সেই হিসেব লিপিবদ্ধ করা হল। সবার সিদ্ধান্ত মর্মে নিয়ম করা হলো, যে বই নেবে, পনের দিনের মধ্যে পড়া শেষ করে বই ফেরত দিতে হবে। পাঠাগারে বসে বই পড়ার জন্য কয়েকটা চেয়ারও যোগার করা হল।
এই খবর সায়রার কাছেও পৌঁছাল।
সে পাঠাগারের জন্য কিছু বই পাঠিয়ে দিল। সঙ্গে একটি চিঠি দিল—
“রহিম,
তোমার পাঠাগারের কথা শুনে খুব ভালো লাগল। মনে আছে, তুমি একদিন বলেছিলে, এমন একটি ঘর চাই যেখানে দরিদ্র ছেলেমেয়েরাও বই পড়তে পারবে?
এই পাঠাগারের মাধ্যমে তোমার সেই স্বপ্ন শুরু হয়েছে। তোমাদের পাঠাগারের নামটি আমার পছন্দ হয়েছে। আমাদের গোবিন্দপুরের লাইব্রেরীর নাম রজনী প্রভাত এবং তোমাদের চরাইমারির পাঠাগারের নাম প্রত্যুষ। একই অর্থ, তবে নাম ভিন্ন।
কিছু বই পাঠালাম। আশা করি তোমাদের কাজে লাগবে।
—সায়রা
রহিম চিঠিটি পড়ে বুঝল, সায়রা তার স্বপ্নের কথা ভুলে যায়নি।
সে বইগুলো পাঠাগারে সাজিয়ে রাখল। গ্রামের ছেলেমেয়েরা এসে বই পড়তে শুরু করল। কেউ গল্প, কেউ বিজ্ঞান, কেউ ইতিহাস।
একটি ছোট উদ্যোগ নিয়ে রহিম বুঝতে পারল, পরিবর্তন সব সময় বড় অর্থ বা বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসে না। ছোট ছোট উদ্যোগও অনেক সময় বড় উদ্যোগের রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। কখনও একজন মানুষের দৃঢ় ইচ্ছাই মানুষকে বড় কিছু করার করা জন্য অনুপ্রাণিত করতে পারে।
কিন্তু গ্রামের সামাজিক বিভাজন তখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। ধনী পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সুযোগ বেশি, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সুযোগ কম, সেজন্য তাদের বেশি সংগ্রাম করতে হয়।
রহিম জানত, একটি ছোট পাঠাগার দিয়ে সবের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। তবু শুরুটা যখন হয়েছে, তখন এটা খুব ছোট করে দেখলে হবেনা।ছোট থেকে যেটা বড় তার স্থায়িত্ব বেশি হয়। পানের দোকান থেকে যে গেলামালের দোকান দেয়, সেই দোকান ভবিষ্যেত বড় দোকানে পরিণত হয়। প্রথমে বড় করে দোকান শুরু করলে সে দোকান অনেক সময় ধাপে টিকে না। চালান গায়েব হয়ে যায়। এটা বাস্তব সত্য।
ছেট হোক শুরুটা যে করতে পেরেছে এটাই তার জন্য যথেষ্ট।একবার শুরু যখন হয়েছে, তখন ভবিষ্যতে কিছু একটা নিশ্চয় হবে। শুধু ধৈর্যসহকারে এগোতে হবে। ধৈর্যের ফল সব সময়ই মিষ্টি হয়।
দ্বাবিংশ অধ্যায়: দশ বছরের অপেক্ষা
সময় মানুষের চেহারা বদলে দেয়, কিন্তু কিছু স্মৃতি বদলায় না।
বছর কেটে গেল। রহিম পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নিল। পরে একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতার সুযোগ পেল। তার চাকরি হয়েছিল তাদের গ্রাম থেকে অনেকটা দূরের একটি গ্রামে। সেজন্য প্রথম বেতন হাতে পেয়ে সে ছোট ভাই আমিনকে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার হাত দিয়ে মাকে টাকা পাঠিয়ে দিল। আমেনা সেই টাকা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন।
তারপর ছোট ছেলে আমিনকে ডেকে এনে একটি চিঠি লিখতে বললেন- তিনি চিঠিতে লিখালেন—
তোমার নিজের উপার্জনের টাকা পেলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ এই যে, তুমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছ। তবে ভুলে যেও না, তোমার পথের শুরু ছোট্ট একটি খড়ের ঘর থেকে।
রহিম চিঠিটি যত্ন করে লিখে মাকে পড়ে শোনাল। তারপর লেফাফা বন্ধ করে মায়ের অনুমতি নিয়ে পোষ্ট অফিসের ডাক বাক্সে ফেলে দিয়ে এল।
সায়রাও নিজের পড়াশোনা শেষ করে রহিমর মতোই একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হলো। শিক্ষার সুযোগ পেলে মেয়েরাও যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে সে অবশেষে এই কথা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হলো। তার চাকরি হয়েছিল বাড়ি থেকে অনেকটা দূরের একটি ছোট শহরে। তাই করিম সাহেব প্রথমে তার চাকরির বিরোধিতা করেছিল। একটি সম্ভান্ত পরিবারের মেয়ে বাড়ি থেকে একা দূরে থেকে চাকরি করবে এটা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু সায়রা তাঁকে বুঝালেন যে, মেয়েরা অবলা নয়, তারা ছেলেদের মতোই একা থেকে নিজের মান-সন্মান বাঁচিয়ে চলতে পারে। সে তার পিতাকে আশ্বাস দিল- আপনারা নিশ্চিত থাকুন, আমি এমন কোনো কাজ করব না যাতে আপনাদের মান-সন্মান ক্ষুণ্ণ হবে। তেমন কিছুর সম্ভাবনা দেখা দিলে আমি নিজেই চাকরি ছেড়ে চলে আসব।
শেষে হাজি করিম সাহেব মেয়ের জেদের সামনে নত স্বীকার করে মেয়ের দাবিই মেনে নিলেন এবং সায়রা শহরের একটি ভাড়াঘরে থেকে শিক্ষকতা চালিয়ে গেলেন।
চাকরির পর রহিম ও সায়রার মধ্যে যোগাযোগ অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। চিঠির যোগাযোগের ব্যবস্থা তেমন ভাল ছিল না। কখনও চিঠি সময় মতো পৌঁছাত, কখনও আবার চিঠি পৌঁছাতে মাসের পর মাস লেগে যেত।
তারা দুজনেই নিজেদের দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তবু পুরোনো বইয়ের পাতা, পরিচিত কোনো কবিতা, কিংবা গ্রামের বাঁশবনের স্মৃতি তাদের মনে পুরোনো দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিত।
হাজি করিম সাহেবেরও বয়েস হয়েছিলো। তাঁর সামাজিক প্রভাব তখনও অটুট ছিল, যদিও আগের মতো দৃঢ়তা ছিল না। সায়রা বাড়ি এলে তিনি মাঝে মাঝে মেয়ের সাথে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। তখন তিনি তার যে বয়েস হয়েছে, এই কথা মেয়েকে মনে করিয়ে দিতে ভুলতেন না। তবে মেয়ের কোনো কথার সরাসরি বিরোধিতা তিনি করতেন না। মেয়ের ওপর কোনো কর্তৃত্ব করতে চাইতেন না তিনি। কারণ মেয়ে উচ্চ শিক্ষিতা, নিজে উপার্জন করতে শিখেছে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সক্ষম।
সায়রা বাড়ি এলেই সায়রার মা তাগিদা দিতেন- এভাবে আর কতদিন থাকবি। এখন সংসারের চিন্তা কর।বয়েস তো আর কম হয়নি। বিয়ে হলে তিন চার ছেলেমেয়ের মা হতে পারতিস।তোর বয়েসের মেয়েরা সেই কবেই বিয়ে-সাদি করে পুরোপুরি গিন্নী হয়ে গেছে।
সায়রা জানে, মার কথার বিরোধিতা করলে, তখন মা কান্দা-কাটি শুরু করে দিবে।তাই সে মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য শান্তভাবে বলে- নিশ্চয় মা, নিশ্চয় বিয়ে করব। আগে বদলি হয়ে নিজের গ্রামে আসি, তারপর বিয়ের কথা ভাবব। চিন্তা করোনা। তোমরা যাকে বিয়ে করতে বলবে, আমি তাকেই বিয়ে করব।
মেয়ের কথা শুনে মা পুরোপুরি খুশি না হলেও এই ভেবে খুশি হোন যে, মেয়ে অন্তত তার কথা মেনে বিয়ে করতে রাজি তো হয়েছে!
একবার পূজোর ছুটিতে বাড়ি এসে সায়রা একদিন বাবাকে বলল— বাবা, আমি বদলি হয়ে গোবিন্দপুর হাইস্কুলে আসতে চাই। আমার অনেক দিনের স্বপ্ন নিজের অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু একটা করার। এদিকে বাড়ি থেকে দূরে চাকরি করার জন্য বাড়ির সাথেও তেমন যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়না। এদিকে আপনাদেরও এখন যথেষ্ট হয়েছে। তাই আপনাদের ছেড়ে দূরে থাকতে এখন মন সায় দেয়না।
হাজি করিম সাহেব উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তিনি বললেন-এটা তো খুবই ভাল কথা হবে। তোমার মা-ও চাইছেন, তুমি আমাদের নিকটে থাক।কিন্তু চাইলেই কি বদলি হয়ে আসতে পারবে?
সায়রা বলল- হ্যাঁ পারব। আমাদের গোবিন্দপুর হাইস্কুলের ইংরেজীর শিক্ষক আগামী মাসেই অবসর নিবে। তার খালী পোষ্টে আসতে পারব। আমি ইতিমধ্যে উভয় আইএসের সাথে আলোচনা করেছি। তারা কাজটা করে নিবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।
এদিকে রহিমের মনেও ইচ্ছা ছিল—গ্রামে ফিরে এসে গ্রামের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য কাজ করার। সে পাঠাগারটিকে আরও বড় করতে চেয়েছিল।
দশ বছর আগে যে ছেলেটি একটি বই ধার নিয়ে রাত জেগে পড়ত, এখন সে অন্যদের হাতে বই তুলে দিতে চায়। এ কাজ করতে হলে তাকে নিজেদের অঞ্চলে বদলি হয়ে আসতে হবে। সেজন্য এবিষযে সে চিন্তাচর্চা করতে লাগল।
এদিকে তার জীবনের অন্য একটি অধ্যায় এখনও অসমাপ্ত।
সে জানত না, সায়রা আবার কখনও বাঁশবনের সেই পথ ধরে আসবে কি না।
তবু সে অপেক্ষা করছিল এমন এক সময়ের জন্য, যখন তাদের সম্পর্ক সামাজিক মর্যদা পাবে।কিন্তু সে নিশ্চিত ছিল না এটা কোনোদিন সম্ভব হবে কিনা।
তেইশতম অধ্যায়
শরতের এক বিকেল। গোবিন্দপুরের আকাশে সাদা সাদা মেঘ। ধানক্ষেতে পাকা শিষ দুলছে। পুকুরের জলে রোদ পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে। গ্রামের মাটির রাস্তা ধরে কয়েকজন শিশু বই হাতে স্কুল থেকে ফিরছে।
রহিম বহু বছর পর স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরেছে। সে তাদের নিকটেরই একটি গ্রামের স্কুলে বদলি হয়ে এসেছে। স্কুলটা তাদের গ্রাম থেকে মাত্র দশ মাইল দূরে। সে সাইকেল কিনেছে। সাইকেল নিয়ে সে বাড়ি থেকেই স্কুলে যাওয়া-আসা করে। সে গ্রামে একটি নৈশ(নাইট)স্কুল খুলেছে। সে সন্ধায় সেখানে গ্রামের বয়স্কদের পড়ায়। তার প্রচেষ্টায় গ্রামের অনেক বয়স্ক লোক সই করতে শিখেছে। নৈশস্কুলের পাশাপাশি সে ছোট পাঠাগারটিরও দেখাশোনা করে। সময় সুযোগ বুঝে সে গ্রামের দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায়ও সাহায্য করে।
তার চুলে সামান্য পাক ধরেছে। মুখে আগের চেয়ে বেশি স্থিরতা। কিন্তু চোখে সেই পুরোনো স্বপ্নের আলো রয়ে গেছে।
সেদিন বিকেলে পাঠাগারের বই গুছিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে এসে সাইকেল নিয়ে গোবিন্দপুরের দিকে চলে এল। সায়রাদের বাড়ির কাছে আসতেই তার চোখ গেলো সায়রাদের বাড়ির পেছনের বাঁশবনের দিকে। বাঁশবনের দিকে তাকাতেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছর আগের সেই দিনগুলো— সায়রা তার হাতে দেওয়া প্রথম কবিতার বই, বৃষ্টির দিনে অঙ্ক বোঝানো, চিরকুটের মতো ছোট্ট চিঠি।
সে সাইকেল স্যাণ্ড করে ধীরে ধীরে বাঁশবনের দিকে হাঁটতে লাগল।
বাঁশবনের কাছে পৌঁছে সে দেখল, একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন বাঁশবনের নিচে। পরনে সাধারণ শাড়ি, হাতে কয়েকটি বই। চুলের পাশে সময়ের ছাপ পড়েছে, কিন্তু মুখের সেই পরিচিত কোমলতা এখনও বিদ্যমান।
রহিম থমকে দাঁড়াল।
নারীটি ঘুরে তাকালেন।
নারীটি আর কেউ নয়- সায়রা।
কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলতে পারল না। যেন দশ বছরের দূরত্ব একসঙ্গে এসে তাদের সামনে দাঁড়িয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সায়রা মৃদু হাসল।
—কেমন আছ, রহিম?
রহিমের কণ্ঠ একটু কেঁপে উঠল।
—আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?
—আমিও ভালো আছি।
আবার নীরবতা।
সায়রা হাতে থাকা বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল—তোমার পাঠাগারের জন্য কাল শহর থেকে কয়েকটা বই কিনে এনেছি। তাই বই নিয়ে দাড়িয়ে আছি কারো হাতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। তুমি এসেছ ভালই হলো।
রহিম বইগুলো হাতে নিল। মলাটে নতুন নাম, কিছু গল্পের বই, কিছু বিজ্ঞানবিষয়ক বই, কয়েকটি কবিতার সংকলন।
সে বলল- তোমার দেখছি আগের মতোই বইয়ের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তুমি এখনও বই পড়?
সায়রা হেসে বলল— আগের মতো নয়, বলো আগের চেয়েও অনেক বেশি। বই না পড়লে এখন রাতে আমার ঘুমই হয় না।
রহিমের মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের সেই কথা।
—জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বাড়ে।
সায়রা মাথা নাড়ল।
—তুমি কথাটা মনে রেখেছ।
—সব কথা ভুলা যায় না।এমন কিছু কথা আছে, যা চিরদিন মনে দাগ কেটে থাকে।
বাঁশপাতার ফাঁক দিয়ে বাতাস বইছিল। পাখিরা বাসায় ফিরছিল। দূরে কোনো বাড়ি থেকে রান্নার ধোঁয়া উঠছিল। রাখালরা গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছিল।
তারা রাস্তা ধরে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো অভিযোগ নেই। তবু তাদের নীরবতার মধ্যে অনেক কথা জমে ছিল।
কিছু দূর যাওয়ার পর সায়রা বলল,
—তোমার মনে আছে, একদিন তুমি বলেছিলে, তোমার নিজের বড় একটা ঘর হবে, সেখানে অনেক বই থাকবে?
রহিম হাসল।
—ঘরটা অবশ্যে হয়েছে, তবে খুব বড় হয়নি। কিন্তু বই জমেছে অনেক।তোমার বইগুলোও সাজানো আছে সেখানে। বলতে পার, আমি প্রায় প্রত্যেকদিনই বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখি। না পড়লেও এমনিতে পৃষ্ঠাগুলো উলটিয়ে দেখি।
-কেন?
কেন উলটিয়ে দেখি সেটা তোমাকে বলতে পারব না। কারণ আমি নিজেও জানি না কেন পৃষ্ঠাগুলো উলটাই।
সায়রা জানে।রহিম কেন উলটায় বইগুলির পৃষ্ঠা। সে নিজেও তো রহিমের দেওয়া বইগুলির পৃষ্ঠা অবসর সময়ে এমনিতে উলটিয়ে দেখে। তাই সে বলল- সেটা তোমার নিজের ব্যাপার। সেগুলি ঘেঁটে আমি তোমাকে ব্যতিব্যস্ত করতে চাই না।
-তোমার ইচ্ছা।
—আর যাদের বই কেনার সামর্থ্য নেই, তারা কি তোমার পাঠাগার থেকে বই পড়তে পারে?
—হ্যাঁ। নিশ্চয় পারে। এখন গ্রামের অনেকেই বই পড়ে পাঠাগার থেকে বই ধারে নিয়ে।পাঠক সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।
সায়রার চোখে আনন্দের আলো ফুটল।
—তাহলে তোমার স্বপ্নের একটা অংশ সত্যি হয়েছে।
রহিম বলল-
—শুধু একটা অংশ। এখনও অনেক কাজ বাকি।
সায়রা তার দিকে তাকাল। একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল-
—তুমি এখনও আগের মতোই ভাবো।
—বলতে পার আগের চেয়েও বেশি। তুমিও তো আগের মতোই আছ। তোমার চিন্তা-ধারাও তো একটুও বদলায়নি।
সায়রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল-
—জানো, শহরে থাকাকালীন অনেকবার মনে হয়েছে, মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না।
রহিম মৃদু স্বরে বলল-
—স্মৃতি শুধু মানুষকে ভাবানোর জন্য নয়। কখনও কখনও স্মৃতিগুলোই মানুষকে পথ দেখায়।বাঁচার জন্য অনুপ্রাণিত করে।
সায়রা বলল,
—তোমার কাছে আমি শুধু স্মৃতি হয়ে থাকিনি তো?
প্রশ্নটি শুনে রহিম থেমে গেল।
দশ বছর আগে যে কথা সে বলতে পারেনি, আজও তা সহজে বলা গেল না। কারণ জীবনের বাস্তবতা শুধু নিজের অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না। তাদের পরিবার, সামাজিক অবস্থান, দায়িত্ব—সবকিছুর ওপর নির্ভর করে।
রহিম শান্তভাবে বলল-
—তুমি আমার জীবনের এমন একজন মানুষ, যার মাধ্যমে আমি শুধু বই পড়তেই শিখিনি, ভাবতেও শিখেছি। তোমার দেওয়া বইগুলো আমার কাছে এখনও আছে। সেগুলো আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সেগুলো আমি লাইব্রেরীতেও জমা দিইনি, অন্যের হাতের ছোয়া লাগবে বলে। সব চেয়ে বড় কথা, একমাত্র তুমিই আমার স্বপ্নকে প্রথমে সম্মান করেছিলে।
সায়রার চোখ ভিজে উঠল।
—আমিও তোমার কাছ থেকে শিখেছি, মানুষের মূল্য তার বাড়ি বা সম্পদ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। মানুষের সন্মান নির্ধারণ করতে হয় তার চিন্তা- তার ব্যবহার দিয়ে।
তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।
বাঁশবনের শেষ প্রান্তে এসে গ্রামের স্কুলটি দেখা যাচ্ছিল। মাঠে কয়েকজন শিশু খেলছে।
সায়রা বলল—শিক্ষার প্রতি লোকের আগ্রহ আগের চেয়েও অনেক বেড়েছে। এই স্কুলে এখন ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই বেশি পড়তে আসে। তবে এখনও অনেক পরিবার মেয়েদের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ করে দেয়।
একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আমাদের স্কুলেও দেখি ক্লাস ফাইভ ছিক্সের মেয়ে হঠাৎ স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। তখন খবর করলে জানতে পারি যে, মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। তখন তাদের বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার গুরুত্ব সম্পর্কে বুঝিয়ে বলতে হয়। দুই একজনে বুঝলেও বেশির ভাগই বুঝতে চায়না। তারা বলে, যদি কিছু একটা হয়ে যায় তখন সমাজে মুখ দেখাবে কীভাবে?..
যে পর্যন্ত মানুষের এই মানসিকতা থাকবে, সে পর্যন্ত সমাজ এগোতে পারবেনা।
-এ ব্যাপারে আমরা কি কিছু করতে পারিনা?
—একদিনে করে উঠা সম্ভব হবে না। লাহে ধীরে এগোতে হবে। শুধু শিক্ষার গুরুত্বই নয়, কম বয়সে বিয়ে দিলে কি কি অসুবিধা হতে পারে, এসব কথা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তাদের বুঝাতে। হবে। অল্প বয়েসে বিয়ে হলে সন্তান হওয়ার পর মেয়েদের স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। মেয়ের চেহেরা নষ্ট হয়ে যায়। তখন সংসারে অশান্তি বাড়ে। জামাই আবার বিয়ে করতে চায়। অনেকে দ্বিতীয় বিয়ে করেও। এসব কথা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে হবে। তাহলে মনে হয়, আমরা কিছুটা হলেও সফল হতে পারব।
রহিম সায়রার দিকে তাকাল। তারপর বলল- তাহলে আমরা একটা কাজ করি। অল্প বয়েসে বিয়ের জন্য যেসব সংসারে অশান্তি হয়েছে, গ্রামে গ্রামে ঘূরে, সেসব পরিবারেরে একটি তালিকা প্রস্তুত করি।
সায়রা একটু ভেবে বলল- তাহলে কাল থেকেই আমরা এই কাজ শুরু করে দিই।
-কিন্তু একা একা এ কাজে হাত দিলে সবাই তেমন গুরুত্ব দিতে চাইবে না। একটা টীম হয়ে কাজ করতে হবে।
টীম মানে? কোথায় পাবে টীম?
-এই ধরো, আমরা দুজনে প্রথমে শুরু করতে পারি। তারপর আমরা ধীরে ধীরে অন্যদেরও যুক্ত করব আমাদের সঙ্গে। আমাদের বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল বই দিয়ে। এখন কাজের মধ্য দিয়েও তা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।
সায়রা মাথা নাড়ল। বলল- অবশ্যেই। একদিন বন্ধের দিন দেখে কাজটা শুরু করে দিই। বন্ধের দিন হলে আমরা দুই তিনজন ছাত্রও সঙ্গে নিতে পারব।
সেদিন তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দিল না। অতীতের সমস্ত কষ্টের হিসাবও চুকিয়ে ফেলল না। শুধু ঠিক করল, গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য- মেয়েদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা জন্য তারা একসঙ্গে কাজ করবে।
তাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা তখনও অনিশ্চিত। কিন্তু তারা বুঝেছিল, ভালোবাসা কেবল কাছে পাওয়ার নাম নয়। কখনও তা অন্যের স্বপ্নকে সম্মান করা, কখনও তার পাশে দাঁড়ানো, কখনও আবার নিজের অভিমান সরিয়ে বৃহত্তর কল্যাণের পথে হাঁটা। এগুলোর নামই প্রকৃত ভালোবাসা।
সন্ধ্যা নেমে আসছিল। মসজিদের আজান শোনা গেল। আলো স্তিমিত হয়ে আসছিল। বাঁশবনের মাথায় শুধু শেষ আলোটুকু রয়ে গেছে।
রহিম ও সায়রা তখন বাড়ির দিকে হাঁটছিল। তাদের হাতে বই, তাদের চোখের সামনে গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যেতের স্বপ্ন।
বহু বছর আগে যে বাঁশবন তাদের দুজনের মধ্যে দূরত্বের প্রতীক ছিল, আজ সেই বাঁশবনই তাদের পুনর্মিলনের সাক্ষী হয়ে উঠল।
গ্রামের পথ একই আছে, পুকুর একই আছে, ধানক্ষেতও প্রায় একই। বদলে গেছে মানুষের অভিজ্ঞতা, তাদের বোঝাপড়া, তাদের স্বপ্নের পরিধি।
রহিম জানত, তার জীবন এখনও সংগ্রামে ভরা। সায়রাও জানত, সামাজিক বাধা একদিনে দূর হয় না। কিন্তু তারা আর আগের মতো অসহায় নয়। নিজেদের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং আত্মসম্মানের ভিত্তিতে তারা নতুন পথ তৈরি করার জন্য এখন সক্ষম।
বাঁশবনের ওপারে সূর্য ডুবে গেল।
আকাশে প্রথম তারা জ্বলে উঠল।
রহিম বইগুলো সাইকেলের ক্যারিয়ারে রেখে মনে মনে বলল—একদিন আমি একটি বই ধার নিয়েছিলাম। সেই বইয়ের পাতায় শুধু কবিতা ছিল না; ছিল একটি সেতুর শুরু। আজ সেই সেতুর ওপর দিয়ে আরও অনেক শিশু হেঁটে যাবে।
সায়রা পাশ থেকে বলল-
—কী ভাবছ?
রহিম মৃদু হাসল।
—ভাবছি, গল্পটা এখনও শেষ হয়নি।মনে হচ্ছে গল্প বুঝি নতুন করে শুরু হলো।
সায়রা বাড়ির দিকে তাকাল। বাঁশপাতার ফাঁক দিয়ে বাডির আলো এসে পড়েছে রাস্তায়।
—হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। কিছু গল্প শেষ হয় না। শুধু অধ্যায়ের পর নতুন অধ্যায় শুরু হতে থাকে।
তারা হাঁটতে হাঁটতে একেবারে বাড়ির সামনে চলে এল। তার দেখল হাজি সাহেব নামাজ পড়ে বারান্দায় বসে তছবি জপ করছে। আগে নিয়মিত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তেন। বয়েস হওয়ার জন্য বেশির ভাগ সময় এখন বাড়িতেই নামাজ পড়েন।
করিম সাহেব একবার তাদের দিকে তাকিয়ে আবার তছবি জপ করতে লাগলেন।
আগে হলে সায়রা গুটিসুটি হয়ে যেত বাবাকে দেখে। এখন সে বাবাকে তেমন ভয় পায়না। রহিমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে নির্ভয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল এবং রহিম বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গেল।
করিম সাহেব সায়রার দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন- সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বেড়োনো উচিত নয়, মা।
রহিম এসেছিল। অনেক দিন পর দেখা তাই কথা বলতে বলতে একটু দেরি হয়ে গেল।
রহিম সাায়রাকে এগিয়ে দিয়ে বাঁশবনের নিচে এসে দাঁড়াল। যে পৃথিবীকে তারা একদিন কল্পনা করেছিল, সেই পৃথিবীর দরজা যেন ধীরে ধীরে তাদের সামনে খুলতে শুরু করছে।
তাই সমাপ্তি নয়— নতুন পথচলার শুরু।
সমাপ্তি
উপন্যাসের মূল সুর
বাঁশবনের ওপারে উপন্যাসে সায়রা ও রহিমের সম্পর্ক কেবল একটি প্রেমের কাহিনি নয়। এটি গ্রামীণ অসমের সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষার অসম সুযোগ, আত্মসম্মান, নারীর স্বাধীনতা এবং মানবিক বন্ধনের কাহিনি।
