তোখড় এবং রাজকুমার(প্ৰচলিত গল্প)

 কবি এবং খেজুরের রস

আমরা সবাই জানি, যে কবিরা স্বভাবতই কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়। কখনো কখনো একজন কবি ভাবনায় বিভোর হয়ে এমন কিছু কাজ করেন যা সাধারণ মানুষকে হাসায়!

একবার আমাদের গল্পের কবি ঘামে ভিজে পরিশ্রান্ত হযে কোথা থেকে বাড়ি ফিরলেন। তাঁর স্ত্রী হকারের নিকট থেকে খেজুরের রস রেখেছিলেন। নিজেরা খাওযার পরে কবির জন্য এক গ্লাস রস রেখে দিয়েছিলেন। কবিকে সেই রস খেতে দিলেন। রস পান করে কবি খুবই তৃপ্ত হলেন। তিনি রসের প্রশংসা করে বললেন- খুবই উপাদেয় রস। খেয়ে প্রাণটা একেবারে জুড়িয়ে গেলো। যদি আছে আর একটু দাও।

স্ত্রী রস দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বললো- না আর নেই। যেটুকু ছিলো সবটুকুই দিয়েছি। আবার ফেরিয়ালা এলে বেশি করে রেখে দিব।

কবি বললেন- আচ্ছা, এই খেজুরের রস কীভাবে বের করে?

কবির অজ্ঞতায় বিস্ময় প্রকাশ করে স্ত্রী বললো- কীভাবে বের করে  তাও জানন না নাকি? খেজুর গাছ কেটে খেজুর রস বের করে!

ওহ, আচ্ছা? কবি তার অজ্ঞতার জন্য লজ্জিত হয়ে স্ত্রীর প্রশংসা করলেন।

বিষয়টি এভাবে ধামাচাপা দিয়ে স্ত্রী অন্য কাজে চলে গেলো।

আসলে কবি রস খেযে খুবই তৃপ্তি পেয়েছিলেন। তাই তিনি আরও অধিক রস পান করার কথা ভাবলেন। তবে কীভাবে আরও অধিক রস পান করবেন, এ নিযে তিনি চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। হঠাৎ তার চোখ গেলো বাড়ীর উঠোনের খেজুর গাছটার দিকে। গাছটি দেখে তাঁর রস খাওয়ার ইচ্ছা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। তিনি তৃপ্ত চোখে গাছটার দিকে তাকাতে লাগলেন।

একপর্যায়ে তিনি ঘরের ভেতরে গিয়ে একটি কুড়াল বের করে নিয়ে এসে ধীরে ধীরে গাছের গোড়ায় গিয়ে কোমরে গামছা বেঁধে গাছটা কাটতে শুরু করলেন। একপর্যায়ে ধড়াস করে গাছটা মাটিতে পড়ে গেলো।

গাছ পড়ার শব্দ শুনে স্ত্রী বাইরে এসে দেখলেন, খেজুর গাছটি মাটিতে পড়ে আছে এবং কবি ঘেমে নেয়ে গাছের গোড়ায় কুড়াল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

স্ত্ৰী কাটা গাছের দিকে ইশারা করে কবিকে জিজ্ঞেস করল, “এভাবে গাছটা কাটলেন কেন?

কবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন- তুমিই তো বললে খেজুর গাছ কেটে খেজুর রস বের করে। নিজের বাড়িতেই যখন খেজুর গাছ রযেছে, তখন গাছটা কেটে রস বের করে খাই এই ভেবে গাছটা কাটলাম। কিন্তু কই, রস কোথায়? কোন রস তো দেখছি না।

স্ত্রী আফসোসের সুরে বলল, “আপনি একটা বোকা মানুষ!এভাবে কাটলে রস বের হয় নাকি? এক বিশেষ উপায়ে গাছ কাটতে হয়, তবে তো রস বের হয়।এভাবে গোড়া থেকে কাটলে রস বের হবে নাকি? আপনি অযথা গাছটা নষ্ট করলেন!

কবি বললেন- অযথাই নষ্ট করেছি!তুমি কি বলতে চাও? তুমিই তো বলেছিলে, খেজুর গাছ কাটলে রস বের হয়?

    তৰ্ক করা বৃথা ভেবে স্ত্ৰী অন্য কাজে চলে গেলো। কবি মাথায় হাত দিয়ে গাছের গোড়ায় বসে রইল।

ভোলানাথের বর

পদ্মলোচন নামের একজন লোক ছিলো। নাম পদ্মলোচন হলেও সে ছিলো জন্মান্ধ। অন্ধ হলেও সে লাঠির সহায়ে অনায়াসে চলা-ফেরা করতে পরতো। প্রয়োজনে সে লাঠির সহায়ে ভীরের মাঝেও যাওয়া আসা করতে পারতো। শুধু তাই নয়, সে সহরে-নগরে গাড়ী-মটর থেকে শরীর বাঁচিয়ে অলি-গলি ঘুরে বেড়াতে পারতো। একবার সে ভিক্ষা মাগতে যাওয়ার সময় হঠাৎ হোঁচট খেয়ে রাস্তার পাশে থাকা একটি শিবলিঙ্গ-এর ওপড়ে সাষ্টাংগে ওপুড় হয়ে পড়ে গেলো। ঠিক প্রণিপাত করার মতো।

শিবলিংগটা ছিলো একটি জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে। ফলে ভক্তের তত সমাগম ছিল না। বিশেষ উৎসৱ-পাৰ্বণ না হলে স্থানটিতে মানুষ যায় না বললেই চলে। সেজন্য ভোলানাথ সর্বক্ষণ প্রায় ধ্যানস্থ হয়ে থাকে। সেদিনও ভোলানাথ ধ্যানস্থ ছিলেন। সেজন্য পদ্মলোচন সেভাবে সাষ্টাংগে ওপুড় হয়ে পরাতে তিনি ভক্তের প্রতি প্রসন্ন হয়ে ভক্তটিকে বর প্রদানের কথা ভাবলেন। তিনি চক্ষু উন্মীলন না করেই বললেন- বৎস, আমার প্রতি তোমার অটল ভক্তি দেখে আমি খুবই প্রসন্ন হয়েছি। তোমাকে আমি বর দিতে চাই। এখন বল, কি বর চাও তুমি? কিন্তু সাবধান, মাত্র একটা বর পাবে। একবারে আমার একটার বাহিরে দু’টি বর দেওয়ার নিয়ম নাই।

ভোলানাথ বর দেওয়ার কথা শুনে পদ্মলোচন হাতে স্বর্গ পেলো। কিন্তু বর মাত্র একটা। সেজন্য সে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। তার অনেক কিছুর প্রয়োজন। তার ভেতরে মুখ্য হলো দৃষ্টি শক্তি এবং ধন-সম্পত্তি। এই দুইটার ভেতরে আবার দৃষ্টিশক্তি বেশি দর্কার। দৃষ্টি শক্তি না থাকলে দিনেই সব অন্ধকার। পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ তার জন্য অর্থহীন। যার দৃষ্টিশক্তি নাই সে-ই বুজে দৃষ্টিশক্তির মর্ম। দৃষ্টিশক্তি না থাকলে শুধু বেঁচে থাকার বাইরে আর কিছু নয়। তা-ও লোকের গলগ্রহ হয়ে। সেজন্য সে চোখ দু’টো ভাল করে দেওয়ার জন্য বর চাওয়ার কথা ভাবলো। কিন্তু আবার ভাবলো, তার জমি-জমা, ধন-সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। দৃষ্টিশক্তি নাই বলে সে ভিক্ষা করে কোনোমতে খেয়ে-ধেয়ে বেঁচে রয়েছে। দৃষ্টিশক্তি না থাকার জন্য মানুষ অনুকম্পা করে তাকে ভিক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পেলে লোকেরা তাকে ভিক্ষা দিবে কি? এসব কথা মনে মনে ভেবে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পাওয়ার চেয়ে অন্ধ হয়ে থাকাটাকে উত্তম বলে ভাবলো। সেজন্য সে ধন-সম্পত্তি চাওয়ার কথা ভাবলো। ধন-সম্পত্তি থাকলে দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও সে ভালোভাবে খেয়ে-ধেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। আবার ভাবলো, চোখের দৃষ্টি না থাকলে সে ধন-সম্পত্তি দিয়ে কি করবে? দৃষ্টিশক্তি না থাকলে বিলাস ব্যসন তার কাছে অর্থহীন। সেজন্য সে একটা বরের জরিয়তে সব জিনিস পাওয়ার কথা ভাবলো। যার দ্বারা একদিকে সে দৃষ্টিশক্তিও ফিরিয়ে পাবে এবং অন্যদিকে ধন-সম্পত্তিও লাভ হবে। কিন্তু কীভাবে খুঁজে সেই বর?

এভাবে মনে মনে চিন্তা-ভাবনা করে থাকতে ভোলানাথ অধৈর্য হয়ে উঠলেন-বৎস, মনে মনে আছ কেন? বর চাও। যা খুঁজবে তাই পাবে। যা মন যায় তাই চাও।

          পদ্মলোচনের মনে হঠাৎ একটি বুদ্ধি খেলালো। একটি শর দিয়ে সে দু’টি শিকার করার কথা ভাবলো। ভাবামতেই সে আবার সাষ্টাংগে প্রণিপাত করে বললো- প্রভু, বর মাত্র একটা। সেজন্য তুমি আমাকে এমন একটা বর দাও, যাতে আমি সোনার সিংহাসনে বসে, দুই চোখ দিয়ে দেখে, সোনার থালায় রূপার চামুচ দিয়ে খেতে পারি।

ভোলানাথ বুঝতেই পারলেন না যে, পদ্মলোচন একটা বরের দ্বারা সংসারের সব জিনিস খুঁজেছে। সেজন্য তিনি দুই হাত উত্তোলন করে প্রসন্নচিত্তে বললেন- তথাস্তু।

          ভোলানাথের বর অথলে যায় না। আখরে আখরে ফলে। পদ্মলোচনকে দেওয়া বরও আখরে আখরে ফললো। সাথে সাথে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পেলো। চোখে দেখার সাথে সাথে সে পূর্বের পদ্মলোচন থেকে নতুন মানুষ হয়ে পড়ল। ভোলানাথকে দেখেই সে চিৎকার করে বললো- ছিঃ ছিঃ, ভোলানাথ এত নোংরা! সাপটা কণ্ঠে ধারণ করে ভাং খেয়ে কি রকম ভয়ংকর রূপ ধারণ করে রয়েছে………।

                 ভাজা পোরা মুখের মজা

                     বুদ্ধিই হোল সবার রাজা।।*

পীর কালসার

      ইসলাম ধর্মে মৌলবীদের পরেই সুফি পীরদের প্রাধান্য।তেমনই একজন সুফি পীর ছিলেন আছাদুল্যা পীর সাহেব। পীর হিসেবে তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন অঞ্চলটিতে। তার অনেক শিষ্য ছিল। শিষ্যদের অধিকাংশই ছিল নিরক্ষর। সেই নিরক্ষর শিষ্যদের মধ্যে পীর সাহেবের দু’জন অতি প্রিয় শিষ্য ছিলেন। একজনের নাম সলিমুদ্দিন ও অন্যজনের নাম কলিমুদ্দিন। দুজনই পীর সাহেবকে নিজেদের আত্মার অংশ মনে করতেন এবং পীর সাহেব যা বলতেন তা তারা নির্বিবাদে পালন করতেন।

      পীর সাহেব বাড়িতে এলে তাঁকে বিভিন্ন উপাদেয় খাবার পরিবেশন করতেন এবং হাত-পা মালিশ করে দিতেন। ফলে পীর সাহেব তাদের প্রতি খুবই প্রসন্ন ছিলেন। তাই পীর সাহেব যেখানেই যেতেন প্রায়ই কলিমুদ্দিন ও সলিমুদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন।

      কলিমুদ্দিন ও সলিমুদ্দিন একত্রিত হলে পীর সাহেবের হাত-পা মালিশ করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। তারা মাঝে মাঝে কে কোন হাত আর কোন পা মালিশ করবে এ নিয়ে তর্কও করতো। মালিশ করার সময় তর্ক করলে মালিশের ছন্দ পতন হওয়াটা স্বাভাবিক। এদিকে ছন্দ পতন হলে পীর সাহেবের অস্বস্তি লাগাটাও স্বাভাবিক।

       একদিন পীর সাহেব এক জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার সময় কলিমুদ্দিন ও সলিমুদ্দিন উভয়েই পীর সাহেবের সঙ্গে গেলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর পীর সাহেব তাসাউফের রহস্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন।আলোচনা চলার সময় অন্যান্য দিনের মতো কলিমুদ্দিন ও সলিমুদ্দিন পীর সাহেবের হাত-পা মালিশ করছিলেন। এটাই নিয়ম। কারণ পীর সাহেব যত বেশি সন্তুষ্ট হবেন, তত বেশি সাবলীলভাবে তাসাউফের রহস্যগুলি ব্যক্ত করবেন। কিন্তু মালিশের সময় হঠাৎ করেই বিপত্তি বেঁধে গেলো। হাত-পা-র ভাগ নিয়ে অর্থাৎ কে কোন পা কোন হাত মালিশ করবে এ নিয়ে তর্ক শুরু করে দিলো। ফলে মালিশের ছন্দ পতন হলো। মালিশের ছন্দ পতন হওয়াতে পীর সাহেব অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। কিন্তু কাকে কি বলবেন? দুজনই প্রিয় শিষ্য। একজনের পক্ষ নিলে অন্যজন খরাপ পাবে। তাই পীর সাহেব একটা বুদ্ধি বের করলেন। তিনি লটারির মাধ্যমে উভয়কে হাত পা ভাগ করে দিলেন। সলিমুদ্দিনের ভাগে পড়ল ডান হাত ও ডান পা এবং কলিমুদ্দিনের ভাগে পড়ল বাম হাত ও বাম পা।

      কলিমুদ্দিনের অবশ্যে বাম পা ও বাম হাত তেমন পছন্দ হলো না, কিন্তু পীরের আদেশ বলে বাম পা ও বাম হাতটাকে মেনে নিতে বাধ্য হলো এবং পীর সাহেব যেভাবে ভাগ করে দিয়েছিলেন সেভাবে উভয়েই হাত-পা মালিশ করতে লাগলো। ফলে পীর সাহেব স্বস্তি পেলেন। অবশেষে, পরবর্তী পর্যায়েও পীর সাহেবের এই বণ্টন অনুসারে হাত-পায়ের মালিশ চলতে থাকলো।

      একদিন পীর সাহেব কলিমুদ্দিনের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। রাত্রে খাওযা-দাওয়ার পর পীর সাহেব তাসাউফের রহস্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন এবং কলিমুদ্দিন তার ভাগের হাত-পা মালিশ করছিলো। বাম পা ও বাম হাতে মালিশ করার পর পীর সাহেব ডান পা ও ডান হাতে অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলেন। তাই পীর সাহেব বললেন- কলিমুদ্দিন, তুমি সলিমুদ্দিনের ভাগের হাত-পাও একটু মালিশ করে দাও। ডান পা ও ডান হাতে আমি খুবই অস্বস্তি বোধ করতেছি।

      পীরের হুকুম অমান্য করা মহাপাপ। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও কলিমুদ্দিন সলিমুদ্দিনের ভাগের হাত-পা মালিশ করতে লাগলো। অসাবধনতার জন্যই  হোক বা ঈর্ষার জন্যই হোক, সলিমুদ্দিনের ভাগের হাত-পা মালিশের সময় সলিমুদ্দিনের ভাগের পাটা সামান্য মচকে গেল। যাইহোক, পরের দিন পীর সাহেব লেংড়াতে লেংড়াতে ধীর পায়ে হেঁটে সলিমুদ্দিনের বাড়ির দিকে রওনা হলেন।

      কিছুদূর আসার পর পথে সলিমুদ্দিনের সাথে পীর সাহেবের দেখা হয়ে গেলো। কারণ সলিমুদ্দিন পীর সাহেবকে তার বাড়িতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন। কিন্তু পীর সাহেবকে লেংড়াতে দেখে সলিমুদ্দিন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো-হুজুর, এভাবে লেংগড়াচ্ছেন কেন?’

      পীর সাহেব যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বললেন- উহুহু, আর বলো না বাবা, কলিমুদ্দিন তোমার ভাগের পা মালিশ করতে গিয়ে এ রকম অবস্থা করেছে। উহুহু! খুবই বেদনা অনুভব করছি। হয়তো মচকে গেছে। বিষে একেবারে জর্জরিত হয়ে পড়েছি।

      পীর সাহেবের কথা শুনে সলিমুদ্দিন ক্ষোভে জ্বলে উঠলো। বললো সে-কি বললেন? কলিমুদ্দিনের এত সাহস! সে আমার ভাগের পা মচকে দিয়েছে? আমিও তার ভাগের পা আস্ত রাখব না? এভাবে বলেই সলিমুদ্দিন পীর সাহেবের বাম পা চেপে ধরে মচকে দিলো। বিষে অস্থির হয়ে পীর সাহেব পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।

      অত্যধিক ভক্তির জন্য পীর সাহেব অবশেষে সাঙীতে চড়ে কলিমুদ্দিনের বাড়ীতে আসতে বাধ্য হলো।

           অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ

পীর সাহেবের হলো সাঙীতে গমন।।*

 টেটনের বুদ্ধি

      জমিদারি প্রথা চালু থাকা সময়ের কথা। একদিন জমিদার হরিনারায়ণ চৌধুরী ঘোড়ায় চড়ে সদর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি পথে দশ-বারো বছরের একটি ছেলেকে দেখতে পেলেন।ছেলেটি রাস্তার পাশে একটি গর্ত খুঁড়ছিল। তিনি জমিদার হলেও তাঁর স্বভাব আর দশজন জমিদারের মতো ছিল না। তিনি মৃদুভাষী এবং গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। কারো সাথে তেমন রাগ গোস্সা করতেন না। কিন্তু তার অন্তরে ছিল আন্তঃসলিলা স্রোতের মতো এক কুটিল মন।

      হরিনারায়ণ চৌধুরী ছেলেটির কাছে এসে ঘোড়া থামিয়ে মিষ্টি স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “বাছা, তোমার নাম কী? রাস্তার মাঝখানে এভাবে গর্ত খুঁড়ছো কেন?

      ছেলেটি সাহসী এবং বুদ্ধিমান ছিল। সে ঘোড়া এবং হরিনারায়ণ চৌধুরীর পোশাক দেখে জমিদার বলে চিনতে পারলো যদিও ভয় পেলো না। সে নির্ভয়ে উত্তর দিল- আমার নাম টেটন। আমি রাস্তার মাঝখানে গর্ত খনন করতেছিনা, রাস্তার প্রান্তে খনন করতেছি।

      টেটনের নির্ভীক ও বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর শুনে হরিনারায়ণ চৌধুরী মনে মনে ক্ষুণ্ণ হলেও, তিনি মনের ভাব গোপন করে বললেন- “তুমি রাস্তার মাঝখানে খোঁড়াখুঁড়ি করছ না এটা ঠিক, তবে তুমি রাস্তার প্রান্তে তো খনন করছ! ভুল করে কেউ যদি হঠাৎ গর্তে পড়ে যায়, তাহলে তো সে আঘাত পাবে না কি?

      টেটন উত্তর দিল- চোখ থাকতেও কেউ যদি অপথে যায়, তাহলে সে আঘাত পাবেই। এটা আর কি বড় কথা!

      টেটনের উত্তর শুনে হরিনারায়ণ চৌধুরী হতবাক। তিনি ভাবলেন, ছেলেটা তো কম নয়! বড় হলে নিশ্চয়ই ছেলেটি খুবই বুদ্ধিমান হবে। ছেলেটি বড় হয়ে তার জমিদারীও হাতিয়ে নিতে পারে! তাই একে কুঁড়িতে গুঁড়িয়ে না দিলে ভবিষ্যতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে! সেজন্য হরিনারায়ণ চৌধুরী তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য ছেলেটিকে তার কাছে রেখে তাকে পঙ্গু করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- ‘তোমার বাড়িতে কে কে আছে?’

      আমার বাবা মারা গেছেন। বাড়িতে মা ছাড়া আর কেউ নেই।

      তোমাদের সংসার চলে কীভাবে?

      আমার মা মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। তাই দিয়ে কোনমতে সংসার খরচ চলে।

      তাহলে তো তোমাদের খুব কষ্ট হয়। তুমি কি আমার সাথে যাবে? তোমার সব খরচ আমি বহন করব। তোমার মত আমারও একটা ছেলে আছে। তার নাম দীপক। দীপক স্কুলে যায়। তুমি চাইলে তার সাথে স্কুলে গিয়ে লেখা-পড়াও শিখতে পারবে।

      টেটন বলল, “কিন্তু আমার মায়ের দেখাশোনা কে করবে?

তোমার মা’কে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।তাঁর ভাতকাপড়ের দায়িত্বও আমি বহন করব।।

আমার আপনার সাথে যেতে কোনো আপত্তি নেই।তবে আমি মা’র অনুমতি ছাড়া কোথাও যাই না। মা অনুমতি দিলে তবে আমি আপনার সাথে যেতে পারব।

তাহলে আমাকে তোমাদের বাড়ী নিয়ে চল। আমি এক্ষুনি গিয়ে তোমার মা’র সাথে কথাটা আলোচনা করব।

      টেটন হরিনারায়ণ চৌধুরীকে তাদের বাড়ী নিয়ে এলো।জমিদার টেটনের মাকে তার অভিপ্রায়ের কথা জানালেন।

      টেটনের মা জমিদারদের স্বভাবের বিষয়ে জানেন। জমিদার তাদের প্রতি এত অনুগ্রহ দেখানোর কারণ কী? আজ অনুগ্রহ দেখাতে চাইছে, কাল আবার তাদের ক্ষতিও করতে পারে! জমিদাররা ঈগলের মতো ধূর্ত। তারা স্বার্থ ছাড়া কোনো কাজ করেন না। তাই তিনি আদর আপ্যায়ন করে জমিদারকে বসিয়ে রেখে গ্রামের কয়েকজন প্রধানকে ডেকে আনলেন। তারপর, প্রধানদের সাক্ষী রেখে তিনি টেটনকে জমিদার সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন।

      জমিদার টেটনকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে এসে তার ছেলে দীপকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন- এই ছেলেটির নাম টেটন। আজ থেকে টেটন তোমার সাথে থাকবে। তুমি স্কুলে গেলে টেটন তোমার বইখাতা নিয়ে যাবে।

      টেটন ও দীপক সমবয়সী। তাই টেটনকে পেয়ে দীপক খুশি হলো। দীপকের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণে টেটনও মুগ্ধ হলো। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠলো।

      পরের দিন থেকে টেটন দীপকের সাথে স্কুলে যেতে শুরু করল। দীপক ক্লাসে থাকাকালীন টেটন দীপকের পাশে বসে থাকে। কারণ এই রকমই জমিদারের আদেশ ছিল।টেটন মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকদের কথা শোনে। টেটন আগে কিছু পড়তে ও লিখতে শিখেছিল।ফলে শিক্ষক দীপককে যা শিখাইতেন তা সে মনোযোগ সহকারে শুনতো এবং সে পাঠ্য সম্পর্কে অনেক কথা শিখে ফেললো। ফলস্বরূপ, শিক্ষকরা দীপককে কিছু লিখতে বললে, টেটন তা লিখে দিতো।

      দীপক আপত্তি করলে টেটন বলতো- তুমি জমিদারের ছেলে। তোমার বাবা আমাকে তোমায় সাহায্য করার জন্য রেখেছে। তোমাকে লিখতে হবে না। তোমাকে যা লিখতে দিবে আমিই তা লিখে দিব।

      কথাটা দীপকেরও পছন্দ হলো।টেটন লিখে দিলে সে  নিজের লেখার চেয়েও বেশি নম্বর পায়। এদিকে, নিজেকেও লিখতে হয় না। আরামে বসে থাকতে পারে।শিক্ষকদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনারও প্রয়োজন হয় না। ফলে দীপকের কাছে টেটনের সমাদর বেড়ে গেলো। এদিকে শিক্ষকরা টেটনের পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে তাকে দীপকের ক্লাসেই ভর্তি করে দিলেন।

      টেটনের আচরণের ফলে দীপক লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেললো এবং টেটনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল।

      বার্ষিক পরীক্ষার পর দীপকের দুর্বলতা ধরা পড়ে গেলো। দীপক কোনো বিষয়ে পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে টেটন প্রতিটি বিষয়ে ভালো নম্বর নিয়ে ক্লাসে প্রথম হয়েছে।

      শিক্ষকরা দীপকের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে টেটনের আচরণ সম্পর্কে জানতে পারলেন। তাঁরা জমিদারকে কথাটা অবগত করলেন। টেটনের আচরণের বিষয়ে জানতে পেরে জমিদার রেগে গেলেন।তিনি ভাবলেন, টেটন যেরকম চতুর,কুঁড়িতে তাকে পিষে না ফেললে সে ভবিষ্যতে তার জমিদারিও কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু কাজটা সে করে কীভাবে? অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত তিনি টেটনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু গ্রামবাসীকে সাক্ষী করে তিনি টেটনকে এনেছেন। তাই হঠাৎ মেরে ফেললে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হওযাটা নিশ্চিত এবং মামলা হলে তাঁর জেল হওয়াটাও নিশ্চিত।

      তাই জমিদার সন্ধির বাঁশ বুদ্ধি দিয়ে কাটার কথা ভাবলেন। তিনি কাগজে কিছু একটা লিখে একটি লেফাফায় ভরে লেফাফার মুখে আঠা লাগিয়ে টেটনক ডেকে এনে বললেন, অনেকদিন হলো তুমি বাড়ী থেকে এসেছ। পরীক্ষাও দিয়েছিলে এবং শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পাসও করেছ। এদিকে নতুন করে ক্লাস শুরু হতেও দেরি আছে। তোমার মা হয়তো তোমার কথা ভেবে অস্থির হয়ে উঠেছে। তাই তুমি বাড়ী গিয়ে তোমার মায়ের সাথে দেখা করে আসগে’।ইচ্ছা করলে পুনরায় স্কুল না খোলা পৰ্যন্ত বাড়ীতে থেকেও আসতে পারবে। এ ভাবে বলে, ইতিমধ্যে লিখে আনা লেফাফাটা জমিদার টেটনের হাতে দিয়ে বললেন-তুমি যাওয়ার সময় এই চিঠিটা কোতোয়ালের হাতে দিয়ে যেও। কিন্তু সাবধান চিঠিটার মুখ খুলো না। এতে জরুরী কথা লিখা আছে।

      টেটন চিঠিটা নিয়ে আনন্দ মনে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। কোতোয়ালের বাড়ি টেটনদের বাড়ি যাওয়ার পথেই। কিছুদূর আসার পর টেটন ভাবলো, জমিদার তাকে চিঠি খুলতে নিষেধ করলেন কেন? চিঠিতে নিশ্চয়ই কিছু গোপন কথা লেখা আছে।

      যেখানে বাধা-নিষেধ আছে সেখানে মানুষের কৌতূহল বেশি। তাই টেটন চিঠিটা খোলার সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু চিঠিটার মুখ আঠা দিয়ে বন্ধ করা।তাই চিঠিটা খুলে পড়লে নিশ্চয়ই কোতোয়াল টের পেয়ে যাবে যে, চিঠিটা খোলা হয়েছিলো। কোতোয়াল যদি চিঠি খোলার কথা জমিদারকে জানিয়ে দেয়, তাহলে জমিদার তাকে ছেড়ে কথা বলবেন না। তাই সে ভাবতে লাগলো, চিঠিটা এমন ভাবে খুলতে হবে, যাতে কোতোয়াল টের না পান যে, চিঠিটা খোলা হয়েছিলো।

      অনেক চিন্তা-ভাবনার পর টেটন একটা বুদ্ধি বের করল।সে একটি পুকুর পাড়ে এসে চিঠির আঠালো অংশটি ধীরে ধীরে ভিজিয়ে ফেললো। ফলে আঠা লাগানো অংশটা আলগা হয়ে গেলো। সে সবসময় তার সাথে একটি সেফটিপিন রাখতো। সে সেফটিপিনের চোকা প্রান্তটি লেফাফার আঠালো অংশের মধ্যে ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে একপাশে টেনে নিতে লাগলো। একপর্যায়ে লেফাফাটা খুলে গেল। লেফাফাটা খোলার পর সে তাড়াতাড়ি চিঠিটা বের করে পড়ে ফেললো।

      চিঠিতে লেখা ছিলো- ‘চিঠিটা হাতে পেলেই পত্র বাহকের শিরশ্ছেদ করবে।

      টেটন চিঠিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, কয়েকবার পড়ে চিঠিটা আবার লেফাফায় ভরে আগের মতো মুখ বন্ধ করলো। সে এখন কী করবে! চিঠিটা কোতোয়ালের হাতে দিলেই সে তার শিরশ্ছেদ করবে!এখন সে এই বিপদ থেকে বাঁচে কী করে?

      এসব কথা ভাবতে ভাবতে সে ভারাক্রান্ত মনে এক পা দু’পা করে কোতোয়ালের বাড়ীর দিকে অগ্রসর হলো।কিছুদূর আসার পর সে দেখলো, দীপক কয়েকজন ছেলের সাথে মার্বেল খেলতেছে।

      দীপক মার্বেল খেলায় হেরে টেটনের জন্য অপেক্ষা করছিল। কারণ টেটন মার্বেল খেলায় ভালো। তাই সে টেটনকে দেখে উতসাহিত  হয়ে উঠে বললো-, টেটন, আমি অনেক মার্বেল হেরেছি। তুমি খেলে মার্বেল কয়টা জিতে দাও।

      টেটন এতক্ষণ ধরে যে সমস্যার কথা ভাবছিল, সে তার সমাধানসূত্র খুঁজে পেলো।সে চিঠিটা দীপকের হাতে দেওয়ার কথা ভাবলো।কিন্তু সে নিজের মনের ভাব লুকিয়ে রেখে খেলার প্রতি অনীহা প্রকাশ করে বললো- ‘আমি এখন খেলতে পারব না। তোমার বাবা আমার হাতে একটি চিঠি পাঠিয়েছে কোতোয়ালকে দেওয়ার জন্য। আমাকে এক্ষুনি চিঠিটা কোতায়ালকে দিতে হবে।

      কোতোয়ালের বাড়ি খেলার মাঠ থেকে বেশি দূরে নয়। তাই দীপক উতসাহিত গলায় বলল- আচ্ছা চিঠিটা তুমি আমাকে দাও। আমি এক্ষুনি গিয়ে চিঠিটা কোতোয়ালকে দিয়ে আসব।

      কিন্তু তোমার বাবা যদি তোমার হাতে চিঠি দেওয়ার কথা জনতে পারে, তাহলে রাগ করবে। তখন কি করবো? টেটন অসুবিধার কথা প্রকাশ করলো।

      দীপক টেটনকে আশ্বস্ত করে বলল- আমি না বললে তিনি জানবেন কী করে? পিতা কথাটা জনতে পারবেন না। চিঠিটা আমাকে দিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত মনে খেলতে থাকো।

      টেটনের চিঠিটা দীপকের হাতে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কারণ দীপক চিঠিটা নিয়ে কোতোয়ালের হাতে দিলে তার মৃত্যু অনিবার্য। ইতিমধ্যে দীপকের সাথে টেটনের নিবিড় বন্ধুত্ব গঢ়ে উঠেছিলো।দীপক জমিদারের মতো কূটিল স্বভাবের নয়।দীপক সরল সহজ।মন মেজাজও ভালো। এদিকে তার খুবই ভক্ত। তাই দীপকের নিশ্চিত মৃত্যুর কথা ভেবে টেটনের মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। পরের মুহূর্তে সে ভাবল, দীপক মরলে মরবে, তাতে তার কি আসে যায়!দীপক বড় হলে হয়তো তার বাবার মতোই হবে। যেমন বাপ, তেমন ছেলে। বাপ কা বেটা, সেপাই কা ঘোড়া। তাই পাপ ছোট থাকতেই শেষ হওয়া উত্তম। এখানে তার কোনো দোষ নেই। সব দোষ রক্তের- জমিদারের। তাই দীপক মরলে, মরুক। দীপক মরুক আর জমিদার ছেলের শোকে পচে গলে মরুক। যেমন কুকুর তেমন মুগুর!

      এ ভাবে ভেবে টেটন চিঠিটা দীপকের হাতে দিল। দীপক দৌড়ে গিয়ে চিঠিটা কোতোয়ালের হাতে দিল।

      কোতোযাল চিঠিটা পড়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়লো। জমিদারের এ কি নিষ্ঠুর আদেশ! বাপ হয়ে ছেলের শিরশ্ছেদের আদেশ! জমিদার ভুল আদেশ দেননি তো? কিন্তু সে এ কথা জানবে কীভাবে? এদিকে জমিদার তাকে মানুষ মারার জন্যই রেখেছেন। মানুষ মারার জন্য তাকে মাসে মাসে টাকা দেওয়া হয়। জমিদারের ছেলে বলে দীপককে না মারলে তার চাকরিও চলে যেতে পারে! চাকরি গেলে সে তার সন্তানদের খাওয়াবে কীভাবে? দাসের কর্তব্যই হলো, প্রভুর আদেশ পালন করা, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের বিচার করা নয়। তদুপরি, ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ বিচার করার জন্য তাকে বেতন দেওয়া হয় না। এ ভাবে ভেবে কোতোয়াল তলোয়ার বের করে এক আঘাতে দীপকের শিরশ্ছেদ করে ফেললো।

      দাবানলের মতো অল্প সময়ের মধ্যে কথাটা প্রচার হয়ে গেলো। খবর পেয়ে জমিদার পাগলের মতো কোতোয়ালের বাড়ির দিকে ছুটে এলেন।

      পথে টেটনের সাথে জমিদারের দেখা হলো।টেটন মাথা নিচু করে ভারাক্রান্ত মনে বলল- আমি আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলাম যে, যেজন পথ ছেড়ে অপথে যায়, সে গর্তে পড়ে মারা যায়। আমি ছোট ছেলে বলে আমার কথা উপেক্ষা করার পরিণাম এখন আপনি নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

             যেজন পরের জন্য গর্ত খুঁড়ে

            সে নিজেই সেই গর্তে পড়ে মরে।।*

পাটা রহস্য

      একদিন এক দম্পতির মধ্যে ঝগড়া লাগলো। দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পর স্বামী বললো- তোমার সঙ্গে আর পারছি না। তোমার গ্যান গ্যান, প্যান প্যান চোপা শোনার চেয়ে জলে ডুবে মরাই ভাল।

      মর না কেন? কে তোমাকে মরতে বারণ করেছে? তুমি মরলে আমিও তোমার জ্বালা যন্ত্রণা নিগ্রহ থেকে রক্ষা পাব? বউ আস্ফালন করে বললো।

      আমি আজই আত্মহত্যা করব। দেখো মরার পর যেন কেঁদো না। স্বামী তার বউকে সতর্ক করে দিলো।

      আত্মহত্যা করতেও সাহস লাগে, বুঝলে। তোমার মত মানুষের কি আত্মহত্যা করার সাহস আছে?

      কি বললে? আমার আত্মহত্যা করার সাহস নেই! দেখি আত্মহত্যা করতে পারি কি না। আমি আজই আত্মহত্যা করবো, নিশ্চয়ই করবো। স্বামী একথা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

      স্বামীকে চলে যেতে দেখে স্ত্রী ডেকে বললো- “যাও, যাও, কোথায় মরবে মর গিয়ে। তুমি মরলে আমারও বুকের জ্বালা মিটবে।তোমার মত মানুষের আমার দরকার নেই। এভাবে বলে বউ দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে শোয়ে পড়লো।

      লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে এসে দাঁড়াল। আসলে তার স্ত্রী ঠিকই বলেছে। তার আত্মহত্যা করার সাহসও নেই আর ইচ্ছাও নেই। রাগের মাথায় আত্মহত্যার কথা বলে সে যেন বিপদেই পড়লো। সে ভেবেছিলো, আত্মহত্যা করার কথা শুনে তার স্ত্রী তাকে আত্মহত্যা না করার জন্য অনুনয়-বিনয় করবে এবং তার পিছু পিছু দৌড়ে এসে তাকে হাতে-পায়ে ধরে ঘরে টেনে নিয়ে যাবে। কিন্তু না, সে রকম কিছুই হল না। অনুনয়-বিনয় করার পরিবর্তে তার চোখের সামনে দরজা বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে শোয়ে পড়ল। এখন সে কোন মুখে স্ত্রীকে দরজা খুলার কথা বলে?

      লোকটা উঠোনে দাঁড়িয়ে নিজের মনে এসব কথা ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে চলে এলো। সে একটি পীরা নিয়ে এসে চুলার পাশে বসে তার স্ত্রী তাকে ডাকার জন্য কান খাঁড়া করে অপেক্ষা করতে লাগলো। যখন তার স্ত্রী ঘরের মধ্যে পাশ ফিরে শোয়ার শব্দ শোনে তখন সে ভাবে, এবার বুঝি তার স্ত্রী তাকে হাত-পা ধরে ডেকে নিয়ে যেতে আসবে। কিন্তু না, সে যা ভেবেছিলো সে রকম কিছুই হল না। প্রায় একঘণ্টা অপেক্ষার পরও তার স্ত্রী বাইরে বেরিয়ে এলো না বা সে কোথায় আছে বা কী করছে খবরও নিলো না।

      স্ত্রীর আচরণে সে খুবই রেগে গেলো। অনুশোচনাও হতে লাগলো তার। বিশ বছর ধরে সে তার স্ত্রীকে খাওয়ানো পরানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করে আসছে। স্ত্রীর ফরমাশ মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে দিয়েছে। এটাই কি তাহলে তার প্রতিদান? তার মরার কথা শুনেও সে কি করে শান্তিতে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে পারছে? এতদিন সে এমন নিষ্ঠুরা নারীকে নিয়ে কীভাবে সংসার করে আসছে? এমন নারীকে নিয়ে সংসার করার চেয়ে সে মরে যাওয়াই ভালো।কিন্তু তার যে মরার সাহস নেই!

      সে কি করে এখন! হঠাৎ তার চোখ পড়ল মশলা বাটা পাটার উপরে। পাটাটি দেখে তার মনে একটা বুদ্ধি খেলালো। কুয়ার জলে পাটাটা ফেলে দিয়ে সে নিজে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরার ভান করার সিদ্ধান্ত নিলো।পাটাটা হাতে নিয়ে সে কুয়ার পাড়ে এলো। কুয়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে সে আবার কিছুক্ষণ স্ত্রীর ডাকের অপেক্ষায় রইলো। কিন্তু না, তার স্ত্রী আসার কোনো লক্ষণই দেখা গেলো না।

      অবশেষে সে পাটাটাকে কুয়ার জলে ফেলে দিয়ে পেছনের বাগানে গিয়ে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। যাতে পাটাটা জলে পড়ার শব্দ শোনে তার স্ত্রীর ভাবে যে, সে পানিতে ঝাঁপ দিয়েছে। কিন্তু তার স্ত্রী ঘুমিয়ে থাকলে তার সব প্রচেষ্টাই বৃথা যাবে। তাই সে ধীরে ধীরে কুয়ার পাড় থেকে তার বেডরুমের কাছে এলো এবং স্ত্রী জেগে আছে, নাকি ঘুমিয়ে আছে তা জানার জন্য দেয়ালে কান পেতে দাঁড়ালো।

      তার স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়লে মৃদু নাক ডাকে। কিন্তু না, নাক ডাকার শব্দ নেই। তার মানে তার স্ত্রী জেগে আছে। এটাই তার জন্য সুবর্ণ সুযোগ। এখন যদি সে পাটাটা জলে ফেলে দেয়, তাহলে তার স্ত্রী অবশ্যই পাটাটা জলে পড়ার শব্দ শুনতে পাবে। এইভাবে আশ্বস্ত হয়ে সে দ্রুত কুয়ার পাড়ে এলো।কুয়ার পাড়ে এসে সে জোরে জোরে বলতে লাগল- আচ্ছা, আমি কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করলে, তখন যেন কেউ কান্নাকাটি না করে।

      তার স্ত্রী জেগেই ছিলো। তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তার স্ত্রী ঘরের ভিতর থেকে চিৎকার করে বললো- কে বারণ করছে আত্মহত্যা করতে? মরতে চাইছে যখন মরেই যাক। কেউ কোনোরূপ কান্নাকাটি করবে না।

      অবশেষে হতাশ হয়ে লোকটি বললো- ‘হে মা গঙ্গা, আমাকে তোমার বুকে আশ্রয় দাও’ বলেই পাটাটা কুয়ার জলে ফেলে দিয়ে পূর্বের পরিকল্পনা মতো নিঃশব্দে পিছনের বাগানে গিয়ে একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইল।

লোকটি যেমন ভেবেছিল তেমনটিই হলো। সে কুয়ার জলে ঝাঁপ দিয়েছে ভেবে তার স্ত্রী দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়ে কুয়ার পাড়ে চলে এলো এবং চেঁচিয়ে বলতে লাগলো- কে কোথায় আছ, তাড়াতাড়ি এস। আমার লোকটি কুয়ার জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সবাই তাড়াতাড়ি এসে লোকটিকে বাঁচাও।’

স্ত্রী লোকটি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। স্ত্রীর কান্না শুনে প্রতিবেশীরা দৌড়ে ছুটে এলো। প্রতিবেশীদের একজন জিজ্ঞেস করলো- ‘কী হয়েছে? এত কান্নাকাটি করছো কেন?’

      স্ত্রী লোকটি বুকে চাপরিয়ে চিৎকার করে বললো- ‘আমার স্বামী কুয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। আমার কপাল পুড়েছে। সে আত্মহত্যার কথা বলাতে আমাকে ভয় দেখানোর জন্য বলছে ভেবে তাকে আমি বারণ করিনি। বারণ না করার ফল আমি হাতে হাতে পেলাম। এভাবে স্ত্রী লোকটি কেঁদে কেঁদে প্রতিবেশীদের কাছে সমস্ত বৃত্তান্ত খুলে বললো।

      একটি লোক একটা লম্বা বাঁশ এনে কুয়ায় নামিয়ে দিয়ে বললো- তুমি বেঁচে থাকলে এই বাঁশটা ধরে উপরে উঠে এসো। আমরা সবাই তোমাকে বাঁচানোর জন্য কুয়ার পাড়ে এসে জড়ো হয়েছি। তাড়াতাড়ি বাঁশ বেয়ে উঠে এসো।

      না, কোন সাড়াশব্দ নেই। প্রতিবেশীদের একজন কুয়ার জলে টর্চলাইটের আলো ফেলে দেখলো।কিন্তু জল ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। কুয়ার জল নিথর হয়ে আছে। জলে মানুষ থকার কোনো চিহ্ন নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও লোকটার কোনো হদিস না পেয়ে একজন হতাশ হয়ে বললো-এতক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও যখন কোনো সাড়াশব্দ নেই, তখন লোকটা নিশ্চয়ই বেঁচে নেই।

      আরেক প্রতিবেশী হতাশ গলায় বলল- ঠিকই বলেছো। যা ঠাণ্ডা পড়েছে মনে হয়, এতক্ষণে সে মরে বরফ হয়ে গেছে। কুয়ায় নেমে দেখতে পারলে অবশ্যে ভালো হতো, কিন্তু এত রাতে কে কুয়ায় নামবে? কাল সকালে এসে লাশ তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

      সবাই লোকটার সাথে একমত হলো। তারপর সবাই স্ত্রী লোকটিকে সান্ত্বনা দিয়ে যার যার বাড়ি চলে গেল। প্রতিবেশীরা চলে যাবার পর স্ত্রী লোকটি ঘরের ভিতরে এসে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে লাগলো- বেঁচে থাকলে বাঁশ বেয়ে উপরে উঠে এসো। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো কীভাবে? তোমার সাথে আর কখনো আমি ঝগড়া করবো না। তুমি যা বলবে আমি তাই করব।

      প্রতিবেশীরা বাড়ি চলে যাওয়ার পর লোকটি ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে চুপচাপ কুয়োর পাড়ে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। লোকটি ভাবলো, এবার তার স্ত্রী উচিত শিক্ষা পেয়েছে। মনে হয়, স্ত্রী তার সাথে আর অযথা ঝগড়া করবে না। কতক্ষণ আর ঠাণ্ডার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকবে? এখন সত্যিটা প্রকাশ করে নাটকটা এখানে শেষ করাই ভালো হবে। এভাবে ভেবে সে বললো- তুমি যদি আর কখনও ঝগড়া করবে না বলে শপথ খাও, তাহলে গৃহে আসতে পারি। আসলে আমি কুয়ায় ঝাঁপ দেই নি। তোমাকে ভয় দেখানোর জন্য শুধু পাটাটা জলে ফেলে দিয়েছি।

      স্ত্রী লোকটির আওয়াজ শুনে দৌড়ে কুয়ার পাড়ে এলো। দেখল, লোকটা হাসি মুখে কুয়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্ত্রী আদর করে লোকটিকে নিয়ে ঘরে চলে এলো। সেদিনের নাটক এভাবেই শেষ হলো।

      প্রবাদ আছে, কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না। একইভাবে, মানুষের প্রকৃতিও সহজে পরিবর্তন হয় না। কয়েকদিন পর তাদের মধ্যে আবার ঝগড়া লাগলো। সেদিনও আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

      তখন স্ত্রী লোকটি পেছন থেকে ডেকে বললো- আজ আর আমি মরার হুমকিতে ভয় পাব না। কারণ আজ ভয় দেখানোর জন্য পাটাটা ঘরে নেই। পাটাটা এখনও কুয়ার জলেই রয়েছে।

                 পাটা রয়েছে কুয়ার জলে

           তাই ভয় পাব না মরার হুমকিতে।*

দাড়ি নিয়ে টানাটানি

      লোকটার নাম বোকারাম। অবশ্যে বাপ মায় নাম রেখেছিলো নিধিরাম। তবে তার বোকামির জন্য কোনো এক সময় নামটা নিধিরাম থেকে বোকারাম হয়ে গেছে।বোকারাম নামটিই এখন লোকে জানে। নিধিরাম নামটা এখন শুধু ঘনিষ্ট কিছু কিছু আত্মীয়ের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

      বোকারাম মানে বোকারামই। এমিনতেই বোকা, তাতে আবার কথা কম বলে। প্রয়োজন ছাড়া একটি কথাও বলে না। নির্ভেজাল নিরাসক্ত লোক। কিন্তু তার স্ত্রী খুবই চালাক। চালুনির ফুটা গোনে খাওয়া মহিলা।

      অবস্থা মোটামুটি ভালো।বাড়ীতে মরশুমের নানা রকম ফল, শাকসব্জি ফলায়, গরু-বাছুর, হাঁস মুরগির অভাব নেই। তাই ফল, শাকসব্জি, দুধ, ডিম প্রভৃতি নিজেরা খাওয়ার পরেও বিক্রী করতে হয়। কিন্তু বোকারাম এতটাই সোজা, যে সে জিনিসপত্র বিক্রীর সময় কোনো দরদাম করে না, অন্যদের থেকে অনেক কম দামে বিক্রী করে দিয়ে আসে।

      এ নিয়ে তার স্ত্রী খুবই দুঃখিত। একদিন সে তার স্বামীকে বললো- তুমি সবসময় অন্যদের থেকে কম দামে জিনিস বিক্রী কর আস। তুমি মোটেই দরাদরি কর না, গ্রাহক যে মূল্য দেয় সেই মূল্যেই জলের দামে বিক্রি করে দিয়ে আস। বেশি দাম পেতে হলে একটু দরদাম করতে হয়। দাম নিয়ে টানাটানি না করলে উচিত মূল্য পাওয়া যায় না। এভাবে চললে, সংসার চলবে কীভাবে? দাম নিয়ে একটু টানাটানি করতে শেখো।

      বোকারাম তার স্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে বাজারে চলে এলো। কিন্তু সেদিনও দাম নিয়ে টানাটানি করা হল না। গ্রাহকরা যে দাম দিলো, সেই দামেই জিনিসপত্র বিক্রী করে বাড়ি চলে এলো। বাড়িতে এসে বোকারাম গামছার গিঁটে বেঁধে আনা টাকা স্ত্রীর হাতে তুলে দিলো। স্ত্রী গামছার গিঁট খুলে টাকা গোনল। সে আশা করার চেয়ে টাকা অনেক কম।তাই স্ত্রী বললো- টাকা এত কম কেন? তার মানে আজও তুমি দাম নিয়ে টানাটানি কর নি?

      বোকারাম মাথায় হাত দিয়ে বললো- হ্যাঁ, দাম নিয়ে টানাটানি করার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। ঠিক আছে, কাল থেকে আর ভুল করব না।কাল নিশ্চয়ই দাম নিয়ে টানাটানি করবো।

      বোকারাম পরের দিন আবার কিছু ডিম নিয়ে বাজারে এলো। কিন্তু সেদিনও দাম নিয়ে টানাটানির কথা ভোলে গেলো। গ্রাহকরা প্রদান করা দামেই ডিমগুলি বিক্রি করে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো। বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ তার দাম নিয়ে টানাটানির কথা মনে পড়ে গেল।

      আরে, আজও তো দাম নিয়ে টানাটানি করা হল না! তার স্ত্রী টানাটানির কথা জিজ্ঞেস করলে তখন সে কী বলবে? স্ত্রী যদি জানতে পারে  যে, সে আজও দাম নিয়ে টানাটানি করে নি,বরং গ্রাহকরা যে দাম দিয়েছে, সেই দামেই বিক্রী করে দিয়ে এসেছে, তখন তার স্ত্রী ছেড়ে কথা বলবে না। স্ত্রী দাম নিয়ে টানাটানির কথা জিজ্ঞেস করলে, তখন সে কি বলবে, এই কথা ভেবে সে মন খারাপ করে এক জায়গায বসে পড়লো।

      হঠাৎ তার চোখ বেনা বনের উপরে পড়ল। বেনা বন দেখে তার মনে একটা বুদ্ধি খেলালো। তার মুখে লম্বা দাড়ি ছিল। সে বেনা বনের সাথে দাড়ি বেঁধে টানাটানি করার কথা ভাবলো।তার স্ত্রী দাম নিয়ে টানাটানির কথা জিজ্ঞেস করলে, তখন অন্তত সে মিথ্যা কথা বলতে হবে না।বলতে পারবে হ্যাঁ, টানাটানি করেছি।

      কাল বিলম্ব না করে সে বেনা বনের সাথে দাড়ি বেঁধে জোরে জোরে টানাটানি করতে লাগল। টানাটানির ফলে এক সময় তার দাড়ি ছিঁড়ে গেলো এবং সে চিত পটাং দিয়ে মাটিতে পড়ে গেলো। দাড়ি ছিঁড়ার ফলে তার সমস্ত মুখমণ্ডল রক্তে ভরে গেলো এবং কাপড় চোপড়ও রক্তে ভিজে গেলো।

      সে বিষের জ্বালায় কেঁকাতে কেঁকাতে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো। পথে অনেকেই তার মুখমণ্ডল ও কাপড় চোপড়ে রক্ত দেখে রক্তের কারণ জানতে চাইলো যদিও সে কোনো উত্তর দিলো না। মানুষ জানে সে বোকা। কথা কম বলে। তাই কেউ কারণ জানার জন্য তেমন বিশেষ জোরাজুরিও করলো না।

      বাড়ীতে এসে সে মন খারাপ করে বারান্দায় বসে পড়লো। তার স্ত্রী রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত ছিলো। অন্যান্য দিন সে বাজার থেকে এসে স্ত্রীকে ডেকে তার হাতে টাকাগুলি তুলে দেন।সেদিন বাড়ীতে এসে চুপচাপ বারান্দায় বসার কারণে তার স্ত্রী ব্যাপার কি জানার জন্য রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তার মুখমণ্ডল, কাপড়চোপড়ে রক্তে দেখে স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো-কি হলো? তোমার মুখমণ্ডল কাপড়চোপড়ে এত রক্ত ​​কিসের? তোমার দাড়ি কোথায় গেল?

      লোকটি যন্ত্রণা কাতর স্বরে বললো- আমি তোমার কথা মতো দামের জন্য টানাটানি করতে ভুলে গিয়েছিলাম এবং লোকে যে দাম দিয়েছিলো সেই দামেই ডিমগুলি বিক্রী করে বাড়ী ফিরছিলাম। বাড়ী ফেরার পথে টানাটানির কথা মনে পড়ল। তাই বেনা বনের সাথে দাড়ি বেঁধে টানাটানি করতে গিয়ে এই অবস্থা হয়েছে।

      রক্তের কারণ জানতে পেরে স্ত্রী তিরস্কারের সুরে বলল- আমি বেনা বনে দাড়ি বেঁধে টানাটানি করতে বলেছিলাম নাকি? তোমাকে নিয়ে কখনোই আমি সুখী হতে পারব না। ব্যস, যা হওয়ার ছিল, তাই তো হয়েই গেছে। তোমাকে আর দাম নিয়ে টানাটানি করতে হবে না। এতদিন যেমন চলেছ, তেমনই ভাবে চললেই হবে। এখন চল, গরম জল করে রক্তগুলো ধুয়ে দিয়ে মলম লাগাতে হবে। এভাবে বলেই স্ত্রী জল গরম করতে রান্নাঘরে গেল আর বোকারাম পা ছড়িয়ে বিষণ্ণ মনে মাটিতে বসে রইলো।*

মতলবি মহিলা

      এক সময় এক গ্রামে এক মতলবি মহিলা ছিলো। সে সব সময় নিজের মতে চলতো। কেউ কিছু বললে, সবসময় সে তার বিপরীত কার্য করত। অর্থাৎ, পূর্ব দিকে যেতে বললে, পশ্চিম দিকে যেতো, এবং পশ্চিম দিকে যেতে বললে, সে পূর্ব দিকে যেতো। দাঁড়াতে বললে বসে পড়তো, আর বসতে বললে দাঁড়িয়ে যেতো।

      একদিন সে নদীতে জল আনতে গেলে হঠাৎ পা পিছলে নদীতে পড়ে মারা গেলো। তার স্বামী খবর পেয়ে লোকজন নিয়ে নদীর তীরে এলো। খরা মরশুমের নদী- তাই স্রোত তেমন প্রবল ছিল না। সেজন্য ঘাটের আশেপাশে জাল ফেলে লাশের সন্ধান করতে লাগলো। কয়েকজন জলে নেমেও লাশের সন্ধান করলো। কিন্তু লাশের সন্ধান পাওয়া গেল না।

      অবশেষে নিরাশ হয়ে সন্ধানকারীদের একজন বললো- অনেক খুঁজাখুঁজি করা হলো। মনে হয়, লাশ ঘাটের আশেপাশে নেই। থাকলে অবশ্যেই এতক্ষণে সন্ধান পাওয়া যেতো। এদিকে পিছলে পড়াও অনেক সময় হলো। তাই লাশটা ভাটির দিকে গিয়ে ভেসে উঠতে পারে!নদীর স্রোতও তেমন বেশি নয়। তাই মনে হয়, লাশটা বেশিদূর ভাটিয়েও যায় নি। চল, ভাটির দিকে গিয়ে খুঁজে দেখি।

      লোকটির পরামর্শে, লোকগুলো লাশের সন্ধানে নদীর তীর ধরে ভাটির দিকে যেতে লাগলো।কিন্তু তার স্বামী তাদের সঙ্গে না গিয়ে লাশের সন্ধানে উজান দিকে এলো। এক মাইল উজিয়ে আসার পরও লাশ না পেয়ে স্বামী হতাশ হয়ে এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে বসলো। স্থানীয় একজন লোক এগিয়ে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করলো- আপনার বাড়ী কোথায়? এখানে কি জন্য এসেছেন? এভাবে বেজার মনে বসে আছেন কেন?

      স্বামী লোকটি ভাটির দিকে ইশারা করে বললো- আমি ওই গ্রাম থেকে এসেছি। আমার স্ত্রী নদীতে জল আনতে এসে পা পিছলে নদীতে পড়ে মারা গেছে। আমি তার লাশের সন্ধানে এসেছি।

      তখন লোকটি বিস্ময় প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করলো- নদীতে পড়ে মারা গেছে, আর আপনি উজান দিকে লাশের সন্ধানে এসেছেন! এটা কীরকম গাছে গরু চড়া কথা! নদীতে পড়ে মরা লাশ তো ভাটির দিকে যাবে।উজানের দিকে উজিয়ে আসবে কেমনে? আপনি তো ভাটির দিকে যাওয়া উচিত ছিলো।

      তখন স্বামী লোকটি বলল- বেঁচে থাকতে সে সব কথাতেই শুধু উজাইতো। তাই মৃত্যুর পরেও উজিয়ে এসেছে ভেবে আমি উজানের দিকে খুঁজতে এসেছি।

      স্বামী লোকটির কথা শুনে লোকটি বললো-‘মৃত্যুর আগে সে সব কিছুতে উজালেও মৃত্যুর পর তার লাশ উজায় নি, লাশ ভাটির দিকেই গেছে। আপনি উজানের দিকে লাশ না খুঁজে, ভাটির দিকে গিয়ে সন্ধান করুন।

      লোকটির কথা মতো স্বামী ভাটির দিকে এলো। কিছুদূর আসার পর লোকটি খবর পেলো,  পিছলে পড়া ঘাট থেকে এক মাইল ভাটিতে তার স্ত্রীর লাশ খুঁজে পাওয়া গেছে এবং লোকেরা লাশ বাড়িতে নিয়ে এসেছে।

      লোকটি বাড়ীতে এসে স্ত্রীর লাশ দেখে আক্ষেপের সুরে বললো- সেই ভাইটালি, তবে মরার আগে নয়, মরার পরে।

                    মতলবি স্বভাব যার

               মরার পরেও হয় বিপত্তি তার।*

রুটি রহস্য

      হরি, রহিম ও অ্যান্টনি নামে তিনজন যুবক এক সাথে তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছিলো। তারা বিভিন্ন তীর্থস্থান দর্শন করে একটি ছোট বাজারে এসে উপস্থিত হলো। ইতিমধ্যে রাত হয়ে গিয়েছিলো, তাই তারা রাত কাটানোর জন্য একটি স্কুলগৃহে আশ্রয় নিলো। ইতিমধ্যে তাদের টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিলো এবং তাদের কাছে শুধু একটি রুটি কেনার মতো টাকা ছিল।তাই তারা বাজার থেকে একটি রুটি কিনে এনেছিলো।

      তাদের খুব খিদে পেয়েছিলো। তাই তারা রুটিটা খেতে বসল। তখন হরি বলল- আমরা তিনজন লোক এবং রুটি মাত্র একটা। তিন জনে ভাগ করে খেলে প্রায় উপোসে থাকার মতো হবে। তাই আমরা তিনজনের কেউই এখন রুটিটা খাব না। আমরা রুটিটা না খেয়েই ঘুমাবো। ঘুমিয়ে পড়ার পর আমাদের তিনজনের মধ্যে যে সবচেয়ে ভালো স্বপ্ন দেখবে সেই কাল সকালে রুটিটা খাবে।

      রহিম এবং অ্যান্টনি হরির প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল এবং রুটিটা গুছিয়ে রেখে তিনজন শোয়ে পড়লো।

      সকালে ঘুম ভাঙার পর হরি বলল- এখন বল, কে কি স্বপ্ন দেখেছিস?

      রহিম বললো- ‘আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি মক্কায় গেছি। তখন হজরত মুহাম্মদ(সাঃ) স্বয়ং আমাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, ‘আমি তোমার প্রতি খুবই প্রসন্ন। আমি তোমাকে বিনা হিসাব-নিকাশে জান্নাতবাসী করব।`

      রহিমের বলা শেষ হলে হরি অ্যান্টনির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল- এখন তুই বল, কি দেখেছিস?

      অ্যান্টনি বললো- স্বপ্নে আমি বেথেলহেম শহরে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি স্বয়ং যীশু খ্রীষ্টের সাথে সাক্ষাত করেছি। আমার মৃত্যুর পর যীশু খ্রীষ্ট আমাকে স্বর্গে স্থান প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এইভাবে অ্যান্টনি তার স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে বললো- আমরা দুজনে স্বপ্নের কথা বললাম। এবার তুই বল, কী স্বপ্ন দেখেছিস?

      হরি বলল- না, আমি কোনো স্বপ্ন দেখিনি। আমি বাস্তবে স্বয়ং যমরাজের দর্শন পেয়েছি। হরি কীভাবে যমরাজের দর্শন পেয়েছে তার বর্ণনা দিলো- আমি চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলাম, কিন্তু পেটে খিদে, তাই ঘুম আসছিলো না। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ শুনে চোখ খুলে দরজার দিকে তাকালাম।দেখলাম, গদা হাতে স্বয়ং যমরাজ দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি হতভম্ব হয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। তখন যমরাজ রুদ্র মূর্তি ধারণ করে আমার দিকে তেড়ে এলেন।   সে কি ভয়ানক মূর্তি! আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ম্যালেরিয়া রোগীর মত ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগলাম।

      এরপর যমরাজ কী করলেন? রহিম জিজ্ঞেস করল।

      তখন যমরাজ চোখ রাঙিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো- হরি, তুই এক্ষুনি রুটিটা খেয়ে ফেল।নইলে তোকে গদা দিয়ে পিটিয়ে সেপুরী পাঠিয়ে দেব।

      আমার রুটিটা একা খাওয়ার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কি করব, যমরাজের গদার ভয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি রুটিটা খেয়ে যমরাজের হাত থেকে কোনোমতে প্রাণ রক্ষা করেছি। হরি এভাবে স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে বললো- রুটি খাওয়ার জন্য তোমরা আমাকে খারাপ পেয়ো না। আমার রুটিটা খাওয়ার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। জীবন বাঁচাতে রুটিটা খেতে বাধ্য হয়েছি।

      হরি রুটিটা খেয়ে ফেলেছে শুনে, রহিম ও অ্যান্টনি হতভম্ব হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাটির পুতুলের মতো বসে রইলো।

                যমরাজের গদার ভয়ে

               রুটি গেলো হরির পেটে।*

দূর্বাসার বিপত্তি

      লোকটির নাম দূর্বাসা। রাগ একটু বেশি। বলতে পারেন বদ মেজাজি। পান থেকে চুন খসলেই স্ত্রীকে মারধোর করে। ফলে তার স্ত্রী তাকে খুবই সমীহ করে চলে।

      একবার দুর্বাসা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লো। ওজা ও কবিরাজদের চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়ে সে সহরের ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হলো।

      ডাক্তার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে না পেরে অবশেষে প্রস্রাব পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

      ডাক্তার বললেন-সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আপনার কোনো রোগ ধরা পড়েনি।তাই এখন আপনার প্রস্রাব পরীক্ষা করতে হবে। ডাক্তার একটা বোতল দিয়ে বললেন-এই বোতলটা নিয়ে যান। আগামীকাল সকালের প্রথম প্রস্রাব এই বোতলে ভরে নিয়ে আসবেন।

      দূর্বাসা বোতলটি নিয়ে বাড়িতে এলো এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পরদিন সকালে বোতলে প্রস্রাব করে ঘরের কোণে রেখে দিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তার স্ত্রী ঘর ঝাড়ু দিতে গেলে হঠাৎ তার পায় লেগে প্রস্রাবের বোতলটা কাত হয়ে পড়ে গিয়ে সমস্ত প্রস্রাব পড়ে গেলো।

      স্ত্ৰী জানে তার স্বামী বদমেজাজি।প্রস্রাব পড়ার কথা জানলে তাকে আস্ত রাখবে না। মেরে হাড়-গোড় ভেঙে দিবে। তাই স্ত্রী ভয়ে নিজে বোতলে প্রস্রাব করে বোতলটা আবার স্বস্থানে রেখে দিল।

      দুর্বাসা স্নান সেরে ভাত খেয়ে প্রস্রাবের বোতলটা নিয়ে সহরে এসে বোতলটা ডাক্তারকে দিল। ডাক্তার বোতলটি পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে দিলেন। যথাসময়ে পরীক্ষার রিপোর্ট এল। কিন্তু রিপোর্ট দেখে ডাক্তার অবাক! এ কেমন কথা! পুরুষ মানুষের গর্ভাবস্থা? এটা কীভাবে সম্ভব? পরীক্ষায় ভুল হতে পারে মনে করে ডাক্তার আবার পরীক্ষার নির্দেশ দিলেন। দ্বিতীয় বার পরীক্ষার পরেও একই রিপোর্ট বেরোল। অবশেষে ডাক্তার দূর্বাসাকে ডেকে রিপোর্টের কথা বুঝিয়ে বললেন।

      রিপোর্টের কথা শুনে দুর্বাসা নিজেও অবাক হলো। মন খারাপ করে সে বাড়ি ফিরে এলো। কিন্তু সে কাউকে রিপোর্টের বিষয়ে কিছু জানাল না। এমনকি তার স্ত্রীকেও নয়। এ কথা সে বলবে কীভাবে? লোকে শুনলে বলবে কি? এ সব কথা ভেবে সে সেদিন থেকে মন বেজার করে বসে থাকতে লাগলো। কারও সাথে তেমন কথাবার্তা বলে না। কাজকামেও মন বসাতে পারে না। সব সময় মন বেজার করে বসে থাকে।

      দূর্বাসার এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে তার স্ত্রী একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলো- “কি হয়েছে আপনার? ডাক্তারের কাছ থেকে আসার পর থেকে দেখছি আপনি সব সময় মন বোজার করে বসে থাকেন। কোন কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন না। আপনার অসুখ কি খুব গুরুতর?

      দূর্বাসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল- না, না, অসুখ তেমন গুরুতর নয়। সাধারণ অসুখ।

      স্ত্রী বললো-তাহলে আপনি এ ভাবে মন বেজার করে বসে থাকেন কেন? বলুন তো অসুখটা কি?

      দূর্বাসা অসুখের কথা বলে না। এদিকে, তার স্ত্রীও ছাড়ে না। অবশেষে, দূর্বাসা তার অসুখের কথা বলতে বাধ্য হলো।

      অসুখের কথা শুনে তাঁর স্ত্রী বললো- এটা কী করে সম্ভব?’ পরীক্ষায় ভুল হয়নি তো?

      না, না, পরীক্ষায় ভুল হয়নি। তারা দু’বার পরীক্ষা করেছে। দু’বার পরীক্ষার পরেও প্রস্রাবের একই রিপোর্ট বেরিয়েছে।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                

      স্ত্রীর সন্দেহ হলো। তার প্রস্রাবের রিপোর্ট বেরিয়েছে হয়তো। কারণ সে এখন অন্তঃস্বত্ত্বা। এদিকে প্রস্রাবের বোতল পড়ে যাওয়াতে সে নিজে বোতলে প্রস্রাব করে রেখে দিয়েছিলো। নিশ্চয় তার প্রস্রাবের রিপোর্টই বেরিয়েছে।তাই সে স্বামীকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল- আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।প্রস্রাবের রিপোর্ট ঠিকই বেরিয়েছে।কিন্তু এই রিপোর্ট আপনার প্রস্রাবের নয়, এটা আমার প্রস্রাবের।

      দূর্বাসা অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞাস করলো- তোমার প্রস্রাবের মানে?

      তখন তার স্ত্রী ঘটনাটা ভেঙে বলে বললো- প্রস্রাব পড়ে যাওয়াতে আমি আপনার মারধোরের ভয়ে নিজে প্রস্রাব করে বোতলে রেখে দিয়েছিলাম।কাল সকালে আপনি নিজে প্রস্রাব করে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।তখন আসল কথাটা ধরা পড়বে।

      একথা শোনার পর দূর্বাসার মাথা থেকে যেন হিমালয় পর্বত নেমে গেলো। সে রাগ না করে অনুশোচনার স্বরে বললো- এটা আসলে আমারই দোষ। আমার অত্যধিক ক্রোধের জন্যই এ রকম হয়েছে।আজ থেকে আমি কোন কিছুতে আর তোমার উপর রাগ করব না।

           বিনা কারণে যেজন রাগ করে

           দূর্বাসার মতো সেজন বিপদে পড়ে।*

কালীমাতা

      এক সময় একজন খুব কৃপণ লোক ছিল। একবার সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। কিন্তু সে খুবই কৃপণ ছিলো। তাই সে কবিরাজ বা ডাক্তারের কাছে না গিয়ে কালীমাতার শরণাপন্ন হলো। সে কালীমাতার কাছে মিনতি করে বললো- মা, তুমি যদি আমাকে এই রোগ থেকে আরোগ্য কর, তাহলে আমি তোমাকে একটি ছাগল দান করব।

      ভক্তের কাতর নিবেদনে কালীমাতা খুশি হয়ে বললেন, তথাস্তু!

      এর পর লোকটা সুস্থ হয়ে উঠল। সুস্থ হওয়ার পর সে কালীমাতার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা সে ভুলে গেলো। তাই একদিন কালীমাতা তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, বৎস, তুমি ছাগের কথা কি ভুলে গেছ? তুমি যা করবে তারাতারি করো, না হলে কিন্তু তুমি আবার অসুস্থ হয়ে পড়বে।

      কৃপণ লোকটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছাগ দানের কথা ভুলে ছিলো। তাই সে ব্যস্তভাবে বললো- না না মাতা, ভুলে যাইনি। মনে আছে। কিন্তু ছাগটা এখন গাভিন। যার জন্য দিতে বিলম্ব হচ্ছে।বিয়ান দিলেই ছাগটা তোমাকে দিয়ে আসব। বিয়ান দিলে তখন তুমি ফাউ হিসেবে দুধও খেতে পারবে।

      এভাবে আশ্বাস দিয়ে কালীমাতাকে বিদায় দিয়ে লোকটি আবার ছাগ দানের কথা ভুলে গেলো। কয়েকদিন পর কালীমাতা আবার স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, বৎস, তুমি কিন্তু আমাকে ঠকাচ্ছ।ছাগটা কিন্তু এখন পর্যন্ত দাওনি। আমি জেনেছি, সেই কবে ছাগটা বিয়ান দিয়েছে।

      এবার কৃপণ লোকটি নাক রগড়ে বুদ্ধি বের করে বলল- ‘মা, এবার আরেক বিপদে পড়েছি। বাড়ীতে একটা বিড়াল আছে। বিড়ালটি তিনটি বিড়ালছানা জন্ম দিয়েছে। ছানাগুলো তাদের মায়ের দুধ পায় না। আমি ছাগটা দোহন করে দুধ খাইয়ে তাদের কোনমতে বাঁচিয়ে রেখেছি। ছাগের দুধ না হলে এতদিন ছানাগুলো মরে যেতো। তাই বিড়াল ছানাগুলো বড় হলেই তোমাকে ছাগটা দিয়ে আসব।এইবার কথার খেলাপ হবে না।

      এর পর আরও এক মাস কেটে গেল। এবারও ছাগটা দেওয়া হল না। কালীমাতা আবার স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, ‘এবার কিন্তু আমি তোমার কোনো কথা শুনব না। দু’দিনের মধ্যে ছাগ না দিলে তুমি আবার অসুস্থ হয়ে পড়বে। তখন তুমি আমার পায়ে পড়ে কাঁদলেও আমি তোমাকে সুস্থ করে তুলব না।

      কৃপণ লোকটি বললো-না, না, মাতা, আমি এইবার অবশ্যই দেব। এভাবে বলেই সে বললো- মাতা, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। তুমি অভয় দিলে বলতে পারি।

      কালীমাতা বললেন- বল, কি বলতে চাও।

      লোকটা বললো- মাতা, ছাগটা এখন দুধ দেওয়া বন্ধ করেছে। এখন তুমি ছাগটা দিয়ে কি করবে? বৃথাই তাদের দানা-জল খাওয়াতে হবে। ছাগটা বিক্রি করে যদি টাকা দিই, কেমন হবে, মা?

      ছাগটা দুধ দেওয়া বন্ধ করার কথা শুনে কালীমাতা কপাল কুঞ্চিত করে কিছুক্ষণ ভাবলেন।বৎস, মিথ্যা বলছে না। দুধ না দিলে ছাগ দিয়ে কি করবে? মিছেমিছি ঘাস-জল খাওয়াতে হবে। তার থেকে ছাগটা বিক্ৰী করে টাকা দিলে মন্দ হবে না। এভাবে ভেবে কালীমাতা বললেন- আচ্ছা, ছাগটা বিক্রি করে টাকাই দিও তাহলে।

      কালীমতার কাছ থেকে বিক্রীর আশ্বাস পেয়ে কৃপণ লোকটি ছাগ এবং বিড়ালছানা নিয়ে হাটে এলো। ক্রেতারা ছাগের দাম জিজ্ঞেস করলে কৃপণ লোকটি বলল- আমি ছাগটা বিক্রি করব ঠিকই; তবে এখানে আমার একটা শর্ত আছে। ছাগের সাথে বিড়ালছানাও কিনতে হবে। ছাগের দাম পাঁচ টাকা এবং বিড়ালের ছানার দাম পাঁচ শ টাকা দিতে হবে।

      লোকটার কথা শুনে গ্রাহক অবাক। এটা কীরকম গাছে গরু চড়া কথা বলছে লোকটা!এ পাগল নাকি? একটি আস্ত ছাগের দাম পাঁচ টাকা এবং একটি বিড়ালছানার দাম পাঁচ শ টাকা। পাঁচশ টাকা দিয়ে কে বিড়ালছানা কিনবে?

      এভাবে ভেবে গ্রাহকরা চলে যেতে লাগলো। বেশ কয়েকজন গ্রাহক চলে যাওয়ার পর একজন চালাক গ্রাহক ভাবলেন, ছাগের দাম ৫ টাকা আর বিড়ালের ছানার দাম ৫০০.০০ টাকা। দুটো মিলিয়ে দাম ৫০৫.০০ টাকা। আমি ছাগটি ৫.০০ টাকায় কিনলাম, না বিড়ালছানাটি ৫০০.০০ টাকায় কিনলাম, কিনার পরে কে কথাটা হিসেব করতে যাবে? এদিকে ছাগটা ৬০০.০০ টাকায় কিনলেও সস্তায় কেনা হবে। ৫০৫.০০ টাকায় কিনলে তো অনেকই লাভ হবে। এভাবে ভেবে লোকটি ছাগ এবং বিড়ালছানা ৫০৫.০০ টাকা দিয়ে কিনে নিলো।

      কৃপণ লোকটি টাকা নিয়ে বাজার থেকে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো। বাড়ী ফেরার পথেই কালী মন্দির। কৃপণ লোকটি কালীমাতার মন্দিরে গিয়ে মাতার চরণে পাঁচ টাকা নিবেদন করে বললো- মাতা, আমি ছাগটি পাঁচ টাকায় বিক্রি করছি। এখন তোমার ভাগের টাকা গ্রহণ করে আমাকে দায় থেকে মুক্তি দাও।

      ছাগটি পাঁচ টাকায় বিক্রি করার কথা শুনে কালীমাতা অবাক হয়ে গেল। ভাবলেন, এত কম দামে ছাগটা বিক্রি করছে? এ বেটা পাগল নাকি? এভাবে ভেবে কালীমাতা বললেন- এত কম দামে ছাগটা বিক্রি করেছিস, তুই পাগল নাকি?

      কৃপণ লোকটি বলল- কি করব মাতা? ছাগটা তোমার ভাগের বলে জানার পর কেউ কেনার সাহসই করছিল না। একজন সাহস করে কিনেছে যদিও পাঁচ টাকার বেশি দিতে রাজি হল না। এদিকে বিক্রী না করলেও নয়। তাই পাঁচ টাকায়ই বিক্রি করে এসেছি।

      এভাবে চাতুরী করে কালীমাতাকে পাঁচ টাকা দিয়ে বাকি পাঁচ শ টাকা নিয়ে লোকটি প্রফুল্ল মনে বাড়ি চলে এলো।*

কাঠুরে এবং দৈত্য

      একদিন এক কাঠুরে জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়েছিলো। একটা গাছ কাটার সাথে সাথে এক দৈত্য গাছের ভেতর থেকে প্রকট হয়ে বলল- “একজন তান্ত্রিক বহু শতাব্দী ধরে আমাকে এই গাছের ভিতর আবদ্ধ করে রেখেছিল। তুমি গাছটা কেটে আমাকে মুক্ত করার জন্য আমি তোমার প্রতি খুবই প্রসন্ন হয়েছি। এভাবে বলে দৈত্যটা তাকে একটি পিতলের প্রদীপ দিয়ে বলল- এই প্রদীপটা নিয়ে যাও। গভীর রাতে তুমি প্রদীপটায় ঘর্ষণ করলে, আমি গিয়ে তোমার সামনে হাজির হব । তখন তুমি আমার কাছে যা চাইবে, তাই পাবে। কিন্তু এখানে একটি শর্ত আছে। তুমি যা পাবে তোমার প্রতিবেশীরা তোমার চেয়ে দ্বিগুণ পাবে। এভাবে  বলে দৈত্য চলে গেল এবং কাঠুরে প্রদীপটি নিয়ে প্রফুল্ল চিত্তে বাড়ি ফিরে এলো। 
      দৈত্যের কথা কতটা সত্য তা প্রমাণ করার জন্য কাঠুরে সেদিন গভীর রাতে প্রদীপটায় ঘর্ষণ করলো । সঙ্গে সঙ্গে দৈত্য তার সামনে হাজির হয়ে বলল- বৎস, তুমি কি চাও, বলো। 
      তখন কাঠুরে বলল- 'আমি জন্মের পর থেকে এই ছোনের কুঁড়েঘরে থাকি। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে জল পড়ে। আমার সন্তানদের নিয়ে তখন খুব কষ্ট হয়। তাই এই কুঁড়েঘরের পরিবর্তে আমাকে একটা দোতলা বাড়ি বানিয়ে দাও। 
      দৈত্য "তথাস্তু ," বলার সাথে সাথে কাঠুরের কুঁড়েঘর দোতলা বাড়িতে পরিণত হলো। দোতালা বাড়ি পেয়ে কাঠুরে খুব খুশি হলো এবং ছেলেপিলে নিয়ে সে গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়লো। তাই সেদিন কাঠুরে অন্যদিনের চেয়ে একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠল।

      কাঠুরে চোখ রগড়ে বাইরে বেরিয়ে দেখে, তার প্রতিবেশীদের বাড়িগুলো চারতলা ভবনে পরিণত হয়েছে। দৃশ্য দেখে সে দৈত্যটাকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানালো। এর পর সে জমিজমা, ধন-সম্পদ, চাকর-বাকরসহ তাঁর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দৈত্যের কাছে নিবেদন করলো এবং সে যা যা নিবেদন করলো সবই সে পেয়ে গেলো। ফলে গরীব কাঠুরে কয়েকদিনের মধ্যেই ধনী হয়ে উঠলো এবং তার সন্তানদের নিয়ে মহাসুখে জীবনযাপন করতে লাগলো।

      কিন্তু আনন্দের মধ্যেও তাকে একটা জিনিস খুবই পীড়া দিতে লাগলো। কারণ সে যা পেয়েছে, প্রতিবেশীরা তার দ্বিগুণ পেয়েছে। ফলে সে প্রতিবেশীদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলো। সে যা পাবে, প্রতিবেশীরা তার দ্বিগুণ পাবে। এটা কেমন কথা! কাজ করবে সে এবং তার দ্বিগুণ ফল ভোগ করবে প্রতিবেশীরা! এটা কিভাবে সম্ভব? তাই তার মনে একটি বুদ্ধি খেলালো। সে তার একটি চোখ কানা করার জন্য দৈত্যর কাছে বর চাওয়ার কথা ভাবলো।

      কারণ তার একটি চোখ কানা হলে প্রতিবেশীদের দুটি চোখ কানা হবে। অর্থাৎ প্রতিবেশীরা অন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে, সে একটি চোখ নিয়ে আরামে চলাফেরা করতে পারবে; কিন্তু প্রতিবেশীদের দু’টি চোখ কানা হলে তারা লাঠির সহায় ছাড়া চলাফেরা করা সম্ভব হবে না। তখন তাদের ধন-সম্পদের কোন মূল্য থাকবে না। তারা তখন তার চেয়ে দ্বিগুণ সম্পদ লাভের মজা পাবে!

      এভাবে ভেবে সে প্রদীপটাতে ঘর্ষণ করে দৈত্যকে হাজির করে বললো- হুজুর, আমার একটি চোখ কানা করে দিন।

      তখন দৈত্য তাকে সতর্ক করে দিয়ে বললো- তোমার একটি চোখ কানা হলে কিন্তু তোমার প্রতিবেশীদের দুটি চোখ কানা হয়ে তারা অন্ধ হয়ে যাবে।

      কাঠুরে বলল- হোক অন্ধ, আমি সেটাই চাইছি।

      কাঠুরের একগুঁয়ে মনোভাব লক্ষ্য করে দৈত্য বলল- ‘তথাস্তু’,। সাথে সাথে কাঠুরের একটি চোখ কানা হয়ে গেল।

      কাঠুরে পরের দিন সকালে প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে দেখলো, প্রতিবেশীদের সবাই অন্ধ হয়ে গেছে এবং তারা সবাই লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা করছে। দৃশ্যটা দেখে কাঠুরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

           হিংসা, বিদ্বেষে মনে প্রতিহিংসার আগুন জ্বালায়

            ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধে মনের প্রশান্তি বাড়ায়।।*

        তিনজন সংবেদনশীল লোক

      জৈষ্ঠ মাস। প্রচণ্ড সূর্যের উত্তাপ। বিভিন্ন স্তরের তিনজন সংবেদনশীল লোক তিন দিক থেকে এসে খেয়াঘাটে উপস্থিত হলো। একজনের হাতে দাউদ। সেই দাউদ সবসময় চুলকায়। না চুলকালে পাগলের মতো হয়ে যায়। তাকে আমরা দাইদা বলতে পারি। একজনের চোখে সবসময় পিঁচুটি জমে থাকে। কিছুক্ষণের জন্য চোখের পাতা না মুছলে সে অন্ধের মতো দেখতে পায় না। আমরা তাকে পিঁচুইটা(কেতুইরা) বলতে পারি। অন্যজনের মাথার তালুতে চুল নেই। সে রোদে বের হলে, মাথায় কিছু না রাখলে তার তালু গরম হয়ে যায়। তাকে চাইন্দা বলতে পারি।

      তিনজনই হত-দরিদ্র। ভিক্ষা করে খায়। তাই তাদের কাছে নদী পার হওয়ার জন্য ভাড়া ছিল না। খেযারী লোকটি ভাড়া চাইলে তারা জানাল, তাদের কাছে ভাড়া দেবার মতো পয়সা নেই। খেয়ারী লোকটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, যে ভাড়া ছাড়া নদী পার করা হবে না।

      এদিকে লোক তিনজেনর  জন্য নদী পার হওয়াটা খুবই জরুরি ছিল। তাই তারা নদী পার করার জন্য খেয়ারীর কাছে অনুরোধ করতে লাগল। খেয়ারী লোকটি লক্ষ্য করলো, যে তিনজনই আলাদা আলাদা রকমের সংবেদনশীল লোক।

      সংবেদনশীল লোক তিনজনের কাতর অনুরোধের ফলে তাই খেয়ারী লোকটি শর্ত সাপেক্ষে তাদের নদী পার করার সিদ্ধান্ত নিলো। খেয়ারী লোকটি বললো- ‘আমি তোমাদের নদী পার করতে পারি; তবে তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে, কোনো পরস্থিতিতেই তোমরা তোমাদের সংবেদনশীল স্থানে হাত দিতে করবে না। মানে দাউদ থাকা লোকটি দাউদ চুলকাতে পারবে না, পিঁচুটি থাকা লোকিট চোখের পিঁচুটি মুছতে পারবে না এবং চাইন্দা লোকটি মাথায়  কিছু দিতে পারবে না। আমার এই শর্ত মেনে নিলে তবে আমি নদী পার করতে পারি।

      সংবেদনশীল লোক তিনজনের জন্য নদী পার হওয়াটা খুবই জরুরি ছিল। তাই তারা খেয়ারীর শর্ত মেনে নিয়ে নৌকায় চড়লো।

      নৌকা নদীর মাঝ বরাবর আসার পর দাইদার দাউদ চুলকাতে লাগলো। কেতুইরার চোখে পিঁচুটি জমে সে অন্ধের মতো হয়ে গেলো। প্রচণ্ড রোদের উত্তাপের ফলে চাইন্দার মাথার তালু গরম হয়ে উঠলো। কিন্তু শর্তসাপেক্ষে তাদের সংবেদনশীল স্থানে হাত দিয়ে স্পর্শ করার উপায় ছিল না। তাই তারা খুব ধৈর্য সহকারে বসে রইলো। কিন্তু এক পর্যায়ে দাইদার দাউদ চুলকানি এতটাই তীব্র হয়ে উঠলো যে, সে অধৈর্য হয়ে উঠলো।

      তাই দাইদা দাউদ চুলকানির জন্য একটা গল্প শুরু করলো: সে বললো- ‘আমাদের দাদুর একটা গরুর গাড়ি ছিল। গাড়ি টানা বলদ দু’টি খুবই শক্তিশালী ছিল। তিনি গাড়ি নিয়ে বের হলে কেউ তার আগে গাড়ি নিয়ে যেতে পারত না। সামনে গাড়ি দেখতে পেলে তিনি গরু দু’টির লেজে ধরে এমনভাবে মুচড়িয়ে দিতেন যে গরু দু’টি তখন দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে দৌড়ে সেই গাড়ি পিছনে ফেলে দিতো। কীভাবে গরুগুলোর লেজে ধরে মুচড়িয়ে দিতেন দাইদা তার দাউদ থাকা স্থানে মুচড়িয়ে দিয়ে মুদ্রাটি করে দেখাল। অর্থাৎ সে তার দাউদ  চুলকিয়ে নিলো।

      দাইদার দাউদ চুলকানি দেখে কেতুইরা একটি গল্প শুরু করলো। সে বললো- আমাদের একটা গাভী ছিলো। গাভীটা দেখতে খুবই সুন্দর ছিল। গাভীটা চার-পাঁচ লিটার করে দুধও দিত। কিন্তু গাভীটার একটা বড় দোষ ছিল। তার শিংগুলো এত বড় ছিল যে, সেগুলো বাঁকিয়ে একেবারে চোখ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলো। শিংগুলো কীভাবে চোখ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলো কেতুইরা মুদ্রাটা করে দেখিয়ে চোখের পিঁচুটি মুছে ফেললো।

      চাইন্দার বলার মতো কোনো গল্প ছিল না। তাই সে বললো- ‘তোমাদের গল্প শুনে খুবই ভালো লাগলো। এভাবে বলে চাইন্দা নৌকার দাঁড়ায় বসে দুই চইল জল তুলে মাথায় দিয়ে বললো- দাইদা ভাইর কথাও আমি মাথায় রাখলাম এবং কেতুইরা ভাইর কথাও আমি মাথায় রাখলাম।  এভাবে বুদ্ধি করে চাইন্দা মাথার তালুতে জল দিয়ে তার মাথা ঠান্ডা করলো। খেয়ারী লোকটি তাদের কাণ্ড দেখে  হতভম্ব হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো।

                 ভাজা পোরা মুখের মজা

                ভাত খাইলে তবে পাছা তাজা।।*

বধির পরিবার

      এক সময় এক গ্রামে একটি বধির পরিবার ছিলো। পরিবারের প্রতিটি সদস্যই বধির ছিলো। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে, তারা কথার প্রকৃত মর্ম না বুঝে পরিস্থিতি সাপেক্ষে নিজের মনে যা উদয় হতো, সেই মতো উত্তর দিতো।

      একদিন পরিবারের প্রধান রাস্তার পাশে একটি ক্ষেতে চাষ করছিলো। সদ্য বদলি হয়ে আসা এক পুলিশ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে জিজ্ঞেস করলেন- কাকা, এই রাস্তা ধরে গেলে কি থানায় যেতে পারব?’                              

      বধির লোকটি যে গরু দিয়ে হাল বাইছিলো, সেই গরুজোড়া সে শ্বশুড় বাড়ি থেকে এনেছিলো। তাই বধির লোকটি ভাবলো, পুলিশ মনে হয়, গরু তার নিজের কিনা তাই জিজ্ঞেস করেছে! তাই সে বলল- না, না, স্যার, গরু আমার নিজের নয়, শ্বশুড় বাড়ি থেকে এনেছি।

      পুলিশ বললেন- আরে, আমি কার গরু তা জিজ্ঞেস করিনি। আমি থানায় যাওয়া রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করেছি।

      লোকটি বলল, “না, না, স্যার, আমার নিজের গরু নেই, সেজন্য শ্বশুড় বাড়ি থেকে হাল হাওয়ার জন্য গরুজোড়া এনেছি। হাল বাওয়া শেষ হলেই আমি গরুজোড়া শ্বশুড় বাড়ি ফেরৎ দিয়ে আসব।

      পুলিশ ভাবলেন, লোকটা নিশ্চয়ই বধির। কানে কম শুনে। তাই বারে বারে জিজ্ঞেস করার পরও সঠিক উত্তর না পেয়ে তিনি বিরক্ত হয়ে একটু রাগান্বিত স্বরে জোরে জোরে বললেন- “কাকা, আমি গরুর কথা জিজ্ঞেস করিনি। আমি থানায় যাওয়া রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করেছি।

      স্বাভাবিকতঃই চোর-ডাকাতের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক থাকে। তাই পুলিশ রাগান্বিত স্বরে জোরে কথা বলাতে বধির লোকটি ভাবলো, পুলিশ মনে হয়, গরু চুরি করে আনার কথা বলেছে। তাই সে তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে উঠলো- “না, না স্যার, আমি গরু চুরি করে আনিনি। বললাম তো শ্বশুর বাড়ি থেকে এনেছি।

      পুলিশ বিরক্ত হয়ে উঠলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, বধিরের সাথে কথা বলাটা সত্যিই মস্কিল কাজ! আমি জিজ্ঞেস করছি রাস্তার কথা এ শুনছে গরু চুরি করার কথা! মহা মস্কিলে পড়লাম তো! তাই পুলিশ রাগান্বিত স্বরে বললেন- আরে ব্যাটা, কে তোকে গরু চুরির কথা বলেছে? আমি রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করেছি। 

      বধির লোকটি বলল- কসম! কসম!! কসম!!! আমি তিনবার কসম খেয়ে বলছি। আমি সত্যিই গরু চুরি করে আনিনি। এ বিষয়ে আপনি আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

       অবশেষে পুলিশ ভাবলেন, এর সাথে কথা বলে লাভ নেই। এর সাথে কথা বলতে গেলে আমি নিজেই পাগল হয়ে যাব। এভাবে ভেবে তিনি বিরক্ত হয়ে তাঁর হাতে থাকা বেতের লাঠি দিয়ে বধির লোকটাকে কয়েকটা বাড়ি মেরে চলে গেলেন।

      পুলিশের মার খেয়ে লোকটি মনের দুঃখে বাড়িতে এসে তার স্ত্রীকে বললো- নিজের পালে গরু নাই যদি না দিলেই হত। তাই বলে চুরির গরু দিয়ে তোর বাপ আমাকে পুলিশের মার খাওয়ালেন কেন?’

      তার স্ত্রীর তরকারি চুরি করে খাওযার অভ্যেস ছিলো। তাই সে ভাবলো, তার স্বামী হয়তো তরকারি চুরি করে খাওয়ার কথা বলছে! তাই সে তার শাশুড়ির কাছে এসে বলল- মা, শুনেছেন কি, আপনার ছেলে বলছে, আমি বোলে তরকারি চুরি করে খাই?”

      শাশুড়ির পারায় পারায় গিয়ে গাল গলপো করার অভ্যেস ছিলো। তাই সে ভাবলো, বউ মনে হয়, পারা বেড়ানোর কথা বলছে। সেজন্য সে তার স্বামীর কাছে এসে নালিশ দিলো- তুমি কি তোমার পুত্রবধূর কথা শুনেছ? আমি বোলে কাজকাম ফেলে সব সময় পারা বেড়াই?

      তার স্বামী আখ ক্ষেত পাহারা দিত এবং সে পকেট খরচের জন্য মাঝে সময়ে দু’ একটা আখ বিক্রি করত। তাই সে ভাবলো, তার বউ মনে হয়, আখ চুরি করে বিক্রি করার কথা বলছে। তাই সে তার নাতনির কাছে এসে বললো- ‘নাতনি, তুই শুনেছিস নাকি, তোর ঠাকমা বলে, আমি নাকি আখ চুরি করে বিক্রি করি?’ তুমি তো মাঝেমধ্যে আখ ক্ষেতে যাও, তুমি কি আমাকে কখনো আখ বিক্রি করতে দেখেছ?

      তাঁর নাতনির বিয়ের বয়স হয়েছিলো। তাই সে ভাবলো, দাদু মনে হয়, তার বিয়ের কথা বলছেন। তাই সে বললো-, বিয়ে দিতে চান যদি দিবেন। বিয়ে দিতে কে নিষেধ করেছে?

           যার মনে যা, ফাল দিয়ে উঠে তা।।*

আঙ্গুরের ব্যঞ্জন

      একদিন দুই বন্ধু সহরে এসে এক চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। তখন তারা শুনতে পেলো, চায়ের দোকানের ছেলেটা ডেকে বলতেছে- আসুন,আসুন,গরম গরম লুচির সাথে আঙ্গুরের ব্যঞ্জন। খেতে খুব সুস্বাদ। আসুন আসুন…একবার খেলে বারবার খেতে চাইবেন। আসুন……  

      এক বন্ধু বলল, “আঙ্গুরের ব্যঞ্জনের কথা আগে তো কখনও শুনিনি। আজ এই প্রথম শুনলাম।আঙুরের ব্যঞ্জন খেতে নিশ্চয় সুস্বাদু হবে। চল, খেয়ে দেখি কেমন লাগে।

      অন্য বন্ধু জিভ চটকে বলল- আঙ্গুরের ব্যঞ্জন যখন খেতে নিশ্চয়ই সুস্বাদু হবে। আঙ্গুর খেয়েছি। তবে আঙ্গুরের ব্যঞ্জন কখনও খাওয়া হয়নি। চল খেয়ে দেখি। বাড়িতে গিয়ে অন্তত আঙ্গুরের ব্যঞ্জন খাওয়ার কথা গল্প করতে পারব।

      তারা আঙ্গুরের ব্যঞ্জন দিয়ে লুচি খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে চায়ের দোকানে এলো।

      দোকানদার ছেলেটি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলো- বলেন, কি খাবেন?

      এক বন্ধু বললো- লুচি এবং আঙ্গুরের তরকারী আন।

      ছেলেটি দুই প্লেট লুচি আর দুই বাটি ব্যঞ্জন এনে দিলো।

      তারা ব্যঞ্জন নেড়েচেড়ে দেখল। না, ছেলেটির কথা মতো আঙ্গুরের ব্যঞ্জন নয়, মিস্টি কুমড়োর ব্যঞ্জন। তাদের একজন বলল- এখানে আঙ্গুরের কোনো নামগন্ধই নেই। এটা তো দেখছি মিস্টি কুমড়োর ব্যঞ্জন। ছেলেটি আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। তাকে অবশ্যই শিক্ষা দিতে হবে। সে ছেলেটিকে ডাকলো-এই ছেলে এখানে এস।

      ছেলেটা এসে জিজ্ঞেস করলো- বলুন, কি জন্য ডেকেছেন?’

      তুমি আমাদের সাথে প্রতারণা করেছো। তুমি বললে, আঙ্গুরের ব্যঞ্জন।এটা তো দেখছি মিস্টি কুমড়োর ব্যঞ্জন। আঙ্গুরের ব্যঞ্জন কই? আঙ্গুরের ব্যঞ্জন আন।

      ছেলেটি বললো- ভালো করে লক্ষ্য করে দেখুন। এটা আঙ্গুরের ব্যঞ্জনই বটে।এখানে আঙ্গুর এবং মিস্টি কুমড়ো সম পরিমাণে আছে। অর্থাৎ একটা মিস্টি কুমড়োর সাথে একটা আঙ্গুর মিশিয়ে ব্যঞ্জনটা বানানো হয়েছে। খেলে খান, আর না খেলে পয়সা দিয়ে চলে যান।

      এভাবে বলে ছেলেটা চলে গেল।

      দুই বন্ধু অবাক! তারা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে লুচি খাওয়ায় মনোনিবেশ করলো।

           ঝকমক করলেই সোনা না।।*

আলসে এবং পেতনী

      এক গ্রামে এক বুড়ি ছিল। বুড়ির একটাই মাত্র ছেলে। তবে ছেলেটা আলসে। কোনো কাজই করে না। দুপুর বারোটা পর্যন্ত শোয়ে থাকে। বারবার তাগাদা দিয়েও বৃদ্ধা ছেলের আচরণ বদলাতে পারলেন না। তাই একদিন তিনি তার ছেলেকে জাগানোর জন্য শোবার ঘরের দরজার সামনে এসে বললেন-‘হে নবাবের পুত্র, দুপুর বারটা বাজল এখনও নবাব পুত্রের ঘুম ভাঙল না।এখনও ফষ্টি করে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। আজ বাদে কাল বিয়ে দিতে হবে। এখনও মায়ের রোজগারে খেতে লজ্জা করে না? তাড়াতাড়ি উঠ। না হলে আজ ঝাঁটা দিয়ে পিটিয়ে তোর পিঠের চামড়া তুলে নেব।

      মায়ের হাক-ডাকে ছেলে ঘুম থেকে জেগে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখে তার মা সত্যি সত্যিই ঝাঁটা হাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঝাঁটার পিটন খাওনের ভয়ে সে বৃদ্ধাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালাতে লাগলো।

      বৃদ্ধাও কম নন। তিনিও ঝাঁটা হাতে ছেলের পেছন পেছন দৌড়োতে লাগলেন। সামনেই একটা সেঁওলা গাছ ছিলো। মায়ের পিটনের হাত থেকে বাঁচার জন্য বৃদ্ধার ছেলে সেঁওলা গাছে চড়লো।

      বৃদ্ধা সেঁওলা গাছটাতে ঝাঁটা দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে বলতে লাগলেন- আয়, গাছ থেকে নেমে আয়। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। তাড়াতাড়ি নেমে আয়। না হলে আজ ধরতে পারলে ঝাঁটা দিয়ে পিটিয়ে তোর পিঠের চামড়া তুলে নেব। নাম, গাছ থেকে তাড়াতাড়ি নাম। এভাবে বলে বৃদ্ধা গাছটাতে এলোপাথাড়ি পিটাতে লাগলো।

       সেঁওলা গাছে এক পেতনী বাস করতো। বৃদ্ধার অগ্নি মূৰ্তি দেখে পেতনী পিটন খাওয়ার ভয়ে গাছ থেকে নেমে উৰ্দ্ধশ্বাসে দৌড়োতে লাগলো। একটু দূরেই একটি রাজপ্ৰাসাদ ছিলো। পেতনী দৌড়ে গিয়ে সেই রাজপ্ৰাসাদ পেলো।

      কাকতালীয়ভাবে সেই রাজ্যের রাজকন্যা তখন দুতালায় বসে ভিজা চুল মেলে শুকাচ্ছিলেন। রাজপ্রাসাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পেতনী রাজকন্যাকে খোলা চুলে বসে থাকতে দেখে দৌড়ে গিয়ে রাজকন্যার দেহে আশ্রয় নিলো।

      সেদিন থেকে রাজকন্যা সময়মতো খায় না। সব সময় মন মেরে চুপচাপ বসে থাকে। কারো সাথে কথা বলে না। মাঝে মাঝে পাগলামো করে। কখনও কখনও আবার চুল মেলে পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে মাথা ঝাঁকিয়ে ভার আসে। ফলে রাজকন্যা দিন দিন শুকিয়ে যেতে লাগলো। রাজা রাজকন্যাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। হঠাৎ কি হল রাজকন্যার? তিনি ওঝা, কবিরাজ ডেকে এনে তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। তারা রাজকন্যাকে পরীক্ষা করে বললেন যে, রাজকন্যার দেহে পেতনী আসন পেতেছে। তাই পেতনী তাড়াতে হবে।

      রাজা বললেন- যা করার তাড়াতাড়ি কর। এভাবে চলতে থাকলে রাজকন্যা একদিন শুকিয়ে মারা যাবে।

      চিকিৎসা চলতে থাকলো। তেলপড়া, সরিষা পোড়ানোসহ কবিরাজ নানা উপায়ে চিকিৎসা চালালেন। পেতনীও সাধারণ পেতনী নয়। রাজকন্যার দেহ ছেড়ে যায় না। সে বলে- সরিষা পোড়া দিলে কি হবে! আমি সাধারণ পেতনী না। সরিষার ধুয়ায় আমার কিছুই করতে পারবে না। আমি বৃদ্ধার সেঁওলা গাছের পেতনী। রাজকন্যার শরীরে আমি খুব আরাম পেয়েছি। রাজকন্যার দেহ ছেড়ে আমি যাব না।

      এদিকে রাজকন্যা ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলেন। ফলে রাজার চোখের ঘুম অন্তৰ্নিহিত হলো। একটাই মাত্ৰ মেয়ে। সে মারা গেলে কার হাতে রাজ্যভার সোপৰ্দ করবে? সেজন্য তিনি রাজময় ঘোষণা করে দিলেন যে, যে রাজকন্যার দেহ থেকে পেতনীকে তাড়াতে পারবে তাকে অর্ধেক রাজ্য দান করবে এবং রাজকুমারীকেও তার সাথে বিয়ে দিবে। ঘোষণা শুনে, যুবক, বৃদ্ধ সবাই প্রাসাদে ছুটে আসতে লাগল। কিন্তু রাজকন্যার শরীর থেকে কেউ পেতনীকে তাড়াতে সক্ষম হল না।

      খবরটা বৃদ্ধার ছেলের কানেও পৌঁছোল। পেতনী নিজেকে সেঁওলা গাছের পেতনী বলে পরিচয় দেওয়ার কথা শুনে সে ভাবলো, পেতনীটা নিশ্চয় তাদের সেঁওলা গাছের পেতনী। সে মা’র ঝাঁটার পিটন থেকে বাঁচার জন্য রাজকন্যার শরীরে গিযে আশ্ৰয় নিযেছে। সেজন্য মায়ের ঝাঁটার পিটনের ভয় দেখালে নিশ্চয় পেতনীটা রাজকন্যার দেহ ছেড়ে যাবে! এভাবে ভেবে,  সে রাজপ্ৰাসাদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।

      সিদ্ধান্ত মৰ্মে সে রাজপ্ৰাসাদে এসে বললো- আমার বিশ্বাস, আমি পেতনীটাকে তাড়াতে পারব। অনুমতি দিলে আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি।

      বৃদ্ধার ছেলের কথা শুনে রাজা বললেন- আচ্ছা চেষ্টা করে দেখ। পেতনীটা তাড়াতে পারলে ঘোষণা অনুসারে আমি অৰ্দ্ধরাজ্য দান করে রাজকন্যাকে তোমার সাথে বিয়ে দিব।

      রাজার নিকট থেকে আশ্বাস পেয়ে বৃদ্ধার ছেলে রাজকন্যার কাছে এসে বললো- আমি সেঁওলা গাছের মালিক বৃদ্ধার ছেলে। তুই নিশ্চয় আমাকে চিনতে পেরেছিস। তুই বোলে রাজকন্যাকে বিরক্ত করতেছিস? কথাটা শুনে মা’র খুব রাগ উঠেছে। তিনি ঝাঁটাটা নিয়ে আসতে চাইছিলেন। কিন্তু কি ভেবে আমাকে আগে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার কথায় রাজকন্যার দেহ ছেড়ে না গেলে তিনি ঝাঁটাটা নিয়ে আসবে বলেছে। এখন কি করবি, আমার কথায় যাবি, না মা’র ঝাঁটার পিটন খাবি?

      বৃদ্ধার ঝাঁটার পিটন থেকে বাঁচতেই সে সেঁওলা গাছ থেকে পালিয়ে এসে রাজকন্যার দেহে আশ্ৰয় নিয়েছে। আবার যদি বৃদ্ধা ঝাঁটা নিয়ে আসেন, তাহলে তার জীবন নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। এভাবে ভেবে, পেতনী ভয়ে কেঁপে উঠলো এবং সে রাজকন্যার দেহ থেকে বেরিয়ে উৰ্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে পালালো।

      রাজপ্ৰাসাদের পেছনেই একটা ডোবা ছিলো। পেতনী দৌড়ে গিয়ে সেই ডোবায় পড়লো।

      রাজকন্যার দেহ থেকে পেতনী ছেড়ে যাওয়ার পরে রাজা ঘোষণা অনুসারে রাজকন্যাকে বৃদ্ধার ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে তাকে অর্দ্ধরাজ্য দান করলেন।

           বৃদ্ধার ঝাঁটার পিটনের ভয়ে

           পেতনী গিয়ে পড়লো খালে।।*

রক্তের দোষ

      এক সময় একজন খুব সৎ প্রকৃতির বৃদ্ধ ছিলেন। তিনি সব সময় ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সেই ধর্মপ্রাণ লোকটি একবার খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। নানাবিধ চিকিৎসার পরেও ডাক্তার ও কবিরাজ রোগ সারাতে সক্ষম হলেন না। অবশেষে ডাক্তার তাঁকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। ডাক্তারের পরামর্শে অনুসারে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। চিকিৎসা চলতে থাকলো। কিন্তু রোগ ভালো হওয়ার বদলে ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থা অবনতি হতে লাগলো।অবশেষে ডাক্তার অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিলেন। রোগী দুর্বল। তাই অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে রোগীকে তিন বোতল রক্ত ​​প্রদান করা হলো। অস্ত্রোপচার সুস্থভাবেই সম্পন্ন হলো এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠার পর লোকটিকে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো।

      বাড়িতে আনার পরে, লোকটির খুব এক খারাপ অভ্যাস গড়ে উঠলো। অবশ্যে অ্ন্যত্র থেকে নয়, নিজের বাড়ী থেকে এটা ওটা জিনিস চুরি করতে লাগলো। বাড়ি থেকে এটা ওটা জিনিস চুরি হওয়াতে সবাই সজাগ হয়ে উঠলো।কে করছে এই কাজ? নিশ্চয়ই বাইরের লোক এসে এটা করেনি। এটা নিশ্চয়ই পরিবারেরই কোনো সদস্যের কাজ হবে। তবে ধরা না পড়া পর্যন্ত কাউকে সন্দেহ অথবা কিছু বলা সম্ভব নয়। তাই পরিবারের প্রতিজন সদস্য নিজেকে দোষমুক্ত করার জন্য তৎপর হয়ে উঠলো এবং চোর ধরার জন্য অঘোষিতভাবে পরিবারের প্রতিজন সদস্য একে অপরের উপরে নজর রাখতে লাগলো।

      কয়েক দিন পরে, সতর্কতার ফল মিললো। একদিন আলমারি থেকে টাকা চুরি করার সময় বৃদ্ধ তার ছোট পুত্রবধূর হাতে ধরা পড়লো। পুত্রবধূ কাণ্ড দেখে অবাক। তার শ্বশুড়ের এই কাজ! এটা একেবারে বিশ্বাসের অযোগ্য কথা। তাই পুত্রবধূ ভাবলো, এই বিষয়টি পরিবারের অন্য সদস্যদের অবগত করলে তারা কেউ তার কথা বিশ্বাস করবে না। তবে এটা কীভাবে সম্ভব? তার শ্বশুড় এই বৃদ্ধ বয়সে চুরি করতে যাবে কেন? তাঁর কিসের অভাব? তাঁর ছেলেরাও তাঁর প্রতি অনেক শ্রদ্ধাশীল। তিনি যা চাইবেন, তাই পাবেন। যা বলবে, ছেলেরা তাই নির্বিবাদে মেনে নিবে। তাহলে তিনি চুরি করতে যাবেন কেন? এখন যদি সে তার শ্বশুড়ের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করে, তাহলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাকেই চোর বলে দোষী সাব্যস্ত করবে। তারা হয়তো ভাববে, চোর আসলে ছোট বউ নিজেই। সে নিজের দোষ ঢাকার জন্য অন্যকে দোষারোপ করার চেষ্টা করছে। তাই ছোট বউ কাউকে চুরির কথাটা না বলে চুপ করে রইলো।

      কিন্তু কথায় আছে, একশত গরু মারলে অবশেষে বাঘেরও মরণ হয়। অবশেষে, বৃদ্ধের চুরির বিষয়টি ধীরে ধীরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নজরেও পড়তে লাগলো। কিন্তু কথাটা কেউ বিশ্বাস করবে না ভেবে, ছোট পুত্রবধূর মতো তারাও চুপ করে রইল। অবশেষে একদিন বৃদ্ধের চুরির কথাটা বড় ছেলের চোখেও ধরা পড়লো। ফলে সবাই বৃদ্ধের চুরির কথাটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো। কিন্তু কিভাবে এটা সম্ভব? সবার মনে একই প্রশ্ন। রোগমুক্ত হওয়ার পর থেকে বৃদ্ধের এই স্বভাব গঢ়ে উঠার কারণ কি? তবে উপর দিকে থু থু ফেললে নিজের শরীরেই পড়বে ভেবে সবাই চুপ করে রইলো।  

      কিন্তু বৃদ্ধের উৎপাত দিন দিন বাড়তে লাগলো। অবশেষে, বড় ছেলে হতাশ হয়ে একজন জ্ঞানী লোকের নিকটে কথাটা ভেঙে বলে বললো- অপারেশনের পর থেকে বাবার এই অভ্যাস গড়ে উঠেছে। এখন এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায়ই খুঁজে পাচ্ছি না। এখন নিজের বাড়ীতে চুরি করছেন, কিন্তু কোনোদিন যদি অন্যের বাড়ীতে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে, তখন মানুষের সামনে মুখ দেখাব কী করে?

      জ্ঞানী লোকটি বৃদ্ধের ছেলের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে এক সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। তিনি বললেন- ‘আমার মনে সন্দেহ হচ্ছে,  অপারেশনের সময় আপনার বাবাকে দেওয়া রক্তের জন্য এটা হতে পারে। তাই হাসপাতালে গিয়ে খবর করে দেখুন, অপারেশনের সময় আপনার বাবাকে কার রক্ত প্ৰদান করা হয়েছিলো। হাসপাতাল থেকে রক্ত প্রদান করা লোকটির নাম ঠিকানা সংগ্রহ করে জানার চেষ্টা করুন, সেই লোকটির ল্বভাব চরিত্র কেমন ছিলো।আমার ধারণা, রক্ত প্রদান করা লোকটি নিশ্চয় চোর ছিলো।যারজন্য আপনার বাবা চোরের স্বভাববিশিষ্ট হয়ে উঠেছে।কারণ রক্তের দোষ বড় দোষ।সহজে দূর হয় না।

      জ্ঞানী লোকটির কথামতো, বড় ছেলে হাসপাতালে গিয়ে খবর নিয়ে জানতে পারলেন, যে তাঁর বাবাকে একজন কুখ্যাত চোরের রক্ত প্রদান করা হয়েছিলো।

                 কয়লা ধুলে ময়লা যায়না,

            রক্তের দোষও সহজে দূর হয় না।*

জ্ঞানী পুত্রবধূ

      একদা এক গ্রামে একজন জ্ঞানী লোক ছিলেন। তাঁর তিন ছেলে ছিল। ছেলেরা বিয়ের বয়সে উপনীত হলে তিনি উপযুক্ত পাত্রী দেখে তাদের বিয়ে দিয়ে দিলেন। তিন পুত্রবধূই খুব সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী। তাই কোন পুত্রবধূর হাতে  তিনি সংসারের দায়িত্ব তুলে দিবেন এ নিয়ে সমস্যায় পড়লেন। তিন জনই সমান সমান রূপবতী ও বুদ্ধিমতী।এখন কার হাতে তুলে দেন তিনি সংসারের কর্তৃত্ব!

      তাই লোকটি একদিন পুত্রবধূদের শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপের সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথমে তিনি তাঁর বড় পুত্রবধূকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন- “মা, আমাদের ভারতীয় আবহাওয়া অনুসারে ছয়টি ঋতু বিদ্যমান। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। তুমি কোন ঋতু সবচেয়ে বেশি পছন্দ কর এবং এই পছন্দের কারণ কী?

            জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ বিনীতভাবে বললো- “প্রত্যেক ঋতুরই নিজস্ব তাৎপর্য আছে, তবে গ্রীষ্ম ঋতু আমার কাছে বেশি ভালো লাগে। এর কারণ হল, গ্রীষ্মকালে গাছ ও ফসল জমকালোভাবে বেড়ে ওঠে।

      লোকটি বড় পুত্রবধূর উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে যেতে দিলেন এবং মেজো পুত্রবধূকে ডেকে এনে একই প্রশ্ন করলেন। মেজো পুত্রবধূ বললো-ছয় ঋতুর মাঝে আমি শীতকালটাই বেশি পছন্দ করি। কারণ শীতকাল হলো ক্ষেতের ফসল তোলার সময়। শীতকালে, লক্ষ্মী ভাণ্ডারে তোলা হয়। পুষ্টিকর শাক-সবজিও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় শীতকালে। খাবারের অপচয়ও কম হয়। একদিন রান্না করে তিনদিন খেলেও খাবার নষ্ট হয় না।

            মেজো পুত্রবধূর উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে লোকটি তাকে যেতে দিলেন এবং ছোট পুত্রবধূকে ডেকে এনে একই প্রশ্ন করলেন। ছোট পুত্রবধূ কিছুক্ষণ ভেবে বললো- “প্রশ্নটা আসলে জটিল। কারণ প্রতিটি ঋতুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই ছয়টি ঋতুর কোনোটিই আমি বিশেষভাবে পছন্দ করি না। আমি সব ঋতুই সমানভাবে পছন্দ করি। কারণ সব ঋতুই একে অপরের পরিপূরক। আমরা এই ছয়টি নির্দিষ্ট ঋতুর সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে চলাটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

      ছোট পুত্রবধূর উত্তরে লোকটি খুবই খুশি হলেন এবং তার হাতে সংসারের কর্তৃত্ব তুলে দিলেন। কারণ প্রকৃত জ্ঞানী সেইজন, যেজন ভালো-মন্দ সকল পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

           পরিবেশ পরিস্থিতি সাপেক্ষে যেজন চলতে পারে

           জটিল সংসার সমুদ্রে সেজন তরতে পারে।।*

হরিসত্তরের মেলা

    রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের স্ত্রী একবার হরিসত্তরের মেলায় যাওয়ার জন্য জেদ ধরেছিলেন। হরিসত্তের মেলা হলো, গরীব কৃষক প্রজাদের মেলা। সেখানে রাণী গেলে কথাটা অশোভন হবে বলে রাজা রাণীকে মেলায় না যাওয়ার জন্য বারণ করছিলেন। কিন্তু রাজা কোনোমতে রাণীকে বুঝাতে সক্ষম হচ্ছিলেন না। তাই রাজা গোপাল ভাঁড়ের শরণাপন্ন হওয়ার কথা ভাবলেন। মেলার আগের দিন রাজা গোপাল ভাঁড়কে ডেকে এনে বললেন, রাণী হরিসত্তেরের মেলায় যাওয়ার জন্য জেদ ধরেছে। হরিসত্তরের মেলা হলো গরীব কৃষক প্রজাদের মেলা। সেখানে রাণী গেলে লোকে কি বলবে? আমি অনেক বুঝিয়েছি মেলায় না যাওয়ার জন্য। কিন্তু রাণী আমার কথায় গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তুমি কোন বুদ্ধি বের করে রাণীকে মেলায় যাওয়া থেকে বিরত করো। যদি রাণীকে মেলায় যাওয়া থেকে বিরত করতে পার, তাহলে  তোমাকে আমি পুরস্কৃত করব।

গোপাল ভাঁড় বললেন,আপনি চিন্তা করবেন না, মহারাজ{আপনি নিশ্চন্ত থাকুন রাণী মা মেলায় যাবেন না।

রাজাকে এভাবে আশ্বাস দিয়ে গোপাল ভাঁড় রাণীর নিকটে এসে বললেন,রাণী মা, আপনি বোলে মেলায় যাবেন। আপনাকে মেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মহারাজ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। কাল সকালে এসে আমি আপনাকে মেলায় নিয়ে যাব। আপনি প্রস্তুত হয়ে থাকবেন।

কথাটা শুনে রাণী খুশি হয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমি  প্ৰস্তুত হয়ে থাকব।তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।তুমি সময় মতো এলেই হলো।

পরের দিন সকাল বেলা গোপাল ভাঁড় কোমরের চারদিকে খেজুরের কাঁটা ঝুলিয়ে বেঁধে এসে রাণীকে বললেন, রাণী মা, চলুন।

রাণী বললেন, হ্যাঁ চল।

রাণী গোপাল ভাঁড়ের কোমরে খেজুর কাঁটা ঝুলানো দেখে বললেন- ,গোপাল, তুমি একি মূর্তি ধরে এসেছ? তোমার কোমরে খেজুর কাঁটা বাঁধা কেন?

গোপাল ভাঁড় বললেন,- আপনি খেজুরের কাঁটা বাঁধেন নি। হরিসত্তেরের মেলা গরীব কৃষকদের মেলা। সেখানে ভালো লোকের সাথে অনেক বদমাশ লোকও আসে। খেজুরের কাঁটা না বেঁধে গেলে মাজা নিয়ে আসা সম্ভব হবে না। রাণী মা, আমার মতো আপনিও খেজুর কাঁটা বেঁধে নিন।

খেজুর কাঁটা বাঁধার কথা শুনে রাণী মা ভয় পেয়ে বললেন– না গোপাল, এ রকমই যদি হয়, তাহলে আমি মেলায় যাব না।

রাণীকে এভাবে মেলায় যাওয়া থেকে বিরত করে গোপাল ভাঁড় পুরস্কার নিয়ে বাড়ী ফিরলেন। *

তোখড় এবং রাজকুমার

      এক সময় তোখড় নামে এক যুবক ছিল। তোখড় নামেও তোখড় এবং বুদ্ধিতে তোখড় ছিলো। ছেলেবেলায় তোখড়ের বাবা মারা গিয়েছিলো। তাই সে মানুষের এঁটোকাঁটা খেয়ে কোনোমতে মানুষ হয়েছিলো।বয়েসকালে বিয়ে করে সে এক পর্যায়ে সংসারীও হলো। তার বউ খুব সুন্দরী ছিলো। অন্যান্য নারীর মতো তার বউয়েরও অলঙ্কারের প্রতি দুর্বলতা ছিলো। কিন্তু তোখড় গরিব, লোকের গৃহে কাজকাম করে সে সংসার চালায়। তাই চাইলেই তোখড় তার স্ত্রীকে অলঙ্কার কিনে দিতে পারে না। সেজন্য তোখড়ের স্ত্রীর মনে খুব দুঃখ। সে তোখড়কে দুই চোখে দেখতে পারে না। সব সময় চোপা ঝামটা করে।

      একদিন তোখড়ের স্ত্রী নদীতে জল আনতে যাওয়ার সময় সেই রাজ্যের রাজকুমারের সাথে দেখা হলো। তোখড়ের স্ত্রীকে দেখে রাজকুমারের খুব পছন্দ হলো এবং সে ঘোড়া থেকে নেমে তোখড়ের স্ত্রীকে প্রেম নিবেদন করলো। এমিনতে বুড়ী নাচওয়ালী, তাতে আবার নাতনির বিয়ে!তোখড়ের স্ত্রী রাজকুমারের প্রস্তাবে সন্মতি জানালো।

      রাজপ্রসাদ তোখড়েদের বাড়ী থেকে খুব একটা দূরে নয়। সামান্য দূর। প্রাসাদ থেকে তোখড়দের বাড়ী থেকে দেখা যায়। ফলে রাজকুমার তোখড় বাড়ীতে না থাকা অবস্থায় তাদের বাড়ীতে আসা-যাওয়া করতে লাগলো। প্রথমে পারা-প্রতিবেশী, পরে গ্রামের লোকের চোখে তোখড়ের স্ত্রী এবং রাজকুমারের এই অভিসারের কথা ধরা পড়লো।এক সময় তোখড়ও কথাটা জানতে পারলো। কিন্তু তোখড় নিরূপায়!রাজার ছেলে।পান থেকে চূণ খসলেও রাজা তাকে শূলে দিতে পারে! ফলে সব জেনেও তোখড় প্ৰতিবাদ করার সাহস পেলোনা। এ নিয়ে তোখড়ের মনে খুব দুঃখ। নিজের স্ত্রী পরপুরুষের প্রতি আসক্তা। এর থেকে আর কি দুঃখের কথা হতে  পারে!

      তোখড় মুখ খোলে প্রকাশ্যে প্ৰতিবাদ না করলেও কীভাবে রাজকুমারকে জব্দ করতে পারে এ নিয়ে মনে মনে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলো।একদিন তোখড়ের মনে এক বুদ্ধি খেলালো।তার স্ত্রী নদীতে জল আনতে যাওয়া রাস্তার মাঝে একটি পুরানা গাবগাছ ছিলো।গাছটায় পেতনী বাস করে বলে অঞ্চলটাতে এক প্রবাদ প্রচলিত ছিলো।সে গাব গাছটাতে চড়ে পেতনীর ভান করে তার স্ত্রীকে জব্দ করার সিদ্ধান্ত নিলো।

      সিদ্ধান্ত মতেই তোখড় তার স্ত্রী নদীতে জল আনার জন্য যাওযার পরে মনে মনে গাবগাছে চড়ে বসে রইলো। তার স্ত্রী জল নিয়ে গাব গাছের তলায় পৌঁছানোর পর সে পেতনীদের মতো নাকি স্বরে বললো- এটা তোখড়ের স্ত্রী নাকি?

            গাবগাছ থেকে নাকি স্বরে কথা বলার শব্দ শুনে তোখড়ের স্ত্রী থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। তখন তোখড় আবার নাকি স্বরে বললো- ভয় পাস নে। আমি গাবগাছের পেতনী। তোর কপাল খুব ভালো। তোর কপালে রাজরাণী হওয়ার লক্ষ্মণ আছে।কিন্তু তোখড় তোর রাজরাণী হওয়ার পথে বাধা হয়ে আছে।তোখড় মরলেই তুই রাজরাণী হতে পারবি। তোখড়কে মারার এক সহজ উপায় আছে। তুই যদি তোখড়কে একমাস রাজভোগ খাওয়াতে পারিস, তাহলে সে এক মাস পরে মরে যাবে।তখন তুই রাজকুমারের সাথে বিয়ে হয়ে রাজপাট ভোগ করতে পারবি। যা, আমার কথামতো কাজ করগে’।তোর ভাল হবে। তবে সাবধান, এই এক মাসের মধ্যে তুই রাজকুমারের সাথে মেলামেশা করতে পারবি না।কথাটা মনে থাকে যেন।

      পেতনীর কথা শুনে তোখড়ের স্ত্রী যেন হাতে স্বর্গের নাগাল পেলো। সে সেদিনই রাজকুমারকে ডেকে এনে পেতনীর কথা ভেঙে বললো।কথাটা শুনে রাজকুমারও খুব খুশী হলো এবং রাজভোগের জন্য তোখড়ের স্ত্রীর হাতে টাকাপয়সা দিয়ে চলে গেলো।

      পরদিন থেকে তোখড়কে রাজভোগ খাওয়ানো শুরু হলো। কাজকাম ছেড়ে তোখড় রাজভোগ খেয়ে পরম সুখে কালাতিপাত করতে লাগলো। কয়েকদিন রাজভোগ খাওয়ার পরে তোখড়ের স্বাস্থ্য বন্যার জলের মতো ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগলো। স্বাস্থ্য যত বাঢ়তে থাকে, তোখড় তত শরীর ভালো নেই বলে অভিনয় করে স্ত্রীকে বঞ্চনা করতে থাকে।শরীর খারাপের কথা শুনে স্ত্রী মনে মনে খুশী হয় যদিও উপরে উপরে সহানুভূতি প্রকট করে এবং সময়ের খবর সময়ে রাজকুমারকে পৌঁছাতে থাকে। খবর শুনে রাজকুমার খুশী হয়ে প্রয়োজনের চেয়েও অতিরিক্ত টাকাপয়সা পাঠিয়ে দেয়।

      এক মাস পূরা হতে একদিন বাকী থাকতে তোখড় তার স্ত্রীকে ডেকে বললো- আমার শরীর আজ খুব খারাপ লাগতেছে। মনে হয়, আমি আর বেশি দিন বাঁচব না। কয়েকবার পাতলা পায়খানা হয়েছে।গৃহের ভেতর থেকে বেরিয়ে বারবার পায়খানা করতে যেতে হয়। তাই আজ আমাকে বারান্দায় বিছানা করে দাও। আজ বারান্দাতে পরে থাকব। দু’বার বমিও করেছি। বমি করলে বালিশও নষ্ট হতে পারে!তাই আমাকে আজ বালিশ দিতে হবে না। বালিশের বদলে একটা পীরা দিলেই হবে।

      তোখড়ের মরণাপন্ন অবস্থা দেখে স্ত্রী উপরে উপরে দুঃখ প্রকাশ করলেও মনে মনে খুশী হয়ে রাজকুমারকে তোখড়ের অসুস্থতার খবর পাঠালো। খবর শুনে রাজকুমার দৌড়ে এলো।

      রাজকুমার দেখলো, তোখড় বারান্দায় শোয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তোখড়ের মরণাপন্ন অবস্থা দেখে রাজকুমার খুশী হয়ে গৃহের ভেতরে প্রবেশ করে তোখড় মরার পরে তারা কি উপায় অবলম্বন করবে এ নিয়ে আলোচনায় মিলিত হলো।                 

      তারা যখন আলোচনায় মগ্ন ছিলো, তখন তোখড় মনে মনে পীরা নিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে রাজকুমারের মাথায় পীরা দিয়ে আঘাত করলো। পীরার আঘাতে রাজকুমারের মাথা ফেটে গেলো এবং সে মেঝেতে ঢলে পড়লো।তোখড় উপর্যুপরি আরও কয়েকবার আঘাত করার ফলে রাজকুমারের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেলো। তার পর টেনে হেঁচড়ে রাজকুমারের লাশ পাশে থাকা একটি তরমূজ খেতে নিয়ে এলো এবং লাঠিতে ভেজান দিয়ে মৃতদেহটা বসিয়ে রেখে বাড়ী এসে হোক্কা টানতে লাগলো।

      এদিকে, রাজকুমারের লাশ রেখে আসা তরমূজ খেত থেকে কয়েকদিন ধরে তরমূজ চুরি যাচ্ছিলো। ফলে গৃহস্ত চোর ধরার জন্য তার ছেলেদের নিয়ে তরমূজ খেত পহরা দিচ্ছিলো। তোখড় রাজকুমারের লাশ তরমূজ খেতে রেখে আসার কিছুক্ষণ পর কাকতালীয়ভাবে গৃহস্ত তরমূজ খেত পহরা দিতে এলো। গৃহস্ত দূর থেকে টর্চ মেরে রাজকুমারের লাশ প্রত্যক্ষ করে মৃতদেহকে চোর বলে ভাবলো। চোর ধরা পড়লো ভেবে গৃহস্ত মনে মনে বললো- র’ আজ কোথায় পালাবি!আজ তোর তরমূজ চুরির মজা চাকাব। আজ হাতেলোটে ধরা পরেছিস।আজ আর তোর পালানোর উপায় নেই।

      গৃহস্ত এভাবে সন্তোষ প্রকাশ করে হাতের লাঠি শক্ত করে ধরে ছেলেদের সাথে  নিয়ে মনে মনে এসে রাজকুমারের মৃতদেহ চারদিক থেকে ঘিরে ধরে এলোপাথাড়ি পিটাতে লাগলো। এমনিতে মৃতদেহ তাতে আবার লাঠির বাড়ি, একটু পড়েই মৃতদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। চোর ঘায়েল হয়েছে ভেবে গৃহস্ত চোরের মুখে টর্চ মেরে আৎকে উঠলো- আরে, এ তো দেখছি আমাদের রাজকুমার। রাজকুমার আবার তরমূজ চুরি করে নাকি? চেয়ে পাঠালেই তো দিয়ে আসতে পারি। এভাবে বলে রাজকুমারকে ডাকলো- উঠেন কুমার, আপনি এভাবে তরমূজ চুরি করতে এসেছেন কেন? না জেনে আমরা মহা অন্যায় করে ফেলেছি। মাফ করবেন। উঠেন, বাড়ী যান। কাল আপনাদের বাড়ীতে তরমূজ দিয়ে আসব।

      কিন্তু রাজকুমারের কোনো সাড়াশব্দ নেই। শেষে শরীরে ধরে ঝাঁকিয়ে ডাকলো। তবুও কোনো সাড়াশব্দ নেই। নাকে হাত দিয়ে দেখলো। না, নিশ্বাসের কোনো চিহ্ন নেই। শরীর ঠাণ্ডা। তারমানে রাজকুমার মরে কাঠ হয়ে গেছে। এখন উপায়? গৃহস্ত ছেলেদের উদ্দেশ্য করে বললো- রাজকুমার মনে হয় মরে গেছে। তাও আবার আমাদের লাঠির বাড়ি খেয়ে। রাজা জানতে পরলে, আমাদের শূলে চড়াবে। এখন কি করি বলতো? রাজার হাত থেকে বাঁচার উপায় বের কর।

      গৃহস্তের কথা শুনে বড় ছেলে বললো-, ‘এই বিপদ থেকে মুক্তির কোনো উপায়ই এখন দেখছি না। একমাত্র তোখড়ই পারবে আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। চল, লাশ নিয়ে তোখড়দের বাড়ী গিয়ে তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করিগে’।

            তারা লাশ নিয়ে তোখড়ের বাড়ী এলো। তোখড় তখন বারান্দায় বসে হোকা টানছিলো। বড় ছেলে বাইরে থেকে ডাক দিলো- ‘তোখড় ভাই, বাসায় আছ নাকি? আমরা খুব বিপদে পড়ে তোমার কাছে এসেছি।’

      তোখড় উত্তর দিলো- ‘কে?’ কে ডাকতেছে? বাড়ীর ভেতরে এসো।    

      গৃহস্ত বললো-‘আমরা তোমার কাছে এক সমস্যা নিয়ে এসেছি।

      তোখড় অপেক্ষাকৃত উচ্চস্বরে বললো-, “ওহ, তোমরা। তা এতো রাতে কি মনে করে? সমস্যা কি?

      গৃহস্ত ঘটনা ভেঙেপেতে বলে বললো- আমরা না জেনে অন্যায় করে ফেলেছি। এখন তুমি আমাদের বাঁচাতে হবে।

      তোখড় ঘটনার বিবরণ শুনে মনে মনে হেসে তাদের আরও ভীত করে তোলার জন্য গোঁফে তা দিয়ে বললো- তোমরা মহা অন্যায় করে ফেলেছ।রাজা তোমাদের সবাইকে শূলে দিয়ে হত্যা করবে। কাজটা করার আগে ভাবা উচিত ছিলো। সাধারণ লোক হলে কথা ছিল না। রাজার ছেলেকে হত্যা করেছ। না, তোমাদের বাঁচার কোনো উপায়ই আমি দেখছি না।   

      গৃহস্তের বড়  ছেলে তোখড়ের পা ধরে বললো- তোখড় ভাই, তুমি আমার বড় ভায়ের মতো। যেভাবেই হোক তুমি আমাদের বাঁচাতে হবে। তুমি ছাড়া আমাদের কেউ বাঁচাতে পারবে না।

      তোখড় ভ্রূ কুঁচকে কিছুক্ষণ ভেবে বলল-তোমরা আসলে খুবই অন্যায় করে ফেলেছ। এ বিপদ থেকে বাঁচতে হলে তোমাদের টাকা খরচ করতে হবে। বাড়ী যাও। বাড়ী গিয়ে আগে পাঁচশ টাকা নিয়ে এসো। টাকা দেওয়ার পর আমি বলবো কি করতে হবে।

      বড় ছেলে বাড়ী গিয়ে পাঁচশ টাকা এনে তোখড়ের হাতে দিলো। তোখড় টাকা পকেটে রেখে বললো-যাও, রাজকুমারের লাশ রাজপ্রাসাদের সামনের আমগাছে ঝুলিয়ে রেখে এসো গিয়ে। কাজটা করার পর আমাকে জানিয়ে যেও। তারপর যা করার আমিই করবো। তোমাদের কিচ্ছু করতে হবে না।

      তোখড়ের পরামর্শ মতো গৃহস্ত রাজকুমারের লাশ আমগাছে ঝুলিয়ে রেখে এসে তোখড়কে খবর দিয়ে চলে গেলো।

      গৃহস্ত চলে যাবার পর তোখড় রাজপ্রাসাদে এসে রাজা ও রাণীর শয়নকক্ষের নিকটে এসে রাজকুমারের স্বর নকল করে বললো-, “মা, তোমরা যদি আমাকে তোখড়ের স্ত্রীর সাথে বিয়ে না দাও, তাহলে আমি আম গাছে ঝুলে আত্মহত্যা করবো।

      তখন রাণী শোইয়ে শোইয়েই বললেন-তোখড়ের স্ত্রীর সাথে বিয়ে! এটা কেমন কথা? দেশে কি পাত্রীর আকাল পড়েছে? তুমি হলে রাজপুত্র। তুমি বিয়ে করবে রাজকন্যা। রাস্তার ভিখারির বউকে বিয়ে করার কথা বলতে তোমার লজ্জা করল না? আর এ কথা শুনার আগে আমার মরণ হল না কেন? যাও শোইয়ে থাকগে’। বিয়ের যদি এতই শখ হয়েছে, রাজকন্যা দেখে তোমার বিয়ে দিয়ে দিব।

      রাজকুমার বললো- না, না, আমি রাজকন্যা বিয়ে করব না। আমি তোখড়ের বউকেই বিয়ে করবো। তোমরা অস্বীকার করলে আমি আমগাছে ঝুলে আত্মহত্যা করবো।

      রাণী ছেলের উপর রাগ করে বললেন- যাও, কোথায় মরবে মরগে’। এ রকম না বুঝ পুত্র থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।

      ঠিক আছে। তোখড় বললো- তোমরা যদি আমার দুঃখ বুঝলে না তাহলে আমি সত্যি সত্যিই আতমহত্যা করবো। এ ভাবে বলে তোখড় বাড়ী ফিরে এলো।

      পরদিন সকালে রাজপ্রাসাদে শোরগোল পড়ে গেলো। দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে সবাই অবাক। এ কি মর্মান্তিক ঘটনা! রাজকুমার আমগাছে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে।দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে রাজারাণী উভয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো। আত্মীয়স্বজন, পাত্রমন্ত্রী সবাই শোকপ্রকাশ করতে লাগলো। সাড়া রাজ্য জুড়ে শোকাকুল পরিবেশ সৃষ্টি হলো। শোকাকুল পরিবেশের মাঝে রাজকুমারের সৎকারের ব্যবস্থা করা হলো।

      দাউ দাউ করে চিতার আগুন জ্বলে উঠলো।য়া হয়।কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজকুমারের নশ্বর দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেলো।

      চিতাভস্ম গঙ্গায় বিসর্জন দেওযার নিয়ম। কিন্তু ধারে কাছে কোনো নদী ছিল না। তাই চিতাভস্ম একটি ডোবায় বিসর্জন দেওয়ার জন্য নিয়ে আসা হলো। তোখড় আগে থেকেই ডোবায় পানার মধ্যে লুকিয়ে ছিলো। সে রাজকুমারের স্বর নকল করে বললো-পিতা, তোখড়কে যদি অর্দ্ধরাজ্য দান না করেন, তাহলে আমি মরেও শান্তি পাব না। আমাকে নরকে জ্বলেপুড়ে মরতে হবে। আপনি আজই তোখড়কে ডেকে এনে অর্দ্ধরাজ্য দান করবেন।

      রাজকুমারের অন্তিম ইচ্ছা অনুসারে পরের দিন রাজা তোখড়কে ডেকে এনে অর্দ্ধরাজ্য দান করে রাজা বলে ঘোষণা করলেন। বুদ্ধির বলে তোখড় রাজা হয়ে মহাসুখে রাজত্ব করতে লাগলো এবং রাজারাণী পুত্র শোকে দগ্ধ হয়ে রাজপাট ছেড়ে কাশী চলে গেলেন।

      বুদ্ধির অভাবে রাজকুমার মরলো

      তোখড় গিয়ে রাজপাটে বসলো।।*

 সমাপ্ত

Scroll to Top