কিংবদন্তি চলচ্চিত্ৰ অভিনেতা

সূচীপত্র
চলচ্চিত্র শিল্পের পিতৃপুরুষ পৃথ্বীরাজ কাপুর-
অশোক কুমার-
বলরাজ সাহনী-
কিংবদন্তি অভিনেতা প্রাণ সিকান্দ-
দিলীপ কুমার-
দেব আনন্দ-
রাজ কাপুর-
রাজ কুমার-
সুনীল দত্ত-
রাজেন্দ্র কুমার-
কিংবদন্তি অভিনেতা ধর্মেন্দ্ৰ-
মনোজ কুমার-
শশী কাপুর-
প্রারম্ভিকা
আমাদের ছেলেবেলা সিনেমা দেখাটা সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিলো। শহরের ছেলে-মেয়েদের যদিও সিনেমা দেখার সুযোগ ছিলো, গ্রামের ছেলে-মেয়েদের মুঠেই সে সুযোগ ছিলনা। তখন গ্রামে রেডিও পর্যন্ত ছিলনা। একেবারে যে ছিলনা, তা নয়, হাতে গুণা এক দুইজন ধনী শিক্ষিত লোকের বাড়ীতে অবশ্যে রেড়িও ছিল। তখন এক দুইজন অশিক্ষিত ধনী লোকেরা শখ করে গ্রামোফোন কিনত এবং গ্রামোফোন নিয়ে আত্মীয়- স্বজনদের বাড়ী গিয়ে গান শোনাত।
তখন ছেলে-মেয়েরা গ্রামোফোনের চারপাশে গোল করে বসে গান শুনত। কেউ কেউ আবার গ্রামোফোনের ভেতরে কে গান গাইছে, তা দেখার জন্য গ্রামোফোনের চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখত। এমনই ছিলো আমাদের ছেলেবেলার অবস্থা ।
আমার জন্ম ১৯৫১ সালের ১২ নভেম্বর। আমি প্রথম সিনেমা দেখেছিলাম ১৯৬৬ সালে আমার ছোট মামা ফয়জল হকের সাথে, বরপেটার ইন্দ্রপূরী (মনমোহন) সিনেমা গৃহে। সিনেমাটা ছিলো ‘খানদান’- সুনীল দত্ত, নূতন, প্রাণ এবং অন্যান্য অভিনেতাদের অভিনীত। পরে অনেকবার অনেক সিনেমা দেখেছি। তখন সিনেমার নায়কদের বিষয়ে জানার খুবই আগ্রহ হতো, তবে জানার উপায় ছিলনা। তাই সে সকল কিংবদন্তি নায়কদের বিষয়ে জানতে গিয়েই আমি ‘কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা’ গ্রন্থটি লেখার প্রেরণা পেয়েছি। গ্রন্থটিতে ১৯৪০ সালের আগে পর্যন্ত জন্ম গ্রহণ করা ১৩জন অভিনেতার সংক্ষিপ্ত জীবনী সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। বিভিন্ন উৎস বিশেষ করে উকিপেডিয়া থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তথ্য বিভ্রাটের জন্য আমি সদাশয় পাঠকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী। ভুল-ত্রুটিগুলো শুধরে দিয়ে আমায় উৎসাহিত করার জন্য আবেদন রইল।
বিনীত
আবুল হোসেইন
যতিগাঁও, বরপেটা আসাম।
চলচ্চিত্র শিল্পের পিতৃপুরুষ: পৃথ্বীরাজ কাপুর
জন্ম, শিক্ষা ও প্রাথমিক জীবন
কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা, নাট্যব্যক্তিত্ব ও ভারতীয় থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ পৃথ্বীরাজ কাপুরের জন্ম ১৯০৬ সালের ৩ নভেম্বর, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের লায়লপুর জেলার সমুদ্রি তহসিলে। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর অভিনয়প্রতিভা, নাট্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ভারতীয় বিনোদনজগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
পৃথ্বীরাজ কাপুর প্রথমে লায়লপুরের খালসা কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি পেশোয়ারের এডওয়ার্ডস কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই অভিনয় ও নাটকের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীকালে সেই আগ্রহই তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
হিন্দি চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগে তিনি অভিনেতা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি শুধু চলচ্চিত্র অভিনেতাই ছিলেন না, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ)-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল পৃথ্বী থিয়েটার। এই নাট্যদল ভারতীয় নাট্যচর্চা, সামাজিক সচেতনতা এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
পৃথ্বীরাজ কাপুরকে ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বিখ্যাত কাপুর পরিবারের পিতৃপুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর পরিবার পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
তাঁর পিতার নাম ছিল বশেশ্বরনাথ কাপুর। তিনি পেশোয়ারে ইম্পেরিয়াল পুলিশের একজন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বশেশ্বরনাথ কাপুরও পরবর্তীকালে ‘আওয়ারা’ চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পৃথ্বীরাজ কাপুরকে ১৯৬৯ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারও তিনি লাভ করেন।
চলচ্চিত্রজগতে পদার্পণ
পৃথ্বীরাজ কাপুরের অভিনয়জীবনের সূচনা হয় লায়লপুর ও পেশোয়ারের স্থানীয় মঞ্চে। অভিনয়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তিনি ১৯২৮ সালে মুম্বাই, তৎকালীন বোম্বে, পাড়ি জমান। শোনা যায়, এই যাত্রার জন্য তিনি তাঁর খালা আম্মার কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলেন।
বোম্বেতে পৌঁছে তিনি ইম্পেরিয়াল ফিল্মস সংস্থায় যোগ দেন। প্রথমদিকে বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করতেন। ১৯২৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দো ধারি তরোয়াল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয় বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘সিনেমা গার্ল’, ‘শের-এ-আরব’ এবং ‘প্রিন্স বিজয় কুমার’-সহ একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯২৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সিনেমা গার্ল’ চলচ্চিত্রে তিনি মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন।
১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আলম আরা’ ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র। এই ছবিতে পৃথ্বীরাজ কাপুর অভিনয় করেছিলেন। নির্বাক চলচ্চিত্র থেকে সবাক চলচ্চিত্রে উত্তরণের সময় তিনি নিজের অভিনয়শৈলীকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন।
১৯৩৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বিদ্যাপতি’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৪১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সিকান্দার’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এই ছবিতে তিনি আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের চরিত্রে অভিনয় করেন। ঐতিহাসিক চরিত্রের ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা ও রাজকীয় উপস্থিতি ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
পৃথ্বীরাজ কাপুর শুধু চলচ্চিত্রের পর্দাতেই নয়, মঞ্চেও সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি গ্রান্ট অ্যান্ডারসন থিয়েটার কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এটি ছিল একটি ইংরেজি নাট্যদল, যা এক বছর বোম্বেতে অবস্থান করেছিল। এই সময়ে তিনি নিয়মিত মঞ্চে অভিনয় করতেন এবং পাশ্চাত্য নাট্যচর্চার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। মঞ্চ ও চলচ্চিত্র—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অভিনয়প্রতিভা তাঁকে বহুমুখী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
পৃথ্বী থিয়েটার প্রতিষ্ঠা ও নাট্যজগতে অবদান
১৯৪৪ সালে পৃথ্বীরাজ কাপুর নিজের নাট্যদল ‘পৃথ্বী থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নাটককে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং অভিনয়ের মাধ্যমে সামাজিক ও জাতীয় চেতনা জাগিয়ে তোলা।
পৃথ্বী থিয়েটারের প্রাথমিক প্রযোজনাগুলির মধ্যে ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে কেন্দ্র করে এই নাট্যদল বিভিন্ন নাটক মঞ্চস্থ করত। তাদের নাট্যপ্রযোজনা দেশজুড়ে সুনাম অর্জন করেছিল।
ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল। পৃথ্বীরাজ কাপুরের নাট্যচর্চাও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক জাগরণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
পৃথ্বী থিয়েটারের অন্যতম জনপ্রিয় নাটক ছিল ‘পাঠান’। নাটকটির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল এক হিন্দু ও এক মুসলমান বন্ধুর আন্তরিক সম্পর্ক। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্প্রীতির বার্তা এই নাটকের মূল আকর্ষণ ছিল। নাটকটি প্রায় ৬০০ বার মঞ্চস্থ হয়েছিল বলে জানা যায়। পৃথ্বীরাজ কাপুর অধিকাংশ প্রদর্শনীতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতেন।
তাঁর নাট্যদল প্রায় ১৬ বছর ধরে সক্রিয় ছিল। এই সময়ে দলটি হাজার হাজার প্রদর্শনী আয়োজন করে এবং দেশব্যাপী ভ্রমণ করে নাটক মঞ্চস্থ করে। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ কাপুরও ১৯৪৬ সাল থেকে পিতার নাট্যকর্মের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন।
তবে ১৯৫০-এর দশকের শেষদিকে পৃথ্বী থিয়েটার পরিচালনা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। প্রায় ৮০ জন সদস্যকে নিয়ে চার থেকে ছয় মাস ধরে দেশভ্রমণ করা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। টিকিট বিক্রির আয় এবং বিভিন্ন রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে দলের ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সময়ে দলের বহু দক্ষ অভিনেতা ও কলাকুশলী চলচ্চিত্রজগতে কাজের সুযোগ পেতে শুরু করেন।
এই পরিস্থিতিতে পৃথ্বীরাজ কাপুর ধীরে ধীরে ভ্রাম্যমাণ নাট্যদলের কার্যক্রম সীমিত করে চলচ্চিত্রে অধিক মনোযোগ দেন। ১৯৫১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আওয়ারা’ চলচ্চিত্রে তিনি তাঁর পুত্র রাজ কাপুরের সঙ্গে অভিনয় করেন। ছবিটিতে তাঁর অভিনয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র শশী কাপুর ও পুত্রবধূ জেনিফার কেন্ডালের উদ্যোগে পৃথ্বী থিয়েটারের ঐতিহ্য নতুনভাবে বিকশিত হয়। ১৯৭৮ সালের ৫ নভেম্বর মুম্বাইয়ে পৃথ্বী থিয়েটারের স্থায়ী মঞ্চের উদ্বোধন হয়। পরবর্তী সময়ে এই মঞ্চ ভারতীয় নাট্যচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
পৃথ্বী থিয়েটারের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ভারতীয় ডাক বিভাগ ১৯৯৬ সালে পৃথ্বীরাজ কাপুরের ছবি ও নাট্যদলের প্রতীকসংবলিত দুই টাকার ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এটি ভারতীয় নাট্যজগতে তাঁর অবদানের এক উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।
চলচ্চিত্রে স্মরণীয় অভিনয়
পৃথ্বীরাজ কাপুরের অভিনয়জীবন ছিল দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, সামাজিক এবং ধর্মীয়—বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। তাঁর কণ্ঠস্বর, ব্যক্তিত্ব, সংলাপ বলার ধরন এবং পর্দায় উপস্থিতি তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছিল।
১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মুঘল-ই-আজম’ চলচ্চিত্রে মুঘল সম্রাট আকবরের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে স্মরণীয়। সম্রাটের রাজকীয় মর্যাদা, কঠোরতা, পিতৃস্নেহ এবং মানসিক দ্বন্দ্ব তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই চরিত্র তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হরিশ্চন্দ্র-তারামতী’ চলচ্চিত্রে তিনি মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৯৬৫ সালের ‘সিকান্দার-ই-আজম’ চলচ্চিত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে প্রাচীন ভারতের রাজা পুরুর চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কাল আজ ঔর কাল’ চলচ্চিত্রে তিনি তাঁর পুত্র রাজ কাপুর এবং নাতি রণধীর কাপুরের সঙ্গে অভিনয় করেন। একই পরিবারের তিন প্রজন্মের শিল্পীর একসঙ্গে অভিনয় ছবিটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছিল।
পৃথ্বীরাজ কাপুর হিন্দি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি পাঞ্জাবি ও কন্নড় চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পাঞ্জাবি ধর্মীয় চলচ্চিত্র ‘নানক নাম জাহাজ হ্যায়’-এ তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছবিটি পাঞ্জাবে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। দর্শকদের দীর্ঘ লাইন এবং ব্যাপক জনসমাগম ছবিটির জনপ্রিয়তার পরিচয় বহন করে।
১৯৭০ সালে তিনি ‘নানক দুখিয়া সব সংসার’ নামের পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭১ সালে পুতন্না কানাগাল পরিচালিত কন্নড় চলচ্চিত্র ‘সাক্ষাৎকার’-এও তাঁকে দেখা যায়। এই ছবিতে তিনি কন্নড় অভিনেতা রাজকুমারের পিতার ভূমিকায় অভিনয় করেন।
এভাবে পৃথ্বীরাজ কাপুর ভাষা ও চলচ্চিত্রের গণ্ডি অতিক্রম করে ভারতীয় সিনেমার বৃহত্তর পরিসরে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছিলেন।
পারিবারিক জীবন
পৃথ্বীরাজ কাপুর অল্প বয়সেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল রামসরণী মেহরা। প্রচলিত তথ্য অনুসারে, পৃথ্বীরাজের বয়স তখন প্রায় ১৭ বছর এবং রামসরণীর বয়স ছিল প্রায় ১৫ বছর।
১৯২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ কাপুরের জন্ম হয়। পরবর্তীকালে রাজ কাপুর ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
পৃথ্বীরাজ কাপুর ও রামসরণীর সংসারে একাধিক সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের দুই সন্তান অল্প বয়সেই মারা যায়। দেবীন্দ্র, যিনি দেবী নামে পরিচিত ছিলেন, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অন্য সন্তান রবীন্দ্র, যিনি বিন্দি নামে পরিচিত ছিলেন, ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে মারা যান বলে পারিবারিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে তাঁদের আরও তিন সন্তান—শাম্মী কাপুর, শশী কাপুর এবং উর্মিলা সিয়াল—জন্মগ্রহণ করেন। শাম্মী কাপুর ও শশী কাপুর দুজনেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হয়ে ওঠেন। শশী কাপুর অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এইভাবে পৃথ্বীরাজ কাপুরের পরিবার ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম প্রভাবশালী পরিবারে পরিণত হয়। তাঁর পুত্র, নাতি এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু সদস্য অভিনয়, পরিচালনা ও প্রযোজনার মাধ্যমে কাপুর পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন।
জীবনের শেষ অধ্যায়
জীবনের শেষ পর্যায়ে পৃথ্বীরাজ কাপুর মুম্বাইয়ের জুহু সমুদ্রসৈকতের কাছে ‘পৃথ্বী ঝোপড়া’ নামে পরিচিত একটি কটেজে বসবাস করতেন। সম্পত্তিটি প্রথমে ইজারায় নেওয়া হয়েছিল এবং পরে তাঁর পুত্র শশী কাপুর সেটি কিনে নেন। পরবর্তী সময়ে এই স্থান পৃথ্বী থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে।
পৃথ্বীরাজ কাপুর ও তাঁর স্ত্রী রামসরণী দুজনেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মৃত্যুর মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় ১৫ দিন। পৃথ্বীরাজ কাপুর ১৯৭২ সালের ২৯ মে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগৎ এক অসামান্য শিল্পীকে হারায়।
তবে তাঁর সৃষ্টি, অভিনয় এবং নাট্যচর্চার উত্তরাধিকার আজও ভারতীয় সংস্কৃতিতে জীবন্ত। বিশেষত পৃথ্বী থিয়েটারের মাধ্যমে তিনি যে নাট্যআন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে।
রাজবৌয়ে পারিবারিক স্মৃতিসৌধ
পৃথ্বীরাজ কাপুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ কাপুর তাঁর পিতা-মাতার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য মহারাষ্ট্রের পুণে অঞ্চলে অবস্থিত তাঁদের পারিবারিক খামার ‘রাজবৌ’-তে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। রাজবৌ নামটির অর্থ হিসেবে ‘উদ্যানের রাজা’ ব্যাখ্যাটি প্রচলিত।
এই সম্পত্তি মুলা-মুঠা নদীর তীরবর্তী লুনি কালভোর গ্রামে অবস্থিত, যা পুণে শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। কাপুর পরিবারের এই জমির একাংশ পরবর্তীকালে এমআইটি ওয়ার্ল্ড পিস ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত হয়।
২০১৪ সালে বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর কাপুর পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করেন বলে উল্লেখ করা হয়। স্মৃতিসৌধের স্থাপত্যে সাতটি প্যাগোডা রয়েছে। সেখানে রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রজীবন এবং কাপুর পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ছবি ও চলচ্চিত্র-সামগ্রী প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে।
রাজ কাপুরের ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’, ‘মেরা নাম জোকার’, ‘ববি’ এবং ‘প্রেম রোগ’-সহ একাধিক চলচ্চিত্রের দৃশ্য এই সম্পত্তিতে ধারণ করা হয়েছিল। ‘হাম তুম এক কমরে মে বন্ধ হো’ গানটির শুটিংও এখানে হয়েছিল বলে পরিচিত।
রাজবৌয়ের স্মৃতিসৌধ শুধু একটি পরিবারের স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস, কাপুর পরিবারের অবদান এবং কয়েক প্রজন্মের শিল্পসাধনার স্মারক হিসেবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
পৃথ্বীরাজ কাপুর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
পৃথ্বীরাজ কাপুরের অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকা দীর্ঘ। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে—
- ১৯২০-এর দশক: ‘দো ধারি তরোয়াল’ (১৯২৮), ‘সিনেমা গার্ল’ (১৯২৯)।
- ১৯৩০-এর দশক: ‘আলম আরা’ (১৯৩১), ‘দ্রৌপদী’ (১৯৩১), ‘রাজরানি মীরা’ (১৯৩৩), ‘ডাকু মনসুর’ (১৯৩৪), ‘সীতা’ (১৯৩৪), ‘মঞ্জিল’ (১৯৩৬), ‘মিলাপ’ (১৯৩৭), ‘প্রেসিডেন্ট’ (১৯৩৭), ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৭), ‘দুশমন’ (১৯৩৯)।
- ১৯৪০-এর দশক: ‘চিঙ্গারি’ (১৯৪০), ‘সজনি’ (১৯৪০), ‘রাজ নর্তকী’ (১৯৪১), ‘সিকান্দার’ (১৯৪১), ‘ইশারা’ (১৯৪৩), ‘মহারথী কর্ণ’ (১৯৪৪)।
- ১৯৫০-এর দশক: ‘দহেজ’ (১৯৫০), ‘আওয়ারা’ (১৯৫১), ‘আনন্দমঠ’ (১৯৫২), ‘ছত্রপতি শিবাজি’ (১৯৫৩), ‘জগ্গা ডাকু’ (১৯৫৯)।
- ১৯৬০-এর দশক: ‘পরদেশী’ (১৯৬০), ‘মুঘল-ই-আজম’ (১৯৬০), ‘হরিশ্চন্দ্র’ (১৯৬৩), ‘রুস্তম সোহরাব’ (১৯৬৩), ‘প্যার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া’ (১৯৬৩), ‘গজল’ (১৯৬৪), ‘জাহানআরা’ (১৯৬৪), ‘জিন্দগি’ (১৯৬৪), ‘জানওয়ার’ (১৯৬৫), ‘সিকান্দার-ই-আজম’ (১৯৬৫), ‘খাকান’ (১৯৬৫), ‘ডাকু মঙ্গল সিং’ (১৯৬৬), ‘লাল বাঙলা’ (১৯৬৬), ‘ইয়ে রাত ফির না আয়েগি’ (১৯৬৬), ‘তিন বহুরূপিয়া’ (১৯৬৮), ‘নানক নাম জাহাজ হ্যায়’ (১৯৬৯)।
- ১৯৭০-এর দশক: ‘হীর রাঞ্ঝা’ (১৯৭০), ‘নানক দুখিয়া সব সংসার’ (১৯৭০), ‘সাক্ষাৎকার’ (১৯৭১), ‘কাল আজ ঔর কাল’ (১৯৭১), ‘মেলে মিত্রাঁ দে’ (১৯৭২)।
এই তালিকাটি তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় মাত্র। পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রতালিকা প্রস্তুত করতে হলে প্রতিটি ছবির মুক্তির সাল, ভাষা এবং তাঁর চরিত্রের নাম নির্ভরযোগ্য চলচ্চিত্র-তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ভারতীয় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতে অসামান্য অবদানের জন্য পৃথ্বীরাজ কাপুর বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্মাননাগুলি হলো—
১. সংগীত নাটক অকাদেমি ফেলোশিপ: ভারতীয় নাট্য ও অভিনয়জগতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি।
২. সংগীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার: অভিনয় ও নাট্যচর্চায় তাঁর অবদানের জন্য এই সম্মান প্রদান করা হয়।
৩. পদ্মভূষণ, ১৯৬৯: ভারত সরকার তাঁকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত করে।
৪. দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার: ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এই সম্মান লাভ করেন।
এ ছাড়া তিনি রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর ভূমিকা চলচ্চিত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর জনজীবনেও বিস্তৃত ছিল।
উপসংহার
পৃথ্বীরাজ কাপুর ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি অভিনয়কে কেবল পেশা হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবেও গ্রহণ করেছিলেন। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ থেকে সবাক চলচ্চিত্র, মঞ্চনাটক থেকে বৃহৎ চলচ্চিত্র প্রযোজনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
‘মুঘল-ই-আজম’-এ সম্রাট আকবরের মতো স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় এবং পৃথ্বী থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতিতে স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নাট্যদল নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য পথ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, কাপুর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সাফল্য তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ব্যাপ্তি আরও বাড়িয়েছে।
১৯৭২ সালে তাঁর জীবনাবসান হলেও তাঁর শিল্পসাধনা, নাট্যদর্শন এবং সাংস্কৃতিক অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের ইতিহাসে পৃথ্বীরাজ কাপুরের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কিংবদন্তি অভিনেতা অশোক কুমার

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অশোক কুমার এক কিংবদন্তি অভিনেতা। স্বাভাবিক ও সাবলীল অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের অন্যতম সুপারস্টার এবং পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতাদের কাছে এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। চলচ্চিত্রজগতে তিনি ‘দাদামণি’ নামেও সুপরিচিত ছিলেন।
অশোক কুমারের জন্ম ১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ভাগলপুরে, একটি বাঙালি হিন্দু পরিবারে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল কুমুদলাল গাঙ্গুলী। তাঁর পিতার নাম কুঞ্জলাল গাঙ্গুলী এবং মাতার নাম গৌরী দেবী। তাঁর বাবা পেশায় আইনজীবী ছিলেন এবং মা ছিলেন গৃহিণী।
চার ভাইবোনের মধ্যে অশোক কুমার ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তাঁর ছোট বোন সতী দেবীর সঙ্গে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক বছর। অল্প বয়সেই সতী দেবীর সঙ্গে চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত শশধর মুখোপাধ্যায়ের বিবাহ হয়। তাঁদের পরবর্তী দুই ভাই ছিলেন কল্যাণ গাঙ্গুলী ও আভাস গাঙ্গুলী। কল্যাণ গাঙ্গুলী চলচ্চিত্রজগতে অনুপ কুমার এবং আভাস গাঙ্গুলী কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমার নামে পরিচিত হন।
কিশোর কুমার হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল নেপথ্যগায়ক, অভিনেতা, সুরকার ও সংগীতশিল্পী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর অশোক কুমার নিজের জন্মদিন পালন করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। ছোট ভাইয়ের প্রতি তাঁর গভীর স্নেহ ও ভালোবাসার এটি ছিল এক আবেগঘন প্রকাশ।
দাম্পত্য জীবন ও সন্তানসন্ততি
অল্প বয়সেই অশোক কুমার শোভার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। চলচ্চিত্রজগতে ব্যস্ত জীবন কাটালেও তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। তাঁদের এক ছেলে অরূপ গাঙ্গুলী এবং তিন মেয়ে—ভারতী প্যাটেল, রূপা ভার্মা ও প্রীতি গাঙ্গুলী।
চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তাঁরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো সাধারণ জীবনযাপন করতেন। সন্তানদের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার বিকাশে তাঁরা গুরুত্ব দিতেন।
অরূপ গাঙ্গুলী ১৯৬২ সালে ‘বেজুবান’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি বক্স অফিসে সাফল্য পায়নি। এরপর তিনি অভিনয়জগৎ থেকে সরে এসে কর্পোরেট ক্ষেত্রে নিজের কর্মজীবন গড়ে তোলেন।
অশোক কুমারের বড় মেয়ে ভারতী প্যাটেল অভিনেত্রী অনুরাধা প্যাটেলের মা। অনুরাধা প্যাটেল অভিনেতা কানওয়ালজিৎ সিংকে বিয়ে করেন। ভারতী প্রথমে এক গুজরাটি ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি অভিনেতা সাঈদ জাফরির ভাই হামিদ জাফরিকে বিয়ে করেন।
দ্বিতীয় মেয়ে রূপা ভার্মা ছিলেন অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী দেবেন ভার্মার স্ত্রী। তাঁদের ছোট মেয়ে প্রীতি গাঙ্গুলীও অভিনয়জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে তিনি বেশ কয়েকটি হিন্দি ছবিতে কৌতুকাভিনেত্রী হিসেবে অভিনয় করেন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন এবং ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
অশোক কুমারের পরিবারকে ঘিরে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, অভিনেত্রী কিয়ারা আদভানি নাকি তাঁর নাতনি। প্রকৃতপক্ষে, কিয়ারা আদভানির সঙ্গে অশোক কুমারের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। কিয়ারার মা জেনেভিভ আদভানি এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে অশোক কুমারের পারিবারিক সম্পর্কের যে দাবি প্রচারিত হয়, তা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের সূচনা
অশোক কুমার কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন। তবে পড়াশোনার চেয়ে সিনেমা ও প্রযুক্তির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। তিনি চলচ্চিত্রের কারিগরি দিক সম্পর্কে জানতে চাইতেন এবং একজন প্রযুক্তিবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
তাঁর বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে আইনজীবী হোক। সেই উদ্দেশ্যে অশোক কুমারকে আইন কলেজে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু আইন পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি কিছুদিনের জন্য বোম্বাইয়ে তাঁর বোন সতী দেবীর কাছে চলে যান। তখন তাঁর ভগ্নীপতি শশধর মুখোপাধ্যায় বোম্বাই টকিজ স্টুডিওর কারিগরি বিভাগে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন।
নিজের উপার্জনের ব্যবস্থা করতে অশোক কুমার বোম্বাই টকিজে পরীক্ষাগার সহকারী হিসেবে চাকরি নেন। কাজটি তাঁর ভালো লাগত। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়ে তিনি মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে শুরু করেন।
তবে তাঁর বাবা প্রথমে এই চাকরিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি ছেলেকে পড়াশোনা শেষ করে আইনজীবী হওয়ার জন্য চাপ দিতেন। অশোক কুমার তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে আইন পেশার চেয়ে প্রযুক্তিগত কাজেই তাঁর আগ্রহ বেশি। শেষ পর্যন্ত শশধর মুখোপাধ্যায়ের মধ্যস্থতায় তাঁর বাবা এই কর্মজীবন মেনে নেন।
এভাবেই অভিনেতা হিসেবে নয়, একজন প্রযুক্তিকর্মী হিসেবেই অশোক কুমারের কর্মজীবন শুরু হয়। প্রায় পাঁচ বছর তিনি পরীক্ষাগার সহকারী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য পথ নির্ধারণ করে রেখেছিল।
আকস্মিকভাবে অভিনয় জগতে প্রবেশ
১৯৩৬ সালে বোম্বাই টকিজের প্রযোজনায় ‘জীবন নাইয়া’ চলচ্চিত্রের শুটিং চলছিল। ছবিটির নায়ক ছিলেন নাজম-উল-হাসান এবং নায়িকা ছিলেন দেবিকা রানি, যিনি বোম্বাই টকিজের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিমাংশু রায়ের স্ত্রী ছিলেন।
শুটিং চলাকালে নাজম-উল-হাসান দেবিকা রানিকে নিয়ে চলে যান বলে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে দেবিকা রানি স্বামীর কাছে ফিরে এলে নাজম-উল-হাসানকে ছবিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর পরিবর্তে অশোক কুমারকে নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ছবিটির পরিচালক ফ্রাঞ্জ অস্টেন প্রথমে অশোক কুমারকে নায়ক হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, অশোক কুমারের চেহারা তখনকার প্রচলিত নায়কের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকেই নির্বাচিত করা হয়।
তৎকালীন চলচ্চিত্রজগতে অনেক অভিনেতাই পর্দার জন্য আলাদা নাম গ্রহণ করতেন। সেই রীতি অনুসরণ করে কুমুদলাল গাঙ্গুলী ‘অশোক কুমার’ নামেই অভিনয়জগতে আত্মপ্রকাশ করেন।
পরের ছবি ‘অচ্ছুত কন্যা’ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দেবিকা রানির বিপরীতে অভিনীত এই ছবিতে এক ব্রাহ্মণ যুবক ও এক অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের তরুণীর প্রেমকাহিনি তুলে ধরা হয়েছিল। জাতিভেদ ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার কারণে ছবিটি বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে।
‘অচ্ছুত কন্যা’ বাণিজ্যিক ও সমালোচনামূলক সাফল্য লাভ করে। অশোক কুমার ও দেবিকা রানি সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় পর্দার জুটি হয়ে ওঠেন।
দেবিকা রানি ও লীনা চিতনিসের সঙ্গে সফল জুটি
অশোক কুমার ও দেবিকা রানি একসঙ্গে ‘জন্মভূমি’ (১৯৩৬), ‘ইজ্জত’ (১৯৩৭), ‘সাবিত্রী’ (১৯৩৭), ‘বচন’ (১৯৩৮) এবং ‘নির্মলা’ (১৯৩৮) ছবিতে অভিনয় করেন। তাঁদের জুটি দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
১৯৪১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অঞ্জন’ ছবিটি প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় তাঁদের জুটির জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। দেবিকা রানি তখন প্রতিষ্ঠিত তারকা ছিলেন এবং অশোক কুমার তাঁর তুলনায় নবীন অভিনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার লক্ষ্যে অশোক কুমার অভিনেত্রী লীনা চিতনিসের সঙ্গে জুটি বাঁধেন। তাঁদের অভিনীত ‘কঙ্গন’ (১৯৩৯), ‘বন্ধন’ (১৯৪০) ও ‘আজাদ’ (১৯৪০) সফল হয়। এরপর ১৯৪১ সালে ‘ঝুলা’ ছবির সাফল্য তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় ও মূল্যবান অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এই সময় থেকেই অশোক কুমার প্রমাণ করতে শুরু করেন যে তিনি কেবল অন্য তারকার জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল নন; নিজের অভিনয়ক্ষমতায়ও দর্শকদের মন জয় করতে পারেন।
‘কিসমত’ ও ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের সুপারস্টার
১৯৪৩ সালে জ্ঞান মুখার্জি পরিচালিত ‘কিসমত’ চলচ্চিত্রে অশোক কুমার এমন এক চরিত্রে অভিনয় করেন, যার মধ্যে প্রচলিত নায়কোচিত গুণাবলির পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বও ছিল। এই ধরনের চরিত্রকে পরবর্তীকালে ‘অ্যান্টি-হিরো’ বলা হয়।
‘কিসমত’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে। ছবিটি দীর্ঘদিন ধরে প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল এবং সে সময়ের বাণিজ্যিক সাফল্যের বহু রেকর্ড ভেঙে দেয়। ছবিটির বিপুল জনপ্রিয়তা অশোক কুমারকে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের সুপারস্টারদের অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, চলচ্চিত্রকার ও লেখক সাদাত হাসান মান্টো তাঁর বিপুল জনসমর্থনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। অশোক কুমার বাইরে বেরোলেই তাঁকে দেখার জন্য মানুষের ভিড় জমত বলে সমসাময়িক বিবরণে পাওয়া যায়।
‘কিসমত’-এর পর তিনি ‘চল চল রে নওজওয়ান’ (১৯৪৪), ‘শিকারি’ (১৯৪৬), ‘সাজন’ (১৯৪৭), ‘মহল’ (১৯৪৯), ‘মশাল’ (১৯৫০), ‘সংগ্রাম’ (১৯৫০) এবং ‘সমাধি’ (১৯৫০)-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন। একের পর এক সাফল্য তাঁকে সেই সময়ের সর্বাধিক পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতাদের একজন করে তোলে।
প্রযোজক হিসেবে অবদান ও নতুন প্রতিভার বিকাশ
অশোক কুমার শুধু অভিনেতা ছিলেন না; চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বোম্বাই টকিজের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। ‘জিদ্দি’ (১৯৪৮) ছিল তাঁর প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর একটি।
এই ছবির মাধ্যমে দেব আনন্দ অভিনয়জগতে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পান। একইভাবে ‘নীলকমল’ (১৯৪৭) চলচ্চিত্রে দেব আনন্দ ও প্রাণের অভিনয়জীবনের বিকাশে তাঁর ভূমিকা ছিল। পরবর্তীকালে ‘মহল’ (১৯৪৯) ছবির মাধ্যমে মধুবালার অভিনয়জীবনও বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে।
‘মহল’-এ অশোক কুমারের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন মধুবালা। ছবিটির ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি লতা মঙ্গেশকরের সংগীতজীবনের অন্যতম স্মরণীয় গান হয়ে ওঠে।
অশোক কুমার নতুন শিল্পীদের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তরুণ পরিচালকদের বিকাশেও সহায়তা করেছিলেন। বি. আর. চোপরা, হৃষীকেশ মুখার্জি ও শক্তি সামন্তের মতো চলচ্চিত্রকারদের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সহযোগিতা ও উৎসাহ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
‘ইন্সপেক্টর’ (১৯৫৬), ‘হাওড়া ব্রিজ’ (১৯৫৮) ও ‘ডিটেকটিভ’ (১৯৫৮)-এর মতো ছবির সাফল্য শক্তি সামন্তের পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভে সহায়ক হয়েছিল। অন্যদিকে, হৃষীকেশ মুখার্জির সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা পরবর্তীকালে হিন্দি চলচ্চিত্রের বেশ কিছু স্মরণীয় কাজের পথ প্রশস্ত করে।
১৯৫০-এর দশকে অভিনয়ের সাফল্য
১৯৫০-এর দশকে দেব আনন্দ, দিলীপ কুমার ও রাজ কাপুরের মতো তরুণ অভিনেতারা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও অশোক কুমারের অবস্থান অটুট ছিল। তিনি ‘আফসানা’ (১৯৫১), ‘নৌবাহার’ (১৯৫২), ‘পরিণীতা’ (১৯৫৩), ‘বন্দিশ’ (১৯৫৫), ‘এক হি রাস্তা’ (১৯৫৬), ‘এক সাল’ (১৯৫৭) এবং ‘হাওড়া ব্রিজ’ (১৯৫৮)-এর মতো ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন।
‘দিদার’ (১৯৫১) ছবিতে তিনি দিলীপ কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। এ ছাড়া নলিনী জয়বন্তের সঙ্গেও তিনি বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন।
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অশোক কুমার প্রায়ই ধূমপায়ী অপরাধী, রহস্যময় ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করতেন। সেই সময় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে ‘ফিল্ম নোয়ার’ ধারার প্রভাব দেখা যাচ্ছিল। অপরাধ, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাসম্পন্ন চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পায়।
মধুবালার সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ অভিনয়-সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন সময়ে তাঁরা একাধিক ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেন। তাঁদের অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে ‘হাওড়া ব্রিজ’ ও ‘মহল’ বিশেষভাবে স্মরণীয়।
চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নতুন অধ্যায়
১৯৬০-এর দশক থেকে অশোক কুমার নিজের অভিনয়ের ধরন ও চরিত্র নির্বাচনে পরিবর্তন আনেন। তরুণ নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করার পরিবর্তে তিনি পিতা, কাকা, বিচারক, প্রবীণ সমাজসেবক ও অন্যান্য পরিণত চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করেন।
১৯৬০ সালে ‘কানুন’ ছবিতে তিনি বিচারকের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৯৬৩ সালের ‘বন্দিনী’ ছবিতে তিনি একজন প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামীর চরিত্রে অভিনয় করেন। ‘মেহবুব’ (১৯৬৩) ছবিতে তাঁর চরিত্র ছিল স্নেহশীল ভাইয়ের। ‘চিত্রলেখা’ (১৯৬৪)-তে তিনি এক প্রবীণ ধর্মগুরুর ভূমিকায় অভিনয় করেন।
পরবর্তী সময়ে ‘জবাব’ (১৯৭০) ও ‘ভিক্টোরিয়া নম্বর ২০৩’ (১৯৭২)-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের আকৃষ্ট করে। চরিত্রের ধরন বদলালেও তাঁর অভিনয়ের শক্তি ও ব্যক্তিত্ব কমেনি।
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তিনি ‘জুয়েল থিফ’ (১৯৬৭), ‘আশীর্বাদ’ (১৯৬৮), ‘পূরব অউর পশ্চিম’ (১৯৭০), ‘পাকিজা’ (১৯৭২), ‘মিলি’ (১৯৭৫), ‘ছোটি সি বাত’ (১৯৭৬) এবং ‘খুবসুরত’ (১৯৮০)-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন।
বিশেষত ‘আশীর্বাদ’ ছবিতে তাঁর অভিনয় ছিল অসাধারণ। ছবিটির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। এই ছবির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে একজন অভিনেতা নায়কের ভূমিকায় না থেকেও চলচ্চিত্রের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারেন।
১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে শশী কাপুর, রাজেশ খান্না এবং অন্যান্য জনপ্রিয় অভিনেতার সঙ্গে তিনি বহু ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ সহ-অভিনেতার ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকদের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন।
টেলিভিশনে অভিনয়
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি অশোক কুমার টেলিভিশনেও কাজ করেছেন। ১৯৮৪ সালে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘হাম লোগ’-এ তিনি সঞ্চালকের ভূমিকায় উপস্থিত হন। ভারতীয় টেলিভিশনের প্রাথমিক যুগে এই ধারাবাহিকটি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
১৯৮৬ সালে নির্মিত ‘বাহাদুর শাহ জাফর’ ধারাবাহিকে তিনি নামভূমিকায় অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রটি ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
১৯৯৪ সালে ‘তহকিকাত’ গোয়েন্দা ধারাবাহিকের ‘লাকি ড্র—মার্ডার আফটার লাকি ড্র’ পর্বেও তিনি অভিনয় করেন। সেখানে বিজয় আনন্দ ও সৌরভ শুক্লার মতো শিল্পীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়।
১৯৯৭ সালে ‘আঁখো মে তুম হো’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বড় পর্দায় তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছান।
অভিনয়ের বাইরের জীবন
অশোক কুমার অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রকলায় পারদর্শী ছিলেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি হোমিওপ্যাথি চর্চা করতেন এবং পরিচিত মহলে একজন দক্ষ অনুশীলনকারী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন।
তাঁর অভিনয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল স্বাভাবিকতা, সংলাপ বলার সহজ ভঙ্গি এবং চরিত্রের মনস্তত্ত্ব প্রকাশের ক্ষমতা। অতিনাটকীয় অভিনয়ের পরিবর্তে তিনি সংযত অভিব্যক্তি ও বাস্তবধর্মী অভিনয়ের ওপর গুরুত্ব দিতেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ২৭৫টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। কলকাতার ধাকুরিয়ায় মঞ্চনাটকেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
হিন্দি চলচ্চিত্রে স্বাভাবিক অভিনয়ের বিকাশে অশোক কুমারের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একজন অভিনেতার সাফল্য কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা প্রচলিত নায়কোচিত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে না; অভিনয়দক্ষতা, চরিত্রের গভীরতা এবং ব্যক্তিত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যান্য শিল্পীর কর্মজীবনে অবদান
অশোক কুমারের আরেকটি বড় অবদান হলো, তিনি বহু প্রতিভাবান শিল্পীর বিকাশে সাহায্য করেছিলেন। বোম্বাই টকিজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় তিনি নতুন অভিনেতা ও পরিচালকদের কাজের সুযোগ করে দেন।
দেব আনন্দের প্রাথমিক অভিনয়জীবনে ‘জিদ্দি’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাণ পরবর্তীকালে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম বিখ্যাত খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। মধুবালার অভিনয়জীবনের বিকাশেও ‘মহল’ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।
চলচ্চিত্রকার বি. আর. চোপরা পরিচালিত ‘আফসানা’ (১৯৫১)-তে অভিনয় করে অশোক কুমার আরও একবার নিজের অভিনয়ক্ষমতার পরিচয় দেন। ছবিটি চোপরা ও অশোক কুমার—উভয়ের কর্মজীবনেই উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে।
তাঁর ছোট ভাই অনুপ কুমার ও কিশোর কুমারের কর্মজীবনেও অশোক কুমারের উৎসাহ ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ (১৯৫৮) ছবিতে তিন ভাইয়ের একসঙ্গে অভিনয় আজও দর্শকদের কাছে স্মরণীয়।
অশোক কুমারের নিজের অভিনয়ের ধরনও পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের প্রভাবিত করেছে। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় এখনও অনুকরণশিল্পীদের কাছে জনপ্রিয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা
অশোক কুমারের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- ১৯৫৯: সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার।
- ১৯৬২: ‘রাখী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার।
- ১৯৬২: ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী সম্মান।
- ১৯৬৩: ‘গুমরাহ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার।
- ১৯৬৬: ‘আফসানা’ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতা পুরস্কার—এমন উল্লেখ বিভিন্ন জীবনীতে পাওয়া যায়; পুরস্কারের বছর ও বিভাগ যাচাই করা প্রয়োজন।
- ১৯৬৯: ‘আশীর্বাদ’ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার।
- ১৯৬৯: ‘আশীর্বাদ’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার স্বীকৃতি।
- ১৯৮৮: ভারত সরকার কর্তৃক দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।
- ১৯৯৪: স্টার স্ক্রিন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ১৯৯৫: ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ১৯৯৯: ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণ সম্মান।
- ২০০১: উত্তর প্রদেশ সরকারের অবধ সম্মান।
- ২০০৭: স্টার স্ক্রিন পুরস্কারে বিশেষ সম্মাননা।
এই পুরস্কারগুলো ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর দীর্ঘ অবদান, অভিনয়ের উৎকর্ষ এবং শিল্পজগতে তাঁর স্থায়ী প্রভাবের স্বীকৃতি বহন করে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
অশোক কুমার ২০০১ সালের ১০ ডিসেম্বর, ৯০ বছর বয়সে, মুম্বাইয়ের চেম্বুরে নিজের বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর মৃত্যুর পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী তাঁকে বহু প্রজন্মের উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিনেতাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
অশোক কুমারের জীবন ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগের পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে আধুনিক হিন্দি চলচ্চিত্রের বিকাশ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে অভিনয় করেছেন। নায়ক, অ্যান্টি-হিরো এবং চরিত্রাভিনেতা—প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। যখন অনেক অভিনেতা নায়কের পরিচয় আঁকড়ে ধরে থাকতেন, তখন তিনি সাহসের সঙ্গে চরিত্রাভিনেতার ভূমিকায় নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এভাবেই তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভিনয়ের একটি স্বতন্ত্র আদর্শ গড়ে তোলেন।
অশোক কুমার কেবল একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক পথপ্রদর্শক ব্যক্তিত্ব। তাঁর অভিনয়শৈলী, নতুন প্রতিভাকে উৎসাহ দেওয়ার মানসিকতা এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের সাফল্য তাঁকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
অভিনেতা বলরাজ সাহনী

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বলরাজ সাহনী ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভাবান অভিনেতা, লেখক, চিত্রনাট্যকার ও সমাজসচেতন ব্যক্তিত্ব। স্বাভাবিক অভিনয়শৈলী, গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দো বিঘা জমিন ও গরম হাওয়া চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
কিংবদন্তি অভিনেতা বলরাজ সাহনীর জন্ম ১৯১৩ সালের ১ মে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডিতে। বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডি পাকিস্তানের অন্তর্গত। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল যুধিষ্ঠির সাহনী। তিনি লাহোরের সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে ফিরে এসে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। পাশাপাশি তিনি হিন্দি সাহিত্যেও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে দময়ন্তী সাহনীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।
শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতা ও বিবিসিতে যোগদান
১৯৩০-এর দশকে বলরাজ সাহনী তাঁর স্ত্রী দময়ন্তী সাহনীকে নিয়ে বাংলায় আসেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ে তাঁদের বড় ছেলে পরীক্ষিত সাহনীর জন্ম হয়। দময়ন্তী সাহনীও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৩৮ সালে বলরাজ সাহনী মহাত্মা গান্ধীর সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর আদর্শ ও চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হন। পরে তিনি লন্ডনে বিবিসি রেডিওর হিন্দি বিভাগের ঘোষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন।
অভিনয় জীবনের সূচনা
ছোটবেলা থেকেই বলরাজ সাহনীর অভিনয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। তাঁর স্ত্রী দময়ন্তী সাহনী ইতিমধ্যেই ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ)-এর একজন পরিচিত অভিনেত্রী ছিলেন। স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় বলরাজ সাহনী বোম্বাইয়ে এসে আইপিটিএ-তে যোগ দেন। মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা হয়।
১৯৪৬ সালে ইনসাফ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। একই বছর খাজা আহমদ আব্বাস পরিচালিত ধরতী কে লাল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে তাঁর স্ত্রী দময়ন্তী সাহনী এবং তৃপ্তি মিত্রও অভিনয় করেছিলেন। একই বছর ফণী মজুমদার পরিচালিত দূর চলে চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেন।
তবে তাঁর অভিনয়প্রতিভার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৫৩ সালে বিমল রায় পরিচালিত দো বিঘা জমিন চলচ্চিত্রে। একজন দরিদ্র কৃষকের সংগ্রাম, অসহায়ত্ব ও মানবিক বেদনা তিনি এতটাই বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে দর্শক ও সমালোচক উভয়ের কাছেই তাঁর অভিনয় বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি অর্জন করে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে সম্মান লাভ করে।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত কাবুলিওয়ালা চলচ্চিত্রে আবদুর রহমান খানের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটির স্নেহ, মমতা ও মানবিক অনুভূতি অসাধারণভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।
ব্যক্তিজীবন
বলরাজ সাহনীর স্ত্রী দময়ন্তী সাহনী ১৯৪৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত গুড়িয়া চলচ্চিত্রে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর দময়ন্তী সাহনীর মৃত্যু হয়। স্ত্রীর অকালমৃত্যু বলরাজ সাহনীর জীবনে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছিল।
পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর চাচাতো বোন সন্তোষ চাঁদহোককে বিয়ে করেন। সন্তোষ চাঁদহোক পরবর্তী জীবনে একজন পরিচিত লেখক ও টেলিভিশন চিত্রনাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
বলরাজ সাহনীর ছেলে পরীক্ষিত সাহনী একজন পরিচিত চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনেতা ছিলেন। তাঁর ভাই ভীষ্ম সাহনীও ছিলেন একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক। তাঁর মেয়ে শবনমের অকালমৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে শোকাহত করেছিল।
চলচ্চিত্রে অভিনয় ও অসামান্য সাফল্য
বলরাজ সাহনী তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি কখনো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ-কষ্ট, কখনো মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, আবার কখনো সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার জটিলতা পর্দায় তুলে ধরেছেন।
তিনি নূতন, মীনা কুমারী, বৈজয়ন্তীমালা, নার্গিস এবং পদ্মিনী কোলাপুরীর মতো অভিনেত্রীদের সঙ্গে বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে বিন্দিয়া (১৯৫৫), সীমা (১৯৫৫), কাঠপুতলি (১৯৫৭), সোনে কি চিড়িয়া (১৯৫৮), লাজবন্তী (১৯৫৮), ঘর-সংসার (১৯৫৮), ছট্টা বাজার (১৯৫৯), ভাবী কি চুড়িয়া (১৯৬১), ওয়াক্ত (১৯৬৫), নীল কমল (১৯৬৮), দো রাস্তে (১৯৬৯), এক ফুল দো মালি (১৯৬৯) এবং ঘর ঘর কি কাহানি (১৯৭০)।
ওয়াক্ত চলচ্চিত্রে তিনি অচলা সচদেবের সঙ্গে ‘অ্যায় মেরি জোহরা জবীন’ গানে অভিনয় করেন। গানটি পরবর্তীকালে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় ও স্মরণীয় গানে পরিণত হয়।
পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সতলুজ দে কান্দে (১৯৬৪) চলচ্চিত্রে রামপ্রকাশ মালহোত্রার চরিত্রে এবং নানক দুখিয়া সব সংসার (১৯৭০) চলচ্চিত্রে সুবেদার বৈরাম সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রশংসা অর্জন করেন।
গরম হাওয়া: অভিনয়জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি
বলরাজ সাহনীর অভিনয়জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হলো এম. এস. সাথ্যু পরিচালিত গরম হাওয়া (১৯৭৩)। এই চলচ্চিত্রে তিনি সেলিম মির্জা নামের এক মুসলিম ব্যবসায়ীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি দেশভাগের পর নানা প্রতিকূলতা ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে যেতে চান না।
সেলিম মির্জার চরিত্রে বলরাজ সাহনী দেশভাগের বেদনা, মানুষের শিকড়ের প্রতি টান, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং অস্তিত্বের সংকট অত্যন্ত সংযত ও বাস্তবধর্মী অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেন। সমালোচকদের অনেকে এই অভিনয়কে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন।
দুঃখজনকভাবে, চলচ্চিত্রটির সম্পাদনা ও ডাবিংয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরদিনই তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে তিনি নিজের শেষ চলচ্চিত্রটির সম্পূর্ণ কাজ দেখে যেতে পারেননি। চলচ্চিত্রটির সঙ্গে যুক্ত তাঁর শেষ রেকর্ড করা সংলাপ হিসেবে ‘ইনসান কব তক অকেলা জি সকতা হ্যায়’ কথাটি বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। এর অর্থ, মানুষ আর কত দিন একা বেঁচে থাকতে পারে?
সাহিত্যচর্চা ও লেখক হিসেবে অবদান
বলরাজ সাহনী শুধু অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক ও ভ্রমণলেখক। কর্মজীবনের প্রথম দিকে তিনি ইংরেজিতে লেখালেখি করলেও পরবর্তী সময়ে পাঞ্জাবি সাহিত্যে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন।
১৯৬০ সালে পাকিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি মেরা পাকিস্তানি সফরনামা রচনা করেন। ১৯৬৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন মেরা রুশি সফরনামা। দ্বিতীয় গ্রন্থটির জন্য তিনি ‘সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার’ লাভ করেন।
তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা, প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনা প্রকাশ করতেন। পাঞ্জাবি সাময়িকী প্রীতলড়ী-তেও তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা ফিল্মি আত্মকথা তাঁর জীবন, সাহিত্যচর্চা ও চলচ্চিত্রজগতের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে।
চিত্রনাট্যকার হিসেবেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। গুরু দত্ত পরিচালিত বাজি (১৯৫১) চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনায় তিনি অংশ নেন। চলচ্চিত্রটিতে দেব আনন্দ, গীতা বালি ও কল্পনা কার্তিক অভিনয় করেছিলেন।
সমাজসেবা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
বলরাজ সাহনী ছিলেন অধ্যয়নশীল, প্রগতিশীল চিন্তাধারার অধিকারী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন একজন মানুষ। তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়ন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
১৯৫০ সালে তিনি দিল্লিতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য একটি গ্রন্থাগার ও অধ্যয়নকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। ১৯৭৩ সালে বোম্বাইয়ে তিনি ‘পাঞ্জাবি কলাকেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বার্ষিক বলরাজ সাহনী পুরস্কার প্রদান করে। এ ছাড়া অল ইন্ডিয়া আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনও তাঁর নামে পুরস্কার প্রদান করে।
যুব আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। কমরেড গুরু রাধা কিষণ ও পি. কে. বাসুদেবনের সহযোগিতায় দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া ইয়ুথ ফেডারেশনের (এআইওয়াইএফ) প্রথম জাতীয় সম্মেলন আয়োজনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের যুবসংগঠন থেকে প্রায় ২৫০ জন প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষক সেই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সংগঠনটির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে এআইওয়াইএফ ভারতের যুব আন্দোলনে একটি উল্লেখযোগ্য সংগঠন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
বলরাজ সাহনীর অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকা
বলরাজ সাহনী ১৯৪৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের বিস্তৃতি বোঝার জন্য নিচে বছর অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির তালিকা দেওয়া হলো। তালিকাটি তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নির্বাচিত ও পরিচিত কাজগুলির একটি সংকলন।
১৯৪৬: ধরতী কে লাল, দূর চলে, বদনামী।
১৯৪৭: গুড়িয়া।
১৯৪৮: গুঞ্জন।
১৯৫০: মালধার।
১৯৫১: হম লোগ, হালচাল।
১৯৫২: বদনাম, আকাশ, রাহি।
১৯৫৩: দো বিঘা জমিন, চালিশ বাবা এক চোর, ভাগ্যবান।
১৯৫৪: মজবুরি, আওলাদ, নৌকরি, বাজুবন্ধ।
১৯৫৫: টাঙ্গেওয়ালী, সীমা, জরু কা ভাই, জবাব, গরম কোট।
১৯৫৬: টাকশাল, এরা বাটর সুর (অসমীয়া চলচ্চিত্র)।
১৯৫৭: কৃষ্ণ-সুদামা, পরদেশী, মাই বাপ, লাল বাত্তি, কাঠপুতলি, দো রুটি, ভাবী।
১৯৫৮: সোনে কি চিড়িয়া, নয়া কদম, লাজবন্তী, খাজাঞ্চি, ঘর-সংসার, ঘর-গৃহস্থী, দেবর-ভাবী।
১৯৫৯: চান্দ, ব্ল্যাক ক্যাট, সত্তা বাজার, হীরা মোতি, ছোটী বেহেন, সিআইডি গার্ল।
১৯৬০: নই মা, দিল ভি তেরা হম ভি তেরে, বিন্দিয়া, অনুরাধা।
১৯৬১: কাবুলিওয়ালা, সোহাগ সিন্দুর, স্বপ্নে সুহানে, ভাবী কি চুড়িয়া।
১৯৬২: শাদী, আনপড়।
১৯৬৩: অকেলা।
১৯৬৪: সতলুজ দে কান্দে (পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র), ম্যায় ভি লড়কি হুঁ, পুনর্মিলন, হকীকত।
১৯৬৫: ডাকঘর, ওয়াক্ত, ফেরার।
১৯৬৬: আয়ে দিন বাহার কে, পিঞ্জরে কে পঞ্চি, নীন্দ হামারি খোয়াব তুমহারে, লাডলা, আসরা।
১৯৬৭: হমরাজ, নানিহাল, ঘর কা চিরাগ, আমান।
১৯৬৮: ইজ্জত, সংঘর্ষ, নীল কমল, দুনিয়া।
১৯৬৯: এক ফুল দো মালি, দো রাস্তে, তালাশ, ননহা ফরিস্তা, হম এক হ্যায়।
১৯৭০: নানক দুখিয়া সব সংসার (পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র), হোলি আয়ি রে, মেরে হামসফর, পেহচান, পবিত্র পাপী, নয়া রাস্তা, ঘর ঘর কি কাহানি, ধরতি।
১৯৭১: পরায়া ধন, জওয়ান মহব্বত।
১৯৭২: জওয়ানি দিওয়ানি, জঙ্গল মে মঙ্গল, শায়ের-এ-কাশ্মীর মহজুর, মাঙ্গেতর।
১৯৭৩: চিমনি কা ধোঁয়া, প্যার কা রিশতা, হিন্দুস্তান কি কসম, হাঁসতে জখম, দামন আউর আগ, গরম হাওয়া।
১৯৭৭: আমানত, জালিয়ানওয়ালা বাগ।
এই তালিকায় কিছু চলচ্চিত্রের নামের বানান প্রচলিত হিন্দি নামের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ অনুসারে লেখা হয়েছে। বিরল ও আঞ্চলিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে মুক্তির বছর ও নামের বানান নির্ভরযোগ্য চলচ্চিত্র-তথ্যসূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
অভিনয়শৈলী ও চলচ্চিত্রে অবদান
বলরাজ সাহনী ছিলেন বাস্তবধর্মী অভিনয়ের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি মনে করতেন, চলচ্চিত্রের প্রধান উদ্দেশ্য শুধু দর্শককে বিনোদন দেওয়া নয়; বরং মানুষের জীবন, সমাজের বৈষম্য এবং মানবিক সম্পর্কের সত্যকে তুলে ধরা। তাঁর অভিনয়ে অতিরঞ্জন ছিল না; বরং সংলাপ, মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতেন।
দো বিঘা জমিন ও গরম হাওয়া চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ভারতীয় নব্যবাস্তববাদী চলচ্চিত্রধারার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সাধারণ মানুষের দুঃখ, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদাকে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
মৃত্যু
১৯৭৩ সালের ১৩ এপ্রিল, নিজের ষাটতম জন্মদিনের কয়েক সপ্তাহ আগে, বলরাজ সাহনী হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগৎ এক অসাধারণ অভিনেতা, সাহিত্যিক ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্বকে হারায়।
তাঁর অভিনয়, সাহিত্যকর্ম, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারা আজও শিল্পী ও দর্শকদের অনুপ্রাণিত করে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন প্রকৃত অভিনেতার সাফল্য শুধু জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানুষের জীবন ও সমাজের গভীর সত্যকে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করার মধ্যেই তাঁর প্রকৃত কৃতিত্ব নিহিত।
বলরাজ সাহনী তাই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কেবল একজন কিংবদন্তি অভিনেতা নন, তিনি মানবিক মূল্যবোধ ও বাস্তবধর্মী শিল্পচর্চার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
কিংবদন্তি অভিনেতা প্রাণসিকান্দ

ভূমিকা
ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খলনায়ক ও চরিত্রাভিনেতা হিসেবে প্রাণ সিকান্দ এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর অভিনয়শৈলী, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি, অভিব্যক্তির বৈচিত্র্য এবং পর্দায় উপস্থিতির অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক অভিনেতাদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিল। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি চলচ্চিত্রজগতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কখনো নিষ্ঠুর খলনায়ক, কখনো রহস্যময় অপরাধী, আবার কখনো স্নেহশীল ও সহানুভূতিশীল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পদ্মভূষণ ও দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হন।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
প্রাণ সিকান্দের পুরো নাম ছিল প্রাণ কৃষণ সিকান্দ। তিনি ১৯২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ শাসিত ভারতের দিল্লির বল্লিমারান অঞ্চলে এক সচ্ছল হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কেওয়াল কৃষণ সিকান্দ। তিনি পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও সরকারি ঠিকাদার ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল রামেশ্বরী। প্রাণ ছিলেন সাত ভাইবোনের একজন।
শৈশব থেকেই প্রাণ পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন। বিশেষ করে গণিত বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট দক্ষতা ছিল। পিতার বদলির চাকরির কারণে তাঁকে বিভিন্ন স্থানে পড়াশোনা করতে হয়। তিনি দেরাদুন, কাপুরথালা, মিরাট এবং উত্তর প্রদেশের উন্নাওয়ের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে উত্তর প্রদেশের রামপুরের হামিদ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ ও অভিনয়জীবনের সূচনা
প্রথম জীবনে প্রাণ পেশাদার ফটোগ্রাফার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই উদ্দেশ্যে তিনি দিল্লির দাস অ্যান্ড কোম্পানিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তাঁর জীবন অন্য পথে এগিয়ে যায়।
শিমলায় অনুষ্ঠিত একটি রামলীলা নাটকে তিনি সীতার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ওই নাটকে রামের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেতা মদন পুরী। এই অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়জীবনের প্রাথমিক প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
১৯৪০ সালে লাহোরে দোকানি ও লেখক ওয়ালি মহম্মদ ওয়ালির সঙ্গে আকস্মিকভাবে তাঁর পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্রেই তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। ডি. ডি. কাশ্যপের সঙ্গে যুক্ত প্রযোজক ডালসুখ এম. পাঞ্চলির পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র যমলা জট-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবন শুরু হয়। মতি বি. গিদওয়ানি পরিচালিত এই ছবিতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন দুর্গা খোটে। শিশু শিল্পী হিসেবে ছবিটিতে ছিলেন নূরজাহান।
১৯৪১ সালে তিনি চৌধুরী অ্যান্ড খাজাঞ্চি ছবিতে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। পরের বছর, ১৯৪২ সালে, এম. পাঞ্চলি তাঁকে খানদান ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ দেন। এটিই ছিল প্রাণের প্রথম হিন্দি চলচ্চিত্র। ছবিটিতে তিনি নূরজাহানের বিপরীতে রোমান্টিক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। তখন নূরজাহানের বয়স ছিল মাত্র পনেরো বছর। উচ্চতার পার্থক্যের কারণে কয়েকটি ক্লোজ-আপ দৃশ্যে তাঁকে ইটের ওপর দাঁড় করিয়ে শুটিং করতে হয়েছিল বলে জানা যায়।
দেশভাগের আগে পরিচালক মতি বি. গিদওয়ানির পরিচালনায় প্রাণ কাইসে কহুঁ (১৯৪৪) এবং খামোশ নিগাহেঁ (১৯৪৬) ছবিতেও অভিনয় করেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে তিনি একাধিক চলচ্চিত্রে কাজ করেন এবং ধীরে ধীরে পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রজগতে পরিচিতি অর্জন করেন।
দেশভাগ ও বোম্বাইয়ে নতুন করে যাত্রা
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের ফলে প্রাণের চলচ্চিত্রজীবনে সাময়িক ছেদ পড়ে। দেশভাগের আগে তাঁর অভিনীত কয়েকটি চলচ্চিত্র ভারতে মুক্তি পেলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলে যায়। তারাশ (১৯৫১) ও খানাবাদোশ (১৯৫২)-এর মতো তাঁর অভিনীত কয়েকটি ছবি পাকিস্তানে মুক্তি পেয়েছিল। ওই ছবিগুলিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন মনোরমা।
পরবর্তীকালে প্রাণ লাহোর ছেড়ে বোম্বাইয়ে চলে আসেন। নতুন শহরে এসে প্রথমদিকে তাঁকে কাজের জন্য যথেষ্ট সংগ্রাম করতে হয়। অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার আগে তিনি প্রায় আট মাস ডেলিমার ও মেরিন ড্রাইভ হোটেলে চাকরি করেছিলেন।
১৯৪৮ সালে লেখক সাদাত হাসান মান্টো এবং অভিনেতা শ্যামের সহায়তায় তিনি বোম্বে টকিজের প্রযোজনায়, শহীদ লতিফ পরিচালিত জিদ্দি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। ছবিটিতে দেব আনন্দ ও কামিনী কৌশলও অভিনয় করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রাণের বোম্বাইয়ের হিন্দি চলচ্চিত্রজগতে নতুন করে প্রতিষ্ঠা লাভের পথ খুলে যায়। একই ছবির মাধ্যমে দেব আনন্দও নায়ক হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
জিদ্দি মুক্তির পরপরই প্রাণ আরও কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের চুক্তি করেন। এগুলির মধ্যে ছিল এস. এম. ইউসুফ পরিচালিত গৃহস্থী (১৯৪৮), যশবন্ত পেঠকর পরিচালিত অপরাধী (১৯৪৯) এবং ওয়ালি মহম্মদ পরিচালিত পুতলি (১৯৪৯)। গৃহস্থী ছবিটি বক্স অফিসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়। এই সাফল্যের পর প্রাণের অভিনয়জীবন ক্রমশ স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
নায়ক থেকে খলনায়ক
প্রাণের চলচ্চিত্রজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি নায়ক ও রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করলেও ১৯৫০-এর দশক থেকে খলনায়ক হিসেবে তাঁর পরিচিতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পর্দায় তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং চরিত্র অনুযায়ী পোশাক ও অভিব্যক্তি পরিবর্তনের ক্ষমতা তাঁকে একজন অসাধারণ খলনায়কে পরিণত করে।
বড়ি বেহেন (১৯৪৯) এবং জিদ্দি (১৯৪৮)-এর মতো ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনীত খলচরিত্র দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলতে থাকে। তাঁর চরিত্রগুলো এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, অনেক দর্শক বাস্তব জীবনেও তাঁকে পর্দার নিষ্ঠুর খলনায়কের সঙ্গে এক করে দেখতেন। এমনকি কথিত আছে, কোনো কোনো অভিভাবক সন্তানের নাম ‘প্রাণ’ রাখতেও দ্বিধা করতেন। চলচ্চিত্রজগতের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘প্রাণ সাহেব’ বলে সম্বোধন করতেন।
তাঁর সংলাপে ব্যবহৃত ‘বরখুরদার’ শব্দটি বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। একইভাবে তাঁর ধূমপানের ধোঁয়া দিয়ে বলয় তৈরির ভঙ্গিও পরবর্তী ছবিগুলিতে এক ধরনের স্বাক্ষর হয়ে ওঠে।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে দিলীপ কুমার, দেব আনন্দ এবং রাজ কাপুরের মতো জনপ্রিয় নায়কদের বিপরীতে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য প্রাণ নিয়মিতভাবে প্রস্তাব পেতেন। এম. ভি. রমন, নানাভাই ভাট, কালিদাস, রবীন্দ্র দাভে, আই. এস. জোহর ও বিমল রায়ের মতো পরিচালক তাঁকে বিভিন্ন নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন। পরবর্তী দশকগুলিতেও এ. ভীম সিং, শক্তি সামন্ত, নাসির হুসেন এবং অন্যান্য বিশিষ্ট পরিচালকের ছবিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অভিনয়ের বহুমুখিতা ও উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
প্রাণ কেবল খলনায়ক হিসেবেই সফল ছিলেন না; বরং বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের অসাধারণ দক্ষতার জন্যও তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে মধুমতী (১৯৫৮), জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় (১৯৬০), শহীদ (১৯৬৫), উপকার (১৯৬৭), রাম অউর শ্যাম (১৯৬৭), আঁসু বন গয়ে ফুল (১৯৬৯), পূরব অউর পশ্চিম (১৯৭০), জনি মেরা নাম (১৯৭০), ভিক্টোরিয়া নম্বর ২০৩ (১৯৭২), বে-ইমান (১৯৭২), জঞ্জির (১৯৭৩), অমর আকবর অ্যান্টনি (১৯৭৭), ডন (১৯৭৮) এবং দুনিয়া (১৯৮৪)।
দিলীপ কুমারের সঙ্গে আজাদ (১৯৫৫), দেবদাস (১৯৫৫), মধুমতী (১৯৫৮), দিল দিয়া দর্দ লিয়া (১৯৬৬), রাম অউর শ্যাম (১৯৬৭) ও আদমি (১৯৬৮)-তে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। দেব আনন্দের সঙ্গে জিদ্দি (১৯৪৮), মুনিমজি (১৯৫৫), অমরদীপ (১৯৫৮) এবং জব পেয়ার কিসি সে হোতা হ্যায় (১৯৬১)-এর মতো ছবিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন।
রাজ কাপুর অভিনীত আহ (১৯৫৩), চোরি চোরি (১৯৫৬), জাগতে রহো (১৯৫৬), ছলিয়া (১৯৬০) এবং জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় (১৯৬০)-তেও প্রাণের অভিনয় উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক, সামাজিক, রোমান্টিক ও অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রে তাঁর স্বচ্ছন্দ অভিনয় প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রে সীমাবদ্ধ ছিলেন না।
সিন্দবাদ দ্য সেইলর (১৯৫৬) ও ডটার অব সিন্দবাদ (১৯৫৮)-এ তিনি জলদস্যুর চরিত্রে অভিনয় করেন। আন (১৯৫২) ও রাজ তিলক (১৯৫৮)-এর মতো ঐতিহাসিক ছবিতেও তাঁর উপস্থিতি ছিল স্মরণীয়। অন্যদিকে মুনিমজি (১৯৫৫) ও আশা (১৯৫৭)-এর মতো ছবিতে তিনি তুলনামূলক হালকা মেজাজের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন।
১৯৬০-এর দশকে প্রাণের অভিনয়ে নেতিবাচক চরিত্রের মধ্যেও হাস্যরসের উপাদান দেখা যায়। পূজা কে ফুল ও কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪)-এর মতো ছবিতে তিনি চরিত্রের একাধিক দিক তুলে ধরতে সক্ষম হন। বয়সে প্রবীণ হয়েও শাম্মী কাপুর, জয় মুখার্জি, রাজেন্দ্র কুমার ও ধর্মেন্দ্রের মতো তরুণ নায়কদের বিপরীতে তিনি সাবলীলভাবে অভিনয় করেছেন।
‘উপকার’ ও মালং চাচার স্মরণীয় চরিত্র
প্রাণের অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে মনোজ কুমার পরিচালিত উপকার (১৯৬৭) ছবিতে। এই চলচ্চিত্রে তিনি মালং চাচার ভূমিকায় অভিনয় করেন। প্রচলিত খলনায়ক-ভাবমূর্তির বাইরে এসে তাঁর অভিনীত চরিত্রটি দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করে যে, প্রাণ কেবল নেতিবাচক চরিত্রেই নয়, মানবিক ও সহানুভূতিশীল চরিত্রেও সমান দক্ষ।
ছবিটিতে কল্যাণজি-আনন্দজির সুরে ‘কসমে, ওয়াদে, প্যার, ওয়াফা’ গানটি তাঁর অভিনয়ের সঙ্গে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়। উপকার-এর জন্য তিনি প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর মনোজ কুমারের পূরব অউর পশ্চিম (১৯৭০) এবং বে-ইমান (১৯৭২)-এর মতো চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেন।
প্রাণের অভিনয়জীবনে বাংলা চলচ্চিত্রেরও একটি অধ্যায় রয়েছে। তিনি অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত বাংলা ছবি সোনাই দীঘি-তে অভিনয় করেন। ছবিটিতে জয় মুখার্জি তাঁর বিপরীতে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে এটি ছিল প্রাণের উল্লেখযোগ্য পদার্পণ।
কিশোর কুমার, মেহমুদ ও অন্যান্য অভিনেতার সঙ্গে কাজ
প্রাণ বিভিন্ন প্রজন্মের বহু অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন। কিশোর কুমার ও মেহমুদের সঙ্গে তাঁর অভিনীত ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে চম চমা চম (১৯৫২), আশা (১৯৫৭), বেওকুফ (১৯৬০), হাফ টিকিট (১৯৬২), মন-মৌজি (১৯৬২), সাধু অউর শয়তান (১৯৬৮) এবং লাখোঁ মে এক (১৯৭১)।
অশোক কুমারের সঙ্গে প্রাণের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আফসানা দিয়ে শুরু করে ১৯৫১ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে তাঁরা বহু চলচ্চিত্রে একসঙ্গে অভিনয় করেন। তাঁদের উল্লেখযোগ্য যৌথ কাজের মধ্যে রয়েছে মিস্টার এক্স (১৯৫৭), অধিকার (১৯৭১), ভিক্টোরিয়া নম্বর ২০৩ (১৯৭২), চোরি মেরা কাম (১৯৭৫) এবং রাজা অউর রাঙ্ক (১৯৮৪)।
দেব আনন্দের সঙ্গে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা ১৯৪৮ সালে হলেও পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তাঁদের একসঙ্গে দেখা গেছে। জনি মেরা নাম (১৯৭০), ইয়ে গুলিস্তাঁ হামারা (১৯৭২), জোশিলা (১৯৭৩), ওয়ারেন্ট (১৯৭৫) এবং দেশ পরদেশ (১৯৭৮)-এ তাঁরা একসঙ্গে অভিনয় করেন।
অমিতাভ বচ্চনের অভিনয়জীবনেও প্রাণের বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৯৭৩ সালে জঞ্জির ছবিতে বিজয়ের চরিত্রে অমিতাভ বচ্চনকে নেওয়ার জন্য তিনি পরিচালক-প্রযোজক প্রকাশ মেহরাকে সুপারিশ করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে জঞ্জির, ডন (১৯৭৮), অমর আকবর অ্যান্টনি (১৯৭৭), দাস্তান (১৯৮০), নসিব (১৯৮১) এবং শরাবি (১৯৮৪)-এর মতো ছবিতে প্রাণ অভিনয় করেন। তাঁদের পর্দার রসায়ন দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল।
পারিশ্রমিক, জনপ্রিয়তা ও অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা
১৯৬৯ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে প্রাণ হিন্দি চলচ্চিত্রজগতের সর্বাধিক পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতাদের একজন ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। খলনায়ক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক ছিল যে, অনেক সময় নায়কের মতোই তাঁর উপস্থিতি ছবির আকর্ষণ বাড়িয়ে দিত।
১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে তিনি মর্যাদা (১৯৭১), নয়া জামানা, জওয়ান মুহাব্বত, আন বান, রূপ তেরা মস্তানা, গাদ্দার, রাহু কেতু, অন্ধা কানুন (১৯৮৩), দুনিয়া (১৯৮৪), ইনসাফ কৌন করেগা, দুর্গা, বেওয়াফাই এবং আজাদ দেশ কে গুলাম-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন। খুন কা রিশতা, ইনসাফ ও জঙ্গল মে মঙ্গল-এ তিনি দ্বৈত চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন।
১৯৯১ সালে তিনি লক্ষ্মণ রেখা নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। ছবিটিতে তিনি কিষাণলাল শর্মার চরিত্রে অভিনয় করেন।
শেষ জীবনের অভিনয়
১৯৯০-এর দশকে অমিতাভ বচ্চনের চলচ্চিত্রজীবনে যখন কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, তখন তাঁর হোম প্রোডাকশনের ছবি তেরে মেরে স্বপ্নে (১৯৯৬) এবং মৃত্যুদাতা (১৯৯৭)-তে অভিনয়ের জন্য প্রাণকে অনুরোধ করা হয়। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি এই ছবিগুলিতে অভিনয় করেন।
১৯৯৮ সালে ৭৮ বছর বয়সে প্রাণ হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরবর্তী সময়ে বার্ধক্যজনিত সমস্যার কারণে তিনি অনেক চলচ্চিত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবুও ২০০০-এর দশকে কয়েকটি ছবিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে উপস্থিত হন। শারীরিক অসুবিধা সত্ত্বেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও নিষ্ঠা ছিল প্রশংসনীয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য প্রাণ জীবদ্দশায় বহু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। তাঁর অভিনয় প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি তিনবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে সম্মানিত হন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননাগুলি হলো—
১. ১৯৬৭: উপকার ছবিতে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার—সেরা পার্শ্ব অভিনেতা।
২. ১৯৬৯: আঁসু বন গয়ে ফুল ছবিতে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার—সেরা পার্শ্ব অভিনেতা।
৩. ১৯৭২: বে-ইমান ছবিতে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার—সেরা পার্শ্ব অভিনেতা।
৪. ১৯৯৭: ফিল্মফেয়ার বিশেষ পুরস্কার।
৫. ২০০০: স্টার স্ক্রিন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার, জি সিনে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার এবং স্টারডাস্টের ‘ভিলেন অব দ্য মিলেনিয়াম’ সম্মান।
৬. ২০০১: ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণ সম্মান।
৭. ২০১০: দাদাসাহেব ফালকে অ্যাকাডেমির ‘ফালকে আইকন অ্যান্ড লেজেন্ডারি ভার্সেটাইল সিনেমা স্টার’ সম্মান।
৮. ২০১৩: ভারতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।
এ ছাড়া বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, বোম্বে ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড এবং পাঞ্জাব কলা সংগমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁকে অভিনয়ের জন্য সম্মানিত করে। ১৯৭২-৭৩ সালে চিত্রলোক সিনে সার্কেল তাঁকে সেরা চরিত্রাভিনেতার পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৮৪ সালে তিনি ‘অভিনয় সম্রাট’ সম্মান লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে পাঞ্জাব কলা সংগম তাঁকে ‘কলা ভূষণ’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৯০ সালে তিনি ‘কলা রতন’ সম্মান অর্জন করেন। চলচ্চিত্রজগতে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে আরও বহু পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান করা হয়।
বে-ইমান ছবির জন্য ১৯৭৩ সালে পুরস্কার গ্রহণের সময় প্রাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ জানান বলে জানা যায়। তাঁর মতে, ওই বছরের সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কারটি পাকিজা ছবির সংগীত পরিচালক গুলাম মহম্মদকে দেওয়া উচিত ছিল, বে-ইমান-এর সংগীত পরিচালক শংকর-জয়কিশনকে নয়। এই ঘটনার মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধার পরিচয় পাওয়া যায়।
২০১৩ সালের এপ্রিলে ভারত সরকার প্রাণকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রদানের কথা ঘোষণা করে। ৬০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে ভারতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মান প্রদান করা হয়। অমিতাভ বচ্চনসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁকে অভিনন্দন জানান। অমিতাভ বচ্চন তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবন
প্রাণ ১৯৪৫ সালে শুক্লা আহলুওয়ালিয়ার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই পুত্র—অরবিন্দ ও সুনীল সিকান্দ এবং এক কন্যা—পিঙ্কি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পাশাপাশি তিনি পারিবারিক জীবনও অতিবাহিত করেন। চলচ্চিত্রজগতের বহু শিল্পীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক ছিল।
মৃত্যু
জীবনের শেষ পর্যায়ে প্রাণ বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০১৩ সালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে কয়েকবার মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০১৩ সালের ১২ জুলাই, ৯৩ বছর বয়সে, মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর মৃত্যুসংবাদে চলচ্চিত্রজগতে শোকের ছায়া নেমে আসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তাঁকে একজন আইকন হিসেবে অভিহিত করেন। অমিতাভ বচ্চনও শোক প্রকাশ করে প্রাণকে ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের এক দুর্দান্ত স্তম্ভ বলে উল্লেখ করেন।
উপসংহার
প্রাণ সিকান্দ ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যিনি খলনায়কের সংজ্ঞাকেই নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো কেবল ভয় বা ঘৃণার উদ্রেক করত না; বরং চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিত্ব ও আচরণের সূক্ষ্ম দিকগুলোও দর্শকের সামনে তুলে ধরত। তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন দক্ষ অভিনেতা নেতিবাচক চরিত্রেও অসাধারণ শিল্পসৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারেন।
নায়ক, খলনায়ক, চরিত্রাভিনেতা কিংবা সহানুভূতিশীল ব্যক্তিত্ব—প্রতিটি ভূমিকাতেই প্রাণ নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, অভিনয়ের বৈচিত্র্য এবং অসামান্য জনপ্রিয়তা তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর অভিনীত বহু চরিত্র আজও দর্শকদের স্মৃতিতে জীবন্ত। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রাণ সিকান্দের নাম তাই চিরকাল শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমার

জন্ম ও শৈশব
হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমার ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মুহাম্মদ ইউসুফ খান। অভিনয়ের অসাধারণ দক্ষতা, সংলাপ পরিবেশনের স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। আবেগঘন চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের কারণে তাঁকে ‘ট্র্যাজেডি কিং’ বা ‘বেদনাবিধুর চরিত্রের সম্রাট’ বলা হতো।
দিলীপ কুমারের জন্ম ১৯২২ সালের ১১ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ারের ঐতিহাসিক কিসা খাওয়ানি বাজার এলাকায়। তাঁর পিতার নাম লালা গোলাম সরোয়ার খান এবং মাতার নাম আয়েশা বেগম। তিনি ছিলেন তাঁদের বারো সন্তানের একজন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ভূস্বামী ও ফলের ব্যবসায়ী। পেশোয়ার এবং মহারাষ্ট্রের দেওলালিতে তাঁদের ফলের বাগান ছিল।
দিলীপ কুমারের শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছিল মহারাষ্ট্রের নাশিকের কাছে দেওলালিতে। সেখানে তিনি বার্নস স্কুলে পড়াশোনা করেন। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। পরবর্তী জীবনে ভারতীয় চলচ্চিত্রের আরেক কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ কাপুরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাঁরা দুজনেই পেশোয়ারের মানুষ ছিলেন এবং পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র জগতে সমসাময়িক দুই মহান শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের সূচনা
১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে পারিবারিক মতবিরোধের কারণে দিলীপ কুমার বাড়ি ছেড়ে মহারাষ্ট্রের পুনেতে চলে যান। সেখানে কয়েকজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও পারসি ব্যবসায়ীর সহায়তায় তিনি একটি ক্যান্টিন ঠিকাদারের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং লেখার যোগ্যতা দেখে ঠিকাদার তাঁকে সেনা-অফিসারদের একটি ক্লাবের কাছে স্যান্ডউইচের দোকান চালানোর সুযোগ দেন।
এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে সক্ষম হন। পরে সেই অর্থ নিয়ে পরিবারের আর্থিক দায়িত্বে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে বোম্বে—বর্তমান মুম্বাই—ফিরে আসেন।
বোম্বেতে তাঁর পরিচয় হয় চিকিৎসক ও চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ডা. মাসানির সঙ্গে। তাঁর পরামর্শে দিলীপ কুমার মালাডে অবস্থিত বোম্বে টকিজ স্টুডিওতে যান। সেখানে স্টুডিওর অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ও অভিনেত্রী দেবিকা রানির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। দেবিকা রানি তাঁর প্রতিভা উপলব্ধি করে মাসিক ১,২৫০ টাকা বেতনে তাঁকে বোম্বে টকিজে কাজের সুযোগ দেন।
এরপর দিলীপ কুমারের পরিচয় হয় অভিনেতা অশোক কুমারের সঙ্গে। অশোক কুমারের অভিনয় তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে, দিলীপ কুমারের স্বাভাবিক অভিনয়শৈলী ও ভাষাগত দক্ষতাও চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। উর্দু ভাষায় তাঁর অসাধারণ দক্ষতার কারণে তিনি প্রথমদিকে চিত্রনাট্য ও গল্প রচনার কাজেও সহযোগিতা করেছিলেন।
দেবিকা রানির পরামর্শেই তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘দিলীপ কুমার’ রাখেন। এই নামেই তিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
১৯৪৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জোয়ার ভাটা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা হয়। যদিও ছবিটি তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারেনি, তবু এটি ছিল তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় চলচ্চিত্রজীবনের প্রথম পদক্ষেপ।
১৯৪৭ সালে অভিনেত্রী নূরজাহানের সঙ্গে জুগনু চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়। এরপর শহীদ ও মেলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
১৯৪৯ সালে মেহবুব খানের পরিচালনায় আন্দাজ চলচ্চিত্রে রাজ কাপুর ও নার্গিসের সঙ্গে অভিনয় করেন। ছবিটি ছিল তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। একই বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত শবনম চলচ্চিত্রও দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল।
‘ট্র্যাজেডি কিং’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা
১৯৫০-এর দশক ছিল দিলীপ কুমারের অভিনয়জীবনের স্বর্ণযুগ। এই সময়ে তিনি একের পর এক স্মরণীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। জোগন (১৯৫০), বাবুল (১৯৫০), হলচল (১৯৫১), দিদার (১৯৫১), তরানা (১৯৫১), দাগ (১৯৫২), সংদিল (১৯৫২), শিকস্ত (১৯৫৩), অমর (১৯৫৪), উড়ন খাটোলা (১৯৫৫), ইনসানিয়াত (১৯৫৫), দেবদাস (১৯৫৫), নয়া দৌড় (১৯৫৭), ইহুদি (১৯৫৮) এবং পৈগাম (১৯৫৯) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে।
বিশেষত দেবদাস চলচ্চিত্রে তাঁর মর্মস্পর্শী অভিনয় তাঁকে ‘ট্র্যাজেডি কিং’ উপাধিতে প্রতিষ্ঠিত করে। দুঃখ, বেদনা, প্রেমের ব্যর্থতা ও মানসিক দ্বন্দ্বকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ।
তবে একের পর এক বিষাদময় চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি তুলনামূলকভাবে হালকা ও হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করেন।
১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আজাদ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কোহিনূর চলচ্চিত্রে রাজকুমারের চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন। এই ছবিতে তাঁর অভিনয়ের অন্য একটি দিক দর্শকদের সামনে উন্মোচিত হয়।
মুঘল-ই-আজম এবং অভিনয় জীবনের শিখর
১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কে. আসিফ পরিচালিত ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র মুঘল-ই-আজম দিলীপ কুমারের অভিনয়জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এতে তিনি মোগল যুবরাজ সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর বিপরীতে অনারকলির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মধুবালা।
রাজকীয় ব্যক্তিত্ব, প্রেমের আবেগ, পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং আত্মমর্যাদার দ্বন্দ্ব—সবকিছুই তিনি অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ছবিটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘকাল ধরে এটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বাধিক ব্যবসাসফল ছবিগুলোর একটি ছিল।
ছবিটি প্রথমে সাদা-কালোয় নির্মিত হলেও পরবর্তীকালে এর উল্লেখযোগ্য অংশ রঙিন করা হয়। ২০০৪ সালে রঙিন সংস্করণটি পুনরায় মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটির জনপ্রিয়তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অটুট রয়েছে।
দিলীপ কুমারই প্রথম অভিনেতা, যিনি দাগ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তীকালে তিনি আরও সাতবার এই পুরস্কার লাভ করেন। ফলে মোট আটবার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার জিতে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন।
১৯৫০-এর দশকে বৈজয়ন্তীমালা, মধুবালা, নার্গিস, নিম্মি, মীনা কুমারী ও কামিনী কৌশলের মতো প্রতিভাবান অভিনেত্রীদের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর অভিনীত বহু চলচ্চিত্র সেই দশকের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সাফল্যের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। সে সময় তিনি ছিলেন হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতা।
গঙ্গা যমুনা ও নতুন ধরনের অভিনয়
১৯৬১ সালে দিলীপ কুমার নিজে প্রযোজনা করেন গঙ্গা যমুনা চলচ্চিত্রটি। এতে তিনি গঙ্গা নামের এক গ্রামীণ যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর বিপরীতে ছিলেন বৈজয়ন্তীমালা এবং তাঁর ছোট ভাই নাসির খানও ছবিতে অভিনয় করেন।
ছবিটির কাহিনি, গ্রামীণ সমাজের বাস্তবতা, ভাষার ব্যবহার এবং চরিত্রগুলোর সামাজিক দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। চলচ্চিত্রটি ভারতীয় সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও দিলীপ কুমারের দক্ষতা এই ছবিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৬২ সালে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ডেভিড লিন তাঁকে লরেন্স অব অ্যারাবিয়া চলচ্চিত্রে শরিফ আলির চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু দিলীপ কুমার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। শেষ পর্যন্ত চরিত্রটিতে অভিনয় করেন মিশরীয় অভিনেতা ওমর শরিফ।
১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত লিডার প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ১৯৬৬ সালে তিনি দিল দিয়া দিল লিয়া চলচ্চিত্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন, যদিও পরিচালক হিসেবে তিনি অভিনয়জীবনের মতো প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেননি।
১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রাম অউর শ্যাম চলচ্চিত্রে তিনি দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। দুই যমজ ভাইয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং তাঁর অভিনয়প্রতিভার বহুমুখিতা প্রমাণ করে।
১৯৬৮ সালে তিনি আদমি চলচ্চিত্রে মনোজ কুমার ও ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে অভিনয় করেন। একই বছরে বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে সংঘর্ষ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। তাঁদের জুটি দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। একাধিক সফল ছবিতে একসঙ্গে অভিনয়ের ফলে তাঁদের জুটি হিন্দি চলচ্চিত্রের স্মরণীয় জুটিগুলোর মধ্যে স্থান পায়।
সত্তরের দশক: কিছুটা মন্দা
১৯৭০-এর দশকে দিলীপ কুমারের অভিনয়জীবনে কিছুটা মন্দা দেখা দেয়। দাস্তান চলচ্চিত্রটি প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তবে এই সময়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
১৯৭০ সালে তিনি স্ত্রী সায়রা বানুর সঙ্গে গোপী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। একই বছরে বাংলা চলচ্চিত্র সাগিনা মাহাতো-তে তাঁদের জুটি দর্শকদের সামনে আসে। ১৯৭৪ সালে একই কাহিনি অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় সাগিনা নির্মিত হয়।
১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বৈরাগ চলচ্চিত্রে তিনি তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেন—একজন পিতা এবং তাঁর দুই পুত্র। অভিনয়ের দিক থেকে এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াস। তবে ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি।
রাম অউর শ্যাম-এ ভীতু রামের চরিত্রে তাঁর অভিনয় যেমন প্রশংসিত হয়েছিল, তেমনি বৈরাগ-এও তিনি নিজের অভিনয়ক্ষমতার ভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এই সময়ে রাজেশ খান্না ও সঞ্জীব কুমারের মতো অভিনেতাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিলীপ কুমার বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ হারিয়েছিলেন বলে চলচ্চিত্রমহলে আলোচনা রয়েছে। তবু তাঁর অভিনয়প্রতিভা ও দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কখনো সম্পূর্ণ ম্লান হয়ে যায়নি।
আশির দশকে প্রত্যাবর্তন
১৯৮১ সালে ক্রান্তি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দিলীপ কুমার আবার সাফল্যের সঙ্গে বড় পর্দায় ফিরে আসেন। মনোজ কুমারের পরিচালনায় নির্মিত এই দেশাত্মবোধক ছবিতে তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মনোজ কুমার, শশী কাপুর, হেমা মালিনী ও শত্রুঘ্ন সিনহার মতো জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী। ছবিটি সে বছরের অন্যতম সফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়।
১৯৮২ সালে সুভাষ ঘাই পরিচালিত বিধাতা চলচ্চিত্রে সঞ্জয় দত্ত, সঞ্জীব কুমার ও শাম্মী কাপুরের সঙ্গে অভিনয় করেন। একই বছর রমেশ সিপ্পি পরিচালিত শক্তি চলচ্চিত্রে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। পিতা ও পুত্রের সম্পর্ক, কর্তব্যবোধ এবং আবেগের সংঘাতকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটিতে দুই প্রজন্মের দুই শক্তিশালী অভিনেতার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। এই ছবির জন্য দিলীপ কুমার তাঁর অষ্টম ও শেষ ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৮৪ সালে যশ চোপড়া পরিচালিত মশাল চলচ্চিত্রে অনিল কাপুরের সঙ্গে অভিনয় করেন। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। একই বছরে দুনিয়া চলচ্চিত্রে ঋষি কাপুরের সঙ্গে এবং ১৯৮৬ সালে ধর্ম অধিকারী চলচ্চিত্রে জিতেন্দ্রর সঙ্গে অভিনয় করেন।
১৯৮৬ সালে সুভাষ ঘাই পরিচালিত কর্মা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন প্রবীণ অভিনেত্রী নূতন। তাঁদের অভিনয় দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হয়। এর আগে শিকওয়া নামে একটি অসমাপ্ত চলচ্চিত্রেও তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে কানুন আপনা আপনা চলচ্চিত্রে আবার নূতনের সঙ্গে অভিনয় করেন।
নব্বইয়ের দশক ও শেষ চলচ্চিত্র
১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সুভাষ ঘাই পরিচালিত সওদাগর চলচ্চিত্রে দিলীপ কুমার ও রাজ কুমার দীর্ঘ বিরতির পর আবার একসঙ্গে অভিনয় করেন। ১৯৫৯ সালের পৈগাম চলচ্চিত্রের পর এটিই ছিল তাঁদের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য যৌথ অভিনয়। দুই প্রবীণ অভিনেতার শক্তিশালী অভিনয় ছবিটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে। সওদাগর বাণিজ্যিকভাবেও সফল হয়।
চলচ্চিত্রজগতে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৯৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কিলা ছিল তাঁর শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। ছবিটি প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে তাঁকে অভিনয়ের জন্য বিবেচনা করা হলেও সেগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৯০ সালে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া আগ কা দরিয়া চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। একইভাবে মাদার ল্যান্ড নামে অমিতাভ বচ্চন ও শাহরুখ খানের সঙ্গে তাঁর অভিনয়ের একটি পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।
ব্যক্তিগত জীবন ও প্রেম
দিলীপ কুমারের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর অভিনয়জীবনের মতোই বহু আলোচনার বিষয় ছিল। মুঘল-ই-আজম চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করার সময় মধুবালার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁদের সম্পর্ক প্রায় সাত বছর স্থায়ী হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু নয়া দৌড় চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে আইনি বিরোধের সময় মধুবালা ও তাঁর পিতার বিরুদ্ধে দিলীপ কুমারের সাক্ষ্য দেওয়ার ঘটনায় তাঁদের সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। মুঘল-ই-আজম-এর পর তাঁরা আর একসঙ্গে অভিনয় করেননি।
বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক নিয়ে সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় নানা আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রচারিত সব খবরের সত্যতা নিশ্চিত নয়। বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে তাঁর একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র রয়েছে।
১৯৬৬ সালে দিলীপ কুমার নিজের চেয়ে প্রায় ২২ বছরের ছোট অভিনেত্রী সায়রা বানুকে বিয়ে করেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সায়রা বানু তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর পাশে ছিলেন।
১৯৮১ সালে তিনি আসমা সাহিবা নামে এক মহিলাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই সম্পর্ক ১৯৮৩ সালে শেষ হয়।
দিলীপ কুমার ও সায়রা বানুর কোনো সন্তান ছিল না। দিলীপ কুমারের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে তাঁদের সন্তান ধারণসংক্রান্ত একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভাষাজ্ঞান ও পারিবারিক জীবন
দিলীপ কুমার বহুভাষায় দক্ষ ছিলেন। হিন্দি, উর্দু, হিন্দকো, পাঞ্জাবি, ইংরেজি, মারাঠি এবং আরও কয়েকটি ভাষায় তিনি কথা বলতে পারতেন। ভাষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ অভিনয় ও সংলাপ পরিবেশনায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।
তাঁর ছোট ভাই নাসির খানও একজন অভিনেতা ছিলেন। নাসির খান ১৯৭৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর দুই ভাই আসলাম খান ও এহসান খান ২০২০ সালে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
দিলীপ কুমার জীবনের শেষ পর্যায়ে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় স্ত্রী সায়রা বানুর সঙ্গে বসবাস করতেন।
রাজনীতি ও সমাজসেবা
দিলীপ কুমার শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না, সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন দাতব্য উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন।
২০০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মনোনীত সদস্য হিসেবে রাজ্যসভায় দায়িত্ব পালন করেন। সমাজের উন্নয়ন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য তিনি তাঁর সাংসদ তহবিলের অর্থও ব্যয় করেছিলেন।
সমাজসেবামূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনি অভিনেতা সুনীল দত্তসহ কয়েকজনের সঙ্গে মুম্বাইয়ের জগার্স পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। বান্দ্রার ব্যান্ডস্ট্যান্ড প্রমেনেড ও সংলগ্ন উদ্যানের উন্নয়নেও তিনি সাংসদ তহবিলের অর্থ ব্যয় করেছিলেন বলে জানা যায়।
১৯৬০ সালে আফগান নেতা খান আবদুল গফ্ফার খান চেন্নাইয়ের মীনামবাক্কম বিমানবন্দরে পৌঁছালে দিলীপ কুমার তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এই ঘটনা তাঁর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য দিলীপ কুমার দেশ-বিদেশে বহু সম্মাননা অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার: মোট আটবার এই পুরস্কার লাভ করেন।
- পদ্মভূষণ: ১৯৯১ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত করে।
- এন. টি. আর. জাতীয় পুরস্কার: ১৯৯৭ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার তাঁকে এই সম্মান প্রদান করে।
- নিশান-ই-ইমতিয়াজ: ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান লাভ করেন।
- ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার: চলচ্চিত্রজগতে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার অর্জন করেন।
- পদ্মবিভূষণ: ২০১৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত করে।
এ ছাড়াও তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেন।
আত্মজীবনী ও অভিনয়শৈলী
দিলীপ কুমারের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ Dilip Kumar: The Substance and the Shadow ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়। বইটিতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, চলচ্চিত্রজীবনের নানা অভিজ্ঞতা, সহশিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অভিনয় সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। উদয়তারা নায়ার বইটি লিপিবদ্ধ করতে তাঁকে সহযোগিতা করেন। বইটি প্রকাশ করে হে হাউস পাবলিশার্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড।
দিলীপ কুমারের অভিনয়শৈলী ছিল স্বাভাবিক, সংযত এবং গভীর আবেগনির্ভর। তিনি অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গির পরিবর্তে চোখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, বিরতি এবং সংলাপের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতেন। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব ও অন্তর্গত বেদনা বিশেষভাবে প্রকাশ পেত।
তাঁর অভিনয় পরবর্তী প্রজন্মের বহু অভিনেতাকে প্রভাবিত করেছে। শাহরুখ খানসহ অনেক অভিনেতা দিলীপ কুমারকে নিজেদের অভিনয়জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাস্তবধর্মী অভিনয়ের বিকাশে তাঁর অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়াণ
দীর্ঘ ও গৌরবময় অভিনয়জীবনের অধিকারী দিলীপ কুমার ২০২১ সালের ৭ জুলাই মুম্বাইয়ে ৯৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগৎ এক অসামান্য শিল্পীকে হারায়।
তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন অভিনয়শিল্পের এক প্রতিষ্ঠান। তাঁর অভিনীত দেবদাস, মুঘল-ই-আজম, গঙ্গা যমুনা, রাম অউর শ্যাম, ক্রান্তি, শক্তি এবং সওদাগর প্রভৃতি চলচ্চিত্র ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দিলীপ কুমারের শিল্পীসত্তা, অভিনয়প্রতিভা এবং চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান তাঁকে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতার মর্যাদা দিয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ধরন বদলেছে, নতুন নতুন অভিনেতার আবির্ভাব ঘটেছে, কিন্তু দিলীপ কুমারের অভিনয়ের আবেদন আজও অমলিন। কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমার ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
অভিনেতা দেব আনন্দ
হিন্দি চলচ্চিত্রের চিরসবুজ কিংবদন্তি
দেব আনন্দ ছিলেন ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের একজন কিংবদন্তি অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক। তাঁর স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী, দ্রুত কথা বলার ভঙ্গি, প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, রোমান্টিক উপস্থিতি এবং চিরসবুজ তারকাখ্যাতি তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে। প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা, প্রযোজনা ও চিত্রনাট্য রচনাতেও তিনি নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
জন্ম ও শৈশব
দেব আনন্দের জন্ম ১৯২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার শকরগড় তহসিলে। তাঁর পিতা পিশোরিলাল আনন্দ পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে দেব আনন্দ ছিলেন তৃতীয়। তাঁর বড় ভাই মনমোহন আনন্দ গুরুদাসপুরে আইনজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মেজো ভাই ছিলেন চেতন আনন্দ এবং ছোট ভাই বিজয় আনন্দ, যিনি চলচ্চিত্র জগতে গোল্ডি আনন্দ নামেও পরিচিত ছিলেন।
তাঁর বোন শীলকান্তা কাপুর ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক শেখর কাপুরের মা।
দেব আনন্দ ডালহৌসির সেক্রেড হার্ট স্কুলে ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর ধর্মশালার সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে লাহোরের সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের সূচনা
স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর দেব আনন্দ কর্মসংস্থানের সন্ধানে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) চলে আসেন। সেখানে তিনি চার্চগেটের একটি সামরিক সেন্সর অফিসে মাসিক ৬৫ টাকা বেতনে কেরানি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে একই প্রতিষ্ঠানে হিসাব বিভাগের কেরানি হিসেবে মাসিক ৮৫ টাকা বেতনে কাজ করেন।
তবে তাঁর মনে ছিল অভিনয়শিল্পী হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন অভিনেতা অশোক কুমারের ‘অচ্যুত কন্যা’ ও ‘কিসমত’ চলচ্চিত্র দেখে।
দেব আনন্দ এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, প্রথমবার প্রভাত ফিল্ম স্টুডিওর অফিসে প্রবেশ করার সময় বাবুরাও পাই তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পরে বাবুরাও পাই জানিয়েছিলেন, দেব আনন্দের হাসি, সুন্দর চোখ এবং প্রবল আত্মবিশ্বাস তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
দেব আনন্দ তাঁর বড় ভাই চেতন আনন্দকে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন বা ইপ্টার সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত করেছিলেন। এই সময় থেকেই দুই ভাইয়ের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে।
১৯৪৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাম এক হ্যায়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেব আনন্দের অভিনয়জীবনের সূচনা হয়। চলচ্চিত্রটিতে তিনি কমলা কোটনিসের বিপরীতে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটির মূল বক্তব্য ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য। এই ছবির শুটিংয়ের সময়ই তাঁর সঙ্গে অভিনেতা ও পরিচালক গুরু দত্তের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
দুই বন্ধু পরস্পরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে যিনি আগে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করবেন, তিনি অন্যজনকে সফল হতে সাহায্য করবেন। তাঁরা আরও স্থির করেছিলেন, দেব আনন্দ চলচ্চিত্র প্রযোজনা করলে গুরু দত্ত পরিচালনা করবেন এবং গুরু দত্ত চলচ্চিত্র প্রযোজনা করলে দেব আনন্দ তাতে অভিনয় করবেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের এই বন্ধুত্ব ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে ওঠে।
সুরাইয়ার সঙ্গে প্রেম
১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে দেব আনন্দের অভিনয়জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। সে সময় তিনি জনপ্রিয় গায়িকা ও অভিনেত্রী সুরাইয়ার সঙ্গে একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। তাঁদের অভিনীত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বিদ্যা’ (১৯৪৮), ‘জিদ্দি’ (১৯৪৯), ‘শায়ের’ (১৯৪৯), ‘আফসার’ (১৯৫০), ‘নিলি’ (১৯৫০), ‘দো সিতারে’ (১৯৫১) এবং ‘সনম’ (১৯৫১)।
এই চলচ্চিত্রগুলির মাধ্যমে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পর্দার বাইরেও তাঁদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রেমে পরিণত হয়।
‘বিদ্যা’ চলচ্চিত্রের ‘কিনারে কিনারে চলে জায়েঙ্গে’ গানটির শুটিংয়ের সময় একটি নৌকায় তাঁদের দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছিল। কথিত আছে, নৌকাটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে দেব আনন্দ সুরাইয়াকে উদ্ধার করেন। এই ঘটনার পর তাঁদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
প্রথমদিকে সুরাইয়ার পরিবারের সদস্যরা দেব আনন্দকে সাদরে গ্রহণ করলেও পরে তাঁদের সম্পর্কের বিরোধিতা শুরু হয়। দেব আনন্দ ছিলেন হিন্দু এবং সুরাইয়া ছিলেন মুসলমান। সুরাইয়ার মাতামহী এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। ফলে তাঁদের বিয়ের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
‘জিত’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় তাঁরা বিয়ের কথা ভেবেছিলেন বলেও জানা যায়। অভিনেত্রী দুর্গা খোটে ও কামিনী কৌশলের সহযোগিতায় তাঁরা চিঠিপত্র আদান-প্রদান করতেন। ‘আফসার’ চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে দেব আনন্দ সুরাইয়াকে একটি হীরার আংটিও উপহার দিয়েছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে।
কিন্তু পারিবারিক বাধার কারণে তাঁদের প্রেম পরিণতি পায়নি। শেষ পর্যন্ত সুরাইয়া দেব আনন্দের সঙ্গে অভিনয় বন্ধ করে দেন। ‘দো সিতারে’ তাঁদের একসঙ্গে অভিনীত শেষ চলচ্চিত্রগুলির অন্যতম। সুরাইয়া পরবর্তী জীবনে অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
দেব আনন্দ বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সুরাইয়ার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্কের কথা অকপটে বলেছেন। ১৯৭২ সালে ‘স্টারডাস্ট’ পত্রিকার জুন সংখ্যায়, ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘স্টার অ্যান্ড স্টাইল’ পত্রিকায় এবং ২০০২ সালে করণ থাপারের সঙ্গে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারেও তিনি এই সম্পর্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। সুরাইয়ার মৃত্যুর পর সিমি গারেওয়ালসহ বিভিন্ন সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর সঙ্গে আলাপচারিতায়ও তিনি তাঁদের প্রেমের স্মৃতি তুলে ধরেন।
‘জিদ্দি’ ও নবকেতন ফিল্মসের প্রতিষ্ঠা
দেব আনন্দের কর্মজীবনে বড় সুযোগ এনে দেন অভিনেতা অশোক কুমার। ১৯৪৮ সালে বোম্বে টকিজের প্রযোজনায় নির্মিত ‘জিদ্দি’ চলচ্চিত্রে তিনি কামিনী কৌশলের বিপরীতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং দেব আনন্দের তারকাখ্যাতি প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।
‘জিদ্দি’ চলচ্চিত্রের সংগীতও বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ছবিটির ‘ইয়ে কৌন আয়া করকে ইয়ে শোলা সিংগার কে’ গানটি লতা মঙ্গেশকর ও কিশোর কুমারের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। কিশোর কুমারের সঙ্গে দেব আনন্দের বন্ধুত্বও এই সময় আরও গভীর হয়।
১৯৪৯ সালে দেব আনন্দ নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘নবকেতন ফিল্মস’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটির নামকরণ করা হয় তাঁর বড় ভাই চেতন আনন্দের ছেলে কেতনের নাম অনুসারে। ‘নবকেতন’ শব্দের অর্থ নতুন পতাকা বা নতুন ব্যানার। পরবর্তী কয়েক দশকে এই সংস্থা ভারতীয় চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
১৯৫০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নিরালা’ চলচ্চিত্রে দেব আনন্দ মধুবালার সঙ্গে অভিনয় করেন। পরবর্তী সময়েও তাঁদের জুটি দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
পঞ্চাশের দশকে সাফল্য
১৯৫১ সালে দেব আনন্দ তাঁর বন্ধু গুরু দত্তকে ‘বাজি’ চলচ্চিত্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন। ছবিটিতে দেব আনন্দ, গীতা বালি ও কল্পনা কার্তিক অভিনয় করেন। ‘বাজি’ হিন্দি চলচ্চিত্রে নগরভিত্তিক অপরাধ ও রহস্যনির্ভর কাহিনির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে গুরু দত্ত পরিচালক হিসেবে এবং কল্পনা কার্তিক নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
এরপর দেব আনন্দ ও কল্পনা কার্তিক একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁদের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে ‘আঁধিয়াঁ’ (১৯৫২), ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ (১৯৫৪), ‘হাউস নম্বর ৪৪’ (১৯৫৫) এবং ‘নৌ দো গ্যায়ারহ’ (১৯৫৭)।
‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময় দেব আনন্দ ও কল্পনা কার্তিকের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের বিয়ে ছিল অনাড়ম্বর। ১৯৫৬ সালে তাঁদের পুত্র সুনীল আনন্দের জন্ম হয়। পরে তাঁদের কন্যা দেবিনার জন্ম হয়। বিয়ের পর কল্পনা কার্তিক চলচ্চিত্রে অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ান।
দেব আনন্দের দ্রুত কথা বলার ভঙ্গি, কথা বলার সময় মাথা ও শরীরের বিশেষ নড়াচড়া এবং স্বতন্ত্র পোশাক-পরিচ্ছদ তাঁকে অন্য অভিনেতাদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। ‘মুনিমজি’ (১৯৫৫), ‘হাউস নম্বর ৪৪’ (১৯৫৫), ‘পকেট মার’ (১৯৫৬), ‘ফানটুশ’ (১৯৫৬), ‘সিআইডি’ (১৯৫৬) এবং ‘পেয়িং গেস্ট’ (১৯৫৭) চলচ্চিত্রগুলি তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়।
পঞ্চাশের দশকে তাঁর অভিনীত ছবিগুলির অধিকাংশই ছিল রহস্য, অপরাধ, রোমান্স ও সামাজিক বিষয়নির্ভর। ‘ফানটুশ’ (১৯৫৬) এবং ‘এক কে বাদ এক’ (১৯৫৯) ছবিতেও তাঁর অভিনয় দর্শকদের আকৃষ্ট করে।
১৯৫৬ সালে ‘সিআইডি’ চলচ্চিত্রে নবাগতা ওয়াহিদা রেহমানের বিপরীতে অভিনয় করেন দেব আনন্দ। পরে তাঁরা ‘সোলহওয়াঁ সাল’ (১৯৫৮), ‘কালা বাজার’ (১৯৬০), ‘বাত এক রাত কি’ (১৯৬২) এবং ‘প্রেম পূজারি’র মতো চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের জুটি দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
১৯৫৫ সালে ‘ইনসানিয়াত’ চলচ্চিত্রে দিলীপ কুমারের সঙ্গে সহ-অভিনেতা হিসেবে কাজ করেন দেব আনন্দ। ১৯৫৮ সালে মধুবালা ও নলিনী জয়ন্তের সঙ্গে অভিনয় করেন ‘কালা পানি’ চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে তাঁর প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন।
যদিও দেব আনন্দ প্রধানত রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন, তবু তিনি বিভিন্ন সময়ে গম্ভীর ও ট্র্যাজিক চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। ‘পকেট মার’ (১৯৫৬), ‘কালা পানি’ (১৯৫৮), ‘বোম্বে কা বাবু’ (১৯৬০) এবং ‘শরাবি’ (১৯৬৪) তার উদাহরণ।
নেতিবাচক চরিত্রেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। ‘জাল’ (১৯৫২) ছবিতে তিনি চোরাচালানকারীর চরিত্রে এবং ‘দুশমন’ (১৯৫৭) চলচ্চিত্রে পলাতক অপরাধী দলের সদস্যের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ‘কালা বাজার’ ছবিতে তিনি কালোবাজারির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
সুরাইয়া ও কল্পনা কার্তিকের পাশাপাশি নূতন, ওয়াহিদা রেহমান এবং অন্যান্য জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গে অভিনয় করেও তিনি দর্শকদের মন জয় করেন। ‘রাহি’ (১৯৫২) ও ‘আঁধিয়াঁ’ (১৯৫২)-এর মতো চলচ্চিত্রও সে সময় আলোচনায় আসে।
পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর ও দেব আনন্দ হিন্দি চলচ্চিত্রের তিন প্রধান পুরুষ তারকা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন।
ষাটের দশকে রোমান্টিক তারকা
ষাটের দশকে দেব আনন্দের রোমান্টিক নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। ‘মঞ্জিল’ ও ‘তেরে ঘর কে সামনে’ চলচ্চিত্রে নূতনের সঙ্গে, ‘কিনারে কিনারে’ ছবিতে মীনা কুমারীর সঙ্গে, ‘মায়া’ ছবিতে মালা সিনহার সঙ্গে এবং ‘আসলি-নকলি’ ছবিতে সাধনা শিবদাসানীর সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি।
এ ছাড়া ‘জব প্যার কিসি সে হোতা হ্যায়’ ও ‘মহল’ ছবিতে আশা পারেখের সঙ্গে এবং ‘তিন দেবিয়াঁ’ ছবিতে কল্পনা, সিমি গারেওয়াল ও নন্দার সঙ্গে অভিনয় করেন। ‘তিন দেবিয়াঁ’ ছবিতে তিনি একজন প্লেবয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাম দোনো’ তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। ছবিতে তিনি সাধনা শিবদাসানীর বিপরীতে অভিনয় করেন এবং দ্বৈত চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। প্রেমে বাধা পেয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এক যুবকের কাহিনিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন জয়দেব। চলচ্চিত্রটি দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
‘গাইড’: অভিনয়জীবনের মাইলফলক
দেব আনন্দের অভিনয়জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘গাইড’। আর. কে. নারায়ণের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি নির্মিত হয়। দেব আনন্দ উপন্যাসটির চলচ্চিত্ররূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন এবং তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন ওয়াহিদা রেহমান। ছবিটি ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায়। হিন্দি সংস্করণটি পরিচালনা করেন তাঁর ছোট ভাই বিজয় আনন্দ। একই সময়ে ইংরেজি সংস্করণও নির্মিত হয়।
‘গাইড’ ছবিতে দেব আনন্দ রাজু নামের এক ভ্রমণ-গাইডের চরিত্রে অভিনয় করেন। রোজি নামের এক নারীর জীবনে স্বাধীনতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে রাজু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু রাজুর নিজের জীবনেও প্রেম, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নৈতিক দ্বন্দ্ব, লোভ ও আত্মত্যাগের জটিলতা দেখা দেয়।
ছবিটিতে দেব আনন্দের অভিনয়, বিজয় আনন্দের পরিচালনা এবং সংগীত বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। ‘গাইড’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
এরপর বিজয় আনন্দ পরিচালিত ‘জুয়েল থিফ’ চলচ্চিত্রেও দেব আনন্দ অভিনয় করেন। বৈজয়ন্তীমালা, তনুজা, অঞ্জু মহেন্দ্রু, ফরিয়াল ও হেলেন অভিনীত এই রহস্য-রোমাঞ্চকর ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়।
১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জনি মেরা নাম’ চলচ্চিত্রে হেমা মালিনীর সঙ্গে অভিনয় করেন দেব আনন্দ। ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং হেমা মালিনীর তারকাখ্যাতি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।
১৯৬৯ সালে তিনি ষষ্ঠ মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।
সত্তরের দশকে নতুন ধারার চলচ্চিত্র
দেব আনন্দ কেবল অভিনেতা ছিলেন না; তিনি সময়ের পরিবর্তন ও নতুন সামাজিক প্রবণতাকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরতেও আগ্রহী ছিলেন। ‘প্রেম পূজারি’ এবং ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।
১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ ছবিটি নেপালের কাঠমান্ডু ও ভক্তপুরসহ বিভিন্ন স্থানে চিত্রায়িত হয়। ছবিটিতে পাশ্চাত্যের হিপ্পি সংস্কৃতি, তরুণ প্রজন্মের জীবনযাপন, মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার বিষয় তুলে ধরা হয়। জিনাত আমান এই ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর পোশাক, আধুনিক উপস্থিতি ও অভিনয় দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
১৯৭১ সালে ‘গ্যাম্বলার’ ছবিতেও দেব আনন্দ জাহিদার সঙ্গে অভিনয় করেন। ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য পায়। পরের বছর এ. জে. ক্রোনিনের ‘দ্য সিটাডেল’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘মেরে আপনে’ নয়, বরং ‘মেরে স্বপ্নে’ ছবিতে মমতাজের সঙ্গে অভিনয় করেন দেব আনন্দ।
সত্তরের দশকে রাজ কাপুর ও দিলীপ কুমারও তাঁদের অভিনয়জীবনে পরিবর্তন আনছিলেন। রাজ কাপুর ‘আজ কাল আওর কাল’ (১৯৭১) ও ‘ধরম করম’ (১৯৭৫)-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন। দিলীপ কুমার ‘দাস্তান’ ও ‘বৈরাগ’-এর মতো চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন।
অন্যদিকে দেব আনন্দের কয়েকটি ছবি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। হেমা মালিনীর সঙ্গে ‘শরিফ বদমাশ’, ‘জানেমন’ ও ‘জোশিলা’; জিনাত আমানের সঙ্গে ‘ইশক ইশক ইশক’ ও ‘প্রেমশাস্ত্র’; এবং প্রিয়া রাজবংশের সঙ্গে ‘সাহেব বাহাদুর’ বাণিজ্যিকভাবে খুব বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
তবে ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বানারসি বাবু’ ছবির মাধ্যমে তিনি আবার বাণিজ্যিক সাফল্য ফিরে পান। ছবিটি পরিচালনা করেন শঙ্কর মুখার্জি। এতে দেব আনন্দ দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। রাখী ও যোগিতা বালি তাঁর সহশিল্পী ছিলেন।
এরপর ‘ইয়ে গুলিস্তাঁ হামারা’, ‘ছুপা রুস্তম’ (১৯৭৩), ‘আমির গরিব’ (১৯৭৪), ‘হীরা পান্না’ (১৯৭৩), ‘ওয়ারেন্ট’ (১৯৭৫), ‘কালাবাজ’ এবং ‘ডার্লিং ডার্লিং’ (১৯৭৭)-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। পারভিন বাবির সঙ্গে ‘বুলেট’ (১৯৭৬) ছবিতেও অভিনয় করেন।
জিনাত আমান, টিনা মুনিম, রাখী, হেমা মালিনী ও পারভিন বাবির মতো জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। বয়স বাড়লেও তাঁর অভিনয়ের প্রাণবন্ততা ও রোমান্টিক ভাবমূর্তি অটুট ছিল।
১৯৭৮ সালে টিনা মুনিমের সঙ্গে অভিনীত ‘দেশ পরদেশ’ ছবিটি বিশেষ সাফল্য অর্জন করে। ছবিটি সে বছরের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সাফল্যগুলির মধ্যে স্থান পায়। দেব আনন্দের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষমতা তাঁকে বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
জরুরি অবস্থার বিরোধিতা ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ
১৯৭৫ সালের ২৫ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। দেব আনন্দ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিজের মতামত জানান।
১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতা করেন। এ সময় তিনি ‘ন্যাশনাল পার্টি অব ইন্ডিয়া’ নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে দলটি ভেঙে দেওয়া হয়।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে অভিনয় ও পরিচালনা
‘দেশ পরদেশ’-এর সাফল্যের পর দেব আনন্দের জনপ্রিয়তা আরও দৃঢ় হয়। ১৯৮০ সালে বাসু চ্যাটার্জি পরিচালিত ‘মন পসন্দ’ ছবিতে টিনা মুনিমের সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। এরপর নিজের পরিচালনায় ‘লুটমার’ নির্মাণ করেন। ছবিটিও দর্শকদের কাছে সাড়া পায়।
১৯৮২ সালে দেব আনন্দ পরিচালনা ও প্রযোজনা করেন ‘স্বামী দাদা’। এতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেন মিঠুন চক্রবর্তী, নাসিরুদ্দিন শাহ, পদ্মিনী কোলাপুরে, জ্যাকি শ্রফ ও রতি অগ্নিহোত্রী।
আশির দশকে দেব আনন্দ নিজের পুত্র সুনীল আনন্দকে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। ‘আনন্দ আওর আনন্দ’ ছবিতে সুনীলকে প্রধান চরিত্রে উপস্থাপন করেন। দেব আনন্দ ছবিটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন এবং সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আর. ডি. বর্মন। কিন্তু ছবিটি প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এর পর সুনীল আনন্দ আর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রজীবন গড়ে তুলতে পারেননি।
দেব আনন্দ অবশ্য নিজে অভিনয় চালিয়ে যান। ‘হাম নওজওয়ান’ (১৯৮৫) এবং ‘লস্কর’ (১৯৮৯) ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। ‘লস্কর’ ছবিতে তিনি একজন অধ্যাপকের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবেও সাফল্য লাভ করে।
১৯৯০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আওয়াল নম্বর’ ছবিতে আমির খান ও আদিত্য পাঞ্চালির সঙ্গে অভিনয় করেন দেব আনন্দ। ছবিটি মাঝারি ধরনের বাণিজ্যিক সাফল্য পায়। পরবর্তী সময়ে আমির খান এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, দেব আনন্দের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাঁর কিংবদন্তিসম ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি চিত্রনাট্য না পড়েই ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য সম্মতি দিয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালে ‘সচে কা বোলবালা’ ছবিটি পরিচালনা করেন দেব আনন্দ। সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি।
১৯৯৩ সালে তিনি ‘প্যার কা তরানা’ পরিচালনা করেন, যদিও এতে কোনো চরিত্রে অভিনয় করেননি। তাঁর পরিচালিত ‘গ্যাংস্টার’ ছবিটি বিতর্কের মুখে পড়ে। ‘রিটার্ন অব জুয়েল থিফ’ এবং ‘আমান কে ফরিশতে’ ছবিতেও তিনি অভিনয় করেন। তবে ছবিগুলির বাণিজ্যিক ফলাফল একরকম ছিল না।
পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্র
১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সৌ ক্রোড়’ ছবিটি দেব আনন্দের অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির একটি। ১৯৮৮ সালে ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সৈয়দ মোদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছবিটির কাহিনি নির্মিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সেন্সর’ ছবিতেও দেব আনন্দ অভিনয় ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর চলচ্চিত্রগুলি আগের মতো বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চার্জশিট’ ছিল তাঁর পরিচালিত ও অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র। ৩০ সেপ্টেম্বর ছবিটি মুক্তি পায়। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে মুক্তি পেলেও এটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
চলচ্চিত্রজীবনের বিস্তার
দেব আনন্দ ১৯৭০ সালে ল্যামবার্তো ভি. আভেলান্না পরিচালিত ইন্দো-ফিলিপিনো ইংরেজি চলচ্চিত্র ‘দ্য ইভিল উইদিন’-এ অভিনয় করেন। ছবিতে তাঁর সহশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন ভিয়েতনামি অভিনেত্রী কিউ চিন এবং ভারতীয় অভিনেত্রী জিনাত আমান।
প্রায় ছয় দশকব্যাপী কর্মজীবনে তিনি বহু হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত ছবির মধ্যে কয়েকটি মুক্তি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ‘কহি ঔর চল’ ১৯৬৮ সালে নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে মুক্তি পায়। ‘শ্রমণজি’ ছবিতে তিনি অতিথি শিল্পী হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন। ‘এক দো তিন চার’ নামে তাঁর অভিনীত একটি ছবিও মুক্তি পায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
দেব আনন্দের দীর্ঘ কর্মজীবনে অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা, প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সংখ্যা এবং প্রযোজনা ও পরিচালনার পরিসংখ্যান বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর অবদান ও দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
গ্রেগরি পেকের সঙ্গে তুলনা
দেব আনন্দের ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়শৈলীর সঙ্গে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা গ্রেগরি পেকের তুলনা করা হতো। কিন্তু দেব আনন্দ নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম ছিল, তিনি ভারতের গ্রেগরি পেক হিসেবে নয়, দেব আনন্দ হিসেবেই পরিচিত হতে চান।
গ্রেগরি পেকের সঙ্গে তাঁর তিনবার সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৯৪ সালে মুম্বাইয়ের ওয়েলিংটন ক্লাবে, যেখানে সুরাইয়াও উপস্থিত ছিলেন। পরে রোমে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ফেরার পথে এবং লন্ডনেও তাঁদের দেখা হয়েছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে অবদান
দেব আনন্দ শুধু জনপ্রিয় অভিনেতাই ছিলেন না, একজন উদ্ভাবনী চলচ্চিত্র নির্মাতাও ছিলেন। তিনি বহু চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনা করেন এবং নতুন বিষয়, নতুন অভিনয়শিল্পী ও নতুন নির্মাতাদের সুযোগ দেন।
তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে ‘প্রেম পূজারি’, ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’, ‘দেশ পরদেশ’, ‘লুটমার’, ‘স্বামী দাদা’ এবং ‘চার্জশিট’ উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রযোজনা সংস্থা নবকেতন ফিল্মস ভারতীয় চলচ্চিত্রে বহু প্রতিভাবান শিল্পীকে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছে।
দেব আনন্দের চলচ্চিত্রের সংগীত ছিল বিশেষ আকর্ষণ। শংকর-জয়কিষাণ, ও. পি. নায়ার, কল্যাণজি-আনন্দজি, শচীন দেব বর্মন ও রাহুল দেব বর্মনের মতো সংগীত পরিচালকেরা তাঁর ছবিতে কাজ করেছেন। গীতিকারদের মধ্যে ছিলেন হসরত জয়পুরি, মজরুহ সুলতানপুরী, শৈলেন্দ্র, গোপালদাস নীরজ ও আনন্দ বক্সী। নেপথ্য সংগীতশিল্পীদের মধ্যে মহম্মদ রফি, হেমন্ত কুমার ও কিশোর কুমারের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দেব আনন্দ নিজেও কয়েকটি ছবির সংগীত পরিকল্পনা ও গানের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। তাঁর ছবির বহু গান আজও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়।
চলচ্চিত্র জগতের বহু শিল্পী ও কলাকুশলীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গুরু দত্ত, মহম্মদ রফি, প্রাণ, দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর, সুনীল দত্ত, নার্গিস, কিশোর কুমার, শচীন দেব বর্মন ও রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ও পেশাগত সম্পর্কের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
নতুন প্রতিভার পৃষ্ঠপোষক
নবকেতন ফিল্মসের মাধ্যমে দেব আনন্দ বহু শিল্পী ও নির্মাতাকে সুযোগ দিয়েছিলেন। গুরু দত্ত, রাজ খোসলা, ওয়াহিদা রেহমান, শচীন দেব বর্মন, জয়দেব, সাহির লুধিয়ানভি, মজরুহ সুলতানপুরী, যশ জোহর, শেখর কাপুর ও কবীর বেদির মতো শিল্পীদের সঙ্গে নবকেতনের সম্পর্ক ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
জিনাত আমান, জাহিদা, জরিনা ওয়াহাবসহ বেশ কয়েকজন অভিনেত্রী তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। ‘ইশক ইশক ইশক’, ‘স্বামী দাদা’ ও ‘হাম নওজওয়ান’-এর মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন নতুন শিল্পী অভিনয়ের সুযোগ পান।
জিনাত আমান ও টিনা মুনিমের মতো অভিনেত্রীদের তারকাখ্যাতি প্রতিষ্ঠায় দেব আনন্দের চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সংগীত পরিচালক রাজেশ রোশনের সঙ্গেও তাঁর চলচ্চিত্রজগতের যোগাযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
১৯৭১ সালে অমিত খান্না নবকেতন ফিল্মসের নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেব আনন্দের সচিব হিসেবেও কাজ করেন। অমিত খান্নার বক্তব্য অনুযায়ী, নবকেতন ছিল এমন একটি চলচ্চিত্র সংস্থা, যার প্রতিষ্ঠাতা নিজেই দীর্ঘদিন ধরে সেটিকে পরিচালনা করে গিয়েছেন।
অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহাও দেব আনন্দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। ‘প্রেম পূজারি’ ছবির মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। পরে ‘গ্যাম্বলার’ ও ‘শরিফ বদমাশ’-এও তাঁদের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়। শত্রুঘ্ন সিনহার মতে, দেব আনন্দের সঙ্গে কাজ করা ছিল তাঁর জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।
ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা
দেব আনন্দের পোশাক-পরিচ্ছদ, চুলের ধরন, দ্রুত কথা বলার ভঙ্গি এবং হাসিমুখে সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ধরন তাঁকে অন্য অভিনেতাদের থেকে আলাদা করেছিল। বয়স বাড়লেও তাঁর মধ্যে এক ধরনের তারুণ্য ও প্রাণবন্ততা বজায় ছিল। এই কারণেই তিনি ‘চিরসবুজ নায়ক’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
তাঁর কালো কোট পরার জনপ্রিয়তা নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত গল্প রয়েছে। বলা হয়, কালো কোট পরলে তাঁকে এতটাই আকর্ষণীয় দেখাত যে মহিলা ভক্তদের মধ্যে প্রবল উন্মাদনা তৈরি হতো। এমনকি বোম্বে হাইকোর্ট নাকি তাঁর কালো কোট পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। তবে এই গল্পের সত্যতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাব রয়েছে। তাই ঘটনাটিকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
আত্মজীবনী
২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে নিজের জন্মদিন উপলক্ষে দেব আনন্দের আত্মজীবনী ‘Romancing with Life’ প্রকাশিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উপস্থিতিতে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আত্মজীবনীতে তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, চলচ্চিত্রজগতে সংগ্রাম, সাফল্য ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
১৯৬১ সালে সাদাকালোয় নির্মিত ‘হাম দোনো’ চলচ্চিত্রটি পরবর্তী সময়ে রঙিন করে পুনরায় মুক্তি দেওয়া হয়। এতে নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও তাঁর পুরোনো অভিনয় উপভোগ করার সুযোগ পান।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেব আনন্দ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।
প্রধান জাতীয় সম্মান ও পুরস্কার
- ১৯৫৯: ‘কালা পানি’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।
- ১৯৬৫: ‘গাইড’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।
- ১৯৬৭: ‘গাইড’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করে।
- ১৯৯৩: ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
- ২০০১: ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণ সম্মান।
- ২০০২: ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সম্মাননা
- ১৯৯৫: স্টার স্ক্রিন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
- ১৯৯৭: ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য মুম্বাই অ্যাকাডেমি অব মুভিং ইমেজের সম্মাননা।
- ১৯৯৮: কলকাতার উজালা আনন্দলোক ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড কমিটির লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ১৯৯৯: নয়াদিল্লিতে সানসুই লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ২০০০: ফিল্ম গোয়ার্স মেগা মুভি মেট্রো অব দ্য মিলেনিয়াম পুরস্কার।
- ২০০১: বিশেষ স্ক্রিন পুরস্কার এবং জি গোল্ড বলিউড অ্যাওয়ার্ডসের স্টার মিলেনিয়াম সম্মান।
- ২০০৩: দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য আইআইএএফ পুরস্কার।
- ২০০৪: আটলান্টিক সিটির ইন্ডিয়ান লেজেন্ডস অব সিনেমা সম্মান এবং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির লিভিং লেজেন্ড পুরস্কার।
- ২০০৫: ছনি গোল্ড অ্যাওয়ার্ড।
- ২০০৬: এনএনআর জাতীয় পুরস্কার এবং আইআইএএফের গ্লোরি অব ইন্ডিয়া পুরস্কার।
- ২০০৭: ওয়ার্ল্ড পাঞ্জাব অর্গানাইজেশনের ইউরোপীয় শাখার পাঞ্জাব রতন সম্মান।
- ২০০৮: রামাইয়া কালচারাল অ্যাকাডেমি ও মুম্বাই রোটারি ক্লাবের লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ২০০৯: আইআইজেএস সলিটেয়ার অ্যাওয়ার্ড, ম্যাক্স স্টারডাস্ট অ্যাওয়ার্ড এবং লেজেন্ড অ্যাওয়ার্ড।
- ২০১০: দাদাসাহেব ফালকে অ্যাকাডেমির ফালকে রত্ন পুরস্কার এবং রাষ্ট্রীয় গৌরব পুরস্কার।
- ২০১১: মধ্যপ্রদেশ সরকারের জাতীয় কিশোর কুমার সম্মান এবং এনডিটিভির লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
- ২০১৩: ভারতীয় চলচ্চিত্রের শতবর্ষ উপলক্ষে ৩ মে তাঁর স্মরণে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়।
আন্তর্জাতিক সম্মাননা
- ২০০০: নিউইয়র্কে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য সম্মাননা এবং ইন্দো-এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের স্টার অব দ্য মিলেনিয়াম পুরস্কার।
- ২০০১: নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য ডোনা ফেরার তাঁকে ‘গ্রেট স্টেট অব নিউইয়র্ক’ সম্মানে ভূষিত করেন বলে উল্লেখ করা হয়।
- ২০০৫: নেপাল সরকারের বিশেষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
- ২০০৮: স্কটল্যান্ডের ইনভারনেসে হাইল্যান্ড কাউন্সিলের আয়োজিত নৈশভোজে আমন্ত্রণ লাভ।
তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননার পূর্ণাঙ্গ তালিকা বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তাই বই বা গবেষণামূলক রচনায় প্রকাশের আগে প্রতিটি পুরস্কারের নাম, সাল ও প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করা সমীচীন।
মৃত্যু
দেব আনন্দ ২০১১ সালের ৩ ডিসেম্বর লন্ডনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। চিকিৎসা পরীক্ষা করানোর উদ্দেশ্যে তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন। তাঁর পরিচালিত ও অভিনীত ‘চার্জশিট’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার কয়েক মাস পরেই তাঁর মৃত্যু হয়।
১০ ডিসেম্বর লন্ডনের একটি ছোট চ্যাপেলে তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁর মরদেহের কফিন দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের পুটনি ভেল শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং গোদাবরী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।
উপসংহার
দেব আনন্দ ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছেন, নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন এবং বহু প্রজন্মের দর্শকের কাছে জনপ্রিয় থেকেছেন। অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা, সংগীতনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং নতুন প্রতিভাকে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয়।
তাঁর জীবনে প্রেমের অপূর্ণতা ছিল, কর্মজীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতা ছিল, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সাহস ছিল এবং নতুন কিছু করার নিরন্তর আকাঙ্ক্ষাও ছিল। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেছিলেন। তাঁর অভিনীত ‘গাইড’, ‘বাজি’, ‘সিআইডি’, ‘কালা পানি’, ‘হাম দোনো’, ‘জুয়েল থিফ’, ‘জনি মেরা নাম’ ও ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
দেব আনন্দ কেবল একজন জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি যুগের প্রতীক। তাঁর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী ও চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে ভারতীয় সিনেমার চিরসবুজ কিংবদন্তিদের সারিতে স্থান দিয়েছে।
অভিনেতা রাজ কাপুর
ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রাজ কাপুর এক অবিস্মরণীয় নাম। অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে তিনি অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর বহুমুখী অবদান এবং অভিনব চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীর জন্য তিনি ‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের শোম্যান’ নামে পরিচিত। তাঁর চলচ্চিত্রে প্রেম, মানবতা, সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, দেশপ্রেম এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একাধিক ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। চলচ্চিত্রজগতে আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন।
রাজ কাপুরের জন্ম ১৯২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ারের কিসা খাওয়ানি বাজার এলাকায়। বর্তমানে এই অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্গত। তাঁর পিতা পৃথ্বীরাজ কাপুর ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং মাতা রামসরণী দেবী কাপুর। তিনি কাপুর পরিবারের ছয় সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন। তাঁর দুই ভাই শাম্মী কাপুর ও শশী কাপুর পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
রাজ কাপুরের অভিনয়প্রতিভা, পরিচালনাশৈলী এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের দক্ষতা তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তাঁর পরিচালিত ও অভিনীত চলচ্চিত্রগুলি শুধু ভারতেই নয়, এশিয়া, ইউরোপ, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
শৈশব, পরিবার ও শিক্ষাজীবন
রাজ কাপুরের পিতা পৃথ্বীরাজ কাপুর এবং মাতা রামসরণী দেবী কাপুর। তাঁর পিতামহ ছিলেন দেওয়ান বশেশ্বরনাথ কাপুর এবং প্রপিতামহ দেওয়ান কেশবমল কাপুর। কাপুর পরিবারের সঙ্গে অভিনয় ও নাট্যকলার সম্পর্ক বহুদিনের। সেই পারিবারিক পরিবেশই রাজ কাপুরের শিল্পীজীবন গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
তাঁর দুই ভাই শাম্মী কাপুর ও শশী কাপুর পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর বোন উর্মিলা সিয়াল। শৈশবে তাঁর দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছিল বলে জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
রাজ কাপুরের পারিবারিক সম্পর্কও ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কাপুর পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের সদস্য অভিনয়, পরিচালনা ও প্রযোজনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাঁর পরিবারের বিস্তৃত আত্মীয়বৃত্তের মধ্যে অনিল কাপুর, সঞ্জয় কাপুর এবং বনি কাপুরের মতো চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের নামও উল্লেখযোগ্য।
রাজ কাপুর দেরাদুনের কর্নেল ব্রাউন কেমব্রিজ স্কুল এবং কলকাতা ও বোম্বাইয়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সময়কাল সম্পর্কে প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা সমীচীন।
চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ
রাজ কাপুর অল্প বয়সেই চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেন। ১৯৩৫ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে ‘ইনকিলাব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। পিতার নাট্য ও চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তাঁকে অভিনয়ের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করেছিল।
১৯৪৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নীল কমল’ চলচ্চিত্রে তিনি মধুবালার বিপরীতে প্রথম প্রধান নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এই ছবির মাধ্যমে অভিনেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনার ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন।
১৯৪৮ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি আর. কে. ফিল্মস প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পান। একই বছর ‘আগ’ চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ছবিটিতে তিনি নার্গিস, কামিনী কৌশল ও প্রেম নাথের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন।
১৯৪৯ সালে মেহবুব খানের ‘আন্দাজ’ চলচ্চিত্রে দিলীপ কুমার ও নার্গিসের সঙ্গে অভিনয় করে তিনি আরও বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ছবিটি তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর ১৯৪৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বরসাত’ রাজ কাপুরের কর্মজীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ছবিটির পরিচালক, প্রযোজক ও প্রধান অভিনেতা হিসেবে তিনি ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন। ছবির সংগীতও দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ‘বরসাত’-এর সাফল্য আর. কে. ফিল্মসকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সাহায্য করে।
আর. কে. ফিল্মস ও সাফল্যের স্বর্ণযুগ
রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর নিজস্ব চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলী। তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; চিত্রনাট্য, সংগীত, দৃশ্যায়ন, সম্পাদনা এবং চলচ্চিত্রের সামগ্রিক আবহ নির্মাণের প্রতিও তাঁর বিশেষ মনোযোগ ছিল।
আর. কে. ফিল্মসের ব্যানারে তিনি ‘আওয়ারা’ (১৯৫১), ‘আহ’ (১৯৫৩), ‘শ্রী ৪২০’ (১৯৫৫), ‘জাগতে রহো’ (১৯৫৬) এবং ‘জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায়’ (১৯৬০)-এর মতো উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই ছবিগুলির অনেকগুলিতেই তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
‘আওয়ারা’ রাজ কাপুরের আন্তর্জাতিক খ্যাতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ছবিটিতে দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, অপরাধ, পারিবারিক পরিবেশ এবং মানুষের নৈতিক বিকাশের মতো বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল। রাজ কাপুরের অভিনীত চরিত্রটি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। ছবিটি ভারত ছাড়াও সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
‘আওয়ারা’ চলচ্চিত্রটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনের নির্বাচিত সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের তালিকায় ছবিটির উল্লেখ রয়েছে বলে বিভিন্ন বিবরণে বলা হয়েছে। ছবিটির গান, অভিনয় এবং মানবিক আবেদন আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে রাজ কাপুরকে পরিচিত করে তোলে।
‘শ্রী ৪২০’ চলচ্চিত্রে তিনি শহরে আসা এক সরল যুবকের জীবনসংগ্রাম, প্রতারণা, অর্থলোভ এবং সামাজিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন। ছবিটির মাধ্যমে তিনি বিনোদনের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অসংগতি সম্পর্কে দর্শকদের ভাবতে উৎসাহিত করেছিলেন। ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি’ গানটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় দেশাত্মবোধক গানে পরিণত হয়।
‘জাগতে রহো’ ছিল সামাজিক বক্তব্যসমৃদ্ধ একটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। ছবিটিতে গ্রামীণ পরিবেশ থেকে শহরে আসা এক তৃষ্ণার্ত মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শহুরে সমাজের ভণ্ডামি, ভয় এবং নৈতিক সংকট তুলে ধরা হয়। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও লাভ করে।
‘জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায়’ ছবিটি রাজ কাপুরের দীর্ঘদিনের সহযোগী রাধু কর্মকার পরিচালনা করেছিলেন। ছবিটি অপরাধজগৎ, মানবতা, অনুশোচনা এবং সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছিল। এটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি অর্জন করে।
রাজ কাপুরের অভিনয়শৈলীতে চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য ট্র্যাম্প’ চরিত্রের প্রভাব লক্ষ করা যায়। সরলতা, হাস্যরস, অসহায়ত্ব, মানবিকতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদী থাকার বৈশিষ্ট্য তাঁর বহু চরিত্রে ফুটে উঠেছে। তবে তিনি এই প্রভাবকে ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিজস্ব অভিনয়ভঙ্গি তৈরি করেছিলেন।
আর. কে. ফিল্মসের বাইরে থেকেও তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। উল্লেখযোগ্য ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে ‘দাস্তান’ (১৯৫০), ‘আহুনি’ (১৯৫২), ‘চুরি চুরি’ (১৯৫৬), ‘দো উস্তাদ’ (১৯৫৯), ‘ছলিয়া’ (১৯৬০) এবং ‘দিল হি তো হ্যায়’ (১৯৬৩)। এসব ছবিতে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের অভিনয়দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
তিনি ‘বুট পলিশ’ (১৯৫৪) এবং ‘আব দিল্লি দূর নেহি’ (১৯৫৭)-এর মতো সামাজিক ভাবনাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এসব ছবিতে শিশুদের জীবন, দারিদ্র্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছিল।
‘সঙ্গম’ এবং রঙিন চলচ্চিত্রের যুগ
১৯৬৪ সালে রাজ কাপুর ‘সঙ্গম’ চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। এটি তাঁর পরিচালিত প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। ছবিটিতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন বৈজয়ন্তীমালা ও রাজেন্দ্র কুমার। প্রেম, বন্ধুত্ব, ঈর্ষা, আত্মত্যাগ এবং দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে নির্মিত ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে।
‘সঙ্গম’-এর সাফল্য রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রজীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তবে পরবর্তী কয়েকটি ছবিতে তিনি প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। ‘দুলহা দুলহন’ (১৯৬৪), ‘এরাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ (১৯৬৭) এবং ‘স্বপ্ন কা সৌদাগর’ (১৯৬৮)-এর মতো ছবিতে তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করলেও সেগুলি ‘সঙ্গম’-এর মতো বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
১৯৬৫ সালে তিনি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রসারে তাঁর ভূমিকা এই সময়ে আরও বিস্তৃত হয়।
‘মেরা নাম জোকার’: স্বপ্ন, ব্যর্থতা ও পুনরুত্থান
১৯৭০ সালে রাজ কাপুরের পরিচালিত ও প্রযোজিত ‘মেরা নাম জোকার’ মুক্তি পায়। ছবিটিতে তিনি নিজেই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। একজন জোকারের জীবন, তার ব্যক্তিগত বেদনা, প্রেম, আত্মত্যাগ এবং দর্শকদের হাসানোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুঃখকে কেন্দ্র করে ছবিটি নির্মিত হয়েছিল।
চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে তাঁর প্রায় ছয় বছর সময় লেগেছিল। তাঁর ছেলে ঋষি কাপুর এই ছবিতে রাজ কাপুরের চরিত্রের কিশোর বয়সের রূপে অভিনয় করে চলচ্চিত্রজগতে আত্মপ্রকাশ করেন।
ছবিটি মুক্তির পর বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এতে রাজ কাপুর আর্থিক সংকটে পড়েন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘মেরা নাম জোকার’ চলচ্চিত্রপ্রেমী ও সমালোচকদের কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে এটি একটি ‘কাল্ট ক্লাসিক’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ছবিটির সংগীত, আবেগঘন কাহিনি এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলি দর্শকদের কাছে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করে।
১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কাল আজ আউর কাল’ চলচ্চিত্রে তাঁর ছেলে রণধীর কাপুর প্রধান অভিনয়জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। ছবিটিতে রাজ কাপুর, তাঁর পিতা পৃথ্বীরাজ কাপুর এবং রণধীর কাপুর একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। ছবিতে রণধীরের বিপরীতে ছিলেন ববিতা।
১৯৭৩ সালে রাজ কাপুর ‘ববি’ চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। ছবিটির মাধ্যমে ঋষি কাপুর প্রধান নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ডিম্পল কাপাডিয়ার চলচ্চিত্রজীবনেরও সূচনা হয়। তরুণ প্রজন্মের প্রেম, পারিবারিক বাধা এবং সামাজিক বিভেদের কাহিনি নিয়ে নির্মিত ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে বিপুল সাফল্য অর্জন করে।
‘ববি’ ভারতীয় চলচ্চিত্রে তরুণ প্রেমের উপস্থাপনায় নতুন জনপ্রিয় ধারা সৃষ্টি করেছিল। ছবিটির পোশাক, সংগীত এবং অভিনয়শৈলী সেই সময়ের তরুণ দর্শকদের মধ্যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। ডিম্পল কাপাডিয়ার আধুনিক পোশাক ও বিকিনি পরিহিত দৃশ্যও তখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল।
১৯৭৫ সালে রাজ কাপুর তাঁর ছেলে রণধীর কাপুরের সঙ্গে ‘ধরম করম’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। পারিবারিক সম্পর্ক ও চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত এই ছবিটি তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ।
পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্র
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রাজ কাপুর প্রযোজনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এগুলির মধ্যে ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ (১৯৭৮), ‘প্রেম রোগ’ (১৯৮২) এবং ‘রাম তেরি গঙ্গা মেইলি’ (১৯৮৫) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ ছবিতে জিনাত আমান অভিনয় করেছিলেন। সৌন্দর্য, প্রেম, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাহ্যিক রূপের সঙ্গে মানুষের অন্তর্গত সত্তার সম্পর্ক ছিল ছবিটির অন্যতম প্রধান বিষয়।
‘প্রেম রোগ’ চলচ্চিত্রে পদ্মিনী কোলাপুরে ও ঋষি কাপুর অভিনয় করেন। বিধবাবিবাহ, সামাজিক রক্ষণশীলতা, জাতপাত এবং নারীর অধিকার নিয়ে নির্মিত এই ছবি সামাজিক বক্তব্যের জন্য বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
‘রাম তেরি গঙ্গা মেইলি’ ছবিতে মন্দাকিনী প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি ১৯৮৫ সালে মুক্তি পেয়ে বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজ কাপুর আবারও প্রমাণ করেন যে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দর্শকদের রুচি ও চলচ্চিত্রের ভাষা বুঝে কাজ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল।
এই সময়ে রাজ কাপুর অভিনয়ের তুলনায় পরিচালনা ও প্রযোজনার কাজে বেশি মনোযোগ দেন। তবুও তিনি কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন। ‘নৌকরী’ (১৯৭৮) এবং ‘আব্দুল্লাহ’ (১৯৮০)-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ‘দো জাসুস’ (১৯৭৫) এবং ‘গোপীচাঁদ জাসুস’ (১৯৮২) চলচ্চিত্রে তিনি গোয়েন্দা চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিগুলি পরিচালনা করেছিলেন নরেশ কুমার।
১৯৭৯ সালে তিনি একাদশ মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রজগতে তাঁর মর্যাদা ও পরিচিতির এটি আরেকটি নিদর্শন।
১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভাকিল বাবু’ চলচ্চিত্রে তিনি তাঁর ছোট ভাই শশী কাপুরের সঙ্গে অভিনয় করেন। একই বছর ‘চোর মণ্ডলী’ ছবিতেও তিনি প্রবীণ অভিনেতা অশোক কুমারের সঙ্গে কাজ করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে আইনি জটিলতার কারণে ছবিটি মুক্তি পায়নি।
১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ টেলিভিশন চলচ্চিত্র ‘কিম’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি পর্দায় শেষবারের মতো অভিনয় করেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
মৃত্যুর আগে রাজ কাপুর তাঁর ছেলে ঋষি কাপুর এবং পাকিস্তানি অভিনেত্রী জেবা বখতিয়ার অভিনীত ‘হেনা’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে তাঁর মৃত্যু হওয়ায় ছবিটি শেষ করার দায়িত্ব নেন তাঁর ছেলে রণধীর কাপুর। চলচ্চিত্রটি ১৯৯১ সালে মুক্তি পায়।
দাম্পত্য জীবন ও সন্তানসন্ততি
১৯৪৬ সালের মে মাসে রাজ কাপুর কৃষ্ণা মালহোত্রার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের বিবাহ পারিবারিকভাবে স্থির করা হয়েছিল এবং দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়। কৃষ্ণা কাপুরের ভাই রাজেন্দ্র নাথ, প্রেম নাথ ও নরেন্দ্র নাথ পরবর্তী সময়ে অভিনয়জগতে পরিচিতি অর্জন করেন। কৃষ্ণার বোন উমা অভিনেতা প্রেম চোপড়াকে বিয়ে করেন।
রাজ কাপুরের বিবাহের খবর ১৯৪৭ সালের জুন মাসে ‘ফিল্মইন্ডিয়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। সেই সময়ের সংবাদে পৃথ্বীরাজ কাপুরের প্রতিভাবান পুত্রের বিবাহকে তাঁর জীবনের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
রাজ কাপুর ও কৃষ্ণা কাপুরের পাঁচটি সন্তান ছিল—তিন ছেলে রণধীর কাপুর, ঋষি কাপুর ও রাজীব কাপুর এবং দুই মেয়ে ঋতু নন্দা ও রীমা জৈন।
রণধীর কাপুর অভিনেত্রী ববিতাকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই মেয়ে করিশ্মা কাপুর ও করিনা কাপুর পরবর্তী সময়ে বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
ঋষি কাপুর অভিনেত্রী নীতু সিংকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান—মেয়ে ঋদ্ধিমা কাপুর সাহনি এবং ছেলে রণবীর কাপুর। রণবীর কাপুর ২০১০-এর দশক থেকে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
রাজ কাপুরের মেয়ে ঋতু নন্দা শিল্পপতি রাজন নন্দাকে বিয়ে করেন। তাঁদের ছেলে নিখিল নন্দা শ্বেতা বচ্চনকে বিয়ে করেন। শ্বেতা বচ্চন হলেন অমিতাভ বচ্চন ও জয়া বচ্চনের মেয়ে।
অন্য মেয়ে রীমা জৈন ব্যাংকার মনোজ জৈনকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই ছেলে আরমান জৈন ও আধার জৈন চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত হন।
এইভাবে রাজ কাপুরের পরিবার ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। তাঁর ভাই, সন্তান, নাতি-নাতনি এবং পরিবারের একাধিক সদস্য অভিনয়, প্রযোজনা ও বিনোদনজগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন।
নার্গিস ও অন্যান্য অভিনেত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক
রাজ কাপুরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চলচ্চিত্রজগতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। ১৯৪০-এর দশকের শেষভাগ এবং ১৯৫০-এর দশকে অভিনেত্রী নার্গিসের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে বহু জীবনী ও চলচ্চিত্রবিষয়ক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তাঁদের সম্পর্কের ব্যক্তিগত দিকগুলি সম্পর্কে সব বিবরণ সমানভাবে প্রামাণ্য নয়।
রাজ কাপুর ও নার্গিস একসঙ্গে ‘আওয়ারা’, ‘শ্রী ৪২০’ এবং ‘চুরি চুরি’-সহ একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পর্দায় তাঁদের জুটি দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁদের অভিনয়ে প্রেম, আবেগ এবং মানবিক সম্পর্কের যে প্রকাশ দেখা গিয়েছিল, তা হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
পরবর্তী সময়ে নার্গিস রাজ কাপুরের সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করেন। ১৯৫৭ সালে ‘মাদার ইন্ডিয়া’ চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে অভিনেতা সুনীল দত্তের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং পরে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
‘সঙ্গম’ চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে রাজ কাপুর ও বৈজয়ন্তীমালার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বলে কিছু সূত্রে দাবি করা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী পদ্মিনীর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ঋষি কাপুর তাঁর আত্মজীবনী ‘খুল্লম খুল্লা’-তে রাজ কাপুরের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বিবরণ তুলে ধরেছিলেন। তবে এসব সম্পর্কের বিবরণ প্রকাশের সময় তথ্যসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বন্ধু ও চলচ্চিত্রজগতের সহযোগীরা
রাজ কাপুরের কর্মজীবনে বহু অভিনেতা, গায়ক, সংগীত পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁদের মধ্যে প্রাণ, মুকেশ, দেব আনন্দ, দিলীপ কুমার, রাজেন্দ্র কুমার, মান্না দে, শঙ্কর-জয়কিষাণ, ঋষিকেশ মুখার্জি, খাজা আহমদ আব্বাস এবং রাজেশ খান্নার নাম উল্লেখযোগ্য।
এই সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি স্বতন্ত্র সংগীতনির্ভর চলচ্চিত্রধারা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তাঁর ছবিতে গান শুধু বিনোদনের উপাদান ছিল না; কাহিনির আবেগ, চরিত্রের মানসিক অবস্থা এবং সামাজিক বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
‘রাজবাগ’: পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত স্থান
রাজ কাপুর ও তাঁর পরিবারের স্মৃতির সঙ্গে মহারাষ্ট্রের পুনের নিকটবর্তী লোনি কালভোর এলাকার একটি সম্পত্তি যুক্ত। এই সম্পত্তি ‘রাজবাগ’ নামে পরিচিত। ‘রাজবাগ’ শব্দের অর্থ রাজকীয় উদ্যান বা রাজার বাগান। মুলা-মুঠা নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলের সঙ্গে কাপুর পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল।
পরবর্তী সময়ে কাপুর পরিবারের সম্পত্তির একটি অংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত হয়। সেখানে রাজ কাপুর ও তাঁর পরিবারের স্মৃতিরক্ষার জন্য একটি স্মারক নির্মাণ করা হয়। ২০১৪ সালে লতা মঙ্গেশকর কাপুর পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে স্মারকটি উদ্বোধন করেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
স্মারকটির বিভিন্ন অংশে কাপুর পরিবারের ছবি এবং রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত উপকরণ প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। তাঁর ‘মেরা নাম জোকার’, ‘ববি’, ‘প্রেম রোগ’ এবং ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’-এর মতো চলচ্চিত্রের স্মৃতিও এই স্থানটির সঙ্গে জড়িত।
রাজ কাপুরের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারণ এই সম্পত্তি ও তার আশপাশের এলাকায় করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ‘হম তুম এক কমরে মে বন্দ হো’ গানটির সঙ্গে যুক্ত দৃশ্যগুলিও তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের স্মরণীয় অংশ হিসেবে পরিচিত।
চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলী ও শিল্পীসত্তা
রাজ কাপুরকে চলচ্চিত্র সমালোচক ও ইতিহাসবিদেরা প্রায়ই ‘ভারতীয় চার্লি চ্যাপলিন’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তাঁর শিল্পীসত্তা কেবল চ্যাপলিনের প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতীয় সমাজের দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য, নৈতিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে তিনি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন।
তাঁর চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে প্রায়ই থাকত এমন এক সাধারণ মানুষ, যে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদী থাকার চেষ্টা করে। এই চরিত্রগুলির হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে থাকত বেদনা, অসহায়ত্ব এবং সমাজের প্রতি প্রশ্ন। তাঁর অভিনয় দর্শকদের হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে এবং সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে ভাবতে উৎসাহিত করেছে।
রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রগুলি সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। বিশেষ করে ‘আওয়ারা’ ও ‘শ্রী ৪২০’-এর মতো ছবির মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে পরিচিত করে তোলেন।
চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি বিপণন ও দর্শকদের রুচি বোঝার ক্ষেত্রেও তিনি দক্ষ ছিলেন। তাঁর ছবির সংগীত, দৃশ্যায়ন, অভিনয় এবং প্রচার কৌশল পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকত। এর ফলে তাঁর অনেক চলচ্চিত্র দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদের মনে স্থান করে নিতে পেরেছে।
সংগীত ও গানের প্রতি অনুরাগ
রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সংগীতের সার্থক ব্যবহার। তিনি সংগীতের সূক্ষ্ম বিচারক ছিলেন এবং গানের কথা, সুর, কণ্ঠ ও দৃশ্যায়নের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষার চেষ্টা করতেন।
সংগীত পরিচালক শঙ্কর-জয়কিষাণের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগিতা হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁদের সুরে রাজ কাপুরের বহু চলচ্চিত্রের গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গীতিকার শৈলেন্দ্র ও হাসরত জয়পুরিও তাঁর ছবির সংগীতজগৎ সমৃদ্ধ করেছিলেন।
‘বরসাত’, ‘আহ’, ‘আওয়ারা’, ‘বুট পলিশ’, ‘শ্রী ৪২০’, ‘চুরি চুরি’, ‘কানহাইয়া’, ‘ম্যায় নশে মে হুঁ’, ‘জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায়’, ‘আশিক’, ‘এক দিল সও আফসানে’, ‘সঙ্গম’, ‘তিসরি কসম’, ‘এরাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘দিওয়ানা’, ‘স্বপ্ন কা সৌদাগর’, ‘মেরা নাম জোকার’ এবং ‘কাল আজ আউর কাল’-এর মতো ছবিতে শঙ্কর-জয়কিষাণের সংগীত পরিচালনা দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল।
জয়কিষাণের মৃত্যুর পর রাজ কাপুর লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলালের সঙ্গে ‘ববি’, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ ও ‘প্রেম রোগ’-এর মতো চলচ্চিত্রে কাজ করেন। ‘ধরম করম’-এর সংগীত পরিচালনা করেছিলেন রাহুল দেব বর্মন এবং ‘রাম তেরি গঙ্গা মেইলি’-র সংগীত পরিচালনা করেছিলেন রবীন্দ্র জৈন। ‘দো উস্তাদ’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ও. পি. নায়ার।
মুকেশ ছিলেন রাজ কাপুরের পর্দার কণ্ঠ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। রাজ কাপুরের বহু জনপ্রিয় গানে মুকেশ কণ্ঠ দিয়েছিলেন। মুকেশের মৃত্যুর পর রাজ কাপুরের নামে প্রচলিত একটি আবেগপূর্ণ উক্তি হলো, ‘ম্যায়নে আপনি আওয়াজ খো দি’—অর্থাৎ, ‘আমি আমার কণ্ঠ হারিয়ে ফেলেছি।’ এই উক্তি তাঁদের দীর্ঘ শিল্পীসঙ্গের গভীরতা প্রকাশ করে।
মান্না দেও রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রে বেশ কয়েকটি স্মরণীয় গান গেয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য গানগুলির মধ্যে রয়েছে:
- ‘লাগা চুনরি মে দাগ’ — ‘দিল হি তো হ্যায়’
- ‘এ ভাই জরা দেখকে চলো’ — ‘মেরা নাম জোকার’
- ‘দিল কা হাল শুনে দিলওয়ালা’ — ‘শ্রী ৪২০’
- ‘আজা সনম মধুর চাঁদনি মে হাম’ — ‘চুরি চুরি’
- ‘যাহাঁ ম্যায় জাতি হুঁ, ওহিঁ চলে আতে হো’ — ‘চুরি চুরি’
- ‘ইয়ে রাত ভিগি ভিগি’ — ‘চুরি চুরি’
- ‘মস্তি ভরা হ্যায় সামা’ — ‘পরবরিশ’
- ‘মুড় মুড় কে না দেখ’ — ‘শ্রী ৪২০’
- ‘চলত মুসাফির’ — ‘তিসরি কসম’
- ‘লাল্লাহ আল্লাহ তেরা নিগাহবান’ — ‘আব্দুল্লাহ’
- ‘মামা ও মামা’ — ‘পরবরিশ’
এই গানগুলি রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রে সংগীতের বৈচিত্র্য এবং তাঁর সংগীতবোধের পরিচয় বহন করে।
দেশপ্রেম ও সামাজিক বক্তব্য
রাজ কাপুরের বহু চলচ্চিত্রে দেশপ্রেম, জাতীয় পরিচয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের বিষয় উঠে এসেছে। ‘আগ’, ‘শ্রী ৪২০’ ও ‘জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায়’-এর মতো ছবিতে তিনি ভারতীয় সমাজের বাস্তবতা এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেছিলেন।
‘শ্রী ৪২০’ চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গান ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি, ইয়ে প্যান্টলুন ইংলিশতানি, সর পে লাল টোপি রুশি, ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ ভারতীয় পরিচয় ও দেশপ্রেমের একটি জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়। গানটির বক্তব্যে বিদেশি পোশাক ও সামগ্রীর ব্যবহার সত্ত্বেও হৃদয়ে ভারতীয় পরিচয় ধারণ করার কথা বলা হয়েছে।
গানটি কয়েক দশক ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয়। ২০০৬ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় ভারতীয় লেখক মহাশ্বেতা দেবী তাঁর বক্তব্যের সমাপ্তিতে এই গানের উল্লেখ করেছিলেন বলে জানা যায়। ঘটনাটি গানটির আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আবেদন সম্পর্কে ধারণা দেয়।
রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রে সংগীতের পাশাপাশি দৃশ্যায়নেরও বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তিনি বৃহৎ সেট, নাটকীয় আলো, আকর্ষণীয় দৃশ্যবিন্যাস এবং আবেগঘন চিত্রায়ণের সাহায্যে দর্শকদের মনে স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতেন। তাঁর চলচ্চিত্রে গান ও দৃশ্যের সমন্বয় কাহিনির আবেগকে আরও গভীর করে তুলত।
নিম্মি, ডিম্পল কাপাডিয়া ও মন্দাকিনীর মতো অভিনেত্রীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে তাঁর চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। একইভাবে ঋষি কাপুর ও রাজীব কাপুরের অভিনয়জীবনের বিকাশেও তাঁর অবদান ছিল।
তথ্যচিত্র, স্মারক ও সম্মাননা
রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রজীবন ও শিল্পীসত্তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। তাঁর কর্মজীবন সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান তুলে ধরার জন্য চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ও গবেষকেরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
২০০১ সালের ১৪ ডিসেম্বর ভারতীয় ডাক বিভাগ তাঁর মুখাবয়ব-সংবলিত একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ২০১২ সালের মার্চ মাসে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকার ওয়াক অব দ্য স্টার্সে তাঁর সম্মানে একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে। এই ধরনের স্মারক ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে।
রাজ কাপুর তাঁর কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- পদ্মভূষণ (১৯৭১): ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করে।
- দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৮৭): ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মানগুলির অন্যতম এই পুরস্কার তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনের স্বীকৃতি বহন করে।
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: তাঁর চলচ্চিত্র ও প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত কাজ বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে।
- ফিল্মফেয়ার পুরস্কার: অভিনয়, পরিচালনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর কাজ বহুবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয় এবং তিনি একাধিক পুরস্কার অর্জন করেন।
- আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃতি: তাঁর চলচ্চিত্র ‘আওয়ারা’ ও ‘বুট পলিশ’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে পালে দ’অর পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
‘আওয়ারা’ ও ‘বুট পলিশ’-এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তুলতে সাহায্য করে। ‘জাগতে রহো’ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার অর্জন করেছিল। তাঁর চলচ্চিত্রের মানবিক আবেদন, অভিনব কাহিনিবিন্যাস এবং সংগীতের ব্যবহার আন্তর্জাতিক দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল।
২০০১ সালে স্টারডাস্ট পুরস্কারে তাঁকে ‘মিলেনিয়াম সেবক পরিচালক’ এবং ২০০২ সালে স্টার স্ক্রিন পুরস্কারে ‘মিলেনিয়াম শোম্যান’ উপাধিতে সম্মানিত করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে। এই সম্মাননাগুলি তাঁর জনপ্রিয়তা ও চলচ্চিত্রজগতের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের পরিচায়ক।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ও সহযোগীরা
রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রজীবনে বহু চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও সংগীত পরিচালকের অবদান ছিল। চিত্রনাট্যকার খাজা আহমদ আব্বাস তাঁর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের সহযোগিতায় নির্মিত ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে ‘আওয়ারা’ (১৯৫১), ‘শ্রী ৪২০’ (১৯৫৫), ‘জাগতে রহো’ (১৯৫৬), ‘চার দিল চার রাহেঁ’ (১৯৫৯) এবং ‘মেরা নাম জোকার’ (১৯৭০)। এ ছাড়া ‘ববি’ (১৯৭৩) ও ‘হেনা’ (১৯৯১)-এর মতো চলচ্চিত্রের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িত।
রাজ কাপুরের চলচ্চিত্রজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নার্গিসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ অভিনয়-সহযোগিতা। ‘আগ’ (১৯৪৮), ‘আন্দাজ’ (১৯৪৯), ‘বরসাত’ (১৯৪৯), ‘প্যার’ (১৯৫০), ‘জান পেহচান’ (১৯৫০), ‘আওয়ারা’ (১৯৫১), ‘আম্বর’ (১৯৫২), ‘আনহোনি’ (১৯৫২), ‘আশিয়ানা’ (১৯৫২), ‘আহ’ (১৯৫৩), ‘পাপী’ (১৯৫৩), ‘ধুন’ (১৯৫৩), ‘শ্রী ৪২০’ (১৯৫৫), ‘চুরি চুরি’ (১৯৫৬) এবং ‘জাগতে রহো’ (১৯৫৬)-এর মতো ছবিতে তাঁদের সহযোগিতা হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
তাঁর চলচ্চিত্রের সংগীত, অভিনয় এবং পরিচালনার সমন্বয় ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। রাজ কাপুরের ছবিগুলি একদিকে যেমন বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছে, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক ও মানবিক বিষয় নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
অসুস্থতা ও মৃত্যু
জীবনের শেষদিকে রাজ কাপুর হাঁপানিজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। ১৯৮৭ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে নিয়ে যাওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তিনি দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
১৯৮৮ সালের ২ জুন, মাত্র ৬৩ বছর বয়সে রাজ কাপুরের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগৎ এক অসাধারণ অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজককে হারায়। তাঁর অসমাপ্ত চলচ্চিত্র ‘হেনা’ পরবর্তী সময়ে তাঁর ছেলে রণধীর কাপুর সম্পূর্ণ করেন এবং ১৯৯১ সালে মুক্তি দেন।
রাজ কাপুরের মৃত্যু হলেও তাঁর সৃষ্টি আজও জীবন্ত। তাঁর চলচ্চিত্রের গান, চরিত্র, দৃশ্যায়ন এবং সামাজিক বক্তব্য একাধিক প্রজন্মের দর্শককে প্রভাবিত করেছে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি এমন এক শিল্পী, যিনি জনপ্রিয় বিনোদন ও সামাজিক বক্তব্যের মধ্যে সার্থক সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
উপসংহার
রাজ কাপুর শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা চলচ্চিত্র নির্মাতা। অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা এবং সংগীতনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সিনেমাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর ছবিতে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, প্রেম, আশা, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবিকতার যে প্রতিফলন দেখা যায়, তা আজও দর্শকদের কাছে প্রাসঙ্গিক।
‘আওয়ারা’, ‘শ্রী ৪২০’, ‘জাগতে রহো’, ‘সঙ্গম’, ‘মেরা নাম জোকার’, ‘ববি’, ‘প্রেম রোগ’ এবং ‘রাম তেরি গঙ্গা মেইলি’-এর মতো চলচ্চিত্র তাঁর শিল্পীসত্তার বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করে। সংগীত, অভিনয় এবং দৃশ্যায়নের অসাধারণ সমন্বয় তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে।
তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলি প্রমাণ করে যে, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের প্রতিচ্ছবি, মানুষের আবেগের প্রকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধের বাহকও হতে পারে। সেই কারণেই রাজ কাপুরের নাম ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অভিনেতা রাজ কুমার
ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম বিশিষ্ট অভিনেতা রাজ কুমারের জন্ম ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বেলুচিস্তান প্রদেশের লোরালাইয়ে এক কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল কুলভূষণ পণ্ডিত। তাঁর পিতার নাম জগদ্বীশ্বর পণ্ডিত এবং মাতার নাম ধনরাজ রানি পণ্ডিত। তাঁরা ছিলেন তিন ভাই—আনন্দ বাবি পণ্ডিত, জীবনলাল পণ্ডিত ও মহিন্দর নাথ পণ্ডিত। এ ছাড়া তাঁর চার বোনও ছিলেন।
১৯৪০ সালে তিনি বোম্বাইয়ে চলে আসেন এবং বোম্বাই পুলিশের অধীনে সাব-ইনস্পেক্টর পদে চাকরি শুরু করেন। পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত এক বন্ধুর অনুপ্রেরণায় তিনি পুলিশের চাকরি ছেড়ে অভিনয়জগতে প্রবেশ করেন। চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশের সময় কুলভূষণ পণ্ডিত নাম পরিবর্তন করে তিনি ‘রাজ কুমার’ নাম গ্রহণ করেন।
১৯৬০ সালে তিনি জেনিফার নামে এক বিমানসেবিকাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর জেনিফার হিন্দু রীতি অনুসারে নিজের নাম পরিবর্তন করে গায়ত্রী রাখেন। তাঁদের তিন সন্তান—দুই ছেলে পুরু রাজ কুমার ও পাণিনি রাজ কুমার এবং এক মেয়ে বাস্তবিকা পণ্ডিত। পুরু রাজ কুমার বলিউডের একজন অভিনেতা। তাঁদের মেয়ে বাস্তবিকা ২০০৬ সালে ‘এইট: দ্য পাওয়ার অব শানি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জগতে আত্মপ্রকাশ করেন বলে উল্লেখ করা হয়।
চলচ্চিত্রজগতে আত্মপ্রকাশ
অভিনয়জগতে প্রবেশের আগে রাজ কুমার পুলিশের চাকরি করতেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগ্রহ থেকেই তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দেন। প্রথমে ‘দৌলত’ (১৯৪৯) চলচ্চিত্রের জন্য অডিশন দিলেও তিনি নির্বাচিত হননি। পরে ‘রঙ্গিলী’ (১৯৫২) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। এরপর ‘আনমোল সাহারা’ (১৯৫২), ‘আবসার’ (১৯৫৩), ‘ঘমণ্ড’ (১৯৫৫), ‘লাখো মে এক’ এবং ‘কৃষ্ণ সুদামা’ (১৯৫৭)-সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
১৯৫৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অস্কার-মনোনীত চলচ্চিত্র ‘মাদার ইন্ডিয়া’য় একটি সংক্ষিপ্ত চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। এই চলচ্চিত্রে তিনি নার্গিস অভিনীত রাধার স্বামী শামুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। একই বছরে সোহরাব মোদী পরিচালিত ‘নওশেরওয়ান-এ-আদিল’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। এই ছবির মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
১৯৫৯ সালে তিনি ‘উজালা’ চলচ্চিত্রে শাম্মী কাপুরের সঙ্গে অভিনয় করেন। একই বছর ‘পৈগাম’ চলচ্চিত্রে দিলীপ কুমারের পাশাপাশি একজন মিলশ্রমিকের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন।
১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিল এক মন্দির’ চলচ্চিত্রে ক্যানসার আক্রান্ত রমেশের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে যশ চোপড়া পরিচালিত ‘ওয়াক্ত’ চলচ্চিত্রে সুনীল দত্ত, শশী কাপুর ও বলরাজ সাহনীর সঙ্গে অভিনয় করেন। এই ছবিতে তাঁর অভিনয়ের জন্য তিনি আবারও শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান।
১৯৬৫ সালের ‘কাজল’ চলচ্চিত্রে মতির চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে ‘নীল কমল’ চলচ্চিত্রে চিত্রসেনের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্যও তিনি একই বিভাগে মনোনীত হন।
জনপ্রিয়তার শীর্ষে রাজ কুমার
১৯৬৭ সালে বি. আর. চোপড়া পরিচালিত রোমান্টিক থ্রিলার ‘হামরাজ’ চলচ্চিত্রে রাজ কুমার ক্যাপ্টেন রাজেশের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন সুনীল দত্ত, বিমি ও মমতাজ।
১৯৭০ সালে চেতন আনন্দ পরিচালিত ‘হীর রাঞ্ঝা’ চলচ্চিত্রে তিনি রাঞ্ঝার ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছবিতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন প্রিয়া রাজবংশ, প্রাণ, পৃথ্বীরাজ কাপুর ও কামিনী কৌশল।
১৯৭১ সালে অরবিন্দ সেন পরিচালিত ‘মর্যাদা’ চলচ্চিত্রে তিনি রাজা বাবুর চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন মালা সিনহা, রাজেশ খান্না ও প্রাণ। একই বছর সুশীল মজুমদার পরিচালিত ‘লাল পাথর’ চলচ্চিত্রে কুমার বাহাদুরের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন হেমা মালিনী, রাখী গুলজার ও বিনোদ মেহরা।
১৯৭২ সালে কমল আমরোহী পরিচালিত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘পাকিজা’য় তিনি সেলিম আহমেদ খানের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন মীনা কুমারী, অশোক কুমার ও নাদিরা। চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছিল এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান লাভ করে।
১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে তাঁর অভিনীত কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। তবে ‘কুদরত’ (১৯৮১), ‘এক নই পহেলি’ (১৯৮৪), ‘মরতে দম তক’ (১৯৮৭), ‘মুকদ্দর কা ফয়সলা’ (১৯৮৭) ও ‘জংবাজ’ (১৯৮৯)-এর মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি আবারও সাফল্য ফিরে পান।
১৯৯১ সালে, দীর্ঘ ৩২ বছর পর, তিনি প্রখ্যাত অভিনেতা দিলীপ কুমারের সঙ্গে সুভাষ ঘাই পরিচালিত ‘সওদাগর’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাঁর অভিনীত শেষদিকের অন্যতম সফল চলচ্চিত্র ছিল মেহুল কুমার পরিচালিত ‘তিরঙ্গা’ (১৯৯২)। এই ছবিতে তিনি ব্রিগেডিয়ার সূর্যদেব সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিল ‘গড অ্যান্ড গান’ (১৯৯৫)।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে রাজ কুমার ৭০টিরও বেশি হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে ‘দুলহন’ (১৯৫৭), ‘পঞ্চায়েত’ (১৯৫৮), ‘দুর্গামাতা’ (১৯৫৯), ‘শরারত’ (১৯৫৯), ‘অর্ধাঙ্গিনী’ (১৯৫৯), ‘স্বর্গ সে সুন্দর দেশ হামারা’ (১৯৫৯), ‘দিল আপনা আউর প্রীত পরায়ে’ (১৯৬০), ‘ঘরানা’ (১৯৬১), ‘গোদান’ (১৯৬৩), ‘ফুল বনে আঙ্গারে’ (১৯৬৩), ‘প্যার কা বন্ধন’ (১৯৬৩), ‘জিন্দেগি’ (১৯৬৪), ‘উঁচে লোগ’ (১৯৬৫), ‘রিশতে-নাতে’ (১৯৬৫), ‘হামরাজ’ (১৯৬৭), ‘নয়ী রোশনি’ (১৯৬৭), ‘মেরে হুজুর’ (১৯৬৮), ‘বাসনা’ (১৯৬৮), ‘দিল কা রাজা’ (১৯৭২), ‘হিন্দুস্তান কি কসম’ (১৯৭৩), ‘৩৬ ঘণ্টে’ (১৯৭৪), ‘এক সে বাড়কর এক’ (১৯৭৬), ‘কর্মযোগী’ (১৯৭৮), ‘চম্বল কি কসম’ (১৯৮০), ‘বুলন্দি’ (১৯৮১), ‘ধর্মকাঁটা’ (১৯৮২), ‘রাজ তিলক’ (১৯৮৪), ‘সাহারা’ (১৯৮৪), ‘ইতিহাস’ (১৯৮৭), ‘মহব্বত কে দুশমন’ (১৯৮৮), ‘সাজিশ’ (১৯৮৮), ‘মহাবীর’ (১৯৮৮), ‘দেশ কে দুশমন’ (১৯৮৯), ‘গলিয়োঁ কা বাদশাহ’ (১৯৮৯), ‘সূর্য’ (১৯৮৯), ‘পুলিশ পাবলিক’ (১৯৯০), ‘পুলিশ অউর মুজরিম’ (১৯৯২), ‘ইনসানিয়ত কে দেবতা’ (১৯৯৩), ‘উলফত কি নই মঞ্জিলে’ (১৯৯৪), ‘বে-তাজ বাদশাহ’ (১৯৯৪) এবং ‘জবাব’ (১৯৯৫)।
‘দিল কা রাজা’ ও ‘কর্মযোগী’ চলচ্চিত্রে তিনি দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তাঁর অভিনয়জীবনের বিস্তৃতি ও চরিত্র নির্বাচনের বৈচিত্র্য তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের একজন স্বতন্ত্র অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
অভিনয়শৈলী ও ব্যক্তিত্ব
রাজ কুমার ১৯৫২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘মাদার ইন্ডিয়া’য় শামু, ‘দিল এক মন্দির’-এ রমেশ, ‘ওয়াক্ত’-এ রাজা, ‘নীল কমল’-এ চিত্রসেন, ‘পাকিজা’য় সেলিম, ‘সওদাগর’-এ রাজেশ্বর সিং এবং ‘তিরঙ্গা’য় ব্রিগেডিয়ার সূর্যদেব সিংয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
তাঁর সমসাময়িক অনেক অভিনেতা একসঙ্গে একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও রাজ কুমার সাধারণত এক সময়ে একটি চলচ্চিত্রে মনোনিবেশ করতেন। তিনি চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করে অভিনয় করতে পছন্দ করতেন এবং নিজের অভিনয়ের মানের সঙ্গে আপস করতেন না।
একবার এক সাংবাদিক তাঁকে তাঁর পছন্দের কয়েকটি চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নাকি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমি এমন কোনো চরিত্রে অভিনয় করিনি, যা আমার অপছন্দ। আমি সব সময় নিজের পছন্দের চরিত্রেই অভিনয় করি।’
তাঁর স্বতন্ত্র সংলাপ বলার ভঙ্গি, গম্ভীর কণ্ঠস্বর, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয়ের নিজস্ব ধরন তাঁকে অন্য অভিনেতাদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ও সংলাপ পরিবেশনের বিশেষ শৈলী দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
অভিনয়ের বাইরেও রাজ কুমারের নানা শখ ছিল। তিনি ঘোড়দৌড়, গল্ফ খেলা এবং শাস্ত্রীয় সংগীত শুনতে ভালোবাসতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
মৃত্যু
রাজ কুমার ১৯৯৬ সালের ৩ জুলাই ৬৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে গলার ক্যানসারের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁর অসুস্থতা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
প্রখ্যাত সাংবাদিক ফারহানা ফারুককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর ছেলে পুরু রাজ কুমার জানিয়েছিলেন যে তাঁর বাবা হজকিন লিম্ফোমায় আক্রান্ত ছিলেন এবং সেই রোগের চিকিৎসার জন্য কেমোথেরাপি নিয়েছিলেন।
রাজ কুমারের মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগৎ এক স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলীর অধিকারী শিল্পীকে হারায়। তাঁর অভিনয়, সংলাপ পরিবেশনের ভঙ্গি এবং পর্দায় ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর অভিনীত বহু চলচ্চিত্র আজও দর্শকদের কাছে সমাদৃত।
সুনীল দত্ত: জীবন, চলচ্চিত্র ও রাজনৈতিক
জীবন
ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট অভিনেতা, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও রাজনীতিবিদ সুনীল দত্তের জন্ম ১৯২৯ সালের ৬ জুন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের নাক্কা খুর্দ গ্রামে। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল বলরাজ দত্ত। চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের সময় অভিনেতা বলরাজ সাহনীর সঙ্গে নামের বিভ্রান্তি এড়াতে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে সুনীল দত্ত রাখেন। তাঁর পিতার নাম দেওয়ান রঘুনাথ দত্ত এবং মাতার নাম কুলবন্তী দেবী দত্ত।
সুনীল দত্তের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তাঁর বয়স ছিল আঠারো বছর। দেশভাগের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সংকটময় সময়ে তাঁর পিতার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইয়াকুব নামের এক মুসলিম ব্যক্তি তাঁদের পরিবারকে দাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা করেন। গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারটি প্রথমে যমুনানগরের কাছে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত মান্দাউলি নামের একটি ছোট গ্রামে আশ্রয় নেয়। পরে সুনীল দত্ত তাঁর মা কুলবন্তী দেবীর সঙ্গে প্রথমে দিল্লি এবং তারপর লখনউয়ে চলে আসেন। লখনউয়ের আমিনাবাদ এলাকায় তাঁর কৈশোর অতিবাহিত হয়।
স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি লখনউ থেকে বোম্বাইয়ে (বর্তমান মুম্বাই) আসেন। সেখানে জয় হিন্দ কলেজে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় রেডিও সিলোনের উর্দু বিভাগে ঘোষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। বিশিষ্ট রেডিও ব্যক্তিত্ব আমিন সায়ানি সুনীল দত্তকে একজন উৎসাহী ও উদ্যমী ঘোষক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
১৯৫৪ সালে সুনীল দত্ত ইতিহাসে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে রমেশ সায়গলের পরিচালনায় ‘রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু হয়। এই ছবিতে তিনি রামের ভূমিকায় অভিনয় করেন। একই বছর সোহরাব মোদির পরিচালনায় ‘কুন্দন’ চলচ্চিত্রে অমৃতের চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৫৬ সালে নরেশ সায়গলের ‘রাজধানী’, কিশোর সাহুর ‘কিসমত কা খেল’ এবং বি. আর. চোপড়ার ‘এক হি রাস্তা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে থাকেন।
‘মাদার ইন্ডিয়া’ ও নার্গিসের সঙ্গে বিবাহ
১৯৫৭ সালে মেহবুব খানের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘মাদার ইন্ডিয়া’-তে বিরজুর চরিত্রে অভিনয় করে সুনীল দত্ত ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ছবিতে তাঁর মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী নার্গিস। চলচ্চিত্রটির শুটিং চলাকালে এক অগ্নিকাণ্ডের সময় নার্গিসকে উদ্ধার করতে গিয়ে সুনীল দত্ত নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন বলে বহুল প্রচলিত রয়েছে। এই ঘটনার পর তাঁদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
১৯৫৮ সালে সুনীল দত্ত ও নার্গিস বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক পুত্র ও দুই কন্যা—পুত্র সঞ্জয় দত্ত, যিনি পরবর্তীকালে বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, এবং কন্যা প্রিয়া দত্ত ও নম্রতা দত্ত। নম্রতা দত্ত অভিনেতা রাজেন্দ্র কুমারের পুত্র কুমার গৌরবকে বিবাহ করেন। উল্লেখ্য, রাজেন্দ্র কুমার ও সুনীল দত্ত ‘মাদার ইন্ডিয়া’ চলচ্চিত্রে সহ-অভিনেতা ছিলেন।
চলচ্চিত্রজগতে সাফল্য
১৯৫০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত সুনীল দত্ত একের পর এক উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে বি. আর. চোপড়ার ‘সাধনা’ (১৯৫৮), শক্তি সামন্তের ‘ইনসান জাগ উঠা’ (১৯৫৯), বিমল রায়ের ‘সুজাতা’ (১৯৫৯), ‘মুঝে জীনে দো’ (১৯৬৩), ‘গুমরাহ’ (১৯৬৩), ‘খানদান’ (১৯৬৫), ‘মেরা সায়া’ (১৯৬৬), ‘পড়োসন’ (১৯৬৮) এবং ‘মিলন’ (১৯৬৭)। এ ছাড়া তিনি ‘গুমরাহ’, ‘ওয়াক্ত’ (১৯৬৫) ও ‘হামরাজ’ (১৯৬৭)-এর মতো সফল চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।
‘মুঝে জীনে দো’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ১৯৬৪ সালে ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ‘খানদান’ চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৬৫ সালে তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পান। ‘মিলন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্যও তিনি বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন।
পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
১৯৬৪ সালে ‘ইয়াদে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুনীল দত্ত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ছবিটিতে অভিনয়ও করেছিলেন তিনি। অতি অল্পসংখ্যক অভিনয়শিল্পীকে নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি তার অভিনব নির্মাণশৈলীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ছবিটি একক অভিনেতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র হিসেবে গিনেস বুক অব রেকর্ডসের সঙ্গে সম্পর্কিত স্বীকৃতিও পেয়েছিল।
১৯৬৮ সালে তিনি ‘মন কা মিত’ চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেন। এই ছবির মাধ্যমে তাঁর ভাই সোম দত্ত, বিনোদ খান্না ও লীনা চন্দ্রাভরকরের চলচ্চিত্রজগতে অভিষেক ঘটে। ১৯৭১ সালে তিনি ‘রেশমা আউর শেরা’ চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। ছবিটি সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও বাণিজ্যিকভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
‘জওয়ালা’ ও অভিনয়জীবনের উত্থান-পতন
১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে সুনীল দত্তের অভিনয়জীবনে কিছুটা মন্দা দেখা দেয়। এই সময়ে তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এম. ভি. রমনের ‘জওয়ালা’ চলচ্চিত্রে মধুবালার বিপরীতে অভিনয় করেন। ছবিটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে এটি মুক্তি পায়।
মধুবালা প্রথমে ছবিটির শুটিংয়ে অংশ নিলেও অসুস্থতার কারণে কাজ সম্পূর্ণ করতে পারেননি। ১৯৬৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর অন্য অভিনেত্রীর সাহায্যে ছবিটির বাকি অংশ সম্পন্ন করা হয়। ‘জওয়ালা’ বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। তবে এটি মধুবালার অভিনীত একমাত্র মুক্তিপ্রাপ্ত রঙিন চলচ্চিত্র হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।
এরপর সুনীল দত্ত ‘জমিন আসমান’, ‘জিন্দেগি জিন্দেগি’ ও ‘জয় জওয়ালা’ (১৯৭২), ‘মন জিতে জগ জিত’ ও ‘হীরা’ (১৯৭৩) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৪ সালে সাধনা শিবদাসানির পরিচালনায় ‘গীতা মেরা নাম’ ছবিতে জনির চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আবার দর্শকদের নজরে আসেন। ছবিটিতে ফিরোজ খান, সাধনা ও হেলেনও অভিনয় করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ‘জান যায়ে পর বচন না যায়ে’ (১৯৭৪), ‘নাগিন’ (১৯৭৬), ‘জানি দুশমন’ (১৯৭৯), ‘মুকাবালা’ (১৯৭৯) এবং ‘শান’ (১৯৮০)-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘মন জিতে জগ জিত’ (১৯৭৩), ‘দুখ ভঞ্জন তেরা নাম’ (১৯৭৪) ও ‘সাত শ্রী আকাল’ (১৯৭৭) তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য পাঞ্জাবি ধর্মীয় চলচ্চিত্র।
১৯৮০-এর দশকে তিনি ‘দর্দ কা রিশতা’ (১৯৮২), ‘বদলে কি আগ’ (১৯৮২), ‘রাজ তিলক’ (১৯৮৪), ‘মঙ্গল দাদা’ (১৯৮৬), ‘ওয়াতন কে রাখওয়ালে’ (১৯৮৭) এবং ‘ধরমযুদ্ধ’ (১৯৮৮)-এর মতো ছবিতে মুখ্য ও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন।
পুত্র সঞ্জয় দত্তের চলচ্চিত্রজীবন ও সমাজসেবা
১৯৮১ সালে সুনীল দত্ত পরিচালিত ‘রকি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর পুত্র সঞ্জয় দত্তের অভিনয়জীবন শুরু হয়। ছবিটি সাফল্য অর্জন করলেও মুক্তির কয়েক দিন আগে সঞ্জয়ের মা নার্গিস অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রীর মৃত্যু সুনীল দত্তের জীবনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। পরে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের সহায়তার উদ্দেশ্যে তিনি ‘নার্গিস দত্ত ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
শিশুদের মুখমণ্ডলের জন্মগত বিকৃতি সংশোধনের চিকিৎসায় সহায়তা করার জন্যও তিনি বিভিন্ন উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। সমাজসেবা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর গভীর অঙ্গীকার ছিল।
রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯৮২ সালে মহারাষ্ট্র সরকার সুনীল দত্তকে মুম্বাইয়ের শেরিফ নিযুক্ত করে। ১৯৮৪ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং উত্তর-পশ্চিম মুম্বাই লোকসভা কেন্দ্র থেকে একাধিকবার সাংসদ নির্বাচিত হন। চলচ্চিত্রজগতে দীর্ঘদিন কাজ করার পর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৯৩ সালে সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আবহে তিনি শান্তি ও সম্প্রীতির পক্ষে অবস্থান নেন। ওই সময় তাঁর পুত্র সঞ্জয় দত্তকে অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনা পরিবারটির জীবনে কঠিন সময় নিয়ে আসে। সুনীল দত্ত কিছু সময়ের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও পরে আবার সক্রিয় হন।
২০০৪ সালে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তি ও মানবকল্যাণের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার।
শেষজীবন ও পুত্রের সঙ্গে অভিনয়
১৯৯২ সালে ‘পরম্পরা’ এবং ১৯৯৩ সালে ‘ক্ষত্রিয়’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর তিনি চলচ্চিত্রে আগের তুলনায় কম সক্রিয় হয়ে পড়েন। তবে পরবর্তী সময়েও ‘বিরোধী’ (১৯৯২), ‘ফুল’ (১৯৯৩), ‘মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস.’ (২০০৩) এবং ‘লাগে রহো মুন্না ভাই’ (২০০৬)-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর নাম যুক্ত ছিল।
‘রকি’ (১৯৮১) ও ‘ক্ষত্রিয়’ (১৯৯৩) চলচ্চিত্রে সুনীল দত্ত ও সঞ্জয় দত্ত একই ছবিতে অভিনয় করলেও কোনো দৃশ্যে তাঁদের একসঙ্গে দেখা যায়নি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০৩ সালে রাজকুমার হিরানির ‘মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস.’ চলচ্চিত্রে তাঁরা প্রথমবার একই দৃশ্যে একসঙ্গে অভিনয় করেন। পিতা-পুত্রের এই পর্দা-উপস্থিতি দর্শকদের কাছে বিশেষ আবেগের বিষয় হয়ে ওঠে।
পুরস্কার ও সম্মান
সুনীল দত্তের দীর্ঘ অভিনয়জীবন, চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
- ১৯৬৪: ‘মুঝে জীনে দো’ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।
- ১৯৬৫: ‘খানদান’ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।
- ১৯৬৭: ‘মিলন’ চলচ্চিত্রের জন্য বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান।
- ১৯৬৮: ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মশ্রী সম্মান।
- ১৯৮২: মুম্বাইয়ের শেরিফ হিসেবে নিযুক্তি।
- ১৯৯৫: ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ১৯৯৮: রাজীব গান্ধী জাতীয় সদ্ভাবনা পুরস্কার।
- ১৯৯৯: স্ক্রিন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ২০০০: আনন্দলোক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ২০০১: জি সিনে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
এ ছাড়াও আইআইএফএস, লন্ডন কর্তৃক তাঁকে ‘গ্লোরি অব ইন্ডিয়া’ সম্মানে ভূষিত করা হয় বলে জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের বিস্তৃত তালিকা
সুনীল দত্তের অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ। তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে—
১৯৫০-এর দশক: ‘রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম’ (১৯৫৫), ‘কুন্দন’ (১৯৫৫), ‘রাজধানী’ (১৯৫৬), ‘কিসমত কা খেল’ (১৯৫৬), ‘এক হি রাস্তা’ (১৯৫৬), ‘পায়েল’ (১৯৫৭), ‘মাদার ইন্ডিয়া’ (১৯৫৭), ‘সাধনা’ (১৯৫৮), ‘পোস্ট বক্স নং ৯৯৯’ (১৯৫৮), ‘ইনসান জাগ উঠা’ (১৯৫৯), ‘সুজাতা’ (১৯৫৯) ও ‘দিদি’ (১৯৫৯)।
১৯৬০-এর দশক: ‘উসনে কহা থা’, ‘হম হিন্দুস্তানি’, ‘এক ফুল চার কাঁটে’, ‘দুনিয়া ঝুকতি হ্যায়’, ‘ছায়া’ (১৯৬১), ‘ম্যায় চুপ রহুঙ্গি’, ‘ঝুলা’ (১৯৬২), ‘আজ অউর কাল’, ‘ইয়ে রাস্তে হ্যায় প্যায়ার কে’, ‘নর্তকী’, ‘গজল’ (১৯৬৪), ‘বেটি বেটে’ (১৯৬৪), ‘ওয়াক্ত’ (১৯৬৫), ‘মাইতিঘর’ (১৯৬৬), ‘গবন’ (১৯৬৬), ‘অম্রপালি’ (১৯৬৬), ‘মেরা সায়া’ (১৯৬৬), ‘মিলন’ (১৯৬৭), ‘মেহেরবান’ (১৯৬৭), ‘পড়োসন’ (১৯৬৮), ‘সাধু অউর শয়তান’ (১৯৬৮), ‘গৌরি’ (১৯৬৮), ‘পিয়াসি শাম’ (১৯৬৯), ‘মেরি ভাবী’ (১৯৬৯), ‘চিরাগ’ (১৯৬৯) ও ‘ভাই-বেহেন’ (১৯৬৯)।
১৯৭০-এর দশক: ‘দর্পণ’ (১৯৭০), ‘ভাই-ভাই’ (১৯৭০), ‘জওয়ালা’ (১৯৭১), ‘রেশমা আউর শেরা’ (১৯৭১), ‘জয় জওয়ালা’ (১৯৭২), ‘জমিন আসমান’ (১৯৭২), ‘জিন্দেগি জিন্দেগি’ (১৯৭২), ‘মন জিতে জগ জিত’ (১৯৭৩), ‘হীরা’ (১৯৭৩), ‘গীতা মেরা নাম’ (১৯৭৪), ‘দুখ ভঞ্জন তেরা নাম’ (১৯৭৪), ‘৩৬ ঘণ্টে’ (১৯৭৪), ‘জখমি’ (১৯৭৫), ‘ওমর কয়েদ’ (১৯৭৫), ‘নীলিমা’ (১৯৭৫), ‘হিমালয় সে উঁচা’ (১৯৭৫), ‘নেহলে পে দেহলা’ (১৯৭৬), ‘দরিন্দা’ (১৯৭৭), ‘পাপি’ (১৯৭৭), ‘চরণদাস’ (১৯৭৭), ‘আখরি গুলি’ (১৯৭৭), ‘রাম কসম’ (১৯৭৮), ‘ডাকু অউর জওয়ান’ (১৯৭৮), ‘অহিংসা’ (১৯৭৯), ‘জানি দুশমন’ (১৯৭৯) ও ‘মুকাবালা’ (১৯৭৯)।
১৯৮০-এর দশক: ‘শান’ (১৯৮০), ‘ইয়ারি দুশমনি’ (১৯৮০), ‘লহু পুকারেগা’ (১৯৮০), ‘গঙ্গা অউর সুরজ’ (১৯৮০), ‘রকি’ (১৯৮১), ‘দর্দ কা রিশতা’ (১৯৮২), ‘বদলে কি আগ’ (১৯৮২), ‘লাইলা’ (১৯৮৪), ‘রাজ তিলক’ (১৯৮৪), ‘ইয়াদোঁ কি জঞ্জির’ (১৯৮৪), ‘ফাসলে’ (১৯৮৫), ‘কালা ধন্ধা গোরে লোগ’ (১৯৮৬), ‘মঙ্গল দাদা’ (১৯৮৬), ‘ওয়াতন কে রাখওয়ালে’ (১৯৮৭) ও ‘ধরমযুদ্ধ’ (১৯৮৮)।
১৯৯০-এর দশক ও পরবর্তী সময়: ‘ইয়ে আগ কব বুঝেগি’ (১৯৯১), ‘কুরবান’ (১৯৯১), ‘প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’ (১৯৯১), ‘হ্যায় মেরি জান’ (১৯৯১), ‘বিরোধী’ (১৯৯২), ‘পরম্পরা’ (১৯৯২), ‘ক্ষত্রিয়’ (১৯৯৩), ‘ফুল’ (১৯৯৩), ‘মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস.’ (২০০৩) এবং ‘লাগে রহো মুন্না ভাই’ (২০০৬)।
উপরের তালিকাটি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের একটি সংকলন; এটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রতালিকা নয়। চলচ্চিত্রের নাম, মুক্তির সাল ও পুরস্কারের বিবরণ বিভিন্ন তথ্যসূত্রে ভিন্ন হতে পারে।
মৃত্যু
সুনীল দত্ত তাঁর ৭৬তম জন্মদিনের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, ২০০৫ সালের ২৫ মে, মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় নিজের বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। মুম্বাইয়ের সান্তাক্রুজ শ্মশানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
তাঁর মৃত্যুর পর কন্যা প্রিয়া দত্ত উত্তর-পশ্চিম মুম্বাই লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সুনীল দত্তের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর সাহিত্যপ্রীতি। আগাজানি কাশ্মিরী ছিলেন তাঁর প্রিয় লেখকদের একজন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। চলচ্চিত্র, রাজনীতি ও সমাজসেবার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পরিবারপ্রেমের জন্যও সুনীল দত্ত ভারতীয় জনজীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে একজন শিল্পী শুধু পর্দায় অভিনয়ের মাধ্যমেই নয়, সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করেও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করতে পারেন।
কিংবদন্তি অভিনেতা রাজেন্দ্রকুমার
চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা রাজেন্দ্র কুমার ছিলেন রোমান্টিক ও পারিবারিক চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে একের পর এক সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেন। তাঁর অভিনীত একাধিক চলচ্চিত্র রজতজয়ন্তী উদ্যাপন করেছিল। এ কারণেই চলচ্চিত্রজগতে তিনি ‘জুবিলি কুমার’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবেও সাফল্য অর্জন করেছিলেন।
জন্ম ও শৈশব
রাজেন্দ্র কুমারের জন্ম ১৯২৯ সালের ২০ জুলাই ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোটে (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত) একটি পাঞ্জাবি হিন্দু পরিবারে। তাঁর পিতামহ ছিলেন একজন সফল সামরিক ঠিকাদার। তাঁর বাবা ব্রিটিশ ভারতের সিন্ধু প্রদেশের করাচিতে বস্ত্রের ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় তাঁদের পরিবার জমিজমা ও অন্যান্য সম্পত্তি ছেড়ে ভারতে চলে আসে। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজেন্দ্র কুমার পরবর্তী সময়ে বোম্বাইয়ে (বর্তমান মুম্বাই) পাড়ি জমান। সেখানে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক এস. এস. রাওয়াইলের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রায় পাঁচ বছর তিনি এই কাজে যুক্ত ছিলেন। এ সময় পতঙ্গ, সগাই ও পকেটমার প্রভৃতি চলচ্চিত্রের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে এই অভিজ্ঞতা তাঁকে পরবর্তী অভিনয়জীবনে সহায়তা করেছিল।
চলচ্চিত্রজগতে আত্মপ্রকাশ
১৯৪৯ সালে পতঙ্গ চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রাজেন্দ্র কুমার হিন্দি চলচ্চিত্রজগতে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর কিদার শর্মা পরিচালিত জোগান (১৯৫০) চলচ্চিত্রে দিলীপ কুমার ও নার্গিসের সঙ্গে অভিনয় করেন। সেখানে তাঁর ভূমিকা ছোট হলেও প্রযোজক দেবেন্দ্র গোয়েলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।
১৯৫৫ সালে দেবেন্দ্র গোয়েল পরিচালিত বচন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য তাঁকে মাত্র দেড় হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ছবিটি বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য অর্জন করে এবং রজতজয়ন্তী উদ্যাপন করে। এই সাফল্যের পর রাজেন্দ্র কুমারকে একজন সম্ভাবনাময় অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়।
১৯৫৭ সালে মেহবুব খান পরিচালিত বিখ্যাত চলচ্চিত্র *মাদার ইন্ডিয়া*তে নার্গিসের বড় ছেলে রামুর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। চলচ্চিত্রটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হয়।
১৯৫৯ সালে বিজয় ভাট পরিচালিত সংগীতনির্ভর রোমান্টিক চলচ্চিত্র গুঞ্জ উঠি শেহনাই তাঁর অভিনয়জীবনে বিশেষ সাফল্য এনে দেয়। ছবিটিতে তিনি কিষানের ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং তাঁর বিপরীতে ছিলেন অভিনেত্রী অমিতা। ছবিটির জনপ্রিয়তা তাঁকে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
‘জুবিলি কুমার’ হিসেবে জনপ্রিয়তা
১৯৬০-এর দশকে রাজেন্দ্র কুমার জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যান। তাঁর অভিনীত একাধিক চলচ্চিত্র দীর্ঘদিন ধরে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয় এবং অনেক ছবিই রজতজয়ন্তী উদ্যাপন করে। এই ধারাবাহিক বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণেই তিনি ‘জুবিলি কুমার’ উপাধিতে পরিচিত হন।
এই সময়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে ছিল ধুল কা ফুল (১৯৫৯), ঘরানা (১৯৬১), দিল এক মন্দির (১৯৬৩), মেরে মেহবুব (১৯৬৩), সংগম (১৯৬৪), আয়ি মিলন কি বেলা (১৯৬৪), আরজু (১৯৬৫), সুরজ (১৯৬৬), ঝোঁক গয়া আসমান (১৯৬৮), তালাশ (১৯৬৯) এবং গাঁওয়ার (১৯৭০)।
তাঁর অভিনয়ে রোমান্টিক আবেগ, সংযত অভিব্যক্তি ও পারিবারিক মূল্যবোধের প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। দর্শকদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এতটাই বেশি ছিল যে, তাঁর নামই অনেক সময় চলচ্চিত্রের সাফল্যের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠত।
দিল এক মন্দির, আয়ি মিলন কি বেলা ও আরজু চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। সংগম চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্যও তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-অভিনেতা পুরস্কারের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। যদিও এই বিভাগগুলিতে তিনি পুরস্কার জিততে পারেননি, তবু তাঁর অভিনয়দক্ষতা ও জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না।
তিনি কে. আসিফের অসমাপ্ত চলচ্চিত্র *সস্তা খুন মহঙ্গা পানি*তেও সায়রা বানুর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন।
পরবর্তী অভিনয়জীবন
১৯৭০-এর দশকে হিন্দি চলচ্চিত্রে নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের উত্থানের ফলে রাজেন্দ্র কুমারের জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়ে। বিশেষত ১৯৭২ সাল থেকে রাজেশ খান্নার বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে তিনি প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। তাঁর কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ফলে তিনি ধীরে ধীরে প্রধান নায়কের চরিত্র থেকে সরে এসে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে শুরু করেন।
১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাজন বিনা সুহাগন চলচ্চিত্রে নূতনের বিপরীতে অভিনয় করে তিনি আবারও সাফল্যের মুখ দেখেন। এই সময়ে তিনি দো শের (১৯৭৪) এবং তেরি মেরি এক জিন্দড়ি (১৯৭৫)-এর মতো কয়েকটি পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।
১৯৮১ সালে তিনি নিজের ছেলে কুমার গৌরবকে লাভ স্টোরি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জগতে পরিচয় করিয়ে দেন। ছবিটি তিনি প্রযোজনা করেন এবং নিজেও অভিনয় করেন। ছবিটি বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে এবং কুমার গৌরবকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে।
এরপর রাজেন্দ্র কুমার ছেলের অভিনীত আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। তবে *লাভ স্টোরি*র মতো সাফল্য সব ছবিতে পুনরাবৃত্তি হয়নি। ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নাম চলচ্চিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মহেশ ভাট পরিচালিত এই ছবিতে কুমার গৌরবের পাশাপাশি সঞ্জয় দত্তও অভিনয় করেছিলেন।
রাজেন্দ্র কুমারের প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে লাভ স্টোরি (১৯৮১), লাভারস (১৯৮৩), নাম (১৯৮৬), জুররত (১৯৯১) এবং ফুল (১৯৯৩) উল্লেখযোগ্য। ফুল ছিল তাঁর শেষ প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলির অন্যতম।
১৯৯৫ সালে আন্দাজ ও বংশ টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের শেষ পর্যায় চিহ্নিত হয়। এই সময়ের পর তিনি আর নতুন কোনো অভিনয়প্রকল্পে যুক্ত হননি।
সুনীল দত্তের সঙ্গে বন্ধুত্ব
রাজেন্দ্র কুমার ও সুনীল দত্তের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। দুজনেই মাদার ইন্ডিয়া (১৯৫৭) চলচ্চিত্রে নার্গিসের ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। পরবর্তী সময়েও তাঁদের সম্পর্ক অটুট ছিল। সুনীল দত্ত যখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন, তখন রাজেন্দ্র কুমার তাঁকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করতেন।
সুনীল দত্তের ছেলে সঞ্জয় দত্তের বিরুদ্ধে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হলে এবং পুলিশ তাঁদের বাড়িতে একাধিকবার তল্লাশি চালালে রাজেন্দ্র কুমার বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তল্লাশি যেন আইন মেনে পরিচালিত হয়, কোনো মিথ্যা প্রমাণ যেন তৈরি করা না হয় এবং বাড়ির মূল্যবান সামগ্রী যেন সুরক্ষিত থাকে—এসব বিষয়েও তিনি সতর্ক থাকতেন বলে উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনা রাজেন্দ্র কুমারের বন্ধুত্ব, বিশ্বস্ততা ও মানবিকতার পরিচয় বহন করে। পর্দার জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে পরিচিত হলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত ছিলেন।
রাজ কাপুরের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক
রাজ কাপুরের সঙ্গেও রাজেন্দ্র কুমারের সুসম্পর্ক ছিল। রাজেন্দ্র কুমারের ছেলে কুমার গৌরবের সঙ্গে রাজ কাপুরের মেয়ে রিমার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। পরে কুমার গৌরব সুনীল দত্ত ও নার্গিসের মেয়ে নম্রতা দত্তকে বিয়ে করেন।
এই বিবাহের ফলে রাজেন্দ্র কুমার ও সুনীল দত্তের পরিবারের সম্পর্ক আত্মীয়তার বন্ধনে আরও দৃঢ় হয়।
ব্যক্তিজীবন ও পরিবার
রাজেন্দ্র কুমার ও. পি. রালহানের বোন শুক্লাকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ছেলে কুমার গৌরব পরবর্তী সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর মেয়ে ডিম্পল চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজু প্যাটেলকে বিয়ে করেন।
রাজেন্দ্র কুমার তাঁর নামের আগে ‘ডক্টর’ উপাধি ব্যবহার করতেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রির বিষয় ও প্রতিষ্ঠানের নাম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সম্মান ও স্বীকৃতি
রাজেন্দ্র কুমারের দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবন তাঁকে দর্শকদের ভালোবাসার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্মান ও স্বীকৃতি এনে দেয়।
- পদ্মশ্রী: ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
- নেহরু জাতীয় পুরস্কার: কানুন (হিন্দি, ১৯৬০) এবং মেহেন্দি রং লাগ্যো (গুজরাটি, ১৯৬০) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি নেহরু জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন বলে উল্লেখ করা হয়।
- ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মনোনয়ন: দিল এক মন্দির (১৯৬৩), আয়ি মিলন কি বেলা (১৯৬৪) এবং আরজু (১৯৬৫) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে মনোনয়ন পান। সংগম (১৯৬৪) চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-অভিনেতা বিভাগেও মনোনীত হন।
- জনসেবামূলক কাজ: তিনি বিভিন্ন দাতব্য প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী জাতীয় পুরস্কারের সঙ্গেও তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়।
- জাস্টিস অব দ্য পিস: ১৯৬৯ সালে তিনি ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ সম্মানে ভূষিত হন এবং সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা যায়।
নির্বাচিত চলচ্চিত্র তালিকা
নিচে রাজেন্দ্র কুমারের অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো। মূল তালিকায় উল্লিখিত চলচ্চিত্রগুলির বানান ও সাল যথাসম্ভব প্রচলিত নাম অনুসারে সাজানো হয়েছে।
| সাল | চলচ্চিত্র | চরিত্র/বিশেষত্ব |
| ১৯৪৯ | পতঙ্গ | ছোট চরিত্র; চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ |
| ১৯৫০ | জোগান | বিজয়ের বন্ধু |
| ১৯৫৫ | বচন | কিশোর |
| ১৯৫৬ | তোফান আউর দিয়া | সতীশ শর্মা/মাস্টারজি |
| ১৯৫৬ | আওয়াজ | অশোক |
| ১৯৫৭ | মাদার ইন্ডিয়া | রামু |
| ১৯৫৮ | ঘর সংসার | দীপক |
| ১৯৫৮ | খাজাঞ্চি | হরিশ মোহন |
| ১৯৫৮ | তালাক | রবি শঙ্কর চৌবে |
| ১৯৫৯ | ধুল কা ফুল | মহেশ কাপুর |
| ১৯৫৯ | দো বেহেন | রমেশ |
| ১৯৫৯ | গুঞ্জ উঠি শেহনাই | কিষান |
| ১৯৬০ | কানুন | অ্যাডভোকেট কৈলাশ শর্মা |
| ১৯৬০ | মা বাপ | রাজ কুমার (রাজু) |
| ১৯৬১ | জিন্দেগি আউর খোয়াব | ইন্সপেক্টর মনোজ |
| ১৯৬১ | ঘরানা | কমল |
| ১৯৬১ | শশুড়াল | শেখর |
| ১৯৬৩ | দিল এক মন্দির | শঙ্কর |
| ১৯৬৩ | হামরাহি | শেখর |
| ১৯৬৩ | মেরে মেহবুব | আনোয়ার |
| ১৯৬৪ | সংগম | গোপাল বর্মা |
| ১৯৬৪ | আয়ি মিলন কি বেলা | শ্যাম |
| ১৯৬৫ | আরজু | গোপাল/সরজু |
| ১৯৬৬ | সুরজ | সুরজ সিং |
| ১৯৬৭ | পালকি | নাসিম বেগ |
| ১৯৬৭ | আমন | ড. গৌতমদাস |
| ১৯৬৮ | সাথী | রবি |
| ১৯৬৮ | ঝোঁক গয়া আসমান | সঞ্জয় সাক্সেনা |
| ১৯৬৯ | তালাশ | রাজ কুমার (রাজু) |
| ১৯৭০ | মেরা নাম জোকার | মহেন্দ্র কুমার |
| ১৯৭০ | গাঁওয়ার | গোপাল রায়/গরিব দাস |
| ১৯৭১ | আপ আয়ে বাহার আয়ি | কুমার বর্মা |
| ১৯৭২ | গোরা আউর কালা | করণ সিং; দ্বৈত চরিত্র |
| ১৯৭২ | গাঁও হামারা শহর তোমহারা | ব্রিজভূষণ |
| ১৯৭৪ | দুখ ভঞ্জন তেরা নাম | বোটসম্যান |
| ১৯৭৪ | দো শের | শেরা; পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র |
| ১৯৭৫ | দো জাসুস | করমচাঁদ জাসুস |
| ১৯৭৫ | রানি আউর লালপরি | রানির বাবা |
| ১৯৭৫ | তেরি মেরি এক জিন্দড়ি | জগ্গার সিং ফৌজি |
| ১৯৭৭ | দো শোলে | পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র |
| ১৯৭৮ | সাজন বিনা সুহাগন | রাজ কুমার |
| ১৯৮০ | ধন দৌলত | রাজ সাক্সেনা |
| ১৯৮১ | ইয়ে রিশতা না টুটে | পুলিশ ইন্সপেক্টর বিজয় কুমার |
| ১৯৮১ | লাভ স্টোরি | বিজয় মেহরা |
| ১৯৮২ | রুস্তম | জে. ডি. মেহতা |
| ১৯৮৩ | লাভারস | খ্রিস্টান যাজক |
| ১৯৮৮ | ম্যায় তেরে লিয়ে | শিবা |
| ১৯৮৯ | ক্লার্ক | রহিমউদ্দিন খান |
| ১৯৯১ | ইনসাফ কা কানুন | বিচারক কুমার |
| ১৯৯৩ | ফুল | ধরমরাজ; প্রযোজক হিসেবেও যুক্ত |
| ১৯৯৫ | আন্দাজ | টেলিভিশনে উপস্থিতি |
| ১৯৯৫ | বংশ | টেলিভিশনে উপস্থিতি |
দ্রষ্টব্য: এটি একটি নির্বাচিত তালিকা। চলচ্চিত্রের সাল, চরিত্রের নাম ও পুরস্কারসংক্রান্ত কয়েকটি তথ্য বিভিন্ন উৎসে ভিন্নভাবে পাওয়া যেতে পারে; প্রকাশনার আগে নির্ভরযোগ্য চলচ্চিত্র-তথ্যভান্ডার থেকে সেগুলি যাচাই করা বাঞ্ছনীয়।
প্রযোজক হিসেবে রাজেন্দ্রকুমার
অভিনেতা হিসেবে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি রাজেন্দ্র কুমার চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রযোজিত লাভ স্টোরি (১৯৮১) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ছবির মাধ্যমে ছেলে কুমার গৌরবের চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ ঘটে এবং ছবিটি বক্স অফিসে ব্যাপক সাফল্য পায়।
পরবর্তী সময়ে তিনি লাভারস (১৯৮৩), নাম (১৯৮৬), জুররত (১৯৯১) ও ফুল (১৯৯৩)-এর মতো চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্রযোজনা সংস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের সুযোগ করে দেওয়ার প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়।
মৃত্যু
রাজেন্দ্র কুমার ওষুধ সেবনে অনীহা প্রকাশ করতেন বলে তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১২ জুলাই, ৭০তম জন্মদিনের কয়েক দিন আগে, ঘুমের মধ্যে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর প্রয়াণে হিন্দি চলচ্চিত্রজগৎ হারায় এক জনপ্রিয় অভিনেতা, সফল প্রযোজক এবং বহু মানুষের প্রিয় শিল্পীকে।
উপসংহার
রাজেন্দ্র কুমারের জীবন ছিল অধ্যবসায়, জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের এক উল্লেখযোগ্য কাহিনি। সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্রজগতে কাজ শুরু করে তিনি ধীরে ধীরে হিন্দি সিনেমার অন্যতম প্রধান নায়কে পরিণত হয়েছিলেন। মাদার ইন্ডিয়া, গুঞ্জ উঠি শেহনাই, দিল এক মন্দির, সংগম, আয়ি মিলন কি বেলা ও *আরজু*র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও স্মরণীয়।
তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতাই ছিলেন না; ছিলেন একজন প্রযোজক, বন্ধুবৎসল মানুষ এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ ব্যক্তি। তাঁর ‘জুবিলি কুমার’ পরিচয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক বিশেষ যুগের স্মারক হয়ে রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে নতুন তারকারা উঠে এলেও রাজেন্দ্র কুমারের অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও চলচ্চিত্রজগতের অবদান হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কিংবদন্তি অভিনেতা ধর্মেন্দ্র:জীবনও
চলচ্চিত্র জগতে অবদান
জন্ম, পরিবার ও শৈশব
ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতের কিংবদন্তি অভিনেতা, চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং রাজনীতিবিদ ধর্মেন্দ্রর জন্ম ১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের লুধিয়ানা জেলার নাসরালি গ্রামে এক পাঞ্জাবি জাঠ শিখ পরিবারে। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ধরম সিং দেওল। তাঁর পিতার নাম কেওয়াল কিশন সিং দেওল এবং মাতার নাম সতবন্ত কৌর। তাঁর পিতৃপুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল লুধিয়ানা জেলার পাখোয়াল তহশিলের ডাংগন গ্রাম।
ধর্মেন্দ্রর শৈশব কেটেছিল সাহনেওয়াল গ্রামে। তিনি লুধিয়ানার লালটন কালানের সরকারি সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। তাঁর বাবা ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। পরে তিনি ফাগওয়াড়ার রামগড়িয়া কলেজ থেকে ১৯৫২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পড়াশোনা শেষ করার পর মাসিক ১৩৫ টাকা বেতনে রেল বিভাগে কেরানির চাকরিতে যোগ দেন।
চলচ্চিত্রের প্রতি আকর্ষণ ও অভিনয়জগতে প্রবেশ
ছোটবেলা থেকেই ধর্মেন্দ্রর চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল। সিনেমা দেখার নেশায় তিনি কখনো কখনো স্কুলের পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে প্রেক্ষাগৃহে চলে যেতেন। এ কারণে বাবার হাতে মারও খেতে হতো তাঁকে। কথিত আছে, ১৯৪৯ সালে তিনি ‘দিল্লাগি’ চলচ্চিত্রটি ৪০ বারেরও বেশি দেখেছিলেন।
অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন তিনি শৈশব থেকেই লালন করতেন। মাকে নিজের ইচ্ছার কথা জানালেও প্রথমদিকে মা তাঁর এই আকাঙ্ক্ষায় সম্মতি দেননি। বাবাও চেয়েছিলেন, ছেলে পড়াশোনা করে একটি স্থায়ী চাকরি করুক।
এমন সময় তাঁর জীবনে আসে একটি সুযোগ। ফিল্মফেয়ার পত্রিকা আয়োজিত নতুন প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় মায়ের অনুমতি নিয়ে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং বিজয়ী হন। এরপর তিনি পাঞ্জাব ছেড়ে বোম্বাইয়ে (বর্তমান মুম্বাই) চলে আসেন। পুরস্কারের সূত্রে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রতিশ্রুতি পেলেও সেই চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি।
অবশেষে ১৯৬০ সালে অর্জুন হিঙ্গোরানির পরিচালনায় ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ধর্মেন্দ্রর চলচ্চিত্রজীবন শুরু হয়। ছবিটিতে তিনি একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬১ সালে ‘বয় ফ্রেন্ড’ চলচ্চিত্রে সহায়ক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। পরবর্তী কয়েক বছরে বিভিন্ন রোমান্টিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ধীরে ধীরে দর্শকদের নজর কাড়েন।
রোমান্টিক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা
১৯৬০-এর দশকে ধর্মেন্দ্র হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ‘সুরত আউর সিরাত’ (১৯৬২), ‘অনপঢ়’ (১৯৬২), ‘বন্দিনী’ (১৯৬৩), ‘পূজা কে ফুল’ (১৯৬৪), ‘দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া’ (১৯৬৬) এবং ‘দুলহন এক রাত কি’ (১৯৬৭)-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
অভিনেত্রী নুতনের বিপরীতে ‘সুরত আউর সিরাত’, ‘বন্দিনী’, ‘দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া’ এবং ‘দুলহন এক রাত কি’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে। মালা সিনহার সঙ্গে ‘অনপঢ়’, ‘পূজা কে ফুল’, ‘বাহারেঁ ফির ভি আয়েঙ্গি’ ও ‘আঁখে’ চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেন। নন্দার সঙ্গে ‘আকাশদীপ’ এবং সায়রা বানুর সঙ্গে ‘শাদি’ ও ‘আয়ে মিলন কি বেলা’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় উল্লেখযোগ্য।
মীনা কুমারীর সঙ্গে সফল জুটি
ধর্মেন্দ্রর চলচ্চিত্রজীবনে অভিনেত্রী মীনা কুমারীর সঙ্গে তাঁর জুটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাঁদের একসঙ্গে অভিনীত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে ‘ম্যায় ভি লড়কি হুঁ’ (১৯৬৪), ‘কাজল’ (১৯৬৫), ‘পূর্ণিমা’ (১৯৬৫), ‘ফুল অউর পাথর’ (১৯৬৬), ‘মাঝলি দিদি’ (১৯৬৭), ‘চন্দন কা পালনা’ (১৯৬৭) এবং ‘বাহারোঁ কি মঞ্জিল’ (১৯৬৮)।
১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ফুল অউর পাথর’ ধর্মেন্দ্রর অভিনয়জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ছবিটি সে বছরের সর্বাধিক আয়কারী চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে এবং তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি প্রথমবার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। ছবিটিকে তাঁর অ্যাকশনধর্মী নায়ক-পরিচিতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
১৯৬৬ সালে হৃষীকেশ মুখার্জি পরিচালিত ‘অনুপমা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ধর্মেন্দ্র সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন। শর্মিলা ঠাকুরের বিপরীতে তাঁর সংযত ও স্বাভাবিক অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল।
রোমান্টিক নায়ক থেকে অ্যাকশন হিরো
ধর্মেন্দ্রর অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। ‘আয়ে মিলন কি বেলা’ (১৯৬৪), ‘প্যার হি প্যার’ (১৯৬৯), ‘আয়া সাওন ঝুমকে’ (১৯৬৯), ‘মেরে হামদম মেরে দোস্ত’ (১৯৬৮), ‘ইশক পর জোর নেহি’ (১৯৭০) এবং ‘জীবন মৃত্যু’ (১৯৭০)-এর মতো চলচ্চিত্রে তিনি রোমান্টিক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
অন্যদিকে ‘শিকার’ (১৯৬৮), ‘কব? কিউঁ? আউর কাহাঁ?’ (১৯৭০), ‘ব্ল্যাকমেল’ (১৯৭৩) এবং ‘কিমত’ (১৯৭৩)-এর মতো রহস্য ও সাসপেন্সধর্মী চলচ্চিত্রেও তিনি নিজের অভিনয়দক্ষতার পরিচয় দেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। রোমান্টিক চরিত্রের পাশাপাশি অ্যাকশন ও থ্রিলারধর্মী ছবিতে সাফল্যের ফলে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বহুমুখী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
হেমা মালিনীর সঙ্গে জুটি ও ‘শোলে’
ধর্মেন্দ্রর চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিল অভিনেত্রী হেমা মালিনীর সঙ্গে। পর্দায় তাঁদের রসায়ন দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁদের অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘শরাফত’ (১৯৭০), ‘তুম হাসিন ম্যায় জওয়ান’ (১৯৭০), ‘নয়া জামানা’ (১৯৭১), ‘রাজা জানি’ (১৯৭২), ‘সীতা অউর গীতা’ (১৯৭২), ‘জুগনু’ (১৯৭৩), ‘পাথর অউর পায়েল’ (১৯৭৪), ‘দোস্ত’ (১৯৭৪), ‘শোলে’ (১৯৭৫), ‘চাচা ভাতিজা’ (১৯৭৭), ‘আজাদ’ (১৯৭৮), ‘মা’ (১৯৮১) এবং ‘চারস’ (১৯৭৬)।
১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শোলে’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় স্থান অধিকার করে আছে। রমেশ সিপ্পি পরিচালিত এই ছবিতে ধর্মেন্দ্র বীরু চরিত্রে অভিনয় করেন। অমিতাভ বচ্চন, সঞ্জীব কুমার, হেমা মালিনী ও জয়ার সঙ্গে তাঁর অভিনয় ছবিটিকে বিশেষ জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ‘শোলে’ আজও ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘সত্যকাম’ (১৯৬৯) চলচ্চিত্রেও ধর্মেন্দ্রর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁর গম্ভীর ও বাস্তবধর্মী চরিত্র ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতার পরিচয় দেয়।
অ্যাকশন চলচ্চিত্রে সাফল্য
১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৮০-এর দশকে ধর্মেন্দ্র অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ‘ধরমবীর’ (১৯৭৭), ‘আজাদ’ (১৯৭৮), ‘কাতিলোঁ কে কাতিল’ (১৯৮১), ‘গজব’ (১৯৮২), ‘রাজপুত’ (১৯৮২), ‘ভাগবত’ (১৯৮২), ‘জানি দোস্ত’ (১৯৮৩), ‘ধরম অউর কানুন’ (১৯৮৪), ‘ম্যায় ইন্তেকাম লুঙ্গা’ (১৯৮২), ‘জীনে নেহি দুঙ্গা’ (১৯৮৪) এবং ‘হুকুমত’ (১৯৮৭) তাঁর উল্লেখযোগ্য অ্যাকশন ছবির মধ্যে পড়ে।
তিনি রাজেশ খান্না, জিতেন্দ্রসহ একাধিক জনপ্রিয় অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন। রাজেশ খান্নার সঙ্গে ‘টিংকু’ (১৯৭৭), ‘রাজপুত’ (১৯৮২) ও ‘ধরম অউর কানুন’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় উল্লেখযোগ্য। জিতেন্দ্রর সঙ্গে ‘ধরমবীর’, ‘সম্রাট’, ‘বার্নিং ট্রেন’ (১৯৮০), ‘জান হাতেলি পে’ (১৯৮৭), ‘কিনারা’ (১৯৭৭), ‘ধরম করম’ (১৯৭৫) এবং ‘নফরত কি আঁধি’ (১৯৮৯)-এর মতো ছবিতে তিনি অভিনয় করেন।
‘শালিমার’ (১৯৭৮), ‘কিয়ামত’ (১৯৮৩), ‘ঝুটা সাচ’ (১৯৮৪), ‘সিতমগর’ (১৯৮৫), ‘প্রফেসর প্যারেলাল’ (১৯৮১) এবং ‘ফন্দেবাজ’ (১৯৭৮)-এর মতো চলচ্চিত্রেও তিনি বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেন।
পরিচালকদের সঙ্গে কাজ ও দ্বৈত চরিত্রে অভিনয়
দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে ধর্মেন্দ্র বহু পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। অর্জুন হিঙ্গোরানির সঙ্গে তাঁর পেশাগত সম্পর্ক ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’ দিয়ে শুরু হওয়া এই সহযোগিতার ধারায় ‘কব? কিউঁ? আউর কাহাঁ?’, ‘কাহানি কিসমত কি’ (১৯৭৩), ‘খেল খিলাড়ি কা’ (১৯৭৭), ‘কাতিলোঁ কে কাতিল’ (১৯৮১) এবং ‘কৌন করে কুরবানি’ (১৯৯১)-এর মতো চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরিচালক প্রমোদ চক্রবর্তীর সঙ্গে তিনি ‘নয়া জামানা’, ‘ড্রিম গার্ল’, ‘আজাদ’ ও ‘জুগনু’ চলচ্চিত্রে কাজ করেন।
দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেও ধর্মেন্দ্র নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘ইয়াকিন’ (১৯৬৯) ছবিতে তিনি নায়ক ও খলনায়ক—দুই ভূমিকায় অভিনয় করেন। ‘সমাধি’ (১৯৭২)-তে পিতা ও পুত্রের চরিত্রে এবং ‘গজব’ (১৯৮২)-তে যমজ ভাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ‘ঝুটা সাচ’-এর মতো চলচ্চিত্রেও একাধিক চরিত্রে তাঁর অভিনয় উল্লেখযোগ্য।
পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রে অবদান
হিন্দি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ধর্মেন্দ্র নিজের মাতৃভাষা পাঞ্জাবিতেও অভিনয় করেছেন। ‘কঙ্কন’ (১৯৭০), ‘দো শের’ (১৯৭৪), ‘দুখ ভঞ্জন তেরা নাম’ (১৯৭৪), ‘তেরি মেরি এক জিন্দড়ি’ (১৯৭৫), ‘পুত্ত জট্টাঁ দে’ (১৯৮২) এবং ‘কুরবানি জাট্ট দি’ (১৯৯০) তাঁর উল্লেখযোগ্য পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকেও তিনি নায়ক এবং সহায়ক চরিত্রে অভিনয় চালিয়ে যান।
পুরস্কার ও সম্মান
ধর্মেন্দ্র তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বহু পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেছেন। ১৯৯৭ সালে তিনি ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার পান। প্রখ্যাত অভিনেতা দিলীপ কুমার ও তাঁর স্ত্রী সায়রা বানুর হাত থেকে পুরস্কারটি গ্রহণ করার সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
তিনি উল্লেখ করেন, শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে এবং বহু সাফল্য অর্জন করেও তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার জিততে পারেননি। সেই অনুষ্ঠানে দিলীপ কুমার রসিকতা করে বলেছিলেন, সর্বশক্তিমানের কাছে তাঁর একটি অভিযোগ থাকবে—কেন তাঁকে ধর্মেন্দ্রর মতো সুদর্শন করে সৃষ্টি করা হয়নি!
ধর্মেন্দ্রর উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও স্বীকৃতির মধ্যে রয়েছে—
- ১৯৯১: ‘ঘায়েল’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা জনপ্রিয় চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্বীকৃতি; ছবিটির প্রযোজনায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
- ১৯৯৭: ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার।
- ২০০৩: সানসুই ভিউয়ার্স চয়েস লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
- ২০০৭: পুনে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও আইআইএফএ-র আজীবন সম্মাননা-সহ একাধিক স্বীকৃতি।
- ২০০৮: ‘অ্যাক্টর পার এক্সেলেন্স’ সম্মাননা এবং মুম্বাই অ্যাকাডেমি অব মুভিং ইমেজের আজীবন সম্মাননা।
- ২০০৯: নাসিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আজীবন সম্মাননা।
- ২০১০: চলচ্চিত্রজগতে দীর্ঘ অবদানের জন্য ‘বিগ স্টার এন্টারটেইনার’ সম্মাননা।
- ২০১১: অপ্সরা ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন প্রডিউসারস গিল্ডের আজীবন সম্মাননা এবং ভারতীয় টেলিভিশন অ্যাকাডেমির ‘স্ক্রোল অব অনার’।
২০১২ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ প্রদান করে।
ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে মনোনয়ন ও প্রাপ্তি
ধর্মেন্দ্র বিভিন্ন সময়ে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য মনোনয়ন ও পুরস্কার হলো—
| সাল | বিভাগ | চলচ্চিত্র | ফলাফল |
| ১৯৬৫ | শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা | ‘আয়ে মিলন কি বেলা’ | মনোনীত |
| ১৯৬৭ | শ্রেষ্ঠ অভিনেতা | ‘ফুল অউর পাথর’ | মনোনীত |
| ১৯৭২ | শ্রেষ্ঠ অভিনেতা | ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’ | মনোনীত |
| ১৯৭৪ | শ্রেষ্ঠ অভিনেতা | ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’ | মনোনীত |
| ১৯৭৫ | শ্রেষ্ঠ অভিনেতা | ‘রেশম কি ডোরি’ | মনোনীত |
| ১৯৮৪ | হাস্যরসাত্মক চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনয় | ‘নওকর বিবি কা’ | মনোনীত |
| ১৯৯১ | শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র | ‘ঘায়েল’ | পুরস্কৃত |
| ১৯৯৭ | আজীবন সম্মাননা | — | পুরস্কৃত |
চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে ধর্মেন্দ্র
অভিনয়ের পাশাপাশি ধর্মেন্দ্র চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি ‘বিজয়তা ফিল্মস’ নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটির প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘বেতাব’ (১৯৮৩), যার মাধ্যমে তাঁর বড় ছেলে সানি দেওল নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ছবিটি সে বছরের অন্যতম সফল চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে।
১৯৯০ সালে এই সংস্থার প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘ঘায়েল’। সানি দেওল অভিনীত ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি একাধিক পুরস্কার অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে ‘বরসাত’ (১৯৯৫) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ছোট ছেলে ববি দেওলের অভিনয়জীবন শুরু হয়। ধর্মেন্দ্র তাঁর ভাগ্নে অভয় দেওলের চলচ্চিত্রজীবন শুরু করতেও সাহায্য করেন; অভয় ‘সোচা না থা’ (২০০৫) ছবির মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন।
অভিনয়ে বিরতি ও প্রত্যাবর্তন
২০০৩ সালের পর ধর্মেন্দ্র কয়েক বছর অভিনয় থেকে কিছুটা দূরে ছিলেন। ২০০৭ সালে অনুরাগ বসুর ‘লাইফ ইন এ… মেট্রো’ এবং অনিল শর্মার ‘আপনে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি আবার দর্শকদের সামনে ফিরে আসেন।
‘লাইফ ইন এ… মেট্রো’ সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে এবং বাণিজ্যিকভাবেও সাফল্য পায়। ‘আপনে’ ছবিতে তিনি দুই ছেলে সানি ও ববি দেওলের সঙ্গে অভিনয় করেন। একই বছরে মুক্তি পায় শ্রীরাম রাঘবন পরিচালিত ‘জনি গদ্দার’।
২০১১ সালে তিনি দুই ছেলের সঙ্গে ‘ইয়ামলা পাগলা দিওয়ানা’ ছবিতে অভিনয় করেন। ২০১৩ সালে ছবিটির দ্বিতীয় পর্ব ‘ইয়ামলা পাগলা দিওয়ানা ২’ মুক্তি পায়। ‘টেল মি ও খুদা’ (২০১১) চলচ্চিত্রে মেয়ে এশা দেওলের সঙ্গেও তিনি অভিনয় করেন। ২০১৪ সালে পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র ‘ডাবল দি ট্রাবল’-এ দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে আবারও নিজের বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দেন।
২০০৮ সালে জাহ্নু বড়ুয়া পরিচালিত ‘হার পাল’ চলচ্চিত্রে প্রীতি জিন্টার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন। অভিনেত্রী প্রীতি জিন্টা এক সাক্ষাৎকারে ধর্মেন্দ্রকে তাঁর প্রিয় অভিনেতাদের একজন বলে উল্লেখ করেছিলেন।
টেলিভিশনে বিচারক হিসেবে
২০১১ সালে ধর্মেন্দ্র জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘ইন্ডিয়াস গট ট্যালেন্ট’-এর তৃতীয় মরসুমে বিচারক হিসেবে যোগ দেন। সাজিদ খানের পরিবর্তে তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল।
রাজনীতিতে ধর্মেন্দ্র
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ধর্মেন্দ্র রাজনীতিতেও অংশগ্রহণ করেন। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে রাজস্থানের বিকানের কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি লোকসভার সদস্য ছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারের সময় গণতন্ত্র ও নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর একটি মন্তব্যের জন্য তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। সংসদে তাঁর উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। চলচ্চিত্রের কাজ এবং ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে তিনি সংসদীয় কার্যক্রমে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে পারেননি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার
ধর্মেন্দ্র ১৯৫৪ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে, প্রকাশ কৌরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই ছেলে—সানি দেওল ও ববি দেওল—পরবর্তী সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের পরিচিত অভিনেতা হয়ে ওঠেন। তাঁদের দুই মেয়ে বিজেতা দেওল ও অজিতা দেওল।
পরবর্তী সময়ে অভিনেত্রী হেমা মালিনীর সঙ্গে ধর্মেন্দ্রর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৮০ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌরের সঙ্গে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি। হেমা মালিনীর সঙ্গে বিবাহের জন্য তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে একসময় প্রচারিত হয়; ধর্মেন্দ্র অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করেছিলেন।
ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর দুই মেয়ে—এশা দেওল ও অহনা দেওল। এশা দেওল ১৯৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। অহনা দেওল ১৯৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং চলচ্চিত্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ধর্মেন্দ্রর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ববি দেওলের ছেলে ধর্ম সিং দেওল এবং সানি দেওলের ছেলে করণ দেওল এই পরিবারের নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। করণ দেওল ২০১৯ সালে ‘পল পল দিল কে পাস’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জগতে আত্মপ্রকাশ করেন।
অন্যান্য স্বীকৃতি ও জনপ্রিয়তা
১৯৭০-এর দশকে ধর্মেন্দ্রকে বিশ্বের অন্যতম সুদর্শন পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। তাঁর শক্তিশালী শারীরিক গঠন ও অ্যাকশনধর্মী অভিনয়ের জন্য তিনি ‘হি-ম্যান’ নামে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে দীর্ঘ অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্রসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও সম্মাননা পেয়েছেন।
তাঁর অভিনয়জীবনের সাফল্য কেবল বাণিজ্যিক ছবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘সত্যকাম’-এর মতো চলচ্চিত্রে সংবেদনশীল ও বাস্তবধর্মী অভিনয় এবং ‘শোলে’-এর মতো ছবিতে স্মরণীয় চরিত্র তাঁকে বিভিন্ন প্রজন্মের দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
উপসংহার
ধর্মেন্দ্র ভারতীয় চলচ্চিত্রের এমন একজন শিল্পী, যিনি রোমান্টিক নায়ক, অ্যাকশন হিরো, হাস্যরসাত্মক চরিত্রাভিনেতা এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক—বিভিন্ন পরিচয়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। পাঞ্জাবের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার তাঁর যাত্রা বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন। অভিনয়, প্রযোজনা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর কর্মজীবনের বৈচিত্র্য, সহজাত অভিনয়ক্ষমতা এবং দর্শকদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংযোগই তাঁকে কিংবদন্তি অভিনেতাদের সারিতে স্থান দিয়েছে।
কিংবদন্তি অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক
মনোজ কুমার
ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক মনোজ কুমার দেশাত্মবোধক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও অভিনয়ের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। দেশপ্রেমের আবেগকে তাঁর চলচ্চিত্রে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলার কারণে তিনি ‘ভারত কুমার’ নামে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁর প্রকৃত নাম হরিকিষণ গিরি গোস্বামী।
জন্ম ও শৈশব
মনোজ কুমারের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৪ জুলাই ব্রিটিশ শাসিত ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অ্যাবোটাবাদে, যা বর্তমানে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের অন্তর্গত। তাঁর পিতার নাম এইচ. এল. গোস্বামী এবং মাতার নাম কৃষ্ণা কুমারী গোস্বামী। তাঁরা চার ভাইবোন ছিলেন। তাঁর দুই ভাই রাজীব গোস্বামী ও মনীশ আর. গোস্বামী এবং বোন নীলম গোস্বামী।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় তাঁদের পরিবার জান্ডিয়ালা শের খান থেকে দিল্লিতে চলে আসে। তখন মনোজ কুমারের বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। দিল্লির বিজয়নগরের কিংসওয়ে ক্যাম্পে কিছুদিন বসবাস করার পর তাঁদের পরিবার নতুন দিল্লির রাজেন্দ্র নগরে চলে যায়। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন।
শৈশবে তিনি দিলীপ কুমার, অশোক কুমার ও অভিনেত্রী কামিনী কৌশলের অনুরাগী ছিলেন। দিলীপ কুমার অভিনীত ‘শবনম’ চলচ্চিত্রে মনোজ নামের চরিত্রটি তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। সেই চরিত্রের নাম থেকেই তিনি নিজের চলচ্চিত্রজগতের নাম ‘মনোজ কুমার’ গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে এই নামেই তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ ও প্রাথমিক সাফল্য
১৯৫৭ সালে ‘ফ্যাশন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মনোজ কুমার অভিনয়জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। এই ছবিতে তিনি আশি বছর বয়সি এক বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পরের বছর, ১৯৫৮ সালে, ‘সাহারা’ চলচ্চিত্রে মীনা কুমারীর বিপরীতে শ্যামের চরিত্রে এবং ‘পঞ্চায়েত’ চলচ্চিত্রে শ্যামার বিপরীতে গোপালের চরিত্রে অভিনয় করেন।
১৯৫৯ সালে ‘চাঁদ’ চলচ্চিত্রে মীনা কুমারীর বিপরীতে গোকুলের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছবিটিতে বলরাজ সাহনীও অভিনয় করেছিলেন।
১৯৬০ সালে ‘হানিমুন’, ‘কাঁচ কি গুড়িয়া’ এবং ‘পিয়া কি মিলন কি আস’-এর মতো ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। ‘কাঁচ কি গুড়িয়া’ চলচ্চিত্রে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সাইদা খান এবং ‘পিয়া কি মিলন কি আস’-এ ছিলেন অমিতা। ১৯৬১ সালে ‘সুহাগ সিঁদুর’ ছবিতে মালা সিনহা এবং ‘রেশমি রুমাল’ ছবিতে শাকিলার বিপরীতে অভিনয় করেন।
১৯৬২ সালে বিজয় ভাট পরিচালিত ‘হরিয়ালি আউর রাস্তা’ চলচ্চিত্রে মালা সিনহার বিপরীতে অভিনয় করে তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। একই সময়ে ‘শাদি’, ‘বনারসি ঠগ’, ‘মা-বেটা’, ‘নকলি নবাব’ এবং ‘আপনা বনা কে দেখো’-এর মতো ছবিতেও তিনি অভিনয় করেন। এসব ছবিতে তাঁর সহ-অভিনেত্রীদের মধ্যে ছিলেন সায়রা বানু, বৈজয়ন্তীমালা, অমিতা, শাকিলা ও আশা পারেখ। ‘শাদি’ চলচ্চিত্রে বলরাজ সাহনী ও ধর্মেন্দ্রও অভিনয় করেছিলেন।
১৯৬৩ সালে ‘ঘর বসাকে দেখো’, ‘গৃহস্থী’ এবং ‘আপনে হুয়ে পরায়ে’ ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৬৪ সালে রাজ খোসলা পরিচালিত রহস্য-রোমাঞ্চধর্মী ‘ওহ কৌন থি?’ চলচ্চিত্রে সাধনার বিপরীতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একই বছরে ‘ফুলো কি সেজ’, ‘শহিদ’ ও ‘বেদাগ’-এর মতো ছবিতেও অভিনয় করেন।
১৯৬৫ সালে বিজয় ভাট পরিচালিত ‘হিমালয় কি গোধ মে’ চলচ্চিত্রে মালা সিনহার বিপরীতে অভিনয় করে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সেই বছর ‘গুমনাম’ ও ‘পুনম কি রাত’-এর মতো ছবিতেও তাঁকে দেখা যায়। ১৯৬৬ সালে ‘পিকনিক’, ‘দো বদন’, ‘সাওন কি ঘটা’, ‘পত্থর কে সনম’ এবং ‘অনিতা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এসব ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন কল্পনা, আশা পারেখ, শর্মিলা ঠাকুর, ওয়াহিদা রহমান, মমতাজ ও সাধনা।
ষাটের দশকে মনোজ কুমার রোমান্টিক, সামাজিক ও রহস্য-রোমাঞ্চধর্মী—বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দেন। ‘হানিমুন’, ‘নকলি নবাব’, ‘পত্থর কে সনম’ ও ‘সাওন কি ঘটা’ ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য রোমান্টিক ছবি। অন্যদিকে ‘গৃহস্থী’, ‘আপনে হুয়ে পরায়ে’ ও ‘আদমি’-তে তিনি সামাজিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। ‘গুমনাম’, ‘অনিতা’ এবং ‘ওহ কৌন থি?’-এর মতো ছবিতে রহস্য-রোমাঞ্চধর্মী চরিত্রেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন।
দেশপ্রেমমূলক চলচ্চিত্রে নতুন পরিচয়
মনোজ কুমারের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় দেশপ্রেমমূলক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ‘জয় জওয়ান, জয় কিষান’ স্লোগানের ভাবধারায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তাঁকে অনুপ্রাণিত করেন। সেই প্রেরণায় মনোজ কুমার স্বাধীনতা সংগ্রামী ভগৎ সিংয়ের জীবন ও আত্মত্যাগের ওপর ভিত্তি করে ‘শহিদ’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ছবিটিতে তিনি শহিদ-ই-আজম ভগৎ সিংয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটি তাঁর দেশপ্রেমমূলক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত ও অভিনীত ‘উপকার’। এই ছবিতে তিনি একদিকে সৈনিক, অন্যদিকে কৃষকের জীবন ও আদর্শের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন। ছবিটিতে আশা পারেখ, প্রাণ, কামিনী কৌশল ও প্রেম চোপড়াও অভিনয় করেছিলেন।
‘উপকার’ চলচ্চিত্রটি দর্শক ও সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে। ছবিটির জন্য মনোজ কুমার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার অর্জন করেন। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের ফিল্মফেয়ার পুরস্কারসহ একাধিক সম্মান লাভ করে। মনোজ কুমার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন।
‘উপকার’ চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল দেশপ্রেমমূলক গান ‘মেরে দেশ কি ধরতি’। গানটির কথা লিখেছিলেন গুলশন বাওরা, সুরারোপ করেছিলেন কল্যাণজি-আনন্দজি এবং কণ্ঠ দিয়েছিলেন মহেন্দ্র কাপুর। গানটি ভারতীয় দেশাত্মবোধক সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
১৯৬৮ সালে ‘আদমি’ চলচ্চিত্রে ওয়াহিদা রহমানের বিপরীতে অভিনয় করেন মনোজ কুমার। এই ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। ১৯৬৯ সালে ‘সাজন’ চলচ্চিত্রে আশা পারেখের বিপরীতে অভিনয় করেন।
সত্তরের দশকে সাফল্যের শিখরে
১৯৭০ সালে মনোজ কুমার পরিচালনা ও অভিনয় করেন ‘পূরব আউর পশ্চিম’ চলচ্চিত্রে। ছবিটিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সায়রা বানু। ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও দেশপ্রেমের ভাবধারাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিটি বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। একই বছরে ‘ইয়াদগার’, ‘পেহচান’ এবং রাজ কাপুর পরিচালিত ‘মেরা নাম জোকার’-এও অভিনয় করেন।
১৯৭১ সালে ‘বলিদান’ চলচ্চিত্রে সায়রা বানুর বিপরীতে এবং ‘সুরজ’ নয়, বরং ‘শোর’ চলচ্চিত্রে জয়া বচ্চনের বিপরীতে অভিনয় করেন। ‘শোর’ ছবিটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও এর গান দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। ছবিটির বিখ্যাত গান ‘এক প্যায়ার কা নগমা হ্যায়’-এর কথা লিখেছিলেন সন্তোষ আনন্দ, সুরারোপ করেছিলেন লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল এবং গানটি গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর ও মুকেশ। ছবিটি সম্পাদনার জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করে এবং পরিচালনা ও কাহিনির জন্যও পুরস্কারের মনোনয়ন পায়।
১৯৭২ সালে ‘বে-ইমান’ চলচ্চিত্রে মোহনের চরিত্রে অভিনয় করে মনোজ কুমার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেন। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন রাখী। প্রেমনাথ, প্রাণ, প্রেম চোপড়া, কামিনী কৌশল ও হেমা মালিনীর মতো শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতেও তিনি পছন্দ করতেন।
১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘রুটি কাপড়া আউর মকান’। ছবিটির পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রধান অভিনেতা ছিলেন মনোজ কুমার। এতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেন জিনাত আমান, মৌসুমি চট্টোপাধ্যায়, শশী কাপুর ও অমিতাভ বচ্চন। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, জীবিকার সংকট এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার মতো সামাজিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
এই চলচ্চিত্রের জন্য মনোজ কুমার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেন। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কারসহ একাধিক বিভাগে মনোনয়ন পায়। শ্রেষ্ঠ অভিনেতার বিভাগেও মনোজ কুমার মনোনীত হয়েছিলেন।
১৯৭৪ সালেই তিনি ‘সন্ন্যাসী’ চলচ্চিত্রে হেমা মালিনীর বিপরীতে অভিনয় করেন। ধর্মীয় আবহে নির্মিত এই কমেডি ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং তাঁর অভিনয়জীবনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে ওঠে।
১৯৭৬ সালে ‘দশ নম্বরি’ চলচ্চিত্রে হেমা মালিনীর বিপরীতে অভিনয় করেন। ছবিটিতে প্রাণ ও প্রেমনাথের মতো অভিনেতারাও ছিলেন। ১৯৭৭ সালে ‘শিরডি কে সাই বাবা’ চলচ্চিত্রে হেমা মালিনীর বিপরীতে এবং ‘আমানত’ ছবিতে সাধনার বিপরীতে অভিনয় করেন। ‘শিরডি কে সাই বাবা’ ছবিতে রাজেন্দ্র কুমারও অভিনয় করেছিলেন। ‘আমানত’-এ তাঁর সহশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন বলরাজ সাহনী, মেহমুদ, অরুণা ইরানি ও অসিত সেন।
১৯৭৯ সালে ‘জাত পাঞ্জাবি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সত্তরের দশকে মনোজ কুমার অভিনয় ও পরিচালনা—উভয় ক্ষেত্রেই নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত তাঁর চলচ্চিত্রগুলো তাঁকে অন্য অভিনেতাদের থেকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দেয়।
‘ক্রান্তি’ ও পরবর্তী চলচ্চিত্রজীবন
১৯৮১ সালে মনোজ কুমার পরিচালিত ‘ক্রান্তি’ মুক্তি পায়। এই ঐতিহাসিক দেশপ্রেমমূলক চলচ্চিত্রটি তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম বৃহৎ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ছবিটিতে তিনি তাঁর আদর্শ অভিনেতা দিলীপ কুমারকে পরিচালনা করার সুযোগ পান। দিলীপ কুমার, শশী কাপুর, শত্রুঘ্ন সিনহা, হেমা মালিনী, পারভিন বাবি, নিরূপা রায় ও প্রেম চোপড়ার মতো তারকারা এতে অভিনয় করেন। মনোজ কুমার ছবিটিতে ভারতের চরিত্রে অভিনয় করেন। ‘ক্রান্তি’ বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সাফল্য লাভ করে এবং দেশপ্রেমমূলক চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তাঁর খ্যাতিকে আরও সুদৃঢ় করে।
‘ক্রান্তি’-র পর থেকে তাঁর অভিনয়জীবনের গতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ১৯৮৭ সালে ‘কালযুগ আউর রামায়ণ’ চলচ্চিত্রে তিনি পবনপুত্র হনুমানের চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৮৯ সালে ‘সন্তোষ’ ও ‘ক্লার্ক’ ছবিতে অভিনয় করেন। ‘সন্তোষ’-এ তিনি সন্তোষ সিংয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছবিটিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন নিরূপা রায়, রাখী, প্রেম চোপড়া ও হেমা মালিনী।
‘ক্লার্ক’ চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাও করেন। এতে অশোক কুমার, রাজেন্দ্র কুমার, রেখা, শশী কাপুর, অনিতা রাজ, প্রেম চোপড়া এবং পাকিস্তানি অভিনেতা মোহাম্মদ আলী ও জেবার মতো শিল্পীরা অভিনয় করেছিলেন।
১৯৯১ সালে ‘দেশবাসী’ চলচ্চিত্রে সংগ্রাম সিংয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৯৯৫ সালে ‘ময়দান-ই-জং’-এ মাস্টার দীননাথের চরিত্রে তাঁকে দেখা যায়। ছবিটিতে ধর্মেন্দ্র, অক্ষয় কুমার ও করিশ্মা কাপুরও অভিনয় করেছিলেন। এটিই ছিল তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র। ১৯৯৯ সালে তিনি দেশপ্রেমের ভাবধারায় নির্মিত ‘জয় হিন্দ’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন। এরপর তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও অভিনয় থেকে কার্যত অবসর নেন।
রাজনীতিতে যোগদান
অনেক চলচ্চিত্রশিল্পীর মতো মনোজ কুমারও জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন। তবে তাঁর প্রধান পরিচয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের একজন বিশিষ্ট অভিনেতা ও দেশপ্রেমমূলক চলচ্চিত্রের নির্মাতা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।
পুরস্কার ও সম্মাননা
দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে মনোজ কুমার অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও মনোনয়নগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ও মনোনয়ন
- ১৯৬৮: ‘উপকার’ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার অর্জন করেন। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, কাহিনি ও সংলাপসহ বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার ও মনোনয়ন লাভ করে। মনোজ কুমার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন।
- ১৯৬৯: ‘আদমি’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার বিভাগে মনোনয়ন পান।
- ১৯৭২: ‘বে-ইমান’ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেন।
- ১৯৭৩: ‘শোর’ চলচ্চিত্রের জন্য পরিচালনার বিভাগে মনোনয়ন পান।
- ১৯৭৫: ‘রুটি কাপড়া আউর মকান’-এর জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেন। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ অভিনেতাসহ একাধিক বিভাগে মনোনয়ন পায়।
- ১৯৭৬: ‘সন্ন্যাসী’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার বিভাগে মনোনয়ন পান।
- ১৯৯৯: চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার লাভ করেন।
অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মাননা
- ১৯৬৮: ‘উপকার’ চলচ্চিত্রের জন্য বোম্বে ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএফজেএ)-এর শ্রেষ্ঠ সংলাপের পুরস্কার লাভ করেন।
- ১৯৯২: ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
- ২০০১: চলচ্চিত্রজগতে দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য কলাকার পুরস্কার লাভ করেন।
- ২০০৭: সরদার প্যাটেল লাইফটাইম আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত হন।
- ২০০৮: স্টার স্ক্রিন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার লাভ করেন।
- ২০০৯: দাদাসাহেব ফালকে অ্যাকাডেমির ‘ফালকে রত্ন’ সম্মান পান।
- ২০১০: মুম্বাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আজীবন অবদানের স্বীকৃতি লাভ করেন।
- ২০১২: অপ্সরা ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন প্রডিউসারস গিল্ডের লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার এবং নাসিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আজীবন অবদানের সম্মান লাভ করেন। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে ‘ভারত গৌরব’ সম্মানেও ভূষিত হন।
- ২০১৩: জাগরণ চলচ্চিত্র উৎসবে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার লাভ করেন।
- ২০১৬: দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হন।
- ২০১৯: বিএফজেএ-র পক্ষ থেকে আজীবন অবদানের স্বীকৃতি পান।
- ২০২০: ডব্লিউবিআর-এর পক্ষ থেকে ‘বলিউডের গোল্ডেন এরা’ সম্মান লাভ করেন।
বিশেষ সম্মান
২০০৮ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার মনোজ কুমারের সম্মানে তাঁর নামে এক লক্ষ টাকার একটি পুরস্কার প্রবর্তন করে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে তাঁকে ভারতরত্ন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর কথাও জানা যায়।
২০১১ সালে শিরডির সাই বাবা সতনাম ট্রাস্ট পিম্পালওয়াড়ি রোডের একটি অংশের নাম ‘মনোজ কুমার গোস্বামী রোড’ রাখে বলে উল্লেখ করা হয়। এসব সম্মান তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন।
ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার
মনোজ কুমার হরিয়ানার সিরসা জেলার শশী গোস্বামীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই পুত্র—বিশাল গোস্বামী ও কুনাল গোস্বামী। তাঁদের কোনো কন্যাসন্তান নেই।
বিশাল গায়ক হিসেবে এবং কুনাল অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর ভাই রাজীব গোস্বামীও চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেছিলেন। তবে পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের কেউই মনোজ কুমারের মতো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি।
উপসংহার
মনোজ কুমার ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা, জাতীয় ঐক্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামকে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন। ‘শহিদ’, ‘উপকার’, ‘পূরব আউর পশ্চিম’, ‘রুটি কাপড়া আউর মকান’ ও ‘ক্রান্তি’-র মতো চলচ্চিত্র তাঁর সৃজনশীলতার স্মারক হয়ে রয়েছে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে দেশপ্রেমমূলক ধারাকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। পর্দায় দেশপ্রেমের আবেগকে জীবন্ত করে তোলার অনন্য ক্ষমতার জন্যই তিনি দর্শকদের কাছে ‘ভারত কুমার’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
শশী কাপুর
অভিনেতা ও চলচ্চিত্র প্রযোজকের জীবনচরিত
ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শশী কাপুর ছিলেন এক জনপ্রিয় অভিনেতা, দক্ষ চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখ। রোমান্টিক নায়ক থেকে শুরু করে পুলিশ অফিসার, পারিবারিক চরিত্র ও সংবেদনশীল ব্যক্তিত্ব—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ব্রিটিশ ও মার্কিন চলচ্চিত্রেও অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেন। তাঁর অভিনয়জীবন, ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় থিয়েটারের প্রতি অবদান তাঁকে চলচ্চিত্র জগতের এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
জন্ম ও পরিবার
অভিনেতা ও চলচ্চিত্র প্রযোজক শশী কাপুরের জন্ম ১৯৩৮ সালের ৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ শাসিত ভারতের কলকাতায়। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বলবীর রাজ কাপুর। তাঁর পিতার নাম পৃথ্বীরাজ কাপুর এবং মাতার নাম রামসরণী দেবী কাপুর। তিনি ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা ও পরিচালক রাজ কাপুর এবং অভিনেতা শাম্মী কাপুরের ছোট ভাই। কাপুর পরিবারের চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের ঐতিহ্য তাঁর শিল্পীজীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
অভিনয় জীবনের সূচনা
শশী কাপুরের অভিনয়জীবনের সূচনা হয়েছিল শৈশবেই। তাঁর পিতা পৃথ্বীরাজ কাপুর পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল পৃথ্বী থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি মঞ্চে অভিনয় করার সুযোগ পান। থিয়েটারের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে করতে অভিনয় ও মঞ্চ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন তিনি।
১৯৪০-এর দশকের শেষদিকে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ঘটে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজ কাপুর অভিনীত ও পরিচালিত ‘আগ’ (১৯৪৮) চলচ্চিত্রে তিনি ‘শশীরাজ’ নামে অভিনয় করেছিলেন। একই নামে অন্য একজন শিশুশিল্পীও পৌরাণিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করতেন। ‘আগ’ (১৯৪৮) এবং ‘আওয়ারা’ (১৯৫১) চলচ্চিত্রে তিনি রাজ কাপুরের চরিত্রের শৈশবকালীন রূপে অভিনয় করেন।
এ ছাড়া ‘সংগ্রাম’ (১৯৫০) চলচ্চিত্রে অশোক কুমার এবং ‘দানাপানি’ (১৯৫৩) চলচ্চিত্রে ভারত ভূষণের শৈশবকালীন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর অভিনয়দক্ষতা দর্শকদের নজর কাড়ে। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেতা হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৬১ সালে যশ চোপড়া পরিচালিত ‘ধর্মপুত্র’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবির মাধ্যমে তাঁর নায়কজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ
অভিনয়ের পাশাপাশি শশী কাপুর চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে সুনীল দত্ত অভিনীত ‘পোস্টবক্স ৯৯৯’ চলচ্চিত্রে তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এটি সুনীল দত্তের অভিনীত প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রগুলোর একটি।
পরবর্তী সময়ে তিনি ‘শ্রীমান সত্যবাদী’ (১৯৬০), ‘গেস্ট হাউস’ (১৯৫৯) এবং ‘দুলহা-দুলহন’ (১৯৬৪) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ‘শ্রীমান সত্যবাদী’ ও ‘দুলহা-দুলহন’ চলচ্চিত্রে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজ কাপুর মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা শশী কাপুরকে চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি ও সৃজনশীল দিক সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করেছিল।
নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা
‘ধর্মপুত্র’ (১৯৬১) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর শশী কাপুর হিন্দি চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে শুরু করেন। তাঁর প্রাথমিক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘চার দিওয়ারি’ (১৯৬১), ‘প্রেমপত্র’ (১৯৬২) এবং ‘ধর্মপুত্র’ (১৯৬১) উল্লেখযোগ্য। যদিও তাঁর প্রথম দিকের কয়েকটি চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি, তবু অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা ও স্বাভাবিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৬০, ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকের প্রথমার্ধে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাঁর আকর্ষণীয় চেহারা, মিষ্টি হাসি, সাবলীল অভিনয় এবং পর্দায় স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তাঁকে বিশেষ জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
১৯৬১ সাল থেকেই তিনি ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্রেও অভিনয় শুরু করেন। জেমস আইভরি পরিচালিত ‘দ্য হাউসহোল্ডার’ (১৯৬৩) এবং ‘শেক্সপিয়র-ওয়াল্লাহ’ (১৯৬৫) তাঁর আন্তর্জাতিক অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য কাজ।
নন্দার সঙ্গে জনপ্রিয় জুটি
ষাটের দশকে অভিনেত্রী নন্দার সঙ্গে শশী কাপুরের জুটি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁদের জুটিতে একাধিক রোমান্টিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ‘চার দিওয়ারি’ (১৯৬১) এবং ‘মেহেন্দি লাগি মেরে হাত’ (১৯৬২) ছিল তাঁদের উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক চলচ্চিত্র।
পরবর্তী সময়ে তাঁরা ‘মহব্বত ইসকো কহতে হ্যায়’ (১৯৬৫), ‘জব জব ফুল খিলে’ (১৯৬৫), ‘নিন্দ হামারি খোয়াব তুমহারে’ (১৯৬৬), ‘রাজা সাব’ (১৯৬৯) এবং ‘রুঠা না করো’ (১৯৭০) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিগুলোর মধ্যে ‘জব জব ফুল খিলে’ বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
শশী কাপুর এক সাক্ষাৎকারে নন্দাকে তাঁর প্রিয় নায়িকাদের একজন এবং অভিনয়জীবনের পরামর্শদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। অন্যদিকে, নন্দাও শশী কাপুরকে তাঁর প্রিয় নায়কদের একজন বলে স্বীকার করেছিলেন। তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব এই জুটিকে আরও স্মরণীয় করে রেখেছে।
রাখীর সঙ্গে অভিনয়
ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত শশী কাপুর রাখীর সঙ্গে একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁদের জুটির প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য ছবি ‘শর্মিলী’ (১৯৭১), যা বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে।
এরপর তাঁরা ‘জানোয়ার আউর ইনসান’ (১৯৭২), ‘কভি কভি’ (১৯৭৬), ‘তৃষ্ণা’ (১৯৭৮) এবং ‘বসেরা’ (১৯৮১) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এসব ছবিতে তাঁদের অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে।
তবে তাঁদের অভিনীত সব চলচ্চিত্র সমান সাফল্য পায়নি। ‘দোসরা আদমী’ (১৯৭৭), ‘বন্ধন কাঁচে ধাগোঁ কা’ (১৯৮৩), ‘বন্ধ হাথ’ (১৯৮৪) এবং ‘জমিন আসমান’ (১৯৮৫) প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
শর্মিলা টেগোরের সঙ্গে জুটি
শশী কাপুর ও শর্মিলা টেগোরের জুটি হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত জুটি। তাঁদের অভিনীত ‘ওয়াক্ত’ (১৯৬৫), ‘আমনে সামনে’ (১৯৬৭), ‘সুহানা সফর’ (১৯৭০), ‘আ গলে লাগ যা’ (১৯৭৩), ‘বচন’ (১৯৭৪), ‘পাপ আউর পুণ্য’ (১৯৭৪), ‘নিউ দিল্লি টাইমস’ (১৯৮৫) এবং ‘স্বাতি’ (১৯৮৬) উল্লেখযোগ্য।
বিশেষত ‘নিউ দিল্লি টাইমস’ চলচ্চিত্রে শশী কাপুরের অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। এই ছবিতে সাংবাদিকতার জগৎ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মতো বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল। ছবিটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
অন্যদিকে, শর্মিলা টেগোরের সঙ্গে তাঁর অভিনীত ‘মাই লাভ’ (১৯৭০), ‘অনাড়ি’ (১৯৭৫), ‘গেহেরি চোট’ (১৯৮৩) এবং ‘মা বেটি’ (১৯৮৬) প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি।
জিন্নাত আমানের সঙ্গে অভিনয়
জিন্নাত আমানের সঙ্গেও শশী কাপুরের জুটি দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। তাঁদের অভিনীত ‘রুটি কাপড়া আউর মকান’ (১৯৭৪), ‘চোর মচায়ে শোর’ (১৯৭৪), ‘দিওয়ানগি’ (১৯৭৬), ‘হীরালাল পান্নালাল’ (১৯৭৮), ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ (১৯৭৮), ‘পাখণ্ডী’ (১৯৮৪) এবং ‘ভবানী জংশন’ (১৯৮৫) উল্লেখযোগ্য।
এই ছবিগুলোর মধ্যে কয়েকটি বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছিল। তবে ‘ক্রোধী’ (১৯৮১), ‘উকিল বাবু’ (১৯৮২) এবং ‘বন্ধন কাঁচে ধাগোঁ কা’ (১৯৮৩) তেমন সাফল্য পায়নি।
হেমা মালিনীর সঙ্গে জুটি
অভিনেত্রী হেমা মালিনীর সঙ্গেও শশী কাপুর বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁদের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অভিনেত্রী’ (১৯৭০), ‘আপ বীতি’ (১৯৭৬), ‘ত্রিশূল’ (১৯৭৮), ‘আপনা খুন’ (১৯৭৮), ‘দো আউর দো পাঁচ’ (১৯৮০), ‘মান গয়ে উস্তাদ’ (১৯৮১) এবং ‘আঁধি তুফান’ (১৯৮৫)।
যশ চোপড়া পরিচালিত ‘ত্রিশূল’ চলচ্চিত্রটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে ‘জহাঁ প্যার মিলে’ (১৯৬৯), ‘নাচ উঠে সংসার’ (১৯৭৬) এবং ‘আঞ্জাম’ (১৯৮৭) প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
অন্যান্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্র
শশী কাপুরের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বহু অভিনেত্রী ও অভিনেতার সঙ্গে তাঁর সফল জুটি গড়ে উঠেছিল। ববিতার সঙ্গে অভিনীত ‘হাসিনা মান যায়েগি’ (১৯৬৮) এবং ‘এক শ্রীমান এক শ্রীমতী’ (১৯৬৯) জনপ্রিয় হয়েছিল। আশা পারেখের সঙ্গে ‘কন্যাদান’ (১৯৬৮) ও ‘প্যার কা মৌসম’ (১৯৬৯) উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।
মমতাজের সঙ্গে ‘চোর মচায়ে শোর’ (১৯৭৪), রীণা রায়ের সঙ্গে ‘বেজুবান’ (১৯৮২) এবং রতি অগ্নিহোত্রীর সঙ্গে ‘বেপনাহ’ (১৯৮৫) তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
রেখার সঙ্গে শশী কাপুর অভিনয় করেন ‘চক্কর পে চক্কর’ (১৯৭৬), ‘কালা পাথর’ (১৯৭৯), ‘কালযুগ’ (১৯৮১), ‘বিজেতা’ (১৯৮২) এবং ‘প্যার কি জিত’ (১৯৮৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে। এ ছাড়া ‘দিল নে পুকারা’ (১৯৬৭), ‘নিয়ত’ (১৯৮০), ‘নাইনা’ (১৯৭৩), ‘ফাঁসি’ (১৯৭৮), ‘শালাখে’ (১৯৭৫), ‘ফকিরা’ (১৯৭৬) এবং ‘জুনুন’ (১৯৭৮) তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে পড়ে। রাজেশ খান্নার সঙ্গে তিনি ‘প্রেম কাহানি’ (১৯৭৫) চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন।
অশোক কুমারের সঙ্গে অভিনয়
শিশুশিল্পী হিসেবে শশী কাপুর প্রখ্যাত অভিনেতা অশোক কুমারের সঙ্গে ‘সংগ্রাম’ (১৯৫০) এবং ‘সমাধি’ (১৯৫০) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এই ছবিগুলো বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে ‘বেনজির’ (১৯৬৪) চলচ্চিত্রে তিনি অশোক কুমারের ছোট ভাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
১৯৭০-এর দশক ও আশির দশকের প্রথমভাগে শশী কাপুরের সঙ্গে অশোক কুমার বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁদের উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে ‘চোর মচায়ে শোর’, ‘আপ বীতি’, ‘শংকর দাদা’ (১৯৭৬), ‘আপনা খুন’, ‘মান গয়ে উস্তাদ’, ‘হীরা আউর পাথর’ (১৯৭৭) এবং ‘দো মুসাফির’ (১৯৭৮) রয়েছে।
‘শংকর দাদা’ চলচ্চিত্রে শশী কাপুর দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ছবিটির একটি গানে তাঁকে নারীর পোশাকে দেখা যায়। গানটি দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘হাসিনা মান যায়েগি’ চলচ্চিত্রেও তিনি দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
প্রাণের সঙ্গে অভিনয়
প্রবীণ অভিনেতা প্রাণের সঙ্গেও শশী কাপুরের দীর্ঘ কর্মসম্পর্ক ছিল। শিশুশিল্পী হিসেবে ‘সংস্কার’ (১৯৫১) চলচ্চিত্রে প্রাণের সঙ্গে অভিনয় করার পর পরবর্তী সময়েও তাঁদের একাধিক ছবিতে একসঙ্গে দেখা যায়।
তাঁদের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘বিরাদরি’ (১৯৬৬), ‘চোর মচায়ে শোর’, ‘ফাঁসি’, ‘শংকর দাদা’, ‘চক্কর পে চক্কর’, ‘রাহু কেতু’ (১৯৭৮) এবং ‘মান গয়ে উস্তাদ’ উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে প্রাণের অভিনয়দক্ষতা এবং শশী কাপুরের স্বাভাবিক অভিনয়শৈলী তাঁদের যৌথ কাজকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ঐতিহাসিক জুটি
শশী কাপুর ও অমিতাভ বচ্চনের জুটি হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁদের একসঙ্গে অভিনীত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘রুটি কাপড়া আউর মকান’ (১৯৭৪), ‘দিওয়ার’ (১৯৭৫), ‘কভি কভি’ (১৯৭৬), ‘ত্রিশূল’ (১৯৭৮), ‘কালা পাথর’ (১৯৭৯), ‘সুহাগ’ (১৯৭৯), ‘দো আউর দো পাঁচ’ (১৯৮০), ‘শান’ (১৯৮০) এবং ‘নমক হালাল’ (১৯৮২)।
এই চলচ্চিত্রগুলোতে শশী কাপুর কখনও অমিতাভ বচ্চনের ভাই, কখনও সহকর্মী, আবার কখনও সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তিত্বের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। দুই অভিনেতার বিপরীতধর্মী অভিনয়শৈলী দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
যদিও তাঁদের অভিনীত ‘ইমান ধরম’ (১৯৭৭), ‘সিলসিলা’ (১৯৮১) এবং ‘অকেলা’ (১৯৯১) প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তবু তাঁদের পর্দার রসায়ন দীর্ঘদিন দর্শকদের স্মৃতিতে অমলিন থেকেছে।
‘দিওয়ার’ (১৯৭৫) চলচ্চিত্রে শশী কাপুর একজন সৎ পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের চরিত্রের সঙ্গে তাঁর সংলাপ—‘মেরে পাস মা হ্যায়’—ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির অন্যতম স্মরণীয় সংলাপে পরিণত হয়। সংক্ষিপ্ত অথচ আবেগপূর্ণ এই সংলাপটি আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের আলোচনায় বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে অভিনয়
শশী কাপুর ও সঞ্জীব কুমারও একাধিক উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রে একসঙ্গে অভিনয় করেছেন। তাঁদের যৌথ কাজের মধ্যে ‘মুক্তি’ (১৯৭৭), ‘ত্রিশূল’ (১৯৭৮), ‘মুকদ্দর কা সিকন্দর’ (১৯৭৮), ‘স্বয়ম্বর’ (১৯৮০), ‘সওয়াল’ (১৯৮২) এবং ‘পাখণ্ডী’ (১৯৮৪) উল্লেখযোগ্য।
শশী কাপুর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক অভিনেতাদের অভিনয়দক্ষতা সম্পর্কে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। তিনি রাজেশ খান্না ও সঞ্জীব কুমারের বহুমুখী অভিনয়প্রতিভার প্রশংসা করতেন। অশোক কুমার ও প্রাণের দীর্ঘ অভিনয়জীবন এবং চরিত্রের বৈচিত্র্যকেও তিনি বিশেষভাবে সম্মান করতেন। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অভিনেতা এম. জি. রামচন্দ্রন ও শিবাজী গণেশনের প্রতিও তাঁর শ্রদ্ধা ছিল।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে অবদান
শশী কাপুরের অভিনয়জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। ভারতীয় অভিনেতাদের মধ্যে তিনি প্রথম সারির শিল্পীদের একজন, যিনি ব্রিটিশ ও মার্কিন চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে কাজ করেছিলেন।
মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকশনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই প্রযোজনা সংস্থার চলচ্চিত্র ‘দ্য হাউসহোল্ডার’ (১৯৬৩), ‘শেক্সপিয়র-ওয়াল্লাহ’ (১৯৬৫), ‘বোম্বে টকি’ (১৯৭০) এবং ‘হিট অ্যান্ড ডাস্ট’ (১৯৮২)-এ তিনি অভিনয় করেন। তাঁর স্ত্রী জেনিফার কেন্ডালও এসব আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের কয়েকটিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন।
অন্যান্য ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘আ ম্যাটার অব ইনোসেন্স’ বা ‘প্রিটি পলি’ (১৯৬৭), ‘সিদ্ধার্থ’ (১৯৭২), ‘স্যামি অ্যান্ড রোজি গেট লেইড’ (১৯৮৭), ‘দ্য ডিসিভার্স’ (১৯৮৮) এবং ‘সাইড স্ট্রিট’ (১৯৯৮) উল্লেখযোগ্য।
এই চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমে শশী কাপুর ভারতীয় ও পাশ্চাত্য চলচ্চিত্রের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ ভারতীয় অভিনেতাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথও উন্মুক্ত করেছিল।
চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে শশী কাপুর
১৯৭৮ সালে শশী কাপুর নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘ফিল্মভালাস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার মাধ্যমে তিনি এমন কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হন, যেগুলো বাণিজ্যিক বিনোদনের পাশাপাশি শিল্পমান ও সামাজিক বক্তব্যের জন্যও প্রশংসিত হয়েছিল।
তাঁর প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘জুনুন’ (১৯৭৮), ‘কালযুগ’ (১৯৮১), ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ (১৯৮১), ‘বিজেতা’ (১৯৮২) এবং ‘উৎসব’ (১৯৮৪) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ ভারতীয় ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ছবিটি ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, বার্ধক্য এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরেছিল। অন্যদিকে, ‘জুনুন’ ও ‘কালযুগ’ ভারতীয় সমাজ, ইতিহাস এবং পারিবারিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক অনুসন্ধান করেছিল।
প্রযোজক হিসেবে শশী কাপুরের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল—তিনি শুধু তারকানির্ভর বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং নতুন ভাবনা, নতুন শিল্পী এবং ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণেও অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করেছিলেন।
পরিচালক হিসেবে ‘অজুবা’
১৯৯১ সালে শশী কাপুর পরিচালিত ফ্যান্টাসি-অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র ‘অজুবা’ মুক্তি পায়। ছবিটিতে অমিতাভ বচ্চন, ঋষি কাপুর, শাম্মী কাপুর এবং অমরীশ পুরীর মতো তারকারা অভিনয় করেছিলেন।
শশী কাপুরের অনুরোধে অমিতাভ বচ্চন ছবিটিতে অভিনয় করতে সম্মত হয়েছিলেন। সে সময় ছবিটি ছিল বড় বাজেটের একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। যদিও ভারতীয় বক্স অফিসে এটি প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তবু ছবিটির কল্পনাপ্রধান কাহিনি, অভিনয় এবং নির্মাণশৈলী নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা হয়েছে।
পরিচালক হিসেবে ‘অজুবা’ শশী কাপুরের সৃজনশীল জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
জনপ্রিয়তা ও পারিশ্রমিক
১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে শশী কাপুর হিন্দি চলচ্চিত্রের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতাদের একজন ছিলেন। বিশেষত ১৯৭০-এর দশকে তাঁর অভিনীত একাধিক চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করায় প্রযোজকদের কাছে তাঁর চাহিদা বেড়ে যায়।
রোমান্টিক চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে বহু-তারকাবিশিষ্ট অ্যাকশন ও পারিবারিক নাটক—বিভিন্ন ধারার ছবিতে অভিনয় করার ক্ষমতা তাঁকে অন্য অনেক অভিনেতার তুলনায় আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খান্না, জিতেন্দ্র, ঋষি কাপুর ও রণধীর কাপুরের মতো সমসাময়িক অভিনেতাদের সঙ্গে তিনি প্রতিযোগিতামূলক চলচ্চিত্রজগতে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।
কাপুর পরিবারের চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের মধ্যেও শশী কাপুরের স্বতন্ত্র পরিচয় ছিল। একক নায়ক হিসেবে বহু ছবিতে অভিনয় করার পাশাপাশি তিনি বহুতারকাবিশিষ্ট চলচ্চিত্রেও সমান দক্ষতায় নিজের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও জেনিফার কেন্ডালের সঙ্গে বিবাহ
১৯৫৬ সালে শশী কাপুরের সঙ্গে ইংরেজ অভিনেত্রী জেনিফার কেন্ডালের পরিচয় হয়। সে সময় তাঁরা দুজনেই নিজ নিজ নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শশী কাপুর তাঁর পিতার পৃথ্বী থিয়েটারের সঙ্গে কাজ করতেন এবং জেনিফার তাঁর পিতা জেফ্রি কেন্ডালের শেক্সপিয়রীয় নাট্যদলের সদস্য ছিলেন।
থিয়েটারের সূত্রে তাঁদের পরিচয় ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্কে পরিণত হয়। পরিবারের কিছু আপত্তি থাকা সত্ত্বেও, শশী কাপুর ১৯৫৮ সালে জেনিফার কেন্ডালকে বিয়ে করেন। এই বিবাহে তাঁর ভ্রাতৃবধূ গীতা বালির সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
শশী কাপুর ও জেনিফার একসঙ্গে বহু বছর কাটিয়েছিলেন। তাঁদের তিন সন্তান—কুনাল কাপুর, করণ কাপুর এবং সঞ্জনা কাপুর।
জেনিফার ছিলেন একজন প্রতিভাবান অভিনেত্রী এবং ভারতীয় থিয়েটারের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। স্বামীর সঙ্গে তিনি ভারতীয় মঞ্চনাট্য ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
পৃথ্বী থিয়েটার প্রতিষ্ঠা
শশী কাপুর ও জেনিফার কেন্ডালের যৌথ উদ্যোগে ভারতীয় থিয়েটার নতুন প্রাণ পায়। তাঁরা পৃথ্বীরাজ কাপুরের নাট্যঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মঞ্চনাটককে আরও সুসংগঠিত ও জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেন।
১৯৭৮ সালের ৫ নভেম্বর মুম্বাইয়ে পৃথ্বী থিয়েটারের স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহের উদ্বোধন হয়। এই থিয়েটার পরবর্তী সময়ে ভারতের আধুনিক মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
নতুন নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা ও নাট্যকর্মীদের জন্য পৃথ্বী থিয়েটার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
পৃথ্বী থিয়েটারের সঙ্গে শশী কাপুরের সম্পর্ক কেবল পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল নাট্যশিল্পের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রকাশ।
জেনিফারের মৃত্যু ও শশী কাপুরের মানসিক অবস্থা
১৯৮৪ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে জেনিফার কেন্ডালের মৃত্যু শশী কাপুরের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। স্ত্রীকে হারানোর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী ও শিল্পী-সহকর্মীর মৃত্যু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং কর্মজীবন—উভয়ের ওপরই প্রভাব ফেলেছিল।
এই সময়ে তিনি কিছুদিন অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে ফিরে আসেন এবং নায়কের পাশাপাশি চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও কাজ করতে শুরু করেন।
জেনিফারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁদের যৌথ থিয়েটার-জীবনের স্মৃতি শশী কাপুরের জীবনের অন্যতম আবেগপূর্ণ অধ্যায়।
পরবর্তী অভিনয়জীবন
আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে শশী কাপুর চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে রাজেশ খান্না অভিনীত ‘অলগ অলগ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের একটি নতুন পর্যায় শুরু হয়।
এরপর তিনি বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রেও তাঁর উপস্থিতি অব্যাহত ছিল। ‘দ্য ডিসিভার্স’ (১৯৮৮)-এর মতো ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ধরে রাখেন।
১৯৯৩ সালে ‘ইন কাস্টডি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের বিশেষ জুরি স্বীকৃতি অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালে টেলিভিশনের জন্য নির্মিত ‘গুলিভার্স ট্রাভেলস’ অভিযোজনে রাজার চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন।
১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে তিনি অভিনয় থেকে অবসর নেন। ‘সাইড স্ট্রিট’ (১৯৯৮) তাঁর অভিনীত পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রগুলোর একটি।
সন্তানদের কর্মজীবন
শশী কাপুরের তিন সন্তানই পরবর্তী সময়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। বড় ছেলে কুনাল কাপুর অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনার ক্ষেত্রেও কাজ করেছেন।
দ্বিতীয় ছেলে করণ কাপুর মডেল হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন এবং পরবর্তী সময়ে ফটোগ্রাফির পেশায় যুক্ত হন। মেয়ে সঞ্জনা কাপুর থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত থেকে ভারতীয় মঞ্চনাট্যের উন্নয়নে কাজ করেছেন।
শশী কাপুরের সন্তানরা তাঁদের পিতামাতার শিল্পীজীবনের ঐতিহ্য বহন করলেও প্রত্যেকে নিজের মতো করে কর্মজীবনের পথ বেছে নিয়েছেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য শশী কাপুর বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: ‘নিউ দিল্লি টাইমস’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: ‘ইন কাস্টডি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বিশেষ জুরি স্বীকৃতি।
- পদ্মভূষণ: ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০১১ সালে ভারত সরকার তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করে।
- ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড: ২০১০ সালে চলচ্চিত্রজীবনের সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।
২০১৮ সালের ৯০তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানের স্মরণপর্বে প্রয়াত শশী কাপুর ও শ্রীদেবীর নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এটি তাঁদের আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে স্মরণীয় করে রাখার একটি উপলক্ষ ছিল; তবে এটি প্রতিযোগিতামূলক অস্কার পুরস্কার প্রাপ্তির সমতুল্য নয়।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
জীবনের শেষ পর্যায়ে শশী কাপুর শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বুকে সংক্রমণজনিত সমস্যার কারণে তাঁকে মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর, নিজের ৭৯তম জন্মদিনে, মুম্বাইয়ের ওই হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবন, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে অবদান এবং ভারতীয় থিয়েটারের প্রতি তাঁর নিষ্ঠার জন্য চলচ্চিত্রজগৎ ও অসংখ্য অনুরাগী গভীর শোক প্রকাশ করেন।
শশী কাপুরের মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র, স্মরণীয় সংলাপ, প্রযোজিত শিল্পসম্মত ছবি এবং পৃথ্বী থিয়েটারের ঐতিহ্য আজও তাঁকে দর্শক ও শিল্পীদের স্মৃতিতে জীবিত রেখেছে।
উপসংহার
শশী কাপুর ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা এবং শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রের মর্যাদাকে একই সঙ্গে ধারণ করতে পেরেছিলেন। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা, অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে স্মরণীয় অভিনয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণ এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে নতুন প্রতিভাকে উৎসাহিত করার ভূমিকা তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দিয়েছে।
পাশাপাশি, পৃথ্বী থিয়েটারের বিকাশে তাঁর অবদান ভারতীয় মঞ্চনাট্যের ইতিহাসেও চিরস্মরণীয়। অভিনয়, প্রযোজনা ও থিয়েটার—এই তিন ক্ষেত্রেই তাঁর কাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
শশী কাপুর কেবল একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র ও নাট্যশিল্পের প্রতি নিবেদিত এক সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। তাঁর শিল্পীসত্তা, মানবিকতা এবং সাংস্কৃতিক অবদান ভারতীয় বিনোদনজগতে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
