
রাস্তায় ধান শুকানোর পরিণতি (একাংকিকা)
বিষয়: জনসচেতনতা, সড়ক নিরাপত্তা ও সামাজিক দায়িত্ব
- ভাষা: বাংলা
- সময়: প্রায় ২০ মিনিট
- দৃশ্য সংখ্যা: ৫টি
- স্থান: অসমের একটি গ্রাম
চরিত্র পরিচিতি
১. আব্দুল করিম — গ্রামের একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি।
২. রহিম মিয়া — কৃষক; রাস্তার ওপর ধান শুকাতে দেন।
৩. সালামত আলী — আরেকজন কৃষক; নিজের সুবিধাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
৪. জলিল উদ্দিন — গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি; প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।
৫. রাকিব — যুবক; মোটর সাইকেল চালক।
৬. ইমরান — চার চাকার গাড়ির চালক।
৭. মোস্তফা — রাকিবের বন্ধু।
৮. করিমা বেগম — রহিমের স্ত্রী।
৯. ডাক্তার ফারুক — হাসপাতালের চিকিৎসক।
১০. নাসির — গ্রামের যুবক ও সমাজসেবক।
১১. কয়েকজন গ্রামবাসী ও পথচারী — প্রয়োজন অনুসারে।
প্রথম দৃশ্য:
স্থান:গ্রামের একটি ব্যস্তরাস্তা
(মঞ্চসজ্জা: মঞ্চের একদিকে গ্রামের পাকা রাস্তা। রাস্তার মাঝখানে এবং একপাশে ধান ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। কয়েকজন মানুষ ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত। অন্যদিকে যানবাহন চলাচলের অভিনয় হবে। মোটর সাইকেল ও গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যাবে।)
রহিম: (রাস্তার ওপর ধান ছড়াতে ছড়াতে) সালামত ভাই, এ বছর ধানের ফলন ভালো হয়েছে। উঠানে এত ধান শুকানোর জায়গা নেই। তাই রাস্তার ওপর শুকিয়ে নিচ্ছি।
সালামত: ঠিকই করেছ, রহিম। উঠানে শুকাতে গেলে অনেক সময় লাগে। এখানে রোদও ভালো লাগে, ধানও তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।
জলিল: (হেসে) অনেকে রাস্তার ওপড় ধান শুকানোকে মন্দ চোখে দেখে। আমরা তো পূর্ব থেকেই রাস্তার ওপর ধান শুকিয়ে আসছি।
রহিম: একদম ঠিক বলেছেন, জলিল চাচা। এত বছর ধরে করছি, কিছু তো হয়নি!
(এমন সময় আব্দুল করিম প্রবেশ করেন।তিনি রাস্তার ওপর ছড়ানো ধান দেখে উদ্বিগ্ন হন।)
আব্দুল করিম: আসসালামু আলাইকুম। রহিম ভাই, সালামত ভাই, একটা কথা বলব?
রহিম: ওয়ালাইকুম আসসালাম। বলুন, কী কথা?
আব্দুল করিম: আপনারা রাস্তার ওপর ধান শুকাচ্ছেন কেন? দেখছেন না, এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন কত গাড়ি, মোটরসাইকেল, সাইকেল চলাচল করে?
সালামত: আরে করিম ভাই, রাস্তার পুরোটা তো আটকাইনি! একপাশ দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে। অসুবিধা কোথায়?
আব্দুল করিম: কিন্তু রাস্তার অর্ধেকটাই তো দখল হয়ে গেছে। ধানের দানা পায়ের নিচে কিংবা গাড়ির চাকার নিচে পড়লে পিছলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
রহিম: (বিরক্ত হয়ে) আপনি সব কিছুতেই বিপদ দেখেন কেন? একটু ধান শুকাতে দিয়েছি, তাতেই এত কথা!
আব্দুল করিম: আমি আপনাদের শত্রু নই। আপনাদেরই মঙ্গল চাই। আজ আপনাদের ধান শুকানোর জন্য যদি দুর্ঘটনা হয়ে কারও প্রাণ যায়, তখন কী করবেন?
সালামত: এসব বড় বড় কথা অন্য কোথাও গিয়ে বলুন। আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন।
জলিল: (মধ্যস্থতা করে) থাক, থাক! এত তর্কের কী আছে? গ্রামের লোকেরা সবাই এভাবেই ধান খড় শুকায়।
আব্দুল করিম: (দুঃখিত স্বরে) প্রচলিত কোনো কাজ হলেই তা যে সঠিক, এমন নয়। মানুষের জীবন অনেক মূল্যবান। একটু সতর্ক হলেই দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
(আব্দুল করিম ধীরে ধীরে মঞ্চথেকে চলে যান।)
রহিম: (সালামতকে) দেখলে তো! নিজে ধান শুকায় না, অন্যকেও শুকাতে দেবে না!
সালামত: ধান থাকলে তো শুকাবে! ছেড়ে দাও ওর কথা। নিজের কাজ করো।
(পেছনে যানবাহনের হর্ন শোনা যায়। আলো ধীরে কমে যায়।)
দ্বিতীয় দৃশ্য
(স্থান:পূর্বের রাস্তা, দুপুরবেলা)
(মঞ্চসজ্জা: রাস্তার ওপর ধান ছড়ানো রয়েছে।রহিম ও সালামত রাস্তার পাশে বসে গল্পকরছেন।কয়েকজন পথচারী যাতায়াত করছেন।একদিকে চারচাকার গাড়িচালানোর অভিনয়, অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালানোর অভিনয়ের ব্যবস্থা থাকবে।)
মোস্তফা: (রাকিবকে) রাকিব, আজ বাজারে যাবি তো?
রাকিব: হ্যাঁ, যাব। আজ বাজারে একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হবে। চল, মোটরসাইকেলে উঠ।
মোস্তফা: সাবধানে চালাস। এই রাস্তার ওপর আবার ধান ছড়িয়ে রেখেছে।
রাকিব: আরে, আমি সাবধানে চালাতে জানি। চিন্তা করিস না।
(দুজন মোটরসাইকেলে ওঠার অভিনয় করে। মোটরসাইকেলের শব্দ শোনা যায়। অন্যদিকে ইমরান চারচাকার গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার অভিনয় করেন।)
ইমরান: (নিজের মনে) ধান শুকানোর জন্য সামনে রাস্তা একটু সরু হয়ে গেছে। ধীরে চালানোই ভালো।
(রাকিবের মোটর সাইকেল গাড়ির পেছনে আসে।)
মোস্তফা: রাকিব, সামনে গাড়ি! ধীরে চালা। ওভারটেক করিস না!
রাকিব: একটু পাশ দিয়ে চলে গেলেই হবে।
(রাকিব গাড়িটিকে ওভারটেক করার অভিনয় করেন। ঠিক তখনই মোটরসাইকেলের চাকা রাস্তার ওপর ছড়ানো ধানের ওপর পড়ে। পিছলে যাওয়ার শব্দ হয়। রাকিব ও মোস্তফা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার অভিনয় করেন। মোটর সাইকেলের শব্দ হঠাৎ থেমে যায়।)
রাকিব: আহ্! বাঁচাও! আমার পা!
মোস্তফা: রাকিব! রাকিব! কী হলো তোর?
(ইমরান দ্রুত গাড়ি থামিয়ে নেমে আসেন। পথচারীরা ছুটে আসেন।)
ইমরান: কেউ কি আহত হয়েছে? ভাই, আপনি শুনতে পাচ্ছেন?
মোস্তফা: আমার বন্ধুর পায়ে খুব আঘাত লেগেছে! সে উঠতে পারছে না!
পথচারী ১: ওকে সাবধানে ধরুন। বেশি নাড়াচাড়া করবেন না।
পথচারী ২: দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। দয়া করে কেউ একটা গাড়ির ব্যবস্থা করুন!
(রহিম ও সালামত আতঙ্কিত হয়ে এগিয়েআসেন।)
রহিম: হায় আল্লাহ! এ কী হয়ে গেল!
সালামত: (ধানের দিকে তাকিয়ে) ধানের ওপর চাকা পড়েই কি মোটরসাইকেলটা পিছলে গেল?
ইমরান: রাস্তার ওপর এভাবে ধান ছড়িয়ে রাখা খুব বিপজ্জনক। গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ চাকা পিছলে গেলে চালকের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
রহিম: (মাথা নিচু করে) আমরা তো ভাবিনি এমন কিছু হবে!
আব্দুল করিম: (দ্রুত প্রবেশ করে) কী হয়েছে? এত লোক জড়ো হয়েছে কেন?
মোস্তফা: করিম চাচা, রাকিব দুর্ঘটনায় পড়েছে। ওকে হাসপাতালে নিতে হবে।
আব্দুল করিম: আর দেরি নয়। আগে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। নাসির, তুমি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করো।
নাসির: ঠিক আছে, চাচা। চলুন, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই।
(কয়েকজন মিলে রাকিবকে সাবধানে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিনয় করেন। মোস্তফা তাদের সঙ্গে যায়।)
রহিম: (কাঁপা গলায়) করিম ভাই, ছেলেটার যদি বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যায়?
আব্দুল করিম: এখন সবচেয়ে জরুরি হলো তার চিকিৎসা। তবে এই দুর্ঘটনা আমাদের সবাইকে একটা শিক্ষা দিয়ে গেল।
(রহিম ও সালামত স্তব্ধ হয়ে রাস্তার ওপর ছড়ানো ধানের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আলো নিভে যায়।)
তৃতীয়দৃশ্য
স্থান:গ্রামের হাস পাতাল
(মঞ্চসজ্জা: মঞ্চের মাঝখানে একটি হাসপাতালের বিছানা। রাকিব শুয়ে আছে। পাশে মোস্তফা, আব্দুল করিম, রহিম, সালামত ও করিমা বেগম। ডাক্তার ফারুক প্রবেশ করেন।)
করিমা বেগম: (উদ্বিগ্নভাবে) ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলের কী হয়েছে? ও কি ভালো হয়ে যাবে?
ডাক্তার ফারুক: আপনারা চিন্তা করবেন না। রাকিবের পায়ে আঘাত লেগেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কিছু পরীক্ষা করতে হবে। তারপর রিলিজ দিয়ে দিব। আপাতত বিশ্রাম নিতে হবে।
মোস্তফা: ডাক্তার সাহেব, দুর্ঘটনাটা খুব ভয়ংকর ছিল। মোটরসাইকেলের চাকা রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা ধানের ওপর পড়তেই পিছলে যায়।
ডাক্তার ফারুক: রাস্তার ওপর ধান, বালি, কাদা বা অন্য কোনো পিচ্ছিল বস্তু থাকলে যানবাহনের চাকার সঙ্গে রাস্তার ঘর্ষণ কমে যায়। তখন বিশেষ করে বাঁক নেওয়ার সময় কিংবা হঠাৎ ব্রেক করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আব্দুল করিম: আমরা অনেক দিন ধরেই মানুষকে এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছি। কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি।
রহিম: (চোখ নামিয়ে) করিম ভাই, আপনি আমাদের আগেই সাবধান করেছিলেন। আমরা আপনার কথা শুনিনি। আজ বুঝতে পারছি, আমাদের সামান্য সুবিধার জন্য আমরা অন্যের জীবন বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছি।
সালামত: আমিও ভুল করেছি। রাস্তার ওপর ধান শুকানোকে খুব সাধারণ ব্যাপার ভেবেছিলাম। কিন্তু এর পরিণতি যে এত ভয়াবহ হতে পারে, তা বুঝিনি।
করিমা বেগম: (কষ্টের স্বরে) ধান শুকানো দরকার, ঠিক আছে। কিন্তু মানুষের জীবনের চেয়ে কি ধান বড়? আমার ছেলের কিছু হয়ে গেলে আমি কী নিয়ে বাঁচতাম?
(কিছুক্ষণ নীরবতা। রহিম চোখ মুছেন।)
রহিম: ভাবি, আমাদের ক্ষমা করবেন। আমরা কখনো চাইনি আপনার ছেলের ক্ষতি হোক।
করিমা বেগম: ইচ্ছা করে কেউ কারো ক্ষতি করেনা। অসাবধানতাও অনেক সময় মানুষের জীবন নষ্ট করে দেয়। কাজ করার আগে তার পরিণতি ভাবতে হয়।
ডাক্তার ফারুক: একদম ঠিক বলেছেন। দুর্ঘটনা ঘটার পর অনুশোচনা করার চেয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা অনেক ভালো। রাস্তা সবার। সেখানে নিরাপদে চলাচল করার অধিকার সবারই আছে।
রাকিব: (ধীরে চোখ খুলে) মোস্তফা… আমি এখন কোথায়?
মোস্তফা: হাসপাতালে আছিস, বন্ধু। তুই এখন কথা বলিস না। বিশ্রাম নে।
রাকিব: আমি ভুল করেছি। সামনে রাস্তা বিপজ্জনক দেখেও গাড়িটাকে ওভারটেক করতে গিয়েছিলাম। একটু ধৈর্য ধরলে হয়তো এই দুর্ঘটনা ঘটত না।
আব্দুল করিম: তুমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছ, এটাই যথেষ্ট। মনে রেখো, দ্রুত পৌঁছানোর চেয়ে নিরাপদে পৌঁছানো বেশি জরুরি।
রহিম: (আবেগভরে) আজ থেকে আমি আর কখনো রাস্তার ওপর ধান শুকাব না। অন্যদেরও নিষেধ করব।
সালামত: আমিও প্রতিজ্ঞা করছি, নিজের সুবিধার জন্য জনসাধারণের নিরাপত্তাকে আর কখনো অবহেলা করব না।
ডাক্তার ফারুক: শুধু প্রতিজ্ঞা করলেই হবে না, বাস্তবেও তা পালন করতে হবে। আর সড়কে সবাইকে ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে হবে।
(সবাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন।)
চতুর্থ দৃশ্য
স্থান:গ্রামের একটি খোলা মাঠ
(মঞ্চসজ্জা: কয়েকটি চেয়ার রাখা আছে। গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়েছেন। সামনে আব্দুল করিম ও নাসির দাঁড়িয়ে আছেন। একটি কাগজে লেখা— “রাস্তা সবার, নিরাপত্তার দায়িত্বও সবার”।)
নাসির: আসসালামু আলাইকুম। আজ আমরা এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে একত্র হয়েছি। রাকিবের দুর্ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা কি নিজেদের ভুল শুধরে নিতে প্রস্তুত?
গ্রামবাসী: অবশ্যই প্রস্তুত।
আব্দুল করিম: ভাই ও বোনেরা, রাস্তা শুধু যানবাহন চলাচলের জায়গা নয়, এটি জনসাধারণের সম্পদ। কৃষিকাজ আমাদের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে অন্যের জীবন বিপন্ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জলিল: করিম, তুমি ঠিকই বলেছিলে। বয়সের কারণে অনেক সময় আমরা পুরোনো অভ্যাস আঁকড়ে ধরে থাকি। কিন্তু সব পুরোনো অভ্যাস যে নিরাপদ, তা নয়। আজ থেকে আমিও সবাইকে সচেতন করব।
রহিম: আমি সবার সামনে স্বীকার করছি, রাস্তার ওপর ধান শুকিয়ে আমি ভুল করেছি। নিজের উঠান ছোট বলে রাস্তা ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু আমার এই সিদ্ধান্তে একজন যুবক আহত হয়েছে। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
সালামত: শুধু ধান নয়, আমরা অনেকে রাস্তার ওপর বিচালি, কাঠ, বালি ও অন্যান্য জিনিসও রেখে দিই। এগুলোও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। আমাদের এই অভ্যাস বদলাতে হবে।
গ্রামবাসী ১: কিন্তু ধান শুকানোর জায়গা না থাকলে আমরা কী করব?
নাসির: ভালো প্রশ্ন। আমরা বাড়ির উঠান, নিজস্ব খালি জমি কিংবা নিরাপদ কোনো নির্দিষ্ট জায়গা ব্যবহার করতে পারি। প্রয়োজনে গ্রামের মানুষ মিলে একটি উপযুক্ত খোলা জায়গা ব্যবহারের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
আব্দুল করিম: ঠিক তাই। সমস্যার সমাধান আছে। রাস্তা দখল করা কোনো সমাধান নয়। আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে হবে।
গ্রামবাসী ২: আমরা কি গ্রামের প্রতিটি পাড়ায় সচেতনতার প্রচার চালাতে পারি?
নাসির: নিশ্চয়ই। আমরা যুবকেরা দল গঠন করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে বলব। স্কুল, বাজার ও গ্রামের সভায়ও এই বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
জলিল: আর যদি কেউ নিষেধ করার পরও রাস্তা দখল করে?
আব্দুল করিম: প্রথমে তাকে শান্তভাবে বোঝাতে হবে। তারপরও সমস্যা চলতে থাকলে গ্রামের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। কাউকে অপমান বা মারামারি করে নয়, সচেতনতা ও আইনসম্মত উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
রহিম: আমি নিজের ভুল শুধরে নেব এবং অন্যদেরও বুঝিয়ে বলব।
সালামত: আমিও সঙ্গে আছি।
সবাই একসঙ্গে: আমরাও আছি!
নাসির: তাহলে আসুন, আমরা সবাই মিলে শপথ নিই।
(সবাই উঠে দাঁড়ান এবং ডান হাত সামনে বাড়ান।)
সবাই একসঙ্গে:
“আমরা শপথ করছি—
- কখনো রাস্তার ওপর ধান, বিচালি বা অন্য কোনো জিনিস শুকাতে দেব না।
- জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা দখল করব না।
- যানবাহন চালানোর সময় ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলব।
- বিপজ্জনক কাজ দেখলে শান্তভাবে মানুষকে সচেতন করব।
- নিজের স্বার্থের চেয়ে মানুষের জীবন ও জননিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেব।”
আব্দুল করিম: মনে রাখবেন, সচেতন নাগরিকই নিরাপদ সমাজ গড়তে পারেন।
(সবাই হাততালি দেন। আলো ধীরে কমে যায়।)
পঞ্চমদৃশ্য
স্থান: গ্রামের সেই একই রাস্তা
(মঞ্চসজ্জা: আগের সেই রাস্তা। এবার রাস্তার ওপর কোনো ধান নেই। রাস্তা পরিষ্কার। পাশে কয়েকজন গ্রামবাসী ধান শুকানোর জন্য একটি নিরাপদ খোলা জায়গা প্রস্তুত করছেন। রাকিব ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে আসে। তার পায়ে সামান্য ব্যান্ডেজ থাকলে ভালো হয়।)
মোস্তফা: রাকিব, এখন কেমন লাগছে?
রাকিব: আগের চেয়ে অনেক ভালো। তবে ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছেন। কিছুদিন মোটরসাইকেল চালাব না।
মোস্তফা: ভালো সিদ্ধান্ত। সেই দিনের দুর্ঘটনা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।
(রহিম ও সালামত একটি গাড়িতে ধান নিয়ে আসার অভিনয় করেন। তারা রাস্তা দিয়ে না ছড়িয়ে পাশের খোলা জায়গায় ধান রাখেন।)
রহিম: সালামত ভাই, দেখুন, এখানে ধান শুকানোর জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে। গ্রামের কয়েকজন মিলে জায়গাটা পরিষ্কার করে নিয়েছি।
সালামত: হ্যাঁ, রাস্তা দখল না করেও কাজ করা যায়। আগে আমরা একটু কষ্ট করতে চাইতাম না, তাই ভুল করতাম।
আব্দুল করিম: (হেসে) ভুল বুঝতে পারা এবং তা শুধরে নেওয়াই মানুষের বড় গুণ।
জলিল: আজ রাস্তা পরিষ্কার দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। যানবাহনও সহজে চলাচল করতে পারছে।
(ইমরান গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার অভিনয় করেন। তিনি থেমে জানালা দিয়ে কথা বলেন।)
ইমরান: আসসালামু আলাইকুম! আজ রাস্তা একেবারে পরিষ্কার। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আগে এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে খুব অসুবিধা হতো।
আব্দুল করিম: ওয়ালাইকুম আসসালাম। রাস্তা পরিষ্কার রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।
রাকিব: আমি আরও একটা শিক্ষা পেয়েছি। শুধু রাস্তা পরিষ্কার থাকলেই হবে না, চালকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। তাড়াহুড়ো করে ওভারটেক করা বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোও বিপজ্জনক।
মোস্তফা: একদম ঠিক। সড়ক নিরাপত্তা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
করিমা বেগম: (প্রবেশ করে) তোমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। দুর্ঘটনাটা আমাদের কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু সেই কষ্ট থেকে যদি সবাই শিক্ষা নিতে পারে, তবে ভবিষ্যতে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।
রহিম: ভাবি, আমি আপনাদের কাছে আবারও ক্ষমা চাইছি। আমার মতো ভুল যেন আর কেউ না করে।
করিমা বেগম: ক্ষমা চাওয়ার চেয়েও বড় কাজ হলো ভুলটি আর না করা। আপনারা যে নিজেদের বদলেছেন, সেটাই সবচেয়ে আনন্দের কথা।
নাসির: ভাই ও বোনেরা, আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি রাস্তা সবার চলাচলের জন্য। একজনের সামান্য সুবিধা যেন অন্য কারও জীবনের জন্য বিপদ হয়ে না দাঁড়ায়।
আব্দুল করিম: (দর্শকদের দিকে তাকিয়ে) আমরা প্রায়ই ভাবি, “আমার জন্য কী আর দুর্ঘটনা ঘটবে?” কিন্তু দুর্ঘটনা কখনো আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে আসে না। তাই বিপদ ঘটার অপেক্ষা না করে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত।
জলিল: মানুষের জীবন অমূল্য। কিছু ধান শুকানোর জন্য যদি একটি প্রাণও বিপন্ন হয়, তবে সেটা খুবই দুর্ভাগ্যের কথা।
রাকিব: আমরা সবাই মিলে নিরাপদ রাস্তা গড়ব।
রহিম: রাস্তার ওপর ধান শুকাব না!
সালামত: নিজের সুবিধার জন্য রাস্তা দখল করব না!
মোস্তফা: ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলব!
নাসির: অন্যকেও সচেতন করব!
সবাই একসঙ্গে: মানুষের জীবন বাঁচাব, নিরাপদ সমাজ গড়ব!
(সবাই দর্শকদের দিকে মুখ করে দাঁড়াবে।)
(নেপথ্যে মৃদু অনুপ্রেরণামূলক সংগীত বাজবে।ধীরে আলো নিভে যায়।)
যবনিকা
একাংকিকাটির মূল বক্তব্য
এই একাংকিকার মাধ্যমে দর্শকদের বোঝানো হয়েছে যে—
১. ব্যস্ত সড়কে ধান, বিচালি বা অন্য কোনো পিচ্ছিল বস্তু শুকানো অত্যন্ত বিপজ্জনক।
২. রাস্তা জনসাধারণের চলাচলের জন্য; ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য তা দখল করা উচিত নয়।
৩. মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিরাপদ গতি বজায় রাখা, সতর্ক থাকা এবং বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক না করা জরুরি।
৪. দুর্ঘটনার পর অনুশোচনা করার চেয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা অনেক ভালো।
৫. সামাজিক সচেতনতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে নিরাপদ গ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।
নির্দেশকের জন্য পরামর্শ: সংলাপের মধ্যে স্বাভাবিক বিরতি, যানবাহনের শব্দ, দুর্ঘটনার মুহূর্তে উপযুক্ত মঞ্চাভিনয় এবং হাসপাতালের দৃশ্যে আবেগের প্রকাশ রাখলে একাংকিকাটি প্রায় ২০ মিনিটের হবে। দুর্ঘটনার দৃশ্যটি প্রতীকীভাবে অভিনয় করতে হবে, যাতে কোনো অভিনেতা বাস্তবে আঘাত না পান।
