
আমি কেন মুসলিম নোবেল বিজয়ীর জীবনী লেখলাম ?
আজ থেকে একশত বিশ বছর আগে অর্থাৎ ১৯০১ সাল থেকে আলফ্রেড নোবেল-এর ১৮৯৫ সালের ‘উইল’ অনুসারে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ফিজিয়লজী তথা মেডিসিন, সাহিত্য এবং শান্তির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান চালু হয়েছে। নোবেল প্রাইজ বিশ্বের সবচেয়ে সন্মানীত পুরস্কার ।১৯৬৮ সাল থেকে নতুন করে অর্থনীতি বিষয়ে ‘নোবেল মেমোরিয়াল প্রাইজ’ চালু হয়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত মোট ৬০৩ টি পুরস্কার ৯৬২ জন বিশেষ ব্যক্তিকে প্রদান করা হয়েছে। তবে, দুঃখের বিষয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সম্প্রদায় মুসলমানদের শুধুমাত্র ১২ জন ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। অথচ একরা অর্থাৎ ‘পড়’ শব্দের জরিয়তে আজ থেকে চৌধ্যশ বছর আগে ইসলাম-এর অভ্যুত্থান হয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষা এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশের তালিকায় আছে আমেরিকা, জার্মানী, নরওয়ে, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, কানাডা, সুইডেন, ফিনল্যান্ড প্রভৃতি। এর মধ্যে একটিও মুসলিম রাষ্ট্র নাই। এই অনগ্রসরতার প্রধান কারণ হিসাবে শিক্ষাকে চিহ্নিত করতে পারি। ৫৭ টি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৫০০ টি কারিকরি শিক্ষার অনুষ্ঠান রয়েছে, পক্ষান্তরে ৩৪ কোটি মানুষের দেশ অ্যামেরিকায় রয়েছে ৮০০০ টি কারিকরি শিক্ষার অনুষ্ঠান। তাই মুসলমানদের কারিকরি শিক্ষার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য আমি মুসলিম নোবেল বিজয়ীদের জীবনী লিখতে প্রয়াস করেছি।
আমি তথ্যগুলি বিশেষ করে ওইকি পেডিয়া থেকে সংগ্রহ করেছি। তাই অনুবাদ করার সময় হয়তো অনেক ভুলত্রুটি রয়ে গেছে। তদুপরি আমি বিজ্ঞানের ছাত্র নই। তাই বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্যগুলিতে হয়তো আরও অনেক ভুলত্রুটি রয়ে গেছে। তাই আমি আমার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য সদাশয় পাঠকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। কেউ ভুলগুলি শুধরে দিলে তার কাছে আমি চিরঋণী হয়ে থাকব এবং পরবর্তী পর্যায়ে ভুলগুলি শুদ্ধ করার চেষ্টা করব।
বিনত
আবুল হোসেইন
সাং-যতিগাঁও,
বরপেটা, আসাম।
সূচীপত্র
আনোয়ার আল সাদাত-
নোবেল বিজয়ী মহান বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম-
নাগুইব মাহফুজের জীবন এবং কর্ম-
ইয়াসির আরাফাতের জীবন এবং কর্ম-
নোবেল বিজয়ী আহম্মদ হাসান জেওয়াইল-
শিরিন ইবাদি-
মহম্মদ এলবারাদেই-
ডক্টর মহম্মদ ইউনূস-
ফেরিট ওরহান পামুক-
নোবেল বিজয়ী তাওয়াক্কুল কারমান-
মালালা ইউসুফজাই-
নোবেল বিজয়ী আজিজ সানকার-

আনোয়ার আল সাদাত
মিশরের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, রাজনীতিবিদ ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
আনোয়ার আল সাদাতের (Anwar al-Sadat) জন্ম ১৯১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর, মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত মিট আবু আল-কওম নামের একটি গ্রামে। তিনি একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আনোয়ার মুহাম্মদ আল-সাদাত এবং মাতার নাম সিত আল-বারেইন। তাঁর বাবা স্থানীয় একটি সামরিক হাসপাতালের কেরানি ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন সুদানি বংশোদ্ভূত। তেরো সন্তানের পরিবারে বেড়ে ওঠা সাদাত শৈশব থেকেই নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে পরিচিত হন।
সাদাতের জন্মের সময় মিশর ব্রিটিশ প্রভাবাধীন ও কার্যত ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন একটি দেশ ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে মিশরকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান প্রেরণা হয়ে ওঠে।
তাঁর ভাইদের মধ্যে আতেফ সাদাত ছিলেন একজন সামরিক পাইলট। ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘটিত ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের প্রথম দিনেই তিনি ইসরায়েল-অধিকৃত সিনাই অঞ্চলে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়ে নিহত হন।
সামরিক শিক্ষা ও কর্মজীবনের সূচনা
আনোয়ার আল সাদাত কায়রোর সামরিক অ্যাকাডেমিতে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি সামরিক শিক্ষা সম্পন্ন করে দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট পদে মিশরীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কর্মজীবনের প্রথম দিকে তাঁকে সুদানে নিয়োগ করা হয়। সে সময় মিশর ও সুদান ব্রিটিশ প্রভাবাধীন একটি রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সুদানে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে গামাল আবদেল নাসেরসহ কয়েকজন তরুণ সামরিক কর্মকর্তার পরিচয় ঘটে। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, ব্রিটিশ আধিপত্য এবং রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান না ঘটলে মিশরের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তাঁরা গোপনে একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীকালে ‘ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত হয়।
এই আন্দোলনের সদস্যরা মিশরের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই সংগঠনই মিশরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও কারাবাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আনোয়ার আল সাদাত ব্রিটিশ বাহিনীকে মিশর থেকে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে জার্মানির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পেরে ১৯৪২ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। প্রায় দুই বছর পর তিনি বন্দিদশা থেকে পালিয়ে মুক্ত জীবনযাপনের চেষ্টা করেন।
১৯৪৬ সালে ব্রিটিশপন্থী মিশরীয় রাজনীতিবিদ ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আমিন উসমানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৪৮ সালে তিনি এই মামলায় খালাস পান।
কারাবাসের সময় তিনি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা শেখার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে আরও সুসংগঠিত করার সুযোগ পান। মুক্তি পাওয়ার পর কিছুদিন তিনি সাধারণ নাগরিকের জীবনযাপন করেন এবং বিভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত হন।
এই সময়েই তাঁর সঙ্গে জিহান সাদাতের পরিচয় ঘটে। পরবর্তীকালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিহান সাদাত পরবর্তী সময়ে মিশরের সামাজিক উন্নয়ন, নারীশিক্ষা ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫২ সালের বিপ্লব ও ফ্রি অফিসার্স আন্দোলন
১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট মিশরে এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। এর ফলে রাজা ফারুক ক্ষমতাচ্যুত হন এবং মিশরের রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসানের পথ প্রশস্ত হয়।
এই বিপ্লবে আনোয়ার আল সাদাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অভ্যুত্থানের সূচনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বেতারযোগে জানানোর দায়িত্বও তিনি পালন করেছিলেন।
১৯৫৩ সালের ১৮ জুন মিশরকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। মুহাম্মদ নাগিব দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে গামাল আবদেল নাসেরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ১৯৫৪ সালের নভেম্বরে নাগিব ক্ষমতাচ্যুত হলে নাসের কার্যত দেশের প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন।
সাদাত নাসেরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৫০-এর দশকে তিনি সরকারি সংবাদপত্র আল-গুমহুরিয়া-র সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন ও আইনসভায় বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত হন।
রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসেরের সহযোগী
গামাল আবদেল নাসেরের শাসনামলে আনোয়ার আল সাদাত ধীরে ধীরে মিশরের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। তিনি ১৯৬০ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া ১৯৬৪–১৯৬৬ এবং ১৯৬৯–১৯৭০ সালে তিনি উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
নাসেরের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সাদাতকে অনেকেই তাঁর ঘনিষ্ঠ ও অনুগত সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করতেন। ফলে নাসেরের মৃত্যুর পর তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে কতটা স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবেন, তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছিল।
১৯৭০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গামাল আবদেল নাসেরের মৃত্যু হলে সাদাত প্রথমে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ১৯৭০ সালের ১৫ অক্টোবর তিনি মিশরের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সাদাত নিজের রাজনৈতিক দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার পরিচয় দেন। তিনি নাসেরের নীতি থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরে এসে মিশরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিশা তৈরি করেন।
সংশোধনমূলক বিপ্লব ও সোভিয়েত প্রভাবের অবসান
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সাদাত বুঝতে পেরেছিলেন যে, নাসেরের সময়কার শক্তিশালী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করা কঠিন হবে। তাই ১৯৭১ সালে তিনি ‘সংশোধনমূলক বিপ্লব’ বা Corrective Revolution নামে পরিচিত একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
এর মাধ্যমে তিনি নাসেরপন্থী কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে উপররাষ্ট্রপতি আলী সাবরি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
সাদাত নিরাপত্তা সংস্থার ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে তিনি মিশরের বৈদেশিক নীতিতেও পরিবর্তন আনেন।
নাসেরের শাসনামলে সোভিয়েত ইউনিয়ন মিশরের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগী ছিল। কিন্তু সাদাত ধীরে ধীরে সোভিয়েত প্রভাব কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার দিকে এগিয়ে যান। ১৯৭২ সালে তিনি সোভিয়েত সামরিক উপদেষ্টাদের একটি বড় অংশকে মিশর থেকে চলে যেতে বলেন।
অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করেন। নাসেরের আমলে দমন করা কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীকে তিনি রাজনৈতিক পরিসরে ফিরে আসার সুযোগ দেন। তবে পরবর্তী সময়ে এসব গোষ্ঠীর একাংশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও ইনফিতাহ নীতি
আনোয়ার আল সাদাতের শাসনামলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল অর্থনৈতিক উদারীকরণ। তিনি ‘ইনফিতাহ’ (Infitah) বা ‘উন্মুক্তকরণ নীতি’ গ্রহণ করেন। এই নীতির উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বেসরকারি উদ্যোগের প্রসার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিশরের অর্থনীতির সম্পর্ক বৃদ্ধি করা।
নাসেরের সময়ে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সাদাত সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে বেসরকারি পুঁজি ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন।
তবে এই অর্থনৈতিক নীতির সুফল সমানভাবে সবার কাছে পৌঁছায়নি। একদিকে কিছু ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী লাভবান হন, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি, বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
১৯৭৭ সালে খাদ্যদ্রব্যের ওপর ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মিশরে ব্যাপক বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। ফলে তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কার যেমন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল, তেমনি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক
সাদাতের শাসনামলে মিশরের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কেরও উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। নাসেরের সময় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও সাদাত ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
ইরান ও মিশরের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষত ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইরানের শাহ মিশরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী ছিলেন। সাদাতও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিতেন। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়।
উল্লেখ্য, ইরানের শাহের প্রথম স্ত্রী রাজকুমারী ফওজিয়া ছিলেন মিশরের রাজা প্রথম ফুয়াদের কন্যা। এই বৈবাহিক সম্পর্কও দুই দেশের রাজপরিবারের মধ্যে ঐতিহাসিক যোগসূত্র তৈরি করেছিল।
১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধ
আনোয়ার আল সাদাতের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধ। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল মিশরের সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নিয়েছিল। একই যুদ্ধে সিরিয়ার গোলান মালভূমিও ইসরায়েলের দখলে চলে যায়।
দখলকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে সাদাত সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি হাফেজ আল-আসাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন। এই যুদ্ধ ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধ বা অক্টোবর যুদ্ধ নামে পরিচিত।
যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মিশরীয় সেনাবাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে সিনাই উপদ্বীপে প্রবেশ করে। তারা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত ‘বার-লেভ লাইন’-এর বেশ কিছু অংশ ভেঙে এগিয়ে যায়। একই সময়ে সিরীয় বাহিনী গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।
মিশরীয় বাহিনীর প্রাথমিক সাফল্য ইসরায়েলকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দেয়। ১৯৬৭ সালের পরাজয়ের কারণে মিশরীয় জনগণের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, এই যুদ্ধের প্রাথমিক সাফল্য তা অনেকটাই দূর করে। সাদাত মিশরে একজন জাতীয় বীর হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তবে যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফলকে নিঃশর্ত মিশরীয়-সিরীয় বিজয় বলা যায় না। প্রাথমিক সাফল্যের পর ইসরায়েল পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সামরিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
তবুও এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। মিশর প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার সক্ষমতা তার রয়েছে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে শান্তি আলোচনা ও সিনাই উপদ্বীপ পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হয়।
১৯৭৫ সালের ৫ জুন সাদাত সুয়েজ খাল পুনরায় আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য খুলে দেন। এই পদক্ষেপ মিশরের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর আনোয়ার আল সাদাত উপলব্ধি করেন যে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে মিশরের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
১৯৭৭ সালের নভেম্বরে তিনি এক ঐতিহাসিক সফরে ইসরায়েল যান এবং জেরুজালেমে ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে ভাষণ দেন। আরব বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের এ ধরনের সফর ছিল অভূতপূর্ব। তাঁর এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সাদাতের লক্ষ্য ছিল মিশরের দখলকৃত সিনাই উপদ্বীপ ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিনের আরব-ইসরায়েল সংঘাতের অবসান ঘটানোর পথ তৈরি করা।
১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় সাদাত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিনের মধ্যে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৭৯ সালের ২৬ মার্চ সাদাত ও বেগিন আনুষ্ঠানিকভাবে মিশর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে মিশর ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
চুক্তির প্রধান বিষয়গুলির মধ্যে ছিল পারস্পরিক স্বীকৃতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যবস্থা এবং সিনাই উপদ্বীপ থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার। চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েল পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে সিনাই থেকে সরে যায় এবং ১৯৮২ সালে মিশরের কাছে উপদ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়।
সুয়েজ খাল ও আকাবা উপসাগর-সংক্রান্ত নৌচলাচলের অধিকার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলিও এই শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৮ সালে আনোয়ার আল সাদাত ও মেনাখেম বেগিন যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। মুসলিম বিশ্বের একজন রাষ্ট্রনেতা হিসেবে সাদাতের এই অর্জন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
শান্তিচুক্তি নিয়ে বিরোধ ও আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত মিশরের অভ্যন্তরে এবং আরব বিশ্বে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেক মিশরীয় নাগরিক শান্তিচুক্তিকে দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান এবং সিনাই পুনরুদ্ধারের পথ হিসেবে স্বাগত জানান। কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুড, বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং বহু আরব রাষ্ট্র এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।
তাদের অভিযোগ ছিল, ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে যথেষ্ট অগ্রগতি ছাড়াই সাদাত ইসরায়েলের সঙ্গে পৃথক শান্তিচুক্তি করেছেন। আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়াও তাদের বিরোধিতার একটি প্রধান কারণ ছিল।
মিশরের এই পদক্ষেপের পর ১৯৭৯ সালে দেশটিকে আরব লীগের সদস্যপদ থেকে স্থগিত করা হয়। ১৯৮৯ সালে মিশর পুনরায় আরব লীগের সদস্যপদ ফিরে পায়।
মুসলিম ব্রাদারহুড ১৯২৮ সালে হাসান আল-বান্নার প্রতিষ্ঠিত একটি প্রভাবশালী ইসলামপন্থী আন্দোলন। সংগঠনটির সঙ্গে মিশরের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা, বিরোধিতা ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে। সাদাতের শাসনামলেও এই সম্পর্ক ক্রমশ সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যু
আনোয়ার আল সাদাতের শান্তি উদ্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নীতির বিরোধিতা তাঁর শাসনামলের শেষ দিকে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৮১ সালে তাঁর সরকার বহু বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, ইসলামপন্থী কর্মী ও অন্যান্য সমালোচককে গ্রেপ্তার করে। এর ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়।
১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর কায়রোতে ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধের বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করার সময় সাদাত আততায়ীদের হামলার শিকার হন। মিশরীয় সেনাবাহিনীর সদস্য খালিদ আল-ইসলামবুলির নেতৃত্বে একদল হামলাকারী স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে তাঁর ওপর গুলি চালায়।
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল মিশরীয় ইসলামিক জিহাদ নামের উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্যরা। তারা সাদাতের সরকার, রাজনৈতিক দমননীতি এবং বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করত। হত্যাকাণ্ডের পেছনে মুসলিম ব্রাদারহুডের সরাসরি সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল—এমনভাবে ঘটনাটিকে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়।
হামলায় আনোয়ার আল সাদাতসহ মোট এগারোজন নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। আহতদের মধ্যে উপরাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারকও ছিলেন। পরবর্তীকালে মোবারক মিশরের রাষ্ট্রপতি হন।
১৯৮২ সালে খালিদ আল-ইসলামবুলিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
সাদাতের হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মহলে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। তাঁর মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং মিশরের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
শেষকৃত্য ও সমাধি
আনোয়ার আল সাদাতের শেষকৃত্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি জেরাল্ড ফোর্ড, জিমি কার্টার ও রিচার্ড নিক্সন তাঁর শেষকৃত্যে অংশ নেন। আরব রাষ্ট্রগুলির প্রতিনিধিত্ব ছিল সীমিত; সুদানের রাষ্ট্রপতি জাফর নিমেইরি উপস্থিত ছিলেন।
সাদাতকে কায়রোর অজানা সৈনিকের স্মৃতিসৌধসংলগ্ন স্থানে সমাধিস্থ করা হয়। এই স্মৃতিসৌধ ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে নিহত মিশরীয় সৈনিকদের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল।
সংক্ষেপে জীবনবৃত্তান্ত
| বিষয় | বিবরণ |
| পূর্ণ নাম | মুহাম্মদ আনোয়ার আল-সাদাত |
| জন্ম | ২৫ ডিসেম্বর ১৯১৮ |
| জন্মস্থান | মিট আবু আল-কওম, মিশর |
| পিতার নাম | আনোয়ার মুহাম্মদ আল-সাদাত |
| মাতার নাম | সিত আল-বারেইন |
| প্রথম স্ত্রী | ইকবাল মাদি |
| দ্বিতীয় স্ত্রী | জিহান সাদাত |
| সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান | মিশরীয় সামরিক অ্যাকাডেমি |
| সামরিক পদ | দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু |
| মিশরের রাষ্ট্রপতি | ১৯৭০–১৯৮১ |
| উপরাষ্ট্রপতি | ১৯৬৪–১৯৬৬ ও ১৯৬৯–১৯৭০ |
| অর্থনৈতিক নীতি | ইনফিতাহ বা অর্থনৈতিক উন্মুক্তকরণ |
| প্রধান সামরিক ঘটনা | ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধ |
| নোবেল পুরস্কার | ১৯৭৮ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার |
| মৃত্যুর তারিখ | ৬ অক্টোবর ১৯৮১ |
| মৃত্যুর স্থান | কায়রো, মিশর |
| মৃত্যুর কারণ | সামরিক কুচকাওয়াজে আততায়ীর গুলিতে নিহত |
জীবন ও রাজনৈতিক পদসংক্রান্ত তথ্য: নোবেল পুরস্কারের সরকারি জীবনী এবং মিশরের রাষ্ট্রপতির সরকারি জীবনী।
পরিবার ও সন্তানসন্ততি
আনোয়ার আল সাদাত প্রথমে ইকবাল মাদিকে বিবাহ করেন। তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি জিহান সাদাতকে বিবাহ করেন। তাঁর সন্তানদের নাম হিসেবে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে কামালিয়া, গামাল, জেলিয়ান, লুবনা, নোহা, রাবিয়া ও রুকিয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
আনোয়ার আল সাদাত ছিলেন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি সামরিক সংগ্রাম ও কূটনীতিকে একই রাজনৈতিক লক্ষ্যের দুটি পৃথক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে মিশরের প্রাথমিক সামরিক সাফল্য তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে; পরবর্তী শান্তি উদ্যোগ মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করে। এই প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৮ সালে মেনাখেম বেগিনের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
তাঁর উত্তরাধিকার আজও বিতর্কিত। একদিকে তিনি সিনাই উপদ্বীপ পুনরুদ্ধার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; অন্যদিকে তাঁর অর্থনৈতিক নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থান নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। এই দ্বৈত মূল্যায়নই তাঁকে আধুনিক মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নোবেল বিজয়ী মহান
বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম
নোবেলজয়ী মহান বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারজয়ী মহান বিজ্ঞানী মুহাম্মদ আব্দুস সালামের জন্ম ১৯২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝং শহরে, যা বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত। তাঁর পিতার নাম চৌধুরি মুহাম্মদ হুসেইন এবং মাতার নাম হাজিরা হুসেইন। তাঁর পিতা একটি অনুন্নত কৃষিপ্রধান জেলার শিক্ষা দপ্তরে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সালামের পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন, জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তাঁর পিতামহ গুল মুহাম্মদ ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যায়ও পারদর্শী ছিলেন। তাঁদের পরিবার আহমদিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল।
শিক্ষাজীবন ও অসাধারণ মেধার পরিচয়
শৈশব থেকেই আব্দুস সালাম ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তাঁর সাফল্যে ঝং শহরের মানুষ আনন্দে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
এরপর তিনি লাহোরের সরকারি কলেজে ভর্তি হন। গণিতের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৪৪ সালে গণিতের একটি পরীক্ষায় ৩০০ নম্বরের মধ্যে ৩০০ নম্বর অর্জনের কৃতিত্ব তাঁর মেধার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের জন্য তিনি বৃত্তি লাভ করেন।
তাঁর পিতা চেয়েছিলেন, ছেলে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে একটি সম্মানজনক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হোক। কিন্তু সালামের আগ্রহ ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে। বাবার ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি ভারতীয় রেলওয়েতে চাকরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দৃষ্টিশক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা এবং বয়সসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। পরবর্তী সময়ে এই ব্যর্থতাই যেন তাঁকে তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য—বিজ্ঞানচর্চার পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।
১৯৪৬ সালে তিনি লাহোরের সরকারি কলেজ থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জনস কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পান। ১৯৪৯ সালে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে অসাধারণ ফলাফলসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট-পূর্ব পর্যায়ের অসামান্য অবদানের জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানজনক স্মিথস প্রাইজ প্রদান করে।
গবেষণাজীবনের সূচনা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিশ গবেষণাগারে আব্দুস সালাম তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৫১ সালে তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণাপত্রে কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিদ্যা বা কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকসের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার মৌলিক বিশ্লেষণ ছিল। এই গবেষণা তাঁকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত করে তোলে।
গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়েই তিনি কণা পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমস্যাগুলোর প্রতি বিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল প্রকৃতির মৌলিক কণাগুলোর আচরণ, তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া এবং সেই ক্রিয়াগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজনীয় গাণিতিক কাঠামো।
১৯৫১ সালে পিএইচডি অর্জনের পর তিনি পাকিস্তানে ফিরে এসে লাহোরের সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৫২ সালে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন। সেখানে তিনি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে নিয়মিত পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমর্থনের অভাবে তাঁর প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়। পরে তিনি সন্ধ্যাকালীন পাঠক্রমে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা পড়ানোর ব্যবস্থা করেন।
তাঁর ছাত্রদের মধ্যে রিয়াজউদ্দিন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সালামের তত্ত্বাবধানে রিয়াজউদ্দিন উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষা ও গবেষণায় অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পান। সালাম উপলব্ধি করেছিলেন, একটি দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জন্য শুধু মেধাবী বিজ্ঞানী তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অপরিহার্য।
১৯৫৩ সালে লাহোরে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত দাঙ্গা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতিকূল পরিবেশ তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। শেষ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান ছেড়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৯৫৪ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জনস কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে যোগ দেন এবং ১৯৫৭ সালে সেখানে অধ্যাপক নিযুক্ত হন।
সহকর্মী পল ম্যাথিউসের সহযোগিতায় তিনি ইম্পেরিয়াল কলেজে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি শক্তিশালী গবেষণাগোষ্ঠী গড়ে তোলেন। ক্রমে এই বিভাগ আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে। স্টিভেন ওয়েইনবার্গ, টম কিবল, রিয়াজউদ্দিনসহ বহু বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষক এই গবেষণাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হন।
১৯৫৯ সালে মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে আব্দুস সালাম রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। এটি ছিল তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে গবেষণামূলক যোগাযোগ গড়ে তোলেন। জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের মতো বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর সঙ্গেও তাঁর আলোচনা ও মতবিনিময় হয়।
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অবদান
আব্দুস সালামের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে মৌলিক কণার পদার্থবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব, প্রতিসাম্য এবং প্রকৃতির মৌলিক বলগুলোর ঐক্যবদ্ধ ব্যাখ্যা।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান অনুসারে প্রকৃতিতে চারটি মৌলিক বল রয়েছে—মহাকর্ষীয় বল, তড়িৎচৌম্বকীয় বল, সবল নিউক্লীয় বল এবং দুর্বল নিউক্লীয় বল। এই বলগুলোর প্রকৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য। আব্দুস সালাম বিশ্বাস করতেন, আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন বলে মনে হওয়া প্রাকৃতিক বলগুলোর মধ্যে গভীর ঐক্য থাকতে পারে।
১৯৬০-এর দশকে তিনি মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী শেলডন গ্লাশো ও স্টিভেন ওয়েইনবার্গের সঙ্গে সমান্তরালভাবে গবেষণা করে দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং তড়িৎচৌম্বকীয় বলকে একটি অভিন্ন তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন। এই ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব পরবর্তীকালে ‘ইলেকট্রোউইক তত্ত্ব’ নামে পরিচিত হয়।
১৯৬৪ সালে আব্দুস সালাম ও জন ক্লাইভ ওয়ার্ড দুর্বল ও তড়িৎচৌম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ার গাণিতিক কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তাঁদের গবেষণায় এসইউ(২) × ইউ(১) গেজ-প্রতিসাম্যের ধারণা বিশেষ গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে শেলডন গ্লাশোও স্বাধীনভাবে অনুরূপ একটি তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন।
১৯৬৭ সালে সালাম তাঁর তত্ত্বে হিগস প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে ইলেকট্রোউইক ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ রূপ উপস্থাপন করেন। স্টিভেন ওয়েইনবার্গও স্বাধীনভাবে একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এই তত্ত্বের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন, কীভাবে দুর্বল নিউক্লীয় বল ও তড়িৎচৌম্বকীয় বল একটি বৃহত্তর তাত্ত্বিক কাঠামোর দুটি প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তত্ত্বটি দুর্বল নিরপেক্ষ প্রবাহের অস্তিত্বের পূর্বাভাসও দেয়, যা পরবর্তীকালে পরীক্ষার মাধ্যমে সমর্থিত হয়।
এই গবেষণা আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের সবকটিকে একীভূত করা এই তত্ত্বের লক্ষ্য ছিল না, তবু এটি মৌলিক বলগুলোর ঐক্য সম্পর্কে বিজ্ঞানের ধারণায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।
এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে আব্দুস সালাম, শেলডন গ্লাশো ও স্টিভেন ওয়েইনবার্গ যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কারটি প্রদান করা হয় মৌলিক কণাগুলোর মধ্যে দুর্বল ও তড়িৎচৌম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ার ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বে তাঁদের অবদানের জন্য। আব্দুস সালাম ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী প্রথম পাকিস্তানি এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম মুসলিম বিজ্ঞানী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
কোয়ার্ক, লেপটন ও ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বের অনুসন্ধান
ইলেকট্রোউইক তত্ত্বের পাশাপাশি সালাম মৌলিক কণাগুলোর মধ্যে আরও গভীর সম্পর্ক অনুসন্ধান করেন। ১৯৭৩ সালে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী যোগেশ পাটির সঙ্গে যৌথভাবে তিনি কোয়ার্ক ও লেপটনের মধ্যে সম্ভাব্য ঐক্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
কোয়ার্ক হলো প্রোটন ও নিউট্রনের মতো কণার গঠনকারী মৌলিক উপাদান। অন্যদিকে ইলেকট্রন ও নিউট্রিনোর মতো কণা লেপটন শ্রেণির অন্তর্গত। কোয়ার্ক ও লেপটনের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গভীর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে সালাম ও পাটি একটি বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বের ধারণা বিকাশে অবদান রাখেন।
তাঁদের গবেষণা পরবর্তীকালে গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিওরি বা বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এই গবেষণার মাধ্যমে মৌলিক কণাগুলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করার সম্ভাবনা আরও প্রসারিত হয়।
নিউট্রিনোর ধর্ম, প্রতিসাম্য, গেজ তত্ত্ব এবং মৌলিক কণার পারস্পরিক ক্রিয়া নিয়েও সালামের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ছিল। তাঁর কাজের ব্যাপ্তি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিকাশের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান জড়িয়ে রয়েছে।
পাকিস্তানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে ভূমিকা
আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করলেও আব্দুস সালাম তাঁর জন্মভূমি পাকিস্তানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
সে সময় পাকিস্তানে মৌলিক বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার পরিকাঠামো ছিল সীমিত। উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগের অভাব দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছিল। সালাম মনে করতেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না।
তিনি পাকিস্তানের বিজ্ঞানীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। তাঁর উদ্যোগে বহু পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ও গবেষক উন্নত গবেষণার সুযোগ লাভ করেন। দেশে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাকে এগিয়ে নিতে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগোষ্ঠী গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬১ সালে পাকিস্তানের মহাকাশ গবেষণা কার্যক্রমের জন্য একটি জাতীয় সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলস্বরূপ ১৯৬১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর স্পেস অ্যান্ড আপার অ্যাটমোস্ফিয়ার রিসার্চ কমিশন—সুপারকো প্রতিষ্ঠিত হয়। সালাম এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান প্রেরণাদাতা ছিলেন। মহাকাশ গবেষণা, উচ্চ বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
পাকিস্তান পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণার উন্নয়নে তিনি কাজ করেন। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচির বিকাশে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে তাঁর বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারের মূল্যায়ন করতে গিয়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন এক বিষয় নয়। পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সম্পৃক্ততা থাকলেও তাঁর সবচেয়ে স্থায়ী আন্তর্জাতিক অবদান ছিল মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান, বিজ্ঞানশিক্ষা এবং গবেষণার প্রসারে।
আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা
আব্দুস সালামের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ইতালির ট্রিয়েস্টে আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রের ইংরেজি নাম International Centre for Theoretical Physics (ICTP)।
সালাম উপলব্ধি করেছিলেন, উন্নয়নশীল দেশের মেধাবী বিজ্ঞানীরা প্রায়ই উন্নত গবেষণার সুযোগ, আধুনিক বৈজ্ঞানিক উপকরণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে তাঁদের প্রতিভা বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয় না। এই বৈষম্য দূর করার জন্য তিনি এমন একটি আন্তর্জাতিক গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা একত্রে গবেষণা করতে পারবেন।
ইতালির সরকার ও ইউনেস্কোর সহযোগিতায় তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। তিনি কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এই প্রতিষ্ঠান উন্নয়নশীল বিশ্বের বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণা, প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও আন্তর্জাতিক মতবিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
সালাম বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম, ভাষা বা দেশের একক সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন সম্পদ। বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিজ্ঞানীরা যাতে আন্তর্জাতিক গবেষণার মূলধারায় অংশগ্রহণ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই তিনি নিরলস কাজ করে গেছেন।
আজও তাঁর প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রটি বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছে আব্দুস সালাম আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্র।
নোবেল পুরস্কার ও অন্যান্য সম্মাননা
বিজ্ঞানজগতে অসামান্য অবদানের জন্য আব্দুস সালাম জীবদ্দশায় দেশ-বিদেশের বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্মাননাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. স্মিথস প্রাইজ, ১৯৫০: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য ডক্টরেট-পূর্ব অবদানের জন্য।
২. হপকিন্স প্রাইজ, ১৯৫৮: পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
৩. অ্যাডামস প্রাইজ, ১৯৫৮: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে।
৪. রয়্যাল সোসাইটির ফেলোশিপ, ১৯৫৯: বিজ্ঞানজগতে তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি।
৫. ম্যাক্সওয়েল পদক ও পুরস্কার, ১৯৬১: লন্ডনের ফিজিক্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে।
৬. হিউজেস পদক, ১৯৬৪: রয়্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে বৈজ্ঞানিক অবদানের জন্য।
৭. পরমাণু শান্তি পুরস্কার, ১৯৬৮: আন্তর্জাতিক শান্তি ও বিজ্ঞানসম্পর্কিত অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
৮. জে. রবার্ট ওপেনহাইমার স্মারক পুরস্কার ও পদক, ১৯৭৬: তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অবদানের জন্য।
৯. ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক পদক, ১৯৭৮: তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
১০. জন টরেন্স টেট পদক, ১৯৭৮: আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্সের পক্ষ থেকে।
১১. রয়্যাল মেডেল, ১৯৭৮: রয়্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে।
১২. পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার, ১৯৭৯: শেলডন গ্লাশো ও স্টিভেন ওয়েইনবার্গের সঙ্গে যৌথভাবে ইলেকট্রোউইক তত্ত্বে অবদানের জন্য।
১৩. আইনস্টাইন পদক, ১৯৭৯: ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে।
১৪. শ্রী আর. ডি. বিড়লা পুরস্কার, ১৯৭৯: ভারতের ইন্ডিয়ান ফিজিক্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে।
১৫. লোমোনোসভ স্বর্ণপদক, ১৯৮৩: সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞান একাডেমির পক্ষ থেকে।
১৬. দায়েমি আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার, ১৯৮৬: বাংলাদেশ থেকে।
১৭. এডিনবার্গ পদক, ১৯৮৮: বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
১৮. ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনারারি নাইট কমান্ডার, ১৯৮৯: যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে সম্মাননা।
১৯. কোপলি পদক, ১৯৯০: রয়্যাল সোসাইটির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সম্মাননা।
এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞান একাডেমি থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট, পদক এবং অন্যান্য স্বীকৃতি লাভ করেন।
তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান
আব্দুস সালামের বৈজ্ঞানিক অবদান ও স্মৃতিকে অমর করে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
- আব্দুস সালাম আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্র, ট্রিয়েস্টে, ইতালি।
- আব্দুস সালাম ফিজিক্স সেন্টার, কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামাবাদ, পাকিস্তান।
- আব্দুস সালাম ন্যাশনাল সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্স, সরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, লাহোর, পাকিস্তান।
- আব্দুস সালাম স্কুল অব ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেস, লাহোর, পাকিস্তান।
- এডওয়ার্ড বাউচেট আব্দুস সালাম ইনস্টিটিউট, যার সদর দপ্তর ট্রিয়েস্টে, ইতালি।
এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
ব্যক্তিজীবন, ধর্মীয় পরিচয় ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক
আব্দুস সালাম ব্যক্তিজীবনে ছিলেন সংযত, অধ্যবসায়ী ও গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী। তিনি আহমদিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী ছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মধ্যে তিনি কোনো মৌলিক বিরোধ দেখতেন না। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের পথ, আর ধর্ম ছিল মানুষের অন্তর্জগত ও বিশ্বাসের বিষয়।
কিন্তু পাকিস্তানে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় পরবর্তী সময়ে গভীর সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে আইনগতভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে সালামের সঙ্গে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তিনি সরকারি বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং পরে পাকিস্তানের বাইরে অবস্থান করেন।
তবু জন্মভূমির প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি। বিদেশে বসবাস করলেও তিনি পাকিস্তানের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন এবং তাঁদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করতেন। নিজের দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জন্য তাঁর অবদান ছিল আন্তরিক ও সুদূরপ্রসারী।
তাঁর জীবনের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন বিজ্ঞানীর প্রতিভা ও অবদানকে ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক মতভেদের সংকীর্ণ মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। বিজ্ঞান ও মানবিকতার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর কাজ, জ্ঞান এবং মানবকল্যাণে অবদানের ভিত্তিতে।
মৃত্যু ও শেষ বিদায়
১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে আব্দুস সালাম মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল সত্তর বছর। তাঁর মরদেহ পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পাঞ্জাবের রাবওয়াহে তাঁর পিতা-মাতার সমাধির কাছে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তাঁর শেষকৃত্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। বিজ্ঞানী, শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
তাঁর সমাধিফলকে প্রথমে তাঁকে ‘প্রথম মুসলিম নোবেলজয়ী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের আইনি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ফলে ফলক থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি মুছে ফেলা হয়। এই ঘটনা তাঁর জীবনের বেদনাদায়ক বৈপরীত্যের প্রতীক হয়ে আছে। যে বিজ্ঞানী নিজের জন্মভূমির আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন, সেই দেশেই তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তাঁর মৃত্যুর পরও অব্যাহত ছিল।
উপসংহার
আব্দুস সালামের জীবন ছিল প্রতিভা, অধ্যবসায়, জ্ঞানসাধনা ও মানবকল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দারিদ্র্যপীড়িত কৃষিপ্রধান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেও তিনি নিজের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীতে পরিণত হয়েছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর নোবেলজয়ী গবেষণা আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তবে তাঁর কৃতিত্ব শুধু নোবেল পুরস্কার বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নশীল দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, তরুণ গবেষকদের উৎসাহিত করা এবং বিজ্ঞানের জ্ঞানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা তাঁকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।
আব্দুস সালাম দেখিয়েছেন, একজন মানুষের প্রতিভা কোনো ভৌগোলিক সীমানা, জাতিগত পরিচয় কিংবা ধর্মীয় বিভাজনের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যিকারের জ্ঞানসাধনা, মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই সভ্যতার অগ্রগতির প্রকৃত ভিত্তি।
মহান বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম তাই শুধু পাকিস্তানের গর্ব নন; তিনি সমগ্র মানবজাতির বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আগামী প্রজন্মের বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর জীবন চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

নোবেলজয়ী সাহিত্যিক নাগুইব মাহফুজ: জীবন ও কর্ম
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক এবং আরবি ভাষায় সাহিত্যচর্চার প্রথম নোবেলজয়ী নাগুইব মাহফুজের জন্ম ১৯১১ সালের ১১ ডিসেম্বর মিশরের রাজধানী কায়রোর পুরোনো শহরের গামালিয়া এলাকায় এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পুরো নাম নাগুইব মাহফুজ আবদেল আজিজ ইব্রাহিম। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর ভাই-বোনেরা বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক বড় ছিলেন।
মাহফুজের পরিবার প্রথমে কায়রোর পুরোনো শহরের গামালিয়া এলাকায় বসবাস করত। ১৯২৪ সালে তাঁরা আব্বাসিয়া এলাকায় চলে যান। কায়রোর এই দুই এলাকার জনজীবন, অলিগলি, বাজার, সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি হয়ে ওঠে।
তাঁর বাবা আবদেল আজিজ ইব্রাহিম ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। শৈশবে তিনি ছেলেকে মিশরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান, জাদুঘর এবং বিখ্যাত পিরামিড দেখাতে নিয়ে যেতেন। এসব অভিজ্ঞতা মাহফুজের মনে প্রাচীন মিশরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল। তাঁর মায়ের নাম ছিল ফাতিমা।
মাহফুজের পরিবার ছিল ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবার। ছোটবেলায় তাঁকে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হতো। পরবর্তী জীবনে এক সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশবের ধর্মীয় পরিবেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে এমন একটি রক্ষণশীল পারিবারিক পরিবেশ থেকে কীভাবে তাঁর মতো একজন শিল্পী ও সাহিত্যিকের জন্ম হলো।
শৈশব ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ
মাহফুজের শৈশবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৯১৯ সালের মিশরীয় বিপ্লব। তখন তাঁর বয়স মাত্র সাত বছর। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মিশরীয় জনগণের আন্দোলন এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্রিটিশ বাহিনীর দমন-পীড়ন তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন। বাড়ির জানালা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
পরবর্তী জীবনে তিনি স্মরণ করেছিলেন যে ১৯১৯ সালের বিপ্লব তাঁর শৈশবের নিরাপদ জগৎকে আলোড়িত করেছিল। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে জাতীয়তাবোধ, সামাজিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক উপলব্ধি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
তরুণ বয়সে তিনি মিশরের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক তাহা হুসেইন এবং সালামা মুসার মতো ব্যক্তিত্বের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হন। তাঁদের লেখালেখি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড মাহফুজের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের সূচনা
মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর ১৯৩০ সালে মাহফুজ কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৩৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে তিনি দর্শনে স্নাতকোত্তর পর্যায়েও পড়াশোনা করেন। তবে গবেষণার পরিবর্তে সাহিত্যচর্চাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন।
১৯৩০-এর দশকে তিনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। আল-রিসালা, আল-হিলাল এবং আল-আহরাম-এর মতো সাময়িকী ও সংবাদপত্রে তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। প্রথমদিকে তিনি ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও সাহিত্যবিষয়ক রচনা লিখতেন। পরে ধীরে ধীরে উপন্যাস রচনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩৪ সালে স্নাতক হওয়ার পর তিনি মিশরের সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সরকারি দপ্তর, ধর্মীয় দানসম্পত্তি-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শিল্পকলার সেন্সরশিপ বিভাগ, চলচ্চিত্র উন্নয়ন-সহায়ক সংস্থা এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও কাজ করেন। ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।
সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান। তাঁর কর্মজীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, সরকারি দায়িত্ব পালন করেও তিনি সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর সাহিত্যকে বাস্তবধর্মী ও জীবনঘনিষ্ঠ করে তুলেছিল।
সাহিত্যজীবনের সূচনা ও ঐতিহাসিক উপন্যাস
নাগুইব মাহফুজের সাহিত্যজীবন শুরু হয় প্রাচীন মিশরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা এবং লেখালেখির মধ্য দিয়ে। ১৯৩২ সালে তিনি জেমস বাইকির প্রাচীন মিশরবিষয়ক একটি গ্রন্থের আরবি অনুবাদ প্রকাশ করেন। এরপর ছোটগল্প রচনায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৩৮ সালে তাঁর ছোটগল্প সংকলন হুইস্পারস অব ম্যাডনেস প্রকাশিত হয়।
১৯৩৯ সালে প্রকাশিত আবাথ আল-আকদার তাঁর প্রথম উপন্যাস। ইংরেজিতে এটি Mockery of the Fates এবং Khufu’s Wisdom নামে পরিচিত। উপন্যাসটিতে প্রাচীন মিশরের রাজবংশ, ভাগ্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে।
এরপর ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয় রাডোপিস অব নুবিয়া এবং ১৯৪৪ সালে দ্য স্ট্রাগল অব থিবস। এই তিনটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি প্রাচীন মিশরের ইতিহাস, রাজনীতি, ধর্মবিশ্বাস ও সামাজিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন।
ইংরেজ লেখক স্যার ওয়াল্টার স্কটের ঐতিহাসিক উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মাহফুজ একসময় মিশরের সুদীর্ঘ ইতিহাসকে ধারাবাহিক উপন্যাসের মাধ্যমে তুলে ধরার পরিকল্পনা করেছিলেন। যদিও তাঁর সেই বৃহৎ পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হয়নি, তবু প্রাচীন মিশরকে কেন্দ্র করে রচিত তাঁর প্রাথমিক উপন্যাসগুলো আরবি সাহিত্যে ঐতিহাসিক কথাসাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
আধুনিক কায়রোর জীবন ও সমাজবাস্তবতা
প্রাচীন মিশরের ইতিহাস নিয়ে লেখালেখির পর মাহফুজ ক্রমে সমকালীন মিশরের সমাজজীবনের দিকে মনোনিবেশ করেন। তাঁর রচনায় কায়রোর জনবহুল পাড়া, সরু গলি, চায়ের দোকান, বাজার, মধ্যবিত্ত পরিবার, দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ এবং পরিবর্তনশীল সামাজিক সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পায়।
১৯৪০-এর দশকে প্রকাশিত কায়রো মডার্ন, খান আল-খলিলি, মিদাক অ্যালি এবং দ্য বিগিনিং অ্যান্ড দ্য এন্ড তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এসব রচনায় আধুনিকতার প্রভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, পারিবারিক সংকট, সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত ফুটে উঠেছে।
মাহফুজের সাহিত্যিক সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল সাধারণ মানুষকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। তাঁর চরিত্রগুলো কোনো আদর্শায়িত সমাজের বাসিন্দা নয়; তারা বাস্তব জীবনের মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রেম, ঈর্ষা, লোভ, হতাশা, প্রতিবাদ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। এই মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই তাঁর রচনা মিশরের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্যের সম্পদে পরিণত হয়েছে।
‘কায়রো ট্রিলজি’: মাহফুজের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি
নাগুইব মাহফুজের সর্বাধিক পরিচিত সাহিত্যকীর্তি হলো কায়রো ট্রিলজি বা ‘কায়রো ত্রয়ী’। তিনটি উপন্যাস নিয়ে গঠিত এই বিশাল সাহিত্যকর্মের অংশগুলো হলো—
১. প্যালেস ওয়াক (Palace Walk, ১৯৫৬)
২. প্যালেস অব ডিজায়ার (Palace of Desire, ১৯৫৭)
৩. সুগার স্ট্রিট (Sugar Street, ১৯৫৭)
এই উপন্যাসত্রয়ীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ১৯৫২ সালের মিশরীয় বিপ্লব ও রাজতন্ত্রের পতনের সময়কাল পর্যন্ত একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের জীবন ও অভিজ্ঞতা চিত্রিত হয়েছে।
উপন্যাসগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্র আল-সাইয়িদ আহমদ আবদেল গাওয়াদ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের পারিবারিক জীবন, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক রীতিনীতি, প্রেম, বিবাহ, প্রজন্মগত দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মাহফুজ তৎকালীন মিশরীয় সমাজের একটি বিস্তৃত চিত্র নির্মাণ করেছেন।
এই উপন্যাসত্রীর বিশেষত্ব হলো, একটি পরিবারের ব্যক্তিগত জীবনের মধ্য দিয়ে সমগ্র দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরকে তুলে ধরা। পুরোনো মূল্যবোধ ও আধুনিক চিন্তাধারার সংঘাত, নারীর অবস্থান, তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয়তাবাদের বিকাশ এতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটে উঠেছে।
কায়রো ট্রিলজি প্রকাশের পর মাহফুজ আরবি ভাষাভাষী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। এই রচনা তাঁকে আধুনিক আরবি উপন্যাসের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৫২ সালের বিপ্লব ও সাহিত্যিক বিরতি
১৯৫২ সালের মিশরীয় বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতন এবং নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা মাহফুজের চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি আশা করেছিলেন, নতুন শাসনব্যবস্থা মিশরে সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানুষের মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তাঁর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে নানা ক্ষেত্রে বিরোধ তৈরি হয়।
কায়রো ট্রিলজি রচনার পর তিনি কয়েক বছর উপন্যাস লেখা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৫৯ সালে চিলড্রেন অব গেবেলাউই প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যচর্চায় নতুন পর্যায়ের সূচনা হয়। এই পর্যায়ে তিনি বাস্তবধর্মী বর্ণনার পাশাপাশি প্রতীক, রূপক, দার্শনিক প্রশ্ন ও রাজনৈতিক ইঙ্গিতের ব্যবহার বাড়িয়ে দেন।
১৯৫০-এর দশকের শেষভাগ থেকে তাঁর রচনায় মানুষের অস্তিত্ব, নৈতিকতা, ধর্মবিশ্বাস, ক্ষমতা ও সামাজিক অবিচারের প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উঠে আসে।
‘চিলড্রেন অব গেবেলাউই’: বিতর্কিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস
১৯৫৯ সালে প্রকাশিত চিলড্রেন অব গেবেলাউই (Children of Gebelawi), যা চিলড্রেন অব দ্য অ্যালি নামেও পরিচিত, মাহফুজের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত উপন্যাসগুলোর একটি।
উপন্যাসটিতে গেবেলাউই নামের এক পিতৃপুরুষ এবং তাঁর উত্তরসূরিদের কাহিনির মাধ্যমে মানুষের ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, নৈতিকতা, ক্ষমতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে। এর চরিত্র ও ঘটনাবলিতে ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলামের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীকী অনুষঙ্গ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
ধর্মীয় প্রতীক ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের রূপকধর্মী উপস্থাপনার কারণে উপন্যাসটি তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। মিশরে এর প্রকাশনা নিয়ে আপত্তি ওঠে এবং পরবর্তী সময়ে বইটি আরব বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে।
এই উপন্যাসে মাহফুজ কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নই তোলেননি; বরং মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সমাজে ন্যায়বিচারের অভাব নিয়েও গভীর অনুসন্ধান করেছেন।
নতুন আঙ্গিক ও দার্শনিক অনুসন্ধান
১৯৬০-এর দশকে মাহফুজের সাহিত্যিক রীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। তাঁর উপন্যাসে বহুমাত্রিক বর্ণনা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক প্রতীকের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।
১৯৬১ সালে প্রকাশিত দ্য থিফ অ্যান্ড দ্য ডগস উপন্যাসে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক চোরের প্রতিশোধস্পৃহা, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক বিপর্যয়ের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সংঘাত এবং ন্যায়বিচারের জটিলতা বিশ্লেষণ করেন।
১৯৬৬ সালে প্রকাশিত অ্যাড্রিফট অন দ্য নাইল (Adrift on the Nile) উপন্যাসে নাসের-যুগের মিশরীয় সমাজের একাংশের নৈতিক অবক্ষয়, উদাসীনতা ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার সমালোচনা করা হয়েছে। উপন্যাসটির চলচ্চিত্ররূপ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।
১৯৬৭ সালে প্রকাশিত মিরামার উপন্যাসে আলেকজান্দ্রিয়ার একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানের বাসিন্দাদের জীবন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়। একাধিক বর্ণনাকারীর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করে মাহফুজ দেখিয়েছেন, একই ঘটনা ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে দ্য বেগার (১৯৬৫), অটাম কোয়েল (১৯৬২), দ্য সার্চ (১৯৬৪), দ্য হারাফিশ (১৯৭৭), আরাবিয়ান নাইটস অ্যান্ড ডেজ (১৯৮১), দ্য জার্নি অব ইবনে ফাত্তুমা (১৯৮৩) এবং আখেনাতেন: ডুয়েলার ইন ট্রুথ (১৯৮৫)।
এসব রচনায় তিনি মানুষের অস্তিত্ব, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, বিশ্বাস ও যুক্তির দ্বন্দ্ব, সামাজিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করেছেন।
রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তা
নাগুইব মাহফুজের সাহিত্যকে মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। তাঁর রচনায় মিশরীয় জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সামাজিক সংস্কার, গণতন্ত্র এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তার প্রভাব লক্ষ করা যায়।
যৌবনে তিনি জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মিশরের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং ওয়াফদ পার্টির জাতীয়তাবাদী রাজনীতি তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল। একই সঙ্গে তিনি ধর্মীয় মৌলবাদ ও অসহিষ্ণুতার বিরোধিতা করেন।
তবে মাহফুজ কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। বরং তাঁর সাহিত্যকর্মে আদর্শ ও বাস্তবতার ব্যবধান, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপ্লব-পরবর্তী সমাজের সীমাবদ্ধতা বারবার উঠে এসেছে।
১৯৫২ সালের বিপ্লব এবং ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে মিশরের পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক উপলব্ধিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে উচ্চ আদর্শের কথা বলা সহজ, কিন্তু সেই আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন।
১৯৯৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি গামাল আবদেল নাসেরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছিলেন। সুয়েজ খাল জাতীয়করণের মতো পদক্ষেপ তাঁর ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।
মাহফুজের মতে, রাজনীতি মানুষের চিন্তা ও দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাঁর সাহিত্যেও প্রেম, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত সংকটের আড়ালে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা উপস্থিত থাকে।
সাহিত্যিক প্রভাব ও রচনার বৈশিষ্ট্য
মাহফুজের সাহিত্যিক জগৎ গড়ে উঠেছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন চিন্তাধারার সংমিশ্রণে। তিনি আরবি সাহিত্যের ঐতিহ্যের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের গোয়েন্দা কাহিনি, রুশ ধ্রুপদি সাহিত্য এবং আধুনিকতাবাদী লেখকদের রচনা পড়তেন। মার্সেল প্রুস্ত, ফ্রানৎস কাফকা ও জেমস জয়েসের মতো সাহিত্যিকদের রচনাও তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর উপন্যাসে বাস্তববাদ, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, প্রতীকী বর্ণনা ও দার্শনিক অনুসন্ধানের সমন্বয় দেখা যায়। কায়রো শহর তাঁর সাহিত্যে প্রায় জীবন্ত চরিত্রের মতো উপস্থিত। শহরের অলিগলি, চায়ের দোকান, বাজার ও আবাসিক এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে তিনি সাধারণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন, ব্যর্থতা ও সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন।
তাঁর চরিত্রগুলো আধুনিকায়ন, পশ্চিমা মূল্যবোধের প্রভাব, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সামাজিক রীতিনীতির মধ্যকার দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে মাহফুজ দেখিয়েছেন, পরিবর্তনশীল সমাজে মানুষ কীভাবে নিজের পরিচয় ও মূল্যবোধ ধরে রাখার চেষ্টা করে।
তাঁর রচনায় মিশরের বিশেষ সামাজিক ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থাকলেও সেগুলোর মানবিক তাৎপর্য সর্বজনীন। এ কারণেই তাঁর সাহিত্য বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে।
নোবেল পুরস্কার অর্জন
১৯৮৮ সালে নাগুইব মাহফুজ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ছিলেন আরবি ভাষায় সাহিত্য রচনার জন্য নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম লেখক। এই অর্জনের মাধ্যমে আধুনিক আরবি সাহিত্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।
নোবেল কমিটি তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রশংসা করে জানায় যে তিনি এমন এক আরবীয় আখ্যানশিল্প নির্মাণ করেছেন, যার তাৎপর্য সমগ্র মানবজাতির কাছে প্রযোজ্য। সময়, প্রেম, সমাজ, প্রচলিত রীতিনীতি, জ্ঞান, বিশ্বাস ও মানুষের অস্তিত্বের মতো মৌলিক বিষয় তাঁর রচনায় গভীরতা ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।
পুরস্কার ঘোষণার পর মাহফুজের সাহিত্য আন্তর্জাতিক পাঠকদের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাঁর বহু উপন্যাস ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। এর আগে পাশ্চাত্যে তাঁর কয়েকটি রচনা প্রকাশিত হলেও নোবেল পুরস্কার তাঁর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই পুরস্কার শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যিক সাফল্যের স্বীকৃতি ছিল না; বরং আরবি ভাষা ও সাহিত্যের আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল।
বিতর্ক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মৃত্যুর হুমকি
নাগুইব মাহফুজ তাঁর সাহিত্যিক জীবনে নানা বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৭৮ সালে মিশরের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত এবং ইসরায়েলের মধ্যে সম্পাদিত ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিকে তিনি সমর্থন করেছিলেন। এই অবস্থানের কারণে আরব বিশ্বের কিছু মহলে তাঁর বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
তাঁর চিলড্রেন অব গেবেলাউই উপন্যাসটি নিয়েও ধর্মীয় বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগেই তাঁর কিছু বই বিভিন্ন আরব দেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে।
১৯৮৯ সালে সালমান রুশদির দ্য স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি হলে মাহফুজ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি উপন্যাসটির কিছু বিষয়বস্তুর সমালোচনা করলেও লেখকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডমূলক ফতোয়া জারির বিরোধিতা করেন। তাঁর অবস্থান ছিল, কোনো সাহিত্যিকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তার জন্য সহিংসতা বা হত্যার হুমকি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই সময় তাঁর নিজের জীবনও হুমকির মুখে পড়ে। ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের কাছ থেকে তিনি মৃত্যুর হুমকি পেতে থাকেন। তাঁর নিরাপত্তার জন্য পুলিশি সুরক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়।
১৯৯৪ সালের হামলা ও শেষ জীবনের সংগ্রাম
১৯৯৪ সালের ১৪ অক্টোবর কায়রোতে নিজের বাড়ির বাইরে এক উগ্রপন্থীর ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন নাগুইব মাহফুজ। হামলায় তাঁর ঘাড়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও ডান হাতের ওপর স্থায়ী প্রভাব পড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে লেখা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে।
এই আঘাত তাঁর সাহিত্যচর্চার গতি অনেকটাই কমিয়ে দেয়। তবু তিনি লেখালেখি পুরোপুরি বন্ধ করেননি। সীমিত শারীরিক সামর্থ্য নিয়ে তিনি ছোট রচনা, স্মৃতিচারণ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম চালিয়ে যান।
জীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ও শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটে। তা সত্ত্বেও সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ অটুট ছিল। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিও একজন নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যিকের সৃজনশীলতাকে সম্পূর্ণরূপে থামিয়ে দিতে পারে না।
ব্যক্তিজীবন ও বিবাহ
নাগুইব মাহফুজ জীবনের দীর্ঘ সময় অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, সংসার ও পারিবারিক দায়িত্ব সাহিত্যচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। নিজের ভাই-বোনদের পারিবারিক ব্যস্ততা দেখে বিবাহ সম্পর্কে তাঁর মনে দ্বিধা তৈরি হয়েছিল।
অবশেষে ১৯৫৪ সালে তিনি আতিয়াতুল্লাহ ইব্রাহিমকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই কন্যা ছিল। বিবাহের পরও তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে অনাগ্রহী ছিলেন। প্রচারমাধ্যম ও জনসমাগম থেকে দূরে থেকে তিনি নিজের সাহিত্যচর্চা এবং ব্যক্তিগত পরিসরকে গুরুত্ব দিতেন।
তাঁর এই সংযত জীবনযাপন সাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল। খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতে পছন্দ করতেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট, ৯৪ বছর বয়সে কায়রোতে নাগুইব মাহফুজের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে আরবি সাহিত্যজগতে এক যুগের অবসান ঘটে। তবে তাঁর সাহিত্যকর্ম আজও বিশ্বসাহিত্যের পাঠক, গবেষক ও সমালোচকদের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় সাত দশকের সাহিত্যজীবনে তিনি ত্রিশটিরও বেশি উপন্যাস, সাড়ে তিন শতাধিক ছোটগল্প এবং বহু প্রবন্ধ, নাটক ও চিত্রনাট্য রচনা করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে আধুনিক মিশরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়।
তাঁর অবদান শুধু আরবি সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে কোনো একটি নির্দিষ্ট শহর, সমাজ কিংবা পরিবারের কাহিনিও যথার্থ সাহিত্যিক শক্তির মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতির অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
নাগুইব মাহফুজ ছিলেন এমন একজন কথাসাহিত্যিক, যিনি ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের, ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে রাজনীতির এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতার সঙ্গে সর্বজনীন মানবিকতার সেতুবন্ধন ঘটিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লেখক ও পাঠকদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
নাগুইব মাহফুজের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম
নাগুইব মাহফুজের সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক উপন্যাস, সামাজিক উপন্যাস, রাজনৈতিক আখ্যান, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণ। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম ও প্রকাশকাল নিচে দেওয়া হলো।
Nobel Prize
+2
| প্রকাশকাল | গ্রন্থের নাম |
| ১৯৩২ | প্রাচীন মিশর — জেমস বাইকির গ্রন্থের আরবি অনুবাদ |
| ১৯৩৮ | হুইস্পারস অব ম্যাডনেস |
| ১৯৩৯ | মকরি অব দ্য ফেটস (খুফুর প্রজ্ঞা) |
| ১৯৪৩ | রাডোপিস অব নুবিয়া |
| ১৯৪৪ | দ্য স্ট্রাগল অব থিবস |
| ১৯৪৫ | কায়রো মডার্ন |
| ১৯৪৫ | খান আল-খলিলি |
| ১৯৪৭ | মিদাক অ্যালি |
| ১৯৪৮ | দ্য মিরাজ |
| ১৯৪৯ | দ্য বিগিনিং অ্যান্ড দ্য এন্ড |
| ১৯৫৬ | প্যালেস ওয়াক |
| ১৯৫৭ | প্যালেস অব ডিজায়ার |
| ১৯৫৭ | সুগার স্ট্রিট |
| ১৯৫৯ | চিলড্রেন অব গেবেলাউই |
| ১৯৬১ | দ্য থিফ অ্যান্ড দ্য ডগস |
| ১৯৬২ | অটাম কোয়েল |
| ১৯৬৪ | দ্য সার্চ |
| ১৯৬৫ | দ্য বেগার |
| ১৯৬৬ | অ্যাড্রিফট অন দ্য নাইল |
| ১৯৬৭ | মিরামার |
| ১৯৭২ | মিররস |
| ১৯৭৩ | লাভ ইন দ্য রেইন |
| ১৯৭৪ | কারনাক ক্যাফে |
| ১৯৭৫ | রেসপেক্টেড স্যার |
| ১৯৭৭ | দ্য হারাফিশ |
| ১৯৭৯ | আরাবিয়ান নাইটস অ্যান্ড ডেজ |
| ১৯৮১ | ওয়েডিং সং |
| ১৯৮৩ | দ্য জার্নি অব ইবনে ফাত্তুমা |
| ১৯৮৫ | আখেনাতেন: ডুয়েলার ইন ট্রুথ |
| ১৯৮৫ | দ্য ডে দ্য লিডার ওয়াজ কিল্ড |
| ১৯৮৭ | মর্নিং অ্যান্ড ইভনিং টক |
| ১৯৯৪ | ইকোজ অব অ্যান অটোবায়োগ্রাফি |
| ১৯৯৯ | ইকোজ অব ফরগেটফুলনেস |
| ২০০৪ | ড্রিমস অব দ্য রিকনভ্যালেসেন্স পিরিয়ড |
| ২০০৫ | দ্য সেভেনথ হেভেন |
মৃত্যুর পর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
- ড্রিমস অব ডিপারচার — ২০০৭
- বিফোর দ্য থ্রোন — ২০০৯
- ইন দ্য টাইম অব লাভ — ২০১০
- হার্ট অব দ্য নাইট — ২০১১
- দ্য কোয়ার্টার — ছোটগল্প সংকলন, ২০১৯
এখানে গ্রন্থগুলোর ইংরেজি অনুবাদে প্রচলিত শিরোনাম ব্যবহার করা হয়েছে। মূল আরবি গ্রন্থের প্রকাশকাল ও ইংরেজি অনুবাদের প্রকাশকাল কোনো কোনো ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে।
উপসংহার
নাগুইব মাহফুজ ছিলেন এমন একজন সাহিত্যিক, যিনি মিশরের সাধারণ মানুষের জীবনকে বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন। তাঁর উপন্যাসে যেমন কায়রোর অলিগলির জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাজনীতি, ধর্ম, নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান।
১৯৮৮ সালের নোবেল পুরস্কার তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আরবি ভাষায় রচিত সাহিত্য যে ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে সমগ্র মানবজাতির অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করতে পারে, মাহফুজ তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছেন।
২০০৬ সালে তাঁর জীবনাবসান হলেও তাঁর সাহিত্য আজও জীবন্ত। তাঁর রচনা পাঠককে শুধু মিশরের ইতিহাস ও সমাজের সঙ্গে পরিচিত করে না, বরং নিজের সমাজ, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও মানবিক দায়িত্ব সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে শেখায়। এই কারণেই নাগুইব মাহফুজ বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ইয়াসির আরাফাতের জীবন ও কর্ম
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা, প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান এবং ১৯৯৪ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ইয়াসির আরাফাত ছিলেন বিংশ শতাব্দীর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি কয়েক দশক ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একদিকে সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনা—তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এই দুই ধারাই তাঁকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছিল।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
ইয়াসির আরাফাতের জন্ম ১৯২৯ সালের ২৪ আগস্ট মিশরের কায়রোতে। তাঁর জন্মনাম ছিল মোহাম্মদ আবদেল রহমান আবদেল রউফ আরাফাত আল-কুদওয়া আল-হুসেইনি। তাঁর পিতা আবদেল রউফ আল-কুদওয়া ছিলেন গাজা অঞ্চলের অধিবাসী এবং মিশরে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। তাঁর মা জাহওয়া আবুল সৌদ ছিলেন জেরুজালেমের বাসিন্দা। আরাফাতের জন্মস্থান ও জন্মতারিখ নিয়ে কিছু মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ প্রামাণ্য জীবনীতে কায়রো ও ১৯২৯ সালের ২৪ আগস্টের উল্লেখ পাওয়া যায়।
সাত ভাইবোনের মধ্যে আরাফাত ছিলেন অন্যতম সন্তান। ১৯৩৩ সালে, তাঁর বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন কিডনি রোগে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। মাতৃবিয়োগের পর আরাফাত ও তাঁর ভাই ফাতিকে জেরুজালেমে তাঁদের মামা সেলিম আবুল সৌদের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁরা প্রায় চার বছর কাটান। ১৯৩৭ সালে আরাফাতকে আবার কায়রোতে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁর বড় বোন ইনামও তাঁর শৈশবের দেখাশোনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আরাফাতের শৈশব ছিল পারিবারিক টানাপোড়েন ও নানা অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে তাঁর সঙ্গে পিতার সম্পর্কের দূরত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বোনের বক্তব্যের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যালান হার্ট লিখেছেন যে, ছোটবেলায় আরাফাত কায়রোর ইহুদি অধ্যুষিত এলাকায় যেতেন এবং ইহুদিদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ দেখাতেন। এ নিয়ে তাঁর পিতার সঙ্গে মতবিরোধ হতো বলেও বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। শৈশব থেকেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা ও মানসিকতা সম্পর্কে জানার আগ্রহ তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল বলে ধারণা করা হয়।
নামের পরিচয় ও পরিবর্তন
আরাফাতের পূর্ণ নামের বিভিন্ন অংশ তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তিনি পরবর্তী জীবনে ‘ইয়াসির আরাফাত’ নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত হন। ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি এই নাম ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাঁর আরেকটি পরিচিত নাম ছিল ‘আবু আম্মার’।
শিক্ষাজীবন ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ
১৯৪৪ সালে আরাফাত কায়রোর ফুয়াদ প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় রাখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ইহুদি ইতিহাস, জায়নবাদী আন্দোলন এবং ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও তিনি পড়াশোনা করতেন।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে আরাফাত ফিলিস্তিনের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড-সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সঙ্গে গাজা অঞ্চলের সংঘর্ষে অংশ নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তবে আরব বাহিনীর পরাজয় ও যুদ্ধের পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তিনি মিশরে ফিরে যান।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে তিনি ফিলিস্তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি জেনারেল ইউনিয়ন অব প্যালেস্টিনিয়ান স্টুডেন্টসের নেতৃত্ব দেন। ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আরব দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করেন।
১৯৫৬ সালে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে মিশরে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে কুয়েতে চলে যান এবং সেখানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলেন। ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করতেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
ফাতাহ প্রতিষ্ঠা ও সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা
১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে আরাফাত তাঁর কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে ‘ফাতাহ’ নামে একটি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনটির পূর্ণ আরবি নামের সংক্ষিপ্ত রূপ থেকেই ‘ফাতাহ’ নামটি এসেছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংগ্রাম করা।
১৯৫৯ সালের দিকে সংগঠনটি আরও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। কুয়েতসহ বিভিন্ন আরব দেশে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ফাতাহ সদস্য সংগ্রহ শুরু করে। সংগঠনটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনার পথ বেছে নেয়। এভাবেই আরাফাত ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন।
পিএলও গঠন ও আরাফাতের নেতৃত্বে উত্থান
১৯৬৪ সালের ২৮ মে আরব লীগের উদ্যোগে ফিলিস্তিনি জনগণের জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলও গঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠনকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। প্রথমদিকে পিএলও আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রভাবাধীন ছিল।
১৯৬৭ সালের জুনে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে ছয় দিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করে। আরব দেশগুলোর পরাজয় ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। প্রচলিত আরব নেতৃত্বের ওপর আস্থা কমতে থাকে এবং ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব সংগঠনের মাধ্যমে সংগ্রাম পরিচালনার দাবি জোরালো হয়।
এই পরিস্থিতিতে ফাতাহ দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আরাফাত ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ও সমর্থকদের সংগঠিত করেন এবং পিএলওর নেতৃত্বে ফাতাহর প্রভাব বাড়াতে থাকেন। ১৯৬৮ সালের কারামেহ যুদ্ধের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পিএলওর কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
আরাফাতের নেতৃত্বে পিএলও ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনে পরিণত হয়। বিভিন্ন মতাদর্শের ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকে একত্রিত করার মাধ্যমে তিনি সংগঠনটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন।
জর্ডান ও লেবাননে সংগ্রাম
পিএলওর কার্যক্রম ক্রমশ বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জর্ডানে সংগঠনটির প্রভাব বাড়তে থাকে। কিন্তু জর্ডানের রাজতন্ত্রের সঙ্গে পিএলওর সম্পর্ক ক্রমশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালে জর্ডানের সেনাবাহিনী ও ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ নামে পরিচিত। এর পরিণতিতে পিএলও জর্ডানে তার প্রধান অবস্থান হারায় এবং আরাফাতকে লেবাননে চলে যেতে হয়।
লেবাননে গিয়ে আরাফাত পিএলও ও ফাতাহকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। কিন্তু লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, গৃহযুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান চালায়। ১৯৮২ সালে ইসরায়েল আবারও বড় আকারের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে এবং বৈরুত অবরোধ করে। এর ফলে আরাফাত ও পিএলওর নেতৃত্বকে লেবানন ছেড়ে যেতে হয়।
পরবর্তী সময়ে পিএলওর সদর দপ্তর তিউনিসিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৮০-এর দশকে তিউনিসিয়ায় অবস্থানকালে আরাফাত ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা জোরদার করেন।
সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে শান্তি আলোচনার পথে
১৯৭৪ সালে আরাফাত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও বেশি গুরুত্ব লাভ করে। একই বছর পিএলও জাতিসংঘে পর্যবেক্ষক মর্যাদা অর্জন করে। বহু দেশ পিএলওকে ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তবে পিএলওর বিভিন্ন গোষ্ঠীর সশস্ত্র কর্মকাণ্ড এবং বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার কারণে সংগঠনটি আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনারও মুখোমুখি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন পিএলওকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
১৯৮৭ সালে প্রথম ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা বা গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। অধিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলি শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা প্রশ্নকে নতুন মাত্রা দেয়। এই সময়ে আরাফাত ও পিএলওর নেতৃত্বের সামনে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৮৮ সালে আরাফাত ও পিএলওর রাজনৈতিক অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি সামনে রেখে তাঁরা জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতে আলোচনার পথ গ্রহণ করেন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করার দিকে অগ্রসর হন। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ধারণা তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৯১ সালের মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল। এরপর নরওয়ের অসলোতে গোপন আলোচনা শুরু হয়। এর ফল হিসেবে ১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও পিএলওর মধ্যে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও সীমিত ফিলিস্তিনি স্বশাসনের পথ উন্মুক্ত হয়।
১৯৯৩ সালের চুক্তির পর ইসরায়েল সরকার পিএলওকে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিনিময়ে পিএলও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় এবং সহিংসতা পরিহারের অঙ্গীকার করে। তবে চুক্তিটি ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, জেরুজালেমের মর্যাদা, শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন এবং সীমান্তসংক্রান্ত সব সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান করতে পারেনি।
১৯৯৪ সালে অসলো শান্তি প্রক্রিয়ায় অবদানের জন্য ইয়াসির আরাফাত ইসরায়েলি নেতা ইয়িৎসাক রবিন ও শিমন পেরেজের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েই তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
১৯৯০ সালে আরাফাত ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান পরিবারের সন্তান সোহা তাওয়িলকে বিয়ে করেন। তখন আরাফাতের বয়স ছিল প্রায় ৬১ বছর এবং সোহা তাওয়িলের বয়স ছিল ২৭ বছর। ফ্রান্সে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। পরে সোহা তিউনিসিয়ায় আরাফাতের সঙ্গে কাজ করেন।
১৯৯৫ সালের ২৪ জুলাই ফ্রান্সে তাঁদের একমাত্র কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে। আরাফাত তাঁর মায়ের নামের অনুকরণে কন্যার নাম রাখেন জাহওয়া।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আরাফাত নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে সাধারণত আড়ালে রাখতেন। তাঁর বিবাহের খবরও কিছু সময় গোপন ছিল। রাজনৈতিক কর্মসূচি, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং নানা দেশে অবস্থানের কারণে তাঁর পারিবারিক জীবন বেশির ভাগ সময়ই জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।
ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তন ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া
১৯৯৪ সালে অসলো চুক্তির ভিত্তিতে আরাফাত তিউনিসিয়া থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ফিরে আসেন। তিনি গাজায় অবস্থান নেন এবং ফিলিস্তিনি স্বশাসন প্রতিষ্ঠার কাজে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার কিছু অংশে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আরাফাত প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এই পদে থেকে তিনি ফিলিস্তিনি প্রশাসন পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার কাজ করেন।
কিন্তু শান্তি প্রক্রিয়া নানা বাধার সম্মুখীন হয়। ২০০০ সালের ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলনে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই বছর দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা শুরু হলে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়তে থাকে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়ে।
অসলো চুক্তির শর্ত ও ইসরায়েলের সঙ্গে আপসের নীতি নিয়ে আরাফাত ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক মহলেও সমালোচনার মুখে পড়েন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রম ক্রমশ সীমিত হয়ে আসে।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হামাসসহ বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এসব সংগঠনের সঙ্গে ফাতাহর রাজনৈতিক ও আদর্শগত বিরোধও বৃদ্ধি পায়। ফলে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়।
জীবনের শেষ অধ্যায়
২০০২ সাল থেকে আরাফাত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় তাঁর সদর দপ্তরে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অবরোধের কারণে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০০৩ সালে পিএলওর চেয়ারম্যান পদে তাঁর ক্ষমতা ভাগাভাগি ও নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস নিয়ে নানা পরিবর্তন ঘটে। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট পদে বহাল ছিলেন এবং পিএলওর প্রধান নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বজায় রাখেন।
২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে আরাফাত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য ফ্রান্সের প্যারিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর, ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। মৃত্যুর পর প্রাথমিক চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিবরণে তাঁর অসুস্থতার নির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট হয়নি। পরে বিষপ্রয়োগের সন্দেহ দেখা দিলে ২০১২ সালে তাঁর দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে পরীক্ষা করা হয়।
২০১৩ সালের নভেম্বরে সুইস গবেষকদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর দেহাবশেষ ও সংশ্লিষ্ট নমুনায় পোলোনিয়াম-২১০-এর উপস্থিতি সম্পর্কে এমন কিছু ফলাফল তুলে ধরা হয়, যা বিষপ্রয়োগের সন্দেহকে জোরালো করে। তবে এই ফলাফল তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করেনি। পরবর্তী ফরাসি ও রুশ তদন্তেও হত্যার অভিযোগ নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আরাফাতের মৃত্যু আজও ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়।
মূল্যায়ন ও উত্তরাধিকার
ইয়াসির আরাফাতের রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, সংঘর্ষ, কূটনীতি ও বিতর্কে পরিপূর্ণ। ফিলিস্তিনিদের জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে ফাতাহর নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ১৯৬৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পিএলওর চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ফিলিস্তিনি আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন।
তাঁর নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি আন্দোলন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথে অগ্রসর হয়। ১৯৯৪ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ছিল সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক কৌশল, সশস্ত্র সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থা এবং শান্তি আলোচনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনাও কম ছিল না।
বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি আরাফাতকে জাতীয় সংগ্রামের প্রতীক ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধি হিসেবে শ্রদ্ধা করেন। অন্যদিকে, বহু ইসরায়েলি তাঁকে সশস্ত্র হামলা ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত নেতা হিসেবে দেখেছেন। এই দুই বিপরীত মূল্যায়নই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জটিলতা তুলে ধরে।
ইয়াসির আরাফাতের জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসের অন্যতম প্রধান প্রতীক। তাঁর জীবনের সাফল্য, ব্যর্থতা ও বিতর্ক মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, জাতীয় অধিকার এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

নোবেল বিজয়ী আহম্মদ হাসান জেওয়াইল
নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আহমদ হাসান জেওয়াইল
ফেমটোকেমিস্ট্রির জনক হিসেবে খ্যাত বিজ্ঞানী আহমদ হাসান জেওয়াইলের জন্ম ১৯৪৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মিশরের দামানহুর শহরে। তাঁর পিতার নাম হাসান জেওয়াইল এবং মাতার নাম রওহিয়া দার। তাঁর বাবা সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন। শৈশব থেকেই জেওয়াইলের রসায়নবিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীকালে তাঁর অসাধারণ গবেষণা বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
শিক্ষাজীবন
জেওয়াইল ১৯৬৭ সালে আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক এবং ১৯৬৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই বছর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।
এরপর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক রবিন এম. হকস্ট্রাসের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে ১৯৭৪ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে অধ্যাপক চার্লস বি. হ্যারিসের তত্ত্বাবধানে পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন।
কর্মজীবন ও অধ্যাপনা
১৯৭৬ সালে জেওয়াইল ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি—সংক্ষেপে ক্যালটেকের রাসায়নিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯০ সালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের রসায়ন বিভাগের লিনাস পলিং চেয়ারে নিযুক্ত হন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
লিনাস পলিং ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তিনি ১৯৫৪ সালে রসায়নে এবং ১৯৬২ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
জেওয়াইল টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়, আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ক্যালটেকের আল্ট্রাফাস্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ফিজিক্যাল বায়োলজি-সংক্রান্ত গবেষণার নেতৃত্ব দেন।
১৯৮২ সালের ৫ মার্চ তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন। পরবর্তীকালে মার্কিন বিজ্ঞানজগতে তাঁর অবদান তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়।
ফেমটোকেমিস্ট্রি: বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত
আহমদ হাসান জেওয়াইলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো ফেমটোকেমিস্ট্রির বিকাশ। ফেমটোকেমিস্ট্রি এমন একটি বৈজ্ঞানিক শাখা, যার মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় অণু ও পরমাণুর অতি দ্রুত পরিবর্তন এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
এক ফেমটোসেকেন্ড হলো এক সেকেন্ডের দশ লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগেরও এক হাজার ভাগ; অর্থাৎ (১০^{-১৫}) সেকেন্ড। এই সময় এতটাই ক্ষুদ্র যে সাধারণ যন্ত্রের সাহায্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্যবর্তী ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়।
১৯৮০-এর দশকে অতি দ্রুত লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে জেওয়াইল এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন ও বিকশিত করেন, যার মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়কে ফেমটোসেকেন্ড সময়মাত্রায় পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। তাঁর এই গবেষণার ফলে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো রাসায়নিক বন্ধন তৈরি হওয়া ও ভেঙে যাওয়ার সময় অণুর অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলি আরও প্রত্যক্ষভাবে বুঝতে পারেন।
এই পদ্ধতি ফেমটোসেকেন্ড স্পেকট্রোস্কপি নামে পরিচিত। এতে অতি স্বল্প সময়ের লেজার আলোকস্পন্দন ব্যবহার করে অণুর গতিবিধি এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর সাহায্যে বিক্রিয়ার মধ্যবর্তী অবস্থা, শক্তির পরিবর্তন এবং অণুর গঠনগত রূপান্তর সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়।
জেওয়াইলের গবেষণা প্রমাণ করে যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ঘটনাগুলিকে শুধু তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করাই নয়, অতি ক্ষুদ্র সময়ের ব্যবধানে সেগুলিকে পর্যবেক্ষণ করাও সম্ভব। ফলে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ওষুধ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নতুন গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
চার-মাত্রিক ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি
ফেমটোকেমিস্ট্রির পাশাপাশি অতি দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির বিকাশেও জেওয়াইল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি অতি দ্রুত ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি নিয়ে গবেষণা করেন, যার মাধ্যমে অণু ও পদার্থের গঠনগত পরিবর্তনকে সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে পর্যবেক্ষণ করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।
চার-মাত্রিক বা ৪ডি মাইক্রোস্কোপির ধারণায় পদার্থের তিনটি স্থানিক মাত্রার পাশাপাশি সময়কেও বিবেচনা করা হয়। এর ফলে অতি ক্ষুদ্র জগতে কেবল কোনো বস্তুর গঠন দেখাই নয়, সময়ের সঙ্গে তার পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
এই প্রযুক্তি পদার্থের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে নতুন পথ খুলে দেয়। তাঁর ৪ডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন অব ম্যাটার গ্রন্থটি ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা ফেমটোসেকেন্ড স্পেকট্রোস্কপি ও অতি দ্রুত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়া, গ্যাস ও তরলের অণুগতিবিদ্যা, পলিমারের পরিবর্তন, অনুঘটকের কার্যপ্রণালি এবং জৈবিক প্রক্রিয়ার সূক্ষ্ম পর্যায় নিয়ে গবেষণা করেন। ভবিষ্যতের ওষুধ, উন্নত উপাদান এবং আণবিক ইলেকট্রনিকসের বিকাশেও এই গবেষণার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
নোবেল পুরস্কার ও অন্যান্য সম্মাননা
১৯৯৯ সালে ফেমটোকেমিস্ট্রিতে অসামান্য অবদানের জন্য আহমদ হাসান জেওয়াইল রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অতি দ্রুত লেজার আলোকস্পন্দন ব্যবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্যবর্তী অবস্থা পর্যবেক্ষণের গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মান প্রদান করা হয়। তিনি মিশরের তৃতীয় নোবেলজয়ী এবং বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম মিশরীয় বিজ্ঞানী হিসেবে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে রয়েছে—
- ১৯৮৯ সালে কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
- ১৯৯৩ সালে উলফ পুরস্কার।
- ১৯৯৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার।
- ১৯৯৯ সালে মিশরের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গ্র্যান্ড কলার অব দ্য নাইল’।
- ২০০০ সালে আমেরিকান একাডেমি অব অ্যাচিভমেন্টের গোল্ডেন প্লেট পুরস্কার।
- ২০০৬ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ড অব সায়েন্স।
- ২০০৯ সালে ওথমার স্বর্ণপদক।
- ২০১১ সালে প্রিস্টলি পদক।
- ২০১১ সালে রয়্যাল সোসাইটির ডেভি পদক।
বিজ্ঞানক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁকে সম্মানিত করে। তিনি রয়্যাল সোসাইটির বিদেশি সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লোজান বিশ্ববিদ্যালয়, সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ ব্রান্সউইক বিশ্ববিদ্যালয়, লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রিদের কমপ্লুতেন্সে বিশ্ববিদ্যালয়, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অবদান তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত বিজ্ঞানীতে পরিণত করে।
গ্রন্থ ও গবেষণাপত্র
জেওয়াইল তাঁর কর্মজীবনে প্রায় ৬০০টি গবেষণাপত্র ও ১৪টি বই প্রকাশ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে—
- The Chemical Bond: Structure and Dynamics — ১৯৯২।
- Physical Biology: From Atoms to Medicine — ২০০৮।
- 4D Visualization of Matter — ২০১৪।
তাঁর বই ও গবেষণাপত্রে রাসায়নিক বন্ধনের গঠন, অণুর গতিবিদ্যা, অতি দ্রুত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং পদার্থের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর গবেষণা পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানদূত হিসেবে ভূমিকা
বিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রেও জেওয়াইল সক্রিয় ছিলেন। ২০০৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলির সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ ঘোষণা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেওয়াইলসহ কয়েকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানদূত হিসেবে মনোনীত করা হয়।
২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদ—পিসিএএসটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পরিষদ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন-সংক্রান্ত বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ প্রদান করে।
মিশরের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক জীবনে ভূমিকা
জেওয়াইল শুধু একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না; নিজের মাতৃভূমি মিশরের উন্নয়ন নিয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। ২০১১ সালের মিশরীয় বিপ্লবের সময় তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। সে সময় মিশরের রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং বিজ্ঞান ও শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে তিনি মতামত প্রকাশ করেন।
তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যেতে পারে—এমন জল্পনা তৈরি হলেও তিনি নিজেকে রাজনীতির চেয়ে বিজ্ঞান ও গবেষণার কাজে বেশি নিবেদিত বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, তিনি বিজ্ঞানী হিসেবেই মিশরের সেবা করতে চান।
তিনি আইমান নূরের নেতৃত্বে গঠিত একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ২০১১ সালে তিনি কায়রোতে ‘জেওয়াইল সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। আধুনিক গবেষণা, উচ্চশিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের অংশ।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৮৯ সালে জেওয়াইল চিকিৎসক দিমা ফাহিমকে বিয়ে করেন। তাঁদের চার সন্তান—মাহা, আমানি, নাবিল ও হানি। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি পরিবারকে গুরুত্ব দিতেন। একই সঙ্গে গবেষণা, শিক্ষা এবং মানবকল্যাণে অবদান রাখার মাধ্যমে তিনি নিজের জীবনকে অর্থবহ করে তুলেছিলেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০১৬ সালের ২ আগস্ট, ৭০ বছর বয়সে আহমদ হাসান জেওয়াইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের পাসাডেনা শহরে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাঁকে মিশরে সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। তাঁর শেষকৃত্যে মিশরের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, প্রধানমন্ত্রী শরিফ ইসমাইলসহ দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
জেওয়াইলের মৃত্যুতে মিশর একজন মহান বিজ্ঞানীকে হারায়। কিন্তু তাঁর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, গবেষণা এবং শিক্ষাবিস্তারের স্বপ্ন আজও বিশ্ববিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ফেমটোকেমিস্ট্রির মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃতির অতি ক্ষুদ্র ও দ্রুততম ঘটনাগুলিও মানুষের জ্ঞানের আওতায় আনা সম্ভব। তাঁর গবেষণা রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বিজ্ঞানকে মানবকল্যাণের কাজে লাগানোর যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
আহমদ হাসান জেওয়াইল আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর কর্ম, আবিষ্কার ও জ্ঞানচর্চার উত্তরাধিকার যুগের পর যুগ মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে অবদান রেখে যাবে।•

নোবেল বিজয়ী শিরিন এবাদি
জীবন, কর্ম ও মানবাধিকারের সংগ্রাম
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বিশিষ্ট নারী অধিকারকর্মী এবং ইরানের প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নারী শিরিন এবাদির জন্ম ১৯৪৭ সালের ২১ জুন ইরানের হামাদান শহরে এক শিক্ষিত পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন লেখক ও আইনবিষয়ক অধ্যাপক। শৈশবেই তাঁর পরিবার তেহরানে চলে আসে। সেখানে তিনি আনোশিরাভন দাদগর ও রেজা শাহ কবির স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে ১৯৬৫ সালে তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৬৯ সালে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি বিচার বিভাগে ছয় মাসের শিক্ষানবিশি সম্পন্ন করে বিচারক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ইরানের প্রথম দিকের নারী বিচারকদের অন্যতম ছিলেন। ১৯৭১ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যক্তিগত আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি তেহরানের একটি সিটি কোর্টের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
ইরানি বিপ্লব ও বিচারকের পদ থেকে অপসারণ
১৯৭৮-৭৯ সালে ইরানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত এই বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
নতুন সরকার নারীদের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকে ইসলামি আইনের সঙ্গে অসংগত বলে বিবেচনা করে। এর ফলে শিরিন এবাদিকে বিচারকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে বিচার বিভাগে অপেক্ষাকৃত নিম্নপদে কাজ করার জন্য নিযুক্ত করা হয়। তিনি ও অন্যান্য নারী বিচারক এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিচার বিভাগের বিভিন্ন পদে পুনর্বহাল করা হলেও বিচারক হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে এবাদি আইন পেশায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সরকার দীর্ঘদিন তাঁকে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতিপত্র দেয়নি। অবশেষে ১৯৯৩ সালে তিনি আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি লাভ করেন এবং আইন পেশায় সক্রিয়ভাবে আত্মনিয়োগ করেন।
আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন
আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করার পাশাপাশি শিরিন এবাদি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। নারী, শিশু এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেওয়াকে তিনি নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল বহু মানুষের হয়ে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে মামলা পরিচালনা করেন।
তাঁর কাছে আইন পেশা কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম ছিল না; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় ছিল। তিনি নারী ও শিশুদের আইনি সুরক্ষা, নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেন।
তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ইরানের প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থায় নারী ও শিশুদের প্রতি বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেন। ১৯৯৭ সালের ২৩ মে অনুষ্ঠিত ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ও তিনি সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক পরিবেশ ও নাগরিক অধিকারবিষয়ক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ছাত্র আন্দোলন ও ইজ্জাত ইব্রাহিম-নেজাদের মামলা
১৯৯৯ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ইরানে একটি বড় ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ একপর্যায়ে সহিংস রূপ ধারণ করে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এটিকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণ-আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই আন্দোলনের সময় ইজ্জাত ইব্রাহিম-নেজাদ নামের এক শিক্ষার্থী নিহত হন। শিরিন এবাদি নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। মামলাটির সঙ্গে যুক্ত আমির ইব্রাহিমির একটি স্বীকারোক্তির ভিডিও রেকর্ডিং আদালতে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এই মামলা পরিচালনার সময় ভিডিও রেকর্ডিং-সংক্রান্ত অভিযোগে এবাদি ও অন্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০০০ সালে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাঁর আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতিও সাময়িকভাবে বাতিল করা হয় বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরে উচ্চতর আদালতে তিনি ওই অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বস্তি লাভ করেন এবং আইন পেশায় ফিরে আসেন।
মামলাটি ইরানের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মামলা
ইরানের বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দারিউস ফরুহর এবং তাঁর স্ত্রী পারভানেহ এসকান্দারিকে ১৯৯৮ সালে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড ইরানে ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত রাজনৈতিক হত্যার ঘটনাগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। শিরিন এবাদি এ-সংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন।
মামলাটির সঙ্গে ইরানের গোয়েন্দা বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী সাঈদ ইমামি গ্রেপ্তারের পর হেফাজতে মারা যান। তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে জানানো হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি করে।
শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম
শিশুদের প্রতি নির্যাতন ও অবিচারের বিরুদ্ধে শিরিন এবাদির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি এমন অনেক মামলায় অংশ নেন, যেগুলো ইরানের শিশু সুরক্ষা আইন ও পারিবারিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে।
এরিয়ান গুলশানি নামের এক শিশুর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের মামলা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। শিশুটির বাবা ও সৎমায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত শিশুটি নিহত হয়। এবাদি এই মামলার মাধ্যমে শিশুদের হেফাজত, পারিবারিক নির্যাতন এবং শিশু সুরক্ষায় আইনের সীমাবদ্ধতাগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
একইভাবে, লাইলা নামের এক কিশোরীর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাতেও তিনি আইনি সহায়তা প্রদান করেন। মামলাটিতে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে না পারলেও তিনি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। এসব ঘটনা তাঁকে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষার একজন গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জহরা কাজেমির মামলা
ইরানে সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার বিরুদ্ধে শিরিন এবাদি আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
২০০৩ সালে ইরানি বংশোদ্ভূত কানাডীয় ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক জহরা কাজেমি তেহরানে গ্রেপ্তার হন। হেফাজতে থাকাকালে নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
শিরিন এবাদি কাজেমির পরিবারের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা সাক্ষীদের যথাযথভাবে শুনানি না করার প্রতিবাদে আদালত থেকে বেরিয়ে আসেন। এই ঘটনা ইরানে হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের অধিকার এবং বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে।
মানবাধিকার সংগঠন প্রতিষ্ঠা
শিরিন এবাদি মনে করতেন, ব্যক্তিগতভাবে মামলা পরিচালনার পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষার জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
১৯৯৪ সালে তিনি সোসাইটি ফর প্রোটেক্টিং দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শিশু সুরক্ষায় আইনগত সংস্কার সাধন।
২০০১ সালে তিনি ডিফেন্ডার্স অব হিউম্যান রাইটস সেন্টার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই কেন্দ্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক বন্দি, বিবেকের বন্দি, নারী, শিশু এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেওয়া হতো।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় তৈরি একটি আইনের খসড়া ২০০২ সালে ইরানের পার্লামেন্টে গৃহীত হয় বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া, নারীরা কীভাবে বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে বিষয়ে ইসলামি আইনের একটি ব্যাখ্যামূলক খসড়া প্রস্তুত করার জন্য ইরানের কয়েকজন নারী সংসদ সদস্য তাঁর সহযোগিতা চান। এবাদি খসড়াটি তৈরি করে পার্লামেন্টে পেশ করেন। তবে পুরুষ সংসদ সদস্যদের বিরোধিতার কারণে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়নি।
ধর্ম, ইসলাম ও নারী অধিকার সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
শিরিন এবাদি ইসলাম, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং নারী-পুরুষের সমতা সম্পর্কে নিজস্ব যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানবাধিকারের মধ্যে অপরিহার্য কোনো বিরোধ নেই। বরং ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে এমনভাবে প্রয়োগ করা উচিত, যাতে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমান অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।
তিনি মনে করেন, নারীদের অধীনস্থ করে রাখার জন্য ধর্মের কিছু ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিক মর্যাদার মতো মূল্যবোধকে সামনে রেখে ধর্মীয় বিধানের ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
তাঁর আত্মজীবনী ইরান অ্যাওয়েকেনিং-এ তিনি ইরানি বিপ্লব, বিচারকের পদ থেকে অপসারণ, মানবাধিকারের জন্য তাঁর সংগ্রাম এবং নিজের রাজনৈতিক উপলব্ধির কথা তুলে ধরেছেন। বইটিতে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে একদিন ইরানের মানুষ তাঁর কাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করবে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে।
আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস প্রতিষ্ঠার ধারণা
২০০৪ সালে শিরিন এবাদি মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস পালনের একটি প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন। এই ধারণাটি পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও গুরুত্ব লাভ করে।
২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২ অক্টোবর, মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অহিংস আন্দোলন, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আদর্শকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়াই এই দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য।
নোবেল উইমেনস ইনিশিয়েটিভ
২০০৬ সালে শিরিন এবাদি আরও পাঁচজন নারী শান্তিতে নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে মিলে নোবেল উইমেনস ইনিশিয়েটিভ প্রতিষ্ঠা করেন। অন্য পাঁচজন হলেন বেটি উইলিয়ামস, মেইরিড কোরিগান ম্যাগুয়ার, ওয়াঙ্গারি মাথাই, জোডি উইলিয়ামস এবং রিগোবার্তা মেনচু তুম।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী ও মেয়েদের অধিকার রক্ষা, লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং শান্তির পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা।
উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অভিজ্ঞতাকে একত্র করে এই নোবেল বিজয়ী নারীরা মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করেন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে মতামত
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে শিরিন এবাদির বক্তব্যে জাতীয় মর্যাদা, অর্থনৈতিক কল্যাণ, জননিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন একসঙ্গে উঠে এসেছে।
তিনি ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি বিকাশের আকাঙ্ক্ষাকে একটি প্রাচীন জাতির আত্মমর্যাদা ও ঐতিহাসিক গৌরবের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি পারমাণবিক কর্মসূচির অর্থনৈতিক ব্যয়, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
২০১২ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের জনগণ শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চায়। পারমাণবিক শক্তির জন্য অন্য অধিকারগুলো বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, সরকারের কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণের উদ্বেগ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে পারমাণবিক সংঘাতের সম্ভাবনা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে জনগণের কল্যাণ ও মানবাধিকারের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
ইরান, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে অবস্থান
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের প্রশ্নেও শিরিন এবাদি মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০১০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে প্রযুক্তি সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এবাদিসহ কয়েকজন নোবেল বিজয়ী ওই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান।
তাঁর সামগ্রিক অবস্থানের কেন্দ্রে ছিল যুদ্ধ, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান।
আইএসআইএস ও সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে মতামত
২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএসের ক্রমবর্ধমান শক্তি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শিরিন এবাদি বলেন, শুধু অস্ত্র ও বোমার সাহায্যে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, দুর্নীতি, বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং চরমপন্থার বিস্তারের পেছনে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি।
তিনি যুক্তি দেন, কোনো আদর্শ বা বিশ্বাসের ভুল ব্যাখ্যা থেকে চরমপন্থার জন্ম হলে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে তার সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো কঠিন। তাই সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুশাসন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ইরানের রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
২০১৩ সালে হাসান রুহানি ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরও শিরিন এবাদি দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে নেদারল্যান্ডসের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবাধিকার দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তিনি নীরব থাকলেও ইরানের সমস্যার সমাধান হবে না। এই বক্তব্য তাঁর আপসহীন মনোভাবের পরিচয় বহন করে।
২০১৮ সালে ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সংস্কারযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোটের আহ্বান জানান।
তাঁর মতে, জনগণের মতামতকে সম্মান করা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত রাখাই একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।
২০০৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার
২০০৩ সালের ১০ অক্টোবর শিরিন এবাদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা, বিশেষত নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়।
তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এবং ইরানের প্রথম নোবেল বিজয়ী। নোবেল কমিটি তাঁর সাহসিকতা, ব্যক্তিগত ঝুঁকি উপেক্ষা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং মানবাধিকারের পক্ষে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের প্রশংসা করে।
এই পুরস্কার ইরানের নারী অধিকার আন্দোলন ও মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব এনে দেয়। তবে পুরস্কারটি নিয়ে ইরানের রাজনৈতিক মহলে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ কেউ একে মানবাধিকারের স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কেউ পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত বলে সমালোচনা করেন।
নোবেল পুরস্কার গ্রহণের পর এবাদি বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান ইরানের জনগণকেই করতে হবে। তিনি বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন এবং দেশের মানুষের নিজস্ব উদ্যোগে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। তাঁর এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, মানবাধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইলেও তিনি ইরানের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে গুরুত্ব দেন।
নোবেল পুরস্কারের পর ইরানের পরিস্থিতি
নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভের পর শিরিন এবাদি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বহু স্থানে সফর করেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মানবাধিকার সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে তিনি নারী অধিকার, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।
তবে ইরানের অভ্যন্তরে তাঁর কাজের পরিবেশ ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। ২০০৮ সালের ২১ ডিসেম্বর ইরান সরকার তাঁর প্রতিষ্ঠিত ডিফেন্ডার্স অব হিউম্যান রাইটস সেন্টার বন্ধ করে দেয়। একই বছর বাহাই ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
২০০৮ সালে তিনি ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির বিষয়েও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বাহাই সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তিনি ইরান সরকারের সমালোচনা করেন। বিদেশি সহায়তা চাওয়ার কারণে ইরানের কয়েকটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনাও চালায়।
২০০৯ সালের নভেম্বরে লন্ডনে তিনি দাবি করেন, ইরানে তাঁর নোবেল পদক ও সনদ ব্যাংকে জব্দ করা হয়েছে এবং তাঁর ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২০০৯ সালের পর থেকে তিনি মূলত দেশের বাইরে অবস্থান করতে শুরু করেন। বিদেশে থেকেও তিনি ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষার পক্ষে বক্তব্য ও প্রচার চালিয়ে যান।
বই ও সাহিত্যকর্ম
শিরিন এবাদি একজন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী হওয়ার পাশাপাশি একজন লেখকও। তাঁর বইগুলোতে ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাস, ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতা, নারী অধিকার, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মানবাধিকারের সংগ্রাম উঠে এসেছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. Iran Awakening: A Memoir of Revolution and Hope — ২০০৬ সালে প্রকাশিত এই আত্মজীবনীতে ইরানি বিপ্লব, বিচারকের পদ থেকে অপসারণ, আইন পেশায় প্রত্যাবর্তন এবং মানবাধিকারের জন্য তাঁর সংগ্রামের বিবরণ রয়েছে। বইটির মাধ্যমে তিনি পাশ্চাত্যের পাঠকদের কাছে ইরানের সমাজ ও রাজনীতির একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাভিত্তিক চিত্র তুলে ধরেন।
২. Refugee Rights in Iran — ২০০৮ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে ইরানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের অধিকার ও তাঁদের আইনি সুরক্ষার প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে।
৩. The Golden Cage: Three Brothers, Three Choices, One Destiny — ২০১১ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে রাজনৈতিক বিভাজন, আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং মানুষের জীবনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবের বিষয় উঠে এসেছে।
৪. Until We Are Free — ২০১৬ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং নিজের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁর লেখালেখির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছে তুলে ধরা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার
মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় অবদানের জন্য শিরিন এবাদি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
- ২০০১: নরওয়ের রাফতো পুরস্কার—মানবাধিকার রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতি।
- ২০০৩: নোবেল শান্তি পুরস্কার।
- ২০০৪: জেমস পার্কস মর্টন ইন্টারফেইথ অ্যাওয়ার্ড।
- ২০০৪: একাডেমি অব অ্যাচিভমেন্টের গোল্ডেন প্লেট অ্যাওয়ার্ড।
- ২০০৪: আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র ও নারী নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননা।
- ২০০৫: ইউসিআই সিটিজেন পিস বিল্ডিং অ্যাওয়ার্ড।
- ২০০৬: ফ্রান্সের লেজিয়ন অব অনার।
- ২০০৮: টলারানজপ্রাইস ডার ইভানগেলিশেন আকাদেমি টুটজিং।
- ২০০৯: মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ সম্মাননা।
- ২০১৩: কলাম্বিয়া জার্নাল অব ট্রান্সন্যাশনাল ল-এর উলফগ্যাং ফ্রিডম্যান মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড।
২০০৪ সালে ফোর্বস সাময়িকীর বিশ্বের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি বুদ্ধিজীবী জরিপেও তিনি উল্লেখযোগ্য স্থান লাভ করেন।
সম্মানসূচক ডিগ্রি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি
শিরিন এবাদির মানবাধিকারবিষয়ক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করেছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
- উইলিয়ামস কলেজ, ২০০৪।
- ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৪।
- ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৪।
- মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ পার্ক, ২০০৪।
- টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৪।
- সাইমন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৪।
- আকুরেয়রি বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৪।
- অস্ট্রেলিয়ান ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৫।
- সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৫।
- কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৫।
- ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৫।
- জ্যঁ মুলাঁ বিশ্ববিদ্যালয়, লিয়োঁ, ২০০৫।
- ডিপল বিশ্ববিদ্যালয়, শিকাগো, ২০০৭।
- নিউ স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৭।
- মারকুয়েট বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৯।
- কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১১।
- স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ, লন্ডন, ২০১২।
২০০৫ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলে অবস্থিত ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি মানবাধিকারের পক্ষে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একই বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির তৎকালীন উপাচার্য গর্ডন গি তাঁকে চ্যান্সেলর মেডেল প্রদান করেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উপদেষ্টা পরিষদে ভূমিকা
শিরিন এবাদি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকার মধ্যে রয়েছে—
- নোবেল উইমেনস ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
- আপনে আপ উইমেন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা পরিষদের সহ-সভাপতির দায়িত্ব।
- অরোরা পুরস্কারের নির্বাচন কমিটির সদস্য।
- রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের সম্মানসূচক বোর্ডের সদস্য।
- স্কলারস অ্যাট রিস্কের রাষ্ট্রদূত পরিষদের সদস্য।
- নুরেমবার্গ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীর সদস্য।
- মানবাধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে উপদেষ্টা ও অংশগ্রহণকারী।
এই ভূমিকাগুলোর মাধ্যমে তিনি বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষা, নারী নেতৃত্বের বিকাশ, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং নির্যাতিত মানুষের আইনি সুরক্ষার পক্ষে কাজ করে গেছেন।
উপসংহার
শিরিন এবাদির জীবন সংগ্রাম, সাহসিকতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইরানের একজন নারী বিচারক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে পদ হারানো, আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি পেতে দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং মানবাধিকার রক্ষায় নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া—সবকিছুই তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তিনি নারী ও শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নির্যাতনের শিকার মানুষের আইনি সহায়তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি ইরানের নারী ও মানবাধিকারকর্মীদের দীর্ঘ সংগ্রামের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও।
নিজের দেশ থেকে দূরে অবস্থান করেও তিনি ইরানের জনগণের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে কথা বলে চলেছেন। তাঁর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য সাহস, ধৈর্য ও নীতির প্রতি অবিচল থাকা অপরিহার্য। শিরিন এবাদি তাই কেবল একজন নোবেল বিজয়ী আইনজীবী নন; তিনি মানবাধিকার, নারী স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে বিশ্বব্যাপী এক অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব।

মহম্মদ এলবারাদেই
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মহম্মদ এলবারাদেই: জীবন ও কর্ম
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মহম্মদ এলবারাদেইয়ের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৭ জুন মিশরের রাজধানী কায়রোতে। তাঁর পিতা মোস্তফা এলবারাদেই ছিলেন একজন আইনজীবী এবং মিশরের আইনজীবী সংগঠনের প্রধান। তিনি দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সমর্থক ছিলেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে এলবারাদেই ছিলেন অন্যতম।
এলবারাদেই ১৯৬২ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জেনেভার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধ্যয়নবিষয়ক স্নাতকোত্তর ইনস্টিটিউটে আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৭৪ সালে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল থেকে আন্তর্জাতিক আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘শান্তিকালীন প্রণালিতে চলাচলের অধিকার’ (The Right of Passage through Straits in Time of Peace)।
তিনি আরবি ভাষায় সাবলীল ছিলেন এবং ইংরেজি ও ফরাসি ভাষাতেও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
কূটনৈতিক জীবন ও আন্তর্জাতিক কর্মজীবন
১৯৬৪ সালে মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদানের মাধ্যমে এলবারাদেইয়ের কূটনৈতিক জীবন শুরু হয়। তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘে মিশরের স্থায়ী মিশনে এবং জেনেভায় রাজনৈতিক, আইনগত ও অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করেন।
১৯৮০ সালে তিনি জাতিসংঘের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে আন্তর্জাতিক আইন কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল-এ আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।
১৯৮৪ সালে তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (International Atomic Energy Agency—IAEA) সচিবালয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি সংস্থাটির আইন উপদেষ্টা এবং ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বহির্বিষয়ক সহকারী মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক আইন ও পারমাণবিক অস্ত্রনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে একজন বিশিষ্ট কূটনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি আন্তর্জাতিক আইন সমিতি এবং আমেরিকান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক
হ্যান্স ব্লিক্সের অবসরের পর ১৯৯৭ সালের ১ ডিসেম্বর এলবারাদেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ২০০৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই পদে ছিলেন এবং মোট তিনটি চার বছর মেয়াদে সংস্থাটির নেতৃত্ব দেন।
তাঁর কার্যকালে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, ইরাকের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন।
মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় এলবারাদেই বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে সদস্যরাষ্ট্রগুলির আস্থা ও সমর্থন অর্জন করতে হলে তাদের প্রয়োজনের প্রতি সাড়া দিতে হবে, কার্যকর ফলাফল দেখাতে হবে, দক্ষতার সঙ্গে সম্পদ ব্যবহার করতে হবে এবং ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব, স্বচ্ছতা ও মুক্ত আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
পারমাণবিক নিরাপত্তা জোরদার
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় পদার্থের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। পারমাণবিক উপাদান চুরি, অবৈধ পাচার কিংবা সন্ত্রাসবাদীদের হাতে সেগুলি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা মোকাবিলায় এলবারাদেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার উদ্যোগ নেন।
তাঁর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা পারমাণবিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে। পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় পদার্থ এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলির নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলিকে সহায়তা দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি কমানো এবং বিপজ্জনক পদার্থের অবৈধ ব্যবহার প্রতিরোধ করা।
অতিরিক্ত প্রোটোকল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এলবারাদেই মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার আগে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত প্রোটোকল গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে সংস্থাটির পক্ষে সদস্যরাষ্ট্রগুলির ঘোষিত পারমাণবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অঘোষিত পারমাণবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়।
এলবারাদেই এই প্রোটোকলকে সংস্থাটির প্রচলিত নিরাপত্তা যাচাই ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত করার উদ্যোগ নেন। এর লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক উপাদান যাতে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তিনি সদস্যরাষ্ট্রগুলিকে অতিরিক্ত প্রোটোকল গ্রহণ ও কার্যকর করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, পারমাণবিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হলে শুধু কয়েকটি রাষ্ট্রের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক আস্থা।
ইরাকের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক আগ্রাসনের আগে দেশটির গণবিধ্বংসী অস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তীব্র হয়ে ওঠে। এলবারাদেই জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০০৩ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তিনি জানান, ইরাক নাইজার থেকে ইউরেনিয়াম কেনার চেষ্টা করেছিল বলে যে নথি উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলি জাল। এই বক্তব্য ইরাকের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত মার্কিন দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
এলবারাদেই মনে করতেন, পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া বিপজ্জনক। তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হয়ে তা আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইরাক আক্রমণ ছিল এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তিনি আরও যুক্তি দিয়েছিলেন, অস্ত্র পরিদর্শনের কাজ সময়সাপেক্ষ; তাই ধৈর্য ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তদন্ত চালিয়ে যাওয়া জরুরি। ইরাকের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় চালু হওয়ার প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
২০০৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের দ্বৈত মানদণ্ডের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, কিছু রাষ্ট্রের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রকে অনৈতিক বলা হলেও অন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অজুহাতে একই অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতাকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। এই বৈপরীত্য দূর না করলে বিশ্ব আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
২০০৩ সালের অক্টোবরে কায়রো টাইমস-এ প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে এলবারাদেই মানবজাতির অভিন্ন পরিচয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, মানুষের প্রাথমিক আনুগত্য হওয়া উচিত সমগ্র মানবজাতির প্রতি, কোনো বিশেষ জাতি বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়। সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই পৃথিবী আরও নিরাপদ ও উন্নত হয়ে উঠবে।
তৃতীয় মেয়াদে পুনর্নির্বাচন
২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবে এলবারাদেইয়ের তৃতীয় মেয়াদে পুনর্নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বুশ প্রশাসন তাঁর পুনর্নিয়োগের বিরোধিতা করেছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
২০০৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলের সাবেক চিফ অব স্টাফ লরেন্স উইলকারসন অভিযোগ করেন, এলবারাদেইকে পুনর্নিয়োগ থেকে বিরত রাখার জন্য মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা গোপনে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একই সময়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে ইরানি কূটনীতিকদের সঙ্গে এলবারাদেইয়ের ফোনালাপ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের উদ্বেগের কথা প্রকাশিত হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি দেশ এলবারাদেইয়ের প্রতি সমর্থন জানায়। তাদের মতে, তাঁর নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
২০০৫ সালের ১৩ জুন সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে তৃতীয় মেয়াদের জন্য পুনর্নির্বাচিত করে। ২০০৮ সালে তিনি ঘোষণা করেন, মহাপরিচালক হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। ২০০৯ সালের নভেম্বরে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের এই অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
মিশরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষ করার পর এলবারাদেই মিশরের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কার, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
২০০৯ সাল থেকে তিনি মিশরে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর চেঞ্জ’ বা পরিবর্তনের জাতীয় সমিতি গণতান্ত্রিক সংস্কার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি তোলে।
২০১১ সালের জানুয়ারিতে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে মিশরে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ২৫ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মোবারক প্রায় তিন দশক ধরে ক্ষমতায় ছিলেন।
এই সংকটের সময় এলবারাদেই মিশরে ফিরে আসেন এবং ঘোষণা করেন, জনগণ চাইলে তিনি রাজনৈতিক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। তিনি তাহরির স্কোয়ারের বিক্ষোভে অংশ নেন এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ তাঁর ওপর জলকামান ব্যবহার করে এবং তাঁর আশপাশে থাকা সমর্থকদের ওপর লাঠিচার্জ করে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এলবারাদেইয়ের উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সম্ভাব্য নেতা হিসেবেও বিবেচনা করে।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিরোধী নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার, অবাধ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণ ছিল তাঁদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিনিধিরাও পরিবর্তনের দাবিতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত
২০১১ সালে এলবারাদেই মিশরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে আলোচনা শুরু হয়। তবে ২০১২ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী না হওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
২০১২ সালের নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড-সমর্থিত ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির প্রার্থী মহম্মদ মুরসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি হোসনি মোবারকের আমলের শেষ প্রধানমন্ত্রী আহমদ শফিককে পরাজিত করেন। মুরসি ছিলেন মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি।
কিন্তু তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ২০১৩ সালে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। একই বছরের জুলাই মাসে সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং সুপ্রিম সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি আদলি মনসুরকে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এলবারাদেই মুরসির অপসারণের পর গঠিত রাজনৈতিক অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন। তবে পরবর্তী সময়ে সামরিক সরকারের দমনমূলক পদক্ষেপের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেয়।
২০১৩ সালে সহ-রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ ও পদত্যাগ
২০১৩ সালের জুলাই মাসে মিশরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সহ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে এলবারাদেইয়ের নাম ঘোষণা করা হয়। ১৪ জুলাই তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক দায়িত্বসহ সহ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
কিন্তু ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি মহম্মদ মুরসির সমর্থকদের অবস্থান কর্মসূচি সরিয়ে দিতে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালায়। এই অভিযানে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন। সহিংসতার মাত্রা ও প্রাণহানির ঘটনায় এলবারাদেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি মনে করতেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিস্থিতির সমাধান করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বলপ্রয়োগ করা হয়েছিল। সরকারের এই পদক্ষেপের দায়ভার বহন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি সহ-রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে নৈতিক দায়বদ্ধতা ও মানবজীবনের মূল্য তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ক্যান্সার চিকিৎসায় পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার
এলবারাদেইয়ের কাজ কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
২০০৪ সালে তাঁর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন ফর ক্যান্সার থেরাপি’ (Programme of Action for Cancer Therapy—PACT) কর্মসূচি শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, বিশেষত রেডিওথেরাপির মাধ্যমে ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
এলবারাদেই উল্লেখ করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। বহু দেশে পর্যাপ্ত রেডিওথেরাপি যন্ত্র, প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব রয়েছে। অথচ বহু ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
২০০৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের অর্থের একটি অংশ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ক্যান্সার চিকিৎসা ও শিশুদের পুষ্টি উন্নয়নের কাজে ব্যয় করার উদ্যোগ নেয়। প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে এই কর্মসূচি বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য গ্রহণ করে।
২০০৮ সালের সাধারণ সম্মেলনে এলবারাদেই বলেন, উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলির প্রযুক্তিগত সহযোগিতার চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ করা জরুরি। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কোনো দর-কষাকষির বিষয় নয়; এটি সংস্থাটির উন্নয়নমূলক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আন্তর্জাতিক সংস্থায় অন্যান্য দায়িত্ব
এলবারাদেই আন্তর্জাতিক সংকট গ্রুপের ট্রাস্টি বোর্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি গ্লোবাল লিডারশিপ ফাউন্ডেশন এবং গ্লোবাল কমিশন অন ড্রাগ পলিসির মতো সংস্থার সঙ্গেও কাজ করেছেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থান তাঁকে বিশ্বপরিসরে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন
২০০৫ সালের ৭ অক্টোবর মহম্মদ এলবারাদেই এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়। পারমাণবিক শক্তির সামরিক ব্যবহার প্রতিরোধ এবং শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁরা এই সম্মান লাভ করেন।
নোবেল কমিটির মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলবারাদেইয়ের নেতৃত্বে সংস্থাটি পারমাণবিক নিরাপত্তা যাচাই ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
এলবারাদেই ছিলেন মিশরের চতুর্থ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর আগে আনোয়ার সাদাত ১৯৭৮ সালে শান্তিতে, নাগিব মাহফুজ ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে এবং আহমদ জেওয়াইল ১৯৯৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।
এলবারাদেই তাঁর নোবেল বক্তৃতায় পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার, পারমাণবিক উপাদানের অবৈধ বাজার এবং সন্ত্রাসবাদীদের হাতে বিপজ্জনক উপাদান পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেন। তিনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য উপাদানের উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—বিশ্বের বিপুল সম্পদ অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয় না করে মানবকল্যাণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করা উচিত। মানবসভ্যতাকে আত্মবিনাশের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান এলবারাদেই ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার এই সম্মান অর্জনে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বিশ্বশান্তিতে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানান।
২০০৫ সালের ৮ অক্টোবর মিশর সরকার এলবারাদেইয়ের নোবেল পুরস্কার অর্জন স্মরণে দুটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
আন্তর্জাতিক শান্তি, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে অবদানের জন্য এলবারাদেই দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
১. ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ফোর ফ্রিডমস অ্যাওয়ার্ড — ২০০০।
২. জেমস পার্কস মর্টন আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি পুরস্কার।
৩. আমেরিকান একাডেমি অব অ্যাচিভমেন্টের গোল্ডেন প্লেট পুরস্কার।
৪. জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিট ট্রেনার পুরস্কার — কূটনৈতিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ।
৫. মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মানবনিরাপত্তা পুরস্কার।
৬. ইতালির রাষ্ট্রপতির গোল্ডেন ডাভ অব পিস পুরস্কার।
৭. গোল্ডেন ডাভস পুরস্কার — ২০০৭।
৮. ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পুরস্কার — ২০০৭।
৯. ইস্ট-ওয়েস্ট ইনস্টিটিউটের পিস বিল্ডিং পুরস্কার — ২০০৮।
১০. ইন্দিরা গান্ধী শান্তি, নিরস্ত্রীকরণ ও উন্নয়ন পুরস্কার — ২০০৮।
১১. ডেল্টা পুরস্কার ফর গ্লোবাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং — ২০০৯।
১২. অস্ট্রিয়া প্রজাতন্ত্রের উচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা — ২০০৯।
১৩. জার্মানির অর্ডার অব মেরিটের গ্র্যান্ড ক্রস উইথ স্টার অ্যান্ড স্যাশ — ২০১০।
১৪. মিশরের অর্ডার অব দ্য নাইল, যা দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলির অন্যতম।
১৫. আলজেরিয়ার ন্যাশনাল অর্ডার অব মেরিটের এল আথির পদক।
এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তসাংস্কৃতিক সংলাপ এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রসারে অবদানের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।
সম্মানসূচক ডিগ্রি
এলবারাদেই ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ও অন্যান্য শিক্ষাগত সম্মাননা অর্জন করেন। সম্মাননা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রো, ইতালির ফ্রি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সোশ্যাল স্টাডিজ, জাপানের সোকা বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বুখারেস্টের পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষিণ কোরিয়ার কনকুক বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমহার্স্ট কলেজ।
তিনি ইব্রাহিম ফাউন্ডেশনের পুরস্কার কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
গ্রন্থ রচনা
এলবারাদেই আন্তর্জাতিক আইন, পারমাণবিক কূটনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনা এবং সম্পাদনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে—
১. The Age of Deception: Nuclear Diplomacy in Treacherous Times — মেট্রোপলিটন বুকস/হেনরি হল্ট অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১১।
২. The International Law of Nuclear Energy: Basic Documents — সম্পাদক হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ।
৩. Atoms for Peace: A Pictorial History of the International Atomic Energy Agency (1957–2007) — আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ।
তাঁর লেখালেখিতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিলতা, নিরস্ত্রীকরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
মহম্মদ এলবারাদেই তাঁর বাল্যকালের শিক্ষিকা আইদা এল-কাছেফকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান—কন্যা লাইলা এবং পুত্র মোস্তাফা। লাইলা লন্ডনে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন এবং মোস্তাফা কায়রোতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। তাঁদের দুই নাতনির নাম মায়া ও নিনা।
উপসংহার
মহম্মদ এলবারাদেইয়ের জীবন ও কর্ম আন্তর্জাতিক কূটনীতি, পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বশান্তির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একজন আইনজ্ঞ ও কূটনীতিক হিসেবে তিনি পারমাণবিক শক্তির সামরিক ব্যবহার প্রতিরোধ, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রসার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার জন্য দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
ইরাক যুদ্ধের আগে তাঁর অবস্থান, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার সম্পর্কে সতর্কবার্তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দিক। মিশরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০০৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর আন্তর্জাতিক অবদানের স্বীকৃতি। এলবারাদেইয়ের কর্মজীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কেবল অস্ত্র ও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছতা, মানবিক মূল্যবোধ, কূটনৈতিক সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি অঙ্গীকার।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জীবন ও কর্ম
জন্ম ও শৈশব
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, সমাজসেবক ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৮ জুন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত চট্টগ্রামের বাথুয়া গ্রামে এক বাঙালি মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতা হাজি দুলা মিয়া সওদাগর ছিলেন পেশায় একজন স্বর্ণকার এবং তাঁর মাতার নাম সুফিয়া খাতুন। নয় ভাইবোনের মধ্যে মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন তৃতীয় সন্তান।
ইউনূসের শৈশবের প্রথম কয়েকটি বছর গ্রামেই কাটে। ১৯৪৪ সালে তাঁর পরিবার চট্টগ্রাম শহরে চলে আসে। এরপর তিনি গ্রামের বিদ্যালয় ছেড়ে শহরের লামাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৪৯ সালের দিকে তাঁর মা মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হন।
তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। কথিত আছে, প্রায় ৩৯ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে তিনি ষোড়শ স্থান অধিকার করেছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি বয় স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারত ভ্রমণ করেন। পরে ১৯৫৫ সালে বয় স্কাউট দলের সঙ্গে কানাডা সফর করেন। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং নাটকে অভিনয়ের জন্য পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের সূচনা
স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনীতি গবেষণার কাজে যোগ দেন। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহানের তত্ত্বাবধানে তিনি অর্থনীতি ব্যুরোতে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি একটি লাভজনক প্যাকেজিং কারখানাও প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৬৫ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ফুলব্রাইট বৃত্তি লাভ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে ১৯৭১ সালে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন জোগাতে তিনি সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিয়ে একটি নাগরিক কমিটি গঠন করেন এবং একটি তথ্যকেন্দ্র পরিচালনায় অংশ নেন। ন্যাশভিলের বাসভবন থেকে তিনি ‘বাংলাদেশ নিউজলেটার’ নামে একটি প্রকাশনাও শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দেন। কিন্তু সেখানে কাজের ধরন তাঁর কাছে একঘেয়ে মনে হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য এবং দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন।
দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টা
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মুহাম্মদ ইউনূসের চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষের অনাহার ও মৃত্যু তাঁকে প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি উপলব্ধি করেন, শ্রেণিকক্ষে শেখানো অর্থনীতির তত্ত্ব ক্ষুধার্ত মানুষের তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। তাই তিনি মানুষের জীবনের বাস্তব পরিস্থিতি থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায় খুঁজতে উদ্যোগী হন।
এই উদ্দেশ্যে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের গ্রামগুলোতে গবেষণামূলক কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি ‘নবযুগ তেভাগা খামার’ নামে একটি কৃষি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কর্মসূচি গড়ে ওঠে।
গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য তিনি ‘গ্রাম সরকার’ প্রতিষ্ঠার ধারণার প্রতিও আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে গ্রাম সরকারব্যবস্থা চালু করা হলেও ২০০৫ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট এক রায়ে সংশ্লিষ্ট গ্রাম সরকারব্যবস্থাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন।
ক্ষুদ্রঋণের ধারণা ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা
মুহাম্মদ ইউনূসের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থার প্রসার এবং গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী জোবরা গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপলব্ধি করেন। অল্প কিছু অর্থের অভাবে অনেক দরিদ্র মানুষ নিজেদের শ্রম ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারছিলেন না।
বিশেষ করে বাঁশের তৈরি আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রী উৎপাদনকারী দরিদ্র নারীরা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হতেন। ঋণের বিনিময়ে তাঁদের উৎপাদিত সামগ্রী কম দামে বিক্রি করতে হতো এবং উপার্জনের বড় অংশ ঋণদাতাদের হাতে চলে যেত। অন্যদিকে, প্রচলিত ব্যাংকগুলো দরিদ্র মানুষের জামানত দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় তাঁদের ঋণ দিতে আগ্রহী ছিল না।
ইউনূস বিশ্বাস করতেন, দরিদ্র মানুষও সুযোগ পেলে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে এবং তা পরিশোধ করতে সক্ষম। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ক্ষুদ্রঋণের একটি বাস্তবভিত্তিক মডেল তৈরি করেন।
১৯৭৬ সালে তিনি নিজের অর্থ থেকে ২৭ মার্কিন ডলার ৪২ জন দরিদ্র নারী ও কারুশিল্পীকে ঋণ হিসেবে দেন বলে বহুল প্রচলিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এই সামান্য অর্থ তাঁদের উৎপাদনমূলক কাজে সহায়তা করে এবং ঋণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজেদের আয় বাড়ানোর সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে সাহায্য করে যে, দরিদ্র মানুষের কাছে সহজ শর্তে ঋণ পৌঁছে দেওয়া গেলে দারিদ্র্য মোকাবিলায় কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।
১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে জোবরা গ্রামের দরিদ্র মানুষদের ঋণ দেওয়ার জন্য তিনি সরকারি জনতা ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ সংগ্রহ করেন। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ব্যাংকও এই উদ্যোগে অর্থায়ন করে। ১৯৮২ সালের মধ্যে এই কর্মসূচির সদস্যসংখ্যা প্রায় ২৮ হাজারে পৌঁছায়।
১৯৮৩ সালের ১ অক্টোবর ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। এর নাম রাখা হয় ‘গ্রামীণ ব্যাংক’। ব্যাংকটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জামানতবিহীন ঋণের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণব্যবস্থায় ছোট ছোট দল গঠন করে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সদস্যরা দলবদ্ধভাবে ঋণের জন্য আবেদন করতেন এবং একে অপরকে ঋণ পরিশোধ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় উৎসাহিত করতেন।
২০০৭ সালের জুলাই নাগাদ গ্রামীণ ব্যাংক প্রায় ৭৪ লাখ ঋণগ্রহীতাকে মোট ৬.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছিল বলে তৎকালীন বিবরণে উল্লেখ করা হয়। ব্যাংকটির ঋণগ্রহীতাদের অধিকাংশই ছিলেন নারী। তাঁদের ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, কৃষি ও অন্যান্য আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি পায়। মৎস্যচাষ, সেচ, কৃষি এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর মতো ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ গড়ে ওঠে। গ্রামীণ উদ্যোগের বিস্তৃত পরিসরে গ্রামীণ ট্রাস্ট, গ্রামীণ ফান্ড, গ্রামীণ টেলিকম এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটে।
গ্রামীণ টেলিকম বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। গ্রামীণফোনের সঙ্গে গ্রামীণ টেলিকমের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে মোবাইল ফোন ও যোগাযোগসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পেছনের প্রেরণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউনূস দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব ক্ষুধার্ত মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে না পারলে সেই তত্ত্বের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। একজন মানুষ হিসেবে অন্য মানুষের কাজে লাগতে পারাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার বিশ্বব্যাপী প্রভাব
মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ মডেল বিশ্বের বহু দেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগকে প্রভাবিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি গড়ে ওঠে। এসব কর্মসূচির অনেকগুলোতেই নারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত বেশি। এর ফলে বহু নারী ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তবে ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষণা হয়েছে, এবং এর সাফল্য সব ক্ষেত্রেই সমান নয়। ঋণের শর্ত, সুদের হার, বাজারের সুযোগ ও ঋণগ্রহীতার পরিস্থিতির ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
ইউনূসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘সামাজিক ব্যবসা’। এই ধারণার মূল লক্ষ্য শুধু মুনাফা অর্জন নয়; বরং ব্যবসায়িক পদ্ধতি ব্যবহার করে দারিদ্র্য, অপুষ্টি, বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা। সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে টিকে থাকার পাশাপাশি সমাজের উপকার সাধন করতে পারে।
এই ধারণাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক ব্যবসা নিয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। ইউনূসের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি দরিদ্র মানুষকে কেবল সাহায্যপ্রার্থী হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের সৃজনশীলতা, শ্রম ও উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের জীবন পরিবর্তনের সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখেছেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার
দারিদ্র্য বিমোচন এবং ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল কমিটির মতে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়েছে যে দরিদ্র মানুষেরও অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আগ্রহ ও সক্ষমতা রয়েছে। উপযুক্ত সুযোগ পেলে তাঁরা নিজেদের জীবনমান উন্নত করতে পারেন এবং সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর অবদান রাখতে পারেন।
মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার অর্জনকারী প্রথম বাংলাদেশি। পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি দরিদ্র মানুষের জন্য কম খরচে পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন, নিজ অঞ্চলে শিক্ষা ও প্রযুক্তির প্রসার এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন ইউনূসের কাজের একজন উল্লেখযোগ্য সমর্থক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন বক্তৃতা ও লেখায় ইউনূসের অবদানের প্রশংসা করেন এবং অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের জন্যও তাঁকে উপযুক্ত বলে মন্তব্য করেছিলেন। ইউনূসকে শেষ পর্যন্ত শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলে অর্থনীতিবিদদের একাংশ পুরস্কারটির উপযুক্ততা নিয়ে আলোচনা করেন। তবে নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল দারিদ্র্য বিমোচন ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনে ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের অবদান।
অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মাননা
নোবেল শান্তি পুরস্কার ছাড়াও মুহাম্মদ ইউনূস বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৮৪ সালের র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার, ১৯৯৬ সালের বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক বলিভার পুরস্কার, ১৯৯৮ সালের ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার, ১৯৯৯ সালের প্রিন্স অব আস্তুরিয়াস পুরস্কার ও সিডনি শান্তি পুরস্কার এবং ২০০৬ সালের সিউল শান্তি পুরস্কার।
২০০৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং ২০১০ সালে কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল লাভ করেন। এই দুটি সম্মাননা তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বহু সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন। সামাজিক উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও উদ্যোক্তা বিকাশে তাঁর অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়েছে।
সামাজিক ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাস্কিয়া ব্রুস্টেন, সোফি আইজেনম্যান ও হান্স বিটিজের সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূস ‘ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভস’ প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হন। এর উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন দেশে সামাজিক ব্যবসার বিকাশে সহায়তা করা, সামাজিক সমস্যার সমাধানে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং নতুন সামাজিক উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা।
২০১২ সালে তিনি গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। অর্থনীতি, ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক ব্যবসা ও উন্নয়ন নিয়ে তিনি একাধিক বই লিখেছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি বাস্তবায়নে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তৎকালীন মহাসচিব বান কি-মুন তাঁকে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। ইউনাইটেড নেশনস ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমেও তিনি ভূমিকা পালন করেছেন।
২০০৮ সালে ফ্রান্সের সাবেক রাষ্ট্রপতি জাক শিরাক প্রতিষ্ঠিত শিরাক ফাউন্ডেশনের সম্মানিত সদস্য হিসেবে তিনি যুক্ত হন। দারিদ্র্য বিমোচন, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তিনি বিভিন্ন উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছেন।
তবে ২০১১ সালে বয়সসংক্রান্ত বিধি ও আইনগত বিষয়ের উল্লেখ করে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। এ নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
গণমাধ্যম ও জনজীবনে উপস্থিতি
মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘দ্য ডেইলি শো উইথ জন স্টুয়ার্ট’, ‘দ্য অপরাহ উইনফ্রে শো’, ‘দ্য কলবার্ট রিপোর্ট’ এবং ‘রিয়েল টাইম উইথ বিল মাহের’-এ তিনি অংশগ্রহণ করেন।
তাঁর কাজ ও ধারণা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা তাঁকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়।
রাজনীতিতে প্রবেশের উদ্যোগ
২০০৬ সালের দিকে মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সক্রিয় আগ্রহ দেখান। অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, ড. কামাল হোসেন, মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম ও দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থায় সততা ও স্বচ্ছতার পক্ষে জনমত গঠনের উদ্যোগে অংশ নেন।
২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘দ্য ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে নাগরিকদের মতামত চান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন ও যোগ্য নেতৃত্বের ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ গড়ে তোলা।
২০০৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠকের পর ৩ মে তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ
২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা, গ্রাচা মাচেল ও ডেসমন্ড টুটু বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অভিজ্ঞ ও নীতিবান ব্যক্তিদের নিয়ে ‘দ্য এল্ডার্স’ নামে একটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী গঠনের উদ্যোগ নেন। মুহাম্মদ ইউনূসও এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ২০০৯ সালে তিনি এর সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ান।
তিনি আফ্রিকার উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগেও অংশগ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এসএনভি নেদারল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের উপদেষ্টা বোর্ডে তিনি যুক্ত হন। ২০১০ সাল থেকে তিনি ব্রডব্যান্ড কমিশন ফর ডিজিটাল ডেভেলপমেন্টের কমিশনার হিসেবে কাজ করেন। এই কমিশনের লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের প্রসারের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা।
২০১৬ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি-মুন তাঁকে স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কমিশনে নিয়োগ দেন। ফ্রান্সের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি জ্যাকব জুমা এই কমিশনের সহসভাপতি ছিলেন।
২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ এবং তাঁদের মানবাধিকার রক্ষার দাবিতেও মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ব্যক্তিজীবন ও পরিবার
মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিজীবনেও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা রয়েছে। ১৯৬৭ সালে ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তাঁর পরিচয় হয় রুশ অভিবাসী পরিবারের সন্তান এবং রুশ সাহিত্যের শিক্ষার্থী ভেরা ফোরস্টেনকোর সঙ্গে। ১৯৭০ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রামে তাঁদের কন্যা মণিকার জন্ম হয়। পরে ভেরা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান এবং তাঁদের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে।
পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূস পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক আফরোজী ইউনূসকে বিয়ে করেন। আফরোজী পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের কন্যা দীনা আফরোজ ইউনূসের জন্ম ১৯৮৬ সালে।
তাঁর ভাইদের মধ্যেও শিক্ষা ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তাঁর ভাই মুহাম্মদ ইব্রাহীম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে ‘সেন্টার ফর মাস এডুকেশন ইন সায়েন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশেষ করে গ্রামীণ কিশোরীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়।
তাঁর আরেক ভাই মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপস্থাপক ও সমাজকর্মী। তিনি ২০১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
উপসংহার
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জীবন ও কর্ম দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি দেখিয়েছেন যে দরিদ্র মানুষের হাতে উপযুক্ত সুযোগ, আর্থিক সহায়তা ও উৎপাদনমূলক কাজে অংশগ্রহণের পরিবেশ তুলে দিতে পারলে তাঁদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ক্ষুদ্রঋণের ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক ব্যবসার প্রসারে তাঁর অবদান তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করেছে। ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার অন্যতম স্বীকৃতি।
তাঁর কর্মপদ্ধতি ও ক্ষুদ্রঋণের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা, সমালোচনা ও গবেষণা হয়েছে। তা সত্ত্বেও দারিদ্র্যকে কেবল আর্থিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের মর্যাদা, সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ফেরিট ওরহান পামুক
নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ফেরিত ওরহান পামুকের জীবন ও কর্ম
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
নোবেলজয়ী তুর্কি সাহিত্যিক ফেরিত ওরহান পামুকের জন্ম ১৯৫২ সালের ৭ জুন তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে। তাঁর পিতামহ, পিতা ও কাকা—তিনজনই পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। পিতামহের হাত ধরেই তাঁদের পরিবারের আর্থিক সমৃদ্ধি এসেছিল। পামুক ইস্তাম্বুলের রবার্ট কলেজে (বর্তমানে রবার্ট কলেজ নামে পরিচিত) পড়াশোনা করেন। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা শেষ করার পর পেশাদার চিত্রশিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তিনি ইস্তাম্বুল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু তিন বছর পড়াশোনার পর স্থাপত্যের পাঠ ছেড়ে দিয়ে পূর্ণকালীন লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৭৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
২২ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত পামুক তাঁর মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। এই সময়ে তিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস রচনা করেন এবং বইটি প্রকাশের জন্য প্রকাশক খুঁজতে থাকেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নে তিনি নিজেকে একজন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন; ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক সংযোগের বিষয়ে তিনি প্রচলিত ধর্মীয় ধারণা থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন।
১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পামুক যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এ সময় তিনি নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং স্কলার হিসেবে কাজ করেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখালেখি ও তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়েও তিনি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে শিক্ষাগত ও সাহিত্যিক সম্পর্ক বজায় রাখেন।
সাহিত্যজীবনের সূচনা ও প্রথম উপন্যাস
ওরহান পামুক ১৯৭৪ সাল থেকে নিয়মিতভাবে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম ছিল ‘কারানলিক ভে ইশিক’ (Karanlık ve Işık), যার ইংরেজি অর্থ ‘Darkness and Light’। ১৯৭৯ সালে মিলিয়েত উপন্যাস প্রতিযোগিতায় এই উপন্যাসটি যৌথভাবে পুরস্কৃত হয়। অন্য বিজয়ী ছিলেন মেহমেত এরোলু। পরে উপন্যাসটি সংশোধিত ও সম্প্রসারিত হয়ে ‘সেভদেত বে ভে ওউল্লারি’ (Cevdet Bey ve Oğulları) বা ‘মিস্টার জেভদেত অ্যান্ড হিজ সন্স’ নামে ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসটিতে ইস্তাম্বুলের নিসান্তাশিতে বসবাসকারী একটি ধনী পরিবারের তিন প্রজন্মের জীবন, সম্পর্ক, সামাজিক পরিবর্তন এবং তুরস্কের আধুনিকায়নের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। বইটি প্রকাশের পর পামুক সাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি উপন্যাসটির জন্য ওরহান কামাল উপন্যাস পুরস্কার অর্জন করেন।
১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সেসসিজ এভ’ (Sessiz Ev), যার ইংরেজি নাম ‘The Silent House’। উপন্যাসটিতে তুরস্কের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনজন বর্ণনাকারীর দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে একটি পরিবারের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়ের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামাজিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন ঘটেছে। বইটির ফরাসি অনুবাদ ১৯৯১ সালে ইউরোপীয় আবিষ্কার পুরস্কার লাভ করে।
১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় পামুকের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘বেয়াজ কালে’ (Beyaz Kale), যার ইংরেজি নাম ‘The White Castle’। একজন ভেনিসীয় বন্দি এবং একজন উসমানীয় পণ্ডিতের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটিতে পরিচয়, জ্ঞান, ক্ষমতা ও পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে। এই বইয়ের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক সাহিত্যজগতে পামুকের পরিচিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
সাহিত্যিক সাফল্য ও উল্লেখযোগ্য উপন্যাস
১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় পামুকের উপন্যাস ‘কারা কিতাপ’ (Kara Kitap), যার ইংরেজি নাম ‘The Black Book’। ইস্তাম্বুলের ইতিহাস, অলিগলি, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও মানুষের অন্তর্জগতের জটিল বর্ণনা উপন্যাসটিকে তুর্কি সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত রচনায় পরিণত করে। এর অভিনব আখ্যানরীতি ও প্রতীকী ভাষা পাঠক এবং সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।
১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস ‘ইয়েনি হায়াত’ (Yeni Hayat), অর্থাৎ ‘The New Life’। প্রকাশের পর বইটি তুরস্কে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং দ্রুত বিক্রির রেকর্ড গড়ে। এই সময়ে পামুক কেবল একজন ঔপন্যাসিক হিসেবেই নন, বরং তুরস্কের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মতপ্রকাশকারী একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তাঁর অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস ‘বেনিম আদিম কিরমিজি’ (Benim Adım Kırmızı), যার ইংরেজি নাম ‘My Name Is Red’, ১৯৯৮ সালে তুরস্কে প্রকাশিত হয়। উসমানীয় সাম্রাজ্যের চিত্রকলা, ক্ষুদ্রচিত্রশিল্প, প্রেম, রহস্য ও হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসে শিল্পের স্বাতন্ত্র্য, ব্যক্তিসত্তা এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত তুলে ধরা হয়েছে। বইটি আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এই উপন্যাসের জন্য পামুক ২০০২ সালে ‘প্রিক্স দু মেলিয়র লিভ্র এত্রঁজে’ এবং ‘প্রেমিও গ্রিনজানে কাভুর’ পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৩ সালে তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমপ্যাক ডাবলিন লিটারারি অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন। এই পুরস্কার তাঁর সাহিত্যিক খ্যাতিকে আরও সুদৃঢ় করে।
পামুকের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘স্নো’ (Snow), ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ (The Museum of Innocence), ‘দ্য রেড-হেয়ার্ড ওম্যান’ (The Red-Haired Woman) এবং ‘আ স্ট্রেঞ্জনেস ইন মাই মাইন্ড’ (A Strangeness in My Mind)। তাঁর উপন্যাসের কাহিনিতে প্রায়ই ইতিহাস, স্মৃতি, ব্যক্তিসত্তা, প্রেম, রাজনীতি, ধর্ম, আধুনিকতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন উঠে আসে।
পামুকের সাহিত্যকর্মের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মূল্যবোধের সংঘাত এবং পারস্পরিক সংযোগের অনুসন্ধান। তাঁর উপন্যাসে আধুনিক উত্তরাধুনিক আখ্যানকৌশল, বহুস্তরীয় বর্ণনা, আত্মপ্রতিফলন ও ঐতিহাসিক উপাদানের সৃজনশীল ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
লেখালেখি, স্মৃতিকথা ও অন্যান্য রচনা
১৯৯২ সালে পামুক ‘কারা কিতাপ’ উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে ‘গিজলি ইউজ’ (Gizli Yüz) চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেন। তুর্কি পরিচালক ওমের কাভুর এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন।
১৯৯৫ সালে পামুক তুরস্কের কুর্দি জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং তাদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। এসব প্রবন্ধ ১৯৯৯ সালে ‘ওতেকি রেংলার’ (Öteki Renkler), অর্থাৎ ‘Other Colours’ নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পায়।
২০০৩ সালে তিনি স্মৃতিকথা ও ভ্রমণধর্মী রচনা ‘ইস্তানবুল—হাতিরালার ভে শেহির’ প্রকাশ করেন। এর ইংরেজি সংস্করণ ‘Istanbul: Memories and the City’ ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। বইটিতে লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক ইতিহাস, শৈশব, ইস্তাম্বুলের নগরজীবন এবং শহরটির অতীত ও বর্তমানের রূপান্তর অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে বর্ণিত হয়েছে।
এই বই লেখার সময় তিনি ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। পিতার মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ এবং পেশাগত সমস্যার কারণে তাঁর জীবন কঠিন হয়ে উঠেছিল। তা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে যান। বইটির সৌন্দর্য ও সাহিত্যিক নির্মাণের প্রতি মনোযোগ দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত দুঃখকে সৃষ্টিশীল কাজে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
পামুকের রচনায় ইস্তাম্বুল শুধু একটি শহর নয়; এটি তাঁর স্মৃতি, পরিচয়, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের প্রতীক। তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে।
রাজনৈতিক অবস্থান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
ওরহান পামুক তুরস্কের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে খোলাখুলি মতপ্রকাশ করার জন্যও পরিচিত। বিশেষত কুর্দি জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ে আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা নিয়ে তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।
২০০৫ সালে একটি সুইস সংবাদপত্রে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আর্মেনীয় ও কুর্দিদের হত্যা সম্পর্কে মন্তব্য করার পর তাঁর বিরুদ্ধে তুর্কি জাতির মর্যাদা অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। আইনজীবী কামাল কেরিনচিসের উদ্যোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পামুকের বক্তব্যের ফলে তুরস্কে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায় নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এই মামলা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বহু বিশিষ্ট লেখক তাঁর পাশে দাঁড়ান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হোসে সারামাগো, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, গুন্টার গ্রাস, উমবের্তো একো, কার্লোস ফুয়েন্তেস, জুয়ান গোয়তিসোলো, জন আপডাইক এবং মারিও ভার্গাস ইয়োসা। তাঁরা যৌথভাবে পামুকের প্রতি সমর্থন জানান।
আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও মামলাটি তুরস্কে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলাসংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ নিয়ে পৃথক আইনি বিরোধের ঘটনাও ঘটে।
পামুক সলমন রুশদির বিরুদ্ধে জারি করা ফতোয়ারও প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছিলেন। মুসলিম বিশ্বের লেখকদের মধ্যে তিনি এ বিষয়ে প্রথম দিককার সোচ্চার ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর মতে, সাহিত্য ও লেখকের স্বাধীনতা রক্ষা করা একটি মুক্ত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার
২০০৬ সালের ১২ অক্টোবর সুইডিশ অ্যাকাডেমি ওরহান পামুককে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করে। তাঁর সাহিত্যকর্মে নিজ শহরের বিষণ্ন আত্মাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংঘাত ও পারস্পরিক সংযোগের নতুন প্রতীক আবিষ্কারের জন্য তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়। <Cite refs={[“turn165300search2″,”turn165300search3”]}/>
২০০৬ সালের ৭ ডিসেম্বর স্টকহোমে সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে পামুক তাঁর নোবেল বক্তৃতা প্রদান করেন। বক্তৃতাটির নাম ছিল ‘বাবামিন বাভুলু’ (Babamın Bavulu), যার ইংরেজি অনুবাদ ‘My Father’s Suitcase’।
এই বক্তৃতায় তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে সম্পর্ক, পিতার রেখে যাওয়া লেখাপত্র এবং লেখক হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেন। ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যিক স্বাধীনতা, সৃষ্টিশীলতার দায়িত্ব এবং পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁর নোবেল বক্তৃতা ব্যক্তিগত জীবন ও সাহিত্যচিন্তার এক গভীর সংমিশ্রণ হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। <Cite refs={[“turn165300search11”]}/>
নোবেল পুরস্কার অর্জনের পর পামুকের রচনার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পায়। তাঁর বই বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয় এবং বিভিন্ন দেশের পাঠকের কাছে তুরস্কের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজের পরিচয় পৌঁছে দেয়।
বিতর্ক ও সাহিত্যিক প্রভাব
পামুকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মৌলিকতা ও প্রভাবের প্রশ্নে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কিছু সমালোচক তাঁর লেখায় অন্যান্য সাহিত্যিকের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। আবার কয়েকজন লেখক তাঁর কিছু রচনায় পূর্ববর্তী বইয়ের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকার অভিযোগও তুলেছেন।
বিশেষ করে ‘দ্য হোয়াইট ক্যাসল’ উপন্যাসের কিছু অংশ নিয়ে অনুকরণ বা উদ্ধৃতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। পামুক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তাঁর রচনায় বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক কাহিনি এবং আধুনিক আখ্যানরীতির প্রভাব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
তাঁর সাহিত্যকর্মের বিশেষত্ব হলো, তিনি তুরস্কের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর রচনায় অতীত ও বর্তমান, ধর্ম ও আধুনিকতা, ব্যক্তি ও সমাজ এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্ক নতুনভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৮২ সালের ১ মার্চ ওরহান পামুক ইতিহাসবিদ আইলিন তুরেগানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে রুয়া নামে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয় ১৯৯১ সালে। পরবর্তীকালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
পামুকের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং শৈশবের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকর্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ‘ইস্তানবুল—মেমোরিজ অ্যান্ড দ্য সিটি’ গ্রন্থে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে শহরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীর সম্পর্ক ফুটে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা
ওরহান পামুক তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তুরস্ক ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলির মধ্যে রয়েছে ওরহান কামাল উপন্যাস পুরস্কার, মাদারালি উপন্যাস পুরস্কার, ইন্ডিপেনডেন্ট ফরেন ফিকশন পুরস্কার, প্রিক্স দু মেলিয়র লিভ্র এত্রঁজে, প্রেমিও গ্রিনজানে কাভুর এবং আন্তর্জাতিক ইমপ্যাক ডাবলিন সাহিত্য পুরস্কার।
২০০১ সালে টাইম পত্রিকার ‘টাইম ১০০’ তালিকায় তাঁকে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০৬ সালে পত্রিকাটি তাঁকে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান দেয়। ২০০৭ সালে তিনি কান চলচ্চিত্র উৎসবের জুরির সদস্য ছিলেন। তাঁর উপন্যাস ‘স্নো’ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর ২০০৪ সালের উল্লেখযোগ্য বইয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছিল।
তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। ২০১৪ সালে তিনি আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পামুকের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের ষাটটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর বই আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
উপসংহার
ফেরিত ওরহান পামুক সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক। তাঁর সাহিত্যকর্মে তুরস্কের ইতিহাস, ইস্তাম্বুলের নগরজীবন, ব্যক্তিগত স্মৃতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সম্পর্ক গভীর শিল্পসুষমায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ঐতিহাসিক উপাদান, দার্শনিক চিন্তা ও আধুনিক আখ্যানকৌশলকে একত্র করে উপন্যাসের জগতে স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছেন।
২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্যজগতে স্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করেন। তাঁর রচনায় মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট, ইতিহাসের ভার, সামাজিক পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক যে গভীরতা ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে ফুটে উঠেছে, তা তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের একজন স্বতন্ত্র ও স্মরণীয় লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নোবেল বিজয়ী তাওয়াক্কুল কারমান
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী তাওয়াক্কুল কারমান
জন্ম ও শৈশব
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী তাওয়াক্কুল কারমানের জন্ম ১৯৭৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইয়েমেনের তায়েজ শহরের কাছে সারাব আস সালাম এলাকায়। তিনি ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তায়েজে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানেই শৈশবের পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। তাঁর বাবা আবদেল সালাম কারমান ছিলেন একজন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি একসময় ইয়েমেনের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আলী আবদুল্লাহ সালেহের মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিশেষ কারণে তিনি পদত্যাগ করেন।
তাওয়াক্কুল কারমান কবি তারিক কারমান ও আইনজীবী সাফা কারমানের বোন। সাফা কারমান হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম ইয়েমেনি নাগরিক হিসেবে পরিচিত।
তাওয়াক্কুল কারমান একজন সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেত্রী। তিনি আল-জাজিরাসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সাংবাদিকতার কাজে যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষা ও পারিবারিক জীবন
তাওয়াক্কুল কারমান ১৯৯৯ সালে সানার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে সানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১২ সালে কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে আইন বিষয়ে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।
তিনি মহম্মদ আল-নাহিমকে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন সন্তান রয়েছে।
সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার আন্দোলনের সূচনা
২০০৫ সালে তাওয়াক্কুল কারমান ইয়েমেনের সংবাদপত্র আল-থাওরাহ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ইয়েমেন সাংবাদিক সিন্ডিকেটেরও সদস্য ছিলেন।
২০০৫ সালের মার্চ মাসে তিনি আরও সাতজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে মিলে ‘উইমেন জার্নালিস্টস উইদাউট চেইনস’ (Women Journalists Without Chains—WJWC) নামে একটি মানবাধিকার সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
সরকারি লাইসেন্স পাওয়ার সুবিধার্থে সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ডারলেস ফিমেল রিপোর্টার্স’ রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে সংগঠনটি পরবর্তী সময়ে উইমেন জার্নালিস্টস উইদাউট চেইনস নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
২০০৫ সালে কারমান মোবাইলভিত্তিক সংবাদসেবা চালু করেন। কিন্তু ২০০৭ সালে ইয়েমেন সরকার সেই পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। সংবাদপত্র ও একটি বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অনুমতি চেয়েও সংগঠনটি সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পায়নি।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কারমান ২০০৭ সাল থেকে নিয়মিত আন্দোলন শুরু করেন। এ কারণে তিনি সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হুমকি, চাপ ও হয়রানির শিকার হন। টেলিফোন ও চিঠির মাধ্যমেও তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
সংগঠনটি এমন একটি সংবাদব্যবস্থার পক্ষে কাজ করছিল, যেখানে প্রচলিত সংবাদপত্র আইনের বাইরে থাকা মোবাইল এসএমএস সংবাদসেবাও স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারে। লাইসেন্স ছাড়াই প্রায় এক বছর একটি বার্তাভিত্তিক সংবাদসেবা চালানোর পর সরকার সেটি বন্ধ করে দেয়।
২০০৭ সালে সংগঠনটি ইয়েমেনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অপব্যবহার ও সাংবাদিকদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা করে। ২০০৯ সালে কারমান সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগে তথ্য মন্ত্রণালয়েরও সমালোচনা করেন।
২০০৭ সাল থেকেই তিনি সানার তাহরির স্কোয়ারে নিয়মিত বিক্ষোভ প্রদর্শন ও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
নারী অধিকার ও পোশাকের স্বাধীনতা
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি তাওয়াক্কুল কারমান নারীর অধিকার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। তিনি নারীর পোশাকের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন এবং মুখ সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা নিকাব পরা বন্ধ করেন। একটি সম্মেলনে তিনি নিকাব ছাড়াই অংশগ্রহণ করেন।
২০১০ সালে ইয়েমেন টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ মুখাবরণ একটি সাংস্কৃতিক রীতি; ইসলাম ধর্মের পক্ষ থেকে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
নারীর সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি মনে করতেন, নারীদের কেবল সমস্যার শিকার হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং সমাজের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেও তাঁদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নারীরা সমাজের প্রান্তে অবস্থান করছেন। এখন তাঁদের অন্যের অনুমোদনের অপেক্ষা না করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে এবং সমাজ পরিবর্তনের কাজে অংশ নিতে হবে। তাঁর মতে, এভাবেই ইয়েমেনের বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
বাল্যবিবাহ, নিরক্ষরতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান
তাওয়াক্কুল কারমান ইয়েমেনে মেয়েদের অপুষ্টি, নিরক্ষরতা এবং বাল্যবিবাহের মতো সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, বহু মেয়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অল্প বয়সে বিয়ের শিকার হচ্ছে।
তিনি ১৭ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ে আইন করে বন্ধ করার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ইয়েমেনের বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য ছিল না; এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং সমাজের গভীরে প্রোথিত বৈষম্য দূর করা।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি নারীদের অধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর সংগঠন নারীদের অংশগ্রহণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সবচেয়ে উন্মুক্ত সংগঠনগুলির মধ্যে একটি।
কারমানের কাছে নারীর মুক্তি, শিক্ষা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ ছিল গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবস্থান
তাওয়াক্কুল কারমান ইয়েমেন সরকারের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছেন। ইব শহরের আশপাশে স্থানীয় এক দুর্নীতিগ্রস্ত নেতার বিরুদ্ধে পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ ওঠার পর রাষ্ট্রপতি আলী আবদুল্লাহ সালেহের শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় হয়।
তিনি বিদেশি শক্তির প্রভাবমুক্ত থেকে ইয়েমেনের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক, পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠন ও আরব বিশ্বের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তবে তিনি নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিতেন।
তাঁর বহুল আলোচিত একটি বক্তব্য হলো, “পৃথিবী আমার দেশ, আর মানবতা আমার জাতি।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জাতীয় সীমানার ঊর্ধ্বে মানবিক মূল্যবোধ ও বিশ্বজনীন সংহতির প্রতি তাঁর বিশ্বাস প্রকাশ করেন।
মিশরের রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে মতামত
২০১২-১৩ সালের মিশরীয় রাজনৈতিক সংকটের সময় তাওয়াক্কুল কারমান গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনগণের মতামতের গুরুত্ব তুলে ধরেন। ২০১৩ সালের ৩০ জুন রাষ্ট্রপতি মহম্মদ মুরসির পদত্যাগের দাবিতে যে বিক্ষোভ হয়, তিনি তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তবে সামরিক বাহিনীর হাতে মুরসির ক্ষমতাচ্যুতি এবং সংবিধান স্থগিত করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
মুরসি ছিলেন মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। কারমানের আশঙ্কা ছিল, সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হলে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
তিনি মুরসির সমর্থকদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সহিংসতা এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতাদের গ্রেপ্তারেরও সমালোচনা করেন। মিশরে সংশ্লিষ্ট বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য প্রবেশের চেষ্টা করলেও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাঁকে সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
হুথি বিদ্রোহ ও আল-কায়দার বিরোধিতা
তাওয়াক্কুল কারমান ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহ এবং আরব উপদ্বীপে আল-কায়দার উপস্থিতির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, উভয় শক্তিই ইয়েমেনের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
তিনি হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কেরও সমালোচনা করেন। ইয়েমেন সরকার যখন হুথি বিদ্রোহীদের সরকারি সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বিবেচনা করছিল, তখন কারমান বলেছিলেন, অস্ত্র সমর্পণ না করলে তাদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়।
২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হলে তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি সালেহ ও হুথি বিদ্রোহীদের সহযোগিতাকে ২০১১ সালের বিপ্লবের অর্জন নস্যাৎ করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন।
মার্কিন ড্রোন হামলার সমালোচনা
ইয়েমেনে মার্কিন ড্রোন হামলার নীতিরও সমালোচনা করেছেন তাওয়াক্কুল কারমান। তাঁর মতে, জনবহুল এলাকায় ড্রোন হামলা চালানো মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হতে পারে।
২০১৩ সালের আগস্টে ইয়েমেনে ড্রোন হামলা বৃদ্ধির পর তিনি বলেন, এ ধরনের হামলা ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করছে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করার পাশাপাশি এসব হামলা আল-কায়দার পক্ষে নতুন সদস্য সংগ্রহের সুযোগও তৈরি করতে পারে।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা
ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক হস্তক্ষেপেরও বিরোধিতা করেন কারমান। তিনি অভিযোগ করেন, জোটটি যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বিবেচনা না করেই বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।
তিনি অবিলম্বে বিমান হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান। তাঁর অবস্থানের কেন্দ্রে ছিল ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা।
২০১১ সালের ইয়েমেনি বিপ্লবে নেতৃত্ব
২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে ইয়েমেনে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসন, দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে জনগণ রাস্তায় নেমে আসে।
তাওয়াক্কুল কারমান সানায় ছাত্রসমাবেশ ও বিক্ষোভের আয়োজন করেন। ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি স্বামীর সঙ্গে গাড়িতে যাওয়ার সময় পুলিশ তাঁকে আটক করে কারাগারে নিয়ে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ছাত্র, সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা আটক থাকার পর ২৪ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্তি পান। আটক অবস্থায় তাঁকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।
২৯ জানুয়ারি তিনি আবারও একটি বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন এবং ৩ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান। আন্দোলনের সময় তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।
কারমান ঘোষণা করেন, আলী আবদুল্লাহ সালেহের পতন না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তাঁর মতে, একনায়কতন্ত্র, দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সম্মিলিত প্রভাবেই বিপ্লবের জন্ম হয়েছিল। মানুষের উন্নত জীবনের আশা যখন বারবার ব্যর্থ হয়, তখন অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়।
সরকারি বাহিনীর হাতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার প্রতিবাদে তিনি রাষ্ট্রপতির প্রাসাদের সামনে বিক্ষোভের আহ্বান জানান। এ সময় আন্দোলনের অন্যান্য সংগঠকের সঙ্গে তাঁর কিছু মতপার্থক্যও দেখা দেয়।
২০১১ সালের ১৮ জুন দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ তাঁর ‘ইয়েমেনের অসমাপ্ত বিপ্লব’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি সালেহ সরকারকে সমর্থন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমালোচনা করেন।
আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ ছিলেন নারী। ১৬ অক্টোবর তায়েজে সরকারি স্নাইপারের গুলিতে আজিজা ওসমান কালিব নামে এক নারী বিক্ষোভকারী নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর প্রায় দশ দিন পরে সানায় নারীরা তাঁদের বিরুদ্ধে চালানো সহিংসতার প্রতিবাদে মাথার আবরণ বা ওড়না পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। সে সময় কারমান ওয়াশিংটন ডিসিতে ছিলেন। তিনি বলেন, নারীদের এই প্রতিবাদ ছিল সালেহ সরকারের অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক সাহসী অবস্থান। তাঁর মতে, ইয়েমেনের নারীরা আর পর্দা, দেয়াল কিংবা অন্য কোনো আড়ালে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চান না।
অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলনের চাপে রাষ্ট্রপতি আলী আবদুল্লাহ সালেহ ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের উদ্যোগে প্রস্তাবিত ক্ষমতা হস্তান্তর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ২০১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুরাব্বুহ মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
সালেহের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পরও তাওয়াক্কুল কারমান ইয়েমেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। তিনি আন্তর্জাতিক জনমত এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন, যাতে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি সালেহের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।
তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের কাছে দাবি জানান, কোনো রাজনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে যেন সালেহকে দায়মুক্তি দেওয়া না হয়। তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং তাঁকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার আওতায় আনার পক্ষেও তিনি মত দেন।
২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইয়েমেনে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। তবে সালেহের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার নিশ্চিত করার যে দাবি কারমান তুলেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ক্লিনটন ইয়েমেনে গণতান্ত্রিক উত্তরণ, মানবাধিকার এবং জনগণের নিজেদের নেতা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে সমর্থন করার কথা বলেন।
এর জবাবে কারমান ইয়েমেনি সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া জনগণের আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
২০১১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার
২০১১ সালে তাওয়াক্কুল কারমান লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপতি এলেন জনসন সারলিফ এবং শান্তিকর্মী লেমাহ গবোয়ির সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
নারীর নিরাপত্তা, নারীর অধিকার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য অহিংস সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ায় তাঁদের এই সম্মান প্রদান করা হয়।
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সময় কারমানের বয়স ছিল মাত্র ৩২ বছর। তিনি আরব বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ নোবেলজয়ী এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনকারী প্রথম ইয়েমেনি নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন। ২০১৪ সালে মালালা ইউসুফজাই ১৭ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর কনিষ্ঠতম নোবেলজয়ীর রেকর্ডটি তাঁর দখলে চলে যায়।
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগে ১১০ বছরেরও বেশি সময়ে মাত্র ১২ জন নারী এই সম্মান পেয়েছিলেন বলে সে সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নোবেল কমিটি কারমানের অবদানের প্রশংসা করে জানায়, আরব বসন্তের আগে ও চলাকালে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি ইয়েমেনে নারীর অধিকার, গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
কমিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২০০০ সালে গৃহীত ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করে। এই প্রস্তাবে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় নারী ও শিশুদের ওপর সংঘাতের প্রভাব এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীদের অধিকতর অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান থরবিয়র্ন ইয়াগল্যান্ডের বক্তব্যের মূল কথাও ছিল স্পষ্ট—সমাজের সর্বস্তরে নারীরা পুরুষদের সমান সুযোগ না পেলে বিশ্বে গণতন্ত্র ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়া
নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার সময় তাওয়াক্কুল কারমান সানায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। টেলিভিশনের মাধ্যমে তিনি পুরস্কারের খবর জানতে পারেন। তিনি আগে থেকে মনোনয়নের বিষয়ে জানতেন না বলে জানান।
পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এই সম্মান তাঁর কাছে যেমন বিস্ময়কর, তেমনি সমগ্র আরব বিশ্বের জন্যও একটি বিজয়। তিনি এটিকে আরব নারীদের বিজয় এবং শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি পুরস্কারটি আরব বসন্তের সঙ্গে যুক্ত তরুণ সমাজ, নারী এবং গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনরত জনগণের উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। তিউনিসিয়া, মিশর, ইয়েমেন, লিবিয়া ও সিরিয়ার স্বাধীনতা, অধিকার এবং গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামরত মানুষদের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধা জানান।
কারমানের মতে, শান্তি ছাড়া কোনো দেশ বা সমাজকে প্রকৃত অর্থে গড়ে তোলা যায় না। নারীর অধিকার কেবল স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজেই সুরক্ষিত হতে পারে। মানবসভ্যতার বিকাশে নারী ও পুরুষ উভয়ের অবদান অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, আরব বিশ্বের তরুণ-তরুণীদের নাগরিকত্ব, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে এই পুরস্কার নতুন আশার বার্তা বহন করে। ইয়েমেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও নারী সাংবাদিকদের সহায়তা
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরে কারমান কাতার সফর করেন। সেখানে তিনি শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দোহায় একটি টেলিভিশন ও বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের জন্য সহায়তা চান। নারী সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের বিষয়েও তিনি সহযোগিতা কামনা করেন।
২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও সংগঠনগুলির একটি প্রতিবেদনের প্রকাশ উপলক্ষে তিনি ভিডিও বার্তা পাঠান। ওই প্রতিবেদনে আরব বসন্ত, ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কারমানের মানবাধিকার আন্দোলনের বিষয়গুলি আলোচিত হয়েছিল।
তিনি বিশ্বের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী অধিকার, মানবাধিকার এবং আরব বিপ্লব সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়েছেন। ইয়েমেনের মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এমবিআই আল জাবের ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া সাংবাদিকদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
জীবনের প্রতি হুমকি ও সাইবার নজরদারি
মানবাধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের কারণে তাওয়াক্কুল কারমানকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
২০১০ সালে একটি প্রতিবাদী মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় এক নারী তাঁকে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করেন বলে জানা যায়। তবে তাঁর সমর্থকেরা সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন।
কারমানের ভাই তারিক কারমানের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি ইয়েমেনের একজন প্রবীণ সরকারি কর্মকর্তা তাঁকে টেলিফোনে মৃত্যুর হুমকি দিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে হুথি বিদ্রোহীদের রাজধানী সানা দখল এবং ইয়েমেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে কারমান দেশ ছাড়তে বাধ্য হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘প্রজেক্ট র্যাভেন’ নামের একটি গোপন নজরদারি অভিযানের কথা উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, এই অভিযানের মাধ্যমে আমিরাতের সরকার ও রাজতন্ত্রের সমালোচক এবং মানবাধিকারকর্মীদের ওপর নজরদারি চালানো হয়েছিল। অত্যাধুনিক গুপ্তচরবৃত্তির প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারমানের আইফোনে অনুপ্রবেশের ঘটনাও ওই প্রতিবেদনগুলিতে আলোচিত হয়।
তুরস্কের নাগরিকত্ব ও অন্যান্য সম্মাননা
তুরস্ক সরকার তাওয়াক্কুল কারমানকে তুরস্কের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর নাগরিকত্বসংক্রান্ত নথি পাঠান বলে জানা যায়।
২০১৯ সালে সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি এশিয়ান অ্যাওয়ার্ডসের সম্মান লাভ করেন।
ইয়েমেনি চলচ্চিত্র নির্মাতা খাদিজা আল-সালামি ইয়েমেনের অভ্যুত্থানের সময় নারীদের ভূমিকা নিয়ে দ্য স্ক্রিম শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সেই তথ্যচিত্রে কারমানের সাক্ষাৎকারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১২ সালে দুবাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত হয়।
২০২০ সালের ৬ মে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফেসবুকের ওভারসাইট বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিয়োগ করে। এই নিয়োগ তাঁর আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী হিসেবে পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করে।
প্রকাশিত নিবন্ধ ও বক্তৃতা
তাওয়াক্কুল কারমানের বিভিন্ন নিবন্ধ ও বক্তৃতায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, নারী অধিকার এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের বিষয়গুলি উঠে এসেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে—
১. ‘বার্নিং অ্যাম্বিশন ইজ নট দ্য ওয়ে’ — ইয়েমেন টাইমস, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৬।
২. ‘আওয়ার রেভলিউশনস ডুয়িং হোয়াট সালেহ কান্ট’ — দ্য গার্ডিয়ান, ৯ এপ্রিল ২০১১।
৩. ‘ইয়েমেনস আনফিনিশড রেভলিউশন’ — দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৮ জুন ২০১১।
৪. ‘দ্য ওয়ার্ল্ড মাস্ট নট ফরগেট ইয়েমেনস স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম’ — দ্য গার্ডিয়ান, ১ নভেম্বর ২০১১।
৫. ‘তাওয়াক্কুল কারমান নোবেল লেকচার’ — ১০ ডিসেম্বর ২০১১।
৬. ‘ইন দ্য অ্যাবসেন্স অব আ ফ্রি প্রেস, দেয়ার ইজ নো ডেমোক্রেসি’ — ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজপেপার্স অ্যান্ড নিউজ পাবলিশার্স, ৩ মে ২০১২।
৭. ‘ইজিপ্টস কুপ হ্যাজ ক্রাশড অল দ্য ফ্রিডমস ওন ইন দ্য রেভলিউশন’ — দ্য গার্ডিয়ান, ৮ আগস্ট ২০১৩।
৮. ‘মুরসি ইজ দ্য আরব ওয়ার্ল্ডস ম্যান্ডেলা’ — ফরেন পলিসি, ৯ আগস্ট ২০১৩।
৯. ‘ইমপাওয়ারিং কম্পিটেন্সি: ওয়ার্কিং টুওয়ার্ড আ জাস্ট অ্যান্ড ইফেক্টিভ ডেভেলপমেন্ট’ — ২০ মার্চ ২০১৭-এ প্রকাশিত একটি রচনা।
উল্লেখ্য, প্রকাশনাগুলির কয়েকটি ইংরেজি শিরোনাম মূল লেখার ভিত্তিতে বাংলা হরফে লেখা হয়েছে। প্রকাশের আগে মূল শিরোনাম ও প্রকাশের তারিখ নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
উপসংহার
তাওয়াক্কুল কারমানের জীবন সংগ্রাম, সাহস, মানবিক মূল্যবোধ এবং গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল আস্থার এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ইয়েমেনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বহুবার হুমকি, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তবুও তিনি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, মানবাধিকার এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
২০১১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি হওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের নারী, তরুণ সমাজ এবং গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনরত মানুষের সংগ্রামকেও আন্তর্জাতিক মর্যাদা দিয়েছে।
তাঁর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়, সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়, মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হয় এবং নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়। শান্তি, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রধান শর্ত—তাওয়াক্কুল কারমানের জীবন ও কর্ম সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।

নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের জন্ম ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের সোয়াত জেলার মিঙ্গোরা শহরে। তিনি একটি পশতুন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই এবং মা তুর পেকাই ইউসুফজাই। তাঁদের পরিবার সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। মালালার জন্মের সময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। তাই বাড়িতেই ধাত্রীর সহায়তায় তাঁর জন্ম হয়।
মালালা নামটি রাখা হয় দক্ষিণ আফগানিস্তানের মাইওয়ান্দের বিখ্যাত পশতুন নারী যোদ্ধা মালালাইয়ের নাম অনুসারে। ছোটবেলায় তিনি বাবা-মা এবং দুই ছোট ভাই খুশাল ও আতলের সঙ্গে মিঙ্গোরায় বসবাস করতেন।
মালালার বাবা জিয়াউদ্দিন ছিলেন একজন কবি, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসচেতন ব্যক্তি। তিনি ‘খুশাল পাবলিক স্কুল’ নামে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। বাবার শিক্ষাভাবনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা মালালার জীবন ও চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম
মালালা ইউসুফজাই ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে তিনি আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করতেন। তবে তাঁর জীবনে সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর বাবা, যিনি মেয়েদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে মালালা প্রকাশ্যে মেয়েদের শিক্ষার অধিকারের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন। তাঁর বাবা তাঁকে পেশোয়ারের একটি স্থানীয় প্রেসক্লাবে নিয়ে যান। সেখানে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধিদের সামনে মালালা প্রশ্ন তোলেন, তালিবান কীভাবে তাঁর মতো মেয়েদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে।
সেই সময় পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় তালিবানদের প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। মাওলানা ফজলুল্লাহর নেতৃত্বে তালিবানরা মেয়েদের পড়াশোনা, গান শোনা, টেলিভিশন দেখা এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপনের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। এমনকি মেয়েদের কেনাকাটা করতেও বাধা দেওয়া হতো। বহু স্কুল ধ্বংস করা হয় এবং এলাকাজুড়ে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
২০০৮ সালের শেষ দিকে বিবিসি উর্দু বিভাগের সাংবাদিকেরা সোয়াত উপত্যকার পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য স্থানীয় স্কুলছাত্রীদের দিয়ে ছদ্মনামে ব্লগ লেখানোর পরিকল্পনা করেন। প্রথমে কয়েকজন ছাত্রী রাজি হলেও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁরা পিছিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত মালালার বাবা জিয়াউদ্দিনের পরামর্শে মাত্র এগারো বছর বয়সে মালালা এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নিরাপত্তার কারণে মালালা ‘গুল মাকাই’ ছদ্মনামে ব্লগ লিখতে শুরু করেন। পশতুন লোককথার একটি চরিত্র থেকে এই নামটি নেওয়া হয়েছিল। তিনি হাতে লিখে নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা সাংবাদিকদের কাছে পাঠাতেন। পরে সেগুলি বিবিসি উর্দু ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হতো।
তাঁর লেখায় উঠে আসত যুদ্ধবিধ্বস্ত সোয়াতের মানুষের জীবন, মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, তালিবানদের ভয়াবহতা এবং শিক্ষার অধিকার হারানোর যন্ত্রণা। সামরিক অভিযান, গোলাগুলি ও সহিংসতার কারণে কীভাবে শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাত, তা তিনি নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন।
২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে তালিবানরা ঘোষণা করে যে ১৫ জানুয়ারির পর মেয়েরা স্কুলে যেতে পারবে না। এরই মধ্যে বহু স্কুল ধ্বংস করা হয়েছিল। মালালা তাঁর ব্লগে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া, সহপাঠীদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগের কথা লিখেছিলেন।
একটি লেখায় তিনি জানিয়েছিলেন, সামরিক হেলিকপ্টার ও তালিবানদের নিয়ে তিনি দুঃস্বপ্ন দেখতেন। স্কুলে যাওয়ার সময়ও তাঁর মনে ভয় কাজ করত। তালিবানদের নিষেধাজ্ঞার পর তাঁর স্কুলের বহু ছাত্রী অনুপস্থিত থাকত।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেও সোয়াতের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়েছিল, বহু দোকান বন্ধ ছিল এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে ছেলেদের কিছু স্কুল খুললেও মেয়েদের অনেক স্কুল বন্ধই থেকে যায়। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল।
তালিবান ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের কারণে সোয়াতের বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। মালালার পরিবারকেও নিজেদের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়। পড়াশোনার সুযোগ হারিয়ে মালালা গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, পড়ার মতো বই না থাকায় তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছিল।
সেই সময় মালালার বাবা তালিবানদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এবং মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর এই সাহসী ভূমিকার জন্য তিনি তালিবানদের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছিলেন। বাবার সংগ্রাম মালালাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। একসময় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা মালালা উপলব্ধি করেন, সমাজ ও দেশকে পরিবর্তন করতে হলে রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
২০০৯ সালের জুলাই মাসে সোয়াতের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে মালালার পরিবার আবার একত্রিত হয় এবং ২৪ জুলাই নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসে। বাড়ি ফেরার পথে মালালা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ প্রতিনিধি রিচার্ড হলব্রুকের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। সেখানে মালালা সোয়াতের শিশুদের শিক্ষার জন্য সাহায্য করার আবেদন জানান।
এরপর মালালা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করেন। তাঁর সাহসী বক্তব্য ও শিক্ষার পক্ষে নির্ভীক অবস্থান তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত খপল কোর ফাউন্ডেশনের জেলা শিশু পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে মেয়েদের ক্ষমতায়ন ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও মৃত্যুর হুমকি
মালালার জনপ্রিয়তা যত বাড়তে থাকে, তাঁর বিপদের আশঙ্কাও তত বৃদ্ধি পায়। মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে তাঁর বক্তব্য তালিবানদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাঁকে সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়।
২০১১ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু মালালাকে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন। মেয়েদের শিক্ষার অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং নিজের বক্তব্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরার জন্য তিনি এই স্বীকৃতি পান।
২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি মালালাকে জাতীয় যুব শান্তি পুরস্কার প্রদান করেন। মালালা পুরস্কার গ্রহণের পর জানান, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন; তবে শিক্ষার প্রসারের জন্য একটি জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ গড়ে তুলতে চান।
তাঁর অনুরোধে সোয়াতের একটি মহিলা ডিগ্রি কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর সম্মানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামকরণও করা হয়।
২০১২ সালের মধ্যে মালালা দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর জন্য একটি শিক্ষা তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তালিবানদের হুমকিও ক্রমশ বাড়তে থাকে। ২০১২ সালের গ্রীষ্মে তালিবান নেতারা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মালালা জানতেন, শিক্ষার অধিকারের পক্ষে কথা বলার কারণে তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে। তবু তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার এবং কোনো গোষ্ঠীরই সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকা উচিত নয়।
তালিবানের গুলিতে আহত
২০১২ সালের ৯ অক্টোবর মালালা ইউসুফজাইয়ের জীবনে এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। সোয়াত উপত্যকার স্কুলে পরীক্ষা দেওয়ার পর তিনি সহপাঠীদের সঙ্গে বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় একজন সশস্ত্র তালিবান সদস্য বাসে উঠে মালালাকে শনাক্ত করে গুলি চালায়। ওই হামলায় মালালার পাশাপাশি তাঁর দুই সহপাঠী কাইনাত রিয়াজ ও শাজিয়া রমজানও আহত হন।
মালালার মাথার কাছে গুলি লাগে এবং তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁকে প্রথমে পাকিস্তানের একটি সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে গুলি বের করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে রাওয়ালপিণ্ডির একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
মালালার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০১২ সালের ১৫ অক্টোবর তাঁকে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
এই হামলার খবর দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশের সরকার, মানবাধিকার সংস্থা, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরেও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। মেয়েদের শিক্ষার অধিকারের পক্ষে একটি আবেদনে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাক্ষর করেন।
পাকিস্তানের বিভিন্ন ধর্মীয় পণ্ডিত ও আলেমও হামলার নিন্দা করেন। ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর দেশটির ৫০ জন ইসলামি আলেমের একটি দল মালালাকে হত্যার চেষ্টার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে। সুন্নি ইত্তিহাদ কাউন্সিলের পণ্ডিতেরাও হামলাকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন।
তবে পাকিস্তানি তালিবানের মুখপাত্র এহসানউল্লাহ এহসান হামলার দায় স্বীকার করে মালালার বিরুদ্ধে উগ্রপন্থী বক্তব্য দেন। তালিবানরা তাদের কাজকে ধর্মীয় যুক্তি দিয়ে ন্যায্য প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও বিশ্বজুড়ে তাদের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে।
মালালার বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই ঘোষণা করেন, তাঁর মেয়ে বেঁচে থাকুক বা না থাকুক, তাঁরা নিজেদের দেশ ছেড়ে যাবেন না। তাঁদের আদর্শ শান্তি ও শিক্ষার পক্ষে। গুলি চালিয়ে কোনো স্বাধীন কণ্ঠকে চিরদিন স্তব্ধ করা যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি এই হামলাকে সভ্য মানুষের বিরুদ্ধে আক্রমণ বলে অভিহিত করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ বিশ্বের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ঘটনার নিন্দা জানান। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকেও হামলাটিকে বর্বরোচিত বলে উল্লেখ করা হয়।
সুস্থতা ও নতুন জীবনের সূচনা
দীর্ঘ চিকিৎসার পর মালালা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ২০১৩ সালের ৩ জানুয়ারি তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে বসবাস করতে থাকেন। তাঁর পুনর্বাসনের জন্য নিয়মিত ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা করা হয়।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর মাথার খুলির পুনর্গঠন ও শ্রবণশক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করেন।
তাঁকে হত্যার চেষ্টা বিশ্বজুড়ে শিক্ষার অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করে। পাকিস্তানে শিশুদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিও আরও জোরালো হয়। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের জন্য পাকিস্তান সরকার পুরস্কার ঘোষণা করে।
এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা মালালার মনোবল ভেঙে দিতে পারেনি। বরং তিনি আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি হলো শিক্ষা, শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ।
জাতিসংঘে ঐতিহাসিক ভাষণ
২০১৩ সালের ১২ জুলাই, নিজের ষোড়শ জন্মদিনে, মালালা জাতিসংঘের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাপী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তালিবানের হামলার পর জনসমক্ষে সেটিই ছিল তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা তাঁর লক্ষ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা বদলে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের আক্রমণ তাঁকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না; বরং প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে চান।
মালালা তাঁর ভাষণে শুধু মেয়েদের নয়, তালিবান ও অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর ছেলে-মেয়েদেরও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলেন। তাঁর মতে, অজ্ঞতা ও ঘৃণার বিরুদ্ধে লড়াই করার সর্বোত্তম উপায় হলো শিক্ষা।
এই ভাষণের দিনটি জাতিসংঘ ‘মালালা দিবস’ হিসেবে পালন করে। মালালা স্পষ্ট করে জানান, এই দিন শুধু তাঁর নিজের নয়; বরং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়াজ তোলা সব শিশু ও তরুণের দিন।
তাঁর বক্তব্য বিশ্বজুড়ে বিপুল সাড়া ফেলে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন তাঁকে একজন নায়ক হিসেবে বর্ণনা করেন।
‘আই অ্যাম মালালা’ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম
২০১৩ সালে মালালা ইউসুফজাই ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস্টিনা ল্যাম্বের সহযোগিতায় তাঁর আত্মজীবনী ‘আই অ্যাম মালালা’ প্রকাশ করেন। বইটিতে তাঁর শৈশব, সোয়াত উপত্যকার সংঘাত, তালিবানের দমননীতি, শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং তাঁকে হত্যার চেষ্টার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
বইটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং বিভিন্ন দেশে সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় স্থান পায়। বইটির একটি কিশোরপাঠ্য সংস্করণও প্রকাশিত হয়।
২০১৫ সালে ‘হি নেমড মি মালালা’ নামে মালালার জীবনভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশিত হয়। ছবিটি তাঁর জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এটি অস্কারের সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল।
২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর মালালা ‘ম্যাজিক পেন্সিল’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। বইটিতে একটি জাদুকরী পেনসিলের কল্পনার মাধ্যমে পৃথিবীকে আরও সুন্দর ও মানবিক করে তোলার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে তিনি শরণার্থীদের জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘উই আর ডিসপ্লেসড: ট্রু স্টোরিজ অব রিফিউজি লাইভস’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে বাস্তুচ্যুত মানুষের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিজের জীবনের কিছু অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার
শিশু ও তরুণদের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সব শিশুর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে মালালা ইউসুফজাই নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ভারতের শিশু অধিকারকর্মী কৈলাস সত্যার্থীর সঙ্গে তিনি এই পুরস্কারের সহ-প্রাপক ছিলেন।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কার লাভ করে মালালা ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী হিসেবে পরিচিত হন। পাকিস্তানের পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামের পর তিনি দেশটির দ্বিতীয় নোবেলজয়ী হিসেবেও স্বীকৃতি পান।
নোবেল পুরস্কার লাভের মাধ্যমে মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রাম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।
তবে তাঁর নোবেল পুরস্কার লাভ নিয়ে কিছু সমালোচনাও হয়েছিল। নরওয়ের বিচারক ফ্রেডরিক হেফারমেল মনে করতেন, নোবেল শান্তি পুরস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্বকে নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তির পথে এগিয়ে নেওয়া। তা সত্ত্বেও মালালার শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক সমর্থন পায়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা
মালালা ইউসুফজাই শুধু পাকিস্তানের মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নিয়েই কাজ করেননি; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশু, নারী ও শরণার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষেও সোচ্চার হয়েছেন।
২০১৩ সালের জুলাই মাসে তিনি জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার পর ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই বছর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অক্সফোর্ড ইউনিয়নেও তিনি বক্তব্য দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় পাকিস্তানে ড্রোন হামলার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ে, তা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
২০১৪ সালে তিনি গাজা উপত্যকার স্কুল পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থসাহায্য দেন। একই বছর লন্ডনে বালিকা সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন এবং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
২০১৫ সালের ১২ জুলাই, নিজের অষ্টাদশ জন্মদিনে, তিনি লেবাননের বেকা উপত্যকায় সিরীয় শরণার্থী মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় উদ্বোধন করেন। মালালা ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত এই বিদ্যালয়ে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে শিক্ষাবঞ্চিত মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধেও মালালা বারবার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ২০১৫ সালে তিনি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, সমান অধিকার ও সমান সুযোগের পক্ষে বক্তব্য দেন। ২০১৭ সালেও তিনি রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা বন্ধ করার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান এবং অং সান সু চির ভূমিকার সমালোচনা করেন।
২০১৯ সালে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহার করার পর মালালা কাশ্মীরে শান্তি ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মালালা বিশ্বাস করেন, শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির উপায় নয়; এটি বৈষম্য, দারিদ্র্য, সহিংসতা ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
রাজনীতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
মালালা ইউসুফজাই একসময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বেনজির ভুট্টোর রাজনৈতিক জীবন থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, সরকারে যোগ দিয়ে বা প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তবে ২০১৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, রাজনৈতিক পদে আসীন হওয়াই সমাজে পরিবর্তন আনার একমাত্র উপায় নয়। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সামাজিক পরিবর্তন আনার আরও অনেক পথ রয়েছে।
মালালা রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে শিক্ষা, মানবাধিকার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে থাকেন।
পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন
তালিবানের হামলার পর দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস করার পর মালালা ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ প্রথমবারের মতো পাকিস্তানে ফিরে আসেন। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে নিজের জন্মস্থান সোয়াত উপত্যকার মিঙ্গোরাও পরিদর্শন করেন।
পাকিস্তানে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল আবেগপূর্ণ একটি ঘটনা। তিনি জানান, ভয়মুক্ত পরিবেশে নিজের দেশে ফিরে আসা তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। একই সঙ্গে তিনি নিজের ধর্ম ও দেশের প্রতি ভালোবাসার কথাও প্রকাশ করেন।
তবে পাকিস্তানে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে মতভেদ ছিল। তালিবানবিরোধী অবস্থান এবং শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে তাঁর আন্তর্জাতিক প্রচার কিছু মহলে সমালোচিত হয়। ২০১৫ সালে পাকিস্তানের একটি বেসরকারি স্কুল সংগঠন ‘আই অ্যাম মালালা’ বইটির বিরোধিতা করে এবং ‘আই অ্যাম নট মালালা’ শীর্ষক প্রচারাভিযান চালায়।
শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা
সারা বিশ্বে পরিচিতি অর্জন করলেও মালালা নিজের পড়াশোনা অব্যাহত রেখেছিলেন। ২০১৩ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি বার্মিংহামের এজবাস্টন হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন।
২০১৫ সালের আগস্টে তিনি জিসিএসই পরীক্ষায় ছয়টি এ-স্টার এবং চারটি এ গ্রেড অর্জন করেন বলে উল্লেখ করা হয়। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তিনি ভূগোল, ইতিহাস, গণিত ও ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে পড়াশোনা করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লেডি মার্গারেট হলের শিক্ষার্থী হিসেবে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ২০২০ সালে তিনি এই বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা
মালালা ইউসুফজাই তাঁর সাহস, মানবিকতা এবং শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতিগুলির মধ্যে রয়েছে—
- ২০১১: আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন এবং পাকিস্তানের জাতীয় যুব শান্তি পুরস্কার।
- ২০১২: পাকিস্তানের সিতারা-ই-শুজাতসহ বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক স্বীকৃতি।
- ২০১৩: ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাখারভ পুরস্কার, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অ্যাম্বাসাডর অব কনসায়েন্স পুরস্কার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মাননা।
- ২০১৪: কৈলাস সত্যার্থীর সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার, ফিলাডেলফিয়া লিবার্টি মেডেল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
- ২০১৪: কানাডার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব।
- ২০১৫: তাঁর সম্মানে একটি গ্রহাণুর নামকরণ করা হয়।
- ২০১৬: শিশুদের অধিকার ও মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননা।
- ২০১৭: জাতিসংঘের সর্বকনিষ্ঠ শান্তির দূত হিসেবে নিযুক্তি এবং অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি।
- ২০১৮: হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের গ্লিটসম্যান পুরস্কার।
- ২০২০: তাঁর নামে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু হয়।
এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মানবাধিকার সংস্থা, সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অসংখ্য পুরস্কার, সম্মাননা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন।
উপসংহার
মালালা ইউসুফজাইয়ের জীবন সাহস, অধ্যবসায় ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শৈশবেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং এই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও তিনি মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে কথা বলেছেন এবং তালিবানের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পরও নিজের আদর্শ থেকে সরে আসেননি।
তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে শান্তি, ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা এবং অজ্ঞতার পরিবর্তে শিক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর সংগ্রাম বিশ্বের অসংখ্য শিশু ও তরুণকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাহসী হতে অনুপ্রাণিত করেছে।
মালালার জীবন আমাদের শেখায়, একজন মানুষের দৃঢ় সংকল্পও পৃথিবীতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তাঁর বিশ্বাস ও সংগ্রামের মূল বার্তা হলো—প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার রয়েছে, আর একটি বই ও একটি কলমও সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। •

নোবেল বিজয়ী আজিজ সানকার
আজিজ সানকার একজন বিশ্বখ্যাত তুর্কি-আমেরিকান বিজ্ঞানী। ডিএনএ মেরামত-সংক্রান্ত গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০১৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর গবেষণা জীবকোষের জিনগত উপাদান কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কীভাবে সেই ক্ষতি মেরামত করে জীবদেহকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
আজিজ সানকারের জন্ম ১৯৪৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের মারদিন প্রদেশের সাভুর শহরে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। তাঁর বাবার নাম আব্দুল গণি এবং মায়ের নাম মরিয়ম সানকার। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম সন্তান। ছোটবেলায় তিনি বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে আরবি ভাষায় এবং ভাইবোনদের সঙ্গে তুর্কি ভাষায় কথা বলতেন।
তাঁর বড় ভাই কেনান সানকার তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন। রাজনীতিবিদ মিঠাত সানকারের সঙ্গেও তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়।
হাইস্কুলে পড়ার সময় আজিজ সানকার ফুটবলের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। একসময় তিনি পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর আগ্রহ অনুভব করে তিনি ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করেন এবং পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন।
শিক্ষাজীবন
আজিজ সানকারের বাবা-মা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ না করলেও সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। সানকারের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় তাঁর নিজের শহর সাভুরে। শৈশব থেকেই তিনি কয়েকজন আদর্শ শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি স্বীকার করেছেন, এই শিক্ষকেরাই তাঁর অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস ছিলেন।
বিদ্যালয়জীবনে তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। হাইস্কুলে পড়ার সময় রসায়নের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৬৯ সালে সেখান থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সূচনা
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জনের পর আজিজ সানকার নিজের শহর সাভুরে ফিরে আসেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমে তাঁকে নিজ অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী তিনি সাভুর অঞ্চলের একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় দেড় বছর চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন।
পরবর্তী সময়ে তুরস্কের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত গবেষণা পরিষদ—টুবিটাকের বৃত্তি লাভ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈবরসায়ন অধ্যয়ন শুরু করেন। কিন্তু সামাজিক পরিবেশ ও আমেরিকান জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অসুবিধা হওয়ায় প্রায় দেড় বছর পর তিনি তুরস্কে ফিরে আসেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রথম দিকে তিনি মূলত ফরাসি ভাষায় কথা বলতেন। পরে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।
ডিএনএ মেরামত নিয়ে গবেষণা
আজিজ সানকারের বৈজ্ঞানিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ডিএনএ মেরামত-প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা। ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য বহন করে। বিভিন্ন কারণে, বিশেষত অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে, ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জীবকোষের বিশেষ কিছু এনজাইম এই ক্ষতি শনাক্ত করে মেরামত করতে সাহায্য করে।
সানকার আণবিক জীববিজ্ঞানে পিএইচডি করার আগ্রহ প্রকাশ করে বিজ্ঞানী ক্লদ স্ট্যান রুপার্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর আবেদন গৃহীত হলে তিনি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডালাস ক্যাম্পাসে রুপার্টের তত্ত্বাবধানে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইশেরিশিয়া কোলাই বা ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার আলোক-নির্ভর ডিএনএ মেরামত-প্রক্রিয়া। অতিবেগুনি রশ্মির কারণে ডিএনএতে থাইমিন ডাইমার নামের ক্ষতিকর গঠন তৈরি হতে পারে। নির্দিষ্ট এনজাইম নীল আলোর শক্তি ব্যবহার করে এই ক্ষতি মেরামত করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে ফটোরিঅ্যাক্টিভেশন বলা হয়।
সানকার এই আলোক-নির্ভর মেরামত-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত জিন শনাক্ত করতে এবং তার কার্যপদ্ধতি বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা
পিএইচডি শেষ করার পর সানকার পোস্টডক্টরাল গবেষণার জন্য তিনবার আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হন। পরে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষাগার-প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি প্রায় পাঁচ বছর গবেষণা করেন।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণার প্রধান বিষয় ছিল নিউক্লিওটাইড এক্সিশন রিপেয়ার বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ অপসারণের মাধ্যমে ডিএনএ মেরামত-প্রক্রিয়া। এই পদ্ধতিতে ডিএনএর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ শনাক্ত করে কেটে বাদ দেওয়া হয় এবং পরে সেই অংশের শূন্যস্থান পূরণ করা হয়।
সানকার এই প্রক্রিয়ার আণবিক কার্যপদ্ধতি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি দেখান, ইউভিআরএ, ইউভিআরবি ও ইউভিআরসি প্রোটিনসমন্বিত ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ শনাক্ত করতে এবং নির্দিষ্ট স্থানে কাটতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যাকটেরিয়ায় এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশের আশপাশে ডিএনএ কেটে সাধারণত প্রায় ১২ থেকে ১৩টি নিউক্লিওটাইডের একটি অংশ অপসারণ করা হয়। এরপর নতুন করে ডিএনএ সংশ্লেষণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি মেরামত করা হয়।
এই গবেষণা ডিএনএ মেরামতের আণবিক প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা
ডিএনএ মেরামত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার পর আজিজ সানকার যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাপেল হিল ক্যাম্পাসে শিক্ষকতা ও গবেষণার সুযোগ লাভ করেন। সেখানে তিনি জৈবরসায়ন ও জীবপদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন।
নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন যে ইংরেজি ভাষায় তাঁর উচ্চারণের ধরন প্রথম দিকে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধা সৃষ্টি করেছিল। তা সত্ত্বেও তিনি অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে গবেষণা চালিয়ে যান।
চ্যাপেল হিলে তিনি ব্যাকটেরিয়ায় নিউক্লিওটাইড এক্সিশন রিপেয়ার-প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ নিয়ে গবেষণা করেন। একই সঙ্গে মানুষের কোষে এই মেরামত-ব্যবস্থার আরও জটিল রূপ সম্পর্কেও অনুসন্ধান চালান। তাঁর গবেষণা থেকে জানা যায়, মানুষের কোষেও ডিএনএর ক্ষতি শনাক্ত ও মেরামত করার জন্য অত্যন্ত সুসংগঠিত ব্যবস্থা রয়েছে।
জৈবিক ঘড়ি ও সার্কাডিয়ান ছন্দ নিয়ে গবেষণা
আজিজ সানকারের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো ফটোলায়েজ, ফটোরিঅ্যাক্টিভেশন এবং জীবদেহের জৈবিক ঘড়ি।
জীবদেহের অনেক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম দিন-রাতের প্রায় ২৪ ঘণ্টার চক্র অনুসরণ করে। এই চক্রকে সার্কাডিয়ান ছন্দ বলা হয়। ঘুম, জাগরণ, হরমোন নিঃসরণ এবং বিপাকীয় কার্যক্রমের সঙ্গে এই জৈবিক ঘড়ির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
সানকার ও তাঁর গবেষক দল ক্রিপ্টোক্রোম প্রোটিনের কার্যক্রম এবং মানবদেহের সার্কাডিয়ান ঘড়ির সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। তাঁদের গবেষণা থেকে জীবকোষের জৈবিক ছন্দ নিয়ন্ত্রণের আণবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আরও সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেন।
এই গবেষণার ফলাফল ঘুমের সমস্যা, জেট ল্যাগ, ঋতুভিত্তিক মানসিক অবসাদ এবং ক্যানসারের মতো রোগের সঙ্গে জৈবিক ঘড়ির সম্ভাব্য সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব রোগের চিকিৎসায় এই গবেষণার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
অধ্যাপনা, পারিবারিক জীবন ও তুর্কি সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক
২০০৫ সালে আজিজ সানকার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাপেল হিল ক্যাম্পাসে জৈবরসায়ন ও জীবপদার্থবিজ্ঞান বিভাগে সারাহ গ্রাহাম কেনান অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৭৮ সালে তিনি গিউর বোলেস সানকারকে বিয়ে করেন। তাঁদের পরিচয় হয়েছিল ডালাসে পিএইচডি করার সময়। গিউর বোলেসও আণবিক জীববিজ্ঞানে অধ্যয়ন ও গবেষণা করেছিলেন।
তাঁরা দুজনে মিলে নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাপেল হিল ক্যাম্পাসের কাছে তুর্কি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য একটি আবাসন ও সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তুরস্ক থেকে আসা স্নাতক পর্যায়ের গবেষকদের থাকার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তুর্কি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের স্বল্পমেয়াদি আতিথেয়তার ব্যবস্থাও করা হয়।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে তুর্কি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের শিক্ষাগত এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ জোরদার করার চেষ্টা করেছেন।
নোবেল পুরস্কার ও অন্যান্য সম্মাননা
২০১৫ সালে আজিজ সানকার ডিএনএ মেরামত-সংক্রান্ত গবেষণার জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর এই পুরস্কারের অন্য দুই ভাগীদার ছিলেন টমাস লিন্ডাল ও পল মডরিচ। জীবকোষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামত করে এবং জিনগত তথ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, তা বোঝার ক্ষেত্রে তাঁদের গবেষণা বিশেষ অবদান রেখেছে।
১৯৮৪ সালে সানকার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্সিয়াল ইয়ং ইনভেস্টিগেটর পুরস্কার লাভ করেন। এই পুরস্কারের মাধ্যমে তরুণ বিজ্ঞানীদের গবেষণাকাজে উৎসাহ দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে এই কর্মসূচির পরিবর্তে অন্য গবেষণা-সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হয়।
আজিজ সানকার ২০০৫ সালে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক সমাজেও বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনি তুরস্কের বিজ্ঞানচর্চা ও আন্তর্জাতিক গবেষণাক্ষেত্রে একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
জাতীয় পরিচয় ও আত্মপরিচয়
নোবেল পুরস্কার লাভের পর আজিজ সানকারের জাতিগত পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। তাঁর পারিবারিক পটভূমি এবং ভাষাগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি নিজের তুর্কি পরিচয়ের ওপর জোর দেন। বিবিসির একটি সাক্ষাৎকারে তাঁকে তুর্কি না অর্ধ-আরব—এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। উত্তরে তিনি বলেন, তিনি আরবি বা কুর্দি ভাষায় কথা বলেন না, তবে তিনি একজন তুর্কি।
তাঁর ভাই তাহির সানকার এক সাক্ষাৎকারে তাঁদের পরিবারের পূর্বপুরুষদের মধ্য এশিয়ার ওঘুজ তুর্কি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, আজিজ সানকারের নোবেল পুরস্কার তুরস্কের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য গর্বের বিষয়।
অন্য এক সাক্ষাৎকারে আজিজ সানকার তাঁর যৌবনের জাতীয়তাবাদী মনোভাবের কথা উল্লেখ করলেও জানান যে তিনি কোনো জাতীয়তাবাদী কার্যক্রমে অংশ নেননি।
নোবেল পদক দান
আজিজ সানকার তাঁর নোবেল পুরস্কারের স্বর্ণপদক ও প্রশংসাপত্রের মূল কপি ২০১৬ সালের ১৯ মে তুরস্কের জাতির জনক মোস্তাফা কামাল আতাতুর্কের সমাধিতে দান করেন। দিনটি ছিল আতাতুর্কের জন্মবার্ষিকীর ৯৭তম বছর। তাঁর এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া তিনি তাঁর নোবেল পদক ও প্রশংসাপত্রের একটি প্রতিলিপি ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদান করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাঁর জীবনের এই পদক্ষেপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাতৃভূমির প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মানবকল্যাণে বিজ্ঞানচর্চার অবদান
আজিজ সানকারের জীবন অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং জ্ঞানসাধনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানজগতে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা তাঁর অসাধারণ সাফল্যের পরিচায়ক।
ডিএনএ মেরামত-প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ক্যানসার-গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর কাজ বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করেছে, কীভাবে জীবকোষ জিনগত ক্ষতি মোকাবিলা করে এবং কীভাবে এই প্রক্রিয়ার ত্রুটি বিভিন্ন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি, প্রতিকূলতা যতই থাকুক না কেন, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আজিজ সানকারের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। তাঁর গবেষণা ও জীবনাদর্শ আগামী প্রজন্মের বিজ্ঞানসাধকদের অনুপ্রেরণা জোগাক এই প্রত্যাশা করছি।•
–সমাপ্ত–

