
“ডক্টর জেকিল ও মিস্টার হাইডের অদ্ভুত
কাহিনি”
লেখক-রবার্ট লুই স্টিভেনসন।
দরজার গল্প
— ১ —
আইনজীবী মি. আটারসন এমন একজন লোক ছিলেন, যার কঠোর মুখমণ্ডলকে কখনো হাসির আলোয় উজ্জ্বল হতে দেখা যেত না। কথাবার্তায় তিনি ছিলেন শীতল, সংক্ষিপ্ত এবং কিছুটা জড়তাগ্রস্ত; আবেগ-অনুভূতির প্রকাশে ছিলেন অত্যন্ত সংযত। রোগা, লম্বা, ধুলো-মলিন, বিষণ্ণ চেহারার এই মানুষটির মধ্যে তবু কী এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল, যা তাঁকে সকলের প্রিয় করে তুলেছিল।
বন্ধুদের সঙ্গে মিলনমেলায়, আর বিশেষ করে যখন তাঁর পছন্দমতো মদ সামনে থাকত, তখন তাঁর চোখের দৃষ্টিতে এক গভীর মানবিকতার ঝলক দেখা দিত। সেই মানবিকতা তাঁর কথাবার্তায় কখনো প্রকাশ পেত না; বরং নৈশভোজের পর তাঁর নীরব মুখভঙ্গির মধ্য দিয়ে যেমন প্রকাশ পেত, তার চেয়েও বেশি এবং জোরালোভাবে তা ফুটে উঠত তাঁর জীবনযাপনের কাজে।
নিজের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও সংযমী। একা থাকলে ভালো মানের মদের প্রতি নিজের আসক্তি কমানোর জন্য তিনি জিন পান করতেন। নাটক দেখতে তাঁর ভালো লাগত, কিন্তু গত বিশ বছর ধরে তিনি কোনো নাট্যশালার দরজাও পেরোননি।
অন্যদের ব্যাপারে অবশ্য তাঁর সহনশীলতা ছিল প্রশংসনীয়। কখনো কখনো তিনি প্রায় ঈর্ষার সঙ্গেই ভাবতেন—মানুষের দুষ্কর্মের পেছনে কীরকম প্রবল আবেগ ও উত্তেজনা কাজ করে! আর কেউ কোনো বিপদের চরম অবস্থায় পড়লে, তাকে ভর্ৎসনা করার চেয়ে সাহায্য করতেই তিনি বেশি আগ্রহী হতেন।তিনি প্রায়ই একটু অদ্ভুত ভঙ্গিতে বলতেন-আমি কেইনের মতবাদেরই অনুসারী। আমার ভাইকে আমি নিজের মতো করে নরকের পথে যেতে দিই।
এই স্বভাবের কারণেই অনেক সময় অধঃপতনের পথে এগিয়ে যাওয়া মানুষের জীবনে শেষ সম্মানিত পরিচিত ব্যক্তি এবং শেষ ভালো প্রভাব হিসেবে মি. আটারসনের উপস্থিতি দেখা যেত। আর এই ধরনের লোকেরা যতদিন তাঁর চেম্বারে আসত, ততদিন তাঁদের প্রতি তাঁর আচরণে সামান্যতম পরিবর্তনও দেখা যেত না।
নিশ্চয়ই এই কাজটি মি. আটারসনের পক্ষে সহজ ছিল। কারণ, সব অবস্থাতেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত ও ভাবলেশহীন। এমনকি তাঁর বন্ধুত্বও যেন একই রকম উদার ও সর্বগ্রাহী সদয়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
একজন বিনয়ী মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো—সুযোগের হাত ধরে যে বন্ধুমহল তৈরি হয়ে যায়, সে সেটিকেই সহজভাবে নিজের বন্ধুমহল হিসেবে গ্রহণ করে। আইনজীবীও ঠিক তেমনই ছিলেন। তাঁর বন্ধুরা হয় তাঁর আত্মীয়স্বজন, নয়তো যাঁদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ছিলেন।
তাঁর স্নেহ-ভালোবাসাও ছিল অনেকটা আইভি লতার মতো—সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠত; সেই ভালোবাসার পেছনে প্রিয় ব্যক্তিটির বিশেষ কোনো গুণ থাকা অপরিহার্য ছিল না। সম্ভবত এ কারণেই তাঁর দূরসম্পর্কের আত্মীয়, শহরের সুপরিচিত মানুষ মি. রিচার্ড এনফিল্ডের সঙ্গে তাঁর এত গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। এই দুই মানুষের মধ্যে এমন কী মিল ছিল, অথবা তাঁরা একে অপরের মধ্যে কী দেখতে পেতেন—এটা অনেকের কাছেই ছিল এক দুর্বোধ্য রহস্য।
যাঁরা রবিবার তাঁদের একসঙ্গে হাঁটতে দেখেছেন, তাঁদের কাছ থেকে শোনা যেত—দুজন প্রায় কোনো কথাই বলতেন না, তাঁদের দুজনকেই অস্বাভাবিক রকমের নিরস মনে হতো, আর কোনো পরিচিত বন্ধুর দেখা পেলেই তাঁরা যেন স্পষ্ট স্বস্তি অনুভব করতেন।
তা সত্ত্বেও, এই দুজন মানুষ তাঁদের এই সাপ্তাহিক হাঁটাহাঁটিকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করতেন। প্রতি সপ্তাহের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিল এই ভ্রমণ। শুধু আনন্দের অন্যান্য সুযোগই তাঁরা এড়িয়ে যেতেন না, এমনকি কাজের জরুরি ডাকও উপেক্ষা করতেন, যাতে তাঁদের এই হাঁটাহাঁটি কোনো বাধা ছাড়াই উপভোগ করতে পারেন।
একদিন এমনই এক রবিবারের হাঁটাহাঁটিতে তাঁদের পথ লন্ডনের ব্যস্ত এলাকার একটি ছোট গলির দিকে চলে গেল।
রাস্তাটি ছিল ছোট এবং যাকে বলা যায় শান্ত; কিন্তু সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে সেখানে বেশ জমজমাট ব্যবসা চলত। মনে হতো, এখানকার সব বাসিন্দাই বেশ ভালো অবস্থায় আছেন এবং প্রত্যেকেই যেন অন্যের চেয়ে আরও ভালো করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। নিজেদের উপার্জনের অতিরিক্ত অর্থ তাঁরা দোকানপাট ও ব্যবসার সাজসজ্জায় ব্যয় করতেন। ফলে রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দোকানের সামনের অংশ এমন এক আমন্ত্রণময় চেহারা ধারণ করেছিল, যেন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা বিক্রয়কর্মীদের সারি।
রবিবারে, যখন দোকানপাটের চাকচিক্য কিছুটা ঢাকা পড়ত এবং পথচারীর আনাগোনা তুলনামূলকভাবে কমে যেত, তখনও এই রাস্তা তার আশপাশের মলিন এলাকার মধ্যে অদ্ভুতভাবে উজ্জ্বল হয়ে থাকত—যেন ঘন অরণ্যের মধ্যে হঠাৎ জ্বলে ওঠা আগুন।
নতুন করে রং করা জানালার পাল্লা, ঝকঝকে পালিশ করা পিতলের হাতল ও অন্যান্য ধাতব অংশ এবং সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা ও প্রাণবন্ত পরিবেশ পথচারীর চোখকে মুহূর্তেই আকর্ষণ করত।
রাস্তার এক কোণ থেকে পূর্বদিকে যেতে বাম পাশে দুটো দরজা পার হওয়ার পর একটি প্রবেশপথের কারণে রাস্তার সারি হঠাৎ ভেঙে গিয়েছিল। ঠিক সেই জায়গাতেই একটি অশুভ চেহারার ভবনের অংশ তার সামনের ত্রিভুজাকার দেওয়ালটি রাস্তার দিকে ঠেলে বের করে রেখেছিল।
বাড়িটি ছিল দোতলা। তাতে কোনো জানালা দেখা যেত না। নিচতলায় ছিল শুধু একটি দরজা, আর ওপরতলায় ছিল বিবর্ণ হয়ে যাওয়া দেওয়ালের একটি অন্ধ, নিষ্প্রাণ অংশ। ভবনটির প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নোংরা-জীর্ণ অবস্থার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
দরজাটিতে কোনো ঘণ্টা ছিল না, এমনকি কড়াও ছিল না। দরজাটি ছিল ফোস্কা-পড়া, দাগে-ছোপে নোংরা। ভবঘুরেরা দরজার ভেতরের খোপে ঢুকে দরজার পাটাতনে দেশলাইয়ের কাঠি ঘষে আগুন জ্বালাত। শিশুরা দরজার সিঁড়িতে বসে দোকানদারি করার খেলা খেলত। আর স্কুলের ছেলেটি ছুরি দিয়ে দরজার কাঠের কারুকাজে আঁচড় কাটার চেষ্টা করেছিল। এবং প্রায় এক প্রজন্ম ধরে এমন কেউই সেখানে দেখা যায়নি, যে এইসব উটকো আগন্তুকদের তাড়িয়ে দেবে কিংবা তাদের করা ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করবে।
মি. এনফিল্ড এবং উকিল তখন সেই গলির অন্য পাশে ছিলেন। কিন্তু দরজাটির কাছাকাছি এসে মি. এনফিল্ড তাঁর ছড়িটি তুলে দরজাটির দিকে ইঙ্গিত করলেন।
“আপনি কি কখনও ওই দরজাটি লক্ষ করেছেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
সঙ্গী সম্মতিসূচক উত্তর দিলে তিনি বললেন- “এই দরজাটির সঙ্গে আমার মনে একটি অদ্ভুত গল্প জড়িয়ে আছে।”
“তাই?” মি. আটারসন সামান্য স্বর বদলে বললেন, “গল্পটি কী?”
“ঘটনাটা এই রকম,” মি. এনফিল্ড বললেন। “একদিন পৃথিবীর যেন শেষ প্রান্তে অবস্থিত কোনো এক জায়গা থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। তখন শীতের এক অন্ধকার রাত, প্রায় ভোররাত তিনটে। আমাকে শহরের এমন একটি অংশ দিয়ে যেতে হচ্ছিল, যেখানে রাস্তার বাতি ছাড়া আক্ষরিক অর্থেই আর কিছুই চোখে পড়ছিল না। একটার পর একটা রাস্তা—সবাই ঘুমিয়ে আছে। রাস্তার পর রাস্তা আলোয় ঝলমল করছে, যেন কোনো শোভাযাত্রার জন্য সাজানো হয়েছে, অথচ সবকিছুই ছিল গির্জার মতো নিস্তব্ধ ও জনশূন্য।
শেষ পর্যন্ত আমার এমন একটা মানসিক অবস্থা হলো যে, আমি চারপাশের শব্দ শোনার জন্য কান পেতে পেতে একজন পুলিশকর্মীকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। ঠিক তখনই হঠাৎ দুজন মানুষকে দেখতে পেলাম। একজন ছিল ছোটখাটো এক লোক, বেশ দ্রুত পায়ে পূর্বদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর অন্যজন ছিল আট-দশ বছরের মতো একটি মেয়ে, যে একটি আড়াআড়ি রাস্তা দিয়ে যত জোরে সম্ভব দৌড়ে আসছিল।
স্বাভাবিকভাবেই রাস্তার মোড়ে দুজনের ধাক্কা লাগল। কিন্তু এরপর যা ঘটল, সেটাই ছিল ভয়াবহ। লোকটি একেবারে নির্বিকারভাবে মেয়েটির শরীরের ওপর দিয়ে পা মাড়িয়ে চলে গেল এবং তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে গেল—মেয়েটি তখন চিৎকার করে কাঁদছিল।
শুনতে হয়তো ঘটনাটি তেমন ভয়াবহ মনে হবে না, কিন্তু নিজের চোখে দেখাটা ছিল নরকের দৃশ্য। ওটা কোনো মানুষের আচরণ ছিল না; মনে হচ্ছিল যেন কোনো অভিশপ্ত জগন্নাথ রথ মানুষের ওপর দিয়ে চলে গেল।
আমি কয়েকবার জোরে চিৎকার করে উঠলাম, তারপর দৌড়ে গিয়ে লোকটির জামার কলার ধরে ফেললাম এবং যেখানে তখন ইতিমধ্যে ওই চিৎকাররত মেয়েটিকে ঘিরে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়ে গিয়েছিল, সেখানে তাকে টেনে নিয়ে এলাম।
লোকটি একেবারেই ঠান্ডা মাথায় ছিল এবং কোনো প্রতিরোধও করল না। কিন্তু সে আমার দিকে এমন কুৎসিত দৃষ্টিতে একবার তাকাল যে, দৌড়ানোর ফলে যতটা ঘাম হয়, তার চেয়েও বেশি ঘাম আমার শরীর থেকে বেরিয়ে এল।
যারা সেখানে জড়ো হয়েছিল, তারা ছিল মেয়েটির নিজের পরিবারের লোকজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ডাক্তারও এসে হাজির হলেন, যার কাছে মেয়েটিকে পাঠানো হয়েছিল। ডাক্তারের মতে, মেয়েটির তেমন গুরুতর কিছু হয়নি; সে শুধু খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তখন মনে হতে পারে, এখানেই বুঝি ঘটনার শেষ।
কিন্তু একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছিল।
প্রথম দেখাতেই ওই লোকটির প্রতি আমার মনে তীব্র ঘৃণা জন্মেছিল। মেয়েটির পরিবারের লোকজনেরও একই অনুভূতি হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ডাক্তারটির আচরণ আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল।
তিনি ছিলেন একেবারে গতানুগতিক, নিরস ধরনের ওষুধের ডাক্তার—বয়স বা চেহারায় বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। তাঁর কথায় ছিল প্রবল এডিনবরার উচ্চারণ, আর আবেগপ্রকাশের ক্ষমতা ছিল যেন ব্যাগপাইপের মতোই নিস্তেজ।
কিন্তু স্যার, তিনিও আমাদের মতোই অনুভব করছিলেন। যখনই তিনি আমার ধরে রাখা লোকটির দিকে তাকাচ্ছিলেন, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম—লোকটিকে হত্যা করার ইচ্ছায় তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে এবং তিনি অসুস্থের মতো বমি-বমি ভাব অনুভব করছেন।
আমি বুঝতে পারছিলাম তাঁর মনে কী চলছে, যেমন তিনিও বুঝতে পারছিলেন আমার মনে কী চলছে। কিন্তু হত্যা করা তো সম্ভব ছিল না। তাই তার পরের সবচেয়ে ভালো কাজটিই আমরা করলাম।
আমরা লোকটিকে জানিয়ে দিলাম যে, এই ঘটনার এমন কেলেঙ্কারি আমরা করতে পারি এবং করব, যাতে লন্ডনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত তার নাম ঘৃণার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। যদি তার কোনো বন্ধু থাকে, কোনো সামাজিক মর্যাদা বা প্রভাব থাকে, সেসবও আমরা নষ্ট করে দেব—এমন হুমকিও দিলাম।
আর আমরা যখন প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে তাকে এসব কথা শোনাচ্ছিলাম, তখন মেয়েটির পরিবারের মহিলাদের তার কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখছিলাম। কারণ তারা তখন যেন হিংস্র হ্যার্পি পাখির মতো হয়ে উঠেছিল।
আমি এত ঘৃণায় ভরা মুখের সমাবেশ জীবনে আর কখনও দেখিনি। আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই লোকটি—তার মুখে ছিল এক ধরনের কালো, বিদ্রূপময় শীতলতা। ভয় যে সে পায়নি তা নয়—সেটা অবশ্যে আমি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু সে ভয়টাকে এমনভাবে সামলে রাখছিল, যেন সত্যিই সে শয়তান।
সে বলল, ‘আপনারা যদি এই দুর্ঘটনাটিকে কাজে লাগিয়ে লাভ করতে চান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমার কিছু করার নেই। কোনো ভদ্রলোকই তো এমন একটা কেলেঙ্কারি এড়াতে চাইবেন। বলুন, কত টাকা চান?’
শেষ পর্যন্ত আমরা মেয়েটির পরিবারের জন্য একশো পাউন্ড দিতে তাকে রাজি করিয়ে ফেললাম। বোঝাই যাচ্ছিল, সে প্রথমে কিছুতেই রাজি হতে চাইছিল না। কিন্তু আমাদের সকলের মধ্যে এমন একটা উত্তেজনা ছিল, যা থেকে যে কোনো মুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে—এটা সে বুঝেছিল। তাই শেষ পর্যন্ত সে রাজি হয়ে গেল।
এরপর প্রশ্ন হলো, টাকা কোথায় পাওয়া যাবে। আর আপনি কি ভাবছেন, সে আমাদের কোথায় নিয়ে গেল? দরজাওয়ালা সেই জায়গাটিতে নিয়ে গেল! সে পকেট থেকে একটি চাবি বের করল, দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল এবং কিছুক্ষণ পর ফিরে এল। তার হাতে ছিল প্রায় দশ পাউন্ডের সোনার মুদ্রা এবং বাকি টাকার জন্য একটি চেক।
চেকটি ছিল কাউটস ব্যাংকের, বাহকের দাবিতে পরিশোধযোগ্য। তাতে এমন একজনের নাম স্বাক্ষর করা ছিল, যার নাম আমি উল্লেখ করতে পারি না—যদিও আমার গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটিই ছিলো। তবে এটুকু বলতে পারি, নামটি ছিল অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রায়ই নামটি খবরের কাগজে ছাপা হতো।
টাকার অঙ্কটি বেশ বড় ছিল, কিন্তু স্বাক্ষরটি যদি সত্যিই আসল হয়ে থাকে, তাহলে সেই স্বাক্ষরের মূল্য তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল।
আমি ভদ্রলোকটিকে বললাম যে, পুরো ব্যাপারটিই আমার কাছে অবিশ্বাস্য ও সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে। কারণ বাস্তব জীবনে কোনো মানুষ ভোররাত চারটের সময় একটি বেসমেন্টের দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য একজনের প্রায় একশো পাউন্ডের চেক নিয়ে বেরিয়ে আসে—এটা বিশ্বাস করা কঠিন।
কিন্তু সে একেবারেই নিশ্চিন্ত এবং বিদ্রূপময় ভঙ্গিতে বলল, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন। ব্যাংক খোলা পর্যন্ত আমি আপনাদের সঙ্গেই থাকব এবং নিজেই চেকটি নগদ করে দেব।’
তখন আমরা সবাই রওনা হলাম—ডাক্তার, মেয়েটির বাবা, আমাদের সেই লোকটি এবং আমি নিজের ঘরে ফিরে এসে বাকি রাতটা সেখানেই কাটালাম। পরদিন সকালে আমরা নাশতা সেরে সবাই মিলে ব্যাংকে গেলাম। আমি নিজেই চেকটি জমা দিয়ে বললাম, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এটি একটি জাল চেক।
“কিন্তু মোটেই তা নয়। চেকটি আসল ছিল।”
“আচ্ছা, আচ্ছা,” মি. আটারসন বললেন।
“দেখছি, আপনি ঠিক আমার মতোই ব্যাপারটা অনুভব করছেন,” মি. এনফিল্ড বললেন। “হ্যাঁ, ঘটনাটা বেশ খারাপ। কারণ আমার সঙ্গে যে লোকটির দেখা হয়েছিল, সে এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে কোনো ভদ্রলোকেরই সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়—একেবারে জঘন্য প্রকৃতির লোক। অথচ যে ব্যক্তি চেকটি দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন ভদ্রতা ও সচ্চরিত্রতার আদর্শ; সমাজে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতিও ছিল। আর ব্যাপারটাকে আরও খারাপ করে তুলেছিল এই বিষয়টি যে, তিনি ছিলেন সেই ধরনের মানুষদের একজন, যাঁরা ‘ভালো কাজ’ করেন বলে পরিচিত। আমার ধারণা, এটা নিশ্চয়ই ব্ল্যাকমেলের ব্যাপার। অর্থাৎ, একজন সৎ ও সম্মানিত মানুষ তাঁর যৌবনের কোনো দুষ্টুমি বা গোপন কীর্তির জন্য চড়া মূল্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাই দরজাওয়ালা ওই বাড়িটাকে আমি ‘ব্ল্যাকমেল হাউস’ বলি। যদিও জানেন, এটাও কিন্তু পুরো ঘটনাটার ব্যাখ্যা নয়।”এই কথা বলতে বলতে তিনি আবার গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।
হঠাৎ মি. আটারসনের প্রশ্নে তাঁর চিন্তার ঘোর কাটল।“আর আপনি কি জানেন, যিনি চেকটি লিখেছিলেন, তিনি ওই বাড়িতেই থাকেন কি না?”
“সম্ভাবনাটা মন্দ নয়, তাই না?” মি. এনফিল্ড উত্তর দিলেন। “তবে কাকতালীয়ভাবে আমি তাঁর ঠিকানাটা লক্ষ্য করেছিলাম।তিনি অন্য কোথাও, কোনো একটি স্কোয়ারে থাকেন।”
“আর দরজাওয়ালা ওই জায়গাটি সম্পর্কে আপনি কখনো খোঁজ নেননি?” মি. আটারসন জিজ্ঞেস করলেন।
“না, স্যার। একটু সংকোচ বোধ করেছিলাম,” তিনি উত্তর দিলেন। “অন্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে আমার খুবই অস্বস্তি হয়। ব্যাপারটা যেন শেষ বিচারের দিনের মতো মনে হয়। আপনি একটি প্রশ্ন করতে শুরু করলেন—ব্যাপারটা অনেকটা পাহাড়ের চূড়া থেকে একটি পাথর গড়িয়ে দেওয়ার মতো। আপনি নিশ্চুপ হয়ে পাহাড়ের ওপর বসে আছেন; আর পাথরটা গড়াতে গড়াতে আরও কতগুলো পাথরকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে আনছে। তারপর দেখা গেল, এমন কোনো শান্ত-শিষ্ট বুড়ো লোক—যার কথা আপনি স্বপ্নেও ভাবেননি—নিজের বাড়ির বাগানে সেই পাথরের আঘাতে মাথায় চোট পেলেন, আর তাঁর পরিবারকে শেষ পর্যন্ত পদবি পর্যন্ত বদলাতে হলো! না স্যার, আমি একটা নিয়ম মেনে চলি—কোনো ব্যাপার যত বেশি সন্দেহজনক বা গোলমেলে মনে হয়, আমি তত কম প্রশ্ন করি।”
“বেশ ভালো নিয়ম,” আইনজীবী বললেন।
“তবে আমি নিজে জায়গাটা একটু খুঁটিয়ে দেখেছি,” মি. এনফিল্ড বলতে থাকলেন। “দেখে মনে হয়, সেটাকে ঠিক বাড়ি বলাই যায় না। আর কোনো দরজাও নেই। ওই একটি দরজা দিয়ে কেউ ঢোকে না, বেরও হয় না—শুধু মাঝে মাঝে আমার সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ভদ্রলোকটি সেখানে আসেন-যান। প্রথম তলায় উঠোনের দিকে মুখ করা তিনটি জানালা আছে; নিচতলায় একটিও জানালা নেই।”
জানালাগুলো সব সময় বন্ধ থাকে, কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আর সেখানে একটি চিমনিও আছে, যেটি প্রায়ই ধোঁয়ায় ভরা থাকে। সুতরাং, নিশ্চয়ই সেখানে কেউ না কেউ বাস করে। তবু ব্যাপারটা একেবারে নিশ্চিত করে বলা যায় না; কারণ ওই উঠোনটিকে ঘিরে বাড়িগুলো এত ঘনসন্নিবিষ্ট যে, কোন বাড়ি কোথায় শেষ হয়েছে আর কোনটি কোথা থেকে শুরু হয়েছে, তা বোঝা কঠিন।
দুজন আবার কিছুক্ষণ নীরবে হাঁটতে লাগলেন। তারপর মি. আটারসন বললেন,
“এনফিল্ড, তোমার ওই নিয়মটা বেশ ভালো।”
“হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়,” এনফিল্ড উত্তর দিলেন।
“কিন্তু তা সত্ত্বেও,” আইনজীবী বললেন, “একটা বিষয় আমি জানতে চাই। যে লোকটি শিশুটির ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল, তার নামটা জানতে চাই।”
“আচ্ছা,” মি. এনফিল্ড বললেন, “তার নাম জানলে এমন কী ক্ষতি হবে, তা তো আমি বুঝতে পারছি না। লোকটির নাম হাইড।”
“হুম,” মি. আটারসন বললেন। “দেখতে কেমন সে?”
“তাকে সহজে বর্ণনা করা যায় না। তার চেহারায় যেন কিছু একটা অস্বাভাবিক আছে; এমন কিছু, যা অপ্রীতিকর— বরং সরাসরি ঘৃণ্য। জীবনে এমন কোনো মানুষ আমি দেখিনি, যাকে এতটা অপছন্দ হয়েছে, অথচ কেন তাকে অপছন্দ করি, সেটাও ঠিক করে বলতে পারি না। নিশ্চয়ই তার শরীরের কোথাও কোনো বিকৃতি আছে; তাকে দেখলে প্রবলভাবে মনে হয়, লোকটি বিকৃতদেহের। কিন্তু ঠিক কোথায় সেই বিকৃতি, তা আমি নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। লোকটির চেহারা অদ্ভুত, অথচ ঠিক কী অস্বাভাবিক, তা সত্যিই বলতে পারি না। না, মহাশয়, আমি কিছুতেই তাকে যথাযথভাবে বর্ণনা করতে পারব না। আর এটা আমার স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার জন্য নয়; কারণ এই মুহূর্তেও আমি যেন তাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।”
মি. আটারসন আবার কিছুদূর নীরবে হাঁটলেন। তাঁকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তিনি গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন।
শেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি নিশ্চিত তো, লোকটি চাবি ব্যবহার করেছিল?”
মি. এনফিল্ড বিস্মিত হয়ে বললেন,“আমার প্রিয় মহাশয়…”
“হ্যাঁ, আমি জানি,” আটারসন বললেন। “আমি জানি, প্রশ্নটা তোমার কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে। আসলে ব্যাপারটা হলো, অন্য লোকটির নাম যদি তোমার কাছে না জানতে চাই, তার কারণ আমি নামটা আগে থেকেই জানি। বুঝতেই পারছ, রিচার্ড, তোমার গল্পটা আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। গল্পের কোনো অংশ যদি ভুল বা অস্পষ্টভাবে বলে থাকো, তাহলে এখনই তা সংশোধন করা ভালো।”
“আমার মনে হয়, আপনি আমাকে আগে সতর্ক করতে পারতেন,” এনফিল্ড কিছুটা বিরক্তির সুরে বললেন। “তবে আপনি যাকে অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে বলা যায়, সেই অর্থেই বলছি—আমি কিন্তু ঘটনাটা একেবারে নিখুঁতভাবে বলেছি। লোকটির কাছে একটি চাবি ছিল; আর শুধু তাই নয়, চাবিটি এখনও তার কাছেই আছে। এক সপ্তাহও হয়নি, আমি নিজের চোখে তাকে সেই চাবি দিয়ে দরজা খুলতে দেখেছি।”
মি. আটারসন গভীরভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কিন্তু একটি কথাও বললেন না। কিছুক্ষণ পর যুবকটি আবার বলল— “আরও একটি শিক্ষা হলো—কিছু কথা না বলাই ভালো। এত বেশি কথা বলে ফেলার জন্য আমি লজ্জিত। চলুন, আমরা দুজনে একটা চুক্তি করি—এ ব্যাপারটি নিয়ে আর কখনো আলোচনা করব না।”
“আমারও তাতে সম্পূর্ণ সম্মতি আছে,” আইনজীবী বললেন। “এই ব্যাপারে তোমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চুক্তি করলাম, রিচার্ড।”
মি. হাইডের সন্ধানে
সেদিন সন্ধ্যায় মি. আটারসন একাকী তাঁর বাড়িতে ফিরে এলেন বিষণ্ণ মনে এবং অনীহাভরে রাতের খাবার খেলেন। রবিবারের দিনে তাঁর বরাবরের অভ্যাস ছিল—খাওয়া শেষ হলে আগুনের কাছাকাছি বসে পড়া, সামনে পড়ার টেবিলে ধর্মতত্ত্বের কোনো শুষ্ক ও গুরুগম্ভীর বই রাখা, এবং পাশের গির্জার ঘড়ি রাত বারোটার ঘণ্টা বাজানো পর্যন্ত পড়া। তারপর শান্ত ও কৃতজ্ঞ মনে তিনি শুতে যেতেন।
কিন্তু সেদিন রাতে খাবারের টেবিল সরিয়ে নেওয়া মাত্রই তিনি একটি মোমবাতি হাতে নিয়ে তাঁর কর্মকক্ষে চলে গেলেন। সেখানে তিনি তাঁর সিন্দুক খুললেন এবং তার সবচেয়ে গোপন অংশ থেকে একটি দলিল বের করলেন। খামের ওপর লেখা ছিল—“ড. জেকিলের উইল”। কপাল কুঁচকে তিনি বসে দলিলটির বিষয়বস্তু পড়তে লাগলেন।
উইলটি ছিল ড. জেকিলের নিজের হাতে লেখা। যদিও উইলটি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর মি. আটারসন তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তবু এটি তৈরি করার সময় তিনি সামান্যতম সাহায্য করতেও অস্বীকার করেছিলেন। উইলে শুধু এই কথাই বলা ছিল না যে, হেনরি জেকিল, এম.ডি., ডি.সি.এল., এল.এল.ডি., এফ.আর.এস. ইত্যাদির মৃত্যু হলে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তাঁর “বন্ধু ও উপকারকারী এডওয়ার্ড হাইডের” হাতে চলে যাবে; বরং আরও বলা ছিল যে, ড. জেকিল যদি “নিখোঁজ হয়ে যান অথবা টানা তিন ক্যালেন্ডার মাসের বেশি সময় ধরে তাঁর অনুপস্থিতির কোনো ব্যাখ্যা না পাওয়া যায়,” তাহলে কোনো বিলম্ব ছাড়াই এডওয়ার্ড হাইড হেনরি জেকিলের স্থলাভিষিক্ত হবেন এবং ডাক্তারের গৃহস্থালির কয়েকজন কর্মচারীকে সামান্য কিছু অর্থ দেওয়া ছাড়া তাঁর ওপর আর কোনো দায় বা বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
এই দলিলটি বহুদিন ধরেই আইনজীবী আটারসনের চোখের কাঁটা হয়ে ছিল। একজন আইনজীবী হিসেবে যেমন, তেমনি জীবনের সুস্থ, স্বাভাবিক ও প্রচলিত দিকগুলোর প্রতি অনুরাগী মানুষ হিসেবেও এটি তাঁকে বিরক্ত করত। কারণ তাঁর কাছে অদ্ভুত ও কল্পনাপ্রবণ বিষয়গুলো ছিল রুচিহীনতার লক্ষণ।
এতদিন পর্যন্ত মি. হাইড সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতাই তাঁর ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল; কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেল—এখন তিনি হাইড সম্পর্কে কিছুটা জানেন।
যখন “হাইড” নামটি কেবল একটি নাম ছিল, যার সম্পর্কে তিনি আর কিছুই জানতে পারছিলেন না, তখন ব্যাপারটি যথেষ্ট খারাপ ছিল। কিন্তু যখন সেই নামের সঙ্গে ঘৃণ্য ও জঘন্য বৈশিষ্ট্যগুলো যুক্ত হতে শুরু করল, তখন ব্যাপারটি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠল। এতদিন যে অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে রহস্য তাঁর দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল, সেই কুয়াশার মধ্য থেকে হঠাৎ যেন এক শয়তানের স্পষ্ট মূর্তি তাঁর সামনে লাফিয়ে উঠল।
“আমি ভেবেছিলাম এটা পাগলামি,” আপত্তিকর দলিলটি আবার সিন্দুকে রেখে তিনি বললেন, “কিন্তু এখন আমার ভয় হচ্ছে, এটা হয়তো কলঙ্কজনক কোনো ব্যাপার।”
এই বলে তিনি মোমবাতিটি নিভিয়ে দিলেন, একটি মোটা ওভারকোট গায়ে চাপালেন এবং ক্যাভেনডিশ স্কোয়ারের দিকে রওনা হলেন। এটি ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক প্রধান কেন্দ্র, যেখানে তাঁর বন্ধু, বিখ্যাত চিকিৎসক ড. ল্যানিয়ন বাস করতেন এবং অসংখ্য রোগী দেখতেন।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “যদি কেউ এ ব্যাপারে কিছু জানে, তবে সে ল্যানিয়ন।”
গম্ভীর চেহারার বাটলার তাঁকে চিনতে পেরে স্বাগত জানাল। তাঁকে অপেক্ষা করানো হলো না; দরজা থেকেই সরাসরি খাবার ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে ড. ল্যানিয়ন একা বসে মদ পান করছিলেন।
তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, সুস্থ-সবল, পরিপাটি, লালমুখো এক ভদ্রলোক। তাঁর ঘন চুল অকালে সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও দৃঢ়।
মি. আটারসনকে দেখামাত্র তিনি চেয়ার থেকে লাফিয়ে দাঁড়ালেন এবং দুই হাত বাড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। তাঁর স্বভাবসুলভ আন্তরিকতা দেখতে কিছুটা অভিনয়সুলভ মনে হলেও, তার ভিত্তি ছিল সত্যিকারের বন্ধুত্বপূর্ণ অনুভূতি।
কারণ এই দুজন ছিলেন বহুদিনের পুরোনো বন্ধু—স্কুলজীবন ও কলেজজীবন, উভয় সময়েরই সহপাঠী। দুজনেই নিজেদের এবং একে অপরকে গভীরভাবে সম্মান করতেন। আর যা সব সময় হয় না, তা হলো— তাঁরা একে অপরের সঙ্গ সত্যিই উপভোগ করতেন।
কিছুক্ষণ এদিক-ওদিকের কথাবার্তার পর আইনজীবী সেই প্রসঙ্গের দিকে কথোপকথন ঘুরিয়ে আনলেন, যে বিষয়টি তাঁকে এতটা অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
“আমার মনে হয়, ল্যানিয়ন,” তিনি বললেন, “হেনরি জেকিলের সবচেয়ে পুরোনো দুই বন্ধু সম্ভবত আমরা দুজনই, তাই না?”
“ইশ, বন্ধুগুলো যদি একটু কম বয়সী হতো!” ড. ল্যানিয়ন হেসে বললেন। “তবে মনে হয়, সেটাই সত্যি। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? এখন তো আমি ওর সঙ্গে খুব কমই দেখা করি।”
“সত্যি?” আটারসন বললেন। “আমি তো ভেবেছিলাম, তোমাদের মধ্যে একই ধরনের আগ্রহের একটা বন্ধন আছে।”
“ছিল,” ল্যানিয়ন উত্তর দিলেন। “কিন্তু হেনরি জেকিল আমার কাছে অতিরিক্ত কল্পনাপ্রবণ হয়ে ওঠার পর দশ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে। সে ভুল পথে যেতে শুরু করেছিল—চিন্তাভাবনার দিক থেকে ভুল পথে। অবশ্য পুরোনো বন্ধুত্বের খাতিরে, যেমন লোকে বলে, আমি এখনও তার প্রতি আগ্রহ রাখি; কিন্তু এখন তার সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ প্রায় নেই বললেই চলে।”
“এমন সব অবৈজ্ঞানিক আজগুবি কথা,” ডাক্তার হঠাৎ রাগে বেগুনি হয়ে বললেন, “ডেমন ও পিথিয়াসের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুকেও পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিত!”
ড. ল্যানিয়নের এই সামান্য রাগ মি. আটারসনের কাছে বরং স্বস্তিদায়ক মনে হলো।তিনি মনে মনে ভাবলেন, “ওদের মধ্যে নিশ্চয়ই শুধু বিজ্ঞানের কোনো একটি বিষয় নিয়ে মতভেদ হয়েছে।”
আর তিনি নিজে বিজ্ঞানের বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানী না হওয়ায় “আবেগপ্রবণতা” (যদিও দলিল-দস্তাবেজ সংক্রান্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে নয়)—এই প্রসঙ্গেও তিনি যোগ করেছিলেন, “এটা তার চেয়েও খারাপ কিছু নয়!”
বন্ধুকে স্বাভাবিক হয়ে ওঠার জন্য কয়েক মুহূর্ত সময় দিয়ে উটারসন এবার সেই প্রশ্নটি তুললেন, যে প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি এসেছিলেন।
“আপনি কি কখনও তাঁর কোনও আশ্রিত বা ঘনিষ্ঠ অনুগত ব্যক্তির কথা শুনেছেন—হাইড নামে একজন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“হাইড?” ল্যানিয়ন প্রশ্নটি পুনরাবৃত্তি করলেন। “না। কখনও শুনিনি। আমার সময়ে তো নয়ই।”
এই সামান্য তথ্যটুকুই সঙ্গে নিয়ে উটারসন ফিরে এলেন তাঁর সেই বিশাল, অন্ধকার শয্যায়। সেখানে শুয়ে তিনি এপাশ-ওপাশ করতে করতে রাতের গভীর প্রহর পর্যন্ত জেগে রইলেন। তাঁর পরিশ্রান্ত মনের জন্য রাতটি ছিল অত্যন্ত অস্বস্তিকর—এক নিছক অন্ধকারের মধ্যে মন অবিরাম প্রশ্নের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে চলেছে।
মি. উটারসনের বাড়ির খুবই কাছে অবস্থিত গির্জার ঘণ্টায় যখন সকাল ছয়টা বেজে উঠল, তখনও তিনি সেই রহস্যের সমাধান খুঁজে চলেছেন। এতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টি তাঁকে কেবল বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকেই আকৃষ্ট করেছিল; কিন্তু এখন তাঁর কল্পনাশক্তিও এতে জড়িয়ে পড়েছে—বরং বলা যায়, কল্পনাশক্তি তাঁকে পুরোপুরি নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে।
রাতের ঘন অন্ধকারে, পর্দা-ঢাকা ঘরের মধ্যে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে মি. এনফিল্ডের বলা ঘটনাগুলো তাঁর মনের সামনে যেন আলোকিত ছবির মতো একের পর এক ভেসে উঠতে লাগল।
কখনও তিনি দেখতে পেলেন—রাতের শহর, অসংখ্য বাতির আলোয় ভরা এক বিশাল রাস্তা। তারপর দেখতে পেলেন দ্রুত পায়ে হেঁটে চলা এক মানুষের অবয়ব। এরপর দেখলেন—একটি শিশু চিকিৎসকের বাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসছে। তারপর সেই মানুষ ও শিশুর মুখোমুখি সংঘর্ষ। সেই নিষ্ঠুর মানুষটি যেন এক মানব-জগন্নাথের মতো শিশুটিকে পায়ের নিচে পিষে দিয়ে, তার আর্তনাদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, নির্বিকারভাবে এগিয়ে চলে যাচ্ছে।
আবার কখনও তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠত একটি ধনী মানুষের বাড়ির ঘর। সেখানে তাঁর বন্ধু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন, স্বপ্ন দেখছেন এবং নিজের স্বপ্নে মৃদু হাসছেন। হঠাৎ সেই ঘরের দরজা খুলে গেল। বিছানার পর্দা সরিয়ে দেওয়া হলো। ঘুমন্ত মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা হলো। আর দেখলেন—তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক রহস্যময় অবয়ব, যার হাতে রয়েছে এমন ক্ষমতা যে, গভীর রাতের সেই নিস্তব্ধ সময়েও ঘুমন্ত মানুষটিকে বিছানা ছেড়ে উঠে তার আদেশ পালন করতেই হবে।
এই দুই রূপে সেই রহস্যময় অবয়বটি সারারাত আইনজীবী উটারসনকে তাড়া করে বেড়াল। আর যখনই তিনি একটু তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন, তখনও অবয়বটি তাঁর স্বপ্নে আরও নিঃশব্দে ঘুমন্ত বাড়িগুলোর ভেতর দিয়ে এগিয়ে বেড়াত। কখনও তাকে দেখা যেত আরও দ্রুত, আরও দ্রুত—এমনকি মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো দ্রুত গতিতে—বাতির আলোয় ভরা শহরের বিস্তৃত গোলকধাঁধার মতো রাস্তাগুলোর মধ্য দিয়ে ছুটে চলতে। আর প্রতিটি রাস্তার মোড়ে সে একটি শিশুকে পিষে দিয়ে তার আর্তনাদকে পিছনে ফেলে চলে যেত।
কিন্তু সেই অবয়বটির কোনও মুখ ছিল না—যে মুখ দেখে তাকে চেনা যায়। এমনকি স্বপ্নের মধ্যেও তার কোনও মুখ দেখা যেত না; অথবা এমন একটি মুখ দেখা যেত, যা উটারসনকে বিভ্রান্ত করে দিত এবং তাঁর চোখের সামনেই যেন গলে মিলিয়ে যেত।
এইভাবেই আইনজীবী উটারসনের মনে বাস্তব মি. হাইডের মুখটি একবার নিজের চোখে দেখার জন্য এক অদ্ভুত, প্রবল—প্রায় অস্বাভাবিক মাত্রার—কৌতূহল জন্ম নিল।
তিনি ভাবলেন, যদি একবার মাত্র হাইডকে নিজের চোখে দেখা যায়, তাহলে হয়তো এই রহস্যের অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে, এমনকি রহস্যটি পুরোপুরিই দূর হয়ে যেতে পারে। কারণ, কোনও রহস্যময় বিষয়কে ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখলে প্রায়ই তার রহস্যময়তা আর থাকে না।
হয়তো তখন তিনি তাঁর বন্ধুর এই অদ্ভুত পছন্দের—অথবা বলা যায়, অদ্ভুত বন্ধনের—কারণ বুঝতে পারবেন। এমনকি উইলে লেখা সেই চমকে দেওয়ার মতো শর্তটির কারণও হয়তো স্পষ্ট হবে।
অন্তত, এমন একজন মানুষের মুখ তো দেখার মতোই হবে—যে মানুষের মধ্যে সামান্যতম দয়ামায়াও নেই; এমন একজন মানুষের মুখ, যার মুখটি একবার দেখলেই অনুভূতিহীন ও শান্ত স্বভাবের মি. এনফিল্ডের মনেও চিরস্থায়ী ঘৃণার আগুন জ্বলে উঠত।
সেই সময় থেকে মি. আটারসন দোকানপাটে ঘেরা সেই পাশের গলির দরজাটির ওপর নজর রাখতে শুরু করলেন। সকালে অফিসে যাওয়ার আগেই, দুপুরে যখন কাজের ব্যস্ততা তুঙ্গে এবং সময় অতি অল্প, আবার রাতে কুয়াশায় ঢাকা শহরের চাঁদের আলোয়—দিনের যে-কোনো সময়ে, আলো-আঁধারির মধ্যে কিংবা জনসমাগমের ভিড়ে—সেই আইনজীবীকে তাঁর নির্দিষ্ট প্রহরায় দেখা যেত।
তিনি মনে মনে বলেছিলেন, “সে যদি মি. হাইড হয়, তাহলে আমি হব মি. সিক—অর্থাৎ তাকে খুঁজে বের করবই।”
অবশেষে তাঁর ধৈর্যের ফল মিলল।
সেদিন রাতটি ছিল চমৎকার শুষ্ক ও নির্মল। বাতাসে হিমের ছোঁয়া; রাস্তাগুলো নাচঘরের মেঝের মতো পরিষ্কার। বাতিগুলোর আলো বাতাসে দুলছিল না; ফলে রাস্তার ওপর নিয়মিত ছন্দে আলো ও ছায়ার নকশা তৈরি হচ্ছিল।
রাত দশটার মধ্যে দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাশের গলিটি তখন প্রায় জনশূন্য। চারদিক থেকে লন্ডন শহরের মৃদু গর্জন শোনা গেলেও, গলিটির ভেতর ছিল আশ্চর্য নীরবতা। সামান্য শব্দও অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল। রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলো থেকে ঘরের ভেতরের নানা শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। এমনকি কোনো পথচারী এগিয়ে এলে, সে নিজে কাছে আসার অনেক আগেই তার আসার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
মি. আটারসন তাঁর নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি অদ্ভুত হালকা পায়ের শব্দ শুনতে পেলেন।
রাতের পর রাত এই গলিতে টহল দিতে দিতে তিনি এমন একটি অদ্ভুত ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, শহরের বিশাল কোলাহল ও মানুষের চলাফেরার শব্দের মধ্যেও, কোনো একাকী পথচারী অনেক দূরে থাকতেই তার পায়ের শব্দ হঠাৎ আলাদা করে তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু এর আগে কোনো শব্দই তাঁর মনোযোগকে এত তীব্রভাবে এবং এত নিশ্চিতভাবে আকর্ষণ করেনি।
তাই সফল হওয়ার এক প্রবল, প্রায় কুসংস্কারমিশ্রিত পূর্বানুভূতি নিয়ে তিনি গলির প্রবেশপথের আড়ালে সরে গেলেন।
পায়ের শব্দ দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল। লোকটি রাস্তার শেষ প্রান্তে এসে মোড় নিতেই শব্দটি হঠাৎ আরও জোরালো হয়ে উঠল।
প্রবেশপথের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে মি. আটারসন এবার বুঝতে পারলেন, কেমন ধরনের মানুষের সঙ্গে তাঁকে মোকাবিলা করতে হবে।
লোকটি ছিল খাটো, খুব সাধারণ পোশাক পরা। কিন্তু এত দূর থেকেও তাকে দেখে মি. আটারসনের মনে এক ধরনের তীব্র বিরূপতা জেগে উঠল।
লোকটি সোজা সেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সময় বাঁচানোর জন্য রাস্তা পার হয়ে সে দরজার কাছে চলে এল। বাড়ির দিকে আসা মানুষের মতোই সে পকেট থেকে একটি চাবি বের করল।
মি. আটারসন তখন আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে লোকটির কাঁধে হাত রাখলেন।
— “মি. হাইড, তাই তো?”
মি. হাইড শিস দেওয়ার মতো শব্দ করে হঠাৎ জোরে শ্বাস টেনে পিছিয়ে গেল। কিন্তু তার এই ভয় ছিল মাত্র এক মুহূর্তের জন্য।আইনজীবীর মুখের দিকে না তাকিয়েই সে বেশ ঠান্ডা গলায় বলল— “হ্যাঁ, এটাই আমার নাম। আপনি কী চান?”
— “দেখতেই পাচ্ছি, আপনি ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছেন,” আইনজীবী বললেন। “আমি ড. জেকিলের একজন পুরোনো বন্ধু—গন্ট স্ট্রিটের মি. আটারসন। নিশ্চয়ই আমার নাম শুনেছেন। আর আপনার সঙ্গে এমন সুবিধাজনক সময়ে দেখা হয়ে গেল যখন, তাই ভাবলাম, আপনি হয়তো আমাকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেবেন।”
মি. হাইড চাবির ওপর ফুঁ দিতে দিতে বলল— “ড. জেকিলকে আপনি এখানে পাবেন না; তিনি বাড়িতে নেই।” তারপর হঠাৎ, তবুও মাথা না তুলে, সে জিজ্ঞেস করল— “আপনি আমাকে চিনলেন কীভাবে?”
মি. আটারসন বললেন— “আপনার কাছে আমি কি একটি অনুরোধ করতে পারি?”
অন্যজন উত্তর দিল— “অবশ্যই। কী আপনার অনুরোধ?”
আইনজীবী বললেন— “আপনি কি আমাকে আপনার মুখটা দেখতে দেবেন?”
মি. হাইড কিছুক্ষণ ইতস্তত করলেন। তারপর হঠাৎ যেন কোনো কথা মনে পড়ে যাওয়ায়, এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছোড়ার ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়ালেন। দুজন কয়েক সেকেন্ড বেশ স্থিরভাবে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“‘এবার আমি আপনাকে আবার দেখলে চিনতে পারব,’ বললেন মিস্টার আটারসন। মি. আটারসন বললেন- “এটা হয়তো কাজে লাগবে।”
“হ্যাঁ,” মি. হাইড উত্তর দিলেন, “আমাদের দেখা হওয়াটা ভালোই হয়েছে। আর যেহেতু কথাটা উঠলই, আপনার আমার ঠিকানাটাও জানা উচিত।” বলে তিনি সোহো এলাকার একটি রাস্তার নম্বর বললেন।
“হে ঈশ্বর!” মি. আটারসন মনে মনে ভাবলেন, “তাহলে কি সেও উইলের কথাই ভাবছিল?” কিন্তু তিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলেন না। শুধু ঠিকানাটি শুনে স্বীকৃতিসূচকভাবে গলা থেকে একটি অস্পষ্ট শব্দ বের করলেন।
“আর এখন বলুন,” হাইড বললেন, “আপনি আমাকে কী করে চিনলেন?”
“আপনার বর্ণনা শুনে,” আটারসন উত্তর দিলেন।
“কার কাছ থেকে আমার বর্ণনা শুনেছেন?”
“আমাদের কয়েকজন অভিন্ন বন্ধু আছেন,” মি. আটারসন বললেন।
“অভিন্ন বন্ধু?” মি. হাইড একটু কর্কশ স্বরে কথাটি পুনরাবৃত্তি করলেন। “তাঁরা কারা?”
“উদাহরণ হিসেবে জেকিলের কথাই ধরুন,” আইনজীবী বললেন।
“তিনি আপনাকে কিছুই বলেননি!” রাগে মুখ লাল হয়ে উঠল মি. হাইডের। “আমি ভাবিনি যে আপনিও মিথ্যা কথা বলবেন।”
“আচ্ছা, মি. হাইড,” মি. আটারসন বললেন, “এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা আপনার উচিত নয়।”
মি. হাইড হঠাৎ এক বিকট, হিংস্র হাসি হাসল। পরমুহূর্তেই অবিশ্বাস্য দ্রুততায় দরজার তালা খুলে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মি. হাইড চলে যাওয়ার পর মি. আটারসন কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চেহারায় স্পষ্ট উদ্বেগ ও অস্বস্তির ছাপ। তারপর ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে এগোতে লাগলেন। প্রতি দু-এক পা পরপর থেমে কপালে হাত রাখছিলেন—যেন গভীর মানসিক বিভ্রান্তির মধ্যে কোনো জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজছেন।
হাঁটতে হাঁটতে তিনি যে সমস্যাটি নিয়ে ভাবছিলেন, তা এমন এক ধরনের সমস্যা, যার সমাধান খুব কমই পাওয়া যায়।
মি. হাইড ছিলেন ফ্যাকাশে ও বেঁটে। তাঁর চেহারায় এমন এক ধরনের বিকৃতির ছাপ ছিল, যা কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক কারণ বলা যায় না। তাঁর হাসি ছিল বিরক্তিকর। আইনজীবীর সঙ্গে আচরণ করার সময় তাঁর মধ্যে এক অদ্ভুত মিশ্রণ দেখা গিয়েছিল—একদিকে যেন ভীরুতা, অন্যদিকে হত্যাকারীর মতো ঔদ্ধত্য। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল কর্কশ, ফিসফিসে এবং খানিকটা ভাঙা।
এই সবকিছুই তাঁর বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো কারণ ছিল। কিন্তু এসব বৈশিষ্ট্য একত্র করেও মি. আটারসনের মনে হাইডকে ঘিরে যে অজ্ঞাত ঘৃণা, বিতৃষ্ণা ও ভয় জন্ম নিয়েছিল, তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছিল না।
“এর মধ্যে নিশ্চয়ই আরও কিছু আছে,” বিভ্রান্ত ভদ্রলোকটি নিজেকে বললেন। “আরও কিছু একটা আছে—শুধু তার নামটা যদি খুঁজে পেতাম! ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করুন, লোকটিকে তো প্রায় মানুষ বলেই মনে হয় না! গুহামানবসুলভ কিছু বলা যায় কি? নাকি এ সেই পুরোনো ড. ফেল-এর গল্প—যাঁকে দেখলেই কেন জানি না, মানুষ অপছন্দ করে? নাকি তার নোংরা আত্মার বিকৃত আলোই তার মাটির তৈরি শরীরের মধ্য দিয়ে বাইরে এসে তাকে এমন অদ্ভুত রূপ দিয়েছে?”
“আমার মনে হয় শেষের কথাটাই সত্যি। কারণ, হায় আমার প্রিয় বুড়ো হ্যারি জেকিল! কোনো মানুষের মুখে যদি কখনও শয়তানের স্বাক্ষর পড়ে থাকতে দেখে থাকি, তবে তা তোমার এই নতুন বন্ধুর মুখেই দেখেছি।”
গলির রাস্তার মোড় ঘুরতেই দেখা গেল এক চত্বরজুড়ে সারি সারি প্রাচীন, সুন্দর বাড়ি। একসময় এগুলো ছিল অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত মানুষের বাসস্থান; কিন্তু এখন অধিকাংশই তাদের পুরোনো জৌলুস হারিয়ে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং নানা ধরনের মানুষকে ফ্ল্যাট ও ছোট ছোট ঘর ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সেখানে বাস করত মানচিত্র-নকশাকার, স্থপতি, সন্দেহজনক চরিত্রের আইনজীবী এবং নানা অস্পষ্ট ও রহস্যময় ব্যবসার দালালেরা।
তবে মোড় থেকে দ্বিতীয় বাড়িটি এখনও সম্পূর্ণ একটি বাড়ি হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছিল। তার দরজায় এখনও ঐশ্বর্য ও স্বচ্ছলতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে বাড়িটি অন্ধকারে ডুবে ছিল; কেবল দরজার ওপরের কাচঘেরা ছোট জানালাটি দিয়ে সামান্য আলো দেখা যাচ্ছিল।
মি. আটারসন সেখানে থামলেন এবং দরজার কড়া নাড়লেন।
পরিপাটি পোশাক পরা এক বয়স্ক ভৃত্য দরজা খুলল।
“ড. জেকিল কি বাড়িতে আছেন, পুল?” মি. আটারসন জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি দেখে আসছি, মি. আটারসন,” পুল বলল এবং অতিথিকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিল।
তিনি কথা বলতে বলতে একটি বড়, নিচু ছাদের আরামদায়ক হলঘরে এসে পৌঁছালেন। মেঝেটি পাথরের ফলকে বাঁধানো, আর একটি উজ্জ্বল খোলা আগুনের উনুন দিয়ে—একটি গ্রাম্য বাড়ির মতো করে—ঘরটি উষ্ণ রাখা হয়েছে। ঘরটি আবার দামী ওক কাঠের আলমারি ও ক্যাবিনেটে সুসজ্জিত।
“স্যার, আপনি কি এখানে আগুনের পাশে অপেক্ষা করবেন? নাকি আপনাকে খাবার ঘরের আলো জ্বেলে দেব?”
“এখানেই থাকব, ধন্যবাদ,” আটারসন বললেন। তারপর তিনি এগিয়ে গিয়ে লম্বা অগ্নিরোধক লোহার বেড়াটির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন।
যে হলঘরে এখন তিনি একা বসে রইলেন, সেটি তাঁর বন্ধু ডাক্তার জেকিলের অত্যন্ত প্রিয় একটি ঘর ছিল। আটারসন নিজেও প্রায়ই বলতেন, লন্ডনের সবচেয়ে মনোরম ঘর এটি। কিন্তু আজ রাতে তাঁর রক্তে যেন এক অজানা শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল। হাইডের মুখটি তাঁর মনে এমনভাবে গেঁথে বসেছিল যে, তিনি তা কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না। এমনকি—যা তাঁর স্বভাবের একেবারেই বিপরীত—জীবন সম্বন্ধে তাঁর মনে এক ধরনের বিতৃষ্ণা ও অস্বস্তি জেগে উঠেছিল। মনের সেই বিষণ্ণ অবস্থায়, পালিশ করা কাঠের ক্যাবিনেটগুলোর ওপর আগুনের কাঁপতে থাকা আলো আর ছাদের ওপর অস্থিরভাবে নড়াচড়া করা ছায়ার মধ্যেও তাঁর মনে যেন কোনো অশুভ সংকেত ফুটে উঠছিল।
কিছুক্ষণ পর পুল ফিরে এসে যখন জানাল যে ড. জেকিল বাইরে বেরিয়ে গেছেন, তখন নিজের মনে স্বস্তি অনুভব করাতে উটারসন কিছুটা লজ্জাই পেলেন।তিনি বললেন, “পুল, আমি মি. হাইডকে পুরোনো শবব্যবচ্ছেদ কক্ষের দিক দিয়ে ঢুকতে দেখেছি। ডাক্তার জেকিল যখন বাড়িতে নেই, তখনও কি সে এভাবে আসতে পারে?”
“অবশ্যই পারে, মি. আটারসন,” ভৃত্যটি উত্তর দিল। “মি. হাইডের কাছে একটি চাবি আছে।”
“তোমার মনিব যে ওই যুবকটির ওপর এতখানি বিশ্বাস রাখেন, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে, পুল,” আটারসন চিন্তামগ্নভাবে বললেন।
“জি স্যার, সত্যিই তাই,” পুল বলল। “আমাদের সবাইকে তাঁকে মান্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
“আমার মনে হয় না, আমি কখনো মি. হাইডের সঙ্গে দেখা করেছি?” আটারসন জিজ্ঞেস করলেন।
“ওহ, না স্যার। তিনি এখানে কখনো রাতের খাবার খান না,” পুল উত্তর দিল। “সত্যি বলতে কী, বাড়ির এই অংশে আমরা তাঁকে খুব কমই দেখি। তিনি সাধারণত পরীক্ষাগারের দিক দিয়েই আসা-যাওয়া করেন।”
“বেশ, শুভরাত্রি, পুল।”
“শুভরাত্রি, মি. আটারসন।”
এরপর আটারসন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিজের বাড়ির পথে রওনা হলেন।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “বেচারা হ্যারি জেকিল! আমার মন বলছে, সে গভীর বিপদের মধ্যে পড়েছে! যৌবনে সে বেশ উচ্ছৃঙ্খল ছিল—অবশ্য সে অনেক আগের কথা। কিন্তু ঈশ্বরের আইনে তো কোনো অপরাধের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় না। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তাই! কোনো পুরোনো পাপের ছায়া, কোনো গোপন কলঙ্কের ক্যানসারের মতো ক্ষত—এখন তার শাস্তি এগিয়ে আসছে, ধীরে ধীরে হলেও নিশ্চিতভাবে; আর আত্মপ্রেম সেই অপরাধকে এতদিন ক্ষমা করে রেখেছিল।”
এই চিন্তা করতে করতে আটারসন নিজের অতীতের কথাও ভাবতে লাগলেন। স্মৃতির প্রতিটি কোণ তিনি যেন হাতড়ে দেখতে লাগলেন—পাছে তাঁর নিজের কোনো পুরোনো অন্যায় হঠাৎ জ্যাক-ইন-দ্য-বক্সের মতো লাফিয়ে বেরিয়ে আসে!
তাঁর অতীত মোটামুটি নিষ্কলঙ্কই ছিল। খুব কম মানুষই তাঁদের জীবনের হিসাব এত কম ভয় নিয়ে ফিরে দেখতে পারে। তবু তিনি নিজের করা বহু মন্দ কাজের কথা মনে করে গভীরভাবে লজ্জিত হলেন। আবার এমন অনেক অন্যায় কাজও তিনি করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সেগুলো থেকে বিরত হয়েছিলেন—সেসব কথা মনে পড়ে তাঁর মনে এক ধরনের সংযত ও ভীত কৃতজ্ঞতাও জেগে উঠল।
তারপর আবার তিনি আগের বিষয়টিতে ফিরে এলেন এবং তাঁর মনে সামান্য আশার আলো জ্বলে উঠল।
তিনি ভাবলেন, “এই মি. হাইডকে যদি ভালোভাবে অনুসন্ধান করা যায়, তবে নিশ্চয়ই তার নিজেরও কিছু গোপন রহস্য আছে। তার চেহারা দেখেই বোঝা যায়—সেগুলো ভয়ংকর রহস্য। এমন রহস্য, যার তুলনায় বেচারা জেকিলের সবচেয়ে বড় অপরাধও হয়তো সূর্যের আলোর মতো নির্মল মনে হবে। এভাবে আর চলতে পারে না। হাইড যদি চোরের মতো গোপনে হ্যারির শয্যার পাশে গিয়ে হাজির হয়— এই কথা ভাবলেই আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে! বেচারা হ্যারি, ঘুম থেকে উঠে সে কী ভয়ানক দৃশ্যই না দেখবে! আর এর মধ্যে যে কী বিপদ লুকিয়ে আছে! হাইড যদি উইলটির অস্তিত্বের কথা জানতে পারে, তবে সে হয়তো উত্তরাধিকার পাওয়ার জন্য অধৈর্য হয়ে উঠবে। হ্যাঁ, আমাকে অবশ্যই এই সমস্যার সমাধান করতে নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে—যদি জেকিল আমাকে তা করতে দেয়,”—তিনি যোগ করলেন, “যদি জেকিল আমাকে সাহায্য করার সুযোগ দেয়।”
আর একবার তাঁর মনের চোখের সামনে সেই অদ্ভুত উইলের ধারাগুলো এমন স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল, যেন কাঁচের ওপারে লেখা কোনো কিছু তিনি দেখতে পাচ্ছেন।
ড. জেকিল বেশ স্বচ্ছন্দেই ছিলেন
এক পক্ষ পরে, একেবারে সৌভাগ্যক্রমে, ডাক্তার তাঁর পাঁচ-ছয়জন পুরোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিয়ে একটি চমৎকার নৈশভোজের আয়োজন করলেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন বুদ্ধিমান, সম্মানিত ব্যক্তি এবং ভালো মদের সমঝদার। অন্য অতিথিরা চলে যাওয়ার পরও যেন মি. আটারসন থেকে যান, তিনি সেই ব্যবস্থা করে নিলেন।
এটি কোনো নতুন ব্যাপার ছিল না; এরকম ঘটনা এর আগেও অসংখ্যবার ঘটেছে। যেখানে আটারসনকে পছন্দ করা হতো, সেখানেই তাঁকে খুবই পছন্দ করা হতো। প্রাণচঞ্চল ও মুখরা অতিথিরা যখন দরজার চৌকাঠে পা বাড়িয়ে বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত, তখন গৃহকর্তারা এই গম্ভীর স্বভাবের আইনজীবীকে আরও কিছুক্ষণ আটকে রাখতে ভালোবাসতেন। তাঁরা তাঁর নির্লিপ্ত সঙ্গ উপভোগ করতেন; যেন একাকিত্বের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতেন এবং আনন্দ-উল্লাসের পর যে মানসিক উত্তেজনা ও ক্লান্তি আসে, তা এই মানুষের গভীর নীরবতার মধ্যে বসে ধীরে ধীরে প্রশমিত করতেন।
ড. জেকিলও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিলেন না। এবারও তিনি আগুনের উল্টো পাশে বসেছিলেন—পঞ্চাশ বছর বয়সী, সুঠাম ও সুদর্শন এক ব্যক্তি; মুখটি মসৃণ ও প্রফুল্ল। তাঁর মধ্যে হয়তো কিছুটা আভিজাত্যের ছাপ ছিল, কিন্তু তাঁর চেহারায় বুদ্ধিমত্তা, সামর্থ্য ও মমতার সব লক্ষণই স্পষ্ট ছিল। তাঁকে দেখলেই বোঝা যেত, মি. আটারসনের প্রতি তাঁর আন্তরিক ও গভীর স্নেহ ছিল।
“জেকিল, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা বলার ছিল,” আটারসন শুরু করলেন। “তোমার সেই উইলটার কথা জানো তো?”
কোনো সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক হয়তো বুঝতে পারতেন যে বিষয়টি ডাক্তারের কাছে মোটেই সুখকর নয়; কিন্তু ডাক্তার হাসিখুশি ভঙ্গিতেই ব্যাপারটি সামলে নিলেন।
“আমার বেচারা আটারসন,” তিনি বললেন, “এমন একজন মক্কেল পাওয়া সত্যিই তোমার দুর্ভাগ্য। আমার উইল নিয়ে তোমাকে যতটা উদ্বিগ্ন হতে দেখেছি, তেমন আর কোনো মানুষকে দেখিনি। অবশ্য ল্যানিয়নকে বাদ দিলে—সে-ও আমার তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক ভ্রান্তি’(বৈজ্ঞানিক প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধ মত।) নিয়ে বেশ বিচলিত হয়েছিল। ওহ, আমি জানি, সে ভালো মানুষ—তুমি ভ্রু কুঁচকোতে হবে না—অত্যন্ত ভালো মানুষ। আর আমি সবসময়ই ভাবি, তার সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটাব। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে একেবারে গোঁড়া, সংকীর্ণমনা পণ্ডিত; আসলে অনেক কিছু না জেনেই বড় বড় কথা বলা এক গোঁড়া পণ্ডিত। ল্যানিয়নকে নিয়ে আমি যতটা হতাশ হয়েছি, আর কোনো মানুষকে নিয়ে ততটা হইনি।”
“তুমি জানো, আমি কখনোই ওই উইলটাকে সমর্থন করিনি,” আইনজীবী নতুন প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আবার বললেন।
“আমার উইল? হ্যাঁ, অবশ্যই জানি,” ডাক্তার একটু তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন। “তুমি আমাকে সে কথা বহুবার বলেছ।”
“ঠিক আছে, আবারও বলছি,” আইনজীবী চালিয়ে গেলেন। “আমি ওই তরুণ হাইড সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনেছি।”
ড. জেকিলের বড়, সুদর্শন মুখটি মুহূর্তের মধ্যেই ঠোঁট পর্যন্ত ফ্যাকাশে হয়ে গেল এবং তাঁর চোখের চারপাশে যেন অন্ধকার ছায়া নেমে এল।
“আমি আর কিছু শুনতে চাই না,” তিনি বললেন। “আমি ভেবেছিলাম, এই বিষয়টি নিয়ে আর কথা না বলার ব্যাপারে আমাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে।”
“আমি যা শুনেছি, তা অত্যন্ত জঘন্য,” আটারসন বললেন।
“তাতে কোনো পরিবর্তন হবে না। তুমি আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছ না,” ডাক্তার কিছুটা অসংলগ্ন ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন। “আমি খুবই দুর্বিপাকে পড়েছি, আটারসন। আমার অবস্থাটা অত্যন্ত অদ্ভুত—অত্যন্ত অদ্ভুত। এমন এক ব্যাপার, যা কথাবার্তা বলে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব নয়।”
“জেকিল,” আটারসন বললেন, “তুমি আমাকে চেনো। আমি একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। আমার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে সব কথা খুলে বলো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমি তোমাকে এই বিপদ থেকে বের করে আনতে পারব।”
“আমার প্রিয় আটারসন,” ডাক্তার বললেন, “তুমি আমার জন্য এতটা করতে চাইছ—এটা সত্যিই তোমার অসাধারণ দয়া। তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর মতো ভাষা আমার নেই। আমি তোমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। পৃথিবীর আর যেকোনো মানুষের চেয়ে তোমার ওপর আমি বেশি ভরসা করি— হ্যাঁ, সুযোগ থাকলে নিজের ওপরও তোমার চেয়ে বেশি ভরসা করতাম না। কিন্তু সত্যিই ব্যাপারটা তুমি যেমন ভাবছ, তেমন নয়; তবে এতটা খারাপও নয়। আর তোমার সৎ ও উদ্বিগ্ন মনটাকে একটু শান্ত করার জন্য আমি একটি কথা বলব—আমি যখনই চাইব, তখনই আমি মিস্টার হাইডের হাত থেকে মুক্ত হতে পারব—এ ব্যাপারে আমি তোমাকে আমার কথা দিচ্ছি। আর তোমাকে বারবার ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শুধু আরও একটি কথা বলব, অটারসন—আমি নিশ্চিত, তুমি কথাটি ভালোভাবেই নেবে: এটি একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাই আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, বিষয়টি নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি কোরো না; এটিকে ঘুমিয়ে থাকতে দাও।”
উৎটারসন কিছুক্ষণ আগুনের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমার মনে হয়, তুমি সম্পূর্ণ ঠিকই বলেছ।”
“যেহেতু আমরা বিষয়টা একবার তুলেই ফেলেছি, এবং আশা করি এটাই শেষবারের মতো,” ডাক্তার বললেন, “তাই আরও একটি কথা তোমাকে পরিষ্কার করে বলতে চাই। অসহায় হাইডের ব্যাপারে আমার সত্যিই গভীর—খুবই গভীর—আগ্রহ আছে। আমি জানি, তুমি তার সঙ্গে দেখা করেছ; সে আমাকে তা বলেছে। আর আমার আশঙ্কা, সে তোমার সঙ্গে অভদ্র আচরণ করেছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, ওই যুবকটির প্রতি আমার আন্তরিক এবং গভীর সহানুভূতি রয়েছে। যদি কোনোদিন আমি না থাকি, আটারসন, তাহলে আমি চাই তুমি আমাকে কথা দাও যে তুমি তার প্রতি সহনশীল থাকবে এবং তার ন্যায্য অধিকার তাকে পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। তুমি যদি সবকিছু জানতে, তাহলে নিশ্চয়ই তা করতে। আর তুমি যদি আমাকে এই প্রতিশ্রুতি দাও, তাহলে আমার মনটা অনেকটা হালকা হবে।”
আইনজীবী(আটারসন) বললেন, “আমি কখনোই তাকে পছন্দ করতে পারব— এমন ভান আমি করতে পারি না।”
জেকিল তাঁর বাহুর ওপর হাত রেখে অনুনয়ের সুরে বললেন, “আমি তোমাকে তাকে পছন্দ করতে বলছি না। আমি শুধু ন্যায়বিচার চাইছি; শুধু চাইছি, আমি যখন আর থাকব না, তখন তুমি যেন আমার কথা ভেবে তাকে সাহায্য করো।”
আটারসন অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, “বেশ, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি।”……………….
কেয়ারু হত্যাকাণ্ড
প্রায় এক বছর পর, ১৮— সালের অক্টোবর মাসে লন্ডন এমন এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল, যার শিকার হয়েছিলেন সমাজের অত্যন্ত উচ্চপদস্থ একজন ব্যক্তি। ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ, আর তার বিবরণও ছিল অল্প অথচ চমকে দেওয়ার মতো।
নদীর কাছাকাছি একটি বাড়িতে একা বসবাস করত এক পরিচারিকা। রাত প্রায় এগারোটার দিকে সে উপরে উঠে শুতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলো। যদিও গভীর রাতে কুয়াশা এসে পুরো শহরকে ঢেকে ফেলেছিল, রাতের প্রথম ভাগটি ছিল একেবারে পরিষ্কার। পরিচারিকার ঘরের জানালা থেকে যে সরু গলিটি দেখা যেত, পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় সেটি তখন ঝলমল করছিল।
মেয়েটি ছিল কিছুটা কল্পনাপ্রবণ স্বভাবের। তাই জানালার ঠিক নিচে রাখা তার বাক্সটির ওপর বসে সে আনমনে ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলো। পরে যখন সে সেই ঘটনার কথা বলত, তখন তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ত। সে বলত— জীবনে কখনো সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে নিজেকে এত শান্তি অনুভব করেনি, কিংবা পৃথিবীর প্রতি এতটা ভালোবাসা ও মমতা অনুভব করেনি।
এমন সময় সে দেখতে পেল, সাদা চুলের এক বৃদ্ধ, সুদর্শন ভদ্রলোক গলিপথ ধরে এগিয়ে আসছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য বিপরীত দিক থেকে আরও একজন লোক এগিয়ে এলেন— আকারে খুবই ছোটখাটো। প্রথমে পরিচারিকা তাঁর দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়নি।
দুজন যখন কথা বলার মতো দূরত্বে এসে পৌঁছালেন— আর সেই জায়গাটি ছিল ঠিক পরিচারিকার জানালার নিচে— তখন বয়স্ক ভদ্রলোকটি অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত ভঙ্গিতে মাথা নত করে অপর ব্যক্তিকে সম্ভাষণ জানালেন। মনে হচ্ছিল, তিনি যে বিষয়ে কথা বলছেন তা খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। তাঁর হাতের ইঙ্গিত দেখে কখনো কখনো মনে হচ্ছিল, যেন তিনি শুধু পথের ঠিকানাই জানতে চাইছেন।
কথা বলার সময় চাঁদের আলো সরাসরি তাঁর মুখের ওপর পড়ছিল। মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাঁর চেহারা ও আচরণে এমন এক নিষ্পাপ, সেকেলে ভদ্রতা ফুটে উঠেছিল, যার সঙ্গে আবার এক ধরনের মর্যাদা ও আত্মতৃপ্তিও মিশে ছিল।
কিছুক্ষণ পর মেয়েটির দৃষ্টি অন্য লোকটির দিকে গেল। আর তখনই সে বিস্মিত হয়ে চিনতে পারল— লোকটি আর কেউ নয়, সেই মিস্টার হাইড, যিনি একবার তার মনিবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এবং যাঁর প্রতি তার তখন থেকেই এক অকারণ বিরূপতা জন্মেছিল।
হাইডের হাতে ছিল একটি ভারী ছড়ি। সে সেটি নিয়ে অন্যমনস্কভাবে খেলছিল। কিন্তু বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কথার কোনো উত্তর সে দিল না। বরং মনে হচ্ছিল, প্রবল বিরক্তি ও অধৈর্য নিয়ে সে তাঁর কথা শুনছে।
হঠাৎ কী ঘটল, কেউ বুঝে ওঠার আগেই হাইড প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ল। সে পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে লাগল, ছড়িটি শূন্যে ঘোরাতে লাগল এবং— পরিচারিকার ভাষায়— একেবারে পাগলের মতো আচরণ করতে শুরু করল।
বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি অত্যন্ত বিস্মিত ও কিছুটা আহতের মতো মুখভঙ্গি করে এক পা পিছিয়ে গেলেন। আর ঠিক তখনই হাইড সমস্ত সংযম হারিয়ে ফেলল। সে ছড়ি দিয়ে বৃদ্ধ লোকটিকে এমন জোরে আঘাত করল যে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
পরের মুহূর্তেই, হিংস্র বানরের মতো উন্মত্ত ক্রোধে হাইড তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে লোকটিকে পায়ের নিচে পিষতে লাগল এবং একের পর এক প্রচণ্ড আঘাত করতে থাকল। আঘাতের তীব্রতায় হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল, আর তাঁর নিথর দেহ বারবার রাস্তার ওপর লাফিয়ে উঠছিল।
এই ভয়াবহ দৃশ্য ও শব্দের আতঙ্কে পরিচারিকা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
রাত দুটো নাগাদ তার জ্ঞান ফিরল। তখন সে পুলিশকে খবর দিল। কিন্তু ততক্ষণে হত্যাকারী বহু আগেই পালিয়ে গেছে। আর গলির মাঝখানে পড়ে ছিল তার শিকার—লাশটি এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত ও বিকৃত হয়েছিলো যে দৃশ্যটি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের ভয়াবহ।
যে ছড়িটি দিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়েছিল, সেটি ছিল অত্যন্ত দুর্লভ, শক্ত ও ভারী কাঠের তৈরি। কিন্তু এই উন্মত্ত নিষ্ঠুরতার প্রবল আঘাত সহ্য করতে না পেরে ছড়িটি মাঝখান থেকে ভেঙে গিয়েছিল। তার একটি ভাঙা অংশ গড়িয়ে পাশের নর্দমায় গিয়ে পড়েছিল। অন্য অংশটি যে হত্যাকারী সঙ্গে করে নিয়ে পালিয়ে গেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না।
নিহত ব্যক্তিটির পকেট থেকে একটি টাকার থলি এবং একটি সোনার ঘড়ি পাওয়া গেল। কিন্তু তাঁর পরিচয়পত্র বা অন্য কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। শুধু একটি সিলমোহরযুক্ত ও ডাকটিকিট লাগানো খাম ছিল, যা সম্ভবত তিনি ডাকযোগে পাঠানোর জন্য সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই খামের ওপর লেখা ছিল— মিস্টার আটারসনের নাম ও ঠিকানা।
পরদিন সকালে উকিল সাহেব বিছানা থেকে ওঠার আগেই খবরটি তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হলো। ঘটনাটির বিবরণ শোনার পর এবং চিঠিটি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গম্ভীরভাবে ঠোঁট কুঁচকে বললেন,-“মৃতদেহটি না দেখা পর্যন্ত আমি কিছুই বলব না। ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। দয়া করে আমি পোশাক পরা পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করুন।”
তারপর সেই একই গম্ভীর মুখে তিনি তাড়াতাড়ি প্রাতরাশ সেরে গাড়িতে করে থানায় গেলেন। মৃতদেহটি সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তিনি কক্ষে ঢুকেই মৃতদেহটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ,” তিনি বললেন, “আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, ইনি স্যার ড্যানভার্স ক্যারু।”
“হে ভগবান, স্যার!” অফিসারটি বিস্ময়ে বলে উঠল, “এ কি সত্যিই সম্ভব?”
পরক্ষণেই তার চোখে পেশাগত উত্তেজনা ও সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠল।
“এই ঘটনা তো বেশ হইচই ফেলে দেবে,” সে বলল। “আর সম্ভবত আপনি আমাদের সেই লোকটির কাছে পৌঁছতেও সাহায্য করতে পারবেন।”
এরপর সে সংক্ষেপে পরিচারিকা যা দেখেছিল তা বর্ণনা করল এবং ভাঙা লাঠিটি উকিলের সামনে তুলে ধরল।
হাইডের নাম শুনেই মি. আটারসন আগে থেকেই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু যখন লাঠিটি তাঁর সামনে রাখা হলো, তখন তাঁর আর কোনো সন্দেহ রইল না। লাঠিটি ভাঙা ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তিনি সেটিকে চিনতে পারলেন। বহু বছর আগে তিনি নিজেই এই লাঠিটি হেনরি জেকিলকে উপহার দিয়েছিলেন।
“এই মি. হাইড কি খাটো গড়নের লোক?” তিনি জানতে চাইলেন।
অফিসারটি বলল, “পরিচারিকার ভাষায়, লোকটি বিশেষভাবে খাটো এবং দেখতে অত্যন্ত দুশ্চরিত্র ও ভয়ংকর।”
মি. আটারসন কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন,-“আপনি যদি আমার সঙ্গে আমার গাড়িতে আসেন, তাহলে মনে হয় আমি আপনাকে তার বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারব।”
তখন সকাল প্রায় ন’টা বাজে। ঋতুর প্রথম কুয়াশাও নেমে এসেছিল। আকাশের ওপর চকলেট-রঙের এক বিশাল অন্ধকার পর্দার মতো কুয়াশা ঝুলে ছিল। তবে বাতাস বারবার সেই ঘন কুয়াশাকে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছিল। ফলে গাড়িটি যখন এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল, মি. আটারসনের চোখে বারবার গোধূলির অদ্ভুত নানা রং ও ছায়া ধরা পড়ছিল।
কোথাও মনে হচ্ছিল সন্ধ্যার একেবারে শেষ প্রহরের মতো ঘন অন্ধকার; আবার কোথাও দেখা যাচ্ছিল গাঢ়, ভয়ংকর বাদামি আভা—যেন কোনো অদ্ভুত অগ্নিকাণ্ডের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার কোনো কোনো মুহূর্তে কুয়াশা একটু সরে গেলে তার পাক খাওয়া স্তরের ফাঁক দিয়ে বিবর্ণ দিনের আলো একটি চিকন রশ্মির মতো উঁকি দিচ্ছিল।
এই পরিবর্তনশীল আলো-ছায়ার মধ্যে সোহোর বিষণ্ণ এলাকাটি—তার কর্দমাক্ত রাস্তা, অপরিচ্ছন্ন ও অগোছালো পথচারী, এবং এমন সব রাস্তার বাতি, যেগুলো হয় সারারাত জ্বলেই ছিল, নয়তো অন্ধকারের এই করুণ পুনরাগমন ঠেকাতে নতুন করে আলো জ্বালানো হয়েছিল—উকিলের চোখে যেন দৃশ্যটি দুঃস্বপ্নে দেখা কোনো এক অচেনা শহরের একটি অংশ বলে মনে হচ্ছিল।
তার ওপর তাঁর নিজের মনও তখন গভীর বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন। সঙ্গে থাকা পুলিশ অফিসারের দিকে তাকালে তাঁর মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল—আইন এবং আইনের কর্মকর্তাদের ভয় যে কখনো কখনো সবচেয়ে সৎ মানুষকেও গ্রাস করতে পারে, সেই ভয়েরই যেন সামান্য স্পর্শ তিনি অনুভব করছিলেন।
গাড়িটি যখন নির্দিষ্ট ঠিকানার সামনে এসে থামল, তখন কুয়াশা সামান্য সরে গিয়েছিল। দেখা গেল একটি মলিন ও নোংরা রাস্তা; একটি সস্তা মদের দোকান, নিচু ছাদের একটি ফরাসি খাবারের দোকান, এক পয়সা ও দু’পয়সার সস্তা পত্রিকা ও সালাদ বিক্রির দোকান, দরজার মুখে জটলা করে থাকা ছেঁড়া পোশাকের বহু শিশু এবং বিভিন্ন জাতীয়তার অনেক নারী—হাতে চাবি নিয়ে—সকালের এক পেগ পানীয় খেতে বাইরে বেরিয়ে আসছে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই কুয়াশা আবার সেই এলাকাটিকে ঢেকে ফেলল। গাঢ় বাদামি কুয়াশা যেন চারদিক থেকে নেমে এসে উকিলকে তাঁর সেই নোংরা ও দুশ্চরিত্র পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিল।
এই ছিল হেনরি জেকিলের প্রিয় মানুষটির বাসস্থান—এমন একজন মানুষের বাসস্থান, যে উত্তরাধিকারসূত্রে আড়াই লক্ষ পাউন্ড স্টার্লিংয়ের সম্পত্তির মালিক হতে চলেছে।
দরজা খুললেন হাতির দাঁতের মতো ফ্যাকাশে মুখের এবং রুপালি চুলের এক বৃদ্ধা। তাঁর মুখে ছিল ভণ্ডামির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অশুভ ভাব; কিন্তু তাঁর ব্যবহার ছিল অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত।
তিনি জানালেন, হ্যাঁ, এটাই মি. হাইডের বাড়ি। কিন্তু তিনি এখন বাড়িতে নেই। আগের রাতে তিনি খুব দেরিতে বাড়ি ফিরেছিলেন, তবে এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে আবার বেরিয়ে গেছেন।
বৃদ্ধার কথায় আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু ছিল না। মি. হাইডের অভ্যাস ছিল অত্যন্ত অনিয়মিত; তিনি প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকতেন। এমনকি গতকাল পর্যন্ত প্রায় দু’মাস ধরে বৃদ্ধা তাঁকে দেখেনইনি।
“বেশ, তাহলে আমরা তাঁর ঘরগুলো দেখতে চাই,” উকিল বললেন। মহিলা যখন বলতে শুরু করলেন যে তা অসম্ভব, তখন তিনি যোগ করলেন, “তাহলে আপনাকে আগেই বলে দেওয়াই ভালো, এই ভদ্রলোকটি কে। ইনি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ইন্সপেক্টর নিউকমেন।”
মহিলার মুখে হঠাৎ এক ঝলক কুৎসিত আনন্দ ফুটে উঠল। “আহা!” সে বলল, “তাহলে লোকটা বিপদে পড়েছে! কী করেছে সে?”
মি. আটারসন ও ইন্সপেক্টর পরস্পরের দিকে তাকালেন।
“লোকটা যে খুব জনপ্রিয় নয়, তা বোঝাই যাচ্ছে,” ইন্সপেক্টর মন্তব্য করলেন। “এখন, ভালো মহিলা, আমাকে আর এই ভদ্রলোকটিকে একটু ঘরগুলো দেখে নিতে দিন।”
বাড়িটির প্রায় সমস্তটাই খালি ছিল; শুধু বৃদ্ধা মহিলাটি সেখানে থাকতেন। এত বড় বাড়িতে মি. হাইড মাত্র দু-একটি ঘর ব্যবহার করতেন। কিন্তু সেই ঘরগুলো বিলাসবহুল ও রুচিসম্মত আসবাবে সাজানো ছিল। একটি ছোট ঘর ভর্তি ছিল নানা রকমের মদে। বাসনপত্র ছিল রুপোর, টেবিলের কাপড় ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও পরিপাটি। দেওয়ালে একটি উৎকৃষ্ট ছবি টাঙানো ছিল—আটারসনের ধারণা, সেটি হেনরি জেকিলের উপহার; কারণ জেকিল শিল্পকর্মের একজন ভালো সমঝদার লোক ছিলেন। মেঝেতে পাতা কার্পেটগুলো ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট এবং মনোরম রঙের।
কিন্তু সেই মুহূর্তে ঘরগুলোর চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। দেখে মনে হচ্ছিল, অল্প কিছুক্ষণ আগেই তাড়াহুড়ো করে সবকিছু তছনছ করে খোঁজা হয়েছে। জামাকাপড় মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল, তাদের পকেটগুলো উল্টে বাইরে বের করে রাখা। তালাবদ্ধ ড্রয়ারগুলো খোলা অবস্থায় পড়ে ছিল। আর অগ্নিকুণ্ডের ওপর পড়ে ছিল ধূসর ছাইয়ের একটি স্তূপ—মনে হচ্ছিল, সেখানে অনেক কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।
ইন্সপেক্টর সেই ছাইয়ের মধ্য থেকে একটি সবুজ চেকবইয়ের পোড়া অংশ উদ্ধার করলেন, যার এক প্রান্ত আগুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। চেকবইটির বাকি অংশটি দরজার পেছনে পাওয়া গেল। এই আবিষ্কার তাঁর সন্দেহকে আরও নিশ্চিত করে দিল। ফলে ইন্সপেক্টর অত্যন্ত আনন্দিত হলেন।
এরপর তাঁরা ব্যাংকে গেলেন। সেখানে দেখা গেল, খুনির নামে কয়েক হাজার পাউন্ড জমা রয়েছে। এই তথ্য ইন্সপেক্টরের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিল।
তিনি মি. আটারসনকে বললেন, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, স্যার—লোকটাকে আমি হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছি। নিশ্চয়ই সে বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিল, নইলে ওই লাঠিটা ফেলে যেত না; আর সবকিছুর চেয়েও বড় কথা, চেকবইটাও পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করত না। কেননা, টাকাই তো লোকটার জীবনের মূল ভরসা। আমাদের এখন শুধু ব্যাংকে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে এবং তার নামে পোস্টার ও প্রচারপত্র ছাপিয়ে দিতে হবে।”
কিন্তু শেষের কাজটি এত সহজে করা গেল না। কারণ মি. হাইডের পরিচিত মানুষের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। এমনকি যে বাড়ির পরিচারিকাটি তাঁর সেবা করত, তার মালিকও তাঁকে মাত্র দুবার দেখেছিলেন। তাঁর পরিবারের কোনো সন্ধানই কোথাও পাওয়া গেল না। তাঁর কোনো ছবিও কখনো তোলা হয়নি। আর যারা তাঁকে বর্ণনা করতে পারত, তাদের বর্ণনাও একে অপরের সঙ্গে বিস্তর অমিল ছিল—যেমনটা সাধারণত প্রত্যক্ষদর্শীদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
তবে একটি বিষয়ে প্রত্যেকেই একমত ছিল। মি. হাইডকে দেখলে প্রত্যেকের মনেই এক অদ্ভুত, অস্বস্তিকর অনুভূতির জন্ম হতো—যেন তাঁর চেহারা বা সত্তার মধ্যে এমন কোনো অব্যক্ত বিকৃতি লুকিয়ে আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তিনি যাঁদের সামনে পড়েছিলেন, তাঁদের মনে সেই অজ্ঞাত বিকৃতির এক গভীর ও অস্বস্তিকর বা বিষণ্ণ অনুভূতি রেখে গিয়েছিলেন।
চিঠির ঘটনা
বিকেল তখন বেশ গড়িয়ে গেছে। মিস্টার আটারসন ডক্টর জেকিলের বাড়ির দরজায় এসে পৌঁছালেন। পোলে সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে তাঁকে ভিতরে নিয়ে গেল। তারপর বাড়ির রান্নাঘর-সংলগ্ন অংশ দিয়ে তাঁকে নিয়ে এমন একটি উঠোন পার করিয়ে দিল, যেটি একসময় বাগান ছিল। উঠোনের শেষ প্রান্তে ছিল একটি ভবন—যেটিকে কেউ সাধারণভাবে গবেষণাগার, আবার কেউ শবব্যবচ্ছেদ কক্ষ বলে চিনত।
ডক্টর জেকিল বাড়িটি এক বিখ্যাত সার্জনের উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে কিনেছিলেন। তবে তাঁর নিজের আগ্রহ যেহেতু শারীরবিদ্যার চেয়ে রসায়নের দিকে বেশি ছিল, তাই তিনি বাগানের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা ভবনটির ব্যবহার পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন।
এই প্রথম মিস্টার আটারসন তাঁর বন্ধুর বাড়ির এই অংশে প্রবেশ করলেন। সেজন্য মলিন, জানালাবিহীন ভবনটির দিকে তিনি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেন। কিন্তু এর অদ্ভুত পরিবেশ তাঁর মনে এক ধরনের অস্বস্তিও সৃষ্টি করল। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো সেই বড় ঘরটির মধ্য দিয়ে, যেখানে একসময় আগ্রহী ছাত্রদের ভিড় লেগে থাকত; অথচ এখন সেটি নির্জন ও নিস্তব্ধ। ঘরের টেবিলগুলো রাসায়নিক যন্ত্রপাতিতে ভর্তি, মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বাক্সপেটরা ও প্যাকিংয়ের খড়। আর কুয়াশায় ঢাকা গম্বুজের মধ্য দিয়ে আবছা আলো এসে ঘরটিকে আরও বিষণ্ণ করে তুলেছিলো।
ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে কয়েক ধাপ সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়ির মাথায় লাল কাপড়ে ঢাকা একটি দরজা। সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করেই মিস্টার আটারসন শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের ব্যক্তিগত কক্ষে পৌঁছালেন।
ঘরটি ছিল বেশ বড়। চারদিকে কাচের আলমারি বসানো। ঘরের আসবাবের মধ্যে ছিল একটি বড় আয়না এবং একটি লেখার টেবিল। তিনটি ধুলোমাখা জানালা নিয়ে ঘরটি উঠোনের দিকে মুখ করে ছিল, আর জানালাগুলো লোহার শিক দিয়ে আটকানো ছিলো।
অগ্নিকুণ্ডে আগুন জ্বলছিল। চিমনির তাকের ওপর একটি বাতি জ্বলছিল, কারণ তখন বাড়ির ভেতরেও কুয়াশা ঘন হয়ে আসতে শুরু করেছে। সেই আগুনের উষ্ণতার একেবারে কাছে বসেছিলেন ডক্টর জেকিল। তাঁকে দেখতে ভীষণ অসুস্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের মতো লাগছিল।
তিনি তাঁর অতিথিকে অভ্যর্থনা জানাতে উঠে দাঁড়ালেন না। শুধু একটি ঠান্ডা হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরিবর্তিত কণ্ঠে তাঁকে স্বাগত জানালেন।
পোলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মিস্টার আটারসন বললেন,-“এখন বলুন তো, আপনি নিশ্চয়ই খবরটি শুনেছেন?”
ডক্টর শিউরে উঠলেন।
“চত্বরের লোকেরা চিৎকার করে খবরটি বলছিল,” তিনি বললেন। “আমি আমার খাবার ঘর থেকেও তাদের কথা শুনতে পেয়েছি।”
“একটি কথা বলব,” আইনজীবী বললেন। “কেয়ারু আমার মক্কেল ছিলেন, কিন্তু আপনিও আমার মক্কেল। তাই আমি জানতে চাই, এখন আমার কী করা উচিত। আপনি নিশ্চয়ই এতটা পাগলামি করেননি যে ওই লোকটিকে লুকিয়ে রেখেছেন?”
“আটারসন, আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি,” ডাক্তার উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, “আমি আর কোনোদিন তার মুখ দেখব না। আপনাকে আমার সম্মানের শপথ করে বলছি, এই পৃথিবীতে তার সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক শেষ। সবকিছু চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। আর সত্যি বলতে, তার আমার সাহায্যেরও প্রয়োজন নেই। আপনি তাকে আমার মতো করে চেনেন না। সে নিরাপদে আছে, একেবারে নিরাপদে। আমার কথা মনে রাখবেন—তার সম্পর্কে আর কখনো কোনো খবর শোনা যাবে না।”
আইনজীবী বিষণ্ণ মুখে তাঁর কথা শুনলেন। বন্ধুর এই অস্বাভাবিক উত্তেজনা ও অস্থির আচরণ তাঁর মোটেই ভালো লাগছিল না। তিনি বললেন, “তাকে নিয়ে আপনি বেশ নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে। আপনার ভালোর জন্যই আশা করি, আপনি ঠিক বলেছেন। কারণ বিষয়টি যদি আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে আপনার নামও সেখানে উঠে আসতে পারে।”
“আমি তার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত,” জেকিল উত্তর দিলেন। “এমন কিছু কারণ আমার কাছে আছে, যা আমাকে নিশ্চিত করেছে; কিন্তু সেগুলো আমি আর কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি না। তবে একটি বিষয়ে আপনি আমাকে পরামর্শ দিতে পারেন। আমি—আমি একটি চিঠি পেয়েছি। এখন আমি বুঝতে পারছি না, চিঠিটি পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিত হবে কি না। আমি চিঠিটি আপনার হাতেই তুলে দিতে চাই, আটারসন। আপনি নিশ্চয়ই বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আপনার ওপর আমার এতটাই গভীর আস্থা আছে।”
“আপনার কি আশঙ্কা হচ্ছে,” আইনজীবী জিজ্ঞেস করলেন, “যে এই চিঠির কারণে শেষ পর্যন্ত হাইডের পরিচয় ফাঁস হয়ে যেতে পারে?”
“না,” জেকিল বললেন। “হাইডের কী হয়, তা নিয়ে আমার এখন আর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক একেবারে শেষ। আমি বরং নিজের সুনামের কথা ভাবছিলাম—এই ঘৃণ্য ঘটনাটি আমার চরিত্রকেও বেশ খানিকটা কলঙ্কিত করে তুলেছে।”
আটারসন কিছুক্ষণ গভীরভাবে চিন্তা করলেন। বন্ধুর এই আত্মকেন্দ্রিকতা তাঁকে যেমন বিস্মিত করল, তেমনি খানিকটা স্বস্তিও দিল।
“বেশ,” অবশেষে তিনি বললেন, “চিঠিটা আমাকে দেখতে দিন।”
চিঠিটি অদ্ভুত ধরনের খাড়া হাতের লেখায় লেখা এবং নিচে স্বাক্ষর—“এডওয়ার্ড হাইড”। সংক্ষেপে চিঠিতে লেখা ছিল—তার উপকারক ডক্টর জেকিল, যাঁর কাছ থেকে সে দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য অনুগ্রহ পেয়েও অত্যন্ত অকৃতজ্ঞের মতো প্রতিদান দিয়েছে, তাঁর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, পালিয়ে যাওয়ার এমন কিছু উপায় তার জানা আছে, যার ওপর সে সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারে।
চিঠিটি আটারসনের বেশ ভালোই লাগল। এতে জেকিল ও হাইডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটি তাঁর আশঙ্কার তুলনায় অনেক কম সন্দেহজনক বলে মনে হলো। নিজের অতীতের কিছু সন্দেহের জন্য তিনি নিজেকেই মনে মনে দোষ দিতে লাগলেন।
“খামটা কি আপনার কাছে আছে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“পুড়িয়ে ফেলেছি,” জেকিল উত্তর দিলেন। “আমি কী করছি তা বোঝার আগেই পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। তবে খামের গায়ে কোনো ডাকঘরের সিল ছিল না। চিঠিটা হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।”
“আমি কি চিঠিটা নিজের কাছে রেখে আজ রাতে একটু ভেবে দেখব?” আটারসন জিজ্ঞেস করলেন।
“আপনিই সম্পূর্ণভাবে আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিন,” জেকিল উত্তর দিলেন। “নিজের ওপর আমার আর কোনো আস্থা নেই।”
“বেশ, আমি বিষয়টি বিবেচনা করব,” আইনজীবী বললেন। “আর একটা কথা—আপনার উইলে আপনার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে যে শর্তগুলো লেখা হয়েছিল, সেগুলো কি হাইডই আপনাকে দিয়ে লিখিয়েছিল?”
ডাক্তারের মুখে হঠাৎ দুর্বলতার ছাপ ফুটে উঠল। তিনি শক্ত করে ঠোঁট বন্ধ করলেন এবং মাথা নাড়লেন।
“আমি জানতাম,” আটারসন বললেন। “সে আপনাকে খুন করতে চেয়েছিল। আপনি অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন।”
“আমি তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেয়েছি,” ডাক্তার গম্ভীর স্বরে বললেন। “আমি একটি শিক্ষা পেয়েছি—হে ঈশ্বর, আটারসন, কী ভয়ংকর শিক্ষা যে আমি পেয়েছি!”
এই কথা বলে তিনি কিছুক্ষণের জন্য দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলেন।
বেরিয়ে আসার সময় আইনজীবী থামলেন এবং পুলের সঙ্গে দু-একটি কথা বললেন।
“আচ্ছা, আজ একটা চিঠি হাতে করে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল—লোকটা দেখতে কেমন ছিল?”
কিন্তু পুল দৃঢ়ভাবে জানাল, ডাকযোগে আসা ছাড়া আর কোনো চিঠিই আসেনি।
“আর ডাকেও যা এসেছে, তার মধ্যে শুধু কিছু বিজ্ঞপ্তি বা প্রচারপত্র ছিল,” সে যোগ করল।
এই খবর শুনে আটারসন আরও উদ্বিগ্ন হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। স্পষ্টতই, চিঠিটি ল্যাবরেটরির দরজা দিয়েই এসে থাকবে; এমনকি সম্ভবত সেটি সেই গোপন কক্ষেই লেখা হয়েছিল। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টিকে অন্যভাবে বিচার করতে হবে এবং আরও বেশি সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হবে।
তিনি যখন পথে চলছিলেন, তখন ফুটপাথের ধারে সংবাদপত্র বিক্রেতারা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে খবর দিচ্ছিল—“বিশেষ সংস্করণ! এম.পি.-কে নৃশংসভাবে খুন!”
এই সংবাদটি তাঁর এক বন্ধু ও মক্কেলের মৃত্যুর যেন শেষ ঘোষণা হয়ে দাঁড়াল। আর তিনি কিছুতেই সেই আশঙ্কা কাটিয়ে উঠতে পারলেন না যে, এই কেলেঙ্কারির ঘূর্ণাবর্তে তাঁর আরেক বন্ধুর সুনামও হয়তো তলিয়ে যাবে।
অন্তত সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও সূক্ষ্ম। নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর অভ্যস্তভাবে নির্ভরশীল মানুষ হওয়া সত্ত্বেও, আটারসনের মনে এবার কারও পরামর্শ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগল। তবে সরাসরি সেই পরামর্শ পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। তিনি ভাবলেন, হয়তো কোনোভাবে সেই পরামর্শটি পরোক্ষভাবে বের করে আনা যেতে পারে।
কিছুক্ষণ পর তিনি নিজের অগ্নিকুণ্ডের এক পাশে বসলেন, আর অন্য পাশে বসলেন তাঁর প্রধান কেরানি মি. গেস্ট। তাঁদের মাঝখানে, আগুন থেকে হিসেব করে উপযুক্ত দূরত্বে রাখা ছিল এক বোতল বিশেষ পুরোনো মদ। বহুদিন ধরে সেটি তাঁর বাড়ির ভাণ্ডারের অন্ধকারে, সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত অবস্থায় পড়ে ছিল।
তখনও কুয়াশায় ডুবে থাকা লন্ডন শহরের ওপর ডানার মতো বিস্তৃত হয়ে নিঃশব্দে ভেসে ছিল কুয়াশা। দূরের গ্যাসবাতিগুলো কুয়াশার মধ্যে এমনভাবে জ্বলছিল, যেন অন্ধকারে লালচে ঝকঝকে রত্ন জ্বলছে। একাধিক ফোঁড়ার সমষ্টির মতো ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা শহরের মধ্য দিয়েও জীবনের স্রোত তখনও তার প্রশস্ত প্রধান পথগুলো দিয়ে গর্জন করে বয়ে চলেছে—শব্দটা যেন প্রবল ঝড়ের বাতাসের মতো।
কিন্তু ঘরের পরিবেশ আগুনের আলোয় ছিল উজ্জ্বল ও আনন্দময়।
বোতলের ভেতরের মদের তীব্রতা বহু আগেই কোমল হয়ে এসেছিল। সময়ের সঙ্গে তার গাঢ় রাজকীয় রংও মোলায়েম হয়ে উঠেছিল—যেমন রঙিন কাচের জানালায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রং আরও গভীর ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত আঙুরের বাগানে কাটানো উষ্ণ শরতের দুপুরগুলোর যে উজ্জ্বলতা সেই মদের মধ্যে বন্দি ছিল, এখন যেন তা মুক্ত হয়ে লন্ডনের কুয়াশায় ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।
ধীরে ধীরে আটারসনের মনও নরম হয়ে এল।
মি. গেস্টের কাছে তিনি যত কথা কম গোপন রাখতেন, এমন মানুষ তাঁর আর ছিল না। বরং কখনও কখনও তাঁর মনে হতো, তিনি যতটা গোপন রাখতে চান, তার চেয়েও কমই হয়তো গেস্টের কাছ থেকে কথা গোপন রাখতে পেরেছেন।
গেস্ট বহুবার ব্যবসার কাজে ড. জেকিলের বাড়িতে গিয়েছেন। তিনি পুলকে চিনতেন। তাই বাড়িতে মি. হাইডের অবাধ যাতায়াতের কথা তাঁর কানে না যাওয়াই বরং অসম্ভব ছিল। নিশ্চয়ই তিনি এ নিয়ে কিছু ধারণাও করে থাকতে পারেন।
তাহলে এমন একটি চিঠি, যা এই রহস্যের সমাধান করতে পারে, সেটি গেস্টকে দেখানোই কি ভালো নয়?
বিশেষ করে গেস্ট যেহেতু হাতের লেখা বিশ্লেষণ ও বিচার করার ব্যাপারে একজন বড় মাপের অনুরাগী ও সমালোচক—তাই তাঁকে চিঠিটি দেখানোও স্বাভাবিক এবং ভদ্রতার পরিচয় হবে।
এ ছাড়া গেস্ট ছিলেন বিচক্ষণ পরামর্শদাতা। এমন অদ্ভুত একটি দলিল পড়েও তিনি নিশ্চয়ই কোনো মন্তব্য না করে থাকতে পারবেন না। আর তাঁর সেই মন্তব্যের ওপর ভিত্তি করে মি. আটারসন নিজের পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে পারবেন!
উটারসন বললেন,-“স্যার ড্যানভার্সের ব্যাপারটা সত্যিই বড় দুঃখজনক।”
“হ্যাঁ, স্যার, নিশ্চয়ই। ঘটনাটি জনসাধারণের মধ্যে যথেষ্ট উত্তেজনা ও আবেগ সৃষ্টি করেছে,” গেস্ট উত্তর দিলেন।
“লোকটি নিশ্চয়ই পাগল ছিল।”
“এ বিষয়ে আপনার মতামত শুনতে আমার বেশ আগ্রহ হচ্ছে,” আটারসন বললেন। “এই যে, তাঁর নিজের হাতের লেখা একটি দলিল আমার কাছে আছে। বিষয়টি আমাদের দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। সত্যি বলতে কী, এটি নিয়ে কী করা উচিত, তা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ব্যাপারটি এমনিতেই অত্যন্ত কুৎসিত। তবে যেহেতু দলিলটি আপনার বিশেষ আগ্রহের বিষয়— এটি তো একজন খুনির নিজের হাতে লেখা স্বাক্ষর।”
গেস্টের চোখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়লেন এবং গভীর আগ্রহ নিয়ে লেখাটি পরীক্ষা করতে লাগলেন।
“না, স্যার,” তিনি বললেন, “লোকটি পাগল ছিল না। তবে তার হাতের লেখাটা অদ্ভুত।”
আটারসন বললেন,-“আর যতদূর শোনা যায়, লেখক নিজেও নাকি বেশ অদ্ভুত ধরনের মানুষ ছিলেন।”
ঠিক সেই সময় চাকরটি একটি চিঠি নিয়ে ঘরে ঢুকল।
কেরানি জিজ্ঞেস করলেন,-“এটি কি ড. জেকিলের কাছ থেকে এসেছে, স্যার? আমার মনে হচ্ছে, আমি এই হাতের লেখা চিনি।”
আটারসন বললেন,-“কিছু ব্যক্তিগত ব্যাপার নাকি, মি. গেস্ট?”
“না, শুধু রাতের খাবারের নিমন্ত্রণ। কেন?” “আপনি কি চিঠিটা দেখতে চান?”
“এক মুহূর্তের জন্য, স্যার।” আটারসন কাগজটা দিলেন। গেস্ট তখন দুটি কাগজ পাশাপাশি রাখলেন এবং অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে দুটির হাতের লেখা তুলনা করতে লাগলেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন,-“ধন্যবাদ, স্যার,” বলে দুটি কাগজই ফিরিয়ে দিয়ে বললেন- “এটি সত্যিই অত্যন্ত আকর্ষণীয় হাতের লেখা।”
কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল। এই সময় মি. উটারসন নিজের মনের সঙ্গে একরকম সংগ্রাম করতে লাগলেন।
হঠাৎ তিনি জিজ্ঞেস করলেন,-“গেস্ট, আপনি দুটো হাতের লেখা তুলনা করলেন কেন?”
কেরানি উত্তর দিলেন,-“আসলে, স্যার, দুটির মধ্যে বেশ অদ্ভুত মিল রয়েছে। অনেক দিক থেকেই দুই হাতের লেখা প্রায় একই রকম—শুধু লেখার ঢালটা আলাদা।”
“বেশ অদ্ভুতই তো,” আটারসন বললেন।
“আপনি যেমন বলছেন, সত্যিই বেশ অদ্ভুত,” গেস্টও সম্মতি জানালেন।
“এই চিঠির কথা কিন্তু কাউকে বলবেন না, বুঝলেন?” মনিব বললেন।
“না, স্যার,” কেরানি উত্তর দিল। “কথাটা আমি বুঝেছি।”
কিন্তু সেদিন রাতে মি. আটারসন একা হতেই চিঠিটিকে তাঁর সিন্দুকের তালাবদ্ধ নিরাপদ কুঠুরিতে রেখে দিলেন। তারপর থেকে সেটি সেখানেই সযত্নে সংরক্ষিত রইল।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “কী আশ্চর্য! হেনরি জেকিল একজন খুনির জালিয়াতি করে চিঠি লিখেছেন!”
এই চিন্তা মনে আসতেই তাঁর শিরায় শিরায় রক্ত যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
ড. ল্যানিয়নের আশ্চর্য ঘটনা
সময় গড়িয়ে চলল। স্যার ড্যানভার্সের হত্যাকাণ্ডকে জনসাধারণের প্রতি এক গুরুতর আঘাত বলে মনে করা হয়েছিল; তাই হত্যাকারীর সন্ধান দিতে হাজার হাজার পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু মিস্টার হাইডের যেন কখনও অস্তিত্বই ছিল না—এমনভাবে পুলিশের নজর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
তার অতীতের অনেক কথাই অবশ্য অনুসন্ধান করে বের করা হয়েছিল, এবং সেসবের প্রায় সবই ছিল অত্যন্ত নিন্দনীয়। তার নির্মমতা ও হিংস্রতার নানা কাহিনি প্রকাশ্যে এল; তার জঘন্য জীবনযাপন, তার অদ্ভুত সঙ্গীসাথি এবং তার জীবনকে ঘিরে থাকা গভীর ঘৃণার কথাও জানা গেল। কিন্তু বর্তমানে সে কোথায় আছে, সে সম্পর্কে সামান্যতম খবরও পাওয়া গেল না।
হত্যার সকালে সোহোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই সে যেন সম্পূর্ণভাবে পৃথিবী থেকে মুছে গেল। সময় যত গড়াতে লাগল, মিস্টার আটারসনও ধীরে ধীরে তার আতঙ্কের তীব্রতা কাটিয়ে উঠতে লাগলেন এবং মনে কিছুটা শান্তি ফিরে পেলেন। স্যার ড্যানভার্সের মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছিল, তাঁর মনে হলো, মি. হাইডের অন্তর্ধান যেন সেই ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে দিয়েছিল।
হাইডের সেই অশুভ প্রভাব দূর হয়ে যাওয়ার পর ড. জেকিলের জীবনেও যেন নতুন অধ্যায় শুরু হলো। তিনি তাঁর নিভৃতবাস থেকে বেরিয়ে এলেন, বন্ধুদের সঙ্গে আবার সম্পর্ক স্থাপন করলেন এবং আগের মতোই তাঁদের ঘনিষ্ঠ অতিথি ও আপ্যায়নকারী হয়ে উঠলেন। তিনি বরাবরই দান-খয়রাতের জন্য পরিচিত ছিলেন; এখন ধর্মপরায়ণতার জন্যও সমানভাবে খ্যাতি অর্জন করলেন।
তিনি নানা কাজে ব্যস্ত থাকতেন, প্রায়ই বাইরে বেরোতেন এবং মানুষের উপকার করতেন। তাঁর মুখ যেন আরও উজ্জ্বল ও প্রসন্ন হয়ে উঠেছিল—মনে হতো, অন্তরের কোনো সৎকর্মের তৃপ্তি তাঁর মুখমণ্ডলে আলো ছড়াচ্ছে। এভাবে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ডাক্তার শান্তিতে ছিলেন।
৮ জানুয়ারি আটারসন কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ডাক্তারের বাড়িতে নৈশভোজে গিয়েছিলেন। সেখানে ল্যানিয়নও উপস্থিত ছিলেন। বাড়ির আতিথেয়তায় জেকিলের মুখে এমন এক আনন্দের ছাপ ফুটে উঠেছিল, যেন পুরোনো সেই দিনগুলো ফিরে এসেছে— যে সময় এই তিনজন ছিলেন অবিচ্ছেদ্য বন্ধু।
কিন্তু ১২ জানুয়ারি এবং আবার ১৪ জানুয়ারি আটারসনের জন্য ডাক্তারের দরজা বন্ধ রইল।
পুল বলল,-“ডাক্তার বাড়িতেই আছেন, কিন্তু কারও সঙ্গে দেখা করছেন না।”
১৫ জানুয়ারি আটারসন আবার দেখা করার জন্য চেষ্টা করলেন, কিন্তু এবারও তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। গত দুই মাস ধরে প্রায় প্রতিদিন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তাঁর। তাই হঠাৎ আবার এই নিঃসঙ্গতা তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলল।
পঞ্চম রাতে তিনি গেস্টকে নিজের সঙ্গে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানালেন। আর ষষ্ঠ রাতে তিনি গেলেন ড. ল্যানিয়নের বাড়িতে।
অন্তত সেখানে তাঁকে ঢুকতে বাধা দেওয়া হলো না। কিন্তু ঘরে প্রবেশ করেই ডাক্তারকে দেখে আটারসন ভীষণভাবে চমকে উঠলেন। ল্যানিয়নের চেহারায় যেন স্পষ্টভাবে মৃত্যুর ছাপ লেখা ছিল।
একসময় যে মানুষটির মুখ ছিল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও গোলাপি, তাঁর মুখ এখন বিবর্ণ হয়ে গেছে। শরীরের মাংস শুকিয়ে গিয়েছে; তাঁকে স্পষ্টতই আগের চেয়ে মাথায় বেশি টাক পড়েছিল ও বয়স্ক দেখাচ্ছিল। তবে তাঁর দ্রুত শারীরিক অবনতির এই লক্ষণগুলো আটারসনের সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েনি। বরং তাঁর চোখের দৃষ্টি এবং আচরণের মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা মনের গভীরে প্রোথিত কোনো ভয়াবহ আতঙ্কের সাক্ষ্য দিচ্ছিল।
ডাক্তার ল্যানিয়ন যে মৃত্যুকে ভয় করবেন, তা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। তবু আটারসনের মনে সেই সন্দেহই জাগল।
তিনি ভাবলেন,-“হ্যাঁ, তিনি তো ডাক্তার। নিজের শারীরিক অবস্থা তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এবং জানেন যে তাঁর জীবনের দিন গোনা শেয হয়ে গেছে। আর এই সত্যটাই হয়তো তিনি সহ্য করতে পারছেন না।”
তবু আটারসন যখন তাঁর অসুস্থ চেহারা সম্পর্কে মন্তব্য করলেন, ল্যানিয়ন অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে জানালেন যে তিনি মৃত্যুপথযাত্রী।
“আমি এক ভয়াবহ ধাক্কা খেয়েছি,” তিনি বললেন, “এবং আর কখনও সুস্থ হয়ে উঠব না। আর কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার। তবে জীবন তো সুখেরই ছিল; আমি জীবনকে ভালোবেসেছিলাম। হ্যাঁ, মহাশয়, একসময় আমি জীবনকে সত্যিই ভালোবাসতাম। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা যদি মানুষ যদি জীবন, পৃথিবী, মানুষের স্বভাব সম্পর্কে সবকিছু জানতে পারতাম, তাহলে হয়তো এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার জন্য আরও বেশি আগ্রহী হতাম।”
আটারসন বললেন,-“জেকিলও অসুস্থ। আপনি কি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন?”
কিন্তু জেকিলের নাম শুনতেই ল্যানিয়নের মুখের ভাব বদলে গেল। তিনি কাঁপতে কাঁপতে একটি হাত তুলে ধরলেন।
“ড. জেকিলের কথা আমি আর শুনতেও চাই না, দেখতেও চাই না,” তিনি উচ্চ ও অস্থির কণ্ঠে বললেন। “ওই ব্যক্তির সঙ্গে আমার সমস্ত সম্পর্ক শেষ। আর যাঁকে আমি মৃত বলে মনে করি, দয়া করে তাঁর কথা আমার সামনে আর তুলবেন না।”
“আহা, আহা!” আটারসন বললেন।
তারপর বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,-“আমি কি কিছুই করতে পারি না?”
“আমরা তো তিনজন বহু পুরোনো বন্ধু, ল্যানিয়ন। আমাদের জীবনে আর নতুন বন্ধু তৈরি করার মতো সময়ও বোধহয় বেশি নেই।”
“কিছুই করার নেই,” ল্যানিয়ন উত্তর দিলেন। “ওঁকেই জিজ্ঞেস করুন।”
“কিন্তু তিনি তো আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন না,” আইনজীবী বললেন।
“তাতে আমি অবাক হচ্ছি না,” ল্যানিয়ন উত্তর দিলেন। “একদিন, আটারসন—আমি মারা যাওয়ার পর— হয়তো আপনি এই ঘটনার সত্য-মিথ্যা, সঠিক-ভুল সবকিছু জানতে পারবেন। কিন্তু আমি এখন আপনাকে কিছুই বলতে পারছি না।
“এই মুহূর্তে আপনি যদি আমার সঙ্গে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে বসে গল্প করতে পারেন, তাহলে ঈশ্বরের দোহাই, বসে থাকুন এবং তাই করুন। কিন্তু যদি এই অভিশপ্ত বিষয়টি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে না পারেন, তাহলে ঈশ্বরের নামে বলছি, চলে যান। কারণ আমি আর এটি সহ্য করতে পারছি না।”
বাড়ি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মি. আটারসন ড. জেকিলকে একটি চিঠি লিখলেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করলেন যে, তাঁকে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না কেন এবং ড. ল্যানিয়নের সঙ্গে জেকিলের এই দুঃখজনক সম্পর্কচ্ছেদের কারণ জানতে চাইলেন। পরদিনই জেকিলের কাছ থেকে একটি দীর্ঘ উত্তর এল। চিঠিটির ভাষা অনেক সময় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী, আবার কোথাও কোথাও তার বক্তব্য ছিল গভীর রহস্যে আচ্ছন্ন।
ল্যানিয়নের সঙ্গে তাঁর বিরোধ আর মিটবার নয়। জেকিল লিখেছিলেন—“আমাদের পুরোনো বন্ধু ল্যানিয়নকে আমি দোষ দিই না। বরং তাঁর সঙ্গে আমারও এই মত যে, আমাদের আর কখনো দেখা করা উচিত নয়। এখন থেকে আমি সম্পূর্ণ নির্জন জীবনযাপন করতে চাই। তাই আমার দরজা যদি প্রায়ই আপনার জন্যও বন্ধ থাকে, তাতে অবাক হবেন না এবং আমার বন্ধুত্ব নিয়েও সন্দেহ করবেন না। আমাকে আমার নিজের অন্ধকার পথে চলতে দিন। আমি নিজের জন্য এমন এক শাস্তি ও বিপদ ডেকে এনেছি, যার নামও আমি উচ্চারণ করতে পারছি না। আমি যদি পাপীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপী হয়ে থাকি, তবে আমিই আবার সবচেয়ে বেশি কষ্টভোগ করছি। আমি কখনো ভাবিনি যে এই পৃথিবীতে এমন যন্ত্রণা ও আতঙ্কের কোনো স্থান থাকতে পারে, যা একজন মানুষকে এতটা দুর্বল ও ভেঙে দিতে পারে। আটারসন, আমার এই দুর্ভাগ্য কিছুটা লাঘব করার জন্য আপনি একটিমাত্র কাজই করতে পারেন—আমার নীরবতাকে সম্মান করুন।”
আটারসন বিস্মিত হয়ে গেলেন। হাইডের অশুভ প্রভাব যেন দূর হয়ে গিয়েছিল; ড. জেকিল আবার তাঁর পুরোনো কাজকর্ম ও বন্ধুত্বের জীবনে ফিরে এসেছিলেন। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও মনে হচ্ছিল, তাঁর সামনে আনন্দময় ও সম্মানজনক বার্ধক্যের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ এখন এক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর বন্ধুত্ব, মানসিক শান্তি এবং সমগ্র জীবনযাত্রাই যেন ধ্বংস হয়ে গেল।
এত বড় এবং আকস্মিক পরিবর্তন পাগলামির দিকেই ইঙ্গিত করছিল। কিন্তু ল্যানিয়নের আচরণ ও কথাবার্তা বিবেচনা করলে বোঝা যাচ্ছিল, এর পেছনে নিশ্চয়ই আরও গভীর কোনো কারণ রয়েছে।
এর এক সপ্তাহ পর ড. ল্যানিয়ন শয্যাশায়ী হলেন এবং তারও দুই সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি মারা গেলেন।
ল্যানিয়নের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরের রাতে, যে অনুষ্ঠানে আটারসন গভীরভাবে শোকাহত হয়েছিলেন, তিনি তাঁর অফিসের দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর বিষণ্ণ একটি মোমবাতির আলোয় বসে তিনি তাঁর মৃত বন্ধুর হাতের লেখা ও সিলমোহর করা একটি খাম বের করে সামনে রাখলেন।
খামের ওপর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লেখা ছিল—“ব্যক্তিগত—শুধুমাত্র জি. জে. আটারসনের হাতে দেওয়ার জন্য। এবং যদি তিনি আমার আগে মারা যান, তবে না খুলেই এটি ধ্বংস করতে হবে।”
খামের ভেতরের বিষয়বস্তু কী হতে পারে, তা ভেবে আইনজীবীর মনে ভয় জেগে উঠল। তিনি ভাবলেন, “আজ আমি আমার একজন বন্ধুকে কবর দিয়েছি। এই চিঠির কারণে যদি আমাকে আরেকজন বন্ধুকেও হারাতে হয়?”
কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজের এই ভয়কে বন্ধুর প্রতি অবিশ্বাস ও বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করলেন এবং খামের সিল ভেঙে চিঠি খোলে ফেললেন।
ভেতরে আরও একটি সিলমোহর করা খাম ছিল। তার ওপর লেখা ছিল—“ড. হেনরি জেকিলের মৃত্যু অথবা নিখোঁজ হওয়ার আগে এটি খোলা যাবে না।”
আটারসন নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। হ্যাঁ, সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল—“নিখোঁজ হওয়া”।
অনেক বছর আগে তিনি যে অদ্ভুত উইলটি তার লেখকের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, সেখানেও এমনই একটি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কথা এবং হেনরি জেকিলের নাম পাশাপাশি লেখা ছিল। তবে সেই উইলে এই ধারণাটি এসেছিল সেই অশুভ মানুষ হাইডের ভয়ংকর প্ররোচনা থেকে; আর সেখানে এটি এমন এক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল, যার অর্থ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভয়াবহ।
কিন্তু এই কথাগুলো তো ল্যানিয়নের নিজের হাতে লেখা! তাহলে এর অর্থ কী?
আটারসনের মনে প্রবল কৌতূহল জেগে উঠল। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিনি যেন সঙ্গে সঙ্গেই এই সমস্ত রহস্যের গভীরে পৌঁছে যেতে চাইলেন। কিন্তু পেশাগত নীতি এবং মৃত বন্ধুর প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল অত্যন্ত কঠোর বাধ্যবাধকতা। তাই তিনি সেই খামটি তাঁর ব্যক্তিগত সিন্দুকের একেবারে গভীরতম কোণে রেখে দিলেন।
কৌতূহলকে দমন করা এক জিনিস, আর তাকে সম্পূর্ণরূপে জয় করা আরেক জিনিস। তাই সেই দিন থেকে জীবিত বন্ধুটির সঙ্গ পাওয়ার জন্য আটারসনের আগের মতো আর তীব্র আগ্রহ রইল কি না, তা নিয়েই সন্দেহ হয়।
তিনি জেকিলের কথা স্নেহের সঙ্গেই ভাবতেন, কিন্তু তাঁর চিন্তায় এখন অস্বস্তি ও ভয় মিশে থাকত।
তিনি জেকিলের বাড়িতে দেখা করতে যেতেন ঠিকই, কিন্তু দরজা থেকে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হলে হয়তো তাঁর মনে একরকম স্বস্তিই আসত। হয়তো অন্তরে তিনি সেই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার চেয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পুলের সঙ্গে কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন—খোলা শহরের বাতাস ও নানা শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে। কারণ তিনি সেই স্বেচ্ছাবন্দিত্বের বাড়ির ভেতরে ঢুকে তার রহস্যময় নিঃসঙ্গ বাসিন্দার সঙ্গে বসে কথা বলতে চাইতেন না।
পুলের কাছ থেকেও অবশ্য খুব সুখবর পাওয়া যেত না।
জানা গেল, ডাক্তারের অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ। তিনি এখন পরীক্ষাগারের ওপরের সেই ছোট ঘরটিতেই প্রায় সারাক্ষণ নিজেকে বন্দি করে রাখেন। এমনকি কখনো কখনো সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। তাঁর মন-মেজাজ সবসময় খারাপ থাকত, তিনি অত্যন্ত নীরব হয়ে গিয়েছিলেন, কোনো বইও পড়তেন না। মনে হতো, যেন কোনো গভীর চিন্তা তাঁকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
এই একই ধরনের খবর বারবার শুনতে শুনতে আটারসন ধীরে ধীরে তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেন। ফলে তিনি জেকিলের বাড়িতে যাওয়ার পরিমাণও একটু একটু করে কমিয়ে দিলেন।
জানালার পাশের ঘটনা
এক রবিবারের ঘটনা। মি. আটারসন তাঁর অভ্যাসমতো মি. এনফিল্ডের সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে তাঁদের পথ আবার সেই সরু গলির ভেতর দিয়ে গেল। সেই বাড়িটির দরজার সামনে এসে দুজনেই থমকে দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ দরজাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“আচ্ছা,” এনফিল্ড বললেন, “অন্তত সেই কাহিনির এখানেই শেষ। মি. হাইডকে আমরা আর কখনও দেখতে পাব না।”
“আমি তাই আশা করি,” আটারসন বললেন। “আমি কি কখনও তোমাকে বলেছি যে, একবার আমিও তাকে দেখেছিলাম এবং তোমার মতোই তার প্রতি গভীর ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা অনুভব করেছিলাম?”
“একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটা অনুভব করা অসম্ভব ছিল,” এনফিল্ড উত্তর দিলেন। “আর হ্যাঁ, একটা কথা মনে পড়ল—আমি যে জানতাম না এটি ড. জেকিলের বাড়ির পেছনের প্রবেশপথ, সেজন্য নিশ্চয়ই তুমি আমাকে কী বোকাই না ভেবেছিলে! যদিও শেষ পর্যন্ত আমি বিষয়টি জানতে পেরেছিলাম, তার জন্য কিছুটা দায় তোমারও ছিল।”
“তাহলে তুমি ব্যাপারটা জেনে গিয়েছিলে?” আটারসন বললেন। “যদি তাই হয়, তবে চলো, আমরা ভেতরের উঠোনে গিয়ে জানালাগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে আসি। সত্যি বলতে কী, বেচারা জেকিলকে নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত। এমনকি বাইরে দাঁড়িয়েও আমার মনে হচ্ছে “পাশে একজন বন্ধু থাকলে হয়তো তার ভালো লাগবে।”
উঠোনটি বেশ ঠান্ডা ও সামান্য স্যাঁতসেঁতে ছিল। চারদিকে যেন অসময়ের গোধূলি নেমে এসেছিল, যদিও মাথার অনেক ওপরে আকাশ তখনও সূর্যাস্তের আলোয় উজ্জ্বল ছিলো।
তিনটি জানালার মাঝের জানালাটি অর্ধেক খোলা ছিল। তার ঠিক পাশে বসে ছিলেন ড. জেকিল। তাঁর মুখে ছিল অসীম বিষণ্ণতার ছাপ—যেন কোনো হতাশ ও নিঃসঙ্গ বন্দি নিঃশব্দে মুক্ত বাতাসের স্বাদ নিচ্ছে।
আটারসন তাঁকে দেখে চিৎকার করে উঠলেন, “কী, জেকিল! আশা করি এখন তুমি কিছুটা ভালো আছ।”
“আমি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছি, আটারসন,” ডাক্তার বিষণ্ণ কণ্ঠে উত্তর দিলেন। “খুবই দুর্বল। তবে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এই অবস্থা আর বেশিদিন চলবে না।”
“তুমি ঘরের ভেতরেই খুব বেশি সময় কাটাচ্ছ,” আইনজীবী বললেন। “তোমার বাইরে বের হওয়া উচিত। আমাদের মতো একটু হাঁটাহাঁটি করলে শরীরের রক্তসঞ্চালনও ভালো হবে। এই যে, মি. এনফিল্ড—আমার আত্মীয়। আর এ হলেন ড. জেকিল। চলো, এবার টুপি নিয়ে আমাদের সঙ্গে একটু হাঁটতে বেরিয়ে পড়ো।”
“তুমি খুবই ভালো মানুষ,” অপরজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। “আমারও খুব ইচ্ছে করছে তোমাদের সঙ্গে যেতে। কিন্তু না, না, তা একেবারেই সম্ভব নয়। আমি সাহস পাচ্ছি না। তবে সত্যি বলছি, আটারসন, তোমাকে দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমাকে এবং মি. এনফিল্ডকে উপরে ডেকে নিতে পারলে আমার খুব ভালো লাগত। কিন্তু জায়গাটা এখন সত্যিই দেখানোর মতো অবস্থায় নেই।”
“তাহলে,” আইনজীবী সদয়ভাবে বললেন, “আমরা নিচেই থাকি এবং এখান থেকেই তোমার সঙ্গে কথা বলি—এটাই বোধহয় সবচেয়ে ভালো হবে।”
“আমি ঠিক সেই কথাটাই বলার সাহস করছিলাম না,” ডাক্তার মৃদু হেসে উত্তর দিলেন।
কিন্তু কথাগুলো তাঁর মুখ থেকে বেরোতে না বেরোতেই সেই হাসি মুহূর্তের মধ্যে মুখ থেকে মুছে গেল। তার জায়গায় ফুটে উঠল এমন এক চরম আতঙ্ক ও হতাশার অভিব্যক্তি, যা নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ভদ্রলোকের রক্তও যেন হিম করে দিল।
তাঁরা সেই মুখটি মাত্র এক ঝলকের জন্য দেখতে পেলেন। কারণ মুহূর্তের মধ্যেই জানালাটি সজোরে বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু ওই সামান্য দৃশ্যই তাঁদের জন্য যথেষ্ট ছিল।
কোনো কথা না বলে তাঁরা উঠোন থেকে বেরিয়ে এলেন।
নীরবতায় তাঁরা সেই সরু গলিটিও পেরিয়ে এলেন। অবশেষে পাশের একটি বড় রাস্তায় এসে, যেখানে রবিবার হলেও মানুষের চলাচলের কিছুটা কোলাহল ছিল, মি. আটারসন সেখানে থামলেন এবং তাঁর সঙ্গীর দিকে তাকালেন।
দুজনের মুখই ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তাঁদের চোখে ছিল একই রকম আতঙ্কের ছাপ।
“ঈশ্বর আমাদের ক্ষমা করুন, ঈশ্বর আমাদের ক্ষমা করুন,” আটারসন বললেন।
কিন্তু মি. এনফিল্ড শুধু অত্যন্ত গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন এবং আবার নীরবে হাঁটতে শুরু করলেন।
শেষ রাত
এক সন্ধ্যায় রাতের খাবার শেষ করে মি. আটারসন আগুনের পাশে বসেছিলেন। এমন সময় পোলের আগমন তাঁকে বেশ অবাক করে দিল।
“আরে পোলে, তুমি এখানে কী জন্য এলে?”—তিনি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন। তারপর তাঁকে ভালো করে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কী হয়েছে? ডাক্তার কি অসুস্থ?”
“মি. আটারসন,” লোকটি বলল, “কিছু একটা গোলমাল হয়েছে।”
“বসো। এই নাও, এক গ্লাস মদ। এখন ধীরে-সুস্থে বলো, কী ব্যাপার?”
“আপনি তো ডাক্তারের স্বভাব জানেন, স্যার,” পোলে উত্তর দিল, “তিনি কীভাবে নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে রাখেন, সেটাও জানেন। এবারও তিনি নিজের ঘরে—ক্যাবিনেটে—নিজেকে বন্ধ করে রেখেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে না, স্যার। একেবারেই না। মি. আটারসন, আমি ভয় পাচ্ছি।”
“আচ্ছা, পোলে,” উকিল বললেন, “স্পষ্ট করে বলো। তুমি কীসের জন্য ভয় পাচ্ছ?”
প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর না দিয়ে পোলে একগুঁয়েভাবে বলল, “প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আমি ভয়ে আছি, স্যার। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”
লোকটির চেহারাই তার কথার সত্যতা প্রমাণ করছিল। তার আচরণ আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। প্রথমবার ভয়ের কথা বলার পর থেকে সে একবারের জন্যও উকিলের চোখের দিকে তাকায়নি। এখনও সে হাঁটুর ওপর রাখা মদের গ্লাসটিতে একটুও চুমুক না দিয়ে মেঝের এক কোণের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল।
“আমি আর সহ্য করতে পারছি না,” সে আবার বলল।
“এসো, পোলে,” উকিল বললেন, “আমি বুঝতে পারছি, তোমার ভয়ের নিশ্চয়ই যথেষ্ট কারণ আছে। নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু ঘটেছে। চেষ্টা করো, আমাকে বলো ব্যাপারটা কী।”
“আমার মনে হয়, এখানে কোনো নোংরা কারসাজি হয়েছে,” পোলে কর্কশ গলায় বলল।
“কারসাজি!” উকিল বেশ ভয় পেয়ে এবং কিছুটা বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন। “কীসের কারসাজি? তুমি কী বলতে চাইছ?”
“আমি বলতে সাহস পাচ্ছি না, স্যার,” পোয়েল উত্তর দিল। “তবে আপনি কি আমার সঙ্গে গিয়ে নিজের চোখে দেখে আসবেন?”
মি. আটারসন কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু উঠে দাঁড়িয়ে টুপি ও ভারী কোটটি পরে নিলেন। কিন্তু তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলেন, তাঁর যাওয়ার সম্মতিতে বাটলারের মুখে কীরকম গভীর স্বস্তি ফুটে উঠেছে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, পোলে যখন মদের গ্লাসটি নামিয়ে রেখে তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে এল, তখনও গ্লাসের মদে একবারও চুমুক দেওয়া হয়নি সে।
মার্চ মাসের সেই রাতটি ছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা ও ঝোড়ো ছিলো। আকাশে ফ্যাকাশে চাঁদটি এমনভাবে পড়ে ছিল, যেন বাতাস তাকে কাত করে দিয়েছে। তার চারপাশে অত্যন্ত পাতলা, মেঘের মতো স্বচ্ছ ও সাদা ছিন্নভিন্ন মেঘ দ্রুত উড়ে চলছিল।
বাতাস এত জোরে বইছিল যে কথা বলাও কঠিন হয়ে উঠেছিল। তীব্র ঠান্ডা হাওয়ায় মুখ লাল হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, বাতাস যেন লন্ডনের রাস্তাগুলোকে অস্বাভাবিকভাবে জনশূন্য করে দিয়েছে। মি. আটারসনের মনে হলো, লন্ডনের এই অংশটিকে তিনি জীবনে কখনও এত নির্জন দেখেননি।
অবস্থাটা অন্যরকম হলে তিনি হয়তো খুশিই হতেন। কিন্তু সেদিন তাঁর মনে হচ্ছিল, জীবনে এর আগে কখনও তিনি তাঁর সহমানুষদের এত কাছে পেতে, তাদের দেখতে ও স্পর্শ করতে এত তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেননি। যতই তিনি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করুন না কেন, তাঁর মনে ক্রমেই এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা চেপে বসছিল।
তাঁরা যখন সেই চত্বরটিতে পৌঁছাল, তখন চারদিকে শুধু ঝোড়ো বাতাস আর ধুলো উড়ছিল। বাগানের সরু গাছগুলো প্রবল বাতাসে এমনভাবে দুলছিল, যেন তারা রেলিংয়ের ওপর আছড়ে পড়ছে।
পোলে এতক্ষণ দু-এক পা এগিয়ে এগিয়ে হাঁটছিল। এবার সে হঠাৎ ফুটপাথের মাঝখানে থেমে গেল। তীব্র ঠান্ডা সত্ত্বেও টুপি খুলে লাল রুমাল দিয়ে সে কপাল মুছতে লাগল।
কিন্তু এত তাড়াহুড়ো করে আসার কারণে যে ঘাম তার কপালে জমেছিল, তা পরিশ্রমের ঘাম ছিল না। তা ছিল যেন গলা চেপে ধরা কোনো গভীর আতঙ্ক ও যন্ত্রণার আর্দ্রতা। তার মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং কথা বলার সময় তার কণ্ঠস্বর ছিল কর্কশ ও ভাঙা।
“এই যে, স্যার,” সে বলল, “আমরা এসে গেছি। ঈশ্বর করুন, যেন কোনো বিপদ না ঘটে।”
“আমেন, পোলে,” উকিল বললেন।
এরপর ভৃত্য অত্যন্ত সাবধানে দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা সামান্য শিকল লাগানো অবস্থায় ছিল। ভেতর থেকে একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল—“পোলে, তুমি?”
“হ্যাঁ, সব ঠিক আছে,” পোলে বলল। “দরজা খোল।”
তারা ভেতরে ঢোকার পর দেখল, হলঘরটি উজ্জ্বলভাবে আলোকিত। আগুনে প্রচুর কাঠ জ্বলছিল। আর অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে বাড়ির সব চাকর-বাকর—পুরুষ ও নারী—একটি ভীতসন্ত্রস্ত ভেড়ার পালের মতো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে ছিল।
মি. আটারসনকে দেখামাত্র গৃহপরিচারিকা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। আর রান্নার মহিলা চিৎকার করে উঠল—“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! এই যে মি. আটারসন!” সে এমনভাবে ছুটে এল, যেন তাঁকে জড়িয়ে ধরবে।
“কী ব্যাপার? কী হয়েছে? তোমরা সবাই এখানে কেন?”—উকিল বিরক্ত হয়ে বললেন। “এটা একেবারেই নিয়মবহির্ভূত এবং অত্যন্ত অশোভন ব্যাপার। তোমাদের মনিব এ দৃশ্য দেখলে মোটেই খুশি হতেন না।”
“ওরা সবাই ভয় পেয়েছে,” পোলে বলল।
এরপর নেমে এল নিস্তব্ধতা। কেউ কোনো প্রতিবাদ করল না। শুধু গৃহপরিচারিকাটি আরও জোরে কাঁদতে লাগল।
“চুপ করো!”—পোলে তাকে এমন কঠোর ও প্রচণ্ড রাগী স্বরে বলল যে, তার নিজের উত্তেজিত স্নায়ুর অবস্থাও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
মহিলাটি হঠাৎ এত জোরে বিলাপ করে উঠতেই সবাই চমকে উঠল এবং ভয়াবহ আশঙ্কায় ভরা মুখে ঘরের ভেতরের দরজাটির দিকে ফিরে তাকাল।
এরপর বাটলার রান্নাঘরের ছেলেটিকে বলল, “এবার আমাকে একটা মোমবাতি দাও। আমরা এক্ষুনি ব্যাপারটা নিজেদের হাতে নিয়ে দেখব।”
তারপর সে মি. আটারসনকে তার সঙ্গে আসতে অনুরোধ করল এবং তাঁকে নিয়ে বাড়ির পেছনের বাগানের দিকে এগিয়ে গেল।
“এখন, স্যার,” সে বলল, “যতটা সম্ভব নিঃশব্দে আসবেন। আমি চাই আপনি যেন শুনতে পান, কিন্তু আপনার উপস্থিতির শব্দ যেন কেউ না শুনতে পায়। আর একটা কথা, স্যার—যদি কোনোভাবে সে আপনাকে ভেতরে যেতে বলে, তবুও যাবেন না আপনি।”
এই অপ্রত্যাশিত কথায় মি. আটারসনের স্নায়ু এমনভাবে কেঁপে উঠল যে, তিনি প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু তিনি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বাটলারের পিছু পিছু এগিয়ে গেলেন।
তারা শল্যচিকিৎসার ঘর পেরিয়ে পরীক্ষাগার-সংলগ্ন ভবনের দিকে গেলেন। সেখানে নানা ধরনের বাক্স ও বোতলের স্তূপ করে রাখা ছিল। অবশেষে তারা সিঁড়ির নিচে এসে পৌঁছালেন।
এখানে পোলে ইশারা করে মি. আটারসনকে এক পাশে দাঁড়িয়ে শুনতে বলল। তারপর সে নিজে মোমবাতিটি মাটিতে রেখে গভীর সংকল্প সঞ্চয় করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।
তারপর কিছুটা কাঁপা হাতে সে কক্ষের লাল বেইজ কাপড়ে মোড়া দরজায় কড়া নাড়ল। “মিস্টার আটারসন, স্যার, আপনাকে দেখতে এসেছেন,” সে ডাকল। আর কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই আবারও সে আইনজীবীকে কান পেতে শুনতে অনুরোধ করার জন্য জোরে জোরে ইশারা করতে লাগল।
ভেতর থেকে একটি কণ্ঠস্বর উত্তর দিল,- “তাকে বলো, আমি কারও সঙ্গে দেখা করতে পারব না,”—কণ্ঠটিতে অসহায় অভিযোগের সুর ছিলো।
“ধন্যবাদ, স্যার,” পুলে বলল। তার কণ্ঠে যেন এক ধরনের বিজয়ের আভাস। তারপর সে হাতে মোমবাতি তুলে মিস্টার আটারসনকে নিয়ে উঠোন পেরিয়ে বড় রান্নাঘরে ফিরে এল। সেখানে আগুন নিভে গিয়েছিল এবং মেঝের ওপর পোকামাকড় লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল।
“স্যার,” পুলে মিস্টার আটারসনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওটা কি আমার মনিবের কণ্ঠস্বর ছিল?”
আইনজীবী অত্যন্ত ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন, তবে পুলের চোখের দিকে তাকিয়েই বললেন,
“কণ্ঠস্বরটা বেশ বদলে গেছে বলে মনে হলো।”
“বদলে গেছে? হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়,” বাটলার বলল। “আমি কি এই লোকটির বাড়িতে বিশ বছর ধরে কাজ করছি না যে তাঁর কণ্ঠস্বর চিনতে ভুল করব? না, স্যার। আমার মনিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—তাঁকে আট দিন আগেই মেরে ফেলা হয়েছে, যেদিন আমরা তাঁকে ঈশ্বরের নাম ধরে চিৎকার করতে শুনেছিলাম। আর তাঁর জায়গায় ভেতরে কে রয়েছে, এবং কেন সে সেখানে রয়ে গেছে, মিস্টার আটারসন!”
“এটা তো খুবই অদ্ভুত কাহিনি, পুলে। বেশ অবিশ্বাস্য লাগছে ব্যাপারটা আমার কাছে,” মিস্টার আটারসন বললেন। তিনি আঙুল কামড়াতে কামড়াতে কিছুক্ষণ ভাবলেন। “ধরো, তোমার ধারণাই সত্যি। ধরো, ডক্টর জেকিলকে—মানে, তাঁকে যদি খুনই করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই খুনি কেন সেখানে থেকে যাবে? তোমার এই যুক্তি তো টেকে না; এটা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না।”
“আচ্ছা, মিস্টার আটারসন, আপনাকে সন্তুষ্ট করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত আপনাকে বিশ্বাস করাবই,” পুলে বলল। “পুরো গত সপ্তাহ ধরে—এটা আপনার জানা দরকার—ওই ঘরে যে-ই থাকুক, মানুষ হোক বা অন্য যে-ই কিছু এই কক্ষের ভেতরে বাস করুক, সে দিন-রাত চিৎকার করে কোনো এক ধরনের ওষুধ চাইছে, কিন্তু তার পছন্দমতো ওষুধ কিছুতেই পাচ্ছে না। মাঝে মাঝে মনিবের এমন অভ্যাস ছিল—মানে ডক্টর জেকিলের—তিনি এক টুকরো কাগজে ওষুধের নির্দেশ লিখে সিঁড়ির ওপর ফেলে দিতেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহে আমরা আর কিছুই পাইনি; শুধু কাগজ, বন্ধ দরজা, আর খাবার— যেগুলো কাউকে দেখতে না দিয়ে গোপনে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়েছে।”
“প্রতিদিন, স্যার—হ্যাঁ, একই দিনে দু-তিনবারও—ওষুধের নির্দেশ আর অভিযোগ আসত। আর আমাকে শহরের সব বড় ওষুধের পাইকারি দোকানে ছুটে বেড়াতে হতো। প্রতিবার ওষুধ নিয়ে ফিরে আসার পরই আরেকটি কাগজ আসত—সেখানে লেখা থাকত, ওষুধটা ফেরত দিতে, কারণ সেটা নাকি যথেষ্ট বিশুদ্ধ নয়। তারপর অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন করে ওষুধ চাওয়া হতো। যে ওষুধটা দরকার, স্যার, সেটা যেন ভীষণ জরুরি—কী কারণে দরকার, তা অবশ্য আমি জানি না।”
“তোমার কাছে কি সেই কাগজগুলোর কোনোটি আছে?” মিস্টার আটারসন জিজ্ঞেস করলেন।
পুলে পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটি কুঁচকানো চিঠি বের করে দিল।
আইনজীবী মোমবাতির আরও কাছে ঝুঁকে সেটি খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করলেন। তাতে লেখা ছিল—“ডক্টর জেকিল মেসার্স মাও-এর প্রতি তাঁর শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তিনি তাঁদের জানাতে বাধ্য হচ্ছেন যে, তাঁদের পাঠানো সর্বশেষ নমুনাটি অপবিত্র এবং তাঁর বর্তমান প্রয়োজনের জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য। ১৮— সালে ডক্টর জে. আপনাদের কাছ থেকে এই ওষুধের বেশ কিছু পরিমাণ কিনেছিলেন। এখন তিনি অনুরোধ করছেন, আপনারা যেন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খুঁজে দেখেন এবং যদি সেই একই মানের ওষুধের কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে, তাহলে যেন তা অবিলম্বে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। খরচের কোনো বিষয় নেই। ডক্টর জে.-এর জন্য এর গুরুত্ব কতখানি, তা কোনোভাবেই অতিরঞ্জিত করে বলা সম্ভব নয়।”
এ পর্যন্ত চিঠিটি বেশ শান্ত ও সংযত ভাষায় লেখা ছিল। কিন্তু হঠাৎ কলমের আঁচড় যেন কেঁপে উঠল, এবং লেখকের উত্তেজনা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তিনি শেষে লিখেছিলেন- “ঈশ্বরের দোহাই, আমাকে সেই পুরোনো ওষুধটির কিছু হলেও খুঁজে দিন।”
“চিঠিটা সত্যিই অদ্ভুত,” মিস্টার আটারসন বললেন। তারপর হঠাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু এটা খোলা অবস্থায় তোমার কাছে এল কীভাবে?”
“মাও-এর দোকানের লোকটি ভীষণ রেগে গিয়েছিল, স্যার। সে জিনিসটা এমনভাবে আমার দিকে ছুড়ে দিয়েছিল, যেন ওটা একমুঠো আবর্জনা,” পুলে বলল।
“তুমি তো জানো, এটা নিঃসন্দেহে ডাক্তারের নিজের হাতের লেখা, তাই না?” আটারসন আবার বললেন।
“আমারও তাই মনে হয়েছিল,” পুলে কিছুটা বিরক্তির সুরে বলল। তারপর হঠাৎ অন্যরকম স্বরে বলল, “কিন্তু হাতের লেখায় কী আসে-যায়? আমি তাঁকে দেখেছি!”
“দেখেছ?” মি. আটারসন বিস্ময়ে পুনরাবৃত্তি করলেন। “কীভাবে?”
“সেটাই বলছি!” পুলে বলল। “ঘটনাটা এ রকম—আমি বাগান থেকে হঠাৎ করে থিয়েটারঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। মনে হয়, তিনি ওই ওষুধটা—অথবা যাই হোক না কেন—খুঁজতে বাইরে বেরিয়েছিলেন। কারণ কক্ষের দরজা খোলা ছিল, আর ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে তাঁকে বাক্সগুলোর মধ্যে কিছু খুঁজতে দেখেছিলাম।
“আমি কক্ষে ঢুকতেই তিনি মাথা তুলে তাকালেন, একরকম চিৎকার করে উঠলেন, তারপর বিদ্যুতের মতো সিঁড়ি বেয়ে উঠে কক্ষের ভেতরে চলে গেলেন। মাত্র এক মিনিটের জন্য তাঁকে দেখেছিলাম, কিন্তু তাতেই আমার মাথার চুল ভয়ে খাড়া হয়ে গিয়েছিল।
“স্যার, যদি উনিই আমার মনিব হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর মুখে মুখোশ ছিল কেন? আর যদি উনিই আমার মনিব হন, তাহলে তিনি ইঁদুরের মতো চিৎকার করে আমার কাছ থেকে পালালেন কেন? আমি তো তাঁর কাছে বিশ বছর ধরে কাজ করছি। আর তারপর…”পুলে থেমে গেল এবং হাত দিয়ে মুখ মুছে নিল।
“ঘটনাগুলো সত্যিই খুব অদ্ভুত,” মি. আটারসন বললেন। “তবে আমার মনে হচ্ছে, ব্যাপারটার একটা ব্যাখ্যা আমি বুঝতে পারছি। তোমার মনিব, পুলে, নিশ্চয়ই এমন কোনো ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, যে রোগ মানুষকে যেমন অসহ্য যন্ত্রণা দেয়, তেমনি তার চেহারাও বিকৃত করে দেয়। তাই হয়তো তাঁর কণ্ঠস্বর বদলে গেছে; সেজন্য মুখোশ পরে আছে; তাই বন্ধুদের এড়িয়ে চলা; আর তাই এই ওষুধটি পাওয়ার জন্য তাঁর এমন মরিয়া চেষ্টা— হয়তো এই ওষুধের সাহায্যেই সেই অসহায় মানুষটি সুস্থ হয়ে ওঠার শেষ আশাটুকু ধরে রেখেছেন। ঈশ্বর করুন, তাঁর সেই আশা যেন মিথ্যা না হয়!
“এই হলো আমার ব্যাখ্যা। ব্যাপারটি অত্যন্ত দুঃখজনক, পুলে—এমনকি ভয়ংকরও। কিন্তু ব্যাখ্যাটি স্বাভাবিক ও যুক্তিসংগত; সবকিছু যেন একে অপরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। অন্তত এতে আমাদের অকারণ আতঙ্ক থেকে রেহাই পাওয়া যায়।”
“স্যার,” পুলে বলল। তার মুখ মুহূর্তে ছোপ ছোপ ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। “ওটা আমার মনিব ছিল না। এটাই সত্যি। আমার মনিব”—এই বলে সে চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—“লম্বা-চওড়া, সুঠাম দেহের মানুষ। কিন্তু ওটা ছিল অনেকটা বেঁটে মানুষের মতো।”
আটারসন প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেন।
“ ওহ, স্যার!” পুলে চিৎকার করে উঠল। “আপনি কি মনে করেন, বিশ বছর ধরে যাঁর সেবা করে আসছি, আমি তাঁকে চিনব না? আপনি কি মনে করেন, কক্ষের দরজায় দাঁড়ালে তাঁর মাথা ঠিক কোথায় পৌঁছত, সেটাও কি আমি জানি না? জীবনের প্রতিটি সকালে তো আমি তাঁকে সেখানে দেখেছি!“না, স্যার! ওই মুখোশ-পরা মানুষটি কখনোই ডক্টর জেকিল ছিলেন না। ঈশ্বরই জানেন, ওটা কী ছিল! কিন্তু ডক্টর জেকিল যে ছিল না, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর আমার অন্তর থেকে মনে হচ্ছে— কেউ নিশ্চয় খুন হয়েছে।”
“পুলে,” আটারসন বললেন, “তুমি যখন এ কথা বলছ, তখন বিষয়টি নিশ্চিতভাবে আমার জন্য তদন্ত করাটা কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। তোমার মনিবের অনুভূতিতে আঘাত না করতে আমি যতই চাই, আর এই চিঠিটি—যেটি দেখে মনে হচ্ছে তিনি এখনও জীবিত— আমাকে যতই বিভ্রান্ত করুক, তবুও দরজাটি ভেঙে ভেতরে ঢোকাটা আমার কর্তব্য বলে আমি মনে করছি।”
“হ্যাঁ-হ্যাঁ, মি. উটারসন, এবার ঠিক কথা বলেছেন!” পুলে আনন্দের সঙ্গে বলে উঠল।
“এখন দ্বিতীয় প্রশ্ন,” আটারসন বললেন। “কিন্তু দরজাটা ভাঙবে কে?”
“কেন, আপনি আর আমি, স্যার,” পুলে নির্ভীকভাবে উত্তর দিল।
“বেশ বলেছ,” উটারসন বললেন। “আর এর পরিণতি যা-ই হোক না কেন, তোমার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব আমি নেব।”
“থিয়েটারঘরে একটা কুড়াল আছে,” পুল বলল। “আর আপনি চাইলে রান্নাঘরের লোহার শিকটা সঙ্গে নিতে পারেন।”
আইনজীবী সেই সাদামাটা কিন্তু ভারী লোহার শিকটি হাতে তুলে নিয়ে তার ওজন যাচাই করলেন।
“পুলে,” তিনি মাথা তুলে বললেন, “তুমি কি জানো, আমরা দুজন এমন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমাদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে?”
“তা তো বটেই, স্যার,” পুলে উত্তর দিল।
“তাহলে ভালো হয়, আমরা যেন একে অপরের সঙ্গে আর কোনো কথা গোপন না করি,” আটারসন বললেন। “আমরা দুজনেই যা বলছি, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু ভাবছি। তাই সব কথা খুলে বলি। তুমি যে মুখোশ-পরা মানুষটিকে দেখেছিলে— তাকে কি তুমি চিনতে পেরেছিলে?”
“ঠিক আছে, স্যার, ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটেছিল, আর সেই প্রাণীটা এমনভাবে কুঁজো হয়ে গুটিয়ে ছিল যে, আমি নিশ্চিত হয়ে শপথ করে বলতে পারি না যে সে-ই ছিল,” পোলে উত্তর দিল। “কিন্তু আপনি যদি জানতে চান, সে কি মিস্টার হাইড ছিল—তাহলে হ্যাঁ, আমার মনে হয়, সে-ই ছিল! দেখুন, তার দেহের গড়ন প্রায় একই রকম ছিল; চলাফেরাতেও সেই একই দ্রুত, হালকা ভঙ্গি। আর ল্যাবরেটরির দরজা দিয়ে আর কে-ই বা ঢুকতে পারত? আপনি নিশ্চয় ভুলে যাননি, স্যার, হত্যাকাণ্ডের সময়ও চাবিটা তার কাছেই ছিল? তবে ব্যাপারটা শুধু এতটুকুই নয়। মিস্টার আটারসন, আপনি কি কখনও ওই মিস্টার হাইডের সঙ্গে দেখা করেছিলেন?”
“হ্যাঁ,” আইনজীবী বললেন, “একবার তার সঙ্গে কথা হয়েছিল।”
“তাহলে আমাদের সবার মতো আপনিও নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন যে লোকটার মধ্যে কিছু একটা অদ্ভুত ছিল— এমন কিছু, যা একজন মানুষকে ভিতর থেকে শিউরে তুলে। ঠিক কীভাবে বলব জানি না, স্যার; শুধু এটুকু বলতে পারি—তাকে দেখলে মনে হতো যেন শরীরের ভেতর পর্যন্ত হঠাৎ ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।”
“তুমি যা বলছ, তার কিছুটা আমিও অনুভব করেছিলাম,” মিস্টার আটারসন স্বীকার করলেন।
“ঠিক তাই, স্যার,” পোলে বলল। “যখন সেই মুখোশ-পরা বানরের মতো জিনিসটা রাসায়নিক পদার্থগুলোর মাঝখান থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে ঝট করে সেই কক্ষের ভিতরে ঢুকে গেল, তখন আমার মেরুদণ্ড বেয়ে যেন বরফের স্রোত নেমে গেল। ওহ, আমি জানি, মিস্টার আটারসন, এটা কোনো প্রমাণ নয়; বইপত্র পড়ে আমি অন্তত এতটা জানি। কিন্তু মানুষের নিজের অনুভূতি বলেও তো একটা জিনিস আছে। আর আমি বাইবেলের নামে শপথ করে বলছি—ওটা মিস্টার হাইডই ছিল!”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ,” আইনজীবী বললেন। “আমার আশঙ্কাও একই দিকেই ইঙ্গিত করছে। আমি ভয় করছি, শুরু থেকেই এই সম্পর্কের মধ্যে অশুভ কিছু ছিল—আর সেই অশুভের পরিণতি যে একদিন ভয়াবহ কিছু হবে, তা যেন নিশ্চিতই ছিল। হ্যাঁ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করছি; আমি বিশ্বাস করছি, হতভাগা হ্যারি নিহত হয়েছে। আর আমি বিশ্বাস করছি, তার হত্যাকারী—কী উদ্দেশ্যে সে এমন করেছে, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন—এখনও তার শিকারের ঘরের মধ্যে লুকিয়ে আছে। যাই হোক, এবার প্রতিশোধের পালা। ব্র্যাডশকে ডাকো।”
ডাক পেয়ে ফুটম্যান ব্র্যাডশ এসে হাজির হল। তার মুখ ভীষণ ফ্যাকাশে, আর সে স্পষ্টতই নার্ভাস।
আইনজীবী বললেন, “নিজেকে সামলে নাও, ব্র্যাডশ। আমি জানি, এই উৎকণ্ঠা তোমাদের সবার ওপরই প্রভাব ফেলছে। কিন্তু এবার আমরা এর একটা শেষ করতে চাই। পোলে আর আমি কক্ষের দরজা জোর করে খুলে ভিতরে ঢুকব। যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তাহলে এর দায়-দায়িত্ব নেওয়ার মতো আমার যথেষ্ট প্রশস্ত কাঁধ আছে। আর যদি সত্যিই কোনো বিপদ ঘটে, অথবা কোনো অপরাধী পিছনের দিক দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, সেই আশঙ্কায় তুমি আর ছেলেটা দুটো ভালো শক্ত লাঠি নিয়ে বাড়ির কোণ ঘুরে ল্যাবরেটরির দরজার কাছে গিয়ে অবস্থান নেবে। তোমাদের নিজেদের জায়গায় পৌঁছানোর জন্য দশ মিনিট সময় দিলাম।”
ব্র্যাডশ চলে যাওয়ার পর আইনজীবী তাঁর ঘড়ির দিকে তাকালেন।“এবার, পোলে, চল আমরাও আমাদের জায়গায় যাই,” তিনি বললেন। এই বলে তিনি বগলের নিচে লোহার শিকটি চেপে ধরে উঠোনের দিকে এগিয়ে চললেন।
ততক্ষণে ছুটে চলা মেঘ চাঁদকে ঢেকে ফেলেছে, চারদিক একেবারে অন্ধকার হয়ে গেছে। উঁচু ভবনগুলোর মাঝখানের সেই গভীর কুয়োর মতো সরু জায়গাটিতে বাতাস কখনও ঝাপটা দিয়ে, কখনও দমকা হয়ে ঢুকছিল। তাতে পোলের হাতে থাকা মোমবাতির শিখা এদিক-ওদিক দুলছিল এবং তাদের পায়ের সামনে আলোটাও কাঁপতে কাঁপতে নড়ছিল।
শেষ পর্যন্ত তারা থিয়েটারের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিল এবং নীরবে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
চারপাশে সমগ্র লন্ডন যেন এক গভীর, গম্ভীর গুঞ্জনে মুখরিত ছিল। কিন্তু তাদের একেবারে কাছে নেমে এসেছিল এক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতা কেবল মাঝে মাঝে ভেঙে যাচ্ছিল—কক্ষের মেঝের ওপর কারও পায়ের শব্দে, যে শব্দ একবার এদিক থেকে ওদিক, আবার ওদিক থেকে এদিকে চলাফেরা করছিল।
“তাহলে স্যার, সারা দিনই সে এভাবে হাঁটাহাঁটি করে,” পুল ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ, রাতেরও বেশির ভাগ সময়। শুধু রসায়নবিদের কাছ থেকে নতুন নমুনা এলে একটু বিরতি নেয়। আহা, অপরাধবোধে জর্জরিত বিবেক যে বিশ্রামের এমন শত্রু হতে পারে! আহা, স্যার, তার প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে যেন অন্যায়ভাবে ঝরানো রক্তের দাগ লেগে আছে! কিন্তু আবার শুনুন, একটু কাছে এসে—মি. আটারসন, আপনার কানকে আরও মনোযোগী করুন, আর বলুন তো, ওটা কি ডাক্তারের পায়ের শব্দ?”
পায়ের শব্দগুলো খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল, তবু সেগুলো ছিল হালকা ও অদ্ভুত, যেন এক বিশেষ ছন্দে দুলে দুলে হাঁটা হচ্ছে। ড. হেনরি জেকিলের ভারী, কড়কড়ে পায়ের শব্দের সঙ্গে এর কোনো মিলই ছিল না।
আটারসন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “এ ছাড়া আর কখনও অন্য কিছু শুনেছ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
পুলে মাথা নাড়ল। “একবার,” সে বলল। “একবার আমি তাকে কাঁদতে শুনেছিলাম!”
“কাঁদতে? কীভাবে?” আইনজীবী হঠাৎ এক শীতল আতঙ্কে শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করলেন।
“কোনো মহিলার মতো, কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনো আত্মার মতো,” বাটলার বলল। “সেই কান্নার শব্দটা আমার হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, আমারও কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে হয়েছিল।”
কিন্তু ইতিমধ্যে দশ মিনিটের সময় শেষ হয়ে আসছিল। পুলে প্যাকিংয়ের খড়ের স্তূপের নিচ থেকে কুঠারটি বের করে আনল। তাদের আক্রমণের পথ আলোকিত করার জন্য কাছের টেবিলের ওপর মোমবাতিটি রাখা হলো। তারপর তারা নিঃশ্বাস বন্ধ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেই জায়গার দিকে, যেখানে রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে সেই ধৈর্যশীল পায়ের শব্দ এখনও একবার এদিকে, একবার ওদিকে—একটানা চলছিল।
“জেকিল!” আটারসন জোরে চিৎকার করে বললেন, “আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।” তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন, কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
“আমি আপনাকে স্পষ্ট করে সতর্ক করছি—আমাদের সন্দেহ হয়েছে, এবং আমাকে অবশ্যই আপনার সঙ্গে দেখা করতে হবে,” তিনি আবার বললেন। “ভালোভাবে যদি না হয়, তাহলে খারাপভাবেই হবে—আপনার সম্মতিতে যদি না হয়, তাহলে জোর করে হবে!”
“আটারসন,” ভেতর থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ঈশ্বরের দোহাই, দয়া করুন!”
“আহা! এটা জেকিলের কণ্ঠস্বর নয়—এটা হাইডের কণ্ঠস্বর!” আটারসন চিৎকার করে উঠলেন। “পুলে, দরজাটা ভেঙে ফেলো!”
পুলে কুঠারটি কাঁধের ওপর তুলে জোরে আঘাত করল। আঘাতের অভিঘাতে পুরো বাড়িটি যেন কেঁপে উঠল, আর লাল কাপড়ে মোড়া দরজাটি তালা ও কবজার ওপর প্রচণ্ড শব্দে দুলে উঠল। ঘরের ভেতর থেকে এমন এক করুণ চিৎকার ভেসে এল, যেন কোনো অসহায় পশু আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠছে।
আবার কুঠার উঠল, আবার আঘাত পড়ল। দরজার পাটাতনগুলো বিকট শব্দে ভেঙে গেল এবং কাঠের ফ্রেম কেঁপে উঠল। এভাবে চারবার আঘাত করা হলো। কিন্তু কাঠ ছিল অত্যন্ত শক্ত, আর দরজার তালা ও অন্যান্য জিনিসপত্রগুলো ছিল অত্যন্ত মজবুতভাবে তৈরি। শেষ পর্যন্ত পঞ্চম আঘাতে তালাটি ভেঙে গেল এবং দরজার ভাঙাচোরা অংশটি ভেতরের কার্পেটের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
নিজেদের সৃষ্ট সেই প্রচণ্ড শব্দ এবং তার পরের অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতায় ভীত ও স্তম্ভিত হয়ে আক্রমণকারীরা কিছুটা পিছিয়ে গেল এবং ভেতরে উঁকি দিল।
তাদের চোখের সামনে শান্ত প্রদীপের আলোয় সেই কক্ষটি দেখা গেল। অগ্নিকুণ্ডে আগুন জ্বলছিল এবং মৃদু শব্দে কটকট করছিল। কেটলিটৈ সরু সুরে শিস দিচ্ছিল। লেখার টেবিলের ওপর দু-একটি ড্রয়ার খোলা ছিল, আর কাগজপত্র সুন্দরভাবে সাজানো ছিল। আগুনের কাছাকাছি চা খাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সাজানো ছিল।
দেখে মনে হলো, এ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত একটি ঘর—আর রাসায়নিক পদার্থে ভরা কাচের আলমারিগুলো না থাকলে, সেদিন রাতে লন্ডনের সবচেয়ে সাধারণ ঘরগুলোর একটি বলেই মনে হতো।
কিন্তু ঘরের ঠিক মাঝখানে পড়ে ছিল একজন মানুষের দেহ। তার শরীর প্রচণ্ডভাবে মোচড়ানো ছিলো এবং তখনও সামান্য কাঁপছিল।
তারা পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নিঃশব্দে কাছে এগিয়ে এল। তারপর দেহটিকে চিৎ করে ঘুরিয়ে দিল। এবং তারা দেখতে পেল—সে এডওয়ার্ড হাইড।
তার পরনে ছিল এমন পোশাক, যা তার শরীরের তুলনায় অনেক বড়—ডাক্তারের শরীরের মাপের পোশাক। তার মুখের পেশিগুলো এখনও সামান্য নড়ছিল, যেন জীবনের ক্ষীণ কোনো চিহ্ন রয়েছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার প্রাণ সম্পূর্ণ চলে গেছে। তার হাতে চূর্ণ হয়ে যাওয়া একটি শিশি এবং বাতাসে ভেসে থাকা তীব্র তিক্ত বাদামের মতো গন্ধ দেখে আটারসন বুঝতে পারলেন, তিনি একজন আত্মহত্যাকারীর মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
“আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি,”আটারসন কঠোর স্বরে বললেন, “তাকে বাঁচানোর জন্য হোক কিংবা শাস্তি দেওয়ার জন্যই হোক—দুই ক্ষেত্রেই। হাইড তার কর্মের হিসাব দিতে চলে গেছে। এখন শুধু আমাদের তোমার প্রভু—ড. জেকিলের দেহটি খুঁজে বের করতে হবে।”
বাড়িটির অনেক বড় অংশই ছিল সেই থিয়েটার বা প্রধান ঘরটি নিয়ে, যা প্রায় পুরো নিচতলাটাই দখল করে ছিল এবং ওপর দিক থেকে আলো পেত। আর এক প্রান্তে ওপরের তলায় ছিল সেই কক্ষটি বা গবেষণাগার, যেটি উঠানের দিকে মুখ করে ছিল।
একটি করিডর থিয়েটারটিকে পাশের গলির দরজার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। আর দ্বিতীয় একটি সিঁড়ির মাধ্যমে ক্যাবিনেট বা গবেষণাগারটির সঙ্গে আলাদা যোগাযোগ ছিল।
এ ছাড়াও কয়েকটি অন্ধকার ছোট ঘর এবং একটি প্রশস্ত ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডার ছিল।
এবার তারা সব জায়গা খুব ভালোভাবে তল্লাশি করল। ছোট ঘরগুলোর প্রতিটিতে একবার তাকালেই যথেষ্ট ছিল, কারণ সবগুলোই খালি। দরজার ওপর জমে থাকা ধুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বহুদিন ধরে সেগুলো খোলা হয়নি।
ভূগর্ভস্থ ঘরটি অবশ্য নানা ধরনের পুরোনো ও ভাঙাচোরা জিনিসপত্রে ভর্তি ছিল। সেগুলোর অধিকাংশই সেই সার্জনের আমলের, যিনি জেকিলের আগে এই বাড়িতে কাজ করতেন। কিন্তু দরজাটি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তারা বুঝতে পারল যে আর খোঁজাখুঁজি করার কোনো অর্থ নেই। কারণ দরজার মুখটি বহু বছর ধরে জমে থাকা মাকড়সার জালের এমন এক ঘন আস্তরণ দিয়ে বন্ধ ছিল যে, দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পূর্ণ জালের আস্তরণ মাটিতে ঝরে পড়ল।
কোথাও—জীবিত কিংবা মৃত—হেনরি জেকিলের কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না।
পুলে করিডরের পাথরের মেঝেতে পা ঠুকলেন। শব্দ আন্দাজ করে সে বলল-, “ওকে নিশ্চয়ই এখানেই কবর দেওয়া হয়েছে।”
“অথবা তিনি পালিয়ে গিয়েও থাকতে পারে,” বললেন অ্যাটারসন। তারপর তিনি গলির দিকের দরজাটি পরীক্ষা করতে এগিয়ে গেলেন। দরজাটি তালাবদ্ধ ছিল। দরজার কাছেই পাথরের মেঝেতে পড়ে ছিল একটি চাবি; তাতে ইতিমধ্যেই মরচে ধরে গেছে।
“এটা তো ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না,” মন্তব্য করলেন আইনজীবী।
“ব্যবহার!” পুলে প্রতিধ্বনির মতো করে বললো। “আপনি কি দেখছেন না, স্যার, চাবিটা ভেঙে গেছে? মনে হচ্ছে যেন কেউ পা দিয়ে মাড়িয়ে ভেঙে দিয়েছে।”
“হ্যাঁ,” অ্যাটারসন বললেন, “আর ভাঙা অংশগুলিতেও মরচে ধরেছে।”
দুজনেই আতঙ্কিত দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকালেন।
“পুলে, ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না,” আইনজীবী বললেন। “চলুন, আবার কক্ষে ফিরে যাই।”
তাঁরা নীরবে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন। মাঝেমধ্যে মৃতদেহটির দিকে ভীত ও বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাঁরা আবার কক্ষের ভেতরের জিনিসপত্র আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করতে লাগলেন।
একটি টেবিলের ওপর রাসায়নিক পরীক্ষার চিহ্ন দেখা গেল। কাচের ছোট ছোট পাত্রে সাদা রঙের কোনো এক রাসায়নিক পদার্থ মেপে মেপে রাখা ছিল—মনে হচ্ছিল, কোনো পরীক্ষার জন্য এগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগা মানুষটি পরীক্ষাটি শেষ করার আগেই কোনো কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
“এই সেই একই ওষুধ, যা আমি সবসময় তাঁর জন্য এনে দিতাম,” পুলে বলল।
সে কথাটি বলার সময়ই কেটলিটি হঠাৎ বিকট শব্দ করে ফুটে উপচে পড়ল।
এই শব্দে তাঁদের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আগুনের দিকে। সেখানে আরামকেদারাটি বেশ আরাম করে টেনে রাখা ছিল এবং বসার জন্য প্রস্তুত চা-সরঞ্জামগুলো হাতের নাগালেই সাজানো ছিল। এমনকি কাপের মধ্যে চিনিও রাখা ছিল।
একটি তাকের ওপর কয়েকটি বই ছিল। চা-সরঞ্জামের পাশেই একটি বই খোলা অবস্থায় পড়ে ছিল। অ্যাটারসন বিস্মিত হয়ে দেখলেন, সেটি একটি ধর্মীয় ভক্তিমূলক বই—যে বইটির প্রতি জেকিল বহুবার গভীর শ্রদ্ধা ও প্রশংসা প্রকাশ করেছিলেন। অথচ বইটির পাতায় জেকিলের নিজের হাতের লেখায় এমন সব ভয়াবহ ধর্মনিন্দামূলক মন্তব্য লেখা ছিল যে তা দেখে শিউরে উঠতে হয়।
এরপর ঘরটি তন্নতন্ন করে পরীক্ষা করতে গিয়ে অনুসন্ধানকারীরা সেই বড় আয়নাটির সামনে এসে দাঁড়ালেন। অনিচ্ছাকৃত এক ভয় নিয়ে তাঁরা আয়নাটির গভীরে তাকালেন। কিন্তু আয়নাটি এমনভাবে ঘোরানো ছিল যে তাতে তাঁদের নিজেদের কিছুই দেখা গেল না—শুধু ছাদের ওপর আগুনের লালচে আভা, কাচঘেরা আলমারির সামনের অংশে আগুনের শত শত প্রতিফলিত ঝিলিক এবং তার মধ্যে ঝুঁকে থাকা তাঁদের নিজেদের ফ্যাকাশে ও ভীত মুখ।
“স্যার, এই আয়নাটি নিশ্চয়ই অনেক অদ্ভুত জিনিস দেখেছে,” পুলে ফিসফিস করে বললেন।
“আর নিশ্চয়ই তার নিজের চেয়ে অদ্ভুত আর কিছু সে দেখেনি,” একই স্বরে আইনজীবী উত্তর দিলেন। “কারণ জেকিল—” কথাটি বলতে গিয়ে তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন। তারপর নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে বললেন, “জেকিলের এই আয়নাটির কী প্রয়োজন ছিল?”
“সেটাই তো বলছি!” পুলে বললেন।
এরপর তাঁরা কাজের টেবিলটির দিকে ফিরলেন। টেবিলের ওপর পরিপাটি করে সাজানো কাগজপত্রের মধ্যে একটি বড় খাম সবার ওপরে রাখা ছিল। খামের ওপর ডাক্তারের নিজের হাতের লেখায় লেখা ছিল—মি. অ্যাটারসনের নামে।
আইনজীবী খামটির সিল খুললেন। ভেতর থেকে কয়েকটি কাগজ বেরিয়ে মেঝেতে পড়ল। প্রথম কাগজটি ছিল একটি উইল। ছয় মাস আগে যে উইলটি তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এটিও প্রায় সেই একই অদ্ভুত ভাষায় লেখা। তাতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটি উইল এবং নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল হিসেবে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে এডওয়ার্ড হাইডের নামের পরিবর্তে আইনজীবী অবর্ণনীয় বিস্ময়ের সঙ্গে পড়লেন—গ্যাব্রিয়েল জন অ্যাটারসন।
তিনি একবার পুলের দিকে তাকালেন, তারপর আবার কাগজটির দিকে, এবং শেষে কার্পেটের ওপর পড়ে থাকা মৃত অপরাধীর দিকে তাকালেন।
“আমার মাথা যেন ঘুরে যাচ্ছে,” তিনি বললেন। “এতদিন পর্যন্ত সবকিছুই তার দখলে ছিল; তার আমাকে পছন্দ করার কোনো কারণ ছিল না। নিজের জায়গায় আমাকে বসানো হয়েছে দেখে তার প্রচণ্ড রাগ হওয়ারই কথা ছিলো। অথচ সে এই দলিলটি ধ্বংস করেনি!”
তিনি তাড়াতাড়ি পরের কাগজটি তুলে নিলেন। সেটি ছিল ডাক্তারের নিজের হাতের লেখায় লেখা একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি। চিঠির ওপরে তারিখও লেখা ছিল।
“ওহ, পুলে!” আইনজীবী চিৎকার করে উঠলেন, “আজও সে জীবিত ছিল এবং এখানেই ছিল। এত অল্প সময়ের মধ্যে তার দেহ সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়; সে নিশ্চয়ই এখনও জীবিত—সে পালিয়ে গেছে! কিন্তু কেন পালাল? কীভাবে পালাল? আর যদি সে পালিয়েই থাকে, তাহলে আমরা কি এটাকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করার সাহস করতে পারি? না, আমাদের খুব সাবধান হতে হবে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তোমার মনিবকে হয়তো আমরা কোনো ভয়াবহ বিপদের মধ্যে জড়িয়ে ফেলতে পারি।”
“স্যার, আপনি চিঠিটা পড়ছেন না কেন?” পুলে জিজ্ঞেস করলেন।
“কারণ আমি ভয় পাচ্ছি,” আইনজীবী গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন। “ঈশ্বর করুন, আমার এই ভয়ের কোনো কারণ যেন না থাকে!” এই বলে তিনি কাগজটি চোখের সামনে তুলে ধরলেন এবং পড়তে শুরু করলেন—
“আমার প্রিয় আটারসন,
“এই চিঠি যখন আপনার হাতে এসে পৌঁছবে, তখন আমি আর থাকব না—কোন পরিস্থিতিতে আমি অদৃশ্য হয়ে যাব, তা আগেভাগে অনুমান করার মতো দূরদৃষ্টি আমার নেই। কিন্তু আমার অন্তর্দৃষ্টি এবং আমার নামহীন অবস্থার সমস্ত পরিস্থিতিই আমাকে বলছে যে, পরিণতি অবশ্যম্ভাবী এবং তা খুব শীঘ্রই ঘটবে। অতএব, যান এবং প্রথমে ল্যানিয়ন যে বিবরণটি আপনার হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলে সতর্ক করে গিয়েছিলেন, সেটি পড়ুন; আর যদি আপনি আরও কিছু জানতে চান, তবে আমার স্বীকারোক্তিটি (confession) পড়ুন।”
তোমার অযোগ্য ও দুর্ভাগা বন্ধু,
হেনরি জেকিল।”
“আরও একটি খাম ছিল?” আটারসন জিজ্ঞেস করলেন।
“এই যে, স্যার,” পুলে বলল এবং তাঁর হাতে একটি মোটা প্যাকেট তুলে দিল। প্যাকেটটি বেশ কয়েকটি জায়গায় সিলমোহর করা ছিল।
আইনজীবী প্যাকেটটি নিজের পকেটে রেখে দিলেন।
“এই কাগজটির কথা আমি কাউকে কিছু বলব না। আপনার মনিব যদি পালিয়ে গিয়ে থাকেন কিংবা মারা গিয়ে থাকেন, অন্তত তাঁর সুনামটুকু আমরা রক্ষা করতে পারব। এখন দশটা বাজে; আমাকে বাড়ি ফিরে শান্তভাবে এই নথিগুলো পড়তে হবে। তবে মধ্যরাতের আগেই আমি ফিরে আসব। তখন আমরা পুলিশকে খবর পাঠাব।”
তাঁরা বেরিয়ে এলেন এবং পেছনের সেই কক্ষের দরজাটি তালাবদ্ধ করে এলেন। হলঘরের আগুনের পাশে জড়ো হয়ে থাকা চাকরদের সেখানে রেখে আটারসন তাঁর অফিসের দিকে ফিরে চললেন। সেখানে তিনি সেই দুটি বিবরণ পড়বেন, যার মধ্যেই এই রহস্যের সমাধান প্রকাশ পাওয়ার কথা।
ড. ল্যানিয়নের বয়ান
আজ থেকে চার দিন আগে, অর্থাৎ ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যার ডাকযোগে আমি আমার সহকর্মী এবং পুরোনো স্কুলসঙ্গী হেনরি জেকিলের হাতের লেখা ঠিকানাযুক্ত একটি রেজিস্ট্রি করা খাম পেলাম। এতে আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম। কারণ আমাদের মধ্যে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের কোনো অভ্যাসই ছিল না। এমনকি তার আগের রাতেই আমি তার সঙ্গে দেখা করেছি, একসঙ্গে নৈশভোজও করেছি। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে আমি কল্পনাও করতে পারছিলাম না, যার জন্য চিঠি রেজিস্ট্রি করে পাঠানোর মতো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হতে পারে। চিঠির ভেতরের বিষয়বস্তু আমার বিস্ময় আরও বাড়িয়ে দিল। চিঠিটি ছিল এমন—
“১০ ডিসেম্বর, ১৮—
প্রিয় ল্যানিয়ন,
তুমি আমার সবচেয়ে পুরোনো বন্ধুদের একজন। বিজ্ঞান সংক্রান্ত নানা বিষয়ে আমাদের মধ্যে কখনো কখনো মতভেদ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অন্তত আমার দিক থেকে আমাদের বন্ধুত্বে কোনোদিন ফাটল ধরেছে বলে আমি মনে করতে পারি না। এমন কোনো দিন ছিল না, যেদিন তুমি যদি আমাকে বলতে—‘জেকিল, আমার জীবন, আমার সম্মান, আমার বিবেক—সবই তোমার ওপর নির্ভর করছে’— “তোমাকে সাহায্য করার জন্য আমি আমার বাঁ হাতটিও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করতাম না।(অর্থাত “তোমাকে বাঁচাতে বা সাহায্য করতে হলে নিজের বড় ক্ষতি স্বীকার করতেও আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা করতাম না।”)ল্যানিয়ন, আমার জীবন, আমার সম্মান, আমার বিবেক—সবই তোমার হাতে সমর্পিত।”
“আজ রাতে তুমি যদি আমাকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হও, তাহলে আমি শেষ হয়ে যাব। এই ভূমিকার পর তোমার মনে হতে পারে যে, আমি এমন কোনো অনুরোধ করতে যাচ্ছি, যা মেনে নেওয়া তোমার পক্ষে অসম্মানজনক হবে। কথাটা তুমি নিজেই বিচার করে দেখো।”
আজ রাতের জন্য তোমার অন্য সব কাজ বাতিল করে দাও—হ্যাঁ, এমনকি যদি কোনো সম্রাটের মৃত্যুশয্যার পাশে তোমাকে থাকার আদেশও আসে, তবুও। তারপর একটি ভাড়ার গাড়ি নিয়ে রওনা হও; তবে যদি তোমার নিজের গাড়ি দরজার সামনেই প্রস্তুত থাকে, তাহলে সেটিই ব্যবহার করবে। এই চিঠিটি সঙ্গেই রাখবে, যাতে প্রয়োজনে দেখে নিতে পারো, এবং সোজা আমার বাড়িতে চলে আসবে।
আমার বাটলার পুলেকে আমি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে রেখেছি। তুমি পৌঁছানোর সময় তাকে একজন তালাচাবি মিস্ত্রিসহ অপেক্ষা করতে পাবে। এরপর আমার ব্যক্তিগত অধ্যয়নকক্ষের দরজার তালা জোর করে খুলতে হবে। তুমি একাই ভেতরে ঢুকবে। বাম দিকের কাচঘেরা আলমারিটি খুলবে—যেটিতে ‘E’ লেখা আছে। সেটি বন্ধ থাকলে তালা ভেঙে খুলবে। তারপর ওপর থেকে চতুর্থ, অথবা নিচ থেকে তৃতীয় ড্রয়ারটি খোলে তার ভেতরের সমস্ত জিনিসপত্রসহ ঠিক যেভাবে আছে সেভাবেই বের করে নেবে।
এই মুহূর্তে আমার মনের যে চরম অস্থির অবস্থা, তাতে তোমাকে ভুল নির্দেশ দিয়ে ফেলছি কি না—এই ভয় আমাকে অস্বাভাবিকভাবে পেয়ে বসেছে। কিন্তু আমি যদি ভুলও করে থাকি, তাহলে ড্রয়ারটির ভেতরের জিনিস দেখেই তুমি চিনতে পারবে। সেখানে থাকবে কয়েকটি গুঁড়ো ওষুধ, একটি শিশি এবং একটি খাতার মতো বই।
আমি অনুরোধ করছি, ড্রয়ারটি ঠিক যেভাবে আছে, সেই অবস্থাতেই সঙ্গে করে ক্যাভেন্ডিশ স্কোয়ারে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাবে।
এটাই কাজটির প্রথম অংশ। এবার দ্বিতীয় অংশের কথা বলি। তুমি যদি এই চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রওনা দাও, তাহলে মধ্যরাতের অনেক আগেই ফিরে আসতে পারবে। তবে আমি তোমাকে সেই অতিরিক্ত সময়টুকু হাতে রাখার সুযোগ দিচ্ছি—শুধু এমন কোনো বাধার আশঙ্কায় নয়, যে বাধা প্রতিরোধ করা বা আগে থেকে অনুমান করা কোনোটিই সম্ভব নয়, বরং এই কারণে যে, পরবর্তী যে কাজটি বাকি থাকবে, তার জন্য এমন একটি সময়ই বেশি উপযুক্ত হবে, যখন তোমার চাকর-বাকররা বিছানায় শুয়ে থাকবে।”
তাই মধ্যরাতে তোমাকে তোমার পরামর্শকক্ষটিতে একা থাকতে হবে। আমার নামে একজন লোক তোমার কাছে যাবে। তাকে তুমি নিজ হাতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে দেবে এবং আমার অধ্যয়নকক্ষ থেকে যে ড্রয়ারটি সঙ্গে করে নিয়ে আসবে, সেটি তার হাতে তুলে দেবে।
এরপর তোমার কাজ সম্পূর্ণ হবে এবং আমি তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
তার পাঁচ মিনিট পরও যদি তুমি এই ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে চাও, তখন তুমি বুঝতে পারবে যে এই ব্যবস্থাগুলোর প্রতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো তোমার কাছে যতই অদ্ভুত বা অবিশ্বাস্য মনে হোক না কেন, এর কোনো একটি নির্দেশ অবহেলা করলে তোমার বিবেকের ওপর আমার মৃত্যুর দায়, অথবা আমার মানসিক সুস্থতার সম্পূর্ণ ধ্বংসের দায় তোমার ওপর এসে পড়তে পারে।”
“আমি নিশ্চিত যে আপনি আমার এই আকুল অনুরোধকে হেলাফেলা করবেন না। তবু এমন সম্ভাবনার কথা সামান্য কল্পনা করলেই আমার হৃদয় ভয়ে দমে যায় এবং হাত কাঁপতে থাকে। এই মুহূর্তে আমাকে কল্পনা করুন—এক অচেনা জায়গায়, এমন এক গভীর দুর্দশার অন্ধকারে আমি নিমজ্জিত, যার ভয়াবহতা কল্পনায়ও বাড়িয়ে বলা সম্ভব নয়। অথচ আমি ভালোভাবেই জানি, আপনি যদি সময়মতো আমার অনুরোধটি পালন করেন, তবে আমার সমস্ত দুঃখকষ্ট এমনভাবে দূর হয়ে যাবে, যেন বলা একটি গল্পের মতোই তার সমাপ্তি ঘটেছে।
আমার অনুরোধটি পালন করুন, প্রিয় ল্যানিয়ন, এবং আমাকে রক্ষা করুন।
— এইচ. জে.
পুনশ্চ: এই চিঠিটি ইতিমধ্যে সিল করে ফেলেছিলাম, এমন সময় আরেকটি ভয়ংকর আশঙ্কা আমার মনে উদয় হলো। সম্ভবত ডাকঘর আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে এবং এই চিঠি আগামীকাল সকাল পর্যন্ত আপনার হাতে নাও পৌঁছাতে পারে। সেক্ষেত্রে, প্রিয় ল্যানিয়ন, দিনের মধ্যে যখন আপনার সবচেয়ে সুবিধা হবে, তখনই আমার অনুরোধটি পালন করবেন; এবং আবারও মধ্যরাতে আমার দূতকে আপনার কাছে আসতে দেখবেন। ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। আর যদি সেই রাতটি কোনো ঘটনা ছাড়াই কেটে যায়, তবে ধরে নেবেন—আপনি হেনরি জেকিলকে শেষবারের মতোই দেখেছেন।”
চিঠিটি পড়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হলো যে আমার সহকর্মী নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গেছেন। কিন্তু যতক্ষণ না বিষয়টি সম্পূর্ণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ তাঁর অনুরোধ পালন করা আমার কর্তব্য বলে মনে হলো। এই চিঠির কথাগুলোর অর্থ যত কম বুঝতে পারছিলাম, তার গুরুত্ব বিচার করার ক্ষমতাও তত কমে যাচ্ছিল। আর এমন ভাষায় লেখা একটি আকুল আবেদন উপেক্ষা করলে যে গুরুতর দায়িত্ব আমার ওপর এসে পড়বে, তা অস্বীকার করার উপায় ছিল না। তাই আমি টেবিল থেকে উঠে পড়লাম, একটি ঘোড়ায় টানা হ্যানসম গাড়িতে উঠলাম এবং সোজা জেকিলের বাড়ির দিকে রওনা হলাম।
বাটলার আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমার চিঠির সঙ্গেই সে একটি নিবন্ধিত নির্দেশপত্র পেয়েছিল এবং ইতিমধ্যে একজন তালাচাবিওয়ালা ও একজন কাঠমিস্ত্রিকে ডেকে পাঠিয়েছিল। আমরা কথা বলার মধ্যেই কারিগর দুজন এসে গেল। তারপর আমরা সবাই মিলে পুরোনো ড. ডেনম্যানের শল্যচিকিৎসা-থিয়েটারের দিকে গেলাম। সেখান থেকেই—আপনি নিশ্চয়ই জানেন—জেকিলের ব্যক্তিগত অধ্যয়নকক্ষে সবচেয়ে সহজে প্রবেশ করা যায়।
দরজাটি ছিল অত্যন্ত মজবুত এবং তালাটিও ছিল চমৎকার। কাঠমিস্ত্রি স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে জোর করে দরজা খুলতে গেলে তাকে অনেক কষ্ট করতে হবে এবং যথেষ্ট ক্ষতিও করতে হবে। তালাচাবিওয়ালারও প্রায় হতাশ হয়ে পড়ার অবস্থা। কিন্তু লোকটি ছিল বেশ দক্ষ। প্রায় দুই ঘণ্টা পর অবশেষে দরজাটি খুলে গেল।
‘E’ চিহ্নিত আলমারিটি খোলা হলো। আমি সেখান থেকে একটি ড্রয়ার বের করলাম, সেটিকে খড় দিয়ে ভরে একটি চাদরের মধ্যে শক্ত করে বেঁধে নিলাম এবং সেটি সঙ্গে নিয়ে ক্যাভেন্ডিশ স্কোয়ারে ফিরে এলাম।
সেখানে গিয়ে আমি ড্রয়ারটির ভেতরের জিনিসপত্র পরীক্ষা করতে শুরু করলাম।
ওষুধের গুঁড়োগুলো বেশ পরিপাটি করে তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো দক্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারকের কাজের মতো নিখুঁত ছিল না। তাই সহজেই বোঝা গেল, এগুলো জেকিল নিজেই নিজের ব্যবহারের জন্য তৈরি করেছিলেন। একটি মোড়ক খুলে দেখলাম, তার ভেতরে সাদা রঙের এক ধরনের সাধারণ স্ফটিকজাত লবণ রয়েছে বলে মনে হলো।
এরপর শিশিটির দিকে নজর দিলাম। তাতে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ রক্তের মতো গাঢ় লাল একটি তরল ছিল। সেটির গন্ধ ছিল অত্যন্ত তীব্র ও ঝাঁঝালো। আমার মনে হলো, এর মধ্যে ফসফরাস এবং কোনো উদ্বায়ী ইথারজাত পদার্থ রয়েছে। অন্য উপাদানগুলোর ব্যাপারে আমি কোনো ধারণাই করতে পারলাম না।
বইটি ছিল একটি সাধারণ হিসাবের খাতা। তাতে বিশেষ কিছু লেখা ছিল না—শুধু একের পর এক তারিখের তালিকা। এই তারিখগুলো বহু বছর ধরে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, প্রায় এক বছর আগে হঠাৎ করেই এই নথিবদ্ধকরণ বন্ধ হয়ে গেছে।
কোথাও কোথাও কোনো তারিখের পাশে ছোট্ট একটি মন্তব্য লেখা ছিল—সাধারণত মাত্র একটি শব্দ। কয়েকশো নথির মধ্যে ‘double’ শব্দটি হয়তো ছয়বার লেখা ছিল। আর তালিকার একেবারে প্রথম দিকের একটি তারিখের পাশে কয়েকটি বিস্ময়চিহ্নসহ লেখা ছিল—
‘total failure!!!’ — ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থতা!!!’ এই সবকিছু আমার কৌতূহল বাড়িয়ে তুলেছিল ঠিকই, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাকে দেয়নি। আমার সামনে ছিল এক শিশি কোনো এক ধরনের লবণ এবং কয়েক বছরের পরীক্ষানিরীক্ষার নথি—যে পরীক্ষাগুলো জেকিলের অন্যান্য বহু গবেষণার মতোই বাস্তব কোনো কার্যকর ফলাফল এনে দিতে পারেনি।
কিন্তু আমার বাড়িতে এই জিনিসগুলোর উপস্থিতি কীভাবে আমার চঞ্চল ও অস্থির সহকর্মীর সম্মান, মানসিক সুস্থতা কিংবা জীবনের ওপর কোনোরকম প্রভাব ফেলতে পারে?
যদি তার বার্তাবাহক এক জায়গায় যেতে পারে, তবে অন্য জায়গায় যেতে পারবে না কেন? আর কোনো বাধা থাকলেও, এই ভদ্রলোককে কেন আমার সঙ্গে গোপনে দেখা করতে হবে? যতই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে লাগলাম, ততই আমার দৃঢ় বিশ্বাস হতে লাগল যে, আমি মস্তিষ্কের কোনো রোগে আক্রান্ত একজন মানুষের ব্যাপার নিয়ে কাজ করছি। তবু আমি আমার চাকর-বাকরদের শুতে পাঠিয়ে দিলাম এবং একটি পুরোনো রিভলভার ভরে প্রস্তুত রাখলাম, যাতে কোনো বিপদ ঘটলে অন্তত আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে আমাকে পাওয়া যায়।
লন্ডনের ঘড়িতে রাত বারোটা বাজতে না বাজতেই দরজার কড়া খুব আস্তে করে বেজে উঠল। সেই ডাক শুনে আমি নিজেই দরজা খুলতে গেলাম এবং দেখলাম, একজন খাটো মানুষ বারান্দার স্তম্ভগুলোর গা ঘেঁষে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“আপনি কি ড. জেকিলের কাছ থেকে এসেছেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে কিছুটা অস্বস্তি ও সংযত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে জানাল, “হ্যাঁ।”
আমি তাকে ভেতরে আসতে বললাম। কিন্তু ঘরে ঢোকার আগে সে পিছন ফিরে চত্বরের অন্ধকারের দিকে ভালো করে তাকাল। একটু দূরে একজন পুলিশ তার হাতে থাকা লণ্ঠনটি জ্বালিয়ে এগিয়ে আসছিল। তাকে দেখেই আমার অতিথি যেন চমকে উঠল এবং আরও দ্রুত পা চালাল।
এই ঘটনাগুলো, স্বীকার করতেই হয়, আমার মনে বেশ অস্বস্তির সৃষ্টি করেছিল। তাকে নিয়ে আমি পরামর্শকক্ষের উজ্জ্বল আলোয় ঢোকার সময়ও আমার হাত অস্ত্রের ওপর প্রস্তুত রেখেছিলাম।
অবশেষে এবার তাকে স্পষ্ট করে দেখার সুযোগ পেলাম। এর আগে আমি তাকে কখনো চোখে দেখিনি—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আগেই বলেছি, লোকটি ছিল ছোটখাটো গড়নের। তার মুখের ভয়ংকর অভিব্যক্তি আমাকে বিশেষভাবে বিচলিত করেছিল। আশ্চর্যের বিষয় ছিল, তার শরীরে প্রচণ্ড পেশিশক্তির প্রকাশ থাকলেও সামগ্রিকভাবে তাকে একই সঙ্গে অত্যন্ত দুর্বল ও অসুস্থ প্রকৃতির বলে মনে হচ্ছিল। আর সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো—তার সান্নিধ্যেই আমার মনে এক অদ্ভুত, ব্যাখ্যাতীত অস্বস্তির অনুভূতি হচ্ছিল।
সেই অনুভূতির সঙ্গে যেন শীতল কাঁপুনির কিছুটা মিল ছিল, আর একই সঙ্গে আমার নাড়ির গতি লক্ষণীয়ভাবে মন্থর হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি ব্যাপারটিকে আমার ব্যক্তিগত রুচি-অরুচির অদ্ভুত কোনো প্রতিক্রিয়া বলে মনে করেছিলাম এবং এই উপসর্গগুলোর তীব্রতা দেখে শুধু বিস্মিত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে এমন কিছু কারণ জানার সুযোগ হয়েছিল, যার ফলে আমার বিশ্বাস হয়েছে যে এর কারণ মানুষের প্রকৃতির আরও গভীরে নিহিত এবং এর ভিত্তি নিছক ঘৃণার প্রবৃত্তি নয়, বরং তার চেয়ে আরও মহৎ কোনো মানবিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
লোকটি ঘরে ঢোকার প্রথম মুহূর্ত থেকেই আমার মধ্যে এমন এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল, যাকে আমি কেবল বিরক্তিকর কৌতূহল বলেই বর্ণনা করতে পারি।
তার পোশাক এমন ছিল, যা সাধারণ কোনো মানুষের গায়ে দেখলে হাস্যকর বলে মনে হতো। পোশাকের কাপড় অবশ্য দামী ও গম্ভীর ধরনের ছিলো, কিন্তু প্রতিটি মাপেই সেগুলো তার শরীরের তুলনায় অত্যন্ত বড় ছিলো। প্যান্টগুলো তার পায়ের ওপর ঢিলেঢালাভাবে ঝুলছিল এবং মাটিতে লেগে যাওয়া ঠেকাতে নিচের অংশ গুটিয়ে রাখা হয়েছিল। কোটের কোমরের অংশ তার নিতম্বের অনেক নিচে ছিলো, আর কলারটি তার কাঁধের ওপর এমনভাবে ছড়িয়ে ছিল যেন সেটিও তার শরীরের তুলনায় অতিরিক্ত বড়।
অদ্ভুত ব্যাপার বলতে কী, এই হাস্যকর পোশাক-পরিচ্ছদ আমাকে মোটেই হাসায়নি। বরং, আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রাণীটির সত্তার মধ্যেই যেহেতু এমন কিছু অস্বাভাবিক ও বেমানান ছিল—এমন কিছু যা আমাকে আকস্মিকভাবে চমকে দিচ্ছিল, বিস্মিত করছিল এবং ঘৃণায় ভরিয়ে তুলছিল—তাই তার এই নতুন অমিলটিও যেন সেই অস্বাভাবিকতার সঙ্গে মানানসই হয়ে উঠল এবং সেটিকেই আরও প্রবল করে তুলল। ফলে, লোকটির স্বভাব ও চরিত্র সম্পর্কে আমার যে আগ্রহ ছিল, তার সঙ্গে আরও যুক্ত হলো তার উৎপত্তি, তার জীবনযাপন, তার ভাগ্য এবং সমাজে তার অবস্থান সম্পর্কে জানার কৌতূহল জেগে উঠল।
এই পর্যবেক্ষণগুলো লিখে বোঝাতে যতটা সময় লাগছে, বাস্তবে সেগুলো ঘটেছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। আমার অতিথি তখন গম্ভীর উত্তেজনায় যেন অস্থির হয়ে উঠেছিল।
তুমি কি সেটা পেয়েছ?’—সে চিৎকার করে বলল। ‘তুমি কি সেটা পেয়েছ?’ তার অধৈর্যতা এতটাই প্রবল ছিল যে, সে আমার বাহুতে হাত রেখে আমাকে ঝাঁকাতেও চেষ্টা করল।
আমি তাকে সরিয়ে দিলাম। তার স্পর্শে আমার শরীরের ভেতর দিয়ে যেন এক শীতল শিহরণ বয়ে গেল।
“আসুন, মহাশয়,” আমি বললাম। “আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে এখনও আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়নি। দয়া করে বসুন।”
আমি তাকে বসার আসন দেখিয়ে নিজেও আমার চিরপরিচিত আসনে বসলাম। তারপর একজন রোগীর সঙ্গে যেমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলি, তেমনই আচরণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম। যদিও রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল, আমার মনে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল এবং এই অতিথির প্রতি আমার গভীর আতঙ্কও ছিল—তবু আমি নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলাম।
“আমাকে ক্ষমা করবেন, ড. ল্যানিয়ন,” সে যথেষ্ট ভদ্রভাবেই উত্তর দিল। “আপনি যা বললেন, তা যথার্থ। আমার অধৈর্যতা আমার ভদ্রতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমি আপনার সহকর্মী ড. হেনরি জেকিলের নির্দেশেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজের জন্য এখানে এসেছি। আর আমি বুঝেছিলাম যে…” সে থেমে গেল এবং গলায় হাত রাখল। তার বাহ্যিক স্থিরতা বজায় থাকলেও আমি বুঝতে পারছিলাম, সে যেন হিস্টিরিয়ার আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য প্রাণপণে লড়াই করে চলছে।
“এই যে, স্যার,” আমি ড্রয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, “ওখানেই আছে”—টেবিলের পিছনে মেঝের ওপর পড়ে ছিল সেটি, আর তখনও চাদর দিয়ে ঢাকা ছিল।
কিন্তু এখানে এসে আমি তার উৎকণ্ঠার অবসান ঘটানোর জন্য—এবং হয়তো নিজের ক্রমবর্ধমান কৌতূহল মেটানোর জন্যও—তার প্রতি কিছুটা সহানুভূতি দেখালাম।
“ওখানে আছে, মহাশয়,” আমি বললাম। টেবিলের পেছনে মেঝের ওপর রাখা, এখনও চাদর দিয়ে ঢাকা ড্রয়ারটির দিকে ইশারা করলাম।
সে সঙ্গে সঙ্গে সেটির দিকে ছুটে গেল। তারপর হঠাৎ থেমে নিজের বুকে হাত রাখল। তার চোয়াল এমনভাবে কাঁপছিল যে দাঁতের ঘর্ষণের শব্দ পর্যন্ত আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। তার মুখের চেহারা এতটাই ভয়াবহ ও বিবর্ণ হয়ে উঠেছিল যে আমি তার জীবন এবং মানসিক সুস্থতা—দুটো নিয়েই শঙ্কিত হয়ে পড়লাম।
“নিজেকে সামলে নিন,” আমি বললাম।
সে আমার দিকে এক ভয়ংকর হাসি ছুড়ে দিল এবং যেন মরিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে চাদরটি টেনে সরিয়ে ফেলল। ভেতরের জিনিসগুলো চোখে পড়তেই সে এমন এক গভীর স্বস্তির কান্না বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিল যে আমি হতবাক হয়ে বসে রইলাম।
পরের মুহূর্তেই, তার কণ্ঠস্বর তখন বেশ নিয়ন্ত্রিত, সে জিজ্ঞেস করল—“আপনার কাছে কি মাপার জন্য দাগযুক্ত কোনো কাচের পাত্র আছে?”
আমি কিছুটা কষ্ট করে আসন থেকে উঠে তার চাওয়া পাত্রটি এনে দিলাম।
সে হাসিমুখে মাথা নেড়ে আমাকে ধন্যবাদ জানাল। তারপর লাল রঙের তরলের কয়েক ফোঁটা—অর্থাৎ কয়েক মিনিম (“মিনিম” বা “অতি অল্প পরিমাণ (প্রায় ০.০৬১ মি.লি.)”) মেপে নিল এবং তার সঙ্গে একটি গুঁড়োর দানা যোগ করল।
মিশ্রণটি প্রথমে ছিল লালচে রঙের। কিন্তু স্ফটিকগুলো গলে যেতে শুরু করতেই তার রং ক্রমে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একই সঙ্গে সেটি ফেনাতে লাগল এবং স্পষ্ট শব্দে ফুসফুস করতে করতে সামান্য বাষ্পও ছাড়তে লাগল।
হঠাৎ একই মুহূর্তে সেই ফুটতে থাকা প্রতিক্রিয়া থেমে গেল এবং মিশ্রণটির রং বদলে গিয়ে গাঢ় বেগুনি হয়ে উঠল। তারপর সেটি ধীরে ধীরে আবার বিবর্ণ হয়ে জলীয় সবুজ রঙে পরিণত হলো।
আমার অতিথি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এই অদ্ভুত রূপান্তরগুলো লক্ষ্য করছিল। অবশেষে সে মৃদু হাসল, কাচের পাত্রটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল এবং তারপর ঘুরে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন অত্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।
“এখন,” সে বলল, “বাকি বিষয়টি মীমাংসা করা যাক। তুমি কি বুদ্ধিমানের মতো আচরণ করবে? তুমি কি আমার কথামতো চলবে? তুমি কি আমাকে এই পাত্রটি হাতে নিয়ে, আর কোনো কথা না বলে তোমার বাড়ি থেকে চলে যেতে দেবে? নাকি কৌতূহলের লোভ তোমার ওপর অত্যধিক প্রভাব বিস্তার করেছে? উত্তর দেওয়ার আগে ভালো করে ভেবে নাও, কারণ তুমি যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, ঠিক সেভাবেই কাজ হবে।
“আর এখন,” সে বলল, “যেটুকু বাকি আছে, তা মীমাংসা করা যাক। তুমি কি বুদ্ধিমানের মতো আচরণ করবে? তুমি কি আমার কথা মেনে চলবে? তুমি কি আমাকে এই গ্লাসটি হাতে নিয়ে, আর কোনো কথাবার্তা না বাড়িয়ে, তোমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেবে? নাকি কৌতূহলের লোভ তোমার ওপর অতিরিক্ত কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে?
উত্তর দেওয়ার আগে ভালো করে ভেবে নাও, কারণ তোমার সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সবকিছু করা হবে। তুমি যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী তোমাকে আগের মতোই রেখে যাওয়া হবে—তুমি না হবে আরও ধনী, না হবে আরও জ্ঞানী; তবে মরণাপন্ন অবস্থায় থাকা একজন মানুষকে সাহায্য করার যে অনুভূতি, সেটিকে যদি আত্মার এক ধরনের সম্পদ বলে গণ্য করা যায়, তাহলে অবশ্যই তুমি সেই সম্পদ নিয়ে থাকবে। অথবা, তুমি যদি সেটিই বেছে নিতে চাও, তাহলে এই মুহূর্তে, এই ঘরেই, তোমার সামনে জ্ঞানের এক নতুন ক্ষেত্র এবং খ্যাতি ও ক্ষমতার নতুন নতুন পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে; আর তোমার চোখ এমন এক বিস্ময়কর দৃশ্যের সাক্ষী হবে, যা স্বয়ং শয়তানের অবিশ্বাসকেও টলিয়ে দিতে পারে।”
“স্যার,” আমি বললাম, এমন এক শীতল ও নির্লিপ্ত ভাব দেখিয়ে যা প্রকৃতপক্ষে আমার মনে মোটেই ছিল না, “আপনি ধাঁধার মতো কথা বলছেন। তাই আমাকে খুব বেশি বিশ্বাসের সঙ্গে আপনার কথা শুনতে না দেখে আপনি নিশ্চয়ই অবাক হবেন না। কিন্তু ব্যাখ্যাতীত সেবার পথে আমি এতদূর এগিয়ে এসেছি যে শেষটা না দেখা পর্যন্ত এখন আর থামতে পারি না।”
“তুমি তোমার শপথের কথা মনে রেখো; এরপর যা ঘটবে, তা আমাদের পেশার গোপনীয়তার অঙ্গীকারের সিলমোহরের অধীনে থাকবে। আর এখন, তুমি—যে এতদিন ধরে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আবদ্ধ ছিলে, তুমি—যে অতীন্দ্রিয় চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষমতাকে অস্বীকার করেছ, তুমি—যে তোমার ঊর্ধ্বতনদের উপহাস করেছ—দেখো!”
সে পাত্রটি ঠোঁটে তুলল এবং এক ঢোকে পান করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে একটি আর্তচিৎকার শোনা গেল। সে টলতে লাগল, দুলে উঠল, টেবিলটি আঁকড়ে ধরে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ রক্তাভ ও বিস্ফারিত, মুখ হাঁ করা, সে হাঁপাতে লাগল। আর আমি তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম—আমার মনে হলো, তার মধ্যে যেন একটি পরিবর্তন ঘটছে। তাকে যেন ফুলে উঠতে দেখা গেল; তার মুখ হঠাৎ কালো হয়ে গেল, আর মুখের অবয়বগুলো যেন গলে গিয়ে বদলে যেতে লাগল।
পরের মুহূর্তেই আমি লাফ দিয়ে উঠে দেয়ালের দিকে পিছিয়ে গেলাম। সেই ভয়ংকর বিস্ময়কর দৃশ্য থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য দু’হাত তুলে ধরলাম। আতঙ্কে আমার মন যেন ডুবে গেল।
“হে ঈশ্বর!” আমি চিৎকার করে উঠলাম। আবার, বারবার বললাম, “হে ঈশ্বর!”
কারণ আমার চোখের সামনে—ফ্যাকাশে, কাঁপতে কাঁপতে, প্রায় অজ্ঞান হয়ে, সামনে হাতড়াতে হাতড়াতে, যেন মৃত্যুর পর আবার জীবনে ফিরে আসা কোনো মানুষ—সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল হেনরি জেকিল!
পরের এক ঘণ্টায় সে আমাকে যা বলেছিল, তা কাগজে লিখে প্রকাশ করার মতো মানসিক শক্তি আমার ছিল না। আমি যা দেখেছি, তা-ই দেখেছি; আমি যা শুনেছি, তা-ই শুনেছি—এবং সেই অভিজ্ঞতায় আমার আত্মা যেন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। অথচ এখন, সেই দৃশ্য আমার চোখ থেকে মুছে যাওয়ার পর, আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি কি সত্যিই সেই দৃশ্য বিশ্বাস করি? আমি উত্তর দিতে পারি না।
আমার জীবন যেন একেবারে শিকড় পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে; ঘুম আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে; দিনের প্রতিটি মুহূর্তে এবং রাতের প্রতিটি প্রহরে সবচেয়ে ভয়ংকর আতঙ্ক আমার পাশে বসে থাকে। আমার মনে হয়, আমার জীবনের দিনগুলি ফুরিয়ে এসেছে এবং আমাকে মরতেই হবে; অথচ অবিশ্বাসী অবস্থাতেই আমার মৃত্যু হবে।
আর সেই মানুষটি আমার সামনে যে নৈতিক অধঃপতন উন্মোচন করেছিল, অনুতাপের অশ্রুসহকারে তা প্রকাশ করলেও, তার কথা স্মরণ করলেই আমি শিউরে উঠি; এমনকি স্মৃতিতেও আমি সে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারি না।
আমি শুধু একটি কথাই বলব, আটারসন, আর সেটিই—যদি তুমি তা বিশ্বাস করার মতো মানসিক শক্তি সঞ্চয় করতে পারো—তোমার জন্য যথেষ্টেরও বেশি হবে। সেই রাতে যে প্রাণীটি চুপিসারে আমার বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল, জেকিলের নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তার নাম ছিল হাইড; এবং সারা দেশে প্রতিটি কোণে তাকে খুঁজে বেড়ানো হচ্ছিল কেরিউ হত্যার অপরাধে।
— হ্যাস্টি ল্যানিয়ন
হেনরি জেকিলের নিজের মুখে তাঁর কাহিনির পূর্ণ বিবরণ
আমি ১৮– সালে এক বিরাট সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। তার সঙ্গে ছিল অসাধারণ কিছু গুণ ও প্রতিভা। স্বভাবতই আমি পরিশ্রমী ছিলাম এবং সমাজের জ্ঞানী ও সৎ মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে ভালোবাসতাম। ফলে মনে হওয়ারই কথা ছিল যে, আমার সামনে একটি সম্মানজনক ও বিশিষ্ট ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে আছে।
সত্যি বলতে, আমার সবচেয়ে বড় দোষ ছিল এক ধরনের অস্থির প্রফুল্লতা—যে স্বভাব অনেক মানুষের জীবনে আনন্দ এনে দিয়েছে, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা আমার মাথা উঁচু করে চলার প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজের সামনে সাধারণের চেয়ে বেশি গম্ভীর মুখে থাকার ইচ্ছার সঙ্গে সহজে মিলত না। তাই আমি আমার আনন্দ-উল্লাস ও ব্যক্তিগত ভোগবিলাস গোপন করতে শুরু করলাম। যখন পরিণত বয়সে পৌঁছে আত্মসমালোচনা করতে এবং পৃথিবীতে আমার অবস্থান ও অগ্রগতি বিচার করে দেখতে শুরু করলাম, তখন বুঝতে পারলাম যে আমি ইতিমধ্যেই গভীর দ্বৈত জীবনের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি।
আমার মতো অনিয়ম ও গোপন দোষের জন্য অনেক মানুষ হয়তো গর্বই করত। কিন্তু আমি নিজের সামনে যে উচ্চ আদর্শ স্থাপন করেছিলাম, তার কারণে আমার সেই দুর্বলতাগুলোকে প্রায় অসুস্থ রকমের লজ্জার সঙ্গে দেখতাম এবং লুকিয়ে রাখতাম। তাই আমার দোষগুলোর মধ্যে বিশেষ কোনো নৈতিক অধঃপতন যতটা আমাকে প্রভাবিত করেছিল, তার চেয়ে আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আদর্শের কঠোর দাবিই আমাকে এমন মানুষ করে তুলেছিল। এর ফলেই আমার মধ্যে ভালো ও মন্দ—মানুষের দ্বৈত প্রকৃতির যে দুই অংশ পরস্পরকে বিভক্ত করেও একসঙ্গে গড়ে তোলে—তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ অন্য মানুষের তুলনায় আরও গভীর হয়ে উঠেছিল।
এই পরিস্থিতিতে আমি জীবনের সেই কঠিন নিয়মটি নিয়ে গভীর ও অবিচলভাবে ভাবতে বাধ্য হলাম—যে নিয়ম ধর্মের মূল ভিত্তিতে রয়েছে এবং মানুষের দুঃখ-কষ্টের অন্যতম প্রধান উৎস।
আমি এত গভীরভাবে দ্বিমুখী জীবনযাপন করলেও কোনো অর্থেই ভণ্ড ছিলাম না। আমার সত্তার দুই দিকই ছিল সম্পূর্ণ সত্য ও আন্তরিক। দিনের আলোয় যখন আমি জ্ঞানচর্চার অগ্রগতি সাধন করতাম কিংবা মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য কাজ করতাম, তখন আমি যতটা সত্যিকার ‘আমি’ ছিলাম, নিজেকে সংযমের বন্ধন থেকে মুক্ত করে লজ্জাজনক আনন্দে ডুবে যাওয়ার সময়ও ঠিক ততটাই সত্যিকার ছিলাম আমি।
এমন সময় ঘটল যে, আমার বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয় আমাকে ক্রমশ রহস্যময় ও অতীন্দ্রিয় জগতের দিকে নিয়ে গেল। আর সেই গবেষণাই আমার অন্তরের মধ্যে চলতে থাকা চিরন্তন সংঘাতের দিকে নতুন ও তীব্র আলো ফেলল। প্রতিদিন, আমার বুদ্ধির দুই দিক—নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক—থেকেই আমি ধীরে ধীরে সেই সত্যের আরও কাছে পৌঁছাতে লাগলাম, যার আংশিক আবিষ্কার শেষ পর্যন্ত আমাকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সেই সত্য হলো—মানুষ প্রকৃত অর্থে এক নয়; মানুষ প্রকৃত অর্থে দুই।
আমি ‘দুই’ বলছি, কারণ আমার নিজের জ্ঞান এখনো তার বেশি দূর এগোয়নি। ভবিষ্যতে অন্যরা এই পথ অনুসরণ করবে, কেউ হয়তো আমাকে ছাড়িয়েও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। আমার অনুমান, শেষ পর্যন্ত মানুষকে হয়তো এমন এক বহুসত্তার সমষ্টি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, যার মধ্যে বাস করবে বহু বিচিত্র, পরস্পর-বিরোধী এবং স্বাধীন সত্তা।
আমার নিজের জীবনের প্রকৃতির কারণে আমি অবধারিতভাবে একটি নির্দিষ্ট দিকেই এগিয়ে গিয়েছিলাম। সেটি ছিল নৈতিকতার দিক। নিজের মধ্যেই আমি মানুষের প্রকৃত ও আদিম দ্বৈত স্বভাবকে চিনতে শিখেছিলাম। আমার চেতনার মধ্যে যে দুটি প্রকৃতি পরস্পরের সঙ্গে সংগ্রাম করে চলছিল, তার কোনো একটিকে যদি আমার প্রকৃত সত্তা বলা যায়, তবে কেবল এই কারণেই বলা যায় যে আমি মূলত একই সঙ্গে দু’টিই ছিলাম।
আর সেই প্রথম দিক থেকেই—এমনকি আমার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর ধারাবাহিকতা এমন কোনো অলৌকিক সম্ভাবনার কথা ইঙ্গিত করার বহু আগেই—আমি আনন্দের সঙ্গে, এক প্রিয় দিবাস্বপ্নের মতো, এই চিন্তায় ডুবে থাকতে শিখেছিলাম যে, যদি এই দুটি সত্তাকে পৃথক পৃথক পরিচয়ে আলাদা করে রাখা যেত! তাহলে জীবন তার সমস্ত অসহনীয় বোঝা থেকে মুক্তি পেত। অন্যায়প্রবণ মানুষটি তার উচ্চতর নৈতিক আকাঙ্ক্ষার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে নিজের পথে চলে যেতে পারত, এবং তার আরও নীতিবান যমজ সত্তার অনুশোচনার হাত থেকেও রেহাই পেত। আর ন্যায়পরায়ণ মানুষটি দৃঢ় ও নিরাপদভাবে তার ঊর্ধ্বমুখী পথে এগিয়ে যেতে পারত; যে ভালো কাজগুলোতে সে আনন্দ পেত, সেগুলোই করতে পারত, এবং বাইরের সেই দুষ্ট সত্তার কারণে আর অপমান ও অনুতাপের শিকার হতে হতো না।
মানবজাতির অভিশাপ ছিল এই যে, পরস্পরের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এই দুই উপাদানকে একই বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল; ফলে চেতনার যন্ত্রণাকাতর গর্ভের মধ্যে এই দুই বিপরীত মেরুর যমজ সত্তা অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছিল। তাহলে কীভাবে তাদের পৃথক করা সম্ভব ছিল?
আমি যখন এই চিন্তার এতদূর পৌঁছেছি, তখনই, যেমন বলেছি, আমার গবেষণাগারের টেবিল থেকে এই বিষয়টির ওপর একটি পার্শ্ব-আলো এসে পড়ল।
আমি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করলাম—যা এর আগে কেউ এত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেনি—আমাদের এই আপাতদৃষ্টিতে এত দৃঢ় ও কঠিন দেহ আসলে কতটা কাঁপনশীল, অস্থায়ী এবং কুয়াশার মতো ক্ষণস্থায়ী। আমরা যে দেহকে এত দৃঢ় বলে মনে করি, তা আসলে কতটা ভঙ্গুর, তা বুঝতে পারলাম। আমি এমন কিছু উপাদান বা পদার্থের সন্ধান পেয়েছিলাম, যেগুলোর এমন ক্ষমতা ছিল যে, তারা মানুষের এই দেহরূপী আবরণকে কাঁপিয়ে দিতে এবং পিছনে টেনে সরিয়ে দিতে পারত—যেমন বাতাস কোনো তাঁবুর পর্দাকে দুলিয়ে তুলে পিছনে সরিয়ে দেয়।
আমার স্বীকারোক্তির এই বৈজ্ঞানিক অংশটি আমি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করব না—এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। প্রথমত, আমি শিখেছি যে আমাদের জীবনের নিয়তি ও বোঝা চিরকাল মানুষের কাঁধে চাপানো। মানুষ যখন সেই বোঝা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে, তখন তা আরও অপরিচিত এবং আরও ভয়ংকর ভার নিয়ে আবার তার ওপর ফিরে আসে।
দ্বিতীয়ত, আমার এই বিবরণ থেকেই দুর্ভাগ্যবশত খুব স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, আমার আবিষ্কারগুলো সম্পূর্ণ ছিল না। তাই এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, আমার আত্মার বিভিন্ন শক্তি ও প্রবৃত্তির চারপাশে যে স্বাভাবিক দেহের আবরণ ছিল, আমি শুধু সেই দেহটিকে তাদের আভা ও দীপ্তি থেকে আলাদা করে চিনতে পারিনি, বরং এমন একটি ওষুধও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলাম, যার সাহায্যে আমার সত্তার সেই শক্তিগুলোকে তাদের আধিপত্যের আসন থেকে উৎখাত করা সম্ভব হয়েছিল। তার পরিবর্তে আমি একটি দ্বিতীয় দেহ ও দ্বিতীয় মুখমণ্ডল সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম—যা আমার কাছে কোনো অংশেই অস্বাভাবিক ছিল না; কারণ সেটিও ছিল আমারই আত্মার নিম্নতর ও অধঃপতিত প্রবৃত্তিগুলোর প্রকাশ এবং সেই প্রবৃত্তিগুলোর ছাপ বহনকারী এক স্বাভাবিক রূপ।
আমি দীর্ঘদিন দ্বিধায় ছিলাম, এই তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করে পরীক্ষা করার সাহস করব কি না। আমি ভালোভাবেই জানতাম যে এতে আমার মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে; কারণ এমন কোনো ওষুধ, যা মানুষের পরিচয়বোধের একেবারে দুর্গের ওপর এত প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং তাকে কাঁপিয়ে দেয়, সামান্য মাত্রাতিরিক্ত সেবনেই কিংবা প্রয়োগের মুহূর্তে সামান্যতম ভুল সময়ের কারণেও সেই অদৃশ্য সত্তাটিকেই সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারে—যে সত্তাটিকে আমি এই ওষুধের মাধ্যমে পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এমন এক অসাধারণ ও গভীর আবিষ্কারের প্রলোভন শেষ পর্যন্ত আমার সমস্ত আশঙ্কাকে পরাভূত করল।
এরই মধ্যে আমি আমার ওষুধের নির্যাস প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। পরীক্ষার মাধ্যমে আমি জানতাম যে আর একটি বিশেষ উপাদানই কেবল বাকি আছে। তাই এক পাইকারি রাসায়নিক দ্রব্যের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেই নির্দিষ্ট লবণটি একসঙ্গে বিপুল পরিমাণে কিনে আনলাম। তারপর এক অভিশপ্ত রাতে আমি সব উপাদান একত্রে মিশিয়ে দিলাম। কাচের পাত্রের মধ্যে সেগুলোকে ফুটতে ও ধোঁয়া উঠতে দেখলাম। যখন সেই তীব্র স্ফুটন থেমে এল, তখন প্রবল সাহস সঞ্চয় করে আমি ওষুধটি এক নিঃশ্বাসে পান করে ফেললাম।
তারপর শুরু হলো অসহনীয় যন্ত্রণা—হাড়ের ভেতর যেন কেউ নির্মমভাবে পেষণ করছে, ভয়ংকর বমিভাব, আর আত্মার এমন এক আতঙ্ক, যার চেয়ে তীব্র যন্ত্রণা জন্ম বা মৃত্যুর মুহূর্তেও হয়তো অনুভূত হয় না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই যন্ত্রণা দ্রুত কমে আসতে লাগল, এবং মনে হলো যেন এক ভয়াবহ অসুস্থতা থেকে ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পাচ্ছি।
আমার অনুভূতিতে তখন এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটেছে—এমন কিছু, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব; আর তার একেবারে নতুনত্বের কারণেই তা অবিশ্বাস্য রকম মধুর মনে হচ্ছিল। শরীরকে আমার আগের চেয়ে তরুণ, হালকা ও সুখী মনে হচ্ছিল। মনের গভীরে অনুভব করছিলাম এক ধরনের উত্তেজনাময় বেপরোয়া আনন্দ; এলোমেলো ইন্দ্রিয়সুখের নানা ছবি যেন আমার কল্পনায় প্রবল স্রোতের মতো ছুটে চলেছে। মনে হচ্ছিল, সমস্ত কর্তব্য ও দায়বদ্ধতার বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে; আত্মা যেন এমন এক অজানা স্বাধীনতা লাভ করেছে, যা মোটেই নিষ্পাপ নয়।
এই নতুন জীবনের প্রথম শ্বাসেই আমি বুঝতে পারলাম—আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি পাপী হয়ে উঠেছি; দশগুণ বেশি পাপী। আমার জন্মগত মন্দ প্রবৃত্তির কাছে আমি সম্পূর্ণরূপে দাসত্ব স্বীকার করেছি। অথচ সেই মুহূর্তে এই উপলব্ধিই আমাকে মদ পানের মতো উত্তেজিত ও আনন্দিত করে তুলেছিল।
আমি এই নতুন অনুভূতির সতেজতায় উল্লসিত হয়ে দু’হাত প্রসারিত করলাম। আর তখনই হঠাৎ বুঝতে পারলাম—আমার উচ্চতা কমে গেছে।
সেই সময় আমার ঘরে কোনো আয়না ছিল না। আমি এখন যে আয়নাটির পাশে বসে লিখছি, সেটি পরে সেখানে পরে আনা হয়েছিল—বিশেষভাবে এই রূপান্তরগুলি প্রত্যক্ষ করার উদ্দেশ্যে।
ততক্ষণে রাত অনেকটা গড়িয়ে ভোর হয়ে এসেছে। যদিও ভোরের আকাশ তখনও অন্ধকার, তবু দিনের আলো ফুটে ওঠার সময় প্রায় এসে গেছে। আমার বাড়ির সমস্ত বাসিন্দা গভীর নিদ্রায় অচেতন। আশা ও সাফল্যের উত্তেজনায় উজ্জ্বল হয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই নতুন রূপে অন্তত নিজের শোবার ঘর পর্যন্ত যাওয়ার সাহস করব।
আমি উঠোন পার হলাম। মনে হলো, আকাশের নক্ষত্রগুলো যেন বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে—তাদের বিনিদ্র প্রহরায় এমন অদ্ভুত কোনো প্রাণীকে তারা এর আগে কখনো দেখেনি। আমি নিঃশব্দে করিডর দিয়ে এগিয়ে চললাম—নিজেরই বাড়িতে নিজেকে যেন এক অপরিচিত মানুষ মনে হচ্ছিল। অবশেষে নিজের ঘরে পৌঁছে প্রথমবারের মতো আমি কাচের মধ্যে এডওয়ার্ড হাইডের অবয়ব দেখতে পেলাম।
এখানে আমাকে কেবল তত্ত্বের ভিত্তিতেই কথা বলতে হবে। আমি যা নিশ্চিতভাবে জানি, তা নয়; বরং যা আমার কাছে সবচেয়ে সম্ভাব্য বলে মনে হয়, সেটিই বলব।
আমার স্বভাবের যে অশুভ দিকটির ওপর আমি তখন সেই পরিবর্তনের শক্তি স্থানান্তরিত করেছিলাম, সেটি ছিল আমার সৎ ও শুভ স্বভাবের তুলনায় অনেক কম শক্তিশালী এবং কম বিকশিত। আমার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেই জীবন আসলে নয়- সেই জীবনের দশমাংশই ছিল চেষ্টা, নৈতিকতা ও আত্মসংযমের জীবন। ফলে আমার মন্দ প্রবৃত্তির চর্চাও হয়েছিল অনেক কম, আর সেটি ক্ষয়প্রাপ্তও হয়েছিল অনেক কম।
আমার মনে হয়, এই কারণেই এডওয়ার্ড হাইডের শরীর হেনরি জেকিলের তুলনায় এত ছোট, রোগা ও তরুণ ছিল।
একজনের মুখমণ্ডলে যেমন ভালোত্বের আলো ফুটে উঠেছিল, অন্যজনের মুখে তেমনি মন্দের ছাপ স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে উঠেছিল। আর মন্দ—যাকে আমি এখনও মানুষের স্বভাবের প্রাণঘাতী দিক বলেই বিশ্বাস করি—সেই দেহের ওপর বিকৃতি ও ক্ষয়ের এক গভীর ছাপ রেখে দিয়েছিল।
তবু যখন আমি আয়নায় সেই কুৎসিত অবয়বটির দিকে তাকালাম, তখন আমার মনে বিন্দুমাত্র ঘৃণা বা বিরক্তি জাগল না। বরং তাকে দেখে আমার ভেতরে এক আনন্দময় স্বাগতবোধ জেগে উঠল।
কারণ, এ-ও তো আমি নিজেই।
তাকে আমার কাছে স্বাভাবিক ও মানবিক মনে হলো। আমার চোখে সেই মুখটি আমার অন্তরের প্রকৃত স্বভাবকে আরও জীবন্তভাবে প্রকাশ করছিল। এতদিন যে অসম্পূর্ণ ও দ্বিধাবিভক্ত মুখটিকে নিজের বলে মনে করে এসেছি, তার চেয়ে এই মুখটি যেন আমার আত্মার প্রকৃত রূপকে আরও স্পষ্ট ও এককভাবে প্রকাশ করছিল।
এই দিক থেকে বিচার করলে, আমার ধারণা নিঃসন্দেহে সঠিক ছিল।
আমি লক্ষ্য করেছি, যখনই আমি এডওয়ার্ড হাইডের রূপ ধারণ করতাম, প্রথম দেখায় কোনো মানুষই আমার খুব কাছে আসতে পারত না—আমাকে দেখলেই তার শরীরী প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট আতঙ্ক ও অস্বস্তি ফুটে উঠত। আমার ধারণা, এর কারণ হলো—আমরা যখন মানুষের সঙ্গে দেখা করি, তখন প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ভালো ও মন্দ—দুইয়েরই মিশ্রণ থাকে। কিন্তু মানবজাতির মধ্যে একমাত্র এডওয়ার্ড হাইড ছিল সম্পূর্ণ মন্দের প্রতিমূর্তি।
আমি আয়নার সামনে এক মুহূর্তের বেশি দাঁড়ালাম না। কারণ দ্বিতীয় এবং চূড়ান্ত পরীক্ষাটি তখনও বাকি ছিল। আমাকে শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে—আমি কি এমনভাবে নিজের পরিচয় হারিয়েছি, যেখান থেকে আর ফিরে আসার কোনো উপায় নেই? আমাকে কি দিনের আলো ফোটার আগেই এমন একটি বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে হবে, যা আর আমার নিজের বলে মনে হবে না?
এই চিন্তায় তাড়াহুড়ো করে আমি আবার আমার গবেষণাগারে ফিরে গেলাম। পুনরায় ওষুধ তৈরি করলাম এবং সেই পানপাত্রের তরল আবার পান করলাম। আবারও আমাকে সেই ভয়ংকর বিলীন হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে হলো। তারপর আবার যখন আমার জ্ঞান ফিরল, তখন আমি ফিরে পেলাম হেনরি জেকিলের চরিত্র, দেহের উচ্চতা এবং মুখমণ্ডল।
সেই রাতেই আমি এসে পৌঁছেছিলাম সেই মরণফাঁদের সন্ধিক্ষণে। আমি যদি আরও মহৎ মনোভাব নিয়ে আমার আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে যেতাম, যদি উদার কিংবা ধর্মীয় কোনো মহান আকাঙ্ক্ষার প্রেরণায় এই পরীক্ষার ঝুঁকি নিতাম, তাহলে সবকিছুই অন্যরকম হতে পারত। আর জীবন-মৃত্যুর সেই যন্ত্রণাদায়ক প্রসবের মধ্য দিয়ে আমি এক পিশাচের বদলে এক দেবদূত হয়ে বেরিয়ে আসতে পারতাম।
ওষুধটির কোনো বাছবিচার করার ক্ষমতা ছিল না; সেটি শয়তানিই হোক বা ঐশ্বরিকই হোক—কোনোটিই ছিল না। এটি কেবল আমার স্বভাবের কারাগারের দরজাগুলো কাঁপিয়ে খুলে দিয়েছিল; আর ফিলিপ্পির বন্দিদের মতো, ভেতরে যে সত্তাটি বন্দী ছিল, সে-ই ছুটে বেরিয়ে এসেছিল।
সেই সময় আমার সৎ ও নৈতিক সত্তা ঘুমিয়ে ছিল; আর আমার অশুভ সত্তা, উচ্চাকাঙ্ক্ষার দ্বারা জাগ্রত ও সজাগ হয়ে, সুযোগটি লুফে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। আর যে সত্তাটি বাইরে প্রকাশ পেল, তার নাম ছিল এডওয়ার্ড হাইড।
অতএব, এখন আমার যেমন দুটি চেহারা ছিল, তেমনি ছিল দুটি চরিত্রও। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি ছিল সম্পূর্ণ অশুভ, আর অন্যটি ছিল সেই পুরোনো হেনরি জেকিল—যে অদ্ভুত ও পরস্পরবিরোধী সত্তার সংস্কার ও উন্নতি সম্পর্কে আমি ইতিমধ্যেই আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সুতরাং পরিবর্তনের গতিপথ সম্পূর্ণরূপে খারাপের দিকেই এগিয়ে গেল।
এমনকি তখনও পড়াশোনাময়, শুষ্ক জীবনের প্রতি আমার অনীহা দূর হয়নি। মাঝে মাঝে আমি এখনও আনন্দপ্রিয় ও আমোদপ্রিয় হয়ে উঠতাম। আর আমার সেই আনন্দ-বিনোদনগুলো ছিল—অন্তত বলতে গেলে—মর্যাদাহীন। অথচ আমি শুধু সমাজে সুপরিচিত ও অত্যন্ত সম্মানিতই ছিলাম না, ক্রমে বৃদ্ধ বয়সের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ফলে আমার জীবনের এই দ্বৈততা প্রতিদিনই আরও বেশি অস্বস্তিকর ও অনভিপ্রেত হয়ে উঠছিল।
এই দিক থেকেই আমার নতুন শক্তি আমাকে প্রলুব্ধ করতে শুরু করল, যতক্ষণ না শেষ পর্যন্ত আমি তার দাস হয়ে পড়লাম। আমার শুধু সেই পানীয়ের পেয়ালাটি পান করতে হতো—আর সঙ্গে সঙ্গে বিখ্যাত অধ্যাপক হেনরি জেকিলের দেহটি খুলে ফেলে, যেন একটি ভারী চাদর গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছি, তেমনি এডওয়ার্ড হাইডের দেহ ধারণ করতে পারতাম।
এই ধারণায় আমি মুচকি হাসতাম। তখন আমার কাছে ব্যাপারটি বেশ হাস্যকরই মনে হতো। আর তাই অত্যন্ত যত্ন ও পরিকল্পনার সঙ্গে আমি সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম।
আমি সোহোতে সেই বাড়িটি ভাড়া নিলাম ও সাজিয়ে তুললাম, যেখানে পরে পুলিশ এডওয়ার্ড হাইডের সন্ধান পেয়েছিল। বাড়িটির দেখাশোনার জন্য এমন একজন গৃহপরিচারিকা নিয়োগ করলাম, যাকে আমি ভালোভাবেই চিনতাম—সে ছিল নীরব, গোপনীয় এবং বিবেকহীন।
অন্যদিকে, আমার চাকরদের জানিয়ে দিলাম যে মি. হাইড—যার চেহারা ও পরিচয় আমি তাদের বর্ণনা করে দিয়েছিলাম—স্কোয়ারের আমার বাড়িতে অবাধে আসা-যাওয়া ও ইচ্ছেমতো কাজ করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখবেন। কোনো অঘটন বা সন্দেহ এড়ানোর জন্য আমি নিজেও আমার দ্বিতীয় পরিচয়ে সেখানে যাতায়াত করতাম, যাতে চাকরদের কাছে হাইডের উপস্থিতি অস্বাভাবিক না লাগে।
এরপর আমি সেই উইলটি তৈরি করলাম, যেটি নিয়ে আপনি এত আপত্তি করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল—ড. জেকিলের পরিচয়ে আমার যদি কোনো অঘটন ঘটে, তাহলে যেন কোনো আর্থিক ক্ষতি ছাড়াই আমি এডওয়ার্ড হাইডের পরিচয়ে আমার সম্পত্তি ও জীবন পরিচালনা করতে পারি।
এইভাবে চারদিক থেকে নিজেকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত মনে করে আমি আমার অদ্ভুত অবস্থানের বিশেষ সুবিধাগুলো ভোগ করতে শুরু করলাম।
মানুষ এর আগেও নিজেদের অপরাধ সংঘটিত করার জন্য ভাড়াটে দুষ্কৃতকারীদের কাজে লাগিয়েছে, আর নিজের ব্যক্তিত্ব ও সুনামকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে দিয়েছে। কিন্তু নিজের আনন্দ-উল্লাসের জন্য এমন কাজ আমিই প্রথম করেছিলাম।
জনসমক্ষে আমি প্রথম এমন একজন মানুষ হতে পেরেছিলাম, যে সম্মান, ভদ্রতা ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারে; অথচ মুহূর্তের মধ্যে সেই ধার করা আবরণ খুলে ফেলে একজন স্কুলছাত্রের মতো স্বাধীনতার সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আর আমার সেই দুর্ভেদ্য আবরণের আড়ালে সম্পর্ণ নিরাপত্তা ছিল।ভেবে দেখুন—আমি যেন অস্তিত্বই রাখতাম না!
আমাকে শুধু আমার পরীক্ষাগারের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে হতো। তারপর এক-দুই সেকেন্ড সময় নিয়ে, সবসময় প্রস্তুত রাখা সেই মিশ্রণটি তৈরি করে পান করলেই হতো। আর এডওয়ার্ড হাইড যা-ই করে থাকুক না কেন, আয়নার ওপর জমে থাকা নিঃশ্বাসের দাগের মতোই সে মিলিয়ে যাবে; আর তার জায়গায় থাকবে হেনরি জেকিল—নিজের বাড়িতে নিশ্চিন্তে, মাঝরাতে নিজের অধ্যয়নকক্ষে প্রদীপের সলতে ছেঁটে আলো ঠিক রাখতে ব্যস্ত থাকা এমন এক মানুষ, যে তার বিরুদ্ধে ওঠা যেকোনো সন্দেহকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নিরাপদ অবস্থায় থাকবে।
আমি যে আনন্দগুলোর সন্ধানে আমার ছদ্মবেশে তাড়াহুড়ো করে ছুটে বেড়াতাম, সেগুলো, যেমন আমি বলেছি, ছিল মর্যাদাহীন; এর চেয়ে কঠোর কোনো শব্দ ব্যবহার করতে আমি প্রায় সংকোচ বোধ করি। কিন্তু এডওয়ার্ড হাইডের হাতে পড়ে সেই আনন্দগুলো খুব শীঘ্রই ভয়াবহ ও পাশবিক রূপ নিতে শুরু করল।
এইসব অভিযান শেষে যখন আমি জেকিল হয়ে ফিরে আসতাম, তখন প্রায়ই নিজের হয়ে করা সেই পাপাচার দেখে এক ধরনের বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতাম। আমার নিজের আত্মা থেকে ডেকে বের করে আনা এবং একাকী নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার জন্য পৃথিবীতে পাঠানো এই সত্তাটি ছিল স্বভাবগতভাবেই দুষ্ট ও খল। তার প্রতিটি কাজ ও চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেবল নিজস্ব স্বার্থ ও আনন্দ। অন্য কাউকে যত বেশি যন্ত্রণা দেওয়া যায়, তত বেশি পাশবিক লোভে সে সেই আনন্দ উপভোগ করত। পাথরের মতো নির্মম ছিল সে।
কখনও কখনও হেনরি জেকিল এডওয়ার্ড হাইডের কাজকর্ম দেখে আতঙ্কে শিউরে উঠত। কিন্তু এই পরিস্থিতি ছিল সাধারণ নৈতিক নিয়মের বাইরে; আর ধীরে ধীরে, অত্যন্ত কৌশলে, এটি আমার বিবেকের ওপরের নিয়ন্ত্রণকে শিথিল করে দিচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত তো অপরাধী ছিল হাইড— শুধু হাইডই। জেকিল তো আর খারাপ হয়ে যায়নি! সে আবার নিজের ভালো গুণগুলো নিয়েই জেগে উঠত, যেন সেগুলোর কোনো ক্ষতিই হয়নি। এমনকি যেখানে সম্ভব হতো, সেখানে হাইডের করা অন্যায় দ্রুত সংশোধন করার চেষ্টাও করত। এইভাবেই আমার বিবেক ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আমি যে নীচতা ও কলঙ্কজনক কাজগুলোর সঙ্গে এভাবে নীরবে সহযোগিতা করেছিলাম—কারণ এখনও আমি নিজেকে পুরোপুরি স্বীকার করাতে পারি না যে সেগুলো আমিই করেছিলাম—সেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনায় যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমি শুধু বোঝাতে চাই, কী কী সতর্কসংকেত এবং কোন কোন ধাপে ধাপে আমার শাস্তি আমার দিকে এগিয়ে আসছিল।
একবার একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। যেহেতু তার কোনো পরিণতি ঘটেনি, তাই আমি শুধু ঘটনাটির উল্লেখ করব।
একটি শিশুর প্রতি করা নিষ্ঠুর আচরণ এক পথচারীর মনে আমার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। অন্যদিন আমি তাকে আপনার আত্মীয় হিসেবে চিনতে পেরেছিলাম। সেই ডাক্তার এবং শিশুটির পরিবারের লোকজনও তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। এমন কিছু মুহূর্ত এসেছিল, যখন আমি নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পেতে শুরু করলাম; তখন শেষ পর্যন্ত, তাদের অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য, এডওয়ার্ড হাইডকে তাদের দরজা পর্যন্ত এনে দিতে হয়েছিল এবং হেনরি জেকিলের নামে লেখা একটি চেক দিয়ে তাদের পাওনা মেটাতে হয়েছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে এই বিপদটি সহজেই এড়ানো সম্ভব ছিল—অন্য একটি ব্যাংকে এডওয়ার্ড হাইডের নিজের নামে একটি হিসাব খুলে। আর যখন নিজের হাতের লেখাকে উল্টো ঢঙে একটু বাঁকিয়ে আমি আমার সেই দ্বিতীয় সত্তার জন্য একটি স্বাক্ষর তৈরি করে নিলাম, তখন আমার মনে হলো, ভাগ্যের নাগালের বাইরে আমি নিরাপদেই অবস্থান করছি।
ছার ডানভারচ হত্যার প্রায় দুই মাস আগে, একদিন আমি আমার সেই দুঃসাহসিক অভিযানের একটিতে বেরিয়েছিলাম এবং বেশ রাত করে ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর আমার শরীরে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।
আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম—কিন্তু কিছুতেই যেন সেই অনুভূতিটা দূর হলো না। বৃথাই আমি ঘরের পরিচ্ছন্ন আসবাবপত্র ও চত্বরের দিকের আমার ঘরের উঁচু গড়ন লক্ষ করলাম; বৃথাই বিছানার পর্দার নকশা এবং মেহগনি কাঠের খাটের নকশা চিনতে চেষ্টা করলাম। তবু আমার মনে একটিই কথাই জোর করে ফিরে আসছিল—আমি যেন যেখানে আছি, আসলে সেখানে নেই; আমি যেন যে ঘরে জেগে উঠেছি বলে মনে হচ্ছে, সেখানে আমি জাগিনি। বরং আমি জেগে উঠেছি সোহোর সেই ছোট্ট ঘরে, যেখানে এডওয়ার্ড হাইডের দেহে অবস্থানকালে আমি সাধারণত ঘুমাতাম।
আমি নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে ফেললাম এবং আমার স্বভাবসুলভ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভঙ্গিতে অলসভাবে ভাবতে শুরু করলাম—এই অদ্ভুত ভ্রমের পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে। ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে আবার সকালের আরামদায়ক তন্দ্রায় ডুবে যাচ্ছিলাম। এই অবস্থাতেই ছিলাম, এমন সময় হঠাৎ একটু বেশি সজাগ হয়ে আমার চোখ পড়ল আমার হাতের ওপর।
আপনি যেমন প্রায়ই লক্ষ্য করেছেন, হেনরি জেকিলের হাতের গড়ন ও আকার ছিল একজন পেশাজীবী মানুষের মতো—বড়, দৃঢ়, ফর্সা এবং সুন্দর। কিন্তু সেই মুহূর্তে সকালের হলদে আলোয় বিছানার চাদরের ওপর আধবোজা অবস্থায় যে হাতটি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, সেটি ছিল রোগা, শিরা-উঠে থাকা, গাঁটগুলো প্রকট, কালচে ফ্যাকাশে বর্ণের এবং ঘন কালো লোমে ঢাকা। সেটি ছিল এডওয়ার্ড হাইডের হাত।
প্রায় আধ মিনিট আমি সেই হাতটির দিকে নির্বোধের মতো তাকিয়ে ছিলাম। বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই হঠাৎ আমার বুকের মধ্যে আতঙ্ক এমন তীব্র ও আকস্মিকভাবে জেগে উঠল, যেন হঠাৎ করতালের প্রচণ্ড শব্দে কেউ আমাকে চমকে দিয়েছে। আমি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে ছুটে গেলাম আয়নার সামনে।
আয়নায় যা দেখলাম, তাতে আমার রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে বরফের মতো ঠান্ডা ও পাতলা হয়ে গেল।হ্যাঁ—আমি হেনরি জেকিল হয়ে শুতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ঘুম থেকে উঠেছি এডওয়ার্ড হাইড হয়ে! কীভাবে এমন হলো?—আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম। তারপর আরও এক দফা আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করল—এ থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী?
ততক্ষণে সকাল অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। বাড়ির চাকর-বাকরেরা জেগে উঠেছে। আমার সমস্ত ওষুধ রাখা ছিল আলমারিতে। অথচ সেই ওষুধে পৌঁছতে হলে আমাকে যে ঘরে দাঁড়িয়ে তখন আতঙ্কে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে দু-তলা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে, পেছনের পথ দিয়ে, খোলা উঠোন পার হয়ে অ্যানাটমিক্যাল থিয়েটারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
আমার মুখ হয়তো কোনোভাবে ঢেকে রাখা সম্ভব হতো; কিন্তু তাতে কী লাভ? আমার শরীরের গড়ন যে বদলে গেছে, তা তো কোনোভাবেই লুকানো সম্ভব নয়!
ঠিক তখনই এক অপার স্বস্তির কথা আমার মনে পড়ল—আমার চাকর-বাকরেরা ইতিমধ্যেই আমার এই দ্বিতীয় সত্তার আসা-যাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
আমি যতটা সম্ভব নিজের মাপের পোশাক পরে নিলাম। তারপর বাড়ির ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলাম। আমাকে সেই সময়ে এবং সেই অদ্ভুত বেশে দেখে ব্র্যাডশ অস্বস্তিতে আমার দিকে তাকাল এবং পিছিয়ে গেল। আর তার মাত্র দশ মিনিট পরেই ড. জেকিল আবার নিজের স্বাভাবিক রূপে ফিরে এলেন এবং গম্ভীর মুখে বসে নাশতা করার ভান করতে লাগলেন।
আসলে আমার ক্ষুধা ছিল সামান্যই।
এই ব্যাখ্যাতীত ঘটনা—আমার আগের অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিপরীত এই ঘটনা—আমার কাছে যেন দেওয়ালে লেখা ব্যাবিলনের সেই রহস্যময় আঙুলের মতো মনে হলো, যা আমার আসন্ন বিচারের রায়ের অক্ষরগুলো লিখে দিচ্ছে। আর তাই, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গভীরভাবে আমি আমার দ্বৈত অস্তিত্বের পরিণতি ও সম্ভাবনাগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।
আমার যে সত্তাটিকে আমি নিজের ইচ্ছায় বাইরে প্রকাশ করতে পারতাম, সাম্প্রতিক সময়ে সেই সত্তার চর্চা ও বিকাশ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ইদানীং আমার মনে হচ্ছিল, এডওয়ার্ড হাইডের দেহ যেন ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠছে; যেন সেই রূপ ধারণ করলে আমার শরীরে আরও প্রবলভাবে রক্ত সঞ্চালিত হচ্ছে বলে অনুভব করতাম।
তখন আমার মনে এক ভয়ংকর আশঙ্কা জাগল—যদি এই অবস্থা আরও দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে আমার স্বভাবের ভারসাম্য হয়তো চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে। নিজের ইচ্ছায় এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হওয়ার ক্ষমতা আমি হয়তো হারিয়ে ফেলব, আর এডওয়ার্ড হাইডের চরিত্রই শেষ পর্যন্ত চিরতরে আমার নিজের চরিত্রে পরিণত হবে।
ওষুধটির ক্ষমতাও সবসময় সমানভাবে কাজ করত না। আমার জীবনের একেবারে শুরুর দিকে একবার এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর একাধিকবার আমাকে ওষুধের মাত্রা দ্বিগুণ করতে হয়েছে; এমনকি একবার মৃত্যুর প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে তিনগুণ মাত্রাও গ্রহণ করতে হয়েছিল। এতদিন পর্যন্ত এই বিরল ও অনিশ্চিত ঘটনাগুলোই কেবল আমার সুখ ও নিশ্চিন্ততার ওপর সামান্য ছায়া ফেলেছিল।
কিন্তু এখন, সেই সকালের দুর্ঘটনার আলোকে, আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারলাম। প্রথমদিকে আমার প্রধান সমস্যা ছিল জেকিলের দেহ থেকে হাইডের দেহে পরিবর্তিত হওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সমস্যা ধীরে ধীরে, অথচ স্পষ্টভাবে, উল্টো দিকে সরে গেছে।
অর্থাৎ, সবকিছুই যেন এই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছিল—আমি ধীরে ধীরে আমার আসল ও শ্রেয়তর সত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি এবং ধীরে ধীরে আমার দ্বিতীয়, নিকৃষ্টতর সত্তা এডওয়ার্ড হাইডের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাচ্ছি।
এই দুটির মধ্যে এখন আমাকে একটি বেছে নিতেই হবে—এ কথা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম। আমার এই দুই সত্তার স্মৃতি ছিল অভিন্ন; কিন্তু অন্যান্য মানসিক ক্ষমতা ও প্রবৃত্তিগুলো দুই সত্তার মধ্যে অত্যন্ত অসমভাবে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। জেকিল—যে ছিল এই দুই সত্তার সমন্বিত রূপ—কখনও গভীর সংবেদনশীলতা নিয়ে, আবার কখনও প্রবল লোভ ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে হাইডের আনন্দ ও দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিত এবং সেগুলো উপভোগ করত। কিন্তু হাইডের কাছে জেকিলের কোনো গুরুত্বই ছিল না; সে শুধু জেকিলকে এমনভাবে মনে রাখত, যেমন কোনো পাহাড়ি দস্যু পুলিশের তাড়া থেকে আত্মগোপন করার জন্য সেই গুহাটিকে মনে রাখে, যেখানে সে লুকিয়ে থাকে।
জেকিলের মধ্যে হাইডের প্রতি পিতার চেয়েও বেশি মমতা ছিল; কিন্তু হাইডের মধ্যে জেকিলের প্রতি সন্তানের চেয়েও বেশি উদাসীনতা ছিল। যদি আমি জেকিলের পক্ষ বেছে নিই, তবে আমাকে সেইসব কামনা-বাসনা ও আনন্দের কাছ থেকে চিরবিদায় নিতে হবে, যেগুলো এতদিন আমি গোপনে লালন করেছি এবং সাম্প্রতিক সময়ে আরও প্রশ্রয় দিতে শুরু করেছিলাম। আর যদি হাইডের পক্ষ নিই, তাহলে আমাকে আমার হাজারো স্বার্থ, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মৃত্যু মেনে নিতে হবে; এক মুহূর্তেই এবং চিরদিনের জন্য আমি হয়ে উঠব ঘৃণিত ও বন্ধুহীন একজন মানুষ।
দেখতে গেলে এই দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতাটি যেন অসম ছিল। কিন্তু হিসাবের দাঁড়িপাল্লায় আরও একটি বিষয় ছিল। জেকিলকে সংযমের যন্ত্রণাদায়ক আগুনের মধ্যে পুড়তে হতো; কিন্তু হাইড তার হারানো জিনিসগুলোর কথা জানতেও পারত না। আমার পরিস্থিতি যতই অদ্ভুত হোক না কেন, এই দ্বন্দ্বের মূল কথাগুলো মানুষের কাছে অতি পুরোনো এবং অতি পরিচিত ছিলো। প্রলোভনে পড়া ও ভীত-কম্পিত একজন পাপী মানুষকে যে ধরনের লোভ ও ভয় টানাপোড়েনের মধ্যে ফেলে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল। আর পৃথিবীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতো আমিও ভালো পথটিই বেছে নিয়েছিলাম—কিন্তু সেই পথ ধরে চলার মতো শক্তি আমার ছিল না।
হ্যাঁ, আমি সেই বয়স্ক ও অসন্তুষ্ট ডাক্তার জেকিলকেই বেছে নিয়েছিলাম—যিনি বন্ধুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন এবং সৎ ও মহৎ আশা-আকাঙ্ক্ষা লালন করতেন। আর হাইডের ছদ্মবেশে আমি যে স্বাধীনতা, তুলনামূলক যৌবনের অনুভূতি, হালকা ও দ্রুত পদক্ষেপ, হঠাৎ উচ্ছ্বাস এবং গোপন আনন্দ উপভোগ করেছিলাম, সেসবকে দৃঢ় সংকল্পে বিদায় জানিয়েছিলাম।
তবে হয়তো আমার এই সিদ্ধান্তের মধ্যে অজান্তেই কিছুটা দ্বিধা বা গোপন শর্ত রেখে দিয়েছিলাম। কারণ আমি সোহো-র বাড়িটি ছেড়ে দিইনি, কিংবা এডওয়ার্ড হাইডের পোশাকগুলোও নষ্ট করিনি; সেগুলো আমার আলমারিতেই প্রস্তুত অবস্থায় পড়ে ছিল।
তবু দু’মাস পর্যন্ত আমি আমার সংকল্পে অটল ছিলাম। দু’মাস ধরে এমন কঠোর ও সংযমী জীবনযাপন করেছিলাম, যা এর আগে কখনও পারিনি। আর সেই সময়ে আমি নিজের বিবেকের প্রশংসা ও সন্তুষ্টির পুরস্কারও উপভোগ করেছিলাম।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সময় আমার ভয়ের তীব্রতাকে মুছে দিতে শুরু করল। বিবেকের প্রশংসাও ধীরে ধীরে আমার কাছে স্বাভাবিক ও তুচ্ছ ব্যাপারে পরিণত হলো। আমি তখন হাইডের স্বাধীনতার জন্য ছটফট করা ও তীব্র আকাঙ্ক্ষার মতোই যন্ত্রণা ও অদম্য আকুলতায় কাতর হতে লাগলাম; এবং শেষ পর্যন্ত, নৈতিক দুর্বলতার এক মুহূর্তে, আমি আবার সেই রূপান্তরকারী পানীয়টি তৈরি করে পান করে ফেললাম।
আমি মনে করি না, কোনো মদ্যপ ব্যক্তি যখন নিজের নেশার অভ্যাসের পক্ষে যুক্তি দেখায়, তখন পাঁচশো বারের মধ্যে একবারও সে তার সেই পশুসুলভ শারীরিক অসাড়তার কারণে যে সে নিজেকে বিপদগুলোর মধ্যে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে, সেগুলো নিয়ে সত্যিকারভাবে চিন্তা করে না। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। আমার অবস্থান নিয়ে আমি যতই দীর্ঘদিন ভেবে থাকি না কেন, এডওয়ার্ড হাইডের সম্পূর্ণ নৈতিক অসাড়তা এবং অশুভ কাজের প্রতি তার নির্বোধ প্রস্তুতির বিষয়টি আমি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করিনি। অথচ শেষ পর্যন্ত এই কারণেই আমাকে শাস্তি পেতে হয়েছিল।
আমার শয়তানটিকে এতদিন ধরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল; এবার সে গর্জন করতে করতে বেরিয়ে এল। সেই ওষুধটি পান করার সময়ও আমি বুঝতে পারছিলাম যে, মন্দ কাজের প্রতি আমার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক বেশি লাগামছাড়া, অনেক বেশি উগ্র হয়ে উঠেছে। আমার মনে হয়, এই প্রবণতাই আমার আত্মার মধ্যে সেই অধৈর্যের ঝড় জাগিয়ে তুলেছিল, যার কারণে আমি আমার সেই দুর্ভাগা শিকারের ভদ্র কথাবার্তা শুনতে শুনতে অসহ্য অস্থিরতায় ভুগছিলাম।
আমি অন্তত ঈশ্বরের সামনে শপথ করে বলতে পারি—নৈতিকভাবে সুস্থ কোনো মানুষ এত সামান্য উসকানিতে এমন অপরাধ করতে পারত না। আর আমি যে আঘাত করেছিলাম, তা কোনো যুক্তিসংগত বা সংযত মানসিকতা থেকে নয়; বরং ঠিক সেই মানসিকতা থেকে, যে মানসিকতায় একটি অসুস্থ শিশু রাগের বশে তার খেলনাটি ভেঙে ফেলতে পারে।
কিন্তু আমি স্বেচ্ছায় নিজেকে সেই সমস্ত সংযমী প্রবৃত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিলাম, যেগুলোর সাহায্যে আমাদের মধ্যকার সবচেয়ে অধম মানুষটিও প্রলোভনের মধ্যে কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে চলতে পারে; আর আমার ক্ষেত্রে সামান্যতম প্রলোভনের মুখোমুখি হওয়াই ছিল পতনের জন্য যথেষ্ট।
সঙ্গে সঙ্গেই নরকের সেই আত্মা আমার মধ্যে জেগে উঠল এবং উন্মত্ত হয়ে উঠল। প্রবল উল্লাসের সঙ্গে আমি সেই প্রতিরোধহীন দেহটিকে নির্মমভাবে প্রহার করতে লাগলাম; প্রতিটি আঘাতের মধ্যেই আমি আনন্দের স্বাদ পেতে লাগলাম। অবশেষে যখন ক্লান্তি ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই, আমার উন্মত্ততার চরম মুহূর্তে, হঠাৎ এক শীতল আতঙ্কের শিহরণ আমার হৃদয় ভেদ করে গেল।
এক মুহূর্তে যেন কুয়াশার পর্দা সরে গেল; আমি বুঝতে পারলাম, আমার জীবন আর রক্ষা পাওয়ার নয়। তাই সেই সমস্ত পাশবিক উচ্ছৃঙ্খলতার স্থান থেকে পালিয়ে গেলাম—একদিকে নিজের কুকর্মের জন্য গর্বিত ও উল্লসিত, অন্যদিকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে; আমার পাপের লালসা যেমন তৃপ্ত হয়েছিল, তেমনি আরও প্রবল হয়ে উঠেছিল, আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা পৌঁছে গিয়েছিল তার সর্বোচ্চ সীমায়।
আমি সোহোর বাড়িতে ছুটে গেলাম এবং, বিষয়টি যাতে কোনওভাবেই অনিশ্চিত না থাকে, আমার সমস্ত কাগজপত্র ধ্বংস করে ফেললাম। সেখান থেকে বাতির আলোয় আলোকিত রাস্তাগুলির মধ্য দিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। আমার মন তখন একই সঙ্গে দুই বিপরীত অনুভূতিতে বিভক্ত—নিজের অপরাধের কথা ভেবে আনন্দে আত্মহারা, হালকা চিত্তে ভবিষ্যতে আরও কী কী অপরাধ করা যায় তার পরিকল্পনা করছি; অথচ একই সঙ্গে দ্রুত পা চালিয়ে চলেছি এবং পিছনে কান পেতে শুনছি—প্রতিশোধ নিতে আসা মানুষের পদশব্দ আমার পিছু নিয়েছে কি না।
হাইড তখন ওষুধটি তৈরি করতে করতে ঠোঁটে গান গাইছিল; আর তা পান করার সময় সে মৃত মানুষটির উদ্দেশে যেন পানপাত্র তুলে শুভেচ্ছা জানাল। হাইড ওষুধের মিশ্রণ তৈরি করার সময় তার ঠোঁটে যেন আনন্দের গান ছিল; আর তা পান করার সময় সে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে যেন এক ব্যঙ্গাত্মক পানপাত্র তুলল।
রূপান্তরের যন্ত্রণার শেষ ছিঁড়ে যাওয়া টানটিও তখনও থামেনি, তার আগেই হেনরি জেকিল কৃতজ্ঞতা ও অনুশোচনার অশ্রুতে ভেসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল এবং প্রার্থনায় জোড় করা হাত ঈশ্বরের দিকে তুলে ধরল।
আত্মভোগ ও আত্মপ্রবঞ্চনার যে পর্দা এতদিন আমাকে ঢেকে রেখেছিল, তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছিন্ন হয়ে গেল। আমি আমার সমগ্র জীবনকে একসঙ্গে দেখতে পেলাম। শৈশবের সেই দিনগুলো থেকে, যখন বাবার হাত ধরে আমি পথ চলতাম, তারপর আমার পেশাগত জীবনের আত্মসংযম ও কঠোর পরিশ্রমের দিনগুলো পেরিয়ে— আবারও, সেই একই অবাস্তবতার অনুভূতি নিয়ে, সন্ধ্যার সেই অভিশপ্ত ভয়াবহ ঘটনাগুলোর দিকে তাকালাম।
আমার ইচ্ছে হচ্ছিল জোরে চিৎকার করে উঠি। চোখের জল ও প্রার্থনার মাধ্যমে আমি চেষ্টা করছিলাম আমার স্মৃতিতে ভিড় করে আসা সেই ভয়ংকর সব দৃশ্য ও শব্দকে মন থেকে মুছে ফেলতে। কিন্তু প্রতিটি প্রার্থনার ফাঁকেই আমার পাপময় জীবনের কুৎসিত মুখটি আমার আত্মার দিকে তাকিয়ে থাকত।
যখন অনুশোচনার তীব্রতা ধীরে ধীরে কমে এল, তখন তার জায়গায় এক গভীর আনন্দ এসে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আমার আচরণের সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে হাইড হয়ে থাকা আর সম্ভব নয়—আমি চাই বা না চাই, এখন থেকে আমাকে আমার জীবনের ভালো অংশটির মধ্যেই আবদ্ধ থাকতে হবে। আর এই ভাবনায় আমি কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম! স্বাভাবিক জীবনের সীমাবদ্ধতাগুলোকে আমি কী গভীর বিনয়ের সঙ্গে আবার গ্রহণ করেছিলাম! যে দরজা দিয়ে আমি এতবার যাতায়াত করেছি, কী আন্তরিক ত্যাগের মন নিয়ে সেই দরজাটি আমি বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং গোড়ালির নিচে চাবিটিকে পিষে ফেলেছিলাম!
পরের দিন খবর এল যে হত্যাকাণ্ডটি আর গোপন নেই; পৃথিবীর কাছে হাইডের অপরাধ এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে এবং নিহত ব্যক্তি ছিলেন সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত একজন মানুষ। এটি শুধু একটি অপরাধ ছিল না—এটি ছিল এক মর্মান্তিক নির্বুদ্ধিতাও।
সত্যি বলতে, এই খবর শুনে আমি যেন কিছুটা স্বস্তিই পেয়েছিলাম। মনে হয়, আমার ভালো প্রবৃত্তিগুলোকে যেন ফাঁসির মঞ্চের আতঙ্ক আরও শক্ত করে বেঁধে ফেলল এবং সুরক্ষিত করল—এতে হয়তো আমি আনন্দই পেয়েছিলাম। জেকিল তখন আমার আশ্রয়ের দুর্গ হয়ে উঠেছিল। হাইড যদি এক মুহূর্তের জন্যও বাইরে উঁকি দিত, তবে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের হাত তাকে ধরে হত্যা করার জন্য উঠে আসত।
আমি স্থির করলাম, ভবিষ্যৎ জীবনে ভালো কাজের মাধ্যমে অতীতের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করব। আর সত্যি বলতে কী, আমার সেই সংকল্প কিছুটা হলেও ফলপ্রসূ হয়েছিল। গত বছরের শেষ কয়েক মাসে আমি কত আন্তরিকভাবে দুঃখ-কষ্টে থাকা মানুষদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছি, তা আপনি নিজেই জানেন। অন্যদের জন্য অনেক কিছু করা হয়েছিল, আর আমার নিজের দিনগুলোও শান্তিতে এবং প্রায় সুখেই কেটে যাচ্ছিল।
এমনকি এটাও সত্যি নয় যে এই উপকারী ও নিষ্পাপ জীবনযাপনে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। বরং আমার মনে হয়, প্রতিদিনই আমি এই জীবনকে আরও গভীরভাবে উপভোগ করছিলাম। কিন্তু আমার ভেতরের দ্বৈত সত্তা তখনও আমাকে অভিশাপের মতো অনুসরণ করছিল। অনুশোচনার প্রথম তীব্রতা যখন ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে গেল, তখন আমার সেই নীচ প্রবৃত্তি—যাকে এতদিন অবাধে প্রশ্রয় দিয়েছিলাম এবং এত অল্পদিন আগে শৃঙ্খলিত করে রেখেছিলাম—আবার স্বাধীনতার জন্য গর্জন করতে শুরু করল।
তবে আমি হাইডকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। সেই চিন্তাটুকুই আমাকে উন্মত্ত আতঙ্কে ভরিয়ে দিত। না, এবার আমি নিজের পরিচয়েই আবার আমার বিবেকের সঙ্গে ছেলেখেলা করার প্রলোভনে পড়েছিলাম; এবং শেষ পর্যন্ত প্রলোভনের আক্রমণের কাছে একজন সাধারণ গোপন পাপীর মতো আমি নত হলাম।
সবকিছুরই একসময় শেষ হয়। সবচেয়ে বড় পাত্রও শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হয়ে যায়। আমার এই সামান্য সময়ের জন্য মন্দের দিকে ফিরে যাওয়াই শেষ পর্যন্ত আমার আত্মার ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিল।
তবুও আমি ভীত হইনি। আমার এই পতনকে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল—যেন সেই আবিষ্কারের আগে আমি আমার পুরোনো জীবনে আবার ফিরে গিয়েছি।
দিনটি ছিল জানুয়ারির এক সুন্দর, পরিষ্কার দিন। বরফ গলে যাওয়ায় পায়ের নিচের মাটি ভেজা, কিন্তু মাথার ওপর আকাশ ছিল সম্পূর্ণ মেঘমুক্ত। রিজেন্টস পার্ক তখন শীতের পাখিদের মিষ্টি কিচিরমিচিরে মুখরিত, আর বাতাসে যেন বসন্তের মধুর সুবাস।
আমি সূর্যের আলোয় একটি বেঞ্চে বসেছিলাম। আমার ভেতরের পশুসত্তা যেন পুরোনো স্মৃতির স্বাদ নিয়ে আবার জেগে উঠছিল; আর আমার আধ্যাত্মিক সত্তা ছিল কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন—পরে অনুশোচনা করব বলে মনে মনে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, কিন্তু তখনও তা শুরু করার মতো তাগিদ অনুভব করছিল না।
শেষ পর্যন্ত আমি ভাবলাম, আমিও তো আমার চারপাশের অন্য মানুষদের মতোই। তারপর নিজেকে অন্য মানুষের সঙ্গে তুলনা করে মৃদু হাসলাম। অন্যদের অলস নিষ্ঠুরতার পাশে নিজের সক্রিয় সদিচ্ছাকে রেখে আমি নিজেকেই যেন শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করলাম।
আর ঠিক সেই আত্মগর্বে ভরা চিন্তার মুহূর্তেই হঠাৎ আমার মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি নেমে এল—এক ভয়ংকর বমিভাব এবং মৃত্যুর মতো শীতল এক শিহরণ আমাকে আচ্ছন্ন করল।
কিছুক্ষণ পর সেগুলো কেটে গেল এবং আমাকে দুর্বল ও অবসন্ন করে রেখে গেল। তারপর সেই দুর্বলতাও যখন ধীরে ধীরে কেটে যেতে লাগল, আমি অনুভব করলাম আমার চিন্তার স্বভাব বদলে যাচ্ছে। আমার মধ্যে এক অস্বাভাবিক সাহস জন্ম নিল, বিপদের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য এল, আর কর্তব্য ও নৈতিকতার বন্ধনগুলো যেন একে একে খুলে যেতে লাগল।
আমি নিচের দিকে তাকালাম। আমার কৃশ হয়ে যাওয়া অঙ্গগুলোর ওপর পোশাকগুলো ঢিলেঢালা ও বেখাপ্পাভাবে ঝুলে আছে। আমার হাঁটুর ওপর রাখা হাতটি শিরা-উপশিরায় টানটান, লোমশ এবং অপরিচিত।
আমি আবারও এডওয়ার্ড হাইড হয়ে গিয়েছিলাম।
মাত্র এক মুহূর্ত আগেও আমি ছিলাম এমন একজন মানুষ, যাকে সবাই সম্মান করত; আমি ছিলাম ধনী, প্রিয় এবং নিরাপদ—বাড়ির খাবারঘরে আমার জন্য টেবিল সাজানো ছিল। আর এখন আমি হয়ে গেলাম সমগ্র মানবজাতির সাধারণ শিকার—পলাতক, গৃহহীন, সবার পরিচিত একজন খুনি, এবং ফাঁসির দড়ির অধীন এক অসহায় মানুষ।
আমার বিচারবুদ্ধি টলমল করছিল, কিন্তু একেবারে ব্যর্থ হয়ে যায়নি। আমি একাধিকবার লক্ষ্য করেছি যে, আমার দ্বিতীয় সত্তায় আমার মানসিক ক্ষমতাগুলি যেন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠত এবং আমার প্রাণশক্তি যেন আরও প্রবল ও টানটান হয়ে উঠত। তাই এমনটা ঘটল যে, যেখানে জেকিল হয়তো পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করত, সেখানে হাইড সেই মুহূর্তটির গুরুত্ব অনুযায়ী নিজেকে আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী করে তুলল।
আমার ওষুধগুলি আমার পরীক্ষাগারের একটি আলমারিতে রাখা ছিল; কিন্তু আমি কীভাবে সেখানে পৌঁছব? এই সমস্যাটিই আমি দুই হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে সমাধান করার চেষ্টা করতে লাগলাম। পরীক্ষাগারের দরজা আমি বন্ধ করে রেখেছিলাম। যদি বাড়ির ভেতর দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করি, তাহলে আমার নিজের চাকরেরাই আমাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেবে। তখন বুঝলাম, আমাকে অন্য কারও সাহায্য নিতে হবে। তখন ল্যানিয়নের কথা মনে পড়ল।
কিন্তু তার কাছে কীভাবে পৌঁছব? কীভাবে তাকে রাজি করাব? ধরেই নিলাম, রাস্তায় পুলিশ আমাকে ধরতে পারেনি; তবু কীভাবে আমি তার সামনে গিয়ে হাজির হব? আর একজন অচেনা ও অপ্রীতিকর দর্শনার্থী হিসেবে কীভাবে আমি সেই বিখ্যাত চিকিৎসককে তাঁর সহকর্মী ড. জেকিলের অধ্যয়ন কক্ষ তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখতে রাজি করাব?
হঠাৎ মনে পড়ল, আমার পুরোনো সত্তার একটি ক্ষমতা তখনও আমার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল—আমি নিজের হাতের লেখায় লিখতে পারতাম। এই সামান্য আশার স্ফুলিঙ্গটি মনে জ্বলে উঠতেই আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে কোন পথে এগোতে হবে। তারপর যতটা সম্ভব নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ ঠিকঠাক করে নিলাম এবং রাস্তা দিয়ে যাওয়া একটি হ্যানসম ক্যাব থামিয়ে পোর্টল্যান্ড স্ট্রিটের একটি হোটেলে চলে গেলাম। হোটেলটির নাম দৈবক্রমে আমার মনে ছিল।
আমাকে সেই অদ্ভুত পোশাকে দেখে—যে পোশাকের আড়ালে কত ভয়াবহ পরিণতি লুকিয়ে ছিল, তা অবশ্য চালক জানত না—লোকটি তার হাসি কিছুতেই লুকিয়ে রাখতে পারল না। তার দিকে আমি এমন শয়তানি ক্রোধে দাঁত কিড়মিড় করে তাকালাম যে তার মুখের হাসি সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে গেল। তার জন্য সেটা সৌভাগ্যেরই ছিল—আর আমার জন্যও আরও বেশি সৌভাগ্যের; কারণ আর এক মুহূর্ত দেরি হলে আমি নিশ্চিতভাবেই তাকে তার আসন থেকে টেনে নামাতাম।
হোটেলে ঢোকার সময় আমার মুখের ভাব এমন ভয়ংকর ছিল যে, কর্মচারীরা পর্যন্ত কাঁপতে লাগল। আমার সামনে তারা একে অপরের দিকে তাকাতেও সাহস করল না। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তারা আমার আদেশ পালন করল, আমাকে একটি নির্জন কক্ষে নিয়ে গেল এবং লেখার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু এনে দিল।
হাইড যখন প্রাণসংশয়ের মধ্যে ছিল, তখন তার এই রূপটি আমার কাছেও একেবারে নতুন ছিল—অসীম ক্রোধে কাঁপছিল সে, হত্যার উন্মত্ততায় টানটান হয়ে উঠেছিল তার সমস্ত সত্তা, এবং অন্যকে যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য তার মধ্যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল।
তবু সেই প্রাণীটি ছিল অত্যন্ত চতুর। প্রবল ইচ্ছাশক্তির সাহায্যে সে অনেক কষ্টে নিজের ক্রোধকে সংযত করল; তারপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লিখল—একটি ল্যানিয়নের কাছে এবং অন্যটি পুলের কাছে। আর চিঠি দুটি যে সত্যিই ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ যেন সে পেতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে সেগুলো রেজিস্ট্রি করে পাঠানোর নির্দেশ দিল।
তারপর থেকে সে সারাদিন ব্যক্তিগত ঘরের আগুনের পাশে বসে নখ কামড়াতে থাকত; সেখানেই সে একা বসে, নিজের ভয়কে সঙ্গী করে খাবার খেত—আর তাকে দেখলেই পরিবেশনকারী ভয়ে কেঁপে উঠত। তারপর, রাত যখন পুরোপুরি নেমে আসত, সে একটি বন্ধ ঘোড়ার গাড়ির কোণে বসে বেরিয়ে পড়ত এবং শহরের রাস্তায় এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত। নরকের সেই সন্তানটির মধ্যে মানুষের কিছুই অবশিষ্ট ছিল না; তার মধ্যে শুধু ভয় আর ঘৃণাই জীবিত ছিল।
অবশেষে তার মনে হলো, গাড়ির চালক সম্ভবত তাকে নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। তখন সে গাড়িটি ছেড়ে দিল এবং তার গায়ে বেমানান পোশাক পরে, রাতের পথচারীদের ভিড়ে পায়ে হেঁটে চলতে লাগল। তার সেই অদ্ভুত বেশ তাকে সহজেই সবার নজরে পড়ার মতো করে তুলেছিল। তখন তার ভেতরে এই দুই নীচ প্রবৃত্তি—ভয় ও ঘৃণা—ঝড়ের মতো তাণ্ডব চালাচ্ছিল।
সে দ্রুত হাঁটতে লাগল; ভয় যেন তাকে তাড়া করে ফিরছিল। নিজের সঙ্গেই বিড়বিড় করে কথা বলতে বলতে সে কম জনবহুল রাস্তাগুলোর আড়াল দিয়ে চলছিল এবং সময় গুনছিল—মধ্যরাত আসতে আর কত মিনিট বাকি।
একবার এক মহিলা তার সঙ্গে কথা বলল—আমার মনে হয়, সে তাকে দেশলাইয়ের একটি বাক্স বিক্রি করতে চেয়েছিল। সে মহিলাটির মুখে সজোরে আঘাত করল, আর মহিলা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
ল্যানিয়নের বাড়িতে যখন আমার চেতনা ফিরে এল, তখন আমার পুরোনো বন্ধুর আতঙ্কিত অবস্থার দৃশ্য হয়তো আমাকে কিছুটা প্রভাবিত করেছিল। আমি জানি না। তবে অন্তত এতটুকু বলতে পারি, সেই কয়েক ঘণ্টার স্মৃতি মনে পড়লে আমার যে ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা জাগত, তার তুলনায় ল্যানিয়নের আতঙ্ক ছিল সমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা জলের মতোই সামান্য।
আমার মধ্যে একটি পরিবর্তন এসেছিল। এখন আর আমার যন্ত্রণা ফাঁসির দড়ির ভয় থেকে আসছিল না; বরং হাইড হয়ে থাকার চিন্তাই আমাকে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল।
ল্যানিয়নের নিন্দা ও তিরস্কারের কথা আমি আংশিকভাবে যেন স্বপ্নের মধ্যে শুনেছিলাম। আবার স্বপ্নের মতোই মনে হয়েছিল, আমি নিজের বাড়িতে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়েছি।
সারাদিনের প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক অবসাদের পর আমি এমন গভীর ও কঠিন ঘুমে তলিয়ে গেলাম যে, আমাকে যেসব দুঃস্বপ্ন যন্ত্রণা দিচ্ছিল, সেগুলোও সেই ঘুম ভাঙাতে পারল না।
সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন আমি কাঁপছিলাম, দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু একই সঙ্গে কিছুটা সতেজও অনুভব করছিলাম। আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সেই পশুটির কথা ভাবলেই তখনও আমার মনে ঘৃণা ও ভয় জাগত। আগের দিনের ভয়াবহ বিপদগুলোর কথাও অবশ্য আমি ভুলিনি। কিন্তু এবার আমি আবার নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরে এবং নিজের ওষুধগুলোর একেবারে কাছে ফিরে এসেছি।
এইভাবে বেঁচে ফিরে আসার জন্য কৃতজ্ঞতা আমার অন্তরে এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, তা প্রায় আশার উজ্জ্বল আলোর সমকক্ষ হয়ে উঠেছিল।
প্রাতঃরাশের পর আমি ধীরে-সুস্থে উঠোন পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। শীতল বাতাসের স্নিগ্ধ পরশ বেশ উপভোগ করছিলাম। এমন সময় আবারও সেই অবর্ণনীয় অনুভূতিগুলো আমাকে গ্রাস করল—যে অনুভূতিগুলো আমার রূপান্তর ঘটার পূর্বলক্ষণ ছিল। আমি শুধু পরীক্ষাগারের ঘরে আশ্রয় নেওয়ার মতো সময়টুকু পেলাম; তারপরই আবার হাইডের উন্মত্ততা ও হিমশীতল নিষ্ঠুর আবেগ আমার ওপর চেপে বসল।
এবার আমাকে আবার নিজের স্বাভাবিক সত্তায় ফিরিয়ে আনতে ওষুধের দ্বিগুণ মাত্রা নিতে হলো। হায়! তার মাত্র ছয় ঘণ্টা পর, আমি যখন বিষণ্ণভাবে আগুনের দিকে তাকিয়ে বসেছিলাম, তখন সেই যন্ত্রণাগুলো আবার ফিরে এল এবং আমাকে পুনরায় ওষুধটি সেবন করতে হলো।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সেই দিন থেকে মনে হতে লাগল—প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রমের মতো এক বিরাট প্রচেষ্টার মাধ্যমে, এবং কেবল ওষুধের তাৎক্ষণিক প্রভাবে, তবেই আমি জেকিলের চেহারা ধারণ করতে পারছি। দিনের যে-কোনো সময়ে, এমনকি রাতেও, হঠাৎ সেই রূপান্তরের পূর্বলক্ষণস্বরূপ কাঁপুনি আমাকে আচ্ছন্ন করত। বিশেষ করে আমি যদি ঘুমিয়ে পড়তাম, কিংবা চেয়ারে বসে এক মুহূর্তের জন্যও তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়তাম, তবে জেগে উঠতাম সবসময় হাইড হিসেবেই।
ক্রমাগত আসন্ন সর্বনাশের আশঙ্কা এবং নিজেকে যে নিদ্রাহীনতার মধ্যে আমি বন্দী করে ফেলেছিলাম—যে নিদ্রাহীনতা মানুষের পক্ষে সম্ভব বলে আমি ভেবেছিলাম, নিদ্রাহীনতা তারও বেশি সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল—তার চাপে আমি নিজেই যেন জ্বলে পুড়ে ক্ষয় হয়ে যাওয়া, শূন্য হয়ে যাওয়া এক প্রাণীতে পরিণত হলাম। শরীর ও মন—উভয় দিক থেকেই আমি হয়ে পড়েছিলাম অবসন্ন ও দুর্বল। আমার সমস্ত চিন্তা তখন কেবল একটিমাত্র বিষয়কে ঘিরে ছিল—আমার সেই অন্য সত্তার আতঙ্ক।
কিন্তু যখন আমি ঘুমিয়ে পড়তাম, অথবা ওষুধের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যেত, তখন রূপান্তরের যন্ত্রণা যেহেতু প্রতিদিনই কিছুটা কম স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, প্রায় কোনো বিরতি ছাড়াই আমি এমন এক কল্পনার জগতে নিক্ষিপ্ত হতাম, যা ভয়াবহ সব দৃশ্যে পরিপূর্ণ; এমন এক আত্মা আমার মধ্যে জেগে উঠত, যা অকারণ ঘৃণায় উত্তাল; আর এমন এক শরীর যেন আমার অধিকার নিত, যা জীবনের উন্মত্ত শক্তিগুলোকে ধারণ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
জেকিল যতই অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়ছিল, হাইডের শক্তি যেন ততই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর সত্যিই, তাদের পরস্পরের প্রতি যে ঘৃণা জন্মেছিল, তা উভয় পক্ষেই সমান হয়ে উঠেছিল।
জেকিলের ক্ষেত্রে এই ঘৃণা ছিল একেবারে প্রাণের গভীর থেকে উৎসারিত স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। সে এখন সেই প্রাণীটির সম্পূর্ণ বিকৃত রূপ দেখতে পেয়েছিল—যে প্রাণীটি তার সঙ্গে চেতনার কিছু অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিত এবং তার সঙ্গে মৃত্যুরও সমান উত্তরাধিকারী ছিল। তাদের এই সামান্য অভিন্নতার বন্ধনই জেকিলের যন্ত্রণার সবচেয়ে তীব্র কারণ হয়ে উঠেছিল। এর বাইরে, হাইডের প্রবল জীবনশক্তি থাকা সত্ত্বেও, জেকিল তাকে শুধু নরকীয়ই নয়, বরং প্রাণহীন ও জড় কোনো বস্তু বলেই মনে করত।
এটাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার—অন্ধকার অতল গহ্বরের কাদামাটির মতো সেই জঘন্য পদার্থ যেন আর্তনাদ করে কথা বলছে; আকারহীন ধুলোর স্তূপ যেন হাত-পা নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করছে এবং পাপ করছে; যে বস্তু মৃত এবং যার কোনো আকৃতিই নেই, সেটিই যেন জীবন্ত মানুষের কাজকর্ম দখল করে নিচ্ছে!
আরও ভয়ঙ্কর ছিল এই সত্য যে, সেই বিদ্রোহী আতঙ্কটি আমার সঙ্গে একজন স্ত্রীর চেয়েও ঘনিষ্ঠভাবে, এমনকি নিজের চোখের চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। সে আমার দেহের মধ্যেই বন্দী হয়ে ছিল; সেখানে আমি তার অস্পষ্ট গুঞ্জন শুনতে পেতাম এবং অনুভব করতাম, সে যেন জন্ম নেওয়ার জন্য আমার শরীরের ভেতরে ছটফট করছে। আর যখনই আমি দুর্বল হয়ে পড়তাম, অথবা ঘুমের নিশ্চিন্ত মুহূর্তে থাকতাম, তখনই সে আমার ওপর জয়ী হতো এবং আমাকে জীবন থেকে উৎখাত করে নিজের স্থান দখল করত।
অন্যদিকে, জেকিলের প্রতি হাইডের ঘৃণা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। ফাঁসিতে ঝোলার আতঙ্ক তাকে বারবার সাময়িক আত্মহত্যার মতো করে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করতে এবং একজন পূর্ণ মানুষ না থেকে জেকিলের শরীরের একটি অধীন অংশের অবস্থানে ফিরে যেতে বাধ্য করত। কিন্তু এই প্রয়োজনীয়তাকেই সে ঘৃণা করত; জেকিল যে গভীর হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল, তাকেও সে ঘৃণা করত; এবং জেকিল যে তাকে নিজেই ঘৃণা করত, সেই বিরূপ মনোভাবের প্রতিও তার প্রবল ক্ষোভ ছিল।
এই কারণেই সে আমার সঙ্গে বানরের মতো নানা কৌতুকপূর্ণ দুষ্টুমি করত—আমার নিজের হাতের লেখায় আমার বইয়ের পাতায় ধর্মনিন্দামূলক ও অশ্রাব্য কথাবার্তা লিখে রাখত, চিঠিগুলো পুড়িয়ে ফেলত এবং আমার পিতার প্রতিকৃতিও নষ্ট করে দিয়েছিল। সত্যি বলতে, মৃত্যুর ভয় যদি তাকে সংযত না রাখত, তবে আমাকে ধ্বংসের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতে সে অনেক আগেই নিজেকেও সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলত।
তবু জীবনের প্রতি তার ভালোবাসা বিস্ময়কর; বরং আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলব—যে তার কথা মনে পড়লেই, তার প্রতি এই আসক্তির হীনতা ও উন্মত্ত আবেগ স্মরণ করলে এবং যখন জানি যে আত্মহত্যার মাধ্যমে আমি তাকে চিরতরে নিজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারি—এই ভাবনাতেই আমি শিউরে উঠি ও ভয়ে জমে যাই, সেই আমিই আবার তার জন্য করুণা অনুভব করি।
এই বর্ণনা আর দীর্ঘায়িত করা আমার পক্ষে অর্থহীন, আর সময়ও আমাকে ভয়াবহভাবে তাড়া দিচ্ছে। কেউ কখনও এমন যন্ত্রণা ভোগ করেনি—এইটুকুই যথেষ্ট। তবু এই যন্ত্রণার মধ্যেও অভ্যাস আমাকে কিছুটা সহ্যশক্তি এনে দিয়েছিল—না, উপশম নয়—বরং আত্মার মধ্যে এক ধরনের অসাড়তা, এক ধরনের হতাশাকে মেনে নেওয়ার প্রবণতা এনে দিয়েছিলো। আর শেষ পর্যন্ত যে বিপর্যয়টি আমার ওপর এসে পড়েছে এবং যা আমাকে আমার নিজের মুখ ও স্বভাব থেকে চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, সেটি না ঘটলে হয়তো আমার এই শাস্তি বছরের পর বছর ধরে চলতে পারত।
প্রথম পরীক্ষার সময় থেকে আমার কাছে থাকা সেই লবণের মজুত আর কখনও নতুন করে সংগ্রহ করা হয়নি; এখন তা ফুরিয়ে আসতে শুরু করল। আমি নতুন করে লবণ আনতে লোক পাঠালাম এবং ওষুধটি মিশিয়ে প্রস্তুত করলাম। মিশ্রণটি যথারীতি ফেনিয়ে উঠল এবং প্রথমবারের মতো রং পরিবর্তিত হল, কিন্তু দ্বিতীয়বার আর পরিবর্তন আর ঘটল না। আমি ওষুধটি পান করলাম, কিন্তু তাতে কোনো ফল হল না।
পুলের কাছ থেকে আপনি জানতে পারবেন, আমি কীভাবে সমগ্র লন্ডন তন্নতন্ন করে খুঁজিয়েছি; কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়েছে। এখন আমি নিশ্চিত যে আমার প্রথমবারের লবণের মজুতটি বিশুদ্ধ ছিল না, এবং সেই অজানা অশুদ্ধ পদার্থটিই সম্ভবত ওষুধটিকে কার্যকর করার শক্তি দিয়েছিল।
প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে। এখন পুরোনো গুঁড়ো ওষুধগুলোর শেষটুকুর প্রভাবে আমি এই বিবৃতিটি শেষ করছি। অতএব, কোনো অলৌকিক ঘটনা না ঘটলে, এই শেষবারের মতোই হেনরি জেকিল নিজের চিন্তা ভাবতে পারছেন, কিংবা আয়নায় নিজের মুখটি দেখতে পারছেন—যে মুখটি এখন কতই না করুণভাবে বদলে গেছে!
আমার লেখাটি শেষ করতেও আর বেশি দেরি করা উচিত নয়। কারণ, এতক্ষণ পর্যন্ত আমার এই বিবৃতিটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে মূলত অসাধারণ সতর্কতা এবং সৌভাগ্যের এক অদ্ভুত সমন্বয়ে। লেখার সময় যদি হঠাৎ সেই ভয়ংকর রূপান্তরের যন্ত্রণা আমাকে গ্রাস করে, তবে হাইড এই লেখাটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। কিন্তু লেখাটি লিখে রাখার পর যদি কিছুটা সময় কেটে যায়, তাহলে তার আশ্চর্য স্বার্থপরতা এবং মুহূর্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার চিন্তাশক্তিই সম্ভবত আবারও তাকে এই লেখাটি ধ্বংস করা থেকে বিরত রাখবে। কারণ, তার বিদ্বেষ যতই বানরের মতো হিংস্র হোক না কেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার ক্ষমতা তার নেই।
আর সত্যি বলতে, যে ভয়ংকর পরিণতি আমাদের দুজনের ওপরই ধেয়ে আসছে, তা ইতিমধ্যেই হাইডকেও বদলে দিয়েছে এবং ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। আর মাত্র আধঘণ্টা পর, যখন আমি আবার সেই ঘৃণ্য ব্যক্তিত্বটিকে চিরকালের জন্য নিজের মধ্যে ধারণ করব, তখন আমি জানি, কীভাবে এই চেয়ারে বসে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদব; অথবা প্রবল উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে চারপাশের প্রতিটি শব্দ শোনার জন্য এই ঘরের মধ্যে—যা এখন আমার শেষ পার্থিব আশ্রয়—পায়চারি করে বেড়াব এবং প্রতিটি সম্ভাব্য বিপদের শব্দের দিকে কান পেতে থাকব।
হাইড কি ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে মৃত্যুবরণ করবে? নাকি সে শেষ মুহূর্তে নিজেকে মুক্ত করার সাহস পাবে? ঈশ্বরই জানেন। আমার আর তাতে কিছু যায় আসে না। এটাই আমার প্রকৃত মৃত্যুর মুহূর্ত। এরপর যা ঘটবে, তা আর আমার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অতএব, এখন আমি কলম নামিয়ে রাখছি এবং আমার এই স্বীকারোক্তিপত্রটি সিল করে বন্ধ করতে চলেছি। এর মধ্য দিয়েই আমি সেই দুর্ভাগা হেনরি জেকিলের জীবনকাহিনির সমাপ্তি ঘটালাম।
সমাপ্ত
রবার্ট লুই স্টিভেনসন: সংক্ষিপ্ত জীবনী
Robert Louis Stevenson (রবার্ট লুই স্টিভেনসন) ছিলেন উনিশ শতকের একজন বিখ্যাত স্কটিশ ঔপন্যাসিক, কবি, প্রবন্ধকার ও ভ্রমণলেখক। তিনি বিশেষভাবে রোমাঞ্চ, রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চারধর্মী সাহিত্য রচনার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
জন্ম: ১৩ নভেম্বর ১৮৫০, এডিনবরা, স্কটল্যান্ড
মৃত্যু: ৩ ডিসেম্বর ১৮৯৪, আপিয়া, সামোয়া
স্টিভেনসনের পুরো নাম Robert Louis Balfour Stevenson। তাঁর বাবা টমাস স্টিভেনসন ছিলেন একজন খ্যাতনামা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং বাতিঘর নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শৈশব থেকেই স্টিভেনসনের স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো ছিল না। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার মধ্যেও তিনি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান।
তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৮৭৫ সালে আইনজীবী হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু আইন পেশার পরিবর্তে তাঁর প্রধান আগ্রহ ছিল সাহিত্য ও ভ্রমণ।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- Treasure Island (১৮৮৩) — রোমাঞ্চকর জলদস্যু-কাহিনি
- Kidnapped (১৮৮৬)
- The Strange Case of Dr. Jekyll and Mr. Hyde (১৮৮৬) — মানুষের দ্বৈত সত্তা নিয়ে বিখ্যাত রহস্য-উপন্যাস
- The Master of Ballantrae (১৮৮৯)
- A Child’s Garden of Verses (১৮৮৫) — শিশুদের জন্য কবিতার সংকলন
বিশেষ করে The Strange Case of Dr. Jekyll and Mr. Hyde তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে স্থায়ী খ্যাতি এনে দেয়। এই কাহিনিতে মানুষের ভালো ও মন্দ—দুটি বিপরীত সত্তার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে রহস্য ও ভয়ের আবহে তুলে ধরা হয়েছে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে স্টিভেনসন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে বসবাস করেন এবং শেষ পর্যন্ত সামোয়ার আপিয়া শহরের কাছে তাঁর বাড়ি Vailima-তে মৃত্যুবরণ করেন। সামোয়ার মানুষ তাঁকে “Tusitala”, অর্থাৎ “গল্পের কথক” (Storyteller) নামে অভিহিত করত।
স্টিভেনসনের সাহিত্য আজও পাঠকদের কাছে জনপ্রিয়, বিশেষত তাঁর অ্যাডভেঞ্চার, রহস্য, কল্পনা ও মানবমনের অন্ধকার দিকের অসাধারণ উপস্থাপনার জন্য।

