বৃদ্ধ এবং সমুদ্র (Old man and the Sea)

বৃদ্ধ এবং সমুদ্র

Ernest Hemingway – সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

  • জন্ম: ২১ জুলাই ১৮৯৯
  • জন্মস্থান: Oak Park
  • মৃত্যু: ২ জুলাই ১৯৬১ (আত্মহত্যা)
  • বিশেষ পরিচিতি: For Whom the Bell Tolls-এর বিশ্ববিখ্যাত লেখক।

জীবন ও সাহিত্যকর্ম

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কিন সাহিত্যিক। তাঁর লেখার ভাষা ছিল অত্যন্ত সহজ, সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী। এই স্বতন্ত্র লেখনশৈলী পরবর্তীকালে “Hemingway style” নামে পরিচিতি লাভ করে এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য লেখককে প্রভাবিত করে।

তিনি জীবনের বিভিন্ন সময়ে Paris, Cuba এবং Key West-এ বসবাস করেন। ষাঁড়ের লড়াই, শিকার এবং অভিযাত্রী জীবন তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয় ছিল। তিনি Spanish Civil War এবং World War II-এ যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করেছেন।

১৯৫৪ সালে তিনি সাহিত্যে Nobel Prize in Literature লাভ করেন। তাঁর জনপ্রিয় ডাকনাম ছিল “Papa”

         উল্লেখযোগ্য উপন্যাস

  • The Torrents of Spring (১৯২৫)
  • The Sun Also Rises (১৯২৬)
  • A Farewell to Arms (১৯২৯)
  • To Have and Have Not (১৯৩৭)
  • For Whom the Bell Tolls (১৯৪০)
  • Across the River and Into the Trees (১৯৫০)
  • The Old Man and the Sea (১৯৫২)
  • Adventures of a Young Man
  • Islands in the Stream
  • The Garden of Eden

উল্লেখযোগ্য নন-ফিকশন গ্রন্থ

  • Death in the Afternoon
  • Green Hills of Africa
  • The Dangerous Summer
  • A Moveable Feast
  • Ernest Hemingway Selected Letters 1917–1961
  • Under Kilimanjaro

ছোটগল্প সংকলন

  • Three Stories and Ten Poems
  • In Our Time
  • Men Without Women
  • The Snows of Kilimanjaro
  • Winner Take Nothing
  • The Fifth Column and the First Forty-Nine Stories
  • The Essential Hemingway
  • The Hemingway Reader
  • The Nick Adams Stories
  • The Complete Short Stories of Ernest Hemingway
  • Collected Stories

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক। তাঁর রচনায় সাহস, সংগ্রাম, যুদ্ধ, প্রেম, মানবিকতা এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতা গভীরভাবে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে The Old Man and the Sea বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি হিসেবে আজও সমান জনপ্রিয়।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল কমিটি বিশেষভাবে তাঁর কাহিনি বলার শিল্পে অসাধারণ দক্ষতা’-র প্রশংসা করে এবং উল্লেখ করে যে, সেই দক্ষতার উজ্জ্বল প্রকাশ তাঁর দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি   গ্রন্থে দেখা যায়। এই বইটিই ১৯৫৩ সালে কথাসাহিত্যের জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুলিৎজার পুরস্কারও অর্জন করেছিল।

            বৃদ্ধ  এবং সমুদ্র
                                                                                                 — আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন। উপসাগরীয় স্রোতে (গালফ স্ট্রিমে) একটি ছোট নৌকা নিয়ে তিনি একাই তিনি ধরতেন। টানা চুরাশি দিন কেটে গেছে, কিন্তু তিনি একটি মাছও ধরতে পারেননি। প্রথম চল্লিশ দিন তাঁর সঙ্গে একটি ছেলে ছিল। কিন্তু চল্লিশ দিনেও কোনো মাছ না পাওয়ায় ছেলেটির বাবা-মা তাকে বলেছিলেন যে বৃদ্ধটি এখন নিশ্চিত এবং সম্পূর্ণভাবে সালাও’—অর্থাৎ চরম দুর্ভাগা। তাই তাদের নির্দেশে ছেলেটি অন্য একটি নৌকায় চলে যায়, আর সেই নৌকাটি প্রথম সপ্তাহেই তিনটি ভালো মাছ ধরে।

বৃদ্ধকে প্রতিদিন খালি নৌকা নিয়ে ফিরে আসতে দেখে ছেলেটির খুব কষ্ট হতো। তাই সে প্রতিদিন নৌকা থেকে নেমে এসে কখনও প্যাঁচানো মাছ ধরার সুতো, কখনও গ্যাফও হারপুন, আবার কখনও মাস্তুলে জড়ানো পাল বহন করতে বৃদ্ধকে সাহায্য করত।পালটি ছিল ময়দার বস্তার টুকরো দিয়ে বারবার জোড়া লাগানো; আর যখন সেটি গুটিয়ে রাখা থাকত, তখন সেটিকে চিরস্থায়ী পরাজয়ের পতাকার মতো দেখাত।

বৃদ্ধ মানুষটি রোগা ও ক্ষীণকায় ছিলেন। তাঁর ঘাড়ের পেছনে গভীর ভাঁজ ছিল। উষ্ণমণ্ডলীয় সমুদ্রের প্রতিফলিত সূর্যালোকের কারণে যে ধরনে ত্বকের বাদামি দাগযুক্ত ক্যানসার হয়,  সেরকম চিহ্ন তাঁর গালে স্পষ্ট ছিল। সেই দাগ মুখের দুই পাশ বেয়ে অনেকটা নিচ পর্যন্ত নেমে এসেছিল। ভারী মাছ ধরার দড়ি বছরের পর বছর ধরে টানতে টানতে তাঁর হাতেও গভীর ক্ষতের দাগ পড়ে গিয়েছিল। তবে সেগুলোর কোনোটিই নতুন ছিল না; মাছহীন মরুভূমির ক্ষয় চিহ্নের মতোই সেগুলো পুরানো ছিল।

তাঁর সবকিছুই ছিল পুরানো—শুধু তাঁর দুটো চোখ ছাড়া। সেই চোখ দুটির রং ছিল সমুদ্রের মতো, আর সেগুলো ছিল প্রফুল্ল ও কখনো পরাজয় স্বীকার না করা রকমের।

ছেলেটি বলল- সান্তিয়াগো, আমি আবার আপনার সঙ্গে যেতে পারি। আমরা এখন কিছু টাকা রোজগার করেছি।

বৃদ্ধ মানুষটিই ছেলেটিকে মাছ ধরা শিখিয়েছিলেন, আর ছেলেটি তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসত।

বৃদ্ধ বললেন- না। তুমি এখন ভাগ্যবান একটি নৌকায় আছ। তাদের সঙ্গেই থাকো।

ছেলেটি বলল- কিন্তু আপনার মনে আছে তো, একবার আপনি টানা সাতাশি দিন কোনো মাছ ধরতে পারেননি। তারপর আমরা পরপর তিন সপ্তাহ প্রতিদিন বড় বড় মাছ ধরেছিলাম।

আমি মনে করতে পারি, বৃদ্ধ বললেন।-আমি জানি, আমার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে তুমি আমাকে ছেড়ে যাওনি।

বাবাই আমাকে যেতে বাধ্য করেছিলেন। আমি তো একটি ছেলে, বাবার কথাতো আমাকে মানতেই হবে।

আমি জানি, বৃদ্ধ বললেন- এটাই স্বাভাবিক।

“বাবার তেমন বিশ্বাস নেই।”

“না,” বৃদ্ধ বললেন। “কিন্তু আমাদের আছে। তাই না?”

“হ্যাঁ,” ছেলেটি বলল। “চলুন, টেরেসে(বারান্দা) গিয়ে আপনাকে এক গ্লাস বিয়ার খাওয়াই, তারপর আমরা জিনিসপত্র বাড়ি নিয়ে যাব।”

“কেন নয়? চল” বৃদ্ধ বললেন। “জেলেদের মধ্যে এসব তো চলেই।”

তারা টেরেসে বসে রইল। অনেক জেলে বৃদ্ধকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিল, কিন্তু তিনি রাগ করলেন না। অন্যদিকে, বয়স্ক জেলেরা তাঁর দিকে তাকিয়ে মনে মনে দুঃখ পেলেও তা প্রকাশ করল না। তারা ভদ্রভাবে সাগরের স্রোত, কত গভীরে জাল ফেলেছিল, আবহাওয়ার স্থির ভালো অবস্থা এবং সেদিন সমুদ্রে যা যা দেখেছে, সেসব নিয়েই আলোচনা করছিল।

সেদিন যারা সফলভাবে মাছ ধরেছিল, তারা ইতিমধ্যে তাদের বিশাল মার্লিন মাছ কেটে টুকরো করেছে। সেই মাছগুলোকে দুটি লম্বা তক্তার ওপর লম্বালম্বি সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যে শুইয়ে, প্রতিটি তক্তার দুই প্রান্তে একজন করে— মোট দুজন মানুষ কষ্ট করে বহন করে মাছ ঘরে নিয়ে যাচ্ছিল। বরফবাহী ট্রাক এসে সেগুলো সেখান থেকে হাভানার বাজারে নিয়ে যাবে।আর যারা হাঙর ধরেছিল, তারা সেগুলো উপসাগরের অপর প্রান্তে অবস্থিত হাঙর প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে পুলি ও দড়ির সাহায্যে হাঙরগুলো ঝুলিয়ে তাদের যকৃত বের করা হচ্ছিল, পাখনা কেটে ফেলা হচ্ছিল, চামড়া ছাড়ানো হচ্ছিল এবং মাংস লবণ দিয়ে সংরক্ষণের জন্য লম্বা লম্বা ফালি করে কাটা হচ্ছিল।

যখন পূর্ব দিক থেকে বাতাস বইত, তখন হাঙরের কারখানার তীব্র গন্ধ পুরো বন্দরে ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু আজ বাতাস উত্তর দিকে ঘুরে, পরে একেবারে থেমে গেছে। তাই গন্ধের শুধু হালকা আভাসটুকুই ভেসে আসছিল। টেরেসে তখন রৌদ্রোজ্জ্বল, মনোরম পরিবেশ বিরাজ করছিল।

“সান্তিয়াগো,” ছেলেটি ডাকল।

“হ্যাঁ, বল” বৃদ্ধ বললেন। তিনি হাতে গ্লাস ধরে তখন বহু বছর আগের স্মৃতিতে ডুবে ছিলেন।

“আগামীকালের জন্য আমি কি আপনার জন্য সার্ডিন মাছ এনে দেব?”

“না। তুমি গিয়ে বেসবল খেলো। আমি এখনও নিজেই নৌকা বাইতে পারি, আর রোজেলিওজাল ফেলবে।”

“আমি যেতে চাই। যদি আপনার সঙ্গে মাছ ধরতে না-ও পারি, তবু কোনো না কোনোভাবে আপনার সেবা করতে চাই।”

“তুমি আমাকে এক গ্লাস বিয়ার কিনে দিয়েছ,” বৃদ্ধ বললেন। “তুমি তো এখন একজন পুরুষ হয়ে গেছ।”

“আপনি প্রথম যখন আমাকে নৌকায় তুলেছিলেন তখন আমার বয়স কত ছিল?”

“পাঁচ বছর। আর আমি যখন মাছটাকে পুরোপুরি দুর্বল না করেই নৌকায় তুলেছিলাম, তখন তুমি প্রায় মরে যেতে বসেছিলে। মাছটা প্রায় নৌকাটাই ভেঙে ফেলেছিল। তোমার কি মনে আছে?”

“মনে আছে। তার লেজের প্রচণ্ড আঘাত, ধাক্কাধাক্কি, নৌকার আড়াআড়ি কাঠের আসনটি ভেঙে যাওয়ার শব্দ— সবই মনে আছে। মনে আছে, আপনি আমাকে নৌকার সামনের দিকে প্যাঁচানো ভেজা দড়ির ওপর ছুড়ে দিয়েছিলেন। মনে আছে, পুরো নৌকাটাই কেঁপে উঠেছিল। আপনি যেভাবে লাঠি দিয়ে মাছটাকে আঘাত করছিলেন, যেন একটি গাছ কেটে ফেলছেন। আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা সেই মিষ্টি রক্তের গন্ধ— সবই আজও আমার মনে আছে।”

“তোমার সত্যিই এসব মনে আছে, নাকি? আমি তোমাকে শুধু গল্প বলেছিলাম?”

“আমার সবকিছুই মনে আছে—যেদিন আমরা প্রথম একসঙ্গে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম, সেদিন থেকে।”

বৃদ্ধ লোকটি তাঁর রোদে পোড়া, আত্মবিশ্বাসী এবং স্নেহভরা চোখে ছেলেটির দিকে তাকালেন।তিনি বললেন, “তুমি যদি আমার নিজের ছেলে হতে, তাহলে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রে যেতাম, ভাগ্য পরীক্ষা করতাম। কিন্তু তুমি তোমার বাবা-মায়ের ছেলে, আর এখন তুমি এমন একটি নৌকায় আছ, যেটি ভাগ্যবান।”

ছেলেটি বলল, “আমি কি সার্ডিন মাছগুলো এনে দেব? আমি জানি কোথা থেকে আরও চারটি টোপ জোগাড় করা যাবে।”

বৃদ্ধ বললেন- “আজকের কিছু টোপ আমার কাছে এখনও আছে। সেগুলো লবণ দিয়ে বাক্সে রেখে দিয়েছি।”

ছেলেটি বলল- “তবু আমি চারটি টাটকা টোপ এনে দিই।”

বৃদ্ধ বললেন- “একটি হলেই হবে।” তাঁর আশা ও আত্মবিশ্বাস কখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তবে এখন সেগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠল, যেমন হালকা বাতাস ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে ওঠে।

ছেলেটি বলল- “দুটি আনব।”

বৃদ্ধ সম্মতি জানিয়ে বললেন- “আচ্ছা, দুটিই দিও। তবে তুমি এগুলো চুরি করোনি তো?”

ছেলেটি হেসে বলল- “প্রয়োজনে চুরিই করতাম, কিন্তু এগুলো আমি কিনে এনেছি।”

বৃদ্ধ বললেন- “ধন্যবাদ।”

তিনি এতটাই সরল মানুষ ছিলেন যে কখন তাঁর মধ্যে প্রকৃত বিনয় এসেছে, তা নিয়ে কখনও তিনি ভাবেননি। কিন্তু তিনি জানতেন, তিনি বিনয় অর্জন করেছেন। তিনি আরও জানতেন, এতে অসম্মানের কিছু নেই, আর এতে সত্যিকারের আত্মমর্যাদারও কোনো ক্ষতি হয় না।

তিনি বললেন- “এই সমুদ্রস্রোত দেখে মনে হচ্ছে, আগামীকাল দিনটা খুব ভালো যাবে।”

ছেলেটি জিজ্ঞেস করল- “কাল আপনি কোথায় যাবেন?”

বৃদ্ধ বললেন- “অনেক দূরে। তারপর যখন বাতাসের দিক বদলাবে, তখন ফিরে আসব। আমি ভোর হওয়ার আগেই সমুদ্রে পৌঁছে যেতে চাই।”

ছেলেটি বলল- “আমিও চেষ্টা করব, যাতে আমি যার সঙ্গে যাই, সে-ও অনেক দূরে যায়। তাহলে আপনি যদি সত্যিই বিশাল কোনো মাছ ধরেন, আমরা আপনার সাহায্যে যেতে পারব।”

বৃদ্ধ বললেন- “ আমি জানি সে এত দূরে যেতে পছন্দ করে না।”

ছেলেটি বলল- “না, করে না,  কিন্তু আমি এমন কিছু দেখতে পাব যা সে দেখতে পাবে না—যেমন কোনো পাখি যদি মাছের খোঁজে ঘোরাফেরা করে। তখন আমি তাকে ডলফিন মাছের খোঁজে আরও দূরে যেতে রাজি করাতে পারব।”

বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন- “তার চোখ কি এতটাই খারাপ?”

ছেলেটি বলল- “সে তো প্রায় অন্ধ।”

বৃদ্ধ বললেন- “অদ্ভুত! সে কখনও কচ্ছপ শিকার করেনি। কচ্ছপ শিকারইতো মানুষের চোখ নষ্ট করে।”

ছেলেটি বলল- “কিন্তু আপনি তো বহু বছর Mosquito Coast-এর উপকূলে কচ্ছপ শিকার করেছেন, অথচ আপনার চোখতো এখনও ভালো আছে।”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন- “আমি তো এক অদ্ভুত বুড়ো মানুষ।”

ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করল- “কিন্তু আপনি কি এখনও সত্যিই বড় কোনো মাছের সঙ্গে লড়াই করার মতো শক্তি রাখেন?”

বৃদ্ধ দৃঢ়ভাবে বললেন- “আমারতো তাই মনে হয়। আর আমার অনেক কৌশল জানা আছে।”

ছেলেটি বলল- “চলুন, এখন জিনিসপত্র বাড়িতে নিয়ে যাই। তারপর আমি জাল নিয়ে গিয়ে সার্ডিন মাছ ধরে আনব।”

তারা নৌকা থেকে সব সরঞ্জাম নামিয়ে নিল। বৃদ্ধ তাঁর কাঁধে মাস্তুলটি তুলে নিলেন। আর ছেলেটি মাছ ধরার কুণ্ডলী পাকানো শক্ত বাদামি দড়ি, গ্যাফ এবং দণ্ড লাগানো হারপুনটি নিয়ে কাঠের নৌকাটি বহন করল। টোপ রাখা বাক্সটি নৌকার পেছনের দিকে ছিল। তার পাশেই ছিল একটি ভারী গদা, যা বড় মাছ নৌকায় তোলার পর তাকে শান্ত বা নিস্তেজ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। বৃদ্ধের কাছ থেকে কেউ চুরি করত না। তবু তিনি মনে করতেন, পাল আর ভারী দড়িগুলো বাড়িতে নিয়ে যাওয়াই ভালো, কারণ রাতের শিশির সেগুলোর ক্ষতি করতে পারে। আর যদিও তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে গ্রামের কেউ তাঁর জিনিস চুরি করবে না, তবুও গ্যাফ আর হারপুন নৌকায় ফেলে রাখাটা অযথা প্রলোভন সৃষ্টি করার মতো কাজ বলে তিনি মনে করতেন।

তারা একসঙ্গে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বৃদ্ধের ছোট কুঁড়েঘরে এসে পৌঁছাল এবং খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। বৃদ্ধ পালের সঙ্গে বাঁধা মাস্তুলটি দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখলেন, আর ছেলেটি টোপের বাক্স ও অন্যান্য সরঞ্জাম তার পাশে গুছিয়ে রাখল। মাস্তুলটি এতটাই লম্বা ছিল যে, তা প্রায় পুরো এক-কক্ষের ঘরের সমান ছিল। ঘরটি রাজকীয় তালগাছের শক্ত খোলস দিয়ে তৈরি, যাকে গুয়ানো বলা হয়। ঘরের ভেতরে ছিল একটি খাট, একটি টেবিল, একটি চেয়ার এবং মাটির মেঝের ওপর কয়লা জ্বালিয়ে রান্না করার একটি ছোট জায়গা। বাদামি রঙের দেয়ালে, শুকনো তালপাতার ওপর ঝুলছিল যিশু খ্রিস্টের পবিত্র হৃদয়ের একটি রঙিন ছবি এবং ভার্জিন অব কোরে(তামা)এর আরেকটি ছবি। এগুলো ছিল তাঁর স্ত্রীর স্মৃতিচিহ্ন।

একসময় দেয়ালে তাঁর স্ত্রীর একটি রঙিন আলোকচিত্রও ঝুলত। কিন্তু সেটি দেখলে তাঁর খুব একাকী মনে হত বলে তিনি তা খুলে ফেলেছিলেন। ছবিটি এখন কোণের তাক এর ওপর, তাঁর পরিষ্কার শার্টের নিচে রাখা ছিল।

ছেলেটি জিজ্ঞেস করলখাওয়ার জন্য কী আছে আপনার?

বৃদ্ধ বললেন—হলুদ ভাত এবং মাছ রান্না রয়েছেতুমি কি খাবে?

না, আমি বাড়িতেই খাব। আপনি চাইলে আমি আগুন জ্বালিয়ে দিই?

না, পরে আমি নিজেই জ্বালাব। নইলে ঠান্ডা ভাতই খেয়ে নেব।

আমি কি জালটা নিয়ে যেতে পারি?

অবশ্যই।

আসলে তাদের আর কোনো ছোঁড়া(খেপলা)জাল (কাস্ট নেট) ছিল না। অনেক আগেই সেটি বিক্রি করতে হয়েছিল। কিন্তু তারা প্রতিদিনই যেন সেই পুরোনো কথোপকথনটি অভিনয় করে যেত। যেমন সত্যিই কোনো হলুদ ভাত বা মাছও ছিল না, আর ছেলেটিও তা জানত।

বৃদ্ধ বললেন— পঁচাশি সংখ্যাটা খুবই সৌভাগ্যের। কেমন হয় যদি আমি এমন একটা মাছ ধরতে পারি, যার ওজন পরিষ্কার করার পরও হাজার পাউন্ডের বেশি হবে?

ছেলেটি বলল— আমি জাল নিয়ে সার্ডিন মাছ ধরতে যাচ্ছি। আপনি কি ততক্ষণ দরজায় বসে রোদ পোহাবেন?

হ্যাঁ। গতকালের খবরের কাগজটা আছে। বসে বসে বেসবলের খবর পড়ব।

ছেলেটি জানত না, গতকালের খবরের কাগজটাও আগের কথাগুলোর মতো কল্পনা কি না। কিন্তু বৃদ্ধ সত্যিই খাটের নিচ থেকে একটি খবরের কাগজ বের করলেন।

তিনি বললেনপেরিকো সংবাদপত্র পড়তে দিতেন।) আমাকে বডেগা (ছোট মুদি দোকান) থেকে এটা দিয়েছে।

ছেলেটি বললআমি সার্ডিন মাছ নিয়ে ফিরে আসব। আপনার আর আমার টোপ একসঙ্গে বরফে রেখে দেব। কাল সকালে আমরা ভাগাভাগি করে নেব। ফিরে এলে আপনি আমাকে বেসবলের খবর বলবেন

বৃদ্ধ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেনইয়াঙ্কিরাহারতেই পারে না।

ছেলেটি মৃদু হেসে বললকিন্তু আমার ভয় ক্লিভল্যান্ড ইন্ডিয়ানসকে নিয়ে।

— “ইয়াঙ্কিদের ওপর বিশ্বাস রাখো, আমার ছেলে। মহান ডি’ম্যাজিও র কথা ভাবো।”

— “কিন্তু আমার ভয় লাগে ডেট্রয়েট টাইগার্স আর ক্লিভল্যান্ড ইন্ডিয়ান্সকে।”

— “সাবধান! এভাবে চললে একদিন সিনসিনাটির রেডস আর শিকাগো হোয়াইট সক্সকেও ভয় পাবে।”

— “আমি ফিরে এলে তুমি এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করে আমাকে বলবে।”

— “তোমার কি মনে হয়, আমরা পঁচাশি নম্বর দিয়ে লটারির একটা টিকিট কিনব? আগামীকাল তো পঁচাশিতম দিন।”

— “হ্যাঁ, কিনতে পারি,” ছেলেটি বলল। “কিন্তু তোমার সেই বিখ্যাত সাতাশি দিনের রেকর্ডের কথা?”

— “সেটা দ্বিতীয়বার ঘটতে পারে না। তোমার কি মনে হয়, পঁচাশি নম্বরের টিকিট পাওয়া যাবে?”

— “আমি অর্ডার দিতে পারি।”

— “একটা টিকিট। দাম আড়াই ডলার। কিন্তু সেই টাকা আমরা কার কাছ থেকে ধার করব?”

— “ওটা খুব সহজ। আমি সবসময়ই আড়াই ডলার ধার করতে পারি।”

— “আমারও মনে হয় আমিও পারব। কিন্তু আমি চেষ্টা করি ধার না করতে। কারণ আগে মানুষ ধার করে, তারপর একসময় ভিক্ষা করতে হয়।”

— “নিজের খেয়াল রেখো, তুমি বুড়ো মানুষ,” ছেলেটি বলল। “মনে রেখো, এখন সেপ্টেম্বর মাস।”

— “এই মাসেই বড় বড় মাছ আসে,” বৃদ্ধ বললেন। “মে মাসে তো যে কেউ জেলে হতে পারে।”

— “আমি এখন সার্ডিন মাছ আনতে যাচ্ছি,” ছেলেটি বলল।

ছেলেটি ফিরে এসে দেখল, বৃদ্ধ চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছেন এবং সূর্য ইতিমধ্যে ডুবে গেছে। সে বিছানা থেকে পুরোনো সেনাবাহিনীর কম্বলটি এনে আলতো করে চেয়ারের পিঠে ও বৃদ্ধের কাঁধে জড়িয়ে দিল। কাঁধ দুটি ছিল অদ্ভুত— বৃদ্ধ হলেও এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁর ঘাড়ও ছিল দৃঢ়; ঘুমের মধ্যে মাথা সামনের দিকে নুয়ে পড়ায় ঘাড়ের ভাঁজগুলো তেমন চোখে পড়ছিল না। তাঁর জামাটি এতবার সেলাই করা হয়েছিল যে সেটি দেখতে অনেকটা তাঁর পালটির মতোই হয়েছে। সূর্যের তাপে কাপড়গুলোর রং ফিকে হয়ে নানা রকম ছোপ ছোপ আভা ধারণ করেছে। বৃদ্ধের মাথাটি ছিল খুবই বৃদ্ধ মানুষের মতো। কিন্তু চোখ বন্ধ থাকায় তাঁর মুখে যেন জীবনের কোনো চিহ্নই ছিল না। হাঁটুর ওপর একটি সংবাদপত্র রাখা ছিল, আর সন্ধ্যার হাওয়ায় সেটি যাতে উড়ে না যায়, সেজন্য সেটিকে তাঁর হাতের ভার দিয়ে চেপে রেখেছিলেন। তাঁর পায়ে কোনো জুতো ছিল না।

ছেলেটি তাঁকে সেভাবেই রেখে চলে গেল। পরে আবার ফিরে এসে দেখল, বৃদ্ধ তখনো ঘুমিয়েই আছেন।

— “জেগে ওঠো, বুড়ো মানুষ,” ছেলেটি বলল এবং বৃদ্ধের একটি হাঁটুর ওপর আলতো করে হাত রাখল।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। কিছুক্ষণ যেন মনে হলো তিনি বহু দূর কোথাও থেকে ফিরে আসছেন। তারপর তিনি মৃদু হেসে উঠলেন।

— “কি এনেছ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

— “রাতের খাবার,” ছেলেটি বলল। “চলো, আমরা রাতের খাবার খাব।”

“আমার খুব একটা ক্ষুধা নেই।”

“আসুন, খেয়ে নিন। না খেয়ে মাছ ধরতে যাওয়া যায় না।

বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজটি হাতে নিলেন এবং ভাঁজ করে রাখলেন। তারপর কম্বলটিও গুছিয়ে ভাঁজ করতে লাগলেন।

“কম্বলটা গায়ে চেপেই থাকুন,” ছেলেটি বলল। “আমি যতদিন বেঁচে আছি, আপনাকে না খাইয়ে মাছ ধরতে যেতে দেব না।”

“তাহলে তুমি অনেক দিন বেঁচে থেকো এবং নিজেরও যত্ন নিও,” বৃদ্ধ বললেন। “আজ আমরা কী খাচ্ছি?”

“কালো শিম আর ভাত, ভাজা কলা, আর একটু মাংসের ঝোল।”

ছেলেটি টেরেস থেকে দুই তলাযুক্ত ধাতব খাবারের পাত্রে করে খাবারগুলো এনে ছিল। দুটি ছুরি, দুটি কাঁটা-চামচ ও দুটি চামচ সে নিজের পকেটে এনেছিল; প্রতিটি সেট কাগজের ন্যাপকিনে মোড়ানো ছিল।

“এগুলো তোমাকে কে দিয়েছে?”

“মার্টিন। রেস্তোরাঁর মালিক।

“আমার ওকে ধন্যবাদ জানানো উচিত।”

“আমি ইতিমধ্যেই ধন্যবাদ জানিয়েছি,” ছেলেটি বলল। “আপনার আর আলাদা করে ধন্যবাদ জানানোর দরকার নেই।”

“আমি ওকে একটা বড় মাছের পেটের সেরা মাংসটা দেব,” বৃদ্ধ বললেন। “সে কি আমাদের জন্য এর আগেও এমন করেছে?”

“আমার তাই মনে হয়।”

তাহলে শুধু পেটের মাংস দিলেই হবে না। আরও কিছু দেওয়া উচিত। সে আমাদের জন্য সত্যিই অনেক চিন্তা করে।”

“সে দু’বোতল বিয়ারও পাঠিয়েছে।”

“আমার ক্যান (ধাতব কৌটা)র বিয়ারই বেশি পছন্দ।”

“জানি। কিন্তু এটা বোতলের হাতুয়েই বিয়ার১০। পরে আমি বোতলগুলো ফেরত দিয়ে আসব।”

“এটা তোমার খুবই ভালো আচরণ,” বৃদ্ধ বললেন। “চলো, এবার খাওয়া শুরু করি?”

“আমি তো অনেকক্ষণ ধরেই আপনাকে খেতে বলছি,” ছেলেটি মৃদু হেসে বলল। “আপনি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত আমি খাবারের পাত্র খুলতে চাইনি।”

“এখন আমি প্রস্তুত,” বৃদ্ধ বললেন। “শুধু একটু সময় দরকার ছিল মুখ-হাত ধোয়ার জন্য।”

ছেলেটি মনে মনে ভাবল, উনি মুখ-হাত ধুলেন কোথায়? গ্রামের পানির কল তো রাস্তার দুই মোড় দূরে। তার মনে হলো, এখানেই ওনার জন্য পানি, সাবান আর একটি ভালো তোয়ালের ব্যবস্থা করা উচিত। আমি এত অসাবধান কেন? ওনার জন্য আরেকটি জামা, শীতের একটি জ্যাকেট, একজোড়া জুতো আর একটি অতিরিক্ত কম্বল এনে দেওয়া দরকার।

“তোমার রান্না করা স্ট্যুটা১১ দারুণ হয়েছে,” বৃদ্ধ বললেন।

“বেসবলের কথা বলুন,” ছেলেটি বলল।

“আমেরিকান লিগে তো ইয়াঙ্কিসই সেরা, যেমন আমি বলেছিলাম,” বৃদ্ধ খুশি হয়ে বললেন।

“কিন্তু আজ তাঁরা হেরে গেছে,” ছেলেটি জানাল।

“তাতে কিছুই আসে যায় না। মহান ডি-ম্যাজিও আবার তার পুরোনো ছন্দে ফিরেছে।”

“দলে তো আরও অনেক খেলোয়াড় আছে।”

“অবশ্যই আছে। কিন্তু পার্থক্যটা গড়ে দেয় সে-ই। আর অন্য লিগে ব্রুকলিন আর ফিলাডেলফিয়ার মধ্যে হলে আমি ব্রুকলিনকেই বেছে নেব। তবে তখন আবার ডিক সিসলারের কথা মনে পড়ে, আর সেই পুরোনো মাঠে তাঁর দুর্দান্ত সব দীর্ঘ শটের কথা।”

“ওর মতো আর কাউকে কখনও দেখিনি। আমি যতজনকে খেলতে দেখেছি, তাদের মধ্যে সে সবচেয়ে দূরে বল পাঠাতে পারত।”

“মনে আছে, সে যখন টেরেসে আসত?”

“আমি ওকে একদিন মাছ ধরতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বলতে এত লজ্জা লাগছিল, তাই সাহস পাইনি। তারপর তোমাকে বলেছিলাম তুমি যেন তাকে এবিষয়ে জিজ্ঞেস করো। কিন্তু তুমিও লজ্জা পেয়েছিলে।”

“জানি। ওটা আমাদের বড় ভুল ছিল। যদি সে আমাদের সঙ্গে যেত, তাহলে সেই স্মৃতি সারা জীবনের জন্য আমাদের কাছে থেকে যেত।”

“আমি মহান ডি-ম্যাজিওকে মাছ ধরতে নিয়ে যেতে চাই,” বৃদ্ধ বললেন। “শোনা যায়, তার বাবাও একজন জেলে ছিলেন। হয়তো তিনিও আমাদের মতোই দরিদ্র ছিলেন, তাই আমাদের কষ্ট বুঝতে পারতেন।”

“কিন্তু মহান সিসলারের বাবা কখনও দরিদ্র ছিলেন না। আর তার বাবা যখন আমার বয়সী ছিলেন, তখনই তিনি বড় লিগে খেলতেন।”

“আমি যখন তোমার বয়সী ছিলাম, তখন আফ্রিকাগামী একটি চারকোনা পালওয়ালা জাহাজে নাবিক হিসেবে কাজ করতাম। সন্ধ্যাবেলায় আফ্রিকার সমুদ্রতীরে আমি সিংহ দেখেছি।”

“জানি। আপনি আমাকে একথা আগেই বলেছেন।”

“তাহলে তুমি বলো, আমরা এখন আফ্রিকার কথা বলব, না বেসবলের?”

“আমার মনে হয়, বেসবলের কথা বলাটাই ভালো হবে,” ছেলেটি বলল। “মহান জন জে. ম্যাকগ্র সম্পর্কে বলুন।” সে ‘জে’ অক্ষরটিকে স্প্যানিশ উচ্চারণে ‘হোতা’ (জোটা) বলে উচ্চারণ করল।

“অনেক বছর আগে তিনিও মাঝে মাঝে টেরেসে১২আসতেন। তবে তিনি ছিলেন একটু রুক্ষ, কড়া ভাষার মানুষ, আর মদ খেলে আরও কঠিন হয়ে উঠতেন। বেসবলের পাশাপাশি ঘোড়দৌড় নিয়েও তাঁর ভীষণ আগ্রহ ছিল। অন্তত সব সময় পকেটে ঘোড়ার তালিকা রাখতেন, আর প্রায়ই টেলিফোনে ঘোড়াদের নাম নিয়ে কথা বলতেন।”

“তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ দল-পরিচালক ছিলেন।”ছেলেটি বলল। “আমার বাবা মনে করেন, তিনিই সর্বকালের সেরা ছিলেন।”

“কারণ তিনি এখানে সবচেয়ে বেশি বার এসেছেন,” বৃদ্ধ বললেন। “যদি ডুরোচারও১৩ প্রতি বছর এখানে আসতেন, তাহলে তোমার বাবা তাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ দল পরিচালক বলতেন।”

“আসলে সেরা দল-পরিচালক কে—লুকে, না মাইক গঞ্জালেস?”

“আমার মনে হয়, তাঁরা দুজনই সমান।”

“আর সেরা জেলে হচ্ছেন আপনি।”

বৃদ্ধ হেসে বললেন- “না। আমি জানি, আমার চেয়েও ভালো জেলে আছে।”

“তা হতে পারে না,” ছেলেটি বলল। “অনেক ভালো জেলে আছে, আবার কিছু অসাধারণ জেলেও আছে। কিন্তু আপনার মতো আর কেউ নেই।”

“না। আমি অন্যদের আরও ভালো করেই চিনি।”

ছেলেটি বলল- “ধুর! অনেক ভালো জেলে আছে, আবার কয়েকজন অসাধারণ জেলেও আছে। কিন্তু তোমার মতো তুমি একজনই আছ।”

বৃদ্ধ বললেন- “ধন্যবাদ। তোমার কথা শুনে আমি খুব খুশি হলাম। আশা করি এমন কোনো মাছ সামনে আসবে না, যে আমাদের ভুল প্রমাণ করবে।”

ছেলেটি বলল- “আপনি যদি এখনও আগের মতোই শক্তিশালী হোন, তাহলে তেমন কোনো মাছ নেই।”

বৃদ্ধ বললেন- “হয়তো আমি নিজেকে যতটা শক্তিশালী ভাবি, ততটা এখন আর নেই। কিন্তু আমি অনেক কৌশল জানি, আর আমার আছে অদম্য সংকল্প।”

ছেলেটি বলল-  “এখন আপনার শুয়ে পড়া উচিত, যাতে সকালে একেবারে সতেজ থাকতে পারেন। আমি জিনিসগুলো টেরেসে ফিরিয়ে দিয়ে আসি।”

“তাহলে শুভরাত্রি। সকালে আমি তোমাকে ডেকে দেব।”

ছেলেটি হেসে বলল- “আপনিই তো আমার অ্যালার্ম ঘড়ি।”

বৃদ্ধ বললেন- “বয়সই আমার অ্যালার্ম ঘড়ি। বুড়ো মানুষরা এত ভোরে কেন জেগে ওঠে বলো তো? দিনের সময়টা একটু বেশি পাওয়ার জন্য?”

ছেলেটি বলল- “আমি জানি না। শুধু এটুকুই জানি যে ছোট ছেলেরা গভীর ঘুমে অনেক দেরি পর্যন্ত ঘুমায়।”

বৃদ্ধ বললেন- “আমার তা মনে আছে। সময় মতোই তোমাকে জাগিয়ে দেব।”

ছেলেটি বলল- “আপনি যখন আমাকে জাগান, তখন আমার ভালো লাগে না। মনে হয়, আমি যেন আপনার চেয়ে ছোট বা দুর্বল।”

বৃদ্ধ বললেন- “আমি কথাটা বুঝতে পারছি।”

ছেলেটি বলল- “ভালো করে ঘুমোবেন, বুড়ো মানুষ।”

ছেলেটি চলে গেল। তারা কোনোপ্রকার আলো নাজ্বালিয়ে রাতের খাবার খেয়েছিল। বৃদ্ধ অন্ধকারেই তার প্যান্ট খুলে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তিনি প্যান্টটি গুটিয়ে তার ভেতরে খবরের কাগজ ভরে বালিশ বানালেন। তারপর কম্বল মুড়ি দিয়ে সেই পুরোনো খবরের কাগজগুলোর ওপর শুয়ে পড়লেন, যেগুলো দিয়ে বিছানার স্প্রিং ঢেকে রেখেছিল।

অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে তিনি ফিরে গেলেন তার শৈশবের আফ্রিকায়— দীর্ঘ সোনালি সমুদ্রসৈকত, আর এমন সাদা বালুর সৈকত, যার উজ্জ্বলতায় চোখ ঝলসে যায়; উঁচু অন্তরীপ আর বিশাল বাদামি পাহাড়। এখন প্রায় প্রতি রাতেই তিনি স্বপ্নে সেই উপকূলে ঘুরে বেড়ান। স্বপ্নে তিনি শুনতেন উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন, দেখতেন স্থানীয় নৌকাগুলো সেই ঢেউ ভেঙে তীরের দিকে ভেসে আসছে। ঘুমের মধ্যেই তিনি ডেকের আলকাতরা ও ওকাম (পুরোনো দড়ি)এর গন্ধ পেতেন, আর ভোরের স্থলবাতাসে ভেসে আসা আফ্রিকার মাটির গন্ধও অনুভব করতেন।

সাধারণত স্থলবাতাসের গন্ধ পেলেই তিনি জেগে উঠতেন, পোশাক পরে ছেলেটিকে ডাকতে যেতেন। কিন্তু সেদিন রাতে সেই গন্ধ খুব তাড়াতাড়ি এসেছিল। স্বপ্নের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারলেন, এখনও ওঠার সময় হয়নি। তাই তিনি আবার স্বপ্ন দেখতে লাগলেন— সমুদ্রের বুক থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ১৪ এর শুভ্র শিখরগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর তিনি স্বপ্নে দেখলেন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের নানা বন্দর ও নোঙর ফেলার স্থান।

এখন আর তিনি ঝড়ের স্বপ্ন দেখেন না; না কোনো নারীর, না কোনো মহৎ ঘটনার, না বিশাল মাছের, না লড়াইয়ের, না শক্তির প্রতিযোগিতার, এমনকি তার স্ত্রীরও নয়। এখন তিনি শুধু স্থানগুলোর১৫ আর সমুদ্রসৈকতে খেলতে থাকা সিংহগুলোর স্বপ্ন দেখেন।  গোধূলি বেলায় তারা ছোট বিড়ালছানার মতো খেলত। তিনি তাদের ততটাই ভালোবাসতেন, যতটা ভালোবাসতেন সেই ছেলেটিকে। তবে ছেলেটিকে নিয়ে তিনি কখনো স্বপ্ন দেখতেন না।

হঠাৎ তিনি জেগে উঠলেন। খোলা দরজা দিয়ে চাঁদের দিকে একবার তাকালেন, তারপর গুটিয়ে রাখা প্যান্ট পরে নিলেন। এরপর তিনি বাইরে গিয়ে প্রস্রাব করলেন।

কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে বৃদ্ধটি রাস্তা ধরে ছেলেটিকে জাগাতে গেলেন। ভোরের ঠান্ডায় তিনি কাঁপছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, অল্পক্ষণ পরই শরীর গরম হয়ে যাবে, আর খুব শিগগিরই তিনি নৌকা নিয়ে সমুদ্রে রওনা হবেন।

যে বাড়িতে ছেলেটি থাকত, তার দরজায় তালা ছিল না। বৃদ্ধটি দরজা খুলে খালি পায়ে নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকলেন। প্রথম ঘরের একটি খাটে ছেলেটি ঘুমিয়ে ছিল। অস্তমিতপ্রায় চাঁদের ক্ষীণ আলোয় বৃদ্ধ তাকে স্পষ্ট দেখতে পেলেন। ছেলেটি জেগে উঠে তাঁর দিকে না তাকানো পর্যন্ত তিনি আলতো করে ছেলেটির একটি পা ধরে রাখলেন। ছেলেটি জেগে উঠে তাঁর দিকে তাকাল। বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। ছেলেটি বিছানার পাশে রাখা চেয়ার থেকে নিজের প্যান্টটি নিয়ে বিছানায় বসেই পরে নিল।

বৃদ্ধটি বাইরে বেরিয়ে এলেন, আর ছেলেটিও তাঁর পিছু পিছু বেরিয়ে এল। ছেলেটির তখনও ঘুম ঘুম ভাব। বৃদ্ধ তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন— “তোমাকে কষ্ট দিলাম বলে দুঃখিত।”

ছেলেটি বলল— “ও কিছু নয়। একজন মানুষের যা করা উচিত, সেটাই তো করেছেন।”

তারা রাস্তা ধরে বৃদ্ধের কুঁড়েঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। চারপাশ তখনও অন্ধকার। সেই অন্ধকারে খালি পায়ে অনেক জেলে নিজেদের নৌকার মাস্তুল কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলেছিল।

বৃদ্ধের কুঁড়েঘরে পৌঁছে ছেলেটি গুটিয়ে রাখা ঝুড়িভর্তি মাছ ধরার সুতো, হারপুন আর গ্যাফ তুলে নিল। আর বৃদ্ধ ভাঁজ করা পাল-জড়ানো মাস্তুলটি কাঁধে তুলে নিলেন।

ছেলেটি জিজ্ঞেস করল— “আপনি কি কফি খাবেন?”

বৃদ্ধ বললেন— “আগে জিনিসপত্র নৌকায় রেখে আসি, তারপর কফি খাব।”

তারা ভোরবেলায় জেলেদের জন্য খোলা ছোট্ট এক দোকানে গিয়ে কনডেন্সড মিল্কের খালি টিনের কাপে কফি খেল।

ছেলেটি জিজ্ঞেস করল— “বুড়ো মানুষ, গত রাতে কেমন ঘুম হয়েছে?”

এখন তার ঘুম প্রায় কেটে গেছে, যদিও পুরোপুরি জেগে উঠতে এখনও একটু কষ্ট হচ্ছিল।

বৃদ্ধ বললেন— “খুব ভালো ঘুম হয়েছে, মানোলিন। আজ আমার খুব আত্মবিশ্বাস জেগেছে।”

ছেলেটিও বলল— “আমারও তাই মনে হচ্ছে। এখন আমি আপনার সার্ডিন মাছ, আমার সার্ডিন আর আপনার জন্য টাটকা টোপ নিয়ে আসি।”

বৃদ্ধ সব সময় নিজের সরঞ্জাম নিজেই নিয়ে আসেন। কাউকে কখনও কিছু বহন করতে দিতে চান না। তাই ছেলেটি বলল।

বৃদ্ধ হেসে বললেন— “আমরা দুজন আলাদা। তুমি যখন পাঁচ বছরের ছিলে, তখন থেকেই আমি তোমাকে জিনিসপত্র বহন করতে দিয়েছি।”

ছেলেটি বলল— “আমি জানি। আমি এখনই ফিরে আসছি। আপনি আরেক কাপ কফি পান করুন। এখানে আমাদের জন্য বাকিতে পাওয়া যায়।”

সে খালি পায়ে প্রবালের পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বরফঘরের দিকে চলে গেল, যেখানে মাছের টোপগুলো সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে কফি পান করলেন। সারা দিনে এটাই ছিল তাঁর একমাত্র খাবার, আর তিনি জানতেন এটুকুই তাঁর জন্য যথেষ্ট। অনেক দিন ধরেই খাওয়ার প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ নেই; তাই তিনি কখনও দুপুরের খাবার সঙ্গে নিতেন না। নৌকার সামনের অংশে শুধু এক বোতল পানি রাখা ছিল, আর সারা দিনের জন্য সেটুকুই তাঁর প্রয়োজন ছিল।

ছেলেটি এবার ফিরে এল। তার হাতে ছিল সংবাদপত্রে মোড়ানো সার্ডিন মাছ আর দুটি টোপ। তারা দুজন পায়ের নিচে নুড়িপাথর-মিশ্রিত বালুর স্পর্শ অনুভব করতে করতে সরু পথ ধরে নৌকার দিকে গেল। তারপর দুজনে মিলে ছোট নৌকাটি তুলে পানিতে নামিয়ে দিল।

— “শুভকামনা, বুড়ো মানুষ।”

— “তোমাকেও শুভকামনা,” -বুড়ো বললেন।

তিনি দাঁড়গুলোর দড়ির বাঁধনগুলো থোলে পিনের (দাঁড় রাখার কাঠের খুঁটি) ওপর ঠিকমতো লাগিয়ে দিলেন। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে, বৈঠার জোরে পানি ঠেলে অন্ধকারে বন্দর ছেড়ে সমুদ্রের দিকে নৌকা চালাতে শুরু করলেন। অন্য সৈকত থেকেও অনেক জেলেরা তখন সমুদ্রে বেরিয়ে পড়ছিল। চাঁদ পাহাড়ের আড়ালে ডুবে যাওয়ায় তাদের দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু পানিতে বৈঠা ডোবা-ওঠার শব্দ বুড়োর কানে স্পষ্ট ভেসে আসছিল।

মাঝেমধ্যে কোনো নৌকা থেকে কারও কারও কথা শোনা যাচ্ছিল। তবে বেশিরভাগ নৌকাই ছিল নীরব; তাই শুধু বৈঠার  ছন্দময় শব্দই শোনা যাচ্ছিল। বন্দরের মুখ পেরিয়ে সবাই আলাদা আলাদা দিকে ছড়িয়ে পড়ল। প্রত্যেকে সমুদ্রের সেই অংশের দিকে রওনা হলো, যেখানে তারা মাছ পাওয়ার আশা করছিল।

বুড়ো জানতেন,  তিনি আজ অনেক দূরে যাবে। ধীরে ধীরে স্থলের গন্ধ পিছনে ফেলে তিনি ভোরের নির্মল সমুদ্রের সুগন্ধে প্রবেশ করলেন। নৌকা চালাতে চালাতে তিনি পানির মধ্যে উপসাগরের শৈবালের জ্বলজ্বলে আলোকচ্ছটা দেখতে পেলেন। তিনি সমুদ্রের সেই অংশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যাকে জেলেরা দ্য গ্রেট ওয়েল” বলে। সেখানে হঠাৎ করে সমুদ্রের গভীরতা প্রায় সাতশো ফ্যাদম১৬এ নেমে গেছে। সমুদ্রতলের খাড়া ঢালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে স্রোতের ঘূর্ণির কারণে সেখানে নানা ধরনের মাছ একত্রিত হয়।

সেখানে প্রচুর চিংড়ি ও ছোট টোপমাছ১৭ থাকত। কখনও গভীর গর্তে স্কুইড১৮এর বড় বড় ঝাঁকও দেখা যেত। রাতে তারা পানির উপরিভাগের কাছে উঠে আসত, আর তখন শিকারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো বিভিন্ন মাছ তাদের শিকার করত।

অন্ধকারের মধ্যেই বুড়ো বুঝতে পারছিলেন, সকাল ঘনিয়ে আসছে।বইঠা চালাতে চালাতে তিনি উড়ন্ত মাছের পানির ওপর লাফিয়ে ওঠার কাঁপা কাঁপা শব্দ শুনতে পেলেন। তাদের শক্ত ডানাগুলো বাতাস কেটে উড়ে যাওয়ার সময় শিসের মতো শব্দ হচ্ছিল।

বুড়ো উড়ন্ত মাছকে খুব ভালোবাসতেন। সমুদ্রে তারাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর পাখিদের জন্য তার খুব মায়া হতো— বিশেষ করে ছোট, কোমল, কালচে রঙের টার্ন১৯ পাখিগুলোর জন্য। তারা সারাক্ষণ উড়ে বেড়ায়, খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু খুব কমই কিছু পায়।

তিনি ভাবলেন, ডাকাত পাখি২০আর বড়, শক্তিশালী পাখিদের বাদ দিলে ছোট পাখিদের জীবন মানুষের চেয়েও কঠিন। এত কোমল, এত সুন্দর সামুদ্রিক পাখিদের কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, যখন সমুদ্র এত নিষ্ঠুর হতে পারে? সমুদ্র দয়ালু, আবার অপরূপ সুন্দরও। কিন্তু সে কখন যে হঠাৎ ভীষণ নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, তা কেউ জানে না। ছোট ছোট বিষণ্ন কণ্ঠের সেই পাখিগুলো, যারা ডুব দিয়ে শিকার করে বেড়ায়, তারা যেন এই কঠোর সমুদ্রের জন্য খুবই নরম ও ভঙ্গুর।

বুড়ো সবসময় সমুদ্রকে লা মার”২১ বলে ভাবতেন— যারা সমুদ্রকে ভালোবাসে, তারা স্প্যানিশ ভাষায় সমুদ্রকে এভাবেই ডাকে। যারা সমুদ্রকে ভালোবাসে, কখনও কখনও  তারা সমুদ্র সম্পর্কে খারাপ কথা বলে; কিন্তু সেই কথাগুলো সবসময়ই এমনভাবে বলা হয়, যেন সমুদ্র একজন নারী।কিন্তু তরুণ জেলেরা, যারা ভাসা২২ ব্যবহার করত এবং হাঙরের যকৃত বিক্রি করে অনেক টাকা উপার্জনের পর মোটরচালিত নৌকা কিনেছিল, তারা সমুদ্রকে এল মার” বলত—যা স্প্যানিশ ভাষায় পুংলিঙ্গ। তারা সমুদ্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী, কোনো স্থান, কিংবা কখনও শত্রু হিসেবে দেখত।কিন্তু বুড়োর কাছে সমুদ্র ছিল এক নারী—যিনি কখনও অঢেল আশীর্বাদ দেন, আবার কখনও তা ফিরিয়ে নেন। আর যদি সে কখনও বন্য বা নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, তবে সেটাও যেন তার নিজের ইচ্ছায় নয়;  সে যেন তা এড়াতে পারে না। বুড়ো মনে মনে ভাবলেন, চাঁদ যেমন একজন নারীর ওপর প্রভাব ফেলে, তেমনি সমুদ্রের ওপরও প্রভাব ফেলে।

তিনি সমান ছন্দে বৈঠা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এতে তার কোনো কষ্ট হচ্ছিল না, কারণ তিনি নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই নৌকা চালাচ্ছিলেন। সমুদ্রের পৃষ্ঠ ছিল প্রায় শান্ত; মাঝে মাঝে শুধু স্রোতের ছোট ছোট ঘূর্ণি দেখা যাচ্ছিল। তিনি সমুদ্রের স্রোতকে তাঁর কাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ করে নিতে দিচ্ছিলেন। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে তিনি বুঝতে পারলেন, এই সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দূরে চলে এসেছে।

তিনি মনে মনে ভাবলেন, এক সপ্তাহ ধরে আমি গভীর জলে মাছ ধরেছি, কিন্তু কিছুই পাইনি। আজ আমি সেখানে যাব, যেখানে বনিটো২৩ আর আলবাকোর২৪ এর ঝাঁক থাকে। হয়তো তাদের সঙ্গে কোনো বিশাল মাছও থাকবে। ভোর পুরোপুরি ফোটার আগেই তিনি চারটি টোপ পানিতে নামিয়ে স্রোতের সঙ্গে ধীরে ধীরে ভেসে চললেন। একটি টোপ ছিল চল্লিশ ফ্যাদম গভীরে, দ্বিতীয়টি পঁচাত্তর ফ্যাদমে, আর তৃতীয় ও চতুর্থটি নীল সমুদ্রের একশো এবং একশো পঁচিশ ফ্যাদম গভীরে ঝুলছিল।

প্রতিটি টোপের মাথা নিচের দিকে ঝুলছিল। বড়শির দণ্ডটি টোপ মাছের শরীরের ভেতরে ঢুকিয়ে শক্ত করে সুতো দিয়ে সেলাই করে বাঁধা ছিল। বড়শির বাঁকানো অংশ ও তীক্ষ্ণ ফলা পুরোপুরি টাটকা সার্ডিন মাছ দিয়ে ঢাকা ছিল। প্রতিটি সার্ডিনকে দুই চোখের মাঝখান দিয়ে গেঁথে এমনভাবে লাগানো হয়েছিল, সেগুলো যেন বড়শির ইস্পাতের বেরিয়ে থাকা অংশে অর্ধেক মালার মতো সাজানো ছিলো। বড় কোনো মাছ যাতে বড়শির কোনো অংশ স্পর্শ করেও সন্দেহ না করে, সেজন্য বড়শির কোথাও এমন কিছু খোলা ছিল না, যা সুগন্ধি ও সুস্বাদু টোপে ঢাকা নয়।

ছেলেটি তাঁকে দুটি টাটকা ছোট টুনা, অর্থাৎ আলবাকোর, দিয়েছিল। সেগুলো সবচেয়ে গভীর দুইটি লাইনে ভারের মতো ঝুলছিল। অন্য দুই লাইন২৫এ ছিল একটি বড় নীল ব্লু রানার এবং একটি ইয়েলো জ্যাক। এগুলো আগেও ব্যবহার করা হয়েছিল, তবু তখনও ভালো অবস্থায় ছিল। তার ওপর টাটকা সার্ডিনের গন্ধ তাদের আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

প্রতিটি লাইন(মাছ ধরার সুতা (বড়শির দড়ি) বোঝানো হয়েছে।) ছিল মোটা পেন্সিলের সমান পুরু। সেগুলো সদ্য কাটা সবুজ রসযুক্ত কাঠির সঙ্গে এমনভাবে বাঁধা ছিল যে, টোপে সামান্য টান বা স্পর্শ লাগলেই কাঠিটি নিচের দিকে নুয়ে পড়বে। প্রতিটি লাইনের সঙ্গে চল্লিশ ফ্যাদম করে দুটি অতিরিক্ত পাকানো দড়ি বাঁধা ছিল। প্রয়োজনে সেগুলো আরও অতিরিক্ত দড়ি (সুতো)র সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যাবে, যাতে কোনো বড় মাছ তিনশো ফ্যাদমেরও বেশি লম্বা দড়ি টেনে নিয়ে যেতে পারে।

বৃদ্ধ লোকটি তখন নৌকার পাশে থাকা তিনটি কাঠির নড়াচড়ার দিকে সতর্ক নজর রাখছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ধীরে ধীরে বৈঠা চালাচ্ছিলেন, যাতে লাইনগুলো(সুতোগুলো)একেবারে সোজা নিচের দিকে এবং ঠিক নির্ধারিত গভীরতায় পৌঁছে থাকে। চারদিকে তখন বেশ আলো হয়ে এসেছে। যে কোনো মুহূর্তে সূর্য উদয় হবে।

সমুদ্রের বুক থেকে মৃদুভাবে সূর্য উদয় হল। বৃদ্ধ দেখতে পেলেন, অন্য নৌকাগুলো, পানিতে অনেক নিচু হয়ে ভাসছিল এবং তীরের বেশ কাছাকাছি ছিল। সেগুলো স্রোতের টানে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ পর সূর্যের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে সমুদ্রের জলে ঝলসে উঠল। যখন সূর্য পুরোপুরি ওপরে উঠল, তখন সমুদ্রের সমতল জলে সেই আলো এমন তীব্রভাবে প্রতিফলিত হলো যে তাঁর চোখে লেগে চোখ ব্যথা করতে লাগল। তাই তিনি সামনে না তাকিয়ে বইঠা চালাতে লাগলেন। তিনি নিচের পানির দিকে তাকিয়ে সেই লাইনগুলো দেখছিলেন, যেগুলো গভীরতার অন্ধকারের দিকে সোজা নেমে গেছে। তিনি অন্য যে কোনো জেলের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে লাইনগুলো সোজা রাখতেন, যাতে প্রতিটি টোপ জলের নির্দিষ্ট গভীরতায় ঠিক যেখানে তিনি চান, সেখানেই অপেক্ষা করে ঝোলে থাকে। অন্য জেলেরা স্রোতের সঙ্গে লাইন(সুতো) ভাসতে দিত। ফলে তারা ভাবত সুতোগুলো একশো ফ্যাদম গভীরে আছে, অথচ তা হয়তো মাত্র ষাট ফ্যাদম গভীরে থাকত।

কিন্তু আমি সবকিছু নিখুঁতভাবে করি, তিনি ভাবলেন। শুধু ভাগ্যটাই এখন আর আমার সঙ্গে নেই। তবে কে জানে? হয়তো আজই ভাগ্য ফিরবে। প্রতিটি দিনই একটি নতুন দিন। ভাগ্যবান হওয়া ভালো, কিন্তু আমি বরং নিখুঁত হতে চাই। কারণ ভাগ্য যখন প্রসন্ন হবে, তখন আমি প্রস্তুত হয়ে থাকব।

এখন সূর্য আরও দুই ঘণ্টা ওপরে উঠেছে। পূর্বদিকে তাকালে চোখে তেমন আর কষ্ট হচ্ছিল না। এখন দূরে মাত্র তিনটি নৌকা দেখা যাচ্ছে, সেগুলোও তীরের খুব কাছে।

সারা জীবন ভোরের সূর্য আমার চোখে কষ্ট দিয়েছে, তিনি ভাবলেন। তবু আমার চোখ এখনও ভালো আছে। সন্ধ্যাবেলায় আমি সূর্যের দিকে সরাসরি তাকাতে পারি, চোখে অন্ধকার নামে না, যদিও সন্ধ্যার সূর্যের শক্তি আরও বেশিকিন্তু সকালের সূর্যই বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

ঠিক তখনই সে সামনের আকাশে লম্বা কালো ডানা মেলে চক্কর দিতে থাকা একটি ম্যান-অফ-ওয়ার পাখি দেখতে পেল। হঠাৎ পাখিটি তার ডানাগুলো পেছনের দিকে প্রসারিত করে তির্যকভাবে নিচের দিকে দ্রুত ঝাঁপ দিল, তারপর আবার আকাশে চক্কর দিতে শুরু করল।

“ও কিছু একটা পেয়েছে,” বৃদ্ধ লোকটি জোরে বললেন।-“সে শুধু শুধুই এদিক-ওদিক তাকিয়ে বেড়াচ্ছে না।”

তিনি ধীরে ধীরে এবং স্থিরভাবে সেই জায়গার দিকে নৌকা বেয়ে এগিয়ে গেলেন, যেখানে পাখিটি চক্কর কাটছিল। তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করলেন না এবং তাঁর মাছ ধরার সুতোগুলো একেবারে সোজা, উলম্বভাবে পানির নিচে রাখলেন। তবে তিনি স্রোতের সঙ্গে একটু দ্রুত এগোলেন, যাতে পাখিটিকে অনুসরণ করে সঠিকভাবে মাছ ধরা চালিয়ে যেতে পারেন।

পাখিটি আরও উঁচুতে উঠে আবার বৃত্তাকারে ঘুরতে লাগল; তার ডানাগুলো একেবারে স্থির ছিল। তারপর হঠাৎ সে নিচের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তখন বৃদ্ধ দেখলেন, উড়ন্ত মাছগুলো পানি থেকে ছিটকে উঠে মরিয়া হয়ে সমুদ্রের পৃষ্ঠের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে।

 “ডলফিন,” বৃদ্ধ লোকটি জোরে বললেন। “বড় ডলফিন।”

তিনি বৈঠা গুটিয়ে রেখে নৌকার সামনের অংশের নিচ থেকে একটি ছোট মাছ ধরার সুতো বের করলেন। তাতে তারের লিডার২৬ এবং মাঝারি আকারের একটি বড়শি লাগানো ছিল। তিনি একটি সার্ডিন মাছ টোপ হিসেবে গেঁথে সেটি নৌকার পাশ দিয়ে পানিতে নামিয়ে দিলেন এবং নৌকার পেছনের একটি লোহার বল্টুর সঙ্গে বেঁধে রাখলেন। এরপর আরেকটি সুতোতেও টোপ লাগিয়ে তিনি সেটি নৌকার সামনের ছায়ায় গুটিয়ে রেখে দিলেন। তারপর আবার বৈঠা বাওয়া শুরু করলেন এবং দীর্ঘ ডানাওয়ালা কালো পাখিটির দিকে নজর রাখতে লাগলেন, যা তখন পানির খুব কাছাকাছি দিয়ে উড়ছিল।

তিনি দেখলেন, পাখিটি আবার ডানা সঙ্কুচিত করে পানির দিকে ঝাঁপ দিল। তারপর উড়ন্ত মাছের পেছনে ছুটতে গিয়ে ব্যর্থভাবে ডানা ঝাঁপটাতে লাগল। বৃদ্ধ লোকটি পানির ওপরে হালকা ফুলে ওঠা অংশ দেখতে পেলেন, যা বড় ডলফিনগুলোর তাড়া করার ফলে তৈরি হয়েছিল। ডলফিনগুলো উড়ন্ত মাছের নিচ দিয়ে দ্রুত পানির মধ্যে ছুটে চলছিল এবং মাছগুলো যখন আবার পানিতে আছড়ে পড়ছিল, তখনই সেগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল।

এটা ডলফিনের একটা বড় ঝাঁক, তিনি মনে মনে ভাবলেন। ওরা অনেকটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তাই উড়ন্ত মাছগুলোর বাঁচার সুযোগ খুবই কম। পাখিটিরও কোনো সুযোগ নেই। উড়ন্ত মাছগুলো তার জন্য খুব বড় এবং খুব দ্রুত ছিল

তিনি বারবার উড়ন্ত মাছগুলোকে পানির ওপরে উঠে উড়ে যেতে দেখলেন এবং পাখিটির ব্যর্থ চেষ্টা লক্ষ্য করলেন।

ওই মাছের ঝাঁকটা আমার নাগালের বাইরে চলে গেল, তিনি ভাবলেন। ওরা খুব দ্রুত এবং অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। তবে হয়তো কোনো বিচ্ছিন্ন মাছ আমার হাতে পড়বে। আর হয়তো আমার সেই বড় মাছটি ওদের আশেপাশেই আছে। আমার বড় মাছটা নিশ্চয় কোথাও কাছেই রয়েছে।

এখন স্থলভাগের ওপরের মেঘগুলো পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে উঠেছে। উপকূলরেখা শুধু একটি দীর্ঘ সবুজ রেখার মতো দেখা যাচ্ছে, যার পেছনে ছিল ধূসর-নীল পাহাড়। সমুদ্রের জল এখন গাঢ় নীল— জল এতটাই গাঢ় যে প্রায় বেগুনি বলে মনে হচ্ছিল। নিচের দিকে তাকিয়ে তিনি গাঢ় জলের মধ্যে লাল রঙের ভেসে থাকা প্ল্যাঙ্কটন২৭ এবং সূর্যের আলোয় তৈরি হওয়া অদ্ভুত ঝলক দেখতে পেলেন।

তিনি তাঁর মাছ ধরার সুতোগুলোর দিকে তাকালেন। সেগুলো একেবারে সোজা হয়ে গভীর পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে রয়েছে। এত বেশি প্ল্যাঙ্কটন দেখে তিনি খুশি হলেন, কারণ এর অর্থ সেখানে মাছ আছে। সূর্য যখন আরও উপরে উঠল, তখন পানির মধ্যে সূর্যের তৈরি সেই অদ্ভুত আলোর ঝলকানি ভালো আবহাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। আর স্থলভাগের ওপর ভেসে থাকা মেঘগুলোর আকৃতিও একই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু পাখিটি তখন প্রায় চোখের আড়ালে চলে গেছে। পানির ওপরে শুধু সূর্যের তাপে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া হলুদ ভাসমান বাদামি সামুদ্রিক শৈবালের কিছু অংশ এবং নৌকার পাশ দিয়ে ভেসে চলা বেগুনি রঙের, চকচকে, জেলির মতো পর্তুগিজ ম্যান-অব-ওয়ার২৮ দেখা যাচ্ছিল। সেগুলো একবার কাত হয়ে যাচ্ছিল, আবার সোজা হয়ে ভেসে উঠছিল। সেগুলো বুদবুদের মতো আনন্দে ভেসে চলছিল, আর তার পেছনে প্রায় এক গজ লম্বা বিষাক্ত বেগুনি সূতাগুলো পানির মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

আগুয়া মালা২৯  বৃদ্ধ লোকটি বললেন। “তুই এক হারামজাদি।”

বৈঠার সঙ্গে হালকাভাবে দুলতে দুলতে তিনি পানির নিচের দিকে তাকালেন এবং দেখলেন সমুদ্রের ভাসমান বিষাক্ত প্রাণীটির চারপাশে ছোট ছোট মাছগুলো সাঁতার কাটছে। প্রাণীটি তার ঝুলন্ত সূক্ষ্ম সুতোসদৃশ শুঁড়গুলোর মতোই রঙিন ছিল এবং তার নিচে বুদবুদের তৈরি ভাসমান ছোট্ট ছায়ার ভেতর দিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, তারা তাদের নিজের বিষে আক্রান্ত হতো না। কিন্তু মানুষ সে বিষ থেকে রেহাই পেত না। মাছ ধরার সময় যদি সেই বেগুনি, পিচ্ছিল শুঁড়ের কোনো অংশ দড়িতে জড়িয়ে বুড়ো মানুষের হাত বা বাহুতে লেগে যেত, তবে সেখানে বিষাক্ত লতা বা বিষাক্ত ওক গাছের সংস্পর্শে যেমন ফোস্কা ও ঘা হয়, তেমনই ক্ষত তৈরি হতো। ‘আগুয়া মালা’র এই বিষ খুব দ্রুত কাজ করে এবং চাবুকের আঘাতের মতো তীব্র যন্ত্রণা দেয়।

রংধনুর মতো ঝলমলে সেই বুদবুদগুলো দেখতে ছিল অপূর্ব সুন্দর। কিন্তু সমুদ্রে তাদের মতো প্রতারক আর কিছু ছিল না। বুড়ো মানুষটি খুব আনন্দ পেত যখন বিশাল সামুদ্রিক কচ্ছপগুলো সেগুলো খেয়ে ফেলত। কচ্ছপগুলো সামনে থেকে এগিয়ে আসত, তারপর চোখ বন্ধ করে শক্ত খোলসের আড়ালে নিজেদের নিরাপদে রেখে শুঁড়সহ পুরো প্রাণীটিকেই গিলে ফেলত। ঝড়ের পর সৈকতে ভেসে আসা এসব প্রাণীর ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতেও বৃদ্ধের ভালো লাগত। তার শক্ত পায়ের তলায় চাপা পড়ে যখন তারা ‘পপ’ শব্দ করে ফেটে যেত, সেই শব্দও তিনি উপভোগ করতেন।

সবুজ কচ্ছপ এবং হকসবিল(Hawk-billsবলতে Hawksbill sea turtleকে বোঝায়।) কচ্ছপকে তিনি খুব ভালোবাসতেন—তাদের সৌন্দর্য, দ্রুতগতি এবং মূল্যবান খোলসের জন্য। আর বিশালাকার, ধীরবুদ্ধি লগারহেড কচ্ছপদের তিনি এক ধরনের স্নেহমিশ্রিত অবজ্ঞার চোখে দেখতেন। তাদের হলদে বর্ম, অদ্ভুত মিলনপ্রক্রিয়া এবং চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে পর্তুগিজ ম্যান-অব-ওয়ার খাওয়ার অভ্যাস তাঁকে বিস্মিত করত।

অনেক বছর কচ্ছপ শিকারের নৌকায় কাজ করলেও কচ্ছপ নিয়ে তিনি কোনো অলৌকিক বা রহস্যময় বিশ্বাসে আস্থা রাখতেন না। তবু তিনি সব কচ্ছপের জন্যই দুঃখ অনুভব করতেন— এমনকি সেই বিশাল ট্রাঙ্কব্যাক কচ্ছপগুলোর জন্যও, যাদের দৈর্ঘ্য ছিল তার নৌকার সমান এবং ওজন প্রায় এক টন। অধিকাংশ মানুষ কচ্ছপের প্রতি নির্মম, কারণ কেটে টুকরো টুকরো করার পরও তাদের হৃদপিণ্ড ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্পন্দিত হতে থাকে। কিন্তু বুড়ো মানুষটি ভাবতেন, ‘আমারও তো ঠিক তেমনই একটি হৃদয় আছে, আর আমার হাত-পাওও যেন তাদের মতোই।’

নিজেকে শক্তিশালী রাখার জন্য তিনি কচ্ছপের সাদা ডিম খেতেন। মে’ মাসজুড়ে তিনি নিয়মিত সেই ডিম খেতেন, যাতে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বড় বড় মাছ ধরার সময় তাঁর শরীরে যথেষ্ট শক্তি থাকে।

এ ছাড়াও প্রতিদিন তিনি তাঁদের কুঁড়েঘরের বড় ড্রাম থেকে এক কাপ করে হাঙরের যকৃতের তেল পান করতেন। সেখানে বহু জেলে তাদের মাছ ধরার সরঞ্জাম রাখত, আর যে কেউ চাইলে সেই তেল খেতে পারত। বেশির ভাগ জেলেই এর স্বাদ অপছন্দ করত। কিন্তু বুড়ো মানুষের কাছে ভোরবেলায় ঘুম থেকে ওঠার কষ্টের চেয়ে এর স্বাদ মোটেও খারাপ ছিল না। বরং তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই তেল সর্দি-কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে রক্ষা করে এবং চোখের জন্যও খুব উপকারী।

এ সময় বুড়ো মানুষটি মাথা তুলে দেখলেন, পাখিটি আবার আকাশে চক্কর কাটছে।

তিনি উচ্চস্বরে বললেন- “ও মাছ খুঁজে পেয়েছে।”

সমুদ্রের ওপর কোথাও কোনো উড়ন্ত মাছ লাফিয়ে উঠছিল না, ছুটে পালানোর মতো টোপ মাছও দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু তিনি তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটি ছোট টুনা মাছ হঠাৎ পানির ওপর উঠে এল এবং বাতাসে একবার উল্টে ডিগবাজি খেয়ে মাথা তলমুখ করে পানিতে ডুব দিল। সূর্যের আলোয় তার রুপালি দেহ ঝলমল করে উঠল। তারপর একটির পর একটি টুনা মাছ পানির ওপর লাফিয়ে উঠতে লাগল। তারা চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছিল, ফেনা তুলে পানিকে সাদা করে তুলছিল এবং দীর্ঘ লাফ দিয়ে টোপ মাছের পেছনে ধাওয়া করছিল। তারা টোপ মাছগুলোকে ঘিরে ফেলেছিল এবং একসঙ্গে তাড়া করছিল।

বুড়ো মানুষটি মনে মনে ভাবলেন, “ওরা যদি খুব দ্রুত সরে না যায়, তবে আমি নিশ্চয়ই ওদের নাগাল পাব।”

তিনি দেখলেন, মাছের ঝাঁক পানিকে সাদা ফেনায় ভরে ফেলেছে, আর পানির ওপর আতঙ্কে উঠে আসা টোপ মাছগুলোর ওপড় পাখিটি বারবার ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

বুড়ো মানুষটি বললেন- “পাখিটা আমাকে মাছের অবস্থান খুঁজে পেতে অনেক সাহায্য করছে। ঠিক তখনই তার পায়ের নিচে রাখা পেছনের সুতোটি হঠাৎ টানটান হয়ে গেল। তিনি দাঁড় দুটো নামিয়ে রাখলেন এবং সুতোটি শক্ত করে ধরে ছোট টুনা মাছটির কাঁপা কাঁপা টান দেওয়ার ভার অনুভব করলেন। তারপর তিনি ধীরে ধীরে সেটিকে টেনে তুলতে শুরু করলেন। যতই টানছিলেন, মাছটির কাঁপুনি ততই বাড়ছিল। কিছুক্ষণ পর তিনি পানির ভেতর মাছটির নীলচে পিঠ আর সোনালি পাশ দেখতে পেলেন। তারপর এক ঝটকায় মাছটিকে টেনে নৌকার ভেতরে তুলে আনলেন।

মাছটি নৌকার পেছনের অংশে রোদের মধ্যে পড়ে ছিল—গড়নে ছিল শক্তপোক্ত ও গুলির মতো সরু-লম্বা। তার বুদ্ধিহীন বড় চোখ দুটি স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল। আর সে যখন প্রাণপণে ছটফট করছিল, তখন তার ছোট, দ্রুতগতিসম্পন্ন লেজের দ্রুত কাঁপুনি নৌকার তক্তার ওপর বারবার আঘাত করছিল এবং আঘাত করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিল। বৃদ্ধ লোকটি দয়া করে তার মাথায় একটি আঘাত করলেন, তারপরও যখন তার দেহ কাঁপছিল, তখন তাকে লাথি মেরে নৌকার পেছনের ছায়ার নিচে ঠেলে দিলেন।

“আলবাকোর,(অ্যালবাকোর) হলো টুনা (tuna) জাতীয় এক ধরনের সামুদ্রিক মাছ) তিনি জোরে বললেন।-“এটা দারুণ টোপ হবে। অন্তত দশ পাউন্ড ওজন হবে।”

তিনি মনে করতে পারলেন না, একা থাকলে কবে থেকে নিজে নিজে জোরে কথা বলা শুরু করেছে। অনেক আগে, যখন তিনি একা থাকতেন, তখন তিনি গান গাইতেন। কখনও কখনও রাতের বেলায় যখন মাছ ধরার নৌকা বা কচ্ছপ ধরার নৌকায় একা পালা করে হাল ধরতেন, তখনও গান গাইতেন। সম্ভবত ছেলেটি তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই তিনি একা একা কথা বলতে শুরু করেছেন। কিন্তু তাঁর তা মনে ছিল না। যখন তিনি আর ছেলেটি একসঙ্গে মাছ ধরতেন, তখন খুব প্রয়োজন না হলে তারা কথা বলতেন না। তাঁরা কথা বলতেন রাতে, অথবা খারাপ আবহাওয়ায় সমুদ্রে আটকা পড়লে। সমুদ্রে অপ্রয়োজনীয় কথা না বলাকে সবাই একটি গুণ বলে মনে করে। বৃদ্ধও সবসময় তাই বিশ্বাস করতেন এবং সেই নিয়মকে সম্মান করতেন। কিন্তু এখন তিনি প্রায়ই নিজের চিন্তাগুলো উচ্চস্বরে বলে ফেলছেন, কারণ সেগুলো শুনে বিরক্ত হওয়ার মতো সেখানে আর কেউ ছিল না।

তিনি জোরে বললেন- “অন্যরা যদি আমাকে এভাবে একা একা কথা বলতে শুনত, তাহলে নিশ্চয়ই ভাবত আমি পাগল হয়েছি। কিন্তু আমি তো পাগল নই, তাই আমি এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। আর ধনী জেলেদের নৌকায় তো রেডিও আছে— সেটাই তাদের সঙ্গে কথা বলে, আর বেসবলের খবরও শোনায়।”

এখন বেসবল নিয়ে ভাবার সময় নয়, তিনি মনে মনে বললেন। এখন শুধু একটি বিষয় নিয়ে ভাবার সময়— যে কাজের জন্য আমার জন্ম হয়েছে। ওই মাছের ঝাঁকের আশেপাশে হয়তো কোনো বিশাল মাছ আছে। আমি তো শুধু আলবাকোরের ঝাঁক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া একটি মাছ ধরেছি। কিন্তু ওরা অনেক দূরে, খুব দ্রুত সাঁতরে চলেছে। আজ সমুদ্রের উপরিভাগে যা কিছু দেখা যাচ্ছে, সবই খুব দ্রুত উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা কি দিনের সময়ের প্রভাব? নাকি এমন কোনো আবহাওয়ার লক্ষণ, যা আমি এখনও বুঝতে পারনি?

এখন আর তিনি তীরের সবুজ রেখা দেখতে পাচ্ছিলেন না। কেবল দূরের নীল পাহাড়গুলো চূড়া দেখা যাচ্ছিল, যেগুলো এমন সাদা দেখাচ্ছিল যেন বরফে ঢাকা। তাদের ওপরের মেঘগুলোও যেন তুষারে আচ্ছাদিত উঁচু পর্বতের মতো মনে হচ্ছিল। সমুদ্র ছিল গাঢ় নীল। সূর্যের আলো জলের মধ্যে অসংখ্য বর্ণচ্ছটার সৃষ্টি করছিল। মধ্যাহ্নের তীব্র সূর্যের আলোয় প্ল্যাঙ্কটনের অগণিত ক্ষুদ্র ঝিলিক আর তখন চোখে পড়ছিল না। এখন বৃদ্ধ শুধু গভীর নীল জলের বিশাল আলোকচ্ছটা আর তার মাছ ধরার সুতোগুলোকে দেখতে পাচ্ছিলেন, যেগুলো একেবারে সোজা নেমে গেছে প্রায় এক মাইল গভীর জলের দিকে।

জেলেরা এই গোত্রের সব মাছকেই সাধারণভাবে ‘টুনা’ বলত। বিক্রি করার সময় বা টোপের বিনিময়ে লেনদেনের সময়ই তারা প্রতিটি মাছকে তার নির্দিষ্ট নামে আলাদা করে চিনাক্ত করত। এখন সেই টুনাগুলো আবার গভীরে জলে নেমে গেছে। সূর্য তখন বেশ তপ্ত। বৃদ্ধ তাঁর ঘাড়ের পেছনে রোদের উত্তাপ অনুভব করছিলেন, আর বৈঠা চালাতে চালাতে তাঁর পিঠ বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল।

আমি চাইলে শুধু স্রোতের ভরসায় ভেসে থাকতে পারি, একটু ঘুমিয়েও নিতে পারি। পায়ের বুড়ো আঙুলে সুতো বেঁধে রাখব, টান লাগলেই ঘুম ভেঙে যাবে—তিনি ভাবলেন। কিন্তু আজ তো পঁচাশি দিন। আজ আমাকে ভালো করেই মাছ ধরতে হবে।

ঠিক তখনই নিজের মাছ ধরার সুতোগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিনি দেখলেন, সবুজ রঙের একটি সরু দণ্ড হঠাৎ তীব্রভাবে নিচের দিকে ঝুঁকে গেল।

“হ্যাঁ,” তিনি বললেন। “হ্যাঁ।” তিনি কোনো রকম শব্দ না করে বৈঠা নৌকার ভেতরে তুলে রাখলেন। তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মধ্যে আলতো করে মাছ ধরার সুতোটি ধরে রাখলেন। তিনি কোনো টান বা ওজন অনুভব করলেন না। তাই তিনি সুতোটি খুব হালকাভাবে ধরে রইলেন। কিছুক্ষণ পর আবার টান লাগল। এবারও টানটি ছিল সতর্ক ও পরীক্ষামূলক—খুব জোরালো বা ভারী নয়। আর তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলেন, কী ঘটছে। একশো ফ্যাদম গভীরে একটি মার্লিন মাছ সেই সার্ডিন মাছগুলো খাচ্ছে, যেগুলো দিয়ে বড়শির অগ্রভাগ ও বাঁট ঢেকে রাখা হয়েছে।

ছোট টুনা মাছটির মাথা ভেদ করে হাতে তৈরি বঁড়শির দণ্ডের অংশটি বাইরে বেরিয়ে ছিল।”

বৃদ্ধ খুব সতর্কভাবে ও কোমল হাতে সুতোটি ধরে রাখলেন। তারপর বাঁ হাত দিয়ে ধীরে ধীরে সেটিকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থা থেকে খুলে দিলেন। এখন তিনি আঙুলের ফাঁক দিয়ে সুতো ছেড়ে দিতে পারবেন, অথচ মাছটি কোনো টান অনুভব করবে না।

‘সমুদ্রের পার এত দূরে, বছরের এই সময়ে, নিশ্চয়ই মাছটা বিশাল,’ তিনি মনে মনে ভাবলেন। ‘খাও, মাছ। খাও। অনুগ্রহ করে খাও।’

 ‘দেখো, টোপগুলো কত টাটকা! আর তুমি নিচে, ছয়শো ফুট গভীরের সেই ঠান্ডা, অন্ধকার জলে আছ। অন্ধকারে আর একবার ঘুরে এসো, তারপর ফিরে এসে এগুলো খেয়ে নাও।’তিনি অনুভব করলেন, খুব হালকা, কোমল একটি টান। তারপর একটু জোরালো টান লাগল—সম্ভবত সার্ডিন মাছটির মাথা বড়শি থেকে ছিঁড়ে নিতে একটু কষ্ট হচ্ছিল। তারপর আবার সব নিস্তব্ধ।

বৃদ্ধ জোরে বললেন, “এসো। আর একবার ঘুরে যাও। শুধু গন্ধটা নাও। কত সুন্দর গন্ধ, তাই না? এবার ভালো করে খেয়ে নাও। তারপর আছে টুনা মাছ—কঠিন, ঠান্ডা, আর দারুণ সুস্বাদু। লজ্জা কোরো না, মাছ। খেয়ে ফেলো।”

তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মাঝখানে সুতো ধরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। একই সঙ্গে অন্য সুতোগুলোর দিকেও নজর রাখলেন, কারণ মাছটি ওপরে বা নিচে সরে যেতে পারে। কিছুক্ষণ পর আবার সেই একই কোমল টান অনুভূত হলো।

“ও নেবে,” বৃদ্ধ উচ্চস্বরে বললেন। “ঈশ্বর, ওকে টোপটা নিতে সাহায্য করুন।”

কিন্তু সে নিল না। সে সরে গেল, এবং বৃদ্ধ আর কিছুই অনুভব করলেন না।

“সে চলে যেতে পারে না,” তিনি বললেন। “খ্রিস্ট জানেন, সে যেতে পারে না। ও শুধু ঘুরছে।হয়তো এর আগে কোনোদিন বড়শিতে ধরা পড়েছিল, তাই কিছুটা মনে আছে।”

তারপর আবার তিনি সুতোর ওপর সেই কোমল স্পর্শ অনুভব করলেন, আর তাঁর মন আনন্দে ভরে উঠল।

“ও শুধু ঘুরে এসেছে,” তিনি বললেন। “এবার ও নেবেই।”

সেই মৃদু টান অনুভব করে তিনি খুশি হলেন। তারপর হঠাৎ তিনি এমন এক ভার অনুভব করলেন, যা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের ভারী। সেটাই ছিল মাছটির ওজন। তিনি সুতো ছেড়ে দিতে লাগলেন—নিচে, আরও নিচে, আরও নিচে। অতিরিক্ত মজুত রাখা দুই পাক সুতোর প্রথম কুণ্ডলী ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল। সুতো যখন তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে অনায়াসে পিছলে নামছিল, তখনও তিনি সেই বিরাট ওজন স্পষ্টভাবে অনুভব করছিলেন, যদিও তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি আর তর্জনীর চাপ প্রায় অনুভবই করা যাচ্ছিল না।

“কী বিশাল মাছ!” তিনি বললেন। -“এখন ও টোপটাকে মুখের ভেতর আড়াআড়িভাবে ধরে রেখেছে এবং ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।”

‘এবার ও ঘুরবে, তারপর পুরোটা গিলে ফেলবে,’ তিনি মনে মনে ভাবলেন।

কিন্তু তিনি কথাটা মুখে বললেন না। কারণ তিনি জানতেন, ভালো কিছু মুখে বললে অনেক সময় তা আর ঘটে না। তিনি বুঝতে পারছিলেন মাছটি কত বড়। তাঁর কল্পনায় ভেসে উঠল— অন্ধকার গভীর জলের মধ্যে টুনা মাছটিকে মুখে আড়াআড়িভাবে ধরে সে দূরে সরে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই তিনি অনুভব করলেন, মাছটি আর এগোচ্ছে না, কিন্তু তার ওজন তখনও রয়ে গেছে। এরপর ওজন আরও বেড়ে গেল। তিনি আরও কিছু সুতো ছেড়ে দিলেন। এক মুহূর্তের জন্য তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর চাপ একটু বাড়ালেন, আর সঙ্গে সঙ্গে ওজন আরও বেড়ে গেল এবং সুতো একেবারে সোজা নিচের দিকে নামতে লাগল।

 “ও টোপটা নিয়েছে,” তিনি বললেন। “এখন আমি ওকে ভালো করে খেতে দেব।”

তিনি আঙুলের ফাঁক দিয়ে সুতো পিছলে যেতে দিলেন। একই সঙ্গে বাঁ হাত বাড়িয়ে অতিরিক্ত রাখা দুই পাক সুতোর খোলা প্রান্তটিকে পরের সুতোর দুই পাক কুণ্ডলীর ফাঁসের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দিলেন। এখন তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তাঁর কাছে এখন অতিরিক্ত হিসেবে চল্লিশ ফ্যাদম দৈর্ঘ্যের তিনটি সুতোর কুণ্ডলী মজুত রয়েছে এবং তিনি যে কুণ্ডলী পাকানো দড়িটি ব্যবহার করছিলেন সেটিও প্রস্তুত রাখলেন।

“আরও একটু খাও,” তিনি বললেন। “ভালো করে খাও।”

খাও, যাতে বঁড়শির ফলাটা তোমার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধে তোমাকে মেরে ফেলে,-তিনি মনে মনে ভাবলেন। ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এসো, যাতে আমি হারপুন দিয়ে তোমাকে বিদ্ধ করতে পারি। ঠিক আছে, তুমি কি প্রস্তুত, তুমি কি অনেকক্ষণ ধরে খাওয়ার টেবিলে বসে আছ?”

“এবার!” তিনি উচ্চস্বরে বলে উঠলেন। দুই হাতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তিনি বঁড়শির সূতোয় জোরে টান দিলেন। এক গজের মতো সূতো টেনে নিয়ে আবার টান দিলেন, তারপর বারবার। কখনো ডান, কখনো বাঁ হাত দিয়ে পালাক্রমে সুতো টানতে লাগলেন; তিনি হাতের সমস্ত শক্তি আর শরীরের ওজনকে কাজে লাগালেন।

কিন্তু কিছুই হলো না। মাছটি শুধু ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে চলল। বৃদ্ধ তাকে এক ইঞ্চিও ওপরে তুলতে পারলেন না।তাঁর সুতো ছিল খুবই মজবুত, বড় মাছ ধরার জন্যই তৈরি। তিনি সূতোটি পিঠে ঠেকিয়ে মাছটির টান সামলাচ্ছেন। সুতোটি এত বেশি টানটান হয়ে গেল যে, তার ওপর লেগে থাকা সমুদ্রের পানির ছোট ছোট ফোঁটা টানের কম্পনের কারণে ছিটকে উঠছে। কিছুক্ষণ পর সূতোটি পানির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে হিস্-হিস্ শব্দ করতে লাগল। তবুও তিনি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, নৌকার আড়াআড়ি কাঠে ভর দিয়ে শরীর পেছনে হেলিয়ে টান সামলাতে লাগলেন।

মাছটি ধীরে ধীরে ছোট নৌকাটি উত্তর-পশ্চিম দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল।

মাছটি অবিরাম গতিতে এগিয়ে চলল, আর শান্ত সমুদ্রের ওপর দিয়ে নৌকাটিও ধীরে ধীরে তার পিছু নিল। অন্য টোপগুলো তখনও পানিতে ছিল, কিন্তু সেগুলো নিয়ে কিছু করার উপায় ছিল না তখন।

“আহা, ছেলেটা যদি সঙ্গে থাকত!” বৃদ্ধ উচ্চস্বরে বললেন। আমি একটি মাছের টানে ভেসে চলেছি, আর “আমি যেন নৌকার টানার খুঁটি৩০হয়ে গেছি।“ চাইলে সূতোটি নৌকায় বেঁধে দিতে পারতাম। কিন্তু তাহলে সে সুতোটি ছিঁড়ে ফেলতে পারে। যতক্ষণ পারি, আমাকে নিজের হাতেই ধরে রাখতে হবে, আর যখন তার দরকার হবে তখন তাকে সুতো ছেড়ে দিতে হবে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, সে নিচের দিকে ডুবছে না, শুধু সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।”

যদি সে হঠাৎ গভীরে নেমে যায়, তখন আমি কী করব জানি না। যদি গভীরে গিয়ে মারা যায়, তবুও কী করব জানি না। তবে কিছু একটা করবই। করার মতো অনেক কিছুই আছে।

তিনি সুতোটা পিঠে চেপে ধরে রাখলেন এবং পানির মধ্যে তার ঢালু অবস্থান দেখতে দেখতে উত্তর-পশ্চিমমুখে ধাবিত নৌকার দিকে নজর রাখলেন।

এতে ওরই মৃত্যু হবে, বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন। সে চিরকাল এভাবে চলতে পারবে না।

কিন্তু চার ঘণ্টা পরেও মাছটি একইভাবে সমুদ্রের দিকে সাঁতার কেটে চলেছে, নৌকাটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর বৃদ্ধও পিঠে সুতোর ভার নিয়ে আগের মতোই অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

“আমি ওকে দুপুরে ধরেছিলাম,” তিনি বললেন। “আর এখন পর্যন্ত একবারও ওকে চোখে দেখিনি।”

মাছ ধরার সময় টুপিটি যেন বাতাসে উড়ে না যায়, তাই সেটি মাথায় খুব শক্ত করে চেপে পরেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই অবস্থায় থাকার কারণে টুপির কিনারা তাঁর কপালে চাপ দিয়ে কেটে বা ঘষে ব্যথা সৃষ্টি করছিল। তাঁর তৃষ্ণাও পেয়েছিল। তাই খুব সাবধানে,সুতোতে যেন কোনো ঝাঁকুনি না লাগে সেদিকে খেয়াল রেখে, তিনি হাঁটু গেড়ে নৌকার সামনের দিকে যতটা সম্ভব এগিয়ে গেলেন এবং এক হাতে পানির বোতলটি টেনে নিলেন।

বোতল খুলে অল্প একটু পানি খেলেন। তারপর নৌকার সামনের অংশে হেলান দিয়ে বসলেন। মাস্তুল আর গুটিয়ে রাখা পালে ভর দিয়ে বসে তিনি চেষ্টা করলেন কিছু না ভাবতে—শুধু সব রকম কষ্ট সহ্য করে যেতে লাগলেন।

এরপর তিনি পেছন ফিরে তাকালেন। কোথাও আর তখন স্থলভূমি দেখা যাচ্ছে না।

তাতে কিছু আসে যায় না,তিনি ভাবলেন। হাভানার আলোর আভা দেখেই আমি ফিরে যেতে পারব। সূর্য ডুবতে এখনও দুই ঘণ্টা বাকি। হয়তো তার আগেই মাছটা ওপরে উঠে আসবে। যদি না ওঠে আসে, তাহলে হয়তো চাঁদের আলোয় উঠবে। তাও যদি না হয়, তাহলে সূর্য ওঠার সময় উঠবে। আমার শরীরে কোনো খিঁচুনি নেই, আমি এখনও শক্ত আছি। বঁড়শিটা তো ওরই মুখে আটকে আছে।

“কী অসাধারণ শক্তি এই মাছটার! এভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছে! নিশ্চয়ই সে তার মুখ তারের হুকের ওপর শক্ত করে চেপে রেখেছে। আহা, যদি একবার তাকে দেখতে পেতাম! অন্তত একবার চোখের দেখা পেলে বুঝতে পারতাম, আমি কেমন প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়ছি।”

সারা রাত ধরে মাছটি তার পথ বা দিক একবারও বদলায়নি— আকাশের তারাগুলো দেখে বৃদ্ধ যতটুকু বুঝতে পেরেছিলেন। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর বেশ ঠান্ডা পড়ছিল, আর বৃদ্ধের পিঠ, দুই হাত ও বুড়ো পায়ে জমে থাকা ঘাম শুকিয়ে গিয়ে শরীর আরও শীতল হয়ে উঠেছিল।

দিনের বেলায় তিনি টোপ রাখা বাক্সের ওপর ঢাকা দেওয়া বস্তাটি খুলে রোদে শুকিয়ে নিয়েছিলেন। সূর্যাস্তের পর সেটি গলায় বেঁধে এমনভাবে পিঠের ওপর ঝুলিয়ে দিলেন, যাতে কাঁধের ওপর দিয়ে টানা সুতোটার নিচে তা সাবধানে গুঁজে দিতে পারেন। বস্তাটি সুতোর চাপ কিছুটা হ্রাস করেছিলো। নৌকার সামনের দিকে শরীর ঝুঁকিয়ে এমন একটি ভঙ্গি তিনি খুঁজে পেলেন, যাতে তিনি প্রায় আরামেই থাকতে পারছিলেন। আসলে অবস্থাটি খুব বেশি আরামদায়ক ছিল না—শুধু আগের চেয়ে কিছুটা কম কষ্টকর ছিল। তবু তিনি সেটাকেই আরামদায়ক বলে ভাবলেন।

তিনি মনে মনে বললেন- “আমি ওর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছি না, আর ও-ও আমার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারছে না—যতক্ষণ সে এভাবেই টানতে থাকবে।”

একবার তিনি উঠে দাঁড়িয়ে নৌকার এক পাশে প্রস্রাব করলেন। তারপর আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে নিজের পথ ঠিক আছে কি না যাচাই করে নিলেন। তাঁর কাঁধ থেকে সোজা পানির ভেতর নেমে যাওয়া মাছ ধরার সুতোটি জলের মধ্যে জোনাকির আলোর ফসফরাসের রেখার মতো জ্বলজ্বল করছিল। এখন তারা আগের চেয়ে ধীরে এগোচ্ছিল। হাভানার আলোর আভাও আগের মতো উজ্জ্বল ছিল না। তাই তিনি বুঝতে পারলেন, স্রোত তাদের পূর্বদিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি ভাবলেন, “যদি হাভানার আলো চোখের আড়াল হয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে আমরা আরও পূর্বদিকে চলে যাচ্ছি। মাছটা যদি এভাবেই একই পথে যেতে থাকে, তাহলে আমাকে আরও অনেক ঘণ্টা সেই আলো দেখতে হবে।”

হঠাৎ তাঁর মনে হলো, “আজ বড় লিগের বেসবল খেলার ফল কী হলো কে জানে! যদি একটা রেডিও থাকত, তাহলে কী দারুণই না হতো!”

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সতর্ক করলেন, “যা করছ, সেটাই ভাবো। সব সময় সেটাই ভাবো। কোনো বোকামি করা চলবে না।”

তারপর তিনি উচ্চস্বরে বললেন- “আহা, যদি ছেলেটা এখানে থাকত! আমাকে একটু সাহায্য করতে পারত, আর এই দৃশ্যটাও দেখতে পেত।”

তিনি মনে মনে ভাবলেন, “বার্ধক্যে কোনো মানুষের একা থাকা উচিত নয়। কিন্তু এটা এড়ানোরও উপায় নেই। শক্তি ধরে রাখতে হলে সকালে টুনা মাছটা নষ্ট হওয়ার আগেই খেয়ে নিতে হবে। মনে রেখো, খেতে ইচ্ছে না করলেও সকালে অবশ্যই খেতে হবে। মনে রেখো।”

রাতের বেলায় দুটি পোরপয়েজ ডলফিন(পোরপয়েজ মানে সমুদ্রের শুশুক) নৌকার চারপাশে ঘুরতে লাগল। বৃদ্ধ তাদের চলাচলের এবং নিশ্বাস ছাড়ার শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি সহজেই বুঝতে পারলেন কোনটি পুরুষ আর কোনটি স্ত্রী। পুরুষটির নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল জোরালো, আর স্ত্রীটির শব্দ ছিল দীর্ঘশ্বাসের মতো কোমল।

তিনি বললেন- “ওরা খুব ভালো প্রাণী। ওরা খেলে, মজা করে, একে অপরকে ভালোবাসে। উড়ন্ত মাছগুলোর মতোই ওরাও আমাদের ভাই।”

এরপর তাঁর মনে সেই বিশাল মাছটির জন্য মায়া জেগে উঠল।তিনি ভাবলেন, “সে সত্যিই বিস্ময়কর, রহস্যময়। কে জানে, তার বয়স কত! এত শক্তিশালী মাছ আমি আগে কখনো ধরিনি, আর এমন অদ্ভুতভাবে লড়তেও দেখিনি। হয়তো সে এতটাই বুদ্ধিমান যে লাফ দিচ্ছে না। যদি সে লাফিয়ে উঠত, কিংবা হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে ছুটে যেত, তাহলে আমার সর্বনাশ হয়ে যেতে পারত। হয়তো সে আগেও অনেকবার বড়শিতে ধরা পড়েছে। তাই সে জানে, এভাবেই লড়াই করতে হয়। সে জানে না যে তার প্রতিপক্ষ মাত্র একজন মানুষ—তাও আবার একজন বৃদ্ধ। কিন্তু সে কী অসাধারণ মাছ! যদি তার মাংস ভালো হয়, তবে বাজারে কত দামই না পাবে! সে পুরুষ মাছের মতোই টোপ গিলেছে, পুরুষের মতোই টানছে, আর তার লড়াইয়ে বিন্দুমাত্র ভয় নেই। কে জানে, তারও কি কোনো পরিকল্পনা আছে? নাকি সেও আমার মতোই মরিয়া?”

এভাবে ভাবতে ভাবতেই তাঁর মনে পড়ল সেই দিনের কথা, যখন তিনি এক জোড়া মার্লিন মাছের মধ্যে একটিকে বঁড়শিতে ধরেছিলেন।

সবসময়ই পুরুষ মাছটি স্ত্রী মাছটিকে আগে খাবার খেতে দিত। আর যখন স্ত্রী মাছটি বঁড়শিতে আটকা পড়ল, তখন সে ভয়, আতঙ্ক আর হতাশায় উন্মত্তের মতো ছটফট করতে লাগল। অল্প সময়ের মধ্যেই সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু সেই পুরো সময়টাতেই পুরুষ মাছটি তার সঙ্গ ছাড়েনি। কখনও বড়শির সুতো অতিক্রম করেছে, কখনও তার চারপাশে জলের উপর ঘুরে বেড়িয়েছে। সে এতটাই কাছে ছিল যে বৃদ্ধের ভয় হচ্ছিল, তার কাস্তের মতো ধারালো ও প্রায় ততটাই বড় লেজের আঘাতে যদি সুতোটি কেটে যায়!

অবশেষে বৃদ্ধ যখন গ্যাফ দিয়ে স্ত্রী মাছটিকে টেনে তুললেন, মাথায় আঘাত করলেন, তার বর্শার মতো লম্বা ও স্যান্ডপেপারের মতো খসখসে মুখটি শক্ত করে ধরে বারবার মাথায় আঘাত করতে লাগলেন, যতক্ষণ না তার শরীরের রঙ আয়নার পেছনের রূপালি আবরণের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল—তারপর ছেলেটির সাহায্যে তাকে টেনে নৌকায় তুলে আনলেন। তবুও পুরুষ মাছটি নৌকার পাশেই থেকে গেল।

এরপর বৃদ্ধ যখন বড়শির সুতো গুছিয়ে হারপুন প্রস্তুত করছিলেন, তখন পুরুষ মাছটি নৌকার পাশে অনেক উঁচুতে লাফিয়ে উঠল, যেন দেখতে চাইল তার সঙ্গিনী কোথায়। তারপর আবার গভীর জলে নেমে গেল। তার বুকের পাখনা দুটি, যা ল্যাভেন্ডার রঙ(হালকা বেগুনি রঙের)এর ডানার মতো ছড়িয়ে ছিল, আর শরীরের প্রশস্ত ল্যাভেন্ডার রঙের ডোরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কী অপূর্ব সুন্দর ছিল সে— বৃদ্ধের আজও তা মনে আছে। আর সে শেষ পর্যন্ত সেখানেই ছিল।

ওদের নিয়ে আমি জীবনে যত কিছু দেখেছি, তার মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে দুঃখের দৃশ্য, বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন। ছেলেটিও খুব কষ্ট পেয়েছিল। আমরা মাছটির কাছে যেন ক্ষমা চেয়েছিলাম, তারপর দ্রুত তাকে কেটে টুকরো করেছিলাম।

বৃদ্ধ উচ্চস্বরে বললেন— আহা, ছেলেটা যদি এখন এখানে থাকত!”

তিনি নৌকার সামনের গোলাকার তক্তার গায়ে হেলান দিয়ে বসলেন এবং কাঁধের ওপর দিয়ে টানা সুতোর মাধ্যমে সেই বিশাল মাছটির অটল শক্তি অনুভব করতে লাগলেন, যে নিরন্তর এগিয়ে চলছে নিজের বেছে নেওয়া গন্তব্যের দিকে।

একবার, আমার বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন। মাছটির সিদ্ধান্ত ছিল—সব ফাঁদ, সব জাল, সব প্রতারণা থেকে বহু দূরে, গভীর অন্ধকার সমুদ্রে থেকে যাওয়া। আর আমার সিদ্ধান্ত ছিল—সব মানুষের নাগালের বাইরে, সেই গভীর সমুদ্রে গিয়ে তাকে খুঁজে বের করা। পৃথিবীর সব মানুষের বাইরে। এখন আমরা দু’জন যেন একসূত্রে বাঁধা পড়েছি, আর দুপুর থেকেই এভাবেই একসঙ্গে আছি। অথচ আমাদের দু’জনের কাউকেই সাহায্য করার মতো কেউ নেই।

হয়তো আমার জেলে হওয়া উচিত ছিল না, বৃদ্ধ ভাবলেন। কিন্তু এটাই তো আমার জন্মগত পেশা। ভোর হলে অবশ্যই টুনা মাছটা খেতে হবে— এ কথা ভুললে চলবে না।

ভোর হওয়ার কিছু আগে হঠাৎ পেছনে ফেলা একটি টোপে কোনো একটি মাছ কামড় দিল। তিনি লাঠি ভেঙে যাওয়ার শব্দ শুনলেন এবং দেখলেন সুতো দ্রুত নৌকার কিনারা পেরিয়ে ছুটে যাচ্ছে। অন্ধকারেই তিনি খাপ থেকে ছুরিটি বের করলেন। বাঁ কাঁধে বিশাল মাছটির সমস্ত টান সামলে রেখে নৌকার কাঠের ধার ঘেঁষে সুতোটি কেটে ফেললেন। তারপর নিজের সবচেয়ে কাছের আরেকটি সুতোও কেটে দিলেন। অন্ধকারেই বাড়তি সুতোর পাকগুলো দক্ষ হাতে একসঙ্গে বেঁধে ফেললেন। এক হাতেই কাজ করছিলেন, আর পা দিয়ে পাকগুলো চেপে ধরে গিঁট শক্ত করছিলেন। এখন তার হাতে অতিরিক্ত সুতোর ছয়টি পাক রইল। কেটে ফেলা দুইটি টোপের জন্য চারটি এবং যে টোপটি অজানা মাছটি নিয়ে গেছে তার জন্য আরও দুটি— সবগুলোই এখন একসঙ্গে জোড়া লাগানো।

ভোর হলে, তিনি ভাবলেন, চল্লিশ ফ্যাদম গভীরের টোপটিও তুলে ফেলবে এবং সেটার সুতোটাও এই বাড়তি সুতোগুলোর সঙ্গে জুড়ে দেবে এতে আমার দুইশো ফ্যাদম উৎকৃষ্ট কাতালান সুতো৩১,, বড়শি আর লিডার৩২ হারাতে হবে। কিন্তু সেগুলো আবার কেনা যাবে। অথচ এই মাছটাকে যদি অন্য কোনো মাছ এসে সুতো কেটে মুক্ত করে দেয়, তবে তাকে আর কে ফিরিয়ে দেবে?

এইমাত্র যে মাছটি টোপ নিয়ে গেল, সেটি কী মাছ ছিল আমি জানি না। মার্লিনও হতে পারে, ব্রডবিলও হতে পারে, কিংবা হাঙরও হতে পারে। আমি তাকে একবারও অনুভব করতে পারিনি। এত দ্রুত তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে।

তারপর তিনি উচ্চস্বরে বললেন- আহা, ছেলেটা যদি আমার সঙ্গে থাকত!”

“এখন তোমার ভরসা শুধু তুমি নিজেই। তাই অন্ধকার হোক বা না-হোক, নৌকার পেছনের দিকে গিয়ে শেষ লাইনের কাছে পৌঁছাও, সেটি কেটে ফেলো, তারপর অতিরিক্ত রাখা দুটি সুতোর কুণ্ডলী জুড়ে দাও।”

তিনি তাই করলেন। অন্ধকারে কাজটি খুবই কঠিন ছিল। একবার মাছটি হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনি দিলে তিনি মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন এবং তার চোখের নিচে একটু কেটে গেল। রক্ত গাল বেয়ে কিছুটা নিচে নেমে এসেছিল, কিন্তু থুতনিতে পৌঁছানোর আগেই তা জমে শুকিয়ে গেল। তারপর তিনি নৌকার সামনের দিকে ফিরে এসে কাঠের সঙ্গে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। বস্তাটি ঠিকঠাক করে কাঁধে গুঁজে নিলেন, যাতে সুতোটি কাঁধের নতুন অংশের ওপর দিয়ে যায়। কাঁধে সুতোর টান স্থির রেখে তিনি মাছের টান অনুভব করলেন, আর পানিতে হাত দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেন পানির ওপড় দিয়ে নৌকাটি কীভাবে এগিয়ে চলেছে।

“হঠাৎ সে এমন ঝাঁকুনি কেন দিল?” বৃদ্ধ ভাবলেন। হয়তো তার পিঠের বিশাল উঁচু ঢিবির মতো অংশের ওপর দিয়ে তারের লিডারটি৩৪নিশ্চয়ই পিছলে গেছে। অবশ্যই তার পিঠ আমার পিঠের মতো এতটা ব্যথা করছে না। কিন্তু সে যত বড়ই হোক না কেন, এই নৌকাটাকে চিরকাল টেনে নিয়ে যেতে পারবে না।এখন আর এমন কিছু নেই যা বিপদ ডেকে আনতে পারে, আর আমার কাছে অতিরিক্ত অনেক সুতোও আছে। একজন মানুষের আর কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে?”

বৃদ্ধ আস্তে করে উচ্চস্বরে বললেন-“মাছ, আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার সঙ্গ ছাড়ব না।” তারপর মনে মনে ভাবলেন, “আমার ধারণা, সেও শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গ ছাড়বে না।”

তিনি ভোর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। সূর্য ওঠার আগের সেই সময়টায় বেশ ঠান্ডা ছিল। উষ্ণ থাকার জন্য তিনি কাঠের গায়ে শরীর চেপে ধরলেন।

“সে যতক্ষণ পারবে, আমিও ততক্ষণ পারব,” তিনি মনে মনে বললেন।

দিনের প্রথম আলোয় দেখা গেল সুতোটি পানির ভেতর তির্যকভাবে নিচের দিকে চলে গেছে। নৌকাটি স্থির গতিতে এগিয়ে চলছে। সূর্যের প্রথম আলো যখন দিগন্তের ওপরে উঠল, তখন তার আলো বৃদ্ধের ডান কাঁধে এসে পড়ল।

“ও উত্তর দিকে যাচ্ছে,” বৃদ্ধ বললেন।

তিনি ভাবলেন, “সমুদ্রের স্রোত নিশ্চয়ই আমাদের অনেকটা পূর্ব দিকে ভাসিয়ে এনেছে। আহা, সে যদি স্রোতের সঙ্গে ঘুরে যেত! তাহলে বুঝতাম সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।”

সূর্য আরও ওপরে উঠলে বৃদ্ধ বুঝতে পারলেন, মাছটি মোটেও ক্লান্ত হয়নি। তবে একটি ভালো লক্ষণ ছিল। সুতোর ঢাল দেখে বোঝা যাচ্ছিল মাছটি এখন আগের তুলনায় কম গভীরতায় সাঁতার কাটছে। অবশ্য এর মানে এই নয় যে সে লাফ দেবে। তবে হয়তো দিতেও পারে।

“হে ঈশ্বর, ওকে একবার লাফ দিতে দাও,” বৃদ্ধ বললেন। “ওকে সামলানোর মতো যথেষ্ট দড়ি (সুতো) আমার কাছে আছে।”

তিনি ভাবলন, “হয়তো সুতোর টান আরেকটু বাড়াতে পারলে ওর কষ্ট হবে, আর তখনই সে লাফ দেবে। এখন যেহেতু দিন হয়েছে, ও যেন লাফ দেয়। তাহলে তার পিঠের লম্বা বায়ুথলিগুলো৩৫বাতাসে ভরে যাবে, আর তখন গভীরে ডুবে গিয়ে মরতে পারবে না।”

তিনি সুতোর টান আরও বাড়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু মাছটিকে গাঁথার পর থেকেই সুতোটি ছিঁড়ে যাওয়ার একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত টানটান ছিল। তিনি পিছনে হেলে টান দিতে গিয়ে সেই চরম টান অনুভব করলেন এবং বুঝলেন, এর চেয়ে বেশি চাপ দেওয়া সম্ভব নয়।

“আমার কখনোই সুতোতে ঝাঁকুনি দেওয়া চলবে না,” তিনি ভাবলেন। “প্রতিটি ঝাঁকুনিতে বঁড়শির ক্ষত আরও বড় হবে। আর যদি সে লাফ দেয়, তাহলে বড়শিটাই ছিটকে বেরিয়ে যেতে পারে। যাই হোক, সূর্যের আলোয় এখন আমার অনেক ভালো লাগছে। অন্তত আজ আর আমাকে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে না।”

সুতোতে হলুদ রঙের সামুদ্রিক আগাছা লেগে ছিল। বৃদ্ধ জানত, এতে টান একটু বাড়বে, কিন্তু তাতে তিনি খুশিই হলেন। কারণ রাতের অন্ধকারে যে হলুদ উপসাগরীয় আগাছাগুলো উজ্জ্বল ফসফোরেসেন্স ছড়িয়েছিল, এগুলি সেগুলিই।

বৃদ্ধ বললেন-“মাছ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আর গভীর শ্রদ্ধাও করি। কিন্তু আজকের দিন শেষ হওয়ার আগেই আমি তোমাকে হত্যা করব।”

আশা করি তাই হবে,” বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন।

উত্তর দিক থেকে একটি ছোট পাখি নৌকার দিকে উড়ে এলো। সেটি ছিল একটি ছোট গায়ক পাখি৩৬আর সমুদ্রের জলের খুব কাছ দিয়ে নিচু হয়ে উড়ছিল। বৃদ্ধ বুঝতে পারলেন, পাখিটি ভীষণ ক্লান্ত। পাখিটি এসে নৌকার পেছনের অংশে (স্টার্নে) বসল। তারপর সে বৃদ্ধের মাথার চারদিকে একবার ঘুরে এসে মাছ ধরার লাইনের ওপর বসল, কারণ সেখানে সে আরও আরাম বোধ করছিল।

বৃদ্ধ পাখিটিকে জিজ্ঞেস করলেন- তোমার বয়স কত? এ কি তোমার প্রথম দীর্ঘ যাত্রা?”

পাখিটি বৃদ্ধের কথা শুনে তাঁর দিকে তাকাল। সে এতটাই ক্লান্ত ছিল যে, লাইনের দিকেও ভালো করে তাকানোর শক্তি তার ছিল না। তার কোমল পা দুটি শক্ত করে লাইন আঁকড়ে ধরেছিল, তবু সে ক্লান্তিতে টলছিল।

বৃদ্ধ বললেন- এটা বেশ স্থির আছে। বরং অতিরিক্তই স্থির। বাতাসহীন একটা রাতের পর তোমার এত ক্লান্ত হওয়ার কথা নয়। পাখিদের কী যে হচ্ছে!”

তার মনে পড়ল সমুদ্রের ওপরে উড়ে বেড়ানো বাজপাখিদের কথা, যারা ছোট পাখিদের ধরার জন্য সমুদ্রে চলে আসে। কিন্তু তিনি পাখিটিকে এ কথা বললেন না। যাই হোক, পাখিটি তা বুঝতও না, আর সে খুব শিগগিরই নিজের অভিজ্ঞতায় বাজপাখিদের চিনে নেবে।

বৃদ্ধ বললেন- ভালো করে একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও, ছোট্ট পাখি। তারপর তুমিও অন্য সব মানুষ, পাখি কিংবা মাছের মতো নিজের ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করতে এগিয়ে যেও।”

কথা বলতে তাঁর ভালো লাগছিল। কারণ রাতভর একই ভঙ্গিতে থাকার ফলে তার পিঠ শক্ত হয়ে গিয়েছিল, আর এখন সেখানে সত্যিই ব্যথা করছিল।

তিনি আবার বললেন- ইচ্ছা করলে আমার ঘরেই থাকতে পারতে, ছোট্ট পাখি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই যে হালকা বাতাস উঠছে, তাতে আমি পাল তুলে তোমাকে তীরে নিয়ে যেতে পারছি না। কারণ আমি এখন আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আছি।”

ঠিক তখনই মাছটি হঠাৎ এক প্রবল ঝাঁকুনি দিল। বৃদ্ধ সামনে নৌকার আগায় (বাউয়ে মানে নৌকার একেবারে সামনের দিক।) পড়ে গেল। যদি তিনি নিজেকে সামলে না নিতেন এবং কিছুটা সুতো ছেড়ে না দিতেন, তবে হয়তো সমুদ্রেই ছিটকে পড়তেন।

সুতো ঝাঁকুনি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখিটি উড়ে চলে গেল। বৃদ্ধ বুঝতেই পারেনি কখন সে উড়ে গেল। ডান হাতে তিনি সাবধানে লাইনটি স্পর্শ করলেন এবং দেখলেন, তার হাত থেকে রক্ত ঝরছে।

তিনি উচ্চস্বরে বললেন-, তাহলে ওরও নিশ্চয়ই কোথাও আঘাত লেগেছে।”

তারপর তিনি সুতোটা টেনে দেখতে চাইল, মাছটিকে ঘোরানো যায় কি না। কিন্তু যখন বুঝল, সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার একেবারে সীমায় পৌঁছে গেছে, তখন তিনি আর জোর করলেন না। বরং স্থির হয়ে সেই প্রবল টান সামলাতে লাগলেন।

তিনি বললেন, এবার তুমি টের পাচ্ছ, মাছ। আর ঈশ্বর জানেন, আমিও পাচ্ছি

তিনি চারদিকে তাকিয়ে পাখিটিকে খুঁজলেন। কারণ তার সঙ্গ খুব দরকার ছিল। কিন্তু পাখিটি আর কোথাও নেই।

বৃদ্ধ মনে মনে বললেন, তুমি বেশিক্ষণ থাকলে না। তবে যেদিকে যাচ্ছ, তীর না পাওয়া পর্যন্ত পথটা আরও কঠিন। মাছটার ওই এক ঝটকায় আমি কী করে নিজের হাত কেটে ফেললাম? নিশ্চয়ই আমি বড্ড বোকা হয়ে যাচ্ছি। অথবা হয়তো ছোট্ট পাখিটার দিকেই মন দিয়ে তাকিয়ে ছিলামএখন থেকে আমাকে শুধু নিজের কাজেই মন দিতে হবে। তারপর টুনা মাছটা খেয়ে নিতে হবে, যাতে শক্তি হারিয়ে না ফেলি।”

তিনি উচ্চস্বরে বললেন-, ছেলেটা যদি এখানে থাকত! আর যদি একটু লবণও থাকত!”

সুতোর টানটি বাঁ কাঁধে সরিয়ে নিয়ে বৃদ্ধ সাবধানে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তিনি সমুদ্রের পানিতে হাত ধুয়ে এক মিনিটেরও বেশি সময় হাতটি পানির নিচে ডুবিয়ে রাখলেন। তিনি দেখলেন, রক্ত ধীরে ধীরে জলে মিলিয়ে যাচ্ছে এবং নৌকাটি এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে পানির স্রোত তাঁর হাতের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।

তিনি বললেন— “মাছটা অনেকটা ধীর হয়ে গেছে।”

বৃদ্ধ আরও কিছুক্ষণ লবণাক্ত জলে হাত ডুবিয়ে রাখতে চাইছিলেন। কিন্তু তিনি ভয় পেলেন, যদি মাছটা হঠাৎ জোরে টান দেয়। তাই তিনি উঠে দাঁড়ালেন, নিজেকে সামলে নিয়ে হাতটি সূর্যের দিকে তুলে ধরলেন। সুতোর ঘর্ষণে শুধু হাতের চামড়া কেটে গিয়েছিল। কিন্তু সেটি ছিল হাতের সবচেয়ে দরকারি অংশ। তিনি জানতেন, এই লড়াই শেষ হওয়ার আগে তাঁর দুই হাতই খুব প্রয়োজন হবে। তাই লড়াই শুরুর আগেই হাত কেটে যাওয়াটা তাঁর মোটেই ভালো লাগছিল না।

হাত শুকিয়ে গেলে- তিনি বললেন— “এবার ছোট টুনা মাছটা খেতে হবে। গ্যাফ দিয়ে ওটাকে টেনে এনে এখানেই আরামে খেতে পারব।”

তিনি হাঁটু গেড়ে নৌকার সামনের অংশের নিচে রাখা টুনা মাছটিকে সাবধানে গ্যাফ দিয়ে টেনে নিজের কাছে আনলেন, যাতে প্যাঁচানো দড়িগুলোর সঙ্গে না লাগে। আবার বাঁ কাঁধে সুতোর ভার নিয়ে এবং বাঁ হাত ও বাহু দিয়ে নিজেকে সামলে তিনি মাছটিকে গ্যাফ থেকে খুলে রাখলেন। তারপর এক হাঁটু মাছটির ওপর রেখে ধারালো ছুরি দিয়ে মাথার পেছন থেকে লেজ পর্যন্ত লম্বা, গাঢ় লাল মাংসের কয়েকটি ফালি কাটলেন। ফালিগুলো ছিল ত্রিভুজাকৃতির; মেরুদণ্ডের পাশ থেকে পেটের কিনারা পর্যন্ত তিনি সেগুলো কাটলেন।

ছয়টি ফালি কেটে তিনি নৌকার সামনের কাঠের তক্তার ওপর সাজিয়ে রাখলেন। ছুরিটি প্যান্টে মুছে মাছের অবশিষ্ট দেহটি লেজ ধরে সমুদ্রে ফেলে দিলেন।

তিনি বললেন— “মনে হয় পুরোটা খেতে পারব না।”

এরপর তিনি একটি মাংসের ফালির ওপর ছুরি চালালেন। এদিকে তিনি অনুভব করছিলেন, সুতোটি এখনও শক্তভাবে টানছে। তাঁর বাঁ হাতটিতে খিঁচুনি ধরেছিল। মোটা সুতোটি হাতটিকে শক্ত করে টেনে ধরেছিল। তিনি বিরক্ত হয়ে হাতটির দিকে তাকিয়ে বললেন— “এ কেমন হাত! খিঁচুনি ধরতে চাইলে ধরো। নিখর হয়ে যাও। তাতে তোমার কোনো লাভ হবে না।”

তিনি মনে মনে বললেন- চলো, এখনই এটা খাও। এতে হাতে শক্তি ফিরে আসবে। হাতের কোনো দোষ নেই। এত ঘণ্টা ধরে তুমি মাছটার সঙ্গে লড়েছ। প্রয়োজনে সারাজীবনও লড়তে পারবে। এখন টুনা মাছটা খেয়ে নাও।”

তিনি এক টুকরো মাংস তুলে মুখে দিলেন এবং ধীরে ধীরে চিবোতে লাগলেন। খেতে তেমন খারাপ লাগছিল না।

তিনি মনে মনে ভাবলেন- ভালো করে চিবাওসব রস বের করে খাও। একটু কাগজি লেবু বা লবণ থাকলে খেতে আরও ভালো হতো।”

তিনি খিঁচুনিতে শক্ত হয়ে যাওয়া হাতটিকে জিজ্ঞেস করলেন— “কেমন লাগছে, হাত? তোমার জন্যই আমি আরেকটু খাচ্ছি।”

তিনি কাটা টুকরোটির বাকি অংশও খেয়ে ফেললেন। খুব যত্ন করে চিবিয়ে শেষে চামড়াটা ফেলে দিলেন।

তিনি আবার বললেন— “কেমন আছো, হাত? নাকি এখনও তোমার বোঝার সময় হয়নি?”

এরপর তিনি আরেকটি বড় টুকরো তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে চিবাতে শুরু করলেন।

“এটি একটি শক্তিশালী, পূর্ণবয়স্ক মাছ,” বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন। “ডলফিনের বদলে এটিকে ধরতে পেরে আমি ভাগ্যবান। ডলফিনের মাংস খুব বেশি মিষ্টি। কিন্তু এই মাছের মাংস মোটেও তেমন মিষ্টি নয়, আর এর সমস্ত শক্তি এখনও অটুট আছে।”

যাই হোক, বাস্তববাদী হওয়াই সবচেয়ে ভালো, তিনি ভাবলেন। আহা, যদি একটু লবণ থাকত! সূর্যের তাপে বাকি মাংস পচে যাবে, নাকি শুকিয়ে যাবে, তা-ও জানি না। তাই ক্ষুধা না থাকলেও সবটুকু খেয়ে নেওয়াই ভালো। মাছটি এখন শান্ত এবং স্থির। আমি সবটুকু খেয়ে নেব, তাহলে সামনে যা-ই ঘটুক, তার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারব।

“ধৈর্য ধরো, হাত,” তিনি বললেন। “আমি এসব তোমার ভালোর জন্যই করছি।”

ইস, যদি মাছটিকেও কিছু খেতে দিতে পারতাম, তিনি ভাবলেন। সে তো আমার ভাইয়ের মতো। কিন্তু তাকে আমায় মারতেই হবে, আর তা করতে হলে আমাকে নিজের শক্তি বজায় রাখতে হবে।

তিনি ধীরে ধীরে এবং অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে মাছের ত্রিভুজাকৃতির প্রতিটি টুকরো খেয়ে নিলেন।

এরপর তিনি সোজা হয়ে বসে হাতটি প্যান্টে মুছে বললেন- “এবার সুতোটা ছেড়ে দিতে পারো, হাত। তুমি আর জেদ করো না। আমি ডান হাত দিয়েই ওকে সামলাতে পারব।”

তিনি বাঁ পা দিয়ে মাছ ধরার ভারী সুতোটি চেপে ধরলেন এবং পিঠে সুতোর টান নিয়ে হেলান দিয়ে বসলেন।

“হে ঈশ্বর, আমার হাতের টানটা (ক্র্যাম্প) যেন সেরে যায়,” তিনি প্রার্থনা করলেন। “কারণ আমি জানি না, মাছটি এরপর কী করবে।”

কিন্তু মাছটিকে তো শান্তই মনে হচ্ছে, তিনি ভাবলেন। সে নিশ্চয়ই নিজের কোনো পরিকল্পনা অনুসরণ করছে। কিন্তু তার পরিকল্পনাটা কী? আর আমার পরিকল্পনাই বা কী?

তার বিশাল শক্তি ও আকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমার পরিকল্পনা তো মুহূর্তে মুহূর্তে বদলাতে হবে। যদি সে পানির ওপরে লাফ দেয়, তাহলে আমি তাকে হারপুন দিয়ে মারতে পারব। কিন্তু সে যদি সারাক্ষণ নিচেই থাকে, তাহলে আমিও তার সঙ্গে নিচের এই লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে।

তিনি ক্র্যাম্প ধরা হাতটি প্যান্টে ঘষে আঙুলগুলো নরম করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আঙুলগুলো খুললেন না।

হয়তো সূর্যের তাপে খুলে যাবে, তিনি ভাবলেন। হয়তো এই কাঁচা টুনা মাছ হজম হয়ে গেলে হাতটাও ঠিক হয়ে যাবে। যদি জোর করেই খুলতে হয়, তবে খুলব— যে মূল্যই দিতে হোক না কেন। কিন্তু এখন জোর করে খুলতে চাই না। ও নিজে থেকেই খুলুক, নিজে থেকেই আগের অবস্থায় ফিরে আসুক। আসলে গত রাতে বিভিন্ন সুতো খুলতে ও গুছিয়ে নিতে গিয়ে আমি হাতটার ওপর অনেক বেশি অত্যাচার করেছি।

তিনি সমুদ্রের চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, তিনি এখন কতটা একা।

তবু তিনি গভীর, গাঢ় নীল জলের মধ্যে রঙধনুর মতো আলোর ঝিলিক দেখতে পেলেন। সামনে অনেকদূর পর্যন্ত টানটান হয়ে থাকা সুতোটি দেখতে পেলেন। শান্ত সমুদ্রের অদ্ভুত ঢেউয়ের দোলাও তাঁর চোখে পড়ল।

এদিকে বাণিজ্যিক বাতাসের (ট্রেড উইন্ড) জন্য আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। তিনি সামনে তাকিয়ে দেখলেন, এক ঝাঁক বুনো হাঁস পানির ওপরের আকাশে উড়ছে। কখনো তারা স্পষ্ট ছায়ার মতো ফুটে উঠছে, আবার কখনো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, তারপর আবার স্পষ্ট হচ্ছে। তখন তাঁর মনে হলো—সমুদ্রে কোনো মানুষই কখনও সত্যিকার অর্থে একা নয়।

তাঁর মনে পড়ল, অনেক মানুষ ছোট নৌকায় তীরের দেখা না পেলে ভয় পায়। তিনি বুঝতে পারলেন, আকস্মিক দুর্যোগের মাসগুলোতে তাদের সেই ভয় অযৌক্তিক নয়।

কিন্তু এখন তো হারিকেনের মৌসুম। আর যখন হারিকেন আসে না, তখন এই মৌসুমের আবহাওয়াই সারা বছরের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর।

তিনি ভাবলেন, সমুদ্রে থাকলে হারিকেন আসার কয়েক দিন আগেই আকাশে তার লক্ষণ দেখা যায় কিন্তু তীরে থাকা মানুষরা সেগুলো দেখতে পায় না, কারণ তারা জানেই না কী লক্ষণ খুঁজতে হয়। অবশ্য স্থলভাগের প্রভাবেও মেঘের আকৃতি কিছুটা বদলে যায়।

তবে এখন কোনো হারিকেন আসছে না।

তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সাদা কিউমুলাস৩৭মেঘগুলো যেন বন্ধুসুলভ আইসক্রিমের স্তূপের মতো সাজানো রয়েছে।

আর অনেক ওপরে, সেপ্টেম্বরের উঁচু আকাশে সাদা পালকের মতো পাতলা সিরাস মেঘ৩৮ ভেসে ছিল।

“হালকা বাতাস,” বৃদ্ধ বললেন। “এই আবহাওয়া আমার জন্য তোমার চেয়ে ভালো, মাছ।”

তাঁর বাঁ হাতটি তখনও শক্ত হয়ে ছিল, তবে ধীরে ধীরে সেই আড়ষ্টতা কাটছিল।

আমি এই পেশির টানকে ঘৃণা করি, তিনি মনে মনে ভাবলেন। এ যেন নিজের শরীরেরই বিশ্বাসঘাতকতা। খাদ্যে বিষক্রিয়ায় ডায়রিয়া হওয়া বা অন্যের সামনে বমি করা যেমন লজ্জার, তেমনি পেশির টান—যাকে তিনি স্প্যানিশ ভাষায় ক্যালামব্রে বলতেন—মানুষকে নিজের কাছেই লজ্জিত করে তোলে, বিশেষ করে যখন সে একা থাকে।

ছেলেটা যদি এখানে থাকত, সে আমার হাতটা মালিশ করে কনুই পর্যন্ত টানটা ছেড়ে দিতে পারত, তিনি ভাবলেন। তবে ঠিকই সেরে যাবে।

“তারপর ডান হাত দিয়ে তিনি ছিপের সুতোর টানে যে সামান্য পরিবর্তন এসেছে তা অনুভব করলেন, পরে তিনি দেখলেন, সেই পরিবর্তনের কারণে পানির মধ্যে সুতোর ঢালও বদলে গেছে। তিনি সুতোয় ভর দিয়ে দাঁড়ালেন এবং বাঁ হাতটি জোরে জোরে উরুর ওপর চাপড়াতে লাগলেন। তারপর দেখলেন, সুতোটি ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে আসছে।

“সে ওপরে উঠে আসছে,” তিনি বললেন। “চল হাত, দয়া করে সাড়া দাও।”

সুতো ধীরে ধীরে কিন্তু অবিরতভাবে ওপরে উঠতে লাগল। তারপর নৌকার সামনে সমুদ্রের জল ফুলে উঠল এবং মাছটি পানির ওপর ভেসে উঠল।

সে যেন অন্তহীনভাবে জল থেকে উঠে আসছিল, আর তার দেহের দুই পাশ বেয়ে অবিরাম পানি ঝরে পড়ছিল। রোদের আলোয় তার দেহ ঝলমল করছিল। মাথা ও পিঠ ছিল গাঢ় বেগুনি রঙের, আর শরীরের দুপাশে চওড়া হালকা ল্যাভেন্ডার রঙের ডোরাকাটা দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তার তলোয়ারের মতো লম্বা মুখটি ছিল প্রায় একটি বেসবল ব্যাটের সমান দীর্ঘ, কিন্তু অগ্রভাগে সরু হয়ে রেপিয়ার তলোয়ারের মতো ধারালো ছিল। সে সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য নিয়ে পানির ওপর উঠে এল, তারপর একজন দক্ষ ডুবুরির মতো মসৃণ ভঙ্গিতে আবার জলে ডুবে গেল। বৃদ্ধ তখন তার বিশাল কাস্তের ফলার মতো লেজটিকে জলের নিচে মিলিয়ে যেতে দেখলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে সুতো দ্রুত বেরিয়ে যেতে শুরু করল।

ও নৌকাটার চেয়েও অন্তত দুই ফুট লম্বা,” বৃদ্ধ বললেন। সুতোটি দ্রুত, কিন্তু স্থিরভাবে বেরিয়ে যাচ্ছিল; মাছটি মোটেও আতঙ্কিত ছিল না। বৃদ্ধ দুই হাতের সর্বশক্তি দিয়ে সুতোটিকে এমনভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন, যাতে সেটি ছিঁড়ে যাওয়ার সীমার ঠিক নিচে টানটি বজায় থাকে। তিনি জানতেন, যদি তিনি অবিরাম ও স্থির চাপ দিয়ে মাছটির গতি কিছুটা কমিয়ে রাখতে না পারেন, তবে মাছটি সব সুতো টেনে বের করে ফেলবে এবং শেষ পর্যন্ত সুতোটি ছিঁড়ে যাবে।

এ এক অসাধারণ মাছ, তিনি ভাবলেন। আমাকে ওকে বশে আনতেই হবে। ও যেন কখনো নিজের শক্তির পূর্ণ পরিচয় না পায়, কিংবা বুঝতে না পারে যে সে একবার প্রাণপণ ছুটলে কী করতে পারে। আমি যদি ওর জায়গায় থাকতাম, তাহলে এখনই সমস্ত শক্তি দিয়ে ছুটতাম, যতক্ষণ না কিছু একটা ঘটে যায়। কিন্তু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ওরা আমাদের মতো বুদ্ধিমান নয়—যদিও আমরা যারা ওদের হত্যা করি, তাদের চেয়ে ওরা অনেক বেশি মহৎ এবং অনেক বেশি সক্ষম।

বৃদ্ধ জীবনে অনেক বড় বড় মাছ দেখেছেন। হাজার পাউন্ডেরও বেশি ওজনের বহু মাছ তিনি দেখেছেন, আর এমন আকারের দুটি মাছ নিজেই ধরেছিলেন। কিন্তু তখন তিনি একা ছিলেন না।

আজ তিনি একা। তীরের কোনো চিহ্ন চোখে পড়ছে না। আর তিনি এমন এক বিশাল মাছের সঙ্গে লড়ছেন, যা তার জীবনে দেখা সব মাছের চেয়ে বড়— এমনকি যার কথা তিনি কখনো শোনেননি, তার চেয়েও বড়। অথচ তার বাঁ হাতটি তখনও ঈগলের নখরের মতো শক্ত হয়ে মুঠো পাকিয়ে আছে।

হাতের খিঁচুনি অবশ্যই সেরে যাবে,” বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন। নিশ্চয়ই সেরে যাবে, যাতে আমার ডান হাতকে সাহায্য করতে পারে। আমরা তিনজন যেন সহোদর—ওই মাছটি আর আমার দুই হাত। তাই এর খিঁচুনি কাটতেই হবে। এভাবে খিঁচ ধরে থাকা এর জন্য শোভন নয়। এদিকে মাছটি আবার গতি কমিয়ে তার স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে চলল।

ও হঠাৎ লাফ দিল কেন?হয়তো আমাকে দেখাতে চেয়েছিল যে সে কত বড়। যাই হোক, এখন অন্তত আমি তার আকার সম্পর্কে জানি,” বৃদ্ধটি মনে মনে ভাবলেন ইচ্ছে করছে, আমিও যদি ওকে দেখাতে পারতাম আমি কেমন মানুষ। কিন্তু তা হলে সে আমার আড়ষ্ট হাতটাও দেখে ফেলত। ও বরং ভাবুক, আমি তার ধারণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী একজন মানুষ। আমার চেয়ে সে অনেক বেশি শক্তিশালী, আর তাই থাকবে,” বৃদ্ধ ভাবলেন। ইস, যদি আমি ওই মাছটির মতো হতাম! তার বিরুদ্ধে আছে শুধু আমার ইচ্ছাশক্তি আর বুদ্ধিমত্তা।

তিনি নৌকার কাঠের গায়ে আরাম করে হেলান দিয়ে বসলেন এবং নিজের কষ্টকে নীরবে মেনে নিলেন। মাছটি অবিরতভাবে সাঁতরে চলল, আর নৌকাটিও ধীরে ধীরে অন্ধকার জলের ওপর দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। পূর্ব দিক থেকে বাতাস বইতে শুরু করায় সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউ উঠেছিল। দুপুরের মধ্যে বৃদ্ধের বাঁ হাতের খিঁচুনিও সেরে গেল।

“তোমার জন্য খারাপ খবর, মাছ,” তিনি বললেন এবং কাঁধে চাপা বস্তার ওপর দিয়ে সুতোটা একটু সরিয়ে নিলেন।

তিনি তুলনামূলকভাবে আরামেই ছিলেন, কিন্তু কষ্ট পাচ্ছিলেন। যদিও তিনি নিজের কাছে সেই কষ্টের কথা একেবারেই স্বীকার করলেন না।

আমি ধর্মভীরু নই,” তিনি বললেনতবু আমি দশবার ‘আওয়ার ফাদার’ (প্রভুর প্রার্থনা) এবং দশবার ‘হেইল মেরি’ (মাতা মরিয়মের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা) বলব, যাতে আমি এই মাছটিকে ধরতে পারি। আর যদি মাছটাকে ধরতে পারি, তাহলে আমি ‘ভার্জিন অব কোব্রে’৩৯এর তীর্থযাত্রায় যাব। এ আমার প্রতিজ্ঞা।”

তিনি যান্ত্রিকভাবে প্রার্থনা করতে শুরু করলেন। কখনো কখনো তিনি এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন যে প্রার্থনার শব্দই মনে থাকত না। তখন তিনি খুব দ্রুত প্রার্থনা বলতেন, যেন মুখস্থ বলার মতোই কথাগুলো আপনাআপনি বেরিয়ে আসে। তিনি ভাবলেন-, ‘হেইল মেরি’ বলাটা ‘আওয়ার ফাদার’-এর চেয়ে সহজ।

“হে অনুগ্রহে পূর্ণ মেরি, প্রভু তোমার সঙ্গে আছেন। সকল নারীর মধ্যে তুমি ধন্য, আর তোমার গর্ভের ফল যিশুও ধন্য। হে পবিত্র মেরি, ঈশ্বরের জননী, এখন এবং আমাদের মৃত্যুকালে আমাদের পাপীদের জন্য প্রার্থনা করো। আমেন।”

তারপর তিনি যোগ করলেন, “হে পবিত্র কুমারী, এই মাছটির মৃত্যুর জন্যও প্রার্থনা করো। সে যতই বিস্ময়কর হোক না কেন।”

প্রার্থনা শেষ করে তাঁর মন অনেকটা হালকা হল। কিন্তু শরীরের কষ্ট একটুও কমল না, বরং যেন আরও একটু বাড়ল। তিনি নৌকার সামনের কাঠের অংশে হেলান দিয়ে বসে বাঁ হাতের আঙুলগুলো যান্ত্রিকভাবে নাড়াতে শুরু করলেন।

এখন সূর্যের তাপ বেশ বেড়েছে, যদিও হালকা বাতাসও বইছে।

আমার নৌকার পেছনের দিকে ঝুলিয়ে রাখা ছোট ছিপটায় আবার টোপ লাগিয়ে দেওয়া উচিত,”তিনি বললেন। যদি মাছটা আরও এক রাত এভাবেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমাকে আবার কিছু খেতে হবে। আর বোতলে যে পানি আছে, তাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এখানে ডলফিন ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তবে একেবারে টাটকা অবস্থায় খেতে পারলে খারাপ লাগবে না। আহা, যদি আজ রাতে একটা উড়ন্ত মাছ নৌকায় এসে পড়ত! কিন্তু তাদের আকর্ষণ করার মতো কোনো আলো তো আমার নেই। কাঁচা উড়ন্ত মাছ খেতে দারুণ, আর সেটাকে কাটাকুটিও করতে হয় না। এখন আমাকে আমার সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে হবে। হে খ্রিস্ট, আমি জানতামই না যে মাছটা এত বড়!”

তবু আমি তাকে হত্যা করব,”বৃদ্ধ বললেন। সে যতই মহান ও গৌরবময়ই হোক না কেন।”

যদিও এটা অন্যায়, তিনি মনে মনে ভাবলেন। কিন্তু আমি তাকে দেখিয়ে দেব— একজন মানুষ কী করতে পারে এবং কতটা সহ্য করতে পারে।

“আমি ছেলেটাকে বলেছিলাম, আমি এক অদ্ভুত বুড়ো মানুষ,” তিনি বললেন।

“এখনই সেই কথার প্রমাণ দেওয়ার সময়।”

হাজারবার তিনি তাঁর সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন—সেসবের এখন কোনো মূল্য নেই। এবার তিনি আবার নিজেকে প্রমাণ করছেন। প্রতিবারই সেটা ছিল একেবারে নতুন পরীক্ষা, আর যখন তিনি সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হতেন, তখন কখনোই অতীতের কথা ভাবতেন না।

“ইশ, যদি মাছটা ঘুমিয়ে পড়ত, তাহলে আমিও একটু ঘুমোতে পারতাম আর সিংহদের স্বপ্ন দেখতে পারতাম,” তিনি মনে মনে ভাবলেন। “কেন যে সিংহদের কথাই এখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে? আর ভাবিস না, বুড়ো,” তিনি নিজেকেই বললেন। “কাঠের গায়ে আলতো করে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নে। কিছুই ভাবিস না। মাছটা তার কাজ করছে। তুই যত কম পরিশ্রম করতে পারিস, ততই ভালো।”

বিকেল গড়িয়ে আসছিল, আর নৌকাটি তখনও ধীরে কিন্তু অবিচলভাবে এগিয়ে চলেছিল। তবে এবার পূর্ব দিক থেকে আসা বাতাসের কারণে মাছটার টানের চাপ আরও বেড়ে গিয়েছিল। ছোট ছোট ঢেউয়ের সঙ্গে নৌকাটি মৃদুভাবে দুলছিল, আর পিঠের ওপর সুতোর ঘর্ষণের ব্যথাটা যেন ধীরে ধীরে, তাকে মৃদুভাবে অনুভব করাচ্ছিল।

বিকেলের একসময় সুতোটা আবার ওপরে উঠতে শুরু করল। কিন্তু মাছটি কেবল একটু উঁচু স্তরে উঠে সাঁতার কাটতে লাগল। সূর্যের আলো তখন বুড়োর বাঁ হাত, কাঁধ আর পিঠে পড়ছিল। তাই তিনি বুঝতে পারলেন, মাছটি এখন উত্তর দিক ছেড়ে উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরছে।

এখন যেহেতু তিনি একবার মাছটিকে দেখেছেন, তাই তিনি কল্পনা করতে পারছিলেন—গভীর জলের মধ্যে মাছটি তার বেগুনি রঙের বুকের পাখনাগুলো ডানার মতো ছড়িয়ে সাঁতার কাটছে, আর তার বিশাল সোজা লেজ অন্ধকার চিরে এগিয়ে যাচ্ছে।

“জলের এত গভীরে থেকে ও কতটা দেখতে পায়?” বৃদ্ধ ভাবলেন। “ওর চোখ তো বিরাট। অথচ ঘোড়ার চোখ অনেক ছোট হয়েও সে অন্ধকারে দেখতে পায়। আমিও একসময় অন্ধকারে বেশ ভালোই দেখতে পেতাম। তবে পুরোপুরি অন্ধকারে নয়, প্রায় বিড়ালের মতো।”

সূর্যের উষ্ণতা আর আঙুলের অবিরাম নড়াচড়ার ফলে তাঁর বাঁ হাতের খিঁচুনি পুরোপুরি সেরে গেল। তখন তিনি সুতোর টান আরও বেশি করে বাঁ হাতে নিতে শুরু করলেন এবং পিঠের পেশিগুলো একটু ঝাঁকিয়ে সুতোর চাপের ব্যথাটা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করলেন।

তিনি জোরে জোরে বললেন- “মাছ, যদি তুই ক্লান্ত না হয়ে থাকিস, তাহলে তুই সত্যিই এক অদ্ভুত প্রাণী।”

এখন তিনি নিজেও খুব ক্লান্ত বোধ করছিলেন। তিনি জানতেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাত নেমে আসবে। তাই তিনি অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করলেন। তার মনে পড়ল বড় লিগের বেসবল খেলার কথা—যাকে তিনি বলতেন ‘গ্রান লিগাস’৪০। তিনি জানতেন, নিউইয়র্ক ইয়াঙ্কিস তখন ডেট্রয়েট টাইগার্সের বিরুদ্ধে খেলছে।

“এখন দ্বিতীয় দিন চলছে, অথচ আমি খেলার ফলই জানি না,” তিনি ভাবলেন। “তবু আমার আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। আমাকে মহান ডিমাজিওর মতো যোগ্য হতে হবে। তিনি তো গোড়ালির হাড়ের যন্ত্রণা নিয়েও সবকিছু নিখুঁতভাবে করেন।”

“হাড়ের কাঁটা জিনিসটা আসলে কী?” তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। “আমাদের তো এমন হয় না। এটা কি লড়াইয়ের মোরগের পায়ের ধারালো কাঁটার মতোই কষ্ট দেয়? আমি মনে করি না, আমি এমন যন্ত্রণা সহ্য করতে পারতাম। কিংবা এক বা দুই চোখ হারিয়েও যেমন লড়াইয়ের মোরগগুলো লড়ে যায়, তেমনই লড়তে পারতাম। মানুষ, প্রকৃতির সেই বিশাল পাখি আর জন্তুর তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র। তবু আমি বরং সমুদ্রের অন্ধকারে থাকা ওই প্রাণীটিই হতে চাই।”

তিনি উচ্চস্বরে বললেন- “যদি হাঙর না আসে। ঈশ্বর, হাঙর এলে ওকে আর আমাকেও রক্ষা করুন।”

তিনি আবার ভাবলেন, “মহান ডিমাজিও কি আমার মতো এতক্ষণ ধরে একটি মাছের সঙ্গে লড়ে যেতে পারতেন?  আমি নিশ্চিত, পারতেন—বরং আরও বেশি পারতেন। কারণ তিনি তরুণ, শক্তিশালী, আর তাঁর বাবাও ছিলেন একজন জেলে। কিন্তু গোড়ালির সেই হাড়ের কাঁটার ব্যথা কি তাঁকে খুব কষ্ট দিত না?”

তিনি বললেন- “জানি না। আমার তো কখনও এমন হাড়ের কাঁটা হয়নি।”

সূর্য যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন নিজের সাহস বাড়ানোর জন্য তাঁর মনে পড়ল কাসাব্লাঙ্কা৪১- র এক মদের দোকানের কথা। সেখানে একবার তিনি সিয়েনফুয়েগোসের বন্দরের সবচেয়ে শক্তিশালী কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকের সঙ্গে হাত-কুস্তি লড়েছিলেন। তাঁদের প্রতিযোগিতা টানা এক দিন এক রাত ধরে চলছিল। দুজনেই টেবিলের ওপর চক দিয়ে টানা দাগের ওপর কনুই রেখে, বাহু সোজা খাড়া ও শক্ত করে একে অপরের হাত চেপে ধরেছিলেন। প্রত্যেকেই চেষ্টা করছিলেন প্রতিপক্ষের হাতটিকে টেবিলের ওপর নামিয়ে দিতে। টেবিলের ওপর তাঁদের হাত স্থির ছিল। প্রচুর বাজি ধরা হয়েছিল, আর কেরোসিন বাতির আলোয় মানুষজন ঘরটাতে আসা-যাওয়া করছিল।তিনি কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বীর বাহু, হাত এবং মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। প্রথম আট ঘণ্টার পর প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর রেফারি বদলানো হচ্ছিল, যাতে তারা কিছুক্ষণ ঘুমাতে পারে। তাঁর এবং কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়েরই নখের নিচ থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছিল। তাঁরা একে অপরের চোখের দিকে, আবার নিজেদের হাত ও বাহুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বাজি ধরারা ঘরে ঢুকছিল, বেরিয়ে যাচ্ছিল, দেয়ালের পাশে উঁচু চেয়ারে বসে প্রতিযোগিতা দেখছিল। কাঠের দেয়ালগুলো উজ্জ্বল নীল রঙে রাঙানো ছিল, আর কেরোসিন বাতির আলোয় তাদের বিশাল ছায়া দেয়ালে পড়ছিল। বাতাসে বাতিগুলো দুললে কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বীর বিশাল ছায়াটিও দেয়ালের ওপর নড়ে উঠত।

সারারাত বাজির অঙ্ক ওঠানামা করছিল। কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাম খেতে দেওয়া হচ্ছিল এবং তাঁর জন্য সিগারেট ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

তারপর রাম পান করার পর কৃষ্ণাঙ্গটি এক প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করল। একসময় সে বৃদ্ধকে— যিনি তখনও বৃদ্ধ হননি, বরং “সান্তিয়াগো, যিনি ‘এল ক্যাম্পেওন’ নামে পরিচিত ছিলেন, হাত প্রায় তিন ইঞ্চি মতো ভারসাম্যচ্যুত করে ফেলেছিল। কিন্তু সান্তিয়াগো আবার ধীরে ধীরে নিজের হাতকে আগের মত অবস্থায় ফিরিয়ে আনলেন। তখনই তিনি নিশ্চিত হলেন যে এই অসাধারণ মানুষ ও মহান ক্রীড়াবিদকে তিনি পরাজিত করতে পারবেন।

ভোর হয়ে এলে বাজি ধরারা ম্যাচটিকে ড্র ঘোষণা করার অনুরোধ করছিল, আর রেফারি মাথা নাড়ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে সান্তিয়াগো তাঁর সমস্ত শক্তি একত্র করলেন। ধীরে ধীরে কৃষ্ণাঙ্গটির হাত নিচের দিকে ঠেলে দিলেন, যতক্ষণ না তা টেবিলের কাঠের ওপর গিয়ে ঠেকে। প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল রবিবার সকালে এবং শেষ হয়েছিল সোমবার সকালে।অনেক বাজিধরা মানুষ ড্র চাইছিল, কারণ তাদের বন্দরে চিনির বস্তা বোঝাই করার কাজে কিংবা হাভানা কোল কোম্পানিতে কাজে যাওয়ার তাড়া ছিল। নইলে সবাই শেষ পর্যন্ত লড়াই দেখতে চাইত। কিন্তু সান্তিয়াগো যাই হোক প্রতিযোগিতার নিষ্পত্তি করেছিলেন, এবং কারও কাজে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই তা শেষ করেছিলেন।

তারপর দীর্ঘদিন সবাই তাকে দ্য চ্যাম্পিয়ন” বলে ডাকত। বসন্তকালে আবার একটি পুনর্ম্যাচ(রিম্যাচ) হয়েছিল। কিন্তু সেখানে খুব বেশি টাকা বাজি ধরা হয়নি, এবং সেখানে সান্তিয়াগো সহজেই জয়ী হয়েছিলেন। কারণ প্রথম ম্যাচেই তিনি সিয়েনফুয়েগোসের সেই কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিলেন।এরপর তিনি আরও কয়েকটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারপর আর কখনও অংশগ্রহণ করেননি। তিনি বুঝেছিলেন, যদি সত্যিই মনপ্রাণ দিয়ে ইচ্ছে করেন, তবে তিনি যে কাউকে হারাতে পারবেন। কিন্তু তিনি এটাও উপলব্ধি করেছিলেন যে এই ধরনের প্রতিযোগিতা তাঁর মাছ ধরার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডান হাতের ক্ষতি করে। তাই তিনি বাম হাত দিয়ে কয়েকবার অনুশীলন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বাম হাত যেন সবসময়ই বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। বাম হাত দিয়ে যখনই তিনি যা করতে চাইতেন, তা করতে পারতেন না। তাই তিনি বাম হাতের ওপর কখনও ভরসা করতে পারেন নি।

তিনি মনে মনে ভাবলেন,“এখন রোদে হাতটা ভালোভাবেই শুকিয়ে যাবে। রাতটা যদি খুব বেশি ঠান্ডা না হয়, তবে আর টান ধরবে না। কে জানে, আজ রাত আমার জন্য কী নিয়ে আসছে!”

ঠিক তখনই একটি বিমান মিয়ামির পথে উড়ে চলে গেল। তিনি বিমানের ছায়া সমুদ্রের ওপর পড়তে দেখলেন। সেই ছায়া দেখে উড়ন্ত মাছের ঝাঁক আতঙ্কিত হয়ে চারদিকে ছুটে পালাল।

তিনি বললেন- “এত উড়ন্ত মাছ যখন আছে, নিশ্চয়ই কাছাকাছি ডলফিনও আছে। তিনি সুতোয় ভর দিয়ে একটু পেছনে হেললেন, দেখতে চাইলেন বড় মাছটির ওপর সামান্য হলেও বাড়তি নিয়ন্ত্রণ আনা যায় কি না। কিন্তু কিছুই হলো না। মাছটি আগের মতোই শক্ত টান ধরে রইল; জলের ফোঁটা কাঁপছিল, যেন সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার আগের সেই টানটান অবস্থা। নৌকাটি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। তিনি বিমানের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যতক্ষণ না সেটি চোখের আড়াল হয়ে গেল।

তিনি ভাবলেন,“বিমানের ভেতর থেকে পৃথিবীটা নিশ্চয়ই খুব অদ্ভুত লাগে। এত ওপর থেকে সমুদ্রটা দেখতে কেমন হয়? যদি খুব বেশি উঁচুতে না উড়ে, তাহলে নিশ্চয়ই মাছগুলোও দেখা যায়। আমার ইচ্ছে হয়, প্রায় দুইশো ফ্যাদম উচ্চতায় খুব ধীরে উড়ে ওপরে থেকে মাছগুলো দেখি।কচ্ছপ ধরার নৌকায় কাজ করার সময় আমি একসময় মাস্তুলের মাথার ক্রস-ট্রির ওপর উঠতাম। সেই উচ্চতা থেকেও অনেক কিছু দেখতে পেতাম। ওপর থেকে ডলফিনগুলো আরও সবুজ দেখায়। তাদের শরীরের ডোরাগুলো স্পষ্ট দেখা যায়, আর বেগুনি রঙের আভাও চোখে পড়ে। দ্রুতগতির স্রোতের মধ্যে সাঁতার কাটতে থাকা মাছগুলোর গায়ে বেগুনি ডোরা বা দাগ স্পষ্ট দেখা যায়। কেন যে অন্ধকার স্রোতের সব দ্রুতগতির মাছেরই পিঠ বেগুনি রঙের হয় এবং তাদের শরীরে সাধারণত বেগুনি ডোরা বা দাগ থাকে! ডলফিন মাছটিকে অবশ্য সবুজ দেখায়, যদিও আসলে তার রং সোনালি। কিন্তু যখন সে সত্যিই ক্ষুধার্ত হয়ে খাবার খোঁজে বেরোয়, তখন মার্লিন মাছের মতোই তার দুই পাশে বেগুনি ডোরা ফুটে ওঠে। এটা কি রাগের কারণে, নাকি অতিরিক্ত গতিতে ছুটে চলার ফলে এমন হয়?

অন্ধকার নামার ঠিক আগে, তাঁরা যখন সারগাসো আগাছার বিশাল এক ভাসমান দ্বীপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন—সেগুলো শান্ত সমুদ্রে এমনভাবে দুলছিল যেন হলুদ কম্বলের নিচে সমুদ্র কারও সঙ্গে প্রেম করছে— ঠিক তখনই তাঁর ছোট ছিপে একটি ডলফিন মাছ ধরা পড়ল। সূর্যের শেষ আলোয় মাছটিকে প্রথম দেখলেন তিনি। একেবারে খাঁটি সোনার মতো ঝলমল করছিল, আর ভয়ে বারবার আকাশে লাফিয়ে নানা কসরত দেখাচ্ছিল। মাছটি বারবার লাফিয়ে উঠছিল। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে নৌকার পেছনের দিকে এগিয়ে গেলেন। ডান হাত ও বাহু দিয়ে বড় সুতোটি শক্ত করে ধরে রেখে, বাম হাত দিয়ে মাছটিকে টেনে আনতে লাগলেন। যতবারই সুতো টানছিলেন, ততবারই খালি বাম পা দিয়ে টেনে আনা সুতোর ওপর পা রেখে সেটিকে আটকে দিচ্ছিলেন।মাছটি যখন নৌকার পেছনে এসে মরিয়া হয়ে এদিক-ওদিক ছটফট করতে লাগল, তখন বৃদ্ধ নৌকার ধারে ঝুঁকে পড়ে বেগুনি দাগওয়ালা ঝকঝকে সোনালি মাছটিকে টেনে তুলে নৌকায় নিয়ে এলেন। বঁড়শিতে আটকে থাকা তার চোয়াল দ্রুত কাঁপছিল এবং সে উন্মত্তের মতো কামড়াতে চাইছিল। তার লম্বা চ্যাপ্টা দেহ, মাথা আর লেজ দিয়ে নৌকার তলায় প্রচণ্ড আঘাত করছিল। অবশেষে বৃদ্ধ তার চকচকে সোনালি মাথায় গদা দিয়ে জোরে আঘাত করলেন। মাছটি কেঁপে উঠল এবং একসময় সম্পূর্ণ নিশ্চল হয়ে গেল।

বৃদ্ধ বঁড়শি খোলে ফেললেন এবং নতুন একটি সার্ডিন মাছ গেঁথে আবার ছিপটি সমুদ্রে ছুড়ে দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে নৌকার সামনের দিকে ফিরে এলেন। তিনি বাম হাত সমুদ্রের পানিতে ধুয়ে প্যান্টে মুছে নিলেন। তারপর ভারী সুতোটি ডান হাত থেকে বাম হাতে নিয়ে ডান হাতটিও সমুদ্রে ধুয়ে ফেললেন। সেই সময় তিনি দেখছিলেন সূর্য ধীরে ধীরে সমুদ্রের বুকে ডুবে যাচ্ছে এবং মোটা সুতোটি তির্যকভাবে পানির মধ্যে নেমে আছে।

“তার কোনো পরিবর্তনই হয়নি,” তিনি বললেন।কিন্তু পানির মধ্যে নিজের হাতের পাশ দিয়ে স্রোতের চলাচল দেখে বুঝতে পারলেন, মাছটির গতি সামান্য হলেও কমেছে।

“আমি নৌকার পেছনে দুটি বইঠা বেঁধে দেব,” তিনি বললেন। “তাতে রাতে ওর গতি কিছুটা কমে যাবে। রাতের জন্য সে প্রস্তুত, আমিও প্রস্তুত।”

তিনি ভাবলেন, একটু পরে ডলফিন মাছটির পেট পরিষ্কার করলে ভালো হবে, তাতে মাংসের মধ্যে রক্ত আরও ভালো থাকবে। একই সঙ্গে বইঠাগুলোও বেঁধে দেওয়া যাবে, যাতে সেগুলো পানিতে টান সৃষ্টি করে। এখন বরং মাছটিকে শান্ত থাকতে দেওয়াই ভালো, সূর্যাস্তের সময় তাকে বেশি বিরক্ত করা উচিত নয়। সূর্য ডোবার সময়টা সব মাছের জন্যই কঠিন সময়।

তিনি হাতটি বাতাসে শুকিয়ে নিয়ে আবার সুতো শক্ত করে ধরলেন। নিজেকে সামনের কাঠের সঙ্গে ঠেকিয়ে যতটা সম্ভব আরাম করে বসলেন, যাতে নৌকাটিও তাঁর সঙ্গে সমানভাবে, এমনকি তাঁর চেয়েও বেশি মাছের টানের চাপ সামলাতে পারে।

কীভাবে এই ধরণের পরিস্থিতি সামলাতে হয়, অন্তত এই অংশটাতো শিখেছি। তিনি মনে মনে ভাবলেন। তারপর মনে পড়ল, বঁড়শিতে ধরা পড়ার পর থেকে মাছটি কিছুই খায়নি। সে তো বিশাল এক মাছ, তার প্রচুর খাবার দরকার। আমি পুরো বনিটো৪২মাছটাই খেয়ে ফেলেছি। আগামীকাল এই ডলফিন মাছটাই খাব। তিনি এটিকে ডোরাডো৪৩ বলে ডাকত। মাছটা পরিষ্কার করার সময় হয়তো কিছুটা খেয়ে নেব। বনিটোর চেয়ে এটি খেতে কঠিন হবে। কিন্তু পৃথিবীতে সহজ বলে তো কিছুই নেই।

তিনি জোরে বললেন- “কেমন আছ, মাছ?”

“আমি ভালো আছি। আমার বাম হাতও এখন অনেকটা ভালো। এক রাত আর এক দিনের খাবারও আছে আমার। এবার নৌকাটাকে টেনে নিয়ে চলো, মাছ।”

আসলে তিনি মুঠেই ভালো অনুভব করছিলেন না। পিঠের ওপর সুতোর যে ব্যথা ছিল, তা এতটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে যে আর এখন তীব্র ব্যথা নয়, এক ধরনের অসাড় অনুভূতিতে পরিণত হয়েছে—আর সেই অসাড়তাকেই তিনি বেশি ভয় পাচ্ছিলেন। তবু তিনি মনে মনে বললেন, এর চেয়েও খারাপ কষ্ট আমি সহ্য করেছি। আমার এক হাত শুধু সামান্য কেটেছে, আর অন্য হাতের খিঁচুনিও সেরে গেছে।আমার পা এখন ঠিক আছে। আর এখন খাবারের দিক থেকেও আমি তার চেয়ে এগিয়ে আছি।

সেপ্টেম্বরে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর যেমন দ্রুত অন্ধকার নেমে আসে, তেমনই চারপাশে রাত নেমে এল।বৃদ্ধ নৌকার সামনের ক্ষয়প্রাপ্ত কাঠের গায়ে হেলান দিয়ে যতটা সম্ভব বিশ্রাম নিলেন। আকাশে প্রথম তারাগুলো ফুটে উঠেছে। তিনি রিগেল তারাটির নাম জানতেন না, কিন্তু সেটিকে দেখতে পেলেন। তিনি জানতেন, অল্পক্ষণেই আকাশে সব তারা ফুটে উঠবে, আর তখন তাঁর সেই দূরের বন্ধুরা তাঁর সঙ্গী হবে।”

“মাছটাও আমার বন্ধু,” তিনি উচ্চস্বরে বললেন। “এমন মাছ আমি কখনও দেখিনি, এমন মাছের কথা কখনও শুনিওনি। তবু আমাকে ওকে মারতেই হবে। তবে আমি খুশি যে আমাদের আকাশের তারাগুলোকে মারার চেষ্টা করতে হয় না।

তিনি ভাবলেন, যদি প্রতিদিন একজন মানুষকে চাঁদকে হত্যা করার চেষ্টা করতে হতো! কিন্তু চাঁদ তো ডুবে যায়। আবার যদি প্রতিদিন সূর্যকে হত্যা করার চেষ্টা করতে হতো? সত্যিই আমরা সৌভাগ্যবান হয়ে জন্মেছি।

তারপর তিনি সেই বিশাল মাছটির জন্য দুঃখ অনুভব করলেন, কারণ তার খাওয়ার মতো কিছুই নেই। তবু তাকে হত্যা করার সংকল্প তার একটুও শিথিল হলো না। তিনি ভাবলেন, “এই মাছ কত মানুষকে আহার জোগাবে! কিন্তু তারা কি সত্যিই এর মাংস খাওয়ার যোগ্য? না, নিশ্চয়ই নয়। এর আচরণ, এর মহত্ত্ব ও মর্যাদা দেখলে মনে হয়, কেউই এর যোগ্য নয়।”

“আমি এসব বুঝি না,” তিনি মনে মনে বললেন। “তবে এটাই ভালো যে আমাদের সূর্য, চাঁদ কিংবা তারাগুলোকে হত্যা করতে হয় না। সমুদ্রে বাস করা প্রকৃত ভাইদের হত্যা করেই আমাদের জীবনধারণ করতে হয়—এটাই যথেষ্ট।

এরপর তিনি আবার ভাবতে লাগলেন সুতোর টানের কথা। এর যেমন বিপদ আছে, তেমনি সুবিধাও আছে। যদি মাছটি হঠাৎ সর্বশক্তি দিয়ে ছুটে যায় এবং বইঠাগুলোর সৃষ্টি করা টান ঠিকমতো কাজ করে, তাহলে হয়তো আমার এত বেশি সুতো বেরিয়ে যাবে যে শেষ পর্যন্ত  মাছটাকেই হারিয়ে ফেলব। আবার নৌকার হালকাভাবও নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু নৌকার এই হালকাভাব তাদের দুজনের কষ্ট দীর্ঘায়িত করলেও সেটাই তাঁর নিরাপত্তা, কারণ মাছটি এখনও তার প্রকৃত গতির পরিচয় দেয়নি।

যাই ঘটুক না কেন, ডলফিন মাছটির পেট পরিষ্কার করতে হবে, যাতে সেটি নষ্ট না হয়। তারপর তার কিছুটা খেয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে।

“এখন আমি আর এক ঘণ্টা বিশ্রাম নেব। তারপর যখন নিশ্চিত হব যে মাছটি এখনও একইভাবে শক্ত ও স্থির আছে, তখন নৌকার পেছনে গিয়ে কাজ শুরু করব এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। এর মধ্যে আমি তার আচরণ লক্ষ্য করব— কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না। দাঁড়গুলো ব্যবহার করাটা ভালো কৌশল বটে; কিন্তু এখন আর ঝুঁকি নেওয়ার সময় নয়—এখন নিরাপদ পথেই এগোতে হবে। মাছটি এখনও ভীষণ শক্তিশালী। আমি দেখেছি, বঁড়শিটি তার মুখের এক কোণে আটকে আছে, আর সে মুখ শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। বঁড়শির যন্ত্রণা তেমন কিছু নয়। প্রকৃত যন্ত্রণা হলো ক্ষুধা এবং এমন এক অজানা শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, যাকে সে বুঝতেই পারছে না। এখন বিশ্রাম নাও, বুড়ো মানুষ। তাকে কাজ করতে দাও, যতক্ষণ না তোমার আবার কর্তব্যের সময় আসে।”

তিনি মনে করলেন, প্রায় দুই ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়েছেন। চাঁদ তখনও ওঠেনি, তাই সময় বোঝার কোনো উপায় ছিল না। আসলে তিনি পুরোপুরি বিশ্রামও নেয়নি। মাছের টান এখনও তার কাঁধে ছিল। তবে তিনি বাঁ হাতটি নৌকার সামনের ধারটিতে রেখে প্রতিরোধের দায়িত্ব অনেকটাই নৌকার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।

তিনি ভাবলেন- সুতোটা যদি কোথাও শক্ত করে বেঁধে রাখতে পারতাম, তাহলে কত সহজ হতো! কিন্তু মাছটি যদি হঠাৎ একবার ঝাঁকুনি দেয়, তবে সুতো ছিঁড়ে যেতে পারে। তাই আমার শরীর দিয়েই সুতোর টান সামলাতে হবে, আর দুই হাত সব সময় প্রস্তুত রাখতে হবে— প্রয়োজনে সঙ্গে সঙ্গে আরও সুতো ছেড়ে দেওয়ার জন্য।”

তারপর তিনি উচ্চস্বরে বললেন- “কিন্তু তুমি তো এখনও ঘুমাওনি, বুড়ো মানুষ। আধা দিন, এক রাত, তারপর আরেকটা দিন কেটে গেছে—তবু তোমার চোখে ঘুম নেই। মাছটা যদি শান্ত ও স্থির থাকে, তাহলে তোমাকে একটু ঘুমানোর উপায় বের করতেই হবে। না হলে তোমার মাথা পরিষ্কার থাকবে না।”

“আমার মাথা এখনো যথেষ্ট পরিষ্কার,” বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন। “বরং অতিরিক্তই পরিষ্কার। আমার মন আকাশের সেই তারাগুলোর মতোই স্বচ্ছ, যারা যেন আমার ভাই। তবুও আমাকে ঘুমাতেই হবে। তারা ঘুমায়, চাঁদ ও সূর্যও ঘুমায়, এমনকি সমুদ্রও কখনো কখনো ঘুমিয়ে পড়ে—যখন কোনো স্রোত না থাকে এবং চারদিক নিস্তরঙ্গ হয়ে থাকে।

কিন্তু ঘুমানোর কথা মনে রাখতে হবে, তিনি ভাবলেন। নিজেকে জোর করেই ঘুমাতে হবে, আর সুতোগুলোর এমন একটি সহজ ও নিরাপদ ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ঘুমের সময়ও সব ঠিক থাকে। এখন পেছনে ফিরে গিয়ে ডলফিন মাছটি প্রস্তুত করো। যদি ঘুমিয়ে পড়তেই হয়, তাহলে বইঠাগুলোকে নৌকা টেনে রাখার জন্য বইঠব্যবহার করা খুবই বিপজ্জনক হবে।

‘ঘুম ছাড়াও হয়তো চলতে পারি,’ তিনি নিজেকেই বললেন। ‘কিন্তু তা খুবই বিপজ্জনক হবে।’

তিনি হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে নৌকার পেছনের দিকে এগোতে লাগলেন, খুব সাবধানে, যেন মাছটি টান পেয়ে বিরক্ত না হয়। ‘হয়তো সেও আধো ঘুমে আছে,’ তিনি ভাবলেন। ‘কিন্তু আমি চাই না সে বিশ্রাম পাক। মরার আগ পর্যন্ত তাকে টানতেই হবে।’

নৌকার পেছনে পৌঁছে তিনি এমনভাবে বসলেন যাতে বাঁ কাঁধের ওপর দিয়ে যাওয়া সুতোর টানটি তার বাঁ হাতে থাকে। এরপর ডান হাতে খাপ থেকে ছুরিটি বের করলেন। তখন আকাশে তারাগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তাই তিনি ডলফিন মাছটিকে স্পষ্ট দেখতে পেলেন। তিনি ছুরির ফলাটি মাছটির মাথায় ঢুকিয়ে সেটিকে নৌকার নিচ থেকে টেনে বের করলেন। এক পা মাছটির ওপর রেখে দ্রুত পায়ুপথ থেকে নিচের চোয়ালের আগা পর্যন্ত পেট চিরে ফেললেন। তারপর ছুরিটি নামিয়ে রেখে ডান হাত দিয়ে ভেতরের সব নাড়িভুঁড়ি বের করে পরিষ্কার করলেন এবং ফুলকাগুলোও টেনে আলাদা করে ফেললেন।

মাছটির পাকস্থলী তাঁর হাতে ভারী ও পিচ্ছিল লাগছিল। তিনি সেটিও চিরে খোলে  ফেললেন। ভেতরে দুটি উড়ন্ত মাছ ছিল। মাছ দুটো ছিল একেবারে টাটকা ও শক্ত। তিনি সেগুলো পাশাপাশি রেখে নাড়িভুঁড়ি ও ফুলকাগুলো সমুদ্রে ফেলে দিলেন। সেগুলো ডুবে যেতে যেতে পানির নিচে ফসফোরেসেন্ট আলোর একটি রেখা রেখে গেল।তারার আলোয় ডলফিন মাছটির গা তখন ঠান্ডা, ধূসর-সাদাটে এবং কুষ্ঠরোগীর চামড়ার মতো বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। বৃদ্ধ তাঁর ডান পা মাছটির মাথার ওপর রেখে এক পাশের চামড়া ছাড়ালেন। তারপর মাছটিকে উল্টে অন্য পাশের চামড়াও ছাড়িয়ে নিলেন এবং মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত দুই পাশের মাংস আলাদা করে কেটে নিলেন।

এরপর তিনি মাছটির কঙ্কাল সমুদ্রে ফেলে দিলেন এবং পানিতে কোনো ঘূর্ণি তৈরি হয় কি না তা লক্ষ্য করলেন। কিন্তু সেখানে শুধু ধীরে ধীরে তলিয়ে যাওয়া মৃতদেহের ক্ষীণ আলোর আভা দেখা গেল।

নৌকার সামনের অংশে ফিরে এসে তিনি মাছের দুটি টুকরো কাঠের ওপর রাখলেন, আর তার পাশে রাখলেন উড়ন্ত মাছটি। তারপর তিনি কাঁধের ওপর দিয়ে যাওয়া সুতোটিকে আরেকটু আরামদায়কভাবে নতুন জায়গায় ঠিক করে নিলেন এবং বাম হাতটি নৌকার পাশের কিনারায় রেখে আবার সুতোটি ধরে রইলেন। এরপর তিনি নৌকার পাশ দিয়ে ঝুঁকে উড়ন্ত মাছটিকে সমুদ্রের জলে ধুয়ে নিলেন এবং হাতের সঙ্গে জলের স্রোতের বেগ অনুভব করতে লাগলেন। মাছের চামড়া ছাড়ানোর কারণে তাঁর হাত ফসফোরেসেন্ট আলোয় হালকা জ্বলজ্বল করছিল। তিনি দেখছিলেন, সেই জ্বলজ্বলে হাতের ওপর দিয়ে কীভাবে জল বয়ে যাচ্ছে। স্রোতের টান আগের তুলনায় কিছুটা কমে এসেছিল। তিনি যখন স্কিফের কাঠের গায়ে হাতের পাশ ঘষলেন, তখন ফসফোরেসেন্ট কণাগুলো হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধীরে ধীরে নৌকার পেছনের দিকে ভেসে যেতে লাগল।

বৃদ্ধ বললেন- “সে হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, অথবা বিশ্রাম নিচ্ছে। এখন আমি এই ডলফিন মাছটা খেয়ে নিই, তারপর একটু বিশ্রাম আর সামান্য ঘুম দিই।”

তারাভরা আকাশের নিচে, ক্রমশ শীতল হয়ে ওঠা রাতে, তিনি ডলফিন মাছের একটি পাতলা টুকরোর অর্ধেক এবং একটি উড়ন্ত মাছ—যার নাড়িভুঁড়ি ফেলে মাথা কেটে রাখা হয়েছিল সেটি খেয়ে নিলেন।

“রান্না করা ডলফিন মাছ খেতে কী দারুণ!” তিনি বললেন। “কিন্তু কাঁচা অবস্থায় কী ভয়ানক বাজে! আমি আর কোনো দিন লবণ বা লেবু ছাড়া নৌকায় বের হব না।”

যদি আমার একটু বুদ্ধি থাকত, তবে সারাদিন নৌকার সামনের অংশে সমুদ্রের জল ছিটিয়ে শুকাতে দিতাম। তাতে লবণ তৈরি হতো, তিনি ভাবলেন। কিন্তু সূর্য ডোবার প্রায় আগে পর্যন্ত তো আমি ডলফিন মাছটাকে ধরতেই পারিনি! তবু, বলতে হয়, এটা আমার প্রস্তুতির অভাব ছিল। যাই হোক, আমি মাছটা ভালো করে চিবিয়ে খেয়েছি, তাই বমি বমি লাগছে না।

পূর্ব আকাশে মেঘ জমতে শুরু করছে, আর তিনি যে তারাগুলো চিনতেন, সেগুলো একে একে অদৃশ্য হয়ে গেল। এখন মনে হচ্ছিল, যেন তিনি বিশাল এক মেঘের গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছেন। বাতাসও থেমে গেছে।

“তিন-চার দিনের মধ্যে খারাপ আবহাওয়া হবে,” তিনি বললেন। “তবে আজ রাতে নয়, কালও নয়। এখন একটু ঘুমের ব্যবস্থা করো, বুড়ো মানুষ। মাছটা এখন শান্ত আর স্থির হয়ে আছে।”

তিনি ডান হাতে সুতো শক্ত করে ধরে রাখলেন। তারপর ডান হাতকে সমর্থন দেওয়ার জন্য উরু ঠেকিয়ে, নৌকার সামনের কাঠের গায়ে নিজের সমস্ত ওজন হেলিয়ে দিলেন। এরপর সুতোটা কাঁধের একটু নিচে নামিয়ে এনে বাম হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলেন।

আমার ডান হাত এভাবেই ধরে রাখতে পারবে যতক্ষণ এটাকে ভর দেওয়া আছে, তিনি ভাবলেন। যদি ঘুমের মধ্যে হাত ঢিলে হয়ে যায়, তবে সুতো ছুটতে শুরু করলেই বাম হাত আমাকে জাগিয়ে দেবে। ডান হাতের ওপর খুব চাপ পড়ছে। কিন্তু হাতটা তো কষ্ট সহ্য করতে অভ্যস্ত। আমি যদি বিশ মিনিট বা আধঘণ্টাও ঘুমাতে পারি, তাহলেই অনেক উপকার হবে।

তিনি শরীরকে সুতোর সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে, সমস্ত ওজন ডান হাতের ওপর রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে শুয়ে পড়লেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি ঘুমিয়ে গেলেন।

তিনি সিংহদের স্বপ্ন দেখলেন না। তার বদলে দেখলেন অসংখ্য পরপয়েজ৪৪এর এক বিশাল দল, যা আট-দশ মাইল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। তখন তাদের মিলনের সময়। তারা উঁচু হয়ে লাফিয়ে আকাশে উঠছে, যে গর্ত তৈরি করে জল থেকে উঠেছিল, ঠিক সেই গর্তেই আবার ফিরে এসে পড়ছে।

এরপর স্বপ্ন দেখলেন, তিনি গ্রামের নিজের বিছানায় শুয়ে আছেন। উত্তরের ঠান্ডা বাতাস বইছে। তিনি ভীষণ ঠান্ডায় কাঁপছেন। ডান হাতটাও অবশ হয়ে গেছে, কারণ বালিশের বদলে মাথাটা সেই হাতের ওপর রেখেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

তারপর তিনি স্বপ্নে দেখলেন সেই দীর্ঘ হলুদ সমুদ্রতট। সন্ধ্যার অন্ধকার নামার মুখে প্রথম সিংহটি সৈকতে নেমে এল। তারপর আরও সিংহ এল। তিনি নোঙর করা জাহাজের নৌমুখের কাঠ৪৫এর ওপর থুতনি রেখে, উপকূল থেকে বইতে থাকা সন্ধ্যার বাতাসে বসে আরও সিংহ আসবে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রইলেন। আর তখন তিনি সুখী ছিলেন।

চাঁদ অনেকক্ষণ আগেই উঠেছিল। কিন্তু তিনি তখনও ঘুমিয়ে ছিলেন। মাছটি সমান টানে সাঁতরে চলছিল, আর নৌকাটি মেঘের সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ ডান হাতের মুঠি নিজের মুখে সজোরে আঘাত করায় তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। একই সঙ্গে সুতো দ্রুত ছুটে যেতে যেতে তাঁর ডান হাতের তালু পুড়িয়ে দিচ্ছিল। তিনি বুঝলেন, বাম হাতে কোনো অনুভূতিই নেই। তাই ডান হাত দিয়েই যতটা সম্ভব সুতো আটকে রাখার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সুতো অবিশ্বাস্য গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

অবশেষে বাম হাতেও সুতোর স্পর্শ অনুভব করলেন। তিনি সুতোর বিপরীতে শরীর হেলিয়ে দিলেন। এবার সুতো তাঁর পিঠ আর বাম হাত জ্বালিয়ে দিতে লাগল। বাম হাতেই এখন পুরো টান এসে পড়েছে, আর সেই হাত গভীরভাবে কেটে যাচ্ছে।

তিনি পেছনে তাকিয়ে দেখলেন, গুটিয়ে রাখা সুতোর পাকগুলো ঠিকমতো বেরিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই মাছটি বিরাট এক লাফ দিল। যেন সমুদ্র বিস্ফোরিত হলো, তারপর প্রচণ্ড শব্দে আবার জলে আছড়ে পড়ল। তারপর সে আবার লাফ দিল, আবারও দিল। নৌকাটি দ্রুত ছুটে চলল, অথচ সুতো তখনও দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে।

বৃদ্ধ বারবার সুতোর টান এমন সীমায় নিয়ে যাচ্ছিলেন, যেন আর একটুখানি হলেই তা ছিঁড়ে যাবে। প্রতিবারই টান সেই চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে আবার থেমে যাচ্ছিল। তিনি নৌকার সামনের অংশে এত শক্ত করে চেপে গিয়েছিলেন যে তাঁর মুখটা কেটে রাখা ডলফিন মাছের টুকরোর ওপর ঠেসে ছিল। তিনি আর একটুও নড়তে পারছিলেন না।

“এই মুহূর্তটির জন্যই তো আমি অপেক্ষা করছিলাম,” বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন। “এবার তাহলে মোকাবিলা শুরু করা যাক। সুতোর মূল্য তাকে দিতেই হবে। প্রতিটি ইঞ্চির দাম তাকে চুকোতে হবে।”

তিনি মাছটির লাফ দেওয়া দেখতে পেলেন না; শুধু সমুদ্রের জল ভেঙে ওঠার শব্দ ও আবার জলে পড়ার ভারী ছপাৎ শব্দ শুনতে পেলেন। দ্রুত ছুটে চলা সুতোটি তাঁর হাত দুটিকে গভীরভাবে কেটে দিচ্ছিল। কিন্তু তিনি জানতেন, এমনটা হবেই। তাই তিনি চেষ্টা করছিলেন যেন সুতোটি কেবল হাতের শক্ত কড়া পড়া অংশের ওপর দিয়েই সরে যায়, তালু বা আঙুলে যেন না কেটে বসে।

“ছেলেটা যদি এখানে থাকত, তবে সুতোর পাকগুলো ভিজিয়ে দিতে পারত,” তিনি ভাবলেন। “হ্যাঁ, ছেলেটা যদি এখানে থাকত! যদি এখানে থাকত!”

সুতো বেরিয়েই চলল, বেরিয়েই চলল, বেরিয়েই চলল— তবে তার গতি এখন ধীরে ধীরে কমছিল। আর বৃদ্ধও মাছটিকে সুতোর প্রতিটি ইঞ্চির জন্য মূল্য দিতে বাধ্য করছিলেন। তিনি কাঠের গায়ে ঠেস দিয়ে থাকা মাথাটা তুলে নিলেন, গালে লেগে থাকা ডলফিন মাছের চেপ্টে যাওয়া মাংসের টুকরো থেকে মুখ সরিয়ে নিলেন। প্রথমে হাঁটু গেড়ে বসলেন, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি এখনও সুতো ছাড়ছিলেন, তবে আগের তুলনায় অনেক ধীরে। অন্ধকারে যে সুতোর পাকগুলো দেখতে পাচ্ছিলেন না, সেগুলোর কাছে পা টিপে টিপে ফিরে গেলেন, যাতে পায়ের স্পর্শে তাদের অবস্থান বুঝতে পারে। এখনও অনেক সুতো বাকি ছিল। আর এখন মাছটিকে সেই নতুন সুতোর সমস্ত ঘর্ষণ (প্রতিরোধ) টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছিল পানির ভেতর দিয়ে।

“হ্যাঁ,” তিনি ভাবলেন, “এখন সে এক ডজনেরও বেশি বার লাফিয়েছে। তার পিঠ বরাবর থাকা বায়ুথলিগুলো বাতাসে ভরে গেছে। এখন সে আর অত গভীরে ডুব দিতে পারবে না, যেখানে মারা গেলে আমি তাকে আর টেনে ওপরে তুলতে পারব না। শিগগিরই সে বৃত্তাকারে ঘোরা শুরু করবে। তখনই আমাকে আসল কাজ শুরু করতে হবে। হঠাৎ এমন কী হলো যে সে এতটা উন্মত্ত হয়ে উঠল? ক্ষুধাই কি তাকে এমন মরিয়া করে তুলেছিল? নাকি রাতের অন্ধকারে কোনো কিছু তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল? হয়তো হঠাৎই তার মনে ভয় ঢুকে পড়েছে। অথচ সে তো ছিল এত শান্ত, এত শক্তিশালী, এত নির্ভীক ও আত্মবিশ্বাসী এক মাছ। সত্যিই আশ্চর্য!”

“বুড়ো,” তিনি নিজেকেই বললেন- “তোমাকেও নির্ভীক আর আত্মবিশ্বাসী থাকতে হবে। তুমি তাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছ, কিন্তু এখনও সুতো গুটিয়ে আনতে পারছ না। তবে খুব শিগগিরই ও বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করবে।”

বৃদ্ধ এবার বাম হাত ও কাঁধ দিয়ে সুতোটা চেপে ধরে রাখলেন। তারপর ঝুঁকে ডান হাতে সমুদ্রের জল তুলে মুখে ছিটিয়ে গালের সঙ্গে লেগে থাকা ডলফিন মাছের থেঁতলানো মাংস ধুয়ে ফেললেন। তাঁর ভয় হচ্ছিল, ওই মাংসের গন্ধে যদি বমি বমি ভাব লাগে, যদি বমি করে ফেলে, তবে তার শক্তি নষ্ট হয়ে যাবে। মুখ পরিষ্কার করার পর ডান হাতটিও নৌকার পাশ দিয়ে সমুদ্রের লবণাক্ত জলে ধুয়ে অনেকক্ষণ সেখানে ডুবিয়ে রাখলেন। এদিকে সূর্য ওঠার আগের প্রথম আলো ধীরে ধীরে ফুটে উঠছিল। সে প্রায় পূর্বদিকে যাচ্ছে,” বৃদ্ধ ভাবলেন। “এর মানে সে ক্লান্ত, আর স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলেছে। খুব শিগগিরই তাকে বৃত্তাকারে ঘুরতেই হবে। তখনই আমাদের প্রকৃত লড়াই শুরু হবে।

যখন তাঁর মনে হলো ডান হাতটি যথেষ্ট সময় পানিতে ছিল, তখন তিনি হাতটি তুলে ভালো করে নিরীক্ষণ করলেন।

“খুব একটা খারাপ হয়নি,” তিনি বললেন। “একজন মানুষের কাছে ব্যথার কোনো মূল্য নেই।”

তিনি সাবধানে আবার সুতো ধরলেন, যেন নতুন কাটা ক্ষতগুলোর ওপর সুতো না লাগে। তারপর শরীরের ভর সামলে নিলেন, যাতে নৌকার অন্য পাশ দিয়ে বাম হাতটিও সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে রাখতে পারেন।

“তুই কিন্তু এতটা খারাপ করিসনি, যদিও তোকে আমি অকেজোই বলি,”তিনি নিজের বাম হাতকে বললেন। “তবে একটা সময় তোকে যেন খুঁজেই পাচ্ছিলাম না।”

“আমার জন্ম যদি দুটো সমান ভালো হাত নিয়ে হতো!” তিনি মনে মনে ভাবলেন। “হয়তো দোষটা আমারই। আমি কখনো এই হাতটাকে ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দিইনি। তবে ঈশ্বর জানেন, শেখার জন্য এর যথেষ্ট সুযোগ ছিল। অবশ্য রাতের বেলায় সে খুব একটা খারাপ কাজ করেনি। মাত্র একবারই খিঁচুনি ধরেছিল। যদি আবার খিঁচুনি ধরে— তাহলে সুতোটাকেই কেটে আলাদা করে দিতে দাও।”

যখন তিনি ভাবলেন যে তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর মাথা আর পরিষ্কারভাবে কাজ করছে না, তখন তাঁর মনে হলো হয়তো ডলফিন মাছের আরেকটু খাওয়া উচিত। কিন্তু তিনি নিজেকেই বললেন, না, পারব নাবমি হলে শক্তিই নষ্ট হবে; তার চেয়ে মাথাটা একটু ঝিমঝিম করাই ভালো। তাছাড়া আমি জানি, আমি যদি এটি খেয়ে ফেলি, তাহলে আর সংরক্ষণ করে রাখতে পারব না। কারণ আমার মুখ তো ইতিমধ্যেই এর গায়ে লেগেছে। তবে জরুরি প্রয়োজনের জন্য রেখে দেব, যতক্ষণ না নষ্ট হয়ে যায়। তবে এখন খাবার খেয়ে শক্তি ফেরানোর সময় আর নেই। আহাম্মক, তিনি নিজেকে বললেন, অন্য উড়ন্ত মাছটা খেয়ে নাও।”

উড়ন্ত মাছটি পরিষ্কার করে প্রস্তুত করেই রাখা ছিল। তিনি বাঁ হাতে সেটি তুলে নিলেন এবং হাড়গুলো ভালোভাবে চিবিয়ে লেজ পর্যন্ত পুরো মাছটাই খেয়ে ফেললেন।

প্রায় সব মাছের চেয়ে এতে বেশি পুষ্টি আছে,” তিনি ভাবলেন। অন্তত এখন আমার যে শক্তির দরকার, তা এটি দেবে। আমি যা পারি তা করেছি। এর বেশি করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এবার ওকে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করতে দাও, তারপর যুদ্ধ শুরু হোক।”

তিনি সমুদ্রে বেরোনোর পর তৃতীয়বারের মতো সূর্য উঠছিল, ঠিক তখনই মাছটি বৃত্তাকারে ঘোরা শুরু করল।

সুতোর ঢাল দেখে তিনি বুঝতে পারেননি যে মাছটি ঘুরছে। তখনও তা বোঝার মতো সময় হয়নি। তিনি শুধু অনুভব করলেন সুতোর টান সামান্য ঢিলে হয়েছে। তিনি ডান হাতে ধীরে ধীরে সুতো টানতে শুরু করলেন। আগের মতোই সুতো টানটান হয়ে উঠল। কিন্তু ঠিক যখন মনে হলো আর একটুখানি টানলেই সুতো ছিঁড়ে যাবে, তখনই সুতো একটু একটু করে তাঁর দিকে আসতে লাগল।

তিনি কাঁধ ও মাথা সুতোর নিচ থেকে সরিয়ে নিলেন এবং ধীরে ধীরে স্থিরভাবে সুতো টানতে লাগলেন। দুই হাত দোলনার মতো ছন্দে নড়ছিল। যতটা সম্ভব তিনি হাতের বদলে শরীর ও পায়ের শক্তি দিয়ে টান দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর বৃদ্ধ পা ও কাঁধ প্রতিটি টানের সঙ্গে সঙ্গে দুলছিল।

ও অনেক বড় একটা বৃত্ত কাটছে,” তিনি বললেন। কিন্তু ও ঘুরছেই।”তারপর আবার সুতো আর এগোল না। তিনি সেটিকে ধরে রইলেন, যতক্ষণ না সূর্যের আলোয় সুতো থেকে পানির ফোঁটাগুলো লাফিয়ে উঠতে দেখলেন। এরপর সুতো আবার বেরিয়ে যেতে শুরু করল। বৃদ্ধ হাঁটু গেড়ে বসে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেটিকে আবার গভীর কালো জলের দিকে যেতে দিলেন।

“মাছটি এখনও অনেকটা দূরে চক্কর দিচ্ছে, নৌকার কাছে আসেনি।”তিনি বললেন।

যতটা পারি, ততটাই চেপে ধরে রাখতে হবে,” তিনি ভাবলেন। এই চাপই প্রতিবার ওর বৃত্তকে ছোট করবে। হয়তো আর এক ঘণ্টার মধ্যে আমি ওকে দেখতে পাব। আগে ওকে পরাস্ত করতে হবে, তারপর ওকে মারতে হবে।”

কিন্তু মাছটি ধীরে ধীরে বৃত্ত কাটতেই থাকল। আরও দুই ঘণ্টা পরে বৃদ্ধের শরীর ঘামে ভিজে গেল, আর ক্লান্তি যেন হাড়ের গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তবে এখন বৃত্তগুলো আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে এসেছে। সুতোর ঢাল দেখে তিনি বুঝতে পারলেন, মাছটি ঘুরতে ঘুরতেই ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে আসছে।

এক ঘণ্টা ধরে বৃদ্ধের চোখের সামনে কালো কালো দাগ ভাসছিল। ঘামের নোনাজল তাঁর চোখে জ্বালা ধরাচ্ছিল, চোখের ওপরের কাটা জায়গা আর কপালেও লবণের দাহ অনুভূত হচ্ছিল। কালো দাগগুলো দেখে তিনি ভয় পাননি। এত প্রবল টান সামলাতে গেলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। তবে দু-দুবার তাঁর মাথা ঘুরে উঠেছিল এবং মনে হয়েছিল তিনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন—এটাই তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।

এমন একটা মাছের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমি নিজের কাছে হেরে গিয়ে মরতে পারি না,” তিনি বললেন। এখন যখন ও এত সুন্দরভাবে আমার নিয়ন্ত্রণে আসছে, ঈশ্বর, আমাকে এই কষ্ট সহ্য করার শক্তি দিন। আমি একশোবার আওয়ার ফাদারআর একশোবার হেইল মেরিপ্রার্থনা করব। কিন্তু এখন সেগুলো বলতে পারছি না।”

ধরে নাও, আমি সেগুলো বলেই ফেলেছি,” তিনি মনে মনে ভাবলেন। পরে অবশ্যই বলব।”

ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর দুই হাতে ধরা সুতোতে হঠাৎ প্রচণ্ড এক ধাক্কা ও ঝাঁকুনি অনুভূত হলো। আঘাতটি ছিল তীক্ষ্ণ, শক্ত এবং ভীষণ ভারী। সে তার বর্শা(মাছের মাথা বা ঠোঁট) দিয়ে স্টিলের তারের লিডারটাকেই আঘাত করছে,”বৃদ্ধ ভাবলেন। এটা ঘটবেই জানতাম। ওর তা করতেই হতো। এতে হয়তো সে আবার লাফ দেবে, অথচ আমি চাই সে এখন বৃত্ত কেটেই ঘুরতে থাকুক। বাতাস নেওয়ার জন্য তার লাফ দেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু এরপর প্রতিটি লাফেই বঁড়শির বিদ্ধের ক্ষতটি আরও বড় হতে পারে, আর সে এক সময় বঁড়শিটাই ছুড়ে ফেলে দিতে পারে।”

লাফ দিও না, মাছ,” তিনি বললেন। লাফ দিও না।

মাছটি আরও কয়েকবার তারের লিডারটিকে আঘাত করল। প্রতিবার মাথা ঝাঁকানোর সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ একটু একটু করে সুতো ছেড়ে দিলেন।

ওর যন্ত্রণাটা যতটা আছে ততটাই ধরে রাখতে হবে,” তিনি ভাবলেন। আমার কষ্টের কথা নয়। আমি আমার কষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। কিন্তু ওর যন্ত্রণা ওকে পাগল করে দিতে পারে।

কিছুক্ষণ পরে মাছটি তারে আঘাত করা বন্ধ করে আবার ধীরে ধীরে বৃত্ত কেটে সাঁতার কাটতে শুরু করল। বৃদ্ধ এবার ধীরে ধীরে সুতো গুটিয়ে আনছিলেন। কিন্তু আবারও তাঁর মাথা ঘুরতে লাগল। তিনি বাঁ হাত দিয়ে কিছু সমুদ্রের পানি তুলে মাথায় ঢাললেন। তারপর আরও কিছু পানি নিয়ে ঘাড়ের পেছনে ঘষে দিলেন।

আমার হাতে আর খিঁচুনি নেই,” তিনি বললেন। ও খুব শিগগিরই ওপরে উঠে আসবে, আর আমি ততক্ষণ টিকে থাকতে পারব। আমাকে টিকে থাকতেই হবে। এ নিয়ে আর একটি কথাও নয়।”

তিনি নৌকার সামনের অংশে হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং এক মুহূর্তের জন্য আবার সুতোটিকে পিঠের ওপর দিয়ে নিয়ে নিলেন।

এখন একটু বিশ্রাম নিই,” তিনি মনে মনে স্থির করলেন। ও যখন বৃত্তের বাইরের দিকে যাবে, তখন আমি বিশ্রাম নেব। তারপর ও যখন আবার কাছে ফিরে আসবে, তখন উঠে দাঁড়িয়ে আবার লড়াই শুরু করব।”

নৌকার আগায় শুয়ে থেকে মাছটিকে একবার সম্পূর্ণ বৃত্ত কাটতে দেওয়া এবং সেই সময়ে একটুও সুতো না গুটিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তাঁর প্রবল প্রলোভন হচ্ছিল। কিন্তু সুতোর টান বদলাতে দেখে বুঝতে পারলেন মাছটি আবার নৌকার দিকে ফিরেছে। তখনই তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং শরীর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, কাপড় বুননের মতো ছন্দে টান দিতে দিতে যতটা সুতো ফিরে পেয়েছিল সব গুটিয়ে আনতে লাগলেন।

জীবনে এর চেয়ে বেশি ক্লান্ত আমি কখনো হইনি,” তিনি ভাবলেন। আর এখন বাণিজ্যিক বাতাসও উঠছে। তবে সেটাই ভালো হবে— ওকে নিয়ে ঘরে ফিরতে সেই বাতাসের খুব দরকার হবে

পরেরবার ও যখন বৃত্তের বাইরের দিকে যাবে, তখন আমি একটু বিশ্রাম নেব,” তিনি বললেন। এখন অনেক ভালো লাগছে। আর দুই-তিনবার বৃত্ত কাটলেই ওকে আমি পেয়ে যাব।”

খড়ের টুপিটা মাথার অনেক পেছনে সরে গিয়েছিল। মাছটি আবার ঘুরে দাঁড়াতেই সুতোর প্রবল টানে তিনি নৌকার আগায় বসে পড়লেন।

এখন কাজ করো, মাছ,” তিনি মনে মনে বললেন। বাঁক ঘুরে এলে তখন আমি তোমাকে ধরব।”

এদিকে সমুদ্রের ঢেউ অনেকটাই বেড়ে উঠেছিল। তবে আবহাওয়া পরিষ্কার ছিল, আর ঘরে ফেরার জন্য সেই হাওয়াই তাঁর প্রয়োজন ছিল।

আমি শুধু দক্ষিণ-পশ্চিম দিকেই নৌকা চালাব,” তিনি বললেন। মানুষ সমুদ্রে কখনো সত্যিই হারিয়ে যায় না। দ্বীপটা অনেক দীর্ঘ।”

তৃতীয়বার বৃত্ত কাটার সময় তিনি প্রথমবার মাছটিকে দেখতে পেলেন।

প্রথমে তিনি মাছটিকে দেখলেন নৌকার নিচ দিয়ে অতিক্রম করা এক বিশাল কালো ছায়ার মতো। ছায়াটি এত দীর্ঘ সময় ধরে নৌকার তলা দিয়ে যেতে লাগল যে, তার দৈর্ঘ্য বিশ্বাস করাই যেন কঠিন হয়ে উঠল।

“না,” বৃদ্ধ বললেন। “ও এত বড় হতে পারে না।”

কিন্তু মাছটি সত্যিই এত বড় ছিল। সেই চক্করের শেষে সে নৌকা থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরে পানির ওপর ভেসে উঠল। বৃদ্ধ তার লেজটিকে জলের ওপর দেখতে পেলেন। সেটি যেন বিশাল এক কাস্তের ফলার চেয়েও উঁচু, আর গাঢ় নীল সমুদ্রের ওপর তার রং ছিল ফ্যাকাশে বেগুনি। লেজটি পেছনের দিকে বাঁকানো ছিল। মাছটি যখন জলের ঠিক নিচ দিয়ে সাঁতার কাটছিল, তখন বৃদ্ধ তার বিশাল দেহ আর গায়ের ওপর জড়ানো বেগুনি ডোরাগুলো স্পষ্ট দেখতে পেলেন। তার পৃষ্ঠপাখনা নিচু হয়ে ছিল, আর দু’পাশের বিশাল পাখনাগুলো সম্পূর্ণ প্রসারিত ছিল।

এই চক্করে বৃদ্ধ মাছটির চোখও দেখতে পেলেন। তার সঙ্গে দুটি ধূসর রঙের রেমোরা মাছ৪৬          ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কখনো তারা বড় মাছটির গায়ে লেগে থাকছিল, কখনো আবার দ্রুত সরে যাচ্ছিল। আবার কখনো তার ছায়ার ভেতরেই নিশ্চিন্তে সাঁতার কাটছিল। প্রতিটি মাছই তিন ফুটেরও বেশি লম্বা ছিল। দ্রুত সাঁতার কাটার সময় তারা পুরো শরীরটি সাপের মতো দুলিয়ে দুলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।

এখন বৃদ্ধের শরীর ঘামে ভিজে গেছে, তবে শুধু রোদের জন্য নয়। মাছটি প্রতিটি শান্ত ও ধীর চক্করে ঘুরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কিছুটা করে সুতো টেনে নিতে হয়েছিল। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হলো, আর দুটো চক্কর পরেই তিনি হারপুনটি মাছের শরীরে বিদ্ধ করার সুযোগ পাবেন।

ওকে আরও কাছে আনতে হবে—আরও কাছে, আরও কাছে,” তিনি মনে মনে বললেন। মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করা যাবে না। আমাকে তার হৃদয় লক্ষ্য করে আঘাত করতে হবে।”

“শান্ত থাকো, শক্ত থাকো, বুড়ো,” তিনি নিজেকেই বললেন।

পরের চক্করে মাছটির পিঠ পানির ওপর উঠে এল, কিন্তু সে তখনও নৌকা থেকে একটু বেশি দূরে ছিল। তার পরের চক্করে সে দূরেই রইল, তবে আরও বেশি অংশ জলের ওপরে উঠে এসেছিল। বৃদ্ধ বুঝতে পারলেন, আর একটু সুতো টানতে পারলেই মাছটিকে নৌকার একেবারে পাশে আনা যাবে।

তিনি অনেক আগেই হারপুন প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। তার সঙ্গে বাঁধা হালকা দড়িটি সুন্দর করে গোল ঝুড়ির মধ্যে প্যাঁচানো ছিল, আর দড়ির অন্য প্রান্ত নৌকার সামনের শক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ছিল।

মাছটি আবার শান্ত, সৌন্দর্যময় ভঙ্গিতে নিজের বৃত্ত সম্পূর্ণ করে এগিয়ে আসছিল। শুধু তার বিশাল লেজটি ধীরে ধীরে নড়ছিল। বৃদ্ধ সমস্ত শক্তি দিয়ে সুতো টানলেন, যাতে মাছটিকে আরও কাছে আনা যায়। এক মুহূর্তের জন্য মাছটি সামান্য কাত হয়ে গেল। তারপর আবার সোজা হয়ে আরেকটি চক্কর কাটতে শুরু করল।

“আমি ওকে নড়াতে পেরেছি,” বৃদ্ধ বললেন। “হ্যাঁ, এবার আমি ওকে নড়াতে পেরেছি।”

আবার তাঁর মাথা ঘুরে উঠল। তবু তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই বিশাল মাছটিকে ধরে রাখলেন।

আমি ওকে নড়াতে পেরেছি,” তিনি মনে মনে বললেন। হয়তো এবার ওকে পুরোপুরি কাত করতে পারবটানো, হাত টানোশক্ত থাকো, পা। মাথা, আরেকটু সহ্য করো। তুমি তো কখনও হার মানোনি। এবার আমি ওকে কাত করেই ছাড়ব।”

কিন্তু মাছটি নৌকার পাশে আসার আগেই তিনি সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে টান দিলেও, মাছটি শুধু অল্প একটু কাত হলো। তারপরই আবার নিজেকে সোজা করে নিয়ে সাঁতার কেটে দূরে সরে গেল।

“মাছ,” বৃদ্ধ বললেন- “যাই হোক তোমাকে মরতেই হবে। কিন্তু তার জন্য কি আমাকেও মেরে ফেলতে চাও?”

এভাবে কিছুই হবে না, তিনি ভাবলেন।তাঁর মুখ এতটাই শুকিয়ে গিয়েছিল যে কথা বলাও কঠিন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন পানি খাওয়ার জন্য হাত বাড়ানোরও সময় ছিল না।

“আমি আর খুব বেশি বার এমন কঠিন লড়াই সামলাতে পারব না,” তিনি ভাবলেন। তারপর নিজেকেই সাহস দিয়ে বললেন- “পারবে। তুমি তো চিরকালই সক্ষম।” পরের পাক ঘোরার সময় বৃদ্ধ প্রায় তাকে জয় করেই ফেলেছিলেন। কিন্তু মাছটি আবার নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে সাঁতরে দূরে সরে গেল।

তুমি আমাকে মেরে ফেলেছ, মাছ,”বৃদ্ধ মনে মনে বললেন। কিন্তু তোমার সেই অধিকার আছে। তোমার মতো এত মহান, এত সুন্দর, এত শান্ত আর এত মহৎ প্রাণী আমি জীবনে কখনও দেখিনি, ভাই। এসো, আমাকে মেরে ফেলো। কে কাকে মারে, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।”

তারপরই তিনি ভাবলেনএখন তোমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। মাথা পরিষ্কার রাখতে হবে। একজন মানুষের মতো কষ্ট সহ্য করতে শিখো।কিংবা একটি মাছের মতো,-“ তিনি মনে মনে যোগ করলেন।

প্রায় শোনা যায় না এমন ক্ষীণ স্বরে তিনি বললেন- মাথা, পরিষ্কার হওপরিষ্কার হও।”

আরও দু’বার একই ঘটনা ঘটল। প্রতিবার মাছটি পাক খেয়ে আবার নিজেকে সামলে নিলেন। আমি জানি না,” বৃদ্ধ ভাবলেন। প্রতিবারই তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন অজ্ঞান হয়ে পড়বেন। তবু তিনি হাল ছাড়লেন না। আবার চেষ্টা করলেন। মাছটিকে ঘোরানোর সময় তাঁর নিজেরই মাথা চক্কর কেটে উঠল। কিন্তু মাছটি আবার নিজেকে সোজা করে ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল। বিশাল লেজটি বাতাসে দুলছিল।আরও একবার চেষ্টা করব,” বৃদ্ধ নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিলেন। এখন তাঁর হাত দুটো প্রায় থেঁতলে যাওয়া মাংসের মতো নরম হয়ে গেছে। চোখেও সবকিছু কেবল ঝলকের মতো দেখা যাচ্ছিল। তিনি আবার চেষ্টা করলেন। ফল একই হলো।তখন তিনি ভাবলেনআর একবার। শেষবারের মতো চেষ্টা করব

তিনি নিজের সমস্ত যন্ত্রণা, অবশিষ্ট সামান্য শক্তি আর বহু আগেই হারিয়ে যাওয়া অহংকার— সব একত্রিত করলেন। সেগুলো তিনি মাছটির মৃত্যুযন্ত্রণার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলেন। এবার মাছটি ধীরে ধীরে কাত হয়ে গেল। সে পাশ ফিরে সাঁতরাতে লাগল। তার লম্বা ঠোঁট প্রায় নৌকার তক্তাকে স্পর্শ করছিল। নৌকার পাশ দিয়ে ভেসে যেতে লাগল সেই অসীম দীর্ঘ, গভীর, প্রশস্ত, রুপালি দেহ—যার গায়ে বেগুনি ডোরাগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল।

বৃদ্ধ সুতো ছেড়ে দিলেন এবং পা দিয়ে সেটিকে চেপে ধরলেন। তারপর যতটা সম্ভব উঁচু করে হারপুন তুললেন এবং নিজের সমস্ত শক্তি—এমনকি কোথা থেকে যেন জোগাড় করে আনা অতিরিক্ত শক্তিটুকুও—একত্র করে মাছটির বিশাল বুকের পাখনার ঠিক পেছনে সজোরে হারপুন বিদ্ধ করলেন।তিনি অনুভব করলেন, লোহার ফলাটি গভীরভাবে ভেতরে ঢুকে গেছে।তিনি আরও ঝুঁকে পড়লেন, আরও জোরে ঠেলে দিলেন, তারপর নিজের পুরো শরীরের ওজন সেই আঘাতের ওপর চাপিয়ে দিলেন।

ঠিক তখনই মৃত্যুকে বুকে নিয়ে মাছটি যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। সে জলের ওপর অনেক উঁচুতে লাফিয়ে উঠল।এক মুহূর্তের জন্য তার সম্পূর্ণ বিশাল দেহ—তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, অপরিসীম শক্তি আর অনিন্দ্যসুন্দর রূপ—সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠল। মনে হলো, সে যেন বৃদ্ধ আর ছোট্ট নৌকার অনেক ওপরে বাতাসে ঝুলে আছে। তারপর প্রবল শব্দে সে সমুদ্রে আছড়ে পড়ল। ছিটকে ওঠা পানির ফোয়ারা বৃদ্ধকে এবং পুরো নৌকাটিকে ভিজিয়ে দিল।

বৃদ্ধের মাথা ঘুরছিল। শরীর দুর্বল ও অসুস্থ লাগছিল। তিনি ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিলেন না। তবু তিনি হারপুনের দড়ি খুলে দিলেন এবং নিজের ক্ষতবিক্ষত হাতের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে দড়িটা চলতে দিলেন।চোখ কিছুটা পরিষ্কার হলে তিনি দেখলেন, মাছটি চিৎ হয়ে ভাসছে। তার রুপালি পেট ওপরে উঠে এসেছে।হারপুনের দণ্ডটি মাছটির কাঁধের কাছে তির্যকভাবে বেরিয়ে রয়েছে। মাছটির হৃদয় থেকে বের হওয়া রক্তে সমুদ্রের নীল জল ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে। প্রথমে সেই রক্ত গভীর নীল সমুদ্রের মধ্যে একটি কালো মাছের ঝাঁকের মতো দেখাল।তারপর তা ধীরে ধীরে মেঘের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। মাছটি নিস্তব্ধ হয়ে রুপালি ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে রইল।

বৃদ্ধ ঝাপসা চোখে চেষ্টা করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হারপুনের দড়িটি নৌকার সামনের খুঁটিতে দু’পাক জড়িয়ে বাঁধলেন এবং দুই হাতের ওপর মাথা রেখে ঝুঁকে পড়লেন।

তিনি নৌকার কাঠে মুখ ঠেকিয়ে বললেন- মাথা, পরিষ্কার থাকো। আমি এক ক্লান্ত বৃদ্ধ মানুষকিন্তু আমি এই মাছটিকে হত্যা করেছি—যে ছিল আমার ভাই। এখন আমাকে দাসের মতো পরিশ্রম করতে হবে।”

তিনি মনে মনে ভাবলেন- এখন ফাঁসের দড়িগুলো আর মোটা রশি প্রস্তুত করতে হবে, যাতে ওকে নৌকার পাশে শক্ত করে বাঁধতে পারি। আমরা যদি দুজন মানুষও হতাম, নৌকাটি ডুবিয়ে মাছটিকে তুলে পরে পানি সেচে ফেলতাম, তবে এই ছোট নৌকাটি তাকে বহন করতে পারত না। তাই সব প্রস্তুত করতে হবে। তারপর তাকে কাছে এনে শক্ত করে বেঁধে মাস্তুল দাঁড় করিয়ে পাল তুলব—এবং বাড়ির পথে রওনা দেব।”

তিনি মাছটিকে নিজের নৌকার পাশে টেনে আনতে শুরু করলেন, যাতে তার ফুলকার ভেতর দিয়ে এবং মুখ দিয়ে একটি দড়ি ঢুকিয়ে তার মাথাটি নৌকার সামনের অংশে শক্ত করে বাঁধতে পারেন। আমি ওকে দেখতে চাই,” তিনি মনে মনে ভাবলেন। ওকে ছুঁতে চাই, অনুভব করতে চাই। ও-ই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে শুধু সেই কারণেই আমি ওকে ছুঁতে চাই না। দ্বিতীয়বার হারপুনের দণ্ড ঠেলে দেওয়ার সময় যেন আমি ওর হৃদস্পন্দন অনুভব করেছিলাম। এবার ওকে কাছে এনে ভালো করে বেঁধে ফেলতে হবে। লেজে একটি ফাঁস দিতে হবে, আরেকটি শরীরের মাঝখানে, যাতে নৌকার সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা থাকে

তিনি নিজেকেই বললেন- কাজে লেগে পড়ো, বুড়ো।”তিনি অল্প একটু পানি খেলেন। লড়াই শেষ হয়েছে, কিন্তু এখনো অনেক কঠিন কাজ বাকি।”

তিনি আকাশের দিকে তাকালেন, তারপর মাছটির দিকে। সূর্যের দিকে ভালো করে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, এখনো দুপুর খুব বেশি পেরোয়নি। সমুদ্রের বাতাসও জোরে বইতে শুরু করেছে। মাছ ধরার সুতোগুলোর আর এখন কোনো দরকার নেই। বাড়ি ফিরলে আমি আর ছেলেটি এগুলো জোড়া লাগিয়ে নেব।

তিনি বললেন, এসো, মাছ।” কিন্তু মাছটি এগিয়ে এল না।

সে শুধু ঢেউয়ের ওপর ভেসে রইল। তখন বুড়ো মানুষটি নিজের ছোট নৌকাটি টেনে মাছটির একেবারে পাশে নিয়ে গেলেন।

নৌকাটি মাছটির পাশে পৌঁছাতেই এবং মাছটির মাথা নৌকার সঙ্গে লাগতেই তিনি তার বিশাল আকার দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি নৌকার খুঁটি থেকে হারপুনের দড়ি খুললেন। দড়িটি মাছের এক পাশের ফুলকা দিয়ে ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে বের করলেন। তারপর মাছটির লম্বা ঠোঁটের চারদিকে একবার পেঁচিয়ে অন্য পাশের ফুলকা দিয়ে আবার বের করে আরেকবার পেঁচালেন। এরপর দড়ির দুই মাথা শক্ত করে বেঁধে নৌকার সামনের খুঁটিতে আটকে দিলেন। তারপর অবশিষ্ট দড়ি কেটে নৌকার পেছনে গিয়ে মাছটির লেজে ফাঁস লাগালেন।

মাছটির আগের বেগুনি-রূপালি রং বদলে এখন প্রায় পুরোপুরি রূপালি হয়ে গেছে। শরীরের বেগুনি ডোরাগুলোও হালকা বেগুনি রঙের হয়ে গেছে। প্রতিটি ডোরা একজন মানুষের মেলে ধরা হাতের চেয়েও চওড়া। মাছটির চোখ ছিল একেবারে শান্ত ও স্থির—যেন ডুবোজাহাজের পেরিস্কোপের আয়না, অথবা ধর্মীয় শোভাযাত্রায় বহন করা কোনো সাধুর মূর্তির চোখ।

বুড়ো মানুষটি বললেন- ওকে মারার এটাই একমাত্র উপায় ছিল।”পানি খাওয়ার পর তিনি কিছুটা ভালো বোধ করছিলেন। তিনি জানতেন, আর অজ্ঞান হবেন না। তাঁর মাথাও এখন পরিষ্কার। তিনি মনে মনে হিসাব করলেন, এখন ওজন নিশ্চয়ই  পনেরোশো পাউন্ডেরও বেশি। হয়তো আরও বেশি। পরিষ্কার করার পর যদি তার দুই-তৃতীয়াংশ মাংস থাকে, আর প্রতি পাউন্ড ত্রিশ সেন্ট করে বিক্রি হয়, তাহলে…”

তিনি বললেন, এ হিসাব করার জন্য একটা পেন্সিল দরকার। মাথা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়তবে আজকের এই কাজ দেখে মহান ডি ম্যাজিও নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে গর্ব করতেন। আমার পায়ে বোন স্পার৪৭নেই। কিন্তু হাত আর পিঠে সত্যিই খুব ব্যথা করছে আবার ভাবলেন, বোন স্পার জিনিসটা আসলে কী? হয়তো আমাদেরও আছে, কিন্তু আমরা নিজেরাই জানি না।

তিনি মাছটিকে নৌকার সামনে, মাঝখানে এবং পেছনে শক্ত করে বেঁধে দিলেন। মাছটি এত বড় ছিল যে মনে হচ্ছিল, ছোট নৌকার পাশে যেন আরেকটি বড় নৌকা বাঁধা আছে।তিনি আরেক টুকরো দড়ি কেটে মাছটির নিচের চোয়াল তার লম্বা ঠোঁটের সঙ্গে বেঁধে দিলেন, যাতে মুখ খুলে না যায় এবং নৌকাটি যতটা সম্ভব সহজে পানির ওপর দিয়ে চলতে পারে।

তারপর তিনি মাস্তুল দাঁড় করালেন। গ্যাফ হিসেবে ব্যবহার করা লাঠিটি ঠিক করলেন এবং পাল তুলে দিলেন। জোড়াতালি দেওয়া পালটি বাতাসে ফুলে উঠল। নৌকাটি চলতে শুরু করল। তিনি নৌকার পেছনে আধশোয়া হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করলেন।

দক্ষিণ-পশ্চিম কোন দিকে, তা জানার জন্য তাঁর কম্পাসের দরকার ছিল না। সমুদ্রের বাতাসের স্পর্শ আর টানটান হয়ে ওঠা পালই তাঁকে সঠিক পথ দেখিয়ে দিচ্ছিল।

বৃদ্ধ ভাবলেন, একটা ছোট সুতোয় চামচের মতো টোপ লাগিয়ে পানিতে ফেলি। যদি কিছু ছোট মাছ বা অন্য কিছু ধরা পড়ে, তাহলে খেতে পারব। আর তাতে শরীরেও একটু পানি থাকবে। কিন্তু তাঁর কাছে কোনো চামচ ছিল না, আর সার্ডিন মাছগুলোও পচে গিয়েছিল। তাই নৌকার পাশ দিয়ে ভেসে যাওয়া হলুদ রঙের উপসাগরীয় সামুদ্রিক আগাছার একটি গুচ্ছ তিনি গ্যাফ দিয়ে টেনে তুললেন। সেটি ঝাঁকাতেই তার ভেতর থেকে এক ডজনেরও বেশি ছোট চিংড়ি নৌকার তলায় পড়ে গেল। তারা বালির পোকামাকড়ের মতো লাফাতে লাগল। বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে তাদের মাথা ছিঁড়ে ফেললেন এবং খোসা ও লেজসহ চিবিয়ে খেয়ে নিলেন। চিংড়িগুলো খুব ছোট ছিল, কিন্তু তিনি জানতেন এগুলো শরীরের জন্য উপকারী। খেতেও বেশ ভালো লাগছিল।

তাঁর বোতলে তখনও দুই চুমুকের মতো পানি ছিল। চিংড়ি খাওয়ার পর তিনি তার অর্ধেক পান করলেন। সব বাধা সত্ত্বেও ছোট নৌকাটি ভালোই চলছিল। তিনি বাহুর নিচে হাল চেপে নৌকা চালাচ্ছিলেন। মাছটিকে তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন। নিজের ক্ষতবিক্ষত হাতের দিকে তাকিয়ে এবং পিঠে নৌকার স্পর্শ অনুভব করে তিনি বুঝতে পারলেন— এসব সত্যিই ঘটেছে, এটা কোনো স্বপ্ন নয়। এক সময় খুব দুর্বল হয়ে পড়ে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো সবই স্বপ্ন। কিন্তু যখন তিনি বিশাল মাছটিকে সমুদ্র থেকে উঠে আকাশে স্থির হয়ে থাকতে দেখেছিলেন, তখন বুঝেছিলেন এটি সত্যি, যদিও সেই দৃশ্য এত অদ্ভুত ছিল যে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।

সেই সময় তাঁর চোখেও ভালো দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু এখন তিনি আগের মতোই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। এখন তিনি নিশ্চিত—মাছটিও সত্যি, তাঁর আহত হাত আর ব্যথা পাওয়া পিঠও সত্যি। তিনি মনে মনে বললেন, হাতের ক্ষত দ্রুতই সেরে যাবে। রক্ত বেরিয়ে গেছে, আর সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ক্ষত সারিয়ে তুলবে। গভীর সমুদ্রের এই নোনা পানি পৃথিবীর সেরা ওষুধ। এখন শুধু মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। তাঁর হাত কাজ করছে, আর আমরা ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছি মুখ বন্ধ করে, মাছের লেজ সোজা রেখে, তারা যেন দুই ভাইয়ের মতো পাশাপাশি ভেসে চলছিল। হঠাৎ তাঁর মাথা একটু ঘোলাটে হয়ে উঠল। তিনি ভাবলেন, মাছটা কি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আমি ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি? যদি মাছটাকে আমি পেছনে টেনে আনতাম, তাহলে কোনো প্রশ্নই থাকত না। আবার যদি মাছটা নৌকার ভেতরে থাকত, তাহলেও সন্দেহের কিছু অবকাশ থাকত না। কিন্তু তারা দুজন পাশাপাশি বাঁধা অবস্থায় একসঙ্গে চলছিল। বৃদ্ধ মনে মনে বললেন, যদি মাছটা আমাকে নিয়ে যেতে চায়, যাক। আমি শুধু কৌশল করে ওকে জয় করেছিও কখনও আমার কোনো ক্ষতি করতে চায়নি।

তারা শান্তভাবে এগিয়ে চলল। বৃদ্ধ বারবার লবণ পানিতে হাত ভিজিয়ে মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছিলেন। আকাশে বড় বড় সাদা মেঘ ছিল, তার ওপরে ছিল পাতলা পালকের মতো মেঘ। এগুলো দেখে তিনি বুঝলেন, রাতভর বাতাস বইবে। তিনি বারবার মাছটির দিকে তাকাচ্ছিলেন, যেন নিশ্চিত হতে পারেন—সবকিছু সত্যিই ঘটছে। প্রায় এক ঘণ্টা পরে প্রথম হাঙরটি এসে আক্রমণ করল।

হাঙরটির আসা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। গভীর সমুদ্রে মাছের রক্তের কালো মেঘ ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই রক্তের গন্ধ পেয়ে হাঙরটি অনেক নিচ থেকে দ্রুত ওপরে উঠে এসেছে। এত দ্রুত উঠে আসছিল যে সে সমুদ্রের নীল পানি ভেঙে সূর্যের আলোয় এসে পড়ল। তারপর আবার পানিতে ডুব দিল, রক্তের গন্ধ ঠিকমতো ধরে ফেলল এবং নৌকা ও মাছ যে পথে যাচ্ছিল, সেই পথেই দ্রুত সাঁতার কাটতে লাগল।

মাঝে মাঝে সে গন্ধ হারিয়ে ফেলত। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার গন্ধ পেয়ে যেত, অথবা সামান্য আভাস পেলেই সেই পথ ধরে দ্রুত ছুটে চলত। এটি ছিল এক বিশাল ম্যাকো হাঙর সমুদ্রের দ্রুততম মাছগুলোর মতোই দ্রুত সাঁতার কাটার জন্য তার শরীর তৈরি। তার চোয়াল ছাড়া শরীরের প্রতিটি অংশ ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তার পিঠ ছিল সোর্ডফিশের মতো নীল, পেট রুপালি, আর চামড়া ছিল মসৃণ ও চকচকে। বিশাল চোয়াল ছাড়া দেখতে অনেকটা সোর্ডফিশের মতোই ছিল। সে পানির ঠিক নিচ দিয়ে খুব দ্রুত এগোচ্ছিল। তার পিঠের বড় পাখনাটি পানির ওপর দিয়ে ছুরির ধারের মতো পানি কেটে এগিয়ে যাচ্ছিল।

তার মুখ বন্ধ থাকলেও ভেতরে আট সারি ধারালো দাঁত ছিল, যেগুলো ভেতরের দিকে বাঁকানো ছিল। সেগুলো সাধারণ হাঙরের ত্রিভুজাকৃতি দাঁতের মতো ছিল না।

ওগুলো দেখতে মানুষের আঙুলের মতো ছিল, আঙুলের নখর যেমন বাঁকানো থাকে, তেমনই বাঁকানো ছিল। দৈর্ঘ্যে প্রায় বৃদ্ধের আঙুলের সমান, আর দুই পাশেই ছিল ক্ষুরের মতো ধারালো কাটার অংশ। এই হাঙরটি এমনভাবে তৈরি, যাতে সে সমুদ্রের সবচেয়ে দ্রুতগামী, শক্তিশালী ও সশস্ত্র মাছগুলোকেও শিকার করতে পারে। তাদের আর কোনো প্রকৃত শত্রু ছিল না। তাজা রক্তের গন্ধ পেয়ে সে আরও দ্রুত এগিয়ে এল। তার নীল পৃষ্ঠ-পাখনা পানির উপর দিয়ে ছুরি কেটে যাওয়ার মতো এগিয়ে চলল।

বৃদ্ধ যখন হাঙরটিকে আসতে দেখলেন, তখনই বুঝলেন—এ এমন এক হাঙর, যার কোনো ভয় নেই। সে যা করতে চায়, তাই করবে। বৃদ্ধ হারপুন প্রস্তুত করলেন এবং দড়িটি শক্ত করে বাঁধলেন। তবে দড়িটি ছোট হয়ে গিয়েছিল, কারণ আগেই মাছটিকে বেঁধে রাখতে তিনি তার অনেকটা কেটে ফেলেছিলেন।

এখন বৃদ্ধের মাথা পরিষ্কার ছিল। তিনি দৃঢ় সংকল্পে ভরপুর ছিলেন, কিন্তু মনে খুবই কম আশা ছিল। তিনি ভাবলেন, এত ভালো সময় বেশিক্ষণ টিকে থাকার নয়।” হাঙরটি কাছে আসার সময় তিনি একবার বিশাল মাছটির দিকে তাকালেন।মনে হচ্ছে যেন সবই স্বপ্ন ছিলআমাকে আঘাত করা থেকে ওকে থামাতে পারব না,  তবে হয়তো ওকে মারতে পারব। ডেনতুসো৪৮ তোর সর্বনাশ হোক!” মনে মনে বললেন তিনি।

হাঙরটি খুব দ্রুত পেছন দিক থেকে এসে মাছটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বৃদ্ধ দেখলেন, তার বিশাল মুখ হা হয়ে আছে, অদ্ভুত চোখ দুটি জ্বলছে, আর ধারালো দাঁতগুলো শব্দ করতে করতে মাছটির লেজের ঠিক ওপরের অংশের মাংসে গভীরভাবে কামড় বসিয়ে দিয়েছে। হাঙরের মাথা তখন পানির ওপর উঠে এসেছে। তার পিঠও ভেসে উঠছিল। বৃদ্ধ স্পষ্ট শুনতে পেলেন মাছের চামড়া আর মাংস ছিঁড়ে যাওয়ার ভয়ংকর শব্দ। সেই মুহূর্তে তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে হারপুনটি হাঙরের মাথায় বসিয়ে দিলেন—চোখ দুটির মাঝখানের অংশে, যেখানে তার মস্তিষ্ক থাকার কথা। সেখানে কোনো দাগ ছিল না, কিন্তু অভিজ্ঞতায় তিনি ঠিক জায়গাটি চিনতে পেরেছিলেন। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত হাত দিয়ে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে হারপুন চালালেন। তাঁর মনে কোনো আশা ছিল না, শুধু অটল সংকল্প আর প্রবল প্রতিশোধের ইচ্ছা ছিল।

হাঙরটি একবার উল্টে গেল। বৃদ্ধ বুঝতে পারলেন, তার চোখের প্রাণ নিভে গেছে। তারপরও সে আবার ঘুরে উঠল এবং দড়ির দুই পাকের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলল। বৃদ্ধ জানতেন, হাঙরটি মারা গেছে, কিন্তু সে যেন নিজেই তা মানতে চাইছিল না। পিঠের ওপর ভেসে থেকে সে লেজ ঝাপটাতে লাগল, দাঁত কটমট করতে করতে মোটরবোটের মতো পানির ওপর ছুটে চলল। তার লেজের আঘাতে চারদিকে সাদা ফেনা ছড়িয়ে পড়ল। শরীরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পানির ওপরে উঠে এল। হঠাৎ দড়িটি টানটান হয়ে কেঁপে উঠল এবং ছিঁড়ে গেল। হাঙরটি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে পানির ওপর ভেসে রইল। বৃদ্ধ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে সেটি সমুদ্রের গভীরে ডুবে গেল।

বৃদ্ধ জোরে বললেন,-ও প্রায় চল্লিশ পাউন্ড মাংস নিয়ে গেলতিনি মনে মনে ভাবলেনআমার হারপুনও নিয়ে গেল, সেই সঙ্গে সব দড়িও। আর এখন আমার মাছ আবার রক্ত ঝরাচ্ছে। এবার আরও হাঙর আসবে।” এখন তিনি আর মাছটির দিকে তাকাতে চাইছিলেন না। হাঙরের আক্রমণে মাছটি ভয়াবহভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। মাছটিকে আঘাত করাটা যেন তাঁকেই আঘাত করার সমান ছিল। তবু তিনি নিজেকে বললেনযে হাঙর আমার মাছে আক্রমণ করেছিল, আমি তাকে মেরেছি। জীবনে যত ডেনতুসো দেখেছি, তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়। ঈশ্বর জানেন, আমি অনেক বড় হাঙর দেখেছি।”তারপর আবার ভাবলেন-এত ভালো সময় বেশিক্ষণ থাকারই ছিল না। এখন যদি সবই স্বপ্ন হতো! যদি আমি কখনো এই মাছটাকে না ধরতাম, আর বাড়িতে বিছানায় শুয়ে খবরের কাগজের ওপর ঘুমিয়ে থাকতাম!”

তারপর তিনি জোরে বললেন- মানুষ পরাজিত হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি। মানুষকে ধ্বংস করা যেতে পারে, কিন্তু তাকে পরাজিত করা যায় না।”তবে মনে মনে আবার বললেন, মাছটাকে মেরে ফেলেছি বলে এখন খারাপ লাগছে। সামনে আরও কঠিন সময় আসছে। আর আমার কাছে এখন হারপুনও নেই। ডেনতুসো নিষ্ঠুর, শক্তিশালী, সাহসী এবং বুদ্ধিমানকিন্তু আমি ওর চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ছিলাম।”কিছুক্ষণ পরে নিজেই আবার সন্দেহ করলেন,হয়তো তা নয়। হয়তো আমার কাছে শুধু ভালো অস্ত্র ছিল।”

“এত ভাবো না, বুড়ো,” তিনি জোরে বললেন। “এই পথেই নৌকা চালিয়ে যাও। যা আসবে, তখন তার মোকাবিলা করবে।”

কিন্তু তিনি মনে মনে ভাবলেন, আমাকে তো ভাবতেই হবে। এখন আমার কাছে আর কিছুই নেই। শুধু চিন্তা আর বেসবল তিনি আবার ভাবলেন, মহান ডি-ম্যাজিও হলে আমি যেভাবে হাঙরের মাথায় আঘাত করেছি, তা দেখে কী বলতেন? আসলে এটা খুব বড় কোনো কাজ নয়। যে কেউই হয়তো এটা করতে পারত। কিন্তু আমার হাতের এই অবস্থা কি তাঁর পায়ের হাড়ের ব্যথার মতোই বড় বাধা ছিল? তা আমি জানি না। আমার গোড়ালিতে কোনোদিন বড় সমস্যা হয়নি, শুধু একবার সাঁতার কাটার সময় একটি স্টিংরে৪৯মাছের ওপর পা পড়ার ফলে মাছটি আমার পায়ে তার হুল ফুটিয়েছিল। ফলে আমার পায়ের নিচের অংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল এবং অসহ্য যন্ত্রণা হয়েছিল।

“ভালো কিছু ভাবো, বুড়ো,” তিনি নিজেকে বললেন। “প্রতিটি মুহূর্তে তুমি বাড়ির আরও কাছে পৌঁছে যাচ্ছ। আর মাছের চল্লিশ পাউন্ড মাংস হারিয়ে যাওয়ায় নৌকাও এখন অনেক হালকা।”

তিনি ভালো করেই জানতেন, স্রোতের ভেতরের অংশে পৌঁছালে কী কী বিপদ ঘটতে পারে। কিন্তু এখন আর তাঁর করার মতো তেমন কিছু ছিল না।

হঠাৎ তিনি বললেন, “না, একটা কাজ করা যায়। একটি বইঠার মাথায় আমার ছুরিটা শক্ত করে বেঁধে দিই।”

তিনি তাই করলেন। এক হাতে নৌকার হাল ধরে রাখলেন, আর পায়ের নিচে পাল চেপে রেখে ছুরিটি বইঠার সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দিলেন।

“এবার,” তিনি বললেন, “আমি বুড়ো মানুষ ঠিকই, কিন্তু আমি নিরস্ত্র নই।”

তখন বাতাস বেশ জোরে বইছিল। নৌকাও ভালোভাবে এগিয়ে চলল। তিনি শুধু মাছটির সামনের অংশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে আবার একটু আশা সঞ্চার এল।

আশা ছেড়ে দেওয়া বোকামি,তিনি ভাবলেন। তাছাড়া, আমি বিশ্বাস করি আশা হারানোও যেন এক ধরনের পাপ।

তারপর আবার ভাবলেন, পাপ নিয়ে এখন ভেবে লাভ নেই। এখন এমনিতেই অনেক সমস্যা আছে। তাছাড়া, পাপের ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝিও না।

আমি পাপের অর্থ পুরোপুরি বুঝি না, এমনকি আমি সত্যিই এতে বিশ্বাস করি কি না, তাও নিশ্চিত নই। হয়তো মাছটিকে মারা পাপ ছিলকিন্তু আমি তো নিজে বাঁচার জন্য আর অনেক মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্যই তাকে মেরেছি। আবার যদি তা-ই হয়, তবে পৃথিবীর সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে পাপীনা, এসব এখন আর ভাবা যাবে না। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এসব বিচার করার জন্য অন্য মানুষ আছে, যাদের কাজই হলো এসব নিয়ে ভাবা। তারা ভাবুক। তুমি যেমন জেলে হয়ে জন্মেছ, মাছও তেমনি মাছ হয়ে জন্মেছে। সান পেদ্রোও ছিলেন একজন জেলে, যেমন মহান ডি-ম্যাজিওর বাবাও জেলে ছিলেন।

তবে তিনি যেসব বিষয়ে জড়িত থাকতেন, সেসব নিয়ে ভাবতে ভালোবাসতেন। পড়ার মতো কোনো বই ছিল না, রেডিওও ছিল না। তাই তিনি শুধু ভাবতেই থাকলেন, বিশেষ করে পাপের কথা।তুমি শুধু বাঁচার জন্য বা মাছ বিক্রি করার জন্য তাকে মারোনি,তিনি নিজেকে বললেন। তুমি তাকে মেরেছ নিজের গর্বের জন্য, কারণ তুমি একজন জেলে। সে যখন বেঁচে ছিল তখন তুমি তাকে ভালোবেসেছিলে, আর মরে যাওয়ার পরও ভালোবাসো। যদি সত্যিই তাকে ভালোবাসো, তাহলে তাকে হত্যা করা কি পাপ? নাকি তাতে পাপ আরও বেড়ে যায়?

“তুমি খুব বেশি ভাবছ, বুড়ো,” তিনি জোরে বললেন। তারপর আবার ভাবলেন,কিন্তু ডেনতুসো হাঙরটাকে মারতে তোমার ভালোই লেগেছিল। সে যেমন জীবন্ত মাছ খেয়ে বাঁচে, তুমিও তেমনই মাছ ধরে বাঁচো। সে কোনো মৃত প্রাণীখেকো নয়, আবার অন্য অনেক হাঙরের মতো শুধু লোভীও নয়সে সুন্দর, সাহসী এবং কোনো কিছুকেই ভয় পায় না।

“আমি ওকে আত্মরক্ষার জন্যই মেরেছি,” বুড়ো লোকটি জোরে বললেন। “আর আমি খুব ভালোভাবেই তাকে মেরেছি।”

এরপর তিনি আবার ভাবলেন, এই পৃথিবীতে প্রত্যেক প্রাণী কোনো না কোনোভাবে অন্য প্রাণীকে মেরে বেঁচে থাকে। মাছ ধরা যেমন আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, তেমনি ধীরে ধীরে আমাকে শেষও করে দেয়। আর সেই ছেলেটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। নিজের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রতারণা করা ঠিক হবে না।

বৃদ্ধ নৌকার পাশ দিয়ে ঝুঁকে হাঙরের কামড়ে ছিঁড়ে যাওয়া মাছের মাংসের একটি টুকরো হাতে তুলে নিলেন। তিনি সেটি চিবিয়ে দেখলেন এবং বুঝলেন, এর মান ও স্বাদ সত্যিই অসাধারণ। মাংসটি ছিল শক্ত, রসালো এবং গরুর মাংসের মতো, কিন্তু লাল রঙের নয়। এতে কোনো আঁশও ছিল না। তিনি জানতেন, বাজারে এই মাছের খুবই ভালো দাম পাওয়া যাবে। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে মাছের গন্ধ সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। তাই সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

বাতাস একই গতিতে বইছিল। তা আরও একটু উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরে গিয়েছিল। বৃদ্ধ বুঝলেন, এই বাতাস সহজে থামবে না। তিনি সামনে তাকালেন, কিন্তু কোথাও কোনো পালতোলা নৌকা, জাহাজ কিংবা জাহাজের ধোঁয়া দেখতে পেলেন না। শুধু তাঁর নৌকার সামনে থেকে উড়ে যাওয়া উড়ন্ত মাছ আর ভেসে থাকা হলুদ উপসাগরীয় আগাছা (গালফ উইড) চোখে পড়ল। এমনকি একটি পাখিও দেখা গেল না।

প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তিনি নৌকার পেছনে বসে বিশ্রাম নিতে নিতে মাঝে মাঝে মার্লিন মাছের মাংস চিবোচ্ছিলেন, যাতে শক্তি ফিরে পান। ঠিক তখনই তিনি দুটি হাঙরের মধ্যে প্রথমটিকে দেখতে পেলেন।

“আঃ!”—তিনি জোরে বলে উঠলেন। এই শব্দটির কোনো নির্দিষ্ট অনুবাদ নেই। এটি যেন হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা পেলে মানুষের মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে আসা একটি আর্তনাদ।

তিনি আবার বললেন, “গালানোস!”এবার তিনি দ্বিতীয় হাঙরের পাখনাও প্রথমটির পেছনে ভেসে উঠতে দেখলেন। বাদামি ত্রিভুজাকার পাখনা এবং লেজের দোল দেখে তিনি বুঝলেন, এগুলো কোদাল-মুখো গালানোস হাঙর। মাছের গন্ধ পেয়ে তারা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। প্রবল ক্ষুধার কারণে তারা কখনো গন্ধ হারাচ্ছে, আবার খুঁজে পাচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা নৌকার দিকেই এগিয়ে আসছিল।

বৃদ্ধ পাল শক্ত করে বেঁধে হাল আটকে দিলেন। তারপর তিনি বৈঠার মাথায় বাঁধা ছুরিটি হাতে তুলে নিলেন। হাতের অসহ্য ব্যথার কারণে তিনি যতটা সম্ভব সেটি হালকাভাবে ধরলেন। আঙুলগুলো কয়েকবার খুলে-বন্ধ করলেন, যাতে একটু নমনীয় হয়। তারপর শক্ত করে বৈঠা চেপে ধরলেন। তিনি ঠিক করলেন, এখন ব্যথা সহ্য করতেই হবে; হাত যেন ভয়ে কেঁপে না ওঠে। তিনি হাঙর দুটির দিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে রইলেন। এখন তিনি তাদের চওড়া, চাপা, কোদালের মতো মাথা এবং সাদা ডগাওয়ালা বড় পাখনাগুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন। এগুলো ছিল ভয়ঙ্কর, দুর্গন্ধযুক্ত হাঙর— মৃতদেহভোজীও, আবার নিষ্ঠুর শিকারিও। ক্ষুধার্ত হলে তারা নৌকার বৈঠা কিংবা হাল পর্যন্ত কামড়ে ফেলতে পারে। এই হাঙরগুলোই পানির ওপর ভেসে ঘুমিয়ে থাকা কচ্ছপের পা ও পাখনা কেটে খেয়ে ফেলে। এমনকি কোনো মানুষের গায়ে মাছের রক্ত বা কাঁদার গন্ধ না থাকলেও, যদি তারা ক্ষুধার্ত হয়, তবে তাকেও আক্রমণ করতে দ্বিধা করে না।

বৃদ্ধ আবার বললেন, “আঃ! গালানোস (মৃতভোজী হাঙর)! এসো, গালানোস।”

হাঙর দুটো এগিয়ে এল। তবে তারা আগের মাকো হাঙরের মতো সরাসরি আক্রমণ করল না। একটি নৌকার নিচে ডুব দিল। সেটি মাছটিকে টানতে শুরু করতেই নৌকাটি কেঁপে উঠল। অন্যটি সরু হলুদ চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখ বড় করে খুলে, অর্ধবৃত্তের মতো দাঁত বের করে, আগে যেখানে কামড় দিয়েছিল ঠিক সেখানেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। বৃদ্ধ স্পষ্ট দেখতে পেলেন হাঙরের বাদামি মাথার ওপর সেই জায়গাটি, যেখানে মস্তিষ্ক মেরুদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তিনি বৈঠার মাথায় বাঁধা ছুরিটি সজোরে সেই স্থানে বসিয়ে দিলেন। তারপর ছুরি টেনে বের করে আবার হাঙরের হলুদ, বিড়ালের মতো চোখে আঘাত করলেন। হাঙরটি সঙ্গে সঙ্গে মাছ ছেড়ে দিল এবং মরতে মরতে যে মাংস ছিঁড়ে নিয়েছিল, সেটি গিলতে গিলতে গভীর জলে তলিয়ে গেল।

এদিকে অন্য হাঙরটি এখনও মাছটিকে ছিঁড়ে খাচ্ছিল, তাই নৌকাটি কাঁপছিল। বৃদ্ধ তখন পালের দড়ি ছেড়ে দিলেন, যাতে নৌকাটি পাশ ফিরে ঘুরে যায় এবং নৌকার নিচে থাকা হাঙরটি বাইরে বেরিয়ে আসে। হাঙরটিকে দেখতে পেয়েই বৃদ্ধ নৌকার পাশ দিয়ে ঝুঁকে তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করলেন। কিন্তু আঘাতটি শুধু মাংসে লাগল। হাঙরের চামড়া এত শক্ত ছিল যে ছুরিটি ঠিকমতো ঢুকল না। এতে তাঁর নিজের হাতের সঙ্গে কাঁধেও ব্যথা লাগল। এরপর হাঙরটি আবার দ্রুত ওপরে উঠে এল। তার মাথা পানির বাইরে উঠতেই বৃদ্ধ তার চ্যাপ্টা মাথার ঠিক মাঝখানে জোরে ছুরি দিয়ে আঘাত করলেন। হাঙরের নাক মাছের গায়ে ঠেকে ছিল। তিনি ছুরিটি টেনে বের করে একই জায়গায় আবার আঘাত করলেন। তবুও হাঙরটি তার শক্ত চোয়াল দিয়ে মাছটিকে আঁকড়ে ধরে রইল। তখন বৃদ্ধ তার বাঁ চোখে ছুরি বসিয়ে দিলেন। তবুও সে ছাড়ল না।

বৃদ্ধ বললেন, “তবুও না?”এরপর তিনি হাঙরের মেরুদণ্ড আর মস্তিষ্কের মাঝখানে ছুরি ঢুকিয়ে দিলেন। এবার আঘাতটি ঠিক জায়গায় লাগল। তিনি অনুভব করলেন, শক্ত তরুণাস্থি(হাড়ের তুলনায় নরম অস্থি) কেটে গেছে। তারপর বৈঠাটি উল্টে ছুরির ফলাটি হাঙরের চোয়ালের ফাঁকে ঢুকিয়ে চোয়াল খুলে দিলেন। ছুরিটি ঘুরিয়ে দিতেই হাঙরটি মাছ ছেড়ে গভীর জলে ডুবে গেল। বৃদ্ধ বললেন, “যাও, গালানোস। এক মাইল গভীরে নেমে যাও। গিয়ে তোমার সঙ্গীকে দেখো, কিংবা হয়তো তোমার মাকেই।”

তিনি ছুরির ফলাটি মুছে রাখলেন। তারপর পাল ঠিক করে দিলেন। বাতাসে পাল ফুলে উঠল, আর ছোট নৌকাটি আবার নিজের পথে চলতে লাগল।

তিনি জোরে বললেন, “ওরা মাছের অন্তত এক-চতুর্থাংশ নিয়ে গেছে, আর সবচেয়ে ভালো মাংসটাই খেয়েছে। যদি সবকিছু একটা স্বপ্ন হতো! যদি আমি কখনো এই মাছটিকে না ধরতাম! আমি খুব দুঃখিত, মাছ। সবকিছুই যেন নষ্ট হয়ে গেল।”

তিনি আর মাছটির দিকে তাকাতে চাইলেন না। অনেক রক্ত হারিয়ে মাছটি এখন পানিতে ভাসছে। তার রং আয়নার পেছনের রূপালি অংশের মতো হয়ে গেছে। তবে শরীরের ডোরাগুলো এখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

বৃদ্ধ বললেন, “আমার এত দূরে সমুদ্রে আসা উচিত হয়নি, মাছ। তোমার জন্যও নয়, আমার জন্যও নয়। আমাকে ক্ষমা করো।”

এরপর তিনি নিজেকে বললেন, “এখন ছুরিটা ভালো করে বাঁধা আছে কি না দেখো। তারপর হাত দুটো ঠিক করার চেষ্টা করো। কারণ সামনে আরও বিপদ আসবে।”

তিনি বললেন, “আহা, যদি ছুরি ধার করার জন্য একটা পাথর সঙ্গে আনতাম! আনা উচিত ছিল।”

তিনি মনে মনে আবার ভাবলেন, “অনেক কিছুই সঙ্গে আনা উচিত ছিল। কিন্তু আনোনি, বুড়ো মানুষ। এখন যা নেই, তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। বরং যা আছে, তা দিয়েই কী করা যায়, সেটাই ভাবো।”

তিনি হেসে বললেন, “তুমি নিজেকেই বেশ ভালো উপদেশ দিচ্ছ। কিন্তু এসব শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।”

তিনি হালটি বগলের নিচে চেপে ধরে দুই হাত সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে রাখলেন, যাতে একটু আরাম পাওয়া যায়। নৌকাটি এগিয়ে চলল।

তিনি বললেন, “শেষ হাঙরটা কতটা মাংস নিয়ে গেছে, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।”

তারপর বললেন, “তবে এখন নৌকাটা অনেক হালকা হয়ে গেছে।”তিনি মাছটির ক্ষতবিক্ষত নিচের অংশের কথা ভাবতে চাইলেন না। তিনি জানতেন, হাঙরের প্রতিটি কামড়ে মাছের বড় বড় মাংসের টুকরো ছিঁড়ে গেছে। আর সেই রক্তের গন্ধ এখন সমুদ্রে এমন এক দীর্ঘ পথ তৈরি করেছে, যেন সব হাঙরের জন্য খোলা মহাসড়ক।

তিনি ভাবলেন, “এই মাছটা থাকলে একজন মানুষের পুরো শীতকাল চলে যেত। কিন্তু এসব কথা ভেবে লাভ নেই। বরং একটু বিশ্রাম নাও। হাত দুটো আবার শক্ত করো, যাতে যা বাকি আছে, তা রক্ষা করতে পারো। আমার হাতের রক্তের গন্ধ এখন আর তেমন কোনো ব্যাপার নয়। কারণ পানিতে মাছের রক্তের গন্ধই অনেক বেশি ছড়িয়ে আছে। তাছাড়া আমার হাত থেকেও আর তেমন রক্ত বের হচ্ছে না। এমন কোনো ক্ষত নেই, যা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। বরং এই সামান্য রক্ত বের হওয়ায় হয়তো বাঁ হাতটা এখন আর শক্ত হয়ে যাবে না।”

শেষে তিনি মনে মনে বললেন, “এখন আমি কী ভাবব? কিছুই না। কোনো কিছুই ভাবব না। শুধু অপেক্ষা করব—পরের হাঙরগুলো আসার জন্য।”ইশ, যদি সত্যিই সবকিছু একটা স্বপ্ন হতো,”বৃদ্ধ মনে মনে ভাবলেন। তবে কে জানে? শেষটা হয়তো ভালোই হতে পারত।”

এরপর যে হাঙরটি এল, সেটি ছিল একা একটি চওড়া নাকওয়ালা(শভেলনোজ)৫০হাঙর। খাবারের পাত্র দেখে শূকর ঝাঁপিয়ে পড়ার মতোই সে মাছটির দিকে ঝাঁপিয়ে এল। তবে তার মুখ এতটাই বড় ছিল যে, যেন একজন মানুষের মাথাও তাতে ঢুকে যেতে পারে। বৃদ্ধ তাকে আগে মাছে কামড় বসাতে দিল। তারপর বৈঠার মাথায় বাঁধা ছুরিটি তার মাথায় জোরে বসিয়ে দিল। কিন্তু হাঙরটি প্রচণ্ডভাবে ছটফট করে পিছিয়ে গেল, আর সেই ধাক্কায় ছুরির ফলাটি ভেঙে গেল।

বৃদ্ধ আবার নৌকার হাল ধরলেন। ডুবে যাওয়া হাঙরটির দিকেও তিনি আর তাকালেন না। আগে তিনি হাঙরকে ধীরে ধীরে পানির নিচে মিলিয়ে যেতে দেখতে ভালোবাসতেন—প্রথমে বড়, তারপর ছোট, শেষে একেবারে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। কিন্তু এবার তাঁর সে আগ্রহও আর রইল না।

তিনি বললেন, এখন আমার হাতে শুধু গ্যাফ আছে। কিন্তু এতে তেমন লাভ হবে না। আমার কাছে আছে শুধু দুইটা বৈঠা, হাল আর একটা ছোট লাঠি।”

তিনি মনে মনে ভাবলেন, এবার ওরা আমাকে হারিয়ে দিয়েছে। হাঙরগুলোকে মেরে ফেলার মতো আমি আর এখন তরুণ নই। তবু যতক্ষণ পর্যন্ত আমার হাতে বৈঠা, লাঠি আর হাল আছে, আমি লড়াই চালিয়ে যাব।”

তিনি আবার হাত দুটো সমুদ্রের পানিতে ভিজিয়ে নিলেন। বিকেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চারদিকে শুধু সমুদ্র আর আকাশ। আকাশে বাতাসও আগের চেয়ে বেশি বইছে। তিনি আশা করলেন, শিগগিরই হয়তো স্থলভূমি দেখা যাবে।

সে নিজেকেই বলেন- তুমি খুব ক্লান্ত, বুড়ো মানুষ। শুধু শরীর নয়, মনও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তোমার

সূর্য ডোবার ঠিক আগে পর্যন্ত আর কোনো হাঙর এল না।

হঠাৎ বৃদ্ধ দেখলেন, পানির ওপর দুটি বাদামি পাখনা এগিয়ে আসছে। বড় মাছটির রক্তের গন্ধে তৈরি হওয়া লম্বা পথ ধরেই তারা আসছে।

তারা গন্ধ খুঁজে খুঁজে আসছিল না। সরাসরি পাশাপাশি সাঁতরে নৌকার দিকেই এগিয়ে আসছিল। বৃদ্ধ হাল শক্ত করে ধরলেন, পাল বেঁধে রাখলেন এবং নৌকার সামনে রাখা ছোট লাঠিটি হাতে নিলেন। এটি ছিল ভাঙা বৈঠার হাতল কেটে বানানো প্রায় আড়াই ফুট লম্বা একটি গদা।

হাতের আঘাতের কারণে তিনি এটি শুধু ডান হাতে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারতেন। তাই ডান হাতে শক্ত করে লাঠিটি ধরলেন এবং হাঙর দুটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। দুটিই ছিল গালানোস হাঙর।

তিনি মনে মনে ভাবলেন- প্রথম হাঙরটা যেন ভালো করে মাছে কামড় বসায়। তারপর আমি তার নাকের আগায় অথবা মাথার ওপর জোরে আঘাত করব।”

দুটি হাঙর একসঙ্গে এগিয়ে এল। কাছেরটি মুখ বড় করে খুলে মাছের রুপালি শরীরে দাঁত বসাতেই বৃদ্ধ লাঠি উঁচু করে তার চওড়া মাথার ওপর প্রচণ্ড জোরে আঘাত করলেন। আঘাতের সময় তিনি হাঙরের চামড়ার শক্ত, রাবারের মতো অনুভূতি পেলেন। আবার মাথার হাড়ের কঠিনতাও টের পেলেন। তারপর হাঙরটি যখন মাছ ছেড়ে নিচে নামছিল, তখন তিনি তার নাকের ওপর আরও একটি জোরালো আঘাত করলেন।

অন্য হাঙরটি এদিকে একবার কামড় দিয়েই সরে গিয়েছিল। এবার আবার মুখ বড় করে ফিরে এল। বৃদ্ধ দেখলেন, তার মুখের কোণা দিয়ে মাছের সাদা মাংসের টুকরো বেরিয়ে আসছে। হাঙরটি আবার মাছে কামড় বসাল। বৃদ্ধ লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন, কিন্তু কেবল তার মাথাতেই লাগল। হাঙরটি বৃদ্ধের দিকে একবার তাকিয়ে মাছের মাংসের বড় টুকরো ছিঁড়ে নিয়ে সরে গেল। বৃদ্ধ আবার লাঠি চালালেন। কিন্তু এবারও আঘাত গিয়ে লাগল শুধু তার শক্ত, মোটা, রাবারের মতো দেহে।

“এসো, গালানোস,” বৃদ্ধ বললেন। “আরেকবার এগিয়ে এসো।”

হাঙরটি আবার দ্রুত আক্রমণ করল। সে মুখ বন্ধ করার মুহূর্তে বৃদ্ধ তাঁর গদা দিয়ে জোরে আঘাত করলেন। যতটা শক্তি ছিল, সব দিয়ে তিনি আঘাত করলেন। এবার তিনি হাঙরের মস্তিষ্কের নিচের শক্ত হাড়ে আঘাত লাগছে বলে অনুভব করলেন। তারপর একই জায়গায় আবার আঘাত করলেন। তবু হাঙরটি ধীরে ধীরে মাছের মাংস ছিঁড়ে নিয়ে নিচের দিকে সরে গেল।

বৃদ্ধ আবার হাঙরগুলো ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু কোনো হাঙরই আর ফিরে এল না। কিছুক্ষণ পরে তিনি দেখলেন, একটি হাঙর পানির ওপর গোল গোল ঘুরছে। অন্য হাঙরটির পাখনা আর দেখা গেল না।

তিনি মনে মনে ভাবলেন, ওদের মেরে ফেলতে পারব—এমন আশা করা ঠিক হবে না। এক সময় হয়তো পারতাম। তবে দুটোকেই আমি বেশ আহত করেছিওদের এখন নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে। যদি দুই হাতে ধরার মতো একটি শক্ত লাঠি থাকত, তাহলে প্রথম হাঙরটাকে নিশ্চয়ই মেরে ফেলতে পারতাম হয়তো এখনও পারতাম।

তিনি আর মাছটির দিকে তাকাতে চাইলেন না। কারণ তিনি জানতেন, মাছটির অর্ধেক অংশ ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। হাঙরের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই সূর্য ডুবে যাবে।

তিনি বললেন, “অল্পক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে। তখন নিশ্চয়ই হাভানার আলো দেখতে পাব। যদি আমি খুব বেশি পূর্ব দিকে না চলে এসে থাকি, তাহলে নতুন সমুদ্রসৈকতগুলোর কোনো একটির আলো নিশ্চয় দেখা যাবে।”

তিনি মনে মনে ভাবলেন, এখন নিশ্চয়ই আমি খুব বেশি দূরে নেই। আশা করি, আমার জন্য কেউ খুব বেশি দুশ্চিন্তা করছে না। শুধু ছেলেটাই নিশ্চয় চিন্তা করছে। তবে আমি জানি, সে আমার ওপর বিশ্বাস রাখবে। গ্রামের বয়স্ক জেলেরা হয়তো চিন্তা করছে। আরও অনেকে হয়তো করছেআমি সত্যিই একটি ভালো মানুষের শহরে থাকি।

তিনি আর মাছটির সঙ্গে কথা বলতে পারলেন না। কারণ মাছটি এতটাই ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে যে তাকে দেখে কষ্ট লাগছিল। তখন হঠাৎ তার মনে একটি কথা এল।

তিনি বললেন, “অর্ধেক মাছ, একসময় তুমি কত সুন্দর মাছ ছিলে! আমি খুব দুঃখিত যে এত দূরে চলে এসেছিলাম। এতে আমাদের দুজনেরই ক্ষতি হয়েছে। তবে তুমি আর আমি মিলে অনেক হাঙর মেরেছি, আরও অনেককে আহত করেছি। বলো তো, বুড়ো মাছ, তুমি জীবনে কত হাঙর মেরেছ? তোমার মাথার লম্বা বর্শার মতো মুখটা তো এমনি এমনি নয়।”

তিনি ভাবতে লাগলেন, মাছটি যদি এখনও মুক্তভাবে সাঁতার কাটতে পারত, তাহলে হাঙরগুলোর কী অবস্থা করত। ইস! যদি মাছটির ধারালো মুখটা কেটে নিয়ে বৈঠার সঙ্গে বেঁধে অস্ত্র বানাতে পারতাম! কিন্তু আমার কাছে কোনো কুড়াল ছিল না, এদিকে ছুরিটাও হারিয়ে গেছে

যদি সেটা করতে পারতাম, তাহলে আমরা দুজনে মিলে হাঙরগুলোর বিরুদ্ধে লড়তে পারতাম। এখন যদি রাতের অন্ধকারে আবার ওরা আসে, তখন আমি কী করব?

তিনি নিজেই উত্তর দিলেন, “লড়ব। মৃত্যু না আসা পর্যন্ত লড়ে যাব।”

কিন্তু এখন চারদিকে ঘন অন্ধকার। কোথাও হাভানার আলো দেখা যাচ্ছে না, কোনো বাতিও জ্বলছে না। শুধু বাতাস বইছে, আর নৌকাটিকে পাল টেনে নিয়ে চলছে। সেই অন্ধকারে তাঁর এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, হয়তো তিনি ইতিমধ্যেই মৃত।

তিনি দুই হাত একসঙ্গে করে মাথার তালু স্পর্শ করলেন। হাত দুটো এখনও জীবিত। মুঠো খুলে-বন্ধ করতেই ব্যথা অনুভব করলেন, আর তখন বুঝলেন—তিনি এখনও বেঁচে আছেন।

তিনি নৌকার পেছনের অংশে হেলান দিয়ে বসলেন। কাঁধের যন্ত্রণা তাকে মনে করিয়ে দিল যে তিনি এখনও মরেন নি। তিনি ভাবলেন, মাছটি ধরতে পারলে যে সব প্রার্থনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেগুলো এখনও করা হয়নি। কিন্তু এখন আমি এতটাই ক্লান্ত যে প্রার্থনাও উচ্চারণ করতে পারছি না। বরং বস্তাটা নিয়ে কাঁধের ওপর চাপিয়ে নিই

তিনি নৌকার পেছনের দিকে শুয়ে হাল ধরে ছিলেন এবং আকাশে আলো ফুটে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন।মাছটার অন্তত অর্ধেক তো আমার কাছে আছে,” তিনি ভাবলেন। হয়তো সামনের অর্ধেকটুকু নিয়ে তীরে ফিরতে পারব। ভাগ্য যদি একটু সহায় হয়

তারপর নিজেই বললেন, না, এত দূরে সমুদ্রে চলে এসে তুমি নিজের ভাগ্যকেই নষ্ট করেছ।”

তিনি জোরে বললেন, বোকামি কোরো না। জেগে থাকো, নৌকা চালাও। হয়তো এখনও ভাগ্য তোমার সঙ্গে আছে।

আবার ভাবলেন, যদি কোথাও ভাগ্য বিক্রি হতো, তবে আমি কিছু কিনে নিতাম।”

তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, কিন্তু কী দিয়ে কিনব? হারিয়ে যাওয়া হারপুন, ভাঙা ছুরি আর আহত দুটি হাত দিয়ে?”

নিজেই উত্তর দিলেন, হয়তো পারতে। টানা চুরাশি দিন সমুদ্রে কাটিয়ে তুমি তো ভাগ্য কিনতেই চেয়েছিলেপ্রায় পেয়েও গিয়েছিলে।”

এরপর তিনি ভাবলেন, এভাবে আজেবাজে কথা ভাবা ঠিক নয়। ভাগ্য নানা রূপে আসে, কে-ই বা তাকে চিনতে পারে? তবু যেভাবেই আসুক, আমি তাকে গ্রহণ করব এবং তার জন্য যা দাম চাইবে, আমি দিতে রাজি আছি। তিনি আরও ভাবলেন, ইস, যদি শহরের আলোগুলো দেখতে পেতাম! এখন আমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা সেটাই।” তিনি আরও আরাম করে বসে হাল ধরার চেষ্টা করলেন। শরীরের যন্ত্রণা তাঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে তিনি এখনও বেঁচে আছেন।

রাত প্রায় দশটার দিকে তিনি শহরের আলোর আভা সমুদ্রের ওপর প্রতিফলিত হতে দেখলেন। প্রথমে আলো খুবই ম্লান ছিল, ঠিক যেমন চাঁদ ওঠার আগে আকাশে হালকা আলো দেখা যায়। পরে আলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। এদিকে বাতাস বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রও উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তিনি সেই আলোর দিকেই নৌকা চালাতে লাগলেন এবং ভাবলেন, আর একটু পরেই নিশ্চয়ই স্রোতের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাব।”

তিনি মনে মনে বললেন, সব শেষ। হয়তো আবার হাঙর আসবে। কিন্তু অন্ধকারে কোনো অস্ত্র ছাড়া একজন মানুষ তাদের বিরুদ্ধে আর কী-ই বা করতে পারে?”

এ সময় তাঁর পুরো শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছিল। ক্ষতস্থান, টান ধরা পেশি—সবই রাতের ঠান্ডায় আরও বেশি ব্যথা করছিল। তিনি প্রার্থনা করলেন, আশা করি আর লড়াই করতে হবে না। সত্যিই চাই, আর যেন লড়তে না হয়।”

কিন্তু মধ্যরাতে আবার তাঁকে লড়তে হলো। এবার তিনি বুঝেছিলেন, এই লড়াই জেতার কোনো আশা নেই। হাঙরগুলো দল বেঁধে এল। অন্ধকারে তিনি শুধু পানির ওপর তাদের পাখনার রেখা আর শরীরের জ্বলজ্বলে আভা দেখতে পাচ্ছিলেন। তারা একের পর এক মাছের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। তিনি লাঠি দিয়ে যতটা পারলেন তাদের মাথায় আঘাত করলেন। হাঙরগুলোর দাঁত দিয়ে মাছ ছিঁড়ে খাওয়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। তারা মাছ টানতে থাকায় ছোট নৌকাটিও কেঁপে উঠছিল।

তিনি মরিয়া হয়ে শুধু শব্দ আর অনুভূতির ভরসায় আঘাত করে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ অনুভব করলেন, একটি হাঙর তাঁর লাঠিটা কামড়ে ধরেছে। মুহূর্তেই লাঠিটিও হারিয়ে গেল।

তখন তিনি হালের দণ্ড খুলে নিয়ে দুই হাতে শক্ত করে ধরলেন এবং বারবার হাঙরগুলোর ওপর আঘাত করতে লাগলেন। কিন্তু ততক্ষণে হাঙরগুলো নৌকার সামনের দিকে পৌঁছে গেছে। তারা একের পর এক, কখনও একসঙ্গে, মাছের বাকি মাংস ছিঁড়ে খেতে লাগল। সমুদ্রের নিচে ছিঁড়ে যাওয়া মাংসগুলো জ্বলজ্বল করছিল, আর তারা ঘুরে ঘুরে আবার আক্রমণ করছিল।

শেষে একটি হাঙর মাছের মাথার কাছেও আক্রমণ করল। তখন বৃদ্ধ বুঝলেন, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তিনি ভাঙা হালের দণ্ড দিয়ে হাঙরের মাথায় জোরে আঘাত করলেন, যেখানে তার চোয়াল মাছের শক্ত মাথায় আটকে ছিল। তিনি একবার, দুবার, তিনবার আঘাত করলেন। হঠাৎ হালের দণ্ড ভেঙে গেল। তখন তিনি ভাঙা ধারালো অংশটি বর্শার মতো হাঙরের দিকে সজোরে ঠেলে দিলেন। তিনি অনুভব করলেন, সেটি হাঙরের শরীরে ঢুকে গেছে। তাই আবারও আরও জোরে সেটি ঢুকিয়ে দিলেন। হাঙরটি সঙ্গে সঙ্গে মাছ ছেড়ে দিয়ে গড়িয়ে দূরে সরে গেল। এটাই ছিল সেই দলের শেষ হাঙর।

আর এখন বৃদ্ধের শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। তাঁর মুখে এক অদ্ভুত স্বাদ অনুভূত হলো। স্বাদটা ছিল তামার মতো, আবার একটু মিষ্টিও লাগছিল। মুহূর্তের জন্য তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। তবে মুখে খুব বেশি রক্ত ছিল না।

তিনি সমুদ্রে থুথু ফেলে বললেন,— এই নাও, গালানোস (হাঙরগুলো), এটা খাও। আর স্বপ্ন দেখো যে তোমরা একজন মানুষকে মেরে ফেলেছ।”

তিনি বুঝতে পারলেন, এবার তিনি সত্যিই হেরে গেছেন। আর এই হার থেকে ফিরে আসার কোনো উপায় নেই। তিনি নৌকার পেছনের দিকে গিয়ে দেখলেন, ভাঙা হালের হাতলটুকু কোনো রকমে রাডারের খাঁজ৫১এ বসিয়ে নৌকা চালানো যাবে। তিনি বস্তাটি কাঁধে জড়িয়ে নিলেন এবং নৌকাটিকে নিজের গ্রামের বন্দরের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। এখন নৌকাটি হালকাভাবে এগিয়ে চলছিল। তাঁর মনে আর কোনো চিন্তা ছিল না, কোনো অনুভূতিও ছিল না। সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছিলেন তিনি। যতটা সম্ভব বুদ্ধি ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি নৌকাটি ঘরের পথে চালাতে লাগলেন।রাতের অন্ধকারে হাঙরগুলো বারবার মাছের অবশিষ্ট দেহে কামড় বসাচ্ছিল। যেন কেউ খাবার টেবিলের ওপড় পড়ে থাকা টুকরো কুড়িয়ে খাচ্ছে। বৃদ্ধ সেদিকে একবারও তাকালেন না। তিনি শুধু নৌকা চালাতেই মন দিলেন। তাঁর কেবল মনে হলো, বড় মাছটির ভার না থাকায় নৌকাটি এখন কত হালকা আর সুন্দরভাবে চলছে।

তিনি ভাবলেন— আমার নৌকাটা ভালোই আছে। হালের হাতল ছাড়া আর কোথাও কোনো ক্ষতি হয়নি। ওটা সহজেই বদলে নেওয়া যাবে তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি এখন সমুদ্রস্রোতের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। তীরের সৈকত-সংলগ্ন বসতিগুলোর আলোও তাঁর চোখে পড়ল। তিনি জানতেন, এখন তিনি কোথায় আছেন। এখান থেকে বাড়ি পৌঁছানো আর কঠিন নয়।

তিনি মনে মনে বললেন,— যাই হোক, বাতাস আমাদের বন্ধুতারপর আবার ভাবলেন,
অবশ্য সব সময় নয়এই বিশাল সমুদ্রে যেমন বন্ধু আছে, তেমনি শত্রুও আছে।”এরপর তাঁর মনে হলো— বিছানাই আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু। শুধু একটা বিছানা পেলেই হবে। হার মেনে নেওয়ার পর সবকিছু কত সহজ হয়ে যায়! আগে কখনো বুঝিনি। কিন্তু আমাকে হারাল কে?”

তিনি জোরে বললেন— কেউ না। আমি নিজেই অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম।”

ছোট বন্দরে পৌঁছানোর সময় তিনি দেখলেন, টেরেসের সব আলো নিভে গেছে। তিনি বুঝলেন, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। এদিকে বাতাসও জোরে বইতে শুরু করেছে। বন্দরের ভেতরটা অবশ্য শান্ত ছিল। তিনি নৌকাটি পাথরের নিচের ছোট নুড়িপাথরের তীরে তুলে আনলেন। সাহায্য করার মতো সেখানে কেউ ছিল না। তাই যতটা সম্ভব নিজের শক্তিতে নৌকাটি ওপরে টেনে এনে একটি পাথরের সঙ্গে বেঁধে দিলেন।

তারপর তিনি মাস্তুল নামিয়ে পাল গুটিয়ে বেঁধে ফেললেন। মাস্তুলটি কাঁধে তুলে পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। তখনই তিনি বুঝলেন, তিনি কতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি একটু থেমে পেছনে তাকালেন। রাস্তার বাতির আলোয় তিনি দেখলেন, নৌকার পেছনে মাছটির বিশাল লেজ এখনো উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাছটির সাদা মেরুদণ্ড স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাথার কালো অংশ আর লম্বা ধারালো মুখটাও দেখা যাচ্ছে। মাঝের সমস্ত মাংস হাঙর খেয়ে ফেলেছে—শুধু কঙ্কালটুকুই পড়ে আছে।

তিনি আবার উঠতে শুরু করলেন। কিন্তু পাহাড়ের চূড়ার কাছে এসে হঠাৎ পড়ে গেলেন। মাস্তুলটি তখনও তাঁর কাঁধের ওপর ছিল। কিছুক্ষণ সেভাবেই শুয়ে রইলেন। পরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু শরীরে আর শক্তি ছিল না। তাই তিনি মাস্তুল কাঁধে নিয়েই বসে রইলেন এবং সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। রাস্তার ওপাশ দিয়ে একটি বিড়াল নিজের কাজে হেঁটে চলে গেল। বৃদ্ধ লোকটি চুপচাপ সেটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আবার তিনি নীরবে রাস্তার দিকেই তাকিয়ে থাকলেন।

অবশেষে বৃদ্ধটি মাস্তুলটি নামিয়ে রাখলেন। তারপর আবার সেটি কাঁধে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজের কুঁড়েঘরের পথে হাঁটতে শুরু করলেন। পথ এতটাই কষ্টকর ছিল যে ঘরে পৌঁছানোর আগে তাঁকে পাঁচবার বসে বিশ্রাম নিতে হলো।

ঘরের ভেতরে ঢুকে তিনি মাস্তুলটি দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখল। অন্ধকারে হাতড়ে পানির বোতল খুঁজে পেলেন এবং একটু পানি পান করলেন। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কম্বলটি কাঁধ, পিঠ ও পায়ের ওপর টেনে দিলেন। পুরোনো খবরের কাগজের ওপর উপুড় হয়ে, দুই হাত সোজা সামনের দিকে ছড়িয়ে এবং হাতের তালু ওপরে রেখে তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন।

পরদিন সকালে ছেলেটি এসে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। সেদিন বাতাস এত জোরে বইছিল যে মাছ ধরার নৌকাগুলো সমুদ্রে যেতে পারেনি। তাই ছেলেটিও একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো বৃদ্ধের কুঁড়েঘরে এসেছিল। সে প্রথমে দেখল, বৃদ্ধটি এখনও শ্বাস নিচ্ছে। তারপর তাঁর ক্ষতবিক্ষত হাত দুটো দেখে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার চোখে জল চলে এল। সে নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে বৃদ্ধের জন্য কফি আনতে গেল। পুরো পথজুড়ে সে কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে এল।

এদিকে অনেক জেলে বৃদ্ধের নৌকার পাশে ভিড় করেছিল। নৌকার সঙ্গে বাঁধা বিশাল মাছটির শুধু কঙ্কালটি পড়ে ছিল। একজন জেলে প্যান্ট গুটিয়ে পানিতে নেমে দড়ি দিয়ে কঙ্কালটির দৈর্ঘ্য মাপল।

ছেলেটি আর নিচে গেল না। সে আগেই সেখানে গিয়েছিল, আর একজন জেলে তার জন্য নৌকাটির দেখাশোনা করছিল। একজন জেলে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল— “তিনি কেমন আছেন?”

ছেলেটি উত্তর দিল— “ঘুমাচ্ছেন।”

লোকেরা তাকে কাঁদতে দেখলেও সে কোনো পরোয়া করল না। সে বলল,— “কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে।”

যে জেলেটি মাছের কঙ্কাল মাপছিল, সে বলল— “নাক থেকে লেজ পর্যন্ত পুরো আঠারো ফুট!”

ছেলেটি শান্তভাবে বলল— “আমি বিশ্বাস করি।”

এরপর সে ‘টেরেস’ রেস্তোরাঁয় গিয়ে এক ক্যান কফি চাইল-— “গরম কফি দিন। তাতে যেন অনেক দুধ আর চিনি থাকে।”

রেস্তোরাঁর মালিক জিজ্ঞেস করলেন— “আর কিছু লাগবে?”

— “না। পরে দেখে নেব, তিনি কী খেতে পারবেন।”

মালিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— “কী অসাধারণ মাছ ছিল! এমন মাছ কেউ কোনো দিন ধরতে পারেনি। আর তুমি গতকালও দুটি চমৎকার মাছ ধরেছিলে।”

ছেলেটি কষ্টভরা কণ্ঠে বলল— “আমার মাছের কথা বলবেন না।”এই বলে সে আবার কেঁদে ফেলল।

মালিক বললেন— “তুমি কি অন্য কিছু খাবে বা পান করবে?”

— “না। সবাইকে বলবেন, সান্তিয়াগোকে যেন কেউ বিরক্ত না করে। আমি আবার ফিরে আসব।”

মালিক বললেন— “তাকে বলবে, আমি তার জন্য খুবই দুঃখিত।”

— “ধন্যবাদ,” বলল ছেলেটি।

ছেলেটি গরম কফির ক্যানটি নিয়ে বৃদ্ধের কুঁড়েঘরে ফিরে এল। সে বৃদ্ধের পাশে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। একবার মনে হলো বৃদ্ধ বুঝি জেগে উঠবেন, কিন্তু আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। তখন ছেলেটি রাস্তার ওপার থেকে কিছু জ্বালানি কাঠ ধার করে এনে কফি গরম রাখল।

অবশেষে বৃদ্ধের ঘুম ভাঙল।

ছেলেটি তাড়াতাড়ি বলল— “উঠে বসবেন না। এই কফিটা আগে পান করুন।”

সে কিছুটা কফি একটি গ্লাসে ঢেলে দিল।

বৃদ্ধ লোকটি গ্লাসটি নিয়ে কফি পান করলেন।

— “মানোলিন, তারা আমাকে হারিয়ে দিয়েছে,” তিনি বললেন। “সত্যিই তারা আমাকে পরাজিত করেছে।”

ছেলেটি বলল— “না, কেউ আপনাকে হারাতে পারেনি। অন্তত মাছটি তো পারেনি।”

বৃদ্ধ বললেন— “না, মাছটি নয়। পরে যা ঘটেছে, সেটাই আমাকে হারিয়েছে।”

ছেলেটি বলল— “পেদ্রিকো নৌকা আর মাছ ধরার সরঞ্জামের দেখাশোনা করছে। মাছটার মাথাটা কী করা হবে?”

— “পেদ্রিকোকে বলো, মাথাটা কেটে মাছ ধরার ফাঁদে ব্যবহার করতে।”

— “আর বর্শাটা?”

— “তুমি চাইলে সেটা রেখে দিও।”

— “আমি রাখব,” ছেলেটি বলল। “এখন আমাদের পরের পরিকল্পনাগুলো করতে হবে।”

বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন— “তারা কি আমাকে খুঁজেছিল?”

— “অবশ্যই। কোস্ট গার্ড আর বিমান দিয়েও খোঁজা হয়েছিল।”

বৃদ্ধ বললেন— “সমুদ্র খুব বিশাল, আর একটা ছোট নৌকা এত ছোট যে তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি অনুভব করলেন, নিজের সঙ্গে বা সমুদ্রের সঙ্গে কথা বলার বদলে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারা কত আনন্দের। তিনি বললেন— “আমি তোমাকে খুব মিস করেছি। তুমি কী মাছ ধরেছিলে?”

ছেলেটি বলল— “প্রথম দিনে একটা, দ্বিতীয় দিনে একটা, আর তৃতীয় দিনে দুটো।”

— “খুব ভালো।”

ছেলেটি বলল— “এবার থেকে আমরা আবার একসঙ্গে মাছ ধরব।”

বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন— “না। আমি ভাগ্যবান নই। আমি এখন আর সৌভাগ্যবান নই।”

ছেলেটি দৃঢ়ভাবে বলল— “ভাগ্যকে ছেড়ে দিন। আমি আমার ভাগ্য সঙ্গে নিয়ে আসব।”

— “তোমার পরিবার কী বলবে?”

— “আমি পরোয়া করি না। গতকাল আমি দুটো মাছ ধরেছি। কিন্তু এখন থেকে আমরা একসঙ্গে মাছ ধরব। কারণ আমার এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে।”

বৃদ্ধ বললেন— “আমাদের একটা ভালো হারপুন (মাছ মারার বর্শা) বানাতে হবে এবং সব সময় নৌকায় রাখতে হবে। পুরোনো ফোর্ড গাড়ির স্প্রিংয়ের পাত দিয়ে এর ফলক বানানো যাবে। গুয়ানাবাকোয়ায়৫২সেটাকে ধার করিয়ে নেব। ফলকটা খুব ধারালো হবে, কিন্তু বেশি শক্ত করে টেম্পার করা যাবে না, নইলে ভেঙে যাবে। আমার ছুরিটা তো ভেঙেই গেছে।”

ছেলেটি বলল— “আমি আরেকটা ছুরি এনে দেব, আর স্প্রিংটাও ধার করিয়ে নেব।”

তারপর সে জিজ্ঞেস করল— “আর কত দিন জোর হাওয়া (ব্রিসা) থাকবে?”

বৃদ্ধ বললেন— “হয়তো তিন দিন। হয়তো আরও বেশি।”

ছেলেটি বলল— “সবকিছু আমি ঠিকঠাক করে রাখব। আপনি শুধু আপনার হাত দুটো ভালো করে সুস্থ করে তুলুন, বুড়ো মানুষ।”

                                        সারাংশ

এই অংশে দেখা যায়, সান্তিয়াগো শারীরিকভাবে পরাজিত হলেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি। মানোলিন তাকে ছেড়ে যেতে রাজি নয়; বরং আবার একসঙ্গে মাছ ধরার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে। তাদের সম্পর্ক এখানে গুরু-শিষ্য, বাবা-ছেলের মতো গভীর ভালোবাসা ও আশার প্রতীক হয়ে ওঠে।

“আমি জানি ওগুলোর কীভাবে যত্ন নিতে হয়। রাতে আমি এক অদ্ভুত জিনিস থুতু দিয়ে ফেলেছিলাম, আর মনে হলো আমার বুকের ভেতরে যেন কিছু একটা ভেঙে গেছে।”

ছেলেটি বলল, “সেটাও ভালো করে তুলতে হবে। আপনি শুয়ে থাকুন, বুড়ো মানুষ। আমি আপনার পরিষ্কার জামা আর কিছু খাবার নিয়ে আসছি।”

বৃদ্ধ বললেন, “আমি যতদিন সমুদ্রে ছিলাম, সেই সময়কার সব খবরের কাগজ নিয়ে এসো।”

ছেলেটি বলল, “আপনাকে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে। আপনার কাছ থেকে আমার অনেক কিছু শেখার আছে। আপনি আমাকে সবকিছু শেখাবেন। বলুন তো, আপনি কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন?”

বৃদ্ধ শান্তভাবে বললেন, “অনেক।”

ছেলেটি বলল- “আমি খাবার আর খবরের কাগজ নিয়ে আসছি। আপনি বিশ্রাম নিন। আপনার হাতের জন্য ওষুধের দোকান থেকেও কিছু নিয়ে আসব।”

বৃদ্ধ বললেন- “পেদ্রিকোকে বলতে ভুলো না, মাছটার মাথাটা ওর জন্য রেখে দিয়েছি।”

“না, ভুলব না,” ছেলেটি উত্তর দিল।

দরজা পেরিয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত প্রবাল-পাথরের পথ ধরে নেমে যেতে যেতে ছেলেটি আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল।

সেদিন বিকেলে টেরেসে কয়েকজন পর্যটক এসেছিল। তারা নিচে জলের দিকে তাকিয়ে দেখল—খালি বিয়ারের ক্যান আর মৃত ব্যারাকুডা মাছের মাঝে একটি বিশাল সাদা মেরুদণ্ড, যার শেষে ছিল এক বিরাট লেজ। জোয়ারের ঢেউয়ে লেজটি ধীরে ধীরে দুলছিল, আর বন্দরের বাইরে পূর্ব দিকের বাতাসে উত্তাল সমুদ্র গর্জন করছিল।

একজন মহিলা একজন পরিবেশনকারীকে জিজ্ঞেস করলেন- “ওটা কী?” তিনি সেই বিশাল মাছটির দীর্ঘ মেরুদণ্ডের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন, যা এখন কেবল জোয়ারের সঙ্গে ভেসে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা আবর্জনায় পরিণত হয়েছে।

পরিবেশনকারী বলল, “তিবুরোন—হাঙর।” আসলে কী ঘটেছিল সে তা বোঝাতে চেয়েছিল।

মহিলাটি বিস্ময়ে বললেন- “আমি তো জানতামই না, হাঙরের লেজ এত সুন্দর আর এত নিখুঁত গঠনের হয়!

তার সঙ্গী পুরুষটি বললেন, “আমিও জানতাম না।”

পথের ওপরে নিজের ছোট কুঁড়েঘরে বৃদ্ধ আবার ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি এখনও উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছিলেন, আর ছেলেটি তাঁর পাশে বসে তাঁকে দেখছিল।

বৃদ্ধ স্বপ্ন দেখছিলেন—সিংহদের।

                                                   সমাপ্ত।

                                     -টোকা-

১.বড় মাছ টেনে তোলার বরশী

২. Rogelio (রোজেলিও) হল আর্নেস্ট হেমিংওয়ের The Old Man and the Sea উপন্যাসের একটি গৌণ চরিত্র।

৩. বড় মাছ টেনে তোলার লোহার হুক

৪. পাখির বিষ্ঠা (বিশেষ করে সমুদ্রের পাখির)

৫. আলমারি বা দেয়ালে জিনিস রাখার সমতল অংশ

৬. (সান্তিয়াগোকে (বৃদ্ধ জেলে)

৭. যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিখ্যাত বেসবল দলগুলোর একটি

৮. যুক্তরাষ্ট্রের Cleveland শহরে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ বা ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়।

. (DiMaggio (1914–1999) ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কিংবদন্তি বেসবল খেলোয়াড় তিনি দীর্ঘদিন New York Yankees-এর হয়ে খেলেছেন এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত।

১০. কিউবাৰ এখন বিখ্যাত বিয়াৰ ব্ৰেণ্ড।

১১. ঝোলযুক্ত ধীরে রান্না করা মাংস বা সবজির পদ

১২. Terrace নামের ক্যাফে/রেস্তোরাঁ

১৩. লিও ডুরোচার (Leo Durocher) ছিলেন একজন বিখ্যাত আমেরিকান বেসবল খেলোয়াড় এবং সফল বেসবল দল পরিচালক।

১৪. ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের শিখর হলো মাউন্ট তেইদে (Mount Teide)।

১৫. (Africa-র উপকূল,  আফ্রিকার দীর্ঘ সোনালি সমুদ্রসৈকত, সাদা বালুকাবেলা, উঁচু অন্তরীপ

১৬. ১ fathom = ৬ ফুট = প্রায় ১.৮৩ মিটার

১৭. বড় মাছ ধরার জন্য টোপ (bait) হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

১৮.(Squid (স্কুইড) হলো সমুদ্রে বসবাসকারী একটি নরমদেহী প্রাণী। এটি Squid নামে পরিচিত এবং অক্টোপাস ও কাটলফিশের আত্মীয়।)

১৯. Tern (বহুবচন: terns) হলো এক ধরনের সামুদ্রিক পাখি

২০. “robber bird” (ডাকাত পাখি) বলা হয় কারণ এরা প্রায়ই অন্য সমুদ্রিকপাখির কাছ থেকে খাবার ছিনিয়ে নেয়।

২১. (মমতাময়ী বা নারীসুলভ রূপে কল্পিত সমুদ্র)।

২২. (ভাসমান চিহ্ন, বয়া, বা জলে ভাসমান দিকনির্দেশক বস্তু)

২৩. (Bonito)(এটি টুনা পরিবারের (Scombridae) একটি দ্রুত সাঁতার কাটা মাছ।)

২৪. (Albacore)-(এটি এক ধরনের টুনা মাছ

২৫. মাছ ধরার সুতা (বড়শির দড়ি) বোঝানো হয়েছে।

২৬. (Wire leader হলো মাছ ধরার একটি শক্ত ধাতব তার, যা মাছ ধরার সূতার (fishing line) শেষে হুকের আগে লাগানো হয়।

২৭. (Plankton (প্ল্যাঙ্কটন) হলো সমুদ্র, নদী, হ্রদ বা পুকুরের পানিতে ভেসে থাকা অতি ক্ষুদ্র জীব বা উদ্ভিদ

২৮. (পর্তুগিজ ম্যান-অফ-ওয়ার) দেখতে জেলিফিশের মতো হলেও এটি আসল জেলিফিশ নয়। এটি একটি Portuguese man o’ war, যা বহু ক্ষুদ্র জীব (পলিপ) একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটি উপনিবেশ (colony) গঠন করে।)

২৯. ”(Agua mala” একটি স্প্যানিশ শব্দ। এর আক্ষরিক অর্থ খারাপ পানি” বা দুষ্ট জল

৩০. (টানার খুঁটি (towing bitt) হলো জাহাজ বা নৌকার ডেকে বসানো একটি অত্যন্ত শক্ত ধাতব বা কাঠের খুঁটি, যার সঙ্গে মোটা দড়ি বা টানার রশি বেঁধে অন্য জাহাজ, নৌকা বা ভারী বস্তু টানা হয়।

৩১. খুব মজবুত, টেকসই ও শক্তভাবে পাকানো মাছ ধরার সুতা বা দড়ি

৩২. বঁড়শির মূল সুতো ও হুকের মাঝখানে লাগানো শক্ত, ছোট সংযোগকারী সুতো বা তার বোঝায়,

৩৩. শেষে ফেলা বা সবচেয়ে দূরের মাছ ধরার সুতো (fishing line) বোঝানো হয়েছে।

৩৪. (তারের লিডার (Wire Leader)হলো মাছ ধরার লাইনের একেবারে শেষ প্রান্তে লাগানো ছোট, শক্ত ইস্পাতের তার)

৩৫. বায়ুথলি মাছের দেহের ভেতরে মেরুদণ্ডের নিচে অবস্থিত একটি লম্বাটে, বায়ুভর্তি থলির মতো অঙ্গ।

৩৬.ওয়ার্বলার)(ছোট, চঞ্চল, সুমধুর কণ্ঠের গায়ক পাখিকে বোঝায়।

৩৭.(Cumulus cloud হলো সাদা, তুলার মতো ফোলাফোলা মেঘ যা সাধারণত পরিষ্কার আবহাওয়ায় আকাশে দেখা যায়।)

৩৮. (সিরাস মেঘ (Cirrus clouds) হলো আকাশের সবচেয়ে উঁচু স্তরে (প্রায় ৬–১৩ কিলোমিটার উচ্চতায়) তৈরি হওয়া পাতলা, সাদা, পালকের মতো মেঘ।

৩৯. হলেন কিউবার ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের অত্যন্ত পূজিত পবিত্র মাতৃমূর্তি—অর্থাৎ যিশু খ্রিস্টের জননী ভার্জিন মেরির একটি বিশেষ রূপ।

৪০. (Gran Ligas) বলতে মেজর লিগ বা প্রধান পেশাদার বেসবল লিগ বোঝায়।)।

৪১.(কাসাব্লাঙ্কা) হলো উত্তর আফ্রিকার দেশ Casablanca-এর বৃহত্তম শহর এবং প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

৪২. টুনা-জাতীয় এক ধরনের দ্রুতগতির সামুদ্রিক মাছ।

৪৩. ডোরাডো হলো এক ধরনের সামুদ্রিক মাছ। একে মাহি-মাহি (Mahi-mahi)বা ডলফিনফিশ (Dolphinfish) নামেও ডাকা হয়।

৪৪.Porpoises হলো এক ধরনের ছোট সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী, যা দেখতে ডলফিনের মতো হলেও ডলফিন নয়।

৪৫. জাহাজের নৌমুখের কাঠ বলতে সাধারণত নৌকা বা জাহাজের সামনের উঁচু কাঠের অংশ (bow structure) বোঝায়)

৪৬. রেমোরা মাছ (Remora) হলো এক ধরনের সামুদ্রিক মাছ, যাকে বাংলায় সাধারণভাবে চোষক মাছ বা আঁকড়ে ধরা মাছও বলা হয়।

৪৭. (বোন স্পার) বলতে হাড়ের উপর গজিয়ে ওঠা অতিরিক্ত ছোট হাড়ের উঁচু অংশ বা হাড়ের কাঁটা বোঝায়।

৪৮. ডেনতুসো (Dentuso) হচ্ছে মেকো হাঙর (Mako shark)এর স্পেনিছ নাম।

৪৯. স্টিংরে মাছ (Stingray) হলো এক ধরনের চ্যাপ্টা সামুদ্রিক মাছ, যা হাঙরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।

৫০. শভেলনোজ (Shovelnose) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো বেলচা-আকৃতির নাক

৫১. (রাডারের খাঁজ (Rudder notch) = নৌকার পেছনের কাঠামোর সেই কাটা অংশ বা ফাঁক, যেখানে হাল লাগানো থাকে বা যেখান দিয়ে হাল নড়াচড়া করে।

৫২. (Guanabacoa (গুয়ানাবাকোয়া) হলো কিউবার রাজধানী হাভানার (Havana) নিকটবর্তী একটি ঐতিহাসিক শহর, যা বর্তমানে বৃহত্তর হাভানা মহানগরের অংশ।)

Scroll to Top