স্বপ্নকে ডানা মেলতে দিন
(এক মিনিটের গল্প)

সূচিপত্র
স্বপ্নকে ডানা মেলতে দিন/ ড্রাগস ভাইরাস/ মায়ের ভালোবাসা/ গরিবের ঈদ/ রিক্সাওয়ালা/ বড় ভাইয়ের ভালোবাসা/ সমাজসেবী শিক্ষক/ লোভের শাস্তি/ সন্দেহ/ সুখী পরিবারে অশান্তি/ অভাগা রাহুল/ সবুজ পৃথিবী/ দুষ্ট বউমা/ দুষ্ট বউমার অনুতাপ/বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো বাবা/ আব্দুল কাকু/ অনাথ মেয়ের ত্যাগ/অনাথ মেয়ের ত্যাগ/ দুই ভাই/ মানবতাই সবচেয়ে বড় গুণ/ রাস্তায় ধান শুকানোর পরিণতি/ শত্রুতার চেয়ে উপকারের শক্তি বেশি/ দারিদ্র্য ও চরিত্র/ মূল্যবোধই চরিত্রের প্রকৃত পরিচয়/ রহিমের মহানতা/ নতুন ধনীর অহংকার/ ভালোবাসার আরেক নাম বিশ্বাস/ অ্যাম্বুলেন্স চালকের মহানতা/ আশি বছরেও অটুট ভালোবাসা/ ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য/ সংগ্রামের ফল/ লোভের শাস্তি/পাখিদের জন্য রফিকের লিচু/ রহিমের যোগব্যায়াম শুরু/আগামী কালের ভরসা নেই/ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি/ আপন মানুষ/ গরু-ছাগল ও ধানখড়ের কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা/ সুখ ও দুঃখ/ অন্তরের আগুন/অন্নদান মহাদান/ ধারের মূল্য/সত্যিকারের বন্ধুত্ব/ মা-বাবার মূল্য/ একটি ছোট ছেলের মানবতা/ আত্মসম্মানের মূল্য/ দুষ্ট বউয়ের শিক্ষা/ প্রকৃত পরিচয়/ অভাবের মূল্য/ মা-বাবার সঙ্গে রাগ করার মাশুল/সহানুভূতির প্রয়োজন আছে
স্বপ্নকে ডানা মেলতে দিন
গ্রামটির নাম সোনতলি। সেই গ্রামে মৌসুমী নামের তেরো বছরের একটি মেয়ে ছিল। তার স্বপ্ন ছিল প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে হাসিখুশি সময় কাটানো এবং বড় হয়ে একজন শিক্ষিকা হওয়া।
কিন্তু একদিন সে শুনল—তার বিয়ে হয়ে যাবে। তার বাবা-মা তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য তার বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। কথাটা শুনে তাক অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল- আমি এখনই বিয়ে করতে চাই না। আমি পড়াশোনা করতে চাই।”
স্থানীয় স্কুলের শিক্ষিকা মালতী দেবী এই খবর পেয়ে মৌসুমীদের বাড়ি এসে তার বাবা-মাকে বোঝালেন- বাল্যবিবাহ একটি শিশুর স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়। একটি মেয়ে যদি শিক্ষিত হয়, সে নিজের জীবন নিজেই গড়তে পারে। তাকে নিয়ে তখন বাবা-মার চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন হয় না।অন্যদিকে, বাল্যবিবাহ একটি শিশুর স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়। আইনও এটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।
এভাবে বোঝানোর পর মৌসুমীর বাবা-মা বিয়েটা থামিয়ে দিলেন। ফলে মৌসুমী আবার স্কুলে যেতে শুরু করলো। কয়েক বছর পর মৌসুমী তার গ্রামের স্কুলেই শিক্ষিকা হয়ে এলেন। প্রথম দিন ক্লাসে প্রবেশ করে তিনি বাচ্চাদের উদ্দেশে বললেন- স্বপ্নকে বিয়ে দিও না, স্বপ্নকে ডানা মেলতে দিও।
ড্রাগস ভাইরাস
কদমতলা একটি ছোট গ্রাম। সেই গ্রামে রাহুল নামে একজন মেধাবী ছেলে ছিল। পড়াশোনায় সে খুবই ভালো ছিল এবং গ্রামের সবাই তাকে ভালোবাসত। কিন্তু একসময় কিছু খারাপ বন্ধুর পাল্লায় পড়ে সে ধীরে ধীরে ড্রাগসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ল।
প্রথমে সে ভাবত, “এটা শুধু সাময়িক আনন্দের জন্য। বন্ধুদের সঙ্গে একটু মজা করছি। ইচ্ছে হলেই এগুলো ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব।” কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ড্রাগস তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলল। সে চাইলেও আর ড্রাগস ছাড়া সম্ভব হবে না এমন এক পর্যায়ে উপনীত হলো সে। কিছুদিনের মধ্যেই সে ড্রাগসাসক্ত হিসেবে গ্রাম ও স্কুলে পরিচিত হয়ে গেলো। ফলে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হলো। একসময় বন্ধুবান্ধব এবং গ্রামের মানুষও তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল।
ড্রাগস কেনার জন্য টাকার প্রয়োজন হওয়ায় সে নিজের বাড়ি থেকেই টাকা-পয়সা চুরি করতে শুরু করল। কখনও কখনও টাকার জন্য সে বাবা-মায়ের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করতে লাগলো। ফলে সে বাবা-মায়ের বিশ্বাস হারিয়ে ফেললো। ছেলের এই অধঃপতন দেখে বাবা-মায়ের চোখের ঘুম উড়ে চলে গেলো।
একদিন ড্রাগস সেবন করে সে বাড়ির কাছেই একটি মাঠের পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল। তার ছোট বোন তাকে সেই অবস্থায় দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল- দাদা, তুমি আমাদের পরিবারের বড় ছেলে। একদিন তোমাকেই এই সংসারের দায়িত্ব নিতে হবে। তোমার ওপর আমাদের অনেক আশা। তুমি ভালো হয়ে যাও দাদা। এই খারাপ জিনিসগুলো ছেড়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসো।
ছোট বোনের কথাগুলো রাহুলের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিল। সে নিজের ভুল বুঝতে পারল। এরপর সে চিকিৎসা নিল, খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করল এবং নতুন করে জীবন শুরু করল। কিছুদিন পর সে গ্রামের অন্যান্য যুবকদের ড্রাগসের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করতে শুরু করল।
এই কাহিনী আমাদের শিকায়, ড্রাগস সমাজের জন্য এক ভয়ংকর ভাইরাসের মতো। এটি শুধু একজন মানুষের জীবনই নয়, তার পরিবারের সুখ-শান্তিও ধ্বংস করে দেয়। তবে সঠিক সিদ্ধান্ত, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং পরিবারের সহযোগিতা থাকলে যে কেউ আবার নতুন জীবন শুরু করতে পারে।
মায়ের ভালোবাসা
পদুমণি গ্রামে রাজীব নামে একটি ছেলে ছিল। তার বাবা দিনমজুর ছিলেন এবং মা মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। দরিদ্র্য হ’লেও মা কখনো ছেলেকে কষ্ট অনুভব করতে দিতেন না।
একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে রাজীবের জুতাজোড়া ছিঁড়ে গেল। মন খারাপ করে সে বাড়ি ফিরে এসে মাকে বলল- মা, আমার জুতাজোড়া ছিঁড়ে গেছে। আজ কোনো রকমে স্কুল করে এলাম। কাল জুতা ছাড়া স্কুলে যেতে পারব না।
মা হেসে বললেন- চিন্তা করিস না বাবা, কাল তোর নতুন জুতা হবে।
কিন্তু ঘরে জুতা কেনার মতো টাকা ছিল না। কয়েকদিন পরই দূর্গা পূজা। পূজাতে পরার জন্য নতুন শাড়ি কিনবেন বলে মা অল্প অল্প করে কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন। তিনি ভাবলেন, নিজের নতুন কাপড়ের চেয়ে ছেলের জুতাজোড়া বেশি প্রয়োজন। নতুন শাড়ি ছাড়াই তিনি পূজা কাটিয়ে দিতে পারবেন, কিন্তু জুতা ছাড়া ছেলে স্কুলে যেতে পারবে না।
তাই তিনি জমিয়ে রাখা টাকাগুলো নিয়ে বাজারে গিয়ে রাজীবের জন্য একজোড়া নতুন জুতা কিনে আনলেন।
নতুন জুতা পেয়ে রাজীব খুব খুশি হলো। পরের দিন সে নতুন জুতা পরে আনন্দের মনে স্কুলে গেল।
কয়েকদিন পর পূজা এল। মা পুরোনো শাড়ি পরেই পূজা উদযাপন করলেন। পূজায় মাকে পুরোনো কাপড় পরে থাকতে দেখে রাজীব বুঝতে পারল, মা জমানো টকা দিয়ে নিজের জন্য নতুন শাড়ি না কিনে তার জন্য জুতা কিনেছিলেন।
মায়ের এই ত্যাগ আর ভালোবাসা দেখে রাজীবের চোখে জল এসে গেল। সে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল- মা, তোমার ভালোবাসার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
মা স্নেহভরে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন- সন্তানের সুখই মায়ের সবচেয়ে বড় সুখ, বাবা।
সেদিন রাজীব বুঝতে পারল, মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, পবিত্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
গরিবের ঈদ
রহিম একজন গরিব রিক্সাচালক। নদীভাঙনে তার জমি-জমা সব নদীয়ে গ্রাস করে নিয়েছে। তাই সে শহরের একটি ভাড়া বাড়িতে পরিবার নিয়ে থেকে রিক্সা চালায়। স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তান—জুনাইদ ও মরিয়মকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার।
কিন্তু ই-রিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর থেকে রহিমের আয় কমতে শুরু করেছে। তার ওপর ঈদের ঠিক আগেই সে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলো। তাই প্রায় এক সপ্তাহ সে রিক্সা চালাতে পারেনি। সেজন্য তার ঘরে খাবারও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। দু’দিন পরেই ঈদ, অথচ সে চাল, চিনি কিংবা সেমাই কিছুই কিনতে পারেনি। নিজের পুরোনো পাঞ্জাবিটাও এতটাই জীর্ণ হয়ে গেছে যে সেটা আর পরার উপযোগী নেই।
ঈদের আগের দিন জ্বর কিছুটা কমতেই রহিম দুর্বল শরীর নিয়েই রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বের হওয়ার সময় মেয়ে মরিয়ম তাকে ডেকে করল—আব্বা, এবারের ঈদে আমাকে নতুন জামা কিনে দেবে তো?
রহিম মুখে চেষ্টাকৃত হাসি এনে বলল—“ইনশাআল্লাহ, অবশ্যই দেব।”
সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে সে প্রায় ছয়শ টাকা রোজগার করল। সন্ধ্যার দিকে আবার তার জ্বর এলো, তবুও সন্তানের মুখের হাসির কথা ভেবে সে কাজ চালিয়ে গেল। সেদিন সে সর্বসাকুল্যে সাতশ টাকা ভাড়া মারলো। সন্ধ্যের পরা টাকা কয়টি নিয়ে সে বাজারে গেলো।বাজারে গিয়ে দেখল কাপড়ের দাম অনেক বেশি। তাই অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সে নিজের জন্য কিছুই কিনল না। শুধু দুই সন্তানের জন্য সস্তা হলেও নতুন পোশাক কিনল। সঙ্গে কিছু চাল, চিনি ও সেমাইও কিনে আনলো।
ঈদের দিন সকালে জুনাইদ ও মরিয়ম নতুন পোশাক পরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। স্ত্রী সেমাই রান্না করল। ঘরে বড় কোনো আয়োজন ছিল না, দামি কোনো খাবারও ছিল না, কিন্তু ছিল ভালোবাসা, শান্তি আর সুখ।
সন্তানদের হাসিমুখ দেখে রহিমের চোখে আনন্দের অশ্রু চলে এলো। সে মনে মনে বলল—আমার ধন-সম্পদ নেই, তবুও আমি আমার সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি। তাই আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ।
রিক্সাওয়ালা
একদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যে একজন বৃদ্ধা মহিলা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ঠান্ডায় কাঁপছিলেন। অনেক গাড়ি ও মানুষ তাঁর পাশ দিয়ে চলে গেল, কিন্তু কেউ তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল না। ঠিক তখনই করিম তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। মহিলার অবস্থা দেখে সে তার রিকশা থামিয়ে বলল— মা, আপনি কোথায় যাবেন? আসুন, আমার রিকশায় উঠুন। আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।
বৃদ্ধা লজ্জিত স্বরে বললেন— বাবা, আমার কাছে ভাড়া দেওয়ার টাকা নেই।
করিম মুচকি হেসে বলল— মা, আপনাকে ভাড়া দিতে হবে না। এই ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকলে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। উঠুন, তাড়াতাড়ি রিকশায় উঠে বসুন।
বৃদ্ধা আবার বললেন— আমাদের বাড়ি এখান থেকে অনেক দূরে। পঞ্চাশ টাকা ভাড়া লাগে। তোমার তো অনেক লোকসান হবে।
করিম শান্তভাবে উত্তর দিল— হোক লোকসান। সব কাজ লাভ-লোকসানের হিসেব করে করা যায় না। আপনার আশীর্বাদই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা হবে।
এরপর বৃদ্ধা রিকশায় উঠে বসলেন। করিম তাঁকে নিরাপদে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দিল। বাড়িতে পৌঁছে বৃদ্ধা চোখের জল মুছে বললেন— বাবা, আজও পৃথিবীতে তোমার মতো ভালো মানুষ আছে বলেই পৃথিবীটা এত সুন্দর।
সেদিন করিম হয়তো বেশি টাকা রোজগার করতে পারেনি, কিন্তু তার মন আনন্দ, তৃপ্তি এবং মানবতার গর্বে ভরে গিয়েছিলো। সে উপলব্ধি করতে পেরেছিলো, দয়া, সহানুভূতি ও মানবতা টাকার চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। অন্যকে সাহায্য করার মধ্যেযে সুখ আছে, সেই সুখ লাখ টাকা দিয়েও কেনা যায় না।
বড় ভাইয়ের ভালোবাসা
একটি নদীর তীরবর্তী গ্রামে রাহুল ও তার ছোট ভাই রিজু তাদের মাকে নিয়ে বাস করত। তাদের বাবা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। তখন রাহুল নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। পড়াশোনায় সে খুবই ভালো ছিল। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। কারণ তাদের বাবাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে অভাব-অনটন দেখা দিয়েছিলো।
পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তখন রাহুল নিজের পড়াশোনা ছেড়ে গ্রামের একটি দোকানে কাজ শুরু করেছিলো এবং সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলো। অন্যদিকে, রিজুও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। তাই হাজারো অভাব-অনাটনের মধ্যেও রাহুল তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহায্য করছিলো।
সময়ের সঙ্গে রিজু স্টার মার্কস নিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো। নিজে রাজা হওয়ার চেয়ে রাজার বাবা হওয়া ভালো— এই মনোভাব নিয়ে রাহুল তাকে শহরের একটি নামী বেসরকারি কলেজে ভর্তি করিয়ে দিল।
একবার মায়ের গলব্লাডার অপারেশন করতে হলো। ফলে রিজুর দুই মাসের কলেজ ফি বাকি পড়ে গেল। একদিন রিজু ফোন করে বলল— দাদা, এই মাসে হোস্টেল ও কলেজের ফি না দিলে আমাকে হোস্টেল থেকে বের করে দেবে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফি জমা করে দাও।
হাতে টাকা না থাকলেও রাহুল তাকে আশ্বস্ত করে বলল— চিন্তা করিস না। আমি দু-এক দিনের মধ্যেই তোর সব ফি জমা করে দেব।
সেদিনই রাহুল নিজের প্রিয় মোবাইল ফোনটি বিক্রি করে রিজুর কলেজের সমস্ত বকেয়া ফি জমা করে দিল।
পরের দিন রিজু জানতে পারল যে তার কলেজের ফি আদায় দেওয়ার জন্য তার দাদা নিজের প্রিয় মোবাইল ফোনটি বিক্রি করে দিয়েছে।
কথাটি জানতে পেরে রিজুর চোখে জল এসে গেল। সে সেদিনই বাড়ি এসে রাহুলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল— দাদা, আমি বড় হয়ে তোমার সব কষ্ট দূর করে দিব।
রাহুল তখন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল— তুই ভালো মানুষ হ। তুই যদি একজন ভালো মানুষ হতে পারিস, সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এভাবেই একজন বড় ভাইয়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছোট ভাইয়ের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করল এবং তাকে আবেগে আপ্লুত করে তুলল। সেদিন সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যেভাবেই হোক, তাকে একদিন বড় ভাইয়ের এই ভালোবাসার মূল্য দিতেই হবে।
সমাজসেবী শিক্ষক
সোনাপুর নামে একটি ছোট গ্রাম ছিল। সেই গ্রামে যোগেন মণ্ডল নামে একজন শিক্ষক ছিলেন। গ্রামের সবাই তাকে “মণ্ডল স্যার” নামে চিনত। তিনি গ্রামের বিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করতেন। বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানোর পাশাপাশি তিনি সমাজের উন্নতির বিষয়েও সবসময় চিন্তা করতেন।
একদিন তিনি লক্ষ্য করলেন যে গ্রামের অনেক দরিদ্র শিশু টাকার অভাবে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কাজ করতেও বাধ্য হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে রমেন স্যার খুবই দুঃখ পেলেন।
এই সমস্যা সমাধান করার জন্য তিনি গ্রামের মানুষদের ডেকে একটি সভার আয়োজন করলেন। সভায় তিনি সবাইকে বোঝালেন— “শিক্ষাই একটি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের দেশের ভবিষ্যৎ। আপনারা সবাই নিজেদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠান। আমি জানি, অভাবের কারণে আপনাদের অনেকের সন্তান বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে। যারা দিনে কাজ করে, তাদের আমি সন্ধ্যায় বিনামূল্যে পড়াশোনা করাব। আগামীকাল থেকে আপনারা তাদের আমার রাতের শিক্ষা কেন্দ্রে পাঠাবেন।”
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি গ্রামে একটি “নৈশ শিক্ষা কেন্দ্র” চালু করলেন। সেখানে দিনে কাজ করা ছেলে-মেয়েদের সন্ধ্যায় বিনামূল্যে পড়াতে শুরু করলেন। শুধু পড়াশোনাই নয়, গ্রামের সচ্ছল মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহ করে তিনি দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বই, খাতা ও পোশাকও বিতরণ করতে লাগলেন।
ধীরে ধীরে গ্রামের চিত্র বদলাতে শুরু করল। অনেক শিশু আবার স্কুলে যেতে শুরু করল। কয়েক বছর পর গ্রামের বহু ছাত্র-ছাত্রী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলো। তাদের মধ্যে দুজন ডাক্তারও হলো।
একদিন সেই সফল ডাক্তারদের একজন মণ্ডল স্যারের কাছে এসে বলল, “স্যার, আপনি যদি তখন আমাকে সাহায্য না করতেন, তাহলে আমি ডাক্তার হওয়া তো দূরের কথা, আজও হয়তো আমি অশিক্ষিতই থেকে যেতাম। আপনার ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না।”
ছাত্রটির কথা শুনে মণ্ডল স্যারের চোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠল। তিনি উপলব্ধি করলেন, শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু বিদ্যালয়ের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁদের কর্ম সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রসারিত হওয়া উচিত। কারণ একজন প্রকৃত শিক্ষক চাইলে সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও অসাধারণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু জ্ঞানই বিতরণ করেন না, তিনি সমাজকে আলোকিতও করতে পারেন।
লোভের শাস্তি
সুমি নামে এক শান্ত-ভদ্র মেয়ের পাশের একটি গ্রামে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের সময় সুমির বাবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জামাইয়ের বাড়িতে অনেক উপহারসামগ্রী দিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই স্বামীর পরিবার আরও টাকা এবং একটি মোটরসাইকেল যৌতুক হিসেবে দাবি করতে শুরু করে।
সুমির বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তিনি একজন সাধারণ কৃষক ছিলেন। অনেক কষ্টে সংসার চালাতেন। তাই স্বামীর পরিবারের এই অতিরিক্ত দাবি পূরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। এর ফলস্বরূপ, একসময় স্বামীর পরিবার সুমির ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। সামান্য বিষয় নিয়েও তাকে গালিগালাজ ও অপমান করা হতো। তবুও সুমি ধৈর্য ধরে সব অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছিল।
অবশেষে সুমির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। দিনের পর দিন অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকায় সে গ্রামের একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হলো। আইনজীবী তাকে বললেন-“যৌতুক আমাদের সমাজের একটি ঘৃণ্য কুপ্রথা। যৌতুক দাবি করা এবং তার জন্য একজন নারীকে নির্যাতন করা শুধু অনৈতিকই নয়, আইনের চোখেও এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই তুমি আইনের সাহায্য নাও। সত্যের জয় হবেই।”
আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী সুমি আইনের আশ্রয় নিল। তদন্তের পর সমস্ত সত্য প্রকাশ্ পেলো। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত দোষীদের দোষী সাব্যস্ত করে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করল।
সেদিন সুমি উপলব্ধি করল, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে থাকার চেয়ে সাহসের সঙ্গে তার প্রতিবাদ করাই শ্রেয়। কারণ অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে অত্যাচার আরও বেড়ে যায়, আর সাহসী প্রতিবাদ ন্যায়বিচারের পথ খুলে দেয়।
এই গল্প আমাদের শেখায়, যৌতুক একটি ঘৃণ্য সামাজিক কুপ্রথা। লোভ মানুষের বিবেককে নষ্ট করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আইনের আশ্রয় নিলে ন্যায়বিচার অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হয়।
সন্দেহ
হরেন দত্ত একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। কয়েক বছর আগে তিনি অবসর নিয়েছেন। দুই ছেলে, দুই পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁর একটি সুখী পরিবার ছিল। বাড়িতে সবসময় হাসি-আনন্দ আর মিলেমিশে থাকার পরিবেশ বিরাজ করত।
কিন্তু ছোট ছেলের বিয়ের পর থেকেই বাড়িতে অশান্তির সূচনা হলো। নতুন বউমা নমিতা পরিবারের প্রতিটি বিষয় সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করল। সে মনে করত, বড় বউমাকে বেশি ভালোবাসা ও সম্মান করা হয়। তাই সে স্বামীর কানে নানা কথা বলতে শুরু করল। ছোটখাটো বিষয়কেও বড় করে তুলে শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে ছোট ছেলের কাছে অভিযোগ করতে লাগল।
ধীরে ধীরে দুই ভাইয়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে লাগল। পরিবারের মধ্যে বিভেদের মনোভাব সৃষ্টি হলো। যে পরিবার একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করত, তারা আলাদা আলাদা বসতে শুরু করল। হাসির পরিবর্তে বাড়িতে তর্ক-বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হলো। যে ঘর একসময় আনন্দে মুখর ছিল, তা অশান্তিতে ভরে উঠল। এতে পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশাপাশি বৃদ্ধ মা-বাবাও মানসিকভাবে কষ্ট পেতে লাগলেন।
একদিন গ্রামের একজন প্রবীণ ও জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁদের বাড়িতে এলেন। বাড়ির অশান্তির মূল কারণ জেনে তিনি ছোট বউমা নমিতাকে ডেকে বললেন- একটি সংসার ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগে না, কিন্তু গড়ে তুলতে অনেক বছর লেগে যায়। সন্দেহ একটি মানসিক ব্যাধি। বলতে গেলে সন্দেহ যেন একটি পরমাণু বোমার মতো ভয়ংকর। সন্দেহ একটি সুখী পরিবারকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই পরিবারের কোনো সদস্য সম্পর্কে কোনো সন্দেহ হলে মনে মনে হিংসা বা ক্ষোভ পুষে না রেখে সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেই সন্দেহ দূর করা উচিত।
এরপর তিনি নমিতাকে সরাসরি বললেন- আসলে তুমি যেমন ভাবছ, তেমনটা নয়। এই বাড়িতে বড় বউমাকে কেউ তোমার চেয়ে বেশি ভালোবাসে বা সম্মান করে না। তাঁকে যতটা ভালোবাসা হয়, তোমাকেও ঠিক ততটাই ভালোবাসা হয়। এই সংসারে বড় বউমার যতটা অধিকার আছে, তোমারও ঠিক ততটাই অধিকার আছে। সন্দেহ, হিংসা এবং কানে কথা লাগানো—এই তিনটি জিনিস একটি সুখী পরিবারের শান্তি নষ্ট করে। সন্দেহ, ঈর্ষা ও পরনিন্দা একটি সুখী পরিবারকে ধ্বংস করে; আর পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা ও খোলামেলা আলোচনা পরিবারে শান্তি ও ঐক্য ফিরিয়ে আনে। তাই মন থেকে সন্দেহ নামের এই ভাইরাস দূর করে সবার সঙ্গে মিলেমিশে চললে এই বাড়িতে আবার সুখ, শান্তি ও ভালোবাসা ফিরে আসবে।
জ্ঞানী ব্যক্তির কথায় নমিতা নিজের ভুল বুঝতে পারল। সে পরিবারের সকলের কাছে ক্ষমা চাইল এবং সবার সাথে মিলেমিশে থাকার জন্য সংকল্প নিলো। ফলে এরপর ধীরে ধীরে পরিবারে আবার ভালোবাসা, বিশ্বাস, সম্প্রীতি এবং সুখ-শান্তি ফিরে এল।
সুখী পরিবারে অশান্তি
লখিমপুরের একটি গ্রামে হরেন কাকার একটি সুখী পরিবার ছিল। দুই ছেলে, দুই পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁর সংসারটি সবসময় হাসি-আনন্দে ভরে থাকত। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করত। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়ে মিলেমিশে জীবন কাটাত।
ছোট ছেলের বিয়ের পর বাড়িতে নতুন বউ মীনা এল। প্রথমদিকে সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। তবে মীনা বাবা-মা এবং ছোট ভাইকে নিয়ে ছোট পরিবারের সদস্য ছিলো। তাই বড় পরিবারে এসে সে নিজেকে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হলো। প্রথম অবস্থায় সে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল যদিও বিফল হলো। তাই কিছুদিন পর থেকে মীনা প্রায়ই স্বামীর কানে শ্বশুর-শাশুড়ি ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা কথা বলতে শুরু করল। ছোটখাটো ঘটনাকেও বড় করে তুলে ধরে সে পরিবারের মানুষ তাকে সম্মান দেয় না বলে অভিযোগ করতে লগলো।
স্বামীও ধীরে ধীরে সেই কথাগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করল। সে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কম কথা বলতে লাগল। বাড়িতে সন্দেহ, ভুল বোঝাবুঝি এবং এক সময় ঝগড়ার সৃষ্টি হলো। যে সংসার একসময় হাসি-খুশিতে মুখর ছিল, সেই সংসারে অশান্তি নেমে এল।
একদিন হরেন কাকা সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে বললেন- একটি পরিবারকে ধ্বংস করে মিথ্যা কথা, অহংকার এবং অবিশ্বাস। আমরা যদি একে অপরকে বোঝার চেষ্টা না করি, তাহলে কোনোদিনই সংসারে পুনরায় সুখ-শান্তি ফিরে আসবে না। একটা কথা মনে রেখ, কুচিন্তা, পরনিন্দা ও অবিশ্বাস একটি পরিবারকে ধ্বংস করে; আর ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়া পরিবারকে সুখী, ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করে তোলে। ছোট বউমা ছোট পরিবারের সন্তান। তাই বড় পরিবারে এসে তার কিছু অসুবিধা হচ্ছে। তবে বড় পরিবারে কিছু কিছু অসুবিধা থাকলেও, মানিয়ে নিতে পারলে মজাও আছে। তাই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে এক সময় সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
শশুড়ের কথায় মীনা নিজের ভুল বুঝতে পারল এবং সে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলো। সেদিন থেকে সে মিলেমিশে থাকারও চেষ্টা করতে লাগলো। ফলে ধীরে ধীরে সংসারে আবার সুখশান্তি ফিরে এল।
অভাগা রাহুল
একটি ছোট গ্রামে রাহুল নামে দশ বছরের একটি ছেলে ছিলো। ছোট থাকতেই এক দুর্ঘটনায় সে তার মা-বাবাকে হারিয়েছিল। এরপর সে তার বৃদ্ধ দিদিমার সঙ্গে থেকে বড় হতে থাকে। দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যেও সে ভবিষ্যতে একজন বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখত। তাই সে পড়াশোনার প্রতি খুব গুরুত্ব দিত এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেত।
তাদের ঘরে সবসময়ই অভাব লেগেই থাকত। তাই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে সে অন্যের বাড়িতে ছোটখাটো কাজ করে দিদিমাকে সাহায্য করত। অনেক দিন সে পেট ভরে খেতেও পেত না। তবুও সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়নি। তার পরিশ্রম এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে খাতা-কলম ও বইয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি রাহুল খেলাধুলা, কবিতা আবৃত্তি এবং বক্তৃতা প্রতিযোগিতাতেও অংশগ্রহণ করত। একবার বিদ্যালয়ের বার্ষিক অধিবেশনে অনুষ্ঠিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় রাহুল প্রথম স্থান অর্জন করল। পুরস্কার নেওয়ার জন্য সে মঞ্চে উঠে বলল- আমার মা-বাবা নেই, কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন আজও আমার সঙ্গে আছে। আমি পড়াশোনা করে বড় মানুষ হতে চাই। তাই আমি আমাদের এলাকার সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।”
তার কথা শুনে সেখানে উপস্থিত সকলের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। এরপর গ্রামের মানুষ তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন। গ্রামের মানুষের ভালোবাসা ও স্নেহ পেয়ে রাহুল বুঝতে পারল যে, গ্রামের মানুষ কখনোই তার মা-বাবার অভাব পূরণ করতে পারবেন না, কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা, আর তার নিজের আগ্রহ, একাগ্রতা, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ই একদিন তার সাফল্যের দ্বার খুলে দিবে।
সেদিন থেকে সে অধিক একাগ্রতার সাথে পড়াশোনা চালিয়ে গেলো এবং অবশেষে সে সরকারের একজন উচ্চপদস্থ বিষয়া হয়ে গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করলো।
সবুজ পৃথিবী
আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিদ্যালয়ে এই দিবস উদযাপনের জন্য সকল ছাত্র-ছাত্রী একত্রিত হয়েছিল। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বললেন, “একটি গাছ রোপণ করা মানে ভবিষ্যতের জন্য জীবন রোপণ করা। গাছ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে। অক্সিজেন ছাড়া প্রাণিজগতের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই গাছ লাগানোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এছাড়া একটি গাছ কাটার আগে অন্তত দুটি গাছের চারা রোপণ করা উচিত। গাছ শুধু অক্সিজেনই দেয় না; ফল, ফুল, প্রয়োজনীয় কাঠ এবং অসংখ্য জীবজন্তুর আশ্রয়ও প্রদান করে।”
শিক্ষকের এই কথাগুলো দশ বছর বয়সী বিমানের মনে গভীর প্রভাব ফেলল। বাড়ি ফিরে সে তার বাবাকে একটি আমগাছের চারা এনে দিতে বলল। পরের দিন বাবা একটি সুন্দর আমগাছের চারা এনে দিলেন। বিমান বাড়ির সামনে চারাটি রোপণ করল এবং প্রতিদিন নিয়মিত পানি দিয়ে যত্ন নিতে শুরু করল।
বছর কেটে গেল। ছোট্ট চারাটি একদিন বড়, সবুজ গাছে পরিণত হলো। গাছটি সুস্বাদু ফল দিতে শুরু করল, পথচারীদের শীতল ছায়া দিল এবং অসংখ্য পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠল।
একদিন বিমান গাছটির নিচে বসে ভাবল, “ছোটবেলায় আমি যে গাছটি লাগিয়েছিলাম, আজ সেটি কত মানুষ, পশুপাখি এবং প্রকৃতির উপকার করছে!”
সেদিন সে উপলব্ধি করল, পরিবেশ রক্ষার জন্য বড় কোনো কাজ করার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেক মানুষ যদি অন্তত একটি করে গাছের চারা রোপণ করে এবং তার সঠিক যত্ন নেয়, তবে আমাদের পৃথিবী আবারও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। তাই গাছ লাগানো এবং পরিবেশ সংরক্ষণ করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
দুষ্ট বউমা
সোনাপুর গ্রামের হরিদাস নামে এক বৃদ্ধ কৃষক বাস করতেন। তাঁর দুই ছেলে ছিল। বড় ছেলের স্ত্রী মীনা ছিল অত্যন্ত দুষ্ট ও স্বার্থপর স্বভাবের। সে সংসারের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সবসময় ঝগড়া করার অজুহাত খুঁজে বেড়াত।
বৃদ্ধ হরিদাস ও তাঁর স্ত্রী বহু কষ্ট করে সংসার গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু মীনা সবসময় তাঁদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত এবং অপমান করত। বার্ধক্যের কারণে বৃদ্ধ দম্পতি আর কাজ করতে পারতেন না। তাই মীনা তাঁদের সময়মতো খাবারও দিত না। এমনকি সে নিজের স্বামীকেও বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে উসকানি দিত। ফলে বাড়িতে সবসময় অশান্তি লেগেই থাকত।
একদিন হঠাৎ হরিদাস গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গ্রামের লোকজন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। কিন্তু বড় বউমা মীনা সম্পূর্ণ উদাসীন রইল। শ্বশুরের খোঁজ নেওয়া তো দূরের কথা, মনে মনে তাঁর মৃত্যুই কামনা করল। কিন্তু ভাগ্যের বিধান ভিন্ন ছিল। হরিদাস মারা গেলেন না। কয়েকদিন চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
শ্বশুর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কিছুদিন পর মীনা একটি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলো। তাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। তখন বৃদ্ধ হরিদাস ও তাঁর স্ত্রী দিন-রাত তার সেবা-শুশ্রূষা করে তাকে সুস্থ করে তুললেন।
এই দৃশ্য দেখে মীনার মন বদলে গেল। সে বুঝতে পারল, মা-বাবা একটি পরিবারের বটবৃক্ষের মতো। তাই তাঁদের সম্মান ও ভালোবাসা করা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য। তাঁদের প্রতি অন্যায় আচরণ করলে সংসারে অশান্তি বাড়ে এবং নিজের নীচ মানসিকতারই পরিচয় প্রকাশ পায়।
মীনা নিজের ভুল উপলব্ধি করল। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে শাশুড়ি-শ্বশুরের কাছে ক্ষমা চাইল। বৃদ্ধ দম্পতিও তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এরপর থেকে সেই সংসারে আবার সুখ, শান্তি ও ভালোবাসার পরিবেশ ফিরে এল।
দুষ্ট বউমার অনুতাপ
সোনাপুর গ্রামের এক প্রান্তে বাস করতেন হরিদাস নামে এক বৃদ্ধ কৃষক। সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে তিনি ও তাঁর স্ত্রী একটি ছোট্ট সুখের সংসার গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের দুই ছেলে ছিল। বড় ছেলে শান্ত স্বভাবের হলেও তার স্ত্রী মীনা ছিল অত্যন্ত স্বার্থপর, রাগী ও ঝগড়াটে স্বভাবের। সামান্য বিষয় নিয়েই সে প্রতিদিন অশান্তি সৃষ্টি করত। শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি তার মনে কোনো শ্রদ্ধা, না ছিল সামান্য সহানুভূতি ছিল না।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছিলেন হরিদাস ও তাঁর স্ত্রী। একসময় যাঁদের পরিশ্রমে সংসার চলত, আজ তাঁরা অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মীনা তাঁদের কষ্ট বুঝতে চাইত না। অনেক সময় ইচ্ছা করেই সময়মতো খাবার দিত না, অপমানজনক কথা শুনিয়ে তাঁদের চোখে জল এনে দিত। শুধু তাই নয়, সে নিজের স্বামীকেও বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে উসকে দিত। ফলে যে সংসার একসময় হাসি-আনন্দে মুখর ছিল, সেখানে প্রতিদিনই অশান্তির কালো ছায়া নেমে আসত।
একদিন হঠাৎ হরিদাস গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গ্রামের মানুষ মানবিকতার পরিচয় দিয়ে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল। কিন্তু মীনার মনে সামান্য দুঃখও জাগল না। শ্বশুরের খোঁজ নেওয়া তো দূরের কথা, সে মনে মনে ভাবল—“উনি মারা গেলে সংসারের ঝামেলাও শেষ হবে।”
কিন্তু মানুষের ভাবনার চেয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাই শেষ কথা। দীর্ঘ চিকিৎসার পর হরিদাস সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
কয়েক সপ্তাহ পরই ঘটল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মীনা গুরুতর আহত হলো। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সেই কঠিন সময়ে যাঁদের সে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল, সেই বৃদ্ধ হরিদাস ও তাঁর স্ত্রী-ই দিন-রাত হাসপাতালের বারান্দায় বসে তার সেবা করলেন। নিজের হাতে ওষুধ খাওয়ালেন, কপালে হাত রেখে সাহস দিলেন, রাত জেগে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করলেন।
একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে মীনা দেখল, বৃদ্ধ শ্বশুর ক্লান্ত শরীর নিয়ে তার শয্যার পাশে বসে আছেন, আর শাশুড়ি নিঃশব্দে তার কপালে পানি দিচ্ছেন। সেই দৃশ্য দেখে তার বুকটা হুহু করে উঠল। চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে উপলব্ধি করল, রক্তের সম্পর্কই শুধু আপন নয়—ক্ষমা, মমতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে মীনা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে শ্বশুর-শাশুড়ির পায়ে লুটিয়ে পড়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল- “আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি আপনাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি। আজ বুঝেছি, মা-বাবা সংসারের বটবৃক্ষ। তাঁদের আশীর্বাদ ছাড়া কোনো পরিবারে সত্যিকারের সুখ-শান্তি আসে না।”
বৃদ্ধ দম্পতি স্নেহভরে তাকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁদের চোখ থেকেও আনন্দের অশ্রু ঝরে পড়ল। সেই দিন থেকে মীনা সম্পূর্ণ বদলে গেল। সে শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের বাবা-মায়ের মতো ভালোবাসতে শুরু করল। যে বাড়িতে একসময় অশান্তির আগুন জ্বলত, সেখানে আবার ফিরে এল হাসি, ভালোবাসা আর শান্তির আলো।
শিক্ষা: মা-বাবা ও শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও মানবিক আচরণ একটি পরিবারের প্রকৃত সুখের ভিত্তি। ক্ষমা ও ভালোবাসা মানুষের হৃদয়কে বদলে দিতে পারে।
বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো বাবা
রমেশবাবু একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি তাঁর একমাত্র ছেলে অমিতের সঙ্গে বসবাস করতেন। অমিতের বিয়ের পর নতুন বউমা নীলিমা বাড়িতে এল। প্রথম দিকে নীলিমা সবার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করলেও কিছুদিন পর থেকেই সে শ্বশুরকে সংসারের বোঝা মনে করতে শুরু করল।
প্রায়ই সে স্বামীর কাছে অভিযোগ করত, “তোমার বাবার জন্য আমার কোনো স্বাধীনতা নেই। এই ছোট্ট বাড়িতে আমি নিজের মতো করে চলাফেরা করতে পারি না। বাবার বন্ধুরা প্রায়ই বাড়িতে আসেন। ফলে সব সময় আমাকে অস্বস্তির মধ্যে থাকতে হয়। তাদের জন্য নিয়মিত চা-নাশতার ব্যবস্থাও করতে হয়। তার ওপর বাবার চাহিদারও শেষ নেই। গরম পানি ছাড়া তিনি স্নান করতে পারেন না। সময়মতো কাপড় ধুয়ে না দিলে বিরক্ত হন। ঘড়ি ধরে ওষুধ খাওয়াতে হয়। এমনকি আমি মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বললেও তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। এভাবে চলতে থাকলে আমি একদিন পাগল হয়ে যাব।”
প্রথমদিকে অমিত স্ত্রীর এসব কথায় তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু একই অভিযোগ বারবার শুনতে শুনতে একসময় সেও স্ত্রীর কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর চাপে একদিন সে নিজের বাবাকে একটি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এল।
বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার সময় রমেশবাবুর চোখে জল এসে গেল। তিনি ছেলেকে বললেন- “বাবা, ভালো থাকিস। বউমাকে কখনো দোষারোপ করিস না। নিজের শরীরের যত্ন নিবি। সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করবি।”
কয়েক বছর পর রমেশবাবু বৃদ্ধাশ্রমেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বহু বছর কেটে গেল। একসময় অমিতও বৃদ্ধ হল। তখন তার নিজের ছেলে ও পুত্রবধূও তার সঙ্গে ঠিক একই রকম আচরণ করতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত তাকেও বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হলো।
বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার পথে অমিত গভীরভাবে উপলব্ধি করল—সেদিন তার বাবা যখন বৃদ্ধাশ্রমে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর হৃদয়ে কতটা গভীর আঘাত লেগেছিল।
সে অনুতপ্ত কণ্ঠে বলল- “মানুষ যেমন বীজ বোনে, একদিন তেমনই ফল পায়। বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, ভালোবাসা এবং তাদের পাশে থাকা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। যারা তাঁদের অবহেলা করে, একদিন সেই অবহেলার ফল তাদের নিজেদেরই ভোগ করতে হয়।
আব্দুল কাকু
শহরের একটি ব্যস্ত গলিতে বসে ভিক্ষা করে বৃদ্ধ আব্দুল কাকু জীবন নির্বাহ করতেন। একসময় তিনি একজন পরিশ্রমী রাজমিস্ত্রি ছিলেন। কিন্তু বার্ধক্য ও অসুস্থতা তাঁকে এক সময় কর্মক্ষমতাহীন করে তোলে। তাঁর দুই ছেলে থাকলেও তাদের অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। তারা দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে নিজেদের সংসার চালাত। তাঁর স্ত্রী অচিরণ বহু বছর আগেই ক্যান্সারে আক্ৰান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন। তাই তিনি কারও ওপর বোঝা না হয়ে ভিক্ষা করেই কোনোমতে নিজের পেট চালাতেন।
একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে রাহুল নামে এক ছাত্র আব্দুল কাকুকে রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখল। কাকুর চোখে গভীর বিষাদের ছায়া দেখে সে তাঁর কাছে এগিয়ে এল। শুধু টাকা দিয়ে চলে যাওয়ার পরিবর্তে সে কিছুক্ষণ তাঁর সঙ্গে গল্প করল, ভালমন্দ খোঁজ খবর নিল।। তারপর পাশের একটি হোটেল থেকে এক প্লেট ভাত এনে তাঁকে খেতে দিল।
রাহুলের এমন আন্তরিক আচরণে আব্দুল কাকুর চোখে জল এসে গেল। তিনি বললেন, “বাবা, অনেকেই আমাকে টাকা দেয়, কিন্তু আমার খোঁজ খুব কম মানুষই নেয়। তুমি আমার খোঁজখবর নিয়েছ, আমাকে নিজের হাতে ভাত খাইয়েছ।” এই বলে তিনি রাহুলের মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললেন, “আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন, বাবা। আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি, তুমি জীবনে অনেক বড় মানুষ হবে।”
সেদিন রাহুল উপলব্ধি করল, শুধু দান করলেই প্রকৃত মানবতা প্রকাশ পায় না। অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মানুষের কষ্ট অনুভব করে তাদের পাশে দাঁড়ালে তবে প্রকৃত মানবতা প্রকাশ পায়। তার মনে হলো, সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান উপহারটি আব্দুল কাকুর কাছ থেকে আশীর্বাদ স্বরূপ পেল। এমন আশীর্বাদ অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যায় না; মানুষের হৃদয় জয় করে এমন আশীৰ্বাদ অর্জন করতে হয়।.
অনাথ মেয়ের ত্যাগ
রুবিনা এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তার বর্তমান বয়স মাত্র আঠারো বছর। পাঁচ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তাদের বাবা-মা মারা গেছেন। তারা চার ভাই-বোন। দুই ভাই এবং দুই বোন। রুবিনাই ছিল পরিবারের বড় মেয়ে। তাই বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়েছে।
রুবিনা পড়াশোনায় খুবই মেধাবী ছাত্রী ছিল। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার কারণে তাকে মাঝপথেই স্কুলের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে পাশের একটি হোটেলে কাজ করতে হয়। প্রতিদিন ভোরে উঠে ঘরের সব কাজ শেষ করে সে হোটেলে যায়। সারাদিন মানুষের খাবার পরিবেশন করে যে সামান্য টাকা আয় করে, তা দিয়েই বাড়িভাড়া, সংসারের খরচ এবং ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনার খরচ চালায়।
সংসারের খরচ অনেক, কিন্তু আয় খুবই সীমিত। তাই অনেক সময় নিজের জন্য একটি নতুন কাপড়ও কিনতে পারে না সে। কিন্তু হাজারো অভাব-অভিযোগের মধ্যেও ভাই-বোনদের মুখে হাসি দেখলেই সে নিজের সব কষ্ট ভুলে যায়।
একবার তার এক ছোট ভাই স্কুলে প্রথম স্থান অর্জন করল। বিদ্যালয়ের বার্ষিক অধিবেশনে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে পুরস্কার হিসেবে একগুচ্ছ বই উপহার দিল। বাড়িতে এসে ভাই সেই বইয়ের গুচ্ছ রুবিনার হাতে তুলে দিয়ে বলল- আপা, তোমার ত্যাগের কারণেই আজ আমি এই পুরস্কার পেয়েছি। আমার এই সাফল্যের সব কৃতিত্ব তোমার।
ভাইয়ের কথা শুনে আনন্দে রুবিনার চোখ জলে ভরে উঠল। সে অনুভব করল, কষ্ট আর ত্যাগ কখনোই বৃথা যায় না। প্রকৃত ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ মানুষকে যেকোনো কঠিন পথ অতিক্রম করার শক্তি যোগায়।
সে নিজে হয়তো লেখাপড়া শেখার সুযোগ পায়নি, কিন্তু তার ত্যাগ ও পরিশ্রম যে তার ভাইয়ের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছে, এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে! সেদিন রুবিনা গভীরভাবে উপলব্ধি করল—নিজে রাজা হওয়ার চেয়ে রাজা গড়ে তোলার আনন্দ অনেক বেশি।
দুই ভাই
একটি গ্রামে রমেন ও কমল নামে দুই ভাই ছিল। দুই ভাই-ই খুবই সৎ ও সরল স্বভাবের ছিল। তারা একসঙ্গে চাষবাস করত এবং তাদের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ও মিলাপ্রীতি ছিল। কিন্তু গ্রামের কিছু হিংসুটে মানুষ তাদের এই মিলাপ্রীতি সহ্য করতে পারত না। তাই তারা মনে মনে দুই ভাইয়ের প্রতি ঈর্ষা পোষণ করত।
সময়ের সঙ্গে দুই ভাই বিয়ে করে এক সময় সংসারী হলো। পরে সংসারের নিয়ম অনুযায়ী তারা আলাদা হয়ে গেল। আলাদা হওয়ার কিছুদিন পর সেই হিংসুটে লোকদের একজন রমেনকে বলল- তোর ভাই তোকে ঠকিয়েছে। ভালো ভালো চাষের জমিগুলো সে নিজের ভাগে রেখেছে, আর তোকে দিয়েছে অনুর্বর খারাপ জমি।
কথাটি শুনে রমেনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। লোকটির কথা পুরোপুরি মিথ্যাও ছিল না। সত্যিই কমলের ভাগে পড়া জমিগুলো উর্বর ছিল এবং সেগুলো ধান চাষের জন্য খুবই উপযোগী ছিল। অন্যদিকে রমেনের ভাগে ধান চাষের জমি খুবই কম পড়েছিল। তার অধিকাংশ জমিই ছিল বাগান করার জন্য উপযুক্ত।
কয়েক দিন পরে সেই লোকটি আবার কমলের কাছে গিয়ে একই ধরনের কথা বলল। সে বলল- রমেন বাগান করার জন্য ভালো জমিগুলো নিজের ভাগে নিয়ে তোকে ধান চাষের জমি দিয়েছে। আজকাল ধানি জমির চেয়ে বাগানের জমির মূল্য অনেক বেশি। একবার বাগান তৈরি করতে পারলে বহু বছর ধরে তার ফল ভোগ করা যায়।
এভাবে লোকটি দুই ভাইয়ের মনে একে অপরের বিরুদ্ধে সন্দেহ ও হিংসার বীজ বপন করল। ফলে ধীরে ধীরে তাদের মনে অবিশ্বাস জন্ম নিল। তারা একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করল। একসময় এমন অবস্থা হলো যে, তারা একে অপরকে সহ্যই করতে পারত না। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে প্রায়ই তাদের মাঝে ঝগড়া শুরু হতো। শেষে সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয়ে গেল যে, তারা একে অপরের সঙ্গে কথাবার্তাও বন্ধ করে দিল।
দুই ভাইয়ের এই পরিবর্তন গ্রামের মানুষের চোখ এড়াল না। একদিন গ্রামের একজন প্রবীণ ব্যক্তি তাদের দুজনকে একসঙ্গে ডেকে বসিয়ে বললেন- তোমরা নিজেরা সত্যটা না জেনে অন্যের কথায় বিশ্বাস করে নিজেদের সম্পর্ক নষ্ট করছ, এটা মোটেই ঠিক হয়নি। তোমরা কেউ কারও শত্রু নও। তোমরা একই মায়ের গর্ভে জন্মেছ। জমি-জমা ভাগ করার সময় সামান্য এদিক-ওদিক হতে পারে। তাই বলে কি ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক নষ্ট করবে? যদি সত্যিই ভাগ-বাটোয়ারায় সামান্য এদিক-ওদিক হয়ে থাকে, তাহলে তা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করে নাও। প্রথমে একে অপরের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলো। তাহলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। অন্যের কথায় বিশ্বাস করে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া করাটা কখনোই উচিত নয়। সত্যতা যাচাই করে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বজায় রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
প্রবীণ ব্যক্তির কথা শুনে রমেন ও কমল খোলাখুলি আলোচনা করল। তখন তারা বুঝতে পারল, সব কথাই ছিল মিথ্যা। কারও ভাগে কোনো কমবেশি হয়নি। সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। তাদের দুজনের সম্মতিতেই জমি-জমা ভাগ করা হয়েছিল। কেবল তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যেই ওই ব্যক্তি মিথ্যা ও উসকানিমূলক কথা বলেছিল।
শেষ পর্যন্ত দুই ভাই আবার মিলেমিশে গেল। তারা প্রতিজ্ঞা করল, ভবিষ্যতে আর কখনো অন্যের কথায় বিশ্বাস করে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবে না। বরং যেকোনো সমস্যা হলে তারা নিজেরাই তা আলোচনা করে সমাধান করবে।
মানবতাই সবচেয়ে বড় গুণ
একদিন দুপুরবেলা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে এক ছোট ছেলে ফেরি করে ঠান্ডা পানি বিক্রি করছিল। রাস্তায় একজন ভদ্রলোককে দেখে সে বিনয়ের সঙ্গে বলল— দাদা, একটি পানির বোতল নিন। এইমাত্র ফ্রিজ থেকে বের করেছি। এখনও বেশ ঠান্ডা আছে।
ভদ্রলোক বললেন— যাও, আমার পানি লাগবে না।
ছেলেটি আবার বলল— দাদা, একটা বোতল নিন না। আজ সারাদিনে একটাও বিক্রি হয়নি।
ভদ্রলোক তখন বিরক্ত হয়ে বললেন— যাও, বিরক্ত করো না! বলেছি তো, আমার পানির দরকার নেই।
কিন্তু কথাটা এখানেই শেষ হলো না। ছেলেটি আবারও অনুরোধ করতেই ভদ্রলোক রেগে গিয়ে তাকে ধাক্কা দিলেন। ধাক্কা খেয়ে ছেলেটি মাটিতে পড়ে গেল। সে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ বা রাগ প্রকাশ না করে মন খারাপ করে অন্যদিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সেই ভদ্রলোক একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চিপস খেতে লাগলেন। হঠাৎ চিপসের একটি টুকরো তাঁর গলায় আটকে গেল। তিনি শ্বাস নিতে পারছিলেন না। তাঁর এই অবস্থা দেখে কয়েকজন লোক এগিয়ে এলেও কী করবে তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না।
ছোট ছেলেটি একটু দূরে দাঁড়িয়ে পানি বিক্রি করছিল। লোকটির বিপদ দেখে সে দৌড়ে এসে নিজের বোতল থেকে তাঁকে পানি পান করাল। পানী পান করার কিছুক্ষণ পর গলায় আটকে থাকা চিপসটা নেমে গেল এবং ভদ্রলোক সুস্থ হয়ে উঠলেন।
ভদ্রলোক তখন লজ্জিত হয়ে বললেন,— ভাই, আমি তোমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি। অথচ তুমিই পানি পান করিয়ে আমার জীবন বাঁচালে। আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ছেলেটি মুচকি হেসে বলল— কোনো সমস্যা নেই, দাদা। বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় কথা। আপনার পানির দরকার ছিল না, তাই আপনি নেননি। আসলে একবার ‘না’ বলার পর আপনাকে বারবার পানি নিতে বলাটা আমারও ঠিক হয়নি। কিন্তু কী করব দাদা! আমার পঙ্গু বাবা আর অসুস্থ মায়ের ওষুধের কথা ভেবে কখনো কখনো এমন কাজও করতে হয়, যা হয়তো করা উচিত নয়।
ছেলেটির কথা শুনে ভদ্রলোকের চোখে জল এসে গেল। তিনি ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন— মানুষের বড়ত্ব ধন-সম্পদে নয়, মানুষের বড়ত্ব থাকে মানবতায়। এতদিন আমি অর্থের অহংকারে অন্ধ হয়ে ছিলাম। আজ তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ। আজ আমি বুঝতে পেরেছি, ধনী-গরিব দেখে মানুষের সঙ্গে আচরণ করা উচিত নয়। কারণ শুধু ধনীদেরই নয়, গরিবদেরও হৃদয় আছে। আর মানুষকে তার সম্পদ দিয়ে নয়, তার মানবতা দিয়ে বিচার করা উচিত। তাই বলতে হয়, মানুষের মহত্ত্ব ধনে নয়, মানবতায়।
রাস্তায় ধান শুকানোর পরিণতি
গ্রামের ব্যস্ত একটি সড়ক। প্রতিদিনই সেই সড়ক দিয়ে নিয়মিতভাবে গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু বর্ষাকাল এলেই গ্রামের কিছু মানুষ রাস্তার অর্ধেক অংশ দখল করে সেখানে ধান, বিচালি শুকাতে দেন। দু-একজন সচেতন ব্যক্তি এভাবে রাস্তায় ধান শুকানো ঠিক নয় বলে সতর্ক করলেও কেউ তাতে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না। বরং সুযোগ পেলে সতর্ককারী ব্যক্তিকেই উল্টো নানা কথা শুনিয়ে দেয়।
সেদিন দুপুরে কয়েকজন রাস্তার ওপর ধান শুকাতে দিয়েছিলেন। সেই সময় চারচাকার গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছিল। এমন সময় এক যুবক মোটরসাইকেলে করে একটি চারচাকার গাড়িকে ওভারটেক করার চেষ্টা করেন। হঠাৎ মোটরসাইকেলের চাকা রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা ধানের ওপর উঠে যায়। ধানের দানা পিছল হওয়ায় মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে। সৌভাগ্যবশত যুবকটি চারচাকার গাড়ির নিচে পড়েননি, তবে তিনি গুরুতর আহত হন। আশপাশের পথচারীরা দ্রুত ছুটে এসে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এই দুর্ঘটনা দেখে ধান শুকাতে দেওয়া লোকজনের হুঁশ ফিরল। তারা বুঝতে পারল, নিজেদের সামান্য সুবিধার জন্য ব্যস্ত সড়কের ওপর ধান শুকানো মোটেও উচিত হয়নি। বাইরে থেকে বিষয়টি তেমন বিপজ্জনক মনে না হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তারা আরও উপলব্ধি করল, সামান্য অসাবধানতাও ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রত্যেক মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য কখনোই বৃহত্তর জনস্বার্থকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
সেদিন থেকেই গ্রামের মানুষ সম্মিলিতভাবে অঙ্গীকার করলেন, ভবিষ্যতে আর কখনো তারা রাস্তায় ধান শুকাতে দেবেন না।
শত্রুতার চেয়ে উপকারের শক্তি বেশি
সোনতলী গ্রামে রমেন নামে একজন পরোপকারী লোক ছিলেন। গ্রামের যে-ই বিপদে পড়ত, তিনি তাকে সাহায্য করার জন্য সর্বাগ্রে এগিয়ে যেতেন। কিন্তু সেই গ্রামেরই মোহন নামে একজন লোক রমেনকে একেবারেই সহ্য করতে পারত না। সে রমেনকে হিংসা করত। রমেনের ভালো কাজেরও সে সবসময় সমালোচনা করত এবং তাঁর দোষ খুঁজে বেড়াত। রমেনের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা প্রচার করে সে নিজের শত্রুতা বাড়িয়ে রেখেছিল।
গ্রামের মাঝখানে একটি ছোট খাল ছিল। গ্রীষ্মকালে খালটি শুকিয়ে থাকলেও বর্ষাকালে তা পানিতে উপচে পড়ত। তাই বর্ষার সময় খাল পারাপারের জন্য একটি বাঁশের সাঁকো ছিল। সেই বছর প্রবল বন্যার কারণে খালটি পানিতে উপচে পড়েছিল এবং তাতে প্রচণ্ড স্রোতের সৃষ্টি হয়েছিল। একদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যে খাল পার হওয়ার সময় মোহনের পা পিছলে যায় এবং সে পানিতে পড়ে যায়। স্রোত ছিল অত্যন্ত তীব্র, আর মোহন সাঁতারও জানত না। তাই পানির প্রবল স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করে। পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন চিৎকার-চেঁচামেচি করলেও কেউ তাকে বাঁচানোর জন্য সাহস করে এগিয়ে এল না। ঠিক তখনই রমেন দৌড়ে এসে নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে মোহনকে পানির মধ্য থেকে উদ্ধার করে আনলেন।
সুস্থ হয়ে ওঠার পর মোহন লজ্জায় রমেনের দিকে মাথা তুলে তাকাতে পারল না। সে লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে রমেনকে বলল- আমি সবসময় তোমার অমঙ্গল কামনা করেছি, অথচ তুমি নিজের জীবন বিপন্ন করে আমার জীবন বাঁচালে। তোমার এই উপকারের কথা আমি জীবনে কোনোদিন ভুলতে পারব না।
রমেন তখন হেসে বললেন- মানুষের বিপদে এগিয়ে যাওয়া মানুষেরই কর্তব্য। আমি শুধু আমার কর্তব্য পালন করেছি। আমরা যদি সমাজে একে অপরের সঙ্গে শত্রুতা করে চলি, তাহলে সমাজ এগিয়ে যাবে কীভাবে? হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা কখনো সমাজের মঙ্গল করে না; বরং সমাজের ক্ষতিই করে।”
সেদিন থেকে মোহনের মন বদলে গেল। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা ও উপকারের শক্তি শত্রুতার চেয়ে অনেক গুণ বেশি।
দারিদ্র্য ও চরিত্র
একটি গ্রামে দুইটি মেয়ে ছিল। একজনের নাম রিমি, অন্যজনের নাম মেঘা। রিমি ছিল দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, আর মেঘা ছিল ধনী পরিবারের।
গ্রামের অনেকেই মনে করত, রিমি যেহেতু গরিব ঘরের মেয়ে, তাই তার চরিত্র নিশ্চয়ই ভালো হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রিমি টাকার লোভে মানুষের সঙ্গে মিথ্যা বলত। দোকান থেকে বাকিতে জিনিস নিয়ে টাকা পরিশোধ করত না। এমনকি নিজের স্বার্থে বন্ধুদেরও প্রতারণা করতে দ্বিধা করত না।
অন্যদিকে, মেঘা ধনী পরিবারের মেয়ে হয়েও ছিল অত্যন্ত নম্র, সৎ ও মানবিক। সে বিদ্যালয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সাহায্য করত, বয়স্ক লোকদের নানা বিষয়ে সহযোগিতা করত এবং কখনোই কারও ক্ষতি করার কথা ভাবত না।
একদিন গ্রামের একটি সমিতি সৎ ও আদর্শ যুবক-যুবতীদের সম্মানিত করার উদ্দেশ্যে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করল। গ্রামের অনেক তরুণ-তরুণীর সঙ্গে রিমি ও মেঘাও সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করল।
তদন্তে রিমির অসৎ কাজের একের পর এক অনেক প্রমাণ সামনে এলো। অন্যদিকে, গ্রামের সবাই একবাক্যে মেঘার ভালো কাজ ও সততার স্বীকৃতি দিল।
সেদিন গ্রামের এক প্রবীণ শিক্ষক বললেন- মানুষের চরিত্র ধন-সম্পদ বা দারিদ্র্য দিয়ে বিচার করা যায় না। ভালো চরিত্র গড়ে ওঠে সৎ শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নিজের আচরণের মাধ্যমে। কেউ দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেই যে তার চরিত্র ভালো হবে, কিংবা ধনী পরিবারের সন্তান হলেই যে তার চরিত্র খারাপ হবে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার কর্ম, সততা এবং আচরণের মধ্যেই প্রকাশ পায়।
মূল্যবোধই চরিত্রের প্রকৃত পরিচয়
রমেন কাকা তাঁর ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজছিলেন। অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিলেন— ধনী পরিবারের মেয়ে বিয়ে করার চেয়ে গরিব পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করানো ভালো। কারণ, ধনী পরিবারের অনেক মেয়ে নাকি অহংকারী হয়, আর গরিব পরিবারের মেয়েরা সাধারণত নম্র, ভদ্র ও সহনশীল হয়। মানুষের এই পরামর্শে বিশ্বাস করে তিনি সত্যিই একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়েকেই পুত্রবধূ করে ঘরে আনলেন।
বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে পুত্রবধূর আচরণ বদলাতে শুরু করল। সে বাড়ির বড়-ছোট কাউকেই আর সম্মান করত না। সামান্য বিষয়েই রেগে গিয়ে ঝগড়া করত। শাশুড়ি-শ্বশুরের কথা অমান্য করত। এমনকি একসময় নিজের স্বামীকেও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করল। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও সে দুর্ব্যবহার করতে লাগল।
ফলে সংসারে প্রতিদিন অশান্তি বাড়তে লাগল। একদিন রমেন কাকা গভীর দুঃখের সঙ্গে বললেন- আমরা ভেবেছিলাম, গরিব পরিবারের মেয়ে হলে নিশ্চয়ই তার ব্যবহার ভালো হবে। কিন্তু বাস্তবে হলো তার উল্টো। আজ বুঝতে পারলাম, মানুষের ভালো-মন্দ তার দারিদ্র্য বা ধন-সম্পদের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে তার শিক্ষা, মূল্যবোধ ও চরিত্রের ওপর।
পুত্রবধূর এই আচরণ থেকে পরিবারের সবাই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেল— কেবল ধনী বা গরিব বলে কারও চরিত্র বিচার করা উচিত নয়। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার অর্থ-সম্পদে নয়, বরং তার আচরণ, শিক্ষা ও মূল্যবোধেই প্রকাশ পায়। মূল্যবোধই মানুষের চরিত্র নির্ধারণ করে।
রহিমের মহানতা
মাত্র আট বছর বয়সেই রহিমের বাবা-মা দুজনই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যান। মুহূর্তের মধ্যেই সে অনাথ হয়ে পড়ে। তার নিজের ঘর, মায়ের স্নেহ আর বাবার ভালোবাসা—সবকিছুই এক নিমেষে হারিয়ে যায়।
বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর রহিমকে তার কাকা নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। কাকা ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ, কিন্তু কাকিমা তেমন ভালো ছিলেন না। তিনি ছিলেন হিংসুটে স্বভাবের এবং সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তিনিই সামলাতেন। কাকা রহিমকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন, কিন্তু কাকিমা তাকে চোখে দেখতে পারতেন না। ফলে কাকার বাড়িতে আসার পর থেকেই রহিমকে কাকিমার নানা রকম অত্যাচার ও অবহেলার শিকার হতে হয়।
প্রতিদিন ভোরে সবার আগে উঠে তাকে পানি আনতে হতো, ঘরদোর পরিষ্কার করতে হতো, গরু-ছাগলকে খাবার দিতে হতো। তারপরও সামান্য ভুল হলেই কাকিমা তাকে বকাঝকা করতেন, কখনও মারধরও করতেন। অনেক সময় পেট ভরে খেতেও দিতেন না তাকে। খাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য করতেন। নিজের ছেলে-মেয়েদের মাছ-মাংস বেশি দিলেও রহিমের ভাগে খুব সামান্যই পড়ত। কখনও কখনও তার ভাগে মাছ-মাংস কিছুই জুটত না; শুধু ভাত খেয়েই থাকতে হতো তাকে।
কিন্তু রহিম কখনও আশাহত হয়নি। সে জানত, একমাত্র শিক্ষাই তার জীবন বদলে দিতে পারে। তাই সে দিনে সংসারের সব কাজ করত, আর রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় কুপির আলোয় জেগে জেগে পড়াশোনা করত। অনেক সময় ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলেও নিজের স্বপ্নের কথা মনে করে আবার বই খুলে বসত।
একদিন বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক রহিমের দুর্দশার কথা জানতে পারেন। তাঁর মেধা ও পড়াশোনার প্রতি আন্তরিকতা দেখে তিনি রহিমকে উৎসাহিত করেন। তাকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন বৃত্তির জন্য আবেদন করতেও সাহায্য করেন। রহিমও সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে। ফলে বিদ্যালয়ের প্রতিটি পরীক্ষায় সে চমৎকার ফলাফল করে এবং একসময় সে সবার নজর কেড়ে নেয়।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় স্টার মার্ক নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিজ্ঞান বিভাগে ডিস্টিংশনসহ উচ্চতর মাধ্যমিক পরীক্ষায়ও সফল হয়। নানা অভাব-অনটনের মধ্যে বইপত্র সংগ্রহ করে সে নীট (NEET) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। নীট পরীক্ষায় সফল হয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার সুযোগ পায় সে।
তবে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। অর্থের অভাব ছিল প্রবল। অন্যদিকে কাকার আর্থিক অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। তাই কাকা রহিমের প্রাপ্য জমি বিক্রি করে পড়াশোনার খরচ চাল চালানোর কথা ভাবলেন। কিন্তু কাকিমা নানা অজুহাত দেখিয়ে সেই জমি বিক্রি করতে দিলেন না, কারণ তিনি চেয়েছিলেন রহিমের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক। তবুও কাকিমার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বৃত্তি এবং কয়েকজন শুভানুধ্যায়ীর সাহায্যে রহিম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়।
কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ পাঁচ বছর পরে রহিম একজন ডাক্তার হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে। সে প্রমাণ করে দিল যে, জীবনে যতই বাধা-বিপত্তি আসুক না কেন, অধ্যবসায়, ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাস মানুষকে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।
ডাক্তার হওয়ার পর রহিম শুধু অর্থ উপার্জনের কথা ভাবেনি। সে নিজের গ্রামে ফিরে এসে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিৎসা শুরু করে। বিশেষ করে অনাথ শিশু এবং দরিদ্র পরিবারের মানুষদের সে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিতে থাকে।
একদিন কাকিমা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে রহিমের কাছে নিয়ে আসা হলো। রহিমকে দেখে কাকিমা লজ্জা ও অনুশোচনায় মাথা নিচু করে রইলেন। কিন্তু রহিম অতীতের সব অন্যায়-অত্যাচার ভুলে আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা করল এবং তাঁকে সুস্থ করে তুলল।
সুস্থ হওয়ার পর কাকিমা কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন— আমি তোমার সঙ্গে অনেক অন্যায় করেছি, বাবা। তোমার পড়াশোনা বন্ধ করার জন্যও অনেক চেষ্টা করেছি আমি। হিংসার বশে তোমার নিজের অংশের জমিও আমি বিক্রি করতে দিইনি। অথচ তুমি সেই সব অন্যায় ভুলে আমাকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছ। আমাকে ক্ষমা করে দাও, বাবা।”এই বলে কাকিমা রহিমের পায়ে হাত দিতে গেলেন।
তখন রহিম তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল— এ আপনি কী করছেন কাকিমা! আপনি কেন আমাকে পাপের ভাগী করতে চাইছেন? আপনি আমার মাতৃতুল্য। সন্তানের স্থান সবসময় মায়ের পদতলে। আপনার পায়ের ধুলোই আমার জন্য আশীর্বাদের সমান।
এরপর কাকিমার পায়ের ধুলো নিয়ে রহিম বলল— মানুষ ভুল করেই। কিন্তু যখন নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়, তখন সেই অনুতাপই মানুষকে মহান করে তোলে। আপনি নিজের ভুল বুঝেছেন, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। আপনি আমার সঙ্গে যে অন্যায় করেছিলেন, আমি অনেক আগেই তা ভুলে গেছি। আপনি আমার গুরুজন। আমাকে আশীর্বাদ করুন, যেন একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি মানুষের সেবা করে জীবনে সফল হতে পারি।
সেদিন কাকিমা উপলব্ধি করলেন, প্রকৃত মহানতা প্রতিশোধে নয়; বরং ক্ষমা, সহমর্মিতা এবং মানবতার মধ্যেই নিহিত থাকে।
নতুন ধনীর অহংকার
বিহপুরিয়া গ্রামের রমেন আগে একজন সাধারণ কৃষক ছিলেন। সারাদিন মাঠে কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। ভারতের একটি বড় কোম্পানি এবং সরকার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ দিয়ে তাঁর জমি কিনে সেখানে একটি কারখানা স্থাপন করল। ফলে রমেন একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়ে গেলেন।
অর্থ হাতে পাওয়ার পর রমেনের জীবন পুরোপুরি বদলে গেল। তিনি বড় একটি বাড়ি নির্মাণ করলেন, দামি গাড়ি কিনলেন এবং সব সময় বিলাসবহুল পোশাক পরতে শুরু করলেন। আগে গ্রামের যাঁরা তাঁর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতেন, এখন তিনি তাঁদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে লাগলেন। এমনকি গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদেরও আর তিনি সম্মান করতেন না।
একদিন গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক হরিদেব বরুয়া রমেনকে ডেকে বললেন— বাবা, ধন-সম্পদ খুবই চঞ্চল। জীবনে আসতে পারে, আবার চলে যেতেও পারে। তাই অর্থের অহংকার করা কখনোই উচিত নয়। সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে চলবে। ধন-সম্পদ জোয়ারের পানির মতো—যেমন আসে, তেমনি একদিন চলেও যায়। আর একটি কথা মনে রেখো, জ্ঞানী মানুষ কখনো ধনের অহংকার করে না; মূর্খরাই ধন নিয়ে অহংকার করে।
রমেন হেসে উত্তর দিলেন— স্যার, সেই দিন এখন আর নেই। এখন আমার টাকার কোনো অভাব নেই। আমি যা চাই, তাই করতে পারি।
প্রবীণ শিক্ষক আর কিছু বললেন না, শুধু মৃদু হেসে রইলেন।
কয়েক মাস পরে রমেন একটি নতুন ব্যবসা শুরু করলেন। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাব এবং ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হলো। ফলে ঋণের বোঝা বাড়তে লাগল, আর তাঁর সম্পদও দ্রুত কমতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিজের গাড়ি বিক্রি করতে হলো, এমনকি বাড়িটিও বন্ধক রাখতে হলো।
যাঁদের তিনি একসময় অপমান করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাছেই সাহায্য চাইতে বাধ্য হলেন। আশ্চর্যের বিষয়, গ্রামের সেই সাধারণ মানুষরাই তাঁকে আন্তরিকভাবে সাহায্য করলেন। প্রবীণ শিক্ষক হরিদেব বরুয়াও তাঁকে সাহস ও উৎসাহ দিলেন।
একদিন হরিদেব বরুয়ার সাথে দেখা হলে রমেন লজ্জায় মাথা নিচু করে বললেন— স্যার, আমি ভুল করেছি। অর্থ আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল।
শিক্ষক স্নেহভরে বললেন— নিজের ভুল বুঝতে পারাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। মনে রেখো, ধন মানুষকে বড় করে না; মানুষের ব্যবহারই তাকে সত্যিকারের অর্থে বড় করে তোলে।
সেদিনের পর থেকে রমেন আবার নম্র, ভদ্র এবং সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করতে শুরু করলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, অহংকারের কোনো মূল্য নেই; নম্রতা, সৌজন্যতা এবং ভালো ব্যবহারের মাধ্যমেই মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব।
শিক্ষা:-অপ্রত্যাশিতভাবে ধন-সম্পদ বা সাফল্য লাভ করলে কখনো অহংকারী হওয়া উচিত নয়। নম্রতা, মানবিকতা এবং সুন্দর ব্যবহারই মানুষের প্রকৃত সম্পদ।
ভালোবাসার আরেক নাম বিশ্বাস
একটি ছোট্ট গ্রামে অমল ও মীরা নামে এক দম্পতি বাস করত। তাদের আর্থিক অবস্থা খুব স্বচ্ছল ছিল না, কিন্তু সুখ-শান্তিতেই তাদের সংসার চলছিল। অমল ছিলেন একজন সাধারণ দোকানদার, আর মীরা যত্ন করে সংসার সামলাত।
একদিন ব্যবসার কাজে অমলকে কয়েক দিনের জন্য শহরে যেতে হলো। রওনা হওয়ার আগে তিনি নিজের জমানো টাকা একটি বাক্সে রেখে মীরার হাতে দিয়ে বললেন— এই টাকাগুলো আমাদের ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রেখেছি। এগুলো তোমার কাছে রেখে গেলাম। সময় ভালো নয়, তাই খুব সাবধানে রেখো। আমার ফিরতে কয়েক দিন দেরি হতে পারে।
মীরা হেসে বলল— তোমার বিশ্বাসই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমি কোনোদিনও সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করব না।
অমল শহরে চলে গেলেন। দু-এক দিন পর হঠাৎ গ্রামে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিল। অনেকের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেল। এরই মধ্যে পাশের বাড়ির এক বিধবা মহিলার ছেলে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল। চিকিৎসার জন্য তার হাতে কোনো টাকা ছিল না। তাই তিনি মীরার শরণাপন্ন হল।
বিধবা মহিলার অসহায় অবস্থা দেখে মীরার মন গলে গেল। অমলকে ফোন করে অনুমতি চাইলে যদি তিনি টাকা দিতে রাজি না হন, তবে ছেলেটির জীবন বিপন্ন হতে পারে— এই আশঙ্কা করে মীরা অমলকে ফোন করল না। সে বাক্স থেকে কিছু টাকা বের করে বিধবা মহিলার হাতে তুলে দিল।
চার-পাঁচ দিন পরে অমল বাড়ি ফিরলেন। বাক্স খুলে তিনি দেখলেন, টাকা কিছু কম। মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে নানা প্রশ্ন উদয় হল— মীরা কি আমার অনুমতি ছাড়া কাউকে টাকা দিয়েছে? নাকি কেউ চুরি করেছে? কিন্তু তিনি কোনো রকম রাগ বা সন্দেহ প্রকাশ না করে শান্তভাবে মীরাকে জিজ্ঞেস করলেন— টাকা কম কেন? টাকা কোথায় গেল?
মীরা তখন সব ঘটনা খুলে বলল। সে ভয় পাচ্ছিল, হয়তো বিধবা মহিলাকে টাকা দেওয়ার কথা শুনে অমল রাগ করবেন। কিন্তু অমল একটুও রাগ করলেন না। বরং মৃদু হেসে বললেন— তুমি যা করেছ, ঠিকই করেছ। আমি জানি, তুমি এই টাকা কোনো অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করোনি। নিশ্চয়ই খুব জরুরি প্রয়োজনে খরচ করেছ। তোমার প্রতি আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। তবে একটি কথা, তুমি চাইলে আমাকে একবার ফোন করে কথাটা জানাতে পারতে।
মীরা কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলল— বিধবা মহিলার তখন টাকার খুবই দরকার ছিল। টাকা না পেলে তাঁর ছেলের জীবন বিপন্ন হতে পাড়ত। তাই তোমাকে ফোন করলে যদি তুমি না বলতে, সেই ভয়েই আমি ফোন করিনি।
অমল শান্ত কণ্ঠে বললেন— আমি তোমাকে ভালোবাসি, মীরা। আর ভালোবাসার আরেক নামই হলো বিশ্বাস। বিশ্বাস না থাকলে ভালোবাসা কখনো টিকে থাকতে পারে না। তোমার প্রতি আমার অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস আছে। তুমি যদি কারও বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও, আমি কখনোই তাতে আপত্তি করব না। কারণ এই সংসার শুধু আমার নয়, আমাদের— আমাদের দুজনের।
অমলের কথা শুনে মীরার চোখ আনন্দের অশ্রুতে ভরে উঠল। সেদিন তারা দুজনেই উপলব্ধি করল, ভালোবাসার ভিত্তি শুধু মিষ্টি কথায় গড়ে ওঠে না; তার আসল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যেখানে বিশ্বাস থাকে, সেখানেই সত্যিকারের ভালোবাসা চিরদিন বেঁচে থাকে।
অ্যাম্বুলেন্স চালকের মহানতা
একদিন সোনতলী গ্রামের দরিদ্র কৃষক আব্দুল হক হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানালেন, তাঁর অস্ত্রোপচার করা জরুরি। কিন্তু রোগী অত্যন্ত দুর্বল থাকায় অস্ত্রোপচারের আগে রক্ত দেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসক পরিবারকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন- যত দ্রুত সম্ভব রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরও জানালেন, সময়মতো রক্ত না পেলে রোগীর জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।
আব্দুল হকের অসুস্থতার খবর পেয়ে অনেক আত্মীয়-স্বজন হাসপাতালে এলেও কেউ রক্ত দিতে এগিয়ে এল না। কেউ বলল, তার শরীর ভালো নয়; কেউ বলল, তার ডায়াবেটিস আছে; আবার কেউ সময়ের অজুহাত দেখিয়ে সরে গেল। এভাবে একে একে সবাই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অসহায় পরিবারটি কান্নায় ভেঙে পড়ে চারদিকে মানুষের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন জানাতে লাগল।
ঠিক সেই সময় আব্দুল হককে হাসপাতালে নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্সের চালক রমেন ঘটনাটি জানতে পারলেন। দরিদ্র পরিবারটির অসহায় অবস্থা দেখে তিনি বললেন, চিন্তা করবেন না। আমার রক্তের গ্রুপ যদি রোগীর সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে আমিই রক্ত দেব।
পরীক্ষা করে দেখা গেল, রমেনের রক্তের গ্রুপ রোগীর সঙ্গে মিলে গেছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি রক্তদান করলেন। সেই রক্ত পেয়ে চিকিৎসক সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করলেন। শেষ পর্যন্ত আব্দুল হকের জীবন রক্ষা পেল।
কয়েক দিন পর সুস্থ হয়ে আব্দুল হক রমেনের হাত ধরে আবেগভরা কণ্ঠে বললেন- যারা আমার আপনজন ছিল, রক্ত দেওয়ার কথা শুনেই সবাই দূরে সরে গেল। অথচ আপনি একজন সম্পূর্ণ অচেনা হিন্দু মানুষ হয়েও নিজের রক্ত দিয়ে আমার জীবন বাঁচালেন। আপনার এই মহান উপকারের ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
রমেন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন- মানুষের বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় ধর্ম। সেখানে আপন-পর, হিন্দু-মুসলমান বলে কোনো ভেদাভেদ থাকতে নেই। আত্মীয়তা শুধু রক্তের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; বিপদের সময় যে মানুষ পাশে এসে দাঁড়ায়, সেই-ই হলো প্রকৃত আত্মীয়। হিন্দু ও মুসলমানের রক্তের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সবার রক্তের রং একই—লাল। পার্থক্য যদি কোথাও থাকে, তা শুধু আমাদের মানসিকতায়।
আশি বছরেও অটুট ভালোবাসা
গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট বাড়িতে থাকতেন আশি বছর বয়সী হরেন দাদু এবং তাঁর স্ত্রী মালতী ঠাকুমা। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। দুই মেয়ের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে, আর দুই ছেলে চাকরির কারণে শহরে থাকে। তাই বৃদ্ধ দম্পতি গ্রামের সেই ছোট্ট বাড়িতে একাই জীবন কাটান। দাম্পত্য জীবনের পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আজও তাঁদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর পারস্পরিক আন্তরিকতা একটুও কমেনি।
একদিন সকালে হঠাৎ মালতী ঠাকুমা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাঁটাচলা তো দূরের কথা, তিনি বিছানা থেকে উঠতেও পারছিলেন না। তখন হরেন দাদু নিজেই রান্না করলেন, স্ত্রীকে ওষুধ খাইয়ে দিলেন, আর বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁর পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন।
ঠিক সেই সময় পাশের বাড়ির এক আত্মীয় নাতি এসে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,— দাদু, ঠাকুমার কী হয়েছে? আপনি এভাবে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন কেন?
হরেন দাদু শান্তভাবে বললেন— তোমার ঠাকুমার জ্বর হয়েছে। বিদ্যুৎ নেই, তাই ওকে একটু বাতাস করছি।
নাতিটি বিস্মিত হয়ে বলল— আশ্চর্য! এই বয়সেও আপনি ঠাকুমার এত যত্ন নিচ্ছেন?
হরেন দাদু মৃদু হেসে উত্তর দিলেন— যখন আমরা দুজনেই শক্ত-সমর্থ ছিলাম, তখন তোমার ঠাকুমাই আমার জন্য সবকিছু করত। আজ সে দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই তার পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য।
কয়েকদিন পর হরেন দাদুও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন মালতী ঠাকুমা লাঠিতে ভর নিয়ে ধীরে ধীরে রান্নাঘরে গিয়ে তাঁর জন্য ভাত রান্না করলেন, ওষুধ খাইয়ে দিলেন এবং সেবা-যত্ন করলেন।
সেদিনও সেই নাতি দৃশ্যটি দেখে জিজ্ঞেস করল— ঠাকুমা, এত বছর পরেও আপনাদের ভালোবাসা এত অটুট রইল কীভাবে?
মালতী ঠাকুমা মুচকি হেসে বললেন— ভালোবাসা মানে শুধু মিষ্টি কথা বলা নয়। ভালোবাসা মানে সুখে-দুঃখে, সুস্থতায়-অসুস্থতায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।
সেদিন নাতিটি উপলব্ধি করল, সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও সৌন্দর্য, ধন-সম্পদ কিংবা যৌবনের ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃত ভালোবাসার ভিত্তি হলো বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং পরস্পরের প্রতি আন্তরিকতা। সত্যিকারের ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায় না; বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরও গভীর আরও দৃঢ় এবং আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।
ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য
হাজরিকা পরিবারের একমাত্র মেয়ে নীলিমা। বিয়ের বয়স হওয়ায় তার বাবা-মা তাড়াহুড়ো করে পাশের গ্রামের এক ধনী যুবক রাকেশের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দেন। অনেকেই সতর্ক করেছিলেন যে রাকেশ মদ্যপ এবং তার স্বভাব-চরিত্রও তেমন ভালো নয়, তাই তার সঙ্গে বিয়ে না দেওয়াই ভাল। কিন্তু ধন-সম্পদের মোহে নীলিমার পরিবার সেই সতর্কবার্তাগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে রাকেশের সঙ্গেই নীলিমাকে বিয়ে দিয়ে দেন।
বিয়ের কিছুদিন পরই নীলিমা স্বামীর আসল রূপ দেখতে পেল। মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে রাকেশ প্রায়ই অকারণে ঝগড়া করত, সামান্য বিষয়েও নীলিমার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাত। ফলে তাদের সংসারে নিত্যদিন অশান্তি লেগেই থাকত। সুখের স্বপ্ন নিয়ে যে সংসারে নীলিমা পা রেখেছিল, তা অল্পদিনের মধ্যেই দুঃখ-কষ্ট আর যন্ত্রণায় ভরে উঠল।
একদিন নীলিমার বাবা মেয়ের এই দুর্দশা দেখে গভীরভাবে মর্মাহত হলেন। অনুশোচনায় তাঁর হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। তিনি প্রতিবেশীদের সামনে আফসোস করে বললেন- সেদিন আপনাদের কথায় গুরুত্ব না দেওয়ার ফল আজ হাতে-নাতে পেলাম। ভেবেছিলাম, ধনী ঘরে বিয়ে দিলে নীলিমা সুখে থাকবে। তাই আপনাদের সতর্কবাণী উপেক্ষা করেছিলাম। যদি সেদিন ধন-সম্পদের পরিবর্তে ছেলেটির চরিত্র, অভ্যাস ও ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতাম, তাহলে হয়তো আমাকে আজ এই দিন দেখতে হতো না।
তখন গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি বললেন- বিয়ের ক্ষেত্রে ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে মানুষের চরিত্র, অভ্যাস এবং ব্যবহার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভুল মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিলে তার পরিণতি অনেক সময় সারাজীবন ধরে ভোগ করতে হয়। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে ধন-সম্পদের চেয়ে সর্বদা পাত্রের স্বভাব-চরিত্রের ওপর বেশি গুরত্ব প্রদান করা উচিত।
সংগ্রামের ফল
বরপেটা জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম শওপুর। সেই গ্রামেরই এক শ্রমিক পরিবারের ছেলে ছিল রফিক। তার বাবা-মা দুজনকেই কাজের কারণে শহরে থাকতে হতো। তাই রফিক একাই বাড়িতে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেত।
মাত্র তেরো বছর বয়সেই তাকে নিজের সংসারের সব কাজ নিজেকেই সামলাতে হতো। রান্না করে খাওয়া থেকে শুরু করে ঘরের সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধেই ছিল। তবুও কোনো অবস্থাতেই সে স্কুলে যাওয়া বাদ দিত না; প্রতিদিন সময়মতো স্কুলে উপস্থিত হতো। গ্রামের অনেকেই তার কষ্টের জীবন দেখে দুঃখ প্রকাশ করলেও রফিক কখনো নিজের দুঃখ-কষ্টকে অজুহাত বানায়নি।
ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিন ভোরে উঠে দৌড়ানো, ব্যায়াম এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অনুশীলন করত। প্রচণ্ড গরম হোক কিংবা প্রবল বৃষ্টি, সে কোনো দিনই অনুশীলন বন্ধ করেনি।
এভাবেই বছর কেটে গেল। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য ধৈর্যের জোরে অবশেষে রফিক ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় সফল হলো। এই সুখবর পেয়ে তার বাবা-মায়ের চোখ আনন্দের অশ্রুতে ভরে উঠল।
সেদিন গ্রামের সবাই উপলব্ধি করল— জীবনে সফল হতে হলে ধন-সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি অটল বিশ্বাস।
লোভের শাস্তি
সুমি নামে এক শান্ত, ভদ্র মেয়ের বিয়ে হয় পাশের একটি গ্রামে। বিয়ের সময় সুমির বাবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জামাইয়ের বাড়িতে অনেক উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা অতিরিক্ত টাকা এবং একটি মোটরসাইকেল যৌতুক হিসেবে দাবি করতে শুরু করে।
সুমির বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। কোনোমতে কষ্ট করে সংসার চালাতেন। তাই মেয়ের শ্বশুরবাড়ির এই অযৌক্তিক দাবি পূরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। এর ফলেই একসময় সুমির ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করে স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে। সামান্য বিষয়েও তাকে অপমান, গালিগালাজ ও অত্যাচার করা হতো। তবুও সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় সুমি সবকিছু ধৈর্য ধরে সহ্য করে যাচ্ছিল।
কিন্তু একসময় তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। অত্যাচারের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সে গ্রামের এক আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়। আইনজীবী তাকে বলেন-যৌতুক একটি জঘন্য সামাজিক কুপ্রথা। যৌতুক দাবি করা এবং সেই দাবিতে একজন নারীকে নির্যাতন করা শুধু অনৈতিকই নয়, আইনগতভাবেও এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই তুমি আইনের সাহায্য নাও। সত্যের জয় অবশ্যই হবে।”
আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী সুমি আইনের আশ্রয় নিল। তদন্তের পর সমস্ত সত্য প্রকাশ পেল। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত দোষীদের দোষী সাব্যস্ত করে এবং যথাযথ শাস্তি প্রদান করল।
সেদিন সুমি উপলব্ধি করল, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে চুপ করে থাকার চেয়ে সাহসের সঙ্গে তার প্রতিবাদ করাই শ্রেয়। কারণ দুর্বলতা প্রকাশ পেলে অত্যাচারীরা আরও বেশি অত্যাচর করার জন্য উৎসাহিত হয়।
পাখিদের জন্য রফিকের লিচু
রফিক একজন দরিদ্র কৃষক। চাষাবাদ করেই তিনি কোনো রকমে সংসার চালান। তাঁর বাড়ির উঠোনে কয়েকটি লিচুগাছ ছিল। গ্রীষ্মকাল এলেই গাছগুলো পাকা, রসালো লিচুতে ভরে উঠত।
গ্রামের অন্য কৃষকেরা বাদুড় ও পাখির হাত থেকে লিচু রক্ষা করার জন্য গাছে জাল টানিয়ে দিতেন। কিন্তু রফিক কখনোই তা করতেন না। প্রতিদিন ভোরে চড়ুই, শালিক, বুলবুলি ও নানা রকম পাখিকে গাছে বসে মিষ্টি লিচু খেতে দেখে রফিক এক অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করতেন।
একদিন এক প্রতিবেশী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন— রফিক ভাই, প্রতি বছরই দেখি আপনার লিচুগাছে প্রচুর ফল ধরে। আপনি তো গরিব মানুষ। এই লিচু বিক্রি করলে অনেক টাকা পেতেন। তাহলে গাছে জাল লাগান না কেন? পাখিগুলো তো অনেক লিচু খেয়ে ফেলে!
রফিক মুচকি হেসে বললেন— এই পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়। এই পাখিদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে এই পৃথিবীতে। আল্লাহ আমাকে যতটুকু দিয়েছেন, তার থেকে যদি সামান্য কিছু ওরা খায়, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। পাখিদের লিচু খেতে দেখলে আমি মনে কোনো কষ্টও অনুভব করিনা- বরঞ্চ আমি আনন্দ উপভোগ করি পাখিদের লিচু খেতে দেখলে।
রফিকের কথা শুনে প্রতিবেশী মানুষটি চুপ করে গেলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, সত্যিই রফিক দরিদ্র হলেও তাঁর মন ছিল অত্যন্ত উদার ও সমৃদ্ধ। তিনি জানতেন, প্রকৃতির সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়ার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সুখ, মানবতা এবং শান্তি।
রফিকের কথা শুনে প্রতিবেশী আরও বুঝতে পারলেন যে, মানুষকে জীবজন্তু ও পাখি-প্রাণীর প্রতি দয়া, মমতা ও সহানুভূতি দেখানোটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ মানুষের মতো এই পৃথিবীতে অন্যান্য প্রাণীরও সমানভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
রহিমের যোগব্যায়াম শুরু
রহিম একজন পরিশ্রমী যুবক। দেখতে সুস্থ-সবল হলেও তিনি নানা ধরনের রোগে ভুগছিলেন। ফলে অল্প বয়সেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। রহিমের এই শারীরিক অবনতি দেখে গ্রামের মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলত-এই বয়সেই যদি তোমার শরীরের এমন অবস্থা হয়, তাহলে বয়স বাড়লে তখন কী হবে? শহরে গিয়ে একজন ভালো ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করো।”
রহিম ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগেই একদিন গ্রামে একজন যোগব্যায়াম শিক্ষক এলেন। তিনি রহিমের দুর্বল স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থা দেখে বললেন- তুমি যদি নিয়মিত যোগব্যায়াম করো, তাহলে তোমার শরীর ও মন—দুটোই অনেক বেশি সুস্থ ও শক্তিশালী হবে। তখন হয়তো তোমাকে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না। একটি কথা সবসময় মনে রাখবে—সুস্থ দেহেই সুস্থ মন বাস করে। যোগব্যায়াম শরীর ও মন—উভয়কেই সুস্থ ও সতেজ রাখে।
শিক্ষকের কথায় রহিম অনুপ্রাণিত হলো। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ছিল ২১ জুন—আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। সেই বিশেষ দিনেই রহিম যোগব্যায়াম শেখার সংকল্প নিলো এবং শিক্ষকের কাছ থেকে প্রাণায়াম ও বিভিন্ন সহজ যোগাসন শেখা শুরু করল।
দিন যেতে লাগল। রহিম অনুভব করল যে, যোগব্যায়াম তার মনকে শান্ত করছে, একাগ্রতা বাড়াচ্ছে এবং শরীরকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। পরে সে নিজেও গ্রামের অন্যান্য যুবক-যুবতীদের নিয়মিত যোগব্যায়াম করার জন্য উৎসাহিত করতে শুরু করল।
এভাবেই ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে নেওয়া একটি ছোট্ট সিদ্ধান্ত রহিমের জীবনে সুস্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস ও সুখের এক নতুন আলোর সূচনা করল।
আগামী কালের ভরসা নেই
হরেন দাস গ্রামের একজন পঁচাত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধ। তিনি সৎ ও সরল স্বভাবের মানুষ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন।
একদিন সকালে তিনি গ্রামের একটি চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেলেন। চা খাওয়ার পর দাম দিতে পকেটে হাত দিয়েই তিনি অবাক হয়ে গেলেন। পকেটে একটিও টাকা নেই। লজ্জিত হয়ে তিনি দোকানদারকে বললেন— বাবা, বয়স হয়েছে, টাকা আনতে ভুলে গেছি। কাল এসে তোমার টাকা দিয়ে যাব।
দোকানদার বৃদ্ধকে ভালো করেই চিনতেন। তাঁর সততার ওপরও দোকানদারের পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। তাই তিনি হেসে বললেন— কোনো অসুবিধা নেই কাকু। আপনি যখন সময় পাবেন, তখনই এসে দিয়ে গেলেই হলো।
কিন্তু বৃদ্ধ সেদিনই বিকেলে আবার দোকানে ফিরে এসে চায়ের দাম পরিশোধ করলেন।
দোকানদার বিস্মিত হয়ে বললেন— কাকু, আপনি তো বলেছিলেন কাল দেবেন। আজই আবার কেন এলেন? কাল দিলেই তো হতো!
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন— বাবা, আমার বয়স এখন পঁচাত্তর বছর। আগামীকাল কী হবে, তা কে বলতে পারে? যদি কাল আমি বেঁচেই না থাকি, তাহলে তোমার এই পাওনাটা আর শোধ করা হবে না। তাই ভাবলাম, আজই দায়িত্বটা পালন করে যাই।
বৃদ্ধের কথা শুনে দোকানদার গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। সত্যিই তো, জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। একজন সৎ মানুষ কখনো নিজের ঋণ বা দায়িত্ব অকারণে ফেলে রাখেন না। আজকের কাজ কখনো আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা উচিত নয়। কারণ আগামীকাল কী ঘটবে, তা কেউ জানে না। তাই সময়ের কাজ সময়মতো করাই বুদ্ধিমানের কাজ। জীবনে সততা, দায়িত্ববোধ এবং কর্তব্যনিষ্ঠাই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি
নাজমা নামে এক বিবাহিতা মহিলা স্বামীর সঙ্গে সুখে-শান্তিতে সংসার করছিলেন। তাঁর স্বামীর আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। দরিদ্র হওয়ায় তিনি স্ত্রীকে সোনার গয়না তৈরি করে দিতে পারছিলেন না। তাছাড়া তিনি দেখতে খুব একটা সুদর্শনও ছিলেন না। অন্যদিকে নাজমা ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী। গ্রামের সবাই তাঁর রূপের প্রশংসা করত। কিন্তু এই সৌন্দর্যের কারণেই গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেলে তিনি কখনো কখনো হীনমন্যতায় ভুগতেন।
কোনো অনুষ্ঠানে গেলে গ্রামের কয়েকজন মহিলা প্রায়ই তাঁর কানে নানা কথা ঢালত। তারা বলত- তোমার মতো এত সুন্দরী একজন মেয়ে কীভাবে এমন গরিব স্বামীর সঙ্গে সংসার করছো, কথাটা ভাবতেই অবাক লাগে। তোমাকে একটা ভালো গয়নাও কিনে দিতে পারে না। কোনো অনুষ্ঠানে আসতে হলে তোমাকে নকল গয়না পরে আসতে হয়। এর মানে তোমার স্বামী তোমাকে মোটেও গুরুত্ব দেয় না। এমন স্বামীর সঙ্গে সংসার করার চেয়ে তালাক নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যাওয়াই ভালো। তালাক নিলে তোমার জন্য ভালো ভালো পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসবে। আমরা নিজেরাই তখন তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারব। এভাবেই তারা নানা ধরনে প্রলোভন ও উসকানি দিত সুযোগ পেলে।
একসময় অন্যের কথায় বিশ্বাস করে নাজমা, সংসারে কোনো বড় সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও, সামান্য বিষয় নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে শেষ পর্যন্ত তালাক নিয়ে বাবা-মায়ের বাড়িতে চলে এলেন।
প্রথমদিকে বাবা-মা তাঁকে মোটামুটি আদর-যত্নেই রাখলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির পরিবেশ বদলে যেতে লাগল। ভাইয়ের স্ত্রী তাঁকে পরিবারের ওপর বোঝা মনে করতে শুরু করল।সুযোগ পেলেই ছোটখাট কথা নিয়েই খোঁটা দিতে লাগল। একসময় পরিবারের ছোটখাটো সিদ্ধান্তেও তাঁর মতামতের কোনো মূল্য রইল না। আর যেসব মানুষ তাঁকে তালাক নিতে উসকানি দিয়েছিল, বিপদের সময় তাদের কাউকেই পাশে পাওয়া গেল না।
একদিন নাজমা কান্নায় ভেঙে পড়ে মাকে বললো- অন্যের কথায় বিশ্বাস করে আমি নিজের সুখের সংসারটা নিজেই নষ্ট করে ফেলেছি। এখন আমি একূল-ওকূল দুই কূলই হারিয়েছি।
তখন মা গভীর দুঃখের সঙ্গে বললেন- জীবনের বড় সিদ্ধান্ত কখনোই অন্যের প্ররোচনায় নেওয়া উচিত নয়। নিজের বিবেক, বিচারবুদ্ধি এবং বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িই একজন স্ত্রীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। একজন নারী বিয়ের পর স্বামীর সংসারে যে সম্মান ও মর্যাদা পান, বাবা-মায়ের বাড়িতে কখনও সেই সন্মান ও মর্যাদা পান না। তাই অন্যের উসকানিতে তালাক নিয়ে চলে আসা তোমার মোটেও ঠিক হয়নি। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সব সময় বিবেচনা-বুদ্ধি ও বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে নেওয়া উচিত। তুমি সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেছ। তাই এখন অনুশোচনা করা ছাড়া তোমার আর কোনো উপায় নেই।
আপন মানুষ
জাহানারা দুই সন্তানের জননী। ছোটবেলাতেই তিনি বাবা-মাকে হারিয়েছিলেন। বড় ভাই তাঁকে স্নেহে-যত্নে মানুষ করে পাশের একটি গ্রামে বিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামীর সংসারে তিনি সুখ-দুঃখে সুন্দরভাবে জীবন কাটাচ্ছিলেন। তবে মনটা হালকা করার জন্য তিনি মাঝে-মধ্যে বড় ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে আসতেন।
একদিন জাহানারা দুই সন্তানকে নিয়ে কয়েক দিনের জন্য বড় ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। তাঁকে দেখে ভাই খুশি হলেও ভাবি আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করার পরিবর্তে পাকে-প্রকারে অবজ্ঞা করতে লাগলেন। খাওয়ার সময় বিরক্তির ভাব প্রকাশ করতে লাগলেন, এমনকি জাহানারার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গেও খিটখিটে ও রূঢ় ব্যবহার করতে লাগলেন।
সবকিছু বুঝেও জাহানারা প্রথম দুদিন নীরবে সব সহ্য করলেন। তিনি জানতেন, এত তাড়াতাড়ি ফিরে গেলে স্বামী নিশ্চয়ই তাঁকে অনেক প্রশ্ন করবেন। কারণ বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তিনি এক সপ্তাহ থাকার কথা বলে এসেছেন স্বামীকে।
দুদিন পর তিনি ভাবলেন, ভাবির এই আচরণ যদি ভাই বুঝতে পারেন, তাহলে তাঁর খুব কষ্ট হবে। এতে ভাইয়ের সংসারেও অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তাই তিনি দুদিন পরেই মন ভার করে নিজের বাড়িতে ফিরে এলেন।
এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে দেখে তাঁর স্বামী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
— তুমি তো এক সপ্তাহ থাকার কথা বলে গিয়েছিলে। মাত্র দুদিনেই ফিরে এলে কেন? কোনো ঝগড়া বা মনোমালিন্য হয়েছে নাকি?
জাহানারা কোনো কিছু গোপন না করে স্বামীর কাছে পুরো ঘটনাটি খুলে বললেন।
সব কথা শুনে স্বামী তাঁকে দোষারোপ না করে স্নেহভরে বললেন— তুমি ঠিক কাজই করেছ। যেখানে সম্মান নেই, সেখানে বেশি দিন থাকা উচিত নয়। তোমার সম্মান মানেই আমার সম্মান। তোমার মর্যাদা আমার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
স্বামীর এই কথাগুলো শুনে জাহানারার ভারাক্রান্ত মন অনেকটাই হালকা হয়ে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন, প্রকৃত আপন মানুষ সেই-ই, যে দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায়, ভালোবাসা দেয়, সাহস জোগায় এবং আন্তরিক সান্ত্বনা দিয়ে হৃদয়ের ক্ষত সারিয়ে তোলে।.
গরু-ছাগল ও ধানখড়ের কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা
মরলেরটারি গ্রামের মধ্য দিয়ে একটি ব্যস্ত পাকা সড়ক চলে গেছে। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে অসংখ্য মোটরসাইকেল, চারচাকার গাড়ি এবং অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু গ্রামের কিছু মানুষ নিজেদের সুবিধার জন্য রাস্তার ধারে গরু-ছাগল বেঁধে রাখে এবং ধানখড়, পাটসহ বিভিন্ন ফসল শুকাতে দেয়। ফলে রাস্তার অনেকটা অংশ দখল হয়ে যায় এবং সড়কটি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। এর ফলে মোটরসাইকেল, গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একদিন রাহুল নামে এক যুবক মোটরসাইকেল চালিয়ে কলেজে যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তার ধারে বাঁধা একটি ছাগল দড়ি ছিঁড়ে রাস্তার মাঝখানে ছুটে আসে। ছাগলটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে রাহুলের মোটরসাইকেল রাস্তার ধারে পুরু করে বিছিয়ে রাখা ধানখড়ের ওপর উঠে যায়। ধানখড়ে চাকা পিছলে যাওয়ায় মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে উল্টে যায়। এতে রাহুল গুরুতর আহত হয় এবং তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনার পর গ্রামের মানুষ উপলব্ধি করল যে, নিজের সুবিধার জন্য রাস্তার ধারে গরু-ছাগল বেঁধে রাখা কিংবা ধানখড় ও অন্যান্য শস্য শুকাতে দেওয়াটা মোটেই উচিত নয়। কারণ এ ধরনের অসচেতন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ অন্য মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই ওই দুর্ঘটনার পর থেকে গ্রামের সবাই সিদ্ধান্ত নিল যে, আর কখনও নিজেদের ব্যক্তিগত কাজে সরকারি রাস্তা ব্যবহার করবে না। একটি সভা ডেকে তারা সর্বসম্মতিক্রমে শপথ নিল যে, ভবিষ্যতে কেউ রাস্তার ওপর বা রাস্তার ধারে গরু-ছাগল বেঁধে রাখবে না এবং ধানখড় বা অন্য কোনো শস্যও শুকাতে দেবে না।
সেদিনের সেই দুর্ঘটনা শুধু ওই গ্রামের মানুষকেই নয়, গোটা এলাকার মানুষকেও সচেতন করে তুলল। সবাই উপলব্ধি করল যে, জনসাধারণের সম্পদকে কখনোই ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করা উচিত নয়।
সুখ ও দুঃখ
গুয়াহাটি শহরের একটি রিকশা স্ট্যান্ডে ভাড়া মেরে ফিরে এসে দুই রিকশাচালক পাশাপাশি বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। একজনের নাম করিম, অন্যজনের নাম রহিম।
করিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল— ভাই, খেয়াল করেছ? দুঃখকে কখনো খুঁজে আনতে হয় না। সে নিজেই অনাহূতের মতো এসে দরজায় দাঁড়ায়। আর সুখ? তাকে সারাজীবন খুঁজে বেড়ালেও অনেক সময় পাওয়া যায় না।
রহিম মৃদু হেসে বলল— তুমি একেবারে ঠিক কথাই বলেছ। আমি ভাবতাম, বেশি রোজগার করতে পারলেই সুখী হব। রোজগার বাড়ল, কিন্তু আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ল। চিকিৎসা করাতে গিয়ে সব টাকা শেষ হয়ে গেল। তখনই বুঝলাম, সুখ টাকায় নয়; সুখ মানুষের মনে থাকে।
হাইস্কুলে পড়ার সময় আনন্দচন্দ্র আগরওয়ালের ‘সুখ’ নামে একটি কবিতায় পড়েছিলাম—
“সুখ-দুঃখের মূল কারণ মন, মনকে করো স্থির;
ত্যাগেই মিলবে পরম তৃপ্তি, সাধন করো লোকের হিত।”
করিম বলল— কবি একেবারে সত্য কথাই বলেছেন, ভাই। দিন-রাত পরিশ্রম করি, তবুও অভাব যায় না। সুখের পেছনে ছুটে বেড়াই, কিন্তু তার দেখা পাই না। তবে আজ বাসস্ট্যান্ডে এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাঁর কাছে বাসভাড়া ছিল না। বাসে আসার সময় পকেটমার তাঁর সব টাকা পকেট মেরে নিয়ে গেছে। তিনি জিএমসি হাসপাতালে একজন অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে যাচ্ছিলেন। আমাকে তিনি সব কথা বললেন।
বৃদ্ধ লোক বলে তাঁর প্রতি আমার মায়া হলো। আমি তাঁকে বিনা ভাড়ায় জিএমসি হাসপাতালে পৌঁছে দিলাম। সেখানে নেমে তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন— তুমি খুব সৎ মানুষ। আজকাল তোমার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আজ তুমি আমার যে উপকার করলে, জীবনে কোনোদিন তা ভুলব না। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।
বৃদ্ধের এই কয়েকটি কথা শুনে আমার মনে যে শান্তি পেলাম, লাখ টাকা দিলেও এমন শান্তি আমি পেতাম না।
তখন রহিম বলল— সুখ বাইরে খুঁজে বেড়ালে পাওয়া যায় না। প্রকৃত সুখ লুকিয়ে থাকে নিজের সততা, সন্তুষ্টি আর মানুষের আন্তরিক আশীর্বাদের মধ্যে। সুখ আর দুঃখ জীবনেরই অংশ। দুঃখ অনাহূতের মতো এসে যায়, কিন্তু সুখ আসে সৎকর্ম, মানবিকতা আর ভালো আচরণের মাধ্যমে।
করিম রহিমের কথায় সমর্থন জানিয়ে বলল— তুমি একেবারে ঠিকই বলেছ। আজ ওই বৃদ্ধকে সাহায্য করে আমি কথাটার সত্যতা উপলব্ধি করতে পেরেছি।
এরপর দুজন আবার নিজেদের রিকশায় উঠে যাত্রীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। জীবনের কষ্ট রয়ে গেল, কিন্তু তাঁদের মনে জন্ম নিল নতুন এক উপলব্ধি— দুঃখ না চাইলেও আসে, কিন্তু সত্যিকারের সুখ পেতে হলে সৎকর্ম, ধৈর্য আর সন্তুষ্টির পথই বেছে নিতে হয়।
অন্তরের আগুন
একটি ছোট্ট গ্রামে হেমন্ত নামে এক সরল ও শান্ত স্বভাবের লোক বাস করতেন। গ্রামের সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করত। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আঘাত তিনি পেতেন নিজের আপনজনদের কাছ থেকেই।ছোট ছোট বিষয় নিয়ে তাঁকে অপমান, অবহেলা আর তিক্ত কথার আঘাতে প্রতিদিন তাঁর হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করা হত।
একদিন গ্রামের পাশের বনে আগুন লেগে গেল। দূর থেকে সেই আগুন দেখে গ্রামের মানুষ সবাই পানি নিয়ে ছুটে গেল আগুন নেভানোর জন্য। হেমন্ত গভীর বেদনা মিশ্রিত একটুখানি হাসি হেসে বললেন— বনের আগুন সবাই দেখতে পায়, তাই তা নেভানোরও চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষের অন্তরের আগুন কেউ দেখতে পায় না, তাই কেউ সেটি নেভানোর চেষ্টা করে না।
কথাটা ভাবতেই তাঁর চোখ জলে ভরে এল। কিন্তু সেই জল কেউ লক্ষ্য করল না। কারণ আপনজনদের দেওয়া কষ্টের কথা তিনি কাউকে কোনোদিন বলতে পারেননি। তাই সেই অব্যক্ত নীরব যন্ত্রণার আগুন বুকে নিয়েই একদিন তিনি পরপারে চলে গেলেন।
বনের আগুন হয়তো নেভানো যায়, কিন্তু আপন মানুষের দেওয়া হৃদয়ের আগুন সহজে নেভানো যায় না। কোনোমতে নেভাতে পারলেও ক্ষত চিরদিন থেকে যায় বুকে। তাই আপনজনদের সঙ্গে সর্বদা সতর্ক হয়ে চলা উচিত।
অন্নদান মহাদান
একটি ব্যস্ত শহরের রাস্তার পাশে সাত বছরের একটি মেয়ে তার চার বছরের ছোট ভাইকে নিয়ে ভিক্ষা করছিল। কয়েক দিন আগেই এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তাদের বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন। আপন বলতে তাদের আর কোনো অভিভাবক না থাকায় তারা মানুষের কাছে হাত পেতে কোনো রকমে দিন যাপন করছিলো।
সেদিন সকাল থেকে তারা কিছুই খেতে পারেনি। ছোট ভাইটি প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাঁদছিল এবং ছটফট করছিল। ভাইয়ের এমন অসহায় অবস্থা দেখে মেয়েটি খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল, কিন্তু তার কিছুই করার ছিল না।
তারা যেখানে বসে ছিল, তার কাছেই একটি হোটেল ছিল। সেখানে এক ভদ্রলোক বসে বিরিয়ানি খাচ্ছিলেন। ভাইয়ের কষ্ট আর সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি সাহস করে তাঁর কাছে গিয়ে আস্তে করে বলল— কাকু, আমার ভাইটার খুব ক্ষুধা লেগেছে। দয়া করে ওকে একটু খাবার দিন। আমরা আজ সকাল থেকে কিছুই খাইনি। ও ক্ষুধায় খুব কষ্ট পাচ্ছে।
মেয়েটির কথা শুনে ভদ্রলোকের হৃদয়ে দয়া সঞ্চার হল। তিনি দুই ভাইবোনকে হোটেলের ভেতরে নিয়ে গিয়ে গরম গরম বিরিয়ানি খেতে দিলেন। অনেক দিন পর পেট ভরে খাবার পেয়ে ছোট ভাইটির মুখে হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটিও চোখে জল নিয়ে ভদ্রলোককে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাল।
দুই ভাইবোনের মুখের সেই হাসি দেখে ভদ্রলোক উপলব্ধি করলেন, পৃথিবীতে ধন-সম্পদের চেয়েও বড় সম্পদ হলো মানবতা। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়াই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দান। সত্যিই, অন্নদান মহাদান।
ধারের মূল্য
বিকাশ ও দীপক—দুজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। ছোটবেলা থেকে কলেজজীবন পর্যন্ত তারা একসঙ্গে পড়াশোনা করেছে। বলতে গেলে, তারা ছিল একে অপরের প্রাণের বন্ধু—একই থালায় বসে ভাত খাওয়ার মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাদের। কিন্তু দুজনেই ছিল বেকার। কৃষিকাজ করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করত।
একবার বিকাশের ছেলের জন্য একটি চাকরির সুযোগ এল। চাকরিটি পেতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাগবে। টাকা দিলেই নিশ্চিতভাবে চাকরিটি হয়ে যাবে। বাড়ির কিছু জিনিসপত্র বিক্রি করে বিকাশ চার লাখ টাকা জোগাড় করল। শেষ পর্যন্ত এক লাখ টাকার জন্য সে তার বন্ধু দীপকের শরণাপন্ন হলো।
বন্ধুর ছেলের চাকরির কথা শুনে দীপক ভাবল, “বন্ধুর বিপদ মানে আমারও বিপদ। বন্ধুর ছেলে মানে আমারও ছেলে”- তাই কোনো কিছু না ভেবে নিজের জমি বন্ধক রেখে বন্ধুকে এক লাখ টাকা দিয়ে দিল।
বিকাশের ছেলের চাকরি হয়ে গেল। দেখতে দেখতে এক মাস, দুই মাস করে ছয় মাস কেটে গেল। কিন্তু দীপকের টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো উদ্যোগই নিল না বিকাশ। বাধ্য হয়ে ছয় মাস পর দীপক টাকা ফেরত চাইলে “আজ দেব, কাল দেব।” এভাবে বলতে বলতে বিকাশ আরও ছয় মাস পার করল।
শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি দাঁড়াল যে, দীপক টাকা চাইতে গেলেই বিকাশের মুখ কালো হয়ে যেতে লাগল এবং সে ধীরে ধীরে দীপককে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। রাস্তায় দেখা হলেও বিকাশ মুখ ঘুরিয়ে এমনভাবে চলে যেত লাগল, যেন দীপককে সে দেখতেই পায়নি।
এ কান-ও কান করতে করতে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গ্রামের মানুষের কানেও পৌঁছে গেল। তখন গ্রামের মানুষজন বলাবলি করতে লাগল—ধার এমন এক জিনিস, যা সোনার আংটিকেও লোহার আংটিতে পরিণত করতে পারে। তাই বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিণত হতে আর কতক্ষণই বা লাগে!”
অনেকে দীপককে আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শও দিল। কিন্তু দীপকের বিবেক তাকে তা করতে বাধা দিল। মনে মনে সে ভাবল, বিকাশ বন্ধুত্বকে কলঙ্কিত করেছে বলে আমিও কি তেমনই আচরণ করব? না, তা কোনোমতেই সম্ভব নয়! এভাবে ভেবে দীপক টাকার আশা বাদ দিয়ে নীরব হয়ে থাকল।
যে দীপক একসময় বিকাশের প্রাণের বন্ধু ছিল, শুধু টাকা ফেরত চাইতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত সে বিকাশের শত্রুতে পরিণত হলো।
টাকা দিয়ে বন্ধুত্ব কেনা যায় না, কিন্তু একটি ধার সারা জীবনের বন্ধুত্বকে ভেঙে দিতে পারে। বিকাশ ও দীপকের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটল।
সত্যিকারের বন্ধুত্ব
রতন ও করিম—দুজন পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দা। ধর্ম আলাদা হলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। সময়ের স্রোতে দুজনেই সত্তর বছর পেরিয়ে গেছেন, তবুও তাদের বন্ধুত্ব পূর্বের মতো আজও অটুট রযেছে। কোনো প্রলোভন কিংবা পরিস্থিতিই তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে পারেনি।
তারা খুব বেশি লেখাপড়া শেখেনি। তাই জীবনের অধিকাংশ সময় দুজনেই কৃষিকাজ করে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ করেছেন। যৌবনকাল থেকেই কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এখনো দুজনেই বেশ কর্মঠ ও সবল। বয়স বাড়লেও রতন এখনো সাইকেল চালান অনায়াসে।
রতনকে কাছের বাজারে যেতে হলে করিমের বাড়ির সামনে দিয়েই যেতে হয়। তাই বাজারে যাওয়ার সময় করিমের বাড়ির সামনে পৌঁছালেই রতন প্রতিবার সাইকেল থামিয়ে হাসিমুখে ডাকেন—করিম, এসো। বাজারে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি এসে আমার সাইকেলের পেছনে উঠে বসো।
করিমও জানেন, কখন রতন সাইকেল নিয়ে এসে তাঁকে ডাকবেন। তাই তিনি সবসময় প্রস্তুত হয়ে রতনের ডাকের অপেক্ষায় থাকেন। তাই রতন ডাকলেই তিনি হাসিমুখে এসে রতনের সাইকেলের ক্যারিয়ারে উঠে বসেন।
দুজন বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন। এরপর নির্দিষ্ট একটি চায়ের দোকানে বসে একসঙ্গে চা পান করেন এবং পুরোনো দিনের নানা স্মৃতি রোমন্থন করে আনন্দ উপভোগ করেন।
গ্রামের মানুষ এই দৃশ্য দেখে বলেন—ধর্ম মানুষকে আলাদা করে না, মানুষকে আলাদা করে ধর্মান্ধতা। সত্যিকারের বন্ধুত্বের কোনো ধর্ম, জাতি কিংবা বয়স নেই। পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস ও ভালোবাসাই বন্ধুত্বকে আজীবন অটুট রাখে।
মা-বাবার মূল্য
একটি ছোট শহরে একজন উচ্চশিক্ষিত, সহজ-সরল ও ভদ্র যুবক বাস করতেন। তিনি সরকারি চাকরি করে নিজের পরিবারকে সুখে-শান্তিতে প্রতিপালন করতেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত ও জেদি স্বভাবের। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই সে শ্বশুর-শাশুড়িকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলেন। ফলে সংসারে একধরনের অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হতে লাগল।
একদিন সুযোগ বুঝে স্ত্রী তাঁর স্বামীকে বললো—আমি তোমাকে বিয়ে করে তোমার সংসারে এসেছি। তাই তোমার সেবা-যত্ন করার দায়িত্ব আমার আছে। কিন্তু তোমার মা-বাবার সেবা-যত্ন করার জন্য আমি দায়বদ্ধ নই। তুমি যদি তোমার মা-বাবাকে এই বাড়িতে রাখো, তাহলে আমি আমার মা-বাবার বাড়িতে চলে যাব। এখন সিদ্ধান্ত নাও—তুমি তোমার মা-বাবাকে নিয়ে থাকবে, নাকি আমাকে নিয়ে থাকবে?
যুবকটি কিছুক্ষণ নীরবে থেকে ধীর-স্থির ও শান্ত কণ্ঠে বললেন—তুমি আমার স্ত্রী। সুখে-দুঃখে সারাজীবন তোমার পাশে থাকব—এই অঙ্গীকার করে, অগ্নিকে সাক্ষী রেখে, স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে তোমাকে আমি আমাদের ঘরে এনেছি। তাই আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং সম্মানও করি। কিন্তু যে মা-বাবা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করে বড় করেছেন, পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করেছেন, তাঁদের আমি কোনোদিন পরিত্যাগ করতে পারব না।
তার মানে? তুমি কি বলতে চাইছো? স্ত্রী রুক্ষ কণ্ঠে প্রশ্ন করলো।
তার মানে, আমি বলতে চাচ্ছি- যুবক দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- তাই তুমি যে শর্ত দিয়েছ, তার ভিত্তিতে আমার সিদ্ধান্ত হলো—আমি আমার মা-বাবার সঙ্গেই থাকব। জীবনসঙ্গী অবশ্যই অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু যে মা-বাবা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করেন, তাঁদের সম্মান করা এবং তাঁদের যত্ন নেওয়াও প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। আমার সিদ্ধান্ত আমি তোমাকে জানিয়ে দিলাম।এখন তোমার সিদ্ধান্ত তুমি নিজেই নাও।
স্বামীর দৃঢ়কণ্ঠের উত্তর শুনে স্ত্রী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলো। পরে সে নিজের ভুল উপলব্ধি করতে পারলো এবং স্বামীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলো। সেইদিন থেকে সে শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের মা-বাবার মতোই সম্মান ও সেবাযত্ন করতে শুরু করলো।
ফলে ধীরে ধীরে সংসারের সমস্ত অশান্তি দূর হয়ে গেল। ঘরটি আবার ভালোবাসা, মমতা, সুখ ও শান্তিতে ভরে উঠল।
শিক্ষা: জীবনসঙ্গী যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মা-বাবার স্থানও অনন্য। সন্তানের প্রতি মা-বাবার ত্যাগের ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। তাই তাঁদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও যত্ন দেখানো প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক কর্তব্য।
একটি ছোট ছেলের মানবতা
একদিন সকালে রাহুল নামে একটি ছোট ছেলে স্কুলে যাচ্ছিল। শহরের একটি ছোট গলির ধারে এক মধ্যবয়স্ক দরিদ্র মহিলা তার দুই ছোট ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্ষা করছিলেন। তাঁর চোখেমুখে দুঃখের ছাপ স্পষ্ট ছিল। পথ দিয়ে যাঁরাই যাচ্ছিলেন, তাঁদের কাছে হাত পেতে তিনি সাহায্য চাইছিলেন।
মহিলার স্বামী রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করতেন। প্রায় এক বছর আগে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে সংসারের সমস্ত দায়ভার এসে পড়েছে মহিলাটির কাঁধে। আয়ের অন্য কোনো উৎস না থাকায়, শেষ পর্যন্ত পেটের তাগিদে তাঁকে ভিক্ষা করতে বাধ্য হতে হয়েছে।
মহিলার পাঁচ বছরের ছোট মেয়েটি ক্ষুধায় কাতর হয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলছিল—
“মা, আমাকে কিছু খেতে দাও। আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে।
এমন সময় রাহুল তাঁদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। দৃশ্যটা দেখে রাহুলের মন কেঁদে উঠল। সে এক মুহূর্তও না ভেবে মায়ের দেওয়া টিফিনের রুটিগুলো বের করে মেয়েটির হাতে তুলে দিল। ক্ষুধার্ত মেয়েটি মুখে হাসি ফুটিয়ে সেই খাবার খেতে শুরু করল।
ছোট্ট ছেলেটির এই উদারতা দেখে মহিলার চোখ থেকে কৃতজ্ঞতার অশ্রু ঝরে পড়ল। তিনি হৃদয় উজাড় করে রাহুলকে আশীর্বাদ দিয়ে বললেন—বাবা, তোমাকে আশীর্বাদ করি, তুমি বড় হয়ে একদিন নিশ্চয়ই একজন বড় মনের মানুষ হবে।
সেদিন রাহুল হয়তো নিজে টিফিন খেতে পারেনি, কিন্তু একজন ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে পেরে সে টিফিন খাওয়ার চেয়েও বেশি তৃপ্তি অনুভব করেছিল।
সত্যিকারের মানবতা ধন-সম্পদের মধ্যে নয়, অন্যের দুঃখে সহানুভূতিশীল হয়ে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে নিহিত থাকে।
আত্মসম্মানের মূল্য
বিশেষভাবে সক্ষম বিকাশ প্রতিদিন শহরের একটি ফুটপাতে চানাচুর বিক্রি করে। ছোটবেলায় পোলিও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে তার একটি পা পঙ্গু। তাই লাঠির সাহায্য ছাড়া সে হাঁটতে পারে না। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা কখনোই তার মনোবল ভেঙে দিতে পারেনি। সে কখনো নিজের দুর্ভাগ্যকে দোষারোপ করে বসে থাকেনি। ছোটবেলা থেকেই অন্য দশজন সুস্থ-সবল মানুষের মতো নিজের কাজ নিজে করে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এসেছে।
প্রায় ছয় বছর আগে যৌবনের স্বাভাবিক ধর্ম অনুসারে সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। বর্তমানে সে দুই সন্তানের বাবা। ভিক্ষা করে জীবনযাপন করার পরিবর্তে সে চানাচুর বিক্রি করে অত্যন্ত কষ্টে নিজের পরিবারকে প্রতিপালন করছে। উপার্জন হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু সেই উপার্জনের সঙ্গে মিশে আছে তার ঘাম, শ্রম এবং আত্মসম্মান।
একদিন একজন লোক বিকাশকে বলল—তুমি এত কষ্ট করে চানাচুর বিক্রি করে বেড়ানোর চেয়ে ভিক্ষা করলেই তো এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা উপার্জন করতে পারতে!
বিকাশ লোকটির কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে মৃদু হেসে বলল—হয়তো ভিক্ষা করলে বেশি টাকা উপার্জন করতে পারতাম। কিন্তু আমি ভিক্ষা করে নয়, নিজের পরিশ্রমে এবং সৎভাবে উপার্জন করে পরিবারকে প্রতিপালন করতে চাই। আমি চাই না, একদিন আমার সন্তানকে কেউ ‘ভিখারির সন্তান’ বলে উপহাস করুক। কষ্ট করে উপার্জন করা অর্থ কম হলেও তার মূল্য ভিক্ষা করে পাওয়া বেশি অর্থের চেয়ে বহুগুণ বেশি। আমি মানুষকে একটি কথা প্রমাণ করে দেখাতে চাই—শারীরিক অক্ষমতা কখনোই মানুষের প্রকৃত দুর্বলতা নয়। মানুষের প্রকৃত শক্তি তার শারীরিক সামর্থ্যের মধ্যে নয়; তা লুকিয়ে থাকে তার মনোবল, পরিশ্রম, আত্মসম্মান এবং সৎ উপার্জনের মধ্যে।
বিকাশের কথাগুলো শুনে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে গেল। তার কথাগুলো যেন সবার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। অনেকেই তার কাছ থেকে চানাচুর কিনল। শুধু চানাচুর কিনেই তারা থেমে থাকল না; তার আত্মমর্যাদা, সততা এবং জীবনসংগ্রামের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানাল।
সে প্রমাণ করল—জীবনে কত টাকা উপার্জন করা হলো সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো সে সেই টাকা কোন পথে উপার্জন করা হয়েছে। পরিশ্রম করে উপার্জন করা টাকার মূল্য ভিক্ষা করে বা অসৎ উপায়ে উপার্জন করা টাকার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
দুষ্ট বউয়ের শিক্ষা
রমেন একজন সরকারি কর্মচারী। কর্মসূত্রে তিনি শহরে থাকতেন। বাড়িতে থাকেন তাঁর বৃদ্ধা মা এবং স্ত্রী মীনা। রমেন বাড়িতে না থাকার সুযোগ নিয়ে মীনা তাঁর শাশুড়িকে দিয়ে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বাসনপত্র ধোয়া—সব ধরনের কাজ করিয়ে নিত। কাজ করতে কষ্ট হলেও সংসারে অশান্তি হবে ভেবে বৃদ্ধা সবকিছু নীরবে করে যেতেন।
একদিন রমেন এক প্রতিবেশী মহিলার কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারলেন। কথাটার সত্যতা যাচাই করার জন্য রমেন তিন দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি এলেন।তিনি পাশের বাড়ির বিশ্বস্ত দু’চারজনের কাছে জিজ্ঞেস করেও কথাটার সত্যতা জানতে পারলেন। এভাবে কথাটার সত্যতা যাচাই করার পর তিনি স্ত্রীকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কাউকে কিছু না বলে একদিন মীনার মাকে, অর্থাৎ তাঁর শাশুড়িকে, বাড়িতে ডেকে আনলেন।
মীনার সামনেই রমেন হাসিমুখে তাঁর শাশুড়িকে বললেন- মা, অনেক দিন হলো আপনার হাতের রান্না খাইনি। তাই আজ আপনি আমাকে রান্না করে খাওয়াবেন। শুধু রান্নাই নয়, আপনি যত দিন আমাদের বাড়িতে থাকবেন, রান্নাবান্নার পাশাপাশি ঘর মোছা, বাসন ধোয়া—সব কাজই করবেন। কারণ আমি দেখতে চাই, একজন বৃদ্ধা মানুষকে দিয়ে সংসারের কাজ করালে দেখতে কেমন লাগে।
এই কথা শুনে মীনা রেগে গিয়ে বলল- মায়ের তো এখন বয়স হয়েছে। এই বয়সে মা এত কাজ কীভাবে করবে? মায়ের কষ্ট হবে না?”
রমেন শান্তভাবে উত্তর দিলেন- যদি তোমার মা এসব কাজ করতে কষ্ট পান, তাহলে আমার বৃদ্ধা মা এসব কাজ করতে কষ্ট পান নাকি? হয়তো তুমি বলবে, আমার মাকে দিয়ে তুমি এসব কাজ করাও না। কিন্তু মিথ্যা বলে কোনো লাভ হবে না। কারণ এ বিষয়ে আমার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে।
মীনার মা সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে ধমক দিয়ে বললেন-জামাই যে কথাগুলো বলছে, সেগুলো কি সত্যি? যদি সত্যি হয়, তাহলে তুই তোর শাশুড়ির প্রতি খুবই অন্যায় করেছিস। একটা কথা মনে রাখবি—তোর শাশুড়িওতো কারও মা। তুই যে ব্যবহার অন্যের মায়ের সঙ্গে করেছিস, সেই একই ব্যবহার আমার সঙ্গে করতে বলা হলে এখন আপত্তি করছিস কেন? বড়দের সম্মান করতে শিখ। বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করাটা সবারই নৈতিক দায়িত্ব। আমরা যেমন ব্যবহার অন্যের কাছ থেকে আশা করি, অন্যের প্রতি আমাদেরও তেমনই ব্যবহার করা উচিত। বড়দের আশীর্বাদের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত থাকে। যদি আবার শুনি যে তুই শাশুড়িকে দিয়ে সংসারের কাজ করাচ্ছিস, তাহলে মনে রাখবি—আমি আর কোনোদিন তোদের বাড়িতে আসব না।
মায়ের কথা শুনে মীনার চেতনা উদয় হলো। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে লজ্জিত হলো। সে শাশুড়ির পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নিলো এবং আর কোনোদিন তাঁকে দিয়ে কোনো কাজ করাবে না বলে প্রতিজ্ঞা করলো।
সেই দিন থেকে মীনা তাঁর শাশুড়িকে নিজের মায়ের মতো ভালোবাসতে ও সম্মান করতে শুরু করল। ধীরে ধীরে তাঁদের সংসার থেকে অশান্তি দূর হয়ে গেল এবং বাড়িতে শান্তি ও সুখ ফিরে এল।
প্রকৃত পরিচয়
একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে সাত-আট বছরের একটি ছেলে খালের ওপর নির্মিত একটি বাঁশের সাঁকো পার হচ্ছিল। হঠাৎ পা পিছলে সে পানিতে পড়ে গেল। খালটি ছিল বেশ গভীর ছিলো এবং বর্ষার পানিতে ভরপূর ছিলো। এদিকে ছেলেটি সাঁতার জানত না। ফলে পানিতে পড়ে সে বাঁচার জন্য প্রাণপণে হাত-পা ছুড়তে লাগল।
ছেলেটির এমন অবস্থা দেখে পাড়ের লোকজন হইচই শুরু করে দিলেও কেউ সাহস করে পানিতে নেমে তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে গেল না।
ঠিক তখনই, যাকে কেউ তেমন গুরুত্বই দিত না, এমন এক তেইশ-চব্বিশ বছরের সাধারণ যুবক এক মুহূর্তও না ভেবে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে সে স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে ছেলেটিকে পানি থেকে পাড়ে তুলে আনল।
ছেলেটিকে নিরাপদে পাড়ে তুলে আনার পর উপস্থিত সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল এবং উপস্থিত সবাই যুবকটির সাহস ও মানবিকতার ভূয়সী প্রশংসা করতে লাগল।
সবাই উপলব্ধি করল, মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু ধন-সম্পদ, খ্যাতি কিংবা পদমর্যাদায় থাকেনা, মানুষের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার মানবিকতার মাঝে।
অভাবের মূল্য
ধনী পরিবারের ছেলে রাহুল খুবই বেহিসেবই ছিল। সে কোনোদিন বুঝতে পারেনি অভাব কী জিনিস। তাই সে অদর্কারী জিনিস কিনে, বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে আড্ডা দিয়ে অযথা টাকা-পয়সা অপচয় করত। এ নিয়ে মা-বাবা সতর্ক করত যদিও সে তাঁদের কথায় গুরুত্বই দিত না। একদিন সে এক বন্ধুর বাড়িতে গেল। বন্ধুটির মা মাত্র একটি রুটি আর সামান্য ডাল তিনজনের মধ্যে ভাগ করে খাচ্ছিলেন। ঘরে এক দানা চালও ছিল না, পকেটেও ছিল না একটি টাকাও। তবুও তাঁরা হাসিমুখে অতিথিকে স্বাগত জানালেন।
সেই দৃশ্য দেখে রাহুলের বুক কেঁপে উঠল। সে প্রথমবার অনুভব করল—খাবারের অভাব মানে শুধু খালি পেট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লজ্জা, দুশ্চিন্তা, অসহায়ত্ব এবং নীরব কান্না। অর্থের অভাব মানুষের স্বপ্নকে ছোট করে দিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা ও মানবতাকে কখনো ছোট করতে পারে না।
সেদিনের পর থেকে রাহুল অপচয় করা ছেড়ে দিল এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুরু করল। কারণ, যে মানুষ অভাবকে বোঝে, সেই-ই অন্যের কষ্ট সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে পারে।
মা-বাবার সঙ্গে রাগ করার মাশুল
রাজু একজন কলেজপড়ুয়া ছাত্র। একদিন সামান্য একটি বিষয় নিয়ে সে বাবার সঙ্গে রাগ করে কাজের সন্ধানে মুম্বাই চলে গেল। কাজের সন্ধানে সেখানে তাকে কয়েক দিন থাকতে হলো। মুম্বাই গিয়ে প্রথমে সে একটি হোটেলে উঠছিল। বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া টাকা ট্রেনভাড়া, হোটেলের বিল এবং খাওয়া-দাওয়ার খরচ মেটাতে কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। এদিকে সে নিয়মিত কাজের সন্ধান করছিলো যদিও কাজ পাচ্ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে সে হোটেল ছেড়ে দিয়ে রেলস্টেশনে থাকতে শুরু করল। হোটেল ছাড়ার সময় তার পকেটে মাত্র কয়েকটি টাকা অবশিষ্ট ছিল। ফলে ভাতের পরিবর্তে দু-এক দিন তাকে বড়াপাও খেয়েই কাটাতে হলো। কয়েক দিন পর বড়াপাও কেনার টাকাও তার কাছে আর রইল না। শেষ পর্যন্ত দু-দিন প্রায় না খেয়ে থেকে সে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়ল।
ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির হয়ে একদিন এক টুকরো রুটির জন্য সে এক সাধারণ চায়ের দোকানির কাছে গেল। চায়ের দোকানির কাছে সে বাড়ি থেকে রাগ করে চলে আসা থেকে শুরু করে তার জীবনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। তার কথা শুনে দোকানদারটির মনে তার প্রতি মায়া হলো। তিনি তাকে পেট ভরে ভাত খেতে দিলেন।
এরপর রাজু প্রায় দশ দিন কোনো টাকা-পয়সা না নিয়ে সেই চায়ের দোকানেই বাসনপত্র ধোয়ার কাজ করল। বাসন ধোয়ার পারিশ্রমিক হিসেবে চায়ের দোকানদার তাকে বাড়ি ফেরার ট্রেনের টিকিট কেটে দিয়ে বললেন— বাড়ির লোকের সঙ্গে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে আসে শুধু বোকা মানুষরাই। যে মা-বাবা অসীম কষ্ট করে সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করে তোলেন, তাঁদের সঙ্গে কখনো রাগ করা উচিত নয়। মা-বাবা কখনো কখনো হয়তো সন্তানের ভালোর জন্য দুটো কঠিন কথা বলতে পারেন, কিন্তু সেই কঠিন কথার পেছনেও থাকে সন্তানের মঙ্গল কামনা। তাই রাগ করে কখনো বাড়ি ছেড়ে চলে আসা উচিত নয়। যাও, বাড়ি ফিরে গিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করোগে’। শুধু লেখা-পড়া করলেই চলবেনা, একজন ভালো মানুষ হওয়ারও চেষ্টা করতে হবে।”
চায়ের দোকানির কথা শুনে রাজুর চোখে জল এসে গেল। বাড়ি ফিরে সে মা-বাবার কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিলো এবং আর কখনো মা-বাবার অবাধ্য হবে না বলে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল।
সহানুভূতির প্রয়োজন আছে
রমেন একজন অত্যন্ত দরিদ্র কৃষক। নিজের কোনো চাষের জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করে সে চাষাবাদ করে। কিন্তু একবার আগাম বন্যায় তার সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে গেল। ফলে সংসারে চরম অভাব-অনটন দেখা দিল।
একদিন সকালে তার স্ত্রী বিষণ্ণ মুখে বলল- ঘরে একমুঠো চালও নেই। ছেলেমেয়েদের কী খেতে দেব?”
স্ত্রীর কথা শুনে রমেন প্রতিবেশীদের কাছে গিয়ে ধারে কিছু চাল চাইল। কিন্তু সবার অবস্থা প্রায় তার মতোই শোচনীয়। তাই কোথাও সে ধার পেল না। পরে বাজারে গিয়েও বাকিতে চাল চাইল, কিন্তু সেখান থেকেও হতাশ হয়ে সে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হলো।
অবশেষে নিরুপায় হয়ে রমেন রাস্তার ধারে জন্মানো কয়েকটি কচু তুলে বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে গেল। কিন্তু লোকজন বলল- আজকাল বাজারে কত উন্নত জাতের কচু পাওয়া যায়! তোমার রাস্তার ধারের কচু কে কিনবে? এভাবে বলে সম্ভাব্য ক্রেতারা সবাই তাকে এড়িয়ে চলে গেল।
তবুও কোনো না কোনো ক্রেতা কচুগুলো কিনবে—এই আশায় রমেন কচুগুলো নিয়ে বসে রইল। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও একজন ক্রেতাও কচু কিনতে এল না। একসময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। বাজারে মানুষের আনাগোনাও কমে গেল। তবুও রমেন হতাশ ও বিমর্ষ মুখে সেখানেই বসে রইল।কারণ ছেলেমেয়েদের অনাহারী ক্লিষ্ট মুখের কথা ভেবে খালী হাতে বাড়ি ফেরার সাহস ছিল না তার।
রমেনকে এভাবে অসহায় অবস্থায় বসে থাকতে দেখে একসময় একজন লোক তার কাছে এগিয়ে এলেন। কথাবার্তার মাধ্যমে তিনি রমেনের দুরবস্থার কথা জানতে পেরে কচুগুলোর প্রকৃত মূল্যের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে সব কচু কিনে নিলেন।
সেই টাকা দিয়ে রমেন চাল, ডাল ও সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে বাড়ি ফিরে এলো। সেদিন সে উপলব্ধি করতে পারল— মানুষের দুখ-কষ্ট উপলব্ধি করার মতো লোক এখনও পৃথিবীতে বেঁচে আছে। যার জন্য পৃথিবীটা এত সুন্দর। শুধু টাকাপয়সাই নয়, মানুষের জন্য দয়া, মমতা ও সহানুভূতিরও প্রয়োজন আছে।
মানবতার ইফতার
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এক রোজাদার ব্যক্তি সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে একটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার ছোট্ট একটি হোটেলে এসে ঢুকলেন। তিনি লজ্জা ও সংকোচের সঙ্গে দোকানীকে বললেন- ভাই, ইফতারের সময় হয়ে গেছে। একটু পানি পাব কি?
লোকটি রোজাদার বলে জানতে পেরে দোকানী শুধু পানি দিয়েই ক্ষ্যান্ত হলেন না। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁকে বসতে দিলেন এবং খেজুর, কলা ইত্যাদি দিয়ে ইফতার করালেন। আশপাশে কোনো মসজিদ না থাকায় ইফতারের পর দোকানের এক কোণে তাঁকে নামাজ পড়ারও ব্যবস্থা করে দিলেন।
নামাজ শেষ হলে দোকানী কিছু খাবার সুন্দর করে প্যাকেট করে রোজাদারের হাতে দিয়ে বললেন- এগুলো নিয়ে যান, রাতে খেতে পারবেন।”
দোকানীর এই অকৃত্রিম ভালোবাসায় রোজাদারের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি দোকানীর হাত ধরে বললেন- আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। আজ আপনি একজন মানুষকে নয়, ধর্মকে সম্মান করলেন।
সেদিন দুজনেই উপলব্ধি করতে পারলেন—মানুষের আসল পরিচয় তার ধর্মে নয়; মানুষের আসল পরিচয় হলো তার মানবতায়।
