আমার ভ্রাতৃ (My Brother)

      ফাতিমা জিন্নাহ

সম্পাদনা: শরীফ আল মুজাহিদ

                                                     পুনর্মুদ্রণ: সানি এইচ. পানহওয়ার

মিস ফাতিমা জিন্নাহ আমার জন্য সর্বদা সহায়তা ও অনুপ্রেরণার এক অবিচল উৎস। ব্রিটিশ সরকার যখন আমাকে বন্দি করতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করছিলাম, সেই কঠিন দিনগুলোতে আমার বোনই আমাকে সাহস জুগিয়েছিলেন এবং আশাব্যঞ্জক কথা বলেছিলেন, যখন বিপ্লব যেন আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারেও তাঁর নিরন্তর যত্ন ও উদ্বেগ ছিল।”
কায়েদে-আজম, ৯ আগস্ট ১৯৪৭

     সূচি

প্রাককথন ………………………………………………… ১

১. একটি জাতি এতিম হয়ে পড়ে …………………….. ৫

২. কাথিয়াওয়ার থেকে করাচি ……………………….৩২

৩. একজন ব্যবসায়ী থেকে ব্যারিস্টার …………….৪৭

সূচি (ইনডেক্স) …………………………………………. ৬১

                           ভূমিকা (Preface)

কায়েদে-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাত ভাইবোনের মধ্যে তাঁর তৃতীয় বোন মিস ফাতিমা জিন্নাহ (১৮৯৩–১৯৬৭) ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি স্বভাব ও ব্যক্তিত্বে তাঁর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর মতো এতটা ঘনিষ্ঠ আর কেউ ছিলেন না।

তাঁদের পিতা জিন্নাহ পুঞ্জা ১৯০১ সালে মৃত্যুবরণ করলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ফাতিমার অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ফাতিমার শিক্ষার প্রতিও গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তাঁর অটল সমর্থনেই ১৯০২ সালে ফাতিমা বান্দ্রা কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং পরে ১৯১৯ সালে কলকাতার ড. আহমদ ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হতে সক্ষম হন। সে সময় একটি খোজা (Khoja) পরিবারের মেয়ের কনভেন্টে আবাসিক ছাত্রী হওয়া কিংবা পেশাগত শিক্ষায় অংশ নেওয়ার বিরুদ্ধে পরিবারের প্রবল আপত্তি ছিল। কিন্তু জিন্নাহ সেই বিরোধিতা উপেক্ষা করে তাঁর বোনকে উৎসাহ ও সমর্থন দেন। ডেন্টাল ডিগ্রি অর্জনের পর ফাতিমা যখন বোম্বেতে একটি দন্তচিকিৎসা কেন্দ্র (ডেন্টাল ক্লিনিক) খোলার সিদ্ধান্ত নেন, তখনও জিন্নাহ তাঁর পাশে দাঁড়ান এবং ১৯২৩ সালে ক্লিনিকটি প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেন।

প্রথমদিকে মিস জিন্নাহ প্রায় আট বছর তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করেন— ১৯১৮ সাল পর্যন্ত। এরপর জিন্নাহ রতনবাইকে (Ruttenbai) বিয়ে করলে তিনি আলাদা হয়ে যান। কিন্তু ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রতনবাইয়ের মৃত্যুর পর ফাতিমা জিন্নাহ তাঁর ডেন্টাল ক্লিনিক বন্ধ করে জিন্নাহর বোম্বের বাংলোতে চলে আসেন এবং গৃহের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁদের আজীবনের সহযাত্রা, যা ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

সব মিলিয়ে ফাতিমা জিন্নাহ প্রায় আটাশ বছর তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করেন। এর মধ্যে শেষ উনিশ বছর ছিল জিন্নাহর জীবনের সবচেয়ে সংকটময় ও কঠিন সময়। এই সময়েই কায়েদে-আজম ধীরে ধীরে, কিন্তু নাটকীয়ভাবে, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা— বিশেষত ১৯৩১ থেকে ১৯৩৪ সালে ইংল্যান্ডে তাঁর স্বেচ্ছা-নির্বাসনের সময়কার একাকীত্ব—অতিক্রম করে একশো মিলিয়ন (দশ কোটি) মুসলমানের নবঘোষিত জাতির প্রায় সর্বজনস্বীকৃত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

এই সময় তিনি আপাত পরাজয়ের মুখ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। ভারতের দুই প্রধান জাতির মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের জন্য আরও যুক্তিসংগত ও ন্যায়সঙ্গত কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি দীর্ঘ ও কঠোর সংগ্রাম চালান, যাতে মুসলমানদের জন্য জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। সেই সংগ্রামের পরিণতিতে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব নতুন বিন্যাসের সূচনা হয়।

মিস ফাতিমা জিন্নাহ শুধু তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাসই করেননি, বরং তাঁর অসংখ্য সফরেও সঙ্গী হয়েছিলেন। ফলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম পরিচালনা করছিলেন, তার গভীর তাৎপর্য তিনি অনুধাবন করেছিলেন এবং সেই উপলব্ধির পরিচয়ও দিয়েছিলেন। এমনও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, জিন্নাহ প্রায়ই নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতেন—বিশেষ করে সকালের নাশতা ও রাতের খাবারের টেবিলে। তিনি নিজের অনেক ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ভাবনাও তাঁর বোনের কাছে অকপটে প্রকাশ করতেন।

অন্যদিকে, মিস জিন্নাহও তাঁর ভাইয়ের জন্য—কায়েদে আজমের ভাষায় ছিলেন—“সহায়তা ও উৎসাহের এক অবিচল উৎস।” তিনি এমন সময়েও আশাব্যঞ্জক কথা বলতেন, যখন নানা প্রতিকূলতা ও সংকট জিন্নাহকে ঘিরে ধরত এবং তাঁকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করত।

মনে হয়, তাঁর প্রখ্যাত ভাইয়ের জীবনী রচনা বা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা মিস ফাতিমা জিন্নাহর মনে জাগে ১৯৫৪ সালে হেক্টর বোলিথোর Jinnah গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হওয়ার সময়। বইটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো জীবনী ছিল। গ্রন্থটি মূলত জিন্নাহর পেশাগত সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, পর্যবেক্ষক এবং তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ও জনজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, তাঁদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল।

তবুও সাধারণভাবে মনে করা হয়েছিল যে, বোলিথোর Jinnah গ্রন্থটি কোনো না কোনোভাবে জিন্নাহর প্রকৃত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর ঐতিহাসিক রাজনৈতিক কৃতিত্বকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়নি।

এর কিছুদিন পর মিস ফাতিমা জিন্নাহ কায়েদে আজমের একটি জীবনী রচনার জন্য একজন উপযুক্ত পাকিস্তানি লেখকের সন্ধান শুরু করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শুধুমাত্র একজন পাকিস্তানি—বিশেষত যিনি ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সালের মুসলিম রাজনীতির বিবর্তন সম্পর্কে গভীর ও সংবেদনশীল উপলব্ধি রাখেন—তিনিই সেই জটিল সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে পুনর্গঠন করতে পারবেন এবং কায়েদে আজমের ব্যক্তিত্ব ও তাঁর ঐতিহাসিক মিশনের প্রতি সুবিচার করতে সক্ষম হবেন।

তাঁর প্রথম পছন্দ ছিলেন অধ্যাপক ইত্রাত হুসাইন জুবেরী, যিনি একসময় কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। কিন্তু ১৯৫৮-৫৯ সালে কোনো এক কারণে অধ্যাপক জুবেরী পাকিস্তান ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেতে বাধ্য হলে, ফাতিমা জিন্নাহ বিচারপতি এম. আর. কায়ানিকে এই দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ১৯৬২ সালের ১৫ নভেম্বর বিচারপতি কায়ানি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

এরপর তিনি জনাব জি. আল্লানাকে জীবনী রচনার দায়িত্ব দেন। প্রায় আঠারো মাস ধরে আল্লানা ফাতিমা জিন্নাহকে এ কাজে সহায়তা করেন। কিন্তু ১৯৬৪ সালের শেষদিকে, যখন বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তাঁকে রাজি করানো হয়, তখন অজ্ঞাত কারণে তাঁদের যৌথ কাজের সমাপ্তি ঘটে। আশ্চর্যের বিষয়, এই বিচ্ছেদে ফাতিমা জিন্নাহ কিংবা আল্লানা— কেউই তাঁদের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। ফাতিমা জিন্নাহ মৃত্যুর (৮ জুলাই ১৯৬৭) আগ পর্যন্ত উপযুক্ত লেখক বা সহলেখকের সন্ধান চালিয়ে যান। অন্যদিকে, আল্লানা কায়েদে আজমের জীবনী রচনার সংকল্পে অবিচল থাকেন এবং ফাতিমা জিন্নাহর মৃত্যুর পর Quaid-i-Azam Jinnah: The Story of a Nation শিরোনামে একটি জীবনী প্রকাশ করেন। আজও সেটিকে একজন পাকিস্তানি লেখকের রচিত কায়েদে আজমের সর্বোত্তম জীবনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বর্তমান গ্রন্থের উপাদানসমূহ ফাতিমা জিন্নাহর মৃত্যুর পর মোহাট্টা প্রাসাদ থেকে কায়েদে আজমের নথিপত্রের সঙ্গে উদ্ধার করা হয় এবং পরে ইসলামাবাদের পাকিস্তান জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত হয়। ধারণা করা হয়, এগুলো ১৯৬৩-৬৪ সালের মধ্যে রচিত। এর প্রমাণ পাওয়া যায় শিরোনাম পৃষ্ঠায়, যেখানে লেখা আছে—“Fatima Jinnah with the assistance of G. Allana” অর্থাৎ “জি. আল্লানার সহায়তায় ফাতিমা জিন্নাহ”।

এতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এই উপাদানগুলোর তথ্যের মূল উৎস ছিলেন ফাতিমা জিন্নাহ। আল্লানার অবদান প্রধানত মূল লেখাকে পরিমার্জিত করা এবং পাঠযোগ্য করে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান সম্পাদক এই ধারণার পক্ষে দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন।

প্রথমত, ১৯৬৩ সালের শেষদিকে জীবনী প্রকল্প নিয়ে আলোচনার সময় জনাব আল্লানা তাঁকে জানান যে, তিনি ফাতিমা জিন্নাহর সহযোগিতায় কায়েদে আজমের জীবনী লিখছেন। তিনি আরও বলেন, পারিবারিক পটভূমি ও শৈশব নিয়ে প্রথম দুটি অধ্যায় ফাতিমা জিন্নাহ নিজে মুখে বলে লিখিয়েছেন এবং সেগুলো উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে থাকবে, যাতে তাঁর লেখকত্ব স্পষ্ট হয়।

দ্বিতীয়ত, আল্লানার প্রকাশিত জীবনীতে এমন বহু দীর্ঘ অংশ রয়েছে, যা উদ্ধৃতি চিহ্ন ছাড়াই বর্তমান পাণ্ডুলিপির সঙ্গে প্রায় শব্দে শব্দে মিলে যায়।

এই পাণ্ডুলিপিতে মোট তিনটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে মূলত কায়েদে আজমের জীবনের শেষ বছরটির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে গেলেও পাকিস্তানের প্রতি তাঁর অটল নিষ্ঠা ও আত্মনিবেদনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে তাঁর পারিবারিক পটভূমি ও শৈশবের বিবরণ রয়েছে এবং তৃতীয় অধ্যায়ে লন্ডনে কাটানো দিনগুলো ও পরে বোম্বেতে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তাঁর সংগ্রামের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।

যদিও দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায় কিছুটা অসম্পূর্ণ ও খণ্ডিত, তবুও এগুলোতে কায়েদে আজমের জীবন সম্পর্কে বহু অপ্রকাশিত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। আর প্রথম অধ্যায়ের শেষাংশ ডা. ইলাহী বখশ তাঁর With the Quaid-i-Azam during His Last Days (১৯৪৯) গ্রন্থে কায়েদে আজমের শেষ অসুস্থতার যে বিবরণ দিয়েছেন, তার সত্যতাকেই সমর্থন করে।

এই উপাদানগুলো জিন্নাহর জীবনের প্রারম্ভিক বছরগুলো সম্পর্কে তথ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। গবেষকদের জন্য এগুলো উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই জিন্নাহ-সংক্রান্ত সাহিত্যে এগুলোর উল্লেখ ও ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশেষ করে, স্ট্যানলি ওলপার্ট তাঁর বহুল প্রশংসিত গ্রন্থ Jinnah of Pakistan (১৯৮৪)-এ এই উপাদানগুলো থেকে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃতি ও তথ্য গ্রহণ করেছেন। উপাদানগুলোর সম্পাদিত ও কিছুটা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ Pakistan: Past and Present (১৯৭৭) গ্রন্থে “A Sister’s Recollections” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল; তবে গবেষণামূলক রচনায় এটি তেমন গুরুত্ব পায়নি।

বর্তমান গ্রন্থটি স্বীকৃত সম্পাদনা-নীতিমালা অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং একটি অত্যন্ত বিতর্কিত অংশ বাদে মূল উপাদানের বিষয়বস্তু যথাযথভাবে উপস্থাপন করেছে। তবে এই স্মৃতিকথায় কায়েদে আজম সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে, তা সম্ভবত ফাতিমা জিন্নাহ কোনো ডায়েরি বা লিখিত নথির সহায়তা ছাড়াই কেবল নিজের স্মৃতির ভিত্তিতে পুনর্গঠন করেছিলেন। ফলে কোথাও কোথাও তারিখ, ঘটনা বা স্থানের বিবরণে কিছু বিভ্রান্তি বা ভুল থেকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির প্রকৃত তথ্য প্রয়োজন অনুযায়ী পাদটীকায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

বর্ণনার মধ্যে কায়েদে আজমের ভাষণ থেকে উদ্ধৃত অংশগুলো তাঁর বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশিত ভাষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে এবং মূল পাণ্ডুলিপির পরিবর্তে যথাযথ সূত্র-উল্লেখসহ সঠিক পাঠ সংযোজন করা হয়েছে। একইভাবে, জিন্নাহর শেষ অসুস্থতা সম্পর্কে ইলাহী বখশের বিবরণ থেকেও প্রয়োজনীয় অংশ পাদটীকায় সংযোজন করা হয়েছে, যাতে তা ফাতিমা জিন্নাহর বর্ণনার সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়।

বর্তমান স্মৃতিকথার পরিশিষ্টে জিন্নাহর প্রারম্ভিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত পনেরোটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংযোজন করা হয়েছে। এগুলো হলো—

১.সিন্ধ মাদ্রাসাতুল ইসলাম-এর নিবন্ধন খাতার প্রাসঙ্গিক পৃষ্ঠা।
২. খ্রিস্টান মিশন স্কুলের নিবন্ধন খাতার প্রাসঙ্গিক পৃষ্ঠা।
৩. উপরোক্ত নিবন্ধনের আরেকটি প্রাসঙ্গিক পৃষ্ঠা।
৪. ব্রিটিশ মিউজিয়ামের লাইব্রেরি কার্ড (তারিখ: ১০ ফেব্রুয়ারি [১৮৯৬?])।
৫. ২৫ এপ্রিল ১৮৯৩ তারিখে লিঙ্কনস ইন-এর সম্মানিত সমিতির কাছে ল্যাটিন বিষয়ের প্রাথমিক পরীক্ষার অংশ থেকে অব্যাহতি চেয়ে জিন্নাহর আবেদনপত্র।
৬. একই তারিখে তাঁর আবেদন মঞ্জুর করার বিষয়ে লিঙ্কনস ইন-এর বিজ্ঞপ্তি।
৭. ২৫ মে ১৮৯৩ তারিখে প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সনদ।
৮. ১৪ এপ্রিল ১৮৯৬ তারিখে লিঙ্কনস ইন-এর বিজ্ঞপ্তি, যাতে সমিতির নথিতে তাঁর নাম “Mohamed Ali Jinnah” হিসেবে পরিবর্তনের আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
৯. ১১ মে ১৮৯৬ তারিখে তাঁকে বার-এ আহ্বানের (Call to the Bar) সনদ প্রদান করার নির্দেশসংবলিত বিজ্ঞপ্তি।
১০. লিঙ্কনস ইন কর্তৃক প্রদত্ত সনদ, যেখানে উল্লেখ আছে যে তিনি ৫ জুন ১৮৯৩ সালে ইন-এ ভর্তি হন এবং ২৯ এপ্রিল ১৮৯৬ সালে বার-এ আহ্বানপ্রাপ্ত হন।
১১. তাঁর শিক্ষক স্যার হাওয়ার্ড ডব্লিউ. এলফিনস্টোন কর্তৃক ৫ মার্চ ১৮৯৬ তারিখে প্রদত্ত সনদ।
১২. শিক্ষক ডব্লিউ. ডগলাস এডওয়ার্ডস কর্তৃক ৬ মার্চ ১৮৯৬ তারিখে প্রদত্ত সনদ।
১৩. ১৮ আগস্ট ১৮৯৬ তারিখে বোম্বে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারের নিকট আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য জিন্নাহর আবেদনপত্র।
১৪. ম্যানচেস্টার ডায়োসিসের চ্যান্সেলর পি. ভি. স্মিথ কর্তৃক প্রদত্ত একটি চরিত্র-প্রমাণপত্র।
১৫. Bombay Civil List থেকে নেওয়া একটি উদ্ধৃতি, যাতে তাঁকে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

দুঃখজনকভাবে, দুটি দলিলের (১২ ও ১৪ নম্বর) অনুপস্থিত অংশ সংগ্রহের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। প্রথম পাঁচটি দলিল ব্যতীত বাকি সবগুলো দলিল এই গ্রন্থেই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হলো। আশা করা যায়, এই দলিলসমূহ এবং ফাতিমা জিন্নাহর স্মৃতিকথা গবেষকদের জন্য মূল্যবান সহায়ক হবে এবং কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছাত্রজীবন ও আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবনের প্রারম্ভিক অধ্যায় পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এখন কেবল তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই বাকি, যাঁরা নানাভাবে এই গ্রন্থ প্রকাশে আমাকে সহায়তা করেছেন।

আমি পাকিস্তানের জাতীয় আর্কাইভস এবং এর পরিচালক জনাব আতীক জাফর শেখের কাছে গভীরভাবে ঋণী। তাঁদের সহযোগিতায় আমরা মূল দলিলগুলোর একটি স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য ফটোকপি এবং বেশ কয়েকটি আলোকচিত্র সংগ্রহ করতে পেরেছি। একইভাবে, লাহোরের ন্যাশনাল ডকুমেন্টেশন সেন্টার এবং বিশেষ করে জনাব নজির আহমদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। তিনি আমাদের (vi) থেকে (x) নম্বর পর্যন্ত দলিলগুলোর মাইক্রোফিল্ম ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছেন।

এ ছাড়া, এই গ্রন্থের প্রকাশ-প্রস্তুতির কাজে সহায়তার জন্য আমি মোহাম্মদ আহমদ এবং খাজা রাজি হায়দারের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

সর্বোপরি, আমি আমার ভাতিজা মুহাম্মদ আকবরের কাছে বিশেষভাবে ঋণী। তাঁর অক্লান্ত অধ্যবসায়ের ফলেই আমরা বোম্বে হাইকোর্ট থেকে শেষ পাঁচটি দলিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি।

এই গ্রন্থে সংযোজিত অধিকাংশ আলোকচিত্রই আমার প্রয়াত প্রিয় বন্ধু জামিল-উদ-দীন আহমদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে নেওয়া হয়েছে। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই তিনি কায়েদে আজম এবং পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে যে পথপ্রদর্শক গবেষণা ও কাজ শুরু করেছিলেন, তার জন্য আজ এ বিষয়ের গবেষক ও বিশেষজ্ঞ সবাই তাঁর কাছে গভীরভাবে ঋণী। তাঁর অমূল্য আলোকচিত্র-সংগ্রহটি একাডেমিকে দান করার জন্য আমি তাঁর সহধর্মিণীর প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

শরীফ আল মুজাহিদ
করাচি
২৭ ডিসেম্বর ১৯৮৬

                     প্রথম অধ্যায়

একটি জাতি অনাথ হয়ে গেল

করাচিতে আমার ভাইয়ের সমাধিসৌধটি যখন ধীরে ধীরে—ইঞ্চি ইঞ্চি করে—আকাশের দিকে উঠতে দেখছি, তখন বারবার ফিরে আসে সেই বেদনাময় দিনের স্মৃতি। দিনটি ছিল ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, শনিবার। সেদিন আমি হারিয়েছিলাম আমার বড় ভাইকে, আর আমার জাতি হারিয়েছিল তার অভিভাবককে—একটি অনাথ জাতিতে পরিণত হয়েছিল।

তাঁর জীবনের কাহিনি, যেভাবে আমি তাঁকে দেখেছি—চার দশকেরও বেশি সময় তাঁর নিত্যসঙ্গী হিসেবে—সেটি তুলে ধরার এই প্রয়াস শুরু করার আগে আজ সকালে আমি তাঁর কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম। সেখানে তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেছি, কিছু ফুল অর্পণ করেছি এবং নীরবে কয়েক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিয়েছি। কারণ, যাদের আমরা গভীরভাবে ভালোবেসেছি এবং যারা চিরবিদায় নিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের আর কী-ই বা দেওয়ার থাকে?

আজ তিনি ইতিহাসের অংশ। এই বইয়ের পাতাগুলোতে তাঁর জীবন ও কর্ম, সংগ্রামের দীর্ঘ বছর, হতাশার দিনগুলো, বিজয়ের মুহূর্ত এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবির পেছনে যে চিন্তা, দর্শন ও আদর্শ কাজ করেছিল, তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

প্রকৃতি তাঁকে দিয়েছিল এক দৈত্যসম দৃঢ়তা—নিজের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের অদম্য সংকল্প। কিন্তু সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে ধারণ করার জন্য তাঁকে দিয়েছিল এক দুর্বল শরীর, যা তাঁর অস্থির মন ও অপরাজেয় ইচ্ছার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারত না। একদিকে ছিল ঝড়ঝঞ্ঝায় ভরা সংগ্রামী জীবন, অন্যদিকে ছিল ভঙ্গুর স্বাস্থ্য। তবু তাঁর অদম্য মনোবল সব বাধা অতিক্রম করে নিজের জাতিকে তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর ছিল।

জীবনের শেষ দশ বছরে, যখন তিনি ইতোমধ্যেই বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ড বহুগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের পরামর্শ কিংবা ছোট বোনের আন্তরিক অনুরোধ—কোনোটিই তাঁকে বিশ্রাম নিতে রাজি করাতে পারেনি। তাঁর জীবনে যেন একমাত্র শব্দ ছিল— কাজ, কাজ, আর কাজ। প্রকৃতির উদার সন্তান যেমন অযত্নে নিজের সব সম্পদ ব্যয় করে ফেলে, তেমনি তিনি নিজের শক্তির শেষ সঞ্চয়টুকুও নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন। তাঁর ক্রমাবনতিশীল স্বাস্থ্য নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলাম। মাঝে মাঝে তাঁকে অনুরোধ করতাম, এত দীর্ঘ সময় কাজ না করতে, কিছুদিনের জন্য অবিরাম সফর বন্ধ রাখতে। কারণ সেই সময় তিনি ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন রাজনৈতিক সংগ্রামের কাজে। তখন তিনি বলতেন, “কোনো সেনাপতিকে কি কখনও ছুটি নিতে দেখেছ, যখন তাঁর বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে?” তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি একটি সুগঠিত যুক্তিকে মাত্র একটি বাক্যেই ভেঙে দিতে পারতেন। তাঁর সঙ্গে তর্কে আমার জেতার কোনো সুযোগই ছিল না। তাই তখন আমি যুক্তির পথ ছেড়ে আবেগের আশ্রয় নিতাম। আমি বলতাম, “কিন্তু আপনার জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন তো আপনাকেই নিতে হবে।”

তিনি দূরে কোথাও দৃষ্টি স্থির করে শান্ত কণ্ঠে বলতেন,একজন মানুষের স্বাস্থ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, যখন আমার চিন্তার বিষয় ভারতের দশ কোটি মুসলমানের অস্তিত্ব? তুমি কি উপলব্ধি করতে পারছ, এখানে কত বড় স্বার্থ জড়িত?” এই কথার পর আর আমার আবেগের কোনো স্থান থাকত না। তিনি আবারও নিজেকে রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তাল সাগরে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত করতেন— নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি চরম উদাসীন থেকে।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন কার্যকর হওয়ার পর ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সারা ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো মুসলিম লীগ নিজস্ব প্রার্থী প্রক্ষেপ করে। সে সময় দলটি তেমন সুসংগঠিত ছিল না, আর তাদের আদর্শ ও বার্তাও তখনো সাধারণ মুসলমানদের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। তাই দলকে সংগঠিত করা, জনমত গড়ে তোলা এবং মুসলিম লীগের পক্ষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার প্রধান দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে।

তিনি যত বেশি দেশজুড়ে সফর করতেন এবং জনসভায় ভাষণ দিতেন, ততই বিভিন্ন শহর, মফস্বল ও গ্রাম থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হতো। সর্বত্র তাঁকে অনুরোধ করা হতো মুসলমানদের কাছে মুসলিম লীগের বার্তা পৌঁছে দিতে। ধীরে ধীরে মুসলমানরা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল যে, ঐক্যবদ্ধ না হলে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে না।

তিনি যেখানে যেতেন, আমি তাঁর সঙ্গেই থাকতাম। মুসলমানদের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই পরিবর্তন ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। প্রতিটি জনসভায় ক্রমবর্ধমান মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করছিল যে মুসলিম লীগ মানুষের মনে ক্রমেই দৃঢ় স্থান করে নিচ্ছে, পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি বক্তৃতায় বলতেন, মুসলমানদের হাতে এক বিরাট শক্তি রয়েছে। যদি তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে ভবিষ্যতের যেকোনো রাজনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারণে সেই শক্তি হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই আহ্বানে জনসমুদ্র বারবার দীর্ঘ করতালিতে ফেটে পড়ত।

একজন দূরদর্শী ও প্রেরণাদায়ী নেতার দৃঢ় কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করতেন—“সবাই উপলব্ধি করুন, মুসলিম লীগ এসেছে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে। মুসলিম লীগের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে নস্যাৎ করার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। মুসলমানরা এগিয়ে চলেছে, আর পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাদের সফল হওয়ার সংকল্পকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।”

তাঁর ভাষণ যখন আশা, আত্মবিশ্বাস ও অঙ্গীকারের উচ্চতম সুরে শেষ হতো, তখন বিশাল জনতা একসঙ্গে গর্জে উঠত—

“মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ!”
“মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জিন্দাবাদ!”

১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে যে ঐতিহাসিক প্রস্তাব গৃহীত হয়—যা পরে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে পরিচিতি লাভ করে—তার পর থেকেই তিনি নিজের ক্রমশ অবনতিশীল স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে আরও কঠোর পরিশ্রমে আত্মনিয়োগ করেন।

চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এবং তেমন সংগঠিত নয় এমন একদল সমর্থকই ছিল তাঁর একমাত্র শক্তি। তবু তিনি দৃঢ় সংকল্প নিয়েছিলেন, পাকিস্তানের দাবিকে তিনি মানব ইতিহাসের এক বীরত্বগাঁথায় পরিণত করবেন।

অবিরাম সফর, দিনের পর দিন দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর কর্মঘণ্টা, আর সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের অবিরাম দুশ্চিন্তা—সবকিছুই তাঁর শরীরের ওপর প্রচণ্ড চাপ ফেলছিল। কিন্তু তিনি সেই চাপ হাসিমুখেই স্বীকার করে নিতেন।

পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি উচ্চতার তাঁর শরীরের স্বাভাবিক ওজন ছিল প্রায় ১১২ পাউন্ড। কিন্তু নিরন্তর পরিশ্রমে সেই ওজন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছিল। তবুও নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে তিনি যেন সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত শারীরিক সুস্থতার চেয়ে জনগণের কাজই ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমি বারবার তাঁকে অনুরোধ করেছি, অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে এবং নিজের শরীরের প্রতি অন্তত কিছুটা যত্নবান হতে। কিন্তু তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির যে প্রবল স্রোত নিজের জাতির অগ্রযাত্রার পথে দাঁড়ানো সব বাধা ভেঙে এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, তাকে থামাতে আমি কখনোই সফল হইনি।

মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের পাশাপাশি তাঁকে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ পার্টির নেতার গুরুদায়িত্বও বহন করতে হতো।

১৯৪০ সালের নভেম্বরের প্রথম দিকে আমরা দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইনসভার অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য বোম্বে থেকে রওনা হই। কয়েক দিন ধরেই তাঁর হালকা জ্বর ছিল, তবুও তিনি যাত্রা স্থগিত করেননি। রাতের খাবার শেষে ট্রেনটি নির্মল আকাশের নিচে অসংখ্য জ্বলজ্বলে তারার সঙ্গী হয়ে দ্রুতগতিতে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছিল।

তিনি শয্যায় শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ এমন এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন, যেন কেউ তাঁকে লাল-গরম লোহার শলাকা দিয়ে বিদ্ধ করেছে। আমি তৎক্ষণাৎ তাঁর পাশে গিয়ে চিৎকারের কারণ জানতে চাইলাম। যন্ত্রণার তীব্রতায় তিনি কথা বলার শক্তিই হারিয়ে ফেলেছিলেন। কেবল আঙুল দিয়ে মেরুদণ্ডের নিচের দিকে, ডান পাশে একটি স্থানের দিকে ইঙ্গিত করলেন। বোঝাই যাচ্ছিল, যন্ত্রণাটি অসহনীয়। চলন্ত ট্রেনে কোনো চিকিৎসকের সাহায্য পাওয়াও সম্ভব ছিল না।

আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আলতো করে মালিশ করলে কিছুটা আরাম পাবেন। তাই খুব সতর্কভাবে ব্যথার জায়গায় মালিশ করতে শুরু করলাম। কিন্তু তাতে যন্ত্রণা আরও বেড়ে গেল। নিরুপায় হয়ে চেষ্টা ছেড়ে দিলাম এবং অপেক্ষা করতে লাগলাম, কখন ট্রেনটি কোনো স্টেশনে থামবে, যাতে একটি গরম পানির বোতল এনে সেঁক দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি। প্রতিটি মুহূর্ত যেন ভারী হয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে ব্রেকের কর্কশ শব্দ শোনা গেল, এবং ট্রেনটি একটি স্টেশনে এসে থামল।

আমি সঙ্গে সঙ্গে গার্ডকে ডেকে আমাদের কামরায় একটি গরম পানির বোতল এনে দিতে বললাম। বোতলটি একটি ন্যাপকিনে জড়িয়ে আলতো করে ব্যথার স্থানে সেঁক দিলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, তাঁর ব্যথা কিছুটা কমেছে। এতে আমি স্বস্তি পেলাম।

ভোরের দিকে ট্রেনটি দিল্লি স্টেশনে পৌঁছাল। সেখান থেকে আমরা দ্রুত ১০, আওরঙ্গজেব রোডে অবস্থিত আমাদের দিল্লির বাসভবনে পৌঁছাই। আমি তাঁকে গাড়ি থেকে ধরে ধরে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চিকিৎসককে টেলিফোন করে আসতে বললাম।

ডাক্তার বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানালেন যে, এটি প্লুরিসি(ফুসফুসের আবরণে প্রদাহ) রোগের আক্রমণ, এবং তাঁকে অন্তত দুই সপ্তাহ সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে।

ডাক্তার চলে যাওয়ার পর আমার ভাই আমাকে বললেন- “কী দুর্ভাগ্য! এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিবেশন। সেখানে আমার উপস্থিতি খুবই প্রয়োজন। অথচ আমি এখানে বাধ্য হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি—এবং অনিচ্ছাকৃত বিশ্রামের বিলাসিতা উপভোগ করছি!”

কিন্তু তিনি মাত্র দুই দিন শয্যাশায়ী ছিলেন। তারপরই আবার কাজে ফিরে গেলেন। তাঁর মন ছিল অদম্য ও অস্থির—যে সময়ে তাঁর জাতির ইতিহাসও ছিল সংগ্রাম ও অস্থিরতায় পরিপূর্ণ।

সেটি ছিল কেন্দ্রীয় আইনসভার এক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন। ভারতের যুদ্ধপ্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের প্রশ্নে মুসলিম লীগের অবস্থান ব্যাখ্যা করার গুরুদায়িত্ব তাঁর ওপরই বর্তায়। আমি দর্শক গ্যালারি থেকে তাঁকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য দাঁড়াতে দেখে মনে মনে ভাবছিলাম, তিনি আদৌ কয়েক মিনিটের বেশি কথা বলতে পারবেন কি না। তিনি যখন বক্তৃতা শুরু করলেন, তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ ছিল। কিন্তু বক্তব্য যত এগোতে লাগল, ততই সেই ক্লান্তির চিহ্ন মিলিয়ে গেল। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস ও তীক্ষ্ণ যুক্তির ভঙ্গিতে ফিরে এলেন।

ভারতীয় মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য তিনি সরকারের কপট প্রচারণাকে ব্যঙ্গ করলেন এবং কঠোর ভাষায় সরকারের সমালোচনা করে বললেন— “অবশ্যই, প্রচারণার মাধ্যমে অনেক কিছু করা যায়; কিন্তু এমন কিছু বিষয় আছে, যা কেবল ভয় সৃষ্টি করে কখনোই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়…”

তিনি আরও বলেন— “আজকাল দুর্বল পক্ষকে উপদেশ দেওয়াই যেন একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। আপনারা দুর্বল পক্ষকে উপদেশ দিতে পারেন… কিন্তু যে ব্যয়ের ওপর আমাদের কোনো অংশীদারিত্ব নেই, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কোনো কর্তৃত্ব নেই—সেই ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দের পক্ষে আমরা কখনোই ভোট দিতে পারি না।”

তিনি উষ্ণ কণ্ঠে বলতে থাকলেন—“যদি কংগ্রেস সরকারকে পরাজিত করতে সফল হয়, তবে তার জন্য আমি দায়ী নই; দায়ী আপনাদের সংবিধান। এই সংবিধান তো আপনারাই প্রণয়ন করেছেন। দশকের পর দশক ধরে আপনারাই এই সেকেলে, অচল ও যুগোপযোগিতা হারানো শাসনব্যবস্থা চালিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে দুই ধরনের দাবি করা চলে না। এটি আপনাদেরই সংবিধান, আপনাদেরই সৃষ্টি।”

তিনি আরও বলেন—“আমি এই আইনসভার মেঝেতে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করে বলছি যে, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমঝোতা না হওয়ার প্রধান কারণ হলো—কংগ্রেসের নেতারা, আমাকে ক্ষমা করবেন, কংগ্রেস প্রকৃতপক্ষে একটি হিন্দু সংগঠন, তারা যা-ই বলুন না কেন। হিন্দু ও কংগ্রেস নেতাদের মনে সব সময় এই ধারণাই কাজ করেছে যে মুসলমানদের শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ও হিন্দু রাজের অধীনেই আসতে হবে। তাদের দৃষ্টিতে মুসলমানরা কেবল একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, তাই তারা সংখ্যালঘু হিসেবে কিছু নিরাপত্তা বা সুরক্ষা ছাড়া আর কিছু ন্যায্যভাবে দাবি করতে পারে না।

কিন্তু আমি কংগ্রেস ও ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির সম্মানিত সদস্যদের বলতে চাই যে, গত পঁচিশ বছর ধরে মুসলমানদের অবস্থান কখনোই এরকম ছিল না। তাদের মৌলিক বিশ্বাস ছিল এবং রয়েছে—তারা একটি স্বতন্ত্র সত্তা (Separate Entity)।

এ সময় মি. এম. এস. আনে তাঁকে বাধা দিয়ে বলে ওঠেন, “অন্তত ১৯২০ সালের আগে তো মি. জিন্নাহর মতামত এমন ছিল না।”

কায়েদে আজম সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, “১৯১৬ সাল থেকে—লখনউ চুক্তি (Lucknow Pact) গৃহীত হওয়ার পর থেকেই—দুটি পৃথক সত্তার মৌলিক নীতির ভিত্তিতেই আমাদের অবস্থান।”

মি. আনে তাতেও সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, “আমি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম।”

কায়েদে আজম সম্পূর্ণ শান্ত ও অবিচল থেকে শীতল কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “আমার বন্ধু হয়তো সেখানে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু সেই সময় তাঁর নামই কেউ শোনেনি।”

এই তীক্ষ্ণ ও বিধ্বংসী মন্তব্যে সাধারণত অত্যন্ত বাকপটু মি. আনে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যান।১০

তিনি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ভাষণ দিয়েছিলেন, তবুও তখনও দাঁড়িয়েই ছিলেন। তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা যে মোটেই ভালো ছিল না, সে কারণে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। সৌভাগ্যবশত তিনি বক্তৃতা শেষ করলেন। সমাপ্তিতে তিনি বললেন—“ভুলাভাই দেশাই তাঁর পুরো বক্তৃতায় মাত্র দুটি বিষয়ের ওপরই জোর দিয়েছেন— গণতন্ত্র, গণতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং একটি জাতীয় সরকার! কিন্তু তাতে কী লাভ? সেই মন্ত্রিসভা যাই হোক না কেন, তাকে এই আইনসভার কাছেই জবাবদিহি করতে হবে— আর সেখানে মি. ভুলাভাই দেশাই নির্বাচিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন আদায় করতে পারবেন। আমি সেই ব্যক্তির জন্য দুঃখ অনুভব করব, যিনি সেই মন্ত্রিসভার সদস্য হবেন কিন্তু কংগ্রেসের নির্দেশ ও কংগ্রেসের আদেশ মানবেন না!”

আইনসভা থেকে আমরা যখন গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলাম, তখন আমি লক্ষ্য করলাম তাঁর হাত কাঁপছে, এমনকি তাঁর আঙুলগুলোও কষ্ট করে সিগারেট ধরে রাখতে পারছিল। বাড়িতে পৌঁছেই তিনি পোশাক পরিবর্তন করারও সময় নিলেন না; সরাসরি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন।

আমার মতে, সেই প্লুরিসি (ফুসফুসের আবরণে প্রদাহ) আক্রমণই ছিল তাঁর সেই অসুস্থতার সূচনা, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন কেড়ে নেয়। তিনি হয়তো সুস্থ হয়ে উঠতে পারতেন, যদি নিজের যথাযথ যত্ন নিতেন, নিয়মিত জীবনযাপন করতেন এবং উপমহাদেশজুড়ে প্রায় বিরামহীন সফরের সময় ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিজেকে বারবার উন্মুক্ত না রাখতেন। এরপর থেকে তিনি সর্দি-কাশিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। সামান্য ঠান্ডাও দ্রুত তীব্র জ্বর ও যন্ত্রণাদায়ক কাশির রূপ নিত।

কয়েক মাস পরে, অর্থাৎ ১৯৪১ সালের এপ্রিল মাসে, আমরা বোম্বে থেকে মাদ্রাজের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেখানে তিনি সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের মাদ্রাজ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল।১১ আমাদের ট্রেন তখন মাদ্রাজ থেকে কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে। তিনি আসন ছেড়ে শৌচাগারের দিকে যাচ্ছিলেন। আমি বিস্মিত হয়ে দেখলাম, কয়েক কদম এগোতেই তিনি ট্রেনের কাঠের মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।

আমি তড়িঘড়ি তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- “জিন,(মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ডাকনাম বা আদরের সংক্ষিপ্ত সম্বোধন) কী হয়েছে?”

তিনি ক্লান্ত এক মৃদু হাসি হেসে বললেন, “আমি খুব দুর্বল অনুভব করছি… ভীষণ ক্লান্ত।” তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন এবং টলতে টলতে নিজের শয্যার দিকে ফিরে এলেন।

সৌভাগ্যক্রমে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রেনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশনে থামল। সেখানে হাজার হাজার উৎসাহী মুসলিম লীগ সমর্থক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন— “কায়েদে আজম জিন্দাবাদ!”

আমি আমাদের কামরার দরজা সামান্য খুলে বললাম- “চিৎকার করবেন না। কায়েদে আজম শয্যাশায়ী। অতিরিক্ত ক্লান্তি ও জ্বরে তিনি অসুস্থ। তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তার নিয়ে আসুন।”

কয়েক মিনিটের মধ্যেই একজন ডাক্তার এলেন। তিনি পরীক্ষা করে বললেন-“স্যার, আপনার হালকা ধরনের স্নায়বিক অবসাদ (নার্ভাস ব্রেকডাউন) হয়েছে। বিষয়টি গুরুতর নয়। তবে অন্তত এক সপ্তাহ আপনার চলাফেরা করা উচিত হবে না। আপনাকে পুরো এক সপ্তাহ বিছানায় বিশ্রামে থাকতে হবে।”

আমরা তখন মাদ্রাজে পৌঁছেছি। সেখানে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য হাজার হাজার প্রতিনিধি সমবেত হয়েছিলেন। কায়েদে আজম প্রথম দিন এতটাই দুর্বল ছিলেন যে তিনি উন্মুক্ত অধিবেশনে ভাষণ দিতে পারেননি। কিন্তু পরদিন তিনি দৃঢ়ভাবে জানালেন যে তিনি তাঁর সভাপতির ভাষণ অবশ্যই দেবেন।

আমি তাঁকে তা না করার পরামর্শ দিলাম। কিন্তু তিনি যখন নিজের সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন, তখন অন্তত সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম।

তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন- হ্যাঁ, বক্তৃতাটি খুবই সংক্ষিপ্ত হবে।”

এক বিশাল জনসমাবেশে তিনি বক্তৃতা দিতে উঠতেই চারদিকে নেমে এলো নিস্তব্ধ নীরবতা। তিনি কোনো লিখিত নোট ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বক্তব্য রাখলেন। প্রতিটি বিষয় তিনি সুস্পষ্ট যুক্তি ও চিন্তার স্বচ্ছতায় উপস্থাপন করলেন এবং এমন সহজ ভাষায় প্রকাশ করলেন যে, তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতির জটিলতা সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিরাও সহজেই তা বুঝতে পারছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল এমন এক নেতার আত্মবিশ্বাস, যিনি শুধু নিজের লক্ষ্যই জানতেন না, বরং নিজের অনুসারীদের মনোভাব সম্পর্কেও সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন।

তাঁর ভাষণ সংক্ষিপ্ত ছিল না; তিনি টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বক্তব্য রাখেন১২। অসুস্থ শরীর নিয়ে, শয্যা ছেড়ে, নিজের জনগণের মাঝে উপস্থিত হওয়া এই নেতা ভারতের মুসলমানদের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন— আমি যতটা সম্ভব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই যে, সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের লক্ষ্য হলো—ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ প্রতিষ্ঠা করা, যাদের হাতে থাকবে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, যোগাযোগ, শুল্ক, মুদ্রা, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। আমরা কোনো অবস্থাতেই সমগ্র ভারতের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সরকারবিশিষ্ট সংবিধান চাই না। আমরা কখনোই তাতে সম্মত হব না। কারণ একবার যদি আমরা তাতে রাজি হই, তবে ভারতের মুসলমানরা তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলবে। আমাদের স্বাধীন জাতীয় আবাসভূমির উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল কোনো কেন্দ্রীয় সরকার বা অন্য কোনো শক্তির অধীন থাকবে না।১৩

তাঁর এই অসাধারণ বক্তৃতা দেখে আমি গর্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু সেই গর্বের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির আশঙ্কা। তবে সেই বিশাল জনসমুদ্রের সীমাহীন উৎসাহ ও ভালোবাসা যেন তাঁর ক্লান্ত ও অবসন্ন শরীরে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছিল। তিনি নিজের দুর্বলতা, অবসাদ ও জ্বর ভুলে গিয়ে আবারও অক্লান্তভাবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগের সাত বছর ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ত, কঠিন ও ঝড়ো সময়। তিনি ভারতের মুসলমানদের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন, আর মুসলমানরাও তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন ও অবিচল আনুগত্য দিয়েছে। স্নেহভরে তারা তাঁকে কায়েদে-আজম’—অর্থাৎ মহান নেতা’—উপাধিতে ভূষিত করেছিল। মুসলমানদের মুক্তির সংগ্রামে নিজের ভূমিকার গুরুত্ব তিনি তখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উপলব্ধি করছিলেন।

আমি, যিনি সবসময় তাঁর সঙ্গেই থাকতাম, প্রায়ই দেখতাম—তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে কষ্ট করে শয্যা থেকে উঠছেন। পরিপাটি পোশাক পরলেও তাঁর মুখে ক্লান্তি ও অবসাদের ছাপ স্পষ্ট ছিল। তবু আমরা যখন গাড়িতে করে কোনো বিশাল মুসলিম জনসভায় ভাষণ দিতে যেতাম, তখন তিনি নিজের শারীরিক কষ্টের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যেতেন এবং জনগণের উদ্দেশে আবারও একই দৃঢ়তা ও অদম্য মনোবল নিয়ে দাঁড়াতেন।

যাত্রাপথে তিনি কঠোর নীরবতা বজায় রাখতেন। চিন্তাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং নিজের শক্তির প্রতিটি বিন্দু সঞ্চয় করে রাখার জন্য। তিনি তাঁর অনুরাগী অনুসারীদের ভিড়ের মধ্যে প্রবেশ করতেন গম্ভীর মুখে। কখনও ডানে, কখনও বামে সামান্য মাথা নত করে অভিবাদন জানাতেন এবং দলের কর্মীদের উচ্ছ্বসিত শুভেচ্ছার জবাব দিতেন। তাঁর পদক্ষেপ ছিল দৃঢ়, আর চোখে ঝলমল করত আশার দীপ্তি।

মঞ্চে উঠে পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত এবং স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য শেষ হলে তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেন। খালি মাটিতে বসে থাকা হাজার হাজার মানুষের উত্তাল জনসমুদ্রের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে তিনি এমন কণ্ঠে ভাষণ দিতেন, যাতে বার্ধক্য বা অসুস্থতার কোনো ছাপই প্রকাশ পেত না। তিনি যখনই একটু থামতেন, জনতা একসঙ্গে গর্জে উঠত— কায়েদে-আজম জিন্দাবাদ!” তিনি ক্রমেই আরও জোরালো, আরও উদ্দীপনাময় কণ্ঠে তাঁর জনগণের মনে আশা ও সাহস জাগিয়ে তুলতেন। মনে হতো, তারা যেন নির্মেঘ আকাশের নিচে এক দীর্ঘ অন্ধকারের বন্দিত্বে আবদ্ধ। কিন্তু তাঁর জনগণ জানত না, তিনি কতটা ক্লান্ত, অবসন্ন, পরিশ্রান্ত এবং কতটা অসুস্থ ছিলেন। তিনি ছিলেন তাদের নায়ক—আর একজন নায়কের কাছে মানুষ নায়কোচিত আচরণই প্রত্যাশা করে; এজন্য তাদের দোষ দেওয়া যায় না।

বাড়িতে ফিরে নিজের কক্ষের পবিত্র নির্জনতায় তিনি বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে পড়তেন। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে তাঁর শ্বাস ভারী হয়ে উঠত, তিনি হাঁপিয়ে উঠতেন। ইতিহাসের বহু মহান নায়কের মতো তিনিও নিঃসঙ্গতার মধ্যেই স্বস্তি খুঁজে পেতেন। কিন্তু দূর থেকেও তাঁর দীপ্তিমান ব্যক্তিত্বের উষ্ণতা তাঁর জনগণের হৃদয়কে উজ্জীবিত করে রাখত।

সৌভাগ্যবশত, তিনি ইচ্ছামতো ঘুমিয়ে পড়ার এক অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। ফলে দিনের সমস্ত উদ্বেগ ও দায়িত্ব সাময়িকভাবে তাঁর অবচেতন মনের প্রান্তে সরে যেত, যদিও গভীর নিদ্রার উষ্ণতায় সেগুলো পুরোপুরি মিলিয়ে যেত না। ভোরের আলো ফুটতেই আবার এসে হাজির হতো নতুন নতুন চিঠি, নতুন আবেদন, নতুন সমস্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব। তাঁর আত্মা ছিল মানুষের সেবায় নিবেদিত, কিন্তু সেই আত্মা বাস করছিল এমন এক দেহে, যা অবিরাম পরিশ্রম ও অসুস্থতায় জীর্ণ হয়ে পড়েছিল। তবুও বারবার জ্বর এসে তাঁর শরীরকে আরও ক্ষীণ করে দিলেও তিনি বহু বছর ধরে একই দুর্বার কর্মগতিতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

পাকিস্তানের দাবি শেষ পর্যন্ত গৃহীত হলো এবং ১৯৪৭ সালের ১৪–১৫ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলো। করাচির রাস্তায় উল্লাসে মুখর জনতার মধ্য দিয়ে যখন আমরা গভর্নর জেনারেলের ভবনের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন সেই আনন্দোচ্ছ্বাসে মেতে ওঠা মানুষগুলো বুঝতেই পারেনি, কায়েদে-আজম কতটা অসুস্থ ছিলেন। জাতির কাছে সেটি ছিল স্বাধীনতার দিন; আর তাঁর কাছে ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের সফল পরিণতি। গন্তব্যে পৌঁছানো গেলেও যাত্রা তখনও শেষ হয়নি। বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রে সদ্য আত্মপ্রকাশ করা নতুন রাষ্ট্রকে তখন অসংখ্য বিশাল ও জটিল সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছিল। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পাকিস্তানের ভাগ্যের নৌকাকে নিরাপদ বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছিল তাঁর সেই হাত দুটির ওপর, যা বছরের পর বছর পরিশ্রমে ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়েছিল।

অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে আমি দেখেছি, বিজয়ের সেই গৌরবময় মুহূর্তেও কায়েদে-আজম শারীরিকভাবে মোটেই সুস্থ ছিলেন না। তাঁর প্রায় কোনো ক্ষুধাই ছিল না; ভালোবাসা ও যত্ন দিয়ে তৈরি করা সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারও তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারত না। তাঁর জীবনের দীর্ঘদিনের অভ্যাস—ইচ্ছামতো ঘুমিয়ে পড়া— হারিয়ে গিয়েছিল। তিনি অসংখ্য রাত নির্ঘুম কাটাতেন, অস্থির বালিশে এপাশ-ওপাশ করতে করতে। তাঁর কাশি বেড়ে চলেছিল, সঙ্গে বাড়ছিল জ্বরও।

পাকিস্তানের সীমান্তের ওপার থেকে একের পর এক ভয়াবহ সংবাদ আসছিল—মুসলমানদের গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের বিভীষিকাময় কাহিনি। এসব হৃদয়বিদারক খবর তাঁর অত্যন্ত সংবেদনশীল মনকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।

তিনি নাশতার টেবিলে বসে যখন আমার সঙ্গে এই গণহত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন, তখন প্রায়ই তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠত। ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাণ বাঁচাতে হেঁটে হেঁটে এসে পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া মুসলিম শরণার্থীদের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করত। যে পাকিস্তানকে তারা নিজেদের প্রতিশ্রুত ভূমি (Promised Land) বলে মনে করেছিল, সেখানে পৌঁছেও তাদের সীমাহীন কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করে তুলত।

এরপর ছিল পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের বিশাল দায়িত্ব। যখনই কিছুটা সময় পেতেন, তিনি নিজের অধ্যয়নকক্ষে বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধান সম্পর্কিত বইপত্র নিয়ে গভীর মনোযোগ সহকারে কাজ করতেন। কাশ্মীরের মুসলমানদের সমস্যাও তাঁর মনকে ভারাক্রান্ত করে রাখত। এক বিদেশি ও অত্যাচারী শাসকের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিল তারা।(বিদেশি ও অত্যাচারী শাসক” বলতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদেরই বোঝানো হয়েছে।) পাকিস্তান বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছিল বটে, কিন্তু নিজের মাটিতে এখনও দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি।

এই ছিল সেই সমস্যাগুলো, যেগুলো নিয়ে তিনি সকাল, দুপুর ও রাত—সবসময় কথা বলতেন। এই চিন্তাগুলোই তাঁর মনের শান্তি কেড়ে নিত এবং দুঃস্বপ্নের প্রেতাত্মার মতো তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত।

করাচিতে আমাদের পৌঁছানোর কয়েক দিন পর, তাঁর সম্মানে করাচি ক্লাবে আয়োজিত এক নৈশভোজে তিনি বলেছিলেন—“মিস ফাতিমা জিন্নাহ আমার জন্য সর্বদা সাহায্য ও প্রেরণার উৎস। যে সময় আমি ব্রিটিশ সরকারের হাতে বন্দি হওয়ার আশঙ্কা করছিলাম, তখন আমার বোনই আমাকে সাহস জুগিয়েছিলেন এবং আশাব্যঞ্জক কথা বলেছিলেন, যখন বিপ্লব যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি সবসময় আমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন।”১৪

তাঁর বক্তৃতা শুনতে আসা মানুষদের কেউই বুঝতে পারেনি যে তাদের প্রিয় নেতা কতটা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। একটি প্রবাদ আছে—সম্পূর্ণ ব্যর্থতার চেয়ে কখনও কখনও সম্পূর্ণ সাফল্যই বীরত্বপূর্ণ প্রেরণার জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছিল, এবং তিনি সাফল্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। কিন্তু তাতেও জনগণের সেবায় আরও বেশি কাজ করার প্রতি তাঁর উৎসাহ, উদ্দীপনা ও নিষ্ঠা একটুও কমেনি।

অসুস্থতার নির্মম আঘাতে তাঁর শারীরিক শক্তি অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল, তবু তাঁর অদম্য মনোবলের জন্য তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর নবগঠিত জাতির সামনে যে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো (প্রত্যাহ্বানগুলো) এসে দাঁড়িয়েছিল, তিনি সেগুলোর মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন সাহসের সঙ্গে, সেগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে চেয়েছিলেন এবং উপযুক্ত সমাধান খুঁজে বের করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।

তিনি নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। তাঁর ক্রমাগত কাশি এবং হালকা জ্বর আমাকে দিন দিন আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলছিল। আমার বারবার অনুরোধে তিনি অবশেষে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক কর্নেল ডা. রহমানের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে সম্মত হয়েছিলেন।

ডাক্তারের ওষুধের প্রতি তাঁর এক অস্বাভাবিক অনীহা ছিল। সারা জীবনের এই অভ্যাসের প্রকৃত কারণ আমি কখনও জানতে পারিনি। কর্নেল রহমান তাঁকে পরীক্ষা করে বললেন, তাঁর হালকা ধরনের ম্যালেরিয়ার আক্রমণ হয়েছে এবং সেই রোগ নির্ণয়ের ভিত্তিতেই তিনি চিকিৎসা শুরু করতে চান।

কিন্তু কায়েদে-আজম তাঁর চিকিৎসককে এমনভাবে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলেন, যেন তিনি আদালতে কোনো সাক্ষীকে জেরা করছেন। ডাক্তারের ব্যাখ্যায় তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাই তিনি চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ খেতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, “আমার ম্যালেরিয়া হয়নি। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে আমি কেবল দুর্বল হয়ে পড়েছি। এ অবস্থায় বিশ্রামই ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ, কিন্তু সেটিও তিনি নিতে রাজি ছিলেন না। কারণ তাঁর সামনে তখনও অসংখ্য কাজ বাকি ছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন-“আমার জনগণের সেবায় আমি আমার শারীরিক শক্তির খনিকে শেষ ধাতুকণাটি পর্যন্ত খনন করে যাব। আর যখন সেই শক্তিও নিঃশেষ হয়ে যাবে, তখন আমার কাজও শেষ হবে; কারণ তখন জীবনও আর থাকবে না।”

খোখরাপার সীমান্ত১৫ দিয়ে তখন শরণার্থীরা দলে দলে পাকিস্তানে প্রবেশ করছিল। তিনি লাহোরে যেতে চেয়েছিলেন, যাতে শরণার্থী শিবিরগুলো এবং তাদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা নিজ চোখে দেখতে পারেন।

তাঁর সামনে তখন দুটি পথ খোলা ছিল। একদিকে ছিল সেই মহান আদর্শ ও দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, যাকে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে করতেন; অন্যদিকে ছিল নিজের স্বাস্থ্য, যা তাঁর জীবনকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র অবলম্বন। তিনি কর্তব্যের আহ্বানই গ্রহণ করলেন এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ উপেক্ষা করলেন। তাঁর ব্যক্তিসত্তা সম্পূর্ণভাবে নেতাসত্তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।

সুতরাং ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, করাচিতে পৌঁছানোর প্রায় এক মাস পর, আমরা করাচি থেকে লাহোরের উদ্দেশে রওনা হলাম। লাহোরে কয়েক দিন থাকার পর আবার করাচিতে ফিরে এলাম। কিন্তু করাচিতে আমাদের তিন সপ্তাহও কাটেনি, অক্টোবরের শেষ দিকে আবার লাহোরে যেতে হলো।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা তাঁর কাছে ছিল কেবল তাঁর জীবনের ও কর্মের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। এর পরেই শুরু হয় আরেকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—পাকিস্তানকে সুসংহত করা এবং তার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। জাতি যখন গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল, তখন তিনি নিজের দায়িত্বের স্থান ত্যাগ করার কথা কল্পনাও করতে পারেননি। নিজের স্বাস্থ্যের প্রতিও তিনি কোনো রকম ছাড় দেননি।

পাকিস্তানের আকাশে তখন হতাশার কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মনে নতুন উদ্দীপনা, সাহস ও আশার সঞ্চার করতে, যাতে হতাশা ও নিরাশার অন্ধকার দূর হয়ে যায়।

১৯৪৭ সালের ৩০ অক্টোবর লাহোরের ইউনিভার্সিটি স্টেডিয়ামে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন— “অনেকের মনে হতে পারে যে ৩ জুনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা মুসলিম লীগের একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আমি তাদের বলতে চাই, অন্য কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তার পরিণতি এতটাই ভয়াবহ হতো যে তা কল্পনাও করা যায় না। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি সম্পূর্ণ পরিষ্কার বিবেক এবং আন্তরিক উদ্দেশ্য নিয়ে। সময় ও ইতিহাস একদিন তা প্রমাণ করবে।

অন্যদিকে, ইতিহাস তাদের বিরুদ্ধেও তার রায় লিপিবদ্ধ করবে, যাদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র এই উপমহাদেশে বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের শক্তিকে মুক্ত করে দিয়েছিল। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, অগণিত সম্পদ ধ্বংস হয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি ও প্রিয় সবকিছু থেকে উৎখাত হয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ ও দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়েছে।

নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানুষের ওপর যে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয়েছে, তা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম স্বৈরাচারীদের সংঘটিত সবচেয়ে জঘন্য নৃশংসতাকেও লজ্জায় ফেলে দেয়। আমরা একটি সুপরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি, যা সততা, বীরোচিত আচরণ এবং সম্মানের মতো মানবতার মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি সম্পূর্ণ অবহেলা প্রদর্শন করে কার্যকর করা হয়েছে।

এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মহান আল্লাহ আমাদের যে সাহস ও ঈমান দান করেছেন, তার জন্য আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। আমরা যদি পবিত্র কুরআন থেকে অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করি, তবে আমি আবারও বলছি—চূড়ান্ত বিজয় অবশ্যই আমাদেরই হবে।”১৬

তিনি যখন তাঁর বক্তৃতা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আবেগে তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠেছিল। সেই প্রথমবার আমি তাঁকে মৃত্যুর কথা বলতে শুনি।

তিনি বললেন—“এর পাশাপাশি তোমাদের মনোবল অটুট রাখো। মৃত্যুকে ভয় কোরো না। আমাদের ধর্ম আমাদের সবসময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে শিক্ষা দেয়। পাকিস্তান ও ইসলামের সম্মান রক্ষার জন্য আমাদের সাহসের সঙ্গে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। একজন মুসলমানের জন্য ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্যে শহীদের মৃত্যু লাভের চেয়ে বড় মুক্তি আর কিছু হতে পারে না। … তোমরা তোমাদের কর্তব্য পালন করো এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখো। পৃথিবীর কোনো শক্তিই পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে পারবে না। পাকিস্তান এসেছে, এবং চিরস্থায়ীভাবেই থাকবে।”১৭

তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পাকিস্তানে আগত শরণার্থীদের স্বার্থে যা কিছু সম্ভব ছিল, তা-ই করেছিলেন। তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এই নিশ্চয়তা পেয়ে আমরা করাচিতে ফিরে এলাম। কিন্তু সেই সফরের আবেগঘন পরিবেশ এবং নিজের জনগণের দুর্ভোগের দৃশ্য তাঁর শরীরের পাশাপাশি মন ও আত্মাকেও গভীরভাবে ক্লান্ত করে তুলেছিল। আবারও তিনি প্রচণ্ড অবসাদ ও ক্রমবর্ধমান জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

এদিকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রের সরকারকে শূন্য থেকে কাজ শুরু করতে হয়েছিল, ফলে প্রতিদিনই কাজের চাপ বেড়ে চলছিল। নথিপত্রের স্তূপ জমতে লাগল, মন্ত্রী ও সচিবেরা তাঁর পরামর্শ নিতে একের পর এক আসতে থাকলেন। শান্তি ও বিশ্রামের কোনো সুযোগই আর ছিল না তাঁর।

তাঁর জীবন যেন কয়েক সপ্তাহের নিরবচ্ছিন্ন কাজ আর কয়েক দিনের বাধ্যতামূলক বিশ্রামের মধ্যে দোল খেতে লাগল। তিনি সীমান্ত প্রদেশের (ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স) জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি পেশোয়ারে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন। কারণ, আগের বছরের গণভোটে তাঁরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং সেই গণভোটের মাধ্যমেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে চাননি। তাই ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে আমরা পেশোয়ারে গেলাম, যেখানে তাঁর জন্য ছিল অত্যন্ত ব্যস্ত কর্মসূচি।

১৯৪৮ সালের ১২ এপ্রিল ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছিলেন—

এই উপলক্ষে আমার মনে যে বিষয়টি সর্বাগ্রে স্থান করে নিয়েছে, তা হলো পাকিস্তান অর্জনের আন্দোলনে, বিশেষ করে এই প্রদেশের ছাত্রসমাজ যে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছিল, তার কথা। আমি মনে করি, গত বছর অনুষ্ঠিত গণভোটে এই প্রদেশের জনগণ যে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, তার পেছনে ছাত্রসমাজের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশেষভাবে গর্ব অনুভব করি যে, এই প্রদেশের জনগণ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কখনোই পিছিয়ে থাকেনি; বরং সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।”১৮

পরের দিন আমরা রিসালপুরে রওনা হলাম। সেখানে তাঁকে রয়্যাল পাকিস্তান বিমানবাহিনীর (Royal Pakistan Air Force) কর্মকর্তা ও সদস্যদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে হতো।

দেশভাগের সময় যে সমঝোতা অনুযায়ী কিছু সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানের পাওয়ার কথা ছিল, ভারত সেগুলো নিজেদের কাছেই রেখে দিয়েছিল। ফলে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত বিমান ও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জামের অভাব দেখা দিয়েছিল। সেই উপলক্ষে তিনি বলেছিলেন: “আমি এটাও জানি যে, আপনাদের বিমান ও অন্যান্য সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং আধুনিক বিমান সংগ্রহের জন্যও ইতোমধ্যে অর্ডার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সংখ্যক বিমান ও জনবল থাকলেও তাতে খুব বেশি লাভ হবে না, যদি বিমানবাহিনীর মধ্যে দলগত চেতনা না থাকে এবং কঠোর শৃঙ্খলাবোধ বজায় না থাকে। আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাই—মনে রাখবেন, কেবল শৃঙ্খলা ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমেই রয়্যাল পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাকিস্তানের উপযুক্ত মর্যাদা অর্জন করতে পারবে।”১৯

১৪ই এপ্রিল তিনি পেশোয়ারের গভর্নমেন্ট হাউসে সিভিল অফিসারদের একটি সভা আহ্বান করেন। সেখানে তিনি তাঁদের অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, আন্তরিকভাবে মিশে যান এবং এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বলেন— “আমি প্রথমেই আপনাদের একটি কথা বলতে চাই। কোনো রাজনৈতিক চাপ, কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো ব্যক্তিগত রাজনীতিকের প্রভাবে আপনারা যেন কখনো প্রভাবিত না হন। যদি পাকিস্তানের মর্যাদা ও মহানতা বৃদ্ধি করতে চান, তবে কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। জনগণ ও রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে নির্ভীকভাবে এবং সততার সঙ্গে আপনাদের দায়িত্ব পালন করুন।

রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো সরকারি প্রশাসন। সরকার গঠিত হয়, সরকার পতনও ঘটে। প্রধানমন্ত্রী আসেন ও চলে যান, মন্ত্রীরাও আসেন ও চলে যান; কিন্তু আপনারা থেকে যান। তাই আপনাদের কাঁধে এক বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো রাজনৈতিক নেতাকে সমর্থন করা আপনাদের কাজ নয়। সংবিধান অনুযায়ী যে সরকারই গঠিত হোক এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় যেই প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী ক্ষমতায় আসুন না কেন, তাঁদের সরকারের প্রতি বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা আপনাদের কর্তব্য। একই সঙ্গে নির্ভীক থেকে আপনাদের উচ্চ সুনাম, মর্যাদা, সম্মান এবং সরকারি সেবার সততা ও অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।

আপনারা যদি এই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেন, তবে আমাদের কল্পিত ও স্বপ্নের  পাকিস্তান গঠনে এক মহান অবদান রাখতে পারবেন—এক গৌরবময় রাষ্ট্র, যা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হবে।”

এরপর তিনি বলেন—“আপনাদের উদ্দেশে এসব কথা বলার পাশাপাশি আমি আমাদের রাজনৈতিক নেতা ও রাজনীতিবিদদেরও একইভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, তাঁরা যদি কখনো আপনাদের কাজে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেন বা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেন— যার ফল শুধু দুর্নীতি, ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি; যা একটি ভয়াবহ ব্যাধি এবং যার কারণে শুধু আপনাদের প্রদেশ নয়, অন্যান্য প্রদেশও ভুগছে—তবে আমি বলব, তাঁরা পাকিস্তানের কোনো উপকার করছেন না; বরং পাকিস্তানের প্রতি চরম অমঙ্গল সাধন করছেন…”

“আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো মন্ত্রীদের খেয়াল-খুশি পূরণ না করার কারণে তাদের রোষের শিকার হতে পারেন। আমি আশা করি এমনটি হবে না। কিন্তু এমনও হতে পারে যে, আপনারা কোনো ভুল কাজ করছেন বলে নয়, বরং সঠিক কাজ করছেন বলেই নানা ধরনের হয়রানি বা সমস্যার সম্মুখীন হবেন।

ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়। তাই প্রয়োজন হলে আমি আপনাদের আহ্বান জানাই—দেশের স্বার্থে সেই ত্যাগ স্বীকার করতে এগিয়ে আসুন। কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও, কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের হয়রানি বা দুর্ভোগের মুখোমুখি হলেও সাহসের সঙ্গে তা মোকাবিলা করতে হবে।

আপনাদের যদি আমাকে আপনাদের এই ত্যাগের সুযোগ দেন— অন্তত আপনাদের মধ্যে কয়েকজন যদি এমন আত্মত্যাগে এগিয়ে আসেন—তবে বিশ্বাস করুন, খুব শিগগিরই আমরা এর কার্যকর প্রতিকার করতে সক্ষম হব। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, যদি আপনারা সততা, আন্তরিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি অবিচল আনুগত্যের সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেন, তবে আপনাদের ব্ল্যাকলিস্টে থাকতে হবে না।

আপনারাই আমাদের সেই সুযোগ করে দিতে পারেন, যার মাধ্যমে আমরা এমন একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যা আপনাদের পূর্ণ নিরাপত্তাবোধ প্রদান করবে।

আপনাদের এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে হবে এবং এমন মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে, যাতে প্রত্যেক মানুষ ন্যায্য সুযোগ পায় এবং সবার প্রতি সুবিচার করা হয়। শুধু ন্যায়বিচার করলেই হবে না; মানুষের মনে এই বিশ্বাসও জন্মাতে হবে যে, তাদের সঙ্গে সত্যিই ন্যায়বিচার করা হয়েছে।২০ 

কয়েক দিন পরে তিনি পেশোয়ারের এডওয়ার্ডস কলেজের শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভাষণ প্রদান করেন। সেখানে তিনি স্মরণ করেন ১৯৩৭ সালের সেই দিনটির কথা, যখন তাঁকে “আক্ষরিক অর্থেই এই প্রদেশ থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম লীগের পরাজয়ের দিনগুলোর কথাও স্মরণ করেন। এরপর তিনি গত দুই-তিন বছরে প্রদেশে যে আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল, সে সম্পর্কে কথা বলেন। তিনি সাহসী পাঠান জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যারা পাকিস্তানের পক্ষে বিপুল সমর্থন জানিয়ে রায় দিয়েছিলেন।

ভাষণের শেষে তিনি বলেন—”আমি চাই, তোমরা একটি স্বাধীন, মুক্ত ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকো। তোমাদের সরকার যখন প্রশংসার যোগ্য হবে, তখন তার প্রশংসা করো। আর যখন সমালোচনার যোগ্য হবে, তখন নির্ভয়ে তার সমালোচনা করো। অবশ্যই, যখন কোনো ভুল কাজ করা হবে, তখন নির্ভীকভাবে তার সমালোচনা করো। আমি সমালোচনাকে স্বাগত জানাই। … এভাবেই তোমরা নিজেদের জনগণের কল্যাণে আরও দ্রুত উন্নতি সাধন করতে পারবে।”২১

পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত এক উন্মুক্ত জনসভায় উপস্থিত থাকার সময় আকাশ ছিল কালো মেঘে ঢাকা, যেন অশনি সংকেত দিচ্ছিল। সভা চলাকালীন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়। কিন্তু সেখানে সমবেত হাজার হাজার মানুষ বৃষ্টির আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে নিজেদের আসনে অটল ছিলেন। আমার ভাইও তাঁদের নিরাশ করতে চাননি। আমি তাঁর পাশে বসে বারবার বলছিলাম যে আমাদের চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু তিনি মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে গেলেও প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে পুরো সভায় উপস্থিত থাকলেন।

সেই রাতেই তাঁর নাক দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল, ঠান্ডা লাগল, কাশি ও জ্বর দেখা দিল। আমি ডাক্তার ডাকার পরামর্শ দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন- “এ কিছুই নয়। সামান্য সর্দি। আমি ঠিক হয়ে যাব।”

কিন্তু তিনি আর কখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। করাচিতে ফিরে আসার পরও তাঁর কাশি অব্যাহত রইল। শেষ পর্যন্ত তাঁকে জোর করেই একজন চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে জানা গেল, তিনি মৃদু ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। যদিও কয়েক দিন তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন, তবুও প্রতিদিন তাঁর কাছে সরকারি নথিপত্র (ফাইল) এনে দেওয়া হতো এবং তিনি নিয়মিত সেগুলো দেখতেন।

প্রায় ছয় সপ্তাহ পরে তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। তবে দুর্বলতা তখনও কাটেনি। আমি সব সময় তাঁকে অনুরোধ করছিলাম করাচি ছেড়ে পাকিস্তানের অন্য কোথাও গিয়ে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে, যাতে তাঁর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। আমার এই অনুরোধকে সমর্থন করেছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. রহমান। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, যদি তিনি অন্তত দুই মাসের জন্য সম্পূর্ণভাবে কাজ বন্ধ করে পূর্ণ বিশ্রাম না নেন, তবে তাঁর স্বাস্থ্যের এমন ক্ষতি হবে যা আর কখনও পূরণ করা সম্ভব হবে না।

অবশেষে জুন মাসের একদিন তিনি আমার কথায় সম্মত হলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন যে, করাচির দমবন্ধ করা গরম থেকে দূরে সরে পাকিস্তানের শীতল পার্বত্য নগরী কোয়েটায় যাওয়া যাক।

কোয়েটায় পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই আমি তাঁর স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করলাম। তিনি ভালোভাবে ঘুমাতে পারছিলেন, ভালোভাবে খেতেও পারছিলেন। কাশি প্রায় সেরে গিয়েছিল এবং শরীরের তাপমাত্রাও স্বাভাবিক ছিল। কেবলমাত্র অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিগুলোই তাঁর কাছে আনা হতো। বহু বছরের মধ্যে এই প্রথম তাঁকে দীর্ঘ সময়ের বিশ্রাম উপভোগ করতে দেখেছিলাম।

কোয়েটায় থাকাকালীন মাঝেমধ্যে তিনি কোয়েটার বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের আয়োজিত কয়েকটি জনসভা ও অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সম্মত হতেন। এসব অনুষ্ঠানকে তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সম্পর্কে নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতেন। উদাহরণস্বরূপ, কোয়েটার পারসি সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তাঁকে দেওয়া এক সংবর্ধনার জবাবে তিনি বলেছিলেন— “পরিস্থিতির স্বাভাবিক ধারায় পাকিস্তানের নতুন সংবিধান প্রস্তুত হতে অন্তত আঠারো মাস থেকে দুই বছর সময় লাগবে…”২২ তিনি যখন এই কথাগুলো বলছিলেন, তখন স্বাধীনতার পর বহুবার আমার সঙ্গে তাঁর হওয়া কথোপকথনের কথা আমার মনে পড়ে গেল। তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলতেন যে, পাকিস্তানের জন্য যত দ্রুত সম্ভব একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা দরকার—যে সংবিধান হবে উদার এবং  জনগণের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। তাঁর আশা ছিল, প্রায় দুই বছরের মধ্যেই তিনি এই কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। তিনি বলতেন, “এটি হবে এমন একটি সংবিধান, যা একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন জনগণের মর্যাদার উপযুক্ত হবে।”

কিন্তু তাঁর সংবেদনশীল মনকে অত্যন্ত পীড়া দিত এই ভেবে যে, বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে এত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বিলম্বিত হচ্ছে।

অভ্যর্থনার জবাবে বক্তব্য অব্যাহত রেখে তিনি পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের সমস্যা সম্পর্কে বললেন— “আপনারা জানেন, আমার সরকার এবং আমার ব্যক্তিগত নীতি হলো— জাতি, বর্ণ, ধর্ম বা গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি সম্প্রদায়ের প্রত্যেক সদস্যের জীবন, সম্পদ ও সম্মান পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। পাকিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং যে কোনো মূল্যে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে।“ ২৩

পরের দিন তিনি কোয়েটা স্টাফ কলেজের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। দৃঢ় ও জোরালো কণ্ঠে তিনি বলেন— “আরও একটি বিষয় আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ, এক-দুজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনার সময় আমি লক্ষ্য করেছি যে, পাকিস্তানের সেনাসদস্যরা যে শপথ গ্রহণ করে, তার প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে তারা অবগত নন। অবশ্যই, শপথ গ্রহণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিষয়; এর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই শপথের প্রকৃত চেতনা এবং আন্তরিকতা সম্পর্কে অবগত হওয়া।”

“কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার এবং আমি এই সুযোগে আপনাদের স্মৃতিকে সতেজ করতে চাই—আপনাদের সামনে নির্ধারিত শপথটি পাঠ করে শোনানোর মাধ্যমে। ‘আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপস্থিতিতে সশ্রদ্ধভাবে শপথ (বা দৃঢ় অঙ্গীকার) করছি যে, আমি পাকিস্তানের সংবিধান এবং পাকিস্তান ডোমিনিয়নের প্রতি আনুগত্য পালন করব (এখানে সংবিধান’ এবং পাকিস্তান ডোমিনিয়নের সরকার’—এই শব্দগুলোর প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করুন)। আমি আমার কর্তব্য অনুযায়ী সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পাকিস্তান ডোমিনিয়নের সশস্ত্র বাহিনীতে সেবা করব। আমাকে আকাশপথে, স্থলপথে বা সমুদ্রপথে যেখানে যেতে আদেশ দেওয়া হবে, আমার নিয়োগের শর্তানুযায়ী সেখানে যাব। এবং আমার ঊর্ধ্বতন যে কোনো কর্মকর্তার সকল বৈধ আদেশ আমি মেনে চলব ও পালন করব…।’

আমি একটু আগেই বলেছি, আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই শপথের অন্তর্নিহিত চেতনা। তাই আমি চাই, বর্তমানে পাকিস্তানে যে সংবিধান কার্যকর রয়েছে, আপনারা তা মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করুন এবং যখন আপনারা বলেন যে আপনারা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের সংবিধানের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন, তখন সেই অঙ্গীকারের প্রকৃত সাংবিধানিক ও আইনগত তাৎপর্য ভালোভাবে উপলব্ধি করুন।”২৪

১৫ জুন কোয়েটা পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রদত্ত নাগরিক সংবর্ধনার জবাবে তিনি বলেন, পাকিস্তানের সর্বত্র প্রাদেশিকতার অভিশাপ ছড়িয়ে পড়েছে দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত। তিনি সবাইকে উপদেশ দেন—তারা যেন নিজেদের বেলুচ, পাঠান, সিন্ধি, পাঞ্জাবি বা বাঙালি হিসেবে না দেখে, বরং সর্বাগ্রে এবং সর্বশেষে নিজেদের পাকিস্তানি হিসেবে বিবেচনা করে।

বক্তৃতার শেষের দিকে তিনি বলেন—“প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার এবং প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে ভালো ও কাম্য। কিন্তু যখন মানুষ এগুলোকে কেবল ব্যক্তিগত উন্নতি বা স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তখন এগুলো শুধু তাদের প্রকৃত মূল্যই হারায় না, বরং বদনামও অর্জন করে। আমাদের অবশ্যই তা এড়িয়ে চলতে হবে। আর তা সম্ভব হবে তখনই, যখন আমরা আমাদের প্রতিটি কাজকে নিরন্তর আত্মসমালোচনার আলোকে বিচার করব এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের পরিবর্তে রাষ্ট্রের কল্যাণকেই আমাদের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করব।”

তিনি ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই করাচিতে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পাদনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। আমি আশঙ্কা করছিলাম, এই উদ্দেশ্যে যদি তিনি কোয়েটা থেকে করাচি যান এবং এক-দুদিনের মধ্যে আবার কোয়েটায় ফিরে আসেন, তবে তাঁর অসুস্থতা আবার বেড়ে যেতে পারে। তাই আমি তাঁকে এই সফর থেকে বিরত থাকার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করি এবং পরামর্শ দিই যে, অনুষ্ঠানে তাঁর পরিবর্তে অন্য কাউকে পাঠিয়ে তাঁর প্রস্তুতকৃত ভাষণটি পড়িয়ে শোনানো যেতে পারে।

তিনি উত্তরে বললেন— “তুমি তো জানো, কংগ্রেস এবং হিন্দুরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে পাকিস্তান একটি দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হবে; আমাদের মানুষ বাণিজ্য, শিল্প, ব্যাংকিং, জাহাজ চলাচল কিংবা বীমা পরিচালনা করতে পারবে না। আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়েও আমাদের দেশ পরিচালনার যোগ্যতা রাখি। তাই সেখানে আমার উপস্থিতি অপরিহার্য। কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা আবার কোয়েটায় ফিরে আসব। আমার স্বাস্থ্য নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কী আছে? এটি এমন একটি দায়িত্ব, যা আমাকে পালন করতেই হবে। আমি এটিকে পিছিয়ে দিতে পারি না কিংবা ঝুঁকি নিতে ভয় পাই—এ কথাও বলতে পারি না।”

কোয়েটা থেকে করাচি এবং পুনরায় করাচি থেকে ফেরার এই বিমানযাত্রা তাঁর শারীরিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে। স্টেট ব্যাংকের উদ্বোধনের দিন তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। তিনি এতটাই দুর্বল ছিলেন যে বিছানা ছেড়ে ওঠাও কঠিন ছিল তাঁর পক্ষে। তবুও তিনি উঠে অনুষ্ঠানের উপযোগী পোশাক পরেন এবং বিশিষ্ট অতিথিদের সমাবেশে তাঁর ভাষণ পাঠ করেন।

তাঁর অত্যন্ত দুর্বল স্বাস্থ্যের মধ্যেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার কারণটি তিনি ভাষণের একেবারে প্রথম বাক্যেই ব্যাখ্যা করেছিলেন।

“পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের উদ্বোধন আমাদের রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের প্রতীক।… গভর্নর মহাশয়, আপনি যেমন উল্লেখ করেছেন, অবিভক্ত ভারতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত অমুসলিমদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তাঁদের চলে যাওয়ার ফলে আমাদের নবগঠিত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক জীবনে যথেষ্ট অস্থিরতা ও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্য ও শিল্পের চাকা যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সে জন্য অমুসলিমদের প্রস্থানে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা বিলম্ব না করে পূরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট, তাদেরকে অত্যন্ত কঠিনভাবে আঘাত করেছে। দেশের বর্তমান অস্থিরতা ও অসন্তোষের একটি বড় কারণও এটি। পাকিস্তান সরকারের নীতি হলো—দাম এমন একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখা, যা উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য হবে।

পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানবজাতির জন্য এমন সব সমস্যার সৃষ্টি করেছে, যেগুলোর সমাধান প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অনেকেরই মনে হয়, আজ যে বিপর্যয়ের মুখোমুখি বিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে, তা থেকে কেবল অলৌকিক কোনো ঘটনাই তাকে রক্ষা করতে পারে। এই ব্যবস্থা মানুষের সঙ্গে মানুষের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংঘাত ও বিরোধ দূর করতেও সফল হয়নি। বরং গত অর্ধশতকে সংঘটিত দুটি বিশ্বযুদ্ধের জন্যও এটি অনেকাংশে দায়ী। যান্ত্রিকীকরণ ও শিল্পোন্নয়নের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা বিশ্ব আজ ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব না, যেখানে মানুষ সুখী ও সন্তুষ্ট থাকবে।

আমাদের নিজেদের ভাগ্য আমাদের নিজেদের পথেই গড়ে তুলতে হবে এবং বিশ্বের সামনে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উপস্থাপন করতে হবে, যা ইসলামের প্রকৃত সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে আমরা মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব পালন করব এবং মানবজাতির কাছে শান্তির সেই বাণী পৌঁছে দেব, যা একমাত্র পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ, সুখ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।”২৫.

সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকেই নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছিলেন যে কায়েদে-আজমের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল। তাঁর কণ্ঠস্বর প্রায় শোনা যাচ্ছিল না; বক্তৃতার লেখা পড়তে পড়তে তাঁকে বারবার থামতে হচ্ছিল এবং কাশি পাচ্ছিল। অনুষ্ঠান শেষে আমরা যখন গভর্নর জেনারেলের বাসভবনে ফিরে এলাম, তখন তিনি জামাকাপড় ও জুতা খোলারও শক্তি না পেয়ে সেগুলো পরিহিত অবস্থাতেই বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কিন্তু সেই শীর্ণ, জীর্ণ শরীরের ভেতরেও এক অসাধারণ প্রতিভার দীপ্ত শিখা জ্বলছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অসুস্থতা তাঁকে সরকারি দায়িত্ব পালনে বিরত রাখতে পারেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হলেন এবং আমরা রাষ্ট্রদূতের সংবর্ধনায় উপস্থিত হলাম। সেখানে তাঁর মধ্যে ক্লান্তি বা দুর্বলতার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। যেসব অতিথিকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তাঁদের সঙ্গে তিনি আন্তরিকভাবে আলাপচারিতা করলেন। তাঁর প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল আচরণ দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে তিনি কতটা গুরুতর অসুস্থ। এমন উচ্চ মর্যাদার পদে থেকে এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার যে মূল্য দিতে হয়, তিনি তা হাসিমুখেই পরিশোধ করেছিলেন।

করাচিতে পাঁচ দিন অবস্থানকালে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সরকারি নথি ও কাজ সম্পন্ন করেন। এরপর আমরা বিমানে করে আবার কোয়েটায় ফিরে আসি। যদিও তিনি বিমানযাত্রা মোটামুটি ভালোভাবেই সহ্য করেছিলেন, পরদিন থেকেই তাঁর মধ্যে অবসাদ ও ক্লান্তির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামান্য জ্বরও স্থায়ীভাবে তাঁকে কষ্ট দিচ্ছিল, যা তাঁর অস্বস্তি যেমন বাড়াচ্ছিল, তেমনি আমার উদ্বেগও বৃদ্ধি করছিল।

কোয়েটায় ফিরে আসার পর আবারও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য আমন্ত্রণ আসতে শুরু করল। বহু ব্যক্তি ও নেতা কায়েদে-আজমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু নিজের অসুস্থতার কারণে তাঁদের ইচ্ছা পূরণ করতে না পারায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ছিলেন। অবশেষে একদিন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে আমরা কোয়েটা থেকে কয়েক মাইল দূরের জিয়ারতে চলে যাব। সেখানে আবহাওয়া কোয়েটার তুলনায় আরও শীতল এবং নিঃসন্দেহে বিশ্রামের জন্য অধিক উপযোগী ছিল।

জিয়ারতের রেসিডেন্সি, যেখানে আমরা অবস্থান করেছিলাম, ছিল একটি মনোরম, পুরোনো, দোতলা ভবন।(জিয়ারাত (Ziarat)পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের একটি পাহাড়ি শহর ও জেলা সদর। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ,৪৫০ মিটার (,০০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত এবং শীতল আবহাওয়া, প্রাচীন জুনিপার বন ও মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।) একটি উঁচু টিলার ওপর প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনটির চারদিকে ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ লন ও সুন্দর বাগান। সেখানে ভোরবেলায় পাখিরা যেন তাদের প্রার্থনার গান গেয়ে দিন শুরু করত এবং সন্ধ্যায় আবার মধুর কণ্ঠে দিনের সমাপ্তির সংগীত শোনাত। ফলের গাছের সারি এবং নানা রঙের ফুলের বাগান স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। জিয়ারতের সেই নীরব, শান্ত ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ কায়েদে-আজমের হৃদয় জয় করে নিয়েছিল।

কোয়েটা বিভাগের কমিশনারের স্ত্রী মিসেস খান আমাকে জানালেন যে ডা. রিয়াজ আলি শাহ তাঁর এক রোগীকে দেখতে জিয়ারাতে এসেছেন। তিনি মনে করলেন, সুযোগটি কাজে লাগিয়ে কায়েদে-আজমকেও ডা. রিয়াজকে দিয়ে পরীক্ষা করানো ভালো হবে। আমি যখন এই প্রস্তাবটি আমার ভাইকে দিলাম, তিনি দৃঢ়ভাবে না” বলে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি বললেন, তাঁর বিশ্বাস, তাঁর শরীরে গুরুতর কোনো অসুখ নেই; কেবল যদি তাঁর পাকস্থলী খাবার একটু ভালোভাবে হজম করতে পারত, তবে তিনি খুব শিগগিরই আবার সুস্থ হয়ে উঠতেন।

সারা জীবনই চিকিৎসকদের নির্দেশ মেনে চলার প্রতি তাঁর এক ধরনের অনীহা ছিল। কী করতে হবে, কী খেতে হবে, কতটুকু খেতে হবে, কখন ঘুমাতে হবে, কতক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে—ডাক্তারদের এসব নির্দেশ তাঁর কাছে কখনোই সুখকর মনে হতো না। এই স্বভাব তখনও তাঁর মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল। এ পর্যন্ত তিনি কখনো পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে বা নিজেকে পুরোপুরি চিকিৎসকদের হাতে সঁপে দিতে রাজি হননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির জোরেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন।

কিন্তু তখন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁর সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। জীবনে প্রথমবারের মতো তাঁর নিজের কাছেও তাঁর শারীরিক অবস্থা সত্যিই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক ভোরবেলা তিনি যখন সম্মত হলেন যে আর কোনো ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয় এবং তাঁর সত্যিই ভালো চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন, তখন আমি অত্যন্ত আনন্দিত হলাম।

আমি এক মুহূর্তও দেরি করিনি। কায়েদে-আজমের ব্যক্তিগত সচিব মি. ফাররুখ আমিনকে অনুরোধ করলাম, যেন তিনি তখনকার মন্ত্রিসভার মহাসচিব চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে টেলিফোন করে জানান যে লাহোরের খ্যাতনামা চিকিৎসক কর্নেল ডা. ইলাহী বখশকে অবিলম্বে বিমানযোগে জিয়ারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হোক। সেদিন দিনটি ছিল ২১ জুলাই ১৯৪৮।

বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল, আর আমরা উৎকণ্ঠার সঙ্গে কর্নেল ইলাহী বখশের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কারণ প্রতি ঘণ্টায় কায়েদে-আজমের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছিল।

তাঁর শরীর তখন ভীষণ দুর্বল হলেও তাঁর মন ছিল সক্রিয় ও সজাগ; তাঁর সাহস ও মনোবল অটুট ছিল। জীবনের বহু সংগ্রামে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন; অসুস্থতার বিরুদ্ধে এই লড়াইটিও তিনি একই আত্মবিশ্বাস নিয়ে মোকাবিলা করছিলেন। সারা জীবন তিনি সংগ্রাম ও অবিচারের বিরুদ্ধে এক অগ্নিপথে হেঁটেছেন; তাই জীবনের শেষ অধ্যায়টিও তিনি আত্মতুষ্টির ছাইয়ের মধ্যে শেষ করতে চাননি।

তিনি প্রায়ই আমার সঙ্গে নতুন সংবিধান, কাশ্মীর সমস্যা এবং উদ্বাস্তুদের দুর্দশা নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর প্রতিটি কথায় আমি এমন এক আত্মার গভীর বেদনা অনুভব করতাম, যে আরও অনেক কিছু করতে চায়, অথচ যার হাতে আর সময়ও নেই, শক্তিও নেই।

তবুও তাঁর বিশ্বাস ছিল—ভোরের আলো নিজের দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত একটি প্রদীপের শিখা যেমন অবিরাম আলো বিলিয়ে যায়, তেমনি মানুষেরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের কর্তব্য পালন করে যেতে হবে।

১৯৪৮ সালের ২৩ জুলাই, শুক্রবারের বিকেলের শেষভাগে আমি স্বস্তির সঙ্গে জানতে পারলাম যে ফাররুখ আমিনের কাছ থেকে খবর এসেছে—কর্নেল ইলাহী বখ্‌শ জিয়ারতে পৌঁছেছেন এবং কায়েদে আজমকে পরীক্ষা করার জন্য নিচতলায় অপেক্ষা করছেন।

আমি আনন্দের সঙ্গে এই সংবাদটি আমার ভাইকে জানালাম। তিনি অনাগ্রহভরা কণ্ঠে বললে- “ডাক্তারকে বলো, তিনি যেন আগামীকাল সকালে আমাকে দেখেন। এখন তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে, এই মুহূর্তে আমি বিরক্ত হতে চাই না।”

তিনি এতটা নির্লিপ্তভাবে খবরটি গ্রহণ করলেন যে আমি বিস্মিত হয়ে পড়লাম। আমি তাঁকে অনেক অনুরোধ করলাম যেন তিনি ডাক্তারকে এখনই পরীক্ষা করতে দেন, কারণ নিজের জীবন নিয়ে এমন অবহেলা করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু আমার সব অনুরোধের জবাবে তিনি শুধু একটি মৃদু, স্নিগ্ধ হাসি হাসলেন—একটি হাসি, যা আমার সমস্ত যুক্তি ও অনুরোধকে মুহূর্তেই নিষ্প্রভ করে দিল।

পরদিন সকালে আমি কর্নেল ইলাহী বখ্‌শকে নিয়ে কায়েদে-আজমের কাছে গেলাম। ডাক্তার তাঁর রোগীকে কোনো প্রশ্ন করার আগেই কায়েদে-আজম নিজেই বললেন-“আশা করি, ডাক্তার সাহেব, আপনার যাত্রা ভালোই হয়েছে।“ ২৬  

ডাক্তার তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁর কী সমস্যা এবং তাঁর অসুস্থতার ইতিহাস ও উপসর্গগুলি কী। কায়েদে-আজম ১৯৩৪ সাল থেকে তাঁর সমস্ত শারীরিক সমস্যার একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু নির্ভুল বিবরণ দিলেন। তবে তিনি বারবার জোর দিয়ে বললেন যে তিনি মূলত ভালোই আছেন, এবং যদি তাঁর পেটের সমস্যাটি ঠিক হয়ে যায়, তবে তিনি খুব শিগগিরই স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবেন এবং পূর্বনির্ধারিত সব কর্মসূচিও যথারীতি পালন করতে সক্ষম হবেন।

তিনি বললেন- “গত চৌদ্দ বছর ধরে আমি প্রতিদিন চৌদ্দ ঘণ্টা করে কাজ করেছি। প্রকৃত অর্থে অসুস্থতা কাকে বলে, তা আমি কখনোই জানতাম না। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আমার ঘন ঘন জ্বর ও কাশির আক্রমণ হচ্ছে। কয়েক দিনের বিশ্রাম নিলেই সেগুলো সেরে যেত। কিন্তু সম্প্রতি এসব আক্রমণ আরও তীব্র এবং আরও ঘন ঘন হতে শুরু করেছে, আর সেগুলো আমাকে একেবারে দুর্বল করে ফেলেছে।”

এই কয়েকটি বাক্য বলতেই তিনি সম্পূর্ণ ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। ডাক্তার তাঁর নাড়ির গতি পরীক্ষা করার জন্য তাঁর বাঁ হাতটি ধরলেন। এ সময় রোগী বারবার কাশছিলেন।

তিনি আবার বলতে শুরু করলেন-“কয়েক সপ্তাহ আগে আমার প্রচণ্ড ঠান্ডা ও কাঁপুনি দিয়ে জ্বর হয়েছিল। তখন থেকে আমি পেনিসিলিন লজেন্স খেয়ে আসছি। আমি নিশ্চিত, আমার শরীরে গুরুতর কোনো অঙ্গগত (জৈবিক) সমস্যা নেই। আমার সব সমস্যার মূল কারণ হলো আমার পেট। প্রায় পনেরো বছর আগে লন্ডনের কয়েকজন ডাক্তার আমাকে পেটের অপারেশন করানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে যখন আমি জার্মানির ডাক্তারদের সঙ্গে পরামর্শ করি, তাঁরা বলেন আমার পেট একেবারেই ঠিক আছে। আবার সেই সময় আমাদের বোম্বের ডাক্তার বলেছিলেন, আমার হৃদ্‌রোগ রয়েছে। তাই এখন দেখতেই পাচ্ছেনতো, ডাক্তারদের নিজেদের মধ্যেই কোনো ঐকমত্য নেই।”২৭

কর্নেল ইলাহি বখ্‌স তাঁকে অত্যন্ত যত্নসহকারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর বললেন— “স্যার, আপনার পাকস্থলীতে কোনো সমস্যা নেই। তবে আপনার বুক ও ফুসফুসের অবস্থা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। আপনার রক্ত ও কফ (থুতু) পরীক্ষা করাতে হবে। সে জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আনাতে হবে এবং এই কাজে আমাকে সহায়তা করার জন্য আরও কয়েকজন চিকিৎসককে ডাকতে হবে।”২৮

কায়েদে-আজম নীরবে চিকিৎসকের কথা শুনলেন।এরপর চিকিৎসক পরামর্শ দিলেন—“স্যার, আপনাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। সকালের নাশতায় থাকবে পোরিজ(পোরিজ (Porridge)হলো শস্য (বিশেষ করে ওটস, চাল, গম, ভুট্টা বা অন্যান্য শস্য) পানি বা দুধে সেদ্ধ করে তৈরি করা নরম, ঘন খাদ্য।), ডিম, মাখন, রুটি, কফি এবং প্রচুর দুধ। দুপুরের খাবারে কিমা করা মুরগির মাংস, সবজি এবং কাস্টার্ড অথবা জেলি। রাতের খাবারে আপনার পছন্দের সসসহ গ্রিল করা মাছ, সবজি, ফল, পুডিং এবং কফি।”

কায়েদে-আজম বললেন—“ডাক্তার, এ তো অনেক খাবার! আপনি কি মনে করেন আমার দুর্বল পাকস্থলী এত কিছু সহ্য করতে পারবে?”

চিকিৎসক উত্তর দিলেন—“স্যার, আপনার জন্য উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাদ্য অত্যন্ত জরুরি। আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থায় এটি অপরিহার্য।”২৯

পরদিন সকালে কোয়েটার সিভিল সার্জন ডা. সিদ্দিকী এবং ক্লিনিক্যাল প্যাথোলজিস্ট ডা. মাহমুদ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা কায়েদে-আজমের রক্ত ও কফের নমুনা সংগ্রহ করেন। সেদিন বিকেলেই আমি সেই ভাগ্যনির্ধারক সংবাদটি জানতে পারি—পরীক্ষার ফল পজিটিভ এসেছে।

মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো যেন আমার পায়ের নিচ থেকে পৃথিবী সরে যাচ্ছে। আমি কী করতে পারি? অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম, কর্নেল ইলাহি বখ্‌সই তাঁকে বিষয়টি জানাবেন। কারণ আমার মনে হলো, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম ও চিকিৎসার ব্যাপারে তাঁর পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়ার এটিই একমাত্র উপায়।

কর্নেল ইলাহি বখ্‌স তাঁর কক্ষে প্রবেশ করে, উদ্বেগকে যতটা সম্ভব আড়াল করে শান্ত কণ্ঠে বললেন—

বললেন-“স্যার, দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফলাফল থেকে জানা গেছে যে আপনার ফুসফুসে সংক্রমণ হয়েছে।”

তিনি শান্তভাবে সংবাদটি শুনলেন। কয়েক মিনিট নীরব থাকার পর বললেন- “তার মানে আমি যক্ষ্মা (টিউবারকুলোসিস) রোগে ভুগছি।”

কর্নেল ইলাহী বক্স কোনো উত্তর দিলেন না।

তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন- “ডাক্তার, আপনার কী মনে হয়, আমি কতদিন ধরে এই রোগে ভুগছি?”

কর্নেল ইলাহী বক্স বললেন-“স্যার, আমার ধারণা অন্তত দুই বছর ধরে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত মত দেওয়ার আগে আমি আপনার বুকের একটি এক্স-রে করাতে চাই। তবে স্যার, আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি—রোগটি খুব গুরুতর অবস্থায় নেই। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, আর যদি আপনার শরীর চিকিৎসায় ভালো সাড়া দেয়, তাহলে আপনি খুব শিগগিরই আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন।”

তিনি জিজ্ঞেস করলেন- “মিস জিন্নাহ কি এ কথা জানেন? আপনি কি তাঁকে বলেছেন?”

ডাক্তার উত্তর দিলেন-“জি স্যার, বলেছি।”

তিনি বললেন-“আমার মনে হয়, সেটা ঠিক হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি তো একজন নারী।”৩০

ঠিক তখনই আমি ঘরে ঢুকলাম। কায়েদে-আজম ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলেন— “আপনার কী মনে হয়, আমাকে আর কতদিন বিছানায় থাকতে হবে? আপনি তো জানেন, আমার ওপর কত দায়িত্ব, কত কাজ এখনো বাকি।”

ডা. ইলাহি বক্স উত্তর দিলেন— “স্যার, এই মুহূর্তে এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। তবে আপনাকে যত দ্রুত সম্ভব সুস্থ করে তোলার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”

ডাক্তার চলে যাওয়ার পর আমি ভাইয়ের সঙ্গে একা ছিলাম। তাঁর মুখ ছিল অত্যন্ত ফ্যাকাশে; ক্লান্তি ও অবসাদের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল মুখমণ্ডলে। তবুও তিনি মৃদু হেসে বললেন, — “ফাতি, দেখলে তো, তুমি ঠিকই বলেছিলে—আমার আরও আগেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া উচিত ছিল। … তবে এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। মানুষ কেবল সংগ্রামই করতে পারে… ভাগ্যের ভাষা সবসময় নীরব… যতদিন পারি, আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাব… তুমি জানো, আমার নীতি সবসময়ই ছিল… অন্ধভাবে কারও পরামর্শ মেনে না নেওয়া… আমি সবসময় নিজের ইচ্ছামতো চলেছি… আর কঠিন আঘাত থেকে শিক্ষাও নিয়েছি।”

মাত্র কয়েক মাস আগে পেশোয়ারের ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন- “তোমরা জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা ও বারবার প্রাপ্ত আঘাত থেকেই শিক্ষা লাভ করবে।”

নিজের পথ নিজে বেছে নেওয়া এবং কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ—এই ছিল তাঁর সমগ্র জীবনের ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

এটি আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক ছিল যে, বহু সপ্তাহের তুলনায় তিনি এখন কিছুটা বেশি খেতে পারছিলেন। তাঁর রুচি বাড়ানোর জন্য আমি আমানত আলীকে আমাদের রাঁধুনি হিসেবে নিয়োগ করলাম। তিনি প্যারিসের বিখ্যাত রিটজ হোটেলে রন্ধনশিল্প শিখেছিলেন এবং কিছুদিন কাপুরথালার মহারাজার প্রধান রাঁধুনি হিসেবে কাজ করেছিলেন।

ডা. ইলাহি বক্স কায়েদে-আজমের তাপমাত্রা মাপার জন্য একজন মহিলা কম্পাউন্ডার নিয়োগ করলেন। প্রথমবারের মতো কায়েদে-আজম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন— “আমার শরীরের তাপমাত্রা কত?”

তিনি দৃঢ়ভাবে উত্তর দিলেন— “স্যার, আমি সেটা শুধু ডাক্তারকেই বলতে পারি।”

কায়েদে-আজম আবার বললেন— “কিন্তু আমার নিজের তাপমাত্রা তো আমার জানা উচিত।”

মহিলা কম্পাউন্ডার অনড় রইলেন। বললেন— “দুঃখিত, স্যার। আমি আপনাকে তা বলতে পারব না।”

তিনি চলে যাওয়ার পর কায়েদে-আজম আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন— “আমি এ ধরনের মানুষকে পছন্দ করি… যারা নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থাকে… এবং ভয় দেখিয়ে যাদের নতি স্বীকার করানো যায় না।”

কোনো দর্শনার্থীকেই কায়েদে-আজমের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল না। তবে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মি. হাসান ইস্পাহানি যখন জিয়ারাতে আমাদের বাড়িতে এলেন, তখন কায়েদে-আজম তাঁকে দেখে খুবই আনন্দিত হলেন। বহু বছর ধরে তিনি কায়েদে-আজমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।

নেতার সঙ্গে দেখা করে নিচে নেমে আসতেই মি. ইস্পাহানি অঝোরে কেঁদে ফেললেন। অসংখ্য সংগ্রামের সেই অদম্য যোদ্ধাকে অসহায়ভাবে শয্যাশায়ী অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে দেখে তিনি নিজেকে সামলাতে পারেননি। তিনি ডা. ইলাহি বক্সকে আশ্বাস দিয়ে বললেন- প্রয়োজন হলে তিনি আমেরিকা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দ্রুত বিমানে করে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন।

তাঁকে জানানো হলো, যদি সত্যিই প্রয়োজন হয়, তবে অবশ্যই তাঁর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে।

এদিকে ডা. ইলাহি বক্সের অনুরোধে লাহোর থেকে ডা. রিয়াজ আলী শাহ, এক্স-রে বিশেষজ্ঞ ডা. আলম এবং ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট ডা. গুলাম মুহাম্মদ এক্স-রে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে জিয়ারাতে এসে পৌঁছান।

তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল ডা. ইলাহি বক্সের নির্ণয়কে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করল।

চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন, কায়েদে-আজমের সেবার জন্য একজন রাতের নার্স নিয়োগ করা প্রয়োজন।

প্রথমে তিনি এতে রাজি হননি। তিনি বললেন— “আমার যথেষ্ট ভালোভাবেই যত্ন নেওয়া হচ্ছে। একজন রাতের নার্স নিয়োগ করা অকারণে অর্থের অপচয় হবে।”

কিন্তু পরে তিনি মত পরিবর্তন করে বললেন— “আমার বোন এত সপ্তাহ ধরে দিন-রাত আমার শয্যার পাশে রয়েছে। সে নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঠিক আছে, একজন রাতের নার্স নিয়োগ করা যেতে পারে।”

এরপর কোয়েটা সিভিল হাসপাতালে কর্মরত সিস্টার ফিলিস ডানহাম জিয়ারাতে এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষ নার্স হিসেবে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন এবং কায়েদে-আজমও তাঁর দক্ষতা ও নিষ্ঠায় সন্তুষ্ট ছিলেন।

সিস্টার ডানহাম ডা. ইলাহি বক্সকে জানান যে, কায়েদে-আজম সারাজীবন রেশমের পায়জামা পরার অভ্যাস বজায় রেখেছেন এবং রাতে প্রায়ই ঠান্ডায় কাঁপতেন।

এ কথা শুনে ডাক্তার করাচি থেকে ভিয়েলা (Viyella)৩১ কাপড় আনানোর নির্দেশ দেন। আমি সেই কাপড় দিয়ে তাঁর জন্য কয়েকটি পায়জামা তৈরি করিয়ে দিই।

এসব আমাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করল। আমরা লক্ষ্য করলাম, তিনি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বস্তিতে আছেন, দীর্ঘ সময় ঘুমাতে পারছেন এবং পর্যাপ্ত খাবারও গ্রহণ করছেন। তাঁর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক ছিল, কাশি প্রায় সম্পূর্ণ কমে গিয়েছিল এবং রক্তচাপেও উদ্বেগের কোনো কারণ সৃষ্টি করছিল না।

জুলাই মাসের শেষের দিকে, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী মি. লিয়াকত আলী খান চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে সঙ্গে নিয়ে জিয়ারতে এসে পৌঁছান। তিনি ডা. ইলাহী বখশের কাছে কায়েদে-আজমের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাঁর রোগনির্ণয় জানতে চান।

ডা. ইলাহী বখশ বলেন, যেহেতু আমাকে কায়েদে-আজমের চিকিৎসার জন্য তাঁর বোন আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাই রোগীর অবস্থা সম্পর্কে আমার মতামত আমি কেবল তাঁকেই জানাতে পারি।

তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন- “কিন্তু আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।”

ডা. ইলাহী বখশ বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দেন- “জি, স্যার। কিন্তু রোগীর অনুমতি ছাড়া আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারি না।”৩২

আমি যখন কায়েদে-আজমের পাশে বসে ছিলাম, তখন আমাকে জানানো হলো যে প্রধানমন্ত্রী এবং সেক্রেটারি জেনারেল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান। আমি বিষয়টি তাঁকে জানালাম। কয়েক মিনিট নীরব থাকার পর তিনি বললেন,— “নিচে যাও, প্রধানমন্ত্রীকে বলো আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করব।”

আমি বললাম,-— “এখন অনেক রাত হয়ে গেছে, জিন। ওঁদের কাল সকালে আপনার সঙ্গে দেখা করতে দিন।”

তিনি দৃঢ়ভাবে বললেন— “না, তাঁকে এখনই আসতে বলো…।”

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান প্রায় আধঘণ্টা তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনি নিচে নেমে আসার পর আমি আবার আমার ভাইয়ের ঘরে গেলাম। দেখলাম তিনি সম্পূর্ণ ক্লান্ত এবং অত্যন্ত অসুস্থ দেখাচ্ছে। তিনি আমাকে কিছু ফলের রস দিতে বললেন। তারপর বললেন— “এখন মি. মোহাম্মদ আলীকে পাঠাও।”

ক্যাবিনেটের সেক্রেটারি জেনারেল তাঁর সঙ্গে প্রায় পনেরো মিনিট ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি আবার ঘরে প্রবেশ করলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তিনি ফলের রস নেবেন, নাকি কফি। কিন্তু তাঁর মন তখন এতটাই চিন্তায় নিমগ্ন ছিল যে তিনি কোনো উত্তরই দিলেন না।

এদিকে রাতের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছিল। তিনি বললেন— “তুমি নিচে যাও। ওঁদের সঙ্গে রাতের খাবার খাও…।”

আমি বললাম— “না, তা ঠিক হবে না…।”

তিনি বললেন— “ওঁরা এখানে আমাদের অতিথি। যাও, ওঁদের সঙ্গে খাও।”

১৪ আগস্ট—যেদিন আমাদের জাতি স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকী উদযাপন করতে চলেছিল—সেই দিনটি ঘনিয়ে আসছিল। চিকিৎসকের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি স্বাধীনতা দিবসে জাতির উদ্দেশে যে বার্তা দেবেন, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছিলেন। শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে গেলেও তিনি সেই বার্তা প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।

স্বাধীনতা দিবসে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করা তাঁর বার্তায় তিনি লিখেছিলেন-“মনে রাখবেন, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা এমন এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যার তুলনা বিশ্বের ইতিহাসে নেই। আমার জনগণের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।নবজাত রাষ্ট্রটিকে জন্মের মুহূর্তেই ধ্বংস করার অন্যান্য সব প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে আমাদের শত্রুরা আশা করেছিল যে অর্থনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তারা তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে পারবে। বিদ্বেষ ও কু-মনোভাব থেকে উদ্ভূত অসংখ্য যুক্তি ও তথ্য হাজির করে তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে পাকিস্তান দেউলিয়া হয়ে পড়বে। তাদের ধারণা ছিল, শত্রুর আগুন ও তরবারি যা করতে পারেনি, রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া অর্থনীতি তা করে দেখাবে।

কিন্তু অমঙ্গলের সেই ভবিষ্যদ্বক্তাদের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের প্রথম বাজেট উদ্বৃত্ত ছিল; বৈদেশিক বাণিজ্যে অনুকূল ভারসাম্য সৃষ্টি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সর্বত্র ধারাবাহিক উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”৩৩

কয়েক দিন পরে চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করলেন যে তাঁর রক্তচাপ খুবই কমে গেছে। তাঁর পায়ে ফোলা দেখা দিয়েছে এবং প্রস্রাবের পরিমাণও অনেক কমে গেছে। দীর্ঘ আলোচনার পর চিকিৎসকেরা আমাকে জানালেন যে তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনি—উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমান শারীরিক অবস্থায় জিয়ারাতের আবহাওয়া তাঁর জন্য আর উপযোগী নয়।

কায়েদে-আজম চিকিৎসকদের এই পরামর্শে সম্মতি দিলেও জোর দিয়ে বললেন যে ১৪ আগস্টের পর তাঁকে কোয়েটায় স্থানান্তর করা হোক, কারণ সেদিন আমাদের স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকী উদ্‌যাপিত হবে। কিন্তু চিকিৎসকেরা এতদিন অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে ১৩ আগস্টই আমরা জিয়ারাত ছেড়ে কোয়েটার উদ্দেশ্যে রওনা হব।৩৪

তিনি জোর দিয়ে বললেন- তিনি কখনোই পায়জামা-স্যুট পরে ভ্রমণ করবেন না; জীবনে তিনি এমনটি কখনও করেননি।

তাঁর মধ্যে এখনও জীবনের প্রতি আগ্রহের লক্ষণ দেখে আমি খুবই আনন্দিত হলাম। আমি তাঁর জন্য একেবারে নতুন একটি স্যুট বের করলাম, যা তিনি আগে কখনও পরেননি। তার সঙ্গে মানানসই একটি টাই পরিয়ে দিলাম, কোটের বুকপকেটে একটি রুমাল গুঁজে দিলাম এবং তাঁর চকচকে পাম্প-জুতাও পরিয়ে দিলাম।

এরপর তাঁকে স্ট্রেচারে করে নিচে আনা হলো এবং বড় বিউমার (Buick) গাড়িটির পেছনের আসনে আধশোয়া অবস্থায় বসানো হলো। সেই গাড়িতেই আমরা কোয়েটার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমি তাঁর পাশে বসলাম, অতিরিক্ত আসনে বসেছিলেন সিস্টার ডানহাম, আর তাঁর এ.ডি.সি.(Aide-de-Camp) সামনের আসনে চালকের পাশে বসেছিলেন।

রাস্তার ঝাঁকুনি ও ধাক্কা এড়ানোর জন্য গাড়িটি ধীরে ধীরে চলছিল। পথে আমরা দু’বার থামি। প্রতিবারই আমি তাঁকে চা ও বিস্কুট খেতে দিই।

কোয়েটায় পৌঁছাতে আমাদের চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল। পুরো পথজুড়ে আমার মনে একটিই উদ্বেগ কাজ করছিল—তিনি এত দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রার ধকল সহ্য করতে পারবেন তো?

অবশেষে আমরা কোয়েটার রেসিডেন্সিতে পৌঁছালাম, যেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছেই চিকিৎসকেরা তাঁকে পরীক্ষা করেন এবং আমাকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি যাত্রার ধকল ভালোভাবেই সহ্য করেছেন।

কয়েক ঘণ্টা পরে তিনি চিকিৎসকদের বললেন- “এখানে… আমার… অনেক ভালো লাগছে। জিয়ারাতে… শ্বাস নিতে… খুব কষ্ট হতো। ৩৫

তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে শুরু করলেন। কর্নেল ইলাহি বক্স পরামর্শ দিলেন যে, প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা করে তিনি যেন তাঁর সরকারি নথিপত্র (ফাইল) দেখেন। ডাক্তারের ধারণা ছিল, তাঁর কর্মচঞ্চল মনকে কিছু কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখলে তিনি সারাক্ষণ নিজের অসুস্থতা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়বেন না। এই সুযোগে তিনি খুবই আনন্দিত হলেন এবং গভীর আগ্রহ ও তৃপ্তির সঙ্গে সেই কাজ করতে লাগলেন।

কয়েক দিন পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে বিছানা ছেড়ে উঠে প্রতিদিন তাঁদের সহায়তায় নিজের ঘরের মধ্যে কয়েক পা হাঁটার পরামর্শ দিলেন, যাতে তাঁর রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। তিনি হাসিমুখে সেই পরামর্শ গ্রহণ করলেন। অসুস্থের শয্যায় শুয়ে থাকার পরিবর্তে বহু সপ্তাহ পর তিনি আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন—এই ভাবনায় তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন।

এটি ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক দৃশ্য। তাঁর মধ্যে এখনও লড়াই করে বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা রয়েছে— এমনই আশা আরও দৃঢ় হলো, যখন তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশে একটি গল্প বললেন।

“ডাক্তার, আপনাদের একটি গল্প বলি। এক মহিলা তাঁর চিকিৎসককে বলেছিলেন, তিনি হাঁটতে পারেন না। কারণ তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন এবং বহু মাস ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন। চিকিৎসক বললেন, তিনি এখন সুস্থ হয়ে উঠেছেন; তাই বিছানা ছেড়ে উঠে হাঁটাচলা শুরু করা দরকার। কিন্তু চিকিৎসকের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি রাজি হলেন না।

তারপর আরেকজন ডাক্তার এলেন। তিনিও তাঁকে পরীক্ষা করে একই পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হলো না।

এরপর এলেন তৃতীয় একজন ডাক্তার। তিনি মহিলার অজান্তে তাঁর বিছানার নিচে একটি জ্বলন্ত চুলা রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পর মহিলা বুঝতে পারলেন, তাঁর বিছানায় আগুন ধরে যেতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চিৎকার করতে করতে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন।”

এ কথা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম। তারপর তিনি মুচকি হেসে ডাক্তারদের উদ্দেশে বললেন- “ডাক্তার, আমার সঙ্গেও কি আপনারা ঠিক এভাবেই করতে চান?” ৩৬

একটু নীরব থাকার পর তিনি বললেন-“ডাক্তার, আমি ধূমপান করতে খুব পছন্দ করি। কিন্তু অনেক দিন ধরে একটি সিগারেটও খাইনি… আমি কি এখন ধূমপান করতে পারি?”

ডা. ইলাহি বক্স আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন- “জি, অবশ্যই। তবে শুরুতে দিনে মাত্র একটি সিগারেট খাবেন। আর ধোঁয়া ফুসফুসে টানবেন না।”

আমি তাঁর প্রিয় ব্র্যান্ড ক্রেভেন এ (Craven A) সিগারেটের একটি টিন এনে দিলাম। তিনি আজীবনই একজন প্রবল ধূমপায়ী ছিলেন; প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশটি সিগারেট খেতেন।৩৭

সেদিন সন্ধ্যায় ডাক্তার আবার দেখতে এলেন। অ্যাশট্রেতে পাঁচটি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ দেখে তিনি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে রোগীর দিকে তাকালেন। কায়েদে-আজম হাসিমুখে বললেন-“হ্যাঁ, ডাক্তার, আমি পাঁচটি সিগারেট খেয়েছি… তবে ধোঁয়া একবারও ফুসফুসে টানিনি।” এ কথা বলে তিনি শিশুর মতো আনন্দে হেসে উঠলেন।

সেই বছর ঈদুল ফিতর পড়েছিল ২৭ আগস্ট৩৮ তিনি তখন জাতির উদ্দেশে তাঁর ঈদের বাণী প্রস্তুত করতে ব্যস্ত ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে শত শত ভাষণ ও বাণী রচনা করেছিলেন, এটি ছিল সেগুলোর মধ্যে সর্বশেষ।

সেই বার্তায় তিনি লিখেছিলেন—“শুধুমাত্র ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং আমাদের ভাগ্যের প্রতি অটল বিশ্বাসের মাধ্যমেই আমরা আমাদের স্বপ্নের পাকিস্তানকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হব।”৩৯

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্পদিন পর যে শেষ ঈদুল ফিতর আমরা উদযাপন করেছিলাম, তা পূর্ব পাঞ্জাবের মর্মান্তিক ঘটনাবলির কারণে গভীরভাবে ম্লান হয়ে গিয়েছিলগত বছরের রক্তস্নান এবং তার পরিণতিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ব্যাপক দেশান্তর মানব ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। আশ্রয়হীন ও দিশেহারা এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য নতুনভাবে বসবাস ও জীবিকার ব্যবস্থা করা আমাদের শক্তি ও সম্পদের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করেছিল যে আমরা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিলাম। সমস্যার বিশালতা আমাদের প্রায় অভিভূত করে ফেলেছিল, এবং আমরা কেবলমাত্র কোনোভাবে সেই কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিলাম।

মাত্র বারো মাসের স্বল্প সময়ের মধ্যে সব মোহাজিরকে পাকিস্তানে লাভজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে পুনর্বাসিত করা সম্ভব হয়নি। তাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বটে, কিন্তু তখনও অনেকেই পুনর্বাসনের অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারা পর্যন্ত আমাদের আনন্দ সম্পূর্ণ হতে পারে না। আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী যে আগামী ঈদুল ফিতরের আগেই এই কঠিন ও জটিল সমস্যার সমাধান হবে এবং সকল শরণার্থী পাকিস্তানের অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সমাজের উপযোগী ও উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।৪০

তিনি তাঁর বার্তায় আরও লিখেছিলেন—”আমার ঈদের বার্তা আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর প্রতি বন্ধুত্ব ও শুভেচ্ছার বার্তা। আমরা সবাই অত্যন্ত সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছি। ফিলিস্তিন, ইন্দোনেশিয়া এবং কাশ্মীরে যে ক্ষমতার রাজনীতির নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, তা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে একটি সম্মিলিত অবস্থান গ্রহণ করি, তবেই বিশ্বসভায় আমাদের কণ্ঠস্বর যথাযথভাবে শোনা যাবে।””অতএব, আমি আপনাদের প্রতি আবেদন জানাই—আপনারা যে ভাষাতেই আমার কথাকে প্রকাশ করুন না কেন, আমার পরামর্শের মূল কথা একটিই: প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সততা, আন্তরিকতা এবং নিঃস্বার্থভাবে পাকিস্তানের সেবা করা।”৪১

এগুলোই পরবর্তীকালে তাঁর শেষ লিপিবদ্ধ কথাগুলো হিসেবে প্রমাণিত হয়।৪২

আগস্ট মাসের শেষের দিকে কায়েদে-আজম হঠাৎ করেই জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। একদিন গভীরভাবে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন- “ফাতি, আমার আর বেঁচে থাকার কোনো আগ্রহ নেই। যত তাড়াতাড়ি আমি চলে যাই… ততই ভালো।”

এই কথাগুলো ছিল অত্যন্ত অশুভ ইঙ্গিতবাহী। যেন খোলা বিদ্যুতের তারে হাত দিয়েছি—এমন ধাক্কা খেলাম কথাগুলো শুনো। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম- “জিন, তুমি খুব শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবে। ডাক্তাররা আশাবাদী।”

তিনি এক ম্লান, মৃত্যুর ছায়ামাখা হাসি হেসে বললেন- “না… আমি আর বাঁচতে চাই না।”

১ সেপ্টেম্বর ডা. ইলাহি বক্স বিষণ্ন কণ্ঠে আমাকে বললেন- “কায়েদে-আজমের রক্তক্ষরণ (হেমোরেজ) হয়েছে। আমি খুব উদ্বিগ্ন। তাঁকে অবিলম্বে করাচিতে নিয়ে যেতে হবে। কোয়েটার উচ্চতা তাঁর জন্য একেবারেই অনুকূল নয়।”

এরপর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ৫ সেপ্টেম্বর ডাক্তাররা তাঁর কফ পরীক্ষা করে নিউমোনিয়ার জীবাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করেন এবং রক্ত পরীক্ষায় তীব্র সংক্রমণের প্রমাণ মেলে। তাঁর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় এবং তিনি হাঁপিয়ে উঠতে থাকেন। তাই তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া শুরু করা হয়।

৭ সেপ্টেম্বর আমি ওয়াশিংটনে অবস্থানরত মি. ইস্পাহানীকে তারবার্তা পাঠিয়ে ডা. রিয়াজের সুপারিশ করা আমেরিকান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্রুত নিয়ে আসার অনুরোধ করি। পরদিন করাচির ডা. মোহাম্মদ আলি মিস্ত্রিকে অবিলম্বে কোয়েটায় আসার জন্য টেলিফোন করি।

এরপর চিকিৎসকদের আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সব দিক বিবেচনা করে তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, কায়েদে-আজমকে অবিলম্বে করাচিতে স্থানান্তর করা জরুরি, কারণ কোয়েটার উচ্চতা তাঁর দুর্বল হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁরা আমাকে জানালেন যে, এখন আর তেমন কোনো আশা নেই; কেবল অলৌকিক কোনো ঘটনাই তাঁর জীবন রক্ষা করতে পারে।

আমি যখন আমার ভাইকে ডাক্তারদের করাচি নিয়ে যাওয়ার পরামর্শের কথা জানালাম, তখন তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন- “হ্যাঁ… আমাকে করাচি নিয়ে চলো। আমার জন্ম সেখানে… আমি সেখানে… সমাধিস্থ হতে চাই।”

এরপর তিনি চোখ বন্ধ করলেন। আমি তাঁর শয্যার পাশে বসে রইলাম। মনে হচ্ছিল, তাঁর অবচেতন মন যেন নানা চিন্তার জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুমের ঘোরে তিনি অস্পষ্টভাবে বলতে লাগলেন- “কাশ্মীর… তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দাও… সংবিধান… আমি খুব শিগগিরই তা সম্পূর্ণ করব… শরণার্থীরা… পাকিস্তানে তাদের সব ধরনের সাহায্য দাও…”

গভর্নর-জেনারেলের ব্যবহৃত ভাইকিং বিমানটি দ্রুত কোয়েটায় পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নেন যে, ১১ সেপ্টেম্বর দুপুর দুইটায় আমাদের করাচির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে।

স্ট্রেচারে করে যখন তাঁকে ভাইকিং বিমানের কেবিনে তোলা হচ্ছিল, তখন পাইলট ও বিমানকর্মীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন। তিনি অত্যন্ত কষ্টে তাঁর দুর্বল হাতটি সামান্য তুলে তাঁদের সালামের জবাব দিলেন।

বিমানের সামনের কেবিনের আসনগুলোকে অস্থায়ী শয্যায় রূপান্তর করে তাঁকে আরাম করে শুইয়ে দেওয়া হয়। তাঁর পাশে ছিলাম আমি, ডা. মিস্ত্রি এবং সিস্টার ডানহাম।

পাইলট আগে থেকেই আমাদের জানিয়েছিলেন যে, কিছু সময় বিমানটি প্রায় ৭,০০০ ফুট উচ্চতায় উড়বে। বেলুচিস্তানের পর্বতমালা অতিক্রম করার পর সেটি ৫,০০০ ফুট উচ্চতায় নেমে আসবে। অক্সিজেন সিলিন্ডার ও গ্যাস মাস্ক প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, এবং উচ্চতায় ওঠার সময় আমার দায়িত্ব ছিল তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া।

বিমানটি আকাশে উড়ে ক্রমশ উচ্চতায় উঠতে লাগল। কায়েদে-আজমের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি তাঁর মুখে গ্যাস মাস্ক পরিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ তিনি অক্সিজেন নিলেন, তারপর মাস্কটি সরিয়ে দিলেন—যেন বলতে চাইছেন- “এতে আর কোনো লাভ নেই। সব শেষ হয়ে গেছে।”

আমি ডা. মিস্ত্রিকে ডা. ইলাহি বক্সকে ডাকতে বললাম। তিনি এসে কায়েদে-আজমকে আবার অক্সিজেন নিতে রাজি করাতে সক্ষম হন। জীবনে এর চেয়ে উদ্বেগপূর্ণ বিমানযাত্রা আর কখনো আমার হয়নি।

প্রায় দুই ঘণ্টা উড়ে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে আমরা করাচির মৌরিপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম।

প্রায় এক বছর আগে তিনি এই বিমানবন্দরেই নেমেছিলেন—অগাধ আশা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে যে তিনি পাকিস্তানকে একটি মহান রাষ্ট্রে পরিণত করবেন। সেদিন তাঁকে স্বাগত জানাতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিল। উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরাও।

কিন্তু সেই দিন, আগাম নির্দেশ অনুযায়ী, বিমানবন্দরে কাউকেই উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়নি।

গভর্নর-জেনারেলের সামরিক সচিব কর্নেল জিওফ্রি নোলসই প্রথম আমাদের অভ্যর্থনা জানান। বিমান থেকে নামানোর পর কায়েদে-আজমকে স্ট্রেচারে করে একটি সামরিক অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়, যা তাঁকে গভর্নর-জেনারেলের বাসভবনে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।

আমি এবং সিস্টার ডানহাম তাঁর সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে বসলাম। গাড়িটি খুব ধীরগতিতে চলছিল। আমাদের দলের অন্য সদস্যরা পৃথক গাড়িতে রওনা হলেন। শুধু ডা. ইলাহি বক্স, ডা. মিস্ত্রি এবং সামরিক সচিব গভর্নর জেনারেলের ক্যাডিলাক গাড়িতে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে অনুসরণ করছিলেন।

আমরা প্রায় চার মাইল পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ অ্যাম্বুলেন্সটি যেন হাঁপিয়ে উঠল, কাশির মতো শব্দ করে থেমে গেল। প্রায় পাঁচ মিনিট পরে আমি অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে জানতে পারলাম, তেল শেষ হয়ে গেছে। চালক ইঞ্জিন নিয়ে অনেক চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু সেটি আর চালু হলো না।

আমি আবার অ্যাম্বুলেন্সে ফিরে আসতেই কায়েদে-আজমের হাত সামান্য নড়ল। তিনি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমি তাঁর কাছে ঝুঁকে নরম স্বরে বললাম,
— “অ্যাম্বুলেন্সের ইঞ্জিনে গোলযোগ হয়েছে।”

তিনি আবার চোখ বন্ধ করে নিলেন।

সাধারণত করাচিতে সমুদ্রের দিক থেকে প্রবল বাতাস বয়ে আসে, যা গরমের তীব্রতা অনেকটা কমিয়ে দেয়। কিন্তু সেদিন বাতাসের লেশমাত্র ছিল না; অসহনীয় গরমে চারদিক যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল। তার ওপর অসংখ্য মাছি তাঁর মুখের চারপাশে ভনভন করছিল। সেগুলো তাড়ানোর মতো শক্তিও তাঁর হাতে আর অবশিষ্ট ছিল না। সিস্টার ডানহাম এবং আমি পালা করে তাঁকে পাখা করতে লাগলাম, আর অপেক্ষা করতে লাগলাম আরেকটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য। প্রতিটি মিনিট যেন অনন্ত যন্ত্রণার মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।

তাঁকে ক্যাডিলাক গাড়িতে স্থানান্তর করা সম্ভব ছিল না, কারণ স্ট্রেচার রাখার মতো যথেষ্ট জায়গা ছিল না সেখানে। তাই আমরা শুধু অপেক্ষাই করতে লাগলাম—আশায় বুক বেঁধে।

কাছেই ছিল শত শত শরণার্থীর কুঁড়েঘর। তারা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল; কেউ জানত না যে, যিনি তাঁদের জন্য একটি স্বদেশ গড়ে দিয়েছিলেন,  তাঁদের সেই কায়েদে-আজম ঠিক তাঁদেরই মাঝখানে, একটি পেট্রোলশূন্য অচল অ্যাম্বুলেন্সে অসহায় অবস্থায় শুয়ে আছেন। চারপাশ দিয়ে গাড়ির হর্ন বেজে চলেছে, বাস ও ট্রাক গর্জন করতে করতে নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটে যাচ্ছে, আর আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক ইঞ্চিও এগোতে না-পারা একটি অ্যাম্বুলেন্সে— যেখানে এক অমূল্য জীবন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, রক্তবিন্দু রক্তবিন্দু, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে।

আমরা এক ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করেছিলাম। আমার জীবনের আর কোনো ঘণ্টা এত দীর্ঘ, এত কষ্টদায়ক বলে মনে হয়নি। অবশেষে আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছাল। তাঁকে স্ট্রেচারে করে নতুন অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো, এবং আমরা গভর্নর-জেনারেলের বাসভবনের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

সাবধানে তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার পর ইলাহীর ঘড়ি দেখে বুঝলাম, মৌরিপুর বিমানবন্দরে অবতরণের পর দুই ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেছে। কোয়েটা থেকে করাচি আসতে লেগেছিল দুই ঘণ্টা, আর মৌরিপুর বিমানবন্দর থেকে গভর্নর-জেনারেলের বাড়িতে পৌঁছাতেও লেগে গেল আরও দুই ঘণ্টা।

চিকিৎসকেরা তাঁকে পরীক্ষা করে বললেন- বিমানযাত্রা কিংবা অ্যাম্বুলেন্সের সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার ফলে তাঁর অবস্থার বিশেষ অবনতি হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। চিকিৎসকেরা বললেন, অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁরা আবার ফিরে আসবেন, তারপর তাঁরা চলে গেলেন।

এবার আমি একা রইলাম আমার ভাইয়ের পাশে। তিনি শান্তভাবে ঘুমিয়ে ছিলেন। আমার অন্তর যেন অনুভব করছিল—এটি সেই প্রদীপের শেষ উজ্জ্বল শিখা, নিভে যাওয়ার ঠিক আগের শেষ দীপ্তি। নীরবে আমার মন যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলছিল—

“ওহ, জিন! যদি আমার শরীরের সমস্ত রক্ত তোমার শরীরে ঢেলে দিতে পারতাম, যাতে তুমি বেঁচে থাকতে! যদি আল্লাহ আমার জীবনের সমস্ত বছর কেড়ে নিয়ে তোমাকে দিতেন, যাতে তুমি আমাদের জাতিকে আরও দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিতে পারতে—তবে তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ থাকত না।”

তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুমিয়ে ছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। আমাকে দেখে মাথা ও চোখের ইশারায় কাছে ডাকলেন। শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে তিনি ফিসফিস করে বললেন—“ফাতি… খুদা হাফিজ… লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।”

এরপর তাঁর মাথা আস্তে করে ডানদিকে কাত হয়ে গেল। চোখ দুটি চিরতরে বন্ধ হয়ে এল।

আমি ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে চিৎকার করে উঠলাম—“ডাক্তার! ডাক্তার! তাড়াতাড়ি আসুন! আমার ভাই মারা যাচ্ছেন! ডাক্তাররা কোথায়?”

কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁরা এসে পৌঁছালেন। তাঁরা তাঁকে পরীক্ষা করলেন এবং একের পর এক ইনজেকশন দিতে লাগলেন। আমি নিথর, নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর দেখলাম, তাঁরা তাঁর সমগ্র দেহ—মাথা থেকে পা পর্যন্ত—একটি সাদা চাদরে ঢেকে দিলেন। আমি বুঝে গেলাম এর অর্থ কী। মৃত্যু এসে তাঁকে এই ক্ষণস্থায়ী জীবন থেকে সেই অনন্ত, অমর জীবনের পথে নিয়ে গেছে।

কর্নেল ইলাহি বক্স ভারী পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি তাঁর ডান হাতটি আমার বাম কাঁধে রাখলেন এবং ছোট শিশুর মতো অঝোরে কেঁদে উঠলেন। তাঁর সেই অশ্রু—যার কোনো শব্দ ছিল না, কোনো ভাষা ছিল না—আমাকে চূড়ান্ত দুঃসংবাদটি জানিয়ে দিল। আমি নিজের চোখে জল খুঁজলাম, কিন্তু যেন অশ্রুর উৎসই শুকিয়ে গিয়েছিল। আমি চিৎকার করে কাঁদতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার কণ্ঠস্বর যেন বাকরুদ্ধতার অতল গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল। আমি নিজেকে টেনে তাঁর শয্যার পাশে নিয়ে গেলাম এবং কাঠের গুঁড়ির মতো মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম।

তাঁর মৃত্যুসংবাদ মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। গভর্নর-জেনারেলের বাসভবনের বিশাল লোহার ফটক—যেখানে সাধারণত কঠোর নিরাপত্তার কারণে অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারত না—সেদিন প্রশস্তভাবে খুলে দেওয়া হলো। চারদিক থেকে মানুষের অন্তহীন স্রোত সেখানে এসে ভিড় জমাতে লাগল।

অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁদের অনেকেই সেই কক্ষে এসে উপস্থিত হলেন, যেখানে তিনি এমন এক নিদ্রায় শায়িত ছিলেন, যেখান থেকে আর কোনো জাগরণ নেই। আমি সেখানেই বসে ছিলাম, চারপাশের সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন। সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলাম; আমার অপূরণীয় ক্ষতির বেদনায় আমি যেন নিজেকেও হারিয়ে ফেলেছিলাম।

আমি জানি না কতক্ষণ আমি সেখানে বসে ছিলাম, আমার ভাইয়ের দেহ ঢেকে রাখা সেই সাদা চাদরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।

তবে আমার স্পষ্ট মনে আছে, এক বয়স্কা মহিলা—যাঁকে আমি আগে কখনও দেখিনি বা চিনতাম না—নিঃশব্দে এসে আমার গলায় তাঁর বাহু জড়িয়ে ধরলেন এবং খুব শান্ত কণ্ঠে আমার কানে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত ফিসফিস করে পড়ে শুনালেন।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন।

অর্থ- “তিনি আল্লাহর কাছ থেকে এসেছিলেন, আল্লাহর কাছেই ফিরে গেলেন।”

অধ্যায় দুই

                  কাথিয়াওয়ার থেকে করাচি

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের সূচনালগ্নে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূর্য ধীরে ধীরে মধ্যগগনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। যারা একসময় এই উপমহাদেশে বণিক হিসেবে এসেছিল—বাণিজ্যিক সুবিধা চাইতে, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও অনুকূল আচরণের আবেদন জানাতে—তারাই শেষ পর্যন্ত এই দেশের শাসকে পরিণত হয়। তারা এমন এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মুকুটের সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্নে পরিণত হয়।

বাহ্যত চারদিকে ছিল এক ধরনের শান্ত পরিবেশ—যে শান্তি প্রায়ই ঝড়ের পূর্বাভাস হয়ে দেখা দেয়।বিদেশি শাসকরা মনে করেছিল, তাদের তথাকথিত সভ্যতা  প্রসারের মিশন অসন্তুষ্ট মানুষের ক্ষোভকে স্তিমিত করে দিয়েছে এবং প্যাক্স ব্রিটানিকা (ব্রিটিশ শান্তি) ভারতীয়দের বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের আগুন নিভিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের অন্তর্লীন ঘৃণা ও ক্ষোভের গুঞ্জন তাদের নজর এড়িয়ে যায়। অবশেষে ১৮৫৭ সালে একটি সুপরিকল্পিত স্ফুলিঙ্গ প্রজ্বলিত হয়ে এক মহাবিদ্রোহের অগ্নিশিখায় রূপ নেয়, যা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে এই ঘটনাই ভারতের দীর্ঘ, কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে।

এটি ছিল আমাদের ইতিহাসের এক অশান্ত সময়। অসংখ্য দেশপ্রেমিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন এবং তাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। এই বিদ্রোহ ভারতের প্রায় সর্বত্র মানুষের মনে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।

তবে এমন কিছু অঞ্চলও ছিল, যেখানে চারদিকে রাজনৈতিক অগ্নিকাণ্ড জ্বললেও মানুষের জীবন ছিল শান্ত ও নির্বিকার। বোম্বে প্রেসিডেন্সির কাথিয়াওয়ার অঞ্চলের দেশীয় রাজ্য গোন্ডল ছিল তেমনই একটি স্থান। গোন্ডলের ঠাকুর সাহেব ব্রিটিশ রাজমুকুটের প্রতি তাঁর অটল আনুগত্যের বিনিময়ে নিজের রাজ্যে জাঁকজমকের সঙ্গে শাসন চালিয়ে যেতে থাকেন। ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহের ছায়া যাতে তাঁর রাজ্যে প্রবেশ না করে এবং তাঁর নিজের অবিসংবাদিত ক্ষমতার জৌলুস ম্লান না হয়, সে বিষয়ে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তাঁর সুরক্ষার ছায়াতলে গোন্ডলের সাধারণ মানুষ ভারতের অন্যত্র চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব থেকে অনেকটাই মুক্ত থেকে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাপন করত।

গোন্ডলের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল কৃষি। এখানকার প্রধান ফসল ছিল তুলা, গম, জোয়ার এবং বাজরা। তবে গোন্ডলের কৃষিপণ্যের মধ্যে যে জিনিসটি তাকে বিশেষ খ্যাতি এনে দিয়েছিল, তা হলো মরিচ। আজও গোন্ডলের মরিচ তার উৎকৃষ্ট মানের জন্য সুপরিচিত।

সম্ভবত এ কারণেই, আমার শৈশবের যতদূর স্মৃতি মনে পড়ে, আমাদের বাড়ির প্রায় প্রতিটি রান্নাতেই প্রচুর পরিমাণে মরিচ ব্যবহার করা হতো। আর যাদের কাছে সেই ঝালও যথেষ্ট মনে হতো না, তারা সবসময় টেবিলে রাখা এক থালা ভর্তি মরিচ থেকে ইচ্ছামতো আরও মরিচ নিয়ে খাবারের ঝাল বাড়িয়ে নিত।

গোন্ডল ছিল সেই দেশীয় রাজ্যের রাজধানী এবং রাজ্যের সবচেয়ে বড় শহর। তবে রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ অসংখ্য গ্রামে বসবাস করত। তারা ছিল সহজ-সরল, সন্তুষ্ট এবং শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাদের পৃথিবী ছিল খুবই সীমাবদ্ধ; তাদের জীবন ও চিন্তার পরিসর মূলত নিজেদের রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ ছিল।

পানেলি ছিল তেমনই একটি ছোট গ্রাম। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ যখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধের বীজ বপন করছিল, তখন এই গ্রামের জনসংখ্যা ছিল এক হাজারেরও কম। এই ছোট্ট গ্রামেই বাস করতেন আমার দাদা পুঞ্জা। তাঁর পূর্বপুরুষেরাও এই গ্রামেই বসবাস করেছেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেছেন।

আমার দাদা ছিলেন পানেলির অল্প কয়েকজন মানুষের একজন, যিনি কৃষিকাজ করতেন না। তাঁর কয়েকটি হাতচালিত তাঁত ছিল। তিনি দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম করে এবং কয়েকজন মজুরের সহায়তায় মোটা সুতির হাতবোনা কাপড় তৈরি করতেন। সেই কাপড় বিক্রি করে তিনি এতটাই উপার্জন করতেন যে তাঁর পরিবারকে গ্রামের সচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যে গণ্য করা হতো।

তাঁর তিন ছেলে ছিল—ভালজি, নাথু এবং জিন্নাহ; আর একটি মেয়ে ছিল, যার নাম মানবাই। জিন্নাহ ছিলেন সবচেয়ে ছোট ছেলে। তিনি তাঁর দুই বড় ভাইয়ের তুলনায় অনেক বেশি উদ্যমী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল আনুমানিক ১৮৫৭ সালে—ভারতের প্রথম মহাবিদ্রোহের ঐতিহাসিক বছরে।

তরুণ ও উচ্চাভিলাষী জিন্নাহর কাছে পানেলি ছিল এক নিস্তেজ, ঘুমন্ত গ্রাম, যেখানে মানুষের জীবন আবর্তিত হতো গ্রামের বাজারের আড্ডা আর কুয়োর ধারের গল্পগুজবকে কেন্দ্র করে। তিনি শুনেছিলেন, গোন্ডল একটি বড় শহর, যেখানে জীবন অনেক বেশি কর্মচঞ্চল এবং ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক বিস্তৃত। পানেলিতে থেকে তিনি কী-ই বা করতে পারবেন? পরিবারের তাঁতে দুই ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার ভবিষ্যৎ তাঁকে মোটেও আকর্ষণ করত না। তাঁর কাছে সেটি ছিল অত্যন্ত ছোট পরিসরের উদ্যোগ। তাঁর দৃষ্টি ছিল বড় শহরের দিকে, যেখানে সাহসিকতা, নতুন সুযোগ এবং সাফল্যের আহ্বান তাঁকে টানছিল।

তাঁর বাবা তাঁকে সামান্য কিছু অর্থ দিলেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দিলেন মূল্যবান উপদেশ। তিনি বললেন, কোনো ব্যবসায়ে অর্থ বিনিয়োগ করার আগে ভালোভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে, কোন ব্যবসাটি সবচেয়ে লাভজনক হতে পারে।

বিশ্লেষণী ও সতর্ক স্বভাবের মানুষ হওয়ায়, আর পুঁজি কম থাকায়, আমার বাবা তাড়াহুড়ো করে কোনো ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়েননি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এমন কয়েকটি লাভজনক ব্যবসার ক্ষেত্র খুঁজে বের করলেন, যেখানে দ্রুত পণ্য কিনে বিক্রি করে ভালো মুনাফা অর্জন করা সম্ভব ছিল। ব্যবসার প্রতি তাঁর সহজাত দক্ষতা এবং অক্লান্ত পরিশ্রম তাঁকে দ্রুত সাফল্য এনে দিল। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এমন লাভ করতে লাগলেন যে তাঁর প্রাথমিক মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেল।

কয়েক মাস পরে তিনি যখন গোন্ডল থেকে পানেলিতে ফিরে এলেন, তখন তাঁর বাবা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এই দেখে যে তাঁর ছেলে বড় শহরে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পেরেছে।

তবে পরিবারের সদস্যরা তখনও জীবন সম্পর্কে প্রাচীন ঐতিহ্যগত মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, গোন্ডলের নানা প্রলোভন হয়তো তাঁদের তরুণ ছেলেকে আকৃষ্ট করবে এবং এত অল্প সময়ে যে লাভজনক ব্যবসা সে গড়ে তুলেছে, সেখান থেকে তার মনকে বিচ্যুত করবে। তাছাড়া তাঁর বাবা-মাও ক্রমে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ছিলেন। তাঁদের অন্য দুই ছেলে ও মেয়ের বিয়ে ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। এখন বাবা-মায়ের একমাত্র অবশিষ্ট দায়িত্ব ছিল তাঁদের কনিষ্ঠ ছেলে জিন্নাহর জন্য নিজেদের ইসমাইলি খোজা সম্প্রদায়ের একটি সম্মানিত ও সুশীল পরিবারের উপযুক্ত কন্যার সঙ্গে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করা।

তাঁরা তাঁর জন্য উপযুক্ত কনের সন্ধান শুরু করলেন। তাঁদের প্রবল ইচ্ছা ছিল, গন্ডলে স্থায়ীভাবে নতুন জীবন শুরু করতে প্যানেলি ছেড়ে যাওয়ার আগেই তাঁর বিয়ে হয়ে যাক। কনের খোঁজ তাঁদের প্যানেলির বাইরেও নিয়ে গেল। প্যানেলি থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরের ধাফা (Dhaffa) গ্রামে তাঁরা একটি সম্মানিত পরিবারের কন্যা মিঠিবাই-কে তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্রের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করলেন। ঘটকের মাধ্যমে মেয়ের বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং তাঁরা এই প্রস্তাবিত বিবাহে সম্মতি দেন। এভাবেই প্রায় ১৮৭৪ সালের দিকে ধাফা গ্রামে আমার বাবা জিন্নাভাই (Jinnahbhai) এবং আমার মা মিঠিবাই-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়।

আমার বাবার ব্যবসা দ্রুত উন্নতি করতে লাগল এবং তাঁর সামনে একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের অদম্য তাগিদ এবং আরও বড় ব্যবসা গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন তাঁর রক্তেই প্রবাহিত হতো। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনে যে পথই বেছে নেওয়া হোক, সফল হতে হলে নিজের সমস্ত শক্তি ও শ্রম সেই পথে নিয়োজিত করতে হবে। অলসতা ও আত্মতুষ্টিকে তিনি অগ্রগতির প্রধান বাধা মনে করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা, দীর্ঘ ও নিরলস পরিশ্রমই সাফল্যের প্রকৃত মূলধন।

তাঁর কাছে গন্ডল তাঁর বিশাল স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার তুলনায় খুবই ছোট একটি শহর বলে মনে হতে লাগল।

তিনি শুনেছিলেন, বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) নামে এক বিরাট শহরের কথা—যেখানে সমৃদ্ধি উপচে পড়ছে এবং বড় বড় ব্যবসায়ী পরিবার বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে তিনি করাচি সম্পর্কেও উৎসাহব্যঞ্জক সংবাদ শুনেছিলেন। গত কয়েক বছরে করাচি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর এবং বাণিজ্যের সমৃদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।

তখন তিনি ভাবতে শুরু করলেন—গন্ডলকে চিরদিনের জন্য পিছনে ফেলে তিনি কি বোম্বেতে যাবেন, নাকি করাচিতে? বোম্বের বিশাল ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তাঁকে আকৃষ্ট করলেও, শেষ পর্যন্ত ভাগ্যই তাঁর জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে দিল। সেই সিদ্ধান্তের ফলেই আমার বাবা ও মা কাথিয়াওয়ার ছেড়ে করাচিতে পাড়ি জমালেন।

তখন পর্যন্ত তিনি করাচির মতো এত বড় শহর কখনও দেখেননি। যদিও সেই সময়ের করাচি আজকের মতো বিশাল ছিল না। শহরটির প্রধান অংশ ছিল খাড্ডা (Khadda)—যেখানে প্রতিদিন পালতোলা নৌকায় প্রচুর মাছ এসে পৌঁছাত; খোলা রোদে সেগুলো শুকানো হতো এবং উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাছের গুদামে সংরক্ষণ করা হতো।

আর ছিল খারাদার (Kharadar)—নাম থেকেই যার অর্থ বোঝা যায়, এটি ছিল এমন এক জনপদ যেখানে আরব সাগরের লবণাক্ত পানি সরু রাস্তা, গলি ও অলিগলিতে ঢুকে পড়ত।

মিঠাদার (Mithadar)-এ লিয়ারি (Lyari) ও মালির (Malir) নদীর মিষ্টি পানি হাঁটু-গভীর কূপ খুঁড়ে সংগ্রহ করা যেত।

আর ছিল সদর (Saddar)—যেখানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট ও ব্যারাক অবস্থিত ছিল।

আমাদের বাবা শহরের বাণিজ্যকেন্দ্র খারাদারের নিউনহ্যাম রোডে (Newnham Road) একটি সাধারণ দুই কক্ষের ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন। সেখানে গুজরাট ও কাথিয়াওয়ার থেকে আগত বহু ব্যবসায়ী পরিবার বসবাস করতেন।

বাড়িটি পাথরের গাঁথুনি ও চুন-সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত ছিল; ছাদ ও মেঝে ছিল কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি। বাবার ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটটি ছিল প্রথম তলায়। এর সামনে কাঠ ও লোহার একটি প্রশস্ত বারান্দা রাস্তার উপর কিছুটা বেরিয়ে ছিল। দিনের বেলায় এটি ছিল বসে থাকার জন্য শীতল ও বাতাসপূর্ণ একটি আরামদায়ক স্থান, আর রাতে সেখানে একটি চারপাই পেতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যেত।

বারান্দা ও ঘরগুলো পশ্চিমমুখী ছিল। করাচিতে পশ্চিমমুখী বাড়ি সবচেয়ে উপযোগী বলে বিবেচিত হতো, কারণ বছরের প্রায় পুরো সময়ই আরব সাগর থেকে আসা শীতল সমুদ্রের বাতাস সেখানে অবাধে প্রবাহিত হতো।

যুবক মি. জিন্নাহ প্রথমদিকে এমন কোনো ব্যবসা খুঁজে পেতে বেশ অসুবিধায় পড়েছিলেন, যেখানে সহজে প্রবেশ করে লাভজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। তিনি পর্যায়ক্রমে নানা ধরনের ব্যবসায় হাত দেন এবং ধীরে ধীরে নিজের সামান্য মূলধন বাড়িয়ে তুলতে থাকেন। তাঁর হাতে যেন সোনার ছোঁয়া ছিল—যে ব্যবসাতেই তিনি হাত দিতেন, সেখান থেকেই তিনি ভালো লাভ অর্জন করতেন।

সেই সময় করাচিতে কয়েকটি ব্রিটিশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল, যারা করাচি ও তার আশপাশের অঞ্চল থেকে উৎপাদিত পণ্য ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যে রপ্তানি করত এবং ইংল্যান্ড থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানি করত। গ্রাহামস ট্রেডিং কোম্পানি (Grahams Trading Co.) এমনই একটি প্রতিষ্ঠান এবং করাচির অন্যতম শীর্ষ আমদানি-রপ্তানি সংস্থা ছিল।

যদিও আমার পিতা কোনো বিদ্যালয়ে নিয়মিত ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেননি, তবুও তাঁর অধ্যবসায় ও সহজাত মেধার কারণে তিনি ইংরেজি ভাষায় যথেষ্ট দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তখনকার দিনে এটি ছিল এক বিরল কৃতিত্ব, কারণ করাচির খুব কম ব্যবসায়ীই ইংরেজিতে কথোপকথন করতে পারতেন। সম্ভবত তাঁর এই ইংরেজি বলার দক্ষতাই তাঁকে গ্রাহামস ট্রেডিং কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করে তোলে, আর সেটিই তাঁর ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণে এক বিরাট আশীর্বাদ হিসেবে প্রমাণিত হয়।

অনেক বছর পরে, যখন আমাদের পরিবার কিছুদিনের জন্য রত্নাগিরিতে বসবাস করছিল, তখন আমাদের বাবা প্রতি রাতে আমাকে এবং আমার দুই বোনকে একত্র করে ইংরেজি পড়তে ও লিখতে শেখাতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ। সেই পড়ার সময় আমাদের তাঁর সামনে এমনভাবে আচরণ করতে হতো, যেন আমরা স্কুলের শ্রেণিকক্ষে বসে আছি।

আমাদের শিশুসুলভ চোখে বাবা ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ—যিনি এত সুন্দর ইংরেজি বলতে পারতেন। আমরা তাঁর সেই দক্ষতাকে ঈর্ষা করতাম এবং মনে মনে চাইতাম, যদি আমরাও তাঁর মতো ইংরেজি বলতে পারতাম! কখনো কখনো আমরা তিন ভাইবোন একত্র হয়ে খেলাচ্ছলে বাবার ইংরেজি বলার ভঙ্গি নকল করতাম। একজন বলত, “ইশ, ফিশ, ইশ, ফিশ, ইয়েস”, আর আরেকজন জবাব দিত, “ইশ, ফিশ, ইশ, ফিশ, নো।” আমরা খেলাটিকে এতটাই গুরুত্ব দিয়ে খেলতাম যে মনে হতো, বুঝি ইংরেজি শেখার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি—অথবা হয়তো ভাষাটি ইতিমধ্যেই রপ্ত করে ফেলেছি!

সেই সময় কান্দাহার থেকে অনেক আফগান ব্যবসায়ী ব্যবসার উদ্দেশ্যে করাচিতে আসতেন। আমাদের বাবারও তাঁদের সঙ্গে বিস্তৃত ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। বছরের পর বছর তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি কথ্য ফারসি ভাষায়ও যথেষ্ট সাবলীল হয়ে উঠেছিলেন। আমরা মূলত কাথিয়াওয়ারের মানুষ হওয়ায় আমাদের বাড়িতে গুজরাটি ভাষাই প্রচলিত ছিল। কিন্তু করাচিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর আমাদের পরিবারের সদস্যরা কচ্ছি(Cutchi) ও সিন্ধি ভাষাতেও সমান স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠেছিলেন।

গ্রাহামস ট্রেডিং কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর আমাদের বাবা তাঁর অন্যান্য ব্যবসার পাশাপাশি আইসিংগ্লাস#(isinglass) এবং গাম অ্যারাবিক(gum arabic)-# এর ব্যবসাও শুরু করেন। এ সময়ে তাঁর ব্যবসায়িক যোগাযোগ ইংল্যান্ড ও হংকংসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক চিঠিপত্র ইংরেজিতে লিখতে হতো। তাই আমাদের বাবা নিজ প্রচেষ্টায় ইংরেজি পড়া ও লেখা শিখে নেন।

সেই সময় খারাদারের কিছু ব্যবসায়ী শুধু বাণিজ্যই করতেন না, তাঁরা এক অর্থে ব্যাংকারের ভূমিকাও পালন করতেন। সিন্ধ, বেলুচিস্তান এবং পাঞ্জাবের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের প্রায় সমগ্র বাণিজ্য করাচি বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু তখন পর্যাপ্ত ব্যাংকিং সুবিধা না থাকায় অর্থ লেনদেন ও টাকা স্থানান্তরের কাজ সাধারণত এই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই সম্পন্ন হতো। বহু পরিবার নিজেদের সঞ্চিত অর্থ বিশ্বাসের ভিত্তিতে এসব ব্যবসায়ীর কাছে জমা রাখতেন; তাঁদের দপ্তরগুলোই তখনকার দিনে মানুষের কাছে আজকের ব্যাংকের মতো কাজ করত। অবশ্য আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার নানা আনুষঙ্গিক সুবিধা তখন ছিল না, কিন্তু এসব ব্যবসায়ী ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও বিশ্বস্ত। তাঁদের একটি কথাই লিখিত চুক্তির সমান নির্ভরযোগ্য ছিল। আমাদের পিতার প্রতিষ্ঠান জিন্নাহ পুঞ্জা অ্যান্ড কোম্পানিও ছিল তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ ও সফল ব্যবসায়িক সংস্থা, যা সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ী সমাজের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছিল।

এদিকে আমাদের মা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং বাবা তাঁর তরুণী স্ত্রীর প্রতি সর্বোচ্চ যত্ন ও মনোযোগ দিচ্ছিলেন। দুজনেই তাঁদের প্রথম সন্তানকে ঘিরে আনন্দ ও প্রত্যাশায় দিন গুনছিলেন। তখন করাচিতে নামমাত্র কয়েকটি প্রসূতি কেন্দ্র ছিল, আর যাঁরা দক্ষ ধাত্রী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন, তাঁদের চাহিদা ছিল খুবই বেশি। গর্ভকালীন চিকিৎসা ও পরিচর্যার ধারণা তখন প্রায় ছিলই না। প্রসবের সময় উপস্থিত হলেই কেবল ধাত্রীকে বাড়িতে ডেকে আনা হতো। খারাদার ছিল একটি সমৃদ্ধ এলাকা। সেখানে একজন অভিজ্ঞ ধাত্রী বাস করতেন, যিনি শহরের অন্যতম সেরা বলে পরিচিত ছিলেন। আমাদের মা আগেভাগেই তাঁকে ঠিক করে রেখেছিলেন। প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দক্ষ হয়ে ওঠা সেই ধাত্রীর হাতেই আমাদের মায়ের প্রথম সন্তান—একটি পুত্রসন্তানের—জন্ম হয়। দিনটি ছিল রবিবার, আর তারিখ ছিল ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর

নবজাতক শিশুটি দুর্বল ও খুবই ছোটখাটো ছিল। তার হাত ছিল সরু ও লম্বা, আর মাথাটিও ছিল কিছুটা লম্বাটে। শিশুটির স্বাস্থ্য নিয়ে তার বাবা-মা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ওজনও ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। তাঁরা শিশুটিকে একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান, দুর্বল চেহারা ছাড়া তার শরীরে বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কোনো শারীরিক ত্রুটি নেই এবং তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণও নেই। কিন্তু একজন চিকিৎসকের আশ্বাসেও স্নেহময়ী মায়ের উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কা সহজে দূর হলনা।

এরপর শিশুটির নাম রাখার প্রসঙ্গ উঠল। কাঠিয়াওয়ারে বসবাসের সময় আমাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের নামগুলো অনেকটাই হিন্দু নামের মতো ছিল। কিন্তু সিন্ধ ছিল একটি মুসলিম-প্রধান প্রদেশ,৪৩  আর তাঁদের প্রতিবেশীদের সন্তানদের নামও ছিল মুসলিম নাম। তাই বাবা-মা দুজনেই সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁদের প্রথম সন্তানের জন্য মোহাম্মদ আলী নামটিই হবে সবচেয়ে শুভ। সেই নামেই তাঁর নামকরণ করা হলো।

আমাদের মা মোহাম্মদ আলীকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। পরবর্তীকালে তাঁর আরও ছয়টি সন্তান জন্মালেও—তিন পুত্র ও চার কন্যা—জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মোহাম্মদ আলীকেই তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তান হিসেবে দেখেছেন। তাঁর অন্য সন্তানরা ছিলেন—রহমত, মরিয়ানি, আহমদ আলী, শিরীন, ফাতিমা এবং বন্দে আলী। মোট সন্তান ছিল সাতজন—তিন ছেলে ও চার মেয়ে।

আমাদের বাবার সফল ব্যবসার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে ভারী বোঝার মতো চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবুও আমার মা জোর দিয়ে বললেন যে, তাঁরা যেন ছোট্ট মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে আমাদের গ্রাম পানেলি থেকে প্রায় দশ মাইল দূরের গানোদে অবস্থিত হাসান পীরের দরগায় আকীকা অনুষ্ঠানের জন্য যান।

শৈশবে মা হাসান পীরের অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে অসংখ্য কাহিনি শুনেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যাঁরা এই পীরের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করেন, তাঁরা তাঁর আশীর্বাদ লাভ করেন। মাতৃসুলভ অন্তর্দৃষ্টি থেকে তিনি অনুভব করেছিলেন যে, তাঁর মোহাম্মদ আলীর জন্য এক মহান ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। তাই তিনি ছেলেকে হাসান পীরের দরগায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যেখানে সে সময়ের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শিশুর মাথা আনুষ্ঠানিকভাবে মুণ্ডন করা হতো এবং মা সন্তানের মঙ্গল ও ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য পীরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হতো।

প্রথমে বাবা নানা অজুহাতে যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি বললেন, করাচিতে ব্যবসার কাজ ফেলে এক মাসেরও বেশি সময় দূরে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তরুণ স্ত্রীর আন্তরিক অনুরোধের কাছে শেষ পর্যন্ত তাঁর অনমনীয়তা গলে গেল। তাই কয়েক মাস বয়সী শিশুপুত্রকে নিয়ে বাবা-মা একটি পালতোলা নৌকায় যাত্রার জন্য টিকিট কাটলেন। সেই নৌকা করাচি থেকে তাঁদের কাথিয়াওয়াড়ের ভেরাভাল বন্দরে নিয়ে যাবে—বর্ষার ঝড়-বৃষ্টি ও উত্তাল সমুদ্রের ঝুঁকি সত্ত্বেও।

দুর্বল কাঠের সেই নৌকাটি বহু যাত্রী নিয়ে মাঝসমুদ্রে এক ভয়াবহ ঝড়ের কবলে পড়ল। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে সেটি যেন একটি কাঠের তক্তার মতো দুলতে লাগল। নৌকার যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল; এমন পরিস্থিতিতে ভয় খুব দ্রুত একজনের কাছ থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন, কবে ঝড় থামবে এবং নৌকাটি নিরাপদে চলতে পারবে। আর মা তাঁর ছোট্ট ছেলেকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সকল সহযাত্রীর নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন—বিশেষ করে তাঁর প্রাণের ধন মোহাম্মদ আলীর জন্য।

অবশেষে ঝড় থেমে গেল। সমুদ্রে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো এবং নৌকাটি আনন্দের সঙ্গে নিরাপদে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল।

কয়েক দিন পরে মা বাবাকে বললেন, সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তে তিনি মানত করেছিলেন—যদি তাঁরা কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, তবে তিনি গানোদে আরও এক দিন অবস্থান করবেন এবং হাসান পীরের দরগায় আল্লাহর রহমতের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রার্থনা করবেন।

নৌকাটি যখন ভেরাভাল বন্দরে নোঙর ফেলল এবং তাঁরা নিরাপদে স্থলভাগে পা রাখলেন, তখন কয়েক মাইল দূরের গানোদে যাওয়ার জন্য তাঁরা একটি গরুর গাড়ি ভাড়া করলেন। আরব সাগরের ঝড়ো নৌযাত্রা এবং তারপর ঝাঁকুনিপূর্ণ গরুর গাড়ির ভ্রমণ শেষে আমাদের ছোট্ট ভাই মোহাম্মদ আলী মায়ের কোলে বসে অসংখ্য আত্মীয়স্বজনে পরিবেষ্টিত অবস্থায় হাসান পীরের দরগায় পৌঁছাল। সেখানে মায়ের করা মানত পূরণের উদ্দেশ্যে তাঁর মাথা মুণ্ডন করা হলো।

হাসান পীরের জীবন সম্পর্কে সত্য ঘটনা ও লোককাহিনি এতটাই একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে যে, ইতিহাস থেকে কিংবদন্তিকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, তিনি ইরান থেকে একজন ইসলামিক ধর্মপ্রচারক হিসেবে বেলুচিস্তান হয়ে স্থলপথে ভারতে এসেছিলেন এবং কিছুদিন মুলতানে বসবাস করেছিলেন।

তাঁর পবিত্র ও আদর্শ জীবন অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল এবং তাঁর হাতে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি সিন্ধু অঞ্চলে ভ্রমণ করে ধর্মপ্রচার চালিয়ে যান, কচ্ছ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত পানেলির নিকটবর্তী এক স্থানে এসে বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই তিনি তাঁবু গেড়ে স্থানীয় অমুসলিম জনগণের মধ্যে ইসলাম প্রচারে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করেন।

লোককথায় বলা হয়, তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। তাঁকে ঘিরে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এমন মহান ধর্মপ্রচারকদের জীবনকে ঘিরে এ ধরনের কিংবদন্তি সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে ঐতিহাসিক দলিল ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাবে এসব অলৌকিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

হাসান পীর সম্পর্কে বলা হয়, তিনি সেইসব মুসলিম সুফি সাধকদের পথ অনুসরণ করতেন, যারা দিনের বেলা কুরআনের শিক্ষা ও ইসলামের বাণী প্রচারে জীবন উৎসর্গ করতেন এবং রাত কাটাতেন ধ্যান-সাধনার রহস্যময় জগতে। তাঁর অভ্যাস ছিল সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া, রাত প্রায় দুইটার সময় জেগে ওঠা এবং ভাধর নদীর তীরে নিজের তাঁবুর বাইরে বসে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন থাকা। এরপর তিনি ফজরের নামাজ আদায় করতেন।

এক রাতে তিনি যখন অদৃশ্য পরম সত্তার সঙ্গে গভীর আত্মিক সংযোগে নিমগ্ন ছিলেন, তখন নদীতে হঠাৎ এক প্রবল জলোচ্ছ্বাস দেখা দেয়। সেই উত্তাল ঢেউ নদীর তীর ভেঙে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ধ্যানমগ্ন হাসান পীরকে নদীর প্রবল স্রোত মাঝনদীতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেখানেই ডুবেই তাঁর পার্থিব জীবনের অবসান ঘটে।

রাতের অন্ধকারে তাঁর নিথর দেহ ভেসে ভেসে পানেলি গ্রাম থেকে গিয়ে পৌঁছায় গনোদ নামের একটি গ্রামের কাছে নদীর তীরে। সেই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিলেন রাবারি জাতির অমুসলিম মানুষ, যাদের বংশানুক্রমিক পেশা ছিল গরু পালন।

ভোরবেলা কয়েকজন রাবারি যখন ভাধর নদীর তীরে আসেন, তখন তাঁরা নদীর সরে যাওয়া পানিতে তীরে ভেসে আসা হাসান পীরের মৃতদেহ দেখতে পান। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গেই সেই পুণ্যবান ব্যক্তিকে চিনতে পারেন, যার খ্যাতি পানেলি গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

গ্রামের প্রবীণদের এক সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ভাগ্য যখন এই মহান সাধকের দেহ তাঁদের গ্রামে এনে দিয়েছে, তখন তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে দাফন করা হবে এবং তাঁর কবরের ওপর একটি মাজার নির্মাণ করা হবে। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই দরগাহ তাঁদের গ্রামের জন্য সমৃদ্ধি ও কল্যাণ বয়ে আনবে।

এইভাবেই হাসান পীরের সমাধি গনোদ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর প্রতি গন্ডল রাজ্যের মানুষের ভক্তি ও শ্রদ্ধা এতটুকু কমেনি। আজও প্রতি বছর তাঁর দরগায় উরস পালিত হয়, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের অসংখ্য ভক্ত একত্রিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

হাসান পীরের দরগায় আকীকার অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর আমাদের বাবা-মা তাঁদের ন্যাড়া-মাথার ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে আবার গরুর গাড়িতে করে নিজেদের জন্মভূমি পানেলি গ্রামে ফিরে আসেন।

করাচিতে আমাদের বাবার আর্থিক সাফল্যের কথা তাঁর শৈশবের বন্ধু ও আত্মীয়স্বজন ইতিমধ্যেই অবগত হয়েছিলেন। তাঁর সাফল্য তাঁকে এমন এক মর্যাদা এনে দিয়েছিল, যা গ্রামের মানুষের চোখে তাঁকে বিশেষ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

আমাদের মা তাঁর আদরের ছেলের জন্ম উপলক্ষে একটি বড় ভোজের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পুরো গ্রামের মানুষকে সেই সামষ্টিক ভোজে আমন্ত্রণ জানান।

আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন বড়দের মুখে শুনতাম— সেদিন পানেলি গ্রামে একটি পরিবারও নিজেদের ঘরে চুলা জ্বালায়নি। রান্নার হাঁড়ি-পাতিল আর খাওয়ার থালা-বাসন রান্নাঘরের তাকেই পড়ে ছিল, যেন সেগুলোও বিশ্রাম নিচ্ছিল। কারণ, সেদিন গোটা গ্রাম একসঙ্গে আনন্দ উদ্‌যাপন করেছিল— পানেলি গ্রামেরই এক পরিবারের ঘরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট মোহাম্মদ আলির আগমন উপলক্ষে।”

পানেলি ও গন্ডালে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে আমাদের বাবা-মা তাঁদের ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে আবার করাচিতে ফিরে আসেন। সেই শিশুটির তখনও বুঝতে পারার মতো বড় হয়নি যে, গনোদ ও পানেলিতে তার আগমনকে ঘিরে কত আনন্দ-উৎসব উদ্‌যাপন করা হয়েছিল।

করাচিতে ফিরে বাবা আবার পুরোপুরি ব্যবসার কাজে ডুবে গেলেন, আর মা তাঁর সমস্ত সময় ও স্নেহ নিবেদন করলেন নবজাতক সন্তানের লালন-পালনে।

মাঝে মাঝে, বিশেষ করে মায়ের ইচ্ছায়, বাবা কিছুটা খরুচে হয়ে উঠলেও সাধারণভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিতব্যয়ী এবং অর্থব্যয়ের ব্যাপারে সতর্ক। নতুন শহরে নিজের ব্যবসা গড়ে তোলা ও সম্প্রসারণের সংগ্রামে ব্যস্ত থাকা একজন ব্যবসায়ী প্রতিটি পয়সার মূল্য বুঝে চলাই স্বাভাবিক ছিল। তাই আমাদের পরিবার খুবই সাধারণ জীবনযাপন করত। বাহ্যিক জাঁকজমক না থাকলেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিল গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা। বাবার ব্যবসা তখন যথেষ্ট ভালো চললেও অপ্রয়োজনীয় খরচ না করার অভ্যাস তিনি কখনও ত্যাগ করেননি।

তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাগ্য বড়ই চঞ্চল—আজ সে হাসিমুখে আশীর্বাদ করতে পারে, কিন্তু আগামীকাল তার মনোভাব কী হবে, তা কেউ জানে না। এই নীতিকেই সামনে রেখে তিনি সংসারের ব্যয় পরিচালনা করতেন। তাঁর এই অভ্যাস আমাদের মনেও গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তীকালে এই মিতব্যয়িতা কায়েদে-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চরিত্রেরও এক স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

মোহাম্মদ আলীর তখন প্রায় ছয় বছর বয়স। বাবা-মা ছেলেকে গুজরাটি শেখানোর জন্য বাড়িতে একজন শিক্ষক নিয়োগ করলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, সে এখনও স্কুলে যাওয়ার মতো বড় হয়নি। তাছাড়া নিকটতম স্কুলটিও আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে ছিল, আর এতটা পথ হেঁটে যাওয়া ছয় বছরের একটি শিশুর পক্ষে কষ্টকর বলেই তাঁরা মনে করতেন।

পড়াশোনার প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। বিশেষ করে যোগ-বিয়োগ শেখা তার কাছে ছিল একেবারেই অসহ্য। গৃহশিক্ষকের সঙ্গে কাটানো সময়টাকে সে যেন এক অযাচিত শাস্তি বলে মনে করত।

কিন্তু পাড়ার সমবয়সি ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলার সময় সে ছিল একেবারেই অন্য মানুষ। খেলায় সে এতটাই দক্ষ ছিল যে, অল্প বয়সেই বন্ধুদের মধ্যে নেতৃত্বের আসন দখল করে নিয়েছিল। তার সঙ্গীরাও তাকে নিজেদের নেতা বলেই মনে করত, আর সেও স্বভাবতই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে সে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

তবে প্রায় নয় বছর বয়সে তাকে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। সেখানে পরীক্ষার সময় তাকে সহপাঠীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হতো। তখন সে বিস্মিত ও হতাশ হয়ে দেখল, অনেক ছাত্রই তার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে তাকে পিছনে ফেলে দিচ্ছে।

যে ছেলে খেলাধুলায় নিজেকে সবার সেরা বলে ভাবত, সে বুঝতে পারল পড়াশোনায় সে প্রথম হতে পারছে না। একদিকে প্রতিদিন অনেকটা সময় খেলাধুলা ছেড়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেই স্কুলজীবন তাকে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবও এনে দিচ্ছে না। ফলে তার মনে বই ও স্কুলের প্রতি এক ধরনের শিশুসুলভ বিরাগ জন্ম নিল।

এতে বাবা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, ছেলে ভালোভাবে পড়াশোনা করে ম্যাট্রিক পাস করবে এবং পরে তাঁর ব্যবসায় যোগ দেবে। আর মা, যিনি ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অগাধ বিশ্বাস পোষণ করতেন, প্রায়ই বলতেন,— “আমাদের মোহাম্মদ আলী একদিন বড় মানুষ হবে। সে খুবই বুদ্ধিমান হবে, অন্য সব ছেলেদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ হবে।” কিন্তু ছেলের পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ দেখে তাঁর সেই স্বপ্ন যেন ভেঙে পড়তে লাগল।

মা তাকে আদর করে বুঝিয়ে বলতেন, নিয়মিত স্কুলে যেতে এবং মন দিয়ে পড়াশোনা করতে। তিনি বলতেন-, একমাত্র এভাবেই সে জীবনে উন্নতি করতে পারবে এবং অন্য সবার চেয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

ছেলের আচরণে অনেক সময় বিরক্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও বাবা ধৈর্য হারাতেন না। তিনি স্নেহভরে জিজ্ঞেস করতেন— “মোহাম্মদ আলী, বল তো, তুমি বই নিয়ে যথেষ্ট সময় কাটাও না কেন?”

ছোট্ট মোহাম্মদ আলী উত্তর দিল— “আব্বা, আমার স্কুলে যেতে ভালো লাগে না।”

বাবা আবার জিজ্ঞেস করলেন— “তাহলে তুমি কী করতে চাও?”

— “আব্বা, আমি আপনার সঙ্গে অফিসে বসতে চাই। ব্যবসা শিখতে চাই।”

বাবা হেসে বললেন— “কিন্তু তুমি তো এখনও খুব ছোট, মোহাম্মদ আলী।”

ছেলেটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল— “আমি স্কুলের চেয়ে আপনার অফিসেই বেশি ভালো করতে পারব।”

বাবা ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ। তিনি ছেলেকে একটু পরীক্ষা করার জন্য বললেন— “মোহাম্মদ আলী, আমার অফিসে কিন্তু খুব কঠোর নিয়ম। তোমাকে সকালে ঠিক আটটায় আমার সঙ্গে অফিসে যেতে হবে। দুপুরে দুইটা থেকে চারটা পর্যন্ত বাড়ি ফিরে খাবার খেয়ে বিশ্রাম নেওয়া যাবে। তারপর আবার বিকেল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত অফিসে থাকতে হবে।”

ছোট্ট মোহাম্মদ আলী এক মুহূর্তও দেরি না করে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল— “আমি পারব, আব্বা।”

— “কিন্তু তাহলে তো তোমার খেলাধুলার জন্য একেবারেই সময় থাকবে না।”

— “তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”

এভাবেই ছোট্ট মোহাম্মদ আলী কিছুদিন বাবার অফিস আর বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ—এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থায় দোদুল্যমান থাকার পর বাবার সঙ্গে নিয়মিত অফিসে যেতে শুরু করলেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারলেন, অফিসে তাঁর করার মতো তেমন কোনো কাজ নেই। সেখানে সবকিছুই নির্ভর করে পড়াশোনা ও লেখাপড়ার ওপর। কত টাকা এল, কত টাকা খরচ হলো—সব হিসাব খাতায় লিখে রাখতে হতো। অথচ তিনি তখন পড়তে, লিখতে কিংবা হিসাব রাখতে—কোনোটাই জানতেন না।

ফলে অফিসে তাঁর কাজ বলতে ছিল ছোটখাটো টুকিটাকি দায়িত্ব পালন করা, যা তাঁর একেবারেই ভালো লাগত না। অন্যদিকে কেনাবেচা এবং ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত তাঁর বাবা অভিজ্ঞ কর্মচারীদের পরামর্শে নিতেন। এসব বিষয়ে তাঁর মতামত নেওয়ার বা অনুমোদন চাওয়ার প্রয়োজন কেউই মনে করত না। এর চেয়েও বড় অসুবিধা ছিল—তিনি সম্পূর্ণভাবে তাঁর প্রিয় খেলাধুলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, যা তাঁকে ভীষণ আকর্ষণ করত।

প্রায় দুই মাসের মধ্যেই অফিসের কাজের প্রতি তাঁর সম্পূর্ণ অনীহা জন্মাল। একদিন তিনি বাবাকে অবাক করে দিয়ে বললেন— “বাবা, অফিসের কাজ আমার ভালো লাগে না।”

বাবা জিজ্ঞেস করলেন— “তাহলে তুমি কী করতে চাও, মোহাম্মদ আলী?”

তিনি উত্তর দিলেন— “আমি আবার স্কুলে যেতে চাই।”

এ কথা শুনে তাঁর বাবা ভীষণ খুশি হলেন। কিন্তু নিজের আনন্দ গোপন রেখে শান্ত স্বরে বললেন— “দেখো বাবা, জীবনে শেখার মাত্র দুটি পথ আছে।”

মোহাম্মদ আলী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন— “সেগুলো কী, বাবা?”

বাবা বললেন— “প্রথম পথ হলো—বড়দের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখা, তাঁদের পরামর্শ মেনে নেওয়া এবং তাঁরা যেমন বলেন ঠিক তেমনই করা।”

মোহাম্মদ আলী আবার জিজ্ঞেস করলেন— “আর দ্বিতীয় পথ?”

বাবা উত্তর দিলেন— “দ্বিতীয় পথ হলো নিজের পথ নিজে বেছে নেওয়া; ভুল করতে করতে শেখা; জীবনের কঠিন আঘাত, ধাক্কা ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা অর্জন করা।”

ছোট্ট মোহাম্মদ আলী গভীর মনোযোগ দিয়ে বাবার কথা শুনলেন।

এই ঘটনাটিই পরবর্তী জীবনে কায়েদে আজমের (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অন্যের পরামর্শে নয়, বরং নিজের বিবেচনা ও বিশ্বাসের পথেই চলতে বেশি পছন্দ করতেন।

স্কুলে ফিরে এসে সে যেন একেবারে বদলে গেল। আর আগের মতো অমনোযোগী, উদাসীন বা সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে থাকা ছেলে সে রইল না। নিজের হারানো সময় পুষিয়ে নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা তার মধ্যে জন্ম নিল। কারণ, তার সমবয়সী এমনকি তার চেয়েও ছোট অনেক ছেলে পড়াশোনায় অনেক এগিয়ে গিয়েছিল। সে নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় মন দিল। বাড়িতে রাত গভীর পর্যন্ত পড়াশোনা করত এবং দৃঢ় সংকল্প নিয়েছিল যে, সে অবশ্যই সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে।

আমাদের বাবা মোহাম্মদ আলীকে পড়াশোনার প্রতি এতটা আন্তরিক হতে দেখে খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। একদিন পথে তার শ্রেণিশিক্ষকের সঙ্গে দেখা হলে তিনি ছেলের পড়াশোনার খবর জানতে চান। শিক্ষক বললেন— “সে ধীরে ধীরে উন্নতি করছে। তবে একটা কথা বলতে হবে— অঙ্কে ছেলেটি ভীষণ দুর্বল।”

এই কথা শুনে বাবা খুব হতাশ হলেন। তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, ছেলেটি তার মায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো অসাধারণ প্রতিভাবান শিশু নয়, কিংবা অল্প বয়সেই বিস্ময়কর মেধার পরিচয় দেবে এমনও নয়। তার শিক্ষকেরাও তাকে বিশেষ সম্ভাবনাময় ছাত্র বলে মনে করতেন না। তাদের ধারণা ছিল, কঠোর পরিশ্রম করলে সে হয়তো পরীক্ষায় পাস করতে পারবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাধারণ অফিস-কর্মচারীদের ভিড়েই হারিয়ে যাবে।

কিন্তু বাবার ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। তিনি চেয়েছিলেন, তার ছেলে গণিতে দক্ষ হোক। কারণ ব্যবসার মূল ভিত্তিই হলো হিসাব-নিকাশ। তিনি আশা করেছিলেন, একদিন যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পুঞ্জা অ্যান্ড কোম্পানি-এর দায়িত্ব নেবে, তখন প্রতিষ্ঠানটি আরও উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। তাই তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বললেন,— “অঙ্কে দুর্বল! তাহলে ছেলেটা ভবিষ্যতে কী হবে?”

কিন্তু আমার মায়ের বিশ্বাস একটুও টলেনি। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
— “তুমি অপেক্ষা করো। আমার মোহাম্মদ আলী অবশ্যই ভালো করবে, আর একদিন অনেক মানুষ তাকে দেখে ঈর্ষা করবে।”

বাবা মনে করলেন, স্ত্রীর অন্তর্দৃষ্টির চেয়ে ছেলের প্রকৃত কল্যাণের কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তিনি বুঝেছিলেন, খারাদারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা মোহাম্মদ আলীর পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি করছে। তারা তাকে প্রায়ই বই-খাতা ছেড়ে মার্বেল, লাট্টু, গিলি-ডান্ডা ও ক্রিকেট খেলতে প্রলুব্ধ করত। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ছেলেকে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের একটি স্কুলে ভর্তি করে দিবেন।

নিউনহ্যাম রোডে, তাদের বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইল দূরে অবস্থিত সিন্ধ মাদ্রাসাতুল ইসলামযেটি ছিল সে সময় খান বাহাদুর হাসান আলী আফেন্দি প্রতিষ্ঠিত সিন্ধের মুসলমানদের একমাত্র উল্লেখযোগ্য উচ্চবিদ্যালয়—সেই স্কুলেই তিনি মোহাম্মদ আলীকে ভর্তি করে দিলেন।

তখন মোহাম্মদ আলীর বয়স প্রায় দশ বছর। তাকে সিন্ধ মাদ্রাসায় গুজরাটি বিভাগের চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, তিনি ছিলেন সেখানে ভর্তি হওয়া ১১৪তম ছাত্র। কিন্তু স্কুল বদলালেও তার স্বভাবের বিশেষ পরিবর্তন হলো না। পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলার মাঠেই সাফল্য ও বিজয় অর্জনের প্রতি তার আকর্ষণ বেশি রয়ে গেল।

এই সময়ে বাবার একমাত্র বোন মানবাই বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) থেকে করাচিতে বেড়াতে এলেন। বিয়ের পর তিনি স্বামীর সঙ্গে সেখানেই বসবাস করতেন। আমরা তাঁকে আদর করে মানবাই ফুফি বলে ডাকতাম। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত, রসিক ও বুদ্ধিমতী একজন নারী। আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি অগ্রসর না হলেও তার প্রজ্ঞা ছিল অসাধারণ।

বাবা তার বোনকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, আর মানবাইও তার ছোট ভাইপো জিন্নাহকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ভাই-বোনের এই আন্তরিক সম্পর্ক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। প্রায় চার দশক ধরে কায়েদে-আজমের সান্নিধ্যে থাকার স্মৃতি ফিরে দেখলে, বাবা ও তার বোনের সেই গভীর বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক নিবেদনের কথা আমার বারবার মনে পড়ে। আরও মনে আছে, বহু বছর পরে যখন মানবাই তার স্বামীকে নিয়ে স্থায়ীভাবে করাচিতে বসবাস করতে আসেন, তখন তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন।

তিনি ছিলেন এক অসাধারণ গল্পকথক। আজও আমি বিস্মিত হই—কীভাবে তিনি শত শত গল্প মুখস্থ মনে রাখতে পারতেন! তিনি কখনো বিদ্যালয়ে যাননি, তাই বই পড়ে গল্প শেখার সুযোগও তাঁর ছিল না। তবু সন্ধ্যা নামলেই মানবাই পুফি আমাকে, আমাদের বোনদের এবং কাজিনদের চারপাশে জড়ো করতেন। তখন তিনিই হয়ে উঠতেন আমাদের চোখ ও কানের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা মুগ্ধ হয়ে তাঁর গল্প শোনতাম। রাতের পর রাত তিনি এমন মোহনীয় ভঙ্গিতে গল্প বলতেন যে আমরা যেন গল্পের জাদুর জগতে হারিয়ে যেতাম। তিনি আমাদের পরীদের গল্প শোনাতেন, উড়ন্ত গালিচার গল্প, জিন-পরী ও ড্রাগনের গল্প। আমাদের শিশুমনে সেগুলো ছিল এক বিস্ময়কর, অলৌকিক জগতের কাহিনি।

আমাদের বাবা, মা এবং মানবাই পুফি একদিন বসে পরামর্শ করছিলেন—মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে কী করা যায়। সে কোনোভাবেই পড়াশোনায় মন দিতে চাইছিল না। তখন তার বয়স প্রায় দশ বছর, অথচ সে এখনও গুজরাটি চতুর্থ শ্রেণি পাস করতে পারেনি। মানবাই পুফি প্রস্তাব দিলেন, তিনি মোহাম্মদ আলীকে সঙ্গে করে বোম্বাই নিয়ে যাবেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, পরিবেশের পরিবর্তন হলে ছেলেটি হয়তো নিয়মিত পড়াশোনা করতে আগ্রহী হবে। অনেক বোঝানোর পর মা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এতে সম্মতি দিলেন। এভাবেই মোহাম্মদ আলী মানবাই পুফির সঙ্গে বোম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

বোম্বাইয়ে তিনি মোহাম্মদ আলীকে আনজুমান-ই-ইসলাম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। কিছুদিনের জন্য মনে হলো, সে সত্যিই পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে। সে গুজরাটি চতুর্থ শ্রেণি উত্তীর্ণ হলো এবং ইংরেজি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করল। কিন্তু এদিকে ছেলেকে ছাড়া মা ভীষণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের ভালোবাসা ও স্নেহ বাবার যুক্তিবোধকে হার মানাল। ফলে মোহাম্মদ আলী আবার বোম্বাই থেকে করাচিতে ফিরে এল।

আমাদের বাবা তাঁকে পুনরায় সিন্ধ মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলেন। বিদ্যালয়ের নথিপত্রে দেখা যায়, এবার তাঁর ভর্তি-ক্রমিক নম্বর ছিল ১৭৮, ভর্তি হওয়ার তারিখ ২৩ ডিসেম্বর ১৮৮৭ আগের বিদ্যালয়ের নাম হিসেবে উল্লেখ ছিল আনজুমান-ই-ইসলাম স্কুল, বোম্বাই

এ সময়ের মধ্যে মোহাম্মদ আলীর ঘোড়ায় চড়ার প্রতি প্রবল আকর্ষণ জন্মেছিল। আমার বাবার বেশ কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি ছিল। তখনকার দিনে মোটরগাড়ির যুগ শুরু হয়নি; ঘোড়ার গাড়িই ছিল অভিজাতদের যাতায়াতের প্রধান বাহন। বাবার আস্তাবলে অনেক উৎকৃষ্ট জাতের ঘোড়া ছিল। মোহাম্মদ আলী খুব দ্রুতই ঘোড়ায় চড়া শিখে ফেলল এবং এই খেলাটি সে ভীষণ উপভোগ করত। তার এক সহপাঠী ছিল করিম কাসিম, খারাদারের আরেক ব্যবসায়ীর ছেলে। দুজনে প্রতিদিন অনেক দূর পর্যন্ত ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে যেত।

সে তার ঘোড়াগুলোকে গভীরভাবে ভালোবাসত। ঘোড়াগুলো মাথা উঁচু করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত— যা ছিল শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার প্রতীক। প্রকৃতির সর্বত্রই সে প্রত্যক্ষ করত জীবন যেন ঊর্ধ্বমুখী রেখায় নিজেকে গড়ে তোলে। ঘোড়া সোজা হয়ে দাঁড়ায়; গাছপালাও আকাশের দিকে মাথা তুলে বাড়ে; ডালের ফুলও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ফোটে; মানুষ সোজা হয়ে হাঁটে; পাখি ও পশুর মধ্যেও সেই ঋজুতা বিদ্যমান। মসজিদের মিনার ও গম্বুজও যেন আকাশ স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষায় ঊর্ধ্ব দিকে উঠে যায়।

এই উপলব্ধি থেকেই তিনি জীবনের একটি নীতি গ্রহণ করেছিলেন—শুধু সামনে তাকিয়ে চলাই নয়, সর্বদা মাথা উঁচু করে চলতে হবে। কোনো বাধা বা প্রতিকূলতা তাঁকে কখনো নত করতে পারবে না। বরং তিনি সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করবেন এবং জয় করবেন। তিনি হতে চেয়েছিলেন এক বিশাল পাইনগাছের মতো— যাকে ঝড় প্রবলভাবে দুলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু কখনোই নত করতে পারে না।

তিনি দিনের বেলা স্কুলে পড়াশোনা করতেন এবং কোনো রকমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেন। আর সন্ধ্যার সময় তিনি ঘোড়ায় চড়ার অনুশীলনে কাটাতেন।

তবে নতুন কিছু করার প্রবণতা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তাঁর মনো। তিনি বাবাকে অনুরোধ করলেন তাঁকে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি করে দিতে। কিছু তর্ক-বিতর্কের পর তাঁর কথায় বাবা রাজি হলেন। সিন্ধ মাদ্রাসার নথি থেকে জানা যায়, তিনি ইংরেজি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন ১৮৯১ সালের ৫ জানুয়ারি সেই স্কুল ত্যাগ করেন। এরপর তিনি করাচির লরেন্স রোডে অবস্থিত সি.এম.এস. হাই স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু নতুন স্কুলটিও তাঁর ভালো লাগেনি। আবারও তিনি বাবাকে অনুরোধ করলেন তাঁকে সিন্ধ মাদ্রাসায় ফিরিয়ে নিতে। ফলে ১৮৯১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ মাত্র এক মাস পর, তিনি আবার সিন্ধ মাদ্রাসায় ফিরে এসে ইংরেজি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা শুরু করেন।

তখন তাঁর বয়স ছিল পনেরো বছর। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর বাবা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, “এই ছেলেটি ভবিষ্যতে কী হবে?”

এদিকে গ্রাহামস ট্রেডিং কোম্পানির একজন ইংরেজ জেনারেল ম্যানেজার, যিনি ইতিমধ্যেই তাঁর বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন, প্রস্তাব দিলেন যে তরুণ মোহাম্মদ আলীকে লন্ডনে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে তিন বছরের জন্য শিক্ষানবিশ (Apprentice) হিসেবে পাঠানো যেতে পারে। সেখানে তিনি ব্যবসা পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, যা তাঁকে দেশে ফিরে এসে বাবার ব্যবসায়ে যোগ দেওয়ার জন্য সর্বোত্তমভাবে প্রস্তুত করবে। জেনারেল ম্যানেজারের বিশ্বাস ছিল, লন্ডন থেকে এমন মূল্যবান অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এলে তিনি বাবার ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারিত করতে এবং নতুন নতুন লাভজনক ব্যবসার ক্ষেত্র যোগ করতে সক্ষম হবেন।

এই প্রস্তাব একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর বাবাকে আকৃষ্ট করল। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করলেন যে, লন্ডনের অভিজ্ঞতা তাঁর ছেলেকে পারিবারিক ব্যবসার জন্য এক অমূল্য সম্পদে পরিণত করবে।

তবে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল—এই উদ্যোগে কত ব্যয় হবে? যদিও ভবিষ্যতে এর সুফল পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এর কোনো আর্থিক লাভের সম্ভাবনা ছিল না। তাই তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে জেনারেল ম্যানেজারের কাছে জানতে চাইলেন, করাচি থেকে লন্ডনে যাওয়ার সবচেয়ে সাশ্রয়ী উপায় কী এবং ইংল্যান্ডে ছেলের মাসিক ভরণপোষণের জন্য কত অর্থের প্রয়োজন হবে।

সব হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করা হলো। তিন বছরের মোট ব্যয় যথেষ্ট বেশি হলেও,  বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি সেই অর্থ গ্রাহামস কোম্পানির লন্ডন অফিসে জমা রাখবেন, যাতে ছেলের প্রশিক্ষণ নির্বিঘ্নে চলতে পারে। তিনি মনে করতেন, ব্যবসায় সাফল্য বাতাসের মতোই চঞ্চল—কখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা আগে থেকে বলা যায় না।

পরবর্তীকালে দেখা গেল, কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া একজন দূরদর্শী ব্যবসায়ীর এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছিল। যদি তিনি আগেভাগে এই আর্থিক ব্যবস্থা না করতেন, তবে লন্ডনে তাঁর ভাইয়ের কর্মজীবন হয়তো অকালেই থেমে যেত।

কিন্তু আমাদের মা ছিলেন অনড়। তাঁর আদরের মোহাম্মদ আলীকে কীভাবে তিনি তিন বছরের জন্য নিজের কাছ থেকে দূরে থাকতে দেবেন? বাবা তাঁকে বোঝালেন যে, এটি ছেলেটির ভবিষ্যৎ এবং তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা জিন্নাহ পুনজা অ্যান্ড কোম্পানি—উভয়েরই মঙ্গলের জন্য জরুরি। তাছাড়া, তিন বছর দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।

কয়েক দিনের অনেক বোঝানোর পর মা রাজি হলেন, তবে তিনি একটি শর্ত দিলেন। অবিবাহিত এক তরুণকে ইংল্যান্ডে পাঠানো খুবই বিপজ্জনক—বিশেষ করে তাঁর সুদর্শন ছেলে মোহাম্মদ আলীকে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, যদি সে কোনো ইংরেজ মেয়েকে বিয়ে করে বসে, তবে তা জিন্নাহ পুনজা পরিবারের জন্য এক বড় বিপর্যয় হবে।

বাবা তাঁর এই যুক্তি মেনে নিলেন। তখন প্রশ্ন উঠল, মোহাম্মদ আলীর বিয়ে কোথায় দেওয়া হবে?

মায়ের কাছে এরও প্রস্তুত উত্তর ছিল। তিনি জানতেন, পানেলি গ্রামের একটি ইসলামিক খোজা পরিবার তাঁদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। সেই পরিবারে বিবাহ-যোগ্যা বয়সের একটি মেয়ে ছিল—এমি বাই। তাঁর বিশ্বাস, এমি বাই-ই মোহাম্মদ আলীর জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গিনী হবে।

বাবার এতে কোনো আপত্তি ছিল না। তবে দুজনেই মনে করলেন, তাঁদের ছেলেকে বিষয়টি জানানো উচিত। সে সময় সন্তানদের বিয়ের ব্যবস্থা করতেন বাবা-মায়েরাই। ছেলে বা মেয়ের কোনো মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল না; তাঁদের বিশ্বাস করতে হতো যে, বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বিচক্ষণ এবং সন্তানের কল্যাণের জন্য সর্বোত্তম।

সম্ভবত এটিই ছিল কায়েদে-আজমের জীবনের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা তিনি অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর মাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তাঁর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। আবার বাবার পার্থিব প্রজ্ঞার ওপর তাঁর এত গভীর আস্থা ছিল যে, তিনি বিশ্বাস করতেন—বাবা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

তৎকালীন রীতি অনুসারে তিনি একজন বাধ্য ছেলের মতো বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। এভাবেই তাঁর বাগদান হলো পানেলির এমি বাইয়ের সঙ্গে।

এই তরুণের নিজের চিন্তাশক্তি ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ছিল। তিনি নিজের পথ নিজেই বেছে নিতে এবং জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাই প্রথমদিকে এমন এক মেয়েকে বিয়ে করতে তাঁর কিছুটা আপত্তি ছিল, যাকে তিনি কখনো দেখেননি বা কথা বলেননি। কিন্তু মায়ের আশ্বাসে সেই আপত্তি দ্রুতই দূর হয়ে গেল। মা তাঁকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে, এ ধরনের বিষয়ে মায়ের আশীর্বাদ শুভফল বয়ে আনে এবং এমন বিয়েই সুখী ও মঙ্গলময় হয়।

এই বাগদানের পর, যা পরে বিয়েতে রূপ নেয়, পানেলি যাওয়ার আগে তিনি ১৮৯২ সালের ৩০ জানুয়ারি সিন্ধ মাদ্রাসা ত্যাগ করেন। তখন তিনি ইংরেজি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছিলেন। বিদ্যালয়ের নথিতে লেখা ছিল— “মোহাম্মদ আলী জিন্নাহভাই বিবাহের উদ্দেশ্যে কচে (কচ্ছে) যাওয়ার জন্য বিদ্যালয় ত্যাগ করেছেন।”

১৯৪৭ সালের ৯ আগস্ট পাকিস্তানের মনোনীত গভর্নর-জেনারেল হিসেবে তাঁর প্রথম ভাষণে তিনি স্নেহভরে স্মরণ করেছিলেন— “হ্যাঁ, আমার জন্ম করাচিতে। করাচির বালুকাবেলাতেই আমি শৈশবে মার্বেল খেলেছি। আমার পড়াশোনাও করাচিতেই হয়েছে।”

নিজের প্রচেষ্টা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখার জন্য তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। তাই অন্যরা তাঁকে কী করতে হবে, কী করা উচিত নয়, কোনটি তাঁর জন্য ভালো আর কোনটি ভালো নয়—এসব বলে দিক, তা তিনি কখনোই মেনে নিতে চাইতেন না। শৈশবেই গড়ে ওঠা এই বৈশিষ্ট্যই পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়েও তাঁকে সঠিক পথ দেখিয়েছিল।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, জীবনসঙ্গিনী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণভাবে তাঁর মায়ের সিদ্ধান্তের কাছেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন-

 আমাদের বাবা, মা, মোহাম্মদ আলী, মানবাই ফুফি এবং আরও কয়েকজন আত্মীয় করাচি থেকে সমুদ্রপথে ভেরাভালে পৌঁছালেন। সেখান থেকে বরযাত্রীরা বলদগাড়িতে চড়ে আমাদের গ্রাম প্যানেলির উদ্দেশে রওনা হলেন।

দূরত্ব মানুষের কল্পনাকে আরও রঙিন করে তোলে। প্যানেলির সরল-সাদাসিধে গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করত, করাচির সেই বিশাল শহরে ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যের সঙ্গে ব্যবসা করে জিন্নাভাই নাকি অগাধ সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। তারা বলাবলি করত, তিনি বড় বড় পালবিহীন সমুদ্রযানযোগে দূরদেশে পণ্য পাঠান। তাঁর নাকি বিশাল বাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, ঘোড়া—সবই আছে। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল, “জিন্নাভাই তো এখন বিরাট ধনকুবের!” পুঞ্জা পরিবারও গর্বিত ছিল যে এমন একজন ধনী ব্যবসায়ীর পুত্রের বিশাল বরযাত্রা তাদের গ্রাম প্যানেলিতে আসছে।

আমাদের বাবা এসব কথা জানতেন এবং তিনি আত্মীয়স্বজন বা গ্রামের মানুষের সেই প্রত্যাশাকে নিরাশ করতে চাননি। তিনি সঙ্গে করে প্রচুর উপহার নিয়ে এসেছিলেন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং প্যানেলির প্রতিটি পরিবারের প্রধানকে বিয়ের উপহার দেওয়ার জন্য সেগুলো আনা হয়েছিল। কিন্তু হিসাব করে দেখা গেল, উপহার যথেষ্ট নয়। তাই তিনি তাঁর এক চাচাতো ভাইকে গন্ডলে পাঠালেন আরও উপহার কিনে আনতে, যাতে কোনো ঘাটতি না থাকে।

তিনি আরও প্রচুর আতশবাজি নিয়ে আসতে নির্দেশ দিলেন, যাতে নিস্তব্ধ প্যানেলি আতশবাজির প্রচণ্ড শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে এবং তার ঝলমলে আলো বহু মাইল দূরের আকাশও আলোকিত করে। সে সময় প্যানেলির রাস্তায় বা বাজারে শোভাযাত্রা করার মতো কোনো ব্যান্ডদল ছিল না, যারা ঘোষণা করবে যে এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলের বিয়ে হচ্ছে। তাই গন্ডল থেকে পেশাদার নাকারা বাদকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারা একটি বড় অর্ধবৃত্তাকার ঢোলে দুটি সরু কাঠি দিয়ে তালে তালে বাজাত। অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র তাদের সঙ্গে থাকত না, কিন্তু তাদের সেই প্রবল শব্দই ছিল যথেষ্ট— তার প্রতিধ্বনি প্যানেলির সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত।

পরিবারের মহিলারা টানা কয়েক দিন ধরে কনের বাড়িতে উপহার, পোশাক, গয়না ও মিষ্টি নিয়ে যেতেন। শোভাযাত্রার সামনে থাকত নাকারা বাদকরা। মহিলারা ধীরে ধীরে বিয়ের গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যেতেন এবং তখনকার রীতি অনুযায়ী পথজুড়ে চাল ছিটিয়ে দিতেন।

গ্রামের প্রতিটি মানুষকে এক সপ্তাহ ধরে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজ ও নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সাধারণত অনাড়ম্বর ও নিরাভরণ প্যানেলি যেন উৎসবের সাজে সেজে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, এক সকালে ঘুম ভেঙে যেন সে এক নববধূতে পরিণত হয়েছে।

আমাদের বাবা এই বিপুল ব্যয়ের কথা একবারও ভাবেননি। শেষ পর্যন্ত এ তো তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তানের বিয়ে। কে জানে, তাঁর অন্য সন্তানদের বিয়ে হয়তো করাচি বা বোম্বেতেই হবে। এই জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে প্যানেলির মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। করাচিতে ফিরে যাওয়ার পরও তারা নিশ্চয়ই বহুদিন মনে রাখবে সেই জিন্নাভাইকে—যিনি একসময় প্যানেলির সরু গলিতে অন্য সব শিশুর মতোই খেলাধুলা করতেন, অথচ পরে এক বড় শহরে গিয়ে বিশাল ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছে।

“এতসব উৎসব-আনন্দের মধ্যেও বরের মনে তখন কী চিন্তা-ভাবনা চলছিল, তা কেবল কল্পনাই করা যায়।” তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ষোল বছর। তিনি জীবনের এক সম্পূর্ণ অজানা পথে, বৈবাহিক জীবনের অনাবিষ্কৃত সাগরে যাত্রা শুরু করছিলেন। নিজের বোন ও চাচাতো/ফুফাতো বোনদের বাইরে তাঁর সমবয়সী কোনো মেয়ের সঙ্গে কখনও কথা হয়নি। যে কন্যার সঙ্গে তাঁকে সারাজীবন কাটাতে হবে, তাঁর মুখও তিনি আগে কখনও দেখেননি, তাঁর সঙ্গে একটিও কথা বলেননি। তিনি সম্ভবত শুধু এটুকুই উপলব্ধি করেছিলেন যে, তিনি নিজের জন্য যে জীবনপথ নির্ধারণ করেছিলেন— নিজের মতো চলবেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবেন—সেখান থেকে তাঁকে সরে আসতে হয়েছে। ভাগ্যের কাছে তিনি ছিলেন অসহায়; আর সেই ভাগ্য তাঁর মায়ের রূপ ধরে ঘোষণা করেছিল যে তাঁকে এমি বাইকে বিয়ে করতেই হবে।

মাথা থেকে পা পর্যন্ত অদৃশ্য সাদা সুতোয় গাঁথা দীর্ঘ ফুলের মালায় সজ্জিত হয়ে তিনি শোভাযাত্রাসহ তাঁর দাদার বাড়ি থেকে শ্বশুরের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন। সেখানে চৌদ্দ বছর বয়সী এমি বাই নতুন দামি পোশাক পরে, ভারী অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে বসেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল মেহেদির নকশা, আর মুখ ও পোশাকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল দামী আতরের সুগন্ধ। গ্রামের মৌলভী নিকাহ সম্পন্ন করলেন, পবিত্র কোরআন শরীফ থেকে কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন, আর সেই মুহূর্তেই দুজন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আবদ্ধ হলেন।

ততদিনে আমাদের বাবা প্রায় চার সপ্তাহ ধরে করাচির বাইরে ছিলেন। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে ব্যবসার কী অবস্থা হচ্ছে তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁর মধ্যে অস্থিরতার লক্ষণ দেখা দিল এবং তিনি জানিয়ে দিলেন যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে করাচি ফিরে যেতে হবে।

কিন্তু সেকালের প্রত্যন্ত গ্রামের সামাজিক রীতিনীতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সেগুলো ভঙ্গ করা বা অমান্য করা প্রায় ধর্মবিরোধী কাজ বলেই গণ্য হতো। আমার ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ছিলেন প্রথানিষ্ঠ। তাঁরা অত্যন্ত ভদ্র কিন্তু দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিলেন যে, তাঁদের সদ্যবিবাহিত মেয়েকে অন্তত এক মাস, না হলে তিন মাস পর্যন্ত তাঁদের বাড়িতেই থাকতে হবে। তারপরই তাঁরা তাঁকে স্বামীর সঙ্গে করাচি যেতে দেবেন।

আমাদের বাবার পক্ষে এতদিন প্যানেলিতে থাকা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি করাচি ফেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। কিন্তু আমাদের মা কোনোভাবেই স্বামীকে একা যেতে দিতে রাজি হলেন না। তাঁর স্বামী সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং দীর্ঘ সময় কাজ করতেন। তাঁর জন্য রান্না করে গরম গরম খাবার পরিবেশন করার জন্য তাঁর নিজের উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল। চাকর-বাকরের ওপর কীভাবে ভরসা করা যায়? তারা হয়তো যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে না, ভালো রান্নাও করতে পারবে না, আবার গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকে স্বামীর জন্য সদ্য বানানো গরম রুটি পরিবেশনও করবে না। তাই তিনি কোনোভাবেই পেছনে থেকে যেতে রাজি হলেন না।

অবশ্য মোহাম্মদ আলি চাইলে প্যানেলিতেই অপেক্ষা করতে পারতেন, যতদিন না তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কনেকে করাচি নিয়ে যেতে সম্মতি দেন। কিন্তু আমার ভাইও তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে করাচি ফিরতে আগ্রহী ছিলেন।

বিবাহসূত্রে সদ্য আত্মীয় হওয়া দুই পরিবার তখন এই বিষয়টি নিয়ে উত্তপ্ত তর্কে জড়িয়ে পড়ল। বহুদিন ধরে বৈঠক ও আলোচনা চললেও কোনো সমাধান সূত্র বের হলো না। মনে হচ্ছিল, তাঁরা যেন এক অচলাবস্থায় এসে পৌঁছেছেন।

আলোচনা চলাকালীন তরুণ মোহাম্মদ আলি নীরবই ছিলেন। পারিবারিক বিরোধের ময়দানে তিনি নিজেকে আড়ালেই রেখেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে আলোচনার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তখন তিনিই পরিস্থিতির দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিলেন। পিতা-মাতাকে কিছু না জানিয়েই মোহাম্মদ আলী একদিন তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। নববিবাহিত জামাইকে তাঁরা যথাযোগ্য আন্তরিকতা, আদর-আপ্যায়ন ও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করলেন। অনেকক্ষণ ধরে তিনি তাঁদের সঙ্গে নানা সাধারণ বিষয় নিয়ে কথা বললেন, কিন্তু কেন এসেছেন, তা প্রথমে জানালেন না। শ্বশুর-শাশুড়ি নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছিলেন—কী শান্ত, ভদ্র আর নম্র জামাই!

কিন্তু সৌজন্য ও আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর মোহাম্মদ আলী দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, তাঁর বাবা-মা আর প্যানেলিতে থাকতে পারবেন না; তাঁদের করাচি ফিরে যেতে হবে এবং তিনিও তাঁদের সঙ্গে যাবেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চান এবং আশা করেন, এ বিষয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির কোনো আপত্তি থাকবে না।

তবে যদি তাঁরা গ্রামের প্রচলিত রীতি ও প্রথার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অন্যরকম সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেটিও তিনি মেনে নেবেন। সে ক্ষেত্রে তাঁদের মেয়েকে আপাতত নিজেদের কাছেই রাখতে পারেন এবং যখন ইচ্ছা তখন করাচিতে পাঠিয়ে দিতে পারবেন।

এক কিশোর জামাইয়ের মুখে এমন স্পষ্ট ও দৃঢ় ভাষায় কথা বলতে শুনে কনের বাবা-মা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁরা বিস্ফারিত চোখে জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমন অপ্রত্যাশিত দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস তাঁরা কল্পনাও করেননি।

কিন্তু মোহাম্মদ আলী থামলেন না। তিনি আরও বললেন, খুব শিগগিরই তিনি ইউরোপে, অর্থাৎ ইংল্যান্ডে, পড়াশোনার জন্য রওনা হবেন এবং টানা তিন বছর সেখানে থাকবেন। হয়তো তাঁর অনুপস্থিতিতেই কনের বাবা-মা তাঁদের মেয়েকে করাচিতে পাঠাতে চাইবেন। আর তখন তাঁর স্ত্রীকে স্বামীর ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে।

যে সমস্যার সমাধান তাঁর বাবা-মা করতে পারেননি, সেটিই তরুণ মোহাম্মদ আলী নিজের বুদ্ধি ও দৃঢ়তার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেললেন।

পরদিনই তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি জিন্নাভাই ও মিঠিবাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। অত্যন্ত আন্তরিকভাবে জানতে চাইলেন, তাঁরা কবে এমি বাইকে সঙ্গে নিয়ে করাচি যেতে চান, যাতে সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা যায়। দুই পরিবারের মধ্যে আবার সৌহার্দ্য ফিরে এল; সমস্ত বিরোধ ও মনোমালিন্য মুছে গেল।

আমাদের পরিবারে তখন একটি পুরোনো প্রথা প্রচলিত ছিল। শ্বশুরের সামনে এলে এমি বাইকে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হতো। এটি ছিল স্বামীর পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি রীতি। কিন্তু এ বিষয়ে মোহাম্মদ আলীর নিজস্ব মত ছিল। তাঁর বিশ্বাস, তাঁর স্ত্রী তাঁর বাবা-মায়ের কাছেও মেয়ের মতোই, পরিবারের একজন পূর্ণ সদস্য। শুধুমাত্র পূর্বপুরুষদের সময় থেকে এমন প্রথা চলে আসছে বলেই তা অন্ধভাবে পালন করার কোনো প্রয়োজন নেই। জিন্নাভাইও তাঁর তরুণ পুত্রের এই মতকে সমর্থন করলেন। সেই দিন থেকেই এমি বাই বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই পুরোনো প্রথা ত্যাগ করলেন।

এদিকে তিন বছরের জন্য ছেলেকে দূরে পাঠানোর চিন্তায় মিঠিবাইয়ের হৃদয় ভেঙে যাচ্ছিল। তাঁর কাছে তিন বছর যেন এক অনন্তকাল। তবুও তিনি জানতেন, মোহাম্মদ আলীর ভবিষ্যতের মঙ্গলের জন্যই তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্তে সম্মতি দিয়েছেন।তিনি ছেলেকে বললেন, — “বাবা, তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমার খুব কষ্ট হবে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, ইংল্যান্ডে এই সফর তোমাকে একদিন বড় মানুষ করে তুলবে। এটাই তো সারা জীবনের আমার স্বপ্ন।”

মোহাম্মদ আলী নীরবে মায়ের কথা শুনছিলেন।মিঠিবাই আবার বললেন— “মোহাম্মদ আলী, তুমি আজ দীর্ঘ যাত্রায় বেরিয়ে যাচ্ছ। আমার মনে হচ্ছে, ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আসার আগে হয়তো আমি আর বেঁচে থাকব না।” এই কথা বলতে বলতেই তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন।

আবেগে গলা রুদ্ধ হয়ে মোহাম্মদ আলী মাকে জড়িয়ে ধরলেন।

বিদায়ের মুহূর্তে মিঠিবাই ছেলেকে আশীর্বাদ করে বললেন— “মোহাম্মদ আলী, আল্লাহ তোমার রক্ষাকর্তা হোন। তিনি আমার স্বপ্ন পূরণ করবেন। তুমি একদিন অনেক বড় মানুষ হবে, আর তোমাকে নিয়ে আমি গর্বিত হব।”

তৃতীয় অধ্যায়

একজন ব্যবসায়ী থেকে ব্যারিস্টার

সমুদ্রযাত্রায় যে জাহাজটি মানচিত্র, কম্পাস এবং নক্ষত্রের সাহায্যে ইংল্যান্ডের দিকে এগিয়ে চলেছিল, সেই জাহাজেই আমার ভাইও জীবনের এক সম্পূর্ণ অজানা পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তিনি এমন এক দেশে যাচ্ছিলেন, যার সম্পর্কে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা কয়েকজন শিশুকে বাদ দিলে, জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।

১৮৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে, কোনো ভারতীয়ের ইংল্যান্ডে যাত্রা ছিল অত্যন্ত বিরল ও ব্যতিক্রমী ঘটনা। এমন সময়ে মাত্র ষোলো বছরের এক কিশোরকে একা, কোনো অভিভাবক ছাড়াই জাহাজে ভ্রমণ করতে দেখে অধিকাংশ ইংরেজ সহযাত্রীর কৌতূহল জেগে ওঠে। তাঁদের মধ্যে একজন ইংরেজ ভদ্রলোক এই একাকী তরুণের প্রতি বিশেষ স্নেহ অনুভব করেন। ছেলেটির চেহারায় ছিল কিশোরসুলভ সরলতা, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত মানুষের মতো।

তিনি জানতে চাইলেন, ইংল্যান্ডে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী, সেখানে তাঁর পরিচিত কেউ আছেন কি না, কোথায় থাকবেন এবং ভবিষ্যতে কী হতে চান। তরুণটির উত্তর ও ব্যবহার সেই বয়স্ক ইংরেজ ভদ্রলোককে গভীরভাবে মুগ্ধ করল। তিনি তাঁকে নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করতে শুরু করেন। প্রতিদিনই তিনি অনেকটা সময় আমার ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করতেন এবং লন্ডন সম্পর্কে এমন নানা তথ্য জানাতেন, যা তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগতে পারে।

সেই সময়ে বোম্বে থেকে ইংল্যান্ডে জাহাজে পৌঁছাতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগত। পথে বিভিন্ন বন্দরে জাহাজ থামত, আর যাত্রীরা সেই সুযোগে তীরে নেমে দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতেন। জাহাজ যখন পোর্ট সাঈদ বন্দরে নোঙর করল, তখন সেই ইংরেজ ভদ্রলোক আমার ভাইকে সতর্ক করে বললেন— “পোর্ট সাঈদে খুব সাবধান থাকবে। এখানকার মানুষের হাত খুবই সাফ। টের পাওয়ার আগেই তারা তোমার মানিব্যাগ চুরি করে নিতে পারে।”

সতর্কতার জন্য আমার ভাই নিজের সঙ্গে অল্প কিছু টাকা রাখলেন। কিন্তু তিনি ভদ্রলোকের এই উপদেশকে নিজের দায়িত্ববোধ ও সতর্কতার এক ধরনের পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করলেন। “তিনি একাই, নিজের উদ্যোগে পোর্ট সাঈদের রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। বাইরে থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ও নির্বিকার মনে হচ্ছিল, কিন্তু তাঁর মনের গভীরে প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ।” সন্ধ্যায় জাহাজে ফিরে এসে তিনি সেই ইংরেজ ভদ্রলোককে পোর্ট সাঈদ, সেখানকার মানুষ এবং আঁকাবাঁকা বাজারগুলোর অভিজ্ঞতার কথা বললেন। শেষে হাসিমুখে বললেন— “দেখুন, স্যার, আমার মানিব্যাগ এখনো নিরাপদে আমার কাছেই আছে। আমি খুব সাবধানে ছিলাম।”

ভদ্রলোক সন্তুষ্ট হয়ে বললেন— “এই তো ঠিক, আমার ছেলে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সব সময় খুব সতর্ক থাকাই সবচেয়ে ভালো।”

মার্স মাসে বন্দরে নেমে যাওয়ার আগে সেই ইংরেজ ভদ্রলোক তাঁর লন্ডনের ঠিকানা আমার ভাইকে দিয়ে বললেন,  সুযোগ পেলেই যেন তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান।

পরবর্তী চার বছর ধরে, যখনই সেই ইংরেজ ভদ্রলোক ভারত থেকে নিজ দেশে ফিরে আসতেন, তিনি আমার ভাইকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতেন এবং তাঁর ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে আহার গ্রহণ করার জন্য সস্নেহে আমন্ত্রণ জানাতেন।

মোহাম্মদ আলী সাউদ্যাম্পটনে জাহাজ থেকে নেমে লন্ডনের উদ্দেশে ট্রেনে উঠলেন। বিশাল বিস্তৃত এই মহানগরটি তাঁর তরুণ মনকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে প্রশস্ত সড়ক ধরে তিনি এমন একটি হোটেলে পৌঁছালেন, যা গাড়িচালক তাঁকে সুপারিশ করেছিলেন— খরচে সাশ্রয়ী, অথচ ব্যক্তিগত বাড়ির মতো আরাম ও খাবারের ব্যবস্থা ছিল সেখানে।

তিনি রিসেপশনের ডেস্কে গিয়ে একটি সাধারণ মানের কক্ষ চাইলেন। রিসেপশনিস্ট মাথা থেকে পা পর্যন্ত এই তরুণ ভারতীয়কে ভালো করে লক্ষ্য করে কিছুটা অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করলেন— “তরুণ, আপনি কি এই হোটেলের খরচ বহন করতে পারবেন?”

মোহাম্মদ আলী দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন— “ওহ, অবশ্যই পারব। তবে আশা করি খরচটা খুব বেশি হবে না।”

অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর লাগেজ হোটেলের একটি আরামদায়ক কক্ষে পৌঁছে দেওয়া হলো।

তাঁর বাবা তাঁকে দুটি পরিচয়পত্র (সুপারিশপত্র) দিয়েছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি প্রথমেই সেই ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিস্ময় ও হতাশার বিষয় ছিল, দুজনেই তখন লন্ডনের বাইরে ছিলেন।

তখন ছিল শীতের প্রকোপ। লন্ডনের জীবন প্রথমদিকে মোহাম্মদ আলীর কাছে বেশ বিষণ্ন ও কষ্টকর মনে হয়েছিল। এমন তীব্র শীতের সঙ্গে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না। হোটেল থেকে কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করার সামর্থ্যও তাঁর ছিল না। তাই শীতল ও স্যাঁতসেঁতে লন্ডনের আবহাওয়ায় তাঁকে প্রতিদিন অনেকটা পথ হেঁটে অফিসে যেতে হতো।

বহু বছর পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন- “ওটা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তখন আমি ছিলাম খুবই তরুণ এবং ভীষণ একাকী। বাড়ি থেকে, বাবা-মায়ের কাছ থেকে অনেক দূরে, এক সম্পূর্ণ নতুন দেশে এসে পড়েছিলাম, যেখানে জীবন ছিল আমার করাচির পরিচিত জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত। গ্রাহামস কোম্পানির, যেখানে আমি কাজ করতাম, কয়েকজন কর্মচারী ছাড়া আমি আর কাউকে চিনতাম না। বিশাল লন্ডন শহরের ব্যাপকতা আমার নিঃসঙ্গ জীবনের ওপর যেন এক ভারী বোঝার মতো নেমে এসেছিল। প্রচণ্ড ঠান্ডা আর অবিরাম বৃষ্টিতে আমার শরীর জমে যেত, পেশি ও হাড় পর্যন্ত শীতল হয়ে যেত। নিজেকে খুব অসহায় ও বিষণ্ন মনে হত। তবে অল্পদিনের মধ্যেই আমি লন্ডনের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলাম, এবং শীঘ্রই শহরটিকে ভালোবাসতেও শুরু করলাম।”

গ্রাহামস শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানির অফিস ছিল থ্রেডনিডল স্ট্রিটের কাছে, তাদের করাচির এক ব্যবসায়িক বন্ধুর ছেলে এই তরুণ শিক্ষানবিশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। তাঁকে একটি ছোট টেবিল ও একটি চেয়ার দেওয়া হয়েছিল। সেখানে অন্যান্য অফিসকর্মীদের সঙ্গে বসে তিনি ব্যবসা পরিচালনার খুঁটিনাটি ও প্রশাসনিক কাজের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন।

ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে কিছু নগদ অর্থ ছিল। এছাড়া আমার বাবা গ্রাহামস (Grahams) কোম্পানিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে করাচি অফিস থেকে তাদের লন্ডন অফিসে আরও অর্থ পাঠানো হয়, যাতে তাঁর ছেলে শিক্ষানবিশের পুরো সময়কালে পর্যাপ্ত অর্থ পায়।

পরিবারের মিতব্যয়ী স্বভাব উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ায় আমার ভাই তাঁর অর্থ লন্ডনের রয়্যাল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড-এর ১২৩ বিশপসগেট স্ট্রিট শাখায় জমা রাখেন। খুব শিগগিরই তিনি বুঝতে পারেন যে, অন্তত দুই বছর লন্ডনে থাকতে হলে হোটেলে থাকা মোটেই সাশ্রয়ী নয়। তার চেয়ে কোনো ভালো পরিবারের কাছে অর্থের বিনিময়ে অতিথি হিসেবে থাকলে খরচ অনেক কম হবে।

প্রতিদিনের সংবাদপত্রের ছোট ছোট বিজ্ঞাপন খুঁটিয়ে পড়ে তিনি এমন কয়েকটি পরিবারের ঠিকানা লিখে নেন, যারা অর্থের বিনিময়ে অতিথি রাখতেন। বেশ কয়েকটি পরিবার পরিদর্শনের পর তিনি শেষ পর্যন্ত মিসেস এফ. ই. পেজ ড্রেক-এর বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়িটির ঠিকানা ছিল ৩৫ রাসেল রোড, কেনসিংটন, বর্তমানের বিশাল অলিম্পিয়া ভবনের ঠিক বিপরীতে, হাই স্ট্রিট, কেনসিংটনে। অলিম্পিয়া ভবনটি ১৮৯২ সালের অনেক পরে নির্মিত হয়েছিল।

এখনও এলাকাটি লন্ডনের একটি সম্মানজনক আবাসিক অঞ্চল, যেখান থেকে অসংখ্য রেললাইনের দৃশ্য দেখা যায় এবং এটি কেনসিংটনের কেন্দ্রীয় স্থানে অবস্থিত। তবে ১৮৯০-এর দশকে এটি নিশ্চয়ই লন্ডনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবাসিক এলাকাগুলোর একটি ছিল। কয়েক বছর আগে লন্ডন কাউন্টি কাউন্সিল এই ভবনে একটি স্মারক ফলক স্থাপন করে, যেখানে লেখা আছেকায়েদ-ই-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬–১৯৪৮), পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা, ১৮৯৫ সালে এখানে অবস্থান করেছিলেন।”

ইংল্যান্ডে অবস্থানের সুযোগকে তিনি সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। তখন ব্রিটিশ উদারনীতির (British Liberalism) প্রভাব দেশটির মানুষের চিন্তাধারায় গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিল। তিনি ইংরেজদের একটি অভ্যাস রপ্ত করেন—ঘুম থেকে উঠে সকালের সংবাদপত্র মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং নাশতা শেষ হওয়ার আগেই তা পড়ে শেষ করা।

তিনি গভীর আগ্রহের সঙ্গে সেইসব মহান রাজনৈতিক নেতাদের সাফল্যের খবর পড়তেন, যারা তখন ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করছিলেন। সংসদের ভেতরে ও বাইরে তাঁদের বক্তৃতা লাখো মানুষ অকুণ্ঠ প্রশংসার সঙ্গে পড়ত। তিনি যেখানেই যেতেন, মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত এসব নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্য। জনগণ তাঁদের নিজেদের সময়ের ভাগ্যনির্ধারক ব্যক্তি হিসেবে দেখত তাঁদের।

অন্যদিকে তিনি প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থ্রেডনিডল স্ট্রিটের কাছে গ্রাহামস কোম্পানির অফিসে একঘেয়ে শিক্ষানবিশের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। ধৈর্য, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার একমাত্র সম্ভাব্য পুরস্কার ছিল—একদিন বাবার ব্যবসায় যোগ দিয়ে সেটিকে আরও সমৃদ্ধ করা। কিন্তু তাঁর কাছে এই ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সংকীর্ণ ও একঘেয়ে বলে মনে হতে লাগল।

অর্থ অবশ্যই জীবনে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন করে তিনি কখনও মানুষের নেতা হতে পারবেন না, কিংবা নিজের দেশবাসীর কল্যাণে কাজ করা কোনো মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পারবেন না—এই উপলব্ধি তাঁর মনে গভীর দাগ কাটে।

নিজের ভবিষ্যৎ পেশা সম্পর্কে সন্দেহ জাগতে শুরু করলে তিনি ইংল্যান্ডের সমকালীন ও অতীতের মহান জননেতাদের জীবন অধ্যয়ন ও আলোচনা করতে শুরু করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, তাঁদের অনেকেই ব্যারিস্টারি পড়েছিলেন এবং আইনের সুগভীর জ্ঞান তাঁদের কর্মজীবনে অসাধারণ সহায়ক হয়েছিল।

এরপর তাঁর মনে দ্বিধা দেখা দিল—তিনি কি গ্রাহামসে শিক্ষানবিশ হিসেবেই কাজ চালিয়ে যাবেন, নাকি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে লন্ডনের কোনো ইন অব কোর্ট-এ (Inn of Court) ভর্তি হয়ে ব্যারিস্টার হবেন?

তিনি পরে স্মৃতিচারণায় বলেছিলেনআমি সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় নিইনি। আমি ঠিক করেছিলাম, আমি ব্যারিস্টারি পড়ব।”

সৌভাগ্যক্রমে, সেই বছরই ছিল শেষ বছর যখন লিটল গো’ (Little Go) নামে পরিচিত ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইন অব কোর্টে ভর্তি হওয়া যেত। পরের বছর থেকে নিয়ম পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল, এবং তখন ব্যারিস্টার হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আরও অতিরিক্ত দুই বছর সময় লাগত।

তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন গ্রাহামসে তাঁর শিক্ষানবিশের কাজ ছেড়ে দিয়ে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করবেন, যাতে লিটল গো’ পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে পারেন।

এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি— একটি সিদ্ধান্ত, যা তাঁর সমগ্র জীবনের গতিপথই বদলে দিয়েছিল। দেশের জনজীবনে নিজের জন্য একটি সম্মানজনক স্থান গড়ে তোলার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তাঁর তরুণ মনে জ্বলে উঠেছিল। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি তাঁর সমস্ত সময় ও শক্তি নিবেদন করলেন। যেন তাঁর মধ্যে এক সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেল। তিনি বইয়ের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে যুক্ত করলেন যে, পড়াশোনাই হয়ে উঠল তাঁর একমাত্র সাধনা।

তাঁর এই অধ্যবসায় সফল হয়। তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ‘লিটল গো’ (Little Go) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং এরপর লিংকনস ইন (Lincoln’s Inn)-এ ভর্তি হন।

কেন তিনি লিংকনস ইন-এ যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি আমাকে বলেছিলেন— “আমি যখন ‘লিটল গো’ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন দৃঢ় সংকল্প নিয়েছিলাম যে আমি অবশ্যই পরীক্ষায় পাস করব। আমার বিশ্বাসও ছিল যে আমি সফল হব। তাই আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্যে লন্ডনের বিভিন্ন ইনস অব কোর্ট (Inns of Court) ঘুরে দেখলাম এবং সেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললাম। তাদের সঙ্গে আলোচনা ও খোঁজখবর নিয়ে আমি প্রথমে লিংকনস ইন ছাড়া অন্য একটি ইন-এ যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে লিংকনস ইন-এর প্রধান প্রবেশদ্বারে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আইনপ্রণেতাদের নামের সঙ্গে আমাদের মহানবী (সা.)-এর নাম উৎকীর্ণ দেখতে পেলাম। তখনই আমি এক ধরনের মানত (Minnat) করলাম যে, ‘লিটল গো’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আমি লিংকনস ইন-এই ভর্তি হব।”

আজও আমার কাছে ১৮৯২ থেকে ১৮৯৬ সালের সময়কালের রয়্যাল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড-এর তাঁর ব্যাংক পাসবইটি সংরক্ষিত আছে। সেখানে তিনি নিজের হাতে লিখেছিলেন তাঁর নাম—“MAHOMED ALLI JINNAHBHAI ESQ”

এই পাসবইয়ের একটি নথি থেকে জানা যায় যে, ১৮৯৫ সালের ৭ জুন তিনি লিংকনস ইন-কে ভর্তি-ফি হিসেবে ১৩৮ পাউন্ড ১৯ শিলিং (£138.19)-এর একটি চেক প্রদান করেছিলেন। অর্থাৎ, মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ব্যারিস্টারি পড়া শুরু করেছিলেন। অথচ করাচিতে আমাদের বাবা তখনও আশা করছিলেন, তাঁর বড় ছেলে খুব শিগগিরই ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা ও সম্প্রসারণে তাঁকে সাহায্য করবে।

যখন বাবা ছেলের কাছ থেকে জানতে পারলেন যে, সে লিংকনস ইন-এ ভর্তি হয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যারিস্টার হতে আরও তিন বছর সময় লাগবে, তখন তিনি একটি কঠোর ভাষায় লেখা চিঠিতে তাঁকে এই অলাভজনক পেশার চিন্তা ত্যাগ করে অবিলম্বে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

কিন্তু কায়েদে আজম (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) বিনীত ভাষায় বাবাকে উত্তর লিখলেন। তিনি অনুরোধ করলেন, যেন তাঁকে ইংল্যান্ডে থেকে ব্যারিস্টারির পড়াশোনা শেষ করার অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি আরও আশ্বাস দিলেন যে, বাবার কাছ থেকে আর কোনো অর্থ চাইবেন না। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ইংল্যান্ডে কাজ করবেন, অত্যন্ত মিতব্যয়ী জীবনযাপন করবেন এবং বাবা যে দুই বছরের খরচ দিয়ে পাঠিয়েছেন, তা এমনভাবে ব্যয় করবেন যাতে সেই অর্থ দিয়ে চার বছর পর্যন্ত চলতে পারে।

যদিও আমার বাবা তাঁর একগুঁয়ে ছেলের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিলেন না, তবুও শেষ পর্যন্ত তিনি পরিস্থিতিকে মেনে নিলেন এবং ছেলের ভবিষ্যতের মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করতে লাগলেন।

লন্ডনে যাওয়ার কিছুদিন পরেই কায়েদে আজমের স্ত্রী এমি বাই মারা যান। পিতা-মাতার ইচ্ছায় অল্প বয়সে যে শিশুবধূকে তিনি বিয়ে করেছিলেন, তার সঙ্গে দীর্ঘদিন সংসার করার সুযোগ তিনি পাননি। তাই তার মৃত্যুর শোকে তিনি খুব বেশি ভেঙে পড়েননি।

কিন্তু লিংকনস ইন-এ পড়াশোনা করার সময় যখন তিনি খবর পেলেন যে আমাদের মা সর্বকনিষ্ঠ ভাই বুন্দে আলী-র জন্ম দিতে গিয়ে প্রসবকালীন মৃত্যুবরণ করেছেন, তখন সেই আঘাত তিনি সহ্য করতে পারেননি। কারণ পৃথিবীর সব কিছুর চেয়ে তিনি তাঁর মাকে বেশি ভালোবাসতেন। মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অঝোরে কেঁদেছিলেন।

তাঁর হৃদয় ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই দুঃখ তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করত এবং তিনি সেই দুঃখও গভীরভাবে অনুভব করতেন। দেশ থেকে বহু দূরে, একাকী অবস্থায়, মায়ের জীবনের শেষ মুহূর্তে পাশে থাকতে না পারার যন্ত্রণা তাঁকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলে। শোকের তীব্র আঘাতে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।

শেষ পর্যন্ত তাঁর মায়ের আশঙ্কাই সত্যি হলো—প্রিয় পুত্র মোহাম্মদ আলী লন্ডন থেকে করাচিতে ফিরে আসার আগেই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

তিনি প্রায়ই স্মরণ করতেন মায়ের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর কথা—একদিন তিনি একজন মহান মানুষ হবেন। কিন্তু তখনকার বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। একজন অখ্যাত তরুণ হিসেবে তাঁর জীবন ছিল সম্পূর্ণ সাধারণ; ভবিষ্যৎ তাঁর জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে, সে সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না।

মায়ের মৃত্যুর পর আমাদের পিতার ব্যবসায়ে একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসে। তিনি তখন অকালেই বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ছিলেন ছয় সন্তানের জনক এক বিপত্নীক; তাদের মধ্যে কেউ ছিল অল্পবয়সী, আবার কেউ ছিল একেবারেই শিশু—যাদের লালন-পালনের সমস্ত দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। তাঁর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র মোহাম্মদ আলিই তাঁর ভরসা হতে পারতেন, কিন্তু তিনি তখন লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ছিলেন। আমার ভাইয়ের অজান্তেই আমার বাবা তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের নামে আলাদা একটি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই সব উদ্যোগে বড় ধরনের লোকসান হচ্ছিল। ফলে পিতা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।

তিনি অত্যন্ত বেদনাভরা চিঠি লিখে মোহাম্মদ আলীকে সবকিছু জানান। উত্তরে আমার ভাই লিখলেন, পিতার কোনো দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। তিনি ভারতে ফিরে আসামাত্রই সব পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন এবং পিতা ও পরিবারের সম্মান রক্ষা করবেন।

মাত্র আঠারো বছর বয়সেই কায়েদে আজম তাঁর মা ও স্ত্রী—দুজনকেই হারিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জানতেন, তাঁর পিতার অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তোলা সমৃদ্ধ পারিবারিক ব্যবসাও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

জীবনের কঠিন আঘাত অনেক সময় মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অজানা শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। কায়েদে আজমও এসব দুঃখ ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন এক স্টোইক দার্শনিক (স্টোইক দার্শনিক (Stoic philosopher) হলেন সেইসব দার্শনিক, যারা স্টোইসিজম (Stoicism)নামক দর্শন অনুসরণ করেন। এই দর্শনের উৎপত্তি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে প্রাচীন গ্রিসে হয়েছিল)র মতো অবিচল সাহস নিয়ে। তিনি দৃঢ়সংকল্প করেছিলেন যে, তিনি অবশ্যই সফল হবেন এবং পরিবারের নাম উজ্জ্বল করবেন। এই সময় থেকেই তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে “M.A. Jinnah Esqr.” ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাঁর ব্যাংক পাসবই থেকে জানা যায়, তিনি প্রতি মাসে ১০ পাউন্ড করে মিসেস এফ. ই. পেজ-ড্রেক-কে দিতেন, যার বাড়িতে তিনি পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতেন।

পরবর্তী জীবনে তিনি স্মরণ করে বলেছিলেন, মিসেস ড্রেক ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীলা এক বৃদ্ধা। তাঁর বড় একটি পরিবার ছিল, আর তিনি বিশেষভাবে মোহাম্মদ আলীকে নিজের ছেলের মতো স্নেহ করতেন।

মিসেস ড্রেকের এক সুন্দরী কন্যা ছিলেন, যে তখন কায়েদে আজমের সমবয়সী ছিলেন। সেই তরুণী আমার ভাইয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করতেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলী এমন মানুষ ছিলেন না, যিনি ক্ষণিকের মোহে নিজের ভালোবাসা বিলিয়ে দেবেন।

মিস ড্রেক নানা উপায়ে তাঁর প্রতি বিশেষ যত্ন ও আন্তরিকতা দেখিয়ে তাঁর মন জয় করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তিনি সব সময়ই যথাযথ ভদ্রতা বজায় রেখে তাঁকে একটি সম্মানজনক দূরত্বে রাখতেন।

মিস ড্রেক মাঝে-মধ্যে তাঁর বাড়িতে নারী-পুরুষের মিলিত আড্ডার আয়োজন করতেন। সেখানে একটি প্রচলিত পাশ্চাত্য খেলা হতো। সেই খেলায় কেউ কেউ লুকিয়ে থাকত, আর যাকে খুঁজে পাওয়া যেত, তার শাস্তি ছিল একটি চুম্বন।

মিস ড্রেকের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কায়েদে আজম কখনোই সেই “চুম্বনের খেলায়” অংশগ্রহণ করেননি।

একদিনের ঘটনা স্মরণ করে তিনি আমাকে বলেছিলেন—”সেদিন ছিল বড়দিনের আগের সন্ধ্যা। ড্রেক পরিবার বড়দিন উদযাপন করছিল। খ্রিস্টানদের রীতি অনুযায়ী দরজার উপরে মিস্টলটো ঝুলিয়ে রাখা হত। সেই গাছের নিচে দাঁড়ালে একে অপরকে চুম্বন করা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হত।

আমি নিজেই বুঝতে পারিনি যে মিস্টলটো(এক ধরনের অর্ধ-পরজীবী (hemiparasitic) উদ্ভিদ,যা অন্য গাছের ডালপালায় জন্মায়।)র নিচে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ মিস ড্রেক এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তাঁকে চুমু দিতে।

আমি তাঁকে কঠোরভাবে বারণ করলাম এবং বললাম, আমাদের সমাজে এ ধরনের আচরণ শোভন নয় এবং এটি অনুমোদিতও নয়।

আজ আমি আনন্দিত যে সেদিন আমি ওইভাবেই আচরণ করেছিলাম। কারণ, সেই ঘটনার পর থেকে তাঁর রসিকতা ও প্রণয়প্রবণ আচরণের কারণে আমাকে আর প্রতিদিন বিব্রত হতে হয়নি।”

লিংকনস ইন-এ অধ্যয়নকালে কায়েদে আজমের আগ্রহ ও জ্ঞানচর্চার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রন্থাগারের পাঠক-কার্ড৪৪ সংগ্রহ করেন এবং গভীর ও বিস্তৃত পাঠের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে আত্মনিয়োগ করেন।

রবিবারের সকালে তিনি প্রায়ই লন্ডনের বিখ্যাত হাইড পার্ক কর্নারে যেতেন। সেখানে খোলা আকাশের নিচে কাঠের বাক্সের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করা নানা বক্তার আবেগপূর্ণ, কখনও উগ্র, কখনও অদ্ভুত বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। এসব বক্তা অনেক সময় নিজেদের সরকারকেও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতেন। তাদের বক্তব্য শুনে তিনি উপলব্ধি করেন যে বাক্‌স্বাধীনতা একটি জাতির জন্যঅপরিহার্য। এটি যেন একটি জাতির ‘নিষ্কাশন নল’—যার মাধ্যমে মানুষের ক্ষোভ, মতামত ও অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ থাকে। এই স্বাধীনতা না থাকলে জনগণের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে যায়।

তিনি নিয়মিত হাউস অব কমন্সে যেতেন এবং সে সময়ের প্রখ্যাত উদারপন্থী রাজনীতিবিদ—মি. গ্ল্যাডস্টোন৪৫, লর্ড মরলি, মি. জোসেফ চেম্বারলেইন, মি.বালফোর৪৬ এবং বিশিষ্ট আইরিশ দেশপ্রেমিক মি. টি. পি. ও’কনরের বক্তৃতা গভীর আগ্রহ ও প্রশংসার সঙ্গে শুনতেন। কমন্সে তাঁর এই নিয়মিত উপস্থিতি তাঁকে সংসদীয় বক্তৃতাশৈলী ও বিতর্ককলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত করে তোলে। পরবর্তী জীবনে এই অসাধারণ বক্তৃতা-দক্ষতাই তাঁর অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়।

অদম্য পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি মাত্র দুই বছরের মধ্যেই লিংকনস ইন-এর সব পরীক্ষা সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি বার-এ অন্তর্ভুক্ত (Called to the Bar) হওয়া সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় শিক্ষার্থীর গৌরব অর্জন করেন। তবে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যারিস্টারের ক্যাপ ও গাউন গ্রহণ করতে পারেননি। কারণ, সে সময়ের নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে নির্ধারিত সংখ্যক আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে (Formal Dinners) অংশগ্রহণের বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ করতে হয়েছিল।

তিনি এমন ছাত্র ছিলেন না যে পরীক্ষায় পাস করার জন্য সারাক্ষণ শুধু পাঠ্যবই নিয়েই পড়ে থাকতেন। ছাত্রজীবনেই তিনি লন্ডনে অবস্থানরত ভারতীয় ছাত্রদের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন।

লন্ডনে পৌঁছানোর প্রথম বছরেই ভারতীয় ছাত্রসমাজের মধ্যে প্রবল উৎসাহের সৃষ্টি হয়। কারণ, বোম্বের প্রবীণ পারসি নেতা দাদাভাই নওরোজি,৪৭ যিনি বহু বছর ধরে লন্ডনে ব্যবসায়ী হিসেবে বসবাস করছিলেন, তিনি সেন্ট্রাল ফিন্সবুরি আসন থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স-এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। কোনো ভারতীয়ের পক্ষে এ ছিল প্রথম এমন উদ্যোগ। তাই ভারতীয় ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

কায়েদে আজমও সর্বান্তকরণে এই নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নিষ্ঠা ও পরিশ্রম দাদাভাই নওরোজির দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তিনি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও স্নেহ অর্জন করেন। পরবর্তীকালে সেই নির্বাচনের কথা স্মরণ করে আমার ভাই আমাকে বলেছিলেন— “যখন জানতে পারলাম যে লর্ড স্যালিসবারি তাঁর এক বক্তৃতায় দাদাভাইকে ‘একজন কালো মানুষ’ বলে উপহাস করেছেন এবং ফিন্সবুরির ভোটারদের তাঁকে নির্বাচিত না করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন, তখন আমি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলাম। যদি দাদাভাই কালো হন, তবে তাঁর চেয়েও আমি বেশি কালো। আর যদি আমাদের শাসকদের মানসিকতা এমনই হয়, তাহলে তাদের কাছ থেকে আমরা কখনোই ন্যায্য বিচার পাব না। সেই দিন থেকেই আমি বর্ণবৈষম্যের সব ধরনের রূপের বিরুদ্ধে আপসহীন শত্রু হয়ে উঠি।

আমি বৃদ্ধ নেতার নির্বাচনী প্রচারে সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করেছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে তিনি মাত্র তিন ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা যতই অল্প হোক না কেন, লন্ডনের ভারতীয় ছাত্রদের আনন্দ-উল্লাস ছিল অপরিসীম। পরে যখন আমি দর্শক গ্যালারিতে বসে হাউস অব কমন্সে সেই বৃদ্ধ নেতার প্রথম ভাষণ শুনছিলাম, তখন আমার অন্তরে এক নতুন শিহরণ জেগে উঠেছিল।

তিনি বলেছিলেন, ব্রিটিশদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠানকে তিনি শ্রদ্ধা করেন। আর সেখানে দাঁড়িয়ে একজন ভারতীয় সেই স্বাধীনতার অধিকার ব্যবহার করে নিজের দেশবাসীর জন্য ন্যায়বিচারের জন্য দাবি জানাচ্ছিলেন। তিনি একেবারেই সঠিক ছিলেন। কারণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া একটি জাতি ঠিক সেই গোলাপগাছের মতো, যাকে এমন স্থানে রোপণ করা হয়েছে যেখানে না সূর্যের আলো পৌঁছায়, না বিশুদ্ধ বাতাস।”

কায়েদে আজম দাদাভাই নওরোজির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ গড়ে তোলেন। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক জীবনে নওরোজি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। বয়সে অনেক ছোট হলেও কায়েদে আজম আজীবন এই ‘ভারতের প্রবীণ নেতা’র একনিষ্ঠ অনুগত ও বন্ধু ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁরা দুজন একসঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রারম্ভিক যুগে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অবদান রাখেন।

ইংল্যান্ডে ছাত্রজীবন কাটানোর সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উপলব্ধি করেছিলেন যে ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও নিয়মিত যোগাযোগের অভাব রয়েছে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই অভাব দূর না হলে তারা নিজেদের কিংবা নিজেদের দেশের স্বার্থে কার্যকরভাবে সংগঠিত হতে পারবে না। তিনি মনে করতেন, যদি ভারতীয় ছাত্ররা একটি সমিতি গঠন করতে পারে, যেখানে তারা নিয়মিত মিলিত হতে পারবে এবং মতবিনিময়ের একটি মঞ্চ পাবে, তবে তা তাদের জন্য অত্যন্ত উপকারী হবে।

তিনিই এই ধারণার পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি এ বিষয়ে বহু ভারতীয় ছাত্রের সঙ্গে আলোচনা করেন। কিন্তু অধিকাংশ ছাত্রই আপত্তি জানায়। তাদের মতে, এত বড় উদ্যোগ গ্রহণ করার মতো তিনি তখনও খুবই তরুণ ও অনভিজ্ঞ। তবুও এই চিন্তা তাঁর মন থেকে কখনও মুছে যায়নি।

১৯১৩ সালে, যখন তিনি আবার ইংল্যান্ডে যান, তখন তিনি আর অপরিচিত তরুণ ছিলেন না; তিনি তখন ভারতের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা। লন্ডনে অবস্থানরত ভারতীয় ছাত্ররা তাঁর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার জন্য ভিড় জমায়। তাদের উদ্যোগে লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে (Caxton Hall) ভারতীয় ছাত্রদের একটি সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে কায়েদে আজমকে বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

তিনি ছাত্রদের পরামর্শ দেন যে, ইংল্যান্ড ও ভারতের রাজনৈতিক ঘটনা ও পরিবর্তনের প্রতি গভীর আগ্রহ রাখতে হবে। তবে পড়াশোনা চলাকালীন সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করার জন্য তিনি তাদের সতর্ক করেন। তাঁর মতে, ছাত্রজীবনে তাদের উচিত রাজনৈতিক বিষয়ে জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি গড়ে তোলা, যাতে ভবিষ্যতে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করলে তারা সমাজে জ্ঞান, প্রগতিশীল চিন্তা ও আলোকপ্রদর্শনের দূত হিসেবে কাজ করতে পারে। তিনি তাদের একটি সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠন৪৮ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর এই আহ্বানের ফলেই লন্ডনে সেন্ট্রাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইংরেজি ভাষার বহু লেখক ও কবির রচনার সঙ্গে তিনি তাঁর বিস্তৃত ও গভীর পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে পরিচিত হন। তাঁদের অনেকের লেখাই তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পড়ে আনন্দ পেতেন। তবে তাঁদের মধ্যে যিনি তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করতেন, তিনি ছিলেন উইলিয়াম শেকসপিয়ার

তিনি লন্ডনের নাট্যজগতের একজন অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত থিয়েটারে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লন্ডনের ঝলমলে কিন্তু ব্যয়বহুল নাট্যজগতের আকর্ষণ থেকে নিজেকে সংযত রাখতেন। সেই অর্থ তিনি বই কেনার জন্য ব্যয় করতেন এবং লিংকনস ইন-এ আইনশাস্ত্রের কঠোর ও নিয়মিত পড়াশোনার জন্য ধৈর্যসহকারে নিজেকে প্রস্তুত করতেন।

অত্যন্ত সীমিত বাজেটে জীবনযাপন করায়, অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য যে কোনো কাজই তাঁর কাছে স্বাগত ছিল। মাঝে মাঝে তিনি ওল্ড ভিক (Old Vic) থিয়েটারে শেকসপিয়ারের নাটক দেখতে যেতেন। সেসময়ের বিখ্যাত শেকসপিয়ারীয় অভিনেতাদের অভিনয় তাঁকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল।

কিছুদিনের জন্য তিনি নিজেও অভিনয়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তাঁর একমাত্র প্রাপ্ত প্রস্তাব ছিল একটি অখ্যাত নাট্যদলে ছোটখাটো ভূমিকায় কাজ করা, যারা মাঝেমধ্যে শেকসপিয়ারের নাটক মঞ্চস্থ করত।

তখন তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল ওল্ড ভিক মঞ্চে শেকসপিয়ারের রোমিও চরিত্রে অভিনয় করা। কিন্তু সেই স্বপ্ন কখনও পূরণ হয়নি—শুধু নাট্যমঞ্চেই নয়, জীবনের বিস্তৃত অঙ্গনেও নয়।

পরবর্তীকালে, যখন তিনি রাজনীতির সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন, দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম শেষে গভীর রাতে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরেও তিনি প্রায়ই শেকসপিয়ারের একটি নাটক হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তেন। অনেক সময় রাতের খাবারের পর আমরা দুজন বসার ঘরে একসঙ্গে বসলে তিনি শেকসপিয়ারের নাটক থেকে তাঁর প্রিয় অংশগুলো আমাকে উচ্চস্বরে পড়ে শোনাতেন।

আজও আমার মনে আছে, যখনই তিনি শেকসপিয়ারের কোনো অংশ আবৃত্তি করতেন, তাঁর কণ্ঠে এক বিশেষ গাম্ভীর্য, সুরের শুদ্ধতা এবং যথাযথ ওঠানামা ফুটে উঠত—যা সাধারণত মঞ্চাভিনয়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের কণ্ঠে শোনা যায়।

তাঁর জীবনের সেই চারটি গঠনমূলক বছরে তাঁর তরুণ মন নীরবে, অদৃশ্যভাবে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা ভবিষ্যতে তাঁর সমগ্র জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রকৃতি তাঁকে অসাধারণ প্রতিভা দিয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করছিলেন যে ব্যবসায়িক জীবন তাঁর স্বভাব ও মেধার সঙ্গে মানানসই নয়— যেখানে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলো বছরের পর বছর সম্পদের পরিমাণ আয়ের চেয়ে বেশি রাখা এবং ধীরে ধীরে বিপুল সম্পদ সঞ্চয় করা। তিনি সেই সংকীর্ণ ও নিছক অর্থকেন্দ্রিক জগতে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাননি; বরং তিনি খুঁজে নিতে চেয়েছিলেন খ্যাতি, মর্যাদা ও নেতৃত্বের বিস্তৃত পথ।

মঞ্চাভিনয়ের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ থাকলেও তিনি সেই পেশাও ত্যাগ করলেন, কারণ তাঁর উচ্চাভিলাষের তুলনায় তা ছিল খুবই সীমিত। একজন অভিনেতা কেবল নাট্যমঞ্চে উপস্থিত সীমিতসংখ্যক দর্শকের করতালি অর্জন করতে পারেন; কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন আরও বৃহত্তর অঙ্গনে একজন নায়ক হতে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে তাঁদের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।

লিংকনস ইন-এর নৈশভোজ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা তখন শেষ হয়েছে। প্রায় চার বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে তিনি এখন করাচিতে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

রয়্যাল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ডের তাঁর পাসবইয়ের ভেতরের মলাটে লন্ডনে ইস্যু করা শেষ চারটি চেকের রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। এর একটি ১৮৯৬ সালের ১৪ জুলাই মিসেস এফ. ই. পেজ-ড্রেকের নামে ৩ পাউন্ডের। সম্ভবত তিনি তাঁদের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকার বকেয়া হিসাব চুকিয়ে দিতে এই অর্থ পরিশোধ করেছিলেন।

১৫ জুলাই তিনি আরও তিনটি চেক ইস্যু করেন। একটি ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া লিমিটেড, বোম্বের অনুকূলে ৭১ পাউন্ড ১ শিলিং ১০ পেন্স এটি থেকে বোঝা যায় যে লন্ডনেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, দেশে ফিরে করাচিতে নয়, বরং বোম্বেতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন।

আরেকটি চেক ছিল থমাস কুক অ্যান্ড সন্স-এর নামে  ৪২ পাউন্ড ১৮ শিলিং ১২ পেন্স, যা লন্ডন থেকে করাচি পর্যন্ত তাঁর সমুদ্রযাত্রার ভাড়ার জন্য প্রদান করা হয়েছিল।

শেষ চেকটি ছিল নিজের নামে, ১০ পাউন্ড ৯ শিলিং ৮ পেন্স, যার মাধ্যমে তিনি তাঁর ব্যাংক হিসাব সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

লন্ডনে প্রায় সাড়ে তিন বছর অবস্থানকালে তাঁর ব্যাংক হিসাবের জমা অংশে মোট প্রায় ৮০০ পাউন্ড জমা পড়েছিল। তিনি সবসময় নিজের নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা রাখার অভ্যাস করেছিলেন। তাই নিরাপদে অনুমান করা যায়, ইংল্যান্ডে থাকার পুরো সময়ে তিনি প্রায় এই পরিমাণ অর্থই ব্যয় করেছিলেন। এটি একজন ছাত্রের অত্যন্ত সাদামাটা ও মিতব্যয়ী জীবনযাপনের প্রমাণ বহন করে— পারিবারিক আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের কারণে যাঁকে বাড়ি থেকে পর্যাপ্ত অর্থ পাঠানো সম্ভব হয়নি, ফলে তাঁকে প্রতিটি খরচ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়েছে।

এরপর তিনি আবার জাহাজে চড়ে স্বদেশের পথে রওনা হলেন। সেই সময়কার জাহাজে লন্ডন থেকে করাচি পৌঁছাতে সময় লাগত প্রায় তিন সপ্তাহ। তাঁর ভবিষ্যৎ ছিল গভীর সমুদ্রের মতোই রহস্যময় ও অজানা। তিনি শুধু জানতেন, তাঁর দুর্বল হয়ে পড়া পিতার কাঁধে একটি বড় পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়েছে, এবং তাঁর বাবা আশা করছেন যে জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে তিনি খুব শিগগিরই সেই দায়িত্বের একটি বড় অংশ নিজের কাঁধে তুলে নেবেন।

তবে তাঁর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের আনন্দের সঙ্গে এক গভীর বিষাদের ছায়াও মিশে ছিল। জাহাজটি যখন ধীরে ধীরে করাচি বন্দরের ঘাটে নোঙর ফেলতে এগিয়ে এল, তিনি অধীর চোখে অপেক্ষমাণ জনতার দিকে তাকালেন। সেখানে তিনি তাঁর পিতা, ভাইবোন এবং কয়েকজন আত্মীয়কে দেখতে পেলেন, কিন্তু দেখতে পেলেন না তাঁর মাকে।

নিয়তি তাঁর প্রতি কতই না নির্মম ছিল!

তখন যদি তাঁর মা বেঁচে থাকতেন—যখন তিনি ইংল্যান্ড থেকে একজন ব্যারিস্টার হয়ে, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরেছেন— তবে তাঁর প্রিয় মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে তিনি কতই না গর্বিত হতেন!

বাড়ি ফিরে আসার পরপরই আমার বাবা তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করলেন। তিনি জানালেন যে, পারিবারিক ব্যবসা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিপুল অঙ্কের ঋণ বাকি রয়েছে, এবং তাদের মধ্যে অনেকে আদালতে মামলাও দায়ের করেছে।

এমনকি আমাদের বাবা ভবিষ্যতের কথা ভেবে “Mohammad Ali Jinnahbhai & Co.”-এর নামে যে ব্যবসা শুরু করেছিলেন—এই আশা নিয়ে যে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে তাঁর ছেলে পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি নিজের প্রতিষ্ঠিত ও সমৃদ্ধ ব্যবসারও দায়িত্ব নেবে— সেই ব্যবসাটিও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। ফলে Mohammad Ali Jinnahbhai & Co.-এর বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা আদালতে চলছিল।

এমন পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ড-ফেরত এক তরুণ ব্যারিস্টারের সামনে এমন এক কঠিন বাস্তবতা এসে দাঁড়াল যে,  হয়তো তাঁকে নিজের বিরুদ্ধেই দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মুখোমুখি হতে হবে।

বাবা গভীর হতাশায় বললেন— বাবা, আমার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তোমাদের, তোমার ছোট ভাইবোনদের ভবিষ্যৎ কী হবে, আমি জানি না। আমি শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছি; আর কতদিন বাঁচব, তাও বলতে পারি না।”

মোহাম্মদ আলী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে উত্তর দিলেনআব্বা, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি কঠোর পরিশ্রম করব এবং আপনার ও আমাদের পুরো পরিবারের দায়িত্ব নেব। আমি এখনও তরুণ; আমার সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে। আমি অর্থ উপার্জন করব এবং আমাদের পরিবারের সমস্ত ঋণ একে একে শোধ করে দেব।”

বাবা মনে করলেন, করাচির কোনো প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীর অধীনে তাঁকে জুনিয়র হিসেবে কাজ শুরু করাই সবচেয়ে ভালো হবে।এ উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর আইনজীবী প্রতিষ্ঠান হরচন্দ্রাই বিষানদাস অ্যান্ড কোং এবং লালচাঁদ অ্যান্ড কোং-এর সঙ্গে কথা বললেন।

উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানই সদ্য ইংল্যান্ড-ফেরত এই তরুণ মুসলিম ব্যারিস্টারকে সানন্দে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে নিতে রাজি হলেন। কারণ সে সময় সিন্ধ প্রদেশে মুসলিম ব্যারিস্টারের সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে তরুণ মোহাম্মদ আলী তাঁদের প্রতিষ্ঠানের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবেন।

কিন্তু আমার ভাই ইতোমধ্যেই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি করাচিতে আইন পেশা শুরু করতে চাননি। তাঁর মনে হয়েছিল, পারিবারিক ব্যবসার ব্যর্থতার তিক্ত স্মৃতি করাচিতে তাঁর পথচলাকে সবসময় ম্লান করে রাখবে। তাই তিনি ভাগ্য পরীক্ষা করার জন্য বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কঠোর পরিশ্রম করার জন্য প্রস্তুত মানুষের জন্য বোম্বেতে সুযোগ অনেক বেশি।

আমার বাবা খুবই চেয়েছিলেন, ছেলে করাচিতেই আইন পেশা শুরু করুক। সেখানে তাঁদের পরিবারের বহু পরিচিত ও বন্ধু ছিল। করাচির শিকড় ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে বোম্বেতে জীবন শুরু করার ভাবনাটা তাঁর কাছে মোটেও ভালো লাগেনি।

তাই তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রতিবেশী মি. রামজিভাই পেথাভাই-কে অনুরোধ করলেন, যেন তিনি মোহাম্মদ আলীকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার জন্য বোঝান।

কিন্তু রামজিভাইয়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তরুণ ব্যারিস্টার নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। তিনি স্থির করে ফেলেছিলেন—তিনি নিজের পথেই চলবেন। বরাবরের মতো তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের কঠিন ধাক্কা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মানুষ প্রকৃত শিক্ষা লাভ করে।

তখন তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে, বোম্বেতে চলে যাওয়ার এই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে এবং তাঁর ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

অবশেষে বাবা, ভাইবোন ও পরিবারের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি বোম্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।

তিনি বোম্বের (বর্তমান মুম্বাই) অ্যাপোলো হোটেলে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে একটি কক্ষ ভাড়া নিলেন এবং বোম্বে হাইকোর্টে নিজের নাম আইনজীবী (ব্যারিস্টার) হিসেবে নিবন্ধন করালেন। এগুলো ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা, যা সহজেই সম্পন্ন হয়ে গেল।

কিন্তু প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তখনই শুরু হলো। তাঁকে একটি চেম্বার গড়ে তুলতে হবে, মামলার ব্রিফ (মোকদ্দমার দায়িত্ব) সংগ্রহ করতে হবে এবং একজন দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য ব্যারিস্টার হিসেবে নিজের সুনাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কাজগুলো তাঁর জন্য ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও হৃদয়বিদারক এক সংগ্রাম। যেন তিনি একটি খাড়া ও দুর্গম পাহাড়ে আরোহণ করছেন, আর প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর পা পিছলে যাচ্ছে।

চোখে আত্মবিশ্বাস ও গর্বের দীপ্তি নিয়ে এই তরুণ আদালতের এক করিডর থেকে আরেক করিডরে হেঁটে বেড়াতেন। তাঁকে দেখে মনে হতো তিনি যেন একজন প্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতিমান আইনবিদ। কিন্তু বাস্তবে তিনি মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর জীবনের প্রথম মামলার ব্রিফ পাওয়ার জন্য।

তিনি যেন নিজের কল্পনায় নির্মিত এক দুর্গের চূড়ায় গৌরবময় একাকীত্বে বসবাস করছিলেন। অথচ তাঁর চেয়ে কম প্রতিভাবান অনেক আইনজীবীর চেম্বারে একের পর এক মক্কেল ভিড় জমাচ্ছিল, তারা নির্ধারিত ফি দিতে প্রস্তুত ছিল।

অন্যদিকে, তিনি ফোর্ট এলাকার একটি ছোট এক-কক্ষের চেম্বারে বসে থাকতেন। কোনো এক সৌভাগ্যবান মুহূর্তে যদি একজন মক্কেল এসে হাজির হন—সেই আশায় তিনি অপেক্ষা করতেন। অবসরে তাঁর হাতে থাকা অল্প কয়েকটি আইনবিষয়ক বই উল্টেপাল্টে দেখতেন এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন।৪৯

বোম্বে হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করা, প্রতিদিন ধর্মীয় নিয়মের মতো আদালতে যাওয়া, আর সন্ধ্যায় অ্যাপোলো হোটেলের ছোট্ট ঘরে ফিরে আসা—মাসের পর মাস একটি টাকাও উপার্জন করতে না পারা—এটাই ছিল তাঁর জন্য যথেষ্ট কষ্টের। কিন্তু যখন সেই বিরক্তিকর মাসগুলো দীর্ঘ হতে হতে তিন বছরের যন্ত্রণাদায়ক সময়ে গিয়ে পৌঁছাল, তখন তিনি সত্যিই গভীরভাবে হতাশ ও বিষণ্ন হয়ে পড়লেন।

এদিকে করাচিতে তাঁর বাবা ও পরিবারের সদস্যরা মামলা-মোকদ্দমা এবং নানা আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। বোম্বেতে আসার সময় তিনি ভেবেছিলেন, সফল হয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি তাঁদের কোনো সাহায্যই করতে পারছিলেন না। এই ব্যর্থতা ও হতাশা তাঁকে ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছিল। বাইরে তিনি দৃঢ়চিত্ত ও আত্মসংযমী রূপেই নিজেকে উপস্থাপন করতেন, কিন্তু অন্তরের গভীরে অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার তীব্র যন্ত্রণা তাঁকে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করত।

এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তিনি সামাজিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। তিনি নিয়মিত বোম্বের কয়েকটি অভিজাত ক্লাবে যেতেন এবং শহরের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়িতে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র বিশের কোঠায়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন ও আকর্ষণীয় এক তরুণ—দীর্ঘদেহী, ব্যক্তিত্বময়, ছোট হলেও তীক্ষ্ণ ও গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন চোখ, যা তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিত। তাঁর মুখাবয়বে ছিল ধারালো গ্রিক আদলের সৌন্দর্য, দীর্ঘ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, নিখুঁত ও রুচিশীল পোশাক-পরিচ্ছদ আর এমন এক স্বাভাবিক গাম্ভীর্য ও আত্মবিশ্বাস, যা তাঁকে জন্মগত নেতার মর্যাদা দিত।

প্রকৃতি তাঁকে অপরিসীম আকর্ষণ ও ব্যক্তিত্বে সমৃদ্ধ করেছিল, কিন্তু সমাজ তাঁকে এমন সুযোগ বা উপায় দেয়নি, যার মাধ্যমে তিনি স্বচ্ছন্দে জীবিকা নির্বাহ করতে পারতেন। সংগ্রামের সেই দিনগুলোতে যারা তাঁর সংস্পর্শে এসেছিল, তারা তাঁকে এক অসাধারণ সম্ভাবনাময় যুবক হিসেবেই দেখেছিল। কিন্তু খুব কম মানুষই জানত, তাঁর পকেট তখন প্রায় শূন্য ছিল।

তবে অজান্তেই এই সামাজিক সম্পর্কগুলো তাঁর জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এল এবং শেষ পর্যন্ত সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দিল। তাঁর এক বন্ধু, যিনি তাঁর প্রতিভা ও যোগ্যতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন,  তিনি তাঁকে সেই সময়ের বোম্বের ভারপ্রাপ্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল মি. ম্যাকফারসন-এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

মি. ম্যাকফারসন এই তরুণ ব্যারিস্টারের মেধা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন। তিনি তাঁকে নিজের অধীনে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানান এবং নিজের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ব্যবহার করার পাশাপাশি তাঁর চেম্বারে বসে পড়াশোনা ও আইনচর্চার সুযোগ করে দেন।

আমাদের ভাই মি. ম্যাকফারসনের এই মহানুভবতার কথা কখনোই ভুলে যাননি। বিশেষ করে সেই সময়ে, যখন কোনো ইংরেজের পক্ষে ভারতীয় ব্যারিস্টারদের প্রতি এমন আন্তরিক সৌজন্য ও সহযোগিতা প্রদর্শন করা ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

মি. ম্যাকফারসন খুব শিগগিরই বুঝতে পারলেন যে তাঁর অফিসের নতুন কর্মী একজন অসাধারণ আকর্ষণীয়, মেধাবী, অধ্যবসায়ী এবং সৎ তরুণ। তাই তিনি দেরি না করে কয়েকটি মামলা তরুণ ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতে তুলে দিতে শুরু করেন।

এই সময়ে আমাদের ভাই সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। কারণ আইন পেশায় সাফল্য পাওয়া অনিশ্চিত ছিল এবং সেই অনিশ্চয়তা তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল। সরকারি চাকরি হলে অন্তত নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো। তিনি যখন এই ইচ্ছার কথা মি. ম্যাকফারসনকে জানালেন, তখন তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বিচার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য স্যার চার্লস অলিভ্যান্টের কাছে তাঁর জন্য জোরালো সুপারিশ করলেন। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই আমার ভাই অস্থায়ী প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্তি পেলেন।

তিনি অনুভব করলেন, যে সাফল্য এতদিন তাঁর নাগালের বাইরে ছিল, এবার তা তাঁর মুঠোর মধ্যে এসে গেছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তাঁর আদর্শ আচরণ ও দক্ষতা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রশংসা অর্জন করল। অস্থায়ী নিয়োগের মেয়াদ শেষ হলে স্যার চার্লস অলিভ্যান্ট তাঁকে মাসিক ,৫০০ টাকা বেতনের আরও উন্নত বিচার বিভাগীয় পদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। সে সময় এটি ছিল এক রাজকীয় বেতন।

কিন্তু জিন্নাহ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন— “না, ধন্যবাদ, স্যার। খুব শিগগিরই আমি একদিনেই এর চেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারব।”

অস্থায়ী প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ থেকে পদত্যাগ করার পরপরই বহু মানুষ তাঁকে তাদের আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করতে এগিয়ে এলেন। তিনি অ্যাপোলো হোটেলের ছোট ঘরটি ছেড়ে অ্যাপোলো বন্দরের এলাকায় একটি সাধারণ কিন্তু সুন্দর ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন। সেটি রুচিসম্মতভাবে সাজিয়ে তোললেন এবং এমন একটি ভবনে নতুন চেম্বার খোললেন, যেখানে তৎকালীন অনেক খ্যাতনামা আইনজীবীর অফিস ছিল।

সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি কোনো কার্পণ্য করেননি। নিজের চেম্বারকে তিনি এমনভাবে সজ্জিত ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন, যা যে কোনো আইনজীবীর গর্বের বিষয় হতে পারত। তাঁর সাফল্যের সিঁড়িতে পা তখন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি বাবাকে চিঠি ও টেলিগ্রাম পাঠিয়ে পরিবারসহ বোম্বেতে চলে আসার জন্য অনুরোধ জানালেন।

আমাদের বাবা করাচিতে তাঁর স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন। বহু পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসাও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করলেন, করাচিতে থেকে গেলে কেবলই অতীতের তিক্ত স্মৃতিগুলো মনে পড়বে। তাছাড়া, তাঁর ছেলে তখন বোম্বেতে বেশ ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, পুরো পরিবারকে নিয়ে বোম্বেতেই চলে যাওয়াই শ্রেয় হবে।

অতঃপর আমরা বোম্বেতে এসে খাড়াক এলাকার খোজা মহল্লায় দুটি কক্ষবিশিষ্ট একটি ছোট বাসা ভাড়া নিলাম। আমাদের ভাই প্রায়ই সেখানে আমাদের দেখতে আসতেন। তখন তিনি আইন পেশা থেকে যথেষ্ট উপার্জন করতেন। নিজে ভালোভাবে জীবনযাপনের পাশাপাশি পরিবারের সমস্ত দায়িত্বও তিনি কাঁধে তুলে নিলেন। বিশেষ করে ভাই-বোনদের শিক্ষার সমস্ত ব্যয়ভার তিনি নিজেই বহন করতেন।

দীর্ঘ, কঠিন ও হৃদয়বিদারক সংগ্রাম তাঁর আত্মবিশ্বাসের দীপ্তিকে একটুও ম্লান করতে পারেনি। স্বাধীনভাবে নিজের পথ চলার বিশ্বাসও কখনো তাঁকে টলিয়ে দিতে পারেনি। তিনি কখনো ঊর্ধ্বতনদের পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করেননি, আবার জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের ভয়ভীতি বা চাপের কাছেও মাথা নত করেননি।

এই কারণেই স্যার চিমানলাল সেতালভাদ লিখেছিলেন— “জিন্নাহ তাঁর কর্মজীবনের একেবারে প্রারম্ভিক সময় থেকেই অসাধারণ স্বাধীনচেতা ও সাহসী ছিলেন। বিচারক কিংবা প্রতিপক্ষের আইনজীবী—কারও কাছেই তিনি কখনো নিজেকে প্রভাবিত বা ভীত হতে দেননি।”

আমাদের বাবাকে প্রায়ই বলা হতো যে তাঁর তরুণ পুত্র নিজের সামর্থ্যের চেয়েও অনেক বড় লক্ষ্য স্থির করছে। আইনজীবী মহলের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের এবং বিচারকদের প্রতি তাঁর আপাত অহংকারী আচরণ ও তীক্ষ্ণ মেজাজ নাকি তাঁর উন্নতি ও সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মদ আলীকে নিয়ে বাবার প্রাথমিক সংশয় দূর হয়ে যায়। তার পরিবর্তে তাঁর মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের জন্য এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

মিস্টার স্ট্র্যাংম্যান ছিলেন বোম্বের একজন ইংরেজ, প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যারিস্টার। একটি মামলায় তিনি ও আমাদের ভাই একসঙ্গে নিযুক্ত হয়েছিলেন। একদিন যৌথ পরামর্শের জন্য আমাদের ভাইকে স্ট্র্যাংম্যানের চেম্বারে যেতে হয়। সে সময় ইংরেজদের অনেকেই তাঁদের ভারতীয় সহকর্মীদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতেন। স্ট্র্যাংম্যানও কায়েদে আজমের সঙ্গে এমন ভঙ্গিতে কথা বলেছিলেন, যা তিনি অপমানজনক ও অবমাননাকর বলে মনে করেছিলেন। সেই দিনের পর থেকে তিনি আর কখনও স্ট্র্যাংম্যানের চেম্বারে যাননি। এমনকি আদালতে বা আদালতের বাইরে দেখা হলেও তাঁর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

বোম্বে হাইকোর্টে সদ্য তালিকাভুক্ত এক তরুণ ব্যারিস্টার হিসেবে তিনি একবার বিচারপতি মির্জার আদালতে একটি মামলায় সওয়াল করছিলেন। তখন বিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন স্যার চিমনলাল সেতালভাদ। তিনি যখন নিজের যুক্তি উপস্থাপন করছিলেন, তখন বিচারপতি মির্জা তাঁকে মাঝপথে থামিয়ে ভর্ৎসনা করেন। এতে কায়েদে আজম ক্ষুব্ধ হন এবং এরপর তিনি বিচারকের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করেন, যা বিচারপতি মির্জার কাছে অসম্মানজনক বলে মনে হয়।

বিচারপতি তাঁকে সতর্ক করে বললেন- “আপনার কথার ভঙ্গি ও ভাষাকে আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।” এরপর তিনি স্যার চিমনলাল সেতালভাদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন-“আপনিও কি আমার সঙ্গে একমত, মিস্টার সেতালভাদ?”

এই ঘটনার উল্লেখ করে স্যার চিমনলাল সেতালভাদ তাঁর বইয়ে লিখেছেন—“বিচারকের পক্ষে আমাকে এমন প্রশ্ন করাটা সত্যিই বোকামির কাজ ছিল। আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘মি. জিন্নাহ আদালত অবমাননা করেছেন কি না, সে বিষয়ে মত দেওয়া আমার কাজ নয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র আপনার। তবে আমি এটুকু বলতে পারি, আমি মি. জিন্নাহকে যতটুকু জানি, তিনি কখনও আদালতকে অপমান করার উদ্দেশ্যে এমন আচরণ করেননি।’৫০

অনেক বছর পরে এই ঘটনার কথা স্মরণ করে কায়েদে আজম বলেছিলেন- “সেদিনের পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বিচারপতি মির্জার আদালতে আর কখনও সওয়াল করব না।”

             সমাপ্ত

                                 -টোকা-

১.রত্তনবাই ১৯২৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করার পর মিস জিন্নাহ মালাবার হিলে অবস্থিত জিন্নাহর বাংলোতে এসে থাকতে শুরু করেন। সেই সময় থেকে তিনি সর্বদা জিন্নাহর সঙ্গী ও সহচরী হয়ে ছিলেন।

২. “এক কোটি সমান দশ মিলিয়ন।”

৩. জিন্নাহর উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি।

৪. তিনি ১৯৪০ সালের ১৯ নভেম্বর ভাষণ দিয়েছিলেন।

৫. জামিল-উদ্-দীন আহমদ (সম্পাদক), Speeches and Writings of Mr. Jinnah (লাহোর: শেখ মুহাম্মদ আশরাফ, ৭ম সংস্করণ, ১৯৬৮), পৃ. ১৯৯; পরবর্তীতে এই গ্রন্থটিকে এর শিরোনাম দ্বারাই উল্লেখ করা হয়েছে।

৬। একই গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ২০৭।

৭. একই গ্রন্থ, পৃ. ২০৮।

৮. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ২১০।

৯. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ২১০–২১১।১০. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ২২০।

১১। মুসলিম লীগের অধিবেশনটি ১৯৪১ সালের ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল, ইস্টার ছুটির সময় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

১২। ১৯৪১ সালের ১২ এপ্রিল অধিবেশনের প্রথম দিনে, অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি আবদুল হামিদ খানের স্বাগত ভাষণের পর জিন্নাহ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন—প্রথমে উর্দুতে এবং পরে ইংরেজিতে। তিনি তখনও অসুস্থ থাকায় তাঁর সভাপতির ভাষণ ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। ওই দিন তিনি টানা এক ঘণ্টা চুয়ান্ন মিনিট বক্তৃতা দেন, যা ছিল সত্যিই এক অসাধারণ কৃতিত্ব; কারণ এর মাত্র তিন দিন আগে তিনি স্নায়বিক ভেঙে পড়ার (nervous breakdown) শিকার হয়েছিলেন। ১১ এপ্রিলের শোভাযাত্রা এবং পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে তাঁর পরিবর্তে প্রতিনিধিত্ব করেন মাহমুদাবাদের রাজা আমির মুহাম্মদ খান, যিনি সে সময় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের (AIML) কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। সম্পাদক পুরো অধিবেশন জুড়েই উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে আরও দেখুন—সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সরকারি মুখপত্র মানশুর (দিল্লি)-এর সম্পাদক হাসান রেয়াজের বিবরণ, যা মানশুর, ১৭ মে ১৯৪১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

১৩। Speeches and Writings of Mr. Jinnah, পৃষ্ঠা ২৬২–২৬৩।

১৪. Quaid-i-Azam Mohammad Ali Jinnah: Speeches as Governor-General of Pakistan (ইসলামাবাদ: ডিরেক্টরেট অব রিসার্চ, রেফারেন্স অ্যান্ড পাবলিকেশনস, প্রকাশকাল উল্লেখ নেই), পৃ. ৫; পরবর্তীতে এই গ্রন্থকে Speeches as G.G. নামে উল্লেখ করা হবে।

উপরোক্ত উদ্ধৃতিটির আরেকটি সংস্করণ (মিস জিন্নাহ সম্পর্কে মিসেস রাফিয়া শরীফের Freedom, করাচি, ৪ মার্চ ১৯৪৯ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রবন্ধে উদ্ধৃত) নিম্নরূপ—

**“দুশ্চিন্তা ও কঠোর পরিশ্রমে ভরা সেই দীর্ঘ বছরগুলোতে আমার বোন ছিল আমার জীবনের এক উজ্জ্বল আলোকরশ্মি ও আশার উৎস। আমি যখনই বাড়ি ফিরে তার সঙ্গে দেখা করতাম, তখনই নতুন করে সাহস পেতাম। তার সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ না থাকলে আমার দুশ্চিন্তা আরও অনেক বেশি হতো এবং আমার স্বাস্থ্যেরও আরও অবনতি ঘটত। সে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেনি, কখনো অভিযোগও করেনি। আপনাদের এমন একটি কথা জানাই, যা হয়তো আপনারা জানেন না। এক সময় আমরা এক মহাবিপ্লবের সম্মুখীন হয়েছিলাম। আমরা গুলির মুখোমুখি হতে, এমনকি মৃত্যুকেও বরণ করে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম। সে তখন একটি কথাও বলেনি যা আমাকে নিরুৎসাহিত করতে পারে; বরং উল্টো সে আমাকে সাহস ও উৎসাহ জুগিয়েছিল। টানা দশ বছর ধরে সে আমার পাশে অটলভাবে দাঁড়িয়ে ছিল এবং আমাকে শক্তি ও সমর্থন জুগিয়েছিল।”

১৫ এটি ওয়াঘা সীমান্ত (Wagah Border)হিসেবে পড়তে হবে, কারণ লাহোরের নিকটে ওয়াঘা অবস্থিত, খোখরাপার (Khokhrapar) নয়।

১৬. Speeches as G.G., পৃষ্ঠা ২৯–৩০।

১৭পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৩০৩১১৮পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১১৪

১৯. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ১২০।

২০. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১২৬–১২৮।

২১. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৩৭।

২২ পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৫২।
২৩ পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৫৩।

২৪. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৫৪–১৫৫।

২৫। পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৫৮।

২৬। পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৫৯–১৬১।

২৭. ইলাহী বখশ জিন্নাহর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন—

“আমার তেমন কোনো গুরুতর অসুখ নেই,” তিনি আমাকে বললেন, “শুধু পেটের সমস্যা রয়েছে এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম ও দুশ্চিন্তার কারণে আমি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। গত চল্লিশ বছর ধরে আমি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা কাজ করেছি; এর আগে কখনো রোগব্যাধি কী, তা জানতাম না। তবে গত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছরই আমার জ্বর ও কাশির আক্রমণ হচ্ছে। আমাদের বোম্বের চিকিৎসকেরা এগুলোকে ব্রঙ্কাইটিসের আক্রমণ বলে মনে করতেন এবং প্রচলিত চিকিৎসা ও কয়েক দিন বিছানায় বিশ্রাম নিলেই সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে আমি সুস্থ হয়ে উঠতাম। কিন্তু গত এক-দুই বছরে এই আক্রমণগুলোর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি তীব্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং এগুলো আমাকে আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল ও ক্লান্ত করে দিচ্ছে।”

“প্রায় তিন সপ্তাহ আগে আমার ঠান্ডা লেগেছিল। এরপর জ্বর ও কাশি দেখা দেয়, যার জন্য কোয়েটার সিভিল সার্জন আমাকে পেনিসিলিন লজেঞ্জ খাওয়ার পরামর্শ দেন। তখন থেকেই আমি সেগুলো খাচ্ছি। আমার সর্দি কিছুটা কমেছে, জ্বরও হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু আমি এখনও খুব দুর্বল অনুভব করছি। আমার মনে হয় না শরীরে কোনো গুরুতর বা অঙ্গগত (জৈবিক) সমস্যা রয়েছে। আমার যে কফ বের হচ্ছে, তা সম্ভবত আমার পাকস্থলী থেকেই আসছে। যদি আমার পাকস্থলীর সমস্যাটি ঠিক করা যায়, তাহলে আমি খুব শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠব। বহু বছর আগে আমার পাকস্থলীতে বেশ গুরুতর সমস্যা হয়েছিল। সে সময় আমি লন্ডনের দুই-তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছিলাম, কিন্তু তাঁরা কেউই আমার রোগ নির্ণয় করতে পারেননি। তাঁদের একজন তো এমনকি অস্ত্রোপচারের পরামর্শও দিয়েছিলেন…।”

সূত্র: ইলাহী বখশ, With the Quaid-i-Azam During His Last Days (করাচি: কায়েদ-ই-আজম একাডেমি, ১৯৭৮), পৃষ্ঠা ৪–৫।

২৮. ইলাহী বখশ তাঁর সাক্ষাৎকারের বিবরণে লিখেছেন:

“…এখন আমাকে সব খুলে বলুন। আমি কতদিন ধরে এই রোগে ভুগছি? এই রোগ থেকে আমার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতটা? চিকিৎসা কতদিন চলবে? আমি সবকিছু জানতে চাই, এবং পুরো সত্যটা বলতে আপনি একটুও দ্বিধা করবেন না।”

এর উত্তরে আমি বলেছিলাম যে, এক্স-রে পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের প্রকৃত বিস্তার নির্ণয় না করা পর্যন্ত আমি কোনো নির্দিষ্ট মতামত দিতে পারব না। তবে আধুনিক ওষুধের সাহায্যে যথেষ্ট পরিমাণে সুস্থতার একটি ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। আমি যা বলেছিলাম, তাতে তিনি বিশেষভাবে বিচলিত বা মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েছেন বলে মনে হয়নি। বরং এত গুরুতর সংবাদ তিনি যে শান্ত, সংযত ও স্থিরচিত্তে গ্রহণ করেছিলেন, তা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। ইবিড., পৃ. ৮।

২৯. ইলাহী বখশের বর্ণনা অনুযায়ী:

“সকালের নাশতায় আমি তাঁকে পোরিজ, আধা-সেদ্ধ, স্ক্র্যাম্বলড অথবা পোচ ডিম, মাখন মাখানো পাতলা সাদা পাউরুটির টুকরো এবং পর্যাপ্ত দুধ মিশ্রিত কফি খাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলাম। সকাল ১১টায় ফলের রস; দুপুরের খাবারে কিমা করা মুরগির মাংস অথবা ভাপে রান্না করা কিংবা সেদ্ধ মাছ, তার সঙ্গে সাদা সস, আলুর ভর্তা ও সবুজ মটরশুঁটি; এরপর বেকড কাস্টার্ড অথবা ক্রিমসহ ফলের জেলি। বিকেলে বিস্কুট ও চা; আর রাতের খাবারে কিমা করা মুরগির মাংস অথবা গ্রিল করা মাছ, তার সঙ্গে রুচিবর্ধক কোনো সস, আলুর ভর্তা, সবুজ মটরশুঁটি অথবা সেদ্ধ ম্যারো (কচি লাউ/স্কোয়াশজাতীয় সবজি), এরপর হালকা পুডিং এবং কফি। …”

তথ্যসূত্র: একই গ্রন্থ (Ibid.), পৃষ্ঠা ৬।

৩০. ইলাহী বখশের বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ—

“আমি যখন তাঁকে এই ভয়াবহ সংবাদটি জানাচ্ছিলাম, তখন গভীর মনোযোগ দিয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার মনে বারবার সন্দেহ জাগছিল—আমি কোথাও ভুল করলাম না তো? কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ শান্ত ছিলেন। আমি কথা শেষ করার পর তিনি শুধু জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মিস জিন্নাহকে বিষয়টি জানিয়েছেন?’

আমি উত্তর দিলাম- জি, স্যার। আমি ভেবেছিলাম আপনার কাছ থেকে রোগের প্রকৃত অবস্থা গোপন রাখাই সমীচীন হবে, কারণ আশঙ্কা করেছিলাম এতে আপনার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই আমাকে তাঁর (মিস জিন্নাহর) কাছে বিষয়টি গোপন না রেখে আস্থার সঙ্গে জানাতে হয়েছিল।’

তখন কায়েদে-আজম আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন- না, আপনার তা করা উচিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি তো একজন নারী।’

আমি তাঁর বোনের যে মানসিক কষ্ট হয়েছে, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলাম। তবে ব্যাখ্যা করলাম যে, এর বাইরে আমার আর কোনো উপায় ছিল না।

তথ্যসূত্র: একই গ্রন্থ (Ibid.), পৃষ্ঠা ৮।

৩১. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৯ দেখুন।

৩২. ইলাহী বখশের বর্ণনা নিম্নরূপ:

“… নিচতলার ড্রয়িংরুমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার দেখা হয়। সেদিন তিনি জনাব মুহাম্মদ আলীর সঙ্গে কায়েদে-আজমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে জিয়ারাতে এসেছিলেন। তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্নভাবে কায়েদে-আজমের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিলেন। রোগীর আস্থা অর্জন করে আমি চিকিৎসার প্রথম ধাপে সফল হয়েছি বলে তিনি আমাকে অভিনন্দন জানান এবং আশা প্রকাশ করেন যে, এটি তাঁর আরোগ্যে সহায়ক হবে। তিনি আমাকে রোগটির দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মূল কারণ গভীরভাবে অনুসন্ধান করারও অনুরোধ করেন।

আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি যে, কায়েদে-আজমের অবস্থা গুরুতর হলেও এখনও আশার কারণ রয়েছে। যদি করাচি থেকে বিশেষভাবে আনানো সর্বশেষ ওষুধগুলোর প্রতি তাঁর শরীর ইতিবাচক সাড়া দেয়, তবে তিনি হয়তো এই রোগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন। আমি আরও বলি, সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো রোগীর অসাধারণ রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা। তাঁর প্রধান এবং দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধার স্বাস্থ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।”

সূত্র: পূর্বোক্ত গ্রন্থ (Ibid.), পৃষ্ঠা ১১।

৩৩. Speeches as G.G., পৃষ্ঠা ১৬২–১৬৩।

৩৪. আরও দেখুন: ইলাহী বখশ, পূর্বোক্ত গ্রন্থ (op. cit.), পৃষ্ঠা ১৪–১৫।

৩৫. ইলাহী বখশের বর্ণনা অনুযায়ী:

“হ্যাঁ, আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন, এতে আমি আনন্দিত। আমি জিয়ারাতে এসে যেন বন্দি হয়ে পড়েছিলাম।”— পূর্বোক্ত গ্রন্থ (Ibid.), পৃষ্ঠা ১৯।

৩৬। আরও দেখুন, পূর্বোক্ত গ্রন্থ (Ibid.), পৃষ্ঠা ২৫।

৩৭। আরও দেখুন, পূর্বোক্ত গ্রন্থ (Ibid.), পৃষ্ঠা ২৬।

৩৮। ওই বছর ঈদুল ফিতর ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভুলটির কারণ সম্ভবত এই যে, Quaid-e-Azam Speaks (করাচি: Pak. Publicity, ১৯৫০?) গ্রন্থে ভুলবশত ঈদের বাণীটি ২৭ আগস্ট১৯৪৮ তারিখে স্থান দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোও সেই ভুল তথ্যই পুনরাবৃত্তি করেছে। মিস জিন্নাহ এবং মি. আল্লানা সম্ভবত এসব গ্রন্থেরই কোনো একটি ব্যবহার করেছিলেন।

৩৯। Speeches as G.G., পৃষ্ঠা ১৬৬।

৪০. পূর্বোক্ত গ্রন্থ (Ibid.), পৃষ্ঠা ১৬৫।

৪১. পূর্বোক্ত গ্রন্থ (Ibid.), পৃষ্ঠা ১৬৬।

৪২. উপরের ৩৮ নম্বর টীকায় উল্লেখিত ভুলের কারণে, ১৪ আগস্ট ১৯৪৮-এ প্রদত্ত জিন্নাহর স্বাধীনতা দিবসের বাণী-কেই তাঁর সর্বশেষ লিপিবদ্ধ (রেকর্ডকৃত) বক্তব্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

৪৩। সেই সময়ে সিন্ধ প্রদেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ ছিল না। পরবর্তীকালে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন (Government of India Act, 1935) অনুযায়ী ১৯৩৬ সালের ১ এপ্রিল সিন্ধ একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশে পরিণত হয়।

৪৪। তাঁর পাঠক-পরিচয়পত্রের (Reader’s Ticket) প্রতিলিপির জন্য পরিশিষ্ট (Appendix) দেখুন।

৪৫। উইলিয়াম ইউয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোন (১৮০৯–১৮৯৮) ছিলেন একজন খ্যাতনামা ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ এবং ব্রিটিশ লিবারেল পার্টির নেতা। তিনি ১৮৬৮–৭৪, ১৮৮০–৮৫, ১৮৮৬ এবং ১৮৯২–৯৪ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ভারতীয় প্রশাসনে উদারনীতির কিছুটা প্রবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই লর্ড রিপন ১৮৮০–৮৪ সালে ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন।

জন ভিসকাউন্ট মরলি (১৮৩৮–১৯২৩) ছিলেন গ্ল্যাডস্টোনপন্থী লিবারেল রাজনীতিবিদ এবং ১৮৮৩–৯৫ ও ১৮৯৬–১৯০৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য। তিনি ১৯০৫–১০ সালে ভারতের সেক্রেটারি অব স্টেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯০৯ সালের মরলি–মিন্টো সংস্কার (Morley–Minto Reforms)-এর অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন।

জোসেফ চেম্বারলেইন (১৮৩৬–১৯১৪) ১৮৭৬ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন।

দাদাভাই নওরোজি (১৮২৫–১৯১৭), যিনি প্রায়ই ভারতের মহাবৃদ্ধ” (Grand Old Man of India) নামে পরিচিত, কংগ্রেসের প্রাথমিক যুগের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। তিনি ১৯০৬ সালের কলকাতা কংগ্রেসে স্বশাসন (Self-Government)-এর লক্ষ্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি ১৮৮৬, ১৮৯৩ এবং ১৯০৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি স্থায়ীভাবে ইংল্যান্ডে বসবাস করতেন এবং ১৮৯২ সালে ফিন্সবারি নির্বাচনী এলাকা থেকে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স-এর সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ইংল্যান্ডে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ১৯০৬–১১ সালের স্বদেশী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং একজন উদারপন্থী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিন্নাহর প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন।

থমাস পাওয়ার ও’কনর (১৮৪৮–১৯২৯) ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইরিশ জাতীয়তাবাদী নেতা, সাংবাদিক এবং ১৮৮০ সাল থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য।

আর্থার জেমসব্যালফোর (১৮৪৮–১৯৩০) ছিলেন একজন ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিবিদ। তিনি ১৮৯১–৯২ সালে হাউস অব কমন্সের নেতা এবং ফার্স্ট লর্ড অব দ্য ট্রেজারি ছিলেন; ১৮৯২–৯৫ সালে বিরোধী দলের নেতা; ১৮৯৫–৯৬ সালে পুনরায় হাউসের নেতা; ১৯০২–০৫ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী; ১৯১৬–১৯ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী; এবং ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরিত ব্রিটিশ মিশনের প্রধান ছিলেন।

৪৬। লন্ডনে তাঁর ছাত্রজীবনের কথা বলতে গিয়ে জিন্নাহ নাকি ড. আশরাফকে বলেছিলেন, সেই সময় লর্ড মরলির উদারনীতি সর্বত্র প্রবলভাবে বিরাজ করছিল। আমি সেই উদারনীতিকে আত্মস্থ করেছিলাম; তা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে এবং আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।” — হেক্টর বলিথো, Jinnah: Creator of Pakistan (লন্ডন: জন মারে, ১৯৫৪), পৃ. ৯।

৪৭। দাদাভাই নওরোজির নির্বাচনী প্রচারণায় জিন্নাহর অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। রিজওয়ান আহমদ এ দাবির বিরোধিতা করে বলেন যে, জিন্নাহর ইংল্যান্ড ত্যাগের তারিখ সম্ভবত ১৮৯৩ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো এক সময় ছিল। দেখুন: রিজওয়ান আহমদ, Quaid-e-Azam: Ibtidai Tees Saal (করাচি: মার্কাজ-ই-তাহরিক-ই-পাকিস্তান, ১৯৭৬), পৃষ্ঠা ৮৫–৮৬।

৪৮. ১৯১৩ সালের ২ জুন ওয়েস্টমিনস্টারের ক্যাক্সটন হলে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় জিন্নাহ লন্ডন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন গঠনের প্রস্তাব (রেজোলিউশন) উত্থাপন করেন। ওই উপলক্ষে প্রদত্ত তাঁর ভাষণটি সরোজিনী নাইডু রচিত Mohammad Ali Jinnah: An Ambassador of Unity (মাদ্রাজ: গণেশ অ্যান্ড কোং, ১৯১৮) গ্রন্থের ১২৮–১৩৩ পৃষ্ঠায় সংকলিত হয়েছে।

৪৯. জিন্নাহ ড. আশরাফকে বলেছিলেন যে, লন্ডনে শেষ দুই বছর অবস্থানকালে” তিনি তাঁর সময় স্বাধীনভাবে আরও অধ্যয়নে ব্যয় করেছিলেন, সেই রাজনৈতিক জীবনের প্রস্তুতির জন্য, যার পরিকল্পনা তিনি ইতিমধ্যেই মনে মনে করেছিলেন।”Bolitho, পূর্বোক্ত গ্রন্থ (op. cit.), পৃ. ৭।

ওই সময়ে তিনি যে বইগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, তার কিছু আজও করাচি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে অবস্থিত কায়েদ-ই-আজম লিটারারি সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

১. The Works of Rt. Hon’ble Edmund Burke: Writings and Speeches (১২ খণ্ড)
২. Thomas Carlyle, Past and Present (১৮৯৪)
৩. Thomas Carlyle, The French Revolution: A History (১৮৮৮)
৪. Andrew Lang, The Politics of Aristotle (১৮৮০)
৫. John Stuart Mill, Principles of Political Economy (১৮৯৩)
৬. W. M. Torrens, Empire in Asia: How We Came by It (১৮৭২)
৭. J. G. Morison, Gibbon (১৮৮৭)
৮. Isaac Disraeli, Literary Character of Men of Genius
৯. Mazzini, Essays
১০. Sir Walter Scott, On Morality (প্রকাশ-সাল উল্লেখ নেই, তবে সম্ভবত ১৮৯৫)।

এই বইগুলোর কয়েকটিতে জিন্নাহর নিজস্ব স্বাক্ষর রয়েছে। সর্বশেষ উল্লিখিত On Morality বইটির দুটি স্থানে তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন। এছাড়া বইটির শেষ পাতায় তিনি নিম্নলিখিত কথাগুলো লিখেছিলেন—

“এই বইটি আমার—আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন এটি আমারই থাকবে। লজ্জার ভয়ে এটি চুরি কোরো না। তাই এখানে মালিকের নাম লেখা রইল।

এম. এ. জিন্নাহ
১০ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৫

Bottom of Form

Bottom of Form

Bottom of Form

Scroll to Top