মুখে মুখে ফেরা মুক্তা(প্ৰচলিত গল্প)

 সাপুড়ে এবং বানর।

            মদন একজন সাপুড়ে। একদিন সে সাপের খেলা দেখাতে বাজারে যাচ্ছিল। জৈষ্ঠ মাসের বিকেল। প্ৰচণ্ড সূৰ্যের উত্তাপ। সূর্যের উত্তাপে তার গলা শুকিয়ে গেলো, তাই সে সাপ ভর্তি মাটির পাত্ৰটি একটি গাছের নিচে নামিয়ে পাশের বাড়িতে জল খেতে গেল গাছটিতে বেশ কিছু বানর বাস করত। বানররা ভাবল, মাটির পাত্রে অবশ্যেই লোভনীয় কিছু খাদ্যবস্তু আছে। লোকটির পোশাকও নজরকাড়া! মাথাটিও সুন্দরভাবে তেলজল দিয়ে আঁচড়ানো। বানররা ভাবল, লোকটি নিশ্চয় মিষ্টি নিয়ে শশুড় বাড়ী যাচ্ছে। মিষ্টির কথা মনে পড়তেই বানরের জিভে জল আসতে শুরু করলো- যেমন টক্ দেখলে জিভে জল আসতে শুরু করে।
বানররা লোভ সামলাতে না পেরে গাছ থেকে নেমে এক পা দু-পা করে ধীরে ধীরে পাত্রের দিকে এগিয়ে এলো। দলনেতা বানরটি পাত্রের কাছে এসে কয়েকবার জিভ চটকে ধীরে ধীরে পাত্ৰের ঢাকনা খুলে ফেললো।

      ঢাকনা খুলতেই একটা সাপ ফোঁস করে ফণা তুলে উঠে দাঁড়ালো।ঘটনার আকস্মিকতায় বানরটি বিভ্রান্ত হয়ে আত্মরক্ষার জন্য সে সাপটির গলায় চেপে ধরলো।

অতর্কিত আক্রমণের ফলে ভয় পেয়ে সাপটি আত্মরক্ষার জন্য লক্ষ্ণণকে নাগপাশে জড়িয়ে ধরার মতো বানরটিকে জড়িয়ে ধরলো।

            সাপ কামড়ালে মৃত্যু অনিবাৰ্য,তাই বানরটি সাপের প্যাঁচ খুলার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো।তবে বৃথা চেষ্টা! এক পাশ থেকে প্যাঁচ খুললে সাপ আবার অন্য পাশ থেকে প্যাঁচিয়ে ধরে। বারবার চেষ্টা করেও বানরটি যখন সাপের প্যাঁচ খুলতে সক্ষম হলো না, তখন সে অন্য উপায় চিন্তা করতে বাধ্য হলো।

      পাশেই একটি সিজ গাছ (কণ্টক বিশিষ্ট গাছ) বানরের চোখ পড়লো। সে সিজ গাছ দেখে মনে মনে ভাবলো, যে কণ্টকযুক্ত সিজ গাছের কাণ্ডে ঘষলে নিশ্চয় সাপটি প্যাঁচ খুলতে বাধ্য হবে। ভাবা মতেই কাজ। বানরটি লাফাতে লাফাতে সিজ গাছের গোড়ায় গিয়ে গাছের কণ্টকবিশিষ্ট কাণ্ডে সাপটিকে ঘষতে লাগলো। কাঁটার আঁচড় খেয়ে সাপটি প্যাঁচ খুলতে বাধ্য হলো। এক পর্যায়ে বানরটি নাগপাশ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে পড়লো এবং বানরটি সঙ্গে সঙ্গে সাপটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এক লাফে গাছে গিয়ে চড়লো।
‘কলা গাছ দিয়ে বিয়ের কুঞ্জ সাজে
শক্তি দিয়ে যা করা যায় না, তা বুদ্ধি দিয়ে সাধে।

 সন্ন্যাসী এবং মুখফোড় মহিলা।

একদিন একজন সন্ন্যাসী একটি ইট বালিশের মতো করে শিতান দিয়ে একটি গাছের নিচে শোয়েছিলেন। কয়েকজন মহিলা সেই পথে নদীতে জল তুলতে যাচ্ছিলো। সন্ন্যাসীকে ইট শিতান দিয়ে শোয়ে থাকতে দেখে একজন মুখফোড় মহিলা তার বন্ধুদের বললো- দ্যাখ দ্যাখ, সন্ন্যাসী তাঁর স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের মায়া ত্যাগ করতে পেরেছেন, কিন্তু সাধারণ একটি বালিশের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি।আসলে এরা সন্ন্যাসী নামের কলংক!কাজের ভয়ে সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করেছে।

মহিলাটির কথা সন্ন্যাসীর কানে গেলো।তিনি ভাবলেন, মহিলাটি যা বলেছেন তা অপ্রীতিকর হলেও সত্য। আমি সবকিছু ছেড়ে দিতে পেরেছি,অথচ সাধারণ একটি বালিশের মায়া ত্যাগ করতে পারি নি, এটা কেমন কথা? বালিশের মায়াও নিশ্চয়ই ত্যাগ করতে পারব। আজ থেকে আর বালিশ ব্যবহার করব না। মনে মনে এভাবে ভেবে সন্ন্যাসী মাথার নিচে থেকে ইটটা বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।

সন্ন্যাসীকে ইট ছুঁড়ে ফেলে দিতে দেখে মহিলাটি আবার বলল, ‘দ্যাখ দ্যাখ, সন্ন্যাসীর রাগ দ্যাখ। বালিশের কথা বলাতে রাগ করে ইটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।’ এত রাগ নিয়ে তিনি কী করে সন্ন্যাসী হলেন? এটা আসলে একজন ভন্ড সন্ন্যাসী। হয়তো সংসার চালাতে না পেরে সন্ন্যাসী হয়েছেন।

দলের মহিলারা মুখফোড় মহিলাটিকে ইশারায় সমর্থন করে সন্ন্যাসীর দিকে আড় চোখে তাকিয়ে মুচকি হেসে নদীতীরের দিকে চলে গেল।

    মহিলার মন্তব্যে সন্ন্যাসী আহত হলেও তিনি প্রতিবাদ করলেন না। তিনি মহিলাদের গন্তব্যের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, মানুষকে খুশি করার জন্য কিছু করার মতো বোকামি আর হয়তো দ্বিতীয়টি নেই!*

মানুষ এমন জিনিষ এমন তার মন
কলিজা ভূনা করে দিলেও পাওয়া যায় না মন।।

দুই ভাই

      এক সময় এক গ্রামে দুই ভাই ছিল। এক ভাইযের নাম গেন্ধেলা এবং আরেক ভাইযের না বীরবল। আর্থিক অবস্থাও মোটামুটি সচ্ছল। ছোট ভাই বীরবল চতুর প্রকৃতির। কিছু লেখা-পড়াও জানে। কিন্তু গেন্ধেলা বোকা। সে দুনিয়ার কিছুই বোঝে না। ছোট ভাইয়ের নির্দেশে সব সময় চলে। বাড়ির সব কাজ-কামও সে ছোট ভাইযের নির্দেশে করে।

      এদিকে বীরবল কিছুই করে না। সে সবসময় মেল মিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকে। শুধু সে তার বড় ভাইকে কাজ করার নির্দেশ দেয়। বড় ভাই ছোট ভাইয়ের নির্দেশ অনুযায়ী সব কাজ করে।

      ভাই ভাই ঠাই ঠাই বলে একটা কথা আছে। সময়ের পরিক্রমায় একদিন তাদের আলাদা হতে হলো। তারা তাদের জমি, বাড়ি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ করে নিলো।

  তাদের একটি দোহনকৃত গাভী ছিলো।গাভীটি নিয়ে তারা বিপাকে পড়ল। একটাই গাভী! দুটি থাকলে কথা ছিল না। তারা একটা একটা করে সমানভাবে ভাগ করে নিতে পারত। কিন্তু একটি মাত্র গাভী থাকায় সমস্যা হলো। অন্য কিছু হলে, কেটে দুই ভাগে ভাগ করতে পারত! গরু জীবন্ত প্রাণী, তাই কেটে দুই ভাগে ভাগ করা সম্ভব নয়! তাই বীরবল ভাবতে লাগলো কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়।

      বীরবল চালাক। বুদ্ধিতে বৃহস্পতি! সে ভাইকে বলল, ‘দাদা, এখন গাভীটিকে ভাগ করব কী করে?’ একটি জীবন্ত প্রাণীকে কেটে দুই ভাগে করা সম্ভব নয়। তাই গাভীটিকে সামনে পেছনে ভাগ করার কথা ভাবছি। আপনি যখন বড়, তাই পেছনের দিকটা দিলে লোকে খারাপ ভাবতে পারে, তাই আপনাকে সামনের দিকটা প্রদানের কথা ভাবছি। আর আমি পেছনের দিকটা নেওয়ার কথা ভাবছি।

      ভাইয়ের প্রস্তাবে আপত্তির কোন কারণ না দেখে বড় ভাই গেন্ধেলা রাজি হয়ে গেলো।

  গাভীটি দোহনকৃত ছিল। মুখ যখন সামনে দিকে, তাই বড় ভাই গেঁথেলা ঘাস-পানি খাওয়ায়, আর ছোট ভাই বীরবল সকালে গাভীটিকে দোহন করে দিয়ে যায়। গাভীটি যতদিন বেঁচে ছিলো, ততদিন এই নিয়ম অনুসারে গাভীটিকে ঘাস খাওয়ানো এবং দোহন কার্য চলে ছিলো।

               হালা গাছ পেলে সবাই কোমর বেঁধে কুড়াল মারে

             সুযোগ পেলে ভাইয়ের সাথে ভাইয়েও প্রতারণা করে।!*                                  

দুই কৃপণ

  অনেক দিন আগের কথা। দুটি ভিন্ন গ্রামে দুজন কৃপণ লোক ছিল। একজনের নাম বৃন্দাবন এবং অন্যজনের নাম হরিহর। দুই গ্রামের মধ্যে দূরত্বের কারণে দুই কৃপণের মধ্যে কোনো চিনা-পরিচয় ছিল না। বৃন্দাবন কৃপনের একটি পুত্র এবং হরিহর কৃপানের একটি কন্যা সন্তান ছিল। তারা দুজনেই যৌবনের ধর্ম অনুযায়ী বিয়ের বয়সে পৌঁছলো। কিন্তু কৃপণের বাড়ি বলে তাদের কেউ কন্যা দিতে বা বিয়ে দিতে কেউ এগিয়ে এলোনা। তাই ধারে-কাছে সম্পর্কের কোনো লক্ষণ না দেখে বৃন্দাবন কৃপণ কনের সন্ধানে এবং হরিহর কৃপণ বরের সন্ধানে বের হলো।

      কাকতালীয়ভাবে দুই কৃপণ এসে একই সাথে একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে বসল। কিন্তু সামনা-সামনি মুখ করে বসল না তারা। সামনাসামনি বসলে হয়তো অহেতুক দুটো কথা খরচ করতে হয়! এই ভয়ে একে অপরের দিকে পিঠ দিয়ে বসে রইল।

      হঠা সেখানে একটি সাত-আট বছরের মেয়ে এল।

      মেয়েটিকে দেখে বৃন্দাবন কৃপণ জল খাবার কথা ভাবলো। সে বল বললো-এই মেযে তোমাদের বাড়ি কোথায়?

      মেয়েটি বলল- বাড়ি কাছেই। পাশের বাড়ির দিকে ইশারা করে বলল, ওইটাই আমাদের বাড়ি।

      আমি জলখাবার খাব। বৃন্দাবন বলল- ‘আমাকে এক গ্লাস জল এনে দিতে পারবে?’

  হ্যাঁ নিশ্চয় পারব।এক্ষুণি জল এনে দিচ্ছি। বলেই মেয়েটি একদৌড়ে গিয়ে এক গ্লাস জল নিয়ে এলো।

  বৃন্দাবন তার পকেট থেকে সযত্নে সংরক্ষিত একটি বাতাসা বের করে, বাতাসাটা জলের গ্লাসে আলতো করে চুবিয়ে, সাবধানে আবার পকেটে রেখে, বাতাসা চুবানো জল পান করল।

            হরিহরও পিপাসার্ত ও ক্ষুধার্ত ছিল। বৃন্দাবনকে জল পান করতে দেখে তার পিপাসা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে মেয়েটিকে এক গ্লাস জল আনার জন্য অনুরোধ করলো। মেয়েটি আরেক গ্লাস জল এনে হরিহরকে দিল।

  জলের গ্লাসটা সামনে রেখে হরিহর পকেট থেকে সাবধানে মোড়ানো একটা কাগজের টোপলা বের করে কাগজটা খুলে ফেলল। টোপলার ভেতর বাতাসা ছিলো। সে বাতাসার ছায়া গ্লাসের জলে ফেলে বাতাসাটা কাগজে মুড়ে আবার সাবধানে পকেটে রাখলো এবং একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস টেনে গ্লাসের জলে চুমুক দিলো।

  বৃন্দাবন কৃপণ ঘটনাটা আড় চোখে নিরীক্ষণ করছিলো। আরে, এ এত কৃপণ! কৃপণতায় এ দেখছি আমার চেয়েও একধাপ এগিয়ে। এর কাছ থেকে কৃপণতা সম্পর্কে অনেক কিছু শেখার আছে! এর যদি একটি কন্যা থাকত. তাহলে সোনায় সুহাগা চড়তো!এর মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে দিয়ে কৃপণালী সম্পর্কে অনেক কিছু শেখা যেত!

      বৃন্দাবন কৃপণ আলাপ জমানোর জন্য জিজ্ঞেস করলো- মহাশয়ের বাড়ী কোথায়?

      হরিহর কৃপণ আড়চোখে বৃন্দাবনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি ভরা সুরে বললো- আমার বাড়ির খোঁজ নিয়ে করবে?

      বৃন্দাবন চাটুকারিতার সুরে বলল- “না, মানে….. আপনার কাজ আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আজকাল আপনার মতো জিনিয়াস পাওয়া কঠিন। এটা আমার সৌভাগ্য যে আমি আপনার মত একজন গুণীর সন্ধান পেয়েছি।

      বৃন্দাবনের প্রশংসা শুনে হরিহর একটু নরম হলো। সে পূর্ব দিকে ইশারা করে বললো- ঐযে পূর্ব দিকে আমার বাড়ি। এখান থেকে অনেক দূরে। দুই ঘণ্টার পথ হবে।

  বৃন্দাবন জিজ্ঞেস করলো- কি প্রয়োজনে এদিকে এসেছেন?

      বৃন্দাবনের জল খাওয়া দেখে স্বাভাবিকভাবেই হরিহর কিছুটা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাই সে তার মনের কথা খুলে বললো- উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে। আমার একটি বিবাহযোগ্যা মেয়ে আছে। সেই মেয়ের জন্য বরের সন্ধানে এসেছি।

  হরিহরের কথা শুনে বৃন্দাবন যেন স্বর্গ হাতের নাগালে পেলো। সে ধীরে ধীরে বললো- আমার ছেলেরও বিয়ের বয়স হয়েছে। কিন্তু মনের মতো সম্পর্ক না পাওয়ার জন্য এখনও বিয়ে দিতে পারিনি। আপনি আপনার মেয়েকে আমার ছেলের সাথে বিয়ে দিন না কেন?

      হরিহরের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বললো- “দারুণ হবে!” আপনার মত একজন গুণী লোকের সাথে আত্মীয়তা করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। আজ থেকে তাহলে আমরা দুজন বেয়াই। আপনি কি বলেন?

      এটা কি আর কি বলার আছে? বৃন্দাবন বললো- “এখন শুধু বিয়ের তারিখ ঠিক করার কথা!”

      উভয়ে বিয়ের দিনতারিখ ঠিক করে বাসায় চলে গেল। কয়েকদিন পর কুকুর-বিড়াল বেঁধে রেখে মহাআড়ম্বর করে বিয়ের কাজ সমাধা করল।

                   সাপে শুধু সাপের ঠেং দেখে

                  ডলার চিহ্ন দেখে পিঠা লেখে!*

ব্রাহ্মণ এবং জ্যোতিষী

      অনেকদিন আগে বিপ্রপাদ নামে এক ব্রাহ্মণ ছিলেন। ব্রাহ্মণের একটি অকর্মণ্য পুত্র ছিল। ছেলের নাম ছিল দামোদর।

      দামোদরের বয়স হলে ব্রাহ্মণ তাকে শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ে পাঠালেন। কিন্তু সরস্বতী তাঁর প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। তাই একটি ক্লাসে তিন চারবার করে ফেল করে করে ক্লাস টেনে উঠলো যদিও চারবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিযেও সে ম্যাট্রিক পাস করতে পারল না। তাই বাবা তার পড়া ছাড়িযে তাকে ব্যবসায়ে লাগিযে দিলেন। কিন্তু সে ব্যবসায়ও সফল হতে পারল না।

      অবশেষে, ব্রাহ্মণ রাগ করে তাকে চাষবাসের কাজে লাগালেন, কিন্তু চাষবাসেও সে সফল হতে পারল না। এভাবে বারবার চেষ্টা করেও তাকে কোন কাজে লাগাতে না পেরে ব্রাহ্মণ হতাশ হয়ে পড়লেন। কোন কাজের যোগ্য নয়, এমন ছেলেকে বাড়ীতে বসিয়ে খাইয়ে লাভ কি? তাই ব্রাহ্মণ দামোদরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবলেন।

      কিন্তু বাবার মন! ছেলেকে তাড়াতেও চায় না। তাই তিনি তার ছেলে যোগ্য কিনা অযোগ্য তা জানার জন্য একজন জ্যোতিষীর সাথে পরামর্শ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

      ভাবামতেই কাজ! দু’দিন পর একজন জ্যোতিষীকে ডেকে আনলেন ছেলের ভাগ্য গুনে দেখার জন্য। এক বোজা বই নিয়ে জ্যোতিষী এলেন।    জ্যোতিষী বইগুলো দেখে গণনা করে দামোদরের কোথাও কোন যোগ্যতা খুঁজে পেলেন না। তাই গণনা শেষে ব্রাহ্মণ বললেন- মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যংগ খুঁজে দেখলাম, কিন্তু আপনার ছেলের কোথাও একটুও যোগ্যতা খুজে পেলাম না। এখন আপনার যা খুশি করতে পারেন!

      জ্যোতিষী দক্ষিণা নিয়ে তাঁর বই-পত্র গুছিয়ে বাড়ী চলে গেলেন। জ্যোতিষী চলে যাওযার পর ব্রাহ্মণ হতাশ হয়ে অযোগ্য ছেলে দামোদরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন।

      বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেওযার পর দামোদর মনের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তা দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে যেতে লাগলেন। পথে সেই রাজ্যের রাজকুমারের সাথে তার সাথে দেখা হলো।

      রাজকুমার শিকারে গিয়েছিলেন। রাজকুমার সেদিন প্রচুর শিকারও পেয়েছিলেন। তাই তাঁর মন মেজাজ ভালো ছিলো। দামোদর এক সময় তাঁর সহপাঠীও ছিলো। তাই দামোদরকে কাঁদতে দেখে রাজকুমারের মন গলে গেল।তিনি ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে ঘোড়া রেখে দামোদরকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হল দামোদর, তুমি এভাবে কাঁদছ কেন? তোমার কান্নার কারণ কি?

      দামোদর কাঁদতে কাঁদতে রাজকুমারকে তার দুর্ভাগ্যের কথা জানালেন। রাজপুত্র সব শুনে মর্মাহত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন কোথায় যাবে ভেবেছ?”

      দামোদর কেঁদে কেঁদে বললো- আর কোথায় যাব? আমার দু’চোখ যেদিকে নিয়ে যাবে সেদিকেই যাব। কোথাও আশ্রয় না পেলে শেষে আত্মহত্যা করতে হবে। আমার মত হতভাগা মরে যাওয়াই ভালো!’

রাজপুত্র দামোদরের কষ্টে বিচলিত হয়ে তাকে তাঁর প্রাসাদে নিয়ে এলেন। রাজপুত্র তাকে ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করিয়ে তাঁর সাথেই বিছানায় শোতে দিলেন। দামোদর রাজকীয় খাবার খাওয়ার পর নরম বিছানায় শোয়ে স্বর্গীয় সুখ অনুভব করতে লাগলো। এক পর্যায়ে সে সমস্ত দুঃখ কষ্ট ভুলে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন।

      মাঝরাতে রাজকুমারের হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাঁর শরীর, জামাকাপড় এবং হাতে আঠালো কিছু  একটা লেগে আছে এ রকম অনুভব হলো। তার নাকেও এক ধরনের দুর্গন্ধ লাগলো। বাতাসে শুঁকে, আঠালো জিনিসগুলো থেকে যে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে তা অনুমান করতে রাজকুমারের কোনো অসুবিধা হল না। তিনি জিনিসগুলো দেখার জন্য হারিকেনের ফিতা বাড়িয়ে আলো জ্বালালেন।

      আলো জ্বলে উঠতেই রাজকুমার দেখলেন, তাঁর হাতে এবং জামাকাপড়ে মানুষের মল লেগে আছে।

      তিনি অবাক হয়ে বললেন-আরে, এগুলো তো দেখছি মানুষের মল! রাজকুমার বিরক্তি ও ঘৃণায় ‘উওয়াক থু’ বলে বমি বলে করে দিলেন।

      বমির শব্দে দামোদরের ঘুম ভেঙ্গে গেলো এবং সে বিছানায় উঠে বসল। সে দেখলো, বিছানা মল এবং বমিতে ভর্তি।

      দামোদর রাজপুত্রকে বমি করতে দেখে মলের দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলেন, “এগুলো কী? এভাবে বমি করছো কেন?

      এগুলো কি, তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছ? রাজপুত্র রাগান্বিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি ডেকে আপদ চাপিয়ে এনেছি!তোমার পায়খানা পেযেছে আমাকে ডাকলেই পারতে, এভাবে বিছানায় এটা করাটা কি উচিত হয়েছে?

      তুমি কি বলতে চাইছো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না? দামোদর কিছু না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করল।

      এখন তুমি কিছুই বুঝতে পারছ না, তাই না! রাজকুমার রেগে বললেন- তোমার মলদ্বারে হাত দিয়ে দেখো, সবই বুঝতে পারবে।

      দামোদর হাত দিয়ে তার মলদ্বার স্পর্শ করল। আঠালো গন্ধযুক্ত কিছু তার হাতে লেগে এলো। সে তার হাতের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে রাজকুমারের দিকে তাকাল।

      রাজকুমার দামোদরের দৃষ্টির মর্ম বুঝতে পেরে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললেন, “এখন কি করেছ, বুঝতে পেরেছ? আমি যদি জানতাম যে, তুমি এমন কাজ করবে, তাহলে আমি কখনই তোমাকে ডেকে আনতাম না! ডেকে আপদ চাপিয়ে এনেছি। রাজকুমার এভাবে বলে নিন্মস্বরে বললেন: আচ্ছা, তুমি যা করেছ, করেছ! তবে তুমি একথা অন্য কাউকে বলবে না।

      দামোদর হ্যাঁ, না কিছু না বলে অবাক চোখে রাজকুমারের দিকে তাকিয়ে রইলো।

      এদিকে এক অজানা ভয় এবং লজ্জায় রাজকুমারের হৃদয় হাহাকার করে উঠল। তিনি ভয়ার্ত চোখে দামোরের দিকে তাকিয়ে অনুনয় করে বললেন, “তুমি তো জানো আমি রাজার ছেলে। আমার বিছানায় এমন ঘটনা ঘটেছে, কথাটা জানাজানি হলে আমি জনসমক্ষে মুখ দেখাতে পারব না।প্রজারা আমাকে রাজা বলে স্বীকারও না-ও করতে পারে। তোমাকে পাঁচ হাজার টাকা দেব। টাকা নিয়ে তুমি আজ রাতেই এখান থেকে চলে যাও। আমার সম্মানের কথা চিন্তা করে তুমি আমার এই উপকারটুকু কর।

      দামোদর অবাক দৃষ্টিতে রাজকুমারের দিকে তাকাল।দেখল,রাজপুত্রের চোখ-মুখ ভয়ের অভিব্যক্তি।রাজকুমারের চোখেমুখে আতঙ্কিত অভিব্যক্তি দেখে দামোদরের মনে লালসা সঞ্চার হলো।সে মনে মনে গভীর আত্মতৃপ্তি অনুভব করলো এবং গম্ভীর সুরে বললো- “আচ্ছা, আমি তোমার কথা মানলাম। কিন্তু পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার পাশাপাশি রাজ দরবারে আমাকে স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

      রাজকুমার তখন ভয়ে আড়ষ্ট। তাই তিনি দামোদরের প্রস্তাব সমর্থন করে বললেন, ‘ঠিক আছে! বাবাকে বলে রাজদরবারে তোমার স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থাও করে দেব।

      এভাবে বলে রাজকুমার বিছানা থেকে নামলেন এবং আলমারী খুলে পাঁচ হাজার টাকা বের করে দামোদরের হাতে দিয়ে বললেন- কয়েকদিনের মধ্যে ফিরে এসো, তোমার চাকরির ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

      দামোদর টাকার বান্ডিলটা হাতে নিয়ে বলল, দেখ, চাকরি না পেলে কিন্তু হঠাৎ কাউকে বলেও দিতে পারি।

      রাজপুত্র তিনবার শপথ খেয়ে বললেন, ‘পাবে, পাবে, পাবে। আমার কথা কখনও নড়চড় হবে না। তুমি আজ রাতে, এখনই বাড়ি চলে যাও।

      দামোদর টাকার বান্ডিলটা রুমালে মুড়ে পকেটে রেখে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। সে বাসায় ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেলো।

      ব্রাহ্মণ বারান্দায় বসে হোকা খাচ্ছিল। দামোদরকে দেখে ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে গেলেন! এ কি ঘটনা! আমি গতকাল এটাকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলাম। আর আজই এত সকালে বিপর্যয়টা আবার কোথা থেকে এসে হাজির হলো!

      দামোদর রুমালে বাঁধা টাকাগুলো ব্রাহ্মণের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো- নাও, গোনে দেখ।

      ব্রাহ্মণ রুমালের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘আরে বোকা, কী আছে এ রুমালে?

      দামোদর বুক উঁচিযে বললো-রুমালে টাকা আছে। পূরা পাঁচ হাজার।গোনে দেখ।

      টাকা? ব্রাহ্মণ অবজ্ঞার সুরে বললেন, ‘তুমি কি আমার সাথে ঠাট্টা করতে এসেছ?’ তুমি আনবে পাঁচ হাজার টাকা!বেঙের পিঠে পশম গজানোর মতো কথা বলতে এসেছ?

      দামোদর অবিচলিত কণ্ঠে বলল, ‘আরে, রুমালটা আগে খুলেই দেখ না।

      ব্রাহ্মণ রুমালের গাঁট খুলে অবাক হয়ে গেলেন। সত্যিই তো টাকা। এত টাকা! ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত টাকা কোথায় পেলে?’ কোথাও চুরিটুরি করেছ নাকি ?

      দামোদর উদ্ধত ভঙ্গিতে বললো- না, চুরি করিনি। রাজার ছেলে নিজেই আমাকে দিয়েছে তাঁর একটি উপকার করার জন্য। আমাকে রাজ দরবারে স্থায়ী চাকরিও দিবে বলেও কথা দিয়েছ।

      টাকার বাণ্ডিল হাতে নিয়ে ব্রাহ্মণ প্রচণ্ড ক্রোধে জ্যোতিষীর গৃহ অভিমুখে রওয়ানা হলেন। পাষণ্ড জ্যোতিষী, আজকে আমি তোমাকে মজা দেখাব! তুমি ভুল গণনা করে আমার যোগ্য ছেলেকে অযোগ্য বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে! আজ আমি তোমাকে ছেড়ে দিব না। এইভাবে, ভেবে ভেবে ব্রাহ্মণ জ্যোতিষীর বাড়িতে পৌঁছলেন।

      জ্যোতিষী বাড়িতেই ছিলেন। জ্যোতিষীকে দেখে ব্রাহ্মণ দ্বিগুণ রেগে গেলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘কী জ্যোতিষী! আপনি যদি গণনা করতে জানেনই না তো ভুল গণনা করে মানুষকে হয়রানি করেন কেন?

      জ্যোতিষী ব্রাহ্মণের অভিযোগের কারণ খুঁজে না পেয়ে বললেন, ‘আমি কি দোষ করেছি, মহাশয়?’ আমি কি ভুল গণনা করলাম?

      কি ভুল গণনা করলে? কিছুই যেন বুঝতে পারছে না! ব্রাহ্মণ ব্যঙ্গাত্মক সুরে কথাগুলো বলে টাকা বাঁধা রুমালটা জ্যোতিষীর সামনে ছুড়ে দিয়ে বলেলন- গোনে দেখ, পূরা পাঁচ হাজার।

      -পাঁচ হাজার মানে? কি পাঁচ হাজার?

      টাকা! ব্রাহ্মণ রাগান্বিত স্বরে বললেন, রুমালটা খুলে নিজের চোখেই দেখ না কেন?

      জ্যোতিষী রুমালের গাঁট খুললেন। টাকা দেখে তিনি অবাক! বললেন-আরে, এত দেখছি অনেক টাকা! এত টাকা! কোথায পেলেন এত টাকা?

      ব্ৰাহ্মণ বললেন- তুমি যাকে অয়োগ্য বলে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে সে-ই কামাই করে এনেছে এত টাকা।

      জ্যোতিষী বললেন- আমার গণনায় তো ভুল হওয়ার কথা ছিল না। সব বই দেখেও আমি আপনার ছেলের কোথাও কোনো যোগ্যতা খুঁজে পাইনি। এরই মধ্যে সে অনেক টাকা নিয়ে এসেছে! যোগ্যতা না থাকলে এত টাকা আনবেই বা কীভাবে? আচ্ছা, আমি আবার গণনা করে দেখছি, কোথাও যোগ্যতা পাওযা যায় কিনা।

      এভাবে বলেই জ্যোতিষী আবার গণনা করতে বসলেন। বইয়ের পাতা উলটাতে উলটাতে তিনি বলে উঠলেন- হ্যাঁ, এইবার পেয়েছি।তবে, এত চিপা জায়গায় যে যোগ্যতা থাকে আমি এই প্রথম দেখলাম।

      ব্রাহ্মণ অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চিপা জায়গা বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?’

      জ্যোতিষী বললেন- আপনার ছেলের মলদ্বারে একটু যোগ্যতা রযেছে। তারই দরুন সে এত টাকা কামাই করেছে।এত আঁটসাঁট জায়গায় যে যোগ্যতা থাকে তা এই আমি প্রথম দেখলাম।

      শিলা-বৃষ্টিতে বক মরে

      ফকিরের কেরামতি বাঢ়ে।।*

সিংহ এবং শিয়াল

      পশুর ভেতরে শিয়াল সবচেয়ে ধূর্ত প্রাণী। শিয়াল সব সময় অন্যকে ঠকায়, বই নিজে ঠকে না। কিন্তু হাতিরও পিছলে পাও, সজ্জেনরও ডুবে নাও। আমাদের গল্পের শেয়ালটির ক্ষেত্রেও একদিন সেই ঘটনাই ঘটল।

      একদিন আমাদের গল্পের শিয়াল সিংহের অবর্তমানে সিংহের মারা হরিণের মাংস মজা করে খাচ্ছিল। শিয়াল ভেবেছিল, সিংহ মামা আসার আগেই সে পেট পূরে মাংস খেয়ে নিবে! কিন্তু সব সময় ভাবা কথা হয় না সিদ্ধি, মাঝে আছে কানা বিধি। সে যখন মাংস খাচ্ছিল, তখন হঠাৎ কোথা থেকে এসে সিংহ হাজির হলো। সিংহ দেখে শেয়াল দৌড়ে পালাতে লাগলো। তবে সিংহটিও কম নয়! সে শিয়ালটিকে ধরার জন্য তার পিছনে তাড়া করল।

      সামনে শেয়াল এবং পেছনে সিংহ! সে এক মর্মান্তিক দৃশ্য। বনের অন্যান্য প্রাণীরা আতঙ্কিত।কি হয়, কি হয়, এমন ভাব আর কি! সিংহটি শিয়ালটিকে ধরতেই যাচ্ছিল, এমন সময় শিয়ালটি তার সামনে একটি গর্ত দেখতে পেল। শিয়াল দৌড়ে গিয়ে সেই গর্তে ঢুকে পড়ল। গর্তটি ছোট ছিল। তাই সিংহ গর্তে ঢুকতে না পেরে বাইরে থেকে তর্জন গর্জন করতে লাগল।

      সিংহ গর্তে ঢুকতে পারবে না, এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে শিয়াল আরামে বসে হাত-পা চাটতে চাটতে ভাবতে লাগলো, ‘বা বা, আমি আজ ভালো বেঁচে গেলাম!’ সিংহ মামা ধরতে পারলে আজ আমার জীবন নিয়ে টানাটানি লেগে যেতো। কিন্তু আমার শরীরের কোন অঙ্গের জোরে আমি আজ এই বিপদ থেকে রক্ষা পেলাম? সে ভাবলো, আজ সে তার চারটে ঠেঙের জোরে সিংহের হাত থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছে। না, না, শুধু ঠেঙ নয়, কান দুটিও তাকে কম সহায় করে নি। কান দুটির জন্যই সিংহ মামা আসার কথা আগে থেকে টের পেয়ে সে পালাতে সক্ষম হয়েছে। তার চোখ দুটিও তাকে এই ক্ষেত্রে কম সহায় করেনি। চোখ দিয়ে গর্তটি দেখার জন্যইতো সে আজ গর্তে ঢুকে সিংহের হাত থেকে প্রাণ বাঁচতে সক্ষম হয়েছে। গর্তে না ঢুকলে সে কতক্ষণ দৌড়াতো! এতক্ষণ সিংহ মামা তাকে মেরে তার মাংস মজা করে খাওয়া শুরু করে দিতো। চোখ, কান ও ঠেঙের জোরেই আজ সে সিংহের হাত থেকে বাঁচতে সক্ষম হয়েছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ নিয়ে এভাবে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ শিয়ালের নজর গেলো তার লেজের দিকে। লেজ! লেজটি তাকে এই ক্ষেত্রে কি সহায় করেছে? সে অনেক সময় ভ্রু কুঁচকে ভেবে দেখলো, তবে লেজ তাকে বিপদের সময় কীভাবে সাহায্য করেছিল তা সে ভেবে পেল না। বরং উল্টো চিত্রই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। বিপদের সময় লেজ তাকে কোন সাহায্যই করেনি, বরং সে দৌড়ে পালানোর সময় অসুবিধা করছিলো। লেজের জন্য সে দ্রুত দৌড়াতে পারনি। এই রকম লেজ থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।

      তাহলে সিংহ মামাকে লেজটা দিয়ে দিলে কেমন হয়? লেজটা পেলে সিংহ মামাও খুশি হবে এবং সে নিজেও অপ্রয়োজনীয় লেজের বোঝা বহন করতে হবে না!

      ভাবা মতেই কাজ! শেয়াল তার লেজটিকে গর্ত থেকে বের করে সিংহের দিকে এগিয়ে দিলো। ক্রুদ্ধ সিংহ লেজ ধরে শেয়ালটিকে গর্ত থেকে টেনে বের করে মেরে ফেলল।

            ‘কাঁঠালে ফেললো মুছে

            শিয়াল মরলো লেজকে দোষে।।*

রাজা এবং লাফ মারা নাপিত

      এক সময় শম্ভুচরণ নামে একজন নাপিত ছিলো। সে ছিলো রাজকীয় নাপিত।সে রাজার চুল-দাড়ি কাটত। কিন্তু তার একটি খুব খারাপ অভ্যাস ছিল। রাজার চুল-দাড়ি কাটার জন্য ক্ষৌর কার্য শুরু করলে, কিছুক্ষণ পরেই সে ক্ষৌর কাৰ্য বন্ধ করে দুই-তিনটি লাফ মেরে এসে আবার ক্ষৌর কার্য শুরু করত। নাপিতের আচরণে রাজা খুবই অস্বস্তি অনুভব করতেন। চুল-দাড়ি কাটার সময় ক্ষৌর কাৰ্য বন্ধ করে লাফ মারতে গেলে কার না অস্বস্তি লাগবে!এতো আবার রাজার কথা! ছোটমোট লোক হলে অবশ্যে অন্য কথা ছিলো।

      একদিন রাজা শম্ভুচরণের কর্মে বিরক্ত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “শম্ভুচরণ, তোমার এরূপ আচরণের কারণ কী? আমি তোমার এরূপ আচরণের ফলে খুবই অস্বস্তি বোধ করি।

      শম্ভুচরণ হাতজোড় করে বললো- মহারাজ, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি নিজেই জানি না কীভাবে লাফ মারতে যাই।দুই তিন লাফ মারার পরে, তবে আমার হুঁস ফিরে আসে।

      রাজা ভাবলেন, হয়তো ভয় ডর দেখালে নাপিতের বদ অভ্যাস দূর হবে। তাই রাজা বললেন, তুমি যদি ক্ষৌর কার্য করার সময় এভাবে আবার লাফাতে যাও, তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে। আজ থেকে সাবধান হয়ে যাও।

      সেদিন থেকে নাপিত সজাগ হয়ে হলো।কোনও পরিস্থিতিতে সে আর লাফ মারতে যাবে না বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞাও করলো। সেদিন থেকে সে লাফ না মারার জন্য সাধ্যমত চেষ্টাও  করতে লাগল।

      কিন্তু সাধ্য মতো চেষ্টা করেও সে তার বদ অভ্যাস ছাড়তে পারল না। রাজার চুল-দাড়ি কাটতে গেলেই সে লাফ মারতে যাবে এবং রাজাও তাকে দুই কথা শুনাবে!

      তাই রাজা একবার শম্ভুকে তাড়ানোর কথা ভাবলেন; কিন্তু তাকে তাড়ানোও সম্ভব নয়। কারণ সে কাজে ভালো। এদিকে বিশ্বাসীও। রাজা মানুষ সবাইকে বিশ্বাস করতেও পারেন না। শম্ভূচরণকে তাড়িয়ে নতুন কাউকে আনলে সে দাড়ি কাটতে গিয়ে যদি গলায় গেচ করে ক্ষুর বসিয়ে দেয়! তাহলে তার জীবন শেষ হয়ে যাবে! তাই ভয় ডর দেখিয়ে নাপিতের বদ অভ্যাস দূর করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন।

      কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও যখন নাপিতের বদ অভ্যাস দূর হলো না, তখন রাজা মরিয়া হয়ে একদিন একজন জ্যোতিষীকে ডেকে এনে শম্ভূচরণের লাফ মারার কারণ খুঁজে বের করতে বললেন।

      জ্যোতিষী এক গাদা বই নিয়ে এলেন।জ্যোতিষী বই দেখে নাপিতের লাফ মারার রহস্য খুঁজতে লাগলেন।

      এক সময় জ্যোতিষী বলে উঠলেন- পেয়েছি, মহারাজ, নাপিতের লাফ মারার রহস্য খুঁজে পেয়েছি। আপনি খুব ভাগ্যবান, মহারাজ! যেখানে বসে আপনি ক্ষৌর কাৰ্য করান, সেখানে মাটির তিন হাত নিচে সোনার খনি আছে।

      মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! রাজা ও সম্রাটদের সোনা-রূপার প্রতি লোভ একটু বেশী। সোনার খনির কথা শুনে রাজার চোখ আনন্দে নেচে উঠল। তিনি মন্ত্রীদের ডেকে এনে বললেন- যান, এক্ষুণি লোক ডেকে এনে মাটি খননের ব্যবস্থা করুন।

      রাজার হুকুম! দশ-বিশজন লোক এসে মাটি খুঁড়তে লাগল। কয়েক হাত খনন করার পর, জ্যোতিষীর হিসাব অনুসারে সোনার খনি বেরিয়ে পড়ল। লোকেরা সোনা নিয়ে ভাণ্ডারে জমা করলো।

      সোনার খনি পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে রাজা জ্যোতিষীকে জিজ্ঞেস করলেন, “সোনার খনি পেয়েছি ভালো কথা। কিন্তু নাপিতের লাফ মারার রহস্য কিন্তু রহস্যই রয়ে গেল?

      জ্যোতিষী বললেন- মহারাজ, সোনার খনির পেছনেই লুকিয়ে আছে নাপিতের লাফ মারার রহস্য।

      জ্যোতিষীর কথা উপলব্ধি করতে না পেরে রাজা জিজ্ঞেস করলেন- সোনার খনির সাথে নাপিতের লাফ মারার রহস্য কি?

      জ্যোতিষী কথাটা বুঝিয়ে বললেন- নাপিত যখন সোনার খনির উপরে দাঁড়িয়ে ক্ষৌর কাৰ্য শুরু করে, তখন সোনার গ্যাস তার মলদ্বার দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে সেই গ্যাস তার মাথায় গিয়ে পৌঁছায়। মাথায় পৌঁছানোর সাথে সাথে সে সোনার গ্যাসের ক্রিয়া সহ্য করতে না পেরে লাফ মারতে যায়।

      আমিও তো সেখানে বসি, আমি কেন লাফ মারতে যাই না? রাজা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

      জ্যোতিষী হেসে বললেন- মহারাজ, আপনি রাজা মানুষ! সোনা-রূপার বাটি মুখে নিয়েই আপনি জন্মেছেন। তাই সোনার গ্যাসে আপনার উপর ক্রিয়া করতে পারে না। অন্যদিকে নাপিত দরিদ্র। সোনা-রূপার মুখই সে দেখেনি। তাই সে গ্যাসের ক্রিয়া সহ্য করতে পারে না।

      জ্যোতিষীর জবাবে খুশি হয়ে রাজা জ্যোতিষীকে নানাবিধ উপহার দিয়ে বিদায় দিলেন।

            “টক্ দেখলেই সবার মুখ ভরে জলে

           নাপিত লাফাতে যায় সোনার গ্যাসের ক্রিয়ার ফলে।।*

এক শোল মাছের গল্প

ছাইয়ে লুটোপুটি

দুই কান(পাখা) কাটা

সেখান থেকে ধরে নিলো

ভুবন চিলের ব্যাটা

ভূমিতে পইড়া বুরাইলাম

সাউদের সাত নাও

যে না জানে টিপের বাও

তার কাছে গিয়ে টিপ টিপাও।।

একদিন এক জেলে বরশী দিয়ে একটি শোল মাছ ধরল। মাছটি বড় ছিল। ফলে জেলে মাছটা বিক্রি না করে খাওযার জন্য বাড়িতে নিয়ে এলো। সে তার স্ত্রীর হাতে মাছটা দিয়ে বললো- মাছটা কেটেবেচে রান্না কর। আমি আবার মাছ ধরতে যাচ্ছি। মাছ ধরে বাড়ীতে এসে মাছের তরকারী দিয়ে ভাত খাব।

জেলে আবার মাছ ধরতে বেরিয়ে গেলো এবং তার স্ত্রী বড় মাছ দেখে খুশি হয়ে ছাই মেখে প্রথমে মাছের কান দু’টি কেটে ফেললো। এমন সময় কোথা এক চিল উড়ে এসে খাবা মেরে মাছটা ধরে নিয়ে উড়ে পালিয়ে গেলো। একটু দূরেই নদীর ধারে একটা বড় বট গাছ ছিল। সেই গাছটিতে চিলের বাসা ছিল। বাসাটিতে চিলের তিনটি ছানা ছিল। ছানাগুলোকে মাছটা খেতে দিয়ে চিলটা আবার অন্য শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে গেলো।

    চিলের ছানাগুলো মাছটা খাওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি করতে লাগালো। শোল, কই, মাগুর প্রভৃতি মাছBottom of Form

 জল ছাড়াও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। আমাদের গল্পের মাছটির শুধুমাত্র কান কাটা হয়েছিলো। তাই মাছটা জীবন্ত ছিল। ফলে ছানাগুলোর কাড়াকাড়ির সুযোগে মাছটি বাসা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে গেলো। বাসার ঠিক নিচেই নদী ছিল এবং সেখানে সাউদের সাতটি নৌকা বাঁধা ছিল। মাছটি জলে না পড়, দুর্ভাগ্যবশতঃ সাউদের নৌকায় পড়েছিলো। মাছটা দেখে মাঝিমাল্লারা খুশি হয়ে সেটা ধরার জন্য ছুটাছুটি করতে লাগালো। ছুটাছুটির ফলে নৌকাটা ডুবে গেলো এবং মাছটা লাফিয়ে জলে না পড়ে দৈবক্রমে অন্য এক নৌকায় গিয়ে পড়লো। মাঝিমাল্লারাও তখন লাফিয়ে সেই নৌকায় গিয়ে চড়লো। অত্যধিক ছুটাছুটির ফলে সেই নৌকাটাও ডুবে গেলো। তখন মাছটা লাফিয়ে অন্য এক নৌকায় গিয়ে পড়লো। মাঝিমাল্লারা লাফিয়ে সেই নৌকায় চড়ার ফলে সেই নৌকাটাও ডুবে গেলো। এভাবে একটা নৌকা ডুবে এবং ডুবার আগে আগে মাছটা লাফিয়ে অন্য নৌকায় গিয়ে পড়ে। মাঝিমাল্লারা তখন লাফিয়ে সেই নৌকায় গিয়ে চড়ে। মাঝিমাল্লাদের ছুটাছুটির ফলে সেই নৌকাটাও ডুবে। এভাবে সাতটা নৌকা ডুবার পরে মাছটা অবশেষে নদীর জলে গিয়ে পড়লো। অর্থাৎ মাছটা বেঁচে গেলো।

      তিনচার দিন পর মাছটা জলের উপরে ভেসে উঠলো।তখন অন্য এক জেলে মাছটি দেখে তার সামনে বরসী টোয়াতে লাগলো।মাছটি তখন উপরের ছড়াটা বলে জলে ডুব মারলো। *.

জজ এবং কাঁঠাল

      ব্রিটিশ আমলের কথা। একবার এক ব্যক্তি ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে পড়েছিল। সাক্ষী, আরগুমেণ্ট ইত্যাদির পর তার শাস্তি হওযাটা প্রায় নিশ্চিত হয়েছিল। আইনজীবী,মহুরি এবং জ্ঞানী ব্যক্তিরা সবাই একমত ছিলো, যে শাস্তি হওয়াটা একপ্রকার নিশ্চিত। কেউ কেউ অভিমত ব্যক্ত করলেন যে, জজ সাহেব সদয় হলে, ইচ্ছা করলে তবে তাকে মুক্তি দিলে দিতেও পারেন।

      ইংরেজ বিচারক।তাঁরা আইন অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তার মধ্যে ভারতীয় হলে তো কথাই নাই। দর্কার হলে পাঁচ বছরের জায়গায় দশ বছর জেল দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। তাই বিচারকের কাছ থেকে অনুগ্রহ আশা করাটা প্রায় অসম্ভব।সেজন্য লোকটি আসন্ন শাস্তির কথা ভেবে উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠলো।

      একদিন লোকটি তাদের গ্রামের এক জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে গেল এবং আসন্ন বিপদ থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তার জন্য পরামর্শ চাইলো। জ্ঞানী লোকটি মনযোগ সহকারে ভূক্তভোগী লোকটির কথা শুনলেন এবং চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভেবে বললেন- “তোমার কথা মতো মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায়ই আমি দেখতেছি না। তবে, তুমি যদি জজের হাত-পা ধরে অনুনয়-বিনয় করতে পার, তাহলে তিনি দয়া পরবশ হয়ে তোমাকে মুক্তি দিলে দিতেও পারেন! বৃটিশরা যতটা কঠিন ততটাই ভদ্র ও নরম হৃদয়ের। তবে জজের নিকট যেতে হলে একাই যেতে হবে- কাউকে সংগে নেওয়া যাবেনা। তবে মনে রাখবে, খালি হাতে জজের কাছে যাবে না। একটা কথা আছে-শিশু, নারী ও রাজকর্মচারী এই তিনজনের কাছে খালি হাতে যাওয়া শাস্ত্ৰে নিষেধ রয়েছে। টাকাপয়সা নেওয়ার দরকার নেই। রাজার জাত! তাঁদের টাকার অভাব নেই। তাই বাড়ির কিছু একটা ভালো খাবার জিনিস নিয়ে যাবে। পারলে বাড়ির উৎ্পন্ন মাছ, ডিম, সবরি কলা বা খাঁটি ঘি নিয়ে যাবে। জজ সাহেব বাড়ির জিনিস বলে জানলে খুশি হবেন।

      জ্ঞানী লোকটির কথা মতো, লোকটি বাড়িতে এসে তার স্ত্রীকে বিষয়টি ভেঙে বললো এবং বাড়ীতে কলা বা ডিম থাকলে সেগুলি একটি পুঁটলিতে বেঁধে দিতে বললো।

      ব্যক্তিটির স্ত্রী বললো- বাড়িতে কোনো কলা বা ডিম নেই। তবে একটি পাকা কাঁঠাল আছে। পারলে কাঁঠালটা নিয়ে যান। ভালো জাতের কাঁঠাল। খেতেও খুব সুস্বাদু। জজ সাহেব খেয়ে খুব মজা পাবেন।

      স্ত্রী কাঁঠালটা এনে দিলো।লোকটি কাঁঠাল মাথায় নিয়ে জজ সাহেবের কোয়ার্টারে এসে পৌঁছোলেন। জজ মানুষের কথা! সেখানে সেপাই সন্তুরীরা বন্দুক নিয়ে গেটের সামনে পাহারা দিচ্ছিল।তাই সে গেটের ভেতরে প্রবেশ করার সাহস পেলো না। এদিকে, জজ সাহেবের সাথে দেখা না করলেও নয়। তাই সে কাঁঠালটা মাথায় নিয়ে জজ সাহেবের কোয়ার্টারের সামনের রাস্তা দিয়ে এদিক সেদিক হাঁটতে লাগল এবং ভাবতে লাগলো, কীভাবে জজ সাহেবের সাথে দেখা করা যায়।

      পাকা কাঁঠাল। খুবই সুগন্ধি। কাঁঠালের সুবাসে পুরো জায়গাটা ভরে গেল। পথচারীদের নাকেও গন্ধ গেলো এবং তারা বাতাসে কাঁঠালের গন্ধ শুঁকে শুঁকে যেতে লাগল। এক পর্যায়ে জজ সাহেবের নাকেও গন্ধ গিয়ে পৌঁছোল।

      জজ সাহেব ভারতে নবাগত ছিলেন। তাই তিনি কাঁঠাল সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ছিলেন। কারণ জজ সাহেব ছিলেন একজন আমেরিকান।আমেরিকায় কাঁঠাল নেই। তাই তিনি কখনো কাঁঠাল দেখেন নি। ফলে কাঁঠালের গন্ধের জ্ঞানও তাঁর ছিল না।

      বাতাসে অদ্ভুত ঘ্রাণ পেয়ে জজ সাহেব কোয়ার্টারের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। বাইরে এসে দেখলেন, একটি লোক মাথায় কিছু একটা নিয়ে কোয়ার্টারের সামনের রাস্তায় ঘুরাঘূরি করছে। তিনি বুঝতে পারলেন, লোকটির মাথার জিনিসটা থেকেই গন্ধটা বের হচ্ছে। এত মিস্টি সুগন্ধ! তাই জিনিসটা সম্পর্কে জানার জন্য তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।

      জজ সাহেব হাত ইশারায় লোকটিকে ডাকলেন, “হ্যালো, তুমি কে আছে? ইধার আও।

      লোকটি দূরের গঙ্গা কাছে পেয়ে দ্রুত গেটের ভেতর প্রবেশ করল।

      লোকটি কাছে আসার পর জজ সাহেব মাথার কাঁঠালের দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলেন-” তোমার মাথায় এটা কি চীজ আছে?”

      লোকটি বলল, ‘কাঁঠাল, হুজুর।

      -কাঁঠাল আবার কী চীজ আছে?

      -কাঁঠাল গাছের ফল।খেতে খুব সুস্বাদু।

      – তুমি এটা কি বিক্রী করিবে?

      – না, না, হুজুর, এটা বিক্রীর জন্য আনিনি। আমি এটা আপনার জন্যই নিয়ে এসেছি।

      – তুমি আমার জন্য এনেছ? কেন এনেছ আমার জন্য?

      লোকটি মনের কথা বলার সুযোগ পেয়ে তার সমস্যার কথা ভেঙে বললো।

      জজ সাহেব লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার মামলা কি আমার এজলাসে আছে?’

      -জ্বী হুজুর, আপনার এজলাসেই আছে। বলেই লোকটি কাঁঠালটা জজ সাহেবের পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে নতজানু হয়ে বলল, “দয়া করেন, হুজুর, আমি জেলে গেলে আমার ছেলেমেয়েরা না খেয়ে মারা যাবে।

      লোকটির কাতর অনুরোধে জজ সাহেবের মন টলে গেলো। তিনি বললেন- ‘ঠিক আছে, তুমি কাঁঠালটা রেখে যাও। আমি তোমাকে খালাস করে দিব।

      লোকটি জজ সাহেবকে সালাম করে চলে গেল। লোকটি চলে যাবার পর জজ সাহেব সেপাইকে কাঁঠালটা কোয়ার্টারে নিয়ে আসতে নির্দেশ দিলেন। কাঁঠালটা কোয়ার্টারের ভেতর আনার পর কাঁঠালটা দু’ফালি করে মুখ গুঁজে জজ সাহেব কোয়াগুলো টপাটপ গিলতে লাগলেন। বলা বাহুল্য, কাঁঠালের বিষয়ে অজ্ঞতার জন্য তিনি কাঁঠালের কয়েকটা কোয়া বীজ সমেতই গিলে ফেললেন।

      যাইহোক, অবশেষে, তিনি বীজগুলি ফেলে কোয়াগুলি খেতে লাগলেন। কিন্তু কাঁঠাল খাওয়ার পর তিনি মহা সমস্যায় পড়লেন।

      জজ সাহেবের দাড়ি-গোঁফ ছিল। তিনি কাঁঠাল খাওয়ায় অনভিজ্ঞ হওয়াতে কাঁঠালের আঠা তার দাড়ি-গোঁফের সাথে আটকে গেলো। সরষের তেল লাগালে যে কাঁঠালের আঠা দূর হয় জজ সাহেব এ বিষয়ে জ্ঞাত ছিলেন না। তাই তিনি আঠা দূর করার জন্য সাবান ঘষতে লাগলেন। কিন্তু তিনি যত বেশি সাবান ঘষতে লাগলেন, আঠা তত বেশি তাঁর দাড়ি এবং গোঁফের মধ্যে আটকে গিয়ে জট পাকিয়ে ধরতে লাগলো। অনেক চেষ্টা করেও আঠা ছাড়াতে না পেরে অবশেষে তিনি হতাশ হয়ে পড়লেন।

      এদিকে, আদালতে যাওয়ার সময় হয়ে গেলো! সেদিন আদালতে একাধিক মামলার শুনানিও ছিলো। তাই আদালতে না গেলেও নয়। এদিকে জট পাকানো দাড়ি-গোঁফ নিয়ে আদালতে যাওয়াও সম্ভব নয়! তাই তিনি মরিয়া হয়ে ব্লেড দিয়ে দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে, জামাকাপড় পরে আদালতে এলেন।

      সেদিন জজ সাহেব নতুন দাড়ি-গোঁফ কামানো কোন লোক দেখলেই ডেকে ডেকে বলতে লাগলেন-হ্যাঁ, হাম, বুঝিয়াছে, তুম কাঁঠাল খাইয়াছে।

                      ‘কাঁঠাল-এ লাগালো লেঠা

জজ সাহেবের গেলো দাড়ি-গোঁফ কাটা।`*

  দুই বন্ধুর কনে দর্শন

একদিন এক যুবক তার এক বন্ধুকে নিয়ে কনে দেখতে বেরোল। রাস্তায় আসার সময় যুবকটি তার বন্ধুকে বলল-গৃহের মালিক যদি কিছু জিজ্ঞেস করেন, তাহলে আমি যা বলবো, তুমি আমার চেয়ে একটু বাড়িয়ে বলবে। ধর, আমি যদি এক বলি, তাহলে তুমি দুই বলবে। আমি যদি দুই বলি,তুমি চার বলবে।

বন্ধুটি যুবকের সাথে একমত হয়ে বলল- তুমি বলার চেয়ে আমি একটু বাড়িয়ে বলবো, এটা আমার কাছে খুব বড় একটা ব্যাপার নয়। তুমি এই বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।

তারা কনের বাড়িতে এলো। কনের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করার পর কনে পক্ষ তাদের কনে দেখাল। কনে দেখে তাদের পছন্দও হলো। কনে পক্ষেরও পাত্র পছন্দ হলো।

তখন কনের দাদু এসে ভাবী নাতিন জামাইয়ের ভালোমন্দ খোঁজ খবর নিতে লাগলো।

কিছুক্ষণ সুখ-দুঃখের কথাবার্তার পর কনের দাদু জিজ্ঞেস করলেন-নাতিন জামাইয়ের ব্যাংক ব্যালেঞ্চ কী রকম আছে?

যুবক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো- না, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স আর কত হবে? এই ধরুন, পাঁচ ছয়টা ব্যাংকে পাসবুক খুলেছি মাত্র।

যুবকটির বন্ধু পূর্বের সিদ্ধান্ত মতে বললো- আপনার নাতিন জামাই একটু লাজুক প্রকৃতির তো তাই কম করে বলেছে। আসলে, আসামের প্রায় প্রতিটি ব্যাঙ্কেই দুই বা তিনটি করে পাসবুক রয়েছে।

দাদু সন্তুষ্ট হয়ে বললেন- “আচ্ছা আচ্ছা, তা ভালো। শুনে খুবই খুশি হলাম। এখনই তো সঞ্চয়ের সময়। সময় মতো সঞ্চয় না করলে বৃদ্ধ বয়সে চলবে কীভাবে? যৌবনের সঞ্চয় হলো বার্ধক্যের লাঠির মতো। এভাবে উপদেশ দিয়ে দাদু প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করলেন- সবারই হবি(শখ) থাকে।একেক জনের একেক রকম হবি। তা নাতনি জামাইয়ের কী কী শখ রয়েছে?

যুবক বললো- তেমন অবশ্যে হবি নাই।তবে মাংস খাওয়ার প্রতি লোভটা একটু বেশি।

দাদু উপদেশের সুরে বলল – বেশি মাংস খাওয়া ভলো নয়। মাংস খেলে রোগব্যাধির প্রকোপ বাঢ়ে।

বন্ধু বললো- মাংসের প্রতি লোভ থাকলেও তেমন খায় না। এই ধরুন, যেদিন মদটদ খায় সেদিন একটু বেশি খায় আর কি।

দাদু জাঁপ মেরে উঠে বললেন- কী, এখনই মদ খাওয়া শুরু করেছে নাকি?

বন্ধু বললো- না না, মদও সব সময় খায় না। এই ধরুন, যেদিন পকেট মেরে টাকা একটু বেশি পায়, সেদিন একটু বেশি পান করে আর কি!

দাদু দরজার দিকে ইশারা করে বললেন- এক্ষুনি এই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও। তোমার মত বরের সাথে বিয়ে হওযার চেয়ে নাতনি বাড়িতে আইবুড়ো হয়ে থাকাও বেশি ভালো হবে।

দুই বন্ধু আর কী করবে? লাজে অপমানে জর্জরিত হয়ে অস্ মুখ ঠস্ করে দাদু দেখানো দরজা দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো।

             মিথ্যে কথার ঠেং খাটো

            ধরা পড়লে আরও হয়ে যায় ছোট।।*

ব্রাহ্মণ এবং ইলিশ মাছ

      একদিন একজন ব্রাহ্মণ সস্তায় পেয়ে বাজার থেকে একটা ইলিশ মাছ কিনে এনেছিলেন। মাছটা ব্রাহ্মণীর হাতে দিয়ে ব্রাহ্মণ বললেন- নাও, মাছটা ধরো। কুটে বেচে ভালো করে রান্না করো। ভাত খেয়ে আমাকে একজন যজমানের বাড়িতে যেতে হবে। আমি নদীতে স্নান করতে যাচ্ছি। স্নান করে এসে ভাত খাব।

      মাছ পেয়ে ব্রাহ্মণী খুব খুশি হলেন। তিনি মাছটি কুটে বেচে রান্নাঘরে এসে সাবধানে রান্না করলেন এবং রান্নার  পাত্রটি নামিয়ে রেখে ব্রাহ্মণী অন্য কাজে চলে গেলেন।

      ব্রাহ্মণী কাজ সেরে এসে দেখে রান্না করা মাছগুলি একটা কুকুরে খাচ্ছে। ঘটনাটি দেখে ব্রাহ্মণী অবাক হয়ে গেলেন। খেয়েই যখন ফেলেছে তখন আর কি করার আছে! একটা লাঠি নিয়ে এসে তিনি কুকুরটিকে কয়েকটা মার মেরে তাড়িয়ে দিলেন এবং কুকুরে খাওয়া তরকারি খাওয়াটা ঠিক হবে না ভেবে তিনি তরকারিগুলি এক জায়গায় রেখে দিলেন।

      ব্রাহ্মণ স্নান সেরে এলে কি দিয়ে ভাত খেতে দিবেন এই ভেবে তিনি আলুর ভর্তা বানিয়ে রাখলেন এবং ব্রাহ্মণ স্নান সেরে আসার পর আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দিলেন।

      ইলিশ মাছের তরকারির আশায় ব্রাহ্মণ দুই গ্রাসে আলু ভর্তা শেষ করে তরকারী খুঁজলেন। ব্রাহ্মণী আবার আলু ভর্তা এনে দিলেন। আলু ভর্তা দেখে বিরক্ত হয়ে ব্রাহ্মণ বললেন-‘ইলিশ মাছের তরকারি কোথায়?’ তুমি আমাকে বার বার আলু ভর্তা দিচ্ছ কেন? তুমি ইলিশ মাছের তরকারির কথা ভুলে গেছ নাকি?

      ব্রাহ্মণী ইলিশ মাছের তরকারীর কথাটা বুঝিয়ে বললেন- আমি তরকারী রেঁধে নামিয়ে রেখে একটা কাজে গিয়েছিলাম। কাজ সেরে এসে দেখি তরকারি কুকুরে খাচ্ছে। তাই তরকারি এক জায়গায় রেখে দিয়েছি। এখন আলু ভর্তা দিয়েই ভাত খেতে হবে।

      এমন সময় স্থানীয় পোস্ট অফিসের পিয়ন চিঠি দিতে ব্রাহ্মণের বাড়ি এলো। পিয়নের ডাক শুনে ব্রাহ্মণের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলালো। তিনি ব্রাহ্মণীকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আমরা তো সব সময় লোকের জিনিস খাই। আমরা কখনও মানুষকে খাওয়াতে পারি না। তাই আজ এক কাজ কর, পিয়নকে কুকুরে খাওয়া তরকারী দিয়ে ভাত খেতে দাও। কুকুরের খাওয়া তরকারিরও সদগতি হোক এবং অতিথি নারায়ণের সেবা করে পুণ্যও সঞ্চয় হোক।

      ব্রাহ্মণের পরামর্শ মতো, ব্রাহ্মণী পিয়নকে ডেকে এনে বসিয়ে কুকুরে খাওয়া তরকারি দিয়ে ভাত খেত দিলেন। ব্রাহ্মণের ছোট মেয়ে পিয়নের খাবার পরিবেশন করছিলো।

      কুকুরটি সামান্য তরকারি খেয়েছিল, বেশিরভাগ তরকারি পাত্রেই রয়ে গিয়েছিলো। তাই মেয়েটি পিয়নকে বেশি বেশি করে তরকারি পরিবেশন করছিলো। বেশি বেশি তরকারি পরিবেশন করতে দেখে পিয়ন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো- আমাকে এত তরকারি দিচ্ছ, তোমরা কি খাবে?’

      অবুঝ মেয়ে! চালাকি বোঝে না। তাই সে কোন লুকঢাক না করেই বলে ফেললো- আমাদের বাড়ির কেউ কুকুরে খাওয়া তরকারি খাবে না।

      কুকুরে খাওয়া তরকারির কথা শুনে পিয়ন হতবাক হয়ে গেলেন। খাওয়া বন্ধ করে সে বললো-কি বললে? কুকুরে খাওয়া তরকারি? আমাকে কুকুরে খাওয়া তরকারি দিয়ে ভাত খেতে দিয়েছ নাকি?

      হ্যাঁ, মেয়েটি বলল- তরকারি কুকুরে খেয়েছে বলেইতো আমাদের বাবা পূণ্য সঞ্চয়ের জন্য তোমাকে খেতে দিতে বলেছে!’

      কথাটা শুনার সাথে সাথে পিয়ন মাটির পাত্রটি ছুঁড়ে ফেলে দিল। পাত্রটি একটি কাঠের খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো।

      মাটির পাত্র ভাঙ্গতে দেখে মেয়েটি তার বাবা ব্রাহ্মণকে ডেকে বলল- বাবা, বাবা, দেখ, পিয়ন ঠাকুমার মুতের পাত্রটা ভেঙ্গে ফেলেছে।

      পিয়ন বিস্ময় প্রকাশ করে বললো- কি বললে? যে পাত্রে আমাকে খেতে দিয়েছিলে সেটা মুতের পাত্র ছিল নাকি?

      মেয়েটি বলল, হ্যাঁ, ঠাকুমা রাতে চোখে দেখেন না। তাই তিনি রাতে বাইরে বেরোতে পারেন না। সেজন্য ঠাকুমা রাতে এই মাটির পাত্রটিতে প্রস্রাব করেন।

      পিয়ন ক্রোধে জ্বলে উঠলো এবং মুখে যা আসে তাই বলে অভিশাপ দিতে দিতে চলে গেলো।

          ‘ব্রাহ্মণ করলেন পূণ্য সঞ্চয়                              

          পিয়নের গেলো জাত ধর্ম।*

ষোল কলা

অনেক দিন আগে একটি গ্রামে এক চাষী দম্পতি বাস করতো। তারা সাধারণ কথা নিয়ে সবসময় একে অপরের সাথে ঝগড়া করত। কখনও কখনও একটি সাধারণ বিষয় নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয়ে যেত। কখনও আবার দম্পতিদ্বয় সাধারণ বিষয় নিয়ে তিন চার দিনের জন্য কথা বলা বন্ধ করে দিত।

একদিন কৃষক ক্ষেত থেকে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে এসে তার স্ত্রীর কাছে জল চাইল। কোন কাজে ব্যস্ত থাকার দরুন জল দিতে একটু দেরি হওয়াতে কৃষক প্রচণ্ড রেগে গিয়ে স্ত্রীকে মারধর শুরু করে দিলো।

স্ত্ৰী বললো- কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তাই জল দিতে একটু দেরি হয়েছে, তার জন্য এত মারধর করছ কেন?

কৃষক তখন বললো- তুমি ভেবেছ, আজকের ভুলের জন্য মারছি। আসলে তা না, আমি তোমাকে পুরানো রাগে মারতেছি।

এটা আবার কি কথা হ্যাঁ? পুরানো রাগে মারতেছ! স্ত্রী সিনা টান করে দাঁড়িয়ে বললো-“ তুমি কি জানো না যে নারীরা ষোল কলা জানে!তুমি পুরানো রাগ দেখাচ্ছো এবং আমি যদি তোমাকে ষোল কলার একটি কলাও দেখাই তাহলে তোমার জীবন নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে!

চাষী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে স্ত্রীর গালে জোরে একটা চড় কষিয়ে বললো- দেখাও দেখি তোমার ষোল কলা। আমাকে ষোল কলা দেখাতে পারলে সেদিন থেকে তোমাকে আমি লক্ষ্মী বউ বলে মানব।

সেদিনের ঝগড়া সেখানেই শেষ হলো। তবে সেদিন থেকে কৃষকের স্ত্রী কৃষককে ষোল কলা দেখানোর জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগলো। একদিন সুযোগ এলো। সেদিন এক ফেরিওয়ালা বিকেল বেলা ইলিশ মাছ বিক্রি করতে এসেছিলো। স্ত্রী ইলিশ মাছ দিয়ে কৃষককে ষোল কলা দেখানোর কথা ভাবলো।

ভাবা মতেই কাজ। সে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে একটি ইলিশ মাছ কিনে রাতের আঁধারে গোপনে বাড়ির পেছনের চাষ করে থাকা জমিতে পুঁতে রেখে এলো। পরের দিন সকালে কৃষক ইলিশ মাছ পুঁতে রাখা জমিতে হাল বাইতে গেলে লাঙ্গলের ফালে সেই পুঁতে রাখা মাছটি উঠে এলো। কৃষক মাছ পেয়ে খুশি হয়ে আনন্দ মনে মাছটি বাড়িতে নিয়ে এলো। সে মাছটি তার স্ত্রীর হাতে দিয়ে বললো- কি আচরিত!লাঙ্গলের ফালে মাছটি উঠে এসেছে।এমনিতেও অভাবের জন্য মাছ কিনতে পারিনা।ভালোই হয়েছে।ইলিশ মাছ দিয়ে আজ মজা করে ভাত খেতে পারব।

স্ত্রী মাছটা কেটে রান্না করে পূর্বের পরিকল্পনা অনুসারে সে তরকারীর পাত্রটি এক বিশেষ জায়গায় লুকিয়ে রাখল।

কৃষক হাল থেকে এসে স্নান সেরে ভাত খেতে বসল। তার স্ত্রী তাকে আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দিল। ইলিশ মাছের তরকারীর আশায় কৃষক দুই গ্রাসে ভর্তা শেষ করে স্ত্রীকে ডাকলো- কইগো,ইলিশ মাছের তরকারি নিয়ে এসো।

তার স্ত্রী তাকে আবার আলু ভর্তা এনে দিল। আলু ভর্তা দেখে কৃষক অধৈর্য হয়ে বললো- আবার আলু ভর্তা এনেছ!মাছ কোথায়? মাছের তরকারি নিয়ে এসো।

স্ত্রী আকাশ থেকে পড়ার মত করে বললো- মাছ? কিসের মাছ? কোথায় পাব মাছ? একমাস হলো মাছের মুখই দেখিনি।মাছের তরকারি তো দূরের কথা!

কৃষক তার স্ত্রীর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো- আজ সকালে হাল ক্ষেত থেকে যে মাছটা পেয়ে এনে দিলাম সেই মাছটা কোথায়?

স্ত্রী কিছু না বোঝার ভান করে বললো- হাল ক্ষেত থেকে মাছ পেয়ে এনে দিলে! কখন দিলে? ঠাট্টা করার আর জায়গা পাওনি!

কৃষক নরম গলায় বললো-আমি ঠাট্টা করছি? না, তুমি ইযার্কি করছ? ইযার্কি ছেড়ে মাছের তরকারি নিয়ে এস।

মাছের তরকারি থাকলে কি আমি শুধু শুধু তোমাকে আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দিতাম? তার স্ত্রী উদাসীনভাবে বলল।

স্ত্রীর কথা শুনে কৃষক দ্বিগুণ রেগে গেল। রাগের মাথায় সে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললো- “মাছ থাকলে তো দেব! সকালে ক্ষেত থেকে যে মাছটা এনে তোমাকে দিলাম, সেই মাছ কোথায়? যাও, মাছের তরকারি নিয়ে এসো।

কথা কাটাকাটি করতে করতে এক সময় কৃষক দম্পতির মাঝে প্রচণ্ড ঝগড়া শুরু হয়ে গেলো। শেষমেশ রাগের মাথায় কৃষক স্ত্রীকে মারধর শুরু করে দিলো।মারের চোটে স্ত্রী হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। কান্নার শব্দ পেয়ে প্রতিবেশী এসে উঠোন ভরে পড়ল।

প্রতিবেশীরা কান্নার কারণ জানতে চাইলে, স্ত্রী আনুপূৰ্বিক কান্নার কারণ ব্যাখ্যা করলো। কথাগুলো শুনে প্রতিবেশীরা অবাক বিস্ময়ে বললো-এই কলির জনক রাজা আবার কোথা থেকে এলো? কথিত আছে, সত্য যুগের জনক রাজা হাল বাইতে গিয়ে লাঙ্গলের ফালে সীতাকে পেয়েছিলেন! এই কলির জনক রাজা পেলেন ইলিশ মাছ! কথাটা প্রায় গাছে গরু উঠার মতো।এভাবে নানান জনে নানান মন্তব্য করতে লাগলো।

প্রতিবেশীদের মন্তব্যে কৃষক কিছুটা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়লো। সে তাদের ঘটনাটা বোঝানোর জন্য অপেক্ষাকৃত নরম সুরে বলল-আমি মিথ্যা বলিনি। সকালে হাল বাইতে গিয়েছিলাম, তখন সত্যিই একটি ইলিশ মাছ লাঙলের ফালে লেগে মাটির তল থেকে উঠে এসেছিলো। মাছটার ওজন এক কিলোর মতো হবে। আমি মাছটা পেয়ে বাড়িতে এনে রান্না করতে দিয়ে আবার হাল বাইতে গিয়েছিলাম। এখন ভাত খেতে এসে মাছের তরকারি খুঁজলে, স্ত্রী এক মাস যাবত মাছের মুখই দেখিনি বলে আমাকে প্রতারণা করছে। এমন মিথ্যা কথা শুনলে কার না রাগ উঠবে বলুন? আপনারা কথাটার বিচার করুন।

কৃষকের কথা শেষ হলে তার স্ত্রী দ্বিগুণ উৎসাহে কৃষকের কথার সাথে সুর মিলিয়ে বললো- হ্যাঁ, আপনারা বিচার করুন। ক্ষেতে লাঙল দিতে গিয়ে ফালে লেগে মাটির তল থেকে মাছ উঠে আসা কথাটা কতদূর সত্যি আপনারা তা বিচার করুন। এ সব সময় বিনা কারণে আমাকে এভাবে মারধর করে!

স্ত্রীর কথা শুনে কৃষক আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সে তার স্ত্রীকে মারার জন্য তাড়া করলো।

স্ত্রী ভয়ে ভিড়ের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালো।উপস্থিত লোকজন কৃষককে পাগল ভেবে দড়ি দিয়ে পিঠমোড়া করে বেঁধে উত্তমমাধ্যম কিলঘুষি দিয়ে একটি গাছের সাথে বেঁধে রেখে বাড়ি চলে গেলো।

লোকজন বাড়ি বাড়ি চলে যাওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পর স্ত্রী কৃষকের কাছে এসে হাতের দড়ি খুলে দিয়ে বললো-গৃহের ভেতর চল।

কৃষক লজ্জা, ক্ষোভ, অপমানে একেবারে ম্রিযমান হয়ে পড়েছিলো। স্ত্রীর ওপর তার প্রচণ্ড রাগও উঠেছিলো, কিন্তু রাগ করলে আবার বা কী হয়? তখন প্রতিবেশীরা তাকে দু’একটা কিলঘুষি মেরে বেঁধে রেখে চলে গেছে। এবার এলে হয়তো একেবারে গরু পিটনই দিবে। তাই সে বাধ্য ছাত্রের মতো তার স্ত্রীর পেছন পেছন গিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো।

স্ত্রী লুকানো জায়গা থেকে ইলিশ মাছের তরকারী বের করে এনে কৃষককে ভাত খেতে দিলো।

ইলিশ মাছের তরকারী দেখে কৃষক বললো- এখন ইলিশ মাছের তরকারি কোথায় পেলে? তরকারি থাকতে মিছেমিছি আমাকে লোকের সামনে অপমান অপদ্স্ত করলে কেন?

স্ত্রী মুচকি হেসে বললো-আমি তোমাকে ষোল কলার একটা কলা দেখালাম। তুমি যদি এই নিয়ে আবার মারধর কর, তাহলে তোমাকে আমি ষোল কলাই দেখাব।তখন প্রতিবশীরা তোমাকে শুধু বেঁধে রেখে যাবে না, সোজা পাগলা গারদে পাঠাবে। তাই শান্তভাবে ভাত খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা কর। তোমাকে অপদস্ত করে আমারও ভালো লাগেনি। আজ থেকে ভালো হওয়ার চেষ্টা করবে।ঝগড়াঝাঁটি করলে কার ভালো লাগে বলো!আর কোনদিন সাধারণ কথা নিয়ে ঝগড়া করবে না।

    কৃষক কোনো কথা না বলে চুপচাপ ভাত মুখে দিলো।

           ‘লাঙ্গলের ফালে কৃষক পেলো মাছ

           মাছ পেয়ে হলো তার মহা সর্বনাশ।*

 বাঘ শাবক

একদিন একটা বাঘের বাচ্চা ভুলক্রমে মেষের পালের সাথে মিশে গিয়েছিলো। মেষপালক মেষগুলো দেখতে এসে দেখল, একটা বাঘের বাচ্চা মেষের পালের সাথে মিশে রয়েছে।বাচ্চাটি খুবই ছোট ছিলো এবং দেখতেও খুব সুন্দর ছিলো।তাই মেষপালক আদর করে বাঘের বাচ্চাটিকে মেষের পালের সাথে বাড়িতে নিয়ে এল। একটি মেষ বাঘের বাচ্চাটিকে দুধও খেতে দিল।

সেইদিন থেকে বাঘের বাচ্চা মেষের পালের সাথে, বলতে গেলে মহা আনন্দেই, বড় হতে লাগলো।

এদিকে বাঘিনী তার শাবক হারিয়ে পাগল হয়ে উঠেছিলো। দুধের ভারে তার ওলান ফাটো ফাটো অবস্থা হলো। সে পাগলের মতো তার হারিয়ে যাওয়া বচ্চাটিকে খুঁজতে লাগলো।

প্রায় একমাস পর একদিন বাঘটা দেখল, তার বাচ্চাটা মেষের পালের সাথে মিশে রযেছে। সে পাগলের মতো লাফাতে লাফাতে তার বাচ্চার দিকে ছুটে গেল।

মেষগুলো বাঘ দেখে পঙ্গপালের মত দৌড়ে পালিয়ে গেল।মেষগুলোর দেখাদেখি বাঘের বাচ্চাটাও তাদের পেছন পেছন ছুটতে লাগলো। কিন্তু বাঘ একটু দূর গিয়েই বাচ্চাটিকে ধরে ফেললো। বাচ্চাটি ভয়ে ম্যালেরিয়া রোগীর মতো কাঁপতে লাগলো।

তখন বাঘ বাচ্চাটির শরীর আদর করে চাটতে চাটতে বলল- বাছা, তুমি আমাকে দেখে এত কাঁপছ কেন?

বাঘের বাচ্চাটি কাঁপতে কাঁপতে বললো- তোমাকে দেখে মেষরা পালিয়ে গেল কেন? তুমি নিশ্চয় আমাদের মেষদের শত্রু!তাই আমি ভয়ে কাঁপছি।

বাঘ হেসে বলল- হ্যাঁ, আমি অবশ্যেই মেষদের শত্রু; কিন্তু তুমি তো আর মেষ নও? তাই আমি তোমার শত্রু নই। তুমি আমার বাচ্চা, বাঘের বাচ্চা। তাহলে তুমি আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছ কেন? তোমাকে হারানোর পর আমি একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। তোমাকে ফিরে পেয়ে আমার আত্মা যেন আমি ফিরে পেয়েছি এমন মনে হচ্ছে। চলো, এখন আমরা বনে চলে যাই।আমাদের বাসস্থান তো বন জংঘল। এই লোকালয় নয়।

বাঘের বাচ্চা আপত্তি করে বলল- না না, আমি তোমার সাথে যাব না। আমি তোমার বাচ্চা নই, আমি মেষ শাবক। বনে নিয়ে গিয়ে তুমি আমাকে মেরে ফেলবে।

-না না, তুমি মেষ নও। তুমি বাঘের বাচ্চা- আমার বাচ্চা।আমি তোমাকে মারবো কেন?

-না,না, আমি মেষ শাবক, বাঘ শাবক নই।

-বোকা! আমি বলছি, তুমি বাঘের বাচ্চা- আমার বাচ্চা। মেষের বাচ্চা নও।

– না না, আমি মেষের বাচ্চা।

এভাবে বাঘ বলে, তুমি বাঘের বাচ্চা আর বাঘের বাচ্চা বলে, না না, আমি মেষের বাচ্চা।শাবকটিকে বাঘ কোনোমতেই বোঝাতে সক্ষম হল না যে, সে বাঘের শাবক। অবশেষে, হতাশ হয়ে বাঘটি বাচ্চাটিকে একটি ঝরনার পারে নিয়ে এলো। ঝরনার জলের উপর উভয়ের ছায়া পড়লো। বাঘ ঝরনার জলে পড়া তাদের ছায়া দেখিয়ে শাবকটিকে জিজ্ঞেস করল- এখন দেখ তো জলে কার কার ছায়া পড়েছে?

বাচ্চাটি মনোযোগ সহকারে ছায়ার দিকে লক্ষ্য করে বলল- জলের মাঝে তুমি রয়েছ!”

বাঘ বলল- ‘আমার সঙ্গে আর কে রয়েছে?’

– তোমার বাচ্চা।

-আমার বাচ্চা মানে? তুমি আর আমি ছাড়া তো এখানে আর কেউ নেই। তাই জলের মাঝে ঐটা তোমার ছায়া, তাই না?

বাচ্চাটি সম্মতিতে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, এটা আমার ছায়া।

-এখন দেখ তো, তুমি আর আমি দেখতে একই রকম কিনা?”

শাবকটি একবার বাঘের দিকে এবং আরেকবার ছায়ার দিকে তাকিয়ে ফের বাঘের দিকে তাকিয়ে বলল-হ্যাঁ, আমি দেখতে তোমার মতোই।

তাহলে আমি যদি বাঘ হই, তুমি মেষ হবে কীভাবে? তুমিও বাঘ এবং তুমি আমার বাচ্চা।

বাঘের বাচ্চা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল- তাহলে আমি মেষের বাচ্চা নই, আমি বাঘের বাচ্চা?”

-হ্যাঁ, তুমি বাঘের বাচ্চা এবং আমারই বাচ্চা। তোমাকে হারিয়ে আমি একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। চলো, এখন আমরা বনে যাই। লোকালয় আমাদের বাসস্থান নয়। আমাদের বাসস্থান বনে।

বাঘ শাবকটি নিজের পরিচয় পেয়ে মহানন্দে বাঘটিকে অনুসরণ করে বনের মাঝে প্রবেশ করলো।

            “পরিস্থিতির পাকে পড়ে বাঘও মেষ হয়

            ঘঁষতে ঘঁষতে একদিন পাথরও হয় ক্ষয়।*

  ভক্তের অধীন ভগবান

অনেক দিন আগের কথা। রতনপুর রাজ্যে একজন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ রাজা ছিলেন। ধনী বা দরিদ্র যাই হোক না কেন, সে সর্বদা তাঁর কাছ থেকে ন্যায়বিচার পেতেন। কিন্তু রাজার একটা দোষ ছিল। ধর্মের প্রতি তিনি উদাসীন ছিলেন। কাজের প্রতি তাঁর ছিল গভীর বিশ্বাস। তিনি মনে করতেন, কর্মই ধর্ম।তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সৎ কৰ্ম, সৎ আচরণ করলে অন্য ধর্ম পালনের প্রয়োজন নেই। ধর্মীয় রীতি-নীতি মানুষের সৃষ্টি। মানুষ নিজের সুবিধার জন্য এসব সৃষ্টি করেছে। ফলে এর জন্য তিনি জনগণের কাছে সমালোচিতও হতেন। তবুও তিনি তার মতের উপর অবিচল ছিলেন।কিন্তু এক রাতে এক স্বপ্ন দেখে রাজার মনে আবেগের স্পর্শ লাগলো। ধর্ম অবিহনে কর্ম অসম্পূর্ণ বলে তাঁর উপলব্ধি হলো। কেউ যেন তাকে স্বপ্নের মাঝে ডেকে বলেছে- ‘আরে বুর্বক!আর কত দিন ঘুমিয়ে কাটাবি? সততা, সৎ কর্মের পাশাপাশি সৎধৰ্ম আচরণেরও প্রযোজন আছে। শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মত তোর যৌবনশ্রী ম্লান হতে চলেছে, তবুও তোর চোখ খুলল না। ধর্ম আচরণ কর, পর পারের সম্বল অর্জন কর। নইলে মৃত্যুর পর জাহান্নামের আগুনে পুড়ে মরতে হবে। তখন মনস্তাপ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। সময় থাকতে ধর্মের প্রতি মনযোগ দে।

স্বপ্ন দেখে রাজার হৃদয় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলো। তিনি ঘুম থেকে জেগে রানীর শরীরে ধরে ঝাঁকিয়ে বললেন- “আরে ওঠো, ওঠো। আমি একটি খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি!

রাণী ঘুম থেকে জেগে দেখলেন রাজা বিছানায় বসে আছেন। তাঁর চোখে-মুখে বিস্মিত আতঙ্কিত দৃষ্টি। দুরন্ত ভয়ে যেন রাজার হৃদয় আচ্ছন্ন। রাজার অবস্থা দেখে রানী অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন-, “কি হয়েছে? এভাবে বিছানায় বসে আছেন কেন? আপনি কি অসুস্থ?

রাজা উদাস অথচ প্রশান্ত হাসি হেসে বললেন- “না, না, আমি অসুস্থ নই। আমি একটি স্বপ্ন দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম। স্বপ্নটা দেখে আমি খুব বিব্রত বোধ করছি।

রাণী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- স্বপ্ন! কি স্বপ্ন দেখেছেন আপনি?

রাজা রাণীকে স্বপ্নের বিষয়ে ভেঙে বললেন। রাণী স্বপ্নের বর্ণনা শুনে মন্তব্য করলেন- “আপনি স্বপ্নের মাঝে সত্য কথাই শুনেছেন। খরার জলের মতো আমাদের যৌবনশ্রী শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে।এবার আমাদের পরপারে যাওয়ার সময় সমাগত। এখন শুধু কর্মে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই যথেষ্ট হবে না, ধর্ম-কর্মও পালন করতে হবে। কারণ সবকিছুর মূল হলো ধর্ম।ধৰ্ম না থাকলে সভ্যতার প্রভাবও থাকবে না। মানুষ আবার আদিম বন্য প্রবৃত্তির দাস হয়ে যাবে। আমি তো অনেক দিন ধরেই আপনাকে কথাটা বলে আসছি, কিন্তু আপনি আমার কথায় গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

রাণীর কথায় তিরস্কারের সুর থাকলেও রাণীর কথা শুনে রাজা খুশী হলেন। তিনি বললেন- ‘ঠিক আছে, আমি তোমার কথা মানলাম। আমি সারা জীবন কর্মের পূজা করে, রেসের ঘোড়ার মতো শুধু কর্মের পিছনে ছুটেছি। ধর্মের পূজা করার আমার সময়ই ছিল না। আচ্ছা, যা হওয়ার ছিলো, তা হয়েছে, এখন থেকে ধর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব।কাল সকালে ঘুম থেকে জেগে, বিছানা থেকে নেমে, দরজা খুলে যার সাথে আমার প্রথম দেখা হবে তার কাছে আমি দীক্ষা নেব। আর কাল থেকে আমরা নতুন জীবন শুরু করব। এভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজা-রাণী আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।   

কাকতালীয়ভাবে সেই রাতে মঙ্গলা নামে এক চোর চুরি করতে এসে রাজার শয়ন কক্ষের পেছনে দাঁড়িয়ে রাজা-রাণী ঘুমিয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সে রাজারাণীর কথোপকথন মনোযোগ সহকারে শুনে ভাবলো, রাজার কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে আজ আর চুরি করব না। এতদিন ধরে চুরি করে আসছি, তবুও দারিদ্র আমার পিছু ছাড়েনি। শুধু খেয়েধেয়ে কোনোমতে বেঁচে রয়েছি। রাজার কথা সত্যি হলে কাল সকালেই আমার সব কষ্টের অবসান হবে। যদি কাল সকালে রাজাকে দীক্ষা দিতে পারি, তাহলে বাকী দিনগুলি আমি বাচ্চাদের নিয়ে পরম সুখে কাটাতে পারব। কিন্তু আবার ভাবলো, রাজা মানুষ, কখন তিনি কী মূর্তি ধরে তার ঠিক নেই। ক্ষণে তুষ্ট, ক্ষণে রুষ্ট হওয়াই রাজা বাদশাহদের স্বভাব। রাতে স্বপ্ন দেখে আবেগের বসে বলেছে, সকালে দরজা খোলে যাকে প্রথম দেখবে তার কাছে দীক্ষা নিবে। সকালে যদি রাজার এই মনোভাব পরিবর্তন হয়, তখন কি হবে? রাজার কথায় বিশ্বাস করে দরজার পাশে বসে থাকলে তাকে যদি চোর বলে ধরে নিয়ে বন্দীশালায় আটক করে রাখে?

এভাবে মনে মনে চিন্তাভাবনা করে অনেক সময় পার করলো। শেষে সে সিদ্ধান্ত নিলো যে, কপালে যা আছে তাই হবে। পুরুষ মানুষের বাত, হাতীর দাঁত। রাজা যদি পুরুষ হয় কথা ঠিক থাকবে, আর যদি কাপুরুষ হয় কথার খেলাপ হবে। তখন তাকে ধরে নিয়ে বন্দীশালায় আটক করে রাখবে। এর বাইরে রাজা তাকে আর কি করতে পারবে? সে রাজাকে তো অ্ন্তত চিনতে পারবে। জীবনে কৃতকার্য হতে হলে কিছু ‘রিক্স’ নিতেই হয়।এভাবে ভেবে মঙ্গলা চোর চুরি করা বাদ দিয়ে রাজার শয়ন কক্ষের দরজার সামনে এসে বসে রাত পোহানোর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

সকালে রাজার ঘুম ভাঙলো এবং স্বপ্নের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে এক অনাবিল আনন্দে তাঁর দেহমন ভরে উঠলো। তিনি শরীর মোচড় দিয়ে বিছানা থেকে নেমে ইস্টের নাম স্মরণ করে, আস্তে আস্তে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। রাতের প্রতিশ্রুতি অনুসারে তিনি দরজার চারপাশে তাকাতে লাগলেন। তখন তাঁর চোখ দরজার পাশে বসে থাকা মঙ্গলা চোরের উপরে পড়লো। মঙ্গলাকে দেখে রাজা হাতজোড় করে বললেন- ‘প্রভু, আপনি আমাকে দীক্ষা দিতে হবে। রাতে স্বপ্ন দেখে, সকালে দরজা খুলে প্রথমে যাকে দেখব তাঁর কাছেই দীক্ষা নেব বলে আমি প্রতিজ্ঞা করেছি। এখন আপনি আমাকে দীক্ষা দিয়ে আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন।

মঙ্গলা চোর দূরের গঙ্গা কাছে পেয়ে সে স্বপ্নে দেখা এক কপ্লিত কাহিনী বর্ণনা করলো-আমিও গত রাতে একটি স্বপ্ন দেখেছি। শেষ রাতের স্বপ্ন কখনও মিথ্যা হয় না!

    রাজা ব্যস্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কি স্বপ্ন দেখেছেন, গুরুজী?

    মংলা মনে গড়া এক কাহিনী বলে গেলো- আমি স্বপ্নে দেখছি, কেউ যেন আমাকে ডেকে বলছে, মঙ্গলা, তুমি যাও, রাজা তোমার কাছে দীক্ষা নিতে আগ্রহী। রাজাকে দীক্ষা দিলে রাজার সাথে সাথে তুমিও স্বর্গবাসী হবে।যাও, আজ রাতেই রাজার শয়ন কক্ষের দরজার পাশে দিয়ে বসে থাকগে’। এভাবে স্বপ্নাদেশ পেয়েই আমি দৌড়ে চলে এসেছি।

এভাবে মনে গড়া স্বপ্নের কাহিনী বর্ণনা করে মঙ্গলা গহীনভাবে বললো- যাও, এখন দীক্ষা গ্রহণের জন্য যাবতীয় আয়োজন করগে’। আমি এই মুহূর্তেই তোমাকে দীক্ষা দিব। এখন মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত।

নিস্তরঙ্গ পুকুরে ঢিল ছুড়লে যেরকম ঢেউ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, সেভাবে রাজপ্রাসাদে আলোড়ন সৃষ্টি হলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজপ্রাসাদে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হলো।রাজার আদেশ পেয়ে দাসদাসী দৌড়ে এসে মঙ্গলাকে পাতকোলা করে স্নানাগারে নিয়ে গিয়ে সুবাসিত গোলাপ জলে স্নান করালো। তারপর মখমলের সাজপোশাক পড়িয়ে মঙ্গলাকে রাজার শয়নকক্ষে এনে দুগ্ধকোমল বিছানায় বসিয়ে দাসদাসীরা চলে গেলো। রাণী এসে মঙ্গলার পা ছুঁয়ে হাতজোড় করে বললেন- গুরুজী, আপনি কোনো অসুবিধা অনুভব করছেন নাকি? আপনার জলযোগের জন্য সব প্রস্তুত। আপনি অনুমতি দিলেই ভোজনের ব্যবস্থা করতে পারি।

  মঙ্গলা সারারাত জেগে কাটিয়েছে। তাই তার খুব খিদে পেয়েছিলো। সেজন্য ভোজনের কথা শুনে তার খিদে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলো যদিও সে কোনোমতে নিজেকে সংযত করে বললো-না না, অসুবিধে নেই। তোমরা স্নান সেরে এসো। তোমাদের দীক্ষা দেওয়ার পরে আমি জলস্পর্শ করব।

রাজা-রাণী স্নান সেরে এসে মঙ্গলার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করলেন।দীক্ষা গ্রহণের পর নানা প্রকার খদ্যসম্ভার দিয়ে গুরুদেবকে আপ্যায়ন করলেন।রাণী খাদ্য পরিবেশন করলেন এবং রাজা স্বয়ং গুরুদেবকে ময়ূরের পাখা দিয়ে বাতাস করলেন।

    পরম তৃপ্তি সহকারে ভোজন গ্রহণ করার পর গুরুদেব বললেন- “তোমাদের আপ্যায়নে আমি খুবই সন্তুষ্ট। এখন যাও, তোমারা ভোজন গ্রহণ করগে’।

গুরুর আদেশ পেয়ে রাজা এবং রাণী ভোজন গ্রহণ করে মঙ্গলার নিকটে এসে হাতজোড় করে বললেন- গুরুদেব, আপনার সেবার জন্য অনুমতি দিলে আমরা কৃতার্থ হব।

মঙ্গলা গহীনভাবে বললো- দীক্ষা যখন দিয়েছি, তখন তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করাটা আমার কর্তব্য। আচ্ছা, কি সেবা করতে চাও, কর।

গুরুর আদেশ পেয়ে রাজা মঙ্গলার হাত-পা মালিশ করতে লাগলো এবং শিয়রে দাঁড়িয়ে রাণী ময়ূরের পাখা দিয়ে মঙ্গলাকে বাতাস করতে লাগলো। মঙ্গলা গভীর তৃপ্তিতে স্বর্গসুখ অনুভব করে রাজা-রাণীকে আশীর্বাদ দিলো- তোমাদের সকল মনস্কামনা পূর্ণ হোক, ধর্ম-কর্মে মতি হোক এবং স্বর্গসুখ লাভ হোক।  

সেই দিন থেকে, মঙ্গলা তার বাড়ির কথা ভুলে গিয়ে রাজদরবারে পরম সুখে দিন অতিবাহিত করতে লাগল। একদিন মঙ্গলা বললো- তোমাদের সেবায় আমি খুবই সন্তুষ্ট। তোমাদের কৃপায় নানান উপাদেয় খাদ্য গ্রহণ করে আমি ধন্য হয়েছি। কিন্তু আমরা একটা জিনিস খেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। খাওয়াইতে পারবে কি?

রাজা জিজ্ঞেস করলেন- কি জিনিস গুরুদেব? দয়া করে প্রকাশ করুন। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব খাওযাতে।

 “আমি হরিণের মাংস খেতে চাই,” মঙ্গলা ইতস্ততঃ করে বলল- আমি কখনো হরিণের মাংস খাইনি। যদি খাওয়াতে পার আমার অনেক দিনের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।

রাজা গর্ব করে বললেন- আমি পারব না এমন কাজ নেই। আপনার আদেশ পেলে আমি অবশ্যই খাওয়াতে পারব। আজই আমি শিকারে যাব এবং হরিণ শিকার করে আনব।

গুরুর আদেশ পেয়ে রাজা পাত্র-মিত্র, বন্ধুদের নিয়ে সেদিনই হরিণ শিকারে বের হয়ে গেলেন।

দীক্ষা নেওয়ার পর রাজা মঙ্গলাকে নিজের শয়নকক্ষে শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। রাজা শিকারে গেলেও রাজার অনুপস্থিতিতে সেদিনও মঙ্গলাকে রাজার শয়ন কক্ষে শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না, সেরূপ চোরের স্বভাবও হঠাৎ পরিবর্তন হয় না। রাণীর গলায় মুক্তার হার দেখে প্রথমদিন থেকেই মঙ্গলা হারের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলো। যাইহোক, রাজা রাণীর আদর আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়েই হোক বা হারটা সরানোর সুযোগ না পেয়ে হোক, মঙ্গলা হারটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো। রাণীকে একা দেখে তার মনে লোভ নামের বাষ্পপূঞ্জ সঞ্চারিত হলো।সে ভাবল, আমি হারটা হাতিয়ে নিতে পরলে খুব ভালো হতো। এদিকে আমি রাজভোগ খেয়ে আরামে দিন পার করছি, অন্যদিকে বাচ্চারা না খেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। হারটা হাতিয়ে নিতে পারলে তাদেরও রাজভোগ খাওয়াতে পারতাম।

 এভাবে ভাবাগুণা করে মঙ্গলার হৃদয় আকাশে লোভের বাষ্প সঞ্চারিত হলো। সে রাজার আদর যত্নের কথা ভুলে বারবার রাণীর বিছানার দিকে তাকিয়ে রাণী ঘুমিয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। এক পর্যায়ে রাণী ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম গভীর হওয়ার সাথে সাথে রাণীর মৃদু মৃদু নাক ডাকতে লাগল। রাণীর নাক ডাকার শব্দ শুনে মঙ্গলার মনে লোভ নামের উন্মত্ত উল্লাস জেগে উঠলো। সে বিছানা থেকে নেমে এক পা দু পা করে রাণীর বিছানার পাশে এসে রাণীর গলা থেকে হারটা খুলে ফেললো। রানীর গলা থেকে হারটা সরানোর সময় অঘটন ঘটে গেলো।রাণীর ঘুম ভেঙে গেলো।

কক্ষে মৃদুমন্দ মমবাতি জ্বলছিল। রাণী চোখ খুলে দেখল, মঙ্গলা তাঁর বিছানার পাশে হারটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাণী অবাক দৃষ্টিতে মঙ্গলার দিকে তাকিয়ে বললেন- গুরুদেব, আপনি!রানী বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারলেন না। ধরা পড়ার ভয়ে মঙ্গলা রাণীর বালিশের নিচে থেকে তলোয়ার টেনে এনে এক আঘাতে রাণীর দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। রক্তে মঙ্গলার কাপড় এবং বিছানা ভেসে গেলো।

 রানীকে হত্যা করে মঙ্গলা দৌড়ে পালাতে লাগলো। কিন্তু তার কাপড়ে রক্তের দাগ দেখে সজাগ রক্ষীরা তাকে গেটের সম্মুখে ধরে ফেললো এবং রক্ষীরা জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারল যে, সে রানীকে হত্যা পালানোর চেষ্টা করছে।রক্ষীরা তাকে কিল ঘুষি মেরে বন্দীশালায় বন্দী করে রাখলো।

 সকালে রাণীর হত্যার খবর শুনে ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্য রাজপ্রাসাদে জনতার স্রোত বইতে লাগলো। দেখতে দেখতে রাজপ্রাসাদ লোকারণ্য হয়ে পড়লো। ঘটনা প্রত্যক্ষ করে সবার চোখ কপালে উঠলো। সবাই মঙ্গলাকে অভিসম্পাত করতে লাগলো।

খবর শুনে রাজা শিকার থেকে বাড়ি ফিরে এলেন। তিনি ঘোড়া থেকে নেমে বন্দীশালায় এলেন। তিনি মঙ্গলাকে বন্দীশালা থেকে মুক্ত করার আদেশ দিয়ে সেপাই সন্তরীদের ভৎর্সনা করে বললেন- কে গুরুদেবকে বন্দী করার আদেশ দিয়েছে? যাও, সবাই গুরুদেবের পরিচর্যার ব্যবস্থা কর এবং স্নান করিয়ে আমার শয়ন কক্ষে বসাবার ব্যবস্থা করগে’।

রাজার কথা শুনে সবাই অবাক! কি ব্যাপার?! একজন খুনিকে গ্রেফতার করার জন্য রাজা কেন ক্ষুব্ধ হয়েছেন? কেন তিনি শাস্তির পরিবর্তে খুনিকে সেবা করার আদেশ দিলেন? এর পেছনের রহস্য কী? এভাবে হাজারো প্রশ্ন উপস্থিত জনতার মনে নাড়া দিয়ে উঠলো।

 রাজার হুকুম অলঙ্ঘনীয়!হুকুম পেয়ে দাসদাসীরা মঙ্গলাকে স্নান করিয়ে রাজার শয়ন কক্ষে নিয়ে এলো। উপস্থিত জনতা মাটির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে উদাসীনভাবে রাজা পরবর্তীতে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা প্রত্যক্ষ করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

এদিকে মঙ্গলাও আতঙ্কিত। সে যা অপরাধ করেছে তার কোন ক্ষমা নেই! সে নরহত্যার অপরাধে অপরাধী। তাও সাধারণ কোনো মানুষকে হত্যা করেনি। স্বয়ং রাজ্যের রাণীকে হত্যা করেছে। তাকে শূলে চড়াবেন অথবা আগুনে পুড়িয়ে মারবেন। শুকনো বালি জল শুষে নেওয়ার মতো মঙ্গলার হৃদয়ে সঞ্চারিত ভয়ের বাষ্পপূঞ্জ তার জীবনের আশা শুষে নিতে লাগলো। সে বিছানায় বসে বিস্মিত ও ভীত চোখে রাজার কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করতে লাগলো।

রাজা স্নান সেরে এক ঘটি জল নিয়ে মঙ্গলার কাছে এসে বললেন- “গুরুদেব, আমি আপনার পদযুগল ধৌত করে পাদোদক নেওয়ার জন্য অনুমতি চাইছি। আপনি অনুমতি দিলে আমি বাধিত হব।

রাজার বিনীত প্রার্থনা শুনে মঙ্গলার ভীত শরীরে কিছুটা শক্তি সঞ্চার হলো এবং সে ইতস্তত করে বলল- “আচ্ছা, তুমি যখন ইচ্ছে করেছ, নিতে পার।

অনুমতি নিয়ে রাজা মঙ্গলার পা ধৌত করে পাদোদক নিয়ে রাণীর দ্বিখণ্ডিত দেহের কাছে এলেন এবং বিচ্ছিন্ন মস্তকটি রাণীর শরীরের সাথে সংযুক্ত করে রাণীর শরীরে পাদোদক ছিটিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর মৃতা রানী জীবিত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় উঠে বসলেন।

ঘটনা দেখে সবাই অবাক! সবার চোখ কপালে উঠলো। মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার! একেবারে অবিশ্বাস্য ঘটনা! এটা কিভাবে সম্ভব হলো? এটা রাজার গুরুভক্তির মাহাত্ম্য, নাকি মঙ্গলার পায়ের মাহাত্ম্য? এটা নিশ্চয় রাজার গুরুভক্তির ফল। মঙ্গলার পায়ের কোনো মহত্ব নেই। উপস্থিত সবাই রাজাকে ধন্য ধন্য করতে লাগল। একেই বলে, গুরুভক্তি! রাজার ভক্তির গুণে মৃতা রাণীর দেহে প্রাণ সঞ্চার হলো! রাজার প্রতি সকলেরই ভক্তিভাব উদয় হলো। ফলের ভারে নুইয়ে পড়া গাছের মতো সবাই মাথা নত করে রাজাকে প্রণাম করল।

এদিকে মঙ্গলা গর্বে বায়ুবর্তি বেলুনের মতো ফুলে উঠতে লাগল। সে এতদিন বুঝতে পারেনি যে, তার পায়ের মধ্যে এত মহিমা নিহিত হয়ে আছে! দূর্বাঘাসের তুষারের মতো তার মনে অহংকার জ্বল জ্বল করে জ্বলতে লাগল। সে উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে গর্বিত স্মিত হাসি হাসলেন। প্রজারা রাজাকে প্রণাম করে যার যার বাড়ি চলে গেলো।

দু-তিন দিন পর মংলা রাজার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। সে তার স্ত্রীকে দেখে ধমকের সুরে বললো- “আমি এতদিন বাড়ি থেকে দূরে ছিলাম, কেউ আমার খবরও নিলে না, আমি মারা গেছি, নাকি বেঁচে আছি! এই কি তোমার স্বামী ভক্তি?

রাজপ্রাসাদ মঙ্গলাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। তাই রাজার বাড়িতে মঙ্গলাকে নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটে গেছে, সে বিষয়ে মঙ্গলার স্ত্রী কিছুই জানতো না। তাই সে মঙ্গলার কথা শুনে ঝামটা মেরে বলল- “যদি মরতে গিয়েছিলে, তাহলে মরনি কেন? আমি খবর নেইনি বলে আমার দোষ হয়েছে, আমি আমার সন্তানদের নিয়ে কোন সুখে এতদিন কাটিয়েছি সে খবর কে রেখেছে? তোমার মত অপদার্থকে বিয়ে করার চেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মরাই আমার ভালো ছিলো।

 স্ত্রীর কথায় অপমানবোধ করে মঙ্গলা বন্য পশুর মতো চিৎকার করে উঠলো-, “কি বললে, আমি অপদার্থ? তুমি আমার মহিমার কথা কি জান? আমি ইচ্ছে করলে একজনকে কেটে আবার জীবিত করতে পারি।

স্ত্রী ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললো- “এহ, সিদ্ধ পুরুষ! মানুষ কেটে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে!সিদ্ধ পুরুষ এসেছে! তুমি সিদ্ধ পুরুষ নও, তুমি কাপুরুষ!

মঙ্গলা আস্ফালন করে বললো- কি বললে, আমি কাপুরুষ? আচ্ছা, এই মুহূর্তে আমি তোমাকে দেখাচ্ছি, আমি কাপুরুষ না সিদ্ধ পুরুষ। এভাবে বলে মঙ্গলা একটা দাও এনে এক আঘাতে তার স্ত্রীর মাথা থেকে দেহ বিচ্ছন্ন করে ফেললো।

সন্তানরা কাছেই ছিলো। মাকে দুই টুকরো করে কাটতে দেখে তারা চিৎকার করতে লাগলো। মঙ্গলা তাদের বাধা দিল না। চিৎকার করলে তবেই তো লোক এসে জড়ো হবে। আর লোক এসে জড়ো হলেই তো তার মহিমা প্রকাশ হবে। আজ গ্রামবাসীরা তার প্রকৃত মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারবে। এভাবে ভেবে মঙ্গলা বারান্দায় বসে নির্বিকারভাবে হোকা টানতে লাগলো।

ভাবামতেই, সন্তানদের চিৎকার শুনে গ্রামবাসী কৌতূহলবশতঃ মংলার বাড়িতে দৌড়ে এলো!ঘটনা দেখে অবাক!সারা উঠোন রক্তে ভেসে গেছে ।সেই রক্তের মাঝে মঙ্গলার স্ত্রীর রক্তমাখা মুণ্ডহীন দেহ পড়ে আছে!সন্তানরা তাদের মৃত মায়ের পাশে বসে কান্নাকাটি করছে।

মঙ্গলার কাণ্ড দেখে সবাই তাকে বকাঝকা করতে লাগল। কেউ কেউ মঙ্গলাকে ধরে বেঁধে রাজদরবারে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও চালালো।

মঙ্গলা তখন নির্বিকারভাবে বললো- কোথাও নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই! এক ঘটি জল এনে আমার পা ধৌত করে আমার স্ত্রীর শরীরে ছিটিয়ে দাও। এক্ষুনি স্ত্রী জীবিত হয়ে উঠবে!

মঙ্গলার কথায় লোকেরা হেসে বলল-সিদ্ধ পুরুষ এসেছ! পা ধোযা জল মৃতদেহের ওপর ছিটিয়ে দিলেই প্ৰাণ ফিরে আসবে! এটা গাছে গরু উঠার মতো কথা ছাড়া আর কি? বেটা আসলে পাগল! একে বন্দীশালায় ভরিয়ে রাখলেই পাগলামীর মজা পাবে!

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বয়স্ক লোক বললেন- এ যখন বলতেছে, চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?” ঈশ্বরের মহিমার শেষ নেই। দেখা যাক কি হয়! একে পরেও আটক করে বন্দীশালায় ভরাতে পারবে!

 বৃদ্ধের কথামতো গ্রামবাসীদের একজন মঙ্গলার পা ধুয়ে জল নিয়ে এসে মঙ্গলার স্ত্রীর দেহ ও মস্তক এক সাথে রেখে জল ছিটিয়ে দিলো। কিন্তু কিছুই হলো না! মঙ্গলার স্ত্রী আগের মতই নিথর হয়ে পড়ে রইল।

মঙ্গলা ভাবলো, কোথাও নিশ্চয় কিছু ভুল হয়েছে। সে গভীর হতাশায় ভেঙে পড়লো! এক অপরাধবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। সে পাগলের মতো কয়েকবার নিজেই পা ধুয়ে জল ছিটিয়ে দিলো। কিন্তু কাজ হল না। হতাশায় তার মুখ মরা বোয়ালের মত ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

উপস্থিত লোকজন এতক্ষণ ধৈর্য ধরে মঙ্গলার কাণ্ডকারখানা প্রত্যক্ষ করছিলো! অবশেষে তাদের ধৈর্য্যের বাঁধ শিথিল হয়ে গেলো। তারা মঙ্গলাকে বেঁধে রাজদরবারে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো এবং সিদ্ধান্ত মতে তারা মঙ্গলার হাত পিঠমোড়া করে বেঁধে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলো।

    এদিকে রাজা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ মঙ্গলার বাড়িতে আসার জন্য রওয়ানা হয়ে এসেছিলেন।রাস্তায় জনতার সাথে তাঁর সাক্ষাত হলো।রাজা উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- গুরুদেবকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। আপনারা  সসম্মানে গুরুদেবের হাতের বাঁধন খুলে দিন। যা করতে হয় আমিই করব। আপনাদের এ নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না।

রাজার কথার প্রতিবাদ করার সাহস কারও হলো না। তারা মঙ্গলার হাতের বাঁধন খুলে দিল এবং রাজার আদেশ মতো মঙ্গলাকে পালকীতে বসানো হলো। মঙ্গলাকে পালকীতে বসানোর পর রাজা অন্য একটি পালকিতে বসে মঙ্গলার বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলেন। কৌতূহলী লোকেরাও মিছিল করে রাজার পিছু পিছু মঙ্গলার বাড়িতে এলো। রাজা এক ঘটি জল আনার নির্দেশ দিলেন। এক সৈনিক জল এনে দিলো। রাজা মঙ্গলার পা ধুইয়ে পাদোদক এনে মঙ্গলার মৃতা স্ত্রীর গায়ে ছিটিয়ে দিলেন, সাথে সাথে মঙ্গলার স্ত্রী জীবিত হয়ে উঠে বসলো।

সমবেত জনতা অবাক। এটা মঙ্গলার পায়ের মাহাত্ম্য, না রাজার গুরুভক্তির মাহাত্ম্য?প্রজারা সবাই রাজাকে ধন্য ধন্য করতে লাগলো এবং তারা সবাই রাজাকে আশীর্বাদ দিয়ে বাড়ি চলে গেল।

    রাজার কাণ্ড প্রত্যক্ষ করে মঙ্গলা মাটির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো এবং শাওন মাসের মেঘলা আকাশের মতো তার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। সে বুঝতে পারলো, তাঁর চরণের কোনো মাহাত্ম্য নেই, সকল মাহাত্ম্য রাজার ভক্তভক্তির। এক পর্যায়ে সে বসা থেকে উঠে গিয়ে রাজার পায়ে লুটিয়ে পড়ল।    

    রাজা মঙ্গলাকে ধরে বললেন- গুরুদেব এ আপনি কি করছেন? কেন আপনি আমাকে পাপীর ভাগি করতে চাইছেন কেন? আপনার স্থান পদতলে নয়, আপনার স্থান আমার মাথায়। এভাবে বলে রাজা মঙ্গলাকে টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন- লোকেরা যাই ভাবুক না কেন, আমি জানি, সমস্ত গৌরব আপনারই। আমাকে আশীর্বাদ করুন, গুরুদেব। আমি যেন চিরদিন আপনার অনুগত হয়ে থাকতে পারি। এভাবে বলে রাজা মঙ্গলার পা জড়িয়ে ধরলেন।

    রাজার ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে মঙ্গলা রাজাকে টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো- ‘না, না, সব মাহাত্ম্য তোমার, এতে আমার কোনো মহত্ত্ব নেই।ভক্তের অধীন যে ভগবান, আজ আমি তার প্রমাণ পেলাম।

             ভক্তের অধীন ভগবান

             ভক্তে রাখলো গুরুর মান।।

বুদ্ধিমতী মন্ত্রীকন্যা

অনেক দিন আগের কথা। একদিন এক রাজা দরবারে বসে তার মন্ত্রী পরিষদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আলোচনার মাঝখানে হঠাৎ মন্ত্রী বললেন- “মানুষ তো সব ভেড়ার পালের মতো। যখন একটি ভেড়া দৌড়ায়, অন্যরা বাচবিচার না করেই তার পিছনে পিছনে দৌড়াতে শুরু করে। সেরকম, কেউ কোনো গুজব রটনা করলে, মানুষ সত্য মিথ্যা বিচার না করেই সেই গুজবে ভেসে যায়।

রাজার ভ্রু কুঁচকে গেল। কারণ তিনিও তো মানুষ! তাহলে তিনিও কি ভেড়ার মত? রাজার আত্মসম্মানে আঘাত লাগলো। তাই তিনি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন- ‘আচ্ছা, আপনার কথাই মানলাম। তবে মানুষ যে ভেড়ার পালের মতো এ কথা আপনাকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে। আপনাকে এক মাস সময় দিলাম। এক মাসের মধ্যে আপনি কথাটা প্রমাণ করতে না পারলে এক মাস পর আপনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।

 রাজার কথা শুনে মন্ত্রী চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি যা বলেছেন তা অবশ্যেই সত্য। কিন্তু কথাটা তিনি প্রমাণ করবেন কীভাবে?

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মন্ত্রী বাড়িতে এলেন। কথাটা কীভাবে প্ৰমাণ করবেন সেই দিন থেকে তিনি তা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। তিনি রাজ দরবারে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করাও ছেড়ে দিলেন। মন্ত্রীর আচরণে তাঁর পরিবারও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। মন্ত্রীর একটি কন্যা ছিল। কন্যাটি খুবই বুদ্ধিমতী ছিল। মন্ত্রীকন্যা একদিন জিজ্ঞাসা করলো- ‘বাবা, আমি কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি যে, আপনি রাজদরবারে যান না এবং ঠিকমতো খাওয়া দাওয়াও করেন না। কারো সাথে তেমন কথাও বলেন না। আপনি কি অসুস্থ, বাবা?

মন্ত্রী বললেন- না, না, মা, আমি অসুস্থ নই। তবে মা, আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে।

মন্ত্রীকন্যা বললো- অসুখ না করলে মৃত্যুর প্রশ্ন উঠল কেন বাবা?’

মেয়ের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী রাজদরবারের ঘটনা ভেঙে বললেন। মন্ত্রীর কথা শুনে মন্ত্রীকন্যা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল- “বাবা, আপনি চিন্তা করবেন না। মানুষ যে ভেড়ার পালের মতে, আমি তা প্রমাণ করে দেখাব।আপনি এক মাস ছুটি নিয়ে বাড়িতে শোয়েবসে আরাম করে কাটান। আমি কালই রাজদরবারে গিয়ে রাজার নিকট থেকে এক মাসের ছুটী নিয়ে আসব।

মন্ত্রীকন্যা পরদিন সকালে রাজ দরবারে এসে বললো- মহারাজ, মানুষ যে ভেড়ার পালের মতো তা পিতা এক মাসের মধ্যে প্রমাণ করে দেখাবে বলে আমার নিকট বলে পাঠিয়েছেন।এর জন্য কিছু টাকা ও শ্রমিক প্রয়োজন হবে এবং পিতাকেও এক মাসের ছুটী দিতে হবে।

রাজা বললেন- এক মাস কেন? আমি দুই মাসের ছুটি দিতেও প্রস্তুত।তবে মানুষ যে ভেড়ার পালের মতো তা তোমার পিতাকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে। টাকা আর লোক আমি কালই পাঠিয়ে দিব।

রাজার আশ্বাস পেয়ে মন্ত্রীকন্যা বাড়ি এসে মত্রীকে কথাটা অবগত করলো এবং সে টাকা এবং শ্রমিক দিয়ে কি করবো তা পিতার নিকট ভেঙে বললো।কন্যার কথা শুনে মন্ত্রীর মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।

 পরের দিন সকালে রাজ দরবার থেকে শ্রমিক ও টাকা এলো। মন্ত্রীকন্যা শ্রমিক ও টাকা নিয়ে সেদিনই গভীর জঙ্গলে এসে ছাউনি ফেললো। পরের দিন সকালে মন্ত্রীকন্যা ইটের দোতালা দালান নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ আনতে কয়েকজন শ্রমিককে শহরে পাঠালো। যথাসময়ে উপকরণ এলো। পরদিনই দালান নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে গেলো।এক মাসের মধ্যে দালান নির্মাণের কাজ শেষ হলো। দালান নির্মাণ শেষ হওয়ার পর মন্ত্রীকন্যা শ্রমিকদের নিয়ে বাড়িতে এসে তাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। সে শ্রমিকদের পই পই করে বলে দিলো যে, তারা যেন জংঘলে দালান নির্মাণের কথা কোথাও প্রকাশ না করে।

পরদিন মন্ত্রীকন্যা একা জংঘলে গিয়ে দালানের সামনে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলো। সাইনবোর্ডে লিখা ছিলো- ‘যাও, দোতালার ওপড়ে চড়ে নিজের চোখে ভগবানের দর্শন লাভ করে ধন্য হয়ে এসো। তবে একটা কথা, একমাত্র সতী মায়ের সন্তানই ভগবানের দর্শন পাবে। সতী মায়ের সন্তান ছাড়া অন্য কেউ ভগবানের দর্শন পাবে না। আর একবারে মাত্র একজনই প্রবেশ করতে পারবে এবং প্রত্যেকে পাঁচ টাকার টিকেট কেটে দালানে প্রবেশ করতে হবে।

সাইনবোর্ড লাগিয়ে বাড়ি এসে মন্ত্রীকন্যা রাজ্যময় ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে দিলো যে, অমুক জঙ্গলে মাটি ফুটে একটি দোতলা দালান  উঠেছে। সেই দালানের দোতালায় চড়ে উপড়ের দিকে তাকালে সিংহাসন সমেত ভগবানের দর্শন পাওয়া যায়।

    ঘোষণা শুনে দলে দলে লোক জংঘেলর দিকে রওয়ানা হলো। দালানের সন্মুখে লাগানো সাইনবোর্ড পড়ে মানুষের কৌতূহল দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। লোকে পাঁচ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে এক এক করে দালানের ভিতরে প্রবেশ করতে লাগলো। সবাই দালান থেকে বেড়িয়ে এসে বুক ফুলিয়ে বলতে লাগলো- তারা ভগবানের দর্শন লাভ করেছে।ফলস্বরূপ, জংঘলের মাঝে দর্শনার্থীদের অবিরাম স্রোত বইতে লাগলো। একপর্যায়ে রাজার কানেও খবরটা পৌঁছোল। রাজা মন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। রাজার আহ্বানে মন্ত্রী রাজার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। রাজা বললেন- ‘মন্ত্রী, শুনেছেন নাকি, অমুক জংঘলে বোলে রাতারাতি মাটি ফুটে দোতালা দালান উঠেছে? সেই দোতালায় চড়ে উপড়ের দিকে তাকালে বোলে ভগবানের দর্শন পাওয়া যায়?

মন্ত্রী বললেন- ‘হ্যাঁ মহারাজ, কথাটা আমিও শুনেছি। তবে আমি নিজে এখনো সেখানে যাইনি।

রাজা বললেন- ‘আমাদের রাজ্যে এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে আর আমরা এখনও দেখতে যাইনি। লোকে শুনলে, আমাদের কি বলবে, মন্ত্রী?

মন্ত্রী বললেন-“মানুষ আমাদের বোকা ভাববে, মহারাজ।

রাজা বললেন- চলুন, আমরাও গিয়ে ভগবানের দর্শন লাভ করে ধন্য হয়ে আসি।

রাজা মন্ত্রীকে নিয়ে ভগবান দর্শনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। তাঁরা জংঘলে এসে অসংখ্য মানুষ দেখতে পেলেন। মানুষের পায়ের চাপে দুর্বা, ঘাস মাটির সাথে মিশে গেছে। দালানের চারপাশে অসংখ্য মানুষ ভগবান দর্শনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেছে। রাজাকে দেখে সবাই রাস্তা ছেড়ে দিলো। রাজা দালানের সামনে এসে সাইনবোর্ডটি মনোযোগ দিয়ে পড়লেন।

মন্ত্রী বললেন- মহারাজা যান, ভগবান দর্শন করে ধন্য হয়ে আসুন। রাজা ইষ্টনাম স্মরণ করে দালানের ভেতর প্রবেশ করলেন। তিনি দালানের ভেতর প্রবেশ করে দ্বিতীয় মহলায় উঠে এসে আকাশের দিকে তাকালেন, কিন্তু কোথাও তিনি ভগবানের নাম বা গন্ধ দেখতে পেলেন না। রাজা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর মাথা কুমোরের চাকার মত ঘুরতে লাগল। ভগবান দর্শন করে সবাই ধন্য হচ্ছে, শুধু তিনি ভগবানের দর্শন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন! তিনি কি তাহলে সতী মায়ের সন্তান নন? কিন্তু তিনি কীভাবে এ কথা লোক সমাজে প্রকাশ করবেন? এ কথা শুনে মানুষ তার সম্পর্কে কি ভাববে? প্রজারা নিশ্চয় তাকে রাজা বলে মেনে নিতেই অস্বীকার করবে। পাত্রমিত্ররাও এ কথা শুনলে হাসবে। সেজন্য মায়ের সন্মান রক্ষার জন্য হলেও তিনি ভগবানের দর্শন পেয়েছেন বলে বলতে হবে।

এভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজা মুখে চেষ্টাকৃত হাসির রেখা ফুটিয়ে দোতলা থেকে নেমে এলেন। রাজাকে দেখে মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন- ‘মহারাজ আপনি কি ভগবানের দর্শন পেয়েছেন?’

রাজা হেসে বললেন- হ্যাঁ, পেয়েছি। একেবারে অলৌকিক কাণ্ড। নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। আচ্ছা, এখন আপনিও গিয়ে ভগবান দর্শন করে ধন্য হয়ে আসুন।

রাজার নির্দেশ পেয়ে মন্ত্রী দোতলায় উঠে এলেন। মন্ত্রীর মুখে বিজয়ের হাসি। তিনি ভালো করেই জানেন যে, তিনি ভগবানের দর্শন পাবেন না। এটা তো তার মেয়ের কারসাজি। সেজন্য তিনি দোতালার উপড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দালান থেকে বেরিয়ে এলেন।

রাজা হাসিমুখে মন্ত্রীকে স্বাগত জানালেন- আসুন, মন্ত্রী। আপনি নিশ্চয় ভগবান দর্শন করে ধন্য হয়েছেন?

মন্ত্রী রাজাকে একপাশে ডেকে এনে বললেন- মহারাজ, আমি ভগবানের দর্শন পাইনি।

মন্ত্রীর কথা শুনে রাজা একটু স্বস্তি পেলেন। তিনি ভাবলেন, তিনি-ই একমাত্র অসতী মায়ের সন্তান নন, মন্ত্রীও অসতী মায়ের সন্তান। সমব্যথীর নিকট মনের গোপন কথা প্রকাশ করতে অসুবিধা নেই ভেবে রাজা বললেন- “দুঃখিত হবেন না মন্ত্রী, আসলে আমিও ভগবানের দর্শন পাইনি। নিজের সন্মান রক্ষার জন্য ভগবানের দর্শন পেয়েছি বলে প্রচার করেছিলাম।

কথা বললে বাতাস। রাজা ও মন্ত্রী ভগবানের দর্শন পায়নি এ কথা কিছুক্ষণের মধ্যে প্রচার হয়ে গেলো। জনতারা ভাবলো, রাজাই যখন অসতী মায়ের সন্তান, তাহলে তারা আবার কত বড় সতী মায়ের সন্তান! সেজন্য এ বললো, ভগবানের দর্শন পাইনি, সে-ও বললো, ভগবানের দর্শন পাইনি। এভাবে কেউ যে ভগবানের দর্শন পায়নি কথাটা কিছুক্ষণের মধ্যে রাজ্যময় প্রচার হয়ে গেলো।

আসলে কেউ ভগবানের দর্শন লাভ করেনি, শুধু অসতী মায়ের সন্তান বলে পরিচয় দিতে লজ্জা পেয়ে সবাই ভগবানের দর্শন লাভের কথা প্রচার করেছিলো।

বাড়ি আসার পথে মন্ত্রী রাজাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- “চিন্তা করবেন না মহারাজ। আসলে কেউ ভগবানের দর্শন লাভ করেনি। সবাই নিজের সন্মান রক্ষার জন্য ভগবানের দর্শন লাভ করার কথা বলেছিলো। আসলে ভগবানের দর্শন লাভ করা সম্ভবও ছিল না।কারণ সেখানে কোনো ভগবান ছিলই না। এটা ছিলো আমার মেয়ের কারসাজি। এভাবে বলে মন্ত্রী ভগবান দর্শনের প্রকৃত কাহিনী ব্যাখ্যা করে বললেন- মানুষ যে আসলে ভেড়ার পালের মতো, এখন নিশ্চয় আপনি এ কথার প্রমাণ পেলেন, মহারাজ?

রাজা বললেন- হ্যাঁ, নিশ্চয় পেয়েছি। তবে, আমার একটা অনুরোধ আছে, মন্ত্রী। আমি আপনার মেয়েকে আমার পুত্রবধূ হিসেবে পেতে চাই। আপনি এ ব্যাপারে কী বলেন?

মন্ত্রী হাসি মুখে রাজার প্রস্তাব সমর্থন করলেন- আপনার সাথে আত্মীয়তা করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব, মহারাজ। আমার মেয়ের জীবনও ধন্য হবে।

পরের দিন বিবাহের কথাবার্তা পাকা হলো এবং এক মাস পরে রাজপুত্র এবং মন্ত্রীর কন্যার শুভবিবাহ বেশ আড়ম্বরের সাথে সম্পন্ন হলো।   

উড়ো খবরে কেউ দিবেন না কান

             বুদ্ধির জোরে মন্ত্রী কন্যা রাখলো পিতার মান।।

সমাপ্ত

Scroll to Top