
মোগল সম্ৰাট
নিবেদন
বাবর ভারতবর্ষের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের বিস্ময়কর চরিত্র। বাবর ছিলেন ধৈর্য, সাহস, ত্যাগের মহিমায় মহিমামণ্ডিত এক বিস্ময়কর বিরল প্রতিভার অধিকারী। বাবরের জন্ম ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী। মাত্র এগার বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হয়েছিলেন; তবে নিজের প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের বলে তিনি সকল বাধা-বিপত্তি, দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা-বঞ্চনার সুউচ্চ পর্বত ডিঙিয়ে দেশের পরে দেশ জয় করে ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইংরাজি ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল পানীপত নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীকে পরাস্ত করে তিনি ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত নির্মাণ করেছিলেন এবং ২৭ এপ্রিলে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। মাত্র চার বছর তিনি ভারতবর্ষের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই চার বছরেই তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বরে তিনি এন্তেকাল করেছিলেন। তাঁর এস্তেকালের পরে তিনশত বছরের চেয়েও অধিককাল তাঁর উত্তরসূরীরা ভারতবর্ষে রাজত্ব করেছেন।
বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ূন মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তিনি মাত্র একটা দশক রাজত্ব করার পর আফগান নেতা শেরশাহ সুরির হাতে পরাস্ত হয়ে সাম্রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। শেরশাহ সুরির মৃত্যুর পর হুমায়ূন শেরশাহ সুরির উত্তরসূরি সিকান্দার সুরিকে পরাস্ত করে মোগল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন। সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার পরেই আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করার জন্য তিনি সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনের বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি শুধু পূর্বের কান্দাহার, কাবুল, পঞ্জাব, দিল্লী এবং আগ্রা নিজের দখলে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
হুমায়ুনের মৃত্যুর পর মাত্র তেরো বছর বয়সে আকবর মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। আকবর ১৫৫৬ সালে সংঘটিত পানিপতের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে আগ্রা এবং দিল্লীতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছিলেন। আকবর ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে ভারতের প্রায় সকল অঞ্চল এবং জাতিকে প্রশাসনের সাথে যুক্ত করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর একটি বিশাল, সুদৃঢ় সাম্রাজ্য লাভ করেছিলেন। তাঁর পুত্র শাহ জাহানের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য উন্নতির চরম শিখরে উপনীত হয়েছিলো। ছাহ জাহানের রাজত্বকালকে মোগল ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়। ছাহ জাহান সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের চেয়ে স্থাপত্যের দিকে অধিক মনোনিবেশ করেছিলেন। ওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে মোগল যুগের সকল অভিলেখ ভঙ্গ করেছিলো এবং পতনও শুরু হয়েছিলো। যদুনাথ সরকারের মতে, আওরঙ্গজেবের ইতিহাস মানেই ভারতের ইতিহাসের ৬০ বছর। আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় গোঁড়ামী, রাজপুত নীতি, সন্দেহজনক মনোভাব, দেওলীয়া অর্থনৈতিক অবস্থা, উত্তরাধিকার আইনের অভাব তথা দুর্বল উত্তরাধিকারীর জন্য মোগল সাম্রাজের পতন হয়েছিলো বলে অনুমান করা হয়।
মহম্মদ শাহের রজত্বকালে আহমদ শাহ দুররানির ভারত আক্রমণে মোগল সাম্রাজ্যের পতন সুনিশ্চিত করেছিলো। ‘হিস্টরী অফ বেঙ্গল এর মতে ১৭৫৭ সালের ২৩ মার্চ ভারতের মধ্যযুগের অন্ত এবং আধুনিক যুগ শুরু হয়েছিলো। সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পরে মোগল সভ্যতা ব্যবহৃত বন্দুকের গুলি মতো হয়ে পড়েছিলো। সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা অস্থির এবং দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। জনসাধারণ দরিদ্র এবং অজ্ঞ হয়ে পড়েছিলো। স্বার্থপর, অহংকারী এবং অদক্ষ শাসকশ্রেণীর উত্থান হয়েছিলো। সেনাবাহিনী বিশৃংখল হয়ে পড়েছিলো। ধর্ম পাপী এবং মূর্খের হাতে বন্দি হয়েছিলো।
আমরা সর্বমোট ২৩ জন মোগল সম্রাট দেখতে পাই। এঁদের মধ্যে শাহরিয়ার মির্জা, নিকুসিয়ার, মহম্মদ ইব্রাহীমকে সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি। শাহরিয়ার মির্জা, রফি-উদ-দারজাত, রফি-উদ-দৌলা, মাহমুদ শাহ বাহাদুর (শাহ জাহান-চতুর্থ) এবং মহম্মদ ইব্রাহীম তিন মাস অথবা তার চেয়েও কম সময় রাজত্ব করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের পরবর্তী সম্রাট আজম শাহ রাজত্ব করেছিলেন মাত্র এগার মাস। অর্বাচীন কালে মোগলদের বিদেশী আক্রমণকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। ‘বাবরের আওলাদ’ বলে মুসলমানদের ভর্ৎসনা করা হয়। তবে, নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করলে দেখা যায় যে, মোগল সম্রাটদের বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের কথা কল্পনা করা যায় না। সেজন্য আমরা নিরপেক্ষভাবে মোগল সম্রাটদের বিশ্লেষণ করাটা প্রাসংঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
আমি প্রকৃতার্থে অসমীয়া ভাষায় লেখা-পড়া শিখেছি। সেজন্য বাংলা ভাষার জ্ঞান আমার খুবই সীমিত। তাই সদাশয় পাঠক গ্রন্থটিতে রয়ে যাওয়া ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করে গ্রন্থটি গ্রহণ করলে আমার শ্রম সার্থক হবে। পরবর্তী সংস্করণে ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করার প্রতিশ্রুতি রইল।
বিনীত
আবুল হোসেইন
সাকিন- যতিগাঁও
ডাকঘর- জাহোর পাম-৭৮১৩১৪
জেলা- বরপেটা, আসাম (ভারত)
সূচীপত্র
জহির-উদ-দীন মহম্মদ বাবর-
নাসির-উদ-দীন মহম্মদ হুমায়ুন-
মহামতি আকবর-
জাহাঙ্গীর-
শাহরিয়ার মির্জা-
শাহ জাহান-
আওরঙ্গজেব-
আজম শাহ-
বাহাদুর শাহ-প্রথম-
জাহান্দার শাহ-
নিকু সিয়ার-
ফারুখসিয়ার-
রফি-উদ-দারজাত
শাহ জাহান- দ্বিতীয়-
মহম্মদ ইব্রাহীম-
মহম্মদ শাহ-
আহমদ শাহ বাহাদুর-
আলমগীর-দ্বিতীয়-
শাহ জাহান-তৃতীয়-
শাহ আলম-দ্বিতীয়-
মাহমুদ শাহ বাহাদুর-
আকবর-দ্বিতীয়-
বাহাদুর শাহ জাফর-
মোগল সম্রাট জহির–উদ্–দীন মহম্মদ বাবর
বাবরের জন্ম ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাইমুরিদ সাম্রাজ্যের আন্দিজান-এ। তাঁর সম্পূর্ণ নাম মির্জা জহির উদ্- দীন মহম্মদ। জহির-উদ্-দীন-এর আরবী অর্থ “বিশ্বাসের রক্ষক’। নামটি তাঁর পিতার আধ্যাত্মিক গুরু খাজা আহরার রেখেছিলেন। মধ্য এশিয়ার তুর্কি-মঙ্গোলদের উচ্চারণে অসুবিধার জন্য তাঁকে সবাই বাবর উপনামে সম্বোধন করতেন। বাবর নামটি পার্সিয়ান শব্দ বাবুর থেকে আনা হয়েছিলো। বাবর শব্দের অর্থ বাঘ। তাঁর পিতার নাম মির্জা ওমর শেখ এবং মাতৃর নাম কুতলুগ নিগার বেগম। তিনি ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি পিতৃ এবং মাতৃর তরফ থেকে যথাক্রমে টাইমূর এবং চেঙ্গিস খাঁর উত্তর পুরুষ। বাবরের মাতৃ মোগলিস্থানের শাসক চেঙ্গিস খাঁর বংশধর ইউনিস খাঁর কন্যা ছিলেন। মৃত্যুর পরে বাবরের নাম দেওয়া হয়েছিলো ‘স্বর্গের বাসিন্দা’।
বাবর চাগতাই তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং ফারগানা উপত্যকার আন্দিজানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ফারগানা বর্তমান উজবেকিস্থান নামে পরিচিত। বাবর মির্জা ওমর শেখ(১৪৬৯-১৪৯৪)এর জ্যেষ্ঠপুত্র এবং তৈমূর(১৩৩৬-১৪০৫)এর পরনাতি ছিলেন। তিনি মঙ্গোল তুর্কি বংশোদ্ভব বরলস উপজাতির অন্তর্গত ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষ শতাব্দী পূর্বে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং তাঁরা তুর্কিস্থান ও খোরাসানের অধিবাসী ছিলেন। বাবর চাঘটাই ভাষা ছাড়াও অভিজাতদের ভাষা ফার্সি ভাষায় সমানে সাবলীল ছিলেন। বাবর যদিও মঙ্গোল তুর্কি বংশোদ্ভব ছিলেন, তিনি তুর্কি এবং মধ্য এশিয়ার জনগণের কাছ থেকে বেশি সমর্থন পেয়েছিলেন। তাঁর সেনাবাহিনী জাতিগত গঠনে বৈচিত্রময় ছিলো। বাবরের সেনা বাহিনীতে পার্সিয়ান (বাবরের নিকট সার্টস এবং তাজিক নামে পরিচিত), নৃতাত্ত্বিক আফগান এবং আরবীয়-এর পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার বরলস এবং চাঘটাই তুর্কি মঙ্গোলরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বাবরের পিতা মির্জা ওমর শেখ কবুতরের খাঁচা থেকে একটি কবুতর হাতে নিয়ে আদর করে উড়িয়ে দেওয়ার সময় খাঁচা ভেঙ্গে নদীতে পড়ে গিয়ে ১৪৯৪ সালে মারা গিয়েছিলেন। কবুতরের খাঁচাটি প্রাসাদের নিচে নদীর পাড়ে দুর্বলভাবে নির্মিত ছিলো। তাই কবুতরটি উড়িয়ে দেওয়ার সময় যে ঝটকা লেগেছিলো, সেই ঝটকায় খাঁচাটি ভেঙ্গে নদীতে পড়ে গিয়েছিলো। তখন বাবরের বয়স ছিলো মাত্র এগার বছর। পিতার মৃত্যুর পরে মাত্র এগার বছর বয়সে তিনি ফারগানার শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তখন তাঁর দুই চাচা পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে রাজত্ব করছিলেন। তাঁরা বাবরের পিতার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন। তাই বাবরের দুই চাচা এবং একদল অভিজাত লোক বাবরের সৎ ভাই মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। তবে, বাবর তাঁর নানী এহসান দৌলত বেগমের সাহায্যে ষড়যন্ত্রকারীদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।।
সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার দুই বছর পরে ১৪৯৭ সালে বাবর সাত মাস যাবত সমরকন্দ অবরোধ করে রেখেছিলেন এবং সমরকন্দ দখল করেছিলেন। তখন বাবরের বয়স ছিলো মাত্র পনের বছর। পনের বছর বয়সে সমরকন্দ দখল করাটা ছিলো বিশাল কৃতিত্বের ব্যাপার। বাবর সমরকন্দ দখল করার পরে কিছু সংখ্যক সেনা তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলো। তবুও বাবর অনেকদিন সমরকন্দ নিজের দখলে রেখেছিলেন। সমরকন্দে থাকাকালীন তিনি গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেই সুযোগে প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁর সৎ ভাই মির্জা জাহাঙ্গীরকে ফারগানার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। ফারগানা সমরকন্দ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিলো। তিনি ফারগানা পুনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হওয়ার সময়ে একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে সমরকন্দের দখল চলে গিয়েছিলো। এদিকে তিনি ফারগানা অধিকার করতেও ব্যর্থ হয়েছিলেন।
ফারগানা অধিকার করতে ব্যর্থ হয়ে বাবর তিন বছরের জন্য শক্তিশালী সেনা বাহিনী গঠনে মনোনিবেশ করেছিলেন। সেনা বাহিনীতে বদ খসার তাজিকদের বিশেষভাবে নিয়োগ করা হয়েছিলো। সেনা বাহিনী গঠনের পরে তিনি সমরকন্দ অবরোধ করে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দখল করেছিলেন যদিও ১৫০১ সালে সংঘটিত যুদ্ধে তিনি উজবেক মহম্মদ শৈবানি খাঁর হাতে পরাস্ত হয়ে দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তখন শৈবানি খাঁ দুর্গ আক্রমণ না করে অবরোধ করে রেখেছিলেন। অবরোধের ফলে বাবর প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষেরে সন্মুখীন হয়েছিলেন। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, যে তিনি তাঁর বোন খানজাদা বেগমকে শৈবানি খাঁর সাথে বিয়ে দিয়ে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং বোনের বিয়ের পরে তাঁকে তাঁর সেনা বাহিনীসহ নিরাপদে শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি প্রদান করা হয়েছিলো।
বাবর ১০০ দিন সমরকন্দে ছিলেন এবং স্বপ্নের শহর সমরকন্দ হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে সমরকন্দ হারানোর বেদনা তিনি মনের মধ্যে পোষে রেখেছিলেন। এমনকি ভারতবর্ষ বিজয়ের পরেও তিনি সমরকন্দ হারানোর বেদনা ভুলতে পারেননি।
সমরকন্দ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাবর পুনরায় ফারগানা দখলের চেষ্টা করেছিলেন, তবে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফারগানা দখল করতে ব্যর্থ হয়ে তিনি তাঁর মামা সুলতান মহম্মদ খাঁ শাসিত তাসকন্দে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু সেখানে তাঁর মামা তাঁকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে অবজ্ঞার চোখে দেখেছিলেন। এ বিষয়ে বাবর লিখেছেন, ‘তাসকন্দে অবস্থান কালে আমি অনেক দারিদ্র এবং অপমান সহ্য করেছি। কিন্তু কেউ আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি।’ আশ্রয়হীন এবং নির্বাসিত হয়ে তিনি অনুসারিদের একটি ছোট দল নিয়ে পাহাড়ি উপজাতির কৃষকদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
কিছুদিন পরে বাবর ফারগানা পুনরুদ্ধারের সমস্ত আশা ত্যাগ করে ১৫০২ সালে ভাগ্যের অন্বেষণে বের হন।
তখন কাবুল ও গজনীর টাইমূরীয় শাসক ছিলেন তাঁর মামা মির্জা উলুগ বেগ-দ্বিতীয়। তিনি শিশু সন্তান আব্দুর রাজ্জাককে রেখে ১৫০১ সালে মৃত্যু বরণ করেছিলেন। শিশু আব্দুর রাজ্জাকের হয়ে তাঁর মন্ত্রী শিরিম জিকির ক্ষমতা হস্তগত করেছিলেন। তবে, মহম্মদ কাশিম বেগ এবং ইউনিস আলীর নেতৃত্বে শিরিম জিকিরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো। ফলে এই অঞ্চলে তখন অরাজকতা বিরাজ করছিলো। এই সুযোগে ধুল-নুন বেগ আরঘুনের পুত্র মুকিন বেগ কাবুলের সিংহাসন দখল করেছিলো। তবে, স্থানীয় জনগণ তাঁকে দখলকারীরূপে বিবেচনা করছিলেন এবং এর বিরোধিতা করছিলেন। এদিকে রাজ্য হারিয়ে আব্দুল রাজ্জাক মির্জা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে রাজধানী পুনরুদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এই সময়ে বাবর শৈবানি খাঁর হাত থেকে পালিয়ে ১৫০৪ সালে তুষারাবৃত হিন্দুকোশ পর্বতমালা অতিক্রম করে হিসারের শাসক খশ্রু শাহের অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। খশু শাহের অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় খশুর ভাইসহ খশুর সেবায় নিয়োজিত অন্যান্য মোগলরা বাবরের সাথে যোগদান করেন। বাবর তখন নিজের বাহিনী নিয়ে কাবুলের দিকে অগ্রসর হয়ে কাবুল অবরোধ করেন। অবরোধের ফলে মুকিন বেগ কাবুল ছেড়ে দিয়ে কান্দাহারে পিছু হটতে বাধ্য হয়। বাবর কাবুল এবং গজনী অঞ্চল নিয়ে একটি নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন সাম্রাজ্য তাঁকে উজবেক সমস্যা থেকে অবসর দিয়েছিলো এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি নতুন রাজ্যটিকে একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাবর ১৫২৬ সাল পর্যন্ত কাবুল শাসন করেছিলেন।
বাবর হেরাতের সুলতান এবং তাঁর দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় মির্জা হোসেন বায়কারার সাথে মিলিত হয়ে উভয়ের শত্রু উজবেক শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। তবে, ১৫০৬ সালে হোসেন বায়কারা মারা যান এবং তাঁর দুই পুত্র মুজাফ্ফর ও বদি-উদ-জামান শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুকতা প্রকাশ করেন। তাই বাবরের সেই অভিযান সফল হয়নি। তবে, তিনি দুই ভ্রাতৃর আমন্ত্রণক্রমে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হেরাতে ছিলেন। তখন হেরাত ছিলো প্রাচ্যের মুসলিম বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী। তিনি হেরাতের পাপকর্ম ও বিলাসিতা দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন। তবে তিনি হেরাতের লোকদের বুদ্ধিবৃত্তি এবং প্রাচুর্য দেখে বিস্মিতও হয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, হেরাত পণ্ডিত পুরুষে পরিপূর্ণ। তিনি সেখানে চাগতাই কবি আলীশের নবাইর কাজের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। আলীশের নবাই চাগতাই ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য উৎসাহিত করতেন। চাগতাই ভাষার প্রতি আলীশের নবাইর দক্ষতা দেখেই সম্ভবত তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় চাগতাই ভাষা প্রয়োগের জন্য প্রভাবিত হয়েছিলেন।
বাবর দুই মাস যাবত হেরাতে অবস্থান করার পর কাবুল চলে এসেছিলেন। তিনি কাবুল চলে আসার পরে উজবেক শৈবানি খাঁ হেরাত আক্রমণ করেছিলেন। দুই ভ্রাতৃ মুজাফ্ফর ও বদি-উদ্-জামান শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গঢ়ে তুলতে না পেরে হেরাত ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন। শৈবানি খাঁ হেরাত দখলের পরে তৈমুরীয় রাজবংশের মধ্যে একমাত্র বাবরই তৈমূরীয় শাসক। শৈবানি খাঁ পশ্চিমের দিকে আক্রমণ প্রসারিত করার ফলে অনেক রাজপুত্র পালিয়ে এসে বাবরের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। তখন বাবর তৈমুরীয়দের মধ্যে বাদশাহ উপাধি গ্রহণ করেন। তবে উপাধিটি নগণ্য ছিলো। কারণ বাবরের অধিকাংশ পৈতৃক ভূমি তখনও শত্রুর দখলে ছিলো। এদিকে শৈবানি খাঁ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো এবং বাবর নিজেও কাবুলে বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবে বাবর কাবুলের সাম্ভাব্য বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুই বছর পরে আবার নেতৃস্থানীয় বেগদের বিদ্রোহের ফলে তাঁকে কাবুল থেকে সাময়িকভাবে বিতাড়িত হতে হয়। তখন খুব কম সংখ্যক সঙ্গী নিয়ে বাবর পালিয়ে যান এবং অতি শীঘ্রই তিনি কাবুল ফিরে এসে কাবুল দখল করেন ও বিদ্রোহীদের আনুগত্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হোন। ১৫১০ সালে পারস্যের শিয়া সাফাভিদ শাহ ইসমাইল প্রথম-এর হাতে শৈবানি খাঁ পরাজিত এবং নিহত হয়।
এই সুযোগে বাবর এবং অন্যান্য তৈমূরীয়রা তাঁদের হৃত পৈতৃক অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধারের জন্য যত্নপর হয়। পরের বছরগুলিতে বাবর এবং শাহ ইসমাইল-প্রথম মিলে মধ্য এশিয়ার অঞ্চলগুলির কিছু অংশ দখলের জন্য উদ্যোগ নেন। সাফাভিদদেরকে বাবর নিজে এবং তাঁর অনুগামীদের অধিপতি হিসাবে মেনে নেন। ১৫১৩ সালে ইসমাইল-প্রথম-এর ভ্রাতৃ নাসির মির্জাকে কাবুলের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে বাবর সমরকন্দ অবরোধ করে তৃতীয় বারের জন্য সমরকন্দ দখল করেন এবং পরে তিনি বুখারাও দখল করেন, তবে উজবেকদের হাতে তিনি আবার উভয় স্থানের দখল হারাতে হয়।
শৈবানি খাঁ নিহত হওয়ার পরে বাবরের ভগ্নী খানজাদা বেগম শাহ ইসমাইল-প্রথম এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এই সময়ে শাহ ইসমাইল-১ তাঁকে তাঁর বোন খানজাদা বেগমের সাথে পুনর্মিলন করিয়ে দেন। তিন বছর পরে অর্থাৎ ১৫১৪ সালে বাবর আবার কাবুল ফিরে আসেন। এর পরের এগার বছর তিনি বিশেষত পূর্ব পার্বত্য অঞ্চল ব্যাপী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি আফগান উপজাতি, আত্মীয়, অভিজাতদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হয়। এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ সময়গুলিতে তিনি তাঁর সেনাবহিনীকে আধুনিকীকরণ এবং প্রশিক্ষণ প্রদানে ব্যস্ত ছিলেন।
সাফাভিদ রাজবংশ ১৫০১ সাল থেকে ১৭৩৬ সাল পর্যন্ত ইরানে রাজত্ব করছিলেন। সাফাভিদ শাসক নজম-ই-সানি মধ্য এশিয়ায় অনেক বেসামরিক লোকদের হত্যা করেছিলো। তখন সাফাভিদ সেনা এবং উজবেকদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে নজম-ই-সানি বাবরের সহায়তা খুঁজেছিলেন। তবে বাবর তা অস্বীকার করেছিলেন এবং নজম-ই-সানিকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাবরের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে নজম-ই-সানি উবায়দুল্যা খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। ১৫১২ খ্রীষ্টাব্দে সংঘটিত গজদেওয়ানের সেই যুদ্ধে নজম-ই-সানি উজবেক যুদ্ধবাজ উবায়দুল্ল্যা খাঁর কাছে পরাজিত হয়।
অটোম্যানদের সাথে বাবরের প্রাথমিক সম্পর্ক খারাপ ছিলো। কারণ অটোমান সুলতান সেলিম-১ বাবরের প্রতিদ্বন্দ্বী উবায়দুল্ল্যা খাঁকে শক্তিশালী ম্যাচলক (বারূদ সহযোগে প্রস্তুত এক প্রকার যুদ্ধাস্ত্র।) এবং কামান সরবরাহ করেছিলেন। তাই ১৫০৭ সালে যখন সুলতান সেলিম-১কে বাবরের বৈধ অভিভাবক হিসাবে মেনে নেওয়ার জন্য আদেশ প্রদান করা হয়েছিলো তখন বাবর তা অস্বীকার করেছিলেন এবং গজদেওয়ানের যুদ্ধে উবায়দুল্যা খাঁর বিরুদ্ধে কিজিলবাশ সেনাদের সহায় করেছিলেন। বাবর সাফাভিদদের সাথে যোগদান করতে পারে এই ভয়ে সেলিম প্রথম ১৫১৩ সালে আবার বাবরের সাথে বন্ধুত্ব গঢ়ে তুলেছিলেন। বন্ধুত্বের চিহ্নস্বরূপ সেলিম-১ বাবরকে যুদ্ধে সহায়তার জন্য ওস্তাদ আলীকুলি এবং ম্যাচলক ম্যান মোস্তফা রুমি এবং আরও অনেকজন অটোমান তুর্কিকে প্রেরণ করেছিলেন। এই সহায়তার পরে অটোমান-মোগল সম্পর্কের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছিলো। তাঁদের কাছ থেকে বাবর শুধু যুদ্ধের ক্ষেত্রেই সহায়তা নেননি, ম্যাচলক এবং কামান পরিচালনার জ্ঞানও আহরণ করেছিলেন। এই জ্ঞান আহরণের ফলে তাঁর হিন্দুস্থান বিজয়ের পথ সুগম হয়েছিলো।
8বাবর তখন উজবেকদের হাত থেকে পালাতে চেয়েছিলেন এবং বদখসাঁর পরিবর্তে হিন্দুস্থানকে আশ্রয়স্থল হিসাবে বেচে নিয়েছিলেন। বদখসাঁ কাবুল থেকে উত্তর দিকে অবস্থিত ছিলো। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন- উজবেকদের শক্তি এবং ক্ষমতার জন্য আমাদের নিজেদের জন্য কিছু নিরাপদ স্থানের কথা চিন্তা করতে হয়েছিলো। সংকটময় এবং খারাপ সময়ে যাতে শক্তিশালী শত্রু এবং আমাদের মধ্যে এক নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকে, এই চিন্তা করেই বাবর হিন্দুস্থানকে আশ্রয়স্থল হিসাবে বেচে নিয়েছিলেন।।
তৃতীয় বারের জন্য সমরকন্দ হারানোর পরেই বাবর হিন্দুস্থান বিজয়ের জন্য মনোনিবেশ করেছিলেন এবং অভিযান শুরু করেছিলেন। অবশ্যে এর আগেও পার্বত্য রাজ্য কাবুলে রাজস্ব কম হওয়ার জন্য ১৫০৫ সালে বাবর প্রথম ভারতবর্ষ অভিযানের কথা চিন্তা করেছিলেন এবং খাইবার গিরিপথ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলেন। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘হিন্দুস্থান বিজয়ের আকাঙ্খা আমার অনেকদিন থেকেই ছিলো। সেটা ছিলো শাবান মাস, সূর্য কুম্ভরাশিতে ছিলো, আমরা কাবুল থেকে হিন্দুস্থান অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিলাম। সেটা খাইবার গিরিপথে এটি একটি সংক্ষিপ্ত অভিযান ছিলো।
১৫১৯ সালে বাবর হিন্দুস্থান অভিযানের উদ্যোগ নিয়ে বর্তমান পাকিস্থানে অবস্থিত চেনাব নদী পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলেন। ১৫২৪ সাল পর্যন্ত বাবরের লক্ষ্য ছিলো পঞ্জাব পর্যন্ত তাঁর শাসন সম্প্রসারণ করা। কারণ পঞ্জাব পর্যন্ত এক সময় তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুরের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই সময় উত্তর ভারতের কিছু অংশ দিল্লীর সুলতানের অধীনে ছিলো। লোডী রাজবংশের ইব্রাহীম লোডী সেখানে শাসন করছিলেন। তবে, ইব্রাহীম লোডীর স্বেচ্ছাচারিতার ফলে অনেকে ইব্রাহীম লোডীর সঙ্গ ত্যাগ করে যাওয়ার ফলে লোডী সাম্রাজ্য তখন প্রায় ভেঙে পরার উপক্রম হয়েছিলো। চেনাব নদী পর্যন্ত আসার পরে পঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁ লোডী এবং ইব্রাহীমের চাচা আলা-উদ-দীনের কাছ থেকে তিনি ভারত আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ পান। তখন সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকার দাবি করে বাবর ইব্রাহীম লোডীর নিকট দূত প্রেরণ করেন। তবে দূতকে পঞ্জাবের লাহোরে আটক করে রাখা হয়। কয়েকমাস পরে অবশ্যে দূতকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিলো। ১৫২৪ সালে বাবর লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তবে তিনি দেখতে পান যে, ইব্রাহীম লোডীর প্রেরিত বাহিনী দ্বারা দৌলত খাঁ লোডীকে ইতিমধ্যে বিতাড়ন করা হয়েছে। বাবর লাহোরে পৌঁছোলে লোডী বাহিনী তাঁদের আক্রমণ করে এবং বাবর সেনা পরাজিত হয়। এর জবাবে বাবর লাহোর জ্বালিয়ে দিয়ে বাহিনী নিয়ে দিবলপুর অভিমুখে যাত্রা করেন। যাওয়ার সময় বাবর লোডীর একজন চাচা আলম খাঁকে লাহোরের শাসক নিযুক্ত করে যান। তবে আলম খাঁ দ্রুত ক্ষমতাচ্যূত হয়ে কাবুল পালিয়ে যান। জবাবে, বাবর আলম খাঁকে সৈন্য সরবরাহ করেন এবং উক্ত বাহিনী দৌলত খাঁ লোডীর সাথে সংযুক্ত হয়ে আলম খাঁর নেতৃত্বে ৩০,০০০ সৈন্য নিয়ে ইব্রাহীম লোডীকে দিল্লীতে অবরোধ করেন। ইব্রাহীম লোডী সহজেই আলম খাঁকে পরাজিত করে দিল্লী থেকে বিতাড়ন করেন। তখন বাবর উপলব্ধি করেন যে ইব্রাহীম লোডী সহজে তাঁকে পঞ্জাৱ দখল করতে দিবেন না।
পানীপতের যুদ্ধ– ১৫২৫ সালের নভেম্বর মাসে বাবর পেশোয়ারে খবর পান যে, দৌলত খাঁ লোডী পক্ষ পরিবর্তন করেছেন এবং আলা-উদ-দীনকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। খবর পেয়ে বাবর দৌলত খাঁ লোডীকে বাধা প্রদানের জন্য লাহোর অভিমুখে রওয়ানা হোন। বারকে দেখেই দৌলত খাঁ লোডী আত্মসমর্পণ করেন এবং বাবর তাঁকে ক্ষমা করে দেন। এভাবে সিন্ধু নদী পার হওয়ার পরে তিন সপ্তাহের মধ্যে বাবর পঞ্জাবের শাসনকর্তা হয়ে পড়েন।
বাবর সিরহিন্দ হয়ে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হোন এবং তিনি ১৫২৬ সালের ২০ এপ্রিল পানীপত পৌঁছোন। সেখানে তিনি ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সৈন্য এবং একশত হাতীর সন্মুখীন হোন। ২৩ এপ্রিল চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। বাবর তুলুগমা যুদ্ধ (তুলুগমা যুদ্ধ পদ্ধতিতে সেনা বাহিনী বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে শত্রুপক্ষকে ঘিরে ধরে) কৌশল অবলম্বন করে ইব্রাহীম লোডীর সেনাদের ঘিরে ধরেন এবং লোডী সেনাদের সরাসরি কামানের সন্মুখে আসতে বাধ্য করেন। কামানের প্রচণ্ড শব্দে হাতীগুলি ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় এবং বাবর যুদ্ধে জয়লাভ করেন। উক্ত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডী নিহত হোন এবং লোডী সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
পানীপত যুদ্ধে বিজয় সম্পর্কে বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন- সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমতে কঠিন কাজটি সহজ হয়ে গিয়েছিলো এবং শক্তিশালী লোডী বাহিনী দেড় দিনের ব্যবধানে ধূলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিলো।
যুদ্ধ বিজয়ের পরে বাবর দিল্লী এবং আগ্রা দখল করে সিংহাসনে আরোহণ করে হিন্দুস্থানে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। উত্তর ভারতের শাসক হওয়ার পূর্বে তাঁকে রাণা সাঙ্গার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতিহত করতে হয়েছিলো।
খানওয়ার যুদ্ধ– মেওয়ারের শাসক রাণা সাঙ্গা এবং বাবরের সাথে ১৫২৭ সালের ১৬ মার্চ খানওয়া নামক স্থানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। রাণা সাঙ্গা বাবরকে বিদেশী শাসক মনে করেছিলেন এবং তাঁকে উৎখাত করে দিল্লী এবং আগ্রাকে সংযুক্ত করে রাজপূত অঞ্চলগুলির সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। রাণা সাঙ্গা এই ক্ষেত্রে আফগান প্রধানদের দ্বারা সমর্থিত হয়েছিলেন। কারণ আফগান প্রধানরা বাবর তাঁর অঙ্গীকার পূরণ না করে তাঁদের সাথে প্রতারণা করেছেন বলে ভেবেছিলেন। রাণা সাঙ্গা আগ্রা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার খবর পেয়ে বাবর প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করে পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিলেন। কে, ভি কৃষ্ণ রাওয়ের মতে উচ্চতর সৈন্য পরিচালনা এবং আধুনিক রণ কৌশলের জন্য বাবর যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। এই যুদ্ধে প্রথম কামান এবং মাস্কেট(দীঘল নলের খাঁজা বন্দুক) ব্যবহার করা হয়েছিলো। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, রাণা সাঙ্গা বিশ্বাসঘাতকতারও সম্মুখীন হয়েছিলেন। হিন্দু সেনা প্রধান শিলহাদি ৬,০০০ সেনা নিয়ে বাবরের পক্ষে যোগদান করেছিলেন।
বাবর রাণা সাঙ্গার দক্ষতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তাঁকে তদানীন্তন ভারতীয় দুইজন সর্বশ্রেষ্ঠ অমুসলিম শাসকের একজন বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যজন শাসক ছিলেন বিজয় নগরের শাসক কৃষ্ণদেব রায়।
চান্দেরীর যুদ্ধ– খানওয়ারের যুদ্ধের কয়েক মাস পরে চান্দেরীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। রাণা সাঙ্গা বাবরের বিরুদ্ধে পুনরবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এই খবর পেয়ে বাবর রাণা সাঙ্গাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য রাণার কট্টর সমর্থক মালওয়ারের শাসক মেদিনী রাওকে আগে পরাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রাণা সাঙ্গার অধীনস্থ বেশির ভাগ অঞ্চলে তখন মেদিনী রাও শাসন করছিলেন। মেদিনী রাও প্রতিহার রাজপুতদের চান্দেরী শাখার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মেদিনী রাওয়ের রাজধানী ছিলো চান্দেরী। বাবর চান্দেরী পৌঁছোনের পরে ১৫২৮ সালের ২০ জানুয়ারি মেদিনী রাওকে চান্দেরীর বিনিময়ে শমসাবাদ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে মেদিনী রাও সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। তাই চান্দেরীর বাইরের দুর্গটি বাবর সেনা রাতে দখল করে এবং দিনের বেলা উপরের দুর্গটি দখল করে। বাবর নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে, উপরের দূর্গটি দখল করতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লেগেছিলো। মেদিনী রাও জহরের ব্যবস্থা করেছিলেন, যা পান করে দূর্গের মধ্যে নারী এবং শিশুরা আত্মহত্যা করেছিলো। অল্প সংখ্যক সৈন্য দুর্গের মধ্যে সমবেত হয়ে সন্মিলিত আত্মহত্যায় একে অপরকে সহায় করেছিলো। এই আত্মহত্যা বাবরকে হয়তো তেমন প্রভাবিত করতে পারেননি, যার জন্য তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি শত্রুর জন্য একটুও প্রশংসা করেন নি।
ধর্মীয় নীতি– বাবর একটি চিঠিতে হুমায়ূনকে লিখেছিলেন- হে আমার পুত্র, হিন্দুস্থান বিভিন্ন ধর্মে পরিপূর্ণ। সকল প্রশংসা ঈশ্বরের জন্য যে তিনি আপনাকে এরূপ একটি সাম্রাজ্য দান করেছেন। আপনি সমস্ত ধর্মীয় গোঁড়ামী থেকে মুক্ত হয়ে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি ন্যায় বিচার করাটা উচিত হবে। গরু কোরাবানি থেকে বিরত থেকে হিন্দুস্থানের মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে। রাজকীয় অনুগ্রহ পেলে প্রজারা আপনার জন্য উৎসর্গকৃত হবে। সাম্রাজের অধীনস্থ প্রতিটি মন্দির এবং উপাসনালয়গুলি আপনি ক্ষতি করাটা উচিত হবে না। সবার প্রতি ন্যায় বিচার করলে শাসকও সুখী হবে এবং প্রজারাও সুখী থাকবে। ইসলামের অগ্রগতি রহমত(দয়া)-এর তরবারি দ্বারা হবে, অত্যাচারের তরবারি দ্বারা নয়। ১৫২৬ সালে বাবর ইব্রাহীম লোডীকে পরাজিত ও হত্যা করে দিল্লীর সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়ে মাত্র চার বছর শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর মৃত্যুর পরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। হুমায়ূনের সিংহাসন সাময়িকভাবে সূরি রাজবংশ দ্বারা দখল করা হয়েছিলো। হুমায়ূনের ৩০ বছরের শাসনকালে ধর্মীয় সংহিংসতা অব্যাহত ছিলো। ধর্মীয় সহিংসতা এবং অসহিষ্ণুতার কথা ষোল্ল শতকের শিখ সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে প্রাথমিক মোগল যুগের ধর্মীয় সহিংসতা আত্মদর্শনে অবদান রেখেছিলো এবং তারপর আত্মরক্ষার জন্য জঙ্গীবাদে রূপান্তর হয়েছিলো। বাবরের আত্মজীবনী বাবর নামা অনুসারে উত্তর পশ্চিম ভারতে হিন্দু, শিখের পাশাপাশি স্বধর্মত্যাগী (ইসলামের অ-সুন্নি মুসলিম)দের লক্ষ্য করে অনেক আক্রমণ সংঘটিত করা হয়েছিলো এবং অনেককে হত্যা করা হয়েছিলো। যেখানে মুসলিম শিবির ছিলো সেখানে পাহাড়ের উপর নাস্তিকদের খুলির স্তুপ তৈরি হয়েছিলো।
বাদশাহ আকবরের রাজত্ব কালে বাবরনামা অনুবাদ করার সময় অঙ্কন করা একটি চিত্রের বাইরে বাবরের শারীরিক গঠন সম্বন্ধে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাবরনামায় বাবর নিজে বর্ণনা করা মতে তিনি শরীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন। তিনি অভিযানের সময় নদী সাঁতরে পার হতেন। উত্তর ভারতে তিনি দু’বার গঙ্গা নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন।
প্রথমাবস্থায় বাবরের হিন্দুস্থানের ভাষা সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান ছিল না। তুর্কি ভাষায় রচিত তাঁর শায়েরি থেকে জানা যায় যে পরবর্তী জীবনে তাঁর হিন্দুস্থানী ভাষার শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছিলো।
ব্যক্তিগত জীবন– পিতৃর বিপরীতে বাবর সন্ত প্রকৃতির লোক ছিলেন এবং নারীর প্রতি তাঁর খুব বেশি আগ্রহ ছিলেন না। তাঁর প্রথম স্ত্রী আয়েশা সুলতানা বেগমের প্রতি তিনি লজ্জাশীল ছিলেন এবং পরে তিনি আয়েশা সুলতানার প্রতি আসক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। আয়েশা সুলতানা ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন। আয়েশা সুলতানার পিতৃর নাম ছিলেন সুলতান আহম্মদ মির্জা। আয়েশা সুলতানার মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ১৪৮৮ সালে বাবরের সাথে বিবাহের বাগদান করা হয়েছিলো এবং ১৪৯৮/১৪৯৯ সালে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তখন আয়েসা সুলতানার বয়স ছিলো এগার বছর এবং বাবরের পনের বছর। এই দম্পত্তির ১৫০০ সালে ফখরুন্নিসা নামক একটি কন্যা সন্তান জন্ম হয়েছিলো। কন্যা সন্তানটি মাত্র এক বছর বয়সে ১৫০১ সালে মারা গিয়েছিলো। তিন বছর পরে ফারগানায় বাবরের প্রথম পরাজয়ের পর আয়েশা সুলতানা বাবরকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ১৫০৪ সালে বাবর জয়নব সুলতানা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, তবে দুই বছর পরে নিঃসন্তান অবস্থায় জয়নব সুলতানা মারা গিয়েছিলেন। ১৫০৬ থেকে ১৫০৮ সালের মধ্যে বাবর চারটি বিয়ে করেছিলেন। ১৫০৬ সালে তিনি মাহম বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এর পরে মাসুমা সুলতানা বেগম, গুলরুখ বেগম এবং দিলদার আলাসা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মাহম বেগমের তরফ থেকে বাবরের চারটি সন্তান জন্ম হয়েছিলো তার মধ্যে একমাত্র জ্যেষ্ঠ সন্তান হুমায়ূন জীবিত ছিলেন। মাসুমা সুলতানা ১৫০৮ মতান্তরে ১৫১৯ সালে সন্তান প্রসবের সময় মারা গিয়েছিলেন। গুলরুখ বেগমের তরফ থেকে বাবরের দু’টি সন্তান ছিলো- মির্জা কামরান এবং মির্জা আকসারি। বাবরের ছোট ছেলে হিন্দালের মাতৃ ছিলেন দিলদার আলাসা বেগম। বাবর পরে ইউসূফজাই উপজাতির পাশতুন মহিলা মুবারকা ইউসূফজাইকে বিয়ে করেছিলেন। পারস্যের শাহ তালুমাস্প সাফাভিদ উপহার হিসাবে প্রদান করা সার্কাসিয়ান ক্রীতদাস গুলনার আগাছা এবং নারগুল আগাছাকে বাবর উপপত্নীর মর্যদা প্রদান করেছিলেন। উভয়ে রাজ পরিবারের মহিলা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
কাবুলে শাসনকালে বাবরের জন্য অপেক্ষাকৃত শান্তির সময় ছিলো। বাবর তখন সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প, সঙ্গীত এবং বাগান নির্মাণে মনোনিবেশ করেছিলেন। বাবর প্রথম জীবনে কখনও মদ্য পান করেননি। ত্রিশ বছর বয়সে কাবুলে থাকাকালীন তিনি প্রথম মদ্যপান করেছিলেন। এর পরে তিনি নিয়মিতভাবে মদ্যপান করতেন। তিনি মদ্যপান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত করতেন এবং আফিম থেকে তৈরি খাদ্য খেতে শুরু করেছিলেন। বাবর ধর্মীয় বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তবে তিনি সমসাময়িক কবির একটি কবিতার লাইনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন- ‘আমি মাতাল অফিসার, আমি শান্ত হলে আমাকে শাস্তি দাও।’ তিনি মৃত্যুর দুই বছর আগে খানওয়া যুদ্ধের পূর্বে স্বাস্থ্যগত কারণে মদ্যপান ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁর সভাসদদেরও এ কাজ করতে দাবি জানিয়ে ছিলেন। তবে তিনি মাদকদ্রব্য চর্বন বন্ধ করেন নি। মাদকদ্রব্য চর্বন করলেও তিনি কখনও অনুভূতি হারাননি। তিনি লিখেছেন-সবাই মদ্যপানের জন্য অনুশোচনা করেন এবং বর্জনের জন্য শপত গ্রহণ করেন এবং আমি শপত গ্রহণ করে আফসোস করেছি।
বাবর চিঙ্গিসিড আইন এবং রীতি অন্ধভাবে অনুকরণের বিরোধী ছিলেন। তিনি লিখেছেন- আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা চিঙ্গিসিড আইনের প্রতি অস্বাভাবিক সন্মান প্রদর্শন করতেন। তাঁরা কাউন্সিল, দরবার, ভোজ এবং নৈশভোজে উঠতে বসতে এই আইন লঙ্ঘন করেন নি। চেঙ্গিস খাঁর আইন কোনো পাঠ্যপুস্তকের নির্দ্ধারিত পাঠ নয় যে তা একজন ব্যক্তিকে অবশ্যেই অনুসরণ করতে হবে। পূর্বপুরুষরা যদি একটি ভাল রীতি ত্যাগ করে গিয়ে থাকেন, তাহলে তা অনুসরণ করা উচিত। তবে যদি খারাপ রীতি ত্যাগ করে গিয়ে থাকেন, তাহলে তার পরিবর্তে একটি ভালো রীতিকে প্রতিস্থাপন করাআবশ্যক। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর মতে শ্রেণীবদ্ধ পাঠ্য (উদাহরণ স্বরূপে কুরআন) চেঙ্গিস খানের ইয়াসাকে নৈতিক এবং আইনগতভাবে স্থানচ্যূত করেছে। ইয়াসা হলো চেঙ্গিস খাঁ কর্তৃক বুখারায় জনসম্মুখে ঘোষিত মঙ্গোলদের মৌখিক আইন৷
পরিবার-
আয়েশা সুলতানা বেগম- আয়েশা সুলতানা বেগম সমরকন্দ এবং বুখারার সুলতান মির্জা আহম্মদ সুলতানের কন্যা ছিলেন। আয়েশা সুলতানা জন্মগতভাবে তাইমুরীয় বংশজাত ছিলেন। তিনি আহম্মদ সুলতান মির্জার তৃতীয় সন্তান ছিলেন। ১৪৯৮-৯৯ সালে তিনি বাবরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৫০৩ সালে তাসকন্দে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিলো।
মাহম বেগম– মাহম বেগমের সাথে বাবর ১৫০৬ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মাহম বেগম ছিলেন। বাবরের তৃতীয় স্ত্রী। তিনি ১৫২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাবরের প্রধানা মহিষী ছিলেন। তিনি খোরাসনের সম্ভ্রান্ত পরিয়াল হোসেন আহম্মদ মির্জার কন্যা ছিলেন। ১৫৩৪ সালের ২৮ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি মোগল সাম্রাজের প্রথম বাদশাহ বেগম ছিলেন। তাঁর বিষয়ে গুলবদন বেগম হুমায়ূন নামায় বর্ণনা করেছেন।
জয়নব সুলতানা বেগম– জয়নব সুলতানা বেগমের সাথে বাবর ১৫০৪ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। জয়নব সুলতানা বেগম তাইমূর বংশীয় শাহজাদী ছিলেন এবং তাঁর পিতৃর নাম ছিলেন সুলতান মাহমুদ মির্জা। সুলতান মাহমুদ মির্জা বাবরের চাচা ছিলেন। বিয়ের ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে ১৫০৬-০৭ সালে নিংসন্তান অবস্থায় তিনি বসন্ত রোগে মারা গিয়েছিলেন।
মাসুমা সুলতানা বেগম– মাসুমা সুলতানার সাথে বাবর ১৫০৭ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি তাইমুর বংশীয় শাহজাদী ছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম ছিলেন সুলতান আহম্মদ মির্জা। বিয়ের এক বছর পরে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে তিনি মারা গিয়েছিলেন। কন্যা সন্তানটির নাম ছিলো গুলবদন বেগম। গুলবদন বেগম হুমায়ূন নামা রচনা করেছিলেন।
বিবি মুবারকা– বিবি মুবারকার সাথে বাবর ১৫১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি পাশতুন উপজাতির ইউসুফজাই শাখার দলপতি মালিক শাহ মনসুরের কন্যা ছিলেন। তিনি আকবরের শাসনকালের প্রথমাবস্থায় মারা গিয়েছিলেন। গুলবদন বেগম হুমায়ূন নামায় তাঁর নাম প্রসংগক্রমে উল্লেখ করেছেন।
গুলরুখ বেগম এবং দিলদার আগাচা বেগমের বিষয়ে বিশেষ কোথাও উল্লেখ নেই। গুলরুখ বেগমের দুই পুত্র। নাম ছিলো মির্জা কামরান ও মির্জা আকসারি। দিলদার আগাচা বেগমের একমাত্র সন্তানের নাম ছিলো মির্জা হিন্দাল । দিলদার আগাচা এবং নারগুল আগাচা বাবরের ‘সারকাশিয়ান’ উপপত্নী ছিলেন। সারকাশিয়ানরা কাঁকস ক্ষেত্রের আদিবাসী ছিলেন। তাঁরা চারকসী ভাষায় কথা বলতেন।
পুত্র সন্তান
হুমায়ূন– হুমায়ূন বাবরের জ্যেষ্ঠ সন্তান। মাতৃর নাম মাহম বেগম। তাঁর জন্ম ১৫০৮ সালে এবং মৃত্যু ১৫৫৬ সালে। বাবরের মৃত্যুর পরে তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
কামরান মির্জা– কামরান মির্জা বাবরের দ্বিতীয় সন্তান। তার মাতৃর নাম গুলরুখ বেগম। তাঁর জন্ম ১৫০৯ সালে এবং মৃত্যু ১৫৫৭ সালের ৫ অথবা মতান্তরে ৬ অক্টোবর।
মির্জা আকসারি– মির্জা আকসারির জন্ম ১৫১৬ সালে এবং মৃত্যু ১৫৫৭ সালের ৫ অক্টোবর। তার মাতৃর নাম গুলরুখ বেগম। তিনি হজ্বযাত্রার সময়ে মারা গিয়েছিলেন।
হিন্দাল মির্জা– হিন্দাল মির্জার মাতৃর নাম দিলদার আগাচা বেগম। হিন্দাল মির্জার জন্ম ১৯১৯ সালের ৪ মার্চ এবং মৃত্যু ১৫৫১ সালের ২০ নভেম্বর।
আহম্মদ মির্জা– গুলরুখ বেগমের পুত্র। যুবা অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
শাহ রুখ মির্জা–গুলরুখ বেগমের পুত্র। যুবা অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
বারবুল মির্জা-মাহম বেগমের পুত্র। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
আলওয়ার মির্জা– দিলদার বেগমের পুত্র। শৈশবে মারা গিয়েছিলো।
ফারুক মির্জা– মাহম বেগমের পুত্র। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
কন্যা সন্তান
ফখরুন্নিসা– আয়েশা সুলতানার সন্তান। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
আইসান দৌলত বেগম– মাহম বেগমের সন্তান। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
মেহেরজান বেগম– মাহম বেগমের সন্তান। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
মাসুমা সুলতানা বেগম– মাতৃ মাসুমা সুলতানা বেগমের নামেই তাঁর নাম রাখা হয়েছিলো। মাসুমা সুলতানার জন্ম ১৫০৮ সালে। হুমায়ুননামায় তাঁর বিষয়ে প্রসংগক্রমে উল্লেখ রয়েছে। তিনি মহম্মদ জামান মির্জার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মহম্মদ জামান মির্জা তাইমূর বংশীয় শাহজাদা ছিলেন। তিনি বাবর এবং হুমায়ূনের সৈন্যাধ্যক্ষ ছিলেন। মহম্মদ জামান মির্জার জন্ম ১৪৯৬ এবং মৃত্যু ১৫৩৯ সালে।
গুলজার বেগম– গুলরুখ বেগমের সন্তান। যুবা অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
গুলরুখ বেগম– গুলবার্গ বেগম নামেও পরিচিত। মাতৃর পরিচয় বিতর্কিত। দিলদার বেগম অথবা সালিহা বেগমও হতে পারে। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো খাজা হাসান নক্সবন্দীর পুত্র নুরুদ্দীন মহম্মদ মির্জার সাথে।
গুলবদন বেগম– গুলবদন বেগমের জন্ম ১৫২৩ সালে এবং মৃত্যু ১৬০৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। তাঁর মাতৃর নাম দিলদার বেগম। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো মোগলিস্থানের শাসক আইম্যান খাজা সুলতানের পুত্র খিজির খাজা খাঁর সাথে। তিনি তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময় কাবুলে কাটিয়েছিলেন। তাঁর ভাতিজা আকবরের আমন্ত্রণক্রমে তিনি ১৫৫৭ সালে রাজকীয় পরিবারে যোগদানের জন্য আগ্রায় এসেছিলেন। রাজকীয় পরিবারে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিলেন এবং তিনি প্রভূত সন্মানের অধিকারীও ছিলেন। আকবর এবং আকবরের মাতৃ হামিদা বেগমের অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী ছিলেন তিনি। আবুল ফজল রচিত সমগ্র আকবর নামা ব্যাপী গুলবদনের প্রসংগ খুঁজে পাওয়া যায়।
হুমায়ুন-নামার লেখিকা হিসাবে গুলবদন বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি তাঁর ভাতিজা সম্রাট আকবরের অনুরোধে হুমায়ুন- নামা লিখেছিলেন। তিনি হজ্বব্রত পালন করতে মক্কা গিয়েছিলেন। তিনি মক্কায় সাত বছর ছিলেন এবং ১৫৮২ সালে ভারতে ফিরে এসেছিলেন।
গুল চেহেরা বেগম– গুল চেহেরা বেগমের জন্ম ১৫১৫ সালে এবং মৃত্যু ১৫৫৭ সালে। তাঁর মাতৃর নাম দিলদার বেগম। তাঁর বিয়ে চৌদ্দ বছর বয়সে ১৫৩০ সালের শেষের দিকে চাঘটাল মোগল তুখটা বুঘা খাঁর সাথে হয়েছিলো। তবে ১৫৩৩ সালেই তিনি বিধবা হয়েছিলেন। ১৫৪৯ সাল পর্যন্ত তাঁর বিয়ের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। হুমায়ুন বলখ অভিযানে যাত্রা করার ঠিক আগে তিনি আব্বাস সুলতান উজবেকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ১৫৫৭ সালে ভারতে মারা গিয়েছিলেন।
গুলরঙ্গ বেগম– দিলদার বেগমের কন্যা। ১৫৩০ সালে তাঁর বিয়ে হয়েছিলো বাবরের মামাতো চাচা মোগলিস্থানের আহম্মদ আলাকের নবম সন্তান ইশান টাইমূর সুলতানের সাথে। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাবরের মৃত্যু– বাবর ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর-এ মৃত্যু বরণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ূন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বাবরকে প্রথমে আগ্রায় সমাধিস্থ করা হয়েছিলো এবং পরে ১৫৩৯ থেকে ১৫৪৪ সালের মধ্যে তাঁর ইচ্ছা অনুসারে মৃতদেহ কাবুলে স্থানান্তর করে ‘বাগ-ই-বাবর-এ পুনঃ সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
একজন তাইমুরীয় হিসাবে বাবর শুধু মাত্র পারস্য শিল্প-সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না, বরং তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে পারস্যের শিল্পনীতির প্রসারও ঘটিয়েছিলেন। তিনি ভারতে ইসলামিক, শৈল্পিক সাহিত্য এবং সামাজিক দিকগুলোতে তৈমুরীয় রেনেসাঁর উত্তরাধিকারী ছিলেন। এফ, লেহম্যান ইনসাইক্লোপেডিয়া ইরানিকাতে বলেছেন, তাঁর উৎপত্তি, পরিস্থিতি, প্রশিক্ষণ এবং সংস্কৃতি পারস্য সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত ছিলো, তাই বাবর এবং তাঁর বংশধরেরা ভারতে সেই সংস্কৃতি লালনপালনের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে পারস্যের উন্নত সাহিত্য, শৈল্পিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী ছিলেন।
প্রথম মোগল সম্রাট বাবরকে উজবেকিস্থানে জাতীয় বীর হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উজবেকিস্থানে ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাবরের ৫২৫ তম জন্ম বার্ষিকীর স্মরণে ডাক টিকিট জারি করা হয়েছিলো। বাবর রচিত অনেক শায়েরি জনপ্রিয় উজবেক লোকগীতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উজবেকিস্থানের জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী, গীতিকার, অভিনেতা শেরালি জোরায়েভ দ্বারা জনপ্রিয় করে তোলা হয়েছে। কিছু সূত্র দাবি করে যে, বাবর কিরঘিস্থানেও একজন জাতীয় বীর হিসাবে সমাদৃত। ২০০৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্থান সরকার বাবরের সন্মানে ক্ষেপনাস্ত্র নির্মাণ করেছে। শাহেনশাহ বাবর শিরোনামে ওজাহত মির্জা পরিচালিত একটি চলচ্চিত্র ১৯৪৪ সালে মুক্তি পেয়েছিলো। ১৯৬০ সালে হেমেন গুপ্তা পরিচালিত বাবরের জীবনীমূলক চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকায় গজানন জায়গিরদার অভিনয় করেছিলেন।
বাবরের জীবনের একটি বৈশিষ্ট ছিলো যে তিনি বাবর-নামা শিরোনামে একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রেখে গেছেন। হেনরি রেভারেজের উদ্ধৃতি দিয়ে স্ট্যানলি লেন-পুল লিখেছেন- বাবরের আত্মজীবনী সর্বকালের অমূল্য রেকর্ডগুলির একটি, যা সেণ্ট আগাস্টিন এবং রুশোর স্বীকারোক্তি এবং গিবন ও নিউটনের স্মৃতিকথার সাথে মানানসই।
বাবর তাঁর নিজের ভাষায় লিখেছেন, আমার সাক্ষ্যের সারাংশ এই যে, নিজের ভ্রাতৃদের বিরুদ্ধে কিছুই করবেন না, যদিও তাঁরা এটির উপযুক্ত হয়। এছাড়াও নতুন বছর, বসন্ত, মদ এবং প্রেয়সী আনন্দময়। বাবর আনন্দ কর, কারণ বিশ্ব আপনার জন্য দ্বিতীয়বার থাকবেনা।
বাবরি মসজিদ বিতর্ক-
অযোধ্যার বাবরি মসজিদ বাবরের অন্যতম সেনাপতি মীর বাকির নির্দেশে নির্মিত হয়েছিলো বলে জানা যায়। ২০০৩ সালে এলহাবাদ হাইকোর্ট ভারতীয় জরিপ বিভাগ (এএছআই)কে মসজিদের নিচের কাঠামোর ধরণ নির্ধারণ করার জন্য গভীরভাবে অধ্যয়ন এবং খননের নির্দেশ দিয়েছিলেন। খনন কার্য ২০০৩ সালের ১২ মার্চ থেকে আগস্ট মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত চলছিলো। খননের ফলে ১৩৬০ টি আবিষ্কার হয়েছিলো।
জরিপ বিভাগের রিপোর্টের সারাংশে মসজিদের নিচে দশম শতাব্দীর একটি মন্দিরের উপস্থিতি পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো। খ্রীষ্টপূর্ব ১৩ শতকের মানুষের কার্যকলাপের নিদর্শন পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলো। পরবর্তী কয়েকটা স্তরে শুঙ্গযুগ(খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় এবং প্রথম) এবং কুষাণ যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলো। মসজিদের প্রায় ৫০ মিটার উত্তর-দক্ষিণ দিকে প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয় যুগ (১১-১২ শতক)-এ স্বল্পস্থায়ী অথচ বিশাল কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিলো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলো। এই কাঠামোর অবশিষ্টাংশের উপরে একটি বিশাল কাঠামো তৈরি করা হয়েছিলো। এই কাঠামোটির অন্তত তিনটি কাঠামোগত পর্যায় ছিলো এবং তিনটি মেঝে পরপর সংযুক্ত ছিলো। প্রতিবেদনের উপসংসারে বলা হয়েছিলো যে, এই কাঠামোটির উপরে বিতর্কিত কাঠামোটি ১৬ শতকের প্রথম দিকে নির্মাণ করা হয়েছিলো।
প্রত্নতাত্ত্বিক কে, কে, মহম্মদ জরীপ ও খননকারী দলের একমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন। এছাড়াও পৃথকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিলো যে, বাবরি মসজিদ নির্মাণের আগে সেখানে মন্দিরের মতো কাঠামো বিদ্যমান ছিলো। ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছিলো যে, মসজিদ নির্মাণের আগে সেখানে একটি মন্দির বিদ্যমান ছিলো। মসজিদটি নির্মাণের জন্য যে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামোর অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করা হয়েছিলো তা প্রমাণ করার মতো কিছুই পাওয়া যায়নি।
বাবরকে অনেকে আক্রমণকারী এবং খলনায়কের রূপে তুলে ধরার চেষ্টা করা দেখা যায়। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যায় যে বাবর একজন জ্ঞানী শাসক ছিলেন এবং সর্বধর্মের প্রতি তিনি সহনশীল ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে হুমায়ুনকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা থেকে এই কথা স্পষ্ট হয়ে যায়। *

নাসির–উদ–দীন মহম্মদ হুমায়ুন
নাসির-উদ-দীন মহম্মদ হুমায়ুন-এর জন্ম ১৫০৮ সালের ৬ মার্চ মঙ্গলবার-এ কাবুলে। তিনি হুমায়ূন নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম মির্জা জহির-উদ-দীন বাবর এবং মাতৃর নাম মাহম বেগম। তিনি তাঁর পিতা বাদশাহ বাবরের মৃত্যুর পরে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বর্তমানের আফগানিস্থান, পাকিস্থান, উত্তর ভারত এবং বাংলাদেশ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। তিনি ১৫৩০ থেকে ১৫৪০ এবং ১৫৫৫ থেকে ১৫৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাজত্ব করছিলেন। পিতৃর মতোই তিনি সাম্রাজ্যের শাসন ক্ষমতা হারিয়েছিলেন এবং পারস্যের সাফাভিদ বংশের সহযোগিতায় সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় মোগল সাম্রাজ্য প্রায় এক মিলিয়ন স্কোয়ার কিলোমিটার বিস্তৃত ছিলো।
বাবর তাঁর সাম্রাজ্য দুই পুত্রের মধ্যে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যদিও সেটা ভারতের জন্য অস্বাভাবিক ছিলো, তবে চেঙ্গিস খাঁর সময় থেকে মধ্য এশিয়ায় এটি সাধারণ প্রথা ছিলো। এই প্রথার অধীনে শুধুমাত্র একজন চেঙ্গিসিডই সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারতেন। তবে, উপ-শাখার একজন পুরুষ চেঙ্গিসিডও সিংহাসনের সমান দাবিদার ছিলেন। চেঙ্গিস খাঁ নিজেই পীর মহম্মদ, মিরান শাহ, খলিল সুলতান এবং শাহরুখের মধ্যে তাঁর সাম্রাজ্য শান্তিপূর্ণভাবে বিভক্ত করে দিয়েছিলেন। প্রচলিত রাজতন্ত্রের বিপরীতে তৈমূরীয়রা চেঙ্গিস খাঁর উদাহরণ অনুসরণ করে জ্যেষ্ঠপুত্রের হাতে সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ অধিকার ছেড়ে না দিয়ে পুত্রদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। তখন প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিজন উপ- শাখার চেঙ্গিসিড উত্তরাধিকার দাবি করে ভ্রাতৃহত্যায় জড়িত হয়ে পড়তেন। হুমায়ূনের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিলো। হুমায়ূন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে তাঁর দুই সৎ ভ্রাতৃ তাঁর তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন।
হুমায়ূন তাঁর পিতার মৃত্যুর পরে মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৫৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বরে দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বাবরের সিদ্ধান্ত অনুসারে তাঁর সৎ ভাই কামরান মির্জা তখন কাবুল, কান্দাহার এবং ভারতের কিছু অংশ উত্তরাধিকার সূত্রে ভোগ করছিলেন। কামরান মির্জা এক সময় হুমায়ূনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন। এদিকে উমরাহ(সভ্রান্ত ব্যক্তি)বৃন্দও হুমায়ুনকে সঠিক শাসক হিসাবে মেনে নেননি। বাবর যখন অসুখে পড়েছিলেন তখন কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তি তাঁর শ্যালক মাহদি খাজাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও তখন সে প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছিলো, তবে সেটি সমস্যার একটি ইঙ্গিত ছিলো।
হুমায়ূনের ভ্রাতৃদের মধ্যে মাত্র একজন ভ্রাতৃ খলিল মির্জা(১৫০৯-১৫৩০) হুমায়ূনের পক্ষে ছিলেন। তবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো। হুমায়ূন ১৫৩৮ সালে তাঁর সেই মৃত ভ্রাতৃর জন্য একটি সমাধিক্ষেত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন, তবে নির্মাণ কার্য শেষ করার আগেই তিনি শের শাহ সূরির হাতে পরাস্ত হয়ে পারস্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন শের শাহ সূরি কাঠামোটি ধ্বংস করেছিলেন এবং হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের পরেও সেই নির্মাণ কার্য সম্পূর্ণ করা হয়নি।
ভ্রাতৃদের বাইরেও হুমায়ুনের দু’জন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। একজন ছিলেন গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ এবং অন্যজন ছিলেন পূর্ব বিহারের গঙ্গা নদীর তীরের শের শাহ সূরি। হুমায়ূন প্রথমে শের শাহ সূরি বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। তবে মাঝ পথে অভিযান সমাপ্ত করে গুজরাটে বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই অভিযানে হুমায়ূন গুজরাট, মালওয়া, চম্পারেন এবং মাণ্ডুর দূর্গ জয় করে বিজয়ী হতে সক্ষম হয়েছিলেন।
হুমায়ূনের পাঁচ বছরের শাসনকালে সুলতান বাহাদুর শাহ এবং শের শাহ সূরি তাঁদের সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। সুলতান বাহাদুর শাহ পর্তুগীজদের সাথে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জন্য পূর্ব দিকে চাপের সম্মুখীন হয়েছিলেন। মোগলরা অটোম্যান সাম্রাজের নিকট থেকে আগ্নেয়াস্ত্র অর্জন করছিলেন এবং সুলতান বাহাদুর শাহ চুক্তির মাধ্যমে পর্তুগীজদের নিকট থেকে আগ্নেয়াস্ত্র অর্জন করেছিলেন। এই চুক্তির ফলে পর্তুগীজরা উত্তর-পশ্চিম ভারতে কৌশলগত অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৫৩৫ সালে হুমায়ূনকে অবহিত করা হয়েছিলো যে, গুজরাটের সুলতান পর্তুগীজদের সাহায্যে মোগল অঞ্চলে আক্রমণ সংঘটিত করার পরিকল্পনা করছে। তখন হুমায়ূন একদল সৈন্য নিয়ে গুজরাটের দিকে অগ্রসর হোন এবং এক মাসের মধ্যে তিনি মাণ্ডু এবং চাম্পারেনের দূর্গ দখল করেন। বাহাদুর শাহকে চাপের মুখে ফেলার বিপরীতে হুমায়ূন নতুন বিজিত অঞ্চলগুলিকে সুসংহত করার দিকে মনযোগ প্রদান করেন। এদিকে বাহাদুর শাহ পালিয়ে গিয়ে পর্তুগীজদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন।
বাবর গুজরাটের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরে শের শাহ সূরি মোগলদের কাছ থেকে আগ্রার নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার সুযোগ পান। শের শাহ সূরি যতদূর সম্ভব দ্রুত আগ্রা অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। হুমায়ূন এই উদ্বেগজনক খবর পেয়ে সদ্য দখলকৃত অঞ্চলগুলির দখল বাহাদুর শাহের হাতে ছেড়ে দিয়ে তিনি তাঁর সেনা বাহিনী নিয়ে দ্রুত আগ্ৰা অভিমুখে অগ্রসর হোন। এই সুযোগেপর্তুগীজরা বাহাদুর শাহের রাজ্য আক্রমণ করেন। ১৫৩৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পর্তুগীজদের সাথে গুজরাট উপকূলে সংঘটিত যুদ্ধে সুলতান বাহাদুর শাহ পরাজিত এবং নিহত হয়।
এদিকে হুমায়ুন শের শাহ সুরির হাত থেকে আগ্রা রক্ষা করতে সক্ষম হোন। তবে বাংলার ভিলায়েতের রাজধানী গৌড়ের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হয়। শের শাহের পুত্র জালাল খান দখলকৃত চুনার দূর্গ হুমায়ূন সেনারা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সময় বিলম্ব হওয়ার জন্য দখল করতে ব্যর্থ হয়। তখন গৌড়ে অবস্থিত সাম্রাজের সর্ববৃহৎ শস্য ভাণ্ডার খালী করা হয় এবং হুমায়ূন সেগুলো রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করেন। বাংলার বিশাল সম্পত্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় সেগুলো পূর্বদিকে সরিয়ে আনা হয় এবং শের শাহকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য বাধ্য করা হয়।
শের শাহ পূর্বদিকে সেনা প্রত্যাহার করেন, তবে হুমায়ূন তাঁকে অনুসরণ করেননি। পরিবর্তে তিনি নিজেকে হেরেমে বন্দী করে রেখে অনেক দিন আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত ছিলেন। হুমায়ূনের ১৯ বছরের ভ্রাতৃ হিন্দাল মির্জা যুদ্ধে হুমায়ুনকে সহায় করার জন্য সন্মত হয়েছিলেন, তবে তিনি পরে সেনা প্রত্যাহার করে আগ্রা চলে এসে নিজেকে ভারপ্রাপ্ত সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। হুমায়ূন গ্রাণ্ড মুফতি শেখ বাহালুলকে হিন্দালের সাথে আলোচনার জন্য প্রেরণ করেছিলেন, তখন মুফতিকে হত্যা করা হয়েছিলো এবং হিন্দাল বিদ্রোহকে উস্কে দিয়ে প্রধান মসজিদে খুতবা অবরোধ করে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হুমায়ূনের অন্যজন ভ্রাতৃ কামরান মির্জা হুমায়ূনকে সাহায্য করার জন্য পঞ্জাব থেকে আগ্রা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। তবে তাঁর আগ্রা প্রত্যাবর্তন করার উদ্দেশ্য ছিলো হুমায়ুনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। কারণ তিনি হুমায়ূনের পতনশীল সাম্রাজ্যের জন্য দাবি উত্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তিনি হিন্দালের সাথে চুক্তি করেন যে, হুমায়ূনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরে কামরান যে নতুন সাম্রাজ্য তৈরি করবেন তাঁর একটি অংশ হিন্দালকে প্রদান করা হবে।
১৫৩৯ সালে ২৬ জুন-এ বক্সারের নিকট গঙ্গার তীরে অবস্থিত চৌচা নামক স্থানে হুমায়ূন এবং ভারতবর্ষে সুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাপক আফগান শের শাহ সূরির মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের সময় উভয়ে পরিখা খননে অধিক সময় ব্যস্ত ছিলেন। শের শাহ সূরি ইচ্ছাকৃতভাবেই যুদ্ধ পিছিয়ে নিচ্ছিলেন। কারণ তিনি অনুভব করছিলেন যে কিছু দিন পরে বর্ষা ঋতু শুরু হবে। তখন মোগলদের সৈন্য পরিচালনা করাটা অসুবিধা হবে এবং তাঁদের পক্ষে সৈন্য পরিচালনা করা সুবিধা হবে। আশা করা মতেই বর্ষাঋতু শুরু হওয়ার সাথে সাথে মোগল সৈন্যের প্রধান শক্তি আর্টিলারি ও কামান অচল হয়ে পড়েছিলো। তখন হুমায়ুন বাংলা এবং বিহার শের শাহকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মহম্মদ আজিজকে দূত হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিলো যে শের শাহ সুরি শুধুমাত্র সম্রাট হুমায়ূন কর্তৃক প্রদত্ত প্রদেশ হিসাবে শাসন করবে। যেখানে শের শাহের সার্বভৌমত্বের অভাব থাকবে। দুই পক্ষের মাঝে দর কষাকষিও চলে। দর কাষাকষি চলে থাকতেই হুমায়ুন সৈন্যরা শের শাহর সৈন্যদের আক্রমণ করে এবং শের শাহ সৈন্যরা ভয়ে পিছু হটে যায়। তখন বাধ্য হয়ে শের শাহ হুমায়ূনের প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেন।
এভাবে হুমায়ুনের সৈন্যরা নিজের করণীয় দায়িত্ব পালন করেন এবং শের শাহর সৈন্যরা পশ্চাদপসরণ করে। মোগল সৈন্যরা তখন প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি শিথিল করে পহরার ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই তাঁদের শিবিরে ফিরে আসেন। উত্তরে গঙ্গা এবং কামানাসারের মধ্যবর্তী নিচু স্থানে মোগলরা ছাউনি স্থাপন করেছিলো। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে ছাউনিগুলো প্লাবিত হয়ে পড়েছিলো।
মোগল সেনার দুর্বলতা প্রত্যক্ষ করে শের শাহ সূরি পূর্বের চুক্তি ভংগ করে নিজের বাহিনী নিয়ে মোগল শিবিরের নিকট আসে এবং তিনি মোগল সেনা অপ্রস্তুত অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করেন। তখন শের শাহ তাঁর পুত্র জালাল খান এবং তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি খাওয়াস খানের অধীনে সেনা বাহিনী তিনটি দলে বিভক্ত করে মোগল শিবির আক্রমণ করেন। অতর্কিত আক্রমণের ফলে মোগল সেনারা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পেরে পালাতে থাকে। শের শাহের সেনারা তাঁদের পশ্চাদধাবন করে প্রায় ৮০০ মোগল সেনা হত্যা করে। সাঁতরে গঙ্গা পার হওয়ার সময় মহম্মদ জামান মির্জাসহ কয়েকজন বিশিষ্ট মোগল জলে ডুবে মারা যায়। তবে, হুমায়ূন বায়ুভর্তি চামড়ার থৈলা নিয়ে সাঁতরে গঙ্গা নদী পার হয়ে নিরাপদে আগ্রা ফিরে আসেন। গঙ্গা পার হওয়ার সময় সামস-উদ-দীন মহম্মদ তাঁকে সহায় করেছিলেন।
হুমায়ূন আগ্রায় ফিরে এসে তাঁর তিন ভ্রাতৃকে আগ্রায় উপস্থিত পান। হুমায়ূনের বিরুদ্ধে ভ্রাতৃরা যে ষড়যন্ত্র করেছিলো, সেসব ভুলে গিয়ে তিনি তাঁদের ক্ষমা করে দেন। এমন কী হিন্দাল মির্জা তাঁর সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তা ভুলে গিয়ে তিনি তাঁকেও ক্ষমা করে দেন। এদিকে শের শাহ ধীরে ধীরে আগ্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শের শাহের এই অগ্রগতি মোগল পরিবারের জন্য গুরুতর হুমকি ছিলো যদিও কীভাবে শের শাহর গতিরোধ করবে এ নিয়ে হুমায়ূন এবং কামরানের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। কামরান শের শাহের বিরুদ্ধে যতদূর সম্ভব দ্রুত আক্রমণ সংঘটিত করার পরামর্শ দেন। কিন্তু হুমায়ূন নিকটবর্তী শত্রুর বিরুদ্ধে দ্রুত আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন। ফলে কামরান মির্জা তাঁর সেনা প্রত্যাহার করে নিজের নামে বৃহত্তর সেনা বাহিনী গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে লাহোর ফিরে যান। প্রকৃত পক্ষে কামরান মির্জা হুমায়ূনের অধীনে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ তিনি নিজেই সিংহাসন নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিলেন।
কামরান লাহোর ফিরে আসার পর হুমায়ূন শের শাহকে বাধা প্রদান করার জন্য তাঁর অন্য দুই ভ্রাতৃ মির্জা আকসারি এবং হিন্দালকে নিয়ে আগ্রা থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কনৌজ পৌঁছোন। ১৫৪০ সালের ১৭ মে কনৌজের নিকটে অবস্থিত বিলগ্রাম নামক স্থানে হুমায়ূন বাহিনী এবং শের শাহ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধটি বিলগ্রামের যুদ্ধ নামেও পরিচিত। উক্ত যুদ্ধে হুমায়ূন কৌশলগত কারণে শের শাহ বাহিনীর হাতে দ্বিতীয় বারের জন্য পরাজিত হয়ে আগ্রা অভিমুখে পশ্চাদসরণ করেন। তখন শের শাহ তাঁদের পশ্চাদধাবন করেন। প্রতিরোধ গঢ়ে তুলতে সক্ষম না হয়ে হুমায়ুন তাঁর ভাইদের নিয়ে লাহোরে কামরান মির্জার নিকট চলে আসেন। ফলে শের শাহ সূরি দিল্লীর সিংহাসন দখল করে ভারতে স্বল্পস্থায়ী সুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার ফলে হুমায়ূন ইরানের সাফাভিদ শাসক শাহ ইসমাইল-১-এর পুত্র শাহ তাহমাস্প-১এর দরবারে ১৫ বছর নির্বাসিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
লাহোরে আসার পরে চার ভ্রাতৃ একত্রিত হয়, তবে ভাইদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য হুমায়ূন শের শাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গঢ়ে তুলতে সক্ষম হোননি। কারণ কামরান মির্জা তখন পঞ্জাব ও আফগানিস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং হিন্দাল মির্জা সিন্ধ নিয়ন্ত্রণে আনার কথা ভাবছিলেন। এদিকে শের শাহ আগ্রা ও দিল্লী দখল করে ধীরে ধীরে তাঁদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শের শাহ সিরহিন্দ পৌঁছোনোর খবর পেয়ে হুমায়ুন শের শাহর নিকট এই বলে পত্র প্রেরণ করেছিলেন যে, আমি সমগ্র হিন্দুস্থান(গঙ্গা উপত্যকার অধিকাংশ ভূমি সমন্বিতে পঞ্জাবের ভূমি ছেড়ে এসেছি। আপনি আমাদের জন্য একমাত্র লাহোর ছেড়ে দিয়ে সিরহিন্দ পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করুন। তখন শের শাহ পত্রের উত্তরে বলেছিলেন যে, আমি তোমার জন্য কাবুল ছেড়ে এসেছি, তুমি কাবুল যাওয়া উচিত।
ইতিমধ্যে মোগলদের অনুগত হিন্দু শাসক মালদেও রাঠোর মোগল সাম্রাজের বিরুদ্ধে গিয়ে শের শাহের পক্ষে যোগদান করেছিলেন। ফলে হুমায়ুন দিল্লীর সিংহাসন উদ্ধারের চিন্তা বাদ দিয়ে তাঁর বাহিনী নিয়ে থর মরুভূমি পাড়ি দিয়ে সিন্ধ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পূর্বের বিদ্রোহী হিন্দাল মির্জা কান্দাহারে ফিরে যান এবং কামরান মির্জা ও আকসারি মির্জা অপেক্ষাকৃত শান্ত কাবুলে ফিরে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিলো হুমায়ূনের পরিবারের সাথে প্রথম বিচ্ছেদ।
সিদ্ধ যাওয়ার পথে কষ্টকর পথযাত্রার বিষয়ে হুমায়ুন অনেক বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি কীভাবে তাঁর গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে মরুভূমি পাড়ি দিতে হয়েছিলো। তাঁদের উপযুক্ত খাদ্য পানীয়র সমস্যা ছিলো। আট মাসের গর্ভবর্তী স্ত্রী হামিদার ঘোড়া মারা যাওয়ার পরে কেউ ঘোড়া ধার দেয়নি। তখন তিনি নিজের ঘোড়া স্ত্রীকে দিতে হয়েছিলো। যার ফলে তিনি ছয় কিলোমিটার রাস্তা উটের পিঠে চড়ে গিয়েছিলেন, যদিও খালিদ বেগ তাঁকে তার নিজের পিঠে চড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলো। হুমায়ূন এই ঘটনাটিকে তাঁর জীবনের সর্বনিম্ন বিন্দু হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
হুমায়ুন সিন্ধের আমীর হোসেন ইমরানির নিকট থেকে সহায়ের আশা করছিলেন। কারণ হোসেন ইমরানিকে তিনি সিন্ধের শাসক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন এবং হোসেন ইমরানি তাঁর আনুগত্য প্রকাশের জন্য শপতও খেয়েছিলেন। তদুপরি হামিদা বেগম সিন্ধের সম্ভ্রান্ত পীর পরিবারের কন্যা ছিলেন। আমিরের দরবারে যাওয়ার পথে হুমায়ূনকে যাত্রা স্থগিত রাখতে হয়েছিলো, কারণ গর্ভবর্তী হামিদা বেগম ভ্রমণ করতে অসুবিধা পাচ্ছিলেন। হুমায়ূন তখন বাধ্য হয়ে অমরকোট (বর্তমান অমরকোট সিন্ধু প্রদেশের অংশ) মরুদ্যানের হিন্দু শাসক রাণা প্রসাদ রাওয়ের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
রাণা প্রসাদ রাও হুমায়ূনকে তার বাড়িতে যথাযথ স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং হুমায়ুন কয়েক মাস তাঁর বাড়িতে ছিলেন। এখানে, একজন হিন্দু রাজপুতের গৃহে, সিন্ধের সভ্রান্ত পরিবারের কন্যা হামিদা বানুর গর্ভ থেকে ১৫৪২ সালের ১৫ অক্টোবর ভবিষ্যতের ভারত সম্রাট আকবরের জন্ম হয়েছিলো। জন্ম তারিখটি সুপ্রতিষ্ঠিত, কারণ হুমায়ূন জ্যোতির্বিদদের সাথে সেদিন গ্রহের অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। আকবর ছিলেন অনেক প্রার্থনার পরে ৩৪ বছর বয়সী হুমায়ূনরে বহু প্রতিক্ষীত উত্তরাধিকারী। আকবরের জন্মের অল্প পরেই হুমায়ূন তাঁর দলবল নিয়ে অমরকোটকে পেছনে ফেলে সিন্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন।
ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য হুমায়ূন যে মানুষটির উপর সহায়ের প্রত্যাশা করেছিলেন তিনি তাঁর দ্বারা প্রতারিত হোন নি। সিন্ধের শাসক আমির হোসেন উমরানি হুমায়ূনের উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন এবং হুমায়ূনের প্রতি অনুগত ছিলেন। হারানো অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধারের জন্য হুমায়ূন ঘোড়া এবং অস্ত্র সংগ্রহ করে নতুন জোট গঠন করছিলেন এবং শত শত মোগল, বেলুচ ও সিন্ধ উপজাতিদের একত্রিত করে হুমায়ূন কান্দাহার অভিমুখে যাত্রা করছিলেন। হুমায়ূন নিজেকে প্রথম তৈমুরীয় মোগল সম্রাট বাবরের সঠিক উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণা করার জন্য আরও হাজার হাজার সেনা তাঁর সাথে যোগদান করেছিলো। যেসকল উপজাতি হুমায়ুনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলো, তাঁদের মধ্যে ছিলো লেঘারি, মাঘসি, রিন্দ এবং অনেকে।
১৫৪৩ সালের ১১ জুলাই হুমায়ূন সিন্ধু নদী পার হয়ে সূরিদের উৎখাত করে হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের আকাংক্ষা নিয়ে কান্দাহারে তাঁর ভ্রাতৃদের সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে সিন্ধ থেকে কান্দাহার অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। সিন্ধ থেকে কান্দাহার অভিমুখে যাত্রা করার সময় তাঁর সাথে ৩০০ বন্য উট এবং ২০০০ গাড়ী খাদ্যশস্য ছিলো।
কামরান মির্জার নামে খোৎবা পাঠ করতে অস্বীকার করাতে হিন্দাল মির্জাকে কাবুলে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিলো। তাঁর আরেক ভ্রাতৃ আকসারি মির্জাকে সেনা সংগ্রহ করে হুমায়ূনের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। শত্রুসেনার কাছাকাছি পৌঁছোনোর পরে এই সংবাদ পেয়ে হুমায়ূন তাঁদের মুখামুখি না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন। তখন ছিলো ডিসেম্বর মাস। ফলে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ছিলো। হিন্দুকোষ পর্বতমালার ঠাণ্ডার মধ্যে ১৪ মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে যাত্রা করাটা খুবই বিপজ্জক ছিলো। তাই আকবরকে কান্দাহারের নিকটবর্তী একটি শিবিরে রেখে আসা হয়েছিলে। খবর পেয়ে আকসারি মির্জা সেই শিবির থেকে আকবরকে নিয়ে গিয়ে কামরান মির্জা এবং আকসারি মির্জার স্ত্রীর উপরে তাঁর লালনপালনের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। হুমায়ুন নামায় আকসারি মির্জার স্ত্রী সুলতানা বেগমরে নাম বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।
হুমায়ূন আবার কান্দাহারে ফিরে যান, সেখানে তাঁর ভ্রাতৃ কামরান মির্জা শাসন করছিলেন। তবে সেখানে তিনি কামরান মির্জার নিকট থেকে কোনো সাহায্য না পেয়ে ৪০ জন পুরুষ সঙ্গী এবং বেগা বেগমকে নিয়ে পর্বতমালা এবং উপত্যকার মধ্য দিয়ে পারস্য অভিমুখে যাত্রা করেন। সেই যাত্রা খুবই কষ্টকর ছিলো। রাজকীয় পরিবারকে শিরস্ত্রাণে সিদ্ধ ঘোড়ার মাংস খেয়ে বাঁচতে হয়েছিলো। হেরাতে পৌঁছোতে তাঁদের প্রায় এক মাস লেগেছিলো এবং এভাবেই কষ্ট করে বেঁচে থাকতে হয়েছিলো। তবে হেরাতে পৌঁছোনের পরে তাঁরা শাহ তাহমাস্প দ্বারা রাজকীয় সম্বর্ধনা পেয়েছিলেন। হুমায়ুনের সেনা বাহিনীকে রাজকীয় রক্ষীদের দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিলো এবং তাঁদের জন্য খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তাঁদের সন্মানে রাস্তাঘাট পরিস্কার করা হয়েছিলো এবং হুমায়ুনকে রাজকীয় সন্মান প্রদর্শন করা হয়েছিলো। সেখানে থাকাকালীন তিনি হেরাতের দর্শনীয় স্থানগুলি পরিদর্শন করেছিলেন। সেখানকার শিল্পকর্ম প্রত্যক্ষ করে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। শিল্পকর্মগুলি বিশেষত হোসেন বায়কারা, তাঁর পূর্বপুরুষ এবং তৈমূরীয় শাসক শাহরুখের প্রধানা বেগম গওহর সাদের দ্বারা নির্মিত ছিলো। এভাবে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের নির্মাণ কাজের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন।
হেরাতে তিনি সুক্ষ্ম চিত্রশিল্পী কামালুদ্দিন বেহজাদ এবং তাঁর দুই ছাত্রের সাথে রাজদরবারে পরিচিত হয়েছিলেন। তখন তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি যদি হিন্দুস্থান পুনর দখল করতে সক্ষম হোন তাহলে তাঁরা তাঁর সাথে হিন্দুস্থান যেতে সন্মত হবে কি-না ? তাঁরা সন্মত হয়েছিলেন। পারস্যে আসার ছয়মাস পর জুলাই মাসে তিনি শাহ তাহমাস্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। হেরাত থেকে পথযাত্রার পর তাঁরা কাজভিনে দেয়াল চিত্রে শোভিত ইস্পাহানের বিখ্যাত চল্লিশ স্তম্ভের প্রাসাদে মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের জন্য একটি বড় ভোজ এবং পার্টির আয়োজন করা হয়েছিলো। হুমায়ূন সুন্নি মুসলিম ছিলেন। শাহ তাহমাস্প তাঁকে এবং তাঁর সেনাদের সুন্নি থেকে শিয়া সম্প্রদায়ে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। মোগলরা জানতেন যে শাহের প্রস্তাবে সন্মতি জানালে শাহ হুমায়ূনকে আরও সম্মান প্রদর্শন করবেন তবুও তাঁরা ধর্মান্তকরণে অসন্মতি প্রকাশ করেছিলেন। কামরান মির্জা হুমায়ুনকে জীবিত অথবা মৃত তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিনিময়ে কামরান মির্জা কান্দাহার পারস্যদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে শাহ তাহমাস্প সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন।
পরিবর্তে শাহ তাহমাস্প একটি ভোজসভা উদযাপন করেছিলেন এবং শাহ সেই ভোজসভায় ভ্রাতৃ কামরানের উপর আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য হুমায়ূনকে ৩০০ টি তাঁবু, ১২,০০০ অশ্বারোহী এবং শাহের ৩০০ জন প্রবীণ সৈনিক প্রদানের কথা ঘোষণা করেছিলেন। শাহ তাহমাস্প আশা করেছিলেন হুমায়ূন বাহিনী বিজয়ী হলে কান্দাহার তাঁর হবে। হুমায়ূন এ বিষয়ে সন্মতি জানিয়েছিলেন।
সাফাভিদদের সাহায্যে হুমায়ূন দুই সপ্তাহের মধ্যে আকসারি মির্জাকে পরাজিত করে কান্দাহার দখল করেছিলেন। হুমায়ূন উল্লেখ করেছেন, ‘কান্দাহার দখল করার পরে আকসারি মির্জার সেবায় যেসকল অভিজাতবর্গ নিয়োজিত ছিলো, তাঁরা অতি দ্রুত তাঁর সেবায় নিয়োজিত হয়েছিলো। তিনি বলেছেন, বিশ্বের অধিবাসীদের অধিকাংশ লোক সত্যিই ভেড়ার পালের মতো, একজন একদিকে গেলে অন্যরা তা অবিলম্বে অনুসরণ করে।’ কান্দাহার দখল করার পরে প্রতিশ্রুতি অনুসারে হুমায়ূন কান্দাহার শাহকে প্রদান করেছিলেন। শাহ তাঁর শিশু পুত্র মুরাদকে সেখানে প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। যাইহোক, শিশু সন্তানটি শীঘ্র মারা গিয়েছিলো এবং ক্ষমতা গ্রহণের জন্য হুমায়ূন নিজেকে যথেষ্ট শক্তিশালী ভেবে শাসন ক্ষমতা নিজের হাতে এনেছিলেন।
হুমায়ূন পরে কামরান মির্জা শাসিত কাবুল দখল করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। কামরান মির্জাকে একজন শাসক হিসাবে সবাই ঘৃণা করতো। হুমায়ূনের পারস্য বাহিনী শহরের নিকটে আসার সাথে সাথে কামরান মির্জার শত শত সেনা হুমায়ূনের পক্ষে যোগদান করেছিলো। ফলে কামরান মির্জা কোনো প্রতিরোধ গড়ে না তুলেই সহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে সেনা বাহিনী গঠনের জন্য মনোনিবেশ করেছিলেন।
১৫৪৫ সালের নভেম্বর মাসে হামিদা বেগম এবং আকবর হুমায়ূনের সাথে মিলিত হয়েছিলো। এই উপলক্ষ্যে একটি বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছিলো। আকবরের খাতনার সময়েও অন্য একটি বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছিলো।
হুমায়ুনের বিশাল সেনা বাহিনীর তুলনায় কামরান মির্জার সেনা বাহিনী নগণ্য হলেও কামরান মির্জা কাবুল এবং কান্দাহার পুনরুদ্ধারের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এই ক্ষেত্রে কামরান মির্জার পক্ষে যে সেনারা তাঁর বিরুদ্ধে শহর রক্ষা করছিলো, তাদের প্রতি হুমায়ূনের নমনীয় মনোভাবের জন্য তারা কামরান মির্জাকে প্রত্যাখান করেছিলো। তাই কামরান মির্জা কাবুল এবং কান্দাহার পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই যুদ্ধে হুমায়ুনের সবচেয়ে অবিশ্বাসী ভ্রাতৃ মির্জা হিন্দাল তার পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। অন্য একটি ভ্রাতৃ আকসারি মির্জাকে অভিজাতরা শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন। পরে তাঁকে হজ্বে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, তবে দামেস্কের বাইরে মরুভূমিতে তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
কামরান মির্জা বারবার হুমায়ুনকে হত্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৫৫২ সালে কামরান মির্জা শের শাহের উত্তরসুরি ইসলাম খাঁর সাথে হুমায়ুনের বিরুদ্ধে একটি চুক্তি করার চেষ্টা করছিলেন। তবে একজন গাখারের হাতে তিনি ধরা পড়েছিলেন। গাখাররা ছিলো পাঞ্জাবের উত্তর অংশে বসবাসরত পতুহার উপজাতির পাঞ্জাবী মুসলিম। তারা মোগলদের প্রতি অনুগত ছিলো। গাখারদের সুলতান আদম কামরান মির্জাকে হুমায়ূনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। হুমায়ূন তাঁর ভ্রাতৃকে ক্ষমা করে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তবে, তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিলো যে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করার পরেও শাস্তি দেওয়া না হলে, সমর্থকদের মাঝে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। তাই কামরান মির্জাকে হত্যা করার পরিবর্তে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো এই ভেবে যে অন্ধ হলে তাঁর সিংহাসনের দাবি শেষ হয়ে যাবে। তাঁকে হজ্বে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। তবে তিনি ১৫৫৭ সালে আরব উপদ্বীপের মক্কার কাছে মারা গিয়েছিলেন।
১৫৪৫ সালের ২২ মে কালিঞ্জার দূর্গ অবরোধের সময় শের শাহ সূরি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র জালাল খাঁ ১৫৪৫ সালে ইসলাম খাঁ সূরি নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং ১৫৫৪ সালের ২২ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তার পুত্র ফিরোজ শাহ সূরি মাত্র বার বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। কিছুদিন পরেই শের শাহের ভাতিজা মুবারিজ খাঁ তাঁকে হত্যা করে মহম্মদ আদিল খাঁ নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। আদিল খাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ সূরি ১৫৫৫ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তখন শহরের নেতৃস্থানীয় লোক স্বাধীনতার জন্য দাবি উত্থাপন করার চেষ্টা করছিলেন। ফলে হুমায়ুনের জন্য সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিলো।
ইতিমধ্যে হুমায়ূন লেখারি, মাঘসি এবং রিন্দের বেলুচ উপজাতি নিয়ে এক বিশাল সেনা বাহিনী গঠন করেছিলেন এবং দিল্লীর সিংহাসন দখল করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হুমায়ূন নিজের পূর্বের যুদ্ধ পরিচালানার দুর্বল রেকর্ড দেখে বৈরাম খাঁকে সৈন্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বৈরাম খাঁ একজন বুদ্ধিমান, মহান এবং কৌশলী যোদ্ধা হিসাবে পরিচিত ছিলেন।
বৈরাম খাঁ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পঞ্জাবের মধ্য দিয়ে এসে রোহতাস দূর্গে উপস্থিত হয়েছিলেন। রোহাতাস দূর্গ শের শাহ সূরি ১৫৪১-১৫৪৩ সালে হুমায়ূনের প্রতি অনুগত গাখারদের পরাস্ত করার জন্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। রোহতাস দূর্গের দেয়ালগুলি ১২.৫ মিটার পুরু এবং ১৮.২৮ মিটার উঁচু ছিলো। দুর্গটি ৪ কিলোমিটার বিস্তৃত ছিলো এবং ৬৮ টি অর্ধবৃত্তাকার বুরুজ বিশিষ্ট ছিলো। দূর্গের বেলে পাথরের বিশাল দুয়ারগুলিতে মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন ছিলো। সিকান্দার শাহ সূরির একজন বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি কোনো ধরণের প্রতিরোধ ছাড়াই মোগলদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো। ১৫৫৫ সালের ২২ জুন হুমায়ূন বাহিনী এবং সিকান্দার বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। উক্ত যুদ্ধে হুমায়ুনের হয়ে সৈন্য পরিচালান করছিলেন সুকৌশলী সেনাপতি বৈরাম খাঁ। তিনি একটি কৌশল প্রায়োগ করে শত্রুসেনাদের সন্মুখ সমরে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু কৌশল অনুসারে পরমুহূর্তেই হুমায়ুন সেনা কৃত্রিম ভয়ে দ্রুত পশ্চাদসরণ করছিলেন। শত্রুসেনা তখন তাঁদের পশ্চাদধাবন করে ফাঁদে পড়েছিলেন। অর্থাৎ হুমায়ূন সেনা কৌশল করে তাঁদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরে সিকান্দার শাহ সূরিকে যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। সিকান্দার শাহ সূরি যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার পরে সিরহিন্দের অধিকাংশ গ্রাম এবং শহরের লোকেরা আক্রমণকারী হুমায়ূন বাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং হুমায়ূন রাজধানীতে প্রবেশ করে ১৫৫৫ সালের ২৩ জুনে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। এভাবেই ভারতে মোগল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিলো।
হুমায়ূন ইতিমধ্যে একজন সফল শাসক হয়ে উঠেছিলেন এবং সেনাপতিদেরও বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন। ইতিমধ্যে তাঁর সব কয়জন ভ্রাতৃ মারা গিয়েছিলো, তাই অভিযানের সময় সিংহাসন হারানোর ভয় ছিলো না। সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি নতুন উদ্যমে উপমহাদেশের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। নির্বাসনে থাকাকালীন তাঁর জ্যোতিষীদের উপরে নির্ভরশীলতা হ্রাস পেয়েছিলো এবং পারস্যে থাকাকালীন তিনি যুদ্ধের যেসব ফলপ্রসূ কৌশল পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সেই কৌশলগুলো অনুকরণ করে তিনি সব কয়টি যুদ্ধে সফল হয়েছিলেন।
চরিত্র– এওয়ার্ড এইস হোল্ডেন লিখেছেন, হুমায়ূন তাঁর প্রতি নির্ভরশীলদের উপরে সদয় এবং বিবেচনাশীল ছিলেন। তাঁর পুত্র আকবরের প্রতি, তাঁর বন্ধুদের প্রতি, ভ্রাতৃদের প্রতি তিনি একনিষ্ঠ ছিলেন। ভ্রাতৃদের প্রতি কঠোর হওয়ার জন্যই তাঁর শাসনামলে বড় দুর্ভাগ্য দেখা দিয়েছিলো। তিনি আরও লিখেছেন, তাঁর চরিত্রের ত্রুটিগুলি, যা তাঁকে জাতির একজন সফল শাসক এবং মানুষ হিসাবে কম প্রশংসার যোগ্য করে তুলেছে। তাই বলে তিনি পুত্রের পিতা এবং অন্যের পিতৃ হওয়ার অযোগ্য ছিলেন না। স্ট্যানলি লেনপুল তাঁর ‘মধ্যযুগীয় ভারত’ গ্রন্থে লিখেছেন, তাঁর নামের অর্থ ভাগ্যবান/বিজয়ী, তবে ইতিহাসে এমন কোনো শাসক নেই, যিনি হুমায়ূনের মতো নামের অর্থের সাথে অবিচার করেছেন। তিনি ছিলেন ক্ষমাশীল প্রকৃতির। তিনি আরও লিখেছেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে দুর্ভাগ্যের শিকার ছিলেন। যেখানে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকত, সেখানে তিনি পড়ে যেতেনই। সেখান থেকে তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা ছিলো না। হুমায়ূন ভুলবশত একজন ইমামকে হাতীর পা-র তলে ফেলে পিষে মারার হুকুম দিয়েছিলেন, যিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সমালোচনা করেছিলেন।
দ্বিতীয়বার সিংহাসনে আরোহণ করার ছমাস পরে তিনি শের মণ্ডল লাইব্রেরী থেকে হাতভর্তি বই নিয়ে পালিশ করা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পড়ে গিয়ে ১৫৫৬ সালের ২৪ জানুয়ারি মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি পড়ে যাওয়ার সময় মুয়াজ্জিন আযান দিচ্ছিলেন। তাঁর অভ্যেস ছিলো, যেখানেই তিনি আযানের শব্দ শুনতে পেতেন সেখানেই শ্রদ্ধায় নতজানু হতেন। নতজানু হওয়ার সময় পোশাকে তাঁর পা আটকে ধরে এবং তিনি সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ পিছলে পড়েন। পিছলে পড়ার সময় সিঁড়ির কানায় লেগে তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিন দিন পরে মারা যান। তাঁর মৃতদেহ প্রথমে পুরানা কিল্লায় সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। কিন্তু দিল্লীতে হিমুর আক্রমণ এবং পুরানা কিল্লা দখলের কারণে পলায়নরত সেনারা তাঁর মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পাঞ্জাবের কালানৌরে স্থানান্তর করেছিলো। কালানৌরে আকবরের মাথায় রাজমুকুট পরানো হয়েছিলো।
হিমু আদিল শাহ সূরির সেনাপতি ও উজির ছিলেন এবং হুমায়ুন মারা যাওয়ার সময় তিনি বাংলায় ছিলেন। হুমায়ূনের মৃত্যু হিমুকে মোগলদের পরাজিত করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছিলো। তিনি বাংলা থেকে পদযাত্রা শুরু করেছিলেন এবং বায়না, ইটওয়া, সম্বল, কাল্পি এবং নারনৌল থেকে মোগলদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হিমুর আক্রমণের কথা শুনে শহর খালি করে যুদ্ধ না করেই আগ্রার শাসক পালিয়ে গিয়েছিলো। হিমু আগ্রা দখলের সময় আকবর জলন্ধরে ছিলেন। আগ্রা বিজয়ের কথা শুনে, জলন্ধরে অবস্থানরত আকবরের নিকট দিল্লীর শাসক তারদি বেগ খাঁ পত্র লিখেছিলেন যে, হিমু আগ্রা দখল করেছে এবং রাজধানী দিল্লী দখলের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। সৈন্য বৃদ্ধি ছাড়া তাঁদের সাথে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বৈরাম খাঁ সেনাপতি পীর মহম্মদকে দিল্লী প্রেরণ করেছিলেন। ইতিমধ্যে তারদি বেগ খাঁ আশেপাশের মোগল রাজন্যবর্গদের দিল্লী রক্ষার জন্য সেনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং আলোচনার জন্য কাউন্সিল আহ্বান করে হিমুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আগ্রা দখল করে হিমু পলায়নরত শাসককে অনুসরণ করে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে ঠিক দিল্লীর বাইরের একটি গ্রাম তুঘলকাবাদে পৌঁছেছিলেন। সেখানে ১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবর হিমু বাহিনী এবং তারদি বেগ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বাদাউনের মতে, হিমুর সেনা সংখ্যায় বেশি হলেও মোগলরা তাঁর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করছিলেন। যদুনাথ সরকার সেই যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- উক্ত যুদ্ধে ১০০০ টি হাতী, ৫০,০০০ টি ঘোড়া, ৫১ টি কামান এবং ৫০০ টি ফালক’নেট (পাতল কামান) ব্যবহার করা হয়েছিলো।
মোগল বাহিনী এভাবে পরিচালিত করা হয়েছিলো- আবদুল্যাহ উজবেগ সেনাবাহিনীর অগ্রভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। আবদুল্ল্যাহ উজবেগের অধীনে তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনী ছিলো। হায়দার মহম্মদ সেনাদলের ডান দিকে এবং ইসকান্দার বেগ বামদিকে এবং তারদি বেগ কেন্দ্রস্থিত ভাগে নেতৃত্ব দিচিছলেন। সেনাদলের অগ্রভাগে থাকা তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনী এবং বামদিক থেকে ইসকান্দার বেগের নেতৃত্বে আক্রমণ সংঘটিত করে শত্রু সেনাদের তাড়িয়ে দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলো। এই আক্রমণে বিজয়ীরা ৪০০ টি হাতী বন্দি করেছিলো এবং ৩,০০০ আফগান সেনা হত্যা করেছিলো। বিজয়ের সম্ভাবনা দেখে তারদি বেগের অনেক সেনা শত্রু শিবির লুণ্ঠন করার জন্য ছত্রভংগ হয়ে পড়েছিলো। এই সুযোগে হিমু ৩০০ টি পসন্দের হাতী এবং নির্বাচিত ঘোড়সওয়ার নিয়ে তারদি বেগের উপর আক্রমণ সংঘটিত করেছিলো। বিশাল জন্তুদের অগ্রগতি এবং পেছনে অশ্বারোহীদের দেখে মোগল বেগেরা প্রতিরক্ষার অপেক্ষা না করেই পালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে তারদি বেগকেও একই পথ ধরতে হয়েছিলো।
এদিকে আলওয়ার থেকে হাজি খাঁর নেতৃত্বে নতুন সেনা এসে যোগদান করাতে হিমুর শক্তি বৃদ্ধি হয়েছিলো। তখন পূর্বের বিজয়ী মোগলদের অগ্রভাগের সেনা এবং ডানদিকের সেনারা যুদ্ধ জয়ের আশা না দেখে ছত্রভংগ দিয়েছিলো। এভাবেই হিমু ১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবরে একদিনের যুদ্ধেই দিল্লী দখল করেছিলেন।
তুঘলকাবাদের বিপর্যের খবর পেয়ে আকবর অবিলম্বে দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। ১০,০০০ অশ্বারোহী সেনা দিয়ে আলীকুলি খাঁ শাইবানীকে সবার অগ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। দুর্বল পহরায় পরিবহণ করা হিমুর গুলি- বারূদ আলীকুলি বাহিনী দখল করার ফলে হিমু বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বরে সংঘটিত পানীপতের ঐতিহাসিক যুদ্ধে হিমু বাহিনী পরাজিত হয়েছিলো এবং তাঁকে আহত অবস্থায় হাতীসহ বন্দি করা হয়েছিলো। তখন ১৩ বছরের কিশোর আকবরকে হিমুর শিরশ্ছেদ করতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু তিনি একজন মৃতপ্রায় ব্যক্তির উপরে তরবারি দিয়ে আঘাত করতে অস্বীকার করেছিলেন। পরে আকবর তরবারি দিয়ে হিমুর মস্তক স্পর্শ করতে রাজি হয়েছিলেন এবং বৈরাম খাঁ হিমুকে হত্যা করেছিলেন। হিমুর মস্তক কাবুল পাঠানো হয়েছিলো এবং তাঁর দেহ দিল্লী গেটের নিকট জনতার দর্শনের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো।
দিল্লী দখলের পরে আকবর তাঁর পিসি গুলবদন বেগমকে হুমায়ুনের জীবনী হুমায়ূন নামা লিখতে বলেছিলেন। হুমায়ূন নামা অন্যান্য রাজকীয় জীবনী (তৈমূরের জীবনী জাফরনামা, বাবরের জীবনীবাবরনামা এবং আকবরের জীবনী আকবর নামা) থেকে ভিন্ন ছিলো। হুমায়ুন নামার কোনো সমৃদ্ধ অনুলিপি টিকে নেই। শুধুমাত্র একটি বিক্ষিপ্ত পাণ্ডুলিপি ১৮৬০ সাল থেকে ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত রয়েছে। অ্যানেট বেভারেজ ১৯০১ সালে এটি ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন। ২০০০ সালে হুমায়ুন নামার ইংরেজি এবং বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯৪৫ সালে হুমায়ূনের জীবনের আধারে নির্মিত মেহবুব খান পরিচালিত ‘হুমায়ূন’ শিরোনামে ঐতিহাসিক বলিউড মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিলো। ১৯৪৫ সালে চলচ্চিত্রটি সপ্তম সর্বোচ্চ উপার্জনকারী ভারতীয় চলচ্চিত্র ছিলো।
বেগা বেগম– বেগা বেগমের বিষয়ে কিছু বর্ণনা না দিলে অন্যায় হবে বলে বেগা বেগমের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো। বেগা বেগম হুমায়ূনের মামাতো চাচা ইয়াদগার বেগের কন্যা ছিলেন। বেগা বেগমের সাথে হুমায়ূন ১৫২৭ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিয়ের এক বছর পরে ১৫২৮ সালে তিনি আল আমান মির্জা নামক একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। তবে সন্তানটি শিশু অবস্থাই মারা গিয়েছিলো। তিনি ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ১৫৪০ সালের ১৭ মে এবং ১৫৫৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫৫৬ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুনের প্রধানা মহিষী ছিলেন। বেগা বেগম মোগল সাম্রাজ্যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রথা চালু করেছিলেন। ১৬ শতকের শেষের দিকে দিল্লীতে হুমায়ুনের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করিয়েছিলেন। এই স্মৃতিস্তম্ভটিকে মোগল স্থাপত্যের মাষ্টারপিস হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই স্মৃতিস্তম্ভটিকে দেখেই বাদশাহ শাহ জাহান তাজমহল নির্মাণের জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বেগা বেগম জ্ঞানী মহিলা ছিলেন এবং ওষুধ সম্বর্কে তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞান ছিলো। ১৫৮২ সালে তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন।

হুমায়ূন-এর সমাধিক্ষেত্র

মহামতি আকবর
আবুল ফাদ জালাল-উদ-দীন মহম্মদ আকবরের জন্ম ১৫৪২ সালের ২৫ অক্টোবর রাজপুতনার অমরকোটে হিন্দু শাসক রাণা প্রসাদ রাওয়ের গৃহে। তাঁর পিতৃর নাম দ্বিতীয় মোগল শাসক হুমায়ূন এবং মাতৃর নাম হামিদা বানু। হামিদা বানু সিন্ধের সভ্রান্ত পরিবারের কন্যা ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পরে ১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মাত্র তের বছর বয়সে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
১৫৩৯ এবং ১৫৪১ সালে সংঘটিত চৌচা এবং কনৌজের যুদ্ধে শের শাহ সূরির কাছে পরাজিত হয়ে মোগল সম্রাট হুমায়ুন সিন্ধে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর ছোট ভাই হিন্দাল মির্জার ফার্সি শিক্ষক শেখ আলী আকবর জামির ১৪ বছরের কন্যা হামিদা বানুর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিয়ের এক বছর পর রাজপুতনার অমরকোট দূর্গে ১৫৪২ সালের ২৫ অক্টোবর জালাল-উদ-দীন মহম্মদ আকবরের জন্ম হয়েছিলো।
আকবর হুমায়ূনের ভ্রাতৃ কামরান মির্জা এবং আকসারি মির্জার যৌথ পরিবারের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হয়েছিলেন। লালন-পালনের ক্ষেত্রে হুমায়ুন নামায় আকসারি মির্জার স্ত্রী সুলতানা বেগমরে নাম বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে। ছেলেবেলা আকবর শিকার এবং যুদ্ধ বিদ্যা আহরণ করেছিলেন এবং তিনি একজন সাহসী ও দক্ষ যোদ্ধা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি লিখা- পড়া শিখেন নি। তবে, লিখা-পড়া না শিখাটা তাঁর জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। জীবনের শেষ বয়সে তিনি কিছু লিখা-পড়া শিখেছিলেন বলে জানা যায়।
নয় বছর বয়সে আকবর গজনীর শাসক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। কামরান মির্জার বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে ১৫৫১ সালের ২০ নভেম্বরে হিন্দাল মির্জা যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং ভ্রাতৃর মৃত্যুর খবর পেয়ে হুমায়ূন শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। হিন্দাল মির্জা মারা যাওয়ার পরে হুমায়ূন পাঞ্জাবের জলন্ধরে ১৫৫৬ সালে হিন্দাল মির্জার কন্যা রুকিয়া বেগমের সাথে আকবরের বিবাহ অনুষ্ঠিত করেছিলেন। তখন আকবরের বয়স ছিলো চৌদ্দ বছর এবং রুকিয়া বেগমের নয় বছর। হিন্দাল মির্জার সমস্ত ধন-সম্পত্তি, সেনা এবং গজনীর জায়গির হুমায়ূন উত্তরাধিকারসূত্রে আকবরকে দান করেছিলেন। রুকিয়া বেগম আকবরের প্রধানা মহিষী ছিলেন। রুকিয়া বেগম নিঃসন্তান ছিলেন এবং আকবরের সন্তান খুরমকে দত্তক নিয়েছিলেন।
১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বরে সংঘটিত পানীপতের ঐতিহাসিক যুদ্ধে হিমু বাহিনীকে পরাজিত করে হুমায়ূন দিল্লীর সিংহাসন পুনরুদ্ধারের পর ১৫৫৬ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর আকবর দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। উত্তরাধিকারীর প্রস্তুতির জন্য আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ হুমায়ূনের মৃত্যুর খবর কিছুদিন গোপন রেখেছিলেন। ১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাবের কালনৌরে মাত্র তেরো বছর বয়সে আকবরকে হুমায়ূনের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছিলো এবং বয়স না হওয়া পর্যন্ত বৈরাম খাঁ আকবরের হয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে অপরাজিত সামরিক অভিযান চালিয়ে মোগল সাম্রাজ্যকে সুসংহত করার জন্য আকবরকে ‘মহামতি’উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। আকবরের এই সামরিক শক্তি ও কৃতিত্বের ভিত্তি ছিলো সেনা বাহিনীর সাংগঠনিক দিশ ও সুসংহত সৈন্য পরিচালনা। আকবরের শাসনামলে মোগলদের ক্ষমতাকে সমুন্নত রাখার জন্য মনসবদারি ব্যবস্থার বিশেষ ভূমিকা ছিলো এবং কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা অনেকদিন টিকে ছিলো। তবে, উত্তরসূরিদের অধীনে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিলো।
সামরিক উদ্ভাবন– আকবরের শাসনামলে কামান এবং হাতী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করা হয়েছিলো। ম্যাচলক(লঘু কামান)এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত এবং যুদ্ধের সময় কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হত। আকবর কামান এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে অটোম্যান, ইউরোপীয়ান বিশেষ করে পর্তুগিজ এবং ইটালীয়দের সাহায্য নিয়েছিলেন। আকবরের সময়ে মোগল সাম্রাজ্যের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি আঞ্চলিক শাসক, অধীনস্থ রাজ্য এবং জমিদারদের দ্বারা ব্যবহৃত অস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ছিলো। এই অস্ত্রগুলি এতই বেশি কার্যকর ছিলো যে, আকবরের সভাসদ আবুল ফজল বলেছিলেন, একমাত্র তুরস্কর বাইরে সম্ভবত এমন কোনো দেশ নেই যেখানে বন্দুকগুলি ভারতের চেয়ে তাঁদের সরকারকে অধিক সুরক্ষিত রাখতে পারে। ‘গান পাউডার সাম্রাজ্য’ শব্দটি ভারতে মোগলদের সাফল্যের বিশ্লেষণে পণ্ডিত এবং ঐতিহাসিকরা প্রায়শই ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধের কৌশল বিশেষ করে আকবর কর্তৃক আগ্নেয়াস্ত্রের দক্ষ ব্যবহার দ্বারা মোগল শক্তিকে চিহ্নিত করা হয় ৷
উত্তর ভারত দখলের জন্য সংগ্রাম– আকবরের পিতা হুমায়ূন সাফাভিদদের সমর্থনে পাঞ্জাব, দিল্লী এবং আগ্রা পুনরুদ্ধার করলেও এই অঞ্চলগুলিতে মোগল শাসন অনিশ্চিত ছিলো। হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে যখন হিমু কর্তৃক দিল্লী এবং আগ্রা দখল করা হয়েছিলো তখন কিশোর আকবরের ভাগ্য অনিশ্চিত বলে ধারণা করা হয়েছিলো। বদখসাঁর শাহজাদা মির্জা সোলেইমান কর্তৃক আক্রমণের ফলে মোগলদের দূর্গ স্বরূপ কাবুল থেকেও সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ফলে পরিস্থিতি অধিক খারাপ করে তুলেছিলো। আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ যখন হিমুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যুদ্ধ পরিষদ আহ্বান করেছিলেন, তখন কেউ যুদ্ধের জন্য অনুমোদন জানান নি। অবশেষে বৈরাম খাঁ অভিজাতদের প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং পাঞ্জাবের সবচেয়ে শক্তিশালী সূর শাসক সিকান্দার শাহ সূরির বিরুদ্ধে অভিযান সংঘটিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্যে সিকান্দার শাহ সূরি অবশ্যে আকবরের জন্য তেমন উদ্বেগের কারণ ছিলো না। মোগল সৈন্য অগ্রসর হওয়ার সাথে সিকান্দার শাহ সুরি পিছিয়ে গিয়েছিলেন। প্রত্যাহ্বান এসেছিলো হিমুর তরফ থেকে। তবে পানীপতের দ্বিতীয় যুদ্ধে আকবর বাহিনীর কাছে হিমু পরাজিত এবং হিমু স্বয়ং যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো।
হিমুর দিল্লী বিজয়– হিমু সূরি বংশের আদিল শাহ সূরির সেনাপতি ও উজির ছিলেন এবং হুমায়ুন মারা যাওয়ার সময় তিনি বাংলায় ছিলেন। হুমায়ুনের মৃত্যু হিমুকে মোগলদের পরাজিত করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছিলো। তিনি বাংলা থেকে পদযাত্রা শুরু করেছিলেন এবং বায়না, ইটওয়া, সম্বল, কাল্পি এবং নারনৌল থেকে মোগলদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হিমুর আক্রমণের কথা শুনে যুদ্ধ না করেই শহর খালি করে আগ্রার শাসক পালিয়ে গিয়েছিলো। হিমু আগ্রা দখলের সময় আকবর জলন্ধরে ছিলেন। হিমু আগ্রা দখলের কথা শুনে, দিল্লীর শাসক তারদি বেগ খাঁ জলন্ধরে অবস্থানরত আকবরের নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন যে, ‘হিমু আগ্রা দখল করেছে এবং রাজধানী দিল্লী দখলের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়া তাঁদের সাথে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।’ পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বৈরাম খাঁ সেনাপতি পীর মহম্মদকে দিল্লী প্রেরণ করেছিলেন। ইতিমধ্যে তারদি বেগ খাঁ আশেপাশের মোগল রাজন্যবর্গদের দিল্লী রক্ষার জন্য সেনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং আলোচনার জন্য কাউন্সিল আহ্বান করে হিমুর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আগ্রা দখল করে হিমু পলায়নরত শাসককে অনুসরণ করে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে ঠিক দিল্লীর বাইরের অবস্থিত একটি গ্রাম তুঘলকাবাদে পৌঁছেছিলেন। সেখানে ১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবর হিমু বাহিনী এবং তারদি বেগ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বাদাউনের মতে, হিমুর সেনা বাহিনী সংখ্যায় বেশি হলেও মোগলরা তাঁর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করছিলেন। যদুনাথ সরকার সেই যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- উক্ত যুদ্ধে ১০০০ টি হাতী, ৫০,০০০টি ঘোড়া, ৫১ টি কামান এবং ৫০০ টি ফালক’নেট (পাতল কামান) ব্যবহার করা হয়েছিলো।
মোগল বাহিনী এভাবে পরিচালনা করা হয়েছিলো- আবদুল্যাহ উজবেগ সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। হায়দার মহম্মদ সেনাদলের বাম দিকে এবং ইসকান্দার বেগ ডানদিকে এবং তারদি বেগ তুর্কি অশারোহী বাহিনী নিয়ে কেন্দ্রস্থিত ভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। বামদিক থেকে ইসকান্দার বেগের নেতৃত্বে আক্রমণ করে শত্রু সেনাদের তাড়িয়ে দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলো। এই আক্রমণে বিজয়ীরা ৪০০ টি হাতী বন্দি করেছিলো এবং ৩০০০ আফগান সেনা হত্যা করেছিলো। বিজয়ের সম্ভাবনা দেখে তারদি বেগের অনেক সেনা শত্রু শিবির লুণ্ঠন করার জন্য ছত্রভংগ হয়ে পড়েছিলো। এই সুযোগে হিমু ৩০০ টি পসন্দের হাতী এবং নির্বাচিত ঘোড়সওয়ার নিয়ে তারদি বেগের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বিশাল জন্তুদের অগ্রগতি এবং পেছনে অশ্বারোহীদের দেখে মোগল সেনা প্রতিরক্ষার অপেক্ষা না করেই পালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে তারদি বেগকেও একই পথ ধরতে হয়েছিলো।
এদিকে আলওয়ার থেকে হাজি খাঁর নেতৃত্বে নতুন সেনা এসে যোগদান করাতে হিমুর শক্তি বৃদ্ধি হয়েছিলো। তখনপূর্বের বিজয়ী মোগলদের অগ্রভাগের সেনা এবং ডানদিকের সেনারা যুদ্ধ জয়ের আশা না দেখে ছত্রভংগ দিয়েছিলো। এভাবেই হিমু ১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবরে একদিনের যুদ্ধেই দিল্লী দখল করেছিলেন।
পানীপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ– হিমু তাঁর অবস্থান সুসংহত করার পূর্বেই বৈরাম খাঁর পরামর্শ অনুসারে আকবর তাঁর সেনা বাহিনী নিয়ে দিল্লীর দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। আলী কুলি খান সাইবানিকে ১০,০০০ অশ্বারোহী সেনা দিয়ে অগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। আলী কুলি খান দুর্বল পহরায় প্রেরণ করা হিমুর আর্টিলারি সম্পূর্ণ দখল করেছিলেন। এটি হিমুর জন্য খুবই ক্ষতির কারণ হয়েছিলো।
বৈরাম খার নেতৃত্বে ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর দিল্লী থেকে ৫০ মাইল (৮০ কিলোমিটার) উত্তরে অবস্থিত পানীপতের দ্বিতীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো এবং সেই যুদ্ধে হিমু বাহিনী পরাজিত হয়েছিলো। আকবর এবং হিমু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আট মাইল দূরে অবস্থান নিয়েছিলেন। মোগল সেনার কেন্দ্রস্থিত ভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সাইবানি খান সাইবানি, ডানদিকের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সিকান্দার খান উজবেক এবং বামদিকের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আব্দুল্ল্যাহ খান উজবে, হোসেন কুলি বেগ এবং সেনাদলের অগ্রভাগের নেতৃত্বে ছিলেন শাহ কুলি মাহরাম। হিমু হাওয়াই নামক একটি হাতীর পিঠে বসে তাঁর সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁর সেনাদলের বামদিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাঁর ভগ্নীর ছেলে রামায়া এবং ডানদিকের সেনার নেতৃত্বে দিচ্ছিলেন সাদি খাকন কক্কর।
এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ যুদ্ধ ছিলো এবং যুদ্ধ প্রথমাবস্থায় হিমু বাহিনীর অনুকূলে ছিলো। মোগল বাহিনীর উভয় দিকই পিছিয়ে পড়েছিলো। হিমু তাঁর হাতী এবং অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে মোগল সেনাদের ছত্রভংগ করে দেওয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলেন। হিমু যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন হঠাৎ একটি তীর এসে তাঁর চোখে আঘাত করে এবং তিনি আহত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। ফলে তাঁর সেনাবাহিনী আতঙ্কিত এবং বিশৃংখল হয়ে পড়ে। ফলে হিমু বাহিনী যুদ্ধে পরাজিত হয়। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রায় ৫০০০ সেনা নিহত হয়েছিলো এবং অনেকে পালিয়ে যাওয়ার সময়ও নিহত হয়েছিলো। আহত হিমুকে বন্দি করে মোগল শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। ১৩ বছর বয়সী আকবরকে হিমুর শিরশ্ছেদ করতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু তিনি একজন মৃতপ্রায় ব্যক্তির শিরশ্ছেদ করতে অস্বীকার করেছিলেন। পরে আকবর তরবারি দিয়ে হিমুর মাথা স্পর্শ করেছিলেন এবং বৈরাম খান শিরশ্ছেদ করেছিলেন। হিমুর মস্তক কাবুলে প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং তাঁর দেহ দিল্লী গেটে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো।
উক্ত যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আকবর দিল্লী এবং আগ্রা দখল করে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেছিলেন এবং তিনি দিল্লীতে তিন মাস অবস্থান করেছিলেন। এর মধ্যে পাঞ্জাবে সিকান্দার শাহ সূরি সক্রিয় হয়ে উঠার খবর পেয়ে আকবর তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করতে পাঞ্জাব ফিরে এসেছিলেন। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে মোগল বাহিনী সিকান্দার খাঁর বিরুদ্ধে আরও একটি বড় যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন এবং সিকান্দার খাঁ পূর্ব বাংলায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। আকবর ১৫৫৮ সালে পাঞ্জাবের লাহোর এবং মুলতান দখল করেছিলেন। এর পরে আকবর রাজপুতনার মুসলিম শাসককে পরাজিত করে আজমীর দখল করেছিলেন। আকবর বাহিনী নর্মদা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত সুরিদের শক্ত ঘাঁটি গোয়ালিয়র দুর্গও দখল করেছিলেন।
এই সময়ে অভিজাত পরিবারের বেগমদের সাথে রাজকীয় পরিবারের বেগমদের কাবুল থেকে দিল্লীতে আনা হয়েছিলো। আকবরের উজীর-এ-আজম আবুল ফজলের মতে, পুরুষরা যাতে ভারতে স্থির হয়ে অবস্থান নিতে পারে তারজন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। আকবর দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, মোগলরা ভারতেই থাকবে। আকবরের পিতামহ বাবর এবং তাঁর পিতা হুমায়ূন উভয়কেই ক্ষণস্থায়ী শাসক হিসাবে চিহ্নিত করা হতো। যাহোক, আকবর এই সিদ্ধান্ত দ্বারা তাঁর পূর্বপুরুষরা রেখে যাওয়া তৈমুরিদ রেঁনেসার পদ্ধতিগতভাবে এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন।
মধ্য ভারতে অভিযান– ১৫৫৯ সাল নাগাদ আকবর দক্ষিণের রাজপুতনা এবং মালওয়ায় অভিযান শুরু করেছিলেন। তবে, আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁর সাথে মত বিরোধ হওয়াতে এই অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিলো। আকবর তখন আঠারো বছর বয়সের যুবক সম্রাট। তাই তিনি রাজকার্য সম্পর্কীয় বিষয়গুলো পরিচালনায় আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর পালক মাতৃ মহাম আঙ্গা এবং আত্মীয়স্বজনদের পরামর্শে তিনি বৈরাম খাঁর সেবা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। আকবর ১৫৬০ সালে বৈরাম খাঁকে বরখাস্ত করেন এবং হজ্ব করার জন্য মক্কা পাঠিয়ে দেন। মক্কা যাওয়ার পথে বিদ্রোহীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বৈরাম খাঁ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তবে, মোগল বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে বৈরাম খাঁ বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হোন। অবশ্যে আকবর তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং আকবর তাঁকে দু’টি বিকল্প দিয়েছিলেন, কোর্টে পুনরায় বাহাল অথবা হজ্ব যাত্রা। বৈরাম খাঁ মক্কা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং মক্কা যাওয়ার পথে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জন্য একজন আফগান কর্তৃক নিহত হয়েছিলেন।
১৫৬০ সালে আকবর তাঁর পালক ভ্রাতৃ আদম খাঁ এবং সেনাপতি পীর মহম্মদের নেতৃত্বে মালওয়ায় অভিযান চালিয়েছিলেন। মোগল বাহিনী এবং মালওয়ারের সুলতান বাজ বাহাদুরের সাথে সংঘটিত সারাংপুরের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাজ বাহাদুর ধন-সম্পত্তি, গুপ্তধন, হাতী রেখে খান্দেশ পালিয়ে গিয়েছিলেন। যুদ্ধে সাফল্য সত্ত্বেও যুদ্ধটি আকবরের দৃষ্টিকোণ থেকে বিপর্যয় হিসাবে বিবেচিত হয়েছিলো। যুদ্ধে জয়ী হয়ে তাঁর পালক ভ্রাতৃ আদম খাঁ লুণ্ঠনের তাণ্ডব চালিয়েছিলেন এবং গ্যারিসন ও তাঁর স্ত্রী-সন্তান, মহম্মদের বংশধর মুসলিম ধর্মগুরু, সৈয়দদের হত্যা করেছিলেন। আকবর নিজে মালওয়ায় উপস্থিত হয়ে আদম খাঁকে সেনাপতি পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন এবং পীর মহম্মদকে বাজ বাহাদুরের পশ্চাদধাবন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে খান্দেশ ও বেরারের শাসকদের জোট কর্তৃক পরাজিত হয়ে পীর মহম্মদ ফিরে এসেছিলো এবং বাজ বাহাদুর সাময়িকভাবে মালওয়ারের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছিলেন। আকবর পরের বছর আবদুল্যাহ খান উজবেককে মালওয়ার উদ্ধার করতে পাঠিছিলেন এবং আবদুল্যাহ খান উজবেক মালওয়ার পুনরুদ্ধার করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়ে বাজ বাহাদুর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে-ফিরে আট বছর পরে আকবরের অধীনে চাকরি নিয়েছিলেন।
মালওয়ার সাফল্য সত্ত্বেও আকবরের আত্মীয়, সন্তান এবং অভিজাতদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছিলো। ১৫৬২ সালে আদম খাঁ আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো। আকবর তাঁকে যুদ্ধে পরাস্ত করে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন। একবার ছাদ থেকে নিক্ষেপ করার পরে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য আকবর আবারও তাঁকে ছাদ থেকে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদেশ প্রতিপালিত হয়েছিলো। আকবর পরাক্রমী অভিজাতদের ক্ষমতা হ্রাস করে সংশয় মুক্ত হতে চেয়েছিলেন। তিনি সাম্রাজ্য শাসন সম্পর্কীয় বিশেষ মন্ত্রী পদ সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে মোগল অভিজাতদের প্রশ্নাতীত প্রাধান্য ছিলো না।
১৫৬৪ সালে উজবেক প্রধানদের একটি গোষ্ঠী বিদ্রোহ করলে আকবর প্রথমে মালওয়া এবং পরে বিহারে সংঘটিত যুদ্ধে তাঁদের পরাজিত করেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তাঁরা সমঝোতা করেছিলেন এবং আকবর তাঁদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার তাঁরা আবার বিদ্রোহ করলে তাঁদের সেই বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিলো। কাবুলের মোগল শাসক, আকবরের ভ্রাতৃ, মহম্মদ হাকিম মির্জা উজবেক সর্দারদের সাহায্যে নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করলে আকবর ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং বিদ্রোহ দমন করে বেশ কিছু উজবেক সর্দারকে হত্যা করেছিলেন। বিদ্রোহী নেতাদের ধরে ধরে হাতীর পা-র তলে ফেলে পিষে হত্যা করা হয়েছিলো।
আকবরের দূর সম্পর্কীয় চাচাতো ভাইয়েরা আগ্রায় পাইকান্তা জমি ভোগ দখল করছিলেন। তাঁরা একবার বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন। সেই বিদ্রোহ দমন করে, তাঁদের কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিলো এবং অনেককে সাম্রাজ্য থেকে বিতাড়ন করা হয়েছিলো।
১৫৬৬ সালে কাবুলের শাসক, আকবরের ভ্রাতৃ, মহম্মদ হাকিম মির্জা সাম্রাজ্য হস্তগত করার উদ্দেশ্যে আবার পাঞ্জাব পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। তখন আকবর তাঁকে বাধা প্রদান করার জন্য পাঞ্জাব পর্যন্ত এসেছিলেন এবং এক সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পরে মহম্মদ হাকিম মির্জা আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে কাবুল ফিরে গিয়েছিলেন।
১৫৬৪ সালে আকবর মধ্য ভারতের বন্য হাতী সমৃদ্ধ পাতল জনবসতি সম্পন্ন পাহাড়ি এলেকায় অবস্থিত গর্হা মান্ডলা রাজ্য বিজয়ের জন্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। অঞ্চলটি নাবালক রাজা বীর নারায়ন এবং তাঁর মাতৃ রাণী দূর্গাবতী কর্তৃক শাসিত ছিলো। রাণী দূর্গাবতী চান্দেল রাজপুত শালিবাহনের পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি গর্গারাজ্যের রাজা সংগ্রাম শাহের পালক পুত্র দলপত শাহ কাচ্চবাহার সাথে বিবাহপাশে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ১৫৫০ থেকে ১৫৬৪ সাল পর্যন্ত নাবালক পুত্র বীর নারয়নের হয়ে গর্হা রাজ্য শাসন করেছিলেন। এই অভিযানে আকবর ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দেননি, কারণ তিনি তখন উজবেক বিদ্রোহীদের দমনে ব্যস্ত ছিলেন। তাই অভিযানটি পরিচালনার জন্য কারার মোগল শাসক আসফ খানকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দামোহতে সংঘটিত যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাণী দূর্গাবতী আত্মহত্যা করেছিলেন এবং তাঁর নাবালক পুত্র গন্ডের পাহাড়ি দূর্গ চৌরাগড় পতনের সময় নিহত হয়েছিলেন। উক্ত যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মোগলরা প্রচুর সম্পদ, অগণিত পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের গহনা এবং ১০০০ টি হাতী হস্তগত করেছিলেন। দূর্গাবতীর ছোট বোন কমলা দেবীকে মোগল হারেমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এবং রাণী দূর্গবতীর মৃত স্বামীর ভ্রাতৃ চন্দ্র শাহকে এই অঞ্চলের শাসক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিলো।
মালওয়ারের মতোই গর্হা রাজ্য বিজয় নিয়ে অধীনস্থ লোকদের সাথে আকবরের মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিলো। আসফ খাঁর বিরুদ্ধে প্রচুর সম্পদ হস্তগত এবং মাত্র দু’শটি হাতী আকবরকে ফেরত (১৫৬৫ সালের ১৩ জুলাই) দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। আসফ খাঁকে হিসাব প্রদানের জন্য তলব করা হলে তিনি এলাহাবাদে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি প্রথমে উজবেকদের নিকটে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং মোগল বাহিনী তাঁকে ধাওয়া করলে তিনি গন্ডোয়ানায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন তিনি আহরণকৃত সকল সম্পদ মোগল দরবারে জমা দিয়েছিলেন এবং আকবর তাঁকে ক্ষমা করে দিয়ে পূর্বের পদেই বাহাল রেখেছিলেন।
আকবরকে হত্যার চেষ্টা–১৫৬৪ সালের দিকে আকবরকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো বলে একটি চিত্রকর্মে নথিভুক্ত করা হয়েছিলো। দিল্লীর নিকটে অবস্থিত হজরত নিজামুদ্দিনের দরগাহ পরিদর্শন করে ফিরে আসার পথে একজন ঘাতক তাঁকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করেছিলো। তীরটি তাঁর ডান কাঁধে বিদ্ধ হয়েছিলো। ঘাতককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো এবং সম্রাট কর্তৃক তাকে শিরশ্ছেদের আদেশ প্রদান করা হয়েছিলো। ঘাতক আকবরের দরবারের একজন সভ্রান্ত সভাসদ শরিফুদ্দিনের দাস ছিলো এবং ঘাতকের শিরশ্ছেদের পরে শরিফুদ্দিনকে দমন করা হয়েছিলো।
রাজপুতনা বিজয়– উত্তর ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পরে আকবর রাজপুতনা জয়ের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। কারণ সাম্রাজ্যের পার্শ্ববর্তী রাজপুতনায় ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্যমান থাকলে ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে কোনো রাজশক্তি নিরাপদ হতে পারবে না আকবর ভেরেছিলেন। মোগলরা ইতিমধ্যেই উত্তর রাজপুতনার মেওয়াত, আজমীর এবং নাগোরের কিছু অংশে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো। তাই আকবর কোনোদিন দিল্লী সুলতানাতের বশ্যতা স্বীকার না করা রাজপুত রাজাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৫৬১ সালের প্রারম্ভ থেকে আকবর রাজপুতদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং কূটনীতিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিলেন। প্রায়গুলি রাজপুত রাজা আকবরের আধিপত্য মেনে নিয়েছিলেন। একমাত্র মেওয়ারের মহারাণা উদয় সিংহ এবং মারওয়ারের ভারতীয় শাসক চন্দ্রসেন রাঠোর মোগলদের আধিপত্য মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। রাণা উদয় সিংহ সিসোদিয়ার শাসক রাণা সাঙ্গার বংশধর ছিলেন। রাণা সাঙ্গা ১৫২৭ সালে খানওয়ার যুদ্ধে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সিসোদিয়া বংশের প্রধান হিসাবে তিনি ভারতের সমস্ত রাজপুত রাজা এবং সর্দারদের মধ্যে সর্বোচ্চ সন্মানের অধিকারী ছিলেন। আকবর ভেবেছিলেন, উদয় সিংহকে বশ্যতা স্বীকার করাতে না পারলে রাজপুতদের চোখে মোগলদের মর্যদা হ্রাস পাবে। আকবর জীবনের প্রারম্ভে ইসলামের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের সবচেয়ে মর্যদাপূর্ণ যোদ্ধাদের উপর তাঁর বিশ্বাসের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন।
১৫৬৭ সালে আকবর মেওয়ারের রাজধানী চিতোরগড় দুর্গ আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। চিতোরগড় দুর্গ কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কারণ দূর্গটি আগ্রা থেকে গুজরাট পর্যন্ত যাওয়া সংক্ষিপ্ত পথের মাঝখানে ছিলো এবং রাজপুতনার অভ্যন্তরীণ অংশগুলিকে ধরে রাখার জন্য চাবিকাঠি হিসাবে বিবেচিত ছিলো। চিতোর দূর্গ অবরোধের সময় উদয় সিংহ তাঁর দুই রাজপুত যোদ্ধা জয়মাল এবং পাট্টাকে রেখে মেওয়ারের পাহাড়ে অবসর যাপন করতে গিয়েছিলেন। চার মাস অবরোধ করে রাখার পরে ১৫৬৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চিতোরগড়ের পতন হয়েছিলো।
চিতোরগড় জয়ের সময় আকবর দূর্গরক্ষকসহ ৮০০০ যোদ্ধা এবং ৩০,০০০ জন অসামরিক লোককে হত্যা করেছিলেন এবং তাঁদের ছিন্নমুণ্ডগুলি সমগ্র অঞ্চলে প্রদর্শনের জন্য ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। মোগলদের হাতে যেসব লুণ্ঠনের সামগ্রী পড়েছিলো, তা সমগ্র সাম্রাজ্য ব্যাপী বিতরণ করা হয়েছিলো। আকবর তিনদিন চিতোরগড়ে অবস্থান গ্রহণ করে আগ্রায় ফিরে এসেছিলেন। বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আকবর দূর্গের গেটে হাতীর উপরে বসানো জয়মাল এবং পাট্টার মূর্তি স্থাপন করিয়েছিলেন। চিতোরগড়ের পতনের পরে উদয় সিংহের ক্ষমতা ও প্রভাব হ্রাস পেয়েছিলো। উদয় সিংহ আর কখনও পাহাড়ি আশ্রয় ছেড়ে মেওয়ারে যাননি এবং আকবর তাঁকে সেখানে থাকতে দিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন।
চিতোরগড় দখলের পর আকবর আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন এবং ১৫৬৮ সালে রস্থাম্ভর দূর্গ আক্রমণ করেছিলেন। রন্থান্তর দূর্গ হাদা(চৌহান রাজপুতদের একটি শাখা) রাজপুতদের বুন্দি ফৌদের রাও সুরজন হাদার দখলে ছিলো এবং দূর্গটি ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী দূর্গ হিসাবে পরিচিত ছিলো। কয়েক মাসের অবরোধের ফলে দূর্গটি পতন হয়েছিলো। ৫০,০০০ সেনারও অধিক এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আকবর দূর্গ অবরোধ করেছিলেন। অবরোধের সময় মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ভারি কামান ব্যবহার করা হয়েছিলো। তিনটি কামান ১৫ ফুটেরও অধিক লম্বা ছিলো। প্রচণ্ড আক্রমণের কাছে নতি স্বীকার করে রাও সুরজন হাদা ১৫৬৮ সালের ২১ শে মার্চে দূর্গের দ্বার খুলে দিয়ে আকবরকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
১৫৬৯ সালে আকবর আগ্রা থেকে ২৩ মাইল (৩৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফতেপুর সিক্রিীতে রাজধানী স্থাপন করে রাজপুতনা বিজয়ের বিজয় উৎসব উদ্যাপন করেছিলেন। রন্থাম্ভর দূর্গ দখলের পর রাজপুত রাজাদের প্রায় সবাই মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। একমাত্র মেওয়ারের রাণা উদয় সিংহের পুত্র মহারাণা প্রতাপ সিংহই প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছিলেন। তবে, ১৫৭৬ সালে সংঘটিত হলদিঘাটের যুদ্ধে মোগলদের কাছে পরাজয় বরণ করেছিলেন। ১৫৭৬ সালের ১৮ জুন মেওয়ারের রাণা মহারাণা প্রতাপ সিংহ এবং অম্বরের রাজা মান সিংহ-প্রথমের নেতৃত্বে মোগল বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো রাজস্থানের গুগুন্দার নিকটে অবস্থিত হলদিঘাটির সরু গিরিপথে। উক্ত যুদ্ধে মেওয়ারিদের অনেক সেনা হতাহত হয়েছিলো। তবে, প্রতাপ সিংহ আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর পরে মহারাণা প্রতাপ সিংহ ক্রমাগতভাবে মোগলদের উপর আক্রমণ অব্যাহত রেখেছিলেন এবং আকবরের জীবনকালেই পূর্বপুরুষদের অধিকাংশ ভূমি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
পশ্চিম ও পূর্ব ভারতে অভিযান– আকবরের পরবর্তী আক্রমণের লক্ষ্য ছিলো গুজরাট এবং বাংলা। এই দু’টি প্রদেশের মাধ্যমে ভারত যথাক্রমে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির সাথে যুক্ত ছিলো। অধিকাংশ গুজরাট ছিলো, বিদ্রোহী মোগল সম্রান্তদের আশ্রয়স্থল এবং বাংলায় আফগান শাসক সোলেমান কররানি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। রাজপুতনা এবং মালওয়া প্রদেশে অবস্থিত মোগল প্রভাবিত গুজরাটে আকবর প্রথমে আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। আকবর গুজরাটের উপকূলীয় অঞ্চলগুলির সাথে কৃষিপণ্য উৎপাদনে সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় সমভূমি অঞ্চল, টেক্সটাইল, অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে চিত্তাকর্ষক সমুদ্র বন্দরগুলি দখল করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কারণ আকবর ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির বিশাল সম্পদের সাথে সামুদ্রিক বন্দরগুলিকে যুক্ত করার ইচ্ছা করেছিলেন। সে যাইহোক, ভারত থেকে বিতাড়িত মির্জারা দক্ষিণ গুজরাটে ঘাঁটি স্থাপন করে আকবরের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলো। এদিকে আকবর গুজরাটের শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য গুজরাট থেকেই আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। যা তাঁকে সামরিক অভিযানের ন্যায্যতা প্রদান করেছিলো। ১৫৭২ সালে তিনি গুজরাটের রাজধানী এবং উত্তরের অন্যান্য শহরগুলি দখল করার জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন। অভিযানে জয়ী হয়ে নিজেকে গুজরাটের বৈধ সার্বভৌম শাসক হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ১৫৭৩ সাল নাগাদ মির্জাদের গুজরাট থেকে বিতাড়ন করা হয়েছিলো এবং তারা পালিয়ে গিয়ে দাক্ষিণাত্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। ফলে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক রাজধানী সুরাট এবং অন্যান্য উপকূলীয় শহরগুলি আকবরের নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলো। রাজা মুজাফ্ফর শাহ-তৃতীয় একটি ভূট্টা ক্ষেতে লুকিয়ে ছিলেন এবং তিনি ধরা পড়েছিলেন। আকবর তাঁকে সামান্য ভাতা দিয়ে পেনশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
গুজরাটের উপরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার পর আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে ফিরে এসেছিলেন, যেখানে গুজরাট বিজয়ের স্মরণে ১৬০২ সালে বুলন্দ দরওজা নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু ইদারের রাজপুত শাসক দ্বারা সমর্থিত আফগান সভ্রান্তদের বিদ্রোহ ও মির্জাদের ষড়যন্ত্রের জন্য আকবর পুনরায় গুজরাট ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। আকবর রাজপুতনা পেরিয়ে এগার দিনের মধ্যে আহমেদাবাদ পৌঁছেছিলেন। রাস্তাটি পেরোতে সাধারণত ছয় মাস লাগতো। ১৫৭৩ সালের ২ শে সেপ্তেম্বর আকবরের সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নির্ণায়ক বিজয় সাব্যস্ত করেছিলেন। যুদ্ধে বিজয়ের পর আকবর বিদ্রোহী নেতাদের হত্যা করেছিলেন। গুজরাট বিজয় মোগলদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণিত হয়েছিলো এবং অঞ্চলটি থেকে ব্যয়ের পরে আকবরের কোষাগারে বার্ষিক ৫০ লাখ টাকারও অধিক রাজস্ব জমা হতো।
আকবর অধিকাংশ আফগানদের পরাজিত করেছিলেন। তখন ভারতে আফগান ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলো একমাত্র বাংলা। বাংলায় সোলেমান কররানি শাসন করছিলেন। তবে সোলেমান কররানি আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে আকবরের নামে খোৎবা পাঠ করেছিলেন। সোলেমান কররানির উত্তরসূরি পুত্র দাউদ খাঁ ১৫৭২ সালে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে নিজেকে স্বাধীন শাসক হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং আকবরের পরিবর্তে নিজের নামে খোৎবা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দাউদ খানের অধীনে ৪০,০০০ অশ্বারোহী, ৩৬০০ হাতী, ১,৪০,০০০ পদাতিক সেনা এবং ২০০ টি কামান ছিলো। দাউদ খাঁকে শায়েস্তা করার জন্য প্রথমে আকবর বিহারের শাসক মুনিম খাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং পরে আকবর নিজেই বাংলায় এসেছিলেন। এটি আকবরের জন্য বাংলার বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলি মোগলদের অধীনে আনার এক সুবর্ণ সুযোগ ছিলো। ১৫৭৪ সালে মোগলরা দাউদ খাঁর নিকট থেকে পাটনা দখল করেন এবং দাউদ খাঁ বাংলায় পালিয়ে যান। পাটনা দখলের পরে মুনিম খানকে বাংলা ও বিহারের শাসক নিযুক্ত করে মুনিম খানকে সহায় করার জন্য টোডরমলকে রেখে আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে ফিরে আসন।
পরবর্তীতে ১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ তুকরাইয়ে মোগল এবং দাউদ খান বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। প্রথম যুদ্ধে ফলাফল ড্র হয় এবং দাউদ খান বাহিনী উড়িষ্যার কটকে পিছু হটে যায়। তখন মোগলরা বাংলার রাজধানী টান্ডা আক্রমণ করে দখল করেন। মুনিম খান বাংলার রাজধানী ঠান্ডা থেকে গৌড়ে স্থানান্তর করেন। তখন কটকে মোগল এবং দাউদ খানের মধ্যে সন্ধি হয়। সন্ধির শর্ত সাপেক্ষে দাউদ খান শুধু উড়িষ্যা নিজের দখলে রেখে বাংলা এবং বিহার মোগলদের ছেড়ে দেন। ছমাস পর প্লেগ শুরু হয় এবং মুনিম খান ১৫৭৫ সালের অক্টোবরে মারা যান। তখন কালাপাহাড় এবং ঈশা খানের নেতৃত্বে মোগল বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। দাউদ খান তখন উড়িষ্যা থেকে গৌড়ের দিকে অগ্রসর হোন।
আকবর তখন শক্তিশালী শত্রু দাউদ খানের বিরুদ্ধে জাহান কুলির নেতৃত্বে একদল সেনা প্রেরণ করেন। জাহান কুলি তেতিয়াগড়ি দখল করে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হোন। রাজমহলের রমক্ষেত্রে উভয় বাহিনীর অনেকদিন সংঘর্ষ চলে। আকবরের পক্ষে যুদ্ধ জয় কঠিন হয়ে উঠলে আকবরের অনুরোধে বিহারের শাসক মুজাফ্ফর খান তুরবাতি এবং অন্যান্য সেনাপতি জাহান কুলির সাথে যোগদান করেন। দাউদ খানের সাথে ছিলেন জুনায়েদ, কুতলু খান এবং ইসমাইল খান লোধির মতো আফগান নেতারা। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দাউদ খান বাহিনী জাহান কুলি বাহিনীর নিকট পরাজিত হয় এবং দাউদ খান পালিয়ে যান। তিনি পরে মোগল বাহিনীর হাতে বন্দি হোন এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে আকবরের কাছে তাঁর ছিন্নমুণ্ড প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং তাঁর অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যংগ বাংলার রাজধানী তাণ্ডায় গিবতে (কুৎসা)র জন্য রাখা হয়েছিলো।
আফগানিস্থান এবং মধ্য এশিয়া অভিযান– গুজরাট এবং বাংলা বিজয়ের পরে আকবর কিছুদিন পারিবারিক উদ্বেগ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পারিবারিক উদ্বেগের জন্য আকবর ১৫৮১ সাল পর্যন্ত কোনো রকমের সামরিক অভিযান পরিচালনা না করে ফতেহপুর সিক্রিতে ছিলেন। ১৫৮১ সালে তাঁর ভ্রাতৃ মির্জা মহম্মদ হাকিম পাঞ্জাব আক্রমণ করেছিলেন। মহম্মদ হাকিমকে আকবর তখন কাবুলে বহিষ্কার করেছিলেন এবং মহম্মদ হাকিম ও অন্যান্যদের হুমকি চিরদিনের জন্য বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন। আগে তাঁর পূর্বপুরুষদের পক্ষে সভ্রান্ত পূর্বপুরুষদের ভারতে সংস্থাপন করাটা সমস্যা হয়েছিলো, আকবরের সময়ে তার বিপরীতে তাঁদের ভারত থেকে বহিষ্কার করাটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। আবুল ফজলের মতে, একদিকে মোগলরা আফগানিস্থানের ঠাণ্ডার জন্য ভীত ছিলো এবং অপর দিকে হিন্দু বিষয়ারা সিন্ধ পেরিয়ে যেতে আপত্তি করেছিলো। তবে, আকবর তাঁদের উৎসাহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সৈন্যদের আট মাসের অগ্রিম বেতন দেওয়া হয়েছিলো। ১৫৮১ সালের আগস্টে আকবর কাবুল দখল করেন এবং পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়া তাঁর ভ্রাতৃর অনুপস্থিতিতে বাবরের পুরাতন দূর্গে তিনি তিন সপ্তাহ ছিলেন। মহম্মদ হাকিমের অনুপস্থিতিতে আকবর তাঁর ভগ্নী বখত- উন-নিসা বেগমের হাতে কাবুলের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে ভারতে ফিরে আসেন। পরে আকবর তাঁর ভ্রাতৃকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন যদিও বখত-উন-নিসা কাবুলে সরকারী শাসক হিসাবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৫৮৫ সালে মহম্মদ হাকিম মারা যান এবং কাবুল আবার আকবরের হাতে চলে আসে। কাবুল তখন আনুষ্ঠানিকভাবে মোগল সাম্রাজ্যের একটি প্রদশে হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো।
কাবুল অভিযান ছিলো সাম্রাজ্যের উত্তর সীমান্তে দীর্ঘ অভিযানের সূচনা। ১৫৮৫ সালের শুরু থেকে আকবর তেরো বছর উত্তর সীমান্তে অবস্থান করেছিলেন। খাইবার গিরিপথের ওপার থেকে আসা প্রত্যাহ্বানের মোকাবিলা করার জন্য তিনি রাজধানী পাঞ্জাবের লাহোরে স্থানান্তর করেছিলেন। সবচেয়ে বড় হুমকি এসেছিলো উজবেকদের নিকট থেকে, যারা তাঁর পিতামহ বাবরকে এশিয়া থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো। তাঁরা দক্ষ সেনাপতি আবদুল্যাহ খাঁ শায়বানির অধীনে সংগঠিত হয়েছিলো এবং আকবরের দূরবর্তী তৈমুরিদ আত্মীয়ের কাছ থেকে বদখসাঁ ও বলখ দখল করেছিলো। ফলে উজবেক সৈন্যরা মোগল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের জন্য গুরুতর প্রত্যাহ্বান সৃষ্টি করেছিলো। বাজাউর ও সোয়াতের ইউসুফজাইদের শত্রুতা এবং রোশানিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা বায়েজিদের নতুন ধর্মীয় নেতার কার্যকলাপের জন্য সীমান্তের আফগান উপজাতিরাও প্রচণ্ড উদ্বেগের মধ্যে ছিলো। উজবেকরা আফগানদের ভর্তুকিও দিচ্ছিলেন।
সফাভিদ অধ্যুষিত খোরাসানে উজবেকরা আক্রমণ সংঘটিত করার সময় মোগলরা নিরপেক্ষ থাকবে বলে ১৫৮৬ সালে আকবর আবদুল্যাহ খাঁর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। বিনিময়ে আবদুল্যাহ খাঁ মোগলদের সাথে শত্রুতা আচরণ করা আফগান উপজাতিদের সমর্থন, ভর্তুকি বা আশ্রয় দেওয়া থেকে বিরত থাকতে সন্মত হয়েছিলেন। এভাবে চুক্তি করে আকবর ইউসুফজাই এবং অন্যান্য বিদ্রোহীদের শান্ত করার জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন। আফগান উপজাতিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য আকবর তাঁর দুধভাই জইন খাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আকবরের দরবারের বিখ্যাত মন্ত্রী বীরবলকেও সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভিযান পরিচালনার সময় এক বিপর্যয়ে দেখা দিয়েছিলো এবং পর্বত থেকে পশ্চাদসরণ করার সময় বীরবল এবং তাঁর দলবল ১৫৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালান্দারাই গিরিপথে আফগানদের দ্বারা অতর্কিত আক্রমণের ফলে নিহত হয়েছিলেন। আকবর অবিলম্বে রাজা টোডরমলের নেতৃত্বে ইউসূফজাইর ভূমি পুনরুদ্ধার করার জন্য একদল সেনা পাঠিয়েছিলেন। পরের ছয় বছর মোগলরা পাহাড়িয়া উপত্যকায় ইউসূফজাইদের পেছনে লেগে ছিলেন এবং বাজাউর ও সোয়াতের অনেক সর্দারকে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন। অঞ্চলটিকে সুরক্ষিত করার জন্য কয়েক ডজন দূর্গ নির্মাণ ও দখল করেছিলেন। আফগান উপজাতিদের উপরে নিয়ন্ত্রণ আকবরের দৃঢ় সামরিক অভিযানের ক্ষমতা প্রমাণ করে।
উজবেকদের সাথে চুক্তি সত্ত্বেও আকবর আজকের আফগানিস্থান থেকে মধ্য এশিয়া পুনরুদ্ধারের আশা গোপনে পোষণ করেছিলেন। তবে বদখসাঁ এবং বলখ আকবরের রাজত্বকালে দৃঢ়ভাবে উজবেক শাসনের অংশ ছিলো। (১৭ শতকের মাঝামাঝি আকবরের নাতি বাদশাহ শাহজাহান দু’টি প্রদেশের একটি সাময়িকভাবে দখল করেছিলেন। তা সত্ত্বেও উত্তর সীমান্তে আকবরের অবস্থান আশাব্যঞ্জক ছিলো। ১৬০০ সাল নাগাদ আফগান উপজাতিরা পরাজিত হয়েছিলো এবং রোশানিয়া আন্দোলন দৃঢ়ভাবে দমন করা হয়েছিলো। আফ্রিদি এবং ওরাকজাই উপজাতিরা রোশানিয়া আন্দোলন(একটি জনপ্রিয় অসাম্রাদায়িক আন্দোলন)-এর অধীনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। অবশ্যে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিলো এবং নেতাদের নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিলো। রোশানিয়া আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা বায়েজিদের পুত্র জালালুদ্দিন ১৬০১ সালে গজনীর নিকট মোগল সেনাদের সাথে সংঘটিত যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। ১৫৯৮ সালে আবদুল্যাহ খাঁর মৃত্যুর পরে উজবেক হুমকি হ্রাস পেয়েছিলো এবং আফগাস্থিানের ওপর মোগল শাসন সুরক্ষিত হয়েছিলো।
সিন্ধু উপত্যকা বিজয়– লাহোরে উজবেকদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করার পর সীমান্ত প্রদশেগুলিকে সুরক্ষিত করারজন্য আকবর সিন্ধু উপত্যকা দখল করার চেষ্টা করেছিলেন। শিয়া চক রাজবংশের শাসক আলী শাহ তাঁর ছেলেকে মোগল দরবারে জিম্মি হিসাবে পাঠাতে অস্বীকার করলে ১৫৮৫ সালে আকবর উচ্চ সিন্ধু অববাহিকায় অবস্থিত কাশ্মীর জয় করার জন্য একদল সেনা প্রেরণ করেছিলেন। আলী শাহ তৎক্ষণাৎ মোগলদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তবে তাঁর পুত্র ইয়াকুব নিজেকে রাজা হিসাবে ঘোষণা করে মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ১৫৮৯ সালের জুন মাসে ইয়াকুব এবং তাঁর সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করানোর জন্য আকবর নিজে লাহোর থেকে শ্রীনগর গিয়েছিলেন। কাশ্মীর সংলগ্ন তিব্বতি প্রদেশের বাল্টিস্থান এবং লাডাখ আকবরের প্রতি তাদের আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিলো। তারপর মোগলরা নিম্ন সিন্ধু উপত্যকায় অবস্থিত সিন্ধু জয় করার জন্য অভিযান চালিয়েছিলো। ১৫৭৪ সাল থেকে ভাক্কারের উত্তরে দূর্গ মোগলদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। শর্ত সাপেক্ষে দক্ষিণ সিন্ধের ঠাট্টার স্বাধীন শাসক মির্জা জানি বেগের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে গিয়ে মুলতানের মোগল শাসক ব্যর্থ হয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে আকবর ঠাট্টার রাজধানী সেওয়ান অবরোধ করার জন্য একদল সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। জানি বেগ মোগলদের সাথে মোকাবিলা করার জন্য এক বিশাল বাহিনী গঠন করেছিলেন। সেওয়ানের যুদ্ধে মোগল বাহিনী সিন্ধি বাহিনীকে পরাজিত করে। পরাজয়ের পরে জানি বেগ ১৫৯১ সালে মোগলদের নিকট আত্মসমর্পণ করেন এবং ১৫৯৩ সালে লাহোরে আকবরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৫৮৬ সালের প্রারম্ভে নামমাত্র পানী আফগান শাসকের অধীনস্থ অর্ধ ডজন বেলুচি প্রধানকে মোগলদের আধিপত্য স্বীকার করার জন্য প্ররোচিত করা হয়েছিলো। সাফাভিদদের কাছ থেকে কান্দাহার দখলের প্রস্তুতি হিসাবে ১৫৯৫ সালে আকবর মোগল বাহিনীকে বেলুচিস্থানের বাকী অংশ দখল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। মোগল সেনাপতি মীর মাসুমের নেতৃত্বে একদল সেনা কোয়েটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সিবির দূর্গ আক্রমণ করেন এবং উক্ত যুদ্ধে স্থানীয় সর্দারদের একটি জোটকে পরাস্ত করেন। তাঁদের মোগল আধিপত্য স্বীকার করতে এবং আকবরের দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য করা হয়। ফলস্বরূপ মাক্রান উপকুল সহ বেলুচিস্থানের আধুনিক পাকিস্থান এবং আফগানিস্থানের অংশগুলি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়।
সাফাভিদ ও কান্দাহার– প্রাচীন ভারতীয় রাজ্য গান্ধারকে আরব ইতিহাসবিদরা নামকরম করেছিলো কান্দাহার। ১৪ শতকে মোগলদের পূর্বপুরুষ তাইমূর পশ্চিম, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ অঞ্চল দখল করেছিলেন। তখন থেকে কান্দাহার ঘনিষ্ঠভাবে মোগলদের সাথে যুক্ত ছিলো। তবে সাফাভিদরা কান্দাহারকে পারস্য শাসিত খোরাসান অঞ্চলের রাজকীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করছিলেন এবং মোগল সম্রাটের সাথে এর সম্পর্ককে দখল বলে ঘোষণা করেছিলেন। ১৫৫৮ সালে আকবর যখন উত্তর ভারতে তাঁর শাসনকে সুসংহত করছিলেন, তখন সাফাভিদ সম্রাট তাহমাস্প-প্রথম কান্দাহার দখল করেছিলেন এবং এর মোগল শাসককে কান্দাহার থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। তখন থেকে পরবর্তী ত্রিশ বছর এটি পারস্য শাসনের অধীনে ছিলো। কান্দাহার দখল আকবরের জন্য অগ্রাধিকার ছিল না, তবে উত্তর সীমান্তে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক তৎপরতার পর, এই অঞ্চলে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা করাটা অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। সিন্ধু, কাশ্মীর এবং বেলুচিস্থানের কিছু অংশ এবং আধুনিক আফগানিস্থানের উপর বিজয় সাব্যস্ত করার পরে আকবরের আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে তুলেছিলো। তা ছাড়া কান্দাহার এ সময়ে উজবেকদের হুমকির মধ্যে ছিলো, কিন্তু পারস্যের সম্রাট নিজে অটোম্যান তুর্কিদের দ্বারা নিগৃহীত ছিলেন। ফলে সৈন্য পাঠিয়ে কান্দাহারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পারস্যের সম্রাটের ছিল না। ফলস্বরূপ পরিস্থিতি মোগলদের অনুকূলে ছিলো।
১৫৯৩ সালে সাফাভিদ শাহজাদা রোস্তম মির্জা পরিবারের সাথে ঝগড়া করে আকবরের নিকটে এসে নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। রোস্তম মির্জা মোগলদের অনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিলেন। আকবর তাঁকে ৫,০০০ সৈন্যের সেনাপতির মর্যদা দিয়ে মুলতানের জায়গীর প্রদান করেছিলেন। ক্রমাগত উজবেক অভিযানে বিপর্যস্ত এবং মোগল দরবারে রোস্তম মির্জার অভ্যর্থনা দেখে, সাফাভিদ শাহজাদা এবং কান্দাহারের শাসক মুজাফ্ফর হোসেনও মোগলদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। মুজাফ্ফর হোসেন শাহ আব্বাসের সাথে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে ছিলো। মুজাফফর হোসেনকে ৫০০০ সৈন্যের সেনাপতির পদমর্যদা দেওয়া হয়েছিলো এবং তাঁর কন্যা কান্দাহারি বেগমকে আকবরের নাতি খুররমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। ১৫৯৫ সালে মোগল সেনাপতি শাহ বেগ খাঁর নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাঠিয়েকান্দাহার শেষ পর্যন্ত দখল করা হয়েছিলো। কান্দাহার পুনঃবিজয়ের পরেও মোগল-পারস্য সম্পর্ক ব্যাহত হয়নি। আকবর এবং পারস্য শাহ দূত ও উপহার প্রেরণ অব্যাহত রেখেছিলেন। অবশ্যে উভয়ের মধ্যে সংঘটিত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ মোগলদের পক্ষে ছিলো।
দাক্ষিণাত্যের সুলতানদের বিরুদ্ধে অভিযান– দাক্ষিণাত্যের সুলতান, যারা আকবরের আধিপত্য স্বীকার করছিলেন না, ১৫৯৩ সালে আকবর তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। ১৫৯৫ সালে আকবর আহম্মদ নগর দূর্গ অবরোধ করেছিলেন এবং চাদ বিবিকে বেরার ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছিলেন। ১৫৯৯ সালে আকবর তাপ্তী নদীর উত্তর পারে অবস্থিত বুরহানপুর দূর্গ দখল করেন এবং অসিরগড় দূর্গ অবরোধ করেন। মীরন বাহাদুর শাহ খান্দেশ ছেড়ে দিতে অস্বীকার করলে ১৬০১ সালের ১৭ জানুয়ারি দুর্গটি দখল করেন। আকবর তখন যুবরাজ ড্যানিয়ালের অধীনে আহম্মদ নগর, বেরার এবং খান্দেশ নিয়ে একটি সুবাহ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৬০৫ সালে ড্যানিয়ালের মৃত্যুর পর বঙ্গোপসাগর থেকে কান্দাহর এবং বদখসাঁ পর্যন্ত এক বিস্তৃত অঞ্চল আকবর নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। তিনি তখন সিন্ধু এবং সুরাটের পশ্চিম উপকূল এবং মধ্য ভারত দৃঢ়ভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।
রাজনৈতিক শাসন– দিল্লী সুলতানাতের পর থেকে যে শাসন ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিলো তার উপর ভিত্তি করে আকবর কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। বিভিন্ন দপ্তরের কার্যাবলীর উপর ভিত্তি করে সাবধানতার সাথে বিশদ বিধিবিধান প্রস্তুত করে পুনঃনির্মাণ করা হয়েছিলো। রাজস্ব বিভাগের প্রধান উজির, জায়গির ও ইনাম জমি সম্পৰ্কীয় যাবতীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ছিলেন।
সামরিক বিভাগের প্রধানকে মীর বক্সী বলা হতো, যাকে দরবারের শীর্ষস্থানীয় অভিজাতদের মধ্য থেকে নিযুক্ত করা হতো। মীর বক্সী গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন এবং সামরিক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য সম্রাটের নিকট সুপারিশও করতেন।
মীর সামন রাজকীয় পরিবারের দায়িত্বে ছিলেন এবং দরবার ও রাজকীয় দেহরক্ষীর কাজকর্মের তদারকি করতেন।
বিচার বিভাগ একজন প্রধান কাজির নেতৃত্বে একটি পৃথক সংস্থা ছিলো, যিনি ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনুশীলনের জন্যও দায়ী ছিলেন।
করকাটল– শের শাহ সূরির ব্যবস্থা অনুসারে আকবর সাম্রাজ্যের ভূমি রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারের ব্যবস্থা করেছিলেন। চাষকৃত এলেকা, যেখানে ফসল উৎপাদন ভালো হতো পরিমাপ করে, উৎপাদনশীলতার উপরে নির্ভর করে কর ধার্য করা হতো। এই ব্যবস্থা কৃষকদের মধ্যে অসুবিধা সৃষ্টি করেছিলো, কারণ রাজদরবারে প্রচলিত মূল্যের উপর নির্ভর করে করা ধার্য করা হতো, যে মূল্য গ্রামাঞ্চলের মূল্যের তুলনায় বেশি ছিলো। আকবর বার্ষিক কর নির্ধারণের জন্য এক বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা করেছিলেন, কিন্তু এর ফলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি দেখা দিয়েছিলো। ফলে ১৫৮০ সালে এই ব্যবস্থা পরিত্যাগ করা হয়েছিলো। এর পরিবর্তে দহশালা নামে একটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিলো। নতুন ব্যবস্থার অধীনে আগের দশ বছরের গড় উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ হিসাবে রাজস্ব গণনা করা হতো, যা সম্রাটকে নগদ পরিশোধ করা হতো। স্থানীয় মূল্য বিবেচনায় নিয়ে এবং অনুরূপ উৎপাদনশীল অঞ্চলগুলিকে গোষ্ঠীভূক্ত করে এই ব্যবস্থা পরে পরিমার্জিত করা হয়েছিলো। এই ব্যবস্থায় অতিরিক্ত খরা বা বন্যার জন্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষকদের খাজনা মওকুফ করা হতো। আকবরের এই দহশালা(যা যাবতি ব্যবস্থা নামেও পরিচিত)ব্যবস্থার কৃতিত্ব রাজা টোডরমলকে দেওয়া হয়েছিলো, যিনি শের শাহ সূরির অধীনে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে ১৫৮২ সাল থেকে ১৫৮৩ সাল পর্যন্ত কাজ করছিলেন।
কিছু কিছু অঞ্চলে রাজস্ব নির্দ্ধারণের জন্য স্থানীয় পদ্ধতি অব্যাহত ছিলো। পতিত বা অনাবাদী জমির জন্য রেয়াতি হারে রাজস্ব নির্দ্ধারণ করা হতো। আকবর নিজে কৃষির উন্নতি ও সম্প্রসারণের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করতেন। গ্রামের রাজস্ব নির্দ্ধারণ প্রাথমিক একক হিসাবে ধারাবাহিকভাবে প্রচলিত ছিলো। প্রয়োজনে কৃষকদের ঋণ প্রদান, কৃষি উপকরণ সরবরাহ, উন্নত মানের বীজ বপনের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করাটা প্রতিটি এলেকার জামিদারদের কর্তব্য হিসাবে গণ্য ছিলো। ফলস্বরূপ উৎপাদিত শস্যের একটি অংশ সংগ্রহের জন্য জমিদারদের বংশগত অধিকার দেওয়া হয়েছিলো। জমির রাজস্ব সময় মতে পরিশোধ করা পর্যন্ত কৃষকদের জমির উপর বংশগত অধিকার ছিলো। রাজস্ব নির্দ্ধারণ ব্যবস্থা ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিলো এবং রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রতি অবিশ্বাসের মাত্রাও বজায় রেখেছিলো। রাজস্ব কর্মকর্তাদের তাঁদের বেতনের মাত্র তিন-চতুর্থাংশ প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছিলো এবং বাকী ত্রৈমাসিক বেতন তাঁদের জন্য নির্দ্ধারিত রাজস্ব সম্পূর্ণ আদায়ের উপর নির্ভশীল ছিলো।
সামরিক সংস্থা– আকবর মনসবদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সেনাবাহিনী এবং অভিজাতদের সংগঠিত করেছিলেন। এই ব্যবস্থার অধীনে, সেনাবাহিনীর প্রতিজন অভিজাত অফিসারকে মনসবদার পদবী প্রদান করা হয়েছিলো এবং বেশ কয়েকজন অশ্বারোহীকে নিযুক্তি দেওয়া হয়েছিলো, যারা সাম্রাজ্যের জন্য সেনা সংগ্রহ করতেন। মনসবদারদের ৩৩ টি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছিলো। ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ সেনার মধ্যে শীর্ষ তিনটি সেনাপতির খিতাব সাধারণত রাজকুমারদের জন্য সংরক্ষিত ছিলো। ১০,০০০ থেকে ৫,০০০ সেনার মধ্যে অন্যান্য খিতাবগুলি অভিজাত সদস্যদের জন্য বরাদ্দ ছিলো। সাম্রাজের স্থায়ী বাহিনী বেশ ছোট ছিলো এবং সাম্রাজ্যের বাহিনী মনসবদারদের রক্ষণাবেক্ষণের উপর নির্ভরশীল ছিলো। সাধারণ ব্যক্তিদের সাধারণত নিম্ন মনসবদার পদে নিযুক্ত করা হতো এবং তাদের যোগ্যতা এবং সম্রাটের অনুগ্রহের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হতো। প্রতিজন মনসবদারকে নির্দিষ্ট সংখ্যক অশ্বারোহী এবং তার দ্বিগুণ সংখ্যক ঘোড়া রাখতে হতো। অশ্বারোহীর চেয়ে ঘোড়ার সংখ্যা বেশি রাখা হতো, কারণ ঘোড়াদের বিশ্রাম দিতে হতো। সশস্ত্র বাহিনীর মান উচ্চ স্তরে বজায় রাখার জন্য কঠোর অনুশীলনের ব্যবস্থা ছিলো। ঘোড়াদের নিয়মিত পরিদর্শন করা হতো এবং সাধারণত শুধু মাত্র আরবীয় ঘোড়া নিযুক্ত করা হতো। মনসবদাররা ঘোড়ার পরিষেবার জন্য পারিশ্রমিক পেতেন এবং সেই সময়ের সর্বোচ্চ বেতনভোগী সামরিক পরিষেবা গঠন করা হয়েছিলো।
আকবর সেলিম চিশতির অনুসারী ছিলেন। সেলিম চিশতি আগ্রার নিকটে সিক্রি অঞ্চলে বসবাস করতেন এবং তিনি একজন সুফি সাধক ছিলেন। এলেকাটিকে নিজের জন্য ভাগ্যবান মনে করে আকবর মুসল্লিদের ব্যবহারের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
নতুন রাজধানী নির্মাণ– আকবর ১৫৬৯ সালে আগ্রা থেকে ২৩ মাইল(৩৭ কিলোমিটার) পশ্চিমে ফতেহপুরে একটি প্রাচীর ঘেরা নতুন রাজধানীর ভিত্তি স্থাপন করে চিতোর এবং রস্থান্তরের উপরে বিজয় সাব্যস্ত করেছিলেন। যার নাম ১৫৭৩ সালে গুজরাট বিজয়ের পরে ফতেপুর(বিজয়ের শহর)রাখা হয়েছিলো। পরবর্তীকালে অন্যান্য অনুরূপ নামের শহর থেকে আলাদা করার জন্য ফতেহপুর সিক্রী নামকরণ করা হয়েছিলো। আকবরের প্রবীণ রাণীদের প্রত্যেকের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিলো এবং সেখানে বিশাল কৃত্রিম হ্রদ ও জলপূর্ণ চমৎকার চত্বর নির্মাণ করা হয়েছিলো। যাইহোক, শহরটি শীঘ্রেই পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিলো এবং রাজধানী ১৫৮৫ সালে লাহোরে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। কারণ হতে পারে সিক্রিতে নিন্মমানের জল অথবা পর্যাপ্ত জলের অভাব ছিলো ! কিছু ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে, আকবরকে সামরিক কারণে তাঁর সাম্রাজ্যের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে যেতে হয়েছিলো এবং তাই রাজধানী উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। অন্যান্য সূত্র ইঙ্গিত করেন যে, আকবর সিক্রির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন অথবা বুঝতে পেরেছিলেন যে, শহরটি সামরিক দিক থেকে নিরাপদ নয়। ১৫৯৯ সালে আকবর তাঁর রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তর করেছিলেন। যেখানে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।
মুদ্রা– মুদ্রার ক্ষেত্রে আকবর একজন মহান উদ্ভাবক ছিলেন। আকবরের উদ্ভাবিত মুদ্রা ভারতের মুদ্রা সংক্রান্তীয় ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছিলেন। আকবরের পিতামহ বাবর এবং তাঁর পিতা হুমায়ূনের মুদ্রাগুলি মৌলিক এবং উদ্ভাবন বর্জিত ছিলো। কারণ প্রথমজন শাসক সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপনে ব্যস্ত ছিলেন এবং দ্বিতীয়জন আফগান শের শাহ সুরি কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। বাবর এবং হুমায়ূনের শাসনামলে সাম্রাজ্যে অশান্তি ছিলো। আকবর পঞ্চাশ বছরের অধিক কাল রাজত্ব করেছিলেন। ফলে মুদ্রা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অবসর পেয়েছিলেন।
আকবর ফুলের নমুনা, ফুটফুট বর্ডার, কোয়ট্রিয়েল(পাতা বা ফুলের অনুরূপ শোভাময় নক্সা) এবং অন্যান্য রকমের মুদ্রা প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর মুদ্রাগুলি বৃত্তাকার, বর্গাকার এবং মেহরাব আকৃতির ছিলো, যা তাঁর সর্বোত্তম মুদ্রা সংক্রান্ত ক্যালিগ্রাফিককে প্রস্ফুটিত করে। আকবরের প্রতিকৃতি টাইপ মুদ্রা(মোহর), যা যুবরাজ সেলিম উদ্ভাবন করেছিলেন। রাম- সীতার মুর্তি সম্বলিত রৌপ্য মুদ্রা, যা আকবরের ধর্মীয় সহনশীলতার দৃষ্টিভংগী উপস্থাপন করে। রাজত্বের শেষভাগে নতুন প্রচারিত ‘দীন ইলাহী’-র ধারণার ইল্লাহি এবং জাল্লার সাথে চিত্রিত মুদ্রা দেখা যায়। জাল্লাহু টাইপের মুদ্রাও দেখা যায়।
আকবরের দ্বারা প্রবর্তিত মুদ্রাগুলি আকবরের উদ্ভাবনী ধারণাকে উপস্থাপন করে, যা তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর এবং সম্রাট শাহজাহান দ্বারা পরিমার্জিত এবং নিখুঁত করা হয়েছিলো।
ব্যবসায়–বাণিজ্য– আকবরের রাজত্বকাল বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। মোগল সরকার ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতেন। লেন-দেনের জন্য নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করার জন্য কম শুল্ক নির্ধারণ করেছিলেন। তদুপরি চুরি হওয়া পণ্যের ক্ষতি পূরণ প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার ব্যবস্থা ছিলো। এই ধরণের ঘটনা হ্রাস করার জন্য রাস্তায় পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা ছিলো। ব্যবসায়-এর উন্নতির জন্য আকবর গৃহীত অন্যান্য সক্রিয় পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও যোগাযোগের রাস্তা নির্মাণ এবং সুরক্ষা প্রদান। খাইবার গিরিপথে ঢাকা চালিত যান- বাহন চলাচলের জন্য রাস্তার উন্নতির জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। এটি কাবুল থেকে ভারতে যাত্রা করার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় পথ ছিলো। তিনি পাঞ্জাবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মুলতান এবং লাহোর কৌশলগত কারণে দখল করে বিশাল দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। যেমন গ্রাপ্ত ট্রাঙ্ক রোড এবং সিন্ধু নদীর ক্রসিং অ্যাটকের নিকট একটি এবং এই দূর্গের পাশাপাশি থানা নামেছোট ছোট দূর্গের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। পারস্য এবং এশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বর্হিঃদেশীয় বাণিজ্য চালু করেছিলেন।
বৈবাহিক মৈত্রী– হিন্দু রাজকন্যা এবং মুসলিম রাজাদের সাথে বিবাহের প্রথা আকবরের অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিলো। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই বিবাহগুলি উভয় পরিবারের মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক সৃষ্টি করেনি। এই বিবাহের ফলে হিন্দু মহিলারা তাঁদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। তবে, আকবরের বৈবাহিক মৈত্রীর নীতি পূর্বের পরম্পরাকে বিদায় দিয়েছিলো এবং ভারতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলো। যেসব হিন্দু রাজপুতরা তাঁর সাথে তাঁদের কন্যা বা বোনকে বিয়ে দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করবে, শশুড় শাশুড়ী এবং শশুড় বাড়ির সাথে খাওয়া- দাওয়া, নামাজ পড়া এবং মুসলিম স্ত্রী গ্রহণ করা ছাড়া সব ক্ষেত্রেই মুসলমানদের সমান আচরণ করা হবে। রাজপুতদের তাঁর দরবারের সদস্য করা হয়েছিলো। তবে, মুসলমানদের সাথে তাঁদের কন্যা বা বোনদের বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করাটা বৈবাহিক অবক্ষয় ও অপমানের চিহ্ন হিসাবে ভেবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।
আমেরের কচ্ছওয়াহা রাজপুত রাজা ভারমল, আকবরের উত্তরসূরি, জাহাঙ্গীরের মাতৃ হরকা বাইকে সম্রাটের সাথে বিয়ে দিয়ে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন। হরকা বাই (হীরা কুঁয়ারী)মরিয়ম-উজ-জামানি ও যোধাবাই নামেও পরিচিত ছিলেন। রাজা ভারমল পরে আকবরের দরবারে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং পরবর্তী কালে তাঁর পুত্র ভগবন্ত দাস ও নাতি মান সিংহ উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
অন্যান্য রাজ্যগুলির সাথেও আকবর বৈবাহিক মৈত্রী স্থাপন করেছিলেন, তবে জোট গঠনের পূর্ব শর্ত হিসাবে বিবাহের উপর জোর দেওয়া হয়নি। দু’টি রাজপুত গোষ্ঠী এই বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন থেকে দূরে অবস্থান করছিলো, মেওয়ারের সিসোদিয়া এবং রস্থাম্ভরের হাদাসরা। অম্বরের রাজা মান সিংহ-প্রথম আকবরের সাথে জোট গঠনের উদ্দেশ্যে নিয়ে হাদা নেতা সুরজন হাদার নিকট গিয়েছিলেন। আকবর তাঁর কন্যাদের কাউকে বিয়ে করবেন না এই শর্তে সুরজান হাদা আকবরের সাথে মৈত্রী স্থাপন করেছিলেন। কোনো বৈবাহিক মৈত্রী ছাড়াই সুরজান হাদাকে আকবরের দরবারের সদস্য করা হয়েছিলো এবং তাঁকে গড়-কাটাঙ্গার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়েছিলো।
এই বৈবাহিক মৈত্রীর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ছিলো। আকবরের হারেমে প্রবেশকারী মহিলাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তকরণ করার আগে তাঁদের সাধারণত পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিলো এবং তাঁদের হিন্দু আত্মীয়রা উল্লেখযোগ্য অভিজাত একটি শ্রেণী সৃষ্টি করেছিলো। তাঁরা সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দুদের হয়ে দরবারে মতামত প্রকাশ করতেন। এই মিশ্রণের ফলে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাব বিনিময় ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান হয়েছিলো। মোগল বংশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাজপুত রক্তের সংমিশ্রণ হওয়ার ফলে উভয় সম্প্রদায়ের সম্পর্ক নিবিড়ি হয়ে উঠেছিলো। ফলে রাজপুতরা মোগলের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র হয়ে উঠেছিলো এবং রাজপুত সৈন্য ও সেনাপতিরা আকবরের অধীনে মোগলদের হয়ে যুদ্ধ করতেন। ১৫৭২ সালে গুজরাট বিজয় সহ বেশ কয়টি অভিযানে রাজপুতরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আকবরের এই ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি নিশ্চিত করে যে, সাম্রাজ্য প্রশাসনের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিলো এবং এর ফলে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক পরিষেবার শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিলো।
একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে যে, আকবরের কন্যা মেহেরুন্নিসা তানসেনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং আকবরের দরবারে সভাসদ হওয়ার পেছনে মেহেরুন্নিসার ভূমিকা ছিলো। উভয়ের সাথে বিয়ের প্রাক্কালে তানসেন ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন।
পর্তুগীজদের সাথে সম্পর্ক– ১৫৫৬ সালে আকবর সিংহাসনে আরোহণ করার সময় পর্তুগীজরা ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম উপকূলে বেশ কয়েকটি দূর্গ এবং কারাখানা স্থাপন করেছিলেন এবং সেই অঞ্চলে নৌ চলাচল ও সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। এই ঔপনিবেশিকতার ফলস্বরূপ অন্যান্য সমস্ত ব্যবসায়িক সংস্থা পর্তুগীজদের শর্তাবলীর অধীনে ছিলো। গুজরাটের শাসক বাহাদুর শাহ সহ তৎকালীন শাসকরা এর ফলে পর্তুগীজদের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন।
১৫৭২ সালে গুজরাটকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করার পরে স্থানীয় কর্মকর্তারা আকবরকে অবগত করেছিলেন, যে পর্তুগীজরা ভারত মহাসাগরে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। পর্তুগীজদের উপস্থিতি হুমকি বলে বিবেচনা করে আকবর আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল তোলা নৌকা চলাচলের জন্য কার্টাজে (পারমিট)র ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৫৭২ সালে সুরাট অবরোধের সময় মোগল এবং পর্তুগীজদের প্রাথমিক বৈঠকে পর্তুগীজরা মোগল সেনা বাহিনী অধিক শক্তিশালী বলে মেনে নিয়েছিলো এবং যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতির দ্বারা সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলো। আকবরের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পর্তুগীজ শাসক আকবরের নিকট দূত প্রেরণ করেছিলেন। তখন আকবর পর্তুগীজদের কাছ থেকে আর্টিলারি ক্রয়ের চেষ্টা করেছিলেন, তবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো। ফলে আকবর গুজরাট উপকূলে মোগল নৌ বাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
আকবর কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু পর্তুগীজরা ভারত মহাসাগরে তাঁদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা অধিক জোরদার করে তুলেছিলেন। জাহাজে করে মক্কা এবং মদিনায় হজ্ব করতে যাওয়ার সময় পর্তুগীজদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হতো, এর জন্য আকবর খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। পর্তুগীজদের দখলকৃত অঞ্চল দমনে পর্তুগীজদের উসকানি না দেওয়ার জন্য আকবর গুজরাটের মোগল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ফরমান জারি করেছিলেন। ফলে পর্তুগীজরা মোগল পরিবারের সদস্যদের জন্য পালাক্রমে মক্কায় হজ্বে যাওয়ার জন্য পাস জারি করেছিলেন। পর্তুগীজরা জাহাজে মোগল পরিবার এবং অন্যান্য যাত্রীদের অসাধারণ মর্যদা প্রদান করতেন।
১৫৭৯ সালে গোয়ার জেসুইটস (রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান)দের আকবরের দরবারে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। আকবর তাঁর লেখকদের দ্বারা নিউ টেস্টামণ্ট অনুবাদ করিয়েছিলেন এবং গসপেল প্রচারের স্বাধীনতা প্রদান করেছিলেন। আকবর অ্যান্তোনি দ্য মন্টসেরাতের উপর তাঁর পুত্র সুলতান মুরাদ মির্জার শিক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন। তবে জেসুইটসরা শুধু তাঁদের নিজেদের ধর্মীয় মতবাদ প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেন নি, ইসলামের বদনামও করেছিলেন। তাঁদের মন্তব্যে ইমাম ও উলামারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং আকবরের নিকট আপত্তি জানিয়েছিলেন। আকবর তখন জেসুইটসদের মন্তব্য রেকর্ড করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁদের আচরণ সাবধানে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ১৫৮১ সালে বাংলার মোল্লা মহম্মদ ইয়াজদি এবং মুইজ-উল-মুলুকের নেতৃত্বে মুসলিম ধর্মগুরুদের দ্বারা বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়েছিলো।। বিদ্রোহীরা আকবরকে উৎখাত করে মির্জা মহম্মদ হাকিমকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। আকবর সফলভাবে বিদ্রোহীদের পরাজিত করেছিলেন এবং পরবর্তীতে জেটুইসদের প্রতি অধিক সতর্কতা অবলম্বন করছিলেন। তিনি পরবর্তীতে উপদেষ্টামণ্ডলীর দ্বারা জেসুইটসদের বিষয়গুলি সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করেছিলেন।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক– ১৫৫৫ সালে আকবর যখন শিশু ছিলেন, তখন অটোম্যান সেনাপতি সাঈদি আলী রেইস মোগল সম্রাট হুমায়ূনের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ১৫৬৯ সালে, আকবরের শাসনের প্রথম বছরগুলিতে, আরেকজন অটোম্যান সেনাপতি কুতোআগুলু হিজার রেইস মোগল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ভারত মহাসাগরের তীরে এসেছিলেন। এই অটোম্যান সেনাপতিরা তাদের ভারত মহাসাগর অভিযানের সময় পর্তুগীজ সাম্রাজ্যের ক্রমবর্দ্ধমান হুমকির অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। আকবর তাঁর শাসনামলে অটোম্যান সুলতান সুলেইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টেকে সম্বোধন করে ছয়টি নথি পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
১৫৭৬ সালে আকবর ৬,০০,০০০ স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, ১২,০০০ কাফতান কাপড়সহ চালের বড় চালান খাজা সুলতান নকসবন্দি ও ইয়াহিয়া সালেহের নেতৃত্বে তাঁর পরিবারের সদস্য খালা গুলবদন বেগম এবং তাঁর সহধর্মিনী সালিমা সহ তীর্থযাত্রীদের খুব বড় একটি দল হজ্বে পাঠিয়েছিলেন। একটি উসমানীয় জাহাজ সহ সুরাট বন্দর থেকে দু’টি জাহাজ পাঠিয়েছিলেন এবং সেই জাহাজ দু’টি ১৫৭৭ সালে জেদ্দা বন্দরে পৌঁছেছিলো এবং তারপরে উক্ত হজ্বযাত্রী মক্কা ও মদিনার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। ১৫৭৭ থেকে ১৬০৮ পর্যন্ত মক্কা ও মদিনার কর্তৃপক্ষের জন্য চমৎকার উপহার সহ আরও চারটি কাফেলা পাঠানো হয়েছিলো।
মোগল বাহিনী প্রায় চার বছর মক্কা ও মদিনায় অবস্থান করেছিলেন এবং চার বার হজ্বব্রত পালন করেছিলেন। এই সময়ে আকবর তাঁর সাম্রাজ্যের অনেক দরিদ্র মুসলমানদের অর্থ সাহায্য দিয়ে তীর্থযাত্রায় পাঠিয়েছিলেন এবং হিজাজে কাদরিয়া সুফি দরবেশ লজের ভিত্তি স্থাপনের জন্য অর্থ পাঠিয়েছিলেন। হজ্ব সম্পন্ন করে মোগলরা শেষপর্যন্ত সুরাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন এবং জেদ্দায় অটোম্যান পাশা তাঁদের প্রত্যাবর্তনে সহায়তা করেছিলেন। মক্কা ও মদিনায় মোগলদের উপস্থিতির জন্য স্থানীয় শরীফরা মোগল সাম্রাজ্যের দেওয়া আর্থিক সহায়তার প্রতি আস্থা প্রদর্শন শুরু করেছিলেন এবং উসমানীয়া অনুগ্রহের উপর তাঁদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছিলেন। এই সময়কালে মোগল ও উসমানীয়দের বাণিজ্যেরও বিকাশ ঘটেছিলো। আকবরের অনুগত বণিকরা বসরা বন্দরের মধ্য দিয়ে আলেপ্পোতে (এলেপ্পো সিরিয়ার একটি শহর) পৌঁছেছিলেন বলে জানা যায়।
কিছু বর্ণনা অনুসারে আকবর পর্তুগীজদের সাথে জোট বন্ধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু যখনই পর্তুগীজরা অটোম্যান সাম্রাজ্য আক্রমণের চেষ্টা করছিলো, তখনই আকবর অটোম্যানদের আনুগত্য প্রদর্শন করছিলেন। ১৫৮৭ সালে পর্তুগীজ নৌবহর অটোম্যান নৌবহরের উপর আক্রমণ সংঘটিত করে নির্মমভাবে পরাজিত হয়েছিলো। এর পরে জাঞ্জিয়ার মোগল সাম্রাজের ভাসাল(অধীনস্থ শাসক)দের ক্রমাগত চাপের জন্য মোগল-পর্তুগীজ জোট ভেঙে গিয়েছিলো।
সাফাভিদ এবং মোগলদের কূটনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস ছিলো। হুমায়ূন শের শাহ সূরির হাতে পরাজিত হওয়ার পরে সাফাভিদ শাসক তাহমাস্প প্রথম হুমায়ূনকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সাফাভিদরা ইসলামের শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলো এবং মোগলরা সুন্নি সম্প্রদায়ভূক্ত ছিলো। হিন্দুকুশ অঞ্চলের কান্দাহার শহর নিয়ে সাফাভিদ এবং মোগলদের মধ্যে বিরোধ ছিলো, যা পরে দুই সাম্রাজ্যের সীমা নির্ধারিত হয়েছিলো। হিন্দুকুশ অঞ্চলটি ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে সামরিক অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। ফলস্বরূপে শহরটি আকবরের শাসনামলে বৈরাম খাঁ দ্বারা শাসিত ছিলো এবং শহরটি ১৫৫৮ সালে পারস্যের শাসক শাহ তাহমস্প প্রথম-এর চাচাতো ভ্রাতৃ হোসেন মির্জা দখল করে নিয়েছিলেন। এর পরে সাফাভিদদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বৈরাম খাঁ শাহ তাহমাস্প প্রথম-এর দরবারে একজন দূত প্রেরণ করেছিলেন। আকবরের রাজত্বের দুই দশকে উভয় সাম্রাজ্যের মধ্যে সৌহৃদ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। ১৫৭৬ সালে শাহ তাহমস্প প্রথম-এর মৃত্যুর ফলে সাফাভিদ সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ এবং অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছিলো এবং দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কূটনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ হয়ে ছিলো। ১৫৮৭ সালে শাফাভিদ শাহ আব্বাস সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিলো। কিছুদিন পরে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য আকবর বাহিনী কান্দাহার পুনরুদ্ধার করেছিলেন। ১৫৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল কোনো ধরণের প্রতিরোধ ছাড়াই কাবুলের শাসক মুজাফ্ফর হোসেন আত্মসমর্ষণ করে মোগল দরবারে চলে এসেছিলেন। ১৬৪৬ সালে শাহজাহানের বদখসাঁ অভিযান পর্যন্ত কয়েক দশক ধরে কান্দাহার এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, মোগলদের অধীনে ছিলো। আকবরের রাজত্বের শেষ অবধি সফাভিদ এবং মোগলদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিলো।
ধর্মীয় নীতি– আকবর, তাঁর মাতৃ এবং অন্যান্য সদস্যরা সুন্নি হানাফি মুসলমান ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাঁর জীবনের প্রারম্ভিক দিনগুলি এমন এক পরিবেশের মধ্যে অতিবাহিত হয়েছিলো, যেখানে উদারনৈতিক অনুভূতিগুলোকে উৎসাহিত করা হতো এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে ঘৃণা করা হতো। ১৫ শতক থেকে দেশের বিভিন্ন অংশে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি গড়ে তোলার জন্য ধর্মীয় সহনশীলতার উদার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিলো। এই অনুভূতিগুলো পূর্বে গুরু নানক, কবির এবং চৈতন্য দেবের মতো জনপ্রিয় সাধকদের শিক্ষা এবং মানবের প্রতি সহানুভূতি এবং উদার দৃষ্টিভংগী সমর্থন করা পারস্যের কবি হাফিজের উক্তির দ্বারা উৎসাহিত করা হতো। পাশাপাশি তৈমূরীয়দের ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি তৈমুরের সময় থেকে হুমায়ূন পর্যন্ত সাম্রাজ্যে অবিচল ছিলো এবং ধর্মের বিষয়ে আকবরের সহনশীলতার নীতিকে প্রভাবিত করছিলো। আকবরের শৈশব কালের শিক্ষক, যার মধ্যে দুইজন ইরানী শিয়া সম্প্রদায়ভূক্ত ছিলো, তাঁরা মূলতঃ কুসংস্কারের উর্দ্ধে ছিলেন, তাঁদের শিক্ষার দ্বারা পরবর্তী জীবনে আকবরকে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দিকে ঝোঁকে পড়তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলো।
আকবর বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠী (শিয়া. সুন্নি, ইসমাইলি এবং সুফি), পার্সি, হিন্দু(শৈব ও বৈষ্ণব), শিখ, জৈন, ইহুদি, জেসুইট বা বস্তুবাদীদের মধ্যে ধর্মীয় বিতর্কের পৃষ্ঠপোষকতা করছিলেন। তিনি সুফিবাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রজ্ঞা বেদান্ত হলো সুফিবাদের জ্ঞান।
আকবর যখন ফতেপুর সিক্রিতে ছিলেন, তখন তিনি সকল ধর্মের বিষয়ে আলোচনা করতেন, কারণ তিনি অন্যদের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন। এই সময়েই তিনি জানতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, অন্য ধর্মের ধর্মাবলম্বীরা প্রায়ই অন্যদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অসহিষ্ণু। এই ধারণা তাঁকে নতুন ধর্ম, ‘সুল-ই-কুল’ অর্থাৎ সার্বজনীন শান্তির ধারণা তৈরি করতে পরিচালনা করেছিলো। এই ধর্মের ধারণা অন্য ধর্মের প্রতি বৈষম্য করেনি, বরঞ্চ শান্তি, ঐক্য এবং সহনশীলতার ধারণার উপর তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো।
মুসলিম অভিজাততন্ত্রের সাথে সম্পর্ক– রাজত্বের প্রথম দিকে আকবর মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি দমনের মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন। ফলে মুসলিম গোঁড়াদের দ্বারা তিনি নিন্দিত হয়েছিলেন। ১৫৬৭ সালে শেখ আব্দুউন নবীর পরামর্শে তিনি দিল্লীতে আমির খশুর কবরের নিকট সমাধিস্থ করা একজন শিয়া সম্প্রদায়ের লোক মীর মুর্জা শরিফী শিরাজির মৃতদেহ কবর থেকে খুঁড়ে বের করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুক্তি ছিলো যে, একজন ধর্ম বিদ্বেষীকে একজন সুন্নি সাধক আমির খশুর কবরের নিকট কবর দেওয়া যাবে না। এটি শিয়াদের প্রতি তাঁর সংকীর্ণ মনোভাব প্রতিফলিত করেছিলো, যা ১৫৭০ দশকের শুরু পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। ১৫৭৩ সালে গুজরাট অভিযানের সময় তিনি ‘মাহদাভিজম’কে দমন করেছিলেন। তাঁর নির্দেশে মাহদাভিজম নেতা বন্দেগী মিয়া শেখ মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো এবং বিচারের জন্য শিকল দিয়ে বেঁধে কোর্টে আনা হয়েছিলো এবং আঠারো মাস পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিলো। আকবর ১৫৭০ সালের গোঁড়ার দিক থেকে ক্রমবর্দ্ধমানভাবে সর্বৈশ্বরবাদী সুফি রহস্যবাদের প্রভাবে এসেছিলেন, তাই বন্দেগী মিয়া শেখ মোস্তফার গ্রেপ্তার তাঁর ধর্ম সম্পর্কীয় দৃষ্টিভংগীতে একটি বড় পরিবর্তন এনেছিলো এবং ইসলামের সীমা অতিক্রম করে তিনি ঐতিহ্যগতভাবে গোঁড়া ইসলাম থেকে আলাদা একটি নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছিলো। ফলস্বরূপে তিনি রাজত্বের শেষার্দ্ধে শিয়াদের প্রতি সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন এবং সিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। আকবর সাম্রাজ্যের আভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের বিষয়ে নিরপেক্ষ ছিলেন। ১৫৭৮ সালে আকবর উল্লেখ করেছিলেন-ইসলামের সম্রাট, বিশ্বস্তদের আমীর, পৃথিবীতে ঈশ্বরের ছায়া, আবুল ফাতহ জালাল-উদ-দীন মহম্মদ আকবর বাদশাহ গাজী(যার সাম্রাজ্য আল্লাহ চিরস্থায়ী করুন) একজন সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ, সবচেয়ে জ্ঞানী, সবচেয়ে ঈশ্বর ভয়শীল শাসক ।
১৫৮০ সালে আকবরের সাম্রাজ্যের পূর্ব দিকে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো এবং কাজি দ্বারা আকবরকে ধর্মদ্রোহী বলে ঘোষণা করে তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি ফতোয়া জারি করা হয়েছিলো। আকবর বিদ্রোহ দমন করেছিলেন এবং বিদ্রোহীদের কঠোর শাস্তি প্রদান করেছিলেন। কাজিদের সাথে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার জন্য ১৫৭৯ সালে আকবর সমস্ত প্রধান উলেমা দ্বারা স্বাক্ষরিত একটি মাজহার (বড় আকারের ঢোল) দ্বারা ঘোষণা করেন। মাজহারে দাবি করা হয়েছিলো যে, আকবর হলো যুগের খলিফা, একজন মুজতাহিদের চেয়ে উচ্চ পদমর্যদা সম্পন্ন, মুজতাহিদদের মধ্যে মত পার্থক্য হলে, আকবর যেকোনো একটি মতবাদকে বেছে নিতে পারবেন এবং ন্যায়ের বিরুদ্ধে যায় না, এমন আদেশও জারি করতে পারবেন। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, মাজহার সাম্রাজ্যের ধর্মীয় পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছিলো। এটি আকবরকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তুলেছিলো এবং অটোম্যান খলিফাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব দূর করতে সাহায্য করেছিলো।
আকবর তাঁর রাজত্বকালে মীর আহম্মদ নাসরুল্লাহ ঠাট্টভি এবং তাহির মোহাম্মদ ঠাট্টভির মতো প্রভাবশালী মুসলিম পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আকবর যখন কোনো মসজিদের জামাতে যোগদান করতেন তখন নিম্নোক্ত ঘোষণাটি করা হতো-
প্রভু আমাকে রাজ্য দিয়েছেন, তিনি আমাকে জ্ঞানী, শক্তিশালী এবং সাহসী করেছেন, তিনি আমাকে সঠিক ও সত্যের পথে পরিচালিত করেছেন, আমার হৃদয়কে সত্যের ভালোবাসায় পূর্ণ করেছেন, মানুষের কোনো প্রশংসা সাম্রাজ্যের সমস্যা সমাধান করতে পারে না।
দীন ইলাহী– আকবর ধর্মীয় ও দার্শনিক বিষয়ে গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন। তিনি জীবনের প্রথম দিকে একজন গোঁড়া মুসলমান ছিলেন, পরে তিনি দেশে প্রচারিত সুফি রহস্যবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে দূরে সরে এসেছিলেন। তাঁর দরবারে উদার চিন্তাধারার বেশ কিছু প্রতিভাবান ব্যক্তিকে নিয়োগ করেছিলেন। যাঁদের মধ্যে আবুল ফজল, ফায়েজি, বীরবল অন্যতম ছিলেন। ১৫৭৫ সালে তিনি ফতেহপুর সিক্রিতে ইবাদত খানা’ (উপাসনা গৃহ) নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিয়বাদী নির্বাচিত দরবারিরা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে সাফল্যের সাথে উপস্থাপন করেছিলেন এবং তিনি তাঁদের সাথে আধ্যাত্মিকতাবাদের বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। এই আলোচনাগুলি প্রাথমিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। আলোচনা তীব্র ছিলো এবং অংশগ্রহণকারীরা চিৎকার করতেন ও একে অপরকে গালাগাল দিতেন। এতে বিচলিত হয়ে সকল ধর্মের পাশাপাশি আকবর নাস্তিকদের জন্যও একটি ইবাদত খানা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এর ফলে আলোচনার পরিধি কোরআনের বৈধতা এবং ঈশ্বরের প্রকৃতির মতো ক্ষেত্রেও বিস্তৃত ও প্রসারিত হয়েছিলো। এটা গোঁড়া ধর্মতাত্ত্বিকদের হতবাক করেছিলো এবং আকবর ইসলাম ত্যাগ করেছে বলে গুজব ছড়িয়ে অপমান করতে চেয়েছিলো।
তবে, আকবর বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মিলনের যে প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছিলেন, তা আশাব্যঞ্জক রকমে সফল হয়নি। কারণ প্রত্যেকেই অন্য ধর্মের নিন্দা করে নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার চেষ্টা করতেন। ইবাদত খানার বিতর্ক এক সময় তীব্র হয়ে উঠেছিলো এবং ধর্মগুলির মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার পরিবর্তে তিক্ততা সৃষ্টি করেছিলো। যার ফলে আকবর ১৫৮২ সালে বিতর্ক বন্ধ করে দিয়েছিলেন। যাইহোক, বিভিন্ন ধর্মে ধর্মতাত্ত্বিকদের সাথে সংঘটিত বিতর্ক তাঁকে দৃঢ়প্রত্যয়ী করে তুলেছিলো যে, বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সমস্ত ধর্মের বেশ কিছু ভাল অনুশীলন রয়েছে, যা তিনি নতুন ধর্ম দীন ইলাহি নামে একটি নতুন ধর্মে একত্রিত করতে চেয়েছিলেন।
কিছু আধুনিক পণ্ডিত মনে করেন যে, আকবর নতুন ধর্ম সৃষ্টি করেননি, তিনি তান্ত্রিক তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের ট্রান্সথিস্টিক দৃষ্টিভংগী প্রচার করেছিলেন বলে অভিহিত করেন এবং তিনি দীন-ই-ইলাহি শব্দটিও ব্যবহার করেননি। মোগল দরবারের সমসাময়িক ঘটনা অনুসারে আকবর প্রকৃতপক্ষে অনেক উচ্চস্তরের মুসলিম ধর্মগুরুর দ্বারা সম্পদ আত্মসাতের জন্য তাঁদের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন।
দীন ইলাহি এক নৈতিক ব্যবস্থা ছিলো, যার দ্বারা কামুকতা, অপবাদ এবং অহংকারকে পাপ বলে বিবেচনা করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। সাধুতা, বিচক্ষণতা, পরহেজগারি এবং দয়া হলো মানুষের মূল গুণ। দীন ইলাহির মতবাদ দ্বারা ঈশ্বরের আকাংক্ষার মাধ্যমে নিজেকে শুদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করা হতো। ব্রহ্মচার্যকে সম্মান করা হতো, সতীত্ব রক্ষার প্রতি জোর দেওয়া হতো, পশু জবাই নিষিদ্ধ ছিলো, যেখানে কোনো ধর্মগ্রন্থ বা পুরোহিতের শ্রেণীবিন্যাস ছিলো না। আকবরের দরবারের একজন সভ্রান্ত ব্যক্তি আজিজ কোকা ১৫৯৪ সালে মক্কা থেকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে, আকবর কর্তৃক উন্নীত করা ধর্মীয় বিষয়টি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করার বাহিরে আর কিছুই নয়। দীন ইলাহিকে স্মরণ করার জন্য আকবর প্রয়াগের নাম পরিবর্তন করে এলাহাবাদ রেখেছিলেন।
যুক্তি প্রদান করা হয়েছিলো যে, দীন-ই-ইলাহি একটি নতুন ধর্ম, এটা পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের দ্বারা আবুল ফজলের রচনার ভুল অনুবাদ করার জন্য উদ্ভূত হয়েছিলো। যাইহোক এটাও গৃহীত হয় যে, ‘সুল-ই-কুল’নীতি, যা দীন-ই- ইলাহির সারাংশ হিসাবে গৃহীত হয়েছিলো, এটা আকবরের শুধু ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিলো না, বরং সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক নীতির অংশ হিসাবে গৃহীত হয়েছিলো। এর দ্বারা আকবর ধর্মীয় সহনশীলতার নীতির ভিত্তিও তৈরি করেছিলেন। ১৬০৫ সালে আকবরের মৃত্যুর সময় সাধারণ প্রজাদের মাঝে অসন্তোষের কোনো চিহ্ন ছিলো না।
হিন্দুদের সাথে সম্পর্ক– আকবর নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, হিন্দুদের যারা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, তাঁরা মৃত্যুদণ্ডের সন্মুখীন না হয়েই ইচ্ছা করলে হিন্দু ধর্মে ফিরে যেতে পারবে। তাঁর সহনশীলতার নীতি হিন্দুদের দ্বারা এতটাই পসন্দের ছিলো যে, ধর্মীয় স্তোত্রগুলিতে তাঁর প্রশংসা গান গাওয়া হতো।
আকবর বেশ কিছু হিন্দু রীতি পালন করতেন। তিনি দীপাবলী উৎসব পালন করতেন, আশীর্বাদের সময় ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের রত্নখচিত স্ট্রিং(জরি) তাঁর কব্জিতে বাঁধতে দিতেন। তাঁর নেতৃত্বে অনেক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা রাখী উৎসব পালন করতেন। তিনি নিজে গো-মাংস ত্যাগ করেছিলেন এবং নির্দিষ্ট দিনে সব প্রকার মাংস বিক্রী বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এমনকী তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর এবং নাতি শাহজাহান তাঁর অনেক নীতি বজায় রেখেছিলেন। যেমন গরু জবাই নিষিদ্ধ করা, সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার খাওয়া এবং শুধুমাত্র গঙ্গা জল পান করা প্রভৃতি। এমনকী তিনি যখন গঙ্গা থেকে ২০০ মাইল দূরে পাঞ্জাবে ছিলেন, তখন শীল মোহর মেরে বড় জারে করে জল পাঞ্জাবে নিয়ে যাওয়া হতো। তিনি গঙ্গার জলকে ‘অমরত্বের জল’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
জৈনদের সাথে সম্পর্ক– আকবর নিয়মিতভাবে জৈন পণ্ডিতদের সাথে আলোচনা করতেন এবং তাঁদের শিক্ষার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতেন। জৈন আচার আচরণের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন, যখন তিনি ছয় মাস ব্যাপী উপবাসের পরে চম্পা নামক একজন শ্রাবকের (শ্রোতা) মিছিল দেখেছিলেন। তাঁর শক্তি এবং ভক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আকবর তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু আচার্য হরবিজয়া সূরিকে ফতেহপুর সিক্রিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আচার্য আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন এবং গুজরাট থেকে ফতেহপুর সিক্রিতে এসেছিলেন।
আকবর আচার্যের আধ্যাত্মিক গুণ এবং চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মের দার্শনিকদের আন্তঃবিশ্বাসের উপর বক্তব্য বেখেছিলেন। মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে জৈনদের যুক্তি আকবরকে নিরামিষভোজী হতে প্ররোচিত করেছিলেন। আকবর জৈনদের স্বার্থের অনুকূলে অনেক রাজকীয় আদেশ জারি করেছিলেন। যেমন পশু জবাই নিষিদ্ধ করণ। জৈন লেখকরা মোগল দরবারের অভিজ্ঞতার কথা সংস্কৃত গ্রন্থে লিখে গেছেন, যা ঐতিহাসিকদের এখনও অজানা।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট জৈন এবং মোগলদের স্থাপত্যের সহাবস্থানের উদাহরণ উদ্ধৃত করেছেন। আকবর জৈন ধর্মের প্রতি অত্যন্ত সন্মানশীল ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁকে আধুনিক ভারতের স্থপতি বলে অভিহিত করেছেন। ১৫৯৪, ১৫৯২, ১৫৯৮ সালে আকবর পর্যুষণ’ এবং ‘মহাবীর জন্ম কল্যাণ’ (জৈনদের দু’টি পবিত্র উৎসব)কের সময় পশু জবাই নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি পালিটানার মতো জৈন তীর্থস্থান থেকে জিজিয়া কর উঠিয়ে দিয়েছিলেন। হরবিজয়া সূরির শিষ্য শান্তিচন্দ্র মোগল দরবারে এসেছিলেন এবং তিনি তাঁর শিষ্য ভানুচন্দ্র এবং সিদ্ধিচন্দ্রকে মোগল দরবারে রেখে গিয়েছিলেন। আকবর হরবিজয়া সূরির উত্তরসূরিকে মোগল দরবারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং তিনি ১৫৯৩ এবং ১৫৯৫ সালে আকবরের সাথে সাক্ষাত করতে মোগল দরবারে এসেছিলেন।
ব্যক্তিত্ব– আকবরের দরবারে ইতিহাসবিদ আবুল ফজল ‘আকবর নামা ও আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে আকবরের রাজত্ব কালের বিষয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। বাদায়ুনী. শেখজাদা রশিদী, শেখ আহম্মদ সিরহিন্দের রচনাতেও আকবরের রাজত্বকালের বর্ণনা রয়েছে।
আকবর ছিলেন একজন যোদ্ধা, বিচক্ষণ সেনাপতি, পশু প্রশিক্ষক (কথিত আছে, আকবরের রাজত্বকালে হাজার হাজার চিতা পালন করা হতো এবং আকবর নিজে অনেক চিতাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। বিশ্বাস করা হয় যে তিনি প্রতিদিন গ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন এবং তাঁর প্রখর স্মৃতি শক্তি ছিলো। আকবর একজন জ্ঞানী এবং সুবিচারক সম্রাট ছিলেন। আকবরের উত্তরসূরি পুত্র জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতি কথায় আকবরের চরিত্রের প্রশংসা করেছেন এবং আকবরের গুণাবলীকে তুলে ধরার জন্য কয়েক ডজন উপখ্যান লিখে গেছেন। জাহাঙ্গীরের মতে, আকবরের গাত্রের রং গমের বর্ণের তথা ফর্সা ছিলো। চোখ এবং চোখের ভ্রূ কালো ছিলো। এন্থনি দ্য মন্তেসেরাত, কাতালান (রোমান কেথলিক, কাতালোনিয়ার অধিবাসী) জেসুইটস আকবরের দরবারে গিয়েছিলেন এবং আকবরের বিষয়ে নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেন-
“প্রথম দর্শনেই সবাই তাঁকে রাজা বলে চিনতে পারতেন। ব্যাণ্ডি (Bandy)পা, ঘোড়সওয়ারের জন্য উপযুক্ত এবং শরীরের রং হালকা বাদামী। তিনি ডান কাঁধের দিকে মাথা হেলিয়ে (কাত করে) চলতেন। তাঁর ললাট প্রশস্ত এবং চোখ এতো উজ্জ্বল ছিলো যে, চোখ সূর্যের আলোতে জলন্ত সাগরের মতো মনে হতো। তাঁর চোখের পাপড়ি অনেক লম্বা ছিলো। তাঁর ভ্রূ ভালোভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। খাড়া নাক, ছোট ছিলো যদিও তেমন ছোট ছিলো না। নাকের ছিদ্র খোলা ছিলো। বাম নাকের ছিদ্র এবং উপরের ঠোঁটের মাঝখানে একটি তিল চিহ্ন ছিলো। তিনি দাঁড়ি কামিয়ে রাখতেন, তবে গোঁফ কামাতেন না। তিনি বাম পা একটু খুঁড়িয়ে চলতেন, যদিও কখনও কোনো আঘাত পান নি। ‘
আকবর লম্বা ছিলেন না, তবে শক্তিশালী এবং খুব চটপটে ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সাহসিকতার জন্যও বিখ্যাত ছিলেন। ১৯ বছর বয়সে আকবর মালওয়া থেকে আগ্রায় ফেরার পথে একটি ঘটনা ঘটেছিলো। আকবর তাঁর দেহরক্ষীদের আগে আগে আসছিলেন এবং তিনি একটি চিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। চিতাটি তার শাবক সহ ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে আসছিলো। চিতাটি যখন তাঁকে আক্রমণ করছিলো, তখন তিনি তাঁর তরবারির আঘাতে একাই চিতাটিকে হত্যা করেছিলেন। তাঁর দেহরক্ষীরা এসে তাঁকে মৃত চিতাটির পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করছিলেন।
আবুল ফজল, এমনকী আকবরের বিদ্বেষী সমালোচক বাদায়ুনিও তাঁকে একজন কাপ্তানসুলভ ব্যক্তিত্বের অধিকারী বলে বর্ণনা করেছেন। যুদ্ধের সময় তাঁর কাপ্তানসূলভ আচরণের জন্য সবাই জ্ঞাত ছিলেন। আলেকজেণ্ডারের মতো সব সময় জীবনের ঝুঁকি নিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বর্ষাকালে প্রায়শই প্লাবিত নদীতে ঘোড়া নিয়ে নেমে যেতেন এবং নিরাপদে নদী অতিক্রম করতেন। তিনি খুব কমই নিষ্ঠুর আচরণ করতেন এবং আত্মীয়দের প্রতি স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তাঁর বিদ্রোহী ভ্রাতা মহম্মদ হাকিমকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কদাচিৎ তিনি অপরাধীদের সাথে নিষ্ঠুরভাবে মোকাবিলা করতেন। যেমন তাঁর মামা মুয়াজ্জেম এবং পালক ভ্রাতৃ আদমের সাথে করেছিলেন।
কথিত রয়েছে যে, আকবর খাদ্যাভাসে পরিমিত ছিলেন। আইন-ই-আকবরীতে উল্লেখ রয়েছে যে, ভ্রমণের সময় এবং বাড়িতে থাকাকালীন তিনি গঙ্গা নদীর জল পান করতেন। গঙ্গাজলকে তিনি অমরত্বের জল বলে অভিহিত করেছিলেন। সোরুন এবং হরিদ্বারে বিশেষ লোক নিয়োগ করা হয়েছিলো, যারা তিনি যেখানে অবস্থান করতেন সেখানেই শীল করা পাত্রে তাঁর জন্য গঙ্গাজল পাঠাতেন। জাহাঙ্গীরের স্মৃতি কথা অনুসারে তিনি ফল পসন্দ করতেন, তবে মাংস তাঁর খুবই কম পসন্দের ছিলো। পরবর্তীতে তিনি মাংস খাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আকবর ১৫৭০ সালে একবার শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান বৃন্দাবন গিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের দ্বারা মদন-মোহন, গোবিন্দজী, গোপীনাথ এবং যুগল কিশোর চারটি মন্দির নির্মাণের জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন।
আকবর নামা– ‘আকবর নামা’ ফার্সি ভাষায় লেখা তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবরের সরকারী জীবনীমূলক বিবরণ। এতে তাঁর জীবনের ও সময়ের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। বইটি আকবরের দরবারে নয় রত্নের একজন আবুল ফজল, আকবরের তত্ত্বাবধানে, লিখেছিলেন। কথিত রয়েছে, বইটি সম্পূর্ণ করতে সাত বছর লেগেছিলো। মূল পাণ্ডুলিপিতে লেখাগুলিকে সমর্থন করে বেশ কিছু চিত্র রয়েছে এবং সমস্ত চিত্রকর্ম মোগল চিত্র কলার স্কুল পেইনটিং এবং মোগল ইম্পেরিয়াল ওয়ার্কশপের শিক্ষকদের কাজকে প্রতিনিধিত্ব করে।
বিবাহ– আকবরের প্রথম স্ত্রী এবং প্রধান সহধর্মিনী ছিলেন তাঁর চাচা শাহজাদা হিন্দাল মির্জা এবং হিন্দাল মির্জার স্ত্রী সুলতানা বেগমের কন্যা রুকিয়া সুলতানা বেগম। রুকিয়ার সাথে আকবরের বিয়ে হয়েছিলো পাঞ্জাবের জলন্ধরে।
আকবরের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন আবদুল্যা খাঁ মোগলের কন্যা। ১৫৫৭ সালে মানকোট অবরোধের সময় তাঁদের বিয়ে হয়েছিলো। বৈরাম খাঁ এই বিয়েতে সন্মতি দেননি, কারণ আবদুল্যাহ খাঁর বোনের সাথে আকবরের চাচা কামরান মির্জার বিয়ে হয়েছিলো। তাই বৈরাম খাঁ, আবদুল্যাহ খাঁকে কামরানের সমর্থক বলে ভাবতেন। সেজন্য বৈরাম খাঁ এই বিয়ের বিরোধিতা করছিলেন, নাসির-আল-মুলক তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে, এই জাতীয় বিষয়ে বিরোধিতা গ্রহণযোগ্য নয়। নাসির- আল-মুলক একটি ভোজ সভারও আয়োজন করেছিলেন।
আকবরের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন সালিমা সুলতানা বেগম। সালিমা ছিলেন নূর-উদ-দীন মহম্মদ মির্জা এবং বাবরের কন্যা গুলরুখ (গুলরাং) বেগমের কন্যা। সালিমা প্রথমে হুমায়ূনের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈরাম খাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বৈরাম খাঁর মৃত্যুর পরে আকবরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি আকবরের দ্বিতীয় পুত্র মুরাদ মির্জার পালক মাতৃ ছিলেন। তিনি আকবরের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তিনি একজন কবি এবং দক্ষ লেখিকা হিসাবে ব্যতিক্রমী নারী হিসাবে বিবেচিত ছিলেন। আকবর এবং জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে তিনি মোগল দরবারের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করছিলেন। তিনি ১৬১৩ সালের ২ জানুয়ারী তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন।
আকবরের চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন হরকা বাই। যিনি মরিয়ম-উজ-জামানি নামেও পরিচিত ছিলেন। হরকা বাইকে আকবর ১৫৬২ সালে মঈন-উদ-দীন চিশতীর দরবার থেকে প্রার্থনা করে ফেরার পথে বিয়ে করেছিলেন। তিনি আকবরের সবচেয়ে প্রিয় এবং প্রভাবশালী বেগম ছিলেন। তিনি অস্বাভাবিক সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন। আকবরের ধর্মনিরপেক্ষতা প্রচারের তিনি চালিকা শক্তি ছিলেন। ১৫৬৪ সালে তিনি মির্জা হাসান এবং মির্জা হোসেন নামে দু’টি যমজ সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। উক্ত বছরই তাঁকে ‘ওয়ালি নিমাত বেগম (ঈশ্বরের উপহার বা আশীর্বাদ) সন্মানসূচক মুসলিম নাম প্রদান করা হয়েছিলো। ১৫৬৯ সালে সেলিম (ভবিষ্যত ভারতম সম্রাট জাহাঙ্গীর)কে জন্ম দেওয়ার পরে তিনি মরিয়ম-উজ-জামানি’ নামে একটি মর্যদাপূর্ণ নামে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি আকবরের প্রিয়পুত্র দানিয়াল মির্জার পালক মাতৃও ছিলেন। তাঁকে আরও দু’টি উপাধি ‘মল্লিকা-ই-হিন্দুস্থান এবং মল্লিকা-ই-মুজম্মা’ উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। আকবর নামায় আবুল ফজল লিখেছে- মরিয়ম-উজ-জামানি রাজকীয় হারেমে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি একজন চৌকস মহিলা ছিলেন, যিনি মোগল সাম্রাজ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৬২৩ সালের ১৯ শে মে তিনি মারা গিয়েছিলেন। ১৫৬২ সালে আকবর আগ্রার শাসক শেখ বড়ার পুত্র আব্দুল ওয়াসির প্রাক্তন পত্নীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি আব্দুল ওয়াসিরকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর আরেকজন স্ত্রীর নাম ছিলো গওহর-উন- নিসা বেগম। তিনি ছিলেন শেখ মহম্মদ বখতিয়ারের কন্যা ও শেখ জামাল বখতিয়ারের বোন। আকবর ১৫৬২ সালে মের্তার রাও বিরামদের পুত্র জগমল রাঠোরের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন।
১৫৬৪ সালে আকবর খান্দেশের শাসক মিরান মুবারক শাহের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৬২ সালে মিরান তাঁর কন্যাকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করে উপহার সহ আকবরের নিকট দূত পাঠিয়েছিলেন। মিরানের অনুরোধ গৃহীত হয়েছিলো এবং আকবর মিরানের দূতের সাথে ইতিমাদ খাঁকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ইতিমাদ খাঁকে মিরান মোবারক শাহ সম্মানের সাথে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর কন্যাকে ইতিমাদের সাথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মিরান মুবারক শাহ তাঁর জামাতা আকবরকে বিজয় গড় এবং হান্ডিয়া বিয়ের যৌতুক হিসাবে দান করেছিলেন।
আকবর ১৫৭০ সালে বিকানিরের শাসক রায় কল্যাণ মালের ভ্রাতৃ কানহার কন্যা রাজ কানওয়ারিকে বিয়ে করেছিলেন। আকবর যখন তাঁর সাম্রাজ্যের এই অংশে বেরাতে এসেছিলেন তখন রায় কল্যাণ তাঁর ভ্রাতৃর কন্যাকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আকবর সেই অনুরোধ রক্ষা করে রাজ কানওয়ারিকে বিয়ে করেছিলেন। এছাড়াও রায় কল্যাণের আরেক ভ্রাতৃ ভীম রাজের কন্যা ভানুমতীকেও আকবর বিয়ে করেছিলেন। ১৫৭০ সালে তিনি জয়সালমারের শাসক রাওয়াল হর রায়ের কন্যা নাথি বাইকেও বিয়ে করেছিলেন। রাওয়াল তাঁর কন্যাকে আকবরের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে প্রস্তাব পাঠিয়ে ছিলেন। আকবর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি শাহজাদী মাহি বেগমের মাতৃ ছিলেন। তিনি ১৫৭৭ সালের ১৭ ই এপ্রিল মারা গিয়েছিলেন। ১৫৭০ সালে মের্তার রাও বিরামদে-এর নাতি নরহর দাস তাঁর বোন পুরম বাইকে আকবরের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন।
আকবরের আরেক স্ত্রীর নাম ছিলো ভাক্কারী বেগম। তিনি ভাকরের সুলতান মাহমুদের কন্যা ছিলেন। ১৫৭২ সালের ২ ই জুলাই আকবরের দূত ইতিমাদ খাঁ ভাক্করী বেগমকে আকবরের দরবারে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাহমুদের দরবারে এসেছিলেন। ইতিমাদ খাঁ একটি মার্জিত পোশাক, একটি সিমিটার বেল্ট, একটি ঘোড়া এবং চারটি হাতী নিয়ে সুলতান মাহমুদের নিকট এসেছিলেন। সুলতান মাহমুদ ইতিমাদ খাঁকে নগদ ত্রিশ হাজার টাকা, নানাবিধ উপহার এবং দলবল দিয়ে তাঁর মেয়েকে আকবরের দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
আকবরের নবম স্ত্রী ছিলেন কাশিমা বেগম। তিনি আরবের শাহের কন্যা ছিলেন। ১৫৭৫ সালে বিবাহ উৎসব অনুষ্ঠি হয়েছিলো। ১৫৭৭ সালে ডুঙ্গরপুরের রাজা রাওয়াল আসকরন তাঁর মেয়েকে আকবরের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। আকবর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। লুকারন এবং রাজা বীরবলের সাথে রাওয়াল তাঁর কন্যাকে আকবরের দরবারে পাঠিয়ে ছিলেন এবং ১৫৭৭ সালের ১২ ই জুলাই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
আকবরের একাদশ বেগম ছিলেন বিবি দৌলত শাদ। তিনি ছিলেন শাহজাদী শাকর-উন-নিসা এবং আরাম বানু বেগমের মাতৃ । আকবরের পরবর্তী স্ত্রী ছিলেন কাশ্মীরের শামস চাকের কন্যা। বিয়েটি ১৫৯২ সালের ৩ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। ১৫৯৩ সালে তিনি কাজি ঈশার কন্যা ও নাজির খাঁর চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯৩ সালের ৩ রা জুলাই বিয়েটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
মৃত্যু– ১৬০৫ সালের ৩ই অক্টোবর আকবর আমাশায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠেননি। তিনি ১৬০৫ সালের ২৭ শে অক্টোবর মৃত্যু বরণ করেছিলেন। মৃত দেহটি আগ্রার সিকান্দ্রায় সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। তাঁর সমাধি ক্ষেত্রটি ১৬০৫ থেকে ১৬১৩ সালের মধ্যে তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর নির্মাণ করিয়েছিলেন। সমাধি ক্ষেত্রটি ১১৯ একর ভূমিতে বিস্তৃত। সমাধিটি তাঁর সবচেয়ে প্রিয়, নিবেদিত প্রাণ স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানির সমাধি থেকে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
উত্তরাধিকার– আকবর মোগল সাম্রাজের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর শাসনামলে সাংস্কৃতিক সংহতির উপর জোর দিয়ে রাষ্ট্রের প্রকৃতি ধর্মনিরপেক্ষ এবং উদারনীতিতে পরিবর্তন করেছিলেন। তিনি সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ, বিধবা পুনর্বিবাহকে বৈধ করণ এবং বিয়ের বয়স বৃদ্ধিকরণ প্রভৃতি বেশ কিছু সামাজিক সংস্কার চালু করেছিলেন। তিনি এবং তাঁর দরবাবের নবরত্নের একজন বীরবলকে ঘিরে আবর্তিত লোক কাহিনী ভারতে খুবই জনপ্রিয় ।
ভবিষ্য পুরাণ হলো একটি গৌণ পুরাণ। যেখানে হিন্দুদের পবিত্র দিনগুলিকে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে ভারত শাসনকারী বিভিন্ন রাজবংশের জন্য উৎসর্গকৃত একটি অধ্যায় রয়েছে। ভবিষ্য পুরাণের প্রাচীনতম অংশটি ৫০০ খ্রীষ্টপূর্বে রচিত এবং আধুনিক অংশটি ১৮ শতকে রচিত। এতে আকবর সম্পর্কে একটি গল্প রয়েছে, যেখানে অন্যান্য মোগল শাসকদের সাথে আকবরের তুলনা করা হয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় লিখিত ‘আকবরবাদশাহা বর্ণন’ নামক বিভাগটিতে তাঁর জন্মকে একজন ঋষির পুনর্জন্ম হিসাবে বর্ণনা করেছেন। যিনি মোগল সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক বাবরকে দেখে আত্মহত্যা করেছিলেন। বাবরকে ‘ম্লেচ্ছদের নিষ্ঠুর রাজা’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। গ্রন্থটিতে আকবরকে একজন ‘অলৌকিক শিশু’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি মোগলদের পূর্বপুরুষদের মতো হিংসাত্মক পথ অনুসরণ করবেন না বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।
টাইম ম্যাগাজিন আকবরের নাম ২৫ জন বিশ্বনেতার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে।
অন্যদিকে, পাকিস্থানে আকবরের উত্তরাধিকার স্পষ্টভাবে নেতিবাচক। পাকিস্থানি পাঠ্য পুস্তকে ঔরঙ্গজেবের সার্বজনীনতার বিপরীতে আকবরকে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত কোনো পাঠ্যপুস্তকে আকবরকে উল্লেখ করা হয়নি বলে ইতিহাসবিদ ইশতিয়াক হোসেন কুরেশি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আকবর তাঁর ধর্মীয় সহনশীতার জন্য ইসলামকে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিলেন যে,ইসলামকে আর প্রভাবশালী অবস্থানে পুনরুদ্ধার করতে পারেন নি। আকবরের রাজপূত পলিচিকে পাকিস্থানী ঐতিহাসিকরা ‘থ্রেড’ হিসাবে গণ্য করেন। উপসংহারে অনেক পাঠ্যপুথি বিশ্লেষণের পর মোবারক আলী হিন্দু এবং মুসলমানদের এক জাতি হিসাবে একত্রিত করে মুসলমানদের পৃথক পরিচয়কে বিপদে ফেলার জন্য আকবরের সমালোচনা করেছেন। আকবরের এই নীতি দ্বিজাতি তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক এবং তাই আকবরকে পাকিস্থানে অজনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব করে তুলেছে।
আকবরের পুত্রসন্তান–
হাসান মির্জা ও হোসেন মির্জা– উভয় যমজ। জন্ম ১৫৬৪ সালের ১৯ নভেম্বর। হোসেন মির্জার মৃত্যু ১৫৬৪ সালের ২৫ নভেম্বর এবং হাসান মির্জার মৃত্যু উক্ত সালেরই ২৯ নভেম্বর। মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি।
মহম্মদ সেলিম–জন্ম ৩১ আগস্ট, ১৫৬৯ সাল। মৃত্যু ২৮ অক্টোবর, ১৬২৭ সাল। মাতৃ মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি।
মুরাদ মির্জা– জন্ম ১৫৭৯ সালের ১৫ জুন। মৃত্যু ১৫৯৯ সালের ১২ মে। মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি।
দানিয়াল মির্জা– জন্ম ১১ সেপ্তেম্বর, ১৫৭২। মৃত্যু ১৯ মার্চ, ১৬০৫ সাল। মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি।
শাহজাদা খশ্ৰু– শৈশবে মৃত্যু। মাতৃ রাজ কানওয়ারি।
কন্যাসন্তান
শাহজাদী খানম–জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৫৬৯। মাতৃ সালিমা বেগম। তিনি মরিয়ম মাকানি দ্বারা লালিত-পালিত হয়েছিলেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো তৈমূরীয় যুবরাজ মুজাফ্ফর মির্জার সাথে।
মাহি বেগম– মাতৃ নাথি বেগম।
শাকর–উন–নিসা বেগম– মাতৃ বিবি দৌলত শাদ। তাঁর ১৫৯৪ সালে বিয়ে হয়েছিলো ইব্রাহীম মির্জার পুত্র শাহরুখ মির্জার সাথে। ১৬৫৩ সালের ১ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ফিরোজা খানম– আকবরের উপপত্নীর সন্তান। জন্ম ১৫৭৫ সালে।
আরাম বানু বেগম– জন্ম ১৫৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর। মাতৃ বিবি দৌলত শাদ। মৃত্যু ১৬২৪ সালের ১৭ জুন। আরাম বানু অবিবাহিত ছিলেন।
কিষ্ণবতী বাই– (মৃত্যু আগস্ট, ১৬০৯ সাল।) আকবরের পালক সন্তান। সেখাবত কাচবাহা দুর্জন শাহের কন্যা। তাঁকে মারওয়ারের সওয়াই রাজা সুর সিংহ রাঠোরের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মারওয়ারের মহারাজা গজ সিংহ এবং পারভেজ মির্জার স্ত্রী মানভাবতী বাইয়ের মাতৃ ছিলেন।
চলচ্চিত্র এবং টেলিভিছন–
‘শাহেনশাহ আকবর’ ১৯৪৩ সালে নির্মিত এবং জে, আর, শেঠি পরিচালিত আকবরের জীবনী ভিত্তিক হিন্দী চলচ্চিত্র।
মুঘল–ই–আজম– ১৯৬০ সালে নির্মিত হিন্দী চলচ্চিত্র। আকবরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন পৃথ্বীরাজ কাপুর। ভারত সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগ ১৯৬৭ সালে আকবরকে নিয়ে একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছিলেন শান্তি এস, ভার্মা।
১৯৭৮ সালে নির্মিত ‘ভক্তি মে শক্তি‘ চলচ্চিত্রে আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ওমপুরী।
‘আকবর সেলিম আনারকলি‘ চলচ্চিত্র ১৯৭৯ সালে তেলেগু ভাষায় নির্মাণ করা হয়েছিলো। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছিলেন এন, টি রামা রাও। চলচ্চিত্রটিতে রামা রাও আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
১৯৭৯ সালে নির্মিত ‘মীরা‘ চলচ্চিত্রে আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন আমজাদ খান।
২০০৮ সালে নির্মিত ‘যোধা–আকবর‘ চলচ্চিত্রে আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ঋত্বিক রোশন।
১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে জি টিভিতে ‘আকবর–বীরবল‘ হিন্দী ধারাবাহিক সম্প্রচারিত হয়েছিলো। যেখানে আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিক্রম গোখলে।
১৯৯০-এর দশকে ডি ডি ন্যাশনালে আকবর খান পরিচালিত ‘আকবর দ্য গ্রেট‘ নামে একটি টেলিভিশন সিরিজ সম্প্রচারিত হয়েছিলো।
২০১৩-২০১৫ সালে যোধা আকবর‘ নামে জি টিভিতে একটি হিন্দী ধারাবহিক সম্প্রচারিত হয়েছিলো। যেখানে আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রজত টোকাস।
২০১৪ সালে ‘দ্য টুয়েন্টি থ ওয়াইফ‘ উপন্যাস অবলম্বনে রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিয়াসত‘ ইপিক টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছিলো। উদয় টিকোর আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
সনি টিভির ঐতিহাসিক নাটক ভারত কী বীর পুত্র– মহারাণা প্রতাপ-এ আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, প্রথমে ক্রিপ সুরি এবং পরে অবিনেশ রেখী।
বিআইজি মিউজিক টিভির ধারাবাহিক সিটকম(যা একটি চরিত্রের উপর কেন্দ্রীভূত হয়)-এ ‘আকবর বীরবল‘-এ কিকু শারদা আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
বিআইজি মিউজিক টিভি ধারাবাহিকের ‘হাজির জওয়াব‘ বীরবলের ফলো আপ সিটকম-এ সৌরভ রাজ জৈন আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
বিআইজি মিউজিকের ঐতিহাসিক নাটক ‘ আকবর– রক্ত সে তক্ত তক সফর‘-এ আকবরের চরিত্রে অভিষেক নিগম অভিনয় করেছিলেন।
এবিপি নিউজের ডকুমেন্টরি সিরিজ ‘ভারতবর্ষ‘-এ আকবরের ভূমিকায় মহম্মদ ইকবাল খান অভিনয় করেছিলেন।
‘আকবর– রাখ সে তক্ত কা সফর‘ ২০১৭ সালের একটি ভারতীয় নাটক সিরিজ-এ আকবরের ভূমিকায় অভিষেক নিগম অভিনয় করেছিলেন।
কালারস টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ‘দাস্তান–ই–মহব্বত–সেলিম আনারকলি‘তে শাহবাজ খান আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
২০২০ সালের ভারতীয় কমেডি টেলিভিশন সিরিজ ‘আকবর কা বাল বীরবল‘-এ আলী আসগর আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। •

মহামতি আকবর-এর সমাধিক্ষেত্র

জাহাঙ্গীর
নূর-উদ-দীন মহম্মদ সেলিমের জন্ম ১৫৬৯ সালের ৩১ আগস্ট ফতেহপুর সিক্রিতে। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি জাহাঙ্গীর উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম আকবর এবং মাতৃর নাম মরিয়ম-উজ-জামানি (যোধাবাই)। তিনি চতুর্থ মোগল সম্রাট ছিলেন। ১৬০৫ সাল থেকে তিনি ১৬২৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। ১৫৬৪ সালে তাঁর দুই বড় ভ্রাতৃ হাসান মির্জা এবং হোসেন মির্জার জন্ম হয়েছিলো। তবে, তাঁরা শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। দুই শিশু সন্তানের মৃত্যুর পর আকবর সাম্রাজ্যের একজন উত্তরাধিকারীর জন্য সেলিম চিস্তির আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছিলেন। সেলিম চিস্তির আশীর্বাদের ফলেই সেলিমের জন্ম হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। সেলিমের জন্মের পর সেলিম চিস্তির নাম অনুসারে জাহাঙ্গীরের নাম সেলিম নাম রাখা হয়েছিলো।
সেলিমের জন্মের খবর পেয়ে আনন্দিত হয়ে আকবর ভোজের আয়োজন করেছিলেন এবং অপরাধীদের মুক্তির আদেশ দিয়েছিলেন। সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে জনসাধারণের মধ্যে ধন-সম্পত্তি বিতরণ করা হয়েছিলো।
পাঁচ বছর বয়স থেকেই সেলিমের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। সেলিমের শিক্ষা উপলক্ষ্যে একটি ভোজের আয়োজন হয়েছিলো। সেলিমের প্রথম শিক্ষক ছিলেন কুতুবুদ্দিন। কিছুদিন পর বেশ কয়েকজন শিক্ষক দ্বারা সেলিমকে প্রশাসনিক, কৌশলগত এবং সামরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। সেলিমের মামা ভগবন্ত দাসও সেলিমের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি সেলিমকে সামরিক শিক্ষা দিতেন। সেলিম ফার্সি এবং প্রাক-আধুনিক হিন্দীতে সাবলীল হয়ে উঠেছিলেন। মোগলদের পৈতৃক তুর্কি ভাষাতেও তিনি সাবলীল হয়ে উঠেছিলেন।
সেলিম সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ সামরিক পদমর্যদা দশ হাজার সৈন্যের মনসবদার ছিলেন। ১৫৮১ সালে মাত্র বারো বছর বয়সে কাবুল অভিযানের সময় সেলিম স্বাধীনভাবে একটি রেজিমেন্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৫৮৫ সালে ভগবন্ত দাসের কন্যা মান বাইয়ের সাথে বিয়ের পর তাঁর সেনা সংখ্যা পরে ১২ হাজারে বৃদ্ধি করা হয়েছিলো।
আনারকলির সাথে সেলিমের কাল্পনিক প্রেম কাহিনী ভারতের শিল্প, সাহিত্য ও সিনেমায় ব্যাপকভাবে রূপান্তরিত হয়েছে।
শাসন–শাহজাদা সেলিম তাঁর পিতা আকবরের মৃত্যুর আটদিন পর ১৬০৫ সালের ৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবারে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি নূর-উদ-দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজী উপাধি ধারণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের পরে তিনি নিজের পুত্র শাহজাদা খসরু মির্জার বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন। খসরু মির্জা তাঁর প্রপিতামহ আকবর এবং প্রপিতামহী মরিয়ম-উজ-জামানীর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীরেরও সবচেয়ে যোগ্য পুত্র ছিলেন। বীরত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামরিক প্রতিভার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর বয়সের সমস্ত প্রকার বদঅভ্যাস থেকে মুক্ত ছিলেন। আকবর নিজেও খসরুকে অত্যন্ত সাহসী, প্রতিভাবান সেনাপতি এবং উদার ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসাবে ভাবতেন। খসরু মির্জাকে অনেক সমর্থন করতেন। তাঁর মধ্যে ছিলেন তাঁর শশুড় আজিজ কোকা, তাঁর মামা রাজা মান সিং, মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানী, সম্রাট আকবরের তৃতীয় পত্নী সালিমা সুলতানা বেগম এবং জাহাঙ্গীরের প্রিয় বোন শাকর-উন-নিসা। আকবর নিজের পুত্র জাহাঙ্গীরের চেয়ে নাতি খসরুকে বেশি ভালবাসতেন।
১৬০৬ সলের ৬ এপ্রিল খসরু তাঁর প্রপিতামহের সমাধি দর্শনের অজুহাতে ৩৫০ জন অশ্বারোহী নিয়ে আগ্রা ত্যাগ করেছিলেন। ৩০০০ জন অশ্বারোহী নিয়ে হোসেন বেগ তাঁর সাথে মথুরায় যোগদান করেছিলেন। লাহোরের প্রাদেশিক দেওয়ান আব্দুর রহিমও তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিলেন। খসরু অমৃতসরের তারান তারানে পৌঁছে গুরু অর্জন সিংয়ের আশীর্বাদ গ্রহণ করে লাহোর অবরোধ করেছিলেন। সংবাদ পেয়ে জাহাঙ্গীর একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে যথাশীঘ্র লাহোর পৌঁছান এবং ভৈরওয়ালের যুদ্ধে খসরুকে পরাস্ত করেন। পরাস্ত হয়ে খসরু এবং তাঁর সেনাবাহিনী কাবুলের দিকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু চেনাব নদী পার হওয়ার সময় জাহাঙ্গীর বাহিনীর হাতে খসরু বন্দি হোন। জাহাঙ্গীর ১৬০৭ সালে খসরু মির্জাকে আংশিকভাবে অন্ধ করে আগ্রার দুর্গে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো।
জাহাঙ্গীর তাঁর তৃতীয় পুত্র খুররমকে বেশি পসন্দ করতেন। খসরুর শাস্তি হিসাবে পরে জাহাঙ্গীর তাঁকে কনিষ্ঠ ভ্রাতা খুররমের কাছে সমর্পণ করেছিলেন। খুররম তাঁর বড় ভ্রাতা খসরু মির্জাকে সম্পূর্ণভাবে অন্ধ করে দিয়েছিলেন। ১৬২২ সালে জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়পুত্র খুররমকে আহমেদনগর, বিজাপুর এবং গোলকুণ্ডার সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রেরণ করেছিলেন। যুদ্ধে বিজয়ের পর খুররম তাঁর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ১৬২২ সালে খুররম সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য তাঁর অন্ধ বড় ভ্রাতা খসরু মির্জাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হত্যার পর জাহাঙ্গীর খসরুকে তাঁর মাতৃ শাহ বেগমের সমাধির পাশে সমাধিস্থ করেছিলেন এবং তাঁর সমাধিক্ষেত্র নির্মাণের জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। সমাধিক্ষেত্রটি এলাহাবাদে অবস্থিত এবং খসরুবাগ নামে পরিচিত।
জাহাঙ্গীর খসরুর মতই খুররমের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বৈদেশিক নীতি– ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অনুরোধে ইংল্যান্ডের সম্রাট জেমস, টমাস রো’কে রাজদূত হিসাবে জাহাঙ্গীরের দরবারে প্রেরণ করেছিলেন। টমাস রো’ আগ্রায় মোগল দরবারে ১৬১৯ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ তিন বছর ছিলেন। টমাস রো অনেকগুলো ‘রেড ওয়াইন’ উপহার হিসাবে নিয়ে এসেছিলেন।
টমাস রো’র উদ্দেশ্য ছিলো, সুরাটে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর জন্য কারখানা স্থাপন এবং মোগল সম্রাট কর্তৃক সুরক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা আহরণ। অবশ্যে জাহাঙ্গীর কর্তৃক তেমন সুবিধা করা হয়নি যদিও মোগল এবং ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিলো।
টমাস রো’র ডায়েরিগুলি জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের মূল্যবান উৎস। অবশ্যে জাহাঙ্গীর তাঁর বিশাল আত্মজীবনী তুজক- ই-জাহাঙ্গীরীতে টমাস রো’র বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ করেন নি।
কান্দাহারের আশেপাশের অঞ্চলে একটি সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পর পারস্যের সুলতান আব্বাস-প্রথমের সাথে শান্তি আলোচনার জন্য ১৬২৩ সালে জাহাঙ্গীর তাঁর তহবিলদার খান আলমকে পারস্যে প্রেরণ করেছিলেন। খান আলমের সাথে পাঠিয়ে ছিলেন ৮০০ সিপাহি, লেখক, পণ্ডিত এবং স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে সুসজ্জিত ১০টি হাওদা । খান আলম পারসের সাফাভিদ এবং মধ্য এশিয়ার খানেট (খান, খাগান, খাতুন বা খানম দ্বারা শাসিত একটি রাজনৈতিক সত্ত্বা)দের কাছ থেকে নানাবিধ উপহার এবং মীর শিকারের (হান্টার মাস্টার) দল নিয়ে ফিরে এসেছিলেন।
১৬২৬ সালে জাহাঙ্গীর সফাভিদদের বিরুদ্ধে অটোম্যান, মোগল এবং উজবেকদের নিয়ে একটি জোট গঠনের কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন। এমনকী তিনি অটোম্যান চতুর্থ সুলতান মুরাদের নিকট একটি পত্রও প্রেরণ করেছিলেন। ১৬২৭ সালে মৃত্যুর জন্য তাঁর সেই আকাংক্ষা পূরণ হয়নি।
বিবাহ–
শাহ বেগম– সেলিমরে প্রথম স্ত্রী ছিলেন তাঁর মামা আমেরের ভগবন্ত দাসের কন্যা মান বাই। বিয়ের পর তাঁর নামকরণ করা হয়েছিলো শাহ বেগম। সেলিম ১৫ বছর বয়সে তাঁর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মরিয়ম-উজ-জামানি নিজে বিয়ে ঠিক করেছিলেন। বিয়েটি ১৫৮৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আমেরে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। আকবর তাঁর উচ্চপদস্থ সভাসদসহ বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বিয়েটি খুব জাকজমকপূর্ণ হয়েছিলো। জাহাঙ্গীরের সন্মানে আকবর স্বয়ং বর-কনের পাল্কী কিছুদূর বহন করেছিলেন। বিয়ের পর জাহাঙ্গীরকে ১২,০০০ সেনার মনসবদার নিযুক্ত করা হয়েছিলো। জাহাঙ্গীরের জ্যেষ্ঠপুত্র খসরুর জন্মের পর আকবর মান বাইর নাম শাহ বেগম রেখেছিলেন।
সেলিম পরে বেশ কিছু অভিজাত মোগল এবং রাজপুত পরিবারের কন্যার পাণিগ্রহণ করেছিলেন।
জগত গোসাঁই বেগম– জাহাঙ্গীরের প্রথম দিকের প্রিয় স্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন মাড়োয়ারের রাজা উদয় সিং রাঠোরের কন্যা জগত গোসাঁই বেগম। বিয়েটি ১৫৮৬ সালের ১১ ই জানুয়ারি কনের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। বিয়ের পর জাহাঙ্গীর তাঁর নাম রেখেছিলেন তাজ বিবি। তিনি ভবিষ্যত সম্রাট খুররমের মাতৃ ছিলেন।
১৫৮৬ সালের ২৬ জুন জাহাঙ্গীর বিকানেরের রাজা রায় সিংয়ের এক কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৮৬ সালের জুলাই মাসে তিনি আবু সাঈদ খান চাগতাইয়ের কন্যা মালেকা শিকার বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৮৬ সালেই তিনি হেরাতের খাজা হাসানের কন্যা সাহেব-ই-জামাল বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৮৭ সালে তিনি জয়সালমিরের মহারাজা ভীম সিংয়ের কন্যা মালেকা-জাহান বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি দরিয়া মালভাসের কন্যাকেও বিয়ে করেছিলেন।
১৫৯০ সালের অক্টোবরে জাহাঙ্গীর মির্জা সানজার হাজারার কন্যা জোহরা বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। মের্তার রাজা কেশো দাস রাঠোরের কন্যা করমনসী বেগমকেও তিনি বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯২ সালের ১১ ই জানুয়ারি তিনি আলী শের খানের কন্যা কানওয়াল রাণী এবং গুল খাতুনকে বিয়ে করেছিলেন।
১৫৯২ সালের অক্টোবরে তিনি কাশ্মীরের হোসেন চাকের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯৩ সালের জানুয়ারি / মার্চে তিনি ইব্রাহীম হোসেন মীরের কন্যা নূর-উন-নিসা বেগম এবং কামরান মির্জার কন্যা গুলরুখ বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯৩ সালের সেপ্তেম্বরে তিনি খানদেশের রাজা আলী খান ফারুকির কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি আব্দুল্ল্যাহ খান বালুচের কন্যাকেও বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯৬ সালের ২৮শে জুন তিনি কাবুল এবং লাহোরের সুবেদার জয়েন খান কোকার কন্যা খাস মহল বেগমকে বিয়ে করেছিলেন।
১৬০৮ সালে জাহাঙ্গীর রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য কাশিম খানের কন্যা সালিহা বানু বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৬০৮ সালের ১৭ ই জুন অম্বরের যুবরাজ জগৎ সিং-এর বড় মেয়ে কোকা কুমারী বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৬১০ সালের ১১ই জানুয়ারি তিনি রাম চাঁদ বুন্দেলার কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। কোনো এক সময়ে তিনি সম্রাট হুমায়ূনের পুত্র মির্জা মহম্মদ হাকিমের কন্যাকেও বিয়ে করেছিলেন।
নূর জাহান– জাহাঙ্গীর ১৬১১ সালের ২৫ শে মে মেহের-উন-নিসাকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিলো নুর জাহান(বিশ্বের আলো।)। তিনি শের আফগানের বিধবা পত্নী ছিলেন। বিয়ের পর মেহের-উন-নিসা জাহাঙ্গীরের প্রিয় স্ত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী ছিলেন। যার জন্য জাহাঙ্গীর তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। নূর জাহান উপাধিতে ভূষিত হওয়ার আগে তাঁকে বলা হতো নূর মহল (প্রাসাদের আলো।)। তিনি ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ শিকারীও ছিলেন। চারটি গুলিতে তিনটি বাঘ শিকার করেছিলেন বলে কথিত আছে।
নূর জাহান জাহাঙ্গীরের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। তাঁর আদেশ অমান্য করার জন্য কান্দাহার হারাতে হয়েছিলো। পার্সিয়ানরা যখন কান্দাহার অবরোধ করছিলেন, জাহাঙ্গীরের অসুখের জন্য নূর জাহান তখন সাম্রাজ্যের দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি শাহজাদা খুররমকে কান্দাহার অভিযানের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু খুররম সেই নির্দেশ অমান্য করেছিলেন। এর পেছনে অবশ্যে কারণ ছিলো। কারণ নূর জাহান সব সময় তাঁর জামাতা শাহরিয়ারকে সাম্রাজ্যের পরবর্তী উত্তরাধিকার হিসাবে সমর্থন করতেন। খুররম সন্দেহ করেছিলেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে শাহরিয়ারকে পদোন্নতি দিতে পারে এবং তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মারাও যেতে পারেন! এই ভয় খুররমকে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তাঁর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। এর ফলে কান্দাহার শত্রুরা দখল করে নিয়েছিলো। জাহাঙ্গীরের শাসনের শেষ বছরগুলোতে নূর জাহান তাঁর নামে মূদ্রা পর্যন্ত প্রবর্তন করেছিলেন।
জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে সাম্রাজ্য বিজয় এবং সম্প্রসারণের জন্য সব সময় যুদ্ধ লেগেই থাকতো। সেজন্য জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল যুদ্ধরাষ্ট্র হিসাবে জনাজাত ছিলো। জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে বিরক্তিকর শত্রু ছিলো, মেওয়ারের রাণা অমর সিং। অমর সিং শেষপর্যন্ত ১৬১৩ সালে খুররম বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। উত্তর-পূর্বে আসামে আহোমদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ হয়েছিলো, তবে আহোমদের গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের কাছে মোগল বাহিনী নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলো। উত্তর ভারতে খুররমের নেতৃত্বে মোগল বাহিনী ১৬১৫ সালে কাংড়ার রাজাকে পরাজিত করেছিলেন। এই বিজয়ে দাক্ষিণাত্যে মোগল সাম্রাজ্যকে সুসংহত করেছিলো। ১৬২০ সালে জাহাঙ্গীর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং পরবর্তী উত্তরাধিকার অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন। এদিকে নূর জাহান জাহাঙ্গীবের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ পুত্র শাহরিয়ারকে উত্তরাধিকার হিসাবে প্রক্ষেপ করার জন্য তাঁর কন্যা লাডলী বেগমকে শাহরিয়ারের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্যে নূর জাহানের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
বিজয়– ১৫৯৪ সালে সম্রাট আকবর বুন্দেলার ধর্মত্যাগী বীর সিং দেওকে পরাজিত করে বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে বিবেচিত ওর্ছা শহর দখল করার জন্য আবুল হাসান আসাফ খানের সাথে জাহাঙ্গীরকে প্রেরণ করেছিলেন। আবুল হাসান আসফ খান মির্জা গিয়াস বেগ ইস্পাহানির পুত্র মির্জা জাফর বেগ নামেও পরিচিত ছিলেন। জাহাঙ্গীরের বাহিনীতে ১২,০০০ সেনা ছিলো। প্রচণ্ড কয়েক দফা সংঘর্ষের পর জাহাঙ্গীর বীর সিং দেওকে পরাজিত করে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আলোচনার পর বীর সিং দেও ৫,০০০ পদাতিক সেনা এবং ১০০০ অশ্বারোহী সেনা হস্তান্তর করে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মোগলদের প্রতিশোধের ভয়ে বীর সিং দেও জীবিত কাল পর্যন্ত পলাতক ছিলেন। ২৬ বছর বয়সে জাহাঙ্গীর এই বিজয়কে স্মরণীয় এবং সন্মান প্রদর্শনের জন্য মোগল দুর্গ জাহাঙ্গীর মহল নির্মাণ করেছিলেন।
জাহাঙ্গীর আলী কুলি খানের নেতৃত্বে সেনা সংগ্রহ করে কোচবিহারের লক্ষ্মী নারায়ন-এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে লক্ষ্মী নারায়ন মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। মোগলরা লক্ষ্মী নারায়নকে নাজির উপাধি প্রদান করেছিলেন। লক্ষ্মী নারায়ন আঠারিকোঠায় একটি গ্যারিসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৬১৩ সালে মোগল জাহাজ রহিমী ১,০০,০০০ টাকা এবং তীর্থযাত্রী নিয়ে বার্ষিক হজ্বে যোগদানের জন্য সুরাট থেকে মক্কা ও মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। পর্তুগীজরা জাহাজটি দখল করেছিলো। জাহাজটি জাহাঙ্গীরের মাতৃ তথা সম্রাট আকবরের প্রিয় স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানির মালিকাধীন ছিলো। রহিমী লোহিত সাগরে যাত্রা করা ভারতীয় জাহাজ ছিলো এবং ইউরোপীয়দের কাছে ‘মহান তীর্থযাত্রী’ জাহাজ হিসাবে পরিচিত ছিলো। পর্তুগীজরা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজটি ফেরৎ দিতে অস্বীকার করেছিলো, তখন মোগল দরবারে ভীষণ গণ্ডগোল শুরু হয়েছিলো। গণ্ডগোল অধিক তীব্র রূপ ধারণ করেছিলো, যখন জাহাজটির মালিক ও পৃষ্ঠপোষক জাহাঙ্গীরের মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি বলে প্রকাশ হয়েছিলো। জাহাঙ্গীর ক্ষুব্ধ হয়ে পর্তুগীজদের শহর দমন দখল করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। তিনি জেসুইটসদের অধীনে থাকা গির্জাগুলি ক্রোক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই পর্বটিকে সম্পদের জন্য সংগ্রামের একটি উদাহরণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, যা পরবর্তীতে ভারতীয় উপ-মহাদেশে উপনিবেশের সূচনা করেছিলো।
জাহাঙ্গীর মেওয়ারের সাথে এক শতাব্দী ব্যাপী চলে আসা সংগ্রাম অন্ত করেছিলেন। রাজপূতদের বিরুদ্ধে অভিযান এতই প্রচণ্ড করে তোলা হয়েছিলো যে, প্রচুর জীবন ও ধন-সম্পত্তি ক্ষতির পরে রাজপূতরা পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালে বাংলার বিদ্রোহী আফগান শাসক মুসা খানকে দমন করার জন্য ইসমাইল খান প্রথমকে প্রেরণ করেছিলেন।
১৫৫৬ সালে কাংড়ার শাসক ধরম চাঁদ আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে মোগলদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন। ১৬২০ সালে জাহাঙ্গীর কাটোচ রাজা হরি চাঁদকে হত্যা করে কাংড়া রাজ্য মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। নবাব আলী খানের নেতৃত্বে এবং রাজা জগত সিংয়রে সহায়তায় দূর্গটি দখল করা হয়েছিলো। কাংড়া ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত মোগলদের অধীনে ছিলো। কাংড়া দূর্গের মধ্যে জাহাঙ্গীর একটি মসজিদও নির্মাণ করেছিলেন।
মৃত্যু– ১৬২০ সালে জাহাঙ্গীর অসুখে পড়েছিলেন। ফলে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিলো। কাশ্মীর এবং কাবুল ভ্রমণ করে তিনি স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কাবুল ভ্রমণ করে কাশ্মীর গিয়েছিলেন, তবে তিনি প্রচণ্ড শীতের জন্য লাহোর ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কাশ্মীর থেকে লাহোর ফিরে আসার পথে ১৬২৭ সালের ২৮ অক্টোবর ৫৮ বছর বয়সে তিনি কাশ্মীরের ভীম্বরের কাছে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর শরীরকে সুবাসিত এবং সুরক্ষিত করার জন্য অস্ত্রগুলি সরিয়ে কাশ্মীরের ভীম্বরের নিকটে অবস্থিত বাগসার দূর্গে রাখা হয়েছিলো। এরপর দেহটি পাল্কীতে করে লাহোর নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত শাহদরাবাগে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। সুবিন্যস্ত সমাধিটি বর্তমান পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় স্থান।
জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন তৃতীয় পুত্র শাহজাদা খুররম। সিংহাসনে আরোহণের পরে তিনি শাহ জাহান উপাধি ধারণ করেছিলেন।
ধর্মীয় নীতি– টমাস রো’ মোগল দরবারে ইংল্যাণ্ডের প্রথম রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ১৬১৭ সালে ইংলেণ্ডের সাথে মোগলদের সম্পর্ক উত্তেজনা পূর্ণ হয়ে উঠলে, টমাস রো’ সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, গুজরাটে নতুন সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত শাহজাদা শাহ জাহান যদি ইংরেজদের প্রদেশ থেকে বের করে দেন, তাহলে তাঁরা সমুদ্রে ন্যায়বিচারের জন্য সংঘর্ষ করবে। শাহ জাহান ১৬১৮ সালে ইংরেজদের গুজরাটে বাণিজ্য করার অনুমতি প্রদান করে একটি সরকারী ফরমান জারি করেছিলেন।
অনেক সমসাময়িক ইতিহাসবিদ জাহাঙ্গীরের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কীভাবে বর্ণনা করবেন নিশ্চিত ছিলেন না। টমাস রো’ জাহাঙ্গীরকে নাস্তিক আখ্যা দিয়েছিলেন, যদিও অন্য ইতিহাসবিদরা নাস্তিক শব্দটি ব্যবহার করেন নি, তবে তাঁরা মনে করেন নি যে তাঁকে গোঁড়া সুন্নি বলা যেতে পারে। টমাস রো’ বিশ্বাস করতেন, যে জাহাঙ্গীরের ধর্ম তাঁর নিজের তৈরি। কারণ তিনি হজরত মহম্মদকে ঘৃণা করতেন এবং তিনি কোনো কারণ দেখেন নি, যারজন্য তিনি তাঁর মতো মহান নবী হতে পারবেন না। তিনি নিজেকে একজন নবী বলে দাবি করার পর অনেক চাটুকার এবং তাঁকে অনুসরণ করা অনেক শিষ্য পেয়েছিলেন। সেই শিষ্যদের মধ্যে একজন ছিলেন ইংরেজ রাষ্ট্রদূত টমাস রো’। জাহাঙ্গীরের শিক্ষা রো’য়ের জন্য তাৎপর্যহীন ছিলো, কারণ তিনি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারেন নি যে তিনি কি করছিলেন। জাহাঙ্গীর রো’য়ের গলায় তাঁর মূর্তি সম্বলিত একটি সোনার চেইন ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। ছয় পেন্সের মতো ওজনের সোনার চেইনটিকে তিনি তাঁর প্রতি সম্রাটের বিশেষ অনুগ্রহ বলে ভেবেছিলেন।
টমাস রো’ ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মান্তরিত হলে লন্ডনে বেশ কেলেঙ্কারী সৃষ্টি হতে পারত, কিন্তু কোনো উদ্দেশ্য না থাকায় সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। জাহাঙ্গীরের শিষ্যরা ছিলো সাম্রাজ্যের সেবকদের একটি অভিজাত গোষ্ঠী। যাদের একজনকে বিচারপতি পদে নিযুক্ত করা হয়েছিলো। এটা স্পষ্ট নয় যে, যারা জাহাঙ্গীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ পূর্ববর্তী ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন। তাই এটিকে একটি উপায় হিসাবে দেখা যেতে পারে যে, যার মাধ্যমে সম্রাট নিজের এবং তাঁর উচ্চ পদস্থ কর্মচারিদের মধ্যে বন্ধনকে শক্তিশালী করেছিলেন। টমাস রো’ নাস্তিক শব্দটি নৈমিত্তিক হিসাবে ব্যবহার করলেও তিনি জাহাঙ্গীরের প্রকৃত বিশ্বাসের উপর আঙুল তুলতে পারেন নি। টমাস রো’ আক্ষেপ করেছিলেন যে, হয় সম্রাট বিশেষভাবে রূপান্তর হওয়া অসম্ভব মানুষ, নয়তো সবচেয়ে সহজ মানুষ। কারণ জাহাঙ্গীর শুনতে ভালোবাসতেন এবং এমন খুব ধর্ম আছে যাকে তিনি উপহাস করতেন।
জাহাঙ্গীরের জন্য রাষ্ট্রীয় শিল্প নিয়ে লেখা একটি বইতে লেখক পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, তাঁর সমস্ত শক্তি ঋষিদের পরামর্শ এবং উলামাদের অন্তর্দৃষ্টি বুঝার জন্য নিয়োজিত করা উচিত। তাঁর শাসনামলের শুরুর দিকে অনেক কট্টর সুন্নিরা আশা করেছিলেন যে, তিনি তাঁর পিতার মতো ধর্মীয় সহনশীল হবেন না। তাঁর পিতার উজির-এ-আজম এবং ধর্মীয় অবস্থানের স্থপতি আবুল ফজলকে ক্ষমতাচ্যূত করার ফলে গোঁড়া অভিজাতদের একটি দল মোগল দরবারে বর্ধিত ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। এর মধ্যে বিশেষ করে শায়খ ফরিদ, জাহাঙ্গীরের বিশ্বক্ত মীর বক্সীর মতো অভিজাত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা মুসলিম ভারতে গোঁড়ামীর দূর্গকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন।
জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে কুখ্যাত কর্ম ছিলো, শিখ ধর্মগুরু অর্জন দেবের ফাঁসি। তাঁকে বন্দি করে কারাগারে হত্যা করা হয়েছিলো। তাঁর জমি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো। খসরুর বিদ্রোহের সময় সহায়তা করা বলে সন্দেহ করে তাঁর পুত্রদের বন্দি করা হয়েছিলো। এটা স্পষ্ট নয় যে, শিখ কি, জাহাঙ্গীর বুঝতে পেরেছিলেন কি-না। গুরু অর্জন সিংকে তিনি একজন হিন্দু বলে উল্লেখ করেছিলেন, যিনি হিন্দুদের অনেক সরল হৃদয় এমনকী ইসলামের অজ্ঞ ও মূর্খ অনুসারিদের তাঁর আচার- আচরণ দ্বারা প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁরা তিন চার প্রজন্ম ধরে তাঁদের এই দোকানটি গরম করে রেখেছিলেন। আসলে অর্জন সিংয়ের ফাঁসির কারণ ছিলো জাহাঙ্গীরের জ্যেষ্ঠপুত্র খসরুর প্রতি তাঁর সমর্থন। জাহাঙ্গীরের নিজের স্মৃতিচারণ থেকে এটা স্পষ্ট নয় যে, তিনি গুরু অর্জন সিংকে অপসন্দ করতেন। তিনি বলেছিলেন, অনেক সময় এই নিরর্থক ব্যাপারটি বন্ধ করার জন্য ইসলামের সমাবেশ থেকে তাঁর নিকট অভিযোগ এসেছিলো।
জাহাঙ্গীর জৈনদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর একজন দরবারি ইতিহাসবিদ লিখেছেন যে, জাহাঙ্গীরঅবগত হয়েছিলেন যে, আহমেদাবাদে সেওরা (জৈন)দের অনেক অবিশ্বাসী ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি সম্প্রদায় বেশ কয়েকটি অত্যন্ত বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ মন্দির নির্মাণ করে সেগুলিতে তাঁদের মিথ্যা দেবতা স্থাপন করেছে। তাঁরা নিজেরা বিশেষভাবে সন্মানিত হচ্ছে, তবে যেসব মহিলারা মন্দিরগুলোতে পূজা দিতে যাচ্ছে, তাঁরা মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য লোক কর্তৃক দূষিত হচ্ছে। সম্রাট জাহাঙ্গীর অভিযুক্ত লোকদের দেশ থেকে নির্বাসিত এবং মন্দিরগুলি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতিকথায় বর্ণনা করেছেন, তিনি একবার পুষ্করে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি মন্দিরে শুয়োরের আকৃতির দেবতার মূর্তি দেখে তিনি হতবাক হয়েছিলেন। তিনি তখন দাবি করেছিলেন, ‘হিন্দুদের মূল্যহীন ধর্ম এটি।’ তিনি সেখানকার লোকদের মূর্তিটি ধ্বংস করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি একবার যোগীর রহস্যময় কাজের কথা শুনেছিলেন, তিনি যোগীকে উচ্ছেদ ও জায়গাটি ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জাহাঙ্গীরের উপর বহু ধর্মীয় প্রভাব পড়েছিলো। জাহাঙ্গীর একজন হিন্দু তপস্বী যদরূপ গোসাঁইর নিকটে যেতেন। নিজের স্মৃতি কথায় তিনি লিখেছেন, তপস্বীর বেদান্ত জ্ঞান এবং কঠোর জীবনযাপন তাঁর উপরে দুর্দান্ত প্রভাব ফেলেছিলেন। ডক্টর ফাইজান মোস্তাফা লিখেছেন, জৈন প্রজাদের পর্যুষণ উৎসবের সময়ে তাঁদের প্রতি সন্মান প্রদর্শনের জন্য জাহাঙ্গীর ১২ দিন আমিষ আহার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন।
মুকাররম খান একবার জাহাঙ্গীরের কাছে একটি ইউরোপীয় পর্দা পাঠিয়েছিলেন। পর্দাটির মতো সুন্দর হাতের কাজ ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীদের অন্য কোনো কাজে দেখা যায়নি। জাহাঙ্গীর একটি ‘দর্শক হল’ ইউরোপীয় পর্দা দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন। খ্রীস্টান বিষয়বস্তু জাহাঙ্গীরকে আকৃষ্ট করতো। তাঁর আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরে তিনি কথাটি উল্লেখ করেছেন। একবার একজন কৃতদাস জাঙাঙ্গীরকে এক টুকরো হাতীর দাঁত দিয়েছিলো। দাঁত টুকরোয় চারটি দৃশ্য খোদাই করা ছিলো। শেষ দৃশ্যে একটি গাছ এবং গাছটির নীচে শ্রদ্ধেয় ঈশা (আঃ)এর মূর্তি খোদাই করা ছিলো। একজন ব্যক্তি যীশুর পায়ের কাছে মাথা রেখেছেন এবং একজন বৃদ্ধ যীশুর সাথে কথা বলছেন। বৃদ্ধটির পাশে চারজন লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। যে কৃতদাসটি তাঁকে হাতীদাঁতটি দিয়েছিলো, জাহাঙ্গীর তাঁর হাতের কাজ বলে বিশ্বাস করেছিলেন। সাইয়িদ আহম্মদ এবং হেনরি বেভারেজ পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, এটি মূলতঃ ইউরোপীয় শিল্পীদের কাজ ছিলো, সম্ভবতঃ রূপান্তর করা হয়েছিলো। এটি যেখান থেকেই আসুক না কেন, যাই প্রতিনিধিত্ব করুক না কেন, এটা স্পষ্ট যে, ইউরোপীয় শৈলী মোগল শিল্পকে প্রভাবিত করেছিলো। অন্যথায় কৃতদাস এটিকে নিজের কাজ বলে দাবি করত না এবং জাহাঙ্গীরও তা বিশ্বাস করতেন না।
শিল্প ও স্থাপত্য– জাহাঙ্গীর শিল্প ও স্থাপত্য শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মজীবনী জাহাঙ্গীর নামায় তাঁর রাজত্বকালে ঘটে যাওয়া ঘটনা, সম্মুখীন হওয়া উদ্ভিদ এবং প্রাণীর বর্ণনা এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য দিক লিপিবদ্ধ করেছেন। ওস্তাদ মনসুরের মতো দরবারি চিত্রশিল্পীকে জাহাঙ্গীর নামায় লিপিবদ্ধ বিশেষ ঘটনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চিত্র অংকন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, ১৬১৯ সালে তিনি ইরানের শাসকের কাছ থেকে একটি বাজপাখি উপহার পেয়েছিলেন। তিনি বাজপাখিটির বিষয়ে লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন, এই পাখীটির রঙের সৌন্দর্য সম্পর্কে আমি কী লিখব? এটিতে কালো কালো দাগ ছিলো, ডানা, পেছনে এবং পাশের প্রতিটি পালক ছিলো অত্যন্ত সুন্দর। পাখীটি মৃত্যুর পরে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে পাখীটির একটি প্রতিকৃতি অঙ্কন করেছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর শিল্পকে সংরক্ষণ করেছিলেন এবং সেগুলো প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি শত শত ছবি বিস্তৃত অ্যালবামে সংরক্ষণ করেছিলেন। প্রাণীবিদ্যার মতো বিষয়কে ঘিরেও তিনি অ্যালবাম সংগঠিত করেছিলেন।
জাহাঙ্গীর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তিনি যেকোনো চিত্রকর্ম দেখে তার চিত্রশিল্পী নির্ধারণ করতে পারতেন। তিনি বলেছেনঃ চিত্রকলার প্রতি আমার ভালো লাগা এবং তার বিচার করার ক্ষেত্রে আমার অনুশীলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যখন কোনো মৃত বা জীবিত শিল্পীর নাম না জানিয়ে তাঁর কাজগুলো আমার সামনে আনা হয়, তাহলে আমি বলে দিতে পারি কাজটি কোন শিল্পীর। যদি অনেকগুলি প্রতিকৃতি সম্বলিত একটি ছবি থাকে এবং প্রতিটি মুখই আলাদা শিল্পীর আঁকা হয়, আমি তাঁদের প্রত্যেকের অঙ্কিত মুখ আলাদাভাবে চিনাক্ত করতে পারি। যদি কেউও মুখের চোখ এবং ভ্রূ অঙ্কন করে তখনও আমি বুঝতে পারি আসল মুখটি কার কাজ এবং কে চোখ ও ভ্রূ এঁকেছেন।
জাহাঙ্গীর চিত্রকলাকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলেন। তিনি আকবরের সময়ের চিত্রকর্মও সংরক্ষণ করেছিলেন। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো, কিংবদন্তি তানসেনের জামাতা সঙ্গীতশিল্পী নওবত খানের ওস্তাদ মনসুর খান আঁকা চিত্রকর্ম। চিত্রকর্মের নান্দনিক গুণাবলী ছাড়াও জাহাঙ্গীরের শাসনামলে তৈরি চিত্রগুলি তারিখ এবং স্বাক্ষর সহ ঘনিষ্টভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিলো। যা থেকে পণ্ডিত ব্যক্তিরা মোটামুটি অনুমান করতে পারেন যে, কখন এবং কোন প্রসঙ্গে চিত্রগুলি তৈরি করা হয়েছিলো।
ডব্লিউ, এম, থ্যাকস্টনের জাহাঙ্গীরনামার অনুবাদের মুখপাত্র মিলো ক্লিভল্যাণ্ড বিচ ব্যাখ্যা করেছেন যে, জাহাঙ্গীর সাম্রাজ্যের বেশ স্থিতিশীল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সময়ে শাসনে এসেছিলেন। শিল্পীদের তাঁর আত্মজীবনীর সাথে সামঞ্জস্য থাকা চিত্র অঙ্কনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো। তিনি তাঁর সম্পদ এবং তাঁর বিলাসিতা অবসর সময়কে মোগল সাম্রাজ্যকে ঘিরে থাকা জমকালো প্রাকৃতিক জগতকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করতে ব্যবহার করেছেন। তিনি মাঝে মাঝে এই উদ্দেশ্যে তাঁর সাথে চিত্রশিল্পীদের নিয়ে ভ্রমণ করতেন। তিনি যখন রহিমাবাদে ছিলেন, তখন নির্দিষ্ট একটি বাঘের প্রতিকৃতি অঙ্কন করার জন্য তিনি তাঁর চিত্রশিল্পীদের সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাঘটিকে তিনি গুলি করে মেরেছিলেন। কারণ তিনি বাঘটিকে বিশেষ সুন্দর বলে মনে করেছিলেন।
জেসুইটসরা তাঁদের সাথে বিভিন্ন বই, খোদাই করা শিল্পকর্ম এবং চিত্রকর্ম নিয়ে এসেছিলেন। আকবর সেগুলি দেখে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। তখন মোগলদের দেওয়ার জন্য আরও বেশি করে চিত্রকর্ম এবং চিত্রশিল্প প্রেরণ করেছিলেন। আকবর এবং জাহাঙ্গীর সেই চিত্রকর্মগুলি খুব ঘনিষ্টভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং তার প্রতিলিপি প্রস্তুত এবং অভিযোজিত করেছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর দরবারের চিত্রশিল্পীদের দক্ষতার জন্য গর্ব করার মতো উল্লেখযোগ্য ছিলেন। স্যার টমাস রো’র ডায়েরীতে এ বিষয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ বর্ণনা করেছেন, সম্রাট তাঁর চিত্রশিল্পীদের দিয়ে একটি ইউরোপীয় মিনিয়েচার কপি করে মোট পাঁচটি মিনিয়েচার(ক্ষুদ্র আকৃতির চিত্র) তৈরি করিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর তখন রো’কে মিনিয়েচার গুলি থেকে আসলটি বাছাই করার জন্য প্রত্যাহ্বান জানিয়েছিলেন। অবশ্যে জাহাঙ্গীরের আনন্দের জন্য রো’ আসলটি বাছাই করেন নি।
জাহাঙ্গীর ইউরোপীয় শৈলীর অভিযোজনের জন্যও বিখ্যাত ছিলেন। লণ্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে জাহাঙ্গীরের সময়ের ভারতীয় প্রতিকৃতির ৭৪ টি চিত্র রয়েছে। সেই টিত্রগুলির মধে J জাহাঙ্গীরের প্রতিকৃতিও রয়েছে। এই প্রতিকৃতিগুলি জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের চিত্রশিল্পের অনন্য উদাহরণ। জাহাঙ্গীরের সময়ে প্রতিকৃতিগুলির কাঁধ ও মাথাগুলি সম্পূর্ণ অঙ্কন করা ছিলো না।
সমালোচনা– জাহাঙ্গীরকে একজন দুর্বল এবং অসফল শাসক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী ‘তুজক-ই-জাহাঙ্গীরি’র সম্পাদক প্রাচ্যবিদ হেনরি বেভারিজ জাহাঙ্গীরকে রোমান সম্রাট ক্লাডিয়াসের সাথে তুলনা করেছেন। কারণ উভয়েই দুর্বল শাসক ছিলেন এবং শাসক হিসাবে তাঁরা ভুল জায়গায় ছিলেন। জাহাঙ্গীর প্রাকৃতিক ইতিহাসের জাদুগরের প্রধান হলে আরও সুখী মানুষ হতে পারতেন বলে হেনরি বেভারিজ বিশ্বাস করতেন। স্যার উইলিয়াম হকিন্স ১৬০৯ সালে জাহাঙ্গীরের দরবারে এসেছিলেন। জাহাঙ্গীরের পিতা দাক্ষিণাত্যেরও বাদশাহ ছিলেন এবং সেলিম শাহ তা হারাতে শুরু করেছিলেন। ইটালীয় লেখক ও ভ্রমণকারী নিকোলাও মানুচ্চি জাহাঙ্গীরের নাতি দারা শিকোহের অধীনে কাজ করেছিলেন। জাহাঙ্গীর সম্পর্কে তিনি তাঁর আলোচনা শুরু করেছিলেন এইভাবে, এটি অভিজ্ঞতা দ্বারা পরীক্ষিত সত্য যে, পিতারা কপালের ঘাম ফেলে যা অর্জন করে, পুত্রেরা তা নষ্ট করে দেয়।
জন রিচার্ডের মতে, মদ এবং আফিমের প্রতি যথেষ্ট আসক্তির জন্য জাহাঙ্গীরের জীবনের ক্ষেত্রে ঘন ঘন মত পরিবর্তন তাঁর অলসতার প্রতিফলন ছিলো।
জাহাঙ্গীরের পুত্রসন্তান
খসরু মির্জা– জন্ম ১৫৮৬ সালের ১৬ আগস্ট এবং মৃত্যু ১৬২২ সালের ২৬ জানুয়ারি। মাতৃ অম্বরের রজা ভগবন্ত দাসের কন্যা শাহ বেগম ৷
পারভেজ মির্জা– জন্ম ১৫৮৯ সালের ৩১ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৬২৬ সালের ২৮ অক্টোবর। মাতৃ খাজা হাসানের কন্যা জামাল বেগম ।
মহম্মদ খুররম– জন্ম ১৫৯২ সালের ৫ জানুয়ারি এবং মৃত্যু ১৬৬৬ সালের ২২ জানুয়ারি। মাতৃ মাওয়ারের উদয় সিংয়ের কন্যা মাকানি বেগম। পরবৰ্তী ভারত সম্ৰাট।
জাহাঙ্গীর মির্জা– জন্ম ১৬০৫ সালে। একজন উপপত্নীর সন্তান ।
শাহরিয়ার মির্জা– জন্ম ১৬০৫ সালের ১৬ জানুয়ারি এবং মৃত্যু ১৬২৮ সালের ২৩ জানুয়ারি। একজন উপপত্নীর সন্তান।
কন্যাসন্তান
সুলতান–উন–নিসা বেগম– জন্ম ১৫৮৬ সালের ২৫ এপ্রিল এবং মৃত্যু ১৬৪৬ সালের ৫ সেপ্তেম্বর। অম্বরের রাজা ভগবন্ত দাসের কন্যা শাহ বেগম-এর কন্যা।
ইফফাত বানু বেগম– জন্ম ১৫৮৯ সালের ৬ এপ্রিল। কাশঘরের সৈয়দ খান জগততায়ের কন্যা মালেকা শিকার বেগমের কন্যা।
দৌলত–উন–নিসা বেগম– জন্ম ১৫৮৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর। রাজা দরিয়া মালভাসের কন্যার সন্তান।
বাহার বানু বেগম– জন্ম ১৫৯০ সালের ৯ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৬৫৩ সালের ৮ সেপ্তেম্বর। মের্তার কেশব দাস রাঠোরের কন্যা করমসি বেগমের কন্যা।
বেগম সুলতান বেগম– জন্ম ১৫৯০ সালের ৯ অক্টোবর। মাওয়ারের উদয় সিংয়ের কন্যা মাকানি বেগমের কন্যা।
একটি কন্যা– জন্ম ১৫৯১ সালের ২১ জানুয়ারি। খাজা হাসানের কন্যা সাহেব জামাল বেগমের কন্যা।
একটি কন্যা– জন্ম ১৫৯৪ সালের ১৪ অক্টোবর। খাজা হাসানের কন্যা সাহেব জামাল বেগমের কন্যা। একটি কন্যা- জন্ম ১৫৯৪ সালের জানুয়ারি। আবদুল্যাহ খান বালুচের কন্যার সন্তান।
একটি কন্যা– জন্ম- ১৫৯৫ সালের ২৮ আগস্ট। ইব্রাহীম হোসেন মির্জার কন্যা নূর-উন-নিসার সন্তান। লুজ্জাত-উন-নিসা বেগম- জন্ম ১৫৯৭ সালের ২৩ সেপ্তেম্বর। মাওয়ারের উদয় সিংয়ের কন্যা মাকানি বেগমের কন্যা।
চলচ্চিত্র টিভি ধারাবাহিকে জাহাঙ্গীর
পুকার– ১৯৩৯ সালে নির্মিত হিন্দী চলচ্চিত্র। জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন চন্দ্রমোহন।
আনারকলি– ১৯৫৩ সালে নির্মিত হিন্দী চলচ্চিত্র। জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রদীপ কুমার । আনারকলি- ১৯৫৫ সালে নির্মিত তেলেগু চলচ্চিত্র। জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এএনআর।
মুঘল–ই–আজম– ১৯৬০ সালে নির্মিত হিন্দী চলচ্চিত্র। জাহাঙ্গীরের ছেলেবেলার চরিত্রে জালাল আগা এবং যুবক সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দিলীপ কুমার ।
আনারকলি– ১৯৬৬ সালে নির্মিত মালয়ালম চলচ্চিত্র। সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রেম নাজির।
আকবর সেলিম আনারকলি – ১৯৭৯ সালে নির্মিত তেলেগু চলচ্চিত্র। সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বালাকৃষ্ণ।
ভারত এক খোঁজ-১৯৮৮ সালে শ্যাম বেনেগ্যাল নির্মিত টিভি ধারাবাহিক। সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বিজয় আরোরা?
জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা–জাহাঙ্গীরের হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণমুদ্রা– সত্যজিৎ রায় পরিচালিত গোয়েন্দা গল্পে জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফেলুদা। ১৯৯৮ সালে গল্পটি টিভি চলচ্চিত্র হিসাবেও অভিযোজিত হয়েছিলো।
২০০০ সালে নির্মিত টিভি ধারাবহিক নূরজাহান-এ জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মিলিন্দ সুমন।
২০১৩ সালে নির্মিত টিভি ধারাবাহিক যোধা আকবর–এ সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আয়েন জুবায়ের রাহমানি এবং রবি ভাটিয়া।
২০১৪ সালে নির্মিত ইন্দু সুদারসেনের টিভি ধারাবাহিক ‘সিয়াসত’-এ অভিনয় করেছিলেন করণবীর শর্মা এবং সুধাংশু পাণ্ডে।
২০১৪ সালে নির্মিত টিভি সিটকম(একটি চরিত্রের উপর নির্ভর) ‘আকবর কা বাল বীরবল‘-এ সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পবন সিং।
২০১৮ সালের কালার টিভির ধারাবাহিক ‘দাস্তান–ই–মহব্বত সেলিম আনারকলি‘তে সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শাহির শেখ।
সাহিত্যে জাহাঙ্গীর–
দ্য টুয়েনটিথ ওয়াইভস– ইন্দু সুদারসেনের ২০০২ সালে রচিত পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাসে একটি প্রধান চরিত্রে
জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
সিকুয়্যাল দ্য ফিস্ট অফ রোজেস– ইন্দু সুদারসেনের ২০০৩ সালে রচিত পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্রে জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
রুলার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড– ২০১১ সালে রচিত অ্যালেক্স রাদার ফোর্ডের উপন্যাসে একটি চরিত্রে জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
সিকুয়্যাল অফ দ্য টেন্টেড থ্রোন– ২০১২ সালে অ্যালেক্স রাদার ফোর্ড রচিত এম্পায়ার অফ দ্য মোগল সিরিজের একটি প্রধান চরিত্রে ছিলেন জাহাঙ্গীর।
নূর জাহানস ডটার– ২০০৫ সালে তনুশ্রী পোদ্দার রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাসের জাহাঙ্গীর একটি চরিত্রে ছিলেন।
প্রিয় সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল– নিনা কনসেয়েলো এপটন রচিত একটি ঐতিহাসিক উপন্যাসে জাহাঙ্গীর একটি চরিত্রে রয়েছেন।
নূর জাহান– জ্যোতি জাফার রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্রে জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
তাজ, এ স্টোরি অফ মোগল ইণ্ডিয়া– টাইমেরি মুরারি রচিত উপন্যাসে জাহাঙ্গীর একটি চরিত্রে রয়েছেন।

শাহরিয়ার মির্জা
সালেফ-উদ-দীন মহম্মদ শাহরিয়ার মির্জার জন্ম ১৬০৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মোগল সাম্রাজ্যের আগ্রায়। তিনি শাহরিয়ার মির্জা নাম পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম জাহাঙ্গীর এবং মাতৃর নাম জগত গোসাঁই। তিনি মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের পঞ্চম এবং কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর প্রভাবশালী এবং শক্তিশালী সৎ মা নূরজাহানের সহায়তায় সম্রাট হওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। নূর জাহান তাঁর শাশুড়িও ছিলেন। উত্তরাধিকারের যুদ্ধের সময় শাহরিয়ার ১৬২৭ সালের ৭ নভেম্বরে লাহোরে নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং ১৬২৮ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সম্রাট হিসাবে রাজকার্য পরিচালনা করেছিলেন। উত্তরাধিকারের যুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন এবং তাঁর সৎভ্রাতা খুররম(শাহ জাহান) এর নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো। শাহরিয়ার পঞ্চম মোগল সম্রাট হতেন, যদিও তাঁকে সম্রাট হিসাবে গণনা করা হয় না ।
প্রারম্ভিক জীবন– জাহাঙ্গীরের রাজত্বের ১৬তম বছরে শাহরিয়ার মির্জা শের আফগানের পক্ষের তাঁর সৎ মাতৃ নূর জাহানের কন্যা লাডলি বেগম-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। শাহরিয়ার এবং লাডলি বেগমের আরজানি বেগম নামক একটি কন্যা সন্তান ছিলেন।
শাহজাদা খুররম ধোলপুর পরগণা এবং দূর্গ নিজের জন্য জাহাঙ্গীরের কাছে দাবি করেছিলেন। তবে, নূর জাহানের অনুরোধে জাহাঙ্গীর উক্ত পরগণা ও দূর্গ শাহরিয়ারকে প্রদান করেছিলেন। শাহরিয়ারের সৎ মাতৃ তথা শাশুড়ি নূর জাহান শরিফ-উল-মুলকে ধোলপুর পরগণা এবং দূর্গ-এর ভারপ্রাপ্ত শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। শাহরিয়ারকে ১৬২৫ সালের ১৩ অক্টোবর-এ ঠাট্টার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিলেন। শরিফ-উল-মুলক শাহরিয়ারের ডেপুটি হিসাবে প্রশাসন পরিচালনা করেছিলেন।
সিংহাসনে আরোহণ– ১৬২৭ সালের ২৮ শে অক্টোবর সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর শাহরিয়ার মির্জা নূর জাহানের ইচ্ছানুসারে মাত্র তিন মাসের জন্য মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনি তখন লাহোরে ছিলেন এবং তিনি রাজকীয় কোষাগার দখল করেছিলেন। সিংহাসন সুরক্ষিত করার জন্য তিনি অভিজাতদের মধ্যে ৭০ লক্ষ টাকা বিতরণ করেছিলেন। সম্রাটের মৃত্যুর পর শাহজাদা দানিয়াল মির্জার পুত্র মির্জা বাইসিঙঘর লাহোরে পালিয়ে গিয়ে শাহরিয়ারের সাথে যোগদান করেছিলেন।
এদিকে আসফ খান(মমতাজ মহলের পিতা) তাঁর জামাতা খুররমকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন। ফলে শাহরিয়ার মির্জা এবং আসফ খান বাহিনীর মধ্যে লাহোরের নিকটে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিলো। শাহরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে পরের দিন তাঁকে বন্দি করে দাওয়ারের নিকট হাজির করা হয়েছিলো। কারণ সিংহাসনের শূন্যস্থান পূরণের জন্য আসফ খান ইতিমধ্যে শাহ জাহানের স্থলে সাময়িকভাবে দাওয়ারকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। দুই থেকে তিন দিন পর আসফ খান শাহরিয়ারকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন। এভাবেই তাঁর সংক্ষিপ্ত রাজত্বের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটেছিলো। বলা হয় যে, শাহরিয়ার কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার ফলে তিনি চোখের ভ্রূ এবং মাথার সমস্ত চুল হারিয়েছিলেন।
সমস্ত মোগল শাহজাদাদের মতো শাহরিয়ারও কবিতা রচনা করা শিখেছিলেন। অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি জীবনের শেষপ্রান্তে ‘বি গু কুর দিদাহ-ই-আফতাব’ নামে একটি মর্মস্পর্শী শায়েরি রচনা করেছিলেন।
মৃত্যু– শাহ জাহান ১৬২৮ সালে লাহোরে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। ১৬২৮ সালের ২৩ জানুয়ারি দাওয়ার, তাঁর ভ্রাতা গারশাপ এবং শাহরিয়ার মির্জা মৃত শাহজাদা দানিয়ালের পুত্র তাহমুরাস এবং হোসাং আসফ খানের হাতে নিহত হয়েছিলেন।
শেষ পরিণতি- শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর শাহ জাহান আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দি না হওয়া পর্যন্ত ৩০ বছর রাজত্ব করেছিলেন। আসফ খানকে মোগল সাম্রাজ্যের উজির-এ-আজম নিযুক্ত করেছিলেন এবং নূর জাহানকে বার্ষিক দুই লাখ টাকা পেনশন প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। নূর জাহান বাকি দিনগুলি লাহোর দূর্গে তাঁর মেয়ে অর্থাৎ শাহরিয়ারের বিধবা স্ত্রী লাডলি বেগ-এর সাথে বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। •

শাহ জাহান
সাহাব-উদ-দীন মহম্মদ খুররমের জন্ম ১৫৯২ সালের ৫ জনুয়ারি মোগল সাম্রাজ্যের লাহোর দুর্গে। খুররম নামটি তাঁর পিতামহ আকবর রেখেছিলেন। লাহোর বর্তমান পাকিস্থানে অবস্থিত। তাঁর পিতৃর নাম জাহাঙ্গীর এবং মাতৃর নাম জগত গোসাঁই। জগত গোসাঁই মারওয়ারের রাজপুত রাজা উদয় সিং রাঠোরের কন্যা ছিলেন। শাহ জাহান ভারতের পঞ্চম মোগল সম্রাট ছিলেন এবং ১৬২৮ সাল থেকে ১৬৫৮ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। ইতিহাসবিদ জে, এল, মেহতা লিখেছেন, শাহ জাহানের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য গৌরবের উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলো। স্থাপত্য শিল্পের জন্য শাহ জাহান বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য স্থাপত্যের স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিলো। শাহ জাহান অনেকগুলি কীর্তিস্তম্ভ নির্মাণ করিয়েছিলেন। তার মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ছিলো আগ্রার তাজমহল। তাজমহলে তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মমতাজ মহলকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। তাজমহল ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রে ব্যাপকভাবে অভিযোজিত হয়েছে। শাহ জাহান রাজকীয় কোষাগার এবং কহিনূরের মতো অনেক মূল্যবান পাথরের মালিক ছিলেন। তাঁকে ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
১৬২৭ সালের শেষের দিকে শাহ জাহানের পিতা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর সৎ ভ্রাতা শাহরিয়ার এবং তাঁর মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিলো। সেই সংঘর্ষে শাহ জাহান বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৬২৮ সালের ১৯ জানুয়ারি সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি শাহ জাহান(বিশ্বের সম্রাট) উপাধি ধারণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি সিংহাসনের সাম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে লালকেল্লা, শাহ জাহান মসজিদ সহ অনেক বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প দেখা যায়। বৈদেশিক বিষয়গুলির মধ্যে সাফাভিদদের সাথে যুদ্ধ, দাক্ষিণাত্যের শিয়া সুলতানাতের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান, পর্তুগীজদের সাথে বিরোধ এবং অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক রেখেছিলেন। অভ্যন্তরীন উদ্বেগের মধ্যে ছিলো অসংখ্য বিদ্রোহ এবং ১৬৩০-৩২ সালে সংঘটিত বিধ্বংসী দুর্ভিক্ষ।
১৬৫৭ সালের সেপ্তেম্বরে শাহ জাহান গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এই সময়ে তাঁর চার পুত্রের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিলো। সেই সংঘর্ষে বিজয়ী হয়ে তাঁর তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। শাহ জাহান রোগমুক্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠার পরে আওরঙ্গজেব তাঁর পিতাকে ১৬৫৮ সালের জুলাই থেকে ১৬৬৬ সালের জানুয়ারি অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আগ্রা দূর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধির পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। আকবর কর্তৃক প্রচলিত উদারনীতিগুলি দূর করার জন্য শাহ জাহান-এর রাজত্বকাল পরিচিত। তিনি একজন গোঁড়া মুসলিম ছিলেন।
সম্রাট আকবর নিজ পুত্র সেলিমের চেয়ে নাতি খুররমকে অধিক পসন্দ করতেন। সেজন্য খুররম আকবরের স্ত্রী রুকাইয়া সুলতানা বেগমের দায়িত্বে লালিতপালিত হয়েছিলেন। রুকাইয়া সুলতানা বেগম খুব যত্নের সাথে খুররমকে লালনপালন করেছিলেন বলে জানা যায়। জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন যে, রুকাইয়া সুলতানা তাঁর ছেলে খুররমকে খুব স্নেহ করতেন। ১৬০৫ সালে তাঁর পিতা আকবরের মৃত্যুর পর শাহ জাহান তাঁর মাতৃ জগত গোসাঁইর কাছে ফিরে গিয়েছিলেন এবং তিনি তাঁর মাতৃর খুব সেবাযত্ন করতেন এবং অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
শাহ জাহান তাঁর মাতৃর প্রতি এতই অনুগত ছিলেন যে, আদালতের ইতিহাসে তিনি তাঁর মাকে হজরত বলে সম্বোধন করতেন। ১৬১৯ সালের ৮ এপ্রিল আকবরাবাদে তাঁর মাতৃ জগত গোসাঁইর মৃত্যু হয়েছিলো। তাঁর মাতৃর মৃত্যুর পর তিনি ২১ দিন শোকব্রত পালন করেছিলেন বলে রেকর্ড করা হয়েছিলো। শোকব্রতের সময়ে তিনি ২১ দিন কোনো জনসভায় অংশগ্রহণ করেননি এবং নিরামিষ ভোজন করতেন। তাঁর সহধর্মিনী মমতাজ মহল এই শোকব্রত পালনের সময়ে দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করতেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে ব্যক্তিগতভাবে তা তদারকি করতেন। মমতাজ মহল প্রতিদিন সকালে কোরআন তেলাওত করতেন। তাঁর স্বামীকে জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে অনেক শিক্ষা প্রদান করতেন এবং দুঃখ না করার জন্য অনুরোধ করতেন।
শিক্ষা– খুররম শৈশবে একজন শাহজাদা হিসাবে তাঁর মর্যদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁর শিক্ষার মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক শিল্প, যেমন, কবিতা এবং সঙ্গীত অন্তর্ভূক্ত ছিলো। যার বেশির ভাগই আকবরের দরবারের ইতিহাসবিদদের মত অনুযায়ী অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কাজভিনির মতে, শাহজাদা খুররম শুধুমাত্র কয়েকটি তুর্কি শব্দের সাথে পরিচিত ছিলেন এবং শৈশবে ভাষা অধ্যয়নের প্রতি তিনি খুব কমই আগ্রহ দেখাতেন। তিনি সম্রাট আকবরের প্রতি খুব অনুরুক্ত ছিলেন। ১৬০৫ সালে আকবর যখন মৃত্যু শয্যায় শায়িত ছিলেন তখন খুররম আকবরের পাশেই ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিলো মাত্র তের বছর। তাঁর মাতৃ তাঁকে আকবরের শয্যার পাশ থেকে সড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে, তিনি শয্যার পাশ থেকে উঠে যেতে অস্বীকার করেছিলেন। আকবরের মৃত্যুর অব্যবহতি কাল পূর্বে রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে খুররম তাঁর পিতার রাজনৈতিক বিরোধীদের কাছ থেকে যথেষ্ট পরিমাণে শারীরিক বিপদের মধ্যে ছিলেন। শেষপর্যন্ত আকবরের স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়াতে তাঁকে তাঁর পিতামহের বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা মাতামহী সালিমা সুলতানা এবং মরিয়ম-উজ-জামানি তাঁকে তাঁর প্রাসাদে ফিরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।
খসরুর বিদ্রোহ– ১৬০৫ সালে শাহ জাহানের পিতা জাহাঙ্গীর সিংহাসনে আরোহণের পর জ্যেষ্ঠপুত্র খসরুর বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর সেই বিদ্রোহ দমন করে আংশিকভাবে অন্ধ করে খসরুকে কারাগারে বন্দি করে রেখেছিলেন। এই ঘটনার পরে শাহ জাহান আদালতের রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্র থেকে সরে আসার জন্য রুকাইয়া সুলতনার তত্ত্বাবধান থেকে তাঁর মাতৃ জগত গোসাঁইর নিকটে চলে এসেছিলেন। জাহাঙ্গীরের তৃতীয় পুত্র হিসাবে সেই সময়ের দুই প্রধান শক্তি, তাঁর পিতা এবং সৎ ভ্রাতৃর বিরুদ্ধে খুররম কোনো প্রত্যাহ্বান গ্রহণ করেননি। তিনি তাঁর শিক্ষা এবং সামরিক প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একজন শাহজাদা হিসাবে প্রাপ্য সুরক্ষা এবং সকল প্রকার বিলাসিতা উপভোগ করছিলেন। তাঁর জীবনের এই শান্ত এবং স্থিতিশীল সময় তাঁকে মোগল দরবারের সমর্থন আদায় করার জন্য ভিত্তি তৈরি করতে সহায় করেছিলেন। যা পরবর্তী জীবনে তিনি কাজে লাগিয়ে ছিলেন।
নূর জাহানকে গৃহবন্দি– পিতৃ জাহাঙ্গীর এবং তাঁর সৎ ভ্রাতৃ খসরুর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য খুররম তাঁর পিতার কাছাকাছি আসতে শুরু করেছিলেন এবং সময়ের সাথে সাথে দরবারিদের দ্বারা সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসাবে বিবেচিত হতে শুরু করেছিলেন। ১৬০৮ সালে তাঁকে ঐতিহ্যগতভাবে উত্তরাধিকারীর জামাত হিসাবে বিবেচিত হিসার-ফিরোজা সুবাহের কর্তৃত্ব সরকারীভাবে প্রদান করা হয়েছিলো। শাহ জাহানের সৎ মাতৃ নূর জাহান একজন বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী মিহলা ছিলেন। নূর জাহানের শিক্ষাগত পটভূমি ছিলো চমৎকার। জাহাঙ্গীরের সিদ্ধান্তে নূর জাহান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। জাহাঙ্গীর যখন মদ এবং আফিমের প্রতি অধিক অনুরুক্ত হয়ে পড়েছিলেন, নূর জাহান তখন ধীরে ধীরে সিংহাসনের পেছনের প্রকৃত শক্তি হয়ে উঠেছিলেন। মূদ্রায় জাহাঙ্গীরের নামের সাথে তাঁর নামও মুদ্রিত করতে শুরু করেছিলেন। নূর জাহান নিজের আত্মীয়দের মোগল দরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা শুরু করেছিলেন। ঐতিহাসিকরা সেই দরবারিদের নূর জাহান জান্তা বলে অভিহিত করছিলেন। ১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর আসফ খান নূর জাহানকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত নূর জাহান গৃহবন্দি হিসাবেই ছিলেন।
বিবাহ–
কান্দাহারী বেগম– শাহ জাহান প্রথম বিয়ে করেছিলেন পারস্যের শাহ ইসমাইল-প্রথমের প্রপৌত্র সুলতান মুজাফফর হোসেইন মির্জা সাফাভির কন্যা কান্দাহারী বেগমকে। বিয়েটি ১৬১০ সালের ৮ নভেম্বরে আগ্রায় অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তাঁদের ১৬১১ সালের ২১ আগষ্ট একটি কন্যা সন্তান জন্ম হয়েছিলো। কন্যা সন্তানটির নাম ছিলো পারভেজ বানু বেগম।
মমতাজ মহল– ১৬০৭ সালে শাহ জাহান এবং আরজুমন্দ বানু বেগমের বিয়ের বাকদান করা হয়েছিলো। আরজুমন্দ বানু বেগম মমতাজ মহল নামেও পরিচিত ছিলেন। তখন শাহ জাহানের বয়স ১৫ এবং মমতাজ মহলের বয়স চৌদ্দ বছর ছিলো। মমতাজ মহল পারস্যের বিশিষ্ট অভিজাত পরিবারের কন্যা ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা আকবরের রাজত্বকাল থেকে মোগল দরবারে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের পিতৃপুরুষ ছিলেন মির্জা গিয়াস বেগ। তিনি ইতিমাদ-উদ-দৌলা (রাষ্ট্রের স্তম্ভ)নামেও পরিচিত ছিলেন। মির্জা গিয়াস বেগ জাহাঙ্গীরের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর ছেলে আসফ খান, মমতাজ মহলের পিতা, মোগল দরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি পরে উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। মেহের-উন-নিসা (নূর জহান)মমতাজ মহলের পিসি ছিলেন।
সুখী বৈবাহিক জীবনের জন্য বাকদানের পাঁচ বছর পরে দরবারের জ্যোতিষী কর্তৃক নির্বাচিত তারিখে অর্থাৎ ১৬১২ সালে বিবাহটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেই সময়ের জন্য বিবাহটি অত্যন্ত বিলম্বিত বিবাহ ছিলো। বিয়ের পর তাঁকে মমতাজ মহল (প্রাসাদের আলো)উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। বিয়েটা সুখের ছিলো এবং মমতাজ মহল শাহ জাহানের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। মমতাজ মহল চৌদ্দটি সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। যার মধ্যে সাতটি সন্তান প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে উঠেছিলেন।
আরজুমন্দ বানু বেগম একজন রাজনৈতিক বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। তিনি তাঁর স্বামীর একজন বিশ্বস্ত উপদেষ্টা ছিলেন। পরবর্তী জীবনে সম্রাজ্ঞী হিসাবে তিনি বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন। যেমন রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তাঁর স্বামীকে পরামর্শ প্রদান, রাজকীয় সীলমোহরের দায়িত্ব, সরকারী নথিপত্রের চূড়ান্ত খসড়ার পর্যালোচনা করার জন্য তাঁকে অনুমতি প্রদান করা হয়েছিলো।
গওহর আরা বেগমের জন্মের পরে প্রসবোত্তর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ৩৮ বছর বয়সে ১৬৩১ সালের ৭ জুন- এ দাক্ষিণাত্যের বুরহানপুরে মমতাজ মহল মৃত্যু বরণ করেছিলেন। ত্রিশ ঘণ্টার বেদনাদায়ক প্রসবের পর যথেষ্ট রক্তক্ষরণ হয়েছিলো। সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেন যে, ১৭ বছর বয়সী শাহজাদী জাহানারা মাতৃর ব্যথায় এতটাই ব্যথিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি দৈব হস্তক্ষেপের আশায় দরিদ্রদের মধ্যে রত্ন বিতরণ করেছিলেন। শাহ জাহান কাঁদতে কাঁদতে অচেতন হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর মৃতদেহ জয়নাবাদ নামে পরিচিত একটি প্রাচীর ঘেরা উদ্যানে সাময়িকভাবে সমাহিত করা হয়েছিলো। উদ্যানটি শাহ জাহানের চাচা দানিয়াল তাপ্তি নদীর তীরে নির্মাণ করেছিলেন। মমতাজ মহলের মৃত্যু শাহ জাহানের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলো এবং তিনি তাজমহল নির্মাণের জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মমতাজ মহলের মৃতদেহ পরে জয়নাবাদ থেকে স্থানান্তর করে তাজমহলে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
ইজ–উজ–নিসা বেগম– ১৬১৭ সালের ২ অক্টোবর-এ শাহ জাহান বুরহানপুরে ইজ-উজ-নিসা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ইজ-উজ-নিসা বেগম আকবরবাদী মহল নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে সিরহিন্দি বেগম নামেও উল্লেখ করা হতো। তাঁর পিতার নাম ছিলেন মির্জা ইরাজ। মির্জা ইরাজকে শাহনওয়াজ নামেও জানা যেতো। ইজ- উজ-নিসা বেগমের একমাত্র পুত্র সন্তান ছিলেন সুলতান জাহান আফ্ৰোজ মির্জা। ইতিহাসবিদ ইনায়েত খানের মতে, মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর ইজ-উজ-নিসা বেগম শাহ জাহানের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠেছিলেন।
লীলাবতী বাই– খুররম তাঁর মামাতো বোন লীলাবতী বাইকেও বিয়ে করেছিলেন বলেও তথ্য রয়েছে। লীলাবতী বাই খানওয়ারের সাকাত সিং রাঠোরের কন্যা ছিলেন। জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সময় এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
অজাচারের অভিযোগ– ফ্রাঙ্কোইস বার্নিয়ার একজন ফরাসি চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ১৬৫৯ সাল থেকে ১৬৬৮ সাল পর্যন্ত ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। জাহানারার সাথে শাহ জাহানের অজাচারের সম্পর্ক ছিলো বলে একটি গুজব ছিলো। ডে লেয়েট, পিটার মুণ্ডি এবং টাভেনিয়ার দ্বারাও অনুরূপ অভিযোগ করা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ইতিহাসবিদ ভিনসেন্ট স্মিথও একই যুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসবিদ বি,পি, সাক্সেনা এই ধরণের দাবির কোনো সমর্থন নেই বলে দাবি করেছেন। ফ্রাঙ্কোইস বার্নিয়ারের সমসাময়িক নিকোলাও মানুচ্চি এই অজাচারের সম্পর্ক প্রত্যাখান করে বলেছেন- শাহ জাহান যাতে জাহানারার বিয়ের আবেদন মেনে নেন তার জন্য জাহানারা অত্যন্ত আন্তরিকতা এবং ভালোবাসার সাথে তিনি তাঁর পিতার সেবা করেছিলেন। এই কারণেই সাধারণ মানুষ অনুমান করেছিলো যে, তিনি তাঁর পিতার সাথে সহবাস করেছিলেন। সাধারণ মানুষের এই অনুমানের উপর ভিত্তি করেই শাহজাদী জাহানারা সম্পর্কে ফ্রাঙ্কোইস বার্নিয়ার অনেক কিছু লিখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এগুলি আসলে নিচু মানসিকতার মানুষের আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।
মানুচ্চি আরও বলেছেন- বার্নিয়ার যা লিখেছেন, তা অসত্য। ইতিহাসবিদ কে, এস, লাল দাবি করেছেন, গুজবটি দরবারিদের বিদ্বেষ এবং মোল্লাদের রায় দ্বারা ছড়ানো হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব জাহানারাকে রাজকীয় বন্দিদের সাথে আগ্রা দুর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন, এগুলো নিচু মানুষের কথা। নিম্নে প্রদত্ত পরিস্থিতি একটি গুজবকে পূর্ণাঙ্গ কেলেঙ্কারীতে পরিণত করার ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেব জড়িত থাকার ইঙ্গিত বহন করে। প্রথম থেকেই দারা শিকোহের সাথে আওরঙ্গজেবের সম্পর্ক ভালো ছিলো না এবং জাহানারা দারার সমর্থক ছিলেন। উত্তরাধিকারের যুদ্ধের সময় দুই শাহজাদার সমর্থনে অভিজাত ও দরবারিরা দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে তাঁর সমর্থকদের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিলো। মোল্লারা আওরঙ্গজেবের পক্ষে ছিলেন। মোল্লাদের রায় দ্বারা আওরঙ্গজেব শাহ জাহান এবং জাহানারার ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন।
প্রারম্ভিক সামরিক অভিযান– খুররম অসাধারণ সামরিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। মেওয়ারের রাজপুত রাজাদের বিরুদ্ধে মোগলদের অভিযানের সময় খুররম প্রথম সামরিক দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছিলেন। মেওয়ারের রাজপুত রাজারা আকবরের রাজত্বকাল থেকেই মোগলদের প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ করে আসছিলেন। ১৬১৪ সালে খুররম রাজপুতদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযান শুরু করেছিলেন। উক্ত অভিযানে খুররম ২০,০০০ সেনার নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এক বছরের কঠোর যুদ্ধের পর রাজপুত রাণা অমর সিং শর্তসাপেক্ষে প্রথম মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন এবং মোগলদের ভাসাল(অধীনস্থ) রাজ্যে পরিণত হয়েছিলেন।
সাম্রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্ত সুরক্ষিত এবং উক্ত অঞ্চলের উপর সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করার জন্য ১৬১৭ সালে খুররমকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো। এই অভিযানে খুররম সফল হয়েছিলেন এবং জাহাঙ্গীর তাঁকে শাহ জাহান(বিশ্বের রাজা) উপাধি প্রদান করেছিলেন। তাঁর সামরিক পদমর্যদা উন্নীত করা হয়েছিলো এবং তাঁকে দরবারে একটি বিশেষ সিংহাসনে বসার অনুমতি প্রদান করা হয়েছিলো। এটি একজন শাহজাদার জন্য অভূতপূর্ব সন্মান ছিলো। ফলে ‘ক্রাউন প্রিন্স’ হিসাবে দরবারে তাঁর মর্যদা বৃদ্ধি পেয়েছিলো।
বিদ্রোহী শাহজাদা– মোগল সাম্রাজ্যে পরম্পরাগতভাবে জ্যেষ্ঠপুত্র অনুসারে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা হয়নি। শাহজাদাদের মধ্যে সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বীতার মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করা হতো। ফলে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে প্রায়শই যুদ্ধ সংঘটিত হতো। খুররম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর মোগল রাজদরবারকে ঘিরে এক জটিল রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো। ১৬১১ সালে শাহ জাহানের পিতা জাহাঙ্গীর শের আফগানের বিধবা পত্নী নূর জাহানকে বিয়ে করেছিলেন। নূর জাহান দ্রুত মোগল দরবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁর ভ্রাতৃ আসফ খানের সাথে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। শাহ জাহান আসফ খানের কন্যা আরজুমন্দ বানুকে বিয়ে করেছিলেন। ফলে রাজদরবারে নূর জাহান এবং আসফ খানের গুরুত্ব অধিক বৃদ্ধি পেয়েছিলো।
নূর জাহান ষড়যন্ত্র করে তাঁর প্রথমপক্ষের স্বামী শের শাহ সূরির কন্যা লাডলী রেগমকে শাহ জাহানের কনিষ্ঠ সৎ ভ্রাতা শারিয়ারের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে সিংহাসনের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে দরবার অভ্যন্তরীন বিভাজনের দিকে পরিচালিত হয়েছিলো। শাহজাদা খুররম তাঁর পিতা জাহাঙ্গীরের উপর নূর জাহানের প্রভাবের ফলে বিরক্ত ছিলেন এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নূর জাহান তাঁর জামাতা শাহরিয়ারের হয়ে সম্রাটের নিকট উকালতি করার জন্য ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পার্সিয়ানরা কান্দাহার অবরোধ করার সময় জাহাঙ্গীরের অসুস্থতার জন্য নূর জাহান সাম্রাজ্যের দায়িত্বে ছিলেন। ফলে নূর জাহান খুররমকে কান্দাহার যাত্রা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন; কিন্তু নূর জাহানের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকার জন্য খুররম সেই নির্দেশ প্রত্যাখান করেছিলেন। শাহজাদা খুররম আশঙ্কা করেছিলেন যে, তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে নূর জাহান তাঁর পিতাকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করার চেষ্টা করবেন, নইলে তাঁর জায়গায় শাহরিয়ারকে উত্তরাধিকার হিসাবে প্রক্ষেপ করার জন্য তাঁর পিতাকে প্রভাবিত করবেন। এই ভয় খুররমকে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তাঁর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। শাহজাদা খুররম নূর জাহানের নির্দেশ প্রত্যাখান করার ফলে পার্সিয়ানরা পঁয়তাল্লিশ দিনের অবরোধের পর কান্দাহার দখল করে নিয়ে ছিলেন।
১৬২২ সালে শাহজাদা খুররম তাঁর পিতা এবং সৎ মাতৃ নূরজাহানের বিরুদ্ধে নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ১৬২৩ সালের মার্চ মাসে সংঘটিত বিলোচপুরের যুদ্ধে খুররম পরাস্ত হয়েছিলেন। পরাস্ত হয়ে তিনি মেওয়ারের মহারাণা করণ সিং-দ্বিতীয়ের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তাঁকে প্রথমে দেলওয়াদা কী হাভেলিতে রাখা হয়েছিলো এবং পরে তাঁর অনুরোধে জগমন্দির প্রাসাদে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। খুররম মহারাণার সাথে তাঁর পাগড়ি বিনিময় করেছিলেন এবং পাগড়িটি এখনও উদয়পুরের প্রতাপ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, জগমিন্দর প্রাসাদের মোজাইকের কাজ তাঁকে তাজমহলে মোজাইক ব্যবহার করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। অবশ্যে তাঁর সেই বিদ্রোহ সফল হয়নি। তিনি নিশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৬২৬ সালে খুররমকে তাঁর ভুলের জন্য ক্ষমা করা হলেও, নূর জাহান এবং তাঁর মধ্যে উত্তেজনা তলে তলে বৃদ্ধি পাচ্ছিলেন।
উজির-ই-আজম আসফ খান অনেকদিন ধরেই খুররমের পক্ষে ছিলেন। কারণ খুররম তাঁর কন্যা আরজুমন্দ বানুকে বিয়ে করেছিলেন। এদিকে তাঁর বোন সম্রাজ্ঞী নূর জাহান তাঁর জামাতা শাহরিয়ারকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য পরিকল্পনা করছিলেন। ১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর আসফ খান তাঁর বোন নূর জাহানের পরিকল্পনাকে বানচাল করতে অপ্রত্যাশিতভাবে বলপ্রয়োগ করেছিলেন এবং তাঁকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন। শাহজাদা খুররমের সিংহাসন নিশ্চিত করার জন্য আসফ খান প্রাসাদের ষড়যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। ১৬২৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শাহজাদা খুররম আবু উদ-মুজাফফর শিহাব উদ্দীন মহম্মদ সাহেব আল কুইরান উদ-থানি শাহ জাহান পাদশাহ বা শাহ জাহান উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
শাহ জাহানের রাজত্বের নাম বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত ছিলেন। সিহাব উদ্দীনের অর্থ বিশ্বাসের তারা, সাহেব উদ-কুইরান উদ-থানির অর্থ বৃহস্পতি ও শুক্রের শুভ সংযোগের দ্বিতীয় প্রভু, শাহ জাহানের অর্থ বিশ্বের রাজা। তাঁর নাম তাঁর উচ্চাকাংক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তাঁর অন্যান্য উপাধি তাঁর ধর্মীয় নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় কর্তব্যকে প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন খলিফাত পানাহী (খিলাফতের আশ্রয়স্থল), জিল-ই-আল্লাহী (পৃথিবীতে ঈশ্বরের ছায়া)।
সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর প্রধান কাজ ছিলো প্রতিদ্বন্দ্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা এবং তাঁর সৎ মাতৃ নুর জাহানকে বন্দি করা। শাহ জাহানের নির্দেশে ১৬২৮ সালের ২৩ জানুয়ারি বেশ কয়েকটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো। তাঁদের মধ্যে সৎ ভ্রাতৃ শাহরিয়ারও ছিলেন। তাঁর ভাতিজা দাওয়ার এবং গারশাস্প, খসরুর পুত্র, তাঁর চাচাতো ভাই তাইমুরাস এবং হোশাং, প্রয়াত দানিয়্যাল মির্জার পুত্রও ছিলেন। ফলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় রাজত্ব করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
শাসন– শাহ জাহানের শাসনকাল থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ১৬৪৮ সালে শাহ জাহানের সেনাবাহিনীতে ৯,১১,৪০০ পদাতিক, মাস্কেটিয়ার এবং আর্টিলারি সেনা ছিলো। ১,৮৫,০০০ সোয়ার (ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানো পুলিশ বাহিনী)ছিলো। সোয়ারগুলি রাজপুত্র এবং অভিজাতদের দ্বারা পরিচালিত হতো।
তাঁর প্রাথমিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলিকে তাইমুরিদ রেনেসাঁর এক প্রকার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। শাহ জাহান তাঁর পূর্বপুরুষদের অঞ্চল বলখে অসংখ্য ব্যর্থ সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তাইমুরিদ ঐতিহ্যের সাথে ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক বন্ধন তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন রূপে শাহ জাহান তাইমুরিদের পটভূমিকে সংযোজন করে তাঁর উত্তরাধিকারের উপর কলম চারা করে সংস্থাপন করেছিলেন।
তাঁর রাজত্বকালে মাড়োয়ারি ঘোড়ার প্রচলন ছিলো। ঘোড়াগুলি শাহ জাহানের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিলো। জয়গড় দূর্গে মোগল কামান ব্যাপকভাবে উৎপাদন করা হতো। তাঁর রাজত্বকালে সাম্রাজ্য একটি বিশাল সামরিক যন্ত্রে পরিণত হয়েছিলো। শাহ জাহানের শাসনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে অভিজাত এবং তাঁদের দলগুলি নাগরিকদের নিকট থেকে প্রকৃত নির্ধারিত রাজস্বের চেয়েও চারগুণ রাজস্ব দাবি করতেন। কিন্তু আর্থিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে শাহ জাহানের হস্তক্ষেপের ফলে এটি স্থিতিশীল হয়েছিলো। প্রশাসনকে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিলো এবং আদালতের বিষয়গুলিকে সুশৃংখল করা হয়েছিলো।
তাঁর শাসনামলে মোগল সাম্রাজ্য পরিমিতভাবে সম্প্রসারণ হচ্ছিলো। কারণ তাঁর ছেলেরা বিভিন্ন প্রান্তে বিশাল সৈন্য পরিচালনা করছিলেন। সেই সময়ে ভারত শিল্প, কারুশিল্প এবং স্থাপত্যের সমৃদ্ধ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো এবং বিশ্বের সেরা কিছু স্থপতি, কারিগর, চিত্রশিল্পী এবং লেখক শাহ জাহানের সাম্রাজ্যে বসবাস করতেন। অর্থনীতিবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন-এর মতে, বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদনের (জিডিপি) ভারতের অংশ ছিলো ১৬০০ সালে ২২.২৭ শতাংশ এবং ১৭০০ সালে ২৪.৪ শতাংশ। এই উৎপাদন চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলো। ফরিদাবাদ শহরের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফরিদ শাহ জাহানের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।
দুর্ভিক্ষ– ১৬৩০-৩২ সালে দাক্ষিণাত্য, গুজরাট এবং খানদেশে তিনটি ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিলো। অনাহারে প্রায় দুই মিলিয়ন লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলো। মুদিরা কুকুরের মাংস এবং কুকুরের হাড় গুঁড়ো করে ময়দা মিশ্রিত করে বিক্রী করতেন। পিতা-মাতারা তাঁদের সন্তানদের মাংস খেতো। কিছু কিছু গ্রাম সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। রাস্তাগুলি মানুষের লাশে ভরে গিয়েছিলো। ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিকারকল্পে শাহ জাহান লঙ্গরখানা স্থাপন করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্যের সুলতানদের সাথে সম্পর্ক – ১৬৩২ সালে শাহ জাহান মহারাষ্ট্রের দৌলতাবাদ দুর্গ দখল করেছিলেন। আহমেদনগরের নিজাম শাহী রাজ্যের হোসেন শাহকে বন্দি করেছিলেন। ১৬৩৫ সালে গোলকুণ্ডা এবং ১৬৩৬ সালে বিজাপুর দখল করেছিলেন। শাহ জাহান আওরঙ্গজেবকে দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত করেছিলেন, যার মধ্যে খানদেশ, বেরার, তেলেঙ্গানা এবং দৌলতাবাদ অন্তর্ভূক্ত ছিলো। আওরঙ্গজেব সুবেদার থাকাকালীন বাগলানা জয় করেছিলেন। ১৬৫৬ সালে গোলকুণ্ডা এবং ১৬৫৭ সালে বিজাপুর দখল করেছিলেন।
শিখগুরু হরগোবিন্দের বিদ্রোহ– শিখগুরু অর্জন সিংয়ের পুত্র গুরু হরগোবিন্দের নেতৃত্বে শাহ জাহানের রাজত্ব কালে শিখ বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো ।জাহাঙ্গীর ১৬০৬ সালের ৩০ মে পাঞ্জাবের লাহোরে অর্জন সিংকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। অর্জন সিংয়ের মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে ১৬০৬ সালের ২৫ মে শিখগুরু অর্জন সিং তাঁর পুত্র গুরু হরগোবিন্দকে শিখদের নেতা নির্বাচিত করেছিলেন। ১৬২৭ সালে শাহ জাহানের রাজত্বকালে গুরু হরগোবিন্দের নেতৃত্বে শিখরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো।
গুরু হরগোবিন্দের সেনাবাহিনী অমৃতসর, কর্তারপুর এবং অন্যান্য স্থানে শাহ জাহানের মোগল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো। ১৬৩৪ সালে সংঘটিত অমৃতসরের যুদ্ধে গুরু হরগোবিন্দ বাহিনী মোগল বাহিনীকে পরাস্ত করেছিলো। গুরু হরগোবিন্দ আবার মোগলদের প্রাদেশিক বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু হরগোবিন্দ বাহিনী আক্রমণকারীদের পরাস্ত করে তাঁদের নেতাদের হত্যা করেছিলো। গুরু হরগোবিন্দ বৃহত্তর মোগল বাহিনীর প্রত্যাবর্তনের আশংঙ্কা করে তাঁর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে শিবালিক পাহাড়ে পশ্চাদসরণ করে কিরাতপুরে ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন এবং মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।
শাহ জাহান পাইন্দে খানকে প্রাদেশিক সেনাবাহিনীর নেতা নির্বাচন করে গুরু হরগোবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। ১৬৩৫ সালের ২৫ এপ্রিলে সংঘটিত কর্তারপুরের যুদ্ধে গুরু হরগোবিন্দের বাহিনী জয়লাভ করেছিলেন। তখন শাহ জাহান উত্তরাধিকার বিভাজন করে রাজনৈতিক উপায়ে শিখ ঐতিহ্যকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন। শাহ জাহান কর্তারপুরে বসবাসরত বাবা গুরুদিতার জ্যেষ্ঠপুত্র ধীরমালকে জমি অনুদান দিয়ে তাঁকে গুরু হরগোবিন্দের সঠিক উত্তরাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। ধীরমাল মোগল সাম্রাজ্যের পক্ষে তাঁর বিবৃতি জারি করেছিলেন এবং তাঁর পিতামহের সমালোচনা করেছিলেন। গুরু হরগোবিন্দ ১৬৪৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কিরাতপুরের রূপনগরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে ধীরমালের পরিবর্তে তাঁর ছোট ভ্রাতা গুরু হর রায়কে গুরু হিসাবে মনোনীত করেছিলেন। এই পরম্পরা অনুসরণ করে গুরু হর রায় তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্রের পরিবর্তে তাঁর দ্বিতীয় পুত্রকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেছিলেন।
সাফাভিদদের সাথে সম্পর্ক– ১৬৩৮ সালে শাহ জাহান এবং তাঁর ছেলেরা সাফাভিদদের নিকট থেকে কান্দাহার শহরটি দখল করেছিলেন। পারস্যের শাসক আব্বাস-দ্বিতীয়-এর নেতৃত্বে শহরটি ১৬৪৯ সালে পুনরুদ্ধার করা হয়েছিলো। মোগল-সাফাভিদ যুদ্ধের সময় শহরটি অবরোধ করেছিলো যদিও শাহ জাহান শহরটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হননি। শাহ জাহান পশ্চিমে খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে গজনী এবং কান্দাহার পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক– শাহ জাহানের দ্রুত বাগদাদে শিবির স্থাপন করার সময় অটোম্যান সুলতান মুরাদ-চতুর্থ শাহ জাহানের দূত মীর জারিফ এবং মীর বারাকার সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। মীর জারিফ এবং মীর বারাকা সুলতানকে সূচিকর্ম করা ১০০০ টি কাপড় এবং বর্ম উপহার দিয়েছিলেন। মুরাদ-চতুর্থ তাঁদের সর্বোত্তম অস্ত্র, জীন এবং কাফতান(দীঘল ঢিলা জামা) উপহার দিয়েছিলেন। শাহ মুরাদ চতুর্থ তাঁর সেনা বাহিনীকে বসরা বন্দর পর্যন্ত তাঁদের এগিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখান থেকে মোগলরা ঠাট্টা এবং অবশেষে সুরাটের দিকে যাত্রা করেছিলেন।
পর্তুগীজদের সাথে যুদ্ধ– শাহ জাহান ১৬৩১ সালে হুগলি বন্দর থেকে পর্তুগীজদের বিতাড়িত করার জন্য বাংলার সুবেদার কাশিম খানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। হুগলি বন্দর ভারী কামান, যুদ্ধ জাহাজ, যুদ্ধের অন্যান্য সরঞ্জাম এবং প্রাচীর দিয়ে সজ্জিত ছিলো। অভিজাত মোগলরা পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে মানুষ পাচারের অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন এবং বাণিজ্যিক কারণে মোগল নিয়ন্ত্রিত সপ্তগ্রাম বন্দরটি ধ্বসে পড়ার উপক্রম হয়েছিলো। শাহ জাহান সেই অঞ্চলের জেসুইটসদের কার্যকলাপে অসন্তুষ্ট ছিলেন, বিশেষ করে যখন তাঁদের বিরুদ্ধে কৃষকদের অপহরণ করার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। ১৬৩২ সালের ২৫ সেপ্তেম্বর-এ মোগল বাহিনী রাজকীয় ব্যানার টানিয়ে ছিলেন এবং ব্যাণ্ডেল অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্ৰণ লাভ করেছিলেন। পর্তুগীজ গ্যারিসনদের শাস্তি প্রদান করা হয়েছিলো। ১৬৩৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর-এ শাহ জাহান আগ্রাস্থিত গির্জা ভেঙে ফেলার জন্য ফরমান জারি করেছিলেন। গির্জাটি জেসুইটসদের দখলে ছিলো। তবে সম্রাট জেসুইটসদের গোপনে তাঁদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। সম্রাট জেসুইটসদের ধর্ম প্রচার এবং হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মান্তরিতকরণ নিষিদ্ধ করেছিলেন।
পরবর্তী জীবন এবং মৃত্যু– ১৬৫৮ সালে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন দারা শিকোহ তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হিসাবে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তাঁর ভাইদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিলো। সিংহাসনের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে অবগত হয়ে বাংলার সুবেদার দারা শিকোহের ছোট ভ্রাতা সুজা এবং গুজরাটের সুবেদার মুরাদ বক্স স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং সিংহাসন দাবি করার জন্য আগ্রা অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন। এদিকে শাহ জাহানের তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গঠন করে নিজে সেই বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করে আগ্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি আগ্রার নিকটে দারা শিকোহের মুখামুখি হয়েছিলেন এবং ধর্মাতের যুদ্ধে দারা শিকোহকে পরাজিত করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের হাতে পরাজিত হয়ে দারা শিকোহ আগ্রা থেকে ১৬ কিলোমিটার পূর্বে যমুনা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত সামুগড়ের দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের ছোট অথচ শক্তিশালী বাহিনী চম্বল নদীর ধারে দারা শিকোহের বাহিনীর নিকটে অপেক্ষাকৃত স্বল্প জল বিশিষ্ট একটি অসুরক্ষিত স্থান পেয়ে শিবির নির্মাণ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এদিকে দারা শিকোহ লাল তাঁবু এবং ব্যানার স্থাপন করে শিবিরের পেছনের অংশ রক্ষার জন্য মনোনিবেশ করেন।
দারা শিকোহ জয়গড় দূর্গ থেকে কামান এনে একত্রে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কামানের পেছনে ছিলো সুইভেল বন্দুক দিয়ে সুসজ্জিত জাম্বুরাক(আধুনিক যুগের স্বচালিত কামানগুলির একটি বিশেষ রূপ। কামানগুলি উটের উপর স্থাপন করা হতো এবং গুলি চালানোর জন্য ছোট ছোট সুইভেল বন্দুক থাকতো)-এর অবস্থান। মাস্কেট দিয়ে সুসজ্জিত পদাতিক সেনারা উভয় কামানকে রক্ষা করছিলো। আওরঙ্গজেবও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের অভিজ্ঞ সেনাপতি মীরজুমলা-দ্বিতীয় আকস্মিক আক্রমণের আশ্বাস প্রদান করে সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে কৌশলগতভাবে লুকানো কামানগুলি স্থাপন করেছিলেন।
দারা শিকোহ এবং আওরঙ্গজেব উভয়েই হাতীর পিঠে বসেছিলেন এবং ম্যাচলক দিয়ে সজ্জিত ছিলেন। আওরঙ্গজেব সেনার বাম দিক মুরাদ বক্স এবং অভিজাত মোগল সোয়াবদের দ্বারা পরিচালিত ছিলো। বাকী সেনাগুলি আওরঙ্গজেবের অধীনে ছিলো এবং তাঁর সহকারী সেনাপতি মীরজুমলা-দ্বিতীয়, মুর্শিদ কুলি খান, মীর আতীশ খান(আর্টিলারি প্রধান)দ্বারা পরিচালিত ছিলো। অন্যদিকে দারা শিকোহের বিশাল বাহিনী কয়েক ভাগে বিভক্ত ছিলো। বাহিনীর ডানদিক বুন্দির রাও রাজা ছাত্তার লাল দ্বারা পরিচালিত ছিলো। তাঁর ডানদিক শাহ জাহানের দ্বারা নিযুক্ত রুস্তম খান ডেক্কানি দ্বারা পরিচালিত ছিলো। অভিজাত মোগল সোয়াবদের নেতৃত্বে ছিলেন একজন উজবেক কমাণ্ডার খলিলুল্ল্যাহ খান। দারা শিকোহ তাঁর ছেলে সোলেইমান শিকোহের আগমন অপেক্ষায় ছিলেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে দারা শিকোহ তাঁর কামানগুলিকে আওরঙ্গজেবের সেনা বাহিনীর দিকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পর উভয়ে উভয়ের দিকে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। বৃষ্টির জন্য আর্টিলারির গুলি বর্ষণ কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত রাখতে হয়েছিলো। কামানের গুলি বর্ষণে ক্ষুব্ধ হয়ে মুরাদ বক্স আওরঙ্গজেবের অনুমতি ছাড়াই ছাত্তার লাল দ্বারা পরিচালিত দারা বাহিনীর ডান দিকে আক্রমণ করেছিলেন। মুরাদ বক্সের সোয়াব বাহিনী এবং ছাত্তার লালের রাজপুত যোদ্ধারা একে অপরকে ধ্বংস করার জন্য প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো। খলিলুল্ল্যাহ খান রাজপুত বাহিনীকে সহায় করতে অস্বীকার করে পরিবর্তে তাঁর সেনাবাহিনীকে দারা শিকোহকে রক্ষার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। ছাত্তার লাল পরিচালিত রাজপুত বাহিনীর আসন্ন পতনের ভয়ে রুস্তম খান ডেক্কানি তাঁর বিশাল সোয়াব বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেবের কামানের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁর সোয়াব বাহিনী মুরাদ বক্সকে পেছনের দিক থেকে আক্রমণ করার চেষ্টা চালিয়েছিলো, কিন্তু আওরঙ্গজেবের কামানের জন্য তাঁর সেই প্রচেষ্টা অসফল হয়েছিলো এবং ছাত্তার লালসহ দারা শিকোহের অনেক সোয়াব নিহত হয়েছিলো। মুরাদ বক্সও আহত হয়।
ছাত্তার লাল, রাজপুত পদাতিক বাহিনী এবং তাঁর সোয়াবদের পতন এবং মুরাদ বক্স আহত হওয়ার কথা দারা শিকোহকে অবগত করা হয়েছিলেন। মুরাদ বক্সকে তাড়ানোর জন্য দারা শিকোহ এবং খলিলুল্ল্যাহ খান এগিয়ে গিয়েছিলেন। তখন দারা শিকোহ আওরঙ্গজেবের প্রচণ্ড কামানের ভারী হামলার সন্মুখীন হোন। ফলে সেনা বাহিনীর মধ্যে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যুদ্ধের এই জটিল মুহূর্তে দারা শিকোহ হাতীর পিঠ থেকে নেমে পড়েন। তখন হাতী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়। পলায়নরত হাতী দ্বারা দারা শিকোহের অনেক সেনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দারা শিকোহ হাতীর পিঠ থেকে নেমে যাওয়াটাকে অনেকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ভুল ধারণা করেছিলেন। এই সুযোগে আওরঙ্গজেবের সেনারা বিজয়ের ব্যাণ্ড বাজানো শুরু করে দিয়েছিলো। দারা শিকোহের মৃত্যু হয়েছে ভেবে দারা শিকোহের হাজার হাজার সেনা আওরঙ্গজেবের নিকট আত্মসমর্পণ করে। পরে দারা শিকোহের অনেক সেনা আওরঙ্গজেবের আনুগত্যের শপত নেওয়ার জন্য পালিয়ে গিয়েছিলো।
দারা শিকোহ এবং খলিলুল্ল্যাহ খান সুলেইমান শিকোহের দিকে পালিয়ে যান। তখন আওরঙ্গজেবকে নতুন সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এর পর আওরঙ্গজেব আগ্রার দিকে অগ্রসর হয়ে আগ্রা অবরোধ করেন। আগ্রার জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে শাহ জাহান আওরঙ্গজেবের নিকটে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হোন। তাঁকে আগ্রার দূর্গে বন্দি করে রাখা হয়। পরে খলিলুল্ল্যাহ খান আত্মসমর্পণ করে মনসবদার হিসাবে আওরঙ্গজেবের আনুগত্যের শপত গ্রহণ করেন। অবশেষে দারা শিকোহ এবং সোলেইমান শিকোহ আফগান মালিক জীবন খান কর্তৃক বন্দি হোন এবং তাঁদের আওরঙ্গজেবের নিকট হস্তান্তর করা হয়। পরে দারা শিকোহ এবং সোলেইমান শিকোহকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
শাহ জাহান আগ্রার দুর্গে বন্দিত্ব জীবন যাপন করার সময় তাঁর বড় মেয়ে জাহানারা বেগম পিতার শুশ্রূষার জন্য স্বেচ্ছাকৃভাবে ৮ বছর বন্দিত্ব জীবন যাপন করেছিলেন। ১৬৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে বিছানায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েন। তিনি রাজকীয় আদালতের মহিলাদের বিশেষ করে আকবরবাদী মহলের মহিলাদের জাহানারার যত্ন নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে কলেমা এবং কোরআন তেলওয়াত করতে করতে ৭৪ বছর বয়সে ১৬৬৬ সালের ৩০ জানুয়ারি মৃত্যু বরণ করেন।
মৃত্যুর পরে শাহ জাহানের ধর্মীয় গুরু মহম্মদ কানৌজি এবং আগ্রার কাজি কুরবান দুর্গে আসেন এবং শাহ জাহানের মৃতদেহ একটি হলঘরে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে গোসল করিয়ে কাপড় দিয়ে আবৃত করে চন্দন কাঠের কফিনে রাখা হয় ।
শাহজাদী জাহানারা রাষ্ট্রীয় অন্তেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করেছিলেন। শাহ জাহানের মৃতদেহ বিশিষ্ট অভিজাতদের দ্বারা মিছিল করে বহন করা হয়েছিলো। আগ্রার বিশিষ্ট নাগরিক এবং কর্মকর্তারা দরিদ্রদের জন্য মূদ্রা ছিটিয়ে যাচ্ছিলেন। আওরঙ্গজেব এই ধরণের আড়ম্বর অস্বীকার করছিলেন। মৃতদেহ মিছিল করে তাজমহলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো এবং তাঁকে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের কবরের নিকটে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
স্থাপত্য শিল্পে অবদান– শাহ জাহান মোগল স্থাপত্যের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি নির্মিত সবচেয়ে বিখ্যাত স্মৃতিসৌধটি হলো তাজমহল। স্মৃতিসৌধটি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নির্মাণ করিয়েছিলেন। স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করতে বিশ বছর সময় লেগেছিলো বলে জানা যায়। স্মৃতিসৌধটি ১৭ হেক্টর ভূমির উপরে বিস্তৃত। ৭৩ মিটার উঁচু। মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর ১৬৩২ সালে স্মৃতিসৌধটির নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিলো এবং ১৬৫৩ সালে সমাপ্ত হয়েছিলো। নির্মাণের স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ আহম্মদ লাহৌরি।
কাঠামোটি অতি যত্ন সহকারে অঙ্কন করা হয়েছিলো এবং এই উদ্দেশ্যে সারাবিশ্ব থেকে স্থপতিদের ডাকা হয়েছিলো। স্মৃতিসৌধটি সাদা মার্বল পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো। শাহ জাহানের অন্যান্য নির্মাণের মধ্যে রয়েছে, লাল কেল্লা, আগ্রা ফোর্টের বড় অংশ, জামা মসজিদ, ওয়াজির খান মসজিদ, মতি মসজিদ, শালিমার গার্ডেন, লাহোর ফের্টের কিছু অংশ, পেশোয়ারের মহব্বত খান মসজিদ, পশ্চিম দিল্লীর উত্তম নগরের হস্তশালের মিনি কুতব মিনার, জাহাঙ্গীরের সমাধি প্রভৃতি। জাহাঙ্গীরের স্মৃতিসৌধটি তাঁর সৎ মাতৃ নূর জাহানের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিলো। শাহ জাহান ময়ূর সিংহাসন তখত-ই-তাউসও তৈরি করিয়েছিলেন। শাহ জাহান তাঁর স্থাপত্যের মাস্টারপিসে কোরআনের আয়াতও খোদিত করিয়েছিলেন।
পাকিস্থানের করাসি থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিন্ধ প্রদেশের ঠাট্টার শাহজাহান মসজিদও তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন। মসজিদটি লাল ইট দিয়ে নীল রঙের পালিশ করা টাইলস দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন। টাইলসগুলি সম্ভবত সিন্ধের হালা শহর থেকে আমদানি করা হয়েছিলো। মসজিদটিতে সামগ্রিকভাবে ৯৩ টি গম্বুজ রয়েছে। এটি সম্ভবত এত গম্বুজ বিশিষ্ট বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ। ধ্বনিতত্ত্বকে মাথা রেখে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। গম্বুজের একপ্রান্তে ১০০ ডিসিবলের অধিক শব্দ তরঙ্গে কথা বললে গম্বুজের অন্যপ্রান্তে শুনা যায়। ১৯৩৩ সাল থেকে এটিকে অস্থায়ী ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
সন্তানসকল
জাহানারা বেগম– জন্ম ১৬১৪ সালের ২৩ মার্চ এবং মৃত্যু ১৬৮১ সালের ১৬ সেপ্তেম্বর।
মহম্মদ দারা শিকোহ– জন্ম ১৬১৫ সালের ২০ মার্চ এবং মৃত্যু ১৬৫৯ সালের ৩০ আগস্ট।
শাহ সূজা– জন্ম ১৬১৬ সালের ২৬ জুন। মৃত্যু তারিখ অজ্ঞাত।
রৌশনারা বেগম– জন্ম ১৬১৭ সালের সেপ্তেম্বর এবং মৃত্যু ১৬৭১ সালের ১১ সেপ্তেম্বর।
আওরঙ্গজেব– জন্ম ১৬১৮ সালের ৩ নভেম্বর এবং মৃত্যু ১৭০৭ সালের ৩ মার্চ।পরবৰ্তী ভারত সম্ৰাট।
মহম্মদ মুরাদ বক্স– জন্ম ১৬২৪ সালের ৯ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৬১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর।
গওহর বেগম– জন্ম ১৬৩১ সালের ১৭ জুন এবং মৃত্যু ১৭০৬ সাল।
আহম্মদ বক্স– শৈশবে মৃত্যু।
লুতফুল্ল্যাহ মির্জা– শৈশবে মৃত্যু।
দৌলত আফজা মির্জা– শৈশবে মৃত্যু।
এইসকল সন্তানের সবার মাতৃ মমতাজ মহল ।
অন্যান্য স্ত্রীদের সন্তান–
হামজাহ বানু বেগম– জন্ম ১৬১০ সাল।
পারেজ বানু বেগম– জন্ম ১৬১১ সাল।
হুরুন নিসা বেগম– জন্ম ১৬১৩ সাল।
একজন কন্যাসন্তান– জন্ম ১৬১৫ সাল। মাতৃ রাজপূত রাজকুমারী মানাবতী বাই (লাল সাহিব।)।
জাহান আফরোজ– মাতৃ হাসিনা বেগম।
হোসনারা বেগম– জন্ম ১৬৩০ সাল।
ডাহার আরা বেগম– জন্ম ১৬৩১ সাল।
সুরাইয়া বানু বেগম, পুরুনহার বানু বেগম, নজরআরা বেগম ইত্যাদি। *
আওরঙ্গজেব

মহি-উদ-দীন মহম্মদ আওরঙ্গজেবের জন্ম ১৬১৮ সালের ৩ নভেম্বর-এ গুজরাটের দাহোদে। তাঁর পিতার নাম শাহ জাহান এবং মাতৃর নাম মমতাজ মহল। তিনি শাহ জাহান ও মমতাজ মহলের তৃতীয় সন্তান এবং সামগ্রিকভাবে শাহ জাহানের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন। তিনি ছিলেন ষষ্ঠ মোগল সম্রাট এবং ৪৯ বছর ধরে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে রাজত্ব করেছিলেন। আওরঙ্গজেব ফতোয়া-ই-আলমগীর সংকলন করেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে শরিয়া আইন এবং ইসলামিক অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করা কয়েকজন সম্রাটের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ সামরিক সেনাপতি ছিলেন। তাঁর রাজত্বকাল প্রশংসার বিষয় ছিলো যদিও তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বিতর্কিত শাসক হিসাবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
আওরঙ্গজেব একজন বিশিষ্ট সম্প্রসারণবাদী শাসক ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য সর্ব্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছিলো। তিনি প্রায় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় মোগল সাম্রাজ্য দাক্ষিণাত্য সহ ৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। তিনি আনুমাণিক ১৫৮ মিলিয়ন জনসংখ্যার উপর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে ভারত কিং চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন শক্তিতে পরিণত হয়েছিলো। যার মূল্য বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং সমগ্র পশ্চিম ইউরোপের চেয়েও বেশি ছিলো। আওরঙ্গজেব তাঁর ধর্মীয় গোঁড়ামীর জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছিলেন, হাদিস অধ্যয়ন করতেন এবং ইসলামের আচার-অনুষ্ঠানগুলি কঠোরভাবে পালন করতেন। তিনি কোরআনের প্রতিলিপি প্রস্তুত করতেন। তিনি ইসলামিক ক্যালিওগ্রাফিক কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন ।
সমালোচকদের দ্বারা আওরঙ্গজেবের জীবন এবং বছরের পর বছর ধরে করা রাজত্বকালের একাধিক ব্যাখ্যা একটি খুব জটিল উত্তরাধিকারের দিকে পরিচালিত করেছে। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, আওরঙ্গজেবের নীতি তাঁর পূর্বসূরিদের বহুত্ববাদ এবং ধর্মীয় সহনশীলতার উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করেছিলো। হিন্দু প্রজার উপরে নির্ধারিত জিজিয়া কর এবং ইসলামিক নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে অন্যান্য নীতির প্রবর্তন, হিন্দু মন্দির ধ্বংস, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দারা শিকোহ, মারাঠা রাজা সম্ভাজি এবং গুরু তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতি তাঁর খারাপ কাজ। ইসলামে নিষিদ্ধ আচরণ এবং কার্যকলাপের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, যেমন জুয়া, ব্যাভিচার এবং মদ্য সেবন নিষিদ্ধ করণ প্রভৃতি তাঁর ভালো কাজ। কিছু কিছু ইতিহাসবিদ তাঁর সমালোচকদের দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের মতে, আওরঙ্গজেব মন্দির ধ্বংস করাটাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। তাঁরা এমনও উল্লেখ করেন যে, তিনি ধ্বংসের চেয়ে বেশি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। মন্দির নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ প্রদান করতেন। তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় তিনি মোগল রাজ দরবারে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হিন্দু আমোলা নিয়োগ করেছিলেন। তিনি হিন্দু ও শিয়াদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরোধিতা করেছিলেন।
তাঁর পিতা শাহ জাহানের একটি অসফল বিদ্রোহের পর আট বছর বয়সী আওরঙ্গজেব এবং তাঁর জ্যেষ্ঠা ভ্রাতা দারা শিকোহকে তাঁদের পিতাকে ক্ষমা করার বিনিময়ে তাঁদের পিতামহ জাহাঙ্গীর এবং পিতামহী নূর জাহানের জিম্মি হিসাবে লাহোরের মোগল দরবারে প্রেরণ করা হয়েছিলো। ১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর শাহ জাহান উত্তরাধিকারের যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর আওরঙ্গজেব এবং দারা শিকোহ আগ্রায় শাহ জাহানের সাথে পুনরায় মিলিত হয়েছিলেন।
আওরঙ্গজেব শৈশবে সামরিক কৌশল এবং প্রশাসনিক বিষয়ের মতো বিষয়গুলিকে সংহত করে রাজকীয় শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁর পাঠ্যক্রমে ইসলামিক অধ্যয়ন এবং তুর্কি ও ফার্সি সাহিত্যের মতো পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিষয়গুলি অন্তর্ভূক্ত ছিলো। আওরঙ্গজেব হিন্দীতে সাবলীল ছিলেন।
১৬৩৩ সালের ২৮ মে একটি শক্তিশালী যুদ্ধ-হাতী মোগল ছাউনিতে প্রবেশ করেছিলো। আওরঙ্গজেব তাঁর সাহসিকতার জন্য সেই হাতীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি হাতীর পিঠে চড়েছিলেন এবং একটি অঙ্কুশ দ্বারা হাতীর শুঁড়ে আঘাত করেছিলেন। ফলে তিনি পিষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। তাঁর পিতা শাহ জাহান তাঁর বীরত্বের প্রশংসা করেছিলেন এবং বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এবং তাঁর ওজনে ২,০০,০০০ টাকা মূল্যের সোনা উপহার দিয়েছিলেন। উপহার প্রদান অনুষ্ঠানটি ফার্সি এবং উর্দূ শ্লোকে উদযাপন করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব সেই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, যদি হাতীর সাথে আমার লড়াইটি মারাত্মকভাবে শেষ হতো, তাহলে লজ্জার বিষয় হতো না। মৃত্যু এমনকী সম্রাটের উপরেও পর্দা ফেলে দেয়, এটা কোন অসন্মান না। আমার ভ্রাতারা কি করলো সেটা ছিলো লজ্জার বিষয়।
বুন্দেলখণ্ড অভিযান– বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের ওছার শাসক বুন্দেলা রাজপুত বীর সিং দেও-এর মোগলদের অনুগত রাজা ছিলেন। ১৬২৬ সালে ঝুঝার সিং তাঁর পিতা বীর সিং দেওয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর পিতার মতো মোগলদের অনুগত হয়ে না থাকার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে স্বাধীনতা দাবি করার চেষ্টা করেছিলেন। ১৬৩৫ সালে আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে একদল সেনা ওর্ছা অবরোধ করেছিলেন এবং ঝুঝার সিংকে পরাস্ত করে শাসন থেকে অপসারণ করেছিলেন।
সামরিক অভিযান– আওরঙ্গজেবকে ১৬৩৬ সালে দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত করা হয়েছিলো। নিজাম শাহী বালক মুর্তজা নিজাম শাহ-তৃতীয় মারাঠা নেতা শাহজি রাজের কর্তৃত্বের অধীনে ১৬৩৫ সালে আহমেদনগরের নামমাত্র শাসক হয়েছিলেন। শাহ জাহানের নির্দেশে সর্দার রনোজি ওয়াবল আহম্মদ নগর আক্রমণ করে ফতেহ খান এবং হোসেন নিজামশাহ-তৃতীয় এবং তাঁর আত্মীয়দের পাশাপাশি দুই গর্ভবতী মহিলাকে হত্যা করেছিলেন, যাতে ভবিষ্যত কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী জন্ম না হয়। কিন্তু বিজাপুরের সহায়তায় সাহজি ভোসলে নিজামশাহী রাজবংশের একজন শিশু বংশধর মোর্তজাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। নিজাম শাহী পরিবার এবং শাহজি ভোসলে মাহুলি দূর্গে অবস্থান নিয়েছিলেন। শাহ জাহান বিজাপুরের মহম্মদ আদিল শাহ এবং সংশ্লিষ্ট মোগল ও আদিলশাহী সেনাপতির সাথে একটি জোটবন্ধন করে মাহুলি দুর্গ অবরোধ করেন এবং নিজাশাহী রাজবংশের অবসান ঘটান।
১৬৩৭ সালে আওরঙ্গজেব সাফাভিদ শাহজাদী দিলরাস বানু বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হোন। দিলরাস বানু বেগম মরণোত্তরভাবে রাবিয়া-উদ-দৌরানি নামে পরিচিত হয়েছিলেন। দিলরাস বানু বেগম আওরঙ্গজেবের প্রথম স্ত্রী এবং প্রধান সহধর্মিণী ছিলেন। আওরঙ্গজেব ক্রীতদাসী হীরা বাইর প্রতিও অনুরুক্ত ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে তিনি উপপত্নী উদিপুরী বাইয়ের প্রতিও অনুরুক্ত হয়েছিলেন। উদিপুরী বাই পূর্বে দারা শিকোহের সঙ্গী ছিলেন।
শাহ জাহান ১৬৩৭ সালে আওরঙ্গজেবকে ছোট রাজপুত রাজ্য বাগলানা দখল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব অনায়াসেই রাজ্যটি দখল করেছিলেন।
১৬৪৪ সালে আওরঙ্গজেবের বড় বোন জাহানারা আগ্রায় পারফিউমের রাসায়নিকের নিকটে রাখা একটি বাতিতে আগুন লেগে পুড়ে গিয়েছিলেন। ঘটনাটি একটি পারিবারিক রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছিলো। জাহানারার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করতে হাজার হাজার অনুগত রাজা আগ্রায় এসেছিলেন। তবে, আওরঙ্গজেব অবিলম্বে আগ্রায় না এসে, তিনি সপ্তাহ পরে সামরিক পোশাকে অভ্যন্তরীন প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন। যারজন্য শাহ জাহান আওরঙ্গজেবের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবেকে সুবেদার পদ থেকে অপসারণ এবং তাঁকে লাল তাঁবু ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো। এমনকী সরকারী সামরিক মানদণ্ড থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিলো। অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, আওরঙ্গজেব সকল প্রকার বিলাসিতা ত্যাগ করে ফকিরী গ্রহণ করেছিলেন, যারজন্য তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিলো।
১৬৪৫ সালে আওরঙ্গজেব একজন সহকর্মী মোগল সেনাপতির নিকট মনের দুঃখ প্রকাশ করার জন্য সাত মাসের জন্য দরবার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো। পরে তাঁকে গুজরাটের সুবেদার নিযুক্ত করা হয়েছিলো। গুজরাটে তাঁর শাসন ধর্মীয় বিবাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলো। তবে গুজরাটে স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁকে পুরস্কৃতও করা হয়েছিলো।
মুরাদ বক্স বলখের শাসক ছিলেন, তবে তিনি সেখানে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছিলেন। ফলে শাহ জাহান ১৬৪৭ সালে আওরঙ্গজেবকে গুজরাটের সুবেদার পদ থেকে সরিয়ে বলখের সুবেদার নিযুক্ত করেছিলেন। অঞ্চলটি উজবেক এবং তুর্কমেন উপজাতির আক্রমণের মুখে ছিলো। সেখানে আর্টিলারি এবং মাস্কেট সুসজ্জিত একটি শক্তিশালী মোগল বাহিনী। ছিলো। তাঁদের প্রতিপক্ষের সাথে সংঘর্ষ করার দক্ষতাও ছিলো। তবে তাঁরা অচলাবস্থায় ছিলেন। আওরঙ্গজেব লক্ষ্য করেছিলেন যে, যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভূমিতে শীতের জন্য সেনারা তাঁদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করতে অক্ষম। শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে তাঁকে এবং তাঁর পিতাকে উজবেকদের সাথে একটি অসন্তোষজনক চুক্তি সম্পাদন করতে হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব মোগল সার্বভৌমত্বের অধীনে অনুগত শাসক নিযুক্ত করে এলাকাটি উজবেকদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবুও মোগল বাহিনী, উজবেক এবং অন্যান্য উপজাতিদের আক্রমণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন। ফলে আওরঙ্গজেব তুষারপাতের মধ্য দিয়ে কাবুল ফিরে এসেছিলেন। দুই বছরের অভিযানে সামান্য লাভের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিলো।
অপ্রীতিকর সামরিক অভিযানের পর আওরঙ্গজেব মুলতান এবং সিন্ধের শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এক দশক মোগল নিয়ন্ত্রণে থাকার পরে সাফাভিদরা কান্দাহার পুনরুদ্ধার করেছিলেন। ১৬৪৯ এবং ১৬৫২ সালে সাফাভিদদের নিকট থেকে কান্দাহার পুনরুদ্ধার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিলো। তবে শীত ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে উভয় প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিলো। সাম্রাজ্যের শেষপ্রান্তে সেনাবাহিনী সরবরাহের সমস্যা, নিম্নমানের অস্ত্র-শস্ত্র এবং বিরোধীদের অস্থিরতাকে জন রিচার্ডসন ব্যর্থতার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। এর পরে দারা শিকোহ আবার কান্দাহার পুনরুদ্ধারের জন্য চেষ্টা করছিলেন, তবে তিনিও ব্যর্থ হয়েছিলেন।
কান্দাহার পুনরুদ্ধারের জন্য দারা শিকোহ আওরঙ্গজেবের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর তিনি আবার দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত হয়েছিলেন। দারা শিকোহ তাঁর নিজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য পরিস্থিতি পরিচালনা করেছিলেন বলে আওরঙ্গজেব সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের শাসনভার গ্রহণ করার পর দু’টি জায়গির সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। তুলনামূলকভাবে দরিদ্র অঞ্চল হওয়ার জন্য তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। অঞ্চলটি এতই দরিদ্র ছিলো যে, প্রশাসন বজায় রাখার জন্য মালওয়া এবং গুজরাট থেকে অনুদান আনার প্রয়োজন হতো। যারজন্য পিতা ও পুত্রের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করেছিলো। শাহ জাহান জোর দিয়েছিলেন যে, আওরঙ্গজেব যদি চাষাবাদের বিকাশের জন্য চেষ্টা করেন, তাহলে পরিস্থিতি উন্নত করা যেতে পারে! উত্তর ভারতে প্রচলিত জাবত (জাবত ব্যবস্থায় ১০ বছরের শস্যের মূল্যে জরিপ করে রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো) রাজস্ব ব্যবস্থাকে দাণিক্ষণাত্য পর্যন্ত প্রসারিত করার জন্য আওরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খানকে নিযুক্ত করেছিলেন। মুর্শিদকুলি খান কৃষিভূমি জরিপ করে উৎপাদনের উপর কর নির্ধারণের ব্যবস্থা করেছিলেন। রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য মুর্শিদকুলি খান বীজ, পশুসম্পদ এবং সেঁচের জন্য অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে দাক্ষিণাত্যে সমৃদ্ধি ফিরে এসেছিলো।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ–শাহ জাহানের চার পুত্র তাঁদের পিতার রাজত্বকালে বিভিন্ন এলেকায় সুবেদার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তবে, শাহ জাহান পরবর্তী সম্রাট হিসাবে জ্যেষ্ঠপুত্র দারা শিকোহকে সমর্থন করতেন। ফলে ছোট তিনি পুত্রের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিলো। যারজন্য তাঁরা বিভিন্ন সময়ে দারা শিকোহের বিরুদ্ধে নিজেদের মধ্যে জোট গঠনের চেষ্টা করছিলেন। মোগলদের মধ্যে পরম্পরাগতভাবে জ্যেষ্ঠপুত্র সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার ঐতিহ্য ছিলো না। ফলে ছেলেরা পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে অথবা ভ্রাতৃদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরম্পরা চালু হয়েছিলো। যদিও চার ভ্রাতার মধ্যে সবাই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, দরবারি এবং অভিজাতদের সমর্থনের ভিত্তিতে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতাটি মূলতঃ আওরঙ্গজেব এবং দারা শিকোহের মধ্যে ছিলো। এই দুই ভ্রাতার মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিলো। দারা ছিলেন সম্রাট আকবরের ছাঁচে গড়া একজন বুদ্ধিজীবী এবং উদারপন্থী। অপরদিকে আওরঙ্গজেব ছিলেন ধর্মীয়ভাবে অনেক বেশি রক্ষণশীল। ইতিহাসবিদ বারবারা ডি, মেটকাফ এবং টমাস আর মেটকাফ বলেছেন, বিচ্ছিন্ন দর্শনের উপর আলোকপাত করা এই সত্যটিকে উপেক্ষা করে যে, দারা শিকোহ একজন দরিদ্র সেনাপতি এবং নেতা ছিলেন। এই সত্যটিকেও উপেক্ষা করে যে, উত্তরাধিকারের বিরোধে উপদলগুলি মতাদর্শের দ্বারা পরিচালিত ছিলেন না। প্রফেসর মার্ক গাব রিউ ব্যাখ্যা করেন যে, দরবারি এবং তাঁদের অনুগত সশস্ত্র দলগুলি তাঁদের নিজস্ব স্বার্থ, পারিবারিক সম্পর্কের ঘনিষ্টতা এবং সর্বোপরি মতাদর্শগত বিভাজনের চেয়ে ভানকারীর চমৎকারীত্বের দ্বারা বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। হিন্দু এবং মুসলমানরা তাঁদের সমর্থনে ধর্মীয় লাইনে বিভক্ত ছিলেন না। তাঁদের সমর্থনে পরিবার বিভক্ত ছিলেন। জাহানারা অনেক সময় শাহজাদাদের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে মধ্যস্থতা করতেন এবং দারার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করতেন। তবুও আওরঙ্গজেব জাহানারাকে সন্মান করতেন।
১৬৫৭ সালে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে, তিনি দারা শিকোহকে উত্তরাধিকার করতে চান বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন এবং নবনির্মিত শহর শাহজাহানাবাদে (পুরানা দিল্লী) দারা শিকোহের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। শাহ জাহানের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছোট ছেলেরা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন যে, দারা শিকোহ হয়তো ম্যাকিয়াভেলিয়ান (ফন্দি করে)কারণে পিতার মৃত্যু সংবাদ লুকিয়ে রেখেছেন। ১৬৩৭ সাল থেকে শাহ সুজা বাংলার শাসক ছিলেন। শাহ সুজা রাজমহলে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে অশ্বারোহী এবং কামান নিয়ে আগ্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। বারাণসীর কাছে তাঁর বাহিনী দারা শিকোহ দিল্লী থেকে প্রেরণ করা প্রতিরক্ষামূলক বাহিনীর সন্মুখীন হয়েছিলো। প্রতিরক্ষামূলক বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন দারা শিকোহের পুত্র সোলেইমান শিকোহ এবং রাজা জয়সিং।
মুরাদ তখন গুজরাটের শাসক ছিলেন এবং তিনিও একই কাজ করেছিলেন। দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবও একই কাজ করেছিলেন। এই সিদ্ধান্তগুলি শাহ জাহানের মৃত্যুর সংবাদ সত্য ভেবে নিয়েছিলেন, না পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন তা স্পষ্ট নয় ৷
স্বাস্থ্য কিছু উন্নত হওয়াতে শাহ জাহান আগ্রায় চলে যান এবং দারা শিকোহ তাঁকে শাহ সুজা এবং মুরাদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণের জন্য আহ্বান জানান। দারা শিকোহের পরামর্শে শাহ জাহান শাহ সুজা এবং মুরাদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করেন। শাহ সুজা বারাণসীর কাছে সোলেইমান শিকোহ এবং জয়সিংয়ের কাছে পরাজিত হোন। তখন পরাজিত শাহ সুজাকে বিহারের মধ্য দিয়ে ধাওয়া করা হয়। অপর দিকে মুরাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করা বাহিনী দেখেন যে, সাম্রাজ্য দখল করার পর দুই ভ্রাতৃর মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মুরাদ এবং আওরঙ্গজেব ইতিমধ্যে জোটবন্ধন করেছেন।
১৬৫৮ সালের এপ্রিল মাসে ধর্মাত নামক স্থানে দুই বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং সেই সংঘর্ষে আওরঙ্গজেব বিজয়ী হোন। দারা শিকোহের দুর্বল সিদ্ধান্তের ফলে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। কারণ একদিকে ছিলো পরাজিত শত্রু এবং অপরদিকে ছিলো দখলদার একটি শক্তিশালী বাহিনী। সাহসী আওরঙ্গজেবের অগ্রগতিকে প্রতিহত করার জন্য শাহ সুজার পেছনে ধাওয়া করা বিহারের সেনাবাহিনী সময় মতো আগ্রায় পৌঁছোবে না ভেবে দারা শিকোহ জোটবন্ধনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তবে তিনি দেখতে পান যে, আওরঙ্গজেব ইতিমধ্যেই মূল সাম্ভাব্য শক্তির সাথে জোটবন্ধন করেছেন। ১৬৫৮ সালের ২৯ মে সংঘটিত সামুগড়ের যুদ্ধে আওরঙ্গজেব বাহিনীর নিকট দারা বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হোন। (সামুগড়ের যুদ্ধের বর্ণনা এই গ্রন্থের সম্রাট শাহ জাহানের অধ্যায়ে দেওয়া হয়েছে।)
দারা শিকোহকে পরাস্ত করার পর আওরঙ্গজেবকে নতুন সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করা হয় এবং আওরঙ্গজেব আগ্রার দিকে অগ্রসর হয়ে আগ্রা অবরোধ করেন। আগ্রার জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে শাহ জাহান আওরঙ্গজেবের নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হোন। তাঁকে আগ্রার দূর্গে বন্দি করে রাখা হয়।
দারা শিকোহকে পরাস্ত করার পর আওরঙ্গজেব মুরাদ বক্সের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গোয়ালিয়র দূর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। কিছুকাল পূর্বে গুজরাটের দেওয়ানকে হত্যা করার অভিযোগে ১৬৬১ সালের ৪ ডিসেম্বর মুরাদ বক্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো।
সামুগড়ের যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে দারা শিকোহ পাঞ্জাবে পালিয়ে যান। এদিকে সুজার বিরুদ্ধে প্রেরণ করা সেনাবাহিনী পূর্ব দিকে আটকা পড়ে যায়। সেনাপতি জয় সিং এবং দিল্লীর খান আওরঙ্গজেবের নিকটে আত্মসমর্পণ করেন এবং দারার পুত্র সোলেইমান শিকোহ পালিয়ে যান। শাহ সুজাকে দারা শিকোহ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে আওরঙ্গজেব তাঁকে বাংলার গভর্নর পদের প্রস্তাব দেন। তবে আওরঙ্গজেবের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে শাহ সুজা বাংলায় নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে নতুন নতুন অঞ্চল দখল করা শুরু করেছিলেন। ফলে আওরঙ্গজেব দারা শিকোহের পশ্চাধাবন করার পরিবর্তে বৃহৎ সেনাবাহিনী নিয়ে শাহ সুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।
১৬৫৯ সালের ৫ জানুয়ারি খাজওয়া নামক স্থানে আওরঙ্গজেব বাহিনী এবং শাহ সুজা বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। খাজওয়া ফতেহপুর চিক্রী থেকে ৩০ মাইল পূর্ব দিকে গঙ্গা এবং যমুনা নদীর মধ্যবর্তী একটি স্থানে অবস্থিত। স্থানটি শাহ সুজার হাতীর জন্য আদর্শ স্থান ছিলো। শাহ সুজা তাঁর কামানের জন্য ইউরোপীয় বন্দুকধারীদের নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর বাহিনীতে ছিলো ২৫,০০০ সেনা। এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাঁর পুত্র বুলন্দ আখতার, সুলতান বাং এবং জয়নুল আবেদিন। শাহ সুজার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিলো তাঁর ১০,০০০ যুদ্ধ হাতী। এর মধ্যে তিনটি অভিজাত যুদ্ধ হাতী ছিলো এবং ১১০ জন অশ্বারোহী সেনা।
অপর দিকে আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে ছিলো ৯০,০০০ সেনা। ১২০ জন অশ্বারোহী এবং ৮,০০০ যুদ্ধ হাতী। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মীরজুমলা-দ্বিতীয়। ইসলাম খানকে অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব তাঁর বাহিনীকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। সামনের দিকে একটি দল রেখেছিলেন এবং কিলিচ খান বাহাদুর এবং শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে পেছনের দিকে একটি সংরক্ষিত বাহিনী রেখেছিলেন।
শাহ সুজা তাঁর হাতী ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত উভয় বাহিনী একে অপরের দিকে কামানের গুলি বর্ষণ করছিলেন। প্রশিক্ষিত বন্দুকধারীরা যুদ্ধ হাতীর আক্রমণকে শক্তিশালী করবে ভেবে শাহ সুজা তাঁর যুদ্ধ হাতীগুলি একসাথে ছেড়ে দেওয়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন আওরঙ্গজেব তাঁর বাহিনীর সামনের অংশটিকে সামান্য পেছনের দিকে সড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে দুর পাল্লার কামানগুলোকে গুলি চালোনোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর ম্যাচলক বাহিনীকে সামনের দিকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুদ্ধ হাতীর গতিরোধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ঠিক তখনই আওরঙ্গজেব বাহিনী এবং শাহ সুজার হাতীর সংঘর্ষ শুরু হয়েছিলো। শাহ সুজা তাঁর ছেলে বুলন্দ আখতারকে তাঁর সোয়াব বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেবের সেনার উপরে আক্রমণ সংঘটিত করার নির্দেশ দেন। তিনটি অভিজাত যুদ্ধ হাতী বুলন্দ আখতারের আক্রমণকে সহায় করছিলো। এই আক্রমণ অত্যন্ত সফল ছিলো। বুলন্দ আখতারের নেতৃত্বে অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণের ফলে আওরঙ্গজেব বাহিনী একেবারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। ঠিক তখনই আওরঙ্গজেবের অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি ইসলাম খান একটি কামানের গোলায় নিহত হোন।
আওরঙ্গজেব বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি যুদ্ধ প্রায় হেরে গেছেন। তখন তিনি কিলিচ খান বাহাদুর এবং শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে পেছনে থাকা সংরক্ষিত বাহিনীকে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ করার নির্দেশ দেন। কিলিচ খান বাহাদুর এবং শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে ম্যাচলক এবং পদাতিক বাহিনী শাহ সুজার তাণ্ডবধর্মী যুদ্ধ হাতী হত্যা করে। মীরজুমলা-দ্বিতীয় তখন যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত শাহ সুজার আর্টিলারি বাহিনীকে আক্রমণ করেন।
কিলিচ খান বাহাদুর এবং মীরজুমলার বাহিনী যত এগিয়ে যেতে থাকে আওরঙ্গজেবের কামান এবং সংরক্ষিত বাহিনীও ততই এগিয়ে যেতে থাকে। বুলন্দ আখতারের ক্লান্ত এবং বিক্ষিপ্ত বাহিনী তখন পিছিয়ে গিয়ে শাহ সুজার কামানের চারপাশে সংগঠিত হতে থাকে। ফলে আওরঙ্গজেবর নিকটবর্তী শাহ সুজার পদাতিক বাহিনীতে ফাঁক সৃষ্টি হয়। আওরঙ্গজেব নিজেই তখন কামানগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং শাহ সুজা বাহিনীর কেন্দ্রে গুলি বর্ষণ করতে থাকেন। ফলে প্রতিপক্ষ বাহিনীর মধ্যে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
আওরঙ্গজেবের সংরক্ষিত বাহিনী, সোয়াব বাহিনী এবং যুদ্ধ হাতী তখন এগিয়ে গিয়ে শাহ সুজার ছাউনি দখল করতে শুরু করে। শাহ সুজা তখন ইউরোপীয় বন্দুকধারীদের পশ্চাদসরণ করার নির্দেশ দেন। আওরঙ্গজেবের জাম্বুরাক বাহিনী এবং কিলিচ খান নেতৃত্বে সিপাহিরা তখন তাঁদের ঘিরে ফেলে। ফলে তাঁরা আত্মসমর্পণের আয়োজন করে। শাহ সুজা নিজেও হাওদা থেকে নেমে তাঁর ছোট ভ্রাতা আওরঙ্গজেবের কাছে হেরে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যান।
আওরঙ্গজেব তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি মীরজুমলাকে শাহ সুজার পশ্চাদসরণ করার নির্দেশ দেন। শাহ সুজা তখন আরাকানে পালিয়ে যান। সেখানে স্থানীয় শাসক কর্তৃক তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব শাহ সুজার স্থলে শায়েস্তা খানকে বাংলার নবাব হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন।
শাহ সুজা এবং মুরাদের বিষয় নিষ্পত্তি করার পর আওরঙ্গজেব উত্তর পশ্চিম সীমান্ত জুড়ে দারা শিকোহকে তাড়া করেন। আওরঙ্গজেব দাবি করেছিলেন যে, দারা শিকোহ মুসলিম নন। তাঁর বিরুদ্ধে মোগল উজির-এ-আজম সাদুল্ল্যাহ খানের বিরুদ্ধে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছিলো।
সামুগড়ের যুদ্ধে পরাজয়ের পর দারা শিকোহ প্রথমে আগ্রা থেকে দিল্লী এবং দিল্লী থেকে লাহোরে পিছু হটে গিয়েছিলেন। তাঁর গন্তব্যস্থল ছিলো মুলতান এবং তারপর ঠাট্টা(সিন্ধু)। সিন্ধু থেকে তিনি কচ্ছরণ পেরিয়ে কাথিওয়ারে পৌঁছেছিলেন। সেখানে তিনি গুজরাট প্রদেশের শাসক শাহ নওয়াজ খানের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। শাহ নওয়াজ খান তাঁকে অর্থ দিয়ে সেনাবাহিনী গঠন করতে সহায় করেছিলেন। দারা শিকোহ সুরাট দখল করে আজমীরের দিকে অগ্রসর হোন। তিনি মারোয়ারের মহারাজা যশবন্ত সিংয়ের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আওরঙ্গজেব দ্বারা প্রেরিত অনুগমীদের বিরুদ্ধে নিরলস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৬৫৯ সালের ১১ ই মার্চ আজমীরের নিকটে অবস্থিত দেওরাইর যুদ্ধে তিনি পরাজিত হোন। পরাজয়ের পর তিনি সিন্ধে পালিয়ে গিয়ে আফগান সেনাপতি মালিক জীবন(জুনায়েদ খান বারোজাই)-এর নিকটে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মালিক জীবনের জীবন তিনি একাধিকবার সম্রাট শাহ জাহানের ক্রোধ থেকে রক্ষা করেছিলেন। যাইহোক, মালিক জীবন তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বন্দি করে তাঁকে এবং তাঁর দ্বিতীয় পুত্র সিপিহর শিকোহকে ১৬৫৯ সালের ১০ জুন আওরঙ্গজেবের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন।
দারা শিকোহকে একটি নোংড়া হাতীর পিঠে বসিয়ে দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং শৃংখলে বেঁধে দিল্লীর রাস্তায় সমদল করা হয়েছিলো। ১৬৫৯ সালের ৩০ আগস্ট আওরঙ্গজেবের চারজন দোসর তাঁকে তাঁর ভীত ছেলের সামনে হত্যা করেছিলো। মৃত্যুর পর দারা শিকোহের দেহাবশেষ দিল্লীতে হুমায়ূনের সমাধির পাশে একটি অজ্ঞাত কবরে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ অফ ইণ্ডিয়ার মাধ্যমে হুমায়ূনের সমাধির ভেতরে ১২০ টি কক্ষে ১৪০ টি কবর থেকে দারা শিকোহের সমাধিস্থল খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কাজটি কঠিন বলে বিবেচিত হয়েছিলো, কারণ কবরগুলি চিনাক্ত করার জন্য কোনো শিলালিপি ছিলো না ।
নিকুলাও মানুচ্চি(ভারত ভ্রমণকারী এবং মোগল দরবারে কর্মরত ছিলেন)দারা শিকোহের মৃত্যুর বিবরণ লিখেছেন। তাঁর মতে, দারা শিকোহকে হত্যা করার পর তাঁর দেহ বিচ্ছিন্ন মুণ্ড আওরঙ্গজেবের নিকট নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। আসলেই দারার মুণ্ড কিনা আওরঙ্গজেব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরীক্ষণ করেছিলেন। তারপর তিনি তরবারি দিয়ে মাথাটি তিনবার বিকৃত করেছিলেন। এরপর মাথাটি একটি বাক্সে ভরে অসুস্থ পিতা শাহ জাহানের নিকটে প্রেরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বৃদ্ধ পিতা রাতে খাবারের জন্য বসার সময় মুণ্ডুটি প্রেরণ করার স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্দেশ অনুসারেই রাতে খাবারে বসার সময় মুন্ডটি প্রেরণ করা হয়েছিলো। বাক্সে কি আছে, না জেনে শাহ জাহান খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ যে, আমার ছেলে এখনও আমাকে মনে রেখেছে। আসলে বাক্সে দারা শিকোহের কাটামুন্ড ছিলো।
আমলাতন্ত্র– আওরঙ্গজেব তাঁর আমলাতন্ত্রে পূর্বসূরিদের তুলনায় অধিক হিন্দু আমলা নিয়োগ করেছিলেন। ১৬৭৯ সাল থেকে ১৭০৭ সালের মধ্যে মোগল প্রশাসনে হিন্দু কর্মকর্তাদের সংখ্যা অর্ধেক বেড়ে গিয়েছিলো। হিন্দু আমলার সংখ্যা মোগল অভিজাত আমলাদের ৩১.৬ শতাংশ ছিলো। এই সংখ্যা মোগল যুগে সর্বোচ্চ ছিলো। তাঁদের মধ্যে অনেক মারাঠা এবং রাজপুত ছিলো। যারা তাঁর রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন। আওরঙ্গজেব উচ্চপদস্থ হিন্দু কর্মকর্তাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করতেন।
ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা– আওরঙ্গজেব একজন গোঁড়া মুসলিম শাসক ছিলেন। তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের নীতি অনুসরণ করে ইসলামকে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা তাঁকে বিরোধী শক্তির সাথে সংঘর্ষের পথে ঠেলে দিয়েছিলো।
ইতিহাসবিদ ক্যাথারিন ব্রাউন উল্লেখ করেছেন যে, ঐতিহাসিকরা আওরঙ্গজেবের নামটি রাজনৈতিক-ধর্মীয় গোঁড়ামী এবং দমন-পীড়নের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। বিষয়টি আধুনিক সময়েও বামিয়ান (ষষ্ঠ শতাব্দীর বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ) বৌদ্ধদের সালসাল এবং শাহমামা তিনি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। সিংহাসনে আরোহণের পর আওরঙ্গজেব তাঁর পূর্বসূরিদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী অনুসরণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শাহ জাহান ইতিমধ্যেই আকবরের উদারপন্থা থেকে দূরে সরে এসেছিলেন, আওরঙ্গজেব এই পরিবর্তনকে আরও এগিয়ে নিয়েছিলেন। জাওবিয়াত বা ধর্মনিরপেক্ষ ডিক্রি শরিয়া আইনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এই ভয়ে আওরঙ্গজেব শরিয়া আইনের উপর বেশি জোর দিয়েছিলেন, ফলে হিন্দুদের সাথে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব তাঁর পিতা এবং ভ্রাতৃদের বিরুদ্ধে করা কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেকে ‘শরিয়ার রক্ষক’ হিসাবে উপস্থাপন করার জন্য রাজনৈতিক প্রয়োজনে কাজির দ্বারা রাজমুকুট পরানোর প্রয়োজন হয়েছিলো। তবে ১৬৫৯ সালে প্রধান কাজি তা অস্বীকার করেছিলেন। ঐতিহাসিক ক্যাথরিন ব্রাউন যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আওরঙ্গজেব কখনো সঙ্গীতের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। তিনি কয়েকশ আইনবিদের কাজ দ্বারা হানাফি আইনকে সংহিতাবদ্ধ করে ‘ফতোয়া-ই-আলমগীর’ নামে আইন সংহিতা প্রণয়নের চেষ্টা করেছিলেন।
আওরঙ্গজেব অবগত হয়েছিলেন যে, মুলতান, ঠাট্টা এবং বিশেষ করে বারাণসীতে হিন্দু ব্রাহ্মণের শিক্ষা অনেক মুসলমানকে আকৃষ্ট করেছে। তিনি এই প্রদেশের সুবেদারদেরকে অমুসলিমদের স্কুল ও মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অমুসলিমদের মতো পোশাক পরা মুসলমানদের শাস্তি প্রদানের জন্যও সুবেদারদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সমাজ বিরোধী সুফি রহস্যবাদী সারমাদ কাশানী এবং গুরু তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতির সাক্ষ্য বহন করে। প্রথমজনকে ধর্মদ্রোহিতার একাধিক কারণে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো এবং শিখদের মতে, দ্বিতীয়জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের বিষয়ে আপত্তির জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিলো। অনাইসলামিক আচার-আচরণের সাথে জড়িত থাকার জন্য জরাথ্রুস্টীয়দের নওরোজ উৎসব নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তকরণের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে মুসলিম উপদলের বিরুদ্ধে নিপীড়নের ঘটনাও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
করনীতি– ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই আওরঙ্গজেব প্রজাদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এমন ৮০ টিরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী কর মওকুফ করেছিলেন। ১৭৭৯ সালে আওরঙ্গজেব সামরিক চাকরি না করার পরিবর্তে অমুসলিম প্রজাদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করেছিলেন। অনেক হিন্দু শাসক, আওরঙ্গজেবের পরিবারের সদস্য এবং মোগল দরবারের কর্মকর্তাদের দ্বারা বিষয়টি সমালোচিত হয়েছিলো।
আওরঙ্গজেব অঞ্চল বিশেষে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সাথে নির্ধারিত পরিমাণের কর হ্রাস এবং মওকুফের ব্যবস্থা করছিলেন। দুর্যোগ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের কর মওকুফ করা হতো। এছাড়াও ব্রাহ্মণ, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, বেকার, অসুস্থ এবং উন্মাদদের কর চিরতরে মওকুফ করে দিয়েছিলেন। যারা কর সংগ্রহ করতেন তাঁদের মুসলমান হতে বাধ্য করা হয়েছিলো।
আওরঙ্গজেব হিন্দু বণিকদের উপর ৫ শতাংশ এবং মুসলিমদের উপর ২.৫ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের এই করনীতি যথেষ্ট অপসন্দের ছিলো। মার্ক জেসন গিলবার্টের মতে, একজন অমুসলিম কর আদায়কারীর সামনে কোরআনের আয়াত আবৃত্তি করতে হতো, যা অমুসলমানদের জন্য অবমাননাকর ছিলো। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনসাধারণের পাশাপাশি হিন্দু আমলারা প্রতিবাদ সাব্যস্ত করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটানোর জন্য আওরঙ্গজেব ভূমি কর বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার বোঝা চেপেছিলো হিন্দু জাটদের উপর। জিজিয়া কর পুনঃ আরোপের ফলে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর আওতাধীন অঞ্চলে পালিয়ে যেতে জনসাধারণকে উৎসাহিত করেছিলো। কারণ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর আওতাধীন অঞ্চলে পূর্ব নির্ধারিত ধর্মীয় কর নীতি প্রচলিত ছিলো।
মন্দির এবং মসজিদ সম্পর্কীয় নীতি– আওরঙ্গজেব মন্দিরের জন্য ভূমি আবণ্টন দিতেন এবং সেগুলি রক্ষণাক্ষেণের জন্য তহবিল সরবরাহ করতেন। তবে তিনি মন্দির ধ্বংস করারও নির্দেশ দিতেন। আধুনিক ইতিহাসবিদরা ঔপনিবেশিক এবং জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদদের এই দাবিকে প্রত্যাখান করেন যে, এই ধ্বংসগুলি ধর্মীয় উগ্রতা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলো, বরং মন্দিরগুলির সার্বভৌমত্ব, ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের সাথে মন্দির নির্মাণের উপর জোর দেওয়া হতো।
মসজিদ নির্মাণকে প্রজাদের রাজকীয় কর্তব্য হিসাবে বিচেনা করা হলেও আওরঙ্গজেবের নামে বেশ কিছু মন্দির সম্পর্কে ফরমান রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে উড্ডয়নের মহাকালেশ্বর মন্দির, দেরাদুনের গুরুদ্বার, চিত্রকূটের বালাজি মন্দির, গুয়াহাটির উমানন্দ মন্দির এবং গুজরাটের শত্রুঞ্জয় জৈন মন্দির প্রভৃতি। এছাড়াও অন্যান্য অসংখ্য নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিলো।
সমসাময়িক আদালত কাহিনীতে শতাধিক মন্দিরের কথা উল্লেখ রয়েছে, যেগুলি আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তাঁর সর্দারদের দ্বারা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিলো। ১৬৬৯ সালের সেপ্তেম্বরে তিনি মান সিং দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মান সিংয়ের নাতি জয় সিং শিবাজীকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। ১৬৭০ সালের প্রথম দিকে মথুরায় জাটরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং শহর মসজিদের পৃষ্ঠপোষককে হত্যা করেছিলেন। আওরঙ্গজেব বিদ্রোহীদের দমন করেছিলেন এবং শহরের কেশব মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখানে একটি ঈদগাহ স্থাপন করা হয়েছিলো। ১৬৭৯ সালের দিকে খাণ্ডেলা, উদয়পুর, চিতোর এবং যোধপুর সহ বেশ কয়েকটি বিশিষ্ট মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মন্দিরগুলি বিদ্রোহীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন বলে অভিযোগ ছিলো। গোলকুণ্ডার জামে মসজিদের ক্ষেত্রেও একই আচরণ করা হয়েছিলো। কারণ গোলকুণ্ডার শাসক রাজস্ব লুকানোর জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। বিশেষভাবে বেনারসের জন্য একটি শরিয়া আদেশে ঘোষণা করেছিলেন যে, হিন্দুদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদান করা হবে এবং মন্দিরগুলি ধ্বংস করা হবে না। তবে নতুন মন্দির নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকবে। রিচার্ড ইটন প্রাথমিক সূত্রের সমালোচনামূলক মূল্যায়নে বলেছেন যে, আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৫ টি মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিলো বলে গণনা করা হয়েছে। ইয়ান কপল্যাণ্ড এবং অন্যান্য ইতিহাসবিদরা ইকতিদার খানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে উল্লেখ করেন যে, আওরঙ্গজেব সামগ্রিকভাবে ধ্বংসের চেয়ে বেশি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন।
বিরোধীদের মৃত্যুদণ্ড–আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে তাঁর ভ্রাতা দারা শিকোহের মৃত্যুদণ্ড প্রথম কার্যকর করেছিলেন। তিনি হিন্দুধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিলো। কিছু সূত্রের মতে, রাজনৈতিক কারণে দারা শিকোহকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আওরঙ্গজেব তাঁর সহযোগী ভ্রাতা মুরাদ বক্সকে হত্যার দায়ে আটক করেছিলেন এবং বিচারের পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে তাঁর বন্দি ভাইপো সোলাইমান শিকোহকে বিষপ্রয়োগ করেছিলনে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেব দ্বিতীয় মারাঠা ছত্রপতি সম্ভাজিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি, হত্যা, সহিংসতা এবং নৃশংসতার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। তাঁর আদেশে বেরারের বুরহানপুর এবং বাহাদুরপুরের মুসলমানদের মারাঠারা হত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছিলো।
১৬৭৫ সালে আওরঙ্গজেবের নির্দেশে গুরু তেগ বাহাদুরকে গেপ্তার করা হয়েছিলো এবং কাজির আদালত দ্বারা ধর্মনিন্দার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো।
মুস্তাল্লি ইসলামের দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের ৩২ তম দাই আল-মুতলাক সৈয়দনা কুতুব খান কুতুবুদ্দিনকে ধর্মদ্রোহিতার জন্য গুজরাটের গভর্নর থাকাকালীন ১৬৪৮ সালে আহমেদাবাদে আওরঙ্গজেব দ্বারা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিলো।
মোগল সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ– ১৬৬৩ সালে লাদাখ সফরের সময় আওরঙ্গজেব এই অংশের উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং দেলদান নামগিয়ালের মতো অনুন্নত প্রজারা মোগল সাম্রাজ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আনুগত্য প্রকাশের অঙ্গীকার করেছিলেন। দেলদান নামগিয়াল লেহতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এবং মসজিদটি মোগল শাসকদের উৎসর্গ করেছিলেন।
১৬৬৪ সালে আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানকে বাংলার সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। শায়েস্তা খান এই অঞ্চল থেকে পর্তুগীজ এবং আরাকানি জলদস্যুদের নির্মূল করেছিলেন। ১৬৬৬ সালে আরাকানি রাজা থুধাম্মার নিকট থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পুনরুদ্ধার করেছিলেন। মোগল রাজত্বকালে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিলো।
১৬৮৫ সালে আওরঙ্গজেব তাঁর ছেলে আজম শাহকে ৫০,০০০ সৈন্য দিয়ে মোগলদের অনুগত বিজাপুরের শাসক সিকান্দার আদিল শাহকে পরাজিত করে বিজাপুর দূর্গ দখল করতে প্রেরণ করেছিলেন। কারণ সিকান্দার আদিল শাহ অনুগত শাসক হিসাবে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। মুহাম্মদ আজম শাহ বিজাপুর দূর্গ দখল করতে অসমর্থ হয়েছিলেন। সংবাদ পেয়ে ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব স্বয়ং ১৬৮৬ সালের ৪ সেপ্তেম্বর-এ বিজাপুর এসেছিলেন এবং বিজাপুর অবরোধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আটদিন যুদ্ধের পর বিজাপুর দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিজাপুর দখল করার পর একমাত্র গোলকুণ্ডার কুতুবশাহী শাসক আবুল হাসান কুতুব শাহ আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি এবং তাঁর সৈন্যরা গোলকুণ্ডায় তাঁদের সুরক্ষিত করেছিলেন এবং কুল্লুর খনি কঠোরভাবে রক্ষা করছিলেন। কুল্লুর খনি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ ছিলো এবং খনিটি সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল হীরার খনি ছিলো। ১৬৮৭ সালে গোলকুণ্ডা অবরোধের সময় আওরঙ্গজেব মোগল বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কুতুবশাহীরা শহরটিকে ঘিরে ৪০০ ফুটেরও বেশি উঁচু গ্রেনাইট পাহাড়কে পরস্পর সংযোগ করে আট মাইল লম্বা বিশাল দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। গোলকুণ্ডা দূর্গের ফটকগুলোর যেকোনো যুদ্ধ হাতীর আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা ছিলো। কুতুবশাহীরা যদিও দেয়ালগুলো দুর্ভেদভাবে নির্মাণ করেছিলেন, রাতের বেলা আওরঙ্গজেব এবং তাঁর বাহিনী মৈ ভাড়া করে দেয়াল টপকে দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন। আট মাসের অবরোধের সময় মোগলরা তাঁদের অভিজ্ঞ সেনাপতি কিলিচ খান বাহাদুরের মৃত্যু সহ অনেক কষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন। অবশেষে মোগল বাহিনী একটি ফটক অতিক্রম করে দেয়াল ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিলো এবং দুর্গে প্রবেশের পর আবুল হাসান কুতুব শাহ শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
সামরিক সরঞ্জাম– ১৭ শতকে কামান তৈরির দক্ষতা উন্নত হয়েছিলো। সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক মোগল কামানগুলির মধ্যে একটি জাফরবক্স নামে পরিচিত ছিলো। এটি বিরল যৌগিক কামান ছিলো এবং কামানটি নির্মাণ করার জন্য পেটা লোহা ঢালাই এবং ব্রোঞ্জ ঢালাই প্রযুক্তি এবং উভয় ধাতু সম্পর্কে গভীর জ্ঞান প্রয়োজন হতো।
আওরঙ্গজেবের সামরিক বাহিনীতে ১৬ টি কামান ছিলো। যারমধ্যে ছিলো আজদাহা কামান। কামানটি ৩৩.৫ কেজি গুলি ছুঁড়তে সক্ষম ছিলো। ফতেহ রাহবার কামান ২০ ফুট লম্বা ছিলো। ইব্রাহীম রওজা নামে একটি বিখ্যাত কামান ছিলো। কামানটি বহু ব্যারেলের জন্য পরিচিত ছিলো। আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফ্রাঙ্কোইস বার্নিয়ার দু’টি ঘোড়ায় দ্বারা টানা বহুমুখী মোগল বন্দুকের গাড়ী পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
এইসব উদ্ভাবন সত্ত্বেও বেশির ভাগ সৈন্য তীর-ধনুক ব্যবহার করত। তরবারি তৈরির মান এতটাই নিম্নমানের ছিলো যে সেনারা ইংল্যাণ্ড থেকে আমদানি করা তরবারি ব্যবহার করতে পসন্দ করতেন। কামান পরিচালনার দায়িত্ব মোগলদের হাতে ছিল না, ইউরোপীয় বন্দুকধারীদের হাতে ন্যস্ত ছিলো। সেই সময়ে ব্যবহৃত অন্যান্য অস্ত্রের মধ্যে ছিলো, রকেট, ফুটন্ত তেলের কলড্রোন, মাস্কেট এবং মানজানিক(পাথর নিক্ষেপ করা কাটাপল্ট)। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে অবরোধ এবং আর্টিলারিতে পারদর্শী পদাতিক বাহিনী আভির্ভূত হয়েছিলো। যাদের পরে সিপাহি বলা হতো। ১৭০৩ সালে করমণ্ডলের মোগল সেনাপতি দাউদ খান পন্নী চিলোন থেকে ৩০ থেকে ৫০ টি হাতী কেনার জন্য ১০,৫০০ মূদ্রা ব্যয় করেছিলেন।
শিল্প–সংস্কৃতি– আওরঙ্গজেব পূর্বসূরিদের তুলনায় কঠোর প্রকৃতির ছিলেন এবং মোগল মিনিয়েচার(সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম)- এর ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছিলেন। ফলে দরবারের চিত্রশিল্পীরা আঞ্চলিক দরবারে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ধার্মিক হওয়ার জন্য তিনি ইসলামিক ক্যালিগ্রাফিকে উৎসাহিত করতেন। তাঁর রাজত্বকালে তাঁর স্ত্রী রাবিয়া- উদ-দৌরানি(দিলরাস বানু বেগম) এর জন্য লাহোরে বাদশাহী মসজিদ এবং মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে বিবি কা মকবরা নির্মাণ করা দেখা যায়। তাঁর রাজত্বকালে নাখস (পাকানো) শৈলীতে লিখা কোরআনের পাণ্ডুলিপির চাহিদা তুঙ্গে ছিলো। সৈয়দ আলী তাবরিজির পরামর্শে আওরঙ্গজেব নিজে নাখস শৈলীর একজন প্রতিভাবান ক্যালিগ্রাফার ছিলেন। এর প্রমাণ তিনি নিজে লিখা কোরআনের পাণ্ডুলিপি থেকে পাওয়া যায়।
স্থাপত্য– আওরঙ্গজেব তাঁর পিতার মতো স্থাপত্যের সাথে জড়িত ছিলেন না। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে স্থাপত্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে মোগল সম্রাটের অবস্থান হ্রাস পেতে শুরু করেছিলো। যাইহোক, আওরঙ্গজেব কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। ক্যাথারিন অ্যাশার তাঁর রাজত্বকালকে মোগল স্থাপত্যের ইসলামীকরণ হিসাবে অভিহিত করেছেন। তিনি সিংহাসনে আরোহণের পর প্রথম দিকের নির্মাণগুলির মধ্যে ছিলো মার্বেল পাথরে নির্মিত ছোট মসজিদ। মসজিদটি মতি মসজিদ(মুক্তা মসজিদ) নামে পরিচিত। মসজিদটি দিল্লীর লালকেল্লার পরিসরে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিলো। তিনি লাহোরে বাদশাহী মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। মসজিদটি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ। তিনি শ্রীনগরে একটি মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। মসজিদটি কাশ্মীরের বৃহত্তম মসজিদ।
আওরঙ্গজেবের অধিকাংশ নির্মাণ কার্য মসজিদকে ঘিরে আবর্তিত। তবে ধর্মনিরপেক্ষ নির্মাণ কার্যও ছিলো। ঔরঙ্গাবাদের বিবি কা মকবরা, আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তাঁর বড় ছেলে আজম শাহ ‘রাবিয়া-উদ-দৌরানি’র সমাধি নির্মাণ করেছিলেন। সমাধিটি নির্মাণের ক্ষেত্রে তাজমহল থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। আওঙ্গজেব শহরের মতো কাঠামোও নির্মাণ করেছিলেন এবং মেরামত করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপে ঔরঙ্গাবাদের চারপাশের প্রাচীর। যার অনেকগুলি ফটক এখনও টিকে রয়েছে। তিনি সেতু, পথিকদের জন্য বিশ্রামাগার এবং বাগান নির্মাণ করিয়েছিলেন।
আওরঙ্গজেব পূর্ব থেকে বিদ্যমান স্থাপনাগুলির মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের সাথে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো মোগল এবং প্রাক্-মোগল যুগের মসজিদ। তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় তিনি সেগুলি বেশি মেরামত করিয়েছিলেন। তিনি বখতিয়ার কাকীর মতো সুফি সাধকের দরগাহের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং রাজকীয় সমাধিগুলি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।
বস্ত্রশিল্প– আওরঙ্গজেবর রাজত্বকালে বস্ত্রশিল্পের প্রভূত উন্নতি হয়েছিলো। মোগল সম্রাটের ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার লিখেছেন, কীভাবে কারকানাহ বা কারিগরদের জন্য কর্মশালা আয়োজন করা হতো। বিশেষ করে টেক্সটাইলগুলোতে একজন মাস্টারের তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার এমব্রয়ডার নিয়োগ করা হতো। তিনি আরও লিখেছেন, কীভাবে কারিগররা রেশম, সূক্ষ্ম ব্রোকেড এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম মসলিন কাপড় তৈয়ার করতেন। যার মধ্যে ছিলো পাগড়ি, সোনার ফুলের পোশাক, মহিলারা পরিধান করা টিউনিক, এক রাতে পরিধান করার মতো সূক্ষ্ম বস্ত্র। তিনি হিমরু, পৈঠানি, মুশরু, কলমকারির মতো জটিল কাপড় তৈরিতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কৌশল ব্যাখ্যা করেছেন। মোগলদের জন্য কাপড়গুলি উষ্ণতা রক্ষা এবং আরামদায়ক ছিলো। কীভাবে এই টেক্সটাইল এবং শালগুলি ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্স পর্যন্ত পৌঁছেছিলো তাও ব্যাখ্যা করেছেন।
বৈদেশিক নীতি– আওরঙ্গজেব ১৬৫৯ এবং ১৬৬২ সালে মক্কার শরিফদের জন্য অর্থ ও উপহার দিয়ে কূটনৈতিক মিশন প্রেরণ করেছিলেন। ১৬৬৬ এবং ১৬৭২ সালে মক্কা ও মদিনায় দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের জন্য অর্থ পাঠিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ নাইমুর রহমান ফারুকী লিখেছেন, ১৬৯৪ সাল নাগাদ মক্কার শরিফদের প্রতি আওরঙ্গজেবের মোহ ভঙ্গ হতে শুরু হয়েছিলো। তাঁদের লোভ এবং বর্বরতা দেখে আওরঙ্গজেবের বিস্মিত হয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব শরিফদের অনৈতিক আচরণের জন্য ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন। দরিদ্রদের জন্য হিজাজে প্রেরণ করা অর্থ দরিদ্রদের বঞ্চিত করে শরিফরা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন ।
উজবেকদের সাথে সম্পর্ক– ১৬৫৮ সালে বলখের উজবেক শাসক সুবহান কুলি খান আওরঙ্গজেবকে প্রথম সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং একটি সাধারণ জোটবন্ধনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আওরঙ্গজেব বলখের শাসক থাকাকালীন অর্থাৎ ১৬৪৭ সাল থেকে সুবহান কুলি খানের সাথে কাজ করছিলেন।
সাফাভিদ রাজবংশের সাথে সম্পর্ক– ১৬৬০ সালে আওরঙ্গজেব পারস্যের শাহ দ্বিতীয় আব্বাসের দূতদের গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের উপহার দিয়ে ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন। যাইহোক, সাফাভিদ এবং মোগলদের মধ্যে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ ছিলো, কারণ সাফাভিদরা কান্দাহারের নিকটে অবস্থিত মোগল সেনাদের আক্রমণ করেছিলো। আওরঙ্গজেব পাল্টা আক্রমণের জন্য সিন্ধু নদী অববাহিকায় সেনা নিয়োগ করেছিলেন, কিন্তু ১৬৬৬ সালে দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের মৃত্যুর ফলে সমস্ত শত্রুতার অবসান হয়েছিলো। আওরঙ্গজেবের বিদ্রোহী পুত্র সুলতান মহম্মদ আকবর পালিয়ে গিয়ে পারস্যের সুলতান সোলেইমান-দ্বিতীয়ের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর নিকট সেনা সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। তবে, সোলেইমান- প্রথম আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে সামরিক সাহায্য প্রদান করতে অস্বীকার করেছিলেন।
ফরাসিদের সাথে সম্পর্ক– ১৬৬৭ সালে ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুই দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন বিদ্রোহীদের হাত থেকে ফরাসি বণিকদের রক্ষার জন্য অনুরোধ করে ফরাসি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর রাষ্ট্রদূত লে গৌজ এবং বেবার্টের হাতে পত্র প্রেরণ করেছিলেন। পত্রের জবাবে আওরঙ্গজেব ফরাসিদের সুরাটে কারখানা স্থাপন করার অনুমতি প্রদান করে একটিফরমান জারি করেছিলেন।
মালদ্বীপের সুলতনাতের সাথে সম্পর্ক– ১৬৬০-এর দশকে মালদ্বীপের সুলতান ইব্রাহীম ইস্কান্দার-প্রথম আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি বালাসোরের ফৌজাদারের নিকট সাহায্য চেয়ে পত্র প্রেরণ করেছিলেন। সুলতান ডাচ এবং ইংরেজ বাণিজ্য জাহাজ বহিষ্কারের ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেবের সমর্থন চেয়েছিলেন। কারণ সুলতান ডাচ এবং ইংরেজ বণিকদের আগমনে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে ভেবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। আওরঙ্গজেবের যেহেতু শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিলো না, তাই ডাচ এবং ইংরেজদের সাথে সাম্ভাব্য যুদ্ধের কথা চিন্তা করে সাহায্যের জন্য আগ্রহী ছিলেন না। সেজন্য সুলতানের অনুরোধ ব্যর্থ হয়েছিলো।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক– তাঁর পিতার মতো আওরঙ্গজেব উসমানীয়দের খেলাফতের দাবি স্বীকার করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি প্রায়ই উসমানীয় সাম্রাজ্যের শত্রুদের সমর্থন করতেন, বসরার দুই বিদ্রোহী গভর্নরকে সৌহৃদ্যপূর্ণ স্বাগত জানাতেন এবং তাঁদের ও তাঁদের পরিবারকে মোগল দরবারে রাজকীয় চাকরিতে উচ্চ মর্যদা প্ৰদান করতেন। উসমানীয়দের খেলাফতের দাবি অস্বীকার করার জন্য সুলতান সোলেইমান-দ্বিতীয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীকে আওরঙ্গজেব উপেক্ষা করতেন। সুলতান খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে পবিত্র যুদ্ধ পরিচালনা করতে আওরঙ্গজেবকে উৎসাহিত করেছিলেন।
ইংরেজ ও এঙ্গলো–মোগল যুদ্ধের সাথে সম্পর্ক– ১৬৮৬ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী সমগ্র মোগল সাম্রাজ্য জুড়ে নিয়মিত বাণিজ্য করার জন্য ফরমান প্রাপ্তির চেষ্টা করে বিফল হওয়ার পর এঙ্গলো-মোগল যুদ্ধের সূচনা হয়েছিলো। ১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেব মোগল নৌবহরের সেনাপতি ও জাঞ্জিরা দূর্গের রক্ষক সিদি ইয়াকুব ও ম্যাপিলাদের নেতৃত্বে বোম্বে অবরোধ করার জন্য জাঞ্জিরা থেকে একটি বড় নৌবহর প্রেরণ করেছিলেন। নৌবহরটি বোম্বে অবরোধ করেছিলো। ইংরেজদের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়েছিলো। ১৬৯০ সালে যুদ্ধটি ইংরেজদের পক্ষে সুবিধাজনক হচ্ছেনা বুঝতে পেরে কোম্পানী ক্ষমা প্রার্থনা করে আওরঙ্গজেবের শিবিরে দূত প্রেরণ করেছিলেন। দূতরা আওরঙ্গজেবের সামনে সেজদা করে একটি বড় ক্ষতি পূরণ প্রদানের জন্য সন্মত হয়েছিলেন এবং ভবিষ্যতে এরকম কর্ম করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন।
১৬৯৫ সালের সেপ্তেম্বরে ইংরেজ জলদস্যু হেনরি এভরি সুরাটের কাছে একটি গ্রাণ্ড মোগল কনভয়কে আটক করেছিলেন। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক জলদস্যু অভিযান ছিলো। জাহাজগুলি মক্কায় বার্ষিক হজ্ব সমাপন করে বাড়ি ফিরছিলো। তখন জলদস্যুরা গঞ্জ-ই-সওয়াই নামক জাহাজটি আটক করেছিলো। কথিত আছে যে, জাহাজটি মুসলিম নৌবহরের বৃহত্তম জাহাজ ছিলো। জাহাজ দখলের সংবাদ মূল ভূ-খণ্ডে পৌঁছোনোর সাথে সাথে ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব ইংরেজ শাসিত বোম্বে শহর আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব ইংরেজ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর চারটি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জাহাজের ক্যাপ্তেন এবং শ্রমিকদের বন্দি করেছিলেন। প্রত্যেককে বন্দি না করা পর্যন্ত ভারতে সমস্ত ইংরেজ বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন। কোম্পানী মোগল কর্তৃপক্ষকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস প্রদানের পর আওরঙ্গজেব বিষয়টি আপোস করেছিলেন।
১৭০২ সালে আওরঙ্গজেব কর্ণাটক অঞ্চলের মোগল সুবেদার দাউদ খান পন্নীকে মাদ্রাজের উপকূলে অবস্থিত ইংরেজদের সেন্ট জর্জ দূর্গ দখল করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তিন মাস দূর্গটি অবরোধ করে রাখার পর দূর্গের গভর্নর পিটার টমাস পিটকে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী শান্তির জন্য মামলা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ইথিওপিয়ান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক– আওরঙ্গজেব মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ইথিওপিয়ান সম্রাট ফ্যাসিলিটিস১৬৬৪-৬৫ সালে আওরঙ্গজেবকে অভিনন্দন জানাতে ভারতে দূত প্রেরণ করেছিলেন।
তিব্বতি উইঘুর এবং জুঙ্গারদের সাথে সম্পর্ক– ১৬৭৯ সালে তিব্বতিরা মোগল প্রভাবের বলয়ে অবস্থিত লাদাখ আক্রমণ করেছিলেন। ১৬৮৩ সালে আওরঙ্গজেব লাদাখ আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু তিব্বতি অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য জুঙ্গারদের আগমনের পর আওরঙ্গজেব সৈন্যরা পিছু হটে এসেছিলেন। একই সময়ে কাশ্মীরের মোগল গভর্নর দালাই লামাকে পরাজিত করে সমগ্র তিব্বত জয় করেছে বলে পত্র প্রেরণ করেছিলেন।
বৌদ্ধ জুঙ্গাররা মোগলিস্থানের উপর আধিপতা বিস্তার করেছিলেন। ১৬৯০ সালে চাগতাই মোগলিস্থানের আমিন খান ‘কিরখিজ কাফের(বৌদ্ধ জুঙ্গার)দের’ তাড়ানোর জন্য সহায়তা চেয়ে আওরঙ্গজেবের নিকট দূত প্রেরণ করেছিলেন।
রাশিয়ার জারডমদের সাথে সম্পর্ক- রাশিয়ান জার পিটার দ্য গ্রেট ১৭ শতকের শেষের দিকে রুশো-মোগল বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য আওরঙ্গজেবকে অনুরোধ করেছিলেন। ১৬৯৬ সালে আওরঙ্গজেব জারের দূত সেমিয়ন ম্যালেনকির সাথে সাক্ষাত করেছিলেন এবং তাঁকে ভারতে মুক্ত বাণিজ্য পরিচালনার জন্য অনুমতি প্রদান করেছিলেন। সেমিয়ন ম্যালেনকি ভারতে ছয় বছর অবস্থানের পর সুরাট, বুরহানপুর, আগ্রা, দিল্লী এবং অন্যান্য শহর পরিদর্শন করার পর বণিকরা মূল্যবান ভারতীয় পণ্য নিয়ে মস্কোতে ফিরে গিয়েছিলেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি- আওরঙ্গজেব সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সন্মানী পেয়েছিলেন। সেই সম্পদ ব্যবহার করে ভারতে ঘাঁটি এবং দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। বিশেষ করে কর্ণাটক, দাক্ষিণাত্য, বাংলা এবং লাহোরে।
রাজস্ব- ১৬৯০ সালের মধ্যে আওরঙ্গজেবকে কুমারিকা অন্তরীপ থেকে কাবুল পর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব কোষাগার কর, শুল্ক, রাজস্ব ইত্যাদির মাধ্যমে ২৪ টি প্রদেশ থেকে বার্ষিক ৪৫০ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেতেন। এই রাজস্বের পরিমাণ তাঁর সমসাময়িক ফ্রান্সের পঞ্চদশ লুইর থেকে ১০ গুণেরও বেশি ছিলো।
মূদ্রা-আওরঙ্গজেবের পূর্বতন শাসকেরা মূদ্রায় কোরআনের আয়াত স্ট্যাম্প করতেন। সেগুলি ক্রমাগত মানুষের হাত এবং পায়ের দ্বারা স্পর্শ করা হতো। তাই আওরঙ্গজেব মনে করতেন যে, কোরআনের আয়াত মূদ্রায় স্ট্যাম্প করা উচিত নয়। তাঁর মূদ্রার এক পাশে ছিলো টাকশালের শহরের নাম এবং সাল এবং অন্যপাশে ছিলো, নিন্মোক্ত কাপলেট-
‘সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর
মুদ্রাঙ্কিত মুদ্রা, বিশ্বের উজ্জ্বল পূর্ণিমার মতো।‘
বিদ্রোহ- উত্তর-পশ্চিম ভারতের ঐতিহ্যবাহী এবং নতুন সুসংহত সামাজিক গোষ্ঠী, যেমন মরাঠা, রাজপুত, হিন্দু জাট, পশতুন এবং শিখদের মোগল রাজত্বকালে মোগলদের সাথে সহযোগিতা এবং বিরোধিতার মাধ্যমে সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে উত্থান হয়েছিলো।
১৬৬৯ সালে হিন্দু জাট কৃষকরা বিদ্রোহ করে ভরতপুরের আশেপাশে ভরতপুর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো এবং পরে তাঁরা পরাজিত হয়েছিলো। ১৬৫৯ সালে শিবাজি দাক্ষিণাত্যের মোগল সুবেদার শায়েস্তা খানের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন আকস্মিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। শিবাজি এবং তাঁর বাহিনী দাক্ষিণাত্য, জাঞ্জিরা এবং সুরাট অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন আক্রমণ সংঘটিত করে বিস্তীর্ণ এলেকা নিয়ন্ত্রণ লাভের চেষ্টা করেছিলেন। ১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেবের বাহিনী শিবাজির পুত্র সম্ভাজিকে বন্দি করেছিলো এবং বুরহানপুর দখল করার পর তাঁকে হত্যা করেছিলো। কিন্তু মারাঠারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং মোগল সাম্রাজ্যর পতন শুরু হয়েছিলো।
দুর্গাদাস রাঠোর মারওয়ার রাজ্যের রাঠোর রাজপুতদের সেনাপতি ছিলেন। ১৬৭৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরে যশবন্ত সিংয়ের মৃত্যুর পর দূর্গদাস রাঠোরকে রাজা হিসাবে মেনে না নেওয়ার জন্য তিনি ১৬৭৯ সালে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এই ঘটনাই মোগল অধীনস্থ রাজপুত শাসকদের মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিলো এবং রাজপুতনায় অনেক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো। ফলে এই অঞ্চলে মোগল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গিয়েছিলো এবং মন্দির ধ্বংসের জন্য ধর্মীয় তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিলো।
১৬৭২ সালে ভীরভানের নেতৃত্বে দিল্লীর কাছে একত্রিত হয়ে সতনামি সম্প্রদায় নার্নোলের প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা আওরঙ্গজেবের হস্তক্ষেপের ফলে পরাজিত হয়ে খুব কম সংখ্যক জীবিত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৬৭১ সালে মীরজুমলা এবং শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে মোগল সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আহোম রাজ্য আক্রমণ করেছিলো। তবে তাঁরা শরাইঘাটের যুদ্ধে আহোম সেনাপতি লাচিত বরফুকনের হাতে পরাজিত হয়েছিলো।
ভারতীয় বুন্দেলা রাজপুত বংশের মধ্যযুগীয় বীর যোদ্ধা মহারাজা ছত্রশাল মোগলদের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করে বুন্দেলখণ্ডে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বুন্দেলখণ্ড রাজ্যের সাহায্যে মরাঠারা মধ্য এবং উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
জাট বিদ্রোহ– ১৬৬৯ সালে হিন্দু জাটরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এই বিদ্রোহের ফলে আওরঙ্গজেব জিজিয়া কর পুনঃআরোপ করেছিলেন এবং মথুরার হিন্দু মন্দির ধ্বংসের কারণ হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। তিলপাটের বিদ্রোহী জমিদার গোকুল জাট দ্বারা বিদ্রোহ সংঘটিত করা হয়েছিলো। ১৬৭০ সাল নাগাদ আওরঙ্গজেব ২০,০০০ জাট বিদ্রোহীদের দমন করেছিলেন এবং তিলপাটের শাসন ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়েছিলেন। ফলে গোকুলের ভাগের ৯৩,০০০ স্বর্ণ মূদ্রা এবং কয়েক লক্ষ রৌপ্যমুদ্রা মোগলদের হস্তগত হয়েছিলো। গোকুলকে বন্দি করা হয়েছিলো এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো।
গোকুলের পুত্র রাজা রাম জাট পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আবার বিদ্রোহ শুরু করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা আকবরের সমাধির স্বর্ণ, রৌপ্য এবং কার্পেট লুন্ঠন করেছিলেন। আকবরের কবর খুঁড়েছিলেন এবং কবর থেকে হাড়গুলো বের করে প্রতিশোধ হিসাবে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। জাটরা আকবরের সমাধির প্রবেশপথের মিনারগুলির শীর্ষগুলি করে উড়িয়ে ছিয়েছিলেন এবং তাজমহল থেকে দু’টি রূপালী দরজা খুলে আগুনে দিয়ে পুরে গলিয়ে ফেলেছিলেন। জাট বিদ্রোহ দমন করার জন্য আওরঙ্গজেব মহম্মদ বিদার বখতকে সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন। ১৬৮৮ সালের ৪ জুলাই রাজা রাম জাটকে বন্দি করে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো। হত্যার প্রমাণ হিসাবে তাঁর মুণ্ড আওরঙ্গজেবের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিলো। যাইহোক, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বদন সিংয়ের নেতৃত্বে জাটরা ভরতপুরে তাঁদের স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মোগল–মারাঠা যুদ্ধ– ১৬৫৭ সালে আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের গোলকুণ্ডা এবং বিজাপুর দখল করার সময় মারাঠা হিন্দু যোদ্ধা শিবাজি পূর্বে তাঁর পিতার অধীনে থাকা তিনটি আদিলশাহী দূর্গ নিয়ন্ত্রণে নিতে গেরিলা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এই বিজয়ের সময়ে শিবাজি অনেক স্বাধীন মারাঠা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। মারাঠারা যুদ্ধরত আদিল শাহীদের নিকট থেকে অস্ত্র, দূর্গ এবং অনেক অঞ্চল দখল করেছিলেন। শিবাজির ছোট এবং দুর্বল অস্ত্ৰ-শস্ত্র দিয়ে সজ্জিত সেনাবাহিনী আদিল শাহের সর্বাত্মক আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং শিবাজি ব্যক্তিগতভাবে আদিল শাহী সেনাপতি আফজল খানকে হত্যা করেছিলেন। এই ঘটনার পর মারাঠারা শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছিলো। এবং এই অঞ্চলে মোগল শক্তিকে নিরপেক্ষ করার জন্য আরও বেশি আদিলশাহী অঞ্চল দখল করেছিলেন।
১৬৫৯ সালে আওরঙ্গজেব মারাঠা বিদ্রোহীদের কাছ থেকে হৃত দূর্গ পুনরুদ্ধার করার জন্য তাঁর মামা বিশ্বস্ত সেনাপতি শায়েস্তা খান এবং গোলকুণ্ডার ওয়ালি খানকে নিয়োগ করেছিলেন। শায়েস্তা খান মারাঠা অঞ্চলে গিয়ে পুণেতে বসবাস শুরু করেছিলেন। পুণের গভর্নরের প্রাসাদে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান উদযাপনের সময় মধ্যরাতে শিবাজির নেতৃত্বে অতর্কিতে আক্রমণ করে মারাঠারা শায়েস্তা খানের পুত্রকে হত্যা করেছিলেন এবং শায়েস্তা খানের হাতের তিনটি আঙুল কেটে পঙ্গু করে দিয়েছিলেন। শায়েস্তা খান বেঁচে গিয়েছিলেন এবং পরে আহোমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্বে পালন করেছিলেন এবং বাংলার শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন।
এরপর মারাঠাদের পরাস্ত করার জন্য আওরঙ্গজেব রাজা জয় সিংকে প্রেরণ করেছিলেন। জয় সিং পুরন্দর দূর্গ অবরোধ করেছিলেন। পরাজয়ের পূর্বাভাস পেয়ে শিবাজি বিনাশর্তে সন্ধি করতে সন্মত হয়েছিলেন। জয় সিং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার আশ্বাস প্রদান করে শিবাজিকে আওরঙ্গজেবের সাথে সাক্ষাত করার জন্য সন্মত করিয়েছিলেন। তবে মোগল দরবারে আওরঙ্গজেবের সাথে তাঁর আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। শিবাজিকে মোগল দরবারে যেভাবে গ্রহণ করা হয়েছিলো তাতে তিনি অপমানবোধ করেছিলেন। ফলে তিনি রাজকীয় সেবা অগ্রাহ্য করে আওরঙ্গজেবকে অপমান করেছিলেন। এই অপমানের জন্য তাঁকে আটক করা হয়েছিলো। অবশ্যে তিনি সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
শিবাজি দাক্ষিণাত্যে ফিরে এসে ১৬৭৪ সালে ছত্রপতি উপাধি গ্রহণ করে নিজেকে মারাঠা রাজ্যের শাসক হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ১৬৮০ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সমগ্র দাক্ষিণাত্য জুড়ে মারাঠা সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রসারিত করেছিলেন। শিবাজির মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সম্ভাজি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন এবং দাক্ষিণাত্যে সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে মোগলদের নিয়ন্ত্রণের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেছিলেন।
অপরপক্ষে আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র মহম্মদ আকবর কয়েকজন সমর্থক মুসলিম মনসবদার সহ মোগল দরবার ত্যাগ করেছিলেন এবং দাক্ষিণাত্যে মুসলিম বিদ্রোহীদের সাথে যোগদান করেছিলেন। এর জবাবে আওরঙ্গজেব মোগল দরবার আওরঙ্গাবাদে স্থানান্তর করে নিজে দাক্ষিণাত্য অভিযানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়েছিলো এবং মহম্মদ আকবর দাক্ষিণাত্যে পালিয়ে গিয়ে সম্ভাজির নিকটে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। আবারও যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো এবং সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আকবর পারস্যে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি আর দেশে ফিরে আসেন নি।
১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেব সম্ভাজিকে বন্দি করে হত্যা করেছিলেন। এই হত্যার পর ছত্রপতি সম্ভাজি মহারাজের সৎ ভ্রাতৃ তথা শিবাজির তৃতীয় পুত্র রাজারাম ১৬৮৯ সালের ১২ মার্চ মারাঠা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৭০০ সালে ফুসফুস রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পর রাজারামের বিধবা পত্নী তারাবাই তাঁর যুবক পুত্র শিবাজি-দ্বিতীয়কে ছত্রপতি হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং তারাবাই যুবক পুত্রের হয়ে রাজ্য শাসন করেছিলেন। এরা সবাই ১৬৮৯ সাল থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত মোগলদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ অব্যাহত রেখেছিলেন। সীমাহীন যুদ্ধের বছরগুলিতে আওরঙ্গজেবকে প্রাণ এবং অর্থের মূল্যের বিনিময়ে প্রতি ইঞ্চি ভূমির জন্য সংঘর্ষ করতে বাধ্য করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব যখন পশ্চিমে চলে গিয়েছিলেন, মারাঠারা তখন সাতারা জয় করেছিলেন। মারাঠারা পূর্বদিকে মোগল ভূমি দখল করে মালওয়া এবং হায়দ্রাবাদ পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। মারাঠারা তামিলনাড়ুর জিঞ্জির স্বাধীন স্থানীয় শাসককে পরাজিত করে জিঞ্জি দখল করেছিলেন। আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি মারাঠাদের জয় করার জন্য দাক্ষিণাত্যে অনেক যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। শেষপর্যন্ত মারাঠাদের সাথে যুদ্ধ করে করেই তিনি ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্যে প্রচলিত যুদ্ধ থেকে আওরঙ্গজেবের মোগল সামরিক চিন্তাধারার দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন হয়েছিলো। পুণে, জিঞ্জি, মালওয়া এবং ভদোদরায় মোগল এবং মারাঠাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। মোগল সাম্রাজ্যের বন্দর শহর সুরাটকে আরঙ্গজেবের শাসনকালে মারাঠারা দু’বার দখল করেছিলেন এবং বন্দরটিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত করেছিলেন। ম্যাথিউ হোয়াইট অনুমান করেছেন যে, মারাঠা-মোগল যুদ্ধের সময় আওরঙ্গজেবের প্রায় ২.৫ মিলিয়ন সেনা নিহত হয়েছিলো। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভূমিতে ২ মিলিয়ন লোক খরা, প্লেগ এবং দুর্ভিক্ষের জন্য মারা গিয়েছিলো।
আহোমদের বিরুদ্ধে অভিযান– আওরঙ্গজেব এবং শাহ সুজা যখন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তখন এই সুযোগে কোচবিহার এবং আসামের হিন্দু শাসকেরা মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। তিন বছর এই আক্রমণের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ১৬৬০ সালে আওরঙ্গজেব বাংলার সুবেদার মীরজুমলা-দ্বিতীয়কে হৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১৬৬১ সালে মোগলরা আসামের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোচবিহারের রাজধানী দখল করে মোগল সম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। একটি বিচ্ছিন্ন গ্যারিসনকে কোচবিহারে রেখে মোগল সেনা আসামে তাঁদের হৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন। মীরজুমলা-দ্বিতীয় আসামের রাজধানী গড়গাঁও অভিমুখে অগ্রসর হয়ে ১৬৬২ সালের ১৭ মার্চ সেখানে পৌঁছেছিলেন। আসামের শাসক স্বৰ্গদেউ সুতামলা (জয়ধ্বজ সিং)মীরজুমলা গড়গাঁও পৌঁছোনোর আগেই রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মোগলরা ৮২ টি হাতী, নগদ ৩,০০,০০০ টাকা, ১০০০ টি যুদ্ধ নাও এবং ১৭৩ টি চালের ভাণ্ডার দখল করেছিলেন।
১৬৬৩ সালে ঢাকায় ফেরার পথে মীরজুমলা-দ্বিতীয় মারা গিয়েছিলেন। সুতামলার পরে চক্রধ্বজ সিং ১৬৬৩ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণ করে চক্রধ্বজ সিং মোগলদের ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে মোগলরা আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। সেই যুদ্ধের সময় মোগলরা অনেক কষ্টের সন্মুখীন হয়েছিলেন। মুন্নাওয়ার খান নামে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মথুরাপুরের নিকটবর্তী অঞ্চলে মোগলদের খাদ্য সরবরাহ করেছিলেন বলে জানা যায়। ১৬৬৭ সালে ফৌজদার সৈয়দ ফিরোজ খানের নেতৃত্বে মোগলরা ওয়াহাটীতে আহোমদের হাতে দুবার পরাস্ত হয়েছিলেন।
১৬৭১ সালে কুচ্চবাহার রাজা তথা মোগল সেনাপতি রামসিং এবং আহোম সেনাপতি লাচিত বরফুকনের নেতৃত্বে শরাইঘাট নামক স্থানে মোগল এবং আহোমদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। যুদ্ধটি শরাইঘাটে ব্রহ্মপুত্র নদে সংঘটিত হয়েছিলো। অপেক্ষাকৃত দুর্বল আহোম সেনা কূটনৈতিক আলোচনা, গেরিলা কৌশল, সামরিক বুদ্ধিমত্তা এবং মোগলদের একমাত্র দুর্বলতা নৌবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে অপেক্ষাকৃত সবল মোগল বাহিনীকে পরাস্ত করেছিলেন।
আসামে মোগলদের শেষ প্রচেষ্টা ছিলো শরাইঘাট যুদ্ধ। মোগলরা পরে অল্প সময়ের জন্য গুয়াহাটী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৬৮২ সালে সংঘটিত ইটাখুলির যুদ্ধে মোগলদের পরাস্ত করে আহোমরা গুয়াহাটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত সেই নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিলো।
সতনামী বিদ্রোহ– ১৬৭২ সালে একজন ‘দন্তহীন বৃদ্ধ মহিলা’র নির্দেশে মোগল সাম্রাজ্যের কৃষিকেন্দ্রগুলিতে সতনামীরা একটি বিশাল বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিলেন। সতনামীদের মাথা এবং ভ্রূ পর্যন্ত কামানো ছিলো এবং উত্তর ভারতের অনেক অঞ্চলে তাঁদের মন্দির ছিলো। তাঁরা দিল্লী থেকে ৭৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বড় মাপের বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিলেন।
সতনামীরা বিশ্বাস করতেন যে, তাঁরা মোগলদের গুলি থেকে সুরক্ষিত এবং তাঁরা মোগলদের যেকোনো অঞ্চলে প্রবেশ করতে সক্ষম। তাঁরা দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন এবং ছোট-বড় মোগল বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন।
আওরঙ্গজেব সতনামী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ১০,০০০ সেনার একটি বাহিনী এবং বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত মোগল রক্ষীদের বিচ্ছিন্ন দল প্রেরণ করেছিলেন। মোগল সেনাদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য আওরঙ্গজেব ইসলামিক প্রার্থনা লিখেছিলেন, তাবিজ তৈরি করেছিলেন, নক্সা তৈরি করেছিলেন। সেগুলি সেনাবাহিনীর প্রতীক হয়ে উঠেছিলো। এই বিদ্রোহ পাঞ্জাবের উপর পরবর্তীতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিলো।
শিখ বিদ্রোহ– নবম শিখ গুরু, গুরু তেগ বাহাদুর স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের বিরোধী ছিলেন। কারণ এটিকে তিনি ভুল নীতি বলে মনে করেছিলেন। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের তাঁদের বিশ্বাস ধরে রাখতে এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ এড়াতে সাহায্য করার জন্য তিনি আওরঙ্গজেবকে একটি বার্তা প্রেরণ করেছিলেন যে, সম্রাট যদি তাঁকে ধর্মান্তকরণ করাতে পারেন, তাহলে প্রত্যেক হিন্দু মুসলমান হয়ে যাবে। জবাবে, আওরঙ্গজেব গুরু তেগ বাহাদুরকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। গ্রেপ্তার করে তাঁকে দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং ধর্মান্তকরণ করার জন্য নির্যাতন করা হয়েছিলো। ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করার জন্য ১৬৭৫ সালে তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো।
গুরু তেগ বাহাদুরের হত্যার জবাবে তাঁর উত্তরসূরি পুত্র গুরু গোবিন্দ সিং আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর আট বছর আগে ১৬৯৯ সালে খালসা বাহিনী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর অনুসারীদের সামরিকীকরণ করেছিলেন। ১৭০৫ সালে গুরু গোবিন্দ সিং ‘জাফরনামা’ নামে আওরঙ্গজেবকে একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। পত্রটিতে আওরঙ্গজেবের নিষ্ঠুরতা এবং ইসলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। পত্রটি পেয়ে আওরঙ্গজেব অনেক কষ্ট অনুভব এবং অনুশোচনা করেছিলেন। ১৬৯৯ সালে খালসা গঠনের ফলে শিখরা সংগঠিত হয়েছিলেন এবং পরে শিখ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পশতুন বিদ্রোহ– ১৬৭২ সালে কাবুলের যোদ্ধা কবি খুশাল খান খট্টকের নেতৃত্বে পশতুন বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো। মোগল গভর্নর আমির খানের নির্দেশে বর্তমান আফগানিস্থানের কুনার প্রদেশের পশতুন উপজাতির মহিলাদের শ্লীলতা হানি করা হয়েছিলো। তখন সাফি উপজাতিরা সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছিলো। এই আক্রমণটি প্রতিশোধের উদ্রেক করেছিলো এবং উপজাতিদের মধ্যে সাধারণ বিদ্রোহের সূত্রপাত করেছিলো। কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করার চেষ্টায় আমির খান একটি বড় বাহিনী নিয়ে খাইবার গিরিপথে উপজাতিদের বিরুদ্ধে অভিযান সংঘটিত করেছিলো এবং গভর্নর সহ মাত্র চারজন লোক সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলো।
পশতুন অঞ্চলে আওরঙ্গজেবের অনুপ্রবেশকে খুশাল খান খট্টর ‘আমাদের পাঠানদের প্রতি মোগলদের হৃদয় কালো’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। আওরঙ্গজেব সেনা প্রেরণ করে ‘পোড়া মাটির নীতি’ প্রয়োগ করে গণহত্যা, লুটপাট এবং বহু গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। মোগল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একীভূত পশতুন প্রত্যাহ্বানকে বিভ্রান্ত করে উপজাতিদের একে অপরের বিরুদ্ধে পরিণত করার জন্য আওরঙ্গজেব ঘুস ব্যবহার করতেও অগ্রসর হয়েছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিলো উপজাতিদের মধ্যে স্থায়ী অবিশ্বাসের বাতাবরণ সৃষ্টি করা।
এর পরে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং মোগলরা প্রায় সমগ্র পশতুন অঞ্চলে তাঁদের কর্তৃত্ব হারিয়েছিলেন। এটক- কাবুল বাণিজ্য রোড, গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড বরাবর বন্ধ করাটা ছিলো মোগলদের জন্য বড় বিপর্যয়কর। ১৬৭৪ সাল নাগাদ পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে অবনমিত হয়েছিলো যে, আওরঙ্গজেব ব্যক্তিগতভাবে সেনার দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য এটকে ক্যাম্প নির্মাণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অস্ত্রের জোরের সাথে কুটনীতি এবং ঘুস প্রদান করে মোগলরা শেষপর্যন্ত বিদ্রোহীদের বিভক্ত করে বিদ্রোহকে আংশিকভাবে দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অবশ্যে মোগলরা কখনো বাণিজ্য পথের বাইরে তাঁদের কার্যকর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারেন নি।
মৃত্যু– গোলকুণ্ডা এবং দাক্ষিণাত্য বিজয়ের পর ১৬৮৯ সাল নাগাদ মোগল সাম্রাজ্য ৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত হয়েছিলো। জনসংখ্যা ছিলো ১৫৮ মিলিয়নেরও বেশি। লিডেন বিশ্বদ্যিালয়ের ইতিহাসবিদ এবং বিশ্ব ইতিহাসের অধ্যাপক জোনস গোমম্যানস বলেছেন, আওরঙ্গজেবের অধীনে সাম্রাজ্যের উচ্চ কেন্দ্রবিন্দু থেকে সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়েছিলো।
আওরঙ্গজেব দিল্লীর লালকেল্লা কমপ্লেক্সে মতি মসজিদ নামে পরিচিত একটি ছোট মার্বেল মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। ক্রমাগত যুদ্ধ, বিশেষ করে মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাঁর সাম্রাজ্যকে দেউলীয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিলো।
দাক্ষিণাত্য বিজয়ের জন্য আওরঙ্গজেব তাঁর জীবনের ২৬টি বছর উৎসর্গ করেছিলেন। এটি অনেক দিক থেকে পীড়াদায়ক বিজয় ছিলো। যার জন্য বছরে আনুমাণিক লক্ষ লক্ষ প্রাণ বলিদান দিতে হয়েছিলো। কত স্বর্ণ এবং রৌপ্য খরচ হয়েছিলো তা সঠিকভাবে অনুমান করা যাবে তাঁর ছাউনির আড়ম্বর দেখে। আওরঙ্গজেবের ছাউনি ছিলো একটি চলমান রাজধানীর মতো- ৩০ মাইল পরিধির একটি তাঁবুর শহর। সেখানে ছিলো ২৫০ টি বাজার, ১.২ মিলিনেরও বেশি অনুসারি, ৫০,০০০ টি উট এবং ৩০,০০০ টি হাতী। এদের সবাইকে খাওয়াতে হতো, প্রয়োজনে খাদ্য প্রজাদের উদ্বৃত্ত শস্য থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হতো।
প্রায় ৯০ বছরের কাছাকাছি বয়সে এসে মৃত্যুর আগে আওরঙ্গজেব বলেছিলেন, ‘আমি একা এসেছি, একজন অপরিচিত হিসাবে একা চলে যাব। আমি জানিনা, আমি কি, আমি কি করছি।’ মৃতপ্রায় বৃদ্ধ তাঁর ছেলে আজম শাহের নিকট ১৭০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এইসব কথা স্বীকার করেছিলেন।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ এড়াতে মৃত্যুর সময়ে তিনি নিশ্চিত করে গিয়েছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পরেও জনগণ যাতে জানতে পারে তিনি বেঁচে আছেন। ১৭০৭ সালের ৩ মার্চ ৮৮ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর নিকট মাত্র ৩০০ টাকা ছিলো। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর নির্দেশানুসারে সেই টাকা দাতব্য সংস্থায় দান করা হয়েছিলো। তিনি তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর অন্তেষ্টিক্রিয়ার জন্য যাতে অযথা ব্যয় করা না হয় তারজন্য অনুরোধ করে গিয়েছিলেন। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদের খুলদাবাদে তাঁর কবর উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। এই উন্মুক্ত কবর তাঁর ইসলামের প্রতি থাকা গভীর আস্থা এবং ভক্তির কথা প্রকাশ করে। কবরটি দিল্লীর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য সুফি সাধক বুরহান-উদ-দীন গরিবের মাঝারের প্রাঙ্গণে অবস্থিত।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র আজম শাহ কয়েক মাসের জন্য মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর পরে অস্টম মোগল সম্রাট হিসাবে বাহাদুর শাহ প্রথম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বাহাদুর শাহের দুর্বল সামরিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বের জন্য মোগল সাম্রাজ্য চূড়ান্ত পতনের দিকে অগ্রসর হয়েছিলো। বাহাদুর শাহ প্রথম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর মারাঠারা মোগল অঞ্চলে আক্রমণ সংঘটিত করতে শুরু করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই মোগল সম্রাটের দিল্লীর দেয়ালের বাইরে সামান্যই ক্ষমতা ছিলো।
মূল্যায়ন এবং উত্তরাধিকার–সমালোচকরা যুক্তি দেন যে, তাঁর নির্মমতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামী তাঁকে তাঁর সাম্রাজ্যের মিশ্র জনগোষ্ঠীকে শাসন করার জন্য অনুপযুক্ত করে তুলেছিলো। কিছু সমালোচক দাবি করেন যে, শিয়া, সুফি এবং অমুসলিমদের উপর ধর্মীয় গোঁড়া ইসলামিক অনুশীলন আরোপ করার জন্য, যেমন অমুলিসদের উপর শারিয়া এবং জিজিয়া কর আরোপ, মুসলমানদের জন্য শুল্ক বাতিল করে অমুসলিমদের উপর দ্বিগুণ শুল্ক নির্ধারণ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা ইত্যাদি। মন্দির ধ্বংস করার ফলে বহু বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো। জি, এন, মঈন শাকির এবং সরমা ফেস্টস্ক্রিপ্ট যুক্তি দেন যে, তিনি প্রায়ই রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য ধর্মীয় পীড়নকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করতেন। এর ফলস্বরূপ, জাট, মারাঠা, শিখ, সতনামী এবং পশতুনদের দল তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলো।
পাকিস্থানে সম্বর্ধনা– হারুন খালিদ লিখেছেন, যুদ্ধ এবং ইসলামিক সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তারের জন্য পাকিস্থানে আওরঙ্গজেবকে একজন বীর যোদ্ধা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধর্ম এবং আদালত থেকে কলুষিত প্রথাগুলিকে সরিয়ে সাম্রাজ্যকে শুদ্ধি করার জন্য তাঁকে সত্যিকারের আস্তিক হিসাবে কল্পনা করা হয়। মুনিস ফারুকি মত প্রকাশ করেন। যে, পাকিস্থানী রাষ্ট্র এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মিত্ররা তাঁকে প্রাক-আধুনিক মুসলিম বীরদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করেন। বিশেষ করে তাঁর সামরিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত ধার্মিকতা এবং সদিচ্ছার জন্য তাঁকে পাকিস্থানে প্রশংসা করা হয়। মহম্মদ ইকবাল, আওরঙ্গজেবকে পাকিস্থানের আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বিবেচনা করেন। আকবরের দীন-ই-ইলাহি এবং মূর্তিপূজার বিরোধিতা করার জন্য তাঁকে নবী আব্রাহামের সাথে তুলনা করা হয়। ইকবাল সিং সেভিয়া রাজনৈতিক দর্শনের উপর লিখা তাঁর বইতে লিখেছেন যে, মহম্মদ ইকবাল মনে করেছিলেন যে, আওরঙ্গজেবের জীবন ও কর্ম ভারতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের সূচনা করেছিলেন। মাওলানা সাব্বির উসমানি জিন্নাহের অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে বক্তৃতায়, পাকিস্থানের প্রতিষ্ঠাতা এম, এ, জিন্নাহকে আওরঙ্গজেবের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম বলে অভিহিত করেছিলেন। পাকিস্থানী-আমেরিকান শিক্ষাবিদ আকবর ইসলামীকরণ অভিযানের জন্য পরিচিত জিয়া-উল-হককে ধারণাগতভাবে আওরঙ্গজেবের একজন আধ্যাত্মিক বংশধর হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কারণ জিয়া-উল-হকের গোঁড়া ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গী ছিলেন।
ব্যক্তিগত প্রশংসার বাইরে, আওরঙ্গজেবকে পাকিস্থানের জাতীয় আত্মসচেনতার প্রধান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসবিদ আয়শা জালাল পাকিস্থানের পাঠ্যপুস্তক বিতর্কের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে এম. ডি জাফরের পাকিস্থান স্ট্যাডিজের একটি পাঠ্যপুস্তকের কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি লিখেছেন, আওরঙ্গজেবের অধীনে পাকিস্থানের আত্মা একত্রিত করা হয়েছিলো, যখন তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো পাকিস্থানের চেতনাকে দুর্বল করে দিয়েছিলো। পাকিস্থানের আরেকজন ইতিহাসবিদ মোবারক আলী পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, আকবরকে পাঠ্যপুস্তকে সুবিধাজনকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীর কোনো পাঠ্যপুস্তকে আকবরের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। আওরঙ্গজেবকে সামজিক স্ট্যাডিজ এবং উর্দু ভাষার বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকে একজন গোঁড়া এবং ধর্মীয় মুসলমান হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি জীবীকার জন্য কোরআনের অনুলিপি প্রস্তুত এবং টুপি সেলাই করতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আওরঙ্গজেবের এই ভাবমূর্তি শুধু পাকিস্থানের সরকারী ইতিহাসগ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইতিহাসবিদ অ্যান্দ্রে টসকে উল্লেখ করেছেন যে, বি, জে,পি এবং অন্যান্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা আওরঙ্গজেবকে মুসলিম উগ্রবাদী মনে করেন। নেহরু দাবি করেছেন যে, পূর্ববর্তী মোগল সম্রাটদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সমন্বয়বাদের বিপরীতে আওরঙ্গজেব একজন শাসকের চেয়ে একজন মুসলিম হিসাবে বেশি অভিনয় করে গেছেন।
আওরঙ্গজেবের সম্পূর্ণ উপাধি–আল-সুলতান আল-খাগান আল মুকাররম হজরত আবুল মুজাফ্ফর মহি-উদ-দীন মহম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর-প্রথম বাদশাহ গাজি শাহেনশাহ-ই-সুলতানাত-উল-হিন্দিয়া ওয়াল মুঘালিয়া। আওরঙ্গজেবকে আরও বিভিন্ন উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো, যারমধ্যে রয়েছে দয়াময়ের খলিফা, ইসলামের রাজা এবং ঈশ্বরের জীবিত রক্ষক।
বিবাহ–
দিলরাস বানু বেগম-বিবাহ ১৬৩৮ সালে এবং মৃত্যু ১৬৯১ সালে। তিনি কাশ্মীরের রাউরি স্ট্যাটের রাজা তাজুদ্দিন খানের কন্যা ছিলেন।
নবাব বাই– তিনি আওরঙ্গাবাদী মহল নামে পরিচিত ছিলেন। ১৬৬১ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর-এ বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। ১৬৮৮ সালের নভেম্বরে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
উদিপুরি মহল– উদিপুরি মহল দারা শিকোহের ক্রীতদাসী ছিলেন। তিনি মহম্মদ কামবক্সের মাতৃ ছিলেন।
সন্তান–
জেব–উন–নিসা– জন্ম ১৬৩৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং মৃত্যু ১৭০২ সালের ২৬ মে। মাতৃ দিলরাস বানু বেগম।
মহম্মদ সুলতান– ১৬৩৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর এবং মৃত্যু ১৬৭৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর। মাতৃ নবাব বাই।
জিনাত–উন–নিসা– জন্ম ১৬৪৪ সালের ৫ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৭২১ সালের ৭ মে। মাতৃ দিলরাস বানু।
শাহ আলম–প্রথম– জন্ম ১৬৪৩ সালের ১৪ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৭১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। মাতৃ নবাব বাই ।
বদর–উন–নিসা– জন্ম ১৬৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর এবং মৃত্যু ১৬৭০ সালের ৯ এপ্রিল। মাতৃ নবাব বাই ।
জুবদাত–উন–নিসা– জন্ম ১৬৫১ সালের ২ সেপ্তেম্বর এবং মৃত্যু ১৭০৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। মাতৃ দিলরাস বানু বেগম।
আজম শাহ– জন্ম ১৬৫৩ সালের ২৮ জুন এবং মৃত্যু ১৭০৭ সালের ২০ জুন। মাতৃ দিলরাস বানু বেগম। তিনি সপ্তম মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ১৭০৭ সালের ৪ মার্চ থেকে ১৭০৭ সালের ২০ জুন পর্যন্ত কয়েক মাসের জন্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
মহম্মদ আকবর– জন্ম ১৬৫৭ সালের ১১ সেপ্তেম্বর এবং মৃত্যু ১৭০৬ সালের ৩১ মার্চ। মাতৃ দিলরাস বানু বেগম। মহম্মদ আকবরের ছেলে নিকুশিয়ার ১৭১৯ সালে কয়েক মাসের জন্য সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
মিহর–উন–নিসা– জন্ম ১৬৬১ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর এবং মৃত্যু ১৭০৬ সালের ২ এপ্রিল। মাতৃ নবাব বাই ।
কামবক্স– জন্ম ১৬৬৭ সালের ৭ মার্চ এবং মৃত্যু ১৭০৯ সালের ১৪ জানুয়ারি। মাতৃ উদিপুরি মহল।
সাহিত্যে আওরঙ্গজেব–
আওরঙ্গজেব– ১৬৭৫ সালে রচিত জন ড্রাইডনের নাটক। সম্রাটের জীবদ্দশায় লন্ডনের মঞ্চে অভিনীত হয়েছিলো।
হিন্দী উপন্যাস– আচার্য চতুর সেন শাস্ত্রী রচিত হিন্দী উপন্যাস।
শাহেনশাহ– ১৯৭০ সালে রচিত এন, এস, ইনামদারের মারাঠী উপন্যাস।
১৬৩৬- এরিক ফিলিন্ট এবং গ্রিফিন বারবারা দ্বারা ২০১৭ সালে রচিত মোগলদের মিশন।
শাহেনশাহ– ২০১৭ সালে আওরঙ্গজেবের জীবন এবং এন, এস ইমানদারের ১৯৭০ সালে রচিত মারাঠি কাল্পনিক জীবনী বিক্রান্ত পাণ্ডে কর্তৃক ইংরেজি অনুবাদ।
আওরঙ্গজেবঃ দ্য ম্যান এণ্ড দ্য মিথ – ২০১৮ সালে অ্যান্দ্রে টুসকের দ্বারা রচিত উপন্যাস। •
আজম শাহ
কুতুব-উদ-দীন মহম্মদ আজম শাহের জন্ম ১৬৫৩ সালের ২৮ জুন দাক্ষিণাত্যের বুরহানপুরে। তাঁর পিতার নাম আওরঙ্গজেব এবং মাতৃর নাম দিলরাস বানু বেগম। তিনি ষষ্ঠ মোগল সম্রাট আওরঙ্গবের তৃতীয় সন্তান ছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তিনি ১৭০৭ সালের ১৪ মার্চ থেকে ১৭০৭ সালের ২০ জুন পর্যন্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর মাতৃ দিলরাস বানু বেগম পারস্যের বিশিষ্ট সাফাভিদ রাজবংশের মির্জা বদি-উদ-জামান-এর কন্যা ছিলেন। আজম শাহ তাঁর পিতার দিক থেকেই শুধু তিমুরিদ ছিলেন না, মাতৃর দিক থেকেও সাফাভিদ রাজবংশের রক্ত ছিলো তাঁর শরীরে। যার জন্য আজম শাহ খুব গর্বিত ছিলেন। তাঁর ছোট ভ্রাতা মহম্মদ আকবরের মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেবের সবচেয়ে খাঁটি রক্তের একমাত্র জীবিত সন্তান বলে তিনি গর্ব করতেন। আজম শাহের সৎ ভ্রাতা শাহ আলম (বাহাদুর শাহ প্রথম) এবং মহম্মদ কামবক্স ছিলেন আওরঙ্গজেবের নিকৃষ্ট ও হিন্দু স্ত্রীর সন্তান। নিকোলাও মানুচ্চির মতে, আজম শাহ পারস্যের সাফাভিদ রাজবংশের শাহ নওয়াজ খান সাফাভির নাতি হওয়ার জন্য দরবারিরা তাঁর প্রতি প্রভাবিত হয়েছিলেন।
১৬৮১ সালের ১২ আগস্ট আজম শাহ তাঁর পিতার উত্তরাধিকারী (শাহী আলী জাহ) হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং সম্রাটের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বাহাল ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ সামরিক কর্মজীবনে তিনি বেরার সুবাহ, মালওয়া, বাংলা, গুজরাট এবং দাক্ষিণাত্যের সুবেদার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৭০৭ সালের ১৪ মার্চ তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি আহমেদনগরে মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তিনি এবং তাঁর তিন পুত্র সুলতান বিদার বখত, শাহজাদা জওয়ান বখত বাহাদুর এবং শাহজাদা সিকান্দার শান বাহাদুর তাঁর জ্যেষ্ঠ সংভ্রাতা শাহজাদা শাহ আলম কর্তৃক ১৭০৭ সালের ২০ জুন জাজাউর যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন।
জাজাউর যুদ্ধ– ১৭০৭ সালের ২০ জুন আজম শাহ এবং তাঁর সৎ ভ্রাতা বাহাদুর শাহের মধ্যে জাজাউয়ের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। তাঁদের পিতা আওরঙ্গজেব উত্তরাধিকার ঘোষণা না করেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দেওয়ার জন্য ইচ্ছাপত্রে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে সন্তোষজনক চুক্তিতে পৌঁছোতে না পারার জন্য সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। জাজাউর যুদ্ধে আজম শাহ এবং তাঁর তিনি পুত্র নিহত হওয়ার পর শাহ আলম বাহাদুর শাহ-প্রথম উপাধি ধারণ করে ১৭০৭ সালের ১৯ জুন ৬৩ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
চরিত্র– আজম শাহ প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং বীরত্বের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। আওরঙ্গজেব নিজেও তাঁর ছেলের মহৎ চরিত্র, চমৎকার আচার-ব্যবহারে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। সম্রাট আজম শাহকে পুত্রের চেয়ে আওরঙ্গজেব একজন বন্ধু মনে করতেন।
ব্যক্তিগত জীবন– আজম শাহ ১৬৬৮ সালের ১৩ মে আহোম রাজকন্যা রমণী গাভরুর সাথে প্রথম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিয়ের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিলেন রহমত বানু বেগম। তিনি আহোম স্বৰ্গদেউ জয়ধ্বজ সিংয়ের কন্যা ছিলেন। বিবাহটি রাজনৈতিক ছিলো।
১৬৬৯ সালের ৩ জানুয়ারি আজম শাহ তাঁর চাচাতো বোন শাহজাদী জাহানজেবের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। শাহজাদী জাহানজেব তাঁর চাচা দারা শিকোহ এবং তার প্রিয়তমা স্ত্রী নাদিরা বানু বেগমের কন্যা ছিলেন। জাহানজেব ছিলেন আজম শাহের প্রধান ও প্রিয়তমা স্ত্রী। ১৬৭০ সালের ৪ আগস্ট তিনি তাঁর বড় ছেলে বিদার বখতকে জন্ম দিয়েছিলেন। বিদার বখত নামটি রেখেছিলেন আওরঙ্গজেব স্বয়ং। আওরঙ্গজেব আজম শাহ, তাঁর প্রিয়পুত্র বধু জাহানজেব এবং বিদার বখতকে খুব স্নেহ করতেন।
আওরঙ্গজেবের মামা শায়েস্তা খানের কন্যা ইরান দখত রহমত বানু (পরী বিবি)র সাথে আজম শাহের তৃতীয় বিয়ে ঠিক হয়েছিলো। ১৬৭৮ সালে ঢাকায় পরী বিবির আকস্মিক মৃত্যুর ফলে সে বিয়ে করা সম্ভব হয়নি। পরী বিবির স্মরণে আজম শাহ ঢাকায় লালবাগ কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন।
রাজনৈতিক জোঁটের অংশ হিসাবে আজম শাহ পরবর্তীতে ১৬৮১ সালে শাহার বানু বেগম(পাদশাহ বিবি)র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আদিল শাহী রাজবংশের শাসক আলী আদিল শাহ-দ্বিতীয়ের কন্যা।
অন্যান্য বিবাহ সত্ত্বেও জাহানজেবের প্রতি আজম শাহের প্রেম অপরিবর্তিত ছিলেন। ১৭০৫ সালে জাহানজেবের মৃত্যুর পর আজম শাহ অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
বিজাপুর দখল– বিজাপুরের শাসক সিকান্দার আদিল শাহ মোগলদের অনুগত শাসক ছিলেন। তবে, তিনি মোগলদের অনুগত হয়ে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে ১৬৮৫ সালে আওরঙ্গজেব ৫০,০০০ সৈন্য দিয়ে আজম শাহকে বিজাপুর দূর্গ দখল করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। আজম শাহের নেতৃত্বে মোগলরা বিজাপুর দূর্গ দখল করার জন্য অগ্রগতি লাভ করতে সক্ষম হোননি। ফলে ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব নিজেই ১৬৮৬ সালের ৪ সেপ্তেম্বর বিজাপুর এসেছিলেন এবং আটদিনের যুদ্ধের পর বিজয়ী হয়েছিলেন।
বাংলার সুবেদার–বাংলার শাসক আজম খান কোকার মৃত্যুর পর আজম শাহ ১৬৭৮ সাল থেকে ১৭০১ সাল পর্যন্ত বেরার সুবাহ, মালওয়া এবং বাংলার সুবেদার ছিলেন। ১৬৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সফলভাবে কামরূপ অঞ্চল দখল করেছিলেন। তিনি তখন ঢাকায় অসম্পূর্ণ লালবাগ কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে রাজস্ব আদায়ের জন্য মীরজুমলাকে দিওয়ান এবং মুলুকচাঁদকে হুজুর-নাভিস নিযুক্ত করেছিলেন। আওরঙ্গজেব শাহজাদা আজম শাহকে বাংলার সুবেদার পদ থেকে প্রত্যাহার করার পর তিনি ১৬৭৯ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। তখন বাংলার শাসন মুর্শিদাবাদের নবাবের অধীনে চলে গিয়েছিলো।
১৭০১ সাল থেকে ১৭০৬ সাল পর্যন্ত তিনি গুজরাটের সুবেদার ছিলেন।
আজম শাহ তাঁর ছোট সৎ ভ্রাতা কমবক্সকে বিশেষভাবে ঘৃণা করতেন। যারজন্য উত্তরাধিকারের যুদ্ধ এড়াতে আওরঙ্গজেব আজম শাহকে মালওয়ায় এবং কামবক্সকে বিজাপুরে প্রেরণ করেছিলেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আওরঙ্গজেব আজম শাহকে বিদায়ী চিঠি লিখেছিলেন। পরের দিন সকালে আজম শাহ মালওয়া যাওয়ার পরিবর্তে আহমেদনগরের বাইরে অবস্থান করছিলেন এবং পিতৃর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রাজকীয় শিবিরে এসে তাঁর পিতার মৃতদেহ গ্রহণ করে দৌলতাবাদে দাফনের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। পিতার মৃতদেহ দাফনের পর আজম শাহ নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে সিংহাসন দখল করেছিলেন। ১৭০৭ সালের আঠার জুন জাজাউয়ের যুদ্ধে তাঁর বড় সৎ ভ্রাতা বাহাদুর শাহের নিকট পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন।
মালওয়ার জটিল পরিস্থিতি দেখে বাহাদুর শাহ গুরু গোবিন্দ সিংয়ের নিকট সাহায্য চেয়েছিলেন। গুরু গোবিন্দ সি তাঁর ভ্রাতা গুরু ধরম সিংকে ৩০০ সৈন্য দিয়ে বাহাদুর শাহকে সহায় করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। শিখ সৈন্যের একটি তীর এসে আজম শাহের চোখে বিদ্ধ হয়েছিলো এবং সেই আঘাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
আজম শাহের মৃত্যুর পর তাঁকে আওরঙ্গাবাদের নিকটে অবস্থিত খুলদাবাদে সুফি সাধক শেখ জয়নুদ্দিনের দরগাহ কমপ্লেক্সে তাঁর স্ত্রীর সমাধির পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। যেখানে একটু পশ্চিমে আওরঙ্গজেবের সমাধিও রয়েছে। আজম শাহের সন্তান
বিদর বখত-জন্ম ১৬৭০ সালের ৪ আগস্ট এবং মৃত্যু ১৭০৭ সালের ২০ জুন। মাতৃ জাহানজেব বানু বেগম। জওয়ান বখত, সিকান্দার শাহ, ওয়ালা জাহ, ওয়ালা সান, আলী তাবর, গিট্টিআরা বেগম, ইফফাত আরা বেগম, নাজিব- উন-নিসা বেগম। •
বাহাদুর শাহ–প্রথম
বাহাদুর শাহের জন্ম ১৬৪৩ সালের ১৪ অক্টোবর মোগল সাম্রাজ্যের বুরহানপুরে। তিনি মহম্মদ মোয়াজ্জেম এবং শাহ আলম নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি অস্টম মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি ১৭০৭ সাল থেকে ১৭১২ সাল অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম আওরঙ্গজেব এবং মাতৃর নাম নবাব বাই। ১৭০৭ সালের ১৫ জুন দিল্লীতে তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিলো এবং ১৭০৭ সালের ১৯ জুন সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ তাঁর পিতা আওরঙ্গজেবকে উৎখাত করে সিংহাসনে আরোহাণের জন্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন। ফলে আওরঙ্গজেব তাঁকে কয়েকবার বন্দি করেছিলেন। ১৬৯৬ সাল থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত তিনি আকবরাবাদ(পরে আগ্রা), কাবুল এবং লাহোরের সুবেদার ছিলেন।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তাঁর প্রধানা স্ত্রীর পুত্র মহম্মদ আজম শাহ নিজেকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু জাজাউর যুদ্ধে বাহাদুর শাহ কর্তৃক পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন। বাহাদুর শাহের শাসনামলের কয়েক বছর পূর্বে যোধপুর এবং অম্বর স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। বাহাদুর শাহ সেগুলি আবার মোগল সাম্রাজের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। বাহাদুর শাহ খোতবায় আলীকে ওয়ালি ঘোষণা করে ইসলামিক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিলো। বান্দা সিং বাহাদুরের নেতৃত্বে শিখরা, দূর্গদাস রাঠোরের অধীনে রাজপুতরা এবং কামবক্সের নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো। বান্দা সিং বাহাদুর-এর বিদ্রোহ ব্যতীত সব কয়টি বিদ্রোহ তিনি সফলভাবে দমন করেছিলেন।
সম্রাট শাহ জাহানের রাজত্বালে বাহাদুর শাহ– পিতামহ শাহ জাহানের রাজত্বকালে বাহাদুর শাহ ১৬৫৩ থেকে ১৬৫৯ সাল পর্যন্ত লাহোরের উজির-এ-আজম ছিলেন। ১৬৬৩ সালে তিনি দাক্ষিণাত্যের গভর্নর হিসাবে শায়েস্তা খানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। শিবাজি দাক্ষিণাত্যের মোগল রাজধানী আওরঙ্গাবাদের উপকণ্ঠে অভিযান চালিয়েছিলেন, তখন শিবাজির বিরুদ্ধে বাহাদুর শাহ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কোনো উল্লেযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিবাজিকে পরাজিত করার জন্য আওরঙ্গজেব সবচেয়ে দক্ষ সেনাপতি জয় সিং-প্রথমকে দাক্ষিণাত্যে প্রেরণ করেছিলেন। জয় সিং পুরন্দর দুর্গ অবরোধ করেছিলেন এবং ১৬৬৫ সালের ১১ জুন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব এবং শিবাজির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো। চুক্তিটি পুরন্দর চুক্তি নামে জনাজাত ।
আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাহাদুর শাহ– জয় সিং পুরন্দর দূর্গ দখল করার পর বাহাদুর শাহ প্রথমকে ১৬৬৭ সালের মে মাসে আবারও দাক্ষিণাত্যের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো।
১৬৭০ সালে বাহাদুর শাহ তাঁর পিতা আওরঙ্গজেবকে উৎখাত করার জন্য একটি বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিলেন এবং নিজেকে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। মারাঠাদের প্ররোচনায় বিদ্রোহটি সংঘটিত করতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। আওরঙ্গজেব বিদ্রোহটি শান্তভাবে দমন করেছিলেন এবং বাহাদুর শাহ মোগল দরবারে ফিরে এসে কয়েক বছর দরবারে ছিলেন। ১৬৮০ সালে আওরঙ্গজেব রাজপুত বিদ্রোহ দমন করার সময় পোড়া মাটির নীতি গ্রহণ করার পর বাহাদুর শাহ আবার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। আওরঙ্গজেব আবারও বিদ্রোহটি ভদ্রভাবে দমন করেছিলেন এবং তাঁকে সতর্কতার সাথে নিরীক্ষণে রেখেছিলেন।
পরবর্তী সাত বছর, ১৬৮১ সাল থেকে ১৬৮৭ সাল পর্যন্ত বাহাদুর শাহ ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে পিতার বাধ্য সন্তান’ ছিলেন বলে ইতিহাসবিদ মুনিস ফারুকী বর্ণনা করেছেন।
বিশ্বাসঘাতকতা– আওরঙ্গজেব ১৬৮১ সালে বিদ্রোহী পুত্র মহম্মদ আকবরের পশ্চাদপসরণ করার জন্য বাহাদুর শাহকে দাক্ষিণাত্যে প্রেরণ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ মুনিস ফারুকীর মতে, বাহাদুর শাহ ইচ্ছাকৃতভাবে সেই মিশনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিদ্রোহী পুত্র মহম্মদ আকবর যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে তাঁর জন্য বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে ১৬৮৩ সালে আওরঙ্গজেব বাহাদুর শাহকে কোঙ্কন অঞ্চলে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাহাদুর শাহ আবারও তাঁর অভিযানে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরেও আওরঙ্গজেব তাঁকে দায়িত্ব প্রদানে অটল ছিলেন। আওরঙ্গজেব ১৬৮৭ সালে বাহাদুর শাহকে গোলকুণ্ডার সুলতানাতের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের গুপ্তচরেরা অবগত হয়েছিলেন যে, গোলকুণ্ডার শাসক আবুল হাসান এবং বাহাদুর সাহের মধ্যে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক বার্তা আদান-প্রদান চলছে। এটা কোনো অযোগ্যতার পরিচায়ক ছিলো না, স্পষ্টতই রাষ্ট্রদ্রোহ ছিলো। ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব বাহাদুর শাহ এবং তাঁর পুত্রদের বন্দি করেছিলেন এবং তাঁর নিকটতম অনুসারিদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। বাহাদুর শাহকে দিল্লীতে স্থানান্তর করেছিলেন এবং তাঁর কর্মচারিদের বিদায় দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব তাঁকে ছমাসের জন্য নখ বা চুল কাটতে নিষেধ করেছিলেন। তাঁকে ভালো খাবার এবং ঠাণ্ডা জন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো। পিতার অনুমতি ছাড়া কারও দেখা-সাক্ষাত করাও বারণ ছিলো।
১৬৯৪ সালে আওরঙ্গজেব বাহাদুর শাহকে পুনর্বাসন করেছিলেন। তাঁর পরিবারের সাথে বসবাস করার অনুমতি প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর কিছু কর্মচারিকে পুনরায় নিযুক্ত করেছিলেন। বাহাদুর শাহের পরিবারে গুপ্তচর বৃত্তি করার জন্য কিছু লোক নিয়োগ করা হয়েছিলো। বাহাদুর শাহ এবং তাঁর পরিবারকে দাক্ষিণাত্য থেকে উত্তর দিল্লীতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালের বাকি সময় তাঁকে দাক্ষিণাত্যে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব প্রদান নিষিদ্ধ করেছিলেন। শিখ গুরু তেগ বাহাদুরকে দমন করার জন্য ১৬৯৫ সালে বাহাদুর শাহকে একজন সেনাপতির সাথে পাঞ্জাব অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়েছিলো। সেনাপতি শিখ রাজাদের উপর ভারী কর আরোপ করেছিলেন। বাহাদুর শাহ শিখদের সুরক্ষিত শহর আনন্দপুর তাঁদের জন্য ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন এবং ধর্মের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা দেখে শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেছিলেন। সেই বছর বাহাদুর শাহ আকবরাবাদের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৬৯৬ সালে তাঁকে লাহোরে বদলি করা হয়েছিলো। কাবুলের গভর্নর আমিন খানের মৃত্যুর পর তাঁকে ১৬৯৯ সালে আমিন খানের স্থলাভিক্ত করা হয়েছিলো এবং ১৭০৭ তাঁর পিতার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেই পদে বাহাল ছিলেন।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ– সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়োগ না করেই আওরঙ্গজেব ১৭০৭ সালের তিন মার্চ আহমেদাবাদের ভিঙ্গরে মারা গিয়েছিলেন। বাহাদুর শাহ তখন কাবুলের গভর্নর ছিলেন এবং ছোট দুই সৎ ভ্রাতা মহম্মদ আজম শাহ এবং কামবক্স যথাক্রমে গুজরাট এবং দাক্ষিণাত্যের গভর্নর ছিলেন। তিন ভ্রাতাই সিংহাসন দাবি করেছিলেন। কামবক্স নিজের নামে মূদ্রা তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। মহম্মদ আজম শাহ নিজেকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে আগ্রা যাত্রা করার জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। মহম্মদ আজম শাহ ১৭০৭ সালের ২০ জুন-এ সংঘটিত জাজাউর যুদ্ধে বাহাদুর শাহের কাছে পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন। বাহাদুর শাহ ১৭০৭ সালের ১৯ জুন ৬৩ বছর বয়সে বাহাদুর শাহ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
সংযোজন–সিংহাসনে আরোহণ করার পর বাহাদুর শাহ রাজপুত রাজ্যগুলির যারা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন সেই রাজ্যগুলি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ১০ নভেম্বর বাহাদুর শাহ অম্বর অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। ২১ নভেম্বর ফতেহপুর চিক্রীতে সেলিম চিশতির সমাধি পরিদর্শন করে ১৭০৮ সালের ২০ জানুয়ারি আম্বের পৌঁছেছিলেন। ইতিমধ্যে বাহাদুর শাহ তাঁর সহায়কারী মিহরাব খানকে যোধপুর দখল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন অম্বরের রাজা ছিলেন জয় সিং। তাঁর ভ্রাতা বিজয় সিং তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই বিরোধের কারণে অঞ্চলটি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো এবং অম্বরের নাম পরিবর্তন করে ইসলামাবাদ রাখা হয়েছিলো। উত্তরাধিকারের যুদ্ধের সময় জয় সিং মহম্মদ আজম শাহকে সহায় করার অজুহাতে জয় সিংয়ের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো এবং ১৭০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিজয় সিংকে আম্বেরের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিলো। বাহাদুর শাহ বিজয় সিংকে মির্জা উপাধি প্রদান করেছিলেন। বিনিময়ে বিজয় সিং বাহাদুর শাহকে ১,০০,০০০ টাকা মূল্যের উপহার প্রদান করেছিলেন। এভাবেই বিনাযুদ্ধে আম্বের মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলো।
যোধপুর– আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে যশবন্ত সিং যোধপুরের রাঠোরদের নেতা ছিলেন। উত্তরাধিকারের যুদ্ধের সময় যশবন্ত সিং আওরঙ্গজেবের বড় ভ্রাতা দারা শিকোহের পক্ষে ছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের পর আওরঙ্গজেব যশবন্ত সিংকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং তিনি মোগলদের অনুগত রাজা হয়েছিলেন। ১৬৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর আগে কাবুলের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। যশবন্ত সিংয়ের মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেব তাঁর বিধবা পত্নী এবং ছেলে অজিত সিংকে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার উদ্দেশ্যে বলপূর্বক দিল্লীতে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাঠোর বংশের দুর্গাদাস রাঠোর পূর্ব থেকেই মোগলদের কাছ থেকে যোধপুর জয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে অজিত সিংকে আওরঙ্গজেবের হাত থেকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং অজিত সিং এবং বিধবাদের যোধপুর ফিরিয়ে এনেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বাহাদুর শাহের সৎ ভ্রাতা আজম শাহের কাছ থেকে দূর্গদাস রাঠোর যোধপুর উদ্ধার করেছিলেন।
মিহরাব খান মাইর্থায় অজিত সিংকে পরাজিত করার পর বাহাদুর শাহ যোধপুর যাত্রা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। ১৭০৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাহাদুর শাহ যোধপুর পৌঁছেছিলেন। বাহাদুর শাহ অজিত সিংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার অভিপ্রায়ে তাঁকে লোক পাঠিয়ে যোধপুর ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বাহাদুর শাহ অজিত সিংকে সম্মানের বিশেষ পোশাক এবং একটি রত্নখচিত পোশাক উপহার দিয়েছিলেন। তারপর তিনি সেখান থেকে আজমীরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ২৪ মার্চ আজমীর পৌঁছে দরগাহ শরিফ দর্শন করেছিলেন।
উদয়পুর– হলদিঘাটের যুদ্ধে বিজয়ের পর আকবর ১৫৭৬ সালে উদয়পুর শহর মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সিসোদিয়ারা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
বাহাদুর শাহের উদয়পুর পুনর্দখল করার ইচ্ছে ছিলো। তবে তিনি খবর পেয়েছিলেন যে আম্বের এবং যোধপুরের ঘটনার জন্য ভয় পেয়ে মহারাণা অমর সিং-দ্বিতীয় উদয়পুর থেকে পালিয়ে গিয়ে পাহাড়ে লুকিয়ে আছেন। বাহাদুর শাহ তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে দাক্ষিণাত্যে কামবক্সের বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে অভিযান স্থগিত রেখে কামবক্সের বিদ্রোহ দমন করার উদ্দেশ্যে দাক্ষিণাত্যে চলে গিয়েছিলেন।
রাজপুত বিদ্রোহ– মহম্মদ কামবক্সকে দমন করার উদ্দেশ্যে বাহাদুর শাহ দাক্ষিণাত্যে চলে যাওয়ার পর আম্বের, উদয়পুর এবং যোধপুরের শাসক মোগলদের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। রাজপুতরা প্রথমে যোধপুর এবং হিন্দাউন-বায়নার সেনানায়কদের বহিষ্কার করে রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে আম্বের উদ্ধার করেছিলেন। তাঁরা পরবর্তীতে ১৭০৮ সালের সেপ্তেম্বরে মেওয়াতের সেনানায়ক হোসেন খান বারহা এবং অন্যান্য অফিসারদের হত্যা করেছিলেন। এই সংবাদ পেয়েবাহাদুর শাহ অজিত সিং এবং জয় সিংয়ের সাথে চুক্তি করে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
কামবক্সের উত্থান– ১৭০৭ সালের মার্চ মাসে কামবক্স তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে বিজাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর খবর শহরে ছড়িয়ে পরার পর দূর্গের শাসক সৈয়দ নিয়াজ খান বিনাযুদ্ধে দূর্গটি কামবক্সের হাতে সমর্পণ করেছিলেন। কামবক্স সিংহাসনে আরোহণ করে আহসান খানকে সহস্র বাহিনীর সেনাপতি এবং তাঁর উপদেষ্টা তাবারুক খানকে উজির-ই-আজম হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন এবং নিজে পাদশাহ কামবক্স উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি পরে কুলবার্গ এবং ওয়াকিনখাড়া জয় করেছিলেন।
পরবর্তীতে তাবারুক খান এবং আহসান খানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছিলো। আহসান খান কামবক্সের অনুমতি ছাড়াই বিজাপুরে একটি মার্কেটপ্লেস গড়ে তুলেছিলেন। তবে তিনি কামবক্সকে কোনো কর দেননি। বিষয়টি তাবারুক খান কামবক্সকে অবগত করেছিলেন। কামবক্স তখন মার্কেটপ্লেস বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৭০৭ সালের মে মাসে কামবক্স আহসান খানকে গোলকুণ্ডা এবং হায়দরাবাদ জয় করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। সংবাদ পেয়ে হাদরাবাদের সুবদোর রুস্তম দিল খান আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তবে গোলকুণ্ডার শাসক আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেছিলেন।
আহসান খান, সাইফ খান (কামবক্সের ধনুর্বিদ্যার শিক্ষক), আরসান খান, আহম্মদ খান, নাসির খান এবং রুস্তম দিল খান(এঁরা সবাই কামবক্সের প্রাক্তন শিক্ষক)কে নিয়ে আহসান খান কামবক্সের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। কামবক্স জুম্মার নামাজে যাওয়ার সময় তাঁরা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলো। কামবক্স বিষয়টি তাকাররুব খানের কাছ থেকে অবগত হয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের রাতের ভোজের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। রুস্তম দিল খানকে রাস্তায় আটক করে হাতীর পায়ের নিচে ফেলে পিষ্ট করে হত্যা করা হয়েছিলো। সাইফ খানের হাত কেটে ফেলা হয়, আরশাদ খানের জিভ কেটে ফেলা হয়েছিলো। আহসান খানকে বন্দি করে কারারুদ্ধ করা হয়েছিলো এবং তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো। ১৭০৮ সালের এপ্রিল মাসে বাহাদুর শাহের দূত মক্তরব খান কামবক্সের দরবারে এসেছিলেন। তখন তাকাররুব খান কামবক্সকে অবগত করেছিলেন যে মক্তরব খান তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করতে ষড়যন্ত্র করছেন। কামবক্স মক্তরব খানকে একটি ভোজে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁর দলবলসহ হত্যা করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্য অভিমুখে যাত্রা– বাহাদুর শাহ ১৭০৮ সালের মে মাসে কামবক্সকে একটি চিঠি প্রেরণ করে আশা করেছিলেন যে, কামবক্স নিজেকে সার্বভৌম সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করার বিরুদ্ধে চিঠিটা একটি সতর্কবাণী হবে। চিঠিটা প্রেরণ করে তিনি আওরঙ্গজেবের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাত্রা করেছিলেন। কামবক্স চিঠির ব্যাখ্যা এবং ন্যায্যতা ছাড়াই বাহাদুর শাহকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন।
১৭০৮ সালের ২৮ শে জুন বাহাদুর শাহ হায়দরাবাদ পৌঁছে সংবাদ পেয়েছিলেন যে, কামবক্স মছলিবন্দর আক্রমণ করেছেন। কামবক্সের উদ্দেশ্য ছিলো, মছলিবন্দর দূর্গে লুকিয়ে রাখা ৩০ লক্ষ টাকারও বেশি মূল্যের গুপ্তধন দখল করা। তবে, প্রদেশের সুবেদার জান সিপার খান অর্থ হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেছিলেন। সুবেদারের ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়ে কামবক্স তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাঁকে যুদ্ধের জন্য চার হাজার সেনা নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জুলাই মাসে কুলবর্গা দুর্গের রক্ষক দালের খান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং কামবক্সের সঙ্গ পরিত্যাগের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। ১ নভেম্বর ওয়াকিনখেড়ার জমিদার পাম নায়েক সেনাবাহিনী ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার পর কামবক্স তাঁর জমিদারি দখল করেছিলেন। এদিকে ১৭০৮ সালের ৫ নভেম্বর বাহাদুর শাহ হায়দরাবাদ থেকে ৬৭ মাইল (১০৮ কিলোমিটার) উত্তরে অবস্থিত বিদার পৌঁছেছিলেন। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম আরভিন লিখেছেন যে, বাহাদুর শাহের শিবির যত এগিয়ে আসছিলো, কামবক্সের শিবির তত পিছিয়ে যাচ্ছিলো।
আরভিনের মতে, বাহাদুর শাহ নিকটে আসার সাথে সাথে কামবক্সের সেনা দল তাঁকে ত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলেন। তখন কামবক্সের সেনাপতি অর্থ প্রদানের ব্যর্থতার জন্য সেনারা দল ত্যাগ করে চলে যাওয়ার কথা অবগত করেছিলেন। উত্তরে কামবক্স বলেছিলেন যে, তাঁদের সেনাদলে রাখার আমার প্রয়োজন নেই, আমার বিশ্বাস ঈশ্বরের উপর, যা ভালো তাই ঘটবে।
কামবক্স পারস্যে পালিয়ে যেতে পারে ভেবে বাহাদুর শাহ তাঁর প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার খান নুসরত জংকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির গভর্নর টমাস পিটকে কামবক্সকে বন্দি করার জন্য ২,০০,০০০ টাকা প্রদান করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত কামবক্সের ২,৫০০ অশ্বারোহী এবং ৫,০০০ পদাতিক সেনা ছিলো বলে জানা যায়।
কামবক্সের মৃত্যু– ১৭০৮ সালের ২০ ডিসেম্বর কামবক্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বাহাদুর শাহ তিনশত উট এবং বিশ হাজার রকেট নিয়ে হায়দরাবাদের উপকণ্ঠে অবস্থিত তালাব-ই-মীরজুমলার দিকে যাত্রা করেছিলেন। বাহাদুর শাহ প্রথমে তাঁর পুত্র জাহান্দার শাহকে অগ্রণী বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে খান জামানকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। ১৭০৯ সালের ১২ জানুয়ারি বাহাদুর শাহ হায়দরাবাদ পৌঁছে তাঁর সেনাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এদিকে রাজকীয় জ্যোতিষী ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন যে, যুদ্ধে অলৌকিকভাবে কামবক্সই জয়ী হবেন। জ্যোতিষীর ভবিষ্যত বাণী বিশ্বাস করে কামবক্স তাঁর নগণ্য সংখ্যক সেনা নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন।
পরের দিন সূর্যোদয়ের সময় বাহাদুর শাহের সেনাবাহিনী কামবক্সকে আক্রমণ করেছিলেন। বাহাদুর শাহের ১৫,০০০ সেনা দু’টি দলে বিভক্ত ছিলো। একটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মুনিম খান। তাঁকে সহায় করছিলেন রফি-উশ-শান এবং জাহান্দার শাহ। দ্বিতীয়টি দলের নেতৃত্বে ছিলেন জুলফিকার নুসরত জং। দুই ঘণ্টা পরে কামবক্সের শিবির ঘেরাও করা হয়েছিলো এবং নুসরত জং অধৈর্য্য হয়ে কামবক্সের শিবির আক্রমণ করেছিলেন।
বাহাদুর শাহের সৈন্য সংখ্যা অধিক হওয়ার জন্য আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়ে কামবক্স নিজে যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন এবং প্রতিপক্ষ সেনা তাঁকে লক্ষ্য করে দু’টি তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। রক্তক্ষরণের ফলে কামবক্স যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন, তখন বাহাদুর শাহ তাঁকে তাঁর পুত্র বারিকুল্লাহ সহ বন্দি করেছিলেন। মুনিম খান এবং জুলফিকার নুসরত জংয়ের মধ্যে কে তাঁকে বন্দি করেছিলেন এ নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছিলো। রফি-উস-শান প্রথমজনের পক্ষে রায় ব্যক্ত করেছিলেন। কামবক্সকে পাল্কীতে করে বাহাদুর শাহের নিকটে আনা হয়েছিলো এবং পরের দিন সকালে তিনি মারা গিয়েছিলেন।
১৭০৯ সালের ২৩ জানুয়ারি তাঁকে দিল্লীতে অবস্থিত হুমায়ুনের সমাধির পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
শিখ বিদ্রোহ– গুরু গোবিন্দ সিংয়ের মৃত্যুর এক বছর পর বান্দা সিং বাহাদুরের নেতৃত্বে পাঞ্জাবে শিখরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে বাহাদুর শাহ দাক্ষিণাত্য ত্যাগ করে উত্তর ভারতের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শিখরা দিল্লীর দিকে খুব সাবধানতার সাথে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং হিসার সরকারে প্রবেশ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। ১৭০৯ সালের নভেম্বর মাসে তাঁরা সামানায় আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন এবং তাঁরা সামানার ফৌজদারকে পরাজিত করেছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর সাহাবাদ, সাধৌরা এবং বানুর দখল করার পর ১৭১০ সালের ১২ মে সিরহিন্দ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাপার চিরির যুদ্ধে মোগল ফৌজদার ওয়াজির খানকে পরাজিত এবং নিহত করে সিরহিন্দ দখল করেছিলেন।
সিরহিন্দ জয়ের পর শিখরা গাঙ্গেয় দোয়াবের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। দেওবন্দের একটি গ্রামে পৌঁছোনোর পর ধর্মান্তরিত শিখরা ফৌজদার জালাল খানের বিরুদ্ধে নিপীড়ন এবং কারাবরণের অভিযোগ করেছিলেন। তখন বান্দা সিং বাহাদুর জালালাবাদের পথে সাহারানপুর অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন। রাস্তায় শিখরা বেহতকে আক্রমণ করেছিলেন। বেহতকের পীরজাদা হিন্দু বিরোধী কাজের জন্য কুখ্যাত ছিলেন। শিখরা শহরটি দখল করে পীরজাদাদের হত্যা করেছিলেন। এর পর শিখরা জালালাবাদের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর জালাল খানকে আত্মসমর্পণ এবং বন্দি শিখদের মুক্ত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। কিন্তু জালাল খান সেই নির্দেশ প্রত্যাখান করেছিলেন। ১৭১০ সালের ২১ শে জুলাই শিখরা নানৌতায় আসেন এবং স্থানীয় শেখজাদাদের পরাজিত করেন। শিখরা এর পর জালালাবাদ অবরোধ করেন, তবে কৃষ্ণা নদীতে বন্যার কারণে অবরোধ প্রত্যাহার করে জলন্ধরের দোয়াব অঞ্চলে চলে আসেন।
শিখরা জলন্ধর এবং অমৃতসর অঞ্চল থেকে মোগলদের বিতাড়িত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা জলন্ধরের ফৌজদার শামাস খানকে কোষাগারের চাবি হস্তান্তর করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। শামাস খান প্রথমে আত্মসমর্পণের ভান করে পরে শিখদের আক্রমণ করেছিলেন। তিনি ধর্মের নামে মুসলমানদের আহ্বান জানান এবং জেহাদ ঘোষণা করেন। ১৭১০ সালের ১২ অক্টোবর-এ সংঘটিত রাহোনের যুদ্ধে শিখরা মোগলদের পরাজিত করেন। অমৃতসরে প্রায় ৮,০০০ শিখ সমবেত হয়ে মধ্য পাঞ্জাবের মাঝা এবং রিয়ারকি দখল করেন। তাঁরা লাহোরেও আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন, সেখানে মোল্লারা শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তাঁরা শিখদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
শিখরা নতুন ক্ষমতা দখল করে মোগল আধিকারিকদের বিতাড়ন করেছিলেন এবং তাঁদের জায়গায় শিখ আধিকারিকদের নিয়োগ করেছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর লোহগড়ে তাঁর রাজধানী স্থাপন করে তিনি একটি টাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি জমিদারী প্রথা বিলোপ করেছিলেন এবং কৃষকদের তাঁদের নিজের জমির মালিকানা প্রদান করেছিলেন।
দমনের প্রচেষ্টা– বান্দা সিং বাহাদুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার আগে বাহাদুর শাহ যোধপুরের অজিত সিং এবং অম্বরের মান সিংয়ের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। তিনি অবধের নবাব আসাফ-উদ-দৌলা, প্রাদেশিক গভর্নর খান-ই- দুররানি, মুরাদাবাদের ফৌজদার মহম্মদ আমিন খান চিন, দিল্লীর সুবেদার আসাদ খান এবং জম্মুর ফৌজদার ওয়াজিদ খানকে যুদ্ধে সহযোগ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। বাহাদুর শাহ ১৭১০ সালের ১৭ ই জুন পাঞ্জাবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। যাত্রাপথে তাঁর সাথে বিরোধিতা করা দলগুলিকে তিনি একত্রিত করেছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর, বাহাদুর শাহের পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত হয়ে অজিত সিং এবং মান সিংয়ের নিকট সহায় প্রার্থনা করেছিলেন। যাত্রাপথে বাহাদুর শাহ সোনিপত, কৈথাল এবং পানিপত জয় করেছিলেন। অক্টোবর মাসে বাহাদুর শাহের সেনাপতি নবাব ফিরোজ খান তাঁকে পত্র লিখে অবগত করেছিলেন যে, তিনি ইতিমধ্যে বিদ্রোহীদের তিন শত মাথা কেটে ফেলেছেন। প্রমাণ হিসাবে ফিরোজ খান মাথাগুলি বর্ণায় গেঁথে সম্রাটের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।
১৭১০ সালের ১ নভেম্বর-এ বাহাদুর শাহ কার্নাল পৌঁছোনোর পরে কাটোগ্রাফার রুস্তম দিল খান তাঁকে থানেশ্বর এবং সিরহিন্দের মানচিত্র প্রদান করেছিলেন। ছয়দিন পর শিখদের একটি ছোট দল মেওয়াতি এবং বানসওয়ালে মোগলদের কাছে পরাজিত হয়েছিলো। সিরহিন্দ শহরটি ৭ ই ডিসেম্বর আবার মোগলদের হস্তগত হয়েছিলো। সিরহিন্দ অবরোধকারী আমিন খান বাহাদুর সম্রাটকে বিজয়ের স্মরণে একটি সোনার আংটি উপহার দিয়েছিলেন। সিরহিন্দ দখলের পর সাদৌরা পুনর্দখলে ব্যর্থ হয়ে সম্রাট লোহগড়ের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। লোহগড়ে বান্দা সিং বাহাদুর লুকিয়ে ছিলেন। ৩০ নভেম্বর তিনি লোহগড় দূর্গ আক্রমণ করেছিলেন। সামান্য গোলা-বারুদ এবং কয়েকশত সেনা রেখে বান্দা সিং বাহাদুর দূর্গ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বান্দা সিংয়ের অনুসারি গোলাপ সিং বান্দা সিংয়ের মতো পোশাক পরিধান করে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংঘটিত করেছিলেন। গোলাপ সিংকে যুদ্ধে পরাজিত এবং হত্যা করা হয়েছিলো। সম্রাট কুমাওন এবং শ্রীনগরের শাসকদের আদেশ জারি করেছিলেন যে, বান্দা সিং বাহাদুর যদি তাঁদের অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁকে বন্দি করে যেন সম্রাটের কাছে প্রেরণ করা হয়।
নাহানের রাজা ভূপ প্রকাশের সাথে বান্দা সিং বাহাদুরের মিত্রতা থাকা বলে সন্দেহ করে ১৭১১ সালের জানুয়ারি মাসে ভূপ প্রকাশকে বন্দি করা হয়েছিলো। ভূপ প্রকাশের মাতৃ ভূপ প্রকাশকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য সম্রাটের কাছে অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে ভূপ প্রকাশের মাতৃ বান্দা সিং বাহাদুরের বন্দি অনুসারিদের সম্রাটের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। ফলে একমাস পর সম্রাট ভূপ প্রকাশকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুরের বিদ্রোহ দমন করার উদ্দেশ্যে শুকান খান বাহাদুর এবং হিম্মেত দিলের খানকে লাহোর প্রেরণ করা হয়েছিলো। তাঁরা বান্দা সিং বাহাদুরের বিদ্রোহ দমন করতে অসফল হয়েছিলেন। তখন সম্রাট তাঁদের সহায়ের জন্য অতিরিক্ত ৫,০০০ সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। সম্রাট রুস্তুম দিল খান এবং মহম্মদ আমিন খানকেও তাঁদের সাথে যোগদান করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো।
বান্দা সিং বাহাদুর লাহোর থেকে ৭ মাইল দূরে অবস্থিত আলহালাবে লুকিয়ে ছিলেন। মোগল শ্রমিকরা গ্রামে একটি সেতু মেরামত করার সময় বান্দা সিং বাহাদুরের অনুসারিরা মোগলদের বিভ্রান্ত করার জন্য ভুল বার্তা দিয়েছিলো যে, বান্দা সিং বাহাদুর আজমীর হয়ে দিল্লী আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছেন। বান্দা সিং বাহাদুর মোগলদের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য গ্রামের শাসক রাম চাঁদের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং ১৭১১ সালের এপ্রিল মাসে ফাতেহাবাদ অবরোধ করেছিলেন। রুস্তম জংয়ের কাছ থেকে বান্দা সিং বাহাদুর রাভি নদী পার হওয়ার সংবাদ পেয়ে সম্রাট ঈশা খানের নেতৃত্বে কামানসহ একদল সেনা প্রেরণ করেছিলেন। ঈশা খানের কাছে পরাজিত হয়ে বান্দা সিং বাহাদুর জন্ম পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ঈশা খান এবং আমিন খানের নেতৃত্বে একদল সেনা তাঁকে অনুসরণ করলেও তাঁরা তাঁকে বন্দি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সম্রাট জন্মর জমিদারদের নিকট বার্তা প্রেরণ করেছিলেন যে, সম্ভব হলে তাঁরা যেন বান্দা সিং বাহাদুরকে বন্দি করেন।
আমিন খান সুটলেজ নদীর তীরে বান্দা সিং বাহাদুরকে আক্রমণ করেছিলেন। তবে বান্দা সিং বাহাদুর গাড়োয়াল পাহাড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। ‘অজেয়’ বান্দা সিং বাহাদুরকে বন্দি করার জন্য সম্রাট অজিত সিং এবং জয় সিংয়রে নিকট সাহায্য চেয়েছিলেন। ১৭১১ সালের অক্টোবরে মোগল এবং রাজপুতদের যৌথ বাহিনী সদৌরার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর এই আক্রমণ থেকেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং বর্তমান সময়ের কুলুতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
খোতবা বিতর্ক– সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাহাদুর শাহ শিয়া ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং চতুর্থ খলিফা তথা প্রথম শিয়া ইমাম আলীকে ওয়ালি উপাধি প্রদান করে প্রতি শুক্রবারের নামাজের সময় রাজার জন্য জনসাধারণের প্রার্থনা (খোতবা) পরিবর্তন করেছিলেন। লাহোরের নাগরিকরা এই খোতবা পরিবর্তনের জন্য অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
বাহাদুর শাহ এই সমস্যা সমাধানের জন্য ১৭১১ সালের অক্টোবরে লাহোর গিয়েছিলেন এবং হাজি ইয়ার মহম্মদ, মহম্মদ মুরাদ এবং অন্যান্য সুপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে এই বিষয়ে আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন। সম্রাট ওয়ালি শব্দটিকে ন্যায্যতা প্রদানের জন্য ‘কর্তৃপক্ষের বই’(‘বুক অফ অথরিটি’ যা আইনী লেখকদের দ্বারা ব্যবহৃত আইনী পুস্তক) পড়ে শুনিয়েছিলেন। ‘সাহাদতই একজন রাজার জন্য একমাত্র কাম্য’ বলার সাথে সাথে হাজি ইয়ার মহম্মদের সাথে তর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলো। ইয়ার মহম্মদ (সম্রাটের পুত্র আজিম-উশ-শান দ্বারা সমর্থিত) সম্রাটের বিরুদ্ধে সেনা নিয়োগ করেছিলেন। তবে যুদ্ধ হয়নি। সম্রাট বিষয়টির জন্য মসজিদের খতিব (প্রধান তেলাওয়াতকারী)কে দায়ী করেছিলেন এবং তাঁকে বন্দি করেছিলেন। ২ অক্টোবর মসজিদে সেনা নিয়োগ করা হলেও পুরানা খোতবাই পাঠ করা হয়েছিলো।
মৃত্যু– ইতিহাসবিদ উইলিয়াম আরভিনের মতে বাহাদুর শাহ ১৭১২ সালের জানুয়ারিতে লাহোরে ছিলেন এবং সেখানেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিলেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষবারের জন্য জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন। ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি মারা গিয়েছিলেন। মোগল সম্রান্ত কামওয়ার খানের মতে, তিনি প্লীহা বড় হয়ে মারা গিয়েছিলেন। ১১ এপ্রিল তাঁর মৃতদেহ তাঁর বিধবা স্ত্রী মিহর পাওয়ার এবং সেনাপতি চিন কিলিচ খানের তত্ত্বাবধানে দিল্লীতে প্রেরণ করা হয়েছিলো। ১৫ মে তাঁকে মেহরাউলির মুক্তা মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। মসজিদটি কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহের নিকট অবস্থিত ছিলো। তাঁর মৃত্যুর পর জাহান্দার শাহ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন এবং তিনি ১৭১৩ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।
মুদ্রা– বাহাদুর শাহ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং তামার মূদ্রা প্রচলন করেছিলেন। যদিও তাঁর পূর্বসূরিদের মূদ্রা সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ও বাণিজ্যের জন্য ব্যবহার করা হোত। আওরঙ্গজেবর রাজত্বকালে প্রচলিত তাম্রমূদ্রা তাঁর নামের সাথে পুনঃতৈরি করা হয়েছিলো। অন্যান্য মোগল সম্রাটদের মতো তাঁর মুদ্রায় কাপলেট ব্যবহার করা হয়নি। কবি দানিশমন্দ খান মুদ্রার জন্য দু’টি লাইনের কাপলেট রচনা করেছিলেন, তবে তা অনুমোদন করা হয়নি।
নাম, উপাধি এবং বংশ – উপাধিসহ বাহাদুর শাহের পুরো নাম ছিলো ‘আবুল-নসর সাইয়েদ কুতুবুদ্দিন মহম্মদ শাহ আলম বাহাদুর শাহ বাদশাহ’। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা তাঁকে খুলদ-মঞ্জিল (জান্নাতে প্রস্থান)বলা শুরু করেছিলেন। তিনিই একমাত্র মোগল সম্রাট যিনি সাইয়েদ উপাধি ধারণ করেছিলেন। সাইয়েদ উপাধি নবী(সাঃ)এর বংশধরেরা ব্যবহার করতেন। উইলিয়াম আরভিনের মতে, তাঁর মাতামহ সৈয়দ শাহ মীরের কন্যা ছিলেন। যার কন্যা নবাব বাইজিকে আওরঙ্গজেব বিয়ে করেছিলেন।
স্ত্রী-
নিজাম বাই– (বিবাহ ১৬৬০ সাল এবং মৃত্যু ১৬৯২ সাল),
রাণী অমৃতা বাই-(বিবাহ ১৬৭১ সাল),
মিহর পাওয়ার,
আমাত–উল–হাবিব,
রাণী ছাত্তার বাই ।
সন্তান-
জাহান্দার শাহ,
ইজ্জ–উদ–দীন মির্জা,
আজিম–উশ–সান মির্জা,
দৌলত আফজা মির্জা,
জাহান শাহ মির্জা, হু
মায়ূন মির্জা,
ডাহির আফ্রোজ বানু বেগম এবং রফি–উশ–কদর। •
জাহান্দার শাহ
জাহান্দার শাহের জন্ম ১৬৬১ সালের ১০ মে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত দাক্ষিণাত্যে। তিনি অস্টম মোগল সম্রাট ছিলেন। তাঁর পিতার নাম শাহ আলম (বাহাদুর শাহ-প্রথম)এবং মাতৃর নাম নবাব বাই। নবাব বাই হায়দ্রাবাদের একজন অভিজাত নাগরিক ফতেহইয়ার জংয়ের কন্যা ছিলেন। তাঁর পিতামহের নাম আওরঙ্গজেব আলমগীর। তিনি ১৭১২ সালের ২৯ মার্চ থেকে ১৭১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র এগার মাস রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে জুলফিকার খান নুসরত জং দাক্ষিণাত্য সুবাহকে প্রায় স্বাধীন করে নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ভাতিজা ফারুখসিয়ার কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।
জাহান্দার শাহ তাঁর পিতামহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক বলখের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৭১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর জাহান্দার শাহ এবং তাঁর ভ্রাতৃ আজিম-উশ-সান উভয়েই নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ফলে উত্তরাধিকারের জন্য সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। উত্তরাধিকারের যুদ্ধে আজিম-উশ-সান ১৭১২ সালের ১৭ মার্চে নিহত হয়েছিলেন এবং জাহান্দার শাহ ১১ মাসের জন্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
সিংহাসনে আরোহণের আগে জাহান্দার শাহ একজন অত্যন্ত সফল ও সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ভারত মহাসাগর ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি সিন্ধুর সুবেদারও নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি আজিজ-উদ-দীন সহ তিন পুত্রের পিতৃ ছিলেন। আজিজ-উদ-দীন ১৭৫৪ সাল থেকে ১৭৫৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।
শাসন– জাহান্দার শাহ একজন অসফল শাসক ছিলেন এবং তাঁর দরবার প্রায়শই নাচ-গান বিনোদনের মাধ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে থাকতেন। তিনি একজন নাচের মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে মোগল সাম্রাজ্যের অভিজাতরা চমকে উঠেছিলেন। আওরঙ্গজেবের কন্যা জিনাত-উন-নিসা এই বিবাহের বিরোধিতা করেছিলেন।
কর্ণাটকের তৃতীয় নবাব সাদাতুল্ল্যাহ খান জাহান্দার শাহকে সর্বপ্রথম সম্রাট হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সাদাতুল্ল্যাহ খান ওর্ডার ডে সিংকে হত্যা করেছিলেন। কারণ সাদাতুল্ল্যাহ খান বিশ্বাস করেছিলেন যে, তিনিই ওর্ছা ফোর্টের প্রকৃত সেনাপতি ছিলেন। সাদাতুল্ল্যাহ খান জাহান্দার শাহকে মোগল সিংহাসনের দখলদারী হিসাবে অপপ্রচার শুরু করেছিলেন। জাহান্দার শাহ নিজের কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করার জন্য অটোম্যান সুলতান আহমেদ-তৃতীয়কে উপহার প্রেরণ করেছিলেন।
বিবাহ– জাহান্দার শাহের প্রথম স্ত্রী ছিলেন মির্জা মোকাররম খান সাফাভির কন্যা। ১৬৭৬ সালের ১৩ অক্টোবর বিবাহটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি মির্জা রুস্তমের কন্যা সাইয়িদ-উন-নিসাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৬৮৪ সালের ৩০ আগস্ট এই বিয়ের বাক্দান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। বাক্দান অনুষ্ঠানে কাজি আবু সাইয়িদ, আওরঙ্গজেব এবং শাহজাদা মুয়াজ্জেম (বাহাদুর শাহ প্রথম) উপস্থিত ছিলেন। ১৮ সেপ্তেম্বর বিয়ে অনষ্ঠিত হয়েছিলো। সাইয়্যেদ উন-নিসাকে ৬৭,০০০ টাকা মূল্যের অলংকার প্রদান করা হয়েছিলো। বিবাহ অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন শাহজাদী জিনাত-উন-নিসা।
জাহান্দার শাহের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন রাজপুত রাজকুমারী অনুপ বাই। তিনি শাহজাদা মহম্মদ আজিজ-উদ-দীন মির্জার মাতৃ ছিলেন। শাহজাদা আজিজ-উদ্দীন ১৬৯৯ সালের ৬ জুন জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। আজিজ-উদ-দীন আলমগীর- দ্বিতীয় উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করার ১৯ বছর আগে অনুপ বাই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
জাহান্দার শাহের চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন খাসুসিয়াত খানের কন্যা লাল কুনওয়ার। জাহান্দার শাহ তাঁকে খুব পসন্দ করতেন এবং সিংহাসনে আরোহণের পর তাঁকে ইমতিয়াজ মহল উপাধি প্রদান করেছিলেন।
মৃত্যু– ১৭১৩ সালের ১০ জানুয়ারি আগ্রার যুদ্ধে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সমর্থনের ফলে আজিম-উশ-সানের পুত্র ফার খসিয়ারের কাছে জাহান্দার শাহ পরাজিত হয়েছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি দিল্লীতে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং লাল কুনওয়ারের সাথে তাঁকে বন্দি করে নতুন সম্রাট ফারুখসিয়ারের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। ১৭১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি বন্দি অবস্থায় ছিলেন। পরে তাঁকে একজন পেশাদার হত্যাকারী দ্বারা শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিলো।
মূদ্রা– জাহান্দার শাহ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং তামার মূদ্রা প্রচলন করেছিলেন। তাঁর মূদ্রায় ‘আব-আল-ফাতেহ এবং সাহেবে কিরান কাপলেট’ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। *
নিকু সিয়ার
মির্জা মহম্মদ নিকু সিয়ারের জন্ম ১৬৭৯ সালের ৬ অক্টোবর মোগল সাম্রাজ্যে। তিনি তাইমুর-দ্বিতীয় নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম মহম্মদ আকবর এবং মাতৃর নাম সালিমা বানু বেগম। নিকু সিয়ারের পিতা মহম্মদ আকবর আওরঙ্গজেবের চতুর্থ পুত্র সন্তান ছিলেন। মহম্মদ আকবর তাঁর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং ব্যর্থ হয়ে দাক্ষিণাত্যে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তিনি সেখান থেকে পারস্যে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সেজন্য নিকু সিয়ার মোগল হারেমে প্রতিপালিত হয়েছিলেন। ১৬৯৫ সালে ১৬ বছর বয়সে তাঁর প্রপিতামহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক তিনি আসামের সুবেদার নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৭০২ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন। ১৭০২ সালে তিনি প্রপিতামহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক সিন্ধুর সুবেদার নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৭০৭ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন।
১৭১৯ সালের ১৮ মে আগ্রার স্থানীয় শাসক বীরবল (আকবরের দরবারের বীরবল নয়) শাহজাদা নিকু সিয়ারকে হারেমের কারাগার থেকে বের করে এনে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাঁকে আগ্রা দূর্গে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু নিকু সিয়ার তাঁর জীবন হারেমের অভ্যন্তরে কাটিয়েছিলেন এবং কাটামাইটে(বয়ঃ সন্ধিকালীন বালকের মতো)র মতো কথা বলতেন। তাই তাঁকে সম্রাট হিসাবে হাস্যকরভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিলো।
যাইহোক, বীরবলের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় সাইয়্যিদ হাসান আলী খান এবং সাইয়্যিদ হোসেইন আলী খান ১৭১৯ সালের ১৩ আগস্ট বীরবল এবং নিকু সিয়ারকে পরাজিত করে উভয়কেই তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিলো এবং নিকু সিয়ারকে গ্রেপ্তার করে পুনরায় হারেমের কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। এর পর তাঁকে দিল্লীর সেলিমগড় দূর্গে স্থানান্তর করা হয়েছিলো এবং নিকু সিয়ার ১৭২৩ সালের ১২ এপ্রিল ৪৩ বছর বয়সে সেলিমগড় দূর্গে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহ প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। *
ফারুখসিয়ার
ফারুখসিয়ারের জন্ম ১৬৮৩ সালের ২০ আগস্ট মোগল সাম্রাজ্যের দাক্ষিণাত্য মালভূমির আওরঙ্গাবাদে। তিন শহীদ- ই-মজলুম নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম আজিম-উশ-সান এবং মাতৃর নাম সাহিবা নিজওয়ান। আজিম-উশ- সান সম্রাট বাহাদুর শাহের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। ফারুখসিয়ার দশম মোগল সম্রাট ছিলেন এবং ১৭১৩ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ১৭১৯ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি একজন সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন এবং সহজেই উপদেষ্টাদের দ্বারা প্রভাবিত হতেন। তাঁর স্বাধীনভাবে শাসন করার ক্ষমতা, জ্ঞান এবং চরিত্রের অভাব ছিলো।
ফারুখসিয়ার ১৬৯৬ সালে তাঁর পিতা আজিম-উশ-সানের সাথে বাংলা অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭০৭ সালে আজিম-উশ-সানকে বাংলা থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং ফারুখসিয়ারকে বাংলা সুবাহের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। ফারুখসিয়ার তাঁর জীবনের প্রথম বছরগুলো ঢাকায় কাটিয়েছিলেন। তাঁর পিতামহ বাহাদুর শাহ-প্রথমের রাজত্বকালে তিনি মুর্শিদাবাদে চলে এসেছিলেন।
১৭১২ সালের ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পিতা আজিম-উশ-সান উত্তরাধিকারের যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং ফারুখসিয়ারকে স্মরণ করেছিলেন। বাহাদুর শাহের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ফারুখসিয়ার আজিমাবাদ (বর্তমান নাম পাটনা) অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন এবং ২১ শে মার্চ তাঁর পিতা আজিম-উশ-সানকে মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং তাঁর পিতার নামে মূদ্রা জারি করেছিলেন। তাঁর পিতার নামে খোতবা পাঠের নির্দেশও দিয়েছিলেন। ৬ এপ্রিল তিনি তাঁর পিতার পরাজয়ের সংবাদ শুনে আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছিলেন। তবে তাঁর হিতাকাংক্ষীরা তাঁকে আত্মহত্যা করতে বারণ করেছিলেন।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ– ১৭১২ সালে ফারুখসিয়ারের চাচা জাহান্দার শাহ তাঁর পিতা আজিম-উশ-সানকে পরাজিত এবং হত্যা করে মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ফারুখসিয়ার তাঁর পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য জাহান্দার শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তাঁর সাথে যোগদান করেছিলেন বাংলার সৈয়দ হোসেন আলী খান এবং তাঁর ভ্রাতৃ এলাহাবাদের সুবেদার আবদুল্ল্যাহ খান ।
ফারুখসিয়ার বাহিনী আজিমাবাদ থেকে এলাহাবাদ পৌঁছোনোর পরে তাঁরা জাহান্দার শাহের সেনাপতি সৈয়দ আব্দুল গাফ্ফার খান গার্দেজির ১২,০০০ সেনার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন। ফলে আবদুল্ল্যাহ খান এলাহাবাদ দূর্গে পিছু হটে গিয়েছিলেন। যাইহোক, ইতিমধ্যে গার্দেজির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং গার্দেজির মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে গার্দেজির সেনা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিলো। ফলে শেষমুহূর্তে ফারুখসিয়ার বাহিনী যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন।
যুদ্ধে পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে জাহান্দার শাহ সেনাপতি খাজা আহসান এবং তাঁর পুত্র আজউদ্দিনকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করেছিলেন। তাঁরা খাজওয়াহ পৌঁছে সংবাদ পেয়েছিলেন যে, ফারুখসিয়ারের সাথে হোসেন আলী খান এবং আবদুল্ল্যাহ খান যোগদান করেছেন। আবদুল্ল্যাহ খানের নেতৃত্বে ফারুখসিয়ার বাহিনী সংঘর্ষ শুরু করেছিলেন। একরাত ব্যাপী যুদ্ধের পর আজউদ্দিন এবং খাজা আহসান খান যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তাঁদের ক্যাম্পটি ফারুখসিয়ারের হস্তগত হয়েছিলো।
১৭১৩ সালের ১০ জানুয়ারি ফারুখসিয়ার বাহিনী এবং জাহান্দার শাহ বাহিনী বর্তমান উত্তর প্রদেশের আগ্রা থেকে ১৪ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত সামুগড়ে মিলিত হয়েছিলো। উক্ত যুদ্ধে জাহান্দার শাহ পরাজিত এবং বন্দি হয়েছিলেন। পরের দিন ফারুখসিয়ার নিজেকে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ফারুখসিয়ার লালকেল্লা দখল করে মোগল রাজধানী দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন। জাহান্দার শাহকে হত্যা করে তাঁর মাথাটি বাঁশের শলাকায় গেঁথে একজন জল্লাদ হাতীর পিঠে বসে প্রদর্শন করছিলো এবং দেহটি অন্য একটি হাতীর পিঠে বহন করা হয়েছিলো।
সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে শত্রুতা– ১৮ শ শতকে সাইয়্যিদ হাসান আলী খান এবং সাইয়্যিদ হোসেইন আলী খান মোগল সম্রাজ্যে খুব প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা নিজেদের সাইয়্যিদ এবং হজরত মহম্মদ(সাঃ)এর কন্যা ফাতিমা(রহঃ) এবং হজরত আলী(করমুল্লাহর) বংশধর বলে দাবি করতেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এরাঁ মোগল দরবারে খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা ইচ্ছামতে সম্রাটদের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করতেন বা সিংহাসনচ্যূত করতেন। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সহায়তায় ফারুখসিয়ার জাহান্দার শাহকে পরাজিত করার পর তাঁরা তাঁদের অন্য একজন ভ্রাতা আবদুল্লাহ খানের জন্য উজির (প্রধানমন্ত্রী) পদ দাবি করেছিলেন। কিন্তু ফারুখসিয়ার ইতিমধ্যেই পদটি গাজিউদ্দিন খানকে প্রদান করেছিলেন, সেজন্য ফারুখসিয়ার তাঁদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং আবদুল্লাহকে ওয়াকিল-ই-মুতলাক নামে একটি রিজেন্ট (রাজার অবর্তমানে শাসনকার্য পরিচালনা করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত) পদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ খান এই বলে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে, তিনি আসলে উজির-এ-আজম পদের জন্য যোগ্য। কারণ যেহেতু তিনি জাহান্দার শাহের বিরুদ্ধে ফারুখসিয়ারের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। ফারুখসিয়ার শেষপর্যন্ত তাঁদের দাবি মেনে নিয়েছিলেন এবং আবদুল্লাহকে উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।
ইতিহাসবিদ উইলিয়াম আরভিনের মতে, ফারুখসিয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মীরজুমলা-তৃতীয় এবং খান দাউরান ফারুখসিয়ারের মনে সন্দেহের বীজ রোপন করেছিলেন এই বলে যে, সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় সম্রাটের কাছ থেকে সিংহাসন কেড়ে নিতে পারেন। এই সম্পর্কে অবগত হয়ে সাইয়্যিদ হোসেইন আলী খান আব্দুল্লাহ খানকে পত্র লিখে অবগত করেছিলেন যে, শাহজাদার কথা-বর্তা এবং কাজের প্রকৃতি দেখে, শাহাজাদা তাঁদের সম্পাদিত সেবার দাবিকে গুরুত্ব প্রদান না করে বিশ্বাস তথা কথা ভঙ্গকারী এবং সম্পূর্ণরূপে লজ্জাহীন ব্যক্তির পরিচয় দিচ্ছেন। নতুন সার্বভৌমের পরিকল্পনার তোয়াক্কা না করে তাঁদের স্বার্থে আমাদের কাজ করা প্রয়োজন।
অজিত সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান– মহারাজা অজিত সিং মারোয়ারী অভিজাতদের সমর্থনে আজমীর দখল করে মোগল কূটনীতিবিদদের তাঁর রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। ফারুখসিয়ার তাঁকে বশীভূত করার জন্য সৈয়দ হোসেইন আলী খানকে প্রেরণ করেছিলেন। এদিকে মোগল দরবারের সাইয়্যিদ ভ্রাতৃ বিরোধী দল সাইয়্যিদ হোসেন আলীকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। সৈয়দ হোসেন আলী খানকে পরাজিত করতে পারলে পুরস্কার প্রদানের আশ্বাস প্রদান করে ফারুখসিয়ারকে অজিত সিংয়ের নিকট চিঠি লিখতে বাধ্য করেছিলেন। হোসেন আলী খান ১৭১৪ সালের ৬ জানুয়ারি আজমীরের উদ্দেশ্যে দিল্লী ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন সরবুলন্দ খান এবং আফ্রাসিয়াব খান। হোসেন আলী খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে হোসেন আলী খান সরাই সাহলে পৌঁছোনোর পর অজিত সিং শান্তি আলোচনার জন্য দূত প্রেরণ করেছিলেন। তবে সেই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিলো। হোসেইন আলী খান যোধপুর, জয়সেলমার এবং মাইর্থা হয়ে আজমীরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে অজিত সিং মোগল সেনাপতিকে যুদ্ধ থেকে বিরত করার আশায় মরুভূমির দিকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। হোসেইন আলী খান অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে অজিত সিং মাইর্থায় মোগল বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ফলস্বরূপ, শান্তি চুক্তির মাধ্যমে রাজস্থানে মোগল কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। চুক্তির শর্ত হিসাবে অজিত সিং তাঁর কন্যা ইন্দিরা কানওয়ারকে ফারুখসিয়ারের নিকট বিয়ের কনে হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর পুত্র অভয় সিংকে ইন্দিরা কানওয়ারের সাথে মোগল দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
জাটদের বিরুদ্ধে অভিযান– দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে আওরঙ্গজেব প্রায় ২৬ বছর অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ফলে উত্তর ভারতে স্থানীয় শাসকদের উত্থান হয়েছিলো এবং মোগল কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে জাটদেরও উত্থান হয়েছিলো। ১৭১৩ সালের প্রথম দিকে ফারুখসিয়ার আগ্রার সুবেদার ছাবেলা রামকে জাট নেতা ছুরামনের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করেছিলেন। তবে ছাবেলা রামের সেই অভিযান ব্যর্থ হয়েছিলো। পরে ছাবেলা রামের উত্তরসূরি সামসামুদ দৌলা খান ছুরামনকে মোগল সম্রাটের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছিলেন। রাজা বাহাদুর রাঠোর সামসামুদ দৌলা খানের সাথে মোগল দরবারে গিয়েছিলেন। তবে ফারুখসিয়ারের সাথে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিলো।
১৭১৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাজা জয় সিং-দ্বিতীয় জাট নেতা চুরামনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। চুরামন তখন থুনে দূর্গে ছিলেন। সংবাদ পেয়ে জয় সিং-দ্বিতীয় থুনে দূর্গ অবরোধ করেছিলেন। ডিসেম্বরে চুরামনের পুত্র মুহকাম সিং দূর্গ থেকে বের হয়ে জয় সিং-দ্বিতীয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেছিলেন। মোগলদের গোলাবরুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় জয় সিং-দ্বিতীয় সৈয়দ মুজাফ্ফর খানকে আগ্রার অস্ত্রাগার থেকে বারুদ, রকেট এবং সীসার ঢিবি আনার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১৭১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় এক বছর অবরোধ চলছিলো। এদিকে ১৭১৭ সালে দেরিতে বৃষ্টি আসার জন্য জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গিয়েছিলো। ফলে জয় সিং-দ্বিতীয় অবরোধ চালিয়ে যাওয়াটা কঠিন মনে করেছিলেন। অভিযান শক্তিশালী করার জন্য জয় সিং-দ্বিতীয় ফারুখসিয়ারের নিকট পত্র লিখেছিলেন যে, তিনি জাটদের সাথে অনেকবার মুখামুখি হয়েছেন। এখন তাঁর সহায়ের প্রয়োজন। তবে, জয় সিংয়ের পত্র ফারুখসিয়ারকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলো। সেজন্য জয় সিং তাঁর দিল্লীর এজেন্টের মাধ্যমে সৈয়দ আবদুল্লাহ খানকে জানিয়েছিলেন, যে তিনি যুদ্ধে জয়ী হলে সম্রাটকে ত্রিশ লক্ষ টাকা এবং মন্ত্রীকে দুই মিলিয়ন টাকা দিবেন। সৈয়দ আবদুল্লাহ খান এবং ফারুখসিয়ারের মধ্যে আলোচনা সফল হওয়ায় তিনি জয় সিংয়ের দাবি মেনে নিয়েছিলেন এবং চুরামনকে মোগল দরবারে আনার জন্য সৈয়দ খান জাহানকে প্রেরণ করেছিলেন। অবরোধের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ফারুখসিয়ার জয় সিংকে একটি ফরমানও পাঠিয়েছিলেন।
১৭১৮ সালের ১৯ এপ্রিল চুরামনকে ফারুখসিয়ারের নিকট হাজির করা হয়েছিলো এবং চুরামন মোগল কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে শান্তি আলোচনার জন্য সন্মত হয়েছিলেন। খান জাহানকে বাহাদুর উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিলো যে, চুরামন সৈয়দ আব্দুল্লাহ খানের মাধ্যমে ফারুখসিয়ারকে নগদ ৫০ লক্ষ টাকা এবং অন্যান্য জিনিসপত্র প্রদান করবেন।
শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং বান্দা বাহাদুরের হত্যা– বান্দা সিং বাহাদুর একজন শিখ নেতা ছিলেন। ১৭০০ সালের প্রথম দিকে তিনি পাঞ্জাবের কিছু অঞ্চল দখল করেছিলেন। মোগল সম্রাট বাহদুর শাহ প্রথম বান্দা সিং বাহাদুরকে দমন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
১৭১৪ সালে সিরহিন্দের ফৌজদার জয়নুদ্দিন আহমদ খান রোপারের নিকটে শিখদের আক্রমণ করেছিলেন। ১৭১৫ সালে বান্দা সিং বাহদুরকে পরাজিত করার জন্য ফারুখসিয়ার কামরুদ্দিন খান, আব্দুস সামাদ খান এবং জাকারিয়া খান বাহাদুরের অধীনে ২০,০০০ সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। গুরুদাসপুরে বান্দা সিং বাহাদুরকে আট মাস অবরোধ করে রাখার পর গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে বান্দা সিং বাহাদুর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০০ জন সঙ্গীসহ বান্দা সিং বাহাদুরকে আটক করে সিরহিন্দ শহরের চারপাশে কুচকাওয়াজ করে দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়েছিলো।
বান্দা সিং বাহাদুরকে একটি লোহার খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছিলো এবং তাঁর সঙ্গীদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিলো। তাঁদেরকে তাঁদের ধর্ম পরিত্যাগ করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিলো এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া শিখদের মুক্ত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছিলো। উইলিয়াম আরভিনের মতে, একজন বন্দিও ধর্মান্তরিত হোননি। তাঁরা ধর্মান্তরিত হতে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে বন্দি শিখদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো। ৭৮০ জন বন্দি শিখ, ২০০০ শিখের মাথা বর্ণায় ঝুলিয়ে দিল্লীতে আনা হয়েছিলো। ফারুখসিয়ার বাহিনী লালকেল্লায় পৌঁছোনোর পর ফারুখসিয়ার বান্দা সিং বাহাদুর, বাজ সিং, ফতেহ সিং এবং তাঁর সঙ্গীদের ত্রিপোলিয়ায় বন্দি করে রাখার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। দিল্লীর ধনী খত্রীরা বান্দা সিং বাহাদুরের মুক্তির বিনিময়ে অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে ১৭১৬ সালের ১৯ জুন বান্দা সি বাহাদুর ও তাঁর অনুসারিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরা করা হয়েছিলো। প্রথমে বান্দা সিং বাহাদুরের চোখ উপরে ফেলা হয়েছিলো, তাঁর চামড়া তুলে ফেলা হয়েছিলো এবং পরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো।
বাণিজ্যে ছাড়– ১৭১৭ সালে ফারুখসিয়ার ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে মোগল সাম্রাজ্যে বসবাস এবং বাণিজ্য করার অধিকার প্রদান করে ফরমান জারি করেছিলেন। বার্ষিক ৩,০০০ টাকার বিনিময়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করার অধিকার প্রদান করা হয়েছিলো। বাণিজ্যে ছাড় প্রদানের কারণ ছিলো উইলিয়াম হ্যামিলটন কোম্পানীর সাথে যুক্ত একজন সার্জন ফারুখসিয়ারের রোগ নিরাময় করেছিলেন। পণ্য চলাচলের জন্য কোম্পানীকে দস্তক (পাস) প্রদানের অধিকার প্রদান করে ফরমান জারি করা হয়েছিলো। এই অধিকার কোম্পানীর কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
এই ফরমান যোগে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী বাংলা প্রদেশেও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করার অধিকার পেয়েছিলেন। ফলে বাংলার নবাব আলীবর্দি খান ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। বাংলার পরবর্তী নবাব মীর কাশিম স্থানীয় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অবস্থান কোম্পানীর সমকক্ষ রাখার জন্য ভারতীয় ব্যবসায়ীদের শুল্কও বাতিল করেছিলেন ।
সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে চূড়ান্ত লড়াই– ১৭১৭ সালের মধ্যে ফারুখসিয়ার মীরজুমলা-তৃতীয়কে তাঁর পক্ষে নথিতে স্বাক্ষর প্রদানের অধিকার প্রদান করেছিলেন। ফলে মীরজুমলা-তৃতীয় উজির-এ-আজম সৈয়দ আব্দুল্লাহ খানের সাথে পরামর্শ ছাড়াই জায়গির এবং মনসবের প্রস্তাব অনুমোদন করা শুরু করেছিলেন। সৈয়দ আব্দুল্লাহ খানের ডেপুটি রতন চাঁদ কাজের বিনিময়ে তাঁর হয়ে ঘুষ গ্রহণ করতেন এবং রাজস্ব চাষে জড়িত হয়েছিলেন। মোগল সম্রাট দ্বারা এসব কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে মীরজুমলা-তৃতীয় ফারুখসিয়ারকে বলেছিলেন যে, সাইয়্যিদ ভ্রাতৃরা কাজের জন্য অনুপযুক্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের ক্ষমতাচ্যূত করার আশায় ফারুখসিয়ার সামরিক প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন এবং মীরজুমলা এবং খান দৌরানের অধীনে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলেন।
সৈয়দ হোসেন আলী খান ফারুখসিয়ারের পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলিতে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার কথা ভেবেছিলেন। তাঁকে নিজাম-উল-মুলকের পরিবর্তে দাক্ষিণাত্যের ভাইসরয় হিসাবে নিযুক্ত করতে বলেছিলেন, কিন্তু ফারুসিয়ার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে নিজাম-উল-মুলক হিসাবে দাক্ষিণাত্যে স্থানান্তর করেছিলেন। ফলে ফারুখসিয়ারের সমর্থকদের আক্রমণের ভয়ে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় সামরিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন। ফারুখসিয়ার প্রথমে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের পিষে ফেলার জন্য আমিন খানকে দায়িত্ব অর্পণের কথা ভাবছিলেন, কিন্তু আমিন খানকে পরে অপসারণ করা কঠিন হবে ভেবে তিনি এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন।
সৈয়দ হোসেন আলী খান দাক্ষিণাত্যে এসে ১৭১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মারাঠা শাসক শাহু-প্রথমের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন। চুক্তির মাধ্যমে শাহুকে দাক্ষিণাত্যে সারদেশমুখী কর(করের উপরে সারদেশমুখী ছিলো ১০ শতাংশ কর। এটি রাজাকে প্রদান করা শ্রদ্ধা ছিলো।) সংগ্রহের অনুমতি প্রদান করে বেরার এবং গাণ্ডোয়ানার শাসন ভার প্রদান করেছিলেন। বিনিময়ে শাহু-প্রথম মোগলদের বার্ষিক ১০ লক্ষ টাকা প্রদান এবং সৈয়দদের জন্য ১৫,০০০ সেনা রাখতে সন্মত হয়েছিলেন। এই চুক্তি ফারুখসিয়ারের অনুমোদন ছাড়াই স্বাক্ষর করা হয়েছিলো। ফলে চুক্তির বিষয়ে অবগত হয়ে ফারুখসিয়ার সৈয়দ হোসেন আলী খানের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
মোগল সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলি–
উত্তর ভারত
প্রদেশ শাসক
আগ্রা সামস-উদ-দৌলা খান
আজমীর সৈয়দ মুজাফ্ফর খান বারহা
এলাহাবাদ খান জাহান
অবধ সরবুল্লাহ খান
বেঙ্গল ফারখন্দ খান
বিহার সৈয়দ হোসেন আলী খান
দিল্লী মহম্মদ ইয়ার খান
গুজরাট শাহাদাত খান
কাবুল বাহাদুর নাসির জং
কাশ্মীর সাদাত খান
লাহোর আব্দুস সামাদ খান
মালওয়া রাজা জয় সিং
মুলতান কুতুব-উল-মুলক
উড়িষ্যা মুর্শিদকুলি খান
দক্ষিণ ভারত
বেরার ইয়াজ খান
বিদার আমিন খান
বিজাপুর মনসুর খান
বুরহানপুর শুকুরুল্লাহ খান
হায়দ্রাবাদ ইউসুফ খান
ক্ষমতাচ্যুত– ১৭১৩ সালে ফারুখসিয়ার মারওয়ারের অজিত সিংকে ঠাট্টা সুবাহের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু অজিত সিং দরিদ্র প্রদেশে যেতে অস্বীকার করেছিলেন। তখন অজিত সিংকে বশীভূত করার জন্য সম্রাট সৈয়দ হোসেন আলী খানকে প্রেরণ করেছিলেন। এদিকে সৈয়দ হোসেন আলী খানকে পরাজিত করতে পারলে পুরস্কার প্রদানের আশ্বাস দিয়ে অজিত সিংয়ের নিকট সম্রাট গোপনে একটি ব্যক্তিগত পত্র প্রেরণ করেছিলেন। অজিত সিং সৈয়দ হোসেন আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে শান্তি চুক্তি করেছিলেন এবং সৈয়দ হোসেন আলী তাঁকে অদূরে গুজরাটে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন। ফলে অজিত সিং ঠাট্টা সুবাহের গভর্নর পদ গ্রহণ করেছিলেন। এই চুক্তির আরেকটি শর্ত ছিলো সম্রাটের সাথে তাঁর কন্যা বাই ইন্দিরা কানওয়ারের বিয়ে।
অজিত সিং ১৭১৯ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ফারুখসিয়ারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। অজিত সিং ফারুখসিয়ারকে লালকেল্লায় অবরোধ করে রেখেছিলেন এবং রাতব্যাপী যুদ্ধের পর তিনি প্রাসাদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কুতুব-উল-মুলক অজিত সিংকে প্রাসাদে প্রবেশে বাধা প্রদান করার চেষ্টা করেছিলেন। ক্ষুব্ধ হয়ে অজিত সিং তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছিলেন এবং রাজপুত ও পাঠান সেনাদের প্রাসাদে প্রবেশ করে ফারুখসিয়ারকে আটক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ফারুখসিয়ার তাঁর মাতৃ, স্ত্রী এবং কন্যাদের সাথে হারেমে লুকিয়ে ছিলেন। পাঠান সেনারা হারেমে প্রবেশ করে তাঁকে আটক করেছিলেন। ফারুখসিয়ার প্রথমে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও তাঁর সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো। তাঁকে আটক করে ত্রিপোলিয়া গেটের কাছে অবস্থিত একটি ছোটগৃহে নিয়ে আসা হয়েছিলো। সেখানে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিলো এবং পরে একটি সুই দিয়ে তাঁকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। মোগল কর্মকর্তারা তাঁর জন্য করুণা ভিক্ষা করেছিলেন। অজিত সিংয়ের এই কার্যের বিরুদ্ধে জয়পুরের রাজা জয় সিং এবং হায়দরাবাদের নিজাম-উল-মুলক হুমকি দিয়েছিলেন, তবে তাঁরা কেউ পরে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি।
১৭১৯ সালের ২ শে মার্চ শাহজাদাদের মধ্য থেকে রফি-উদ-দারজাতকে বেছে নিয়ে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সহায়তায় অজিত সিং রফি-উদ-দারজাতের হাতে ধরে মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।
পারিবারিক জীবন– ফারুখসিয়ার প্রথম বিয়ে করেছিলেন মীর মহম্মদ তাকির কন্যা ফখর-উন-নিসা বেগমকে। তিনি গওহর-উন-নিসা নামেও পরিচিত ছিলেন।
ফারুখসিয়ার দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন, মহারাজা অজিত সিংয়ের কন্যা বাই ইন্দিরা কানওয়ারকে। ফারুখসিয়ারের রাজত্বের চতুর্থ বছরে ১৭১৫ সালের ২৭ শে মার্চ এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তাঁদের কোনো সন্তান-সন্ততি ছিলেন না। ফারুখসিয়ার ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর ১৭১৯ সালের ১৭ ই জুলাই তিনি রাজকীয় হারেম ত্যাগ করে তাঁর সম্পত্তি নিয়ে পিতৃগৃহে ফিরে এসেছিলেন এবং বাকি জীবন পিতৃগৃহেই কাটিয়েছিলেন।
ফারুখসিয়ারের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন কিশতওয়ারের রাজা জয়া সিংয়ের কন্যা বাই ভুপ দেবী। জয়া সিং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং বখতিয়ার খান নামে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কিরাত সিং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। ১৭১৭ সালে দিল্লীর মুফতির একটি বার্তার জবাবে কিরাত সিং তাঁর ভ্রাতা মিয়া মহম্মদ খানের সাথে বাই ভূপ দেবীকে দিল্লীতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফারুখসিয়ার তাঁকে বিয়ে করার পর ১৭১৭ সালের তিন জুলাই রাজকীয় হারেমে প্রবেশ করেছিলেন।
মূদ্রা– ফারুখসিয়ারের রাজত্বকালে জারি করা মূদ্রায় নিন্মলিখিত বাক্যাংশ খোদিত ছিলো-
সিক্কা জাদ আল ফজল-ই-হক বার সিম জার
পাদশাহ-ই-বাহর- ও-বার ফারুখসিয়ার।
(সত্যি ঈশ্বরের কৃপায় রূপার উপর আঘাত করা হয়েছে এবং স্বর্ণ, স্থল ও সমুদ্রের সম্রাট ফারুখসিয়ার ) ।
লাহোর যাদুঘর এবং কলকাতার ভারতীয় যাদুঘরে ফারুখসিয়ারের শাসনামলের ১১৬ টি মূদ্রা রক্ষিত রয়েছে। মুদ্রাগুলি কাবুল, কাশ্মীর, আজমীর, এলাহাবাদ এবং বিদারে প্রস্তুত করা হয়েছিলো।
নাম– ফারুখসিয়ারের পুরো নাম ছিলেন আবুল মুজাফ্ফর মুইনুদ্দিন মহম্মদ ফারুখসিয়ার বাদশাহ। মরণোত্তরভাবে তিনি ‘শহীদ-ই-মরহুম’ (রহমতের সাথে প্রাপ্ত শহীদ) নামে পরিচিত হয়েছিলেন।
মৃত্যু– ১৭১৯ সালের ১৯ এপ্রিল ফারুখসিয়ার দিল্লীতে ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
কীর্তি–দিল্লী থেকে ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত গুরগাঁও জেলার ফারুখনগর শহর ফারুখসিয়ারের নামে নামকরণ করা হয়েছিলো। তাঁর শাসনামলে সেখানে তিনি শীশ মহল এবং একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। উত্তর প্রদেশের ফারুখাবাদ শহরও তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছিলো। *
রফি–উদ–দারজাত
রফি-উদ-দারজাতের জন্ম ১৬৯৯ সালের ১ ডিসেম্বর। তিনি বাহাদুর শাহ-প্রথমের পুত্র রফি-উস-শানের কনিষ্ঠ পুত্র এবং আজিম-উস-সানের ভাতিজা ছিলেন। তাঁর মাতৃর নাম ছিলেন নূর-উন-নিসা বেগম। তিনি একাদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। মারওয়ারের রাজা অজিত সিং ফারুখসিয়ারকে ক্ষমত্যচ্যূত করে ১৯১৯ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। অজিত সিং এবং সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় তাঁকে পুতুল রাজা হিসাবে প্রক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
রফি-উদ-দারজাতের শাসনকাল অশান্তিতে ভরা ছিলেন। ১৭১৯ সালের ২০ শে ফেব্রুয়ারি সিংহাসনে আরোহণ করার তিন মাসেরও কম সময়রে মধ্যে রফি-উদ-দারজাতের চাচা নিকুসিয়ার নিজেকে রাফি-উদ-দারজাতের চেয়ে বেশি উপযুক্ত ভেবে আগ্রা দূর্গে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় রফি-উদ-দারজাতের সিংহাসন রক্ষা এবং অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। নিকুসিয়ার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় আগ্রা দূর্গ অবরোধ করেছিলেন। অবরোধের ফলে নিকুসিয়ার আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং তাঁকে বন্দি করা হয়েছিলো। তাঁকে আমির-উল-উলামা সন্মানের সাথে সলিমগড় দূর্গে বন্দি করে রেখেছিলে এবং সেখানে তিনি ১৭২৩ সালের ১২ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
মৃত্যু– মৃত্যুর আগে রফি-উদ-দারজাত তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রফি-উদ-দৌলাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তিন মাস ছয় দিন রাজত্ব করার পর ১৯১৯ সালের ৬ জুন তিনি সিংহাসনচ্যূত হয়েছিলেন। দুইদিন পর তাঁর ভ্রাতা রফি-উদ-দৌলা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। রফি-উদ-দারজাত যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭১৯ সালের ৬ জুন আগ্রায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর মৃতদেহ মেহরাউলিতে সুফি সাধক খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর মাজারের নিকেট সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। •
শাহজাহান–দ্বিতীয়(রফি–উদ–দৌলা)
শাহ জাহান-দ্বিতীয়ের জন্ম ১৬৯৬ সালের জুন মাসে। তিনি রফি-উদ-দৌলা নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি দ্বাদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। তাঁর পিতার নাম রফি-উশ-সান এবং মাতৃর নাম বিয়াত-উন-নিসা বেগম। রফি-উশ-সান বাহাদুর শাহ-প্রথমের দৌহিত্র ছিলেন। শাহ জাহান-দ্বিতীয় তাঁর ছোট ভ্রাতৃ রফি-উদ-দারজাত যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর ১৭১৯ সালের ৬ জুন সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের দ্বারা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ৮ জুন দিল্লীর লালকেল্লায় তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিলো। তিনি এক সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি শাহ জাহান-দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি রফি-উদ-দারজাতের চেয়ে আঠারো মাসের বড় ছিলেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন কিনা বা তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততি ছিলো কিনা তা অজ্ঞাত ।
শাসন– ছোট ভ্রাতৃ রফি-উদ-দারজাতের মতোই শাহ জাহান-দ্বিতীয়কে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের দ্বারা নির্বাচিত করা হয়েছিলো। তিনি নামমাত্র সম্রাট ছিলেন, কার্যত তাঁর কোনো ক্ষমতাই ছিলেন না। ১৩ জুন প্রথমবারের মতো তাঁর নামে খোতবা পাঠ করা হয়েছিলো। দিওয়ান-ই-আমে তাঁর প্রথম উপস্থিতি ছিলো ১১ ই জুন। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের যেকোনো একজনের উপস্থিতি ছাড়া তাঁকে কোনো সন্মানিত ব্যক্তি অথবা জুম্মার নামাজে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হতোনা।
মৃত্যু– শাহ জাহান-দ্বিতীয় তাঁর ছোট ভ্রাতৃর মতো যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি একজন শাসক হিসাবে দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক এবং মানসিকভাবে অযোগ্য ছিলেন। তিনি ১৭১৯ সালের ১৮ সেপ্তেম্বর ফতেহপুর চিক্রীর নিকটে অবস্থিত বিদ্যাপুরে ২৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁকে দিল্লীর কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহের পাশে রফি-উদ-দরজাতের সমাধির পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
মহম্মদ ইব্রাহীম(জাহাঙ্গীর–দ্বিতীয়)
মহম্মদ ইব্রাহীমের জন্ম ১৭০৩ সালের ৯ আগস্ট লালকেল্লার ত্রিপুলি গেট কারাগারে। তিনি জাহাঙ্গীর-দ্বিতীয় নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি বাহাদুর শাহ -প্রথমের পুত্র রফি-উস-শানের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তাঁর মাতৃর নাম ছিলেন নূর-উন- নিসা বেগম। নূর-উন-নিসা শেখ বাকির কন্যা ছিলেন। রফি-উস-শান পিতামহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক মালকাদর কিলাদার নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেখানে নিয়োজিত ছিলেন। মহম্মদ ইব্রাহীম সম্রাট রফি-উদ-দারজাত এবং শাহ জাহান-দ্বিতীয়ের ভ্রাতৃ ছিলেন। ১৭০৭ সালের ২ ডিসেম্বর তাঁকে ৭০০০ এবং ২০০০ ঘোড় সওয়ারের পদ মর্যদা প্রদান করা হয়েছিলো।
শাসন– রফি-উদ-দৌলা(শাহ জাহান-দ্বিতীয়)এর মৃত্যুর পর ১৭২০ সালের ১৫ অক্টোবর মহম্মদ ইব্রাহীমকে কারাগার থেকে বের করে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় তাঁকে ভ্রাতৃর উত্তরসূরি হিসাবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি জাহাঙ্গীর-দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন। দিল্লীর শাসক সৈয়দ জাহান খান, মহম্মদ ইব্রাহীমের হিংস্র মেজাজের জন্য খুজিস্তা আখতারের পুত্র তাঁর চাচাতো ভ্রাতৃ রওশন আখতার মহম্মদ শাহকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। হাসানপুরের যুদ্ধে মহম্মদ ইব্রাহীম, মহম্মদ শাহের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন এবং ১৭২০ সালের ১৩ নভেম্বর তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহজাহানবাদের দূর্গ কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। খুশ- হাল চাঁদ তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে বলেছিলেন- মহম্মদ ইব্রাহীমের রাজত্বকাল ঘাসের উপর শিশির বিন্দুর মতো স্বল্পস্থায়ী ছিলো।
মৃত্যু– ১৭৪৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ৪৩ বছর বয়সে মহম্মদ ইব্রাহীম মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ১৩ শতকের সুফি সাধক কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহ প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
মহম্মদ শাহ
মির্জা নাসির উদ্দিন মহম্মদ শাহের জন্ম ১৭০২ সালের ৭ আগস্ট মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত আফগানিস্থানের গজনীতে। তিনি মহম্মদ শাহ রঙ্গিলা নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম খুজিস্তা আকতার (জাহান শাহ) এবং মাতৃর নাম ফখর-উন-নিসা বেগম। খুজিস্তা আকতার বাহাদুর শাহ-প্রথমের চতুর্থ সন্তান ছিলেন এবং তিনি জাহান শাহ নামে পরিচিত ছিলেন। মহম্মদ শাহ ছিলেন ত্রয়োদশ মোগল সম্রাট। তিনি ১৭১৯ সালের ১৭ সেপ্তেম্বর থেকে ১৭৪৮ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তিনি সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের সহায়তায় মাত্র ১৬ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় তাঁকে হাতের পুতুল হিসাবে ব্যবহার করছিলেন এবং সৈয়দ আসফ জাহ-প্রথমের সহায়তায় তিনি সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। ১৭২০ সালে সৈয়দ হোসেন আলী খান ফতেহপুর চিক্রীতে খুন হয়েছিলেন এবং সৈয়দ হাসান আলী বারহা ১৭২২ বিষ পান করার ফলে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
মহম্মদ শাহ সঙ্গীত, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক উন্নয়ন সহ শিল্পকলার একজন মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর ডাকনাম ছিলো সদা রঙ্গিলা। তাঁকে প্রায়শই মহম্মদ শাহ রঙ্গিলী নামে অভিহিত করা হতো। কখনো কখনো তাঁকে তাঁর পিতামহ বাহাদুর শাহ রঙ্গিলা নামেও অভিহিত করা হতো। তিনি যদিও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর রাজত্বকাল মোগল সাম্রাজ্যের দ্রুত অপরিবর্তনীয় পতন দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিলো। মোগল সাম্রাজ্য ইতিমধ্যেই যদিও ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় ছিলো, নাদির শাহের ভারত আক্রমণ এবং পরবর্তীতে মোগল রাজধানী স্থানান্তরের ফলে পতনের গতি ত্বরান্বিত হয়েছিলো। ঘটনার গতিপথ প্রত্যক্ষ করে শুধু মোগলরাই নন, ব্রিটিশসহ অন্যান্য বিদেশীদেরও হতবাক এবং হতাশ করেছিলো।
শাসন- ১৭১৯ সালের ২৯ সেপ্তেম্বর মহম্মদ শাহ আবু আল ফাতাহ-নাসির-উদ-দীন রোশন আকতার মহম্মদ শাহ উপাধি ধারণ করে লালকেল্লায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় তাঁকে কাঠোর নজরে রেখেছিলেন এবং তাঁর মাতৃ ফখর-উন-নিসা বেগমকে মাসিক ১৫,০০০ ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। উজির-এ-আজম সৈয়দ হাসান আলী খান বারহা এবং তাঁর ভ্রাতা সেনাপতি সৈয়দ হোসেন আলী খান বারহা ভালোভাবে অবগত ছিলেন যে, আসফ জাহ-প্রথম এবং তাঁর সহযোগী জয়ন উদ্দীন আহম্মদ খান তাঁদের প্রশাসন থেকে ক্ষমতাচ্যূত করার জন্য সক্রিয় হয়ে রয়েছেন। সেজন্য সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় রফি-উদ-দৌলার মৃত্যুর সাথে সাথে একজন অপেশাদার শাহজাদা মহম্মদ শাহকে পরবর্তী সম্রাট হিসাবে মনোনীত করে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা নতুন মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের অনুগতদের কাছে ১৭২০ সালের ১৩ নভেম্বর পরাজিত হয়েছিলেন।
১৭২০ সালের ৯ অক্টোবর মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অভিজাত সেনাপতি হোসেন আলী খান বারহা টোরা ভীমের ক্যাম্পে নিহত হয়েছিলেন। হোসেন আলী খান বারহা নিহত হওয়ার পর মহম্মদ শাহ সরাসরি মোগল সেনাবাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং আসফ জাহ-প্রথমকে দাক্ষিণাত্যের ছয়টি মোগল প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ লাভের জন্য দাক্ষিণাত্যে প্রেরণ করেছিলেন। মহম্মদ আমীন খান তুরানীকে ৮,০০০ সেনার সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত করে সৈয়দ হাসান আলী খান বারহাকে অনুসরণ করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। সৈয়দ হাসান আলী খান বারহা হাসানপুরের যুদ্ধে আমিন খান তুরানী, মীর মহম্মদ আমিন ইরানী এবং মহম্মদ হায়দার বেগের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৭২০ সালের ১৫ নভেম্বর সৈয়দ হাসান আলী খান বারহা মহম্মদ শাহ কর্তৃক বন্দি হয়েছিলেন এবং দুই বছর পর তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো। মৃত্যুদণ্ডের পূর্বে মহম্মদ শাহকে সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার রফি-উস-শানের পুত্র মহম্মদ ইব্রাহীমের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিলো। কারণ রফি-উদ-দৌলা (শাহ জাহান-দ্বিতীয়)-এর মৃত্যুর পর সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় ১৭২০ সালের ১৫ ই অক্টোবর মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। মহম্মদ শাহ ইব্রাহীমকে ১৭২০ সালের ১৩ নভেম্বর পরাজিত করেছিলেন। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের পতনের সাথে সাথে দাক্ষিণাত্যে মোগল সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের অবসান সূচনা হয়েছিলো।
১৭২১ সালে মহম্মদ শাহ ক্ষমতাচ্যূত সম্রাট ফারুখসিয়ারের কন্যার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
১৭২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মহম্মদ শাহ, আসফ জাহ-প্রথমকে উজির-এ-আজম পদে নিযুক্ত করেছিলেন। আসফ জাহ-প্রথম মহম্মদ শাহকেআকবরের মতো সতর্ক এবং আওরঙ্গজেবের মতো সাহসী হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। মহম্মদ শাহ শাসনকার্যে অবহেলা করার জন্য আসফ জাহ উজির-এ-আজম পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। আসফ জাহ-প্রথম সেনাপতি এওয়াজ খানকে আওরঙ্গাবাদের গ্যারিসনের মাস্টার নিযুক্ত করেছিলেন। এওয়াজ খানের বেশির ভাগ ন্যায়সিদ্ধ কাজগুলো ইনায়েতুল্লাহ কাশ্মিরী দ্বারা পরিচালিত হতো। আসফ জাহ-প্রথম ঘৃণাভরে রাজদরবার ত্যাগ করেছিলেন। ১৭২৩ সালে আসফ জাহ-প্রথম দাক্ষিণাত্যে একটি অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য যাত্রা করেছিলেন। তিনি দাক্ষিণাত্যের মোগল সুবেদার মুবারিজ খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেছিলেন এবং মুবারিজ খানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শকর খেদার যুদ্ধে মুবারিজ খানকে পরাজিত ও নির্মূল করেছিলেন। ১৭২৫ সালে আসফ জাহ-প্রথম হায়দ্রাবাদের নিজামশাহী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই সময়ে মোগল-মারাঠা(১৭২৮-১৭৬৩) অপ্রত্যাশিত যুদ্ধ পতনমুখী মোগল সাম্রাজ্যের বাসিন্দাদের জন্য অপূরণীয় ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছিলো। ১৭২৪ সালে অবধের নবাব সাদাত আলী খানের বিদ্রোহ, বাঙ্গালোরের মোগল সুবেদার দিলওয়ার খানের মালবার উপকূলে সু-রক্ষিত ঘাঁটি স্থাপন, রংপুরের মোগল ফৌজদার মহম্মদ আলী খান এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী দীনা নারায়নকে কোচবিহার থেকে উপেন্দ্র নারায়ন নামের একজন হিন্দু বিহারী এবং ভূটানের শাসক মিফাম ওয়াংপো দ্বারা অতর্কিতে আক্রমণ। আলী মহম্মদ খান রোহিলাখণ্ডে ব্যারন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৭২৮ সালে ভূপালের নবাব ইয়ার মহম্মদ খান মহম্মদ শাহ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিলেন। মালওয়ায় মারাঠাদের অবিরাম অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন যদিও ১৭৪২ সাল নাগাদ মহম্মদ শাহ তাঁর সাম্রাজ্যের প্রায় অর্ধেক অঞ্চল হারাতে শুরু করেছিলেন।
মহম্মদ শাহ তাঁর তিনজন অযোগ্য উপদেষ্টা, তাঁর পালক বোন কোকি জি, তাঁর বণিক বন্ধু রওশন-উদ-দৌলা, তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষক ঠাট্টার সুফি আব্দুল গফুরকে অপসারণ করার পর মহম্মদ শাহ রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
পাঞ্জাব অঞ্চলে শিখরা মোগল সুবেদারদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। শিখদের ‘আঘাত এণ্ড রান’ রণ কৌশল মোগলদের ধ্বংসের কারণ হয়েছিলো। আজমীরে অজিত সিং একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করেছিলেন এবং বিদ্রোহী মারাঠাদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন। মহম্মদ শাহ দাক্ষিণাত্যে থাকাকালীন মারাঠারা মোগল দূর্গগুলি ধ্বংস করেছিলো এবং যুদ্ধ সংঘটিত করেই চলছিলেন। এই সবই মোগল সাম্রাজ্যের পতনের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলো। ১৭৩৭ সালে মারাঠারা বাজিরাও-প্রথম-এর নেতৃত্বে গুজরাট, মালওয়া এবং বুণ্ডেলখণ্ড দখল করেছিলো এবং দিল্লীতেও আক্রমণ সংঘটিত করেছিলো।
১৭৩৯ সালে পারস্যের নাদির শাহ মোগলদের দুর্বলতা এবং সম্পদের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত কান্দাহারের বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে গজনী, কাবুল, লাহোর এবং সিন্ধু দখল করে মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। নাদির শাহ মহম্মদ শাহের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন এবং কার্নালের যুদ্ধে মহম্মদ শাহকে পরাজিত করেছিলেন। নাদির শাহ তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে মোগল বাহিনীকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। তারপর দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে দিল্লী দখল করেছিলেন এবং ধনসম্পদ লুটপাট করেছিলেন। এই ঘটনাই মোগলদের দুর্বল করে দিয়েছিলেন এবং অন্যান্য আক্রমণকারীদের আক্রমণের পথ প্রশস্ত করেছিলো। শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর উত্থান হয়েছিলো।
১৭৪৮ সালে আফগানিস্থানের আহমদ শাহ দুররানি মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। লাহোরে শাহনওয়াজ খানের পরাজয়ের পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আহমদ শাহ বাহাদুর, উজির-এ-আজম কামরুদ্দিন খান, তাঁর ছেলে মাইন-উল-মুলক(মীর মন্নু), ইন্ডিজাম-উদ-দৌলা(সফদর জং নামে বেশি পরিচিত)কে ৭৫,০০০ সৈন্যসহ মহম্মদ শাহ আহমদ শাহ দুররানির বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলেন। ১৭৪৮ সালে সংঘটিত মনপুরের যুদ্ধে আহমদ শাহ দুররানির ১২,০০০ সৈন্য সন্মিলিত বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিলো এবং তাঁরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই জয় সমগ্র মোগল সাম্রাজ্যের জন্য মহান আনন্দের দিন ছিলো।
সাংস্কৃতিক উন্নয়ন– উর্দূ মহম্মদ শাহের রাজত্বের আগে থেকে ব্যবহার করা হয়েছিলো যদিও তাঁর রাজত্বকালে জনগণের মধ্যে আরও জনপ্রিয় হয়েছিলো এবং উর্দুকে ফার্সির পরিবর্তে আদালতের ভাষা হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে কাওয়ালী মোগল দরবারে পুনঃপ্রবর্তন হয়েছিলো এবং দ্রুত দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলো। মহম্মদ শাহ ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মক্তব চালু করেছিলেন বলেও জনা যায়। তাঁর রাজত্বকালে সর্বপ্রথম সহজ ফার্সি এবং উর্দুতে কোরআন অনুবাদ করা হয়েছিলো। তাঁর রাজত্বকালে আনুষ্ঠানিক তুর্কি পোশাক, সাধারণত উচ্চ অভিজাত মোগলরা পরিধান করতেন, যেহেতু তাঁরা সমরকন্দের অধিবাসী ছিলেন। সেই পোশাক শেরওয়ানি দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিলো।
মহম্মদ শাহ পারফর্মিং আর্টের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। প্রশাসনিক অগ্রাধিকার খরচে, পারফর্মিং আর্ট প্রশাসন থেকে মুক্ত করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে মোগলদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস পেলেও সম্রাট শিল্পকে উৎসাহিত করতেন। নিধামাল এবং চিতারমনের মতো দক্ষ শিল্পীদের নিয়োগ করেছিলেন, যারা হোলী উদযাপন, শিকার এবং আদালত জীবনের প্রাণবন্ত দৃশ্যগুলিকে চিত্রিত করেছিলেন। তৎকালীন মোগল দরবারে সদারং নামে পরিচিত নঈমত খান এবং তাঁর ভাগ্নে ফিরোজ খানের মতো সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন, যাদের রচনাগুলি খেয়াল সঙ্গীতের রূপকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। নেয়ামত খান তাঁর শিষ্যদের জন্য খেয়াল রচনা করেছিলেন। ভারতীয় শস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই মূল উপাদানটি মহম্মদ শাহের দরবারে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হয়েছিলো।
বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন– মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে ১৭২৭ সাল থেকে ১৭৩৫ সালের মধ্যে অম্বরের জয় সিং-দ্বিতীয় দ্বারা ৪০০ পৃষ্ঠার জিজ-ই-মহম্মদ শাহী নামে একটি বৈজ্ঞানিক কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিলো।
পরবর্তী মোগল–মারাঠা যুদ্ধ– মারাঠারা ইতিমধ্যে নর্মদা নদী পর্যন্ত তাঁদের রাজ্য বিস্তৃত করেছিলেন। আসফ জাহ- প্রথম দিল্লী ত্যাগ করার পর তাঁরা ১৭২৩ সালের শুরুতে সমৃদ্ধ মালওয়া প্রদেশ আক্রমণ করেছিলেন। মোগল সম্রাট মালওয়ার গভর্নরকে আক্রমণ প্রতিহত করার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন এবং তিনি আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন। একই বছরের শীতকালে মারাঠারা মালওয়ার রাজধানী উজ্জয়ন পর্যন্ত পৌঁছেছিলো। ১৭২৫ সালে সরবুলন্দ খানকে গুজরাটের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিলো। মোগল সম্রাটের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে মারাঠারা গুজরাট আক্রমণ করেছিলেন, তবে সরবুলন্দ খান তাঁদের পরাস্ত করেছিলেন। এই পরাজয়ের কারণ ছিলো, বাজিরাও- প্রথম সহ বেশির ভাগ মারাঠা সেনা তখন সেই সময়ে হায়দ্রাবাদে আসফ জাহ-প্রথমের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। হায়দ্রাবাদে আসফ জাহ প্রথমের সাথে যুদ্ধ অবশ্যে মারাঠাদের পক্ষে সুবিধাজনকভাবে এগিয়ে ছিলো।
১৭২৮ সালর ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত পালখেদার যুদ্ধে আসফ জাহ-প্রথম মারাঠাদের কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৭২৮ সালে বাজিরাও প্রথম এবং তাঁর ভ্রাতৃ চিমনজি আপ্পার নেতৃত্বে মারাঠারা মালওয়া আক্রমণ করেছিলেন। আমঝোরার যুদ্ধে একটি বড় মোগল বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করা মোগল সুবেদার গিদিহার বাহাদুরকে তাঁরা প্রত্যাহ্বান জানিয়েছিলেন। গির্দিহার বাহাদুর এবং তাঁর বিশ্বস্ত চাচাতো ভাই দয়া বাহাদুর উভয়েই সেই যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন। ২৯ নভেম্বরে চিমনজি আপ্পা উজ্জয়নের অবরোধে ব্যর্থ হয়ে মালওয়ার অবশিষ্ট মোগল বাহিনীকে অবরোধ করতে গিয়েছিলেন।
১৭৩১ সালে ত্রিম্বক রাও দাভাদে এবং সানভোজি মারাঠাদের ত্যাগ করে মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের বাহিনীতে যোগদানের হুমকি দিয়েছিলেন। হায়দ্রাবাদের নিজাম আসফ জাহ-প্রথম সেই দলত্যাগকে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন। এই পদক্ষেপটি বাজিরাও-প্রথম এবং তাঁর ভ্রাতৃ চিমনজি আপ্পার জন্য অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিলো এবং তাঁরা ত্রিম্বক রাও দাভাদে এবং সানভোজিকে বাধা প্রদানের জন্য বিশাল মারাঠা বাহিনী নিয়ে ডাভোইয়ের যুদ্ধের সময় দলত্যাগী দলগুলিকে পরাজিত এবং নিহত করেছিলেন। ১৭৩৫ সালে বাজি রাও প্রথম পূর্ণ শক্তি নিয়ে গুজরাট আক্রমণ করে সর বুলন্দ খানকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
১৭৩৬ সালে মুরুদ-জাঞ্জিরার সিদ্দিরা বাজিরাও বাহিনীর কাছ থেকে রায়গড় দূর্গ পুনরুদ্ধার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ১৭৩৬ সালের ১৯ এপ্রিল রিওয়াসের নিকটে সংঘটিত যুদ্ধের সময় চিমনজি সিদ্দিদের শিবিরে জমায়েত সিদ্দিদের উপর আক্রমণ সংঘটিত করে তাঁদের পরাজিত করেছিলেন। সিদ্দি নেতা সাট সহ ১৫০০ জন সিদ্দিকে হত্যা করেছিলেন। ১৭৩৬ সালের সেপ্তেম্বর মাসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো এবং সিদ্দিরা জাঞ্জিরা, গোয়ালকোট এবং অঞ্জনভেল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
১৭৩৭ সালে হায়দ্রাবাদের নিজাম আসফ জাহ-প্রথম ভূপালের নবাব ইয়ার মহম্মদ খান বাহদুরকে সহায় করার জন্য একটি বিশাল মোগল বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। প্রত্যুত্তরে বাজি রাও প্রথমের নেতৃত্বে ৮০,০০০ মারাঠা সেনা ভূপাল শহরের অভ্যন্তরে অবরোধ করেছিলেন। মালহার রাও হোলকার, সফদর জং এবং তাঁর ত্রাণ বাহিনীকে তাড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত ছিলো। পরে আসফ জাহ-প্রথম মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহ কর্তৃক অনুমোদিত শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। শান্তিচুক্তি সাপেক্ষে মারাঠাদের মালওয়া প্রদেশ প্রদান করা হয়েছিলো। ১৭৩৭ সালে মারাঠা সেনাপতি বাজি রাও-প্রথম মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী দিল্লী আক্রমণ করেছিলেন এবং আমিন খান বাহাদুরের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সুপ্রশিক্ষিত মোগল বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন। পরে দিল্লীর উপকণ্ঠে সংঘটিত বড় ধরণের যুদ্ধে মারাঠারা পরাজিত হয়েছিলো। পরাজিত হয়ে বাজিরাও-প্রথম এবং মারাঠারা দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বাদশপুরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাজি রাও মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। মহম্মদ শাহ মারাঠাদের কাছে মালওয়া হস্তান্তর করতে সন্মত হয়ে শান্তিচুক্তিতে অনুমোদন জানিয়েছিলেন।
মোগল সাম্রাজ্যের অনুন্নত উপজাতিগুলির মধ্যে ছিলেন ডিগুিগুল ফোর্টের মাদুরাই নায়েকদের রাণী মিনাক্ষী। তিনি মারাঠাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার কর্ণাটকের মোগল বাহিনীকে সহায় করেছিলেন।
১৭৪০ সালে কর্ণাটকের নবাব আলী দোস্ত খান, চান্দ সাহেব এবং শাহু কর্তৃক অনুমোদিত রাঘোজি ভোঁসলের নেতৃত্বে পরিচালিত মারাঠাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। ১৭৪০ সালের ২০ মে আকোর্ট এবং তাঁর জনগণের প্রতিরক্ষার জন্য সংঘটিত দামালচেরির যুদ্ধে নবাব আলী দোস্ত খান নিহত হয়েছিলেন। চান্দ সাহেবকে তাঁর বাহিনী সহ আটক করে সাতারায় বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। মারাঠাদের এই দুঃসাধ্য প্রচেষ্টা কৌতুহলী ফরাসি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লেক্স কর্ণাটক অঞ্চলে মারাঠাদের দখলে অসন্তুষ্ট হয়ে আসফ জাহ প্রথমকে মুক্ত করার জন্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সাদাতুল্লাহ খান-দ্বিতীয় এবং আনোয়ার উদ্দিন খানের সাথে যোগদান করে জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লেক্স ১৭৪৩ সালে আকোর্ট পুনরুদ্ধার করে ত্রিচিনোপলি অবরোধ করেছিলেন। অবরোধ পাঁচ মাস স্থায়ী হয়েছিলো এবং মুরারি রাও ঘোড়পাড়ের নেতৃত্বে পরিচালিত মারাঠারা কর্ণাটক থেকে পশ্চাদসরণ করতে বাধ্য হয়েছিলো।
১৭৪৭ সালে রাঘোজি- প্রথম ভোঁসলের নেতৃত্বে মারাঠারা বাংলার নবাব আলীবর্দি খানের অঞ্চলগুলিতে আক্রমণ, লুটপাট এবং দখল করতে শুরু করেছিলেন। মারাঠারা উড়িষ্যায় আক্রমণ সংঘটিত করার সময় উড়িষ্যার সুবেদার মীর জাফর মোগল এবং আলীবর্দি খান বাহিনীর আগমন না হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে সেনা প্রত্যাহার করে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসেছিলেন। আলীবর্দি খান এবং মোগল বাহিনীর আগমনে পরে সংঘটিত বর্ধমানের যুদ্ধে মারাঠা বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়েছিলো। বাংলার ক্ষুব্ধ নবাব আলিবর্দি খান মীর জাফরকে বরখাস্ত করেছিলেন। যাইহোক, চার বছর পর মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহ উড়িষ্যা মারাঠাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
নাদির শাহের ভারত আক্রমণ– ১৭৩৯ সালের ১৩ ই ফেব্রুয়ারি আফশারিদের সেনাপতি নাদির শাহের অধীনে পার্সিয়ানরা সাফাভিদ রাজবংশকে পরাজিত করেছিলো। তারপর পারস্যের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অটোম্যান সাম্রাজ্যকে বেশ কয়েকবার পরাজিত করে সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তকে সুরক্ষিত করেছিলো। তখন তাঁদের চোখ পড়েছিলো দুর্বল অথচ ধনী দেশ মোগল সাম্রাজ্যের উপর। ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন এবং তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কারনালের যুদ্ধে মহম্মদ শাহকে পরাজিত করেছিলোন। তারপর তাঁরা মোগল রাজধানী দিল্লীর দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং বেশ কিছু ঘটনার পর মহম্মদ শাহকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করে লুটপাটের তাণ্ডব চালিয়েছিলেন। তখন নাদির শাহ মোগল সাম্রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ অঞ্চল দখল করে নিয়েছিলেন।
পারস্যের সাথে উত্তেজনা– নাদির শাহ কান্দাহারের আশেপাশের অঞ্চল বিশেষ করে ঘিলজাই উপজাতির আফগান বিদ্রোহীদের দমন করতে চেয়েছিলেন। বিদ্রোহীরা যাতে মোগল সাম্রাজ্যে পালিয়ে যেতে না পারে তারজন্য নাদির শাহ মহম্মদ শাহকে কাবুল এবং সিন্ধু উপত্যকা সংলগ্ন সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। মহম্মদ শাহ নাদির শাহের অনুরোধ রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যদিও কার্যত তিনি কিছুই করেননি। কারণ স্থানীয় সুবেদাররা আফগানদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং তাঁরা পার্সিয়ানদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আফগান বিদ্রোহীরা শেষপর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নাদির শাহ পলাতক বিদ্রোহীদের তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে মহম্মদ শাহের কাছে দূত প্রেরণ করেছিলেন। মহম্মদ শাহ সেই দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেননি এবং পার্সিয়ানদের পুরো এক বছর মোগল সাম্রাজ্য থেকে প্রান্তিক করে রেখেছিলেন। ফলে নাদির শাহ মহম্মদ শাহের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং তিনি মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করার জন্য দুটি কারণ খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রথম কারণ, মোগলরা আফগান বিদ্রোহীদের তাঁর হাতে তুলে দেননি এবং দ্বিতীয় কারণ, মোগলরা দুর্বল এবং ধনী ছিলেন।
উপরোক্ত কারণের উপর ভিত্তি করে নাদির শাহ আফগানিস্থান থেকে আক্রমণ শুরু করে মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৭৩৮ সালের মে মাসে নাদির শাহ উত্তর আফগানিস্থানে আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। একই মাসে তিনি গজনী এবং সেপ্তেম্বর মাসে জালালাবাদ দখল করেছিলেন। নভেম্বর মাসে তিনি পেশোয়ার দূর্গ অবরোধ করেছিলেন এবং খাইবার পাসের যুদ্ধের পর পেশোয়ার দূর্গ দখল করেছিলেন।
অবশেষে লাহোরের মোগল ভাইসরয় জাকারিয়া খান বাহাদুরের ২৫,০০০ অভিজাত সোয়াব বাহিনীকে পরাস্ত করে লাহোর দখল করেছিলেন। নাদির শাহ ধারণা করা মতেই চেনাব নদীর পাড়ে আফশারিদ বাহিনী শিখ বিদ্রোহীদের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
ইতিমধ্যে নাদির শাহ বাহিনী এটক পর্যন্ত সমস্ত এলেকা দখল করে ফেলেছিলেন। মহম্মদ শাহ এবং তাঁর দরবারিরা তখন সজাগ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, পারশ্য সম্রাট এমন শক্তি নয়, যারা একটি প্রদেশে লুটপাট করে চলে যাবে! তদুপরি নাদির শাহ যেসব অঞ্চল জয় করেছিলেন, সেসব প্রদেশ ধ্বংস করে ফেলেছিলেন। ওয়াজিরাবাদ, এমানাবাদ এবং গুজরাটের মতো শহরগুলিতে শুধু লুটপাটই করা হয়নি, ধ্বংসও করে ফেলেছিলেন। লারকানার কাছে নাদির শাহ বাহিনী সিন্ধুর নবাব মাইনুর মহম্মদ কালনোরের মোগল বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করে তাঁর দুই পুত্রকে বন্দি করেছিলেন।
১৭৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাদির শাহ সিরহিন্দ দখল করে কার্নালের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি নাদির শাহ বাহিনী এবং মোগল বাহিনীর মধ্যে কার্নালের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। নাদির শাহের ৫৫,০০০ সেনার বিরুদ্ধে মোগল বাহিনীর এক লক্ষ সেনা তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত হয়েছিলো। কার্নালের যুদ্ধের তেরো দিন পর ২৬ শে ফেব্রুয়ারি নাদির শাহের শিবিরে গিয়ে মহম্মদ শাহ আত্মসমর্পণ করে নাদির শাহকে দিল্লী গেটের চাবি হস্তান্তর করেছিলেন এবং মহম্মদ শাহ বন্দি হিসারে নাদির শাহের সাথে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন।
দিল্লী প্রবেশের পর নাদির শাহ মোগল সাম্রাজ্য দখল করার দাবি করেছিলেন এবং দাক্ষিণাত্যের মারাঠারা দিল্লীর দিকে অগ্রসর হলে তাঁদের নরকের অতল গহ্বরে ঠেলে দিবেন বলে দাবি করেছিলেন।
প্রথম দিকে দুই সম্রাটের মধ্যে সম্বন্ধ সৌহৃদ্যপূর্ণ ছিলো। তবে একদিন দিল্লী ব্যাপী গুজব ছাড়িয়ে পড়েছিলো যে, নাদির শাহকে হত্যা করা হয়েছে। তখন জনসাধারণ পারস্য বাহিনীকে আক্রমণ করে কিছু পারস্য সেনা হত্যা করেছিলেন। সংবাদ পেয়ে নাদির শাহ ক্ষুব্ধ হয়ে জনগণকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং কমপক্ষে ৩০,০০০ নাগরিককে হত্যা করা হয়েছিলো। তখন মহম্মদ শাহ এবং আসফ জাহ-প্রথম নাদির শাহের কাছে করুণা ভিক্ষা করে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করেছিলেন। গণহত্যা বন্ধ করে নাদির শাহ কোষাগার লুণ্ঠনের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন এবং বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন, দরিয়া-ই-নূর (কাহিনূর)হীরা এবং অকল্পনীয় সম্পদ লুটপাট করেছিলেন। এ ছাড়া হাতী, ঘোড়া সহ পসন্দের সবকিছুই লুট করেছিলেন। মহম্মদ শাহকে তাঁর কন্যা জাহান আফরুজ বানু বেগমকে নাদির শাহের কনিষ্ঠ পুত্রের নিকট বিয়ে দিতে হয়েছিলো।
সমগ্র ঘটনার পর নাদির শাহ নিজেই ১২ মে মহম্মদ শাহকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে রাজমুকুট পরিয়েছিলেন। মহম্মদ শাহ সিন্ধু নদীর পশ্চিমের এলাকা নাদির শাহকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরপর নাদির শাহ কোহ-ই-নূর হীরা এবং অন্যান্য ধন-সম্পদসহ পারস্য বাহিনী নিয়ে পারস্যে চলে যেতে শুরু করেছিলেন।
এই আক্রমণের পর আসফ জাহ-প্রথম তাঁর বড় ছেলে ইস্তিজাম-উদ-দৌলাকে মোগল সেনাবাহিনীতে প্রধান সেনাপতি হিসাবে নিযুক্ত করে তিনি অবসর গ্রহণ করে দাক্ষিণাত্যে চলে গিয়েছিলেন।
পরিণাম–নাদির শাহের আক্রমণের ফলে মোগল সাম্রাজ্য পতনের দিকে অগ্রসর হয়েছিলো।
বিবাহ– মহম্মদ শাহের চার স্ত্রী ছিলেন। মহম্মদ শাহের প্রথম এবং প্রধানা সহধর্মিনী ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন শাহজাদী বাদশা বেগম। তিনি ক্ষমতাচ্যূত সম্রাট ফারুফসিয়ারের কন্যা ছিলেন। ১৭২১ সালের ৮ ডিসেম্বর সিংহাসনে আরোহণের পর তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁকে মালিকা-উজ-জামানি (যুগের রাণী) উপাধি প্রদান করেছিলেন। এই উপলক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী আনন্দ উৎসব চলছিলো। তিনি প্রথম পুত্র সন্তান শাহরিয়ার শাহ বাহাদুরের মাতৃ ছিলেন। শাহরিয়ার শাহ বাহাদুর ১৭২৬ সালে অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিলেন। বাদশা বেগম সবচেয়ে প্রভাবশালী স্ত্রী ছিলেন। বাদশা বেগম ১৭৮৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর মারা গিয়েছিলেন।
পরে মহম্মদ শাহ সাহিবা মহল নামে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর একমাত্র কন্যা সন্তান ছিলেন হজরত বেগম। হজরত বেগম ১৭৫৭ সালে আহমদ শাহ দুররানিকে বিয়ে করেছিলেন।
মহম্মদ শাহের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন নৃত্যশিল্পী উধম বাই। তিনি কুদসিয়া বেগম নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৭২৫ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করা ভবিষ্যত মোগল সম্রাট আহমদ শাহ বাহাদুরের মাতৃ ছিলেন। আহম্মদ শাহ বাহাদুরের জন্মের পর বাদশা বেগম তাঁকে লালনপালন করেছিলেন। বাদশা বেগমের প্রচেষ্টাই আহমদ শাহ বাহাদুর ১৭৪৮ সালে মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
সন্তান–আহমদ শাহ বাহাদুর, তাজ মাহমুদ মির্জা, শাহরিয়ার মির্জা এবং হজরত বেগম।
মৃত্যু– পারস্যের আফশারিদ রাজবংশের শেষ সম্রাট নাদির শাহের হত্যার পর আহমদ শাহ দুররানি ১৭৪৭ সালে পারস্য আফগানিস্থানের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তিনিও মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। কাবুল, পেশোয়ার দখল করার পর তিনি ১৭৪৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি লাহোর দখল করেছিলেন। ১৭৪৮ সালের ১১ ই মার্চ আহমদ শাহ দুররানি এবং লাহোর প্রদেশের সুবেদার কমরুদ্দিন বাহিনীর মধ্যে মনপুরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। উক্ত যুদ্ধে মোগল বাহিনী জয়লাভ করেছিলেন যদিও উক্ত যুদ্ধে কমরুদ্দিন যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। কমরুদ্দিনের মৃত্যু সংবাদ সম্রাটের কাছে পৌঁছোনোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনদিন তিনি প্রাসাদ থেকে বের হননি। এই সময়ে তিনি রোজা রেখেছিলেন। প্রহরীরা তাঁকে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে শুনেছিলেন, ‘আমি কী তাঁর (কমরুদ্দিনের মতো বিশ্বস্ত কাউকে পাব?’ ১৭৪৮ সালের ২৬ শে এপ্রিল তিনি শোকের কারণে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর অন্তেষ্টিক্রিয়ায় মক্কা থেকে আসা ইমামগণ অংশগ্রহণ করেছিলেন।
মহম্মদ শাহকে নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার দরগাহের পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। তাঁর মৃত্যুর পর আহমদ শাহ বাহাদুর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
জয়প্রিয় সংস্কৃতিতে মহম্মদ শাহ– ২০১০ সালে ডিডি ন্যাশনালে সম্প্রচারিত ঐতিহাসিক টিভি ধারাবাহিক মহারাজা রঞ্জিত সিং-এ মহম্মদ শাহের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ঋষিকেশ শর্মা। •
আহমদ শাহ বাহাদুর
আহমদ শাহ বাহাদুরের জন্ম ১৭২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর মোগল সাম্রাজ্যের দিল্লীতে। তিনি ছিলেন চতুর্দশ মোগল সম্রাট। তাঁর পিতার নাম সম্রাট মহম্মদ শাহ এবং মাতৃর নাম কুদসিয়া বেগম। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর ১৭৪৮ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে মারাঠাদের উত্থান এবং নাদির শাহের আক্রমণের ফলে মোগল সম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিলো এবং আহমদ শাহ বাহাদুরের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়েছিলো। আহমদ শাহ বাহাদুরের প্রশাসনিক দুর্বলতার ফলে উজির-এ- আজম ইমাদ-উল-মুলকের উত্থান হয়েছিলো।
শাহজাদা আহমদ শাহ বাহাদুরের মহিলাদের প্রতি দুর্বলতা ছিলো। এছাড়াও তিনি একজন নিরক্ষর ছিলেন এবং কোনো সামরিক প্রশিক্ষণে তিনি অংশগ্রহণ করেননি বলে যানা যায়। তাঁর স্বভাবের জন্য তাঁর পিতা তাঁকে কটূক্তি করতেন এবং তাঁকে একজন শাহজাদা হিসাবে প্রাপ্য প্রয়োজনীয় ভাতাও প্রদান করা হয়নি বলে জানা যায়। তাঁকে তাঁর সৎ মা বাদশা বেগম নিজের তত্ত্বাবধানে লালনপালন করেছিলেন। তিনি সিংহাসনে আরোহণের ক্ষেত্রে তাঁর পালক মাতৃর বিশেষ ভূমিকা ছিলো। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি তাঁর মাতৃ কুদসিয়া বেগম এবং হারেমের প্রধান নংপুসক জাভেদ খান বাহাদুরের তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলি পরিচালনা করতেন। আহমদ শাহ বাহাদুর রাজকার্য পরিচালনার চেয়ে হারেমের প্রতি বেশি অনুরুক্ত ছিলেন।
শাহজাদা হিসাবে আহমদ শাহ বাহাদুর মনুপুরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ১৭৪৮ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ১৭৫৪ সালের ২ জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় বছর রাজত্ব করেছিলেন এবং রাষ্ট্রের সমস্ত বিষয় প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। উজির-এ-আজম ইমাদ-উল-মুলক তাঁকে ক্ষমতাচ্যূত করেছিলেন এবং তাঁকে অন্ধ করে তাঁর মাতৃর সাথে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি জীবনের বাকি সময় কারাগারে কাটিয়ে ১৭৭৫ সালে ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি(আবদালি)র প্রথম ভারত আক্রমণ– লাহোরের মোগল ভাইসরয় জাকারিয়া খানের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র ইয়াহিয়া খান বাহাদুর এবং মুলতানের আমির মিয়াঁ শাহ নেওয়াজ খান উত্তরাধিকারের জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন। উক্ত সংঘর্ষে বড় ভাই মিয়াঁ শাহ নেওয়াজ খান ছোট ভ্রাতা ইয়াহিয়া খান বাহাদুরকে পরাজিত করে নিজেকে পাঞ্জাবের ভাইসরয় হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। শাহ নেওয়াজ খান মোগল দরবারের কর ফাঁকির জন্য অভিযুক্ত ছিলেন এবং ইয়াহিয়া খান বাহাদুর উজির-এ-আজম কমরুদ্দিন খানের জামাতা ছিলেন। দুই ভ্রাতৃর এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আহমদ শাহ দুররানি ৩০,০০০ অশ্বারোহী সেনা নিয়ে শাহ নেওয়াজ খানকে সহায়ের জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন।
১৭৪৮ সালের এপ্রিল মাসে আহমদ শাহ দুররানি শাহ নেওয়াজ খানের সাথে মিলে সিন্ধু নদী উপত্যকায় আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। ফলে সিন্ধুর সুবেদার মুরাদিয়াব খান কালহারো সিন্ধু নদীর তীরে মোগল সেনাবাহিনীকে সহায় করার জন্য সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানিকে প্রতিহত করার জন্য সম্রাট মহম্মদ শাহ শাহজাদা আহমদ শাহ বাহাদুর, উজির-এ-আজম কমরুদ্দিন খান, হাফিজ রহমত খান, অবধের নবাব সফদর জং, ইন্তিজাম-উদ- দৌলা, গজনি ও কাবুলের প্রাক্তন সুবেদার নাসির খান, ইয়াহিয়া খান এবং আলী মহম্মদ খানের নেতৃত্বে ৭৫,০০০ সেনার একটি বৃহৎ বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানির বাহিনীতে ছিলো মাত্র ১২,০০০ অশ্বারোহী সেনা। সিরহিন্দের সুটলেজ নদীর তীরে মনুপুর নামক স্থানে উভয় বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলো এবং সংঘর্ষে আহমদ শাহ বাহাদুরের নেতৃত্বাধীন বাহিনী জয়ী হয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় বিপক্ষ বাহিনীর একটি গোলার আঘাতে উজির-এ-আজম কামরুদ্দিন খান মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
যাইহোক, কমরুদ্দিন খানের পুত্র মঈন-উল-মুলক(মীর মন্নু) মনপুরের যুদ্ধে বীর নায়ক হিসাবে স্বীকৃত হয়েছিলেন। এবং মহম্মদ শাহের মৃত্যুর পর আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁকে পাঞ্জাবের গভর্নর পদে নিযুক্ত করেছিলেন।
সামরিক উদ্ভাবন– মনুপুরের যুদ্ধে আহমদ শাহ বাহাদুরের কৌশলগত যুদ্ধ যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিলেন। সম্রাট হিসাবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর আহমদ শাহ বাহাদুর সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আক্রমণকারী আহমদ শাহ দুররানি এবং শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য পূর্বিয়া উট কার্পাস (যুদ্ধে উট ব্যবহার) চালু এবং সংগঠিত করেছিলেন বলে জানা যায় ।
উত্তরাধিকার– সিরহিন্দের মনুপুরের যুদ্ধে মোগল উজির-এ-আজম কমরুদ্দিন খানের মৃত্যু সংবাদ সম্রাটের কাছে পৌঁছোনোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনদিন তিনি প্রাসাদ থেকে বের হননি। এই সময়ে তিনি রোজা রেখেছিলেন। প্রহরীরা তাঁকে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে শুনেছিলেন, ‘আমি কী তাঁর (কমরুদ্দিনের মতো বিশ্বস্ত কাউকে পাব?’ ১৭৪৮ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি শোকের কারণে মারা গিয়েছিলেন। মহম্মদ শাহ মৃত্যুবরণ করার পর শাহজাদা আহমদ শাহ বাহাদুর ১৭৪৮ সালের ২৭ এপ্রিল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং ২৯ এপ্রিল দিল্লীর লালকেল্লায় তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিলো। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি আবু নাসির মুজাহিদ-উদ্দীন আহমদ শাহ গাজী উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি অবধের নবাব সফদর জংকে উজির-এ-আজম, ইমাদ-উল-মুলকে মীরবক্সী এবং কমরুদ্দিনের পুত্র মঈন-উল-মুলকে পাঞ্জাবের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। মোগল দরবারের প্রধান সেবক জাভেদ খানকে নবাব বাহদুর উপাধি প্রদান করে ৫,০০০ সেনার সুবেদারের মর্যদা প্রদান করা হয়েছিলো। সম্রাটের মাতৃ কুদসিয়া বেগমের সাথে জাভেদ খানকে ৫০,০০০ সেনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো।
জাভেদ খান কার্যকরী শাসক ছিলেন। জাভেদ খানের ক্ষমতায় উত্থান এবং কর্তৃত্ব সাম্রাজ্যের অভিজাত এবং সম্রাটের সেনাদের প্রতি অবমাননা হিসাবে গণ্য করা হয়েছিলো।
অভ্যন্তরীন সীমা লঙ্ঘন (১৭৫০–৫৪ )
সফদর জংয়ের পক্ষপাতিত্বের বিরোধিতা– জাভেদ খানকে প্রদান করা উচ্চ কর্তৃত্ব রক্ষা করার জন্য কুদসিয়া বেগম সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। জাভেদ খানের প্রতি বিরোধিতা এবং বিরক্তি প্রকাশকারীদের প্রতি শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতাও জাভেদ খানকে প্রদান করা হয়েছিলো। ১৭৪৯ সালে জাভেদ খান কর্তৃক সফদর জংকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো। সফদর জং উক্ত হত্যার প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সফদর জং সাম্রাজ্যবাদী আফগান উপদলের নংপুসকদের কর্তৃত্বের পদ থেকে অপসারণ এবং পূর্ববর্তী মোগল উজির-এ-আজমের আত্মীয়কে মোগল দরবারে নিয়োগে করার চেষ্টা করেছিলেন। এই নীতির জন্য তুরানি গোষ্ঠীর প্রধান সদস্যদের বিশেষ করে জাভেদ খানের সাথে সফদর জংয়ের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিলো।
১৭৫০ সালে মোগল সেনাপতি সালাবত খান মারওয়ারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর দিল্লীতে ফিরিয়ে আনা ১৮,০০০ সৈন্যের জন্য অর্থ দাবি করেছিলেন। ফলে তাঁকে বন্দি করা হয়েছিলো। সৈন্যদের বিদ্রোহ বন্ধ করার জন্য বন্দি থাকাকালীন সালাবত খান সৈন্যদের অর্থ প্রদানের জন্য নিজের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রী করে পরে দরবেশের মতো দারিদ্র জীবন যাপন করেছিলেন।
উজির-এ-আজম সফদর জংয়ের নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁর সম্পত্তি আক্রমণ করেছিলেন। এই সময়ে সফদর জং কাঁধে আঘাত পেয়েছিলেন। সফদর জং মারাঠা এবং শিখ ভাড়াটে সৈন্য নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিলেন। এই বাহিনী রোহিলাখণ্ডে কুদসিয়া বেগমের অনুসারিদের পরাজিত করেছিলো। এই সময়ে আহমদ শাহ বাহাদুর এই শত্রুতা বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং সফদর জং সেই আহ্বানে সন্মতি প্রকাশ করেছিলেন। তবে, জাভেদ খান নৃশংসতার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৭৫২ সালের আগস্টে মহম্মদ আলী জেরচির নেতৃত্বে জাভেদ খানের তুর্কি ইউনিটগুলিকে সফদর জং হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সফদর জংয়ের এই পদক্ষেপের ফলে ইন্তিজাম-উদ-দৌলার মতো জাভেদ খান এবং কুদসিয়া বেগমের বিরোধীদের উত্থানের পথ মসৃণ হয়েছিলো।
মারাঠাদের আশ্রিত রাজ্য– ১৭৫২ সালে মারাঠা মিত্রজোট মোগল দরবারের উপর একতরফা সুরক্ষা আরোপ করেছিলেন। এই পদক্ষেপের ফলে সম্রাট এবং তাঁর প্রজারা পেশোয়ার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ইমাদ–উল–মুলক– ১৭৫৩ সালের মে মাসে সম্রাট বাহাদুর শাহ বাহাদুর সফদর জংয়ের ক্রমবর্দ্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার জন্য ১৮ বছর বয়সী গাজী উদ্দিন খান ফিরোজ জং-তৃতীয়কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। গাজী উদ্দিন খান ফিরোজ জং মৃত ইস্তিজাম-উদ-দৌলার পুত্র ইমাদ-উল-মুলক নামে পরিচিত ছিলেন। ইমাদ-উল-মুলক সফদর জংয়ের বিরোধিতা করেছিলেন এবং তাঁর সাথে হাফিজ রহমত খান বারেচ, কুদসিয়া বেগম এবং আহমদ শাহ বাহাদুর স্বয়ং যোগদান করেছিলেন। সফদর জং পরাজিত হয়েছিলেন এবং তাঁর সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো।
১৭৫৩ সালর ১৩ মে সফদর জংকে উজির-এ-আজম পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিলো। তাঁর জায়গায় ইন্টিস্কামকে নিযুক্ত করা হয়েছিলো। ইমাদ-উল-মুলকে মীরবক্সী হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিলো। এর প্রতিবাদে সফদর জং সূরজমলের পরামর্শে অবধের ক্ষমতাচ্যুত নবাব সফদর জং ১৭৫৩ সালের ১৩ মে অজ্ঞাত পরিচয় আকবর আদিল শাহকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। ১৪ মে জাটরা চারবাগ, বাগ-ই-কুলতাত, হাকিম মুনিম সেতু এবং পরের দিন জয়সিংপুরাসহ কয়েকটি এলেকা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। ১৬ মে জাটরা দিল্লী আক্রমণ করে সাদিল খান এবং রাজা দেবিদত্তকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন। ১৭ মে জাটরা ফিরোজ শাহ কোটলা দখল করেছিলেন। রোহিলাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জাটরা ষাঁড়ের পিঠে চড়ে খালিহাতে কামানের গোলা নিক্ষেপ করেছিলেন। যুদ্ধে নাজিব খান আহত এবং ৪০০ রোহিলা পাঠান মারা গিয়েছিলো।
ইমাদ-উল-মুলক দিল্লীর শাসক হওয়ার উদ্দেশ্যে মারাঠাদের জাট অঞ্চল আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেছিলেন। সূরজমল বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। মারাঠারা কুমহের দূর্গ দখল করতে সক্ষম হচ্ছিলনা। আহমদ শাহ বাহাদুর তখন সফদর জংকে ক্ষমা করেছিলেন এবং তিনি অবধে সেনা প্রত্যাহার করেছিলেন।
ইমাদ-উল-মুলক তখন নতুন শাসক হিসাবে আভির্ভূত হয়েছিলেন। ইমাদ-উল-মুলক ১,৫০০,০০০ ডাম (ছোট তামার মূদ্রা)সংগ্রহ করে মোগল সেনাবাহিনী এবং কর্মকর্তাদের বেতন দিতে অস্বীকার করেছিলেন। আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁর পরাক্রমে ভয় পেয়ে সফদর জংকে উজির-এ-আজম পদে নিযুক্ত করেছিলেন। আহমদ শাহ বাহাদুর ইমান-উল-মুলকে রাজকীয় দরবার থেকে অপসারণের চেষ্টা করেছিলেন। ফলে ইমাদ-উল-মুলক সম্রাটকে গ্রেপ্তার করার জন্য আকিবত মামুদকে প্রেরণ করেছিলেন। তখন পেশোয়া নানাসাহেব-প্রথমের ভ্রাতৃ রঘুনাথ রাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠাদের সাথে জোটবন্ধন করেছিলেন।
সিকান্দ্রাবাদে পরাজয়– সিকান্দ্রাবাদের যুদ্ধে কামান এবং শ্বাপশূটারগুলি হাতীর উপর বোঝাই থাকা সত্ত্বেও আহমদ শাহ বাহাদুর যুদ্ধে পরাস্ত হয়েছিলেন। মারাঠাদের মতে ৮,০০০ যোদ্ধাকে বন্দি করা হয়েছিলো।
মালহার রাও হোলকারের নেতৃত্বে মারাঠাদের সহায়তায় ইমাদ-উল-মুলক সফদর জংকে পরাজিত করেছিলেন। এরপর সম্রাট একটি বড় সেনাবাহিনী সংগ্রহ করে সিকান্দ্রাবাদে শিবির স্থাপন করেছিলেন। ১৭৫৪ সালে আহমদ শাহ বাহাদুর এবং মারাঠা সেনাপতি রঘুনাথ রাও, মালহাররাও হোলকার এবং ইমাদ-উল-মুলক বাহিনীর মধ্যে সিকান্দ্রাবাদে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। কামান এবং শ্বাপশূটারগুলি হাতীর উপর বোঝাই থাকা সত্ত্বেও উক্ত যুদ্ধে আহমদ শাহ বাহাদুর পরাস্ত হয়েছিলেন। আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁর মাতৃ, স্ত্রী এবং ৮,০০০ মহিলাকে রেখে দিল্লী পালিয়ে গিয়েছিলেন। যার মধ্যে অধিকাংশই মহিলা ছিলেন। সিকান্দ্রাবাদের অভিযান মারাঠাদের বিরুদ্ধে সম্রাট কর্তৃক পরিচালিত সর্বশেষ অভিযান বলে ধারণা করা হয় ।
আহমদ শাহ বাহাদুর পালিয়ে যাওয়ার পর ইমাদ-উল-মুলক রঘুনাথ রাওয়ের সমর্থনে দিল্লী গিয়েছিলেন এবং আহমদ শাহ বাহাদুর এবং তাঁর মাতৃ কুদসিয়া বেগমকে বন্দি করেছিলেন।
এদিকে সিকান্দ্রাবাদ যুদ্ধের পর অসুস্থ সফদর জং অবধে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং একজন মোগল সেনাপতি সুরজমল এবং জাট বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূতপুর অবরোধ করেছিলেন। ইমাদ-উল-মুলক উজির-এ-আজম হিসাবে বাহাল হওয়ার পর তিনি নতুন গোলাবারুদ সংগ্রহ করে লেফটেনেন্টকে সহায় করার জন্য দিল্লীর বাইরে চলে গিয়েছিলেন।
ইমাদ-উল-মুলক আবার দিল্লীতে ফিরে এসে আহমদ শাহ বাহাদুরকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন। এই কর্মকাণ্ডের পর সফদর জং অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।
মোগল সাম্রাজ্যের খণ্ডিত নীতি– দুর্বল, কিন্তু প্রভাবশালী আহমদ শাহ বাহাদুর দূরবর্তী অনুগত রাজা এবং নবাবদের যেমন টিনেভেলির নবাব চান্দা সাহেব এবং মুজাফফর জংয়ের সাথে চিঠিপত্রের দ্বারা সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। মহম্মদ শাহ মুজাফ্ফর জংকে নাসির জং উপাধি প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীতে আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁকে দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত করে নাসির-উদ-দৌলা উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
কর্ণাটক যুদ্ধ(১৭৪৬–১৭৪৮)– ১৭৪৯ সালে ফরাসি সেনাপতি জোসেফ ফ্রাঙ্কোইস ডুপ্লেক্স দাক্ষিণাত্যের দুই মনোনীত শাসক চান্দ সাহিব এবং মুজাফ্ফর জংয়ের সাথে জোটবন্ধন করে তাঁদের নিজ নিজ অঞ্চলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। হায়দার আলীর মতো অন্যান্য নেতারাও ফরাসিদের পক্ষে ছিলেন। শীঘ্রই চান্দ সাহিব, মুজাফফর জং এবং ডি, বুসির নেতৃত্বে ফরাসিরা আম্বুরের যুদ্ধে কর্ণাটকের নবাব আনোয়ার উদ্দিন মহম্মদ খানকে পরাজিত করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্যে মোগল শাসকদের মধ্যে এই ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিক্রিয়ায় মহম্মদ আলী ওয়াল্লাজাহ এবং মুজাফ্ফর জং ইংরেজদের সাথে ১৭৫০ সালে জোটবন্ধন করেছিলেন। ডি, বুসির দখলে থাকা জিঞ্জি দূর্গ নাসির জং পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছিলেন। তখন ডি, বুসি তাঁকে বাধা প্রদান করেছিলেন। তখন কাদাপারার নবাব হিম্মত খান তাঁকে পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন। উত্তরসূরিদের পেছনের শক্তি ছিলেন জোসেফ ফ্রাঙ্কোইস ডুপ্লেক্স। তিনি তাঁর মিত্রদের একটি শক্তিশালী শাসনভার অর্পণ করেছিলেন। মুজাফফরকে পূর্ব-দাক্ষিণাত্যের মোগল ভূমির নিজাম এবং চান্দ সাহিবকে কর্ণাটকের নতুন নবাব হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিলো। সমগ্র মোগল সাম্রাজ্য জুড়ে ফরাসিদের তখন শক্তিশালী অভিজাত হিসাবে গণ্য হতো। এদিকে তাঁদের সমকক্ষ ইংরেজরা আওরঙ্গজেবের সময় থেকে জলদস্যু হিসাবে কুখ্যাত ছিলো।
মারওয়ারের বিরুদ্ধে মোগল অভিযান– মোগল মীরবক্সী এবং সেনাপতি সালাত খান মারওয়ারের ভক্ত সিংয়ের সাথে রাম সিং এবং ঈশ্বরী সিংয়ের বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ১৭৫০ সালে সংঘটিত রাওনার যুদ্ধে উভয় বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলো। যুদ্ধের পরপরই ঈশ্বরী সিং সালাবত খানের সাথে আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন এবং যুদ্ধ বিরতিতে যুদ্ধ শেষ হয়েছিলো। এর পরেই মারাঠা মিত্রবাহিনী জয়পুর আক্রমণ করেছিলেন এবং ঈশ্বরী সিং আত্মহত্যা করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানির দ্বিতীয় এবং তৃতীয় আক্রমণ– আহমদ শাহ দুররানি কাবুল সুবাহের সহায়তার জন্য বরাদ্দ পাঞ্জাবের চারটি জেলার রাজস্ব দাবি করেছিলেন। এই সুবাহগুলি আগে মোগলদের অধীনে ছিলো এবং ১৭৩৯ সালে তাঁরা সুবাহগুলি নাদির শাহের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। পাঞ্জাবের শাসক মইন-উল-মুলক বারাদ্দ রাজস্ব প্রদান করতে অস্বীকার করার জন্য ১৭৪৯ সালে আহমদ শাহ দুররানি দ্বিতীয় বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। তখন যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে মঈন-উল- -মুলক দুররানির সাথে একটি প্রতারিত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
১৭৪৯ সালের চুক্তির শর্ত পূরণ না করার জন্য আহমদ শাহ দুররানি তৃতীয়বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। লাহোরের ফটকের সামনে একটি তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো এবং সেই যুদ্ধে মইন-উল-মুলকের সাহসী সেনাপতি কোরামল নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধে মইন-উল-মুলক বন্দি হয়েছিলেন। তবে, যুদ্ধে সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য আহমদ শাহ দুররানি তাঁকে ক্ষমা করে দিয়ে পাঞ্জাব সুবাহের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন।
এদিকে ১৭৩৯ সালের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে তাঁর জন্য মোগল দরবার উম্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। উজির-এ- আজম সফদর জং প্রচুর অর্থের প্রতিশ্রুতিতে ৫০,০০০ মারাঠা সেনা নিযুক্ত করেছিলেন, কিন্তু তিনি কিছু করার আগেই মাতৃ কুদসিয়া বেগমের পরামর্শে নংপুসক জাভেদ খান আহমদ শাহ বাহাদুরের হয়ে আহমদ শাহ দুররানির সাথে একটি শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাঞ্জাব (সিন্ধু এবং মুলতানসহ) এবং কাশ্মীর সম্রাটের নামে আহমদ শাহ দুররানির দ্বারা শাসিত এবং সম্রাট কর্তৃক সুবাহের যেকোনো গভর্নর নিযুক্তির ক্ষেত্রে আহমদ শাহ দুররানির অনুমোদন থাকার কথা ছিলো। এটি শুধু একটি মৌখিক চুক্তি ছিলো, প্রকৃতপক্ষে সুবাহগুলি আফগানদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিলো। ১৬৫৭ সালে ইমাদ-উল-মুলক সুবাহগুলি মোগল নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলো এবং আফগানরা আনুষ্ঠানিকভাবে সুবাহগুলি নিজেদের সাথে যুক্ত করেছিলেন।
মারাঠা জোটের হাতে গুজরাট এবং উড়িষ্যার নিয়ন্ত্রণ হস্তচ্যুত– মারাঠা মিত্রজোটের বিভিন্ন সর্দারের কাছে আহমদ শাহ বাহাদুরের শাসকদের পরাজয় হয়েছিলো। ১৭৫৩ সাল পর্যন্ত গুজরাট মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো, কিন্তু ১৭৫৩ সালে মারাঠারা মোগল গভর্নরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। যুদ্ধের সময় রাজ বোভরি মসজিদ কমপ্লেক্সটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। গুজরাট অধিগ্রহণের প্রতিক্রিয়ায় আহমদ শাহ বাহাদুর জুনাগড়ের নবাব মহম্মদ বাহাদুর খানজিকে নিয়োগ করে মোগল সেনাবাহিনী শক্তিশালী করেছিলেন এবং মোগল সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত বিভিন্ন সত্ত্বাকে বিভিন্ন উপাধি এবং কর্তৃত্ব প্রদান করেছিলেন। সালাত খানের নেতৃত্বে আহমদ শাহ বাহাদুর এবং সফদর জং ১৮,০০০ সেনার একটি বাহিনী রাজপুত অঞ্চলে প্রেরণ করেছিলেন এবং সালাবত খান রাজপুত অঞ্চলের সমস্ত বিদ্রোহীদের দমন এবং সেই অঞ্চলের গ্যারিসনদের সমর্থন আদায়ের জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন।
নবাব আলীবর্দি খান উড়িষ্যার নিয়ন্ত্রণ হস্তচ্যুত-প্রায় ১১ বছর ধরে বাংলার নবাব আলীবর্দি খান মারাঠাদের কাছ থেকে নিজের অঞ্চল রক্ষা করার পর পাটনা, ঢাকা এবং উড়িষ্যার মতো বিভিন্ন ফৌজদাররা রাঘোজি ভোঁসলে -প্রথমের নেতৃত্বাধীন মারাঠাদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত উড়িষ্যাকে মারাঠা জোটবন্ধনের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিলো। শুধুমাত্র মেদিনীপুর মোগলদের হাতে রয়ে গিয়েছিলো এবং বাংলার নবাব আলীবর্দি খান প্রয়াত সম্রাট মহম্মদ শাহ যেমনটি চৌথা(কর) প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তেমনটি চৌথা(রাজস্ব) প্রদান করতে সন্মত হয়েছিলেন।
দ্বিতীয় কৰ্ণাটক যুদ্ধ(১৭৪৯–৫৪)– ১৭৫১ সালে চান্দ সাহিব, তাঁর লেফটেনেণ্ট রেজা সাহেব এবং মহম্মদ ইউসুফ খান আর্কটের যুদ্ধে মহম্মদ আলী খান ওয়াল্লাজাহ এবং ক্লাইভের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে কর্নল, কুদ্দাপহ এবং সাভানুরের বিদ্বেষী নবাবরা যৌথভাবে হায়দ্রাবাদের মুজাফ্ফর জং (মুহি-উদ-দীন মুজাফফর জং হিদায়েত) য়ের ৩০০০ সৈন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। উক্ত সংঘর্ষের সময় সাভানুরের নবাব নিহত, কর্নলের নবাব গুলিবিদ্ধ এবং হিম্মত খান আহত হয়েছিলেন। কুদ্দাপাহের নবাব দ্বৈত যুদ্ধের জন্য মুজাফ্ফর জংকে আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং একে অপরের প্রতি হাওদা চার্জ করে একে অপরকে নির্মূল করেছিলেন।
ফরাসি–নিজাম জোটবন্ধন– মুজাফ্ফর জংয়ের মৃত্যু সংবাদে মোগলদের মধ্যে আতংঙ্ক সৃষ্টি করেছিলো। ফরাসিরাও এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ডি, বুসি সম্রাট আহমদ শাহ বাহাদুরের অনুমোদন ছাড়াই মোগল রাজকীয় দরবারের ক্রোধের ঝুঁকি নিয়ে দাক্ষিণাত্যের নতুন সুবেদার হিসাবে মুজাফ্ফর জংয়ের ভ্রাতৃ সালাত খানকে মনোনীত করেছিলেন। তাঁরা একসাথে ১২ এপ্রিল হায়দ্রাবাদে প্রবেশ করেছিলেন এবং ১৮ জুন মোগল বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য আওরঙ্গাবাদে মারাঠাদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছিলেন। মোগল সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী সেনাপতি ইন্তিজাম- উদ-দৌলা সালাবত খানকে ক্ষমতা প্রদানে অনিচ্ছুক ছিলেন। সালাত খানকে সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত করার প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন এবং ১,৫০,০০ সেনা নিয়ে দাক্ষিণাত্যে গিয়ে মারাঠা প্রতিপক্ষ বালাজি বাজিরাওয়ের সহায়তায় সালাবত খানকে উৎখাত করার হুমকি প্রদান করেছিলেন।
আসন্ন আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করার পরিবর্তে ডুপ্লেক্স মারাঠাদের প্রত্যাহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৭৫১ সালের ডিসেম্বর-এ চন্দ্রগ্রহণের আন্ধারের সুযোগ গ্রহণ করে মারাঠাদের আক্রমণ করে মারাঠা নেতা বালাজি বাজিরাওকে পরাজিত করেন। বালাজি বাজিরাওকে পরাজিত করার পর ডি, বুসি এবং সালাবত জংয়ের মিত্রজোট পুণের দিকে যাত্রা করেছিলেন এবং কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো মারাঠা এবং তাঁদের মিত্রজোটকে পরাজিত করেছিলেন। পরের বছর ডি, বুসি আহমেদনগরে মারাঠাদের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
বালাজি বাজিরাওয়ের সাথে জোটবন্ধন করার জন্য ইতিজাম-উদ-দৌলাকে তাঁর সৈন্যরা বিষপ্রয়োগ করেছিলেন। ১৭৫২ সালে মহম্মদ আলী খান ওয়াল্লাজাহ এবং ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ক্লাইভের কাছে পরাজিত হওয়ার পর কর্ণাটকের নবাব চান্দ সাহিব একটি বিদ্রোহে নিহত হয়েছিলেন। মহম্মদ আলী খান ওয়াল্লাজাহ আহমদ শাহ বাহাদুরের সহানুভূতি আদায় করে কর্ণাটকের নবাব হিসাবে স্বীকৃত হয়েছিলেন।
১৭৫৩ সালে ডি, বুসির নেতৃত্বে তাঁর মিত্রজোট উত্তর সার্কারগুলি দখল করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং ১৭৫৪ সালে মারাঠা প্রধান রাঘোজি ভোঁসলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কয়েকটি জয়ের সূচনা করেছিলেন। এই অভিযান ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো এবং সালাবত জং ও ডি, বুসির বাহিনী পুণে দূর্গের চারপাশে সমবেত মারাঠাদের বিপর্যস্ত করে ফেলেছিলো। ১৭৫৬ সালে সালাবত জংয়ের বাহিনী কামানের থেকেও দ্রুত গুলি ছুড়তে সক্ষম মাটির সাথে সংযুক্ত ক্যাটিয়কস নামে পরিচিত ভারী মাস্কেট ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। এই অস্ত্রগুলি মারাঠা বিদ্রোহীদের ভাগ্য সম্পূর্ণ রূপে উল্টে দিয়েছিলো।
স্ত্রী– এনায়েতপুরী বেগম, সরফরাজ মহল এবং রাণী উত্তম কুমারী।
সন্তান– বিদার বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুর, মহতার- উন-নিসা বেগম এবং দিল আফ্রোজ বানু বেগম।
মৃত্যু– ১৭৫৪ সালে ইমাদ-উল-মুলক, আহমদ শাহ বাহাদুরকে অন্ধ করে সলিমগড় দূর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। ১৭৭৫ সালে সম্রাট শাহ আলম-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর এক পুত্র মাহমুদ শাহ বাহাদুর বিদার বখত শাহ জাহান-চতুর্থ উপাধি ধারণ করে ১৭৮৮ সালে কয়েক মাসের জন্য সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
আহমদ শাহ বাহাদুরের সমাধি মেহরুলির কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহের পাশে মতি মসজিদের সাথে সংযুক্ত একটি সমাধিক্ষেত্রে অবস্থিত। •
আলমগীর–দ্বিতীয়
আজিজ-উদ-দীন মহম্মদ আলমগীর-দ্বিতীয়ের জন্ম ১৬৯৯ সালের ৬ জুন মোগল সাম্রাজ্যের দাক্ষিণাত্যের বুরহানপুরে। তিনি পঞ্চদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি আলমগীর-দ্বিতীয় নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৭৫৪ সালের ৩ জুন থেকে ১৭৫৯ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম জাহান্দার শাহ এবং মাতৃর নাম অনুপ বাই । অনুপ বাই রাজপুত রাজকুমারী ছিলেন। জাহান্দার শাহ বাহাদুর শাহ -প্রথমের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন।
দাক্ষিণাত্যের আওরঙ্গাবাদে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর সময় আলমগীর-দ্বিতীয়-এর বয়স ৭ বছর ছিলেন । তাঁর পিতামহ বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পিতা জাহান্দার শাহ কয়েক মাসের জন্য সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। ইমাদ-উল- মুলকের সহায়তায় ফারুখসিয়ার তাঁর পিতা জাহান্দার শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
আজিজ-উদ-দীন মহম্মদ আলমগীর-দ্বিতীয় ১৭১৪ সাল থেকে ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় ছিলেন। ১৭৫৪ সালে উজির-এ-আজম ইমাদ-উল-মুলক আহমদ শাহ বাহাদুরকে ক্ষমতাচ্যুত করে আলমগীর-দ্বিতীয়কে কারাগার থেকে মুক্ত করে ১৭৫৪ সালের ৩ জুন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার সময় তিনি আলমগীর- দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন। কারণ তিনি আওরঙ্গজেবের কেন্দ্রীভূত নীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তাঁর বয়স ছিলো ৫৫ বছর। তাঁর প্রশাসন এবং সামরিক অভিজ্ঞতা ছিলো না। কারণ তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময় কারাগারে কাটিয়েছিলেন। তিনি একজন দুর্বল শাসক ছিলেন, সাম্রাজ্যের প্রশাসন ক্ষমতা উজির-এ- আজম ইমাদ-উল-মুলকের হাতে ন্যস্ত ছিলো।
আলমগীর-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে আহমদ শাহ দুররানি আবার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। তিনি দিল্লী দখল করে মথুরায় লুন্ঠনের তাণ্ডব চালিয়েছিলেন। ইমাদ-উল-মুলকের সহাযোগিতার ফলে মারাঠারা অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠছিলো এবং সমগ্র উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো। মারাঠাদের উত্থানের ফলে মোগল সাম্রাজ্যের জন্য বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিলো। এক সময় ইমাদ-উল-মুলকের সাথে আলমগীর-দ্বিতীয়ের সম্পর্ক খারাপ হয়ে উঠেছিলো এবং ইমাদ- উল-মুলকের হাতে তিনি খুন হয়েছিলেন। আলমগীর-দ্বিতীয় খুন হওয়ার পর তাঁর পুত্র আলী গওহর ইমাদ-উল-মুলকের নিপীড়ন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দিল্লী থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তিনি শাহ জাহান-তৃতীয় উপাধি ধারণ করে মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
রাজত্ব–আলমগীর-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য পুনরায় উদ্বেগজনকভাবে কেন্দ্রীভূত হতে শুরু হয়েছিলো। বিশেষ করে অনেক নবাব সম্রাটের সন্তুষ্টি এবং মারাঠাদের বিরুদ্ধে সম্রাটের প্রতিরোধের বিষয়ে সমন্বয় কামনা করেছিলেন। সাম্রাজ্যের এই উন্নয়ন স্পষ্টতই ইমাদ-উল-মুলকের জন্য অনাকাংক্ষিত ছিলো। কারণ ইমাদ-উল-মুলক মাঠারাদের অদম্য সমর্থন দিয়ে তাঁর কর্তৃত্ববাদকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন।
দুররানি আমিরতের সাথে জোটবন্ধন– ১৭৫৫ সালে পাঞ্জাবের মোগল ভাইসরয় মইন-উল-মুলক মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর বিধবা স্ত্রী মুঘলানি বেগম যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে উত্তরাধিকারের সংঘর্ষ স্থগিত এবং পূর্বাঞ্চলে শিখ বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য আহমদ শাহ দুররানির সহায় চেয়েছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি এবং তাঁর বাহিনী ১৭৫৬ সালে লাহোর অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং সেনাপতি জাহান খানের সুরক্ষায় তাঁর পুত্র তৈমূর শাহ দুররানিকে লাহোরের নতুন ভাইসরয় হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। আদিনা বেগকে দোয়াবের ফৌজদার হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানি তখন পাঞ্জাবের পূর্বাঞ্চলের অস্থিতিশীল এবং বেআইনী শিখ এবং হিন্দু বাসিন্দাদের লুন্ঠন করেছিলেন।
এরপর আহমদ শাহ দুররানি দিল্লীর দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। ১৭৫৭ সালের অক্টোবরে মোগল সম্রাট আলমগীর- দ্বিতীয়, নাজিব-উদ-দৌলার মতো অভিজাতদের সাথে আহমদ শাহ দুররানির সাথে সাক্ষাত করতে এসেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানির বাহিনী তখন মারাঠাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। তিনি ইমাদ-উল-মুলকের প্রশাসনকে উৎখাত এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার হুমকি প্রদান করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি এবং আলমগীর-দ্বিতীয়ের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছিলো, যখন দুররানির পুত্র তৈমুর শাহ দুররানি আলমগীর-দ্বিতীয়ের কন্যা জহুরা বেগমকে সঙ্গী হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানি নিজেও সাবেক মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের কন্যা হজরত বেগমকে বিয়ে করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি তাঁর বাহিনী তৈমুর শাহ দুররানির নেতৃত্বে লাহোরে রেখে তিনি নিজে কাবুল ফিরে গিয়েছিলেন। তৈমুর শাহ দুররানি মোগল ধাতুশিল্পীদের সহায়তায় জমজমা কামান প্রস্তুত করেছিলেন। ভাওয়ালপুরের আমির এবং নাসির খান প্রথম তাঁকে এই ক্ষেত্রে সহায় করেছিলেন।
দিল্লী দখল- ১৭৫৭ সালের জুলাই মাসে রঘুনাথ রাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠারা দুররানি সাম্রাজ্য এবং মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত মৈত্রী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মারাঠারা ইমাদ-উল-মুলকের সহায়তায় লালকেল্লা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে শিবির স্থাপন করে যমুনা নদীর তীরের সমস্ত গ্রাম দখল করে দিল্লী অবরোধ করেছিলেন। মারাঠারা আলমগীর- দ্বিতীয়ের মীর বক্সী নাজিব-উদ-দৌলা, সেনাপতি কুতুব শাহ এবং আমান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত ২,৫০০ মোগল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো।
বিক্ষুব্ধ মারাঠারা ফেরি জ্বালিয়ে দিয়ে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিলো। নাজিব-উদ-দৌলা তখন ভারী কামানসহ লালকেল্লার আশেপাশে অবস্থান গ্রহণ করে আহমদ শাহ দুররানির আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তবে, হেরাতের বিভিন্ন বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকার জন্য আহমদ শাহ দুররানির আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে মারাঠা সন্মিলিত বাহিনীকে প্রতিরোধ করে রাখার পর নাজিব-উদ-দৌলা পরাজয় স্বীকার করে নাজিবাবাদ চলে গিয়েছিলেন। মারাঠারা দিল্লীতে প্রবেশ করেছিলেন। মারাঠাদের হাতে ধরা পরার আগেই সম্রাট আলমগীর-দ্বিতীয় রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভরতপুর পালিয়ে গিয়েছিলেন।
মারাঠা প্রধান সদাশিব ভাউ তখন শাহ জাহান তৃতীয়কে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং মোগল রাজ দরবারের গহনা, অলঙ্কার লুন্ঠনের অভিযান শুরু করেছিলেন। দিল্লী ও আগ্রাতে মোগলদের দ্বারা নির্মিত মসজিদ, সমাধিগুলিকে অপবিত্র করা হয়েছিলো। রাজকীয় মতি মসজিদকেও অপবিত্র করেছিলো।
মারাঠারা দিল্লী প্রবেশের কিছুক্ষণ পরেই সূরজমল কর্তৃক প্রেরিত একটি জাট রেজিমেন্টের সন্মুখীন হয়েছিলেন। জাটরা দিল্লীর উপর সার্বভৌমত্ব দাবি করতে শুরু করেছিলেন।
জাটরাও দিল্লীতে লুণ্ঠন চালিয়েছিলো।
যাইহোক, দিল্লীর নিয়ন্ত্রণ হারানো সত্ত্বেও নাজিব-উদ-দৌলা এবং তাঁর সহযোগীরা যেমন, কুতুব খান, সিরহিন্দের মোগল ফৌজদার আব্দুস সামাদ খান সাহারানপুর এবং শাহাবাদ মার্কন্দায় মারাঠা মিত্রজোটের বিরুদ্ধে প্রত্যাহ্বান অব্যাহত রেখেছিলেন। প্রত্যুত্তরে মারাঠা মিত্রজোট তারাওরি, কর্নাল এবং কুঞ্জপুরার বাসিন্দাদের লুটপাট করেছিলেন। এর মধ্যে আলমগীর-দ্বিতীয় এবং মোগল রাজপরিবার দিল্লীতে ফিরে এসেছিলেন।
কুঞ্জপুরার উপর মারাঠা মিত্রজোটের আক্রমণ আহমদ শাহ দুররানির সামরিক অভিযানের সূত্রপাত করেছিলো। দুররানি বাহিনী পবিত্র নদী অতিক্রম করে বিদ্রোহী মারাঠাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলো।
বাংলা হস্তচ্যুত– বাংলার বিখ্যাত নবাব আলীবর্দি খান মোগল রাজদরবারে বার্ষিক ৫ মিলিয়ন ডামস প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি ১৭৫৬ সালের ৯ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আলীবর্দি খানের মৃত্যুতে আলমগীর-দ্বিতীয় শোক প্রকাশ করেছিলেন এবং আলীবর্দি খানের উত্তরসূরি সিরাজ-উদ-দৌলাকে বাংলার পরবর্তী নবাব হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সিরাজ-উদ-দৌলা অভ্যন্তরীন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীরা আলমগীর-দ্বিতীয় সিরাজ-উদ-দৌলাকে প্রদত্ত ফরমান বিবেচনা করতে অস্বীকার করেছিলেন। এই অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের ফলে সিরাজ-উদ-দৌলা সম্রাট আলমগীর- দ্বিতীয় এবং সালাবত খানের অনুমোদন ছাড়াই ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কাছ থেকে কলকাতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে ক্লাইভ অতি শীঘ্রই কলকাতা পুনর দখল করেছিলেন। এর পর ১৭৫৭ সালে ক্লাইভ পলাশীর যুদ্ধে সিরা-উদ-দৌলাকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সিরাজ-উদ-দৌলা পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর বাহিনী কর্তৃক নিহত হয়েছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলার হত্যাকারীরা মোগল রাজদরবারে গোলাম হোসেন তাবাতাবাই কর্তৃক সমালোচিত হয়েছিলেন এবং আলমগীর-দ্বিতীয় মীরজাফরকে বাংলার পরবর্তী নবাব হিসাবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিলেন। রাজকীয় মোগল দরবারের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় মীরজাফর মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কৌশলী ইমাদ-উদ-দৌলার সাথে জোটবন্ধন করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্যের কর্তৃত্ব– আলমগীর-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে ফরাসি সেনাপতি ডি, বুসি ও লালি এবং তাঁর সহযোগীরা যেমন সালাবত জং, হায়দার আলী মারাঠা বিদ্রোহীদের আধিপত্যের বিরোধিতা করে দাক্ষিণাত্যে মোগল বাহিনীর অগ্রগতিতে ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছিলেন। তাঁদের কৃতিত্ব তাঁদের প্রভাবশালী মহলে খ্যাতি লাভ করেছিলো। ১৭৫৬ সালে সালাবত খান-এর বাহিনী ক্যাটিওয়কস নামে পরিচিত ভারী মাস্কেট ব্যবহার করেছিলো। মাস্কেটগুলি মাটির সাথে যুক্ত ছিলো এবং কামানের থেকেও দ্রুত গুলি ছুড়তে সক্ষম ছিলো বলে জানা যায়। এই মাস্কেটগুলি মারাঠাদের ভাগ্য সম্পূর্ণভাবে উল্টে দিয়েছিলো।
পলাশী যুদ্ধের পরপরই ফরাসি সেনাপতি ডি, বুসি মোগল সম্রাট কর্তৃক সাইফ-উদ-দৌলা উমদাত-উল-মুলক উপাধি এবং ৭,০০০ সেনার মনসবদার পদবী লাভ করেছিলেন। তিনি তাঁর সহযোগী মোগল সাম্রাজ্যে ফরাসিদের প্রতিনিধিত্বকারী হায়দার জং (অ্যাটর্নি) এবং সালাবত জং-এর সাথে মিলে ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তর সার্কারগুলি দখল করেছিলেন। যাইহোক, ১৭৫৮ সালে ফোর্ড দ্বারা উত্তর সার্কারগুলি পুনর দখল করা হয়েছিলো এবং ডি, বুসিকে ফ্রান্সে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিলো। খারাপ কিছু হওয়ার ভয়ে সালাবত জং ইংরেজ ইস্ট ইণ্ডিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন এবং তাঁদের সুরক্ষার স্বীকৃতি প্রদান করেছিলেন। অবশ্যে শীঘ্রই তিনি তাঁর ভ্রাতা নিজাম আলী খান কর্তৃক উৎখাত হয়েছিলেন।
ভূপালের নবাব– ১৭৫৮ সালে ভূপালের নবাব ফয়েজ মহম্মদ খানের সৎ মা মামোলা বাই মারাঠাদের বিন্যাস অনুসারে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফয়েজ মহম্মদ খানের মোগল বাহিনীকে রাইসেন দুর্গে অবরোধ করেছিলেন। তখন মোগল সম্রাট আলমগীর-দ্বিতীয় বিক্ষুব্ধ হয়ে ফয়েজ মহম্মদ খানই রাইসেন দুর্গের একমাত্র নির্বাচিত প্রশাসক বলে ফরমান জারি করেছিলেন এবং তাঁকে ভূপালের নবাব বাহাদুর উপাধি প্রদান করেছিলেন। তবে দূর্গটি মামোলা বাই এবং নানা সাহেব পেশোয়ার নিয়ন্ত্রণেই ছিলো। আলমগীর-দ্বিতীয়ের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর ও পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের আগে এবং সদাশিবরাও ভাউ ভূপাল ধ্বংস করার হুমকি প্রদানের পর ফয়েজ মহম্মদ খান ১৭৬০ সালে রাইসেন দূর্গ পুনর দখল করেছিলেন। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, পানিপথ যুদ্ধের ঠিক আগে ফয়েজ মহম্মদ খানের সেনারাই মারাঠাদের বিভিন্ন সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিয়েছিলো।
কাম্বের নবাব– কাম্বের নবাব নজম-উদ-দৌলা তাঁর এস্টেটের বেশির ভাগ অংশকে আন্তর্জাতিক নিরাপদ অঞ্চলে পরিণত করার জন্য কাম্বেতে ব্রিটিশদের উপস্থিতি সমর্থন করেছিলেন। অবশ্যে তাঁকেও সম্ভবত মারাঠাদের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিলো।
মহীশূরের নবাব– ১৭৫৮ সালে হায়দার আলী মারাঠা জোটবন্ধনের খান্দে রাওয়ের কাছ থেকে বাঙ্গালোর দখল করেছিলেন। কর্ণাটক যুদ্ধের সময় তাঁর কৃতিত্বের জন্য সম্রাট আলমগীর-দ্বিতীয় তাঁকে ‘নবাব হায়দার আলী খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। ১৭৫৯ সাল নাগাদ হায়দার আলী সমগ্র মহীশূরীয় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন।
মারাঠা জোটবন্ধন– ১৭৫৮ সালে রঘুনাথ রাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠারা ইমাদ-উল-মুলকের কাছ থেকে বলপূর্বক রাজকীয় সম্পদ দখলের পর লাহোর দখল করেছিলেন। তাঁরা আহমদ শাহ দুররানির পুত্র তৈমূর শাহ দুররানিকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছিলেন। শিখ এবং মারাঠাদের আক্রমণের ফলে তৈমুর শাহ দুররানি এবং জাহান খান লাহোর থেকে পেশোয়ারে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই বিজয়ের ফলে পেশোয়া দিল্লী দখল করে বিশ্বনাথ রাওকে মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছিলেন।
সাত বছরের যুদ্ধ– ১৭৫৬ সালে সাত বছরের যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিলো, যেখানে ভারতের সীমার বাইরেও মোগলরা জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। সেই যুদ্ধে আলমগীর-দ্বিতীয়কে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিদ্রোহীরা সমর্থন করেছিলো।
আলমগীর–দ্বিতীয়ের স্ত্রী– জিনাত মহল, ফাইজ বখত বেগম, আজিজাবাদী মহল, লতিফা বেগম, জিনাত আফ্ৰোজ বেগম এবং আওরঙ্গাবাদী মহল।
আলমগীর–দ্বিতীয়ের সন্তান– শাহ আলম-দ্বিতীয়, মির্জা মহম্মদ আলী আসগর বাহাদুর, মির্জা মহম্মদ হারুন, হিদায়েত বক্স বাহাদুর, মির্জা তালি মুরাদ শাহ বাহাদুর, মির্জা জামিয়াত শাহ বাহাদুর, মির্জা মহম্মদ হিম্মত শাহ বাহাদুর, মির্জা আসান-উদ-দীন মহম্মদ বাহাদুর, মির্জা মুবারক শাহ বাহাদুর, গওহর-উন-নিসা বেগম, খায়ির-উন-নিসা বেগম এবং দোলত-উন-নিসা বেগম।
মৃত্যু– আহমদ শাহ দুররানির আক্রমণের পর নবনিযুক্ত উজির-এ-আজম নাজিব-উদ-দৌলা মারাঠাদের বিরুদ্ধে ফৌজদার, নবাব এবং নিজামদের একত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর এই পদক্ষেপে ভয় পেয়ে পদচ্যূত ইমাদ-উল- মুলক মারাঠা নেতা সদাশিবরাও ভাউয়ের সাথে জোটবন্ধন করে নাজিব-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছিলেন। এই যুদ্ধ ১৫ দিন স্থায়ী হয়েছিলো এবং নাজিব-উদ-দৌলার পরাজয় হয়েছিলো।
ইমাদ-উল-মুলক তখন ভয় পেয়েছিলেন যে, আলমগীর-দ্বিতীয় হয়তো আহমদ শাহ দুররানিকে আহ্বান জানাবেন, নয়তো শাহজাদা আলী গওহরকে ব্যবহার করবেন। ইমাদ-উল-মুলক তখন আলমগীর-দ্বিতীয় এবং তাঁর পরিবারের বিশিষ্ট সদস্যদের হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। আলী গওহর সহ কয়েকজন মোগল শাহজাদা হত্যার আগে মরিয়া হয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৭৫৯ সালের ২৯ নভেম্বরে আলমগীর-দ্বিতীয়কে বলা হয়েছিলো যে, একজন ধার্মিক ব্যক্তি কোটলা ফতেহ শাহেতে তাঁর সাথে সাক্ষাত করার জন্য এসেছেন। আলমগীর-দ্বিতীয় তখন তাঁর সাথে সাক্ষাত করার জন্য কোটলা ফতেহ শাহেতে রওয়ানা হয়েছিলেন। তাঁকে তখন ইমাদ-উল-মুলকের নিয়োজিত হত্যাকারীদের দ্বারা বারবার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছিলো ।
আলমগীর-দ্বিতীয়ের মৃত্যুতে সমগ্র মোগল সাম্রাজ্য বিশেষ করে মুসলিম জনগণ শোক প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুর পর হুমায়ূনের সমাধির পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
আলমগীর-দ্বিতীয়ের হত্যার পর সদাশিবরাও ভাউয়ের অধীনস্থ পেশোয়া স্বল্পস্থায়ী ক্ষমতার শিখরে পৌঁছেছিলেন। যখন তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথাটা প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিলো, তখন তিনি মোগল সাম্রাজ্য বিলুপ্ত করে বিশ্বরাওকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে– ২০১৯ সালে নির্মিত বলিউড মহাকাব্য পানিপথ যুদ্ধে আলমগীর-দ্বিতীয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এস, এম, জাহির।
১৯৯৪ সালের টিভি ধারাবাহিক ‘দ্য গ্রেট মারাঠা’য় আলমগীর-দ্বিতীয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অরুণ বালি। •
শাহ জাহান–তৃতীয়
শাহ জাহান-তৃতীয়ের জন্ম ১৭১১ সালে। তিনি মির্জা মুহি-উদ-দীন মিল্লাত নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ষষ্ঠদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি ছিলেন কামবক্সের জ্যেষ্ঠ পুত্র মুহি-উস-সুন্নাতের পুত্র। তাঁর মাতৃর নাম ছিলেন রুসকিমি বেগম। তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি ছিলেন। ইমাদ-উল-মুলকের সহায়তায় তিনি স্বল্প সময়ের জন্য মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সম্রাট আলমগীর-দ্বিতীয়ের হত্যার পর তিনি ১৭৫৯ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৭৬০ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ইমাদ-উল-মুলকের হাতের পুতুল স্বরূপ ছিলেন। তিনি নামমাত্র সম্রাট ছিলেন। সাম্রাজ্যের সমস্ত ক্ষমতা ছিলো ইমাদ-উল-মুলকের হাতে।
মারাঠা নেতা সদাশিব ভাউ দ্বারা তিনি সিংহাসনচ্যূত হয়েছিলেন এবং তাঁর পরে শাহ আলম-দ্বিতীয় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৭৭২ সালে তিনি ৬০-৬১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
শাহ জাহান-তৃতীয়ের স্ত্রীর নাম ছিলেন সাদাত বেগম। তিনি দু’টি পুত্র সন্তানের পিতৃ ছিলেন। মির্জা সাদাত বখত বাহাদুর এবং মির্জা ইকরাম বাহাদুর। •
শাহ আলম–দ্বিতীয়
শাহ আলম-দ্বিতীয়ের জন্ম ১৭২৮ সালের ২৫ জুন মোগল সাম্রাজ্যের দিল্লীর শাহজাহানাবাদ সুবাহে। তিনি আলী গওহর নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি সপ্তদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম আলমগীর-দ্বিতীয় এবং মাতৃর নাম জিনাত মহল। শাহ আলম-দ্বিতীয়ের পিতৃ আলমগীর-দ্বিতীয় জাহান্দার শাহ বাহাদুর শাহ(শাহ আলম-প্রথম)-এর পুত্র এবং আওরঙ্গজেবের নাতি ছিলেন। শাহ আলম-দ্বিতীয় ধ্বংসপ্রাপ্ত মোগল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে তাঁর ক্ষমতা এতটাই সীমিত হয়েছিলো যে, ফার্সি ভাষায় একটি প্রবাদ প্রচলিত হয়েছিলো, ‘সুলতান-ই- শাহ আলম, আজ দিল্লী তা পালাম’। যার অর্থ, শাহ আলমের রাজত্ব দিল্লী থেকে পালাম পর্যন্ত। পালাম দিল্লীর একটি উপ-শহর।
শাহ আলম-দ্বিতীয় তাঁর পিতা আজিজ-উদ-দীন মহম্মদ আলমগীর-দ্বিতীয়ের সাথে ১৭১৪ সাল থেকে ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় ছিলেন। তিনি তাঁর পিতা আলমগীর-দ্বিতীয়ের পাশাপাশি লালকেল্লার সালাটিন প্রাসাদে অর্দ্ধ বন্দি অবস্থায় বেড়ে উঠেছিলেন। ১৭৫৪ সালে উজির-এ-আজম ইমাদ-উল-মুলক আহমদ শাহ বাহাদুরকে ক্ষমতাচ্যূত করে আলমগীর-দ্বিতীয়কে কারাগার থেকে মুক্ত করে ১৭৫৪ সালের ৩ জুন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর পিতার রাজত্বকালে শাহ আলম-দ্বিতীয়কে উচ্চ পদে নিয়োগ করা হয়েছিলো। তাঁকে সাম্রাজ্যের ‘ওয়ালি-আল-আহাদ’ হিসাবেও ঘোষণা করা হয়েছিলো।
ইমাদ-উল-মুলকের সহযোগিতার ফলে মারাঠারা অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলো এবং সমগ্র উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো। মারাঠাদের উত্থানের ফলে মোগল সাম্রাজ্যের জন্য বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিলো। এক সময় ইমাদ- উল-মুলকের সাথে আলমগীর-দ্বিতীয়ের সম্পর্ক খারাপ হয়ে উঠে এবং ইমাদ-উল-মুলকের হাতে তিনি খুন হোন।
আলমগীর-দ্বিতীয় খুন হওয়ার পর ইমাদ-উল-মুলক শাহ জাহান-তৃতীয়কে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। শাহ জাহান-তৃতীয় নামমাত্র সম্রাট ছিলেন, প্রকৃত ক্ষমতা ছিলো ইমাদ-উল-মুলকের হাতে।
শাহজাদা আলী গওহরের দিল্লী থেকে পলায়ন– আলমগীর-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য পুনরায় উদ্বেগজনকভাবে কেন্দ্রীভূত হতে শুরু হয়েছিলো। বিশেষ করে অনেক নবাব সম্রাটের সন্তুষ্টি এবং মারাঠাদের বিরুদ্ধে সম্রাটের প্রতিরোধের বিষয়ে সমন্বয় কামনা করেছিলেন। সাম্রাজ্যের এই উন্নয়ন স্পষ্টতই ইমাদ-উল-মুলকের জন্য অনাকাংক্ষিত ছিলো। কারণ ইমাদ-উল-মুলক মাঠারাদের অদম্য সমর্থনে তাঁর কর্তৃত্ববাদকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। আলমগীর- দ্বিতীয় একজন দুর্বল শাসক ছিলেন, সাম্রাজ্যের প্রশাসন ক্ষমতা উজির-এ-আজম ইমাদ-উল-মুলকের হাতে ন্যস্ত ছিলো।
ইমাদ-উল-মুলকের বর্দ্ধিত ক্ষমতার জন্য ভীত হয়ে শাহজাদা আলী গওহর একটি সেনাবাহিনী সংগঠিত করে প্রাণের ভয়ে দিল্লী থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আলমগীর-দ্বিতীয় খুন হওয়ার সময় তিনি বিহারে ছিলেন। ১৭৫৯ সালে সাম্রাজ্যের পূর্ব সুবাহে আবির্ভূত হয়ে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার আশায় বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার ওপর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন।
এদিকে উজির-এ-আজম নাজিব-উদ-দৌলা দিল্লীর বাইরে একটি বড় মোগল বাহিনী একত্রিত করে দখলদার ইমাদ- উল-মুলকে পালাতে বাধ্য করেছিলেন এবং শাহ জাহান-তৃতীয়কে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন নাজিব-উদ-দৌলা এবং অভিজাত মুসলমানরা শক্তিশালী আহমদ শাহ দুররানির সাথে যোগাযোগ করে মারাঠাদের পরাজিত করার পরিকল্পনা করেছিলেন।
১৭৬০ সালের ১৪ জানুয়ারি আহমদ শাহ দুররানির আফগান বাহিনী এবং সদাশিব রাও ভাউ নেতৃত্বাধীন মারাঠাদের মধ্যে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। সদাশিবরাও ভাউ ছত্রপতি শিবাজি এবং পেশোয়ার পরে মারাঠা সাম্রাজ্যের সর্বাধিক কর্তৃত্বশীল ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। নাজিব-উদ-দৌলার নেতৃত্বে পশতুন রোহিলারা, খানাতে কালাতের বেলুচরা, অবধের সুজা-উদ-দৌলা এবং পতনশীল মোগল সাম্রাজ্যের সেনা দ্বারা আফগানরা সমর্থিত ছিলো। যুদ্ধটি ১৮ শতকের সবচেয়ে বড় এবং ঘটনা বহুল যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। একদিনের যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিলো পানিপথ-তৃতীয়ের যুদ্ধে। যুদ্ধে ৬০,০০০ থেকে ৭০,০০০ প্রাণহানি হয়েছিলো এবং অনেক সেনা বন্দি হয়েছিলো। যুদ্ধে আফগানরা জয়লাভ করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি সদাশিবরাও ভাউ নেতৃত্বাধীন মারাঠা সেনাবাহিনীকে বিতাড়ন করার পর ইমাদ-উল-মুলকের হাতের পুতুল স্বরূপ শাহ জাহান-তৃতীয়কে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৭৬০ সালের ১০ অক্টোবর শাহজাদা আলী গওহরকে সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। তবে, ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সাথে করা চুক্তির জন্য তিনি ১৭৭২ সালের আগে পর্যন্ত দিল্লীতে ফিরে আসতে পারেননি। শাহজাদা আলী গওহর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে শাহ আলম-দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন।
বেঙ্গলের যুদ্ধ– ১৭৬০ সালে শাহ আলম-দ্বিতীয়ের সেনাবাহিনী বাংলা, বিহার উড়িষ্যার কিছু অংশের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৭৫৯ সালে আলী গওহর পাটনা ও অবধ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সময় মীর জাফর এবং ইমাদ-উল-মুলক তাঁকে বন্দি অথবা হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। সেজন্য তিনি ৩০,০০০ সেনার একটি বাহিনী নিয়ে মীর জাফর এবং ইমাদ-উল-মুলককে উৎখাত করার জন্য অগ্রসর হচ্ছিলেন।
শাহ আলম-দ্বিতীয়ের সন্মিলিত বাহিনীতে ছিলেন মহম্মদ কুলি খান, কাদিম হোসেন, কামগার খান, হিদায়েত আলী, মীর আফজাল এবং গোলাম হোসেন তাতাবাইয়ের মতো ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সেনাবাহিনী। তাঁদের বাহিনীর সাথে সুজা-উদ-দৌলা, নাজিব-উদ-দৌলা এবং আহমদ শাহ বঙ্গসের বাহিনীও যোগদান করেছিলো। এর উপরেও তাঁদের সাথে ফরাসি উপনিবেশিকতাবাদের পণ্ডিচেরির সেনাপতি জিন ল ডে লরৌস্টিন এবং ২০০ জন ফরাসি সেনাও যোগদান করেছিলেন। তাঁরা সাত বছরের যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।
শাহজাদা আলী গওহর সফলতার সাথে পার্টনার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং ৪০,০০০ সেনার মোগল বাহিনী নিয়ে মোগলদের শপতকৃত শত্রু রামনারায়িনকে বন্দি বা হত্যা করার জন্য পাটনা অবরোধ করেছিলেন। মীর জাফর তাঁর নিকটতম মিত্র রামনারায়িনের বিপদে শঙ্কিত হয়ে তাঁকে মুক্ত এবং পাটনা রক্ষা করার জন্য তাঁর পুত্র মীরনকে প্রেরণ করেছিলেন। মীর জাফর রবার্ট ক্লাইভের কাছেও সহায় প্রার্থনা করেছিলেন। ১৭৬১ সালে মেজর জন ক্যালাউডের বাহিনী পাটনা, সিরপুর, বীরপুর এবং সিওয়ানের মতো চারটি যুদ্ধে আলী গওহরের বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিলেন। সেজন্য আলী গওহর ব্রিটিশদের সাথে শান্তি আলোচনা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ব্রিটিশদের সাথে আলোচনার পর শাহ আলম-দ্বিতীয়কে শান্তির নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছিলো এবং তাঁকে মীর জাফরের পুত্র মীরনের আক্সমিক মৃত্যুর পর বাংলার মনোনীত নতুন নবাব মীর কাশিমের সাথে সাক্ষাত করার জন্য ব্রিটিশরা নিয়ে গিয়েছিলো। মীর কাশিম বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার সুবেদার হিসাবে মোগল সম্রাটের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন এবং মীর কাশিম মোগল দরবারে বার্ষিক ২.৪ মিলিয়ন ডামস রাজস্ব প্রদান করার জন্য সন্মত হয়েছিলেন। শাহ আলম- দ্বিতীয় এরপর এলাহাবাদে ফিরে গিয়েছিলেন ১৭৬১ সাল থেকে ১৭৬৪ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সাথে করা শান্তি চুক্তির শর্ত অনুসারে অবধের নবাব সুজা-উদ-দৌলার সুরক্ষায় ছিলেন।
এদিকে মীর কাশিমের সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু হয়েছিলো। কারণ মীর কাশিম নতুন সংস্কার সূচনা করেছিলেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী কর ছাড়ের যে সুবিধা উপভোগ করেছিলেন নতুন সংস্কারের ফলে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের শপতকৃত শত্রু রামনারায়িনকে ক্ষমত্যচ্যুত করেছিলেন এবং সদ্য সংস্কারকৃত মোগল সেনাবাহিনীকে সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে পাটনায় ফায়ারলক উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছিলেন।
এই ঘটনাগুলোর জন্য ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী মীর কাশিমকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর দ্বারা উৎসাহিত হয়ে আদালত মীর কাশিমকে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বাধ্য করেছিলেন। তখন মীর কাশিম তাঁর পক্ষ থেকে অবধের নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং শাহ আলম- দ্বিতীয়কে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
স্বীকৃত সম্রাট– শাহ আলম-দ্বিতীয় দুররানি সাম্রাজ্য কর্তৃক সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো, সুন্দরবনের ২৪ পরগণা, বাংলা, মুর্শিদাবাদ(বিহার)-এর নবাব মীর কাশিম, বেনারসের রাজা, হায়দ্রাবাদের নিজাম, গাজিপুরের নবাব, পাঞ্জাবের সাহিব, হায়দার আলীর মহীশূর, কাদাপার এবং কর্নলের নবাব, কর্ণাটকের আর্কট এবং নোলোরের নবাব, জুনাগড়ের নবাব, নিন্ম দোয়াবের রোহিলাখণ্ড, উচ্চ দোয়াবের রোহিলাখণ্ড এবং ভাওয়ালপুরের নবাব ।
বক্সারের যুদ্ধ– ১৭৬৪ সালের ২২ এবং ২৩ অক্টোবরের মধ্যে হেক্টর মনরোর নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সেনা এবং বাংলার নবাব মীর কাশিম, অবধের নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মোগল সম্রাট শাহ আলম- দ্বিতীয়ের সন্মিলিত সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছিলো। যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো পাটনা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) পশ্চিমে গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বিহার ভূ-খণ্ডের মধ্যে ‘সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষিত শহর’ বক্সারে।
ব্রিটিশ বাহিনীতে ছিলো ১৮৫৯ জন ব্রিটিশ, ৬০২৪ জন ভারতীয় সেনা এবং ৯১৮৯ জন ভারতীয় অশ্বারোহী সেনার সমন্বয়ে গঠিত ১৭,০৭২ জন সেনা। মোগল সন্মিলিত বাহিনীতে সেনা সংখ্যা ছিলো ৪০,০০০ জন। অন্যান্য সূত্র অনুসারে মোগল, অবধ এবং মীর কাশিমের সন্মিলিত বাহিনীর ৪০,০০০ সেনা ব্রিটিশ বাহিনীর ১০,০০০ সেনার বিরুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলো। তিনটি মিত্রদলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সন্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয় ।
মির্জা নাজাফ খান মোগল সম্রাট বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করছিলেন এবং সূর্যোদয়ের সময় মনরোর বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়েছিলেন। বিশ মিনিটের মধ্যে ব্রিটিশ বাহিনী সংগঠিত হয়ে মোগলদের অগ্রগতিকে বাধা প্রদান করেছিলো। ব্রিটিশদের মতে, দুররানি এবং রোহিলাখণ্ডের সেনারাও যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলো এবং বিভিন্ন সংঘর্ষের সময় যুদ্ধ করেছিলো।
মেজর হেক্টর মনরো তাঁর বাহিনীকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। অবধের নবাব সুজা-উদ-দৌলা নদী পার হওয়ার পর তাঁর নৌকা-ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিলেন। এভাবেই তিনি সম্রাট বাহিনী এবং তাঁর নিজের বাহিনীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। মনরো বিশেষ করে সুজা-উদ-দৌলার বাহিনীকে অনুসরণ করেছিলেন। মধ্যাহ্নের মধ্যেই যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিলো। যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনা দেখে সুজা-উদ-দৌলা তিনটি বড় বড় ট্রিমবিল এবং বারুদের তিনটি বিশাল ম্যাগাজিন উড়িয়ে দিয়েছিলেন। মীর কাশিম তাঁর ৩ মিলিয়ন টাকা মূল্যের রত্ন পাথর নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৭৭৭ সালে মীর কাশিম দারিদ্রতার কারণে মৃতুবরণ করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠার পর মির্জা নাজাফ খান তাঁর বাহিনী নিয়ে শাহ আলমের চার পাশে সমবেত হয়ে সেনা পুনর্গঠন করে ব্রিটিশদের সাথে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়ে পশ্চাদসরণ করেছিলেন।
ইতিহাসবিদ জন উইলিয়াম ফোর্টসকিউ দাবি করেছিলেন যে, ইউরোপীয় রেজিমেন্টের ৩৯ নিহত এবং ৬৪ জন আহত হয়েছিলো। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ভারতীয় সিপাহির ২৫০ জন নিহত, ৪৩৫ জন আহত এবং ৮৫ জন নিখোঁজ হয়েছিলো। মোগল মিত্রবাহিনীর ২০০০ জন নিহত এবং অনেক আহত হয়েছিলো। অন্য এক সূত্রের মতে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ৬৪ জন এবং ভারতীয় ইউরোপীয় সিপাহির ৬৬৪ জন সিপাহি নিহত হয়েছিলো। পক্ষান্তরে মিত্রবাহিনীর ৬০০০ জন সিপাহি নিহত হয়েছিলো। ব্রিটিশরা ১৩ টি আর্টিলারি এবং নগদ ১ মিলিয়নেরও বেশি টাকা হস্তগত করেছিলেন। বক্সারের যুদ্ধের পরপরই হেক্টর মনরো মারাঠাদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বক্সারের যুদ্ধে পরাজয়ের পর অভিজাত মোগলদের মিত্রদলের তিনজন প্রধানের বিপর্যয় হয়েছিলো। মীর কাশিম পালিয়ে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন, শাহ আলম-দ্বিতীয় ব্রিটিশদের নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলেন, অবধের নবাব সুজা- উদ-দৌলা পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং পুরো গঙ্গা উপত্যকা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর করুণা নির্ভর হয়ে পড়েছিলো। সুজা- উদ-দৌলা পরে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং ১৭৬৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা তাঁকে বাংলা, বিহার উড়িষ্যার প্রকৃত শাসক হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। রবার্ট ক্লাইভ বাংলার প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন।
দিওয়ানি অধিকার– বক্সারের যুদ্ধে প্রথমবারের জন্য একজন সার্বভৌম শাসক ব্রিটিশদের কাছে পরাজয় বরণ করেছিলেন। ১৭৬৫ সালে স্বাক্ষরিত এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে শাহ আলম-দ্বিতীয় ব্রিটিশদের কাছ থেকে সাম্রাজ্যের সুরক্ষা চেয়েছিলেন। শাহ আলম-দ্বিতীয় ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে দিওয়ানি(রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার) অধিকার প্রদান করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলার(যার মধ্যে বিহার ও উড়িষ্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিলো) রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে প্রদান করা হয়েছিলো। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী সংগ্রহীত রাজস্ব থেকে বার্ষিক ২.৬ মিলিয়ন টাকা মোগল সম্রাটকে প্রদান করতে হবে এরকম চুক্তি হয়েছিলো। কর অব্যাহতি মর্যদাও কোম্পানী পুনরুদ্ধার করেছিলেন। কোরা এবং এলাহাবাদ জেলাগুলির ২০ মিলিয়ন লোকের কাছ থেকেও ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার প্রদান করা হয়েছিলো। এইভাবে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী বাংলার রাজকীয় কর সংগ্রহের অধিকার প্রাপ্ত হয়েছিলো। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর পক্ষে রাজস্ব সংগ্রহের জন্য একজন ডেপুটি নবাব রেজা খানকে নিয়োগ করা হয়েছিলো।
দিল্লী থেকে অনুপস্থিত– ব্রিটিশদের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত হিসাবে শাহ আলম-দ্বিতীয় ১৭৭২ সাল পর্যন্ত দিল্লী থেকে অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর পুত্র সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী জওয়ান বখত এবং নাজিব-উদদৌলা পরবর্তী ১২ বছর সম্রাটের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
বাংলার দুর্ভিক্ষ– ১৭৭০ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য একটি বড় রকমের বিপর্যয় ছিলো। ১৭৬৯ সাল থেকে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছিলো এবং ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো। বাংলার ৩০ মিলিয়ন লোক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিলো। ১৭৬৮ সালের শরত এবং ১৭৬৯ সালের গ্রীষ্মে ফসল উৎপাদনে ব্যর্থতা এবং গুটিবসন্ত মহামারী দুর্ভিক্ষের কারণ ছিলো। ১৭৬৯ সালের শেষের দিকে চালের দাম দ্বিগুণ বেড়েছিলো এবং ১৭৭০ সালে তিনগুণ বেড়ে গিয়েছিলো। সাত থেকে দশ মিলিয়ন লোক অথবা প্রেসিডেন্সির জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ এবং এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। দুর্ভিক্ষের সময় এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো যে, মোগল সাম্রাজ্য আর প্রধান রাজশক্তি ছিলো না।
দিল্লী প্রত্যাবর্তন– শাহ আলম-দ্বিতীয় ছয় বছর এলাহাবাদ দূর্গে বসবাস করেছিলেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর প্রধান ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭৪ সালে বাংলার প্রথম গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর শাসনকালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী অধিক কর সংগ্রহের জন্য ‘দ্বৈত শাসন’ আইন প্রণয়ন করেছিলেন। সম্রাট নিযুক্ত নবাব এবং অন্যান্য বিষয় ওয়ারেন হেস্টিংস দেখাশুনা করতেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী মোগল সম্রাটকে প্রদান করা বার্ষিক ২.৬ মিলিয়ন কর প্রদান বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কোরা এবং এলাহাবাদের জেলাগুলি অবধের নবাবের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। এই পদক্ষেপগুলি কর সংগ্রাহক হিসাবে কোম্পানীর মোগল সম্রাটের অধীনতা প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত ছিলো। ১৭৯৩ সালে কোম্পানী যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলো এবং নিজামত (স্থানীয় শাসন) সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে বাংলাকে কোম্পানীর সাথে যুক্ত করেছিলেন। দুর্বল সম্রাট শাহ আলম কোম্পানীর পরামর্শে সন্মত হয়েছিলেন। কোম্পানী সম্রাটকে মারাঠাদের বিশ্বাস না করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন।
১৭৭১ সালে মহাদাজি সিন্দের নেতৃত্বে মারাঠারা উত্তর ভারতে ফিরে এসেছিলেন এবং এমনকী তাঁরা দিল্লীও দখল করেছিলেন। শাহ আলম-দ্বিতীয় মহাদাজি সিন্দের দ্বারা সুরক্ষিত হয়ে ১৭৭১ সালের মে মাসে এলাহাবাদ ত্যাগ করেছিলেন এবং ১৭৭২ সালের জানুয়ারিতে দিল্লী পৌঁছেছিলেন। মারাঠাদের সাথে মিলে রোহিলাখণ্ডের ‘ক্রাউন ল্যাণ্ড’ (মুকুট ভূমি- ব্রিটিশদের অধীনে থাকা ভূমি) জয় করার উদ্যোগ নিয়ে জবিতা খানকে পরাজিত করে পাথরগড় দূর্গ এবং তাঁর সমস্ত সম্পদ দখল করেছিলেন।
মহাদাজি সিন্দের সুরক্ষায় শাহ আলম-দ্বিতীয় দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ফলে সম্রাট মারাঠাদের অনুগ্রহীত সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন। তখন মারাঠা পেশোয়া সম্রাটের কাছ থেকে শ্রদ্ধা দাবি করেছিলেন এবং সম্রাট মারাঠা জোটবন্ধনের সাথে সংঘর্ষ এড়াতে সেই দাবি মেনে নিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
১৭৮৭ সালে যোধপুর থেকে বিজয় সিংয়ের দূত শাহ আলম-দ্বিতীয়কে শ্রদ্ধা জানাতে আজমীর দূর্গের সোনার চাবি নিয়ে মোগল দরবারে এসেছিলেন।
গোলাম কাদিরকে হত্যা এবং শাহ আলম-দ্বিতীয়কে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে ১৭৮৮ সালে মারাঠা গ্যারিসন স্থায়ীভাবে দিল্লী দখল করেছিলেন এবং দুই দশক ব্যাপী অর্থাৎ অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত উত্তর ভারত শাসন করেছিলেন।
মোগল সৈন্য পুনর বিন্যাস– সম্রাটের প্রধান কাজগুলির মধ্যে একটি ছিলো মির্জা নাজাফ খানের অধীনে একটি নতুন মোগল বাহিনী গড়ে তোলা। এই নতুন সেনাবাহিনীতে পদাতিক সেনারা ফ্লিন্টলক এবং তরবারি সফলভাবে ব্যবহার করতে পারতো। তাঁরা পরিবহনের জন্য হাতী ব্যবহার করতো এবং কামান ও অশ্বারোহী বাহিনীর উপর কম নির্ভরশীল ছিলো। মির্জা নাজাফ খান বাংলার নবাব মীর কাশিমের সহযোগিতায় কার্যকর ফায়ারলক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন বলে জানা যায় ।
বৈদেশিক নীতি– শাহ আলম-দ্বিতীয় পূর্ব সুবাহ(সাত বছরের যুদ্ধের সময়) পুনরুদ্ধারের জন্য প্রচারাভিযানের সময় জিন ল ডি লরিস্টন এবং ২০০ ফরাসি সেনা দ্বারা সমর্থিত ছিলেন। অভিযানের বুদ্ধিদাতা ছিলেন গোলাম হোসেন তাবাতাবাই। গোলাম হোসেন ফরাসি এবং ডাচ উভয়েরই কাছ থেকে অনেক প্রশাসনিক এবং সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।
বক্সারের যুদ্ধে শাহ আলম-দ্বিতীয় পরাজয়ের পর ফরাসিরা আবারও ১৭৮১ সালে পিয়েরে আন্দ্রে ডে সাফ্রেনের নেতৃত্বে সম্রাটের নিকট এসেছিলেন। আন্দ্রে ডে সাফ্রেন মির্জা নাজাফ খানের সহায়তায় মারাঠা জোটবন্ধন এবং ব্রিটিশদের কাছ থেকে বোম্বে এবং সুরাট বন্দর দখলের পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। এই পদক্ষেপের ফলে শেষপর্যন্ত আসাফ জাহ- দ্বিতীয় এবং শাহ আলম-দ্বিতীয় ফরাসিদের সাথে যোগদান করে হায়দার আলীকে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কাছ থেকে মাদ্রাজ দখল করতে সহায় করেছিলেন। মোগল রাজ দরবারের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সম্রাটকে এরকম আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নিরুৎসাহিত করেছিলো।
জাটদের বিজয়– আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে জাটরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ভরতপুরের জাট রাজারা দিল্লীর মোগলদের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন এবং ১৭ ও ১৮ শতকে আগ্রাসহ মোগল অঞ্চলে অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ১৭৫৭ সালে মারাঠাদের হাতে মোগলরা পরাজিত হয়েছিলো। মোগল সম্পত্তি এবং অঞ্চলগুলি জাট নেতা সুরজমলের নেতৃত্বে জাটদের অধীনে চলে গিয়েছিলো।
একটি ব্যাপক অভিযানের পর জাটরা ১৭৬১ সালে আগ্রা অবরোধ করেছিলো এবং ২০ দিনের অবরোধের পর ১৭৬১ সালে ১২ জুন তারিখে মোগল বাহিনী আগ্রায় জাটদের নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলো। জাটরা আগ্রা শহর লুটপাট করে বিখ্যাত তাজ মহলের প্রবেশদ্বারের দু’টি বড় রৌপ্য দরজা খোলে নিয়ে গিয়েছিলো এবং ১৭৬৪ সালে সুরজমাল সেগুলি গলিয়ে ফেলেছিলেন।
সূরজমালের পুত্র জওহর সিং জাট বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করেছিলেন এবং দোয়াব, বল্লবগড় এবং আগ্রা অঞ্চল দখল করেছিলেন। জাটরা ১৭৬১ সাল থেকে ১৭৭৪ সাল পর্যন্ত আগ্রার দূর্গ এবং আশেপাশের অঞ্চলগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলো।
শিখ বিজয়–শিখরা মোগলদের অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে চিরকাল যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, বিশেষ করে শিখগুরু তেগ বাহাদুরের শিরশ্ছেদের পর থেকে। ১৭৬৪ সালে সিমরাং শিখরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং সিরহিন্দের মোগল ফৌজদার জয়েন খান সিরহিন্দীকে পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন। তখন থেকেই শিখরা প্রায় প্রতি বছর আক্রমণ করে দিল্লী পর্যন্ত ভূমি থেকে বাউন্টি আদায় করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
শাহ আলম-দ্বিতীয় দিল্লী আসার আগে মারাঠারা ১৭৭১ সালে দিল্লী দখল করেছিলো। মির্জা নাজাফ খান সেনা বাহিনী সংস্কার করে মোগলদের সমৃদ্ধি এবং প্রশাসনে শৃংখলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। ১৭৭৭ সালে নাজাফ খান রোহিলাখণ্ডের জাবিতা খানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন এবং শিখদের বিতাড়ন করেছিলেন।
১৭৭৮ সালে শিখরা দিল্লী আক্রমণের পর সম্রাট শাহ আলম-দ্বিতীয় শিখদের বিরুদ্ধে মোগল উজির-এ-আজম মাজাদ-উদ-দৌলার নেতৃত্বে ২০,০০০ সেনা প্রেরণ করেছিলেন। তবে মাজাদ-উদ-দৌলার নেতৃত্বে মোগল বাহিনী মুজাফফরগড় এবং ঘানৌরের যুদ্ধে শিখবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিলো। তখন সম্রাট মির্জা নাজাফ খানকে পুনরায় শিখদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলেন।
১৭৭৯ সালে মির্জা নাজাফ খান সতর্কতার সাথে তাঁর বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়ে বিশ্বাসঘাতক জবিতা খান এবং তাঁর শিখ মিত্রজোটকে পরাস্ত করেছিলেন। শিখ মিত্রজোটের এই পরাজয়ের পর সেনাপতি মির্জা নাজাফ খানের জীবদ্দশায় মোগল সাম্রাজ্য আর কোনদিন শিখদের হুমকির মুখে পড়েনি।
মোগল সাম্রাজ্য এমনভাবে ভেঙে পড়েছিলো যে, শাহ আলম-দ্বিতীয়ের হাতে শাসন করার জন্য শুধুমাত্র দিল্লী অবশিষ্ট ছিলো। ১৭৮৩ সালে জাসা সিং রামগড়িয়া, জাসা সিং আহলুওয়ালিয়া এবং বাঘেল সিং দিল্লী শহর অবরোধ করেছিলেন। লালকেল্লায় পৌঁছানোর পর বাঘেল সিংয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে জাসা সিং আহলুওয়ালিয়া দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলো এবং তাঁকে বাদশা সিং উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। তখন বেগম সামরু বাঘেল সিংকে সম্রাট শাহ আলম-দ্বিতীয়ের প্রতি করুণা প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বাঘেল সিংয়ের দাবি মেনে নিয়ে সম্রাট শাহ আলম- দ্বিতীয় ৩০,০০০ শিখ সেনা দিল্লীতে থাকার অনুমতি এবং তাঁদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন। বাঘেল সিংয়ের অন্যান্য দাবির মধ্যে ছিলো, কমপক্ষেও ৫ টি গুরুদ্বার নির্মাণ এবং সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৩.৫ শতাংশ বার্ষিক কর প্রদান। সম্রাট লিখিত চুক্তির মাধ্যমে দাবিগুলি মেনে নিয়েছিলেন। শিখরা রাজনীতির কারণে মোগল দরবারের কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। সেজন্য মহাদাজি সিন্দেকে রাজপ্রতিনিধির দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো। শিখরা ‘ক্রাউন ভূমিতে লুণ্ঠন না করার জন্য তাঁদের দিল্লীর রাজস্বের বার্ষিক এক তৃতীয়াংশ কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছিলো।
পতন– মুজাফ্ফরগড় এবং পরে ঘানৌরে পরাজয়ের পর শাহ আলম-দ্বিতীয়ের নির্দেশে মাজা-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিলো এবং তাঁর নিকট থেকে চুরি করা রাজস্বের দুই মিলিয়ন ডামস উদ্ধার করা হয়েছিলো। মাজাদ-উদ-দৌলা তখন প্রাক্তন উজির-এ-আজম নাজাফ খানকে স্মরণ করেছিলেন। সম্রাট তখন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে শত্রুর সাথে সহযোগিতা করার অপরাধে নাজাফ খানকে গেপ্তার করেছিলেন। এটা সম্রাটের ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো এবং এই সিদ্ধান্তের ফলে মোগল সাম্রাজ্যকে পতনের দিকে নিয়ে গিয়েছিলো। মির্জা নাজাফ খান শক্তিশালী এবং সুপরিচালিত সেনাবাহিনীর মাধমে মোগল সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। ১৭৭৯ সালে নাজাফ খানের নেতৃত্বে সদ্য সংস্কারকৃত মোগল বাহিনী রোহিলাখণ্ডের নবাব জবিতা খানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলো। নাজাফ খানের মৃত্যুর পর দুর্ভাগ্যবশত তাঁর ভাতিজা মির্জা শফিকে সেনাপতি পদে নিযুক্ত করা হয়নি। অথচ তাঁর বীরত্ব বিভিন্ন অভিযানে প্রমাণিত হয়েছিলো। মির্জা শফির পরিবর্তে শাহ আলম-দ্বিতীয় সন্দেজনক আনুগত্য থাকা অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ করেছিলেন। তাঁরা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া শুরু করেছিলেন। দুর্নীতিবাজ এবং বিশ্বাসঘাতক মাজাদ-উদ-দৌলাকে তাঁর প্রাক্তন পদে নিয়োগ করেছিলেন। মাজাদ-উদ-দৌলা শিখদের সাথে যোগসাজশ করে মোগল সেনাবাহিনীর আকার ২০,০০০ থেকে কমিয়ে ৫০০০-এ নামিয়ে এনেছিলেন। এইভাবে পরে শাহ আলম- ম-দ্বিতীয়কে শত্রুর করুণায় বেঁচে থাকতে বাধ্য করা করেছিলো।
গোলাম কাদিরের শত্রুতা– নবাব মাজাদ-উদ-দৌলা মোগলদের পরিচিত শত্রু ছিলেন। নাজিব খানের নাতি গোলাম কাদির তাঁর শিখ মিত্রজোটের সাথে মিলে মাজাদ-উদ-দৌলাকে উজির-এ-আজম পদে নিযুক্ত করার জন্য সম্রাটকে বাধ্য করেছিলেন। গোলাম কাদির মোগল গুপ্তধনের সন্ধানে মোগল প্রাসাদকে ধ্বংস করে ফেলেছিলেন। গুপ্তধনের মূল্য ২৫০ মিলিয়ন টাকা ছিলো বলে বিশ্বাস করা হয়। ভাবা ধরণে গুপ্তধনের সন্ধান এবং শিখদের সাহায্যে সম্রাটকে ক্ষমতচ্যুত না করতে পেরে ক্ষোভিত হয়ে ১৭৮৮ সালের ১০ আগস্ট গোলাম কাদির স্বয়ং একটি আফগানী ছুরি দিয়ে সম্রাটকে অন্ধ করে আহমদ শাহ বাহাদুরের পুত্র বিদর বখতত বাহাদুরকে ১৭৮৮ সালের ৩১ জুলাই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি শাহ জাহান-চতুর্থ উপাধি ধারণ করেছিলেন।
তারপর গোলাম কাদির সম্রাট এবং তাঁর পরিবারের উপর বর্বর অত্যাচার শুরু করেছিলেন। অন্ধ করার ফলে সম্রাটের চোখ থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো। তখন সম্রাটকে সহায় করার জেন্য চেষ্টা করার অপরাধে তিনজন ভৃত্য এবং দুইজন জলবাহকের শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো। একটি বিবরণ অনুসারে গোলাম কাদির বয়স্ক সম্রাটের দাড়ি ধরে টেনেছিলেন। গোলাম কাদির রাজপরিবারের সদস্যদের তাঁর সামনে উলঙ্গ হয়ে নাচতে বাধ্য করেছিলেন। দশদিন পর তাঁরা যমুনা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তখন রাজপরিবারের সন্মান এবং প্রতিপত্তি একেবারে নিম্নস্তরে পৌঁছেছিলো। মারাঠা নেতা মহাদাজি সিন্দে তখন ১৭৮৮ সালের ২ অক্টোবর দিল্লী দখল করে শাহ আলম-দ্বিতীয়কে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন এবং সুরক্ষা দিয়েছিলেন। মহাদাজি সিন্দে গোলাম কাদিরকে বন্দি এবং হত্যা করে তাঁর চোখ এবং কান সম্রাটের কাছে প্রেরণ করেছিলেন।
কৃতজ্ঞতা স্বরূপ শাহ আলম-দ্বিতীয় মহাদাজি সিন্দেকে ভাকিল-উল-মুতলাক এবং আমির-উল-ওমারা (আমিরদের প্রধান)উপাধি প্রদান করেছিলেন। সম্রাট মারাঠা মিত্রজোটের মহাদাজি সিন্দে প্রদত্ত সুরক্ষার বিনিময়ে পুণেকে সন্মানী হিসাবে পেশোয়ার সাথে যুক্ত করেছিলেন।
শাহ আলমকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার পর ১৭৮৮ সালে মারাঠা বাহিনী স্থায়ীভাবে দিল্লী দখল করেছিলেন এবং ১৮০৩ সালের অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার আগে পর্যন্ত মারাঠারা উত্তর ভারত শাসন করেছিলেন।
ব্রিটিশ সেনা আগমন– ইউরোপে ফরাসি হুমকি এবং ভারতে এর সাম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়ে ব্রিটিশরা শাহ আলম- দ্বিতীয়কে নিজেদের পক্ষে আনার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। ব্রিটিশরা আশঙ্কা করেছিলেন যে, ফরাসি সামরিক বিষয়ারা রাঠাদের উৎখাত করে ভারতে তাঁদের স্থিতি শক্তিশালী করার জন্য সম্রাট শাহ আলম-দ্বিতীয়ের কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে পারে! শাহ আলম-দ্বিতীয় ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সম্প্রসারণবাদী শক্তি সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। সেজন্য হায়দার আলী এবং পরে তাঁর পুত্র টিপু সুলতানের সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর দ্বন্দ্বের সময় শাহ আলম-দ্বিতীয় হায়দার আলী এবং পরে তাঁর পুত্র টিপু সুলতানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিলেন।
দিল্লীর যুদ্ধের পর দ্বিতীয় অ্যাংলো-মরাঠা যুদ্ধের সময় ১৮০৩ সালের ১৪ সেপ্তেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা মোগলদের উপর মারাঠা শাসনের অবসান ঘটিয়ে দিল্লীতে প্রবেশ করেছিলো। তখন অন্ধ বৃদ্ধ শাহ আলম-দ্বিতীয় একটি ছেঁড়া ছাউনির নিচে বসে ছিলেন। ব্রিটিশ সৈন্যরা সেখান থেকে তাঁকে আটক করে দিল্লীতে নিয়ে এসেছিলেন। মোগল সম্রাটের তখন তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়ন করার মতো সামরিক শক্তি ছিলো না। তবে তিনি তৈমুর রাজবংশের একজন সম্মানিত সদস্য হিসাবে আনুষ্ঠানিক নির্দেশ প্রদান করতেন। নবাব এবং সুবেদাররা মোগল সম্রাটের অনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতেন এবং মোগল সম্রাট কর্তৃক প্রদত্ত উপাধিকে সম্মান করতেন। তাঁরা সম্রাটের নামে মুদ্রা ব্যবহার করতেন এবং শুক্রবারের নামাজের সময় তাঁর নামে খোতবা পাঠ করতেন। ১৮০৪ সালে মারাঠারা ব্রিটিশদের কাছ থেকে দিল্লী ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিলেন।
মৃত্যু– ১৮০৬ সালের ১৯ নভেম্বর শাহ আলম-দ্বিতীয় দিল্লী সুবাহের শাহজাহানাবাদে প্রাকৃতিক কারণে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ১৩ শতকের সুফি সাধক কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর মেহরুলিস্থিত দরগাহের পাশে মতি মসজিদ সংলগ্ন একটি স্থানে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। তাঁর সমাধির পাশে শাহ আলম-প্রথম এবং আকবর শাহ-দ্বিতীয়ের সমাধি রয়েছে।
শাহ আলম–দ্বিতীয়ের স্ত্রী– তাজ মহল, জামিল-উন-নিসা বেগম, মুবারক মহল, মুরাদ বখত বেগম, কুদসিয়া বেগম, আজিজান মালিকা-ই-আলম, শাহাবাদী মহল, নবাব মহল এবং নাজাকাত মহল ।
সন্তান– আকবর-দ্বিতীয়, মির্জা জাহান্দার শাহ জওয়ান বখত, মির্জা জাহান শাহ ফখরুন্দ আখতার, মির্জা সোলেইমান শিকোহ, মির্জা সিকান্দার শিকোহ, মির্জা ইজ্জত বক্স, মির্জা জামশেদ বখত, বেগম জান বেগম, আজিজ-উন-নিসা বেগম, রুফা-উল-নিসা বেগম, আলিয়াত-উন-নিসা বেগম, সাদাত-উন-নিসা-বেগম, আকবরবাদী বেগম এংব দিল-আফ্রোজ বানু বেগম।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে শাহ আলম–দ্বিতীয়– ১৯৯৪ সালে নির্মিত টিভি ধারাবাহিক ‘দ্য গ্রেট মারাঠা’য় শাহ আলম- দ্বিতীয়ের চরিত্রে ঋষভ শুক্লা অভিনয় করেছিলেন।
মাহমুদ শাহ বাহাদুর (শাহ জাহান–চতুর্থ)
বিদার বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুরের জন্ম ১৭৪৯ সালে মোগল সাম্রাজ্যের লালকেল্লায়। জন্মের পর তাঁর নাম বিদার বখত রাখা হয়েছিলো। পরে তিনি মাহমুদ শাহ বাহাদুর এবং বাঙ্কা নামেও পরিচিত ছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যে বিশিষ্ট যোদ্ধাদের তখন এরকম উপাধি প্রদান করা হতো। তাঁর পিতার নাম আহমদ শাহ বাহাদুর। ১৭৫৩ সালে তৎকালীন পাঞ্জাবের গভর্নর মীর মান্নুর মৃত্যুর পর তাঁকে পাঞ্জাবের গভর্নর হিসাবে নিযুক্তি প্রদান করা হয়েছিলো। ১৭৫৪ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তাঁকে সলিমগড় দূর্গে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। মাহমুদ শাহ বাহাদুর দুই কন্যা সন্তান নবাব নাজিবাদ আফ্রোজ বানু বেগম সাহিবা এবং নবাব মহম্মদী বেগম সাহিবার পিতৃ ছিলেন।
গোলাম কাদিরের উত্থান এবং মাহমুদ শাহ বাহাদুরের সিংহাসন আরোহণ- গোলাম কাদির ছিলেন রোহিলা সর্দার জাবিতা খানের পুত্র। গোলাম কাদিরের সম্পূর্ণ নাম ছিলো, গোলাম আবদেল কাদির আহমদ খান। ১৭৭০ সালের ৩১ অক্টোবর গোলাম কাদিরের পিতামহ নাজিব-উদ-দৌলার মৃত্যুর পর তাঁর পিতা জাবিতা খান আফগান রোহিলাদের একটি শাখার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। শাহ আলম-দ্বিতীয় জাবিতা খানকে মীর বক্সী (মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান) হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন। জাবিতা খানের নেতৃত্বে রোহিলারা বেস কয়েকটি বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিলো। সেজন্য শাহ আলম-দ্বিতীয় মারাঠা নেতা মহাদাজি সিন্দের নেতৃত্বে জাবিতা খানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। এই অভিযানের সময় জাবিতা খান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো এবং জাবিতা খানের পরিবারের সদস্য হিসাবে গোলাম কাদির ঘাউসগৌড়ে বন্দি হয়েছিলো। তখন তাঁর বয়স ছিলো মাত্র দশ বছর।
বন্দি করার পর গোলাম কাদিরকে দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়েছিলো। সেখানে তিনি পুরানা দিল্লীর কুদসিয়া বাগে বড় হয়েছিলেন। শাহ আলম-ি ম-দ্বিতীয় তাঁকে নিজের ছেলে বলে সম্বোধন করতেন এবং তাঁকে রওসন-উদ-দৌলা উপাধি প্রদান করেছিলেন। সম্রাট তাঁকে নিয়ে কবিতাও রচনা করেছিলেন। সেই কবিতাগুলির কিছু এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। এক সময় গোলাম কাদিরের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়তে শুরু হয়েছিলো। ফলে শাহ আলম-দ্বিতীয় তাঁকে তাঁর পিতা জাবিতা খানের কাছে ফেরত পাঠিয়েছিলেন এবং তিনি জাবিতা খানকে ক্ষমা করে দিয়ে মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (মীর বক্সী) হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন।
১৭৮৫ সালের ২১ জানুয়ারি গোলাম কাদির তাঁর পিতা জাবিতা খানের মৃত্যুর পর পিতার উত্তরসূরি হিসাবে রোহিলাদের . নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়েছিলেন। গোলাম কাদির তাঁর পিতামহ ও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মীরবক্সী পদে নিয়োগ হতে চেয়েছিলেন। গোলাম কাদির তাঁর দক্ষতা প্রতিপন্ন করার জন্য সম্রাটের সাথে সাক্ষাত করার অনুমতি চেয়েছিলেন এবং মোগল দরবারের হারেমের নাজির মঞ্জুর (মনসুর) আলী খান মারাঠাদের প্রতিরোধ করার জন্য তাঁকে সমর্থন করেছিলেন। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের মতে, ঘাউসগড়ের যুদ্ধের সময় মঞ্জুর আলী খান ব্যক্তিগতভাবে গোলাম কাদিরের জীবন রক্ষা করেছিলেন। তবে সম্রাট গোলাম কাদিরকে মীর বক্সী পদে নিয়োগ করা থেকে বিরত ছিলেন।
দিল্লী রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত লোক না থাকার সুযোগ নিয়ে ১৭৮৭ সালের ২৬ শে আগস্ট গোলাম কাদির দিল্লী শহরে প্রবেশ করেছিলেন এবং মঞ্জুর আলী খান তাঁকে সম্রাটের সন্মুখে উপস্থিত করেছিলেন। তখন সম্রাট তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ক্ষুব্ধ গোলাম কাদির ১৭৮৭ সালের ৫ সেপ্তেম্বর ২,০০০ সেনা নিয়ে আবার দিল্লীতে প্রবেশ করেছিলেন। এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও সম্রাট তাঁকে মীরবক্সী পদে নিয়োগ করে আমিরুল উলামা উপাধি প্রদান করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
শাহ আলম-দ্বিতীয়ের দরবারে অবস্থান সুসংহত করার জন্য গোলাম কাদির সারধনের শাসক ওয়াল্টার রেইনহার্ডের স্ত্রী বেগম সামরুর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন। কারণ সেই সময়ে বেগম সামরুর মোগল দরবারে যথেষ্ট প্রভাব ছিলো। কারণ বেগম সামরু তখন দিল্লী শহরে অবস্থানরত ফরাসি নেতৃত্বাধীন চারটি ব্যাটালিয়ানকে কমাণ্ড করছিলেন।
তবে, বেগম সামরু গোলাম কাদিরকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে গোলাম কাদিরের ফরাসি ব্যাটালিয়ানকে শহর থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছিলেন এবং অন্যথায় শত্রুতা করার হুমকি প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বেগম সামরু গোলাম কাদিরের হুমকিকে উপেক্ষা করে ফরাসি ব্যাটালিয়ানকে শহর থেকে অপসারণের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত ছিলেন। ফলে গোলাম কাদির ক্ষুব্ধ হয়ে সলিমগড় দূর্গে কামান স্থাপন করেছিলেন এবং ১৭৮৭ সালের ৭ ই অক্টোবর তিনি রাজকীয় প্রাসাদে কামানের গোলা বর্ষণ করেছিলেন। এই ক্ষেত্রে নাজির তাঁকে বাধা প্রদান করেছিলেন এবং নিরুৎসাহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
দিল্লী দখল করতে ব্যর্থ হয়ে গোলাম কাদির এবং তাঁর রোহিলা সেনারা দোয়াব অঞ্চলের ‘ক্রাউন ভূমি’ জয় করার উদ্দেশ্যে দিল্লী ত্যাগ করেছিলেন। গোলাম কাদিরের এই পদক্ষেপের ফলে লর্ড কর্ণওয়ালিশ ১৭৮৭ সালের ১৪ নভেম্বর তাঁকে পত্র লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত গোলাম কাদির ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী এবং তাঁদের মিত্র অবধের নবাবের সাথে শান্তি বজায় রাখবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না। গোলাম কাদির এই দাবি মেনে নিয়েছিলেন।
দিল্লী দখল– ১৭৮৮ সালে গোলাম কাদির ইসমাইল বেগের সেনার সাথে যোগদান করে দিল্লী অভিমুখে অভিযান শুরু করেছিলেন। ছোট মোগল বাহিনীকে তাঁদের সাথে যোগদান করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা রাষ্ট্রদ্রোহীদের সাথে যোগদান করতে অস্বীকার করেছিলেন। ১৭৮৮ সালের ১৮ জুলাই গোলাম কাদির এবং ইসমাইল বেগ দিল্লী শহর এবং লালকেল্লা সম্পূর্ণভাবে দখল করেছিলেন।
১৭৮৮ সালের ১৮ জুলাই থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লীতে গোলাম কাদিরের দখল চলছিলো। এই সময়ে তিনি ১৭৮৮ সালের ৩০ জুলাই শাহ আলম-দ্বিতীয়কে ক্ষমতাচ্যুত করে মোগল শাহজাদা বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুরকে নাসির-উদ-দীন মহম্মদ জাহান শাহ উপাধি প্রদান করে ১৭৮৮ সালের ৩১ জুলাই সম্রাট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিদর বখতকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার বিনিময়ে মহম্মদ শাহের স্ত্রী বাদশা বেগম গোলাম কাদিরকে ১২ লক্ষ টাকা প্রদান করেছিলেন। বাদশাহ বেগম ১৭২১ সাল থেকে ১৭৪৮ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মালিকা-উজ-জামানী ছিলেন। বিদর বখত বাদশা বেগমের নাতি ছিলেন।
গোলাম কাদিরের এই দখলদারিত্ব সাম্রাজ্যকে একটি সন্ত্রাসের রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলো। গোলাম কাদির শাহ আলম- দ্বিতীয়কে ১৭৮৮ সালের ১০ আগস্ট অন্ধ করে দিয়েছিলেন। কথিত রয়েছে যে, শাহ আলম-দ্বিতীয়কে অন্ধ করার পর গোলাম কাদির বলেছিলেন যে, এটি ঘাউসগড়ের যুদ্ধের ফল। ২১ জন শাহজাদা এবং শাহজাদীদের হত্যা করা হয়েছিলো। রাজকীয় পরিবারের মহিলাদের নির্যাতন করা হয়েছিলো। এমনকী বাদা বেগমের প্রাসাদেও অভিযান চালানো হয়েছিলো এবং তাঁকে একটি নদীর তীরে রাখা হয়েছিলো। নাজিরের বাড়ীতেও লুটপাট চালিয়ে সমস্ত জিনিস ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিলো। গোলাম কাদিরের দিল্লী লুণ্ঠনের ফলে ২৫ কোটি টাকার সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছিলো বলে জানা যায়। যদুনাথ সরকারের মতে, ‘এই দানবের নৃত্যের ফলে সাম্রাজ্যের প্রতিপত্তি বিনষ্ট হয়েছিলো।
দিল্লী অভিযানে অংশগ্রহণ করার জন্য ইসমাইল বেগকে পুরস্কৃত করা হয়নি। যার জন্য মারাঠারা দিল্লী আক্রমণ করার সময় ইসমাইল বেগ গোলাম কাদিরের সঙ্গ ত্যাগ করে মারাঠাদের সাথে যোগদান করেছিলেন।
১৭৮৭ সালের সেপ্তেম্বরে মারাঠারা গোলাম কাদিরের দখল থেকে মুক্ত করার জন্য দিল্লী আক্রমণ করেছিলেন। মারাঠা নেতা মহাদাজি সিন্দের নেতৃত্বে ১৭৮৭ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর পুরানা দিল্লী দখল করেছিলেন। এরপর মারাঠাদের সন্মিলিত বাহিনী, বেগম সামরু এবং ইসমাইল বেগ গোলাম কাদিরের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। গোলাম কাদিরের নেতৃত্বে রোহিলারা এই সন্মিলিত বাহিনীকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বাধা দিয়ে রাখতে পারেননি। গোলাম কাদির ১৮৮৭ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর বাহিনী নিয়ে দিল্লী দূর্গ ত্যাগ করেছিলেন।
১৮৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর মারাঠারা অন্ধ শাহ আলম- ম-দ্বিতীয়কে সিংহাসনে পুনর্বাহাল করেছিলেন এবং ১৭ অক্টোবর তাঁর নামে খোতবা পাঠ করা হয়েছিলো। ১৭৮৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয়বারের জন্য শাহ আলম- দ্বিতীয়ের রাজ্যাভিষেক করা হয়েছিলো।
দিল্লী দখল করার পর মারাঠারা গোলাম কাদিরের সন্ধানে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। গোলাম কাদির মিরাট দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। মারাঠারা দূর্গ অবরোধ করার পর গোলাম কাদির ৫০০ অশ্বরোহী সেনা নিয়ে রাতে ঘাউসগড় অভিমুখে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। মারাঠাদের টহলদার বাহিনী দ্বারা তাঁদের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করার পর গোলাম কাদির দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং হোঁচট খেয়ে তাঁর ঘোড়ার পা ভেঙ্গে গিয়েছিলো। তখন তিনি একাই হেঁটে উত্তর প্রদেশের বামৌলিতে একজন ব্রাহ্মণের বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং পুরস্কারের বিনিময়ে ব্রাহ্মণের নিকট একটি ঘোড়ার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তাঁকে মারাঠাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ১৭৮৮ সালের ১৮/১৯ ডিসেম্বরে মারাঠারা তাঁকে বন্দি করেছিলেন। যদুনাথ সরকার এবং হারবার কম্পটনের মতে, দিল্লী থেকে লুট করা মূল্যবান জিনিসপত্র লেস্টিনিউয়ের হাতে পড়েছিলো এবং তিনি সেগুলি যুক্তরাজ্যে নিয়ে গিয়েছিলেন।
কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই গোলাম কাদির কিছুদিনের জন্য মারাঠাদের হেফাজতে ছিলো। ১৭৮৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শাহ আলম-দ্বিতীয় গোলাম কাদিরের চোখ চেয়ে মহাদাজি সিন্দের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। অন্যথায় শাহ আলম দ্বিতীয় অবসর গ্রহণ করে মক্কা গিয়ে ভিক্ষুকের জীবন অতিবাহিত করার কথা লিখেছিলেন। পত্র পেয়ে মহাদাজি সিন্দে গোলাম কাদিরের কান কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং পরের দিন নাক, জিব্বা এবং উপরের ঠোঁট কেটে একটি কাস্কেটে(গয়না রাখা বাস্ক) ভরে সম্রাটের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। এরপর তাঁর অঙ্গচ্ছেদ চলছিলো। হাত, পা, যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছিলো। ১৭৮৯ সালের ৩ মার্চ শিরশ্ছেদ করে মথুরায় একটি গাছে তাঁর মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো। শিরশ্ছেদ করার আগে তাঁর কান কেটে ও চোখ উপড়ে সম্রাটের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।
দিল্লী থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুর এবং রাজকীয় পরিবারের অন্যান্য শাহজাদাদের সঙ্গে নিয়ে গোলাম কাদির মিরাট গিয়েছিলেন। মারাঠারা মিরাট দূর্গ অবরোধ করার সময় গোলাম কাদির বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুর, অসহায় রাজপুত্র এবং অন্যান্য বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু গোলাম কাদিরের দেহরক্ষী মনিয়ার সিং তাঁকে এ কাজ করতে বারণ করেছিলেন। অতঃপর বন্দিদের রেখেই গোলাম কাদির পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৮ ডিসেম্বর বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুর সিন্দের বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন এবং তাঁকে সলিমগড় দূর্গে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। ১৭৮৮ সালের গোলযোগে তাঁর ভূমিকার জন্য শাহ আলম-দ্বিতীয় তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। ১৭৯০ সালে শাহজাহানাবাদে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো।
মৃত্যুর পর বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুরকে পুরানা দিল্লীতে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
আকবর–দ্বিতীয়
মির্জা আকবর-দ্বিতীয়ের জন্ম ১৭৬০ সালের ২২ এপ্রিল মারাঠা সাম্রাজ্যের সাতনার মুকুন্দপুরে। তিনি আকবর শাহ- দ্বিতীয় নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঊনবিংশতম মোগল সম্রাট ছিলেন। তাঁর পিতার নাম শাহ আলম-দ্বিতীয় এবং মাতৃর নাম কুদসিয়া বেগম। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মির্জা জাহান্দার শাহের মৃত্যুর পর ১৭৮১ সালের ২ মে লালকেল্লায় তাঁকে ওয়ালি আহাদ বাহাদুর উপাধি প্রদান করে ‘ক্রাউন প্রিন্স’-এর মর্যদা প্রদান করা হয়েছিলো। ১৭৮২ সালে তাঁকে দিল্লীর ভাইসরয় হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিলো এবং ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি উক্ত পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৭৮৮ সালে রোহিলা সর্দার গোলাম কাদির দিল্লী দখল করার পর তিনি অন্যান্য মোগল শাহজাদা এবং শাহজাদীদের সাথে নাচতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, কীভাবে মোগল শাহজাদা এবং শাহজাদীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছিলো। সেই সাথে তাঁরা ক্ষুধার্তও ছিলেন।
শাহ জাহান-চতুর্থ গোলাম কাদিরের সাথে পালিয়ে যাওয়ার পর মির্জা আকবর, আকবর-দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করে ‘টিটুলার(নামমাত্র)সম্রাট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ১৭৮৯ সালে তাঁর পিতা শাহ আলম-দ্বিতীয় সিংহাসনে পুনঃঅধিষ্ঠিত হওয়ার পরেও তাঁকে ভারপ্রাপ্ত সম্রাট হিসাবে রাজকার্য পরিচালনা করতে হয়েছিলো। তাঁর পিতা শাহ আলম-দ্বিতীয়ের মৃত্যুর পর তিনি ১৮০৬ সালের ১৯ নভেম্বর দিল্লীর লালকেল্লায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং ১৮৩৭ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর মাধ্যমে ভারতে ক্রমবর্দ্ধমান ব্রিটিশ প্রভাবের কারণে আকবর-দ্বিতীয়ের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিলো। তাঁর রাজত্বকালে, ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী মোগল সম্রাটের প্রজা হিসাবে পরিচয় প্রদান করতে অস্বীকার করেছিলেন এবং সম্রাটের নামে মূদ্রা জারি করা বন্ধ করে দিয়েছিলো। কোম্পানীর মূদ্রা থেকে ফার্সি লাইনগুলি মুছে ফেলা হয়েছিলো।
আকবর-দ্বিতীয়কে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য উৎসব ‘ফুল ওয়ালো কী সাইর’ শুরু করার কৃতিত্ব প্রদান করা হয়। ফুল ওয়ালো কী সাইর-এর অর্থ ‘ফুল বিক্রেতাদের মিছিল’। এটি ফুল বিক্রেতাদের বার্ষিক উৎসব ছিলো। উৎসবটি বর্ষাকালের ঠিক পরে মেহরাউলি অঞ্চলে সেপ্তেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হতো এবং তিনদিন স্থায়ী হতো। উৎসবটিকে দিল্লীর মিশ্রিত সংস্কৃতির উদাহরণ হিসাবে দেখা হয়। উৎসবটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশকে শক্তিশালী করতো। উৎসবটি আজও হিন্দু-মুসলমান উভয়েই একই ভাবে উদযাপন করেন।
ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব হিসাবে শেহনাই বাদক এবং নর্তকদের নেতৃত্বে ফুলের পাখা নিয়ে মিছিল করে যোগমায়া মন্দির হয়ে মেহরাউলি বাজারের মধ্য দিয়ে ১৩ শতকের সুফি সাধক খাজা বখতিয়ার কাকীর দরগাহ পর্যন্ত যেতেন।
তিনদিনের এই উৎসব ‘সাইর-ই-গুল ফরোশন’ নামেও পরিচিত ছিলো। ফুল বিক্রেতারা মন্দির এবং দরগাহে সূচিকর্ম করা বড় পাখা অর্পণ করে আগামী বছরের ভালো ফুলের মৌসুমের জন্য প্রার্থনা করতেন।
শাসন– সম্রাট আকবর-দ্বিতীয় একটি বিশাল সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন, যদিও তাঁর শাসন ক্ষমতা কার্যত শুধুমাত্র দিল্লীর লালকেল্লা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলেন। তাঁর রাজত্বাকালে দিল্লীর সাংস্কৃতিক জীবন সামগ্রিকভাবে বিকাশ লাভ করেছিলো। যাইহোক, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কর্মকর্তাদের প্রতি বিশেষ করে লর্ড হেস্টিংসের প্রতি সম্রাটরে মনোভাব একজন প্রজা ছাড়া অন্য কিছু ছিলো না। হেস্টিংসকে তিনি একজন প্রজা ছাড়া অন্য শর্তে প্রজাদের সন্মুখে উপস্থিত হতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশদের ক্রমবর্ধমান উত্থান দেখে হতাশ হয়েছিলেন। পক্ষান্তরে ব্রিটিশরা তাঁকে কেবল তাঁদের পেন্সনভোগী হিসাবে বিবেচনা করতেন। ব্রিটিশরা ১৮৩৫ সালে তাঁকে ‘দিল্লীর রাজা’ পর্যন্ত তাঁর উপাধি সীমাবদ্ধ করে দিয়েছিলেন এবং ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ১৮০৩ সাল থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্যের নিছক লেফটেনেন্ট হিসাবে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁরা মুদ্রায় ফার্সি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা প্রতিস্থাপিত করতে শুরু করেছিলেন, যেখানে সম্রাটের নাম প্রতিস্থাপিত করা হত না ।
ব্রিটিশরা সম্রাটের মর্যদা এবং প্রভাব হ্রাস করার জন্য অবধের নবাব এবং হায়দ্রাবাদের নিজামকে রাজকীয় উপাধি ধারণ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। অবধের নবাব যদিও রাজা উপাধি ধারণ করেছিলেন, হায়দ্রাবাদের নিজাম অবশ্যে তা করেন নি।
আকবর-দ্বিতীয় টঙ্কের নবাব এবং জাওড়ার নবাবকে নবাব উপাধি প্রদান করেছিলেন বলেও জানা যায়।
আকবর-দ্বিতীয় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী তাঁর বিরুদ্ধে করা অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আপীল করার জন্য বাঙালি সংস্কারক রাম মোহন রায়কে রাজা উপাধিতে ভূষিত করে ইংল্যাণ্ড প্রেরণ করেছিলেন। রাজা রাম মোহন রায় জেমসের কোর্টে মোগল রাজদূত হিসাবে সফর করেছিলেন এবং মোগল শাসকের পক্ষে একটি স্মারক জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় নি ।
মৃত্যু– ১৮৩৭ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর দিল্লীতে ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার পর আকবর-দ্বিতীয়কে ১৩ শতকের সুফি সাধক কুতুবুদ্দিন কাকীর মেহরুলিস্থিত দরগাহের পাশে মতি মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। তাঁর সমাধি মতি মসজিদ সংলগ্ন একটি মার্বেল ঘেরের মধ্যে অবস্থিত। মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ প্রথম এবং শাহ আলম-দ্বিতীয়ের সমাধিও সেখানে অবস্থিত।
বংশধর– সিপাহি বিদ্রোহের পর দ্বিতীয় আকবরের পুত্র তথা বাহদুর শাহ জাফরের পুত্র শাহজাদা মির্জা মোগল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। বেঁচে থাকা অনেক শাহজাদা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বসতি স্থাপন করেছিলেন। কেউ কেউ বাংলা এবং বার্মায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। কারণ বাহাদুর শাহ জাফরের সাথে বিপুল সংখ্যক মোগল রাজকীয় পরিবার বার্মায় নির্বাসিত হয়েছিলেন। •
বাহাদুর শাহ জাফর
মির্জা জাফর সিরাজ-উদ-দীন মহম্মদ-এর জন্ম ১৭৭৫ সালের ২৪ শে অক্টোবর মোগল সাম্রাজ্যের শাহজাহানাবাদে। তিনি বাহাদুর শাহ জাফর-দ্বিতীয় নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের বিংশতম এবং শেষ মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি একজন প্রখ্যাত উর্দূ কবি ছিলেন। তাঁর পিতার নাম আকবর শাহ-দ্বিতীয় এবং মাতৃর নাম লাল বাই। তাঁর পিতা আকবর-দ্বিতীয় ১৮৩৭ সালের ২৮ শে সেপ্তেম্বর মৃত্যুবরণ করার পর ১৮৩৭ সালের ২৮ শে সেপ্তেম্বর তিনি লালকেল্লায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর পিতা আকবর-দ্বিতীয় একজন নামধারী সম্রাট ছিলেন। কারণ মোগল সাম্রাজ্য তখন শুধুমাত্র নামেই বিদ্যমান ছিলো এবং তাঁর কর্তৃত্ব শুধুমাত্র প্রাচীর ঘেরা দিল্লী শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো।
১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহে জড়িত থাকার অপরাধে ব্রিটিশরা বাহাদুর শাহ জাফরকে বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ১৮৫৮ সালে বার্মার রেঙ্গুনে নির্বাসিত করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ জাফর উত্তরাধিকারী হিসাবে তাঁর পিতা আকবর-দ্বিতীয়ের পসন্দের ছিলেন না। আকবর-দ্বিতীয়ের স্ত্রী মমতাজ মহল শাহজাদা জাহাঙ্গীরকে উত্তরাধিকার হিসাবে ঘোষণা করার জন্য পীড়াপীড়ি করার ফলে সম্রাট মির্জা জাহাঙ্গীরকে পরবর্তী উত্তরাধিকার হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু লালকেল্লার তৎকালীন রেসিডেন্টে(ব্রিটিশ আবাসিক মন্ত্রী, সরকারী কর্মকর্তা)র সম্রাটের এই সিদ্ধান্ত পসন্দের ছিলো না। একদিন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট আকবর-এর সাথে সাক্ষাত করতে এলে উত্তরাধিকার প্রসঙ্গ উত্থাপন হওয়াতে রেসিডেন্ট ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর হয়ে উত্তরাধিকার সম্পর্কে তাঁদের অবস্থানের কথা প্রকাশ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জাহাঙ্গীর রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েন, কিন্তু গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। রেসিডেন্ট বেরিয়ে গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে জাহাঙ্গীরকে ক্ষমা চাইতে বলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ‘লু লু হায়বে’ বলে কটূক্তি করেন। রেসিডেন্ট আবাসিকে গিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যদের পুরো শাক্তিরক্ষক দল নিয়ে ফিরে আসেন এবং জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করে এলাহাবাদে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। ফলে বাহাদুর শাহ জাফরের সিংহাসনে আরোহণের পথ প্রশস্ত হয়েছিলো।
শাসন– বাহাদুর শাহ জাফর এমন একটি মোগল সাম্রাজ্যে রাজত্ব করেছিলেন ১৯ শতকের গোড়ার দিকে যেখানে শুধুমাত্র দিল্লী শহর এবং পালামের আশেপাশের অঞ্চল পর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্য সীমাবদ্ধ ছিলো। ১৮ শতকে মারাঠারা দাক্ষিণাত্যে মোগল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়েছিলো এবং পূর্ব দিকের মোগল সাম্রাজ্য হয় মারাঠাদের দ্বারা শোষিত হয়েছিলো, নয়তো প্রত্যন্ত অঞ্চলের শাসকেরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে ছোট ছোট রাজ্যে পরিণত করেছিলো। মারাঠারা ১৭৭২ সালে মারাঠা সেনাপতি মহাদাজি সিন্দের সুরক্ষায় শাহ আলম-দ্বিতীয়কে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন এবং দিল্লীতে মারাঠাদের আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী প্রভাবশালী রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিলো। কোম্পানীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের বাইরে শত শত রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে মোগল সাম্রাজ্যের ভূমি খণ্ডিত করেছিলো। সম্রাট কোম্পানীর দ্বারা সন্মানিত ছিলেন এবং কোম্পানী তাঁকে পেন্সন প্রদান করতেন। সম্রাট কোম্পানীকে দিল্লী থেকে কর আদায় এবং সেখানে একটি সামরিক বাহিনী রাখার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। বাহাদুর শাহ জাফরের রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি কোনো আগ্রহ বা সাম্রাজ্যিক উচ্চাকাংক্ষা ছিলেন না। ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা তাঁকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ জাফর একজন প্রখ্যাত কবি ছিলেন এবং তিনি কিছু গজলও রচনা করেছিলেন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় তাঁর কিছু রচনা হারিয়ে বা ধ্বংস হয়ে গেলেও একটি বড় অংশ তাঁর সংগ্রহে ছিলেন এবং সেগুলি ‘কুল্লিয়াত-ই- জাফর’-এ সংকলিত করা হয়েছিলো। তিনি যে দরবার পরিচালনা করেছিলেন সেখানে মির্জা গালিব, দাঘ দেহলবি, মোমিন খান মোমিন এবং মহম্মদ ইব্রাহীম জাউকসহ বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত উর্দূ পণ্ডিত, কবি এবং লেখকের বাড়ি ছিলেন।
পরাজয়ের পর বাহাদুর শাহ জাফর বলেছিলেন-
গাজীয়নে বু রাহে গি যখন তালক ঈমান কী
(যতদিন আমাদের গাজীদের অন্তরে ঈমানের ঘ্রাণ থাকবে)
তখত–ই–লন্ডন তাক চলেগি তেঘ হিন্দুস্থান কী।
(ততদিন লন্ডনের সিংহাসনের সামনে হিন্দুস্থানের তলোয়ার জ্বলবে)
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ– ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সিপাহী রেজিমেন্টগুলি দিল্লী দরবারে পৌঁছেছিলেন। ধর্মের প্রতি বাহাদুর শাহ জাফরের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য অনেক ভারতীয় রাজা এবং রেজিমেন্ট তাঁকে ভারতের সম্রাট হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন এবং সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন।
১৮৫৭ সালের ১২ ই মে কয়েক বছরের মধ্যে বাহাদুর শাহ জাফর প্রথমবারের জন্য অনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন। উপস্থিত বেশ কয়েকজন সিপাহী তাঁর সাথে অসন্মানজনক আচরণ করেছিলেন বলে বর্ণনা করা হয়েছিলো। সিপাহীরা যখন প্রথম বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারে পৌঁছেছিলেন, তখন তিনি সিপাহীদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন তাঁরা তার কাছে এসেছেন। কারণ সিপাহীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো উপায় তাঁর নিকট ছিলো না। তখন বাহাদুর শাহ জাফরের আচরণ ছিলেন সিদ্ধান্তহীন। যাইহোক, তিনি সিপাহীদের নিকট নতি স্বীকার করেছিলেন, যখন তাঁকে বলা হয়েছিলো যে, তাঁকে ছাড়া ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে জয় লাভ করা সম্ভব হবে না।
১৬ ই মে সিপাহী এবং রাজকর্মচারীরা বন্দি এবং শহরে লুকিয়ে থাকা ৫২ জন ইউরোপীয়কে হত্যা করেছিলেন। বাহাদুর শাহ জাফরের প্রতিবাদ সত্ত্বেও রাজপ্রাসাদের সামনে একটি পিপুল গাছের নিচে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিলো। জাফরের সমর্থক নন, এমন কিছু সিপাহীর উদ্দেশ্য ছিলো তাঁকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত করা। একবার তিনি তাঁদের সাথে যোগদান করলে, বিদ্রোহীদের সমস্ত কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করতে তিনি বাধ্য হবেন, এটাই ছিলো সিপাহীদের ধারণা। লুটপাট এবং বিশৃংখলা দেখে হতাশ হলেও তিনি সিপাহীদের সমর্থন করেছিলেন। পরে এটা বিশ্বাস করা হয়েছিলো যে, তিনি হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন না, কিন্তু হয়তো তিনি ইচ্ছা করলে হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করতে সক্ষম হতেন। সেজন্য বিচারের সময় তাঁকে হত্যাকারীদের সমর্থনকারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিলো।
শহরের প্রশাসন এবং নতুন দখলকারী সেনাবাহিনীকে তখন ‘বিশৃংখল এবং ঝামেলাপূর্ণ’ দল হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিলো। বাহাদুর শাহ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মির্জা মোঘলকে তাঁর বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে মনোনীত করেছিলেন, তবে তাঁর সামরিক অভিজ্ঞতা কম ছিলো বলে সিপাহীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো। সিপাহীদের কোনো সর্বসম্মত সেনাপতি ছিলো না, সেজন্য প্রতিটি রেজিমেন্ট নিজের নিজের অফিসার ছাড়া অন্য কারো আদেশ পালন করতে অস্বীকার করেছিলো। মির্জা মোঘলের আদেশ শহর ছাড়া অন্য কোথাও বিস্তৃত ছিলো না। যার জন্য শহরে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিলো।
দিল্লী অবরোধের সময় ব্রিটিশদের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর বাহাদুর শাহ জাফর শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। মেজর উইলিয়াম হডসনের নেতৃত্বে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সেনারা সমাধিটি ঘেরাও করেছিলো এবং ১৮৫৭ সালের ২০ সেপ্তেম্বর সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো।
পরের দিন বাহাদুর শাহ জাফরের পুত্র মির্জা মোঘল, মির্জা খিজির সুলতান এবং সম্রাটের নাতি আবু বখতকে হডসন নিজের কর্তৃত্বে খুনী দরজায় গুলি করে হত্যা করে দিল্লী গেট এবং দিল্লী দখল করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। বাহাদুর শাহকে তাঁর স্ত্রীর প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেখানে সেনারা তাঁর সাথে অসম্মানজক আচরণ করেছিলেন। যখন তাঁর পুত্র এবং নাতির মৃত্যু সংবাদ আনা হয়েছিলো, তখন সম্রাট এতটাই মর্মাহত এবং হতাশ হয়েছিলেন যে, তিনি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে অসমর্থ হয়েছিলেন।
বিচার প্রক্রিয়া– বিচারটি ভারতীয় বিদ্রোহের পরিণতি ছিলো। বিচার প্রক্রিয়া ২১ দিন চলছিলো। ১৯ টি শুনানি, ২১ জন সাক্ষী এবং ফার্সি এবং উর্দূতে একশোর বেশি নথি, সেগুলির ইংরেজি অনুবাদসহ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিলো ।
প্রথমে বিচার প্রক্রিয়া কলকাতায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিলো, যেখানে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর পরিচালকরা বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য বৈঠক অনুষ্ঠিত করতেন, কিন্তু পরে লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত করা হয়েছিলো। এটি ছিলো লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত করা প্রথম মামলা ।
বাহাদুর শাহ জাফরের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগের বিচার করা হয়েছিলো। সৈন্যদের বিদ্রোহে সহায় করা। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তিদের উৎসাহিত এবং সহায়তা করা। হিন্দুস্থানের সার্বভৌমত্ব গ্রহণ কেড়ে নেওয়া। খ্রীস্টানদের হত্যার কারণ এবং অনুসাঙ্গিক।
১৮৫৮ সালের এপ্রিল মাসে বাহাদুর শাহ জাফরের ‘দিল্লীর রাজা’র বিচারের কার্যক্রমের ২০ তম দিনে বাহাদুর শাহ জাফর এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রথম আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন। বাহাদুর শাহ জাফর তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনে সিপাহীদের ইচ্ছার সামনে তিনি সম্পূর্ণ অসহায় ছিলেন বলে ব্যক্ত করেছিলেন। সিপাহীরা খালি খামে তাঁর সীল লাগিয়ে নিত, যার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। সম্রাট সিপাহীদের সামনে তাঁর অক্ষমতার কথা প্রকাশ করেছিলেন। আশি বছর বয়সের কবি-সম্রাট বিদ্রোহীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছিলেন এবং তিনি প্রকৃত নেতৃত্ব প্রদানের প্রতি আগ্রহী বা সক্ষম ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তিনি বিদ্রোহের বিচারে প্রাথমিক অভিযুক্ত ছিলেন।
বাহাদুর শাহ জাফরের সবচেয়ে আস্থাভাজন এবং বিশ্বাসী হাকিম আসানউল্লাহ এবং তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক উভয়েই জোর দিয়েছিলেন যে, সম্রাট নিজেকে বিদ্রোহের সাথে জড়িত করেননি। সেজন্য তিনি ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু পরে হাকিম আসানউল্লাহ তাঁর নিজের ক্ষমার বিনিময়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে সম্রাটের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন।
আত্মসমর্পণের বিষয়ে হডসনের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে শেষপর্যন্ত সম্রাটকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়নি। তবে তাঁকে বার্মার রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়েছিলো। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী জিনাত মহল এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। ১৮৫৮ সালের ৭ ই অক্টোবর ভোর চারটেয়, বাহাদুর শাহ জাফর তাঁর স্ত্রী এবং অবশিষ্ট দুই পুত্রকে নিয়ে লেফটেনেন্ট উসমানির নেতৃত্বে ৯তম লান্সারের রক্ষণাবেক্ষণে গরুর গাড়ীতে রেঙ্গুনের দিকে যাত্রা করেছিলেন।
মৃত্যু– ১৮৬২ সালে ৮৭ বছর বয়সে বাহাদুর শাহ জাফর কিছু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা যায়। অক্টোবরে তাঁকে চামুচ দিয়ে জোল খাওয়ানো হয়েছিলো, কিন্তু তিন নভেম্বরের মধ্যে তিনি চামুচ দিয়ে খেতেও অক্ষম হয়েছিলেন। ৬ নভেম্বর ব্রিটিশ কমিশনার এইসএন ডেভিস রেকর্ড করেছিলেন যে, বাহাদুর শাহ জাফরের গলার অঞ্চল অসার হয়ে পড়েছিলো। তাঁর মৃত্যু আসন্ন দেখে প্রস্তুতি হিসাবে ডেভিস চুন এবং ইট সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁর দাফনের জন্য তাঁর গৃহের পেছনে একটি জায়গা নির্বাচন করেছিলেন।
১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর শুক্রবার ভোর পাঁচটায় বাহাদুর শাহ জাফর মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁকে বিকেল চারটায় ইয়াঙ্গুনের ৬ নম্বর জিওয়াকা রোডের শ্বেদাগন পেগোডার কাছে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
১৯৯১ সালের ১৬ ই ফেব্রুয়ারি বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি পুনরুদ্ধারের পর সেখানে বাহাদুর শাহ জাফরের দরগাহ তৈরি করা হয়েছে।
বাহাদুর শাহ জাফরের বিষয়ে মন্তব্য করে ডেভিস তাঁর জীবনকে— খুবই অনিশ্চিত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস– বাহাদুর শাহ জাফর একজন ধর্মপ্রাণ সুফি ছিলেন। তিনি একজন সুফি পীর হিসাবে বিবেচিত ছিলেন এবং মুরিদ বা শিষ্য গ্রহণ করতেন। দিল্লীর উর্দূ আখবার পত্রিকা তাঁকে ‘ঐশ্বরিক আদালত দ্বারা অনুমোদিত, যুগের অন্যতম প্রধান সাধক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার এক দশক আগে ১৮২৮ সালে মেজর আর্চার বলেছিলেন যে, জাফর একজন অতিরিক্ত ফিগার এবং উচ্চতা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তাঁর চেহেরা একজন নিরীহ মুন্সি, ভাষার শিক্ষকের মতো ছিলেন।
একজন কবি হিসাবে জাফর অতীন্দ্রিয় সুফি শিক্ষার সর্বোচ্চ সূক্ষ্মতাকে আত্মস্থ করেছিলেন। তিনি গোঁড়া সুফিবাদের জাদুকরী এবং কু-সংস্কারপূর্ণ দিকেও বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর অনুসারীদের অনেকের মতে, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একজন সুফি পীর এবং সম্রাট হিসাবে তাঁর অবস্থানকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রদান করেছেন।
সম্রাটের তাবিজ এবং মন্ত্রের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিলেন। বিশেষ করে তিনি পাইলসের উপশমকারী হিসাবে এবং মন্দ মন্ত্রগুলি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাবিজ বা মন্ত্রের সাহায্য নিতেন। তাঁর অসুস্থতার সময় তিনি সুফি পীরদের একটি দলকে বলেছিলেন যে, তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে কয়েকজন সন্দেহ করেছিলেন যে, তাঁর উপর কেউ মন্ত্র করেছে। তাঁর এই শঙ্কা দূর করার জন্য তিনি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। মন্দ প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য তখন পীরের দলটি মন্ত্র লিখে পানিতে মিশিয়ে তাঁকে পান করতে দিয়েছিলেন। একদল পীর, অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন লোক এবং জ্যোতিষীরা সর্বদা তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতেন। তাঁদের পরামর্শ মতে, তিনি মহিষ এবং উট বলি দিতেন, ডিম পুঁতে রাখতেন এবং কথিত কালো জাদুকরদের গ্রেপ্তার করতেন। বদহজম নিরাময়ের জন্য তিনি একটি আংটি পরতেন। এছাড়াও গরীবদের জন্য গরু, সুফিদের মাজারে হাতী, মসজিদের খাদিমদের জামা বা পাদ্রীদের ঘোড়া দান করতেন।
জাফর স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, হিন্দুধর্ম এবং ইসলাম ধর্ম উভয়ই একই সারাংশ ভাগ করে নিয়েছে। এই দর্শনটি তাঁর দরবারিদের দ্বারা বাস্তবায়িত হয়েছিলো, ফলে বহু সংস্কৃতির সংমিশ্রণে হিন্দু ইসলামী মোগল সংস্কৃতি মূর্ত হয়ে উঠেছিলো।
এপিটাফ(স্মৃতি চিত্রাঙ্কিত কথা)- বাহাদুর শাহ জাফর একজন বিশিষ্ট কবি এবং ক্যালিগ্রাফার ছিলেন। তিনি লিখেছেন-
এই ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশে আমার হৃদয়ের বিশ্রাম নেই।
এই নিরর্থক পৃথিবীতে কে কখনো পূর্ণতা অনুভব করেছে?
নাইটিঙ্গেল সেন্টিনেল বা শিকারী সম্পর্কে অভিযোগ করে না।
বসন্তেরে ফসল কাটার সময় ভাগ্য কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলো।
এই আকাঙ্খাগুলোকে বলো অন্য কোথাও যেতে
এই বিষণ্ণ হৃদয়ে তাদের জন্য কী স্থান আছে?
ফুলের ডালে বসে নাইটঙ্গেল আনন্দ করে
আমার হৃদয়ের বাগানে কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘ জীবন চেয়েছি, চার দিন পেয়েছি
দুইটা ইচ্ছায়, দুইটা অপেক্ষায়।
জীবনের দিন শেষ সন্ধ্যা নেমে এসেছে
আমি ঘুমাবো, পা ছড়িয়ে, আমার সমাধিতে।
জাফর কত দুর্ভাগা ! তাঁর দাফনের জন্য
তাঁর প্রেয়সীর দেশে দুই গজ জমিও ছিল না।
স্ত্রী এবং সন্তান–
জাফরের চারজন স্ত্রী এবং অনেক উপপত্নী ছিলেন।
স্ত্রী– বেগম আশ্রাফ মহল, বেগম আখতার মহল, বেগম জীনাত মহল এবং বেগম তাজ মহল।
পুত্র সন্তান– মির্জা দারা বখত মীরান শাহ (১৭৯০- ১৮৪১), মির্জা মহম্মদ শাহরুখ বাহাদুর, মির্জা কাইমার বাহাদুর, মির্জা ফাত-উল-মুলুক বাহাদুর, মির্জা মহম্মদ কুয়াইশ বাহাদুর, মির্জা মোঘল (১৮১৭-১৮৫৭), মির্জা ফরখানন্দ বাহাদুর, মির্জা খিজির সুলতান(১৮৩৪-১৮৫৭), মির্জা বখতবর শাহ বাহাদুর, মির্জা সোহরাব হিন্দি বাহাদুর, মির্জা আবু নসর, মির্জা মহম্মদ বাহাদুর, মির্জা আবদুল্লাহ, মির্জা কুচক সুলতান, মির্জা আবু বকর (১৮৩৭-১৮৫৭), মির্জা জওয়ান বখত, মির্জা শাহ আব্বাস(১৮৪৫-১৯১০)।
কন্যা সন্তান– রাবিয়া বেগম, বেগম ফাতিমা সুলতানা, কুলসুম জামানী বেগম, রওনাক জামানী বেগম (সম্ভবত নাতনি।)
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে– বাহদুর শাহ জাফরকে জাভেদ সিদ্দিকীর নাটক ‘১৮৫৭: এক সফর নামা’ নাটকে চিত্রিত করা হয়েছিলো। এটি ২০০৮ সালে নাদিরা বাব্বর এবং ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা রেপ’র্টারি কোম্পানী পুরানা কিলার প্রাচীরে মঞ্চস্থ করা হয়েছিলো।
নানাভাই ভাট পরিচালিত হিন্দী-উর্দূ সাদা-কালো চলচ্চিত্র ‘লাল কুইলা‘ (১৯৬০)-এ বাহাদুর শাহ জাফরকে ব্যাপকভাবে প্রদর্শন করা হয়েছিলো।
টিভি ধারাবাহিক এবং চলচ্চিত্র– ১৯৮৬ সালে দুরদর্শনে বাহাদুর শাহ জাফর সম্প্রচারিত হয়েছিলো। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অশোক কুমার ।
২০০১ সালে হিন্দী ঐতিহাসিক নাটক সিরিজ ‘১৮৫৭ ক্রান্তি’ ডিডি ন্যাশনালে সম্প্রচারিত হয়েছিলো। সেখানে বাহাদুর শাহ জাফরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এস, এম জহির।
২০০৫ সালে নির্মিত কেতন মেহতা পরিচালিত হিন্দী চলচ্চিত্র ‘মঙ্গল পাণ্ডেছঃ দ্য রাইজিং’ চলচ্চিত্রে বাহাদুর শাহ জাফরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন হাবিব তানভে। *
সমাপ্ত
মোগল সম্ৰাট
নিবেদন
বাবর ভারতবর্ষের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের বিস্ময়কর চরিত্র। বাবর ছিলেন ধৈর্য, সাহস, ত্যাগের মহিমায় মহিমামণ্ডিত এক বিস্ময়কর বিরল প্রতিভার অধিকারী। বাবরের জন্ম ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী। মাত্র এগার বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হয়েছিলেন; তবে নিজের প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের বলে তিনি সকল বাধা-বিপত্তি, দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা-বঞ্চনার সুউচ্চ পর্বত ডিঙিয়ে দেশের পরে দেশ জয় করে ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইংরাজি ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল পানীপত নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীকে পরাস্ত করে তিনি ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত নির্মাণ করেছিলেন এবং ২৭ এপ্রিলে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। মাত্র চার বছর তিনি ভারতবর্ষের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই চার বছরেই তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বরে তিনি এন্তেকাল করেছিলেন। তাঁর এস্তেকালের পরে তিনশত বছরের চেয়েও অধিককাল তাঁর উত্তরসূরীরা ভারতবর্ষে রাজত্ব করেছেন।
বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ূন মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তিনি মাত্র একটা দশক রাজত্ব করার পর আফগান নেতা শেরশাহ সুরির হাতে পরাস্ত হয়ে সাম্রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। শেরশাহ সুরির মৃত্যুর পর হুমায়ূন শেরশাহ সুরির উত্তরসূরি সিকান্দার সুরিকে পরাস্ত করে মোগল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন। সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার পরেই আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করার জন্য তিনি সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনের বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি শুধু পূর্বের কান্দাহার, কাবুল, পঞ্জাব, দিল্লী এবং আগ্রা নিজের দখলে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
হুমায়ুনের মৃত্যুর পর মাত্র তেরো বছর বয়সে আকবর মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। আকবর ১৫৫৬ সালে সংঘটিত পানিপতের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে আগ্রা এবং দিল্লীতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছিলেন। আকবর ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে ভারতের প্রায় সকল অঞ্চল এবং জাতিকে প্রশাসনের সাথে যুক্ত করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর একটি বিশাল, সুদৃঢ় সাম্রাজ্য লাভ করেছিলেন। তাঁর পুত্র শাহ জাহানের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য উন্নতির চরম শিখরে উপনীত হয়েছিলো। ছাহ জাহানের রাজত্বকালকে মোগল ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়। ছাহ জাহান সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের চেয়ে স্থাপত্যের দিকে অধিক মনোনিবেশ করেছিলেন। ওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে মোগল যুগের সকল অভিলেখ ভঙ্গ করেছিলো এবং পতনও শুরু হয়েছিলো। যদুনাথ সরকারের মতে, আওরঙ্গজেবের ইতিহাস মানেই ভারতের ইতিহাসের ৬০ বছর। আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় গোঁড়ামী, রাজপুত নীতি, সন্দেহজনক মনোভাব, দেওলীয়া অর্থনৈতিক অবস্থা, উত্তরাধিকার আইনের অভাব তথা দুর্বল উত্তরাধিকারীর জন্য মোগল সাম্রাজের পতন হয়েছিলো বলে অনুমান করা হয়।
মহম্মদ শাহের রজত্বকালে আহমদ শাহ দুররানির ভারত আক্রমণে মোগল সাম্রাজ্যের পতন সুনিশ্চিত করেছিলো। ‘হিস্টরী অফ বেঙ্গল এর মতে ১৭৫৭ সালের ২৩ মার্চ ভারতের মধ্যযুগের অন্ত এবং আধুনিক যুগ শুরু হয়েছিলো। সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পরে মোগল সভ্যতা ব্যবহৃত বন্দুকের গুলি মতো হয়ে পড়েছিলো। সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা অস্থির এবং দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। জনসাধারণ দরিদ্র এবং অজ্ঞ হয়ে পড়েছিলো। স্বার্থপর, অহংকারী এবং অদক্ষ শাসকশ্রেণীর উত্থান হয়েছিলো। সেনাবাহিনী বিশৃংখল হয়ে পড়েছিলো। ধর্ম পাপী এবং মূর্খের হাতে বন্দি হয়েছিলো।
আমরা সর্বমোট ২৩ জন মোগল সম্রাট দেখতে পাই। এঁদের মধ্যে শাহরিয়ার মির্জা, নিকুসিয়ার, মহম্মদ ইব্রাহীমকে সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি। শাহরিয়ার মির্জা, রফি-উদ-দারজাত, রফি-উদ-দৌলা, মাহমুদ শাহ বাহাদুর (শাহ জাহান-চতুর্থ) এবং মহম্মদ ইব্রাহীম তিন মাস অথবা তার চেয়েও কম সময় রাজত্ব করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের পরবর্তী সম্রাট আজম শাহ রাজত্ব করেছিলেন মাত্র এগার মাস। অর্বাচীন কালে মোগলদের বিদেশী আক্রমণকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। ‘বাবরের আওলাদ’ বলে মুসলমানদের ভর্ৎসনা করা হয়। তবে, নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করলে দেখা যায় যে, মোগল সম্রাটদের বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের কথা কল্পনা করা যায় না। সেজন্য আমরা নিরপেক্ষভাবে মোগল সম্রাটদের বিশ্লেষণ করাটা প্রাসংঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
আমি প্রকৃতার্থে অসমীয়া ভাষায় লেখা-পড়া শিখেছি। সেজন্য বাংলা ভাষার জ্ঞান আমার খুবই সীমিত। তাই সদাশয় পাঠক গ্রন্থটিতে রয়ে যাওয়া ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করে গ্রন্থটি গ্রহণ করলে আমার শ্রম সার্থক হবে। পরবর্তী সংস্করণে ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করার প্রতিশ্রুতি রইল।
বিনীত
আবুল হোসেইন
সাকিন- যতিগাঁও
ডাকঘর- জাহোর পাম-৭৮১৩১৪
জেলা- বরপেটা, আসাম (ভারত)
সূচীপত্র
জহির-উদ-দীন মহম্মদ বাবর-
নাসির-উদ-দীন মহম্মদ হুমায়ুন-
মহামতি আকবর-
জাহাঙ্গীর-
শাহরিয়ার মির্জা-
শাহ জাহান-
আওরঙ্গজেব-
আজম শাহ-
বাহাদুর শাহ-প্রথম-
জাহান্দার শাহ-
নিকু সিয়ার-
ফারুখসিয়ার-
রফি-উদ-দারজাত
শাহ জাহান- দ্বিতীয়-
মহম্মদ ইব্রাহীম-
মহম্মদ শাহ-
আহমদ শাহ বাহাদুর-
আলমগীর-দ্বিতীয়-
শাহ জাহান-তৃতীয়-
শাহ আলম-দ্বিতীয়-
মাহমুদ শাহ বাহাদুর-
আকবর-দ্বিতীয়-
বাহাদুর শাহ জাফর-
মোগল সম্রাট জহির–উদ্–দীন মহম্মদ বাবর
বাবরের জন্ম ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাইমুরিদ সাম্রাজ্যের আন্দিজান-এ। তাঁর সম্পূর্ণ নাম মির্জা জহির উদ্- দীন মহম্মদ। জহির-উদ্-দীন-এর আরবী অর্থ “বিশ্বাসের রক্ষক’। নামটি তাঁর পিতার আধ্যাত্মিক গুরু খাজা আহরার রেখেছিলেন। মধ্য এশিয়ার তুর্কি-মঙ্গোলদের উচ্চারণে অসুবিধার জন্য তাঁকে সবাই বাবর উপনামে সম্বোধন করতেন। বাবর নামটি পার্সিয়ান শব্দ বাবুর থেকে আনা হয়েছিলো। বাবর শব্দের অর্থ বাঘ। তাঁর পিতার নাম মির্জা ওমর শেখ এবং মাতৃর নাম কুতলুগ নিগার বেগম। তিনি ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি পিতৃ এবং মাতৃর তরফ থেকে যথাক্রমে টাইমূর এবং চেঙ্গিস খাঁর উত্তর পুরুষ। বাবরের মাতৃ মোগলিস্থানের শাসক চেঙ্গিস খাঁর বংশধর ইউনিস খাঁর কন্যা ছিলেন। মৃত্যুর পরে বাবরের নাম দেওয়া হয়েছিলো ‘স্বর্গের বাসিন্দা’।
বাবর চাগতাই তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং ফারগানা উপত্যকার আন্দিজানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ফারগানা বর্তমান উজবেকিস্থান নামে পরিচিত। বাবর মির্জা ওমর শেখ(১৪৬৯-১৪৯৪)এর জ্যেষ্ঠপুত্র এবং তৈমূর(১৩৩৬-১৪০৫)এর পরনাতি ছিলেন। তিনি মঙ্গোল তুর্কি বংশোদ্ভব বরলস উপজাতির অন্তর্গত ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষ শতাব্দী পূর্বে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং তাঁরা তুর্কিস্থান ও খোরাসানের অধিবাসী ছিলেন। বাবর চাঘটাই ভাষা ছাড়াও অভিজাতদের ভাষা ফার্সি ভাষায় সমানে সাবলীল ছিলেন। বাবর যদিও মঙ্গোল তুর্কি বংশোদ্ভব ছিলেন, তিনি তুর্কি এবং মধ্য এশিয়ার জনগণের কাছ থেকে বেশি সমর্থন পেয়েছিলেন। তাঁর সেনাবাহিনী জাতিগত গঠনে বৈচিত্রময় ছিলো। বাবরের সেনা বাহিনীতে পার্সিয়ান (বাবরের নিকট সার্টস এবং তাজিক নামে পরিচিত), নৃতাত্ত্বিক আফগান এবং আরবীয়-এর পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার বরলস এবং চাঘটাই তুর্কি মঙ্গোলরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বাবরের পিতা মির্জা ওমর শেখ কবুতরের খাঁচা থেকে একটি কবুতর হাতে নিয়ে আদর করে উড়িয়ে দেওয়ার সময় খাঁচা ভেঙ্গে নদীতে পড়ে গিয়ে ১৪৯৪ সালে মারা গিয়েছিলেন। কবুতরের খাঁচাটি প্রাসাদের নিচে নদীর পাড়ে দুর্বলভাবে নির্মিত ছিলো। তাই কবুতরটি উড়িয়ে দেওয়ার সময় যে ঝটকা লেগেছিলো, সেই ঝটকায় খাঁচাটি ভেঙ্গে নদীতে পড়ে গিয়েছিলো। তখন বাবরের বয়স ছিলো মাত্র এগার বছর। পিতার মৃত্যুর পরে মাত্র এগার বছর বয়সে তিনি ফারগানার শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তখন তাঁর দুই চাচা পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে রাজত্ব করছিলেন। তাঁরা বাবরের পিতার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন। তাই বাবরের দুই চাচা এবং একদল অভিজাত লোক বাবরের সৎ ভাই মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। তবে, বাবর তাঁর নানী এহসান দৌলত বেগমের সাহায্যে ষড়যন্ত্রকারীদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।।
সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার দুই বছর পরে ১৪৯৭ সালে বাবর সাত মাস যাবত সমরকন্দ অবরোধ করে রেখেছিলেন এবং সমরকন্দ দখল করেছিলেন। তখন বাবরের বয়স ছিলো মাত্র পনের বছর। পনের বছর বয়সে সমরকন্দ দখল করাটা ছিলো বিশাল কৃতিত্বের ব্যাপার। বাবর সমরকন্দ দখল করার পরে কিছু সংখ্যক সেনা তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলো। তবুও বাবর অনেকদিন সমরকন্দ নিজের দখলে রেখেছিলেন। সমরকন্দে থাকাকালীন তিনি গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেই সুযোগে প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁর সৎ ভাই মির্জা জাহাঙ্গীরকে ফারগানার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। ফারগানা সমরকন্দ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিলো। তিনি ফারগানা পুনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হওয়ার সময়ে একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে সমরকন্দের দখল চলে গিয়েছিলো। এদিকে তিনি ফারগানা অধিকার করতেও ব্যর্থ হয়েছিলেন।
ফারগানা অধিকার করতে ব্যর্থ হয়ে বাবর তিন বছরের জন্য শক্তিশালী সেনা বাহিনী গঠনে মনোনিবেশ করেছিলেন। সেনা বাহিনীতে বদ খসার তাজিকদের বিশেষভাবে নিয়োগ করা হয়েছিলো। সেনা বাহিনী গঠনের পরে তিনি সমরকন্দ অবরোধ করে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দখল করেছিলেন যদিও ১৫০১ সালে সংঘটিত যুদ্ধে তিনি উজবেক মহম্মদ শৈবানি খাঁর হাতে পরাস্ত হয়ে দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তখন শৈবানি খাঁ দুর্গ আক্রমণ না করে অবরোধ করে রেখেছিলেন। অবরোধের ফলে বাবর প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষেরে সন্মুখীন হয়েছিলেন। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, যে তিনি তাঁর বোন খানজাদা বেগমকে শৈবানি খাঁর সাথে বিয়ে দিয়ে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং বোনের বিয়ের পরে তাঁকে তাঁর সেনা বাহিনীসহ নিরাপদে শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি প্রদান করা হয়েছিলো।
বাবর ১০০ দিন সমরকন্দে ছিলেন এবং স্বপ্নের শহর সমরকন্দ হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে সমরকন্দ হারানোর বেদনা তিনি মনের মধ্যে পোষে রেখেছিলেন। এমনকি ভারতবর্ষ বিজয়ের পরেও তিনি সমরকন্দ হারানোর বেদনা ভুলতে পারেননি।
সমরকন্দ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাবর পুনরায় ফারগানা দখলের চেষ্টা করেছিলেন, তবে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফারগানা দখল করতে ব্যর্থ হয়ে তিনি তাঁর মামা সুলতান মহম্মদ খাঁ শাসিত তাসকন্দে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু সেখানে তাঁর মামা তাঁকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে অবজ্ঞার চোখে দেখেছিলেন। এ বিষয়ে বাবর লিখেছেন, ‘তাসকন্দে অবস্থান কালে আমি অনেক দারিদ্র এবং অপমান সহ্য করেছি। কিন্তু কেউ আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি।’ আশ্রয়হীন এবং নির্বাসিত হয়ে তিনি অনুসারিদের একটি ছোট দল নিয়ে পাহাড়ি উপজাতির কৃষকদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
কিছুদিন পরে বাবর ফারগানা পুনরুদ্ধারের সমস্ত আশা ত্যাগ করে ১৫০২ সালে ভাগ্যের অন্বেষণে বের হন।
তখন কাবুল ও গজনীর টাইমূরীয় শাসক ছিলেন তাঁর মামা মির্জা উলুগ বেগ-দ্বিতীয়। তিনি শিশু সন্তান আব্দুর রাজ্জাককে রেখে ১৫০১ সালে মৃত্যু বরণ করেছিলেন। শিশু আব্দুর রাজ্জাকের হয়ে তাঁর মন্ত্রী শিরিম জিকির ক্ষমতা হস্তগত করেছিলেন। তবে, মহম্মদ কাশিম বেগ এবং ইউনিস আলীর নেতৃত্বে শিরিম জিকিরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো। ফলে এই অঞ্চলে তখন অরাজকতা বিরাজ করছিলো। এই সুযোগে ধুল-নুন বেগ আরঘুনের পুত্র মুকিন বেগ কাবুলের সিংহাসন দখল করেছিলো। তবে, স্থানীয় জনগণ তাঁকে দখলকারীরূপে বিবেচনা করছিলেন এবং এর বিরোধিতা করছিলেন। এদিকে রাজ্য হারিয়ে আব্দুল রাজ্জাক মির্জা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে রাজধানী পুনরুদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এই সময়ে বাবর শৈবানি খাঁর হাত থেকে পালিয়ে ১৫০৪ সালে তুষারাবৃত হিন্দুকোশ পর্বতমালা অতিক্রম করে হিসারের শাসক খশ্রু শাহের অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। খশু শাহের অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় খশুর ভাইসহ খশুর সেবায় নিয়োজিত অন্যান্য মোগলরা বাবরের সাথে যোগদান করেন। বাবর তখন নিজের বাহিনী নিয়ে কাবুলের দিকে অগ্রসর হয়ে কাবুল অবরোধ করেন। অবরোধের ফলে মুকিন বেগ কাবুল ছেড়ে দিয়ে কান্দাহারে পিছু হটতে বাধ্য হয়। বাবর কাবুল এবং গজনী অঞ্চল নিয়ে একটি নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন সাম্রাজ্য তাঁকে উজবেক সমস্যা থেকে অবসর দিয়েছিলো এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি নতুন রাজ্যটিকে একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাবর ১৫২৬ সাল পর্যন্ত কাবুল শাসন করেছিলেন।
বাবর হেরাতের সুলতান এবং তাঁর দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় মির্জা হোসেন বায়কারার সাথে মিলিত হয়ে উভয়ের শত্রু উজবেক শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। তবে, ১৫০৬ সালে হোসেন বায়কারা মারা যান এবং তাঁর দুই পুত্র মুজাফ্ফর ও বদি-উদ-জামান শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুকতা প্রকাশ করেন। তাই বাবরের সেই অভিযান সফল হয়নি। তবে, তিনি দুই ভ্রাতৃর আমন্ত্রণক্রমে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হেরাতে ছিলেন। তখন হেরাত ছিলো প্রাচ্যের মুসলিম বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী। তিনি হেরাতের পাপকর্ম ও বিলাসিতা দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন। তবে তিনি হেরাতের লোকদের বুদ্ধিবৃত্তি এবং প্রাচুর্য দেখে বিস্মিতও হয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, হেরাত পণ্ডিত পুরুষে পরিপূর্ণ। তিনি সেখানে চাগতাই কবি আলীশের নবাইর কাজের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। আলীশের নবাই চাগতাই ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য উৎসাহিত করতেন। চাগতাই ভাষার প্রতি আলীশের নবাইর দক্ষতা দেখেই সম্ভবত তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় চাগতাই ভাষা প্রয়োগের জন্য প্রভাবিত হয়েছিলেন।
বাবর দুই মাস যাবত হেরাতে অবস্থান করার পর কাবুল চলে এসেছিলেন। তিনি কাবুল চলে আসার পরে উজবেক শৈবানি খাঁ হেরাত আক্রমণ করেছিলেন। দুই ভ্রাতৃ মুজাফ্ফর ও বদি-উদ্-জামান শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গঢ়ে তুলতে না পেরে হেরাত ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন। শৈবানি খাঁ হেরাত দখলের পরে তৈমুরীয় রাজবংশের মধ্যে একমাত্র বাবরই তৈমূরীয় শাসক। শৈবানি খাঁ পশ্চিমের দিকে আক্রমণ প্রসারিত করার ফলে অনেক রাজপুত্র পালিয়ে এসে বাবরের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। তখন বাবর তৈমুরীয়দের মধ্যে বাদশাহ উপাধি গ্রহণ করেন। তবে উপাধিটি নগণ্য ছিলো। কারণ বাবরের অধিকাংশ পৈতৃক ভূমি তখনও শত্রুর দখলে ছিলো। এদিকে শৈবানি খাঁ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো এবং বাবর নিজেও কাবুলে বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবে বাবর কাবুলের সাম্ভাব্য বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুই বছর পরে আবার নেতৃস্থানীয় বেগদের বিদ্রোহের ফলে তাঁকে কাবুল থেকে সাময়িকভাবে বিতাড়িত হতে হয়। তখন খুব কম সংখ্যক সঙ্গী নিয়ে বাবর পালিয়ে যান এবং অতি শীঘ্রই তিনি কাবুল ফিরে এসে কাবুল দখল করেন ও বিদ্রোহীদের আনুগত্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হোন। ১৫১০ সালে পারস্যের শিয়া সাফাভিদ শাহ ইসমাইল প্রথম-এর হাতে শৈবানি খাঁ পরাজিত এবং নিহত হয়।
এই সুযোগে বাবর এবং অন্যান্য তৈমূরীয়রা তাঁদের হৃত পৈতৃক অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধারের জন্য যত্নপর হয়। পরের বছরগুলিতে বাবর এবং শাহ ইসমাইল-প্রথম মিলে মধ্য এশিয়ার অঞ্চলগুলির কিছু অংশ দখলের জন্য উদ্যোগ নেন। সাফাভিদদেরকে বাবর নিজে এবং তাঁর অনুগামীদের অধিপতি হিসাবে মেনে নেন। ১৫১৩ সালে ইসমাইল-প্রথম-এর ভ্রাতৃ নাসির মির্জাকে কাবুলের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে বাবর সমরকন্দ অবরোধ করে তৃতীয় বারের জন্য সমরকন্দ দখল করেন এবং পরে তিনি বুখারাও দখল করেন, তবে উজবেকদের হাতে তিনি আবার উভয় স্থানের দখল হারাতে হয়।
শৈবানি খাঁ নিহত হওয়ার পরে বাবরের ভগ্নী খানজাদা বেগম শাহ ইসমাইল-প্রথম এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এই সময়ে শাহ ইসমাইল-১ তাঁকে তাঁর বোন খানজাদা বেগমের সাথে পুনর্মিলন করিয়ে দেন। তিন বছর পরে অর্থাৎ ১৫১৪ সালে বাবর আবার কাবুল ফিরে আসেন। এর পরের এগার বছর তিনি বিশেষত পূর্ব পার্বত্য অঞ্চল ব্যাপী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি আফগান উপজাতি, আত্মীয়, অভিজাতদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হয়। এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ সময়গুলিতে তিনি তাঁর সেনাবহিনীকে আধুনিকীকরণ এবং প্রশিক্ষণ প্রদানে ব্যস্ত ছিলেন।
সাফাভিদ রাজবংশ ১৫০১ সাল থেকে ১৭৩৬ সাল পর্যন্ত ইরানে রাজত্ব করছিলেন। সাফাভিদ শাসক নজম-ই-সানি মধ্য এশিয়ায় অনেক বেসামরিক লোকদের হত্যা করেছিলো। তখন সাফাভিদ সেনা এবং উজবেকদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে নজম-ই-সানি বাবরের সহায়তা খুঁজেছিলেন। তবে বাবর তা অস্বীকার করেছিলেন এবং নজম-ই-সানিকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাবরের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে নজম-ই-সানি উবায়দুল্যা খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। ১৫১২ খ্রীষ্টাব্দে সংঘটিত গজদেওয়ানের সেই যুদ্ধে নজম-ই-সানি উজবেক যুদ্ধবাজ উবায়দুল্ল্যা খাঁর কাছে পরাজিত হয়।
অটোম্যানদের সাথে বাবরের প্রাথমিক সম্পর্ক খারাপ ছিলো। কারণ অটোমান সুলতান সেলিম-১ বাবরের প্রতিদ্বন্দ্বী উবায়দুল্ল্যা খাঁকে শক্তিশালী ম্যাচলক (বারূদ সহযোগে প্রস্তুত এক প্রকার যুদ্ধাস্ত্র।) এবং কামান সরবরাহ করেছিলেন। তাই ১৫০৭ সালে যখন সুলতান সেলিম-১কে বাবরের বৈধ অভিভাবক হিসাবে মেনে নেওয়ার জন্য আদেশ প্রদান করা হয়েছিলো তখন বাবর তা অস্বীকার করেছিলেন এবং গজদেওয়ানের যুদ্ধে উবায়দুল্যা খাঁর বিরুদ্ধে কিজিলবাশ সেনাদের সহায় করেছিলেন। বাবর সাফাভিদদের সাথে যোগদান করতে পারে এই ভয়ে সেলিম প্রথম ১৫১৩ সালে আবার বাবরের সাথে বন্ধুত্ব গঢ়ে তুলেছিলেন। বন্ধুত্বের চিহ্নস্বরূপ সেলিম-১ বাবরকে যুদ্ধে সহায়তার জন্য ওস্তাদ আলীকুলি এবং ম্যাচলক ম্যান মোস্তফা রুমি এবং আরও অনেকজন অটোমান তুর্কিকে প্রেরণ করেছিলেন। এই সহায়তার পরে অটোমান-মোগল সম্পর্কের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছিলো। তাঁদের কাছ থেকে বাবর শুধু যুদ্ধের ক্ষেত্রেই সহায়তা নেননি, ম্যাচলক এবং কামান পরিচালনার জ্ঞানও আহরণ করেছিলেন। এই জ্ঞান আহরণের ফলে তাঁর হিন্দুস্থান বিজয়ের পথ সুগম হয়েছিলো।
8বাবর তখন উজবেকদের হাত থেকে পালাতে চেয়েছিলেন এবং বদখসাঁর পরিবর্তে হিন্দুস্থানকে আশ্রয়স্থল হিসাবে বেচে নিয়েছিলেন। বদখসাঁ কাবুল থেকে উত্তর দিকে অবস্থিত ছিলো। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন- উজবেকদের শক্তি এবং ক্ষমতার জন্য আমাদের নিজেদের জন্য কিছু নিরাপদ স্থানের কথা চিন্তা করতে হয়েছিলো। সংকটময় এবং খারাপ সময়ে যাতে শক্তিশালী শত্রু এবং আমাদের মধ্যে এক নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকে, এই চিন্তা করেই বাবর হিন্দুস্থানকে আশ্রয়স্থল হিসাবে বেচে নিয়েছিলেন।।
তৃতীয় বারের জন্য সমরকন্দ হারানোর পরেই বাবর হিন্দুস্থান বিজয়ের জন্য মনোনিবেশ করেছিলেন এবং অভিযান শুরু করেছিলেন। অবশ্যে এর আগেও পার্বত্য রাজ্য কাবুলে রাজস্ব কম হওয়ার জন্য ১৫০৫ সালে বাবর প্রথম ভারতবর্ষ অভিযানের কথা চিন্তা করেছিলেন এবং খাইবার গিরিপথ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলেন। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘হিন্দুস্থান বিজয়ের আকাঙ্খা আমার অনেকদিন থেকেই ছিলো। সেটা ছিলো শাবান মাস, সূর্য কুম্ভরাশিতে ছিলো, আমরা কাবুল থেকে হিন্দুস্থান অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিলাম। সেটা খাইবার গিরিপথে এটি একটি সংক্ষিপ্ত অভিযান ছিলো।
১৫১৯ সালে বাবর হিন্দুস্থান অভিযানের উদ্যোগ নিয়ে বর্তমান পাকিস্থানে অবস্থিত চেনাব নদী পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলেন। ১৫২৪ সাল পর্যন্ত বাবরের লক্ষ্য ছিলো পঞ্জাব পর্যন্ত তাঁর শাসন সম্প্রসারণ করা। কারণ পঞ্জাব পর্যন্ত এক সময় তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুরের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই সময় উত্তর ভারতের কিছু অংশ দিল্লীর সুলতানের অধীনে ছিলো। লোডী রাজবংশের ইব্রাহীম লোডী সেখানে শাসন করছিলেন। তবে, ইব্রাহীম লোডীর স্বেচ্ছাচারিতার ফলে অনেকে ইব্রাহীম লোডীর সঙ্গ ত্যাগ করে যাওয়ার ফলে লোডী সাম্রাজ্য তখন প্রায় ভেঙে পরার উপক্রম হয়েছিলো। চেনাব নদী পর্যন্ত আসার পরে পঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁ লোডী এবং ইব্রাহীমের চাচা আলা-উদ-দীনের কাছ থেকে তিনি ভারত আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ পান। তখন সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকার দাবি করে বাবর ইব্রাহীম লোডীর নিকট দূত প্রেরণ করেন। তবে দূতকে পঞ্জাবের লাহোরে আটক করে রাখা হয়। কয়েকমাস পরে অবশ্যে দূতকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিলো। ১৫২৪ সালে বাবর লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তবে তিনি দেখতে পান যে, ইব্রাহীম লোডীর প্রেরিত বাহিনী দ্বারা দৌলত খাঁ লোডীকে ইতিমধ্যে বিতাড়ন করা হয়েছে। বাবর লাহোরে পৌঁছোলে লোডী বাহিনী তাঁদের আক্রমণ করে এবং বাবর সেনা পরাজিত হয়। এর জবাবে বাবর লাহোর জ্বালিয়ে দিয়ে বাহিনী নিয়ে দিবলপুর অভিমুখে যাত্রা করেন। যাওয়ার সময় বাবর লোডীর একজন চাচা আলম খাঁকে লাহোরের শাসক নিযুক্ত করে যান। তবে আলম খাঁ দ্রুত ক্ষমতাচ্যূত হয়ে কাবুল পালিয়ে যান। জবাবে, বাবর আলম খাঁকে সৈন্য সরবরাহ করেন এবং উক্ত বাহিনী দৌলত খাঁ লোডীর সাথে সংযুক্ত হয়ে আলম খাঁর নেতৃত্বে ৩০,০০০ সৈন্য নিয়ে ইব্রাহীম লোডীকে দিল্লীতে অবরোধ করেন। ইব্রাহীম লোডী সহজেই আলম খাঁকে পরাজিত করে দিল্লী থেকে বিতাড়ন করেন। তখন বাবর উপলব্ধি করেন যে ইব্রাহীম লোডী সহজে তাঁকে পঞ্জাৱ দখল করতে দিবেন না।
পানীপতের যুদ্ধ– ১৫২৫ সালের নভেম্বর মাসে বাবর পেশোয়ারে খবর পান যে, দৌলত খাঁ লোডী পক্ষ পরিবর্তন করেছেন এবং আলা-উদ-দীনকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। খবর পেয়ে বাবর দৌলত খাঁ লোডীকে বাধা প্রদানের জন্য লাহোর অভিমুখে রওয়ানা হোন। বারকে দেখেই দৌলত খাঁ লোডী আত্মসমর্পণ করেন এবং বাবর তাঁকে ক্ষমা করে দেন। এভাবে সিন্ধু নদী পার হওয়ার পরে তিন সপ্তাহের মধ্যে বাবর পঞ্জাবের শাসনকর্তা হয়ে পড়েন।
বাবর সিরহিন্দ হয়ে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হোন এবং তিনি ১৫২৬ সালের ২০ এপ্রিল পানীপত পৌঁছোন। সেখানে তিনি ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সৈন্য এবং একশত হাতীর সন্মুখীন হোন। ২৩ এপ্রিল চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। বাবর তুলুগমা যুদ্ধ (তুলুগমা যুদ্ধ পদ্ধতিতে সেনা বাহিনী বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে শত্রুপক্ষকে ঘিরে ধরে) কৌশল অবলম্বন করে ইব্রাহীম লোডীর সেনাদের ঘিরে ধরেন এবং লোডী সেনাদের সরাসরি কামানের সন্মুখে আসতে বাধ্য করেন। কামানের প্রচণ্ড শব্দে হাতীগুলি ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় এবং বাবর যুদ্ধে জয়লাভ করেন। উক্ত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডী নিহত হোন এবং লোডী সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
পানীপত যুদ্ধে বিজয় সম্পর্কে বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন- সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমতে কঠিন কাজটি সহজ হয়ে গিয়েছিলো এবং শক্তিশালী লোডী বাহিনী দেড় দিনের ব্যবধানে ধূলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিলো।
যুদ্ধ বিজয়ের পরে বাবর দিল্লী এবং আগ্রা দখল করে সিংহাসনে আরোহণ করে হিন্দুস্থানে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। উত্তর ভারতের শাসক হওয়ার পূর্বে তাঁকে রাণা সাঙ্গার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতিহত করতে হয়েছিলো।
খানওয়ার যুদ্ধ– মেওয়ারের শাসক রাণা সাঙ্গা এবং বাবরের সাথে ১৫২৭ সালের ১৬ মার্চ খানওয়া নামক স্থানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। রাণা সাঙ্গা বাবরকে বিদেশী শাসক মনে করেছিলেন এবং তাঁকে উৎখাত করে দিল্লী এবং আগ্রাকে সংযুক্ত করে রাজপূত অঞ্চলগুলির সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। রাণা সাঙ্গা এই ক্ষেত্রে আফগান প্রধানদের দ্বারা সমর্থিত হয়েছিলেন। কারণ আফগান প্রধানরা বাবর তাঁর অঙ্গীকার পূরণ না করে তাঁদের সাথে প্রতারণা করেছেন বলে ভেবেছিলেন। রাণা সাঙ্গা আগ্রা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার খবর পেয়ে বাবর প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করে পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিলেন। কে, ভি কৃষ্ণ রাওয়ের মতে উচ্চতর সৈন্য পরিচালনা এবং আধুনিক রণ কৌশলের জন্য বাবর যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। এই যুদ্ধে প্রথম কামান এবং মাস্কেট(দীঘল নলের খাঁজা বন্দুক) ব্যবহার করা হয়েছিলো। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, রাণা সাঙ্গা বিশ্বাসঘাতকতারও সম্মুখীন হয়েছিলেন। হিন্দু সেনা প্রধান শিলহাদি ৬,০০০ সেনা নিয়ে বাবরের পক্ষে যোগদান করেছিলেন।
বাবর রাণা সাঙ্গার দক্ষতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তাঁকে তদানীন্তন ভারতীয় দুইজন সর্বশ্রেষ্ঠ অমুসলিম শাসকের একজন বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যজন শাসক ছিলেন বিজয় নগরের শাসক কৃষ্ণদেব রায়।
চান্দেরীর যুদ্ধ– খানওয়ারের যুদ্ধের কয়েক মাস পরে চান্দেরীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। রাণা সাঙ্গা বাবরের বিরুদ্ধে পুনরবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এই খবর পেয়ে বাবর রাণা সাঙ্গাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য রাণার কট্টর সমর্থক মালওয়ারের শাসক মেদিনী রাওকে আগে পরাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রাণা সাঙ্গার অধীনস্থ বেশির ভাগ অঞ্চলে তখন মেদিনী রাও শাসন করছিলেন। মেদিনী রাও প্রতিহার রাজপুতদের চান্দেরী শাখার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মেদিনী রাওয়ের রাজধানী ছিলো চান্দেরী। বাবর চান্দেরী পৌঁছোনের পরে ১৫২৮ সালের ২০ জানুয়ারি মেদিনী রাওকে চান্দেরীর বিনিময়ে শমসাবাদ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে মেদিনী রাও সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। তাই চান্দেরীর বাইরের দুর্গটি বাবর সেনা রাতে দখল করে এবং দিনের বেলা উপরের দুর্গটি দখল করে। বাবর নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে, উপরের দূর্গটি দখল করতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লেগেছিলো। মেদিনী রাও জহরের ব্যবস্থা করেছিলেন, যা পান করে দূর্গের মধ্যে নারী এবং শিশুরা আত্মহত্যা করেছিলো। অল্প সংখ্যক সৈন্য দুর্গের মধ্যে সমবেত হয়ে সন্মিলিত আত্মহত্যায় একে অপরকে সহায় করেছিলো। এই আত্মহত্যা বাবরকে হয়তো তেমন প্রভাবিত করতে পারেননি, যার জন্য তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি শত্রুর জন্য একটুও প্রশংসা করেন নি।
ধর্মীয় নীতি– বাবর একটি চিঠিতে হুমায়ূনকে লিখেছিলেন- হে আমার পুত্র, হিন্দুস্থান বিভিন্ন ধর্মে পরিপূর্ণ। সকল প্রশংসা ঈশ্বরের জন্য যে তিনি আপনাকে এরূপ একটি সাম্রাজ্য দান করেছেন। আপনি সমস্ত ধর্মীয় গোঁড়ামী থেকে মুক্ত হয়ে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি ন্যায় বিচার করাটা উচিত হবে। গরু কোরাবানি থেকে বিরত থেকে হিন্দুস্থানের মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে। রাজকীয় অনুগ্রহ পেলে প্রজারা আপনার জন্য উৎসর্গকৃত হবে। সাম্রাজের অধীনস্থ প্রতিটি মন্দির এবং উপাসনালয়গুলি আপনি ক্ষতি করাটা উচিত হবে না। সবার প্রতি ন্যায় বিচার করলে শাসকও সুখী হবে এবং প্রজারাও সুখী থাকবে। ইসলামের অগ্রগতি রহমত(দয়া)-এর তরবারি দ্বারা হবে, অত্যাচারের তরবারি দ্বারা নয়। ১৫২৬ সালে বাবর ইব্রাহীম লোডীকে পরাজিত ও হত্যা করে দিল্লীর সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়ে মাত্র চার বছর শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর মৃত্যুর পরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। হুমায়ূনের সিংহাসন সাময়িকভাবে সূরি রাজবংশ দ্বারা দখল করা হয়েছিলো। হুমায়ূনের ৩০ বছরের শাসনকালে ধর্মীয় সংহিংসতা অব্যাহত ছিলো। ধর্মীয় সহিংসতা এবং অসহিষ্ণুতার কথা ষোল্ল শতকের শিখ সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে প্রাথমিক মোগল যুগের ধর্মীয় সহিংসতা আত্মদর্শনে অবদান রেখেছিলো এবং তারপর আত্মরক্ষার জন্য জঙ্গীবাদে রূপান্তর হয়েছিলো। বাবরের আত্মজীবনী বাবর নামা অনুসারে উত্তর পশ্চিম ভারতে হিন্দু, শিখের পাশাপাশি স্বধর্মত্যাগী (ইসলামের অ-সুন্নি মুসলিম)দের লক্ষ্য করে অনেক আক্রমণ সংঘটিত করা হয়েছিলো এবং অনেককে হত্যা করা হয়েছিলো। যেখানে মুসলিম শিবির ছিলো সেখানে পাহাড়ের উপর নাস্তিকদের খুলির স্তুপ তৈরি হয়েছিলো।
বাদশাহ আকবরের রাজত্ব কালে বাবরনামা অনুবাদ করার সময় অঙ্কন করা একটি চিত্রের বাইরে বাবরের শারীরিক গঠন সম্বন্ধে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাবরনামায় বাবর নিজে বর্ণনা করা মতে তিনি শরীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন। তিনি অভিযানের সময় নদী সাঁতরে পার হতেন। উত্তর ভারতে তিনি দু’বার গঙ্গা নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন।
প্রথমাবস্থায় বাবরের হিন্দুস্থানের ভাষা সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান ছিল না। তুর্কি ভাষায় রচিত তাঁর শায়েরি থেকে জানা যায় যে পরবর্তী জীবনে তাঁর হিন্দুস্থানী ভাষার শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছিলো।
ব্যক্তিগত জীবন– পিতৃর বিপরীতে বাবর সন্ত প্রকৃতির লোক ছিলেন এবং নারীর প্রতি তাঁর খুব বেশি আগ্রহ ছিলেন না। তাঁর প্রথম স্ত্রী আয়েশা সুলতানা বেগমের প্রতি তিনি লজ্জাশীল ছিলেন এবং পরে তিনি আয়েশা সুলতানার প্রতি আসক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। আয়েশা সুলতানা ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন। আয়েশা সুলতানার পিতৃর নাম ছিলেন সুলতান আহম্মদ মির্জা। আয়েশা সুলতানার মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ১৪৮৮ সালে বাবরের সাথে বিবাহের বাগদান করা হয়েছিলো এবং ১৪৯৮/১৪৯৯ সালে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তখন আয়েসা সুলতানার বয়স ছিলো এগার বছর এবং বাবরের পনের বছর। এই দম্পত্তির ১৫০০ সালে ফখরুন্নিসা নামক একটি কন্যা সন্তান জন্ম হয়েছিলো। কন্যা সন্তানটি মাত্র এক বছর বয়সে ১৫০১ সালে মারা গিয়েছিলো। তিন বছর পরে ফারগানায় বাবরের প্রথম পরাজয়ের পর আয়েশা সুলতানা বাবরকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ১৫০৪ সালে বাবর জয়নব সুলতানা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, তবে দুই বছর পরে নিঃসন্তান অবস্থায় জয়নব সুলতানা মারা গিয়েছিলেন। ১৫০৬ থেকে ১৫০৮ সালের মধ্যে বাবর চারটি বিয়ে করেছিলেন। ১৫০৬ সালে তিনি মাহম বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এর পরে মাসুমা সুলতানা বেগম, গুলরুখ বেগম এবং দিলদার আলাসা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মাহম বেগমের তরফ থেকে বাবরের চারটি সন্তান জন্ম হয়েছিলো তার মধ্যে একমাত্র জ্যেষ্ঠ সন্তান হুমায়ূন জীবিত ছিলেন। মাসুমা সুলতানা ১৫০৮ মতান্তরে ১৫১৯ সালে সন্তান প্রসবের সময় মারা গিয়েছিলেন। গুলরুখ বেগমের তরফ থেকে বাবরের দু’টি সন্তান ছিলো- মির্জা কামরান এবং মির্জা আকসারি। বাবরের ছোট ছেলে হিন্দালের মাতৃ ছিলেন দিলদার আলাসা বেগম। বাবর পরে ইউসূফজাই উপজাতির পাশতুন মহিলা মুবারকা ইউসূফজাইকে বিয়ে করেছিলেন। পারস্যের শাহ তালুমাস্প সাফাভিদ উপহার হিসাবে প্রদান করা সার্কাসিয়ান ক্রীতদাস গুলনার আগাছা এবং নারগুল আগাছাকে বাবর উপপত্নীর মর্যদা প্রদান করেছিলেন। উভয়ে রাজ পরিবারের মহিলা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
কাবুলে শাসনকালে বাবরের জন্য অপেক্ষাকৃত শান্তির সময় ছিলো। বাবর তখন সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প, সঙ্গীত এবং বাগান নির্মাণে মনোনিবেশ করেছিলেন। বাবর প্রথম জীবনে কখনও মদ্য পান করেননি। ত্রিশ বছর বয়সে কাবুলে থাকাকালীন তিনি প্রথম মদ্যপান করেছিলেন। এর পরে তিনি নিয়মিতভাবে মদ্যপান করতেন। তিনি মদ্যপান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত করতেন এবং আফিম থেকে তৈরি খাদ্য খেতে শুরু করেছিলেন। বাবর ধর্মীয় বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তবে তিনি সমসাময়িক কবির একটি কবিতার লাইনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন- ‘আমি মাতাল অফিসার, আমি শান্ত হলে আমাকে শাস্তি দাও।’ তিনি মৃত্যুর দুই বছর আগে খানওয়া যুদ্ধের পূর্বে স্বাস্থ্যগত কারণে মদ্যপান ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁর সভাসদদেরও এ কাজ করতে দাবি জানিয়ে ছিলেন। তবে তিনি মাদকদ্রব্য চর্বন বন্ধ করেন নি। মাদকদ্রব্য চর্বন করলেও তিনি কখনও অনুভূতি হারাননি। তিনি লিখেছেন-সবাই মদ্যপানের জন্য অনুশোচনা করেন এবং বর্জনের জন্য শপত গ্রহণ করেন এবং আমি শপত গ্রহণ করে আফসোস করেছি।
বাবর চিঙ্গিসিড আইন এবং রীতি অন্ধভাবে অনুকরণের বিরোধী ছিলেন। তিনি লিখেছেন- আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা চিঙ্গিসিড আইনের প্রতি অস্বাভাবিক সন্মান প্রদর্শন করতেন। তাঁরা কাউন্সিল, দরবার, ভোজ এবং নৈশভোজে উঠতে বসতে এই আইন লঙ্ঘন করেন নি। চেঙ্গিস খাঁর আইন কোনো পাঠ্যপুস্তকের নির্দ্ধারিত পাঠ নয় যে তা একজন ব্যক্তিকে অবশ্যেই অনুসরণ করতে হবে। পূর্বপুরুষরা যদি একটি ভাল রীতি ত্যাগ করে গিয়ে থাকেন, তাহলে তা অনুসরণ করা উচিত। তবে যদি খারাপ রীতি ত্যাগ করে গিয়ে থাকেন, তাহলে তার পরিবর্তে একটি ভালো রীতিকে প্রতিস্থাপন করাআবশ্যক। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর মতে শ্রেণীবদ্ধ পাঠ্য (উদাহরণ স্বরূপে কুরআন) চেঙ্গিস খানের ইয়াসাকে নৈতিক এবং আইনগতভাবে স্থানচ্যূত করেছে। ইয়াসা হলো চেঙ্গিস খাঁ কর্তৃক বুখারায় জনসম্মুখে ঘোষিত মঙ্গোলদের মৌখিক আইন৷
পরিবার–
আয়েশা সুলতানা বেগম- আয়েশা সুলতানা বেগম সমরকন্দ এবং বুখারার সুলতান মির্জা আহম্মদ সুলতানের কন্যা ছিলেন। আয়েশা সুলতানা জন্মগতভাবে তাইমুরীয় বংশজাত ছিলেন। তিনি আহম্মদ সুলতান মির্জার তৃতীয় সন্তান ছিলেন। ১৪৯৮-৯৯ সালে তিনি বাবরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৫০৩ সালে তাসকন্দে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিলো।
মাহম বেগম– মাহম বেগমের সাথে বাবর ১৫০৬ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মাহম বেগম ছিলেন। বাবরের তৃতীয় স্ত্রী। তিনি ১৫২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাবরের প্রধানা মহিষী ছিলেন। তিনি খোরাসনের সম্ভ্রান্ত পরিয়াল হোসেন আহম্মদ মির্জার কন্যা ছিলেন। ১৫৩৪ সালের ২৮ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি মোগল সাম্রাজের প্রথম বাদশাহ বেগম ছিলেন। তাঁর বিষয়ে গুলবদন বেগম হুমায়ূন নামায় বর্ণনা করেছেন।
জয়নব সুলতানা বেগম– জয়নব সুলতানা বেগমের সাথে বাবর ১৫০৪ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। জয়নব সুলতানা বেগম তাইমূর বংশীয় শাহজাদী ছিলেন এবং তাঁর পিতৃর নাম ছিলেন সুলতান মাহমুদ মির্জা। সুলতান মাহমুদ মির্জা বাবরের চাচা ছিলেন। বিয়ের ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে ১৫০৬-০৭ সালে নিংসন্তান অবস্থায় তিনি বসন্ত রোগে মারা গিয়েছিলেন।
মাসুমা সুলতানা বেগম– মাসুমা সুলতানার সাথে বাবর ১৫০৭ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি তাইমুর বংশীয় শাহজাদী ছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম ছিলেন সুলতান আহম্মদ মির্জা। বিয়ের এক বছর পরে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে তিনি মারা গিয়েছিলেন। কন্যা সন্তানটির নাম ছিলো গুলবদন বেগম। গুলবদন বেগম হুমায়ূন নামা রচনা করেছিলেন।
বিবি মুবারকা– বিবি মুবারকার সাথে বাবর ১৫১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি পাশতুন উপজাতির ইউসুফজাই শাখার দলপতি মালিক শাহ মনসুরের কন্যা ছিলেন। তিনি আকবরের শাসনকালের প্রথমাবস্থায় মারা গিয়েছিলেন। গুলবদন বেগম হুমায়ূন নামায় তাঁর নাম প্রসংগক্রমে উল্লেখ করেছেন।
গুলরুখ বেগম এবং দিলদার আগাচা বেগমের বিষয়ে বিশেষ কোথাও উল্লেখ নেই। গুলরুখ বেগমের দুই পুত্র। নাম ছিলো মির্জা কামরান ও মির্জা আকসারি। দিলদার আগাচা বেগমের একমাত্র সন্তানের নাম ছিলো মির্জা হিন্দাল । দিলদার আগাচা এবং নারগুল আগাচা বাবরের ‘সারকাশিয়ান’ উপপত্নী ছিলেন। সারকাশিয়ানরা কাঁকস ক্ষেত্রের আদিবাসী ছিলেন। তাঁরা চারকসী ভাষায় কথা বলতেন।
পুত্র সন্তান
হুমায়ূন– হুমায়ূন বাবরের জ্যেষ্ঠ সন্তান। মাতৃর নাম মাহম বেগম। তাঁর জন্ম ১৫০৮ সালে এবং মৃত্যু ১৫৫৬ সালে। বাবরের মৃত্যুর পরে তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
কামরান মির্জা– কামরান মির্জা বাবরের দ্বিতীয় সন্তান। তার মাতৃর নাম গুলরুখ বেগম। তাঁর জন্ম ১৫০৯ সালে এবং মৃত্যু ১৫৫৭ সালের ৫ অথবা মতান্তরে ৬ অক্টোবর।
মির্জা আকসারি– মির্জা আকসারির জন্ম ১৫১৬ সালে এবং মৃত্যু ১৫৫৭ সালের ৫ অক্টোবর। তার মাতৃর নাম গুলরুখ বেগম। তিনি হজ্বযাত্রার সময়ে মারা গিয়েছিলেন।
হিন্দাল মির্জা– হিন্দাল মির্জার মাতৃর নাম দিলদার আগাচা বেগম। হিন্দাল মির্জার জন্ম ১৯১৯ সালের ৪ মার্চ এবং মৃত্যু ১৫৫১ সালের ২০ নভেম্বর।
আহম্মদ মির্জা– গুলরুখ বেগমের পুত্র। যুবা অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
শাহ রুখ মির্জা–গুলরুখ বেগমের পুত্র। যুবা অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
বারবুল মির্জা-মাহম বেগমের পুত্র। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
আলওয়ার মির্জা– দিলদার বেগমের পুত্র। শৈশবে মারা গিয়েছিলো।
ফারুক মির্জা– মাহম বেগমের পুত্র। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
কন্যা সন্তান
ফখরুন্নিসা– আয়েশা সুলতানার সন্তান। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
আইসান দৌলত বেগম– মাহম বেগমের সন্তান। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
মেহেরজান বেগম– মাহম বেগমের সন্তান। শিশু অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
মাসুমা সুলতানা বেগম– মাতৃ মাসুমা সুলতানা বেগমের নামেই তাঁর নাম রাখা হয়েছিলো। মাসুমা সুলতানার জন্ম ১৫০৮ সালে। হুমায়ুননামায় তাঁর বিষয়ে প্রসংগক্রমে উল্লেখ রয়েছে। তিনি মহম্মদ জামান মির্জার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মহম্মদ জামান মির্জা তাইমূর বংশীয় শাহজাদা ছিলেন। তিনি বাবর এবং হুমায়ূনের সৈন্যাধ্যক্ষ ছিলেন। মহম্মদ জামান মির্জার জন্ম ১৪৯৬ এবং মৃত্যু ১৫৩৯ সালে।
গুলজার বেগম– গুলরুখ বেগমের সন্তান। যুবা অবস্থায় মারা গিয়েছিলো।
গুলরুখ বেগম– গুলবার্গ বেগম নামেও পরিচিত। মাতৃর পরিচয় বিতর্কিত। দিলদার বেগম অথবা সালিহা বেগমও হতে পারে। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো খাজা হাসান নক্সবন্দীর পুত্র নুরুদ্দীন মহম্মদ মির্জার সাথে।
গুলবদন বেগম– গুলবদন বেগমের জন্ম ১৫২৩ সালে এবং মৃত্যু ১৬০৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। তাঁর মাতৃর নাম দিলদার বেগম। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো মোগলিস্থানের শাসক আইম্যান খাজা সুলতানের পুত্র খিজির খাজা খাঁর সাথে। তিনি তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময় কাবুলে কাটিয়েছিলেন। তাঁর ভাতিজা আকবরের আমন্ত্রণক্রমে তিনি ১৫৫৭ সালে রাজকীয় পরিবারে যোগদানের জন্য আগ্রায় এসেছিলেন। রাজকীয় পরিবারে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিলেন এবং তিনি প্রভূত সন্মানের অধিকারীও ছিলেন। আকবর এবং আকবরের মাতৃ হামিদা বেগমের অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী ছিলেন তিনি। আবুল ফজল রচিত সমগ্র আকবর নামা ব্যাপী গুলবদনের প্রসংগ খুঁজে পাওয়া যায়।
হুমায়ুন-নামার লেখিকা হিসাবে গুলবদন বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি তাঁর ভাতিজা সম্রাট আকবরের অনুরোধে হুমায়ুন- নামা লিখেছিলেন। তিনি হজ্বব্রত পালন করতে মক্কা গিয়েছিলেন। তিনি মক্কায় সাত বছর ছিলেন এবং ১৫৮২ সালে ভারতে ফিরে এসেছিলেন।
গুল চেহেরা বেগম– গুল চেহেরা বেগমের জন্ম ১৫১৫ সালে এবং মৃত্যু ১৫৫৭ সালে। তাঁর মাতৃর নাম দিলদার বেগম। তাঁর বিয়ে চৌদ্দ বছর বয়সে ১৫৩০ সালের শেষের দিকে চাঘটাল মোগল তুখটা বুঘা খাঁর সাথে হয়েছিলো। তবে ১৫৩৩ সালেই তিনি বিধবা হয়েছিলেন। ১৫৪৯ সাল পর্যন্ত তাঁর বিয়ের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। হুমায়ুন বলখ অভিযানে যাত্রা করার ঠিক আগে তিনি আব্বাস সুলতান উজবেকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ১৫৫৭ সালে ভারতে মারা গিয়েছিলেন।
গুলরঙ্গ বেগম– দিলদার বেগমের কন্যা। ১৫৩০ সালে তাঁর বিয়ে হয়েছিলো বাবরের মামাতো চাচা মোগলিস্থানের আহম্মদ আলাকের নবম সন্তান ইশান টাইমূর সুলতানের সাথে। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাবরের মৃত্যু– বাবর ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর-এ মৃত্যু বরণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ূন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বাবরকে প্রথমে আগ্রায় সমাধিস্থ করা হয়েছিলো এবং পরে ১৫৩৯ থেকে ১৫৪৪ সালের মধ্যে তাঁর ইচ্ছা অনুসারে মৃতদেহ কাবুলে স্থানান্তর করে ‘বাগ-ই-বাবর-এ পুনঃ সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
একজন তাইমুরীয় হিসাবে বাবর শুধু মাত্র পারস্য শিল্প-সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না, বরং তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে পারস্যের শিল্পনীতির প্রসারও ঘটিয়েছিলেন। তিনি ভারতে ইসলামিক, শৈল্পিক সাহিত্য এবং সামাজিক দিকগুলোতে তৈমুরীয় রেনেসাঁর উত্তরাধিকারী ছিলেন। এফ, লেহম্যান ইনসাইক্লোপেডিয়া ইরানিকাতে বলেছেন, তাঁর উৎপত্তি, পরিস্থিতি, প্রশিক্ষণ এবং সংস্কৃতি পারস্য সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত ছিলো, তাই বাবর এবং তাঁর বংশধরেরা ভারতে সেই সংস্কৃতি লালনপালনের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে পারস্যের উন্নত সাহিত্য, শৈল্পিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী ছিলেন।
প্রথম মোগল সম্রাট বাবরকে উজবেকিস্থানে জাতীয় বীর হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উজবেকিস্থানে ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাবরের ৫২৫ তম জন্ম বার্ষিকীর স্মরণে ডাক টিকিট জারি করা হয়েছিলো। বাবর রচিত অনেক শায়েরি জনপ্রিয় উজবেক লোকগীতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উজবেকিস্থানের জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী, গীতিকার, অভিনেতা শেরালি জোরায়েভ দ্বারা জনপ্রিয় করে তোলা হয়েছে। কিছু সূত্র দাবি করে যে, বাবর কিরঘিস্থানেও একজন জাতীয় বীর হিসাবে সমাদৃত। ২০০৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্থান সরকার বাবরের সন্মানে ক্ষেপনাস্ত্র নির্মাণ করেছে। শাহেনশাহ বাবর শিরোনামে ওজাহত মির্জা পরিচালিত একটি চলচ্চিত্র ১৯৪৪ সালে মুক্তি পেয়েছিলো। ১৯৬০ সালে হেমেন গুপ্তা পরিচালিত বাবরের জীবনীমূলক চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকায় গজানন জায়গিরদার অভিনয় করেছিলেন।
বাবরের জীবনের একটি বৈশিষ্ট ছিলো যে তিনি বাবর-নামা শিরোনামে একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রেখে গেছেন। হেনরি রেভারেজের উদ্ধৃতি দিয়ে স্ট্যানলি লেন-পুল লিখেছেন- বাবরের আত্মজীবনী সর্বকালের অমূল্য রেকর্ডগুলির একটি, যা সেণ্ট আগাস্টিন এবং রুশোর স্বীকারোক্তি এবং গিবন ও নিউটনের স্মৃতিকথার সাথে মানানসই।
বাবর তাঁর নিজের ভাষায় লিখেছেন, আমার সাক্ষ্যের সারাংশ এই যে, নিজের ভ্রাতৃদের বিরুদ্ধে কিছুই করবেন না, যদিও তাঁরা এটির উপযুক্ত হয়। এছাড়াও নতুন বছর, বসন্ত, মদ এবং প্রেয়সী আনন্দময়। বাবর আনন্দ কর, কারণ বিশ্ব আপনার জন্য দ্বিতীয়বার থাকবেনা।
বাবরি মসজিদ বিতর্ক– অযোধ্যার বাবরি মসজিদ বাবরের অন্যতম সেনাপতি মীর বাকির নির্দেশে নির্মিত হয়েছিলো বলে জানা যায়। ২০০৩ সালে এলহাবাদ হাইকোর্ট ভারতীয় জরিপ বিভাগ (এএছআই)কে মসজিদের নিচের কাঠামোর ধরণ নির্ধারণ করার জন্য গভীরভাবে অধ্যয়ন এবং খননের নির্দেশ দিয়েছিলেন। খনন কার্য ২০০৩ সালের ১২ মার্চ থেকে আগস্ট মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত চলছিলো। খননের ফলে ১৩৬০ টি আবিষ্কার হয়েছিলো।
জরিপ বিভাগের রিপোর্টের সারাংশে মসজিদের নিচে দশম শতাব্দীর একটি মন্দিরের উপস্থিতি পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো। খ্রীষ্টপূর্ব ১৩ শতকের মানুষের কার্যকলাপের নিদর্শন পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলো। পরবর্তী কয়েকটা স্তরে শুঙ্গযুগ(খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় এবং প্রথম) এবং কুষাণ যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলো। মসজিদের প্রায় ৫০ মিটার উত্তর-দক্ষিণ দিকে প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয় যুগ (১১-১২ শতক)-এ স্বল্পস্থায়ী অথচ বিশাল কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিলো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলো। এই কাঠামোর অবশিষ্টাংশের উপরে একটি বিশাল কাঠামো তৈরি করা হয়েছিলো। এই কাঠামোটির অন্তত তিনটি কাঠামোগত পর্যায় ছিলো এবং তিনটি মেঝে পরপর সংযুক্ত ছিলো। প্রতিবেদনের উপসংসারে বলা হয়েছিলো যে, এই কাঠামোটির উপরে বিতর্কিত কাঠামোটি ১৬ শতকের প্রথম দিকে নির্মাণ করা হয়েছিলো।
প্রত্নতাত্ত্বিক কে, কে, মহম্মদ জরীপ ও খননকারী দলের একমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন। এছাড়াও পৃথকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিলো যে, বাবরি মসজিদ নির্মাণের আগে সেখানে মন্দিরের মতো কাঠামো বিদ্যমান ছিলো। ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছিলো যে, মসজিদ নির্মাণের আগে সেখানে একটি মন্দির বিদ্যমান ছিলো। মসজিদটি নির্মাণের জন্য যে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামোর অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করা হয়েছিলো তা প্রমাণ করার মতো কিছুই পাওয়া যায়নি।
বাবরকে অনেকে আক্রমণকারী এবং খলনায়কের রূপে তুলে ধরার চেষ্টা করা দেখা যায়। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যায় যে বাবর একজন জ্ঞানী শাসক ছিলেন এবং সর্বধর্মের প্রতি তিনি সহনশীল ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে হুমায়ুনকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা থেকে এই কথা স্পষ্ট হয়ে যায়। *
নাসির–উদ–দীন মহম্মদ হুমায়ুন
নাসির-উদ-দীন মহম্মদ হুমায়ুন-এর জন্ম ১৫০৮ সালের ৬ মার্চ মঙ্গলবার-এ কাবুলে। তিনি হুমায়ূন নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম মির্জা জহির-উদ-দীন বাবর এবং মাতৃর নাম মাহম বেগম। তিনি তাঁর পিতা বাদশাহ বাবরের মৃত্যুর পরে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বর্তমানের আফগানিস্থান, পাকিস্থান, উত্তর ভারত এবং বাংলাদেশ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। তিনি ১৫৩০ থেকে ১৫৪০ এবং ১৫৫৫ থেকে ১৫৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাজত্ব করছিলেন। পিতৃর মতোই তিনি সাম্রাজ্যের শাসন ক্ষমতা হারিয়েছিলেন এবং পারস্যের সাফাভিদ বংশের সহযোগিতায় সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় মোগল সাম্রাজ্য প্রায় এক মিলিয়ন স্কোয়ার কিলোমিটার বিস্তৃত ছিলো।
বাবর তাঁর সাম্রাজ্য দুই পুত্রের মধ্যে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যদিও সেটা ভারতের জন্য অস্বাভাবিক ছিলো, তবে চেঙ্গিস খাঁর সময় থেকে মধ্য এশিয়ায় এটি সাধারণ প্রথা ছিলো। এই প্রথার অধীনে শুধুমাত্র একজন চেঙ্গিসিডই সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারতেন। তবে, উপ-শাখার একজন পুরুষ চেঙ্গিসিডও সিংহাসনের সমান দাবিদার ছিলেন। চেঙ্গিস খাঁ নিজেই পীর মহম্মদ, মিরান শাহ, খলিল সুলতান এবং শাহরুখের মধ্যে তাঁর সাম্রাজ্য শান্তিপূর্ণভাবে বিভক্ত করে দিয়েছিলেন। প্রচলিত রাজতন্ত্রের বিপরীতে তৈমূরীয়রা চেঙ্গিস খাঁর উদাহরণ অনুসরণ করে জ্যেষ্ঠপুত্রের হাতে সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ অধিকার ছেড়ে না দিয়ে পুত্রদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। তখন প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিজন উপ- শাখার চেঙ্গিসিড উত্তরাধিকার দাবি করে ভ্রাতৃহত্যায় জড়িত হয়ে পড়তেন। হুমায়ূনের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিলো। হুমায়ূন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে তাঁর দুই সৎ ভ্রাতৃ তাঁর তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন।
হুমায়ূন তাঁর পিতার মৃত্যুর পরে মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৫৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বরে দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বাবরের সিদ্ধান্ত অনুসারে তাঁর সৎ ভাই কামরান মির্জা তখন কাবুল, কান্দাহার এবং ভারতের কিছু অংশ উত্তরাধিকার সূত্রে ভোগ করছিলেন। কামরান মির্জা এক সময় হুমায়ূনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন। এদিকে উমরাহ(সভ্রান্ত ব্যক্তি)বৃন্দও হুমায়ুনকে সঠিক শাসক হিসাবে মেনে নেননি। বাবর যখন অসুখে পড়েছিলেন তখন কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তি তাঁর শ্যালক মাহদি খাজাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও তখন সে প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছিলো, তবে সেটি সমস্যার একটি ইঙ্গিত ছিলো।
হুমায়ূনের ভ্রাতৃদের মধ্যে মাত্র একজন ভ্রাতৃ খলিল মির্জা(১৫০৯-১৫৩০) হুমায়ূনের পক্ষে ছিলেন। তবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো। হুমায়ূন ১৫৩৮ সালে তাঁর সেই মৃত ভ্রাতৃর জন্য একটি সমাধিক্ষেত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন, তবে নির্মাণ কার্য শেষ করার আগেই তিনি শের শাহ সূরির হাতে পরাস্ত হয়ে পারস্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন শের শাহ সূরি কাঠামোটি ধ্বংস করেছিলেন এবং হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের পরেও সেই নির্মাণ কার্য সম্পূর্ণ করা হয়নি।
ভ্রাতৃদের বাইরেও হুমায়ুনের দু’জন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। একজন ছিলেন গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ এবং অন্যজন ছিলেন পূর্ব বিহারের গঙ্গা নদীর তীরের শের শাহ সূরি। হুমায়ূন প্রথমে শের শাহ সূরি বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। তবে মাঝ পথে অভিযান সমাপ্ত করে গুজরাটে বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই অভিযানে হুমায়ূন গুজরাট, মালওয়া, চম্পারেন এবং মাণ্ডুর দূর্গ জয় করে বিজয়ী হতে সক্ষম হয়েছিলেন।
হুমায়ূনের পাঁচ বছরের শাসনকালে সুলতান বাহাদুর শাহ এবং শের শাহ সূরি তাঁদের সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। সুলতান বাহাদুর শাহ পর্তুগীজদের সাথে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জন্য পূর্ব দিকে চাপের সম্মুখীন হয়েছিলেন। মোগলরা অটোম্যান সাম্রাজের নিকট থেকে আগ্নেয়াস্ত্র অর্জন করছিলেন এবং সুলতান বাহাদুর শাহ চুক্তির মাধ্যমে পর্তুগীজদের নিকট থেকে আগ্নেয়াস্ত্র অর্জন করেছিলেন। এই চুক্তির ফলে পর্তুগীজরা উত্তর-পশ্চিম ভারতে কৌশলগত অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৫৩৫ সালে হুমায়ূনকে অবহিত করা হয়েছিলো যে, গুজরাটের সুলতান পর্তুগীজদের সাহায্যে মোগল অঞ্চলে আক্রমণ সংঘটিত করার পরিকল্পনা করছে। তখন হুমায়ূন একদল সৈন্য নিয়ে গুজরাটের দিকে অগ্রসর হোন এবং এক মাসের মধ্যে তিনি মাণ্ডু এবং চাম্পারেনের দূর্গ দখল করেন। বাহাদুর শাহকে চাপের মুখে ফেলার বিপরীতে হুমায়ূন নতুন বিজিত অঞ্চলগুলিকে সুসংহত করার দিকে মনযোগ প্রদান করেন। এদিকে বাহাদুর শাহ পালিয়ে গিয়ে পর্তুগীজদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন।
বাবর গুজরাটের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরে শের শাহ সূরি মোগলদের কাছ থেকে আগ্রার নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার সুযোগ পান। শের শাহ সূরি যতদূর সম্ভব দ্রুত আগ্রা অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। হুমায়ূন এই উদ্বেগজনক খবর পেয়ে সদ্য দখলকৃত অঞ্চলগুলির দখল বাহাদুর শাহের হাতে ছেড়ে দিয়ে তিনি তাঁর সেনা বাহিনী নিয়ে দ্রুত আগ্ৰা অভিমুখে অগ্রসর হোন। এই সুযোগেপর্তুগীজরা বাহাদুর শাহের রাজ্য আক্রমণ করেন। ১৫৩৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পর্তুগীজদের সাথে গুজরাট উপকূলে সংঘটিত যুদ্ধে সুলতান বাহাদুর শাহ পরাজিত এবং নিহত হয়।
এদিকে হুমায়ুন শের শাহ সুরির হাত থেকে আগ্রা রক্ষা করতে সক্ষম হোন। তবে বাংলার ভিলায়েতের রাজধানী গৌড়ের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হয়। শের শাহের পুত্র জালাল খান দখলকৃত চুনার দূর্গ হুমায়ূন সেনারা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সময় বিলম্ব হওয়ার জন্য দখল করতে ব্যর্থ হয়। তখন গৌড়ে অবস্থিত সাম্রাজের সর্ববৃহৎ শস্য ভাণ্ডার খালী করা হয় এবং হুমায়ূন সেগুলো রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করেন। বাংলার বিশাল সম্পত্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় সেগুলো পূর্বদিকে সরিয়ে আনা হয় এবং শের শাহকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য বাধ্য করা হয়।
শের শাহ পূর্বদিকে সেনা প্রত্যাহার করেন, তবে হুমায়ূন তাঁকে অনুসরণ করেননি। পরিবর্তে তিনি নিজেকে হেরেমে বন্দী করে রেখে অনেক দিন আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত ছিলেন। হুমায়ূনের ১৯ বছরের ভ্রাতৃ হিন্দাল মির্জা যুদ্ধে হুমায়ুনকে সহায় করার জন্য সন্মত হয়েছিলেন, তবে তিনি পরে সেনা প্রত্যাহার করে আগ্রা চলে এসে নিজেকে ভারপ্রাপ্ত সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। হুমায়ূন গ্রাণ্ড মুফতি শেখ বাহালুলকে হিন্দালের সাথে আলোচনার জন্য প্রেরণ করেছিলেন, তখন মুফতিকে হত্যা করা হয়েছিলো এবং হিন্দাল বিদ্রোহকে উস্কে দিয়ে প্রধান মসজিদে খুতবা অবরোধ করে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হুমায়ূনের অন্যজন ভ্রাতৃ কামরান মির্জা হুমায়ূনকে সাহায্য করার জন্য পঞ্জাব থেকে আগ্রা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। তবে তাঁর আগ্রা প্রত্যাবর্তন করার উদ্দেশ্য ছিলো হুমায়ুনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। কারণ তিনি হুমায়ূনের পতনশীল সাম্রাজ্যের জন্য দাবি উত্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তিনি হিন্দালের সাথে চুক্তি করেন যে, হুমায়ূনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরে কামরান যে নতুন সাম্রাজ্য তৈরি করবেন তাঁর একটি অংশ হিন্দালকে প্রদান করা হবে।
১৫৩৯ সালে ২৬ জুন-এ বক্সারের নিকট গঙ্গার তীরে অবস্থিত চৌচা নামক স্থানে হুমায়ূন এবং ভারতবর্ষে সুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাপক আফগান শের শাহ সূরির মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের সময় উভয়ে পরিখা খননে অধিক সময় ব্যস্ত ছিলেন। শের শাহ সূরি ইচ্ছাকৃতভাবেই যুদ্ধ পিছিয়ে নিচ্ছিলেন। কারণ তিনি অনুভব করছিলেন যে কিছু দিন পরে বর্ষা ঋতু শুরু হবে। তখন মোগলদের সৈন্য পরিচালনা করাটা অসুবিধা হবে এবং তাঁদের পক্ষে সৈন্য পরিচালনা করা সুবিধা হবে। আশা করা মতেই বর্ষাঋতু শুরু হওয়ার সাথে সাথে মোগল সৈন্যের প্রধান শক্তি আর্টিলারি ও কামান অচল হয়ে পড়েছিলো। তখন হুমায়ুন বাংলা এবং বিহার শের শাহকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মহম্মদ আজিজকে দূত হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিলো যে শের শাহ সুরি শুধুমাত্র সম্রাট হুমায়ূন কর্তৃক প্রদত্ত প্রদেশ হিসাবে শাসন করবে। যেখানে শের শাহের সার্বভৌমত্বের অভাব থাকবে। দুই পক্ষের মাঝে দর কষাকষিও চলে। দর কাষাকষি চলে থাকতেই হুমায়ুন সৈন্যরা শের শাহর সৈন্যদের আক্রমণ করে এবং শের শাহ সৈন্যরা ভয়ে পিছু হটে যায়। তখন বাধ্য হয়ে শের শাহ হুমায়ূনের প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেন।
এভাবে হুমায়ুনের সৈন্যরা নিজের করণীয় দায়িত্ব পালন করেন এবং শের শাহর সৈন্যরা পশ্চাদপসরণ করে। মোগল সৈন্যরা তখন প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি শিথিল করে পহরার ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই তাঁদের শিবিরে ফিরে আসেন। উত্তরে গঙ্গা এবং কামানাসারের মধ্যবর্তী নিচু স্থানে মোগলরা ছাউনি স্থাপন করেছিলো। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে ছাউনিগুলো প্লাবিত হয়ে পড়েছিলো।
মোগল সেনার দুর্বলতা প্রত্যক্ষ করে শের শাহ সূরি পূর্বের চুক্তি ভংগ করে নিজের বাহিনী নিয়ে মোগল শিবিরের নিকট আসে এবং তিনি মোগল সেনা অপ্রস্তুত অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করেন। তখন শের শাহ তাঁর পুত্র জালাল খান এবং তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি খাওয়াস খানের অধীনে সেনা বাহিনী তিনটি দলে বিভক্ত করে মোগল শিবির আক্রমণ করেন। অতর্কিত আক্রমণের ফলে মোগল সেনারা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পেরে পালাতে থাকে। শের শাহের সেনারা তাঁদের পশ্চাদধাবন করে প্রায় ৮০০ মোগল সেনা হত্যা করে। সাঁতরে গঙ্গা পার হওয়ার সময় মহম্মদ জামান মির্জাসহ কয়েকজন বিশিষ্ট মোগল জলে ডুবে মারা যায়। তবে, হুমায়ূন বায়ুভর্তি চামড়ার থৈলা নিয়ে সাঁতরে গঙ্গা নদী পার হয়ে নিরাপদে আগ্রা ফিরে আসেন। গঙ্গা পার হওয়ার সময় সামস-উদ-দীন মহম্মদ তাঁকে সহায় করেছিলেন।
হুমায়ূন আগ্রায় ফিরে এসে তাঁর তিন ভ্রাতৃকে আগ্রায় উপস্থিত পান। হুমায়ূনের বিরুদ্ধে ভ্রাতৃরা যে ষড়যন্ত্র করেছিলো, সেসব ভুলে গিয়ে তিনি তাঁদের ক্ষমা করে দেন। এমন কী হিন্দাল মির্জা তাঁর সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তা ভুলে গিয়ে তিনি তাঁকেও ক্ষমা করে দেন। এদিকে শের শাহ ধীরে ধীরে আগ্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শের শাহের এই অগ্রগতি মোগল পরিবারের জন্য গুরুতর হুমকি ছিলো যদিও কীভাবে শের শাহর গতিরোধ করবে এ নিয়ে হুমায়ূন এবং কামরানের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। কামরান শের শাহের বিরুদ্ধে যতদূর সম্ভব দ্রুত আক্রমণ সংঘটিত করার পরামর্শ দেন। কিন্তু হুমায়ূন নিকটবর্তী শত্রুর বিরুদ্ধে দ্রুত আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন। ফলে কামরান মির্জা তাঁর সেনা প্রত্যাহার করে নিজের নামে বৃহত্তর সেনা বাহিনী গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে লাহোর ফিরে যান। প্রকৃত পক্ষে কামরান মির্জা হুমায়ূনের অধীনে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ তিনি নিজেই সিংহাসন নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিলেন।
কামরান লাহোর ফিরে আসার পর হুমায়ূন শের শাহকে বাধা প্রদান করার জন্য তাঁর অন্য দুই ভ্রাতৃ মির্জা আকসারি এবং হিন্দালকে নিয়ে আগ্রা থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কনৌজ পৌঁছোন। ১৫৪০ সালের ১৭ মে কনৌজের নিকটে অবস্থিত বিলগ্রাম নামক স্থানে হুমায়ূন বাহিনী এবং শের শাহ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধটি বিলগ্রামের যুদ্ধ নামেও পরিচিত। উক্ত যুদ্ধে হুমায়ূন কৌশলগত কারণে শের শাহ বাহিনীর হাতে দ্বিতীয় বারের জন্য পরাজিত হয়ে আগ্রা অভিমুখে পশ্চাদসরণ করেন। তখন শের শাহ তাঁদের পশ্চাদধাবন করেন। প্রতিরোধ গঢ়ে তুলতে সক্ষম না হয়ে হুমায়ুন তাঁর ভাইদের নিয়ে লাহোরে কামরান মির্জার নিকট চলে আসেন। ফলে শের শাহ সূরি দিল্লীর সিংহাসন দখল করে ভারতে স্বল্পস্থায়ী সুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার ফলে হুমায়ূন ইরানের সাফাভিদ শাসক শাহ ইসমাইল-১-এর পুত্র শাহ তাহমাস্প-১এর দরবারে ১৫ বছর নির্বাসিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
লাহোরে আসার পরে চার ভ্রাতৃ একত্রিত হয়, তবে ভাইদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য হুমায়ূন শের শাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গঢ়ে তুলতে সক্ষম হোননি। কারণ কামরান মির্জা তখন পঞ্জাব ও আফগানিস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং হিন্দাল মির্জা সিন্ধ নিয়ন্ত্রণে আনার কথা ভাবছিলেন। এদিকে শের শাহ আগ্রা ও দিল্লী দখল করে ধীরে ধীরে তাঁদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শের শাহ সিরহিন্দ পৌঁছোনোর খবর পেয়ে হুমায়ুন শের শাহর নিকট এই বলে পত্র প্রেরণ করেছিলেন যে, আমি সমগ্র হিন্দুস্থান(গঙ্গা উপত্যকার অধিকাংশ ভূমি সমন্বিতে পঞ্জাবের ভূমি ছেড়ে এসেছি। আপনি আমাদের জন্য একমাত্র লাহোর ছেড়ে দিয়ে সিরহিন্দ পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করুন। তখন শের শাহ পত্রের উত্তরে বলেছিলেন যে, আমি তোমার জন্য কাবুল ছেড়ে এসেছি, তুমি কাবুল যাওয়া উচিত।
ইতিমধ্যে মোগলদের অনুগত হিন্দু শাসক মালদেও রাঠোর মোগল সাম্রাজের বিরুদ্ধে গিয়ে শের শাহের পক্ষে যোগদান করেছিলেন। ফলে হুমায়ুন দিল্লীর সিংহাসন উদ্ধারের চিন্তা বাদ দিয়ে তাঁর বাহিনী নিয়ে থর মরুভূমি পাড়ি দিয়ে সিন্ধ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পূর্বের বিদ্রোহী হিন্দাল মির্জা কান্দাহারে ফিরে যান এবং কামরান মির্জা ও আকসারি মির্জা অপেক্ষাকৃত শান্ত কাবুলে ফিরে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিলো হুমায়ূনের পরিবারের সাথে প্রথম বিচ্ছেদ।
সিদ্ধ যাওয়ার পথে কষ্টকর পথযাত্রার বিষয়ে হুমায়ুন অনেক বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি কীভাবে তাঁর গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে মরুভূমি পাড়ি দিতে হয়েছিলো। তাঁদের উপযুক্ত খাদ্য পানীয়র সমস্যা ছিলো। আট মাসের গর্ভবর্তী স্ত্রী হামিদার ঘোড়া মারা যাওয়ার পরে কেউ ঘোড়া ধার দেয়নি। তখন তিনি নিজের ঘোড়া স্ত্রীকে দিতে হয়েছিলো। যার ফলে তিনি ছয় কিলোমিটার রাস্তা উটের পিঠে চড়ে গিয়েছিলেন, যদিও খালিদ বেগ তাঁকে তার নিজের পিঠে চড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলো। হুমায়ূন এই ঘটনাটিকে তাঁর জীবনের সর্বনিম্ন বিন্দু হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
হুমায়ুন সিন্ধের আমীর হোসেন ইমরানির নিকট থেকে সহায়ের আশা করছিলেন। কারণ হোসেন ইমরানিকে তিনি সিন্ধের শাসক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন এবং হোসেন ইমরানি তাঁর আনুগত্য প্রকাশের জন্য শপতও খেয়েছিলেন। তদুপরি হামিদা বেগম সিন্ধের সম্ভ্রান্ত পীর পরিবারের কন্যা ছিলেন। আমিরের দরবারে যাওয়ার পথে হুমায়ূনকে যাত্রা স্থগিত রাখতে হয়েছিলো, কারণ গর্ভবর্তী হামিদা বেগম ভ্রমণ করতে অসুবিধা পাচ্ছিলেন। হুমায়ূন তখন বাধ্য হয়ে অমরকোট (বর্তমান অমরকোট সিন্ধু প্রদেশের অংশ) মরুদ্যানের হিন্দু শাসক রাণা প্রসাদ রাওয়ের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
রাণা প্রসাদ রাও হুমায়ূনকে তার বাড়িতে যথাযথ স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং হুমায়ুন কয়েক মাস তাঁর বাড়িতে ছিলেন। এখানে, একজন হিন্দু রাজপুতের গৃহে, সিন্ধের সভ্রান্ত পরিবারের কন্যা হামিদা বানুর গর্ভ থেকে ১৫৪২ সালের ১৫ অক্টোবর ভবিষ্যতের ভারত সম্রাট আকবরের জন্ম হয়েছিলো। জন্ম তারিখটি সুপ্রতিষ্ঠিত, কারণ হুমায়ূন জ্যোতির্বিদদের সাথে সেদিন গ্রহের অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। আকবর ছিলেন অনেক প্রার্থনার পরে ৩৪ বছর বয়সী হুমায়ূনরে বহু প্রতিক্ষীত উত্তরাধিকারী। আকবরের জন্মের অল্প পরেই হুমায়ূন তাঁর দলবল নিয়ে অমরকোটকে পেছনে ফেলে সিন্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন।
ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য হুমায়ূন যে মানুষটির উপর সহায়ের প্রত্যাশা করেছিলেন তিনি তাঁর দ্বারা প্রতারিত হোন নি। সিন্ধের শাসক আমির হোসেন উমরানি হুমায়ূনের উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন এবং হুমায়ূনের প্রতি অনুগত ছিলেন। হারানো অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধারের জন্য হুমায়ূন ঘোড়া এবং অস্ত্র সংগ্রহ করে নতুন জোট গঠন করছিলেন এবং শত শত মোগল, বেলুচ ও সিন্ধ উপজাতিদের একত্রিত করে হুমায়ূন কান্দাহার অভিমুখে যাত্রা করছিলেন। হুমায়ূন নিজেকে প্রথম তৈমুরীয় মোগল সম্রাট বাবরের সঠিক উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণা করার জন্য আরও হাজার হাজার সেনা তাঁর সাথে যোগদান করেছিলো। যেসকল উপজাতি হুমায়ুনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলো, তাঁদের মধ্যে ছিলো লেঘারি, মাঘসি, রিন্দ এবং অনেকে।
১৫৪৩ সালের ১১ জুলাই হুমায়ূন সিন্ধু নদী পার হয়ে সূরিদের উৎখাত করে হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের আকাংক্ষা নিয়ে কান্দাহারে তাঁর ভ্রাতৃদের সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে সিন্ধ থেকে কান্দাহার অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। সিন্ধ থেকে কান্দাহার অভিমুখে যাত্রা করার সময় তাঁর সাথে ৩০০ বন্য উট এবং ২০০০ গাড়ী খাদ্যশস্য ছিলো।
কামরান মির্জার নামে খোৎবা পাঠ করতে অস্বীকার করাতে হিন্দাল মির্জাকে কাবুলে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিলো। তাঁর আরেক ভ্রাতৃ আকসারি মির্জাকে সেনা সংগ্রহ করে হুমায়ূনের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। শত্রুসেনার কাছাকাছি পৌঁছোনোর পরে এই সংবাদ পেয়ে হুমায়ূন তাঁদের মুখামুখি না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন। তখন ছিলো ডিসেম্বর মাস। ফলে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ছিলো। হিন্দুকোষ পর্বতমালার ঠাণ্ডার মধ্যে ১৪ মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে যাত্রা করাটা খুবই বিপজ্জক ছিলো। তাই আকবরকে কান্দাহারের নিকটবর্তী একটি শিবিরে রেখে আসা হয়েছিলে। খবর পেয়ে আকসারি মির্জা সেই শিবির থেকে আকবরকে নিয়ে গিয়ে কামরান মির্জা এবং আকসারি মির্জার স্ত্রীর উপরে তাঁর লালনপালনের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। হুমায়ুন নামায় আকসারি মির্জার স্ত্রী সুলতানা বেগমরে নাম বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।
হুমায়ূন আবার কান্দাহারে ফিরে যান, সেখানে তাঁর ভ্রাতৃ কামরান মির্জা শাসন করছিলেন। তবে সেখানে তিনি কামরান মির্জার নিকট থেকে কোনো সাহায্য না পেয়ে ৪০ জন পুরুষ সঙ্গী এবং বেগা বেগমকে নিয়ে পর্বতমালা এবং উপত্যকার মধ্য দিয়ে পারস্য অভিমুখে যাত্রা করেন। সেই যাত্রা খুবই কষ্টকর ছিলো। রাজকীয় পরিবারকে শিরস্ত্রাণে সিদ্ধ ঘোড়ার মাংস খেয়ে বাঁচতে হয়েছিলো। হেরাতে পৌঁছোতে তাঁদের প্রায় এক মাস লেগেছিলো এবং এভাবেই কষ্ট করে বেঁচে থাকতে হয়েছিলো। তবে হেরাতে পৌঁছোনের পরে তাঁরা শাহ তাহমাস্প দ্বারা রাজকীয় সম্বর্ধনা পেয়েছিলেন। হুমায়ুনের সেনা বাহিনীকে রাজকীয় রক্ষীদের দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিলো এবং তাঁদের জন্য খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তাঁদের সন্মানে রাস্তাঘাট পরিস্কার করা হয়েছিলো এবং হুমায়ুনকে রাজকীয় সন্মান প্রদর্শন করা হয়েছিলো। সেখানে থাকাকালীন তিনি হেরাতের দর্শনীয় স্থানগুলি পরিদর্শন করেছিলেন। সেখানকার শিল্পকর্ম প্রত্যক্ষ করে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। শিল্পকর্মগুলি বিশেষত হোসেন বায়কারা, তাঁর পূর্বপুরুষ এবং তৈমূরীয় শাসক শাহরুখের প্রধানা বেগম গওহর সাদের দ্বারা নির্মিত ছিলো। এভাবে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের নির্মাণ কাজের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন।
হেরাতে তিনি সুক্ষ্ম চিত্রশিল্পী কামালুদ্দিন বেহজাদ এবং তাঁর দুই ছাত্রের সাথে রাজদরবারে পরিচিত হয়েছিলেন। তখন তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি যদি হিন্দুস্থান পুনর দখল করতে সক্ষম হোন তাহলে তাঁরা তাঁর সাথে হিন্দুস্থান যেতে সন্মত হবে কি-না ? তাঁরা সন্মত হয়েছিলেন। পারস্যে আসার ছয়মাস পর জুলাই মাসে তিনি শাহ তাহমাস্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। হেরাত থেকে পথযাত্রার পর তাঁরা কাজভিনে দেয়াল চিত্রে শোভিত ইস্পাহানের বিখ্যাত চল্লিশ স্তম্ভের প্রাসাদে মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের জন্য একটি বড় ভোজ এবং পার্টির আয়োজন করা হয়েছিলো। হুমায়ূন সুন্নি মুসলিম ছিলেন। শাহ তাহমাস্প তাঁকে এবং তাঁর সেনাদের সুন্নি থেকে শিয়া সম্প্রদায়ে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। মোগলরা জানতেন যে শাহের প্রস্তাবে সন্মতি জানালে শাহ হুমায়ূনকে আরও সম্মান প্রদর্শন করবেন তবুও তাঁরা ধর্মান্তকরণে অসন্মতি প্রকাশ করেছিলেন। কামরান মির্জা হুমায়ুনকে জীবিত অথবা মৃত তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিনিময়ে কামরান মির্জা কান্দাহার পারস্যদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে শাহ তাহমাস্প সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন।
পরিবর্তে শাহ তাহমাস্প একটি ভোজসভা উদযাপন করেছিলেন এবং শাহ সেই ভোজসভায় ভ্রাতৃ কামরানের উপর আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য হুমায়ূনকে ৩০০ টি তাঁবু, ১২,০০০ অশ্বারোহী এবং শাহের ৩০০ জন প্রবীণ সৈনিক প্রদানের কথা ঘোষণা করেছিলেন। শাহ তাহমাস্প আশা করেছিলেন হুমায়ূন বাহিনী বিজয়ী হলে কান্দাহার তাঁর হবে। হুমায়ূন এ বিষয়ে সন্মতি জানিয়েছিলেন।
সাফাভিদদের সাহায্যে হুমায়ূন দুই সপ্তাহের মধ্যে আকসারি মির্জাকে পরাজিত করে কান্দাহার দখল করেছিলেন। হুমায়ূন উল্লেখ করেছেন, ‘কান্দাহার দখল করার পরে আকসারি মির্জার সেবায় যেসকল অভিজাতবর্গ নিয়োজিত ছিলো, তাঁরা অতি দ্রুত তাঁর সেবায় নিয়োজিত হয়েছিলো। তিনি বলেছেন, বিশ্বের অধিবাসীদের অধিকাংশ লোক সত্যিই ভেড়ার পালের মতো, একজন একদিকে গেলে অন্যরা তা অবিলম্বে অনুসরণ করে।’ কান্দাহার দখল করার পরে প্রতিশ্রুতি অনুসারে হুমায়ূন কান্দাহার শাহকে প্রদান করেছিলেন। শাহ তাঁর শিশু পুত্র মুরাদকে সেখানে প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। যাইহোক, শিশু সন্তানটি শীঘ্র মারা গিয়েছিলো এবং ক্ষমতা গ্রহণের জন্য হুমায়ূন নিজেকে যথেষ্ট শক্তিশালী ভেবে শাসন ক্ষমতা নিজের হাতে এনেছিলেন।
হুমায়ূন পরে কামরান মির্জা শাসিত কাবুল দখল করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। কামরান মির্জাকে একজন শাসক হিসাবে সবাই ঘৃণা করতো। হুমায়ূনের পারস্য বাহিনী শহরের নিকটে আসার সাথে সাথে কামরান মির্জার শত শত সেনা হুমায়ূনের পক্ষে যোগদান করেছিলো। ফলে কামরান মির্জা কোনো প্রতিরোধ গড়ে না তুলেই সহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে সেনা বাহিনী গঠনের জন্য মনোনিবেশ করেছিলেন।
১৫৪৫ সালের নভেম্বর মাসে হামিদা বেগম এবং আকবর হুমায়ূনের সাথে মিলিত হয়েছিলো। এই উপলক্ষ্যে একটি বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছিলো। আকবরের খাতনার সময়েও অন্য একটি বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছিলো।
হুমায়ুনের বিশাল সেনা বাহিনীর তুলনায় কামরান মির্জার সেনা বাহিনী নগণ্য হলেও কামরান মির্জা কাবুল এবং কান্দাহার পুনরুদ্ধারের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এই ক্ষেত্রে কামরান মির্জার পক্ষে যে সেনারা তাঁর বিরুদ্ধে শহর রক্ষা করছিলো, তাদের প্রতি হুমায়ূনের নমনীয় মনোভাবের জন্য তারা কামরান মির্জাকে প্রত্যাখান করেছিলো। তাই কামরান মির্জা কাবুল এবং কান্দাহার পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই যুদ্ধে হুমায়ুনের সবচেয়ে অবিশ্বাসী ভ্রাতৃ মির্জা হিন্দাল তার পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। অন্য একটি ভ্রাতৃ আকসারি মির্জাকে অভিজাতরা শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন। পরে তাঁকে হজ্বে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, তবে দামেস্কের বাইরে মরুভূমিতে তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
কামরান মির্জা বারবার হুমায়ুনকে হত্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৫৫২ সালে কামরান মির্জা শের শাহের উত্তরসুরি ইসলাম খাঁর সাথে হুমায়ুনের বিরুদ্ধে একটি চুক্তি করার চেষ্টা করছিলেন। তবে একজন গাখারের হাতে তিনি ধরা পড়েছিলেন। গাখাররা ছিলো পাঞ্জাবের উত্তর অংশে বসবাসরত পতুহার উপজাতির পাঞ্জাবী মুসলিম। তারা মোগলদের প্রতি অনুগত ছিলো। গাখারদের সুলতান আদম কামরান মির্জাকে হুমায়ূনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। হুমায়ূন তাঁর ভ্রাতৃকে ক্ষমা করে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তবে, তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিলো যে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করার পরেও শাস্তি দেওয়া না হলে, সমর্থকদের মাঝে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। তাই কামরান মির্জাকে হত্যা করার পরিবর্তে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো এই ভেবে যে অন্ধ হলে তাঁর সিংহাসনের দাবি শেষ হয়ে যাবে। তাঁকে হজ্বে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। তবে তিনি ১৫৫৭ সালে আরব উপদ্বীপের মক্কার কাছে মারা গিয়েছিলেন।
১৫৪৫ সালের ২২ মে কালিঞ্জার দূর্গ অবরোধের সময় শের শাহ সূরি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র জালাল খাঁ ১৫৪৫ সালে ইসলাম খাঁ সূরি নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং ১৫৫৪ সালের ২২ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তার পুত্র ফিরোজ শাহ সূরি মাত্র বার বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। কিছুদিন পরেই শের শাহের ভাতিজা মুবারিজ খাঁ তাঁকে হত্যা করে মহম্মদ আদিল খাঁ নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। আদিল খাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ সূরি ১৫৫৫ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তখন শহরের নেতৃস্থানীয় লোক স্বাধীনতার জন্য দাবি উত্থাপন করার চেষ্টা করছিলেন। ফলে হুমায়ুনের জন্য সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিলো।
ইতিমধ্যে হুমায়ূন লেখারি, মাঘসি এবং রিন্দের বেলুচ উপজাতি নিয়ে এক বিশাল সেনা বাহিনী গঠন করেছিলেন এবং দিল্লীর সিংহাসন দখল করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হুমায়ূন নিজের পূর্বের যুদ্ধ পরিচালানার দুর্বল রেকর্ড দেখে বৈরাম খাঁকে সৈন্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বৈরাম খাঁ একজন বুদ্ধিমান, মহান এবং কৌশলী যোদ্ধা হিসাবে পরিচিত ছিলেন।
বৈরাম খাঁ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পঞ্জাবের মধ্য দিয়ে এসে রোহতাস দূর্গে উপস্থিত হয়েছিলেন। রোহাতাস দূর্গ শের শাহ সূরি ১৫৪১-১৫৪৩ সালে হুমায়ূনের প্রতি অনুগত গাখারদের পরাস্ত করার জন্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। রোহতাস দূর্গের দেয়ালগুলি ১২.৫ মিটার পুরু এবং ১৮.২৮ মিটার উঁচু ছিলো। দুর্গটি ৪ কিলোমিটার বিস্তৃত ছিলো এবং ৬৮ টি অর্ধবৃত্তাকার বুরুজ বিশিষ্ট ছিলো। দূর্গের বেলে পাথরের বিশাল দুয়ারগুলিতে মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন ছিলো। সিকান্দার শাহ সূরির একজন বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি কোনো ধরণের প্রতিরোধ ছাড়াই মোগলদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো। ১৫৫৫ সালের ২২ জুন হুমায়ূন বাহিনী এবং সিকান্দার বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। উক্ত যুদ্ধে হুমায়ুনের হয়ে সৈন্য পরিচালান করছিলেন সুকৌশলী সেনাপতি বৈরাম খাঁ। তিনি একটি কৌশল প্রায়োগ করে শত্রুসেনাদের সন্মুখ সমরে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু কৌশল অনুসারে পরমুহূর্তেই হুমায়ুন সেনা কৃত্রিম ভয়ে দ্রুত পশ্চাদসরণ করছিলেন। শত্রুসেনা তখন তাঁদের পশ্চাদধাবন করে ফাঁদে পড়েছিলেন। অর্থাৎ হুমায়ূন সেনা কৌশল করে তাঁদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরে সিকান্দার শাহ সূরিকে যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। সিকান্দার শাহ সূরি যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার পরে সিরহিন্দের অধিকাংশ গ্রাম এবং শহরের লোকেরা আক্রমণকারী হুমায়ূন বাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং হুমায়ূন রাজধানীতে প্রবেশ করে ১৫৫৫ সালের ২৩ জুনে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। এভাবেই ভারতে মোগল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিলো।
হুমায়ূন ইতিমধ্যে একজন সফল শাসক হয়ে উঠেছিলেন এবং সেনাপতিদেরও বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন। ইতিমধ্যে তাঁর সব কয়জন ভ্রাতৃ মারা গিয়েছিলো, তাই অভিযানের সময় সিংহাসন হারানোর ভয় ছিলো না। সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি নতুন উদ্যমে উপমহাদেশের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। নির্বাসনে থাকাকালীন তাঁর জ্যোতিষীদের উপরে নির্ভরশীলতা হ্রাস পেয়েছিলো এবং পারস্যে থাকাকালীন তিনি যুদ্ধের যেসব ফলপ্রসূ কৌশল পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সেই কৌশলগুলো অনুকরণ করে তিনি সব কয়টি যুদ্ধে সফল হয়েছিলেন।
চরিত্র– এওয়ার্ড এইস হোল্ডেন লিখেছেন, হুমায়ূন তাঁর প্রতি নির্ভরশীলদের উপরে সদয় এবং বিবেচনাশীল ছিলেন। তাঁর পুত্র আকবরের প্রতি, তাঁর বন্ধুদের প্রতি, ভ্রাতৃদের প্রতি তিনি একনিষ্ঠ ছিলেন। ভ্রাতৃদের প্রতি কঠোর হওয়ার জন্যই তাঁর শাসনামলে বড় দুর্ভাগ্য দেখা দিয়েছিলো। তিনি আরও লিখেছেন, তাঁর চরিত্রের ত্রুটিগুলি, যা তাঁকে জাতির একজন সফল শাসক এবং মানুষ হিসাবে কম প্রশংসার যোগ্য করে তুলেছে। তাই বলে তিনি পুত্রের পিতা এবং অন্যের পিতৃ হওয়ার অযোগ্য ছিলেন না। স্ট্যানলি লেনপুল তাঁর ‘মধ্যযুগীয় ভারত’ গ্রন্থে লিখেছেন, তাঁর নামের অর্থ ভাগ্যবান/বিজয়ী, তবে ইতিহাসে এমন কোনো শাসক নেই, যিনি হুমায়ূনের মতো নামের অর্থের সাথে অবিচার করেছেন। তিনি ছিলেন ক্ষমাশীল প্রকৃতির। তিনি আরও লিখেছেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে দুর্ভাগ্যের শিকার ছিলেন। যেখানে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকত, সেখানে তিনি পড়ে যেতেনই। সেখান থেকে তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা ছিলো না। হুমায়ূন ভুলবশত একজন ইমামকে হাতীর পা-র তলে ফেলে পিষে মারার হুকুম দিয়েছিলেন, যিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সমালোচনা করেছিলেন।
দ্বিতীয়বার সিংহাসনে আরোহণ করার ছমাস পরে তিনি শের মণ্ডল লাইব্রেরী থেকে হাতভর্তি বই নিয়ে পালিশ করা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পড়ে গিয়ে ১৫৫৬ সালের ২৪ জানুয়ারি মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি পড়ে যাওয়ার সময় মুয়াজ্জিন আযান দিচ্ছিলেন। তাঁর অভ্যেস ছিলো, যেখানেই তিনি আযানের শব্দ শুনতে পেতেন সেখানেই শ্রদ্ধায় নতজানু হতেন। নতজানু হওয়ার সময় পোশাকে তাঁর পা আটকে ধরে এবং তিনি সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ পিছলে পড়েন। পিছলে পড়ার সময় সিঁড়ির কানায় লেগে তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিন দিন পরে মারা যান। তাঁর মৃতদেহ প্রথমে পুরানা কিল্লায় সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। কিন্তু দিল্লীতে হিমুর আক্রমণ এবং পুরানা কিল্লা দখলের কারণে পলায়নরত সেনারা তাঁর মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পাঞ্জাবের কালানৌরে স্থানান্তর করেছিলো। কালানৌরে আকবরের মাথায় রাজমুকুট পরানো হয়েছিলো।
হিমু আদিল শাহ সূরির সেনাপতি ও উজির ছিলেন এবং হুমায়ুন মারা যাওয়ার সময় তিনি বাংলায় ছিলেন। হুমায়ূনের মৃত্যু হিমুকে মোগলদের পরাজিত করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছিলো। তিনি বাংলা থেকে পদযাত্রা শুরু করেছিলেন এবং বায়না, ইটওয়া, সম্বল, কাল্পি এবং নারনৌল থেকে মোগলদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হিমুর আক্রমণের কথা শুনে শহর খালি করে যুদ্ধ না করেই আগ্রার শাসক পালিয়ে গিয়েছিলো। হিমু আগ্রা দখলের সময় আকবর জলন্ধরে ছিলেন। আগ্রা বিজয়ের কথা শুনে, জলন্ধরে অবস্থানরত আকবরের নিকট দিল্লীর শাসক তারদি বেগ খাঁ পত্র লিখেছিলেন যে, হিমু আগ্রা দখল করেছে এবং রাজধানী দিল্লী দখলের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। সৈন্য বৃদ্ধি ছাড়া তাঁদের সাথে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বৈরাম খাঁ সেনাপতি পীর মহম্মদকে দিল্লী প্রেরণ করেছিলেন। ইতিমধ্যে তারদি বেগ খাঁ আশেপাশের মোগল রাজন্যবর্গদের দিল্লী রক্ষার জন্য সেনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং আলোচনার জন্য কাউন্সিল আহ্বান করে হিমুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আগ্রা দখল করে হিমু পলায়নরত শাসককে অনুসরণ করে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে ঠিক দিল্লীর বাইরের একটি গ্রাম তুঘলকাবাদে পৌঁছেছিলেন। সেখানে ১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবর হিমু বাহিনী এবং তারদি বেগ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বাদাউনের মতে, হিমুর সেনা সংখ্যায় বেশি হলেও মোগলরা তাঁর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করছিলেন। যদুনাথ সরকার সেই যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- উক্ত যুদ্ধে ১০০০ টি হাতী, ৫০,০০০ টি ঘোড়া, ৫১ টি কামান এবং ৫০০ টি ফালক’নেট (পাতল কামান) ব্যবহার করা হয়েছিলো।
মোগল বাহিনী এভাবে পরিচালিত করা হয়েছিলো- আবদুল্যাহ উজবেগ সেনাবাহিনীর অগ্রভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। আবদুল্ল্যাহ উজবেগের অধীনে তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনী ছিলো। হায়দার মহম্মদ সেনাদলের ডান দিকে এবং ইসকান্দার বেগ বামদিকে এবং তারদি বেগ কেন্দ্রস্থিত ভাগে নেতৃত্ব দিচিছলেন। সেনাদলের অগ্রভাগে থাকা তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনী এবং বামদিক থেকে ইসকান্দার বেগের নেতৃত্বে আক্রমণ সংঘটিত করে শত্রু সেনাদের তাড়িয়ে দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলো। এই আক্রমণে বিজয়ীরা ৪০০ টি হাতী বন্দি করেছিলো এবং ৩,০০০ আফগান সেনা হত্যা করেছিলো। বিজয়ের সম্ভাবনা দেখে তারদি বেগের অনেক সেনা শত্রু শিবির লুণ্ঠন করার জন্য ছত্রভংগ হয়ে পড়েছিলো। এই সুযোগে হিমু ৩০০ টি পসন্দের হাতী এবং নির্বাচিত ঘোড়সওয়ার নিয়ে তারদি বেগের উপর আক্রমণ সংঘটিত করেছিলো। বিশাল জন্তুদের অগ্রগতি এবং পেছনে অশ্বারোহীদের দেখে মোগল বেগেরা প্রতিরক্ষার অপেক্ষা না করেই পালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে তারদি বেগকেও একই পথ ধরতে হয়েছিলো।
এদিকে আলওয়ার থেকে হাজি খাঁর নেতৃত্বে নতুন সেনা এসে যোগদান করাতে হিমুর শক্তি বৃদ্ধি হয়েছিলো। তখন পূর্বের বিজয়ী মোগলদের অগ্রভাগের সেনা এবং ডানদিকের সেনারা যুদ্ধ জয়ের আশা না দেখে ছত্রভংগ দিয়েছিলো। এভাবেই হিমু ১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবরে একদিনের যুদ্ধেই দিল্লী দখল করেছিলেন।
তুঘলকাবাদের বিপর্যের খবর পেয়ে আকবর অবিলম্বে দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। ১০,০০০ অশ্বারোহী সেনা দিয়ে আলীকুলি খাঁ শাইবানীকে সবার অগ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। দুর্বল পহরায় পরিবহণ করা হিমুর গুলি- বারূদ আলীকুলি বাহিনী দখল করার ফলে হিমু বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বরে সংঘটিত পানীপতের ঐতিহাসিক যুদ্ধে হিমু বাহিনী পরাজিত হয়েছিলো এবং তাঁকে আহত অবস্থায় হাতীসহ বন্দি করা হয়েছিলো। তখন ১৩ বছরের কিশোর আকবরকে হিমুর শিরশ্ছেদ করতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু তিনি একজন মৃতপ্রায় ব্যক্তির উপরে তরবারি দিয়ে আঘাত করতে অস্বীকার করেছিলেন। পরে আকবর তরবারি দিয়ে হিমুর মস্তক স্পর্শ করতে রাজি হয়েছিলেন এবং বৈরাম খাঁ হিমুকে হত্যা করেছিলেন। হিমুর মস্তক কাবুল পাঠানো হয়েছিলো এবং তাঁর দেহ দিল্লী গেটের নিকট জনতার দর্শনের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো।
দিল্লী দখলের পরে আকবর তাঁর পিসি গুলবদন বেগমকে হুমায়ুনের জীবনী হুমায়ূন নামা লিখতে বলেছিলেন। হুমায়ূন নামা অন্যান্য রাজকীয় জীবনী (তৈমূরের জীবনী জাফরনামা, বাবরের জীবনীবাবরনামা এবং আকবরের জীবনী আকবর নামা) থেকে ভিন্ন ছিলো। হুমায়ুন নামার কোনো সমৃদ্ধ অনুলিপি টিকে নেই। শুধুমাত্র একটি বিক্ষিপ্ত পাণ্ডুলিপি ১৮৬০ সাল থেকে ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত রয়েছে। অ্যানেট বেভারেজ ১৯০১ সালে এটি ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন। ২০০০ সালে হুমায়ুন নামার ইংরেজি এবং বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯৪৫ সালে হুমায়ূনের জীবনের আধারে নির্মিত মেহবুব খান পরিচালিত ‘হুমায়ূন’ শিরোনামে ঐতিহাসিক বলিউড মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিলো। ১৯৪৫ সালে চলচ্চিত্রটি সপ্তম সর্বোচ্চ উপার্জনকারী ভারতীয় চলচ্চিত্র ছিলো।
বেগা বেগম– বেগা বেগমের বিষয়ে কিছু বর্ণনা না দিলে অন্যায় হবে বলে বেগা বেগমের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো। বেগা বেগম হুমায়ূনের মামাতো চাচা ইয়াদগার বেগের কন্যা ছিলেন। বেগা বেগমের সাথে হুমায়ূন ১৫২৭ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিয়ের এক বছর পরে ১৫২৮ সালে তিনি আল আমান মির্জা নামক একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। তবে সন্তানটি শিশু অবস্থাই মারা গিয়েছিলো। তিনি ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ১৫৪০ সালের ১৭ মে এবং ১৫৫৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫৫৬ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুনের প্রধানা মহিষী ছিলেন। বেগা বেগম মোগল সাম্রাজ্যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রথা চালু করেছিলেন। ১৬ শতকের শেষের দিকে দিল্লীতে হুমায়ুনের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করিয়েছিলেন। এই স্মৃতিস্তম্ভটিকে মোগল স্থাপত্যের মাষ্টারপিস হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই স্মৃতিস্তম্ভটিকে দেখেই বাদশাহ শাহ জাহান তাজমহল নির্মাণের জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বেগা বেগম জ্ঞানী মহিলা ছিলেন এবং ওষুধ সম্বর্কে তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞান ছিলো। ১৫৮২ সালে তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
হুমায়ূন-এর সমাধিক্ষেত্র
মহামতি আকবর
আবুল ফাদ জালাল-উদ-দীন মহম্মদ আকবরের জন্ম ১৫৪২ সালের ২৫ অক্টোবর রাজপুতনার অমরকোটে হিন্দু শাসক রাণা প্রসাদ রাওয়ের গৃহে। তাঁর পিতৃর নাম দ্বিতীয় মোগল শাসক হুমায়ূন এবং মাতৃর নাম হামিদা বানু। হামিদা বানু সিন্ধের সভ্রান্ত পরিবারের কন্যা ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পরে ১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মাত্র তের বছর বয়সে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
১৫৩৯ এবং ১৫৪১ সালে সংঘটিত চৌচা এবং কনৌজের যুদ্ধে শের শাহ সূরির কাছে পরাজিত হয়ে মোগল সম্রাট হুমায়ুন সিন্ধে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর ছোট ভাই হিন্দাল মির্জার ফার্সি শিক্ষক শেখ আলী আকবর জামির ১৪ বছরের কন্যা হামিদা বানুর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিয়ের এক বছর পর রাজপুতনার অমরকোট দূর্গে ১৫৪২ সালের ২৫ অক্টোবর জালাল-উদ-দীন মহম্মদ আকবরের জন্ম হয়েছিলো।
আকবর হুমায়ূনের ভ্রাতৃ কামরান মির্জা এবং আকসারি মির্জার যৌথ পরিবারের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হয়েছিলেন। লালন-পালনের ক্ষেত্রে হুমায়ুন নামায় আকসারি মির্জার স্ত্রী সুলতানা বেগমরে নাম বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে। ছেলেবেলা আকবর শিকার এবং যুদ্ধ বিদ্যা আহরণ করেছিলেন এবং তিনি একজন সাহসী ও দক্ষ যোদ্ধা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি লিখা- পড়া শিখেন নি। তবে, লিখা-পড়া না শিখাটা তাঁর জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। জীবনের শেষ বয়সে তিনি কিছু লিখা-পড়া শিখেছিলেন বলে জানা যায়।
নয় বছর বয়সে আকবর গজনীর শাসক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। কামরান মির্জার বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে ১৫৫১ সালের ২০ নভেম্বরে হিন্দাল মির্জা যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং ভ্রাতৃর মৃত্যুর খবর পেয়ে হুমায়ূন শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। হিন্দাল মির্জা মারা যাওয়ার পরে হুমায়ূন পাঞ্জাবের জলন্ধরে ১৫৫৬ সালে হিন্দাল মির্জার কন্যা রুকিয়া বেগমের সাথে আকবরের বিবাহ অনুষ্ঠিত করেছিলেন। তখন আকবরের বয়স ছিলো চৌদ্দ বছর এবং রুকিয়া বেগমের নয় বছর। হিন্দাল মির্জার সমস্ত ধন-সম্পত্তি, সেনা এবং গজনীর জায়গির হুমায়ূন উত্তরাধিকারসূত্রে আকবরকে দান করেছিলেন। রুকিয়া বেগম আকবরের প্রধানা মহিষী ছিলেন। রুকিয়া বেগম নিঃসন্তান ছিলেন এবং আকবরের সন্তান খুরমকে দত্তক নিয়েছিলেন।
১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বরে সংঘটিত পানীপতের ঐতিহাসিক যুদ্ধে হিমু বাহিনীকে পরাজিত করে হুমায়ূন দিল্লীর সিংহাসন পুনরুদ্ধারের পর ১৫৫৬ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর আকবর দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। উত্তরাধিকারীর প্রস্তুতির জন্য আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ হুমায়ূনের মৃত্যুর খবর কিছুদিন গোপন রেখেছিলেন। ১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাবের কালনৌরে মাত্র তেরো বছর বয়সে আকবরকে হুমায়ূনের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছিলো এবং বয়স না হওয়া পর্যন্ত বৈরাম খাঁ আকবরের হয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে অপরাজিত সামরিক অভিযান চালিয়ে মোগল সাম্রাজ্যকে সুসংহত করার জন্য আকবরকে ‘মহামতি’উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। আকবরের এই সামরিক শক্তি ও কৃতিত্বের ভিত্তি ছিলো সেনা বাহিনীর সাংগঠনিক দিশ ও সুসংহত সৈন্য পরিচালনা। আকবরের শাসনামলে মোগলদের ক্ষমতাকে সমুন্নত রাখার জন্য মনসবদারি ব্যবস্থার বিশেষ ভূমিকা ছিলো এবং কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা অনেকদিন টিকে ছিলো। তবে, উত্তরসূরিদের অধীনে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিলো।
সামরিক উদ্ভাবন– আকবরের শাসনামলে কামান এবং হাতী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করা হয়েছিলো। ম্যাচলক(লঘু কামান)এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত এবং যুদ্ধের সময় কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হত। আকবর কামান এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে অটোম্যান, ইউরোপীয়ান বিশেষ করে পর্তুগিজ এবং ইটালীয়দের সাহায্য নিয়েছিলেন। আকবরের সময়ে মোগল সাম্রাজ্যের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি আঞ্চলিক শাসক, অধীনস্থ রাজ্য এবং জমিদারদের দ্বারা ব্যবহৃত অস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ছিলো। এই অস্ত্রগুলি এতই বেশি কার্যকর ছিলো যে, আকবরের সভাসদ আবুল ফজল বলেছিলেন, একমাত্র তুরস্কর বাইরে সম্ভবত এমন কোনো দেশ নেই যেখানে বন্দুকগুলি ভারতের চেয়ে তাঁদের সরকারকে অধিক সুরক্ষিত রাখতে পারে। ‘গান পাউডার সাম্রাজ্য’ শব্দটি ভারতে মোগলদের সাফল্যের বিশ্লেষণে পণ্ডিত এবং ঐতিহাসিকরা প্রায়শই ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধের কৌশল বিশেষ করে আকবর কর্তৃক আগ্নেয়াস্ত্রের দক্ষ ব্যবহার দ্বারা মোগল শক্তিকে চিহ্নিত করা হয় ৷
উত্তর ভারত দখলের জন্য সংগ্রাম– আকবরের পিতা হুমায়ূন সাফাভিদদের সমর্থনে পাঞ্জাব, দিল্লী এবং আগ্রা পুনরুদ্ধার করলেও এই অঞ্চলগুলিতে মোগল শাসন অনিশ্চিত ছিলো। হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে যখন হিমু কর্তৃক দিল্লী এবং আগ্রা দখল করা হয়েছিলো তখন কিশোর আকবরের ভাগ্য অনিশ্চিত বলে ধারণা করা হয়েছিলো। বদখসাঁর শাহজাদা মির্জা সোলেইমান কর্তৃক আক্রমণের ফলে মোগলদের দূর্গ স্বরূপ কাবুল থেকেও সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ফলে পরিস্থিতি অধিক খারাপ করে তুলেছিলো। আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ যখন হিমুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যুদ্ধ পরিষদ আহ্বান করেছিলেন, তখন কেউ যুদ্ধের জন্য অনুমোদন জানান নি। অবশেষে বৈরাম খাঁ অভিজাতদের প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং পাঞ্জাবের সবচেয়ে শক্তিশালী সূর শাসক সিকান্দার শাহ সূরির বিরুদ্ধে অভিযান সংঘটিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্যে সিকান্দার শাহ সূরি অবশ্যে আকবরের জন্য তেমন উদ্বেগের কারণ ছিলো না। মোগল সৈন্য অগ্রসর হওয়ার সাথে সিকান্দার শাহ সুরি পিছিয়ে গিয়েছিলেন। প্রত্যাহ্বান এসেছিলো হিমুর তরফ থেকে। তবে পানীপতের দ্বিতীয় যুদ্ধে আকবর বাহিনীর কাছে হিমু পরাজিত এবং হিমু স্বয়ং যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো।
হিমুর দিল্লী বিজয়– হিমু সূরি বংশের আদিল শাহ সূরির সেনাপতি ও উজির ছিলেন এবং হুমায়ুন মারা যাওয়ার সময় তিনি বাংলায় ছিলেন। হুমায়ুনের মৃত্যু হিমুকে মোগলদের পরাজিত করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছিলো। তিনি বাংলা থেকে পদযাত্রা শুরু করেছিলেন এবং বায়না, ইটওয়া, সম্বল, কাল্পি এবং নারনৌল থেকে মোগলদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হিমুর আক্রমণের কথা শুনে যুদ্ধ না করেই শহর খালি করে আগ্রার শাসক পালিয়ে গিয়েছিলো। হিমু আগ্রা দখলের সময় আকবর জলন্ধরে ছিলেন। হিমু আগ্রা দখলের কথা শুনে, দিল্লীর শাসক তারদি বেগ খাঁ জলন্ধরে অবস্থানরত আকবরের নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন যে, ‘হিমু আগ্রা দখল করেছে এবং রাজধানী দিল্লী দখলের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়া তাঁদের সাথে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।’ পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বৈরাম খাঁ সেনাপতি পীর মহম্মদকে দিল্লী প্রেরণ করেছিলেন। ইতিমধ্যে তারদি বেগ খাঁ আশেপাশের মোগল রাজন্যবর্গদের দিল্লী রক্ষার জন্য সেনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং আলোচনার জন্য কাউন্সিল আহ্বান করে হিমুর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আগ্রা দখল করে হিমু পলায়নরত শাসককে অনুসরণ করে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে ঠিক দিল্লীর বাইরের অবস্থিত একটি গ্রাম তুঘলকাবাদে পৌঁছেছিলেন। সেখানে ১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবর হিমু বাহিনী এবং তারদি বেগ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বাদাউনের মতে, হিমুর সেনা বাহিনী সংখ্যায় বেশি হলেও মোগলরা তাঁর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করছিলেন। যদুনাথ সরকার সেই যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- উক্ত যুদ্ধে ১০০০ টি হাতী, ৫০,০০০টি ঘোড়া, ৫১ টি কামান এবং ৫০০ টি ফালক’নেট (পাতল কামান) ব্যবহার করা হয়েছিলো।
মোগল বাহিনী এভাবে পরিচালনা করা হয়েছিলো- আবদুল্যাহ উজবেগ সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। হায়দার মহম্মদ সেনাদলের বাম দিকে এবং ইসকান্দার বেগ ডানদিকে এবং তারদি বেগ তুর্কি অশারোহী বাহিনী নিয়ে কেন্দ্রস্থিত ভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। বামদিক থেকে ইসকান্দার বেগের নেতৃত্বে আক্রমণ করে শত্রু সেনাদের তাড়িয়ে দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলো। এই আক্রমণে বিজয়ীরা ৪০০ টি হাতী বন্দি করেছিলো এবং ৩০০০ আফগান সেনা হত্যা করেছিলো। বিজয়ের সম্ভাবনা দেখে তারদি বেগের অনেক সেনা শত্রু শিবির লুণ্ঠন করার জন্য ছত্রভংগ হয়ে পড়েছিলো। এই সুযোগে হিমু ৩০০ টি পসন্দের হাতী এবং নির্বাচিত ঘোড়সওয়ার নিয়ে তারদি বেগের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বিশাল জন্তুদের অগ্রগতি এবং পেছনে অশ্বারোহীদের দেখে মোগল সেনা প্রতিরক্ষার অপেক্ষা না করেই পালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে তারদি বেগকেও একই পথ ধরতে হয়েছিলো।
এদিকে আলওয়ার থেকে হাজি খাঁর নেতৃত্বে নতুন সেনা এসে যোগদান করাতে হিমুর শক্তি বৃদ্ধি হয়েছিলো। তখনপূর্বের বিজয়ী মোগলদের অগ্রভাগের সেনা এবং ডানদিকের সেনারা যুদ্ধ জয়ের আশা না দেখে ছত্রভংগ দিয়েছিলো। এভাবেই হিমু ১৫৫৬ সালের ৭ অক্টোবরে একদিনের যুদ্ধেই দিল্লী দখল করেছিলেন।
পানীপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ– হিমু তাঁর অবস্থান সুসংহত করার পূর্বেই বৈরাম খাঁর পরামর্শ অনুসারে আকবর তাঁর সেনা বাহিনী নিয়ে দিল্লীর দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। আলী কুলি খান সাইবানিকে ১০,০০০ অশ্বারোহী সেনা দিয়ে অগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। আলী কুলি খান দুর্বল পহরায় প্রেরণ করা হিমুর আর্টিলারি সম্পূর্ণ দখল করেছিলেন। এটি হিমুর জন্য খুবই ক্ষতির কারণ হয়েছিলো।
বৈরাম খার নেতৃত্বে ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর দিল্লী থেকে ৫০ মাইল (৮০ কিলোমিটার) উত্তরে অবস্থিত পানীপতের দ্বিতীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো এবং সেই যুদ্ধে হিমু বাহিনী পরাজিত হয়েছিলো। আকবর এবং হিমু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আট মাইল দূরে অবস্থান নিয়েছিলেন। মোগল সেনার কেন্দ্রস্থিত ভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সাইবানি খান সাইবানি, ডানদিকের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সিকান্দার খান উজবেক এবং বামদিকের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আব্দুল্ল্যাহ খান উজবে, হোসেন কুলি বেগ এবং সেনাদলের অগ্রভাগের নেতৃত্বে ছিলেন শাহ কুলি মাহরাম। হিমু হাওয়াই নামক একটি হাতীর পিঠে বসে তাঁর সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁর সেনাদলের বামদিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাঁর ভগ্নীর ছেলে রামায়া এবং ডানদিকের সেনার নেতৃত্বে দিচ্ছিলেন সাদি খাকন কক্কর।
এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ যুদ্ধ ছিলো এবং যুদ্ধ প্রথমাবস্থায় হিমু বাহিনীর অনুকূলে ছিলো। মোগল বাহিনীর উভয় দিকই পিছিয়ে পড়েছিলো। হিমু তাঁর হাতী এবং অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে মোগল সেনাদের ছত্রভংগ করে দেওয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলেন। হিমু যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন হঠাৎ একটি তীর এসে তাঁর চোখে আঘাত করে এবং তিনি আহত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। ফলে তাঁর সেনাবাহিনী আতঙ্কিত এবং বিশৃংখল হয়ে পড়ে। ফলে হিমু বাহিনী যুদ্ধে পরাজিত হয়। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রায় ৫০০০ সেনা নিহত হয়েছিলো এবং অনেকে পালিয়ে যাওয়ার সময়ও নিহত হয়েছিলো। আহত হিমুকে বন্দি করে মোগল শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। ১৩ বছর বয়সী আকবরকে হিমুর শিরশ্ছেদ করতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু তিনি একজন মৃতপ্রায় ব্যক্তির শিরশ্ছেদ করতে অস্বীকার করেছিলেন। পরে আকবর তরবারি দিয়ে হিমুর মাথা স্পর্শ করেছিলেন এবং বৈরাম খান শিরশ্ছেদ করেছিলেন। হিমুর মস্তক কাবুলে প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং তাঁর দেহ দিল্লী গেটে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো।
উক্ত যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আকবর দিল্লী এবং আগ্রা দখল করে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেছিলেন এবং তিনি দিল্লীতে তিন মাস অবস্থান করেছিলেন। এর মধ্যে পাঞ্জাবে সিকান্দার শাহ সূরি সক্রিয় হয়ে উঠার খবর পেয়ে আকবর তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করতে পাঞ্জাব ফিরে এসেছিলেন। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে মোগল বাহিনী সিকান্দার খাঁর বিরুদ্ধে আরও একটি বড় যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন এবং সিকান্দার খাঁ পূর্ব বাংলায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। আকবর ১৫৫৮ সালে পাঞ্জাবের লাহোর এবং মুলতান দখল করেছিলেন। এর পরে আকবর রাজপুতনার মুসলিম শাসককে পরাজিত করে আজমীর দখল করেছিলেন। আকবর বাহিনী নর্মদা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত সুরিদের শক্ত ঘাঁটি গোয়ালিয়র দুর্গও দখল করেছিলেন।
এই সময়ে অভিজাত পরিবারের বেগমদের সাথে রাজকীয় পরিবারের বেগমদের কাবুল থেকে দিল্লীতে আনা হয়েছিলো। আকবরের উজীর-এ-আজম আবুল ফজলের মতে, পুরুষরা যাতে ভারতে স্থির হয়ে অবস্থান নিতে পারে তারজন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। আকবর দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, মোগলরা ভারতেই থাকবে। আকবরের পিতামহ বাবর এবং তাঁর পিতা হুমায়ূন উভয়কেই ক্ষণস্থায়ী শাসক হিসাবে চিহ্নিত করা হতো। যাহোক, আকবর এই সিদ্ধান্ত দ্বারা তাঁর পূর্বপুরুষরা রেখে যাওয়া তৈমুরিদ রেঁনেসার পদ্ধতিগতভাবে এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন।
মধ্য ভারতে অভিযান– ১৫৫৯ সাল নাগাদ আকবর দক্ষিণের রাজপুতনা এবং মালওয়ায় অভিযান শুরু করেছিলেন। তবে, আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁর সাথে মত বিরোধ হওয়াতে এই অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিলো। আকবর তখন আঠারো বছর বয়সের যুবক সম্রাট। তাই তিনি রাজকার্য সম্পর্কীয় বিষয়গুলো পরিচালনায় আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর পালক মাতৃ মহাম আঙ্গা এবং আত্মীয়স্বজনদের পরামর্শে তিনি বৈরাম খাঁর সেবা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। আকবর ১৫৬০ সালে বৈরাম খাঁকে বরখাস্ত করেন এবং হজ্ব করার জন্য মক্কা পাঠিয়ে দেন। মক্কা যাওয়ার পথে বিদ্রোহীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বৈরাম খাঁ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তবে, মোগল বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে বৈরাম খাঁ বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হোন। অবশ্যে আকবর তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং আকবর তাঁকে দু’টি বিকল্প দিয়েছিলেন, কোর্টে পুনরায় বাহাল অথবা হজ্ব যাত্রা। বৈরাম খাঁ মক্কা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং মক্কা যাওয়ার পথে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জন্য একজন আফগান কর্তৃক নিহত হয়েছিলেন।
১৫৬০ সালে আকবর তাঁর পালক ভ্রাতৃ আদম খাঁ এবং সেনাপতি পীর মহম্মদের নেতৃত্বে মালওয়ায় অভিযান চালিয়েছিলেন। মোগল বাহিনী এবং মালওয়ারের সুলতান বাজ বাহাদুরের সাথে সংঘটিত সারাংপুরের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাজ বাহাদুর ধন-সম্পত্তি, গুপ্তধন, হাতী রেখে খান্দেশ পালিয়ে গিয়েছিলেন। যুদ্ধে সাফল্য সত্ত্বেও যুদ্ধটি আকবরের দৃষ্টিকোণ থেকে বিপর্যয় হিসাবে বিবেচিত হয়েছিলো। যুদ্ধে জয়ী হয়ে তাঁর পালক ভ্রাতৃ আদম খাঁ লুণ্ঠনের তাণ্ডব চালিয়েছিলেন এবং গ্যারিসন ও তাঁর স্ত্রী-সন্তান, মহম্মদের বংশধর মুসলিম ধর্মগুরু, সৈয়দদের হত্যা করেছিলেন। আকবর নিজে মালওয়ায় উপস্থিত হয়ে আদম খাঁকে সেনাপতি পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন এবং পীর মহম্মদকে বাজ বাহাদুরের পশ্চাদধাবন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে খান্দেশ ও বেরারের শাসকদের জোট কর্তৃক পরাজিত হয়ে পীর মহম্মদ ফিরে এসেছিলো এবং বাজ বাহাদুর সাময়িকভাবে মালওয়ারের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছিলেন। আকবর পরের বছর আবদুল্যাহ খান উজবেককে মালওয়ার উদ্ধার করতে পাঠিছিলেন এবং আবদুল্যাহ খান উজবেক মালওয়ার পুনরুদ্ধার করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়ে বাজ বাহাদুর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে-ফিরে আট বছর পরে আকবরের অধীনে চাকরি নিয়েছিলেন।
মালওয়ার সাফল্য সত্ত্বেও আকবরের আত্মীয়, সন্তান এবং অভিজাতদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছিলো। ১৫৬২ সালে আদম খাঁ আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো। আকবর তাঁকে যুদ্ধে পরাস্ত করে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন। একবার ছাদ থেকে নিক্ষেপ করার পরে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য আকবর আবারও তাঁকে ছাদ থেকে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদেশ প্রতিপালিত হয়েছিলো। আকবর পরাক্রমী অভিজাতদের ক্ষমতা হ্রাস করে সংশয় মুক্ত হতে চেয়েছিলেন। তিনি সাম্রাজ্য শাসন সম্পর্কীয় বিশেষ মন্ত্রী পদ সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে মোগল অভিজাতদের প্রশ্নাতীত প্রাধান্য ছিলো না।
১৫৬৪ সালে উজবেক প্রধানদের একটি গোষ্ঠী বিদ্রোহ করলে আকবর প্রথমে মালওয়া এবং পরে বিহারে সংঘটিত যুদ্ধে তাঁদের পরাজিত করেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তাঁরা সমঝোতা করেছিলেন এবং আকবর তাঁদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার তাঁরা আবার বিদ্রোহ করলে তাঁদের সেই বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিলো। কাবুলের মোগল শাসক, আকবরের ভ্রাতৃ, মহম্মদ হাকিম মির্জা উজবেক সর্দারদের সাহায্যে নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করলে আকবর ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং বিদ্রোহ দমন করে বেশ কিছু উজবেক সর্দারকে হত্যা করেছিলেন। বিদ্রোহী নেতাদের ধরে ধরে হাতীর পা-র তলে ফেলে পিষে হত্যা করা হয়েছিলো।
আকবরের দূর সম্পর্কীয় চাচাতো ভাইয়েরা আগ্রায় পাইকান্তা জমি ভোগ দখল করছিলেন। তাঁরা একবার বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন। সেই বিদ্রোহ দমন করে, তাঁদের কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিলো এবং অনেককে সাম্রাজ্য থেকে বিতাড়ন করা হয়েছিলো।
১৫৬৬ সালে কাবুলের শাসক, আকবরের ভ্রাতৃ, মহম্মদ হাকিম মির্জা সাম্রাজ্য হস্তগত করার উদ্দেশ্যে আবার পাঞ্জাব পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। তখন আকবর তাঁকে বাধা প্রদান করার জন্য পাঞ্জাব পর্যন্ত এসেছিলেন এবং এক সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পরে মহম্মদ হাকিম মির্জা আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে কাবুল ফিরে গিয়েছিলেন।
১৫৬৪ সালে আকবর মধ্য ভারতের বন্য হাতী সমৃদ্ধ পাতল জনবসতি সম্পন্ন পাহাড়ি এলেকায় অবস্থিত গর্হা মান্ডলা রাজ্য বিজয়ের জন্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। অঞ্চলটি নাবালক রাজা বীর নারায়ন এবং তাঁর মাতৃ রাণী দূর্গাবতী কর্তৃক শাসিত ছিলো। রাণী দূর্গাবতী চান্দেল রাজপুত শালিবাহনের পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি গর্গারাজ্যের রাজা সংগ্রাম শাহের পালক পুত্র দলপত শাহ কাচ্চবাহার সাথে বিবাহপাশে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ১৫৫০ থেকে ১৫৬৪ সাল পর্যন্ত নাবালক পুত্র বীর নারয়নের হয়ে গর্হা রাজ্য শাসন করেছিলেন। এই অভিযানে আকবর ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দেননি, কারণ তিনি তখন উজবেক বিদ্রোহীদের দমনে ব্যস্ত ছিলেন। তাই অভিযানটি পরিচালনার জন্য কারার মোগল শাসক আসফ খানকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দামোহতে সংঘটিত যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাণী দূর্গাবতী আত্মহত্যা করেছিলেন এবং তাঁর নাবালক পুত্র গন্ডের পাহাড়ি দূর্গ চৌরাগড় পতনের সময় নিহত হয়েছিলেন। উক্ত যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মোগলরা প্রচুর সম্পদ, অগণিত পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের গহনা এবং ১০০০ টি হাতী হস্তগত করেছিলেন। দূর্গাবতীর ছোট বোন কমলা দেবীকে মোগল হারেমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এবং রাণী দূর্গবতীর মৃত স্বামীর ভ্রাতৃ চন্দ্র শাহকে এই অঞ্চলের শাসক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিলো।
মালওয়ারের মতোই গর্হা রাজ্য বিজয় নিয়ে অধীনস্থ লোকদের সাথে আকবরের মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিলো। আসফ খাঁর বিরুদ্ধে প্রচুর সম্পদ হস্তগত এবং মাত্র দু’শটি হাতী আকবরকে ফেরত (১৫৬৫ সালের ১৩ জুলাই) দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। আসফ খাঁকে হিসাব প্রদানের জন্য তলব করা হলে তিনি এলাহাবাদে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি প্রথমে উজবেকদের নিকটে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং মোগল বাহিনী তাঁকে ধাওয়া করলে তিনি গন্ডোয়ানায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন তিনি আহরণকৃত সকল সম্পদ মোগল দরবারে জমা দিয়েছিলেন এবং আকবর তাঁকে ক্ষমা করে দিয়ে পূর্বের পদেই বাহাল রেখেছিলেন।
আকবরকে হত্যার চেষ্টা–১৫৬৪ সালের দিকে আকবরকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো বলে একটি চিত্রকর্মে নথিভুক্ত করা হয়েছিলো। দিল্লীর নিকটে অবস্থিত হজরত নিজামুদ্দিনের দরগাহ পরিদর্শন করে ফিরে আসার পথে একজন ঘাতক তাঁকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করেছিলো। তীরটি তাঁর ডান কাঁধে বিদ্ধ হয়েছিলো। ঘাতককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো এবং সম্রাট কর্তৃক তাকে শিরশ্ছেদের আদেশ প্রদান করা হয়েছিলো। ঘাতক আকবরের দরবারের একজন সভ্রান্ত সভাসদ শরিফুদ্দিনের দাস ছিলো এবং ঘাতকের শিরশ্ছেদের পরে শরিফুদ্দিনকে দমন করা হয়েছিলো।
রাজপুতনা বিজয়– উত্তর ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পরে আকবর রাজপুতনা জয়ের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। কারণ সাম্রাজ্যের পার্শ্ববর্তী রাজপুতনায় ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্যমান থাকলে ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে কোনো রাজশক্তি নিরাপদ হতে পারবে না আকবর ভেরেছিলেন। মোগলরা ইতিমধ্যেই উত্তর রাজপুতনার মেওয়াত, আজমীর এবং নাগোরের কিছু অংশে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো। তাই আকবর কোনোদিন দিল্লী সুলতানাতের বশ্যতা স্বীকার না করা রাজপুত রাজাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৫৬১ সালের প্রারম্ভ থেকে আকবর রাজপুতদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং কূটনীতিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিলেন। প্রায়গুলি রাজপুত রাজা আকবরের আধিপত্য মেনে নিয়েছিলেন। একমাত্র মেওয়ারের মহারাণা উদয় সিংহ এবং মারওয়ারের ভারতীয় শাসক চন্দ্রসেন রাঠোর মোগলদের আধিপত্য মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। রাণা উদয় সিংহ সিসোদিয়ার শাসক রাণা সাঙ্গার বংশধর ছিলেন। রাণা সাঙ্গা ১৫২৭ সালে খানওয়ার যুদ্ধে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সিসোদিয়া বংশের প্রধান হিসাবে তিনি ভারতের সমস্ত রাজপুত রাজা এবং সর্দারদের মধ্যে সর্বোচ্চ সন্মানের অধিকারী ছিলেন। আকবর ভেবেছিলেন, উদয় সিংহকে বশ্যতা স্বীকার করাতে না পারলে রাজপুতদের চোখে মোগলদের মর্যদা হ্রাস পাবে। আকবর জীবনের প্রারম্ভে ইসলামের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের সবচেয়ে মর্যদাপূর্ণ যোদ্ধাদের উপর তাঁর বিশ্বাসের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন।
১৫৬৭ সালে আকবর মেওয়ারের রাজধানী চিতোরগড় দুর্গ আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। চিতোরগড় দুর্গ কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কারণ দূর্গটি আগ্রা থেকে গুজরাট পর্যন্ত যাওয়া সংক্ষিপ্ত পথের মাঝখানে ছিলো এবং রাজপুতনার অভ্যন্তরীণ অংশগুলিকে ধরে রাখার জন্য চাবিকাঠি হিসাবে বিবেচিত ছিলো। চিতোর দূর্গ অবরোধের সময় উদয় সিংহ তাঁর দুই রাজপুত যোদ্ধা জয়মাল এবং পাট্টাকে রেখে মেওয়ারের পাহাড়ে অবসর যাপন করতে গিয়েছিলেন। চার মাস অবরোধ করে রাখার পরে ১৫৬৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চিতোরগড়ের পতন হয়েছিলো।
চিতোরগড় জয়ের সময় আকবর দূর্গরক্ষকসহ ৮০০০ যোদ্ধা এবং ৩০,০০০ জন অসামরিক লোককে হত্যা করেছিলেন এবং তাঁদের ছিন্নমুণ্ডগুলি সমগ্র অঞ্চলে প্রদর্শনের জন্য ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। মোগলদের হাতে যেসব লুণ্ঠনের সামগ্রী পড়েছিলো, তা সমগ্র সাম্রাজ্য ব্যাপী বিতরণ করা হয়েছিলো। আকবর তিনদিন চিতোরগড়ে অবস্থান গ্রহণ করে আগ্রায় ফিরে এসেছিলেন। বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আকবর দূর্গের গেটে হাতীর উপরে বসানো জয়মাল এবং পাট্টার মূর্তি স্থাপন করিয়েছিলেন। চিতোরগড়ের পতনের পরে উদয় সিংহের ক্ষমতা ও প্রভাব হ্রাস পেয়েছিলো। উদয় সিংহ আর কখনও পাহাড়ি আশ্রয় ছেড়ে মেওয়ারে যাননি এবং আকবর তাঁকে সেখানে থাকতে দিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন।
চিতোরগড় দখলের পর আকবর আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন এবং ১৫৬৮ সালে রস্থাম্ভর দূর্গ আক্রমণ করেছিলেন। রন্থান্তর দূর্গ হাদা(চৌহান রাজপুতদের একটি শাখা) রাজপুতদের বুন্দি ফৌদের রাও সুরজন হাদার দখলে ছিলো এবং দূর্গটি ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী দূর্গ হিসাবে পরিচিত ছিলো। কয়েক মাসের অবরোধের ফলে দূর্গটি পতন হয়েছিলো। ৫০,০০০ সেনারও অধিক এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আকবর দূর্গ অবরোধ করেছিলেন। অবরোধের সময় মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ভারি কামান ব্যবহার করা হয়েছিলো। তিনটি কামান ১৫ ফুটেরও অধিক লম্বা ছিলো। প্রচণ্ড আক্রমণের কাছে নতি স্বীকার করে রাও সুরজন হাদা ১৫৬৮ সালের ২১ শে মার্চে দূর্গের দ্বার খুলে দিয়ে আকবরকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
১৫৬৯ সালে আকবর আগ্রা থেকে ২৩ মাইল (৩৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফতেপুর সিক্রিীতে রাজধানী স্থাপন করে রাজপুতনা বিজয়ের বিজয় উৎসব উদ্যাপন করেছিলেন। রন্থাম্ভর দূর্গ দখলের পর রাজপুত রাজাদের প্রায় সবাই মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। একমাত্র মেওয়ারের রাণা উদয় সিংহের পুত্র মহারাণা প্রতাপ সিংহই প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছিলেন। তবে, ১৫৭৬ সালে সংঘটিত হলদিঘাটের যুদ্ধে মোগলদের কাছে পরাজয় বরণ করেছিলেন। ১৫৭৬ সালের ১৮ জুন মেওয়ারের রাণা মহারাণা প্রতাপ সিংহ এবং অম্বরের রাজা মান সিংহ-প্রথমের নেতৃত্বে মোগল বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো রাজস্থানের গুগুন্দার নিকটে অবস্থিত হলদিঘাটির সরু গিরিপথে। উক্ত যুদ্ধে মেওয়ারিদের অনেক সেনা হতাহত হয়েছিলো। তবে, প্রতাপ সিংহ আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর পরে মহারাণা প্রতাপ সিংহ ক্রমাগতভাবে মোগলদের উপর আক্রমণ অব্যাহত রেখেছিলেন এবং আকবরের জীবনকালেই পূর্বপুরুষদের অধিকাংশ ভূমি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
পশ্চিম ও পূর্ব ভারতে অভিযান– আকবরের পরবর্তী আক্রমণের লক্ষ্য ছিলো গুজরাট এবং বাংলা। এই দু’টি প্রদেশের মাধ্যমে ভারত যথাক্রমে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির সাথে যুক্ত ছিলো। অধিকাংশ গুজরাট ছিলো, বিদ্রোহী মোগল সম্রান্তদের আশ্রয়স্থল এবং বাংলায় আফগান শাসক সোলেমান কররানি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। রাজপুতনা এবং মালওয়া প্রদেশে অবস্থিত মোগল প্রভাবিত গুজরাটে আকবর প্রথমে আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। আকবর গুজরাটের উপকূলীয় অঞ্চলগুলির সাথে কৃষিপণ্য উৎপাদনে সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় সমভূমি অঞ্চল, টেক্সটাইল, অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে চিত্তাকর্ষক সমুদ্র বন্দরগুলি দখল করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কারণ আকবর ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির বিশাল সম্পদের সাথে সামুদ্রিক বন্দরগুলিকে যুক্ত করার ইচ্ছা করেছিলেন। সে যাইহোক, ভারত থেকে বিতাড়িত মির্জারা দক্ষিণ গুজরাটে ঘাঁটি স্থাপন করে আকবরের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলো। এদিকে আকবর গুজরাটের শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য গুজরাট থেকেই আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। যা তাঁকে সামরিক অভিযানের ন্যায্যতা প্রদান করেছিলো। ১৫৭২ সালে তিনি গুজরাটের রাজধানী এবং উত্তরের অন্যান্য শহরগুলি দখল করার জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন। অভিযানে জয়ী হয়ে নিজেকে গুজরাটের বৈধ সার্বভৌম শাসক হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ১৫৭৩ সাল নাগাদ মির্জাদের গুজরাট থেকে বিতাড়ন করা হয়েছিলো এবং তারা পালিয়ে গিয়ে দাক্ষিণাত্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। ফলে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক রাজধানী সুরাট এবং অন্যান্য উপকূলীয় শহরগুলি আকবরের নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলো। রাজা মুজাফ্ফর শাহ-তৃতীয় একটি ভূট্টা ক্ষেতে লুকিয়ে ছিলেন এবং তিনি ধরা পড়েছিলেন। আকবর তাঁকে সামান্য ভাতা দিয়ে পেনশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
গুজরাটের উপরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার পর আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে ফিরে এসেছিলেন, যেখানে গুজরাট বিজয়ের স্মরণে ১৬০২ সালে বুলন্দ দরওজা নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু ইদারের রাজপুত শাসক দ্বারা সমর্থিত আফগান সভ্রান্তদের বিদ্রোহ ও মির্জাদের ষড়যন্ত্রের জন্য আকবর পুনরায় গুজরাট ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। আকবর রাজপুতনা পেরিয়ে এগার দিনের মধ্যে আহমেদাবাদ পৌঁছেছিলেন। রাস্তাটি পেরোতে সাধারণত ছয় মাস লাগতো। ১৫৭৩ সালের ২ শে সেপ্তেম্বর আকবরের সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নির্ণায়ক বিজয় সাব্যস্ত করেছিলেন। যুদ্ধে বিজয়ের পর আকবর বিদ্রোহী নেতাদের হত্যা করেছিলেন। গুজরাট বিজয় মোগলদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণিত হয়েছিলো এবং অঞ্চলটি থেকে ব্যয়ের পরে আকবরের কোষাগারে বার্ষিক ৫০ লাখ টাকারও অধিক রাজস্ব জমা হতো।
আকবর অধিকাংশ আফগানদের পরাজিত করেছিলেন। তখন ভারতে আফগান ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলো একমাত্র বাংলা। বাংলায় সোলেমান কররানি শাসন করছিলেন। তবে সোলেমান কররানি আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে আকবরের নামে খোৎবা পাঠ করেছিলেন। সোলেমান কররানির উত্তরসূরি পুত্র দাউদ খাঁ ১৫৭২ সালে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে নিজেকে স্বাধীন শাসক হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং আকবরের পরিবর্তে নিজের নামে খোৎবা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দাউদ খানের অধীনে ৪০,০০০ অশ্বারোহী, ৩৬০০ হাতী, ১,৪০,০০০ পদাতিক সেনা এবং ২০০ টি কামান ছিলো। দাউদ খাঁকে শায়েস্তা করার জন্য প্রথমে আকবর বিহারের শাসক মুনিম খাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং পরে আকবর নিজেই বাংলায় এসেছিলেন। এটি আকবরের জন্য বাংলার বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলি মোগলদের অধীনে আনার এক সুবর্ণ সুযোগ ছিলো। ১৫৭৪ সালে মোগলরা দাউদ খাঁর নিকট থেকে পাটনা দখল করেন এবং দাউদ খাঁ বাংলায় পালিয়ে যান। পাটনা দখলের পরে মুনিম খানকে বাংলা ও বিহারের শাসক নিযুক্ত করে মুনিম খানকে সহায় করার জন্য টোডরমলকে রেখে আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে ফিরে আসন।
পরবর্তীতে ১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ তুকরাইয়ে মোগল এবং দাউদ খান বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। প্রথম যুদ্ধে ফলাফল ড্র হয় এবং দাউদ খান বাহিনী উড়িষ্যার কটকে পিছু হটে যায়। তখন মোগলরা বাংলার রাজধানী টান্ডা আক্রমণ করে দখল করেন। মুনিম খান বাংলার রাজধানী ঠান্ডা থেকে গৌড়ে স্থানান্তর করেন। তখন কটকে মোগল এবং দাউদ খানের মধ্যে সন্ধি হয়। সন্ধির শর্ত সাপেক্ষে দাউদ খান শুধু উড়িষ্যা নিজের দখলে রেখে বাংলা এবং বিহার মোগলদের ছেড়ে দেন। ছমাস পর প্লেগ শুরু হয় এবং মুনিম খান ১৫৭৫ সালের অক্টোবরে মারা যান। তখন কালাপাহাড় এবং ঈশা খানের নেতৃত্বে মোগল বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। দাউদ খান তখন উড়িষ্যা থেকে গৌড়ের দিকে অগ্রসর হোন।
আকবর তখন শক্তিশালী শত্রু দাউদ খানের বিরুদ্ধে জাহান কুলির নেতৃত্বে একদল সেনা প্রেরণ করেন। জাহান কুলি তেতিয়াগড়ি দখল করে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হোন। রাজমহলের রমক্ষেত্রে উভয় বাহিনীর অনেকদিন সংঘর্ষ চলে। আকবরের পক্ষে যুদ্ধ জয় কঠিন হয়ে উঠলে আকবরের অনুরোধে বিহারের শাসক মুজাফ্ফর খান তুরবাতি এবং অন্যান্য সেনাপতি জাহান কুলির সাথে যোগদান করেন। দাউদ খানের সাথে ছিলেন জুনায়েদ, কুতলু খান এবং ইসমাইল খান লোধির মতো আফগান নেতারা। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দাউদ খান বাহিনী জাহান কুলি বাহিনীর নিকট পরাজিত হয় এবং দাউদ খান পালিয়ে যান। তিনি পরে মোগল বাহিনীর হাতে বন্দি হোন এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে আকবরের কাছে তাঁর ছিন্নমুণ্ড প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং তাঁর অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যংগ বাংলার রাজধানী তাণ্ডায় গিবতে (কুৎসা)র জন্য রাখা হয়েছিলো।
আফগানিস্থান এবং মধ্য এশিয়া অভিযান– গুজরাট এবং বাংলা বিজয়ের পরে আকবর কিছুদিন পারিবারিক উদ্বেগ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পারিবারিক উদ্বেগের জন্য আকবর ১৫৮১ সাল পর্যন্ত কোনো রকমের সামরিক অভিযান পরিচালনা না করে ফতেহপুর সিক্রিতে ছিলেন। ১৫৮১ সালে তাঁর ভ্রাতৃ মির্জা মহম্মদ হাকিম পাঞ্জাব আক্রমণ করেছিলেন। মহম্মদ হাকিমকে আকবর তখন কাবুলে বহিষ্কার করেছিলেন এবং মহম্মদ হাকিম ও অন্যান্যদের হুমকি চিরদিনের জন্য বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন। আগে তাঁর পূর্বপুরুষদের পক্ষে সভ্রান্ত পূর্বপুরুষদের ভারতে সংস্থাপন করাটা সমস্যা হয়েছিলো, আকবরের সময়ে তার বিপরীতে তাঁদের ভারত থেকে বহিষ্কার করাটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। আবুল ফজলের মতে, একদিকে মোগলরা আফগানিস্থানের ঠাণ্ডার জন্য ভীত ছিলো এবং অপর দিকে হিন্দু বিষয়ারা সিন্ধ পেরিয়ে যেতে আপত্তি করেছিলো। তবে, আকবর তাঁদের উৎসাহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সৈন্যদের আট মাসের অগ্রিম বেতন দেওয়া হয়েছিলো। ১৫৮১ সালের আগস্টে আকবর কাবুল দখল করেন এবং পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়া তাঁর ভ্রাতৃর অনুপস্থিতিতে বাবরের পুরাতন দূর্গে তিনি তিন সপ্তাহ ছিলেন। মহম্মদ হাকিমের অনুপস্থিতিতে আকবর তাঁর ভগ্নী বখত- উন-নিসা বেগমের হাতে কাবুলের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে ভারতে ফিরে আসেন। পরে আকবর তাঁর ভ্রাতৃকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন যদিও বখত-উন-নিসা কাবুলে সরকারী শাসক হিসাবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৫৮৫ সালে মহম্মদ হাকিম মারা যান এবং কাবুল আবার আকবরের হাতে চলে আসে। কাবুল তখন আনুষ্ঠানিকভাবে মোগল সাম্রাজ্যের একটি প্রদশে হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো।
কাবুল অভিযান ছিলো সাম্রাজ্যের উত্তর সীমান্তে দীর্ঘ অভিযানের সূচনা। ১৫৮৫ সালের শুরু থেকে আকবর তেরো বছর উত্তর সীমান্তে অবস্থান করেছিলেন। খাইবার গিরিপথের ওপার থেকে আসা প্রত্যাহ্বানের মোকাবিলা করার জন্য তিনি রাজধানী পাঞ্জাবের লাহোরে স্থানান্তর করেছিলেন। সবচেয়ে বড় হুমকি এসেছিলো উজবেকদের নিকট থেকে, যারা তাঁর পিতামহ বাবরকে এশিয়া থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো। তাঁরা দক্ষ সেনাপতি আবদুল্যাহ খাঁ শায়বানির অধীনে সংগঠিত হয়েছিলো এবং আকবরের দূরবর্তী তৈমুরিদ আত্মীয়ের কাছ থেকে বদখসাঁ ও বলখ দখল করেছিলো। ফলে উজবেক সৈন্যরা মোগল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের জন্য গুরুতর প্রত্যাহ্বান সৃষ্টি করেছিলো। বাজাউর ও সোয়াতের ইউসুফজাইদের শত্রুতা এবং রোশানিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা বায়েজিদের নতুন ধর্মীয় নেতার কার্যকলাপের জন্য সীমান্তের আফগান উপজাতিরাও প্রচণ্ড উদ্বেগের মধ্যে ছিলো। উজবেকরা আফগানদের ভর্তুকিও দিচ্ছিলেন।
সফাভিদ অধ্যুষিত খোরাসানে উজবেকরা আক্রমণ সংঘটিত করার সময় মোগলরা নিরপেক্ষ থাকবে বলে ১৫৮৬ সালে আকবর আবদুল্যাহ খাঁর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। বিনিময়ে আবদুল্যাহ খাঁ মোগলদের সাথে শত্রুতা আচরণ করা আফগান উপজাতিদের সমর্থন, ভর্তুকি বা আশ্রয় দেওয়া থেকে বিরত থাকতে সন্মত হয়েছিলেন। এভাবে চুক্তি করে আকবর ইউসুফজাই এবং অন্যান্য বিদ্রোহীদের শান্ত করার জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন। আফগান উপজাতিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য আকবর তাঁর দুধভাই জইন খাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আকবরের দরবারের বিখ্যাত মন্ত্রী বীরবলকেও সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভিযান পরিচালনার সময় এক বিপর্যয়ে দেখা দিয়েছিলো এবং পর্বত থেকে পশ্চাদসরণ করার সময় বীরবল এবং তাঁর দলবল ১৫৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালান্দারাই গিরিপথে আফগানদের দ্বারা অতর্কিত আক্রমণের ফলে নিহত হয়েছিলেন। আকবর অবিলম্বে রাজা টোডরমলের নেতৃত্বে ইউসূফজাইর ভূমি পুনরুদ্ধার করার জন্য একদল সেনা পাঠিয়েছিলেন। পরের ছয় বছর মোগলরা পাহাড়িয়া উপত্যকায় ইউসূফজাইদের পেছনে লেগে ছিলেন এবং বাজাউর ও সোয়াতের অনেক সর্দারকে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন। অঞ্চলটিকে সুরক্ষিত করার জন্য কয়েক ডজন দূর্গ নির্মাণ ও দখল করেছিলেন। আফগান উপজাতিদের উপরে নিয়ন্ত্রণ আকবরের দৃঢ় সামরিক অভিযানের ক্ষমতা প্রমাণ করে।
উজবেকদের সাথে চুক্তি সত্ত্বেও আকবর আজকের আফগানিস্থান থেকে মধ্য এশিয়া পুনরুদ্ধারের আশা গোপনে পোষণ করেছিলেন। তবে বদখসাঁ এবং বলখ আকবরের রাজত্বকালে দৃঢ়ভাবে উজবেক শাসনের অংশ ছিলো। (১৭ শতকের মাঝামাঝি আকবরের নাতি বাদশাহ শাহজাহান দু’টি প্রদেশের একটি সাময়িকভাবে দখল করেছিলেন। তা সত্ত্বেও উত্তর সীমান্তে আকবরের অবস্থান আশাব্যঞ্জক ছিলো। ১৬০০ সাল নাগাদ আফগান উপজাতিরা পরাজিত হয়েছিলো এবং রোশানিয়া আন্দোলন দৃঢ়ভাবে দমন করা হয়েছিলো। আফ্রিদি এবং ওরাকজাই উপজাতিরা রোশানিয়া আন্দোলন(একটি জনপ্রিয় অসাম্রাদায়িক আন্দোলন)-এর অধীনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। অবশ্যে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিলো এবং নেতাদের নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিলো। রোশানিয়া আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা বায়েজিদের পুত্র জালালুদ্দিন ১৬০১ সালে গজনীর নিকট মোগল সেনাদের সাথে সংঘটিত যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। ১৫৯৮ সালে আবদুল্যাহ খাঁর মৃত্যুর পরে উজবেক হুমকি হ্রাস পেয়েছিলো এবং আফগাস্থিানের ওপর মোগল শাসন সুরক্ষিত হয়েছিলো।
সিন্ধু উপত্যকা বিজয়– লাহোরে উজবেকদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করার পর সীমান্ত প্রদশেগুলিকে সুরক্ষিত করারজন্য আকবর সিন্ধু উপত্যকা দখল করার চেষ্টা করেছিলেন। শিয়া চক রাজবংশের শাসক আলী শাহ তাঁর ছেলেকে মোগল দরবারে জিম্মি হিসাবে পাঠাতে অস্বীকার করলে ১৫৮৫ সালে আকবর উচ্চ সিন্ধু অববাহিকায় অবস্থিত কাশ্মীর জয় করার জন্য একদল সেনা প্রেরণ করেছিলেন। আলী শাহ তৎক্ষণাৎ মোগলদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তবে তাঁর পুত্র ইয়াকুব নিজেকে রাজা হিসাবে ঘোষণা করে মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ১৫৮৯ সালের জুন মাসে ইয়াকুব এবং তাঁর সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করানোর জন্য আকবর নিজে লাহোর থেকে শ্রীনগর গিয়েছিলেন। কাশ্মীর সংলগ্ন তিব্বতি প্রদেশের বাল্টিস্থান এবং লাডাখ আকবরের প্রতি তাদের আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিলো। তারপর মোগলরা নিম্ন সিন্ধু উপত্যকায় অবস্থিত সিন্ধু জয় করার জন্য অভিযান চালিয়েছিলো। ১৫৭৪ সাল থেকে ভাক্কারের উত্তরে দূর্গ মোগলদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। শর্ত সাপেক্ষে দক্ষিণ সিন্ধের ঠাট্টার স্বাধীন শাসক মির্জা জানি বেগের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে গিয়ে মুলতানের মোগল শাসক ব্যর্থ হয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে আকবর ঠাট্টার রাজধানী সেওয়ান অবরোধ করার জন্য একদল সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। জানি বেগ মোগলদের সাথে মোকাবিলা করার জন্য এক বিশাল বাহিনী গঠন করেছিলেন। সেওয়ানের যুদ্ধে মোগল বাহিনী সিন্ধি বাহিনীকে পরাজিত করে। পরাজয়ের পরে জানি বেগ ১৫৯১ সালে মোগলদের নিকট আত্মসমর্পণ করেন এবং ১৫৯৩ সালে লাহোরে আকবরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৫৮৬ সালের প্রারম্ভে নামমাত্র পানী আফগান শাসকের অধীনস্থ অর্ধ ডজন বেলুচি প্রধানকে মোগলদের আধিপত্য স্বীকার করার জন্য প্ররোচিত করা হয়েছিলো। সাফাভিদদের কাছ থেকে কান্দাহার দখলের প্রস্তুতি হিসাবে ১৫৯৫ সালে আকবর মোগল বাহিনীকে বেলুচিস্থানের বাকী অংশ দখল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। মোগল সেনাপতি মীর মাসুমের নেতৃত্বে একদল সেনা কোয়েটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সিবির দূর্গ আক্রমণ করেন এবং উক্ত যুদ্ধে স্থানীয় সর্দারদের একটি জোটকে পরাস্ত করেন। তাঁদের মোগল আধিপত্য স্বীকার করতে এবং আকবরের দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য করা হয়। ফলস্বরূপ মাক্রান উপকুল সহ বেলুচিস্থানের আধুনিক পাকিস্থান এবং আফগানিস্থানের অংশগুলি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়।
সাফাভিদ ও কান্দাহার– প্রাচীন ভারতীয় রাজ্য গান্ধারকে আরব ইতিহাসবিদরা নামকরম করেছিলো কান্দাহার। ১৪ শতকে মোগলদের পূর্বপুরুষ তাইমূর পশ্চিম, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ অঞ্চল দখল করেছিলেন। তখন থেকে কান্দাহার ঘনিষ্ঠভাবে মোগলদের সাথে যুক্ত ছিলো। তবে সাফাভিদরা কান্দাহারকে পারস্য শাসিত খোরাসান অঞ্চলের রাজকীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করছিলেন এবং মোগল সম্রাটের সাথে এর সম্পর্ককে দখল বলে ঘোষণা করেছিলেন। ১৫৫৮ সালে আকবর যখন উত্তর ভারতে তাঁর শাসনকে সুসংহত করছিলেন, তখন সাফাভিদ সম্রাট তাহমাস্প-প্রথম কান্দাহার দখল করেছিলেন এবং এর মোগল শাসককে কান্দাহার থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। তখন থেকে পরবর্তী ত্রিশ বছর এটি পারস্য শাসনের অধীনে ছিলো। কান্দাহার দখল আকবরের জন্য অগ্রাধিকার ছিল না, তবে উত্তর সীমান্তে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক তৎপরতার পর, এই অঞ্চলে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা করাটা অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। সিন্ধু, কাশ্মীর এবং বেলুচিস্থানের কিছু অংশ এবং আধুনিক আফগানিস্থানের উপর বিজয় সাব্যস্ত করার পরে আকবরের আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে তুলেছিলো। তা ছাড়া কান্দাহার এ সময়ে উজবেকদের হুমকির মধ্যে ছিলো, কিন্তু পারস্যের সম্রাট নিজে অটোম্যান তুর্কিদের দ্বারা নিগৃহীত ছিলেন। ফলে সৈন্য পাঠিয়ে কান্দাহারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পারস্যের সম্রাটের ছিল না। ফলস্বরূপ পরিস্থিতি মোগলদের অনুকূলে ছিলো।
১৫৯৩ সালে সাফাভিদ শাহজাদা রোস্তম মির্জা পরিবারের সাথে ঝগড়া করে আকবরের নিকটে এসে নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। রোস্তম মির্জা মোগলদের অনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিলেন। আকবর তাঁকে ৫,০০০ সৈন্যের সেনাপতির মর্যদা দিয়ে মুলতানের জায়গীর প্রদান করেছিলেন। ক্রমাগত উজবেক অভিযানে বিপর্যস্ত এবং মোগল দরবারে রোস্তম মির্জার অভ্যর্থনা দেখে, সাফাভিদ শাহজাদা এবং কান্দাহারের শাসক মুজাফ্ফর হোসেনও মোগলদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। মুজাফ্ফর হোসেন শাহ আব্বাসের সাথে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে ছিলো। মুজাফফর হোসেনকে ৫০০০ সৈন্যের সেনাপতির পদমর্যদা দেওয়া হয়েছিলো এবং তাঁর কন্যা কান্দাহারি বেগমকে আকবরের নাতি খুররমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। ১৫৯৫ সালে মোগল সেনাপতি শাহ বেগ খাঁর নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাঠিয়েকান্দাহার শেষ পর্যন্ত দখল করা হয়েছিলো। কান্দাহার পুনঃবিজয়ের পরেও মোগল-পারস্য সম্পর্ক ব্যাহত হয়নি। আকবর এবং পারস্য শাহ দূত ও উপহার প্রেরণ অব্যাহত রেখেছিলেন। অবশ্যে উভয়ের মধ্যে সংঘটিত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ মোগলদের পক্ষে ছিলো।
দাক্ষিণাত্যের সুলতানদের বিরুদ্ধে অভিযান– দাক্ষিণাত্যের সুলতান, যারা আকবরের আধিপত্য স্বীকার করছিলেন না, ১৫৯৩ সালে আকবর তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। ১৫৯৫ সালে আকবর আহম্মদ নগর দূর্গ অবরোধ করেছিলেন এবং চাদ বিবিকে বেরার ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছিলেন। ১৫৯৯ সালে আকবর তাপ্তী নদীর উত্তর পারে অবস্থিত বুরহানপুর দূর্গ দখল করেন এবং অসিরগড় দূর্গ অবরোধ করেন। মীরন বাহাদুর শাহ খান্দেশ ছেড়ে দিতে অস্বীকার করলে ১৬০১ সালের ১৭ জানুয়ারি দুর্গটি দখল করেন। আকবর তখন যুবরাজ ড্যানিয়ালের অধীনে আহম্মদ নগর, বেরার এবং খান্দেশ নিয়ে একটি সুবাহ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৬০৫ সালে ড্যানিয়ালের মৃত্যুর পর বঙ্গোপসাগর থেকে কান্দাহর এবং বদখসাঁ পর্যন্ত এক বিস্তৃত অঞ্চল আকবর নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। তিনি তখন সিন্ধু এবং সুরাটের পশ্চিম উপকূল এবং মধ্য ভারত দৃঢ়ভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।
রাজনৈতিক শাসন– দিল্লী সুলতানাতের পর থেকে যে শাসন ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিলো তার উপর ভিত্তি করে আকবর কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। বিভিন্ন দপ্তরের কার্যাবলীর উপর ভিত্তি করে সাবধানতার সাথে বিশদ বিধিবিধান প্রস্তুত করে পুনঃনির্মাণ করা হয়েছিলো। রাজস্ব বিভাগের প্রধান উজির, জায়গির ও ইনাম জমি সম্পৰ্কীয় যাবতীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ছিলেন।
সামরিক বিভাগের প্রধানকে মীর বক্সী বলা হতো, যাকে দরবারের শীর্ষস্থানীয় অভিজাতদের মধ্য থেকে নিযুক্ত করা হতো। মীর বক্সী গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন এবং সামরিক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য সম্রাটের নিকট সুপারিশও করতেন।
মীর সামন রাজকীয় পরিবারের দায়িত্বে ছিলেন এবং দরবার ও রাজকীয় দেহরক্ষীর কাজকর্মের তদারকি করতেন।
বিচার বিভাগ একজন প্রধান কাজির নেতৃত্বে একটি পৃথক সংস্থা ছিলো, যিনি ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনুশীলনের জন্যও দায়ী ছিলেন।
করকাটল– শের শাহ সূরির ব্যবস্থা অনুসারে আকবর সাম্রাজ্যের ভূমি রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারের ব্যবস্থা করেছিলেন। চাষকৃত এলেকা, যেখানে ফসল উৎপাদন ভালো হতো পরিমাপ করে, উৎপাদনশীলতার উপরে নির্ভর করে কর ধার্য করা হতো। এই ব্যবস্থা কৃষকদের মধ্যে অসুবিধা সৃষ্টি করেছিলো, কারণ রাজদরবারে প্রচলিত মূল্যের উপর নির্ভর করে করা ধার্য করা হতো, যে মূল্য গ্রামাঞ্চলের মূল্যের তুলনায় বেশি ছিলো। আকবর বার্ষিক কর নির্ধারণের জন্য এক বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা করেছিলেন, কিন্তু এর ফলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি দেখা দিয়েছিলো। ফলে ১৫৮০ সালে এই ব্যবস্থা পরিত্যাগ করা হয়েছিলো। এর পরিবর্তে দহশালা নামে একটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিলো। নতুন ব্যবস্থার অধীনে আগের দশ বছরের গড় উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ হিসাবে রাজস্ব গণনা করা হতো, যা সম্রাটকে নগদ পরিশোধ করা হতো। স্থানীয় মূল্য বিবেচনায় নিয়ে এবং অনুরূপ উৎপাদনশীল অঞ্চলগুলিকে গোষ্ঠীভূক্ত করে এই ব্যবস্থা পরে পরিমার্জিত করা হয়েছিলো। এই ব্যবস্থায় অতিরিক্ত খরা বা বন্যার জন্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষকদের খাজনা মওকুফ করা হতো। আকবরের এই দহশালা(যা যাবতি ব্যবস্থা নামেও পরিচিত)ব্যবস্থার কৃতিত্ব রাজা টোডরমলকে দেওয়া হয়েছিলো, যিনি শের শাহ সূরির অধীনে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে ১৫৮২ সাল থেকে ১৫৮৩ সাল পর্যন্ত কাজ করছিলেন।
কিছু কিছু অঞ্চলে রাজস্ব নির্দ্ধারণের জন্য স্থানীয় পদ্ধতি অব্যাহত ছিলো। পতিত বা অনাবাদী জমির জন্য রেয়াতি হারে রাজস্ব নির্দ্ধারণ করা হতো। আকবর নিজে কৃষির উন্নতি ও সম্প্রসারণের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করতেন। গ্রামের রাজস্ব নির্দ্ধারণ প্রাথমিক একক হিসাবে ধারাবাহিকভাবে প্রচলিত ছিলো। প্রয়োজনে কৃষকদের ঋণ প্রদান, কৃষি উপকরণ সরবরাহ, উন্নত মানের বীজ বপনের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করাটা প্রতিটি এলেকার জামিদারদের কর্তব্য হিসাবে গণ্য ছিলো। ফলস্বরূপ উৎপাদিত শস্যের একটি অংশ সংগ্রহের জন্য জমিদারদের বংশগত অধিকার দেওয়া হয়েছিলো। জমির রাজস্ব সময় মতে পরিশোধ করা পর্যন্ত কৃষকদের জমির উপর বংশগত অধিকার ছিলো। রাজস্ব নির্দ্ধারণ ব্যবস্থা ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিলো এবং রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রতি অবিশ্বাসের মাত্রাও বজায় রেখেছিলো। রাজস্ব কর্মকর্তাদের তাঁদের বেতনের মাত্র তিন-চতুর্থাংশ প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছিলো এবং বাকী ত্রৈমাসিক বেতন তাঁদের জন্য নির্দ্ধারিত রাজস্ব সম্পূর্ণ আদায়ের উপর নির্ভশীল ছিলো।
সামরিক সংস্থা– আকবর মনসবদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সেনাবাহিনী এবং অভিজাতদের সংগঠিত করেছিলেন। এই ব্যবস্থার অধীনে, সেনাবাহিনীর প্রতিজন অভিজাত অফিসারকে মনসবদার পদবী প্রদান করা হয়েছিলো এবং বেশ কয়েকজন অশ্বারোহীকে নিযুক্তি দেওয়া হয়েছিলো, যারা সাম্রাজ্যের জন্য সেনা সংগ্রহ করতেন। মনসবদারদের ৩৩ টি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছিলো। ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ সেনার মধ্যে শীর্ষ তিনটি সেনাপতির খিতাব সাধারণত রাজকুমারদের জন্য সংরক্ষিত ছিলো। ১০,০০০ থেকে ৫,০০০ সেনার মধ্যে অন্যান্য খিতাবগুলি অভিজাত সদস্যদের জন্য বরাদ্দ ছিলো। সাম্রাজের স্থায়ী বাহিনী বেশ ছোট ছিলো এবং সাম্রাজ্যের বাহিনী মনসবদারদের রক্ষণাবেক্ষণের উপর নির্ভরশীল ছিলো। সাধারণ ব্যক্তিদের সাধারণত নিম্ন মনসবদার পদে নিযুক্ত করা হতো এবং তাদের যোগ্যতা এবং সম্রাটের অনুগ্রহের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হতো। প্রতিজন মনসবদারকে নির্দিষ্ট সংখ্যক অশ্বারোহী এবং তার দ্বিগুণ সংখ্যক ঘোড়া রাখতে হতো। অশ্বারোহীর চেয়ে ঘোড়ার সংখ্যা বেশি রাখা হতো, কারণ ঘোড়াদের বিশ্রাম দিতে হতো। সশস্ত্র বাহিনীর মান উচ্চ স্তরে বজায় রাখার জন্য কঠোর অনুশীলনের ব্যবস্থা ছিলো। ঘোড়াদের নিয়মিত পরিদর্শন করা হতো এবং সাধারণত শুধু মাত্র আরবীয় ঘোড়া নিযুক্ত করা হতো। মনসবদাররা ঘোড়ার পরিষেবার জন্য পারিশ্রমিক পেতেন এবং সেই সময়ের সর্বোচ্চ বেতনভোগী সামরিক পরিষেবা গঠন করা হয়েছিলো।
আকবর সেলিম চিশতির অনুসারী ছিলেন। সেলিম চিশতি আগ্রার নিকটে সিক্রি অঞ্চলে বসবাস করতেন এবং তিনি একজন সুফি সাধক ছিলেন। এলেকাটিকে নিজের জন্য ভাগ্যবান মনে করে আকবর মুসল্লিদের ব্যবহারের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
নতুন রাজধানী নির্মাণ– আকবর ১৫৬৯ সালে আগ্রা থেকে ২৩ মাইল(৩৭ কিলোমিটার) পশ্চিমে ফতেহপুরে একটি প্রাচীর ঘেরা নতুন রাজধানীর ভিত্তি স্থাপন করে চিতোর এবং রস্থান্তরের উপরে বিজয় সাব্যস্ত করেছিলেন। যার নাম ১৫৭৩ সালে গুজরাট বিজয়ের পরে ফতেপুর(বিজয়ের শহর)রাখা হয়েছিলো। পরবর্তীকালে অন্যান্য অনুরূপ নামের শহর থেকে আলাদা করার জন্য ফতেহপুর সিক্রী নামকরণ করা হয়েছিলো। আকবরের প্রবীণ রাণীদের প্রত্যেকের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিলো এবং সেখানে বিশাল কৃত্রিম হ্রদ ও জলপূর্ণ চমৎকার চত্বর নির্মাণ করা হয়েছিলো। যাইহোক, শহরটি শীঘ্রেই পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিলো এবং রাজধানী ১৫৮৫ সালে লাহোরে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। কারণ হতে পারে সিক্রিতে নিন্মমানের জল অথবা পর্যাপ্ত জলের অভাব ছিলো ! কিছু ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে, আকবরকে সামরিক কারণে তাঁর সাম্রাজ্যের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে যেতে হয়েছিলো এবং তাই রাজধানী উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। অন্যান্য সূত্র ইঙ্গিত করেন যে, আকবর সিক্রির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন অথবা বুঝতে পেরেছিলেন যে, শহরটি সামরিক দিক থেকে নিরাপদ নয়। ১৫৯৯ সালে আকবর তাঁর রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তর করেছিলেন। যেখানে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।
মুদ্রা– মুদ্রার ক্ষেত্রে আকবর একজন মহান উদ্ভাবক ছিলেন। আকবরের উদ্ভাবিত মুদ্রা ভারতের মুদ্রা সংক্রান্তীয় ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছিলেন। আকবরের পিতামহ বাবর এবং তাঁর পিতা হুমায়ূনের মুদ্রাগুলি মৌলিক এবং উদ্ভাবন বর্জিত ছিলো। কারণ প্রথমজন শাসক সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপনে ব্যস্ত ছিলেন এবং দ্বিতীয়জন আফগান শের শাহ সুরি কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। বাবর এবং হুমায়ূনের শাসনামলে সাম্রাজ্যে অশান্তি ছিলো। আকবর পঞ্চাশ বছরের অধিক কাল রাজত্ব করেছিলেন। ফলে মুদ্রা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অবসর পেয়েছিলেন।
আকবর ফুলের নমুনা, ফুটফুট বর্ডার, কোয়ট্রিয়েল(পাতা বা ফুলের অনুরূপ শোভাময় নক্সা) এবং অন্যান্য রকমের মুদ্রা প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর মুদ্রাগুলি বৃত্তাকার, বর্গাকার এবং মেহরাব আকৃতির ছিলো, যা তাঁর সর্বোত্তম মুদ্রা সংক্রান্ত ক্যালিগ্রাফিককে প্রস্ফুটিত করে। আকবরের প্রতিকৃতি টাইপ মুদ্রা(মোহর), যা যুবরাজ সেলিম উদ্ভাবন করেছিলেন। রাম- সীতার মুর্তি সম্বলিত রৌপ্য মুদ্রা, যা আকবরের ধর্মীয় সহনশীলতার দৃষ্টিভংগী উপস্থাপন করে। রাজত্বের শেষভাগে নতুন প্রচারিত ‘দীন ইলাহী’-র ধারণার ইল্লাহি এবং জাল্লার সাথে চিত্রিত মুদ্রা দেখা যায়। জাল্লাহু টাইপের মুদ্রাও দেখা যায়।
আকবরের দ্বারা প্রবর্তিত মুদ্রাগুলি আকবরের উদ্ভাবনী ধারণাকে উপস্থাপন করে, যা তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর এবং সম্রাট শাহজাহান দ্বারা পরিমার্জিত এবং নিখুঁত করা হয়েছিলো।
ব্যবসায়–বাণিজ্য– আকবরের রাজত্বকাল বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। মোগল সরকার ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতেন। লেন-দেনের জন্য নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করার জন্য কম শুল্ক নির্ধারণ করেছিলেন। তদুপরি চুরি হওয়া পণ্যের ক্ষতি পূরণ প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার ব্যবস্থা ছিলো। এই ধরণের ঘটনা হ্রাস করার জন্য রাস্তায় পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা ছিলো। ব্যবসায়-এর উন্নতির জন্য আকবর গৃহীত অন্যান্য সক্রিয় পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও যোগাযোগের রাস্তা নির্মাণ এবং সুরক্ষা প্রদান। খাইবার গিরিপথে ঢাকা চালিত যান- বাহন চলাচলের জন্য রাস্তার উন্নতির জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। এটি কাবুল থেকে ভারতে যাত্রা করার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় পথ ছিলো। তিনি পাঞ্জাবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মুলতান এবং লাহোর কৌশলগত কারণে দখল করে বিশাল দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। যেমন গ্রাপ্ত ট্রাঙ্ক রোড এবং সিন্ধু নদীর ক্রসিং অ্যাটকের নিকট একটি এবং এই দূর্গের পাশাপাশি থানা নামেছোট ছোট দূর্গের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। পারস্য এবং এশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বর্হিঃদেশীয় বাণিজ্য চালু করেছিলেন।
বৈবাহিক মৈত্রী– হিন্দু রাজকন্যা এবং মুসলিম রাজাদের সাথে বিবাহের প্রথা আকবরের অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিলো। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই বিবাহগুলি উভয় পরিবারের মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক সৃষ্টি করেনি। এই বিবাহের ফলে হিন্দু মহিলারা তাঁদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। তবে, আকবরের বৈবাহিক মৈত্রীর নীতি পূর্বের পরম্পরাকে বিদায় দিয়েছিলো এবং ভারতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলো। যেসব হিন্দু রাজপুতরা তাঁর সাথে তাঁদের কন্যা বা বোনকে বিয়ে দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করবে, শশুড় শাশুড়ী এবং শশুড় বাড়ির সাথে খাওয়া- দাওয়া, নামাজ পড়া এবং মুসলিম স্ত্রী গ্রহণ করা ছাড়া সব ক্ষেত্রেই মুসলমানদের সমান আচরণ করা হবে। রাজপুতদের তাঁর দরবারের সদস্য করা হয়েছিলো। তবে, মুসলমানদের সাথে তাঁদের কন্যা বা বোনদের বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করাটা বৈবাহিক অবক্ষয় ও অপমানের চিহ্ন হিসাবে ভেবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।
আমেরের কচ্ছওয়াহা রাজপুত রাজা ভারমল, আকবরের উত্তরসূরি, জাহাঙ্গীরের মাতৃ হরকা বাইকে সম্রাটের সাথে বিয়ে দিয়ে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন। হরকা বাই (হীরা কুঁয়ারী)মরিয়ম-উজ-জামানি ও যোধাবাই নামেও পরিচিত ছিলেন। রাজা ভারমল পরে আকবরের দরবারে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং পরবর্তী কালে তাঁর পুত্র ভগবন্ত দাস ও নাতি মান সিংহ উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
অন্যান্য রাজ্যগুলির সাথেও আকবর বৈবাহিক মৈত্রী স্থাপন করেছিলেন, তবে জোট গঠনের পূর্ব শর্ত হিসাবে বিবাহের উপর জোর দেওয়া হয়নি। দু’টি রাজপুত গোষ্ঠী এই বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন থেকে দূরে অবস্থান করছিলো, মেওয়ারের সিসোদিয়া এবং রস্থাম্ভরের হাদাসরা। অম্বরের রাজা মান সিংহ-প্রথম আকবরের সাথে জোট গঠনের উদ্দেশ্যে নিয়ে হাদা নেতা সুরজন হাদার নিকট গিয়েছিলেন। আকবর তাঁর কন্যাদের কাউকে বিয়ে করবেন না এই শর্তে সুরজান হাদা আকবরের সাথে মৈত্রী স্থাপন করেছিলেন। কোনো বৈবাহিক মৈত্রী ছাড়াই সুরজান হাদাকে আকবরের দরবারের সদস্য করা হয়েছিলো এবং তাঁকে গড়-কাটাঙ্গার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়েছিলো।
এই বৈবাহিক মৈত্রীর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ছিলো। আকবরের হারেমে প্রবেশকারী মহিলাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তকরণ করার আগে তাঁদের সাধারণত পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিলো এবং তাঁদের হিন্দু আত্মীয়রা উল্লেখযোগ্য অভিজাত একটি শ্রেণী সৃষ্টি করেছিলো। তাঁরা সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দুদের হয়ে দরবারে মতামত প্রকাশ করতেন। এই মিশ্রণের ফলে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাব বিনিময় ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান হয়েছিলো। মোগল বংশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাজপুত রক্তের সংমিশ্রণ হওয়ার ফলে উভয় সম্প্রদায়ের সম্পর্ক নিবিড়ি হয়ে উঠেছিলো। ফলে রাজপুতরা মোগলের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র হয়ে উঠেছিলো এবং রাজপুত সৈন্য ও সেনাপতিরা আকবরের অধীনে মোগলদের হয়ে যুদ্ধ করতেন। ১৫৭২ সালে গুজরাট বিজয় সহ বেশ কয়টি অভিযানে রাজপুতরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আকবরের এই ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি নিশ্চিত করে যে, সাম্রাজ্য প্রশাসনের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিলো এবং এর ফলে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক পরিষেবার শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিলো।
একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে যে, আকবরের কন্যা মেহেরুন্নিসা তানসেনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং আকবরের দরবারে সভাসদ হওয়ার পেছনে মেহেরুন্নিসার ভূমিকা ছিলো। উভয়ের সাথে বিয়ের প্রাক্কালে তানসেন ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন।
পর্তুগীজদের সাথে সম্পর্ক– ১৫৫৬ সালে আকবর সিংহাসনে আরোহণ করার সময় পর্তুগীজরা ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম উপকূলে বেশ কয়েকটি দূর্গ এবং কারাখানা স্থাপন করেছিলেন এবং সেই অঞ্চলে নৌ চলাচল ও সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। এই ঔপনিবেশিকতার ফলস্বরূপ অন্যান্য সমস্ত ব্যবসায়িক সংস্থা পর্তুগীজদের শর্তাবলীর অধীনে ছিলো। গুজরাটের শাসক বাহাদুর শাহ সহ তৎকালীন শাসকরা এর ফলে পর্তুগীজদের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন।
১৫৭২ সালে গুজরাটকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করার পরে স্থানীয় কর্মকর্তারা আকবরকে অবগত করেছিলেন, যে পর্তুগীজরা ভারত মহাসাগরে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। পর্তুগীজদের উপস্থিতি হুমকি বলে বিবেচনা করে আকবর আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল তোলা নৌকা চলাচলের জন্য কার্টাজে (পারমিট)র ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৫৭২ সালে সুরাট অবরোধের সময় মোগল এবং পর্তুগীজদের প্রাথমিক বৈঠকে পর্তুগীজরা মোগল সেনা বাহিনী অধিক শক্তিশালী বলে মেনে নিয়েছিলো এবং যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতির দ্বারা সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলো। আকবরের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পর্তুগীজ শাসক আকবরের নিকট দূত প্রেরণ করেছিলেন। তখন আকবর পর্তুগীজদের কাছ থেকে আর্টিলারি ক্রয়ের চেষ্টা করেছিলেন, তবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো। ফলে আকবর গুজরাট উপকূলে মোগল নৌ বাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
আকবর কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু পর্তুগীজরা ভারত মহাসাগরে তাঁদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা অধিক জোরদার করে তুলেছিলেন। জাহাজে করে মক্কা এবং মদিনায় হজ্ব করতে যাওয়ার সময় পর্তুগীজদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হতো, এর জন্য আকবর খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। পর্তুগীজদের দখলকৃত অঞ্চল দমনে পর্তুগীজদের উসকানি না দেওয়ার জন্য আকবর গুজরাটের মোগল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ফরমান জারি করেছিলেন। ফলে পর্তুগীজরা মোগল পরিবারের সদস্যদের জন্য পালাক্রমে মক্কায় হজ্বে যাওয়ার জন্য পাস জারি করেছিলেন। পর্তুগীজরা জাহাজে মোগল পরিবার এবং অন্যান্য যাত্রীদের অসাধারণ মর্যদা প্রদান করতেন।
১৫৭৯ সালে গোয়ার জেসুইটস (রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান)দের আকবরের দরবারে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। আকবর তাঁর লেখকদের দ্বারা নিউ টেস্টামণ্ট অনুবাদ করিয়েছিলেন এবং গসপেল প্রচারের স্বাধীনতা প্রদান করেছিলেন। আকবর অ্যান্তোনি দ্য মন্টসেরাতের উপর তাঁর পুত্র সুলতান মুরাদ মির্জার শিক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন। তবে জেসুইটসরা শুধু তাঁদের নিজেদের ধর্মীয় মতবাদ প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেন নি, ইসলামের বদনামও করেছিলেন। তাঁদের মন্তব্যে ইমাম ও উলামারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং আকবরের নিকট আপত্তি জানিয়েছিলেন। আকবর তখন জেসুইটসদের মন্তব্য রেকর্ড করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁদের আচরণ সাবধানে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ১৫৮১ সালে বাংলার মোল্লা মহম্মদ ইয়াজদি এবং মুইজ-উল-মুলুকের নেতৃত্বে মুসলিম ধর্মগুরুদের দ্বারা বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়েছিলো।। বিদ্রোহীরা আকবরকে উৎখাত করে মির্জা মহম্মদ হাকিমকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। আকবর সফলভাবে বিদ্রোহীদের পরাজিত করেছিলেন এবং পরবর্তীতে জেটুইসদের প্রতি অধিক সতর্কতা অবলম্বন করছিলেন। তিনি পরবর্তীতে উপদেষ্টামণ্ডলীর দ্বারা জেসুইটসদের বিষয়গুলি সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করেছিলেন।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক– ১৫৫৫ সালে আকবর যখন শিশু ছিলেন, তখন অটোম্যান সেনাপতি সাঈদি আলী রেইস মোগল সম্রাট হুমায়ূনের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ১৫৬৯ সালে, আকবরের শাসনের প্রথম বছরগুলিতে, আরেকজন অটোম্যান সেনাপতি কুতোআগুলু হিজার রেইস মোগল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ভারত মহাসাগরের তীরে এসেছিলেন। এই অটোম্যান সেনাপতিরা তাদের ভারত মহাসাগর অভিযানের সময় পর্তুগীজ সাম্রাজ্যের ক্রমবর্দ্ধমান হুমকির অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। আকবর তাঁর শাসনামলে অটোম্যান সুলতান সুলেইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টেকে সম্বোধন করে ছয়টি নথি পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
১৫৭৬ সালে আকবর ৬,০০,০০০ স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, ১২,০০০ কাফতান কাপড়সহ চালের বড় চালান খাজা সুলতান নকসবন্দি ও ইয়াহিয়া সালেহের নেতৃত্বে তাঁর পরিবারের সদস্য খালা গুলবদন বেগম এবং তাঁর সহধর্মিনী সালিমা সহ তীর্থযাত্রীদের খুব বড় একটি দল হজ্বে পাঠিয়েছিলেন। একটি উসমানীয় জাহাজ সহ সুরাট বন্দর থেকে দু’টি জাহাজ পাঠিয়েছিলেন এবং সেই জাহাজ দু’টি ১৫৭৭ সালে জেদ্দা বন্দরে পৌঁছেছিলো এবং তারপরে উক্ত হজ্বযাত্রী মক্কা ও মদিনার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। ১৫৭৭ থেকে ১৬০৮ পর্যন্ত মক্কা ও মদিনার কর্তৃপক্ষের জন্য চমৎকার উপহার সহ আরও চারটি কাফেলা পাঠানো হয়েছিলো।
মোগল বাহিনী প্রায় চার বছর মক্কা ও মদিনায় অবস্থান করেছিলেন এবং চার বার হজ্বব্রত পালন করেছিলেন। এই সময়ে আকবর তাঁর সাম্রাজ্যের অনেক দরিদ্র মুসলমানদের অর্থ সাহায্য দিয়ে তীর্থযাত্রায় পাঠিয়েছিলেন এবং হিজাজে কাদরিয়া সুফি দরবেশ লজের ভিত্তি স্থাপনের জন্য অর্থ পাঠিয়েছিলেন। হজ্ব সম্পন্ন করে মোগলরা শেষপর্যন্ত সুরাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন এবং জেদ্দায় অটোম্যান পাশা তাঁদের প্রত্যাবর্তনে সহায়তা করেছিলেন। মক্কা ও মদিনায় মোগলদের উপস্থিতির জন্য স্থানীয় শরীফরা মোগল সাম্রাজ্যের দেওয়া আর্থিক সহায়তার প্রতি আস্থা প্রদর্শন শুরু করেছিলেন এবং উসমানীয়া অনুগ্রহের উপর তাঁদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছিলেন। এই সময়কালে মোগল ও উসমানীয়দের বাণিজ্যেরও বিকাশ ঘটেছিলো। আকবরের অনুগত বণিকরা বসরা বন্দরের মধ্য দিয়ে আলেপ্পোতে (এলেপ্পো সিরিয়ার একটি শহর) পৌঁছেছিলেন বলে জানা যায়।
কিছু বর্ণনা অনুসারে আকবর পর্তুগীজদের সাথে জোট বন্ধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু যখনই পর্তুগীজরা অটোম্যান সাম্রাজ্য আক্রমণের চেষ্টা করছিলো, তখনই আকবর অটোম্যানদের আনুগত্য প্রদর্শন করছিলেন। ১৫৮৭ সালে পর্তুগীজ নৌবহর অটোম্যান নৌবহরের উপর আক্রমণ সংঘটিত করে নির্মমভাবে পরাজিত হয়েছিলো। এর পরে জাঞ্জিয়ার মোগল সাম্রাজের ভাসাল(অধীনস্থ শাসক)দের ক্রমাগত চাপের জন্য মোগল-পর্তুগীজ জোট ভেঙে গিয়েছিলো।
সাফাভিদ এবং মোগলদের কূটনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস ছিলো। হুমায়ূন শের শাহ সূরির হাতে পরাজিত হওয়ার পরে সাফাভিদ শাসক তাহমাস্প প্রথম হুমায়ূনকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সাফাভিদরা ইসলামের শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলো এবং মোগলরা সুন্নি সম্প্রদায়ভূক্ত ছিলো। হিন্দুকুশ অঞ্চলের কান্দাহার শহর নিয়ে সাফাভিদ এবং মোগলদের মধ্যে বিরোধ ছিলো, যা পরে দুই সাম্রাজ্যের সীমা নির্ধারিত হয়েছিলো। হিন্দুকুশ অঞ্চলটি ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে সামরিক অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। ফলস্বরূপে শহরটি আকবরের শাসনামলে বৈরাম খাঁ দ্বারা শাসিত ছিলো এবং শহরটি ১৫৫৮ সালে পারস্যের শাসক শাহ তাহমস্প প্রথম-এর চাচাতো ভ্রাতৃ হোসেন মির্জা দখল করে নিয়েছিলেন। এর পরে সাফাভিদদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বৈরাম খাঁ শাহ তাহমাস্প প্রথম-এর দরবারে একজন দূত প্রেরণ করেছিলেন। আকবরের রাজত্বের দুই দশকে উভয় সাম্রাজ্যের মধ্যে সৌহৃদ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। ১৫৭৬ সালে শাহ তাহমস্প প্রথম-এর মৃত্যুর ফলে সাফাভিদ সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ এবং অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছিলো এবং দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কূটনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ হয়ে ছিলো। ১৫৮৭ সালে শাফাভিদ শাহ আব্বাস সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিলো। কিছুদিন পরে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য আকবর বাহিনী কান্দাহার পুনরুদ্ধার করেছিলেন। ১৫৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল কোনো ধরণের প্রতিরোধ ছাড়াই কাবুলের শাসক মুজাফ্ফর হোসেন আত্মসমর্ষণ করে মোগল দরবারে চলে এসেছিলেন। ১৬৪৬ সালে শাহজাহানের বদখসাঁ অভিযান পর্যন্ত কয়েক দশক ধরে কান্দাহার এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, মোগলদের অধীনে ছিলো। আকবরের রাজত্বের শেষ অবধি সফাভিদ এবং মোগলদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিলো।
ধর্মীয় নীতি– আকবর, তাঁর মাতৃ এবং অন্যান্য সদস্যরা সুন্নি হানাফি মুসলমান ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাঁর জীবনের প্রারম্ভিক দিনগুলি এমন এক পরিবেশের মধ্যে অতিবাহিত হয়েছিলো, যেখানে উদারনৈতিক অনুভূতিগুলোকে উৎসাহিত করা হতো এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে ঘৃণা করা হতো। ১৫ শতক থেকে দেশের বিভিন্ন অংশে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি গড়ে তোলার জন্য ধর্মীয় সহনশীলতার উদার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিলো। এই অনুভূতিগুলো পূর্বে গুরু নানক, কবির এবং চৈতন্য দেবের মতো জনপ্রিয় সাধকদের শিক্ষা এবং মানবের প্রতি সহানুভূতি এবং উদার দৃষ্টিভংগী সমর্থন করা পারস্যের কবি হাফিজের উক্তির দ্বারা উৎসাহিত করা হতো। পাশাপাশি তৈমূরীয়দের ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি তৈমুরের সময় থেকে হুমায়ূন পর্যন্ত সাম্রাজ্যে অবিচল ছিলো এবং ধর্মের বিষয়ে আকবরের সহনশীলতার নীতিকে প্রভাবিত করছিলো। আকবরের শৈশব কালের শিক্ষক, যার মধ্যে দুইজন ইরানী শিয়া সম্প্রদায়ভূক্ত ছিলো, তাঁরা মূলতঃ কুসংস্কারের উর্দ্ধে ছিলেন, তাঁদের শিক্ষার দ্বারা পরবর্তী জীবনে আকবরকে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দিকে ঝোঁকে পড়তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলো।
আকবর বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠী (শিয়া. সুন্নি, ইসমাইলি এবং সুফি), পার্সি, হিন্দু(শৈব ও বৈষ্ণব), শিখ, জৈন, ইহুদি, জেসুইট বা বস্তুবাদীদের মধ্যে ধর্মীয় বিতর্কের পৃষ্ঠপোষকতা করছিলেন। তিনি সুফিবাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রজ্ঞা বেদান্ত হলো সুফিবাদের জ্ঞান।
আকবর যখন ফতেপুর সিক্রিতে ছিলেন, তখন তিনি সকল ধর্মের বিষয়ে আলোচনা করতেন, কারণ তিনি অন্যদের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন। এই সময়েই তিনি জানতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, অন্য ধর্মের ধর্মাবলম্বীরা প্রায়ই অন্যদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অসহিষ্ণু। এই ধারণা তাঁকে নতুন ধর্ম, ‘সুল-ই-কুল’ অর্থাৎ সার্বজনীন শান্তির ধারণা তৈরি করতে পরিচালনা করেছিলো। এই ধর্মের ধারণা অন্য ধর্মের প্রতি বৈষম্য করেনি, বরঞ্চ শান্তি, ঐক্য এবং সহনশীলতার ধারণার উপর তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো।
মুসলিম অভিজাততন্ত্রের সাথে সম্পর্ক– রাজত্বের প্রথম দিকে আকবর মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি দমনের মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন। ফলে মুসলিম গোঁড়াদের দ্বারা তিনি নিন্দিত হয়েছিলেন। ১৫৬৭ সালে শেখ আব্দুউন নবীর পরামর্শে তিনি দিল্লীতে আমির খশুর কবরের নিকট সমাধিস্থ করা একজন শিয়া সম্প্রদায়ের লোক মীর মুর্জা শরিফী শিরাজির মৃতদেহ কবর থেকে খুঁড়ে বের করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুক্তি ছিলো যে, একজন ধর্ম বিদ্বেষীকে একজন সুন্নি সাধক আমির খশুর কবরের নিকট কবর দেওয়া যাবে না। এটি শিয়াদের প্রতি তাঁর সংকীর্ণ মনোভাব প্রতিফলিত করেছিলো, যা ১৫৭০ দশকের শুরু পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। ১৫৭৩ সালে গুজরাট অভিযানের সময় তিনি ‘মাহদাভিজম’কে দমন করেছিলেন। তাঁর নির্দেশে মাহদাভিজম নেতা বন্দেগী মিয়া শেখ মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো এবং বিচারের জন্য শিকল দিয়ে বেঁধে কোর্টে আনা হয়েছিলো এবং আঠারো মাস পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিলো। আকবর ১৫৭০ সালের গোঁড়ার দিক থেকে ক্রমবর্দ্ধমানভাবে সর্বৈশ্বরবাদী সুফি রহস্যবাদের প্রভাবে এসেছিলেন, তাই বন্দেগী মিয়া শেখ মোস্তফার গ্রেপ্তার তাঁর ধর্ম সম্পর্কীয় দৃষ্টিভংগীতে একটি বড় পরিবর্তন এনেছিলো এবং ইসলামের সীমা অতিক্রম করে তিনি ঐতিহ্যগতভাবে গোঁড়া ইসলাম থেকে আলাদা একটি নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছিলো। ফলস্বরূপে তিনি রাজত্বের শেষার্দ্ধে শিয়াদের প্রতি সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন এবং সিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। আকবর সাম্রাজ্যের আভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের বিষয়ে নিরপেক্ষ ছিলেন। ১৫৭৮ সালে আকবর উল্লেখ করেছিলেন-ইসলামের সম্রাট, বিশ্বস্তদের আমীর, পৃথিবীতে ঈশ্বরের ছায়া, আবুল ফাতহ জালাল-উদ-দীন মহম্মদ আকবর বাদশাহ গাজী(যার সাম্রাজ্য আল্লাহ চিরস্থায়ী করুন) একজন সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ, সবচেয়ে জ্ঞানী, সবচেয়ে ঈশ্বর ভয়শীল শাসক ।
১৫৮০ সালে আকবরের সাম্রাজ্যের পূর্ব দিকে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো এবং কাজি দ্বারা আকবরকে ধর্মদ্রোহী বলে ঘোষণা করে তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি ফতোয়া জারি করা হয়েছিলো। আকবর বিদ্রোহ দমন করেছিলেন এবং বিদ্রোহীদের কঠোর শাস্তি প্রদান করেছিলেন। কাজিদের সাথে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার জন্য ১৫৭৯ সালে আকবর সমস্ত প্রধান উলেমা দ্বারা স্বাক্ষরিত একটি মাজহার (বড় আকারের ঢোল) দ্বারা ঘোষণা করেন। মাজহারে দাবি করা হয়েছিলো যে, আকবর হলো যুগের খলিফা, একজন মুজতাহিদের চেয়ে উচ্চ পদমর্যদা সম্পন্ন, মুজতাহিদদের মধ্যে মত পার্থক্য হলে, আকবর যেকোনো একটি মতবাদকে বেছে নিতে পারবেন এবং ন্যায়ের বিরুদ্ধে যায় না, এমন আদেশও জারি করতে পারবেন। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, মাজহার সাম্রাজ্যের ধর্মীয় পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছিলো। এটি আকবরকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তুলেছিলো এবং অটোম্যান খলিফাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব দূর করতে সাহায্য করেছিলো।
আকবর তাঁর রাজত্বকালে মীর আহম্মদ নাসরুল্লাহ ঠাট্টভি এবং তাহির মোহাম্মদ ঠাট্টভির মতো প্রভাবশালী মুসলিম পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আকবর যখন কোনো মসজিদের জামাতে যোগদান করতেন তখন নিম্নোক্ত ঘোষণাটি করা হতো-
প্রভু আমাকে রাজ্য দিয়েছেন, তিনি আমাকে জ্ঞানী, শক্তিশালী এবং সাহসী করেছেন, তিনি আমাকে সঠিক ও সত্যের পথে পরিচালিত করেছেন, আমার হৃদয়কে সত্যের ভালোবাসায় পূর্ণ করেছেন, মানুষের কোনো প্রশংসা সাম্রাজ্যের সমস্যা সমাধান করতে পারে না।
দীন ইলাহী– আকবর ধর্মীয় ও দার্শনিক বিষয়ে গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন। তিনি জীবনের প্রথম দিকে একজন গোঁড়া মুসলমান ছিলেন, পরে তিনি দেশে প্রচারিত সুফি রহস্যবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে দূরে সরে এসেছিলেন। তাঁর দরবারে উদার চিন্তাধারার বেশ কিছু প্রতিভাবান ব্যক্তিকে নিয়োগ করেছিলেন। যাঁদের মধ্যে আবুল ফজল, ফায়েজি, বীরবল অন্যতম ছিলেন। ১৫৭৫ সালে তিনি ফতেহপুর সিক্রিতে ইবাদত খানা’ (উপাসনা গৃহ) নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিয়বাদী নির্বাচিত দরবারিরা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে সাফল্যের সাথে উপস্থাপন করেছিলেন এবং তিনি তাঁদের সাথে আধ্যাত্মিকতাবাদের বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। এই আলোচনাগুলি প্রাথমিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। আলোচনা তীব্র ছিলো এবং অংশগ্রহণকারীরা চিৎকার করতেন ও একে অপরকে গালাগাল দিতেন। এতে বিচলিত হয়ে সকল ধর্মের পাশাপাশি আকবর নাস্তিকদের জন্যও একটি ইবাদত খানা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এর ফলে আলোচনার পরিধি কোরআনের বৈধতা এবং ঈশ্বরের প্রকৃতির মতো ক্ষেত্রেও বিস্তৃত ও প্রসারিত হয়েছিলো। এটা গোঁড়া ধর্মতাত্ত্বিকদের হতবাক করেছিলো এবং আকবর ইসলাম ত্যাগ করেছে বলে গুজব ছড়িয়ে অপমান করতে চেয়েছিলো।
তবে, আকবর বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মিলনের যে প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছিলেন, তা আশাব্যঞ্জক রকমে সফল হয়নি। কারণ প্রত্যেকেই অন্য ধর্মের নিন্দা করে নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার চেষ্টা করতেন। ইবাদত খানার বিতর্ক এক সময় তীব্র হয়ে উঠেছিলো এবং ধর্মগুলির মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার পরিবর্তে তিক্ততা সৃষ্টি করেছিলো। যার ফলে আকবর ১৫৮২ সালে বিতর্ক বন্ধ করে দিয়েছিলেন। যাইহোক, বিভিন্ন ধর্মে ধর্মতাত্ত্বিকদের সাথে সংঘটিত বিতর্ক তাঁকে দৃঢ়প্রত্যয়ী করে তুলেছিলো যে, বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সমস্ত ধর্মের বেশ কিছু ভাল অনুশীলন রয়েছে, যা তিনি নতুন ধর্ম দীন ইলাহি নামে একটি নতুন ধর্মে একত্রিত করতে চেয়েছিলেন।
কিছু আধুনিক পণ্ডিত মনে করেন যে, আকবর নতুন ধর্ম সৃষ্টি করেননি, তিনি তান্ত্রিক তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের ট্রান্সথিস্টিক দৃষ্টিভংগী প্রচার করেছিলেন বলে অভিহিত করেন এবং তিনি দীন-ই-ইলাহি শব্দটিও ব্যবহার করেননি। মোগল দরবারের সমসাময়িক ঘটনা অনুসারে আকবর প্রকৃতপক্ষে অনেক উচ্চস্তরের মুসলিম ধর্মগুরুর দ্বারা সম্পদ আত্মসাতের জন্য তাঁদের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন।
দীন ইলাহি এক নৈতিক ব্যবস্থা ছিলো, যার দ্বারা কামুকতা, অপবাদ এবং অহংকারকে পাপ বলে বিবেচনা করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। সাধুতা, বিচক্ষণতা, পরহেজগারি এবং দয়া হলো মানুষের মূল গুণ। দীন ইলাহির মতবাদ দ্বারা ঈশ্বরের আকাংক্ষার মাধ্যমে নিজেকে শুদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করা হতো। ব্রহ্মচার্যকে সম্মান করা হতো, সতীত্ব রক্ষার প্রতি জোর দেওয়া হতো, পশু জবাই নিষিদ্ধ ছিলো, যেখানে কোনো ধর্মগ্রন্থ বা পুরোহিতের শ্রেণীবিন্যাস ছিলো না। আকবরের দরবারের একজন সভ্রান্ত ব্যক্তি আজিজ কোকা ১৫৯৪ সালে মক্কা থেকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে, আকবর কর্তৃক উন্নীত করা ধর্মীয় বিষয়টি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করার বাহিরে আর কিছুই নয়। দীন ইলাহিকে স্মরণ করার জন্য আকবর প্রয়াগের নাম পরিবর্তন করে এলাহাবাদ রেখেছিলেন।
যুক্তি প্রদান করা হয়েছিলো যে, দীন-ই-ইলাহি একটি নতুন ধর্ম, এটা পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের দ্বারা আবুল ফজলের রচনার ভুল অনুবাদ করার জন্য উদ্ভূত হয়েছিলো। যাইহোক এটাও গৃহীত হয় যে, ‘সুল-ই-কুল’নীতি, যা দীন-ই- ইলাহির সারাংশ হিসাবে গৃহীত হয়েছিলো, এটা আকবরের শুধু ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিলো না, বরং সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক নীতির অংশ হিসাবে গৃহীত হয়েছিলো। এর দ্বারা আকবর ধর্মীয় সহনশীলতার নীতির ভিত্তিও তৈরি করেছিলেন। ১৬০৫ সালে আকবরের মৃত্যুর সময় সাধারণ প্রজাদের মাঝে অসন্তোষের কোনো চিহ্ন ছিলো না।
হিন্দুদের সাথে সম্পর্ক– আকবর নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, হিন্দুদের যারা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, তাঁরা মৃত্যুদণ্ডের সন্মুখীন না হয়েই ইচ্ছা করলে হিন্দু ধর্মে ফিরে যেতে পারবে। তাঁর সহনশীলতার নীতি হিন্দুদের দ্বারা এতটাই পসন্দের ছিলো যে, ধর্মীয় স্তোত্রগুলিতে তাঁর প্রশংসা গান গাওয়া হতো।
আকবর বেশ কিছু হিন্দু রীতি পালন করতেন। তিনি দীপাবলী উৎসব পালন করতেন, আশীর্বাদের সময় ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের রত্নখচিত স্ট্রিং(জরি) তাঁর কব্জিতে বাঁধতে দিতেন। তাঁর নেতৃত্বে অনেক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা রাখী উৎসব পালন করতেন। তিনি নিজে গো-মাংস ত্যাগ করেছিলেন এবং নির্দিষ্ট দিনে সব প্রকার মাংস বিক্রী বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এমনকী তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর এবং নাতি শাহজাহান তাঁর অনেক নীতি বজায় রেখেছিলেন। যেমন গরু জবাই নিষিদ্ধ করা, সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার খাওয়া এবং শুধুমাত্র গঙ্গা জল পান করা প্রভৃতি। এমনকী তিনি যখন গঙ্গা থেকে ২০০ মাইল দূরে পাঞ্জাবে ছিলেন, তখন শীল মোহর মেরে বড় জারে করে জল পাঞ্জাবে নিয়ে যাওয়া হতো। তিনি গঙ্গার জলকে ‘অমরত্বের জল’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
জৈনদের সাথে সম্পর্ক– আকবর নিয়মিতভাবে জৈন পণ্ডিতদের সাথে আলোচনা করতেন এবং তাঁদের শিক্ষার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতেন। জৈন আচার আচরণের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন, যখন তিনি ছয় মাস ব্যাপী উপবাসের পরে চম্পা নামক একজন শ্রাবকের (শ্রোতা) মিছিল দেখেছিলেন। তাঁর শক্তি এবং ভক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আকবর তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু আচার্য হরবিজয়া সূরিকে ফতেহপুর সিক্রিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আচার্য আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন এবং গুজরাট থেকে ফতেহপুর সিক্রিতে এসেছিলেন।
আকবর আচার্যের আধ্যাত্মিক গুণ এবং চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মের দার্শনিকদের আন্তঃবিশ্বাসের উপর বক্তব্য বেখেছিলেন। মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে জৈনদের যুক্তি আকবরকে নিরামিষভোজী হতে প্ররোচিত করেছিলেন। আকবর জৈনদের স্বার্থের অনুকূলে অনেক রাজকীয় আদেশ জারি করেছিলেন। যেমন পশু জবাই নিষিদ্ধ করণ। জৈন লেখকরা মোগল দরবারের অভিজ্ঞতার কথা সংস্কৃত গ্রন্থে লিখে গেছেন, যা ঐতিহাসিকদের এখনও অজানা।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট জৈন এবং মোগলদের স্থাপত্যের সহাবস্থানের উদাহরণ উদ্ধৃত করেছেন। আকবর জৈন ধর্মের প্রতি অত্যন্ত সন্মানশীল ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁকে আধুনিক ভারতের স্থপতি বলে অভিহিত করেছেন। ১৫৯৪, ১৫৯২, ১৫৯৮ সালে আকবর পর্যুষণ’ এবং ‘মহাবীর জন্ম কল্যাণ’ (জৈনদের দু’টি পবিত্র উৎসব)কের সময় পশু জবাই নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি পালিটানার মতো জৈন তীর্থস্থান থেকে জিজিয়া কর উঠিয়ে দিয়েছিলেন। হরবিজয়া সূরির শিষ্য শান্তিচন্দ্র মোগল দরবারে এসেছিলেন এবং তিনি তাঁর শিষ্য ভানুচন্দ্র এবং সিদ্ধিচন্দ্রকে মোগল দরবারে রেখে গিয়েছিলেন। আকবর হরবিজয়া সূরির উত্তরসূরিকে মোগল দরবারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং তিনি ১৫৯৩ এবং ১৫৯৫ সালে আকবরের সাথে সাক্ষাত করতে মোগল দরবারে এসেছিলেন।
ব্যক্তিত্ব– আকবরের দরবারে ইতিহাসবিদ আবুল ফজল ‘আকবর নামা ও আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে আকবরের রাজত্ব কালের বিষয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। বাদায়ুনী. শেখজাদা রশিদী, শেখ আহম্মদ সিরহিন্দের রচনাতেও আকবরের রাজত্বকালের বর্ণনা রয়েছে।
আকবর ছিলেন একজন যোদ্ধা, বিচক্ষণ সেনাপতি, পশু প্রশিক্ষক (কথিত আছে, আকবরের রাজত্বকালে হাজার হাজার চিতা পালন করা হতো এবং আকবর নিজে অনেক চিতাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। বিশ্বাস করা হয় যে তিনি প্রতিদিন গ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন এবং তাঁর প্রখর স্মৃতি শক্তি ছিলো। আকবর একজন জ্ঞানী এবং সুবিচারক সম্রাট ছিলেন। আকবরের উত্তরসূরি পুত্র জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতি কথায় আকবরের চরিত্রের প্রশংসা করেছেন এবং আকবরের গুণাবলীকে তুলে ধরার জন্য কয়েক ডজন উপখ্যান লিখে গেছেন। জাহাঙ্গীরের মতে, আকবরের গাত্রের রং গমের বর্ণের তথা ফর্সা ছিলো। চোখ এবং চোখের ভ্রূ কালো ছিলো। এন্থনি দ্য মন্তেসেরাত, কাতালান (রোমান কেথলিক, কাতালোনিয়ার অধিবাসী) জেসুইটস আকবরের দরবারে গিয়েছিলেন এবং আকবরের বিষয়ে নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেন-
“প্রথম দর্শনেই সবাই তাঁকে রাজা বলে চিনতে পারতেন। ব্যাণ্ডি (Bandy)পা, ঘোড়সওয়ারের জন্য উপযুক্ত এবং শরীরের রং হালকা বাদামী। তিনি ডান কাঁধের দিকে মাথা হেলিয়ে (কাত করে) চলতেন। তাঁর ললাট প্রশস্ত এবং চোখ এতো উজ্জ্বল ছিলো যে, চোখ সূর্যের আলোতে জলন্ত সাগরের মতো মনে হতো। তাঁর চোখের পাপড়ি অনেক লম্বা ছিলো। তাঁর ভ্রূ ভালোভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। খাড়া নাক, ছোট ছিলো যদিও তেমন ছোট ছিলো না। নাকের ছিদ্র খোলা ছিলো। বাম নাকের ছিদ্র এবং উপরের ঠোঁটের মাঝখানে একটি তিল চিহ্ন ছিলো। তিনি দাঁড়ি কামিয়ে রাখতেন, তবে গোঁফ কামাতেন না। তিনি বাম পা একটু খুঁড়িয়ে চলতেন, যদিও কখনও কোনো আঘাত পান নি। ‘
আকবর লম্বা ছিলেন না, তবে শক্তিশালী এবং খুব চটপটে ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সাহসিকতার জন্যও বিখ্যাত ছিলেন। ১৯ বছর বয়সে আকবর মালওয়া থেকে আগ্রায় ফেরার পথে একটি ঘটনা ঘটেছিলো। আকবর তাঁর দেহরক্ষীদের আগে আগে আসছিলেন এবং তিনি একটি চিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। চিতাটি তার শাবক সহ ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে আসছিলো। চিতাটি যখন তাঁকে আক্রমণ করছিলো, তখন তিনি তাঁর তরবারির আঘাতে একাই চিতাটিকে হত্যা করেছিলেন। তাঁর দেহরক্ষীরা এসে তাঁকে মৃত চিতাটির পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করছিলেন।
আবুল ফজল, এমনকী আকবরের বিদ্বেষী সমালোচক বাদায়ুনিও তাঁকে একজন কাপ্তানসুলভ ব্যক্তিত্বের অধিকারী বলে বর্ণনা করেছেন। যুদ্ধের সময় তাঁর কাপ্তানসূলভ আচরণের জন্য সবাই জ্ঞাত ছিলেন। আলেকজেণ্ডারের মতো সব সময় জীবনের ঝুঁকি নিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বর্ষাকালে প্রায়শই প্লাবিত নদীতে ঘোড়া নিয়ে নেমে যেতেন এবং নিরাপদে নদী অতিক্রম করতেন। তিনি খুব কমই নিষ্ঠুর আচরণ করতেন এবং আত্মীয়দের প্রতি স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তাঁর বিদ্রোহী ভ্রাতা মহম্মদ হাকিমকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কদাচিৎ তিনি অপরাধীদের সাথে নিষ্ঠুরভাবে মোকাবিলা করতেন। যেমন তাঁর মামা মুয়াজ্জেম এবং পালক ভ্রাতৃ আদমের সাথে করেছিলেন।
কথিত রয়েছে যে, আকবর খাদ্যাভাসে পরিমিত ছিলেন। আইন-ই-আকবরীতে উল্লেখ রয়েছে যে, ভ্রমণের সময় এবং বাড়িতে থাকাকালীন তিনি গঙ্গা নদীর জল পান করতেন। গঙ্গাজলকে তিনি অমরত্বের জল বলে অভিহিত করেছিলেন। সোরুন এবং হরিদ্বারে বিশেষ লোক নিয়োগ করা হয়েছিলো, যারা তিনি যেখানে অবস্থান করতেন সেখানেই শীল করা পাত্রে তাঁর জন্য গঙ্গাজল পাঠাতেন। জাহাঙ্গীরের স্মৃতি কথা অনুসারে তিনি ফল পসন্দ করতেন, তবে মাংস তাঁর খুবই কম পসন্দের ছিলো। পরবর্তীতে তিনি মাংস খাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আকবর ১৫৭০ সালে একবার শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান বৃন্দাবন গিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের দ্বারা মদন-মোহন, গোবিন্দজী, গোপীনাথ এবং যুগল কিশোর চারটি মন্দির নির্মাণের জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন।
আকবর নামা– ‘আকবর নামা’ ফার্সি ভাষায় লেখা তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবরের সরকারী জীবনীমূলক বিবরণ। এতে তাঁর জীবনের ও সময়ের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। বইটি আকবরের দরবারে নয় রত্নের একজন আবুল ফজল, আকবরের তত্ত্বাবধানে, লিখেছিলেন। কথিত রয়েছে, বইটি সম্পূর্ণ করতে সাত বছর লেগেছিলো। মূল পাণ্ডুলিপিতে লেখাগুলিকে সমর্থন করে বেশ কিছু চিত্র রয়েছে এবং সমস্ত চিত্রকর্ম মোগল চিত্র কলার স্কুল পেইনটিং এবং মোগল ইম্পেরিয়াল ওয়ার্কশপের শিক্ষকদের কাজকে প্রতিনিধিত্ব করে।
বিবাহ– আকবরের প্রথম স্ত্রী এবং প্রধান সহধর্মিনী ছিলেন তাঁর চাচা শাহজাদা হিন্দাল মির্জা এবং হিন্দাল মির্জার স্ত্রী সুলতানা বেগমের কন্যা রুকিয়া সুলতানা বেগম। রুকিয়ার সাথে আকবরের বিয়ে হয়েছিলো পাঞ্জাবের জলন্ধরে।
আকবরের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন আবদুল্যা খাঁ মোগলের কন্যা। ১৫৫৭ সালে মানকোট অবরোধের সময় তাঁদের বিয়ে হয়েছিলো। বৈরাম খাঁ এই বিয়েতে সন্মতি দেননি, কারণ আবদুল্যাহ খাঁর বোনের সাথে আকবরের চাচা কামরান মির্জার বিয়ে হয়েছিলো। তাই বৈরাম খাঁ, আবদুল্যাহ খাঁকে কামরানের সমর্থক বলে ভাবতেন। সেজন্য বৈরাম খাঁ এই বিয়ের বিরোধিতা করছিলেন, নাসির-আল-মুলক তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে, এই জাতীয় বিষয়ে বিরোধিতা গ্রহণযোগ্য নয়। নাসির- আল-মুলক একটি ভোজ সভারও আয়োজন করেছিলেন।
আকবরের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন সালিমা সুলতানা বেগম। সালিমা ছিলেন নূর-উদ-দীন মহম্মদ মির্জা এবং বাবরের কন্যা গুলরুখ (গুলরাং) বেগমের কন্যা। সালিমা প্রথমে হুমায়ূনের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈরাম খাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বৈরাম খাঁর মৃত্যুর পরে আকবরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি আকবরের দ্বিতীয় পুত্র মুরাদ মির্জার পালক মাতৃ ছিলেন। তিনি আকবরের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তিনি একজন কবি এবং দক্ষ লেখিকা হিসাবে ব্যতিক্রমী নারী হিসাবে বিবেচিত ছিলেন। আকবর এবং জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে তিনি মোগল দরবারের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করছিলেন। তিনি ১৬১৩ সালের ২ জানুয়ারী তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন।
আকবরের চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন হরকা বাই। যিনি মরিয়ম-উজ-জামানি নামেও পরিচিত ছিলেন। হরকা বাইকে আকবর ১৫৬২ সালে মঈন-উদ-দীন চিশতীর দরবার থেকে প্রার্থনা করে ফেরার পথে বিয়ে করেছিলেন। তিনি আকবরের সবচেয়ে প্রিয় এবং প্রভাবশালী বেগম ছিলেন। তিনি অস্বাভাবিক সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন। আকবরের ধর্মনিরপেক্ষতা প্রচারের তিনি চালিকা শক্তি ছিলেন। ১৫৬৪ সালে তিনি মির্জা হাসান এবং মির্জা হোসেন নামে দু’টি যমজ সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। উক্ত বছরই তাঁকে ‘ওয়ালি নিমাত বেগম (ঈশ্বরের উপহার বা আশীর্বাদ) সন্মানসূচক মুসলিম নাম প্রদান করা হয়েছিলো। ১৫৬৯ সালে সেলিম (ভবিষ্যত ভারতম সম্রাট জাহাঙ্গীর)কে জন্ম দেওয়ার পরে তিনি মরিয়ম-উজ-জামানি’ নামে একটি মর্যদাপূর্ণ নামে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি আকবরের প্রিয়পুত্র দানিয়াল মির্জার পালক মাতৃও ছিলেন। তাঁকে আরও দু’টি উপাধি ‘মল্লিকা-ই-হিন্দুস্থান এবং মল্লিকা-ই-মুজম্মা’ উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। আকবর নামায় আবুল ফজল লিখেছে- মরিয়ম-উজ-জামানি রাজকীয় হারেমে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি একজন চৌকস মহিলা ছিলেন, যিনি মোগল সাম্রাজ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৬২৩ সালের ১৯ শে মে তিনি মারা গিয়েছিলেন। ১৫৬২ সালে আকবর আগ্রার শাসক শেখ বড়ার পুত্র আব্দুল ওয়াসির প্রাক্তন পত্নীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি আব্দুল ওয়াসিরকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর আরেকজন স্ত্রীর নাম ছিলো গওহর-উন- নিসা বেগম। তিনি ছিলেন শেখ মহম্মদ বখতিয়ারের কন্যা ও শেখ জামাল বখতিয়ারের বোন। আকবর ১৫৬২ সালে মের্তার রাও বিরামদের পুত্র জগমল রাঠোরের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন।
১৫৬৪ সালে আকবর খান্দেশের শাসক মিরান মুবারক শাহের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৬২ সালে মিরান তাঁর কন্যাকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করে উপহার সহ আকবরের নিকট দূত পাঠিয়েছিলেন। মিরানের অনুরোধ গৃহীত হয়েছিলো এবং আকবর মিরানের দূতের সাথে ইতিমাদ খাঁকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ইতিমাদ খাঁকে মিরান মোবারক শাহ সম্মানের সাথে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর কন্যাকে ইতিমাদের সাথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মিরান মুবারক শাহ তাঁর জামাতা আকবরকে বিজয় গড় এবং হান্ডিয়া বিয়ের যৌতুক হিসাবে দান করেছিলেন।
আকবর ১৫৭০ সালে বিকানিরের শাসক রায় কল্যাণ মালের ভ্রাতৃ কানহার কন্যা রাজ কানওয়ারিকে বিয়ে করেছিলেন। আকবর যখন তাঁর সাম্রাজ্যের এই অংশে বেরাতে এসেছিলেন তখন রায় কল্যাণ তাঁর ভ্রাতৃর কন্যাকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আকবর সেই অনুরোধ রক্ষা করে রাজ কানওয়ারিকে বিয়ে করেছিলেন। এছাড়াও রায় কল্যাণের আরেক ভ্রাতৃ ভীম রাজের কন্যা ভানুমতীকেও আকবর বিয়ে করেছিলেন। ১৫৭০ সালে তিনি জয়সালমারের শাসক রাওয়াল হর রায়ের কন্যা নাথি বাইকেও বিয়ে করেছিলেন। রাওয়াল তাঁর কন্যাকে আকবরের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে প্রস্তাব পাঠিয়ে ছিলেন। আকবর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি শাহজাদী মাহি বেগমের মাতৃ ছিলেন। তিনি ১৫৭৭ সালের ১৭ ই এপ্রিল মারা গিয়েছিলেন। ১৫৭০ সালে মের্তার রাও বিরামদে-এর নাতি নরহর দাস তাঁর বোন পুরম বাইকে আকবরের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন।
আকবরের আরেক স্ত্রীর নাম ছিলো ভাক্কারী বেগম। তিনি ভাকরের সুলতান মাহমুদের কন্যা ছিলেন। ১৫৭২ সালের ২ ই জুলাই আকবরের দূত ইতিমাদ খাঁ ভাক্করী বেগমকে আকবরের দরবারে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাহমুদের দরবারে এসেছিলেন। ইতিমাদ খাঁ একটি মার্জিত পোশাক, একটি সিমিটার বেল্ট, একটি ঘোড়া এবং চারটি হাতী নিয়ে সুলতান মাহমুদের নিকট এসেছিলেন। সুলতান মাহমুদ ইতিমাদ খাঁকে নগদ ত্রিশ হাজার টাকা, নানাবিধ উপহার এবং দলবল দিয়ে তাঁর মেয়েকে আকবরের দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
আকবরের নবম স্ত্রী ছিলেন কাশিমা বেগম। তিনি আরবের শাহের কন্যা ছিলেন। ১৫৭৫ সালে বিবাহ উৎসব অনুষ্ঠি হয়েছিলো। ১৫৭৭ সালে ডুঙ্গরপুরের রাজা রাওয়াল আসকরন তাঁর মেয়েকে আকবরের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। আকবর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। লুকারন এবং রাজা বীরবলের সাথে রাওয়াল তাঁর কন্যাকে আকবরের দরবারে পাঠিয়ে ছিলেন এবং ১৫৭৭ সালের ১২ ই জুলাই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
আকবরের একাদশ বেগম ছিলেন বিবি দৌলত শাদ। তিনি ছিলেন শাহজাদী শাকর-উন-নিসা এবং আরাম বানু বেগমের মাতৃ । আকবরের পরবর্তী স্ত্রী ছিলেন কাশ্মীরের শামস চাকের কন্যা। বিয়েটি ১৫৯২ সালের ৩ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। ১৫৯৩ সালে তিনি কাজি ঈশার কন্যা ও নাজির খাঁর চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯৩ সালের ৩ রা জুলাই বিয়েটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
মৃত্যু– ১৬০৫ সালের ৩ই অক্টোবর আকবর আমাশায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠেননি। তিনি ১৬০৫ সালের ২৭ শে অক্টোবর মৃত্যু বরণ করেছিলেন। মৃত দেহটি আগ্রার সিকান্দ্রায় সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। তাঁর সমাধি ক্ষেত্রটি ১৬০৫ থেকে ১৬১৩ সালের মধ্যে তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর নির্মাণ করিয়েছিলেন। সমাধি ক্ষেত্রটি ১১৯ একর ভূমিতে বিস্তৃত। সমাধিটি তাঁর সবচেয়ে প্রিয়, নিবেদিত প্রাণ স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানির সমাধি থেকে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
উত্তরাধিকার– আকবর মোগল সাম্রাজের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর শাসনামলে সাংস্কৃতিক সংহতির উপর জোর দিয়ে রাষ্ট্রের প্রকৃতি ধর্মনিরপেক্ষ এবং উদারনীতিতে পরিবর্তন করেছিলেন। তিনি সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ, বিধবা পুনর্বিবাহকে বৈধ করণ এবং বিয়ের বয়স বৃদ্ধিকরণ প্রভৃতি বেশ কিছু সামাজিক সংস্কার চালু করেছিলেন। তিনি এবং তাঁর দরবাবের নবরত্নের একজন বীরবলকে ঘিরে আবর্তিত লোক কাহিনী ভারতে খুবই জনপ্রিয় ।
ভবিষ্য পুরাণ হলো একটি গৌণ পুরাণ। যেখানে হিন্দুদের পবিত্র দিনগুলিকে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে ভারত শাসনকারী বিভিন্ন রাজবংশের জন্য উৎসর্গকৃত একটি অধ্যায় রয়েছে। ভবিষ্য পুরাণের প্রাচীনতম অংশটি ৫০০ খ্রীষ্টপূর্বে রচিত এবং আধুনিক অংশটি ১৮ শতকে রচিত। এতে আকবর সম্পর্কে একটি গল্প রয়েছে, যেখানে অন্যান্য মোগল শাসকদের সাথে আকবরের তুলনা করা হয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় লিখিত ‘আকবরবাদশাহা বর্ণন’ নামক বিভাগটিতে তাঁর জন্মকে একজন ঋষির পুনর্জন্ম হিসাবে বর্ণনা করেছেন। যিনি মোগল সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক বাবরকে দেখে আত্মহত্যা করেছিলেন। বাবরকে ‘ম্লেচ্ছদের নিষ্ঠুর রাজা’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। গ্রন্থটিতে আকবরকে একজন ‘অলৌকিক শিশু’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি মোগলদের পূর্বপুরুষদের মতো হিংসাত্মক পথ অনুসরণ করবেন না বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।
টাইম ম্যাগাজিন আকবরের নাম ২৫ জন বিশ্বনেতার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে।
অন্যদিকে, পাকিস্থানে আকবরের উত্তরাধিকার স্পষ্টভাবে নেতিবাচক। পাকিস্থানি পাঠ্য পুস্তকে ঔরঙ্গজেবের সার্বজনীনতার বিপরীতে আকবরকে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত কোনো পাঠ্যপুস্তকে আকবরকে উল্লেখ করা হয়নি বলে ইতিহাসবিদ ইশতিয়াক হোসেন কুরেশি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আকবর তাঁর ধর্মীয় সহনশীতার জন্য ইসলামকে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিলেন যে,ইসলামকে আর প্রভাবশালী অবস্থানে পুনরুদ্ধার করতে পারেন নি। আকবরের রাজপূত পলিচিকে পাকিস্থানী ঐতিহাসিকরা ‘থ্রেড’ হিসাবে গণ্য করেন। উপসংহারে অনেক পাঠ্যপুথি বিশ্লেষণের পর মোবারক আলী হিন্দু এবং মুসলমানদের এক জাতি হিসাবে একত্রিত করে মুসলমানদের পৃথক পরিচয়কে বিপদে ফেলার জন্য আকবরের সমালোচনা করেছেন। আকবরের এই নীতি দ্বিজাতি তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক এবং তাই আকবরকে পাকিস্থানে অজনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব করে তুলেছে।
আকবরের পুত্রসন্তান–
হাসান মির্জা ও হোসেন মির্জা– উভয় যমজ। জন্ম ১৫৬৪ সালের ১৯ নভেম্বর। হোসেন মির্জার মৃত্যু ১৫৬৪ সালের ২৫ নভেম্বর এবং হাসান মির্জার মৃত্যু উক্ত সালেরই ২৯ নভেম্বর। মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি।
মহম্মদ সেলিম–জন্ম ৩১ আগস্ট, ১৫৬৯ সাল। মৃত্যু ২৮ অক্টোবর, ১৬২৭ সাল। মাতৃ মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি।
মুরাদ মির্জা– জন্ম ১৫৭৯ সালের ১৫ জুন। মৃত্যু ১৫৯৯ সালের ১২ মে। মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি।
দানিয়াল মির্জা– জন্ম ১১ সেপ্তেম্বর, ১৫৭২। মৃত্যু ১৯ মার্চ, ১৬০৫ সাল। মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি।
শাহজাদা খশ্ৰু– শৈশবে মৃত্যু। মাতৃ রাজ কানওয়ারি।
কন্যাসন্তান
শাহজাদী খানম–জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৫৬৯। মাতৃ সালিমা বেগম। তিনি মরিয়ম মাকানি দ্বারা লালিত-পালিত হয়েছিলেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো তৈমূরীয় যুবরাজ মুজাফ্ফর মির্জার সাথে।
মাহি বেগম– মাতৃ নাথি বেগম।
শাকর–উন–নিসা বেগম– মাতৃ বিবি দৌলত শাদ। তাঁর ১৫৯৪ সালে বিয়ে হয়েছিলো ইব্রাহীম মির্জার পুত্র শাহরুখ মির্জার সাথে। ১৬৫৩ সালের ১ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ফিরোজা খানম– আকবরের উপপত্নীর সন্তান। জন্ম ১৫৭৫ সালে।
আরাম বানু বেগম– জন্ম ১৫৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর। মাতৃ বিবি দৌলত শাদ। মৃত্যু ১৬২৪ সালের ১৭ জুন। আরাম বানু অবিবাহিত ছিলেন।
কিষ্ণবতী বাই– (মৃত্যু আগস্ট, ১৬০৯ সাল।) আকবরের পালক সন্তান। সেখাবত কাচবাহা দুর্জন শাহের কন্যা। তাঁকে মারওয়ারের সওয়াই রাজা সুর সিংহ রাঠোরের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মারওয়ারের মহারাজা গজ সিংহ এবং পারভেজ মির্জার স্ত্রী মানভাবতী বাইয়ের মাতৃ ছিলেন।
চলচ্চিত্র এবং টেলিভিছন–
‘শাহেনশাহ আকবর’ ১৯৪৩ সালে নির্মিত এবং জে, আর, শেঠি পরিচালিত আকবরের জীবনী ভিত্তিক হিন্দী চলচ্চিত্র।
মুঘল–ই–আজম– ১৯৬০ সালে নির্মিত হিন্দী চলচ্চিত্র। আকবরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন পৃথ্বীরাজ কাপুর। ভারত সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগ ১৯৬৭ সালে আকবরকে নিয়ে একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছিলেন শান্তি এস, ভার্মা।
১৯৭৮ সালে নির্মিত ‘ভক্তি মে শক্তি‘ চলচ্চিত্রে আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ওমপুরী।
‘আকবর সেলিম আনারকলি‘ চলচ্চিত্র ১৯৭৯ সালে তেলেগু ভাষায় নির্মাণ করা হয়েছিলো। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছিলেন এন, টি রামা রাও। চলচ্চিত্রটিতে রামা রাও আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
১৯৭৯ সালে নির্মিত ‘মীরা‘ চলচ্চিত্রে আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন আমজাদ খান।
২০০৮ সালে নির্মিত ‘যোধা–আকবর‘ চলচ্চিত্রে আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ঋত্বিক রোশন।
১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে জি টিভিতে ‘আকবর–বীরবল‘ হিন্দী ধারাবাহিক সম্প্রচারিত হয়েছিলো। যেখানে আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিক্রম গোখলে।
১৯৯০-এর দশকে ডি ডি ন্যাশনালে আকবর খান পরিচালিত ‘আকবর দ্য গ্রেট‘ নামে একটি টেলিভিশন সিরিজ সম্প্রচারিত হয়েছিলো।
২০১৩-২০১৫ সালে যোধা আকবর‘ নামে জি টিভিতে একটি হিন্দী ধারাবহিক সম্প্রচারিত হয়েছিলো। যেখানে আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রজত টোকাস।
২০১৪ সালে ‘দ্য টুয়েন্টি থ ওয়াইফ‘ উপন্যাস অবলম্বনে রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিয়াসত‘ ইপিক টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছিলো। উদয় টিকোর আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
সনি টিভির ঐতিহাসিক নাটক ভারত কী বীর পুত্র– মহারাণা প্রতাপ-এ আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, প্রথমে ক্রিপ সুরি এবং পরে অবিনেশ রেখী।
বিআইজি মিউজিক টিভির ধারাবাহিক সিটকম(যা একটি চরিত্রের উপর কেন্দ্রীভূত হয়)-এ ‘আকবর বীরবল‘-এ কিকু শারদা আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
বিআইজি মিউজিক টিভি ধারাবাহিকের ‘হাজির জওয়াব‘ বীরবলের ফলো আপ সিটকম-এ সৌরভ রাজ জৈন আকবরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
বিআইজি মিউজিকের ঐতিহাসিক নাটক ‘ আকবর– রক্ত সে তক্ত তক সফর‘-এ আকবরের চরিত্রে অভিষেক নিগম অভিনয় করেছিলেন।
এবিপি নিউজের ডকুমেন্টরি সিরিজ ‘ভারতবর্ষ‘-এ আকবরের ভূমিকায় মহম্মদ ইকবাল খান অভিনয় করেছিলেন।
‘আকবর– রাখ সে তক্ত কা সফর‘ ২০১৭ সালের একটি ভারতীয় নাটক সিরিজ-এ আকবরের ভূমিকায় অভিষেক নিগম অভিনয় করেছিলেন।
কালারস টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ‘দাস্তান–ই–মহব্বত–সেলিম আনারকলি‘তে শাহবাজ খান আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
২০২০ সালের ভারতীয় কমেডি টেলিভিশন সিরিজ ‘আকবর কা বাল বীরবল‘-এ আলী আসগর আকবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। •
মহামতি আকবর-এর সমাধিক্ষেত্র
জাহাঙ্গীর
নূর-উদ-দীন মহম্মদ সেলিমের জন্ম ১৫৬৯ সালের ৩১ আগস্ট ফতেহপুর সিক্রিতে। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি জাহাঙ্গীর উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম আকবর এবং মাতৃর নাম মরিয়ম-উজ-জামানি (যোধাবাই)। তিনি চতুর্থ মোগল সম্রাট ছিলেন। ১৬০৫ সাল থেকে তিনি ১৬২৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। ১৫৬৪ সালে তাঁর দুই বড় ভ্রাতৃ হাসান মির্জা এবং হোসেন মির্জার জন্ম হয়েছিলো। তবে, তাঁরা শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। দুই শিশু সন্তানের মৃত্যুর পর আকবর সাম্রাজ্যের একজন উত্তরাধিকারীর জন্য সেলিম চিস্তির আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছিলেন। সেলিম চিস্তির আশীর্বাদের ফলেই সেলিমের জন্ম হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। সেলিমের জন্মের পর সেলিম চিস্তির নাম অনুসারে জাহাঙ্গীরের নাম সেলিম নাম রাখা হয়েছিলো।
সেলিমের জন্মের খবর পেয়ে আনন্দিত হয়ে আকবর ভোজের আয়োজন করেছিলেন এবং অপরাধীদের মুক্তির আদেশ দিয়েছিলেন। সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে জনসাধারণের মধ্যে ধন-সম্পত্তি বিতরণ করা হয়েছিলো।
পাঁচ বছর বয়স থেকেই সেলিমের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। সেলিমের শিক্ষা উপলক্ষ্যে একটি ভোজের আয়োজন হয়েছিলো। সেলিমের প্রথম শিক্ষক ছিলেন কুতুবুদ্দিন। কিছুদিন পর বেশ কয়েকজন শিক্ষক দ্বারা সেলিমকে প্রশাসনিক, কৌশলগত এবং সামরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। সেলিমের মামা ভগবন্ত দাসও সেলিমের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি সেলিমকে সামরিক শিক্ষা দিতেন। সেলিম ফার্সি এবং প্রাক-আধুনিক হিন্দীতে সাবলীল হয়ে উঠেছিলেন। মোগলদের পৈতৃক তুর্কি ভাষাতেও তিনি সাবলীল হয়ে উঠেছিলেন।
সেলিম সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ সামরিক পদমর্যদা দশ হাজার সৈন্যের মনসবদার ছিলেন। ১৫৮১ সালে মাত্র বারো বছর বয়সে কাবুল অভিযানের সময় সেলিম স্বাধীনভাবে একটি রেজিমেন্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৫৮৫ সালে ভগবন্ত দাসের কন্যা মান বাইয়ের সাথে বিয়ের পর তাঁর সেনা সংখ্যা পরে ১২ হাজারে বৃদ্ধি করা হয়েছিলো।
আনারকলির সাথে সেলিমের কাল্পনিক প্রেম কাহিনী ভারতের শিল্প, সাহিত্য ও সিনেমায় ব্যাপকভাবে রূপান্তরিত হয়েছে।
শাসন–শাহজাদা সেলিম তাঁর পিতা আকবরের মৃত্যুর আটদিন পর ১৬০৫ সালের ৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবারে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি নূর-উদ-দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজী উপাধি ধারণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের পরে তিনি নিজের পুত্র শাহজাদা খসরু মির্জার বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন। খসরু মির্জা তাঁর প্রপিতামহ আকবর এবং প্রপিতামহী মরিয়ম-উজ-জামানীর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীরেরও সবচেয়ে যোগ্য পুত্র ছিলেন। বীরত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামরিক প্রতিভার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর বয়সের সমস্ত প্রকার বদঅভ্যাস থেকে মুক্ত ছিলেন। আকবর নিজেও খসরুকে অত্যন্ত সাহসী, প্রতিভাবান সেনাপতি এবং উদার ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসাবে ভাবতেন। খসরু মির্জাকে অনেক সমর্থন করতেন। তাঁর মধ্যে ছিলেন তাঁর শশুড় আজিজ কোকা, তাঁর মামা রাজা মান সিং, মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানী, সম্রাট আকবরের তৃতীয় পত্নী সালিমা সুলতানা বেগম এবং জাহাঙ্গীরের প্রিয় বোন শাকর-উন-নিসা। আকবর নিজের পুত্র জাহাঙ্গীরের চেয়ে নাতি খসরুকে বেশি ভালবাসতেন।
১৬০৬ সলের ৬ এপ্রিল খসরু তাঁর প্রপিতামহের সমাধি দর্শনের অজুহাতে ৩৫০ জন অশ্বারোহী নিয়ে আগ্রা ত্যাগ করেছিলেন। ৩০০০ জন অশ্বারোহী নিয়ে হোসেন বেগ তাঁর সাথে মথুরায় যোগদান করেছিলেন। লাহোরের প্রাদেশিক দেওয়ান আব্দুর রহিমও তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিলেন। খসরু অমৃতসরের তারান তারানে পৌঁছে গুরু অর্জন সিংয়ের আশীর্বাদ গ্রহণ করে লাহোর অবরোধ করেছিলেন। সংবাদ পেয়ে জাহাঙ্গীর একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে যথাশীঘ্র লাহোর পৌঁছান এবং ভৈরওয়ালের যুদ্ধে খসরুকে পরাস্ত করেন। পরাস্ত হয়ে খসরু এবং তাঁর সেনাবাহিনী কাবুলের দিকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু চেনাব নদী পার হওয়ার সময় জাহাঙ্গীর বাহিনীর হাতে খসরু বন্দি হোন। জাহাঙ্গীর ১৬০৭ সালে খসরু মির্জাকে আংশিকভাবে অন্ধ করে আগ্রার দুর্গে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো।
জাহাঙ্গীর তাঁর তৃতীয় পুত্র খুররমকে বেশি পসন্দ করতেন। খসরুর শাস্তি হিসাবে পরে জাহাঙ্গীর তাঁকে কনিষ্ঠ ভ্রাতা খুররমের কাছে সমর্পণ করেছিলেন। খুররম তাঁর বড় ভ্রাতা খসরু মির্জাকে সম্পূর্ণভাবে অন্ধ করে দিয়েছিলেন। ১৬২২ সালে জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়পুত্র খুররমকে আহমেদনগর, বিজাপুর এবং গোলকুণ্ডার সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রেরণ করেছিলেন। যুদ্ধে বিজয়ের পর খুররম তাঁর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ১৬২২ সালে খুররম সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য তাঁর অন্ধ বড় ভ্রাতা খসরু মির্জাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হত্যার পর জাহাঙ্গীর খসরুকে তাঁর মাতৃ শাহ বেগমের সমাধির পাশে সমাধিস্থ করেছিলেন এবং তাঁর সমাধিক্ষেত্র নির্মাণের জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। সমাধিক্ষেত্রটি এলাহাবাদে অবস্থিত এবং খসরুবাগ নামে পরিচিত।
জাহাঙ্গীর খসরুর মতই খুররমের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বৈদেশিক নীতি– ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অনুরোধে ইংল্যান্ডের সম্রাট জেমস, টমাস রো’কে রাজদূত হিসাবে জাহাঙ্গীরের দরবারে প্রেরণ করেছিলেন। টমাস রো’ আগ্রায় মোগল দরবারে ১৬১৯ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ তিন বছর ছিলেন। টমাস রো অনেকগুলো ‘রেড ওয়াইন’ উপহার হিসাবে নিয়ে এসেছিলেন।
টমাস রো’র উদ্দেশ্য ছিলো, সুরাটে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর জন্য কারখানা স্থাপন এবং মোগল সম্রাট কর্তৃক সুরক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা আহরণ। অবশ্যে জাহাঙ্গীর কর্তৃক তেমন সুবিধা করা হয়নি যদিও মোগল এবং ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিলো।
টমাস রো’র ডায়েরিগুলি জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের মূল্যবান উৎস। অবশ্যে জাহাঙ্গীর তাঁর বিশাল আত্মজীবনী তুজক- ই-জাহাঙ্গীরীতে টমাস রো’র বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ করেন নি।
কান্দাহারের আশেপাশের অঞ্চলে একটি সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পর পারস্যের সুলতান আব্বাস-প্রথমের সাথে শান্তি আলোচনার জন্য ১৬২৩ সালে জাহাঙ্গীর তাঁর তহবিলদার খান আলমকে পারস্যে প্রেরণ করেছিলেন। খান আলমের সাথে পাঠিয়ে ছিলেন ৮০০ সিপাহি, লেখক, পণ্ডিত এবং স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে সুসজ্জিত ১০টি হাওদা । খান আলম পারসের সাফাভিদ এবং মধ্য এশিয়ার খানেট (খান, খাগান, খাতুন বা খানম দ্বারা শাসিত একটি রাজনৈতিক সত্ত্বা)দের কাছ থেকে নানাবিধ উপহার এবং মীর শিকারের (হান্টার মাস্টার) দল নিয়ে ফিরে এসেছিলেন।
১৬২৬ সালে জাহাঙ্গীর সফাভিদদের বিরুদ্ধে অটোম্যান, মোগল এবং উজবেকদের নিয়ে একটি জোট গঠনের কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন। এমনকী তিনি অটোম্যান চতুর্থ সুলতান মুরাদের নিকট একটি পত্রও প্রেরণ করেছিলেন। ১৬২৭ সালে মৃত্যুর জন্য তাঁর সেই আকাংক্ষা পূরণ হয়নি।
বিবাহ–
শাহ বেগম– সেলিমরে প্রথম স্ত্রী ছিলেন তাঁর মামা আমেরের ভগবন্ত দাসের কন্যা মান বাই। বিয়ের পর তাঁর নামকরণ করা হয়েছিলো শাহ বেগম। সেলিম ১৫ বছর বয়সে তাঁর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মরিয়ম-উজ-জামানি নিজে বিয়ে ঠিক করেছিলেন। বিয়েটি ১৫৮৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আমেরে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। আকবর তাঁর উচ্চপদস্থ সভাসদসহ বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বিয়েটি খুব জাকজমকপূর্ণ হয়েছিলো। জাহাঙ্গীরের সন্মানে আকবর স্বয়ং বর-কনের পাল্কী কিছুদূর বহন করেছিলেন। বিয়ের পর জাহাঙ্গীরকে ১২,০০০ সেনার মনসবদার নিযুক্ত করা হয়েছিলো। জাহাঙ্গীরের জ্যেষ্ঠপুত্র খসরুর জন্মের পর আকবর মান বাইর নাম শাহ বেগম রেখেছিলেন।
সেলিম পরে বেশ কিছু অভিজাত মোগল এবং রাজপুত পরিবারের কন্যার পাণিগ্রহণ করেছিলেন।
জগত গোসাঁই বেগম– জাহাঙ্গীরের প্রথম দিকের প্রিয় স্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন মাড়োয়ারের রাজা উদয় সিং রাঠোরের কন্যা জগত গোসাঁই বেগম। বিয়েটি ১৫৮৬ সালের ১১ ই জানুয়ারি কনের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। বিয়ের পর জাহাঙ্গীর তাঁর নাম রেখেছিলেন তাজ বিবি। তিনি ভবিষ্যত সম্রাট খুররমের মাতৃ ছিলেন।
১৫৮৬ সালের ২৬ জুন জাহাঙ্গীর বিকানেরের রাজা রায় সিংয়ের এক কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৮৬ সালের জুলাই মাসে তিনি আবু সাঈদ খান চাগতাইয়ের কন্যা মালেকা শিকার বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৮৬ সালেই তিনি হেরাতের খাজা হাসানের কন্যা সাহেব-ই-জামাল বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৮৭ সালে তিনি জয়সালমিরের মহারাজা ভীম সিংয়ের কন্যা মালেকা-জাহান বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি দরিয়া মালভাসের কন্যাকেও বিয়ে করেছিলেন।
১৫৯০ সালের অক্টোবরে জাহাঙ্গীর মির্জা সানজার হাজারার কন্যা জোহরা বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। মের্তার রাজা কেশো দাস রাঠোরের কন্যা করমনসী বেগমকেও তিনি বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯২ সালের ১১ ই জানুয়ারি তিনি আলী শের খানের কন্যা কানওয়াল রাণী এবং গুল খাতুনকে বিয়ে করেছিলেন।
১৫৯২ সালের অক্টোবরে তিনি কাশ্মীরের হোসেন চাকের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯৩ সালের জানুয়ারি / মার্চে তিনি ইব্রাহীম হোসেন মীরের কন্যা নূর-উন-নিসা বেগম এবং কামরান মির্জার কন্যা গুলরুখ বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯৩ সালের সেপ্তেম্বরে তিনি খানদেশের রাজা আলী খান ফারুকির কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি আব্দুল্ল্যাহ খান বালুচের কন্যাকেও বিয়ে করেছিলেন। ১৫৯৬ সালের ২৮শে জুন তিনি কাবুল এবং লাহোরের সুবেদার জয়েন খান কোকার কন্যা খাস মহল বেগমকে বিয়ে করেছিলেন।
১৬০৮ সালে জাহাঙ্গীর রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য কাশিম খানের কন্যা সালিহা বানু বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৬০৮ সালের ১৭ ই জুন অম্বরের যুবরাজ জগৎ সিং-এর বড় মেয়ে কোকা কুমারী বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৬১০ সালের ১১ই জানুয়ারি তিনি রাম চাঁদ বুন্দেলার কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। কোনো এক সময়ে তিনি সম্রাট হুমায়ূনের পুত্র মির্জা মহম্মদ হাকিমের কন্যাকেও বিয়ে করেছিলেন।
নূর জাহান– জাহাঙ্গীর ১৬১১ সালের ২৫ শে মে মেহের-উন-নিসাকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিলো নুর জাহান(বিশ্বের আলো।)। তিনি শের আফগানের বিধবা পত্নী ছিলেন। বিয়ের পর মেহের-উন-নিসা জাহাঙ্গীরের প্রিয় স্ত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী ছিলেন। যার জন্য জাহাঙ্গীর তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। নূর জাহান উপাধিতে ভূষিত হওয়ার আগে তাঁকে বলা হতো নূর মহল (প্রাসাদের আলো।)। তিনি ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ শিকারীও ছিলেন। চারটি গুলিতে তিনটি বাঘ শিকার করেছিলেন বলে কথিত আছে।
নূর জাহান জাহাঙ্গীরের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। তাঁর আদেশ অমান্য করার জন্য কান্দাহার হারাতে হয়েছিলো। পার্সিয়ানরা যখন কান্দাহার অবরোধ করছিলেন, জাহাঙ্গীরের অসুখের জন্য নূর জাহান তখন সাম্রাজ্যের দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি শাহজাদা খুররমকে কান্দাহার অভিযানের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু খুররম সেই নির্দেশ অমান্য করেছিলেন। এর পেছনে অবশ্যে কারণ ছিলো। কারণ নূর জাহান সব সময় তাঁর জামাতা শাহরিয়ারকে সাম্রাজ্যের পরবর্তী উত্তরাধিকার হিসাবে সমর্থন করতেন। খুররম সন্দেহ করেছিলেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে শাহরিয়ারকে পদোন্নতি দিতে পারে এবং তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মারাও যেতে পারেন! এই ভয় খুররমকে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তাঁর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। এর ফলে কান্দাহার শত্রুরা দখল করে নিয়েছিলো। জাহাঙ্গীরের শাসনের শেষ বছরগুলোতে নূর জাহান তাঁর নামে মূদ্রা পর্যন্ত প্রবর্তন করেছিলেন।
জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে সাম্রাজ্য বিজয় এবং সম্প্রসারণের জন্য সব সময় যুদ্ধ লেগেই থাকতো। সেজন্য জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল যুদ্ধরাষ্ট্র হিসাবে জনাজাত ছিলো। জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে বিরক্তিকর শত্রু ছিলো, মেওয়ারের রাণা অমর সিং। অমর সিং শেষপর্যন্ত ১৬১৩ সালে খুররম বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। উত্তর-পূর্বে আসামে আহোমদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ হয়েছিলো, তবে আহোমদের গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের কাছে মোগল বাহিনী নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলো। উত্তর ভারতে খুররমের নেতৃত্বে মোগল বাহিনী ১৬১৫ সালে কাংড়ার রাজাকে পরাজিত করেছিলেন। এই বিজয়ে দাক্ষিণাত্যে মোগল সাম্রাজ্যকে সুসংহত করেছিলো। ১৬২০ সালে জাহাঙ্গীর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং পরবর্তী উত্তরাধিকার অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন। এদিকে নূর জাহান জাহাঙ্গীবের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ পুত্র শাহরিয়ারকে উত্তরাধিকার হিসাবে প্রক্ষেপ করার জন্য তাঁর কন্যা লাডলী বেগমকে শাহরিয়ারের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্যে নূর জাহানের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
বিজয়– ১৫৯৪ সালে সম্রাট আকবর বুন্দেলার ধর্মত্যাগী বীর সিং দেওকে পরাজিত করে বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে বিবেচিত ওর্ছা শহর দখল করার জন্য আবুল হাসান আসাফ খানের সাথে জাহাঙ্গীরকে প্রেরণ করেছিলেন। আবুল হাসান আসফ খান মির্জা গিয়াস বেগ ইস্পাহানির পুত্র মির্জা জাফর বেগ নামেও পরিচিত ছিলেন। জাহাঙ্গীরের বাহিনীতে ১২,০০০ সেনা ছিলো। প্রচণ্ড কয়েক দফা সংঘর্ষের পর জাহাঙ্গীর বীর সিং দেওকে পরাজিত করে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আলোচনার পর বীর সিং দেও ৫,০০০ পদাতিক সেনা এবং ১০০০ অশ্বারোহী সেনা হস্তান্তর করে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মোগলদের প্রতিশোধের ভয়ে বীর সিং দেও জীবিত কাল পর্যন্ত পলাতক ছিলেন। ২৬ বছর বয়সে জাহাঙ্গীর এই বিজয়কে স্মরণীয় এবং সন্মান প্রদর্শনের জন্য মোগল দুর্গ জাহাঙ্গীর মহল নির্মাণ করেছিলেন।
জাহাঙ্গীর আলী কুলি খানের নেতৃত্বে সেনা সংগ্রহ করে কোচবিহারের লক্ষ্মী নারায়ন-এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে লক্ষ্মী নারায়ন মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। মোগলরা লক্ষ্মী নারায়নকে নাজির উপাধি প্রদান করেছিলেন। লক্ষ্মী নারায়ন আঠারিকোঠায় একটি গ্যারিসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৬১৩ সালে মোগল জাহাজ রহিমী ১,০০,০০০ টাকা এবং তীর্থযাত্রী নিয়ে বার্ষিক হজ্বে যোগদানের জন্য সুরাট থেকে মক্কা ও মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। পর্তুগীজরা জাহাজটি দখল করেছিলো। জাহাজটি জাহাঙ্গীরের মাতৃ তথা সম্রাট আকবরের প্রিয় স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানির মালিকাধীন ছিলো। রহিমী লোহিত সাগরে যাত্রা করা ভারতীয় জাহাজ ছিলো এবং ইউরোপীয়দের কাছে ‘মহান তীর্থযাত্রী’ জাহাজ হিসাবে পরিচিত ছিলো। পর্তুগীজরা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজটি ফেরৎ দিতে অস্বীকার করেছিলো, তখন মোগল দরবারে ভীষণ গণ্ডগোল শুরু হয়েছিলো। গণ্ডগোল অধিক তীব্র রূপ ধারণ করেছিলো, যখন জাহাজটির মালিক ও পৃষ্ঠপোষক জাহাঙ্গীরের মাতৃ মরিয়ম-উজ-জামানি বলে প্রকাশ হয়েছিলো। জাহাঙ্গীর ক্ষুব্ধ হয়ে পর্তুগীজদের শহর দমন দখল করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। তিনি জেসুইটসদের অধীনে থাকা গির্জাগুলি ক্রোক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই পর্বটিকে সম্পদের জন্য সংগ্রামের একটি উদাহরণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, যা পরবর্তীতে ভারতীয় উপ-মহাদেশে উপনিবেশের সূচনা করেছিলো।
জাহাঙ্গীর মেওয়ারের সাথে এক শতাব্দী ব্যাপী চলে আসা সংগ্রাম অন্ত করেছিলেন। রাজপূতদের বিরুদ্ধে অভিযান এতই প্রচণ্ড করে তোলা হয়েছিলো যে, প্রচুর জীবন ও ধন-সম্পত্তি ক্ষতির পরে রাজপূতরা পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালে বাংলার বিদ্রোহী আফগান শাসক মুসা খানকে দমন করার জন্য ইসমাইল খান প্রথমকে প্রেরণ করেছিলেন।
১৫৫৬ সালে কাংড়ার শাসক ধরম চাঁদ আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে মোগলদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন। ১৬২০ সালে জাহাঙ্গীর কাটোচ রাজা হরি চাঁদকে হত্যা করে কাংড়া রাজ্য মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। নবাব আলী খানের নেতৃত্বে এবং রাজা জগত সিংয়রে সহায়তায় দূর্গটি দখল করা হয়েছিলো। কাংড়া ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত মোগলদের অধীনে ছিলো। কাংড়া দূর্গের মধ্যে জাহাঙ্গীর একটি মসজিদও নির্মাণ করেছিলেন।
মৃত্যু– ১৬২০ সালে জাহাঙ্গীর অসুখে পড়েছিলেন। ফলে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিলো। কাশ্মীর এবং কাবুল ভ্রমণ করে তিনি স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কাবুল ভ্রমণ করে কাশ্মীর গিয়েছিলেন, তবে তিনি প্রচণ্ড শীতের জন্য লাহোর ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কাশ্মীর থেকে লাহোর ফিরে আসার পথে ১৬২৭ সালের ২৮ অক্টোবর ৫৮ বছর বয়সে তিনি কাশ্মীরের ভীম্বরের কাছে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর শরীরকে সুবাসিত এবং সুরক্ষিত করার জন্য অস্ত্রগুলি সরিয়ে কাশ্মীরের ভীম্বরের নিকটে অবস্থিত বাগসার দূর্গে রাখা হয়েছিলো। এরপর দেহটি পাল্কীতে করে লাহোর নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত শাহদরাবাগে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। সুবিন্যস্ত সমাধিটি বর্তমান পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় স্থান।
জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন তৃতীয় পুত্র শাহজাদা খুররম। সিংহাসনে আরোহণের পরে তিনি শাহ জাহান উপাধি ধারণ করেছিলেন।
ধর্মীয় নীতি– টমাস রো’ মোগল দরবারে ইংল্যাণ্ডের প্রথম রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ১৬১৭ সালে ইংলেণ্ডের সাথে মোগলদের সম্পর্ক উত্তেজনা পূর্ণ হয়ে উঠলে, টমাস রো’ সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, গুজরাটে নতুন সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত শাহজাদা শাহ জাহান যদি ইংরেজদের প্রদেশ থেকে বের করে দেন, তাহলে তাঁরা সমুদ্রে ন্যায়বিচারের জন্য সংঘর্ষ করবে। শাহ জাহান ১৬১৮ সালে ইংরেজদের গুজরাটে বাণিজ্য করার অনুমতি প্রদান করে একটি সরকারী ফরমান জারি করেছিলেন।
অনেক সমসাময়িক ইতিহাসবিদ জাহাঙ্গীরের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কীভাবে বর্ণনা করবেন নিশ্চিত ছিলেন না। টমাস রো’ জাহাঙ্গীরকে নাস্তিক আখ্যা দিয়েছিলেন, যদিও অন্য ইতিহাসবিদরা নাস্তিক শব্দটি ব্যবহার করেন নি, তবে তাঁরা মনে করেন নি যে তাঁকে গোঁড়া সুন্নি বলা যেতে পারে। টমাস রো’ বিশ্বাস করতেন, যে জাহাঙ্গীরের ধর্ম তাঁর নিজের তৈরি। কারণ তিনি হজরত মহম্মদকে ঘৃণা করতেন এবং তিনি কোনো কারণ দেখেন নি, যারজন্য তিনি তাঁর মতো মহান নবী হতে পারবেন না। তিনি নিজেকে একজন নবী বলে দাবি করার পর অনেক চাটুকার এবং তাঁকে অনুসরণ করা অনেক শিষ্য পেয়েছিলেন। সেই শিষ্যদের মধ্যে একজন ছিলেন ইংরেজ রাষ্ট্রদূত টমাস রো’। জাহাঙ্গীরের শিক্ষা রো’য়ের জন্য তাৎপর্যহীন ছিলো, কারণ তিনি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারেন নি যে তিনি কি করছিলেন। জাহাঙ্গীর রো’য়ের গলায় তাঁর মূর্তি সম্বলিত একটি সোনার চেইন ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। ছয় পেন্সের মতো ওজনের সোনার চেইনটিকে তিনি তাঁর প্রতি সম্রাটের বিশেষ অনুগ্রহ বলে ভেবেছিলেন।
টমাস রো’ ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মান্তরিত হলে লন্ডনে বেশ কেলেঙ্কারী সৃষ্টি হতে পারত, কিন্তু কোনো উদ্দেশ্য না থাকায় সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। জাহাঙ্গীরের শিষ্যরা ছিলো সাম্রাজ্যের সেবকদের একটি অভিজাত গোষ্ঠী। যাদের একজনকে বিচারপতি পদে নিযুক্ত করা হয়েছিলো। এটা স্পষ্ট নয় যে, যারা জাহাঙ্গীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ পূর্ববর্তী ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন। তাই এটিকে একটি উপায় হিসাবে দেখা যেতে পারে যে, যার মাধ্যমে সম্রাট নিজের এবং তাঁর উচ্চ পদস্থ কর্মচারিদের মধ্যে বন্ধনকে শক্তিশালী করেছিলেন। টমাস রো’ নাস্তিক শব্দটি নৈমিত্তিক হিসাবে ব্যবহার করলেও তিনি জাহাঙ্গীরের প্রকৃত বিশ্বাসের উপর আঙুল তুলতে পারেন নি। টমাস রো’ আক্ষেপ করেছিলেন যে, হয় সম্রাট বিশেষভাবে রূপান্তর হওয়া অসম্ভব মানুষ, নয়তো সবচেয়ে সহজ মানুষ। কারণ জাহাঙ্গীর শুনতে ভালোবাসতেন এবং এমন খুব ধর্ম আছে যাকে তিনি উপহাস করতেন।
জাহাঙ্গীরের জন্য রাষ্ট্রীয় শিল্প নিয়ে লেখা একটি বইতে লেখক পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, তাঁর সমস্ত শক্তি ঋষিদের পরামর্শ এবং উলামাদের অন্তর্দৃষ্টি বুঝার জন্য নিয়োজিত করা উচিত। তাঁর শাসনামলের শুরুর দিকে অনেক কট্টর সুন্নিরা আশা করেছিলেন যে, তিনি তাঁর পিতার মতো ধর্মীয় সহনশীল হবেন না। তাঁর পিতার উজির-এ-আজম এবং ধর্মীয় অবস্থানের স্থপতি আবুল ফজলকে ক্ষমতাচ্যূত করার ফলে গোঁড়া অভিজাতদের একটি দল মোগল দরবারে বর্ধিত ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। এর মধ্যে বিশেষ করে শায়খ ফরিদ, জাহাঙ্গীরের বিশ্বক্ত মীর বক্সীর মতো অভিজাত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা মুসলিম ভারতে গোঁড়ামীর দূর্গকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন।
জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে কুখ্যাত কর্ম ছিলো, শিখ ধর্মগুরু অর্জন দেবের ফাঁসি। তাঁকে বন্দি করে কারাগারে হত্যা করা হয়েছিলো। তাঁর জমি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো। খসরুর বিদ্রোহের সময় সহায়তা করা বলে সন্দেহ করে তাঁর পুত্রদের বন্দি করা হয়েছিলো। এটা স্পষ্ট নয় যে, শিখ কি, জাহাঙ্গীর বুঝতে পেরেছিলেন কি-না। গুরু অর্জন সিংকে তিনি একজন হিন্দু বলে উল্লেখ করেছিলেন, যিনি হিন্দুদের অনেক সরল হৃদয় এমনকী ইসলামের অজ্ঞ ও মূর্খ অনুসারিদের তাঁর আচার- আচরণ দ্বারা প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁরা তিন চার প্রজন্ম ধরে তাঁদের এই দোকানটি গরম করে রেখেছিলেন। আসলে অর্জন সিংয়ের ফাঁসির কারণ ছিলো জাহাঙ্গীরের জ্যেষ্ঠপুত্র খসরুর প্রতি তাঁর সমর্থন। জাহাঙ্গীরের নিজের স্মৃতিচারণ থেকে এটা স্পষ্ট নয় যে, তিনি গুরু অর্জন সিংকে অপসন্দ করতেন। তিনি বলেছিলেন, অনেক সময় এই নিরর্থক ব্যাপারটি বন্ধ করার জন্য ইসলামের সমাবেশ থেকে তাঁর নিকট অভিযোগ এসেছিলো।
জাহাঙ্গীর জৈনদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর একজন দরবারি ইতিহাসবিদ লিখেছেন যে, জাহাঙ্গীরঅবগত হয়েছিলেন যে, আহমেদাবাদে সেওরা (জৈন)দের অনেক অবিশ্বাসী ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি সম্প্রদায় বেশ কয়েকটি অত্যন্ত বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ মন্দির নির্মাণ করে সেগুলিতে তাঁদের মিথ্যা দেবতা স্থাপন করেছে। তাঁরা নিজেরা বিশেষভাবে সন্মানিত হচ্ছে, তবে যেসব মহিলারা মন্দিরগুলোতে পূজা দিতে যাচ্ছে, তাঁরা মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য লোক কর্তৃক দূষিত হচ্ছে। সম্রাট জাহাঙ্গীর অভিযুক্ত লোকদের দেশ থেকে নির্বাসিত এবং মন্দিরগুলি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতিকথায় বর্ণনা করেছেন, তিনি একবার পুষ্করে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি মন্দিরে শুয়োরের আকৃতির দেবতার মূর্তি দেখে তিনি হতবাক হয়েছিলেন। তিনি তখন দাবি করেছিলেন, ‘হিন্দুদের মূল্যহীন ধর্ম এটি।’ তিনি সেখানকার লোকদের মূর্তিটি ধ্বংস করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি একবার যোগীর রহস্যময় কাজের কথা শুনেছিলেন, তিনি যোগীকে উচ্ছেদ ও জায়গাটি ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জাহাঙ্গীরের উপর বহু ধর্মীয় প্রভাব পড়েছিলো। জাহাঙ্গীর একজন হিন্দু তপস্বী যদরূপ গোসাঁইর নিকটে যেতেন। নিজের স্মৃতি কথায় তিনি লিখেছেন, তপস্বীর বেদান্ত জ্ঞান এবং কঠোর জীবনযাপন তাঁর উপরে দুর্দান্ত প্রভাব ফেলেছিলেন। ডক্টর ফাইজান মোস্তাফা লিখেছেন, জৈন প্রজাদের পর্যুষণ উৎসবের সময়ে তাঁদের প্রতি সন্মান প্রদর্শনের জন্য জাহাঙ্গীর ১২ দিন আমিষ আহার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন।
মুকাররম খান একবার জাহাঙ্গীরের কাছে একটি ইউরোপীয় পর্দা পাঠিয়েছিলেন। পর্দাটির মতো সুন্দর হাতের কাজ ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীদের অন্য কোনো কাজে দেখা যায়নি। জাহাঙ্গীর একটি ‘দর্শক হল’ ইউরোপীয় পর্দা দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন। খ্রীস্টান বিষয়বস্তু জাহাঙ্গীরকে আকৃষ্ট করতো। তাঁর আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরে তিনি কথাটি উল্লেখ করেছেন। একবার একজন কৃতদাস জাঙাঙ্গীরকে এক টুকরো হাতীর দাঁত দিয়েছিলো। দাঁত টুকরোয় চারটি দৃশ্য খোদাই করা ছিলো। শেষ দৃশ্যে একটি গাছ এবং গাছটির নীচে শ্রদ্ধেয় ঈশা (আঃ)এর মূর্তি খোদাই করা ছিলো। একজন ব্যক্তি যীশুর পায়ের কাছে মাথা রেখেছেন এবং একজন বৃদ্ধ যীশুর সাথে কথা বলছেন। বৃদ্ধটির পাশে চারজন লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। যে কৃতদাসটি তাঁকে হাতীদাঁতটি দিয়েছিলো, জাহাঙ্গীর তাঁর হাতের কাজ বলে বিশ্বাস করেছিলেন। সাইয়িদ আহম্মদ এবং হেনরি বেভারেজ পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, এটি মূলতঃ ইউরোপীয় শিল্পীদের কাজ ছিলো, সম্ভবতঃ রূপান্তর করা হয়েছিলো। এটি যেখান থেকেই আসুক না কেন, যাই প্রতিনিধিত্ব করুক না কেন, এটা স্পষ্ট যে, ইউরোপীয় শৈলী মোগল শিল্পকে প্রভাবিত করেছিলো। অন্যথায় কৃতদাস এটিকে নিজের কাজ বলে দাবি করত না এবং জাহাঙ্গীরও তা বিশ্বাস করতেন না।
শিল্প ও স্থাপত্য– জাহাঙ্গীর শিল্প ও স্থাপত্য শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মজীবনী জাহাঙ্গীর নামায় তাঁর রাজত্বকালে ঘটে যাওয়া ঘটনা, সম্মুখীন হওয়া উদ্ভিদ এবং প্রাণীর বর্ণনা এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য দিক লিপিবদ্ধ করেছেন। ওস্তাদ মনসুরের মতো দরবারি চিত্রশিল্পীকে জাহাঙ্গীর নামায় লিপিবদ্ধ বিশেষ ঘটনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চিত্র অংকন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, ১৬১৯ সালে তিনি ইরানের শাসকের কাছ থেকে একটি বাজপাখি উপহার পেয়েছিলেন। তিনি বাজপাখিটির বিষয়ে লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন, এই পাখীটির রঙের সৌন্দর্য সম্পর্কে আমি কী লিখব? এটিতে কালো কালো দাগ ছিলো, ডানা, পেছনে এবং পাশের প্রতিটি পালক ছিলো অত্যন্ত সুন্দর। পাখীটি মৃত্যুর পরে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে পাখীটির একটি প্রতিকৃতি অঙ্কন করেছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর শিল্পকে সংরক্ষণ করেছিলেন এবং সেগুলো প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি শত শত ছবি বিস্তৃত অ্যালবামে সংরক্ষণ করেছিলেন। প্রাণীবিদ্যার মতো বিষয়কে ঘিরেও তিনি অ্যালবাম সংগঠিত করেছিলেন।
জাহাঙ্গীর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তিনি যেকোনো চিত্রকর্ম দেখে তার চিত্রশিল্পী নির্ধারণ করতে পারতেন। তিনি বলেছেনঃ চিত্রকলার প্রতি আমার ভালো লাগা এবং তার বিচার করার ক্ষেত্রে আমার অনুশীলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যখন কোনো মৃত বা জীবিত শিল্পীর নাম না জানিয়ে তাঁর কাজগুলো আমার সামনে আনা হয়, তাহলে আমি বলে দিতে পারি কাজটি কোন শিল্পীর। যদি অনেকগুলি প্রতিকৃতি সম্বলিত একটি ছবি থাকে এবং প্রতিটি মুখই আলাদা শিল্পীর আঁকা হয়, আমি তাঁদের প্রত্যেকের অঙ্কিত মুখ আলাদাভাবে চিনাক্ত করতে পারি। যদি কেউও মুখের চোখ এবং ভ্রূ অঙ্কন করে তখনও আমি বুঝতে পারি আসল মুখটি কার কাজ এবং কে চোখ ও ভ্রূ এঁকেছেন।
জাহাঙ্গীর চিত্রকলাকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলেন। তিনি আকবরের সময়ের চিত্রকর্মও সংরক্ষণ করেছিলেন। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো, কিংবদন্তি তানসেনের জামাতা সঙ্গীতশিল্পী নওবত খানের ওস্তাদ মনসুর খান আঁকা চিত্রকর্ম। চিত্রকর্মের নান্দনিক গুণাবলী ছাড়াও জাহাঙ্গীরের শাসনামলে তৈরি চিত্রগুলি তারিখ এবং স্বাক্ষর সহ ঘনিষ্টভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিলো। যা থেকে পণ্ডিত ব্যক্তিরা মোটামুটি অনুমান করতে পারেন যে, কখন এবং কোন প্রসঙ্গে চিত্রগুলি তৈরি করা হয়েছিলো।
ডব্লিউ, এম, থ্যাকস্টনের জাহাঙ্গীরনামার অনুবাদের মুখপাত্র মিলো ক্লিভল্যাণ্ড বিচ ব্যাখ্যা করেছেন যে, জাহাঙ্গীর সাম্রাজ্যের বেশ স্থিতিশীল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সময়ে শাসনে এসেছিলেন। শিল্পীদের তাঁর আত্মজীবনীর সাথে সামঞ্জস্য থাকা চিত্র অঙ্কনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো। তিনি তাঁর সম্পদ এবং তাঁর বিলাসিতা অবসর সময়কে মোগল সাম্রাজ্যকে ঘিরে থাকা জমকালো প্রাকৃতিক জগতকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করতে ব্যবহার করেছেন। তিনি মাঝে মাঝে এই উদ্দেশ্যে তাঁর সাথে চিত্রশিল্পীদের নিয়ে ভ্রমণ করতেন। তিনি যখন রহিমাবাদে ছিলেন, তখন নির্দিষ্ট একটি বাঘের প্রতিকৃতি অঙ্কন করার জন্য তিনি তাঁর চিত্রশিল্পীদের সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাঘটিকে তিনি গুলি করে মেরেছিলেন। কারণ তিনি বাঘটিকে বিশেষ সুন্দর বলে মনে করেছিলেন।
জেসুইটসরা তাঁদের সাথে বিভিন্ন বই, খোদাই করা শিল্পকর্ম এবং চিত্রকর্ম নিয়ে এসেছিলেন। আকবর সেগুলি দেখে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। তখন মোগলদের দেওয়ার জন্য আরও বেশি করে চিত্রকর্ম এবং চিত্রশিল্প প্রেরণ করেছিলেন। আকবর এবং জাহাঙ্গীর সেই চিত্রকর্মগুলি খুব ঘনিষ্টভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং তার প্রতিলিপি প্রস্তুত এবং অভিযোজিত করেছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর দরবারের চিত্রশিল্পীদের দক্ষতার জন্য গর্ব করার মতো উল্লেখযোগ্য ছিলেন। স্যার টমাস রো’র ডায়েরীতে এ বিষয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ বর্ণনা করেছেন, সম্রাট তাঁর চিত্রশিল্পীদের দিয়ে একটি ইউরোপীয় মিনিয়েচার কপি করে মোট পাঁচটি মিনিয়েচার(ক্ষুদ্র আকৃতির চিত্র) তৈরি করিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর তখন রো’কে মিনিয়েচার গুলি থেকে আসলটি বাছাই করার জন্য প্রত্যাহ্বান জানিয়েছিলেন। অবশ্যে জাহাঙ্গীরের আনন্দের জন্য রো’ আসলটি বাছাই করেন নি।
জাহাঙ্গীর ইউরোপীয় শৈলীর অভিযোজনের জন্যও বিখ্যাত ছিলেন। লণ্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে জাহাঙ্গীরের সময়ের ভারতীয় প্রতিকৃতির ৭৪ টি চিত্র রয়েছে। সেই টিত্রগুলির মধে J জাহাঙ্গীরের প্রতিকৃতিও রয়েছে। এই প্রতিকৃতিগুলি জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের চিত্রশিল্পের অনন্য উদাহরণ। জাহাঙ্গীরের সময়ে প্রতিকৃতিগুলির কাঁধ ও মাথাগুলি সম্পূর্ণ অঙ্কন করা ছিলো না।
সমালোচনা– জাহাঙ্গীরকে একজন দুর্বল এবং অসফল শাসক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী ‘তুজক-ই-জাহাঙ্গীরি’র সম্পাদক প্রাচ্যবিদ হেনরি বেভারিজ জাহাঙ্গীরকে রোমান সম্রাট ক্লাডিয়াসের সাথে তুলনা করেছেন। কারণ উভয়েই দুর্বল শাসক ছিলেন এবং শাসক হিসাবে তাঁরা ভুল জায়গায় ছিলেন। জাহাঙ্গীর প্রাকৃতিক ইতিহাসের জাদুগরের প্রধান হলে আরও সুখী মানুষ হতে পারতেন বলে হেনরি বেভারিজ বিশ্বাস করতেন। স্যার উইলিয়াম হকিন্স ১৬০৯ সালে জাহাঙ্গীরের দরবারে এসেছিলেন। জাহাঙ্গীরের পিতা দাক্ষিণাত্যেরও বাদশাহ ছিলেন এবং সেলিম শাহ তা হারাতে শুরু করেছিলেন। ইটালীয় লেখক ও ভ্রমণকারী নিকোলাও মানুচ্চি জাহাঙ্গীরের নাতি দারা শিকোহের অধীনে কাজ করেছিলেন। জাহাঙ্গীর সম্পর্কে তিনি তাঁর আলোচনা শুরু করেছিলেন এইভাবে, এটি অভিজ্ঞতা দ্বারা পরীক্ষিত সত্য যে, পিতারা কপালের ঘাম ফেলে যা অর্জন করে, পুত্রেরা তা নষ্ট করে দেয়।
জন রিচার্ডের মতে, মদ এবং আফিমের প্রতি যথেষ্ট আসক্তির জন্য জাহাঙ্গীরের জীবনের ক্ষেত্রে ঘন ঘন মত পরিবর্তন তাঁর অলসতার প্রতিফলন ছিলো।
জাহাঙ্গীরের পুত্রসন্তান
খসরু মির্জা– জন্ম ১৫৮৬ সালের ১৬ আগস্ট এবং মৃত্যু ১৬২২ সালের ২৬ জানুয়ারি। মাতৃ অম্বরের রজা ভগবন্ত দাসের কন্যা শাহ বেগম ৷
পারভেজ মির্জা– জন্ম ১৫৮৯ সালের ৩১ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৬২৬ সালের ২৮ অক্টোবর। মাতৃ খাজা হাসানের কন্যা জামাল বেগম ।
মহম্মদ খুররম– জন্ম ১৫৯২ সালের ৫ জানুয়ারি এবং মৃত্যু ১৬৬৬ সালের ২২ জানুয়ারি। মাতৃ মাওয়ারের উদয় সিংয়ের কন্যা মাকানি বেগম। পরবৰ্তী ভারত সম্ৰাট।
জাহাঙ্গীর মির্জা– জন্ম ১৬০৫ সালে। একজন উপপত্নীর সন্তান ।
শাহরিয়ার মির্জা– জন্ম ১৬০৫ সালের ১৬ জানুয়ারি এবং মৃত্যু ১৬২৮ সালের ২৩ জানুয়ারি। একজন উপপত্নীর সন্তান।
কন্যাসন্তান
সুলতান–উন–নিসা বেগম– জন্ম ১৫৮৬ সালের ২৫ এপ্রিল এবং মৃত্যু ১৬৪৬ সালের ৫ সেপ্তেম্বর। অম্বরের রাজা ভগবন্ত দাসের কন্যা শাহ বেগম-এর কন্যা।
ইফফাত বানু বেগম– জন্ম ১৫৮৯ সালের ৬ এপ্রিল। কাশঘরের সৈয়দ খান জগততায়ের কন্যা মালেকা শিকার বেগমের কন্যা।
দৌলত–উন–নিসা বেগম– জন্ম ১৫৮৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর। রাজা দরিয়া মালভাসের কন্যার সন্তান।
বাহার বানু বেগম– জন্ম ১৫৯০ সালের ৯ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৬৫৩ সালের ৮ সেপ্তেম্বর। মের্তার কেশব দাস রাঠোরের কন্যা করমসি বেগমের কন্যা।
বেগম সুলতান বেগম– জন্ম ১৫৯০ সালের ৯ অক্টোবর। মাওয়ারের উদয় সিংয়ের কন্যা মাকানি বেগমের কন্যা।
একটি কন্যা– জন্ম ১৫৯১ সালের ২১ জানুয়ারি। খাজা হাসানের কন্যা সাহেব জামাল বেগমের কন্যা।
একটি কন্যা– জন্ম ১৫৯৪ সালের ১৪ অক্টোবর। খাজা হাসানের কন্যা সাহেব জামাল বেগমের কন্যা। একটি কন্যা- জন্ম ১৫৯৪ সালের জানুয়ারি। আবদুল্যাহ খান বালুচের কন্যার সন্তান।
একটি কন্যা– জন্ম- ১৫৯৫ সালের ২৮ আগস্ট। ইব্রাহীম হোসেন মির্জার কন্যা নূর-উন-নিসার সন্তান। লুজ্জাত-উন-নিসা বেগম- জন্ম ১৫৯৭ সালের ২৩ সেপ্তেম্বর। মাওয়ারের উদয় সিংয়ের কন্যা মাকানি বেগমের কন্যা।
চলচ্চিত্র টিভি ধারাবাহিকে জাহাঙ্গীর
পুকার– ১৯৩৯ সালে নির্মিত হিন্দী চলচ্চিত্র। জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন চন্দ্রমোহন।
আনারকলি– ১৯৫৩ সালে নির্মিত হিন্দী চলচ্চিত্র। জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রদীপ কুমার । আনারকলি- ১৯৫৫ সালে নির্মিত তেলেগু চলচ্চিত্র। জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এএনআর।
মুঘল–ই–আজম– ১৯৬০ সালে নির্মিত হিন্দী চলচ্চিত্র। জাহাঙ্গীরের ছেলেবেলার চরিত্রে জালাল আগা এবং যুবক সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দিলীপ কুমার ।
আনারকলি– ১৯৬৬ সালে নির্মিত মালয়ালম চলচ্চিত্র। সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রেম নাজির।
আকবর সেলিম আনারকলি – ১৯৭৯ সালে নির্মিত তেলেগু চলচ্চিত্র। সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বালাকৃষ্ণ।
ভারত এক খোঁজ-১৯৮৮ সালে শ্যাম বেনেগ্যাল নির্মিত টিভি ধারাবাহিক। সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বিজয় আরোরা?
জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা–জাহাঙ্গীরের হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণমুদ্রা– সত্যজিৎ রায় পরিচালিত গোয়েন্দা গল্পে জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফেলুদা। ১৯৯৮ সালে গল্পটি টিভি চলচ্চিত্র হিসাবেও অভিযোজিত হয়েছিলো।
২০০০ সালে নির্মিত টিভি ধারাবহিক নূরজাহান-এ জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মিলিন্দ সুমন।
২০১৩ সালে নির্মিত টিভি ধারাবাহিক যোধা আকবর–এ সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আয়েন জুবায়ের রাহমানি এবং রবি ভাটিয়া।
২০১৪ সালে নির্মিত ইন্দু সুদারসেনের টিভি ধারাবাহিক ‘সিয়াসত’-এ অভিনয় করেছিলেন করণবীর শর্মা এবং সুধাংশু পাণ্ডে।
২০১৪ সালে নির্মিত টিভি সিটকম(একটি চরিত্রের উপর নির্ভর) ‘আকবর কা বাল বীরবল‘-এ সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পবন সিং।
২০১৮ সালের কালার টিভির ধারাবাহিক ‘দাস্তান–ই–মহব্বত সেলিম আনারকলি‘তে সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শাহির শেখ।
সাহিত্যে জাহাঙ্গীর–
দ্য টুয়েনটিথ ওয়াইভস– ইন্দু সুদারসেনের ২০০২ সালে রচিত পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাসে একটি প্রধান চরিত্রে
জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
সিকুয়্যাল দ্য ফিস্ট অফ রোজেস– ইন্দু সুদারসেনের ২০০৩ সালে রচিত পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্রে জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
রুলার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড– ২০১১ সালে রচিত অ্যালেক্স রাদার ফোর্ডের উপন্যাসে একটি চরিত্রে জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
সিকুয়্যাল অফ দ্য টেন্টেড থ্রোন– ২০১২ সালে অ্যালেক্স রাদার ফোর্ড রচিত এম্পায়ার অফ দ্য মোগল সিরিজের একটি প্রধান চরিত্রে ছিলেন জাহাঙ্গীর।
নূর জাহানস ডটার– ২০০৫ সালে তনুশ্রী পোদ্দার রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাসের জাহাঙ্গীর একটি চরিত্রে ছিলেন।
প্রিয় সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল– নিনা কনসেয়েলো এপটন রচিত একটি ঐতিহাসিক উপন্যাসে জাহাঙ্গীর একটি চরিত্রে রয়েছেন।
নূর জাহান– জ্যোতি জাফার রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্রে জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
তাজ, এ স্টোরি অফ মোগল ইণ্ডিয়া– টাইমেরি মুরারি রচিত উপন্যাসে জাহাঙ্গীর একটি চরিত্রে রয়েছেন।
শাহরিয়ার মির্জা
সালেফ-উদ-দীন মহম্মদ শাহরিয়ার মির্জার জন্ম ১৬০৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মোগল সাম্রাজ্যের আগ্রায়। তিনি শাহরিয়ার মির্জা নাম পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম জাহাঙ্গীর এবং মাতৃর নাম জগত গোসাঁই। তিনি মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের পঞ্চম এবং কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর প্রভাবশালী এবং শক্তিশালী সৎ মা নূরজাহানের সহায়তায় সম্রাট হওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। নূর জাহান তাঁর শাশুড়িও ছিলেন। উত্তরাধিকারের যুদ্ধের সময় শাহরিয়ার ১৬২৭ সালের ৭ নভেম্বরে লাহোরে নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং ১৬২৮ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সম্রাট হিসাবে রাজকার্য পরিচালনা করেছিলেন। উত্তরাধিকারের যুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন এবং তাঁর সৎভ্রাতা খুররম(শাহ জাহান) এর নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো। শাহরিয়ার পঞ্চম মোগল সম্রাট হতেন, যদিও তাঁকে সম্রাট হিসাবে গণনা করা হয় না ।
প্রারম্ভিক জীবন– জাহাঙ্গীরের রাজত্বের ১৬তম বছরে শাহরিয়ার মির্জা শের আফগানের পক্ষের তাঁর সৎ মাতৃ নূর জাহানের কন্যা লাডলি বেগম-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। শাহরিয়ার এবং লাডলি বেগমের আরজানি বেগম নামক একটি কন্যা সন্তান ছিলেন।
শাহজাদা খুররম ধোলপুর পরগণা এবং দূর্গ নিজের জন্য জাহাঙ্গীরের কাছে দাবি করেছিলেন। তবে, নূর জাহানের অনুরোধে জাহাঙ্গীর উক্ত পরগণা ও দূর্গ শাহরিয়ারকে প্রদান করেছিলেন। শাহরিয়ারের সৎ মাতৃ তথা শাশুড়ি নূর জাহান শরিফ-উল-মুলকে ধোলপুর পরগণা এবং দূর্গ-এর ভারপ্রাপ্ত শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। শাহরিয়ারকে ১৬২৫ সালের ১৩ অক্টোবর-এ ঠাট্টার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিলেন। শরিফ-উল-মুলক শাহরিয়ারের ডেপুটি হিসাবে প্রশাসন পরিচালনা করেছিলেন।
সিংহাসনে আরোহণ– ১৬২৭ সালের ২৮ শে অক্টোবর সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর শাহরিয়ার মির্জা নূর জাহানের ইচ্ছানুসারে মাত্র তিন মাসের জন্য মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনি তখন লাহোরে ছিলেন এবং তিনি রাজকীয় কোষাগার দখল করেছিলেন। সিংহাসন সুরক্ষিত করার জন্য তিনি অভিজাতদের মধ্যে ৭০ লক্ষ টাকা বিতরণ করেছিলেন। সম্রাটের মৃত্যুর পর শাহজাদা দানিয়াল মির্জার পুত্র মির্জা বাইসিঙঘর লাহোরে পালিয়ে গিয়ে শাহরিয়ারের সাথে যোগদান করেছিলেন।
এদিকে আসফ খান(মমতাজ মহলের পিতা) তাঁর জামাতা খুররমকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন। ফলে শাহরিয়ার মির্জা এবং আসফ খান বাহিনীর মধ্যে লাহোরের নিকটে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিলো। শাহরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে পরের দিন তাঁকে বন্দি করে দাওয়ারের নিকট হাজির করা হয়েছিলো। কারণ সিংহাসনের শূন্যস্থান পূরণের জন্য আসফ খান ইতিমধ্যে শাহ জাহানের স্থলে সাময়িকভাবে দাওয়ারকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। দুই থেকে তিন দিন পর আসফ খান শাহরিয়ারকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন। এভাবেই তাঁর সংক্ষিপ্ত রাজত্বের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটেছিলো। বলা হয় যে, শাহরিয়ার কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার ফলে তিনি চোখের ভ্রূ এবং মাথার সমস্ত চুল হারিয়েছিলেন।
সমস্ত মোগল শাহজাদাদের মতো শাহরিয়ারও কবিতা রচনা করা শিখেছিলেন। অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি জীবনের শেষপ্রান্তে ‘বি গু কুর দিদাহ-ই-আফতাব’ নামে একটি মর্মস্পর্শী শায়েরি রচনা করেছিলেন।
মৃত্যু– শাহ জাহান ১৬২৮ সালে লাহোরে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। ১৬২৮ সালের ২৩ জানুয়ারি দাওয়ার, তাঁর ভ্রাতা গারশাপ এবং শাহরিয়ার মির্জা মৃত শাহজাদা দানিয়ালের পুত্র তাহমুরাস এবং হোসাং আসফ খানের হাতে নিহত হয়েছিলেন।
শেষ পরিণতি- শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর শাহ জাহান আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দি না হওয়া পর্যন্ত ৩০ বছর রাজত্ব করেছিলেন। আসফ খানকে মোগল সাম্রাজ্যের উজির-এ-আজম নিযুক্ত করেছিলেন এবং নূর জাহানকে বার্ষিক দুই লাখ টাকা পেনশন প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। নূর জাহান বাকি দিনগুলি লাহোর দূর্গে তাঁর মেয়ে অর্থাৎ শাহরিয়ারের বিধবা স্ত্রী লাডলি বেগ-এর সাথে বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। •
শাহ জাহান
সাহাব-উদ-দীন মহম্মদ খুররমের জন্ম ১৫৯২ সালের ৫ জনুয়ারি মোগল সাম্রাজ্যের লাহোর দুর্গে। খুররম নামটি তাঁর পিতামহ আকবর রেখেছিলেন। লাহোর বর্তমান পাকিস্থানে অবস্থিত। তাঁর পিতৃর নাম জাহাঙ্গীর এবং মাতৃর নাম জগত গোসাঁই। জগত গোসাঁই মারওয়ারের রাজপুত রাজা উদয় সিং রাঠোরের কন্যা ছিলেন। শাহ জাহান ভারতের পঞ্চম মোগল সম্রাট ছিলেন এবং ১৬২৮ সাল থেকে ১৬৫৮ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। ইতিহাসবিদ জে, এল, মেহতা লিখেছেন, শাহ জাহানের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য গৌরবের উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলো। স্থাপত্য শিল্পের জন্য শাহ জাহান বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য স্থাপত্যের স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিলো। শাহ জাহান অনেকগুলি কীর্তিস্তম্ভ নির্মাণ করিয়েছিলেন। তার মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ছিলো আগ্রার তাজমহল। তাজমহলে তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মমতাজ মহলকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। তাজমহল ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রে ব্যাপকভাবে অভিযোজিত হয়েছে। শাহ জাহান রাজকীয় কোষাগার এবং কহিনূরের মতো অনেক মূল্যবান পাথরের মালিক ছিলেন। তাঁকে ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
১৬২৭ সালের শেষের দিকে শাহ জাহানের পিতা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর সৎ ভ্রাতা শাহরিয়ার এবং তাঁর মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিলো। সেই সংঘর্ষে শাহ জাহান বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৬২৮ সালের ১৯ জানুয়ারি সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি শাহ জাহান(বিশ্বের সম্রাট) উপাধি ধারণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি সিংহাসনের সাম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে লালকেল্লা, শাহ জাহান মসজিদ সহ অনেক বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প দেখা যায়। বৈদেশিক বিষয়গুলির মধ্যে সাফাভিদদের সাথে যুদ্ধ, দাক্ষিণাত্যের শিয়া সুলতানাতের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান, পর্তুগীজদের সাথে বিরোধ এবং অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক রেখেছিলেন। অভ্যন্তরীন উদ্বেগের মধ্যে ছিলো অসংখ্য বিদ্রোহ এবং ১৬৩০-৩২ সালে সংঘটিত বিধ্বংসী দুর্ভিক্ষ।
১৬৫৭ সালের সেপ্তেম্বরে শাহ জাহান গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এই সময়ে তাঁর চার পুত্রের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিলো। সেই সংঘর্ষে বিজয়ী হয়ে তাঁর তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। শাহ জাহান রোগমুক্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠার পরে আওরঙ্গজেব তাঁর পিতাকে ১৬৫৮ সালের জুলাই থেকে ১৬৬৬ সালের জানুয়ারি অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আগ্রা দূর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধির পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। আকবর কর্তৃক প্রচলিত উদারনীতিগুলি দূর করার জন্য শাহ জাহান-এর রাজত্বকাল পরিচিত। তিনি একজন গোঁড়া মুসলিম ছিলেন।
সম্রাট আকবর নিজ পুত্র সেলিমের চেয়ে নাতি খুররমকে অধিক পসন্দ করতেন। সেজন্য খুররম আকবরের স্ত্রী রুকাইয়া সুলতানা বেগমের দায়িত্বে লালিতপালিত হয়েছিলেন। রুকাইয়া সুলতানা বেগম খুব যত্নের সাথে খুররমকে লালনপালন করেছিলেন বলে জানা যায়। জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন যে, রুকাইয়া সুলতানা তাঁর ছেলে খুররমকে খুব স্নেহ করতেন। ১৬০৫ সালে তাঁর পিতা আকবরের মৃত্যুর পর শাহ জাহান তাঁর মাতৃ জগত গোসাঁইর কাছে ফিরে গিয়েছিলেন এবং তিনি তাঁর মাতৃর খুব সেবাযত্ন করতেন এবং অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
শাহ জাহান তাঁর মাতৃর প্রতি এতই অনুগত ছিলেন যে, আদালতের ইতিহাসে তিনি তাঁর মাকে হজরত বলে সম্বোধন করতেন। ১৬১৯ সালের ৮ এপ্রিল আকবরাবাদে তাঁর মাতৃ জগত গোসাঁইর মৃত্যু হয়েছিলো। তাঁর মাতৃর মৃত্যুর পর তিনি ২১ দিন শোকব্রত পালন করেছিলেন বলে রেকর্ড করা হয়েছিলো। শোকব্রতের সময়ে তিনি ২১ দিন কোনো জনসভায় অংশগ্রহণ করেননি এবং নিরামিষ ভোজন করতেন। তাঁর সহধর্মিনী মমতাজ মহল এই শোকব্রত পালনের সময়ে দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করতেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে ব্যক্তিগতভাবে তা তদারকি করতেন। মমতাজ মহল প্রতিদিন সকালে কোরআন তেলাওত করতেন। তাঁর স্বামীকে জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে অনেক শিক্ষা প্রদান করতেন এবং দুঃখ না করার জন্য অনুরোধ করতেন।
শিক্ষা– খুররম শৈশবে একজন শাহজাদা হিসাবে তাঁর মর্যদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁর শিক্ষার মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক শিল্প, যেমন, কবিতা এবং সঙ্গীত অন্তর্ভূক্ত ছিলো। যার বেশির ভাগই আকবরের দরবারের ইতিহাসবিদদের মত অনুযায়ী অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কাজভিনির মতে, শাহজাদা খুররম শুধুমাত্র কয়েকটি তুর্কি শব্দের সাথে পরিচিত ছিলেন এবং শৈশবে ভাষা অধ্যয়নের প্রতি তিনি খুব কমই আগ্রহ দেখাতেন। তিনি সম্রাট আকবরের প্রতি খুব অনুরুক্ত ছিলেন। ১৬০৫ সালে আকবর যখন মৃত্যু শয্যায় শায়িত ছিলেন তখন খুররম আকবরের পাশেই ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিলো মাত্র তের বছর। তাঁর মাতৃ তাঁকে আকবরের শয্যার পাশ থেকে সড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে, তিনি শয্যার পাশ থেকে উঠে যেতে অস্বীকার করেছিলেন। আকবরের মৃত্যুর অব্যবহতি কাল পূর্বে রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে খুররম তাঁর পিতার রাজনৈতিক বিরোধীদের কাছ থেকে যথেষ্ট পরিমাণে শারীরিক বিপদের মধ্যে ছিলেন। শেষপর্যন্ত আকবরের স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়াতে তাঁকে তাঁর পিতামহের বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা মাতামহী সালিমা সুলতানা এবং মরিয়ম-উজ-জামানি তাঁকে তাঁর প্রাসাদে ফিরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।
খসরুর বিদ্রোহ– ১৬০৫ সালে শাহ জাহানের পিতা জাহাঙ্গীর সিংহাসনে আরোহণের পর জ্যেষ্ঠপুত্র খসরুর বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর সেই বিদ্রোহ দমন করে আংশিকভাবে অন্ধ করে খসরুকে কারাগারে বন্দি করে রেখেছিলেন। এই ঘটনার পরে শাহ জাহান আদালতের রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্র থেকে সরে আসার জন্য রুকাইয়া সুলতনার তত্ত্বাবধান থেকে তাঁর মাতৃ জগত গোসাঁইর নিকটে চলে এসেছিলেন। জাহাঙ্গীরের তৃতীয় পুত্র হিসাবে সেই সময়ের দুই প্রধান শক্তি, তাঁর পিতা এবং সৎ ভ্রাতৃর বিরুদ্ধে খুররম কোনো প্রত্যাহ্বান গ্রহণ করেননি। তিনি তাঁর শিক্ষা এবং সামরিক প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একজন শাহজাদা হিসাবে প্রাপ্য সুরক্ষা এবং সকল প্রকার বিলাসিতা উপভোগ করছিলেন। তাঁর জীবনের এই শান্ত এবং স্থিতিশীল সময় তাঁকে মোগল দরবারের সমর্থন আদায় করার জন্য ভিত্তি তৈরি করতে সহায় করেছিলেন। যা পরবর্তী জীবনে তিনি কাজে লাগিয়ে ছিলেন।
নূর জাহানকে গৃহবন্দি– পিতৃ জাহাঙ্গীর এবং তাঁর সৎ ভ্রাতৃ খসরুর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য খুররম তাঁর পিতার কাছাকাছি আসতে শুরু করেছিলেন এবং সময়ের সাথে সাথে দরবারিদের দ্বারা সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসাবে বিবেচিত হতে শুরু করেছিলেন। ১৬০৮ সালে তাঁকে ঐতিহ্যগতভাবে উত্তরাধিকারীর জামাত হিসাবে বিবেচিত হিসার-ফিরোজা সুবাহের কর্তৃত্ব সরকারীভাবে প্রদান করা হয়েছিলো। শাহ জাহানের সৎ মাতৃ নূর জাহান একজন বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী মিহলা ছিলেন। নূর জাহানের শিক্ষাগত পটভূমি ছিলো চমৎকার। জাহাঙ্গীরের সিদ্ধান্তে নূর জাহান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। জাহাঙ্গীর যখন মদ এবং আফিমের প্রতি অধিক অনুরুক্ত হয়ে পড়েছিলেন, নূর জাহান তখন ধীরে ধীরে সিংহাসনের পেছনের প্রকৃত শক্তি হয়ে উঠেছিলেন। মূদ্রায় জাহাঙ্গীরের নামের সাথে তাঁর নামও মুদ্রিত করতে শুরু করেছিলেন। নূর জাহান নিজের আত্মীয়দের মোগল দরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা শুরু করেছিলেন। ঐতিহাসিকরা সেই দরবারিদের নূর জাহান জান্তা বলে অভিহিত করছিলেন। ১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর আসফ খান নূর জাহানকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত নূর জাহান গৃহবন্দি হিসাবেই ছিলেন।
বিবাহ–
কান্দাহারী বেগম– শাহ জাহান প্রথম বিয়ে করেছিলেন পারস্যের শাহ ইসমাইল-প্রথমের প্রপৌত্র সুলতান মুজাফফর হোসেইন মির্জা সাফাভির কন্যা কান্দাহারী বেগমকে। বিয়েটি ১৬১০ সালের ৮ নভেম্বরে আগ্রায় অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তাঁদের ১৬১১ সালের ২১ আগষ্ট একটি কন্যা সন্তান জন্ম হয়েছিলো। কন্যা সন্তানটির নাম ছিলো পারভেজ বানু বেগম।
মমতাজ মহল– ১৬০৭ সালে শাহ জাহান এবং আরজুমন্দ বানু বেগমের বিয়ের বাকদান করা হয়েছিলো। আরজুমন্দ বানু বেগম মমতাজ মহল নামেও পরিচিত ছিলেন। তখন শাহ জাহানের বয়স ১৫ এবং মমতাজ মহলের বয়স চৌদ্দ বছর ছিলো। মমতাজ মহল পারস্যের বিশিষ্ট অভিজাত পরিবারের কন্যা ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা আকবরের রাজত্বকাল থেকে মোগল দরবারে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের পিতৃপুরুষ ছিলেন মির্জা গিয়াস বেগ। তিনি ইতিমাদ-উদ-দৌলা (রাষ্ট্রের স্তম্ভ)নামেও পরিচিত ছিলেন। মির্জা গিয়াস বেগ জাহাঙ্গীরের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর ছেলে আসফ খান, মমতাজ মহলের পিতা, মোগল দরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি পরে উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। মেহের-উন-নিসা (নূর জহান)মমতাজ মহলের পিসি ছিলেন।
সুখী বৈবাহিক জীবনের জন্য বাকদানের পাঁচ বছর পরে দরবারের জ্যোতিষী কর্তৃক নির্বাচিত তারিখে অর্থাৎ ১৬১২ সালে বিবাহটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেই সময়ের জন্য বিবাহটি অত্যন্ত বিলম্বিত বিবাহ ছিলো। বিয়ের পর তাঁকে মমতাজ মহল (প্রাসাদের আলো)উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। বিয়েটা সুখের ছিলো এবং মমতাজ মহল শাহ জাহানের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। মমতাজ মহল চৌদ্দটি সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। যার মধ্যে সাতটি সন্তান প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে উঠেছিলেন।
আরজুমন্দ বানু বেগম একজন রাজনৈতিক বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। তিনি তাঁর স্বামীর একজন বিশ্বস্ত উপদেষ্টা ছিলেন। পরবর্তী জীবনে সম্রাজ্ঞী হিসাবে তিনি বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন। যেমন রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তাঁর স্বামীকে পরামর্শ প্রদান, রাজকীয় সীলমোহরের দায়িত্ব, সরকারী নথিপত্রের চূড়ান্ত খসড়ার পর্যালোচনা করার জন্য তাঁকে অনুমতি প্রদান করা হয়েছিলো।
গওহর আরা বেগমের জন্মের পরে প্রসবোত্তর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ৩৮ বছর বয়সে ১৬৩১ সালের ৭ জুন- এ দাক্ষিণাত্যের বুরহানপুরে মমতাজ মহল মৃত্যু বরণ করেছিলেন। ত্রিশ ঘণ্টার বেদনাদায়ক প্রসবের পর যথেষ্ট রক্তক্ষরণ হয়েছিলো। সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেন যে, ১৭ বছর বয়সী শাহজাদী জাহানারা মাতৃর ব্যথায় এতটাই ব্যথিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি দৈব হস্তক্ষেপের আশায় দরিদ্রদের মধ্যে রত্ন বিতরণ করেছিলেন। শাহ জাহান কাঁদতে কাঁদতে অচেতন হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর মৃতদেহ জয়নাবাদ নামে পরিচিত একটি প্রাচীর ঘেরা উদ্যানে সাময়িকভাবে সমাহিত করা হয়েছিলো। উদ্যানটি শাহ জাহানের চাচা দানিয়াল তাপ্তি নদীর তীরে নির্মাণ করেছিলেন। মমতাজ মহলের মৃত্যু শাহ জাহানের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলো এবং তিনি তাজমহল নির্মাণের জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মমতাজ মহলের মৃতদেহ পরে জয়নাবাদ থেকে স্থানান্তর করে তাজমহলে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
ইজ–উজ–নিসা বেগম– ১৬১৭ সালের ২ অক্টোবর-এ শাহ জাহান বুরহানপুরে ইজ-উজ-নিসা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ইজ-উজ-নিসা বেগম আকবরবাদী মহল নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে সিরহিন্দি বেগম নামেও উল্লেখ করা হতো। তাঁর পিতার নাম ছিলেন মির্জা ইরাজ। মির্জা ইরাজকে শাহনওয়াজ নামেও জানা যেতো। ইজ- উজ-নিসা বেগমের একমাত্র পুত্র সন্তান ছিলেন সুলতান জাহান আফ্ৰোজ মির্জা। ইতিহাসবিদ ইনায়েত খানের মতে, মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর ইজ-উজ-নিসা বেগম শাহ জাহানের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠেছিলেন।
লীলাবতী বাই– খুররম তাঁর মামাতো বোন লীলাবতী বাইকেও বিয়ে করেছিলেন বলেও তথ্য রয়েছে। লীলাবতী বাই খানওয়ারের সাকাত সিং রাঠোরের কন্যা ছিলেন। জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সময় এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
অজাচারের অভিযোগ– ফ্রাঙ্কোইস বার্নিয়ার একজন ফরাসি চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ১৬৫৯ সাল থেকে ১৬৬৮ সাল পর্যন্ত ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। জাহানারার সাথে শাহ জাহানের অজাচারের সম্পর্ক ছিলো বলে একটি গুজব ছিলো। ডে লেয়েট, পিটার মুণ্ডি এবং টাভেনিয়ার দ্বারাও অনুরূপ অভিযোগ করা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ইতিহাসবিদ ভিনসেন্ট স্মিথও একই যুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসবিদ বি,পি, সাক্সেনা এই ধরণের দাবির কোনো সমর্থন নেই বলে দাবি করেছেন। ফ্রাঙ্কোইস বার্নিয়ারের সমসাময়িক নিকোলাও মানুচ্চি এই অজাচারের সম্পর্ক প্রত্যাখান করে বলেছেন- শাহ জাহান যাতে জাহানারার বিয়ের আবেদন মেনে নেন তার জন্য জাহানারা অত্যন্ত আন্তরিকতা এবং ভালোবাসার সাথে তিনি তাঁর পিতার সেবা করেছিলেন। এই কারণেই সাধারণ মানুষ অনুমান করেছিলো যে, তিনি তাঁর পিতার সাথে সহবাস করেছিলেন। সাধারণ মানুষের এই অনুমানের উপর ভিত্তি করেই শাহজাদী জাহানারা সম্পর্কে ফ্রাঙ্কোইস বার্নিয়ার অনেক কিছু লিখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এগুলি আসলে নিচু মানসিকতার মানুষের আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।
মানুচ্চি আরও বলেছেন- বার্নিয়ার যা লিখেছেন, তা অসত্য। ইতিহাসবিদ কে, এস, লাল দাবি করেছেন, গুজবটি দরবারিদের বিদ্বেষ এবং মোল্লাদের রায় দ্বারা ছড়ানো হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব জাহানারাকে রাজকীয় বন্দিদের সাথে আগ্রা দুর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন, এগুলো নিচু মানুষের কথা। নিম্নে প্রদত্ত পরিস্থিতি একটি গুজবকে পূর্ণাঙ্গ কেলেঙ্কারীতে পরিণত করার ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেব জড়িত থাকার ইঙ্গিত বহন করে। প্রথম থেকেই দারা শিকোহের সাথে আওরঙ্গজেবের সম্পর্ক ভালো ছিলো না এবং জাহানারা দারার সমর্থক ছিলেন। উত্তরাধিকারের যুদ্ধের সময় দুই শাহজাদার সমর্থনে অভিজাত ও দরবারিরা দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে তাঁর সমর্থকদের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিলো। মোল্লারা আওরঙ্গজেবের পক্ষে ছিলেন। মোল্লাদের রায় দ্বারা আওরঙ্গজেব শাহ জাহান এবং জাহানারার ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন।
প্রারম্ভিক সামরিক অভিযান– খুররম অসাধারণ সামরিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। মেওয়ারের রাজপুত রাজাদের বিরুদ্ধে মোগলদের অভিযানের সময় খুররম প্রথম সামরিক দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছিলেন। মেওয়ারের রাজপুত রাজারা আকবরের রাজত্বকাল থেকেই মোগলদের প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ করে আসছিলেন। ১৬১৪ সালে খুররম রাজপুতদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযান শুরু করেছিলেন। উক্ত অভিযানে খুররম ২০,০০০ সেনার নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এক বছরের কঠোর যুদ্ধের পর রাজপুত রাণা অমর সিং শর্তসাপেক্ষে প্রথম মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন এবং মোগলদের ভাসাল(অধীনস্থ) রাজ্যে পরিণত হয়েছিলেন।
সাম্রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্ত সুরক্ষিত এবং উক্ত অঞ্চলের উপর সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করার জন্য ১৬১৭ সালে খুররমকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো। এই অভিযানে খুররম সফল হয়েছিলেন এবং জাহাঙ্গীর তাঁকে শাহ জাহান(বিশ্বের রাজা) উপাধি প্রদান করেছিলেন। তাঁর সামরিক পদমর্যদা উন্নীত করা হয়েছিলো এবং তাঁকে দরবারে একটি বিশেষ সিংহাসনে বসার অনুমতি প্রদান করা হয়েছিলো। এটি একজন শাহজাদার জন্য অভূতপূর্ব সন্মান ছিলো। ফলে ‘ক্রাউন প্রিন্স’ হিসাবে দরবারে তাঁর মর্যদা বৃদ্ধি পেয়েছিলো।
বিদ্রোহী শাহজাদা– মোগল সাম্রাজ্যে পরম্পরাগতভাবে জ্যেষ্ঠপুত্র অনুসারে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা হয়নি। শাহজাদাদের মধ্যে সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বীতার মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করা হতো। ফলে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে প্রায়শই যুদ্ধ সংঘটিত হতো। খুররম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর মোগল রাজদরবারকে ঘিরে এক জটিল রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো। ১৬১১ সালে শাহ জাহানের পিতা জাহাঙ্গীর শের আফগানের বিধবা পত্নী নূর জাহানকে বিয়ে করেছিলেন। নূর জাহান দ্রুত মোগল দরবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁর ভ্রাতৃ আসফ খানের সাথে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। শাহ জাহান আসফ খানের কন্যা আরজুমন্দ বানুকে বিয়ে করেছিলেন। ফলে রাজদরবারে নূর জাহান এবং আসফ খানের গুরুত্ব অধিক বৃদ্ধি পেয়েছিলো।
নূর জাহান ষড়যন্ত্র করে তাঁর প্রথমপক্ষের স্বামী শের শাহ সূরির কন্যা লাডলী রেগমকে শাহ জাহানের কনিষ্ঠ সৎ ভ্রাতা শারিয়ারের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে সিংহাসনের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে দরবার অভ্যন্তরীন বিভাজনের দিকে পরিচালিত হয়েছিলো। শাহজাদা খুররম তাঁর পিতা জাহাঙ্গীরের উপর নূর জাহানের প্রভাবের ফলে বিরক্ত ছিলেন এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নূর জাহান তাঁর জামাতা শাহরিয়ারের হয়ে সম্রাটের নিকট উকালতি করার জন্য ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পার্সিয়ানরা কান্দাহার অবরোধ করার সময় জাহাঙ্গীরের অসুস্থতার জন্য নূর জাহান সাম্রাজ্যের দায়িত্বে ছিলেন। ফলে নূর জাহান খুররমকে কান্দাহার যাত্রা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন; কিন্তু নূর জাহানের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকার জন্য খুররম সেই নির্দেশ প্রত্যাখান করেছিলেন। শাহজাদা খুররম আশঙ্কা করেছিলেন যে, তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে নূর জাহান তাঁর পিতাকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করার চেষ্টা করবেন, নইলে তাঁর জায়গায় শাহরিয়ারকে উত্তরাধিকার হিসাবে প্রক্ষেপ করার জন্য তাঁর পিতাকে প্রভাবিত করবেন। এই ভয় খুররমকে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তাঁর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। শাহজাদা খুররম নূর জাহানের নির্দেশ প্রত্যাখান করার ফলে পার্সিয়ানরা পঁয়তাল্লিশ দিনের অবরোধের পর কান্দাহার দখল করে নিয়ে ছিলেন।
১৬২২ সালে শাহজাদা খুররম তাঁর পিতা এবং সৎ মাতৃ নূরজাহানের বিরুদ্ধে নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ১৬২৩ সালের মার্চ মাসে সংঘটিত বিলোচপুরের যুদ্ধে খুররম পরাস্ত হয়েছিলেন। পরাস্ত হয়ে তিনি মেওয়ারের মহারাণা করণ সিং-দ্বিতীয়ের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তাঁকে প্রথমে দেলওয়াদা কী হাভেলিতে রাখা হয়েছিলো এবং পরে তাঁর অনুরোধে জগমন্দির প্রাসাদে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। খুররম মহারাণার সাথে তাঁর পাগড়ি বিনিময় করেছিলেন এবং পাগড়িটি এখনও উদয়পুরের প্রতাপ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, জগমিন্দর প্রাসাদের মোজাইকের কাজ তাঁকে তাজমহলে মোজাইক ব্যবহার করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। অবশ্যে তাঁর সেই বিদ্রোহ সফল হয়নি। তিনি নিশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৬২৬ সালে খুররমকে তাঁর ভুলের জন্য ক্ষমা করা হলেও, নূর জাহান এবং তাঁর মধ্যে উত্তেজনা তলে তলে বৃদ্ধি পাচ্ছিলেন।
উজির-ই-আজম আসফ খান অনেকদিন ধরেই খুররমের পক্ষে ছিলেন। কারণ খুররম তাঁর কন্যা আরজুমন্দ বানুকে বিয়ে করেছিলেন। এদিকে তাঁর বোন সম্রাজ্ঞী নূর জাহান তাঁর জামাতা শাহরিয়ারকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য পরিকল্পনা করছিলেন। ১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর আসফ খান তাঁর বোন নূর জাহানের পরিকল্পনাকে বানচাল করতে অপ্রত্যাশিতভাবে বলপ্রয়োগ করেছিলেন এবং তাঁকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন। শাহজাদা খুররমের সিংহাসন নিশ্চিত করার জন্য আসফ খান প্রাসাদের ষড়যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। ১৬২৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শাহজাদা খুররম আবু উদ-মুজাফফর শিহাব উদ্দীন মহম্মদ সাহেব আল কুইরান উদ-থানি শাহ জাহান পাদশাহ বা শাহ জাহান উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
শাহ জাহানের রাজত্বের নাম বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত ছিলেন। সিহাব উদ্দীনের অর্থ বিশ্বাসের তারা, সাহেব উদ-কুইরান উদ-থানির অর্থ বৃহস্পতি ও শুক্রের শুভ সংযোগের দ্বিতীয় প্রভু, শাহ জাহানের অর্থ বিশ্বের রাজা। তাঁর নাম তাঁর উচ্চাকাংক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তাঁর অন্যান্য উপাধি তাঁর ধর্মীয় নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় কর্তব্যকে প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন খলিফাত পানাহী (খিলাফতের আশ্রয়স্থল), জিল-ই-আল্লাহী (পৃথিবীতে ঈশ্বরের ছায়া)।
সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর প্রধান কাজ ছিলো প্রতিদ্বন্দ্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা এবং তাঁর সৎ মাতৃ নুর জাহানকে বন্দি করা। শাহ জাহানের নির্দেশে ১৬২৮ সালের ২৩ জানুয়ারি বেশ কয়েকটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো। তাঁদের মধ্যে সৎ ভ্রাতৃ শাহরিয়ারও ছিলেন। তাঁর ভাতিজা দাওয়ার এবং গারশাস্প, খসরুর পুত্র, তাঁর চাচাতো ভাই তাইমুরাস এবং হোশাং, প্রয়াত দানিয়্যাল মির্জার পুত্রও ছিলেন। ফলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় রাজত্ব করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
শাসন– শাহ জাহানের শাসনকাল থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ১৬৪৮ সালে শাহ জাহানের সেনাবাহিনীতে ৯,১১,৪০০ পদাতিক, মাস্কেটিয়ার এবং আর্টিলারি সেনা ছিলো। ১,৮৫,০০০ সোয়ার (ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানো পুলিশ বাহিনী)ছিলো। সোয়ারগুলি রাজপুত্র এবং অভিজাতদের দ্বারা পরিচালিত হতো।
তাঁর প্রাথমিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলিকে তাইমুরিদ রেনেসাঁর এক প্রকার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। শাহ জাহান তাঁর পূর্বপুরুষদের অঞ্চল বলখে অসংখ্য ব্যর্থ সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তাইমুরিদ ঐতিহ্যের সাথে ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক বন্ধন তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন রূপে শাহ জাহান তাইমুরিদের পটভূমিকে সংযোজন করে তাঁর উত্তরাধিকারের উপর কলম চারা করে সংস্থাপন করেছিলেন।
তাঁর রাজত্বকালে মাড়োয়ারি ঘোড়ার প্রচলন ছিলো। ঘোড়াগুলি শাহ জাহানের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিলো। জয়গড় দূর্গে মোগল কামান ব্যাপকভাবে উৎপাদন করা হতো। তাঁর রাজত্বকালে সাম্রাজ্য একটি বিশাল সামরিক যন্ত্রে পরিণত হয়েছিলো। শাহ জাহানের শাসনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে অভিজাত এবং তাঁদের দলগুলি নাগরিকদের নিকট থেকে প্রকৃত নির্ধারিত রাজস্বের চেয়েও চারগুণ রাজস্ব দাবি করতেন। কিন্তু আর্থিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে শাহ জাহানের হস্তক্ষেপের ফলে এটি স্থিতিশীল হয়েছিলো। প্রশাসনকে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিলো এবং আদালতের বিষয়গুলিকে সুশৃংখল করা হয়েছিলো।
তাঁর শাসনামলে মোগল সাম্রাজ্য পরিমিতভাবে সম্প্রসারণ হচ্ছিলো। কারণ তাঁর ছেলেরা বিভিন্ন প্রান্তে বিশাল সৈন্য পরিচালনা করছিলেন। সেই সময়ে ভারত শিল্প, কারুশিল্প এবং স্থাপত্যের সমৃদ্ধ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো এবং বিশ্বের সেরা কিছু স্থপতি, কারিগর, চিত্রশিল্পী এবং লেখক শাহ জাহানের সাম্রাজ্যে বসবাস করতেন। অর্থনীতিবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন-এর মতে, বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদনের (জিডিপি) ভারতের অংশ ছিলো ১৬০০ সালে ২২.২৭ শতাংশ এবং ১৭০০ সালে ২৪.৪ শতাংশ। এই উৎপাদন চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলো। ফরিদাবাদ শহরের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফরিদ শাহ জাহানের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।
দুর্ভিক্ষ– ১৬৩০-৩২ সালে দাক্ষিণাত্য, গুজরাট এবং খানদেশে তিনটি ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিলো। অনাহারে প্রায় দুই মিলিয়ন লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলো। মুদিরা কুকুরের মাংস এবং কুকুরের হাড় গুঁড়ো করে ময়দা মিশ্রিত করে বিক্রী করতেন। পিতা-মাতারা তাঁদের সন্তানদের মাংস খেতো। কিছু কিছু গ্রাম সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। রাস্তাগুলি মানুষের লাশে ভরে গিয়েছিলো। ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিকারকল্পে শাহ জাহান লঙ্গরখানা স্থাপন করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্যের সুলতানদের সাথে সম্পর্ক – ১৬৩২ সালে শাহ জাহান মহারাষ্ট্রের দৌলতাবাদ দুর্গ দখল করেছিলেন। আহমেদনগরের নিজাম শাহী রাজ্যের হোসেন শাহকে বন্দি করেছিলেন। ১৬৩৫ সালে গোলকুণ্ডা এবং ১৬৩৬ সালে বিজাপুর দখল করেছিলেন। শাহ জাহান আওরঙ্গজেবকে দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত করেছিলেন, যার মধ্যে খানদেশ, বেরার, তেলেঙ্গানা এবং দৌলতাবাদ অন্তর্ভূক্ত ছিলো। আওরঙ্গজেব সুবেদার থাকাকালীন বাগলানা জয় করেছিলেন। ১৬৫৬ সালে গোলকুণ্ডা এবং ১৬৫৭ সালে বিজাপুর দখল করেছিলেন।
শিখগুরু হরগোবিন্দের বিদ্রোহ– শিখগুরু অর্জন সিংয়ের পুত্র গুরু হরগোবিন্দের নেতৃত্বে শাহ জাহানের রাজত্ব কালে শিখ বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো ।জাহাঙ্গীর ১৬০৬ সালের ৩০ মে পাঞ্জাবের লাহোরে অর্জন সিংকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। অর্জন সিংয়ের মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে ১৬০৬ সালের ২৫ মে শিখগুরু অর্জন সিং তাঁর পুত্র গুরু হরগোবিন্দকে শিখদের নেতা নির্বাচিত করেছিলেন। ১৬২৭ সালে শাহ জাহানের রাজত্বকালে গুরু হরগোবিন্দের নেতৃত্বে শিখরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো।
গুরু হরগোবিন্দের সেনাবাহিনী অমৃতসর, কর্তারপুর এবং অন্যান্য স্থানে শাহ জাহানের মোগল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো। ১৬৩৪ সালে সংঘটিত অমৃতসরের যুদ্ধে গুরু হরগোবিন্দ বাহিনী মোগল বাহিনীকে পরাস্ত করেছিলো। গুরু হরগোবিন্দ আবার মোগলদের প্রাদেশিক বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু হরগোবিন্দ বাহিনী আক্রমণকারীদের পরাস্ত করে তাঁদের নেতাদের হত্যা করেছিলো। গুরু হরগোবিন্দ বৃহত্তর মোগল বাহিনীর প্রত্যাবর্তনের আশংঙ্কা করে তাঁর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে শিবালিক পাহাড়ে পশ্চাদসরণ করে কিরাতপুরে ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন এবং মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।
শাহ জাহান পাইন্দে খানকে প্রাদেশিক সেনাবাহিনীর নেতা নির্বাচন করে গুরু হরগোবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। ১৬৩৫ সালের ২৫ এপ্রিলে সংঘটিত কর্তারপুরের যুদ্ধে গুরু হরগোবিন্দের বাহিনী জয়লাভ করেছিলেন। তখন শাহ জাহান উত্তরাধিকার বিভাজন করে রাজনৈতিক উপায়ে শিখ ঐতিহ্যকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন। শাহ জাহান কর্তারপুরে বসবাসরত বাবা গুরুদিতার জ্যেষ্ঠপুত্র ধীরমালকে জমি অনুদান দিয়ে তাঁকে গুরু হরগোবিন্দের সঠিক উত্তরাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। ধীরমাল মোগল সাম্রাজ্যের পক্ষে তাঁর বিবৃতি জারি করেছিলেন এবং তাঁর পিতামহের সমালোচনা করেছিলেন। গুরু হরগোবিন্দ ১৬৪৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কিরাতপুরের রূপনগরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে ধীরমালের পরিবর্তে তাঁর ছোট ভ্রাতা গুরু হর রায়কে গুরু হিসাবে মনোনীত করেছিলেন। এই পরম্পরা অনুসরণ করে গুরু হর রায় তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্রের পরিবর্তে তাঁর দ্বিতীয় পুত্রকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেছিলেন।
সাফাভিদদের সাথে সম্পর্ক– ১৬৩৮ সালে শাহ জাহান এবং তাঁর ছেলেরা সাফাভিদদের নিকট থেকে কান্দাহার শহরটি দখল করেছিলেন। পারস্যের শাসক আব্বাস-দ্বিতীয়-এর নেতৃত্বে শহরটি ১৬৪৯ সালে পুনরুদ্ধার করা হয়েছিলো। মোগল-সাফাভিদ যুদ্ধের সময় শহরটি অবরোধ করেছিলো যদিও শাহ জাহান শহরটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হননি। শাহ জাহান পশ্চিমে খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে গজনী এবং কান্দাহার পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক– শাহ জাহানের দ্রুত বাগদাদে শিবির স্থাপন করার সময় অটোম্যান সুলতান মুরাদ-চতুর্থ শাহ জাহানের দূত মীর জারিফ এবং মীর বারাকার সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। মীর জারিফ এবং মীর বারাকা সুলতানকে সূচিকর্ম করা ১০০০ টি কাপড় এবং বর্ম উপহার দিয়েছিলেন। মুরাদ-চতুর্থ তাঁদের সর্বোত্তম অস্ত্র, জীন এবং কাফতান(দীঘল ঢিলা জামা) উপহার দিয়েছিলেন। শাহ মুরাদ চতুর্থ তাঁর সেনা বাহিনীকে বসরা বন্দর পর্যন্ত তাঁদের এগিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখান থেকে মোগলরা ঠাট্টা এবং অবশেষে সুরাটের দিকে যাত্রা করেছিলেন।
পর্তুগীজদের সাথে যুদ্ধ– শাহ জাহান ১৬৩১ সালে হুগলি বন্দর থেকে পর্তুগীজদের বিতাড়িত করার জন্য বাংলার সুবেদার কাশিম খানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। হুগলি বন্দর ভারী কামান, যুদ্ধ জাহাজ, যুদ্ধের অন্যান্য সরঞ্জাম এবং প্রাচীর দিয়ে সজ্জিত ছিলো। অভিজাত মোগলরা পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে মানুষ পাচারের অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন এবং বাণিজ্যিক কারণে মোগল নিয়ন্ত্রিত সপ্তগ্রাম বন্দরটি ধ্বসে পড়ার উপক্রম হয়েছিলো। শাহ জাহান সেই অঞ্চলের জেসুইটসদের কার্যকলাপে অসন্তুষ্ট ছিলেন, বিশেষ করে যখন তাঁদের বিরুদ্ধে কৃষকদের অপহরণ করার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। ১৬৩২ সালের ২৫ সেপ্তেম্বর-এ মোগল বাহিনী রাজকীয় ব্যানার টানিয়ে ছিলেন এবং ব্যাণ্ডেল অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্ৰণ লাভ করেছিলেন। পর্তুগীজ গ্যারিসনদের শাস্তি প্রদান করা হয়েছিলো। ১৬৩৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর-এ শাহ জাহান আগ্রাস্থিত গির্জা ভেঙে ফেলার জন্য ফরমান জারি করেছিলেন। গির্জাটি জেসুইটসদের দখলে ছিলো। তবে সম্রাট জেসুইটসদের গোপনে তাঁদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। সম্রাট জেসুইটসদের ধর্ম প্রচার এবং হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মান্তরিতকরণ নিষিদ্ধ করেছিলেন।
পরবর্তী জীবন এবং মৃত্যু– ১৬৫৮ সালে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন দারা শিকোহ তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হিসাবে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তাঁর ভাইদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিলো। সিংহাসনের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে অবগত হয়ে বাংলার সুবেদার দারা শিকোহের ছোট ভ্রাতা সুজা এবং গুজরাটের সুবেদার মুরাদ বক্স স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং সিংহাসন দাবি করার জন্য আগ্রা অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন। এদিকে শাহ জাহানের তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গঠন করে নিজে সেই বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করে আগ্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি আগ্রার নিকটে দারা শিকোহের মুখামুখি হয়েছিলেন এবং ধর্মাতের যুদ্ধে দারা শিকোহকে পরাজিত করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের হাতে পরাজিত হয়ে দারা শিকোহ আগ্রা থেকে ১৬ কিলোমিটার পূর্বে যমুনা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত সামুগড়ের দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের ছোট অথচ শক্তিশালী বাহিনী চম্বল নদীর ধারে দারা শিকোহের বাহিনীর নিকটে অপেক্ষাকৃত স্বল্প জল বিশিষ্ট একটি অসুরক্ষিত স্থান পেয়ে শিবির নির্মাণ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এদিকে দারা শিকোহ লাল তাঁবু এবং ব্যানার স্থাপন করে শিবিরের পেছনের অংশ রক্ষার জন্য মনোনিবেশ করেন।
দারা শিকোহ জয়গড় দূর্গ থেকে কামান এনে একত্রে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কামানের পেছনে ছিলো সুইভেল বন্দুক দিয়ে সুসজ্জিত জাম্বুরাক(আধুনিক যুগের স্বচালিত কামানগুলির একটি বিশেষ রূপ। কামানগুলি উটের উপর স্থাপন করা হতো এবং গুলি চালানোর জন্য ছোট ছোট সুইভেল বন্দুক থাকতো)-এর অবস্থান। মাস্কেট দিয়ে সুসজ্জিত পদাতিক সেনারা উভয় কামানকে রক্ষা করছিলো। আওরঙ্গজেবও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের অভিজ্ঞ সেনাপতি মীরজুমলা-দ্বিতীয় আকস্মিক আক্রমণের আশ্বাস প্রদান করে সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে কৌশলগতভাবে লুকানো কামানগুলি স্থাপন করেছিলেন।
দারা শিকোহ এবং আওরঙ্গজেব উভয়েই হাতীর পিঠে বসেছিলেন এবং ম্যাচলক দিয়ে সজ্জিত ছিলেন। আওরঙ্গজেব সেনার বাম দিক মুরাদ বক্স এবং অভিজাত মোগল সোয়াবদের দ্বারা পরিচালিত ছিলো। বাকী সেনাগুলি আওরঙ্গজেবের অধীনে ছিলো এবং তাঁর সহকারী সেনাপতি মীরজুমলা-দ্বিতীয়, মুর্শিদ কুলি খান, মীর আতীশ খান(আর্টিলারি প্রধান)দ্বারা পরিচালিত ছিলো। অন্যদিকে দারা শিকোহের বিশাল বাহিনী কয়েক ভাগে বিভক্ত ছিলো। বাহিনীর ডানদিক বুন্দির রাও রাজা ছাত্তার লাল দ্বারা পরিচালিত ছিলো। তাঁর ডানদিক শাহ জাহানের দ্বারা নিযুক্ত রুস্তম খান ডেক্কানি দ্বারা পরিচালিত ছিলো। অভিজাত মোগল সোয়াবদের নেতৃত্বে ছিলেন একজন উজবেক কমাণ্ডার খলিলুল্ল্যাহ খান। দারা শিকোহ তাঁর ছেলে সোলেইমান শিকোহের আগমন অপেক্ষায় ছিলেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে দারা শিকোহ তাঁর কামানগুলিকে আওরঙ্গজেবের সেনা বাহিনীর দিকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পর উভয়ে উভয়ের দিকে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। বৃষ্টির জন্য আর্টিলারির গুলি বর্ষণ কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত রাখতে হয়েছিলো। কামানের গুলি বর্ষণে ক্ষুব্ধ হয়ে মুরাদ বক্স আওরঙ্গজেবের অনুমতি ছাড়াই ছাত্তার লাল দ্বারা পরিচালিত দারা বাহিনীর ডান দিকে আক্রমণ করেছিলেন। মুরাদ বক্সের সোয়াব বাহিনী এবং ছাত্তার লালের রাজপুত যোদ্ধারা একে অপরকে ধ্বংস করার জন্য প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো। খলিলুল্ল্যাহ খান রাজপুত বাহিনীকে সহায় করতে অস্বীকার করে পরিবর্তে তাঁর সেনাবাহিনীকে দারা শিকোহকে রক্ষার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। ছাত্তার লাল পরিচালিত রাজপুত বাহিনীর আসন্ন পতনের ভয়ে রুস্তম খান ডেক্কানি তাঁর বিশাল সোয়াব বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেবের কামানের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁর সোয়াব বাহিনী মুরাদ বক্সকে পেছনের দিক থেকে আক্রমণ করার চেষ্টা চালিয়েছিলো, কিন্তু আওরঙ্গজেবের কামানের জন্য তাঁর সেই প্রচেষ্টা অসফল হয়েছিলো এবং ছাত্তার লালসহ দারা শিকোহের অনেক সোয়াব নিহত হয়েছিলো। মুরাদ বক্সও আহত হয়।
ছাত্তার লাল, রাজপুত পদাতিক বাহিনী এবং তাঁর সোয়াবদের পতন এবং মুরাদ বক্স আহত হওয়ার কথা দারা শিকোহকে অবগত করা হয়েছিলেন। মুরাদ বক্সকে তাড়ানোর জন্য দারা শিকোহ এবং খলিলুল্ল্যাহ খান এগিয়ে গিয়েছিলেন। তখন দারা শিকোহ আওরঙ্গজেবের প্রচণ্ড কামানের ভারী হামলার সন্মুখীন হোন। ফলে সেনা বাহিনীর মধ্যে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যুদ্ধের এই জটিল মুহূর্তে দারা শিকোহ হাতীর পিঠ থেকে নেমে পড়েন। তখন হাতী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়। পলায়নরত হাতী দ্বারা দারা শিকোহের অনেক সেনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দারা শিকোহ হাতীর পিঠ থেকে নেমে যাওয়াটাকে অনেকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ভুল ধারণা করেছিলেন। এই সুযোগে আওরঙ্গজেবের সেনারা বিজয়ের ব্যাণ্ড বাজানো শুরু করে দিয়েছিলো। দারা শিকোহের মৃত্যু হয়েছে ভেবে দারা শিকোহের হাজার হাজার সেনা আওরঙ্গজেবের নিকট আত্মসমর্পণ করে। পরে দারা শিকোহের অনেক সেনা আওরঙ্গজেবের আনুগত্যের শপত নেওয়ার জন্য পালিয়ে গিয়েছিলো।
দারা শিকোহ এবং খলিলুল্ল্যাহ খান সুলেইমান শিকোহের দিকে পালিয়ে যান। তখন আওরঙ্গজেবকে নতুন সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এর পর আওরঙ্গজেব আগ্রার দিকে অগ্রসর হয়ে আগ্রা অবরোধ করেন। আগ্রার জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে শাহ জাহান আওরঙ্গজেবের নিকটে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হোন। তাঁকে আগ্রার দূর্গে বন্দি করে রাখা হয়। পরে খলিলুল্ল্যাহ খান আত্মসমর্পণ করে মনসবদার হিসাবে আওরঙ্গজেবের আনুগত্যের শপত গ্রহণ করেন। অবশেষে দারা শিকোহ এবং সোলেইমান শিকোহ আফগান মালিক জীবন খান কর্তৃক বন্দি হোন এবং তাঁদের আওরঙ্গজেবের নিকট হস্তান্তর করা হয়। পরে দারা শিকোহ এবং সোলেইমান শিকোহকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
শাহ জাহান আগ্রার দুর্গে বন্দিত্ব জীবন যাপন করার সময় তাঁর বড় মেয়ে জাহানারা বেগম পিতার শুশ্রূষার জন্য স্বেচ্ছাকৃভাবে ৮ বছর বন্দিত্ব জীবন যাপন করেছিলেন। ১৬৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে বিছানায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েন। তিনি রাজকীয় আদালতের মহিলাদের বিশেষ করে আকবরবাদী মহলের মহিলাদের জাহানারার যত্ন নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে কলেমা এবং কোরআন তেলওয়াত করতে করতে ৭৪ বছর বয়সে ১৬৬৬ সালের ৩০ জানুয়ারি মৃত্যু বরণ করেন।
মৃত্যুর পরে শাহ জাহানের ধর্মীয় গুরু মহম্মদ কানৌজি এবং আগ্রার কাজি কুরবান দুর্গে আসেন এবং শাহ জাহানের মৃতদেহ একটি হলঘরে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে গোসল করিয়ে কাপড় দিয়ে আবৃত করে চন্দন কাঠের কফিনে রাখা হয় ।
শাহজাদী জাহানারা রাষ্ট্রীয় অন্তেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করেছিলেন। শাহ জাহানের মৃতদেহ বিশিষ্ট অভিজাতদের দ্বারা মিছিল করে বহন করা হয়েছিলো। আগ্রার বিশিষ্ট নাগরিক এবং কর্মকর্তারা দরিদ্রদের জন্য মূদ্রা ছিটিয়ে যাচ্ছিলেন। আওরঙ্গজেব এই ধরণের আড়ম্বর অস্বীকার করছিলেন। মৃতদেহ মিছিল করে তাজমহলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো এবং তাঁকে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের কবরের নিকটে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
স্থাপত্য শিল্পে অবদান– শাহ জাহান মোগল স্থাপত্যের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি নির্মিত সবচেয়ে বিখ্যাত স্মৃতিসৌধটি হলো তাজমহল। স্মৃতিসৌধটি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নির্মাণ করিয়েছিলেন। স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করতে বিশ বছর সময় লেগেছিলো বলে জানা যায়। স্মৃতিসৌধটি ১৭ হেক্টর ভূমির উপরে বিস্তৃত। ৭৩ মিটার উঁচু। মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর ১৬৩২ সালে স্মৃতিসৌধটির নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিলো এবং ১৬৫৩ সালে সমাপ্ত হয়েছিলো। নির্মাণের স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ আহম্মদ লাহৌরি।
কাঠামোটি অতি যত্ন সহকারে অঙ্কন করা হয়েছিলো এবং এই উদ্দেশ্যে সারাবিশ্ব থেকে স্থপতিদের ডাকা হয়েছিলো। স্মৃতিসৌধটি সাদা মার্বল পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো। শাহ জাহানের অন্যান্য নির্মাণের মধ্যে রয়েছে, লাল কেল্লা, আগ্রা ফোর্টের বড় অংশ, জামা মসজিদ, ওয়াজির খান মসজিদ, মতি মসজিদ, শালিমার গার্ডেন, লাহোর ফের্টের কিছু অংশ, পেশোয়ারের মহব্বত খান মসজিদ, পশ্চিম দিল্লীর উত্তম নগরের হস্তশালের মিনি কুতব মিনার, জাহাঙ্গীরের সমাধি প্রভৃতি। জাহাঙ্গীরের স্মৃতিসৌধটি তাঁর সৎ মাতৃ নূর জাহানের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিলো। শাহ জাহান ময়ূর সিংহাসন তখত-ই-তাউসও তৈরি করিয়েছিলেন। শাহ জাহান তাঁর স্থাপত্যের মাস্টারপিসে কোরআনের আয়াতও খোদিত করিয়েছিলেন।
পাকিস্থানের করাসি থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিন্ধ প্রদেশের ঠাট্টার শাহজাহান মসজিদও তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন। মসজিদটি লাল ইট দিয়ে নীল রঙের পালিশ করা টাইলস দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন। টাইলসগুলি সম্ভবত সিন্ধের হালা শহর থেকে আমদানি করা হয়েছিলো। মসজিদটিতে সামগ্রিকভাবে ৯৩ টি গম্বুজ রয়েছে। এটি সম্ভবত এত গম্বুজ বিশিষ্ট বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ। ধ্বনিতত্ত্বকে মাথা রেখে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। গম্বুজের একপ্রান্তে ১০০ ডিসিবলের অধিক শব্দ তরঙ্গে কথা বললে গম্বুজের অন্যপ্রান্তে শুনা যায়। ১৯৩৩ সাল থেকে এটিকে অস্থায়ী ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
সন্তানসকল
জাহানারা বেগম– জন্ম ১৬১৪ সালের ২৩ মার্চ এবং মৃত্যু ১৬৮১ সালের ১৬ সেপ্তেম্বর।
মহম্মদ দারা শিকোহ– জন্ম ১৬১৫ সালের ২০ মার্চ এবং মৃত্যু ১৬৫৯ সালের ৩০ আগস্ট।
শাহ সূজা– জন্ম ১৬১৬ সালের ২৬ জুন। মৃত্যু তারিখ অজ্ঞাত।
রৌশনারা বেগম– জন্ম ১৬১৭ সালের সেপ্তেম্বর এবং মৃত্যু ১৬৭১ সালের ১১ সেপ্তেম্বর।
আওরঙ্গজেব– জন্ম ১৬১৮ সালের ৩ নভেম্বর এবং মৃত্যু ১৭০৭ সালের ৩ মার্চ।পরবৰ্তী ভারত সম্ৰাট।
মহম্মদ মুরাদ বক্স– জন্ম ১৬২৪ সালের ৯ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৬১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর।
গওহর বেগম– জন্ম ১৬৩১ সালের ১৭ জুন এবং মৃত্যু ১৭০৬ সাল।
আহম্মদ বক্স– শৈশবে মৃত্যু।
লুতফুল্ল্যাহ মির্জা– শৈশবে মৃত্যু।
দৌলত আফজা মির্জা– শৈশবে মৃত্যু।
এইসকল সন্তানের সবার মাতৃ মমতাজ মহল ।
অন্যান্য স্ত্রীদের সন্তান–
হামজাহ বানু বেগম– জন্ম ১৬১০ সাল।
পারেজ বানু বেগম– জন্ম ১৬১১ সাল।
হুরুন নিসা বেগম– জন্ম ১৬১৩ সাল।
একজন কন্যাসন্তান– জন্ম ১৬১৫ সাল। মাতৃ রাজপূত রাজকুমারী মানাবতী বাই (লাল সাহিব।)।
জাহান আফরোজ– মাতৃ হাসিনা বেগম।
হোসনারা বেগম– জন্ম ১৬৩০ সাল।
ডাহার আরা বেগম– জন্ম ১৬৩১ সাল।
সুরাইয়া বানু বেগম, পুরুনহার বানু বেগম, নজরআরা বেগম ইত্যাদি। *
আওরঙ্গজেব
মহি-উদ-দীন মহম্মদ আওরঙ্গজেবের জন্ম ১৬১৮ সালের ৩ নভেম্বর-এ গুজরাটের দাহোদে। তাঁর পিতার নাম শাহ জাহান এবং মাতৃর নাম মমতাজ মহল। তিনি শাহ জাহান ও মমতাজ মহলের তৃতীয় সন্তান এবং সামগ্রিকভাবে শাহ জাহানের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন। তিনি ছিলেন ষষ্ঠ মোগল সম্রাট এবং ৪৯ বছর ধরে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে রাজত্ব করেছিলেন। আওরঙ্গজেব ফতোয়া-ই-আলমগীর সংকলন করেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে শরিয়া আইন এবং ইসলামিক অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করা কয়েকজন সম্রাটের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ সামরিক সেনাপতি ছিলেন। তাঁর রাজত্বকাল প্রশংসার বিষয় ছিলো যদিও তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বিতর্কিত শাসক হিসাবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
আওরঙ্গজেব একজন বিশিষ্ট সম্প্রসারণবাদী শাসক ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য সর্ব্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছিলো। তিনি প্রায় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় মোগল সাম্রাজ্য দাক্ষিণাত্য সহ ৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। তিনি আনুমাণিক ১৫৮ মিলিয়ন জনসংখ্যার উপর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে ভারত কিং চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন শক্তিতে পরিণত হয়েছিলো। যার মূল্য বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং সমগ্র পশ্চিম ইউরোপের চেয়েও বেশি ছিলো। আওরঙ্গজেব তাঁর ধর্মীয় গোঁড়ামীর জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছিলেন, হাদিস অধ্যয়ন করতেন এবং ইসলামের আচার-অনুষ্ঠানগুলি কঠোরভাবে পালন করতেন। তিনি কোরআনের প্রতিলিপি প্রস্তুত করতেন। তিনি ইসলামিক ক্যালিওগ্রাফিক কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন ।
সমালোচকদের দ্বারা আওরঙ্গজেবের জীবন এবং বছরের পর বছর ধরে করা রাজত্বকালের একাধিক ব্যাখ্যা একটি খুব জটিল উত্তরাধিকারের দিকে পরিচালিত করেছে। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, আওরঙ্গজেবের নীতি তাঁর পূর্বসূরিদের বহুত্ববাদ এবং ধর্মীয় সহনশীলতার উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করেছিলো। হিন্দু প্রজার উপরে নির্ধারিত জিজিয়া কর এবং ইসলামিক নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে অন্যান্য নীতির প্রবর্তন, হিন্দু মন্দির ধ্বংস, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দারা শিকোহ, মারাঠা রাজা সম্ভাজি এবং গুরু তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতি তাঁর খারাপ কাজ। ইসলামে নিষিদ্ধ আচরণ এবং কার্যকলাপের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, যেমন জুয়া, ব্যাভিচার এবং মদ্য সেবন নিষিদ্ধ করণ প্রভৃতি তাঁর ভালো কাজ। কিছু কিছু ইতিহাসবিদ তাঁর সমালোচকদের দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের মতে, আওরঙ্গজেব মন্দির ধ্বংস করাটাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। তাঁরা এমনও উল্লেখ করেন যে, তিনি ধ্বংসের চেয়ে বেশি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। মন্দির নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ প্রদান করতেন। তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় তিনি মোগল রাজ দরবারে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হিন্দু আমোলা নিয়োগ করেছিলেন। তিনি হিন্দু ও শিয়াদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরোধিতা করেছিলেন।
তাঁর পিতা শাহ জাহানের একটি অসফল বিদ্রোহের পর আট বছর বয়সী আওরঙ্গজেব এবং তাঁর জ্যেষ্ঠা ভ্রাতা দারা শিকোহকে তাঁদের পিতাকে ক্ষমা করার বিনিময়ে তাঁদের পিতামহ জাহাঙ্গীর এবং পিতামহী নূর জাহানের জিম্মি হিসাবে লাহোরের মোগল দরবারে প্রেরণ করা হয়েছিলো। ১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর শাহ জাহান উত্তরাধিকারের যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর আওরঙ্গজেব এবং দারা শিকোহ আগ্রায় শাহ জাহানের সাথে পুনরায় মিলিত হয়েছিলেন।
আওরঙ্গজেব শৈশবে সামরিক কৌশল এবং প্রশাসনিক বিষয়ের মতো বিষয়গুলিকে সংহত করে রাজকীয় শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁর পাঠ্যক্রমে ইসলামিক অধ্যয়ন এবং তুর্কি ও ফার্সি সাহিত্যের মতো পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিষয়গুলি অন্তর্ভূক্ত ছিলো। আওরঙ্গজেব হিন্দীতে সাবলীল ছিলেন।
১৬৩৩ সালের ২৮ মে একটি শক্তিশালী যুদ্ধ-হাতী মোগল ছাউনিতে প্রবেশ করেছিলো। আওরঙ্গজেব তাঁর সাহসিকতার জন্য সেই হাতীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি হাতীর পিঠে চড়েছিলেন এবং একটি অঙ্কুশ দ্বারা হাতীর শুঁড়ে আঘাত করেছিলেন। ফলে তিনি পিষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। তাঁর পিতা শাহ জাহান তাঁর বীরত্বের প্রশংসা করেছিলেন এবং বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এবং তাঁর ওজনে ২,০০,০০০ টাকা মূল্যের সোনা উপহার দিয়েছিলেন। উপহার প্রদান অনুষ্ঠানটি ফার্সি এবং উর্দূ শ্লোকে উদযাপন করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব সেই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, যদি হাতীর সাথে আমার লড়াইটি মারাত্মকভাবে শেষ হতো, তাহলে লজ্জার বিষয় হতো না। মৃত্যু এমনকী সম্রাটের উপরেও পর্দা ফেলে দেয়, এটা কোন অসন্মান না। আমার ভ্রাতারা কি করলো সেটা ছিলো লজ্জার বিষয়।
বুন্দেলখণ্ড অভিযান– বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের ওছার শাসক বুন্দেলা রাজপুত বীর সিং দেও-এর মোগলদের অনুগত রাজা ছিলেন। ১৬২৬ সালে ঝুঝার সিং তাঁর পিতা বীর সিং দেওয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর পিতার মতো মোগলদের অনুগত হয়ে না থাকার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে স্বাধীনতা দাবি করার চেষ্টা করেছিলেন। ১৬৩৫ সালে আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে একদল সেনা ওর্ছা অবরোধ করেছিলেন এবং ঝুঝার সিংকে পরাস্ত করে শাসন থেকে অপসারণ করেছিলেন।
সামরিক অভিযান– আওরঙ্গজেবকে ১৬৩৬ সালে দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত করা হয়েছিলো। নিজাম শাহী বালক মুর্তজা নিজাম শাহ-তৃতীয় মারাঠা নেতা শাহজি রাজের কর্তৃত্বের অধীনে ১৬৩৫ সালে আহমেদনগরের নামমাত্র শাসক হয়েছিলেন। শাহ জাহানের নির্দেশে সর্দার রনোজি ওয়াবল আহম্মদ নগর আক্রমণ করে ফতেহ খান এবং হোসেন নিজামশাহ-তৃতীয় এবং তাঁর আত্মীয়দের পাশাপাশি দুই গর্ভবতী মহিলাকে হত্যা করেছিলেন, যাতে ভবিষ্যত কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী জন্ম না হয়। কিন্তু বিজাপুরের সহায়তায় সাহজি ভোসলে নিজামশাহী রাজবংশের একজন শিশু বংশধর মোর্তজাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। নিজাম শাহী পরিবার এবং শাহজি ভোসলে মাহুলি দূর্গে অবস্থান নিয়েছিলেন। শাহ জাহান বিজাপুরের মহম্মদ আদিল শাহ এবং সংশ্লিষ্ট মোগল ও আদিলশাহী সেনাপতির সাথে একটি জোটবন্ধন করে মাহুলি দুর্গ অবরোধ করেন এবং নিজাশাহী রাজবংশের অবসান ঘটান।
১৬৩৭ সালে আওরঙ্গজেব সাফাভিদ শাহজাদী দিলরাস বানু বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হোন। দিলরাস বানু বেগম মরণোত্তরভাবে রাবিয়া-উদ-দৌরানি নামে পরিচিত হয়েছিলেন। দিলরাস বানু বেগম আওরঙ্গজেবের প্রথম স্ত্রী এবং প্রধান সহধর্মিণী ছিলেন। আওরঙ্গজেব ক্রীতদাসী হীরা বাইর প্রতিও অনুরুক্ত ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে তিনি উপপত্নী উদিপুরী বাইয়ের প্রতিও অনুরুক্ত হয়েছিলেন। উদিপুরী বাই পূর্বে দারা শিকোহের সঙ্গী ছিলেন।
শাহ জাহান ১৬৩৭ সালে আওরঙ্গজেবকে ছোট রাজপুত রাজ্য বাগলানা দখল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব অনায়াসেই রাজ্যটি দখল করেছিলেন।
১৬৪৪ সালে আওরঙ্গজেবের বড় বোন জাহানারা আগ্রায় পারফিউমের রাসায়নিকের নিকটে রাখা একটি বাতিতে আগুন লেগে পুড়ে গিয়েছিলেন। ঘটনাটি একটি পারিবারিক রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছিলো। জাহানারার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করতে হাজার হাজার অনুগত রাজা আগ্রায় এসেছিলেন। তবে, আওরঙ্গজেব অবিলম্বে আগ্রায় না এসে, তিনি সপ্তাহ পরে সামরিক পোশাকে অভ্যন্তরীন প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন। যারজন্য শাহ জাহান আওরঙ্গজেবের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবেকে সুবেদার পদ থেকে অপসারণ এবং তাঁকে লাল তাঁবু ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো। এমনকী সরকারী সামরিক মানদণ্ড থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিলো। অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, আওরঙ্গজেব সকল প্রকার বিলাসিতা ত্যাগ করে ফকিরী গ্রহণ করেছিলেন, যারজন্য তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিলো।
১৬৪৫ সালে আওরঙ্গজেব একজন সহকর্মী মোগল সেনাপতির নিকট মনের দুঃখ প্রকাশ করার জন্য সাত মাসের জন্য দরবার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো। পরে তাঁকে গুজরাটের সুবেদার নিযুক্ত করা হয়েছিলো। গুজরাটে তাঁর শাসন ধর্মীয় বিবাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলো। তবে গুজরাটে স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁকে পুরস্কৃতও করা হয়েছিলো।
মুরাদ বক্স বলখের শাসক ছিলেন, তবে তিনি সেখানে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছিলেন। ফলে শাহ জাহান ১৬৪৭ সালে আওরঙ্গজেবকে গুজরাটের সুবেদার পদ থেকে সরিয়ে বলখের সুবেদার নিযুক্ত করেছিলেন। অঞ্চলটি উজবেক এবং তুর্কমেন উপজাতির আক্রমণের মুখে ছিলো। সেখানে আর্টিলারি এবং মাস্কেট সুসজ্জিত একটি শক্তিশালী মোগল বাহিনী। ছিলো। তাঁদের প্রতিপক্ষের সাথে সংঘর্ষ করার দক্ষতাও ছিলো। তবে তাঁরা অচলাবস্থায় ছিলেন। আওরঙ্গজেব লক্ষ্য করেছিলেন যে, যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভূমিতে শীতের জন্য সেনারা তাঁদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করতে অক্ষম। শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে তাঁকে এবং তাঁর পিতাকে উজবেকদের সাথে একটি অসন্তোষজনক চুক্তি সম্পাদন করতে হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব মোগল সার্বভৌমত্বের অধীনে অনুগত শাসক নিযুক্ত করে এলাকাটি উজবেকদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবুও মোগল বাহিনী, উজবেক এবং অন্যান্য উপজাতিদের আক্রমণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন। ফলে আওরঙ্গজেব তুষারপাতের মধ্য দিয়ে কাবুল ফিরে এসেছিলেন। দুই বছরের অভিযানে সামান্য লাভের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিলো।
অপ্রীতিকর সামরিক অভিযানের পর আওরঙ্গজেব মুলতান এবং সিন্ধের শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এক দশক মোগল নিয়ন্ত্রণে থাকার পরে সাফাভিদরা কান্দাহার পুনরুদ্ধার করেছিলেন। ১৬৪৯ এবং ১৬৫২ সালে সাফাভিদদের নিকট থেকে কান্দাহার পুনরুদ্ধার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিলো। তবে শীত ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে উভয় প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিলো। সাম্রাজ্যের শেষপ্রান্তে সেনাবাহিনী সরবরাহের সমস্যা, নিম্নমানের অস্ত্র-শস্ত্র এবং বিরোধীদের অস্থিরতাকে জন রিচার্ডসন ব্যর্থতার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। এর পরে দারা শিকোহ আবার কান্দাহার পুনরুদ্ধারের জন্য চেষ্টা করছিলেন, তবে তিনিও ব্যর্থ হয়েছিলেন।
কান্দাহার পুনরুদ্ধারের জন্য দারা শিকোহ আওরঙ্গজেবের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর তিনি আবার দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত হয়েছিলেন। দারা শিকোহ তাঁর নিজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য পরিস্থিতি পরিচালনা করেছিলেন বলে আওরঙ্গজেব সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের শাসনভার গ্রহণ করার পর দু’টি জায়গির সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। তুলনামূলকভাবে দরিদ্র অঞ্চল হওয়ার জন্য তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। অঞ্চলটি এতই দরিদ্র ছিলো যে, প্রশাসন বজায় রাখার জন্য মালওয়া এবং গুজরাট থেকে অনুদান আনার প্রয়োজন হতো। যারজন্য পিতা ও পুত্রের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করেছিলো। শাহ জাহান জোর দিয়েছিলেন যে, আওরঙ্গজেব যদি চাষাবাদের বিকাশের জন্য চেষ্টা করেন, তাহলে পরিস্থিতি উন্নত করা যেতে পারে! উত্তর ভারতে প্রচলিত জাবত (জাবত ব্যবস্থায় ১০ বছরের শস্যের মূল্যে জরিপ করে রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো) রাজস্ব ব্যবস্থাকে দাণিক্ষণাত্য পর্যন্ত প্রসারিত করার জন্য আওরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খানকে নিযুক্ত করেছিলেন। মুর্শিদকুলি খান কৃষিভূমি জরিপ করে উৎপাদনের উপর কর নির্ধারণের ব্যবস্থা করেছিলেন। রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য মুর্শিদকুলি খান বীজ, পশুসম্পদ এবং সেঁচের জন্য অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে দাক্ষিণাত্যে সমৃদ্ধি ফিরে এসেছিলো।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ–শাহ জাহানের চার পুত্র তাঁদের পিতার রাজত্বকালে বিভিন্ন এলেকায় সুবেদার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তবে, শাহ জাহান পরবর্তী সম্রাট হিসাবে জ্যেষ্ঠপুত্র দারা শিকোহকে সমর্থন করতেন। ফলে ছোট তিনি পুত্রের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিলো। যারজন্য তাঁরা বিভিন্ন সময়ে দারা শিকোহের বিরুদ্ধে নিজেদের মধ্যে জোট গঠনের চেষ্টা করছিলেন। মোগলদের মধ্যে পরম্পরাগতভাবে জ্যেষ্ঠপুত্র সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার ঐতিহ্য ছিলো না। ফলে ছেলেরা পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে অথবা ভ্রাতৃদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরম্পরা চালু হয়েছিলো। যদিও চার ভ্রাতার মধ্যে সবাই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, দরবারি এবং অভিজাতদের সমর্থনের ভিত্তিতে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতাটি মূলতঃ আওরঙ্গজেব এবং দারা শিকোহের মধ্যে ছিলো। এই দুই ভ্রাতার মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিলো। দারা ছিলেন সম্রাট আকবরের ছাঁচে গড়া একজন বুদ্ধিজীবী এবং উদারপন্থী। অপরদিকে আওরঙ্গজেব ছিলেন ধর্মীয়ভাবে অনেক বেশি রক্ষণশীল। ইতিহাসবিদ বারবারা ডি, মেটকাফ এবং টমাস আর মেটকাফ বলেছেন, বিচ্ছিন্ন দর্শনের উপর আলোকপাত করা এই সত্যটিকে উপেক্ষা করে যে, দারা শিকোহ একজন দরিদ্র সেনাপতি এবং নেতা ছিলেন। এই সত্যটিকেও উপেক্ষা করে যে, উত্তরাধিকারের বিরোধে উপদলগুলি মতাদর্শের দ্বারা পরিচালিত ছিলেন না। প্রফেসর মার্ক গাব রিউ ব্যাখ্যা করেন যে, দরবারি এবং তাঁদের অনুগত সশস্ত্র দলগুলি তাঁদের নিজস্ব স্বার্থ, পারিবারিক সম্পর্কের ঘনিষ্টতা এবং সর্বোপরি মতাদর্শগত বিভাজনের চেয়ে ভানকারীর চমৎকারীত্বের দ্বারা বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। হিন্দু এবং মুসলমানরা তাঁদের সমর্থনে ধর্মীয় লাইনে বিভক্ত ছিলেন না। তাঁদের সমর্থনে পরিবার বিভক্ত ছিলেন। জাহানারা অনেক সময় শাহজাদাদের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে মধ্যস্থতা করতেন এবং দারার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করতেন। তবুও আওরঙ্গজেব জাহানারাকে সন্মান করতেন।
১৬৫৭ সালে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে, তিনি দারা শিকোহকে উত্তরাধিকার করতে চান বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন এবং নবনির্মিত শহর শাহজাহানাবাদে (পুরানা দিল্লী) দারা শিকোহের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। শাহ জাহানের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছোট ছেলেরা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন যে, দারা শিকোহ হয়তো ম্যাকিয়াভেলিয়ান (ফন্দি করে)কারণে পিতার মৃত্যু সংবাদ লুকিয়ে রেখেছেন। ১৬৩৭ সাল থেকে শাহ সুজা বাংলার শাসক ছিলেন। শাহ সুজা রাজমহলে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে অশ্বারোহী এবং কামান নিয়ে আগ্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। বারাণসীর কাছে তাঁর বাহিনী দারা শিকোহ দিল্লী থেকে প্রেরণ করা প্রতিরক্ষামূলক বাহিনীর সন্মুখীন হয়েছিলো। প্রতিরক্ষামূলক বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন দারা শিকোহের পুত্র সোলেইমান শিকোহ এবং রাজা জয়সিং।
মুরাদ তখন গুজরাটের শাসক ছিলেন এবং তিনিও একই কাজ করেছিলেন। দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবও একই কাজ করেছিলেন। এই সিদ্ধান্তগুলি শাহ জাহানের মৃত্যুর সংবাদ সত্য ভেবে নিয়েছিলেন, না পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন তা স্পষ্ট নয় ৷
স্বাস্থ্য কিছু উন্নত হওয়াতে শাহ জাহান আগ্রায় চলে যান এবং দারা শিকোহ তাঁকে শাহ সুজা এবং মুরাদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণের জন্য আহ্বান জানান। দারা শিকোহের পরামর্শে শাহ জাহান শাহ সুজা এবং মুরাদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করেন। শাহ সুজা বারাণসীর কাছে সোলেইমান শিকোহ এবং জয়সিংয়ের কাছে পরাজিত হোন। তখন পরাজিত শাহ সুজাকে বিহারের মধ্য দিয়ে ধাওয়া করা হয়। অপর দিকে মুরাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করা বাহিনী দেখেন যে, সাম্রাজ্য দখল করার পর দুই ভ্রাতৃর মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মুরাদ এবং আওরঙ্গজেব ইতিমধ্যে জোটবন্ধন করেছেন।
১৬৫৮ সালের এপ্রিল মাসে ধর্মাত নামক স্থানে দুই বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং সেই সংঘর্ষে আওরঙ্গজেব বিজয়ী হোন। দারা শিকোহের দুর্বল সিদ্ধান্তের ফলে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। কারণ একদিকে ছিলো পরাজিত শত্রু এবং অপরদিকে ছিলো দখলদার একটি শক্তিশালী বাহিনী। সাহসী আওরঙ্গজেবের অগ্রগতিকে প্রতিহত করার জন্য শাহ সুজার পেছনে ধাওয়া করা বিহারের সেনাবাহিনী সময় মতো আগ্রায় পৌঁছোবে না ভেবে দারা শিকোহ জোটবন্ধনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তবে তিনি দেখতে পান যে, আওরঙ্গজেব ইতিমধ্যেই মূল সাম্ভাব্য শক্তির সাথে জোটবন্ধন করেছেন। ১৬৫৮ সালের ২৯ মে সংঘটিত সামুগড়ের যুদ্ধে আওরঙ্গজেব বাহিনীর নিকট দারা বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হোন। (সামুগড়ের যুদ্ধের বর্ণনা এই গ্রন্থের সম্রাট শাহ জাহানের অধ্যায়ে দেওয়া হয়েছে।)
দারা শিকোহকে পরাস্ত করার পর আওরঙ্গজেবকে নতুন সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করা হয় এবং আওরঙ্গজেব আগ্রার দিকে অগ্রসর হয়ে আগ্রা অবরোধ করেন। আগ্রার জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে শাহ জাহান আওরঙ্গজেবের নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হোন। তাঁকে আগ্রার দূর্গে বন্দি করে রাখা হয়।
দারা শিকোহকে পরাস্ত করার পর আওরঙ্গজেব মুরাদ বক্সের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গোয়ালিয়র দূর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। কিছুকাল পূর্বে গুজরাটের দেওয়ানকে হত্যা করার অভিযোগে ১৬৬১ সালের ৪ ডিসেম্বর মুরাদ বক্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো।
সামুগড়ের যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে দারা শিকোহ পাঞ্জাবে পালিয়ে যান। এদিকে সুজার বিরুদ্ধে প্রেরণ করা সেনাবাহিনী পূর্ব দিকে আটকা পড়ে যায়। সেনাপতি জয় সিং এবং দিল্লীর খান আওরঙ্গজেবের নিকটে আত্মসমর্পণ করেন এবং দারার পুত্র সোলেইমান শিকোহ পালিয়ে যান। শাহ সুজাকে দারা শিকোহ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে আওরঙ্গজেব তাঁকে বাংলার গভর্নর পদের প্রস্তাব দেন। তবে আওরঙ্গজেবের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে শাহ সুজা বাংলায় নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে নতুন নতুন অঞ্চল দখল করা শুরু করেছিলেন। ফলে আওরঙ্গজেব দারা শিকোহের পশ্চাধাবন করার পরিবর্তে বৃহৎ সেনাবাহিনী নিয়ে শাহ সুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।
১৬৫৯ সালের ৫ জানুয়ারি খাজওয়া নামক স্থানে আওরঙ্গজেব বাহিনী এবং শাহ সুজা বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। খাজওয়া ফতেহপুর চিক্রী থেকে ৩০ মাইল পূর্ব দিকে গঙ্গা এবং যমুনা নদীর মধ্যবর্তী একটি স্থানে অবস্থিত। স্থানটি শাহ সুজার হাতীর জন্য আদর্শ স্থান ছিলো। শাহ সুজা তাঁর কামানের জন্য ইউরোপীয় বন্দুকধারীদের নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর বাহিনীতে ছিলো ২৫,০০০ সেনা। এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাঁর পুত্র বুলন্দ আখতার, সুলতান বাং এবং জয়নুল আবেদিন। শাহ সুজার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিলো তাঁর ১০,০০০ যুদ্ধ হাতী। এর মধ্যে তিনটি অভিজাত যুদ্ধ হাতী ছিলো এবং ১১০ জন অশ্বারোহী সেনা।
অপর দিকে আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে ছিলো ৯০,০০০ সেনা। ১২০ জন অশ্বারোহী এবং ৮,০০০ যুদ্ধ হাতী। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মীরজুমলা-দ্বিতীয়। ইসলাম খানকে অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব তাঁর বাহিনীকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। সামনের দিকে একটি দল রেখেছিলেন এবং কিলিচ খান বাহাদুর এবং শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে পেছনের দিকে একটি সংরক্ষিত বাহিনী রেখেছিলেন।
শাহ সুজা তাঁর হাতী ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত উভয় বাহিনী একে অপরের দিকে কামানের গুলি বর্ষণ করছিলেন। প্রশিক্ষিত বন্দুকধারীরা যুদ্ধ হাতীর আক্রমণকে শক্তিশালী করবে ভেবে শাহ সুজা তাঁর যুদ্ধ হাতীগুলি একসাথে ছেড়ে দেওয়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন আওরঙ্গজেব তাঁর বাহিনীর সামনের অংশটিকে সামান্য পেছনের দিকে সড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে দুর পাল্লার কামানগুলোকে গুলি চালোনোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর ম্যাচলক বাহিনীকে সামনের দিকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুদ্ধ হাতীর গতিরোধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ঠিক তখনই আওরঙ্গজেব বাহিনী এবং শাহ সুজার হাতীর সংঘর্ষ শুরু হয়েছিলো। শাহ সুজা তাঁর ছেলে বুলন্দ আখতারকে তাঁর সোয়াব বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেবের সেনার উপরে আক্রমণ সংঘটিত করার নির্দেশ দেন। তিনটি অভিজাত যুদ্ধ হাতী বুলন্দ আখতারের আক্রমণকে সহায় করছিলো। এই আক্রমণ অত্যন্ত সফল ছিলো। বুলন্দ আখতারের নেতৃত্বে অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণের ফলে আওরঙ্গজেব বাহিনী একেবারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। ঠিক তখনই আওরঙ্গজেবের অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি ইসলাম খান একটি কামানের গোলায় নিহত হোন।
আওরঙ্গজেব বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি যুদ্ধ প্রায় হেরে গেছেন। তখন তিনি কিলিচ খান বাহাদুর এবং শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে পেছনে থাকা সংরক্ষিত বাহিনীকে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ করার নির্দেশ দেন। কিলিচ খান বাহাদুর এবং শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে ম্যাচলক এবং পদাতিক বাহিনী শাহ সুজার তাণ্ডবধর্মী যুদ্ধ হাতী হত্যা করে। মীরজুমলা-দ্বিতীয় তখন যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত শাহ সুজার আর্টিলারি বাহিনীকে আক্রমণ করেন।
কিলিচ খান বাহাদুর এবং মীরজুমলার বাহিনী যত এগিয়ে যেতে থাকে আওরঙ্গজেবের কামান এবং সংরক্ষিত বাহিনীও ততই এগিয়ে যেতে থাকে। বুলন্দ আখতারের ক্লান্ত এবং বিক্ষিপ্ত বাহিনী তখন পিছিয়ে গিয়ে শাহ সুজার কামানের চারপাশে সংগঠিত হতে থাকে। ফলে আওরঙ্গজেবর নিকটবর্তী শাহ সুজার পদাতিক বাহিনীতে ফাঁক সৃষ্টি হয়। আওরঙ্গজেব নিজেই তখন কামানগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং শাহ সুজা বাহিনীর কেন্দ্রে গুলি বর্ষণ করতে থাকেন। ফলে প্রতিপক্ষ বাহিনীর মধ্যে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
আওরঙ্গজেবের সংরক্ষিত বাহিনী, সোয়াব বাহিনী এবং যুদ্ধ হাতী তখন এগিয়ে গিয়ে শাহ সুজার ছাউনি দখল করতে শুরু করে। শাহ সুজা তখন ইউরোপীয় বন্দুকধারীদের পশ্চাদসরণ করার নির্দেশ দেন। আওরঙ্গজেবের জাম্বুরাক বাহিনী এবং কিলিচ খান নেতৃত্বে সিপাহিরা তখন তাঁদের ঘিরে ফেলে। ফলে তাঁরা আত্মসমর্পণের আয়োজন করে। শাহ সুজা নিজেও হাওদা থেকে নেমে তাঁর ছোট ভ্রাতা আওরঙ্গজেবের কাছে হেরে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যান।
আওরঙ্গজেব তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি মীরজুমলাকে শাহ সুজার পশ্চাদসরণ করার নির্দেশ দেন। শাহ সুজা তখন আরাকানে পালিয়ে যান। সেখানে স্থানীয় শাসক কর্তৃক তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব শাহ সুজার স্থলে শায়েস্তা খানকে বাংলার নবাব হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন।
শাহ সুজা এবং মুরাদের বিষয় নিষ্পত্তি করার পর আওরঙ্গজেব উত্তর পশ্চিম সীমান্ত জুড়ে দারা শিকোহকে তাড়া করেন। আওরঙ্গজেব দাবি করেছিলেন যে, দারা শিকোহ মুসলিম নন। তাঁর বিরুদ্ধে মোগল উজির-এ-আজম সাদুল্ল্যাহ খানের বিরুদ্ধে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছিলো।
সামুগড়ের যুদ্ধে পরাজয়ের পর দারা শিকোহ প্রথমে আগ্রা থেকে দিল্লী এবং দিল্লী থেকে লাহোরে পিছু হটে গিয়েছিলেন। তাঁর গন্তব্যস্থল ছিলো মুলতান এবং তারপর ঠাট্টা(সিন্ধু)। সিন্ধু থেকে তিনি কচ্ছরণ পেরিয়ে কাথিওয়ারে পৌঁছেছিলেন। সেখানে তিনি গুজরাট প্রদেশের শাসক শাহ নওয়াজ খানের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। শাহ নওয়াজ খান তাঁকে অর্থ দিয়ে সেনাবাহিনী গঠন করতে সহায় করেছিলেন। দারা শিকোহ সুরাট দখল করে আজমীরের দিকে অগ্রসর হোন। তিনি মারোয়ারের মহারাজা যশবন্ত সিংয়ের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আওরঙ্গজেব দ্বারা প্রেরিত অনুগমীদের বিরুদ্ধে নিরলস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৬৫৯ সালের ১১ ই মার্চ আজমীরের নিকটে অবস্থিত দেওরাইর যুদ্ধে তিনি পরাজিত হোন। পরাজয়ের পর তিনি সিন্ধে পালিয়ে গিয়ে আফগান সেনাপতি মালিক জীবন(জুনায়েদ খান বারোজাই)-এর নিকটে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মালিক জীবনের জীবন তিনি একাধিকবার সম্রাট শাহ জাহানের ক্রোধ থেকে রক্ষা করেছিলেন। যাইহোক, মালিক জীবন তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বন্দি করে তাঁকে এবং তাঁর দ্বিতীয় পুত্র সিপিহর শিকোহকে ১৬৫৯ সালের ১০ জুন আওরঙ্গজেবের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন।
দারা শিকোহকে একটি নোংড়া হাতীর পিঠে বসিয়ে দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং শৃংখলে বেঁধে দিল্লীর রাস্তায় সমদল করা হয়েছিলো। ১৬৫৯ সালের ৩০ আগস্ট আওরঙ্গজেবের চারজন দোসর তাঁকে তাঁর ভীত ছেলের সামনে হত্যা করেছিলো। মৃত্যুর পর দারা শিকোহের দেহাবশেষ দিল্লীতে হুমায়ূনের সমাধির পাশে একটি অজ্ঞাত কবরে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ অফ ইণ্ডিয়ার মাধ্যমে হুমায়ূনের সমাধির ভেতরে ১২০ টি কক্ষে ১৪০ টি কবর থেকে দারা শিকোহের সমাধিস্থল খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কাজটি কঠিন বলে বিবেচিত হয়েছিলো, কারণ কবরগুলি চিনাক্ত করার জন্য কোনো শিলালিপি ছিলো না ।
নিকুলাও মানুচ্চি(ভারত ভ্রমণকারী এবং মোগল দরবারে কর্মরত ছিলেন)দারা শিকোহের মৃত্যুর বিবরণ লিখেছেন। তাঁর মতে, দারা শিকোহকে হত্যা করার পর তাঁর দেহ বিচ্ছিন্ন মুণ্ড আওরঙ্গজেবের নিকট নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। আসলেই দারার মুণ্ড কিনা আওরঙ্গজেব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরীক্ষণ করেছিলেন। তারপর তিনি তরবারি দিয়ে মাথাটি তিনবার বিকৃত করেছিলেন। এরপর মাথাটি একটি বাক্সে ভরে অসুস্থ পিতা শাহ জাহানের নিকটে প্রেরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বৃদ্ধ পিতা রাতে খাবারের জন্য বসার সময় মুণ্ডুটি প্রেরণ করার স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্দেশ অনুসারেই রাতে খাবারে বসার সময় মুন্ডটি প্রেরণ করা হয়েছিলো। বাক্সে কি আছে, না জেনে শাহ জাহান খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ যে, আমার ছেলে এখনও আমাকে মনে রেখেছে। আসলে বাক্সে দারা শিকোহের কাটামুন্ড ছিলো।
আমলাতন্ত্র– আওরঙ্গজেব তাঁর আমলাতন্ত্রে পূর্বসূরিদের তুলনায় অধিক হিন্দু আমলা নিয়োগ করেছিলেন। ১৬৭৯ সাল থেকে ১৭০৭ সালের মধ্যে মোগল প্রশাসনে হিন্দু কর্মকর্তাদের সংখ্যা অর্ধেক বেড়ে গিয়েছিলো। হিন্দু আমলার সংখ্যা মোগল অভিজাত আমলাদের ৩১.৬ শতাংশ ছিলো। এই সংখ্যা মোগল যুগে সর্বোচ্চ ছিলো। তাঁদের মধ্যে অনেক মারাঠা এবং রাজপুত ছিলো। যারা তাঁর রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন। আওরঙ্গজেব উচ্চপদস্থ হিন্দু কর্মকর্তাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করতেন।
ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা– আওরঙ্গজেব একজন গোঁড়া মুসলিম শাসক ছিলেন। তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের নীতি অনুসরণ করে ইসলামকে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা তাঁকে বিরোধী শক্তির সাথে সংঘর্ষের পথে ঠেলে দিয়েছিলো।
ইতিহাসবিদ ক্যাথারিন ব্রাউন উল্লেখ করেছেন যে, ঐতিহাসিকরা আওরঙ্গজেবের নামটি রাজনৈতিক-ধর্মীয় গোঁড়ামী এবং দমন-পীড়নের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। বিষয়টি আধুনিক সময়েও বামিয়ান (ষষ্ঠ শতাব্দীর বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ) বৌদ্ধদের সালসাল এবং শাহমামা তিনি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। সিংহাসনে আরোহণের পর আওরঙ্গজেব তাঁর পূর্বসূরিদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী অনুসরণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শাহ জাহান ইতিমধ্যেই আকবরের উদারপন্থা থেকে দূরে সরে এসেছিলেন, আওরঙ্গজেব এই পরিবর্তনকে আরও এগিয়ে নিয়েছিলেন। জাওবিয়াত বা ধর্মনিরপেক্ষ ডিক্রি শরিয়া আইনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এই ভয়ে আওরঙ্গজেব শরিয়া আইনের উপর বেশি জোর দিয়েছিলেন, ফলে হিন্দুদের সাথে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব তাঁর পিতা এবং ভ্রাতৃদের বিরুদ্ধে করা কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেকে ‘শরিয়ার রক্ষক’ হিসাবে উপস্থাপন করার জন্য রাজনৈতিক প্রয়োজনে কাজির দ্বারা রাজমুকুট পরানোর প্রয়োজন হয়েছিলো। তবে ১৬৫৯ সালে প্রধান কাজি তা অস্বীকার করেছিলেন। ঐতিহাসিক ক্যাথরিন ব্রাউন যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আওরঙ্গজেব কখনো সঙ্গীতের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। তিনি কয়েকশ আইনবিদের কাজ দ্বারা হানাফি আইনকে সংহিতাবদ্ধ করে ‘ফতোয়া-ই-আলমগীর’ নামে আইন সংহিতা প্রণয়নের চেষ্টা করেছিলেন।
আওরঙ্গজেব অবগত হয়েছিলেন যে, মুলতান, ঠাট্টা এবং বিশেষ করে বারাণসীতে হিন্দু ব্রাহ্মণের শিক্ষা অনেক মুসলমানকে আকৃষ্ট করেছে। তিনি এই প্রদেশের সুবেদারদেরকে অমুসলিমদের স্কুল ও মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অমুসলিমদের মতো পোশাক পরা মুসলমানদের শাস্তি প্রদানের জন্যও সুবেদারদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সমাজ বিরোধী সুফি রহস্যবাদী সারমাদ কাশানী এবং গুরু তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতির সাক্ষ্য বহন করে। প্রথমজনকে ধর্মদ্রোহিতার একাধিক কারণে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো এবং শিখদের মতে, দ্বিতীয়জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের বিষয়ে আপত্তির জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিলো। অনাইসলামিক আচার-আচরণের সাথে জড়িত থাকার জন্য জরাথ্রুস্টীয়দের নওরোজ উৎসব নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তকরণের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে মুসলিম উপদলের বিরুদ্ধে নিপীড়নের ঘটনাও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
করনীতি– ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই আওরঙ্গজেব প্রজাদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এমন ৮০ টিরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী কর মওকুফ করেছিলেন। ১৭৭৯ সালে আওরঙ্গজেব সামরিক চাকরি না করার পরিবর্তে অমুসলিম প্রজাদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করেছিলেন। অনেক হিন্দু শাসক, আওরঙ্গজেবের পরিবারের সদস্য এবং মোগল দরবারের কর্মকর্তাদের দ্বারা বিষয়টি সমালোচিত হয়েছিলো।
আওরঙ্গজেব অঞ্চল বিশেষে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সাথে নির্ধারিত পরিমাণের কর হ্রাস এবং মওকুফের ব্যবস্থা করছিলেন। দুর্যোগ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের কর মওকুফ করা হতো। এছাড়াও ব্রাহ্মণ, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, বেকার, অসুস্থ এবং উন্মাদদের কর চিরতরে মওকুফ করে দিয়েছিলেন। যারা কর সংগ্রহ করতেন তাঁদের মুসলমান হতে বাধ্য করা হয়েছিলো।
আওরঙ্গজেব হিন্দু বণিকদের উপর ৫ শতাংশ এবং মুসলিমদের উপর ২.৫ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের এই করনীতি যথেষ্ট অপসন্দের ছিলো। মার্ক জেসন গিলবার্টের মতে, একজন অমুসলিম কর আদায়কারীর সামনে কোরআনের আয়াত আবৃত্তি করতে হতো, যা অমুসলমানদের জন্য অবমাননাকর ছিলো। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনসাধারণের পাশাপাশি হিন্দু আমলারা প্রতিবাদ সাব্যস্ত করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটানোর জন্য আওরঙ্গজেব ভূমি কর বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার বোঝা চেপেছিলো হিন্দু জাটদের উপর। জিজিয়া কর পুনঃ আরোপের ফলে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর আওতাধীন অঞ্চলে পালিয়ে যেতে জনসাধারণকে উৎসাহিত করেছিলো। কারণ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর আওতাধীন অঞ্চলে পূর্ব নির্ধারিত ধর্মীয় কর নীতি প্রচলিত ছিলো।
মন্দির এবং মসজিদ সম্পর্কীয় নীতি– আওরঙ্গজেব মন্দিরের জন্য ভূমি আবণ্টন দিতেন এবং সেগুলি রক্ষণাক্ষেণের জন্য তহবিল সরবরাহ করতেন। তবে তিনি মন্দির ধ্বংস করারও নির্দেশ দিতেন। আধুনিক ইতিহাসবিদরা ঔপনিবেশিক এবং জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদদের এই দাবিকে প্রত্যাখান করেন যে, এই ধ্বংসগুলি ধর্মীয় উগ্রতা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলো, বরং মন্দিরগুলির সার্বভৌমত্ব, ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের সাথে মন্দির নির্মাণের উপর জোর দেওয়া হতো।
মসজিদ নির্মাণকে প্রজাদের রাজকীয় কর্তব্য হিসাবে বিচেনা করা হলেও আওরঙ্গজেবের নামে বেশ কিছু মন্দির সম্পর্কে ফরমান রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে উড্ডয়নের মহাকালেশ্বর মন্দির, দেরাদুনের গুরুদ্বার, চিত্রকূটের বালাজি মন্দির, গুয়াহাটির উমানন্দ মন্দির এবং গুজরাটের শত্রুঞ্জয় জৈন মন্দির প্রভৃতি। এছাড়াও অন্যান্য অসংখ্য নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিলো।
সমসাময়িক আদালত কাহিনীতে শতাধিক মন্দিরের কথা উল্লেখ রয়েছে, যেগুলি আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তাঁর সর্দারদের দ্বারা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিলো। ১৬৬৯ সালের সেপ্তেম্বরে তিনি মান সিং দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মান সিংয়ের নাতি জয় সিং শিবাজীকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। ১৬৭০ সালের প্রথম দিকে মথুরায় জাটরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং শহর মসজিদের পৃষ্ঠপোষককে হত্যা করেছিলেন। আওরঙ্গজেব বিদ্রোহীদের দমন করেছিলেন এবং শহরের কেশব মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখানে একটি ঈদগাহ স্থাপন করা হয়েছিলো। ১৬৭৯ সালের দিকে খাণ্ডেলা, উদয়পুর, চিতোর এবং যোধপুর সহ বেশ কয়েকটি বিশিষ্ট মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মন্দিরগুলি বিদ্রোহীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন বলে অভিযোগ ছিলো। গোলকুণ্ডার জামে মসজিদের ক্ষেত্রেও একই আচরণ করা হয়েছিলো। কারণ গোলকুণ্ডার শাসক রাজস্ব লুকানোর জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। বিশেষভাবে বেনারসের জন্য একটি শরিয়া আদেশে ঘোষণা করেছিলেন যে, হিন্দুদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদান করা হবে এবং মন্দিরগুলি ধ্বংস করা হবে না। তবে নতুন মন্দির নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকবে। রিচার্ড ইটন প্রাথমিক সূত্রের সমালোচনামূলক মূল্যায়নে বলেছেন যে, আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৫ টি মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিলো বলে গণনা করা হয়েছে। ইয়ান কপল্যাণ্ড এবং অন্যান্য ইতিহাসবিদরা ইকতিদার খানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে উল্লেখ করেন যে, আওরঙ্গজেব সামগ্রিকভাবে ধ্বংসের চেয়ে বেশি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন।
বিরোধীদের মৃত্যুদণ্ড–আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে তাঁর ভ্রাতা দারা শিকোহের মৃত্যুদণ্ড প্রথম কার্যকর করেছিলেন। তিনি হিন্দুধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিলো। কিছু সূত্রের মতে, রাজনৈতিক কারণে দারা শিকোহকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আওরঙ্গজেব তাঁর সহযোগী ভ্রাতা মুরাদ বক্সকে হত্যার দায়ে আটক করেছিলেন এবং বিচারের পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে তাঁর বন্দি ভাইপো সোলাইমান শিকোহকে বিষপ্রয়োগ করেছিলনে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেব দ্বিতীয় মারাঠা ছত্রপতি সম্ভাজিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি, হত্যা, সহিংসতা এবং নৃশংসতার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। তাঁর আদেশে বেরারের বুরহানপুর এবং বাহাদুরপুরের মুসলমানদের মারাঠারা হত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছিলো।
১৬৭৫ সালে আওরঙ্গজেবের নির্দেশে গুরু তেগ বাহাদুরকে গেপ্তার করা হয়েছিলো এবং কাজির আদালত দ্বারা ধর্মনিন্দার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো।
মুস্তাল্লি ইসলামের দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের ৩২ তম দাই আল-মুতলাক সৈয়দনা কুতুব খান কুতুবুদ্দিনকে ধর্মদ্রোহিতার জন্য গুজরাটের গভর্নর থাকাকালীন ১৬৪৮ সালে আহমেদাবাদে আওরঙ্গজেব দ্বারা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিলো।
মোগল সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ– ১৬৬৩ সালে লাদাখ সফরের সময় আওরঙ্গজেব এই অংশের উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং দেলদান নামগিয়ালের মতো অনুন্নত প্রজারা মোগল সাম্রাজ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আনুগত্য প্রকাশের অঙ্গীকার করেছিলেন। দেলদান নামগিয়াল লেহতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এবং মসজিদটি মোগল শাসকদের উৎসর্গ করেছিলেন।
১৬৬৪ সালে আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানকে বাংলার সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। শায়েস্তা খান এই অঞ্চল থেকে পর্তুগীজ এবং আরাকানি জলদস্যুদের নির্মূল করেছিলেন। ১৬৬৬ সালে আরাকানি রাজা থুধাম্মার নিকট থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পুনরুদ্ধার করেছিলেন। মোগল রাজত্বকালে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিলো।
১৬৮৫ সালে আওরঙ্গজেব তাঁর ছেলে আজম শাহকে ৫০,০০০ সৈন্য দিয়ে মোগলদের অনুগত বিজাপুরের শাসক সিকান্দার আদিল শাহকে পরাজিত করে বিজাপুর দূর্গ দখল করতে প্রেরণ করেছিলেন। কারণ সিকান্দার আদিল শাহ অনুগত শাসক হিসাবে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। মুহাম্মদ আজম শাহ বিজাপুর দূর্গ দখল করতে অসমর্থ হয়েছিলেন। সংবাদ পেয়ে ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব স্বয়ং ১৬৮৬ সালের ৪ সেপ্তেম্বর-এ বিজাপুর এসেছিলেন এবং বিজাপুর অবরোধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আটদিন যুদ্ধের পর বিজাপুর দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিজাপুর দখল করার পর একমাত্র গোলকুণ্ডার কুতুবশাহী শাসক আবুল হাসান কুতুব শাহ আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি এবং তাঁর সৈন্যরা গোলকুণ্ডায় তাঁদের সুরক্ষিত করেছিলেন এবং কুল্লুর খনি কঠোরভাবে রক্ষা করছিলেন। কুল্লুর খনি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ ছিলো এবং খনিটি সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল হীরার খনি ছিলো। ১৬৮৭ সালে গোলকুণ্ডা অবরোধের সময় আওরঙ্গজেব মোগল বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কুতুবশাহীরা শহরটিকে ঘিরে ৪০০ ফুটেরও বেশি উঁচু গ্রেনাইট পাহাড়কে পরস্পর সংযোগ করে আট মাইল লম্বা বিশাল দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। গোলকুণ্ডা দূর্গের ফটকগুলোর যেকোনো যুদ্ধ হাতীর আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা ছিলো। কুতুবশাহীরা যদিও দেয়ালগুলো দুর্ভেদভাবে নির্মাণ করেছিলেন, রাতের বেলা আওরঙ্গজেব এবং তাঁর বাহিনী মৈ ভাড়া করে দেয়াল টপকে দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন। আট মাসের অবরোধের সময় মোগলরা তাঁদের অভিজ্ঞ সেনাপতি কিলিচ খান বাহাদুরের মৃত্যু সহ অনেক কষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন। অবশেষে মোগল বাহিনী একটি ফটক অতিক্রম করে দেয়াল ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিলো এবং দুর্গে প্রবেশের পর আবুল হাসান কুতুব শাহ শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
সামরিক সরঞ্জাম– ১৭ শতকে কামান তৈরির দক্ষতা উন্নত হয়েছিলো। সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক মোগল কামানগুলির মধ্যে একটি জাফরবক্স নামে পরিচিত ছিলো। এটি বিরল যৌগিক কামান ছিলো এবং কামানটি নির্মাণ করার জন্য পেটা লোহা ঢালাই এবং ব্রোঞ্জ ঢালাই প্রযুক্তি এবং উভয় ধাতু সম্পর্কে গভীর জ্ঞান প্রয়োজন হতো।
আওরঙ্গজেবের সামরিক বাহিনীতে ১৬ টি কামান ছিলো। যারমধ্যে ছিলো আজদাহা কামান। কামানটি ৩৩.৫ কেজি গুলি ছুঁড়তে সক্ষম ছিলো। ফতেহ রাহবার কামান ২০ ফুট লম্বা ছিলো। ইব্রাহীম রওজা নামে একটি বিখ্যাত কামান ছিলো। কামানটি বহু ব্যারেলের জন্য পরিচিত ছিলো। আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফ্রাঙ্কোইস বার্নিয়ার দু’টি ঘোড়ায় দ্বারা টানা বহুমুখী মোগল বন্দুকের গাড়ী পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
এইসব উদ্ভাবন সত্ত্বেও বেশির ভাগ সৈন্য তীর-ধনুক ব্যবহার করত। তরবারি তৈরির মান এতটাই নিম্নমানের ছিলো যে সেনারা ইংল্যাণ্ড থেকে আমদানি করা তরবারি ব্যবহার করতে পসন্দ করতেন। কামান পরিচালনার দায়িত্ব মোগলদের হাতে ছিল না, ইউরোপীয় বন্দুকধারীদের হাতে ন্যস্ত ছিলো। সেই সময়ে ব্যবহৃত অন্যান্য অস্ত্রের মধ্যে ছিলো, রকেট, ফুটন্ত তেলের কলড্রোন, মাস্কেট এবং মানজানিক(পাথর নিক্ষেপ করা কাটাপল্ট)। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে অবরোধ এবং আর্টিলারিতে পারদর্শী পদাতিক বাহিনী আভির্ভূত হয়েছিলো। যাদের পরে সিপাহি বলা হতো। ১৭০৩ সালে করমণ্ডলের মোগল সেনাপতি দাউদ খান পন্নী চিলোন থেকে ৩০ থেকে ৫০ টি হাতী কেনার জন্য ১০,৫০০ মূদ্রা ব্যয় করেছিলেন।
শিল্প–সংস্কৃতি– আওরঙ্গজেব পূর্বসূরিদের তুলনায় কঠোর প্রকৃতির ছিলেন এবং মোগল মিনিয়েচার(সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম)- এর ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছিলেন। ফলে দরবারের চিত্রশিল্পীরা আঞ্চলিক দরবারে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ধার্মিক হওয়ার জন্য তিনি ইসলামিক ক্যালিগ্রাফিকে উৎসাহিত করতেন। তাঁর রাজত্বকালে তাঁর স্ত্রী রাবিয়া- উদ-দৌরানি(দিলরাস বানু বেগম) এর জন্য লাহোরে বাদশাহী মসজিদ এবং মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে বিবি কা মকবরা নির্মাণ করা দেখা যায়। তাঁর রাজত্বকালে নাখস (পাকানো) শৈলীতে লিখা কোরআনের পাণ্ডুলিপির চাহিদা তুঙ্গে ছিলো। সৈয়দ আলী তাবরিজির পরামর্শে আওরঙ্গজেব নিজে নাখস শৈলীর একজন প্রতিভাবান ক্যালিগ্রাফার ছিলেন। এর প্রমাণ তিনি নিজে লিখা কোরআনের পাণ্ডুলিপি থেকে পাওয়া যায়।
স্থাপত্য– আওরঙ্গজেব তাঁর পিতার মতো স্থাপত্যের সাথে জড়িত ছিলেন না। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে স্থাপত্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে মোগল সম্রাটের অবস্থান হ্রাস পেতে শুরু করেছিলো। যাইহোক, আওরঙ্গজেব কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। ক্যাথারিন অ্যাশার তাঁর রাজত্বকালকে মোগল স্থাপত্যের ইসলামীকরণ হিসাবে অভিহিত করেছেন। তিনি সিংহাসনে আরোহণের পর প্রথম দিকের নির্মাণগুলির মধ্যে ছিলো মার্বেল পাথরে নির্মিত ছোট মসজিদ। মসজিদটি মতি মসজিদ(মুক্তা মসজিদ) নামে পরিচিত। মসজিদটি দিল্লীর লালকেল্লার পরিসরে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিলো। তিনি লাহোরে বাদশাহী মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। মসজিদটি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ। তিনি শ্রীনগরে একটি মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। মসজিদটি কাশ্মীরের বৃহত্তম মসজিদ।
আওরঙ্গজেবের অধিকাংশ নির্মাণ কার্য মসজিদকে ঘিরে আবর্তিত। তবে ধর্মনিরপেক্ষ নির্মাণ কার্যও ছিলো। ঔরঙ্গাবাদের বিবি কা মকবরা, আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তাঁর বড় ছেলে আজম শাহ ‘রাবিয়া-উদ-দৌরানি’র সমাধি নির্মাণ করেছিলেন। সমাধিটি নির্মাণের ক্ষেত্রে তাজমহল থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। আওঙ্গজেব শহরের মতো কাঠামোও নির্মাণ করেছিলেন এবং মেরামত করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপে ঔরঙ্গাবাদের চারপাশের প্রাচীর। যার অনেকগুলি ফটক এখনও টিকে রয়েছে। তিনি সেতু, পথিকদের জন্য বিশ্রামাগার এবং বাগান নির্মাণ করিয়েছিলেন।
আওরঙ্গজেব পূর্ব থেকে বিদ্যমান স্থাপনাগুলির মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের সাথে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো মোগল এবং প্রাক্-মোগল যুগের মসজিদ। তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় তিনি সেগুলি বেশি মেরামত করিয়েছিলেন। তিনি বখতিয়ার কাকীর মতো সুফি সাধকের দরগাহের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং রাজকীয় সমাধিগুলি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।
বস্ত্রশিল্প– আওরঙ্গজেবর রাজত্বকালে বস্ত্রশিল্পের প্রভূত উন্নতি হয়েছিলো। মোগল সম্রাটের ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার লিখেছেন, কীভাবে কারকানাহ বা কারিগরদের জন্য কর্মশালা আয়োজন করা হতো। বিশেষ করে টেক্সটাইলগুলোতে একজন মাস্টারের তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার এমব্রয়ডার নিয়োগ করা হতো। তিনি আরও লিখেছেন, কীভাবে কারিগররা রেশম, সূক্ষ্ম ব্রোকেড এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম মসলিন কাপড় তৈয়ার করতেন। যার মধ্যে ছিলো পাগড়ি, সোনার ফুলের পোশাক, মহিলারা পরিধান করা টিউনিক, এক রাতে পরিধান করার মতো সূক্ষ্ম বস্ত্র। তিনি হিমরু, পৈঠানি, মুশরু, কলমকারির মতো জটিল কাপড় তৈরিতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কৌশল ব্যাখ্যা করেছেন। মোগলদের জন্য কাপড়গুলি উষ্ণতা রক্ষা এবং আরামদায়ক ছিলো। কীভাবে এই টেক্সটাইল এবং শালগুলি ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্স পর্যন্ত পৌঁছেছিলো তাও ব্যাখ্যা করেছেন।
বৈদেশিক নীতি– আওরঙ্গজেব ১৬৫৯ এবং ১৬৬২ সালে মক্কার শরিফদের জন্য অর্থ ও উপহার দিয়ে কূটনৈতিক মিশন প্রেরণ করেছিলেন। ১৬৬৬ এবং ১৬৭২ সালে মক্কা ও মদিনায় দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের জন্য অর্থ পাঠিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ নাইমুর রহমান ফারুকী লিখেছেন, ১৬৯৪ সাল নাগাদ মক্কার শরিফদের প্রতি আওরঙ্গজেবের মোহ ভঙ্গ হতে শুরু হয়েছিলো। তাঁদের লোভ এবং বর্বরতা দেখে আওরঙ্গজেবের বিস্মিত হয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব শরিফদের অনৈতিক আচরণের জন্য ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন। দরিদ্রদের জন্য হিজাজে প্রেরণ করা অর্থ দরিদ্রদের বঞ্চিত করে শরিফরা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন ।
উজবেকদের সাথে সম্পর্ক– ১৬৫৮ সালে বলখের উজবেক শাসক সুবহান কুলি খান আওরঙ্গজেবকে প্রথম সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং একটি সাধারণ জোটবন্ধনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আওরঙ্গজেব বলখের শাসক থাকাকালীন অর্থাৎ ১৬৪৭ সাল থেকে সুবহান কুলি খানের সাথে কাজ করছিলেন।
সাফাভিদ রাজবংশের সাথে সম্পর্ক– ১৬৬০ সালে আওরঙ্গজেব পারস্যের শাহ দ্বিতীয় আব্বাসের দূতদের গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের উপহার দিয়ে ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন। যাইহোক, সাফাভিদ এবং মোগলদের মধ্যে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ ছিলো, কারণ সাফাভিদরা কান্দাহারের নিকটে অবস্থিত মোগল সেনাদের আক্রমণ করেছিলো। আওরঙ্গজেব পাল্টা আক্রমণের জন্য সিন্ধু নদী অববাহিকায় সেনা নিয়োগ করেছিলেন, কিন্তু ১৬৬৬ সালে দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের মৃত্যুর ফলে সমস্ত শত্রুতার অবসান হয়েছিলো। আওরঙ্গজেবের বিদ্রোহী পুত্র সুলতান মহম্মদ আকবর পালিয়ে গিয়ে পারস্যের সুলতান সোলেইমান-দ্বিতীয়ের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর নিকট সেনা সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। তবে, সোলেইমান- প্রথম আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে সামরিক সাহায্য প্রদান করতে অস্বীকার করেছিলেন।
ফরাসিদের সাথে সম্পর্ক– ১৬৬৭ সালে ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুই দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন বিদ্রোহীদের হাত থেকে ফরাসি বণিকদের রক্ষার জন্য অনুরোধ করে ফরাসি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর রাষ্ট্রদূত লে গৌজ এবং বেবার্টের হাতে পত্র প্রেরণ করেছিলেন। পত্রের জবাবে আওরঙ্গজেব ফরাসিদের সুরাটে কারখানা স্থাপন করার অনুমতি প্রদান করে একটিফরমান জারি করেছিলেন।
মালদ্বীপের সুলতনাতের সাথে সম্পর্ক– ১৬৬০-এর দশকে মালদ্বীপের সুলতান ইব্রাহীম ইস্কান্দার-প্রথম আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি বালাসোরের ফৌজাদারের নিকট সাহায্য চেয়ে পত্র প্রেরণ করেছিলেন। সুলতান ডাচ এবং ইংরেজ বাণিজ্য জাহাজ বহিষ্কারের ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেবের সমর্থন চেয়েছিলেন। কারণ সুলতান ডাচ এবং ইংরেজ বণিকদের আগমনে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে ভেবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। আওরঙ্গজেবের যেহেতু শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিলো না, তাই ডাচ এবং ইংরেজদের সাথে সাম্ভাব্য যুদ্ধের কথা চিন্তা করে সাহায্যের জন্য আগ্রহী ছিলেন না। সেজন্য সুলতানের অনুরোধ ব্যর্থ হয়েছিলো।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক– তাঁর পিতার মতো আওরঙ্গজেব উসমানীয়দের খেলাফতের দাবি স্বীকার করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি প্রায়ই উসমানীয় সাম্রাজ্যের শত্রুদের সমর্থন করতেন, বসরার দুই বিদ্রোহী গভর্নরকে সৌহৃদ্যপূর্ণ স্বাগত জানাতেন এবং তাঁদের ও তাঁদের পরিবারকে মোগল দরবারে রাজকীয় চাকরিতে উচ্চ মর্যদা প্ৰদান করতেন। উসমানীয়দের খেলাফতের দাবি অস্বীকার করার জন্য সুলতান সোলেইমান-দ্বিতীয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীকে আওরঙ্গজেব উপেক্ষা করতেন। সুলতান খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে পবিত্র যুদ্ধ পরিচালনা করতে আওরঙ্গজেবকে উৎসাহিত করেছিলেন।
ইংরেজ ও এঙ্গলো–মোগল যুদ্ধের সাথে সম্পর্ক– ১৬৮৬ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী সমগ্র মোগল সাম্রাজ্য জুড়ে নিয়মিত বাণিজ্য করার জন্য ফরমান প্রাপ্তির চেষ্টা করে বিফল হওয়ার পর এঙ্গলো-মোগল যুদ্ধের সূচনা হয়েছিলো। ১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেব মোগল নৌবহরের সেনাপতি ও জাঞ্জিরা দূর্গের রক্ষক সিদি ইয়াকুব ও ম্যাপিলাদের নেতৃত্বে বোম্বে অবরোধ করার জন্য জাঞ্জিরা থেকে একটি বড় নৌবহর প্রেরণ করেছিলেন। নৌবহরটি বোম্বে অবরোধ করেছিলো। ইংরেজদের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়েছিলো। ১৬৯০ সালে যুদ্ধটি ইংরেজদের পক্ষে সুবিধাজনক হচ্ছেনা বুঝতে পেরে কোম্পানী ক্ষমা প্রার্থনা করে আওরঙ্গজেবের শিবিরে দূত প্রেরণ করেছিলেন। দূতরা আওরঙ্গজেবের সামনে সেজদা করে একটি বড় ক্ষতি পূরণ প্রদানের জন্য সন্মত হয়েছিলেন এবং ভবিষ্যতে এরকম কর্ম করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন।
১৬৯৫ সালের সেপ্তেম্বরে ইংরেজ জলদস্যু হেনরি এভরি সুরাটের কাছে একটি গ্রাণ্ড মোগল কনভয়কে আটক করেছিলেন। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক জলদস্যু অভিযান ছিলো। জাহাজগুলি মক্কায় বার্ষিক হজ্ব সমাপন করে বাড়ি ফিরছিলো। তখন জলদস্যুরা গঞ্জ-ই-সওয়াই নামক জাহাজটি আটক করেছিলো। কথিত আছে যে, জাহাজটি মুসলিম নৌবহরের বৃহত্তম জাহাজ ছিলো। জাহাজ দখলের সংবাদ মূল ভূ-খণ্ডে পৌঁছোনোর সাথে সাথে ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব ইংরেজ শাসিত বোম্বে শহর আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব ইংরেজ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর চারটি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জাহাজের ক্যাপ্তেন এবং শ্রমিকদের বন্দি করেছিলেন। প্রত্যেককে বন্দি না করা পর্যন্ত ভারতে সমস্ত ইংরেজ বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন। কোম্পানী মোগল কর্তৃপক্ষকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস প্রদানের পর আওরঙ্গজেব বিষয়টি আপোস করেছিলেন।
১৭০২ সালে আওরঙ্গজেব কর্ণাটক অঞ্চলের মোগল সুবেদার দাউদ খান পন্নীকে মাদ্রাজের উপকূলে অবস্থিত ইংরেজদের সেন্ট জর্জ দূর্গ দখল করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তিন মাস দূর্গটি অবরোধ করে রাখার পর দূর্গের গভর্নর পিটার টমাস পিটকে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী শান্তির জন্য মামলা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ইথিওপিয়ান সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক– আওরঙ্গজেব মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ইথিওপিয়ান সম্রাট ফ্যাসিলিটিস১৬৬৪-৬৫ সালে আওরঙ্গজেবকে অভিনন্দন জানাতে ভারতে দূত প্রেরণ করেছিলেন।
তিব্বতি উইঘুর এবং জুঙ্গারদের সাথে সম্পর্ক– ১৬৭৯ সালে তিব্বতিরা মোগল প্রভাবের বলয়ে অবস্থিত লাদাখ আক্রমণ করেছিলেন। ১৬৮৩ সালে আওরঙ্গজেব লাদাখ আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু তিব্বতি অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য জুঙ্গারদের আগমনের পর আওরঙ্গজেব সৈন্যরা পিছু হটে এসেছিলেন। একই সময়ে কাশ্মীরের মোগল গভর্নর দালাই লামাকে পরাজিত করে সমগ্র তিব্বত জয় করেছে বলে পত্র প্রেরণ করেছিলেন।
বৌদ্ধ জুঙ্গাররা মোগলিস্থানের উপর আধিপতা বিস্তার করেছিলেন। ১৬৯০ সালে চাগতাই মোগলিস্থানের আমিন খান ‘কিরখিজ কাফের(বৌদ্ধ জুঙ্গার)দের’ তাড়ানোর জন্য সহায়তা চেয়ে আওরঙ্গজেবের নিকট দূত প্রেরণ করেছিলেন।
রাশিয়ার জারডমদের সাথে সম্পর্ক- রাশিয়ান জার পিটার দ্য গ্রেট ১৭ শতকের শেষের দিকে রুশো-মোগল বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য আওরঙ্গজেবকে অনুরোধ করেছিলেন। ১৬৯৬ সালে আওরঙ্গজেব জারের দূত সেমিয়ন ম্যালেনকির সাথে সাক্ষাত করেছিলেন এবং তাঁকে ভারতে মুক্ত বাণিজ্য পরিচালনার জন্য অনুমতি প্রদান করেছিলেন। সেমিয়ন ম্যালেনকি ভারতে ছয় বছর অবস্থানের পর সুরাট, বুরহানপুর, আগ্রা, দিল্লী এবং অন্যান্য শহর পরিদর্শন করার পর বণিকরা মূল্যবান ভারতীয় পণ্য নিয়ে মস্কোতে ফিরে গিয়েছিলেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি- আওরঙ্গজেব সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সন্মানী পেয়েছিলেন। সেই সম্পদ ব্যবহার করে ভারতে ঘাঁটি এবং দূর্গ নির্মাণ করেছিলেন। বিশেষ করে কর্ণাটক, দাক্ষিণাত্য, বাংলা এবং লাহোরে।
রাজস্ব- ১৬৯০ সালের মধ্যে আওরঙ্গজেবকে কুমারিকা অন্তরীপ থেকে কাবুল পর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব কোষাগার কর, শুল্ক, রাজস্ব ইত্যাদির মাধ্যমে ২৪ টি প্রদেশ থেকে বার্ষিক ৪৫০ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেতেন। এই রাজস্বের পরিমাণ তাঁর সমসাময়িক ফ্রান্সের পঞ্চদশ লুইর থেকে ১০ গুণেরও বেশি ছিলো।
মূদ্রা-আওরঙ্গজেবের পূর্বতন শাসকেরা মূদ্রায় কোরআনের আয়াত স্ট্যাম্প করতেন। সেগুলি ক্রমাগত মানুষের হাত এবং পায়ের দ্বারা স্পর্শ করা হতো। তাই আওরঙ্গজেব মনে করতেন যে, কোরআনের আয়াত মূদ্রায় স্ট্যাম্প করা উচিত নয়। তাঁর মূদ্রার এক পাশে ছিলো টাকশালের শহরের নাম এবং সাল এবং অন্যপাশে ছিলো, নিন্মোক্ত কাপলেট-
‘সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর
মুদ্রাঙ্কিত মুদ্রা, বিশ্বের উজ্জ্বল পূর্ণিমার মতো।‘
বিদ্রোহ- উত্তর-পশ্চিম ভারতের ঐতিহ্যবাহী এবং নতুন সুসংহত সামাজিক গোষ্ঠী, যেমন মরাঠা, রাজপুত, হিন্দু জাট, পশতুন এবং শিখদের মোগল রাজত্বকালে মোগলদের সাথে সহযোগিতা এবং বিরোধিতার মাধ্যমে সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে উত্থান হয়েছিলো।
১৬৬৯ সালে হিন্দু জাট কৃষকরা বিদ্রোহ করে ভরতপুরের আশেপাশে ভরতপুর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো এবং পরে তাঁরা পরাজিত হয়েছিলো। ১৬৫৯ সালে শিবাজি দাক্ষিণাত্যের মোগল সুবেদার শায়েস্তা খানের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন আকস্মিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। শিবাজি এবং তাঁর বাহিনী দাক্ষিণাত্য, জাঞ্জিরা এবং সুরাট অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন আক্রমণ সংঘটিত করে বিস্তীর্ণ এলেকা নিয়ন্ত্রণ লাভের চেষ্টা করেছিলেন। ১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেবের বাহিনী শিবাজির পুত্র সম্ভাজিকে বন্দি করেছিলো এবং বুরহানপুর দখল করার পর তাঁকে হত্যা করেছিলো। কিন্তু মারাঠারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং মোগল সাম্রাজ্যর পতন শুরু হয়েছিলো।
দুর্গাদাস রাঠোর মারওয়ার রাজ্যের রাঠোর রাজপুতদের সেনাপতি ছিলেন। ১৬৭৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরে যশবন্ত সিংয়ের মৃত্যুর পর দূর্গদাস রাঠোরকে রাজা হিসাবে মেনে না নেওয়ার জন্য তিনি ১৬৭৯ সালে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এই ঘটনাই মোগল অধীনস্থ রাজপুত শাসকদের মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিলো এবং রাজপুতনায় অনেক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো। ফলে এই অঞ্চলে মোগল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গিয়েছিলো এবং মন্দির ধ্বংসের জন্য ধর্মীয় তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিলো।
১৬৭২ সালে ভীরভানের নেতৃত্বে দিল্লীর কাছে একত্রিত হয়ে সতনামি সম্প্রদায় নার্নোলের প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা আওরঙ্গজেবের হস্তক্ষেপের ফলে পরাজিত হয়ে খুব কম সংখ্যক জীবিত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৬৭১ সালে মীরজুমলা এবং শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে মোগল সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আহোম রাজ্য আক্রমণ করেছিলো। তবে তাঁরা শরাইঘাটের যুদ্ধে আহোম সেনাপতি লাচিত বরফুকনের হাতে পরাজিত হয়েছিলো।
ভারতীয় বুন্দেলা রাজপুত বংশের মধ্যযুগীয় বীর যোদ্ধা মহারাজা ছত্রশাল মোগলদের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করে বুন্দেলখণ্ডে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বুন্দেলখণ্ড রাজ্যের সাহায্যে মরাঠারা মধ্য এবং উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
জাট বিদ্রোহ– ১৬৬৯ সালে হিন্দু জাটরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এই বিদ্রোহের ফলে আওরঙ্গজেব জিজিয়া কর পুনঃআরোপ করেছিলেন এবং মথুরার হিন্দু মন্দির ধ্বংসের কারণ হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। তিলপাটের বিদ্রোহী জমিদার গোকুল জাট দ্বারা বিদ্রোহ সংঘটিত করা হয়েছিলো। ১৬৭০ সাল নাগাদ আওরঙ্গজেব ২০,০০০ জাট বিদ্রোহীদের দমন করেছিলেন এবং তিলপাটের শাসন ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়েছিলেন। ফলে গোকুলের ভাগের ৯৩,০০০ স্বর্ণ মূদ্রা এবং কয়েক লক্ষ রৌপ্যমুদ্রা মোগলদের হস্তগত হয়েছিলো। গোকুলকে বন্দি করা হয়েছিলো এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো।
গোকুলের পুত্র রাজা রাম জাট পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আবার বিদ্রোহ শুরু করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা আকবরের সমাধির স্বর্ণ, রৌপ্য এবং কার্পেট লুন্ঠন করেছিলেন। আকবরের কবর খুঁড়েছিলেন এবং কবর থেকে হাড়গুলো বের করে প্রতিশোধ হিসাবে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। জাটরা আকবরের সমাধির প্রবেশপথের মিনারগুলির শীর্ষগুলি করে উড়িয়ে ছিয়েছিলেন এবং তাজমহল থেকে দু’টি রূপালী দরজা খুলে আগুনে দিয়ে পুরে গলিয়ে ফেলেছিলেন। জাট বিদ্রোহ দমন করার জন্য আওরঙ্গজেব মহম্মদ বিদার বখতকে সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন। ১৬৮৮ সালের ৪ জুলাই রাজা রাম জাটকে বন্দি করে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো। হত্যার প্রমাণ হিসাবে তাঁর মুণ্ড আওরঙ্গজেবের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিলো। যাইহোক, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বদন সিংয়ের নেতৃত্বে জাটরা ভরতপুরে তাঁদের স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মোগল–মারাঠা যুদ্ধ– ১৬৫৭ সালে আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের গোলকুণ্ডা এবং বিজাপুর দখল করার সময় মারাঠা হিন্দু যোদ্ধা শিবাজি পূর্বে তাঁর পিতার অধীনে থাকা তিনটি আদিলশাহী দূর্গ নিয়ন্ত্রণে নিতে গেরিলা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এই বিজয়ের সময়ে শিবাজি অনেক স্বাধীন মারাঠা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। মারাঠারা যুদ্ধরত আদিল শাহীদের নিকট থেকে অস্ত্র, দূর্গ এবং অনেক অঞ্চল দখল করেছিলেন। শিবাজির ছোট এবং দুর্বল অস্ত্ৰ-শস্ত্র দিয়ে সজ্জিত সেনাবাহিনী আদিল শাহের সর্বাত্মক আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং শিবাজি ব্যক্তিগতভাবে আদিল শাহী সেনাপতি আফজল খানকে হত্যা করেছিলেন। এই ঘটনার পর মারাঠারা শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছিলো। এবং এই অঞ্চলে মোগল শক্তিকে নিরপেক্ষ করার জন্য আরও বেশি আদিলশাহী অঞ্চল দখল করেছিলেন।
১৬৫৯ সালে আওরঙ্গজেব মারাঠা বিদ্রোহীদের কাছ থেকে হৃত দূর্গ পুনরুদ্ধার করার জন্য তাঁর মামা বিশ্বস্ত সেনাপতি শায়েস্তা খান এবং গোলকুণ্ডার ওয়ালি খানকে নিয়োগ করেছিলেন। শায়েস্তা খান মারাঠা অঞ্চলে গিয়ে পুণেতে বসবাস শুরু করেছিলেন। পুণের গভর্নরের প্রাসাদে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান উদযাপনের সময় মধ্যরাতে শিবাজির নেতৃত্বে অতর্কিতে আক্রমণ করে মারাঠারা শায়েস্তা খানের পুত্রকে হত্যা করেছিলেন এবং শায়েস্তা খানের হাতের তিনটি আঙুল কেটে পঙ্গু করে দিয়েছিলেন। শায়েস্তা খান বেঁচে গিয়েছিলেন এবং পরে আহোমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্বে পালন করেছিলেন এবং বাংলার শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন।
এরপর মারাঠাদের পরাস্ত করার জন্য আওরঙ্গজেব রাজা জয় সিংকে প্রেরণ করেছিলেন। জয় সিং পুরন্দর দূর্গ অবরোধ করেছিলেন। পরাজয়ের পূর্বাভাস পেয়ে শিবাজি বিনাশর্তে সন্ধি করতে সন্মত হয়েছিলেন। জয় সিং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার আশ্বাস প্রদান করে শিবাজিকে আওরঙ্গজেবের সাথে সাক্ষাত করার জন্য সন্মত করিয়েছিলেন। তবে মোগল দরবারে আওরঙ্গজেবের সাথে তাঁর আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। শিবাজিকে মোগল দরবারে যেভাবে গ্রহণ করা হয়েছিলো তাতে তিনি অপমানবোধ করেছিলেন। ফলে তিনি রাজকীয় সেবা অগ্রাহ্য করে আওরঙ্গজেবকে অপমান করেছিলেন। এই অপমানের জন্য তাঁকে আটক করা হয়েছিলো। অবশ্যে তিনি সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
শিবাজি দাক্ষিণাত্যে ফিরে এসে ১৬৭৪ সালে ছত্রপতি উপাধি গ্রহণ করে নিজেকে মারাঠা রাজ্যের শাসক হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ১৬৮০ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সমগ্র দাক্ষিণাত্য জুড়ে মারাঠা সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রসারিত করেছিলেন। শিবাজির মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সম্ভাজি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন এবং দাক্ষিণাত্যে সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে মোগলদের নিয়ন্ত্রণের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেছিলেন।
অপরপক্ষে আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র মহম্মদ আকবর কয়েকজন সমর্থক মুসলিম মনসবদার সহ মোগল দরবার ত্যাগ করেছিলেন এবং দাক্ষিণাত্যে মুসলিম বিদ্রোহীদের সাথে যোগদান করেছিলেন। এর জবাবে আওরঙ্গজেব মোগল দরবার আওরঙ্গাবাদে স্থানান্তর করে নিজে দাক্ষিণাত্য অভিযানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়েছিলো এবং মহম্মদ আকবর দাক্ষিণাত্যে পালিয়ে গিয়ে সম্ভাজির নিকটে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। আবারও যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো এবং সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আকবর পারস্যে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি আর দেশে ফিরে আসেন নি।
১৬৮৯ সালে আওরঙ্গজেব সম্ভাজিকে বন্দি করে হত্যা করেছিলেন। এই হত্যার পর ছত্রপতি সম্ভাজি মহারাজের সৎ ভ্রাতৃ তথা শিবাজির তৃতীয় পুত্র রাজারাম ১৬৮৯ সালের ১২ মার্চ মারাঠা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৭০০ সালে ফুসফুস রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পর রাজারামের বিধবা পত্নী তারাবাই তাঁর যুবক পুত্র শিবাজি-দ্বিতীয়কে ছত্রপতি হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং তারাবাই যুবক পুত্রের হয়ে রাজ্য শাসন করেছিলেন। এরা সবাই ১৬৮৯ সাল থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত মোগলদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ অব্যাহত রেখেছিলেন। সীমাহীন যুদ্ধের বছরগুলিতে আওরঙ্গজেবকে প্রাণ এবং অর্থের মূল্যের বিনিময়ে প্রতি ইঞ্চি ভূমির জন্য সংঘর্ষ করতে বাধ্য করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেব যখন পশ্চিমে চলে গিয়েছিলেন, মারাঠারা তখন সাতারা জয় করেছিলেন। মারাঠারা পূর্বদিকে মোগল ভূমি দখল করে মালওয়া এবং হায়দ্রাবাদ পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। মারাঠারা তামিলনাড়ুর জিঞ্জির স্বাধীন স্থানীয় শাসককে পরাজিত করে জিঞ্জি দখল করেছিলেন। আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি মারাঠাদের জয় করার জন্য দাক্ষিণাত্যে অনেক যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। শেষপর্যন্ত মারাঠাদের সাথে যুদ্ধ করে করেই তিনি ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্যে প্রচলিত যুদ্ধ থেকে আওরঙ্গজেবের মোগল সামরিক চিন্তাধারার দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন হয়েছিলো। পুণে, জিঞ্জি, মালওয়া এবং ভদোদরায় মোগল এবং মারাঠাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। মোগল সাম্রাজ্যের বন্দর শহর সুরাটকে আরঙ্গজেবের শাসনকালে মারাঠারা দু’বার দখল করেছিলেন এবং বন্দরটিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত করেছিলেন। ম্যাথিউ হোয়াইট অনুমান করেছেন যে, মারাঠা-মোগল যুদ্ধের সময় আওরঙ্গজেবের প্রায় ২.৫ মিলিয়ন সেনা নিহত হয়েছিলো। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভূমিতে ২ মিলিয়ন লোক খরা, প্লেগ এবং দুর্ভিক্ষের জন্য মারা গিয়েছিলো।
আহোমদের বিরুদ্ধে অভিযান– আওরঙ্গজেব এবং শাহ সুজা যখন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তখন এই সুযোগে কোচবিহার এবং আসামের হিন্দু শাসকেরা মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। তিন বছর এই আক্রমণের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ১৬৬০ সালে আওরঙ্গজেব বাংলার সুবেদার মীরজুমলা-দ্বিতীয়কে হৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১৬৬১ সালে মোগলরা আসামের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোচবিহারের রাজধানী দখল করে মোগল সম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। একটি বিচ্ছিন্ন গ্যারিসনকে কোচবিহারে রেখে মোগল সেনা আসামে তাঁদের হৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন। মীরজুমলা-দ্বিতীয় আসামের রাজধানী গড়গাঁও অভিমুখে অগ্রসর হয়ে ১৬৬২ সালের ১৭ মার্চ সেখানে পৌঁছেছিলেন। আসামের শাসক স্বৰ্গদেউ সুতামলা (জয়ধ্বজ সিং)মীরজুমলা গড়গাঁও পৌঁছোনোর আগেই রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মোগলরা ৮২ টি হাতী, নগদ ৩,০০,০০০ টাকা, ১০০০ টি যুদ্ধ নাও এবং ১৭৩ টি চালের ভাণ্ডার দখল করেছিলেন।
১৬৬৩ সালে ঢাকায় ফেরার পথে মীরজুমলা-দ্বিতীয় মারা গিয়েছিলেন। সুতামলার পরে চক্রধ্বজ সিং ১৬৬৩ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণ করে চক্রধ্বজ সিং মোগলদের ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে মোগলরা আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। সেই যুদ্ধের সময় মোগলরা অনেক কষ্টের সন্মুখীন হয়েছিলেন। মুন্নাওয়ার খান নামে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মথুরাপুরের নিকটবর্তী অঞ্চলে মোগলদের খাদ্য সরবরাহ করেছিলেন বলে জানা যায়। ১৬৬৭ সালে ফৌজদার সৈয়দ ফিরোজ খানের নেতৃত্বে মোগলরা ওয়াহাটীতে আহোমদের হাতে দুবার পরাস্ত হয়েছিলেন।
১৬৭১ সালে কুচ্চবাহার রাজা তথা মোগল সেনাপতি রামসিং এবং আহোম সেনাপতি লাচিত বরফুকনের নেতৃত্বে শরাইঘাট নামক স্থানে মোগল এবং আহোমদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। যুদ্ধটি শরাইঘাটে ব্রহ্মপুত্র নদে সংঘটিত হয়েছিলো। অপেক্ষাকৃত দুর্বল আহোম সেনা কূটনৈতিক আলোচনা, গেরিলা কৌশল, সামরিক বুদ্ধিমত্তা এবং মোগলদের একমাত্র দুর্বলতা নৌবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে অপেক্ষাকৃত সবল মোগল বাহিনীকে পরাস্ত করেছিলেন।
আসামে মোগলদের শেষ প্রচেষ্টা ছিলো শরাইঘাট যুদ্ধ। মোগলরা পরে অল্প সময়ের জন্য গুয়াহাটী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৬৮২ সালে সংঘটিত ইটাখুলির যুদ্ধে মোগলদের পরাস্ত করে আহোমরা গুয়াহাটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত সেই নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিলো।
সতনামী বিদ্রোহ– ১৬৭২ সালে একজন ‘দন্তহীন বৃদ্ধ মহিলা’র নির্দেশে মোগল সাম্রাজ্যের কৃষিকেন্দ্রগুলিতে সতনামীরা একটি বিশাল বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিলেন। সতনামীদের মাথা এবং ভ্রূ পর্যন্ত কামানো ছিলো এবং উত্তর ভারতের অনেক অঞ্চলে তাঁদের মন্দির ছিলো। তাঁরা দিল্লী থেকে ৭৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বড় মাপের বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিলেন।
সতনামীরা বিশ্বাস করতেন যে, তাঁরা মোগলদের গুলি থেকে সুরক্ষিত এবং তাঁরা মোগলদের যেকোনো অঞ্চলে প্রবেশ করতে সক্ষম। তাঁরা দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন এবং ছোট-বড় মোগল বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন।
আওরঙ্গজেব সতনামী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ১০,০০০ সেনার একটি বাহিনী এবং বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত মোগল রক্ষীদের বিচ্ছিন্ন দল প্রেরণ করেছিলেন। মোগল সেনাদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য আওরঙ্গজেব ইসলামিক প্রার্থনা লিখেছিলেন, তাবিজ তৈরি করেছিলেন, নক্সা তৈরি করেছিলেন। সেগুলি সেনাবাহিনীর প্রতীক হয়ে উঠেছিলো। এই বিদ্রোহ পাঞ্জাবের উপর পরবর্তীতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিলো।
শিখ বিদ্রোহ– নবম শিখ গুরু, গুরু তেগ বাহাদুর স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের বিরোধী ছিলেন। কারণ এটিকে তিনি ভুল নীতি বলে মনে করেছিলেন। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের তাঁদের বিশ্বাস ধরে রাখতে এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ এড়াতে সাহায্য করার জন্য তিনি আওরঙ্গজেবকে একটি বার্তা প্রেরণ করেছিলেন যে, সম্রাট যদি তাঁকে ধর্মান্তকরণ করাতে পারেন, তাহলে প্রত্যেক হিন্দু মুসলমান হয়ে যাবে। জবাবে, আওরঙ্গজেব গুরু তেগ বাহাদুরকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। গ্রেপ্তার করে তাঁকে দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং ধর্মান্তকরণ করার জন্য নির্যাতন করা হয়েছিলো। ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করার জন্য ১৬৭৫ সালে তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো।
গুরু তেগ বাহাদুরের হত্যার জবাবে তাঁর উত্তরসূরি পুত্র গুরু গোবিন্দ সিং আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর আট বছর আগে ১৬৯৯ সালে খালসা বাহিনী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর অনুসারীদের সামরিকীকরণ করেছিলেন। ১৭০৫ সালে গুরু গোবিন্দ সিং ‘জাফরনামা’ নামে আওরঙ্গজেবকে একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। পত্রটিতে আওরঙ্গজেবের নিষ্ঠুরতা এবং ইসলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। পত্রটি পেয়ে আওরঙ্গজেব অনেক কষ্ট অনুভব এবং অনুশোচনা করেছিলেন। ১৬৯৯ সালে খালসা গঠনের ফলে শিখরা সংগঠিত হয়েছিলেন এবং পরে শিখ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পশতুন বিদ্রোহ– ১৬৭২ সালে কাবুলের যোদ্ধা কবি খুশাল খান খট্টকের নেতৃত্বে পশতুন বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো। মোগল গভর্নর আমির খানের নির্দেশে বর্তমান আফগানিস্থানের কুনার প্রদেশের পশতুন উপজাতির মহিলাদের শ্লীলতা হানি করা হয়েছিলো। তখন সাফি উপজাতিরা সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছিলো। এই আক্রমণটি প্রতিশোধের উদ্রেক করেছিলো এবং উপজাতিদের মধ্যে সাধারণ বিদ্রোহের সূত্রপাত করেছিলো। কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করার চেষ্টায় আমির খান একটি বড় বাহিনী নিয়ে খাইবার গিরিপথে উপজাতিদের বিরুদ্ধে অভিযান সংঘটিত করেছিলো এবং গভর্নর সহ মাত্র চারজন লোক সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলো।
পশতুন অঞ্চলে আওরঙ্গজেবের অনুপ্রবেশকে খুশাল খান খট্টর ‘আমাদের পাঠানদের প্রতি মোগলদের হৃদয় কালো’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। আওরঙ্গজেব সেনা প্রেরণ করে ‘পোড়া মাটির নীতি’ প্রয়োগ করে গণহত্যা, লুটপাট এবং বহু গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। মোগল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একীভূত পশতুন প্রত্যাহ্বানকে বিভ্রান্ত করে উপজাতিদের একে অপরের বিরুদ্ধে পরিণত করার জন্য আওরঙ্গজেব ঘুস ব্যবহার করতেও অগ্রসর হয়েছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিলো উপজাতিদের মধ্যে স্থায়ী অবিশ্বাসের বাতাবরণ সৃষ্টি করা।
এর পরে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং মোগলরা প্রায় সমগ্র পশতুন অঞ্চলে তাঁদের কর্তৃত্ব হারিয়েছিলেন। এটক- কাবুল বাণিজ্য রোড, গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড বরাবর বন্ধ করাটা ছিলো মোগলদের জন্য বড় বিপর্যয়কর। ১৬৭৪ সাল নাগাদ পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে অবনমিত হয়েছিলো যে, আওরঙ্গজেব ব্যক্তিগতভাবে সেনার দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য এটকে ক্যাম্প নির্মাণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অস্ত্রের জোরের সাথে কুটনীতি এবং ঘুস প্রদান করে মোগলরা শেষপর্যন্ত বিদ্রোহীদের বিভক্ত করে বিদ্রোহকে আংশিকভাবে দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অবশ্যে মোগলরা কখনো বাণিজ্য পথের বাইরে তাঁদের কার্যকর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারেন নি।
মৃত্যু– গোলকুণ্ডা এবং দাক্ষিণাত্য বিজয়ের পর ১৬৮৯ সাল নাগাদ মোগল সাম্রাজ্য ৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত হয়েছিলো। জনসংখ্যা ছিলো ১৫৮ মিলিয়নেরও বেশি। লিডেন বিশ্বদ্যিালয়ের ইতিহাসবিদ এবং বিশ্ব ইতিহাসের অধ্যাপক জোনস গোমম্যানস বলেছেন, আওরঙ্গজেবের অধীনে সাম্রাজ্যের উচ্চ কেন্দ্রবিন্দু থেকে সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়েছিলো।
আওরঙ্গজেব দিল্লীর লালকেল্লা কমপ্লেক্সে মতি মসজিদ নামে পরিচিত একটি ছোট মার্বেল মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। ক্রমাগত যুদ্ধ, বিশেষ করে মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাঁর সাম্রাজ্যকে দেউলীয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিলো।
দাক্ষিণাত্য বিজয়ের জন্য আওরঙ্গজেব তাঁর জীবনের ২৬টি বছর উৎসর্গ করেছিলেন। এটি অনেক দিক থেকে পীড়াদায়ক বিজয় ছিলো। যার জন্য বছরে আনুমাণিক লক্ষ লক্ষ প্রাণ বলিদান দিতে হয়েছিলো। কত স্বর্ণ এবং রৌপ্য খরচ হয়েছিলো তা সঠিকভাবে অনুমান করা যাবে তাঁর ছাউনির আড়ম্বর দেখে। আওরঙ্গজেবের ছাউনি ছিলো একটি চলমান রাজধানীর মতো- ৩০ মাইল পরিধির একটি তাঁবুর শহর। সেখানে ছিলো ২৫০ টি বাজার, ১.২ মিলিনেরও বেশি অনুসারি, ৫০,০০০ টি উট এবং ৩০,০০০ টি হাতী। এদের সবাইকে খাওয়াতে হতো, প্রয়োজনে খাদ্য প্রজাদের উদ্বৃত্ত শস্য থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হতো।
প্রায় ৯০ বছরের কাছাকাছি বয়সে এসে মৃত্যুর আগে আওরঙ্গজেব বলেছিলেন, ‘আমি একা এসেছি, একজন অপরিচিত হিসাবে একা চলে যাব। আমি জানিনা, আমি কি, আমি কি করছি।’ মৃতপ্রায় বৃদ্ধ তাঁর ছেলে আজম শাহের নিকট ১৭০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এইসব কথা স্বীকার করেছিলেন।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ এড়াতে মৃত্যুর সময়ে তিনি নিশ্চিত করে গিয়েছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পরেও জনগণ যাতে জানতে পারে তিনি বেঁচে আছেন। ১৭০৭ সালের ৩ মার্চ ৮৮ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর নিকট মাত্র ৩০০ টাকা ছিলো। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর নির্দেশানুসারে সেই টাকা দাতব্য সংস্থায় দান করা হয়েছিলো। তিনি তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর অন্তেষ্টিক্রিয়ার জন্য যাতে অযথা ব্যয় করা না হয় তারজন্য অনুরোধ করে গিয়েছিলেন। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদের খুলদাবাদে তাঁর কবর উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। এই উন্মুক্ত কবর তাঁর ইসলামের প্রতি থাকা গভীর আস্থা এবং ভক্তির কথা প্রকাশ করে। কবরটি দিল্লীর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য সুফি সাধক বুরহান-উদ-দীন গরিবের মাঝারের প্রাঙ্গণে অবস্থিত।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র আজম শাহ কয়েক মাসের জন্য মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর পরে অস্টম মোগল সম্রাট হিসাবে বাহাদুর শাহ প্রথম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বাহাদুর শাহের দুর্বল সামরিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বের জন্য মোগল সাম্রাজ্য চূড়ান্ত পতনের দিকে অগ্রসর হয়েছিলো। বাহাদুর শাহ প্রথম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর মারাঠারা মোগল অঞ্চলে আক্রমণ সংঘটিত করতে শুরু করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই মোগল সম্রাটের দিল্লীর দেয়ালের বাইরে সামান্যই ক্ষমতা ছিলো।
মূল্যায়ন এবং উত্তরাধিকার–সমালোচকরা যুক্তি দেন যে, তাঁর নির্মমতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামী তাঁকে তাঁর সাম্রাজ্যের মিশ্র জনগোষ্ঠীকে শাসন করার জন্য অনুপযুক্ত করে তুলেছিলো। কিছু সমালোচক দাবি করেন যে, শিয়া, সুফি এবং অমুসলিমদের উপর ধর্মীয় গোঁড়া ইসলামিক অনুশীলন আরোপ করার জন্য, যেমন অমুলিসদের উপর শারিয়া এবং জিজিয়া কর আরোপ, মুসলমানদের জন্য শুল্ক বাতিল করে অমুসলিমদের উপর দ্বিগুণ শুল্ক নির্ধারণ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা ইত্যাদি। মন্দির ধ্বংস করার ফলে বহু বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো। জি, এন, মঈন শাকির এবং সরমা ফেস্টস্ক্রিপ্ট যুক্তি দেন যে, তিনি প্রায়ই রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য ধর্মীয় পীড়নকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করতেন। এর ফলস্বরূপ, জাট, মারাঠা, শিখ, সতনামী এবং পশতুনদের দল তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলো।
পাকিস্থানে সম্বর্ধনা– হারুন খালিদ লিখেছেন, যুদ্ধ এবং ইসলামিক সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তারের জন্য পাকিস্থানে আওরঙ্গজেবকে একজন বীর যোদ্ধা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধর্ম এবং আদালত থেকে কলুষিত প্রথাগুলিকে সরিয়ে সাম্রাজ্যকে শুদ্ধি করার জন্য তাঁকে সত্যিকারের আস্তিক হিসাবে কল্পনা করা হয়। মুনিস ফারুকি মত প্রকাশ করেন। যে, পাকিস্থানী রাষ্ট্র এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মিত্ররা তাঁকে প্রাক-আধুনিক মুসলিম বীরদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করেন। বিশেষ করে তাঁর সামরিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত ধার্মিকতা এবং সদিচ্ছার জন্য তাঁকে পাকিস্থানে প্রশংসা করা হয়। মহম্মদ ইকবাল, আওরঙ্গজেবকে পাকিস্থানের আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বিবেচনা করেন। আকবরের দীন-ই-ইলাহি এবং মূর্তিপূজার বিরোধিতা করার জন্য তাঁকে নবী আব্রাহামের সাথে তুলনা করা হয়। ইকবাল সিং সেভিয়া রাজনৈতিক দর্শনের উপর লিখা তাঁর বইতে লিখেছেন যে, মহম্মদ ইকবাল মনে করেছিলেন যে, আওরঙ্গজেবের জীবন ও কর্ম ভারতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের সূচনা করেছিলেন। মাওলানা সাব্বির উসমানি জিন্নাহের অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে বক্তৃতায়, পাকিস্থানের প্রতিষ্ঠাতা এম, এ, জিন্নাহকে আওরঙ্গজেবের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম বলে অভিহিত করেছিলেন। পাকিস্থানী-আমেরিকান শিক্ষাবিদ আকবর ইসলামীকরণ অভিযানের জন্য পরিচিত জিয়া-উল-হককে ধারণাগতভাবে আওরঙ্গজেবের একজন আধ্যাত্মিক বংশধর হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কারণ জিয়া-উল-হকের গোঁড়া ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গী ছিলেন।
ব্যক্তিগত প্রশংসার বাইরে, আওরঙ্গজেবকে পাকিস্থানের জাতীয় আত্মসচেনতার প্রধান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসবিদ আয়শা জালাল পাকিস্থানের পাঠ্যপুস্তক বিতর্কের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে এম. ডি জাফরের পাকিস্থান স্ট্যাডিজের একটি পাঠ্যপুস্তকের কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি লিখেছেন, আওরঙ্গজেবের অধীনে পাকিস্থানের আত্মা একত্রিত করা হয়েছিলো, যখন তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো পাকিস্থানের চেতনাকে দুর্বল করে দিয়েছিলো। পাকিস্থানের আরেকজন ইতিহাসবিদ মোবারক আলী পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, আকবরকে পাঠ্যপুস্তকে সুবিধাজনকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীর কোনো পাঠ্যপুস্তকে আকবরের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। আওরঙ্গজেবকে সামজিক স্ট্যাডিজ এবং উর্দু ভাষার বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকে একজন গোঁড়া এবং ধর্মীয় মুসলমান হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি জীবীকার জন্য কোরআনের অনুলিপি প্রস্তুত এবং টুপি সেলাই করতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আওরঙ্গজেবের এই ভাবমূর্তি শুধু পাকিস্থানের সরকারী ইতিহাসগ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইতিহাসবিদ অ্যান্দ্রে টসকে উল্লেখ করেছেন যে, বি, জে,পি এবং অন্যান্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা আওরঙ্গজেবকে মুসলিম উগ্রবাদী মনে করেন। নেহরু দাবি করেছেন যে, পূর্ববর্তী মোগল সম্রাটদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সমন্বয়বাদের বিপরীতে আওরঙ্গজেব একজন শাসকের চেয়ে একজন মুসলিম হিসাবে বেশি অভিনয় করে গেছেন।
আওরঙ্গজেবের সম্পূর্ণ উপাধি–আল-সুলতান আল-খাগান আল মুকাররম হজরত আবুল মুজাফ্ফর মহি-উদ-দীন মহম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর-প্রথম বাদশাহ গাজি শাহেনশাহ-ই-সুলতানাত-উল-হিন্দিয়া ওয়াল মুঘালিয়া। আওরঙ্গজেবকে আরও বিভিন্ন উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো, যারমধ্যে রয়েছে দয়াময়ের খলিফা, ইসলামের রাজা এবং ঈশ্বরের জীবিত রক্ষক।
বিবাহ–
দিলরাস বানু বেগম-বিবাহ ১৬৩৮ সালে এবং মৃত্যু ১৬৯১ সালে। তিনি কাশ্মীরের রাউরি স্ট্যাটের রাজা তাজুদ্দিন খানের কন্যা ছিলেন।
নবাব বাই– তিনি আওরঙ্গাবাদী মহল নামে পরিচিত ছিলেন। ১৬৬১ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর-এ বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। ১৬৮৮ সালের নভেম্বরে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
উদিপুরি মহল– উদিপুরি মহল দারা শিকোহের ক্রীতদাসী ছিলেন। তিনি মহম্মদ কামবক্সের মাতৃ ছিলেন।
সন্তান–
জেব–উন–নিসা– জন্ম ১৬৩৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং মৃত্যু ১৭০২ সালের ২৬ মে। মাতৃ দিলরাস বানু বেগম।
মহম্মদ সুলতান– ১৬৩৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর এবং মৃত্যু ১৬৭৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর। মাতৃ নবাব বাই।
জিনাত–উন–নিসা– জন্ম ১৬৪৪ সালের ৫ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৭২১ সালের ৭ মে। মাতৃ দিলরাস বানু।
শাহ আলম–প্রথম– জন্ম ১৬৪৩ সালের ১৪ অক্টোবর এবং মৃত্যু ১৭১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। মাতৃ নবাব বাই ।
বদর–উন–নিসা– জন্ম ১৬৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর এবং মৃত্যু ১৬৭০ সালের ৯ এপ্রিল। মাতৃ নবাব বাই ।
জুবদাত–উন–নিসা– জন্ম ১৬৫১ সালের ২ সেপ্তেম্বর এবং মৃত্যু ১৭০৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। মাতৃ দিলরাস বানু বেগম।
আজম শাহ– জন্ম ১৬৫৩ সালের ২৮ জুন এবং মৃত্যু ১৭০৭ সালের ২০ জুন। মাতৃ দিলরাস বানু বেগম। তিনি সপ্তম মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ১৭০৭ সালের ৪ মার্চ থেকে ১৭০৭ সালের ২০ জুন পর্যন্ত কয়েক মাসের জন্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
মহম্মদ আকবর– জন্ম ১৬৫৭ সালের ১১ সেপ্তেম্বর এবং মৃত্যু ১৭০৬ সালের ৩১ মার্চ। মাতৃ দিলরাস বানু বেগম। মহম্মদ আকবরের ছেলে নিকুশিয়ার ১৭১৯ সালে কয়েক মাসের জন্য সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
মিহর–উন–নিসা– জন্ম ১৬৬১ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর এবং মৃত্যু ১৭০৬ সালের ২ এপ্রিল। মাতৃ নবাব বাই ।
কামবক্স– জন্ম ১৬৬৭ সালের ৭ মার্চ এবং মৃত্যু ১৭০৯ সালের ১৪ জানুয়ারি। মাতৃ উদিপুরি মহল।
সাহিত্যে আওরঙ্গজেব–
আওরঙ্গজেব– ১৬৭৫ সালে রচিত জন ড্রাইডনের নাটক। সম্রাটের জীবদ্দশায় লন্ডনের মঞ্চে অভিনীত হয়েছিলো।
হিন্দী উপন্যাস– আচার্য চতুর সেন শাস্ত্রী রচিত হিন্দী উপন্যাস।
শাহেনশাহ– ১৯৭০ সালে রচিত এন, এস, ইনামদারের মারাঠী উপন্যাস।
১৬৩৬- এরিক ফিলিন্ট এবং গ্রিফিন বারবারা দ্বারা ২০১৭ সালে রচিত মোগলদের মিশন।
শাহেনশাহ– ২০১৭ সালে আওরঙ্গজেবের জীবন এবং এন, এস ইমানদারের ১৯৭০ সালে রচিত মারাঠি কাল্পনিক জীবনী বিক্রান্ত পাণ্ডে কর্তৃক ইংরেজি অনুবাদ।
আওরঙ্গজেবঃ দ্য ম্যান এণ্ড দ্য মিথ – ২০১৮ সালে অ্যান্দ্রে টুসকের দ্বারা রচিত উপন্যাস। •
আজম শাহ
কুতুব-উদ-দীন মহম্মদ আজম শাহের জন্ম ১৬৫৩ সালের ২৮ জুন দাক্ষিণাত্যের বুরহানপুরে। তাঁর পিতার নাম আওরঙ্গজেব এবং মাতৃর নাম দিলরাস বানু বেগম। তিনি ষষ্ঠ মোগল সম্রাট আওরঙ্গবের তৃতীয় সন্তান ছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তিনি ১৭০৭ সালের ১৪ মার্চ থেকে ১৭০৭ সালের ২০ জুন পর্যন্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর মাতৃ দিলরাস বানু বেগম পারস্যের বিশিষ্ট সাফাভিদ রাজবংশের মির্জা বদি-উদ-জামান-এর কন্যা ছিলেন। আজম শাহ তাঁর পিতার দিক থেকেই শুধু তিমুরিদ ছিলেন না, মাতৃর দিক থেকেও সাফাভিদ রাজবংশের রক্ত ছিলো তাঁর শরীরে। যার জন্য আজম শাহ খুব গর্বিত ছিলেন। তাঁর ছোট ভ্রাতা মহম্মদ আকবরের মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেবের সবচেয়ে খাঁটি রক্তের একমাত্র জীবিত সন্তান বলে তিনি গর্ব করতেন। আজম শাহের সৎ ভ্রাতা শাহ আলম (বাহাদুর শাহ প্রথম) এবং মহম্মদ কামবক্স ছিলেন আওরঙ্গজেবের নিকৃষ্ট ও হিন্দু স্ত্রীর সন্তান। নিকোলাও মানুচ্চির মতে, আজম শাহ পারস্যের সাফাভিদ রাজবংশের শাহ নওয়াজ খান সাফাভির নাতি হওয়ার জন্য দরবারিরা তাঁর প্রতি প্রভাবিত হয়েছিলেন।
১৬৮১ সালের ১২ আগস্ট আজম শাহ তাঁর পিতার উত্তরাধিকারী (শাহী আলী জাহ) হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং সম্রাটের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বাহাল ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ সামরিক কর্মজীবনে তিনি বেরার সুবাহ, মালওয়া, বাংলা, গুজরাট এবং দাক্ষিণাত্যের সুবেদার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৭০৭ সালের ১৪ মার্চ তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি আহমেদনগরে মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তিনি এবং তাঁর তিন পুত্র সুলতান বিদার বখত, শাহজাদা জওয়ান বখত বাহাদুর এবং শাহজাদা সিকান্দার শান বাহাদুর তাঁর জ্যেষ্ঠ সংভ্রাতা শাহজাদা শাহ আলম কর্তৃক ১৭০৭ সালের ২০ জুন জাজাউর যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন।
জাজাউর যুদ্ধ– ১৭০৭ সালের ২০ জুন আজম শাহ এবং তাঁর সৎ ভ্রাতা বাহাদুর শাহের মধ্যে জাজাউয়ের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। তাঁদের পিতা আওরঙ্গজেব উত্তরাধিকার ঘোষণা না করেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দেওয়ার জন্য ইচ্ছাপত্রে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে সন্তোষজনক চুক্তিতে পৌঁছোতে না পারার জন্য সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। জাজাউর যুদ্ধে আজম শাহ এবং তাঁর তিনি পুত্র নিহত হওয়ার পর শাহ আলম বাহাদুর শাহ-প্রথম উপাধি ধারণ করে ১৭০৭ সালের ১৯ জুন ৬৩ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
চরিত্র– আজম শাহ প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং বীরত্বের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। আওরঙ্গজেব নিজেও তাঁর ছেলের মহৎ চরিত্র, চমৎকার আচার-ব্যবহারে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। সম্রাট আজম শাহকে পুত্রের চেয়ে আওরঙ্গজেব একজন বন্ধু মনে করতেন।
ব্যক্তিগত জীবন– আজম শাহ ১৬৬৮ সালের ১৩ মে আহোম রাজকন্যা রমণী গাভরুর সাথে প্রথম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিয়ের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিলেন রহমত বানু বেগম। তিনি আহোম স্বৰ্গদেউ জয়ধ্বজ সিংয়ের কন্যা ছিলেন। বিবাহটি রাজনৈতিক ছিলো।
১৬৬৯ সালের ৩ জানুয়ারি আজম শাহ তাঁর চাচাতো বোন শাহজাদী জাহানজেবের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। শাহজাদী জাহানজেব তাঁর চাচা দারা শিকোহ এবং তার প্রিয়তমা স্ত্রী নাদিরা বানু বেগমের কন্যা ছিলেন। জাহানজেব ছিলেন আজম শাহের প্রধান ও প্রিয়তমা স্ত্রী। ১৬৭০ সালের ৪ আগস্ট তিনি তাঁর বড় ছেলে বিদার বখতকে জন্ম দিয়েছিলেন। বিদার বখত নামটি রেখেছিলেন আওরঙ্গজেব স্বয়ং। আওরঙ্গজেব আজম শাহ, তাঁর প্রিয়পুত্র বধু জাহানজেব এবং বিদার বখতকে খুব স্নেহ করতেন।
আওরঙ্গজেবের মামা শায়েস্তা খানের কন্যা ইরান দখত রহমত বানু (পরী বিবি)র সাথে আজম শাহের তৃতীয় বিয়ে ঠিক হয়েছিলো। ১৬৭৮ সালে ঢাকায় পরী বিবির আকস্মিক মৃত্যুর ফলে সে বিয়ে করা সম্ভব হয়নি। পরী বিবির স্মরণে আজম শাহ ঢাকায় লালবাগ কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন।
রাজনৈতিক জোঁটের অংশ হিসাবে আজম শাহ পরবর্তীতে ১৬৮১ সালে শাহার বানু বেগম(পাদশাহ বিবি)র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আদিল শাহী রাজবংশের শাসক আলী আদিল শাহ-দ্বিতীয়ের কন্যা।
অন্যান্য বিবাহ সত্ত্বেও জাহানজেবের প্রতি আজম শাহের প্রেম অপরিবর্তিত ছিলেন। ১৭০৫ সালে জাহানজেবের মৃত্যুর পর আজম শাহ অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
বিজাপুর দখল– বিজাপুরের শাসক সিকান্দার আদিল শাহ মোগলদের অনুগত শাসক ছিলেন। তবে, তিনি মোগলদের অনুগত হয়ে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে ১৬৮৫ সালে আওরঙ্গজেব ৫০,০০০ সৈন্য দিয়ে আজম শাহকে বিজাপুর দূর্গ দখল করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। আজম শাহের নেতৃত্বে মোগলরা বিজাপুর দূর্গ দখল করার জন্য অগ্রগতি লাভ করতে সক্ষম হোননি। ফলে ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব নিজেই ১৬৮৬ সালের ৪ সেপ্তেম্বর বিজাপুর এসেছিলেন এবং আটদিনের যুদ্ধের পর বিজয়ী হয়েছিলেন।
বাংলার সুবেদার–বাংলার শাসক আজম খান কোকার মৃত্যুর পর আজম শাহ ১৬৭৮ সাল থেকে ১৭০১ সাল পর্যন্ত বেরার সুবাহ, মালওয়া এবং বাংলার সুবেদার ছিলেন। ১৬৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সফলভাবে কামরূপ অঞ্চল দখল করেছিলেন। তিনি তখন ঢাকায় অসম্পূর্ণ লালবাগ কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে রাজস্ব আদায়ের জন্য মীরজুমলাকে দিওয়ান এবং মুলুকচাঁদকে হুজুর-নাভিস নিযুক্ত করেছিলেন। আওরঙ্গজেব শাহজাদা আজম শাহকে বাংলার সুবেদার পদ থেকে প্রত্যাহার করার পর তিনি ১৬৭৯ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। তখন বাংলার শাসন মুর্শিদাবাদের নবাবের অধীনে চলে গিয়েছিলো।
১৭০১ সাল থেকে ১৭০৬ সাল পর্যন্ত তিনি গুজরাটের সুবেদার ছিলেন।
আজম শাহ তাঁর ছোট সৎ ভ্রাতা কমবক্সকে বিশেষভাবে ঘৃণা করতেন। যারজন্য উত্তরাধিকারের যুদ্ধ এড়াতে আওরঙ্গজেব আজম শাহকে মালওয়ায় এবং কামবক্সকে বিজাপুরে প্রেরণ করেছিলেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আওরঙ্গজেব আজম শাহকে বিদায়ী চিঠি লিখেছিলেন। পরের দিন সকালে আজম শাহ মালওয়া যাওয়ার পরিবর্তে আহমেদনগরের বাইরে অবস্থান করছিলেন এবং পিতৃর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রাজকীয় শিবিরে এসে তাঁর পিতার মৃতদেহ গ্রহণ করে দৌলতাবাদে দাফনের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। পিতার মৃতদেহ দাফনের পর আজম শাহ নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে সিংহাসন দখল করেছিলেন। ১৭০৭ সালের আঠার জুন জাজাউয়ের যুদ্ধে তাঁর বড় সৎ ভ্রাতা বাহাদুর শাহের নিকট পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন।
মালওয়ার জটিল পরিস্থিতি দেখে বাহাদুর শাহ গুরু গোবিন্দ সিংয়ের নিকট সাহায্য চেয়েছিলেন। গুরু গোবিন্দ সি তাঁর ভ্রাতা গুরু ধরম সিংকে ৩০০ সৈন্য দিয়ে বাহাদুর শাহকে সহায় করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। শিখ সৈন্যের একটি তীর এসে আজম শাহের চোখে বিদ্ধ হয়েছিলো এবং সেই আঘাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
আজম শাহের মৃত্যুর পর তাঁকে আওরঙ্গাবাদের নিকটে অবস্থিত খুলদাবাদে সুফি সাধক শেখ জয়নুদ্দিনের দরগাহ কমপ্লেক্সে তাঁর স্ত্রীর সমাধির পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। যেখানে একটু পশ্চিমে আওরঙ্গজেবের সমাধিও রয়েছে। আজম শাহের সন্তান
বিদর বখত-জন্ম ১৬৭০ সালের ৪ আগস্ট এবং মৃত্যু ১৭০৭ সালের ২০ জুন। মাতৃ জাহানজেব বানু বেগম। জওয়ান বখত, সিকান্দার শাহ, ওয়ালা জাহ, ওয়ালা সান, আলী তাবর, গিট্টিআরা বেগম, ইফফাত আরা বেগম, নাজিব- উন-নিসা বেগম। •
বাহাদুর শাহ–প্রথম
বাহাদুর শাহের জন্ম ১৬৪৩ সালের ১৪ অক্টোবর মোগল সাম্রাজ্যের বুরহানপুরে। তিনি মহম্মদ মোয়াজ্জেম এবং শাহ আলম নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি অস্টম মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি ১৭০৭ সাল থেকে ১৭১২ সাল অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম আওরঙ্গজেব এবং মাতৃর নাম নবাব বাই। ১৭০৭ সালের ১৫ জুন দিল্লীতে তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিলো এবং ১৭০৭ সালের ১৯ জুন সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ তাঁর পিতা আওরঙ্গজেবকে উৎখাত করে সিংহাসনে আরোহাণের জন্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন। ফলে আওরঙ্গজেব তাঁকে কয়েকবার বন্দি করেছিলেন। ১৬৯৬ সাল থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত তিনি আকবরাবাদ(পরে আগ্রা), কাবুল এবং লাহোরের সুবেদার ছিলেন।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তাঁর প্রধানা স্ত্রীর পুত্র মহম্মদ আজম শাহ নিজেকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু জাজাউর যুদ্ধে বাহাদুর শাহ কর্তৃক পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন। বাহাদুর শাহের শাসনামলের কয়েক বছর পূর্বে যোধপুর এবং অম্বর স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। বাহাদুর শাহ সেগুলি আবার মোগল সাম্রাজের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। বাহাদুর শাহ খোতবায় আলীকে ওয়ালি ঘোষণা করে ইসলামিক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিলো। বান্দা সিং বাহাদুরের নেতৃত্বে শিখরা, দূর্গদাস রাঠোরের অধীনে রাজপুতরা এবং কামবক্সের নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো। বান্দা সিং বাহাদুর-এর বিদ্রোহ ব্যতীত সব কয়টি বিদ্রোহ তিনি সফলভাবে দমন করেছিলেন।
সম্রাট শাহ জাহানের রাজত্বালে বাহাদুর শাহ– পিতামহ শাহ জাহানের রাজত্বকালে বাহাদুর শাহ ১৬৫৩ থেকে ১৬৫৯ সাল পর্যন্ত লাহোরের উজির-এ-আজম ছিলেন। ১৬৬৩ সালে তিনি দাক্ষিণাত্যের গভর্নর হিসাবে শায়েস্তা খানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। শিবাজি দাক্ষিণাত্যের মোগল রাজধানী আওরঙ্গাবাদের উপকণ্ঠে অভিযান চালিয়েছিলেন, তখন শিবাজির বিরুদ্ধে বাহাদুর শাহ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কোনো উল্লেযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিবাজিকে পরাজিত করার জন্য আওরঙ্গজেব সবচেয়ে দক্ষ সেনাপতি জয় সিং-প্রথমকে দাক্ষিণাত্যে প্রেরণ করেছিলেন। জয় সিং পুরন্দর দুর্গ অবরোধ করেছিলেন এবং ১৬৬৫ সালের ১১ জুন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব এবং শিবাজির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো। চুক্তিটি পুরন্দর চুক্তি নামে জনাজাত ।
আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাহাদুর শাহ– জয় সিং পুরন্দর দূর্গ দখল করার পর বাহাদুর শাহ প্রথমকে ১৬৬৭ সালের মে মাসে আবারও দাক্ষিণাত্যের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো।
১৬৭০ সালে বাহাদুর শাহ তাঁর পিতা আওরঙ্গজেবকে উৎখাত করার জন্য একটি বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিলেন এবং নিজেকে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। মারাঠাদের প্ররোচনায় বিদ্রোহটি সংঘটিত করতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। আওরঙ্গজেব বিদ্রোহটি শান্তভাবে দমন করেছিলেন এবং বাহাদুর শাহ মোগল দরবারে ফিরে এসে কয়েক বছর দরবারে ছিলেন। ১৬৮০ সালে আওরঙ্গজেব রাজপুত বিদ্রোহ দমন করার সময় পোড়া মাটির নীতি গ্রহণ করার পর বাহাদুর শাহ আবার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। আওরঙ্গজেব আবারও বিদ্রোহটি ভদ্রভাবে দমন করেছিলেন এবং তাঁকে সতর্কতার সাথে নিরীক্ষণে রেখেছিলেন।
পরবর্তী সাত বছর, ১৬৮১ সাল থেকে ১৬৮৭ সাল পর্যন্ত বাহাদুর শাহ ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে পিতার বাধ্য সন্তান’ ছিলেন বলে ইতিহাসবিদ মুনিস ফারুকী বর্ণনা করেছেন।
বিশ্বাসঘাতকতা– আওরঙ্গজেব ১৬৮১ সালে বিদ্রোহী পুত্র মহম্মদ আকবরের পশ্চাদপসরণ করার জন্য বাহাদুর শাহকে দাক্ষিণাত্যে প্রেরণ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ মুনিস ফারুকীর মতে, বাহাদুর শাহ ইচ্ছাকৃতভাবে সেই মিশনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিদ্রোহী পুত্র মহম্মদ আকবর যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে তাঁর জন্য বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে ১৬৮৩ সালে আওরঙ্গজেব বাহাদুর শাহকে কোঙ্কন অঞ্চলে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাহাদুর শাহ আবারও তাঁর অভিযানে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরেও আওরঙ্গজেব তাঁকে দায়িত্ব প্রদানে অটল ছিলেন। আওরঙ্গজেব ১৬৮৭ সালে বাহাদুর শাহকে গোলকুণ্ডার সুলতানাতের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের গুপ্তচরেরা অবগত হয়েছিলেন যে, গোলকুণ্ডার শাসক আবুল হাসান এবং বাহাদুর সাহের মধ্যে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক বার্তা আদান-প্রদান চলছে। এটা কোনো অযোগ্যতার পরিচায়ক ছিলো না, স্পষ্টতই রাষ্ট্রদ্রোহ ছিলো। ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব বাহাদুর শাহ এবং তাঁর পুত্রদের বন্দি করেছিলেন এবং তাঁর নিকটতম অনুসারিদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। বাহাদুর শাহকে দিল্লীতে স্থানান্তর করেছিলেন এবং তাঁর কর্মচারিদের বিদায় দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব তাঁকে ছমাসের জন্য নখ বা চুল কাটতে নিষেধ করেছিলেন। তাঁকে ভালো খাবার এবং ঠাণ্ডা জন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো। পিতার অনুমতি ছাড়া কারও দেখা-সাক্ষাত করাও বারণ ছিলো।
১৬৯৪ সালে আওরঙ্গজেব বাহাদুর শাহকে পুনর্বাসন করেছিলেন। তাঁর পরিবারের সাথে বসবাস করার অনুমতি প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর কিছু কর্মচারিকে পুনরায় নিযুক্ত করেছিলেন। বাহাদুর শাহের পরিবারে গুপ্তচর বৃত্তি করার জন্য কিছু লোক নিয়োগ করা হয়েছিলো। বাহাদুর শাহ এবং তাঁর পরিবারকে দাক্ষিণাত্য থেকে উত্তর দিল্লীতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালের বাকি সময় তাঁকে দাক্ষিণাত্যে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব প্রদান নিষিদ্ধ করেছিলেন। শিখ গুরু তেগ বাহাদুরকে দমন করার জন্য ১৬৯৫ সালে বাহাদুর শাহকে একজন সেনাপতির সাথে পাঞ্জাব অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়েছিলো। সেনাপতি শিখ রাজাদের উপর ভারী কর আরোপ করেছিলেন। বাহাদুর শাহ শিখদের সুরক্ষিত শহর আনন্দপুর তাঁদের জন্য ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন এবং ধর্মের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা দেখে শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেছিলেন। সেই বছর বাহাদুর শাহ আকবরাবাদের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৬৯৬ সালে তাঁকে লাহোরে বদলি করা হয়েছিলো। কাবুলের গভর্নর আমিন খানের মৃত্যুর পর তাঁকে ১৬৯৯ সালে আমিন খানের স্থলাভিক্ত করা হয়েছিলো এবং ১৭০৭ তাঁর পিতার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেই পদে বাহাল ছিলেন।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ– সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়োগ না করেই আওরঙ্গজেব ১৭০৭ সালের তিন মার্চ আহমেদাবাদের ভিঙ্গরে মারা গিয়েছিলেন। বাহাদুর শাহ তখন কাবুলের গভর্নর ছিলেন এবং ছোট দুই সৎ ভ্রাতা মহম্মদ আজম শাহ এবং কামবক্স যথাক্রমে গুজরাট এবং দাক্ষিণাত্যের গভর্নর ছিলেন। তিন ভ্রাতাই সিংহাসন দাবি করেছিলেন। কামবক্স নিজের নামে মূদ্রা তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। মহম্মদ আজম শাহ নিজেকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে আগ্রা যাত্রা করার জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। মহম্মদ আজম শাহ ১৭০৭ সালের ২০ জুন-এ সংঘটিত জাজাউর যুদ্ধে বাহাদুর শাহের কাছে পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন। বাহাদুর শাহ ১৭০৭ সালের ১৯ জুন ৬৩ বছর বয়সে বাহাদুর শাহ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
সংযোজন–সিংহাসনে আরোহণ করার পর বাহাদুর শাহ রাজপুত রাজ্যগুলির যারা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন সেই রাজ্যগুলি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ১০ নভেম্বর বাহাদুর শাহ অম্বর অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। ২১ নভেম্বর ফতেহপুর চিক্রীতে সেলিম চিশতির সমাধি পরিদর্শন করে ১৭০৮ সালের ২০ জানুয়ারি আম্বের পৌঁছেছিলেন। ইতিমধ্যে বাহাদুর শাহ তাঁর সহায়কারী মিহরাব খানকে যোধপুর দখল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন অম্বরের রাজা ছিলেন জয় সিং। তাঁর ভ্রাতা বিজয় সিং তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই বিরোধের কারণে অঞ্চলটি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো এবং অম্বরের নাম পরিবর্তন করে ইসলামাবাদ রাখা হয়েছিলো। উত্তরাধিকারের যুদ্ধের সময় জয় সিং মহম্মদ আজম শাহকে সহায় করার অজুহাতে জয় সিংয়ের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো এবং ১৭০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিজয় সিংকে আম্বেরের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিলো। বাহাদুর শাহ বিজয় সিংকে মির্জা উপাধি প্রদান করেছিলেন। বিনিময়ে বিজয় সিং বাহাদুর শাহকে ১,০০,০০০ টাকা মূল্যের উপহার প্রদান করেছিলেন। এভাবেই বিনাযুদ্ধে আম্বের মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলো।
যোধপুর– আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে যশবন্ত সিং যোধপুরের রাঠোরদের নেতা ছিলেন। উত্তরাধিকারের যুদ্ধের সময় যশবন্ত সিং আওরঙ্গজেবের বড় ভ্রাতা দারা শিকোহের পক্ষে ছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের পর আওরঙ্গজেব যশবন্ত সিংকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং তিনি মোগলদের অনুগত রাজা হয়েছিলেন। ১৬৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর আগে কাবুলের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। যশবন্ত সিংয়ের মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেব তাঁর বিধবা পত্নী এবং ছেলে অজিত সিংকে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার উদ্দেশ্যে বলপূর্বক দিল্লীতে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাঠোর বংশের দুর্গাদাস রাঠোর পূর্ব থেকেই মোগলদের কাছ থেকে যোধপুর জয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে অজিত সিংকে আওরঙ্গজেবের হাত থেকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং অজিত সিং এবং বিধবাদের যোধপুর ফিরিয়ে এনেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বাহাদুর শাহের সৎ ভ্রাতা আজম শাহের কাছ থেকে দূর্গদাস রাঠোর যোধপুর উদ্ধার করেছিলেন।
মিহরাব খান মাইর্থায় অজিত সিংকে পরাজিত করার পর বাহাদুর শাহ যোধপুর যাত্রা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। ১৭০৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাহাদুর শাহ যোধপুর পৌঁছেছিলেন। বাহাদুর শাহ অজিত সিংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার অভিপ্রায়ে তাঁকে লোক পাঠিয়ে যোধপুর ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বাহাদুর শাহ অজিত সিংকে সম্মানের বিশেষ পোশাক এবং একটি রত্নখচিত পোশাক উপহার দিয়েছিলেন। তারপর তিনি সেখান থেকে আজমীরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ২৪ মার্চ আজমীর পৌঁছে দরগাহ শরিফ দর্শন করেছিলেন।
উদয়পুর– হলদিঘাটের যুদ্ধে বিজয়ের পর আকবর ১৫৭৬ সালে উদয়পুর শহর মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সিসোদিয়ারা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
বাহাদুর শাহের উদয়পুর পুনর্দখল করার ইচ্ছে ছিলো। তবে তিনি খবর পেয়েছিলেন যে আম্বের এবং যোধপুরের ঘটনার জন্য ভয় পেয়ে মহারাণা অমর সিং-দ্বিতীয় উদয়পুর থেকে পালিয়ে গিয়ে পাহাড়ে লুকিয়ে আছেন। বাহাদুর শাহ তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে দাক্ষিণাত্যে কামবক্সের বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে অভিযান স্থগিত রেখে কামবক্সের বিদ্রোহ দমন করার উদ্দেশ্যে দাক্ষিণাত্যে চলে গিয়েছিলেন।
রাজপুত বিদ্রোহ– মহম্মদ কামবক্সকে দমন করার উদ্দেশ্যে বাহাদুর শাহ দাক্ষিণাত্যে চলে যাওয়ার পর আম্বের, উদয়পুর এবং যোধপুরের শাসক মোগলদের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। রাজপুতরা প্রথমে যোধপুর এবং হিন্দাউন-বায়নার সেনানায়কদের বহিষ্কার করে রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে আম্বের উদ্ধার করেছিলেন। তাঁরা পরবর্তীতে ১৭০৮ সালের সেপ্তেম্বরে মেওয়াতের সেনানায়ক হোসেন খান বারহা এবং অন্যান্য অফিসারদের হত্যা করেছিলেন। এই সংবাদ পেয়েবাহাদুর শাহ অজিত সিং এবং জয় সিংয়ের সাথে চুক্তি করে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
কামবক্সের উত্থান– ১৭০৭ সালের মার্চ মাসে কামবক্স তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে বিজাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর খবর শহরে ছড়িয়ে পরার পর দূর্গের শাসক সৈয়দ নিয়াজ খান বিনাযুদ্ধে দূর্গটি কামবক্সের হাতে সমর্পণ করেছিলেন। কামবক্স সিংহাসনে আরোহণ করে আহসান খানকে সহস্র বাহিনীর সেনাপতি এবং তাঁর উপদেষ্টা তাবারুক খানকে উজির-ই-আজম হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন এবং নিজে পাদশাহ কামবক্স উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি পরে কুলবার্গ এবং ওয়াকিনখাড়া জয় করেছিলেন।
পরবর্তীতে তাবারুক খান এবং আহসান খানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছিলো। আহসান খান কামবক্সের অনুমতি ছাড়াই বিজাপুরে একটি মার্কেটপ্লেস গড়ে তুলেছিলেন। তবে তিনি কামবক্সকে কোনো কর দেননি। বিষয়টি তাবারুক খান কামবক্সকে অবগত করেছিলেন। কামবক্স তখন মার্কেটপ্লেস বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৭০৭ সালের মে মাসে কামবক্স আহসান খানকে গোলকুণ্ডা এবং হায়দরাবাদ জয় করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। সংবাদ পেয়ে হাদরাবাদের সুবদোর রুস্তম দিল খান আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তবে গোলকুণ্ডার শাসক আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেছিলেন।
আহসান খান, সাইফ খান (কামবক্সের ধনুর্বিদ্যার শিক্ষক), আরসান খান, আহম্মদ খান, নাসির খান এবং রুস্তম দিল খান(এঁরা সবাই কামবক্সের প্রাক্তন শিক্ষক)কে নিয়ে আহসান খান কামবক্সের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। কামবক্স জুম্মার নামাজে যাওয়ার সময় তাঁরা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলো। কামবক্স বিষয়টি তাকাররুব খানের কাছ থেকে অবগত হয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের রাতের ভোজের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। রুস্তম দিল খানকে রাস্তায় আটক করে হাতীর পায়ের নিচে ফেলে পিষ্ট করে হত্যা করা হয়েছিলো। সাইফ খানের হাত কেটে ফেলা হয়, আরশাদ খানের জিভ কেটে ফেলা হয়েছিলো। আহসান খানকে বন্দি করে কারারুদ্ধ করা হয়েছিলো এবং তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিলো। ১৭০৮ সালের এপ্রিল মাসে বাহাদুর শাহের দূত মক্তরব খান কামবক্সের দরবারে এসেছিলেন। তখন তাকাররুব খান কামবক্সকে অবগত করেছিলেন যে মক্তরব খান তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করতে ষড়যন্ত্র করছেন। কামবক্স মক্তরব খানকে একটি ভোজে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁর দলবলসহ হত্যা করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্য অভিমুখে যাত্রা– বাহাদুর শাহ ১৭০৮ সালের মে মাসে কামবক্সকে একটি চিঠি প্রেরণ করে আশা করেছিলেন যে, কামবক্স নিজেকে সার্বভৌম সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করার বিরুদ্ধে চিঠিটা একটি সতর্কবাণী হবে। চিঠিটা প্রেরণ করে তিনি আওরঙ্গজেবের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাত্রা করেছিলেন। কামবক্স চিঠির ব্যাখ্যা এবং ন্যায্যতা ছাড়াই বাহাদুর শাহকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন।
১৭০৮ সালের ২৮ শে জুন বাহাদুর শাহ হায়দরাবাদ পৌঁছে সংবাদ পেয়েছিলেন যে, কামবক্স মছলিবন্দর আক্রমণ করেছেন। কামবক্সের উদ্দেশ্য ছিলো, মছলিবন্দর দূর্গে লুকিয়ে রাখা ৩০ লক্ষ টাকারও বেশি মূল্যের গুপ্তধন দখল করা। তবে, প্রদেশের সুবেদার জান সিপার খান অর্থ হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেছিলেন। সুবেদারের ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়ে কামবক্স তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাঁকে যুদ্ধের জন্য চার হাজার সেনা নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জুলাই মাসে কুলবর্গা দুর্গের রক্ষক দালের খান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং কামবক্সের সঙ্গ পরিত্যাগের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। ১ নভেম্বর ওয়াকিনখেড়ার জমিদার পাম নায়েক সেনাবাহিনী ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার পর কামবক্স তাঁর জমিদারি দখল করেছিলেন। এদিকে ১৭০৮ সালের ৫ নভেম্বর বাহাদুর শাহ হায়দরাবাদ থেকে ৬৭ মাইল (১০৮ কিলোমিটার) উত্তরে অবস্থিত বিদার পৌঁছেছিলেন। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম আরভিন লিখেছেন যে, বাহাদুর শাহের শিবির যত এগিয়ে আসছিলো, কামবক্সের শিবির তত পিছিয়ে যাচ্ছিলো।
আরভিনের মতে, বাহাদুর শাহ নিকটে আসার সাথে সাথে কামবক্সের সেনা দল তাঁকে ত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলেন। তখন কামবক্সের সেনাপতি অর্থ প্রদানের ব্যর্থতার জন্য সেনারা দল ত্যাগ করে চলে যাওয়ার কথা অবগত করেছিলেন। উত্তরে কামবক্স বলেছিলেন যে, তাঁদের সেনাদলে রাখার আমার প্রয়োজন নেই, আমার বিশ্বাস ঈশ্বরের উপর, যা ভালো তাই ঘটবে।
কামবক্স পারস্যে পালিয়ে যেতে পারে ভেবে বাহাদুর শাহ তাঁর প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার খান নুসরত জংকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির গভর্নর টমাস পিটকে কামবক্সকে বন্দি করার জন্য ২,০০,০০০ টাকা প্রদান করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত কামবক্সের ২,৫০০ অশ্বারোহী এবং ৫,০০০ পদাতিক সেনা ছিলো বলে জানা যায়।
কামবক্সের মৃত্যু– ১৭০৮ সালের ২০ ডিসেম্বর কামবক্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বাহাদুর শাহ তিনশত উট এবং বিশ হাজার রকেট নিয়ে হায়দরাবাদের উপকণ্ঠে অবস্থিত তালাব-ই-মীরজুমলার দিকে যাত্রা করেছিলেন। বাহাদুর শাহ প্রথমে তাঁর পুত্র জাহান্দার শাহকে অগ্রণী বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে খান জামানকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। ১৭০৯ সালের ১২ জানুয়ারি বাহাদুর শাহ হায়দরাবাদ পৌঁছে তাঁর সেনাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এদিকে রাজকীয় জ্যোতিষী ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন যে, যুদ্ধে অলৌকিকভাবে কামবক্সই জয়ী হবেন। জ্যোতিষীর ভবিষ্যত বাণী বিশ্বাস করে কামবক্স তাঁর নগণ্য সংখ্যক সেনা নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন।
পরের দিন সূর্যোদয়ের সময় বাহাদুর শাহের সেনাবাহিনী কামবক্সকে আক্রমণ করেছিলেন। বাহাদুর শাহের ১৫,০০০ সেনা দু’টি দলে বিভক্ত ছিলো। একটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মুনিম খান। তাঁকে সহায় করছিলেন রফি-উশ-শান এবং জাহান্দার শাহ। দ্বিতীয়টি দলের নেতৃত্বে ছিলেন জুলফিকার নুসরত জং। দুই ঘণ্টা পরে কামবক্সের শিবির ঘেরাও করা হয়েছিলো এবং নুসরত জং অধৈর্য্য হয়ে কামবক্সের শিবির আক্রমণ করেছিলেন।
বাহাদুর শাহের সৈন্য সংখ্যা অধিক হওয়ার জন্য আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়ে কামবক্স নিজে যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন এবং প্রতিপক্ষ সেনা তাঁকে লক্ষ্য করে দু’টি তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। রক্তক্ষরণের ফলে কামবক্স যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন, তখন বাহাদুর শাহ তাঁকে তাঁর পুত্র বারিকুল্লাহ সহ বন্দি করেছিলেন। মুনিম খান এবং জুলফিকার নুসরত জংয়ের মধ্যে কে তাঁকে বন্দি করেছিলেন এ নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছিলো। রফি-উস-শান প্রথমজনের পক্ষে রায় ব্যক্ত করেছিলেন। কামবক্সকে পাল্কীতে করে বাহাদুর শাহের নিকটে আনা হয়েছিলো এবং পরের দিন সকালে তিনি মারা গিয়েছিলেন।
১৭০৯ সালের ২৩ জানুয়ারি তাঁকে দিল্লীতে অবস্থিত হুমায়ুনের সমাধির পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
শিখ বিদ্রোহ– গুরু গোবিন্দ সিংয়ের মৃত্যুর এক বছর পর বান্দা সিং বাহাদুরের নেতৃত্বে পাঞ্জাবে শিখরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে বাহাদুর শাহ দাক্ষিণাত্য ত্যাগ করে উত্তর ভারতের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শিখরা দিল্লীর দিকে খুব সাবধানতার সাথে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং হিসার সরকারে প্রবেশ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। ১৭০৯ সালের নভেম্বর মাসে তাঁরা সামানায় আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন এবং তাঁরা সামানার ফৌজদারকে পরাজিত করেছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর সাহাবাদ, সাধৌরা এবং বানুর দখল করার পর ১৭১০ সালের ১২ মে সিরহিন্দ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাপার চিরির যুদ্ধে মোগল ফৌজদার ওয়াজির খানকে পরাজিত এবং নিহত করে সিরহিন্দ দখল করেছিলেন।
সিরহিন্দ জয়ের পর শিখরা গাঙ্গেয় দোয়াবের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। দেওবন্দের একটি গ্রামে পৌঁছোনোর পর ধর্মান্তরিত শিখরা ফৌজদার জালাল খানের বিরুদ্ধে নিপীড়ন এবং কারাবরণের অভিযোগ করেছিলেন। তখন বান্দা সিং বাহাদুর জালালাবাদের পথে সাহারানপুর অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন। রাস্তায় শিখরা বেহতকে আক্রমণ করেছিলেন। বেহতকের পীরজাদা হিন্দু বিরোধী কাজের জন্য কুখ্যাত ছিলেন। শিখরা শহরটি দখল করে পীরজাদাদের হত্যা করেছিলেন। এর পর শিখরা জালালাবাদের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর জালাল খানকে আত্মসমর্পণ এবং বন্দি শিখদের মুক্ত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। কিন্তু জালাল খান সেই নির্দেশ প্রত্যাখান করেছিলেন। ১৭১০ সালের ২১ শে জুলাই শিখরা নানৌতায় আসেন এবং স্থানীয় শেখজাদাদের পরাজিত করেন। শিখরা এর পর জালালাবাদ অবরোধ করেন, তবে কৃষ্ণা নদীতে বন্যার কারণে অবরোধ প্রত্যাহার করে জলন্ধরের দোয়াব অঞ্চলে চলে আসেন।
শিখরা জলন্ধর এবং অমৃতসর অঞ্চল থেকে মোগলদের বিতাড়িত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা জলন্ধরের ফৌজদার শামাস খানকে কোষাগারের চাবি হস্তান্তর করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। শামাস খান প্রথমে আত্মসমর্পণের ভান করে পরে শিখদের আক্রমণ করেছিলেন। তিনি ধর্মের নামে মুসলমানদের আহ্বান জানান এবং জেহাদ ঘোষণা করেন। ১৭১০ সালের ১২ অক্টোবর-এ সংঘটিত রাহোনের যুদ্ধে শিখরা মোগলদের পরাজিত করেন। অমৃতসরে প্রায় ৮,০০০ শিখ সমবেত হয়ে মধ্য পাঞ্জাবের মাঝা এবং রিয়ারকি দখল করেন। তাঁরা লাহোরেও আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন, সেখানে মোল্লারা শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তাঁরা শিখদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
শিখরা নতুন ক্ষমতা দখল করে মোগল আধিকারিকদের বিতাড়ন করেছিলেন এবং তাঁদের জায়গায় শিখ আধিকারিকদের নিয়োগ করেছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর লোহগড়ে তাঁর রাজধানী স্থাপন করে তিনি একটি টাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি জমিদারী প্রথা বিলোপ করেছিলেন এবং কৃষকদের তাঁদের নিজের জমির মালিকানা প্রদান করেছিলেন।
দমনের প্রচেষ্টা– বান্দা সিং বাহাদুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার আগে বাহাদুর শাহ যোধপুরের অজিত সিং এবং অম্বরের মান সিংয়ের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। তিনি অবধের নবাব আসাফ-উদ-দৌলা, প্রাদেশিক গভর্নর খান-ই- দুররানি, মুরাদাবাদের ফৌজদার মহম্মদ আমিন খান চিন, দিল্লীর সুবেদার আসাদ খান এবং জম্মুর ফৌজদার ওয়াজিদ খানকে যুদ্ধে সহযোগ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। বাহাদুর শাহ ১৭১০ সালের ১৭ ই জুন পাঞ্জাবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। যাত্রাপথে তাঁর সাথে বিরোধিতা করা দলগুলিকে তিনি একত্রিত করেছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর, বাহাদুর শাহের পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত হয়ে অজিত সিং এবং মান সিংয়ের নিকট সহায় প্রার্থনা করেছিলেন। যাত্রাপথে বাহাদুর শাহ সোনিপত, কৈথাল এবং পানিপত জয় করেছিলেন। অক্টোবর মাসে বাহাদুর শাহের সেনাপতি নবাব ফিরোজ খান তাঁকে পত্র লিখে অবগত করেছিলেন যে, তিনি ইতিমধ্যে বিদ্রোহীদের তিন শত মাথা কেটে ফেলেছেন। প্রমাণ হিসাবে ফিরোজ খান মাথাগুলি বর্ণায় গেঁথে সম্রাটের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।
১৭১০ সালের ১ নভেম্বর-এ বাহাদুর শাহ কার্নাল পৌঁছোনোর পরে কাটোগ্রাফার রুস্তম দিল খান তাঁকে থানেশ্বর এবং সিরহিন্দের মানচিত্র প্রদান করেছিলেন। ছয়দিন পর শিখদের একটি ছোট দল মেওয়াতি এবং বানসওয়ালে মোগলদের কাছে পরাজিত হয়েছিলো। সিরহিন্দ শহরটি ৭ ই ডিসেম্বর আবার মোগলদের হস্তগত হয়েছিলো। সিরহিন্দ অবরোধকারী আমিন খান বাহাদুর সম্রাটকে বিজয়ের স্মরণে একটি সোনার আংটি উপহার দিয়েছিলেন। সিরহিন্দ দখলের পর সাদৌরা পুনর্দখলে ব্যর্থ হয়ে সম্রাট লোহগড়ের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। লোহগড়ে বান্দা সিং বাহাদুর লুকিয়ে ছিলেন। ৩০ নভেম্বর তিনি লোহগড় দূর্গ আক্রমণ করেছিলেন। সামান্য গোলা-বারুদ এবং কয়েকশত সেনা রেখে বান্দা সিং বাহাদুর দূর্গ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বান্দা সিংয়ের অনুসারি গোলাপ সিং বান্দা সিংয়ের মতো পোশাক পরিধান করে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংঘটিত করেছিলেন। গোলাপ সিংকে যুদ্ধে পরাজিত এবং হত্যা করা হয়েছিলো। সম্রাট কুমাওন এবং শ্রীনগরের শাসকদের আদেশ জারি করেছিলেন যে, বান্দা সিং বাহাদুর যদি তাঁদের অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁকে বন্দি করে যেন সম্রাটের কাছে প্রেরণ করা হয়।
নাহানের রাজা ভূপ প্রকাশের সাথে বান্দা সিং বাহাদুরের মিত্রতা থাকা বলে সন্দেহ করে ১৭১১ সালের জানুয়ারি মাসে ভূপ প্রকাশকে বন্দি করা হয়েছিলো। ভূপ প্রকাশের মাতৃ ভূপ প্রকাশকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য সম্রাটের কাছে অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে ভূপ প্রকাশের মাতৃ বান্দা সিং বাহাদুরের বন্দি অনুসারিদের সম্রাটের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। ফলে একমাস পর সম্রাট ভূপ প্রকাশকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুরের বিদ্রোহ দমন করার উদ্দেশ্যে শুকান খান বাহাদুর এবং হিম্মেত দিলের খানকে লাহোর প্রেরণ করা হয়েছিলো। তাঁরা বান্দা সিং বাহাদুরের বিদ্রোহ দমন করতে অসফল হয়েছিলেন। তখন সম্রাট তাঁদের সহায়ের জন্য অতিরিক্ত ৫,০০০ সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। সম্রাট রুস্তুম দিল খান এবং মহম্মদ আমিন খানকেও তাঁদের সাথে যোগদান করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো।
বান্দা সিং বাহাদুর লাহোর থেকে ৭ মাইল দূরে অবস্থিত আলহালাবে লুকিয়ে ছিলেন। মোগল শ্রমিকরা গ্রামে একটি সেতু মেরামত করার সময় বান্দা সিং বাহাদুরের অনুসারিরা মোগলদের বিভ্রান্ত করার জন্য ভুল বার্তা দিয়েছিলো যে, বান্দা সিং বাহাদুর আজমীর হয়ে দিল্লী আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছেন। বান্দা সিং বাহাদুর মোগলদের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য গ্রামের শাসক রাম চাঁদের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং ১৭১১ সালের এপ্রিল মাসে ফাতেহাবাদ অবরোধ করেছিলেন। রুস্তম জংয়ের কাছ থেকে বান্দা সিং বাহাদুর রাভি নদী পার হওয়ার সংবাদ পেয়ে সম্রাট ঈশা খানের নেতৃত্বে কামানসহ একদল সেনা প্রেরণ করেছিলেন। ঈশা খানের কাছে পরাজিত হয়ে বান্দা সিং বাহাদুর জন্ম পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ঈশা খান এবং আমিন খানের নেতৃত্বে একদল সেনা তাঁকে অনুসরণ করলেও তাঁরা তাঁকে বন্দি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সম্রাট জন্মর জমিদারদের নিকট বার্তা প্রেরণ করেছিলেন যে, সম্ভব হলে তাঁরা যেন বান্দা সিং বাহাদুরকে বন্দি করেন।
আমিন খান সুটলেজ নদীর তীরে বান্দা সিং বাহাদুরকে আক্রমণ করেছিলেন। তবে বান্দা সিং বাহাদুর গাড়োয়াল পাহাড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। ‘অজেয়’ বান্দা সিং বাহাদুরকে বন্দি করার জন্য সম্রাট অজিত সিং এবং জয় সিংয়রে নিকট সাহায্য চেয়েছিলেন। ১৭১১ সালের অক্টোবরে মোগল এবং রাজপুতদের যৌথ বাহিনী সদৌরার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। বান্দা সিং বাহাদুর এই আক্রমণ থেকেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং বর্তমান সময়ের কুলুতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
খোতবা বিতর্ক– সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাহাদুর শাহ শিয়া ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং চতুর্থ খলিফা তথা প্রথম শিয়া ইমাম আলীকে ওয়ালি উপাধি প্রদান করে প্রতি শুক্রবারের নামাজের সময় রাজার জন্য জনসাধারণের প্রার্থনা (খোতবা) পরিবর্তন করেছিলেন। লাহোরের নাগরিকরা এই খোতবা পরিবর্তনের জন্য অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
বাহাদুর শাহ এই সমস্যা সমাধানের জন্য ১৭১১ সালের অক্টোবরে লাহোর গিয়েছিলেন এবং হাজি ইয়ার মহম্মদ, মহম্মদ মুরাদ এবং অন্যান্য সুপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে এই বিষয়ে আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন। সম্রাট ওয়ালি শব্দটিকে ন্যায্যতা প্রদানের জন্য ‘কর্তৃপক্ষের বই’(‘বুক অফ অথরিটি’ যা আইনী লেখকদের দ্বারা ব্যবহৃত আইনী পুস্তক) পড়ে শুনিয়েছিলেন। ‘সাহাদতই একজন রাজার জন্য একমাত্র কাম্য’ বলার সাথে সাথে হাজি ইয়ার মহম্মদের সাথে তর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলো। ইয়ার মহম্মদ (সম্রাটের পুত্র আজিম-উশ-শান দ্বারা সমর্থিত) সম্রাটের বিরুদ্ধে সেনা নিয়োগ করেছিলেন। তবে যুদ্ধ হয়নি। সম্রাট বিষয়টির জন্য মসজিদের খতিব (প্রধান তেলাওয়াতকারী)কে দায়ী করেছিলেন এবং তাঁকে বন্দি করেছিলেন। ২ অক্টোবর মসজিদে সেনা নিয়োগ করা হলেও পুরানা খোতবাই পাঠ করা হয়েছিলো।
মৃত্যু– ইতিহাসবিদ উইলিয়াম আরভিনের মতে বাহাদুর শাহ ১৭১২ সালের জানুয়ারিতে লাহোরে ছিলেন এবং সেখানেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিলেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষবারের জন্য জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন। ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি মারা গিয়েছিলেন। মোগল সম্রান্ত কামওয়ার খানের মতে, তিনি প্লীহা বড় হয়ে মারা গিয়েছিলেন। ১১ এপ্রিল তাঁর মৃতদেহ তাঁর বিধবা স্ত্রী মিহর পাওয়ার এবং সেনাপতি চিন কিলিচ খানের তত্ত্বাবধানে দিল্লীতে প্রেরণ করা হয়েছিলো। ১৫ মে তাঁকে মেহরাউলির মুক্তা মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। মসজিদটি কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহের নিকট অবস্থিত ছিলো। তাঁর মৃত্যুর পর জাহান্দার শাহ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন এবং তিনি ১৭১৩ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।
মুদ্রা– বাহাদুর শাহ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং তামার মূদ্রা প্রচলন করেছিলেন। যদিও তাঁর পূর্বসূরিদের মূদ্রা সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ও বাণিজ্যের জন্য ব্যবহার করা হোত। আওরঙ্গজেবর রাজত্বকালে প্রচলিত তাম্রমূদ্রা তাঁর নামের সাথে পুনঃতৈরি করা হয়েছিলো। অন্যান্য মোগল সম্রাটদের মতো তাঁর মুদ্রায় কাপলেট ব্যবহার করা হয়নি। কবি দানিশমন্দ খান মুদ্রার জন্য দু’টি লাইনের কাপলেট রচনা করেছিলেন, তবে তা অনুমোদন করা হয়নি।
নাম, উপাধি এবং বংশ – উপাধিসহ বাহাদুর শাহের পুরো নাম ছিলো ‘আবুল-নসর সাইয়েদ কুতুবুদ্দিন মহম্মদ শাহ আলম বাহাদুর শাহ বাদশাহ’। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা তাঁকে খুলদ-মঞ্জিল (জান্নাতে প্রস্থান)বলা শুরু করেছিলেন। তিনিই একমাত্র মোগল সম্রাট যিনি সাইয়েদ উপাধি ধারণ করেছিলেন। সাইয়েদ উপাধি নবী(সাঃ)এর বংশধরেরা ব্যবহার করতেন। উইলিয়াম আরভিনের মতে, তাঁর মাতামহ সৈয়দ শাহ মীরের কন্যা ছিলেন। যার কন্যা নবাব বাইজিকে আওরঙ্গজেব বিয়ে করেছিলেন।
স্ত্রী-
নিজাম বাই– (বিবাহ ১৬৬০ সাল এবং মৃত্যু ১৬৯২ সাল),
রাণী অমৃতা বাই-(বিবাহ ১৬৭১ সাল),
মিহর পাওয়ার,
আমাত–উল–হাবিব,
রাণী ছাত্তার বাই ।
সন্তান-
জাহান্দার শাহ,
ইজ্জ–উদ–দীন মির্জা,
আজিম–উশ–সান মির্জা,
দৌলত আফজা মির্জা,
জাহান শাহ মির্জা, হু
মায়ূন মির্জা,
ডাহির আফ্রোজ বানু বেগম এবং রফি–উশ–কদর। •
জাহান্দার শাহ
জাহান্দার শাহের জন্ম ১৬৬১ সালের ১০ মে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত দাক্ষিণাত্যে। তিনি অস্টম মোগল সম্রাট ছিলেন। তাঁর পিতার নাম শাহ আলম (বাহাদুর শাহ-প্রথম)এবং মাতৃর নাম নবাব বাই। নবাব বাই হায়দ্রাবাদের একজন অভিজাত নাগরিক ফতেহইয়ার জংয়ের কন্যা ছিলেন। তাঁর পিতামহের নাম আওরঙ্গজেব আলমগীর। তিনি ১৭১২ সালের ২৯ মার্চ থেকে ১৭১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র এগার মাস রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে জুলফিকার খান নুসরত জং দাক্ষিণাত্য সুবাহকে প্রায় স্বাধীন করে নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ভাতিজা ফারুখসিয়ার কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।
জাহান্দার শাহ তাঁর পিতামহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক বলখের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৭১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর জাহান্দার শাহ এবং তাঁর ভ্রাতৃ আজিম-উশ-সান উভয়েই নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ফলে উত্তরাধিকারের জন্য সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। উত্তরাধিকারের যুদ্ধে আজিম-উশ-সান ১৭১২ সালের ১৭ মার্চে নিহত হয়েছিলেন এবং জাহান্দার শাহ ১১ মাসের জন্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
সিংহাসনে আরোহণের আগে জাহান্দার শাহ একজন অত্যন্ত সফল ও সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ভারত মহাসাগর ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি সিন্ধুর সুবেদারও নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি আজিজ-উদ-দীন সহ তিন পুত্রের পিতৃ ছিলেন। আজিজ-উদ-দীন ১৭৫৪ সাল থেকে ১৭৫৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।
শাসন– জাহান্দার শাহ একজন অসফল শাসক ছিলেন এবং তাঁর দরবার প্রায়শই নাচ-গান বিনোদনের মাধ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে থাকতেন। তিনি একজন নাচের মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে মোগল সাম্রাজ্যের অভিজাতরা চমকে উঠেছিলেন। আওরঙ্গজেবের কন্যা জিনাত-উন-নিসা এই বিবাহের বিরোধিতা করেছিলেন।
কর্ণাটকের তৃতীয় নবাব সাদাতুল্ল্যাহ খান জাহান্দার শাহকে সর্বপ্রথম সম্রাট হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সাদাতুল্ল্যাহ খান ওর্ডার ডে সিংকে হত্যা করেছিলেন। কারণ সাদাতুল্ল্যাহ খান বিশ্বাস করেছিলেন যে, তিনিই ওর্ছা ফোর্টের প্রকৃত সেনাপতি ছিলেন। সাদাতুল্ল্যাহ খান জাহান্দার শাহকে মোগল সিংহাসনের দখলদারী হিসাবে অপপ্রচার শুরু করেছিলেন। জাহান্দার শাহ নিজের কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করার জন্য অটোম্যান সুলতান আহমেদ-তৃতীয়কে উপহার প্রেরণ করেছিলেন।
বিবাহ– জাহান্দার শাহের প্রথম স্ত্রী ছিলেন মির্জা মোকাররম খান সাফাভির কন্যা। ১৬৭৬ সালের ১৩ অক্টোবর বিবাহটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি মির্জা রুস্তমের কন্যা সাইয়িদ-উন-নিসাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৬৮৪ সালের ৩০ আগস্ট এই বিয়ের বাক্দান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। বাক্দান অনুষ্ঠানে কাজি আবু সাইয়িদ, আওরঙ্গজেব এবং শাহজাদা মুয়াজ্জেম (বাহাদুর শাহ প্রথম) উপস্থিত ছিলেন। ১৮ সেপ্তেম্বর বিয়ে অনষ্ঠিত হয়েছিলো। সাইয়্যেদ উন-নিসাকে ৬৭,০০০ টাকা মূল্যের অলংকার প্রদান করা হয়েছিলো। বিবাহ অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন শাহজাদী জিনাত-উন-নিসা।
জাহান্দার শাহের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন রাজপুত রাজকুমারী অনুপ বাই। তিনি শাহজাদা মহম্মদ আজিজ-উদ-দীন মির্জার মাতৃ ছিলেন। শাহজাদা আজিজ-উদ্দীন ১৬৯৯ সালের ৬ জুন জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। আজিজ-উদ-দীন আলমগীর- দ্বিতীয় উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করার ১৯ বছর আগে অনুপ বাই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
জাহান্দার শাহের চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন খাসুসিয়াত খানের কন্যা লাল কুনওয়ার। জাহান্দার শাহ তাঁকে খুব পসন্দ করতেন এবং সিংহাসনে আরোহণের পর তাঁকে ইমতিয়াজ মহল উপাধি প্রদান করেছিলেন।
মৃত্যু– ১৭১৩ সালের ১০ জানুয়ারি আগ্রার যুদ্ধে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সমর্থনের ফলে আজিম-উশ-সানের পুত্র ফার খসিয়ারের কাছে জাহান্দার শাহ পরাজিত হয়েছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি দিল্লীতে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং লাল কুনওয়ারের সাথে তাঁকে বন্দি করে নতুন সম্রাট ফারুখসিয়ারের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। ১৭১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি বন্দি অবস্থায় ছিলেন। পরে তাঁকে একজন পেশাদার হত্যাকারী দ্বারা শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিলো।
মূদ্রা– জাহান্দার শাহ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং তামার মূদ্রা প্রচলন করেছিলেন। তাঁর মূদ্রায় ‘আব-আল-ফাতেহ এবং সাহেবে কিরান কাপলেট’ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। *
নিকু সিয়ার
মির্জা মহম্মদ নিকু সিয়ারের জন্ম ১৬৭৯ সালের ৬ অক্টোবর মোগল সাম্রাজ্যে। তিনি তাইমুর-দ্বিতীয় নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম মহম্মদ আকবর এবং মাতৃর নাম সালিমা বানু বেগম। নিকু সিয়ারের পিতা মহম্মদ আকবর আওরঙ্গজেবের চতুর্থ পুত্র সন্তান ছিলেন। মহম্মদ আকবর তাঁর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং ব্যর্থ হয়ে দাক্ষিণাত্যে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তিনি সেখান থেকে পারস্যে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সেজন্য নিকু সিয়ার মোগল হারেমে প্রতিপালিত হয়েছিলেন। ১৬৯৫ সালে ১৬ বছর বয়সে তাঁর প্রপিতামহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক তিনি আসামের সুবেদার নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৭০২ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন। ১৭০২ সালে তিনি প্রপিতামহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক সিন্ধুর সুবেদার নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৭০৭ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন।
১৭১৯ সালের ১৮ মে আগ্রার স্থানীয় শাসক বীরবল (আকবরের দরবারের বীরবল নয়) শাহজাদা নিকু সিয়ারকে হারেমের কারাগার থেকে বের করে এনে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাঁকে আগ্রা দূর্গে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু নিকু সিয়ার তাঁর জীবন হারেমের অভ্যন্তরে কাটিয়েছিলেন এবং কাটামাইটে(বয়ঃ সন্ধিকালীন বালকের মতো)র মতো কথা বলতেন। তাই তাঁকে সম্রাট হিসাবে হাস্যকরভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিলো।
যাইহোক, বীরবলের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় সাইয়্যিদ হাসান আলী খান এবং সাইয়্যিদ হোসেইন আলী খান ১৭১৯ সালের ১৩ আগস্ট বীরবল এবং নিকু সিয়ারকে পরাজিত করে উভয়কেই তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিলো এবং নিকু সিয়ারকে গ্রেপ্তার করে পুনরায় হারেমের কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। এর পর তাঁকে দিল্লীর সেলিমগড় দূর্গে স্থানান্তর করা হয়েছিলো এবং নিকু সিয়ার ১৭২৩ সালের ১২ এপ্রিল ৪৩ বছর বয়সে সেলিমগড় দূর্গে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহ প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। *
ফারুখসিয়ার
ফারুখসিয়ারের জন্ম ১৬৮৩ সালের ২০ আগস্ট মোগল সাম্রাজ্যের দাক্ষিণাত্য মালভূমির আওরঙ্গাবাদে। তিন শহীদ- ই-মজলুম নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম আজিম-উশ-সান এবং মাতৃর নাম সাহিবা নিজওয়ান। আজিম-উশ- সান সম্রাট বাহাদুর শাহের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। ফারুখসিয়ার দশম মোগল সম্রাট ছিলেন এবং ১৭১৩ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ১৭১৯ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি একজন সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন এবং সহজেই উপদেষ্টাদের দ্বারা প্রভাবিত হতেন। তাঁর স্বাধীনভাবে শাসন করার ক্ষমতা, জ্ঞান এবং চরিত্রের অভাব ছিলো।
ফারুখসিয়ার ১৬৯৬ সালে তাঁর পিতা আজিম-উশ-সানের সাথে বাংলা অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭০৭ সালে আজিম-উশ-সানকে বাংলা থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং ফারুখসিয়ারকে বাংলা সুবাহের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। ফারুখসিয়ার তাঁর জীবনের প্রথম বছরগুলো ঢাকায় কাটিয়েছিলেন। তাঁর পিতামহ বাহাদুর শাহ-প্রথমের রাজত্বকালে তিনি মুর্শিদাবাদে চলে এসেছিলেন।
১৭১২ সালের ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পিতা আজিম-উশ-সান উত্তরাধিকারের যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং ফারুখসিয়ারকে স্মরণ করেছিলেন। বাহাদুর শাহের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ফারুখসিয়ার আজিমাবাদ (বর্তমান নাম পাটনা) অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন এবং ২১ শে মার্চ তাঁর পিতা আজিম-উশ-সানকে মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং তাঁর পিতার নামে মূদ্রা জারি করেছিলেন। তাঁর পিতার নামে খোতবা পাঠের নির্দেশও দিয়েছিলেন। ৬ এপ্রিল তিনি তাঁর পিতার পরাজয়ের সংবাদ শুনে আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছিলেন। তবে তাঁর হিতাকাংক্ষীরা তাঁকে আত্মহত্যা করতে বারণ করেছিলেন।
উত্তরাধিকারের যুদ্ধ– ১৭১২ সালে ফারুখসিয়ারের চাচা জাহান্দার শাহ তাঁর পিতা আজিম-উশ-সানকে পরাজিত এবং হত্যা করে মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ফারুখসিয়ার তাঁর পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য জাহান্দার শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তাঁর সাথে যোগদান করেছিলেন বাংলার সৈয়দ হোসেন আলী খান এবং তাঁর ভ্রাতৃ এলাহাবাদের সুবেদার আবদুল্ল্যাহ খান ।
ফারুখসিয়ার বাহিনী আজিমাবাদ থেকে এলাহাবাদ পৌঁছোনোর পরে তাঁরা জাহান্দার শাহের সেনাপতি সৈয়দ আব্দুল গাফ্ফার খান গার্দেজির ১২,০০০ সেনার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন। ফলে আবদুল্ল্যাহ খান এলাহাবাদ দূর্গে পিছু হটে গিয়েছিলেন। যাইহোক, ইতিমধ্যে গার্দেজির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং গার্দেজির মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে গার্দেজির সেনা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিলো। ফলে শেষমুহূর্তে ফারুখসিয়ার বাহিনী যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন।
যুদ্ধে পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে জাহান্দার শাহ সেনাপতি খাজা আহসান এবং তাঁর পুত্র আজউদ্দিনকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করেছিলেন। তাঁরা খাজওয়াহ পৌঁছে সংবাদ পেয়েছিলেন যে, ফারুখসিয়ারের সাথে হোসেন আলী খান এবং আবদুল্ল্যাহ খান যোগদান করেছেন। আবদুল্ল্যাহ খানের নেতৃত্বে ফারুখসিয়ার বাহিনী সংঘর্ষ শুরু করেছিলেন। একরাত ব্যাপী যুদ্ধের পর আজউদ্দিন এবং খাজা আহসান খান যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তাঁদের ক্যাম্পটি ফারুখসিয়ারের হস্তগত হয়েছিলো।
১৭১৩ সালের ১০ জানুয়ারি ফারুখসিয়ার বাহিনী এবং জাহান্দার শাহ বাহিনী বর্তমান উত্তর প্রদেশের আগ্রা থেকে ১৪ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত সামুগড়ে মিলিত হয়েছিলো। উক্ত যুদ্ধে জাহান্দার শাহ পরাজিত এবং বন্দি হয়েছিলেন। পরের দিন ফারুখসিয়ার নিজেকে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ফারুখসিয়ার লালকেল্লা দখল করে মোগল রাজধানী দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন। জাহান্দার শাহকে হত্যা করে তাঁর মাথাটি বাঁশের শলাকায় গেঁথে একজন জল্লাদ হাতীর পিঠে বসে প্রদর্শন করছিলো এবং দেহটি অন্য একটি হাতীর পিঠে বহন করা হয়েছিলো।
সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে শত্রুতা– ১৮ শ শতকে সাইয়্যিদ হাসান আলী খান এবং সাইয়্যিদ হোসেইন আলী খান মোগল সম্রাজ্যে খুব প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা নিজেদের সাইয়্যিদ এবং হজরত মহম্মদ(সাঃ)এর কন্যা ফাতিমা(রহঃ) এবং হজরত আলী(করমুল্লাহর) বংশধর বলে দাবি করতেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এরাঁ মোগল দরবারে খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা ইচ্ছামতে সম্রাটদের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করতেন বা সিংহাসনচ্যূত করতেন। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সহায়তায় ফারুখসিয়ার জাহান্দার শাহকে পরাজিত করার পর তাঁরা তাঁদের অন্য একজন ভ্রাতা আবদুল্লাহ খানের জন্য উজির (প্রধানমন্ত্রী) পদ দাবি করেছিলেন। কিন্তু ফারুখসিয়ার ইতিমধ্যেই পদটি গাজিউদ্দিন খানকে প্রদান করেছিলেন, সেজন্য ফারুখসিয়ার তাঁদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং আবদুল্লাহকে ওয়াকিল-ই-মুতলাক নামে একটি রিজেন্ট (রাজার অবর্তমানে শাসনকার্য পরিচালনা করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত) পদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ খান এই বলে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে, তিনি আসলে উজির-এ-আজম পদের জন্য যোগ্য। কারণ যেহেতু তিনি জাহান্দার শাহের বিরুদ্ধে ফারুখসিয়ারের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। ফারুখসিয়ার শেষপর্যন্ত তাঁদের দাবি মেনে নিয়েছিলেন এবং আবদুল্লাহকে উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।
ইতিহাসবিদ উইলিয়াম আরভিনের মতে, ফারুখসিয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মীরজুমলা-তৃতীয় এবং খান দাউরান ফারুখসিয়ারের মনে সন্দেহের বীজ রোপন করেছিলেন এই বলে যে, সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় সম্রাটের কাছ থেকে সিংহাসন কেড়ে নিতে পারেন। এই সম্পর্কে অবগত হয়ে সাইয়্যিদ হোসেইন আলী খান আব্দুল্লাহ খানকে পত্র লিখে অবগত করেছিলেন যে, শাহজাদার কথা-বর্তা এবং কাজের প্রকৃতি দেখে, শাহাজাদা তাঁদের সম্পাদিত সেবার দাবিকে গুরুত্ব প্রদান না করে বিশ্বাস তথা কথা ভঙ্গকারী এবং সম্পূর্ণরূপে লজ্জাহীন ব্যক্তির পরিচয় দিচ্ছেন। নতুন সার্বভৌমের পরিকল্পনার তোয়াক্কা না করে তাঁদের স্বার্থে আমাদের কাজ করা প্রয়োজন।
অজিত সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান– মহারাজা অজিত সিং মারোয়ারী অভিজাতদের সমর্থনে আজমীর দখল করে মোগল কূটনীতিবিদদের তাঁর রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। ফারুখসিয়ার তাঁকে বশীভূত করার জন্য সৈয়দ হোসেইন আলী খানকে প্রেরণ করেছিলেন। এদিকে মোগল দরবারের সাইয়্যিদ ভ্রাতৃ বিরোধী দল সাইয়্যিদ হোসেন আলীকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। সৈয়দ হোসেন আলী খানকে পরাজিত করতে পারলে পুরস্কার প্রদানের আশ্বাস প্রদান করে ফারুখসিয়ারকে অজিত সিংয়ের নিকট চিঠি লিখতে বাধ্য করেছিলেন। হোসেন আলী খান ১৭১৪ সালের ৬ জানুয়ারি আজমীরের উদ্দেশ্যে দিল্লী ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন সরবুলন্দ খান এবং আফ্রাসিয়াব খান। হোসেন আলী খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে হোসেন আলী খান সরাই সাহলে পৌঁছোনোর পর অজিত সিং শান্তি আলোচনার জন্য দূত প্রেরণ করেছিলেন। তবে সেই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিলো। হোসেইন আলী খান যোধপুর, জয়সেলমার এবং মাইর্থা হয়ে আজমীরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে অজিত সিং মোগল সেনাপতিকে যুদ্ধ থেকে বিরত করার আশায় মরুভূমির দিকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। হোসেইন আলী খান অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে অজিত সিং মাইর্থায় মোগল বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ফলস্বরূপ, শান্তি চুক্তির মাধ্যমে রাজস্থানে মোগল কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। চুক্তির শর্ত হিসাবে অজিত সিং তাঁর কন্যা ইন্দিরা কানওয়ারকে ফারুখসিয়ারের নিকট বিয়ের কনে হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর পুত্র অভয় সিংকে ইন্দিরা কানওয়ারের সাথে মোগল দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
জাটদের বিরুদ্ধে অভিযান– দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে আওরঙ্গজেব প্রায় ২৬ বছর অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ফলে উত্তর ভারতে স্থানীয় শাসকদের উত্থান হয়েছিলো এবং মোগল কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে জাটদেরও উত্থান হয়েছিলো। ১৭১৩ সালের প্রথম দিকে ফারুখসিয়ার আগ্রার সুবেদার ছাবেলা রামকে জাট নেতা ছুরামনের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করেছিলেন। তবে ছাবেলা রামের সেই অভিযান ব্যর্থ হয়েছিলো। পরে ছাবেলা রামের উত্তরসূরি সামসামুদ দৌলা খান ছুরামনকে মোগল সম্রাটের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছিলেন। রাজা বাহাদুর রাঠোর সামসামুদ দৌলা খানের সাথে মোগল দরবারে গিয়েছিলেন। তবে ফারুখসিয়ারের সাথে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিলো।
১৭১৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাজা জয় সিং-দ্বিতীয় জাট নেতা চুরামনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। চুরামন তখন থুনে দূর্গে ছিলেন। সংবাদ পেয়ে জয় সিং-দ্বিতীয় থুনে দূর্গ অবরোধ করেছিলেন। ডিসেম্বরে চুরামনের পুত্র মুহকাম সিং দূর্গ থেকে বের হয়ে জয় সিং-দ্বিতীয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেছিলেন। মোগলদের গোলাবরুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় জয় সিং-দ্বিতীয় সৈয়দ মুজাফ্ফর খানকে আগ্রার অস্ত্রাগার থেকে বারুদ, রকেট এবং সীসার ঢিবি আনার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১৭১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় এক বছর অবরোধ চলছিলো। এদিকে ১৭১৭ সালে দেরিতে বৃষ্টি আসার জন্য জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গিয়েছিলো। ফলে জয় সিং-দ্বিতীয় অবরোধ চালিয়ে যাওয়াটা কঠিন মনে করেছিলেন। অভিযান শক্তিশালী করার জন্য জয় সিং-দ্বিতীয় ফারুখসিয়ারের নিকট পত্র লিখেছিলেন যে, তিনি জাটদের সাথে অনেকবার মুখামুখি হয়েছেন। এখন তাঁর সহায়ের প্রয়োজন। তবে, জয় সিংয়ের পত্র ফারুখসিয়ারকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলো। সেজন্য জয় সিং তাঁর দিল্লীর এজেন্টের মাধ্যমে সৈয়দ আবদুল্লাহ খানকে জানিয়েছিলেন, যে তিনি যুদ্ধে জয়ী হলে সম্রাটকে ত্রিশ লক্ষ টাকা এবং মন্ত্রীকে দুই মিলিয়ন টাকা দিবেন। সৈয়দ আবদুল্লাহ খান এবং ফারুখসিয়ারের মধ্যে আলোচনা সফল হওয়ায় তিনি জয় সিংয়ের দাবি মেনে নিয়েছিলেন এবং চুরামনকে মোগল দরবারে আনার জন্য সৈয়দ খান জাহানকে প্রেরণ করেছিলেন। অবরোধের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ফারুখসিয়ার জয় সিংকে একটি ফরমানও পাঠিয়েছিলেন।
১৭১৮ সালের ১৯ এপ্রিল চুরামনকে ফারুখসিয়ারের নিকট হাজির করা হয়েছিলো এবং চুরামন মোগল কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে শান্তি আলোচনার জন্য সন্মত হয়েছিলেন। খান জাহানকে বাহাদুর উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিলো যে, চুরামন সৈয়দ আব্দুল্লাহ খানের মাধ্যমে ফারুখসিয়ারকে নগদ ৫০ লক্ষ টাকা এবং অন্যান্য জিনিসপত্র প্রদান করবেন।
শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং বান্দা বাহাদুরের হত্যা– বান্দা সিং বাহাদুর একজন শিখ নেতা ছিলেন। ১৭০০ সালের প্রথম দিকে তিনি পাঞ্জাবের কিছু অঞ্চল দখল করেছিলেন। মোগল সম্রাট বাহদুর শাহ প্রথম বান্দা সিং বাহাদুরকে দমন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
১৭১৪ সালে সিরহিন্দের ফৌজদার জয়নুদ্দিন আহমদ খান রোপারের নিকটে শিখদের আক্রমণ করেছিলেন। ১৭১৫ সালে বান্দা সিং বাহদুরকে পরাজিত করার জন্য ফারুখসিয়ার কামরুদ্দিন খান, আব্দুস সামাদ খান এবং জাকারিয়া খান বাহাদুরের অধীনে ২০,০০০ সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। গুরুদাসপুরে বান্দা সিং বাহাদুরকে আট মাস অবরোধ করে রাখার পর গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে বান্দা সিং বাহাদুর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০০ জন সঙ্গীসহ বান্দা সিং বাহাদুরকে আটক করে সিরহিন্দ শহরের চারপাশে কুচকাওয়াজ করে দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়েছিলো।
বান্দা সিং বাহাদুরকে একটি লোহার খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছিলো এবং তাঁর সঙ্গীদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিলো। তাঁদেরকে তাঁদের ধর্ম পরিত্যাগ করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিলো এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া শিখদের মুক্ত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছিলো। উইলিয়াম আরভিনের মতে, একজন বন্দিও ধর্মান্তরিত হোননি। তাঁরা ধর্মান্তরিত হতে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে বন্দি শিখদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো। ৭৮০ জন বন্দি শিখ, ২০০০ শিখের মাথা বর্ণায় ঝুলিয়ে দিল্লীতে আনা হয়েছিলো। ফারুখসিয়ার বাহিনী লালকেল্লায় পৌঁছোনোর পর ফারুখসিয়ার বান্দা সিং বাহাদুর, বাজ সিং, ফতেহ সিং এবং তাঁর সঙ্গীদের ত্রিপোলিয়ায় বন্দি করে রাখার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। দিল্লীর ধনী খত্রীরা বান্দা সিং বাহাদুরের মুক্তির বিনিময়ে অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে ১৭১৬ সালের ১৯ জুন বান্দা সি বাহাদুর ও তাঁর অনুসারিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরা করা হয়েছিলো। প্রথমে বান্দা সিং বাহাদুরের চোখ উপরে ফেলা হয়েছিলো, তাঁর চামড়া তুলে ফেলা হয়েছিলো এবং পরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো।
বাণিজ্যে ছাড়– ১৭১৭ সালে ফারুখসিয়ার ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে মোগল সাম্রাজ্যে বসবাস এবং বাণিজ্য করার অধিকার প্রদান করে ফরমান জারি করেছিলেন। বার্ষিক ৩,০০০ টাকার বিনিময়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করার অধিকার প্রদান করা হয়েছিলো। বাণিজ্যে ছাড় প্রদানের কারণ ছিলো উইলিয়াম হ্যামিলটন কোম্পানীর সাথে যুক্ত একজন সার্জন ফারুখসিয়ারের রোগ নিরাময় করেছিলেন। পণ্য চলাচলের জন্য কোম্পানীকে দস্তক (পাস) প্রদানের অধিকার প্রদান করে ফরমান জারি করা হয়েছিলো। এই অধিকার কোম্পানীর কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
এই ফরমান যোগে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী বাংলা প্রদেশেও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করার অধিকার পেয়েছিলেন। ফলে বাংলার নবাব আলীবর্দি খান ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। বাংলার পরবর্তী নবাব মীর কাশিম স্থানীয় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অবস্থান কোম্পানীর সমকক্ষ রাখার জন্য ভারতীয় ব্যবসায়ীদের শুল্কও বাতিল করেছিলেন ।
সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে চূড়ান্ত লড়াই– ১৭১৭ সালের মধ্যে ফারুখসিয়ার মীরজুমলা-তৃতীয়কে তাঁর পক্ষে নথিতে স্বাক্ষর প্রদানের অধিকার প্রদান করেছিলেন। ফলে মীরজুমলা-তৃতীয় উজির-এ-আজম সৈয়দ আব্দুল্লাহ খানের সাথে পরামর্শ ছাড়াই জায়গির এবং মনসবের প্রস্তাব অনুমোদন করা শুরু করেছিলেন। সৈয়দ আব্দুল্লাহ খানের ডেপুটি রতন চাঁদ কাজের বিনিময়ে তাঁর হয়ে ঘুষ গ্রহণ করতেন এবং রাজস্ব চাষে জড়িত হয়েছিলেন। মোগল সম্রাট দ্বারা এসব কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে মীরজুমলা-তৃতীয় ফারুখসিয়ারকে বলেছিলেন যে, সাইয়্যিদ ভ্রাতৃরা কাজের জন্য অনুপযুক্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার অভিযোগ আনা হয়েছিলো। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের ক্ষমতাচ্যূত করার আশায় ফারুখসিয়ার সামরিক প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন এবং মীরজুমলা এবং খান দৌরানের অধীনে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলেন।
সৈয়দ হোসেন আলী খান ফারুখসিয়ারের পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলিতে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার কথা ভেবেছিলেন। তাঁকে নিজাম-উল-মুলকের পরিবর্তে দাক্ষিণাত্যের ভাইসরয় হিসাবে নিযুক্ত করতে বলেছিলেন, কিন্তু ফারুসিয়ার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে নিজাম-উল-মুলক হিসাবে দাক্ষিণাত্যে স্থানান্তর করেছিলেন। ফলে ফারুখসিয়ারের সমর্থকদের আক্রমণের ভয়ে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় সামরিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন। ফারুখসিয়ার প্রথমে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের পিষে ফেলার জন্য আমিন খানকে দায়িত্ব অর্পণের কথা ভাবছিলেন, কিন্তু আমিন খানকে পরে অপসারণ করা কঠিন হবে ভেবে তিনি এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন।
সৈয়দ হোসেন আলী খান দাক্ষিণাত্যে এসে ১৭১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মারাঠা শাসক শাহু-প্রথমের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন। চুক্তির মাধ্যমে শাহুকে দাক্ষিণাত্যে সারদেশমুখী কর(করের উপরে সারদেশমুখী ছিলো ১০ শতাংশ কর। এটি রাজাকে প্রদান করা শ্রদ্ধা ছিলো।) সংগ্রহের অনুমতি প্রদান করে বেরার এবং গাণ্ডোয়ানার শাসন ভার প্রদান করেছিলেন। বিনিময়ে শাহু-প্রথম মোগলদের বার্ষিক ১০ লক্ষ টাকা প্রদান এবং সৈয়দদের জন্য ১৫,০০০ সেনা রাখতে সন্মত হয়েছিলেন। এই চুক্তি ফারুখসিয়ারের অনুমোদন ছাড়াই স্বাক্ষর করা হয়েছিলো। ফলে চুক্তির বিষয়ে অবগত হয়ে ফারুখসিয়ার সৈয়দ হোসেন আলী খানের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
মোগল সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলি–
উত্তর ভারত
প্রদেশ শাসক
আগ্রা সামস-উদ-দৌলা খান
আজমীর সৈয়দ মুজাফ্ফর খান বারহা
এলাহাবাদ খান জাহান
অবধ সরবুল্লাহ খান
বেঙ্গল ফারখন্দ খান
বিহার সৈয়দ হোসেন আলী খান
দিল্লী মহম্মদ ইয়ার খান
গুজরাট শাহাদাত খান
কাবুল বাহাদুর নাসির জং
কাশ্মীর সাদাত খান
লাহোর আব্দুস সামাদ খান
মালওয়া রাজা জয় সিং
মুলতান কুতুব-উল-মুলক
উড়িষ্যা মুর্শিদকুলি খান
দক্ষিণ ভারত
বেরার ইয়াজ খান
বিদার আমিন খান
বিজাপুর মনসুর খান
বুরহানপুর শুকুরুল্লাহ খান
হায়দ্রাবাদ ইউসুফ খান
ক্ষমতাচ্যুত– ১৭১৩ সালে ফারুখসিয়ার মারওয়ারের অজিত সিংকে ঠাট্টা সুবাহের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু অজিত সিং দরিদ্র প্রদেশে যেতে অস্বীকার করেছিলেন। তখন অজিত সিংকে বশীভূত করার জন্য সম্রাট সৈয়দ হোসেন আলী খানকে প্রেরণ করেছিলেন। এদিকে সৈয়দ হোসেন আলী খানকে পরাজিত করতে পারলে পুরস্কার প্রদানের আশ্বাস দিয়ে অজিত সিংয়ের নিকট সম্রাট গোপনে একটি ব্যক্তিগত পত্র প্রেরণ করেছিলেন। অজিত সিং সৈয়দ হোসেন আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে শান্তি চুক্তি করেছিলেন এবং সৈয়দ হোসেন আলী তাঁকে অদূরে গুজরাটে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন। ফলে অজিত সিং ঠাট্টা সুবাহের গভর্নর পদ গ্রহণ করেছিলেন। এই চুক্তির আরেকটি শর্ত ছিলো সম্রাটের সাথে তাঁর কন্যা বাই ইন্দিরা কানওয়ারের বিয়ে।
অজিত সিং ১৭১৯ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ফারুখসিয়ারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। অজিত সিং ফারুখসিয়ারকে লালকেল্লায় অবরোধ করে রেখেছিলেন এবং রাতব্যাপী যুদ্ধের পর তিনি প্রাসাদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কুতুব-উল-মুলক অজিত সিংকে প্রাসাদে প্রবেশে বাধা প্রদান করার চেষ্টা করেছিলেন। ক্ষুব্ধ হয়ে অজিত সিং তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছিলেন এবং রাজপুত ও পাঠান সেনাদের প্রাসাদে প্রবেশ করে ফারুখসিয়ারকে আটক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ফারুখসিয়ার তাঁর মাতৃ, স্ত্রী এবং কন্যাদের সাথে হারেমে লুকিয়ে ছিলেন। পাঠান সেনারা হারেমে প্রবেশ করে তাঁকে আটক করেছিলেন। ফারুখসিয়ার প্রথমে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও তাঁর সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো। তাঁকে আটক করে ত্রিপোলিয়া গেটের কাছে অবস্থিত একটি ছোটগৃহে নিয়ে আসা হয়েছিলো। সেখানে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিলো এবং পরে একটি সুই দিয়ে তাঁকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। মোগল কর্মকর্তারা তাঁর জন্য করুণা ভিক্ষা করেছিলেন। অজিত সিংয়ের এই কার্যের বিরুদ্ধে জয়পুরের রাজা জয় সিং এবং হায়দরাবাদের নিজাম-উল-মুলক হুমকি দিয়েছিলেন, তবে তাঁরা কেউ পরে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি।
১৭১৯ সালের ২ শে মার্চ শাহজাদাদের মধ্য থেকে রফি-উদ-দারজাতকে বেছে নিয়ে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সহায়তায় অজিত সিং রফি-উদ-দারজাতের হাতে ধরে মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।
পারিবারিক জীবন– ফারুখসিয়ার প্রথম বিয়ে করেছিলেন মীর মহম্মদ তাকির কন্যা ফখর-উন-নিসা বেগমকে। তিনি গওহর-উন-নিসা নামেও পরিচিত ছিলেন।
ফারুখসিয়ার দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন, মহারাজা অজিত সিংয়ের কন্যা বাই ইন্দিরা কানওয়ারকে। ফারুখসিয়ারের রাজত্বের চতুর্থ বছরে ১৭১৫ সালের ২৭ শে মার্চ এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। তাঁদের কোনো সন্তান-সন্ততি ছিলেন না। ফারুখসিয়ার ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর ১৭১৯ সালের ১৭ ই জুলাই তিনি রাজকীয় হারেম ত্যাগ করে তাঁর সম্পত্তি নিয়ে পিতৃগৃহে ফিরে এসেছিলেন এবং বাকি জীবন পিতৃগৃহেই কাটিয়েছিলেন।
ফারুখসিয়ারের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন কিশতওয়ারের রাজা জয়া সিংয়ের কন্যা বাই ভুপ দেবী। জয়া সিং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং বখতিয়ার খান নামে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কিরাত সিং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। ১৭১৭ সালে দিল্লীর মুফতির একটি বার্তার জবাবে কিরাত সিং তাঁর ভ্রাতা মিয়া মহম্মদ খানের সাথে বাই ভূপ দেবীকে দিল্লীতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফারুখসিয়ার তাঁকে বিয়ে করার পর ১৭১৭ সালের তিন জুলাই রাজকীয় হারেমে প্রবেশ করেছিলেন।
মূদ্রা– ফারুখসিয়ারের রাজত্বকালে জারি করা মূদ্রায় নিন্মলিখিত বাক্যাংশ খোদিত ছিলো-
সিক্কা জাদ আল ফজল-ই-হক বার সিম জার
পাদশাহ-ই-বাহর- ও-বার ফারুখসিয়ার।
(সত্যি ঈশ্বরের কৃপায় রূপার উপর আঘাত করা হয়েছে এবং স্বর্ণ, স্থল ও সমুদ্রের সম্রাট ফারুখসিয়ার ) ।
লাহোর যাদুঘর এবং কলকাতার ভারতীয় যাদুঘরে ফারুখসিয়ারের শাসনামলের ১১৬ টি মূদ্রা রক্ষিত রয়েছে। মুদ্রাগুলি কাবুল, কাশ্মীর, আজমীর, এলাহাবাদ এবং বিদারে প্রস্তুত করা হয়েছিলো।
নাম– ফারুখসিয়ারের পুরো নাম ছিলেন আবুল মুজাফ্ফর মুইনুদ্দিন মহম্মদ ফারুখসিয়ার বাদশাহ। মরণোত্তরভাবে তিনি ‘শহীদ-ই-মরহুম’ (রহমতের সাথে প্রাপ্ত শহীদ) নামে পরিচিত হয়েছিলেন।
মৃত্যু– ১৭১৯ সালের ১৯ এপ্রিল ফারুখসিয়ার দিল্লীতে ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
কীর্তি–দিল্লী থেকে ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত গুরগাঁও জেলার ফারুখনগর শহর ফারুখসিয়ারের নামে নামকরণ করা হয়েছিলো। তাঁর শাসনামলে সেখানে তিনি শীশ মহল এবং একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। উত্তর প্রদেশের ফারুখাবাদ শহরও তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছিলো। *
রফি–উদ–দারজাত
রফি-উদ-দারজাতের জন্ম ১৬৯৯ সালের ১ ডিসেম্বর। তিনি বাহাদুর শাহ-প্রথমের পুত্র রফি-উস-শানের কনিষ্ঠ পুত্র এবং আজিম-উস-সানের ভাতিজা ছিলেন। তাঁর মাতৃর নাম ছিলেন নূর-উন-নিসা বেগম। তিনি একাদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। মারওয়ারের রাজা অজিত সিং ফারুখসিয়ারকে ক্ষমত্যচ্যূত করে ১৯১৯ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। অজিত সিং এবং সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় তাঁকে পুতুল রাজা হিসাবে প্রক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
রফি-উদ-দারজাতের শাসনকাল অশান্তিতে ভরা ছিলেন। ১৭১৯ সালের ২০ শে ফেব্রুয়ারি সিংহাসনে আরোহণ করার তিন মাসেরও কম সময়রে মধ্যে রফি-উদ-দারজাতের চাচা নিকুসিয়ার নিজেকে রাফি-উদ-দারজাতের চেয়ে বেশি উপযুক্ত ভেবে আগ্রা দূর্গে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় রফি-উদ-দারজাতের সিংহাসন রক্ষা এবং অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। নিকুসিয়ার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় আগ্রা দূর্গ অবরোধ করেছিলেন। অবরোধের ফলে নিকুসিয়ার আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং তাঁকে বন্দি করা হয়েছিলো। তাঁকে আমির-উল-উলামা সন্মানের সাথে সলিমগড় দূর্গে বন্দি করে রেখেছিলে এবং সেখানে তিনি ১৭২৩ সালের ১২ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
মৃত্যু– মৃত্যুর আগে রফি-উদ-দারজাত তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রফি-উদ-দৌলাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তিন মাস ছয় দিন রাজত্ব করার পর ১৯১৯ সালের ৬ জুন তিনি সিংহাসনচ্যূত হয়েছিলেন। দুইদিন পর তাঁর ভ্রাতা রফি-উদ-দৌলা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। রফি-উদ-দারজাত যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭১৯ সালের ৬ জুন আগ্রায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর মৃতদেহ মেহরাউলিতে সুফি সাধক খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর মাজারের নিকেট সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। •
শাহজাহান–দ্বিতীয়(রফি–উদ–দৌলা)
শাহ জাহান-দ্বিতীয়ের জন্ম ১৬৯৬ সালের জুন মাসে। তিনি রফি-উদ-দৌলা নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি দ্বাদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। তাঁর পিতার নাম রফি-উশ-সান এবং মাতৃর নাম বিয়াত-উন-নিসা বেগম। রফি-উশ-সান বাহাদুর শাহ-প্রথমের দৌহিত্র ছিলেন। শাহ জাহান-দ্বিতীয় তাঁর ছোট ভ্রাতৃ রফি-উদ-দারজাত যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর ১৭১৯ সালের ৬ জুন সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের দ্বারা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ৮ জুন দিল্লীর লালকেল্লায় তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিলো। তিনি এক সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি শাহ জাহান-দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি রফি-উদ-দারজাতের চেয়ে আঠারো মাসের বড় ছিলেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন কিনা বা তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততি ছিলো কিনা তা অজ্ঞাত ।
শাসন– ছোট ভ্রাতৃ রফি-উদ-দারজাতের মতোই শাহ জাহান-দ্বিতীয়কে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের দ্বারা নির্বাচিত করা হয়েছিলো। তিনি নামমাত্র সম্রাট ছিলেন, কার্যত তাঁর কোনো ক্ষমতাই ছিলেন না। ১৩ জুন প্রথমবারের মতো তাঁর নামে খোতবা পাঠ করা হয়েছিলো। দিওয়ান-ই-আমে তাঁর প্রথম উপস্থিতি ছিলো ১১ ই জুন। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের যেকোনো একজনের উপস্থিতি ছাড়া তাঁকে কোনো সন্মানিত ব্যক্তি অথবা জুম্মার নামাজে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হতোনা।
মৃত্যু– শাহ জাহান-দ্বিতীয় তাঁর ছোট ভ্রাতৃর মতো যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি একজন শাসক হিসাবে দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক এবং মানসিকভাবে অযোগ্য ছিলেন। তিনি ১৭১৯ সালের ১৮ সেপ্তেম্বর ফতেহপুর চিক্রীর নিকটে অবস্থিত বিদ্যাপুরে ২৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁকে দিল্লীর কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহের পাশে রফি-উদ-দরজাতের সমাধির পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
মহম্মদ ইব্রাহীম(জাহাঙ্গীর–দ্বিতীয়)
মহম্মদ ইব্রাহীমের জন্ম ১৭০৩ সালের ৯ আগস্ট লালকেল্লার ত্রিপুলি গেট কারাগারে। তিনি জাহাঙ্গীর-দ্বিতীয় নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি বাহাদুর শাহ -প্রথমের পুত্র রফি-উস-শানের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তাঁর মাতৃর নাম ছিলেন নূর-উন- নিসা বেগম। নূর-উন-নিসা শেখ বাকির কন্যা ছিলেন। রফি-উস-শান পিতামহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক মালকাদর কিলাদার নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেখানে নিয়োজিত ছিলেন। মহম্মদ ইব্রাহীম সম্রাট রফি-উদ-দারজাত এবং শাহ জাহান-দ্বিতীয়ের ভ্রাতৃ ছিলেন। ১৭০৭ সালের ২ ডিসেম্বর তাঁকে ৭০০০ এবং ২০০০ ঘোড় সওয়ারের পদ মর্যদা প্রদান করা হয়েছিলো।
শাসন– রফি-উদ-দৌলা(শাহ জাহান-দ্বিতীয়)এর মৃত্যুর পর ১৭২০ সালের ১৫ অক্টোবর মহম্মদ ইব্রাহীমকে কারাগার থেকে বের করে সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় তাঁকে ভ্রাতৃর উত্তরসূরি হিসাবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি জাহাঙ্গীর-দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন। দিল্লীর শাসক সৈয়দ জাহান খান, মহম্মদ ইব্রাহীমের হিংস্র মেজাজের জন্য খুজিস্তা আখতারের পুত্র তাঁর চাচাতো ভ্রাতৃ রওশন আখতার মহম্মদ শাহকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। হাসানপুরের যুদ্ধে মহম্মদ ইব্রাহীম, মহম্মদ শাহের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন এবং ১৭২০ সালের ১৩ নভেম্বর তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহজাহানবাদের দূর্গ কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। খুশ- হাল চাঁদ তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে বলেছিলেন- মহম্মদ ইব্রাহীমের রাজত্বকাল ঘাসের উপর শিশির বিন্দুর মতো স্বল্পস্থায়ী ছিলো।
মৃত্যু– ১৭৪৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ৪৩ বছর বয়সে মহম্মদ ইব্রাহীম মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ১৩ শতকের সুফি সাধক কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহ প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
মহম্মদ শাহ
মির্জা নাসির উদ্দিন মহম্মদ শাহের জন্ম ১৭০২ সালের ৭ আগস্ট মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত আফগানিস্থানের গজনীতে। তিনি মহম্মদ শাহ রঙ্গিলা নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম খুজিস্তা আকতার (জাহান শাহ) এবং মাতৃর নাম ফখর-উন-নিসা বেগম। খুজিস্তা আকতার বাহাদুর শাহ-প্রথমের চতুর্থ সন্তান ছিলেন এবং তিনি জাহান শাহ নামে পরিচিত ছিলেন। মহম্মদ শাহ ছিলেন ত্রয়োদশ মোগল সম্রাট। তিনি ১৭১৯ সালের ১৭ সেপ্তেম্বর থেকে ১৭৪৮ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তিনি সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের সহায়তায় মাত্র ১৬ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় তাঁকে হাতের পুতুল হিসাবে ব্যবহার করছিলেন এবং সৈয়দ আসফ জাহ-প্রথমের সহায়তায় তিনি সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। ১৭২০ সালে সৈয়দ হোসেন আলী খান ফতেহপুর চিক্রীতে খুন হয়েছিলেন এবং সৈয়দ হাসান আলী বারহা ১৭২২ বিষ পান করার ফলে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
মহম্মদ শাহ সঙ্গীত, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক উন্নয়ন সহ শিল্পকলার একজন মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর ডাকনাম ছিলো সদা রঙ্গিলা। তাঁকে প্রায়শই মহম্মদ শাহ রঙ্গিলী নামে অভিহিত করা হতো। কখনো কখনো তাঁকে তাঁর পিতামহ বাহাদুর শাহ রঙ্গিলা নামেও অভিহিত করা হতো। তিনি যদিও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর রাজত্বকাল মোগল সাম্রাজ্যের দ্রুত অপরিবর্তনীয় পতন দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিলো। মোগল সাম্রাজ্য ইতিমধ্যেই যদিও ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় ছিলো, নাদির শাহের ভারত আক্রমণ এবং পরবর্তীতে মোগল রাজধানী স্থানান্তরের ফলে পতনের গতি ত্বরান্বিত হয়েছিলো। ঘটনার গতিপথ প্রত্যক্ষ করে শুধু মোগলরাই নন, ব্রিটিশসহ অন্যান্য বিদেশীদেরও হতবাক এবং হতাশ করেছিলো।
শাসন- ১৭১৯ সালের ২৯ সেপ্তেম্বর মহম্মদ শাহ আবু আল ফাতাহ-নাসির-উদ-দীন রোশন আকতার মহম্মদ শাহ উপাধি ধারণ করে লালকেল্লায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় তাঁকে কাঠোর নজরে রেখেছিলেন এবং তাঁর মাতৃ ফখর-উন-নিসা বেগমকে মাসিক ১৫,০০০ ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। উজির-এ-আজম সৈয়দ হাসান আলী খান বারহা এবং তাঁর ভ্রাতা সেনাপতি সৈয়দ হোসেন আলী খান বারহা ভালোভাবে অবগত ছিলেন যে, আসফ জাহ-প্রথম এবং তাঁর সহযোগী জয়ন উদ্দীন আহম্মদ খান তাঁদের প্রশাসন থেকে ক্ষমতাচ্যূত করার জন্য সক্রিয় হয়ে রয়েছেন। সেজন্য সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয় রফি-উদ-দৌলার মৃত্যুর সাথে সাথে একজন অপেশাদার শাহজাদা মহম্মদ শাহকে পরবর্তী সম্রাট হিসাবে মনোনীত করে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা নতুন মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের অনুগতদের কাছে ১৭২০ সালের ১৩ নভেম্বর পরাজিত হয়েছিলেন।
১৭২০ সালের ৯ অক্টোবর মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অভিজাত সেনাপতি হোসেন আলী খান বারহা টোরা ভীমের ক্যাম্পে নিহত হয়েছিলেন। হোসেন আলী খান বারহা নিহত হওয়ার পর মহম্মদ শাহ সরাসরি মোগল সেনাবাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং আসফ জাহ-প্রথমকে দাক্ষিণাত্যের ছয়টি মোগল প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ লাভের জন্য দাক্ষিণাত্যে প্রেরণ করেছিলেন। মহম্মদ আমীন খান তুরানীকে ৮,০০০ সেনার সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত করে সৈয়দ হাসান আলী খান বারহাকে অনুসরণ করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। সৈয়দ হাসান আলী খান বারহা হাসানপুরের যুদ্ধে আমিন খান তুরানী, মীর মহম্মদ আমিন ইরানী এবং মহম্মদ হায়দার বেগের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৭২০ সালের ১৫ নভেম্বর সৈয়দ হাসান আলী খান বারহা মহম্মদ শাহ কর্তৃক বন্দি হয়েছিলেন এবং দুই বছর পর তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো। মৃত্যুদণ্ডের পূর্বে মহম্মদ শাহকে সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার রফি-উস-শানের পুত্র মহম্মদ ইব্রাহীমের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিলো। কারণ রফি-উদ-দৌলা (শাহ জাহান-দ্বিতীয়)-এর মৃত্যুর পর সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় ১৭২০ সালের ১৫ ই অক্টোবর মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। মহম্মদ শাহ ইব্রাহীমকে ১৭২০ সালের ১৩ নভেম্বর পরাজিত করেছিলেন। সাইয়্যিদ ভ্রাতৃদ্বয়ের পতনের সাথে সাথে দাক্ষিণাত্যে মোগল সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের অবসান সূচনা হয়েছিলো।
১৭২১ সালে মহম্মদ শাহ ক্ষমতাচ্যূত সম্রাট ফারুখসিয়ারের কন্যার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
১৭২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মহম্মদ শাহ, আসফ জাহ-প্রথমকে উজির-এ-আজম পদে নিযুক্ত করেছিলেন। আসফ জাহ-প্রথম মহম্মদ শাহকেআকবরের মতো সতর্ক এবং আওরঙ্গজেবের মতো সাহসী হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। মহম্মদ শাহ শাসনকার্যে অবহেলা করার জন্য আসফ জাহ উজির-এ-আজম পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। আসফ জাহ-প্রথম সেনাপতি এওয়াজ খানকে আওরঙ্গাবাদের গ্যারিসনের মাস্টার নিযুক্ত করেছিলেন। এওয়াজ খানের বেশির ভাগ ন্যায়সিদ্ধ কাজগুলো ইনায়েতুল্লাহ কাশ্মিরী দ্বারা পরিচালিত হতো। আসফ জাহ-প্রথম ঘৃণাভরে রাজদরবার ত্যাগ করেছিলেন। ১৭২৩ সালে আসফ জাহ-প্রথম দাক্ষিণাত্যে একটি অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য যাত্রা করেছিলেন। তিনি দাক্ষিণাত্যের মোগল সুবেদার মুবারিজ খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেছিলেন এবং মুবারিজ খানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শকর খেদার যুদ্ধে মুবারিজ খানকে পরাজিত ও নির্মূল করেছিলেন। ১৭২৫ সালে আসফ জাহ-প্রথম হায়দ্রাবাদের নিজামশাহী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই সময়ে মোগল-মারাঠা(১৭২৮-১৭৬৩) অপ্রত্যাশিত যুদ্ধ পতনমুখী মোগল সাম্রাজ্যের বাসিন্দাদের জন্য অপূরণীয় ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছিলো। ১৭২৪ সালে অবধের নবাব সাদাত আলী খানের বিদ্রোহ, বাঙ্গালোরের মোগল সুবেদার দিলওয়ার খানের মালবার উপকূলে সু-রক্ষিত ঘাঁটি স্থাপন, রংপুরের মোগল ফৌজদার মহম্মদ আলী খান এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী দীনা নারায়নকে কোচবিহার থেকে উপেন্দ্র নারায়ন নামের একজন হিন্দু বিহারী এবং ভূটানের শাসক মিফাম ওয়াংপো দ্বারা অতর্কিতে আক্রমণ। আলী মহম্মদ খান রোহিলাখণ্ডে ব্যারন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৭২৮ সালে ভূপালের নবাব ইয়ার মহম্মদ খান মহম্মদ শাহ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিলেন। মালওয়ায় মারাঠাদের অবিরাম অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন যদিও ১৭৪২ সাল নাগাদ মহম্মদ শাহ তাঁর সাম্রাজ্যের প্রায় অর্ধেক অঞ্চল হারাতে শুরু করেছিলেন।
মহম্মদ শাহ তাঁর তিনজন অযোগ্য উপদেষ্টা, তাঁর পালক বোন কোকি জি, তাঁর বণিক বন্ধু রওশন-উদ-দৌলা, তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষক ঠাট্টার সুফি আব্দুল গফুরকে অপসারণ করার পর মহম্মদ শাহ রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
পাঞ্জাব অঞ্চলে শিখরা মোগল সুবেদারদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। শিখদের ‘আঘাত এণ্ড রান’ রণ কৌশল মোগলদের ধ্বংসের কারণ হয়েছিলো। আজমীরে অজিত সিং একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করেছিলেন এবং বিদ্রোহী মারাঠাদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন। মহম্মদ শাহ দাক্ষিণাত্যে থাকাকালীন মারাঠারা মোগল দূর্গগুলি ধ্বংস করেছিলো এবং যুদ্ধ সংঘটিত করেই চলছিলেন। এই সবই মোগল সাম্রাজ্যের পতনের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলো। ১৭৩৭ সালে মারাঠারা বাজিরাও-প্রথম-এর নেতৃত্বে গুজরাট, মালওয়া এবং বুণ্ডেলখণ্ড দখল করেছিলো এবং দিল্লীতেও আক্রমণ সংঘটিত করেছিলো।
১৭৩৯ সালে পারস্যের নাদির শাহ মোগলদের দুর্বলতা এবং সম্পদের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত কান্দাহারের বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে গজনী, কাবুল, লাহোর এবং সিন্ধু দখল করে মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। নাদির শাহ মহম্মদ শাহের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন এবং কার্নালের যুদ্ধে মহম্মদ শাহকে পরাজিত করেছিলেন। নাদির শাহ তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে মোগল বাহিনীকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। তারপর দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে দিল্লী দখল করেছিলেন এবং ধনসম্পদ লুটপাট করেছিলেন। এই ঘটনাই মোগলদের দুর্বল করে দিয়েছিলেন এবং অন্যান্য আক্রমণকারীদের আক্রমণের পথ প্রশস্ত করেছিলো। শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর উত্থান হয়েছিলো।
১৭৪৮ সালে আফগানিস্থানের আহমদ শাহ দুররানি মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। লাহোরে শাহনওয়াজ খানের পরাজয়ের পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আহমদ শাহ বাহাদুর, উজির-এ-আজম কামরুদ্দিন খান, তাঁর ছেলে মাইন-উল-মুলক(মীর মন্নু), ইন্ডিজাম-উদ-দৌলা(সফদর জং নামে বেশি পরিচিত)কে ৭৫,০০০ সৈন্যসহ মহম্মদ শাহ আহমদ শাহ দুররানির বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলেন। ১৭৪৮ সালে সংঘটিত মনপুরের যুদ্ধে আহমদ শাহ দুররানির ১২,০০০ সৈন্য সন্মিলিত বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিলো এবং তাঁরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই জয় সমগ্র মোগল সাম্রাজ্যের জন্য মহান আনন্দের দিন ছিলো।
সাংস্কৃতিক উন্নয়ন– উর্দূ মহম্মদ শাহের রাজত্বের আগে থেকে ব্যবহার করা হয়েছিলো যদিও তাঁর রাজত্বকালে জনগণের মধ্যে আরও জনপ্রিয় হয়েছিলো এবং উর্দুকে ফার্সির পরিবর্তে আদালতের ভাষা হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে কাওয়ালী মোগল দরবারে পুনঃপ্রবর্তন হয়েছিলো এবং দ্রুত দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলো। মহম্মদ শাহ ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মক্তব চালু করেছিলেন বলেও জনা যায়। তাঁর রাজত্বকালে সর্বপ্রথম সহজ ফার্সি এবং উর্দুতে কোরআন অনুবাদ করা হয়েছিলো। তাঁর রাজত্বকালে আনুষ্ঠানিক তুর্কি পোশাক, সাধারণত উচ্চ অভিজাত মোগলরা পরিধান করতেন, যেহেতু তাঁরা সমরকন্দের অধিবাসী ছিলেন। সেই পোশাক শেরওয়ানি দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিলো।
মহম্মদ শাহ পারফর্মিং আর্টের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। প্রশাসনিক অগ্রাধিকার খরচে, পারফর্মিং আর্ট প্রশাসন থেকে মুক্ত করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে মোগলদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস পেলেও সম্রাট শিল্পকে উৎসাহিত করতেন। নিধামাল এবং চিতারমনের মতো দক্ষ শিল্পীদের নিয়োগ করেছিলেন, যারা হোলী উদযাপন, শিকার এবং আদালত জীবনের প্রাণবন্ত দৃশ্যগুলিকে চিত্রিত করেছিলেন। তৎকালীন মোগল দরবারে সদারং নামে পরিচিত নঈমত খান এবং তাঁর ভাগ্নে ফিরোজ খানের মতো সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন, যাদের রচনাগুলি খেয়াল সঙ্গীতের রূপকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। নেয়ামত খান তাঁর শিষ্যদের জন্য খেয়াল রচনা করেছিলেন। ভারতীয় শস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই মূল উপাদানটি মহম্মদ শাহের দরবারে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হয়েছিলো।
বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন– মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে ১৭২৭ সাল থেকে ১৭৩৫ সালের মধ্যে অম্বরের জয় সিং-দ্বিতীয় দ্বারা ৪০০ পৃষ্ঠার জিজ-ই-মহম্মদ শাহী নামে একটি বৈজ্ঞানিক কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিলো।
পরবর্তী মোগল–মারাঠা যুদ্ধ– মারাঠারা ইতিমধ্যে নর্মদা নদী পর্যন্ত তাঁদের রাজ্য বিস্তৃত করেছিলেন। আসফ জাহ- প্রথম দিল্লী ত্যাগ করার পর তাঁরা ১৭২৩ সালের শুরুতে সমৃদ্ধ মালওয়া প্রদেশ আক্রমণ করেছিলেন। মোগল সম্রাট মালওয়ার গভর্নরকে আক্রমণ প্রতিহত করার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন এবং তিনি আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন। একই বছরের শীতকালে মারাঠারা মালওয়ার রাজধানী উজ্জয়ন পর্যন্ত পৌঁছেছিলো। ১৭২৫ সালে সরবুলন্দ খানকে গুজরাটের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিলো। মোগল সম্রাটের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে মারাঠারা গুজরাট আক্রমণ করেছিলেন, তবে সরবুলন্দ খান তাঁদের পরাস্ত করেছিলেন। এই পরাজয়ের কারণ ছিলো, বাজিরাও- প্রথম সহ বেশির ভাগ মারাঠা সেনা তখন সেই সময়ে হায়দ্রাবাদে আসফ জাহ-প্রথমের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। হায়দ্রাবাদে আসফ জাহ প্রথমের সাথে যুদ্ধ অবশ্যে মারাঠাদের পক্ষে সুবিধাজনকভাবে এগিয়ে ছিলো।
১৭২৮ সালর ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত পালখেদার যুদ্ধে আসফ জাহ-প্রথম মারাঠাদের কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৭২৮ সালে বাজিরাও প্রথম এবং তাঁর ভ্রাতৃ চিমনজি আপ্পার নেতৃত্বে মারাঠারা মালওয়া আক্রমণ করেছিলেন। আমঝোরার যুদ্ধে একটি বড় মোগল বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করা মোগল সুবেদার গিদিহার বাহাদুরকে তাঁরা প্রত্যাহ্বান জানিয়েছিলেন। গির্দিহার বাহাদুর এবং তাঁর বিশ্বস্ত চাচাতো ভাই দয়া বাহাদুর উভয়েই সেই যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হয়েছিলেন। ২৯ নভেম্বরে চিমনজি আপ্পা উজ্জয়নের অবরোধে ব্যর্থ হয়ে মালওয়ার অবশিষ্ট মোগল বাহিনীকে অবরোধ করতে গিয়েছিলেন।
১৭৩১ সালে ত্রিম্বক রাও দাভাদে এবং সানভোজি মারাঠাদের ত্যাগ করে মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের বাহিনীতে যোগদানের হুমকি দিয়েছিলেন। হায়দ্রাবাদের নিজাম আসফ জাহ-প্রথম সেই দলত্যাগকে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন। এই পদক্ষেপটি বাজিরাও-প্রথম এবং তাঁর ভ্রাতৃ চিমনজি আপ্পার জন্য অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিলো এবং তাঁরা ত্রিম্বক রাও দাভাদে এবং সানভোজিকে বাধা প্রদানের জন্য বিশাল মারাঠা বাহিনী নিয়ে ডাভোইয়ের যুদ্ধের সময় দলত্যাগী দলগুলিকে পরাজিত এবং নিহত করেছিলেন। ১৭৩৫ সালে বাজি রাও প্রথম পূর্ণ শক্তি নিয়ে গুজরাট আক্রমণ করে সর বুলন্দ খানকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
১৭৩৬ সালে মুরুদ-জাঞ্জিরার সিদ্দিরা বাজিরাও বাহিনীর কাছ থেকে রায়গড় দূর্গ পুনরুদ্ধার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ১৭৩৬ সালের ১৯ এপ্রিল রিওয়াসের নিকটে সংঘটিত যুদ্ধের সময় চিমনজি সিদ্দিদের শিবিরে জমায়েত সিদ্দিদের উপর আক্রমণ সংঘটিত করে তাঁদের পরাজিত করেছিলেন। সিদ্দি নেতা সাট সহ ১৫০০ জন সিদ্দিকে হত্যা করেছিলেন। ১৭৩৬ সালের সেপ্তেম্বর মাসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো এবং সিদ্দিরা জাঞ্জিরা, গোয়ালকোট এবং অঞ্জনভেল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
১৭৩৭ সালে হায়দ্রাবাদের নিজাম আসফ জাহ-প্রথম ভূপালের নবাব ইয়ার মহম্মদ খান বাহদুরকে সহায় করার জন্য একটি বিশাল মোগল বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। প্রত্যুত্তরে বাজি রাও প্রথমের নেতৃত্বে ৮০,০০০ মারাঠা সেনা ভূপাল শহরের অভ্যন্তরে অবরোধ করেছিলেন। মালহার রাও হোলকার, সফদর জং এবং তাঁর ত্রাণ বাহিনীকে তাড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত ছিলো। পরে আসফ জাহ-প্রথম মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহ কর্তৃক অনুমোদিত শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। শান্তিচুক্তি সাপেক্ষে মারাঠাদের মালওয়া প্রদেশ প্রদান করা হয়েছিলো। ১৭৩৭ সালে মারাঠা সেনাপতি বাজি রাও-প্রথম মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী দিল্লী আক্রমণ করেছিলেন এবং আমিন খান বাহাদুরের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সুপ্রশিক্ষিত মোগল বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন। পরে দিল্লীর উপকণ্ঠে সংঘটিত বড় ধরণের যুদ্ধে মারাঠারা পরাজিত হয়েছিলো। পরাজিত হয়ে বাজিরাও-প্রথম এবং মারাঠারা দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বাদশপুরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাজি রাও মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। মহম্মদ শাহ মারাঠাদের কাছে মালওয়া হস্তান্তর করতে সন্মত হয়ে শান্তিচুক্তিতে অনুমোদন জানিয়েছিলেন।
মোগল সাম্রাজ্যের অনুন্নত উপজাতিগুলির মধ্যে ছিলেন ডিগুিগুল ফোর্টের মাদুরাই নায়েকদের রাণী মিনাক্ষী। তিনি মারাঠাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার কর্ণাটকের মোগল বাহিনীকে সহায় করেছিলেন।
১৭৪০ সালে কর্ণাটকের নবাব আলী দোস্ত খান, চান্দ সাহেব এবং শাহু কর্তৃক অনুমোদিত রাঘোজি ভোঁসলের নেতৃত্বে পরিচালিত মারাঠাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। ১৭৪০ সালের ২০ মে আকোর্ট এবং তাঁর জনগণের প্রতিরক্ষার জন্য সংঘটিত দামালচেরির যুদ্ধে নবাব আলী দোস্ত খান নিহত হয়েছিলেন। চান্দ সাহেবকে তাঁর বাহিনী সহ আটক করে সাতারায় বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। মারাঠাদের এই দুঃসাধ্য প্রচেষ্টা কৌতুহলী ফরাসি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লেক্স কর্ণাটক অঞ্চলে মারাঠাদের দখলে অসন্তুষ্ট হয়ে আসফ জাহ প্রথমকে মুক্ত করার জন্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সাদাতুল্লাহ খান-দ্বিতীয় এবং আনোয়ার উদ্দিন খানের সাথে যোগদান করে জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লেক্স ১৭৪৩ সালে আকোর্ট পুনরুদ্ধার করে ত্রিচিনোপলি অবরোধ করেছিলেন। অবরোধ পাঁচ মাস স্থায়ী হয়েছিলো এবং মুরারি রাও ঘোড়পাড়ের নেতৃত্বে পরিচালিত মারাঠারা কর্ণাটক থেকে পশ্চাদসরণ করতে বাধ্য হয়েছিলো।
১৭৪৭ সালে রাঘোজি- প্রথম ভোঁসলের নেতৃত্বে মারাঠারা বাংলার নবাব আলীবর্দি খানের অঞ্চলগুলিতে আক্রমণ, লুটপাট এবং দখল করতে শুরু করেছিলেন। মারাঠারা উড়িষ্যায় আক্রমণ সংঘটিত করার সময় উড়িষ্যার সুবেদার মীর জাফর মোগল এবং আলীবর্দি খান বাহিনীর আগমন না হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে সেনা প্রত্যাহার করে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসেছিলেন। আলীবর্দি খান এবং মোগল বাহিনীর আগমনে পরে সংঘটিত বর্ধমানের যুদ্ধে মারাঠা বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়েছিলো। বাংলার ক্ষুব্ধ নবাব আলিবর্দি খান মীর জাফরকে বরখাস্ত করেছিলেন। যাইহোক, চার বছর পর মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহ উড়িষ্যা মারাঠাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
নাদির শাহের ভারত আক্রমণ– ১৭৩৯ সালের ১৩ ই ফেব্রুয়ারি আফশারিদের সেনাপতি নাদির শাহের অধীনে পার্সিয়ানরা সাফাভিদ রাজবংশকে পরাজিত করেছিলো। তারপর পারস্যের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অটোম্যান সাম্রাজ্যকে বেশ কয়েকবার পরাজিত করে সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তকে সুরক্ষিত করেছিলো। তখন তাঁদের চোখ পড়েছিলো দুর্বল অথচ ধনী দেশ মোগল সাম্রাজ্যের উপর। ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন এবং তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কারনালের যুদ্ধে মহম্মদ শাহকে পরাজিত করেছিলোন। তারপর তাঁরা মোগল রাজধানী দিল্লীর দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং বেশ কিছু ঘটনার পর মহম্মদ শাহকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করে লুটপাটের তাণ্ডব চালিয়েছিলেন। তখন নাদির শাহ মোগল সাম্রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ অঞ্চল দখল করে নিয়েছিলেন।
পারস্যের সাথে উত্তেজনা– নাদির শাহ কান্দাহারের আশেপাশের অঞ্চল বিশেষ করে ঘিলজাই উপজাতির আফগান বিদ্রোহীদের দমন করতে চেয়েছিলেন। বিদ্রোহীরা যাতে মোগল সাম্রাজ্যে পালিয়ে যেতে না পারে তারজন্য নাদির শাহ মহম্মদ শাহকে কাবুল এবং সিন্ধু উপত্যকা সংলগ্ন সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। মহম্মদ শাহ নাদির শাহের অনুরোধ রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যদিও কার্যত তিনি কিছুই করেননি। কারণ স্থানীয় সুবেদাররা আফগানদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং তাঁরা পার্সিয়ানদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আফগান বিদ্রোহীরা শেষপর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নাদির শাহ পলাতক বিদ্রোহীদের তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে মহম্মদ শাহের কাছে দূত প্রেরণ করেছিলেন। মহম্মদ শাহ সেই দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেননি এবং পার্সিয়ানদের পুরো এক বছর মোগল সাম্রাজ্য থেকে প্রান্তিক করে রেখেছিলেন। ফলে নাদির শাহ মহম্মদ শাহের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং তিনি মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করার জন্য দুটি কারণ খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রথম কারণ, মোগলরা আফগান বিদ্রোহীদের তাঁর হাতে তুলে দেননি এবং দ্বিতীয় কারণ, মোগলরা দুর্বল এবং ধনী ছিলেন।
উপরোক্ত কারণের উপর ভিত্তি করে নাদির শাহ আফগানিস্থান থেকে আক্রমণ শুরু করে মোগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৭৩৮ সালের মে মাসে নাদির শাহ উত্তর আফগানিস্থানে আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। একই মাসে তিনি গজনী এবং সেপ্তেম্বর মাসে জালালাবাদ দখল করেছিলেন। নভেম্বর মাসে তিনি পেশোয়ার দূর্গ অবরোধ করেছিলেন এবং খাইবার পাসের যুদ্ধের পর পেশোয়ার দূর্গ দখল করেছিলেন।
অবশেষে লাহোরের মোগল ভাইসরয় জাকারিয়া খান বাহাদুরের ২৫,০০০ অভিজাত সোয়াব বাহিনীকে পরাস্ত করে লাহোর দখল করেছিলেন। নাদির শাহ ধারণা করা মতেই চেনাব নদীর পাড়ে আফশারিদ বাহিনী শিখ বিদ্রোহীদের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
ইতিমধ্যে নাদির শাহ বাহিনী এটক পর্যন্ত সমস্ত এলেকা দখল করে ফেলেছিলেন। মহম্মদ শাহ এবং তাঁর দরবারিরা তখন সজাগ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, পারশ্য সম্রাট এমন শক্তি নয়, যারা একটি প্রদেশে লুটপাট করে চলে যাবে! তদুপরি নাদির শাহ যেসব অঞ্চল জয় করেছিলেন, সেসব প্রদেশ ধ্বংস করে ফেলেছিলেন। ওয়াজিরাবাদ, এমানাবাদ এবং গুজরাটের মতো শহরগুলিতে শুধু লুটপাটই করা হয়নি, ধ্বংসও করে ফেলেছিলেন। লারকানার কাছে নাদির শাহ বাহিনী সিন্ধুর নবাব মাইনুর মহম্মদ কালনোরের মোগল বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করে তাঁর দুই পুত্রকে বন্দি করেছিলেন।
১৭৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাদির শাহ সিরহিন্দ দখল করে কার্নালের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি নাদির শাহ বাহিনী এবং মোগল বাহিনীর মধ্যে কার্নালের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। নাদির শাহের ৫৫,০০০ সেনার বিরুদ্ধে মোগল বাহিনীর এক লক্ষ সেনা তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত হয়েছিলো। কার্নালের যুদ্ধের তেরো দিন পর ২৬ শে ফেব্রুয়ারি নাদির শাহের শিবিরে গিয়ে মহম্মদ শাহ আত্মসমর্পণ করে নাদির শাহকে দিল্লী গেটের চাবি হস্তান্তর করেছিলেন এবং মহম্মদ শাহ বন্দি হিসারে নাদির শাহের সাথে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন।
দিল্লী প্রবেশের পর নাদির শাহ মোগল সাম্রাজ্য দখল করার দাবি করেছিলেন এবং দাক্ষিণাত্যের মারাঠারা দিল্লীর দিকে অগ্রসর হলে তাঁদের নরকের অতল গহ্বরে ঠেলে দিবেন বলে দাবি করেছিলেন।
প্রথম দিকে দুই সম্রাটের মধ্যে সম্বন্ধ সৌহৃদ্যপূর্ণ ছিলো। তবে একদিন দিল্লী ব্যাপী গুজব ছাড়িয়ে পড়েছিলো যে, নাদির শাহকে হত্যা করা হয়েছে। তখন জনসাধারণ পারস্য বাহিনীকে আক্রমণ করে কিছু পারস্য সেনা হত্যা করেছিলেন। সংবাদ পেয়ে নাদির শাহ ক্ষুব্ধ হয়ে জনগণকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং কমপক্ষে ৩০,০০০ নাগরিককে হত্যা করা হয়েছিলো। তখন মহম্মদ শাহ এবং আসফ জাহ-প্রথম নাদির শাহের কাছে করুণা ভিক্ষা করে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করেছিলেন। গণহত্যা বন্ধ করে নাদির শাহ কোষাগার লুণ্ঠনের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন এবং বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন, দরিয়া-ই-নূর (কাহিনূর)হীরা এবং অকল্পনীয় সম্পদ লুটপাট করেছিলেন। এ ছাড়া হাতী, ঘোড়া সহ পসন্দের সবকিছুই লুট করেছিলেন। মহম্মদ শাহকে তাঁর কন্যা জাহান আফরুজ বানু বেগমকে নাদির শাহের কনিষ্ঠ পুত্রের নিকট বিয়ে দিতে হয়েছিলো।
সমগ্র ঘটনার পর নাদির শাহ নিজেই ১২ মে মহম্মদ শাহকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে রাজমুকুট পরিয়েছিলেন। মহম্মদ শাহ সিন্ধু নদীর পশ্চিমের এলাকা নাদির শাহকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরপর নাদির শাহ কোহ-ই-নূর হীরা এবং অন্যান্য ধন-সম্পদসহ পারস্য বাহিনী নিয়ে পারস্যে চলে যেতে শুরু করেছিলেন।
এই আক্রমণের পর আসফ জাহ-প্রথম তাঁর বড় ছেলে ইস্তিজাম-উদ-দৌলাকে মোগল সেনাবাহিনীতে প্রধান সেনাপতি হিসাবে নিযুক্ত করে তিনি অবসর গ্রহণ করে দাক্ষিণাত্যে চলে গিয়েছিলেন।
পরিণাম–নাদির শাহের আক্রমণের ফলে মোগল সাম্রাজ্য পতনের দিকে অগ্রসর হয়েছিলো।
বিবাহ– মহম্মদ শাহের চার স্ত্রী ছিলেন। মহম্মদ শাহের প্রথম এবং প্রধানা সহধর্মিনী ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন শাহজাদী বাদশা বেগম। তিনি ক্ষমতাচ্যূত সম্রাট ফারুফসিয়ারের কন্যা ছিলেন। ১৭২১ সালের ৮ ডিসেম্বর সিংহাসনে আরোহণের পর তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁকে মালিকা-উজ-জামানি (যুগের রাণী) উপাধি প্রদান করেছিলেন। এই উপলক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী আনন্দ উৎসব চলছিলো। তিনি প্রথম পুত্র সন্তান শাহরিয়ার শাহ বাহাদুরের মাতৃ ছিলেন। শাহরিয়ার শাহ বাহাদুর ১৭২৬ সালে অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিলেন। বাদশা বেগম সবচেয়ে প্রভাবশালী স্ত্রী ছিলেন। বাদশা বেগম ১৭৮৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর মারা গিয়েছিলেন।
পরে মহম্মদ শাহ সাহিবা মহল নামে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর একমাত্র কন্যা সন্তান ছিলেন হজরত বেগম। হজরত বেগম ১৭৫৭ সালে আহমদ শাহ দুররানিকে বিয়ে করেছিলেন।
মহম্মদ শাহের তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন নৃত্যশিল্পী উধম বাই। তিনি কুদসিয়া বেগম নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৭২৫ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করা ভবিষ্যত মোগল সম্রাট আহমদ শাহ বাহাদুরের মাতৃ ছিলেন। আহম্মদ শাহ বাহাদুরের জন্মের পর বাদশা বেগম তাঁকে লালনপালন করেছিলেন। বাদশা বেগমের প্রচেষ্টাই আহমদ শাহ বাহাদুর ১৭৪৮ সালে মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
সন্তান–আহমদ শাহ বাহাদুর, তাজ মাহমুদ মির্জা, শাহরিয়ার মির্জা এবং হজরত বেগম।
মৃত্যু– পারস্যের আফশারিদ রাজবংশের শেষ সম্রাট নাদির শাহের হত্যার পর আহমদ শাহ দুররানি ১৭৪৭ সালে পারস্য আফগানিস্থানের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তিনিও মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। কাবুল, পেশোয়ার দখল করার পর তিনি ১৭৪৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি লাহোর দখল করেছিলেন। ১৭৪৮ সালের ১১ ই মার্চ আহমদ শাহ দুররানি এবং লাহোর প্রদেশের সুবেদার কমরুদ্দিন বাহিনীর মধ্যে মনপুরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। উক্ত যুদ্ধে মোগল বাহিনী জয়লাভ করেছিলেন যদিও উক্ত যুদ্ধে কমরুদ্দিন যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। কমরুদ্দিনের মৃত্যু সংবাদ সম্রাটের কাছে পৌঁছোনোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনদিন তিনি প্রাসাদ থেকে বের হননি। এই সময়ে তিনি রোজা রেখেছিলেন। প্রহরীরা তাঁকে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে শুনেছিলেন, ‘আমি কী তাঁর (কমরুদ্দিনের মতো বিশ্বস্ত কাউকে পাব?’ ১৭৪৮ সালের ২৬ শে এপ্রিল তিনি শোকের কারণে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর অন্তেষ্টিক্রিয়ায় মক্কা থেকে আসা ইমামগণ অংশগ্রহণ করেছিলেন।
মহম্মদ শাহকে নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার দরগাহের পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। তাঁর মৃত্যুর পর আহমদ শাহ বাহাদুর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
জয়প্রিয় সংস্কৃতিতে মহম্মদ শাহ– ২০১০ সালে ডিডি ন্যাশনালে সম্প্রচারিত ঐতিহাসিক টিভি ধারাবাহিক মহারাজা রঞ্জিত সিং-এ মহম্মদ শাহের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ঋষিকেশ শর্মা। •
আহমদ শাহ বাহাদুর
আহমদ শাহ বাহাদুরের জন্ম ১৭২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর মোগল সাম্রাজ্যের দিল্লীতে। তিনি ছিলেন চতুর্দশ মোগল সম্রাট। তাঁর পিতার নাম সম্রাট মহম্মদ শাহ এবং মাতৃর নাম কুদসিয়া বেগম। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর ১৭৪৮ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে মারাঠাদের উত্থান এবং নাদির শাহের আক্রমণের ফলে মোগল সম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিলো এবং আহমদ শাহ বাহাদুরের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়েছিলো। আহমদ শাহ বাহাদুরের প্রশাসনিক দুর্বলতার ফলে উজির-এ- আজম ইমাদ-উল-মুলকের উত্থান হয়েছিলো।
শাহজাদা আহমদ শাহ বাহাদুরের মহিলাদের প্রতি দুর্বলতা ছিলো। এছাড়াও তিনি একজন নিরক্ষর ছিলেন এবং কোনো সামরিক প্রশিক্ষণে তিনি অংশগ্রহণ করেননি বলে যানা যায়। তাঁর স্বভাবের জন্য তাঁর পিতা তাঁকে কটূক্তি করতেন এবং তাঁকে একজন শাহজাদা হিসাবে প্রাপ্য প্রয়োজনীয় ভাতাও প্রদান করা হয়নি বলে জানা যায়। তাঁকে তাঁর সৎ মা বাদশা বেগম নিজের তত্ত্বাবধানে লালনপালন করেছিলেন। তিনি সিংহাসনে আরোহণের ক্ষেত্রে তাঁর পালক মাতৃর বিশেষ ভূমিকা ছিলো। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি তাঁর মাতৃ কুদসিয়া বেগম এবং হারেমের প্রধান নংপুসক জাভেদ খান বাহাদুরের তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলি পরিচালনা করতেন। আহমদ শাহ বাহাদুর রাজকার্য পরিচালনার চেয়ে হারেমের প্রতি বেশি অনুরুক্ত ছিলেন।
শাহজাদা হিসাবে আহমদ শাহ বাহাদুর মনুপুরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ১৭৪৮ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ১৭৫৪ সালের ২ জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় বছর রাজত্ব করেছিলেন এবং রাষ্ট্রের সমস্ত বিষয় প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। উজির-এ-আজম ইমাদ-উল-মুলক তাঁকে ক্ষমতাচ্যূত করেছিলেন এবং তাঁকে অন্ধ করে তাঁর মাতৃর সাথে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি জীবনের বাকি সময় কারাগারে কাটিয়ে ১৭৭৫ সালে ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি(আবদালি)র প্রথম ভারত আক্রমণ– লাহোরের মোগল ভাইসরয় জাকারিয়া খানের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র ইয়াহিয়া খান বাহাদুর এবং মুলতানের আমির মিয়াঁ শাহ নেওয়াজ খান উত্তরাধিকারের জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন। উক্ত সংঘর্ষে বড় ভাই মিয়াঁ শাহ নেওয়াজ খান ছোট ভ্রাতা ইয়াহিয়া খান বাহাদুরকে পরাজিত করে নিজেকে পাঞ্জাবের ভাইসরয় হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। শাহ নেওয়াজ খান মোগল দরবারের কর ফাঁকির জন্য অভিযুক্ত ছিলেন এবং ইয়াহিয়া খান বাহাদুর উজির-এ-আজম কমরুদ্দিন খানের জামাতা ছিলেন। দুই ভ্রাতৃর এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আহমদ শাহ দুররানি ৩০,০০০ অশ্বারোহী সেনা নিয়ে শাহ নেওয়াজ খানকে সহায়ের জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন।
১৭৪৮ সালের এপ্রিল মাসে আহমদ শাহ দুররানি শাহ নেওয়াজ খানের সাথে মিলে সিন্ধু নদী উপত্যকায় আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। ফলে সিন্ধুর সুবেদার মুরাদিয়াব খান কালহারো সিন্ধু নদীর তীরে মোগল সেনাবাহিনীকে সহায় করার জন্য সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানিকে প্রতিহত করার জন্য সম্রাট মহম্মদ শাহ শাহজাদা আহমদ শাহ বাহাদুর, উজির-এ-আজম কমরুদ্দিন খান, হাফিজ রহমত খান, অবধের নবাব সফদর জং, ইন্তিজাম-উদ- দৌলা, গজনি ও কাবুলের প্রাক্তন সুবেদার নাসির খান, ইয়াহিয়া খান এবং আলী মহম্মদ খানের নেতৃত্বে ৭৫,০০০ সেনার একটি বৃহৎ বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানির বাহিনীতে ছিলো মাত্র ১২,০০০ অশ্বারোহী সেনা। সিরহিন্দের সুটলেজ নদীর তীরে মনুপুর নামক স্থানে উভয় বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলো এবং সংঘর্ষে আহমদ শাহ বাহাদুরের নেতৃত্বাধীন বাহিনী জয়ী হয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় বিপক্ষ বাহিনীর একটি গোলার আঘাতে উজির-এ-আজম কামরুদ্দিন খান মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
যাইহোক, কমরুদ্দিন খানের পুত্র মঈন-উল-মুলক(মীর মন্নু) মনপুরের যুদ্ধে বীর নায়ক হিসাবে স্বীকৃত হয়েছিলেন। এবং মহম্মদ শাহের মৃত্যুর পর আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁকে পাঞ্জাবের গভর্নর পদে নিযুক্ত করেছিলেন।
সামরিক উদ্ভাবন– মনুপুরের যুদ্ধে আহমদ শাহ বাহাদুরের কৌশলগত যুদ্ধ যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিলেন। সম্রাট হিসাবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর আহমদ শাহ বাহাদুর সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আক্রমণকারী আহমদ শাহ দুররানি এবং শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য পূর্বিয়া উট কার্পাস (যুদ্ধে উট ব্যবহার) চালু এবং সংগঠিত করেছিলেন বলে জানা যায় ।
উত্তরাধিকার– সিরহিন্দের মনুপুরের যুদ্ধে মোগল উজির-এ-আজম কমরুদ্দিন খানের মৃত্যু সংবাদ সম্রাটের কাছে পৌঁছোনোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনদিন তিনি প্রাসাদ থেকে বের হননি। এই সময়ে তিনি রোজা রেখেছিলেন। প্রহরীরা তাঁকে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে শুনেছিলেন, ‘আমি কী তাঁর (কমরুদ্দিনের মতো বিশ্বস্ত কাউকে পাব?’ ১৭৪৮ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি শোকের কারণে মারা গিয়েছিলেন। মহম্মদ শাহ মৃত্যুবরণ করার পর শাহজাদা আহমদ শাহ বাহাদুর ১৭৪৮ সালের ২৭ এপ্রিল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং ২৯ এপ্রিল দিল্লীর লালকেল্লায় তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিলো। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি আবু নাসির মুজাহিদ-উদ্দীন আহমদ শাহ গাজী উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি অবধের নবাব সফদর জংকে উজির-এ-আজম, ইমাদ-উল-মুলকে মীরবক্সী এবং কমরুদ্দিনের পুত্র মঈন-উল-মুলকে পাঞ্জাবের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। মোগল দরবারের প্রধান সেবক জাভেদ খানকে নবাব বাহদুর উপাধি প্রদান করে ৫,০০০ সেনার সুবেদারের মর্যদা প্রদান করা হয়েছিলো। সম্রাটের মাতৃ কুদসিয়া বেগমের সাথে জাভেদ খানকে ৫০,০০০ সেনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো।
জাভেদ খান কার্যকরী শাসক ছিলেন। জাভেদ খানের ক্ষমতায় উত্থান এবং কর্তৃত্ব সাম্রাজ্যের অভিজাত এবং সম্রাটের সেনাদের প্রতি অবমাননা হিসাবে গণ্য করা হয়েছিলো।
অভ্যন্তরীন সীমা লঙ্ঘন (১৭৫০–৫৪ )
সফদর জংয়ের পক্ষপাতিত্বের বিরোধিতা– জাভেদ খানকে প্রদান করা উচ্চ কর্তৃত্ব রক্ষা করার জন্য কুদসিয়া বেগম সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। জাভেদ খানের প্রতি বিরোধিতা এবং বিরক্তি প্রকাশকারীদের প্রতি শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতাও জাভেদ খানকে প্রদান করা হয়েছিলো। ১৭৪৯ সালে জাভেদ খান কর্তৃক সফদর জংকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো। সফদর জং উক্ত হত্যার প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সফদর জং সাম্রাজ্যবাদী আফগান উপদলের নংপুসকদের কর্তৃত্বের পদ থেকে অপসারণ এবং পূর্ববর্তী মোগল উজির-এ-আজমের আত্মীয়কে মোগল দরবারে নিয়োগে করার চেষ্টা করেছিলেন। এই নীতির জন্য তুরানি গোষ্ঠীর প্রধান সদস্যদের বিশেষ করে জাভেদ খানের সাথে সফদর জংয়ের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিলো।
১৭৫০ সালে মোগল সেনাপতি সালাবত খান মারওয়ারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর দিল্লীতে ফিরিয়ে আনা ১৮,০০০ সৈন্যের জন্য অর্থ দাবি করেছিলেন। ফলে তাঁকে বন্দি করা হয়েছিলো। সৈন্যদের বিদ্রোহ বন্ধ করার জন্য বন্দি থাকাকালীন সালাবত খান সৈন্যদের অর্থ প্রদানের জন্য নিজের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রী করে পরে দরবেশের মতো দারিদ্র জীবন যাপন করেছিলেন।
উজির-এ-আজম সফদর জংয়ের নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁর সম্পত্তি আক্রমণ করেছিলেন। এই সময়ে সফদর জং কাঁধে আঘাত পেয়েছিলেন। সফদর জং মারাঠা এবং শিখ ভাড়াটে সৈন্য নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিলেন। এই বাহিনী রোহিলাখণ্ডে কুদসিয়া বেগমের অনুসারিদের পরাজিত করেছিলো। এই সময়ে আহমদ শাহ বাহাদুর এই শত্রুতা বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং সফদর জং সেই আহ্বানে সন্মতি প্রকাশ করেছিলেন। তবে, জাভেদ খান নৃশংসতার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৭৫২ সালের আগস্টে মহম্মদ আলী জেরচির নেতৃত্বে জাভেদ খানের তুর্কি ইউনিটগুলিকে সফদর জং হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সফদর জংয়ের এই পদক্ষেপের ফলে ইন্তিজাম-উদ-দৌলার মতো জাভেদ খান এবং কুদসিয়া বেগমের বিরোধীদের উত্থানের পথ মসৃণ হয়েছিলো।
মারাঠাদের আশ্রিত রাজ্য– ১৭৫২ সালে মারাঠা মিত্রজোট মোগল দরবারের উপর একতরফা সুরক্ষা আরোপ করেছিলেন। এই পদক্ষেপের ফলে সম্রাট এবং তাঁর প্রজারা পেশোয়ার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ইমাদ–উল–মুলক– ১৭৫৩ সালের মে মাসে সম্রাট বাহাদুর শাহ বাহাদুর সফদর জংয়ের ক্রমবর্দ্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার জন্য ১৮ বছর বয়সী গাজী উদ্দিন খান ফিরোজ জং-তৃতীয়কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। গাজী উদ্দিন খান ফিরোজ জং মৃত ইস্তিজাম-উদ-দৌলার পুত্র ইমাদ-উল-মুলক নামে পরিচিত ছিলেন। ইমাদ-উল-মুলক সফদর জংয়ের বিরোধিতা করেছিলেন এবং তাঁর সাথে হাফিজ রহমত খান বারেচ, কুদসিয়া বেগম এবং আহমদ শাহ বাহাদুর স্বয়ং যোগদান করেছিলেন। সফদর জং পরাজিত হয়েছিলেন এবং তাঁর সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো।
১৭৫৩ সালর ১৩ মে সফদর জংকে উজির-এ-আজম পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিলো। তাঁর জায়গায় ইন্টিস্কামকে নিযুক্ত করা হয়েছিলো। ইমাদ-উল-মুলকে মীরবক্সী হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিলো। এর প্রতিবাদে সফদর জং সূরজমলের পরামর্শে অবধের ক্ষমতাচ্যুত নবাব সফদর জং ১৭৫৩ সালের ১৩ মে অজ্ঞাত পরিচয় আকবর আদিল শাহকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। ১৪ মে জাটরা চারবাগ, বাগ-ই-কুলতাত, হাকিম মুনিম সেতু এবং পরের দিন জয়সিংপুরাসহ কয়েকটি এলেকা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। ১৬ মে জাটরা দিল্লী আক্রমণ করে সাদিল খান এবং রাজা দেবিদত্তকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন। ১৭ মে জাটরা ফিরোজ শাহ কোটলা দখল করেছিলেন। রোহিলাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জাটরা ষাঁড়ের পিঠে চড়ে খালিহাতে কামানের গোলা নিক্ষেপ করেছিলেন। যুদ্ধে নাজিব খান আহত এবং ৪০০ রোহিলা পাঠান মারা গিয়েছিলো।
ইমাদ-উল-মুলক দিল্লীর শাসক হওয়ার উদ্দেশ্যে মারাঠাদের জাট অঞ্চল আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেছিলেন। সূরজমল বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। মারাঠারা কুমহের দূর্গ দখল করতে সক্ষম হচ্ছিলনা। আহমদ শাহ বাহাদুর তখন সফদর জংকে ক্ষমা করেছিলেন এবং তিনি অবধে সেনা প্রত্যাহার করেছিলেন।
ইমাদ-উল-মুলক তখন নতুন শাসক হিসাবে আভির্ভূত হয়েছিলেন। ইমাদ-উল-মুলক ১,৫০০,০০০ ডাম (ছোট তামার মূদ্রা)সংগ্রহ করে মোগল সেনাবাহিনী এবং কর্মকর্তাদের বেতন দিতে অস্বীকার করেছিলেন। আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁর পরাক্রমে ভয় পেয়ে সফদর জংকে উজির-এ-আজম পদে নিযুক্ত করেছিলেন। আহমদ শাহ বাহাদুর ইমান-উল-মুলকে রাজকীয় দরবার থেকে অপসারণের চেষ্টা করেছিলেন। ফলে ইমাদ-উল-মুলক সম্রাটকে গ্রেপ্তার করার জন্য আকিবত মামুদকে প্রেরণ করেছিলেন। তখন পেশোয়া নানাসাহেব-প্রথমের ভ্রাতৃ রঘুনাথ রাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠাদের সাথে জোটবন্ধন করেছিলেন।
সিকান্দ্রাবাদে পরাজয়– সিকান্দ্রাবাদের যুদ্ধে কামান এবং শ্বাপশূটারগুলি হাতীর উপর বোঝাই থাকা সত্ত্বেও আহমদ শাহ বাহাদুর যুদ্ধে পরাস্ত হয়েছিলেন। মারাঠাদের মতে ৮,০০০ যোদ্ধাকে বন্দি করা হয়েছিলো।
মালহার রাও হোলকারের নেতৃত্বে মারাঠাদের সহায়তায় ইমাদ-উল-মুলক সফদর জংকে পরাজিত করেছিলেন। এরপর সম্রাট একটি বড় সেনাবাহিনী সংগ্রহ করে সিকান্দ্রাবাদে শিবির স্থাপন করেছিলেন। ১৭৫৪ সালে আহমদ শাহ বাহাদুর এবং মারাঠা সেনাপতি রঘুনাথ রাও, মালহাররাও হোলকার এবং ইমাদ-উল-মুলক বাহিনীর মধ্যে সিকান্দ্রাবাদে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। কামান এবং শ্বাপশূটারগুলি হাতীর উপর বোঝাই থাকা সত্ত্বেও উক্ত যুদ্ধে আহমদ শাহ বাহাদুর পরাস্ত হয়েছিলেন। আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁর মাতৃ, স্ত্রী এবং ৮,০০০ মহিলাকে রেখে দিল্লী পালিয়ে গিয়েছিলেন। যার মধ্যে অধিকাংশই মহিলা ছিলেন। সিকান্দ্রাবাদের অভিযান মারাঠাদের বিরুদ্ধে সম্রাট কর্তৃক পরিচালিত সর্বশেষ অভিযান বলে ধারণা করা হয় ।
আহমদ শাহ বাহাদুর পালিয়ে যাওয়ার পর ইমাদ-উল-মুলক রঘুনাথ রাওয়ের সমর্থনে দিল্লী গিয়েছিলেন এবং আহমদ শাহ বাহাদুর এবং তাঁর মাতৃ কুদসিয়া বেগমকে বন্দি করেছিলেন।
এদিকে সিকান্দ্রাবাদ যুদ্ধের পর অসুস্থ সফদর জং অবধে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং একজন মোগল সেনাপতি সুরজমল এবং জাট বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূতপুর অবরোধ করেছিলেন। ইমাদ-উল-মুলক উজির-এ-আজম হিসাবে বাহাল হওয়ার পর তিনি নতুন গোলাবারুদ সংগ্রহ করে লেফটেনেন্টকে সহায় করার জন্য দিল্লীর বাইরে চলে গিয়েছিলেন।
ইমাদ-উল-মুলক আবার দিল্লীতে ফিরে এসে আহমদ শাহ বাহাদুরকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন। এই কর্মকাণ্ডের পর সফদর জং অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।
মোগল সাম্রাজ্যের খণ্ডিত নীতি– দুর্বল, কিন্তু প্রভাবশালী আহমদ শাহ বাহাদুর দূরবর্তী অনুগত রাজা এবং নবাবদের যেমন টিনেভেলির নবাব চান্দা সাহেব এবং মুজাফফর জংয়ের সাথে চিঠিপত্রের দ্বারা সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। মহম্মদ শাহ মুজাফ্ফর জংকে নাসির জং উপাধি প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীতে আহমদ শাহ বাহাদুর তাঁকে দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত করে নাসির-উদ-দৌলা উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
কর্ণাটক যুদ্ধ(১৭৪৬–১৭৪৮)– ১৭৪৯ সালে ফরাসি সেনাপতি জোসেফ ফ্রাঙ্কোইস ডুপ্লেক্স দাক্ষিণাত্যের দুই মনোনীত শাসক চান্দ সাহিব এবং মুজাফ্ফর জংয়ের সাথে জোটবন্ধন করে তাঁদের নিজ নিজ অঞ্চলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। হায়দার আলীর মতো অন্যান্য নেতারাও ফরাসিদের পক্ষে ছিলেন। শীঘ্রই চান্দ সাহিব, মুজাফফর জং এবং ডি, বুসির নেতৃত্বে ফরাসিরা আম্বুরের যুদ্ধে কর্ণাটকের নবাব আনোয়ার উদ্দিন মহম্মদ খানকে পরাজিত করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্যে মোগল শাসকদের মধ্যে এই ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিক্রিয়ায় মহম্মদ আলী ওয়াল্লাজাহ এবং মুজাফ্ফর জং ইংরেজদের সাথে ১৭৫০ সালে জোটবন্ধন করেছিলেন। ডি, বুসির দখলে থাকা জিঞ্জি দূর্গ নাসির জং পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছিলেন। তখন ডি, বুসি তাঁকে বাধা প্রদান করেছিলেন। তখন কাদাপারার নবাব হিম্মত খান তাঁকে পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন। উত্তরসূরিদের পেছনের শক্তি ছিলেন জোসেফ ফ্রাঙ্কোইস ডুপ্লেক্স। তিনি তাঁর মিত্রদের একটি শক্তিশালী শাসনভার অর্পণ করেছিলেন। মুজাফফরকে পূর্ব-দাক্ষিণাত্যের মোগল ভূমির নিজাম এবং চান্দ সাহিবকে কর্ণাটকের নতুন নবাব হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিলো। সমগ্র মোগল সাম্রাজ্য জুড়ে ফরাসিদের তখন শক্তিশালী অভিজাত হিসাবে গণ্য হতো। এদিকে তাঁদের সমকক্ষ ইংরেজরা আওরঙ্গজেবের সময় থেকে জলদস্যু হিসাবে কুখ্যাত ছিলো।
মারওয়ারের বিরুদ্ধে মোগল অভিযান– মোগল মীরবক্সী এবং সেনাপতি সালাত খান মারওয়ারের ভক্ত সিংয়ের সাথে রাম সিং এবং ঈশ্বরী সিংয়ের বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ১৭৫০ সালে সংঘটিত রাওনার যুদ্ধে উভয় বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলো। যুদ্ধের পরপরই ঈশ্বরী সিং সালাবত খানের সাথে আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন এবং যুদ্ধ বিরতিতে যুদ্ধ শেষ হয়েছিলো। এর পরেই মারাঠা মিত্রবাহিনী জয়পুর আক্রমণ করেছিলেন এবং ঈশ্বরী সিং আত্মহত্যা করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানির দ্বিতীয় এবং তৃতীয় আক্রমণ– আহমদ শাহ দুররানি কাবুল সুবাহের সহায়তার জন্য বরাদ্দ পাঞ্জাবের চারটি জেলার রাজস্ব দাবি করেছিলেন। এই সুবাহগুলি আগে মোগলদের অধীনে ছিলো এবং ১৭৩৯ সালে তাঁরা সুবাহগুলি নাদির শাহের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। পাঞ্জাবের শাসক মইন-উল-মুলক বারাদ্দ রাজস্ব প্রদান করতে অস্বীকার করার জন্য ১৭৪৯ সালে আহমদ শাহ দুররানি দ্বিতীয় বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। তখন যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে মঈন-উল- -মুলক দুররানির সাথে একটি প্রতারিত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
১৭৪৯ সালের চুক্তির শর্ত পূরণ না করার জন্য আহমদ শাহ দুররানি তৃতীয়বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। লাহোরের ফটকের সামনে একটি তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো এবং সেই যুদ্ধে মইন-উল-মুলকের সাহসী সেনাপতি কোরামল নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধে মইন-উল-মুলক বন্দি হয়েছিলেন। তবে, যুদ্ধে সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য আহমদ শাহ দুররানি তাঁকে ক্ষমা করে দিয়ে পাঞ্জাব সুবাহের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন।
এদিকে ১৭৩৯ সালের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে তাঁর জন্য মোগল দরবার উম্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। উজির-এ- আজম সফদর জং প্রচুর অর্থের প্রতিশ্রুতিতে ৫০,০০০ মারাঠা সেনা নিযুক্ত করেছিলেন, কিন্তু তিনি কিছু করার আগেই মাতৃ কুদসিয়া বেগমের পরামর্শে নংপুসক জাভেদ খান আহমদ শাহ বাহাদুরের হয়ে আহমদ শাহ দুররানির সাথে একটি শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাঞ্জাব (সিন্ধু এবং মুলতানসহ) এবং কাশ্মীর সম্রাটের নামে আহমদ শাহ দুররানির দ্বারা শাসিত এবং সম্রাট কর্তৃক সুবাহের যেকোনো গভর্নর নিযুক্তির ক্ষেত্রে আহমদ শাহ দুররানির অনুমোদন থাকার কথা ছিলো। এটি শুধু একটি মৌখিক চুক্তি ছিলো, প্রকৃতপক্ষে সুবাহগুলি আফগানদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিলো। ১৬৫৭ সালে ইমাদ-উল-মুলক সুবাহগুলি মোগল নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলো এবং আফগানরা আনুষ্ঠানিকভাবে সুবাহগুলি নিজেদের সাথে যুক্ত করেছিলেন।
মারাঠা জোটের হাতে গুজরাট এবং উড়িষ্যার নিয়ন্ত্রণ হস্তচ্যুত– মারাঠা মিত্রজোটের বিভিন্ন সর্দারের কাছে আহমদ শাহ বাহাদুরের শাসকদের পরাজয় হয়েছিলো। ১৭৫৩ সাল পর্যন্ত গুজরাট মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো, কিন্তু ১৭৫৩ সালে মারাঠারা মোগল গভর্নরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। যুদ্ধের সময় রাজ বোভরি মসজিদ কমপ্লেক্সটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। গুজরাট অধিগ্রহণের প্রতিক্রিয়ায় আহমদ শাহ বাহাদুর জুনাগড়ের নবাব মহম্মদ বাহাদুর খানজিকে নিয়োগ করে মোগল সেনাবাহিনী শক্তিশালী করেছিলেন এবং মোগল সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত বিভিন্ন সত্ত্বাকে বিভিন্ন উপাধি এবং কর্তৃত্ব প্রদান করেছিলেন। সালাত খানের নেতৃত্বে আহমদ শাহ বাহাদুর এবং সফদর জং ১৮,০০০ সেনার একটি বাহিনী রাজপুত অঞ্চলে প্রেরণ করেছিলেন এবং সালাবত খান রাজপুত অঞ্চলের সমস্ত বিদ্রোহীদের দমন এবং সেই অঞ্চলের গ্যারিসনদের সমর্থন আদায়ের জন্য অভিযান শুরু করেছিলেন।
নবাব আলীবর্দি খান উড়িষ্যার নিয়ন্ত্রণ হস্তচ্যুত-প্রায় ১১ বছর ধরে বাংলার নবাব আলীবর্দি খান মারাঠাদের কাছ থেকে নিজের অঞ্চল রক্ষা করার পর পাটনা, ঢাকা এবং উড়িষ্যার মতো বিভিন্ন ফৌজদাররা রাঘোজি ভোঁসলে -প্রথমের নেতৃত্বাধীন মারাঠাদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত উড়িষ্যাকে মারাঠা জোটবন্ধনের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিলো। শুধুমাত্র মেদিনীপুর মোগলদের হাতে রয়ে গিয়েছিলো এবং বাংলার নবাব আলীবর্দি খান প্রয়াত সম্রাট মহম্মদ শাহ যেমনটি চৌথা(কর) প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তেমনটি চৌথা(রাজস্ব) প্রদান করতে সন্মত হয়েছিলেন।
দ্বিতীয় কৰ্ণাটক যুদ্ধ(১৭৪৯–৫৪)– ১৭৫১ সালে চান্দ সাহিব, তাঁর লেফটেনেণ্ট রেজা সাহেব এবং মহম্মদ ইউসুফ খান আর্কটের যুদ্ধে মহম্মদ আলী খান ওয়াল্লাজাহ এবং ক্লাইভের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে কর্নল, কুদ্দাপহ এবং সাভানুরের বিদ্বেষী নবাবরা যৌথভাবে হায়দ্রাবাদের মুজাফ্ফর জং (মুহি-উদ-দীন মুজাফফর জং হিদায়েত) য়ের ৩০০০ সৈন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। উক্ত সংঘর্ষের সময় সাভানুরের নবাব নিহত, কর্নলের নবাব গুলিবিদ্ধ এবং হিম্মত খান আহত হয়েছিলেন। কুদ্দাপাহের নবাব দ্বৈত যুদ্ধের জন্য মুজাফ্ফর জংকে আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং একে অপরের প্রতি হাওদা চার্জ করে একে অপরকে নির্মূল করেছিলেন।
ফরাসি–নিজাম জোটবন্ধন– মুজাফ্ফর জংয়ের মৃত্যু সংবাদে মোগলদের মধ্যে আতংঙ্ক সৃষ্টি করেছিলো। ফরাসিরাও এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ডি, বুসি সম্রাট আহমদ শাহ বাহাদুরের অনুমোদন ছাড়াই মোগল রাজকীয় দরবারের ক্রোধের ঝুঁকি নিয়ে দাক্ষিণাত্যের নতুন সুবেদার হিসাবে মুজাফ্ফর জংয়ের ভ্রাতৃ সালাত খানকে মনোনীত করেছিলেন। তাঁরা একসাথে ১২ এপ্রিল হায়দ্রাবাদে প্রবেশ করেছিলেন এবং ১৮ জুন মোগল বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য আওরঙ্গাবাদে মারাঠাদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছিলেন। মোগল সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী সেনাপতি ইন্তিজাম- উদ-দৌলা সালাবত খানকে ক্ষমতা প্রদানে অনিচ্ছুক ছিলেন। সালাত খানকে সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত করার প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন এবং ১,৫০,০০ সেনা নিয়ে দাক্ষিণাত্যে গিয়ে মারাঠা প্রতিপক্ষ বালাজি বাজিরাওয়ের সহায়তায় সালাবত খানকে উৎখাত করার হুমকি প্রদান করেছিলেন।
আসন্ন আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করার পরিবর্তে ডুপ্লেক্স মারাঠাদের প্রত্যাহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৭৫১ সালের ডিসেম্বর-এ চন্দ্রগ্রহণের আন্ধারের সুযোগ গ্রহণ করে মারাঠাদের আক্রমণ করে মারাঠা নেতা বালাজি বাজিরাওকে পরাজিত করেন। বালাজি বাজিরাওকে পরাজিত করার পর ডি, বুসি এবং সালাবত জংয়ের মিত্রজোট পুণের দিকে যাত্রা করেছিলেন এবং কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো মারাঠা এবং তাঁদের মিত্রজোটকে পরাজিত করেছিলেন। পরের বছর ডি, বুসি আহমেদনগরে মারাঠাদের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
বালাজি বাজিরাওয়ের সাথে জোটবন্ধন করার জন্য ইতিজাম-উদ-দৌলাকে তাঁর সৈন্যরা বিষপ্রয়োগ করেছিলেন। ১৭৫২ সালে মহম্মদ আলী খান ওয়াল্লাজাহ এবং ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ক্লাইভের কাছে পরাজিত হওয়ার পর কর্ণাটকের নবাব চান্দ সাহিব একটি বিদ্রোহে নিহত হয়েছিলেন। মহম্মদ আলী খান ওয়াল্লাজাহ আহমদ শাহ বাহাদুরের সহানুভূতি আদায় করে কর্ণাটকের নবাব হিসাবে স্বীকৃত হয়েছিলেন।
১৭৫৩ সালে ডি, বুসির নেতৃত্বে তাঁর মিত্রজোট উত্তর সার্কারগুলি দখল করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং ১৭৫৪ সালে মারাঠা প্রধান রাঘোজি ভোঁসলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কয়েকটি জয়ের সূচনা করেছিলেন। এই অভিযান ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো এবং সালাবত জং ও ডি, বুসির বাহিনী পুণে দূর্গের চারপাশে সমবেত মারাঠাদের বিপর্যস্ত করে ফেলেছিলো। ১৭৫৬ সালে সালাবত জংয়ের বাহিনী কামানের থেকেও দ্রুত গুলি ছুড়তে সক্ষম মাটির সাথে সংযুক্ত ক্যাটিয়কস নামে পরিচিত ভারী মাস্কেট ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। এই অস্ত্রগুলি মারাঠা বিদ্রোহীদের ভাগ্য সম্পূর্ণ রূপে উল্টে দিয়েছিলো।
স্ত্রী– এনায়েতপুরী বেগম, সরফরাজ মহল এবং রাণী উত্তম কুমারী।
সন্তান– বিদার বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুর, মহতার- উন-নিসা বেগম এবং দিল আফ্রোজ বানু বেগম।
মৃত্যু– ১৭৫৪ সালে ইমাদ-উল-মুলক, আহমদ শাহ বাহাদুরকে অন্ধ করে সলিমগড় দূর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। ১৭৭৫ সালে সম্রাট শাহ আলম-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর এক পুত্র মাহমুদ শাহ বাহাদুর বিদার বখত শাহ জাহান-চতুর্থ উপাধি ধারণ করে ১৭৮৮ সালে কয়েক মাসের জন্য সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
আহমদ শাহ বাহাদুরের সমাধি মেহরুলির কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর দরগাহের পাশে মতি মসজিদের সাথে সংযুক্ত একটি সমাধিক্ষেত্রে অবস্থিত। •
আলমগীর–দ্বিতীয়
আজিজ-উদ-দীন মহম্মদ আলমগীর-দ্বিতীয়ের জন্ম ১৬৯৯ সালের ৬ জুন মোগল সাম্রাজ্যের দাক্ষিণাত্যের বুরহানপুরে। তিনি পঞ্চদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি আলমগীর-দ্বিতীয় নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৭৫৪ সালের ৩ জুন থেকে ১৭৫৯ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম জাহান্দার শাহ এবং মাতৃর নাম অনুপ বাই । অনুপ বাই রাজপুত রাজকুমারী ছিলেন। জাহান্দার শাহ বাহাদুর শাহ -প্রথমের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন।
দাক্ষিণাত্যের আওরঙ্গাবাদে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর সময় আলমগীর-দ্বিতীয়-এর বয়স ৭ বছর ছিলেন । তাঁর পিতামহ বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পিতা জাহান্দার শাহ কয়েক মাসের জন্য সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। ইমাদ-উল- মুলকের সহায়তায় ফারুখসিয়ার তাঁর পিতা জাহান্দার শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
আজিজ-উদ-দীন মহম্মদ আলমগীর-দ্বিতীয় ১৭১৪ সাল থেকে ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় ছিলেন। ১৭৫৪ সালে উজির-এ-আজম ইমাদ-উল-মুলক আহমদ শাহ বাহাদুরকে ক্ষমতাচ্যুত করে আলমগীর-দ্বিতীয়কে কারাগার থেকে মুক্ত করে ১৭৫৪ সালের ৩ জুন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার সময় তিনি আলমগীর- দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন। কারণ তিনি আওরঙ্গজেবের কেন্দ্রীভূত নীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তাঁর বয়স ছিলো ৫৫ বছর। তাঁর প্রশাসন এবং সামরিক অভিজ্ঞতা ছিলো না। কারণ তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময় কারাগারে কাটিয়েছিলেন। তিনি একজন দুর্বল শাসক ছিলেন, সাম্রাজ্যের প্রশাসন ক্ষমতা উজির-এ- আজম ইমাদ-উল-মুলকের হাতে ন্যস্ত ছিলো।
আলমগীর-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে আহমদ শাহ দুররানি আবার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। তিনি দিল্লী দখল করে মথুরায় লুন্ঠনের তাণ্ডব চালিয়েছিলেন। ইমাদ-উল-মুলকের সহাযোগিতার ফলে মারাঠারা অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠছিলো এবং সমগ্র উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো। মারাঠাদের উত্থানের ফলে মোগল সাম্রাজ্যের জন্য বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিলো। এক সময় ইমাদ-উল-মুলকের সাথে আলমগীর-দ্বিতীয়ের সম্পর্ক খারাপ হয়ে উঠেছিলো এবং ইমাদ- উল-মুলকের হাতে তিনি খুন হয়েছিলেন। আলমগীর-দ্বিতীয় খুন হওয়ার পর তাঁর পুত্র আলী গওহর ইমাদ-উল-মুলকের নিপীড়ন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দিল্লী থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তিনি শাহ জাহান-তৃতীয় উপাধি ধারণ করে মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
রাজত্ব–আলমগীর-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য পুনরায় উদ্বেগজনকভাবে কেন্দ্রীভূত হতে শুরু হয়েছিলো। বিশেষ করে অনেক নবাব সম্রাটের সন্তুষ্টি এবং মারাঠাদের বিরুদ্ধে সম্রাটের প্রতিরোধের বিষয়ে সমন্বয় কামনা করেছিলেন। সাম্রাজ্যের এই উন্নয়ন স্পষ্টতই ইমাদ-উল-মুলকের জন্য অনাকাংক্ষিত ছিলো। কারণ ইমাদ-উল-মুলক মাঠারাদের অদম্য সমর্থন দিয়ে তাঁর কর্তৃত্ববাদকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন।
দুররানি আমিরতের সাথে জোটবন্ধন– ১৭৫৫ সালে পাঞ্জাবের মোগল ভাইসরয় মইন-উল-মুলক মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর বিধবা স্ত্রী মুঘলানি বেগম যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে উত্তরাধিকারের সংঘর্ষ স্থগিত এবং পূর্বাঞ্চলে শিখ বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য আহমদ শাহ দুররানির সহায় চেয়েছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি এবং তাঁর বাহিনী ১৭৫৬ সালে লাহোর অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং সেনাপতি জাহান খানের সুরক্ষায় তাঁর পুত্র তৈমূর শাহ দুররানিকে লাহোরের নতুন ভাইসরয় হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। আদিনা বেগকে দোয়াবের ফৌজদার হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানি তখন পাঞ্জাবের পূর্বাঞ্চলের অস্থিতিশীল এবং বেআইনী শিখ এবং হিন্দু বাসিন্দাদের লুন্ঠন করেছিলেন।
এরপর আহমদ শাহ দুররানি দিল্লীর দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। ১৭৫৭ সালের অক্টোবরে মোগল সম্রাট আলমগীর- দ্বিতীয়, নাজিব-উদ-দৌলার মতো অভিজাতদের সাথে আহমদ শাহ দুররানির সাথে সাক্ষাত করতে এসেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানির বাহিনী তখন মারাঠাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। তিনি ইমাদ-উল-মুলকের প্রশাসনকে উৎখাত এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার হুমকি প্রদান করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি এবং আলমগীর-দ্বিতীয়ের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছিলো, যখন দুররানির পুত্র তৈমুর শাহ দুররানি আলমগীর-দ্বিতীয়ের কন্যা জহুরা বেগমকে সঙ্গী হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন। আহমদ শাহ দুররানি নিজেও সাবেক মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহের কন্যা হজরত বেগমকে বিয়ে করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি তাঁর বাহিনী তৈমুর শাহ দুররানির নেতৃত্বে লাহোরে রেখে তিনি নিজে কাবুল ফিরে গিয়েছিলেন। তৈমুর শাহ দুররানি মোগল ধাতুশিল্পীদের সহায়তায় জমজমা কামান প্রস্তুত করেছিলেন। ভাওয়ালপুরের আমির এবং নাসির খান প্রথম তাঁকে এই ক্ষেত্রে সহায় করেছিলেন।
দিল্লী দখল- ১৭৫৭ সালের জুলাই মাসে রঘুনাথ রাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠারা দুররানি সাম্রাজ্য এবং মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত মৈত্রী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মারাঠারা ইমাদ-উল-মুলকের সহায়তায় লালকেল্লা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে শিবির স্থাপন করে যমুনা নদীর তীরের সমস্ত গ্রাম দখল করে দিল্লী অবরোধ করেছিলেন। মারাঠারা আলমগীর- দ্বিতীয়ের মীর বক্সী নাজিব-উদ-দৌলা, সেনাপতি কুতুব শাহ এবং আমান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত ২,৫০০ মোগল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো।
বিক্ষুব্ধ মারাঠারা ফেরি জ্বালিয়ে দিয়ে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিলো। নাজিব-উদ-দৌলা তখন ভারী কামানসহ লালকেল্লার আশেপাশে অবস্থান গ্রহণ করে আহমদ শাহ দুররানির আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তবে, হেরাতের বিভিন্ন বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকার জন্য আহমদ শাহ দুররানির আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে মারাঠা সন্মিলিত বাহিনীকে প্রতিরোধ করে রাখার পর নাজিব-উদ-দৌলা পরাজয় স্বীকার করে নাজিবাবাদ চলে গিয়েছিলেন। মারাঠারা দিল্লীতে প্রবেশ করেছিলেন। মারাঠাদের হাতে ধরা পরার আগেই সম্রাট আলমগীর-দ্বিতীয় রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভরতপুর পালিয়ে গিয়েছিলেন।
মারাঠা প্রধান সদাশিব ভাউ তখন শাহ জাহান তৃতীয়কে মোগল সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন এবং মোগল রাজ দরবারের গহনা, অলঙ্কার লুন্ঠনের অভিযান শুরু করেছিলেন। দিল্লী ও আগ্রাতে মোগলদের দ্বারা নির্মিত মসজিদ, সমাধিগুলিকে অপবিত্র করা হয়েছিলো। রাজকীয় মতি মসজিদকেও অপবিত্র করেছিলো।
মারাঠারা দিল্লী প্রবেশের কিছুক্ষণ পরেই সূরজমল কর্তৃক প্রেরিত একটি জাট রেজিমেন্টের সন্মুখীন হয়েছিলেন। জাটরা দিল্লীর উপর সার্বভৌমত্ব দাবি করতে শুরু করেছিলেন।
জাটরাও দিল্লীতে লুণ্ঠন চালিয়েছিলো।
যাইহোক, দিল্লীর নিয়ন্ত্রণ হারানো সত্ত্বেও নাজিব-উদ-দৌলা এবং তাঁর সহযোগীরা যেমন, কুতুব খান, সিরহিন্দের মোগল ফৌজদার আব্দুস সামাদ খান সাহারানপুর এবং শাহাবাদ মার্কন্দায় মারাঠা মিত্রজোটের বিরুদ্ধে প্রত্যাহ্বান অব্যাহত রেখেছিলেন। প্রত্যুত্তরে মারাঠা মিত্রজোট তারাওরি, কর্নাল এবং কুঞ্জপুরার বাসিন্দাদের লুটপাট করেছিলেন। এর মধ্যে আলমগীর-দ্বিতীয় এবং মোগল রাজপরিবার দিল্লীতে ফিরে এসেছিলেন।
কুঞ্জপুরার উপর মারাঠা মিত্রজোটের আক্রমণ আহমদ শাহ দুররানির সামরিক অভিযানের সূত্রপাত করেছিলো। দুররানি বাহিনী পবিত্র নদী অতিক্রম করে বিদ্রোহী মারাঠাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলো।
বাংলা হস্তচ্যুত– বাংলার বিখ্যাত নবাব আলীবর্দি খান মোগল রাজদরবারে বার্ষিক ৫ মিলিয়ন ডামস প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি ১৭৫৬ সালের ৯ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আলীবর্দি খানের মৃত্যুতে আলমগীর-দ্বিতীয় শোক প্রকাশ করেছিলেন এবং আলীবর্দি খানের উত্তরসূরি সিরাজ-উদ-দৌলাকে বাংলার পরবর্তী নবাব হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সিরাজ-উদ-দৌলা অভ্যন্তরীন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীরা আলমগীর-দ্বিতীয় সিরাজ-উদ-দৌলাকে প্রদত্ত ফরমান বিবেচনা করতে অস্বীকার করেছিলেন। এই অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের ফলে সিরাজ-উদ-দৌলা সম্রাট আলমগীর- দ্বিতীয় এবং সালাবত খানের অনুমোদন ছাড়াই ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কাছ থেকে কলকাতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে ক্লাইভ অতি শীঘ্রই কলকাতা পুনর দখল করেছিলেন। এর পর ১৭৫৭ সালে ক্লাইভ পলাশীর যুদ্ধে সিরা-উদ-দৌলাকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সিরাজ-উদ-দৌলা পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর বাহিনী কর্তৃক নিহত হয়েছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলার হত্যাকারীরা মোগল রাজদরবারে গোলাম হোসেন তাবাতাবাই কর্তৃক সমালোচিত হয়েছিলেন এবং আলমগীর-দ্বিতীয় মীরজাফরকে বাংলার পরবর্তী নবাব হিসাবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিলেন। রাজকীয় মোগল দরবারের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় মীরজাফর মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কৌশলী ইমাদ-উদ-দৌলার সাথে জোটবন্ধন করেছিলেন।
দাক্ষিণাত্যের কর্তৃত্ব– আলমগীর-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে ফরাসি সেনাপতি ডি, বুসি ও লালি এবং তাঁর সহযোগীরা যেমন সালাবত জং, হায়দার আলী মারাঠা বিদ্রোহীদের আধিপত্যের বিরোধিতা করে দাক্ষিণাত্যে মোগল বাহিনীর অগ্রগতিতে ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছিলেন। তাঁদের কৃতিত্ব তাঁদের প্রভাবশালী মহলে খ্যাতি লাভ করেছিলো। ১৭৫৬ সালে সালাবত খান-এর বাহিনী ক্যাটিওয়কস নামে পরিচিত ভারী মাস্কেট ব্যবহার করেছিলো। মাস্কেটগুলি মাটির সাথে যুক্ত ছিলো এবং কামানের থেকেও দ্রুত গুলি ছুড়তে সক্ষম ছিলো বলে জানা যায়। এই মাস্কেটগুলি মারাঠাদের ভাগ্য সম্পূর্ণভাবে উল্টে দিয়েছিলো।
পলাশী যুদ্ধের পরপরই ফরাসি সেনাপতি ডি, বুসি মোগল সম্রাট কর্তৃক সাইফ-উদ-দৌলা উমদাত-উল-মুলক উপাধি এবং ৭,০০০ সেনার মনসবদার পদবী লাভ করেছিলেন। তিনি তাঁর সহযোগী মোগল সাম্রাজ্যে ফরাসিদের প্রতিনিধিত্বকারী হায়দার জং (অ্যাটর্নি) এবং সালাবত জং-এর সাথে মিলে ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তর সার্কারগুলি দখল করেছিলেন। যাইহোক, ১৭৫৮ সালে ফোর্ড দ্বারা উত্তর সার্কারগুলি পুনর দখল করা হয়েছিলো এবং ডি, বুসিকে ফ্রান্সে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিলো। খারাপ কিছু হওয়ার ভয়ে সালাবত জং ইংরেজ ইস্ট ইণ্ডিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন এবং তাঁদের সুরক্ষার স্বীকৃতি প্রদান করেছিলেন। অবশ্যে শীঘ্রই তিনি তাঁর ভ্রাতা নিজাম আলী খান কর্তৃক উৎখাত হয়েছিলেন।
ভূপালের নবাব– ১৭৫৮ সালে ভূপালের নবাব ফয়েজ মহম্মদ খানের সৎ মা মামোলা বাই মারাঠাদের বিন্যাস অনুসারে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফয়েজ মহম্মদ খানের মোগল বাহিনীকে রাইসেন দুর্গে অবরোধ করেছিলেন। তখন মোগল সম্রাট আলমগীর-দ্বিতীয় বিক্ষুব্ধ হয়ে ফয়েজ মহম্মদ খানই রাইসেন দুর্গের একমাত্র নির্বাচিত প্রশাসক বলে ফরমান জারি করেছিলেন এবং তাঁকে ভূপালের নবাব বাহাদুর উপাধি প্রদান করেছিলেন। তবে দূর্গটি মামোলা বাই এবং নানা সাহেব পেশোয়ার নিয়ন্ত্রণেই ছিলো। আলমগীর-দ্বিতীয়ের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর ও পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের আগে এবং সদাশিবরাও ভাউ ভূপাল ধ্বংস করার হুমকি প্রদানের পর ফয়েজ মহম্মদ খান ১৭৬০ সালে রাইসেন দূর্গ পুনর দখল করেছিলেন। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, পানিপথ যুদ্ধের ঠিক আগে ফয়েজ মহম্মদ খানের সেনারাই মারাঠাদের বিভিন্ন সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিয়েছিলো।
কাম্বের নবাব– কাম্বের নবাব নজম-উদ-দৌলা তাঁর এস্টেটের বেশির ভাগ অংশকে আন্তর্জাতিক নিরাপদ অঞ্চলে পরিণত করার জন্য কাম্বেতে ব্রিটিশদের উপস্থিতি সমর্থন করেছিলেন। অবশ্যে তাঁকেও সম্ভবত মারাঠাদের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিলো।
মহীশূরের নবাব– ১৭৫৮ সালে হায়দার আলী মারাঠা জোটবন্ধনের খান্দে রাওয়ের কাছ থেকে বাঙ্গালোর দখল করেছিলেন। কর্ণাটক যুদ্ধের সময় তাঁর কৃতিত্বের জন্য সম্রাট আলমগীর-দ্বিতীয় তাঁকে ‘নবাব হায়দার আলী খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। ১৭৫৯ সাল নাগাদ হায়দার আলী সমগ্র মহীশূরীয় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন।
মারাঠা জোটবন্ধন– ১৭৫৮ সালে রঘুনাথ রাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠারা ইমাদ-উল-মুলকের কাছ থেকে বলপূর্বক রাজকীয় সম্পদ দখলের পর লাহোর দখল করেছিলেন। তাঁরা আহমদ শাহ দুররানির পুত্র তৈমূর শাহ দুররানিকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছিলেন। শিখ এবং মারাঠাদের আক্রমণের ফলে তৈমুর শাহ দুররানি এবং জাহান খান লাহোর থেকে পেশোয়ারে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই বিজয়ের ফলে পেশোয়া দিল্লী দখল করে বিশ্বনাথ রাওকে মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছিলেন।
সাত বছরের যুদ্ধ– ১৭৫৬ সালে সাত বছরের যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিলো, যেখানে ভারতের সীমার বাইরেও মোগলরা জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। সেই যুদ্ধে আলমগীর-দ্বিতীয়কে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিদ্রোহীরা সমর্থন করেছিলো।
আলমগীর–দ্বিতীয়ের স্ত্রী– জিনাত মহল, ফাইজ বখত বেগম, আজিজাবাদী মহল, লতিফা বেগম, জিনাত আফ্ৰোজ বেগম এবং আওরঙ্গাবাদী মহল।
আলমগীর–দ্বিতীয়ের সন্তান– শাহ আলম-দ্বিতীয়, মির্জা মহম্মদ আলী আসগর বাহাদুর, মির্জা মহম্মদ হারুন, হিদায়েত বক্স বাহাদুর, মির্জা তালি মুরাদ শাহ বাহাদুর, মির্জা জামিয়াত শাহ বাহাদুর, মির্জা মহম্মদ হিম্মত শাহ বাহাদুর, মির্জা আসান-উদ-দীন মহম্মদ বাহাদুর, মির্জা মুবারক শাহ বাহাদুর, গওহর-উন-নিসা বেগম, খায়ির-উন-নিসা বেগম এবং দোলত-উন-নিসা বেগম।
মৃত্যু– আহমদ শাহ দুররানির আক্রমণের পর নবনিযুক্ত উজির-এ-আজম নাজিব-উদ-দৌলা মারাঠাদের বিরুদ্ধে ফৌজদার, নবাব এবং নিজামদের একত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর এই পদক্ষেপে ভয় পেয়ে পদচ্যূত ইমাদ-উল- মুলক মারাঠা নেতা সদাশিবরাও ভাউয়ের সাথে জোটবন্ধন করে নাজিব-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছিলেন। এই যুদ্ধ ১৫ দিন স্থায়ী হয়েছিলো এবং নাজিব-উদ-দৌলার পরাজয় হয়েছিলো।
ইমাদ-উল-মুলক তখন ভয় পেয়েছিলেন যে, আলমগীর-দ্বিতীয় হয়তো আহমদ শাহ দুররানিকে আহ্বান জানাবেন, নয়তো শাহজাদা আলী গওহরকে ব্যবহার করবেন। ইমাদ-উল-মুলক তখন আলমগীর-দ্বিতীয় এবং তাঁর পরিবারের বিশিষ্ট সদস্যদের হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। আলী গওহর সহ কয়েকজন মোগল শাহজাদা হত্যার আগে মরিয়া হয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৭৫৯ সালের ২৯ নভেম্বরে আলমগীর-দ্বিতীয়কে বলা হয়েছিলো যে, একজন ধার্মিক ব্যক্তি কোটলা ফতেহ শাহেতে তাঁর সাথে সাক্ষাত করার জন্য এসেছেন। আলমগীর-দ্বিতীয় তখন তাঁর সাথে সাক্ষাত করার জন্য কোটলা ফতেহ শাহেতে রওয়ানা হয়েছিলেন। তাঁকে তখন ইমাদ-উল-মুলকের নিয়োজিত হত্যাকারীদের দ্বারা বারবার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছিলো ।
আলমগীর-দ্বিতীয়ের মৃত্যুতে সমগ্র মোগল সাম্রাজ্য বিশেষ করে মুসলিম জনগণ শোক প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুর পর হুমায়ূনের সমাধির পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
আলমগীর-দ্বিতীয়ের হত্যার পর সদাশিবরাও ভাউয়ের অধীনস্থ পেশোয়া স্বল্পস্থায়ী ক্ষমতার শিখরে পৌঁছেছিলেন। যখন তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথাটা প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিলো, তখন তিনি মোগল সাম্রাজ্য বিলুপ্ত করে বিশ্বরাওকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে– ২০১৯ সালে নির্মিত বলিউড মহাকাব্য পানিপথ যুদ্ধে আলমগীর-দ্বিতীয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এস, এম, জাহির।
১৯৯৪ সালের টিভি ধারাবাহিক ‘দ্য গ্রেট মারাঠা’য় আলমগীর-দ্বিতীয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অরুণ বালি। •
শাহ জাহান–তৃতীয়
শাহ জাহান-তৃতীয়ের জন্ম ১৭১১ সালে। তিনি মির্জা মুহি-উদ-দীন মিল্লাত নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ষষ্ঠদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি ছিলেন কামবক্সের জ্যেষ্ঠ পুত্র মুহি-উস-সুন্নাতের পুত্র। তাঁর মাতৃর নাম ছিলেন রুসকিমি বেগম। তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি ছিলেন। ইমাদ-উল-মুলকের সহায়তায় তিনি স্বল্প সময়ের জন্য মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সম্রাট আলমগীর-দ্বিতীয়ের হত্যার পর তিনি ১৭৫৯ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৭৬০ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ইমাদ-উল-মুলকের হাতের পুতুল স্বরূপ ছিলেন। তিনি নামমাত্র সম্রাট ছিলেন। সাম্রাজ্যের সমস্ত ক্ষমতা ছিলো ইমাদ-উল-মুলকের হাতে।
মারাঠা নেতা সদাশিব ভাউ দ্বারা তিনি সিংহাসনচ্যূত হয়েছিলেন এবং তাঁর পরে শাহ আলম-দ্বিতীয় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৭৭২ সালে তিনি ৬০-৬১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
শাহ জাহান-তৃতীয়ের স্ত্রীর নাম ছিলেন সাদাত বেগম। তিনি দু’টি পুত্র সন্তানের পিতৃ ছিলেন। মির্জা সাদাত বখত বাহাদুর এবং মির্জা ইকরাম বাহাদুর। •
শাহ আলম–দ্বিতীয়
শাহ আলম-দ্বিতীয়ের জন্ম ১৭২৮ সালের ২৫ জুন মোগল সাম্রাজ্যের দিল্লীর শাহজাহানাবাদ সুবাহে। তিনি আলী গওহর নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি সপ্তদশ মোগল সম্রাট ছিলেন। তাঁর পিতৃর নাম আলমগীর-দ্বিতীয় এবং মাতৃর নাম জিনাত মহল। শাহ আলম-দ্বিতীয়ের পিতৃ আলমগীর-দ্বিতীয় জাহান্দার শাহ বাহাদুর শাহ(শাহ আলম-প্রথম)-এর পুত্র এবং আওরঙ্গজেবের নাতি ছিলেন। শাহ আলম-দ্বিতীয় ধ্বংসপ্রাপ্ত মোগল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে তাঁর ক্ষমতা এতটাই সীমিত হয়েছিলো যে, ফার্সি ভাষায় একটি প্রবাদ প্রচলিত হয়েছিলো, ‘সুলতান-ই- শাহ আলম, আজ দিল্লী তা পালাম’। যার অর্থ, শাহ আলমের রাজত্ব দিল্লী থেকে পালাম পর্যন্ত। পালাম দিল্লীর একটি উপ-শহর।
শাহ আলম-দ্বিতীয় তাঁর পিতা আজিজ-উদ-দীন মহম্মদ আলমগীর-দ্বিতীয়ের সাথে ১৭১৪ সাল থেকে ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় ছিলেন। তিনি তাঁর পিতা আলমগীর-দ্বিতীয়ের পাশাপাশি লালকেল্লার সালাটিন প্রাসাদে অর্দ্ধ বন্দি অবস্থায় বেড়ে উঠেছিলেন। ১৭৫৪ সালে উজির-এ-আজম ইমাদ-উল-মুলক আহমদ শাহ বাহাদুরকে ক্ষমতাচ্যূত করে আলমগীর-দ্বিতীয়কে কারাগার থেকে মুক্ত করে ১৭৫৪ সালের ৩ জুন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর পিতার রাজত্বকালে শাহ আলম-দ্বিতীয়কে উচ্চ পদে নিয়োগ করা হয়েছিলো। তাঁকে সাম্রাজ্যের ‘ওয়ালি-আল-আহাদ’ হিসাবেও ঘোষণা করা হয়েছিলো।
ইমাদ-উল-মুলকের সহযোগিতার ফলে মারাঠারা অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলো এবং সমগ্র উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো। মারাঠাদের উত্থানের ফলে মোগল সাম্রাজ্যের জন্য বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিলো। এক সময় ইমাদ- উল-মুলকের সাথে আলমগীর-দ্বিতীয়ের সম্পর্ক খারাপ হয়ে উঠে এবং ইমাদ-উল-মুলকের হাতে তিনি খুন হোন।
আলমগীর-দ্বিতীয় খুন হওয়ার পর ইমাদ-উল-মুলক শাহ জাহান-তৃতীয়কে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। শাহ জাহান-তৃতীয় নামমাত্র সম্রাট ছিলেন, প্রকৃত ক্ষমতা ছিলো ইমাদ-উল-মুলকের হাতে।
শাহজাদা আলী গওহরের দিল্লী থেকে পলায়ন– আলমগীর-দ্বিতীয়ের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্য পুনরায় উদ্বেগজনকভাবে কেন্দ্রীভূত হতে শুরু হয়েছিলো। বিশেষ করে অনেক নবাব সম্রাটের সন্তুষ্টি এবং মারাঠাদের বিরুদ্ধে সম্রাটের প্রতিরোধের বিষয়ে সমন্বয় কামনা করেছিলেন। সাম্রাজ্যের এই উন্নয়ন স্পষ্টতই ইমাদ-উল-মুলকের জন্য অনাকাংক্ষিত ছিলো। কারণ ইমাদ-উল-মুলক মাঠারাদের অদম্য সমর্থনে তাঁর কর্তৃত্ববাদকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। আলমগীর- দ্বিতীয় একজন দুর্বল শাসক ছিলেন, সাম্রাজ্যের প্রশাসন ক্ষমতা উজির-এ-আজম ইমাদ-উল-মুলকের হাতে ন্যস্ত ছিলো।
ইমাদ-উল-মুলকের বর্দ্ধিত ক্ষমতার জন্য ভীত হয়ে শাহজাদা আলী গওহর একটি সেনাবাহিনী সংগঠিত করে প্রাণের ভয়ে দিল্লী থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আলমগীর-দ্বিতীয় খুন হওয়ার সময় তিনি বিহারে ছিলেন। ১৭৫৯ সালে সাম্রাজ্যের পূর্ব সুবাহে আবির্ভূত হয়ে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার আশায় বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার ওপর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন।
এদিকে উজির-এ-আজম নাজিব-উদ-দৌলা দিল্লীর বাইরে একটি বড় মোগল বাহিনী একত্রিত করে দখলদার ইমাদ- উল-মুলকে পালাতে বাধ্য করেছিলেন এবং শাহ জাহান-তৃতীয়কে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন নাজিব-উদ-দৌলা এবং অভিজাত মুসলমানরা শক্তিশালী আহমদ শাহ দুররানির সাথে যোগাযোগ করে মারাঠাদের পরাজিত করার পরিকল্পনা করেছিলেন।
১৭৬০ সালের ১৪ জানুয়ারি আহমদ শাহ দুররানির আফগান বাহিনী এবং সদাশিব রাও ভাউ নেতৃত্বাধীন মারাঠাদের মধ্যে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। সদাশিবরাও ভাউ ছত্রপতি শিবাজি এবং পেশোয়ার পরে মারাঠা সাম্রাজ্যের সর্বাধিক কর্তৃত্বশীল ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। নাজিব-উদ-দৌলার নেতৃত্বে পশতুন রোহিলারা, খানাতে কালাতের বেলুচরা, অবধের সুজা-উদ-দৌলা এবং পতনশীল মোগল সাম্রাজ্যের সেনা দ্বারা আফগানরা সমর্থিত ছিলো। যুদ্ধটি ১৮ শতকের সবচেয়ে বড় এবং ঘটনা বহুল যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। একদিনের যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিলো পানিপথ-তৃতীয়ের যুদ্ধে। যুদ্ধে ৬০,০০০ থেকে ৭০,০০০ প্রাণহানি হয়েছিলো এবং অনেক সেনা বন্দি হয়েছিলো। যুদ্ধে আফগানরা জয়লাভ করেছিলেন।
আহমদ শাহ দুররানি সদাশিবরাও ভাউ নেতৃত্বাধীন মারাঠা সেনাবাহিনীকে বিতাড়ন করার পর ইমাদ-উল-মুলকের হাতের পুতুল স্বরূপ শাহ জাহান-তৃতীয়কে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৭৬০ সালের ১০ অক্টোবর শাহজাদা আলী গওহরকে সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। তবে, ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সাথে করা চুক্তির জন্য তিনি ১৭৭২ সালের আগে পর্যন্ত দিল্লীতে ফিরে আসতে পারেননি। শাহজাদা আলী গওহর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে শাহ আলম-দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করেছিলেন।
বেঙ্গলের যুদ্ধ– ১৭৬০ সালে শাহ আলম-দ্বিতীয়ের সেনাবাহিনী বাংলা, বিহার উড়িষ্যার কিছু অংশের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৭৫৯ সালে আলী গওহর পাটনা ও অবধ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সময় মীর জাফর এবং ইমাদ-উল-মুলক তাঁকে বন্দি অথবা হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। সেজন্য তিনি ৩০,০০০ সেনার একটি বাহিনী নিয়ে মীর জাফর এবং ইমাদ-উল-মুলককে উৎখাত করার জন্য অগ্রসর হচ্ছিলেন।
শাহ আলম-দ্বিতীয়ের সন্মিলিত বাহিনীতে ছিলেন মহম্মদ কুলি খান, কাদিম হোসেন, কামগার খান, হিদায়েত আলী, মীর আফজাল এবং গোলাম হোসেন তাতাবাইয়ের মতো ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সেনাবাহিনী। তাঁদের বাহিনীর সাথে সুজা-উদ-দৌলা, নাজিব-উদ-দৌলা এবং আহমদ শাহ বঙ্গসের বাহিনীও যোগদান করেছিলো। এর উপরেও তাঁদের সাথে ফরাসি উপনিবেশিকতাবাদের পণ্ডিচেরির সেনাপতি জিন ল ডে লরৌস্টিন এবং ২০০ জন ফরাসি সেনাও যোগদান করেছিলেন। তাঁরা সাত বছরের যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।
শাহজাদা আলী গওহর সফলতার সাথে পার্টনার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং ৪০,০০০ সেনার মোগল বাহিনী নিয়ে মোগলদের শপতকৃত শত্রু রামনারায়িনকে বন্দি বা হত্যা করার জন্য পাটনা অবরোধ করেছিলেন। মীর জাফর তাঁর নিকটতম মিত্র রামনারায়িনের বিপদে শঙ্কিত হয়ে তাঁকে মুক্ত এবং পাটনা রক্ষা করার জন্য তাঁর পুত্র মীরনকে প্রেরণ করেছিলেন। মীর জাফর রবার্ট ক্লাইভের কাছেও সহায় প্রার্থনা করেছিলেন। ১৭৬১ সালে মেজর জন ক্যালাউডের বাহিনী পাটনা, সিরপুর, বীরপুর এবং সিওয়ানের মতো চারটি যুদ্ধে আলী গওহরের বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিলেন। সেজন্য আলী গওহর ব্রিটিশদের সাথে শান্তি আলোচনা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ব্রিটিশদের সাথে আলোচনার পর শাহ আলম-দ্বিতীয়কে শান্তির নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছিলো এবং তাঁকে মীর জাফরের পুত্র মীরনের আক্সমিক মৃত্যুর পর বাংলার মনোনীত নতুন নবাব মীর কাশিমের সাথে সাক্ষাত করার জন্য ব্রিটিশরা নিয়ে গিয়েছিলো। মীর কাশিম বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার সুবেদার হিসাবে মোগল সম্রাটের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন এবং মীর কাশিম মোগল দরবারে বার্ষিক ২.৪ মিলিয়ন ডামস রাজস্ব প্রদান করার জন্য সন্মত হয়েছিলেন। শাহ আলম- দ্বিতীয় এরপর এলাহাবাদে ফিরে গিয়েছিলেন ১৭৬১ সাল থেকে ১৭৬৪ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সাথে করা শান্তি চুক্তির শর্ত অনুসারে অবধের নবাব সুজা-উদ-দৌলার সুরক্ষায় ছিলেন।
এদিকে মীর কাশিমের সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু হয়েছিলো। কারণ মীর কাশিম নতুন সংস্কার সূচনা করেছিলেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী কর ছাড়ের যে সুবিধা উপভোগ করেছিলেন নতুন সংস্কারের ফলে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের শপতকৃত শত্রু রামনারায়িনকে ক্ষমত্যচ্যুত করেছিলেন এবং সদ্য সংস্কারকৃত মোগল সেনাবাহিনীকে সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে পাটনায় ফায়ারলক উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছিলেন।
এই ঘটনাগুলোর জন্য ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী মীর কাশিমকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর দ্বারা উৎসাহিত হয়ে আদালত মীর কাশিমকে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বাধ্য করেছিলেন। তখন মীর কাশিম তাঁর পক্ষ থেকে অবধের নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং শাহ আলম- দ্বিতীয়কে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
স্বীকৃত সম্রাট– শাহ আলম-দ্বিতীয় দুররানি সাম্রাজ্য কর্তৃক সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো, সুন্দরবনের ২৪ পরগণা, বাংলা, মুর্শিদাবাদ(বিহার)-এর নবাব মীর কাশিম, বেনারসের রাজা, হায়দ্রাবাদের নিজাম, গাজিপুরের নবাব, পাঞ্জাবের সাহিব, হায়দার আলীর মহীশূর, কাদাপার এবং কর্নলের নবাব, কর্ণাটকের আর্কট এবং নোলোরের নবাব, জুনাগড়ের নবাব, নিন্ম দোয়াবের রোহিলাখণ্ড, উচ্চ দোয়াবের রোহিলাখণ্ড এবং ভাওয়ালপুরের নবাব ।
বক্সারের যুদ্ধ– ১৭৬৪ সালের ২২ এবং ২৩ অক্টোবরের মধ্যে হেক্টর মনরোর নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সেনা এবং বাংলার নবাব মীর কাশিম, অবধের নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মোগল সম্রাট শাহ আলম- দ্বিতীয়ের সন্মিলিত সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছিলো। যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো পাটনা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) পশ্চিমে গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বিহার ভূ-খণ্ডের মধ্যে ‘সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষিত শহর’ বক্সারে।
ব্রিটিশ বাহিনীতে ছিলো ১৮৫৯ জন ব্রিটিশ, ৬০২৪ জন ভারতীয় সেনা এবং ৯১৮৯ জন ভারতীয় অশ্বারোহী সেনার সমন্বয়ে গঠিত ১৭,০৭২ জন সেনা। মোগল সন্মিলিত বাহিনীতে সেনা সংখ্যা ছিলো ৪০,০০০ জন। অন্যান্য সূত্র অনুসারে মোগল, অবধ এবং মীর কাশিমের সন্মিলিত বাহিনীর ৪০,০০০ সেনা ব্রিটিশ বাহিনীর ১০,০০০ সেনার বিরুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলো। তিনটি মিত্রদলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সন্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয় ।
মির্জা নাজাফ খান মোগল সম্রাট বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করছিলেন এবং সূর্যোদয়ের সময় মনরোর বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়েছিলেন। বিশ মিনিটের মধ্যে ব্রিটিশ বাহিনী সংগঠিত হয়ে মোগলদের অগ্রগতিকে বাধা প্রদান করেছিলো। ব্রিটিশদের মতে, দুররানি এবং রোহিলাখণ্ডের সেনারাও যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলো এবং বিভিন্ন সংঘর্ষের সময় যুদ্ধ করেছিলো।
মেজর হেক্টর মনরো তাঁর বাহিনীকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। অবধের নবাব সুজা-উদ-দৌলা নদী পার হওয়ার পর তাঁর নৌকা-ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিলেন। এভাবেই তিনি সম্রাট বাহিনী এবং তাঁর নিজের বাহিনীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। মনরো বিশেষ করে সুজা-উদ-দৌলার বাহিনীকে অনুসরণ করেছিলেন। মধ্যাহ্নের মধ্যেই যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিলো। যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনা দেখে সুজা-উদ-দৌলা তিনটি বড় বড় ট্রিমবিল এবং বারুদের তিনটি বিশাল ম্যাগাজিন উড়িয়ে দিয়েছিলেন। মীর কাশিম তাঁর ৩ মিলিয়ন টাকা মূল্যের রত্ন পাথর নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৭৭৭ সালে মীর কাশিম দারিদ্রতার কারণে মৃতুবরণ করেছিলেন। যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠার পর মির্জা নাজাফ খান তাঁর বাহিনী নিয়ে শাহ আলমের চার পাশে সমবেত হয়ে সেনা পুনর্গঠন করে ব্রিটিশদের সাথে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়ে পশ্চাদসরণ করেছিলেন।
ইতিহাসবিদ জন উইলিয়াম ফোর্টসকিউ দাবি করেছিলেন যে, ইউরোপীয় রেজিমেন্টের ৩৯ নিহত এবং ৬৪ জন আহত হয়েছিলো। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ভারতীয় সিপাহির ২৫০ জন নিহত, ৪৩৫ জন আহত এবং ৮৫ জন নিখোঁজ হয়েছিলো। মোগল মিত্রবাহিনীর ২০০০ জন নিহত এবং অনেক আহত হয়েছিলো। অন্য এক সূত্রের মতে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ৬৪ জন এবং ভারতীয় ইউরোপীয় সিপাহির ৬৬৪ জন সিপাহি নিহত হয়েছিলো। পক্ষান্তরে মিত্রবাহিনীর ৬০০০ জন সিপাহি নিহত হয়েছিলো। ব্রিটিশরা ১৩ টি আর্টিলারি এবং নগদ ১ মিলিয়নেরও বেশি টাকা হস্তগত করেছিলেন। বক্সারের যুদ্ধের পরপরই হেক্টর মনরো মারাঠাদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বক্সারের যুদ্ধে পরাজয়ের পর অভিজাত মোগলদের মিত্রদলের তিনজন প্রধানের বিপর্যয় হয়েছিলো। মীর কাশিম পালিয়ে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন, শাহ আলম-দ্বিতীয় ব্রিটিশদের নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলেন, অবধের নবাব সুজা- উদ-দৌলা পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং পুরো গঙ্গা উপত্যকা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর করুণা নির্ভর হয়ে পড়েছিলো। সুজা- উদ-দৌলা পরে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং ১৭৬৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা তাঁকে বাংলা, বিহার উড়িষ্যার প্রকৃত শাসক হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। রবার্ট ক্লাইভ বাংলার প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন।
দিওয়ানি অধিকার– বক্সারের যুদ্ধে প্রথমবারের জন্য একজন সার্বভৌম শাসক ব্রিটিশদের কাছে পরাজয় বরণ করেছিলেন। ১৭৬৫ সালে স্বাক্ষরিত এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে শাহ আলম-দ্বিতীয় ব্রিটিশদের কাছ থেকে সাম্রাজ্যের সুরক্ষা চেয়েছিলেন। শাহ আলম-দ্বিতীয় ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে দিওয়ানি(রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার) অধিকার প্রদান করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলার(যার মধ্যে বিহার ও উড়িষ্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিলো) রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে প্রদান করা হয়েছিলো। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী সংগ্রহীত রাজস্ব থেকে বার্ষিক ২.৬ মিলিয়ন টাকা মোগল সম্রাটকে প্রদান করতে হবে এরকম চুক্তি হয়েছিলো। কর অব্যাহতি মর্যদাও কোম্পানী পুনরুদ্ধার করেছিলেন। কোরা এবং এলাহাবাদ জেলাগুলির ২০ মিলিয়ন লোকের কাছ থেকেও ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার প্রদান করা হয়েছিলো। এইভাবে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী বাংলার রাজকীয় কর সংগ্রহের অধিকার প্রাপ্ত হয়েছিলো। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর পক্ষে রাজস্ব সংগ্রহের জন্য একজন ডেপুটি নবাব রেজা খানকে নিয়োগ করা হয়েছিলো।
দিল্লী থেকে অনুপস্থিত– ব্রিটিশদের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত হিসাবে শাহ আলম-দ্বিতীয় ১৭৭২ সাল পর্যন্ত দিল্লী থেকে অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর পুত্র সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী জওয়ান বখত এবং নাজিব-উদদৌলা পরবর্তী ১২ বছর সম্রাটের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
বাংলার দুর্ভিক্ষ– ১৭৭০ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য একটি বড় রকমের বিপর্যয় ছিলো। ১৭৬৯ সাল থেকে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছিলো এবং ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো। বাংলার ৩০ মিলিয়ন লোক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিলো। ১৭৬৮ সালের শরত এবং ১৭৬৯ সালের গ্রীষ্মে ফসল উৎপাদনে ব্যর্থতা এবং গুটিবসন্ত মহামারী দুর্ভিক্ষের কারণ ছিলো। ১৭৬৯ সালের শেষের দিকে চালের দাম দ্বিগুণ বেড়েছিলো এবং ১৭৭০ সালে তিনগুণ বেড়ে গিয়েছিলো। সাত থেকে দশ মিলিয়ন লোক অথবা প্রেসিডেন্সির জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ এবং এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। দুর্ভিক্ষের সময় এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো যে, মোগল সাম্রাজ্য আর প্রধান রাজশক্তি ছিলো না।
দিল্লী প্রত্যাবর্তন– শাহ আলম-দ্বিতীয় ছয় বছর এলাহাবাদ দূর্গে বসবাস করেছিলেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর প্রধান ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭৪ সালে বাংলার প্রথম গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর শাসনকালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী অধিক কর সংগ্রহের জন্য ‘দ্বৈত শাসন’ আইন প্রণয়ন করেছিলেন। সম্রাট নিযুক্ত নবাব এবং অন্যান্য বিষয় ওয়ারেন হেস্টিংস দেখাশুনা করতেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী মোগল সম্রাটকে প্রদান করা বার্ষিক ২.৬ মিলিয়ন কর প্রদান বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কোরা এবং এলাহাবাদের জেলাগুলি অবধের নবাবের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। এই পদক্ষেপগুলি কর সংগ্রাহক হিসাবে কোম্পানীর মোগল সম্রাটের অধীনতা প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত ছিলো। ১৭৯৩ সালে কোম্পানী যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলো এবং নিজামত (স্থানীয় শাসন) সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে বাংলাকে কোম্পানীর সাথে যুক্ত করেছিলেন। দুর্বল সম্রাট শাহ আলম কোম্পানীর পরামর্শে সন্মত হয়েছিলেন। কোম্পানী সম্রাটকে মারাঠাদের বিশ্বাস না করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন।
১৭৭১ সালে মহাদাজি সিন্দের নেতৃত্বে মারাঠারা উত্তর ভারতে ফিরে এসেছিলেন এবং এমনকী তাঁরা দিল্লীও দখল করেছিলেন। শাহ আলম-দ্বিতীয় মহাদাজি সিন্দের দ্বারা সুরক্ষিত হয়ে ১৭৭১ সালের মে মাসে এলাহাবাদ ত্যাগ করেছিলেন এবং ১৭৭২ সালের জানুয়ারিতে দিল্লী পৌঁছেছিলেন। মারাঠাদের সাথে মিলে রোহিলাখণ্ডের ‘ক্রাউন ল্যাণ্ড’ (মুকুট ভূমি- ব্রিটিশদের অধীনে থাকা ভূমি) জয় করার উদ্যোগ নিয়ে জবিতা খানকে পরাজিত করে পাথরগড় দূর্গ এবং তাঁর সমস্ত সম্পদ দখল করেছিলেন।
মহাদাজি সিন্দের সুরক্ষায় শাহ আলম-দ্বিতীয় দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ফলে সম্রাট মারাঠাদের অনুগ্রহীত সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন। তখন মারাঠা পেশোয়া সম্রাটের কাছ থেকে শ্রদ্ধা দাবি করেছিলেন এবং সম্রাট মারাঠা জোটবন্ধনের সাথে সংঘর্ষ এড়াতে সেই দাবি মেনে নিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
১৭৮৭ সালে যোধপুর থেকে বিজয় সিংয়ের দূত শাহ আলম-দ্বিতীয়কে শ্রদ্ধা জানাতে আজমীর দূর্গের সোনার চাবি নিয়ে মোগল দরবারে এসেছিলেন।
গোলাম কাদিরকে হত্যা এবং শাহ আলম-দ্বিতীয়কে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে ১৭৮৮ সালে মারাঠা গ্যারিসন স্থায়ীভাবে দিল্লী দখল করেছিলেন এবং দুই দশক ব্যাপী অর্থাৎ অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত উত্তর ভারত শাসন করেছিলেন।
মোগল সৈন্য পুনর বিন্যাস– সম্রাটের প্রধান কাজগুলির মধ্যে একটি ছিলো মির্জা নাজাফ খানের অধীনে একটি নতুন মোগল বাহিনী গড়ে তোলা। এই নতুন সেনাবাহিনীতে পদাতিক সেনারা ফ্লিন্টলক এবং তরবারি সফলভাবে ব্যবহার করতে পারতো। তাঁরা পরিবহনের জন্য হাতী ব্যবহার করতো এবং কামান ও অশ্বারোহী বাহিনীর উপর কম নির্ভরশীল ছিলো। মির্জা নাজাফ খান বাংলার নবাব মীর কাশিমের সহযোগিতায় কার্যকর ফায়ারলক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন বলে জানা যায় ।
বৈদেশিক নীতি– শাহ আলম-দ্বিতীয় পূর্ব সুবাহ(সাত বছরের যুদ্ধের সময়) পুনরুদ্ধারের জন্য প্রচারাভিযানের সময় জিন ল ডি লরিস্টন এবং ২০০ ফরাসি সেনা দ্বারা সমর্থিত ছিলেন। অভিযানের বুদ্ধিদাতা ছিলেন গোলাম হোসেন তাবাতাবাই। গোলাম হোসেন ফরাসি এবং ডাচ উভয়েরই কাছ থেকে অনেক প্রশাসনিক এবং সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।
বক্সারের যুদ্ধে শাহ আলম-দ্বিতীয় পরাজয়ের পর ফরাসিরা আবারও ১৭৮১ সালে পিয়েরে আন্দ্রে ডে সাফ্রেনের নেতৃত্বে সম্রাটের নিকট এসেছিলেন। আন্দ্রে ডে সাফ্রেন মির্জা নাজাফ খানের সহায়তায় মারাঠা জোটবন্ধন এবং ব্রিটিশদের কাছ থেকে বোম্বে এবং সুরাট বন্দর দখলের পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। এই পদক্ষেপের ফলে শেষপর্যন্ত আসাফ জাহ- দ্বিতীয় এবং শাহ আলম-দ্বিতীয় ফরাসিদের সাথে যোগদান করে হায়দার আলীকে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কাছ থেকে মাদ্রাজ দখল করতে সহায় করেছিলেন। মোগল রাজ দরবারের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সম্রাটকে এরকম আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নিরুৎসাহিত করেছিলো।
জাটদের বিজয়– আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে জাটরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ভরতপুরের জাট রাজারা দিল্লীর মোগলদের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন এবং ১৭ ও ১৮ শতকে আগ্রাসহ মোগল অঞ্চলে অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ১৭৫৭ সালে মারাঠাদের হাতে মোগলরা পরাজিত হয়েছিলো। মোগল সম্পত্তি এবং অঞ্চলগুলি জাট নেতা সুরজমলের নেতৃত্বে জাটদের অধীনে চলে গিয়েছিলো।
একটি ব্যাপক অভিযানের পর জাটরা ১৭৬১ সালে আগ্রা অবরোধ করেছিলো এবং ২০ দিনের অবরোধের পর ১৭৬১ সালে ১২ জুন তারিখে মোগল বাহিনী আগ্রায় জাটদের নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলো। জাটরা আগ্রা শহর লুটপাট করে বিখ্যাত তাজ মহলের প্রবেশদ্বারের দু’টি বড় রৌপ্য দরজা খোলে নিয়ে গিয়েছিলো এবং ১৭৬৪ সালে সুরজমাল সেগুলি গলিয়ে ফেলেছিলেন।
সূরজমালের পুত্র জওহর সিং জাট বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করেছিলেন এবং দোয়াব, বল্লবগড় এবং আগ্রা অঞ্চল দখল করেছিলেন। জাটরা ১৭৬১ সাল থেকে ১৭৭৪ সাল পর্যন্ত আগ্রার দূর্গ এবং আশেপাশের অঞ্চলগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলো।
শিখ বিজয়–শিখরা মোগলদের অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে চিরকাল যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, বিশেষ করে শিখগুরু তেগ বাহাদুরের শিরশ্ছেদের পর থেকে। ১৭৬৪ সালে সিমরাং শিখরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং সিরহিন্দের মোগল ফৌজদার জয়েন খান সিরহিন্দীকে পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন। তখন থেকেই শিখরা প্রায় প্রতি বছর আক্রমণ করে দিল্লী পর্যন্ত ভূমি থেকে বাউন্টি আদায় করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
শাহ আলম-দ্বিতীয় দিল্লী আসার আগে মারাঠারা ১৭৭১ সালে দিল্লী দখল করেছিলো। মির্জা নাজাফ খান সেনা বাহিনী সংস্কার করে মোগলদের সমৃদ্ধি এবং প্রশাসনে শৃংখলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। ১৭৭৭ সালে নাজাফ খান রোহিলাখণ্ডের জাবিতা খানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন এবং শিখদের বিতাড়ন করেছিলেন।
১৭৭৮ সালে শিখরা দিল্লী আক্রমণের পর সম্রাট শাহ আলম-দ্বিতীয় শিখদের বিরুদ্ধে মোগল উজির-এ-আজম মাজাদ-উদ-দৌলার নেতৃত্বে ২০,০০০ সেনা প্রেরণ করেছিলেন। তবে মাজাদ-উদ-দৌলার নেতৃত্বে মোগল বাহিনী মুজাফফরগড় এবং ঘানৌরের যুদ্ধে শিখবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিলো। তখন সম্রাট মির্জা নাজাফ খানকে পুনরায় শিখদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলেন।
১৭৭৯ সালে মির্জা নাজাফ খান সতর্কতার সাথে তাঁর বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়ে বিশ্বাসঘাতক জবিতা খান এবং তাঁর শিখ মিত্রজোটকে পরাস্ত করেছিলেন। শিখ মিত্রজোটের এই পরাজয়ের পর সেনাপতি মির্জা নাজাফ খানের জীবদ্দশায় মোগল সাম্রাজ্য আর কোনদিন শিখদের হুমকির মুখে পড়েনি।
মোগল সাম্রাজ্য এমনভাবে ভেঙে পড়েছিলো যে, শাহ আলম-দ্বিতীয়ের হাতে শাসন করার জন্য শুধুমাত্র দিল্লী অবশিষ্ট ছিলো। ১৭৮৩ সালে জাসা সিং রামগড়িয়া, জাসা সিং আহলুওয়ালিয়া এবং বাঘেল সিং দিল্লী শহর অবরোধ করেছিলেন। লালকেল্লায় পৌঁছানোর পর বাঘেল সিংয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে জাসা সিং আহলুওয়ালিয়া দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলো এবং তাঁকে বাদশা সিং উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। তখন বেগম সামরু বাঘেল সিংকে সম্রাট শাহ আলম-দ্বিতীয়ের প্রতি করুণা প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বাঘেল সিংয়ের দাবি মেনে নিয়ে সম্রাট শাহ আলম- দ্বিতীয় ৩০,০০০ শিখ সেনা দিল্লীতে থাকার অনুমতি এবং তাঁদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন। বাঘেল সিংয়ের অন্যান্য দাবির মধ্যে ছিলো, কমপক্ষেও ৫ টি গুরুদ্বার নির্মাণ এবং সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৩.৫ শতাংশ বার্ষিক কর প্রদান। সম্রাট লিখিত চুক্তির মাধ্যমে দাবিগুলি মেনে নিয়েছিলেন। শিখরা রাজনীতির কারণে মোগল দরবারের কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। সেজন্য মহাদাজি সিন্দেকে রাজপ্রতিনিধির দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো। শিখরা ‘ক্রাউন ভূমিতে লুণ্ঠন না করার জন্য তাঁদের দিল্লীর রাজস্বের বার্ষিক এক তৃতীয়াংশ কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছিলো।
পতন– মুজাফ্ফরগড় এবং পরে ঘানৌরে পরাজয়ের পর শাহ আলম-দ্বিতীয়ের নির্দেশে মাজা-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিলো এবং তাঁর নিকট থেকে চুরি করা রাজস্বের দুই মিলিয়ন ডামস উদ্ধার করা হয়েছিলো। মাজাদ-উদ-দৌলা তখন প্রাক্তন উজির-এ-আজম নাজাফ খানকে স্মরণ করেছিলেন। সম্রাট তখন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে শত্রুর সাথে সহযোগিতা করার অপরাধে নাজাফ খানকে গেপ্তার করেছিলেন। এটা সম্রাটের ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো এবং এই সিদ্ধান্তের ফলে মোগল সাম্রাজ্যকে পতনের দিকে নিয়ে গিয়েছিলো। মির্জা নাজাফ খান শক্তিশালী এবং সুপরিচালিত সেনাবাহিনীর মাধমে মোগল সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। ১৭৭৯ সালে নাজাফ খানের নেতৃত্বে সদ্য সংস্কারকৃত মোগল বাহিনী রোহিলাখণ্ডের নবাব জবিতা খানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলো। নাজাফ খানের মৃত্যুর পর দুর্ভাগ্যবশত তাঁর ভাতিজা মির্জা শফিকে সেনাপতি পদে নিযুক্ত করা হয়নি। অথচ তাঁর বীরত্ব বিভিন্ন অভিযানে প্রমাণিত হয়েছিলো। মির্জা শফির পরিবর্তে শাহ আলম-দ্বিতীয় সন্দেজনক আনুগত্য থাকা অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ করেছিলেন। তাঁরা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া শুরু করেছিলেন। দুর্নীতিবাজ এবং বিশ্বাসঘাতক মাজাদ-উদ-দৌলাকে তাঁর প্রাক্তন পদে নিয়োগ করেছিলেন। মাজাদ-উদ-দৌলা শিখদের সাথে যোগসাজশ করে মোগল সেনাবাহিনীর আকার ২০,০০০ থেকে কমিয়ে ৫০০০-এ নামিয়ে এনেছিলেন। এইভাবে পরে শাহ আলম- ম-দ্বিতীয়কে শত্রুর করুণায় বেঁচে থাকতে বাধ্য করা করেছিলো।
গোলাম কাদিরের শত্রুতা– নবাব মাজাদ-উদ-দৌলা মোগলদের পরিচিত শত্রু ছিলেন। নাজিব খানের নাতি গোলাম কাদির তাঁর শিখ মিত্রজোটের সাথে মিলে মাজাদ-উদ-দৌলাকে উজির-এ-আজম পদে নিযুক্ত করার জন্য সম্রাটকে বাধ্য করেছিলেন। গোলাম কাদির মোগল গুপ্তধনের সন্ধানে মোগল প্রাসাদকে ধ্বংস করে ফেলেছিলেন। গুপ্তধনের মূল্য ২৫০ মিলিয়ন টাকা ছিলো বলে বিশ্বাস করা হয়। ভাবা ধরণে গুপ্তধনের সন্ধান এবং শিখদের সাহায্যে সম্রাটকে ক্ষমতচ্যুত না করতে পেরে ক্ষোভিত হয়ে ১৭৮৮ সালের ১০ আগস্ট গোলাম কাদির স্বয়ং একটি আফগানী ছুরি দিয়ে সম্রাটকে অন্ধ করে আহমদ শাহ বাহাদুরের পুত্র বিদর বখতত বাহাদুরকে ১৭৮৮ সালের ৩১ জুলাই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি শাহ জাহান-চতুর্থ উপাধি ধারণ করেছিলেন।
তারপর গোলাম কাদির সম্রাট এবং তাঁর পরিবারের উপর বর্বর অত্যাচার শুরু করেছিলেন। অন্ধ করার ফলে সম্রাটের চোখ থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো। তখন সম্রাটকে সহায় করার জেন্য চেষ্টা করার অপরাধে তিনজন ভৃত্য এবং দুইজন জলবাহকের শিরশ্ছেদ করা হয়েছিলো। একটি বিবরণ অনুসারে গোলাম কাদির বয়স্ক সম্রাটের দাড়ি ধরে টেনেছিলেন। গোলাম কাদির রাজপরিবারের সদস্যদের তাঁর সামনে উলঙ্গ হয়ে নাচতে বাধ্য করেছিলেন। দশদিন পর তাঁরা যমুনা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তখন রাজপরিবারের সন্মান এবং প্রতিপত্তি একেবারে নিম্নস্তরে পৌঁছেছিলো। মারাঠা নেতা মহাদাজি সিন্দে তখন ১৭৮৮ সালের ২ অক্টোবর দিল্লী দখল করে শাহ আলম-দ্বিতীয়কে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন এবং সুরক্ষা দিয়েছিলেন। মহাদাজি সিন্দে গোলাম কাদিরকে বন্দি এবং হত্যা করে তাঁর চোখ এবং কান সম্রাটের কাছে প্রেরণ করেছিলেন।
কৃতজ্ঞতা স্বরূপ শাহ আলম-দ্বিতীয় মহাদাজি সিন্দেকে ভাকিল-উল-মুতলাক এবং আমির-উল-ওমারা (আমিরদের প্রধান)উপাধি প্রদান করেছিলেন। সম্রাট মারাঠা মিত্রজোটের মহাদাজি সিন্দে প্রদত্ত সুরক্ষার বিনিময়ে পুণেকে সন্মানী হিসাবে পেশোয়ার সাথে যুক্ত করেছিলেন।
শাহ আলমকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার পর ১৭৮৮ সালে মারাঠা বাহিনী স্থায়ীভাবে দিল্লী দখল করেছিলেন এবং ১৮০৩ সালের অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার আগে পর্যন্ত মারাঠারা উত্তর ভারত শাসন করেছিলেন।
ব্রিটিশ সেনা আগমন– ইউরোপে ফরাসি হুমকি এবং ভারতে এর সাম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়ে ব্রিটিশরা শাহ আলম- দ্বিতীয়কে নিজেদের পক্ষে আনার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। ব্রিটিশরা আশঙ্কা করেছিলেন যে, ফরাসি সামরিক বিষয়ারা রাঠাদের উৎখাত করে ভারতে তাঁদের স্থিতি শক্তিশালী করার জন্য সম্রাট শাহ আলম-দ্বিতীয়ের কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে পারে! শাহ আলম-দ্বিতীয় ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সম্প্রসারণবাদী শক্তি সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। সেজন্য হায়দার আলী এবং পরে তাঁর পুত্র টিপু সুলতানের সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর দ্বন্দ্বের সময় শাহ আলম-দ্বিতীয় হায়দার আলী এবং পরে তাঁর পুত্র টিপু সুলতানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিলেন।
দিল্লীর যুদ্ধের পর দ্বিতীয় অ্যাংলো-মরাঠা যুদ্ধের সময় ১৮০৩ সালের ১৪ সেপ্তেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা মোগলদের উপর মারাঠা শাসনের অবসান ঘটিয়ে দিল্লীতে প্রবেশ করেছিলো। তখন অন্ধ বৃদ্ধ শাহ আলম-দ্বিতীয় একটি ছেঁড়া ছাউনির নিচে বসে ছিলেন। ব্রিটিশ সৈন্যরা সেখান থেকে তাঁকে আটক করে দিল্লীতে নিয়ে এসেছিলেন। মোগল সম্রাটের তখন তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়ন করার মতো সামরিক শক্তি ছিলো না। তবে তিনি তৈমুর রাজবংশের একজন সম্মানিত সদস্য হিসাবে আনুষ্ঠানিক নির্দেশ প্রদান করতেন। নবাব এবং সুবেদাররা মোগল সম্রাটের অনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতেন এবং মোগল সম্রাট কর্তৃক প্রদত্ত উপাধিকে সম্মান করতেন। তাঁরা সম্রাটের নামে মুদ্রা ব্যবহার করতেন এবং শুক্রবারের নামাজের সময় তাঁর নামে খোতবা পাঠ করতেন। ১৮০৪ সালে মারাঠারা ব্রিটিশদের কাছ থেকে দিল্লী ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিলেন।
মৃত্যু– ১৮০৬ সালের ১৯ নভেম্বর শাহ আলম-দ্বিতীয় দিল্লী সুবাহের শাহজাহানাবাদে প্রাকৃতিক কারণে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ১৩ শতকের সুফি সাধক কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর মেহরুলিস্থিত দরগাহের পাশে মতি মসজিদ সংলগ্ন একটি স্থানে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। তাঁর সমাধির পাশে শাহ আলম-প্রথম এবং আকবর শাহ-দ্বিতীয়ের সমাধি রয়েছে।
শাহ আলম–দ্বিতীয়ের স্ত্রী– তাজ মহল, জামিল-উন-নিসা বেগম, মুবারক মহল, মুরাদ বখত বেগম, কুদসিয়া বেগম, আজিজান মালিকা-ই-আলম, শাহাবাদী মহল, নবাব মহল এবং নাজাকাত মহল ।
সন্তান– আকবর-দ্বিতীয়, মির্জা জাহান্দার শাহ জওয়ান বখত, মির্জা জাহান শাহ ফখরুন্দ আখতার, মির্জা সোলেইমান শিকোহ, মির্জা সিকান্দার শিকোহ, মির্জা ইজ্জত বক্স, মির্জা জামশেদ বখত, বেগম জান বেগম, আজিজ-উন-নিসা বেগম, রুফা-উল-নিসা বেগম, আলিয়াত-উন-নিসা বেগম, সাদাত-উন-নিসা-বেগম, আকবরবাদী বেগম এংব দিল-আফ্রোজ বানু বেগম।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে শাহ আলম–দ্বিতীয়– ১৯৯৪ সালে নির্মিত টিভি ধারাবাহিক ‘দ্য গ্রেট মারাঠা’য় শাহ আলম- দ্বিতীয়ের চরিত্রে ঋষভ শুক্লা অভিনয় করেছিলেন।
মাহমুদ শাহ বাহাদুর (শাহ জাহান–চতুর্থ)
বিদার বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুরের জন্ম ১৭৪৯ সালে মোগল সাম্রাজ্যের লালকেল্লায়। জন্মের পর তাঁর নাম বিদার বখত রাখা হয়েছিলো। পরে তিনি মাহমুদ শাহ বাহাদুর এবং বাঙ্কা নামেও পরিচিত ছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যে বিশিষ্ট যোদ্ধাদের তখন এরকম উপাধি প্রদান করা হতো। তাঁর পিতার নাম আহমদ শাহ বাহাদুর। ১৭৫৩ সালে তৎকালীন পাঞ্জাবের গভর্নর মীর মান্নুর মৃত্যুর পর তাঁকে পাঞ্জাবের গভর্নর হিসাবে নিযুক্তি প্রদান করা হয়েছিলো। ১৭৫৪ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তাঁকে সলিমগড় দূর্গে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। মাহমুদ শাহ বাহাদুর দুই কন্যা সন্তান নবাব নাজিবাদ আফ্রোজ বানু বেগম সাহিবা এবং নবাব মহম্মদী বেগম সাহিবার পিতৃ ছিলেন।
গোলাম কাদিরের উত্থান এবং মাহমুদ শাহ বাহাদুরের সিংহাসন আরোহণ- গোলাম কাদির ছিলেন রোহিলা সর্দার জাবিতা খানের পুত্র। গোলাম কাদিরের সম্পূর্ণ নাম ছিলো, গোলাম আবদেল কাদির আহমদ খান। ১৭৭০ সালের ৩১ অক্টোবর গোলাম কাদিরের পিতামহ নাজিব-উদ-দৌলার মৃত্যুর পর তাঁর পিতা জাবিতা খান আফগান রোহিলাদের একটি শাখার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। শাহ আলম-দ্বিতীয় জাবিতা খানকে মীর বক্সী (মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান) হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন। জাবিতা খানের নেতৃত্বে রোহিলারা বেস কয়েকটি বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিলো। সেজন্য শাহ আলম-দ্বিতীয় মারাঠা নেতা মহাদাজি সিন্দের নেতৃত্বে জাবিতা খানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। এই অভিযানের সময় জাবিতা খান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো এবং জাবিতা খানের পরিবারের সদস্য হিসাবে গোলাম কাদির ঘাউসগৌড়ে বন্দি হয়েছিলো। তখন তাঁর বয়স ছিলো মাত্র দশ বছর।
বন্দি করার পর গোলাম কাদিরকে দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়েছিলো। সেখানে তিনি পুরানা দিল্লীর কুদসিয়া বাগে বড় হয়েছিলেন। শাহ আলম-ি ম-দ্বিতীয় তাঁকে নিজের ছেলে বলে সম্বোধন করতেন এবং তাঁকে রওসন-উদ-দৌলা উপাধি প্রদান করেছিলেন। সম্রাট তাঁকে নিয়ে কবিতাও রচনা করেছিলেন। সেই কবিতাগুলির কিছু এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। এক সময় গোলাম কাদিরের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়তে শুরু হয়েছিলো। ফলে শাহ আলম-দ্বিতীয় তাঁকে তাঁর পিতা জাবিতা খানের কাছে ফেরত পাঠিয়েছিলেন এবং তিনি জাবিতা খানকে ক্ষমা করে দিয়ে মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (মীর বক্সী) হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন।
১৭৮৫ সালের ২১ জানুয়ারি গোলাম কাদির তাঁর পিতা জাবিতা খানের মৃত্যুর পর পিতার উত্তরসূরি হিসাবে রোহিলাদের . নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়েছিলেন। গোলাম কাদির তাঁর পিতামহ ও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মীরবক্সী পদে নিয়োগ হতে চেয়েছিলেন। গোলাম কাদির তাঁর দক্ষতা প্রতিপন্ন করার জন্য সম্রাটের সাথে সাক্ষাত করার অনুমতি চেয়েছিলেন এবং মোগল দরবারের হারেমের নাজির মঞ্জুর (মনসুর) আলী খান মারাঠাদের প্রতিরোধ করার জন্য তাঁকে সমর্থন করেছিলেন। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের মতে, ঘাউসগড়ের যুদ্ধের সময় মঞ্জুর আলী খান ব্যক্তিগতভাবে গোলাম কাদিরের জীবন রক্ষা করেছিলেন। তবে সম্রাট গোলাম কাদিরকে মীর বক্সী পদে নিয়োগ করা থেকে বিরত ছিলেন।
দিল্লী রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত লোক না থাকার সুযোগ নিয়ে ১৭৮৭ সালের ২৬ শে আগস্ট গোলাম কাদির দিল্লী শহরে প্রবেশ করেছিলেন এবং মঞ্জুর আলী খান তাঁকে সম্রাটের সন্মুখে উপস্থিত করেছিলেন। তখন সম্রাট তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ক্ষুব্ধ গোলাম কাদির ১৭৮৭ সালের ৫ সেপ্তেম্বর ২,০০০ সেনা নিয়ে আবার দিল্লীতে প্রবেশ করেছিলেন। এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও সম্রাট তাঁকে মীরবক্সী পদে নিয়োগ করে আমিরুল উলামা উপাধি প্রদান করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
শাহ আলম-দ্বিতীয়ের দরবারে অবস্থান সুসংহত করার জন্য গোলাম কাদির সারধনের শাসক ওয়াল্টার রেইনহার্ডের স্ত্রী বেগম সামরুর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন। কারণ সেই সময়ে বেগম সামরুর মোগল দরবারে যথেষ্ট প্রভাব ছিলো। কারণ বেগম সামরু তখন দিল্লী শহরে অবস্থানরত ফরাসি নেতৃত্বাধীন চারটি ব্যাটালিয়ানকে কমাণ্ড করছিলেন।
তবে, বেগম সামরু গোলাম কাদিরকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে গোলাম কাদিরের ফরাসি ব্যাটালিয়ানকে শহর থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছিলেন এবং অন্যথায় শত্রুতা করার হুমকি প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বেগম সামরু গোলাম কাদিরের হুমকিকে উপেক্ষা করে ফরাসি ব্যাটালিয়ানকে শহর থেকে অপসারণের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত ছিলেন। ফলে গোলাম কাদির ক্ষুব্ধ হয়ে সলিমগড় দূর্গে কামান স্থাপন করেছিলেন এবং ১৭৮৭ সালের ৭ ই অক্টোবর তিনি রাজকীয় প্রাসাদে কামানের গোলা বর্ষণ করেছিলেন। এই ক্ষেত্রে নাজির তাঁকে বাধা প্রদান করেছিলেন এবং নিরুৎসাহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
দিল্লী দখল করতে ব্যর্থ হয়ে গোলাম কাদির এবং তাঁর রোহিলা সেনারা দোয়াব অঞ্চলের ‘ক্রাউন ভূমি’ জয় করার উদ্দেশ্যে দিল্লী ত্যাগ করেছিলেন। গোলাম কাদিরের এই পদক্ষেপের ফলে লর্ড কর্ণওয়ালিশ ১৭৮৭ সালের ১৪ নভেম্বর তাঁকে পত্র লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত গোলাম কাদির ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী এবং তাঁদের মিত্র অবধের নবাবের সাথে শান্তি বজায় রাখবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না। গোলাম কাদির এই দাবি মেনে নিয়েছিলেন।
দিল্লী দখল– ১৭৮৮ সালে গোলাম কাদির ইসমাইল বেগের সেনার সাথে যোগদান করে দিল্লী অভিমুখে অভিযান শুরু করেছিলেন। ছোট মোগল বাহিনীকে তাঁদের সাথে যোগদান করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা রাষ্ট্রদ্রোহীদের সাথে যোগদান করতে অস্বীকার করেছিলেন। ১৭৮৮ সালের ১৮ জুলাই গোলাম কাদির এবং ইসমাইল বেগ দিল্লী শহর এবং লালকেল্লা সম্পূর্ণভাবে দখল করেছিলেন।
১৭৮৮ সালের ১৮ জুলাই থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লীতে গোলাম কাদিরের দখল চলছিলো। এই সময়ে তিনি ১৭৮৮ সালের ৩০ জুলাই শাহ আলম-দ্বিতীয়কে ক্ষমতাচ্যুত করে মোগল শাহজাদা বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুরকে নাসির-উদ-দীন মহম্মদ জাহান শাহ উপাধি প্রদান করে ১৭৮৮ সালের ৩১ জুলাই সম্রাট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিদর বখতকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার বিনিময়ে মহম্মদ শাহের স্ত্রী বাদশা বেগম গোলাম কাদিরকে ১২ লক্ষ টাকা প্রদান করেছিলেন। বাদশাহ বেগম ১৭২১ সাল থেকে ১৭৪৮ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মালিকা-উজ-জামানী ছিলেন। বিদর বখত বাদশা বেগমের নাতি ছিলেন।
গোলাম কাদিরের এই দখলদারিত্ব সাম্রাজ্যকে একটি সন্ত্রাসের রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলো। গোলাম কাদির শাহ আলম- দ্বিতীয়কে ১৭৮৮ সালের ১০ আগস্ট অন্ধ করে দিয়েছিলেন। কথিত রয়েছে যে, শাহ আলম-দ্বিতীয়কে অন্ধ করার পর গোলাম কাদির বলেছিলেন যে, এটি ঘাউসগড়ের যুদ্ধের ফল। ২১ জন শাহজাদা এবং শাহজাদীদের হত্যা করা হয়েছিলো। রাজকীয় পরিবারের মহিলাদের নির্যাতন করা হয়েছিলো। এমনকী বাদা বেগমের প্রাসাদেও অভিযান চালানো হয়েছিলো এবং তাঁকে একটি নদীর তীরে রাখা হয়েছিলো। নাজিরের বাড়ীতেও লুটপাট চালিয়ে সমস্ত জিনিস ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিলো। গোলাম কাদিরের দিল্লী লুণ্ঠনের ফলে ২৫ কোটি টাকার সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছিলো বলে জানা যায়। যদুনাথ সরকারের মতে, ‘এই দানবের নৃত্যের ফলে সাম্রাজ্যের প্রতিপত্তি বিনষ্ট হয়েছিলো।
দিল্লী অভিযানে অংশগ্রহণ করার জন্য ইসমাইল বেগকে পুরস্কৃত করা হয়নি। যার জন্য মারাঠারা দিল্লী আক্রমণ করার সময় ইসমাইল বেগ গোলাম কাদিরের সঙ্গ ত্যাগ করে মারাঠাদের সাথে যোগদান করেছিলেন।
১৭৮৭ সালের সেপ্তেম্বরে মারাঠারা গোলাম কাদিরের দখল থেকে মুক্ত করার জন্য দিল্লী আক্রমণ করেছিলেন। মারাঠা নেতা মহাদাজি সিন্দের নেতৃত্বে ১৭৮৭ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর পুরানা দিল্লী দখল করেছিলেন। এরপর মারাঠাদের সন্মিলিত বাহিনী, বেগম সামরু এবং ইসমাইল বেগ গোলাম কাদিরের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করেছিলেন। গোলাম কাদিরের নেতৃত্বে রোহিলারা এই সন্মিলিত বাহিনীকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বাধা দিয়ে রাখতে পারেননি। গোলাম কাদির ১৮৮৭ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর বাহিনী নিয়ে দিল্লী দূর্গ ত্যাগ করেছিলেন।
১৮৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর মারাঠারা অন্ধ শাহ আলম- ম-দ্বিতীয়কে সিংহাসনে পুনর্বাহাল করেছিলেন এবং ১৭ অক্টোবর তাঁর নামে খোতবা পাঠ করা হয়েছিলো। ১৭৮৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয়বারের জন্য শাহ আলম- দ্বিতীয়ের রাজ্যাভিষেক করা হয়েছিলো।
দিল্লী দখল করার পর মারাঠারা গোলাম কাদিরের সন্ধানে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। গোলাম কাদির মিরাট দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। মারাঠারা দূর্গ অবরোধ করার পর গোলাম কাদির ৫০০ অশ্বরোহী সেনা নিয়ে রাতে ঘাউসগড় অভিমুখে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। মারাঠাদের টহলদার বাহিনী দ্বারা তাঁদের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করার পর গোলাম কাদির দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং হোঁচট খেয়ে তাঁর ঘোড়ার পা ভেঙ্গে গিয়েছিলো। তখন তিনি একাই হেঁটে উত্তর প্রদেশের বামৌলিতে একজন ব্রাহ্মণের বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং পুরস্কারের বিনিময়ে ব্রাহ্মণের নিকট একটি ঘোড়ার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তাঁকে মারাঠাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ১৭৮৮ সালের ১৮/১৯ ডিসেম্বরে মারাঠারা তাঁকে বন্দি করেছিলেন। যদুনাথ সরকার এবং হারবার কম্পটনের মতে, দিল্লী থেকে লুট করা মূল্যবান জিনিসপত্র লেস্টিনিউয়ের হাতে পড়েছিলো এবং তিনি সেগুলি যুক্তরাজ্যে নিয়ে গিয়েছিলেন।
কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই গোলাম কাদির কিছুদিনের জন্য মারাঠাদের হেফাজতে ছিলো। ১৭৮৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শাহ আলম-দ্বিতীয় গোলাম কাদিরের চোখ চেয়ে মহাদাজি সিন্দের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। অন্যথায় শাহ আলম দ্বিতীয় অবসর গ্রহণ করে মক্কা গিয়ে ভিক্ষুকের জীবন অতিবাহিত করার কথা লিখেছিলেন। পত্র পেয়ে মহাদাজি সিন্দে গোলাম কাদিরের কান কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং পরের দিন নাক, জিব্বা এবং উপরের ঠোঁট কেটে একটি কাস্কেটে(গয়না রাখা বাস্ক) ভরে সম্রাটের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। এরপর তাঁর অঙ্গচ্ছেদ চলছিলো। হাত, পা, যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছিলো। ১৭৮৯ সালের ৩ মার্চ শিরশ্ছেদ করে মথুরায় একটি গাছে তাঁর মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো। শিরশ্ছেদ করার আগে তাঁর কান কেটে ও চোখ উপড়ে সম্রাটের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।
দিল্লী থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুর এবং রাজকীয় পরিবারের অন্যান্য শাহজাদাদের সঙ্গে নিয়ে গোলাম কাদির মিরাট গিয়েছিলেন। মারাঠারা মিরাট দূর্গ অবরোধ করার সময় গোলাম কাদির বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুর, অসহায় রাজপুত্র এবং অন্যান্য বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু গোলাম কাদিরের দেহরক্ষী মনিয়ার সিং তাঁকে এ কাজ করতে বারণ করেছিলেন। অতঃপর বন্দিদের রেখেই গোলাম কাদির পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৮ ডিসেম্বর বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুর সিন্দের বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন এবং তাঁকে সলিমগড় দূর্গে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। ১৭৮৮ সালের গোলযোগে তাঁর ভূমিকার জন্য শাহ আলম-দ্বিতীয় তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। ১৭৯০ সালে শাহজাহানাবাদে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো।
মৃত্যুর পর বিদর বখত মাহমুদ শাহ বাহাদুরকে পুরানা দিল্লীতে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
আকবর–দ্বিতীয়
মির্জা আকবর-দ্বিতীয়ের জন্ম ১৭৬০ সালের ২২ এপ্রিল মারাঠা সাম্রাজ্যের সাতনার মুকুন্দপুরে। তিনি আকবর শাহ- দ্বিতীয় নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঊনবিংশতম মোগল সম্রাট ছিলেন। তাঁর পিতার নাম শাহ আলম-দ্বিতীয় এবং মাতৃর নাম কুদসিয়া বেগম। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মির্জা জাহান্দার শাহের মৃত্যুর পর ১৭৮১ সালের ২ মে লালকেল্লায় তাঁকে ওয়ালি আহাদ বাহাদুর উপাধি প্রদান করে ‘ক্রাউন প্রিন্স’-এর মর্যদা প্রদান করা হয়েছিলো। ১৭৮২ সালে তাঁকে দিল্লীর ভাইসরয় হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিলো এবং ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি উক্ত পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৭৮৮ সালে রোহিলা সর্দার গোলাম কাদির দিল্লী দখল করার পর তিনি অন্যান্য মোগল শাহজাদা এবং শাহজাদীদের সাথে নাচতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, কীভাবে মোগল শাহজাদা এবং শাহজাদীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছিলো। সেই সাথে তাঁরা ক্ষুধার্তও ছিলেন।
শাহ জাহান-চতুর্থ গোলাম কাদিরের সাথে পালিয়ে যাওয়ার পর মির্জা আকবর, আকবর-দ্বিতীয় উপাধি ধারণ করে ‘টিটুলার(নামমাত্র)সম্রাট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ১৭৮৯ সালে তাঁর পিতা শাহ আলম-দ্বিতীয় সিংহাসনে পুনঃঅধিষ্ঠিত হওয়ার পরেও তাঁকে ভারপ্রাপ্ত সম্রাট হিসাবে রাজকার্য পরিচালনা করতে হয়েছিলো। তাঁর পিতা শাহ আলম-দ্বিতীয়ের মৃত্যুর পর তিনি ১৮০৬ সালের ১৯ নভেম্বর দিল্লীর লালকেল্লায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং ১৮৩৭ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর মাধ্যমে ভারতে ক্রমবর্দ্ধমান ব্রিটিশ প্রভাবের কারণে আকবর-দ্বিতীয়ের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিলো। তাঁর রাজত্বকালে, ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী মোগল সম্রাটের প্রজা হিসাবে পরিচয় প্রদান করতে অস্বীকার করেছিলেন এবং সম্রাটের নামে মূদ্রা জারি করা বন্ধ করে দিয়েছিলো। কোম্পানীর মূদ্রা থেকে ফার্সি লাইনগুলি মুছে ফেলা হয়েছিলো।
আকবর-দ্বিতীয়কে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য উৎসব ‘ফুল ওয়ালো কী সাইর’ শুরু করার কৃতিত্ব প্রদান করা হয়। ফুল ওয়ালো কী সাইর-এর অর্থ ‘ফুল বিক্রেতাদের মিছিল’। এটি ফুল বিক্রেতাদের বার্ষিক উৎসব ছিলো। উৎসবটি বর্ষাকালের ঠিক পরে মেহরাউলি অঞ্চলে সেপ্তেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হতো এবং তিনদিন স্থায়ী হতো। উৎসবটিকে দিল্লীর মিশ্রিত সংস্কৃতির উদাহরণ হিসাবে দেখা হয়। উৎসবটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশকে শক্তিশালী করতো। উৎসবটি আজও হিন্দু-মুসলমান উভয়েই একই ভাবে উদযাপন করেন।
ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব হিসাবে শেহনাই বাদক এবং নর্তকদের নেতৃত্বে ফুলের পাখা নিয়ে মিছিল করে যোগমায়া মন্দির হয়ে মেহরাউলি বাজারের মধ্য দিয়ে ১৩ শতকের সুফি সাধক খাজা বখতিয়ার কাকীর দরগাহ পর্যন্ত যেতেন।
তিনদিনের এই উৎসব ‘সাইর-ই-গুল ফরোশন’ নামেও পরিচিত ছিলো। ফুল বিক্রেতারা মন্দির এবং দরগাহে সূচিকর্ম করা বড় পাখা অর্পণ করে আগামী বছরের ভালো ফুলের মৌসুমের জন্য প্রার্থনা করতেন।
শাসন– সম্রাট আকবর-দ্বিতীয় একটি বিশাল সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন, যদিও তাঁর শাসন ক্ষমতা কার্যত শুধুমাত্র দিল্লীর লালকেল্লা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলেন। তাঁর রাজত্বাকালে দিল্লীর সাংস্কৃতিক জীবন সামগ্রিকভাবে বিকাশ লাভ করেছিলো। যাইহোক, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কর্মকর্তাদের প্রতি বিশেষ করে লর্ড হেস্টিংসের প্রতি সম্রাটরে মনোভাব একজন প্রজা ছাড়া অন্য কিছু ছিলো না। হেস্টিংসকে তিনি একজন প্রজা ছাড়া অন্য শর্তে প্রজাদের সন্মুখে উপস্থিত হতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশদের ক্রমবর্ধমান উত্থান দেখে হতাশ হয়েছিলেন। পক্ষান্তরে ব্রিটিশরা তাঁকে কেবল তাঁদের পেন্সনভোগী হিসাবে বিবেচনা করতেন। ব্রিটিশরা ১৮৩৫ সালে তাঁকে ‘দিল্লীর রাজা’ পর্যন্ত তাঁর উপাধি সীমাবদ্ধ করে দিয়েছিলেন এবং ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ১৮০৩ সাল থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্যের নিছক লেফটেনেন্ট হিসাবে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁরা মুদ্রায় ফার্সি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা প্রতিস্থাপিত করতে শুরু করেছিলেন, যেখানে সম্রাটের নাম প্রতিস্থাপিত করা হত না ।
ব্রিটিশরা সম্রাটের মর্যদা এবং প্রভাব হ্রাস করার জন্য অবধের নবাব এবং হায়দ্রাবাদের নিজামকে রাজকীয় উপাধি ধারণ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। অবধের নবাব যদিও রাজা উপাধি ধারণ করেছিলেন, হায়দ্রাবাদের নিজাম অবশ্যে তা করেন নি।
আকবর-দ্বিতীয় টঙ্কের নবাব এবং জাওড়ার নবাবকে নবাব উপাধি প্রদান করেছিলেন বলেও জানা যায়।
আকবর-দ্বিতীয় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী তাঁর বিরুদ্ধে করা অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আপীল করার জন্য বাঙালি সংস্কারক রাম মোহন রায়কে রাজা উপাধিতে ভূষিত করে ইংল্যাণ্ড প্রেরণ করেছিলেন। রাজা রাম মোহন রায় জেমসের কোর্টে মোগল রাজদূত হিসাবে সফর করেছিলেন এবং মোগল শাসকের পক্ষে একটি স্মারক জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় নি ।
মৃত্যু– ১৮৩৭ সালের ২৮ সেপ্তেম্বর দিল্লীতে ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার পর আকবর-দ্বিতীয়কে ১৩ শতকের সুফি সাধক কুতুবুদ্দিন কাকীর মেহরুলিস্থিত দরগাহের পাশে মতি মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। তাঁর সমাধি মতি মসজিদ সংলগ্ন একটি মার্বেল ঘেরের মধ্যে অবস্থিত। মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ প্রথম এবং শাহ আলম-দ্বিতীয়ের সমাধিও সেখানে অবস্থিত।
বংশধর– সিপাহি বিদ্রোহের পর দ্বিতীয় আকবরের পুত্র তথা বাহদুর শাহ জাফরের পুত্র শাহজাদা মির্জা মোগল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। বেঁচে থাকা অনেক শাহজাদা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বসতি স্থাপন করেছিলেন। কেউ কেউ বাংলা এবং বার্মায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। কারণ বাহাদুর শাহ জাফরের সাথে বিপুল সংখ্যক মোগল রাজকীয় পরিবার বার্মায় নির্বাসিত হয়েছিলেন। •

বাহাদুর শাহ জাফর
মির্জা জাফর সিরাজ-উদ-দীন মহম্মদ-এর জন্ম ১৭৭৫ সালের ২৪ শে অক্টোবর মোগল সাম্রাজ্যের শাহজাহানাবাদে। তিনি বাহাদুর শাহ জাফর-দ্বিতীয় নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের বিংশতম এবং শেষ মোগল সম্রাট ছিলেন। তিনি একজন প্রখ্যাত উর্দূ কবি ছিলেন। তাঁর পিতার নাম আকবর শাহ-দ্বিতীয় এবং মাতৃর নাম লাল বাই। তাঁর পিতা আকবর-দ্বিতীয় ১৮৩৭ সালের ২৮ শে সেপ্তেম্বর মৃত্যুবরণ করার পর ১৮৩৭ সালের ২৮ শে সেপ্তেম্বর তিনি লালকেল্লায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর পিতা আকবর-দ্বিতীয় একজন নামধারী সম্রাট ছিলেন। কারণ মোগল সাম্রাজ্য তখন শুধুমাত্র নামেই বিদ্যমান ছিলো এবং তাঁর কর্তৃত্ব শুধুমাত্র প্রাচীর ঘেরা দিল্লী শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো।
১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহে জড়িত থাকার অপরাধে ব্রিটিশরা বাহাদুর শাহ জাফরকে বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ১৮৫৮ সালে বার্মার রেঙ্গুনে নির্বাসিত করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ জাফর উত্তরাধিকারী হিসাবে তাঁর পিতা আকবর-দ্বিতীয়ের পসন্দের ছিলেন না। আকবর-দ্বিতীয়ের স্ত্রী মমতাজ মহল শাহজাদা জাহাঙ্গীরকে উত্তরাধিকার হিসাবে ঘোষণা করার জন্য পীড়াপীড়ি করার ফলে সম্রাট মির্জা জাহাঙ্গীরকে পরবর্তী উত্তরাধিকার হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু লালকেল্লার তৎকালীন রেসিডেন্টে(ব্রিটিশ আবাসিক মন্ত্রী, সরকারী কর্মকর্তা)র সম্রাটের এই সিদ্ধান্ত পসন্দের ছিলো না। একদিন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট আকবর-এর সাথে সাক্ষাত করতে এলে উত্তরাধিকার প্রসঙ্গ উত্থাপন হওয়াতে রেসিডেন্ট ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর হয়ে উত্তরাধিকার সম্পর্কে তাঁদের অবস্থানের কথা প্রকাশ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জাহাঙ্গীর রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েন, কিন্তু গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। রেসিডেন্ট বেরিয়ে গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে জাহাঙ্গীরকে ক্ষমা চাইতে বলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ‘লু লু হায়বে’ বলে কটূক্তি করেন। রেসিডেন্ট আবাসিকে গিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যদের পুরো শাক্তিরক্ষক দল নিয়ে ফিরে আসেন এবং জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করে এলাহাবাদে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। ফলে বাহাদুর শাহ জাফরের সিংহাসনে আরোহণের পথ প্রশস্ত হয়েছিলো।
শাসন– বাহাদুর শাহ জাফর এমন একটি মোগল সাম্রাজ্যে রাজত্ব করেছিলেন ১৯ শতকের গোড়ার দিকে যেখানে শুধুমাত্র দিল্লী শহর এবং পালামের আশেপাশের অঞ্চল পর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্য সীমাবদ্ধ ছিলো। ১৮ শতকে মারাঠারা দাক্ষিণাত্যে মোগল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়েছিলো এবং পূর্ব দিকের মোগল সাম্রাজ্য হয় মারাঠাদের দ্বারা শোষিত হয়েছিলো, নয়তো প্রত্যন্ত অঞ্চলের শাসকেরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে ছোট ছোট রাজ্যে পরিণত করেছিলো। মারাঠারা ১৭৭২ সালে মারাঠা সেনাপতি মহাদাজি সিন্দের সুরক্ষায় শাহ আলম-দ্বিতীয়কে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন এবং দিল্লীতে মারাঠাদের আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী প্রভাবশালী রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিলো। কোম্পানীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের বাইরে শত শত রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে মোগল সাম্রাজ্যের ভূমি খণ্ডিত করেছিলো। সম্রাট কোম্পানীর দ্বারা সন্মানিত ছিলেন এবং কোম্পানী তাঁকে পেন্সন প্রদান করতেন। সম্রাট কোম্পানীকে দিল্লী থেকে কর আদায় এবং সেখানে একটি সামরিক বাহিনী রাখার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। বাহাদুর শাহ জাফরের রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি কোনো আগ্রহ বা সাম্রাজ্যিক উচ্চাকাংক্ষা ছিলেন না। ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা তাঁকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ জাফর একজন প্রখ্যাত কবি ছিলেন এবং তিনি কিছু গজলও রচনা করেছিলেন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় তাঁর কিছু রচনা হারিয়ে বা ধ্বংস হয়ে গেলেও একটি বড় অংশ তাঁর সংগ্রহে ছিলেন এবং সেগুলি ‘কুল্লিয়াত-ই- জাফর’-এ সংকলিত করা হয়েছিলো। তিনি যে দরবার পরিচালনা করেছিলেন সেখানে মির্জা গালিব, দাঘ দেহলবি, মোমিন খান মোমিন এবং মহম্মদ ইব্রাহীম জাউকসহ বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত উর্দূ পণ্ডিত, কবি এবং লেখকের বাড়ি ছিলেন।
পরাজয়ের পর বাহাদুর শাহ জাফর বলেছিলেন-
গাজীয়নে বু রাহে গি যখন তালক ঈমান কী
(যতদিন আমাদের গাজীদের অন্তরে ঈমানের ঘ্রাণ থাকবে)
তখত–ই–লন্ডন তাক চলেগি তেঘ হিন্দুস্থান কী।
(ততদিন লন্ডনের সিংহাসনের সামনে হিন্দুস্থানের তলোয়ার জ্বলবে)
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ– ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সিপাহী রেজিমেন্টগুলি দিল্লী দরবারে পৌঁছেছিলেন। ধর্মের প্রতি বাহাদুর শাহ জাফরের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য অনেক ভারতীয় রাজা এবং রেজিমেন্ট তাঁকে ভারতের সম্রাট হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন এবং সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন।
১৮৫৭ সালের ১২ ই মে কয়েক বছরের মধ্যে বাহাদুর শাহ জাফর প্রথমবারের জন্য অনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন। উপস্থিত বেশ কয়েকজন সিপাহী তাঁর সাথে অসন্মানজনক আচরণ করেছিলেন বলে বর্ণনা করা হয়েছিলো। সিপাহীরা যখন প্রথম বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারে পৌঁছেছিলেন, তখন তিনি সিপাহীদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন তাঁরা তার কাছে এসেছেন। কারণ সিপাহীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো উপায় তাঁর নিকট ছিলো না। তখন বাহাদুর শাহ জাফরের আচরণ ছিলেন সিদ্ধান্তহীন। যাইহোক, তিনি সিপাহীদের নিকট নতি স্বীকার করেছিলেন, যখন তাঁকে বলা হয়েছিলো যে, তাঁকে ছাড়া ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে জয় লাভ করা সম্ভব হবে না।
১৬ ই মে সিপাহী এবং রাজকর্মচারীরা বন্দি এবং শহরে লুকিয়ে থাকা ৫২ জন ইউরোপীয়কে হত্যা করেছিলেন। বাহাদুর শাহ জাফরের প্রতিবাদ সত্ত্বেও রাজপ্রাসাদের সামনে একটি পিপুল গাছের নিচে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিলো। জাফরের সমর্থক নন, এমন কিছু সিপাহীর উদ্দেশ্য ছিলো তাঁকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত করা। একবার তিনি তাঁদের সাথে যোগদান করলে, বিদ্রোহীদের সমস্ত কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করতে তিনি বাধ্য হবেন, এটাই ছিলো সিপাহীদের ধারণা। লুটপাট এবং বিশৃংখলা দেখে হতাশ হলেও তিনি সিপাহীদের সমর্থন করেছিলেন। পরে এটা বিশ্বাস করা হয়েছিলো যে, তিনি হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন না, কিন্তু হয়তো তিনি ইচ্ছা করলে হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করতে সক্ষম হতেন। সেজন্য বিচারের সময় তাঁকে হত্যাকারীদের সমর্থনকারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিলো।
শহরের প্রশাসন এবং নতুন দখলকারী সেনাবাহিনীকে তখন ‘বিশৃংখল এবং ঝামেলাপূর্ণ’ দল হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিলো। বাহাদুর শাহ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মির্জা মোঘলকে তাঁর বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে মনোনীত করেছিলেন, তবে তাঁর সামরিক অভিজ্ঞতা কম ছিলো বলে সিপাহীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো। সিপাহীদের কোনো সর্বসম্মত সেনাপতি ছিলো না, সেজন্য প্রতিটি রেজিমেন্ট নিজের নিজের অফিসার ছাড়া অন্য কারো আদেশ পালন করতে অস্বীকার করেছিলো। মির্জা মোঘলের আদেশ শহর ছাড়া অন্য কোথাও বিস্তৃত ছিলো না। যার জন্য শহরে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিলো।
দিল্লী অবরোধের সময় ব্রিটিশদের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর বাহাদুর শাহ জাফর শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। মেজর উইলিয়াম হডসনের নেতৃত্বে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সেনারা সমাধিটি ঘেরাও করেছিলো এবং ১৮৫৭ সালের ২০ সেপ্তেম্বর সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো।
পরের দিন বাহাদুর শাহ জাফরের পুত্র মির্জা মোঘল, মির্জা খিজির সুলতান এবং সম্রাটের নাতি আবু বখতকে হডসন নিজের কর্তৃত্বে খুনী দরজায় গুলি করে হত্যা করে দিল্লী গেট এবং দিল্লী দখল করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। বাহাদুর শাহকে তাঁর স্ত্রীর প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেখানে সেনারা তাঁর সাথে অসম্মানজক আচরণ করেছিলেন। যখন তাঁর পুত্র এবং নাতির মৃত্যু সংবাদ আনা হয়েছিলো, তখন সম্রাট এতটাই মর্মাহত এবং হতাশ হয়েছিলেন যে, তিনি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে অসমর্থ হয়েছিলেন।
বিচার প্রক্রিয়া– বিচারটি ভারতীয় বিদ্রোহের পরিণতি ছিলো। বিচার প্রক্রিয়া ২১ দিন চলছিলো। ১৯ টি শুনানি, ২১ জন সাক্ষী এবং ফার্সি এবং উর্দূতে একশোর বেশি নথি, সেগুলির ইংরেজি অনুবাদসহ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিলো ।
প্রথমে বিচার প্রক্রিয়া কলকাতায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিলো, যেখানে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর পরিচালকরা বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য বৈঠক অনুষ্ঠিত করতেন, কিন্তু পরে লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত করা হয়েছিলো। এটি ছিলো লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত করা প্রথম মামলা ।
বাহাদুর শাহ জাফরের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগের বিচার করা হয়েছিলো। সৈন্যদের বিদ্রোহে সহায় করা। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তিদের উৎসাহিত এবং সহায়তা করা। হিন্দুস্থানের সার্বভৌমত্ব গ্রহণ কেড়ে নেওয়া। খ্রীস্টানদের হত্যার কারণ এবং অনুসাঙ্গিক।
১৮৫৮ সালের এপ্রিল মাসে বাহাদুর শাহ জাফরের ‘দিল্লীর রাজা’র বিচারের কার্যক্রমের ২০ তম দিনে বাহাদুর শাহ জাফর এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রথম আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন। বাহাদুর শাহ জাফর তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনে সিপাহীদের ইচ্ছার সামনে তিনি সম্পূর্ণ অসহায় ছিলেন বলে ব্যক্ত করেছিলেন। সিপাহীরা খালি খামে তাঁর সীল লাগিয়ে নিত, যার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। সম্রাট সিপাহীদের সামনে তাঁর অক্ষমতার কথা প্রকাশ করেছিলেন। আশি বছর বয়সের কবি-সম্রাট বিদ্রোহীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছিলেন এবং তিনি প্রকৃত নেতৃত্ব প্রদানের প্রতি আগ্রহী বা সক্ষম ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তিনি বিদ্রোহের বিচারে প্রাথমিক অভিযুক্ত ছিলেন।
বাহাদুর শাহ জাফরের সবচেয়ে আস্থাভাজন এবং বিশ্বাসী হাকিম আসানউল্লাহ এবং তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক উভয়েই জোর দিয়েছিলেন যে, সম্রাট নিজেকে বিদ্রোহের সাথে জড়িত করেননি। সেজন্য তিনি ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু পরে হাকিম আসানউল্লাহ তাঁর নিজের ক্ষমার বিনিময়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে সম্রাটের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন।
আত্মসমর্পণের বিষয়ে হডসনের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে শেষপর্যন্ত সম্রাটকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়নি। তবে তাঁকে বার্মার রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়েছিলো। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী জিনাত মহল এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। ১৮৫৮ সালের ৭ ই অক্টোবর ভোর চারটেয়, বাহাদুর শাহ জাফর তাঁর স্ত্রী এবং অবশিষ্ট দুই পুত্রকে নিয়ে লেফটেনেন্ট উসমানির নেতৃত্বে ৯তম লান্সারের রক্ষণাবেক্ষণে গরুর গাড়ীতে রেঙ্গুনের দিকে যাত্রা করেছিলেন।
মৃত্যু– ১৮৬২ সালে ৮৭ বছর বয়সে বাহাদুর শাহ জাফর কিছু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা যায়। অক্টোবরে তাঁকে চামুচ দিয়ে জোল খাওয়ানো হয়েছিলো, কিন্তু তিন নভেম্বরের মধ্যে তিনি চামুচ দিয়ে খেতেও অক্ষম হয়েছিলেন। ৬ নভেম্বর ব্রিটিশ কমিশনার এইসএন ডেভিস রেকর্ড করেছিলেন যে, বাহাদুর শাহ জাফরের গলার অঞ্চল অসার হয়ে পড়েছিলো। তাঁর মৃত্যু আসন্ন দেখে প্রস্তুতি হিসাবে ডেভিস চুন এবং ইট সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁর দাফনের জন্য তাঁর গৃহের পেছনে একটি জায়গা নির্বাচন করেছিলেন।
১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর শুক্রবার ভোর পাঁচটায় বাহাদুর শাহ জাফর মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁকে বিকেল চারটায় ইয়াঙ্গুনের ৬ নম্বর জিওয়াকা রোডের শ্বেদাগন পেগোডার কাছে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
১৯৯১ সালের ১৬ ই ফেব্রুয়ারি বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি পুনরুদ্ধারের পর সেখানে বাহাদুর শাহ জাফরের দরগাহ তৈরি করা হয়েছে।
বাহাদুর শাহ জাফরের বিষয়ে মন্তব্য করে ডেভিস তাঁর জীবনকে— খুবই অনিশ্চিত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস– বাহাদুর শাহ জাফর একজন ধর্মপ্রাণ সুফি ছিলেন। তিনি একজন সুফি পীর হিসাবে বিবেচিত ছিলেন এবং মুরিদ বা শিষ্য গ্রহণ করতেন। দিল্লীর উর্দূ আখবার পত্রিকা তাঁকে ‘ঐশ্বরিক আদালত দ্বারা অনুমোদিত, যুগের অন্যতম প্রধান সাধক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার এক দশক আগে ১৮২৮ সালে মেজর আর্চার বলেছিলেন যে, জাফর একজন অতিরিক্ত ফিগার এবং উচ্চতা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তাঁর চেহেরা একজন নিরীহ মুন্সি, ভাষার শিক্ষকের মতো ছিলেন।
একজন কবি হিসাবে জাফর অতীন্দ্রিয় সুফি শিক্ষার সর্বোচ্চ সূক্ষ্মতাকে আত্মস্থ করেছিলেন। তিনি গোঁড়া সুফিবাদের জাদুকরী এবং কু-সংস্কারপূর্ণ দিকেও বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর অনুসারীদের অনেকের মতে, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একজন সুফি পীর এবং সম্রাট হিসাবে তাঁর অবস্থানকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রদান করেছেন।
সম্রাটের তাবিজ এবং মন্ত্রের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিলেন। বিশেষ করে তিনি পাইলসের উপশমকারী হিসাবে এবং মন্দ মন্ত্রগুলি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাবিজ বা মন্ত্রের সাহায্য নিতেন। তাঁর অসুস্থতার সময় তিনি সুফি পীরদের একটি দলকে বলেছিলেন যে, তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে কয়েকজন সন্দেহ করেছিলেন যে, তাঁর উপর কেউ মন্ত্র করেছে। তাঁর এই শঙ্কা দূর করার জন্য তিনি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। মন্দ প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য তখন পীরের দলটি মন্ত্র লিখে পানিতে মিশিয়ে তাঁকে পান করতে দিয়েছিলেন। একদল পীর, অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন লোক এবং জ্যোতিষীরা সর্বদা তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতেন। তাঁদের পরামর্শ মতে, তিনি মহিষ এবং উট বলি দিতেন, ডিম পুঁতে রাখতেন এবং কথিত কালো জাদুকরদের গ্রেপ্তার করতেন। বদহজম নিরাময়ের জন্য তিনি একটি আংটি পরতেন। এছাড়াও গরীবদের জন্য গরু, সুফিদের মাজারে হাতী, মসজিদের খাদিমদের জামা বা পাদ্রীদের ঘোড়া দান করতেন।
জাফর স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, হিন্দুধর্ম এবং ইসলাম ধর্ম উভয়ই একই সারাংশ ভাগ করে নিয়েছে। এই দর্শনটি তাঁর দরবারিদের দ্বারা বাস্তবায়িত হয়েছিলো, ফলে বহু সংস্কৃতির সংমিশ্রণে হিন্দু ইসলামী মোগল সংস্কৃতি মূর্ত হয়ে উঠেছিলো।
এপিটাফ(স্মৃতি চিত্রাঙ্কিত কথা)- বাহাদুর শাহ জাফর একজন বিশিষ্ট কবি এবং ক্যালিগ্রাফার ছিলেন। তিনি লিখেছেন-
এই ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশে আমার হৃদয়ের বিশ্রাম নেই।
এই নিরর্থক পৃথিবীতে কে কখনো পূর্ণতা অনুভব করেছে?
নাইটিঙ্গেল সেন্টিনেল বা শিকারী সম্পর্কে অভিযোগ করে না।
বসন্তেরে ফসল কাটার সময় ভাগ্য কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলো।
এই আকাঙ্খাগুলোকে বলো অন্য কোথাও যেতে
এই বিষণ্ণ হৃদয়ে তাদের জন্য কী স্থান আছে?
ফুলের ডালে বসে নাইটঙ্গেল আনন্দ করে
আমার হৃদয়ের বাগানে কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘ জীবন চেয়েছি, চার দিন পেয়েছি
দুইটা ইচ্ছায়, দুইটা অপেক্ষায়।
জীবনের দিন শেষ সন্ধ্যা নেমে এসেছে
আমি ঘুমাবো, পা ছড়িয়ে, আমার সমাধিতে।
জাফর কত দুর্ভাগা ! তাঁর দাফনের জন্য
তাঁর প্রেয়সীর দেশে দুই গজ জমিও ছিল না।
স্ত্রী এবং সন্তান–
জাফরের চারজন স্ত্রী এবং অনেক উপপত্নী ছিলেন।
স্ত্রী– বেগম আশ্রাফ মহল, বেগম আখতার মহল, বেগম জীনাত মহল এবং বেগম তাজ মহল।
পুত্র সন্তান– মির্জা দারা বখত মীরান শাহ (১৭৯০- ১৮৪১), মির্জা মহম্মদ শাহরুখ বাহাদুর, মির্জা কাইমার বাহাদুর, মির্জা ফাত-উল-মুলুক বাহাদুর, মির্জা মহম্মদ কুয়াইশ বাহাদুর, মির্জা মোঘল (১৮১৭-১৮৫৭), মির্জা ফরখানন্দ বাহাদুর, মির্জা খিজির সুলতান(১৮৩৪-১৮৫৭), মির্জা বখতবর শাহ বাহাদুর, মির্জা সোহরাব হিন্দি বাহাদুর, মির্জা আবু নসর, মির্জা মহম্মদ বাহাদুর, মির্জা আবদুল্লাহ, মির্জা কুচক সুলতান, মির্জা আবু বকর (১৮৩৭-১৮৫৭), মির্জা জওয়ান বখত, মির্জা শাহ আব্বাস(১৮৪৫-১৯১০)।
কন্যা সন্তান– রাবিয়া বেগম, বেগম ফাতিমা সুলতানা, কুলসুম জামানী বেগম, রওনাক জামানী বেগম (সম্ভবত নাতনি।)
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে– বাহদুর শাহ জাফরকে জাভেদ সিদ্দিকীর নাটক ‘১৮৫৭: এক সফর নামা’ নাটকে চিত্রিত করা হয়েছিলো। এটি ২০০৮ সালে নাদিরা বাব্বর এবং ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা রেপ’র্টারি কোম্পানী পুরানা কিলার প্রাচীরে মঞ্চস্থ করা হয়েছিলো।
নানাভাই ভাট পরিচালিত হিন্দী-উর্দূ সাদা-কালো চলচ্চিত্র ‘লাল কুইলা‘ (১৯৬০)-এ বাহাদুর শাহ জাফরকে ব্যাপকভাবে প্রদর্শন করা হয়েছিলো।
টিভি ধারাবাহিক এবং চলচ্চিত্র– ১৯৮৬ সালে দুরদর্শনে বাহাদুর শাহ জাফর সম্প্রচারিত হয়েছিলো। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অশোক কুমার ।
২০০১ সালে হিন্দী ঐতিহাসিক নাটক সিরিজ ‘১৮৫৭ ক্রান্তি’ ডিডি ন্যাশনালে সম্প্রচারিত হয়েছিলো। সেখানে বাহাদুর শাহ জাফরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এস, এম জহির।
২০০৫ সালে নির্মিত কেতন মেহতা পরিচালিত হিন্দী চলচ্চিত্র ‘মঙ্গল পাণ্ডেছঃ দ্য রাইজিং’ চলচ্চিত্রে বাহাদুর শাহ জাফরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন হাবিব তানভে। *
