
নিবেদন
বাবর ভারতবর্ষের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের বিস্ময়কর চরিত্র। বাবর ছিলেন ধৈর্য, সাহস, ত্যাগের মহিমায় মহিমামণ্ডিত এক বিস্ময়কর বিরল প্রতিভার অধিকারী। বাবরের জন্ম ইং ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী। মাত্র এগার বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হোন; তবে নিজের প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের বলে তিনি সকল বাধা-বিপত্তি, দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা-বঞ্চনার সুউচ্চ পর্বত ডিঙিয়ে দেশের পরে দেশ জয় করে ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরাজি ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল দিল্লী থেকে ৮৫.৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পানীপত নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীকে পরাস্ত করে তিনি ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত নির্মাণ করেন এবং ২৭ এপ্রিলে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন।
মাত্র চার বছর তিনি ভারতের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই চার বছরেই তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বরে তিনি এন্তেকাল করেন। তাঁর এন্তেকালের পরে তিন শত বছরের চেয়েও অধিককাল ভারতবর্ষে তাঁর উত্তরসূরীরাঁ রাজত্ব করেছেন।
ছেলেবেলা বাবরের বিষয়ে প্রদর্শিত একটি তথ্যচিত্র দেখে বাবরের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। তথ্যচিত্রটিতে বাবর পানীপতের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনার বিরুদ্ধে মাত্র বার হাজার সেনা নিয়ে কীভাবে বিজয় সাব্যস্ত করেছিলেন সেই দৃশ্য প্রদর্শনের সাথে রোগশয্যায় শায়িত প্রাণাধিক পুত্র হুমায়ূনকে নিজের আয়ু দান করার এক বিস্ময়কর বিরল দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়েছিলো। তথ্যচিত্রটি দেখে তখন সেই দৃশ্য দু’টির রহস্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হইনি, তাই তখন থেকে বাবরের প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ ও কৌতূহল অনুভব করে আসছিলাম।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরে করসেবকরা বাবরের সেনাপতি মীর বাকি নির্মিত বাবরী মসজিদ ধ্বংস করে। উক্ত ঘটনার ফলে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। উক্ত সংঘর্ষে ভারতবর্ষের সমান্তরালভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রভূত ধন-জন ক্ষতি হয়। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে পড়ে তখন মর্মাহত হয়ে পড়েছিলাম। ফলে বাবরের চরিত্র সম্পর্কে অধিক জানার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে উঠেছিলাম। তার ফলশ্রুতিতেই বাবর নামক উপন্যাসটি লিখার সিদ্ধান্ত নিই। উপন্যাসটি লিখতে সোভিয়েত সংঘের রাদুগা প্রকাশন দ্বারা প্রকাশিত সুধীর কুমার মাথুরের হিন্দীতে লিখা বাবর নামক উপন্যাসটির বিশেষভাবে সহায় নেওয়া হয়েছে। সেজন্য আমি প্রকাশন গোষ্ঠী এবং লেখকের নিকট বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। উপন্যাসটি আমি প্রথমে অসমীয়া ভাষায় লিখেছিলাম। অসমীয়া পাণ্ডুলিপিটি পড়ে বরপেটা জেলার সহযোগী মিশন সমন্বয়ক মান্যবর সাদুল্যা খান সাহেব ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করে ‘দিগ্বীজয়ী বাবর’ শীর্ষক একটি টোকা’ লিখে দিয়ে আমাকে উৎসাহিত করার জন্য তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল।
বাংলা ভাষায় উপন্যাসটি অনুবাদ করার জন্য বন্ধুবর নুরুল হক (গরেমারি পাথার), ভ্রাতৃপ্রতীম নূর হোসেইন ও বিশ্ববন্ধু দেওয়ান এবং ভাগ্নে বদর উদ্দিন আহমেদ আমাকে উৎসাহিত করার জন্য তাঁদের প্রতি আমার স্নেহাশীষ রইল। উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি পড়ে ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করে দেওয়ার জন্য ভ্রাতৃপ্রতীম বাহাদুর আলীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম।আমি প্রকৃতার্থে অসমীয়া ভাষায় লেখা-পড়া শিখেছি।সেজন্য বাংলা ভাষার জ্ঞান আমার খুবই সীমিত। তাই উপন্যাসটি অনুবাদ করার সময়ে ‘র’ এবং ‘ড়’র ব্যবহার নিয়ে খুবই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হয়তো অনেক ভুল-ত্রুটি রয়ে গেছে। ইতিহাসের একজন বিশিষ্ট চরিত্রকে উপন্যাসের রূপ দেওয়াটা ধৃষ্টতা যদিও আমার আবেগ অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য রেখে সদাশয় পাঠক আমার সেই ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন বলে আশা রইল।
সদাশয় পাঠক উপন্যাসটিতে রয়ে যাওয়া ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করে উপন্যাসটি গ্রহণ করলে এবং পাঠকের হৃদয়ে যৎকিঞ্চিত ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হলে আমার শ্রম সার্থক হবে।
বিনীত
আবুল হোসেইন
সাকিন- যতিগাঁও
ডাকঘর- জাহোরপাম
জেলা- বরপেটা, আসাম (ভারত)
উৎসৰ্গ
পরম পূজনীয় আব্বা মিঠু মিয়া এবং আম্মাজান আয়সা খাতুনের পবিত্র স্মৃতিতে গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হলো।
দিগ্বিজয়ী বাবর
দ্বিপ্রহর। প্রচন্ড রোদ। সূর্য্যের উত্তাপের ফলে বায়ুর গতি স্তব্ধপ্রায়। নিঝুম মেরে ছিলো রৌদ্রস্নাত বৃক্ষের পল্লব। অসহ্য গরম থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য পিঠে ঠোঁট গুজে পক্ষীকুল ঝিমুচ্ছিল। চতুর্দিকে বিরাজ করছিল অসহ্যকর ক্লান্তির পরিবেশ।
রমজান মাস। মুসলমানদের রোজা (উপবাসব্রত) পালনের মাস। রোজাদার মুসলমানরা অসহ্য গরমে শ্রান্ত-ক্লান্ত। ভোক-পিপাসায় কাতর। অবসন্নভাবে বিছানায় গা এলিয়ে সবাই অধীরভাবে সূর্যাস্তের জন্য অপেক্ষা করছিল।আন্দিজানের কোলাহল মুখর রাজপ্রাসাদ নীরব-নিস্তব্ধ। প্রাসাদের বাসিন্দারা শ্রান্ত-ক্লান্ত। কেউ কেউ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন; কেউ কেউ আবার অবসন্নভাবে বিছানায় গা এলিয়ে সময় কাটাতে ব্যস্ত।
শাহজাদা বাবর অবসন্নভাবে বিছানায় গা এলিয়ে ছিলেন; তাঁর চোখে ঘুম নেই। নৈঃশব্দের অলস স্পর্শে তাঁর অনুভূতিতে কবিতার ছন্দ জাগিয়ে তুলছিল। ফলে তিনি কবিতা রচনার কল্পনায় বিভোর হয়ে ছিলেন। হৃদয়ে ছন্দায়িত আবেগ, কবিতার ছন্দে লিপিবদ্ধ করতে তিনি কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন; কিন্তু অনেক সময় চেষ্টা করেও তিনি একটি পংক্তিও লেখতে সক্ষম হলেন না। অবশেষে হতাশ হয়ে তিনি ফারগানা বিদ্রোহীদের বিষয়ে লেখার জন্য মনোনিবেশ করলেন।বাবর গভীরভাবে লেখায় ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় প্রচন্ড গতিতে একটি ঘোড়া ছোটে এসে হঠাৎ প্রাসাদের সন্মুখে থেমে গেল।
বাবর লেখায় এতই ব্যস্ত ছিলেন যে, ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার পরে সেই শব্দ তাঁর কাণে পৌঁছল। নৈঃশব্দের মাঝে হঠাৎ শব্দের সঞ্চার হওয়ায় তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। তিনি মনের মাঝে গোনা-গাঁথা করতে লাগলেন যে, কে আসতে পারে এই ভরা দুপুরে!
কিন্তু বাবর অধিক সময় চিন্তা করার সুযোগ পেলেন না। হঠাৎ সমবেত কন্ঠের কোলাহল মুখর ক্রন্দনের শব্দ তাঁর কর্ণগোচর হলো।
ক্রন্দনের শব্দে অশুভ বার্তার ইংগিত প্রচ্ছন্ন ছিলো। ফলে তিনি সচকিত এবং উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। কি হলো? কে ক্রন্দন করছে এই ভরা দুপুরে? কেন ক্রন্দন করছে? এরকম অনেক প্রশ্ন তাঁর মনের মাঝে উদয় হলো।
কোলাহলের শব্দ এহসান দৌলত বেগমের কক্ষ থেকে ভেসে আসছে বলে অনুমান হলো বাবরের।
কোলাহলের শব্দ ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি হচ্ছিল। কাগজ-কলম ফেলে বাবর দৌঁড়ে এহসান দৌলত বেগমের কক্ষে এলেন।
কক্ষের দুয়ার সম্পূর্ণরূপে খোলা ছিলো। মহিলাদের মাথায় ওড়না ছিল না। সবাই এলোমেলো হয়ে উন্মাদের মতো কপাল চাপরিয়ে রোদন করছিল এবং মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতেছিলো শোকপ্রকাশক শব্দ।
এহসান দৌলত বেগমের হাতে একটি চিঠি।
এহসান দৌলত বেগম বাবরের মাতামহী। উৎকণ্ঠিতভাবে তিনি একটি চিঠি পড়ছিলেন। তাঁর চোখে ভরা পুকুরের মতো জল টলমল করছিলো। চোখের জলের কারণে তাঁর জন্য চিঠি পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল। দুই এক ফোঁটা করে অশ্রু চিঠির মাঝেও গড়িয়ে পড়ছিলো।
রুমাল দিয়ে অশ্রু মুছে তিনি চিঠিটা মনযোগ সহকারে পড়ছিলেন।
চিঠিটাই যে উৎকন্ঠার কারণ সে কথা উপলব্ধি করতে বাবরের অসুবিধা হল না। চিঠিটাই নিশ্চয় কোনো অশুভবার্তা বহন করে এনেছে, যার জন্য এই সমবেত বিলাপ! বাবর মনে মনে ভাবলেন।
বাবর উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। উদ্বেগ-কাতর কণ্ঠে তিনি এহসান দৌলত বেগমকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন- কি হলো, নানীজান? চিঠিতে কি লেখা আছে? কোত্থেকে এসেছে চিঠি?
এহাসান দৌলত বেগম মুখ দিয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করলেন না। কম্পিত হাতে অলসভাবে তিনি চিঠিটা বাবরের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
চিলের মতো ছোঁ মেরে বাবর চিঠিটা মাতামহীর হাত থেকে নিজের হাতে নিলেন।
চিঠির বর্ণমালা দেখে বাবর চিঠিটা তাঁর মাতা কুলতুগ নিগার বেগমের বলে চিনতে পারলেন।
উদ্গ্রীবভাবে বাবর চিঠির ওপড়ে দৃষ্টি ফেরাতে লাগলেন। মাতামহীর অশ্রু চিঠির ওপড় গড়িয়ে পড়ে চিঠির কিছু কিছু অংশ ইতিমধ্যে কিছু অস্পষ্ট হয়ে পড়ছিল যদিও চিঠিটা পড়তে তাঁর বিশেষ অসুবিধা হল না।
চিঠিটা পড়ে বাবরের অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠল। চোখে-মুখে ফুটে উঠল তীব্র ব্যথার অভিব্যক্তি।
চিঠিটায় লিখা ছিলো বাবরের পিতৃ মির্জা ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ।
প্রতিদিনের মতো ওমর শেখ সেহেরি খেয়ে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন। সভাসদবৃন্দ পূর্ব থেকেই উৎকন্ঠিতভাবে তাঁর অপেক্ষায় দরবার কক্ষে অপেক্ষমাণ ছিলেন।
ওমর শেখ দরবার কক্ষে উপস্থিত হয়ে সভাসদদের উদ্দেশ্য করে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- দূত কোত্থেকে এসেছে?
ইসফারা থেকে, জাহাপনা। উজির-এ-আজম বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন।
ইসফারার সংবাদ কি? ওমর শেখের কণ্ঠে উদ্বিগ্নতা।
জাহাপনা, আমি অভয় চাচ্ছি। উজির-এ-আজম বিষণ্ণ হতাশ কণ্ঠে আমতা-আমতা করে অভয় চাইলেন।
এর অর্থ ইসফারাতেও শত্রুর দখল প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে! ওমর শেখ শংকিত কণ্ঠে অস্পষ্টভাবে কথাটা বলেই উজির-এ-আজম-এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- মার্গিলানের সংবাদ কি?
উজির-এ-আজম হতাশ কণ্ঠে বললেন- মার্গিলানের সংবাদের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি, জাহাপনা। সংবাদবাহক এখন পর্যন্ত এসে পৌঁছোয়নি।
উত্তেজনায় ওমর শেখের রক্তের গতি তীব্র হয়ে উঠল। তিনি যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বললেন- মার্গিলানেও আমাদের পরাজয় হবে নাকি? আন্দিজানও তাহলে সংকটমুক্ত নয়। সংবাদ বাহক এখন পর্যন্ত আসেনি কেন? কোনো বিপদে পড়ছে, না বন্দী হয়েছে? স্বয়ং মার্গিলানবাসীরা বিশ্বাসঘাতকতা করেনি তো?
জাহাপনা, যদি দ্বিতীয় একজন দূত পাঠানোর অনুমতি দেন তো……উজির-এ-আজম নির্বোধ বিষণ্ন চোখে ওমর শেখের দিকে তাকিয়ে বাক্যটি সম্পূর্ণ না করে মাথা নত করে নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ওমর শেখ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- এর পরে সেই দূতের জন্যও অপেক্ষা করতে হবে না-কি? আর কত অপেক্ষা করব? অপেক্ষা করে করে আমার ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছে।
ওমর শেখকে উত্তেজিত দেখে উজির-এ-আজমের হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হলো। ক্ষমা নিবেদনের ভংগীতে তিনি কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন।
ওমর শেখের উৎকন্ঠার কারণ হলো, সমরকন্দের বাদশাহ আহম্মদ সুলতান আখসি আক্রমণের জন্য কুবাসায় নদীর সেপাড়ে অবস্থিত কুবা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। ফলে, যে কোনো মুহূর্তে আখসির উপরে আক্রমণ সংঘটিত হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ওমর শেখ সভাসদবৃন্দের উদ্দেশ্যে বললেন- আখসির উপরে আক্রমণ সংঘটিত হওয়াটা নিশ্চিত। ফলে আমরা আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করার সাথে সাথে কিছু জরুরিকালীন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা প্রয়োজন। দূর্গের ভেতর ছয় মাস চলার উপযোগী রসদ-পত্র মজুত করার ব্যবস্থা করা হোক। আমাদের দূর্গটি উঁচো পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। সেখানে জলের সুব্যবস্থা নেই। সেজন্য সেখানে জলের সুব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে বলেই তিনি সভাসদবৃন্দের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। ত্রিশ বছরের কর্মঠ যুবক কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন- কাশিম বেগ….
কাশিম বেগ স্প্রিঙের মতো ছিটকে দ্রুত দাঁড়িয়ে বললেন- জাহাপনা।
ওমর শেখ আদেশের সুরে বললেন- তুমি পাথর দিয়ে জলের চৌবাচ্চা নির্মাণ করে ভিস্তিয়ালার দ্বারা চৌবাচ্চাটা জল দিয়ে পূর্ণ করার ব্যবস্থা কর। এই দায়িত্ব আমি সম্পূর্ণরূপে তোমার ওপর ন্যস্ত করলাম। এভাবে বলেই তিনি অন্যান্য পাত্র-মিত্রের ওপরেও বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব অর্পণ করলেন।
ওমর শেখের রাগান্বিত মূর্তি দেখে সভাসদবৃন্দ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। বাদশাহের হুকুম পালনের জন্য সবাই তৎক্ষণাৎ দরবার কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেল।
কয়েকজন দেহরক্ষী নিয়ে ওমর শেখ সির দরিয়ার পাড়ে অবস্থিত কবুতর পাখির সংগ্রহালয়ের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে এলেন।
সংগ্রহালয় থেকে একটি কবুতর হাতে নিয়ে তিনি কাঠের সিরি বেয়ে ছাদের ওপরে উঠে এলেন। কবুতরের গা-মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি স্নেহাৰ্দ্ধ কণ্ঠে বললেন- যাও, অতি সত্বর মার্গিলান এবং কোকানের সংবাদ নিয়ে ফিরে আসগে’।
এভাবে বলেই তিনি কবুতরটি উড়িয়ে দিলেন। মুক্তির আনন্দে কবুতরটি দুই পাক ঘূরে মার্গিলান অভিমুখে উড়ে গেলেন।
কবুতরটি উড়িয়ে দেওয়ার সময়েই ঘটল ঘটনাটি-
কবুতরটি উড়িয়ে দেওয়ার সময় সামান্য ঝাঁকানির সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই ঝাঁকানির ফলেই ছাদটি হঠাৎ মড়মড় শব্দ করে ভেঙে পড়ল এবং বাদশাহ ওমর শেখ ভাঙা ইট-পাটকেল, কাঠের টুকরার সাথে ছাদ থেকে নিচের দিকে পড়ে গেলেন।
সংগ্রহালয়টা নদীর পাড়ে অবস্থিত ছিল। ফলে তিনি ভাঙা ইট-পাটকেল, কাঠের টুকরার সাথে নদীতে পড়ে গেলেন। প্রচন্ড জলের স্রোত নিমিষে তাঁকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। ফলে তাঁর সলিল সমাধি হলো। এরকমই ছিলো চিঠির মূল বক্তব্য।
পিতৃর আকস্মিক মৃত্যু সংবাদে বাবর মর্মান্তিক আঘাত পেলেন। যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হল তাঁর মাথায়। বিষাদ বেদনায় তাঁর মুখমন্ডল মলিন হয়ে গেল। পত্রবাহক কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।
অবিশ্রান্তভাবে ত্রিশ ক্রোশ ঘোড়া ছুটিয়ে এসে কাশিম বেগ শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। দেয়ালের আশ্রয় নিয়ে তিনি কোনোমতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাঁর সর্বশরীর ধূলির সরোবরে পরিণত হয়েছিলো।
বাবরের বিষাদ গম্ভীর অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তিনি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন- হুজুর আলী আহাদ, আল্লাহ আপনাকে শোক সহ্য করার শক্তি দিন। এখন আল্লাহই আমাদের একমাত্র ভরসা- একমাত্র সহায়। তিন দিক থেকে শত্রু সেনা বাজ পাখির মতো আমাদের ধ্বংস করার জন্য এগিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে আসন্ন বিপদের মোকাবিলা করার জন্য আপনার বিশ্বস্ত সভাসদদের দূর্গে একত্রিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, আলী আহাদ।
এহসান দৌলত বেগমও এই মর্মান্তিক খবর পেয়ে উৎকণ্ঠিত ও মর্মাহত হয়ে পড়েছিলেন। ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সংযত করে নিলেন। তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে অনুভব করতে পেড়েছিলেন যে, বর্তমান এক সংকটময় দুঃসময় উপস্থিত। রোদন করে সময় নষ্ট করার সময় এটা নয়।
তিনি কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- বেগ সাহেব, আপনার বিশ্বস্ততার জন্য আপনাকে শুভচ্ছা জ্ঞাপন করছি। এখন এখানে থাকাটা উচিত হবে না। আমরা সবাই এই সংকটময় মুহূর্তে দূর্গের ভেতরে আশ্রয় গ্রহণ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
এহসান দৌলত বেগম-এর পরামর্শ অনুসারে কাশিম বেগ বাবরকে নিয়ে দূর্গের ভেতরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি চালালেন। কিন্তু কাশিম বেগ প্রস্তুত হওয়ার আগেই বাবার কাউকে কিছু না বলেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন।
কক্ষের বাইরে এসেই তিনি আস্তাবল-এ এসে একটি অশ্ব বের করে ঝাঁপ মেরে অশ্বের পিঠে চড়ে বসলেন। অশ্বের পিঠে বসে তিনি ক্লান্ত নির্বোধ দৃষ্টি প্রসারিত করে চতুর্দিক নিরীক্ষণ করতে লাগলেন।
ফল-ফুল ভরা বৃক্ষ, ইঁট পাথর দিয়ে নির্মিত জলের কুণ্ড দেখে তিনি মর্মাহত হয়ে পড়লেন।
এগুলি তাঁর পিতৃ ওমর শ্বেখ নির্মাণ করিয়েছিলেন। তিনি আর কোনোদিন এগুলির পাশে আসবেন না।
নাসপতি গাছের দিকে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হলো। গাছটি ওমর শেখ নিজ হাতে রোপন করেছিলেন। গাছটিতে ডাল ভরে ফল-ফুল লেগেছে।
ফলের ভারে গাছটি নুয়ে পড়ছে। কিছুদিনের ভেতরেই ফলগুলি পাকবে, কিন্তু গাছটি রোপন করা লোকটি আজ এই সংসারে নেই! আর কোনোদিন তিনি এই ফলগুলির স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন না। কথাগুলি ভাবতেই বাবর-এর বুকে প্রচন্ড শোকে আঘাত করলো।
পরক্ষণেই বুকের বেদনাগুলি দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হয়ে এলো।
কোনোমতে নিজেকে সংযত করে তিনি শোকদগ্ধ হৃদয়ে ঘোড়া ছোটালেন।
বাবর এসে পাকা রাস্তায় উঠলেন। ঘোড়ার ক্ষুরের চাপে পাকা রাস্তায় প্রাণের সঞ্চার হলো। খট্ খটালপ্ শব্দে রাস্তা মুখর হয়ে উঠলো।
বাবর-এর মানসপটে আবার পিতৃর স্মৃতি উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। এই রাস্তা দিয়ে আব্বা কতদিন ঘোড়া ছুটিয়ে গেছেন। ঘোড়ার ক্ষুরের খট্ খটালপ্ ধ্বনির শব্দ তরংগে তখনও রাস্তাটা এরকমই মুখর হয়ে উঠতো। কিন্তু কোনোদিন তিনি আর এই রাস্তায় ঘোড়া ছুটাতে আসবেন না। বিষাদ বেদনায় বাবরের চোখ দু’টি ভরা পুকুরের মতো জলে টলমল করতে লাগলো। চোখের জল মুছে মুছে তিনি দূর্গের দিকে অগ্রসর হলেন।
বাবর দূর্গের মুখ্যদ্বারে পৌঁছোনোর আগেই পাঁচজন অশ্বারোহী সৈনিক তাঁর দিকে এগিয়ে আসা তিনি লক্ষ্য করলেন।
দলের আগে আগে আসছিলো ছোট চোখ এবং মংগোলীয় গঠনের শেরিম তাগায়।
শেরিম তাগায় বাবরের পাশে এসে বাবরের চোখে জল প্রত্যক্ষ করে উৎকণ্ঠিতভাবে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলো। ঘোড়া দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ মেরে নেমে পড়লেন। তাঁর চোখে জল ছিল না যদিও এক প্রচ্ছন্ন বিষাদ বেদনা প্রকট হয়ে ছিলো তাঁর মুখমণ্ডলে।
শেরিম তাগায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেদনার্ত কণ্ঠে বললেন- আমরা যে আমাদের নিরাপদ আশ্রয় থেকে এতিম হয়ে গেলাম এই কথা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে, শাহজাদা। উঃ, কী নির্দয় এই পৃথিবী!
কাশিম বেগ ইতিমধ্যে সেখানে এসে পৌঁছেছিলেন। শেরিম তাগায়র কথা শুনে তিনি বিস্মিত কণ্ঠে বললেন- আপনি এই দুঃসংবাদ কোথা থেকে শুনলেন? আমি জানা মতে, এই দুঃসংবাদ নিয়ে আমার আগে কেউ আসেনি।
প্রকৃতপক্ষে কাশিম বেগের ধারণা সত্য নয়। তিনি আসার আগেই ফাতিমা সুলতানার নির্দেশে আহম্মদ তনয়াল নামের একজন বেগ সংবাদটা নিয়ে আন্দিজান এসে পৌঁছেছে।
বাদশাহ মির্জা ওমর শেখের তিন বেগম। কুতলুগ নিগার বেগম, ফাতিমা সুলতানা এবং কারাকোজ বেগম।
কুতলুগ নিগার বেগমের দুই সন্তান। খানজাদা বেগম এবং মির্জা জহিরুদ্দিন বাবর। ফাতিমা সুলতানার একমাত্র পুত্র মির্জা জাহাঙ্গীর। কারাকোজ বেগমের কোন সন্তান নেই। তিনজন বেগমই ওমর শেখের মৃত্যুর সময় আখসিতে ওমর শেখের সাথেই ছিলেন।
মির্জা জহিরুদ্দিন বাবর বয়সে মির্জা জাহাঙ্গীরেব চেয়ে বড়। সেই হিসেবে মির্জা বাবরই ছিলেন সিংহাসনের ন্যায্য উত্তরাধিকারী।
কিন্তু ফাতিমা সুলতানা মনে-প্রাণে মির্জা জাহাঙ্গীর বাদশাহ হওয়াটা কামনা করছিলেন। সেজন্য মির্জা ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে তিনি মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য আহম্মদ তনয়ালের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়েন।
আহম্মদ তনয়াল নিষ্ঠুর এবং লোভী হিসাবে সবার কাছে পরিচিত ছিলো। সেজন্য তাঁর দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ওমর শেখ তাঁকে দ্বিতীয় শ্রেণীর বেগের মর্যদা প্রদান করে রেখেছিলেন। ফলে আহম্মদ তনয়াল পেটে পেটে বাদশাহ ওমর শেখের উপরে অসন্তুষ্ট ছিলো।
ফাতিমা সুলতানা আহম্মদ তনয়ালের এই অসন্তুষ্টির বিষয়ে জ্ঞাত ছিলেন। সেজন্য তিনি অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য আহম্মদ তনয়ালের সাহায্য নেওয়ার কথা ভেবে তনয়ালকে ডেকে এনে তাঁর অভিপ্রায়ের কথা বুঝিয়ে বলেন এবং মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তাঁকে উপযুক্ত পুরস্কার দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
তনয়াল ভাবলো, উপযুক্ত পুরস্কারের অর্থ হলো, তিনি তাঁর কার্যে সফল হতে পারলে উজির-এ-আজমের পদ পাওয়াটা নিশ্চিত।
নাবালক বাদশাহের উজির-এ-আজম হওয়া মানে প্রায় বাদশাহ হওয়ার মতোই কথা হবে। সেজন্য তিনি ফাতিমা সুলতানার পরামর্শ অনুসারে একজন মাত্র সৈনিক সাথে নিয়ে কাউকে না জানিয়ে আখসি থেকে আন্দিজান রওনা হয়ে কাশিম বেগের আগেই আন্দিজান এসে পৌঁছেছিলো।
ইয়াকুব বেগ আন্দিজানের বেগদের মাঝে সবচেয়ে লোভী এবং ক্ষমতাশলী। বুদ্ধিতে বৃহস্পতি এবং কূটনীতিতে সিদ্ধহস্ত। সেজন্য আহম্মদ তনয়াল মির্জা বাবরকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ইয়াকুব বেগের সহায় নেওয়ার কথা ভাবল এবং ভাবামতেই ইয়াকুব বেগের কাছে সকল বৃত্তান্ত ভেঙে বলে তাঁর সহায় প্রার্থনা করলো।
ইয়াকুব বেগ সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে কূটকৌশলের আশ্রয় গ্ৰহণ করার কথা ভাবলো। সে ভাবলো, বাবরকে কৌশল করে আন্দিজান থেকে সরাতে পারলেই অতি সহজে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। সেজন্য সে বাবরকে আন্দিজান থেকে সরাতে একটি কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবলো। কৌশলটা সফল করার জন্য সে শেরিম তাগায়কে দাবার গুটি হিসাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলো।
শেরিম তাগায় বাবরের মামা। সে তাৎক্ষণিকভাবে ভয় পাওয়া প্রকৃতির লোক ছিলো। তার এই দুর্বলতার বিষয়ে সবাই ভালোভাবে অবগত ছিলো। ইয়াকুব বেগও জানতেন কথাটি। সেজন্য ইয়াকুব বেগ শেরিম তাগায়কে ডেকে এনে বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ দিয়ে বললো, যে আন্দিজানের বেগবৃন্দ বাবরকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। যারজন্য বাবর দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করলে তাঁর জীবন বিপদাপন্ন হতে পারে।
খবরটা শুনে, ইয়াকুব বেগ ভাবামতেই শেরিম তাগায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে এবং ভাগ্নেকে আসন্ন সংকট থেকে মুক্ত করার জন্য বাবরের কাছে দৌড়ে এসেছে।
শেরিম তাগায়ও ওমর শেখের দরবারে উচ্চপদ থেকে বঞ্চিত ছিলো। বাবরকে আসন্ন সংকট থেকে রক্ষা করতে পারলে বাবরের দরবারে উচ্চপদ লাভ করাটা নিশ্চিত ভেবে সে নিজের মহত্ত্ব প্রকাশ করে বাবরের প্রিয়ভাজন হওয়ার কথা ভাবলো। ভাবামতেই সে ইয়াকুব বেগের কাছ থেকে শুনা কাহিনীর আশ্রয় নিয়ে নিজের প্রতিপত্তি ও মহত্ত্ব প্রকাশের জন্য এক কল্পিত কাহিনীর আশ্রয় নিলো।
সে রহস্যময় কল্পিত কাহিনী বলে গেলো- আল্লাহর মর্জি কে বুঝতে পারে! এক অভিনব উপায়ে আমি খবরটা পেয়ে গেলাম। আমার একটি কবুতর, উড়তে উড়তে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে পড়লো। কিছু সময় পরে উড়ে যাওয়া কবুতরটা আবার আমার হাতে এসে বসলো।দেখলাম কবুতরটার ঠেঙে এক টুকরো কাগজ বাঁধা। বিস্ময়াভিভূত হয়ে আমি কাগজ টুকরো খুলে পড়ে দেখলাম। কাগজ টুকরোয় লেখা কথাগুলো পড়ে আমি হতবুদ্ধি এবং স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম। কাগজ টুকরোতে লিখা ছিলো এক অতি মর্মান্তিক এবং আফসোসজনক সংবাদ! বাদশাহের মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদ। কে লিখেছে জানি না, হয়তো কোনো ফিরিস্তার কাজ হবে সেটা! শেরিম তাগায় কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে বাবরের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য বাবরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলো। কিন্তু বাবরের ভাবলেশ শূন্য নির্বিকার মুখমন্ডল প্রত্যক্ষ করে সে নিরাশ হলো। অল্প সময় পরে সে নিজেকে সংযত করে বাবরের কাঁধে হাত রেখে কানের কাছে মুখ এনে ইয়াকুব বেগের কাছে শুনা কাহিনীটি আবার রহস্যময় ভঙ্গীতে ব্যক্ত করলো- শাহজাদা, আপনি দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করবেন না। সেখানে আপনার জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে। আপনাকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করার জন্য বেগবৃন্দ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। সেজন্য দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করলে আপনার বিপদ হতে পারে!
কথাটা কাশিম বেগও শুনলেন। তিনি কিছু পরিমাণে শংকিতও হলেন কথাটা শুনে। তবে, পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি বাবরকে অভয় প্রদানের জন্য বললেন-শাহজাদা, দুর্যোগ আসার আগেই আমরা কাছিমের মতো হাতপা লুকিয়ে বসে থাকাটা কাপুরুষোচিত কাজ হবে। আপনি যতদূর সম্ভব তারাতারি বেগদের একত্রিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত হবে এই মুহূর্তে।
শেরিম তাগায় ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাবরের সাথে কথা বলছিলো। কিন্তু মাটিতে দাঁড়িয়ে কাশিম বেগের সাথে কথা বলাটা উচিত হবে না ভেবে সে লাফ মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে দৃঢ়কণ্ঠে বললো- বেগ সাহেব, দূর্গের ভেতরে কি হচ্ছে, আপনি এখান থেকে কিছুই বুঝতে পারবেন না। আমি জানি দূর্গের ভেতরের খবর। এভাবে বলে সে বাবরকে উদ্দেশ্য করে বললো- শাহজাদা, আপনি বেগ সাহেবের কথায় কর্ণপাত করবেন না। আমাদের জন্য আরও দুঃসংবাদ রয়েছে। আপনার বিশ্বাসী সেনানায়করা খোজন্দ এবং মার্গিলানও শত্রুর হাতে ন্যস্ত করছে।
মার্গিলানও!অস্বস্তিকর ব্যথার অনভূতিতে বাবরের মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন করে ফেললো। তিনি কম্পিত হতাশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- কখন?
বাবরকে উৎকণ্ঠিত দেখে শেরিম তাগায় উৎসাহিত হয়ে উঠলো। বললো- এইমাত্র খবর এসেছে। ফরিঙের মতো শত্রু সেনারা দেশ ছেয়ে ফেলেছে। কুবার দিকেও শত্রু সেনা এগিয়ে আসছে। কুবার পরেই তাদের লক্ষ্য হবে আন্দিজান। শেরিম তাগায় কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে তিরস্কারের সুরে বললো- আপনি আন্দিজানের সাথে শাহজাদা বাবরকেও শত্রুর হস্তগত করতে চাইছেন নাকি? আমি জীবিত থাকতে এই কাজ করা সম্ভব হবে না আপনার পক্ষে। এই কথা আপনি নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন।
শেরিম তাগায়র কথার সুর এবং ভঙ্গী দেখে কাশিম বেগের মুখমণ্ডলে সন্দেহের কালো ছাঁয়া পড়লো। সে তো এরকম কোনো খবরই অবগত হোন নি এখন পর্যন্ত! শেরিম তাগায় বলা কথাগুলো কতদূর সত্যি! বাবরকে আতংকিত করার জন্য উড়ো সংবাদ প্রচার করেনি তো শেরিম তাগায়?
সন্দেহমুক্ত হওয়ার জন্য কাশিম বেগ শেরিম তাগায়কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন-আপনি এসব সংবাদ কোথায় পেলেন?
কাশিম বেগের অন্তরেও উৎকন্ঠা সঞ্চারিত হওয়া দেখে শেরিম তাগায় দুগুণে উৎসাহিত হয়ে উঠলো। কিন্তু কাশিম বেগের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা উচিত হবে না ভেবে সে ভ্রূ কুঞ্চিত করে কাশিম বেগের দিকে অবজ্ঞা মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাবরের কাছে এসে অশ্ববল্গা টেনে ধরে বললো- আমি আপনার মামা, শাহজাদা। আপনার ক্ষতি মানে আমারও ক্ষতি। আপনাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনি আমাকে অনুমতি দিন, শাহজাদা।
শেরিম তাগায় কী করতে চাইছে, এই বিষয়ে বাবরের কিছুই বোধগম্য হলো না। তবুও, দুর্যোগের সময়ে শোকাকুল হৃদয় নিয়ে দূর্গের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকার চেয়ে বাইরের মুক্ত প্রান্তরে থাকাটা উত্তম হবে বলে তাঁর উপলব্ধি হলো। সেজন্য শেরিম তাগায়র কথার বিরোধিতা না করে তিনি নির্বিকারভাবে বললেন- আচ্ছা, দূর্গের বাইরে থেকেই আমি সেনানায়কদের বিশ্বস্ততার বিষয়ে অনুসন্ধান করবো। চলুন, আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছেন?
কাশিম বেগ বাবরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে বললেন- শাহজাদা, আপনার মা কিন্তু আপনাক অন্য কিছু করতে বলে পাঠিয়েছেন।
শেরিম তাগায় বিরক্ত হলো। সে জলন্ত দৃষ্টিতে কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে তিরস্কারের সুরে বললো- কুতলুগ নিগার বেগম সেনাধ্যক্ষ নয়, বেগ সাহেব! এই দুর্যোগের সময়ে একজন মেয়ে মানুষের কথা শুনে শাহজাদাকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে চাইছেন নাকি? আমি বেঁচে থাকতে এটা সম্ভব হবে না। এভাবে বলেই শেরিম তাগায় বাবরের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলো।
কাশিম বেগও কম নন! তিনি বাবরের কাছে এসে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন- আপনার মাতৃ বাদশাহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাধা করেই আন্দিজান অভিমুখে রওনা হবে। কালকেই এসে আন্দিজান পৌঁছেবেন হয়তো! আপনার নানীজানও আপনি দূর্গে থাকাটাকে কামনা করছেন। আপনি দূর্গে না থেকে অন্য কোথাও থাকলে প্রয়োজনের সময়ে আপনাকে কোথায় খুঁজতে যাবে, শাহজাদা?
বাবর সচকিত হয়ে উঠলেন। তিনি শেরিম তাগয়কে উদ্দেশ্য করে বললেন-তাহলে আপনি এখন আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন?
শেরিম তাগায় বাবরের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো- এখন আমরা আলতাউর দিকে যাব। পরে সেখান থেকে উশ এবং উশ থেকে উজগন্তের দিকে যাব।
কাশিম বেগের কাছে এই রাস্তার কথা গোপন করার ইচ্ছা ছিল না বাবরের।সেজন্য তিনি কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আমরা উশের রাস্তায় কোথাও মিলিত হবো। আপনি আম্মীজানকে এই কথা জানিয়ে দিবেন।
আচ্ছা, এখন আমি প্রথমে দূর্গে গিয়ে সেনা নায়কদের সাথে মিলিত হবো। তারপরে অন্য কথা চিন্তা করব। কাশিম বেগ নিজের মনোভাব ব্যক্ত করলেন।
বাবর কাশিম বেগকে পরামর্শ দিলেন- আপনি এই দুর্যোগের বিষয়ে প্রথমে ওস্তাদ খাজা আবদুল্যার সাথে আলোচনা করাটা অধিক সমীচিন হবে। আপনি দূর্গে গিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করে তাঁর পরামর্শ অনুসারে পরবর্তী কার্যপন্থা গ্রহণ করবেন।
কাশিম বেগকে এরূপ উপদেশ দিয়ে বাবর পঞ্চাশজন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে শেরিম তাগায়র সাথে উশের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন।
‘যথা আজ্ঞা’ বলে কাশিম বেগ দূর্গের মুখ্যদ্বারের দিকে ঘোড়া ছোটালেন।
* * *
ইয়াকুব বেগের মুখে বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ শুনে শেরিম তাগায় দূর্গের বাইরে বেরিয়ে আসার পরে শেরিম তাগায়র গতিবিধির উপরে চোখ রাখার জন্য ইয়াকুব বেগ স্বাস্থ্যবান সুগঠিত একজন সেপাই নিয়োগ করেছিলো। সেপাইটি দূর্গের মুখ্যদ্বারের ওপরে অবস্থান নিয়ে শেরিম তাগায়র প্রতিটা গতিবিধির উপর অতি গুরুত্ব সহকারে চোখ রাখছিলো। শেরিম তাগায় বাবরের সাথে মিলিত হওয়া থেকে শুরু করে বাবরকে নিয়ে শেরিম তাগায় দূর্গের বাইরে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা গতিবিধি সে নিরীক্ষণ করে যাচ্ছিল।
শেরিম তাগায়র সাথে বাবর দূর্গের বাইরে চলে যাওয়ার পরে কাশিম বেগকে দূর্গের দিকে এগিয়ে আসা দেখে সেপাইটি দ্রুত দূর্গ শিখর থেকে নেমে ইয়াকুব বেগকে খবরটা দেওয়ার জন্য দৌড়ে এলো।
ইয়াকুব বেগ এবং আহম্মদ তনয়াল উৎকন্ঠিতভাবে সেপাইটির জন্য অপেক্ষা করছিলো। তাদের চোখে-মুখে বিরাজ করছিলো উৎকন্ঠা এবং দৃষ্টিতে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছিলো হিংস্ৰ কূটিল উদ্বেগ কাতরতা। আসন্ন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য সাপের মতো বক্রিল পথে বয়ে চলছিলো তাদের চিন্তার স্রোত।
আহম্মদ তনয়ালের হাতে বনজ পল্লবে নির্মিত একটি ‘কিমীজ’(ঘোড়ার দুধের সরবত)-এর পিয়ালা। সে পিয়ালা থেকে এক চুমুক কিমীজ খেয়ে বামহাতের পৃষ্ঠ দিয়ে মুখ মুছে বলল- আজকের রোজা ভঙ্গের জন্য আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করেন। অবিশ্রান্তভাবে ত্রিশ ক্রোশ(তিন মাইলে এক ক্রোশ)ঘোড়া ছুটিয়ে এসে অণ্ঠকন্ঠ শুকিয়ে একেবারে চৌচির হয়ে গিয়েছিলো। কোনোমতে আমি ঘোড়ার পিঠে বসে আসতে পেরেছি।
ইয়াকুব বেগ পাশে বসে তনয়ালের কার্যকলাপ লক্ষ্য করছিলো। সে নির্লজের মতো হেসে বলল- আপনার আজকের রোজা ভঙ্গের গোনাহ(পাপ) নিশ্চয় আল্লাহ মার্জনা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। আপনি আজ একটি মহৎ কাজের বোজা বহন করে এসেছেন। আপনার সৌভাগ্য যদি আপনার সাথে প্রতাড়না না করে এবং মির্জা জাহাঙ্গীর যদি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়, তাহলে আপনিই হবেন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। ভাগ্য প্রসন্ন হলে আপনি উজির-এ-আজমও হয়ে যেতে পারেন।
আহম্মদ তনয়াল নিজেও তার এই ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করে আনন্দে বিভোর হয়েছিলো। সে অর্থপূর্ণ হাসি হেসে বলল- এই কার্যে সফল হতে হলে আপনার মতো মহৎ ব্যক্তির সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন হবে আমার।
ইয়াকুব বেগ নিজেও এই কথা জানে। কিন্তু তার একটাই মাত্র দুঃশ্চিন্তা, সে যে তনয়ালকে এই সংকটময় মুহূর্তে সহায় করছে, উজির- এ আজম হয়ে তনয়াল এই কথা ভুলে যাবে না তো! সেজন্য সে মুখে কোনো কথা না বলে শুধু অর্থপূর্ণভাবে মিটমিটিয়ে হাসলো।
ইয়াকুব বেগের সন্মুখভাগের দু’টি দাঁত ভগ্ন। সেজন্য মনের দুঃশ্চিন্তা ভগ্ন দাঁতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসে তার হাসি হাস্যস্পদ করে তুললো।
ইয়াকুব বেগের এই মনোভাবের কথা তানয়ালের চোখেও ধরা পড়লো। সেজন্য সে সজাগ হয়ে উঠলো। ইয়াকুব বেগকে আশ্বস্ত করার জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ভঙ্গীতে সে বললো- বেগ সাহেব, আপনি এবং আমি উভয়ে মোগল। এখন ফারগানায় ‘বরলস’ (তুর্কি ভাষী একটি গোষ্ঠী)দের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার সময় সমাগত। এখন মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে আমাদের পালা পড়েছে। মোগলদের মাঝে আপনাকেই আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। আল্লাহর কৃপায় যদি আমি উজির-এ-আজম হতে পারি, তাহলে আপনি-ই হবেন আমার ওস্তাদ এবং একমাত্র বন্ধু।
ইয়াকুব বেগ আত্মসন্তুষ্টিতে নিজের দাড়িতে হাত ফিরিয়ে বললো- আল্লাহই যেন এরূপই করেন।
আহম্মদ তনয়াল এবং ইয়াকুব বেগ এরূপ মিষ্টি স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতেই সেপাইটি দৌড়ে এসে দুয়ার মুখে দাঁড়িয়ে অভিবাদন করে বললো- মিষ্টান্ন খাওয়ান, হুজুর! শাহজাদা বাবর দূর্গের ভেতরে না এসে ফিরে গেছেন।
শেরিম তাগায়-এর সাথে নাকি? তনয়াল উৎকন্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলো।
সেপাইটি সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললো- হ্যাঁ, হুজুর।
আহম্মদ তনয়ালের জন্য খবরটি নিশ্চিতভাবে একটি সুসংবাদ ছিলো। আনন্দের আতিশয্যে উল্লসিত হয়ে সে লাফ মেরে উঠলো- ইয়া আল্লাহ, হাজার হাজার শুকরিয়া। এরূপ বলেই সে আচকানের পকেট থেকে রূপোর একটি মুদ্রা বের করে সেপাইটির উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়ে বললো- নাও, তোমার সুসংবাদের পুরস্কার।
সেপাইটি মাটি থেকে মূদ্রাটি তুলে জেপে পূরে অভিবাদন জানালো।
তনয়াল সেপাইটিকে উদ্দেশ্য করে বললো- যাও, এর পরের গতিবিধির উপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখগে’।
‘যথা আজ্ঞা’ বলে সেপাইটি কক্ষ থেকে বেরিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার সময় সে দুয়ারটি বন্ধ করে গেলো তনয়ালের নির্দেশে।
ইয়াকুব বেগের যোজনা অনুসারে কাজ এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইয়াকুব বেগকে প্রশংসা করে তনয়াল বলল-আপনার পরামর্শ মতো যোজনা সফল হওয়াতে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বর্তমান এর থেকে উত্তম অন্য কিছুই আশা করতে পারি না আমি।
ইয়াকুব বেগ তনয়ালের প্রশংসায় উজ্জীবিত হয়ে উঠলো। সে নিজের দূরদর্শিতা এবং মহত্ত্ব প্রকাশ করার জন্য বললো- শেরিম তাগায় এখন নিজের ভাগ্নেকে বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য অনেক দূরে নিয়ে চলে যাবে, এটা ধ্রুবসত্য। সে এখন বাবরের বিশ্বাসভাজন হওয়ার জন্য মাথার ঘাম জমিতে ফেলতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না। বাবরকে একবারে আলতাউ পাড় করে নিয়ে যাবে হয়তো। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া।
আহম্মদ তনয়াল উল্লাস উচ্ছ্বাসে আত্মহারা হয়ে পড়লো। কূটিল হাসির রেখা খেলে গেল তাঁর মুখমন্ডলে। উৎফুল্লিত কন্ঠে বললো সে- আমরা এখন বাবর পালিয়ে যাওয়া কথাটাকে তিলটাকে তালটা করে প্রজা সাধারণের মাঝে প্রচার করতে হবে। তারা উপলব্ধি করুক, আসন্ন বিপদের ভয়ে বাবর সন্ত্রস্ত হয়ে কীভাবে তাদের দুর্যোগের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে গেছে। বাবর নিজের নিরাপত্তার জন্য তাদের বাঘের মুখে ঠেলে দিয়ে কীভাবে পালিয়ে যেতে পারল সেই কথা তারা অনুভব করুক। এই খবরটা প্রচার হলে বাবরের উপরে প্রজাসাধারণের আস্থা থাকবে না এবং তখন মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করতে কোনো অসুবিধা হবে না।
ইয়াকুব বেগ দাড়িতে হাত ফিরিয়ে বলল- উড়ো খবর প্রচারের জন্য সব থেকে সুবিধাজনক স্থান হলো জনবহুল বাজার। আমার হাতের মুঠোয় এই কাজের জন্য কয়েকজন উপযুক্ত ব্যবসায়ী রয়েছে। তারা এই কাজ নিশ্চয় সুকলমে সমাধা করতে পারবে।
তনয়াল শংকিত কণ্ঠে বললো- কিন্তু আমরা যে উড়ো খবর প্রচার করছি এই কথা ঘুনাক্ষরেও যেন প্রকাশ না হয়।
ইয়াকুব বেগ তনয়ালকে আশ্বাস দেওয়ার জন্য দৃঢ়কণ্ঠে বললো- আপনি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, বেগ সাহেব। কীভাবে কি করতে হবে তা আমি ভালোভাবেই জানি।
যোজনা অনুসারে ইয়াকুব বেগ উড়া খবর প্রচারের জন্য কয়েকজন লোক নিয়োগ করলো। তারা ব্যস্ততাপূর্ণ বাজারে প্রকৃত ঘটনা বিকৃত করে মিথ্যা ভিত্তিহীন কিছু খবর প্রচার করে দিলো। বনের আগুনের মতো সেই সব খবর জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে পড়লো।
আন্দিজানে এমনিতেও একটার পরে একটা উড়া সংবাদে হুলস্থূল সৃষ্টি করে আসছিলো। নিরন্তরভাবে এগিয়ে আসা শত্রুসেনার ভয়ে জনসাধারণ আগে থেকেই সন্ত্রস্ত ছিলো এবং দুঃশ্চিন্তার কালো মেঘে মানুষের হৃদয় ছেয়ে ফেলেছিলো। যেখানেই ভয় সেখানেই উড়ো খবরের বাজার অধিক উত্তপ্ত হয়। ইয়াকুব বেগ ভাবা মতেই উড়ো খবর প্রচার হয়ে আন্দিজানের জনজীবন সন্ত্রস্ত এবং বিপর্যস্ত করে তুললো। বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ ইতিমধ্যে আন্দিজানে প্রচার হয়ে গিয়েছিলো। ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্রের ফলে উক্ত সংবাদ বিকৃত রূপ ধারণ করলো। ওমর শেখ শত্রুর ভয়ে নদীতে জাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রকৃত ঘটনাটা ইতিমধ্যে এরূপ বিকৃত রূপ ধারণ করেছিলো। এর মাঝে ইয়াকুব বেগ-এর লোকেরা শাহজাদা বাবর শত্রু সেনার ভয়ে আন্দিজানবাসীকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে বলে প্রচার করে দিলো। ফলে আন্দিজানের জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার উপক্রম হলো।
উড়ো খবর প্রচার হওয়ার সাথে সাথে জনবহুল বাজারের একটার পরে একটা দোকান বন্ধ হতে লাগলো। উড়ো খবর কোথা থেকে কে প্রচার করছে, কেউ জানে না। কিন্তু একজনের মুখ থেকে আরেকজন শুনছিলো এবং একজনে আরেকজনের কাছে শুনা কথা একটু বাড়িয়ে বর্ণনা করছিলো। মুখে মুখে প্রচারিত খবর এক সময় এমন বিকৃত রূপ ধারণ করলো যে, শেষ মুহূর্তে মানুষ বলতে লাগলো, শত্রু সেনারা আখসি দখল করেছে এবং বাদশাহকে নদীর পার থেকে জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। ফলে বাদশাহর মৃত্যু হয়েছে। শত্রু সেনার ভয়ে বাবর প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে।
কথাগুলো সহরের দারোগা উজ্জন হোসেন-এর কর্ণগোচর হলো। কথাগুলো শুনে দারোগা সাহেব বিচলিত হয়ে উঠলো। সময়ের খবর সময়ে পাওয়ার জন্য সে অবশেষে গুপ্তচর নিয়োগ করতে বাধ্য হলো।
উড়ো খবরের ফলে সেনা নায়কদের মধ্যেও অস্থিরতা দেখা দিলো। কাশিম বেগের মুখে বাদশাহের মৃত্যু সংবাদ শুনে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত হয়ে উঠেছিলো। উত্তরাধিকারীর পরিবর্তনের ফলে যুদ্ধের চিন্তা ছেড়ে তারা অন্য চিন্তা করতে বাধ্য হলো। বাবর শত্রুর ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে তাঁদের উদ্বেগ উৎকন্ঠা কয়েক গুণ বেড়ে গেলো।
এদিকে গুপ্তচরেরা সহর দারোগা উজ্জন হোসেনকে সময়ের খবর সময়ে দিয়ে যেতে লাগলো। একটার পর একটা উড়ো খবর শুনে সে ভীষণভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠলো। উত্তেজনায় তার মাথা কুমারের চাকের মতো ঘুরতে লাগলো। নিরুদ্ধ আক্রোশে ছটফট করতে লাগলো সে। প্রচার হওয়া খবরগুলো ভিত্তিহীন, মিথ্যা উড়ো খবর বলে সে উপলব্ধি করতে পারলো যদিও মানুষকে প্রকৃত ঘটনা বুঝাতে না পেরে অসহায় এবং উৎকন্ঠিতভাবে সময় অতিবাহিত করতে লাগলো। অবশেষে সে অতিষ্ঠ হয়ে পরিস্থিতির উপরে আলোচনা করার জন্য সেনা নায়ক এবং সভ্রান্ত ব্যক্তিদের ডেকে পাঠাতে বাধ্য হলো।
উজ্জন হোসেনের আহ্বানক্রমে সেনানায়ক এবং সভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ দূর্গের ভেতরে সমবেত হলো। উজ্জন হোসেন সমবেত সেনানায়ক এবং সভ্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে পরিস্থিতির উপরে আলোকপাত করলো- মহাশয়বৃন্দ, আমাদের ওপড় ভাগ্য খুবই অপ্রসন্ন। দূর্গের বাইরে চলছে শত্রুদের তাণ্ডব এবং দূর্গের ভেতরে চলছে দৌড়দৌড়ি। কী কথা, কী বার্তা আমরা তার কোনো হদিশই পাচ্ছি না। সেজন্য আমরা কোনো পরিস্থিতির জন্যই নিজেদের প্রস্তুত করতে সক্ষম হচ্ছি না। আমাদের এই বিশৃংখল পরিস্থিতি দেখেই সম্ভবতঃ শাহজাদা বাবর ক্ষুব্ধ হয়ে দূর্গের ভেতরে না এসে বাইরে বাইরে অন্যত্র চলে গেছে। পরিস্থিতি যেন ক্রমান্বয়ে আমাদের আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আমাদেরও এখন পালিয়ে যাওয়া উচিত হবে নাকি, দারোগা সাহেব? খাজা আবদুল্ল্যা ব্যংগভরা কন্ঠে বললেন।
খাজা আবদুল্ল্যা অশীতপর বৃদ্ধ। তাঁর চুলগুলো বকের পাখের মতো সাদা। বিজ্ঞ হিসাবে তিনি সমগ্র আন্দিজানে সুপ্রসিদ্ধ। আন্দিজানের বেগদেরও তিনি প্রভাবশালী ওস্তাদ। এমনকি মির্জা বাবরেরও তিনি ওস্তাদ। সেজন্য আন্দিজানের বাদশাহ, প্রজা সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা ভক্তির সাথে সমীহ করে চলে। যারজন্য উজ্জন হোসেন তাঁর ব্যংগভরা কণ্ঠে মনে মনে ক্ষুব্ধ হলো যদিও অভদ্রোচিত উত্তর দিতে সাহস পেলো না। সকল অপমান সে নীরবে সহ্য করে মনে মনে দাঁড়িয়ে রইলো।
কাশিম বেগও সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি পরামর্শ দিলেন- শাহজাদা বাবর অবিহনে এই পরিস্থিতিতে আমরা কোনো রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করাটা সমীচিন হবে না। তিনি বেশিদূর না যেতেই আমরা তাঁকে ফিরিয়ে আনাটা উচিত হবে। তিনি ফিরে এলেই আমাদের মাঝে সৃষ্টি হওয়া ভয়, শংকা দূর হয়ে যাবে।
আমরা শাহজাদা বাবরকে ভালোভাবেই জানি। খাজা আবদুল্ল্যা সমবতে সুধীবৃন্দের উদ্দেশ্যে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো ভীরু তিনি কখনও নন। এ কথা আমি নিঃসন্দেহে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি। আমাদের বিশ্বস্ততা এবং আজ্ঞাবহতা প্রমাণ করতেই হয়তো তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এদিকে তাঁর এই অন্তর্দ্ধানের সুযোগ নিয়ে একদল দুষ্ট লোক সাধারণ জনতাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কিছু ভিত্তিহীন উড়ো খবর প্রচার করতে প্রবৃত্ত হয়েছে। আপনারা শুনে আচরিত হবেন যে, সেই দুষ্টচক্র আমরা বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রচার করছিলো। নিশ্চয় এর অন্তরালে গুরুতর রহস্য এবং ষড়যন্ত্র নিহিত রয়েছে।
সত্য সব পরিস্থিতিতেই সত্য। সাধারণ জনতা যে সত্য অনুধাবন করতে সক্ষম ছিল না, খাজা আবদুল্ল্যা নিজের বিচার বিবেচনা এবং দূরদর্শিতা দিয়ে সেই সত্যটাকে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই সত্যটাকেই তিনি জনতার সন্মুখে প্রকাশ করে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাঁদের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
আমার ধারণা হচ্ছে, মৌলানা সাহেবের অনুমানই সঠিক। উজ্জন হোসেন খাজা আবদুল্ল্যাকে সমর্থন করে বললো- তিনি নিশ্চয় পরিস্থিতির ভাবগতি পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এভাবে বলেই তিনি সমবেত সুধীবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানালেন- আসুন, আমরা মৌলানা সাহেব-এর পরামর্শ মতোই কাজ করতে প্রবৃত্ত হই।
আমার কথা স্পষ্ট এবং সোজাসুজি। খাজা আবদুল্ল্যা শান্ত ধীর কন্ঠে বললেন- আমরা এখন দ্বেষ, অভিমান, বিভেদ ভোলে একত্রিত হয়ে শাহজাদা বাবরের হাত শক্তিশালী করাটা খুবই প্রয়োজন। এই কাজের মধ্যে আমাদের মঙ্গল নিহিত রয়েছে। শাহজাদা বাবরের হাত শক্তিশালী করতে পাড়লে আমরা শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারব। যদি আমরা শাহজাদা বাবরকে সহযোগিতা করি তাহলে কোনো দুষ্ট শক্তি আমাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। যদি আমরা ভুল বুঝাবুঝির বশবর্তী হয়ে বাবরের দিকে পিঠ দিই, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা অনিশ্চিয়তার করাল গ্রাসে পতিত হব এবং তখন নিজের পা-য় নিজেরা কুড়োল মারার মতো কথা
খাজা আবদুল্ল্যার পরামর্শ উজ্জন হোসেনের তেমন মনোমত হল না যদিও একটি কথা ভেবে সে ভয়বিহ্বল হয়ে উঠলো এবং খাজা আবদুল্ল্যাকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিলো। খাজা আবদুল্ল্যার কথা মতোই যদি পরিস্থিতি পরিবর্তন হয় এবং শাহজাদা বাবরই যদি ফারগানার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়, তাহলে সহর দারোগা হিসাবে তাঁর আজকের এই কিংকর্তব্যবিমুঢ়তার পরিণতি কী হতে পারে সে কথা ভেবে সে সজাগ হয়ে উঠলো। লোকেরা নিশ্চয় তাঁর আজকের এই আচরণের বিষয়ে বাবরকে অবগত করবে এবং তখন সে এই অপরিণামদর্শিতার জন্য সহর দারোগার পদ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
সেজন্য উজ্জন হোসেন বাবরের বিশ্বাসভাজন হওয়ার জন্য খাজা আবদুল্ল্যার পরামর্শকে সন্মান জানিয়ে বললো- মৌলানা সাহেব, আপনার পরামর্শ অনুসারে আমি শাহজাদা বাবরকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। আপনার অনুমতি পেলে আমি নিজেই বাবরকে ফিরিয়ে আনতে যাব। আমাদের সেনানায়কদের বিশ্বস্ততার বিষয়ে আমি শাহজাদা বাবরকে অবগত করব এবং দূর্গে ফিরে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাব। আমি কথা দিচ্ছি, যেকোনো উপায়ে তাঁকে দূর্গে ফিরিয়ে আনব।
খাজা আবদুল্ল্যা উজ্জন হোসেনের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- আপনার সংকল্প নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য, দারোগা সাহেব। তবে আপনি শাহজাদাকে ফিরিয়ে আনার জন্য যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ সহর দারোগা হিসাবে এর চেয়ে গুরু দায়িত্ব এখন আপনার উপরে ন্যস্ত। সহরের শান্তি রক্ষার ভার যেহেতু আপনার উপরে, সেজন্য আপনি দৌড়াদৌড়ি বন্ধ করে সহরে শান্তি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। বদমাশদের চিনাক্ত করে শাস্তি প্রদানেরও ব্যবস্থা করুন। এই সব করতে পারলেই আপনি বাবরের অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
উজ্জন হোসেনের কানে কথাগুলো শেলের মতো বিদ্ধ হলো যদিও পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সে মাথা নত করে খাজা আবদুল্ল্যার কথাগুলো শুনতে বাধ্য হলো।
* * *
গ্রীষ্ম কাল। আকাশ-বাতাস সূর্যের প্রচণ্ড কিরণে উত্তপ্ত করে তুলছিলো। শেরিম তাগায়র সাথে একদল অশ্বারোহী নিয়ে বাবর উজগন্তের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের ঘোড়ার ক্ষুরের চাপে রাস্তার ধূলাকণা কুয়াশার মতো বাতাসে উড়ছিলো। উত্তপ্ত ধূলাকণাগুলো অশ্বারোহীদের মুখমন্ডল আগুনের শিখার মতো দগ্ধ করছিলো।
অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাবরের শরীর থেকে অবিশ্রান্তভাবে ঘাম ঝরছিলো। অসহ্য পিপাসায় তাঁর অণ্ঠকণ্ঠ শুকিয়ে মরুভূমির মতো খড়খড়ে হয়ে উঠেছিলো।
গতকাল এ সময় বাবর আন্দিজানের রাজপ্রাসাদ-এ বসে আয়াসে সময় অতিবাহিত করছিলেন, কিন্তু কোথা থেকে আচম্বিতে ঝাপটা ঝঞ্ঝা এসে সব আরাম আয়াস, বিলাস কল্পনা নিষ্ঠুর হাতের থাবা মেলে উড়িয়ে নিয়ে গেলো। এই মুহূর্তে যেন গতকালের সবকিছু অতীত হয়ে গেছে। বদল হয়ে গেছে তাঁর জীবনের দৃশ্যপট। শস্যশ্যামলা ধরণীর সুশীতল নির্মল সমীর, আয়নার মতো স্বচ্ছ জল, বিলাস কল্পনা সবকিছু রাতের স্বপ্নের মতো মিলিয়ে গেছে নিয়তির নিষ্ঠুর হাতের স্পর্শে। উত্তপ্ত ধূলি ধূসর রাস্তা এবং বিক্ষিপ্ত ভাবনাই বাবরের উপলব্ধিতে শেলের মতো আঘাত করতে লাগলো।
বাবরের উপলব্ধি হলো, যেন পরীর দেশের কাহিনীর মাঝে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝঞ্জা এসে তাঁকে কিশোরসূলভ আনন্দময় জীবন থেকে বিচ্ছন্ন করে নিরালম্বভাবে তৃণকূটার মতো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। উড়ন্ত ধূলাকণা যেন সেই প্রচণ্ড ঝঞ্ঝার ধূলাকণা। পিতৃকে নদীর জলে ফেলে দেওয়া শক্তিও যেন এই ঝঞ্ঝারই শক্তি। তাঁর সাথে আসা পঞ্চাশজন অশ্বারোহীর ছায়া যেন সেই ঝঞ্ঝারই প্রতিচ্ছবি। ঝঞ্জা নিষ্ঠুর হাতে যেন সবাইকে মর্দিত দলিত করে চলেছে।
ক্ষুধা পিপাসার প্রাবল্যে বাবরের মাথা চক্কর কাটতে লাগলো। তার অনুমান হলো, যেন কোনো অপদেবতা তাঁকে পথভ্রষ্ট করে বিপদ সংকুল পথের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।
তাঁরা উজগন্তগামী পথের নামাজগাহ পর্যন্ত আসার পরে বরফ আবৃত পাহাড়ের শিখর দৃষ্টিগোচর হতে লাগলো। চোখেমুখে স্পর্শ করতে লাগলো শীতল বাতাসের মৃদু স্পর্শ। অত্যধিক গরমের পরে শীতল মৃদু স্পর্শে সবাই স্বচ্ছন্দ অনুভব করতে লাগলো।
বাবর শুকনো খড়খড়ে ওষ্ঠ খুলে শেরিম তাগায়কে গতি বাড়ানোর জন্য আহ্বান জানালেন- সবাই গতি বাড়ান, তারাতারি করুন।
শেরিম তাগায় পেছনে পড়ে থাকা সেনাদের গতি বাড়ানোর জন্যে দাবড়ি দিতে পেছন দিকে ঘুরে চাইলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু দূরে একজন সংবাদবাহক অশ্বারোহী দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁদের দিকে আসা তার চোখে পড়লো। শেরিম তাগায় বাবরকে ডেকে বললো- শাহজাদা, একটু অপেক্ষা করুন। কে একজন ঘোড়া ছুটিয়ে আমাদের দিকে আসতেছে।
বাবরসহ সব কয়জন অশ্বারোহী ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন। তাঁরা পেছন দিকে ঘুরে তাকানোর সাথে সাথে অল্পদূরে একজন সংবাদবাহককে ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁদের দিকে আসতে দেখলেন। তাঁরা উৎকণ্ঠিতভাবে সংবাদবাহকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
একটু পরেই সংবাদবাহক তাঁদের কাছে এসে উপস্থিত হলো। সংবাদবাহক ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে অভিবাদন জানিয়ে খাজা আবদুল্ল্যা প্রেরণ করা চিঠিটা সসভ্রমে বাবরের হাতে দিলো।
গোলভাবে মুড়ানো চিঠিটা হাতে নিয়ে বাবর রেশমির ফিতা খুলে নুয়ান কুশল দাশের দিকে বাড়িয়ে বললেন- পড়ুন।
নুয়ান কুশল দাশ বাবরের নির্দেশে সবাই যাতে শুনতে পারে তেমন উচ্চস্বরে চিঠিটা পড়তে লাগলো এবং সবাই উৎকণ্ঠিতভাবে চিঠির বক্তব্য শুনতে লাগলো।
চিঠির বিষয় বস্তু ছিলো এরকম- চিঠিটায় প্রথমে আন্দিজানের বেগদের বিশ্বস্ততার বিষয়ে লিখা ছিলো। এর উপরেও সাবধানতাপূর্বক ইংগিত দেওয়া ছিলো যে, সহরে ভিত্তিহীন কিছু উড়ো খবর প্রচার হচ্ছে। যেমন- মির্জা বাবর সংকট দেখে পালিয়ে গেছে। বাদশাহ ওমর শেখকে শত্রু সেনারা নদীর জলে ঠেলে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। একদল দুষ্টচক্র প্রজাসাধারণকে বাবরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করতেছে। বাবরের অনুপস্থিতির জন্য বিশ্বস্ত বেগবর্গ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছে। সেজন্য বাবর অতিসত্বর আন্দিজানে ফিরে যেতে হবে।
চিঠির বক্তব্য শুনে শেরিম তাগায় উল্লাস-উচ্ছ্বাসে ঝাঁপ মেরে উঠলো। সে উল্লসিত কণ্ঠে বললো- আমি আপনাকে এই কূটচক্রীদের কবল থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছি, শাহজাদা। দূর্গ বর্তমান সেই কূটচক্রীদের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। সেজন্য আপনি কোনোমতেই সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না। যদি প্রকৃতপক্ষে বেগবৃন্দ আপনার অনুগত তাহলে তাঁদের এখানে ডেকে পাঠান। তাঁরা এখানে এসে আপনার প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দিক।
মির্জা বাবর শত্রুর ভয়ে পালিয়ে গেছে! এই খবর সমগ্র আন্দিজানে কানে কানে প্রচার হয়ে গেছে। একটি সহর থেকে আরেকটি সহরে-একটি গ্রাম থেকে অন্য একটি গ্রামে? তাঁকে ভীরু কাপুরুষ ভেবে প্রজাসাধারণ ঘৃণায় নাক কোঁচাচ্ছে? এই সব কথা ভেবে বাবরের কান-মাথা গরম হয়ে উঠলো। নিরুদ্ধ আক্রোশ উত্তেজনায় তিনি ম্যালেরিয়া রোগীর মতো ঠকঠক্ করে কাঁপতে লাগলেন।
বাবর আক্রোশ উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলেন- না না, আমার পালিয়ে যাওয়ার মোটেই ইচ্ছে নেই। আমি শত্রুর ভয়ে পালিয়ে যাব না। আমি তাদের হঠকারিতার সমুচিত উত্তর দিব। এভাবে বলেই বাবর ঝাঁপ মেরে ঘোড়ার পৃষ্ঠে চড়ে আন্দিজানের দিকে ঘোড়া ছোটালেন।
বাবরকে আন্দিজান অভিমুখে ঘোড়া ছুটানো দেখে শেরিম তাগায় ব্যস্ত হয়ে উঠলো। সে দ্রুত বাবরের কাছে এসে হতাশ ও উত্তেজিত কণ্ঠে বললো- আমায় বিশ্বাস করুন, শাহজাদা। এটা শত্ৰুৰ চাতুরালির বাইরে অন্য কিচ্ছু নয়। তারা আপনাকে জালে ফেলতে কৌশল করতেছে। আপনি আন্দিজান গেলেই তারা আপনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আপনি এই পরিস্থিতিতে কোনোমতেই আন্দিজান যাওয়াটা ঠিক হবে না, শাহজাদা।
আমি নিজে সব কথার খবর নেব। বাবর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- আমি তাদের দেখিয়ে দিব যে, মির্জা বাবর ভীরু নয়। শত্রুর সাথে মোকাবিলা করতে তিনি ভয় পান না। চলুন, সবাই আন্দিজান ফিরে চলুন।
বাবর ঘোড়ার লাগাম ঢিল দিয়ে সজোরে ঘোড়ার পিঠে কশাঘাত করলেন। প্রচন্ড বেগে ঘোড়া আন্দিাজন অভিমুখে ধাবিত হলো। বাতাসের ঝাঁপটা এসে বাবরের বুকে আঘাত করতে লাগলো। ফলে কিছুক্ষণ আগের সেই অস্বস্তি থেকেও যেন তিনি কিছুটা স্বস্তি পেলেন। প্রগাঢ় প্রশান্তিতে তাঁর হৃদয় ভরে গেলো। তাঁর উপলব্ধি হলো, যেন সেই আতংকজনক ঝঞ্জা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রাস্তা থেকে অদৃশ্য হয়ে পড়ছে।
সূর্যাস্তের সাথে সাথে বাবর আন্দিজান দূর্গে এসে পৌঁছোলেন। সাধারণতঃ যেসব রাস্তায় অন্যদিন সন্ধ্যেয় প্রচুর জন সমাগম হয়- কলরব, গুঞ্জন, সোরগোলে প্রতিটা অলিগলি মুখর হয়ে থাকে, সেই সব রাস্তা, প্রতিটা অলিগলি জনশূন্য। নিজান পড়ে আছে প্রতিটা অলিগলি। সহরটা যেন নীরবে কবরের ভেতরে শোয়ে রয়েছে। অস্বস্তিকর সীমাহীন নীরবতা বিরাজ করতেছে প্রতিটা রাস্তা, অলিগলিতে। দোকানপাট বন্ধ। চতুর্দিকে বিরাজ করছে অস্বস্তিকর শূন্যতা। প্রেতপুরীর মতো নীরব নিস্তব্ধ এবং ভয়ঙ্কর সত্তা যেন সহরটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
সহরে পৌঁছোনোর সাথে সাথে শেরিম তাগায় বাবরের সুরক্ষার জন্য চিন্তিত হয়ে উঠলো। বাবর সবার আগে আগে যাচ্ছিলেন। তাঁর সুরক্ষার জন্য শেরিম তাগায় ব্যস্ত হয়ে উঠলো। বাবরকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য সে সেনাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইংগিত করলো।সেনারা ইংগিত পেয়ে এগিয়ে এসে বাবরকে ঘিরে ধরলো। বাবরের উপলব্ধি হলো, যেন তাঁকে আবার বন্দি করা হচ্ছে। ঝঞ্ঝা যেন তাঁকে আবার চেপে ধরছে। সেনাদের ব্যুহের মাঝে আবদ্ধ হয়ে তিনি আবার অস্বস্তিতে ভোগতে লাগলেন।
বাবর অসহ্য বিরক্তিতে ঘোড়ার পেটে সজোরে গোড়ালি দিয়ে গোতা মেরে সুরক্ষা ব্যূহ ভেদ কবে বের হয়ে এলেন।
বাবরের এই কার্যের জন্য শেরিম তাগায় সজাগ হয়ে উঠলো। সে দ্রুত এগিয়ে এসে বাবরের সাথে সাথে এগোতে লাগলো। তার মনের ভাব, অন্তত লোকে দেখুক, সে কীভাবে নিজের ভাগ্নেকে ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করার জন্য যত্ন করতেছে।
শেরিম তাগায়র এই কার্যের জন্য বাবর বিরক্ত হলেন যদিও তিনি মুখ খুলে কোনো কথা বললেন না। তিনি বিরক্তি ভরা দৃষ্টিতে শেরিম তাগায়-এর দিকে তাকিয়ে বিরক্তি ভাব প্রকাশ করলেন শুধু। শেরিম তাগায় বাবরের দৃষ্টির অর্থ বুঝেও না বুঝার ভান করে তাঁর সাথে সাথে এগিয়ে আসতে লাগলো।
নুয়ান কুশল দাশ নামক সেনাটি শেরিম তাগায়র এই কার্যে বিরক্ত হয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে শেরিম তাগায়র ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে বললো- বেগ সাহেব, শাহজাদা বাবরকে সবার আগে আগে যেতে দিন। জনতাকে শাহজাদাকে দেখার সুযোগ করে দিন। জনতা নিশ্চয় শাহজাদাকে দেখার জন্য খিরকির ফাঁক দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারা দেখুক, ষড়যন্ত্রকারীরা প্রচার করা উড়ো খবর ভিত্তিহীন এবং মিথ্যা।
কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা যদি কোনো ফাঁক দিয়ে শাহজাদার উপরে তীর নিক্ষেপ করে? শেরিম তাগায় উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল।
তবুও প্রয়োজন নেই। নুয়ান কুশল দাস দৃঢ়কণ্ঠে বলল- শাহজাদারও সবার আগে আগে যাওয়ার ইচ্ছা। আল্লাহই নিশ্চয় তাঁকে রক্ষা করবেন।
নুয়ান কুশল দাসের দৃঢ়তা এবং শাহজাদা বাবরের মুখমন্ডলে বিরক্তির ছায়া প্রত্যক্ষ করে শেরিম তাগায় হতবুদ্ধি হয়ে পিছিয়ে এলো।
অশ্বারোহী দলের আগে আগে এসে বাবর অক্ষতভাবে দূর্গের আর্ক(সহরের মাঝভাগে নির্মাণ করা দূর্গ, যেটা শাসকদের বাসস্থানের মতো) পর্যন্ত পৌঁছোলেন।
খাজা আবদুল্ল্যা, কাশিম বেগ সমন্বিতে অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ আর্কের অভ্যন্তরে বাবরের আগমন অপেক্ষায় অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলেন। বাবর আর্কের দুয়ারমুখে পৌঁছোনোর সাথে সাথে তাঁরা সবাই বাবরকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আর্কের বাইরে বেরিয়ে এলেন। বাবর তাঁদের পাশে এসে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে খাজা আবদুল্ল্যাকে অভিবাদন জানালেন।
খাজা আবদুল্ল্যা হর্ষোৎফুল্লিত হয়ে বাবরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন- বেটাকে সহায় করা উচিত। বেটাকে সান্ত্বনা দেওয়া প্রয়োজন।(খাজা আবদুল্ল্যা বাবরকে বেটা বলে সম্বোধন করতেন)। উপস্থিত সবাই সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য তন্ময় হয়ে উপভোগ করতে লাগলেন।
আনন্দের আতিশয্যে আবদুল্ল্যার চোখে ভরা পুকুরের মতো জল ছলছল করতে লাগলো। তিনি কোনোমতে চোখের জল সম্বরণ করে শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বললেন- আমরা দুঃখিত, শাহজাদা। আমাদের মহামান্য বাদশাহ এই সংসারে নেই। আমরা বর্তমান এতিম (পিতৃ মাতৃহীন)। আপনিই আপনার মরহুম আব্বাজানের অভাব পূরণ করতে হবে। আমরা সবাই আপনার তত্ত্বাবধানে থেকে নিজেদের ধন্য মানবে।
সেনা নায়কদের মাঝ থেকে কেউ একজন এগিয়ে এসে গুরু-গম্ভীর কন্ঠে বললো- আমরা সবাই আপনার সেবায় আত্মনিয়োগ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ, শাহজাদা। শুধু আপনার আদেশের অপেক্ষায় আমরা অধীরভাবে অপেক্ষারত।
বাবরের হৃদয় আকাশ যেন স্নিগ্ধ গোলাপী আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। ভাদ্র মাসের বর্ষাগধুর আকাশের স্থানে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো শরতের কারুকার্য খচিত স্বর্ণিল আকাশ। কৃতজ্ঞতায় তাঁর কন্ঠ গদ্গদ্ হয়ে উঠলো। তিনি কোনোমতে উচ্চারণ করলেন- ধন্যবাদ।
সবাই আর্কের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অগ্রসর হলেন। ঠিক সেই সময়ে কোথা থেকে ইয়াকুব বেগ এসে তাঁদের সাথে মিলিত হলো। বাবর ফিরে আসার খবর পেয়ে সে উৎকন্ঠিত হয়ে উঠেছে এবং তার উপরে যাতে কোনো রকমের বিরূপ সন্দেহ পোষণ করা না হয়, সেজন্যই সে বদান্যতা প্রকাশের জন্য বাবরকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দৌড়ে এসেছে।
আন্দিজান যখন সমগ্র ফারগানার রাজধানী ছিলো, তখন ঠান্ডা কুঠরি(এখনকার শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কোঠার মতো বিশেষভাবে তৈরি কোঠা।)তে দরবার বসছিলো।রাজধানী আন্দিজান থেকে আখসিতে স্থানান্তর করার পর থেকে আন্দিজানের সেই কারুকার্যখচিত প্রাসাদের ভব্যতা ও গুরুত্ব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। যারজন্য দরবার কক্ষটি একপ্রকার পরিত্যক্ত অবহেলিত অবস্থায় পতিত হয়ে
ছিলো।
সেজন্য শাহজাদা বাবরকে আন্দিজান ফিরিয়ে আনার জন্য লোক পাঠিয়ে তাঁকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার প্রস্তুতি হিসাবে খাজা আবদুল্ল্যা দরবার কক্ষটি সুবিন্যস্তভাবে সাজিয়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর নির্দেশ অনুসারে ইতিমধ্যে কক্ষটি সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিলো। যেখানে রাজসিংহাসন সংস্থাপিত ছিলো সেখানে মেঝের উপরে নরম গদিযুক্ত তুর্কিস্থানী কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। ফলে দরবার কক্ষটি ভব্য এবং সুন্দর হয়ে উঠেছিলো।
বাবর দরবার কক্ষে প্রবেশ করে কক্ষের ভব্যতা এবং সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়লেন। ফুলের মতো কোমল মনোরম বেগুনি রঙের কার্পেটের উপর দিয়ে হেঁটে আসার সময় তাঁর কাশি উঠে গেলো। কারণ তার গলাটা ক্ষুধাপিপাসায় শুকিয়ে একেবারে খড়খড়ে হয়ে উঠেছিলো। তবুও তিনি কোনো রকম বিশ্রাম না নিয়ে ধীর মন্থর গতিতে হেঁটে এসে রাজসিংহাসনে উপবেশন করলেন।
বাবর সিংহাসনে উপবেশন করার পর উপস্থিত সেনানায়ক এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ নিজের নিজের আসনে উপবেশন করলেন।
প্রচলিত প্রথা অনুসারে খাজা আবদুল্ল্যা ফাতিহা পাঠ করলেন- হে আল্লাহ, বাদশাহকে রক্ষা করুন।
উপস্থিত পাত্রমিত্র সমন্বিতে গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সমস্বরে বলে উঠলেন- হে আল্লাহ, বাদশাহকে রক্ষা করুন।
সমবেত কন্ঠের ফাতিহা পাঠ শুনে বাবরের মুখমন্ডলে কৃতজ্ঞতা ও শোকের মিশ্রিত অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো। সপ্রশংস দৃষ্টিতে তিনি সমবেত সবার দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। তাঁর দুচোখ কৃতজ্ঞতায় ছলছল করতে লাগলো। চোখের জল লুকোতে তিনি মেঝের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন।
খোদাবন্দ হুকুমের মালিক। খাজা আবদুল্ল্যা গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলতে লাগলেন- মৃত বাদশাহের দক্ষতা ও মর্যদা অনুসারে যথাযোগ্য সন্মান প্রদর্শন করে আখসিতে শেষকৃত্য সমাপন করা হয়েছে।আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা সেই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। তার থেকেও দুর্ভাগ্য যে, প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য আমরা মৃত বাদশাহের জন্য শোকতাপ প্রকাশ করা থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে। বর্তমান আমাদের মাঝে এক প্রকারের বিপদসংকুল সন্ধিক্ষণ উপস্থিত। শত্রু এসে প্রায় আন্দিজানের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছে। সেজন্য শত্রুর সাথে মোকাবিলা করার এক গধুর দায়িত্ব এসে পড়েছে আমাদের উপরে। যারজন্য আমরা বিলম্ব না করে আমাদের নবনিযুক্ত বাদশাহের হাতে শাসনের বাঘডোর ন্যস্ত করা উচিত।
প্রথমে ইয়াকুব বেগ খাজা আবদুল্ল্যার প্রস্তাব সমর্থন করে বললো- আপনি একেবারে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মৌলানা সাহেব। আমরা এখন এই মুহূর্তে মির্জা জহিরুদ্দিন বাবরকে ফারগানার ন্যায়সংগত বাদশাহ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
বাবর তীক্ষ্ণ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে ইয়াকুব বেগের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। ইয়াকুব বেগের আন্তরিকতাপূর্ণ কন্ঠস্বর, আনুগত্য প্রকাশের ভংগী, শান্তশিষ্ট সমাহিত মুখমন্ডল, সন্মুখের ভগ্ন দন্ত দু’টির ফাঁক দিয়ে বের হয়ে আসা হাসির ঝলক, উৎকণ্ঠা প্রভৃতি লক্ষ্য করে বাবরের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে গেলো। ইয়াকুব বেগ মোগল বেগদের মাঝে সবচেয়ে প্রভাবশালী বেগ হিসাবে সবার কাছে পরিচিত। বাবর দেখা স্বপ্নগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্ন ছিলো, পিতৃর সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেনা নায়কদের উপরে নেতৃত্ব এবং একজন প্রকৃত মুসলমান যোদ্ধার মতো সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে শত্রুর উপরে বিজয় সাব্যস্ত করা। বর্তমান পিতৃর অনুপস্থিতিতে তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার সময় সমাগত। ইয়াকুব বেগের বক্তব্যে তাঁর মনে সাহস এবং শক্তি সঞ্চার হলো। উদ্যম এবং সাহসের সাথে তাঁর হৃদয়ে সঞ্চারিত হলো অদম্য উচ্চাকাংক্ষা।
ইয়াকুব বেগের পরে অন্যান্য সেনা নায়কগণও একজনের পর আরেকজন বাবরকে বাদশাহ হিসাবে স্বীকৃতি দিলেন। বাবরের স্বপ্নগুলো ভাদ্রমাসের কালো মেঘের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠলো। এক অনাবিল আনন্দ উল্লাসে তাঁর দেহমন ভরে গেলো। ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য তিনি যে মানসিক এবং শারীরিক দুর্ভোগ ভোগ করতে হয়েছে সেই সব দুঃখকষ্ট যেন শীতের কুয়াসার মতো কোথায় বিলীন হয়ে গেলো। ভবিষ্যতে তিনি একজন শক্তিশালী শাসকরূপে প্রতিষ্ঠিত হবে- সবাই তাঁর আদেশ নির্বিবাদে পালন করবে! এই সব কথা ভাবতেই এক প্রকার গভীর প্রশান্তিতে তাঁর দেহমন ভরে গেলো।
ছেলেবেলা থেকেই নিজেকে একজন দক্ষ প্রভাবশালী সেনাধ্যক্ষ হিসাবে ভেবে বাবরের ভালো লাগতো। তার প্রপিতামহ তৈমূরের ক্রুরতার বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন, কিন্তু প্রপিতামহের মতো নিষ্ঠুর হওয়ার ইচ্ছা তাঁর মোটেই ছিলো না। প্রজাসাধারণের মনে ক্ষতচিহ্ন সৃষ্টি করাটা উচিত নয় বলে তিনি ছেলেবেলা থেকেই উপলব্ধি করতেন। তিনি পূর্বপুরুষের মতো ক্রুরতা প্রদর্শন করতে চান না— তিনি যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে মহান বিজয় সাব্যস্ত করতে চান। অত্যধিক ইচ্ছা শক্তির দ্বারা প্রভাবশালী হিসাবে সুনাম অর্জন করতে চান। তিনি স্বেচ্ছাচারি শক্তির বিরুদ্ধে মহান বিজয় সাব্যস্ত করতে চান নিজের বলবিক্রমের দ্বারা। যেগুলো দেখে স্বেচ্ছাচারি শক্তিসমূহ আতংকে কেঁপে উঠবে।
এরূপ কল্পনায় বিভোর হয়ে থাকতেই দারোগা উজ্জন হোসেন দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন। তিনি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে ক্ষমা প্রার্থনার ভংগীতে বললেন- জাহাপনা, আপনার গোলাম কর্তব্যের তাগিদে সময় মতো আপনাকে স্বাগত জানাতে আসতে পারিনি।তারজন্য অধীনকে কৃপা করুন। আন্দিজানে বর্তমান ভিত্তিহীন মিথ্যা উড়ো খবর প্রচার হচ্ছে। আমি সেই উদণ্ড বিদ্রোহীদেরকে গ্রেপ্তার করার জন্য ব্যস্ত ছিলাম। এইমাত্র তাদের একজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছি, জাহাপনা।
দরজার দিকে সবার দৃষ্টি প্রসারিত হলো। ইয়াকুব বেগের মুখমণ্ডল উৎকণ্ঠায় রক্তশূন্য হয়ে উঠলো। এতক্ষণের প্রদীপ্ত মুখমণ্ডলে প্রকট হয়ে উঠলো দুঃশ্চিন্তার কালো ছায়া। সহর দারোগা তাহলে আহম্মদ তনয়ালকে গ্রেপ্তার করলো নাকি? আহম্মদ তনয়ালকে গ্রেপ্তার করলে সব কথা প্রকাশ হয়ে পড়বে! সে নিজেও তখন গ্রেপ্তার হতে হবে! ইয়া আল্লাহ! এখন উপায়?
ইয়াকুব বেগ ভয়বিহ্বল হয়ে দেয়ালস্থিত খিড়কিগুলোর দিকে তাকাতে লাগলো। কিন্তু খিড়কিগুলো খুবই সরু। একজন লোক আসা-যাওয়া করার জন্য অনুপযুক্ত। সর্বোপরি তার অবস্থান থেকে অনেকটা দূরে অবস্থিত খিড়কিগুলো। খিড়কির পাশে আবার বসে রয়েছে হৃষ্টপুষ্ট থুলথুল বেগ। থুলথুল বেগ প্রকৃতপক্ষেই স্থূল। তার উপরেও সে খুবই প্রভাবশালী। তাকে অতিক্রম করে খিড়কির মাঝ দিয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। সেজন্য আসন্ন মৃত্যু ভয়ে ইয়াকুব বেগ নেতিয়ে পড়লো।
ইয়াকুব বেগ এইসব কথা ভেবে থাকতেই দরজার সেপ্রান্ত থেকে গুরুগম্ভীর উত্তেজিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো- আমার হস্তের বন্ধন খুলে দিন। আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ।
আল্লাহকে ধন্যবাদ!ইয়াকুব বেগ মনে মনে বললো- এ আহম্মদ তনয়ালের কন্ঠস্বর নয়।
কিছুক্ষণ পরেই একজন হৃষ্টপুষ্ট লোক নিয়ে দু’জন সিপাহি দরবার কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলো। লোকটির পরণে ছিলো সুতার দীঘল ঢিলা জামা এবং হাত দু’টি পিঠের পেছন দিকে বাঁধা ছিলো।
এ দেখছি দরবেশ গোব! ইয়াকুব বেগ এবং সভাসদগণ সমবেত কণ্ঠে বলে উঠলেন।
দরবেশ গোব আন্দিজানের ভিস্তিয়ালা(জল বিতরণকারী বিষয়া) তার মাংসল গলা ষাঁড়ের মতো সন্মুখের দিকে বের হয়ে থাকার জন্য সবাই তাকে গোব অর্থাৎ ষাঁড় বলে সম্বোধন করতো। তাকে সবাই গরিবের বন্ধু বলেও জানে। ধনী প্রভাবশালী ব্যক্তির চেয়ে তিনি গরিব লোকদের অধিক গুরুত্ব দেন। আল্লাহ তায়ালা গরিবের প্রতি অধিক দয়াশীল বলে প্রকাশ্যে বলে থাকে। প্রয়োজনে তিনি গরিবের হয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদও করে।
খরা দিনে অনেক কয়েকটি বাগানে জল সিঞ্চন করতে হয়। ফলে তখন জলের অভাব হয়। তখন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গরিবের জলের লাইন থেকে জল বের করে নেওয়ার চেষ্টা করে। একমাত্র দরবেশ গোবই তখন গরিবের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে বলে- আপনারা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শুধু নিজের কথা বেশি চিন্তা করেন। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, আল্লাহর চোখে ধনী-গরিব সবাই সমান।
শুধু প্রতিবাদ করাই না, দরবেশ গোব প্রতিবাদ করে এই দুর্নীতি বন্ধও করে দিয়েছে বর্তমান। ফলে গরিবরা তাঁকে মনে প্রাণে ভালোবাসে এবং প্রকাশ্যে সমর্থনও করে। এই কার্যের ফলে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও পেটে পেটে তাঁকে ঘৃণা করে। বিশেষ করে উজ্জন হোসেন তাঁকে অনেক দিন থেকে খারাপ পায় এই কাজরে জন্যে।
দরবেশ গোবের হাত দু’টি পিঠের পেছন দিকে বাঁধা ছিলো।। সে প্রথমে বাবরের দিকে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করার পরে খাজা আবদুল্ল্যার দিকে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করলো।
বিচার করুন, জাহাপনা, বিচার করুন। দরবেশ গোব মাথা নত করে আত্মসন্মান সহকারে বলতে লাগলো- আমি বিদ্রোহী নই, জাহাপনা! বাজারে একজন সিপাহি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো- শুনছেন নাকি গোব, বাদশাহ ওমর শেখ বোলে নেশা খেয়ে মাতাল হয়ে নদীর পাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং মির্জা বাবর শত্রুর ভয়ে আলতাউ পালিয়ে গেছে?
এ সব একেবারে মিথ্যা কথা। বাবর বারুদের মতো জ্বলে উঠলেন।
এ সব যে মিথ্যা তার সন্ধান আমি পরে পেয়েছি, জাহাপনা। আমি সেপাইর কাছ থেকে শুনা কথা কাউকে বলিনি, জাহাপনা। আমার প্রতি কৃপা করুন, জাহাপনা। দরবেশ গোব দুই তিন হাত এগিয়ে এসে আঁঠু গেড়ে বসে বললো- আমি নিজেও জানি এসব ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা। জাহাপনা, আপনার মুখমণ্ডলে কূটিলতার লেশমাত্র নেই। ফুলের মতো পবিত্র আপনার মুখমণ্ডল। আপনার মুখমণ্ডল মদগর্বীদের মতো কখনও নয়। বাজারে যখন দৌড়াদৌড়ি লেগে দোকানপাট বন্ধ হচ্ছিলো, আমি স্বীকার করি, তখন আমি ভয়-বিহ্বল হয়ে পড়ছিলাম। তাই বলে আমি উড়ো খবর প্রচার করিনি, জাহাপনা। কৌতূহল নিবারণের জন্য একজনকে শুধু জিঞ্জাসা করেছিলাম- ভাই, তুমি শুনেছ নাকি, মানুষগুলো কি বলছে? লোকটি বলেছিলো- হ্যাঁ শুনেছি। আমি আবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম- এসব সত্যি নাকি? ঠিক তখনই সহর দারোগার গুপ্তচরগণ আমাকে গ্রেপ্তার করেছে।
না না, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। উজ্জন হোসেন দৃঢ়কন্ঠে প্রতিবাদ করে উঠলেন- তুই শুধু জিজ্ঞাসা করার কথা বলছিস; কিন্তু তুই শুধু জিজ্ঞাসাই করিসনি, প্রচারও করেছিলি।
আমাকে কোরআন শরিফ দিন। পবিত্র কোরআনের শপত খেয়ে বলব, আমি উড়ো খবর প্রচার করিনি।দরবেশ গোব দৃঢ়কণ্ঠে বললো।
অপরাধী বলছে, তাকে কোরআন শরিফ দেওয়া হোক। ইয়াকুব বেগ বাবরের দিকে দৃষ্টি প্ৰসারিত করে ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গীতে বললো- জাহাপনা, এই অপবিত্র আপনার বিশ্বাসী ভৃত্য হলে, নিশ্চয় উড়ো খবর প্রচার করা সেপাইটিকে ধরে সহর দারোগার হাতে সোপর্দ করতো। এ নিশ্চয় অপরাধী। এ-ই উড়ো খবর প্রচার করে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে।
ইয়া আল্লাহ! দরবেশ গোবের মুখ থেকে শুধু একটি শব্দই বের হলো।
বাবরের দিকে চেয়ে ইয়াকুব বেগ দু’পাটি ভাঙা দাঁত বের করে বললো- জাহাপনা, আপনার পিতা এই পাপীকে অনুগ্রহ করে ভিস্তিয়ালার পদে নিয়োগ করেছিলেন। এই পাপী সেই পূণ্যাত্মা মৃত বাদশাহের প্রতি অপমানজনক খবর প্রচার করেছে। এই পাপীর উপরে গজব বর্ষিত হোক। জাহাপনা, আমি আবার জোর দিয়ে বলছি, এই পাপী-ই মিথ্যা খবর প্রচার করেছে। আমাদের পূণ্যাত্মা বাদশাহকে আল্লাহই বেহেস্ত নসিব করুন। মদিরার নেশায় মাতাল হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে আমাদের প্রয়াত বাদশাহ! আঃ, কি রকম ঘৃণনীয় অপবাদ!
ইয়াকুব বেগ এভাবে বলে বাবরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলো। বাবরের ক্লান্ত নিবোধ দৃষ্টি কৌতুক কৌতূহলে আচ্ছন্ন। শরতের স্বর্ণময় কারুকার্যখচিত আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো শুভ্র মেঘের মতো নির্বোধ কৌতুকাচ্ছন্ন দৃষ্টির অন্তরালে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছিলো অপমানের গ্লানি এবং রোষের অভিব্যক্তি। ইয়াকুব বেগ ভাবলো, এই কোমল হৃদয়ের বাদশাহকে প্রবঞ্চনা না করে কাকে প্রবঞ্চনা করবে! আশা ভরা দৃষ্টিতে সে বাবরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে বাবরের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো।
এ নিজেই মিথ্যা খবর প্রচার করছে বলে স্বীকার করেছে। একজনকে জিজ্ঞাসা করা এবং বলার মাঝে কী পার্থক্য আছে, জাহাপনা? মজিদ বেগ আক্ষেপের সুরে বললো।
মিথ্যা খবর প্রচার করা অবস্থায় যখন ধরা পড়েছে, তখন এ শান্তি পাওয়াই উচিত। আলী দোস্ত বেগও কথাটায় সমর্থন জানালো।
কাশিম বেগ মনে মনে বসে সবার কথা-বার্তা মনযোগ দিয়ে শুনছিলেন। হঠাৎ তাঁর শেরিম তাগায় বলা কবুতরের কথা মনে পড়ে গেলো। তাঁর অনুমান হলো, সেই রহস্যময় কবুতরের সাথে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর নিশ্চয় কোনো দূরভিসন্ধিমূলক যোগসূত্র আছে। সেজন্য কাশিম বেগ মৌনতা ভংগ করে প্রস্তাব রাখলো- এই ঘটনার আবার অনুসন্ধান করলে কেমন হয়, জাহাপনা?
কাশিম বেগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে মজিদ বেগ বলে উঠলো- দীর্ঘদিন অনুসন্ধান চালানোর জন্য আমাদের সময় কোথায়? শত্রু দরজা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। এ রকম পরিস্থিতে অনুসন্ধানের নামে সময় অপচয় করাটা মোটেই ঠিক হবে না। এদিকে যুদ্ধের সময়ে উড়ো খবর প্রচার করে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করা, শাসকের বিরুদ্ধে মান হানিকর মন্তব্য করা লোকদের দেশের শত্রু হিসাবে গণ্য করা হয়। এ রকম দেশদ্রোহীদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করাটা মোটেই উচিত নয়, জাহাপনা।
উড়ো খবর প্রচার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য এ-কে সাধারণ শাস্তি প্রদান করা হোক, জাহাপনা। উজ্জন হোসেন পরামর্শ দিলেন।
সাধারণ শাস্তির কথা শুনে দরবেশ গোবের মুখমণ্ডলে মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে এলো। কারণ তখনকার দিনে সাধারণ শাস্তির অর্থ ছিলো মৃতুদণ্ড। সে আঁঠুর ওপরে ভর করে ঘেসড়িয়ে ঘেসড়িয়ে বাবরের কাছে এসে বাষ্পারুদ্ধ কণ্ঠে মিনতি করে বললো- জাহাপনা, আমি অপরাধী নই। আমি অপরাধীর রোষের শিকার হচ্ছি। আমার প্রতি দয়া করুন, জাহাপনা। আমার পাঁচটা ছেলেমেয়ে। তাদের আপনি আশ্রয়হীন করবেন না।
দরবেশ গোবের দু’হাত পিঠির দিকে বাঁধা ছিলো এবং চোখের জল দাড়ি বেয়ে গড়িয়ে টপ টপ করে জমিতে পড়ছিলো।
বয়োবৃদ্ধ একজন লোকের চোখে জল দেখে বাবরের ক্রোধ, অপমানবোধ, আক্ষেপ কর্পূরের মতো উড়ে গেলো। সুগভীর মমতায় তাঁর মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন হয়ে উঠলো। তিনি খাজা আবদুল্ল্যার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন। চোখের দৃষ্টি দ্বারা ‘গরিবকে দয়া করুন’ এই কথা বলার জন্য যেন তিনি খাজা আবদুল্ল্যার কাছে আবেদন জানাইতে ছিলেন।
কিন্তু খাজা আবদুল্ল্যা বাবরের দৃষ্টির অর্থ বুঝেও না বুঝার ভান করে কোনো রকমের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে মৌনতা অবলম্বন করলেন।
এদিকে বেগবৃন্দ নিজেদের মতে অটল-অচল হয়ে দরবেশ গোবের মৃতুদণ্ডের জন্য আবেদন জানাতে লাগলো।
যে লোকের পাঁচটা ছেলেমেয়ে সে ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত। ইয়াকুব বেগ তিরস্কারের সুরে বললো।
দরবেশ গোব প্রকৃতপক্ষেই বিদ্রোহীদের নেতা। উজ্জন হোসেন হাত নাচিয়ে নাচিয়ে বলতে লাগলো- যে সেপাই মৃত বাদশাহের বিরুদ্ধে অপমানজনক কথা প্রচার করছিলো, তার দু’পাটি দাঁত ভেঙে দেওয়াটা উচিত ছিলো। মরহুম বাদশাহ নেশা খেয়ে মাতাল হয়ে নদীতে পড়ে মরেছে! এ কেমন ঘৃণনীয় কথা! এই অপবাদ যে সেপাইটি প্রচার করছিলো তাকে ধরে বেঁধে আমাদের কাছে আনলে না কেন?
নিবিড় রাতের ছায়ার মতো অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো দরবেশ গোবের মুখমণ্ডলে। চরম বিপর্যয়ের অশুভ সংকেতে সে নিরুদ্ধ ক্ষোভ অপমানে উত্তেজিত হয়ে উঠলো। আবেগ বিগলিত কণ্ঠে সে আবেদন জানালো- আমার বাদশাহ! বিচার করুন। আমি আপনার পিতার আজ্ঞাধীন ভৃত্য। আপনি এই বেগ(একটা গোটের সেনানায়ক)দের এখনো চিনতে পারেন নি। এরা আমার ওপরে প্রতিশোধ নিচ্ছে। গরিবের হয়ে আমি এদের বিরুদ্ধে কথা বলি সেজন্য আমার ওপরে এদের আক্রোশ। এদের বিশ্বাস করবেন না, জাহাপনা। এই বেগদের বাইরে আন্দিজানের প্রতিজন লোককে আমার চরিত্রের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করুন……. প্রতিজন বিশ্বাসী লোকই আমাকে জানে। আমি নিৰ্দোষ, জাহাপনা…
গোবের এই কাতর কণ্ঠের আবেদন বেগদের চিল্লাচিল্লির শব্দে চাপা পড়ে গেলো। অরণ্যরোদনে পর্যবসিত হলো তাঁর হৃদয় ভাঙা কাতর আবেদন।
আলী দোস্ত বেগ নিজের আসন ছেড়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে অভিযোগ ভরা কণ্ঠে আস্ফালন করে উঠলেন- বেগবৃন্দ বেইমান, শুনলেন তো জাহাপনা? আপনি দেখলেন তো, কী রকম কপট অন্তরের লোক এই দরবেশ গোব?
ইয়াকুব বেগ বাবরের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে তোতার মতো মুখস্থ বলে যেতে লাগলো- এই দরবেশ গোব শুধু দেশরই শত্রু নয়, রাজপরিয়াল এবং সভ্রান্ত লোকদেরও শত্রু। এ বেগদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনতাকে প্ররোচিত করে পক্ষান্তরে দেশকে শত্রুর হস্তে অৰ্পণ করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। এ দেশের, দশের, জাতির শত্রু।
এর মনোভাব খুবই খারাপ। উজ্জন হোসেন ঘৃণায় নাক সিটকিয়ে বললো।
বাবর নির্বিকারভাবে উজ্জন হোসেনের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। বাবরের নির্বিকার ভাব লক্ষ্য করে উজ্জন হোসেন উৎসাহিত হয়ে উঠলো। দরবেশ গোবকে দরবারে নিয়ে আসা সিপাহিদের উদ্দেশ্য করে সে বললো- অনেক হয়েছে। এ-কে এখন এখান থেকে নিয়ে যাও।
আদেশ পাওয়া মাত্র সিপাহি দু’জন বাজপাখির মতো এসে দরবেশ গোবকে বগলদাবা করে ধরে শূন্যে তুলে টেনে হিঁচড়িয়ে ঠেলা- গোঁতা মারতে মারতে দরজার দিকে নিয়ে গেলো।
যাওয়ার সময় দরবেশ গোব আক্রোশে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলে গেলো- আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমার সন্তানদের হা-হুতাশ এই আত্মগর্বী বেগদের ধ্বংস ডেকে আনবে। আমার নির্দোষ রক্ত এদের সর্বনাশ করবে।
দরবেশ গোবের ক্ষুব্ধ আক্রোশ ভরা কন্ঠস্বরে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুললো। ধীরে ধীরে তাঁর ক্রুদ্ধ করুণ কন্ঠস্বর খীণ থেকে খীণতর হয়ে ইথারের সাথে মিলিয়ে গেলো।
দরবেশ গোবের অভিযোগ ভরা অভিশাপ বাবরের হৃদয়ে কাঁটার মতো বিদ্ধ হতে লাগলো। দরবেশ গোবের করুণ বিষণ্ণ মুখমন্ডলের কথা ভেবে ক্ষত-বিক্ষত হতে লাগলো তাঁর হৃদয়।
বাবরের মনে পড়ে গেলো, সকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাসমূহ। সকাল থেকে দুপর পর্যন্ত তাঁর হৃদয়ে শংকা এবং ভয়ের লেশমাত্র ছিল না। সকাল থেকে দুপর পর্যন্ত তিনি শায়ের আলীশের নবাইর ফটো দেখে তাঁর মতো বিখ্যাত ও মহান কবি হওয়ার স্বপ্নে মসগুল হয়ে ছিলেন। তাঁর অনুমান হলো, সেইসব ঘটনা যেন অতীত হয়ে গেছে। দুপর পর্যন্ত তাঁর হৃদয় যেন আকাশের মতো নির্মল ছিলো। কোনো পাপ বা শংকার লেশমাত্র ছিল না তাঁর হৃদয়ে। হৃদয়টা যেন রৌদ্রস্নাত নির্মল আকাশের মতো উদ্ভাসিত হয়ে আছিলো। হঠাৎ কোথা থেকে এক খণ্ড মেঘ উড়ে এসে যেন তাঁর হৃদয় আকাশ ঝাঁপটে ধরেছে।
কিন্তু নির্মল আকাশে হঠাৎ কালো মেঘ কোথা থেকে সঞ্চার হলো? দরবেশ গোবের মৃত্যুদণ্ডের জন্য দাবি জানানো বেগদেরকে বাবরের মনে গর্জনরত কালো মেঘের মতো অনুমান হলো। দয়া মমতাহীন ঝঞ্জা এবং কালো নিকষ নিরন্ধ্র অন্ধকার যেন অক্টোপাছের মতো তাঁকে থাবার ভেতর আবদ্ধ করে নিষ্পেষণ করতে লাগলো। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। সিংহাসন এবং রাজমুকুট যেন দরবেশ গোবের মতো নিরীহ লোকের রক্তের জন্য লালায়িত। এক অজানা শংকাই বাবরের হৃদয় নির্মমভাবে নিষ্পেষণ করতে লাগলো।
এদিকে বেগদের আবেদন প্রেতের উল্লাসের মতো ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো- এই অপবিত্রকে শিরচ্ছেদ করা হোক। মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হোক। আমরা দরবেশ গোবের মৃত্যুদণ্ড কামনা করছি………..ইত্যাদি ইত্যাদি……
বাবরের চোখে তখনও দরবেশ গোবের শ্বেত দাড়ি বেয়ে টপটপ করে চোখের জল ঝরে পড়া দৃশ্য ঝলমল করতেছিলো। বাবর ভাবতে লাগলো, সতেজ, সুস্থ, সবল একজন লোককে শুধু একটা দোষের জন্য প্রাণহীন মাংসপিণ্ডে পরিণত করাটা উচিত হবে? উচিত হবে নাকি হত্যা করার জন্য আদেশ প্রদান করাটা? দরবেশ গোবের প্রতি বেগদের আক্রোশমূলক মনোভাবের কারণ কি? বেগবর্গ তাঁকে প্রবঞ্চনা করেনি তো? এই বেগদেরই কেউ একজন তাঁর পিতাকে ঠ্যালা মেরে নদীতে ফেলে দেয়নি তো? এই বেগদেরই একজন একদিন তাঁকেও হত্যা করবে নাতো? এ রকম হাজারটা প্রশ্ন তাঁর মনের মাঝে উঁকি মারতে লাগলো।
ওস্তাদ! বাবর উৎকন্ঠিত কণ্ঠে খাজা আবদুল্ল্যাকে সম্বোধন করলেন।
খাজা আবদুল্ল্যা বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করতে পারলেন। তিনি বাবরের কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন- আপনি কঠিন হয়ে থাকুন, জাহাপনা।
বলুন, কি করব? বাবর উৎকন্ঠিতভাবে ফিসফিস করে সমিধান প্রার্থনা করলেন।
দণ্ডাদেশ ঘোষণা করুন।
আপনিও সেটাই করতে চান নাকি? বাবরের কণ্ঠে বিস্ময় মিশ্রিত সংশয়।
আন্দিজান তথা সমগ্র ফারগানার ভাগ্য যেখানে নিহিত হয়ে রয়েছে, সেখানে দরবেশ গোবের মতো লোকের মূল্য কি? খাজা আবদুল্ল্যা উপদেশের স্বরে ফিসফিস করে বললেন- এই সংকটময় মুহূর্তে বেগদের বিরুদ্ধে যাওয়াটা মোটেই ঠিক হবে না। হুকুম দিন- মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিন।
খাজা আবদুল্ল্যার পরামর্শ অনুসারে সম্পূর্ণ অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবর দরবেশ গোবের মৃত্যু দন্ডাদেশ ঘোষণা করলেন- দরবেশ গোবের শিরশ্ছেদ করা হোক।
পরের দিন ঢোল-খোল-নাগারার শব্দের মাঝে দরবেশ গোবের মৃত্যু দন্ডাদেশ কার্যকর করা হলো।
ঠিক সেদিনই অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে আহম্মদ তনয়াল চুপে চুপে আখসির দিকে রওয়ানা হয়ে গেলো।
* * *
উশের আশেপাশে অবস্থিত শ্যামল সমতল প্রান্তরসমূহ হঠাৎ মুখর হয়ে উঠলো। নৈঃশব্দের মাঝে সশব্দের প্রকাশে প্রাণের সঞ্চার হয়ে অচল প্রান্তর সচল হয়ে উঠলো। মানুষের দৌড়াদৌড়ি, কলরবে মুখর হয়ে উঠলো সমগ্র প্রান্তর। নির্জীব জড় যেন হঠাৎ প্রাণ পেয়ে সজীব হয়ে উঠলো।
আন্দিজান থেকে প্রচুর জাঁকজমক ছাউনির সরঞ্জাম, আসবাব উটের পৃষ্ঠে বোজাই দিয়ে এনে বুরাতন পাহাড়ের পাদদেশে জমা করা হলো। কলকল স্বরে বয়ে চলা আরিক নদীর তীরে সেসব আসবাব, সরঞ্জাম দিয়ে দৃষ্টিনন্দন সুদৃশ্য ছাউনি নির্মাণ করা হলো। বুরাসায় নদীর পাড়েও শত শত তম্বু দেখা যেতে লাগলো। বুরাতান পাহাড় থেকে পালে পালে দুম্বা ধরে এনে জবাই করে বড় বড় ডেগে সুস্বাদু খাদ্য প্রস্তুত হতে লাগলো— প্রস্তুত হতে লাগলো সিক কাবাব। বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগলো তার মনপ্রাণ মাতানো সুঘ্রাণ।
এইসব আয়োজন ছিলো একমাত্র বাবরের আগমন উপলক্ষ্যে। অবশেষে আকাংক্ষিত দিন এলো। সাথে সাথে বাড়লো ব্যস্ততা, উৎকণ্ঠা।
মির্জা বাবরের জন্য অপেক্ষারত ব্যক্তিদের মাঝে বাস্তবিদ ফজিলুদ্দিন অন্যতম ছিলেন। ফজিলুদ্দিন একজন সুদক্ষ বাস্তবিদ তথা ভাস্কর্য শিল্পী। একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী হিসাবেও প্রখ্যাত ছিলেন তিনি। সেদিনকার দিনটা ছিলো ফজিলুদ্দিনের ভাগ্য নির্ণয়ের দিন।
ফজিলুদ্দিন আগে আখসিতে ছিলেন। বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যুর পর তিনি বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে আন্দিজান এসেছিলেন। প্রকাশ থাকে যে, বাবর প্রথম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ছল চাতুরী করে ইয়াকুব বেগ উজির-এ-আজমের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলো। উজির-এ-আজমের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে সে অনেক দিন ফজিলুদ্দিনকে পরিকল্পিতভাবে বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়নি। ফলে ফজিলুদ্দিন আন্দিজান এসেও বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
কয়েক মাস পরে ফজিলুদ্দিন বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পায়।
ইয়াকুব বেগ উজির-এ-আজম হলেও সে মনে মনে বাবরকে ঘৃণা করতো। সেজন্য সে সুযোগ বুঝে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তলে তলে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো, কিন্তু কাশিম বেগের তৎপরতার জন্য এক সময় সেই ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে। ফলে শাস্তির ভয়ে ইয়াকুব বেগ আন্দিজান থেকে পালিয়ে যায়। তবে, পালিয়ে গিয়েও সে শেষ রক্ষা করতে সমর্থ হয়নি। সে পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে কাশিম বেগের নেতৃত্বে একদল সেনা তার পশ্চাদধাবন করে এবং সিরদরিয়ার পাড়ে সংঘটিত সন্মুখ সমরে ইয়াকুব বেগকে হত্যা করে।
ইয়াকুব বেগ বাবরের প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য আহম্মদ তনয়াল বাবরের বিরুদ্ধে রচিত ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ করে দিয়েছিলো। কারণ আহম্মদ তনয়াল এবং ইয়াকুব বেগের মাঝে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা নিয়ে মনোমালিন্য চলছিলো। সেই মনোমালিন্যই শেষে প্রতিহিংসার রূপ নিয়েছিলো এবং ইয়াকুব বেগের জীবনাবসান হয়েছিলো।
ইয়াকুব বেগ নিহত হওয়ার পরে কাশিম বেগ উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত হয় এবং ফজিলুদ্দিনকে বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করার অবসর করে দেয়। প্রথম সাক্ষাতের দিনই বাবর তাঁকে বুরাতান পাহাড়ের উপরে উপাসনা গৃহ নির্মাণের দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন।
বাদশাহ ওমর শেখের রাজত্ব কালেও ওমর শেখ ফজিলুদ্দিনকে দিয়ে অনেক সৌধ নির্মাণ করিয়ে ছিলেন। সময়ে সময়ে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে অর্থাভাবের জন্য নক্সা প্রস্তুতের পরেও তিনি অনেক নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফজিলুদ্দিন বাবরের সাথে সাক্ষাতের প্রথম দিনই বাবর আক্ষেপ করে বলেছিলেন- অশুভ যুদ্ধ সব তছনছ করে দিয়েছে। এখন যুদ্ধ থেমেছে, সেজন্য আমি আব্বাজানের অসম্পূর্ণ কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণ করতে চাই।আপনি আমাকে এ বিষয়ে সহায় করতে হবে।
সেদিনই বাবর বুরাতান পাহাড়ের উঁচু মালভূমির উপরে একটি মসজিদ (উপাসনা) গৃহ নির্মাণের দায়িত্ব ফজিলুদ্দিনকে অর্পণ করেছিলেন।
কয়েক মাসব্যাপী অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ফজিলুদ্দিন উপাসনা গৃহ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছেন। গৃহ নির্মাণের কাজ কয়েক মাস আগে সম্পন্ন হয়েছে যদিও নানান ব্যস্ততার জন্য গৃহটি পরিদর্শনের জন্য বাবর আসতে পারেন নি। আজকে বাবর প্রথমবারের জন্য গৃহটি পরিদর্শনের জন্য আসার কথা। সেজন্যই এতো ব্যস্ততা ও উৎকণ্ঠা।
গৃহটি বাবরের পসন্দ অপসন্দের উপরে নির্ভর করবে ফজিলুদ্দিনের ভবিষ্যত। যদি নির্মাণ কার্য পসন্দ হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও তিনি এর থেকেও বিশাল যোজনার কাজ পাওয়াটা একপ্রকার নিশ্চিত। কিন্তু যদি অপসন্দ হয়? গৃহ নির্মাণের সময় এই প্রশ্ন মাঝে মাঝেই ফজিলুদ্দিনের মনে উদয় হয়ে তাঁকে হতাশ করে তুলছিলেন। তখন তিনি বাবরের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সব উজাড় করে দিয়ে গৃহ নির্মাণের কাজে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। সংশয়, উৎকন্ঠা, চিন্তা-ভাবনার মাঝে তিনি প্রচুর অধ্যবসায় এবং নিষ্ঠার বিনিময়ে গৃহ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করে তুলেছেন।
আজকে ফজিলুদ্দিনের অগ্নি পরীক্ষা। এতো দিনের অধ্যবসায় এবং নিষ্ঠার মূল্যায়ন হবে আজ। সেজন্য বাবর আসার প্রাক্মুহূর্তে তিনি তৎপর হয়ে উঠেছেন। প্রতিটা আয়োজন সুরুচিপূর্ণ এবং মর্যদাপূর্ণ করে তুলতে তিনি আত্মনিয়োগ করেছেন। মোট কথায় বলতে গেলে, ফজিলুদ্দিন যেন এই মুহূর্তে একটি যন্ত্রে পরিণত হয়েছেন।
গৃহটি যতখানি সম্ভব সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য ফজিলুদ্দিন সুদৃশ্য দলিচা এবং তোশকের জন্য বাবরের নিকট পত্র লিখে পাঠিয়ে ছিলেন। রাজ দরবার থেকে সৈন্যরা সেই সব ঈপ্সিত জিনিষপত্র এনে বুরাতান পাহাড়ের পাদদেশে ছাউনি পেতে রয়েছে।
ফজিলুদ্দিন নিজে পাহাড়ের পাদদেশে এসে সেই সব জিনিষপত্র মালভূমির উপরে আনার ব্যবস্থা করলেন। রাজকর্মচারিদের জিনিষপত্রগুলো মালভূমির উপরে বয়ে নেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করে তিনি নিজেও তাদের সাথে সেগুলো বয়ে আনতে লাগলেন।
পাহাড়ের উপরে উঠা ঢালু পথে হাঁটতে অনভ্যস্ত রাজকর্মচারিগণ উপরে উঠে আসার সময় পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল এবং তারা ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে লাগলো।
রাজকর্মচারিদের মুখিয়াল ছিলো একজন হৃষ্টপুষ্ট লোক। সামান্য ওজনের কাশগরি সুরাহি (পানীয় রাখার জন্য লম্বা মুখের এক প্রকার পাত্র।) একটা নিয়ে উপরে উঠতে প্রত্যেক দশ পা হাঁটতেই সে বিশ্রাম নিতে লাগলো। যেকোনো মুহূর্তে সুরাহি পড়ে গিয়ে ভাঙতে পারে এই আশংকা করে ফজিলুদ্দিন তার হাত থেকে সুরাহিটা নিজের হাতে এনে মুখিয়াল লোকটিকে বগলদাবা করে উপরে তুলে আনতে লাগলেন। এক সময় জিনিষগুলো উপরে আনা শেষ হলো এবং ফজিলুদ্দিন উপাসনা গৃহটি সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
মুখিয়াল লোকটি রঙবিরঙের দলিচা বারান্দার সিঁড়ির উপরে পাড়তে চেয়েছিলো। ফজিলুদ্দিন তাকে কাজটা করতে নিষেধ করলেন।কারণ সিঁড়ির উপরে নক্সা অঙ্কন করা ছিলো। পাথরে কাটা নক্সা যেকোনো সুন্দর দলিচার চেয়ে কম সুন্দর ছিল না। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময় নক্সাগুলো যাতে বাবরের চোখে পড়ে তার জন্যই তিনি নক্সাগুলো না ঢেকে খোলাভাবে রাখার ব্যবস্থা করলেন। এইভাবে প্রত্যেকটা কাজের উপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে তিনি উপাসনা গৃহটা রাজকর্মচারিদের সহযোগে সুদৃশ্য করে সাজিয়ে তুললেন। কাজ সম্পূর্ণ করে মুখিয়ালসহ অন্যান্য রাজকর্মচারিরা উপাসনা গৃহ থেকে বেরিয়ে এসে এক খন্ড প্রস্তরের উপরে বিশ্রাম নিতে বসলো।
পাহাড়ের উপর থেকে উশ সহরের আশপাশের এলাকা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। পরিশ্রান্ত মুখিয়াল রাজকর্মচারিটি পাহাড়ের পাদদেশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে সচকিত হয়ে উঠলো এবং স্প্রিঙের মতো লাফিয়ে উঠে বললো- ওই যে, দেখ, তিনি আসছেন।
ফজিলুদ্দিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাজের ভুলত্রুটিগুলো নিরীক্ষণ করছিলেন। মুখিয়াল কর্মচারিটির কথা তাঁর কানেও পৌঁছোল। তিনি দ্রুত বারান্দার প্রান্তে এগিয়ে এসে পাহাড়ের পাদদেশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
পাহাড়ের পাদদেশে দু’দল অশ্বারোহী সমদল করে এগিয়ে আসা তাঁর চোখে পড়ল।
প্রথম দলটির আগে আগে শ্বেত ঘোড়ায় চড়ে বাবর আসছিলেন এবং দ্বিতীয় দলটির আগে আগে আসছিলো তিনটি ঘোড়ায় টানা একটি সুদৃশ্য বগি।
সেই সুদৃশ্য বগিতে কে কে থাকতে পারে ফজিলুদ্দিন একবার মনে মনে অনুমান করার চেষ্টা করলেন। বগিটায় বাবরের মা কুতলুগ নিগার বেগম থাকাটা নিশ্চিত। কিন্তু তিনি একাই এসেছেন, না সাথে আর কেউ রয়েছে? যদি রয়েছে, তাহলে কে হতে পারে! অন্য কেউ এলে নিশ্চয় বাবরের বড় বোন খানজাদা বেগম আসছেন!
খানজাদা বেগমের মুখ ফজিলুদ্দিনের মানসপটে ভেসে উঠার সাথে সাথে তিনি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন। এক মিঠা শিহরণ খেলে গেলো তাঁর দেহমনে। তাঁর এই কয়দিনের ব্যস্ততা শুধু বাবরের আগমন প্রতিক্ষা-ই ছিলো, না এর সাথে প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিলো খানজাদা বেগমের আগমন বার্তা? ফজিলুদ্দিন প্রশ্নটা একবার নিজের মনে যাচাই করার চেষ্টা করতেই উৎকণ্ঠিত চিৎকারে তাঁর চিন্তার ডোঁর ছিড়ে গেলো। ওই যে, তাঁরা দাঁড়িয়ে পড়েছে! মুখিয়াল কর্মচারিটি উচ্চকণ্ঠে চিৎকার বলে উঠলো।
মুখিয়াল কর্মচারিটির চিৎকার শুনে ফজিলুদ্দিন উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। তিনি নিজেও সমগ্র সমদলটি জান্নাত আরিক পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি বিশেষ ছাউনির নিকটে দাঁড়িয়ে পড়া লক্ষ্য করলেন।
ছাউনিটা খাটি রুপোর খুঁটি দিয়ে নির্মিত। নানা রকমের ফুল এবং সুদৃশ্য দলিচা দিয়ে সুসজ্জিত করে রেখেছে ছাউনিটা।পানাহারের সাথে আরামের পর্যাপ্ত সুব্যবস্থাও রয়েছে ছাউনিতে।
নওজোয়ান মির্জা বাবর ছাউনিতে আরাম করে পরের দিন উপাসনাগৃহ পরিদর্শন করতে আসবেন ভেবে ফজিলুদ্দিন পরিকল্পিতভাবে সব সুব্যবস্থা করে রেখেছেন ছাউনিটায়। কিন্তু ফজিলুদ্দিন ভাবা মতে হলো না। বাবরের আগমনের পরে এক ঘণ্টা পার না হতেই বাবরের দেহরক্ষী সর্দারটি চারজন সৈনিক নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে পাহাড়ের উপরে উঠে এলো। সে রাজকর্মচারিদের মুখিয়ালকে উদ্দেশ্য করে বলল- জাহাপনা এখনই এখানে আসবেন। পাল্কী কোথায়?
রাজকর্মচারিদের মুখিয়াল সহায়ের আশায় ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকাল।
ফজিলুদ্দিন রেশমি কাপড়ের ঢিলা জামা পড়ে ছিলেন। তিনি জামা শক্ত করে বেঁধে বুকে হাত রেখে দেহরক্ষী সর্দারের সন্মুখে দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে বললেন- ক্ষমা করবেন, হুজুর।
কী? দেহরক্ষী সর্দার ফজিলুদ্দিনের কথার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকাল।
ফজিলুদ্দিন কথাটা বুঝিয়ে বললেন- আমি ভেবেচিন্তে দেখেছি, পাহাড়ের উপরে পাল্কী নিয়ে আসাটা কোনোমতে সম্ভব হবে না। একজন লোকের জন্যই আসাযাওয়া করা অসুবিধা। উপাসনা গৃহের জন্য ইঁটগুলো উপরে তুলে আনতে একজনের পেছনে আরেকজন শ্রেণিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তুলে আনতে হয়েছে। পাল্কী একটি বয়ে আনতে অতিকমেও চারজন লোক একসাথে আসতে হবে। কিন্তু এই ঢালু পথে চারজন লোক একসাথে উঠে আসা সম্ভব হবে না।
দেহরক্ষীর সর্দার মনোযোগ সহকারে পথের অবস্থা নিরীক্ষণ করলো। সরু সংকীর্ণ পথ। একজন লোকের জন্যই আসাযাওয়া করাটা অসুবিধা। একসাথে চারজন লোক পাল্কী নিয়ে উঠে আসা সম্ভব হবে না বলে তারও ধারণা হলো। সেজন্য সে রাজকর্মচারির মুখিয়ালকে উদ্দেশ্য করে বললো- আচ্ছা, হেঁটে আসার ব্যবস্থাই করতে হবে। এভাবে বলেই সে রাজকর্মচারির মুখিয়ালকে সাবধান করে দিলো- কিন্তু এখানে যেন প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত একজন লোকও না থাকে তার ব্যবস্থা করুন।
উপরে উঠে আসা সরু পথটি উপাসনা গৃহের সন্মুখে এসে শেষ হওয়ার আগে কয়েকটি প্রশস্ত সমতলের সমান্তরালভাবে কয়েকটি ছোট ছোট মালভূমি পার হয়ে আসতে হবে। সেজন্য ফজিলুদ্দিন মালভূমি কয়টির উপরে জলের পাত্রের সাথে পরিচারক নিয়োগ করার কথা ভাবলেন। যাতে প্রয়োজনে আরোহীরাঁ জল পান করতে পারেন এবং হাতমুখ ধোয়ার জন্যও ব্যবহার করতে পারেন। ভাবামতেই তিনি মুখিয়াল রাজকর্মচারিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- প্রয়োজনে জল পাওয়ার জন্য মালভূমি কয়টিতে জলের পাত্রের সাথে পরিচারক নিয়োগের ব্যবস্থা করুন।
ঠিক আছে, আমি এখনই জলের ব্যবস্থা করতেছি। মুখিয়াল লোকটি ব্যস্তভাবে বললো।
নিয়মমতে দেহরক্ষী সর্দার নিজে নিচে গিয়ে বাবরকে সাথে নিয়ে আসা প্রয়োজন, কিন্তু সরু ঢালু পথে দু’বার আসাযাওয়া করাটা একজন হৃষ্টপুষ্ট লোকের জন্য খুবই কঠিন কাজ। সেজন্য তিনি পথটা ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে হতাশ হয়ে পড়লেন। পথটা নিরীক্ষণ করে তাঁর ধারণা হলো, তাঁর পক্ষে দু’বার আসাযাওয়া করাটা একেবারে অসম্ভব। সেজন্য সে দু’জন সৈনিকের সাথে ফজিলুদ্দিনকে নিচে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের সুরে বললো- জ্বনাব, আমি দু’বার আসাযাওয়া করাটা খুবই কষ্টকর কাজ হবে। তার উপর পথের বিষয় আমার তেমন জ্ঞানও নেই। আপনি পথটা ভালভাবে চেনেন, আসাযাওয়া করার অভ্যেসও রয়েছে। সেজন্য আপনি দু’জন সৈনিক নিয়ে নিচে গিয়ে জাহাপনাকে এগিয়ে নিয়ে আসুন।
সর্দারের অনুরোধ মর্মে ফজিলুদ্দিন নিচে নেমে এলেন। দেহরক্ষী সর্দার লোকটি একখন্ড মিহিভাবে পালিছ করা পাথরের উপরে বসে মুখের ঘাম মুছতে লাগলো।
নির্মাণ কার্য চলার সময়ে ফজিলুদ্দিনকে প্রতেকদিন কয়েকবার উঠানামা করতে হয়েছে। সেজন্য তিনি উঠানামা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন। সিঁড়িবেয়ে উপরে উঠার জন্য পাতল জোতা বেশি উপযোগী। সেজন্য তিনি রবারের পাতল জোতা ব্যবহার করতেন। বরাবরের মতো পাতল জোতা পরে তিনি পাহাড়ের পাদদেশে নেমে এলেন।
বাবর ছাউনীতে ছিলেন না। তিনি ছাউনীতে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই দলবল নিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্যসম্ভার উপভোগ করার জন্য বেড়াইতে গিয়েছিলেন। সভ্রান্ত বেগদের উপরেও তাঁর সাথে গিয়েছিলেন মাতৃ কুতলুগ নিগার বেগম এবং ভগ্নী খানজাদা বেগম। তাঁরা দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
ফজিলুদ্দিন ছাউনীতে এসে কিছুক্ষণ জিরানোর পরে পাহাড়ের পূর্ব এবং দক্ষিণ দিক ঘুরে প্রথম দলটি নিয়ে বাবর ছাউনীতে ফিরে এলেন। তিনি ছাউনীতে আসার কিছুক্ষণ পরেই দ্বিতীয় দলটা এসে ছাউনীতে পৌঁছোলেন।
দ্বিতীয় দলে ছিলেন মহিলাগণ। সাদা কাপড় পরিহিতা কুতলুগ নিগার বেগম কস্তুরি রঙের ঘোড়ায় এবং কালোর সাথে লাল রঙ মিশ্রিত সুন্দর রেশমি কাপড় পরে বাদামী রঙের ঘোড়ায় চড়ে আসছিলেন বাবরের ভগ্নী খানজাদা বেগম।
খানজাদা বেগমের মুখমন্ডল ওড়না দিয়ে আবৃত ছিলো। দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসূলভ বসার ভংগি দেখেই ফজিলুদ্দিন তাঁকে খানজাদা বেগম বলে চিনতে পারলেন। খানজাদা বেগমকে দেখেই ফজিলুদ্দিনের হৃদয়ে আবেগ ব্যাকুলতা জেগে উঠলো। উত্তেজনায় তাঁর দেহের সিরা উপসিরা ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো। চোখে জেগে উঠলো বিস্ময় মুগ্ধতা। জলের উপরের শেওলার মতো তাঁর হৃদয়ের গভীর প্রদেশ থেকে ভেসে উঠলো কিঞ্চিত স্মৃতির টুকরো। তাঁর মন বাস্তব ছেড়ে অতীতের সোনালি দিনে উড়ে গেলো-
খানজাদা বেগম তাঁর অদ্বিতীয় বিস্ময়কর গুণ দিয়ে কয়েকবার ফজিলুদ্দিনকে আশ্চর্যচকিত করে তুলছিলেন।
চার বছর আগে ফজিলুদ্দিন ওমর শেখের নির্দেশে হিরাত থেকে আন্দিজান পর্যন্ত দূর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন।তখনই তাঁর খানজাদা বেগমের সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো। খানজাদা বেগমের বয়স তখন মাত্র ষোল বছর। তাঁর উদ্ভিন্ন যৌবন তখন আধাফুটা কলির মতো প্রস্ফুটিত হতে সাজগোছের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন মাত্র। যৌবনের সুষমায় দ্যুতিময়ী হয়ে উঠছিলেন তাঁর মুখমন্ডল। তাঁর আয়ত হরিণ চোখে ছিলো লজ্জার রক্তিম স্বপ্নিল দৃষ্টি। কৌতুকে নাচছিলো তাঁর চোখের মণি। সভ্রান্ত যুবতীদের মধ্যে সবার চেয়ে সুন্দরী বলে তাঁর রূপের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিলো। ঠিক সেরকম একটি মুহূর্তে তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো ফজিলুদ্দিনের।
একদিন খানজাদা বেগম যুবকের বেশে ভ্রাতৃ বাবর এবং অন্যান্যদের সাথে চওগান( পোলো বা অশ্বারোহণে হকি খেলা) খেলতেছিলেন। সেদিনকার সেই খেলা উপভোগ করার সৌভাগ্য হয়েছিলো ফজিলুদ্দিনের। মুগ্ধ বিস্ময়ে তিনি উপভোগ করছিলেন সেই চওগান খেলা। ফজিলুদ্দিনের সেই বিস্ময় মুগ্ধতা হয়তো খানজাদা বেগমের চোখে ধরা পরেছিলেন। তিনিও যেন ফজিলুদ্দিনের সেই বিস্ময় মুগ্ধতা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছিলেন।
ফজিলুদ্দিন তখন পঁচিশ বছরের যুবক। দীর্ঘ আকর্ষণীয় মুখমন্ডল। প্রতিভার দীপ্তিতে উজ্জ্বল দু’টি চোখ। মুখমণ্ডলে তরুণ বয়সের উদ্ভিন্ন দাড়ি। ওষ্ঠের উপরে কালো গোঁফের রেখা। মুখে ভূবন বিজয়ী হাসি। চোখের দৃষ্টিতে ছিলো শিশুসূলভ বিস্ময় মুগ্ধতা।
খানজাদা বেগম হয়তো ফজিলুদ্দিনের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসূলভ চেহেরা এবং বিস্ময় মুগ্ধতা দেখে কৌতুক অনুভব করছিলেন। খেলার মাঝেই দুই তিনবার ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে তিনি ওষ্ঠের কোণায় হাসির রেখা রেখায়িত করে কটাক্ষ করেছিলেন। সেই কটাক্ষে বাণবিদ্ধ হয়ে ফজিলুদ্দিনের হৃদয় শরবিদ্ধ আহত হরিণের মতো ছট্ফট্ করে উঠছিলো।
সেদিন খেলা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে খানজাদা বেগম ফজিলুদ্দিনকে প্রাসাদে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। সেই আহ্বানে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছিলেন ফজিলুদ্দিন। তার চোখের সন্মুখে ভেসে উঠেছিলো খানজাদা বেগমের হাসির রেখা মিশ্রিত কটাক্ষ। দুরু দুরু করে কেঁপে উঠেছিলো তাঁর হৃদয়। আহ্বানের অন্তরালের রহস্য কি? খানজাদা বেগম তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেনি তো? এই আহ্বানের অন্তরালের রহস্য পুরস্কার, না তিরস্কার? এ তাঁর আকর্ষণের প্রতিক্রিয়া, না ঘৃণা বিদ্বেষ বিরাগ বিকর্ষণের প্রতিক্রিয়া? কিন্তু তাঁর চোখে তো তিনি কোনো কূটিলতা, ঘৃণা অথবা বিরাগের প্রতিচ্ছবি দেখেন নি— দেখেছিলেন কৌতূহল এবং বিস্ময় মুগ্ধতা।
দুর্বল মনে সব জায়গায় বিপদের আশংকা দেখে। তিনি তখন সত্যিই খানজাদা বেগমের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন নাকি? যার জন্য তাঁর এই উৎকন্ঠা,
ভয় বিহ্বলতা?
ফজিলুদ্দিন মনে সাহস সঞ্চয় করে আহ্বানের প্রতি সন্মান জানিয়ে উৎকণ্ঠিতভাবে রাজপ্রাসাদে গিয়েছিলেন। কোনো অভিযোগ বা বিরাগের প্রতিক্রিয়া ছিলো না সেই আহ্বানের অন্তরালে। রাজপ্রাসাদের ধসে যাওয়া দেয়ালে রং করার জন্য তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।দায়িত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং খানজাদা বেগম। তখন তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন। তিরস্কৃত নয় পুরস্কৃত হয়েছিলেন তিনি। ফজিলুদ্দিন নিজের বাসগৃহে এসে রং তুলি নিয়ে আবার রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হয়েছিলেন। রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হওয়ার পরেই খানজাদা বেগমের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিলো। খানজাদা বেগম তখন তাঁর সহচরীদের সাথে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন।
কিছুক্ষণ আগে দেখা দক্ষ খেলোয়াড়ের বাঁশি থেকে তখন অপূর্ব মধুর সুর ঝংকারিত হচ্ছিল। তখন তাঁকে অপূর্ব কমনীয় এবং মোহময়ী দেখাচ্ছিল। সেই অপূর্ব রূপসুধা পান করে ফজিলুদ্দিন আত্মহারা হয়ে পড়ছিলেন। সন্মোহিত হয়ে পড়ছিলেন সুমধুর বাঁশির মায়াজালে।
অন্য একদিনের একটি ঘটনা দেখেও ফজিলুদ্দিন আশ্বর্যচকিত হয়ে উঠেছিলেন। ফজিলুদ্দিন সেদিন প্রাসাদের দেয়ালে ভেলভেটের নক্সা অঙ্কন করছিলেন।
হঠাৎ কোথা থেকে এসে খানজাদা বেগম মনযোগ সহকারে তিনি অঙ্কন করা নক্সা নিরীক্ষণ করছিলেন। খানজাদা বেগমকে একলা সেভাবে আসতে দেখে ফজিলুদ্দিন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়ছিলেন। তাঁর বুক দুরু দুরু করে কাঁপতে শুরু করছিলো। হঠাৎ তাঁর হাত থেকে রং তুলি খসে পড়েছিলো।
এই ঘটনায় খানজাদা বেগম বিরক্ত হওয়ার পরিবর্তে সব দোষ নিজের গায় নিয়ে বলেছিলেন- আপনি খুব সুন্দর লতাপাতা অঙ্কন করেছেন। হয়তো আপনার কাজে আমার চোখ লেগেছে! রং তুলি তুলে নিয়ে আবার শুরু করুন।
অভয় পেয়ে ফজিলুদ্দিন পাকা মেঝে থেকে রং তুলি তুলে নিয়ে বিজ্ঞের মতো বলছিলেন- না না, শাহজাদী, যে নক্সায় আপনার চোখ লেগেছে সেই নক্সা প্রাণ পেয়ে আবার অধিক সুন্দর হয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।
মৌলানা, আমি শুনেছি, আপনি বোলে চিত্রকরও?
বাস্তুবিদ শিল্পী একজন চিত্র অঙ্কন জানাটা আবশ্যক, শাহজাদী। এভাবেই ফজিলুদ্দিন নিজেই যে একজন চিত্রশিল্পী সেকথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছিলেন।
তাহলে, আপনি আমার চিত্র এঁকে দিন না কেন?
ফজিলুদ্দিনের জন্য প্রস্তাবটা খুবই অপ্রত্যাশিত এবং লোভনীয় ছিলো।
ফজিলুদ্দিন মুগ্ধ সপ্রশংস দৃষ্টিতে খানজাদা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কক্ষটিতে শুধু তাঁরা দুজনই ছিলেন সেদিন। তবুও ফজিলুদ্দিনে অনুচ্চ স্বরে বলছিলেন- আপনি চাইলে আমি অতি আনন্দ মনেই আপনার চিত্র এঁকে দিব। কিন্তু….। এক অজান আশঙ্কার জন্য ফজিলুদ্দিন বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারছিলেন না।
ফজিলুদ্দিনের সংশয়ের কারণ উপলব্ধি করতে পেরে খানজাদা বেগম অভয় দিয়ে বলছিলেন- আপনি চিন্তা করবেন না, মৌলানা। আমি সব কথা গোপনে রাখব।
তবুও যদি কোনো রকমে কথাটা প্রকাশ হয়ে যায় এবং আমার এই অমূল্য জীবন কোরবাণি দিতে হয়, তখন আমি আমার এই অমূল্য জীবন কোথায় পাব, শাহজাদী? ফজিলুদ্দিন এভাবে বলেই কিছুক্ষণ থেমে আবার ঠাট্টার স্বরে বলেছিলেন- আমার অনুমান হচ্ছে, আমার এই জীবন যেন কোথাও হারিয়ে যেতে চলেছে।
খানজাদা বেগম ফজিলুদ্দিনের কৌতুক উপলব্ধি করতে পেরে মোহনীয় হাসি হেসে বলছিলেন- আমার চিত্র অঙ্কন করার জন্য যদি আপনার জীবন যায়, আমাকে বলবেন, আমি আমার জীবনটাই দিয়ে দিব আপনাকে। এখন নিশ্চয় আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়?
খানজাদা বেগমের এই চিত্ত বিনোদক, চঞ্চল এবং সাবলীল রসিকতায় ফজিলুদ্দিন অভিভূত হয়ে পড়ছিলেন এবং খানজাদা বেগমের চিত্র আঁকতে শুরু করছিলেন। সেই চিত্র দেখে খানজাদা বেগম সন্মোহিত হয়ে পড়ছিলেন, কিন্তু সেদিন তিনি চিত্রটি নেয়নি। সময়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চিত্রটি ফজিলুদ্দিনের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
এর পরে অশুভ যুদ্ধ সব বিপর্যস্ত করে ফেলেছিলো। ফজিলুদ্দিন ফারগানা থেকে পালিয়ে গিয়ে হিরাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবুও হাজারটা বিপত্তির মাঝেও তিনি চিত্রটি অতিশয় যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। খানজাদা বেগম চাইলে যাতে চিত্রটি তাঁকে দিতে পারে এই ভেবে। এখনও চিত্রটি আছে তাঁর সিন্দুকে।
গত শীতে খানজাদা বেগমের সাথে তার শেষবারের মতো সাক্ষাৎ হয়েছিলো। কুতলুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগম গত শীতে উশ সহরে বেড়াইতে এসেছিলেন। তখন মির্জা বাবর তাঁদের বুরাতান পাহাড়ে নির্মীয়মান উপাসনা গৃহটির বুঝ নেওয়ার জন্য বলে পাঠিয়েছিলেন। কারণ উশ সহর থেকে বুরাতান পাহাড় খুবই নিকটে অবস্থিত।
ফজিলুদ্দিন সেদিন শুধু একজন শিষ্য নিয়ে কাজ করছিলেন। রশদ এবং ধনের অভাবে তিনি বাকি শ্রমিকদের ছাটাই করেছিলেন। ফলে ইঁট, তক্তা এবং অন্যান্য রশদপাতি তাঁরা দু’জনেই নিচে থেকে পাহাড়ের উপরে বয়ে আনতে হচ্ছিল। এমনকি পাথর কাটা কারিগরও ছিল না। তদুপরি টাইলস কেনার জন্য পর্যাপ্ত ধনও ছিল না তখন তাঁর হাতে। ফজিলুদ্দিন এইসব অভাব পূরণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। ঠিক তখনই খানজাদা বেগম নির্মাণ কার্যের বুঝ নিতে এসেছিলেন।
ফজিলুদ্দিন এইসব অভাব অভিযোগের কথা খানজাদা বেগমকে বলতে উসখুস করছিলেন, তবে মণিমুক্তাখচিত রেশমি টুপি পরিহিতা, লাল নরম জোতা পরা, কোমলতার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি, দিব্য সৌন্দর্যের আঁকর যুবতী একজনের কাছে এইসব অভাব অভিযোগের কথা বলতে তিনি সংকোচবোধ করছিলেন। তদুপরি খানজাদা বেগমের সৌন্দর্যে সেদিন ফজিলুদ্দিন নির্বাক হয়ে পড়ছিলেন এবং অভাব অভিযোগের কথা বলতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।
কিন্তু খানজাদা বেগম নিজেই সেই সমস্যা সমাধান করে দিয়েছিলেন। তিনি উপাসনা গৃহের নক্সা দেখতে চেয়েছিলেন- মৌলানা সাহেব, উপাসনা গৃহের নক্সাটি আমাকে দেখাতে পারবেন কি?
কেন পারব না। নিশ্চয় পারব। এভাবে বলেই ফজিলুদ্দিন অতি যত্নসহকারে নক্সাটি খানজাদা বেগমের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
খানজাদা বেগম অতিশয় মনযোগ সহকারে নক্সাটিতে চোখ ফিরিয়ে বলছিলেন- আপনি দেখছি, গম্বুজে উজ্জ্বল নীল বাখর খাটানোর কথা ভাবছেন?
কথাটা শুনে বিস্ময়ে ফজিলুদ্দিনের চোখের তারা নিশ্চল হয়ে পড়ছিলো। এই যুবতী তো কম নয়! ইনি দেখছি বাস্তুকলার বিষয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞাত! বাস্তুকলার বিষয়ে ইনি এই জ্ঞান কোথা থেকে পেলেন? ইনি এই বাস্তুকলার বিষয়ে কতদূর অধ্যয়ন করেছেন? ফজিলুদ্দিন বিস্ময়াভিভূত চোখে খানজাদা বেগমের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এইসব কথার বুঝ নিয়ে বলছিলেন-আপনার অনুমান সত্য। গম্বুজে নীল বাখর খাটাতে হবে।
কিন্তু আপনার হাতে পর্যাপ্ত বাখর রয়েছে কি?
ফজিলুদ্দিনে নেতিবাচক ভংগিতে মাথা নেড়ে বলছিলেন- নেই, কিনতে হবে।
বাখরগুলো তো খুব দামি! বাখর কিনার জন্য আপনার হাতে পর্যাপ্ত ধন আছে নাকি?
ফজিলুদ্দিন তখন অভাব অভিযোগের কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন।
অভাব অভিযোগের কথা শুনে খানজাদা বেগম বলছিলেন- ঠিক আছে, বাখরের কথা আপনি ভাববেন না। আপনি নক্সা অনুসারে কাজ করে যান। বাখরের ব্যবস্থা আমি করে দিব।
ফজিলুদ্দিন তখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছিলেন- আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ! আপনার এই বদান্যতার কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারব না।
মির্জা বাবর তখন সমরকন্দের বাদশাহ সুলতান আহম্মদের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। সেজন্য খানজাদা বেগম বলেছিলেন- শুধু উপাসনা গৃহই নয়, মির্জা বাবর যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে আব্বাজানের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য উদ্যোগ নিব। আমি তখন আরও অনেক সৌধ নির্মাণ করাব। সেইসমূহ সৌধ নির্মাণের দায়িত্বও আপনাকেই নিতে হবে, মৌলানা।
ফজিলুদ্দিন যেন এর থেকে স্নেহাশ্রিত মধুর শব্দ জীবনে আগে কোনদিন শুনেন নি এমনই ধারণা হয়েছিলো তাঁর।
পরের দিন থেকে দু’জন হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ সুগঠিত যুবক খাদ্যসামগ্রীর সাথে গৃহ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র এনে ফজিলুদ্দিনের কাছে জমা দিতে শুরু করছিলো। এক সপ্তাহ পরে উটের পিঠে বোজাই হয়ে এসেছিলো চোখ ঝলসানো রংবিরঙের ঝলমলানো বাখর এবং টাইলস। প্রতিটা টাইলস এবং বাখরের মাঝে ফজিলুদ্দিন যেন দেখতে পেয়েছিলেন খানজাদা বেগমের মোহময়ী মুখের প্রতিচ্ছবি। তিনি খানজাদা বেগমের প্রতি কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হয়ে পড়ছিলেন এবং অবসর পেলেই তখন থেকে প্রতিদিন খানজাদা বেগমের চিত্র সিন্দুক থেকে বের করে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকতেন এবং চিত্রটি তাঁকে দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করতো।
এখনও অবসর পেলেই তিনি চিত্রটি বের করে দেখেন। চিত্রটি যেন জীবন্ত হয়ে তাঁর সাথে কথা বলে।
চিত্রের খানজাদা বেগমকে নয়, আজ রক্তমাংসের খানজাদা বেগমকে স্বচক্ষে দর্শন করার সৌভাগ্য হবে তাঁর। এক বছর পরে তিনি খানজাদা বেগমের মুখ দর্শন করতে সক্ষম হবেন। সৌভাগ্য হলে খানজাদা বেগমের সাথে কথা বলারও সুযোগ পেতে পারেন! কথাগুলো ভাবতেই ফজিলুদ্দিন আত্মিক উত্তাপ অনুভব করতে লাগলেন।
এক সময় মির্জা বাবরসহ খানজাদা বেগম পাহাড়ের পাদদেশে এসে উপস্থিত হলেন এবং ফজিলুদ্দিন অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বোরখা আবৃত খানজাদা বেগমের মুখ দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।
হৃদয়ের আবেগ যাতে বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ না হয়, তারজন্য ফজিলুদ্দিন নিজেকে সংযত করার জন্য কসরত করতে লাগলেন। কয়েক পা দূরে থাকতেই ফজিলুদ্দিন মাথা নুইয়ে বাবরকে অভিবাদন জানালেন।
মির্জা বাবর ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে গভীর সপ্রশংস সমাহিত চোখে তিনি চতুর্দিক নিরীক্ষণ করতে লাগলেন।
বাবরের বয়স তখন মাত্র পনের বছর। কিন্তু তাঁর গাম্ভীর্যপূর্ণ চাল-চলন এবং আভিজাত্যসূলভ ব্যবহার দেখে বাবরকে একজন কৈশোর অতিক্রান্ত পরিপক্ক যুবকের মতো অনুমান হলো ফজিলুদ্দিনের। বাবরের চাল-চলনও যেন আগের থেকে সতর্ক। মাত্র এঘার বছর বয়সে বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণ করার চার বছর পূর্ণ হয়েছে মাত্র। সেজন্য তাঁর বয়স বর্তমান পনের বছরের অধিক নয়। কিন্তু বয়সের থেকে তাঁর দেহ এবং মনের বুদ্ধি যেন অনেক বেড়ে গেছে।
কষ্টসাধ্য দুর্যোগময় সময় এবং ঘাত-সংঘাতময় জীবন মানুষকে তারাতারি সজাগ এবং পরিপক্ক করে তুলে। বাবরের ক্ষেত্রেও যেন সেটাই হয়েছে! সিংহাসনে আরোহণ করার পরে তিনি যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন। নানান ঘাত-সংঘাত এবং উত্থান-পতনের মাঝ দিয়ে তিনি দীর্ঘ চারটি বছর অতিবাহিত করতে হয়েছে। অবশ্যে সব পুরুষ বয়স বাড়ার সাথে সাথে এক সময় পৌরুষ হয়ে উঠে, কিন্তু ঘাত-সংঘাতে যেন বাবরকে বয়সের তুলনায় অধিক পৌরষত্ব প্রদান করেছে। শুধু সরু কোমর এবং অপুষ্ট কাঁধের প্রতি লক্ষ্য করলে, বুঝা যায় বাবর একজন যুবক নয়- একজন কিশোর।
পনের বছর বয়স পাহাড়ে উঠার জন্য উপযুক্ত সময়। সেজন্য উপাসনা গৃহে উঠে আসার সময় বাবর একটা মালভূমি থেকে আরেকটি মালভূমিতে আসতে সবাইকে পেছনে ফেলে উঠে আসতে লাগলেন। উপরে উঠে আসতে মাতৃ এবং বোনকেও সহায় করতে লাগলেন সময়ে সময়ে। সরু ঢালু পথে উপরে উঠতে কুতলুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগম খুবই ক্লান্তি এবং কষ্ট অনুভব করছিলেন।
মির্জা বাবরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত উজির-এ-আজম কাশিম বেগ প্রথমাবস্থায় প্রায় বাবরের সমানে সমানে উঠে আসছিলেন, কিন্তু কাশিম বেগ ছিলেন হৃষ্টপুষ্ট স্বাস্থ্যবান। সেজন্য তিনি আধা দূর এসেই শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে লাগলেন।
কাশিম বেগের অবস্থা দেখে বাবর দাঁড়িয়ে পড়লেন।
জিভার জল লুকোতে পান চাবানোর মতো কাশিম বেগ নিজের লজ্জা এবং অক্ষমতা লুকোতে ফজিলুদ্দিনের দিকে ঘুরে তাকিয়ে কৌতুক করে বললেন-জ্বনাব, এখানে সিঁড়ি নির্মাণের কথা আপনার মনে পড়ল না কেন?
ফজিলুদ্দিন মাথা নুইয়ে সন্মান সহকারে বললেন- যদি হুজুরের হুকুম হয়..….
কাশিম বেগের অবস্থা দেখে বাবর একখন্ড পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি হাসছিলেন। তিনি কিশোরসূলভ চঞ্চলতা এবং সুকুমার মধুর স্বরে কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে কৌতুক করে বললেন-মালভূমির উপরে উপাসনা গৃহ নির্মাণের সময় আপনার হৃষ্টপুষ্ট স্থূল দেহের কথা চিন্তা করে নিশ্চয় সিঁড়ি নির্মাণ করাটা উচিত ছিলো, কী বলেন বেগ সাহেব?
কাশিম বেগ সন্মান সহকারে বললেন- আপনার এই অধীনকে সিঁড়িয়েও ঘাম থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হত না, জাহাপনা।
কুতলুগ নিগার বেগম কাশিম বেগের কাছে এসে পৌঁছেছিলেন। তিনি কৌতুক করে ঠাট্টার স্বরে বললেন- বেগ সাহেব, এই মালভূমির মতো কষ্টকর জায়গায়ই তো রাজাপ্রজা সবাইকে এক সাথে হাঁটতে বাধ্য করে।
এবং শাহজাদীকেও…বাবর বোনের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার সুরে বললেন।
খানজাদা বেগম ভ্রাতৃর সুরে সুর মিলিয়ে বললেন- এবং এরকম সময়ে ভ্রাতৃকেও বোনের কথা ভাবতে বাধ্য করে।
এরকম হাসি ঠাট্টার মাঝ দিয়ে এসে সবাই এক সময় উপাসনা গৃহের সন্মুখস্থিত প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলেন।
নীল গম্বুজের নিচে ছোট সৌধটি বসন্তকালের সূর্যের কিরণ পড়ে ঝিলমিল করতে ছিলো এবং নীল গম্বুজে বসানো বাখর থেকে সূর্যের কিরণ বিকিরণ হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়ছিলো। চোখে ছাট মেরে ধরছিলো সেই সূর্য কিরণ। সেই অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য নিরীক্ষণ করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাবর শিশুসুলভ চপলতায় লাফিয়ে উঠলেন। দূরের পাতল নীল পাহাড়, সৌধের বারান্দার খুঁটিতে অঙ্কন করা লতাপাতা, গম্বুজে খাটানো নীল বাখর সব জায়গায় সূর্যের রশ্মি পড়ে এক অভূতপূর্ব ঝিলিমিলি পরিবেশ সৃষ্টি করছিলো। বসন্তের মৃদু মন্দ সমীরে এক প্রকারের মিষ্টি অনুভূতি সিঞ্চন করে দেহমন রোমাঞ্চিত করে তুলছিলো। সবাই সেই নয়নাভিরাম বিরল সৌন্দর্যসম্ভার অভিভূতের মতো উপভোগ করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন।
বাবর, কুতলুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগমকে উপাসনা গৃহের সন্মুখ পর্যন্ত এগিয়ে এনে ফজিলুদ্দিন বারান্দা থেকে নেমে এসে পাথরের সিঁড়ির উপরে দাঁড়ালেন। কারণ তিনি বাবরের অনুমতি অবিহনে সভ্রান্ত মহিলা দু’জনের সাথে উপাসনা গৃহের ভেতরে প্রবেশ করতে অস্বস্তিবোধ করছিলেন।
গৃহের ভেতর অন্ধকার ছিল না যদিও প্রচলিত নিয়মানুসারে মেহরাবের উপর মমবাতি জ্বলছিলো। খিড়কি দিয়ে সূর্যের রশ্মি গৃহের ভেতর পড়ার জন্য মমবাতির শিখাগুলো কোনোমতে চোখে পড়ছিলো। কিন্তু দেয়ালে অঙ্কিত লতাপাতার উপরে আলো পড়ে লতাপাতার সৌন্দর্য চোখে ছাট মেরে ধরছিলো এবং লতাপাতার সৌন্দর্য অনেক গুণে বাড়িয়ে তুলছিলো।
বাবর সেই সৌন্দর্য সম্ভার নিরীক্ষণ করে অতিশয় রূপে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন। মমবাতির আলো পড়ে ঝলকে থাকা লতাপাতাগুলো দেখে তিনি খানজাদা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন- এ যেন ইসলামের বাগান!
খানজাদা বেগম দুষ্টুমি করে বললেন- অভয় পেলে বলতে পারি।
নিশ্চয়, বলুন তো কী বলতে চাইছেন আপনি? বাবর কৌতূহল প্রকাশ করে বললেন।
খানজাদা বেগম ঘুরে দরজার পাল্লার উপরে খোদিত লতাপাতাগুলোর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন- ওই যে, ইসলামের বাগান সেখানে রয়েছে।
খানজাদা বেগম যেগুলো চিত্রর দিকে ইংগিত করেছিলেন, সেইগুলো যেন বহ্নি শিখার মতো জ্বলছিলো। সেগুলো যেন রং তুলিকায় অঙ্কিত চিত্র নয়, অগ্নিশিখা দিয়ে অঙ্কিত লতাপাতার চিত্র।
কিন্তু একটি সত্যি কথা বলার জন্য ভগ্নীর চোখে দুষ্টুমি ভরা হাসি এবং অভয় খুঁজার কারণ বাবর উপলব্ধি করতে পারলেন না। শুধু একটি কথাই তাঁর মনে উদয় হলো, তাঁর ভগ্নী হয়তো লতাপাতার প্রতি ইংগিত করে সমরকন্দে থাকা তাঁর বাগদত্তা আয়েসা বেগমের কথা বুঝাতে চাইছেন! সেজন্য তিনি শুধু সৌজন্যতাবশতঃ বললেন- আপনি ঠিকই বলেছেন, আমারই ভুল হয়েছিলো।
এভাবে হাসি তামাশার মাঝ দিয়ে উপাসনা গৃহটি পরিদর্শন করে অভিভূত হয়ে এক সময় সবাই গৃহের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁদের চোখে-মুখে কৌতুক এবং আনন্দের অভিব্যক্তি দেখে ফজিলুদ্দিন উৎসাহিত হয়ে উঠলেন।
বাবর ছাউনিতে ফিরে এসে শিল্পকর্মের পুরস্কার হিসাবে ফজিলুদ্দিনকে খেলাত(রাজা বাদশাহরাঁ প্রদান করা কোন উপাধির সাথে প্রদান করা সাজ-পোশাক) প্রদান করলেন এবং সম্পূর্ণরূপে সজ্জিত করে একটি ঘোড়া ফজিলুদ্দিনকে প্রদান করার জন্য কাশিম বেগকে নির্দেশ দিলেন।
পুরস্কার ঘোষণা করা দেখে আনন্দে ফজিলুদ্দিনের চোখ জলে ভরে উঠলো। খানজাদা বেগম ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি হাসলেন।
সেই হাসির অর্থ উপলব্ধি করে ফজিলুদ্দিনের দেহমন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো।
* * *
উশের চারদিকে তখন বসন্তের আগমন শুরু হয়েছিলো।বাতাসে কিঞ্চিত পরিমাণো ধূলির লেশ ছিল না।
উপরে সুনীল নির্মল আকাশ। নিচে হিমাচ্ছাদিত পাহাড়। পাদদেশে বিশাল বিস্তৃত শ্যামল প্রান্তর। প্রান্তরগুলো শ্যামল সাগরের মতো প্রতীয়মান হচ্ছিলো।
বাবর উপাসনা গৃহ পরিদর্শন করে এসে উশ সহরের এক সুউচ্চ প্রাসাদে অলসভাবে বসে সেই সৌন্দর্যসম্ভার উপভোগ করছিলেন।
উজগন্ত, মার্গিলান, ইশফারা, খোজন্দ, আশ্বান, আখসি প্রভৃতি সহরগুলো কোথায় কোথায় হতে পারে বাবর বসে বসে সেটাই অনুমান করার চেষ্টা করছিলেন। প্রত্যেকটা সহর মানসপটে ভেসে উঠার সাথে সাথে সহরের পুষ্পিত ফেনিল উদ্যানসমূহো তাঁর চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে লাগলো। তাঁর কল্পনায় উঁচো উঁচো পর্বতশ্রেণি বেষ্টিত মোহময়ী ফারগানা ফুলে ফলে সুরভিত এক নয়নাভিরাম পুষ্প উদ্যান এবং বেহেস্তের টুকরোর মতো প্রতীয়মান হতে লাগলো।
সাথে সাথে বাবরের কল্পনা বিলাসী মন কল্পলোকে উড়ে গেলেন। কল্পলোকে ভেসে উঠা দৃশ্যগুলো তিনি লিপিবদ্ধ করার জন্য পরিচারকদেরকে কাগজ-কলম আনার জন্য নির্দেশ দিলেন।
পরিচারকরা ছয়টি পায়া বিশিষ্ট একটি নিচু টেবিল এনে সন্মুখে পেড়ে দিয়ে কাগজ-কলম এনে দিলেন।
বাবর রোজনামচা খোলে লিখতে বসলেন। রোজনামচাটির উপরে লিখা ছিলো ‘বকাই’। (প্রথমে তিনি রোজনামচাটির নাম বকাই রেখেছিলেন)।
তিনি ইসফারার কাজু বাদাম এবং আখের বিষয়ে লিখতে সিদ্ধান্ত নিলেন এবং চোখে দেখা অবস্থার বিবরণ একাগ্রচিত্তে লিখে যেতে লাগলেন।
হঠাৎ বাবরের একাগ্রতায় বাধা পড়লো। কোনো প্রকারের অনুমতি অবিহনেই কাশিম বেগ কক্ষের দরজার সন্মুখ পর্যন্ত চলে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
কাশিম বেগ ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে বললেন- অপরাধ মার্জনা করবেন, জাহাপনা। আপনার পবিত্র কাজে ব্যাঘাত জন্মানোর জন্য আমি দুঃখিত। বুখারা থেকে সুলতান আলী খাঁ কিছু জরুরী সূচনা দিয়ে পত্র প্রেরণ করেছেন। পত্রবাহক বর্তমান আপনার দর্শন অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বাবর কিঞ্চিত ক্ষোভের সহিত কাগজ-কলম টেবিলের উপরে রেখে কাশিম বেগকে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য ইংগিত করলেন।
অনুমতি পেয়ে কাশিম বেগ কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে গোল করে মুড়ানো রাজকীয় পত্রটি সসন্মানে বাবরের দিকে বাড়িয়ে বললেন-এই যে এটিই সেই পত্র, জাহাপনা।
কাশিম বেগের হাত থেকে পত্রটি নিজের হাতে নিয়ে বাবর পত্রের উপরে অঙ্কিত আঙুলের ছাপ দেখে পত্রটি খোলে মনযোগ সহকারে পড়তে লাগলেন।
পত্র পাঠ শেষ করে কাশিম বেগের দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে বাবর কিঞ্চিত প্রশ্নবোধক স্বরে বললেন- সুলতান আলী খাঁ আমাদের তাঁর সাথে মিলে সমরকন্দ আক্রমণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
কাশিম বেগ কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে চিন্তিতকণ্ঠে বললেন- এক দিকে আমরা সমরকন্দের সাথে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছি এবং অন্যদিকে সুলতান আলী খাঁর সাথে যুদ্ধে সহযোগিতা করার জন্য সমঝোতা করেছি। সেজন্য আমরা এ বিষয়ে এক সুনিশ্চিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত হবে। দু’জনের মধ্যে কে আমাদের প্রকৃত মিত্র, এই বিষয়ে পর্যালোচনা করার পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য আমাদের অগ্রসর হতে হবে। আমার ধারণা, এ ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে হলেও সুলতান আলী খাঁর সাথে সহযোগিতা করাটা উচিত হবে আমাদের। কারণ বুখারার বাদশাহ সুলতান আলী খাঁ-ই আমাদের প্রকৃত বন্ধু। আমার মতে, তাঁর সাথে আমাদের পূর্বে কোনো শত্রুতা ছিল না। পক্ষান্তরে সমরকন্দের বাদশাহ প্রকৃতার্থে আমাদের শত্রু। সন্ধির মাধ্যমে কিছু শর্ত সাপেক্ষে আমরা তাঁর সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গঢ়ে তুলেছি। বায়সংকুর সুযোগ পেলে যেকোনো মুহূর্তে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে পারে! সেজন্য সুলতান আলী খাঁর সাথে সহযোগিতা করে বায়সঙ্কুরের সাথে করা শর্ত সাপেক্ষ সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করলে আমাদের কোনো অপরাধ হবে না বলেই আমার ধারণা, জাহাপনা।
কাশিম বেগের যুক্তি খন্ডন করে বাবর বললেন- সুলতান আলী খাঁর সাথে সহযোগিতা করে সমরকন্দের বাদশাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করাটা এই মুহূর্তে উচিত হবে না বলেই আমার ধারণা। এই বিষয়ে আম্মাজানের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা উচিত হবে বলে আমি মনে করি, বেগ সাহেব।
যেকোনো মহত্ত্বপূর্ণ কাজে বাবর মাতৃ কুতলুগ নিগার বেগমের পরামর্শ নিতেন। কাশিম বেগ এই কথা মোটেই পসন্দ করতেন না। সেদিনও বাবর মাতৃর সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলাতে কাশিম বেগ পেটে পেটে অসন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করলেন না। তিনি ভাবলেন, মাতৃর সাথে পরামর্শ করার কী প্রয়োজন? মহিলারা যে যুদ্ধ পসন্দ করে না এটা তো স্পষ্ট। যুদ্ধ বিগ্রহ হলো বীরের কাজ- বীরের মহত্ব। যুদ্ধ বিগ্রহে বীরের যশস্যা বৃদ্ধি করে। যুদ্ধ হলো স্বেচ্ছাচারি, যুদ্ধ পিপাসু বেগদের হাতের মুঠোয় রাখার একমাত্র উপযুক্ত উপায়। বেগদের পেট শুধু রুটি দিয়ে ভরানো যায় না। তরবারি কোষমুক্ত করার অবসর দিয়ে তাদের রক্তের সাধ গ্রহণ করার অবসর প্রদান করাও প্রয়োজন। অনেক দিন কোষাবদ্ধ হয়ে থাকা তরবারির মরিচা একমাত্র যুদ্ধের সময়ে দূর করা যায়। বীরের তরবারিতে মরিচা পড়া শোভা পায় না।
কাশিম বেগ পেটে পেটে এসব কথা ভাবলেও প্রকাশ্যে বললেন- ঠিক আছে, আপনি যা ভেবেছেন সেটাই করুন।
বাবর কাগজ-কলম গোছিয়ে রেখে মাতৃর সাথে পরামর্শ করতে রওয়ানা হলেন।
কাশিম বেগ অসন্তুষ্ট চিত্তে বাবরের পেছনে পেছনে রওয়ানা হলেন।
কুতলুগ নিগার বেগম নিজের কক্ষে বসে খানজাদা বেগমের সাথে শিক কাবাব খাচ্ছিলেন।
বাবরকে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে মাতৃ-ভগ্নী উভয়ে বাবরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
খানজাদা বেগমের নির্দেশে পরিচারকরা বাবরের জন্য বিছানা পেতে দিলেন। বাবর কাশিম বেগের সাথে বিছানায় বসলেন। একজন পরিচারিকা সোনার থালায় দু’টি শিককাবাব এনে বাবর এবং কাশিম বেগের সন্মুখে রাখলেন। সবাই নীরবে শিক কাবাব খেতে লাগলেন।
শিক কাবাব খাওয়ার পরে কিমীজ আনা হলো। কিমীজ খাওয়ার পরে সবাই কিছুক্ষণ মৌন হয়ে রইলেন।
বাবরের নীরবতা দেখে কাশিম বেগ পেটে পেটে বিরক্ত হয়ে উঠছিলেন। কাউকে কোনো কথা না বলতে দেখে অবশেষে তিনি মুখ খুলতে বাধ্য হলেন। তিনি দাড়িতে লেগে থাকা কিমীজের কণাগুলো হাত দিয়ে ঝেড়ে কুলতুগ নিগার বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন- মহামান্য বেগম সাহেবা, আমরা বুখারার বাদশাহ সুলতান আলী খাঁর সাথে যুদ্ধে সহযোগিতা করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। গ্রীষ্মকালেই সহযোগিতা করার কথা। ইতিমধ্যে গ্রীষ্মকাল আসতে শুরু করেছে…
কাশিম বেগ ইচ্ছাকৃতভাবেই পত্রের কথা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলেন।
অনেক কষ্টের পরে আল্লাহই আমাদের সুখ স্বচ্ছন্দে জীবন অতিবাহিত করার অবসর দিয়েছেন। কাশিম বেগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে কুতলুগ নিগার বেগম পরামর্শের সুরে বললেন- আমরা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। সমরকন্দের বাদশাহ বায়সঙ্কুর সুলতান আলী খাঁর ভ্রাতৃ। ভ্রাতৃ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সুলতান খাঁ অসন্তুষ্ট। এ সুলতান খাঁর অনুচিত সিদ্ধান্ত। আমাদের বাদশাহের আন্দিজানে নিজের সিংহাসন রয়েছে। সেজন্য সিংহাসনের লোভ করে বিপদ ডেকে আনাটা কোনো পরিস্থিতিতেই উচিত হবে না এ সময়ে।
কাশিম বেগ পেটে পেটে অসন্তুষ্ট হলেন যদিও কোনো মন্তব্য না করে মনে মনে বসে রইলেন।
খানজাদা বেগম মাতৃকে সমর্থন করে বললেন- যুদ্ধ মানেই মিথ্যা রক্তপাত এবং অযথা খরচ। অশান্তিও কম হয় না। সমরকন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলে অশান্তির সাথে অনেক খরচও হবে। সেজন্য যুদ্ধের জন্য খরচ না করে সেই ধন দিয়ে সৌধ নির্মাণ করাটা উত্তম হবে। বর্তমান আন্দিজানের সভ্যতা ভব্যতা সবাই সমরকন্দের সাথে তুলনা করতেছে। আমরা আন্দিজান এর থেকেও অধিক উন্নত হওয়াটা কামনা করি। আমাদের বাদশাহের নামও উলুগ বেগের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ুক এটা আমরা মনেপ্রাণে কামনা করি। (মির্জা উলুগ বেগের সময়ে সমরকন্দের প্রভূত উন্নতি হয়েছিলো।) আমি অনেক দিন থেকে এই স্বপ্ন দেখে আসছি। আল্লাহই এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়ন করার জন্য আমাদের বাদশাহের সহায় হোন।
বাবর কৌতুকমিশ্রিত হাসি হেসে বললেন- আন্দিজানকে সমরকন্দের মতো শক্তিশালী করে গঢ়ে তুলতে হলে সমরকন্দের সভ্যতা এবং ভব্যতা স্বচক্ষে দেখে আসাটা নিশ্চয় উচিত হবে। সেগুলো দেখে আসার পরও আন্দিজানে সৌধ নির্মাণের কাজ শুরু করা যেতে পারে।
বাবরের কথায় কাশিম বেগের উৎসাহ বেড়ে গেলো। তিনি বাবরের সমর্থনে বললেন- আপনি যথাযোগ্য কথা বলেছেন, জাহাপনা।
আমাদের বাদশাহ ছেলেবেলা সমরকন্দের ভব্যতা দেখে নাই নাকি? কুতলুগ নিগার বেগম বাবরের উপরে প্রভাব বিস্তার করার জন্য এভাবে বললেন।
হ্যাঁ দেখেছি। কিন্তু তখন আমি খুবই ছোট ছিলাম। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। সেগুলো এখন আমার কিছুই মনে নেই। বাবর মাতৃর যুক্তি খন্ডন করে বললেন।
খানজাদা বেগম মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হয়ে তামাশার সুরে বাবরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন- আর গত বছর? গত বছর আপনি সমরকন্দে যুদ্ধ করতে গেলেন এবং আমরা সাত মাস কাল ছটফট করে অতিবাহিত করলাম। সেই কথা আপনি এই কয়দিনেই ভুলে গেলেন?
বাবরের কপালে ভাঁজ পড়ল। ভগ্নী বলা কথা মিথ্যা নয়। গত বছর তিনি সমরকন্দ আক্রমণ করতে গিয়ে সমরকন্দের আশেপাশে ছাউনি পেতে তিন মাস কাল সুলতান আলী খাঁর আগমন অপেক্ষায় অতিবাহিত করে এসেছেন। কিন্তু সুলতান আলী খাঁ সময়মতে উপস্থিত না হওয়ায় যুদ্ধের আশা বাদ দিয়ে নিরাশ মনে তিনি ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।
বাবর ভগ্নীকে সমর্থন করে বললেন- হ্যাঁ, আপনি বলা কথাটা অবশ্যে সত্য। গত বছর আমরা সমরকন্দ আক্রমণ করতে গিয়ে সুলতান আলী খাঁর আগমন অপেক্ষায় সমরকন্দের আশেপাশে ছাউনি পেতে তিন মাস যাবত অপেক্ষা করে ফিরে এসেছি। সুলতান আলী খাঁ যাওয়ার আগেই বাবা সাহিব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা নিরাশ মনে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি। দূর থেকে সমরকন্দের ঐশ্বর্য, সভ্যতা ও ভব্যতার উষ্ম উত্তাপ অনুভব করে এসেছি আমি। সূর্যের রশ্মি পড়ে ঝিলমিলিয়ে উঠা সৌধের চূড়া, সমগ্র সমতল ভূমি চাদরের মতো আবৃত করে রাখা শ্যামল প্রান্তর যেন এখনও আমার চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়াচ্ছে। সমরকন্দের সেই ঐশ্বর্য বিভূতি, নায়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য আজও আমাকে হাত ইশারায় ডাকে। মানস চোখে সেই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য কল্পনা করে আজও আমি অভিভূত হয়ে পড়ি।
বাবর শেষের শব্দ কয়টি কম্পিতকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন। তাঁর উত্তেজিত কম্পিত কন্ঠস্বর, চোখের উদাস দৃষ্টি এবং মুখমন্ডলের প্রসন্ন অভিব্যক্তি নিরীক্ষণ করে এরকম অনুমান হল যেন সত্যি সত্যিই তাঁকে উলুগ বেগের মহান সহরটি হাত ইশারায় আহ্বান জানাইতেছে।
তাইমূর বংশীয় উলুগ বেগের রাজত্বকালে সমরকন্দের সভ্যতা এবং ভব্যতা চরম সীমা স্পর্শ করেছিলো। উলুগ বেগের পরে সুলতান আহম্মদ সমরকন্দের শাসনভার গ্রহণ করেন। সুলতান আহম্মদের মৃত্যুর পরে তাঁর ভ্রাতৃ সুলতান মামুদ এবং সুলতান মামুদের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র বায়সঙ্কুর সিংহাসনে আরোহণ করে শাসন কার্য চালাইতেছে।
বায়সঙ্কুর বাবরের চেয়ে বয়সে পাঁচ বছরের বড়। তাইমূরের মতোই বায়সঙ্কুর লোভী, মহত্ত্বাকাংক্ষী এবং যুদ্ধপ্রিয়। বায়সঙ্কুরের পিতৃ সুলতাম মামুদ নিজ বাহুবলে সমরকন্দের সিংহাসন দখল করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরে বায়সঙ্কুর উত্তরাধিকার সূত্রে সেই সিংহাসনের অধিকারী হয়েছেন।
আন্দিজানের বেগদের মতে বায়সঙ্কুর অবৈধভাবে সমরকন্দের সিংহাসন দখল করে রয়েছে— সিংহাসনের প্রকৃত অধিকারী বাবর। কারণ বাবরের পিতৃ ওমর শেখ এক সময় সমরকন্দের সিংহাসন দখল করেছিলেন এবং সুলতান আহম্মদ অবৈধভাবে ওমর শেখকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করে নিজে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বেগদের মতে, সেজন্য সুলতান আহম্মদের পরে বাবর সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী। যারজন্য আন্দিজানের বেগবর্গ বায়সঙ্কুরের হাজারটা দোষ ধরে অনেকদিন থেকে বাবরকে সমরকন্দ আক্রমণ করার জন্য উসকাচ্ছেন। সেই উসকানিতে সাড়া দিয়ে বাবর সমরকন্দ আক্রমণ করতে গিয়ে তিন মাস ছাউনি পেতে অবস্থান নিয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছেন সুলতান আলী খাঁ সময় মতো না পৌঁছানোর হওয়ার জন্য।
বায়সঙ্কুর আন্দিজানের বেগদের এই মনোভাবের কথা অগ্রিম আঁচ করতে পেরেছিলেন এবং বাবরকে বাধা প্রদানের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে ছিলেন। ফলে বাবর সমরকন্দ পৌঁছে বাবা সাহেব সহরের উপকণ্ঠে ছাউনি নির্মাণের সংবাদ পেয়েই বায়সঙ্কুর ভয়বিহ্বল হয়ে বাবর যাতে সহরে প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করেছিলেন।
অবশ্যে বায়সঙ্কুর সৈন্য-সামন্ত ছাড়া সহরে প্রবেশের জন্য বাবরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে, এই আমন্ত্রণের অন্তরালে বায়সঙ্কুরের কূটচক্রান্ত নিহিত ছিলো। সহরে প্রবেশের পর বাবরকে বন্দি করার কৌশল রচনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু গুপ্তচরদের মুখে এই কূটকৌশলের অগ্রিম সংবাদ পেয়ে বাবর সেই জালে ধরা দেন নি। এই আমন্ত্রণের পর থেকে উমে উমে জ্বলে থাকা অনল দপ দপ করে জ্বলতে শুরু করেছে। বেগবৃন্দ সময় ও সুযোগ বুঝে অতি সাবধানে সেই অনলে বাতাস দিয়ে চলেছে। যুদ্ধের জন্য আজকের এই আহ্বান সেই প্রতিহিংসারই ফল।
কুতলুগ নিগার বেগম তাঁর পনের বছর বয়সের সন্তানটি সাংঘাতিক কোন যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত না হয়ে নিজের সাম্রাজ্যে শান্তিপূর্ণভাবে রাজত্ব করাটা কামনা করছিলেন। সেজন্য তিনি বাবরের চিন্তাক্লিষ্ট ও উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মাতৃসূলভ আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন- বাবরজান, এই বৈচিত্রময় কূটিল পৃথিবীর কূটিলতা উপলব্ধির বয়স এখনও আপনার হয়নি।
ছেলেবেলা কুতলুগ নিগার বেগম বাবরকে আদর করে বাবরজান বলে সম্বোধন করতেন। তাই বাবরজান বলে সম্বোধন করে কুতলুগ নিগার বেগম কিছুক্ষণের জন্য বাবরের শৈশবে চলে গেলন। তখনকার বাবর সিংহাসনের কথা ভাবতেন না। যুদ্ধবিগ্রহের কথাও চিন্তা করতেন না। তখন তিনি বাবরকে অপত্য স্নেহে বুকের মাঝে ধরে রেখেছিলেন। তখন বাবর মাতৃর বুকেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতেন। তখনকার বাবর ছিলেন মাতৃর স্নেহের ‘বাবরজান’।
বাবরজান কখন বাবরে রূপান্তর হলো? কোথায় গেলো শৈশবের সেই হাসি তামাশা, খেলাধুলা, মান-অভিমান? এখনও কী বুকের মাঝে ধরে রাখা সম্ভব? এখন পাখা গজিয়েছে, উড়তে শিখেছে। নীল আকাশের নীলাভ সৌন্দর্য এখন তাঁকে হাত ইশারায় ডাকছে। পিঞ্জরের চার বের ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করতেছে সেই পাখি।
কিন্তু নীল আকাশের নীলের যে কোনো অস্তিত্ব নেই— সেটা শুধু বিচ্ছুরিত রশ্মির লুকোচুরি খেলা এ কথা কে বুঝাবে বাবরকে?
আকাশ শুধু সীমাহীন শূন্যতা— অন্ধকার, উল্কা, বিদ্যুতের তাণ্ডবে ভরা।
যুদ্ধও মানুষকে আকাশের মতো হাত ইশারায় ডাকে– লোভ, লালসা, মহত্ত্বাকাংক্ষা, ক্ষমতার পণ্য সম্ভারের পসার মেলে মানুষকে আকর্ষিত করে।
যুদ্ধ অনিশ্চয়তার খেলা। যুদ্ধ কখনও এনে দেয় অপরিসীম ক্ষমতা, তুলে দেয় যশের সুউচ্চ শিখরে, কখনও আবার পতিত করে সীমাহীন অন্ধকারের অতল গহ্বরে। গহ্বরে পতিত হলেই জীবনে নেমে আসে সংশয়, করুণ শীতল মৃত্যু।
কথাগুলো ভেবে কুতলুগ নিগার বেগম উৎকন্ঠায় কেঁপে উঠলেন। তিনি স্নেহপূর্ণ চোখে বাবরের দিকে তাকিয়ে উপদেশের সুরে বললেন- সময়ে নিশ্চয় আপনার সমরকন্দ বিজয়ের স্বপ্ন ফলবতী হবে। আপনি বর্তমান কিছুদিনের জন্য ধৈর্য ধরুন। আপনার সহায়ের জন্য কাশিম বেগের মতো সুদক্ষ বিচক্ষণ উজির-এ-আজম রয়েছেন। বলবিক্রম বীরত্বে অদ্বিতীয় সুদক্ষ সৈন্যসামন্ত রয়েছে। সেজন্য সমরকন্দ বিজয়ের স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়ন করতে বেশিদিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন হবে না। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি বর্তমান সমরকন্দ বিজয়ের চিন্তা ত্যাগ করুন। আপনি নির্মাণকার্যে মনোনিবেশ করুন। আপনার কাছে সুদক্ষ ভাস্করবিদ ফজিলুদ্দিন রয়েছেন। সেজন্য আপনি আন্দিজান, মার্গিলান এবং উশে সুন্দর সুন্দর সৌধ এবং শিক্ষানুষ্ঠান নির্মাণ করে সেগুলোর দ্বারা শত্রুর মোকাবিলা করুন।
কুতলুগ নিগার বেগম অনেকদিন বাবরের কোনো কার্যে এ রকম দৃঢ় বিরোধিতা করেন নি। যদি কোন কোন ক্ষেত্রে করেছেনও, সে অত্যন্ত মৃদুভাবে করেছেন, সেজন্য কুতলুগ নিগার বেগমের আজকের এই দৃঢ়তাপূর্ণ কথা শুনে কাশিম বেগ মাথা নত করলেন।
বাবর পিয়ালার প্রান্তে লেগে থাকা কিমীজের সোনালী প্রতিবিম্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বেগদের কীভাবে সান্ত্বনা দিবেন সেটা ভাবতে লাগলেন।
কুতলুগ নিগার বেগমের দৃঢ়তাপূর্ণ কথা শুনে বাবর এবং কাশিম বেগ মুখের ভাষা হারালেন। কক্ষটি অস্বাভাবিক রকমে নীরব হয়ে পড়লো। কাশিম বেগের চোখে মুখে ফুটে উঠলো হতাশা ও বিষণ্নতা। বাবরের চোখে মুখে ফুটে উঠলো দুঃশ্চিন্তার অভিব্যক্তি।
কয়েকটা মুহূর্ত নীরবে পার হওয়ার পরে খানজাদা বেগমের স্পষ্ট এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ শব্দে নীরবতা ভঙ্গ করলো- জাহাপনা, নবাই (তখনকার সমরকন্দের একজন বিশিষ্ট কবি)র নজমে (কবিতা)র কথা নিশ্চয় আপনার মনে আছে? স্মরণ করুন, ফরহাদ কত সুন্দর সুন্দর সৌধ নির্মাণ করেছিলেন। আপনার ভগ্নীও আপনাকে ফরহাদের মতো সৌধ নির্মাণকারীর রূপে দেখতে চায়। পৃথিবীতে সৌধ নির্মাণ করার থেকে অন্য কোন ভালো কাজ রয়েছে বলে আমি কল্পনাই করতে পারি না।
ভগ্নীর কথায় বুরাতন পাহাড়ে নির্মিত উপাসনা গৃহে অতিবাহিত করা সময়ের কথা বাবরের মনে পড়ে গেল। তিনি ভাবতে বাধ্য হলেন যে, ভগ্নী বলা কথা মিথ্যা নয়। ফরহাদের প্রসিদ্ধি শ্রেষ্ঠতম প্রসিদ্ধি। ফরহাদ অমর হয়ে আছে তাঁর শিল্পকর্মের মাঝে। তিনিও ফরহাদের মতো প্রসিদ্ধি চান। মাতৃ বলা কথাও মিথ্যা নয়। সমরকন্দ অবশ্যে যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারবে। মাতৃর কথায় অনেক সত্য নিহিত হয়ে আছে; কিন্তু বেগদের এই কথা বুঝানো যায় কীভাবে? এ বিষয়ে একমাত্র কাশিম বেগই তাঁকে সহায় করতে পারবে বলে বাবরের ধারণা হলো।
সেজন্য বাবর কাশিম বেগকে প্রভাবিত করার জন্য বললেন- উজির সাহেব, আমরা কী ফরহাদের মতো প্রসিদ্ধি অর্জন করতে পারি না?
কথাবার্তার ধরণে যে সমরকন্দের উপরে আক্রমণ স্থগিত রাখার বিষয়ে বলছেন এ কথা উপলব্ধি করতে কাশিম বেগের অসুবিধা হলো না। তবে, এই সিদ্ধান্তই যে সৈনিকদের অসন্তুষ্ট করবে এটাও প্রায় নিশ্চিত। বাবর অসম্ভব এবং অস্বাভাবিক কাজ করে নিজের সাহস ও দক্ষতা প্রমাণ করতে আগ্রহী এ কথা কাশিম বেগ জানে। এই ধারণার বশবর্তী হয়েই সবচেয়ে বিখ্যাত এবং শক্তিশালী বেগবৃন্দই সমরকন্দ আক্রমণের কথা ভাবতেছে এবং তারজন্য যুদ্ধের আয়োজনও চালিয়ে যাইতেছে। কিন্তু হঠাৎ যদি বেগবৃন্দ আক্রমণ স্থগিত রাখার কথা অবগত হয়, তাহলে তাঁরা বিদ্রোহ করাটাও অসম্ভব নয়। দৌড়ে থাকা বলবান ঘোড়ার দৌড় হঠাৎ বন্ধ করা উচিত নয়। শক্তি প্রয়োগ করে দৌড় বন্ধ করতে গেলে, হয়তো ঘোড়ার রাজহাড় ভাঙবে, নয়তো আরোহী পিঠ থেকে ছিটকে পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত হবে। কাশিম বেগ মনে মনে এসব কথা ভাবলেন যদিও প্রকাশ্যে কোন কথা বলতে সাহস পেলেন না।
সেজন্য কাশিম বেগ বুকে হাত স্থাপন করে মাথা নুইয়ে অসহায়ভাবে বললেন- জাহাপনা, আপনার দাস এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে বর্তমান অসমর্থ।
বাবর চোখ বিস্ফারিত করে বললেন- আমি আম্মাজানের কথার অবাধ্য হবো নাকি?
এরাঁ আমার কাছ থেকে চায় কী? কাশিম বেগ এভাবে স্বগতোক্তি করে মনে মনে ভাবতে লাগলেন- বাবর আজ মাতৃ এবং ভগ্নীকে সন্তুষ্ট করতে যুদ্ধ স্থগিত রাখতে চাইছেন। কিন্তু কাল পর্যন্ত যুদ্ধ এবং বীরোচিত কার্যের কথা বলছেন। এদিকে কুতলুগ নিগার বেগমের কথা উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়!
কিশোর পুত্রের উপর মাতৃর প্রভাব দেখে কাশিম বেগ পেটে পেটে বিরক্ত হয়ে উঠলেন। কোনোমতে নিজেকে সংযত করে শান্তশিষ্ট কণ্ঠে বললেন- মালিকা সাহেবার প্রত্যেকটা কথাই আমার জন্য আদেশ তুল্য। আপনার কথা লঙ্গন করার সাহস বা ধৃষ্টতা আমার নেই। তবুও আমি একটি কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি দেশের কথা ভেবে। যুদ্ধের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমরা বেগদের সাথে পরামর্শ করাটা উচিত হবে মালিকা সাহেবা।
কাশিম বেগের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহের চিহ্ন স্বরূপে তাঁর নামের আগে ‘আমির উল উমরাহ’ (বয়োজ্যেষ্ঠদের রাজা) উপাধি প্রদান করা হয়েছিলো। কুতলুগ নিগার বেগম এই কথা ভুলেননি। সেজন্য তিনি উপাধি উল্লেখ করে সম্বোধন করে স্নেহপূর্ণ হাসি হেসে বললেন- জ্বনাব আমির উল উমরাহ,আপনি বেগদের মনোভাব পরিবর্তনের জন্য নিশ্চয় সহায় করতে পারবেন।
আমার জীবন পণ মালিকা সাহেবান। আমি বেগদের কিছু ইচ্ছার কথা জানি। যদি আপনি আমার কথায় ধৃষ্টতা না ধরেন তাহলে তাঁদের সাথে….. এভাবে বলেই তিনি বাক্যটা সম্পূর্ণ না করে থেমে গেলেন।
বলুন, থামলেন কেন? কুতলুগ নিগার বেগম অভয় দিলেন।
কাশিম বেগ কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে উদ্দেশ্যহীনভাবে মাথা ঘুরালেন। মাথা ঘুরানোর ফলে তাঁর দাড়ির অগ্রভাগ কাঁধ স্পর্শ করলো। তারপর তিনি সোজা হয়ে বসে বাবরের দিকে তাকিয়ে বললেন- বিশ্বের আতঙ্ক তৈমূর লং, উলুগ বেগ প্রভৃতি মহান বাদশাহদের অধ্যবসায় এবং মহত্ত্বাকাংক্ষা ছিলো তাঁদের চালিকা শক্তি। বর্তমানের ফারগানা বিশাল যদিও মাউরা উন্নহরের তুলনায় একেবারে নগণ্য।(মাউরা উন্নহর বর্তমানের উজবেকিস্থান, তাজিকিস্থান, দক্ষিণ কাজাকিস্থান, দক্ষিণ কিরঘিস্থান প্রভৃতি অঞ্চল মিলে মধ্য এশিয়ার একটি সাম্রাজ্য ছিলো। অঞ্চলটি আমু দরিয়ার দক্ষিণে এবং চির দরিয়ার উত্তর অঞ্চলে অবস্থিত ছিলো।
কাশিম বেগের কথার অর্থ উপলব্ধি করতে পেরে খানজাদা বেগম কিঞ্চিত বিরক্তি ভরা কন্ঠে বললেন- আমাদের নিকট মহান ভাস্কর্য শিল্পী এবং সৌধ নির্মাণের প্রয়োজনীয় সম্পদ নেই বলে বলতে চাইছেন নাকি আপনি? অবশ্যে পূর্বের সমরকন্দ ঐশ্বর্য বিভূতিতে অনেক উন্নত ছিলো।
বেগম সাহেবা, আমাদের সবই রয়েছে। তবে, আন্দিজান ভব্যতা, সভ্যতা এবং ঐশ্বর্য সম্পদে পূর্বের সমরকন্দের তুলনায় কিছুটা হলেও দুর্বল। বেগবৃন্দ এ কথা অবগত হয়ে পূর্বে যেরকম সাম্রাজ্য ছিলো সেরকম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি উত্থাপন করতে পারে। এই দাবি উত্থাপন করলে নিশ্চয় অযৌক্তিকও হবে না। কিন্তু সেটা করতে হলে সমগ্র স্বাধীন বিকেন্দ্রীভূত শক্তি কেন্দ্রীভূত করে হাতের মুঠোয় আনাটা খুবই জরুরি। বিনা যুদ্ধে এ কাজ সম্ভব হবে না। কার ছত্রছায়ায় এই সমগ্র শক্তি কেন্দ্রীভূত করা যাবে? এ প্রশ্নের উত্তরে সবাই প্রথমে আমাদের বাদশাহ মির্জা বাবরের নামই উচ্চারণ করবেন। সমগ্র শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে পারলে তবেই আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে, বেগম সাহেবা।
কাশিম বেগের কথাই বাবরকে প্রভাবিত করলেন। তিনি মাতৃর প্রতিক্রিয়া জানার জন্য আগ্রহ সহকারে মাতৃর দিকে তাকালেন। মাতৃ কী জন্য কাশিম বেগের কথার প্রতিবাদ করতেছেন সে কথা জানার জন্যও তিনি আগ্রহী হয়ে উঠলেন।
কুতলুগ নিগার বেগম নির্বিকার, নিজের মতে অটল। তিনি কাশিম বেগের যুক্তি খণ্ডন করার জন্য বললেন- জ্বনাব, একমাত্র তাইমুর লঙ এবং উলুগ বেগই সর্বশ্রেষ্ঠ সৌধ নির্মাণ করেন নি। হিরাতে আলীশের নবাই ইখলাসিয়া ভবন(নিষ্ঠা ভবন), খালাসিয়া(আরোগ্য ভবন) এবং উন্সিয়া ভবন(মৈত্রী ভবন) নামে তিনটি বিখ্যাত ভবন নির্মাণ করেছেন। আমাদের বাদশাহর শক্তি আলীশের নবাইর তুলনায় মোটেই কম নয়। সর্বোপরি আপনার মতো একজন পরামর্শদাতা থাকতে এসব কাজ করাটা মোটেই কঠিন হবে না।
সত্য কথা মালিকা সাহেবা, আমিও আপনার কথা সমর্থন করি।
কাশিম বেগের কথায় বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। মহান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তিনি সর্বদা লালায়িত। কখনও মহান সৈনিক রূপে, কখনও কলমের দ্বারা উৎকৃষ্ঠ শায়েরি লিখে মহান হওয়ার চিন্তাই বাবরকে সর্বদা আচ্ছন্ন করে রাখে। আলী শের নবাইর মতো মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়ার জন্যও তিনি স্বপ্ন দেখেন। সৈনিকের খ্যাতি পরিবর্তনশীল। কখনও বিজয়ের গৌরবে দশ দিকে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, কখনও আবার পরাজয়ের গ্লানিয়ে জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। তাহলে তিনি মহান শায়ের হওয়া উচিত নাকি? বাবর নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন এবং শেষ মুহূর্তে ভাবলেন, এ তো দুর্গম অরণ্যে উড়ে বেড়ানো পাখীর মতো কথা!
সেই উড়ে বেড়ানো পাখী ধরার শক্তি তাঁর খুবই সীমিত। কিন্তু মাতৃ যে রাস্তাটি দেখাচ্ছেন, সে রাস্তাটি অবশ্যে আগের চেয়ে কিছু সুগম।
আলীশের নবাই নির্মিত সৌধের খ্যাতি যদি হিরাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, আমাদের সৌধের খ্যাতি হিরাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে না কেন? নিশ্চয় পড়বে। আলীশের নবাইর কর্ণগোচরও হবে। তখন তিনি নিশ্চয় জানতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন- কে এই বাবর?কোথায় তাঁর আবাস? তখন নিশ্চয় আলীশের নবাই তাঁর সাথে পরিচিত হওয়ার জন্যে আগ্রহী হয়ে উঠবেন! বাবর নিজেই হিরাত যান অথবা আলীশের নবাই-ই আন্দিজান আসুন, উভয়ের মাঝে তখন নিশ্চয় ভাব বিনিময় হবে। ইচ্ছা করলে, তখন তিনি আলীশের নবাইর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ধন্য হতে পারবেন। এই কথাগুলো ভেবে বাবর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।
উত্তেজনায় বাবরের চোখ লাল হয়ে উঠলো। তিনি আদেশাত্মক কঠোর স্বরে কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আম্মাজান আমার ভুল সংশোধন করে দিয়েছে যখন, তখন তাঁর পরামর্শ অনুসারে কাজ করাটাই উচিত হবে। আপনি বেগদের যুক্তি-তর্কে পরাস্ত করে যুদ্ধ স্থগিত রাখার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করুন।
বাবরের সিদ্ধান্তে কুতলুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগম প্রসন্ন হয়ে উঠলেন। তাঁরা ভাবলেন, কাশিম বেগ নিশ্চয় যুক্তিতর্কে পরাস্ত হয়েছেন। এখন তিনি তরবারি কোষাবদ্ধ করতে বাধ্য হবেন।
কিন্তু তাঁরা ভাবামতে কাশিম বেগ পরাজয় স্বীকার করলেন না। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল হয়ে রইলেন। কারণ, তিনি জানেন, এই ক্ষেত্রে বেগবৃন্দ তাঁর সাথে রয়েছে। সেজন্য তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- জাহাপনা, আপনার আদেশ পালন করার আগে বেগদের একটি ইচ্ছার কথা প্রকাশ করতে অনুমতি চাইছি।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাবর সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন- বেশ, কী বলতে চান, বলুন?
কাশিম বেগ নিজের মহিষের শিঙের মতো গোঁফে হাত ফিরিয়ে নির্ভীকভাবে খানজাদা বেগমের দিকে তাকালেন। (কাশিম বেগ এ রকম ধৃষ্টতা কখনও কখনও করতে বাধ্য হোন।) তারপর দৃঢ় নির্ভীক কণ্ঠে বললেন- বেগম সাহেবা, আমাদের বাদশাহকে প্রসিদ্ধিতে আপনি ফরহাদের সাথে তুলনা করছেন। আজকের ফরহাদের সেবায় নিয়োজিত হতে পারাটা বেগদের জন্য সত্যিই গৌরবের কথা এবং আমি——কাশিম বেগ অর্থপূর্ণ হাসি হেসে বললেন- শিরিন ফরহাদের মিলনের স্বপ্ন দেখতেছি। কাশিম বেগ রহস্যপূর্ণভাবে এভাবে বলে অল্প সময় মৌন থেকে গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বরে আবার বললেন- আমাদের শিরিন আজকের ফরহাদের জন্য সমরকন্দে অধীরভাবে অপেক্ষা করতেছেন। ব্যাচারি পিঞ্জিরাবদ্ধ পাখীর মতো মুক্তির অপেক্ষায় ছট্ফট্ করতেছেন বলে বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হয়েছি, বেগম সাহেবা।
কাশিম বেগের কথায় বাবরের মুখমণ্ডল লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো।
কাশিম বেগ উত্থাপন করা বিষয়টা অতি স্পর্শকাতর। সমরকন্দের শাসক সুলতান আহম্মদের কন্যা আয়েশা খাতুনের সাথে পাঁচ বছর বয়সে বাবরের বিয়ে হয়েছিলো। (যেজন সুলতান আহম্মদ আখসি আক্রমণের প্রাক্মুহূর্তে বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু হয়েছিলেন এবং আখসি আক্রমণ করতে আসার পথে সুলতান আহম্মদ কুবাশায় নদী পার হওয়ার সময় কুবার সাহসী যুবক তাহিরজানের তৎপরতায় বিস্তর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন।(তাহিরজানের বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি রইল।)আয়েশার বয়েস তখন ছিলো মাত্র চার বছর। সেই হিসাবে আয়েশার বর্তমান বয়েস চৌদ্দ বছর হবে।
বিয়ের পর বাবর কোনোদিন আয়েশা বেগমকে দেখেননি। কিন্তু আয়েশা বেগমকে যারা যারা দেখেছে তাঁদের মতে আয়েশা বেগম বর্তমান গোলাপের পাপড়ির চেয়েও বেশি সতেজ এবং সুন্দর হয়ে উঠেছে। সমরকন্দের শাসক বায়সঙ্কুর বর্তমান তাঁকে নজরবন্দি করে রেখেছে এবং এখন তিনি মুক্তির অপেক্ষায় বাবরের জন্য পথ চেয়ে বসে আছেন।
আয়েসার প্রসংগ উত্থাপন হওয়াতে কুতলুগ নিগার বেগম হতাশ হয়ে পড়লেন। তিনি প্রসংগটা সেখানেই ইতি টানতে বললেন- জ্বনাব, মির্জা বাবরের এই দুর্ভাগ্যের জন্য আমিও দুঃখিত এবং উদ্বিগ্ন। আয়েশার বড় বোন রেজিয়া তাসকন্দের শাসক সুলতান আলী খাঁর বেগম। আমি আপাজান মেহের খানম বেগমের নিকট পত্র লিখে আয়েশাকে সেখানে পাঠাতে বলেছি। হয়তো ইতিমধ্যে আমার ইচ্ছা সফল হয়েছে।
কাশিম বেগ শ্লেষ মিশ্রিত কন্ঠে বললেন- দুঃখের বিষয় মালিকা সাহেবা, আপনার সেই আদেশ এখন পর্যন্ত আপনার আপাজান পূরণ করতে সক্ষম হোননি। আমাদের বিশ্বাসী বেগ একজন এ বিষয়ে সমরকন্দ থেকে আমাদের কাছে পত্র প্রেরণ করেছে। লজ্জার জন্য আমি পত্রটি জাহাপনাকে দেখাতে পারিনি।
কেমন পত্র? বাবর উত্তেজিত ও অসহিষ্ণুভাবে জিজ্ঞাসা করলেন।
বাবরের উৎকণ্ঠা দেখে কাশিম বেগ পেটে পেটে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তিনি গুরুগম্ভীর আবেগিক কন্ঠে চিঠির বক্তব্য প্রকাশ করলেন- আয়েশা বেগম তাঁর মাসির সাথে তাসকন্দ যাওয়ার জন্য আয়োজন করছিলেন। বায়সঙ্কুর কথাটা জানতে পেরে তাঁদের তাসকন্দে যেতে দেন নি। এমন কী তাঁদের প্রাসাদের উপর নজর রাখতে পহরাদার নিযুক্ত করেছেন। বর্তমান তাঁদের গৃহের বাইরে বের হওয়াও নিষেধ। এ-কে একপ্রকার নজরবন্দিও বলতে পারেন। তাঁরা বর্তমান ব্যাকুলভাবে আন্দিজানের দিকে চেয়ে রয়েছেন।
বাবর ক্ষোভ আক্রোশে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। বায়সঙ্কুরের প্রতি জেগে উঠলো প্রচণ্ড বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা। আয়েশার চিন্তাই তাঁর সৌধ নির্মাণের চিন্তা তলে ফেলে দিলো। তাঁর চোখের সন্মুখে শুধু ভেসে বেড়াতে লাগলো বন্দিনী আয়েশার বেদনাচ্ছন্ন মুখের প্রতিচ্ছবি। তিনি ভাবলেন, অবলাদের বিরুদ্ধে নীচ আচরণ করা বায়সঙ্কুর অবশ্যেই শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। ক্ষোভ, অপমানে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে আদেশাত্মক সুরে বললেন- বেগ সাহেব আপনি যুদ্ধের আয়োজন করুন।
কুতলুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগম বাবরের মনোভাব পরিবর্তন হতে দেখে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন।
কুতলুগ নিগার বেগম কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে বললেন- বেগ সাহেব, আপনি শান্তির প্রস্তাব লিখে বায়সঙ্কুরের কাছে পত্র প্রেরণ করুন।
বাবর মাতৃর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বললেন- শান্তির প্রস্তাব করে দুর্বলেরা। আমি বায়সঙ্কুরের চেয়ে দুর্বল নই। ইঁটের জবাব আমি পাথর দিয়ে দিতে জানি। বায়সঙ্কুরের সন্মুখে নতজানু হয়ে আমি আয়েশাকে উদ্ধার করব না। নিজ বাহুবলে তাঁকে আমি উদ্ধার করব। এভাবে মাতৃর বিরোধিতা করেই তিনি কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনি আজকে এই মুহূর্তে বেগদের দেওয়ানী খাসে একত্রিত করার ব্যবস্থা করুন। চলুন…..
বাবর উত্তেজিতভাবে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কাশিম বেগ মাথা নত করে বাবরের পেছনে পেছনে বেরিয়ে গেলেন।
কুতলুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগম শরবিদ্ধ হরিণের মতো অসহায়ভাবে বাবরের অপসৃয়মান দেহের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নিজের পুত্রের কাছে হার মানতে বাধ্য হওয়ার জন্য কুতলুগ নিগার বেগমের মুখমণ্ডলে বিষাদের ছায়া নেমে এলো।
* * *
মির্জা বাবর সমগ্র শীত এবং গ্রীষ্মকাল সমরকন্দ অবরোধ করে রইলেন। বায়সঙ্কুরও পূরা সাত মাস যাবত বাবরের ভয়ে সহরের মুখ্যদ্বার বন্ধ করে রাখলেন। সাত মাস যাবত অবরুদ্ধ হয়ে থাকার ফলে সহরের বাসিন্দারা খাদ্য সংকটের সাথে নানান অসুবিধার সন্মুখীন হলো। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ অস্থির হয়ে উঠলো। অখাদ্য খেয়ে অনেক লোক মৃত্যুমুখে পতিত হলো। রোগীর পথ্য, ঔষধ এবং শিশুর খাদ্য সংকটে দেখা দিলো। চিকিৎসা, ঔষধ, পথ্যের অভাবে দলে দলে মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হতে লাগলো। সমগ্র সহর যেন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হলো। হাহাকার, আতঙ্কে ভরে পড়লো সমগ্র সহর। মানুষগুলো ক্ষুধা পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লো। কাজ করার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেললো মানুষগুলো। ক্রেতার অভাবে দোকান-পাট বন্ধ হতে লাগলো। রাস্তা-ঘাটে ময়লা, আবর্জনা জমা হয়ে চতুর্দিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।
সহরের অবস্থা দেখে বাদশাহ বায়সঙ্কুর শংকিত হয়ে উঠলেন।এতোগুলো মানুষ একমাত্র তাঁর জন্য যমের যাতনা ভোগার জন্য তিনি বিচলিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু দুর্দশা মোচনের কোনো উপায় না দেখে তিনি সহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলেন।
ভাবামতেই বায়সঙ্কুর একদিন রাতে কয়েকজন বিশ্বাসী সহচর নিয়ে হিসারের সুলতান খসরুর কাছে পালিয়ে গেলেন। সেদিন প্রচন্ড শীত পড়েছিলো। সেজন্য তিনি পালিয়ে যাওয়াটা কারও চোখে পড়ল না।
পরের দিন সকালে বায়সঙ্কুর পালিয়ে যাওয়া কথাটা রাষ্ট্র হয়ে পড়ল। তিনি পালিয়ে যাওয়ার খবর প্রচার হওয়ার সাথে সাথে সহরের বেগবৃন্দ তৎক্ষণাৎ এক জায়গায় একত্রিত হলেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তাঁরা সবাই বাবরকে সহরে প্রবেশ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে সিদ্ধান্ত নিলেন এবং দ্বাররক্ষীদের দূর্গের মুখ্যদ্বার খোলে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন।
দূর্গের দ্বার খোলার সাথে সাথে মুক্তির আনন্দে বন্যার স্রোতের মতো শত শত মানুষ দূর্গের বাইরে বেরিয়ে এলো। তাঁরা ঢোল-খোল, নাগারা, সানাইর ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে বাবর এবং তাঁর সেনাদের দূর্গের ভেতর এগিয়ে আনতে সমদল করে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
সমরকন্দের বিশাল জনসমুদ্রের সাথে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত তিন হাজারের অধিক বাবর সেনা ঢোল-খোল, নাগারা, সানাই ধ্বনির তালে তালে সহরে প্রবেশ করলেন।
পাঁচ বছর বয়সে বাবর একবার সমরকন্দ এসেছিলেন। তারপর রাজনৈতিক কারণে তিনি সমরকন্দে আসার অবসর পাননি। তবুও তিনি সহরের বিষয়ে অনেক কথাই জানতেন লোকমুখে শুনে শুনে। তবে সহরের কোথায় কি রয়েছে এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না তিনি।
বাবর তাঁর স্বপ্নের সহর সমরকন্দের সৌন্দর্য বিভূতি দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন। গভীর উৎসাহ উদ্দীপনার সহিত তিনি সহরের উপরে চোখ ফেরাতে লাগলেন।
বাবরের চোখে পড়লো, আকাশলঙঘী ভব্য অট্টালিকাসমূহ। সূর্যের রশ্মি পড়ে সৌধের গম্বুজগুলো ঝলমল করতেছিলো।
গম্বুজের দিকে তাকিয়ে কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বাবর জিজ্ঞেস করলেন- ওই গম্বুজগুলোর কোনটা উলুগ বেগের মাদ্রাসার গম্বুজ? কোনটা বেগম খানমের মসজিদ?
বাবর শিশুসূলভ কৌতূহলবশত এভাবে একটার পর একটা প্রশ্ন করে যেতে লাগলেন এবং কাশিম বেগ যথাযথভাবে উত্তর দিয়ে যেতে লাগলেন।
এভাবে এসে এসে তাঁরা আর্কের সন্মুখে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
আশ্চর্যজনক রূপে সুন্দর ছিলো সৌধের শিরস্ত্রাণ স্বরূপ গম্বুজগুলো। পূর্বপুরুষ দ্বারা নির্মিত মনোহর সৌধের দেয়ালে অঙ্কিত বিবিধ কারোকার্যখচিত নয়নাভিরাম চিত্রসমূহ প্রত্যক্ষ করে বাবর মোহিত হয়ে পড়লেন। এই সমূহ সৌধের সুখ্যাতি শুনে শুনেই তিনি যশের জন্য লালায়িত হয়ে উঠেছিলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তিনি সেই সমূহ সৌধের সৌন্দর্যসম্ভার উপভোগ করতে লাগলেন।
সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা আবাস গৃহগুলোর দিকে তাকিয়ে বাবরের হঠাৎ আয়েশা বেগমের কথা মনে পড়ে গেলো। কাশিম বেগ বাবরের থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে কাশিম বেগের নিকটে এলেন। আয়েসা বেগমের কথা সরাসরি জিজ্ঞাসা না করে তিনি পাকে-প্রকারে জিজ্ঞাসা করলেন- কয়েদীদের বুঝ নিতে কাউকে পাঠিয়েছেন নাকি, বেগ সাহেব?
কাশিম বেগ প্রশ্নের সাথে নিহিত অর্থ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন- কোনগুলো কয়েদীর কথা জিজ্ঞাসা করছেন?
নিজের বাগদত্তার কথা বলতে বাবরের লজ্জাবোধ হলো। লজ্জায় তিনি বিশেষভাবে মাথা নত করলেন।
এবার কাশিম কথাটা বুঝতে পাড়লেন। তিনি উৎসাহিত কণ্ঠে বললেন- হ্যাঁ জাহাপনা, নুয়ান কুশল দাশকে পাঠানো হয়েছে। সন্ধ্যের মধ্যে আমরা সব খবর জানতে পারব?
তাঁরা ঘুরে ফিরে এসে সন্ধ্যায় বোস্তান সরাগ(বায়সঙ্কুরের রাজপ্রাসাদ)-এ পৌঁছোলেন। বোস্তান সরাগে বাবরের জন্য রাতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।
শয়ন কক্ষে লন্ঠন প্রজ্বলিত করার কিছুক্ষণ পর বাবরের অনুমতি নিয়ে নুয়ান কুশল দাশ কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলেন।
কক্ষটি অপেক্ষাকৃত শীতল। সেজন্য গদি এবং তোশক বিছানো হয়েছিলো। কুশল দাশ গরমকোট এবং টুপী পরে কথা বলছিলো।
নুয়ান কুশল দাশ উৎসাহ সহকারে শুরু করলো- জাহাপনার তরফ থেকে সোনার খারু, বিবিধ কাপড়, বাদাম, খেজুর প্রভৃতি নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। আপনার মাসি মেহের নিগার বেগম সেগুলো সানন্দে গ্রহণ করেছেন।
মেহের নিগার বেগম বাবরের মাতৃ কুতলুগ নিগার বেগমের বড় বোন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। অন্যদিকে নাবালিকা অবস্থায় আয়েশা বেগমের মাতৃর মৃত্যু হয়েছিলেন। আয়েশা বেগমের মাতৃও কুতলুগ নিগার বেগমের বোন ছিলেন। সেজন্য মাতৃর মৃত্যুর পরে আয়েশা বেগমের দায়িত্ব মাসি মেহের নিগার বেগম নিয়েছিলেন। তিনি মাতৃস্নেহে আয়েশা বেগমকে লালনপালন করেছেন। সেজন্য মাসিও এখন থেকে বাবরের সাথে থাকবে বলে বাবর উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন। আয়েশা বেগমকে লালন পালন করে মেহের নিগার বেগম যে ঋণে বাবরকে জড়িয়েছেন তার কিছু হলেও পরিশোধ করার সুযোগ পাবে বলে বাবরের মন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো।
বাবর প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে নুয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- তারপর?
নামমাত্র মাংসও নেই বেগম সাহেবার শরীরের। হাড্ডি কয়টা শুধু অবশিষ্ট রয়েছে। নুয়ান কথা কয়টা হতাশা মিশ্রিত সুরে বলে কিছুক্ষণ বিরাম নিয়ে আবার বললেন- ক্ষুধার জ্বালায় প্রায় মরতেই বসেছিলেন। অনেকদিন তাঁরা রুটির মুখই দেখেন নি হয়তো! সোনার বিনিময়েও আটা পাওয়া যায় না। আপনার মাসি আমাদের এসব কথা জানিয়েছেন। তিনি দুঃখের দিনের কথা বলে চোখের জল ফেলেছেন। তিনি কেঁদে কেঁদে বলেছেন- তাঁদের তুষের রুটিও খেতে হয়েছে। খড়ি নেই। ঠাণ্ডায় কোনোমতে না মরে বেঁচে রয়েছেন।
বায়সঙ্কুর মহিলাদের সাথেও দুর্ব্যবহার করেছে নাকি? বাবর ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
নুয়ান কুশল দাশ আবার বলতে লাগলো- মির্জা বায়সঙ্কুরও বোলে শেষের দিন কয়টা পেট ভরে খেতে পান নি। সাত মাস যাবত অবরুদ্ধ হয়ে থাকাটা তো মুখের কথা নয়! রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। সেগুলো সৎকার করার লোক নেই। মৃতদেহগুলো পচেগলে বাতাসে দুর্গোন্ধ ছড়াচ্ছে। মানুষের শরীরে মৃতদেহ সৎকার করার মতো শক্তিও নেই। সবাই দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে। গরিব লোকেরা কুকুর এবং গাধার মাংস পর্যন্ত খেতে হয়েছে। আমি তাঁদের কাছ থেকে আসার পরে কাশিম বেগের কাছে সব খোলে বলে এসেছি। এক গাড়ী আটা চাল, এক গাড়ী খড়ি, দশটা ভেড়া আমি নিজে দিয়ে এসেছি। কাশিম বেগও খাদ্যবস্তু পাঠানোর জন্য যা-যোগার করতেছেন।
নুয়ান কুশল দাশ বিরামহীনভাবে কথাগুলো বলে কিছুক্ষণ বিরাম নিয়ে রহস্যময় হাসি হেসে বললো- আয়েশা বেগম…
নুয়ান বাক্যটা শেষ করতে পাড়ল না। আয়েশার নাম শুনেই বাবর আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- আয়েশা বেগম! বল, আয়েশার খবর কী?
ঠিক এ রকম একটি কক্ষে…. নুয়ান বসে থাকা কক্ষে চোখ ফিরিয়ে বললো- আয়েশা বেগম সাদা বোরখা পড়ে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। নুয়ান আবার বিরাম নিয়ে হতাশা মিশ্রিত সুরে বললো- সত্যি কথা বলতে গেলে, আয়েশা বেগমকে আমার পসন্দ হয়নি। বোরখার অভ্যন্তরে থাকা শরীরটা অবশ্যে আমি দেখতে পারিনি। তবে, খাটো বলে অনুমান হলো। শরীরটাও কৃশ এবং শুকনো।তবে, কন্ঠস্বর খুবই মিষ্ট এবং স্পষ্ট।
আয়েশা বেগমের কথা ভেবে ভেবেই বাবর আন্দিজান থেকে সমরকন্দ এসেছেন। অথচ তিনি এখন পর্যন্ত তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে পারেন নি। আয়েশার সাথে সাক্ষাৎ করাও অবশ্যে তাঁর জন্য নিষিদ্ধ। শরিয়তের বিধান নেই। মৌলানা কালেমা পড়ে বিয়ে পেতে না দেওয়া পর্যন্ত নওসা এবং কন্যা একসাথ হওয়া বা দেখা সাক্ষাত করা ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী। বিধান ভেঙ্গে সাক্ষাত করলেই পরম্পরা ভেঙ্গে যাবে এবং আত্মীস্বজনের কাছে বদনামী হতে হবে।
নুয়ানের ভাব-ভঙ্গীতে বুঝা গেলো তাঁর কাছে এমন কোনো জিনিস আছে যা বাবরকে দেখাতে সে আগ্রহী। সে বগলের তল থেকে রেশমি কাপড়ের একটি ছোট থৈলা বের করে বাবরের দিকে বাড়িয়ে বলল- মেহের নিগার বেগম আয়েশার হয়ে আপনার জন্য থৈলাটা পাঠিয়েছেন।
বাবর অতি আগ্রহে থৈলাটা হাতে নিয়ে টিপে দেখলেন। কিন্তু হতাশ হলেন। তাঁর ধারণা হলো, থৈলাটিতে কিছুই নেই। কৌতূহলবশতঃ তিনি থৈলার মুখের বাঁধন খোলে হাতের তালুর উপর উপুড় করে ধরলেন। ছোট ছোট দুই টুকরা হীরা তাঁর হাতের তালুতে পড়ল। হীরা দুই টুকরা কুয়াশার কণার থেকে কিছুটা বড়। কিন্তু আকারের থেকে ওজনের অনুপাত বেশি। রশ্মি বিচ্ছুরিত করে চিকমিক করতেছিলো হীরার টুকরাগুলো। সেই বিচ্ছুরিত রশ্মি এসে বাবরের চোখে ছাট মেরে ধরলো। হীরার চিকিমিকি আনন্দদায়ক এবং উষ্ম লাগলো তাঁর মনে।
নুয়ান সম্পূর্ণভাবে থৈলাটা উলটিয়ে ধরতে বললো- জাহাপনা, থৈলাটি সম্পূর্ণভাবে উলটিয়ে ধরুন।
নুয়ানের কথা মতো বাবর থৈলাটি উলটিয়ে ধরলেন। উলটিয়ে ধরার সাথে সাথে এক টুকরো কাপড় বেরিয়ে এলো। কাপড় টুকরো মেলে ধরার সাথে সাথে রেশমি সূতা দিয়ে লিখা একটি বাক্য তাঁর চোখে পড়ল। কাপড় টুকরায় শুধু একটি বাক্যই লিখা ছিলো- ‘শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ।’
বাবরের মনে বাক্যটি প্রেমপত্রর চেয়েও মিষ্টি লাগলো। এক মিষ্টি অনুভূতিতে তাঁর দেহমন ভরে গেলো। বাবরের অনুমান হলো- বাবর এসে তাঁকে শত্রুর কবল থেকে উদ্ধার করবে, এ কথা আয়েশা বেগম হয়তো আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলেন। সেজন্য তিনি বাক্যটা আগে থেকেই অতি যত্ন সহকারে লিখে রেখেছিলেন। না হলে অতি কম সময়ের মধ্যে এ রকম একটি বাক্য নুয়ানের হাতে দেওয়া সম্ভব হতো না। তিনি লজ্জায় হয়তো নুয়ানের কাছে এই কথা ব্যক্ত করেন নি। আয়েশার আত্ম উপলব্ধির গভীরতা এবং তাঁর প্রতি আস্থা দেখে বাবরের মুখমন্ডল আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এক সুগভীর প্রশান্তিতে তাঁর চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এলো।
জাহাপনা, এখন আপনার হাতে থাকা হীরার কাহিনী শুনুন। কথাটা আপনার মাসি আমাকে বলে পাঠিয়েছেন। নুয়ান দ্বিধাহীন কণ্ঠে হীরার কাহিনী বলে যেতে লাগলো- হয়তো আপনি নিজেও অনুমান করতে পারছেন এই হীরা দুই টুকরো কোথা থেকে এসেছে! এই হীরা দুই টুকরো সুলতান আহম্মদের রাজমুকুটে ছিলো। তাঁর মৃত্যুর পরে সুলতান মাহমুদ হীরা দুই টুকরো হস্তগত করার আগেই আয়েশা বেগমের মাতৃ রাজমুকুট থেকে খুলে নিজের নিকটে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় হীরা দুই টুকরো মেহের নিগার বেগমের হাতে দিয়ে আয়েশা বেগমকে দিতে বলেছিলেন। আপনি সমরকন্দের সিংহাসনে আরোহণ করার পরে হীরা দুই টুকরো যাতে অতি কমেও একশ বছর আপনার রাজমুকুটে শোভাবর্দ্ধন করে এটাই আয়েশা বেগমের ইচ্ছা।
আয়েশা বেগমের পিতৃ সুলতান আহম্মদের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে বাবরের মন উদাস হয়ে উঠলো।
কিছুদিন আগেও সমরকন্দের বাদশাহ সুলতান আহম্মদ জীবিত ছিলেন। এখন তিনি ইহ সংসারে নেই। নিয়তির অমোঘ বিধানে তিনি বর্তমান কবরের তলে শোয়ে রয়েছেন।
সুলতান আহম্মদ জীবিত থাকা অবস্থায় বাবর সিংহাসনে আরোহণ করার পরেই একবার বাবরের সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। তিনি বাবরের সাম্রাজ্যের কিছু অংশ দখলও করেছিলেন। উপায় বিহীন হয়ে তখন বাবর সুলতান আহম্মদের সাথে অপমানজনক সন্ধি করতে বাধ্যও হয়েছিলেন। তাঁর পিতৃ ওমর শেখের মৃত্যুর জন্যও পরোক্ষভাবে সুলতান আহম্মদই দায়ী ছিলেন।
এখন সেগুলো অতীত কাহিনী। বাবর অতীত রোমন্থন করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
কয়েকটা উদাস মুহূর্ত পার করার পর বাবর বাস্তবে ফিরে এলেন। হীরা দুই টুকরোর দিকে বাবর উদাস দৃষ্টিতে তাকালেন। হীরা দুই টুকরোর চিকিমিকি প্রত্যক্ষ করে বাবরের অনুমান হলো, হীরা দুই টুকরো যেন আয়েশা বেগমের দু’টি চোখ। হীরার চিকিমিকি যেন তাঁর বাগদত্তা আয়েশা বেগমের চোখের জ্যোতি।
আয়েশা বেগম বাবরের জন্য অপেক্ষারত ছিলেন এবং এখন সেই অপেক্ষার অন্ত হলো। অবশেষে তিনি তাঁর বাগদত্তাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। আনন্দে বাবরের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরার উপক্রম হলো। তিনি কোনোমতে চোখের জল সম্বরণ করে বললেন- আচ্ছা, আমি হীরা দু’টুকরো গ্রহণ করলাম। আয়েশা বেগম যা করতে বলেছেন এখন সেটাই করা হবে।
বাবর রাজকোষের কোষাধ্যক্ষকে ডেকে পাঠালেন। কোষাধ্যক্ষ সতর্কতা সহকারে হীরা দুই টুকরো বাবরের রাজমুকুটে লাগিয়ে দিলেন।
রাজমুকুটে হীরার টুকরো দেখে বাবর বিমোহিত হয়ে পড়লেন। তাঁর মানস চোখে ভেসে উঠলো আয়েশা বেগমের সতেজ কোমল মুখাবয়বের প্রতিচ্ছবি।
বাবর আয়েশা বেগমের মুখমণ্ডল স্মরণ করে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন। সাথে সাথে তিনি কাগজ কলম সংগ্রহ করে শায়েরি লিখতে বসলেন-
সুন্দরী চন্দ্রমুখী, তোমার রূপের চর্চা সব জায়গায় হয়
তোমার সাথে আমার কখন মিলন হবে চন্দ্রমুখী…
বাবর সমরকন্দ সহরে প্রবেশের পরের দিনের কথা। হাড় কাঁপানো প্রচণ্ড শীত। সমরকন্দের মুখ্য চক রেগিস্থানে জনতার ভির ওপচে পড়লো। সাত মাস পর সহরটায় যেন আবার প্রাণের স্পন্দন জেগে উঠল। মুক্তির আনন্দে ক্ষুধা পিপাসা ভুলে জনতা উৎফুল্লিত হয়ে রাস্তায় বের হয়ে এলো। জনতার স্রোত ধীরে ধীরে সমদল করে এসে ফিরোজা দরজার কাছে অবস্থিত প্রেমিক গুফায় সমবেত হলো এবং সহর কাজির আগমন উপলক্ষ্যে অপেক্ষা করতে লাগলো।
এক সময় জনতার অপেক্ষার অন্ত হলো।
সহর কাজি সমন্বিতে সভ্রান্ত পদাধিকারীবর্গ বিচার স্থলে উপস্থিত হলেন। সাথে সাথে জনতার মনে জেগে উঠলো অনুসন্ধিৎসু উৎকণ্ঠা।
সহর কাজি অভিযুক্তদের বিচার স্থলে আনতে নির্দেশ দিলেন।
নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত একদল সৈনিক সক্রিয় হয়ে উঠলো। তারা অভিযুক্তদের হাত পা লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে বিচারকের সন্মুখে হাজির করলো।
শীত নিবারণের জন্য অভিযুক্তদের শরীরে কোনো রকম কাপড় ছিল না। তারা শীতে ঠকঠক্ করে কাঁপছিলো। অবশেষে বিচার আরম্ভ হলো। কাজি সাক্ষী-বাদীর সাক্ষ্য গ্রহণ করতে লাগলেন। সাক্ষ্য গ্রহণের পরে কাজি উপস্থিত বেগ এবং উচ্চ পদাধিকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন- আপনারা সাক্ষী-বাদীর মুখে সব শুনলেন। এখন আপনাদের মতামত পেশ করুন।
কাজির আহ্বানে বেগ এবং পদাধিকারীগণ সজাগ হয়ে উঠলেন এবং একজন আরেকজনের সাথে আলোচনায় মিলিত হলেন। তাঁদের সমবেত মৃদু গুঞ্জনে বিচারস্থলী মুখর হয়ে উঠলো। কয়েক মুহূর্ত আলোচনার পরে সবাই একমত হয়ে ব্যক্ত করলেন- সাক্ষীর সাক্ষ্য অনুসারে এরা গুরুতর অপরাধী। এরা আমাদের বাদশাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অমার্জনীয় অপরাধ করেছে। এদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমাদের বিশজন বিশ্বস্ত সেনা আত্মবলিদান দিতে বাধ্য হয়েছেন। সেজন্য এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক। বিশ্বাসঘাতকতার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হোক।
সেটা ছিলো বাবর সমরকন্দ অবরোধ করে থাকা সময়ের কথা। তখন এই অপরাধী কয়জন ফিরোজা দরজার পহরায় নিযুক্ত ছিলো। এরা একদিন বাবরের কাছে বার্তাবাহক প্রেরণ করেছিলো। বার্তাবাহক বাবরের কাছে গিয়ে জানিয়েছিলো যে, দীর্ঘদিন অবরোধের ফলে সহরের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বায়সঙ্কুরের প্রতি জনতা আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা মুক্তির অপেক্ষায় পিঞ্জিরাবদ্ধ পাখির মতো ছটফট করতেছে। সেজন্য ফিরোজা দরজার পহরায় নিযুক্ত সৈনিকরা বাবরের আনুগত্য স্বীকার করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। বাবর রাতে ফিরোজা দরজার নিকটে এলে পহরাদার সেনারা দূর্গের দরজা খুলে দিবে এবং ফিরোজা দরজার পহরায় নিযুক্ত সব কয়জন সেনা বাবর সেনার সাথে মিলে যুদ্ধ করে বায়সঙ্কুরকে সিংহাসন থেকে বিতাড়িত করবে।
প্রস্তাবটা বাবরের জন্য খুবই লোভনীয় ছিলো। সেজন্য তিনি আগপাছ না ভেবে বার্তাবাহকের কথায় বিশ্বাস করে তার সাথে দশজন সেনা পাঠিয়েছিলেন।
কিন্তু কার্যত প্রমাণ হয়েছিলো, অভিযুক্তদের বাবরের প্রতি মোটেই আনুগত্য ছিল না, সেটা ছিলো বাবরকে ধ্বংস করার জন্য তাদের ছলনা মাত্র। অভিযুক্তরা বার্তাবাহকের সাথে পাঠিয়ে দেওয়া বাবর সেনাদের আটক করে বায়সঙ্কুরের সেনাধ্যক্ষের হাতে তুলে দিয়েছিলো এবং সেনাধ্যক্ষের নির্দেশে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিলো।
যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে সেনাদের সেনাধ্যক্ষের হাতে তুলে দিয়েছিলো, তারা আমরা নয়। বিশ্বাসঘাতকতা করা সেনারা পালিয়ে গেছে। আমরা সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমাদের ছেড়ে দিন। অভিযুক্তদের মধ্য থেকে একজন ভয়ে কেঁদে কেঁদে কাকুতি মিনতি করতে লাগলো।
কিন্তু তার কাকুতি মিনতিতে কেউ গুরুত্ব দিল না। ফলে তার কাকুতি মিনতি অরণ্য রোদনে পর্যবসিত হলো।
পরম্পরা অনুসারে অপরাধীদের পিঠ-মোড়া করে বেঁধে বিশেষভাবে খনন করা খাতের পাড়ে নিয়ে যাওয়া হলো এবং অভিযুক্তদের আঁঠু মুড়ে বসে থাকতে বাধ্য করা হলো।
কাজি নির্মমভাবে ঘোষণা করলেন- এদের শিরশ্ছেদ করা হোক।
নির্দেশ ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে পেশীবহুল বলিষ্ঠ সৈনিক একজন শাণিত তরবারি নিয়ে আদেশ প্রতিপালনের জন্য এগিয়ে এলো। সে তারবারির একটি একটি কোপে বলির পাঠার মতো অপরাধীদের মুন্ড দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। উষ্ম রক্তের ধারায় রঞ্জিত অভিযুক্তদের দেহবিচ্যুত মুণ্ডগুলো খাতে ছিটকে পড়লো। অবশেষে মুণ্ডচ্যুত দেহগুলো খাতের মাঝে ঠেলে ফেলে দেওয়া হলো।
সেদিন রাতে বরফ পড়ে মৃত্যুদণ্ডের চিন-ছাপ মুছে ফেললো।
বিনাযুদ্ধে বাবরের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হলো। সমরকন্দের জনতাও অনেক দিন পরে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত বন্দি জীবন থেকে মুক্ত হয়ে উজ্জীবিত হয়ে উঠলো। ভয়, শংকা, সংশয় দূর হলো। আনন্দ উল্লাসে উজ্জীবিত হয়ে জনতা রাজপথে বেরিয়ে এলো। বন্ধ দোকান-পাট খোলা হলো। বাজার, রাস্তাঘাট জনতার গুঞ্জনে মুখর হয়ে উঠলো।
সেদিন রাতে প্রচন্ড ঠাণ্ডা পড়াতে প্রচুর বরফ পড়েছিলো। ফলে উঁচু উঁচু সৌধের গম্বুজগুলো বরফে ঢেকে ফেলেছিলো। পরের দিন সূর্যোদয়ের পর শীতের প্রকোপ কিছু কম হওয়ায় দুপর পর্যন্ত আবহাওয়া কিছুটা গরম হয়ে রইলো। ফলে রোদের আমেজ নেওয়ার জনতা রাজপথে বেরিয়ে এলো।
রাস্তাঘাটে মানুষের আসা-যাওয়া দেখে বাবরের মন চাঙ্গা হয়ে উঠলো। জহুরের নামাজ পড়ে তিনি সহর পরিভ্রমণে বেরিয়ে এলেন।
কাশিম বেগ, আহম্মদ তনয়াল, খানকুলি নামের বেগ এবং অন্যান্য কয়েকজন বেগ তাঁর সাথে বের হলেন। তাঁদের সাথে পথপ্রদর্শক হিসাবে বের হলেন শায়ের জহুরি। জহুরি সমরকন্দের একজন বয়োবৃদ্ধ সভ্রান্ত নাগরকি ও বিখ্যাত শায়ের। সহরের রাস্তাঘাট, অলি-গলি এবং দর্শনীয় স্থানগুলি ছিলো তাঁর নখদর্পণে।
তাঁরা উলুগ বেগ দ্বারা নির্মিত বিশাল গম্বুজ বিশিষ্ট খানকাহ(ধর্মীয় উপাসনা এবং চর্চার স্থান) একটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। শায়ের জহুরি খানকাহর পূর্বদিকের একটি দরজার দিকে যেতে ইংগিত করে বাবরকে বললেন- মীর আলীশের নবাই সমরকন্দে এলে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতেন।
তখন আপনি তাঁর সাথে ছিলেন নাকি, জ্বনাব? বাবর উৎসাহ সহকারে জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ ছিলাম। জহুরি উজ্জীবিত কন্ঠে বললেন- তিনি এবং আমি প্রায় সম বয়সের। তিনি আমার থেকে সম্ভবত দুই তিন বছরের জ্যেষ্ঠ। তবুও আমি তাঁর গুণগরিমায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলাম। আমি আমার শায়েরিগুলো তাঁকে পড়ে শুনাতাম। আমার শায়েরিগুলো তিনি মনযোগ সহকারে শুনে আমাকে পরামর্শ দিয়ে উৎসাহিত করতেন। লোকমুখে জানতে পেরেছি, তিনি বোলে এখনও আমাকে ভুলেনি। সমরকন্দের কোনো লোক গেলেই আমার খোঁজখবর নেন। তাঁর ‘মজলিসি-উন-নাফাই’য়ে বোলে তিনি আমার নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। অবশ্যে তাঁর সেই গ্রন্থে তাঁর একজন পরিচারকের নামও বোলে লিপিবদ্ধ করেছেন।
বাবর সপ্রশংস দৃষ্টিতে জহুরির দিকে তাকালেন। বয়সের চাপে জহুরির দেহ সামান্য নুইয়ে পড়েছে। বকের পালকের মতো সাদা দাড়ি চুল। প্রশস্ত ললাট। ভাবের গভীরতায় কিঞ্চিত কুঞ্চিত। গভীর প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ মুখমণ্ডলে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের অভিব্যক্তি। চোখের দৃষ্টি খীণ যদিও কৌতুকোজ্জ্বল।
আলীশের নবাইর সান্নিধ্যে আসাটা তখন সৌভাগ্যের কথা বলে গণ্য করা হতো। তাঁর দ্বারা প্রশংসিত হওয়াটা ছিলো তাঁর থেকেও বিরাট সাফল্য ও সৌভাগ্যের কথা। সেজন্য আলীশের নবাইর প্রশংসা ও সান্নিধ্য পাওয়ার কথা শুনে বাবর জহুরির প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলেন। তিনি নিজে কখনও আলীশের নবাইর দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো সৌভাগ্য অর্জন করতে পারবে কী? বাবর নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন। তাঁর ধারণা হলো, তিনি নিজেকে শায়ের হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও বাস্তবে যেন তাঁর একজন সাধারণ শায়েরকেও পেছনে ফেলার যোগ্যতা নেই। শায়ের হিসাবে বর্তমান এটাই তাঁর মনোভাব। এমনকি তিনি রচনা করা শায়েরিগুলো খারাপ ভেবে অন্যকে সেগুলো দেখাতেও লজ্জাবোধ করেন।
প্রকৃতার্থে আমি শায়েরির প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও আহরণ করতে পারিনি। তবুও আমি একজন শায়ের হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে রয়েছি। বাবর মনে মনে এভাবে ভেবে নিজেই নিজেকে বললেন- তবুও আমি সৌভাগ্যবান। সমরকন্দের গণ্যমান্য বেগদের পরিবর্তে আলীশের নবাইর সমবয়সী, তাঁর উত্তরসূরী এবং সান্নিধ্যে আসা শায়ের জহুরিকে পথপ্রদর্শক হিসাবে আমন্ত্রণ জানাতে পেরেছি। আমার জন্য এর থেকে আর কী সৌভাগ্যের কথা হতে পারে!
জহুরি বাবরকে হালুইকরের দোকান একটিতে নিয়ে গেলেন।
দোকানপাট বন্ধ। এমনকি গলিটাও শূন্য। রাতে যথেষ্ট বরফও পড়েছিলো গলিটাতে। ঘোড়ার ক্ষুর ডুববে এরকম বরফ তখনও জমেছিলো কোনো কোনো জায়গায়। ছায়া পড়া স্থানসমূহে বিরাজ করছিলো হাড় কাঁপানো প্রচণ্ড শীত। রোদ পড়া কাঁচা রাস্তা এবং পাকা দেয়ালের গা থেকে তখনও বরফের স্রোত বইছিলো।
বাবর অপেক্ষাকৃত নিচু গৃহের ছাদের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। প্রতিটা ছাদের উপরে তখনও বরফ জমে ছিলো। কোনো একটি ছাদ থেকে তখনও বরফ ছাফা করা হয়নি। এমনকি বরফ ছাফা করার জন্য একজন লোকও ছাদের উপরে দেখা গেল না।
তাঁরা এসে এসে একটি দৈনিক বাজারে পৌঁছোলেন। সেখানেও সেই একই অবস্থা। দোকানপাট বন্ধ। বাজার জনশূন্য।
বাজারের অবস্থা দেখে বাবর জহুরির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- মৌলানা সাহেব, হালুইকর এবং দোকানীরা অন্য কোথাও চলে গেছে নাকি?
জহুরি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- জাহাপনা, তিন মাস হলো বাজারে রুটি নেই— আটা নেই। অবরোধের সময়ে অনেক লোক নাখেয়ে ক্ষুধা পিপাসায় মারা গেছে। বেঁচে থাকা লোকজন না খেয়ে, না খেয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। ছাদ থেকে বরফ সরানোর শক্তিও নেই তাদের।
বাবরের অনুমান হলো, জহুরি যেন তাদের এই অবস্থার জন্য পরোক্ষভাবে বাবরকেই দোষী সাব্যস্ত করছেন। বাবর জহুরির কাছ থেকে উত্তর পাওয়ার আশায় অপ্রস্তুতভাবে কাশিম বেগের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। কাশিম বেগ বাবরের দৃষ্টির অর্থ উপলব্ধি করতে পেরে আহত ও হৃদয় বিদারক বিষণ্ন সুরে জহুরিকে জিজ্ঞাসা করলেন- তবুও দুই একজনও জীবিত নাই নাকি?
হ্যাঁ আছে। দুই চারজন নিশ্চয় জীবিত আছে। তবে তাদের সহায়ের প্রয়োজন। আপনি যদি এই মুহূর্তে খাজাঞ্চিকে তাদের আটা দিতে নির্দেশ দেন, তাহলে হয়তো দোকানপাট আবার খুলতে পারবে এবং সমরকন্দবাসী আবার রুটি ও মিষ্টির স্বাদ গ্রহণ করার সুযোগ পাবে।
জহুরির কথায় বাবরের চোখেমুখে সহানুভূতি ও বেদনার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো। তিনি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে কাশিম বেগের দিকে তাকালেন। বাবরের চোখে মুখে উৎকণ্ঠা ও সহানুভূতির প্রতিবিম্ব প্রত্যক্ষ করে কাশিম বেগ উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। তাঁর অনুমান হলো, যেন বাবর তখনই তাঁকে হালুইকরদের আটা যোগান ধরার জন্য নির্দেশ দিবেন।
বাবর যাতে আটা প্রদানের আদেশ প্রদান থেকে বিরত থাকেন তারজন্য কাশিম বেগ ব্যস্তভাবে বললেন- জাহাপনা, আমাদের নিজের জন্য সামান্য খাদ্যসামগ্রী মজুত রয়েছে। সেনা এবং বেগদের জন্যেও রসদপাতি দর্কার। সেজন্য আমাদের তরফ থেকে বর্তমান আটা যোগান ধরাটা সম্ভব হবে না। হয়তো পরে কিছু একটা…..
কাশিম বেগ ইচ্ছাকৃতভাবেই বাক্যটা সম্পূর্ণ করলেন না।
বাবর উত্তেজিতভাবে জহুরির দিকে তাকালেন।
জহুরি আশা ভরা কৌতূহলী দৃষ্টিতে বাবরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। জহুরির দৃষ্টিতে প্রচ্ছন্ন ছিলো বিমর্ষ বিষণ্ন চিন্তার প্রচ্ছায়া।
জহুরির কৃশ কুঞ্চিত দেহের দিকে তাকিয়ে বাবরের মানসপটে মহম্মদ মজহর লিখা একটি শায়েরির চিত্র ভেসে উঠলো। বাবরের অনুমান হলো, তিনি যদি জহুরির মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে না পারেন, তাহলে জহুরি খুবই নিরাশ হবে। কথাটা ভেবে, বাবরের হৃদয় শোকাচ্ছন্ন হয়ে উঠলো।
বাবর রেকাবের উপরে পা দিয়ে অর্ধদন্ডায়মান হয়ে বললেন- শাক-সবজি সদাগরদের না দিয়ে হালুইকরদের দিন। একজন উপযুক্ত লোককে দায়িত্ব দিয়ে হালুইকরদের একটি তালিকা প্রস্তুত করুন এবং আমাদের তরফ থেকে তাদের আটা প্রদান করে রুটি প্রস্তুত করার নির্দেশ দিন। রুটি প্রস্তুত হলে আমাদের তরফ থেকে সেগুলি সমরকন্দের ক্ষুধাতুর লোকের মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা করুন। পাঁচ ছয় বস্তা আটা খরচ হলে আমাদের সৈনিকদের রসদপাতি নিশ্চয় কম পড়বে না। আগামী কাল অথবা পরশু আটা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
বাবরের নির্দেশ শুনে জহুরির মুখমন্ডল আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বাষ্পারুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বললেন- আল্লাহই আপনার মঙ্গল করুন। দান-দক্ষিণা করার জন্য আপনার রাজকোষ ধন-সম্পদে ভরে পড়ুক।
বাবরের নির্দেশের ফলে জহুরি প্রসন্ন হলেন যদিও কাশিম বেগ এবং বেগবৃন্দ মনে মনে অপ্রসন্ন ও বিরক্ত হয়ে উঠলেন।
আহম্মদ তনয়ালই বেশি বিরক্ত হলো। সে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তেরচা চোখে বাবরের দিকে তাকিয়ে স্পষ্টভাবেই বড়বড়ালো- কোথা থেকে আসবে এতো শাক-সবজি, আটা? যার দ্বারা বায়সঙ্কুর ভাগ্যের হাতে ছেড়ে যাওয়া এতোগুলো ক্ষুধাতুর লোকের পেট ভরবে? আমরা অন্নসত্র খুলে খাওয়াতে এসেছি নাকি এদের?
আহম্মদ তনয়াল প্রকৃতার্থে বাবরের ঘোর শত্রু। শত্রুতা করার কারণও আছে অবশ্যে। বাবরের পিতৃ ওমর শেখের সময়ে তনয়ালের দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও একমাত্র তার নিষ্ঠুর স্বভাবের জন্য সে দ্বিতীয় শ্রেণী বেগের মর্যদা পেয়েছিলো। সেজন্য সে ওমর শেখের মৃত্যুর পর বাবরের সৎ ভাই মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করেছিলো। তবে, সে প্রচেষ্টা খাজা আবদুল্ল্যার প্রত্যুৎপন্নমতিতার জন্য ব্যর্থ হয়েছিলো। ফলে সে প্রথম থেকেই পেটে পেটে বাবরকে খুবই খারাপ পায়। বাবরের কাছেও সেই ষড়যন্ত্রের কথা গোপন ছিল না। সেজন্য বাবর নিজে তাকে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও পেটে পেটে খারাপ পায়। বাবরের এই মনোভাবের কথা তনয়ালও অবগত। সেজন্য সে সব সময় বাবরের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য সুযোগ খুঁজে থাকে।
আহম্মদ তনয়াল লোভী এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক হিসাবেও জনাজাত। বাবর নিজেই একদিন তনয়ালের নিষ্ঠুরতার নিদর্শন নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। সেদিন তনয়াল পনেরজন চগ্রকের(তুর্কিভাষী একটা গোষ্ঠী) রক্তে রঞ্জিত কাটা মুন্ড সগর্বে বাবরের সন্মুখে রেখে পশুসুলভ বর্বরতার নিদর্শন প্রদর্শন করেছিলো। দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে ঘৃণায় বাবরের নাক কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিলো। তনয়ালের প্রতি সঞ্চারিত হয়ে উঠেছিলো তীব্র বিদ্বেষ। তবুও তিরস্কারের পরিবর্তে কাশিম বেগের অনুরোধ মর্মে তাকে সোনার তরবারি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। তনয়াল সেই তরবারি সানন্দে গ্রহণ করে চিরদিন বাবরের অনুগত হয়ে থাকার জন্য শপতও খেয়েছিলো। তবে তনয়াল আনুগত্যের শপত খেলেও আগের ষড়যন্ত্রের কথা স্মরণ করে বাবর তাঁকে কোনোদিন বিশ্বাস করতে পারেন নি। তনয়ালও ভালোভাবে অবগত এই কথা।
জ্বলন্ত অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়ার মতো অন্য একটি ঘটনাও ঘটেছিলো। সেই ঘটনার জন্যও তনয়াল বাবরের প্রতি ক্ষুণ্ন।
বাবরের ভগ্নী খানজাদা বেগমের প্রতি তনয়ালের অনেক দিন থেকে দুর্বলতা ছিলো। কিন্তু খানজাদা বেগম তনয়ালকে ঘৃণা করতেন। একবার তনয়াল তাঁর মামা আলীদোস্ত বেগের মারফতে খানজাদা বেগমকে বিয়ে করার জন্য পয়গাম পাঠিয়েছিলো। কিন্তু খানজাদা বেগম প্রত্যক্ষভাবেই সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। বাবর নিজেও সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ছিলেন।
খানজাদা বেগম দ্বারা প্রত্যাখাত হওয়ার পর থেকে তনয়াল বিশেষভাবে বাবরের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে উঠেছে। তবে, পরিস্থিতির কথা ভেবে সে সব অপমান মুখ বুঝে সহ্য করে বাবরের আনুগত্য স্বীকার করে রয়েছে, কিন্তু সে সুযোগ পেলেই তখন থেকে বাবরের কার্যের বিরোধিতা করে থাকে এবং আজকের এই বিরোধিতাও সেই বিদ্বেষরই প্রকাশ্য একটি রূপ মাত্র।
তনয়াল প্রকাশ্যে বিরোধিতা করার জন্য বাবর ক্ষুব্ধ হয়েছিলো যদিও পরিস্থিতির কথা ভেবে তিনি সংযতভাবেই বললেন- জ্বনাব, আমরা সমরকন্দবাসীদের খাওয়াতে আসিনি সত্য; কিন্তু তাদের লুটপাট করতেও তো আসিনি!
তনয়ালকে জব্দ করার জন্যই বাবর ইচ্ছাকৃতভাবেই কথাটা বললেন। কারণ গতকাল আহম্মদ তনয়ালের সেনারা জহুরিদের দোকান লুট-পাট করেছে।
বাবরের প্রকাশ্য সমালোচনায় তনয়াল মনে মনে ভয় পেলো। কথাটা শুনে প্রথমে তনয়ালের মুখমণ্ডল ঘৃণায় কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিলো যদিও তৎক্ষণাৎ নিজেকে সংযত করে স্বাভাবিকভাবে বললো- আপনি সত্যি কথা বলছেন, জাহাপনা। আমার সেনারা লুট-পাট করার কথা আমি অস্বীকার করছিনা। তবে, বিজেতাদের ধন-সম্পত্তির উপরে আমাদের অধিকার নাই নাকি? এর জন্যই তো আমরা এতগুলো সেনা কোরবানি দিয়েছি। প্রচলিত পরম্পরা অনুসারে বিজেতাদের ধন-সম্পত্তির উপরে আমাদের ‘হক’ থাকার কথাটাও তো আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না!
সেনাদলের মাঝে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা খানকুলি তনয়ালের কথায় উৎসাহিত হয়ে উঠলো। সে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও মাথা নেড়ে তনয়ালকে সমর্থন করলো। এমনকি তনয়ালের কথায় অধিকাংশ সেনা সন্তুষ্ট ও উৎসাহিত হয়ে উঠা পরিলক্ষিত হলো।
কথাটা বাবরের চোখেও ধরা পড়লো। কিন্তু সেনাদের অসন্তুষ্টি বাবরের উপরে প্রভাব ফেলতে পারলেন না। কারণ তিনি জানেন, সেনাদের মধ্যে সব সেনাই বাবরকে পসন্দ করে না। তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট সেনাও রয়েছে অনেক। সেনাদের সন্তুষ্ট করার জন্য যদি তাদের লুট-পাটের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তারা সন্তুষ্ট হবে ঠিকই, তবে সমরকন্দের জনতা ক্ষুধার জ্বালায় ডুকরে ডুকরে মরবে। সেজন্য সেনাদের সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি এ রকম হুকুম প্রদান করাটা কোনোমতেই সম্ভব নয়। সমরকন্দবাসী তো বর্তমান তাঁরই প্রজা।
বাবর এ বিষয়ে কাশিম বেগের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য তাঁর দিকে তাকালেন। কিন্তু কাশিম বেগ নির্বিকার। তিনি ইচ্ছা করেই অন্য দিকে তাকিয়ে রইলেন। কারণ তিনি ইতিমধ্যে হয়তো তনয়ালের কথায় মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন।
বাবর কাশিম বেগের প্রতিক্রিয়া জানতে না পেরে মনে মনে হতাশ হয়ে উঠলেন। তবুও তিনি পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য যথাসম্ভব কোমল স্বরে বললেন- সমরকন্দবাসীর এই অবস্থার জন্য পরোক্ষভাবে আমরাই তো দায়ী। সাত মাস যাবত সমরকন্দবাসীদের অবরোধ করে না রাখলে এদের অবস্থা এরকম হতো না। সর্বোপরি সমরকন্দবাসীর এই অবস্থার জন্য দায়ী বায়সঙ্কুর; সমরকন্দের সাধারণ জনতা এর জন্য দায়ী নয়।
বাবর তনয়ালের সাথে কৈফিয়তের স্বরে কথা বলা দেখে কাশিম বেগ অধৈর্য হয়ে উঠলেন। সেজন্য তিনি প্রসংগটা সেখানে ইতি টানতে বললেন- ন্যায় হোক, আর অন্যায়ই হোক, বাদশাহের আদেশ অলঙ্ঘনীয়; অন্ততঃ বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যে জাহাপনা ন্যায়সংগত কথাই বলেছেন। সেজন্য তর্ক করে লাভ নেই। জাহাপনার আদেশ অনুসারে কালই আটা, শাকসব্জি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। আমি নিজে উপস্থিত থেকে সেগুলো বিতরণ করব।
বাবর কাশিম বেগের দিকে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ চোখে তাকিয়ে উৎসাহিত কণ্ঠে বললেন- তাহলে কাজটা হবে বলেই আমি ধরে নিলাম। এভাবে বলেই বাবর শায়ের জহুরির দিকে তাকিয়ে বললেন- চলুন জ্বনাব, আমরা এখন বইয়ের দোকানে যাব।
জহুরি বাবরকে আঁকাবেঁকা একটি রাস্তা দিয়ে বইয়ের দোকানের দিকে নিয়ে এলেন। দুই পাশে সারি সারি বইয়ের দোকান। তাঁরা একটি বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
দোকান খোলা। দোকানের বাইরে ‘রেকে’র মাঝে সাজিয়ে রাখা বইয়ের দিকে বাবরের দৃষ্টি প্রসারিত হলো।
বাবর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বইয়ের ওপরে চোখ ফেরাতে লাগলেন।
হঠাৎ এক অস্পষ্ট চিৎকারের শব্দ বাবরের কর্ণগোচর হলো। চিৎকার শুনার সাথে সাথে তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন এবং উৎকর্ণ হয়ে চিৎকারের উৎস খুঁজতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পরেই ঘোমটাবিহীন মাথা এবং খালী পা বিশিষ্ট একজন বৃদ্ধা উদ্ভ্রান্তের মতো সরু গলি থেকে বেরিয়ে আসা বাবরের দৃষ্টিগোচর হলো।। বৃদ্ধাটির পেছনে পেছনে অন্য একজন আধবয়সের লোক বেরিয়ে আসা বাবরের চোখে পড়ল।
বৃদ্ধাটি রাস্তায় বেরিয়ে এসেই উচ্চস্বরে গালাগাল দিতে লাগলো- যে আমার পুত্রটিকে মেরেছে, আল্লাহ যেন তার ওপরে গজব বর্ষণ করেন। আমার সন্তানটির মতোই যেন তার ক্ষুধা-পিপাসায় মৃত্যু হয়।
হঠাৎ সন্মুখে অশ্বারোহী প্রত্যক্ষ করে বৃদ্ধা এবং আধবয়সের লোকটি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আধা বয়সের লোকটি কিংবর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল যদিও বৃদ্ধা নিজেকে সামলে নিয়ে সৈনিকদের দিকে তাকিয়ে আগের চেয়েও উচ্চস্বরে বলতে লাগলো- এ রকম অবরোধের মাঝে পড়লে স্বয়ং আল্লাহও ধ্বংস হয়ে যেত। অবরোধকারীরা আমার সন্তানের মতো ক্ষুধাপিপাসায় মরুক— গলে পচে মরুক।
জহুরি বিরক্তিভরা কন্ঠে আধবয়সী লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- কী হলো কুতুবুদ্দিন? বৃদ্ধা এভাবে হুলস্থূল করছে কেন?
জহুরির বিরক্তিভরা কন্ঠে সতর্কর্তাবাণীর সুরও প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিলো। সেজন্য কুতুবুদ্দিন অশ্বারোহীদের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলো।
অশ্বারোহীদের মাঝে রাজমুকুট পরিহিত বাবরকে দেখে কুতুবদ্দিন সচকিত হয়ে উঠলো। বাবরকে আগে কোনদিন না দেখলেও রাজমুকুট প্রত্যক্ষ করে কিশোরটি যে আর কেউ নন, স্বয়ং বাদশাহ বাবর এ কথা উপলব্ধি করতে তার অসুবিধা হল না। বিদ্যুৎপৃষ্ট লোকের মতো ঝাঁপ মেরে এসে সে বৃদ্ধাটিকে টেনে হিঁচড়ে বইয়ের দোকানের পেছনের দিকে নিয়ে গেলো।
বৃদ্ধাটিকে সেখানে রেখে ফুঁফিয়ে-জুফিয়ে দৌড়ে এসে বুকে হাত রেখে বাবরকে উদ্দেশ্য করে কাকুতি-মিনতি করে বলতে লাগলো- জাহাপনা, বেয়াদপি মাফ করবেন। বৃদ্ধাটি আমার ভাই বউ। সে নিজের পুত্রের মৃত্যুর পর একেবারে উন্মাদ হয়ে গেছে। আমরা সবাই ক্ষুধাপিপাসায় ছট্ফট্ করছিলাম। একদিন নয়, দুইদিন নয়, এক নাগাড়ে কয়েকদিন জল এবং তুঁষের রুটি ছিলো আমাদের একমাত্র খাদ্য। ভাইপোটি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে একদিন খইল খেয়েছিলো। খইল খাওয়ার পরে তার শরীর ঢোলের মতো ফুলে উঠে এবং পরের দিন সে মারা যায়।
কুতুবুদ্দিনের বর্ণনায় এক মর্মস্পর্শী সুর প্রচ্ছন্ন ছিলো। উপস্থিত সবাই তার বর্ণনা শুনে নির্বাক স্তব্ধ হয়ে পড়লেন। বাবর ব্যথিত হওয়ার সাথে সাথে সংকুচিতও হয়ে উঠলেন। কুতুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে তিনি অস্বস্তিতে মাথা নত করলেন এবং মনে মনে ভাবতে লাগলেন, এমনিতে জনতার দুঃখ দুর্দশা চরম সীমা স্পর্শ করেছে, এর পরে যদি এদের ধনসম্পত্তি লুটপাট করা হয়, তাহলে কেমন হৃদয় বিদারক কথা হবে!
কন্ঠস্বর যেমন বস্ত্রাবরণে ডেকে রাখা যায় না, সেভাবে বাবর তাঁর মনের বেদনাও লুকোতে পারলেন না। শীতের কুয়াশার মতো তাঁর মুখমণ্ডলে বেদনার ছায়া প্রকট হয়ে উঠলো।
বাবরের মুখমণ্ডলে বেদনার অভিব্যক্তি প্রত্যক্ষ করে তনয়াল এবং খান কুলির বাইরে সবাই মাথা নত করলো। আহম্মদ তনয়াল এবং খানকুলি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ভ্রূ কোঁচালো।
কুতুবুদ্দিন সহরের একজন বিখ্যাত পুস্তক ব্যবসায়ী।
জহুরি কুতুবুদ্দিনকে বাবর আসার কথা ব্যক্ত করলেন- চলো, দোকানে চলো। জাহাপনা বই দেখতে এসেছেন।
কুতুবুদ্দিন উৎসাহিত হয়ে উঠলো। তার মনে জেগে উঠলো ব্যবসায়ীসূলভ মনোভাব। সসন্মানে সে বাবরকে দোকানের ভেতরে নিয়ে এলো। সে ব্যস্তভাবে রেক থেকে দূর্লভ বইসমূহ নামিয়ে এনে ঝাড়পোঁছ করে টেবিলের উপরে রেখে যেতে লাগলো।
বইগুলো নামানো হলো। কুতুবুদ্দিন সসন্মানে একটি একটি করে বই বাবরের দিকে বাড়িয়ে বইগুলোর বর্ণনা দিয়ে যেতে লাগলো- এই সোনালী মলাটের বইটি মহম্মদ কাশগরির বই, এটি আব্দুর রহমান জামিরের বই। এটি বেশ দামি বই। এই যে এই ফটো সম্বলিত বইটি, এটি আব্দুর রহমান সমরকন্দির বই এবং এই যে এই বইটি নবাইর উৰ্দূতে রচনা করা ‘খেজান-উল-উজান’।
বাবর কুতুবুদ্দিনের বর্ণনা শুনার সাথে সাথে বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন। বইগুলো তাঁর পসন্দও হলো। অনেক দিন থেকে তিনি এরকম বই-ই খুঁজছিলেন।
বাস্তবেও প্রতিটি বই-ই দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান ছিলো। বাবরের লাইব্রেরির শোভাবর্দ্ধনের জন্য প্রতিটি বই-ই উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় ছিলো। বইগুলো সত্যিই অমূল্য। সোনা-রুপো দিয়ে বইগুলোর মূল্য জোখা সম্ভব ছিল না। ধূলি ধূসরিত দোকানে দাঁড়িয়েও বাবরের উপলব্ধি হলো, তিনি যেন পরীর রাজ্যে বিচরণ করছেন।
বাবর রেকের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে বললেন- এর বাইরেও আরও কী কী বই আছে আপনার সংগ্রহে?
বাবরের উৎসাহ দেখে কুতুবুদ্দিন রেক থেকে একটি একটি করে বই বের করে বাবরকে দেখিয়ে যেতে লাগলো।
কাশিম বেগ নিজেও বইগুলোর উপরে চোখ ফেরাচ্ছিলেন। বইগুলোর পাকাবান্ধা অভাবনীয় দামি মলাটের কারুকার্য এবং বৃহৎ আকার প্রত্যক্ষ করে বইগুলো যে দূর্লভ এবং অনেক মূল্যবান এটা তিনি ভাবতে বাধ্য হলেন। এতগুলো বই কিনতে গেলে নিশ্চয় অনেক ধন প্রয়োজন হবে; কিন্তু তাঁদের বর্তমান ধনের অভাব। এদিকে সমরকন্দ থেকে বর্তমান খাজনার নামে কিছুই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই! আন্দিজান থেকে আনা স্বর্ণ-রৌপ্যও বর্তমান পর্যাপ্ত নেই। সমরকন্দে আসার সময় বই কিনতে হবে এমনটা তাঁরা ভেবেও আসেননি। এদিকে বাবরের নির্বাচিত বইয়ের স্তূপ বেড়েই চলছিলো। দশটার চেয়েও বেশি বই ছিলো স্তূপটিতে। বইগুলোর মূল্যের কথা ভেবে কাশিম বেগ উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন।
কাশিম বেগ বাবরের কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন- জাহাপনা, বর্তমান আমাদের সাথে কোষাধ্যক্ষ নেই।
বাবর বইয়ের মাঝে গভীরভাবে মগ্ন হয়ে ছিলেন। বাহ্যিক জগতের কথা তিনি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন তখন। কাশিম বেগের কথায় বাস্তবে ফিরে এলেন যদিও তাঁর কথার অর্থ বুঝতে না পেরে অসহায়ভাবে বললেন-কোষাধ্যক্ষ! কোষাধ্যক্ষ আবার কেন?
কাশিম বেগ কথাটা স্পষ্ট করতে বললেন-বইয়ের মূল্য…
অহ্, কোনো অসুবিধা নেই। বাবর বললেন- পরে কোষাধ্যক্ষকে পাঠিয়ে দিলেই হবে। এভাবে বলেই বাবর বইয়ের স্তূপটির দিকে তাকিয়ে বললেন-মৌলানা, আপনি এই বইগুলোর মূল্য হিসাব করুন। আজ আমরা বইগুলো নিয়ে যাব না। কাল কোষাধ্যক্ষ এসে নিয়ে যাবে।
বাবরের কাছে বই বিক্রী করতে পেরে কুতুবুদ্দিন নিজেকে ধন্য মনে করছিলো এবং আনন্দে তার মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত হয়ে উঠছিলো। বইয়ের প্রতি বাবরের আকর্ষণ এবং আগ্রহের গভীরতা দেখে কুতুবুদ্দিন অভিভূতও হয়ে উঠেছিলো। অযাচিতভাবে বই কেনার জন্য কুতুবুদ্দিন কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি বাবরকে প্রশংসাও করতে লাগলো।
কুতুবুদ্দিনের প্রশংসার অন্তরালে ব্যবসায়ীসূলভ মনোভাবের উপরেও অন্য কোনো স্বার্থ নিহিত হয়ে রয়েছে বলে বাবরের অনুমান হলো। কুতুবুদ্দিন যেন কথাটা বলতে সংকোচবোধ করতেছে। সেজন্য তিনি অভয় দিয়ে বললেন- সংকোচ করবেন না, মৌলানা। অন্য কোনো কথা বলতে চাইলে নিঃসংকোচে বলতে পারেন। বলুন, লজ্জা করবেন না। আপনার বইগুলো সত্যিই খুবই মূল্যবান। আমার খুব পসন্দ হয়েছে।
জাহাপনা, অভয় পেয়ে কুতুবুদ্দিন সাহস করে বললো-বর্তমান পরিস্থিতিতে সোনা-রূপার কোনো মূল্য নেই সমরকন্দবাসীর কাছে। সোনা-রূপো থাকলেও এখন খাদ্যবস্তু কিনা সম্ভব নয় সমরকন্দবাসীর। ক্ষুধার জ্বালায় ছেলেপিলেগুলো ছটফট করতেছে। তাদের মুখের দিকে তাকালে হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যেতে চায়, জাহাপনা। যদি কিছু মনে না করেন, বইয়ের মূল্যের পরিবর্তে যদি আটা.……..
কুতুবুদ্দিনের কন্ঠস্বর আবেগে বাষ্পারুদ্ধ হয়ে এলো। সে তার বক্তব্য শেষ করতে পারলো না।
কুতুবুদ্দিনের আকূতি ভরা কন্ঠস্বর শুনে বাবর বিচলিত হয়ে উঠলেন। তিনি ভাবলেন, সেই পুত্রহারা মহিলা এবং এই গণ্যমান্য ব্যক্তিটি–– অবরোধের জন্য খেতে না পেড়ে শুকিয়ে গেছে। ছেলেপিলেগুলো ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করতেছে। আর আমরা? আমরা টাকা এবং বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে রয়েছি!ধিক, শত ধিক, আমাদের এই জীবনে!
বাবর মনে মনে কথাগুলো ভেবে কিছু বলার জন্য কাশিম বেগের দিকে তাকালেন। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে হালুইকরের দোকানে সংঘটিত হওয়া আলোচনার কথা তাঁর হঠাৎ মনে পড়ে গেল। সেজন্য তিনি কাশিম বেগকে কিছু না বলে বুদ্ধির আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবলেন। নাক সিটকানো বেগদের না জানিয়ে শাহি বাবুর্চিদের দ্বারা কাজটা সমাধা করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ। আপনি চিন্তা করবেন না। বাবর শিষ্টতাপূর্বকভাবে কথা কয়টি এভাবে বললেন যেন এখানে তাঁর কোনো উদ্দেশ্য নেই। সবই আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়।
বাবর দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন। বাইরে এসে তিনি তনয়ালকে ক্ষোভিতভাবে সেনাদের মাঝে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতে লক্ষ্য করলেন।
সেদিনই সন্ধ্যায় বাবর এক বস্তা আটা, একটি দুম্বা এবং নগদ কিছু মুদ্রা বাবুর্চিদের দ্বারা কুতুবুদ্দিনের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু যতই গোপনে কাজটি করুন না কেন, পরের দিন সবাই কথাটা জেনে গেলো। বাবরকে পেটে পেটে যারা হিংসে করতো তারা আড়ালে তাঁর সমালোচনা করলো, তবে মুখ ফুটিয়ে কিছু বলার সাহস পেল না কেউ। আহম্মদ তনয়াল সুযোগ বুঝে কোপ মারার উদ্দেশ্যে বাবরের এই বদান্যতার সুযোগ নিয়ে অসন্তুষ্ট বেগদের সংঘবদ্ধ করে বাবরের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য নেমে পড়লো।
পরের দিন সকালে কাশিম বেগ আগের দিনের প্রতিশ্রুতি অনুসারে হালুইকরদের জন্য আটা পাঠিয়ে নিজে উপস্থিত থেকে বিতরণ করলেন। অনেকদিন পর রুটির সুবাসে সমরকন্দের অলিগলি আমোদিত হয়ে উঠলো। কিন্তু এর মধ্যেই বাবরের প্রতি অসন্তুষ্ট একাংশ সেনা দাবড়ি ধমক দিয়ে বিনা পয়সায় রুটির স্বাদ গ্রহণ করে বাবরের নিষ্কলুষ বদান্যতায় কালিমা লেপন করতে কুণ্ঠাবোধ করলো না।এই হঠকারিতার অন্তরালে ছিলো আহম্মদ তনয়াল এবং খানকুলির আক্রোশমূলক উসকানি।
বেগদের অনুমতি না নিয়ে খাদ্যবস্তু বিতরণ এবং লুটপাটের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য একাংশ বেগ স্বাভাবিকভাবেই বাবরের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। আহম্মদ তনয়াল এবং খানকুলি এই অসন্তুষ্টির সুযোগ গ্রহণ করলো। তারা প্ররোচনামূলক ভাষণ প্রদান করে অসন্তুষ্ট বেগদের বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন করে তুললো এবং বাবরের অনুমতি না নিয়ে ফারগানা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
সিদ্ধান্ত অনুসারে একদিন রাতে তনয়ালের সেনারা পহরায় নিয়োজিত অবস্থায় পাঁচশ’ জন সেনা নিয়ে খানকুলি মনে মনে পালিয়ে গেলো এবং এক সপ্তাহ পরে আহম্মদ তনয়ালও পালিয়ে গিয়ে খানকুলির সাথে মিলিত হলো। এর পরে তনয়ালের অনুগত সেনাদের অনেকেই সুযোগ বুঝে পালিয়ে গিয়ে তনয়ালের দলে যোগদান করলো। এভাবে পলাতক সেনা দিয়ে তনয়ালের দল শক্তিশালী হওয়ার পরে সে একদিন দলবল নিয়ে আন্দিজান চলে এলো।
* * *
আন্দিজান এসেই তনয়াল আন্দিজানের বেগদের ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজের পক্ষে এনে বাবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলো এবং ফাতিমা সুলতানার সাথে পরামর্শ করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে আন্দিজানের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৎপর হয়ে উঠলো।এই বিদ্ৰোহের খবর সমরকন্দ এসেও পৌঁছোলো।
তবে, সমরকন্দের অনেকেই এই বিদ্রোহের বিষয়ে অবগত ছিলো যদিও বাবর এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। কারণ তখন তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। অনেকদিন জ্বরে ভুগার জন্য তিনি খুবই কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। সেজন্য উত্তেজিত হলে অসুখ বেশি হওয়ার আশংকা করে আন্দিজান থেকে আসা খবর হেকিম বাবরকে জানাতে বারণ করছিলেন।
কাশিম বেগ আন্দিজানের খবর নিয়মিতভাবে পাচ্ছিলেন যদিও বাবরের অসুখের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তিনি বেগদের সাথে পরামর্শ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য চিন্তা-ভাবনা করার পাশাপাশি বাবর আরোগ্য হয়ে উঠার জন্য উৎকণ্ঠিতভাবে অপেক্ষা করছিলেন।
সেদিন শরীরটা একটু সতেজ অনুভব করার জন্য বাবর বোস্তান-ই-শরাইর শয়নকক্ষে বসে ছিলেন।
ঠিক তখনই আন্দিজান থেকে আসা পত্রবাহক প্রাসাদের নিচের মহলার দরজার সামনে উপস্থিত হলো।
পত্রবাহক গোল করে মুড়ানো মোহরযুক্ত একটি পত্র বাবরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত দেহরক্ষীকে দেখিয়ে বললো-পত্রটি মালিকা সাহেবা স্বয়ং জাহাপনার হাতে দেওয়ার জন্য নিৰ্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন।
কয়েকদিন ধরে বাবর আন্দিজানের খবরের জন্য ব্যাকুলভাবে প্রতীক্ষা করছিলেন। আন্দিজান থেকে কোনো খবর এসেছি কি, আসেনি, প্রতিদিন তিনি এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন।বাবরের উৎকণ্ঠা দেখে দেহরক্ষীরাও উৎকণ্ঠিত ও সতর্কতার সাথে পহরায় নিয়োজিত ছিলো। সেজন্য পত্রবাহকের হাতে পত্র দেখে দেহরক্ষীটি পত্রবাহককে বারান্দায় অপেক্ষা করতে বলে সে তৎক্ষণাৎ বাবরের শয়ন কক্ষের পহরায় নিয়োজিত দেহরক্ষীর নিকটে এসে বাবরের সাথে পত্রবাহকের সাক্ষাতের অনুমতি চাইলো।
দেহরক্ষীটি বাধা দিয়ে বললো- না না, এরকম সরাসরি জাহাপনাকে পত্র দেওয়া যাবে না। পত্রটি প্রথমে উজির-এ-আজম পড়বেন। সংবাদ ভালো হলে তখন জাহাপনাকে পড়তে দেওয়া হবে।
তখন পত্রবাহকও দেহরক্ষীটির পেছনে পেছনে এসে সেখানে পৌঁছেছিলো। সে বললো- কিন্তু মালিকা সাহেবাই পত্রটি স্বয়ং জাহাপনার হাতে দেওয়ার জন্য নিৰ্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন।
ঠিক তখনই হেকিম সাহেব সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি পত্রবাহক এবং দেহরক্ষীর বাক-বিতণ্ডা শুনে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বাক-বিতণ্ডার কারণ জানতে চাইলেন- কী হলো? কী নিয়ে বাক-বিতণ্ডা চলছে?
দেহরক্ষীটি পত্ৰবাহকের দিকে ইঙ্গিত করে বললো- এ আন্দিজান থেকে মালিকা সাহেবার পত্র নিয়ে এসেছে। এ স্বয়ং জাহাপনার হাতে পত্রটি দেওয়ার জন্য জোর করতেছে। আমি নিষেধ করায় আমার সাথে তর্ক করতেছে।
হেকিম সাহেব দরজার পাহারায় নিয়োজিত সৈনিককে সমর্থন করে পত্রবাহককে উদ্দেশ্য করে বললেন- জাহাপনার অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। খারাপ সংবাদে অবস্থা অধিক জটিল করতে পারে! কিছু সময় পূর্বে অবস্থা কিছু উন্নত হয়েছে যদিও মানসিক আঘাত পেলে অবস্থা আবার খারাপ হতে পারে!কারণ চিন্তা-ভাবনা উৎকণ্ঠাই রোগ বৃদ্ধি করে। অসুখেও রোগীর উপরে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পায়। যেহেতু অবস্থা কিছু উন্নত হয়েছে, সেজন্য এ সময়ে জাহাপনাকে পত্র প্রদান না করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
আন্দিজান বর্তমান শত্রুর কবলে। পত্রবাহক যুক্তিতর্ক শুরু করে দিলো- যদি এখনই জাহাপনাকে পত্রটি প্রদান করা না হয়, তাহলে দেরি হয়ে যাবে এবং তখন আন্দিজান শত্রুর পদানত হওয়াটাও অসম্ভব নয়!
হেকিম সাহেব জোর গলায় বললেন- না না, তবুও আমি অনুমতি দিতে পারব না। আমায় ক্ষমা করবেন। এ বিষয়ে আপনি আগে কাশিম বেগের সাথে আলোচনা করুনগে’। কাশিম বেগ অনুমতি দিলে তখন দেখা যাবে। একজন চিকিৎসক হিসাবে আমার কাছে রোগীর নিরাপত্তা সবার আগে।
কিন্তু হেকিম সাহেব..। মাথা চুলকিয়ে চুলকিয়ে পত্রবাবহক হতাশ ও বিষণ্ন সুরে বললো।
না না, অসম্ভব… হেকিমের ভ্রূযুগল কুঞ্চিত হয়ে উঠলো।
বাক-বিতণ্ডা বাবরের শয়ন কক্ষের দরজার সন্মুখে হচ্ছিল। সেজন্য বাক-বিতণ্ডার শব্দ বাবরের কাণে পৌঁছোল। তিনি কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে উচ্চস্বরে ডেকে বললেন- যদি পত্রবাহক এসেছে, তাহলে আমার কাছে আসতে দিন। এটা আমার আদেশ।
বাবরের উৎকন্ঠিত গুরু-গম্ভীর কন্ঠের প্রভাবে বাক-বিতণ্ডা বন্ধ হয়ে গেলো। পরাজয়ের গ্লানিতে হেকিমের মুখমন্ডল উদ্ভট এবং হাস্যকর হয়ে উঠলো। তিনি অসহায়ভাবে রক্ষীর দিকে তাকালেন কিছু আশ্বাস পাওয়ার আশায়। কিন্তু রক্ষী কোনো রকমের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে অনিচ্ছাসত্ত্বেও পত্রবাহককে শয়ন কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিলো- যান, জাহাপনা স্বয়ং হুকুম করেছে যখন, তখন আমার তরফ থেকে কিছু বলার নেই।
পত্রবাহক কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে আঁঠু গেড়ে বসে সে ধীরে ধীরে বাবরের নিকটে এসে দুই হাতে পত্রটা ধরে সসন্মানে বাবরের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। বাবর পত্রটি হাতে নিয়ে বালিশের উপরে ভর দিয়ে অর্ধশায়িত অবস্থায় মোহর ছাড়িয়ে খামের মুখ খুলে পত্রটি বের করলেন। এক টুকরো কাগজও বের হলো পত্রটির ভেতর থেকে। কাগজ টুকরোয় খাজা আবদুল্ল্যার এবং পত্রটিতে মাতৃ কুতলুগ নিগার বেগমের হস্তাক্ষর দেখে বাবর ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তিনি অতি আগ্রহের সাথে পত্র দু’টি পড়ে উদভ্রান্ত ও ক্লিষ্ট দৃষ্টিতে পত্রবাহকের দিকে তাকালেন। উত্তেজনায় বাবরের সর্বশরীর ম্যালেরিয়া রোগীর মতো ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলো।
পত্র দু’টির বিষয়বস্তু একই ছিলো। শত্রু আন্দিজান অবরোধ করে রয়েছে এবং তনয়াল সেনাদলের নেতৃত্ব দিচ্ছে। পরিস্থিতি খুবই সংকটজনক। যেকোনো মুহূর্তে আন্দিজান শত্রুর পদানত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছে। আন্দিজান একবার শত্রুর পদানত হলে, তখন সিংহাসন রক্ষা করাটা খুবই কঠিন হয়ে উঠবে। বাবরের হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে এখন আন্দিজান রক্ষা করা সম্ভব নয়। এভাবে লেখার পরে উভয় পত্রেই বাবরের হস্তক্ষেপের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে।
আহম্মদ তনয়াল যে লোভী এবং খামখেয়ালি স্বভাবের এ কথা বাবরের অবিদিত নয়। কিন্তু সে যে এতদূর এগোবে এ কথা ছিলো বাবরের কল্পনারও অগোচর। সেজন্য তিনি নিরুদ্ধ আক্রোশে পত্র দু’টি মুষ্ঠিবদ্ধ করে উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন- বিশ্বাসঘাতক তনয়াল! সে আন্দিজান অবরোধ করে রেখেছে? বিশ্বাসঘাতক বেগদের সাথে ষড়যন্ত্র করে সে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ষড়যন্ত্র করতেছে? এর উদ্দেশ্য আমার কাছ থেকে গৃহরাজ্য কেড়ে নেওয়া হবে? আহম্মদ তনয়াল নাবালক বাদশাহর হয়ে আন্দিজান শাসন করার স্বপ্ন দেখতেছে? না না, তনয়ালের এই স্বপ্ন আমি পূরণ হতে দেব না। আমার ঘোড়া সাজাও— আমার তরবারি আন। আমি এক্ষুণি, এই মুহূর্তে আন্দিজান যাত্রা করব। তনয়ালের স্বপ্ন আমি চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিব। তনয়ালকে আমি এমন শিক্ষা….
বাবর বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারলেন না। কুমারের চাকের মতো তাঁর মাথা ঘুরতে লাগলো। সাথে সাথে তাঁর শরীরে প্রচন্ড জ্বর মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। উত্তেজনায় তাঁর মাথার সিরা উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠলো এবং তাঁর অজ্ঞাতসারেই মাথাটা বালিশ থেকে পড়ে গেলো।
বালিশ থেকে মাথা পড়ে যাওয়ার পর বাবর আচ্ছন্নের মতো ভাবতে লাগলেন, আন্দিজানে যদি আহম্মদ তনয়াল এবং জাহাঙ্গীরের জয়ী হয়, তখন বেশির ভাগ লোক তাঁদের পক্ষে যোগদান করবে। হয়তো, তিনি রোগশয্যায় শায়িত থাকা সময়টুকুতেই ইতিমধ্যে অনেকে পালিয়ে গিয়ে তাঁদের সাথে যোগদান করেছে। ভয়ে বাবরের অত্মরাত্মা কেঁপে উঠলো। দেহের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে তিনি বিছানায় উঠে বসলেন।
হেকিম, পত্রবাহক এবং দরজার পহরায় নিযোজিত রক্ষী নির্বোধ অসহায় চোখে বাবরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় তাঁরা শংকিত, উৎকণ্ঠিত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছিলেন। বাবর বিছনায় উঠে বসাতে তাঁরা খানিকটা প্রকৃতিস্থ হলেন।পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত করার জন্য রক্ষীটি তৎক্ষণাৎ কাশিম বেগের বাসস্থানের দিকে দৌড়ে গেলো।
হেকিম দ্রুত বাবরের পাশে এসে তাঁকে ধরে শোয়ানোর চেষ্টা করে বললেন- জাহাপনা, উত্তেজিত হবেন না। আপনি শোয়ে পড়ুন।
বাবর যন্ত্রণাকাতর কন্ঠে আর্তনাদ করে উঠলেন- কাশিম বেগ কোথায়?
এক্ষুনি এসে পৌঁছোবেন, জাহাপনা। হেকিম বাবরকে উৎসাহিত করার জন্য কোমল কন্ঠে অনুরোধের সুরে বললেন- রক্ষী তাঁকে ডাকতে গেছে। এক্ষুনি এসে পড়বে। আপনি শোয়ে পড়ুন। বর্তমান আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন।
বাবর হেকিমের অনুরোধ রক্ষা করে অলসভাবে বিছনায় গা এলিয়ে শোয়ে পড়লেন। তিনি চোখ মুদে আন্দিজানের বর্তমান পরস্থিতির সম্ভাব্য চিত্র কল্পনা করার সাথে সাথে তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো আহম্মদ তনয়ালের হিংস্র, বীভৎস মূর্তি। তনয়ালের চোখেমুখে পৈচাসিক উল্লাস। হিংস্র রক্তবর্ণ চোখে লোলুপ দৃষ্টি। তনয়াল হাতে ধরে থাকা তরবারিটিও বাবর চিনতে পারলেন। স্বয়ং বাবর তাকে তরবারিটি উপহার দিয়েছিলেন কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে।
তনয়াল সেই তরবারিটিতে চুমা খেয়ে চিরদিনের জন্য বাবরের অনুগত হয়ে থাকার জন্য শপত খেয়েছিলো। তনয়াল সেই তরবারিটিতেই চুমা খেয়ে পৈচাসিক উল্লাসে বাবরের মাথার উপরে ঘুরাতে লাগলো। তনয়ালের পদতলে অসংখ্য রক্তরঞ্জিত ছিন্নমুণ্ড ভূ-লুণ্ঠিত হয়ে পড়ে থাকা বাবরের চোখে পড়লো। সেই ছিন্ন মস্তকগুলির একটি….ইয়া আল্লাহ, এটাতো তাঁর মাতৃর ছিন্ন মস্তক….।
সেই ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে বাবরের সর্বশরীরে হিমপ্রবাহের মতো তীক্ষ্ণ বাতাসের স্রোত বয়ে গেলো। তিনি উদভ্রান্তের মতো হয়ে উঠলেন। সর্পদৃষ্ট মানুষের মতো চমকে উঠে জাঁপ মেরে তিনি বিছানা থেকে নেমে পড়লেন। পা-র তলে তিনি নরম কোমল দলিচার স্পর্শ অনুভব করলেন। দেহের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে তিনি দাঁড়িয়ে আক্রোশ ভরা কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন- আমার তরবারি কোথায়? অতি সত্বর আমার তরবারি দিন।
হেকিম বাবরকে জড়িয়ে ধরে বললেন- জাহাপনা, আপনি অসুস্থ। আপনি শোয়ে থাকা জরুরি। আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন।
বাবরের অনুমান হলো, হেকিম যেন তাঁকে বলপূর্বকভাবে তরবারির তলে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি বলপূর্বকভাবে হেকিমের হাত থেকে মুক্ত হয়ে নেশাগ্রস্ত লোকের মতো ঢুলতে ঢুলতে দরজার দিকে এগিয়ে এলেন।
দরজার কাছে এসেই বাবর পাগলের মতো চিল্লিয়ে ডেকে বললেন- আমার ঘোড়া কোথায়? আমার ঘোড়া আনুন। আমি আন্দিজান যাব। আমার তরবারি কোথায়? বেগদের অতিসত্বর প্রস্তুত হতে বলুন।
হেকিম বাবরের আচকান ও জোতা নিয়ে বাবরের কাছে দৌড়ে এলেন। তিনি বাবরের কাঁধে আচকান এবং পা-র কাছে জোতা রাখলেন।
বাবর এক পা-য় জোতা পরলেন যদিও অন্য পায় পরতে পারলেন না। তাঁর মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। তিনি কোনোমতে উচ্চারণ করলেন- বিদ্রোহী…খুনী.……..
এভাবে বলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন এবং অচেতন হয়ে পড়লেন।
মধ্যরাতে বাবরের চেতনা ফিরলো। তিনি চোখ মেলে দেখলেন, হেকিম শিয়রের দিকে দাঁড়িয়ে তাঁর মুখে ফোটা ফোটা জল দিতেছেন এবং তাঁর দীর্ঘ বিশ্রী ছায়া দেয়ালের উপরে পড়ে আন্দোলিত হচ্ছে।
বাবরের অনুমান হলো যেন, তাঁর জিভা ফুলে উঠেছে। জিভা এতো ভারি হয়ে উঠেছে যে বাবরের জন্য সেই ওজন সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়লো। তাঁর শরীরটা যেন কোনো ভারি জিনিষ দিয়ে চেপে ধরে রাখা হয়েছে। হাত-পাগুলি অসার হয়ে পড়েছে। তাঁর পইথানের দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাশিম বেগ। কাশিম বেগের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে তিনি চোখ মুদলেন।
কাশিম বেগ দ্রুত বাবরের শিতানের দিকে এসে বললেন- আল্লাহ মেহেরবান, জাহাপনা। আপনি তো আমাদের ভয়ই খাইয়েছিলেন।
উত্তরে বাবর কিছু বলতে যাচ্ছিলেন যদিও তিনি জিভা নাড়াতে পারলেন না। তিনি চোখ মেলে অসহায়ভাবে স্থির দৃষ্টিতে কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের জলে চোখ দু’টি ছলছল করতে লাগলো। ব্যথা ও উত্তেজনার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো তাঁর মুখমণ্ডলে।
কাশিম বেগ আত্মীয়তার সুরে বললেন- এখন আপনার অবস্থা কেমন, জাহাপনা?
বাবর কিছুই বললেন না। তিনি আগের মতোই নিশ্চল হয়ে পড়ে রইলেন। তিনি সব দেখছিলেন ও বুঝছিলেন, তবে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ প্রকাশ করার শক্তি ছিল না তাঁর। তিনি অসহায়ভাবে কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বাবরের অবস্থা প্রত্যক্ষ করে কশিম বেগের অন্তর হাহাকার করে উঠলো এবং তাঁর দু’চোখ জলে ভরে উঠলো। ষোল বছরের অসুস্থ কিশোর একজন সুস্থ সবল উজির-এ-আজমের চোখে জল দেখে যাতে বিচলিত হয়ে না উঠে তার জন্য তিনি মুখ ঘুরিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন।
কয়েক মুহূর্ত পর কাশিম বেগ কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে আন্দিজানের পরিস্থিতি সম্পর্কে অধিক তথ্য জনার জন্য তাহিরজানকে আন্দিজান পাঠিয়ে দিলেন।
* * *
বাবর রোগশয্যায় পড়ে থাকা অবস্থায় আহম্মদ তনয়াল আন্দিজান দখল করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করলো।
সেদিন ছিলো দারুণ অন্ধকার রাত। সমগ্র আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে ছিলো। আন্দিজানের দূর্গটি সেই অন্ধকারের মাঝে ডুবে ছিলো। আসন্ন বিপদের আশংকায় আন্দিজানের প্রতিটি অলিগলিতে বিরাজ করছিলো থমথমে নিস্তব্ধতা।
সর্বোপরি সমরকন্দ থেকে আসা সংবাদবাহকের মুখে বাবরের ভয়ঙ্কর অসুখের খবর পেয়ে দূর্গের দায়িত্বে থাকা এক অংশ সেনা আহম্মদ তনয়ালের পক্ষে যোগদান করছিলো। ফলে দূর্গের পহরায় পর্যাপ্ত সেনাও ছিলো না সেদিন। সেজন্য প্রায় অরক্ষিত অবস্থাতে পড়ে ছিলো দূর্গের কোন কোন দরজা।
ঠিক এমনই একটি রাতের জন্য আহম্মদ তনয়াল অপেক্ষারত ছিলো। প্রত্যাশিত রাতটা আসার সাথে সাথে তনয়াল আন্দিজান দূর্গ আক্রমণ করলো এবং প্রত্যাশিতভাবেই সে দূর্গ দখল করতে সক্ষম হলো।
দূর্গের পহরায় নিয়োজিত বাবর সেনা সেই অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই তনয়ালের সেনা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ফলে বাবরের বিধ্বস্ত বেগবর্গের কেউ কেউ খণ্ড যুদ্ধে নিহত হলো এবং অনেকে পালিয়ে গিয়ে প্রাণের ভয়ে তনয়ালের বশ্যতা স্বীকার করে তার পক্ষে যোগদান করলো। সেজন্য অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই আন্দিজান দূর্গ তনয়ালের হস্তগত হলো।
দূর্গ দখলের পরে তনয়াল বাবর পক্ষের সেনাদের নির্বিচারে হত্যা করার পরে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে নিজে স্বয়ং উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত হলো। উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত হয়েই সে পুরাতন আক্রোশ চরিতার্থ করার জন্য তৎপর হয়ে উঠলো। আক্রোশবশতঃ সে কুতলুগ নিগার বেগম ও খানজাদা বেগমকে বন্দি করার নির্দেশ দিলো। তবে, মির্জা জাহাঙ্গীর তাঁর সৎমা এবং সৎবোনকে বন্দি করার পরিবর্তে নজর বন্দি করে রাখার জন্য পরামর্শ দিলেন।
খানজাদা বেগম যে ফজিলুদ্দিনের প্রতি দুর্বল ছিলেন এই কথা তনয়ালের অবিদিত ছিলো না। সেজন্য তনয়াল আক্রোশমূলকভাবে ফজিলুদ্দিনকে বন্দি করে ‘কাল কুঠুরি’তে আটক করে রাখলো।
তবে খাজা আবদুল্ল্যার সহযোগে ফজিলুদ্দিনের ভাগ্নে তাহিরজান ফজিলুদ্দিনকে কাল কুঠুরি থেকে মুক্ত করে হিরাত পাঠিয়ে দিলো।
ফজিলুদ্দিনকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তনয়াল খাজা আবদুল্ল্যাকে ফাঁসি কাঠে ঝুলিয়ে হত্যা করলো।
এসব সময়ের খবর সময়ে সমরকন্দে পৌঁছেছিলো যদিও বাবরের অসুস্থতার জন্য কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছিল না কাশিম বেগের জন্য। পক্ষান্তরে বাবরের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে অপ্রত্যাশিত ফল লাভ করে তনয়াল ধীরে ধীরে সমগ্র আন্দিজান নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো।
দীর্ঘদিন রোগ ভুগের পর কিছু সুস্থ হয়ে উঠায় বাবর মাতৃ এবং ভগ্নীকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করার জন্য সসৈন্যে আন্দিাজন অভিমুখে রওয়ানা হলেন।
শরীর দুর্বল থাকার দরুন বাবর ঘোড়ায় না চড়ে তিনটি ঘোড়ায় টানা একটি বগিতে চড়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন। বগিতে নরম গদি এবং তোশক বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। ছৈর সন্মুখে টানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো রঙীন পর্দা। রঙীন পর্দাটিতে সূর্যের রশ্মি পড়ে বগির ঝাঁকানিতে অগ্নি শিখার মতো লকলক করছিলো।
বাবর এবং তাঁর সেনাদল থেকে দুই তিন মাইল পেছনে পেছনে আসছিলো একটি অতি সুন্দর বগি। সেই বগিটার আরোহী ছিলেন বাবরের মাসি মেহের নিগার খানম এবং তাঁর বাগদত্তা আয়েশা বেগম।
সমরকন্দে আসার প্রস্তুতি অনেকদিন যাবত চলছিল যদিও বাবরের অসুখের জন্য দেরি হচ্ছিল। সেজন্য বাবর সমরকন্দ ছেড়ে আসা খবরটা এ কান সে কান করে সমগ্র সমরকন্দে রাষ্ট্র হয়ে পড়েছিলো। এমনকি সমরকন্দের বাইরেও অন্য শাসকদের কানেও পৌঁছেছিলো খবরটা।
বুখারার শাসক সুলতান আলীর কানেও পৌঁছেছিলো খবরটা। সমরকন্দ দখলের জন্য সুলতান আলী অনেকদিন থেকে প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। বাবর সমরকন্দ ছেড়ে চলে আসার জন্য প্রস্তুতি চালানোর কথা শুনে তিনি উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন এবং সমরকন্দ আক্রমণের জন্য সৈন্য সমাবেশ করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। যাতে বাবর সমরকন্দ ছেড়ে আসার সাথে সাথে সমরকন্দ আক্রমণ করে নিজের দখলে নিতে পারে এটাই ছিলো তাঁর সৈন্য সমাবেশের উদ্দেশ্য।
সুলতান আলীর এই মনোভাবের কথা বাবর আগে থেকেই অবগত ছিলেন যদিও সমরকন্দ রক্ষার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা করে আসা সম্ভব হয়নি। কারণ তাঁর অসুখের সময় অনেক সৈন্য পালিয়ে গিয়ে বিদ্রোহী তনয়ালের দলে যোগদান করেছিলো। ফলে তাঁর সৈন্য সংখ্যা খুবই হ্রাস পেয়েছিলো। সেজন্য তিনি সমরকন্দ রক্ষার জন্য সৈন্য ছেড়ে আসা সম্ভব হয়নি। ফলে সমরকন্দ ছেড়ে চলে আসার পরে সমরকন্দের অবস্থা কী হতে পারে এ বিষয়ে তিনি পূর্ব থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন।
সুলতান আলী ছিলো একজন নিষ্ঠুর শসক। তাঁর কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব ছিলো না। মেহের নিগার বেগমও সুলতান আলীর এই নিষ্ঠুর স্বভাবের বিষয়ে অবগত ছিলেন। সেজন্য সুলতান আলী সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করার কথা শুনে মেহের নিগার বেগম সমরকন্দ ছেড়ে আসার জন্য উত্রাবল হয়ে উঠেছিলেন। এদিকে বাবরও আয়েসা বেগমকে সমরকন্দে ছেড়ে আসতে ভরসা পাননি। সেজন্য বাবর সমরকন্দ ছেড়ে আসার সময় মেহের নিগার বেগম ও আয়েশা বেগমকে সাথে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
এই দুর্দিনের সময়ে মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমের জন্য একমাত্র নিরাপদ স্থান হলো তাসকন্দ।বর্তমান সুলতান আহম্মদ তাসকন্দে রাজত্ব করতেছেন। তিনি মেহের নিগার বেগমের ভ্রাতৃ এবং আয়েশা বেগমের বড় বোন রেজিয়া সুলতানার স্বামী। রেজিয়া সুলতানা বর্তমান সুলতান আহম্মদের সাথেই আছেন। এজন্য আত্মীয়তার দিক থেকেও মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমের জন্য তাসকন্দই সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমকে তাসকন্দে রেখে আন্দিজান আক্রমণ করার কথা ভেবে বাবর সমরকন্দ থেকে চলে এসেছেন।
তাসকন্দ এবং আন্দিজান পর্যন্ত গমন করা রাস্তা জিজ্জখ পর্যন্ত একটাই। জিজ্জখ পাওয়ার পরে মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমকে তাসকন্দ পাঠিয়ে বাবর সৈন্যসহ আন্দিজান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যাবেন এমনটাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাই এখন দু’টি দলই এক সাথে যাইতেছে।
ইসলাম ধর্মীয় বিধান অনুসারে বিয়ের আগে বর-কনে একে অপরের মুখ দর্শন করা নিষিদ্ধ। সেই বিধান অনুসারে যাত্রা পথ একটা হলেও উভয় দল দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে বর-কনের মাঝে দুই তিন মাইলের ব্যবধান রেখে অগ্রসর হচ্ছেন।
উভয় দল বুলুণ্ড গাঁও এবং খালেসিয়া দূর্গের পাশ দিয়ে এসে সংগঝার নদীর পাড়ে উপস্থিত হলো। নদীর পাড় পর্যন্ত আসার পর সন্ধ্যা হওয়াতে রাত্রি যাপনের জন্য নদীর পাড়েই তাঁবু খাটানো হলো। তাঁবু খাটানোর সময়েও দুই তিন মাইলের ব্যবধান রাখা হলো উভয় দলের মাঝে।
তাঁবু খাটানোর পর বাবর জায়গাটা ঘুরে দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। নির্মল সুনীল আকাশ। ঝরঝরে পরিস্কার আবহাওয়া। দেহমন পুলকিত করা মৃদুমন্দ মলয় সমীর বইছিলো চারদিকে। নীল আকাশের নিচে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো সবুজ শ্যামল ছোট ছোট অনেক টিলা। টিলাগুলোর পাদদেশে প্রস্ফুটিত হয়েছিলো নানা জাতের মরসুমি ফুল।
জায়গাখণ্ডের সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে বাবর অভিভূত হয়ে পড়লেন। তিনি নরম কোমল ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতে লাগলেন মনের আনন্দে। পা-র তলে নরম ঘাসের স্পর্শ এবং বিকেলের সোনালী রোদের আমেজ লাগাতে বাবর পুলকিত হয়ে উঠলেন। তিনি নিজেকে স্বচ্ছন্দও মুক্ত অনুভব করতে লাগলেন আগের থেকে। ফলে সমরকন্দে থাকাকালীন মনের মাঝে যে দুঃশ্চিন্তার কালো মেঘ জমেছিলো তা ধীরে ধীরে দূর হতে লাগলো।
কিন্তু এমন কিছু কথা আছে যা মন থেকে দূর করা কঠিন এবং বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয়। সেরকম কিছু স্মৃতি বাবরের মনে লুকোচুরি খেলতে লাগলো।
কত কষ্ট এবং ত্যাগের বিনিময়ে তিনি সমরকন্দ দখল করেছিলেন। নানান দুর্গতি-বিপত্তি, ভয়-শংকা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া অতিক্রম করে তিনি পুরা সাত মাস যাবত সমরকন্দ অবরোধ করে থাকতে হয়েছিলো। একমাত্র দৃঢ় মনোবলের জন্যই তিনি অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু দৈব-দুর্বিপাকে পড়ে তিনি স্বপ্নের সহর সমরকন্দ স্বইচ্ছায় শত্রুর হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে হয়েছে। সমরকন্দ ছেড়ে আসার সময় গভীর বেদনায় তাঁর দেহমন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিলো।দুঃসহ বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠেছিলো হৃদপিন্ড। তাঁর অনুভব হয়েছিলো, যেন সব প্রচেষ্টা, সব শ্রম বিফল হয়ে গেলো। অদৃষ্টের দুর্বিপাকে পড়ে হাহাকার করে উঠছিলো তাঁর হৃদয়। এখানে বেড়াতে আসার আগমুহূর্তেও বিষাদের অনুভতিতে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো তাঁর দেহমন।
শ্যামল প্রান্তরের খোলা ঘাসে হেঁটে, খোলা বাতাস সেবন করে বাবরের মন সতেজ হয়ে উঠলো। তিনি নিজের দুঃখ-বেদনার কথা বিস্মৃত হয়ে মাতৃ-বোন এবং খাজা আবদুল্ল্যাহর কথা ভাবতে লাগলেন। তাঁর চোখের সন্মুখে ভেসে উঠলো তাঁদের বেদনাচ্ছন্ন মুখের প্রতিচ্ছবি। সাথে সাথে তাঁর সমগ্র চিন্তা, সমগ্র ভাবনা মাতৃ-ভগ্নী এবং খাজা আবদুল্ল্যাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে লাগলো। যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তিনি তাঁদের নিষ্ঠুর তনয়ালের হাতের মুঠো থেকে উদ্ধার করবেন, তা না হলে তাঁর মনে শান্তি নেই—স্বস্তি নেই। এরকম একপ্রকার ভাবনাই তাঁর সমগ্র সত্বাকে আলোড়িত করে তুললো।
হঠাৎ বাবরের চোখ প্রসারিত হলো সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা দূরস্থিত তাঁবুগুলোর দিকে। তাঁবুগুলোর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে হঠাৎ আয়েশা বেগমের কথা মনে পড়ে গেলো তাঁর।
ওই তাঁবুগুলোর কোনটায় আয়েশা বেগম থাকতে পারে? ওই যে বিশেষভাবে দু’টি তাঁবু খাটানো হয়েছে, তার কোন একটিতে আয়েশা বেগম নিশ্চয় তাঁর মাসির সাথে রয়েছে! আয়েসা বেগম এখন দেখতে কেমন হয়েছে? লোকমুখে শুনা মতে, গোলাপের পাপড়ির মতো বোলে তাঁর রূপের জ্যোতি প্রস্ফুটিত হয়েছে। আয়েশা বেগম তাঁর এতো কাছে থেকেও অনেক দূরে অবস্থান করছেন। এতো আপন, অথচ আয়েশা বেগম এতো পর! তিনি ভেবেছিলেন, এই বছরই তিনি মাতৃর অনুমতি নিয়ে মৌলবী ডেকে আয়েশা বেগমকে নিজের সাথে রাখার ব্যবস্থা করবেন। মানুষ গড়ে, বিধাতা ভাঙে। তার সেই আশা পূরণ হলো না।। কোথা থেকে ঝাঁপটা বাতাস এসে সব তছনছ করে দিয়ে গেলো। সেই বাতাসের তাণ্ডবে তিনি ঝরা পাতার মতো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাবর সজাগ হয়ে উঠলেন। স্ফীত হয়ে উঠলো তাঁর সিরা উপসিরা। না না, যেভাবেই হোক তিনি এই তাণ্ডবের বিপক্ষে বিজয় সাব্যস্ত করতেই হবে! নিজের হৃত গৌরব আবার উদ্ধার করতে হবে। কথাগুলো ভাবার সাথে সাথে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
এভাবে নানান বিচ্ছিন্ন চিন্তার মাঝে তিনি খোলা প্রান্তরে হাঁটাহাঁটি করে বেলা ডুবার আগে আগে ছাউনিতে ফিরে এলেন।
পরের দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু হলো। আগের দিনের মতোই বাবর বগিতে চড়ে আসতে লাগলেন। কিন্তু বগির ভেতর বসে তিনি বিরক্তি অনুভব করতে লাগলেন। বগির ভেতরে বসে বসে এক সময় তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। অস্বস্তির একপ্রকার তীব্র সংঘাতে তাঁর দেহমন আলোড়িত করে তুললো।
তাঁরা একটি পাহাড়িয়া নির্জন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তৈমূর দরজা পার হয়ে বাবর বগির পর্দা সরিয়ে সহিসকে উদ্দেশ্য করে খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে বললেন- আমার মু-গ বর্ণ ঘো-ড়াটা আনতে বলুন।
দীর্ঘদিন রোগ ভোগের জন্য বাবরের কন্ঠস্বর খোঁনা হয়ে গিয়েছিলো। ফলে তিনি খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে কথা বলতেন।
কাশিম বেগ ঘোড়ার পিঠে চড়ে আসছিলেন। বাবরের কন্ঠস্বর শুনে তিনি দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে বাবরের কাছে এসে উৎকন্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন- জাহাপনা, আপনি এখন ঘোড়া দিয়ে কী করবেন?
আবার খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে কথা বলার ভয়ে বাবর মুখে কিছু না বলে জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের অভিপ্রায়ের কথা জানিয়ে সহিসের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেন। তাঁর চোখের ভাষায় স্পষ্ট হয়েছিলো, আমি যা বলছি, তাই কর।
বাবর যাতে আরও দুই তিন দিন ঘোড়ায় না চড়ে তারজন্য কাশিম বেগ এবং হেকিম অনুরোধ করতে লাগলেন। কিন্তু বাবর তাঁদের অনুরোধ উপেক্ষা করে বিরক্তিভরা কণ্ঠে খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে বললেন- আ-মি এ-ক-টু অ-শ্বা-রো-হ-ণ করব।
বাবরের দৃঢ় প্রত্যয় মিশ্রিত কন্ঠস্বর শুনে কাশিম বেগ এবং হেকিম তাঁদের মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হলেন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাশিম বেগ সহিসকে ঘোড়া আনতে নির্দেশ দিলেন।
নির্দেশ পেয়ে সহিস ঘোড়া নিয়ে এলো। ঘোড়া দেখে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। বগি থেকে নেমে তিনি ঘোড়ার পাশে এলেন। ঘোড়ার পাশে এসে কয়েকটা মুহূর্ত নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কেউ কিছু বুঝার আগেই তিনি হঠাৎ ঝাঁপ মেরে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন।
রোগ ভোগের পর এটাই ছিলো বাবরের প্রথম অশ্বারোহণ। কারও সহায় ব্যতিরেকেই ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করা দেখে সহিস প্রশংসাসূচক হাসি হাসলো। কাশিম বেগ এবং হেকিম স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বাবর নিজেও উল্লসিত হয়ে উঠলেন ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে। তিনি স্বচ্ছন্দে ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে লাগলেন। কোনো অসুবধিা হলে সহায় করার উদ্দেশ্যে কাশিম বেগ বাবরের পেছনে পেছনে আসতে লাগলেন। কিন্তু বাবরের কোনো রকম সহায়ের প্রয়োজন হলো না। তিনি স্বচ্ছন্দে ঘোড়া ছুটিয়ে এগোতে লাগলেন।
বাবর ছোটবেলা থেকেই ঘোড়ায় উঠায় অভ্যস্ত ছিলেন। ছেলেবেলা তিনি ঘোড়ায় চড়ে নানান রকমের খেলা খেলতে ভালো বাসতেন। তেমন খেলা খেলতে গিয়ে তিনি বিপদেও পড়তেন কখনও কখনও।
একদিনের কথা। সেদিন বাবর যুদ্ধবিদ্যা অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলেন। সেদিনের অনুশীলনের বিষয় ছিলো তীরন্দাজি। অন্যান্য সহযোগী তীরন্দাজবর্গ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বাবরের রণ কৌশল প্রত্যক্ষ করছিলেন।
বাবর ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসা অবস্থাতে হঠাৎ ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিয়ে অপূর্ব দক্ষতায় তীর নিক্ষেপ করলেন এবং সেই তীর গিয়ে লক্ষ্যস্থানে আঘাতও করলো।
তীর নিক্ষেপ করেই বাবর সাবলীল ভঙ্গীতে ঘোড়া ছুটিয়ে ওস্তাদ মুস্কী বেগের নিকটে এলেন।
বাবরের অপূর্ব তীর নিক্ষেপ কৌশল প্রত্যক্ষ করে মুস্কী বেগ অভিভূত হয়ে পড়ছিলেন। বাবর তাঁর নিকটে আসার সাথে সাথে তিনি বাবরের পিঠে চাপর মেরে প্রশংসা করে বললেন- বাঃ! অপূর্ব! আমি তোমার রণ কৌশলে অভিভূত। আচ্ছা, যাওঁ, এখন তুমি বিশ্রাম নাওগে’।
এভাবে পরামর্শ দিয়েই মুস্কী বেগ অন্য কাজে চলে গেলেন।
মুস্কী বেগের প্রশংসায় বাবর উৎসাহিত হয়ে বিশ্রামের কথা ভুলে গেলেন। দুষ্টুমি বুদ্ধি জেগে উঠলো তাঁর মনে। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে দুষ্টুমি করার কথা ভাবলেন। মুস্কী বেগ দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হওয়ার সাথে সাথে তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠলো দুষ্টুমি বুদ্ধির চমক।
ভাবামতেই তিনি কপালে তারা চিহ্নযুক্ত অশ্বটি তাঁর কাছে নিয়ে আসার জন্য দেহরক্ষী অশ্বারোহীকে ইংগিতে নির্দেশ দিলেন।
দেহরক্ষীটি বাবরের নির্দেশ অনুসারে ঘোড়া নিয়ে এলেন। ঘোড়ার কাঠি ঠিক মতো বাঁধা আছে কিনা বাবর টেনে দেখে নিলেন। বাঁধা ঠিকই ছিলো। তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন এবং পঞ্চাশ গজ এগিয়ে গিয়ে তাঁর দিকে ঘোঁড়াটা ধীরে ধীরে নিয়ে আসতে দেহরক্ষীকে বললেন। বাবরের নির্দেশ অনুসারে দেহরক্ষীটি ঘোড়ার পিঠে চড়ে পঞ্চাশ গজ এগিয়ে গিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঘোড়ার লাগাম ধরে ধীরে ধীরে বাবরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো।
বাবরের সাথীদের মধ্যে নুয়ান কুশল দাস ছিলো অন্যতম। নুয়ান বাবরের থেকে বয়সে কিছু বড়। সে খানজাদা বেগমের সমবয়সী। খানজাদা বেগম এবং সে একসাথে তার মাতৃর দুগ্ধ পান করেছে। সেজন্য তার বাবরের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিলো।
দেহরক্ষীকে তেমনভাবে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে নুয়ান উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলো। ববার যে ‘পাকচক্ৰ’( পাকচক্র অনুশীলনে সন্মুখের দিক থেকে নিজের দিকে এগিয়ে আসা ঘোড়ার দিকে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে গিয়ে নিজের ঘোড়াটিকে দ্রুত ঘূরিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে জাঁপ মেরে সন্মুখের দিক থেকে মন্থর গতিতে এগিয়ে আসা ঘোড়ার পিঠে চড়তে হয়। এই অনুশীলনে ঘোড়ার পিঠে চড়তে বিফল হলে আঘাত পাওয়াটা প্রায় নিশ্চিত।) অনুশীলনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এ কথা উপলব্ধি করতে নুয়ানের অসুবিধা হল না। সেজন্য বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করে সে তৎক্ষণাৎ বাবরের কাছে এসে উৎকন্ঠিতভাবে অনুরোধের সুরে বললো- শাহজাদা, এইমাত্র আপনি একটি অনুশীলন করেছেন। পাকচক্র অনুশীলনটা আজ না করলে হয় না?
বাবর নুয়ানের কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে বললেন- আচ্ছা, তোমার কথায় পাকচক্র অনুশীলনটা আজকের জন্য বাদ দিলাম। আজ শুধু একটি লঘু অনুশীলন করব।
এভাবে বলেই বাবর রহস্যপূর্ণ হাসি হেসে ঘোড়ার পেটে পা-র গোড়ালি দিয়ে গুঁতো মেরে তাঁর দিকে মন্থর গতিতে এগিয়ে আসা ঘোড়ার দিকে সগৌরবে ঘোড়া ছুটিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেলেন।
ঝাঁপটা দৌড়ে দৌড়ে এসে বাবরের ঘোড়া দেহরক্ষীর ঘোড়ার কাছে পৌঁছোলেন। সাথে সাথে বাবর রেকাব থেকে পা বের করে চাবুক দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে দেহরক্ষীর ঘোড়া লক্ষ্য করে জাঁপ দিলেন। বাবরকে জাঁপ দেওয়া দেখে দেহরক্ষীর ঘোড়াটি ভয় পেয়ে একটু সরে গেলো।
বাবর একমুহূর্ত শূন্যে ভেসে রইলেন এবং পরে দেহরক্ষীর ঘোড়াটির জিনের কাঠি ধরতে সক্ষম হলেন। তবে তাঁর পা মাটিতে ঘেঁসরানি খেতে খেতে হিঁচড়ে যেতে লাগলো। তাঁর মাথার রেশমি পাগুরি মাথা থেকে খসে দূরে ছিটকে পড়লো।
দেহরক্ষী সৈন্যটি অশেষ কষ্ট করে ঘোড়াটা থামাতে সক্ষম হলো। বাবর ঘোড়ার কাঠি ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালেন। তবে তিনি তখনও চাবুকটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ছিলেন।
বাবরের এই দুর্গতির জন্য দেহরক্ষী সৈন্যটি নিজেকে দায়ী ভেবে ঠকঠক্ করে কাঁপতে লাগলো। প্রকৃতার্থে বাবরের এই দুর্ঘটনার জন্য দেহরক্ষী সৈন্যটি দায়ী ছিলো না, দায়ী ছিলো স্বয়ং বাবর নিজে।
সেজন্য দেহরক্ষীর ভয়ের কারণ উপলব্ধি করতে পেরে বাবর অভয় দিয়ে বললেন- তুমি কেন ভয় করছ? এখানে তোমার কোন দোষ নেই। সেজন্য তোমার ভয় করারো প্রয়োজন নেই। যাও, তুমি ঘোড়া সামলাওগে’।
ছেলেবেলা থেকেই এরকম ছিলেন বাবরের মহত্ত্ব এবং অশ্ব চালনার প্রতি আকর্ষণ ও পারদর্শিতা।
সেজন্য বাবর ঘোড়ায় চড়ে স্বচ্ছন্দ অনুভব করতে লাগলেন। বগিতে পা কুঁচিয়ে বসে থেকে তিনি রোগশয্যায় শোয়ে থাকার মতো অনুভব করছিলেন। ঘোড়ার কদম কদম দৌড়ের ছন্দে তিনি শরীরে নতুন শক্তি ও উদ্যম অনুভব করতে লাগলেন। দেহের জড়তার সাথে সাথে তাঁর মনের জড়তাও হ্রাস পেতে লাগলো ঘোড়ার কদম কদম পা ফেলার ছন্দে। ঘোড়ার পিঠে বসে যেন তাঁর স্বাস্থ্যও উত্তরোত্তর উন্নতি হতে লাগলো। তাঁর স্বাস্থ্য এবং মনের গতি লক্ষ্য করে সবাই উৎফুল্লিত হয়ে উঠলো।
সূর্যাস্তের সাথে সাথে তাঁরা এসে জিজ্জখ উপস্থিত হলেন। রাত্রি যাপনের জন্য তাঁবু খাটানো হলো। আগের মতোই দুই তিন মাইলের ব্যবধান রেখে বর-কন্যার তাঁবু পৃথকে পৃথকে খাটানো হলো।
অশ্বারোহণ করে বাবরের স্বাস্থ্য এবং মনের উন্নতি হওয়ার কথা মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমের কানেও পৌঁছোলো। তাঁরা খবর শুনে স্বাভাবিকভাবেই উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন এবং শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা হিসাবে বাবরকে কিছু উপহার প্রদানের কথা ভাবলেন। সেজন্য মেহের নিগার বেগম পরিচারক একজনের দ্বারা কাশিম বেগকে ডেকে পাঠালেন।
কাশিম বেগ আসার পর মেহের নিগার বেগম একটি আচকান, একটি কটিবন্ধ এবং একটি রুপোর মুঠোযুক্ত চাবুক বাবরের জন্য উপহার হিসাবে কাশিম বেগের হাতে পাঠিয়ে দিলেন।
তিনটা উপহারেরই রূপক অর্থ ছিলো। আচকান ছিলো বাবরের স্বাস্থ্য উন্নত হওয়ার জন্য আনন্দের প্রতীক, কটিবন্ধের অর্থ ছিলো, অতি শক্তিশালী ও প্রতাপী হওয়ার প্রতীক এবং রূপোর চাবুকের অর্থ ছিলো বাবর দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে আন্দিজান গিয়ে শত্রুর ওপরে বিজয় সাব্যস্ত করার প্রতীক।
মাগরিবের নামাজের পর কাশিম বেগ উপহার কয়টি এনে বাবরের হাতে দিলেন। উপহার পেয়ে বাবর হর্ষোৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন এবং তিনি প্রতিউপহার প্রদানের কথা ভাবলেন।
উপহারের বিষয়ে বাবর কাশিম বেগের নিকটে পরামর্শ চাইলেন। কাশিম বেগ কিছুক্ষণ ভাবনা-চিন্তা করে মুদ্রাপূর্ণ একটি রুপোর পাত্র প্রদানের পরামর্শ দিলেন।
পরামর্শ বাবরের মনোমত হলো। তবে মুদ্রাপূর্ণ পাত্রের সাথে তিনি একটি ঘোড়ার বগি প্রেরণের কথা ভাবলেন। তবে তিনি সরাসরি বগি প্ৰেরণের কথা না বলে ছলনার আশ্রয় নিয়ে বললেন- আপনার পরামর্শ আমার পছন্দ হয়েছে। তবে আপনি এক কাজ করুন, মুদ্রাপূর্ণ পাত্রটি একটি খালি ঘোড়ার বগিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
খালি বগির কথা শুনে কাশিম বেগ চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু…….বর্তমান আমাদের একটি মাত্র খালি বগি রয়েছে। উপহার ভেবে বগিটা যদি তাঁরা ফেরত না দেন এবং যদি আপনার প্রয়োজন হয়………
বাবর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- আল্লাহর ওপরে ভরসা রাখুন, নিশ্চয় আমার বগির প্রয়োজন হবে না। বগিতে মাসি-ই সফর করুন।
কথাটা বাবরের আদেশ ভেবে কাশিম বেগ কোন রকমের প্রতিবাদ করলেন না। বাবরের ইচ্ছানুসারেই একটি খালি বগিতে মুদ্রাপূর্ণ পাত্রটি পাঠিয়ে দিলেন।
পরের দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু হলো। দু’টি জাকজমক রাজকীয় বগি, মালবাহী গাড়ী এবং উটের সারি উত্তর দিকে ঘুরে তাসকন্দের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলো। বলা বাহুল্য যে, সেই বগি দু’টির একটিতে ছিলেন মেহের নিগার বেগম এবং অন্যটিতে ছিলেন আয়েশা বেগম।
দেহরক্ষী সেনার ওপরেও বাবর নিজের একশ জন সুশিক্ষিত সেনা মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমের সুরক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। এখন থেকে মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগম যাবেন তাসকন্দ অভিমুখে এবং বাবর যাবেন আন্দিজান অভিমুখে।
মাসি এবং বাগদত্তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানানোর জন্য বাবর কয়েকজন সেনা নিয়ে একটি টিলার ওপরে উঠে এসে দাঁড়ালেন। বগি, মালবাহী গাড়ী এবং অপসৃত উটের সারি ধীরে ধীরে বাবরের দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়ে পড়ল। তাঁর সাথে যাওয়া সেনারা টিলা থেকে নেমে এলেন যদিও তিনি টিলার ওপরেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি আয়েশা বেগম চড়ে যাওয়া বগিটি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন। তিনি হয়তো সেভাবে দাঁড়িয়ে নিজের বাগদত্তাকে শুভকামনা জানানোর পাশাপাশি নিজেও তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন।
বাবর সমরকন্দে একশ দিন ছিলেন। এই একশ দিনের ভেতরে তিনি একদিনও আয়েশা বেগমের সামনাসামনি হোননি। ধর্মীয় নীতিনিয়মের পাশাপাশি যুবকসুলভ লজ্জাশীলতাই তাঁকে আয়েশা বেগমের সাথে সামনাসামনি হওয়ায় বাধা প্ৰদান করছিলেন। টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে তাঁর ‘বোস্তান সরায়’ প্রসাদে বসে রচনা করা শায়েরির কথা মনে পড়ে গেলো-
তোমার রূপের জ্যোতি সবার মুখে মুখে চন্দ্রমুখি
তোমার ও আমার কখন মিলন হবে চন্দ্রমুখি?
কিছুক্ষণ পর বাবর অন্যমনস্কভাবে টিলা থেকে নেমে ছাউনিতে এলেন। ছাউনিতে এসেই তিনি দলবল নিয়ে আন্দিজান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে এলেন।
সেদিন সারাটা দিন তিনি ঘোড়ার পিঠে বসে শায়েরির উপরোক্ত পংক্তি দু’টির সাথে অন্য দু’টি পংক্তি সংযোগ করলেন-
তোমার মাথার নাগাল না পেলেও, আঁঠু পর্যন্ত নিশ্চয় পাব
ভাগ্যই আমাকে যেদিকে নিবে, তোমার সাথে আমি সেদিকেই যাব।
সেদিন রাত্রি যাপনের জন্য ‘কোতে গিরমান’-এ সন্ধ্যেবেলা তাঁবু খাটানো হলো। তাঁবু খাটানোর পর তিনি কাগজ কলম নিয়ে তাঁবুর ভেতর বসে সারাদিন ভেবে আসা পংক্তি দু’টি লিখে ফেললেন।
* * *
পরের দিন বাবর সৈন্যসামন্ত নিয়ে জিজ্জখ থেকে রওয়ানা হয়ে নাবদরিয়া পার হয়ে আন্দিজানের সংবাদ জানার জন্য ছাউনি পেতে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কারণ সমরকন্দে থাকতেই আন্দিজানের সবিশেষ পরিস্থিতির বুঝ নেওয়ার জন্য কাশিম বেগ তাহিরজানকে আন্দিজান পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং সমরকন্দ থেকে আন্দিজান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে আসার দু’দিন আগে তাহিরজানের সাথে সাক্ষাৎ করে আন্দিজানের সবিশেষ খবর সংগ্রহ করার জন্য অন্য একজন সংবাদবাহক প্রেরণ করেছিলেন। সেই সংবাদবাহককে নাবদরিয়ার পাড়ে বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন।
কিন্তু বাবর নাব দরিয়া পার হওয়ার সময়ে তাহিরজান আন্দিজান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে কোকন্দ পার হয়ে খোদ দরবেশ রেগিস্থান পৌঁছেছিলেন মাত্র। খোদ দরবেশ থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এলেও বাবর ছাউনি খাটানো স্থানে পৌঁছোতে কমেও সাত আটদিন সময়ের প্রয়োজন হবে। সেজন্য বাবর ছাউনি পেতে ছয়দিন অপেক্ষা করার পরেও আন্দিজানের কোনো সংবাদ না পেয়ে বা তাহিরজান আসার কোনো লক্ষণ না দেখে অধৈর্য হয়ে তিনি সাতদিনের মাথায় আন্দিজান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে এলেন।
বাবর দলবল নিয়ে কিছুদূর আসার পরেই কস্তুরি রঙের ঘোড়ায় চড়ে ধুলো উড়িয়ে তাহিরজানকে আসতে দেখলেন।
বাবরের কাছে এসেই তাহিরজান ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ মেরে নেমে কাঁদতে লাগলো। সে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো- আপনি সমরকন্দ ছেড়ে এলেন কেন, জাহাপনা?…..
তাহিরজান কেঁদে কেঁদে আন্দিজানের সমগ্র ঘটনা বলে গেলো-
তাহিরজানের মুখে আন্দিজানে বাবর সেনার পরাজয় এবং দূর্গ সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাদের বিশ্বাসঘাতকতার বিবরণ শুনে বাবরের অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠলো এবং প্রচণ্ড ব্যথার অনুভূতিয়ে তাঁর দেহমন আচ্ছন্ন করে ফেললো। তাঁর অনুমান হলো, পৃথিবীটা যেন প্রচণ্ড ঝঞ্জার তাণ্ডবে কাঁপতেছে। আকাশ বাতাস আন্দোলিত হইতেছে। প্রচন্ড ভূমিকম্পের তাণ্ডবে যেন পৃথিবীটা তল ওপর হইতেছে। চির দরিয়ার পাড় ভেঙে মাতাল তরঙ্গ যেন ভূ-ভাগ প্লাবিত করার জন্য মুখব্যাদান করে এগিয়ে আসছে। সেই তরঙ্গের জলে যেন ধোয়ে মুছে নিঃশেষ করে দিবে সমগ্র পৃথিবী।
বাবরের চোখেমুখে করুণ ব্যথার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো। চোখ বিস্ফারিত করে তিনি আন্দিজানের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। নাব দরিয়ার সেপাড়ে অবস্থিত খোজন্দের পাহাড়িয়া এলেকা কুয়াশার মতো দৃষ্টিগোচর হলো। খোজন্দ থেকে আন্দিজান কতদূর? বাবর নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন। তাঁর অনুমান হলো, দুর্ভাগ্য যেন তাঁকে আন্দিজান থেকে টেনে হিঁচড়িয়ে সমরকন্দ নিয়ে গিয়েছিলো এবং চরম দুর্ভাগ্যই যেন পুনরায় তাঁকে সমরকন্দ থেকে আন্দিজান অভিমুখে ঠেলে পাঠিয়েছে।
আন্দিজান থেকে বিশ্বাসঘাতক তনয়াল, সমরকন্দ থেকে সুলতান আলী এবং তুর্কিস্থান থেকে শৈবানি খাঁ তাঁর দিকে তাকিয়ে পৈচাশিক উল্লাসে অট্টহাসি হাসছে এবং সেই হাসির শব্দে যেন চতুর্দিক আলোড়িত হচ্ছে। আলীদোস্ত বেগের বিদ্রোহ, বাবরের প্রতি আনুগত্য ও নিষ্ঠা প্রদর্শনের জন্য খাজা আবদুল্ল্যাহকে খাকান দরজায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার কথা এবং বাবরের মাতৃ কুতলুগ নিগার বেগম ও ভগ্নী খানজাদা বেগমের দুর্দশার কথাও তাহিরজান অশ্রুসিক্ত নয়নে বর্ণনা করে গেলো।
খাজা আবদুল্ল্যাহকে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে হত্যা এবং মাতৃভগ্নীর দুর্দশার কথা শুনে বাবর প্রচন্ড ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তাঁর ধৈর্যের বান্ধ শিথিল হয়ে পড়লো। উত্তেজনায় তাঁর চোখমুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। বিক্ষুব্ধ উত্তেজনায় তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। তাঁর দেহের সিরা উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠলো।
বাবর লাফ মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোড়া ছোটালেন। কোথায় যাবেন, তিনি নিজেও জানেন না। যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাক ভেবে তিনি ঘোড়াটিকে ইচ্ছামতো ছুটতে দিলেন।
সকাল থেকে জল পান না করার জন্য পিপাসার্ত হয়ে ঘোড়া নদীর পাড়ে এলো। নদীর উঁচু খাঁড়া পাড় দেখে বাবরের হঠাৎ পিতৃর কথা মনে পড়ে গেলো। তাঁর উপলব্ধি হলো, যেন নদীর উঁচু খাঁড়া পাড় ধীরে ধীরে নিচের দিকে ধসে পড়ছে। তিনি চমকে উঠে পিছিয়ে এলেন। ক্ষোভ, আক্রোশে তিনি উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে উঠলেন। এক সময় তিনি নিরুদ্ধ আক্রোশে ঘোড়ার গলা ঝাঁপটে ধরে মেয়ে মানুষের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
বাবরকে হঠাৎ উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে দেখে কাশিম বেগ এবং হেকিম উৎকণ্ঠিত হয়ে বাবরের পেছনে পেছনে আসছিলেন। তাঁরা কিছুদূরে দাঁড়িয়ে বাববের গতিবিধি নিরীক্ষণ করছিলেন। বাবরকে কাঁদতে দেখে কাশিম বেগ বাবরের নিকটে এসে সমবেদনা প্রকাশ করে বললেন-এভাবে কাঁদবেন না জাহাপনা। আমরা এখন চরম বিপদের সম্মুখীন হয়েছি।বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা উচিত, জাহাপনা।
তনয়াল আন্দিজানে কাশিম বেগরও যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করেছিলো। সেজন্য তিনি তাঁর দুরবস্থার কথা বলে সান্ত্বনা প্রদানের চেষ্টা করলেন- বিদ্রোহীরা আমার সমস্ত সম্পত্তি লুটপাট করে নিয়ে গেছে। তারা আমার ছেলেটিকেও খারাপ ধরণে মারধোর করেছে। এগুলিকে অদৃষ্টের পরিহাসের বাইরে আর কী বলবো, জাহাপনা?
কাশিম বেগের কথা শুনে বাবর উদ্বিগ্নভাবে মাথা তুলে তাকালেন। তাঁর চোখে তখনও জল টলবল করতেছিলো।
বাবরের চোখে জল দেখে হেকিম মাতৃসূলভ স্নেহে বাবরের পিঠে হাত ফিরিয়ে বললেন- জাহাপনা, আপনার অন্তর এতো ছোট করা উচিত নয়। আল্লাহর কৃপায় আপনার মাতৃ এবং ভগ্নী কুশলেই আছেন। আপনি বেঁচে থাকলে পুনরায় সব ফিরে পাবেন। আল্লাহর ওপরে ভরসা রাখুন। আপনি এভাবে হতাশায় ভেঙ্গে পড়লে আপনার অসুখ আবার বেশি হতে পারে! তখন সব আশা ভরসা বরবাদ হয়ে যাবে, জাহাপনা।
হেকিমের উপদেশ মিশ্রিত কথাগুলো বাবরের কর্ণগোচর হল না। কারণ তখন তাঁর চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়াচ্ছিলো খাজা আবদুল্ল্যাহর প্রাণহীন দেহ। তিনি চেষ্টা করেও চোখের জল লুকোতে সক্ষম হচ্ছিলেন না। তাঁর চোখে যেন বর্ষার ঢল নামলো। যন্ত্রণা বিকৃত কণ্ঠে তিনি নিজেকে নিজে বলতে লাগলেন- হায় ! আমার ওস্তাদ, আপনি আমাকে কার কাছে রেখে এভাবে চলে গেলেন? সেই পাষণ্ডরা আপনার মতো মানুষকে কীভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করতে পারলো? এভাবে বলার পরেই যেন তিনি আত্মপ্রত্যয় ফিরে পেলেন। তাঁর ক্লান্ত শিথিল স্নায়ুগুলো যেন হঠাৎ সজীব হয়ে উঠলো। দু’চোখে দপ করে জ্বলে উঠলো প্রতিশোধের বহ্নি শিখা। বিষণ্ণ ক্লান্তির জায়গায় জেগে উঠলো উদ্যম উদ্দীপনা। হঠাৎ তাঁর কন্ঠস্বর বদলে গেলো। তিনি আক্রোশে জ্বলে উঠলেন- আমাদের ওস্তাদ হত্যার বদলা নেব আমি। আমার দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত আমি লড়াই করে যাব। এ আমার কসম!
হেকিম এবং কাশিম বেগ লক্ষ্য করলেন, বাবর খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে কথা বলছেন না। প্রতিটা শব্দ সাবলীল এবং স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করছেন। কথাগুলো বলার সময় প্রতিমুহূর্তে তার মুখমণ্ডলের রঙ বদলে যাচ্ছে। কখনও মলিন, কখনও আবার রাঙা হয়ে উঠছেন তাঁর মুখমন্ডল।
বাবর স্পষ্ট উচ্চারণে কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে আদেশের সুরে বললেন- আমি বদলা নেব, আমি যুদ্ধ করব। আপনি সৈন্যদের সঙ্গবদ্ধ করে আমার আদেশের কথা জানিয়ে দিন। আমি কসম খাচ্ছি, আমি বদলা নেব। সবাই এখন এই মুহূৰ্তে আন্দিজান অভিমুখে যাত্রা করুন।
বাবর কথাগুলো বলে লাফ মেরে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছাউনির দিকে রওয়ানা হলেন।
* * *
বাবর অতি সহজেই মার্গিলান এবং উশ দখল করলেন। আন্দিজানের কাছে সংঘটিত সমরে তনয়াল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। উপায়বিহীন হয়ে তনয়াল আন্দিজান দূর্গের ভেতরে আশ্রয় গ্রহণ করলো।
বিজয়ের আনন্দে বাবর সৈন্য দুঃসাহসী হয়ে উঠলো। একদিন বাবর সেনার কিছুসংখ্যক সৈন্য খাকান দরজার কাছে অবস্থিত পরিখার নিকটে তাঁবু খাড়া করলো, কিন্তু বিজয়ের আনন্দে সৈন্যরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে পহরার ব্যবস্থা না করেই রাতে শোয়ে পড়লো। সেদিন রাতেই তাঁরা এই অপরিণামদর্শিতার মাশুল দিতে হলো।
তনয়াল সৈন্য গোপনে পরিখার পাড়ে অবস্থিত তাঁবুর দিকে নজর রাখছিলো। তারা যখন দেখলো, তাঁবুগুলিতে কোনো পহরার ব্যবস্থা না করেই সেনারা নিশ্চিন্ত মনে শোয়ে পড়ছে, তখন তনয়াল সেনা উজ্জীবিত হয়ে উঠলো। তারা তনয়ালের সাথে পরামর্শ করে সুর্যোদয়ের পূর্বেই অতর্কিতে বাবর সেনার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
গভীর নিদ্রায় শায়িত বাবর সেনা গন্ডগোলের শব্দ পেয়ে জেগে উঠলো যদিও প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত হতে সক্ষম হলো না। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রতিরোধের আশা বাদ দিয়ে তারা প্রাণ নিয়ে পালাতে লাগলো। এই ঘটনার প্রভাব কিছু দূরে অবস্থানরত বাবর সেনার ওপরেও পড়লো।
বাবর সেনার পলাতক সৈন্যদের প্রভাব বাবরের দেহরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাদের ওপরেও পড়লো। তারা বাবরের দেহরক্ষার কথা ভুলে প্রাণ নিয়ে এদিকে সেদিকে পালাতে লাগলো।
গণ্ডলোলের শব্দ পেয়ে বাবর জেগে উঠে দেখলেন তাঁর দেহরক্ষার জন্য শুধু দশজন সেনা অবশিষ্ট রয়েছে। বাকি সেনা সব পালিয়ে গেছে। ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আসন্ন বিপদের মোকাবিলার জন্য তিনি তৎক্ষণাৎ সজ্জিত হয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়ে কোলাহলের উৎস লক্ষ্য করে ঘোড়া ছুটালেন।
বাবর লক্ষ্য করলেন, আহম্মদ তনয়ালের সেনারা তাঁর পলায়নরত সেনার ওপরে নির্বিচারে তীর নিক্ষেপ করে চলেছে।
বাবর ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখলেন, তীরন্দাজ সেনাদের সংখ্যা খুবই কম। সেজন্য তিনি দশজন সেনা নিয়েই তীরন্দাজ সেনাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আকস্মিক আক্রমণে ভয় পেয়ে তীরন্দাজ সেনারা যথেচ্ছভাবে পালাতে লাগলো। বাবর উৎসাহিত হয়ে তাদের পেছনে পেছনে ধাওয়া করলেন।
কিছুদূর আসার পর একদল অশ্বারোহী সেনা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসা বাবর লক্ষ্য করলেন। সেনাদের আগে আগে আসছিল আহম্মদ তনয়াল। তনয়ালকে দেখে বাবর ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন। ফলে ঘোড়াটি দাঁড়িয়ে গেলো।
ঘোড়াটি দাঁড়ানোর পরে বাবর তাঁর নিজের সেনাদের বুঝ নেওয়ার জন্য চতুর্দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, তাহিরজানসহ তাঁর সাথে মাত্র তিনজন সেনা রয়েছে। বাকি সৈন্য আসন্ন বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে। ইচ্ছা করলে এবং কিছু তৎপর হলে বাবরও পালিয়ে যেতে সক্ষম হতেন। তবে তাঁর প্রকৃতি তাঁকে শত্রু সেনার দিকে পিঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যেতে বাধা প্রদান করলো। তাঁর মনে আত্মসন্মানবোধ জেগে উঠলো। কিছুক্ষণ আগে মৃত্যু ভয়ে তিনি কিছু বিচলিত হয়ে উঠেছিলেন যদিও আত্মসন্মানবোধ জেগে উঠার সাথে সাথে সেই মৃত্যুভয় দূরীভূত হলো এবং তিনি বীরের মতো শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন।
ভাবামতেই বাবর তৎক্ষণাৎ তীরধনু নিয়ে প্রস্তুত হলেন এবং শত্রুসেনা লক্ষ্যের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। বাবরকে দেখে তাহিরজান এবং অন্য দু’জন সেনা তীরধনু নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য অবস্থান গ্রহণ করলো।
আহম্মদ তনয়াল দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে বাবরের দিকে ধাবিত হচ্ছিলো। অল্প সৈন্যের মাঝে বাবরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে উল্লসিত হয়ে অশ্ব নিয়ন্ত্রণ না করেই তরবারি কোষমুক্ত করে মাথার ওপরে ঘুরাতে ঘুরাতে পৈচাশিক উল্লাসে বাবরের দিকে ধাবিত হলো।
তনয়াল লক্ষ্যস্থানের ভেতর প্রবেশ করার সাথে সাথে বাবর তনয়ালের নাক এবং চোখের মাঝ বরাবর লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলেন। শনশন শব্দে শর এগিয়ে গিয়ে তনয়ালের শিরস্ত্রাণে আঘাত করলো। কিন্তু শিরস্ত্রাণ খুবই মজবুত ছিলো। সেজন্য কোনো ক্ষয়ক্ষতি না করে শর ধাতব শব্দ করে জমিতে পড়ে গেলো। বাবর পুনরায় তনয়ালকে লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলেন। তনায়ল ক্ষিপ্রহাতে সেই শর প্রতিহত করলো। ঢালে আঘাত করে শর পুনরায় জমিতে পড়ে গেলো।
তনয়াল সেনারাও বাবরকে লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করতে লাগালো। একটি শর বাবরের জোতা ভেদ করে পা-য় আঘাত করলো। বাবর পা থেকে শরটি খুলে নিজেকে সামলিয়ে নেওয়ার আগেই তনয়াল তাঁর কাছে এসে পৌঁছোলো।
তনয়ালের হাতে ছিলো বাবর নিজে উপহার দেওয়া সেই সোনার তরবারি এবং তার চোখেমুখে বিরাজ করছিলো হিংস্র উল্লাস।
সন্মুখে মূর্তিমান যমসদৃশ তনয়ালের হাতে তরবারি প্রত্যক্ষ করেও বাবর নিজের তরবারি কোষমুক্ত করলেন না। তরবারি কোষমুক্ত না করার কারণ পা-র আঘাত, না সময়ের অভাব বুঝা গেল না।
তনয়াল কিন্তু ক্ষ্যান্ত হল না। সে বাবরের নির্লিপ্ততার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করলো। ক্ষণকাল বিলম্ব না করে সে বাবরের মস্তক লক্ষ্য করে তরবারি দ্বারা আঘাত করলো। শিরস্ত্রাণ ভেদ করে তরবারি মাথায় বসে গেল না যদিও শিরস্ত্রাণের আঘাতে মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে লাগলো। আকস্মিক প্রচন্ড আঘাতের ফলে বাবরের মাথা চক্কর কাটতে লাগলো। তাঁর দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
আমার জোতাও কি রক্তে ভরে গেছে? মাথা ঘুরানোর ফলে বাবর ঘোড়ার পিঠে শোয়ে পড়ার আগমুহূর্তে উদাসীনভাবে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন।
বাবরের সংকটাপন্ন অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তনয়াল বিজয়ের উল্লাসে চিৎকার করে পুনরায় আঘাত করার জন্য তরবারি উত্তোলন করলো।
তাহিরজান বাবরের সংকটাপন্ন অবস্থা প্রত্যক্ষ করে সহায়ের জন্য এগিয়ে এসে ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হলো।
তনয়ালের আঘাত প্রতিহত করার অন্য কোনো উপায় না দেখে তাহিরজান বাবরের ঘোড়ার লাগাম ধরে সজোরে তার দিকে আকর্ষণ করলো। আকর্ষণের ফলে ঘোড়া কিঞ্চিত এগিয়ে গেলো। ফলে তনয়ালের তরবারির আঘাত বাবরের শরীরে না লেগে তাঁর তূণে লাগলো। তূণ কেটে জমিতে খসে পড়লো।
তনয়াল পুনরায় তরবারি উত্তোলন করার আগেই তাহিরজান প্রচণ্ড চিৎকার করে বললো- জাহাপনা, ঘোড়া সামলান। এভাবে বলেই সে বাবরের ঘোড়ার পিঠে প্রচণ্ড চাবুকাঘাত করলো।
মুগ বর্ণের ঘোড়াটা বাবরের খুবই প্রিয় ছিলো। কখনও কখনও বিশেষ পরিস্থিতিতে এরকম নিষ্ঠুর ব্যবহার করা হতো ঘোড়াটার সাথে। সেজন্য অনভ্যস্ত চাবুকাঘতে ভীতিগ্রস্ত হয়ে বাবরকে নিয়ে ঘোড়াটা তরিৎগতিতে ছুটে চললো।
তাহিরের উপস্থিত বুদ্ধি এবং তৎপরতার জন্য সেদিন বাবর কোনমতে মৃত্যুমুখ থেকে রক্ষা পেলেন।
বাবরের পা এবং মাথার ক্ষত শুকোতে অনকেদিন লাগলো। ক্ষতের সাথে মাথার যন্ত্রণাও বাবরকে পীড়া দিতে লাগলো। পা-র ক্ষত ধীরে ধীরে শুকালো যদিও অনেকদিন তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে বাধ্য হলেন এবং মাথার যন্ত্রণা তাঁকে অনেকদিন পীড়া দিচ্ছিলো।
অবশেষে বাবর আন্দিজান জয়ের আশা সেখানে সমাপ্ত করে উশ-এ ফিরে এলেন।
দেহের ক্ষতের চেয়ে মনের ক্ষত বাবরকে অধিক যন্ত্রণা দিতে লাগলো। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় তিনি প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত হয়ে পড়লেন।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! নিজে উপহার দেওয়া তরবারির আঘাত তিনি নিজে মাথা পেতে নিতে হলো! এর থেকে দুর্ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে? লোকে বলে, সজ্জনে সুবিচার পায় এবং বেইমানে শাস্তি মাথা পেতে নিতে হয়। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে উলটো হলো কেন? বেইমান, নিষ্ঠুর তনয়ালকে ভাগ্য শাস্তি দিলে না কেন? যুদ্ধক্ষেত্রে বেইমান, অত্যাচারি তনয়ালের হাত-ই কেন অধিক শক্তিশালী এবং সৌভাগ্যবান বলে পরিগণিত হলো?
বাবর উশ-এ আসার কয়েকদিন পরেই মির্জা জাহাঙ্গীর কুতলুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগমকে বাবরের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তখন থেকে তাঁরা বাবরের সাথেই রয়েছেন।
বাবর একদিন কুতলুগ নিগার বেগমকে এসব প্রশ্ন করায় তিনি বাবরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- আল্লাহর মেহেরবাণীতে যে আপনি প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছেন, এটাই যথেষ্ট। আপনি বর্তমান মাত্র ষোল বছরের কিশোর। তনয়ালের মতো বয়স হলে আপনিও এর থেকে বড় বিজয় সাব্যস্ত করতে পারবেন। বর্তমান আপনাদের দুই ভ্রাতৃর মাঝে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহে এই অঞ্চলের শান্তি এবং সমৃদ্ধির মূলে কুঠারাঘাত করেছে। আপনার মেসো সুলতান আহম্মদ জাহাঙ্গীর এবং আপনার মাঝে শান্তি চুক্তির কথা বলতেছেন। তিনি আখসি জাহাঙ্গীরকে এবং আন্দিজান আপনাকে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
মাতৃর কথা শুনে বাবর চিন্তিতকন্ঠে বললেন- কিন্তু ফারগানার মতো এই ছোট সাম্রাজ্য টুকরো করাটা সমীচিন হবে কী? সমগ্র মাউরা উন্নহর একত্রিত করার পরিবর্তে টুকরো টুকরো করলে আমাদের শক্তি কমে যাবে না?
এখন এর বাইরে অন্য কোন উপায় নেই। জাহাঙ্গীর তো আপনারই ভ্রাতৃ। দুই ভ্রাতৃর মাঝে বুঝাপড়া থাকলে বাইরের শত্রুরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এভাবে সান্ত্বনা দিয়েই কুলতুগ নিগার বেগম প্রসংগ পালটিয়ে বললেন- এখন আপনি শুধু সাম্রাজ্যের কথা ভাবলেই চলবে না। তাসকন্দে আপনার বাগদত্তা আপনার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে রয়েছেন। আমি কয়েকদিন আগে আপাজানের নিকট থেকে একটি পত্র পেয়েছি। আপাজান আয়েশা বেগমকে অতি শীঘ্র সেখান থেকে আনার জন্য লিখে পাঠিয়েছেন। আপনি আয়েশা বেগমকে যতদূর সম্ভব শীঘ্র এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করুন।
বাবর মাতৃর কথার বিরোধিতা করতে গিয়েও করতে পারলেন না। কারণ তিনি নিজেও বাগদত্তার সাথে মিলনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।
বাবরের অনুমতি নিয়ে কুতলুগ নিগার বেগম কয়েকদিন পরেই তাসকন্দে লোক পাঠিয়ে আয়েশা বেগমকে উশ-এ নিয়ে এলেন এবং অতি ধূমধাম করে উভয়ের শুভ পরিণয় সম্পন্ন করলেন।
বিয়ের কয়েকদিন পর সুলতান আহম্মদের পরামর্শ অনুসারে বাবর এবং জাহাঙ্গীরের মাঝে শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হলো। চুক্তির শর্ত অনুসারে মির্জা জাহাঙ্গীর আখসি এবং বাবর নিজে আন্দিজানের শাসনভার গ্রহণ করলেন।
বাবরকে এতদিন প্রচণ্ডভাবে পীড়া দিয়ে আসা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন এই শান্তি চুক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে দূরীভূত হলো। ফলে সমগ্র চিন্তাভাবনা ত্যাগ করে বাবর পুনরায় শায়ের হওয়ার কল্পনায় বিভোর হয়ে পড়লেন। কিন্তু কিছুদিন পরে আবার সমরকন্দ আক্রমণ করার জন্য বাধ্য হয়ে পড়লেন। নিয়তি আবার তাঁকে যুদ্ধের পথে ঠেলে দিলেন।
* * *
ক্ৰমশঃ ……………….বাবর সমরকন্দ ছেড়ে আসার পর বুখারার সুলতান সুলতান আলী সমরকন্দ দখল করেছিলেন।
সুলতান আলীর বয়স কম ছিলো। কিন্তু তবুও তিনি অত্যধিক নারীলোভী এবং স্বেচ্ছাচারি ও অকর্মণ্য শাসক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সেজন্য শাসক হিসাবে তাঁকে কেউ ভালবাসত না। সর্বোপরি তাঁর বয়স কম থাকার জন্য মাতৃ জহুরা বেগমই ছিলেন সর্বেসর্বা। জহুরা বেগম নিজেও ক্ষমতালোভী এবং স্বেচ্ছাচারি ছিলেন। সেজন্য জহুরা বেগমকে সমরকন্দের বেগ ও বিশিষ্ট নাগরিকরা পসন্দ করতেন না। ফলে এক সময় বেগ এবং বিশিষ্ট নাগরিকবর্গ তলে তলে সুলতান আলীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন।
এই বিদ্রোহের খবর তুর্কিস্থানের শাসক শৈবানি খাঁর কানে পৌঁছানোর পর তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে এক বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে সমরকন্দ দখলের সিদ্ধান্ত নিলেন।
শৈবানি খাঁ জানতেন যে, সুলতান আলীর মাতৃ জহুরা বেগম বিধবা যদিও যুবতী হয়েই রয়েছেন। কামপীড়িতা বলেও তাঁর দুর্নাম ছিলো। শৈবানি খাঁ তাঁর এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে সমরকন্দ দখল করার কথা ভাবলেন।
ভাবামতেই শৈবানি খাঁ প্রেম নিবেদন করে জহুরা বেগমের নিকট পত্র প্রেরণ করলেন।
পত্র পেয়ে জহুরা বেগমের দেহে কামনার অনল জ্বলে উঠার পাশাপাশি প্রতিহিংসার স্পৃহা দপ্ করে জ্বলে উঠলো। কারণ বেগবৃন্দ তাঁকে ভালবাসত না। তলে তলে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করত। এ কথা জহুরা বেগম অবগত ছিলেন। তবে, তিনি এ বিষয়ে জেনেশুনেও পরিস্থিতির কথা ভেবে সব মুখ বুজে সহ্য করে আসছিলেন।
শৈবানি খাঁর প্রেমপত্র পেয়ে জহুরা বেগম উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন। শৈবানি খাঁর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলে একসাথে তাঁর দু’টি উদ্দেশ্য সফল হবে। প্রথমতঃ তিনি অতৃপ্ত যৌন বাসনা চরিতার্থ করার সুযোগ পাবেন এবং দ্বিতীয়তঃ বিদ্রোহী বেগবৃন্দকে উচিত শিক্ষা দিতে পারবেন। সেজন্য তিনি বিশেষ চিন্তা ভাবনা না করে শৈবানি খাঁকে সমরকন্দ আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।
জহুরা বেগমের নিকট থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে শৈবানি খাঁ সমরকন্দ এসে সহর থেকে কিছুটা দূরে ছাউনি খাটালেন। ছাউনি খাটানোর পর শৈবানি খাঁ সুলতান আলী এবং জহুরা বেগমকে ছাউনিতে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আমন্ত্রণ পেয়ে ছাউনিতে যাওয়ার পর জহুরা বেগম এবং সুলতান আলীকে বন্দি করে শৈবানি খাঁ সমরকন্দের শাসনভার নিজে গ্রহণ করলেন। শাসনভার গ্রহণ করে তিনি জহুরা বেগমকে মনসুর বক্সী নামক একজন বেগের সাথে বিয়ে দিলেন এবং সুলতান আলীকে হত্যা করে সমরকন্দের সিংহাসন কণ্টক মুক্ত করলেন।
শৈবানি খাঁ একজন নিষ্ঠুর প্রকৃতির শাসক ছিলেন। তিনি কূটিল এবং ক্ষমতালোভীও ছিলেন। অঢেল অর্থ-সম্পদ সংগ্রহের জন্য তিনি প্রজাসাধারণকে শোষণ করে অল্পদিনের মধ্যেই সমরকন্দকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিলেন।
শৈবানি খাঁর এই প্রজা উৎপীড়নের কথা এক সময় বাবরের কর্ণগোচর হলো। সমরকন্দের প্রতি তাঁর এক বিশেষ আকর্ষণ ছিলো এবং প্রজাসাধারণও তাঁকে খুব ভালবাসতেন। সেজন্য সমরকন্দের দুর্গতির কথা শুনে তিনি স্থির থাকতে পাড়লেন না। সমরকন্দবাসীকে শৈবানি খাঁর শাসন শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি সসৈন্যে সমরকন্দ অভিমুখে যাত্রা করলেন।
সমগ্র গ্রীষ্মকাল নানান দুর্যোগের মধ্য দিয়ে এসে বাবর শরতের কোনো একটি দ্বিপ্রহরে সমরকন্দ থেকে বিশ মাইল দূরে অবস্থিত জাফরসন নদীর পাড়ে পৌঁছোলেন। শরত কালের জন্য নদীতে তেমন জল ছিল না। সেজন্য তাঁরা হেঁটেই নদী পার হতে সক্ষম হলেন।
নদী পার হয়ে বাবর সেনা অতি দ্রুত অথচ খুব সাবধানে কোন রকমের চিৎকার চেঁচামিচি না করে সিয়াব নদীর দিকে অগ্রসর হলেন।
নদীর অববাহিকা অঞ্চল। উর্বর ভূমি। সেজন্য এখানে সেখানে গড়ে উঠেছিলো ঘন বসতিপূর্ণ অনেক গ্রাম। শৈবানি খাঁ যাতে তাঁদের অভিযানের কথা টের না পায় তারজন্য বাবর সেনা খুব সাবধানে অগ্রসর হলেন। তাঁরা যাতে মানুষের চোখে না পড়ে তারজন্য ঘন বসতিপূর্ণ গ্রামগুলো এড়িয়ে চলতে সচেষ্ট হয়ে সতর্কতার সাথে অগ্রসর হতে লাগলেন। কখনও কখনও ঘন বসতিপূর্ণ গ্রামের মাঝ দিয়ে যেতে হলে অতি সাবধানে কোনো রকমের উচ্ছৃংখলতা প্রদর্শন না করে সাবধানে গ্রামগুলো পেরিয়ে আসতে লাগলেন।
এ সব গ্রামের লোকেরা শৈবানি খাঁর ভয়ে আগে থেকেই সন্ত্রস্ত হয়ে ছিলো। কারণ শৈবানি খাঁর সেনারা আগেই এ সব গ্রাম লুটপাট করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছিলো। সেজন্য আগুনে পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাওয়ার মতো বাবর সেনাকে শৈবানি খাঁর সেনা ভেবে গ্রামের লোকগুলো সন্ত্রস্ত হয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে কিছু দূরে অবস্থান গ্রহণ করে বাবর সেনার গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে লাগলো।
বাবর সেনার একরাতের একটি আচরণ থেকে গ্রামের লোকগুলো উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো যে, এরা শৈবানি খাঁর সেনা নয়, এরাও শৈবানি খাঁর সেনাকে ভয় করে।
সেদিন ছিলো অন্ধকার রাত্রি। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সিয়াব নদী পার হওয়ার সময়ে ঘটেছিলো ঘটনাটি –
নদীর তলভাগ কর্দমাক্ত ছিলো। ফলে নদী পার হওয়ার সময় কিছুসংখ্যক ঘোড়ার ঠ্যাং কাদায় ঢোকে গিয়েছিলো। সেনারা হাসি তামশার মাঝ দিয়ে ঘোড়ার ঠ্যাং কাদা থেকে তুলে আনার সময় নিজেদেরও পা কাদায় ঢোকে গেলো। ফলে হাত-পা-র পাশাপাশি তাঁদের মুখমণ্ডলেও কাদা লেগে তাঁরা কদাকার হয়ে পড়ল।
তাহিরজান নিজেও ছিলো সেই দলে। সে উচ্চকণ্ঠে গালাগাল দিতে লাগলো- শালা, ঢোকে যাওয়ার সময় যেতে পেরেছ, এখন টেনে তোলার সময় উঠতে চাইছিস না কেন?
বাবর অল্পদূরেই ছিলেন। গালাগালের শব্দ তাঁর কানে এসে পৌঁছোল। তিনি ধমকের সুরে বললেন-চিৎকার করছ কেন? সবাইকে বিপদে ফেলতে চাইছ নাকি?
তাহিরজান মিনতিভরা কন্ঠে বললো- ক্ষমা করবেন, জাহাপনা। বদমাশ ঘোড়াটাকে কোনোমতেই কাদা থেকে তুলতে পারছি না।
এমনিতে অন্ধকার রাত, তাতে আবার কুয়াশা পড়ে অন্ধকার অধিক নিবিড় করে তুলছিলো। কয়েক গজ দূরের লোককেও দেখতে অসুবিধা হচ্ছিল। এদিকে দেরি করাও সম্ভব ছিল না। সেজন্য বাবর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- ঘোড়াটা সেখানে রেখেই চল এস। সকালে গ্রামের কোন লোক তুলে নিয়ে যাবে’খন।
কাশিম বেগ বাবরের পাশেই ছিলেন। তিনি বাবরকে সমর্থন করে বললেন- জাহাপনা সময়োচিত সিদ্ধান্তই নিয়েছে। ঘোড়াটা ছেড়ে চলে এস। আমার ঘোড়াটাই আমি তোমাকে দিয়ে দিব’খন।
তাহিরজান ব্যথিত কন্ঠে বললো- রাস্তায় অনেক ঘোড়া এবং উট মরেছে। সৌভাগ্যবশতঃ আমার এই ঘোড়াটা কত দুর্গম রাস্তা নির্বিঘ্নে পাড়ি দিয়ে এসেছে। এখন একে এখানে মরতে ছেড়ে দিয়ে যাব নাকি?
এখন আমাদের মাথার উপরেও মৃত্যু খড়্গ তুলে রয়েছে। বাবর তাহিরজানকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- রাতটা যদি কোনরকমে বেঁচে থাকে, তাহলে সকালে কোন গ্রামবাসী তুলে নিয়ে যেতে পারবে। চল, দুঃখ করো না।
বাবরের পরামর্শ অনুসারে তাহিরজান নিজের ঘোড়ার সাথে আরও দু’টি ঘোড়া ছেড়ে চলে এলো।
এই ঘটনার পরে গ্রামের লোকদের বাবর সেনার প্রতি সঞ্চারিত ভয়ভাব কেটে গেলো। এর পর থেকে এমনকি তারা প্রয়োজনে বাবর সেনাদের সহায় করতেও কুন্ঠাবোধ করত না।
বাবর সেনা ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে সমরকন্দের কাছে এসে পৌঁছোলেন। সমরকন্দের কাছে পৌঁছনোর সাথে সাথে তাঁরা আগের থেকেও অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে লাগলেন। শৈবানি খাঁর সেনারা যাতে তাঁদের এই অভিযানের কথা অগ্রিম টের না পায় তারজন্য তাঁরা অধিক সতর্ক হলেন। কারণ শৈবানি খাঁর সেনারা এই অভিযানের কথা টের পেলে সব প্রচেষ্টা জলে পড়ার সম্ভাবনা ছিলো। এদিকে শৈবানি খাঁর সেনা বাবর সেনার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ছিলো। শৈবানি খাঁর সমগ্র বাহিনী একত্রিত হয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করলে তাঁদের তিষ্ঠে থাকা কঠিন হবে বলে বাবর নিশ্চিত ছিলো।
বাবর আন্দিজান থেকে আসার সময়ে অবশ্যে এত কম সংখ্যক সেনা নিয়ে আসেনি। রাস্তায় আসতে আসতে সৈন্য সংখ্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে বর্তমান মাত্র কয়েক শত সৈন্য অবশিষ্ট রয়েছে। সমগ্র গ্রীষ্মকাল নানান প্রতিকূল অবস্থার মাঝ দিয়ে নানান দুর্যোগ, দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করে আসতে হয়েছে। তিনি আন্দিজান থেকে যাত্রা করে সহরসব্জ থেকে হিসার, হিসার থেকে উদ্গম, উদগম থেকে ফানদরিয়া পার হয়ে আসতে হয়েছে। এই দীর্ঘ কষ্টকর যাত্রাপথে পথশ্রমে পরিশ্রান্ত হয়ে অনেক সেনা হতউদ্যম হয়ে বাবরের সংগ ত্যাগ করে চলে গেছে। সমরকন্দ থেকে যেসকল সেনা তাঁর সাথে গিয়েছিলো তাদের অনেকেই হিসারের বাদশাহ খশ্রুর কাছে চলে গেছে। আন্দিজান থেকে আসা অনেক সেনা যুদ্ধে সফলতার আশা না দেখে বাবরের সংগ ত্যাগ করে ফারগানা বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিয়েছে। যারজন্য সেনা সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে এবং সেনা সংখ্যা হ্রাস পাওয়াতে বাবর অধিক সতর্ক হতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাবর যতই সতর্কতা অবলম্ব করুন না কেন, শৈবানি খাঁ কিন্তু সময়ের খবর সময়েই পেয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি গুপ্তচরদের মুখ থেকে অবগত হয়েছিলেন যে, বাবর সেনা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে বর্তমান মাত্র এক হাজার সেনার কোঠায় এসে পৌঁছেছে এবং তারাও পাহাড়িয়া দুর্গম অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বাবরের এই পরিস্থিতির কথা টের পেয়ে শৈবানি খাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিলো যে, বাবরের মতো বিচক্ষণ একজন যোদ্ধা অল্পসংখ্যক সেনা নিয়ে তাঁর বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনার মতো মূর্খামি কখনও করবে না। হয়তো বাবর আন্দিজান ফিরে যাবে, না হলে তাঁর চাচা আলাসা খাঁর সেখানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করবে।
আলাসা খাঁ ইস্তানিক হ্রদের সেপাড়ে রাজত্ব করেন। চাচার সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করার পর বাবর সমরকন্দ আক্রমণের কথা চিন্তা করবে। কারণ শৈবানি খাঁর সেনা বাবর সেনার চেয়ে দশ গুণ বেশি। সেজন্য এই পরিস্থিতিতে বাবর জলজ উদ্ভিদের মাঝে পোণা মেলে দিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনার মতো কাজ করবে না। শৈবানি খাঁর মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জাগ্রত হওয়াতে তিনি মাত্র পাঁচশ সৈন্য সমরকন্দে রেখে বাকি সেনা নিয়ে সমরকন্দ থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থিত খাজা দিদার নামক স্থানে ছাউনি পেতে বাবরের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিন্তু শৈবানি খাঁর হিসাব ভুল প্রমাণিত হলো। শৈবানি খাঁ অনুমান করা ধরনে বাবরের মনোবল অত ঠুনকো ছিলো না। বাবরের মনোবল ছিলো, বজ্রের মতো কঠিন, ইস্পাতের মতো দৃঢ় এবং আকাশের মতো সুদূরপ্রসারি। তিনি মহৎ বিপদ সংকুল এবং অন্যে ভয় করা কার্য করে নিজেকে একজন অদ্বিতীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লালায়িত ছিলেন। এই মনোভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি জীবন পণ সংগ্রামের সিদ্ধান্ত নিলেন। শৈবানি খাঁর নিকট থেকে তিনি যেকানো মূল্যের বিনিময়ে সমরকন্দ কেড়ে নিবেই এটা ছিলো তাঁর দৃঢ় সংকল্প। এভাবে দৃঢ় এবং জীবন পণ সংকল্প নিয়ে তিনি অতি সন্তর্পণে যুদ্ধের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
সমরকন্দ আক্রমণের সমগ্র পরিকল্পনা এবং আয়োজন সম্পূর্ণ হয়ে উঠার পরেও শৈবানি খাঁর নির্লিপ্ততা দেখে বাবর কিছুদিন নীরব হয়ে রইলেন। বাবরের মনে সন্দেহ ঘণীভূত হয়ে উঠলো যে, শৈবানি খাঁ হয়তো বাবরের এই অভিযানের বিষয়ে সব টের পেয়েও কিছু না জানার ভান করে তাঁকে বেকায়দায় ফেলার জন্য নির্লিপ্ত হয়ে রয়েছে। শৈবানি খাঁ একজন চতুর এবং বিচক্ষণ যোদ্ধা। তিনি হয়তো অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে বাবরকে সহরের ভেতর প্রবেশ করার সুযোগ দিয়ে বাবর সেনা সহরের ভেতর প্রবেশ করার সাথে সাথে সমগ্র শক্তি নিয়ে তাঁদের ওপড় ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করছে! যদি বাবর অনুমান করা ধরনেই শৈবানি খাঁ পরিকল্পনা করেছে, তাহলে সহরের ভেতরে প্রবেশ করলে তাঁর একজন সেনাও প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হবে না। সহরের ভেতরেও বাবর সেনার চেয়ে শৈবানি খাঁর সেনা সংখ্যা অনেক বেশি। সর্বোপরি সুলতান আলীর অনেক সেনা পরিস্থিতির প্যাঁচে পড়ে শৈবানি খাঁর বশ্যতা স্বীকার করে রয়েছে। এদিকে সমগ্র মাউরা উন্নহর থেকে তৈমূর প্রতিষ্ঠিত নতুন রাজবংশ উৎখাত করার জন্য শৈবানি খাঁ সংকল্পবদ্ধ। সেজন্য বাবরকে যদি কোন প্রকারে শৈবানি খাঁর হাতে ধরা দিতে হয়, তাহলে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা কখনও সম্ভব হবে না।
এসব কথা ভেবে বাবর কিছু বিচলিত হয়ে উঠলেন এবং সন্মুখ সমরের পরিকল্পনা ত্যাগ করে রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি আরও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন যে, প্রয়োজন হলে তিনি প্রাণ বিসর্জন দিবেন, কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই শৈবানি খাঁর হাতে ধরা দিবেন না।
সিদ্ধান্ত মতেই একদিন অন্ধকার রাতে বাবর-সেনা নদী-নালা, সোঁতা, জলপূর্ণ খাল পার হয়ে সমরকন্দের দিকে অগ্রসর হলেন। সৌভাগ্যবশতঃ সেদিন রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পরাতে সমগ্র রাস্তা-ঘাট একেবারে জনশূন্য ছিলো। বাবর সেনা নির্বিঘ্নে এসে মগাক পুল পৌঁছোলেন। মগাক পুল থেকে সহর অল্প দূরেই অবস্থিত। দু’দিন আগে মগাক পুল নিরীক্ষণ করার জন্য বাবর দু’জন বিশ্বস্ত সেনা নিয়োগ করেছিলেন এবং দূর্গ দেয়ালে চড়ার জন্য তাদের কয়েকটা মজবুত মৈ তৈয়ার করে রাখার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। সেনারা নির্দেশ অনুসারে তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করে বাবরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
বাবর অপেক্ষারত সেনাদের কাছ থেকে সব কথার বুঝ নিয়ে সেনা বাহিনী দু’টি দলে বিভক্ত করলেন। বাবরের নির্দেশে নুয়ান কুশল দাশের নেতৃত্বে আশীজনের একটি দল মৈ নিয়ে নিশ্চিত বিপদের দিকে এগোতে লাগলেন। অন্য দলটি সন্তর্পণে ফিরোজা দরজার দিকে এগোতে লাগলেন। এই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন স্বয়ং বাবর। ফিরোজা দরজার কাছে এসে তাঁরা গাছ-গাছালির আড়াল নিয়ে মৈ নিয়ে যাওয়া দলটির সংকেতের অপেক্ষায় অধীরভাবে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
নীরব নিস্তব্ধ। চারদিকে যেন বিরাজ করছে বিষণ্ণ ভয়াল কবরের নিস্তব্ধতা। ভয়ঙ্কর ভয়াল অন্ধকার যেন হিংস্র থাবা মেলে সমগ্র সহর গ্রাস করে ফেলেছে। বাবরের নেতৃত্বে আসা দলটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানে গাছ-গাছড়ার ছায়া পড়ে জায়গাটি অধিক ভয়াল করে তুলেছিলো। এক জাক কালো মেঘ দেয়ালের উপরে ভেসে থাকার ফলে দেয়ালটা অস্পষ্টভাবে নজরে পড়ছিলো।
কোন যুদ্ধাভিযানের সময় বাবর সব সময় কাশিম বেগের কাছে অবস্থান নিতেন। সেদিনও বাবর কাশিম বেগের কাছেই অবস্থান নিয়েছিলেন। কাশিম বেগ উত্তেজনায় ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছিলেন। বাবর নিজেও শ্বাসরোধী আতংক উত্তেজনায় নির্বাক নিস্পন্দভাবে অপেক্ষা করছিলেন।
চার মাস আগেও বাবর এ রকম একটি অভিযান চালিয়ে ছিলেন। সেদিনকার রাতের অন্ধকারও এ রকম নিবিড় ছিলো। সেদিন তাঁরা খাজা ইয়াহিয়া দরজার কাছে দূর্গদ্বার খুলে দেওয়ার অপেক্ষায় অপেক্ষা করছিলেন; তবে শত্রু সেনা তাঁদের উপস্থিতির কথা টের পেয়ে অবিরাম তীর বর্ষণ শুরু করেছিলো।
সেদিন বাবরের অনেক সেনা শরাঘাতে আহত হয়েছিলো এবং তাদের যন্ত্রণা কাতর বিকট চিৎকারে রাতের অন্ধকার গুমরে উঠেছিলো। নিজের সৈন্যের যন্ত্রণা কাতর চিৎকার এবং শত্রুসেনার উত্তেজিত গালাগালের মাঝে বাবর সেদিন অভিযান স্থগিত রেখে নিরাশ হয়ে ছাউনিতে ফিরে এসেছিলেন। সেই স্মৃতি আজও সজীব হয়ে আছে বাবরের মানস পটে।
ঠগ, প্রবঞ্চনা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে চোরের মতো লুকিয়ে আক্রমণ, নিজের সেনা এবং শত্রুসেনার মৃত্যু কাতর যন্ত্রণা, জয়-পরাজয়, রাজনীতি তথা সমগ্র মাউরা উন্নহর একসূত্রে গাঁথার চিন্তা-ভাবনা প্রভৃতি নিয়ে বাবরের সমগ্র জীবন পরিপূর্ণ ছিলো। উৎকণ্ঠা- বিপর্যয়. জয়-পরাজয় ছিলো তাঁর নিত্য সহচর।
সেজন্য আগের ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতাই এইবার বাবরকে অধিক সতর্ক হতে বাধ্য করেছে। সেবারের তুলনায় এইবার বাবরের সৈন্যসংখ্যা খুবই অল্প। এবার মাত্র দু’শ চল্লিশ জন সেনা নিয়ে তিনি এই দুঃসাহসী অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। অথচ দেয়ালের সেপ্রান্তে অবস্থান করছে পাঁচশ শত্রুসেনা এবং কিছু দূরেই অবস্থান করছে পাঁচ হাজার সেনা; হয়তো এর থেকেও অধিক হতে পারে!
পূর্বের বারের মতো যাতে এইবারো নিজের সমর্থকবর্গ নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে না হয়, তারজন্য বাবর তাঁর সেনাদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করে সেনারাও নির্বাক নিস্পন্দভাবে মাটির মূর্তির মতো সারি বেঁধে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উত্তেজনা উৎকণ্ঠায় প্রতিজন সেনার সিরা-উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠেছে। বর্শাফলকের মতো দৃঢ় ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে তাঁদের মনোবল। ‘হয় মন্ত্রের সাধন, না হলে শরীর পতন।’ এরকম মনোভাবের জন্য তাঁরা মৃত্যু ভয় জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে জয় কার জন্য অপেক্ষা করছে, এই কথা অনুমান করা খুবই কঠিন। বাবর সেনার, না শৈবানি খাঁর সেনার?
সেনারা বাবরকে এই দুঃসাহসিক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্য বারে বারে অনুরোধ করছিলেন। সমরকন্দ জয়ের আশা ত্যাগ করে আন্দিজান ফিরে যাওয়ার জন্য অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কিন্তু বাবর জানতেন, যোজনা ত্যাগ করে আন্দিজান ফিরে যাওয়ার অর্থ হবে, তনয়ালের হাতের পুতুল হয়ে বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।অৰ্থাৎ তনয়ালের নিকট আত্মসমৰ্পণ। কিন্তু স্বাধীনচেতা বাবর তনয়ালের মতো একজন প্রবঞ্চকের হাতের পুতুল হওয়ার জন্য আত্মসমর্পণ করতে পারেন না। সর্বোপরি অত ঠান্ডার মধ্যে এতো দূর এসে বিনাযুদ্ধে ফিরে যাওয়াটাও সহজ নয়। বাবর অত কাপুরুষও নয়। জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য। এটাই নিয়তির বিধান। নতজানু হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরাও উত্তম। তিনি যুদ্ধ করে মরবেন, নতজানু হয়ে বেঁচে থাকবেন না। বাঘের মতো শৈবানি খাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি বিজয় সুনিশ্চিত করবেন। এটাই বর্তমান তাঁর জীবনপণ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
বাবর বাঘের মতোই ঝাঁপিয়ে পড়বে শৈবানি খার উপরে। বাঘ শিকারির জাল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে শিকারের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে জানে। বাবরও সেটাই করবে। শৈবানি খাঁর জাল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়বেন শৈবানি খাঁর সেনার উপরে। এভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পর বাবরের মনোবল অনেক গুণে বেড়ে গেলো।
বাবর উৎকর্ণ হয়ে সংকেতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
রাত্রি। ভয়াল অন্ধকার। সীমাহীন নিস্তব্ধতা। প্রেতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সমরকন্দ সহর। একমাত্র ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দের বাইরে অন্য কোনো সাড়াশব্দ নেই কোথাও। চতুর্দিকে বিরাজ করছে ভয়াল নিস্তব্ধতা।
বাবরের হৃদপিন্ড জোরে জোরে ঢপঢপ করতে লাগলো। তাঁর অনুমান হলো, বুকের ঢপঢপ শব্দ যেন তাঁর ভাগ্য নামক অশ্বের ক্ষুরার শব্দ।
* * *
নুয়ান কুশল দাশের নেতৃত্বে আসা আশী জনের দলটি পুরানা সফরদীজ কবরগাহ পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত একফালি জায়গার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। সময় পার হওয়ার সাথে সাথে তাদের মাথার বোজা ভারি হয়ে আসছিলো। ফলে বোজার ভারে তারা অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলো।
তবুও সন্তর্পণে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে তারা এগোতে লাগলো। হঠাৎ তারা একটি নিচু খাল পার হয়ে যেতে হলো। খালের তলদেশ উঁচুনিচু ছিলো। সেজন্য তারা হাঁটতে অস্বস্তিবোধ করছিলো।
তাহিরজান হঠাৎ হোঁচট খেয়ে বড়বড় করতে লাগলো। তার এদিক দিয়ে আসার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। সাথী কয়জনের জন্য এদিক দিয়ে আসতে হয়েছে। গন্তব্যস্থানে যাওয়ার জন্য অন্য একটি সূচল এবং সংক্ষিপ্ত রাস্তা ছিলো। তবে সেই রাস্তায় একটি গুহা ছিলো। গুহাটায় পূর্বে রাজদ্রোহে অভিযুক্ত দোষীদের জীবন্তে কবর দেওয়া হত। সেই সব অতৃপ্ত আত্মা সেখানে বিচরণ করে বলে জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। রাতের বেলা সেখানে কেউ গেলে সেই আত্মারা তাদের জীবন্তে ফিরে আসতে দেয় না বলে অন্ধবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। সেজন্য সেখানে রাতের বেলা লোক যাওয়া তো দূরের কথা, দিনের বেলাতেও লোক যেতে ভয় করে। সাথী কয়জন সেই অন্ধবিশ্বাসের শিকার হয়েই সেখান দিয়ে আসতে চায়নি। সেজন্যই এই উঁচুনিচু রাস্তা দিয়ে আসতে হয়েছে।
তারা এক সময়ে এসে গন্তব্যস্থানে পৌঁছাল। গন্তব্যস্থানে এসে তারা দূর্গের দেয়ালের দিকে তাকালেন। পরিখার তলদেশ থেকে দূর্গের দেয়াল প্রেতের মতো অনুমান হতে লাগলো তাদের মনে। তবুও তারা সাহস সঞ্চয় করে পরিখার ঢালু পাড় বেয়ে উপরের দিকে উঠে আসতে লাগলো। পরিখার ঢাল কাঁটাযুক্ত লতা-গুল্ম দিয়ে আবৃত ছিলো। অশেষ কষ্টে তারা সেই কাঁটাযুক্ত ঢাল বেয়ে পরিখার উপরে উঠে এলো।
সৈন্যদের কাপড় ঘামে ভিজে চপচপে হয়ে উঠেছিলো। মৈ নিয়ে ঢাল বেয়ে উঠে আসার জন্য তারা পরিশ্রান্তও অনুভব করছিলো। পরিশ্রমের ক্লান্তির পাশাপাশি বিপদের আশংকায়ও তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি দ্রুততর হয়ে উঠছিলো। দূর্গের দেয়াল পরিখার পাড়েই অবস্থিত ছিলো। সেজন্য ঢাল বেয়ে উপরে উঠে আসার পর তারা মৈগুলো মাথা থেকে নামিয়ে দেয়ালের পাশে রাখলো। নুয়ান কুশল দাশ সৈন্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো। সে পথশ্রমে ক্লান্ত সৈন্যদের কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দিলো। বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগে সে দেয়ালের উচ্চতা নিরীক্ষণ করতে লাগলো।
পাথর এবং ইঁট দিয়ে নির্মিত দেয়ালের উচ্চতা প্রায় একটি উঁচু বৃক্ষের সমান। দেয়ালের উচ্চতা দেখে দূর্গের বিষয়ে জ্ঞান না থাকা কয়েকজন সেনা ভয়বিত হয়ে উঠলো। কিন্তু দূর্গের দেয়ালের বিষয়ে নুয়ান কুশল দাশ ভালভাবে অবগত ছিলো। সে সেনাদের আশ্বাস দিয়ে বললো- ভয়ের কোনো কারণ নেই। দেয়াল যত ভয়ঙ্কর দেখা যাচ্ছে, আসলে তত ভয়ঙ্কর নয়। দেয়ালের উপরের ভাগ খুবই প্রশস্ত। দু’জন লোক স্বচ্ছন্দে চলাচল করার উপযোগী।
আশীজন সেনা মুরগির বাচ্চার মতো জড়সড় হয়ে একজনের গা আরেকজনের সাথে লাগিয়ে নিঃশব্দে বসেছিলো। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দের বাইরে অন্য কোন রকমের শব্দ ছিল না জায়গাটিতে। নৈঃশব্দের পটভূমিতে যেন কবরের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিলো চারদিকে।
নুয়ান কুশল দাশ চতুর্দিকে সতর্ক দৃষ্টি প্রসারিত করে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পদে দেয়ালের পাশে এসে দেয়ালের গাত্রে কান লাগিয়ে দেয়ালের সেপ্রান্তের বুজ নেওয়ার জন্য সচেষ্ট হলো।
দেয়ালের সেপ্রান্তে কি হচ্ছে বর্তমান? শত্রুর আকস্মিক আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কত সৈন্য নিয়োজিত হয়ে রয়েছে দেয়ালের সেপ্রান্তে? দেয়ালে কান লাগিয়ে সে এইসব কথার বুঝ নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালালো নুয়ান কুশল দাশ।
নুয়ানের অনুমান হলো, দেয়ালের সেপ্রান্ত নীরব নিস্তব্ধ। জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই কোথাও। রাতে পহরার দায়িত্বে নিযোজিত সৈন্যরা সম্ভবত প্রচণ্ড শীতের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিজের নিজের আশ্রয়স্থলে আশ্রয় নিয়ে সুখ নিদ্রায় বিভোর হয়ে রয়েছে। সে ভাবলো, সে অনুমান করার মতোই যদি সেপ্রান্তের অবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে অভিযান শুরু করার জন্য এটাই সুবর্ণ সুযোগ।
নুয়ান সাথীদের উদ্দেশ্যে আদেশের সুরে বললো- মৈগুলো স্থাপন করে মৈ বেয়ে উপরে উঠে যাও। কারণ অভিযান শুরু করার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।
নুয়ানের আদেশ পেয়ে সেনাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ভাব ফুটে উঠলো। তারা হতাশভাবে উপরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলো। তাদের মনে মৃত্যুর মতোই ভয়ঙ্কর অনুমান হলো দেয়ালের উচ্চতা। দেয়ালের উচ্চতা ত্রিশ হাতের চেয়েও বেশি। কোন কারণবশতঃ হঠাৎ পড়ে গেলে হাড়-মাংস একাকার হয়ে যাবে। পহরায় নিয়োজিত সেনারা টের পেয়ে মৈ ঠেলে দিলে তো কথাই নেই! সর্বোপরি প্রচণ্ড শীতের প্রকোপে হাত-পা-র সিরা উপসিরাগুলো অস্বাভাবিকভাবে টনটন করছিলো। এই অবস্থায় মৈ বেয়ে উপরে উঠে যাওয়াও প্রায় অসাধ্য কাজ ছিলো। সেজন্য সেনারা হতাশার শিকার হয়ে নুয়ানের আদেশ শুনেও না শুনার ভান করে মাটির মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সেনাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে নুয়ান নিজেই মৈর কাছে এগিয়ে এলো। সে দেয়ালে মৈ স্থাপন করে প্রথম ধাপে পা দিয়েই সেনাদের উদ্দেশ্য করে উপদেশের সুরে বললো- জন্মিলে মৃত্যু নিশ্চিত। একদিন তো মরতেই হবে, আজই মরে যাই না কেন? আমি আগে উঠছি, তোমরা আমার পেছনে পেছনে উঠে এস। এভাবে বলেই কুশল দাশ বই বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।
নুয়ানের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্য একটি মৈ স্থাপন করে তাহিরজানও প্রায় নুয়ানের সমানে সমানে উপরে উঠতে লাগলো।
মৈগুলো কয়েকজন একসাথে উঠার মতো মজবুত ছিলো। নুয়ান এবং তাহিরজানকে উপরে উঠে যেতে দেখে বাকি সেনারাও মৈ বেয়ে তাদের পেছনে পেছনে উপরে উঠতে লাগলো।
নুয়ান সবার আগে দেয়ালের উপরে উঠলো। সে সতর্ক দৃষ্টি প্রসারিত করে দূর্গের অভ্যন্তরে তাকাল। সন্দেহজনক কোনো দৃশ্য পড়ল না তার চোখে। জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই রাস্তায়। দেয়ালের উপরেও কোনো জনপ্রাণী চোখে পড়ল না। দেয়ালের উপর ভাগ বেশ প্রশস্ত। একজন অশ্বারোহী অনায়াসে ঘোড়া ছুটিয়ে যাওয়ার মতো প্রশস্ত।
তাহিরজানও ইতিমধ্যে দেয়ালের উপর ভাগে পৌঁছেছিলো। সে তার পাশে অবস্থানরত সেনাটির কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো- কুড়োল কোথায়? তোমার কাছে আছে নাকি?
সেনাটি মুখে কিছু বলল না। সে কুড়োল কোমরে বেঁধে এনেছিলো। কোমর থেকে কুড়োল খুলে সে তাহিরজানের দিকে এগিয়ে দিলো।
সবাই দেয়ালের উপরে উঠে আসার পর দূর্গ শিখর থেকে নিচে নামার জন্য মৈ খুঁজতে লাগলো। নিচে নামার জন্য দেয়ালের অভ্যন্তর ভাগে মৈ স্থাপন করাই ছিলো। সেজন্য তাদের মৈ খুঁজে পেতে অসুবধিা হলো না। কিছুদূর আসার পরেই তারা মৈ পেয়ে গেলো। নুয়ান এবং তাহিরজান সবার আগে নিচে নেমে এলো। তাদের পেছন পেছন অন্য সেনারাও নেমে এলো নিচে।
দূর্গের অভ্যন্তরে নামার পরে সবাই সষ্টম হয়ে উঠলো। মৃত্যু ভয় পর্যন্ত ভুলে গেলো তারা। দ্রুত অথচ অতি সন্তর্পণে তারা ফিরোজা দরজার গিকে অগ্রসর হতে লাগলো।
দূর্গের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট দূরত্বের ব্যবধানে পহরা চকী। তারা সেরকম একটি পহরা চকীর নিকটে আসার সাথে সাথে শৈবানি খাঁর কোনো একজন সেনা ঘুম জড়িত কণ্ঠে বললো- এই এরিস্থায়, তুই কোথায় মরতে গিয়েছিস? তোর অপেক্ষায় বসে বসে বিরক্ত হয়ে আমরা লেগে পড়েছি। তারাতারি আয়।
নুয়ান উদ্বিগ্নভাবে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে সবার আগে আগে যাচ্ছিল। তাকে দাঁড়িয়ে পড়া দেখে বাকিরাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উত্তেজনায় সবার রক্তের গতি খরস্রোতা নদীর স্রোতের মতো উত্তাল হয়ে উঠলো। উত্তেজনায় সবার বুক দুরু দুরু করে কাঁপতে লাগলো। মুহূর্তের ভেতরে নুয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে হাতের মুঠোয় ধরে থাকা কুড়োল শক্ত করে ধরে বললো- এখানেই আছি। আসতেছি, দাঁড়া।
কে তুমি? পহরা চকীর ভেতর থেকে সন্ধিগ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
নুয়ান প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হাতের মুঠোয় কুড়োল শক্ত করে ধরে স্বচ্ছন্দ অথচ দ্রুত গতিতে চকীর দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা ঠেলে সে ভেতরে প্রবেশ করে একজন সেনাকে অসংলগ্ন অবস্থায় বসে বসে ঘুমিয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করলো। ক্ষণকাল বিলম্ব না করে সে সেনাটির মাথা লক্ষ্য করে কুড়োল চালালো। বিকট চিৎকার করে সেনাটি রক্তে রঞ্জিত হয়ে মেঝেতে ঢলে পড়লো। নুয়ানের কাপড়েও সেই উষ্ম রক্তের ছিটা লাগলো। সাথে সাথে নুয়ান ক্ষিপ্র গতিতে চকী থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো।
বাইরে বেরিয়ে এসেই নুয়ান উত্তেজিত কন্ঠে বললো- তাহিরজান, তুমি ফিরোজা দরজার দিকে যাও।
তাহিরকে এভাবে আদেশ দিয়েই দশজন সেনা নিয়ে নুয়ান অন্য একটি চকীর দিকে অগ্রসর হলো।
বাকি সেনাদের পেছনে পেছনে আসতে নির্দেশ দিয়ে তাহিরজান চোখের পলকে ফিরোজা দরজার কাছে এলো।
ফিরোজা দরজার পহরার দায়িত্বে ছিলো ফাজিল তর খাঁ নামক একজন বেগ। তার অধীনে ডেরশ সেনা ছিলো। প্রায় সবগুলো সেনা নিজের দায়িত্বের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে নিজের নিজের কোঠায় নিশ্চিত মনে শোয়ে ছিলো। মাত্র বিশজন সেনা পহরায় নিয়োজিত ছিলো। পহরার দায়িত্বে অবস্থানরত সেনা কয়জনও অলসভাবে বসে বসে ঝিমুচ্ছিলো। তাহিরজানকে দেখে তাদের মাত্র একজন সেনা তরবারি তুলে নিতে সক্ষম হলো। কিন্তু সে আঘাত করার আগেই তাহিরজান তাকে যমপুরী পাঠিয়ে দিলো।
তাহিরজান অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় নিজের দায়িত্ব পালন করে যেতে লাগলো। সেনাটিকে হত্যা করেই সে দূর্গের দরজার দিকে অগ্রসর এলো। দরজায় ঘোড়ার মাথার আকৃতির একটি প্রকাণ্ড তালা ঝুলছিলো। দুহাতে কুড়োল ধরে দেহের সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে সে তালার উপরে আঘাত করলো। কিন্তু প্রথম আঘাতে তালাটার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলো না। শুধু তালা এবং কুড়োলের সংঘর্ষে সৃষ্ট ধাতব শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। পরের পর্যায়ে তাহিরজান পাগলের মতো তালার উপরে উপর্যুপরি আঘাত করতে লাগলো।
নিহত সেনাটির আর্তচিৎকার এবং তালার উপরে করা উপর্যুপরি আঘাতের ধাতব শব্দ শুনে দরজা থেকে কিছু দূরে পহরারত সেনাগুলো সচকিত হয়ে উঠলো।
ফাজিল তর খাঁ পহরারত সেনাদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো। ধাতব শব্দে অশুভ বার্তার ইংগিত পেয়ে সে মশাল এবং কয়েকজন সেনা নিয়ে দরজার দিকে দৌড়ে এলো। সবার আগে আগে আসা দু’জন সেনা তাহিরকে কুড়োল চালাতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের দু’জনের একজন ক্ষিপ্রহাতে শরধনু বের করে তাহিরকে লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলো। অল্পের জন্য শর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। শরটি তাহিরের মাথার উপর দিয়ে সনসন শব্দ করে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে লোহার শেকলে আঘাত করে ছিটকে এলো।
সেনা দু’জন পুনরায় শর নিক্ষেপ করার আগেই তাহিরজানের সাথে আসা সেনারা তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাদের যমালয় পাঠিয়ে দিলো। এমন সময় তর খাঁর নেতৃত্বে আসা বাকি সেনা সেখানে এসে উপস্থিত হলো। ফলে উভয় দলের মাঝে দরজার কাছে খণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। খঞ্জর, বর্শা প্রভৃতি অবিরামভাবে চলতে লাগলো। মরন্মুখ সেনার আর্তনাদে জায়গাটা কোলাহল মুখর হয়ে উঠলো।
ইতিমধ্যে নুয়ানও সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। সে অসীম বিক্রমে যুদ্ধ করে তরবারির আঘাতে শত্রু সেনা ধারাসায়ী করতে লাগলো। শত্রুসেনার দলপতি তর খাঁও তার তরবারির আঘাতে নিহত হলো।
এদিকে তাহিরজান তালা ভাঙার জন্য উন্মত্তের মতো উপর্যুপরি কুড়োল চালিয়ে যাচ্ছিলো। তার কুড়োলের প্রহার কখনও তালায় এবং কখনও দরজার তক্তায়, কখনও আবার লোহার শেকলে লাগছিলো। কুড়োলের প্রহারে তালা খুলছিলো না যদিও প্রতিটা প্রহারে দরজার কিছু না কিছু ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল। ফলে কুড়োলের উপর্যুপরি প্রহার সহ্য করতে না পেরে এক সময় সম্পূর্ণ দরজাটা খুলে ধড়াস করে পরিখার উপরে পড়ে গেলো। বড় প্রশস্ত দরজাটা পরিখার উপরে পড়ে গিয়ে পুলের মতো সৃষ্টি হলো।
বাবর এবং কাশিম বেগ সসৈন্যে পরিখার সেপাড়ে অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলেন। দরজা ভেঙে পড়ার সাথে সাথে তাঁরা ঝাঁপ মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে তরবারি কোষমুক্ত করে দরজা সৃষ্ট পুল দিয়ে পরিখা পার হয়ে বিজুলি সঞ্চারে সসৈন্যে দূর্গের ভেতর প্রবেশ করলেন।
ইতিমধ্যে ফাজিল তর খাঁর দলের মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন সেনা জীবিত ছিলো। বাকি সেনারা হয়তো নিহত হয়েছিলো, নয়তো আহত হয়ে মৃত্যুর জন্য ক্ষণ গণছিলো। অবশিষ্ট জীবিত সেনারা নুয়ানের দলে অল্প কয়েকজন সেনা দেখে উজ্জীবিত হয়ে তাদের দলের অন্য সেনাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠার জন্য সময় দিতে প্রাণপণে যুদ্ধ করছিলো। কিন্তু বাবরের নেতৃত্বে একশ ষাটজন অশ্বারোহী বন্যার জলের মতো একসাথে দূর্গের ভেতর প্রবেশ করতে দেখে তারা ফরিঙের মতো ছিটকে পালাতে লাগলো। কাশিম বেগ কয়েকজন সেনা নিয়ে পলায়নরত সেনাদের পেছনে পেছনে ধাওয়া করলেন।
পরের ঘটনাগুলো অতি ক্ষিপ্রভাবে সংঘটিত হতে লাগলো।
দূর্গের দরজা চারটে। প্রত্যেকটা দরজা রাতের অন্ধকারে দখল করা প্রয়োজন বলে বাবর উপলব্ধি করলেন। কারণ অভিযানের সংবাদ পেয়ে শৈবানি খাঁ যেকোনো মুহূর্তে সমরকন্দ আসতে পারে! শৈবানি খাঁ আসার আগেই প্রত্যেকটা দরজা নিজেদের দখলে আনতে না পারলে সাপ মেরে নেগুরে বিষ রাখার মতো কথা হবে। শৈবানি খার বিশাল সেনাবাহিনী যদি যেকোনো একটি দরজা দিয়ে সহরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়, তাহলে জয়ের আশা সমুলঞ্চে নাশ হবে এবং তখন জীবন নিয়েও সংশয়ে দেখা দিবে। বাবর এসব কথা চিন্তা করে নিজের সেনাদল চারটে দলে বিভক্ত করে প্রত্যেক দলকে একটা করে দরজা দখলের দায়িত্ব দিলেন।
দায়িত্ব অনুসারে নুয়ান দলবল নিয়ে গিয়ে ‘চারবাহা’ দরজায় আক্রমণ চালালো। বাবর নিজে কয়েকজন সেনা নিয়ে ‘সুজন গরাণ’ দরজার পহরায় অবস্থানরত সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কাশিম বেগ গেলেন ‘শেখজাদা’ দরজার দিকে এবং তাহিরজান থাকলো ফিরোজা দরজার সুরক্ষার দায়িত্বে।
সেনাদের দৌড়াদৌড়ি এবং চিৎকারে সমগ্র সহর ঘুমের জড়তা ভেঙে জেগে উঠলো এবং সমগ্র সহরে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়লো। প্রকৃত ঘটনার খোঁজখবর না পেয়ে নৌকা ডুবা নাবিকের মতো আতংকগ্রস্ত হয়ে জনতা দিশেহারা হয়ে পড়লো। সহরে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচণ্ড কিছু একটা সংঘটিত হওয়ার কথা শুধু উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো তারা।
শেখজাদা দরজা থেকে অল্প দূরেই খাজা ইয়াহিয়ার প্রাসাদ। শৈবানি খাঁ সহর দখল করার সময়ে সহর দারোগা জানবফাই খাজা ইয়াহিয়ার কাছ থেকে প্রাসাদটা কেড়ে নিয়েছিলো। প্রাসাদের জাঁকজমকপূর্ণ কক্ষ একটিতে সে গভীর নিদ্রায় মগ্ন ছিলো। দৌড়াদৌড়ি এবং চিৎকারের শব্দে সে ঘুম থেকে জেগে উঠলো। কিন্তু হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠার জন্য সে ঘটনার কোনো শুংসূত্র পেল না। ঘটনার বুঝ নেওয়ার জন্য সে বিরক্ত ও উৎকণ্ঠিতভাবে দৌড়ে কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে বেরিয়েই সে প্রত্যক্ষ করলো, তাড়া খাওয়া শিয়ালের মতো দৌড়ে পালানো একদল সেনার পেছনে পেছনে শিকারি কুকুরের মতো একদল অশ্বারোহী ধাওয়া করে যাচ্ছে। কে মিত্র, কে শত্রু, সেকথা উপলব্ধি করাটা কঠিন হয়ে পড়লো তার পক্ষে। সবাই চিল্লাচিল্লি ও দৌড়াদৌড়ি করছে। প্রাণপণে দৌড়ে পলায়নরত সেনারা তাদের পেছনে পেছনে ধাওয়া করে আসা সেনাদের পার্যমানে গালাগাল দিচ্ছে। ফলে চারদিকে এক আতংকময় বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বুঝ নিতে জানবফাই তৎক্ষণাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে শেখজাদা দরজার দিকে অগ্রসর হলো। শেখজাদা দরজার কাছে তখনও বাবর এসে পৌঁছোতে পারেন নি। তবে চারদিকে বিশৃংখল পরিবেশ লক্ষ্য করে জানবফার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠলো। সে ভাবলো, নিশ্চয় কোনো শত্রুসেনা সহর আক্রমণ করেছে এবং সেই আক্রমণকারী বাবরের বাইরে অন্য কেউ নয়! সহরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলেও তার উপলব্ধি হলো। সেজন্য ‘চ জীবতি, স্ব পালয়তি’ নীতি অনুসারে সে সহর ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোড়া ছুটালো।
দরজার কাছে এসে ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একশত জন সেনা প্রত্যক্ষ করলো জানবফাই। সেনাদের সে তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে দিতে নির্দেশ দিলো। নির্দেশ পেয়ে একজন সেনা দরজা খুলে দিলো। দরজা খোলার সাথে সাথে সে কয়েকজন সেনা সাথে নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে শৈবানি খাঁর ছাউনি অভিমুখে অগ্রসর হলো।
সহরের বাসিন্দারা গণ্ডগোলের অশুভ শব্দে আতংকিত হয়ে জেগে উঠেছিলো। তবে তারা ঘটনার বুঝ নিতে কেউ বাইরে বের হয়নি। সবাই ভয়ে কাছিমের মতো হাত-পা গুটিয়ে সূর্যোদয়ের জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলো। ভয়ে তারা আলো পর্যন্ত জ্বালায়নি। সহরে প্রকৃতার্থে কী ঘটছে, সরারাত তারা সে বিষয়ে কোনো সংবাদও অবগত হয়নি। মানুষগুলো ভাগ্যের উপর নির্ভর করে উৎকণ্ঠা এবং হতাশায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত পঙ্গুর মতো রাত কাটিয়ে দিলো।
সকাল বেলা কিছু কিছু সাহসী লোক রাস্তায় বের হয়ে এলো। সাধারণ জনতা দরজা খুলে বাইরের দিকে লক্ষ্য করতে লাগলো। তারা লক্ষ্য করলো, একদল সেনা ঢোল পিটিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘোষণা করতেছে- সাধারণ নাগরিকের কোনো ভয় নেই। বাবর সেনা শৈবানি খাঁর সেনাদের পরাজয় করে সহর দখল করেছেন। এখন থেকে সমরকন্দ বাবরের দখলে। জনতা এখন নির্ভয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে।
সকাল হওয়ার সাথে সাথে বাবরের এই বিজয় বার্তা বনের আগুনের মতো সমগ্র সহরে ছড়িয়ে পড়লো। শৈবানি খাঁর পরাজয়ের ফলে সাধারণত জনতা উল্লসিত হয়ে উঠলো।
কারণ শৈবানি খাঁর নিষ্ঠুর আচরণের জন্য সহরের অধিক সংখ্যক লোক তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলো। নির্মম অত্যাচার এবং শাসন-শোষণের ফলে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিলো জনতা। শৈবানি খাঁর সেনারা অনেক শিল্পী, কারিগর এবং সভ্রান্ত লোকের ঘর-বাড়ি লুটপাট করে সর্বস্বান্ত করেছিলো। কৃষকের কষ্টোপার্জিত ক্ষেত-খোলাও বিজয়োমত্ত সেনারা রেহাই দেয়নি। বিজয়ী সেনাদের ঘোড়াগুলো ক্ষেতের শস্য খেয়ে ক্ষেত-খোলাগুলো পদপিষ্ট করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলো। খাজা ইয়াহিয়ার মতো সমরকন্দের একজন গণ্যমান্য লোককে তাঁর দু’টি পুত্রসহ পাহাড়ের উপরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। এক কথায় বলতে গেলে, শৈবানি খাঁ সহরটায় এক শ্বাসরোধী আতংকময় পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছিলো।
ফলে শৈবানি খাঁর শাসন সমাপ্ত হওয়ার আনন্দে সহর মুখর হয়ে উঠলো। বাবরের বিজয় ঘোষণা করে জনতা রাজপথে বেরিয়ে এলো।
সহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি, ভূতপূর্ব শাসক সুলতান আলীর সমর্থক বেগবর্গ বাবরকে উষ্ম অভ্যর্থনা জানালেন। খাজা ইয়াহিয়ার সমর্থক, কৃষক, কারিগর, শিল্পীবর্গ কালো পতাকার নিচে সমবেত হয়ে সহরের প্রধান প্রধান রাস্তায় শোভাযাত্রা বের করলেন।
শৈবানি খাঁর সেনার অত্যাচার, উৎপীড়ন, শাসন-শোষণে জর্জরিত জনতার অন্তরে উল্লাসের সাথে প্রতিশোধের স্পৃহা জেগে উঠলো। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাঁরা উন্মত্ত হয়ে উঠলো। বাবরের দুশ চল্লিশ জন সেনার সাথে মিলে শত শত উন্মত্ত জনতা শৈবানি খাঁর সেনাদের অলিয়ে-গলিয়ে খোঁজে বেরাতে লাগলো।
সে ছিলো এক অত্যন্ত ভয়াবহ লোমহর্ষক দৃশ্য। শৈবানি খাঁর পলায়নরত সেনাদের পালানো স্থান থেকে বের করে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় এনে ভেড়া-ছাগলের মতো নির্বিচারে হত্যা করতে লাগলো। কয়েকজনকে পলায়নরত অবস্থায় ধরে ছুরি, দা, লাঠি এবং পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করলো। নির্মমভাবে সংঘটিত হতে লাগলো হত্যার পর হত্যা। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠলো। মরণোন্মুখ সেনার আর্তনাদে আকাশ-বাতাস কম্পিত হয়ে উঠলো। এভাবে প্রায় দুপর পর্যন্ত চললো এই সেনা নিধন যজ্ঞ।
এদিকে জানবফার কাছ থেকে বাবরের সমরকন্দ বিজয়ের সংবাদ পেয়ে শৈবানি খাঁ সমগ্র বাহিনী নিয়ে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে এসে সমরকন্দে উপস্থিত হলো। কিন্তু তাঁরা সরাসরি বাবর সেনাদের আক্রমণ না করে তাঁবু খাড়া করতে লাগলো।
শৈবানি খাঁর সেনা দেখে বাবর দূর্গ রক্ষার সুব্যবস্থা করলেন। পরিখার উপরে পুলের মতো পড়ে থাকা ফিরোজা দরজার ফটক তুলে এনে মেরামত করে পুনরায় মজবুতভাবে স্থাপন করলেন। বাকিগুলো দূর্গ ফটকও বন্ধ করে দিলেন। আসন্ন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কটকটে পহরার ব্যবস্থাও করলেন ফটকগুলোতে।
কিন্তু শৈবানি খাঁ চিল হয়ে উড়ে এসে কয়েকদিন ছাউনি পেতে থেকে আক্রমণ না করেই ফেঁচা হয়ে ফিরে গেলেন। শৈবানি খাঁ চলে যাওয়ার পর বাবর সেনার পাশাপাশি সমরকন্দের জনতা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।
কয়েকদিনের ভেতরেই সমরকন্দে আবার স্বাভাবিক জীবন শুরু হলো। ভয়-শংকা-আতংকের পরিবর্তে জনতার অন্তরে আবার আনন্দময় উল্লসিত জীবনের উল্লাস জেগে উঠলো।
* * *
সমরকন্দ বিজয়ের কয়েকদিন পরের কথা।
সেদিন সকালের প্রচণ্ড ঠাণ্ডার শেষে সোনালী রোদের মিঠে পরশ পেয়ে সমগ্র সমরকন্দ সহর ঝলমল করে উঠেছিলো।
দালানের ছাদ, মাটির কাঁচা বেড়া, গাছ-লতা এবং দালানের উঁচু উঁচু গম্বুজসমূহে বরফের আচ্ছাদন তখনও সাদা চাদরের মতো ঝলমল করছিলো যদিও কর্মের হাত ইশারায় সমগ্র সহর এক সময় কোলাহল মুখর হয়ে উঠলো।
বাবব অভিভূতের মতো বোস্তান-ই-সরাই(রাজপ্রাসাদ)র ছাদের উপরে উঠে এলেন। ছাদ থেকে তিনি বরফাবৃত সহরের সৌন্দর্যসম্ভার উপভোগ করতে লাগলেন। বরফের মাঝে মাঝে বেরিয়ে থাকা গাছ-বিরিখের শাখা-প্রশাখার দিকে তাকিয়ে তাঁর আরবি বর্ণমালার স্বরচিহ্নের কথা মনে পড়ে গেলো। আরবি বর্ণমালার কথা মনে পড়ার সাথে সাথে আলীশের নবাই তাঁকে লিখা একটি পত্রের কথা মনে পড়ে গেলো। আলীশের নবাইর প্রশংসাসূচক পত্র। সেটা ছিলো তাঁর জন্য এক বিরল প্রাপ্তি।
পত্রের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে গর্ব এবং প্রসন্নতায় বাবরের বুক ফুলে উঠলো। বাবরের নিজেকে বিখ্যাত ও মহৎ ব্যক্তির মতো ধারণা হতে লাগলো। ফলে আলীশের নবাইর মতো একজন বিখ্যাত কবি হওয়ার উজ্জ্বল অনুভূতি জেগে উঠলো তাঁর হৃদয়ে।
বাবর দ্রুত নিচে নেমে এসে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলেন। কাগজ-কলম হাতে নিয়ে তিনি ভাবনায় বিভোর হয়ে পড়লেন। ভাবনার তাঁরে দু’টি মাত্র কলি ঝংকারিত হতেই পরিচারক একজন প্রবেশ করে তাঁর ভাবনার ছন্দ পতন করলেন।
পরিচারকটি বুকে দু’হাত স্থাপন করে ক্ষমা প্ৰাৰ্থনার ভঙ্গীতে বললো- জাহাপনা, ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন।
বাবর বিরক্তিতে ভ্রূযুগল কুঞ্চিত করে বললেন- কী হলো?
আপনার মাতৃ সাহেবা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন, জাহাপনা।
সত্যি! বাবর লাফ মেরে দাঁড়িয়ে বললেন- সত্যিই এসেছে নাকি?
হ্যাঁ জাহাপনা, আপনার ভগ্নী সাহেবাও এসেছেন।
মাতৃ এবং ভগ্নী আসার কথা শুনে বাবরের মুখমন্ডল আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি উৎসাহিত কণ্ঠে বললেন- খুব ভালো হয়েছে। এভাবে বলেই তিনি কাগজ-কলম সরিয়ে রাখলেন।
প্রায় ছয় মাস যাবত বাবরের মাতৃ এবং ভগ্নীর সাথে দেখা সাক্ষাৎ নেই। সমরকন্দের শান্তি সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যস্ত থাকায় অনেকদিন তিনি মাতৃ ও ভগ্নীর খোঁজ খবর নিতে পারেন নি। সমরকন্দে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি হওয়ার পর তাঁর সর্বদা মাতৃ ও ভগ্নীর কথা মনে পড়ছিলেন। তাঁরা কয়েকদিন ধরে নেপাতোলায় রয়েছেন। সেজন্য তিনি মাতৃ-ভগ্নীকে সমরকন্দে আনার জন্য কয়েকদিন আগে কয়েকজন বিশ্বস্ত সেনা নেপাতোলায় পাঠিয়ে ছিলেন। তারাই অল্প আগে মাতৃ-ভগ্নী, মাসি এবং আয়েশা বেগমকে নিয়ে সমরকন্দ ফিরে এসেছে।
বাবর বেঙের মতো লাফ মেরে মেরে সিঁড়ি ভেঙ্গে প্রথম মহলায় নেমে এলেন। প্রথম মহলা মহিলাদের জন্য নির্ধারিত ছিলো। কক্ষে প্রবেশ করেই তিনি মাতৃ-ভগ্নী, মাসি এবং আয়েশা বেগমকে দেখে উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন।
বাবর মাতৃ-ভগ্নী এবং মাসির সাথে ভাব বিনিময় করে অল্প দূরে অবস্থানরত আয়েশা বেগমের নিকটে এলেন। সমরকন্দে আসার সময়ে তিনি আয়েশা বেগমকে সাথে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আয়েশা বেগম তাঁর সাথে আসতে অমান্তি হওয়ায় তিনি তাঁকে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে অনেকদিন পরে আয়েশা বেগমকে দেখে তিনি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন। উজ্জীবিত কণ্ঠে তিনি আয়েশা বেগমকে স্বাগতম জানালেন- উষ্ম সম্বর্ধনা, বেগম।
আয়েশা বেগম তাঁর শীর্ণ হাত বাবরের কাঁধে স্থাপন করে বললেন- আমার বাদশাহ, বিজয়ের জন্য আপনাকেও শুভকামনা জানাচ্ছি।
আপনাকেও শুভকামনা বেগম। আপনার নিজের সহর সমরকন্দে ফিরে আসার জন্য আপনাকেও শুভকামনা জানাচ্ছি।
আয়েশা বেগম মাথা নুইয়ে বললেন- এর জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, আমার বাদশাহ।
খানজাদা বেগম মধ্য থেকে ঠাট্টার সুরে বললেন- বেচেরা আয়েশা রাস্তায় আসতে খুব কষ্ট করে এসেছে। এর জন্য বর্তমান ভ্রমণ করাটাও অসুবিধা। তবুও একমাত্র আপনার কথা ভেবে পথশ্রমের ক্লান্তি ভুলে এতো দূর রাস্তা কষ্ট করে এসেছে। এর জন্যেও বেচারা আয়েশা ধন্যবাদ পাওয়া উচিত।
বাবর ভগ্নীর ঠাট্টার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে নির্বোধের মতো ভগ্নীর দিকে তাকালেন। বাবরের কৌতূহল দেখে খানজাদা বেগমের চোখে-মুখে দুষ্টুমি ভরা কৌতুকের হাসি খেলে গেলো।ভগ্নীর কথার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে বাবর অধিক অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।
খানজাদা বেগম বাবরকে অপ্রস্তুত দেখে তিনি নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। জিব্বার জল লুকানোর জন্য পাণ চাবানোর মতো তিনি নিজের অপ্রস্তুত অবস্থা লুকানোর জন্য বাবরের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাতৃর দিকে তাকালেন। মাতৃ এবং মাসিও বাবরের অপ্রস্তুত অবস্থা লক্ষ্য করে পরস্পরে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষায় কৌতুক করে থাকা খানজাদা বেগমের চোখে ধরা পড়ল।
আসলে বাবর পিতৃ হতে চলেছেন। আয়েশা বেগম ছয় মাসের সন্তানসম্ভবা। খানজাদা বেগম এই সুসংবাদটাই বাবরকে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাতৃ এবং মাসির সন্মুখে কথাটা বলতে লজ্জা পেয়ে তিনি সংকুচিত হয়ে উঠলেন।
বাবর অসহায়ভাবে আয়েশা বেগমের দিকে তাকালেন। কিন্তু তিনি খানজাদা বেগমের ঠাট্টার কারণ উপলব্ধি করতে ব্যৰ্থ হলেন। ফলে তাঁর মুখমণ্ডল লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো।
অবশেষে বাবরের অনুভূতি সজাগ হয়ে উঠলো। তিনি মাতৃ, ভগ্নী, মাসি এবং আয়েশা বেগমের আচরণে রহস্যের গোন্ধ পেলেন। তির্যক সন্ধানী দৃষ্টি মেলে তিনি আয়েশা বেগমের দিকে তাকালেন। আয়েশা বেগম আগের থেকে শীর্ণ হয়েছে যদিও পেটটা যেন মোটা হয়ে উঠেছে।তিনি লক্ষ্য করলেন, আয়েশা বেগমের পেটটা কুর্তা থেকে সন্মুখের দিকে বের হয়ে আছে। আয়েশা বেগমের মুখমণ্ডলও যেন অস্বাভাবিক রকমে ম্লান পড়ে আছে। আয়েশার স্বাস্থ্য ও পেটের অস্বাভাবিক গঠনের প্রতি লক্ষ্য করে আয়েশা বেগম যে সন্তানসম্ভবা একথা তিনি উপলব্ধি করতে বাবরের অসুবিধা হলোনা। রহস্যের সন্ধান ভেদ করতে পেরে তিনি উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন। তবে, গাড়ীর ঝাঁকুনিতে আয়েশা বেগম সন্মুখীন হওয়া অসুবিধার কথা ভেবে তিনি কিছু পরিমাণে শংকিতও হয়ে উঠলেন।
বাবর আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে সহানুভূতির সুরে বললেন- আপনার অসুবিধার কথা আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি, বেগম। বর্তমান আপনি সকল অসুবিধা থেকে মুক্ত। আপনার আরামের জন্য সব ব্যবস্থা করা হবে। বোস্তান-ই-সরাইর প্রতিটা প্রাণী আপনার পরিচর্যার জন্য সর্বদা প্রস্তুত হয়ে থাকবে।
খানজাদা বেগম প্রাণখোলা হাসি হেসে বললেন- আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনার প্রতিশ্রুতির কথা শুনে এবং অনেকদিনের মাথায় আপনাকে কুশলে দেখে আমার আনন্দের সীমা আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
আপনার সেবক ভ্রাতৃও আপনার সাথে কথা বলার জন্য অনেকদিন থেকে ছটফট করছিলো। আপনাকে পেয়ে আমার আনন্দ সাগরে অবগাহন করার মতো লাগছে। আপাজান, আপনারা পথশ্রমে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। বর্তমান আপনাদের বিশ্রামের প্রয়োজন। যান, বিশ্রাম করুনগে’। পরে কথা হবো। আমি আপনাদের বিশ্রামের জন্য বিছানা পাততে হুকুম দিয়েছি। বাবর এভাবে বলেই ঠাট্টার সুরে বললেন- ওই যে, ঐ আকাশের উপরে। বাবর এভাবে বলে ছাদের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে ফেললেন। বাকিরাও তাঁর সাথে হাসিতে যোগ দিলেন।
মাতৃ, ভগ্নী, মাসি এবং আয়েশা বেগমকে বিশ্রামের জন্য এগিয়ে দিয়ে বাবর নিজের কক্ষে এসে ভাবে বিভোর হয়ে পড়লেন।
আজকে তাঁর জন্য খুবই আনন্দের দিন। আনন্দে তাঁর গা সাতখান আটখানের মতো করতে লাগলো। নিজের হৃদপিণ্ডের ঢিপ ঢিপ শব্দ যেন তাঁর দেহ-মনে মিঠা বাঁশির সুর ধ্বনিত করতে লাগলো। তাঁর হৃদয়ে সজীব হয়ে উঠলো পিতৃত্বের পুলক ভরা অনুভূতি।তাঁর অনুভূতিতে জীর্ণ-শীর্ণ আয়েশা বেগমও যৌবনের সুষমামণ্ডিত উজ্জ্বল দ্যুতিময়ী নারীরূপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। আয়েশাকে যেন আগের থেকে অধিক আপন আপন লাগতে লাগলো তাঁর মনে। আয়েশার সান্নিধ্য পেতে তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। সূর্যটাকে দু’হাত দিয়ে অস্তাচলের দিকে ঠেলে দিতে ইচ্ছে হলো তাঁর।
রাতে বাবর এবং আয়েশা বেগম একটি বিছানায় শোইলেন। আলো নিভিয়ে শোয়ার পর আয়েশা বেগম বুক পর্যন্ত লেপ ঠেলে দিয়ে পা মেলে শোয়ে নিশ্চল হয়ে উপরের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর ধারণা হলো, তিনি যেন সত্যই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। তিনি হঠাৎ আচ্ছন্নের মতো বলে উঠলেন- আপনার জন্য আমি গৌরাবান্বিত, আমার বাদশাহ।
অপ্রত্যাশিত সংযোগের জন্য বাবর চমকে উঠলেন। কারণ তিনি নিজেও একই কথাই ভাবছিলেন। তিনি সমরকন্দে আসার আগমুহূর্তে আয়েশাক বলে এসেছিলেন- বেগম, আমরা আবার সমরকন্দে মিলিত হবো।
প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরে বাবর নিজেও গৌরববোধ করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আয়েশা বেগম কথাটা বলছিলেন।এই সংযোগের ফলে বাবর অধিক আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলেন।
আসন্ন পিতৃত্বের গৌরবে বাবর যেভাবে উৎফুল্লিত, আয়েশা বেগমো যে বাবরের সন্তানের পিতৃ হতে পেরে সেভাবে গৌরবান্বিত, আয়েশা বেগমের আচরণে সেকথা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠায় বাবর অধিক পুলকিত হয়ে উঠলেন।
শিশুর মতো চপলতা প্রকাশ করে বাবর জিজ্ঞাসা করলেন- বেগম, আমরা কখন সেই প্রত্যাশিত দিনটির আনন্দ উপভোগ করতে পারব?
তিন মাসের চেয়েও কম সময় রয়েছে, আমার বাদশাহ। সময় যত এগিয়ে চলছে আমার উৎকণ্ঠাও তত বেড়ে চলেছে।
কেমন উৎকন্ঠা? আপনি তো এইমাত্র বললেন যে আপনি গৌরব অনুভব করছেন?
অবশ্যেই গৌরব অনুভব করছি। তবে, সময় এগোনোর সাথে সাথে অন্য প্রকারের ভয়ের অনুভূতিও মনে সঞ্চার হচ্ছে। সেই ভয়ের ব্যাখ্যা আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। আচ্ছা, সেগুলো এখন বাদ দিন। সময়ের কথা সময়ে দেখা যাবে। তবে আমি এখন অন্য একটি কথা ভাবছি।
কি কথা, বেগম?
আল্লাহই যদি আমাদের পুত্র সন্তান দিন তো তার নাম ফখরুদ্দিন রাখার কথা ভাবছি। ভালো হবে না, আমার বাদশাহ?
বাবর ভাবলেন, পিতৃর নাম জহিরুদ্দিন এবং পুত্রের নাম ফখরুদ্দিন। কেমন বুদ্ধিমতী এই আয়েশা! পুত্রের নাম পিতৃর নামের সাথে মিলিয়ে রাখতে চাইছে….
বাবর আয়েশাকে প্রশংসা করে বললেন- ফখরুদ্দিন! কেমন সুন্দর নাম? কিন্তু যদি মেয়ে সন্তান হয়, তবে তাঁর নাম রাখব ফখরুন্নিসা।ঠিক হবে না বেগম?
আয়েশা বেগম আসলে পুত্রের মা হতে চান। সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর মাতৃ হতে চান।
সেজন্য আয়েশা বেগম বললেন- আপনার কথা মেনে নিচ্ছি, কিন্তু আমি আসলে পুত্র সন্তানের মা হতে চাই।
আল্লাহই আপনার মনোবঞ্ছা পূর্ণ করুন।
ফখরুদ্দিন…..ফখরুন্নিসা। কী সুন্দর নাম!
বাবর ভাবনায় বিভোর হয়ে পড়লেন।
* * *
দিনের পরে রাত, রাতের পরে দিন…… এ হলো মহাকালের অমোঘ বিধান।
সমরকন্দ বিজয়ের পরে বাবরের জীবনেও অন্ধকার রাতের অবসান হয়ে নতুন দিনের সূর্যোদয় হলো। সাথে উদয় হলো ভাগ্য রবি। তাঁর জীবনে একটার পরে একটা সফলতা আসতে লগালো। পূর্ব দিকের উর্গুল, পশ্চিম দিকের সোগন্ধ এবং বুসিয়া শৈবানি খাঁর হাত থেকে স্বতন্ত্র হয়ে বাবরের অধীনে এলো।
শৈবানি খাঁ আসন্ন যুদ্ধের জন্য অর্থ এবং সেনাবল বৃদ্ধির জন্য সমরকন্দ থেকে অবরোধ তুলে পিছিয়ে গিয়ে ছোট ছোট দল নিয়ে বাবর সেনাদের ব্যতিব্যস্ত করছিল যদিও শেষ মুহূর্তে সেইসকল স্থানের দখল বাবর নিজের হাতে আনতে সক্ষম হচ্ছিলেন।
কিন্তু কুর্শি এবং খুজার নামক সহর দু’টি অনেকদিন শৈবানি খাঁ নিজের দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। শৈবানি খাঁ নিয়োগ করা দু’জন শাসক উক্ত সহর দু’টির শাসন নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। উৰ্গুল, সোগন্ধ, বুসিয়া বাবরের অধীনে আসার পর বাবর সেনার মনোবল অধিক বৃদ্ধি পেয়েছিলো। সেজন্য বাবর উৎসাহিত হয়ে উক্ত সহর দু’টির দখল নিজের হাতে আনার জন্য একদল সেনা প্রেরণ করলেন। বাবর সেনা অতি সহজে উক্ত সহর দু’টি দখল করে শৈবানি খা নিয়োগ করা শাসক দু’জনকে বিতাড়িত করে নতুন শাসক নিযুক্ত করলেন। নব নিযুক্ত শাসক দু’জন নানান উপহার সামগ্রীর সাথে শত শত সেনা বাবরের জন্য উপঢৌকন পাঠালেন।সেই সেনাদলের একদল সেনা সমরকন্দ এসে পৌঁছেছিলো এবং বাকি সেনা অতিশীঘ্ৰে এসে পৌঁছোবে এমনই সংবাদ পাওয়া গেছে।
উক্ত সংবাদ পেয়ে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। নতুন সেনা নিয়ে আসা বেগদের তিনি আড়ম্বরপূর্ণ জমকালো সাজসজ্জা, আরামদায়ক আবাসগৃহ এবং উচ্চহারে বেতন প্রদান করলেন।
এভাবে বাবর হৃত মর্যদা এবং প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার জন্য মনোনিবেশ করলেন। ভাগ্যলক্ষ্মী প্রসন্ন হওয়ার জন্য তিনি প্রভূত সফলতাও লাভ করতে সক্ষম হলেন।
বিগত বছরগুলোতে সমরকন্দের শাসনভার একজন শাসক থেকে আরেকজন শাসকের হাতে হস্তান্তর হওয়ায় সমরকন্দের অবস্থা সবদিক দিয়েই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। বাবর সহরের অবস্থা উন্নত করার সাথে সাথে জনতার মনোবল ও মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য মনোনিবেশ করলেন। ইতিমধ্যে বিখ্যাত শায়ের আলীশের নবাইর কাছ থেকে প্রশংসাসূচক পত্র পেয়ে বাবর উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। সেজন্য তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে কাব্য চর্চায় মনোনিবেশ করলেন। পত্র আদান-প্রদানের মাধমে তিনি আলীশের নবাইর সাথ সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হলেন।
কয়েকদিন আগে বাবর আলীশের নবাইর কাছে পত্র লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি পত্রটা সম্পূর্ণ করতে পারেন নি। সেজন্য তিনি সেদিন পত্র লিখা সম্পূর্ণ করার মানস নিয়ে লাইব্রেরীর দিকে যাচ্ছিলেন।
লাইব্রেরী যাওয়ার পথে ভগ্নী খানজাদা বেগম তাঁকে সাক্ষাৎ করে বললেন- ভাই, হিরাত থেকে পত্র আসার কথা সত্যি নাকি?
বাবর থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন- হ্যাঁ সত্যি। আলীশের নবাই আমার সফলতার জন্য প্রশংসা পত্র প্রেরণ করেছেন।
আলীশের নবাইর পত্র আসার কথা শুনে খানজাদা বেগম প্রসন্নতা প্রকাশ করে বললেন- আলীশের নবাইর মতো একজন মহান ব্যক্তি আপনাকে প্রশংসা পত্র প্রেরণ করার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, ভাই।
প্রশংসার নম্রতায় বাবর প্রসন্ন হয়ে উঠলেন এবং খানজাদা বেগমের কাছ থেকে আরও অধিক কিছু শুনার আশায় তিনি মৌন হয়ে রইলেন। কিন্তু খানজাদা বেগম কিছুই বললেন না। শুধু উদাসভাবে বসে রইলেন। আসলে তিনি বাবরের কাছ থেকে বিশেষ মহত্ত্বপূর্ণ কিছু সমাচার শুনার আশায় মনে মনে ছিলেন। এই বিশেষ মহত্ত্বপূর্ণ সমাচারের আড়ালের ব্যক্তিটি ছিলো ফজিলুদ্দিন। ফজিলুদ্দিন বর্তমান হিরাতে রয়েছেন। কিন্তু খানজাদা বেগম ভ্রাতৃর কাছে কথাটা জিজ্ঞাসা করতে লজ্জাবোধ করে বিষণ্ন হয়ে উঠলেন এবং নীরবতা অবলম্বন করলেন।
বাবর হতাশভাবে ভগ্নীর দিকে তাকালেন। তিনি অনুভব করলেন, ভগ্নীর চোখেমুখে যেন বিষণ্ন মৌন বেদনার অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। ভগ্নীর হৃদয় যেন কোন এক গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন। কিন্তু কী সেই বেদনা বাবর উপলব্ধি করতে পারলেন না। এক মুহূর্তের জন্য তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইলেন। পরের মুহূর্তে তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন- আপাজান, লাইব্রেরীতে চলুন। আমি আপনাকে হিরাত থেকে আসা পত্রটি দেখাব।
উভয় লাইব্রেরীতে এলেন। আলীশের নবাই তাঁর জন্য লিখা পত্রটি বাবর ভগ্নীর হাতে দিয়ে বললেন- আপাজান, এটাই সেই পত্র।
খানজাদা বেগম সভ্রম সহকারে পত্রটি হাতে নিয়ে মনযোগ সহকারে পড়তে লাগলেন। পত্রটিতে বাবরের প্রশংসার সাথে হিরাতের বিশিষ্ট ব্যক্তি কয়েকজনের কুশল সংবাদ লিখা ছিলো। খানজাদা বেগম আশা করা মতেই পত্রের শেষে ফজিলুদ্দিনের বিষয়ে লেখা ছিলো। ফজিলুদ্দিনের বিষয়ে লিখা কথাটুকু পড়ে খানজাদা বেগমের চোখ জলে ছলছল করতে লাগলো।
ভগ্নীর চোখে জল দেখে বাবরের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। তিনি ভগ্নীকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- আপনার চোখে জল কেন, আপাজান? আমি তো আপনাকে সবসময় আনন্দিত দেখতে চাই।
বাবরের প্রশ্নের উত্তরে খানজাদা বেগম কিছু বললেন না। তিনি অশ্রুসজল নয়নে ভ্রাতৃর দিকে তাকিয়ে মাথা নত করলেন।
ভগ্নীর চোখের জলের কারণ যে ফজিলুদ্দিন এ কথা উপলব্ধি করতে বাবরের অসুবিধা হল না। খানজাদা বেগম যে ফজিলুদ্দিনকে ভালবাসেন এ কথা বাবর কিছু পরিমাণে অবগত ছিলেন আগে থেকেই।
আহম্মদ তনয়াল মির্জা জাহাঙ্গীরের হয়ে আন্দিজানের উপরে আক্রমণ সংঘটিত করার সময়ে খানজাদা বেগমের হয়ে প্রতিবাদ করার জন্য আক্রোশবশতঃ তনয়াল ফজিলুদ্দিনকে বন্দি করার কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। তনয়ালের সেই আক্রোশের কারণ ছিলো খানজাদা বেগম। কারণ তনয়াল খানজাদা বেগম ও ফজিলুদ্দিনের প্রেমের কথা অবগত ছিলো। এদিকে তনয়াল নিজেও খানজাদা বেগমের প্রতি আসক্ত ছিলো। খানজাদা বেগমকে সে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাবও দিয়েছিলো। তবে খানজাদা বেগম সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। ফলে খানজাদা বেগমের প্রতি তনয়াল মনে মনে বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলো। খানজাদা বেগম তনয়ালের প্রস্তাব প্রত্যাখানের মূলে যে ফজিলুদ্দিন ছিলো এ কথা তনয়াল অবগত ছিলো। ফলে তনয়াল ফজিলুদ্দিনের প্রতিও বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলো। সেই বিদ্বেষ চরিতার্থ করার জন্যই তনয়াল ফজিলুদ্দিনকে বন্দি করেছিলো। হয়তো সুযোগ বুঝে ফজিলুদ্দিনকে হত্যাই করত। কিন্তু খাজা আবদুল্ল্যাহ এবং তাহিরজানের তৎপরতার জন্য ফজিলুদ্দিন প্রাণ নিয়ে হিরাত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বর্তমান ফজিলুদ্দিন হিরাতে আলীশের নবাইর নিকটে রযেছেন।হিরাত যাওয়ার পরে ফজিলুদ্দিন এবং খানজাদা বেগমের সাথে দেখা সাক্ষাৎ তো দূরের কথা কোনো রকমের যোগাযোগও ছিল না উভয়ের সাথে। সেজন্য হিরাত থেকে পত্র আসার কথা শুনে পত্রটিতে ফজিলুদ্দিনের কুশল সংবাদ লিখা থাকতে পারে বলে খানজাদা বেগম একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন। সেজন্যই তিনি পত্রটি পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ভাবামতেই পত্রটিতে ফজিলুদ্দিনের কুশল সংবাদ লিখা ছিলো। তাই ফজিলুদ্দিনের কুশল সংবাদ পেয়ে তিনি উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন এবং অনেক দিনের সঞ্চিত আবেগ চোখের জল হয়ে তাঁর অজ্ঞাতেই বেরিয়ে এলো। কিন্তু তিনি বাবরের সন্মুখে এই দুর্বলতার কথা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করছিলেন। প্রকৃতার্থে প্রকাশ করা সম্ভবো ছিলো না তাঁর পক্ষে।
সেজন্য খানজাদা বেগম নিজের দুর্বলতা লুকোতে তারাতারি নিজেকে সামলে নিয়ে চোখের জল মুছে বললেন- এই চোখের জল আনন্দের জল, ভাই। আপনার খ্যাতি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ার জন্য আমি আনন্দিত। আপনাকে আমি শুভ কামনা জানাচ্ছি, ভাই।
ফজিলুদ্দিনের বিষয়ে লিখা কথাটুকুই যে ভগ্নীর চোখের জলের কারণ এ কথা উপলব্ধি করতে বাবরের অসুবিধা হলো না। তবে তিনি সরাসরি কথাটা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করলেন। সেজন্য তিনি পাকেপ্রকারে তাঁদের ভালবাসার প্রতি তাঁর সন্মতি থাকা কথাটা প্রতিপন্ন করতে এবং ভগ্নীকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- আপনি আনন্দিত থাকাটা আমি মনেপ্রাণে কামনা করি, আপাজান। আপনার সন্তুষ্টির কারণে আমি যেকোনো প্রকারে সহায় করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত।
কিন্তু কী করবেন! আপনার ভগ্নী যে অভাগিনী, ভাই।
কিন্তু আপনার ভ্রাতৃ তো সবার উপরে বিজয় সাব্যস্ত করার ক্ষমতা রাখে! বাবর প্রতিটি কথা হাসি তামাশার রূপ দিতে যত্ন করছিলেন। সেজন্য তিনি কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে ভগ্নীকে আশ্বাস প্রদানের জন্য বললেন- আমি আপনাকে সর্বপ্রকারে সহায় করতে প্রস্তুত।
আমার জন্য আপনি অনেক যাতনা সহ্য করতে হয়েছে। সেবার আমি আহম্মদ তনয়ালকে বিয়ে করতে সম্মত হলে হয়তো সে আপনার শত্রু হত না।
খানজাদা বেগমের এই দ্বিধাহীন স্বীকারোক্তিতে বাবর অভিভূত হয়ে পড়লেন। তাঁর অন্তরে ভগ্নীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি উথলে উঠলো। ভগ্নী বলা কথা অবশ্যেই সত্য। খানজাদা বেগম তনয়ালের প্রস্তাবে সম্মত হলে অবশ্যেই তনয়াল তাঁর বিরোধিতা করত না। কণ্টকহীনভাবে তিনি রাজত্ব করতে পারতেন। এতে অবশ্যে কারো দ্বিমত থাকার কথ নয়। কিন্তু ভগ্নী তনয়ালের প্রস্তাবে সন্মত হলে ভগ্নীর থেকে তিনি-ই দুঃখ পেতেন সবচেয়ে বেশি। তনয়ালের মতো একজন নিষ্ঠুর, স্বার্থপর লোককে ভগ্নীর স্বামী হিসাবে তিনি মেনে নিতে কষ্ট পেতন। খানজাদা বেগম এবং তিনি একই মাতৃর গর্ভজাত সন্তান। সেই হিসাবে খানজাদা বেগমের মতো আপন এই সংসারে তাঁর অন্য কেউ নেই। সেজন্য ভগ্নীকে সুখী করার জন্য তিনি যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে সর্বদা প্রস্তুত।
বাবর জানে, খানজাদা বেগম তাঁকে একজন মহান ও বিখ্যাত শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা মনেপ্রাণে কামনা করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরাঁ বিরাট বিরাট মহৎ সৌধ নির্মাণ করে গেছেন। সেগুলো এখন সদম্ভে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে তাঁদের গুণ গরিমা ও কীর্তি প্রকাশ করতেছে। খানজাদা বেগম একজন শিল্পপ্রিয় মহিলা। তিনি বাবরকে পূর্বপুরুষদের মতো সৌধ, শিক্ষানুষ্ঠান প্রভৃতি নির্মাণ করে কীর্তিমন্ত শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা কামনা করেন। মৃত্যুর পরেও যাতে সেইসব কর্মরাজির কীর্তিগাঁথাই বাবরকে যুগ যুগ অমর করে রাখে। তিনি জানেন, একজন শিল্পী হাজারজন শাসকের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। শিল্পী একজন মৃত্যুর পরেও তাঁর শিল্পকর্মের মাঝে অমর হয়ে থাকে। বাবর জানেন, তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর ভগ্নী তাঁকে শিল্পকর্মের মাঝে অমর হয়ে থাকাটা কামনা করেন।
সেজন্য বাবর খানজাদা বেগমকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- আপাজান, তনয়াল শুধু আপনার জন্যই আমার শত্রু হয়নি। আসলে তার রক্তে মিশে রয়েছে পাশবিক প্রবৃত্তি। সাপ সব সময় সাপই। সাপকে যতই দুধকলা খাওয়ান না কেন, সে কখনও ধ্বংসাত্মক কার্য থেকে নিরস্ত হয় না।
আমি কৃতজ্ঞ, বাবরজান। খানজাদা বেগম সন্তুষ্ট হয়ে আবেগে মাতৃর মতো বাবরজান বলে সম্বোধন করলেন। কারণ তাঁদের মাতৃ বাবরকে কখনও কখনও বাবরজান বলে সম্বোধন করেন।
আলীশের নবাই মহৎ এবং কীর্তিমান কাজ করার জন্য আমাকে উপদেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন পত্রের মাধ্যমে। বাবরের কন্ঠস্বর আবার কৌতুকবহ হয়ে উঠলো- আমরাও মাউরা উন্নহর এবং খোরাসানের সৌধের চেয়েও অধিক গৌরবময় সৌধ নির্মাণ করব। সেগুলো নির্মাণের দায়িত্ব ফজিলুদ্দিনের উপরে ন্যস্ত করা হবে। কারণ সেসব কাজের জন্য ফজিলুদ্দিনই সবার থেকে বেশি উপযুক্ত।
ফজিলুদ্দিনের নাম শুনার সাথে সাথে ভগ্নীর সকল বেদনা দূর হয়ে যাবে বলে বাবর জানেন। সেজন্য তিনি জেনেবুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে ফজিলুদ্দিনের নাম উচ্চারণ করলেন।
বাবর অনুমান করামতেই হলো। ফজিলুদ্দিনের নাম শুনার সাথে সাথে খানজাদা বেগমের চোখেমুখে প্রসন্নতার ঢেউ খেলে গেলো। মেঘমুক্ত চন্দ্রের মতো আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো তাঁর মুখমন্ডল। তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি বাবরকে উৎসাহিত করার জন্য বললেন- আমার মতে, আপনি মাউরা উন্নহরের আকাশে দীপ্তিমান নক্ষত্রের মাঝে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। আপনার জন্য আমরা গৌরাবান্বিত।
আপাজান, আল্লাহর কাছে আপনি এই প্রার্থনা করুন, যাতে আমি শৈবানি খাঁকে আমাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারি। আল্লাহ যেন অতিশীঘ্রে আমাদের শান্তির নিশ্বাস নিতে শক্তি দেন। শৈবানি খাঁকে আমাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই আমি আপনার আকাংক্ষা পূরণ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করব। বাবর এভাবে বলেই উশ-এ নির্মিত মসজিদের কথা মনে করিয়ে দিলেন- আপনার মনে পড়ছে নাকি আপাজান, উশে আমরা এরকম কাজ কীভাবে শুরু করেছিলাম?
বাবরের কথায় খানজাদা বেগমের স্মৃতিপটে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো উশের সেই সোনালী দিনগুলোর প্রতিচ্ছবি। উশে নির্মিত উপাসনা গৃহের শিল্পকর্ম নিরীক্ষণ করে বাবর কীরকম অভিভূত হয়ে পড়ছিলেন সেই স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি উজ্জ্বীবিত হয়ে উঠলেন। অদূর ভবিষ্যতে তিনি বৃহৎ বৃহৎ সৌধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তখন খানজাদা বেগম এবং ফজিলুদ্দিনকে। আশ্বাস পেয়ে উভয়ে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন এবং ফজিলুদ্দিন খানজাদা বেগমের সাথে পরামর্শ করে অনেক নক্সাও অঙ্কন করেছিলেন। নক্সাগুলো ফজিলুদ্দিনের কাছে ছিলো যদিও হিরাতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি নক্সাগুলো খানজাদা বেগমকে দেওয়ার জন্য তাহিরজানের হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন। নক্সাগুলো এখনও আছে খানজাদা বেগমরে কাছে। তিনি সযত্নে সেগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছেন। কিন্তু ভ্রাতৃকে কথাটা বলা উচিত হবে না ভেবে তিনি শুধু বললেন- ভাই, আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য আল্লাহ আপনাকে শক্তি দিন। এর জন্য আমি দিনরাত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করব।
এর পরে ভ্রাতৃ-ভগ্নীদ্বয়ে সৌধ নির্মাণের বিষয়ে অনেক কথা আলোচনা করলেন এবং ভ্রাতৃর কাছ থেকে সৌধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি পেয়ে খানজাদা বেগম আনন্দ মনে নিজের কক্ষে চলে গেলেন।
খানজাদা বেগম কক্ষ ত্যাগ করে যাওয়ার পর বাবরের কল্পনা বিলাসী মন কল্পনার রথে চড়ে কল্পলোকে বিচরণ করতে লাগলো। কাগজ কলম নিয়ে বসে অসম্পূর্ণ গজল একটি সম্পূর্ণ করতে তিনি গভীরভাবে মনোনিবেশ করলেন।
* * *
শৈবানি খাঁ একটি উঁচু টিলার উপরে দাঁড়িয়ে সেনাদের যুদ্ধাভ্যাস প্রত্যক্ষ করছিলেন। তাঁর চোখ সেনাদের উপরে নিবদ্ধ হয়ে ছিলো যদিও মনের মাঝে ধূমায়িত হচ্ছিলো বিদ্বেষ আক্রোশের ধূম্রজাল। মনের চিন্তাধারা সাপের মতো একেঁবেঁকে পথে চলতেছিলো এবং ব্যস্ত হয়েছিলো কূটকৌশল রচনায়। চোখে জ্বলছিলো প্রতিহিংসার আগুন… হৃদয়ে পাক খাচ্ছিল বিদ্বেষের ঝঞ্ঝা।
শৈবানি খাঁ বৰ্তমান এক গভীর সংকটময় পরিস্থিতর করাল গ্রাসে পতিত। অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে তাঁর মান-সন্মান, যশ, খ্যাতি বর্তমান ভূলুণ্ঠিত।
শৈবানি খাঁর প্রায় সব কয়টি দূর্গ বর্তমান বাবরের দখলে। বর্তমান তাঁর দখলে রয়েছে মাত্র দু’টি দূর্গ। বুখারা এবং স্তেপী। বুখারার ভাগ্যও অনিশ্চিত। যেকোনো মুহূর্তে বাবরের হস্তগত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছে।
একমাত্র স্তেপী-ই সুরক্ষিত। তবে, সেখানেও সৈন্য সংখ্যা সীমিত। কারণ শৈবানি খাঁ বর্তমান সমরকন্দ আক্রমণের আশায় অধিক সংখ্যক সেনা নিয়ে দবুসিয়ায় ছাউনি পেতে রয়েছে। ফলে স্তেপীও সুরক্ষিত বলে জোর দিয়ে বলা যায় না। সেজন্য বেগবর্গ তাঁকে সমরকন্দ আক্রমণের যোজনা ত্যাগ করে স্তেপী চলে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিতেছে। কারণ স্তেপী শত্রুর হস্তগত হলে তাঁদের দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত থাকবে না। শৈবানি খাঁ কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল। দবুসিয়া দূর্গ দখলের পর তাঁর মনোবল অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজের ভাগ্যের উপরেও তাঁর বিশ্বাস জন্মেছে দবুসিয়া দূর্গ দখলের পর থেকে। সমরকন্দ দখল করতে সক্ষম হবেন বলেও বর্তমান তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। সেজন্য তাঁর সকল ধ্যান- ধারণা, চিন্তা-চর্চা সমরকন্দকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। সময় যত এগিয়ে চলছে, তাঁর আত্মবিশ্বাসও যেন তত উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শৈবানি খাঁর এই আত্মবিশ্বাসের কারণও রয়েছে। কারণ তিনি গুপ্তচরের মুখে অবগত হয়েছেন যে, বাবর বর্তমান কবিতা এবং পণ্ডিতদের নিয়ে ব্যস্ত। কবি এবং কবিতা নিয়ে ব্যস্ত থাকার ফলে বাবর আসন্ন যুদ্ধের জন্য মনসংযোগ করতে পারেন নি। সর্বোপরি সমরকন্দের অর্থনীতি বর্তমান বিপর্যস্ত। বিগত বছরগুলোতে সমরকন্দের ভাগ্যাকাশে অনেক কয়েকজন শাসকের আবির্ভাব হয়েছে। শাসক পরিবর্তনের সাথে সাথে বয়ে গেছে প্রচণ্ড ঝঞ্ঝার তাওব। ফলে বিপর্যস্ত হয়েছে অর্থনীতি- বেড়েছে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। সর্বোপরি শৈবানি খাঁ বিশ্বস্ত সূত্রে অবগত হয়েছেন যে, সমরকন্দে বর্তমান মহামারির তাণ্ডব শুরু হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে শুরু হবে ক্ষুধার তাণ্ডব— অনাহার-অর্দ্ধাহারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে শত শত মানুষ। কথাটা ভাবতেই আসন্ন বিজয়ের আনন্দে শৈবানি খাঁর ওঠের কোনায় ক্রূর হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
বাবর একজন সাহসী এবং বিচক্ষণ যোদ্ধা। তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে সুশিক্ষিত সহনশীল তেজী ঘোড়ার সাথে অসীম সাহসী ধৈর্যশীল সুশিক্ষিত অশ্বারোহীর প্রয়োজন। না হলে যুদ্ধ জয়ের আশা করাটা বৃথা হয়ে যাবে।
টিলার পাদদেশে বর্তমান যে যুদ্ধাভ্যাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেটা আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সুপরিকল্পিত যুদ্ধাভ্যাস মাত্র। অনেকদিন থেকে এই যুদ্ধাভ্যাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কয়েকদিন আগে শৈবানি খাঁ এই কঠোর যুদ্ধাভ্যাসের ফল লাভ করতে সক্ষমও হয়েছেন। তাঁর বিপর্যস্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে বয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন বিজয় বার্তা।
বিজয় যাত্রার প্রস্তুতি হিসাবে কয়েকদিন আগে শৈবানি খাঁ দবুসিয়া দূর্গ আক্রমণ করেছিলেন এবং সেই আক্রমণের সুফলো তিনি লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। বাবর গত শীতের মরশুমে তাঁর কাছ থেকে দবুসিয়া দূর্গ কেড়ে নিয়েছিলেন।সেই দূর্গ বর্তমান শৈবানি খাঁর দখলে। দুর্দিনের সময় তাঁর জন্য এ এক বিরাট সাফল্য।
শৈবানি খাঁর আত্মসন্তুষ্টির জন্যেই বাবর দূর্গটা দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুবুসিয়া দূর্গ বুখারার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। বসন্ত ঋতুর নির্মল আকাশের নিচে দবুসিয়া দূর্গটা শৈবানি খাঁর মনে মানব নির্মিত প্রাচীরের মতো সুরক্ষিত মনে হয়েছিলো। তিনি ভেবেছিলেন, বাবরের বুদ্ধি এবং সেনাবল যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তিনি দবুসিয়া দূর্গ দখল করাটা কোনোমতেই সম্ভব হবে না। কিন্তু তাঁর সব ধারণা ভুল প্রতিপন্ন করে গত শীতের মরশুমে বাবর সেনা দূর্গটি দখল করেছিলো। কিন্তু শৈবানি খাঁ প্রথম আক্রমণেই নিজের দখলে আনতে সক্ষম হয়েছেন সেই দবুসিয়া দূর্গ।
দবুসিয়া দূর্গ দখল করার সময়ে শৈবানি খাঁর সেনারা অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করেছে। যার ফলে তাঁর মনোবল বর্তমান তুঙ্গে। শৈবানি খাঁর সেনারা যখন দূর্গটা আক্রমণ করেছিলো, তখন দবুসিয়া দূর্গের সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাবর সেনা দূর্গ শিখর থেকে পাথর এবং শর নিক্ষেপ করেছিলো। তেলে আগুন ধরিয়েও নিক্ষেপ করেছিলো শৈবানি খাঁর সেনার উপরে।
ক্ষয়-ক্ষতির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে শৈবানি খাঁর সুশিক্ষিত ও সাহসী সেনারা মৈ বেয়ে দূর্গ শিখরে উঠে গিয়েছিলো এবং এক সময় বাবর সেনার আক্রমণ শিথিল হয়ে পড়েছিলো। তখন শৈবানি খাঁর কয়েকজন বাছাই করা সেনা শত্রুসেনার উপরে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। শৈবানি খাঁর সেনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলো ভ্রাতৃ সুলতান মাহমুদ এবং খুড়ার ছেলে তৈমূর। সেনারা যখন প্রত্যক্ষ করলো, যে শৈবানি খাঁ নিজের ভ্রাতৃকেও নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, তখন সেনাদের মনোবল দুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিলো এবং প্রচণ্ড গতিতে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। মরণপণ তীব্র আক্রমণের সম্মুখে টিকতে না পেরে প্রতিপক্ষ সেনা ঝরাপাতার মতো দূর্গ শিখরের পরিখায় পড়ে মরছিলো। এদিকে প্রতিপক্ষের সেনার চেয়ে শৈবানি খাঁর সেনা সংখ্যাও অনেক বেশি ছিলো। ফলে শৈবানি খাঁ অতি সহজে দবুসিয়া দূর্গ নিজের দখলে আনতে সক্ষম হয়েছিলো এবং জীবিত বাবর সেনাদের শৈবানি খাঁর বিজয়ী সেনারা শৈবানি খাঁর আদেশে নির্বিচারে হত্যা করেছিলো।
দূর্গ আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ জানিয়ে বাবরের কাছে পত্র প্রেরণ করা হয়েছিলো যদিও বাবর সেনা পৌঁছানোর আগেই শৈবানি খাঁ বিজয় উৎসব পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
একটার পরে একটা পরাজয়ের পরে শৈবানি খাঁ একবারে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন। সেনাদেরও মনোবল ভেঙে গিয়েছিলো। কিন্তু দবুসিয়া দূর্গ বিজয়ের ফলে শৈবানি খাঁ নিজেও অনুপ্রাণিত এবং সেনাদের মনোবলও তুঙ্গে। সেজন্য কঠোর অনুশীলন এবং নবোদ্যমে সমরকন্দ বিজয়ের জন্য প্রস্তুতি চালাইতেছে তারা। বাবরের বর্তমান অবস্থান এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে সংবাদ নিতে সুশিক্ষিত গুপ্তচর নিয়োগ করে সময়ের সংবাদ সময়ে সংগ্রহ করার ব্যবস্থাও করেছেন শৈবানি খাঁ। এমন কী কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে শৈবানি খাঁ বাবরের দরবারেও কিছুসংখ্যক বাছা বাছা গুপ্তচর নিয়োগ করেছে ইতিমধ্যে।
শৈবানি খাঁ পূর্বে কোনদিন এভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হননি। শুধু সেনাবল দিয়ে বাবরকে পরাজয় করা অসম্ভব। বাবরকে পরাজয় করতে হলে প্রয়োজন হবে সাহসী এবং সুশিক্ষিত সেনা। শুধু সাহসী হলেই হবে না, সেনারা কঠোর পরিশ্রমী এবং মানসিক ভাবেও দৃঢ় হতে হবে। এসব কথা ভেবেই শৈবানি খাঁ এই কঠোর যুদ্ধাভ্যাস চালাচ্ছেন।
বাবরের সাথে যুদ্ধ করা এবং সাহসী সুচতুর বাঘের সাথে যুদ্ধ করা একই কথা। বাবরের বয়স কম, কিন্তু তিনি অসীম সাহসী, উদার ও সৌভাগ্যবান। বাবরের অভিজ্ঞতাও বয়সের তুলনায় অনেক বেশি। বাবর বয়সে নবীন হলেও ধৈর্য, নিষ্ঠা ও বুদ্ধিতে প্রবীণ। বুদ্ধির বলেই মাউরা উন্নহরের প্রতিটা গাঁও এবং সহর বর্তমান বাবরের দখলে।
বেগদের প্রতি শৈবানি খাঁর মোটেই বিশ্বাস নেই। কারণ ধনের বিনিময়ে তাদের কেনা-বেচা করা সম্ভব। যেদিকে শক্তি বেশি সেইদিকে যোগদান করাটা তাদের মজ্জাগত স্বভাব। তারা শুধু অর্থের জন্য লালায়িত। বাজারু মেয়েদের মতো তারা অর্থের বিনিময়ে হাত বদল হয়ে থাকে সুযোগ বুঝে।
সুলতান আলীর বেশিসংখ্যক বেগই এক সময় শৈবানি খাঁর সাথে হাত মিলিয়ে ছিলো। কিন্তু বাবর সমরকন্দ দখল করার পরে তারা বাবরের সাথে হাত মিলিয়ে তাঁর অধীনে চলে গেছে। সেজন্য শৈবানি খাঁ বেগদের বাজারু মেয়েদের সাথে তুলনা করছেন।
এদিকে বাবরের সৈন্যসংখ্যাও দিনে দিনে বানের জলের মতো বৃদ্ধি হচ্ছে। বাবরের চিরশত্রু আহম্মদ তনয়ালও বর্তমান বাবরের প্রতিপত্তি দেখে ভয়ে ত্রস্তমান। সেও বর্তমান দুই শত সেনা দিয়ে তার ভ্রাতৃকে বাবরের সেবার জন্য পাঠিয়েছে। হায় ক্ষমতা! এভাবে যদি বাবরের ক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বাবরকে পরাভূত করাটা দুরূহ কাজ হবে। সেজন্য বাবরের শক্তি অধিক বৃদ্ধি পাওয়াটা কোনোমতেই উচিত হবে না। অচিরেই তাঁকে দমন করা প্রয়োজন। শুধু সেনাবল দিয়ে নয়, কৌশলগতভাবেও বাবরকে পেছনে ফেলতে হবে তাঁদের। তবেই তো তাঁদের অভীষ্ট সিদ্ধি সম্ভব হবে।
এ সব কথা চিন্তা করেই শৈবানি খাঁ সেনাদের কঠোর অনুশীলন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং কীভাবে বাবরকে কৌশলগতভাবে পরাজয় করতে পারেন সেই কৌশল রচনায় তিনি অহোরাত্র ব্যস্ত হয়ে রয়েছেন।
গতকাল আয়েশা বেগম একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছে বলে গুপ্তচর সকলে সংবাদ এনেছে। কন্যা সন্তানের নাম বোলে রেখেছে ফখরুন্নিসা। বাদশাহের প্রথম সন্তান জন্ম হওয়ার আনন্দে সমগ্র সহর বর্তমান উৎসবমুখর। প্রথম পিতৃত্বের আনন্দে বাবর নিজেও সেই আনন্দ উৎসবে যোগদান করেছেন।
শৈবানি খাঁ অনেক ভেবেচিন্তে এটাই যুদ্ধাভিযানের উপযুক্ত অবসর বলে সিদ্ধান্ত নিলেন এবং বেগদের ডেকে এনে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা অবগত করলেন- আমরা কালই যুদ্ধ যাত্রা করব। যাত্রার জন্য আয়োজন সম্পূর্ণ করে তুলুন।
সিদ্ধান্ত মর্মে পরের দিন শৈবানি খাঁ বুখারা এবং দবুসিয়া রক্ষার জন্য কিছু সেনা রেখে বাকি সেনা নিয়ে সমরকন্দ অভিমুখে যাত্রা করলেন। যাত্রার আগমুহূর্তে সেনাদের বীরোচিত চিন্তা-ভাবনায় অভ্যস্ত করার জন্য শৈবানি খাঁ বাবরকে একটি পত্র প্রেরণ করলেন। পত্রটি পত্রবাহকের হাতে দেওয়ার আগে তিনি নিজেই সেনাদের পত্রটি পড়ে শুনালেন- ‘বীরে নিজের শক্তি, বল-বিক্রম খোলা প্রান্তরে, সন্মুখ সমরে প্রদর্শন করা উচিত। রুদ্ধদ্বার দূর্গের ভেতরে একজন শিশুও সুরক্ষিতভাবে বসে থাকতে পারে। সেজন্য যদি সাহস আছে, দূর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজের শক্তির পরীক্ষা দিন।’
পত্রপাঠ শেষ হওয়ার সাথে সাথে শৈবানি খাঁর বিজয় ঘোষণা করে সেনারা সমরকন্দ অভিমুখে অগ্রসর হলো।
যথাসময়ে শৈবানি খাঁর পত্র এসে বাবরের হাতে পড়ল।
পত্র পড়ে বাবরের আত্মসন্মানে আঘাত লাগলো। আগ-পাছ না ভেবে তিনি তারাতারি সিদ্ধান্ত নিয়ে শৈবানি খাঁকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের বাহিনী নিয়ে দূর্গ থেকে বের হয়ে শৈবানি খাঁর দিকে অগ্রসর হলেন। তবে শৈবানি খাঁর ব্যংগাত্মক আহ্বানে রাগান্বিত হয়ে দূর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এলেও শেষ মুহূর্তে তিনি সজাগ হয়ে উঠলেন।
বাবরের সহায়ের জন্য তুর্কিস্থান থেকে একদল সেনা আসার কথা। সেই সেনাদল তখনও এসে পৌঁছোয়নি। সেজন্য শৈবানি খাঁ যতই প্রলোভিত এবং ব্যংগ করুন না কেন, তুর্কিস্থান থেকে সেনা এসে না পৌঁছোনো পর্যন্ত তিনি শৈবানি খাঁকে আক্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শৈবানি খাঁর ছাউনি থেকে ছয় মাইল দূরে সরেপুলের কাছে জাফরসন নদীর পাড়ে ছাউনি খাড়া করলেন। ছাউনি খাড়া করে তিনি তুর্কিস্থান থেকে সেনা এসে পৌঁছানোর পর শৈবানি খাঁকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ছাউনির চারদিকে গভীর পরিখা খনন করলেন এবং শত্রুসেনার শর থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্য গাছের ডাল-পালা দিয়ে বেড়া দিয়ে ছাউনি সুরক্ষিত করলেন। সর্বপ্রকার প্ৰস্তুতি সম্পূৰ্ণ করে বাবর তুর্কিস্থান থেকে সেনা আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
বাবরের এই সিদ্ধান্তের কথা শৈবানি খাঁর কানেও পৌঁছোলো। বাবরের সহায়ের জন্য তুর্কিস্থান থেকে সেনা আসার কথা শুনে শৈবানি খাঁ বিচলিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু কয়েকদিন পরে তিনি সংবাদ পেলেন যে সদ্য তুর্কিস্থান থেকে সেনা আসার সম্ভাবনা নেই। সংবাদটা পেয়ে তিনি উৎফুল্লিত ও উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু তাঁর সেই উৎসাহ বেশি সময় স্থায়ী হল না।পরের মুহূর্তে তিনি অন্য একটি সংবাদ পেয়ে শংকিত হয়ে উঠলেন। তিনি বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হলেন যে, তর খাঁ নামক একজন বেগ বাবরের সহায়ের জন্য দুই হাজার সেনা নিয়ে সমরকন্দ অভিমুখে যাত্রার আয়োজন সম্পূর্ণ করে তুলেছে এবং সে এক হাজার নতুন সেনা ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনা ভর্তি করতেছে। সেনা ভর্তি করা শেষ হলেই সে শীঘ্র সমরকন্দ এসে পৌঁছোবে।
খবর পেয়ে শৈবানি খাঁ সজাগ হয়ে উঠলেন। যত শীঘ্র সম্ভব তিনি যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তর খাঁ এসে পৌঁছোনোর আগেই কীভাবে যুদ্ধ শেষ করতে পারে সেই চিন্তায় তিনি বিভোর হয়ে পড়লেন। ফলে তাঁর কূটিল মস্তিষ্ক কূটিল চিন্তার আবর্তে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো।
নানান জল্পনা-কল্পনার পর শৈবানি খাঁ একটি কৌশল অবলম্বন করলেন। বাবর যাতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হোন, তারজন্য একদিন গভীর রাতে তিনি একদল বাছা বাছা তীরন্দাজ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে বাবরের ছাউনি ঘেরাও করলেন। তিনি সরাসরিভাবে ছাউনি আক্রমণ না করে রণশিঙা, ঢোল-নাগারার কর্ণভেদি শব্দের মাঝে বাবরের ছাউনির উপরে তীর বর্ষণ করতে লাগলেন। কিন্তু এই আক্রমণের ফলে তিনি বাবর সেনার কোনো ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হলেন না। কারণ শৈবানি খাঁর সেনারা ছাউনির চারদিকে নির্মিত গভীর পরিখা অতিক্রম করতে সক্ষম হল না। অবশ্যে পরিখা অতিক্রম করা তাদের উদ্দেশ্যও ছিল না। পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত অনুসারে শৈবানি খাঁর সেনারা দৌড়াদৌড়ির পাশাপাশি অপমানসূচক গালাগাল দ্বারা বাবর সেনাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলল- লুকিয়ে আছিস কেন? খোলা প্রান্তরে যুদ্ধ করতে ভয় করছিস নাকি? বাবর ভয়ে কাঁপতেছে নাকি? সাহস আছে যদি বেরিয়ে আয়..……….ইত্যাদি ইত্যাদি অশ্রাব্য ভাষা, গালাগাল প্রক্ষেপের সমান্তরালভাবে তীরবর্ষণ করতে লাগলো।
রাতের অন্ধকারে সাধারণ উপদ্রব মানুষের চেতনায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। শত শত অশ্বারোহী ছাউনির চারদিকে চক্রাকারে ঘুরে তীরবর্ষণের পাশাপাশি করা গালাগালের শব্দ তরঙ্গে এক ভয়াবহ আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টি করলো। অশ্বক্ষুরার শব্দ ও হ্রেসা ধ্বনি আকাশ-বাতাস কম্পিত করে তুলল। নৈঃশব্দের মাঝে কোলাহলমুখর বিকট শব্দ তরঙ্গে রাতের গভীরতা ভয়াল করে তুলল। কাঠ ও ডাল-পালা দ্বারা নির্মিত বেড়ায় অবিরাম তীরবর্ষণের ফলে আতঙ্কিত হয়ে উঠল বাবর সেনা। দৌড়াদৌড়ি এবং আতঙ্কের মাঝে সাধারণ অগ্নিশিখাও ভয়ঙ্কর শিখার মতো প্রতীয়মান হয়। সেজন্য শৈবানি খাঁর সেনারা বাবর সেনাদের অধিক আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলার জন্য ঘোড়াদের খাওয়ানোর জন্য জমা করে রাখা শুষ্ক ঘাসের পুঁজির মাঝে অগ্নি সংযোগ করল। লেলিহান শিখা মেলে অগ্নি জ্বলে উঠলো। পরিখা থেকে কিছু দূরে অবস্থিত খালী তাঁবুগুলোতেও অগ্নি সংযোগ করলো শৈবানি খাঁর সেনারা। বিন্দুতে সিন্ধুর মতো রাতের অন্ধকারে সাধারণ অগ্নিশিখাও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে প্রচণ্ড জিহ্বা মেলে দপদপ করে জ্বলতে লাগলো।
বাবর সেনা এই ঝঞ্ঝা সদৃশ আক্রমণে প্রথমাবস্থায় কিছু সন্ত্রাসিত হয়ে উঠেছিলো যদিও পরের পর্যায়ে তারা নিজেদের সামলে নিয়ে প্রত্যাক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলো। বেড়ার ফাঁক দিয়ে প্রতিপক্ষ সেনার উপরে অবিরামভাবে তীর বর্ষণ করতে লাগলো তারা। বাবর সেনারা প্রত্যাক্রমণ করার ফলে শৈবানি খাঁর সেনারা রণে ভঙ্গ দিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের ছাউনির দিকে চলে গেলো।
এই যুদ্ধে কোনো পক্ষকে উৎসাহিত করতে পারল না। কিন্তু শৈবানি খাঁর উদ্দেশ্য সফল হলো। তিনি বাবরকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য এই আক্রমণ চালিয়ে ছিলেন এবং আশা করা মতে তিনি উক্ত যোজনায় সফলও হলেন।
শৈবানি খাঁ রণে ভঙ্গ দিয়ে চলে যাওয়ার পর জ্যোতিষী সাহাবুদ্দিন বাবরের তাঁবুতে এলেন। কয়েকদিন ধরে তিনি বাবরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করতে ছিলেন। বাবরকে উৎসাহিত করতে তিনি বলতে ছিলেন যে, বাবরের নক্ষত্র যোগ ভাল। এ সময়ে আক্রমণ করলে তাঁর জয় অনিবার্য। কিন্তু বাবর তাঁর কথায় কান দিচ্ছিলেন না।
সেজন্য শৈবানি খাঁর সেনা চলে যাওয়ার পর সাহাবুদ্দিন বাবরের তাঁবুতে এসে পুনরায় সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আকাশের দিকে আঙুল তুলে রহস্যময় ভঙ্গীতে অনুচ্চস্বরে বলতে লাগলেন- জাহাপনা, ওই যে দেখুন, আটটা নক্ষত্র একসাথে কীভাবে অবস্থান নিয়েছে। এরকম নক্ষত্র যোগ খুব কমই দেখা যায়। আটটা নক্ষত্র এক সারিতে অবস্থান নিয়ে কীভাবে জ্বলজ্বল করে জ্বলতেছে! এটা আল্লাহর অনুগ্রহের লক্ষণ। নক্ষত্রের অবস্থানে আপনার জয়ের কথা নিশ্চিত করছে। দেরি করাটা মোটেই উচিত হবে না। দুই তিন দিন অপেক্ষা করলে নক্ষত্র কয়টির মাঝ থেকে কয়েকটা নক্ষত্র শত্রুর দিকে চলে যাবে এবং তখন আপনার যুদ্ধ জয় কঠিন হয়ে পড়বে।
সাহাবুদ্দিনের কথায় বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ বেগদের ডেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিলেন। কাশিম বেগ সহরসব্জ থেকে তর খাঁর সেনা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অনুরোধ করতে লাগলেন। কিন্তু বাবর তাঁর কথা ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের মতে অটল হয়ে রইলেন।
পরের দিন সকালে বেগবর্গ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলেন। অর্ধচন্দ্রখচিত পতাকা উড়িয়ে বাবর বাহিনী সরেপুলের দিকে অগ্রসর হলেন। সাহাবুদ্দিনের উদ্দেশ্য সফল হলো। বাবর বাহিনী সরেপুল অভিমুখে যাত্রারম্ভ করার পরে তিনি শৈবানি খাঁর ছাউনি অভিমুখে অতি গোপনে রওয়ানা হয়ে এলেন।
প্রকৃতপক্ষে সাহাবুদ্দিন ছিলো শৈবানি খাঁর গুপ্তচর। বাবর প্রথমবার সমরকন্দ দখল করার সময়ে সাহাবুদ্দিন বাবরেরই অনুগত ছিলো।কিন্তু শৈবানি খাঁ সমরকন্দ দখল করার পর তিনি শৈবানি খাঁর অনুগত হয়ে পড়েছিলেন।
সহানুভূতি, বিশ্বাস, উদারতা বাবরের চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট ছিলো। তাঁর এই উদারতার বিষয়ে সবাই ভালোভাবে অবগত ছিলো। শৈবানি খাঁ নিজেও বাবরের এইসমূহ গুণের বিষয়ে অবগত ছিলেন। সেজন্য শৈবানি খাঁ বাবরের সরল জীবনের মহিমায় উদ্ভাসিত মানবিকতার মাথায় কুঠারাঘাত করতে পশুসূলভ কূটিলতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাবরের সৈন্যবল, গতিবিধি ও মনোভাবের উপরে নজর রাখার জন্য তিনি নিজের বিশ্বাসী কয়েকজন গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন। গুপ্তচর কয়জন শৈবানি খাঁর নির্দেশ মতে বাবরের দরবারে এসে শৈবানি খাঁর অমানবিক অবর্ণনীয় অত্যাচারের কল্পিত কাহিনী বলে বাবরের দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। বাবর সরল বিশ্বাসে তাদের আশ্রয় প্রদান করে বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করেছিলেন। সাহাবুদ্দিন ছিলো সেই গুপুতচরদেরই একজন।
শৈবানি খাঁ এক সপ্তাহের ভেতরে বাবরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে সাহাবুদ্দিনকে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন। শৈবানি খাঁর নির্দেশ মতেই সাহাবুদ্দিন নক্ষত্রের গতিবিধির কল্পিত কাহিনী বলে বাবরকে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে পাঠিয়েছে এবং যোজনা মতেই শৈবানি খাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
এদিকে ঝঞ্ঝা আক্রমণের রাতে শৈবানি খাঁ সারারাত প্রায় জেগেই কাটিয়ে দিয়েছেন। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তিনি আধাঘণ্টার জন্য বিছানায় শোয়ে বিশ্রাম নিলেন। বিশ্রামের পর তিনি বিছানা ত্যাগ করে ঘোড়া ছুটিয়ে টিলার উপরে উঠে এলেন।
টিলার উপর থেকে বাবরের ছাউনি এবং ছাউনিতে যাওয়া রাস্তা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
টিলার উপরে উঠে তিনি প্রথমে সহরসব্জ থেকে আসা রাস্তার দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। কিন্তু সহরসব্জ থেকে আসা রাস্তায় কোন সেনা তাঁর দৃষ্টিগোচর হল না। তিনি গুপ্তচরদের মুখ থেকে জানতে পারছিলেন যে, কাল তাসকন্দের শাসক মহম্মদ খাঁ বাবরকে সহায় করার জন্য তিন চার শত সেনা পাঠিয়েছে। সেনাদল আজ এসে বাবরের সাথে মিলিত হওয়ার কথা।
মোগলদের প্রতি অবশ্যে শৈবানি খাঁর তত ভয় নেই। কারণ মোগল এবং সমরকন্দবাসীর মধ্যে তেমন সদ্ভাব নেই বলে শৈবানি খাঁ ভালোভাবে অবগত। সর্বোপরি আলাদা আলাদা স্থান থেকে আসা মোগলদের সম্বন্ধও খুবই খারাপ বলে তিনি জানতেন। সেজন্য মহম্মদ খাঁর সেনাদের প্রতি তাঁর কোন ভয়ের কারণ ছিলো না।
আসন্ন যুদ্ধ শৈবানি খাঁর ভাগ্য নির্ণায়ক যুদ্ধ। সেজন্য তিনি তাঁর সর্বপ্রকার কৌশল, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং অনুভবের সাহায্যে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছেন। বিগত দিনগুলোতে আসন্ন যুদ্ধের অনুকূল-প্রতিকূল অবস্থা এবং সেনা পরিচালনার কৌশল নিয়ে ব্যস্ত হয়েছিলেন। আক্রমণের সময়ে সূর্য কোনদিকে থাকলে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে থাকবে, কোনদিক থেকে বাতাস বইলে সুবিধা হবে এসব ছোট-খাটো বিষয় নিয়েও তাঁর চিন্তাভাবনার অন্ত ছিলো না।
শৈবানি খাঁ সহরসব্জের রাস্তা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বাবরের ছাউনির দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। দৃশ্য দেখে তিনি উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন। তিনি আশা করামতেই বাবর যুদ্ধের জন্য সেনা সমাবেশ করে থাকা তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। বাবরের অর্দ্ধচন্দ্রখচিত পতাকা বাতাসে উড়তে দেখেই তিনি টিলার উপর থেকে নেমে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে নিজের বাহিনীর কাছে এলেন।
শৈবানি খাঁ নিজের বাহিনীর কাছে এসেই তরবারির ঝনঝন শব্দের মতো তীক্ষ্ণ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলতে লাগলেন- আমার প্রিয় সেনাগণ, বর্তমান একমাত্র সৃষ্টিকর্তার বাহিরে আমাদের ত্রাণকর্তা নেই। আমাদের স্বদেশ এখান থেকে অনেক দূরে। যদি শত্রুসেনা আমাদের পরাজয় করে, তাহলে আমরা একটি প্রাণীও প্রাণ নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে পারব না। সেজন্য জীবনপণ যুদ্ধ করে হলেও শত্রু সেনাদের পরাজিত করতে হবে। আল্লাহর উপরে আমার ভরসা রয়েছে। আমরা সবাই আল্লাহর সেনা। জয় আমাদের হবেই।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব আল্লাহর হাতে। আমরা জীবনপণ করে যুদ্ধ করব। হাজার হাজার সেনার কণ্ঠের সমবেত সুরে আকাশ বাতাস কম্পিত করে তুললো।
পা-য় পা মিলিয়ে হাজার হাজার সেনা পিপীলিকার মতো সারি বেঁধে বাবরের ছাউনি অভিমুখে অগ্রসর হলো।বাহিনীর শৃংখলা দেখে অনুমান হলো যেন হাজার হাজার সেনা এক দেহে বিলীন হয়ে গেছে।
শৈবানি খাঁ বাহিনীর বামদিকে জাফরসন নদী। শৈবানি খাঁ তাঁর সেনাদের গতি কিছু তেরছা করে ডানদিকের সেনাদের দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। ডানদিকে জমি ঢালু ছিলো এবং পেছন দিক থেকে বাতাস বইছিল। ফলে ডানদিকের সেনা নির্দেশ অনুসারে কম সময়ের ভেতরে বামদিকের সেনার চেয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হলো।
শৈবানি খাঁ বাবর সেনাদের চারদিক থেকে ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে ডানদিকের অশ্বারোহী সেনাদের বিজুলি সঞ্চারে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুসারে অশ্বারোহী সেনা এগিয়ে গেলো।
বাবরও প্রতিপক্ষ সেনার গতিবিধি তির্যকভাবে লক্ষ্য করছিলেন। তিনি প্রতিপক্ষ বাহিনীর বামদিকের সেনার চেয়ে ডানদিকের সেনা দ্রুত গতিতে অগ্রসর হতে দেখে শৈবানি খাঁর রণকৌশল অনুধাবন করার জন্য গভীরভাবে মনসংযোগ করলেন। ডানদিকের সেনা বামদিকের সেনার চেয়ে অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর বামদিকের সেনাদের একটু বামদিকে ঘুরতে দেখে প্রতিপক্ষ সেনার রণকৌশল তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন। প্রতিপক্ষ বাহিনী যে তাঁর বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরার জন্য জাল বিস্তার করছে সেই কথা উপলব্ধি করতে বাবরের দেরি হল না। সেনা সমাবেশের অবস্থান প্রত্যক্ষ করে তিনি প্রতিপক্ষ সেনার বিরুদ্ধে সন্মুখ সমরে অবতীর্ণ না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং নিজের বাহিনীর ডানদিকের সেনাদের নদীর দিকে পিঠ দিয়ে অগ্রসর হতে নির্দেশ দিলেন।
শৈবানি খাঁর সেনা দ্রুত এগিয়ে আসছিলো। বাছা বাছা দেহরক্ষী এবং কিছু বিশ্বস্ত সেনা নিয়ে শৈবানি খাঁ অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে উভয় পক্ষের সেনাদের গতিবিধি নিরীক্ষণ করছিলেন। শৈবানি খাঁর সেনা ডের মাইল দূরে থাকতেই বাবরও শৈবানি খাঁর মতো একটু উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর পেছনে উদীয়মান সূর্যের কিরণ জাফরসন নদীর জলে পড়ে ঝলমল করতেছিলো। কিন্তু বাবরের তখন প্রকৃতির সেই অনিন্দ্য সৌন্দর্য সম্ভার উপভোগ করা মন বা মানসিকতা কোনটাই ছিল না। তাঁর হৃদয় তখন আসন্ন যুদ্ধের জয় পরাজয়ের সংঘাতমুখর উত্তেজনায় প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত হচ্ছিলো। অনিশ্চিত ফলাফলের দুঃশ্চিন্তাই তার দেহমনকে তখন পাষাণ পিষ্টের মতো পিষ্ট করছিলো। কে পড়বে জয়মাল্য? বাবর, না শৈবানি খাঁ? এই প্রশ্নের উত্তর ছিলো তখন অনিশ্চয়তার অতল গর্ভে।
বাবরের অশ্বারোহী সেনার চেয়ে শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী সেনা অনেক বেশি ছিলো।
বাবরের বাহিনীতে ফার্সি তরবারি, উঁচু ঢাল এবং বর্শাধারী পদাতিক সেনা সংখ্যা অধিক ছিলো। অবশ্যে শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী সেনার জন্য বাবরের পদাতিক বাহিনীর উঁচু ঢাল, ফার্সি তরবারি এবং বর্শাধারী সেনার ব্যূহভেদ করাটা সহজ কাজ ছিল না। তবে শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী সেনা বাবরের পদাতিক সেনার চেয়ে গতিতে অনেক এগিয়ে এসেছিলো। যারজন্য ব্যূহভেদ করাটা অসম্ভবও ছিল না বাবর সেনার পক্ষে।
বাবরের পদাতিক সেনার আধিক্য দেখে শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী বাহিনী দ্রুত তরবারি সঞ্চালন করে বাবর সেনার তীর, বর্শা, তরবারি থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রেখে বাবরের পদাতিক সেনার মাঝে প্রবেশ করে আঘাত করার জন্য লক্ষ্যস্থির করে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলো।
বাবরের পদাতিক সেনা থেকে আধা মাইল দূরে থাকতেই মাহমুদ সুলতান, জানিবেগ এবং তৈমূর সুলতান শৈবানি খাঁর নির্দেশ মর্মে নিজেদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে বাবর সেনার মধ্যভাগ এবং বামদিকের সেনা এড়িয়ে হঠাৎ ডানদিকে ঘুরে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলো। শৈবানি খাঁ স্বয়ং তীরন্দাজ সেনা নিয়ে প্রতিপক্ষের মধ্যভাগ থেকে দূরে অবস্থান নিয়ে বাবর সেনার বামদিক লক্ষ্য করে দ্রুত এগোতে লাগলেন।
বাবর নিজের বাহিনীর সবচেয়ে সুশিক্ষিত এবং শক্তিশালী সেনা বাহিনীর মধ্যভাগে রেখেছিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করে তিনি মধ্যভাগের সেনা দুই ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগ বামদিকে এবং অন্যভাগ ডানদিকে পাঠাতে বাধ্য হলেন। এই কাজ অতি দ্রুত করতে হলো। শৈবানি খাঁর সেনা মধ্যভাগে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিলো। সেজন্য বাবর সেনা প্রথমে প্রতিপক্ষের মধ্যভাগে আক্রমণ করলো। এভাবে আক্রমণের ফলে তারা কিছু আশাব্যঞ্জক সফলতাও লাভ করলো।
তবে একটু পরেই বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। কে শত্রু, কেন মিত্র উভয় পক্ষের জন্য চিনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়লো। জয় পরাজয় তখন পারদর্শিতার চেয়ে ক্ষিপ্রতার উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়লো। যে পক্ষের আক্রমণের গতি ক্ষিপ্রতর হবে সেই পক্ষেরই জয় সুনিশ্চিত হবে।এ রকম পরিস্থিতি উদ্ভব হলো আকস্মিকভাবে।
বাবর সেনা ক্ষিপ্রতায় শৈবানি খাঁর সেনা থেকে পেছনে পড়ে গেলো। বাবরের অশ্বারোহী সেনা শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী সেনাদের ডানদিক বা বামদিক কোনো দিকেই বাধা দিয়ে রাখতে পারল না। মাহমুদ সুলতান বাবর বাহিনীর পেছন দিকে যেতে সক্ষম হলো। হামজাহ সুলতানের অশ্বারোহীরা বাবরের দুই দিকের বাহিনী পেছনে ফেলে মাহমুদ সুলতানের সাথে মিলিত হলো। পেছন দিক থেকে সংঘটিত অপ্রত্যাশিত আক্রমণের ফলে বাবর বাহিনীর মাঝে হুলস্থূল অবস্থার সৃষ্টি হলো। বাবর নিজের বাছা বাছা সৈন্য একত্রিত করে বিশৃংখল পরিস্থিতি থেকে অগ্নিশিখার মতো বেরিয়ে এসে শৈবানি খাঁর স্তেপীবাসী সেনার ব্যূহ ভেদ করে বিজুলি সঞ্চারে শৈবানি খাঁর দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। বাবর বাহিনীর এই আক্রমণ ছিলো অতি ধ্বংসাত্মক।
বাবরকে শৈবানি খাঁর দিকে ধাবিত হতে দেখে কোপেকবে’র অশ্বারোহী সেনা শৈবানি খাঁকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য বাবর সেনার পশ্চাদধাবন করলো। কিন্তু বাবর সেনার অন্য একটি দল এসে কোপেক বে’র সেনাদের বাধা প্রদান করলো। সেই বাধা অতিক্রম করে কোপেক বে’র সেনা শৈবানি খাঁর নিকটে পৌঁছোনোর আগেই বাবর সেনা শৈবানি খাঁকে ঘিরে ফেললো। তাঁরা শৈবানি খাঁর সুরক্ষার দায়িত্বে অবস্থানরত সেনাদের নিমিষের মধ্যে তছনছ করে ফেললো।
শৈবানি খাঁর দেহরক্ষী সর্দার ভয়ে সন্ত্রাসিত হয়ে শৈবানি খাঁকে কাকূতি-মিনতি করতে লাগলো- জাহাপনা, সময় থাকতে আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া উচিত হবে।
শৈবানি খাঁর মুখমণ্ডল ভয়ে মলিন হয়ে উঠলো। অন্তরাত্মা আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠলো। তাঁর সকল কাঠিন্য ও দৃঢ়তা কর্পূরের মতো উড়ে গেলো। শৈবানি খাঁর নিজেরও পিছিয়ে যেতে ইচ্ছে হলো।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই শৈবানি খাঁ নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি ভাবলেন, এই জটিল পরিস্থিতিতে পিছিয়ে গেলে সেনারা তাদের বাদশাহের পতাকা না দেখে তছনছ হয়ে যাবে। তখন সেটা হবে পরাজয়ের পূর্ব লক্ষণ।
সেজন্য শৈবানি খাঁ ভয়-শংকা ঝেড়ে ফেলে নিজের বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলতে লাগলেন- প্রয়োজন হলে যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দেব, তবুও পিছিয়ে যাবো না। এভাবে বলে তিনি বাছা বাছা সেনাদের নির্মম আদেশ দিলেন- যাও, সবাই একত্রিত হয়ে শত্রুসেনাদের বাধা প্রদান কর। মরলে মরবে, তবুও বাধা দাও।
শৈবানি খাঁর অন্তিম আশা ছিলো, তাঁর একশ জনের ছোট একটা দলের উপরে। শৈবানি খাঁর আদেশ পেয়ে তারা পরাজয়ের সন্মুখীন হয়েও প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে পড়লো এবং মরণপণ করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করতে এগিয়ে এলো। বাবর সেনার আক্রমণের ফলে তাদের কয়েকজন মাত্র সেনা জীবিত রইলো। বাকি সব যুদ্ধে নিহত হলো।
ইতিমধ্যে কোপেক বে’র সেনা এসে সেখানে পৌঁছোল। তার চার শত সেনা বাবর সেনাদের ঘিরে ফেললো। বাবরের অতি তেজী বিশজন অশ্বারোহী কেপেক বে’ সেনার ব্যূহভেদ করে শৈবানি খাঁর দিকে এগিয়ে আসতে সক্ষম হলো। শৈবানি খাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা একদল সেনা ভয়ে শৈবানি খাঁকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে পিছিয়ে গেলো। শৈবানি খাঁ মরণপণ করে নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে শর নিক্ষেপ করতে লাগলো। সেই শরে কারো কোনো ক্ষয়ক্ষতি করতে না পাড়লেও কোপেক বে’ বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি করলো। তারা সাহস সঞ্চয় করে বাবর সেনার উপরে ঝাঁপিয়ে পরে বাবর সেনাদের একজন একজন করে হত্যা করতে লাগলো।
মুহূর্তের ভেতরে বাবরের পদাতিক সেনা বিশৃংখল হয়ে পড়লো।বাবরের আদেশ পালন করার মানসিক স্থিতিও হারিয়ে ফেললো তারা। ফলে তারা প্রাণের ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে লাগলো। পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠাতে অনেকে আবার আরোহীবিহীন ঘোড়া নিয়ে শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করতে লাগলো। তাসকন্দ থেকে আসা মোগল সেনারা এই ক্ষেত্রে আগভাগ নিলো। কিছুসংখ্যক অশ্বারোহী সেনা যুদ্ধের বিশৃংখল পরিস্থিতিতে শত্রু-মিত্রের চিহ্ন-পরিচয় হারিয়ে নিজের দলের সেনাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। অনেকে আন্দিজানী এবং সমরকন্দী সেনাদের থেকে ঘোড়া কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আত্মঘাতী সংগ্রামেও লিপ্ত হলো। অনেকে আবার নিজের সেনাদল থেকে ঘোড়া কেড়ে নিয়ে শৈাবনি খাঁর দলে যোগদান করতে লাগলো।
ফলে বাবরের সেনাসংখ্যা কমে যেতে লাগলো। অল্পসংখ্যক সেনার মাঝে বাবরকে অরক্ষিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহমুদ সুলতানের সেনার অগ্রণীভাগ বাবরের দিকে ধেয়ে এলো।
পরিস্থিতি ঘোরতর দেখে বাবর নিজের সেনা নিয়ে নদীর দিকে নেমে যেতে লাগলেন।
একবার সাপে কামড়ালে তখন কেঁচো দেখেই ভয় করে। শৈবানি খাঁ দূর থেকে বাবরের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। বাবরকে অরক্ষিত অবস্থায় নদীর দিকে নেমে যেতে দেখে তিনি সজাগ হয়ে উঠলেন। বাবর কোনো নতুন কৌশল প্রয়োগ করার জন্যই নদীর দিকে নেমে যাচ্ছে ভেবে তিনি নিজের সেনাদের বাবরের পশ্চাদ্ধাবন করতে নির্দেশ দিলেন।
প্রকৃতপক্ষে সেটা বাবরের কোনো রণকৌশল ছিল না। যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠায় তিনি আত্মরক্ষার জন্য পলায়ন করছিলেন।
শত্রুসেনা এগিয়ে আসতে দেখে বাবরের অশ্বারোহী কয়েকজনে বাবরকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য নদীর পাড়ে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।
নদীতে স্বল্প জল ছিলো। বাবর ঘোড়া জলে নামিয়ে যতদূর সম্ভব দ্রুত সেপাড় অভিমুখে যেতে লাগলেন।
বাবর যে প্রকৃতার্থে পালিয়ে যাচ্ছে এ কথা উপলব্ধি করতে শৈবানি খাঁর দেরি হল না। ফলে তিনি উল্লসিত হয়ে উঠলেন। দুই হাত আকাশের দিকে তুলে তিনি আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলতে লাগলেন- তোমাকে ধন্যবাদ, হে আমার আল্লাহ। তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। এভাবে বলেই তিনি নিজের দেহরক্ষী সেনাদের উদ্দেশ্য করে আদেশ দিলেন- যাও, তারাতারি যাও। সেনাদের জানিয়ে দাও, বাবরের মাথা যে এনে দিতে পারবে তাকে বাবরের মাথার সমান ওজনে স্বর্ণ প্রদান করা হবে।
দেহরক্ষী কয়জন আদেশ পেয়ে বাবরের দিকে ধেয়ে গেলো।
শৈবানি খাঁ আনন্দে উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠলেন। মুহূর্তে মুহূর্তে তাঁর মনের স্থিতি পরিবর্তন হতে লাগলো। সেনারা কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পরে তিনি চিল্লায়ে চিল্লায়ে বলতে লাগলেন- না না, আমার প্রিয় সেনাবর্গ। বাবরকে জীবিত ধরে আন। যে বাবরকে জীবিত অবস্থায় ধরে আনতে পারবে তাকে বাবরের শরীরের উচ্চতা বরাবর স্বর্ণের পুঁজি প্রদান করা হবে। যাও, সত্বর যাও। বাবরকে আমার পা-র তলে দেখতে চাই। এভাবে বলেই শৈবানি খাঁ আকাশের দিকে দুই হাত তুলে মাটির মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আল্লাহর কাছে কি বলে প্রার্থনা করবেন সেই কথাও ভুলে গেলেন তিনি। আনন্দে তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। মুচকি হাসি হেসে তিনি দুই হাত তলের দিকে নামিয়ে এনে হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে ফেললেন।
বাবর নদী পার হওয়ার পর তাঁকে সুরক্ষা প্রদান করা সেনারাও নদী পার হলো। নদী পার হয়ে তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে ঘোড়া ছুটালো। শৈবানি খাঁর কয়েকজন সেনা তাদের পেছনে পেছনে ধেয়ে এলো।
বাবর সামান্য কয়েকজন সেনা নিয়ে দূর্গে ফিরে এলেন। ইতিমধ্যে বাবরের অধিকসংখ্যক সেনা শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করেছিলো। সেজন্য বাবর অল্প সংখ্যক সেনা নিয়ে শৈবানি খাঁর বৃহৎ সংখ্যক সেনার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে সরাসরি দূর্গের ভেতর প্রবেশ করে দূর্গদ্বার বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন।
বাবরের নির্দেশে দূর্গদ্বার বন্ধ হয়ে গেলো। দূর্গদ্বার বন্ধ হওয়ায় তাঁদের পেছন পেছন ধেয়ে আসা সেনারা থমকে দাঁড়িয়ে গেলো।
কিছুক্ষণ পরে শৈবানি খাঁ সসৈন্যে এসে দূর্গদ্বারে উপস্থিত হলেন। তবে তিনি দূর্গে প্রবেশর চেষ্টা করলেন না। তিনি বাবরকে হাতে না মেরে ভাতে মারার সিদ্ধান্ত নিলেন।
সিদ্ধান্ত মর্মে শৈবানি খাঁ দূর্গ অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দূর্গের চারদিকে ছাউনি নির্মাণ করলেন। দূর্গের ভেতর থেকে যাতে একটি প্রাণীও বের হতে না পারে তার প্রতি দৃষ্টি রাখার জন্য তিনি সেনাদের নির্দেশ দিলেন।
সমরকন্দবাসীসহ বাবর দূর্গের ভেতরে বন্দি হয়ে পড়লেন। সরেপুল যুদ্ধের পরাজয়ে বাবরের ভাগ্যাকাশ পুনরায় দুর্যোগের কালো মেঘে ছেয়ে ফেললো। দূর্গবন্দি হয়ে তিনি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ালেন।
* * *
সরেপুল যুদ্ধের সাত মাস পরের কথা।
বাবর ‘উলুগ বেগ’ মাদ্রাসার ছাদে বসে সহরের পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করছিলেন। হঠাৎ আস্তাবলের দিকে চোখ গেলো বাবরের। যে আস্তাবলে শত শত ঘোড়া বাঁধা ছিলো, সেখানে খুব বেশি দশটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর চোখে পড়ল। দৃশ্যটা দেখে বাবরের অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠলো।
সরেপুল যুদ্ধের পরে প্রায় সাত মাস কাল মহাকালের বুকে বিলীন হয়ে গেছে। এই সাতমাস কাল যুদ্ধবন্দি হয়ে দুর্বিসহ জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে দূৰ্গের ভেতরে। জনজীবন বিপর্যস্ত– দুর্ভিক্ষের তাণ্ডব থাবা মেলে ধরেছে চারদিকে। মানুষগুলো ক্ষুধায় ছট্ফট্ করে মরতেছে। এমনকি রাজকীয় সদস্যরাও ঘোড়ার মাংস খেয়ে জীবন ধারণ করতে হচ্ছে। দুর্ভিক্ষ এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেছে যে ঘোড়ার দানা-পানী যোগার করাও বর্তমান কঠিন হয়ে পরেছে।
বাবর মাদ্রাসার ছাদ থেকে তাহিরজান এবং হলুদ গোঁফের মমতকে আস্তাবলে কোনো কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করলেন।
তাহিরজান সাহসী যুবক। তাহিরজানই বর্তমান বাবরের দেহরক্ষীদের সর্দার। তাহিরজান সাহসী ও বিশ্বাসী। বাবরের প্রতি তার অগাধ ভক্তি।(তাহিরজানের বিষয়ে সময়ে কিছু কথা বলার প্রতিশ্রুতি রইলো পাঠকের কাছে। খুবই মর্মান্তিক তাহিরজানের সেই বিয়োগাত্মক কাহিনী।)
সরেপুলের যুদ্ধের সময়ে বাবরের বাছা বাছা সেনাদের ভেতর তাহিরজানই সবার থেকে বেশি সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করে ছিলো। যে কয়জন সেনা নিজের জীবন বিপন্ন করে বাবরকে জাফরসন নদী পার হতে সহায় করেছিলো তাহিরজান ছিলো তাদের অন্যতম। তাহিরের স্ত্রী রাবিয়া বর্তমান কুতলুগ নিগার বেগমের পরিচারিকা। নিজের নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা এবং কর্মদক্ষতা দিয়ে সে অল্পদিনের ভেতরেই কুতলুগ নিগার বেগমের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠেছে। দুর্ভিক্ষের ফলে অন্নাভাবে কষ্ট পাওয়া দেখে কুতলুগ নিগার বেগম বর্তমান তাকে নিজের সাথে রেখেছেন। রাবিয়ার অতীত ইতিহাস বড় করুণ। দুর্ভাগ্য তাকে আখসি থেকে সমরকন্দ নিয়ে এসেছে। তাহিরজানের বিষয়ে বলার সময়ে রাবিয়ার কথাও প্রকাশ হয়ে পড়বে ঘটনা স্রোতে।
সময় পার হওয়ার সাথে সাথে দুর্ভিক্ষের প্রকোপও বেড়ে যেতে লাগলো। গরিবের কুটির থেকে শুরু হয়ে ক্রমান্বয়ে সেনা, বেগ এবং পরে স্বয়ং বাবরের প্রাসাদেও দুর্ভিক্ষ মুখব্যদন করে এগিয়ে এলো।
বাবর স্মরণ করতে যত্নপর হলেন তিনি কতদিন ধরে রুটি খাননি। আঙুলের মাথায় গোনে গোনে তিনি হিসাব করে দেখলেন। আজ থেকে দশদিন আগে তিনি রুটি খেয়েছিলেন। আটা কবেই শেষ হয়ে গেছে। কোথাও আটা পাওয়া যাচ্ছেনা। এই কয়দিন তাঁকে সোনার থালায় কিসমিস ও সরবত দেওয়া হয়েছে। রাতে দেওয়া হয়েছে উটের শুষ্ক মাংস। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। এক সময়ের বাদশাহ বর্তমান এক টুকরো রুটির জন্য লালায়িত।
এক ঝুড়ি সোনার চেয়েও এখন একটি রুটির মূল্য বেশি। যেখানে রুটি নেই, সেখানে সোনার থালার কী প্রয়োজন? মনের ক্ষুধার চেয়ে দেহের ক্ষুধার প্রয়োজন বেশি। দেহের ক্ষুধা নিবারণ হলেই তো মনের ক্ষুধা উপলব্ধি হয়। সোনা মানুষের দেহের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না– মনের ক্ষুধা শুধু নিবারণ করতে পারে সোনা। বাবরের ভাবনায় সোনার ভ্রমাত্মক প্রয়োজনের বিষয়ে এক ফাকি কবিতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই সংকটময় ও জটিল হয়ে উঠেছিলো যে কবিতা লেখার অবসর বা মন মানসিকতা কোনোটাই তখন ছিল না বাবরের। কবিতাও মনের খোরাক- কবিতারও দেহের ক্ষুধা নিবারণ করার ক্ষমতা নাই। বাবরের বর্তমান দেহের ক্ষুধা নিবারণ করা প্রয়োজন। মনের খোরাকের প্রয়োজন নেই এখন তাঁর।
কয়েকদিন আগে ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরা কলিজার টুকরো ফখরুন্নিসাকে নিজ হাতে বাবর মাটি চাপা দিয়ে শোইয়ে রেখে এসেছেন। কিন্তু এখনও সেই ফুলের মতো কোমল নিষ্পাপ ফখরুন্নিসার শুকনো মুখের প্রতিচ্ছবি অবসর সময়ে তাঁর চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়ায়। সেই শুকনো মুখের প্রতিচ্ছবি তিনি আজ পর্যন্ত ভুলতে পারেন নি। ফখরুন্নিসার মুখের স্মৃতি পর্দায় ভেসে উঠলেই তিনি তাঁর কলিজায় কাঁটার খোঁচা অনুভব করেন- তখন তাঁর হৃদয় হাহাকার করে উঠে।
সাত মাসের শিশু ফখরুন্নিসা। সেদিন ক্ষুধা পিপাসায় খুবই কাতর হয়ে পড়েছিলো। তার জ্ঞান না থাকলেও উপলব্ধি নিশ্চয় ছিলো। উপলব্ধি তাকে জানিয়ে দিয়েছিলো দেহের ক্ষুধার কথা। ক্ষুধার তাড়নায় সে নিরবচ্ছিন্নভাবে কেঁদে চলছিলো। এদিকে অনাহার অর্দ্ধাহারে থেকে আয়েশা বেগমের বুকে দুধের লেশমাত্রও ছিল না।মুখে স্তন গুঁজে দিয়ে তিনি শুধু মন ভোলানোর চেষ্টা করছিলেন ক্রন্দনরত সন্তানের।
মন ভুলিয়ে মনের খোরাক যোগানো সম্ভব হলেও দেহের ক্ষুধা নিবারণ করা সম্ভব নয়। সেজন্য বাবর দৃশ্যটা দেখে বিচলিত হয়ে একটি দুগ্ধবতী গাভী যোগার করে এনেছিলেন। গাভীটা যেখান থেকে এনেছিলেন সেখানে কলেরা মহামারি রূপ ধারণ করেছিলো। ফলে সেই গাভীর দুধ খেয়ে ফখরুন্নিসারও একদিন কলেরা হলো। দুই তিনদিন রোগ ভোগের পরে বাবরের চোখের সন্মুখেই ফখরুন্নিসা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো। সন্তানের শোকে উন্মাদপ্রায় হয়ে পড়েছিলেন আয়েশা বেগম। নিয়তির বিধান যতই নিষ্ঠুর এবং অপ্রিয় হোক না কেন, তা মেনে নেওয়ার বাইরে অন্য কোনো উপায় থাকেনা। যে যায় সে কখনো ফিরে আসেনা। কাফনাবৃত ফখরুন্নিসার প্রাণহীন দেহ বাবর নিজে দাফন করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। চোখের জল মুছে তিনি আপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন- কলেরা আমাকে মারলে না কেন? আমি মরলেই তো সকল দুঃখ-কষ্টের অবসান হতো। এ ভাবে কেঁদে কেঁদে আক্ষেপ করে তিনি মৃত সন্তানের অধরে চুমা খেয়েছিলেন।
চোখের জল মুছে বাবর কবর থেকে উঠে- তাঁর গর্ব–তাঁর বিজয়ের প্রতীক ফখরুন্নিসাকে মাটি চাপা দিয়েছিলেন। তাঁর তখন অনুভব হয়েছিলো, তিনি যেন নিজের কলিজার টুকরোকে মাটি চাপা দিয়েছিলেন সেদিন।
দূর্গের অভ্যন্তরে দুঃখ-দৈন্যতা যত বাড়ছিলো দূর্গের বাইরে অবস্থানরত শত্রুসেনা তত উল্লসিত হয়ে আনন্দ উৎসব উদযাপন করছিলো।
সাত মাস পর্যন্ত বাবর অসীম ধৈর্য ধারণ করে হিরাতের শাসক খুড়া হোসেন বায়কারা এবং তাসকন্দের শাসক মামা মাহমুদ খাঁর তরফ থেকে সহায় পাওয়ার আশায় দিন যাপন করছিলেন। বাবর তাঁদের নিকট সহায় প্রার্থনা করে পত্রও প্রেরণ করেছিলেন। তবে সকল আশা ভরসা অর্থহীন হয়ে পড়লো। কেউ তাঁকে সহায় করতে এগিয়ে এলেন না। সেজন্য তাঁর নিজের উপরে ভরসার বাহিরে অন্য উপায় ছিল না।
দূর্গের অভ্যন্তরে সংঘটিত দুর্ঘটনার খবর শৈবানি খাঁ নিয়মিতভাবে পাচ্ছিলেন। ফখরুন্নিসার মৃত্যুর খবর পেয়ে শৈবানি খাঁ আনন্দোৎসব পর্যন্ত পালন করছিলেন। বাবরের প্রতিটা দুঃখপ্রদ্ ঘটনাই শৈবানি খাঁর অন্তরে আনন্দের জোয়ার তুলছিলো এবং আনন্দ উল্লাসে তিনি প্রেতের মতো নৃত্য করছিলেন। শত্রু পক্ষের দুর্দশাই প্রতিপক্ষের আনন্দ বর্দ্ধন করে। এ কেমন এক অমানবীয় প্রহসন!
বাবর হোসেন বায়কারা এবং মাহমুদ সুলতানের সহায় পাওয়ার আশা নেই বলে জানতে পেরে শৈবানি খাঁ পাশবিক উল্লাসে নেচে উঠলেন। প্রত্যেক রাতে তাঁর সেনারা ঢোল নাগারা বাজিয়ে সমরকন্দবাসীদের আতঙ্কিত করে তুলতে লাগলো। শৈবানি খাঁর ঘোষকরা দূর্গ দেয়ালের উপরে উঠে সমরকন্দবাসীদের শৈবানি খাঁর সাথে হাত মেলানোর জন্য আহ্বান জানাতে লাগলো। শৈবানি খাঁর সাথে হাত মেলালে পেট পুরে খেতে দেয়ারও প্রলোভন দিতে লাগলো। দুই বেলা দুই মুঠো পেট পুরে খাওয়ার আশায় নিঃসন্দেহে বাবর পক্ষের অনেক বেগ এবং সেনা লুকিয়ে লুকিয়ে শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করতে লাগলো।
একদিন বাবরের একজন দেহরক্ষী সর্দার মনে মনে পালিয়ে গিয়ে শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করলো। কথাটা শুনে বাবর দুঃখে ম্রিয়মান হয়ে পড়লেন। তিনি এখন কার উপরে বিশ্বাস করবেন? কার উপরে তিনি ভরসা করবেন এই দুর্দিনের সময়ে? কথাটা ভাবতেই তাঁর তাহিরজানের কথা মনে পড়লো। তাহিরজানের আনুগত্য এবং বিশ্বস্ততার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তিনি তাহিরজানকে বেগ-এর মর্যদা প্রদান করেছেন। তাহির বেগের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে বাবর তাঁকে ডেকে পাঠালেন।
তাহিরজান বাবরের নিকট আসার পরে বাবর ভূমিকা দিয়ে শুরু করলেন- তাহির বেগ, আরবি নীতি কথায় আছে, পৃথিবী তোর দিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শ করার আগেই তুই পৃথিবীর দিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন কর। কলেরা আমাকে মেরে নিলে সবারই মঙ্গল হতো। কিন্তু কলেরা আমাকে মারল না।
খোদা আপনাকে সুরক্ষিত রাখুন, জাহাপনা। বর্তমান একমাত্র আপনিই তো আমাদের আশা ভরসার স্থল। আপনার বাহিরে এখন আমাদের আশা-ভরসার স্থল আর কে আছে?
তাহির বেগ কথা কয়টি খুব কষ্ট করে উচ্চারণ করলো। কারণ খাদ্যাভাবে সে এমন শুকিয়ে গিয়েছিলো যে, তার স্কন্ধের হাড্ডি যেন আচকান ভেদ করে বেরিয়ে আসার জন্য বিদ্রোহ করতেছিলো।
সময় পার হয়ে যাইতেছে, তাহির বেগ। বাবর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন- গতকাল আমি এই বয়েত(পংক্তি)টা লিখেছি-
দাবি ধমক দিবেনা যে পৃথিবীতে বাবর জট লাগিয়েছে
এই ভাবুক পৃথিবীতে কষ্টের বাইরে আর কী বাকি রয়েছে?
তাহির বেগ মাথা নুইয়ে বললো- এটা সত্যি, জাহাপনা। বর্তমান আমাদের জীবনে দুঃখের বাইরে অন্য কিছুই নেই। কিন্তু জাহাপনা, মাসের পনের দিন আন্ধার এবং পনের দিন জ্যোৎস্না থাকে। এখনও আমাদের বাহুতে শক্তি রযেছে এবং কোমরে তরবারি ঝুলতেছে, জাহাপনা।
তাহলে এখন কী করতে পারি? আমাদের এখন চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সময় সমাগত। এখন দেহের সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে যাওয়ার বাহিরে অন্য কোন উপায় নেই। এখন পর্যন্ত যদি আমাদের জীবনের অন্তিম ক্ষণ উপস্থিত হয় নাই, তাহলে আমরা শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে বেরিয়ে যেতে নিশ্চয় সক্ষম হবো। যদি আমাদের অন্তিম ক্ষণ সমাগত তাহলে তরবারি নিয়েই মরবো।
আল্লাহর ইচ্ছায় নিশ্চয় আমরা ব্যূহ ভেদ করে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হবো, জাহাপনা।
আমাদের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে একমাত্র কাশিম বেগই অবগত। তুমিও এটা গোপনে রেখো। এভাবে বলেই বাবর আবেগিকভাবে বললেন- প্রস্তুত হও দোস্ত, প্রস্তুত হও।
বাবরের ভাগ্যে প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু লেখা ছিল না। সেদিন রাতে অবরোধ ভাঙার বিষয়ে কাশিম বেগের সাথে আলোচনা চলে থাকতে কোন রকমের অগ্রিম সঙ্কেত না দিয়েই মাতৃ কুতলুগ নিগার বেগম এবং মাতামহী এহসান দৌলত বেগম কক্ষের ভেতর প্রবেশ করলেন। এহসান দৌলত বেগম কোন রকমের ভূমিকা না করে সরাসরি বাবরকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শৈবানি খাঁ সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়েছেন, বাবরজান।
সন্ধি! শব্দটা বাবরের নিকট মুক্তির মতই মধুর লাগলো। কিন্তু শৈবানি খাঁর কথা শুনে তাঁর মনে সন্দেহ ঘণীভূত হয়ে উঠলো। শৈবানি খাঁ শান্তিকামী এবং মুক্তিদাতা হতে পারবে কী? বাবর অবিশ্বাসের ভাবে প্রথমে মাতামহী এবং পরে মাতৃর দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন।
এহসান দৌলত বেগমের হাতে একটি রাজকীয় মোহরযুক্ত লেফাফা ছিলো। তিনি লেফাফাটা বাবরকে দেখিয়ে বললেন- এটা শৈবানি খাঁর পইগাম।
কে আনল? বাবর শংকাযুক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন।
একজন খোদার দরবেশ। দরবেশ জ্ঞানী এবং খাজা ইয়াহিয়ার ভক্ত।
বাবর লেফাফার দিকে কৌতূহল মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন- আপনাকে উদ্দেশ্য করে কিছু লিখেছে নাকি?
না, এহসান দৌলত বেগম লেফাফাটা বাবরের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন- এটা খানজাদা বেগমের নামে পাঠিয়েছেন।
আচরিত কথা! বাবর অবজ্ঞা সহকারে লেফাফাটা হাতে নিয়ে বিতৃষ্ণা মিশ্রিত দৃষ্টিতে লেফাফাটার দিকে চেয়ে রইলেন।
আমি যা বলতে চাইছি, সেটা আমার জন্য বলাটা অবশ্যে উচিত নয়। এহসান দৌলত বেগম এভাবে বলেই কয়েকটা মুহূর্ত মনে মনে থেকে আবার বললেন- কিন্তু বলাটা জরুরি বলেই বলছি। শৈবানি খাঁ খানজাদা বেগমের রূপগুণের কথা অবগত হয়েই এই পত্রটা পাঠিয়েছেন।
বাবর বিতৃষ্ণা সহকারে লেফাফাটা খুলে পত্রটি বের করে অবজ্ঞা মিশ্রিত দৃষ্টিতে পত্রটির দিকে তাকিয়ে মাতৃ এবং মাতামহীর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। পরে পত্রের ভাঁজ খুলে খানজাদা বেগমের নিকট প্রেম নিবেদন করে প্রেরণ করা পত্রটির প্রথম পংক্তি পড়েই ঘৃণায় তাঁর নাক কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। তিনি প্রচণ্ড ক্ষোভে পত্রটি মেঝেতে ছোঁড়ে ফেলে বলে উঠলেন- এ কখনও সম্ভব নয়। আমি বেঁচে থাকতে আপাজানকে কখনও একজন ঠগ, প্রবঞ্চকের অংকশায়িনী হতে দিব না। এটা আমার প্রতিজ্ঞা।
বাবর কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও নিজের প্রতিজ্ঞা রাখতে পারলেন না। বাবরের সব বাধা নিষেধ লঙ্ঘন করে খানজাদা বেগম নিজে গিয়ে শৈবানি খাঁর তাঁবুতে উপস্থিত হলেন। কারণ তিনি জানতেন যে তিনি যদি শৈবানি খাঁর প্রস্তাবে সম্মত না হোন, আহম্মদ তনয়ালের মতো শৈবানি খাঁও বাবরের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠবেন। এই দুর্দিনের সময়ে বাবর কখনও তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে সক্ষম হবেন না। বাবরকে হত্যা করে হলেও শৈবানি খাঁ তাঁকে অংকশায়িনী করবেনই। বাধা দিতে গিয়ে বাবরকে শুধু অকালে প্রাণ বলি দিতে হবে। সেজন্য তিনি বাবরকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই বাবরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও শৈবানি খাঁর ছাউনিতে চলে গেলেন।
খানজাদা বেগমের সিদ্ধান্তে বাবর গ্লানি, ক্ষোভ, আক্রোশ, বিতৃষ্ণায় উন্মাদ প্রায় হয়ে উঠলেন। নিরুদ্ধ যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে তিনি দূর্গদ্বার খুলে দিতে নির্দেশ দিলেন- খুলে দাও দূর্গদ্বার। এই পৃথিবীতে কেউ আমার আপন নয়। আমার পক্ষে এখন কাউকে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। এতো অনুরোধের পরেও আপাজান আমার মান-সন্মান ভূলুণ্ঠিত করে শত্রুর অংকশায়িনী হতে চলে গেলেন। এই পৃথিবীতে কেউ আমার বেদনা উপলব্ধি করতে পারল না। আমি মুহূর্তের জন্যও সমরকন্দে থাকবো না। খুলে দাও দূর্গদ্বার।
বাবরের নির্দেশে দূর্গদ্বার খুলে দেওয়া হলো। বাবর তাঁর বিশ্বাসী বেগ, সৈন্য-সামন্ত, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে খোলা দ্বার দিয়ে দূর্গ থেকে বেরিয়ে এলেন। অনেকেই পরে বলা-কওয়া করছিলো যে, শৈবানি খাঁ নিজেই বাবরকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সুযোগ করে দিয়েছিলেন। যাই হোক না কেন, বাবর নিরাপদেই মাহমুদ খাঁর নিকট আসতে সক্ষম হলেন।
তাসকন্দ আসার পরে বাবর মামার কাছ থেকে উষ্ম সম্বর্ধনা পাওয়ার পরিবর্তে অবজ্ঞাপূর্ণ ব্যবহার পেলেন। তবুও লজ্জা, অপমান অগ্রাহ্য করে তিনি মামার নিকট সৈন্য সাহায্য প্রার্থনা করলেন। তিনি মামাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে, শৈবানি খাঁ একজন নিষ্ঠুর ও লোভী শাসক। তদুপরি সে মোগলের ঘোর শত্রু। সমগ্র মাউরা উন্নহর থেকে মোগল শাসন উৎখাত করাটাই বর্তমান তাঁর প্রধান ব্রত। সেজন্য অতিসত্বর তাঁকে দমন না করলে অদূর ভবিষ্যতে তাসকন্দের উপরেও আক্রমণ চালানোর সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। শৈবানি খাঁ অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠার আগেই মোগলদের সুরক্ষার জন্যই তাঁকে দমন করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
কিন্তু মাহমুদ খাঁ বাবরের প্রস্তাবে মোটেই গুরুত্ব দিলেন না। তিনি তলে তলে শৈবানি খাঁর সাথে বন্ধুত্ব করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
মাহমুদ খাঁর দ্বারা প্রত্যাখাত হয়ে বাবর লজ্জা, অপমানে জর্জরিত হয়ে পড়লেন। তাঁর মনে জেগে উঠলো অসহ্যকর ব্যথার অনুভূতি। নিরুদ্ধ অভিমানে তিনি উরাতেপা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
বাবর একদিন আয়েশা বেগমের নিকটে এসে উরাতেপা যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। আয়েশার বড়বোন রেজিয়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আয়েশা বেগম কোনো মন্তব্য করার আগেই রেজিয়া বেগম প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে হাত নাচিয়ে নাচিয়ে বললেন- আপনারা যেতে চান যদি যেতে পারেন; কিন্তু আয়েশাকে আপনাদের সাথে যেতে দেব না। আয়েশাকে জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এর স্বাস্থ্যও এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে ঠিক হয়ে উঠেনি। সেজন্য আমি ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে আয়েশাকে উরাতেপা যেতে দেব না। বেচেরী আর কত দুর্ভোগ সহ্য করবে?
কিন্তু কী করব? আমাদের কপালে যে দুভোর্গই লেখা রয়েছে।
ক্ষমা করবেন, মির্জা। মানুষের ভাগ্য কপালে লেখা থাকে না- লেখা থাকে মস্তিষ্কে।
তবুও একই নৌকার যাত্রীর ভাগ্য তো একই রকম হয়ে থাকে, না কী বলেন?
ভালোই বলছেন, মির্জা। একই ভাগ্য! আয়েশার এই দুর্ভাগ্যের জন্য আয়েশা দায়ী নয়। দায়ী আপনি। আয়েশার এই দুর্ভাগ্য আপনারই অবদান। অনাহার, অর্দ্ধাহারে ছটফটিয়ে আয়েশা শুধু হাড় কয়টা নিয়ে এখানে এসেছে। এখানে আসার পরে স্বাস্থ্য কিছু উন্নত হয়েছে যদিও সম্পূর্ণরূপে ঠিক হয়ে উঠেনি। স্বাস্থ্য ঠিক হওয়ার পূর্বেই আপনি আবার দুর্ভোগের পথে পা দিতে বলছেন। এটা কী উচিত হচ্ছে?
রেজিয়া বেগমের মন্তব্যে বাবর মর্মাহত হলো। শাওন মাসের শস্যক্ষেত্রের মতো তাঁর মন সিক্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু রেজিয়া বেগমের সাথে অধিক যুক্তি-তর্ক করতে তাঁর প্রবৃত্তি হল না। সেজন্য আয়েশা বেগমকে তাসকন্দে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি বললেন- আচ্ছা, আপনার কথাই মানলাম। আয়েশা বর্তমান এখানেই থাকুক। কখনও যদি আমাদের ভাগ্যাকাশ থেকে দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ ঠেলে পাঠাতে সক্ষম হই, তখন আমার সাথে থাকতে নিয়ে যাব। এখন নিশ্চয় আপত্তি নেই? শেষের বাক্যটি তিনি আয়েশা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
এতক্ষণ আয়েশা বেগম ভগ্নী এবং বাবরের যুক্তিতর্ক শুনছিলেন। বাবরের সিদ্ধান্তের কথা শুনে তিনি নির্বিকারভাবে বললেন- আপনি আমাকে এখানে কয়েকদিনের জন্য রেখে যাওয়ার কথা বলছেন, তার থেকে বরং আপনি আমাকে চিরদিনের জন্য আজাদ করে দিয়ে যান।
আয়েশা বেগমের কথায় বাবর অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। রাগ, ক্ষোভ, অভিমানের পরিবর্তে তাঁর হৃদয়ে বিতৃষ্ণা ধূমায়িত হয়ে উঠলো। প্রচণ্ড বিতৃষ্ণার উন্মত্ত মাতাল প্রবাহে তাঁর চিত্তলোকের তটভূমিতে আঘাত করে তাঁকে অস্থির করে তুললো। আয়েশা তাঁর নিকট থেকে আজাদী চাইছে? এতদিনের দাম্পত্য প্রেমের উচ্ছ্বসিত প্রবাহ সে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিতে চাইছে? তাঁর প্রতি আয়েশার ভালোবাসা এত ঠুনকো নাকি? যারজন্য সে দুর্ভাগ্যের সমগ্র দোষ তাঁর উপরে ঝেড়ে দিয়ে তাঁর কাছ থেকে আজাদী চাইছে? আবার ভাবলেন, ঠিকই তো, আয়েশাকে তাঁর জন্যেই তো দুর্ভোগ সইতে হচ্ছে। সে যাতে আরও দুর্ভোগ সহ্য করতে না হয় তার ব্যবস্থাই তিনি করবেন। আয়েশা যা চাইছে, সেটাই করবেন তিনি। আজাদী দিবেন….চিরদিনের জন্য আজাদী.…….
এই সব কথা মনে মনে ভেবে বাবর শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বললেন- তারমানে, আপনি আমার নিকট থেকে তালাক(বিচ্ছেদ)খুঁজছেন। ঠিক আছে, আপনি খুঁজা মতেই কাজ করা হবে। আজ থেকে আপনার পৃষ্ঠদেশ আমার মাতৃর পৃষ্ঠদেশ। আমি আপনাকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ করলাম। ….তালাক! তালাক!! তালাক!!!
বাবর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তিনবার তালাক শব্দ উচ্চারণ করে এক মুহূর্তও সেখানে বিলম্ব না করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন।
এভাবেই বাবরের প্রথম প্রেমের সমাধি হলো।
পরের দিন বিশ্বাসী বেগ এবং আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বাবর উরাতেপা অভিমুখে ভাগ্যের সন্ধানে রওয়ানা হলেন।
উরাতেপা এসে বাবর দহক নামক একটি গ্রামে তাঁবু খাড়া করলেন। গ্রামের লোকগুলো উষ্ম সম্বর্ধনা জানিয়ে সন্মান সহকারে বাবরকে গ্রহণ করলো। গ্রামের লোকদের আত্মিক আতিথ্যে বাবর মুগ্ধ হলেন। সুখ স্বচ্ছন্দে বাবরের কর্মহীন দিনগুলো অতিবাহিত হতে লাগলো। কিন্তু কয়েক দিনের ভেতরে তাঁর কর্মহীন নিরলস জীবন একগুঁয়ে হয়ে উঠলো। কর্মবিমুখ বৈচিত্রহীন জীবনের প্রতি তিনি বিরক্তি অনুভব করতে লাগলেন। গ্রামের উদ্যমী লোকগুলোর উৎসাহ উদ্দীপনা এবং পরস্পরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখে রাজ্য শাসনের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা জন্মে গেলো।
ছাউনি থেকে বেরিয়ে এসে বাবর সময়ে সময়ে শস্যক্ষেত্রে কৃষকদের মাঝে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
কৃষকরা ক্ষেতে কোদাল মারে—তিনি তন্ময় হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবেন, এই কর্ম পাগল উদ্যমী লোকগুলো কত সুখী! এদের রাজ্য লোভ নেই- ঐশ্বর্যের লোভ নেই– রয়েছে শুধু স্নেহ, ভালোবাসা— মানুষের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম হৃদ্যতা। রাজ্যলোভ এদের প্রলোভিত করে না-ঐশ্বর্যের চাকচিক্যে এদের চোখে লালসার অগ্নি প্রজ্বলিত করে না। চোখের দৃষ্ঠি অন্ধ করে না। দুই বেলা দুই মুঠো খেতে পারলেই এরা বেহেস্তের সুখ অনুভব করে। একজন বাদশাহর চেয়ে এইসকল সহজ সরল লোকগুলো যেন অনেক সুখী। বাবর কর্মরত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে এইসব কথা ভেবে তন্ময় হয়ে পড়ে।
বাবর একদিন এইসব কথা ভেবে ভেবেই মনের খেয়ালে জোতা খুলে খালি পা-য় হাঁটতে লাগলেন। তাহির নিকটেই ছিলো। বাবরকে খালি পায় হাঁটতে দেখে সে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। সে জোতা নিয়ে বাবরের নিকট এসে জোতা জোড়া নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে বললো- জাহাপনা, আপনি শূন্য পায় হাঁটাটা শোভা পায় না। জোতা পরুন।
আমি তোমাদের মতো খালি পায় থাকবো, তাহির বেগ। তোমরা যদি শূন্য পায় হাঁটতে পার, আমি পারব না কেন?
আপনার এবং আমার মাঝে অনেক পার্থক্য, জাহাপনা। আপনি বাদশাহ এবং আমি আপনার দাশ। এই গ্রামের লোকগুলো আপনাকে কত সন্মান করে, আপনি লক্ষ্য করেন নি, জাহাপনা?
অবশ্যে তাহির বেগ বলা কথাটা মিথ্যা নয়। গ্রামের লোকগুলো বাবরের সন্মুখ দিয়ে যেতে সব সময় মাথা নুইয়ে যায়। তাঁকে রাস্তায় হাঁটতে দেখলে সসন্মানে রাস্তা ছেড়ে দেয়।
কিন্তু লোকগুলো আমাকে এতো সন্মান করে কেন, তাহিরজান? আমার তো এখন রাজ্য নেই?
হাতী মরলেও তার মূল্য লক্ষ টাকা,জাহাপনা। রাজ্য না থাকলেও আপনার ধমনী থেকে এখন পর্যন্ত রাজকীয় রক্তের স্রোত স্তব্ধ হয়ে যায়নি, জাহাপনা! সব সময় এই দুর্দিন থাকবে না, একদিন সুদিন নিশ্চয় আসবে।
আচ্ছা, তোমার কথাই মানলাম। দাও, জোতা দাও। এভাবে বলেই বাবর তাহিরজানের হাত থেকে জোতা জোড়া নিলেন। তবে, তিনি জোতা পরলেন না। জোতা জোড়া হাতে নিয়ে তিনি অন্যমনস্কভাবে ধীরে ধীরে টিলার উপর উঠে এলেন। টিলার উপরে চড়ে তিনি এক টুকরো পাথরের উপর জোতা জোড়া নামিয়ে রেখে নিজে অন্য এক টুকরো পাথরের উপর বসে পড়লেন। তারপরে তিনি অবসন্নভাবে নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবতে লাগলেন।
টিলা থেকে একটু দূরেই একটি নদী বইছিলো। খরা মাসের নদী। স্বল্প জল। মাত্র এক আঁঠু। হঠাৎ তাঁর নদীর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত হলো। নদীর মাঝ দিয়ে একজন লোককে ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে দেখলেন তিনি। অশ্বারোহী লোকটি তিনি বসে থাকা টিলার দিকেই আসছিলো। টিলার নিকট আসার পরে তিনি লক্ষ্য করলেন, অশ্বারোহী লোকটি অন্য কেউ নয়, কাশিম বেগ।
রাজ্য হারানোর পরে বাবরের অধীনস্থ বেগ এবং সেনাদের কোনো কাজ ছিলো না। প্রথম কয়দিন আশ্রয় গ্রহণ করা গ্রামের লোকেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাদ্যসামগ্রী যোগান ধরছিলো। কিন্তু গ্রামের লোকদের সামর্থ ছিলো খুবই সীমিত। সেজন্য তাদের উপর বেশিদিন বসে খাওয়াটা সম্ভব ছিল না। এই কথা উপলব্ধি করে বেগ এবং সেনারা পেটের ভাত যোগারের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে কৃষিকর্মে নিয়োজিত হয়েছিলো। কিন্তু কাশিম বেগ কৃষিকর্মে অভ্যস্ত ছিলেন না। সেজন্য বাবর তাঁকে কর্মের সন্ধান করতে হিসার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
বাবরকে টিলার উপরে বসে থাকতে দেখে কাশিম বেগ ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঘোড়াটা একটি গাছের সাথে বেঁধে টিলার উপরে উঠে এলেন। বাবরের নিকটে এসে কাশিম বেগ মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে বাবরের কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন- কেমন আছেন, জাহাপনা?
বাবর সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন- হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি কাজ পেয়েছেন নাকি?
হ্যাঁ, পেয়েছি, জাহাপনা। হিসারের রাজ দরবারে একটি সাধারণ কাজ পেয়েছি। এভাবে বলেই তিনি মুহ্যমানের মতো বললেন- আপনার ভবিষ্যত বাণী আখরে আখরে ফলেছে, জাহাপনা। শৈবানি খাঁ মাহমুদ খাঁকে হত্যা করেছে। মাহমুদ খাঁর ষোল বছরের কন্যা মুঘল খানমকে শৈবানি খাঁ নিজে বিয়ে করেছেন এবং মাহমুহ খার ভগ্নী দৌলত খানমকে শৈবানি খাঁর খুড়ার ছেলে তৈমূর সুলতান বিয়ে করে তৃতীয় স্ত্রীর মর্যদা দিয়েছে।
খবরটা শুনতে উৎসাহজনক হলেও প্রকৃতার্থে তাঁর জন্য খুবই বেদনাদায়ক ও হতাশাজনক ছিলো বাবরের জন্য। খবরটা শুনে বাবর ম্রিয়মান হয়ে পড়লেন। মাহমুদ খাঁ তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখান করে অপমান করলেও তিনি তাঁর মামার এতখানি নির্মম পরিণতি আশা করছিলেন না। মামার মৃত্যু সংবাদ এবং পরিজনবর্গের লাঞ্ছনার কথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে উঠলেন। ভয়ার্ত এবং শংকাযুক্ত দৃষ্টিতে তিনি কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করলেন- আয়েশা বেগম, আয়েশা বেগমের কী হয়েছে?
আয়েশা বেগমকে শৈবানি খাঁর পঞ্চান্ন বছরের বেগ কিসমিস সুলতান এবং রেজিয়া বেগমকে জানি বেগ নামের একজন বেগ নিকাহ করেছে।
কাশিম বেগের কথা শুনে বাবর দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠলেন- উঃ, কী ঘৃণার কথা!
আয়েশা বেগমের দুর্দশা এবং কলহপ্রিয় মদগর্বী রেজিয়া বেগমের ভূরি মোটা জানি বেগের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা শুনে বাবরের হৃদয় বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে উঠলো।
কাশিম বেগ বাবরের কানের কাছে মুখ এনে বললেন- জাহাপনা, শৈবানি খাঁর পুত্র এবং বেগবর্গ সমগ্র মাউরা উন্নহর দখল করার স্বপ্ন দেখতেছে। বর্তমান তারা আন্দিজানের দিকেও চিলের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে উরাতেপা পর্যন্ত হাত প্রসারিত করার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছে। আমরা এখন এখানে বেশিদিন থাকাটা নিরাপদ নয়, জাহাপনা। আমরা যতদূর সম্ভব তারাতারি পাহাড় পার হয়ে হিসার চলে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
হিসারের শাসক খশ্রুর কথা মনে পড়ার সাথে সাথে বাবরের চোখের সম্মুখে খশ্রুর হিংস্র ও নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো। খশ্রু বাবরের চাচার পুত্র বায়সঙ্কুরের কাছ থেকে সিংহাসন কেড়ে নিয়েছিলো এবং সিংহাসনের অন্য একজন উত্তরাধিকারীর চোখে লোহার গরম শলাকা বিঁধিয়ে ভবিষ্যতে যাতে সিংহাসন দাবি করতে না পারে তারজন্য অন্ধ করে দিয়েছিলো। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য মনে পড়ার সাথে সাথে বাবর বলে উঠলেন- কিন্তু বেগ সাহেব, আকাশ থেকে খসে খেজুরের কাঁটার মাঝে পড়তে চাইছেন নাকি? এর থেকে আকাশে ভেসে থাকাই উত্তম হবে, না কী বলুন?
না না জাহাপনা, আমি খশ্রুর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলছি না। আমি হিসারের বেগদের সাথে গত বছর গোপনে কথা বলেছিলাম। বেগদের বেশি সংখ্যক-ই খশ্রুর উপরে অসন্তুষ্ট। তারা বলা মতে, খশ্রু নীচ বংশজাত একজন সৈনিকের সন্তান। হিসারের উপরে বোলে তার কোনো অধিকার নেই। আপনি সেখানে গেলে হিসারের বেগবর্গ আপনার সাথে সহযোগ করবে। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
আবার সিংহাসনের জন্য কুকুরের মতো টানাটানি! না না বেগ সাহেব, সিংহাসনের প্রতি আমার মোটেই আকর্ষণ নেই। এখন আমার নির্জনতার প্রয়োজন। এ রকম নির্জনতা যেখানে বসে আমি শায়েরি লিখতে পারব। শায়েরির বাইরে এখন আমি কিছুই চাই না। আমি মুকুটধারীদের জিঞ্জির ছিঁড়ে স্বাধীন হতে চাই। আমি যে শক্তিশালী, ভব্য, ঝাকঝমক মাউরা উন্নহরে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেখানে আমি অসফল হয়েছি। মারা-মারি, কাটা-কাটি, হিংসা-দ্বেষপূর্ণ জীবন আমি চাই না। প্রকৃতির বুকে আমি মুক্তভাবে বেঁচে থাকতে চাই।
বাবরের দৃষ্টিপথে যেন অন্ধকার নেমে এলো। তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।
কাশিম বেগ বাবরকে জড়িয়ে ধরলেন। বাবর অসহায়ভাবে কাশিম বেগের দিকে তাকালেন। তিনি লক্ষ্য করলেন কাশিম বেগের দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তেছে।
কাশিম বেগের চোখে জল দেখে বাবর নিরুৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তিনি কাশিম বেগকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- দুঃখ করবেন না, বেগ সাহেব। আমার সিদ্ধান্তের কথা পরে আপনাকে আমি জানাব। এখন ছাউনিতে চলুন।
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে উভয়ে টিলা থেকে নেমে ছাউনিতে এলেন।
পুনরায় মিলিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাশিম বেগ পরের দিন হিসার চলে গেলেন।
কয়েকদিন পরে স্তেপীবাসী কয়েকজন বাবর সেনা বাজার করতে গিয়ে খবর নিয়ে এলো যে, শৈবানি খাঁ উরাতেপা অভিমুখে আসতেছেন। শৈবানি খাঁ বৰ্তমান আকতংগী নামের একটি স্থানে ছাউনি পেতে রয়েছেন। বাবর আশ্রয় নিয়ে থাকা স্থান থেকে আকতংগী মাত্র পনের মাইল দূরে। শৈবানি খাঁর শিকারি কুকুরগুলো যে কোনো মুহূর্তে দহকত পর্যন্তও আসতে পারে। কারণ শৈবানি খাঁ বাবরের মস্তকের পরিবর্তে সোনা পুরস্কার প্রদানের কথা ঘোষণা করে রেখেছেন। সেজন্য দহকত থেকে চলে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে বাবরের কয়েকজন সেনা পরামর্শ দিলেন।
কুতলুগ নিগার বেগম খবরটা শুনে উৎকণ্ঠিতভাবে বাবরের নিকট এসে বললেন- আপনি আমাদের সবার একমাত্র আশা ভরসার স্থল। এখন আপনার বৈরাগ্য নেওয়ার সময় নয়। আপনাকে এখনও সবাই বাদশাহ হিসাবে সন্মান করে। হিসার এবং অন্যান্য স্থানের বেগবৃন্দও আপনার জন্য অপেক্ষা করতেছে। শৈবানি খাঁর লোক পর্যন্ত আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তদুপরি এই গ্রামের লোকদের প্রতিও আপনার কর্তব্য রয়েছে। আপনি এই গ্রামে থাকলে এই গ্রামের লোকদের উপরেও শৈবানি খাঁর সেনারা উৎপীড়ন চালাবে। সেজন্য আপনি এই গ্রাম ছেড়ে গিয়ে গ্রামের লোকদের অযথা অন্যায় অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করা কর্তব্য।
বাবর ভাবলেন, মাতৃর কথা সম্পূর্ণরূপে সত্য। তাঁর উপরে ভরসা করা, তাঁর হয়ে অস্ত্র ধারণ করা, লোকদের নেতৃত্ব প্রদান করাটা তাঁর নৈতিক দায়িত্ব।
খালি পায় হাঁটার পরেও বাবরের দুর্ভাগ্য বাবরের সংগ ত্যাগ করল না। তিনি তাঁর মামা শেরিম বেগকে ডেকে এনে বললেন- মামা, আমরা এখানে থাকাটা মোটেই নিরাপদ নয়। সেজন্য আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কোথায় যাওয়ার কথা ভাবছেন, জাহাপনা? শেরিম বেগ চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন।
কাশিম বেগ আমাকে হিসার যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আমরা এখন হিসার যাওয়াটা ঠিক হবে না। বর্তমান আমরা ইসফারা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেজন্য এখন ইসফারা যাব। ইসফারা যাওয়ার পরে অন্য কথা চিন্তা করব। বর্তমান কাশিম বেগ নেই, সেজন্য আমি আপনাকে উজির-এ-আজম পদে সাময়িকভাবে নিযুক্ত করলাম। আপনি সৈন্যদের যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিন। আমরা আজ রাতেই দহকত ছেড়ে চলে যাব।
বাবর পুনরায় যুদ্ধের পোশাক পড়লেন। সেদিন রাতেই বাবর সেনাবাহিনী এবং আত্মীয়-পরিজন নিয়ে পূর্ব দিকের ইসফার অভিমুখে ভাগ্যের অন্বেষণে যাত্রা করলেন।
* * *
ইসফারা!
বাবর একটি টিলার উপরে বসে ছিলেন। প্রস্তরে প্রস্তরে ঠেকা খেয়ে টিলার পাদদেশ দিয়ে সংগীতের মূর্ছনা তুলে ইসফারা নদী বয়ে চলছে।
বাবর খোজন্দের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে তাকিয়ে ছিলেন। স্বল্পদূরে অবস্থিত ধূসর পাহাড়ের ঢাল এবং পাহাড়ের শিখরের উপরে ভেসে বেড়ানো মেঘের ছায়া দৃষ্টিপথে পড়তে ছিলো। হিমাচ্ছাদিত পাহাড় শিখর থেকে স্নিগ্ধ মনোরম ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে এসে বাবরের শরীর স্পর্শ করতেছিলো।
বাতাসের ঠাণ্ডা স্নিগ্ধ সুকোমল পরশে বাবরের মনে ভাবের লহর তুললো। তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো পাহাড়ের সেপ্রান্তে অবস্থিত দেশগুলোর দৃশ্য।
পাহাড়ের সেপ্রান্তে এক সময়ের কোলাহল মুখর এবং বর্তমান কিঞ্চিত ম্রিয়মান হয়ে পড়া তাসকন্দ। কিছুদিন পূর্বেও তিনি স্বাধীনভাবে বিচরণ করা জিজ্জখ, সমরকন্দ, মার্গিলান,আন্দিজান প্রভৃতি স্থানের ধূসর ছবিও তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো।
কিন্তু মাউরা উন্নহরে বর্তমান এমন কোনো স্থান নেই যেখানে বাবর শান্তিতে বসবাস করতে পারেন। মাউরা উন্নহরের সকল স্থান বর্তমান শৈবানি খাঁ এবং আহম্মদ তনয়ালের দখলে। বাবর দাঁড়ানোর মতো এক টুকরো স্থানো নেই কোথাও। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ভাবলেন বাবর।
শেরিম বেগ কয়েকদিন ধরে বাবরকে খোরাসান যাওয়ার জন্য অনুনয় বিনয় করতেছে।
কিন্তু শেরিম বেগের সাথে বাবর সহমত হতে পারেন নি। তাঁর ধারণা, একবার মাউরা উন্নহর ত্যাগ করলে চিরদিনের জন্য তিনি জন্মভূমি থেকে বঞ্চিত হতে হবে। পুনরায় তিনি জন্মভূমিতে পা দিতে সক্ষম হবেন না। জন্মভূমি-মাতৃভূমি। জন্মভূমি জন্মধাত্রী মাতৃর বুক। নিরাপদ আশ্রয়। মাতৃভূমি ত্যাগ করার কথা ভাবলেই বাবরের অন্তর হাহাকার করে উঠে। মাতৃভূমির প্রতি যেন অধিক আকর্ষণ অনুভব করেন।
তনয়াল এবং শৈবানি খাঁ। বাবর বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হয়েছেন যে কয়েকদিন আগে থেকে এই দুই মিত্র বোলে পরস্পরের শত্রু হয়ে উঠেছে। একজন আরেকজনের রক্তের জন্য লালায়িত। দুই পরস্পর বিরোধী শাসকের ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় অত্যাচারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সন্ত্রাসিত হয়ে উঠেছে সমগ্র মাউরা উন্নহর। এই দু’টি শিকারী কুকুর যদি পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করে মরে তাহলেই তো তিনি নিষ্কণ্টক হতে পারেন!মনে মনে ভাবলেন বাবর।
বর্তমান বাবরের পরামর্শ করার মতো তেমন কোনো লোকও নেই। কাশিম বেগ হিসারে, তাঁর বিশ্বস্ত নুয়ান কুশল দাশ নিহত। গতবছর আহন গরাণে তনয়ালের সাথে সংঘটিত যুদ্ধে তনয়ালের সেনারা তাকে গভীর খাদে ফেলে হত্যা করেছে। বর্তমান তাহিরজানই তাঁর একমাত্র সহচর। তার পরামর্শ মতেই বাবর বর্তমান শৈবানি খাঁ এবং তনয়ালের যুদ্ধের শেষ পরিণিতি দেখার জন্য আন্দিজানের এলেকাধীন ইসফারায় অবস্থান করতেছেন। তাহিরজান বর্তমান তনয়াল এবং শৈবানি খাঁর যুদ্ধের শেষ পরিণিতি জানার জন্য আন্দিজানে অবস্থান করছে। বাবরই তাকে সেখানে পাঠিয়েছেন।
বর্তমান কাগজ কলমই বাবরের একমাত্র সহচর। কিতাপই তাঁর একমাত্র বন্ধু। কবিতা লিখে এবং গ্রন্থ অধ্যয়ন করে তিনি উৎকণ্ঠিত বিপর্যস্ত জীবন অতিবাহিত করতেছেন।
তরবারি দ্বারা কেড়ে আনা সফলতা তরবারি-ই আবার কেড়ে নেয়। কিন্তু কবিতার দ্বারা আহরণ করা সফলতা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকে। এটাই বর্তমান বাবরের দর্শন।
পূবে ফর্সা হওয়ার পূর্বেই সেদিন আন্দিজান থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে দেড় মাস পরে তাহিরজান ইসফারা পৌঁছোলেন।
এক ঘণ্টার থেকে কম সময়ের ভেতর এসে বাবর তাহিরজানের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সংকটময় মুহূর্তে দেড় মাসকাল অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করে থাকাটা বাবরের জন্য মুখের কথা ছিল না।
প্রদীপের আলোতে বাবরের তাঁবুতে দাঁড়িয়ে আন্দিজানের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাহিরজান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবরণ দিয়ে গেলো। প্রথমে সে প্রধান ঘটনাগুলো বললো-
আন্দিজান বর্তমান শৈবানি খাঁর দখলে। শৈবানি খাঁর সেনারা সহরে লুটপাটের তাণ্ডব চালিয়েছে। সহর দখল করার পরেও শৈবানি খাঁর সেনারা অনেক আন্দিজানী সেনা বর্বরভাবে হত্যা করেছে। তাহিরজানের সাথে যাওয়া সহচর গুপ্তচরটিকেও শৈবানি খাঁর সেনারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
তাহির বেগ খুবই পরিশ্রান্ত এবং দুর্বল হয়ে পড়ছিলো। সেজন্য সে কোনোমতে নিজের পায় দাঁড়িয়ে বাবরের সাথে কথা বলছিলো। তার পা জোড়া কাঁপছিলো। বাবর প্রথমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহিরজানের কথা শুনছিলেন। তাহিরের অবস্থা দেখে তিনি নিজে বিছানার উপরে বসে তাহিরজানকেও বসতে বললেন।
ইসফারা আসার পরে তাহিরজান বাবরের নির্দেশে তার সাথে অন্য একজন সহযোগী নিয়ে আন্দিজানের পরিস্থিতির বুঝ নিতে আন্দিজান গিয়েছিলো। সে আন্দিজান গিয়ে আন্দিজান সহরের নিকটে খাজাকত্তা নামক একটি গ্রামে একজন জমিদারের বাড়িতে চাকর ছিলো। তার সহযোগি সেনাটি তনয়ালের সেনাদলে ভর্তি হয়েছিলো। তারা নিজের পরিচয় গোপনে রেখে আন্দিজানের পরিস্থিতির বুঝ নিচ্ছিলো। তাহিরজান মনযোগ সহকারে বিভিন্ন মানুষের কথা-বার্তা শুনত এবং প্রয়োজনবোধে খুব সতর্কতা অবলম্বন করে মানুষের কাছে প্রশ্ন করে পরিস্থিতির বুঝ নেওয়ার চেষ্টা করতো। সে যখন জামিদারের মালপত্র নিয়ে সহরে যেতো, তখন সে নিজ চোখেও অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে।
আন্দিজান সহরের উপকন্ঠের একটি খোলা প্রান্তরে শৈবানি খাঁ এবং আহম্মদ তনয়ালের মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে সন্মুখ সমরে পরাজিত হয়ে আহম্মদ তনয়াল দূর্গের ভেতর আশ্রয় গ্রহণ করার পরে শৈবানি খাঁ দূর্গের চারদিকে ছাউনি পেতে দূর্গ অবরোধ করে রাখে। ফলে ক্ষুধা পিপাসা, রোগ-ব্যাধি এবং নিজেদের মধ্যে মারামারি করে দূর্গের ভেতর আবদ্ধ জনতা এক সময় শিয়াল- কুকুরের মতো মরতে শুরু করে। বাবরকে ছেড়ে তনয়ালের দলে যোগদান করা সেনাদের অনেকে ক্ষুধা পিপাসায় মরার ভয়ে তনয়ালের সংগ ত্যাগ করে শেষমুহূর্তে শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করতে শুরু করে। আন্দিজানে যেন সমরকন্দের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হলো। একদিন শৈবানি খাঁর সেনারা দূর্গদ্বার ভেঙে দূর্গে প্রবেশ করলো। উপায় বিহীন হয়ে তনয়াল তখন তার ভ্রাতৃ এবং পরিয়াল-পরিজনসহ দূর্গের আর্কের ভেতর আশ্রয় গ্রহণ করার জন্য বাধ্য হলো। এক সময় আর্কও অসুরক্ষিত হয়ে পড়লো। সেজন্য তনয়াল শৈবানি খাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার সিদ্ধান্ত নিলো।
সিদ্ধান্তমর্মে তনয়াল শৈবানি খাঁর বশ্যতা স্বীকার করে একটি পত্র লিখলেন- আমি আমার সমগ্র সেনা, ধন-সম্পত্তি আপনাকে সমর্পণ করে চিরদিনের জন্য আপনার অনুগত হয়ে থাকার শপত নিলাম। আপনি শুধু আমাকে প্রাণভিক্ষা দিন।
তনয়াল একজন বৃদ্ধের হাতে পত্রটি দিয়ে শৈবানি খাঁর নিকট পাঠিয়েছিলো। কিন্তু পত্রবাহক ফিরে এলো না। শৈবানি খাঁর সেনারা পত্র বাহককে হত্যা করে আর্ক আক্রমণ করলো। নিরূপায় হয়ে তনয়াল গলায় তরবারি ঝুলিয়ে বিজেতার কাছ থেকে উদারতাসূলভ প্রাণভিক্ষা পাওয়ার আশায় আর্কের বাহিরে বেরিয়ে এলো। কিন্তু তনয়ালের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হলো না।
তনয়ালকে দেখে সহানুভূতি জানানোর পরিবর্তে তৈমূর সুলতান নির্মম আদেশ দিলো- তাকে বন্দি করতে হবে না…হত্যা কর…
আদেশ পেয়ে সেনারা তনয়ালকে তার ভ্রাতৃদের সাথে নৃশংসভাবে হত্যা করে কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে শৈবানি খাঁকে দেখাতে নিয়ে যায়।
শৈবানি খাঁর সন্মুখে তনয়ালের টুকরো টুকরো দেহ উপস্থিত করে সেনারা আত্ম অহংকারে ফুলে উঠছিলো। তাহিরজান সব ঘটনা আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে শেষে এভাবে মন্তব্য করলো।
হে খোদা! বাবরের মুখ থেকে আপনা-আপনি ইষ্ট নাম বেরিয়ে এলো।
প্রায়শ্চিত্ত! তনয়াল নিজের জীবন দিয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে গেলো। বিশ্বাসঘাতক তনয়াল বাবরের উপরে তরবারি তুলেছিলো। সে নিজেই সেই তরবারির আঘাতে প্রাণ বিসর্জন দিলো। নির্দোষী খাজা আবদুল্ল্যাহকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা দরজার নিকটেই সে নির্মম মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো। বেচেরা চগ্রক(রাশিয়ার এক উপজাতি)দের মতো নিজের ছিন্ন মস্তকের সাথে তার ভ্রাতৃদের ছিন্ন মস্তকও বস্তা থেকে বের হলো।
বাবরের কল্পনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো, শৈবানি খাঁ হয়তো তাদের ছিন্ন মস্তক প্রত্যক্ষ করে ঘৃণ্যভাবে স্পর্শ করে দেখেছেন। পা দিয়ে উলটিয়ে দেখেছেন। তাঁকে ব্যতিব্যস্ত করা তনয়ালকে হয়তো ঘৃণ্যভাবে সেই দেহহীন মস্তকগুলোর মাঝে খুঁজে দেখেছেন। কারণ শৈবানি খাঁ তনয়ালকে জীবিত অবস্থায় কখনো দেখেন নি। হয়তো তনয়ালের ছিন্নমুণ্ড শৈবানি খাঁ হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখতেও ঘৃণাবোধ করেছেন।
দৃশ্যগুলো কল্পনা করে বাবর বলে উঠলেন- হে খোদা! হে খোদা!! এটা ক্রুর ন্যায়, না প্রতিশোধ? ক্রুরতায় শৈবানি খাঁ তনয়ালের চেয়েও উগ্র। তবুও প্রতিহিংসার তরবারি পরমেশ্বর শৈবানি খাঁকে অর্পণ করলেন কেন?
বাবর বিক্ষিপ্ত বিকেন্দ্রীভূত মাউরা উন্নহর কেন্দ্রীভূত করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বাবর বিফল হলো। বাবর যে কাজ করতে পারলেন না, সেই কাজটি করলেন শৈবানি খাঁ। শৈবানি খাঁ কিসের বলে বাবরের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? চতুরতা, ক্রুরতা, না অমানবীয় হিংস্রতায়?
এই পৃথিবীতে বর্তমান শৈবানি খাঁর মতো কূটিল চরিত্রের মানুষ হওয়াটা হয়তো আবশ্যক। বাবর একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলেন। নিজের অধিকাংশ সময় কাব্য, শিল্পকলার নামে সমর্পণ করতে চেয়েছিলেন। মানবতার কথা চিন্তা করছিলেন। এইসব কারণেই তিনি শৈবানি খাঁর মতো কূটিল চরিত্রের হাতে মার খেতে হলো নাকি?
কিন্তু মুখ্য কি? মানবতা, না হিংস্রতা?
জাহাপনা। বাবরকে অন্যমনস্ক দেখে তাহিরজান বললো।
তাহিরের কণ্ঠস্বরে বাবরের ধ্যান মানবতার চিন্তা থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। তিনি অপ্রস্তুতের মতো বললেন- বল।
তাহির বেগ বিচলিত কণ্ঠে বললো- আমি জানতে পেরেছি, শৈবানি খাঁর সেনারা উল্লসিত হয়ে আপনাকে খুঁজতেছে। তাদের গুপ্তচর ইতিমধ্যে হয়তো ইসফারাও এসে পৌঁছেছে!
তাহিরের মন্তব্যে বাবর সজাগ হয়ে উঠলেন। হ্যাঁ, তিনি এখন নিজের জীবন রক্ষা করার কথা চিন্তা করা উচিত। তনয়ালের পরাজয়ের জন্য তাঁর অভিস্পিত ধ্যান-ধারণায় ইতিমধ্যে ভাঙন শুরু হয়েছে। মাতৃভূমির চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের জীবন রক্ষার চিন্তাও শুরু হয়েছে বর্তমান। মাতৃভূমি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় সব রাস্তাই বর্তমান বন্ধ হয়েছে। হয়তো দুই একটা রাস্তা এখনও খোলা রয়েছে। কিন্তু যদি অতিসত্বর বেরিয়ে না যান, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো অন্তিম সম্ভাবনাও শৈবানি খাঁ বন্ধ করে দিবে! হয়তো নয়, এটা প্রায় নিশ্চিতই বলা যেতে পারে!
সন্মুখে যে সাধারণ একজন সৈনিক বসে রয়েছে, উত্তেজনাবশতঃ বাবর সেই কথাও ভুলে গেলেন। তিনি বাষ্পারুদ্ধ কণ্ঠে বললেন- আমাদের মাথার উপর দিয়ে ইতিমধ্যে কম ঝঞ্ঝা বয়ে যায় নি, তাহিরজান। এখন আমরা মাতৃভূমি থেকেও চোরের মতো পালিয়ে যেতে হবে নাকি?
বাবরের চোখে জল দেখে তাহিরজন শোকাভিভূত হয়ে পড়লো। অতি কষ্টে চোখের জল সম্বরণ করে তাহিরজান কম্পিত কণ্ঠে বললো- জাহাপনা, পরের দেশে বেঁচে থাকাটা সবার জন্যই পীড়াদায়ক। তিনি বাদশাহই হোন, বা অন্য কেউই হোন। কেউ নিজের ইচ্ছায় মাতৃভূমি ত্যাগ করেন না। পরিস্থিতির পাকে পড়েই মাতৃভূমির মোহ ত্যাগ করতে হয়। ইসফারায় বর্তমান আপনার জীবন বিপন্ন। আপনি বুকে সাহস সঞ্চয় করুন, জাহাপনা। পরিবার-পরিজনের কথা চিন্তা করে হলেও আপনি বেঁচে থাকতে হবে, জাহাপনা।আপনার সেবা শুশ্রূষার জন্য নিশ্চয় শৈবানি খাঁ আমার উপরেও প্রতিশোধ নিবে।সেজন্য আমি আর কুবায় ফিরে যাব না।আমিও আপনার সাথে যাব। তদুপরি আমি আপনাকে ছেড়ে থাকতেও পারব না। আন্দিজান থেকে আসার সময় আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছি, আপনি যেখানে যাবেন, আমিও আপনার সাথে সেখানেই যাব।
বাবর প্রথম থেকেই তাহিরজানকে ন্যায়পরায়ণ ও সাহসী সেনার পাশাপাশি একজন বিশ্বাসী যুবক হিসাবে ভেবে এসেছেন। তাহিরের মতো চরিত্রের মানুষের ধারণা একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকই শুধু সাধারণ মানুষকে দুর্নীতি ও অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন। এই কথাও বাবর অবগত।
সেজন্য বাবর নিজের বিবেচনা প্রকাশ করে বললেন- কিন্তু আমি তোমরা আশা করা ধরণে বাদশাহ হতে পারলাম না। আগেও হতে পারব কি-না, সেটাও অনিশ্চিত…..
বাবর বাক্যটি সম্পূর্ণ করলেন না। তাহিরজানও কোনো রকম মন্তব্য করল না। একজন ভাগ্যহত নির্বাসিত শাসক এবং একজন দুর্ভাগা সৈনিক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে উভয়ে মুখামুখি হয়ে মৌনভারে বসে রইলেন।
এদিকে রাতের নির্জনতা ভঙ্গ করে ইসফারা নদী গর্জে গর্জে নৈঃশব্দের পটভূমিতে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে চলছিলো।
মান-মর্যদায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকা ব্যক্তি দুজনকে সংকটময় পরিস্থিতি পরস্পরের নিকট সান্নিধ্যে টেনে আনল। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাধারণ সৈনিক একজন প্রথমবারের জন্য বাবরের সাথে এত নিঃসঙ্কোচে কথা বলছিলো। প্রদীপের স্নান আলোয় বসে তাহিরজান এরকম কিছু কথা বললো, যা দিনের আলোতে বা অন্য সময় বলা তো দূরের কথা সে হয়তো কল্পনাও করতে পারতো না।
তাহিরজান বলতে লাগলো- জাহাপনা, আমি একজন সাধারণ সৈনিক, তবুও কেন জানিনা, আপনাকে আমার সহোদরের মতো মনে হয়। আপনার শায়েরি, আপনার সাহস এবং উদারতা দেখে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, আপনার জন্য যেন এক অপূর্ব বিরাট সাফল্য অপেক্ষা করতেছে। আপনার বেশিসংখ্যক শত্রু এখন নিহত। তদুপরি আপনি ইতিমধ্যে অনেক জীবনঘাতক কঠিন বিপদ থেকে কোনোমতে প্রাণরক্ষা করে ফিরে এসেছেন। এগুলো হয়তো আপনার অসাধারণ ভাগ্যেরই নিদর্শন, জাহাপনা।
বিপদের সময়ে ছোট ভ্রাতৃকে সাহস প্রদান করা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃর মতোই তাহিরজানকে মনে হলো বাবরের। বাস্তবেও তাহিরজান বাবরের চেয়ে সাত বছরের জ্যেষ্ঠ ছিলো। সেজন্য তাহিরজানকে নিজের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃর মতো ভেবে ভালো লাগলো বাবরের। সেজন্য তিনি অকপটে নিজের দুর্ভাগ্যকে দোষারূপ করে বললেন- কিন্তু আমার ভাগ্য বারে বারে আমাকে প্রতারণা করছে কেন, তাহির বেগ?
আপনার ভাগ্য আপনার সাথে সৎ মায়ের মতো আচরণ করছেন, জাহাপনা। দুর্ভাগ্য নির্দয়ভাবে আপনার প্রতি আঘাত হেনেছে। দুর্দিন দূর হয়ে একদিন নিশ্চয় সুদিন আসবে। তখন মানুষ আপনার কথা বুঝতে পারবে। কিন্তু এখন.…… তাহির বেগ নড়েচড়ে বসে পুনরায় বললো- অতিসত্বর ইসফারা থেকে চলে যাওয়াটাই উচিত হবে, জাহাপনা। হিরাত তো আপনার পর নয়! হোসেন বায়কারা আপনার আত্মীয়। মামা ফজিলুদ্দিন বর্তমান হিরাত রয়েছেন। সেজন্য সেখানে গেলে আপনার নিশ্চয় কোনো অসুবিধা হবে না।
বাবর আবেগ বিহ্বল কণ্ঠে বললেন- আচ্ছা, তোমার কথাই মানলাম। বিপদসংকুল রাস্তায় তুমিই হবে আমার সবচেয়ে বিশ্বাসী সহচর। আমি আমার জীবন আগে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে, পরে তোমার হাতে সমর্পণ করলাম, তাহির বেগ।
বরফাবৃত বিশাল পর্বতের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে বাবরের হৃদয় কেঁপে উঠলো। তাঁরা ঐ পর্বত শৃংখলা পার হয়ে যেতে পারবে কী? ওই বিশাল হিমাচ্ছাদিত পর্বতশ্রেণী পার হলেই পামীর মালভূমি এবং পামীর থেকে এগিয়ে গেলেই হিন্দুকোশ পর্বত।
* * *
শৈবানি খাঁর দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে বাবর ইসফারা ত্যাগ করে হিরাত অভিমুখে যাত্রা করলেন। তাঁর সাথে বের হলো বেগবর্গ এবং আত্মীয়-পরিজন। দীর্ঘ বিপদসংকুল রাস্তা। দিবা-রাত্র এক করে তাঁরা এগোতে লাগলেন। পথশ্রমে লোকগুলো শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তবুও বিশ্রামের অবকাশ নেই। অবকাশ নেই পেছনে ঘুরে দেখার। দুর্ভাগা পথচারীরা সন্মুখের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগোতে লাগলেন।
এক সময় তাঁদের মধ্যে খাদ্যাভাবে দেখা দিলো। পেটের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্য তাঁরা অবশেষে শুধু উট এবং ঘোড়ার মাংস খেয়ে জীবনধারণ করতে লাগলেন। চারদিকে শুধু উঁচু উঁচু পর্বত এবং বুক কাঁপানো পর্বতের খাড়া ঢাল। দীর্ঘ যাত্রাপথে ঘোড়াগুলো শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়ল। স্বয়ং বাবর নিজের ঘোড়া মাতৃকে দিয়ে নিজে পদব্রজে পথ চলতে লাগলেন। পর্বত আরোহণ করার ফলে অনেকের জুতার তলদেশ ফেটে গেলো। মাথার উপরে খোলা আকাশ এবং পর্বতের বাইরে কিছুই নেই। সমগ্র যাত্রা পথে কোথাও বিশ্রাম নেওয়ার মতো তেমন কোনো সুবিধাজনক স্থানও নেই।
পথশ্রমে ক্লান্ত লোকগুলো এক সময় অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। তাঁরা কোন কোন সময় বাবরের সাথে অসংযত আচরণও করতে লাগলো।
পথশ্রমে ক্লান্ত মহিলারা কোথাও জিরাইতে বসলেই তারা বিরক্তিভরা কণ্ঠে গালি-গালাজ দিতে থাকে- দীর্ঘ যাত্রাপথ! এভাবে বসে থাকলে রাস্তা আপনা-আপনি শেষ হবে নাকি? যত তারাতারি সম্ভব এগোতে হয়। তা না করে সময় বরবাদ করতেছে। কখনও কখনও বাবর এবং মহিলাদের দিকে ইশারা করে সাথীদের উদ্দেশ্যে বলে- ভাইসব, চল, আমরা এগিয়ে যাই। এরা জিরাইয়ে-টিরাইয়ে পরে আসবে’খন।
বেগদের এ রকম অশিষ্ট ব্যবহারের জন্য তাহিরজান কখনও কখনও ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। সে বেগদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তরবারি বের করে। তখন বাবর তাকে বুজিয়ে-ভাঁড়িয়ে শান্ত করতে হয়- ধৈর্য ধরুন, বেগ। আমরা অধৈর্য হলে চলবে না। যাত্রাপথের অনিশ্চয়তায় ওরা অধৈর্য হয়ে উঠেছে। কষ্টও তো কম হয়নি! তারা তো মিথ্যা কথাও বলেনি। যাত্রাপথ এমনিতেই দীর্ঘ। এভাবে বসে থাকলে আরও অধিক দীর্ঘ হবে। চলুন, তারাতারি চলুন। আমরা যতদূর সম্ভব তারাতারি অমু দরিয়া পার হওয়া দর্কার। অমু দরিয়া পার হতে পারলেই তো শৈবানি খাঁর থেকে নিরাপদ হতে পারব।
এভাবে বাবর নানান দুঃখ-কষ্ট, বাধা-বিঘ্নের মধ্য দিয়ে এগোতে লাগলেন। অমু দরিয়া পার হয়ে তিনি একটি সুখবর পেলেন। তিনি একটি পত্রও পেলেন হিসার থেকে।
বাবর কখনও কখনও কথা প্রসঙ্গে কাশিম বেগকে ভবিষ্যত বাণী করে বলছিলেন- শৈবানি খাঁ একজন সাম্রাজ্যলোভী শয়তান। সে একদিন সমগ্র মাউরা উন্নহর দখলের জন্য চেষ্টা চালাবে। বর্তমান সে হিসারের সাথে বন্ধুত্বের অভিনয় করলেও সুযোগ পেলেই সে হিসার গ্রাস করার জন্য চেষ্টা করবে।
কাশিম বেগের সাথে বিনিময় করা এইসব কথা-বার্তা তাহির বেগও শুনেছিলো। অমু দরিয়া পার হওয়ার সাথে সাথে বাবরের ভবিষ্যত বাণী সফল হওয়াতে সে বাবরের প্রতি অধিক শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠলো।
অমু দরিয়া পার হওয়ার সাথে সাথে তাঁরা খবর পেলেন যে শৈবানি খাঁ হিসার আক্রমণ করেছে।
হিসারের শাসক খশ্রু একজন কাপুরুষ স্বভাবের শাসক ছিলেন। তিনি শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভয় পেয়ে সেনাবাহিনী শত্রুর হাতে ছেড়ে দিয়ে একাই পালিয়ে গেছেন।শত্রুর হাত থেকে হিসার রক্ষা করার জন্য বেগবর্গরাঁই বর্তমান যুদ্ধ পরিচালনা করতেছেন।
কাশিম বেগ বর্তমান হিসারে রয়েছেন। হিসারের বেগবর্গ কাশিম বেগের সাথে পরামর্শ করে বাবরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। সিদ্ধান্ত মর্মেই তাঁরা বাবরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাঁরা বাবরকে পত্র লিখে পাঠিয়েছেন যে, হিসারের সিংহাসন এখন শূন্য পড়ে রয়েছে। সেজন্য আপনি অতিসত্বর হিসার আসুন। হিসার এলেই আপনাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ যাত্রা করব।
তবে, বাবর আমন্ত্রণ অস্বীকার করলেন। তিনি ভাবলেন, বেগদের বিশ্বস্ততার কী প্রমাণ রয়েছে। তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাঁরা শৈবানি খাঁর হাতে সমর্পণও তো করতে পারে! সেজন্য বাবর বেগদেরকেই ডেকে পাঠালেন- যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, তাহলে আপনারা নিজেই এখানে আসুন।
হিসারের বেগবর্গ এবং বাবরের মধ্যে বুঝা-পড়া হওয়ার আগেই শৈবানি খাঁ হিসার দখল করলেন। শৈবানি খাঁর পরিকল্পিত আক্রমণের সম্মুখে টিকতে না পেরে খশ্রুর ত্রিশ হাজার সেনা লণ্ড-ভণ্ড হয়ে পড়ল। ফলে হিসারের বেগদের মধ্যে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। অনেকেই শৈবানি খাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করলো। তবে, আত্মমর্যদাসম্পন্ন কয়েকজন বেগ শৈবানি খাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে কষ্ট পেয়ে বিশৃংখল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যত্নপর হলো এবং সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একজন শাসক তালাশ করতে লাগলো। সেজন্য সগা নিয়ানি নামক বেগ একজন চারশত সেনা নিয়ে বাবরের নিকট এলো।
সগা নিয়ানি নিজে আশা করার থেকেও বেশি সন্মান দিয়ে বাবর তাঁকে উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত করলেন।
সগা নিয়ানির পরে আরও কয়েকজন বেগ এসে বাবরের সাথে মিলিত হলো। ফলে বাবরের ভাগ্যাকাশ আবার মেঘমুক্ত হলো।
বাবর মাত্র দুই শত চল্লিশজন সেনা নিয়ে অমু দরিয়া পার হয়েছিলেন। চার মাসের মধ্যে তাঁর সেনা সংখ্যা চার হাজারে বৃদ্ধি পেলো। কাশিম বেগকেও বাবর হিসার থেকে ডেকে আনালেন। সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধির পরে বাবর নিজের বাহিনী নিয়ে কাবুলের দিকে অগ্রসর হয়ে কাবুল অবরোধ করলেন। অবরোধের ফলে কাবুলের বিতর্কিত শাসক মুকিন বেগ কাবুল ছেড়ে দিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হলো। তখন বাবর কাবুল এবং গজনী অঞ্চল নিয়ে একটি নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন। নতুন সাম্রাজ্য তাঁকে উজবেক সমস্যা থেকে মুক্ত করলো।
বাবর হিরাতের সুলতান তথা তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয় মির্জা হোসেন বায়কারার সাথে মিলিত হয়ে উভয়ের শত্রু উজবেক শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। সেজন্য বাবর হিরাত এসে হোসেন বায়কারার সাথে মিলিত হয়েছিলেন। তবে অভিযান শুরু করার আগেই দুর্ভাগ্যবশতঃ হোসেন বায়কারার মৃত্যুর হলো। হোসেন বায়কারার মৃত্যুর পরে বাবর হিরাতের নবনিযুক্ত শাসক মুজাফ্ফরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করলেন। মুজাফ্ফরের আশ্রয়ে বাবর সতের দিন হিরাতে ছিলেন।
বাবরকে উষ্ণিয়ার একটি ভব্য প্রাসাদে থাকতে দেওয়া হয়েছিলো। প্রাসাদটা বিখ্যাত শায়ের আলীশের নবাইর বাসস্থান ছিলো। প্রাসাদের উঁচু দরজা, নীল গম্বুজ এবং বিভিন্ন কারুকার্য প্রত্যক্ষ করে বাবরের সমরকন্দে অবস্থিত উলুগ বেগের মাদ্রাসার কথা মনে পড়ে গেলো।
প্রাসাদের একটি কক্ষে আলীশের নবাইর গ্রন্থাগার ছিলো। বাবর আগ্রহ সহকারে গ্রন্থগুলো পড়তে লাগলেন এবং নিজেও কাব্য চর্চায় মনোনিবেশ করলেন। সতের দিনে তিনি অনেক গজল লিখে ফেললেন।ক্ৰমশঃ
৮৮ নং খণ্ড মুজাফ্ফর একদিন একটি ভোজ উৎসব পেতে বাবরকে নিমন্ত্রণ জানালেন। ভোজ উৎসবে ‘মৈনাব’(এক প্রকার তেজী ও সুগন্ধি সুরা) অবাধে পরিবেশন হচ্ছিল। বাবরকেও মৈনাব পরিবেশন করা হলো।
হিরাতের সুপ্রসিদ্ধ গায়কবর্গ সাবলীল সংগীত পরিবেশন করছিলেন। বাবর পূর্বে কোনোদিন সুরাপান করেননি। সংগীতের লহরে তিনি এতই মুগ্ধ হয়ে পড়ছিলেন যে, সেদিন তাঁরও সুরা পান করতে ইচ্ছে হলো।
কাশিম বেগ তাঁর নিকটেই বসেছিলেন। অভ্যাসবশতঃ তিনি কাশিম বেগের দিকে তাকালেন।
কাশিম বেগ নিজে ধর্মভীরু ছিলেন এবং কোনোদিন সুরা পান করেন নি। বাবরকেও তিনি সুরা পান থেকে বিরত থাকার জন্য সব সময় উপদেশ দিতেন। বাবর কাশিম বেগের দিকে তাকানোতে তিনি বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে বাবরের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন- জাহাজনা, বদিউদ জামানও সেদিন আপনাকে সুরা পান করতে বলেছিলেন; তবে, সেদিন আপনি সুরা পান করেন নি। আজ যদি আপনি সুরা পান করেন, বদিউদ জামান শুনলে খারাপ পেতে পারে!
কাশিম বেগ বলা কথাটা মিথ্যা নয়। বদিউদ জামান এবং মুজাফ্ফর উভয়ে ভ্রাতৃ। কিন্তু ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে মোটেই সদ্ভাব নেই। সেদিন বদিউদ জামানও বাবরকে একটি ভোজ উৎসবে নিমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। সেদিনকার উৎসবেও অবাধে সুরা পরিবেশন হচ্ছিল। বদিউদ জামান তাঁকে সুরা পানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে সেদিন বাবর সুরা পান করেন নি। সেজন্য বাবর সুরা পানের ইচ্ছা দমন করে বললেন- ক্ষমা করবেন মির্জা সাহেব। আমি পূর্বে কোনোদিন সুরা পান করিনি।
ইতিমধ্যে মুজাফফরের নেশা হয়ে গিয়েছিলো। সুরার নেশায় তিনি সাধারণ ভদ্রতাটুকুও ভুলে গেলেন। বাবরকে উদ্দেশ্য করে তিনি অশিষ্টতাপূর্বকভাবে বললেন- কেন, আপনি সুরা পান করতে ভয় করেন নাকি? আন্দিজান এবং সমরকন্দের লোকেরা সুরা পান করেনা নাকি? তাহলে আপনি কেমন করে আনন্দ প্রকাশ করেন?
মুজাফ্ফরের কথায় বাবর একটু আহত হলেন যদিও নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন- এ রকম আনন্দ সমরকন্দ এবং আন্দিজানে বেশি উপভোগ করা হয়। আসলে আমি শরিয়তের বিধান মেনে চলতে চাই। সেদিন আপনার ভ্রাতৃ বদিউদ জামানের ভোজ উৎসবেও আমি সুরা পান করিনি।
বদিউদ জামানের নাম শুনামাত্র মুজাফফর গম্ভীর হয়ে উঠলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, বদিউদ জামান নিজেও তো শরিয়তের বিধান মেনে চলে। তবুও তো তিনি সুরা পান করেন। আসলে বাবর একজন নির্বোধ।
মুজাফফর বাবরকে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও, বাবরকে পরিবেশন করা সুরার পাত্রটি তিনি উজির-এ-আজম জুন্নুন বেগ আরগুনকে পরিবেশন করার জন্য পরিচারককে নির্দেশ দিলেন। পরিচারক সেই নির্দেশ পালন করলেন।
মুজাফ্ফর উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিলর্জ্জের মতো নাচতে শুরু করলেন।
মুজাফ্ফরের অধঃপতন দেখে কাশিম বেগ বাবরের কানের কাছে মুখ এনে বললেন- এই অকর্মণ্য বাদশাহের সাথে এখন আপনি কোনো কথা বলা উচিত হবে না। তদুপরি এর স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করারো কোনো অধিকার নাই। এর মাতৃ খাদিজা বেগমের নির্দেশ মতো সব কাজ চলে। চলুন, আমরা তাঁর সাথে আলোচনা করিগে’।
শৈবানি খাঁ একটার পর একটা দেশ জয় করে খোরাসানের সীমা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলেন। খবরটা শুনার পর থেকে বাবর উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছিলেন। শৈবানি খাঁ হিরাত পর্যন্ত এসে পৌঁছোলেও আচরিত কথা হবে না। সেজন্য তিনি এই বিষয়ে মুজাফ্ফরের সাথে পরামর্শ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুজাফ্ফরের পরিবর্তে কাশিম বেগ খাদিজা বেগমের সাথে পরামর্শ করার কথা বলাতে বাবর ইতস্ততঃ করে বললেন- কিন্তু মাতৃর সাথে আলোচনা করলে মুজাফ্ফর খারাপ পাবেন নাতো?
কাশিম বেগ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন- না, পাবেন না। এ বিষয়ে আমি খাদিজা বেগমের সাথে আগেই আলোচনা করেছি। তিনি এখন আপনার জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করেতেছেন হয়তো।
বাবর মুজাফ্ফরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে খাদিজা বেগমের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বের হলেন। তাঁর সাথে বের হলেন কাশিম বেগ, জুন্নুন বেগ, বুরন্দুক বেগ প্রভৃতিরা। তাঁরা নরম কোমল কার্পেট মাড়িয়ে উপর মহলায় উঠে এলেন।
খাদিজা বেগম বাবরকে ভব্য অভিজাত একটি কক্ষে বসতে দিলেন। ঐশ্বর্য সম্ভার প্রদর্শনের জন্যই হয়তো খাদিজা বেগম বাবরের সন্মুখে খাঁটি সোনার ছয় পায়াযুক্ত একটি টেবিল পেতে দিলেন। কক্ষটি সোনা, হীরা, জহরত আদি করে অনেক মূল্যবান আসবাব এবং নানান উপকরণ দিয়ে সজ্জিত ছিলো। দরজা, খিড়কিসমূহেও ছোট ছোট অনেক মুক্তা ঝিলমিল করতেছিলো। চারদিকে ঝিলমিল করে থাকা উজ্জ্বলতার তীব্রতার মধ্যে বুক ফুলিয়ে বসে থাকা খাদিজা বেগমকে বাবরের মনে চল্লিশ বছরের অপূর্ব সুন্দরীর মতো অনুমান হলো। তাঁর শরীরে কোন রকমের অলঙ্কার ছিলো না। শুধু তাঁর কারুকার্যখচিত কালো পোশাক জোড়া রুপোর মতো ঝিলমিল করছিলো। তাঁর মাথায় ছিলো বহুমূল্যবান হীরা মুক্তাখচিত শংকু আকারের টুপি। তাঁর পরিচারিকা কয়জনের পরনে ছিলো রঙবিরঙের পোশাক। সেই পোশাকের ঝিলমিল আভায় বাবরের চোখ ঝলসে নিতে লাগলো।
ভব্য অভিজাত বিলাসী মহিলাটির সাথে বাবর কীভাবে কথা শুরু করবেন সেটা মনে মনে ভাবতে লাগলেন।
খাদিজা বেগম শান্ত স্নিগ্ধ মুচকি হাসি হেসে প্রথমে কথা শুরু করলেন- মির্জা সাহেব, আপনি আমাদের মেহমান। খাদিজা বেগম পরিচারিকা কয়জনের দিকে ইশারা করে বললেন- এরা সবাই আমার পুত্রবধূ। মুজাফ্ফরের বেগম। এরাও আপনাকে যথেষ্ট সন্মান করে। খাদিজা বেগম কৃত্রিম লজ্জামিশ্রিত হাসি হেসে বললেন- লজ্জা করবেন না। কথা শুরু করুন।
ধন্যবাদ। বাবর এর থেকে বেশি কিছু বলতে পারলেন না।
মমবাতির ক্ষীণ ধূসর আলোতে মহিলাদের অর্দ্ধাবৃত মুখমণ্ডল দেখে বাবরের পক্ষে তাঁদের বয়স অনুমান করা কঠিন হলো। মেহেন্দি রাঙানো হাত, উন্নত বুক এবং সরু কোমর দেখে মহিলা কয়জন যুবতী বলে অনুমান হলো বাবরের।
মুজাফ্ফরের সবচেয়ে প্রিয় বেগম কারাকোজ বেগম শাশুড়ির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে কিছু বলে হেসে ফেললেন।
খাদিজা বেগমও তাঁর সাথে হাসিতে যোগ দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন- মির্জা সাহেব, হিরাত রাজবংশের প্রত্যেকজন যুবতী আপনাকে কামনা করে বলে আমি শুনে আসছি। কিন্তু আপনার মতো এতো ক্ষমতাশালী একজন বাদশাহ, সাহসী নওজোয়ান এবং খ্যাতিমান কবি এখন পর্যন্ত অবিবাহিত থাকাটা সত্য নাকি?
বাবর লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো। তিনি বিবাহিত, না অবিবাহিত এ কথা জেনে এদের লাভ কী? তদুপরি তিনি যে অবিবাহিত এ কথাও সবাই অবগত। এরাও নিশ্চয় অবগত। তবুও সব জেনেশুনেও এ রকম ব্যক্তিগত প্রশ্ন উত্থাপন করার কারণ কী?
আমার বিশ্বাস, ভাগ্য আপনার উপরে প্রসন্ন। আপনি মুজাফ্ফরের ভ্রাতার মতো। আপনারা উভয়ে তৈমূর বংশীয়। আপনি হিরাতে মুজাফ্ফরের সাথে থেকে যান। হিরাতের সবচেয়ে সুন্দরী কন্যার সাথে আমি আপনার বিয়ে দিয়ে দিব।
লঘু হাসি-তামাশার আড়ালে অবশ্যেই গম্ভীর সংকেত প্রচ্ছন্ন ছিলো। সাধারণ দৃষ্টিতে কথাগুলো লঘু যেন লাগলেও কথাগুলোর মাঝে লুকিয়ে ছিলো দূরদর্শী খাদিজা বেগমের গভীর ষড়যন্ত্র। মুজাফ্ফর এবং বদিউদ জামান উভয়ে তাঁর গর্ভজাত সন্তান হলেও তিনি মুজাফ্ফরকে বেশি স্নেহ করেন। মুজাফ্ফর চিরদিন বাদশাহ হয়ে থাকাটা তিনি মনে-প্রাণে কামনা করেন। সেজন্য সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য তিনি সিংহাসনের সাম্ভাব্য দাবিদার মির্জা মোমিন এবং সুলতান হোসেনকে আগেই হত্যা করিয়েছেন। বর্তমান বদিউদ জামানই মুজাফ্ফরের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। বদিউদ জামানকে সরাতে পারলেই মুজাফ্ফর নিষ্কণ্টক। সেজন্য তিনি বিয়ের টোপ দিয়ে বাবরকে মুজাফ্ফরের ভ্রাতৃ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কাজটায় সফল হলেই তিনি ঈস্পিত লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারেন।
আমার জন্য চিন্তা করার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। বাবর কৃত্রিম প্রশংসা করে খাদিজা বেগমকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- কিন্তু আমাদের রাস্তায় প্রাচীর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
প্রাচীর! কেমন প্রাচীর? খাদিজা বেগম উৎকণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন।
মাফ করবেন। সেসব কথা …..বাবর পরিচারিকা কয়জনের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে, পরে খাদিজা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন- এই ভদ্র মহিলাদের সন্মুখে সেসব কথা বলতে আমি লজ্জাবোধ করছি।
বাবর মাথা নত করলেন। খাদিজা বেগম পরিচারিকাদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। ইংগিত পেয়ে পরিচারিকাবর্গ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো।
বাবর গুরু গম্ভীরভাবে শুরু করলেন- মালিকা সাহেবা, আমাদের দিকে বর্তমান এক সংকটময় মুহূর্ত মুখব্যাদন করে এগিয়ে আসছে। সেই সংকটের নায়ক হলো শৈবানি খাঁ। শৈবানি খাঁ আন্দিজান থেকে শুরু করে খোরাসান, মর্ব, তুর্কিস্থান দখল করে এক বিশাল বাহিনী গঠন করেছেন। তিনি প্রত্যেকটা যুদ্ধের আগে অতি নিখুঁতভাবে যোজনা প্রস্তুত করে নেন। ফলে তিনি যখন যুদ্ধে অবতীর্ণ হোন, তখন অতি সতর্ক এবং নিপুণ যোদ্ধাও তাঁর সন্মুখে টিকতে পারেনা। আমি নিজ চোখে তাঁর সেই যুদ্ধ কৌশল প্রত্যক্ষ করেছি।
বাবর এইভাবে বলে শৈবানি খাঁর সৈন্যবল এবং ক্রুরতার বিষয়ে দু-চারটে উদাহরণও দিলেন।
খাদিজা বেগমের মুখমণ্ডল ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠলো। তিনি অতিশয় বিচলিত কণ্ঠে বললেন- আমরা সেই আপদ কেমনে দূর করতে পারবো, বলুন? আপনার বর্ণনা শুনেই আমার হাতপা জঠর হয়ে আসছে।
খদিজা বেগমকে ভয় পাওয়া দেখে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন- সেই বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায় নিশ্চয় বের হবে। কিন্তু তার আগে আমরা শত্রুতা ভুলে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা সকল তৈমুর বংশীয় লোকদের একত্রিত করে এক সন্মিলিত বাহিনী গঠন করতে হবে। যেসব স্থানে আমাদের শাসক পরিবর্তন হয়েছে সেই সব স্থানে নতুন সেনা ভর্তি করে আমরা একসাথে প্রশিক্ষিত হতে হবে। আমাদের সন্মিলিত বাহিনীতে কমেও পঞ্চাছ যাঠ হাজার সৈন্য থাকতে হবে।
কিন্তু সেই বাহিনীর সেনানায়ক কে হবে? খাদিজা বেগম সজাগ হয়ে উঠলেন।
কাশিম বেগ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে বাবরের দিকে তাকালেন। কাশিম বেগের মতে একমাত্র বাবরই সেই সেনা বাহিনীর নায়ক হওয়ার জন্য উপযুক্ত। বাবর নিজেও নিজেকে সেই বাহিনীর নায়ক হওয়ার জন্য উপযুক্ত বলে ভাবছিলেন এবং তাঁর সেনানায়ক হওয়ার ইচ্ছাও ছিলো। কিন্তু বাবর এ কথাও জানছিলেন যে, খাদিজা বেগম কখনও তাঁকে সমর্থন করবেন না। তিনি একমাত্র মুজাফ্ফরকে এই ক্ষেত্রে সমর্থন করবেন।
সেজন্য বাবর খাদিজা বেগমকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুজাফ্ফরে কথা বলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু বদিউদ জামানের উজির-এ-আজম জুন্নুন বেগ সেখানে উপস্থিত ছিলো। সেজন্য তিনি কথাটা সরাসরি না বলে দ্ব্যর্থবোধকভাবে বললেন- সেনানায়ক কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত হিরাতের দুই শাসক ভ্রাতৃয়ে নেওয়া উচিত হবে, মালিকা সাহেবান।
খাদিজা বেগম উপস্থিত বেগদের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য সন্ধানী দৃষ্টিতে বেগদের দিকে তাকালেন।
জুন্নুন বেগ দাঁড়িয়ে বললেন- আমাদের মহামান্য মেহমান শৈবানি খাঁর শক্তি এবং চতুরতা সম্পর্কে আমাদের সচেতন করার জন্য আমি মহামান্যকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস শৈবানি খাঁ মাউরা উন্নহরে বিজয় সাব্যস্ত করতে পারলেও খোরাসানে তার পরাজয় অনিবার্য। সেজন্য আমরা এ বিষয় নিয়ে এখনই ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কোনো অর্থই দেখতেছি না। যদি মহামান্যই বলা ধরণে শৈবানি খাঁ খোরাসানের দিকে হাত বাড়ায় তখন কাঁথা দেখে পা মেললেই হবে। কারণ আমাদের সেনাবলও তো কম নয়!
খাদিজা বেগম ছোট ছেলে মুজাফ্ফরের পক্ষে ছিলেন এবং মুজাফ্ফরকেই বাবরের কল্পিত সেনা বাহিনীর নায়ক হওয়াটা কামনা করছিলেন। কিন্তু বাহিনী গঠন হওয়ার পরে যদি বদিউদ জামান সেনা বাহিনীর নায়ক হয়! এই সন্দেহের শিকার হয়েই তিনি জুন্নুন বেগকে সমর্থন করে বললেন- আমিও বেগ সাহেবকে সমর্থন করছি। সদ্য সন্মিলিত বাহিনীর চিন্তা না করাটাই উত্তম হবে।
সেদিনের আলোচনা সেখানেই ইতি টেনে পরের দিন বদিউদ জামানের নিকট গিয়ে বাবর সেই একই প্রস্তাব রাখলেন। বদিউদ জামানও তাঁকে নিরাশ করলেন। সন্মিলিত বাহিনী গঠন করলে যদি তিনি নায়ক হতে না পারেন, এই সন্দেহের বশবর্তী হয়েই তিনি বাবরের প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন।
সন্মিলিত বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে নিরাশ হয়ে বাবর কয়েকদিন পরে সৈন্যসামন্ত নিয়ে কাবুল অভিমুখে যাত্রা করলেন।
কাবুলের সিংহাসন তখন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিলো। সেজন্য কাবুলের বেগবর্গ সর্বসম্মতিক্রমে বাবরকে কাবুলের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করলেন। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য সেনা সংগ্রহে মনোনিবেশ করলেন।
বাবর কাবুলের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিন পরেই বাবরের ভবিষ্যত বাণী ফললো।
শীতকাল শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শৈবানি খাঁ তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে হিরাতের দিকে এগিয়ে এলেন। মুজাফ্ফর এবং বদিউদ জামান দুর্যোগের সময়েও বিদ্বেষ ভুলে একত্রিত হতে পারলেন না। তাঁরা পৃথকে পৃথকে শৈবানি খাঁর গতিরোধ করার জন্য চেষ্টা করে বিফল হলেন। ফলে দুই ভ্রাতৃ শৈবানি খাঁর হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেন।
যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বদিউদ জামান ধন-সম্পত্তি ঘোড়ার পিঠে বোজাই দিয়ে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে কান্দাহার পালিয়ে গেলেন। অন্যদিকে মুজাফ্ফর আত্মীয়-স্বজন শত্রুর হাতে ছেড়ে দিয়ে পশ্চিম দিকে অবস্থিত আস্তারাবাদের দিকে শুধু নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে গেলেন।
শৈবানি খাঁর বিজয়োন্মত্ত সেনারা অবাধে লুটপাটের তাণ্ডব চালালো। দুই রাজকীয় ভ্রাতৃর বিশিষ্ট লোকগুলোর উপরে চালালো অকথ্য নির্যার্তন। ‘আর্ক’-এ অবস্থানরত মহিলাদের খুঁজে খুঁজে বের করে অমানবীয় পশুসূলভ আচরণ করতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করল না। অমানুষিক বর্বর অত্যাচারের ফলে হিরাতের জনতা আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। লুটপাটের তাণ্ডবে তারা সর্বহারা হয়ে পড়লো। রাজ পরিয়াল এবং সর্বসাধারণ জনতার নিরাপত্তা ও শান্তি সমুলঞ্চে বিনষ্ট হলো।
শৈবানি খাঁ আর্ক থেকে জুর-জুলুম করে ধরে এনে মুজাফ্ফরের মাতৃ খাদিজা বেগমকে মনসুর বক্সী নামক একজন বেগের সাথে নিকাহ দিয়ে দিলেন এবং নিজে মুজাফ্ফরের বেগম কারাকোজ বেগমকে নিকাহ করলেন।
রাতের পরে দিন এবং দিনের পরে রাত এটাই হলো সৃষ্টির নিয়ম। হিরাত দখলের কিছুদিন পরে শৈবানি খাঁর ভাগ্যাকাশ পরাজয়ের কালো মেঘে ছেয়ে ফেললো। তাঁর অন্যায় অত্যাচারের খবর পেয়ে ইরানের শাসক ইসমাইল ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে হিরাতের দিকে রওয়ানা হলেন। ইসমাইলের আগমনের খবর পেয়ে শৈবানি খাঁ ইসমাইলকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজের বাহিনী নিয়ে বের হলেন। কিন্তু ইসমাইলের সাথে সংঘটিত সন্মুখ সমরে শৈবানি খাঁ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। শৈবানি খাঁ নিজেও নিহত হলেন উক্ত সমরে। ইসমাইলের সেনারা শৈবানি খাঁর মাথা কেটে বাদশাহকে উপহার দিলেন। সাথে সাথে একজন লোভী, বর্বর, বিভীষিকাময় শাসকের কলঙ্কিত জীবনের অন্ত হলো।
ইসমাইল হিরাত অধিকার করে শৈবানি খাঁর সম্পত্তি এবং মহিলাদের তাঁর অধীনে আনলেন। পূর-নারীদের মাঝে বাবরের ভগ্নী খানজাদা বেগমও ছিলেন। খানজাদা বেগম তখন শৈবানি খাঁর আট বছরের পুত্র সন্তানের জননী।
এদিকে ইসমাইল হিরাত আক্রমণের সময়ে বাবর ইসমাইলকে সহায় করার জন্য নিজের বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সহায়ের প্রয়োজন হবে না বলে ইসমাইল বাবরকে বলে পাঠানোতে বাবর নিজের হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দিজান এসে অনায়াসে আন্দিজান দখল করলেন। আন্দিজান দখলের পরে বাবরের মনোবল বৃদ্ধি পেলো এবং তিনি হিসার দখল করার জন্য হিসার অভিমুখে রওয়ানা হলেন।
হিসার আক্রমণ করতে এসে বাবর কুন্দুজ নামক একটি স্থানে তাঁবু নির্মাণ করলেন। তখনই বাবর শৈবানি খাঁর পরাজয়ের সংবাদ পেলেন। ইসমাইল শৈবানি খাঁর পুর নারীদের আটক করার সংবাদ পেয়ে বাবর তাঁর ভগ্নী খানজাদা বেগমকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য ইসমাইলের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করলেন। ইসমাইল বাবরের ভব্যতা, সভ্যতা এবং ক্ষমতার বিষয়ে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। সেজন্য পত্র পেয়েই তিনি খানজাদা বেগমকে মুক্ত করে দিলেন।
মুক্তি পেয়ে খানজাদা বেগম তাঁর আট বছরের সন্তান খুরমকে নিয়ে কুন্দুজ এসে বাবরের সাথে মিলিত হলেন। সুদীর্ঘ আট বছর পরে ভগ্নীকে দেখে বাবরের চোখে জল বেরিয়ে এলো। দীর্ঘদিন পরে ভ্রাতৃ-ভগ্নীর মিলনের ফলে ছাউনির সবাই উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন।
* * *
কুন্দুজ!
কুন্দুজ চারদিকে পাহাড় ঘেরা হিন্দুকোশ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এক দুর্গম নিচু জলাশয় অঞ্চল। নিরাপত্তার খাতিরেই বাবর দুর্গম স্থানে ছাউনি পেতে হিসার আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। যুদ্ধের প্রস্তুতি চলাকালীন বাবর অন্য এক বিপর্যয়ের সন্মুখীন হলেন।
শৈবানি খাঁ নিহত হওয়ার পরে তাঁর একাংশ সেনা ইসমাইলের রোষ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। সেই সেনাদলের একাংশ সেনা বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। কথাটা প্রথমে কাশিম বেগমের কানে পড়ল। বিদ্রোহী সেনাদের দলপতি ছিলো কবচ খাঁ নামক একজন বেগ। তাঁর অধীনে বিশ হাজার সেনা ছিলো। সেনাগুলো সুক্ষিশিত এবং যুদ্ধ পাগল ছিলো। ভাড়াটিয়া সেনা হিসাবে যুদ্ধ করাই ছিলো তাদের জীবন নির্বাহের একমাত্র উপায়। যে পক্ষ থেকে টাকা পেতো সেই পক্ষের হয়েই তারা যুদ্ধ করতো। যে পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করে লুটপাট করে অধিক ধন-সম্পত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখত সেই পক্ষের হয়ে তারা যুদ্ধ করতে অধিক আগ্রহী ছিলো। বাবরের জয়ের পূর্বাভাষ পেয়েই তারা বাবরের দলে যোগদান করেছিলো। সেই সেনাদলে শৈবানি খাঁর সাথে সুসম্পর্ক থাকা সেনা সংখ্যাই অধিক ছিলো।
এদিকে কবচ খাঁর সাথে বাবরের ব্যক্তিগত শত্রুতাও ছিলো। কাবুলে থাকাকালীন কবচ খাঁর একজন ভ্রাতৃ গত বছর বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো। কথাটা অবগত হয়ে বাবর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। সেটাই ছিলো বাবরের প্রতি কবচ খাঁর শত্রুতার প্রকৃত কারণ। ফলে বাবরের উপরে ভ্রাতৃ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই সে এখান ওখান থেকে সেনা সংগ্রহ করে বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তবে, রাজবংশোদ্ভব লোকের অভাবেই সে তার প্রতিশোধ স্পৃহা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। কারণ বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হলে একজন রাজবংশোদ্ভব লোকের প্রয়োজন হবে এবং তাঁর অধীনে সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে হবে। তা না হলে অন্যান্য শাসকেরা গর্জে উঠে বাবরের পক্ষ নেবেন।
বাবরের চাচা আলাসা খাঁর সতের বছরের পুত্র সৈয়দ খাঁ বাবরের সেনা বাহিনীর একজন সদস্য ছিলো। সৈয়দ খাঁর উপরে কবচ খাঁর চোখ যায় এবং সে তার অভীষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশ্যে সৈয়দ খাঁকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। সে সাম্রাজ্যের লোভ দেখিয়ে সৈয়দ খাঁকে নিজের জালে ফেলার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সৈয়দ খাঁ ছিলো বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান। সেজন্য সৈয়দ খাঁ সরাসরিভাবে প্রস্তাবটা প্রত্যাখান না করে তার মতামত পরে ভেবেচিন্তে জানাবে বলে সময় নিয়ে গোপনে কাশিম বেগকে কথাটা অবগত করে।
কাশিম বেগ অতি গোপনে কথাটা বাবরকে অবগত করেন। কথাটা শুনে বাবর গর্জে উঠলেন- শঠ প্রবঞ্চক! তোরা আমার পিঠে আর কতদিন ছুরিকাঘাত করবি। এভাবে বলেই কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আহম্মদ তনয়ালের কথা আপনার নিশ্চয় মনে আছে, বেগ সাহেব? আহম্মদ তনয়ালও একজন মোগল ছিলো। তাকে বিশ্বাস করে ক্ষমা করেছিলাম এবং এই উদারতার জন্য সে আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করার সুযোগ পেয়েছিলো। আমি অনেক সহ্য করেছি। আর সহ্য করব না। আপনি ষড়যন্ত্রকারীদের বন্দি করে কেটে টুকরো টুকরো করে শিয়াল-কুকুরকে বিলিয়ে দিন।
তাঁরা গোপনীয়তা রক্ষার জন্যই একটি পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে আলোচনা করছিলেন। বাবরের রাগ দেখে কাশিম বেগ সচকিত হয়ে উঠলেন এবং তিনি পাহাড়ের পাদদেশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
পাহাড়ের পাদদেশে হাজার হাজার তাঁবু খাড়া করা ছিলো। তাঁবুগুলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তিনি শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু জাহাপনা, ষড়যন্ত্রকারীরা যথেষ্ট শক্তিশালী। তাদের অধীনে বিশ হাজারের অধিক সেনা রয়েছে।
সবগুলো মোগলই এই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত নাকি?
সম্ভবতঃ সবগুলো নয়! সৈয়দ খাঁ তো মোগলই, সে দেখছি আমাদের প্রতি বিশ্বস্ততাই প্রদর্শন করছে। হয়তো বেশি সংখ্যক মোগলেরই আমাদের প্রতি ভালো মনোভাব রয়েছে।
তাহলে একমাত্র কবচ খাঁকে বন্দি করুন।
চিন্তার গাম্ভীর্যে কাশিম বেগের ভ্রূযুগল কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। তিনি হতাশা মিশ্রিত সুরে বললেন- কিন্তু জাহাপনা, ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে কবচ খাঁর প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। অনেক বেগ তাঁর আত্মীয়ও। আমরা তার উপরে প্রতিশোধ নিতে গেলে বাকি বেগগুলো গর্জে উঠতে পারে এবং এর প্রভাব হিসারের উপরেও পড়তে পারে।
কাশিম বেগের ধারণা অমূলক ছিল না। বিশ হাজার সেনার মাঝে কে স্বপক্ষে এবং কে বিপক্ষে সঠিকভাবে বলা কঠিন। তদুপরি শত্রু-মিত্র খুঁজে বের করতে হলেও যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। এদিকে যতদূর সম্ভব সত্বর হিসার আক্রমণ করা প্রয়োজন। কিছুদিন পরেই বর্ষাঋতু শুরু হবে। বর্ষাঋতু শুরু হলে সব রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে। রাস্তাঘাট বন্ধ হলে তখন হিসার আক্রমণ করা সম্ভব হবে না।
সেজন্য বাবর কাশিম বেগের যুক্তির সপক্ষে এবং বিপক্ষে নিজের মনে বিবেচনা করে দেখতে যত্নপর হলেন। তবে বিপক্ষ যুক্তিই তাঁর মনে অধিক প্রভাব ফেললেন। যুক্তিতে হেরে অবশেষে রাগই অসন্তোষের রূপ নিলো। নিরুদ্ধ আক্রোশে তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- বিদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক! কবচ খাঁ বিদ্রোহীদের একত্রিত করে আমার উপরে আঘাত হানার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে! যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তাকে আমি এরূপ শাস্তি দিব যে, তার পরিনামের কথা ভেবে কেউ যেন ভবিষ্যতে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস না করে।
আপনি ঠিকই ভেবেছেন, জাহাপনা। প্রবঞ্চকের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগতভাবে যুদ্ধ করা অবশ্যেই উচিত নয়। তবে, এই ক্ষেত্রে আমি অন্য রকমে এগোনোর কথা ভাবছি।
অন্য রকমে! কেমনে?
সৈয়দ খাঁ আপনার বিশ্বস্ত। ষড়যন্ত্রকারীরা সৈয়দ খাঁকে তাদের নায়ক নির্বাচিত করার কথা ভাবছে। সেজন্য আপনি তাদের মতামতকে সমর্থন করে সৈয়দ খাঁকে তাদের সাথে আন্দিজান পাঠিয়ে দিন। আন্দিজান বর্তমান আমাদের অধীনে। সৈয়দ খাঁ সেখানে গিয়ে আন্দিজানের শাসনভার নিজে সামলাকগে’। আমরা বর্তমান এভাবেই কবচ খাঁর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু পরে অন্যান্য বেগবর্গও যদি এর সুযোগ নিতে চায়?
অবশ্যে তেমন হতে পারে! কাশিম বেগ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন- আমি তারও ব্যবস্থা করব। আমি অন্যান্য বিদ্রোহী বেগদের বুঝিয়ে বলব যে, তারা একমাত্র আমার জন্যই আপনার রোষ থেকে রেহাই পেয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ এরকম আচরণ করলে আমি তাদের রক্ষা করতে পারব না। তদুপরি আমরা তাদের উপরে সর্বদা চোখ রাখতে হবে। যদি কখনো তাদের কোনো সন্দেহজনক আচরণ চোখে পড়ে তাহলে সাথে সাথেই তাদের বন্দি করতে হবে।
সৈয়দ খাঁকে বিদ্রোহীদের সাথে আন্দিজান পাঠানোর মানে সৈয়দ খাঁকে বলি দেওয়ার মতোই ধারণা হলো বাবরের। সেজন্য কাশিম বেগের আত্মঘাতী পরামর্শ বাবরের পসন্দ হলো না। কিন্তু তিনি বিকল্প কোনো উপায়ও ভেবে পেলেন না। সেজন্য তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাশিম বেগের সাথে সহযোগ করতে বাধ্য হলেন এবং কাশিম বেগের যোজনা অনুসারে কবচ খাঁর সাথে সৈয়দ খাঁকে আন্দিজান পাঠিয়ে দিলেন।
গ্রীষ্ম ঋতু শুরু হওয়ার সাথে সাথে বাবর সেনাবাহিনী নিয়ে পঞ্জ নদী পার হয়ে বুদুস ঘাটির দিকে অগ্রসর হলেন। ইরানের বাদশাহ ইসমাইল একদল কিজিলবাশ্বী(ইসমাইল ইরানের কিজিলবাশ্ব নামক স্থানের বাসিন্দা ছিলেন। সেজন্য ইরানের একাংশ সেনাকে কিজিলবাশ্বী বলা হত।) সেনা বন্ধুত্বের চিহ্ন স্বরূপে বাবরের সহায়ের জন্য প্রেরণ করছিলেন। তারা তরমেজের নিকটে ছাউনি পেতে বাবরের আগমন অপেক্ষায় আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন।
বাবর বুদুস ঘাটির দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা শুনে শৈবানি খাঁর পুত্র তৈমূর সুলতান বিচলিত হয়ে উঠলো। সে জানতো যে, বাবর তরমেজের দিক দিয়ে এসে বুদুস ঘাটিতে ইসমাইলের সেনার সাথে মিলিত হলে তার পরাজয় নিশ্চিত। সেজন্য সে নিজের বাহিনীর একটা অংশ উবেদুল্যা সুলতানের নেতৃত্বে কর্শি ও সমরকন্দে রেখে মূল বাহিনী নিয়ে হিসার এসে আসন্ন আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য যোজনা প্রস্তুত করতে বাধ্য হলো। বাবর সেনা হিসার পৌঁছানোর আগেই সে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো।
সিদ্ধান্ত মর্মে তৈমূর সুলতান জানি বেগ, হামজাহ সুলতান এবং মেহেদি সুলতানের নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে স্তেপীর দিকে অগ্রসর হলো। তারা দ্রুত এসে স্তেপী পৌঁছোলেন।
স্তেপীতে বহস নদীর পাড়ে একটি পাহাড় ছিলো। বাবর সেনা বহস নদী পার হয়ে সেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে অবস্থান নিতে পারে বলে অনুমান করে বাবর সেনা বহস নদী পার হওয়ার পূর্বেই তাদের বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে তৈমুর সুলতান পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরের দিকে উঠে আসতে লাগলো। কিন্তু পাহাড়ে উঠার মুখে তারা বাধার সম্মুখীন হলো।
তৈমূর সুলতানের সেনা বাধার সম্মুখীন হওয়ার কারণ ছিলো বাবরের প্রত্যুৎপন্নমতিতা। প্রত্যুৎপন্নমতিতার দৌড়ে বাবর তৈমুর সুলতানের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তৈমূর সুলতান ডালে ডালে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বাবর পাতায় পাতায় হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ বাবর তাঁর পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে জানছিলেন, প্রতিপক্ষ সেনা তাঁদের বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে পাহাড়ের উপরে উঠে অবস্থান নেওয়া সম্ভব। যদি তাই হয়, তখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করা অসম্ভব হবে। সেজন্য প্রতিপক্ষ সেনা এসে পৌঁছোনের আগেই বাবর সেনা সংগীন নামক স্থানে বহস নদী পার হয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এসেছিলো। প্রতিপক্ষ সেনা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরের দিকে উঠার সময়ে বাবর সেনা পাহাড়ের উপরে উঠে এসে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নামছিলো। বাবর সেনার এক বৃহৎ অংশ ইতিমধ্যেই পাহাড় থেকে উপত্যকার দিকে নেমে যাওয়া সংকীর্ণ পথের মুখে অবস্থান নিয়ে মালভূমির উপরে চোখ রাখছিলো। প্রতিপক্ষ সেনারা উপত্যকার দিকে নেমে যাওয়া সংকীর্ণ পথের মুখে বাবরদের প্রত্যক্ষ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো এবং তারা পাহাড়ে আরোহণ করা থেকে বিরত হয়ে কীভাবে উদ্ভব পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে সে বিষয়ে দলের মাঝে আলোচনায় মিলিত হলো।
বাবর পাহাড়ের উপর থেকে প্রতিপক্ষ সেনার গতিবিধি নিরীক্ষণ করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনাদের বেগবর্গ পরস্পরের সাথে শলা-পরামর্শ করে বিভিন্ন দিকে চলে গেলো। অল্পপরেই দশ হাজার সেনা নিয়ে সমতলের দিকে নেমে যাওয়া রাস্তার দিকে তৈমুর সুলতানকে অগ্রসর হতে দেখলেন। প্রতিপক্ষের গতিবিধি লক্ষ্য করে বাবর সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনা তিনি দখল করে থাকা উঁচু স্থানটি সম্পূর্ণরূপে ঘেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েই সেভাবে অগ্রসর হচ্ছে।
বাবরের মস্তিষ্ক ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো। প্রতিপক্ষের মনোভাব উপলব্ধি করে তিনি বেগবর্গের সাথে পরামর্শ করে মির্জা খাঁ নামক একজন বেগের নেতৃত্বে একদল সেনা প্রতিপক্ষ সেনা বিশেষ করে তৈমূর সুলতানের নেতৃত্বে আসা সেনাদেরকে বাধা প্রদান করার জন্য প্রেরণ করলেন।
তৈমূর সুলতানের অধীনে আসা সেনা সরাসরি পাহাড়ের উপরে উঠে আসতে অসুবিধা হওয়ার জন্য বৃত্তাকারে ঘুরে উঠে আসতে বাধ্য হলো। এই সুযোগে মির্জা খাঁ প্রতিপক্ষ সেনার আগেই গন্তব্য স্থানে এসে পৌঁছোলো এবং সমগ্র উঁচু স্থান দখল করে প্রতিপক্ষ সেনার আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
তৈমূর সুলতান গন্তব্য স্থানে পৌঁছে বাবর সেনাদের সমগ্র উঁচু স্থান দখল করে অবস্থান নেওয়া প্রত্যক্ষ করে একটি সংকীর্ণ পথ বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে আসতে লাগলো। মির্জা খাঁ প্রতিপক্ষের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে সংকীর্ণ পথের মুখে একদল সেনা প্রেরণ করলো। ফলে দুই পক্ষের মাঝে সংঘর্ষ লাগলো। তৈমূর সুলতান অসীম বীরত্বের সাথে যুঁজেও অগ্রসর হতে ব্যর্থ হলো। বাবর সেনা পাহাড়ের উপর থেকে তীর, পাথর প্রভৃতি নিক্ষেপ করে তৈমূর সুলতানের সমগ্র প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিলো। তৈমূর সুলতানের সেনা প্রকৃতার্থে খোলা প্রান্তরে যুদ্ধ করায় অভ্যস্ত ছিলো। সেজন্য পাহাড়ের ঢালু স্থানে দক্ষতা অনুসারে যুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলো।
বাবর সংবাদ নিয়ে জানতে পারলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনা অবস্থান গ্রহণ করা স্থান থেকে জল অনেক দূরে। সমতল অভিমুখে নেমে যাওয়া রাস্তা থেকে জল কমেও এক মাইল দূরে। এদিকে গরমও পড়েছিলো যথেষ্ট। সেজন্য বাবর অনুমান করলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনা অতি সত্বর জলের সন্ধান করতে বাধ্য হবে। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিপক্ষকে জল আহরণে বাধা প্রদানের জন্য একদল সেনা প্রেরণ করলেন।
তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে আসছিলো। সূর্য অস্ত যাওয়ার মুখে। বাবর কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন। বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে এক হাজার অশ্বারোহী সেনাও ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে লঘু পদক্ষেপে ছাউনির দিকে অগ্রসর হলো।
পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রতিপক্ষ সেনা বাবর সেনার গতিবিধি লক্ষ্য করছিলো। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাবর সেনাদের ছাউনির দিকে অগ্রসর হওয়া দেখে সেদিনের জন্য যুদ্ধ স্থগিত হলো বলে প্রতিপক্ষ সেনারা ভেবে নিলেন। কিন্তু একদল বাবর সেনা তাদের উপরে চরম আঘাত হানার জন্য উপত্যকার সংকীর্ণ পথের দিকে অগ্রসর হওয়াটা তারা লক্ষ্য করলো না। ফলে সুলতানবর্গ নিজের নিজের সেনাদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য দুর্ভাগ্যজনক আদেশ দিলেন। আদেশ পেয়ে সেনাগুলো বিশ্রামের জন্য নিজের নিজের তাঁবুতে গেলো। কিছু সংখ্যক সেনা বের হলো জলের সন্ধানে। ফলে সমগ্র বাহিনী বিশৃংখল হয়ে পড়ল।
বাবর যে সুযোগের অপেক্ষায় অপেক্ষা করছিলেন প্রকৃতপক্ষে সেটাই হলো। প্রতিপক্ষ সেনা বিশৃংখল হয়ে পরার সাথে সাথে সেই সুযোগ এলো। প্রতিপক্ষ সেনাদের বিশৃংখল অবস্থায় দেখেই তিনি নিজের বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন- শত্রুসেনা বিশৃংখল হয়ে পরেছে। যাও, আক্রমণ কর। তাদের ধর এবং মেরে কেটে খতম করে দাও।
বাবরের আদেশ পেয়ে উপত্যকার সংকীর্ণ পথে ইতিমধ্যে গোপনে সমবেত হওয়া বার হাজার অশ্বারোহী বানের জলের মতো প্রচণ্ড গতিতে বেরিয়ে এলো। পাহাড়ের উপর থেকে তিন হাজার পদাতিক সেনা তাদের সহায় করার জন্য নিচের দিকে নেমে আসতে লাগলো। কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে বাবর নিজেও পদাতিক সেনাদের আগে আগে নেমে আসতে লাগলেন।
প্রতিপক্ষের অপ্রস্তুত সেনা বাবর সেনার অতর্কিত আক্রমণের ফলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। প্রতি আক্রমণের অবসর না পেয়ে তারা যে যেদিকে পারে প্রাণ নিয়ে পালাতে লাগলো। ফলে অল্প সময়ের ভেতরে তারা বিশৃংখল হয়ে পড়লো। তৈমূর সুলতান নিজে শত্রুসেনার ব্যূহের মধ্যে পড়ার ভয়ে দূরের একটি উপত্যকার দিকে প্রাণ নিয়ে পালালো। মহম্মদ দুলহায় নামক বাবর সেনার বেগ একজন অসীম বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে প্রতিপক্ষের অনেক সেনা মেরে কেটে হামজাহ সুলতানকে বন্দি করলো। খাজা কালার নেতৃত্বে যাওয়া একদল সেনা দুপর রাতে মেহেদি সুলতানকে জীবন্তে বন্দি করে আনলো।
উভয় সুলতান আন্দিজান এবং কারাকোলে সাধারণ জনতাকে নির্বিচারে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ছিলো। বাবর উভয়কে মৃতুদণ্ডের আদেশ দিলেন।
যুদ্ধে বাবর জয়ী হলেন। দুর্ভাগের কালো মেঘ বিদীর্ণ করে আবার সৌভাগ্য রবি উদয় হলো। অবশেষে তিনি হিসার জয় করে স্বপ্নের সহর সমরকন্দের দিকে অগ্রসর হলেন।
* * *
শরতের নির্মল আকাশ। জোৎস্না রাত। নানান রঙের অনেক ফুল ফুটেছিলো বাগানে। ডালিম, নাশপতি, আতা প্রভৃতি নানান রকমের ফল পেকে গাছে গাছে দুলছিলো। সংগীতের মূর্ছনার মতো ফলের কোমল স্নিগ্ধ সৌরভ ভেসে বেড়াচ্ছিলো বাতাসে।
মহান সমরকন্দ সহরের সমগ্র দরজা উন্মুক্ত।সহরের ভেতর প্রবেশের সবার ছিলো অবাধ স্বাধীনতা।
বিগত দশদিন সহরে কোনো শাসক বা সৈন্য নেই। বহসের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শৈবানি খাঁর সমর্থকরা বাবরের ভয়ে সমরকন্দ ফিরে আসেনি। তারা বাবরের সাথে আবার সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জন্য কর্শি এবং গুজারের আশেপাশে অবস্থান নিয়ে সেনা বাহিনী পুনর্গঠনের জন্য ব্যস্ত ছিলো এবং অল্প সংখ্যক সৈন্য সহরের পহারার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো। কিন্তু তারা যখন শুনলো, ইরানের শাসক ইসমাইল প্রেরিত ত্রিশ হাজার কিজিলবাসী সেনা বাবরের সহায়ের জন্য সমরকন্দ অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে, তখন তারা ভয়ে কুর্শি, বুখারা এবং সমরকন্দ অরক্ষিত অবস্থায় রেখে সোনা-রুপো, পশুর পাল, খাদ্যসামগ্রী নিয়ে স্তেপী পালিয়ে গেছে। ফলে তখন থেকে দূর্গদ্বার উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
মাউরা উন্নহরের কৃষক এবং সহরের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন সংঘটিত যুদ্ধের ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলো। বারে বারে শাসক পরিবর্তন হওয়ার ফলে তাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে অন্যায়-অত্যাচার ও লুটপাটের তাণ্ডব। ফলে তাদের জীবন হয়ে পরছে বিপর্যস্ত- বিধ্বস্ত। তারা প্রতি মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছিলো। সেজন্য তারা অঘরী সুলতান এবং বেগদের প্রতি হয়ে উঠেছিলো অতিষ্ঠ–বীতশ্রদ্ধ। তারা কামনা করছিলো একজন স্থায়ী শাসক। সেজন্য বাবরের আগমনের কথা শুনে তারা উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলো। শৈবানি খাঁর সমর্থকরা সহর ছেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে তারা দূর্গদ্বারসমূহ খোলে বাবরের আগমন অপেক্ষায় অধীরভাবে অপেক্ষা
করতেছিলো।
বাবর মিত্র বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে কর্শি এবং বুখারা বিনাযুদ্ধে অধিকার করে উত্তর পশ্চিম দিক থেকে সমরকন্দ অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিলেন। বাবর সেনা সহর থেকে কিছু দূরে থাকতেই সহরের বাসিন্দারা তাঁদের উষ্ম অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছিলো। বাবরের সন্মানে সহরটা অতি সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিলো। বাবর দূর্গের নিকট পৌঁছানোর সাথে সাথে বিশজন বিশিষ্ট নাগরিক দূর্গের চাবি ও অন্যান্য উপহার সামগ্রী নিয়ে বাবরকে অভ্যর্থনা জানাতে দূর্গদ্বারে সমবেত হলেন।
চারবাহা দরজার দিকে প্রসারিত রাস্তার দুই পাশে অগণন জনতা বাবরের অপেক্ষায় সারি বেধে দাঁড়িয়ে ছিলো। আনন্দ প্রকাশের প্রতীক হিসাবে এবং বাবরের সন্মানার্থে সুন্দরভাবে সাজানো সহরের সর্বত্র আনন্দ উল্লাস বিরাজ করছিলো। দালানের ছাদ এবং দরজায় দরজায় ধ্বনিত হচ্ছিল বাঁশির কোমল স্নিগ্ধ সুর। হিসার বিজয়ের জন্য বাবরের গুণকীর্তন করে এবং সমরকন্দে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রশংসা করে গজল লেখা হয়েছিলো। সেইসমূহ গজল লিখে স্থানে স্থানে টানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এবং অনেকে মুখে মুখে গাইতে ছিলো।
উষ্ম অভ্যর্থনা দেখে বাবর অভিভূত হয়ে পড়লেন। যে সহর থেকে তিনি এক সময় সহরবাসীদের ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে গিয়ে ছিলেন, সে সহরে যে তিনি এতো উষ্ম সম্বর্ধনা পাবেন এটা ছিলো বাবরের কল্পনার অগোচর।
দোকান-পাট সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিলো। নানাবিধ উপাদেয় খাদ্যসামগ্রীতে ভরে ছিলো হালুইকরের দোকান। খাদ্যসামগ্রীর মিঠা স্নিগ্ধ সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিলো। সমগ্র সহরে বিরাজ করছিলো উৎসবমুখর পরিবেশ। এইসব আয়োজন করা হয়েছিলো বাবর এবং কিজিসবাসী সেনাদের অভ্যর্থনার জন্য।
দীর্ঘ সাত বছরের মাথায় বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে বাবর সমরকন্দ সহরে প্রবেশ করলেন এবং হর্ষ-উল্লাসের মাঝে বাবর পুনরায় সমরকন্দের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলেন। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি শৈবানি খাঁর সমর্থকদের দখলে থাকা স্থানসমূহ হস্তগত করার জন্য মনোনিবেশ করলেন।
বাবর কিজিলবাসী সেনার সাথে মিলিত হয়ে একটার পর একটা বিজয় সাব্যস্ত করতে লাগলেন। তাসকন্দ, সৈরাম, উজগন্ত এবং উশের শাসকবর্গ বশ্যতা স্বীকার করে বাবরকে বাদশাহ বলে স্বীকৃতি দিলেন। ইরানের বাদশাহ ইসমাইলকে সন্মান ও কৃতজ্ঞতা জানানোর উদ্দেশ্যে বাবর শ্বাহ ইসমাইলের ফটো সম্বলিত কয়েক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা প্রস্তুত করে কিজিলবাসী সেনার মাঝে বিতরণ করলেন।
বাবরের নিকট থেকে প্রভূত সন্মান এবং আনুগত্য পেয়ে কিজিলবাসী সেনা এক সময় উগ্র ও উদণ্ড হয়ে উঠলো। তাদের লুটপাট এবং উচ্ছৃংখল ব্যবহারের জন্য সমরকন্দবাসী জর্জরিত হয়ে পড়লেন। কিজিলবাসী সেনার লুটপাট, অন্যায়-অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সমরকন্দবাসী তাদের বিরুদ্ধে বাবরের নিকট অভিযোগ জানালেন।
‘সাপও যাতে মরে এবং লাঠিও যাতে নাভাঙে’ এই নীতি অনুসরণ করে বাবর কিজিলবাসী প্রভাবশালী বেগদের পোশাক-পরিচ্ছদ, তেজী ঘোড়া, সোনা-রুপোর বাসন-বর্তনের সাথে নানাবিধ উপহার দিয়ে তাদের মাউরা উন্নহর থেকে ইরান পাঠিয়ে দিলেন। তেমনভাবে সৈন্য-সামন্ত পাঠিয়ে দেওয়াতে শাহ ইসমাইল প্রকাশ্যে কিছু না বললেও পেটে পেটে ক্ষুণ্ন হয়ে উঠলেন। কিছুদিন পরে তাঁর সেই ক্ষুণ্নতার প্রমাণও পাওয়া গেলো।
স্তেপীতে তখনও শৈবানি খাঁর সমর্থক উবেদুল্যাহ সুলতান শাসনকার্য চালাচ্ছিলেন। তিনি তলেতলে সৈন্য সংগ্রহ করে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন।
কথাটা বাবরের কানে পড়ল। এদিকে অনেকদিন শোয়ে-বসে থেকে বেগ এবং সেনাদের তরবারিতে মামরে ধরার উপক্রম হয়েছিলো। সেজন্য বেগবর্গ উবেদুল্যাহ সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য আগে থেকেই বাবরকে প্ররোচিত করতে ছিলো। খবর পেয়ে বাবর উবেদুল্যাহ সুলতানের উপরে ক্ষুণ্ন হয়ে উঠলেন এবং স্তেপী আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। ত্রিশ হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাবর উবেদুল্যাহ সুলতানকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্তেপী অভিমুখে অগ্রসর হলেন। বাবরের যুদ্ধযাত্রার খবর পেয়ে উবেদুল্যাহ সুলতান স্তেপী ত্যাগ করে রেগিস্থানের দিকে পালিয়ে গেলেন।
উবেদুল্যাহ সুলতান পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ বাবরের কানেও পৌঁছলো। সেজন্য তিনি ঘোড়ার দানা-পানী এবং সেনাদের খাদ্যসামগ্ৰী সহজে সংগ্রহ করতে পারবে তেমন এক স্থানে ছাউনি পেতে উবেদুল্যাহ সুলতান রেগিস্থান থেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু অনেকদিন অপেক্ষা করার পরেও উবেদুল্যাহ সুলতান রেগিস্থান থেকে ফিরে এলো না। এদিকে অনেকদিন অপেক্ষা করে করে সেনারাও অধৈর্য হয়ে উঠলো। বাবরের নিজেরও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটলো। সেজন্য তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে রেগিস্থানের দিকে অগ্রসর হলেন।
বাবরের একাংশ সেনা পাহাড়ের অধিবাসী ছিলো। তারা পাহাড়ীয়া স্থানে চলা-চলে অভ্যস্ত ছিলো। সেজন্য তারা রেগিস্থানের বালু ও কাদাময় স্থানে চলা-চল করতে অসুবিধা অনুভব করতে লাগলো। এদিকে রেগিস্থান নদীর পাড়ে অবস্থিত ছিলো। স্থানে স্থানে নদীর চোরাবালির মরণফান্দ ছিলো। কোন কারণে চোরাবালিতে পা দিলে ঘোড়াসহ মানুষ চোরাবালির মাঝে ঢোকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। এদিকে পাহাড়ীয়া সেনার জন্য আগে থেকে চোরাবালি চিনাক্ত করাও অসুবিধা হচ্ছিলো। সেজন্য তাঁরা ঘোড়া নিয়ে আস্তে আস্তে অগ্রসর হতে বাধ্য হলেন।
এদিকে বারূদ-তোপ বয়ে নেওয়া গাড়ীর চাকাও বালির মাঝে ঢোকে যেতে লাগলো। সেগুলো টেনে তুলতে গিয়ে অযথা অনেক সময় নষ্ট হতে লাগলো। ফলে চোরাবালির মরণফান্দ এড়িয়ে চলতে গিয়ে এক সময় সেনাবাহিনী একটি দীঘল সারিতে পরিণত হলো এবং সেনাবাহিনী বিশৃংখল হয়ে পরলো। বিশৃংখল সেনাবাহিনীর মাঝে এক সময় অসন্তোষে দেখা দিলো। এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে একদল সেনা বাবরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। তারা বাবরের সংগ ত্যাগ করে দশ হাজার সেনা নিয়ে উবেদুল্যাহ সুলতানের সাথে যোগদান করতে চলে গেলো।
প্রকৃতার্থে উবেদুল্যাহ সুলতান কৌশলগতভাবেই রেগিস্থানে ছাউনি পেতে অবস্থান করছিলেন। রেগিস্থানের প্রতি ইঞ্চি স্থানের বিষয়ে তিনি ভালোভাবে অবগত ছিলেন। সেজন্য তিনি বাবরকে বেকায়দায় ফেলার জন্য রেগিস্থানের মতো বিপজ্জনক স্থান বেচে নিয়েছিলেন। তিনি প্রতিপক্ষ সেনার গতিবিধি প্রতিমুহূর্তে নিরীক্ষণ করছিলেন এবং বাবর সেনা বিশৃংখল হয়ে পরার সাথে সাথে তিনি খেরাবাদ, কোলে মলিক হ্রদ এবং কারাকোলের নিকটে বাবর সেনার উপরে আক্রমণ চালালেন। ফলে খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো।
দীর্ঘ সারিতে পরিণত হওয়ার জন্য বাবর এক সময় নিজের সেনার উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। ফলে খণ্ডযুদ্ধে উবেদুল্যাহ সুলতান জয় লাভ করলেন। উক্ত খণ্ডযুদ্ধে বাবরের অনেক সেনা হতাহত হলো। ফলে বাবর নিজের বাহিনী নিয়ে বুখারা হয়ে সমরকন্দের দিকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলেন।
সমরকন্দ এসে বাবর পুনরায় সেনা সংগ্রহ করতে লাগলেন। সেনা সংগ্রহ করে তিনি আবার যুদ্ধযাত্রা করলেন। তবে এইবার বুখারার দিক দিয়ে না গিয়ে হিসারের দিক দিয়ে স্তেপী অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। ইতিমধ্যে শাহ ইসমাইল বাবরের সহায়ের জন্য ষাট হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করছিলেন। উক্ত বাহিনী হিসার এসে বাবরের সাথে মিলিত হলো।
শাহ ইসমাইল দেখা-দেখি বাবরের সহায়ের জন্য সেনা প্রেরণ করেছিলেন যদিও তাঁর অন্তনির্হিত উদ্দেশ্য ছিলো অন্য রকম। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো বাবরকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে নিজের অনুগত ও বিশ্বাসী অন্য কোন শাসককে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা। কারণ আগের বার সমরকন্দ থেকে কিজিলবাসী সেনা তারাতারি পাঠিয়ে দেওয়াতে তিনি মনে মনে বাবরের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তদুপরি তিনি গুপ্তচরের মুখ থেকে অবগত হয়েছিলেন যে, বাবর সমগ্র মাউরা উন্নহর দখলের জন্য চেষ্টা করতেছে। এইসব কারণে শাহ ইসমাইল বাবরের প্রতি উপরে উপরে বন্ধুত্বের অভিনয় করলেও মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং তলে তলে মাউরা উন্নহরে ইরানের আধিপত্য বিস্তারের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।
ইরানী সেনা নায়ক নজমে সানির সাথে হওয়া প্রথম সাক্ষাতেই শাহ ইসমাইলের এই আগ্রাসী মনোভাবের ইংগিত পেয়ে বাবর সতর্ক হয়ে উঠলেন।
ঘটনাটা ঘটেছিলো এরকম- বাবরের সাথে পরামর্শ না করেই শাহ ইসমাইলের সেনাপতি নজমে সানি শৈবানি খাঁর বংশধরদের উপরে আক্রমণ সংঘটিত করে।নিজ দুয়ান নামক স্থানে ইরানী সেনা এবং শৈবানি খাঁর বংশধরদের মাঝে যুদ্ধ শুরু হয় এবং সেই যুদ্ধে ইরানী সেনাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বাবরের সাথে পরামর্শ না করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়াতে ইরানী সেনার সাথে সহযোগিতা না করে বাবর হিসারের দিকে চলে আসেন। উক্ত যুদ্ধে অধিকাংশ ইরানী সেনা নিহত হয় এবং নজমে সানি নিজেও মৃত্যুবরণ করে। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অমু দরিয়া পার হতে গিয়েও অনেক ইরানী সেনা জলে ডুবে মারা যায়।
বাবর বায়সানের মধ্য দিয়ে হিসারের কারাতান আসেন। তিনি পরবর্তী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে কারাতানে ছাউনি পেতে রইলেন। কিন্তু এক রাতে একদল বিদ্রোহী সেনা বাবরের তাঁবু আক্রমণ করে। বাবরের দেহরক্ষীরা গণ্ডগোলের শব্দে জাগ্রত হয়ে বিদ্রোহীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
খানজাদা বেগমের পুত্র খুরমের বয়স তখন এগার বছর। বাবরের শৌর্য-বীর্যের প্রতি খুরম খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলো। মামাকে সে খুব ভালও বাসতো। বাবরও তাকে খুব স্নেহ করতেন। খুরম অবসর সময়ে বাবরের সাথে হাসি তামাশা করে সময় অতিবাহিত করতো। সেজন্য বাবরের উপর আক্রমণ সংঘটিত হওয়া দেখে সে ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। বাবরকে বাঁচাতে সে তীর-ধনু নিয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এলো।
খানজাদা বেগম খুরমকে বাধা দিয়ে বললেন-আরে আরে, কোথায় যাচ্ছ? বাইরে যেওনা। যুদ্ধ চলতেছে।
খুরম অসহিষ্ণুভাবে বললো- আমাকে বাধা দিবেন না। আমাকে যেতে দিন। মামার উপরে হামলা হচ্ছে। আমি মামাকে সহায় করতে চাই।
এমন সময় দুটি ঘোড়া নিয়ে তাহিরজান সেখানে পৌঁছোলো। সে খানজাদা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললো- আপনারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে পালান। এটা জাহাঁপনার আদেশ।
মহিলারা ঘোড়ায় চড়ে কাশিম বেগের নেতৃত্বে নিরাপদ স্থানের দিকে অগ্রসর হলেন।
বাইরে পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধ চলছিলো। যুদ্ধের অবস্থা দেখে খুরম আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। মামার উপরে আক্রমণ সংঘটিত করা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ জেগে উঠলো তার হৃদয়ে। মামাকে সহায় করার জন্য তার হৃদয়ে তীব্র ইচ্ছা জেগে উঠলো। একদল সেনা তাদের দিকে অগ্রসর হতে দেখে সে তীর-ধনু নিয়ে প্রস্তুত হলো। সে একটার পর একটা করে তিনটা শর নিক্ষেপ করলো। এমন সময়ে একটি শর এসে তার বুকে বিদ্ধ হলো। তীব্র আর্তনাদ করে সে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলো। খুরমকে ঘোড়ার পিঠ থেকে পতিত হতে দেখে খানজাদা বেগম ‘খুরম’ বলে চিৎকার করে ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝাঁপ মেরে নেমে এসে খুরমকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বিদ্রোহীরা পালিয়ে গেলো। তাহিরজান অচেতন অবস্থায় খুরমকে তাঁবুতে নিয়ে এলো। হেকিম সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু করলেন। তবে, যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করেও খুরমের জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেন না হেকিম। মৃত্যুর সাথে যুঁজে যুঁজে এক সময় শৈবানি খাঁর বংশধর, খানজাদা বেগমের কলিজার টুকরো খুরম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।
খুরমের মৃত্যুতে বাবর মর্মান্তিক আঘাত পেলেন। শৈবানি খাঁর বংশধর বলে প্রথমাবস্থায় বাবর খুরমকে ঘৃণা করতেন যদিও পরে তার অমায়িক ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন। খুরমও মামাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করতো। সেজন্য খুরমের অকালবিয়োগে বাবর শোকে ভেঙে পড়লেন এবং স্তেপী জয়ের আশা ত্যাগ করে আবার কাবুল ফিরে এলেন।
কাবুল এসে বাবর কাবুলের শাসনভার গ্রহণ করলেন। শাসনভার গ্রহণ করার পরে তিনি সেনা সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মনোনিবেশ করলেন। সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার পরে তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করলেন। একটার পর একটা দেশ জয় করে দশ বছরের ভেতরে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে উঠলেন। কুন্দুস থেকে কান্দাহার এবং বক্সার থেকে হিন্দুকোশ পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো। অবশেষে তিনি হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন।
হিন্দুস্থান আক্রমণের আয়োজন চলে থাকতে একদিন রাতে প্রধানা বেগম মহিম বেগম বাবরকে বললেন- আমার একটা অনুরোধ রাখবেন কী, জাহাপনা?
অনুরোধ! কী অনুরোধ করতে চাইছেন, বেগম? সহরের বাইরে নতুন উদ্যান নির্মাণের জন্য অনুরোধ করবেন, না কোনো মূল্যবান সামগ্রী কেনার জন্য টাকা খুঁজবেন!
বাবর এভাবে নিজের মনে প্রশ্ন কয়টা ভেবে প্রকাশ্যে বললেন- আমার সামর্থের ভেতরে হলে নিশ্চয় রাখব। বলুন, কী বলতে চাইছেন?
মাহিম বেগম ভাবছিলেন অন্য কথা। বাবরের তিনজন বেগম। মাহিম বেগম, গুলরুখ বেগম এবং দিলদার আলাসা বেগম। বেগম কয়জনের মধ্যে মাহিম বেগমই জ্যেষ্ঠা। মাহিম বেগমকে হিরাতে থাকতে বিয়ে করিয়েছিলেন এবং বাকি দুইজনকে বিয়ে করিয়েছেন কাবুল আসার পরে।
তিনজন বেগমের গর্ভে মোট পাঁচজন সন্তান। চারজন পুত্র এবং একজন কন্যা। মাহিম বেগমের গর্ভে একমাত্র সন্তান মির্জা হুমায়ূন।
গুলরুখ বেগমের গর্ভে দুই পুত্র সন্তান। মির্জা কামরান এবং মির্জা আকসারা। দিলদার আলাসা বেগমের গর্ভে পুত্র হিন্দাল এবং কন্যা গুলবদন।(এই গুলবদনই প্রাপ্ত বয়সে হুমায়ূন নামা রচনা করেছিলেন।)
পুত্র কয়জনের মধ্যে হুমায়ূন জ্যেষ্ঠ। মাত্র ষোল বছর বয়সে বাবর তাঁকে কাবুল থেকে অনেক দূরে অবস্থিত বদবখসায় সুবেদার হিসাবে পাঠিয়েছেন। বদবখসা চারদিকে পাহাড় ঘেরা অতি বিপজ্জনক স্থান। সুমালি বিদ্রোহীদের ঘাটি ছিলো বদবখসাতে। সেজন্য মাহিম বেগম একমাত্র পুত্রের অমংগল আশংকায় দুঃশ্চিন্তা এবং উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করতেছিলেন এবং হুমায়ূনকে বদবখসা থেকে ফিরিয়ে এনে নিজের সাথে রাখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।
বাবরের নিকট থেকে অনুমতি পেয়ে মাহিম বেগম কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে অনুরোধের সুরে বললেন- আপনি হুমায়ূনকে কাবুল ডেকে পাঠান।
বাবর গম্ভীর হয়ে উঠলেন। মাহিম বেগমের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন- কিন্তু কী বলে ডেকে পাঠাব? চিরদিনের জন্য, না আপনার সাথে দেখা করে যাওয়ার জন্য?
মাহিম বেগম দুঃশ্চিন্তা প্রকট করে আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললেন- সে আজ দুই বছর যাবত সোমালি বিদ্রোহীদের মাঝে রয়েছে। তার অমংগল আশংকায় আমার চোখে ঘুম নেই। হুমায়ূনের পরিবর্তে আপনি সেখানে অন্য কাউকে পাঠান।
কিন্তু কাকে পাঠাব? বাবর কিঞ্চিত বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন।
মির্জা কামরানকে পাঠান। সে হুমায়ূনের থেকে মাত্র দু’বছরেরই তো ছোট। সে নিশ্চয় শাসন কার্য চালাতে পারবে। মির্জা কামরান নওজোয়ান হয়ে উঠেছে বলে গুলরুখ বেগমও দেখছি গৌরব করেন। সেজন্য হুমায়ূনের পরিবর্তে কামরানকে সেখানে সুবেদার করে পাঠান। তখন গুলরুখ বেগমেও নিশ্চয় কথাটায় আপত্তি করবেন না।
মাহিম বেগমের কথা শুনে বাবরের মুখমণ্ডল উদাস ও গম্ভীর হয়ে উঠলো। সন্তান কয়জন বড় হয়ে উঠার সাথে সাথে যেন বেগমদের মাঝে বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেন না। সাধারণ কথা নিয়েই যেন বেগমদের মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হচ্ছে। সেজন্য বাবর অনেকদিন যাবত অশান্তিতে ভূগতেছেন। বেগমদের মাঝে কখনও কখনও প্রকাশ্য শত্রুতার ভাবও প্রকট হয়ে উঠা তিনি লক্ষ্য করতেছেন। হুমায়ূনের পরিবর্তে কামরানকে সুবেদার করে পাঠানোর মূলেও যে সেই বিদ্বেষের বিষবাষ্প প্রচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে এ কথা অনুমান করতে বাবরের অসুবিধা হল না। তিনজন বেগমই নিজের নিজের সন্তানের মংগল চিন্তায় ব্যস্ত। ভবিষ্যতের জন্য এই মনোভাব খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে! বাবরের ভবিষ্যত যোজনার উপরেও যে এই আপনসর্বস্ব মনোভাবে প্রভাব ফেলবে এটা নিশ্চিত। সেজন্য বাবর মাহিম বেগমের প্রস্তাবের বিপক্ষে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে শুধু সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- বেগম, আপনি গুলরুখ বেগমের কথায় কর্ণপাত করবেন না। বয়স দিয়ে মানুষের জ্ঞানের পরিধি মাপা যায় না। কামরান হুমায়ূনের সম বয়স্ক হলেও তার জ্ঞান এখনও হুমায়ূনের মতো পরিপক্ক হয়নি। হুমায়ূনের মতো কামরান এই গুরুদায়িত্ব সামলাতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ কাজে এখন আমি একমাত্র হুমায়ূনকেই নিয়োগ করতে পারি, কামরানকে এখনও গুরু দায়িত্ব অর্পণ করার সময় হয়নি।
হুমায়ূনের প্রশংসা শুনে মাহিম বেগমের মন কিছু পাতল হলো যদিও নিজের ভাগ্যকে দোষারূপ করে বললেন- আমার ভাগ্যই মন্দ। আমার চেয়ে গুলরুখ বেগমই সুখী। তাঁর দুই পুত্র। দু’জনকেই নিজের কাছে রেখে আমোদ-আহ্লাদ করে নিশ্চিন্ত মনে খেয়েধেয়ে আছেন। আমার একমাত্র পুত্র হুমায়ূন। তাকে দূরদেশে বিদ্রোহীদের মাঝে রেখে আমাকে দুঃশ্চিন্তায় সময় কাটাতে হচ্ছে। এক বছর যাবত তার মুখখানাও আমি দেখতে পারিনি। দূরদেশে থাকার জন্য সময় মতো তার খবরও নিতে পারি না। ঘোড়া ছুটিয়ে গেলেও দু’সপ্তাহের পথ। তদুপরি তার চারদিকে শৈবানি খাঁর ছেলেরা বাচ্চা হারানো বাঘিনীর মতো গর্জে-গুমরে রয়েছে। কখন কী বিপদ হয়, বলা যায় না! হুমায়ূনের কথা মনে পড়লে আমার বুকটা হাহাকার করে উঠে।
আপনি অনর্থক উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, বেগম। তিন হাজার সুপ্রশিক্ষিত সেনা রয়েছে হুমায়ূনের সাথে। তদুপরি শৈবানি খাঁর পুত্ররাও পরস্পরের সাথে কাজিয়া করে বর্তমান হীনবল হয়ে পড়েছে। তাদের তরপ থেকে বর্তমান কোনো ভয় নেই। তবুও যদি হুমায়ূনকে দেখতে আপনার আকাঙ্খা হয়েছে, তিন চার সপ্তাহের মধ্যে আপনি হুমায়ূনের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।
কোথায়? মাহিম বেগম ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করলেন- কাবুলে?
না, আদিলপুরে।
মাহিম বেগম শুনছিলেন যে আদিলপুর কাবুল থেকে দক্ষিণ দিকে হিন্দুস্থানের নিকট অবস্থিত। বাবর বর্তমান আদিলপুরের দিকে সেনা প্রেরণ করে থাকার কথাও তিনি এর-ওর মুখে শুনেছেন। হিন্দুস্থান অভিযানের উদ্দেশ্যেই যে এই সেনা সমাবেশ এ বিষয়ে বাবর কিছু না বললেও লোকমুখে শুনেই তিনি কথাটা উপলব্ধি করতে পারছেন।
সেজন্য মাহিম বেগম বিচলিত কণ্ঠে বললেন- আদিলপুরে? তারমানে আপনি হুমায়ূনকেও হিন্দুস্থান নিয়ে যেতে চাইছেন নাকি?
বাবর হিন্দুস্থান অভিযানের প্রস্তুতি অতি গোপনে চালাইতে ছিলেন এবং কথাটা তিনি গোপনেই রাখতে চাইছিলেন। সেজন্য তিনি মাহিম বেগমের মুখে হিন্দুস্থান অভিযানের কথা শুনে সচকিত হয়ে উঠলেন। আশেপাশে কেউ আছে নাকি তার সন্ধান নিতে তিনি কান খাড়া করলেন। আগুনে পোরা গরু রাঙা মেঘ দেখেও আতঙ্কিত হয়ে উঠে। বাবরও বর্তমান হিন্দুস্থান আক্রমণ সম্পর্কে তেমনই আতঙ্কিত। জীবনে তিনি অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হয়েছেন। সেজন্য তিনি হিন্দুস্থান অভিযানের প্রস্তুতি অতি গোপনে চালাচ্ছেন। বর্তমান তিনি মাউরা উন্নহর বিজয়ের আশা ত্যাগ করেছেন। বর্তমান তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হিন্দুস্থান। গত বছর তিনি হিন্দুস্থানে গুপ্তচর পাঠিয়েছেন। ভারতের শুভচিন্তক অনেকে বর্তমান তাঁর সাথে যোগাযোগও করতেছে। বর্তমান তাঁরও অনেক শুভচিন্তক রয়েছে হিন্দুস্থানে। তাঁদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকই রয়েছে। হিন্দুস্থান থেকে মুসলমান শাসক এবং হিন্দু রাজার দূত ইতিমধ্যে ছয় বার কাবুল এসেছে। তাঁরা দিল্লীর সুলতান ইব্রাহীম-এর উপর অসন্তুষ্ট। তাঁদের মতে ইব্রাহীম লোডী একজন অদূরদর্শী এবং স্বেচ্ছাচারি শাসক। লোডীর শোষণ শাসনে জনসাধারণ সর্বস্বান্ত। দেশের উন্নতির জন্য ইব্রাহীম লোডীর বর্তমান কোনো যোজনাই নেই। একটার পরে একটা গৃহযুদ্ধ লেগেই আছে। গৃহযুদ্ধের ফলে দেশের শান্তি বিঘ্নিত। দেশ টুকরো টুকরো বিধ্বস্ত। বর্তমান দেশটিকে সুসংহত এবং পুনর্গঠন করে শান্তি স্থাপনের জন্য এক সুসংগঠিত শক্তির আবশ্যক। তাঁদের ধারণা, একমাত্র মির্জা জহিরুদ্দিন বাবরই সেই শক্তির অধিকারী।
মাহিম বেগমের উৎকণ্ঠা প্রত্যক্ষ করে বাবর যোজনার কথা মোটামুটি প্ৰকাশ করলেন- বেগম, আমার উপরে বিশ্বাস রাখুন। আমি সেখানে নিজ ইচ্ছায় যেতে চাচ্ছিনা না। হিন্দুস্থানের লোকের আমন্ত্রণ মর্মে সেখানে যেতে চাইছি। তদুপরি আমি সেখানে লুটপাটের জন্যও যাব না— আমি যেতে চাইছি এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য। হিন্দুস্থান আক্রমণ করার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে পঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁ তাঁর পুত্র দিলোয়ার খাঁকে আমার নিকট প্রেরণ করেছিলেন। হিন্দু রাজা সংগ্রাম সিঙও আমার সাহায্য প্রার্থনা করে দূত প্রেরণ করেছিলেন। সেজন্য হিন্দুস্থানের জনসাধারণকে অন্যায়-অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সবাই মিলিত হয়ে ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যারজন্য অভিযান নিয়ে ভয়ের কোনো হেতু নেই।
মাহিম বেগম বাবরের কথা মনযোগ সহকারে শুনে সংশয় প্রকাশ করে বললেন- যুদ্ধ জয় এবং পাপের দ্বারা অর্জন করা ফলাফলের মধ্যে সর্বদা গভীর খাদ থাকে, জাহাপনা। সেই খাদের তল অতল, সেখানে কোনো নিশ্চয়তা নেই। আছে শুধু অনিশ্চয়তায় ভরা মৃত্যুর বিভীষিকা।
বাবর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন- আমরা সততা দিয়ে সেই খাদ পার হয়ে নিশ্চয় মৃত্যুর বিভীষিকা অতিক্রম করতে সক্ষম হবো, বেগম। কারণ আমাদের সাথে থাকবে নিপীড়িত জনসাধারণের শুভাশীষ।
কত এতিম এবং বিধবার চোখের জল বয়ে যাবে, কত পুত্রহারা, মাতৃহারার হা-হুতাশে আকাশ বাতাস বিষাক্ত করে তুলবে সেটা একবার ভেবে দেখছেন, জাহাপনা?
গৃহযুদ্ধের জন্য এখনও তো হিন্দুস্থানে অনেক লোক মারা যাচ্ছে। অনেক লোক মৃত্যুর বিভীষিকা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সহায়ের জন্য এখানে আসতেছে। অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ইব্রাহীম লোডীর অধীনে কাজ করা হিন্দুবেগ হিন্দুস্থান থেকে পালিয়ে এসে আমাদের এখানে চাকরি করতেছেন। সেজন্য আমরা নিপীড়িতদের সহায়ের জন্য হিন্দুস্থান যাচ্ছি বলে ভেবে নেন না কেন, বেগম।
জাহাপনা, আপনি আমার একটা প্রার্থনা রাখুন। আপনি হুমায়ূনকে কাবুল রেখে হিনুস্থান যান। আপনার অনুপস্থিতে সে কাবুলের শাসনভার সামলাতে পারবে।
আপনি নিজে শাসনকার্য চালাতে চান নাকি, বেগম?
আমি! আমি তো মেয়ে মানুষ। এ ক্ষেত্রে একজন পত্নীর চেয়ে একজন পুত্রের দাবি অনেক বেশি। হুমায়ূন আপনার সাথে গেলেও মির্জা কামরান ও আক্সারি তো এখানেই থাকবে। আইনতঃ শাসনকার্য চালোনোর জন্য আমার চেয়ে তারাই বেশি যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
মাহিম বেগমের কথা শুনে বাবর তৎক্ষণাৎ একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্ত মর্মে তিনি বললেন- আপনি যাতে নির্বিঘ্নে শাসনকার্য চালাতে পারেন তার ব্যবস্থা আমি করে যাব। মির্জা কামরানকে আমি কান্দাহারের শাসনকর্তা নিযোজিত করে যাব এবং মির্জা আক্সারিকে আমার সাথে নিয়ে যাব। আপনার সহায়ের জন্য কাশিম বেগকে এখানে রেখে যাব। এখন হবে তো, বেগম?
আপনার সিদ্ধান্তে আমি সত্যিই অভিভূত, জাহাপনা। আমার অনুমান হচ্ছে, আপনার সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমি যেন আকাশের সীমা স্পর্শ করছি। তবে, জাহাপনা, আমি শাসনকার্য পরিচালনার জন্য লালায়িত নই।
যে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য লালায়িত নয়, আসলে তাঁকেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে দেওয়া উচিত, বেগম। আপনি মির্জা হিন্দালের নামে শুধু হুকুম জারি করবেন এবং কাশিম বেগ সব দেখা-শুনা করবেন। তখন সবই আইনসংগতভাবে চলে থাকবে।
মির্জা হিন্দাল দিদার আলাসার গর্ভজাত যদিও তাকে লালন-পালন করেন মাহিম বেগম। হিন্দালও মাহিম বেগমের খুব ভক্ত। জন্মধাত্রী মাতৃর চেয়ে হিন্দাল মাহিম বেগমের বেশি অনুরক্ত। মাহিম বেগমকেই সে মাতৃ বলে জানে। সেজন্য বাবর হিন্দালের কথা বলে মাহিম বেগমকে অপ্রস্তুত করতে চাইলেন। কিন্তু মাহিম বেগম বাবরের কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে নিজের মতে অটল হয়ে বললেন- হুমায়ূন কাবুল থাকলে কী ক্ষতি হবে?
শাহী খানদানের পরম্পরা অনুসারে বাদশাহ যুদ্ধে নিহত হলে, তখন তাঁর উত্তরাধিকারী সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া নিয়ম। তা নাহলে বেগবৃন্দ সিংহাসনের অন্যান্য সাম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর পক্ষ নিয়ে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বাবর কথাটা অধিক স্পষ্ট করার জন্য বললেন- যুদ্ধ মানে অনিশ্চয়তার খেলা। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমার মৃত্যু হলে, তখন জ্যেষ্ঠ হিসাবে হুমায়ূনই আমার স্থান নিতে হবে। সেজন্য আমি হুমায়ূনকে সঙ্গে নিতে চাচ্ছি।
মাহিম বেগম বাবরের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারলেন এবং উপলব্ধি করতে পারার জন্যই তাঁর জন্য বিষয়টা অধিক উদ্বেগজনক ও পীড়াদায়ক হয়ে উঠলো। তাঁর ধারণায় হিন্দুস্থান এমন একটি দেশের মতো অনুমান হতে লাগলো, যেখানে গেলে কেউ ফিরে আসতে পারে না। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন- ইয়া আল্লাহ, পৃথিবীটা কেমন নির্দয়!
বাবর কোনো রকম মন্তব্য না করে মনে মনে রইলেন। তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো-নদী-নালা, পর্বত-পাহাড়ে ভরা, নিত্য সাগর চরণ ধৌত করা হিন্দুস্থানের অনিন্দ্যসুন্দর প্রতিচ্ছবি।
* * *
বাবর নিজের বাহিনী নিয়ে হিন্দুস্থান অভিমুখে যাত্রা করার পর কয়েকদিন পার হয়ে গেছে। তাঁরা এসে এসে খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে হিন্দুস্থানের সীমায় পদার্পণ করলেন।
চতর্দিকে দিগন্ত বিস্তৃত গভীর ঘন অরণ্য। অরণ্যের মাঝ দিয়ে বন-জঙ্গলে আবৃত সরু পথ। কোন কোন স্থানে পথের কোনো চিন-ছাপ নেই। সেরকম স্থানে তাঁরা বন-জঙ্গল কেটে পথ বের করে অগ্রসর হতে লাগলেন। যতই এগোতে লাগলেন, বন- জঙ্গল ততই ঘন হতে লাগলো।
গভীর অরণ্যের মাঝে মাঝে বিশৃংখলভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো উঁচু উঁচু বৃহৎ গাছ-বৃক্ষ। বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষের কাণ্ড এবং শাখা-প্রশাখা থেকে শিকড় বেরিয়ে মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। কাণ্ড এবং শাখা-প্রশাখা থেকে বের হওয়া শিকড় মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়াতে একটি গাছই এক বিস্তীর্ণ এলেকা জুড়ে ব্যাপ্ত ছিলো। কাণ্ডের মাঝে জড়িয়ে ছিলো অজস্র কাঁটাযুক্ত গুল্মলতা। লতাগুলি একটি গাছ থেকে অন্য একটি গাছে বেয়ে গিয়ে অভেদ্য প্রাচীর সৃষ্টি করেছিলো। তৃণ, বন-জঙ্গলের জন্য পা-র তলের মাটি পর্যন্ত দেখার উপায় ছিল না।
বাতাস ছিলো আর্দ্র এবং সিক্ত। সবারই শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কষ্টদায়ক শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে সবার মাথা চক্কর কাটতে লাগলো। ফলে সবাই শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
বাবর রেশমের পাতল জামা পরেছিলেন। কষ্টকর পথশ্রম এবং প্রচণ্ড গরমের জন্য তিনি ঘামে ভিজে উঠেছিলেন। অসহ্য ক্লান্তিতে তিনি বাতাসের অবস্থিতি জানার জন্য একটি উঁচু গাছের উপরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। গাছটি হেলে-দুলে থাকা তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। অর্থাৎ গাছের উপর দিয়ে বাতাস বইতেছে। অথচ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বাতাসটুকুও গাছের শাখা-প্রশাখার প্রাচীর ভেদ করে নিচের দিকে বয়ে আসতে পারছে না। কাথাটা ভাবতেই বাবরের মাথা চক্কর কাটতে লাগলো।
কোথাও হঠাৎ একটা বান্দরের চিৎকার শুনা গেলো। সময় এগোনোর সাথে সাথে নানান বন্য জীব-জন্তু, পশু-পক্ষীর কোলাহলমুখর শব্দ বৃদ্ধি পেতে লাগলো। সময়ে সময়ে ভেসে আসতে লাগলো ময়ূরের শ্রবণকটু কোলাহলমুখর কলরব। চারদিকে যেন বিরাজ করছে এক ভয়ঙ্কর ভয়াল পরিবেশ।
লতা-পাতার প্রাচীর ভেদ করে একটি উট পার করে নিয়ে যাওয়া অবস্থায় হঠাৎ একজন সৈনিক চিৎকার করে উঠলো। ভয়ার্ত আর্তচিৎকার। তার পাশে অবস্থানরত সৈনিক একজন ব্যগ্রভাবে চিৎকারের কারণ জিজ্ঞাসা করলো- কি হলো? এরূপ চিৎকার করছ কেন?
সৈনিকটি আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো- সাপ! আমাকে সাপে কামড়েছে।
সাপের কথা শুনে সে আশেপাশে থাকা সবাইকে সাবধান করে দিলো- ভাইসব, সাপ, সাবধান। এভাবে সাবধান করে দিয়েই সে লাফ মেরে সাপে কামড়ানো সৈনিকটির নিকটে এসে জিজ্ঞাসা করলো- কোথায় কামড়েছে?
সর্পদংশিত সৈনিকটি দংশিত স্থান দেখিয়ে বললো- এই যে, এইখানে।
ডান পা-র আঁঠুর তলে কামড়েছিলো। সাপে কামড়ানো স্থান থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। বিষ যাতে উজাতে না পারে তারজন্য সৈনিকটি সর্পদংশিত স্থানের কিছু উপরে একটি রশি দিয়ে কষে বাঁধলেন। ইতিমধ্যে আশ-পাশের কয়েকজন সৈনিক সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। তোপবাহী একটি গাড়ীতে তুলে সর্পদংশিত সৈনিকটিকে অপেক্ষাকৃত এক টুকরো খোলা স্থানে নিয়ে আসা হলো।
মানুষ, হাতি, ঘোড়া, উট প্রভৃতির জন্য ঘন কাঁটাযুক্ত লতা-পাতার মধ্য দিয়ে হাঁটাটা খুবই কষ্টকর হচ্ছিল। তার উপরে ভূতের উপরে দানব পড়ার মতো কোন কেন স্থানে মাটিও কাদাযুক্ত ছিলো। ভারি তোপবাহী গাড়ীর চাকা স্থানে স্থানে কাদার মধ্যে ঢোকে যেতে লাগলো। সেগুলো কাদা থেকে টেনে তুলতে সৈনিকগুলো শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ফলে যাত্রাপথ বিরক্তিজনকভাবে দীর্ঘ হতে লাগলো।
একবার এক স্থানে গাড়ীর চাকা গভীরভাবে কাদায় ঢোকে গেলো। সৈনিকরা যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করেও গাড়ীর চাকা কাদা থেকে টেনে তুলতে সক্ষম হলো না।
কাদায় লুটোপুটি হয়ে আলীকুলি খাঁ নামক একজন সর্দার বাবরের নিকট এসে বললো-জাহাপনা, এই ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে তোপবাহী গাড়ী নিয়ে যাওয়াটা আমাদের সাধ্যের বাইরে। চারদিকে শুধু কাদা। সব কয়টা গাড়ী কাদার জন্য অচল হয়ে পরেছে। একটি গাড়ী তো কাদার মধ্যে ঢোকেই গিয়েছে। অনেক সময় চেষ্টা করেও গাড়ীটা কাদা থেকে টেনে তুলতে সক্ষম হইনি। লোকগুলো শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
বাবর তাঁর পেছনে পেছনে আসা তাহির বেগের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন- তাহির বেগ সাহেব, আপনি যান। পথপ্রদর্শক লোকটিকে এখানে ডেকে আনুনগে’।
পথপ্রদর্শক লোকটি হিন্দুস্থানী। নাম লালচান্দ। সবার আগে আগে সে হাতীতে চড়ে যাচ্ছিলো। তাহির বেগ এগিয়ে এসে লালচান্দকে উদ্দেশ্য করে বললো- লালচান্দ সাহেব, জাহাপনা আপনাকে স্মরণ করেছেন।
স্বয়ং বাবর স্মরণ করার কথা শুনে লালচান্দ তৎক্ষণাৎ হাতীর পিঠে চড়ে বাবরের নিকট এলো।
হাতী দেখে বাবরের ঘোড়াটি চিঁহিহি চিৎকার করে ছটফট করতে লাগলো। লালচান্দ বিশালকায় হাতীটি বাবরের কাছ থেকে কিছু দূরে থামিয়ে হাতীর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কিছু বললো। হাতীটা শুঁড় তুললো। লালচান্দ শুঁড় বেয়ে হাতীর পিঠ থেকে নেমে বাবরের নিকট এসে হাতজোড় করে অভিবাদন জানালো।
লালচান্দ ফার্সি ভাষা জানতো। সেজন্য বাবর লালচান্দকে উদ্দেশ্য করে ফার্সি ভাষায় বললেন- লালচান্দ সাহেব, পথ খুব খারাপ। মানুষ চলাচলের জন্য একেবারে অনুপযুক্ত। আপনি অন্য পথের সন্ধান করুন।
লালচান্দ বিনীতভাবে বললো- জাহাপনা, আমরা এখন পাঞ্জাব এসে পৌঁছেছি। পাঞ্জাব পঞ্চ নদীর দেশ। নদীগুলোতে বর্তমান বান এসেছে। দুই কূল ছাপিয়ে জল ক্ষেত-খোলায় ঢুকে পড়েছে। রাস্তা-ঘাট, ক্ষেত-খোলা বর্তমান জলের তলে। সেজন্য অসুবিধা হলেও আমরা এখান দিয়েই যেতে হবে, জাহাপনা।
আমি জানি পাঞ্জাবে রাস্তা-ঘাটের অভাব নেই। বর্ষায় চলাচলের জন্য উঁচু উঁচু অনেক রাস্তা রয়েছে বলে আমি শুনেছি। গাড়ী নিয়ে যাওয়ার জন্য বোলে ভালো ভালো রাস্তা রয়েছে। আমাদের গাড়ীগুলো কাদার জন্য এগোতে পারছে না। চাকাগুলো মাটিতে ঢোকে যাচ্ছে। বাবর সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন- আমরা ভুল রাস্তায় আসিনি তো?
না না, জাহাপনা, আমরা সঠিক রাস্তায়ই এসেছি। গাড়ীর চাকা কোথায় ঢুকে গেছে? আমায় আদেশ দিন, আমার হাতী সেগুলো কাদা থেকে টেনে বের করে দিবে। আমরা এখন দ্রুত এগিয়ে যাওয়া উচিত। অপেক্ষা করে থাকলে আমাদের অসুবিধা আরও বেশি হবে, জাহাপনা।
আচ্ছা, আপনি হাতী নিয়ে গিয়ে গাড়ীগুলো কাদা থেকে বের করে দিনগে’। বাবর লালচন্দকে গাড়ী তোলার জন্য অনুমতি দিলেন।
আলীকূলি খাঁ নিকটেই ছিলো। সে বাবরের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে লালচান্দের দিকে তাকিয়ে বললো- আচ্ছা, চলুন আপনার হাতী নিয়ে।
লালচান্দের শরীরে মাংসের লেশমাত্র নেই। চর্মসার শরীর। তার শরীর দেখতে একটি কংকালের মতো। আলিকুলির আহ্বান মর্মে সে হাতী নিয়ে আলীকুলির পেছনে পেছনে অগ্রসর হলো।
গন্তব্যস্থানে পৌঁছে হাতীটিকে কাদা থেকে গাড়ীটি টেনে তুলতে নির্দেশ দিলো। নির্দেশ পেয়ে হাতীটি অনায়াসে কাদা থেকে গাড়ীটি টেনে তুললো। হাতীর বিক্রম প্রত্যক্ষ করে সেখানে উপস্থিত সৈনিকগুলো অবাক হয়ে গেলো।
সর্পদংশিত সৈনিকটি গাড়ীর উপরে শোয়ে যন্ত্রণায় উঁআঁ করতে ছিলো। তার মুখমণ্ডল পাণ্ডুর হয়ে গিয়েছিলো। বিষক্রিয়া নষ্ট করার জন্য সাপ কামড়ানো ক্ষতস্থানে লতা-পাতা ছেঁচে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। তবে, ঔষুধের ক্রিয়ার থেকে বিষের ক্রিয়া প্রবল হওয়াতে সৈনিকটির বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছিলো। শরীরের রং এক সময় নীল পড়ে গেলো। একজন সৈনিক তার শিতানে বসে পাখা দিয়ে বাতাস করতে ছিলো।
গাড়ী আবার এগোতে লাগলো। বিকেল বেলা তাঁরা এসে রাবী নদীর পাড়ে উপস্থিত হলো। একশত জন সৈনিক নিয়ে হিন্দু বেগ এসে রাবী নদীর পাড়ে বাবরের সাথে মিলিত হলেন।
হিন্দু বেগ দিল্লীর একজন প্রতিষ্ঠিত নাগরিক। তিনি বর্তমান বাবরের দরবারের একজন সভাসদ। সাত বছর পূর্বে তিনি ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ ছিলেন। কিন্তু তিনি ইব্রাহীম লোডীর স্বেচ্ছাচারিতা পসন্দ করতেন না। সেজন্য ইব্রাহীম লোডীর সাথে তাঁর মনোমালিন্য হয় এবং লোডীর রোষ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তিনি কাবুল পালিয়ে গিয়ে বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
হিন্দু বেগ সুশিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান ছিলেন। তুর্কি এবং ফার্সি ভাষায় তাঁর যথেষ্ট বুৎপত্তি ছিলো। বাবর গুণীর গুণের মূল্য বুঝতেন। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি হিন্দু বেগের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে নিজের দরবারের একজন কর্মচারি হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন এবং কর্মদক্ষতার বলে অল্পদিনের ভেতরে তিনি বাবরের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছেন।
ইব্রাহীম লোডী একজন স্বেচ্ছাচারি ও নিষ্ঠুর শাসক। তাঁর অন্যায় অত্যাচার এবং শাসন শোষণে হিন্দুস্থানের জনসাধারণকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। হিন্দুস্থান থেকে ইব্রাহীম লোডীর শাসন উপরে ফেলে শোষণমুক্ত সমৃদ্ধিশালী হিন্দুস্থান গঢ়াই ছিলো হিন্দু বেগের প্রধান লক্ষ্য। বাবরের দরবারে কর্মচারি হিসাবে নিয়োগ হয়েই তিনি এই বিষয়ে বাবরের সাথে আলোচনা শুরু করেন এবং হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য বাবরকে উৎসাহিত করতে থাকেন।
বাবর আগে থেকেই হিন্দুস্থানের প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করছিলেন। হিন্দু বেগের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে বাবরের সেই আকর্ষণ অনেক গুণে বৃদ্ধি পায় এবং তিনি হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য ইতিবাচক সন্মতি প্রকাশ করেন। বাবরের নিকট থেকে সন্মতি পেয়ে ইব্রাহীম লোডীর প্রতি অসন্তুষ্ট হিন্দুস্থানী রাজন্যবর্গ, শাসক এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে হিন্দু বেগ বাবরের হিন্দুস্থান আক্রমণ সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেন।
হিন্দু বেগ বিনাযুদ্ধে হিন্দুস্থান দখলের পক্ষপাতি ছিলেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তার জন্যই গত বছর বাবর ঝীলাম নদীর পাড়ে অবস্থিত ভীরা সহর দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে হিন্দু বেগের প্রতি বাবরের আস্থা অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইব্রাহীম লোডীর প্রতি অসন্তুষ্ট শাসক এবং নাগরিকদের সাথে আলোচনার জন্য হিন্দু বেগকে ভীরা সহরের সুবেদার নিযুক্ত করে রেখে গিয়েছিলেন।
কিছুদিন আগে পাঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁর পুত্র দিলোয়ার খাঁ হিন্দু বেগের নির্দেশ মর্মে বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে কাবুল গিয়েছিলেন। দিলোয়ার খাঁর সাথে আলোচনা করে সহমতে উপনীত হয়ে গতবারের মতো এইবারও বাবর বিনাযুদ্ধে লাহোর অধিকার করার উদ্দেশ্যে হিন্দু বেগকে লাহোরের শাসক দৌলত খাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করতে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। হিন্দু বেগ বাবরের নির্দেশ মর্মেই দৌলত খাঁর সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করে ইতিবাচক অগ্রগতি লাভ করে বাবরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। হিন্দু বেগের আহ্বান মর্মেই বর্তমান বাবরের এই অভিযান।
হিন্দু বেগ বাবরের নিকট এসেই অভিবাদন জানিয়ে কোনো রকমের ভূমিকা না করে সরাসরি বললেন- জাহাপনা, দৌলত খাঁর অভিপ্রায় ভালো নয়, তিনি আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কোনমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি, জাহাপনা।
বাবর প্রথমে হিন্দু বেগের কথার অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছিলেন না যদিও হিন্দু বেগের বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত চেহেরা এবং উৎকণ্ঠা প্রত্যক্ষ করে কথাটা উপলব্ধি করতে তাঁর অসুবিধা হল না। তিনি উৎকণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন- কী বললেন? দৌলত খাঁ…..
উত্তেজনা উৎকণ্ঠায় বাবর বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না।
হ্যাঁ জাহাপনা, দৌলত খাঁ আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। হিন্দু বেগ বিপর্যস্ত স্খলিত কণ্ঠে বললেন।
তাঁর মনোভাব হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ কি? হিন্দু বেগের কথায় বাবরের হৃদযে ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়েছিলো যদিও নিজেকে সংযত করে শান্ত কণ্ঠে বলার যত্ন করে বললেন- দৌলত খাঁ কয়েক মাস আগে তাঁর পুত্রকে আমার নিকট আলোচনার জন্য পাঠিয়েছিলেন। আমি দিলোয়ার খাঁর সাথে আলোচনা করেই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমার সিদ্ধান্তে সেও সহমত প্রকাশ করে এসেছে। দৌলত খাঁর সাথে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে আপনিও আমার নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন। দৌলত খাঁ একজন প্রবীণ ব্যক্তি। বয়োজ্যেষ্ঠ হিসাবে আমি তাঁর প্রতি সন্মান প্রদর্শন করে এসেছি। এখন তাঁর এ রকম হঠকারিতার কারণ কি?
কিছুদিন আগেও সব ঠিকই ছিলো। কিন্তু এখন দৌলত খাঁ সেসব কথা ভুলে গেছেন। বর্তমান তিনি কটিদেশে দু’টি তরবারি ঝুলিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর এই আচরণের উদ্দেশ্যও তিনি আমাকে বুঝিয়ে বলেছেন। তরবারি দু’টির একটি আপনার জন্য এবং অন্যটি ইব্রাহীম লোডীর জন্য। সময় সুযোগ পেলেই তিনি তরবারি দু’টির সদ্ব্যবহার করার জন্য বদ্ধপরিকর।
দিলোয়ার খাঁও আমাদের সাথে শত্রুতা করবে নাকি?
না না, দিলোয়ার খাঁ আমাদের পক্ষেই রয়েছে। আমাদের সাথে বুঝাপড়ার কথা সে ভুলেও যায়নি। সে বিনাযুদ্ধে লাহোর আমাদের হাতে সঁপে দিতে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। তার জন্যই আমি আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি,জাহাপনা। সে তাঁর পিতৃর চক্রান্তের কথা আমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলো। না হলে আমি দৌলত খাঁর হাত থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হতাম না। অবশ্যে দৌলত খাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র গাজী খাঁ পিতৃর স্বপক্ষে।
এবং আলম খাঁ ?
আলম খাঁ বর্তমান কিংকর্তবিমূঢ় হয়ে পরেছেন। সে ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যে ইব্রাহীম লোডীর কাছ থেকে সে শিক্ষা পেয়েছে। সেজন্য ইব্রাহীম লোডীকে সে বর্তমান যমের মতো ভয় করে। আমার ধারণা, আপনি লাহোর গেলেই সে মনে বল পাবে এবং আপনার বশ্যতা স্বীকার করবে। বর্তমান আমাদের সবচেয়ে প্রধান বাধা হলো গাজী খাঁ। সেনা বাহিনীর উপরে দৌলত খাঁর চেয়ে গাজী খাঁর প্রভাব বেশি। গাজী খাঁকে হারাতে পারলেই যে তাঁর সেনাবাহিনী আমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। হিন্দু বেগ কিছুক্ষণের জন্য থেমে চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু জাহাপনা, আপনি এই দুর্গম পথ দিয়ে আসছেন কেন?
আমরা তো পথ প্রদর্শকের নির্দেশিত পথ দিয়েই আসতেছি। সে আমাদের ভুল পথে এনেছে নাকি?
কোথায় সেই পথ প্রদর্শক? আপনি আমাকে তার সাথে কথা বলতে অনুমতি দিন। বাবরের নির্দেশে তাহিরজান লালচান্দকে ডেকে আনলো।
লালচান্দ হাতীর পিঠে চড়ে বাবরের নিকট এলো। বাবর এবং হিন্দু বেগ ঘোড়ার পিঠে বসে কথা বলছিলেন। সেজন্য লালচান্দ হাতীর পিঠে বসেই বাবরকে অভিবাদন এবং হিন্দু বেগকে নমস্কার জানালো। হিন্দু বেগ হিন্দু প্রথামতে প্রতি নমস্কার জানিয়ে ঘোড়ার পিঠে নড়েচড়ে বসে হিন্দুস্থানী ভাষায় জিঞ্জাসা করলেন- তুমি কোন জায়গার লোক?
আগ্রার হুজুর। লালচান্দ বিনম্রভাবে বললো।
পাঞ্জাব কেন এসেছ?
কাজের সন্ধানে, হুজুর। ক্ষুধা নিবারণ করতে তো কিছু একটা করতেই হয়।
হাতী তোমার নিজের নাকি?
হ্যাঁ হুজুর, নিজের……
এ রকম হাতী থাকতে ইব্রাহীম লোডীর সেখানে কাজ করলে না কেন?
তিনি খুব কৃপণ লোক, হুজুর। সোনা-দানা তিনি শুধু সিন্দুকে জমা করতেছেন। সেগুলো তিনি খরচ করতে চান না।
তুমি একেবারে সত্যি কথা বলেছ। হিন্দু বেগ লালচান্দের মনের খবর নিতে তার সাথে সহমত প্রকাশ করে বললেন- আমি নিজেও ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাঁর সংগ ত্যাগ করে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। ইব্রাহীম লোডীর পিতৃ সিকন্দর লোডী আমার পিতৃর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার মিথ্যা অভিযোগ এনে হাতীর পা-র নিচে ফেলে দিয়েছিলেন এবং হাতী আমার পিতৃকে পা দিয়ে মাড়িয়ে হত্যা করেছিলো। আমিও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি নিজের চোখেই সেই মর্মান্তিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আমি এখন পর্যন্ত সেই দৃশ্য ভুলতে পারিনি। এখনও আমার চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই ভয়াবহ দৃশ্য।
হিন্দু বেগ আশা করা মতেই লালচান্দের চোখেমুখে সহানুভূতির ছাপ প্রকট হয়ে উঠলো। সে জিজ্ঞাসা করলো- আপনি ক্ষত্রিয় নাকি?
হ্যাঁ আমি ক্ষত্রিয়। আমার প্রকৃত নাম ইন্দার সিং। হিন্দু বেগ ইশারায় বাবরকে দেখিয়ে বললেন- জাহাপনা আমাকে হিন্দু বেগ বলে সম্বোধন করেন। বর্তমান সবাই আমাকে এই নামেই সম্বোধন করতে পসন্দ করে। হিন্দু বেগ এভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে লালচান্দের নাম জানতে চাইলেন- আচ্ছা, তোমার নাম কি?
লালচান্দ। লালচান্দ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো।
আচ্ছা লালচান্দ, ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার থেকে বর্তমান কে আমাদের রক্ষা করতে পারবে?
লালচান্দ চিন্তাভাবনা না করেই ফট করে উত্তর দিলো- ভগবান।
ভগবান তো নিজে কিছুই করেন না। তিনি মানুষের দ্বারা কাজ করান। তোমার মতে সেই মানুষ কে হতে পারে?
লালচান্দ চিন্তামগ্ন হলো। সে হিন্দু বেগের প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না।
লালচান্দকে চিন্তামগ্ন দেখে হিন্দু বেগ তার মনের ভাব জানার জন্য টোপ ফেললেন- দৌলত খাঁ এ রকম কাজ করতে পারবে নাকি?
লালচান্দ টোপ গিললো। সে হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে উৎসাহিত কণ্ঠে বললো- দৌলত খাঁ একজন দয়ালু শাসক, কিন্তু গাজী খাঁ দৌলত খার চেয়েও ভালো।
হিন্দু বেগ ঘণিষ্ট হওয়ার জন্য নিম্নস্বরে বললেন- সত্যি কথা বল, তুমি বাবরকে এই দুর্গম পথে এনেছ কেন?
গাজী খাঁর এ রকমই নির্দেশ ছিলো। লালচান্দ গর্বিত কণ্ঠে বললো।
হিন্দু বেগ চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু গাজী খাঁ এই দুর্গম পথ দিয়ে আনতে নির্দেশ দেওয়ার কারণ কি?
লালচান্দ বাবরের দিকে লক্ষ্য করেই পুনরায় হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে নিম্নস্বরে বললো- এদের জন্য এটাই উত্তম পথ।
এরা তোমার কি ক্ষতি করেছে?
আমাদের জন্য ইব্রাহীম লোডীই যথেষ্ট। এখন আরও একজন অত্যাচারি আসতেছে। সেও একজন বিদেশী।
গাজী খাঁ তোমার সাথে ছলনা করেছে। হিন্দু বেগ নিজের ধারণা ব্যক্ত করলেন।
লালচান্দ সচকিত হয়ে উঠলো। হিন্দু বেগের কথায় সে হিন্দু বেগকে বাবরের সমর্থক বলে বুঝতে পারল। সে হঠাৎ তার হাতীটিকে লতা-পাতার মাঝে ঠেলে নিয়ে বললো- এরা বিদেশী- আক্রমণকারী। এরা জল্লাদ। এরা গতবছর আমাদের তিন হাজার সেনা হত্যা করেছে। সহর, গ্রাম লুটপাট করে লোকদের সর্বস্বান্ত করে গেছে। এরা আমাদের দেশের শত্রু—এরা হত্যাকারী জল্লাদ।
এভাবে বলেই লালচান্দ হাতী গভীর অরণ্যের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগলো।
বাবর কিছু দূরে ছিলেন। লালচান্দ পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করা দেখে হিন্দু বেগ উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- জাহাপনা, লালচান্দকে বন্দি করার আদেশ দিন। এ আমাদের শত্রু। গাজী খাঁর নির্দেশে এ আপনাদের ভুল এবং দুর্গম পথে এনেছেন, জাহাপনা।
বাবরও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। ক্ষোভ আক্রোশে তাঁর সিরা-উপসিরাগুলো স্ফীত হয়ে উঠলো। তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে আদেশ দিলেন- ধর, এই বিশ্বাসঘাতককে ধরে ফেল। সে যাতে পালিয়ে যেতে না পারে।
বাবরের নির্দেশ পেয়ে কয়েকজন অশ্বারোহী সেনা লালচান্দের পেছনে পেছনে ধেয়ে গেলো। তিনজন অশ্বারোহী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হাতীটাকে ঘিরে ধরলো।
লালচান্দ হাতীর কানের কাছে মুখ এনে অশ্বারোহী সেনাদের দিকে ইশারা করে ফিসফিস করে কিছু বললো। সাথে সাথে হাতীটিকে ঘিরে দাঁড়ানো অশ্বারোহীদের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতী তিনজনের দুজনকে শুঁড় দিয়ে প্রহার করে মাটিতে ফেলে দিলো। তাদের দুজনের অবস্থা দেখে পেছনে পেছনে ধেয়ে আসা বাকি অশ্বারোহীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। সামনে থাকা অন্যজন অশ্বারোহী ভয়বিহ্বল হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে অরণ্যের মাঝে অদৃশ্য হয়ে পড়লো।
অন্যান্য অশ্বারোহী সেনারা নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে ‘ধর ধর, মার মার’ বলে চিল্লাচিল্লি করতে লাগলো। সমবেত কণ্ঠের চিল্লাচিল্লিতে হাতীটা ক্রমে উন্মত্ত হয়ে উঠলো। হাতীটা গগন ফাটানো নিনাদ করে গাছের শাখা-প্রশাখা, ডাল-পাতা ভেঙ্গে, পা দিয়ে মাড়িয়ে অরণ্যের গভীরে ঢোকে গেলো।
তীরন্দাজ সেনারা ডাল-পাতা ভাঙার শব্দ লক্ষ্য করে অবিরাম তীর বর্ষণ করতে লাগলো। কিন্তু ঘন অরণ্য, ডাল-পাতার প্রাচীর ভেদ করে মাত্র দু’টি শর হাতীর শরীরে আঘাত করতে সক্ষম হলো। বাকিগুলি শর গাছ-লতায় লেগে হাতী পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই রয়ে গেলো। দু’চারটে শরে হাতীর কোনোরূপ ক্ষয়ক্ষতি করতে পারল না।
ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাবর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি তোপধারী সেনাদের তোপ দাগতে নির্দেশ দিলেন। পাথরে ঘষে আগুন জ্বালিয়ে তোপের শলতেয় আগুন ধরাতে ধরাতে হাতী তাদের থেকে অনেক দূরে চলে যেতে সক্ষম হলো।
বাবর ক্ষোভে জ্বলে উঠলেন। আহত সিংহের মতো নিরুদ্ধ আক্রোশে তিনি গর্জে উঠলেন- আহত সেনা দুজনকে গাড়ীতে তুলে নাও এবং আহত ঘোড়া দু’টিকে মেরে ফেল। এভাবে আদেশ দিয়েই তিনি দাঁতে দাঁত ঘর্ষণ করে বললেন- সেই বদমাশ তার বেইমানীর শাস্তি পেতেই হবে। পুনরায় তিনি সেনাদের উদ্দেশ্যে বললেন- যাও, বন-জংঘল ঘিরে ফেল। সে যাতে কোনোমতেই প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে।
বাবরের নির্দেশ অনুসারে একদল অশ্বারোহী লালচান্দকে খুঁজতে বের হলো। কিন্তু লতা-পতা, কাদার জন্য তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারা লালচান্দের সন্ধান বের করতে সক্ষম হল না। অবশেষে নিরাশ হয়ে তারা নিজের দলের সন্ধানে ফিরে এলো।
সন্ধ্যের আগে আগে হিন্দু বেগ সেনাসহ বাবরকে একটি শ্যামল প্রান্তরে নিয়ে এলেন। পথশ্রমে শ্রান্ত ক্লান্ত সৈনিকেরা তাঁবু খাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। বাবর উৎকণ্ঠিতভাবে লালচান্দকে খুঁজতে যাওয়া অশ্বারোহীদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
অশ্বারোহী কয়জন সন্ধ্যের পর পরই তাঁবুতে ফিরে এলো। তাদের জামা-কাপড় ফেটে-ছিঁড়ে গিয়েছিলো এবং ঘোড়াগুলো কাদায় লুটোপুটি হয়ে পরেছিলো। ক্ষুধা পিপাসায় কাতর হয়ে তারা কোনোমতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলো।
সকাল বেলা দৌলত খাঁ লোডী এবং দিলোয়ার খাঁ লোডী পঞ্চাশজনের একটি ছোট সেনাদল নিয়ে বাবরের ছাউনিতে উপস্থিত হলেন। বাবরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পহরারত সৈনিকেরা তাঁদের ছাউনির ভেতর প্রবেশের অনুমতি দিলো। দৌলত খাঁ এবং দিলোয়ার খাঁ সেনাসহ ছাউনির ভেতর প্রবেশ করলেন। বাবর শুধু দিলোয়ার খাঁকে তাঁর তাঁবুতে ডেকে পাঠালেন। দৌলত খাঁ তাঁর সেনার সাথে তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
দিলোয়ার খাঁকে বেগদের মাঝে বসিয়ে বাবর কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসার পরে সরাসরি অভিযোগের সুরে বললেন- জ্বনাব, আপনার পিতৃকে আমি নিজের পিতৃর মতো সন্মান করি; অথচ তিনি সন্ধির শর্ত ভংগ করে আমার সাথে বেইমানী করলেন কেন? কি কারণে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে চাইছেন? এটাকে বিশ্বাসঘাতকতা না বলে কী বলব?
বাবরের কর্কশ প্রশ্নে দিলোয়ার খাঁর মুখমণ্ডল ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠলো। পিতৃকে দোষমুক্ত করার জন্য তিনি আমতা আমতা করে বললেন- জাহাপনা, পিতার অবশ্যে তেমন দোষ নেই। ভ্রাতৃ গাজী খাঁ পিতাকে ভুল পথে পরিচালনা করতেছেন। লাহোরে অন্য কোনো শাসক এলে লাহোরের ক্ষমতা আমাদের হাত থেকে চলে যাবে বলে তিনি পিতৃকে ভয় দেখাচ্ছেন। ইব্রাহীম লোডীর মতো আপনিও যে আমাদের একজন শত্রু এই কথা প্রতিপন্ন করার জন্য তিনি অহরহ চেষ্টা করতেছে। ফলে পিতা বর্তমান মনের স্থিরতা হারিয়ে ফেলেছেন। কোনটা ভালো এবং কোনটা মন্দ এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে না পেরে তিনি বর্তমান উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠেছেন।
এবং উন্মাদপ্রায় হয়ে প্রবীণ ব্যক্তি দৌলত খাঁ আমাদের ভুল পথে নিয়ে আসার জন্য একজন মিথ্যুক পথপ্রদর্শক আমাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন, আমরা যাতে গভীর অরণ্যের ফাঁদে বন্দি হয়ে মরে থাকি তারজন্যই নাকি?
না না জাহাপনা, পিতৃ এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে কিছুই জানেন না। এ নিশ্চয় গাজী খাঁর চক্রান্ত! পিতৃ স্বয়ং এ রকম চক্রান্ত করলে নিশ্চয় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন না। জাহাপনা, আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য পিতা তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। পিতার এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তিনি এখন মোটেই রক্তপাত পছন্দ করেন না। আপনি বিশ্বাস করুন জাহাপনা, আপনি লাহোর যাওয়াটা পিতা মনে-প্রাণে কামনা করেন। দিলোয়ার খাঁ অনুনয় বিনয় করে বললেন- আপনি পিতাকে দয়া করুন, জাহাপনা।
বাবরের মুখমণ্ডল কঠোর হয়ে উঠলো। তিনি দিলোয়ার খাঁর দিকে তাকিয়ে ভ্রূকুটি মিশ্রিত সুরে বললেন- দয়ার যোগ্য শুধু আপনি, জ্বনাব দিলোয়ার খাঁ; আপনার পিতা নয়। আপনার পিতৃ সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। শত্রুকে শাস্তি এবং মিত্রকে সহায় করার জন্য হজরত মহম্মদ(ছাঃ) আমাদের উপদেশ দিয়ে গেছেন। এটা নিশ্চয় আপনি অবগত। বাবর নিজের দেহরক্ষী সর্দারকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শুনেছি দৌলত খাঁ কয়েক দিন যাবত কোমড়ে দু’টি তরবারি ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! আমি দৃশ্যটা একটু দেখতে চাই। আপনি যান, তাঁর পছন্দের জায়গায় তরবারি ঝুলিয়ে এখানে নিয়ে আসুন।
আদেশ প্রতিপালিত হলো। দু’জন মজবুত সেনা দৌলত খাঁর দুই বাহুতে ধরে তাঁবুর ভেতর নিয়ে এলো। দৌলত খাঁ সেনা দু’জনের হাতের মুঠো থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করছিলেন। ফলে তাঁর গলায় ঝুলানো তরবারি দু’টি পরস্পরের সাথে ঠেকা খেয়ে ধাতব শব্দ করতেছিলো। দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করে উপস্থিত বেগবর্গ একজন আরেকজনের মুখের দিকে চেয়ে মুখ টিপে হাসতে লাগলেন।
দৌলত খাঁ বাবরের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভের সাথে চিৎকার করে বলতে লাগলেন- আমাকে এখানে কেউ বন্দি করে আনেনি। আমি নিজ ইচ্ছায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। আপনি আমার সাথে বেইমানী এবং দুর্ব্যবহার করছেন।
বেইমানী কে করছে? আমি, না আপনি? বাবর গর্জে উঠলেন- হিন্দু বেগ যখন আমার আজ্ঞা নিয়ে আপনার নিকট গিয়েছিলেন, তখন আপনি তাঁকে হত্যা করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন এবং গাজী খাঁ আমাদের মারতে কাদাময় গভীর অরণ্যের মাঝে ঠেলে দিয়েছিলো। গাজী খাঁ আপনার পুত্র। সে কার নির্দেশে এরকম কাজ করেছে? সেই পরামর্শ দাতা আপনার বাহিরে অন্য কেউ নয়। আপনি আমাদের সাথে বেইমানী করেছেন। বেইমানের সাথে আমরা বেইমানী-ই করি। বাবর কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে নিজের উজির-এ-আজম দুলহায়কে উদ্দেশ্য করে বললেন- জ্বনাব, আপনি একেঁ এর বংশধরসহ বন্দি করে ভীরা পাঠিয়ে দিন এবং মিলবত দূর্গে বন্দি করে রাখার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠান। এদেঁর অনুপস্থিতিতেও আমরা যুদ্ধের কাজ চালাতে পারব।
আশ্চর্যচকিত দৌলত খাঁর হাত-পা শিথিল হয়ে এলো। তাঁর পা দু’টি নিজের দেহের ভার বহন করতে অসমর্থ হলো। তিনি মাটিতে লেপটে বসে পড়লেন।
দু’জন সেনা দৌলত খাঁকে টেনে-হিঁচড়ে তাঁবুর বাইরে নিয়ে গেলো।
অন্য দু’জন সেনা দিলোয়ার খাঁর পেছনে এমনভাবে এসে দাঁড়ালো যেন তারা মাটি ফুটে বেরিয়ে এলো।
দিলোয়ার খাঁর মুখমণ্ডলও পাংশুবর্ণ ধারণ করলো।
এর পরে কয়েকদিনের কষ্টকর যাত্রার পর বাবর সসৈন্যে পাঞ্জাব এসে পৌঁছোলেন। পাঞ্জাব অধিকার করে গাজী খাঁকে বন্দি করে পাঞ্জাবের শাসনভার তিনি নিজের হাতে আনলেন।
পাঞ্জাব অধিকার করার কয়েকদিন পরে বাবর দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। বাবরের এই মনোভাবের সংবাদ পেয়ে ইব্রাহীম লোডী বাবরকে বাধা প্রদানের জন্য দাউদ খাঁ এবং হামিদ খাঁর নেতৃত্বে বিপুল সেনা পঞ্জাব অভিমুখে পাঠালেন। বাবর অতি সহজেই লোডী বাহিনীকে পরাজিত করে রূপার, আম্বালা প্রভৃতি স্থান দখল করতে সক্ষম হলেন।
কিন্তু পথশ্রমের ক্লান্তি এবং উপর্যুপরি যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার জন্য বাবর সেনা ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ফলে বাবর সেনাবহিনীকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য দিল্লী অভিযান কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখলেন। দিল্লী অভিযান স্থগিত রেখে তিনি সেনাবাহিনী সুবিন্যস্ত করার জন্য মনোনিবেশ করলেন।
* * *
শীতের শেষে বসন্তের আগমন হলো। বসন্তের আগমনের সাথে সাথে গাছ-লতায় নতুন পল্লব অঙ্কুরিত হলো। প্রকৃতি হিন্দুস্থানের বিশাল বিস্তৃত প্রান্তরে বিছিয়ে দিলো সবুজ শ্যামল চাদর। শ্যামল রূপ ধারণ করলো সর্বত্র। প্রকৃতি হয়ে উঠলো উদ্ভিন্ন যৌবনা। দিকে দিকে ফুটে উঠলো নানান রঙের ফুল। ভোমোরার গুঞ্জন, পক্ষীর কলরবে মুখর হয়ে উঠলো ধরণী।
ঠিক এমনি একটি সময়ে বাবর সসৈন্যে ভীরা থেকে পানীপত অভিমুখে যাত্রা করলেন।
বাবর অতি সাবধানে, ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেন।
অবশেষে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে তাঁরা এসে এসে দিল্লী থেকে পঞ্চান্ন মাইল উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত পানীপত নামক স্থানে এসে পৌঁছোলেন। বাবর পানীপত সহর এবং যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছাউনি পেতে আসন্ন নির্ণায়ক যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
সেদিকে আগ্রা থেকে এক লক্ষ সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ইব্রাহীম লোডী বাবরকে বাধা প্রদানের জন্য পানীপত অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলেন।
ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে অসংখ্য যোদ্ধা হাতী ছিলো এবং তাঁর মনোবলো ছিলো যথেষ্ট উন্নত। কারণ গত বছর আলম খাঁ, দিলোয়ার খাঁ এবং অন্যান্য দেশীয় রাজার সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর দিল্লী সীমান্তে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। সেই যুদ্ধে সন্মিলিত বাহিনীর চল্লিশ হাজার সেনার বিরুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর জয় হয়েছিলো।
বর্তমান ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে এক লক্ষ সেনা। বিপরীত পক্ষে বাবরের বাহিনীতে মাত্র বার হাজার সেনা। সেনার দিক থেকে ইব্রাহীম লোডী যথেষ্ট উপরে। তদুপরি বাবরের বাহিনীতে না থাকা অগণন যোদ্ধা হাতী ছিলো ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে।
ইব্রাহীম লোডীর বিশাল সেনা বাহিনী এবং যোদ্ধা হাতীর কথা শুনে বাবরের অনেক সেনা ভয়বিহ্বল হয়ে পড়লো। তারা পরস্পরের মাঝে আলোচনা করতে লাগলো- আমরা আসন্ন যুদ্ধে পরাজিত হলে হিন্দুস্থানের এই বিশাল ভূ-খণ্ড থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেও লাভ হবে না। কারণ লুকিয়ে লুকিয়ে গেলেও শত্রুসেনার হাতে ধরা পড়তে হবে। সেজন্য আমরা প্রাণপণে যুদ্ধ করে শত্রুসেনাদের পরাজিত করার বাহিরে অন্য কোনো উপায় নেই।
কিছুসংখ্যক সেনার বাহিরে অধিকাংশ সেনার বাবরের যুদ্ধের অনুভব এবং রণকৌশলের উপরে অগাধ আস্থা ছিলো। ওস্তাদ আলীকুলির তোপ এবং বন্দুকের উপরেও প্রগাঢ় ভরসা ছিলো অধিকাংশ সেনার। ইব্রাহীম লোড়ীর হাতী থাকলেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। তদুপরি ইব্রাহীম লোডীর সেনার চেয়ে বাবর বাহিনীর আত্মবিশ্বাস, অভিজ্ঞতা এবং পারদর্শিতা অনেক গুণে বেশি ছিলো।
হাতীর প্রতি অবশ্যে বাবর সেনার ভয়ভাব ছিলো। কারণ দৈহিক বল এবং তরবারি দিয়ে সেই অতিকায় প্রাণীর বিরুদ্ধে মোকাবিলা করা কোনমতেই সম্ভব হবে না বলে সবাই অবগত ছিলো। কিন্তু সেনাদের আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, তোপ এবং বন্দুক দিয়ে অতিকায় প্রাণীটাকে ঘায়েল করতে সক্ষম না হলেও ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া নিশ্চয় সম্ভব হবে। সাধারণতঃ তখন হিন্দুস্থানের যুদ্ধের পরিণাম হাতীর উপরে নির্ভরশীল ছিলো। তোপ এবং বন্দুক দিয়ে হাতী তাড়িয়ে পাঠাতে পারলে যুদ্ধে জয়ী হওয়াটা অসম্ভব হবে না বলে বাবর সেনার ধারণা ছিলো।
বাবর পানীপত সহর এবং যমুনা নদীর মধ্যবর্তী একখণ্ড স্থান যুদ্ধের জন্য নির্ধারণ করলেন। কারণ স্থানটুকু ছিলো প্রশস্ত এবং উন্মুক্ত। তোপ এবং গুলি বর্ষণের জন্য প্রশস্ত উন্মুক্ত স্থান বেশি সুবিধাজনক।
পর্যাপ্ত সময় থাকতেই বাবর যুদ্ধের সকল প্রকার আয়োজন সম্পূর্ণ করে তুললেন। যুদ্ধ কৌশল, সেনা পরিচালনা এবং আত্মরক্ষার প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি দিক তন্ন তন্ন করে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ করে বাবর সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেন। শত্রুসেনার ইচ্ছানুসারে যাতে যুদ্ধ করতে না হয় তারও তিনি ব্যবস্থা করলেন।
সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করে বাবর যুদ্ধের অনুশীলন করতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুসারে সেনারা নিজের নিজের কৌশল অনুশীলন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তোপ এবং বন্দুকধারীরা তোপ এবং বন্দুক পরিচালনা, তীরন্দাজসকলে তীর পরিচানার অভ্যাস করতে লাগলো। বাবর পদাতিক সেনাদের জন্য এক অভিনব যুদ্ধ কৌশল উদ্ভাবন করলেন। সেনাদের সেই অভিনব কৌশল অনুশীলন করার জন্য নির্দেশ দিলেন।
বাবরের বাহিনীতে সাতশ গাড়ী ছিলো। গাড়ীগুলো টিলার উপরে তুলে এনে গরুর চামড়ার মজবুত রশি দিয়ে একটার পর একটা বেঁধে অর্ধবৃত্তাকারে সারি বেঁধে স্থাপন করা হলো। গাড়ীগুলো যাতে গড়িয়ে যেতে না পারে তারজন্য চাকার নিচে গাছের ডালের গোঁজ গুঁজে দেওয়া হলো। গাড়ীর সামনের দিকে এবং পেছনের দিকে অনেক খালী জায়গা ছিলো। তীর যাতে ভেদ করে আসতে না পারে তারজন্য সেই সব খালী জায়গায় লোহার অভেদ্য ঢাল খাঁড়া করে দেওয়া হলো।
অভিনব সেই যুদ্ধ কৌশল সম্পূর্ণ হয়ে উঠলো। এখন বাকি রইল শুধু একটি কাজ। যুদ্ধ সঞ্চালন করা নায়কের নির্দেশে গাড়ীর চাকার নিচের গোঁজগুলো একসাথে সরিয়ে নিতে হবে এবং গোঁজগুলো সরিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে সাতশ গাড়ী একসাথে উপর থেকে ঢাল বেয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে যাবে।
গাড়ীগুলো একসাথে গড়িয়ে দেওয়ার জন্য সংকেতের ব্যবস্থা করা হলো। সেনানায়ক আলীকুলি খাঁ অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে হাত ইশারা করবে এবং তাহিরজান সারির শেষপ্রান্তে গিয়ে গোঁজগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য উচ্চ কণ্ঠে নির্দেশ দিবে।
সিদ্ধান্ত অনুসারে তাহির বেগ ঘোড়া ছুটিয়ে গাড়ীর সারির একেবারে শেষপ্রান্তে এসে সেনানায়ক আলীকুলি খাঁর সংকেতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। এদিকে সেনাগুলোও তাহিরজানের ঘোষণার অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়ে রইলো। আলীকুলি খাঁ অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো ।
সবার দৃষ্টি আলীকুলীর উপরে নিবদ্ধ হলো। এক সময় আলীকুলি খাঁ হাত ইশারা করলো। সাথে সাথে তাহির বেগ উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো- গোঁজগুলো সরিয়ে নাও।
নির্দেশানুসারে গোঁজগুলো সরিয়ে নেওয়া হলো। সাথে সাথে গাড়ীগুলো নিচের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু আশা করা মতে গাড়ীগুলো সমানে সমানে গড়িয়ে গেলো না। কিছু সংখ্যক গাড়ী বেশি এগিয়ে গেলো এবং কিছু সংখ্যক পিছিয়ে পড়লো। কয়েকটা গাড়ী আবার রশি ছিঁড়ে পংক্তিচ্যুত হলো। কয়েকটার আবার গাড়ীর সাথে বাঁধা ঢালগুলো উলটে গেলো।
বাবর পেছনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন প্রত্যক্ষ করছিলেন। গাড়ীগুলো বিশৃংখল হয়ে পড়া দেখে তিনি আদেশ দিলেন- ওস্তাদ আলীকুলি, রশিগুলি না ছিঁড়া পর্যন্ত এবং গাড়ীগুলি উলটে না যাওয়া পর্যন্ত অনুশীলন অব্যাহত রাখুন।
সেনারা ঘেমে-জেমে আবার গাড়ীগুলি আগের জায়গায় আনলো।
কয়েকজন সেনা পরিশ্রমের ফলে একেবারে শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। তারা এই পরিশ্রম থেকে শরীর বাঁচিয়ে চলার জন্য চেষ্টা চালালো। সর্দাররা তাদের গালাগাল দিতে লাগলো। আলসে কয়েকজন সেনাকে মারধোর পর্যন্ত করা হলো।
বাবর সেনাদের অমনোযোগিতা প্রত্যক্ষ করে নির্মমভাবে আদেশ দিলেন- অনুশীলনের সময়ে কাউকে অনুগ্রহ করা হবে না। কাজে সফল না হওয়া পর্যন্ত অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে।
এভাবে নির্মম আদেশ দিয়েই তিনি পরিখার কাজের অগ্রগতি নিরীক্ষণ করতে চলে গেলেন।
তিনবার অনুশীলন করার পরে গাড়ীগুলো ঠিক-ঠাক মতো গড়িয়ে দিতে সক্ষম হলো।
কিছুসংখ্যক সেনা নদীর পাড়ে পরিখা খনন করছিলো। একটি হাতী অনায়াসে যাতে ঢোকে যেতে পারে তেমন প্রশস্ত এবং গভীরভাবে খনন করা হয়েছিলো পরিখা গুলি। পরিখা খননের পরে উপরে ডাল-পাতা বিছিয়ে দেওয়া হলো। পরিখার চিন-ছাপ লুকোনোর জন্য ডাল-পাতার উপরে মাটি চাপা দেওয়া হলো।
তাহির বেগ দেহরক্ষীর সর্দার হওয়ার জন্য সব সময় সে বাবরের সাথেই থাকতো। ডাল-পাতা এবং মাটি চেপে পরিখা ঢেকে দেওয়ার পরে তাহির বেগ পরিখার দিকে তাকিয়ে ভাবলো- শত্রু যদি এদিক দিয়ে আক্রমণ করতে আসে খুব মজা হবে! তবে এদিক দিয়ে না এসে যদি অন্য দিক দিয়ে আসে, তাহলে সব পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যাবে।
বাবর কিন্তু সকল বিষয়ের উপরে সমানে দৃষ্টি রাখছিলেন। গুপ্তচরদের মুখ থেকে তিনি অবগত হয়েছিলেন যে, পানীপতের দুই দিকে গভীর অরণ্য এবং কাদাময়। ডানদিকে যমুনা নদী। একদিকে ঘন বসতিপূর্ণ পানীপত সহর। সহরের শত শত অলি-গলি। অলি-গলিগুলিতে প্রতিনিয়ত অগণন লোক চালাচল করে। সেজন্য শত্রুসেনা সহরের মধ্য দিয়ে আসা সম্ভব হবে না। একমাত্র সন্মুখ দিক দিয়ে আসা সম্ভব। অর্থাৎ পরিখা পার হয়ে আসতে হবে। এই সব দিক ভেবেচিন্তেই বাবর পরিখা খননের কথা ভেবেছিলেন।
অবশেষে প্রতীক্ষিত দিন এলো। উভয় পক্ষের সেনা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলো। সেটা ছিলো পনের শ ছাব্বিশ সালের একুশ এপ্রিল। উক্ত দিনটি ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত পানীপত যুদ্ধ নামে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
সেদিন সূর্যটা যমুনা নদীর বামপাড়ে উদয় হয়ে ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা প্লাবিত করে তীরবেগে নিজের শীর্ষবিন্দুর দিকে এগিয়ে আসছিলো। সূর্যের সাথে সাথে পিঁপড়ার জাঙ্গালের মতো এগিয়ে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা। দূর থেকে দেখে অনুমান হচ্ছিলো যে, চলন্ত সাগর একটি যেন বাবরের বার হাজার সেনাকে বানের মুখে ধৌত করে নিতে এগিয়ে আসছে। অগণন সেনার জন্য মাটি পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে পড়েছিলো এবং চলন্ত হাতী শুধু জাহাজের মতো দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল।
বাবর একটি টিলার উপরে দাঁড়িয়ে হিন্দুস্থানী সেনার গতিবিধি মনযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করতে ছিলেন। টিলার উপর থেকে শত্ৰুসেনার আকার-প্রকার বাবরের দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। সেজন্য তাঁর অনুমান হলো, চলন্ত প্রান্তর একটি যেন তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে।
ইব্রাহীম লোডী সেনার আধিক্য দেখে বাবরের মতো সিংহ পুরুষের অন্তরেও ভয় সঞ্চার হলো। উৎকণ্ঠা উত্তেজনায় তাঁর বুক কেঁপে উঠলো।
বাবর ভাবতে লাগলেন- ওই হাতীগুলোর কোনো একটিতে আরোহণ করে ইব্রাহীম লোডী তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। বিশাল হাতীটির পিঠে বসেই হয়তো সে সমগ্র রণভূমি নিরীক্ষণ করতেছে। হয়তো সে বাবর সেনার সংখ্যালঘুত্ব প্রত্যক্ষ করে হাতীর পিঠে বসেই পৈচাশিক উল্লাসে নৃত্য করছে।
শত্রু সেনা ধীরে ধীরে নিকটে চেপে এলো। কিন্তু বাবর আগের মতোই শান্ত ও সংযতভাবে টিলার উপরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
গাড়ী এবং ঢালের মজবুত দেয়াল নির্দেশের অপেক্ষায় অপেক্ষা করছিলো। বাবরের অন্যান্য সেনাও নিজ নিজ দায়িত্ব দক্ষতা সহকারে সম্পন্ন করার জন্য সষ্টম হয়ে অপেক্ষা করতেছিলো। সবার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছিলো। সিরা-উপসিরাগুলো টনটন করতেছিলো। নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে শত্রুসেনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সবাই ব্যগ্রভাবে অপেক্ষা করছিলো।
বাবর সেনার ডান দিকের নায়ক ছিলেন শাহজাদা হুমায়ূন। পিতৃর মতোই হুমায়ূন বুদ্ধিমান ও সাহসী। তাঁর সাথে ছিলো, কালা বেগ, হিন্দু বেগ এবং অন্যান্য অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত সেনা নায়কগণ।
সেনাগুলো অর্ধবৃত্তাকারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলো। সারির মাঝভাগে ছিলো তোপধারী, বন্দুকধারী, তীরন্দাজ ও মজবুত অভিজ্ঞ পদাতিক সেনা। সারির দুই দিকে তুফানি হামলার জন্য সষ্টম হয়ে অপেক্ষা করতেছিলো অশ্বারোহী সেনা।
সন্মুখের দিক থেকে ধীর মন্থর গতিতে এগিয়ে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা। সেনাদলের অগ্রে অগ্রে আসছিলো বিশালাকায় যোদ্ধা হাতীর ঝাঁক। হাতীর ঝাঁকের অগ্রে অগ্রে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর বিশালাকায় হাতী। ইব্রাহীম লোডীর পেছনে পেছনে আসছিলো প্রয়োজনের চেয়েও অধিক পদাতিক সেনা। কম পরিসরে অধিক সেনা একসাথে আসার জন্য তারা ঠেলাঠেলি করে অগ্রসর হচ্ছিলো। ফলে তাদের গতি মন্থর হয়ে পড়ছিলো।
তাহির বেগ কয়েকজন দেহরক্ষীর সাথে বাবরের পরিজনবর্গ থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
বাবরের থেকে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো বাবর এবং সেনার সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী সংবাদবাহক সেনা। বাবর তাদের প্রয়োজন সাপেক্ষে নির্দেশ দিয়ে চলছিলেন। তাঁর নির্দেশের সুর ছিলো আত্মবিশ্বাসপূর্ণ এবং সুস্পষ্ট।
শত্রুসেনার দিকে তাকিয়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা এক সময় বাবরের জন্য অসহ্যকর হয়ে উঠলো। বেগবর্গও শত্রুসেনাদের বাধা প্রদানের জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠলো। কিন্তু বাবর অধৈর্য বেগবর্গ এবং সেনাদের শান্তশিষ্ট গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সাবধান করতে লাগলেন- ধৈর্য ধরুন, অপেক্ষা করুন, কেউ এগিয়ে যাবেন না।
ইব্রাহীম লোডী লক্ষ্য করলেন, বাবর সেনা গাড়ী এবং ঢালের দেয়ালের পেছনে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেউ এগিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করছে না। বাবর সেনার নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যক্ষ করে ইব্রাহীম লোডী তাঁর সেনাদের থামতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পেয়ে চলন্ত জনসমূদ্র নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
ইব্রাহীম লোডী তাঁর সেনা নায়কদের সাথে পরামর্শ করে সেনাদের ডান দিকে ঘুরতে নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ এই কারণেই দিলেন যাতে মূল আক্রমণ মধ্যভাগে না করে প্রতিপক্ষের ডান দিকে করতে পারে। ডান দিক ভেদ করে সহরের দিক থেকে বেরিয়ে এসে যাতে প্রতিপক্ষ সেনারা গাড়ী নিয়ে অবস্থানরত টিলাটি ঘিরে ফেলতে পারে।
কিন্তু এক লক্ষ সেনা শৃংখলাবদ্ধভাবে পরিচালনা করাটা সহজ কাজ ছিল না। নির্দেশ জারি করে থাকতেই কিছু সেনা বাবর সেনার ডান দিক লক্ষ্য করে ঘুরলো যদিও অধিক সংখ্যক সেনা ঘুরলো সহরের দিকে। ফলে সেনা বাহিনীতে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি হলো। বিশৃংখল সেনা শৃংখলাবদ্ধ করতে ইব্রাহীম লোডীর অনেক সময় অপব্যয় হলো।
ইব্রাহীম লোডীর সেনা বিশৃংখল হওয়া দেখে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। প্রতি আক্রমণের জন্য দুই হাজার অশ্বারোহী প্রতিপক্ষ সেনার বাম দিকে পাঠিয়ে দিলেন।
অশারোহী সেনা তীব্র গতিতে এগিয়ে এসে কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থানরত ইব্রাহীম লোডীর পদাতিক সেনা এবং হাতীর পেছন দিকে এলো।
অন্যদিকে হুমায়ূনের অশ্বারোহী বাহিনী প্রতিপক্ষকে ঘিরে ধরে তাদের পুনর্গঠনে বাধা প্রদানের জন্য এগিয়ে এলো।
বাবর পূর্বের যুদ্ধের জয় এবং পরাজয়ের সব অভিজ্ঞতা পানীপতের যুদ্ধে প্রয়োগ করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিলো, প্রতিপক্ষকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে প্রতিপক্ষের পরিকল্পিত যোজনা ভেঙে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করা।
বাস্তবেও বাবর সেটাই করলেন। ঘিরে ধরা সেনার থেকে ঘিরে ফেলা সেনার সংখ্যা অনেক বেশি ছিলো। প্রতিপক্ষ সেনা ঘিরে ধরা সেনার বেষ্টনি ভেঙে কখনও ডান দিকে, কখনও আবার বাম দিকে বের হয়ে আসতে লাগলো।
এর মধ্যেই বাবর একটি কৌশল করলেন। তিনি নিজের বাহিনীর কেন্দ্রভাগ খালী করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন দিকে সংকটজনক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করলেই তাদের সহায়ের জন্য কেন্দ্রস্থিত সেনা থেকে ডানে-বামে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেনা প্রেরণ করতে লাগলেন।
বাবর জেনেশুনেই এই কাজ করছিলেন। কেন্দ্র থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো দুটি। প্রথম উদ্দেশ্য ছিলো, কেন্দ্রস্থিত সেনার পেছন দিকেই গড়িয়ে দেওয়ার জন্য অপেক্ষারত গাড়ী এবং ঢালের দেয়াল ছিলো। সেনা সরিয়ে না নিলে গাড়ী গড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিলো, কেন্দ্রভাগ দুর্বল করে শত্রুসেনাদের প্রলোভিত করে গাড়ীর সন্মুখে টেনে আনা।
কৌশল কাজে এলো। কেন্দ্রভাগ দুর্বল হয়ে পড়ার সাথে সাথে ইব্রাহীম লোডী নিজের বাহিনীকে টিলার দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। কারণ টিলার উপরেই বাবর দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাবরকে আক্রমণ করার জন্য ইব্রাহীম লোডী এই নির্দেশ দিলেন।
নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে ডানে-বামে এবং পেছন দিকে সংঘটিত আক্রমণ উপেক্ষা করে প্রতিপক্ষ সেনার মুখ্য শক্তি যোদ্ধা হাতী নিয়ে টিলার দিকে অগ্রসর হলো।
প্রতিপক্ষ সেনা টিলার ঢাল বেয়ে কিছু উপরে উঠার পরে বাবর নির্দেশ দিলেন- গাড়ীর চাকার তলের গোঁজগুলি সরিয়ে ফেল।
বাবরের নির্দেশ পেয়ে পরিকল্পনা অনুসারে একসাথে সাত শ গাড়ীর চাকার তলের গোঁজ সরিয়ে ফেলা হলো। সাথে সাথে একটি সারিতে সাত শ গাড়ী শত্রুসেনার দিকে কালান্তক যমের মতো গড়িয়ে যেতে লাগলো। ঠিক তখনই গর্জে উঠলো, আলীকুলি খাঁর কামান এবং বন্দুকধারীর বন্দুক।
ইব্রাহীম লোড়ীর হাতী এবং পদাতিক বাহিনীর উপরে অবিরাম গুলী বর্ষণ চলতে লাগলো। কামানের শব্দ কানে তালা মেরে ধরলো। কালো ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে ফেললো। শত্রুসেনা চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলো। এদিকে সাত শ গাড়ী ভয়ানক দৈত্যের মতো গড়িয়ে এসে শত্রুসেনার উপরে আঘাত করলো। শত্রুসেনার গগনভেদি আর্তনাদে আকাশ বাতাস কম্পিত করে তুললো। সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেলো ঈস্পিত দৌড়াদৌড়ি— বিশৃংখল পরিস্থিতি।
এই অভিনব আকস্মিক আক্রমণের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না শত্রুসেনা। কামান এবং বন্দুকের কানে তালা মারা শব্দে সেনার পাশাপাশি হাতীগুলিও আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলো। আহত সেনা এবং আতঙ্কিত হাতীর চিৎকারে যুদ্ধক্ষেত্রে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করতে লাগলো। আহত এবং আতঙ্কিত হাতীগুলো আকাশ-বাতাস কম্পিত করে প্রচণ্ডভাবে চিৎকার করে ছট্ফট্ করতে লাগলো। মাউত বলপূর্বকভাবে হাতীগুলি এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করাতে হাতীগুলি অধিক উগ্র হয়ে উঠলো। শুরু হয়ে গেলো হাতীর তাণ্ডব। হাতীর পা-র তলে পড়ে ইব্রাহীম লোড়ীর অনেক সেনা চেপটা হতে লাগলো।
কামান এবং বন্দুকের গুলীবর্ষণ অবিরামভাবে চলতে থাকলো। কামানের আঘাতে অনেক হাতী মরলো এবং আহত হলো। টিলার ঢালে অনেক মৃত এবং আহত হাতী পড়ে রইল। এদিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বানের জলের মতো শত্রুসেনা এগিয়ে এসে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে লাগলো।
অবশেষে কামান এবং বন্দুকের গুলীর সন্মুখে শত্রুসেনা তিষ্ঠাতে না পেরে উপায়বিহীন হয়ে বাবর সেনার দিকে পিঠ দিয়ে পতঙ্গের মতো ছিটকে পালাতে লাগলো। দৌড়াদৌড়ি এতো ক্ষিপ্রগতিতে চলছিলো যে, পলাতক সেনার ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে গিয়েও ইব্রাহীম লোডীর অনেক সেনা আহত ও নিহত হলো। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অনেকে অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে দিয়েও উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে পালাল।
শত্রুসেনাদের ঘিরে ধরা বাবর সেনা সংখ্যায় অল্প হওয়ার জন্য প্রতিপক্ষের পলাতক সেনাকে বাধা দিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়লো। প্রথমে হাতী ঠেলে-ঠেসে রাস্তা বের করে যেতে লাগলো এবং হাতীর পেছনে পেছনে পালাতে লাগলো পদাতিক সেনা। বাবর টিলার উপরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের গতিবিধি নিরীক্ষণ করতেছিলেন। শত্রুসেনাদের পালিয়ে যেতে দেখে তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন- শত্রুসেনা পালিয়ে গিয়ে দিল্লীর দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। বাধা দাও। তাদের পালিয়ে যেতে দিও না। ধরে ফেলো।
বাবর এভাবে চিৎকার করে নির্দেশ দিয়েই সম্পর্ক রক্ষাকারী সৈনিকদের দিকে তাকালো। তিনি দেখলেন সবাই যুদ্ধে ব্যস্ত। তাঁর কথা শুনার জন্য ধারে-কাছে কেউ নেই। সেজন্য তিনি দ্রুত অল্পদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তাহির বেগের নিকটে এলেন।
বাবর তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন-তাহির বেগ, আমি জানতে চাই– ইব্রাহীম লোডী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছে, না এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে? যদি সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছে, তাহলে তার পশ্চাদধাবন করতে সেনা পাঠান। তাকে ধরে আনুন।
তাহির আচ্ছন্নের মতো যুদ্ধের গতিবিধি প্রত্যক্ষ করতেছিলো। বাবরের আহ্বানে সে সম্বিত ফিরে পেয়ে পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র মরণোন্মুখ প্রচণ্ড আর্তনাদ এবং দৌড়াদৌড়িমুখর। শ্বাসরুদ্ধকারী ধোঁয়ার আচ্ছাদনে চারদিক ছেয়ে ধরেছে। সামগ্রিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্র তার উপলব্ধিতে নরক সদৃশ অনুমান হলো। দৃশ্য দেখে সে আতঙ্কে শিহরে উঠলো। নিজের দুর্বলতা লুকোতে সে কম্পিত কণ্ঠে আচ্ছন্নের মতো বললো- আপনার আদেশ শিরোধার্য, জাহাপনা।
তাহির বেগের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে একজন সংবাদবাহক ঘোড়া ছুটিয়ে বাবরের নিকটে এসে উল্লসিত কণ্ঠে বললো- জাহাপনা, যুদ্ধে আমাদের জয় হয়েছে। শত্রুসেনা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পালিয়ে যাইতেছে।
ইব্রাহীম লোডীও পালিয়েছে নাকি? সংশয়াহত কণ্ঠে বাবর জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ জাহাপনা, পলাতক হাতীর মাঝে তাঁর কালো কাপড়ের ঝালর পরানো হাতীটাও দেখেছি। সম্ভবতঃ সেও পালিয়েছে।
তাহির বেগ, কাশিমতায় মির্জা কোথায়?
চল্লিশ বছরের কাশিমতায় মির্জা এগিয়ে এসে অভিবাদন করে দাঁড়ালো।
বাবর কাশিমতায় মির্জাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ইব্রাহীম লোডী পালিয়ে গিয়ে যদি আগ্রার দূর্গে আশ্রয় নিতে সমর্থ হয়, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘ হবে। আমি বিনাযুদ্ধে আগ্রা দখল করতে চাই। আপনি ইমদাদী সেনা এবং তাহির বেগের অধীনস্থ সেনা নিয়ে শীঘ্ৰে ইব্রাহীম লোডীর পশ্চাদ্ধাবন করুন। প্রয়োজন হলে দিল্লী বা আগ্রা গিয়ে হলেও দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করার পূর্বেই তাঁকে বন্দি অথবা হত্যা করতে হবে। যান, দেরি করবেন না।
কাশিমতায় মাথা নুইয়ে বললো- আমার জীবন বিপন্ন করে হলেও আমি আপনার আদেশ পালন করব, জাহাপনা।
কাশিমতায়, বাবা সোহরা এবং তাহির বেগ ইব্রাহীম লোডীকে খুঁজতে বের হলো। কিন্তু তাঁরা অনেক সময় খুঁজেও ইব্রাহীম লোডীর সঠিক খবর সংগ্রহ করতে সক্ষম হল না। তারা বাবরের নিকটে এসে বললো- ইব্রাহীম লোডী যুদ্ধে নিহত হয়েছে, না বেঁচে আছে কেউ তার সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। কিন্তু এটা ঠিক যে, সে পলাতক সেনার মাঝে নেই।
ইব্রাহীম লোডীর সঠিক সন্ধান বের করতে না পারলেও যুদ্ধে বাবরের জয় হলো।
ইব্রাহীম লোডীর অনেক সেনা পালিয়ে গেলো এবং অনেকে বাবর সেনার হাতে বন্দি হলো।
বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত হয়ে বাবর সদলবলে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হলেন। যাত্রার আগমুহুর্তে তিনি সেনাদের সতর্ক করে দিলেন- কেউ যেন কোনো নাগরিকের উপরে জোর-জবরদস্তি না করে।
* * *
বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত হুমায়ূন একদল সেনা নিয়ে সবার আগে দিল্লী এসে পৌঁছোলেন।
হুমায়ূন দিল্লী এসেই বিনাযুদ্ধে সহর এবং দূর্গের উপরে বিজয় সাব্যস্ত করলেন। ইব্রাহীম লোডীর দিল্লীস্থিত কোষাগারো তিনি দখল করলেন। তার পরে তিনি তিন শ সেনা এবং হিন্দু বেগকে পথপ্রদর্শক হিসাবে নিয়ে সহর পরিভ্রমণ করতে বের হলেন।
বিশাল অসীম দেশ এবং বিশাল তার সহর।
দিল্লী সহর ছোট ছোট টিলা দিয়ে ভরা। তবুও অপেক্ষাকৃত সমতল। চারদিকে শ্যামলের সমাহার। অগণন ঘর-বাড়ি।
রাস্তা প্রায় জনশূন্য। দুই চারজন লোক রাস্তায় চলাচল করতে দেখা গেলো। পানীপত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর পরাজয়ের সংবাদ ইতিমধ্যে সহরে প্রচার হয়ে গিয়েছিলো। ফলে জনতা সম্ভবত বিদেশী আক্রমণকারীর ভয়ে গৃহের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে দুয়ার-খিড়কির ফাঁক দিয়ে সহরের গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে ছিলো।
পবিত্র যমুনা নদীর পাড়ে একদল মানুষ দেখা গেলো। তাঁরা মৃতকের দাহ-সৎকার করতে ছিলেন। তাঁদের পাশে লেলিহান শিখা মেলে আগুন(চিতা) জ্বলতেছিলো। লোকগুলি দাহ-সৎকারে ব্যস্ত। ইহলোকের প্রতি তাদের মোটেই ভ্রূক্ষেপ ছিল না। বিদেশী সেনার প্রতি লক্ষ্য করার মানসিকতা বা অবসর কোনটাই যেন ছিল না তাদের।
হুমায়ূন কৌতূহলী দৃষ্টিতে হিন্দু বেগের দিকে তাকালেন।
হুমায়ূনের মনের ভাব উপলব্ধি করতে পেরে হিন্দু বেগ কথাটা বুঝিয়ে বললেন- হিন্দু প্রথামতে মৃতককে চিতার উপরে শোইয়ে ঘৃতাদি ঢেলে অগ্নি প্রজ্বলন করা হয়। অগ্নির দহনে নশ্বর দেহ পোরে ছাই হয়ে যায় এবং আত্মা পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। ছাইগুলি প্রবাহিত নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
হুমায়ূন এসে এসে একটি বাজারে উপস্থিত হলেন। কয়েকজন মহিলা এবং ছেলে-মেয়েদের ফুল নিয়ে খেলে থাকা প্রত্যক্ষ করলেন। তাদের পা-গুলো খালী। পাকা চুল এবং দাড়িবিশিষ্ট কয়েকজন লোকও ফুল হাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের পা-গুলোও খালী। হুমায়ূনের জন্য সেটা ছিলো এক অভিনব দৃশ্য। তিনি আবার কৌতূহলী হয়ে হিন্দু বেগের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন।
হুমায়ূনের পেছনে পেছনে আসা হিন্দু বেগ হুমায়ূনের দৃষ্টির অর্থ উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- শাহজাদা, আমরা সহরের একটি বড় বাজারে এসেছি।
আজ ঈদ নাকি? এতো ফুল নিয়ে লোকগুলো কোথায় যাচ্ছে? হুমায়ূন জিজ্ঞাসা করলেন।
না শাহজাদা, আজ ঈদ নয়। ফুল নিয়ে লোকগুলো পূজা করতে মন্দিরে যাচ্ছেন। এরাঁ নিজেদের আরাধ্য দেব-দেবীর নিকট মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা জানাবেন। হিন্দুস্থানে প্রতি মাসেই এরকম উৎসব পালিত হয়, শাহজাদা।
আচরিত দেশ এই হিন্দুস্থান! হুমায়ূন স্বগতোক্তি করলেন।
রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পুরানা বিশাল একটি ভবনের ছাদের উপরে দীর্ঘ হাত-পা, দীর্ঘ লেজ এবং কালো মুখবিশিষ্ট কয়েকটা বানর দৌড় লাফ পেরে থাকা দেখা গেলো। তাদের বাচ্চা কয়েকটা ছাদের উপরে দৌড়াদৌড়ি ও লাফালাফি করছিলো এবং কয়েকটা বান্দর একটি ডাল থেকে আরেকটি ডালে দ্রুত গতিতে লাফ মেরে মেরে খেলছিলো। দু’চারটে বান্দর রাস্তায়ও নেমে আসছিলো। কিন্তু পথচারিদের তাদের উপরে একটুও গুরুত্ব দেওয়া দেখা গেল না।
সহজ শিকার সন্মুখে দেখে একজন সৈনিক শরধনু প্রস্তুত করলো। হিন্দু বেগ ব্যস্তভাবে বাধা দিয়ে বললেন- বানর হত্যা মহাপাপ। হত্যাকারীর বিপদ হওয়াটাও বিচিত্র নয়।
হিন্দু বেগের ডান দিক দিয়ে আসা কালা বেগ হেসে হেসে ঠাট্টার সুরে বললো- আমরা গরুগুলোকেও রক্ষণাবেক্ষণ দেওয়া উচিত, না কি বলেন আপনি?
প্রতিটা কষ্টলব্ধ বস্তুকে আমরা রক্ষণাবেক্ষণ দেওয়া উচিত। হিন্দু বেগ গম্ভীরভাবে বললেন- হিন্দুস্থান গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। গ্রীষ্মপ্রধান দেশের লোকগুলো কৃষির উপর নির্ভরশীল। গরু কৃষিকর্মের জন্য অতি প্রয়োজনীয় প্রাণী। সেজন্য হিন্দুস্থানে গরুকে লোকে পূজা করে। তদুপরি গরু থেকে উৎপন্ন পাঁচবিধ বস্তুকে লোকে সন্মান করে। সেজন্য হিন্দুলোকে গো হত্যাকে মহাপাপ বলে গণ্য করে।
হুমায়ূন আলোচনা সমাপ্ত করার জন্য শান্ত কণ্ঠে বললেন- আমরা বাদশাহের নির্দেশ ভুলে গেলে চলবে না। তিনি হিন্দুস্থানের প্রতিটা রীতি-নীতি এবং পরম্পরাকে সন্মান প্রদর্শন করার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্মান হানি বা মনে আঘাত পেতে পারে তেমন সকল আচরণ থেকে আমরা বিরত থাকতে হবে।
খাজা কালা বেগ বুকে হাত স্থাপন করে বললো- জাহাপনার হুকুম শিরোধার্য। আমি আসলে হিন্দু বেগ সাহেবের সাথে তামাশা করছিলাম।
দূরে গাছ-বৃক্ষের উপর দিয়ে রোদের আলোতে দীপ্তিমান একটি গম্বুজ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।
হুমায়ূন প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- ওই যে দীপ্তিমান ওই গম্বুজটা কী?
হিন্দু বেগ বললেন- ওইটা কুতুব মিনার। ওইটা দাসবংশের সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবাক নির্মাণ করিয়েছিলেন। ওইটা প্রায় দুশ বছরের পুরানা, শাহজাদা।
চলুন, বস্তুটা আমরা নিকট থেকে দেখে আসিগে’।
তাঁরা কুতুব মিনারের নিকটে এলেন। কুতুব মিনারের উচ্চতা দেখে সবাই অভিভূত হয়ে পড়লেন।
হুমায়ূন প্রশ্ন করেই ফেললেন- এতো উঁচু ! এটার উচ্চতা কত, বেগ সাহেব?
হিন্দু বেগ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন- দুইশত পঞ্চাশ ফুট, শাহজাদা।
উপরে উঠার সুবিধা রয়েছে নাকি?
নিশ্চয় রয়েছে। একেবারে উপরের মহলায় উঠে যেতে পারি। উপর মহলা থেকে সমগ্র দিল্লী সহর ভালোভাবে চোখে পড়ে।
হুমায়ূন ঘোড়া থেকে নেমে সেনাদের নিয়ে কুতুব মিনারের উপরের মহলায় উঠে এলেন।
কুতুব মিনারের উপর থেকে হুমায়ূন চতুর্দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। মিনার থেকে কিছু দূরে কালো স্তম্ভ একটির দিকে হুমায়ূনরে দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। স্তম্ভটির চতুর্দিকে অনেক লোক ভির করে থাকা হুমায়ূনের চোখে পড়লো। তিনি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- চতুর্দিকে লোক ভির করে থাকা ওই কালো বস্তুটা কী?
ওইটা লোহা দিয়ে নির্মিত স্তম্ভ। (স্তম্ভটার উচ্চতা ২৩ ফুট ৮ ইঞ্চি(৭.২১ মিটার। ব্যাস ১৬ ইঞ্চি(৪১ ছেণ্টিমিটার।) স্তম্ভটি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য-২ (৩৭৫-৪১৫) খ্রীষ্টপূর্বে নির্মাণ করিয়েছিলেন। স্তম্ভটি কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে মেহরুলিতে অবস্থিত)। )শুনামতে ছয় শত বছরের পুরানা। কথিত রয়েছে, স্তম্ভটায় পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে দুই হাত প্রসারিত করে এক হাত দিয়ে অন্য হাতের আঙ্গুল স্পর্শ করতে পারলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়।
হুমায়ূন মনযোগ সহকারে হিন্দু বেগের কথা শুনে যুবকসূলভ উৎসাহ প্রদর্শন করে বললেন- তাহলে চলুন, আমরাও নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করে দেখিগে’।
তাঁরা কুতুব মিনার থেকে নেমে কালো স্তম্ভের নিকটে এলেন। অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত সেনা দেখে ভির করে থাকা লোকগুলো রাস্তা ছেড়ে দিলো।
হুমায়ূন হিন্দু বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনি একটু দেখিয়ে দিন তো কীভাবে হাতের আঙুল স্পর্শ করতে হয়?
স্তম্ভটার উপর এবং তলের অংশ কালো। অসংখ্য হাত এবং পিঠের ঘর্ষণের জন্য মাঝের অংশের রঙ উঠে গিয়ে তরবারির ফলকের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সেখানে সূর্যের রশ্মি পড়ে ঝিকমিক করতে ছিলো।
হিন্দু বেগ স্তম্ভে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে হাত প্রসারিত করে ডান হাতের আঙুল দিয়ে বাম হাতের আঙুল স্পর্শ করার জন্য চেষ্টা করে বিফল হলেন। তাঁর ব্যর্থতায় উপস্থিত সেনাগুলো হেসে ফেললো।
হুমায়ূন নিজেও সেই হাসিতে যোগ দিয়ে হেসে হেসেই স্তম্ভে পিঠ ঠেকিয়ে পিছন দিকে দুই হাত প্রসারিত করে আঙুল স্পর্শ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনিও বিফল হলেন। তাঁর পরে অন্যান্য সেনারাও চেষ্টা করে কাজটা করতে বিফল হলো। অবশেষে দীর্ঘহাতের সমরকন্দী সেনা একজনে কাজটা করতে সক্ষম হলো। হুমায়ূন সাথে সাথে সেনাটিকে একমুষ্টি রুপোর মুদ্রা উপহার দিলেন।
হুমায়ূনের সাথে অন্যান্য সেনা নায়কদের অনেক ছোট ছোট দল নিজেদের অধীনস্থ সেনা নিয়ে সহর পরিভ্রমণ করতে বের হয়েছিলেন। তেমন একটি দলের সেনানায়ক ছিলো ইয়ার হোসেন। ইয়ার হোসেন লোভী এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলো। সহর পরিভ্রমণ করার চেয়ে সে লুটপাটের প্রতে বেশি আগ্রহী ছিলো। হিন্দু মন্দিরে অনেক সোনা-দানা। দেব-দেবীগুলো অনেক মূল্যবান রত্ন দিয়ে সজ্জিত। সেজন্য লোভ সামলাতে না পেরে লুটপাটের উদ্দেশ্যে সে একটি মন্দিরের উপরে আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য অগ্রসর হলো।
মন্দিরের দেয়ালে সাদা মার্বল পাথর লাগানো ছিলো। সূর্যের রশ্মি পড়ে সাদা দেয়ালগুলো ঝিকমিক করতেছিলো। মন্দিরের বহির্ভাগের চাক্চিক্য মন্দিরের অভ্যন্তরের ঐশ্বর্য-বিভূতির কথা ঘোষণা করতে ছিলো।
ইয়ার হোসেন দলবল নিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো।
মন্দিরের বেদীতে স্থাপন করা ছিলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশাল মূর্তি। মূর্তির সন্মুখে ধ্যানমগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বৃদ্ধ পুরোহিত। তাঁর হাত দু’টি জোড়হাত করা ছিলো এবং চোখে ছিলো জল। অগণন স্ত্ৰী-পুৰুষ, বৃদ্ধ-যুবা এবং ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নৈস্বর্গিক আনন্দে মগ্ন হয়ে মূর্তির সন্মুখে নতমস্তকে ধ্যানমগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।বাহ্যিক জগতের প্রতি যেন কারো একটুও ভ্রূক্ষেপ নেই। সবাই ধ্যানস্থ ছিলেন।
ইয়ার হোসেন দলবল নিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেই সঙ্গী সেনাদের নির্মম আদেশ দিলো- লণ্ডভণ্ড করে দাও এই ভূত পূজারীদের।
আদেশ দিয়েই ইয়ার হোসেন ভক্তদের ঠেলে ফেলে দিয়ে মূর্তির দিকে এগিয়ে গেলো। সে মূর্তির গা থেকে রত্নালংকার খুলতে হাত বাড়াতেই দুয়ারমুখ থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বললেন- মহামান্য বাদশাহর নামে আদেশ দিচ্ছি, সাবধান মূর্তির গায় হাত দিবে না। মন্দির থেকে বেরিয়ে এসো।
মন্দিরের অস্পষ্ট আলোয় ইয়ার হোসেন আগন্তুককে চিনতে না পেরে অবজ্ঞার সুরে বললো- কে চিৎকার করছ? কেন, তুইও ভূত পূজারি নাকি? এভাবে বলেই সে সঙ্গীদের আদেশ দিলো- মণি-মুক্তা, সোনা-দানা মূর্তির গা থেকে খুলে নাও।
ইয়ার হোসেনের নির্দেশে একজন সেনা মূর্তির গা থেকে অলংকার খোলার জন্য হাত বাড়ালো। সাথে সাথে আগন্তুক সৈনিকটির হাত লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলো। শর সৈনিকটির হাতে বিদ্ধ হলো। সৈনিকটি ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো।
ইয়ার হোসেন কালবিলম্ব না করে তরবারি কোষমুক্ত করে বললো- কে তুই বেকুব? এভাবে বলেই সে দ্রুত আগন্তুকের দিকে অগ্রসর হলো।
হিন্দু বেগ দ্রুত তরবারি কোষমুক্ত করে ইয়ার হোসেনকে বাধা দিতে এগিয়ে এলেন- সাবধান ইয়ার হোসেন, তোমার সন্মুখে স্বয়ং শাহজাদা হুমায়ূন দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
ইয়ার হোসেন হতচকিত হয়ে দরজার দিকে তাকালো। দরজার সন্মুখে হুমায়ূনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভয়ার্ত ও আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো- ক্ষমা করবেন শাহজাদা। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। ইয়ার হোসেন কৈফিয়তের সুরে কথাটা বলেই দু পা পিছিয়ে এলো।
তরবারিটি আমাকে দিন। হুমায়ূন গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিলেন।
শাহজাদা, আমি আপনার পিতার বিশ্বাসী খেদমতগার।
কিন্তু আপনি সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। আপনি লুটপাট এবং মন্দিরের পবিত্রতা ভঙ্গ করবেন না বলে বাদশাহের সন্মুখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আপনি বাদশাহের সন্মুখে করা সেই প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে পবিত্র গৃহে তরবারি কোষমুক্ত করে মহাপাপ করেছেন। এমন কী, আপনি পবিত্র উপাসনা গৃহেও লুটপাটের তাণ্ডব চালাতে ভয় করেন নি। আপনি এতো লোভী কেন, বেগ? এইসকল মানুষ……….হুমায়ূন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে ইশারা করে বললেন- এরাঁ আমাদের শত্রু নয়। বর্তমান এরাঁ আমাদের আপন লোক। এরাঁ এদের ইষ্ট দেবতার ইবাদত(উপাসনা) করছিলেন এবং আপনি এদেঁর উপরে জুর-জুলুম করতে অগ্রসর হয়েছিলেন। আমরা হিন্দুস্থানে লুটপাট করার জন্য আসিনি। আমরা এখানে এসেছি সাম্রাজ্য বিস্তার করে ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার থেকে এই শোষিত, বঞ্চিত লোকদের রক্ষা করার জন্য। ইব্রাহীম লোডীর মতো একজন লোভী, অত্যাচারী শাসকও হিন্দু দেব-দেবীর গা থেকে সোনা-দানা, হীরা, মুক্তা খুলে নিতে সাহস করেননি; কিন্তু আপনি সেটাই করতে উদ্যত হয়েছিলেন। এটা আমাদের জন্য অতি পরিতাপের কথা। হিন্দুর পবিত্র মন্দিরে প্রবেশ করে— শান্তি ভঙ্গ করে আপনি বাদশাহের সুনাম নষ্ট করেছেন। এর সমুচিত শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে। এভাবে বলেই দেহরক্ষী সেনাদের দিকে তাকিয়ে কঠোর নির্দেশ দিলেন- এর হাত থেকে তরবারি কেড়ে নাও। একে এর সঙ্গীসহ কাল-কঠুরিতে বন্দি করে রাখুন। এদের দেখে আমাদের অন্যান্য সেনারাও শিক্ষা নিক।
আদেশ ঘোষণার সাথে সাথে একদল সেনা ইয়ার হোসেন এবং তার সঙ্গীদের হাত থেকে তরবারি কেড়ে নিয়ে মন্দির থেকে বের করে নিয়ে গেলো।
হুমায়ূন দো-ভাষীর দ্বারা পূজারী এবং উপস্থিত ভক্তদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন- মহামান্য বাদশাহর হয়ে আমি আপনাদের অবগত করতে চাইছি যে, আমরা আপনাদের শত্রু নয়। আমাদের ধর্ম ভিন্ন হলেও মানুষ হিসাবে আপনাদের এবং আমাদের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আমরা সবাইকে একজন স্রষ্টার সৃষ্টি বলে ভাবি। আমাদের মসজিদ এবং আপনাদের মন্দির। আমরা নামাজ পড়ি – আপনারা পূজা করেন। উপাসনার রীতি-নীতি ভিন্ন হলেও উভয়ের উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই- সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ এবং মানুষের মঙ্গল কামনা। সেজন্য আমরা সবাই আপনাদের দেব-দেবী এবং উপাসনা গৃহকে সন্মান করি। আমরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে হিন্দুস্থান এসেছি। আপনাদের সাথে মিলিত হয়ে আমরা মহান ভারত গড়তে চাই। মহান ভারতে আমরা বইয়ে দিতে চাই শান্তি এবং আনন্দের লহর। আপনাদের সহযোগিতা পেলে তবেই তো সেই উদ্দেশ্য সফল করা সম্ভব হবে। আমরা নিজের ইচ্ছায় হিন্দুস্থানে আসিনি। ইব্রাহীম লোডীর শোষণ শাসনে জর্জরিত হয়ে একাংশ লোক আমাদের আমন্ত্রণ করে এনেছে। আমাদের হয়ে অস্ত্রধারণ করা হিন্দু বেগ সাহেব এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হুমায়ূন শেষের কথাগুলো হিন্দু বেগের দিকে ইশারা করে বললেন।
হিন্দু বেগের দ্বারা অনুবাদ করে শুনানো কথাগুলো উপস্থিত জনতা গভীর মনযোগ সহকারে শুনে মাথা নেড়ে সহমত প্রকাশ করলেন।
ভাষণ সমাপ্ত করে হুমায়ূন দলবল নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
হুমায়ূন বেরিয়ে আসার পরে পূজারি আবার মূর্তির সন্মুখে হাতজোড় করে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য দেবতার নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। চোখ থেকে জল গড়িয়ে এসে তাঁর বুক স্পর্শ করলো
* * *
হিন্দু বেগ এবং খাজা খলিফার বুঝানোর পর মৃত সম্রাট ইব্রাহীম লোড়ীর মাতৃ বৈদা সুলতানা অবশেষে আগ্রার প্রাসাদ ছেড়ে আসতে সন্মত হলেন। বাবর দিল্লীর সিংহাসন দখল করার পরেও তিনি আগ্রার প্রাসাদ ছেড়ে আসতে সম্মত হচ্ছিলেন না। নাছোড়বান্দার মতো তিনি অনেকদিন আগ্রার প্রাসাদে বসে ছিলেন। মাতৃস্থানীয় বলে বাবর তাঁকে জুর-জুলুম করে প্রাসাদ থেকে সরিয়ে আনতে কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেজন্য বুঝিয়ে সুঝিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে আসার জন্য সন্মত করানোর উদ্দেশ্যে হিন্দু বেগ এবং খাজা খলিফাকে নিয়োগ করেছিলেন।
পানীপতের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুতে বৈদা সুলতানা শোকবস্ত্র পরিধান করে ছিলেন। শোকবস্ত্র পরিধান করেই তিনি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন।
বৈদা সুলতানাকে বাবরের সন্মুখে হাজির করা হলো। তিনি আগ্রা দূর্গের চাবির গুচ্ছ বাবরের দিকে এগিয়ে দিলেন। চাবির গুচ্ছ নেওয়ার সময়ে বাবর তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়া লক্ষ্য করলেন। বৈদা সুলতানার প্রশস্ত উঁচু ললাটে জোড়া ভ্রূ দেখে বাবর চমকে উঠলেন। বাবরের অনুমান হলো, এরকম উঁচু ললাট এবং জোড়া ভ্রূ যেন তিনি কোথাও দেখেছেন!
বাবর স্মরণ করতে চেষ্টা করতে লাগলেন, তেমন জোড়া ভ্রূ তিনি কোথায় দেখেছেন! হঠাৎ তাঁর পানীপত যুদ্ধের কথা মনে পড়ে গেলো।
বাবরের নির্দেশে হাজার হাজার মৃতদেহের মধ্য থেকে ইব্রাহীম লোডীর মৃতদেহ খুঁজে বের করা হয়েছিলো। পরম্পরা অনুসারে ইব্রাহীম লোডীর মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্শায় বিদ্ধ করে বাবরের সন্মুখে হাজির করা হয়েছিলো। সেই বর্শাবিদ্ধ উন্নত ছিন্নমস্তকের ললাটেও এ রকম জোড় ভ্রূ ছিলো। বৈদা সুলতানার জোড়া ভ্রূ দেখে বাবরের এরকম অনুমান হলো, যেন ইব্রাহীম লোডী মাতৃর রূপে পুনরায় বিজেতার সন্মুখে উপস্থিত হয়েছে।
গর্বিতা এবং উদ্ধত মহিলার দিকে তাকিয়ে বাবর শ্রদ্ধা মিশ্রিত ব্যাকুলতা অনুভব করতে লাগলেন। সেজন্য তিনি ধীর শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- সন্মানীয়া মাতৃ, আপনার কোনো কথা বলার ইচ্ছা আছে নাকি?
বৈদা সুলতানা বিরক্তিভরা কণ্ঠে বললেন- আমাকে যেন আরও কষ্ট দেওয়া না হয়।
বাবর নিজের সভাসদবর্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনারা এই মাতৃস্থানীয়া ভদ্র মহিলাকে নিজের মাতৃর মতো সন্মান প্রদর্শন করবেন।
সভাসদবর্গ বাবরের এই নির্দেশের প্রতি সন্মতিসূচক মাথা নাড়লেন।
বৈদা সুলতানা নিজেও কৃতজ্ঞতায় বাবরের প্রতি মাথা নুয়ালেন। তাঁর চোখের জলে সিক্ত চোখে ঘৃণার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো যদিও বাবর এবং সভাসদবর্গের চোখে পড়ার আগেই সেটা বিলীন হয়ে গেলো।
বাবর বৈদা সুলতানাকে রাজপ্রাসাদ থেকে একটু দূরে একটি প্রাসাদে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। বৈদা সুলতানা বাবরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন।
পানীপত যুদ্ধের নির্মম পরাজয় এবং ইব্রাহীম লোডীর মৃত্যু সংবাদ শুনে হঠাৎ আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ার মতোই বৈদা সুলতানার অনুভব হয়েছিলো। মৃত পুত্ৰকে দু’চোখে দেখে নিজ হাতে কবর দিয়ে তাঁর সমাধির উপরে শোকাশ্রু ফেলে মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাঁর প্রবল ইচ্ছে হয়েছিলো। তবে, তাঁর সেই ইচ্ছে সফল করা সম্ভব ছিল না। কারণ প্রচণ্ড বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে গেলেও আগ্রা থেকে পানীপত তিন দিনের পথ। সেজন্য তিনি ইব্রাহীম লোডীর সন্ধানে পানীপতে প্রেরণ করা বিশ্বস্ত ব্যক্তিবর্গ যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছিলো। তখন কিছু কিছু মৃতদেহ কবর দেওয়া হয়েছিলো এবং কিছু কিছু মৃতদেহ শিয়াল শকুনের আহার হয়েছিলো। বৈদা সুলতানা প্রেরণ করা ব্যক্তিগণ ইব্রাহীম লোডীর মৃতদেহ খুঁজে পায়নি। যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পরে ইব্রাহীম লোডীর দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করার পরে বর্শায় বিদ্ধ করে ছিন্নমস্তকটা বাবরকে দেখানো হয়েছিলো বলে তারা লোকমুখে শুনে এসে সংবাদটা বৈদা সুলতানাকে জানিয়েছিলো। পুত্রের মৃতদেহের দুর্গতির কথা শুনে বৈদা সুলতানার হৃদয় প্রচণ্ড শোকে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলো। হাজার হাজার ছুরির খোঁচায় যেন তাঁর হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলছিলো। তিনি মনে মনে আক্ষেপ করে বলছিলেন- হায় ইব্রাহীম! এই পৃথিবীতে তোর একটা সমাধি চিহ্নও রইল না। তোর প্রাণহীন দেহও ওরা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেন- হে আল্লাহ, বাবররেও যেন আমার পুত্রের মতো মৃত্যু হয়। যে আমার বাছাকে হত্যা করেছে তার যেন আমার পুত্রের চেয়েও হাজার গুণ ভয়ানক মৃত্যু হয়।
বৈদা সুলতানার পরিচারিকা, চাকরাণী এবং আত্মীয়স্বজনরা সহরে শুনে আসা কিছু উড়ো সংবাদ শুনিয়ে শোক সন্তপ্ত বৈদা সুলতানাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলো-
ঘাসের অভাবে বাবরের অশ্বারোহী সেনারা ক্ষেত-খোলার শস্যাদি ঘোড়াকে খাওয়ানোর জন্য কৃষকরা বিদ্রোহ করে কুড়োল এবং দা দিয়ে কেটে অনেক বিদেশী সেনা হত্যা করেছে। এমনও প্রচার হচ্ছিল যে, ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় অভ্যস্ত সেনা এবং ঘোড়া অসহ্য গরম সহ্য করতে না পেরে দলে দলে মরতেছে। এ রকম উড়ো সংবাদ প্রতিদিন প্রচার হচ্ছিলো এবং বৈদা সুলতানার হিতাকাংক্ষীরা সেই সব সংবাদ বলে বৈদা সুলতানাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো। বৈদা সুলতানাও সেই সব উড়ো সংবাদ বিশ্বাস করে আত্মসন্তুষ্টি লাভ করছিলেন।
এই সব উড়ো সংবাদের সত্যাসত্যতা নিরূপণের জন্য বৈদা সুলতানা সিদ্ধান্ত নিলেন। বাবরের দরবারে কর্মরত মৃত ইব্রাহীমের পুত্র বাহাদুর সুলতানকে ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। এমনিতে আসতে দিবে না বলে তিনি তাঁর অসুখ হয়েছে বলে পত্র লিখে পাঠালেন।
সপ্তদশ বর্ষীয় বাহাদুর সুলতান ফার্সি এবং সংস্কৃত ভাষা ভালোভাবে জ্ঞাত ছিলেন। সেজন্য বাবর তাঁকে অত্যাবশ্যকীয় দলিল অনুবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বাবরের অন্য অনুবাদকো ছিলো। তাই তাঁকে বেশি কাজের বোজা দেয়নি। ফলে তাঁর যথেষ্ট অবসর সময় ছিলো। তবে তাঁর সেই অবসর সময় ইচ্ছামতে উপভোগ করার স্বাধীনতা ছিলো না। কয়েকদিন পূর্বের শত্রুর সন্তান হওয়ার জন্য কেউ অপমান করতে পারে ভেবে তাঁর উপরে সবসময় নজর রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তাঁর ইচ্ছামতে প্রাসাদের বাহিরে যাওয়ারও অনুমতি ছিল না।
বৈদা সুলতানার পত্র সরাসরি বাহাদুরের হাতে না দিয়ে উজির-এ-আজম দুলহায় পড়ে দেখলেন। বৈদা সুলতানার অসুখের কথা জেনে দুলহায় বাহাদুরকে মাতামহীর সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। বাহাদুরের সাথে সবসময় দু’জন দেহরক্ষী সৈনিক থাকতো। সেই দেহরক্ষী সৈনিক দু’জনের সাথে বাহাদুরকে মাতামহীর সাথে সাক্ষাৎ করতে পাঠিয়ে দিলেন এবং সেদিনই প্রাসাদে ফিরে আসার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠালেন।
অসুখের ভান করে বিছানায় শোয়ে থাকা বৈদা সুলতানা বাহাদুরকে নিজের কক্ষে ডেকে পাঠালেন। বাহাদুর কক্ষে প্রবেশ করে শোকাভিভূতা মাতামহীকে নিশ্চল হয়ে বিছানায় শোয়ে থাকতে দেখলেন।
বাহাদুরকে দেখে বৈদা সুলতানা বালিশে হেলান দিয়ে উঠে বসলেন এবং বাহাদুরকেও বিছানায় বসার জন্য ইশারা করলেন।
বৈদা সুলতানা বাহাদুরের ঘর্মাসিক্ত মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন- বিদেশিরা আমাদের এখানকার গরম সহ্য করতে পারছে না বলে শুনছি, কথাটা সত্য নাকি? শুনতেছি, গরমে বোলে তাদের অনেক লোক মরতেছে?
হ্যাঁ, কিছু লোক অবশ্যে মরেছে। বাহাদুর ভীত সন্ত্রস্ত সুরে বললেন।
তাদের অনেকেই বোলে বলতেছে, তারা আর হিন্দুস্থানে থাকবে না, নিজেদের ঠাণ্ডা দেশে চলে যাবে?
তাদের বাদশাহে তাদের কখনও তেমন কাজ করতে দিবেন না। অধিক সংখ্যক বিদেশি-ই বাদশাহের কথা মেনে চলে। তিনি নিজের যুক্তি সিদ্ধ করতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর মন ভুলানো মিষ্টি কথারও তুলনা নেই। হিন্দুস্থান থেকে যেসব বিদেশী চলে যেতে চেয়েছিলো তাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে বাদশাহ উপদেশ দিয়েছেন। উপদেশ প্ৰদানের পর সবাই চোপ মেরে রয়েছে। বাহাদুর ভয়ে ভয়ে কথাগুলো বললেন।
তুমি তোমার পিতৃহন্তার প্রশংসা করছ?
বাহাদুর দরজার দিকে ভয়বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকালেন।
বৈদা সুলতানা এবার ফিসফিস করে বললেন- তোমার উপর নজর রাখে নাকি?
হ্যাঁ। বাহাদুর মাতামহীর মতোই ফিসফিস করে বললেন- আমি কারো সাথে একলা থাকতে বা কথা বলতে পারি না। পহরাদার সৈনিকরা সব সময় আমাকে ঘিরে থাকে এবং কথাগুলোও চোপে-চাপে শুনে থাকে। আমি কোনো আপত্তিজনক কাজ করলে তারা বাদশাহকে অবগত করবে।
চিন্তা করো না। এখানে তোমার আমার বাহিরে কেউ নেই। পূর্বে আমাদের সেবায় নিযুক্ত কোনো বিশ্বাসী লোক বর্তমান বিদেশীর প্রাসাদে রয়েছে নাকি?
হ্যাঁ রয়েছে। মালিক দাদ কারাণী এবং আমাদের লাইব্রেরীর দায়িত্বে নিয়োজিত আলেম সাহেব আছেন। বাদশাহ বাবর পূর্বে আমাদের দরবারে কর্মরত লোকদের নিজের পক্ষে নিতে অহরহ চেষ্টা করতেছেন। হিন্দু-মুসলমানের অন্তর জয় করার জন্যও অহরহ চেষ্টা করতেছেন। আমাদের খানসামা চারজনকে বাদশাহ নিজের খানসামা পদে নিযুক্ত করেছেন।
আচ্ছা আচ্ছা, ভালো, খুব ভালো। বৈদা সুলতানা উৎসাহিত হয়ে উঠলেন- তারা রন্ধন করা আহার্য বাদশাহ ভোজন করে নাকি?
ভোজন করেন বলে শুনেছি। তিনি বোলে হিন্দুস্থানী খানসামাদের খুব প্রশংসাও করেন।
ভালো কথা। বৈদা সুলতানা উৎসাহিত হয়ে পালেঙ থেকে নামলেন। তাঁর হৃদয়ে প্রতিশোধ স্পৃহা প্রবল হয়ে উঠলো এবং কীভাবে প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করবেন তাও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। কথাটা ভাবতেই যেন তাঁর দেহে নতুন উদ্যম ও শক্তি সঞ্চার হলো। যদি বাবরকে একেবারে শেষ করা যায়….তাহলে নিশ্চয় বাবরের অনুগত লোকগুলো এখান থেকে চলে যাবে! অন্তত একজন খানসামাকে হাত করতে পারলেই অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবেন বলে তিনি মনে মনে ভাবলেন।
বৈদা সুলতানা বাহাদুরের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন-তুমি খানসামাদের নিজেই দেখেছ নাকি?
হ্যাঁ দেখেছি। বাহাদুর স্বীকৃতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন।
তাদের মাঝে আহাম্মদ রয়েছে নাকি?
বাহাদুর মাতামহীর কথার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে বললেন- নেই। সে আগ্রা চলে গেছে। কিন্তু আহাম্মদকে দিয়ে কী করবেন?
এভাবে বলেই বাহাদুর ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালেন।
বৈদা সুলতানা মুচকি হাসি হেসে মনে মনে ভাবলেন- আমার নাতিটি নির্বোধ! তদুপরি এর উপরে সবাই নজর রাখে। হঠাৎ যদি এঁ এই গোপন পরিকল্পনা প্রকাশ করে ফেলে, তাহলে এঁ তো মরবেই সাথে আমার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যাবে। কোন পরিস্থিতিতেই এঁকে এই বিপদসংকুল পরিকল্পনার কথা অবগত করানোটা উচিত হবে না।
বৈদা সুলতানা পুনরায় অসুখের ভান করে উঁ-আঁ ধ্বনি করে বলতে লাগলেন- এই পৃথিবীটা কী বিচিত্র! যেসকল লোক একদিন আমাদের আজ্ঞাধীন ছিলো, বর্তমান তারাই শত্রুর সেবায় নিয়োজিত। মালিক দাদ কারাণী, খানসামা এবং অন্যান্য লোক আমাদের দুর্ভাগ্য দেখে শত্রুর নিকট চলে গেছে। আমার অন্তর শোকে বিহ্বল….দেহ শোকে বিকল…….কিন্তু তুমি….যাও, তুমি শত্রুর সেবা করগে’…..তবে, পিতৃর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর কথা কখনো ভুলে যেও না।
বাহাদুর মাতামহীর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে কক্ষের বাহিরে বেরিয়ে এলেন।
বাহাদুর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর বৈদা সুলতানার চোখে-মুখে জেগে উঠলো পৈচাশিক উল্লাস….. বুকে জ্বলে উঠলো প্রতিহিংসার অগ্নি। উন্মত্ত অধীর হয়ে উঠলো তাঁর ভাবনার গতি। একজন বিশ্বাসী এবং সাহসী খানসামা তাঁর প্রয়োজন। কিন্তু কে হতে পারে সেই খানসামা? যে অর্থের বিনিময়ে আহার্যে বিষ মেশাতে সন্মত হবে? মালিক দাদ কারাণী? আহাম্মদ? তারা সন্মত হবে তো তাঁর প্রস্তাবে?
অবশ্যে বিজেতাদের পসন্দ করার মতো লোকের পাশাপাশি ঘৃণা করা লোকের সংখ্যাও অনেক ছিলো বাবরের বশ্যতা স্বীকার করা লোকেদের মধ্যে।
বাবর সেনা কিছুসংখ্যকের ভ্রাতৃ, কিছুসংখ্যকের পিতৃ, আবার কিছুসংখ্যকের পুত্রকে হত্যা করেছিলো। অনেকের ভালো আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সুযোগ পেলে তারা অবশ্যেই বাবরের বিরুদ্ধে শত্রুতা করতে কুণ্ঠিত হবে না.…..বরঞ্চ খুশিই হবে।
সেদিন থেকে বৈদা সুলতানা গোপনে বাবরের শত্রুর সন্ধান করতে লাগলেন।
বৈদা সুলতানা খবর নিয়ে জানতে পারলেন, যে বাহালুল নামের একজন খানসামা রয়েছে বাবরের রন্ধনশালায়। পানীপতের যুদ্ধে তার চাচার পুত্রকে হত্যা করা হয়েছিলো। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। বৈদা সুলতানা তাঁর যোজনার জন্য বাহালুলকেই উপযুক্ত ব্যক্তি বলে চিনাক্ত করলেন; তবে সরাসরিভাবে বাহালুলের সাথে আলোচনা করাটা নিরাপদ হবে না ভেবে তিনি একজন বিশ্বাসী লোক পাঠিয়ে আগ্রা থেকে আহাম্মদকে ডেকে আনালেন।
আগ্রাস্থিত ঘর-বাড়ি, সা-সম্পত্তি থেকে বাবর আহাম্মদকে বঞ্চিত করেছিলেন। যারজন্য বাবরের প্রতি আহাম্মদের যথেষ্ট বিদ্বেষ ভাব ছিলো। বৈদা সুলতানা বাবরের অনুমতি নিয়ে আহাম্মদকে নিজের সেবার জন্য নিযুক্ত করলেন। একদিন সুযোগ বুঝে বৈদা সুলতানা আহাম্মদের নিকট নিজের পরিকল্পনার বিষয়ে বললেন। কথাটা শুনে আহাম্মদ আতঙ্কে শিহরে উঠলো। কিন্তু বৈদা সুলতানা তাকে অভয় দিয়ে বললেন যে, তার ভয়ের কোন কারণ নেই। কারণ সে নিজে কিছুই করতে হবে না। সে শুধু খানসামা একজনের সাথে কথাটা আলোচনা করলেই হবে।
বৈদা সুলতানার তরফ থেকে অভয় পেয়ে আহাম্মদ কাজটা করতে সম্মত হলো।
বৈদা সুলতানা একদিন বাহাদুর সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করার ছলনায় আহম্মদের মাথায় একটি ভারি টোপলা দিয়ে বাবরের প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। বৈদা সুলতানা বাহাদুরের সাথে বাক্যালাপ করার সময়ে আহাম্মদ পুরানা সঙ্গীদের সাথে সুখ-দুঃখের আলাপ করতে এলো।
আহম্মদ সুযোগ বুঝে বাহালুলের নিকট বৈদা সুলতানার পরিকল্পনার বিষয়ে বললো।
কথাটা শুনে বাহালুল প্রথমে আহাম্মদের মতোই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলো যদিও শেষে অর্থের টোপ পেয়ে কাজটা করতে সম্মত হলো।
* * *
অবশেষে সকল প্রস্তুতি যোজনা অনুসারে প্রস্তুত হয়ে উঠলো এবং কাজটা অতি শীঘ্র সামাধা করার প্রয়োজন হয়ে পড়লো। কারণ বর্ষা ঋতুর শেষে রাণা সংগ্রাম সিঙের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য বাবর প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। যারজন্য তিনি যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বেই বৈদা সুলতানা কাজটা সমাধা করার কথা ভাবলেন। যুদ্ধে গেলে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তার ঠিক নেই। এদিকে দেরি হলে কথাটা প্রকাশ হয়ে পড়ারো ভয় ছিলো। যারজন্য বাবর যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বেই বৈদা সুলতানা কাজটা সমাধা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
পরিকল্পনা অনুসারে বৈদা সুলতানা একজন বিশ্বাসী পরিচারিকার হাতে বাহালুলের নিকট বিষ পাঠিয়ে দিলেন। অতি সামান্য বিষ। এক চিমটির চেয়েও কম। তবে, অতি মারাত্মক। পেটে পড়লে বেঁচে থাকার আশা নেই। বাহালুল বিষটুকু এক টুকরো সাদা কাগজে মুড়িয়ে অতি সাবধানে কুর্তার পকেটে ভরে রাখলো।
আহার্যে বিষ মেশানোটা সহজ কাজ ছিল না। বাবরের একজন বিশ্বস্ত খানসামা বাবরের জন্য নির্ধারিত আহার্যের উপর সব সময় নজর রাখতো। যারজন্যে সেই খানসামার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আহার্যে বিষ মেশানোটা কষ্টসাধ্য কাজ ছিলো। তদুপরি ধরা পড়লে তো কথাই নেই, একেবারে অবধারিত মৃত্যু।
তবু বাহালুল প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে জীবন পণ সিদ্ধান্ত নিলো। তদুপরি আহাম্মদের থেকে আশ্বাস পেয়ে সে দুর্বিনীত এবং সাহসীও হয়ে উঠেছিলো। আহাম্মদ আশ্বাস দিয়েছিলো যে, বাবরের মৃত্যু হলে বিদেশী সেনা নিজ দেশে চলে যেতে বাধ্য হবে। তখন পরবর্তী শাসক হবে বাহাদুর সুলতান। তখন তার এই উপকারের কথা স্মরণ করে বাহাদুর সুলতান তাকে নিশ্চয় কোনো উচ্চপদে নিয়োগ করবেন। দুঃসাহসের অন্তরালে বাহালুলের মনে এই আশাও প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিলো।
সেদিন বৃষ্টির আবহাওয়া ছিলো। সন্ধ্যা থেকে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিলো। যারজন্য অন্যদিনের চেয়ে ঠাণ্ডাও পড়েছিলো যথেষ্ট বেশি। শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে লোকগুলো কাজ-কর্ম ফেলে গৃহের ভেতর আশ্রয় নিয়ে সময় পার করার জন্য ব্যস্ত ছিলো। কেউ কেউ আবার অলসভাবে বিছানায় গা এলিয়ে বৃষ্টির আমেজ উপভোগ করছিলো। অনেকেই আবার হাসি তামাশা, গল্প-গুজব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে সময়গুলো সরস করে তোলার চেষ্টা করছিলো।
বাবরের রাজকীয় রন্ধনশালায় রাতের জন্য আহার্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। সেদিন রান্ধা-বাড়ার দায়িত্বে ছিলো বাহালুল। বৃষ্টির আমেজে পুলকিত হয়ে একমাত্র বাহালুলের বাহিরে সব খানসামা মাত্রাধিক্য মদ্য পান করে মাতাল হয়ে উঠেছিলো।
বাহালুলের সেদিন মদ্যপান করার মন বা মানসিকতা কোনোটাই ছিল না। সে দুরু দুরু বুক নিয়ে শুধু সুযোগের অপেক্ষা করছিলো। তার সহযোগী খানসামা কয়জন মদ্যপান করে মাতাল হয়ে রন্ধনশালা সংলগ্ন একটি কক্ষে হাসি-তামাশা, গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো।
রন্ধনশালায় সেদিন একটি ডেগে বাবরের প্রিয় ব্যঞ্জন খরগোশের মাংস রন্ধন হচ্ছিলো। মাংসের সুবাসে রন্ধনশালার বাতাস মলমল করতেছিলো। বাহালুলের কিন্তু হাসি-তামাশা, গান-বাজনা বা মাংসের সুবাস উপভোগ করার মন বা মানসিকতা কোনোটাই তখন ছিল না। কুর্তার পকেটে সযত্নে রক্ষিত বিষটুকু কখন সে ডেগের মাংসে মেশাতে পারবে সেই চিন্তাই তার মনে তোলপাড় করতে ছিলো। তার দেহের সিরা-উপসিরা উৎকণ্ঠা, শংকা, আতঙ্কে টনটন করতেছিলো।
অপেক্ষা করে করে এক সময় বাহালুল অধৈর্য হয়ে উঠলো। কুর্তার পকেটে রক্ষিত বিষের পুরিয়া সে হাত দিয়ে টিপে দেখে দরজার নিকটে এসে বাহিরের দিকে উঁকি মেরে দেখলো।
না, বাইরে কেউ নেই। আস্তে আস্তে সে গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা খানসামা দের কক্ষের দরজার নিকট এলো। সে দরজায় কান লাগিয়ে অনুমান করলো, সবাই আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত হয়ে রয়েছে। কম্পিত পা-য় বাহালুল মাংসের ডেগের নিকটে এসে কুর্তার পকেট থেকে বিষের পুরিয়া বের করলো। পুরিয়াটা ডেগের মাঝে ফেলে দিতে গিয়ে সে থমকে দাঁড়ালো। না না, ডেগের মাংসে বিষ মেশানো সম্ভব নয়। কারণ অল্প পরেই খানসামারা এসে মাংস খেতে শুরু করবে। এটা তাদের চিরদিনের অভ্যাস। মাংস রান্ধা হওয়ার পরে ডেগ থেকে মাংস বের করে খাওয়াটা তাদের চিরদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাহলে উপায়? বিষ কোথায় মেশাবে?
বাহালুলের হঠাৎ রুটির দিকে চোখ গেলো। সে রুটির পাত্রের নিকটে এসে কম্পিত হাতে একটি রুটির উপরে বিষটুকু ছিটিয়ে দিলো। তারপর সে বিষ মেশানো রুটিটা পাত্র থেকে বের করে এনে চিনির পাত্রের মাঝে রেখে দিলো।
হঠাৎ ঝাঁপটা বাতাস এসে দরজার পাল্লা দু’টি বন্ধ করে দিলো। খট করে শব্দ হলো। বাহালুল ভয়ে পাল্লা দু’টি বন্ধ করে পুরিয়ায় থাকা অবশিষ্ট বিষ চৌকার আগুনের মাঝে ফেলে দিলো।
বাহালুল দরজা খোলে আবার বাইরের দিকে ফুকচি মেরে দেখলো। না, বাইরে কেউ নেই। সে আবার চিনির পাত্রের নিকটে এসে রুটিটার উপরে মাখন লেপে দিয়ে সামান্য ঘি ঢেলে দিলো।
কিছুক্ষণ পরে পরিচারক এলো। বাহালুল অন্যান্য খাদ্যবস্তুর সাথে চিনির পাত্রে রক্ষিত রুটিটা বাবরের আহারের জন্য সাজিয়ে দিলো। পরিচারক বাবরের আহারের জন্য খাদ্যবস্তু নিয়ে গেলো। বাহালুল দুরু দুরু বুক নিয়ে পরবর্তী ঘটনার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলো।
হঠাৎ রক্ষী সেনাদের মাঝে হুলস্থুল লেগে গেলো। কেউ একজন ‘হেকিম হেকিম’ বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে গেলো।
এতক্ষণ গান-বাজনা, হাসি-তামাশা নিয়ে ব্যস্ত থাকা খানসামা কয়জন ঘটনার গতিপ্রকৃতি টের না পেয়ে একজন আরেকজনকে ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। হুলস্থূল এবং দৌড়াদৌড়ির মাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে লাগলো। সমগ্র প্রাসাদে যেন ভূমিকম্পের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেলো।
মুহূর্তের ভেতরে বাবরের ভোজনালয়ের সন্মুখে ভির জমে গেলো। তাহির বেগ উৎকণ্ঠিতভাবে ভোজনালয়ে দৌড়ে এলো।
বাবর বমি করতেছিলো। ঝরাপাতার মতো তাঁর সমগ্র মুখমণ্ডল মলিন হয়ে গিয়েছিলেন। জবাই করা মোরগের মতো তিনি প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতেছিলেন। তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি পাগলের মতো দরজার দিকে দৌড়ে এলেন। কিন্তু কয়েক পা আসার পরেই তাঁর পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো। তাহির বেগ তৎক্ষণাৎ তাঁকে ঝাঁপটে ধরলো।
তখনই ব্যস্তভাবে হেকিম ইউসূফ সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি এসেই পরিচারক কয়েকজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- যাও, শীঘ্র বিছানা পেতে দাও।
মানুষের হুলস্থূল এবং কক্ষের চার দেয়ালের মাঝে বাবর অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। যারজন্য তিনি হেকিমের কথায় আপত্তি করে বললেন- না না, উঠোনেই বিছানা পেতে দাও।
ঘর্ঘর শব্দ করে হাঁস-ফাঁস করে কথা কয়টা বলেই তিনি আবার বমি করতে লাগলেন।
বমি করার পরে একটু সুস্থ হয়ে উঠার পর হেকিম বললেন- জাহাপনা, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দায়ই ভালো হবে।
হেকিমের পরামর্শ অনুসারে বারান্দায় বিছানা পাতা হলো। তাহির বেগ এবং অন্যান্য পরিচারকরা বাবরের দুই বগলের তল দিয়ে হাত ঢুকিয়ে শূন্যে তুলে বারান্দায় পাতা বিছানায় এনে শোইয়ে দিলো।
হেকিম বাবরের নাড়ি টিপে নাড়ির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে ওষুধ বের করলেন। অধিক মদ্যপান করে দুর্বল হলে শোঁকতে দেওয়া ওষুধ বাবরকে শোঁকতে দিলেন।
বাবর আপত্তি করে বললেন- ‘না না, আমি সিরাজি পান করিনি। আহারের সাথে কোন অখাদ্য খেয়েছি। এভাবে বলে তিনি কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে আদেশ দিলেন- খানসামাদের গ্রেপ্তার করা হোক।’ বলেই বাবর পুনরায় বমি করার জন্য চিলিমচির দিকে এগিয়ে এলেন।
আদেশ ঘোষণার সাথে সাথে একদল সৈনিক রন্ধনশালার দিকে দৌড়ে এলো। সেনা এসে পৌঁছোনোর আগেই অন্যান্য খানসামা এবং পরিচারকরা বাহালুলকে আটক করে রেখেছিলো। সেনা এসে পৌঁছোনোর সাথে সাথে তারা বাহালুলকে সেনাদের হাতে সমঝে দিলো।
জল্লাদ অল্প সময়েই বাহালুলের মুখ থেকে প্রকৃত সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হলো। তার স্বীকারোক্তি অনুসারে আহাম্মদ, বৈদা সুলতানা এবং বাহালুলকে বিষ যোগান ধরা পরিচারিকাকে গ্রেপ্তার করার জন্য একদল সেনা বৈদা সুলতানার প্রাসাদে দৌড়ে গেলো।
হেকিমের চিকিৎসার ফলে বাবরের অবস্থার কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। সেদিন সারারাত সংকটজনক অবস্থায় পার হলো। বমির সাথে সাথে বাবরের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর এলো। বাবরের অবস্থা দেখে সবাই শংকিত হয়ে উঠলো। সবাই বাবরের জীবন নাশের আশংকা করতে লাগলো। একমাত্র হেকিম প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে একটার পরে একটা ওষুধ খাইয়ে যেতে লাগলেন। তিনি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে আশ্বাস দিয়ে বলতে লাগলেন- ধৈর্য ধরুন। সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তার কোনো কারণ নেই।
এদিকে বাবরের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে লাগলো। তাঁর অনুমান হলো, কেউ যেন ধারালো ছোরা দিয়ে তাঁর হৃদপিণ্ড টুকরা টুকরা করে কাটতেছে। কলিজা, শ্বাসযন্ত্র, নাড়ি-ভুঁড়ি যেন বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য বিদ্রোহ করতেছে। তাঁর চোখের সন্মুখে রঙ বিরঙের দৃশ্য ভেসে বেড়াতে লাগলো। কখনো বৈদা সুলতানা, কখনো হুমায়ূন এবং কখনো মাহিম বেগমের মুখ তার চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়াতে লাগলো।
বাবরের পাকস্থলীতে যেন আগুন জ্বলতেছে। সেই আগুনের দহন জ্বালা তাঁর সর্বশরীরে ছড়িয়ে পড়লো। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি আর্তনাদ করতে ছিলেন এবং সময়ে সময়ে প্রলাপ বকতে ছিলেন- হুমায়ূনকে আমি কাবুল পাঠালাম কেন? কাবুল থেকে সে বদবখশা যাবে। সোমালী সীমান্তে বিশৃংখল পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির বতর শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সোমালী সীমান্তে যুদ্ধ শুরু হবে। রক্তের নদী বয়ে যাবে…..
বাবরের চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো, কহিনূর হীরাখচিত কালো রাজমুকুট পরে থাকা আমির তৈমূরের প্রতিচ্ছবি। তাঁর চোখে যেন আগুন জ্বলতেছে— চোখে-মুখে উদ্ভাসিত হচ্ছে পৈচাশিক উল্লাস। বাবর ভয়ে চোখ মুদে ফেললেন। হুমায়ূনের অমঙ্গল আশঙ্কায় তাঁর সর্বশরীর থরথর করে কাঁপতে লাগলো। মাত্রাধিক অস্থিরতার জন্য এক সময় তিনি চেতনা হারিয়ে ফেললেন।
হেকিম চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে চেতনা ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালালেন। কিছুক্ষণ পরে বাবরের চেতনা ফিরে এলো। তিনি আবার আচ্ছন্নের মতো বলতে লাগলেন-……যদি আমি এই সংকট থেকে মুক্ত হতে না পারি…… আমার মৃত্যুর সময়ে হুমায়ূন, মাহিম বেগম কেউ পাশে উপস্থিত থাকবে না……আমার এই সংকটের সংবাদ লিখে আজ এই মুহূর্তে পত্রবাহক প্রেরণ করলেও সে কাবুল পৌঁছে আবার ফিরে আসতে কমেও তিন মাস সময় লাগবে। অথচ আমি এক সপ্তাহের ভেতরেই…….না না……আজকে……….না না, এই মুহূর্তেই মরতে পারি।
উত্তেজিত হয়ে উঠার জন্য বাবরের মুখ থেকে শেষের কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে বের হলো। তাহির বেগ পাশেই বসে ছিলো। বাবরকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য সে মিনতি ভরা কণ্ঠে বললো- মন শক্ত করুন, জাহাপনা। সাহস হারাবেন না। আপনি এবং আমি কতবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি। আজও আপনি মন শক্ত করে মৃত্যুকে জয় করতে হবে।
কিন্তু এরকম আমার কখনো হয়নি, তাহির বেগ। তখন শত্রু আমাদের সন্মুখ দিক থেকে আক্রমণ করেছিলো, কিন্তু আজ আক্রমণ করেছে পেছন দিক থেকে। পেছন দিক থেকে আক্রমণ করা শত্রুর মোকাবিলা করাটা খুবই কঠিন কাজ, তাহির বেগ। বাবর কথাগুলো বলার সময়ে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। তিনি অতিকষ্টে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে থেমে থেমে বলতে লাগলেন- তাহির বেগ, তুমি আমার কাছে এস। তুমি আমার কাছে থাকলে আমি মনে সাহস পাব। তুমিই তো আমার বিপদের বন্ধু।
তাহির বেগ কাছ চেপে বসার সাথে সাথে বাবর চিলিমচির দিকে মুখ বাড়ালো। তাহির বেগ বাবরকে সযত্নে ধরে বমি করতে সহায় করলো।
বমি করার জন্য কষ্ট হওয়াতে বাবর ঘেমে উঠলেন। তাহির বেগ কাপড় দিয়ে সযত্নে মাতৃর মমতায় বাবরের দেহের ঘাম মুছে দিলো।
অসহ্য যন্ত্রণা থেকে আরাম পাওয়ার জন্য বাবর সময়ে সময়ে কিছু সময় নিশ্বাস বন্ধ করে থাকতে লাগলেন এবং তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
বাবরের চোখে জল দেখে তাহির বেগের হৃদয় বেদনায় ভরে পড়লো। সে মনে মনে ভাবতে লাগলো, যদি বাবরের যন্ত্রণার কিছু অংশ সে নিজে ভোগ করে তাঁকে একটু আরাম দিতে পারতো! কখনও কখনও তার এরকম উপলব্ধি হতে লাগলো— সে নিজেই যেন বিষ পান করেছে। বাবরের প্রতি সহানুভূতিতে তাহির বেগের হৃদয় বিগলিত হয়ে উঠলো। তার মানসপটে ভেসে উঠলো অতীতের স্মৃতি বিজড়িত অনেক স্মৃতি-
তাহিরজান…….তাহির বেগ।
তাহিরজান ছিলো কুবার একজন কৃষকের সন্তান। সে ভালোবাসতো তার গ্রামেরই মেয়ে রাবিয়াকে। উভয়ে স্বপ্ন দেখছিলো, দাম্পত্য প্রেমে ভরা একটি সুখী সংসারের। কিন্তু হঠাৎ ঝড়ো বাতাস এলো–তছনছ করে দিলো তাদের স্বপ্ন। তৃণ-কুটার মতো দু’জন দুই দিকে উড়ে গেলো সেই ঝড়ো বাতাসের তাণ্ডবে।
সেটা ছিলো বাদশাহ ওমর শেখের সময়ের কথা। সমরকন্দের শাসক সুলতান আহম্মদ আখসি আক্রমণের জন্য কুবাশ্বায় নদীর সেপারে ছাউনি পেতে অবস্থান করতেছিলেন। কুবাশ্বায় নদী পার হয়ে তিনি যেকোনো মুহূর্তে আখসির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। চালাবে হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতন, অত্যাচারের তাণ্ডব… ভোগের জন্য বলপূর্বক ধরে নিয়ে যাবে সুন্দরী নারী।
কথাটা ভাবতেই তাহিরজান উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলো। তার চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এক বীভৎস মর্মান্তিক দৃশ্য। পাষণ্ডরা যদি রাবিয়াকেও ধরে নিয়ে যায়! তাহলে সে কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? পাষণ্ডরা রাবিয়াকে……
পাষণ্ডরা রাবিয়ার উপরে কীভাবে পাশবিক নির্যাতন চালাতে পারে তার এক কল্পিত চিত্র তাহিরজানের চোখের সন্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। সাথে সাথে সে পাগলের মতো হয়ে উঠলো। না না, সে কোনোমতেই রাবিয়াকে শত্রুর হস্তগত হতে দিবে না। যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে সে রাবিয়াকে রক্ষা করতে হবে। শত্রুদের সে নদী পার হতে দিবে না। শত্রুর হাত থেকে সে আখসি রক্ষা করবে— রক্ষা করবে তার হৃদয়ের স্পন্দন রাবিয়াকে…..
কিন্তু কীভাবে?
তাহিরজানের মনে একটি বুদ্ধি উদয় হলো। কুবাশ্বায় নদীর উপরে মাত্র একটি পুল। সেই পুল দিয়ে নদী পার হয়েই শত্রু এপারে আসতে হবে। পুলটা জ্বালিয়ে দিতে পারলেই আখসি নিরাপদ। আখসি নিরাপদ হলে রাবিয়াও নিরাপদ। তার হৃদয়ের স্পন্দন রাবিয়াকে তখন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তাই সে রাতের অন্ধকারে পুলটা জ্বালিয়ে দিবে।
ভাবামতেই কাজ। কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সে পুলটা জ্বালিয়ে দিতে বের হলো। কেরোসিনের টিন এবং হাতে হাতে কুড়াল নিয়ে তারা পুলের নিকট এলো।
সেদিন অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল। সাথে বইছিলো ঝড়ো বাতাস। প্রথমে তারা পুলে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বৃষ্টি বাতাসের জন্য তারা পুলে আগুন ধরাতে সক্ষম হল না। অবশেষে তারা হতাশ হয়ে আগুন ধরানোর আশা ত্যাগ করলো।
আগুন ধরাতে না পারলেও তাহিরজান হতাশ হল না। সে বজ্রমুষ্টিতে কুড়াল ধরে পুলের একটি খামে উন্মাদের মতো কুড়াল চালাতে লাগলো। প্রচণ্ড শীতের মাঝেও সে ঘেমে নেয়ে উঠলো। তার সঙ্গীরাও এই ক্ষেত্রে তাকে পার্যমানে সহায় করতে লাগলো।নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার পরেও তারা মাত্র একটি খামের বাহিরে পুলের বিশেষ ক্ষতি সাধন করতে পারল না। এদিকে পূর্বদিকে ফর্সা হয়ে গেলো। শত্রুর হাতে ধরা পড়ার ভয়ে শ্রান্ত-ক্লান্ত তাহিরজান সূর্য উদয়ের আগে আগে সঙ্গীদের নিয়ে গৃহে ফিরে এলো।
এদিকে তাহিরজানরা পুলের পাশ থেকে চলে আসার সাথে সাথে শত্রুসেনা আখসি অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলো। পূবে ফর্সা হওয়ার আগেই সেনা বাহিনীর অগ্রভাগ এসে পুলের পাড়ে উপস্থিত হলো। বাড়ন্ত জলের প্রচণ্ড স্রোতে পুলের খামগুলোতে জোরে জোরেধাক্কা মারতে ছিলো। সেনা বাহিনীর অগ্রভাগে সেনা সংখ্যা অল্প ছিলো। যারজন্য তারা অনায়াসে পুল পার হয়ে এপাড়ে আসতে সক্ষম হলো।
সেনা বাহিনীর পশ্চাদভাগ পুলে উঠার সাথে সাথে ঘটলো ঘটনাটা-
সেনা বাহিনীর পশ্চাদভাগে সেনা সংখ্যা অধিক ছিলো। তদুপরি মালবাহী গাড়ীগুলোও ছিলো পশ্চাদভাগে।
মানুষ এবং মালবাহী গাড়ী একসাথে পুলের উপর উঠার ফলে পুলের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়লো। যারজন্য তাহিরজানরা ক্ষতি সাধন করা খামটা মড়মড় করে ভেঙ্গে গেলো। খাম ভাঙার সাথে সাথে পুলটা ধীরে ধীরে নিচের দিকে ধ্বসে যেতে লাগলো। সেনা এবং মালবাহী গাড়ীর বোজা বহন করতে অক্ষম হয়ে এক সময় পুলটা মড়মড় করে ভেঙ্গে নদীর জলে পড়ে গেলো। ফলে সেনাদের মাঝে হাহাকার লেগে গেলো। অনেক সেনা জলে ভেসে গেলো এবং মালবাহী গাড়ীগুলো নদীর জলে তলিয়ে গেলো।
তবুও আহম্মদ সুলতান হতাশ হলেন না। তিনি পুল মেরামত করার জন্য নির্দেশ দিলেন।
কুবা থেকে জুর-জুলুম করে মিস্ত্রী ধরে এনে পুল মেরামত করার জন্য লাগিয়ে দিলেন। দুই দিনেই পুল মেরামতের কাজ সম্পূর্ণ হলো। সেনা বাহিনী পুল পার হয়ে এপাড়ে এলো।
সেনা বাহিনী এপাড়ে এসেই লুটপাটের তাণ্ডব চালালো। পাঁচজন সেনা বারিয়াদের গৃহেও প্রবেশ করলো। রাবিয়া তখন গাই দোহন করছিলো। কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য প্রথমে সে সেনা আসাটা লক্ষ্যই করেনি। সেনা গৃহে প্রবেশ করতে দেখে রাবিয়ার মাতৃ ব্যস্তভাবে দৌড়ে এসে রাবিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো- তুমি এখনও এখানে রয়েছ? গৃহে সেনা প্রবেশ করেছে। যাও, তাড়াতাড়ি পালাও।
রাবিয়া প্রথমে মাতৃর কথার অর্থ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো- কী হয়েছে, মা?
শত্রু। দাঁড়া, বাইরে যাবি না। খিড়কি দিয়ে গৃহের ভেতর প্রবেশ করে গরুর জন্য জমিয়ে রাখা ভুসির পুঁজির মাঝে লুকিয়ে থাকগে’।
রাবিয়া সচকিত হয়ে গাভীর তল থেকে উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে বাগানের ফটক পার হয়ে ভেতরে ঢোকে আসা সৈনিক একজনের চোখ তার উপরে পড়ল।
সৈনিকটি সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গী সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বললো- সুন্দরীর মতোই যেন লাগছে!
সঙ্গী সৈনিকরা ঘোড়া খুঁজার ধান্দায় ছিলো। তারা সৈনিকটির কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে বললো- সুন্দরী মেয়ের চেয়ে আমাদের এখন ঘোড়ার বেশি প্রয়োজন।
সুন্দরী মেয়ে ঘোড়ার চেয়েও বেশি প্রয়োজন। প্রথম সৈনিকটি এভাবে স্বাগতোক্তি করে রাবিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো- এই মেয়ে, দাঁড়া। এভাবে বলেই সৈনিকটি পাশের সৈনিকটিকে উদ্দেশ্য করে বললো- সমরকন্দ নিয়ে গিয়ে ফাজিল বেগের নিকট বিক্রী করলে মূল্য ভালোই পাওয়া যাবে।
সৈনিক দু’জন দ্রুত রাবিয়ার দিকে অগ্রসর হলো। রাবিয়া ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেতে দৌড়ে ভুসি জমিয়ে রাখা গৃহের ভেতর ঢোকে গেলো। সৈনিক দু’জন ক্ষিপ্র গতিতে দৌড়ে এসে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে উদ্যত হলো।
রাবিয়ার মাতৃ দৌড়ে এসে দরজার সন্মুখে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িযে সৈনিক দু’জনকে গৃহের ভেতর প্রবেশ করায় বাধা প্রদান করে বললো- আপনারা যদি মুসলমান হয়ে থাকেন, আমার মেয়ের শরীরে হাত দিবেন না। প্রয়োজন হলে আমাকে মারুন, আমার মেয়ের সর্বনাশ করবেন না। তার একজন যুবকের সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।
প্রথম সৈনিকটি ফোঁস করে উঠলো- মেয়ে! বিয়ে ঠিক হয়ে আছে! সেজন্যেই তো বেশি টাকা পাব। সরে যা, আমার সন্মুখ থেকে। এভাবে বলেই সৈনিকটি রাবিয়ার মাতৃকে ঠেলে ফেলে দিলো। পরে যাওয়ার সময় রাবিয়ার মাতৃর মাথা একটি খুঁটায় লাগলো এবং তিনি সাথে সাথে অচেতন হয়ে পড়লেন।
প্রথম সৈনিকটি গৃহের ভেতর প্রবেশ করলো। ইতিমধ্যে রাবিয়া ভুসির পুঁজির মাঝে ঢোকে পড়েছিলো। সৈনিকটিকে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা দেখে সে ভুসির মাঝ থেকে বেরিয়ে খিড়কির দিকে দৌড়ে গেলো। দ্বিতীয় সৈনিকটি টেনিচ বলের মতো লাফিয়ে এসে রাবিয়ার একটি হাতে ধরে ফেললো।
ইতিমধ্যে তৃতীয় সৈনিকটি একটি বস্তা নিয়ে সেখানে এসে পৌঁছেছিলো। সে বস্তাটা নিয়ে রাবিয়ার দিকে অগ্রসর হলো।
রাবিয়া সজাগ হয়ে উঠলো। তাকে বস্তার ভেতর ভরাবে ভেবে সে সহাযের জন্য চিৎকার করে ডাকলো- কে কোথায় আছ? আমাকে বাঁচাও।
তাহিরজান রাবিয়াদের গৃহের পাশেই একটি গৃহে লুকিয়ে ছিলো। সে খিড়কির ফাঁক দিয়ে রাবিয়াদের গৃহের দিকে তাকিয়ে অসীম ধৈর্য ধরে সৈনিকদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলো। রাবিয়ার চিৎকার শুনে সে ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। সে পাগলের মতো হয়ে উঠলো। তার মন থেকে ভয়-শংকা শীতের কুয়াসার মতো উড়ে গেলো। লুকিয়ে থাকা গৃহ থেকে সে লাফ মেরে বেরিয়ে রাবিয়াদের গৃহের দিকে দৌড়ে এলো। রাবিয়াদের গৃহে এসে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে তার সিরা-উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠলো।
ইতিমধ্যে রাবিয়াকে গৃহের বাইরে বের করে আনা হয়েছিলো এবং রাবিয়া উঠোনে পড়ে ছটফট করছিলো। একজন সেনা তার পা দু’টি ধরে রেখেছিলো এবং আরেকজন সেনা তার হাত দু’টি পেছন দিকে এনে আঁঠু দিয়ে কোমরে চাপ দিয়ে ধরে রেখেছিলো। তৃতীয়জন সেনা তাকে বস্তার ভেতরে ভরানোর জন্য যো-জা করছিলো। চতুর্থজন সেনা ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো এবং পঞ্চমজন সেনা ঘোড়ার পিঠে বসে দৃশ্যটা উপভোগ করছিলো। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা সেনাটির হাতে বর্শা ছিলো।
দৃশ্য দেখে তাহিরজান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। প্রেমাস্পদের দুর্দশা দেখে সে দুর্নিবীত হয়ে উঠলো। পাঁচজন সেনার সাথে সে একলাই মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলো। তার মন থেকে ভয়-শংকা দূর হয়ে গেলো। তার মনে শুধু একটি চিন্তাই তোলপাড় করতে লাগলো যে, সে যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে রাবিয়াকে পাষণ্ডদের কবল থেকে রক্ষা করতেই হবে।
তাহিরজান তরবারি কোষমুক্ত করে রাবিয়ার দিকে দৌড়ে এলো। তখন বর্শাধারী সেনাটি চিৎকার করে বললো- এই এগিয়ে আসবি না। দাঁড়া বলছি, না হলে বর্শায় বিঁধে ফেলব।
তাহিরজান বর্শাধারীর সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করলো না। সে প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে এসে রাবিয়ার পা ধরে থাকা সৈনিকটির উপরে তরবারি দিয়ে আঘাত করলো।
সেনাটি আর্তনাদ করে রাবিয়ার পা ছেড়ে দিয়ে রক্তরঞ্জিত হয়ে উঠোনে ঢলে পড়লো।
তাহিরজান পুনরায় তরবারি তুলতেই তার কাঁধে তীব্র বর্শার আঘাত অনুভব করলো। সে অবসন্ন হয়ে মৃত সেনাটির উপরে ঢলে পড়লো। পরার সময়ে সে রাবিয়ার তীব্র আর্তনাদ শুনতে পেলো- হায়, তাহির! এই জন্মে হয়তো আমাদের আর সংসার পাতা হবে না। পরজন্মে তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করে থাকব।
তাহিরের অনুমান হলো, দূর থেকে কে যেন তাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছে।
তাহির রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকলো এবং বাকি সেনারা রাবিয়াকে বস্তায় পূরে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিলো। তারপরে তারা তাহিরজান এবং মৃত সেনাটিকে সেখানে ফেলে রেখে রাবিয়াকে নিয়ে চলে গেলো।
বর্শার আঘাতে তাহিরের কাঁধে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিলো এবং সেই ক্ষত শুকোতে অনেক দিন লেগেছিলো।
রাবিয়াকে হারিয়ে তাহির পাগলের মতো হয়ে উঠেছিলো এবং ঘাও শুকানোর পরে সে রাবিয়ার উদ্দেশ্যে সমরকন্দ গিয়েছিলো। তবে সে সেখানে রাবিয়ার কোনো সন্ধান বের করতে সক্ষম হয়নি। অবশেষে সে হতাশ হয়ে রাবিয়ার আশা ত্যাগ করে আন্দিজান চলে আসে এবং তখনই মামা ফজিলুদ্দিন তাকে সেনা বাহিনীতে ভর্তি করে দেন।
বাবর প্রথমবার সমরকন্দ বিজয়ের সময়ে তাহিরজানও সেই সেনাবাহিনীর সাথে সমরকন্দে গিয়েছিলো। তখনও সে রাবিয়াকে ভুলতে পারেনি। যারজন্য সমরকন্দ গিয়েই সে রাবিয়াকে খুঁজতে শুরু করেছিলো। তখন তার সাক্ষাৎ হয় মমত নামের একজন সৈনিকের সাথে। মমত জাতে মুচি ছিলো। কয়েকদিনের ভেতরে তাহিরজানের মমতের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গঢ়ে উঠে। আহম্মদ সুলতান আখসি আক্রমণের সময়ে মমত আহম্মদ সুলতানের সেনা বাহিনীতে কাজ করছিলো। অবশেষে মমত তার স্ত্রীর সাহায্যে রাবিয়াকে খুঁজে দেয়ার জন্য শপত খায়। কিন্তু রাবিয়াকে খুঁজে থাকা অবস্থায় আহম্মদ তনয়াল আন্দিজানে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সেজন্য তাহিরজান রাবিয়ার আশা ত্যাগ করে বাবরের সংবাদবাহক হিসাবে আন্দিজান যেতে হয়।
বাবর দ্বিতীয়বার সমরকন্দ দখলের সময়ে তাহিরজান আবার সমরকন্দ যায়। তখন মমতের স্ত্রী রাবিয়ার সন্ধান বের করতে সক্ষম হয়। তাহির মমতের সাহায্যে একজন ধনী ব্যবসায়ীর গৃহ থেকে রাবিয়াকে উদ্ধার করে আনে এবং ধর্মীয় বিধান অনুসারে রাবিয়াকে স্ত্রীর মর্যদা প্রদান করে।
ঝরে শুকিয়ে যাওয়া ফুল পুনরায় সজীব হয়ে উঠে। জীবনের উল্লাস কলরবে ভরে পড়ে তাদের দাম্পত্য জীবন।
প্রেমাস্পদকে হারিয়ে তাহিরজান প্রথমে বাবরের সেনা বাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে ভর্তি হয়েছিলো। অসীম সাহস এবং নিষ্ঠার বলে সে সাধারণ সৈনিক থেকে বেগের মর্যদা লাভ করে এবং বর্তমান তাঁর বাবরের দেহরক্ষীদের সর্দারের পদে পদোন্নতি হয়েছে।
বাবরের কাহিনী বলার সময়ে তাহিরের কথা সময়ে সময়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সংকটময় মুহূর্তে তাহিরজান বাবরকে আসন্ন মৃত্যু মুখ থেকে রক্ষা করেছে। হয়তো ঘটনাক্রমে তাহিরজান বাবরের জীবনে না এলে বাবরের হিন্দুস্থান বিজয় সম্ভব হতো না এবং এক বিস্ময়কর বিরল প্রতিভা অকালে মহাকালের বুকে হারিয়ে যেতো। ইতিহাসের বুকে খোদিত হতো না অসীম সাহসী দৃঢ়চেতা সিংহ পুরুষ বাবরের অনেক শ্বাসরুদ্ধকারী বিস্ময়কর যুদ্ধের কাহিনী।
* * *
বাবর কিছু সুস্থ হয়ে উঠার পরে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তকারী সভাসদ বাবরের নিকট এলেন।
হেকিম ইউসূফ বাবরের নিকটেই বসে ছিলেন। তিনি তদন্তকারী সভাসদকে ইশারায় কাছে ডেকে এনে ফিসফিস্ করে বললেন- বেশি বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দুই একটি কথায় শুধু প্রকৃত ঘটনা বলুন।
তদন্তকারী সভাসদ বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যে তথ্য উদ্ধার করেছিলো তা বাবরের নিকট ভেঙে বললেন।
মূল কথা ছিলো এ রকম- বৈদা সুলতানা নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। বিষপ্রয়োগের পরিকল্পনা তিনি নিজেই করেছিলেন এবং পরিকল্পনাটা সফল করার জন্য লোকও তিনি নিজেই ঠিক করেছিলেন। বাবরকে বিষ প্রদান করতে পেরে তিনি সুখী।পুত্রের হত্যাকারীর উপরে প্রতিশোধ নিতে পেরে বর্তমান তিনি উৎফুল্লিত। এতদিন বুকের মধ্যে প্রজ্বলিত অগ্নি বর্তমান নিবার্পণ হয়েছে। বিষাদের জায়গায় উল্লাসে ভরে উঠেছে হৃদয়। তদন্তকারী সভাসদ এটাও জানতে চেষ্টা করেছিলেন যে, ষড়যন্ত্রের সাথে রাণা সংগ্রাম সিঙও জড়িত ছিলো নাকি? কিন্তু বৈদা বেগম এই প্রশ্নের উত্তর দিতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। শাস্তি প্রদান করলে অবশ্যে স্বীকার করাতে পারতেন, তবে বৈদা সুলতানার মতো একজন বিশিষ্টা মহিলাকে বাবরের অনুমতি অবিহনে শাস্তি প্রদান করার সাহস তিনি পাননি।
তদন্তকারী সভাসদের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে বাবর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি কম্পিত কণ্ঠে বললেন- তিনি জবাব দিতেই হবে….….। সেই বদমাশ খানসামা …সেও শাস্তি পেতে হবে। সবাই শাস্তি পেতে হবে। সেই খানসামাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম…সে রন্ধনকৃত আহার্য আমি গ্রহণ করেছি……এবং সেই পাষণ্ড আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে…. কী জঘন্য তার মানসিকতা!
জাহাপনা, সেই জঘন্য বদমাশদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি প্রদান করে হত্যা করা উচিত। যাতে অন্যরাও সেই শাস্তি দেখে শিক্ষা পায়। তদন্তকারী সভাসদ উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- তাদের সাহস দেখে আমি আচরিত হয়েছি, জাহাপনা।
হ্যাঁ, তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য। তারা তরবারির আঘাতে নরহত্যা করা অপরাধীর চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর। বাবর কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে বললেন- সেই তিনজনকে পরম্পরামতে মৃত্যুদণ্ড দিন। ইব্রাহীমের মাতৃর বিচার পরে করা হবে।
আপনার আদেশ শিরোধার্য। তদন্তকারী সভাসদ বাবরের নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
অসীম মনোবল এবং চিকিৎসার ফলে তিনদিন তিনরাত মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বাবর সুস্থ হয়ে উঠলেন। বাবর আরোগ্য হয়ে উঠাতে শুভাকাংক্ষীবর্গ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
বাবর সুস্থ হয়ে উঠার দিনই বেগবর্গ, শুভাকাংক্ষী, পদস্থ সভাসদ এবং বিভিন্ন প্রান্তের রাজপ্রতিনিধিবর্গ বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। বাবর তাঁদের রাজদরবারে ডেকে পাঠালেন। সবাই এসে পদমর্যদা অনুসারে আসন গ্রহণ করলেন। বাবর ধীরে ধীরে দরবার কক্ষে এসে সিংহাসনে আরোহণ করলেন। সিংহাসনে আরোহণ করেই তিনি বৈদা সুলতানাকে দরবারে হাজির করার জন্য নির্দেশ দিলেন।
বৈদা সুলতানাকে দরবার কক্ষে হাজির করা হলো। তাঁর ডানে বামে দু’জন রক্ষী দাঁড়িয়ে রইলো।
বৈদা সুলতানার মাথার চুলগুলো কাপাস তুলোর মতো সাদা। বয়সের আঁচড়ে তাঁর দেহ কিছু পরিমাণে কুঞ্চিত যদিও তিনি বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সিংহাসনের সোনালী ঢাচা, রাজমুকুটে খচিত হীরা-মুক্তার চমক, বাবরের পাংশু মলিন চেহেরা, কোটরাগত চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি মাথা নত করলেন। পরের মুহূর্তেই তিনি আবার বুক উন্নত করে দাঁড়ালেন।
বাবরের নির্দেশে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। তদন্তকারী সভাসদ বৈদা সুলতানাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন- বাদশাহের হত্যার প্রয়াসে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বাইরেও আরও কে কে জড়িত ছিলো এই কার্যে?
সেটা হত্যার প্রয়াস ছিল না– সেটা ছিলো প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থের প্রয়াস। বৈদা সুলতানা নির্ভীকভাবে বলতে লাগলেন- সেটা ছিলো আপনাদের বাদশাহ দ্বারা প্রবাহিত রক্তের প্রতিশোধ। আমার সাথে সহযোগিতা করা বাহালুল, আহাম্মদ এবং পরিচারিকা সবাই একজন একজন শহীদ। তাঁরা বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছেন। এখন আমার পালা পড়েছে। মৃত্যুর জন্য আমার লেশমাত্র ভয় নেই। পুত্রশোকে জ্বলে জ্বলে আমি ইতিমধ্যেই ছাই হয়ে গেছি। আমাকে হত্যা করে আমার ছাই বাতাসে উড়িয়ে দিন।
বৈদা সুলতানা ফার্সি ভাষায় কথা বলার জন্য সবাই তাঁর কথা বুঝতে পারছিলেন। তাঁর তেজোদীপ্ত বক্তব্য সবাই মনযোগ সহকারে শুনতেছিলেন। যারজন্য দরবার কক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ বিরাজ করছিলো। তিনি যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছেন তাঁর নির্ভীক ও তেজোদীপ্ত বক্তব্যে সেটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ হচ্ছিলো।
বৈদা সুলতানা মৃত্যু ভয় জয় করার কথাটা বাবরের দৃষ্টিতেও প্রকট হয়ে উঠলো। বাবর ভাবলেন, মৃত্যু ভয় জয় করার জন্যেই তিনি প্রত্যেকটা শব্দ তীরের ফলকের মতো তীক্ষ্ণভাবে উচ্চারণ করতে সক্ষম হচ্ছেন। তাঁর প্রত্যেকটা শব্দের মাঝে তাঁর মনের অভিব্যক্তি প্রকট হয়ে উঠেছে। ধূমায়িত হচ্ছে বিদ্বেষ। তীরের মতো তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে সহায় সম্বলহীন, পুত্র শোকে আতুর একজন মাতৃকে বাবর জল্লাদ ডেকে কঠোর থেকে কঠোতর শাস্তি প্রদান করে হত্যা করার জন্য আদেশ প্রদান করাটা তিনি মনে-প্রাণে কামনা করছিলেন। পরাজয়ের মাধ্যমে তিনি জয়ের কীর্তিস্তম্ভ নির্মাণ করতে চাইছেন। বাবর ক্রোধোন্মত্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে জয় বৈদা সুলতানারই হবে– তাঁর নির্ভীকতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে– ইতিহাসের পাতায় একজন নির্ভীক মহিলা হিসাবে চিরদিন অমর হয়ে থাকবে। সবাই তাঁর কথা শ্রদ্ধা সহকারে স্মরণ করবে। সবাই তাঁর কীর্তি কাহিনী আন্তরিকভাবে স্মরণ করবে এবং বাবর চিরদিন সেই কলঙ্কিত কাহিনীর খলনায়ক হয়ে থাকবে।
কথাগুলো ভাবতেই বাবরের ওষ্ঠের কোনায় ঈষৎ হাসির রেখা প্রস্ফূটিত হয়ে উঠলো। না না, বৈদা সুলতানার ঈস্পিত শাস্তি প্রদান করে তাঁকে জয়ী হতে দিবেন না তিনি। বৈদা সুলতানার উপরে তিনি নিজেই বিজয় সাব্যস্ত করবেন। যেভাবে তিনি বিষের প্রতিক্রিয়ার উপরে ধৈর্য এবং দৃঢ়তা সহকারে বিজয় সাব্যস্ত করেছেন।
হৃদয়ে সঞ্চারিত ক্ষোভ, আক্রোশ সংযত করার জন্য বাবর কয়েকটা মুহূর্ত মৌন হয়ে রইলেন।
বাবরের মৌনতার সুযোগে মালিক দাদ কারাণী নামক বেগ একজন বৈদা সুলতানার এই মনের ভাব উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- নিজেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী শহীদ বলে ভাববেন না, ইব্রাহীম মাতৃ। বাদশাহের সাথে বেইমানী করে আপনি নিকৃষ্ট কাজ করেছেন।
চুপ কর বিদ্রোহী। বৈদা সুলতানা ধমকের সুরে বললেন- আমার পুত্রহন্তার উপরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি উপযুক্ত কাজই করেছি।
আপনি মাতৃজাতির নামে কলঙ্ক লেপন করেছেন। জাহাপনা আপনাকে মাতৃ বলে সম্বোধন করে আপনার সন্মান বর্দ্ধন করেছিলেন। আপনি সেই সন্মানের মাথায় কুঠারাঘাত করেছেন। আপনি সেদিন যে কৃতজ্ঞতার চোখের জল ফেলেছিলেন, সে কথা আপনি ভুলে গেলেন নাকি, ইব্রাহীম মাতৃ?
না না, সেটা কৃতজ্ঞতার চোখের জল ছিল না– সেটা ছিলো, ঘৃণার চোখের জল। যারজন্য আমার ইব্রাহীম অকালে শহীদ হয়েছেন, আমি কখনও তাঁর মাতৃ হতে পারি না- কোনো মাতৃই সেটা হতে পারে না।
বাবর তখনও নীরব। তিনি আচ্ছন্নের মতো বৈদা সুলতানার প্রগলভতা উপভোগ করছিলেন।
মালিক দাদ কারাণী উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলতে লাগলেন- আপনার পুত্রের নিকট বাবরের চেয়েও দশগুণ অধিক সৈন্য ছিলো। আমি ভালভাবে জানি, সে যুদ্ধে জয়ী হলে বাবর বাহিনীর একজন সৈনিকো জীবিত রাখতো না। ইব্রাহীমের অত্যাচার-উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়েই হিন্দুস্থানের কিছু সংখ্যক সচেতন লোক বাবরকে ডেকে এনেছেন। যুদ্ধ সব সময় যুদ্ধই। সেখানে এক পক্ষের জয় হলে অন্যপক্ষের পরাজয় নিশ্চিত। বাদশাহ বাবর খোলা প্রান্তরে তরবারির বিরুদ্ধে তরবারি দিয়ে ন্যায় যুদ্ধই করেছেন। আপনার হৃদয়ে তিল পরিমাণ মনুষ্যত্ব থাকলেও আপনি এভাবে হিংস্রতার আশ্রয় নিতে পারতেন না।
আমি একজন অবলা নারী। আমি তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করতে অক্ষম। যারজন্য বিষই আমার তরবারি। বিদেশী আক্রমণকারীরা আমাদের দেশের হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে। সমগ্র হিন্দুস্থানে বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়েছে। অনেক মাতৃকে আমার মতো শোকবস্ত্র পরিধান করতে হয়েছে। অনেক বিধবাকে চোখের জল ফেলতে ফেলতে স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে হয়েছে। বৈদা সুলতানা কথাগুলো বলার সময় প্রতিটা শব্দ তীরের ফলকের মতো তীক্ষ্ণ ও স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করছিলেন।
দীর্ঘ দাড়ির বেগ একজন দাঁড়িয়ে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন- জাহাপনা, আমরা উন্মাদ বৃদ্ধার প্রলাপ অনেক শুনলাম। এখন জল্লাদ ডেকে এর বাগ্মিতা বন্ধ করার আদেশ দিন।
হ্যাঁ হ্যাঁ, টুকরা টুকরা করে কাটার আদেশ দিন। বৈদা সুলতানা গর্জে উঠলেন- মরতে আমি ভয় করিনা, মরতে আমার একটুও ভয় নেই।
সভাসদবর্গ বৈদা সুলতানার প্রাণদণ্ডের দাবি জানাতে লাগলেন- এই উন্মাদ বৃদ্ধাকে হাতীর পা-র নিচে ঠেলে দিয়ে পিষে হত্যা করা হোক। এভাবে নানান জনে নানান পরামর্শ দিতে লাগলেন।
বাবর সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানালেন- আপনারা অনুগ্রহ করে শান্ত হোন। আমাকে ভাবতে সময় দিন।
বাবরের আহ্বানে সবাই শান্ত হলো।
বাবর শান্ত সংযত কণ্ঠে বললেন- এই পুত্র শোকাতুরা জ্ঞানী মাতৃর শুধু একটাই শাস্তি— মৃত্যুর থেকেও ভয়ানক শাস্তি। মাননীয় সভাসদবর্গ, আপনারা শুনলেন যে, মহামান্য মাতৃর হৃদয়— পুত্রহারা মাতৃ, পতিহারা বিধবা এবং পিতৃ-মাতৃ হারানো সন্তানের জন্য কাঁদতেছেন। বাবর এভাবে বলেই কিছুক্ষণ মৌন থেকে কণ্ঠস্বর পাল্টিয়ে বললেন- কিন্তু এসব একেবারে মিথ্যা কথা। ইনার স্নেহধন্য পুত্র-ই বাংলা, গোয়ালিয়র এবং আশেপাশের রাজাদের সাথে অনেক যুদ্ধ করেছেন। সেই সব যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষও নিশ্চিতভাবে মরেছে! বাবর বৈদা সুলতানার দিকে তির্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভ্রূকুটি মিশ্রিত সুরে বললেন- আমাকে একটু বলবেন নাকি মাতৃ—তখন আপনি কী করছিলেন?
মালিক দাদ কারাণী ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ ছিলেন। পানীপত যুদ্ধের পরে বাবরের বশ্যতা স্বীকার করে বাবরের দরবারের একজন সভাসদ হিসাবে যোগদান করেছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাবরকে সমর্থন করে বললেন- গত তিন বছরে আমাদের দিক থেকেই ষাট হাজার সেনা মরেছে, জাহাপনা।
আচ্ছা সভাসদবর্গ, আপনারা এক সময়ের ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ মালিক দাদ কারাণীর মুখে শুনলেন যে, বিগত তিন বছরে কত লোক এই সন্মানীয়া মাতৃর পুত্রের লোভের বলি হয়েছে। এই সন্মানীয়া মাতৃর পুত্র এই সিংহাসনে- বাবর সিংহাসনে চাপড়ে চাপড়ে বললেন- সন্মানীয়া মাতৃর পুত্র দশ বছর এই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। হিন্দুস্থান বিশাল জনসংখ্যার দেশ। মানুষের অভাব নেই- একজন আরেকজনকে হত্যা করার জন্য। আপনারা জানেন, ইব্রাহীম লোডী সর্বদা ভারাটিয়া সেনা নিয়োগ করছিলেন। কারণ তাঁর হাতে ধনের অভাব ছিল না। কিন্তু সেই ধন-সম্পদ সৌধাদি নির্মাণ বা সাম্রাজ্যের কল্যাণের জন্য খরচ করতেন না। তিনি ধন-সম্পদ খরচ করতেন ভারাটিয়া সেনা কিনার জন্য- সৈন্য কিনে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার জন্য— হিন্দুস্থানের পবিত্র শ্যামল মাটি রক্তে রঞ্জিত করার জন্য। ইব্রাহীম ছিলো একজন অদক্ষ সেনা নায়ক। তার প্রমাণ পানীপত যুদ্ধ। একজন সেনা নায়কের সাফল্য ও দক্ষতার পরিমাপ যুদ্ধ জয় দিয়ে করা হয় না— দক্ষতা এবং সাফল্য পরিমাপ করা হয় যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে। পানীপতের যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি দুই হাজার সৈন্য এবং ইব্রাহীম লোডী হারিয়েছে ত্রিশ হাজার সৈন্য। তবুও সে আমার কামান, বন্দুক এবং তরবারির জন্য নয়— সেনা হারিয়েছে নিজের অদক্ষতার জন্য। তার নিজের বাহিনীর সেনা এবং হাতীর পা-র নিচে পড়ে তার অধিক সংখ্যক সেনা মরেছে। ইব্রাহীম লোডী নিজেও হয়তো তার নিজের হাতীর শিকার হয়েছে। এ কথা অবশ্যে আমি জানিনা, শুধু অনুমান করছি। সন্মানীয়া মাতৃ যদি এতই —মানব দরদী- বাবর সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর গমগমিয়ে উঠলো- মৃত সৈনিকদের মাতৃ, বিধবা পত্নী এবং সন্তানদের প্রতি যদি এতই হৃদয় বিগলিত, তাহলে সন্মানীয়া মাতৃ কেন যুদ্ধে এতো মানুষ মরতে দিচ্ছিলেন–নিজের সুযোগ্য সন্তানকে কেন যুদ্ধ করতে নিষেধ করেন নি? তাঁকে বৃথা রক্তপাত করা থেকে বিরত করেন নি কেন?
আমি শুধু একজন মাতৃ। বাদশাহকে হুকুম দেওয়াটা আমার আয়ত্বের বাইরে ছিলো। বৈদা সুলতানা বাবরের যুক্তি খণ্ডন করতে না পেরে এইবার অভিযোগ করার পরিবর্তে শুধু আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করলেন।
আর আমরা সেই যুদ্ধপিপাসু যোদ্ধার যুদ্ধ পিপাসা নিবারণ করার জন্য এ দেশে এসেছি। আমরা এখানে এসেছি– অত্যাচারির অত্যাচার থেকে হিন্দুস্থানের মানুষদের রক্ষা করে সুখী সমৃদ্ধ মঙ্গলকামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য। আমরা যে সংকল্প নিয়ে এসেছি, আমরা সেটা বাস্তবে রূপায়ন করে দেখাব। এই কপট প্রবঞ্চক মাতৃর জন্য ভয়াবহ শাস্তি— আমি এরঁ বিদ্বেষ আক্রোশ ভরা জলন্ত দৃষ্টির সম্মুখে থেকেই শাসনকার্য পরিচালনা করব। সংকল্প নিয়ে আসা কাজ আমরা এই মাতৃকে করে দেখাব।
ধন্যবাদ, বাহ্ বা। মালিক দাদ কারাণী বাবরের মহানুভবতাকে প্রশংসা করলেন।
সবাই অভিভূতের মতো বাবরের দ্বন্দ্বের উপরে বিজয় সাব্যস্ত উপভোগ করতে লাগলেন।
বাবর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- এই মাতৃর হৃদয় বিধবা পত্নী, সন্তানহারা মাতৃ এবং পিতৃহারা সন্তানের জন্য বিগলিত। সেজন্য আমি হুকুম দিলাম….. বাক্যটা সম্পূর্ণ না করে ডাকলেন- আব্দুল করিম বেগ কারাণী…….
বামদিকের সারি থেকে একজন বলিষ্ঠ সুগঠিত বেগ দাঁড়িয়ে অভিবাদন করে বললেন- আদেশ করুন, জাহাপনা।
আপনি এই মাতৃর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে যমুনা নদীর পাড়ে একটা অন্নসত্র নির্মাণ করুন। ইনারঁ চাকর-বাকর সকলে সেখানে কাজ করবে এবং প্রতিদিন বিধবা এবং এতিমদের সেখানে খাওয়াবে।
আপনার হুকুম শিরোধার্য, জাহাপনা। আব্দুল করিম বেগ মাথা নুইয়ে বললো।
এবং আপনি আজীবন সেই অন্নসত্র দেখা-শুনা করবেন।
জাহাপনা। আব্দুল করিম বেগ বৈদা সুলতানার দিকে ইশারা করে বিমূঢ়ের মতো বললো- এর প্রাণদণ্ড হবে না নাকি, জাহাপনা?
আমার যা বলার বলে শেষ করেছি।
প্রাণদণ্ড হবে না নাকি? অপেক্ষিত মৃত্যুর ভায়বহ নিষ্ঠুর স্পর্শ তিনি অনুভব করবেন না নাকি? কথাটা ভাবতেই বৈদা সুলতানার হৃদয়ে জীবনের উষ্ম উল্লাস জেগে উঠলো। তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁর হৃদয় কেঁপে উঠলো।
দুই হাত দিয়ে মুখ ডেকে তিনি কেঁদে ফেললেন।
সাথে সাথে দরবার কক্ষ নিঝুম হয়ে পড়ে গেলো।
* * *
এক মাসের ভেতরে বাবর সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠলেন। অসুখ থেকে আরোগ্য হয়ে উঠেই তিনি সাম্রাজ্যের উন্নয়নমূলক কাজে মনোনিবেশ করলেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তিনি সৌধাদি নির্মাণ ও কাব্যচর্চায়ও মনোনিবেশ করলেন। মৌলানা খাঁন দমির, শায়ের সিহাব মুয়ম্মী, মুদারিশ ইব্রাহীম প্রভৃতি অনেক বিশিষ্ট কবি এবং বাস্তুশিল্পী ফজিলুদ্দিনকে হিরাত থেকে আমন্ত্রণ করে হিন্দুস্থানে আনালেন। কাব্যচর্চা, নানা উন্নয়নমূলক কাজ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহের পাশাপাশি তিনি আত্মজীবনী ‘বাবর নামা’ও লিখে যেতে লাগলেন।
পানীপত যুদ্ধের এক বছর পরে বাবর মেবারের রাণা প্রবল প্রতাপী রাণা সাঙ্গার প্রত্যাহ্বানের সন্মুখীন হলেন। একই সময়ে বিহার খাঁর নেতৃত্বে পূব দিকে আফগান জায়গিরদারগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। শাহজাদা হুমায়ূন আফগান বিদ্রোহীদের পরাস্ত করে জৌনপুর, কালপী প্রভৃতি স্থান দখল করেন।
এর পরে বাবর এবং রাণা সাঙ্গার সাথে খানুয়া নামক স্থানে ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে রাণা সাঙ্গা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান। এই খানুয়া যুদ্ধ জয়ে মোগলদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে।
রাজপূত শক্তিকে পরাভূত করার দুই বছর পরে আফগান সর্দারবর্গ একতাবদ্ধ হয়ে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। চুনার এবং ঘর্ঘরা নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে আফগানরা বাবরের হাতে পরাস্ত হয়। ফলে মধ্য এশিয়ার অক্সাচ উপত্যকা থেকে ঘর্ঘরা এবং হিমালয় থেকে গোয়ালিয়র পর্যন্ত মোগলদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিছুদিনের মধ্যেই বাবরের সাম্রাজ্য এত বিস্তার হয়ে পড়ে যে, একজন অশ্বারোহী সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত তিন মাসেও ভ্রমণ করা কঠিন হয়ে পড়লো। বলখ থেকে কাবুল, কাবুল থেকে লাহোর এবং লাহোর থেকে আগ্রা পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূ-ভাগে বাবরের স্বাক্ষরিত আজ্ঞা নির্বিচারে প্রতিপালিত হতে লাগলো।
ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের জন্য বাবর সাম্রাজ্যের বিক্রী কর হ্রাস করে দিলেন। ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্য অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করলো। উজবেকিস্থান, তাজিকিস্থান এবং ইরান পর্যন্ত ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্র প্রসারিত হলো। কর হ্রাসের ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরাও যথেষ্ট লাভবান হলো। বাবর সাম্রাজ্যে মদ্যপান নিষিদ্ধ করে দিলেন। ফলে হত্যা, লুন্ঠন, চুরি, ডাকাতির মতো অনেক অসামাজিক দুর্নীতি হ্রাস পেলো। সাম্রাজ্যে শান্তি শৃংখলা বিরাজ করতে লাগলো। ইব্রাহীম লোডীর সময়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে থাকা মানুষের জীবনে পুনরায় শান্তি সমৃদ্ধি ফিরে এলো।
শিল্পী ফজিলুদ্দিনের মাধ্যমে সৌধ, বাগান প্রভৃতি নির্মাণ করে আগ্রা সহরকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তুললেন। ফলে আগ্রা সহর নতুন প্রাণ পেয়ে মুখর হয়ে উঠলো।
বাবর অসুখ থেকে আরোগ্য হলেও তাঁর স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যেতে লাগলো। দিনের অধিক সময় তিনি শায়ের খাঁন দমীরের সাথে কাব্যচর্চা করে অতিবাহিত করতে লাগলেন। মাহিম বেগমসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যবর্গকেও তিনি কাবুল থেকে আগ্রা ডেকে আনালেন।
গ্রীষ্ম ঋতু। বাবর সেদিন আত্মজীবনী লেখায় ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় তাহির বেগ একটি সোনার থালায় কয়েক থোকা আঙুর এনে বাবরের সন্মুখে রাখলো।
আঙুর দেখে বাবর বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- আঙুর ! এগুলো কোথা থেকে আনলেন।
বাগান ‘হস্ত বেহেস্ত’ থেকে, জাহাপনা। আপনি যে সমরকন্দ থেকে আঙুরের কলম এনে রোপন করেছিলেন, আপনার মনে আছে, জাহাপনা?
বাবরের কথাটা মনে পড়ল। সমরকন্দের আঙুর গাছের কলম আনিয়ে রোপন করার কথা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন।
বাবর উৎসাহিত কণ্ঠে বললেন- তাই নাকি? আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। খুব আনন্দের কথা। সেদিন আমি যমুনার পাড়ে রোপন করা আঙুরগুলোও পাকতে শুরু করেছে দেখে এসেছি। সমরকন্দ থেকে আনয়ন করা সাদা বেদানা, কিসমিস প্রভৃতিও ডাল ভরে লেগেছে। এগুলো মাহিম বেগমকে দেখাতে হবে। এগুলো দেখলে তিনি খুব আনন্দ পাবেন। চলুন, থাল নিয়ে বেগমের নিকটে চলুন।
মাহিম বেগম প্রাসাদের বারান্দায় বসে হুমায়ূনের নিকট পত্র লিখছিলেন। বাবরকে দেখে তিনি আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে মাথা নত করলেন।
বেগম, দেখুন তো! বাবর তাহিরের হাতের থালার আঙুরের গুচ্ছের দিকে ইশারা করে বললেন- এই আঙুরগুলো দেখতে সমরকন্দের আঙুরের মতোই লাগছে নাকি, বেগম? এই আঙুর সমরকন্দ থেকে আনিয়ে রোপন করা হয়েছিলো।
মাহিম বেগম তখন হুমায়ূনের চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে ছিলেন। যারজন্য তাঁর আঙুর খাওয়ার বা দেখার মন মানসিকতা ছিলো না। তবুও বাবর দুখ পাবেন ভেবে তিনি তাহির বেগের হাত থেকে থালাটা নিয়ে মেজের উপর নামিয়ে রাখলেন।
পতি-পত্নীকে একান্তে ছেড়ে তাহির বেগ বারান্দা থেকে নেমে এলো।
মাহিম বেগমের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ার জন্য চোখের পাতা ভিজে ছিলো। তখন তিনি কোন রকম কথা বলার পরিস্থিতিতে ছিলেন না।
মাহিম বেগমের চোখে জল প্রত্যক্ষ করে বাবর ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি সাদরে জিজ্ঞাসা করলেন- কি হলো বেগম, আপনি কাঁদছেন কেন?
শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, জাহাপনা। মাহিম বেগম নিরাসক্ত সংক্ষেপ উত্তর দিলেন।
মাহিম বেগমের বয়স অনেকদিন পূর্বেই চল্লিশ পার হয়ে গেছে। শরীরে মেদ জমার জন্য তিনি স্থূলও হয়েছিলেন এবং কমনীয়তাও যথেষ্ট কমে গিয়েছিলো। ফলে ত্বক শুষ্ক এবং খসখসে হয়ে উঠেছিলো। তদুপরি তিনি পাহাড়ীয়া ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন। যারজন্য তিনি হিন্দুস্থানের গরম আবহাওয়ায় খুব অস্বস্তি এবং কষ্ট অনুভব করছিলেন। এদিকে হুমায়ূনের চিন্তায়ও তিনি অস্থির ছিলেন। হুমায়ূন তখন চম্ভলের শাসনকার্যে নিয়োজিত ছিলেন।
প্রথমাবস্থায় আমারও কষ্ট হতো, বেগম। বাবর মাহিম বেগমকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- কিছুদিন থাকলে আপনিও এই আবহাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। নিন, আঙুর খান।
মাহিম বেগমের আঙুর খাওয়ার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। তবুও তিনি বাবরের অনুরোধে গোটা দুয়েক আঙুর মুখে দিলেন। আঙুরের স্বাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে তিনি বাবরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- ভালোই পেকেছে, খেতেও খুব ভালো লাগছে। নিন, আপনিও নিন। মাহিম বেগম বাবরের দিকে আঙুর এগিয়ে দিলেন।
আপনি পত্র লিখছিলেন নাকি? বাবর আঙুর চিবুতে চিবুতে বললেন।
হ্যাঁ, হুমায়ূনের নিকট। আসলে আবহাওয়ার জন্য আমার কষ্ট হয়নি–কষ্ট হচ্ছে পুত্র স্নেহের জন্য। অবরুদ্ধ জালরাশি যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। তিনি আবেগিক কণ্ঠে জোরে জোরে বলতে লাগলেন- হুমায়ূনের চিন্তায় আমি ব্যাকুল হয়ে উঠেছি, জাহাপনা। আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই যেন আপনি জেনে-শুনে হুমায়ূনকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। আমি কাবুল থাকতে, সে ছিলো গঙ্গার দেশে, আমি আগ্রা আসতে তাকে পাঠিয়ে ছিলেন বদবখশায়। বর্তমান তাকে পাঠিয়েছেন চম্ভলের সুবেদার করে। কোন দূরবর্তী স্থানে বিদ্রোহে দেখা দিলেই আপনি তাকে সেখানে পাঠান এবং আমি পুত্রের আগমন অপেক্ষায় চাতকের মতো ছটফট করতে থাকি। আমার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে, জাহাপনা। আমি হুমায়ূনের বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারছি না।
আপনি এতো অস্থির হচ্ছেন কেন, বেগম? হুমায়ূন নিজেই চন্তল যাওয়ার জন্য আমার নিকট আবেদন করেছিলো। তাঁর ইচ্ছানুসারেই তাঁকে চম্ভল পাঠানো হয়েছে।
মাহিম বেগম অভিযোগের সুরে বললেন- আপনি অস্থির না হয়ে থাকতে পারছেন, কারণ হুমায়ূনের বাইরেও আপনার অন্য সন্তান রয়েছে। হুমায়ূনই আমার একমাত্র সন্তান। তিনিজনকে পূর্বেই কবর দিয়েছি। ভেবে দেখুন, আমার মাতৃ হৃদয়ের অবস্থা কি হতে পারে?
মাহিম বেগম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। বাবর কিছু বলার আগেই ফুট ফুটে পোশাক পরিধান করে গুলবদন দৌড়ে এসে বাবরকে জড়িয়ে ধরে লাফাতে লাগলেন। কিন্তু মাহিম বেগমকে কাঁদতে দেখে সে পরের মুহূর্তে অবাক হয়ে মাটির পুতুলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।
বাবর অবশ্যে বলতে পারতেন, হিন্দাল এবং গুলবদন তো আপনারই সন্তান। কিন্তু বাবর কথাটা ভাবতেই মাহিম বেগম আবার বলতে লাগলেন- হুমায়ূনের মতো মির্জা কামরাণও তো আপনারই সন্তান। সে তো মাতৃর সাথে লাহোর রয়েছে। একমাত্র হুমায়ূনকে কেন আপনি ঢাল করে রেখেছেন?
বাবর এইবার ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না। মাহিম বেগমের শ্লেষ মিশ্রিত বাক্যবাণে তিনি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়লেন। মাহিম বেগমের অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি ক্ষোভের সহিত বললেন- হুমায়ূনকে সংকটের ঢাল করে রেখেছি, কারণ সে ভবিষ্যত শাসক। আমার মৃত্যুর পরে সে-ই নিতে হবে সিংহাসনের দায়িত্ব। সেজন্য তার অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তের খুঁটিনাটি সে জানাটা আবশ্যক। সে কষ্ট ও সংকটের মোকাবিলা করতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করাটা জরুরি। তাঁর এই বয়সে আমি তাঁর চেয়েও বেশি কষ্ট করতে হয়েছে।
কিন্তু আমি একজন মাতৃ। হুমায়ূনের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে আমার অন্তর হাহাকার করে উঠে। কিন্তু আপনার এতে কী আসে যায়? আমার বাইরেও তো দু’জন যুবতী নারী আপনার বিদ্যমান।
গুলবদন পিতৃ-মাতৃর এই ধরণের কথাবার্তা প্রথমবারের জন্য শুনছিলো। উত্তেজিত পিতৃকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকা দেখে তার শিশু মনেও অশুভ বার্তার ইঙ্গিত পেলো। আগে একজন আরেকজনকে কত ভালো বাসতেন, ছোট হলেও সে কথা অনুমান করতে তার অসুবিধা হতো না। কাবুল থেকে আগ্রা আসার সময়ে রাস্তায় পিতৃর সাথে মিলনের আনন্দে মাতৃর চোখে-মুখে যে ব্যাকুলতার পূর্বাভাস সে প্রত্যক্ষ করেছিলো সেই দৃশ্য আজও তার মনে জ্বাজল্যমান হয়ে রয়েছে। মাতৃ মাহিম বেগমের আগমনে পিতৃ যেভাবে আনন্দিত ও উল্লসিত হয়ে উঠেছিলেন সেকথা ভাবলে আজও সে পুলকিত হয়ে উঠে। মাতৃর প্রতি পিতৃর এতো ভালবাসা! বাবরের বাইরে কোন মোগল সম্রাটই নিজের পত্নীর প্রতি এতো সন্মান প্রদর্শন করেনি বলে লোকেরা পরস্পরে বলা-কওয়া করাও সে শুনেছে।
এই গুলবদনই পরিণত বয়সে ‘হুমায়ূন নামা’ লিখেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি তীক্ষ্ণ অনভূতি এবং সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। সেজন্য তিনি পিতৃ-মাতৃর মাঝে সংঘটিত বাক-বিতণ্ডার কারণ খুঁজে চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছিলেন।
বাবরের অনুভূতিতেও গুলবদনের এই ভাবান্তর ধরা পড়লো। যারজন্য তিনি অশুভ বার্তার ইঙ্গিত পেয়ে পরিস্থিতি থেকে গুলবদনকে সরাতে থালা থেকে একগুচ্ছ আঙুর হাতে নিয়ে গুলবদনের দিকে বাড়িয়ে বললেন- যাও, এই আঙুরগুলো বাগানে বসে খাওগে’ যাও।
বিশেষ আপত্তি না করে গুলবদন আঙুরের গুচ্ছ নিয়ে বাগনের দিকে চলে গেলো।
উত্তেজনা ও ক্ষোভে বাবরের চোখ থেকে জল গড়াতে লাগলো। বাবরের চোখে জল দেখে মাহিম বেগম বিচলিত হয়ে উঠলেন। তিনি সাদরে বাবরের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললেন- আমার বাদশাহ, আপনি আমার উপরে অসন্তুষ্ট হবেন না। আমি একজন অবলা নারী এবং আপনি বাদশাহ। আমি আপনার সাথে অভিমান না করে কার সাথে করব? আপনার নিকট থেকে একটু সহানুভূতি পেলেই আমার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠে, জাহাপনা।
হ্যাঁ, আমি বাদশাহ। বাবর অভিমান ভরা কণ্ঠে বলতে লাগলেন- হ্যাঁ, আমি বাদশাহ। সেজন্য সকল বিপদ, সকল অন্যায়ের বোজা আমি-ই বহন করতে হবে! যুবাবস্থায় আহম্মদ তনয়ালের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে একবার আমার সিংহাসনের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মেছিলো। তখন আমি সিংহাসন হারিয়ে নেপাতোলা নামক একটি গ্রামে ছিলাম। নেপাতোলার দহকতের পাহাড়ীয়া অঞ্চলের কৃষকের আড়ম্বরহীন সুখী জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আমি সিংহাসনের মোহ ত্যাগ করে একজন কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিলাম। তার প্রস্তুতি হিসাবে আমি পাহাড়ীয়া অঞ্চলে খালী পায় কিছু সময় হেঁটেও বেড়িয়ে ছিলাম। আমি ক্ষমতার শিকল ছিঁড়ে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না। তখন এমন একজন বান্ধব পেলাম না, যে আমার মাথা থেকে ক্ষমতার বোজা নিজের মাথায় নিয়ে আমাকে মুক্ত করবে। বর্তমান আমি ক্ষমতার বোজা বহন করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি- ক্ষমতার বোজা বহন করার শক্তি আমি এখন হারিয়ে ফেলেছি। সেজন্য আমি ক্ষমতার বোজা হুমায়ূনের মাথায় তুলে দিয়ে মুক্ত হতে চাইছি।
বাবর কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন, মাহিম বেগম তৎক্ষণাৎ উপলব্ধি করতে পারলেন। কিন্তু তিনি নিজের অনুমানের উপর বিশ্বাস করতে কষ্ট পেয়ে বিমূঢ়ের মতো বাবরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাবর আবার বললেন- বেগম, আপনি হুমায়ূনকে পত্র লিখে তাকে আগ্রা ডেকে পাঠান। আমি জীবিত থাকতেই সে আমার চোখের সন্মুখে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়াটা আমি কামনা করি। আমাকে মুক্তি দিন।
কিন্তু জাহাপনা, আপনি তো নিজেই জানেন, হুমায়ূনের সিংহাসনের প্রতি মোটেই লোভ নেই। আপনি বর্তমান থাকতে সে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়াটা আমিও কামনা করি না। আমি শুধু সে আমার চোখের সন্মুখে থাকাটা কামনা করি।
আমার ইচ্ছার কথা জানিয়ে পত্র লিখে তাঁকে ডেকে আনুন। কিন্তু আমার এই সিদ্ধান্তের কথা আপনি অন্য কারো নিকটে প্রকাশ করবেন না।
আপনি কাবুল ফিরে যেতে চাইছেন নাকি, জাহাপনা?
আমার উপলব্ধি হচ্ছে যে, আমাকে অতিসত্বর চোখ মুদতে হবে। তখন আমার মৃতদেহ কাবুল নিয়ে গিয়ে কবর দিবেন। জীবিত দিন কয়টা আমি আগ্রাতে কাটাব। হয়তো আমি আর বেশিদিন জীবিত থাকব না। আমার অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়; কিন্তু শাসনকার্য পরিচালানোর জন্য সময় পাইনা। আমার আর সিংহাসনের প্রয়োজন নেই, বেগম।
বাবরের অন্তরে দুঃখ দেওয়ার জন্য মাহিম বেগমের অন্তর অনুশোচনায় ভরে উঠলো। তিনি ক্ষমা খুঁজার ভংগীতে বললেন- আমাকে ক্ষমা করবেন, জাহাপনা। আপনি সিংহাসন থেকে অব্যাহতি নেওয়ার কথা জানিয়ে হুমায়ূনকে আমি পত্র লিখতে পারব না।
বাবর দৃঢ় প্রত্যয়ের সুরে বললেন- তাহলে আমাকেই লিখতে হবে। এভাবে বলেই বাবর নির্ভিকারভাবে বসা থেকে দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে চলে গেলেন।
বাবরের পত্র যথাসময়ে এসে চম্ভল পৌঁছোল।
হুমায়ূন তখন জ্বরে ভূগতেছিলেন। পত্র পড়ে তিনি পিতৃর সিদ্ধান্তের সম্ভেদ পেয়ে বিচলিত হয়ে উঠলেন।
হিন্দু বেগ তখন হুমায়ূনের সাথে ছিলেন। হিন্দু বেগকে ডেকে এনে হুমায়ুন বললেন- হিন্দু বেগ সাহেব, আপনি অতিসত্বর আমাকে আগ্রা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
হুমায়ূন প্রচণ্ড জ্বরে ভুগে একেবারে কাহিল হয়ে পড়ছিলেন। যারজন্য হিন্দু বেগ হুমায়ূনকে আগ্রা পাঠাতে ভরসা পেলেন না। তিনি হুমায়ূনকে আগ্রা পাঠানোর পরিবর্তে হুমায়ূনের অসুস্থতার সংবাদ জানিয়ে বাবরের নিকট পত্র প্রেরণ করলেন এবং দিল্লী থেকে হেকিম ডেকে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন।
দিল্লী থেকে হেকিম এসে চিকিৎসা শুরু করলেন যদিও চিকিৎসায় কোনো ফল দিলো না। হুমায়ূনের অসুখ ধীরে ধীরে বেশি হতে লাগলো। জ্বরে ভুগে হুমায়ূনের শরীর একেবারে কয়লার মতো কালো পড়ে গেলো।
হুমায়ূনের অবস্থা দেখে হিন্দু বেগ বিচলিত হয়ে উঠলেন। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি মাহিম বেগমকে ডেকে আনালেন।
হুমায়ূনরে অবস্থা দেখে মাহিম বেগমের অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠলো। একমাত্র পুত্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় তাঁর চোখের ঘুম দূরীভূত হলো। দিনরাত তিনি হুমায়ূনের শুশ্রূষা করার সাথে সাথে পুত্রের আশু আরোগ্য কামনা করে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা জানাতে লাগলেন। কিন্তু আরোগ্যের কোনো লক্ষণ না দেখে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন।
হুমায়ূনের অবস্থা দেখে হেকিমও চিন্তান্বিত হয়ে উঠলেন। তিনি উন্নত চিকিৎসার সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য হুমায়ুনকে আগ্রা পাঠানোর পরামর্শ দিলেন- আমার সাধ্যানুসারে চিকিৎসা করলাম। কিন্তু রোগীর অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছেনা। সেজন্য শাহজাদাকে আগ্রা নিয়ে যাওয়াই উচিত হবে। সেখানে চিকিৎসাও ভালো হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন হলে রোগের প্রভাবো কমে আসবে। আসলে চম্ভলের জলবায়ু শাহজাদার স্বাস্থ্যের প্রতিকূলে ক্রিয়া করতেছে।
হুমায়ূন তখন প্রায়ই অচেতন অবস্থায় আচ্ছন্নের মতো পড়ে থাকতেন। সেজন্য হুমায়ূনকে কীভাবে আগ্রা নিয়ে যেতে পারে মাহিম বেগম সেই বিষয়ে হিন্দু বেগের পরামর্শ চাইলেন- বেগ সাহেব, হেকিম সাহেব হুমায়ূনকে আগ্রা নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, কিন্তু হুমায়ূনের অবস্থা বর্তমান খুবই কাহিল। সেজন্য বর্তমান অবস্থায় কীভাবে আগ্রা নিয়ে যাওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করুন।
মাহিম বেগমের কথা শুনে হিন্দু বেগ চিন্তান্বিত হয়ে উঠলেন। তিনি বললেন- এই অবস্থায় ঘোড়ায় চড়িয়ে আগ্রা নিয়ে যাওয়া কোনোমতেই সম্ভব হবে না। এমনকি পাল্কীতে তুলে নেওয়াও সম্ভব হবে না। সেজন্য বর্তমান আগ্রা নিয়ে যাওয়াটা খুবই কঠিন কাজ হবে।
মাহিম বেগম বিচলিত কণ্ঠে বললেন- তাহলে উপায়?
হিন্দু বেগ পরামর্শ দিলেন- একটি উপায় অবশ্যে আছে, নৌকাযোগে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যাত্রাপথ দীর্ঘ ও কষ্টকর হলেও শাহজাদার কোনো প্রকার অসুবিধা হবে না।
অবশেষে নৌকাযোগে আগ্রা নিয়ে আসার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হলো। শুভ দিনবার দেখে হুমায়ূনকে নৌকায় তুলে আগ্রা অভিমুখে যাত্রা করলেন।
দীর্ঘ নৌকাযাত্রার শেষে হুমায়ূনকে নিয়ে আগ্রা পৌঁছোলেন। হুমায়ূন তখনও অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। অচেতন অবস্থায়ই তাঁকে পাল্কীতে তুলে আটজন পাল্কী বাহক হুমায়ূনকে জাফরসন বাগে বয়ে আনতে লাগলো।
হুমায়ূনকে আগ্রা নিয়ে আসার সংবাদ পেয়ে বাবর উৎকণ্ঠিতভাবে হুমায়ূনকে দেখতে দৌড়ে এলেন।
হুমায়ূন অচেতন অবস্থায় পাল্কীতে পড়ে ছিলেন। হুমায়ূনকে অচেতন অবস্থায় দেখে হৃদয়ের কোন একটা তন্ত্রী ছিঁড়ে যাওয়া যেন অনুমান হলো বাবরের। পাল্কী বাহকেরা বয়ে আনা পাল্কী মৃতকের শবদেহ বয়ে আনা শবাধারের মতো অনুমান হতে লাগলেন বাবরের মনে। মুহ্যমানের মতো তিনি স্তব্ধ হয়ে পড়লেন পুত্রের অবস্থা প্রত্যক্ষ করে।
জাফরসনবাগে আনার পরে হুমায়ূনকে অচেতন অবস্থায় অতি সাবধানে এনে বিছানায় শোইয়ে দেওয়া হলো। প্রচণ্ড জ্বরের বিকারে হুমায়ূন প্রলাপ বকতে লাগলেন। সারারাত সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পার হলো। বাবর এবং মাহিম বেগম সারারাত হুমায়ূনের শিতানে বসে কাটালেন। পূর্বে ফর্সা হওয়ার সময়ে কিছু সময়ের জন্য হুমায়ূনের চেতনা ফিরে এলো। শিতানে অবসন্নভাবে বসে থাকা বাবরকে তিনি চিনতেও পারলেন।
হুমায়ূন বিছানায় উঠে বসতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু তিনি উঠতে না পেরে ছট্ফট্ করতে লাগলেন।হঠাৎ তাঁর মাথা একদিকে ঝোঁকে গেল এবং তিনি অচেতন হয়ে বিছানায় ঢলে পড়লেন।
হুমায়ূনের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর উঠলো। তিনি আবার প্রলাপ বকতে লাগলেন- আমি…..আপনার সেবায়……. আপনার অবর্তমানে….না…..না….।
হুমায়ূন যেন কিছু একটা স্বপ্ন দেখছিলেন। একবার তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন- এগিয়ে যাও……. আক্রমণ কর……..তাকে হত্যা কর…..না না, চলে গেলো। দাঁড়িয়ে পড়…..
দীর্ঘদিন চললো এই সংকটাপন্ন অবস্থা। হেকিম রোগ নিরাময়ের জন্য নিয়মিতভাবে ওষুধ প্রয়োগ করে যেতে লাগলেন যদিও রোগ নিরাময়ের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। রোগীর অবস্থা দিনে দিনে খারাপের দিকে যেতে লাগলো।
একমাত্র পুত্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় মাহিম বেগম শোকে ভেঙে পড়লেন। বন্যার জলের মতো তাঁর চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরতে লাগলো।
বাবরও বিচলিত হয়ে উঠলেন। প্রত্যেকটা কঠিন পরিস্থিতিতে সবাই তাঁর উপরে নির্ভর করায় অভ্যস্ত ছিলো। এবারো তার ব্যতিক্রম হল না। সবাই তাঁর উপরে নির্ভর করতে লাগলো। তবে, এবার তিনি নিজেই বুদ্ধিহীন। স্বয়ং তাঁকেও সান্ত্বনা দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়লো।
বাবরকে শোকাভিভূত এবং বিচলিত দেখে শেখ-উল-ইসলাম বাবরকে সান্ত্বনা প্রদানের উদ্দেশ্যে বললেন- জাহাপনা আল্লাহর উপরে বিশ্বাস রাখুন। ধৈর্য হারাবেন না। আল্লাহই শাহজাদাকে নিশ্চয় আরোগ্য করবেন। তবে শাহজাদার চিকিৎসায় অভিজ্ঞ হেকিমও অসফল। শেখ-উল-ইসলাম রহস্যময় ভঙ্গীতে বলতে লাগলেন- আমার ধারণা রোগের অন্তরালে নিশ্চয় কোনো অন্তর্নিহিত রহস্য রয়েছে। হয়তো আল্লাহ আপনার থেকে কোরবাণি খুঁজতেছেন। আপনি কোনো মহামূল্যবান জিনিস আল্লাহর নামে দান করুন, জাহাপনা।
মহামূল্যবান জিনিস! মাহিম বেগম ইতিমধ্যে অনেক ভেড়া আল্লাহর নামে কোরবাণি করে দুস্থ-গরিবদের মাঝে মাংস বিতরণ করেছেন। গরিবদের সহায় করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন। মাহিম বেগম এই কথা ভেবেই হুমায়ূনের আরোগ্য কামনায় মুক্তহস্তে দান-খয়রাত করতেছেন। শেখ-উল-ইসলাম আবার কী মহামূল্যবান জিনিস দান করার কথা বলছেন!
বাবর এইসব কথা ভাবা-গুণা করে থাকতেই শেখ-উল-ইসলাম আবার বললেন- জাহাপনা, আপনি সেই বড় হীরাখণ্ড আল্লাহর নামে দান করুন।
কোন হীরা? কহিনূর? বাবর উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ, জাহাপনা। কহিনূর হীরা। শেখ-উল-ইসলাম সন্মতিসূচক মাথা নাড়িযে বললেন।
বাবর শেখ-উল-ইসলামের কথায় আশ্চর্যচকিত হয়ে উঠলেন। কহিনূর হীরার মূল্য একশত মোন সোনার মূল্যের সমান। হীরাখণ্ড হুমায়ূনই তাঁকে এনে দিয়েছিলো। হীরাখণ্ড হুমায়ূনের হাতে আসার বিস্ময়কর কাহিনীর কথা বাবরের মনে পড়ে গেলো। হুমায়ূনের মুখে হীরাখণ্ডের কাহিনী শুনে বাবর অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। আশ্চর্যচকিত হয়ে উঠেছিলেন হিন্দু রমণীর ত্যাগের কথা ভেবে।…
সেটা ছিলো পানীপত যুদ্ধ বিজয়ের পরে প্রথম দিল্লীতে আসা সময়ের কথা।
বাবর সেদিন সন্ধ্যেবেলা যমুনা নদীর বুকে দুই মহলার একটি নৌকায় বসে হিন্দু স্বামীর চিতায় উঠে মহিলাদের আত্মদাহের বিস্ময়কর কাহিনীর কথা ভেবে বিচলিত হয়ে কবিতা লিখছিলেন। এমন সময় চারটে পাল খাটানো ভব্য সুসজ্জিত একটি নৌকা এসে বাবরের নৌকার নিকটে থেমে গেলো।
রক্ষী একজন উচ্চকণ্ঠে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো- কে? কার নৌকা?
সেই নৌকাটা থেকে উত্তর এলো- শাহজাদা হুমায়ূনের নৌকা। শাহজাদা জাহাপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন।
কথাটা বাবরের কর্ণগোচর হলো। বাবর নিজেও হুমায়ূনের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে রয়েছিলেন। যারজন্য রক্ষী সেনাটি কোনো মন্তব্য করার আগেই বাবর রক্ষী সেনাটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শাহজাদাকে আসতে দাও।
কিছুক্ষণ পরেই হুমায়ূন বাবরের নিকটে এলেন। হুমায়ূন পিতৃর সাথে কুশল সংবাদ বিনিময় করে কোমরবন্দ ঢিলা করে বুকের মধ্যে লুকিয়ে আনা কারুকার্যখচিত ছোট সুদৃশ্য বাক্স একটি পিতৃর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন- এই বাক্সটা খুলে দেখুন, আব্বা হুজুর।
বাবর আস্তে আস্তে বাক্সের ঢাকনা খুললেন। বাক্সের ভেতরে মখমলের কাপড়ের উপরে সযত্নে রক্ষিত তারার মতো ঝলমলে একখণ্ড পাথর দেখে তাঁর চোখ ছানাবড়া করতে লাগলো। এটা কী? আখরোট একটার সমান বড়। বাবর জীবনে অনেক হীরা দেখেছেন; কিন্তু এতো বড় হীরা! এতো বড় হীরা দেখেছে বলে তাঁর মনে পড়ছে না। হীরা এতো বড় হতে পারে বলে তিনি কোনোদিন কল্পনাও করেন নি।
বাবর আশ্চর্যচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- এটা কীরকম পাথর?
এটা হীরা। হুমায়ূন গর্বসহকারে বললেন।
পাথর থেকে রশ্মি বিকিরণ হচ্ছিল। বাবর পাথরখণ্ড হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন- ওজন কত?
সাত-আট মিস্কাল হবে। (এক মিস্কাল প্রায় ৪.৬৮ গ্রামের সমান)।
এতো বড় হীরা?
আব্বা হুজুর, আমি একজন জহুরিকে হীরাখণ্ড পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছিলাম। তাঁর কাছ থেকেই জানতে পেরেছি, এটা বিখ্যাত কহিনূর হীরা। পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় হীরা দ্বিতীয়টি নেই। সিন্দুক ভর্তি সোনার চেয়েও এর মূল্য বেশি।
আমি শুনেছি, সুলতান আলাউদ্দিনের একখণ্ড বড় হীরা রয়েছে। কথিত রয়েছে যে, সেই হীরার মূল্যের পরিমাণ ধন দিয়ে একটি বিশাল সাম্রাজ্যের লোকের একমাসের আহার্যের খরচ অনায়াসে চালানো যাবে। বাবর বললেন।
জহুরি বলা মতে, কহিনূর হীরার মূল্যের পরিমাণ ধন দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর লোকের আড়াই দিনের আহার্যের ব্যবস্থা করা যাবে। এভাবে বলেই হুমায়ূন খিল খিল করে হেসে ফেললেন।
আপনি হীরাখণ্ড কোথায় পেলেন?
হুমায়ূন আমতা আমতা করে বললেন- গোয়ালিয়রের রাজার তরফ থেকে আমি দানসূত্রে পেয়েছি।
দানসূত্রে পেয়েছেন? কিসের বিনিময়ে?
হুমায়ূন কাহিনী শুরু করলেন- আব্বা হুজুর, আপনি হয়তো শুনেছেন, মহারাজা বিক্রমাদিত্যের বংশধরেরা বিগত একশত বছর গোয়ালিয়রের শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। দিল্লীর সুলতানদের বিরুদ্ধে তাঁরা অনেকদিন যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধেও তাঁরা যুদ্ধ করেছেন। ইব্রাহীম লোডীও তাঁদের প্রথমাবস্থায় পরাভূত করতে পারেন নি। কিন্তু শেষমুহূর্তে তাঁরা গোয়ালিয়র সহর ছেড়ে শস্মাবাদ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
হ্যাঁ, বাবর সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন- হ্যাঁ, গোয়ালিয়রের মহারাজাদের বীরত্বের অনেক কাহিনী আমি শুনেছি, কিন্তু তার সাথে কহিনূরের সম্পর্ক কী?
হুমায়ূন দানসূত্রে হীরাখণ্ড পাওয়ার যে কাহিনী বলে গেলেন তার সারাংশ এরকম-
পানীপত যুদ্ধে জয়ের পরে বাবরের অশ্বারোহী বাহিনী হুমায়ূনের নেতৃত্বে বাবরের আগেই দিল্লী এসে বিনাযুদ্ধে দিল্লী দখল করার পরে শস্মাবাদ আক্রমণ করে দখল করেছিলেন।
শস্মাবাদ দখল করার পর হুমায়ূন সসৈন্যে দূর্গের ভেতর প্রবেশ করে এবং দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করার পর মহারাজার বিধবা পত্নী, দু’জন যুবতী কন্যা এবং বিশ বছরের একটি পুত্রের সাথে হুমায়ূনের সাক্ষাৎ হয়।
মহারাজার বিশ বছরের পুত্র তখন হুমায়ূনকে আশ্বাস দিয়ে বলেন- ইব্রাহীম লোডী শুধু আপনাদেরই শত্রু ছিল না- সে আমাদেরও শত্রু ছিলো। সে নিধন হওয়াতে আমরাও আনন্দিত। এখন আপনি আমাদের শস্মাবাদ থেকে গোয়ালিয়র যাওয়ার জন্য অনুমতি দিন।
হুমায়ূন নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে বললেন- গোয়ালিয়র যাওয়ার জন্য আপনাদের আমি অনুমতি দিতে পারব না? আপনারা আব্বা হুজুর না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং আব্বা হুজুর না আসা পর্যন্ত বৈচ বেগ আপনাদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকবে।
এভাবে আশ্বাস দিয়ে হুমায়ূন দূর্গের বাইরে তাঁবু খাঁড়া করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। রাতে হঠাৎ দূর্গের ভেতরে চিৎকার হুলস্থূলের শব্দ শুনে হুমায়ূনের ঘুম ভেঙে যায়। হুলস্থূলের উৎস খুঁজে তিনি দেহরক্ষী সৈন্য নিয়ে দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করেন।
দূর্গের ভেতর প্রবেশ করে হুমায়ূন রাজপ্রাসাদের দিকে দৌড়ে আসেন। কারণ চিৎকারের শব্দ রাজপ্রাসাদ থেকে আসছিলো। রাজপ্রাসাদের প্রবেশদ্বারে বৈচ বেগের একজন সৈন্য রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেন। মৃত সৈনিকটি থেকে অল্পদূরে আঠারো বছরের একজন রাজকুমারী সিরির উপরে বসে শাড়ীর আঁচল দিয়ে নিজের অনাবৃত বুক ঢাকতে চেষ্টা করছিলেন এবং কয়েকজন সৈনিক রাজকুমারকে ঘিরে অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
ঘটনাটা ছিলো এরকম-
স্বর্গীয় মহারাজার যুবতী কন্যা দু’টিকে দেখে বৈচ বেগের হৃদয়ে কামনার অগ্নি জ্বলে উঠেছিলো। কামনা চরিতার্থ করার জন্য সে কয়েকজন সৈনিকসহ মৃত সৈনিকটিকে রাজকুমারীকে ধরে আনতে পাঠিয়ে দিয়েছিলো।
মৃত সৈনিকটি রাজকুমারীকে বলপূর্বক ধরে নেওয়ার চেষ্টা করতেই তাঁর ভ্রাতৃ সেখানে এসে উপস্থিত হোন এবং ভগ্নীর ইজ্জত বাঁচাতে তিনি সৈনিকটিকে আক্রমণ করে নিহত করেন।
রাজকুমারের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে হুমায়ূন ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেন এবং তিনি সৈনিক কয়জনের দিকে রোষায়িত নেত্রে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দেন- রাজকুমারকে ছেড়ে দাও। ভগ্রীর ইজ্জত বাঁচাতে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া বীরকে তোমরা সন্মান প্রদর্শন করা উচিত।
তবুও সৈনিক কয়জন নির্বিকার হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তখন তিনি বাবরের নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন- বাদশাহ বাবর হিন্দুস্থানের লোকদের সাথে শিষ্টতাপূর্ণ ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। সে কথা তোমরা এখনই ভুলে গেলে নাকি? শাহী নির্দেশ অমান্য করে বৈচ বেগ অন্যায় করেছে। এভাবে বলে তিনি তাঁর সঙ্গী সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বললেন- যাও, এখনই তাকে বন্দি করে বন্দিশালে ভরিয়ে রাখগে’ এবং তাকে সহায় করা সৈনিকদের দশ ঘা করে চাবুক মেরে ছেড়ে দাওগে’।
এভাবে আদেশ দিয়ে হুমায়ূন রাজকুমার এবং রাজকুমারীকে নিয়ে বিধবা রাণীর নিকট এলেন।
মহারাণী সভ্রান্ত এবং সুশিক্ষিতা ছিলেন। তিনি কয়েকটা ভাষা জানতেন। তিনি হুমায়ূনের দিকে সুদৃশ্য একটি বাক্স বাড়িয়ে ধরে ফার্সি ভাষায় বললেন- এই বাক্সের ভেতর আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি রয়েছে। কিন্তু আমার জন্য সকল মূল্যবান জিনিসের চেয়ে আমার সন্তানরা বেশি মূল্যবান। আপনি আমার কন্যার সন্মান রক্ষা করেছেন- আমার পুত্রের জীবন রক্ষা করেছেন। এমন কী আমার জীবনও আপনি রক্ষা করেছেন। সেজন্য এই বাক্সের ভেতরে রক্ষিত হীরাখণ্ড কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপে আপনাকে প্রদান করতে আমাকে অনুমতি দিন।
এটাই সেই হীরাখণ্ড। শেখ-উল-ইসলাম সেই হীরাখণ্ড দান করার জন্য পরামর্শ দিতেছেন। কিন্তু হীরাখণ্ড আমি কাকে দান করব? শেখ-উল-ইসলামকে, না অন্য কাউকে? কারণ আল্লাহ নিজেতো কোনো পার্থিব জিনিস হাত পেতে গ্রহণ করেন না। সেজন্য আল্লাহর সৃষ্ট মানুষকে দান করতে হবে। কিন্তু কে সে? বাবর এভাবে মনে মনে ভেবে শেখ-উল-ইসলাম-এর মনোভাব মাপতে বললেন- কিন্তু আল্লাহর নামে কাকে দান করা যায়?
আল্লাহর নামে কোন জিনিস দান করলে সেই জিনিসটি ইসলাম ধর্মীয় গুরুর প্রাপ্য এবং শেখ-উল-ইসলামই তাঁদের ভেতরে প্রধান। শেখ-উল-ইসলাম সমিধান দিলেন।
বাবর ভাবলেন, শেখ-উল-ইসলাম সরাসরি নিজের কথা বলতে সাহস না পেয়ে নিশ্চয় এভাবে ঘুরিয়ে পাকিয়ে বলছেন। সেজন্য বাবর কিঞ্চিত ক্ষোভের সহিত ভাবলেন, আল্লাহর নামে দান করা হীরাখণ্ড অবশ্যে হজরত মূর্তজার মাজারেও দেওয়া যায়! কিন্তু ভাবী সম্রাট হুমায়ূনের রাজকোষের সবচেয়ে মূল্যবান হীরা কোন মাজারে প্রদান করলে নিশ্চিয় এই লোভী বৃদ্ধের হাতে এসে পড়বে! শেখ-উল-ইসলাম হুমায়ূনের সংকটজনক অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে পিতৃ-মাতৃর নিকট থেকে হীরাখণ্ড ছিনিয়ে নিতে চাইছেন। কারণ তিনি জানেন, বর্তমান পুত্রের আরোগ্যের জন্য পিতৃ-মাতৃ নিজের জীবন পর্যন্ত দান করতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন না।
সেজন্য বাবর ভাবলেন, হীরার পরিবর্তে তিনি নিজের জীবন আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবেন। ভাবামতেই তিনি শেখ-উল-ইসলামকে জিজ্ঞাসা করলেন- মৌলানা সাহেব, আপনি স্পষ্ট করে বলুন, আমার জীবনের চেয়েও হীরাখণ্ডের মূল্য বেশি নাকি?
জাহাপনা, হাজার হাজার কহিনূর হীরা আপনার কনিষ্ঠ আঙুলের সমানও হবে না।
আচ্ছা, সেটাই যদি হয়, সবাই যাতে শুনতে পারে এরূপ উচ্চকণ্ঠে বাবর বললেন- আমি হুমায়ূনের জীবনের পরিবর্তে একটা বড় জিনিস কোরবাণি করব। আমার সেই কোরবাণি কোন আল্লাহর বান্দা নয়, স্বয়ং আল্লাহ-ই গ্রহণ করুন।
কক্ষে সমবেত সবাই ভয়ার্ত এবং বিস্মিতভাবে বাবরের দিকে তাকালেন। বাবর বসা থেকে দাঁড়িয়ে অচেতন হয়ে পড়ে থাকা হুমায়ূনের শিতানে এলেন।
বাবর আচ্ছন্নের মতো প্রার্থনার সুরে বলতে লাগলেন- মোর প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হুমায়ূনের জন্য আমি প্রার্থনা জানাই যে- হে পরওয়ার দেগার আল্লাহ, আপনি হুমায়ূনকে ভয়ানক কঠিন রোগ থেকে মুক্ত করে আমার শরীরে সেই রোগ বিস্তার করে দিন।
বাবরের প্রার্থনা শুনে কক্ষে সমবেত সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন।
বাবর প্রার্থনা করে করে হুমায়ূনের বিছানার চতুর্দিকে তিনিবার প্রদক্ষিণ করলেন- হে পরোয়ার দেগার, আমি বাদশাহ জহিরুদ্দিন বাবর আমার নিজের জীবন প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হুমায়ূনকে দান করলাম। আপনি আমার কোরবাণি কবুল করুন, আল্লাহ—হুমায়ূনকে আপনি আরোগ্য করে দিন।
মাহিম বেগমো স্তম্ভিত। তিনি ক্রন্দন করতে ছিলেন। ক্রন্দন বন্ধ করে তিনি ভয়ার্ত, আশান্বিত দৃষ্টিতে বাবরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বৃদ্ধ শেখ-উল-ইসলাম বাবরের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে রইলেন, যেন হুমায়ূন তখনই রোগশয্যা থেকে উঠে দাঁড়াবেন এবং বাবর সেই রোগশয্যায় পরে যাবেন।
কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। বাবর মুখের ভেতরে কিছু বড়বড়াতে লাগলেন এবং কিছুক্ষণ মৌন হয়ে থেকে চিন্তাক্লিষ্টভাবে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে হুমায়ূন সত্যিই আরোগ্য হয়ে উঠলেন।
* * *
বর্ষা ঋতুর শেষে শরত ঋতু আগমন হলো। মেঘশূন্য পরিস্কার রাতের আকাশ। নীল আকাশে তারাগুলো মুক্তার মতো ঝলমল করে জ্বলতেছিলো।
বাবর নির্মল আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন। কয়েকদিন যাবত তিনি অনিদ্রা রোগে ভূগতেছেন। জ্বরেও তাঁকে দিগদারি দিতেছে কয়েকদিন ধরে। রাতে রাতে জ্বর উঠাটা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়াছে।
বাবর তারাপূর্ণ আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর অনুমান হলো, যেন আকাশটা কাঁপতেছে এবং তারাগুলো বিচরণ করতেছে। শরীরে জ্বর উঠা অবস্থায় বাইরে বেরোলেই যেন তাঁর এরূপ অনুমান হয় আজকাল। কথাটা তিনি কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করতেছেন।
দিনের বেলা সভাসদ, হিতাকাংক্ষী এবং অন্যান্য আত্মীয়-পরিজন পূর্বের মতোই বাবরের খোঁজ-খবর নেন- প্রয়োজনীয় শলা-পরামর্শ খুঁজে। অবশ্যে সবাই যেন তাঁর সাথে আজকাল কম কথা বলে। তাঁর প্রতি সবার ব্যবহার যেন কিছু পরিবর্তন হওয়াটাও তিনি লক্ষ্য করে আসছেন। সবার ব্যবহার যেন পূর্বের থেকে কিছু গম্ভীর এবং শিষ্টতাপূর্ণ। কী যেন এক দুঃশ্চিন্তার ছাপ সবার চোখে-মুখে। সবাই যেন তাঁর সাথে আগের থেকেও অধিক অন্তরঙ্গ হতে চায়। অনুকম্পা দেখাতে চায়। মৃত্যু পথযাত্রীর সাথে করা আচরণই যেন সবাই করছে তাঁর সাথে। বাবর কিন্তু এগুলো লক্ষ্য করে অস্বস্তি অনুভব করেন। সবারই একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, পুত্রের প্রাণরক্ষার জন্য পিতৃর দ্বারা করা কোরবাণি আল্লাহ স্বীকার করেছেন। বাবরের প্রার্থনা অনুসারেই যেন আল্লাহ হুমায়ূনকে নিশ্চিত মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং সেই মৃত্যুর অদৃশ্য তরবারি যেন যেকোনো মুহূর্তে বাবরের মাথায় আঘাত করার জন্য উদ্যত হয়ে রয়েছে।
কোন মৃত্যু পথযাত্রী লোকের প্রতি প্রদর্শন করা সভ্রমপূর্ণ ব্যবহার, অনুকম্পার হাসি, শিষ্টতাপূর্ণ ব্যবহার, অভিবাদন সুখপ্রদ হতে পারে না। বাবরের ক্ষেত্রেও সেটাই হলো। তাঁর প্রতি প্রদর্শন করা অতিরিক্ত আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার দেখে দেখে তাঁরো ধীরে ধীরে অস্বস্তি অনুভব হতে লাগলো। সেজন্য তিনি ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলতে লাগলেন। অধিকাংশ সময় তিনি মাহিম বেগমের সান্নিধ্যে এবং ‘খিলাবত গাহে’ কাব্যচর্চা করে অতিবাহিত করতে লাগলেন।
এদিকে বাবরের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে লাগলো। তাঁর শরীরে কোথাও কোনো ফুট ছিলো না। স্পর্শ করলে কোন যন্ত্রণাও তিনি অনুভব করতেন না। অথচ তিনি যেন হৃদয়ে কোন কিছু জ্বলে থাকা অনুভব করতে লাগলেন এবং বিষণ্ণ ক্লান্তিতে তাঁর দেহ-মন আলোড়িত হতে লাগলো।
হেকিমগণ বাবরের রোগের প্রকার নির্ণয় করতে না পেরে বিচলিত হয়ে উঠলেন। তাঁরা দিনরাত নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে লাগলেন এবং সেই অনুসারে চালিয়ে যেতে লাগলেন ওষুধপথ্যের আতিশয্য। বিষের প্রভাবে রক্তের দোষ হয়েছে বলে অবশেষে তাঁরা সিদ্ধান্তে এলেন এবং প্রচুর পরিমাণে বেদানার রস পান করানোর ব্যবস্থা করলেন।
কিন্তু কোন ওষুধেই রোগের উপরে প্রভাব বিস্তার করতে পারল না। বাবর দিনে দিনে কৃশকায় হয়ে পড়লেন এবং তাঁর জীবনী শক্তিও যেন দ্রুত নিঃশেষ হয়ে আসতে লাগলো।
বাবরের স্বাস্থ্যের অবনতির সংবাদ পেয়ে হুমায়ূন চম্ভল থেকে আগ্রা এলেন।
বিশাল শয়নকক্ষে সাদা বিছনায় কৃশকায় পিতৃকে নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকতে দেখে হুমায়ূনের অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠলো। বিষাদ বেদনাই তাঁর হৃদয় চেপে ধরলো।
হুমায়ূন পিতৃর শিতানে বসে শুকনো অস্থিসার শূন্য মলিন হাতে চুমু খেলেন।
খানজাদা বেগম বাবরের শিতানে বসে ময়ূরের পাখা দিয়ে বাতাস করতে ছিলেন। হুমায়ূনকে বিচলিত দেখে তিনি সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- ধৈর্য ধরুন, শাহজাদা। মনে সাহস সঞ্চয় করুন।
হুমায়ূন পিসির কথার উত্তর না দিয়ে বাবরকে উদ্দেশ্য করে ব্যথা বিগলিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনার কী হয়েছে আব্বা হুজুর? এভাবে জিজ্ঞাসা করেই হুমায়ূন অভিযোগের সুরে বললেন- এটা অন্য কিছুই নয়, এটা আমার জন্য করা কোরবাণির ফল।
হুমায়ূনের চোখে জল প্রত্যক্ষ করে মাহিম বেগমের বুক হাহাকার করে উঠলো। কথা বলতে অসমর্থ হয়ে তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বাবর সতৃষ্ণ নয়নে হুমায়ূনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন; কিন্তু শ্বাসকষ্টের জন্য তিনি কথা বলতে সক্ষম ছিলেন না। শ্বাসকষ্ট অল্প কম হওয়াতে তিনি থেমে থেমে ফিসফিস করে বললেন- আমার পুত্র! আমার রোগ এখন রক্তে মিশে গেছে।
আব্বা হুজুর আমাকে আদেশ দিন….আপনাকে সুস্থ করে তোলার জন্য আমি সব করতে প্রস্তুত।
আমার রোগ সম্পর্ণরূপে আরোগ্য করাটা সম্ভব নয়, পুত্র। যন্ত্রণা শুধু লাঘব করা সম্ভব।
কীভাবে? বলুন, আব্বা হুজুর আমি সেটাই করব। হুমায়ূন ব্যগ্রভাবে বললেন।
উজির-এ-আজমকে ডাকুন…….সাথে পাত্র-মিত্রদেরকেও আসতে বলবেন। আমি তাঁদের সন্মুখে আপনার হাতে শাসনভার সমর্পণ করব।
কিন্তু আব্বা হুজুর, আপনি বিশ্বাস করুন….আপনার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কহিনূর হীরার চেয়েও অধিক মূল্যবান আমার জন্য।
এটা এখন প্রয়োজন, পুত্র। আমি যা বললাম তাই করুন। বাবর দৃঢ়ভারে হুমায়ূনকে নির্দেশ দিলেন।
খানজাদা বেগম ভ্রাতৃর বিছানা ঠিক করে দিলেন। বাবর মাথার তলে আরও একটি বালিশ দিতে বললেন।
অর্ধশায়িত হয়ে দুই একটা প্রয়োজনীয় কথা বলে বাবর ‘দেওয়ানী খাসে’ যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।
দেওয়ানী খাসে এসে বাবর সবার সম্মুখে হুমায়ূনের মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিলেন। পিতৃঋণ পরিশোধ করে বাবর প্রাসাদে ফিরে এসে আবার বিছানায় শোয়ে পড়লেন।
* * *
বাবর তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো বিছানায় পড়ে ছিলেন। বাদশাহ হুমায়ূন, মাহিম বেগম এবং খানজাদা বেগম বাবরের নিকটেই বসে ছিলেন।
মাহিম বেগম হঠাৎ বলে উঠলেন- জাহাপনা, হুমায়ূন নিজেকে আপনার বর্তমানে হিন্দুস্থানের মতো বিশাল সাম্রাজ্যের গুরুদায়িত্ব বহন করার যোগ্য বলে বিবেচনা করতে সাহস পাচ্ছে না।
হুমায়ূনের হাতে সিংহাসনের দায়িত্ব অর্পণ করে বাবর কিছু স্বস্তি অনুভব করছিলেন। মাহিম বেগমের অভিযোগ শুনে তিনি বললেন- এটা ঋণ, বেগম। নিজের সন্তানের হাতে ঋণ ফিরিয়ে দিতে পেরে আজ আমি মুক্ত। বাবর থেমে থেমে বলতে লাগলেন- আমি তৈমূরের উত্তরপুরুষ। তৈমূরের উত্তর পুরুষদের অধিক সংখ্যকই নিজেদের মাঝে মারামারি করে মরেছে। পুত্র পিতৃকে হত্যা করেছে, ছোট ভাই বড় ভাইকে নিধন করেছে। সবাই লোভ এবং কূট-চক্রান্তের শিকার হয়েছে। তাঁদের ভেতরে যারা সৎ ছিলেন, তাঁরা নিজের সজ্জনতার বলি হয়েছেন। খানজাদা বেগমের দিকে ইশারা করে বাবর আবেগিক কণ্ঠে বললেন- যেভাবে আপাজান আমাকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সারাটা জীবন বন্দিত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন। আপাজান ভ্রাতৃর মঙ্গলের জন্য নিজের সুখ-স্বচ্ছন্দ, কামনা-বাসনা ত্যাগ করে নির্বাসিতা জীবন অতিবাহিত করছেন। আপাজানের নিকট থেকে আমি ত্যাগের পাঠ শিখেছি। হুমায়ূনও নিজের ভ্রাতৃ, সন্তান-সন্ততিকে আত্মত্যাগ ও সজ্জনতার পাঠ শিখাতে হবে।
বাবর মাথা ঘুরিয়ে শিতানের দিকে টানিয়ে রাখা রেশমি পর্দার দিকে তাকালেন। হুমায়ূন দেখলেন শিতানের দিকে মাটির মূর্তির মতো নির্বিকার নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাহির বেগ।
তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বাবর বললেন- তাহির বেগ, আপনি আমার গ্রন্থটি এখানে নিয়ে আসুন।
পর্দার পেছনে দেয়ালের সাথে সংলগ্ন একটি রেক। রেকের মাঝে সাজিয়ে রাখা ছিলো বিভিন্ন মূল্যবান গ্রন্থ। গ্রন্থসমূহের মাঝে পাকাবান্ধা একটি গ্রন্থ একটি চামড়ার থলেতে ভরিয়ে সযত্নে রাখা ছিলো। বাবরের নির্দেশ পেয়ে তাহির বেগ রেক থেকে থলেটা বের করে এনে সসম্মানে বাবরের হাতে দিলো। বাবর থলেসহ গ্রন্থটি দু’হাতে ধরে হুমায়ূনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- মনে পড়ে নাকি পুত্র, একদিন কাবুলের নিকটে একটি পাহাড়ে বসে থাকা অবস্থায় আপনি আমার আত্মজীবনী খুঁজার কথা? বাবর গ্রন্থটি হুমায়ূনের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন- এই যে নিন, আপনি খুঁজা সেই আত্মজীবনী। যতদূর সম্ভব আমার কথাগুলো আমি লিখে শেষ করেছি। এই গ্রন্থটি লিখতে আমি বার বছর সময় নিয়েছি।
সেদিন বাবর বলা কথাটা হুমায়ুনের মনে পড়ে গেলো। বাবর সেদিন একটি পাহাড়ের উপরে বসে নিজের আত্মজীবনী লিখছিলেন। কৌতূহলবশতঃ হুমায়ূন পাহাড়ের উপরে চড়ে গিয়ে বাবরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- কী করছেন, আব্বা হুজুর?
বাবর কাগজ কলম পাশের একখণ্ড পাথরের উপরে রেখে বলেছিলেন- আমার জীবনের ঘাত-সংঘাত, অভিজ্ঞতা-ব্যর্থতা, জয়-পরাজয়ের সত্য কাহিনী লিখছি, পুত্র।
হুমায়ূন বালকসূলভ কৌতূহল প্রকাশ করে বলেছিলেন- আমি পড়তে পারব নাকি, আব্বা হুজুর?
বাবর তখন নির্বিকারভাবে বলছিলেন- নিশ্চয় পারবেন। তবে, এখনই নয়। কিতাপটি লিখা সমাপ্ত হলে তখন পড়তে পারবেন। একটা কথা জেনে রাখুন, এই কিতাপটি শেষ হওয়া মানে আমার জীবনের অন্তিম সময় উপস্থিত হবে। এভাবে বলে বাবর গ্রন্থটি হুমায়ূনের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।
বাবর বাড়িয়ে ধরা গ্রন্থটি হুমায়ূন দু’হাতে ধরে মাথায় স্পর্শ করলেন। তারপর গ্রন্থটি মাথা থেকে নামিয়ে চুমা খেলেন। চুমা খাওয়ার সময়ে হুমায়ূনের চোখ থেকে জল গড়িয়ে একফোঁটা জল গ্রন্থের উপরে পড়ল।
বাবর থেমে থেমে বলতে লাগলেন- আমার অন্তিম ইচ্ছার কথা মনে রাখবেন। এই গ্রন্থটি আমার সন্তান-সন্ততিরা পড়া উচিত হবে। এই গ্রন্থটি পড়ে আমি করা ভুলগুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি করা না হয় সেই শিক্ষা নিতে হবে। আমার ভালো কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে এবং খারাপ কাজগুলো পরিত্যাগ করতে হবে। এই গ্রন্থটির নকল প্রস্তুত করে সমরকন্দ, তাসকন্দ এবং আন্দিজান পাঠিয়ে দিতে ভুলবেন না। কে জানে, এই গ্রন্থটি-ই হয়তো একদিন হিন্দুস্থান এবং মাউরা উন্নহরের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে!
খানজাদা বেগমের উপলব্ধি হলো, বাবর যেন গ্রন্থটি নয়, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ‘উইল’(ইচ্ছাপত্র) একটি ছেড়ে যাচ্ছেন। তিনি ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না। অশ্রুসজল নয়নে আবেগিক কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন- বাবরজান, আমার প্রাণাধিক ভাই, আমি আপনার বড় বোন। আমি আপনার চেয়ে বয়সে পাঁচ বছরের বড়। যদি আমাদের দু’জনের মধ্যে একজন এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়, নিয়মমতে আমিই আগে যাব। আপনি আমার থেকে আগে যেতে পারবেন না, বাবরজান। বাবরজান…..আমার ভাই……না না। খানজাদা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
খানজাদা বেগম ‘বাবরজান’ বলে সম্বোধন করার সাথে সাথে বাবর তাঁর শৈশবে ফিরে গেলেন। মনে পড়ে গেলো পিতৃ-মাতৃর কথা। তাঁরা এখন নিশ্চিন্তে শোয়ে রছেছেন মাউরা উন্নহরের মাটিতে এবং তিনি…..মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য অতীতে ফিরে গিয়ে সাথে সাথেই আবার বাস্তবে ফিরে এলেন।
দরবারের আদব-কায়দা অনুসারে বেগ, চাকর-বাকর, পুত্র, প্রিয়তমা পত্নী দ্বারা ‘জাহাপনা’ সম্বোধন বাবরের কছে অসহ্যকর হয়ে উঠলো। সেজন্য তিনি হুমায়ূনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আমাকে একবার আব্বা বলে সম্বোধন করুন, পুত্র।
আব্বা। আব্বাজান। হুমায়ূন ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
সাথে সাথে মহিলারা সমবেত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন।
সংযোগবশতঃ বাবর আত্মীয় পরিজনের নিকট থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ে হেকিম ইউসূফ বেগ এসে সেখানে উপস্থিত হলেন।
বাবর তখন ঘেমে-জেমে উঠেছিলেন। শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। কণ্ঠ থেকে ঘর্ঘর শব্দ বের হচ্ছিলো।
জাহাপনা, আপনি এখন বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। হেকিম ইউসূফ বেগ এভাবে বলে মখমলের সাদা কাপড় দিয়ে বাবরের মুখমণ্ডল মুছে দিলেন। তারপরে মাহিম বেগম এবং খানজাদা বেগমকে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করে বললেন- আপনারা বাইরে যান।
উভয়ে নিঃশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
হেকিম হুমায়ূনের কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন- আপনার মাথায় এখন গুরু দায়িত্বের বোজা। আপনিও যান।
বাবরের শুকনো আঙুলে চুমা খেয়ে হুমায়ূন নিঃশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং হেকিমো তাঁর পেছনে পেছনে বেরিয়ে এলেন।
পরিজনবর্গ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে বাবর আবার চেতনা ফিরে পেলেন। চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি শিতানের দিকে দাঁড়িয়ে বাতাস করে থাকা তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনি বাস্তুকার ফজিলুদ্দিনকে ডেকে আনুন।
তাহির বেগ দরজার কাছে এগিয়ে এসে ফজিলুদ্দিনকে ডেকে আনার জন্য একজন রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন।
শিল্পী ফজিলুদ্দিন কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে বাবরের চর্মসার দেহ প্রত্যক্ষ করে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি মরণোন্মুখ বাবরের দিকে না তাকানোর প্রয়াস করে পালেঙের নিকটে বসলেন। তিনি কোনমতে বাষ্পারুদ্ধ কণ্ঠে বললেন- জাহাপনা, আপনি বিশ্বাস করুন, আপনার সৎকর্ম আপনাকে দীর্ঘজীবী করবে।
এখন আমাকেও মৌলানা বলে সম্বোধন করুন, কারণ আমি সিংহাসন হুমায়ূনকে সমর্পণ করেছি।
কিন্তু আপনার নিকট শায়েরির সিংহাসন এখনও সুরক্ষিত, জাহাপনা। হিরাতে আলীশের নবাইকে সবাই হজরত আলীশের বলে সম্বোধন করতেন। আপনি আমাদের মাতৃভাষাকে আরবি এবং ফার্সির সম মর্যদা সম্পন্ন করে তুলেছেন। আলীশের নবাই জীবিত অবস্থায় এই স্বপ্ন দেখেছিলেন। আপনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে তুলেছেন। সেজন্য রাজ সিংহাসন ত্যাগ করলেও শায়েরির সিংহাসন আপনি কোনদিন ত্যাগ করতে পারবেন না, জাহাপনা।
ধন্যবাদ মৌলানা। আপনি আগ্রা এবং ফতেহপুড় সিক্রিতে আশ্চর্য সৌধ নির্মাণ করেছেন। বেহেস্তের মতো বাগানও আপনি নির্মাণ করেছেন। আল্লাহ যদি আমার আয়ু আরও বাড়িয়ে দিতেন, তাহলে আমার অনেক দিনের স্বপ্ন…..সমরকন্দের ‘বিবি খানম’ মাদ্রাসার মতো একটি সৌধ নির্মাণ করাতাম। কী মনোরম সুন্দর সেই মাদ্রাসার সৌধ! আপাজানের নামে সেরকম একটি সৌধ নির্মাণ করা উচিত।
খানজাদা বেগমের নাম শুনে ফজিলুদ্দিন উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। বয়সের আঁচড়েও ফজিলুদ্দিন এবং খানজাদা বেগমের পবিত্র প্রেমে ফাটল ধরাতে পারেনি। এখনও পরস্পরে পরস্পরকে আগের মতোই ভালবাসেন। অবসর সময়ে একজন আরেকজনের কথা ভেবে পুলক অনুভব করেন। সেজন্য খানজাদা বেগমের নামে নামকরণ করে সৌধ নির্মাণের কথা শুনে তিনি আগ্রহ সহকারে বললেন- আসলে মহিলাদের নামে নামকরণ করে সুন্দর সুন্দর সৌধ নির্মাণ করে মহিলাদের যশ ও গৌরব বৃদ্ধির পরম্পরা পূর্ব থেকেই চলে আসছে, জাহাপনা। সমরকন্দের বিবি খানম মাদ্রাসা বিখ্যাত মাদ্রাসা। হিন্দুরাও মহিলাদের খুব সন্মান করেন। তাঁরা যেসব দেব-দেবীর আরাধনা করেন তার ভেতর দেবীও রয়েছে–লক্ষ্মী, সরস্বতী, পার্বতী প্রভৃতি।
মৌলানা, আমার আপাজান খানজাদা বেগম, আপনি জানেন, নিষ্ঠুর নিয়তি ……..আপনাদের দু’জনকে সুখী হতে দিলে না। আমার জন্যই আপনাদের স্বপ্ন বাস্তাবায়িত হলো না.………বাবর আবার পূর্বের প্রসংগে ফিরে এলেন- মাদ্রাসা…..যার স্বপ্ন আপনি অনেকদিন থেকে দেখে আসছেন……যদি নির্মাণ করতে পারেন…….সেই মাদ্রাসার নাম ‘খানজাদা বেগম’ রাখবেন।
আপনি আমার মনের কথা বলেছেন, জাহাপনা। এটা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। ফজিলুদ্দিন আবেগিকভাবে সহজ সরল ভাষায় বললেন- যদি সেই সব কাজ সফল করার জন্য আয়ু আমাকে সহায় না করে, তাহলে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সেই দায়িত্ব আমার পুত্রকে দিয়ে যাব। সে হিন্দুস্থানী কারিকরের সাথে যুক্ত হয়ে নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করবে।
বাবর আবার ঘামে ভিজে উঠলেন। রেশমি সাদা কামিজ তাঁর শরীরে লেগে ধরলো।
মামাজান, তাহির বেগ শংকিত কণ্ঠে বললো- হেকিমের নির্দেশ— জাহাপনাকে যেন বেশি বিরক্ত করা না হয়।
ফজিলুদ্দিন সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বাবরের হাতে চুমা খেলেন।
ইতিমধ্যে বাবরের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিলো। যারজন্য তিনি হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলতে লাগলেন- আপনার নিকট আমার……….আরও একটি অনুরোধ…….কাবুলে একটি বাগান রয়েছে…..সেটা আপনিই নির্মাণ করেছিলেন…….আমার শেষ আরামগাহ…….. অনাড়ম্বরভাবে সেখানেই নির্মাণ করবেন।
বিষাদ-বেদনায় ফজিলুদ্দিনের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। তিনি মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। শুধু সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে এক প্রকার দৌড়ে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
তাহির বেগ বিছানার চাদর পরিবর্তন করে নতুন চাদর পেতে দিলো। বাবর রোগশয্যায় আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে সকল প্রকার পরিচর্যার কাজ তাহির বেগই সামলাচ্ছিলেন। ওষুধ-পথ্য, পিপাসা লাগলে জল, ঘেমে উঠলে ঘাম মুছানো, বাতাস করা, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হলে সহায় করে দেওয়া এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক কাজগুলো সে আন্তরিকতা ও দায়িত্ব সহকারে সামলাচ্ছিলেন। এইসব কাজের জন্য তাহির বেগ কাউকে পালেঙের নিকট পর্যন্ত আসতে দিত না।
আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে থাকার জন্য সেদিন যথেষ্ট গরম পড়েছিলো। রাতের গভীরতা বেড়ে আসার সাথে সাথে গরমের মাত্রাও বেড়ে আসতে লাগলো। অত্যধিক গরমের জন্য বাবর অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলেন। যারজন্য তাহির বেগ কয়েকজন পরিচারকের সহযোগে পালেঙ বারান্দায় নিয়ে এলো।
বাইরে আন্দিজানের মতো পাতল ঠাণ্ডা অনুভূত হওয়ায় বাবর কিছু স্বচ্ছন্দ অনুভব করতে লাগলেন।
বিছানায় শোয়ে বাবর আকাশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
আকাশে তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলছিলো। বাবর তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে পড়লেন। তাঁর অনুমান হলো, তারাগুলো যেন বিচরণ করতেছে। একটা তারা যেন আরেকটি তারাকে নির্দয়ভাবে ধাক্কা মারতেছে। দৃশ্যটা বাবরের মনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। প্রচণ্ড ভয়ে তিনি তাহির বেগকে ডাকলেন- তাহির বেগ আমার কাছে আসুন।
তাহির বেগ অল্পদূরে দাঁড়িয়ে পরিচারকদের সাথে কথা বলতে ছিলো। বাবরের ভয়ার্ত কণ্ঠের ডাক শুনে সে দৌড়ে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন- কী হলো, জাহাপনা? কিছু লাগবে নাকি?
বাবর চোখ মুদে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন- আমার শরীর শিথিল হয়ে আসছে, তাহির বেগ।
তাহির বেগ উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- হেকিম ডেকে আনব নাকি, জাহাপনা?
না হেকিম ডাকতে হবে না। আপনি আমার শরীরটা একটু মালিশ করে দিন।
আচ্ছা, আপনি শোয়ে থাকুন। আমি আপনার হাত-পা মালিশ করে দিচ্ছি।
তাহির আস্তে আস্তে বাবরের কান্ধ, হাত-পা মালিশ করে দিতে লাগলো। কিছুক্ষণ নিশ্চল হয়ে পড়ে থেকে বাবর আবার আকাশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
বাবরের অনুমান হলো, যেন কালো আকাশের বিশালতায় তারাগুলো স্থির হয়ে আগুনের আংটার মতো গনগন করে জ্বলতেছে। এবার তিনি ভয় পেলেন না। তারাগুলোর মাঝ থেকে তিনি সপ্তর্ষিমণ্ডল, ধ্রুবতারা এবং পূর্ব আকাশের কৃত্তিকা নক্ষত্র খুঁজতে লাগলেন।
তাহির বেগও আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলো। সে হঠাৎ উৎসাহিত কণ্ঠে বলে উঠলো-ওই যে, ঔই দিকে দেখুন, জাহাপনা। ঔই তারকারাজ্যের দিকে তাকান। আমাদের কুবা থেকেও তারকারাজ্য এরকমই দেখা যেতো।
বাবরের মন আন্দিজান এবং আন্দিজানে ছোটবেলা অতিবাহিত করা ছেলেবেলার দিনগুলোতে ফিরে গেলো।
বাবর ছেলেবেলা শুনছিলেন, যে সপ্তর্ষিমণ্ডল হীরার ঘুড়ি। আকাশী বায়ুর সাহায্যে সপ্তর্ষিমণ্ডল মনের আনন্দে হীরার পুচ্ছ নাচিয়ে নাচিয়ে উত্তরোত্তর উপরের দিকে উঠতে থাকে; কিন্তু এক অদৃশ্য সূতো দিয়ে ধ্রুবতারার সাথে বেঁধে রাখার জন্য বেশি দূরে চলে যেতে পারে না।
ছেলেবেলা শুনা সেই কাহিনী বাবরের মনে পড়ে গেলো। আন্দিজানের আকাশের মতো আগ্রাতেও তারার অবস্থান একই হওয়াতে তাঁর মন চাঙ্গা হয়ে উঠলো। ফলে তিনি ছেলেবেলার দিনগুলোতে কিছু সময় বিচরণ করতে মনস্থ করলেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
তারাগুলো আবার কুমারের চাকের মতো চক্রাকারে ঘুরতে লাগলো। হঠাৎ যেন তারার সেই ঘূর্ণি বাবরের উপর খসে পড়লো। পরের মুহূর্তে এক অদৃশ্য শক্তি যেন তাঁকে সাদরে ধরে শূন্যে উড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগলো।
এক সুগভীর অনুভূতিতে বাবর চোখ মুদলেন…….।।
সমাপ্ত
